Friday, January 22, 2016

ব্যাংকঋণের সুদ ও সঞ্চয়পত্রের মুনাফা by আলী ইমাম মজুমদার

দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দাবি রয়েছে ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা। এটা স্বাভাবিক, ব্যাংকঋণের সুদ যত কম হবে, শিল্প স্থাপন ও পরিচালনা ব্যয়ও তত কমবে। বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এগিয়ে থাকার সুযোগ পাবেন আমাদের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা। শিল্প ও ব্যবসা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এগুলোর প্রসার যতটা ঘটবে, ততই বাড়বে কর্মসংস্থান ও সরকারি রাজস্ব। বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও বৃদ্ধি পেতে থাকবে। অর্থনীতির অন্য খাতগুলো আরও চাঙা হবে। ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সামাজিক খাতেও। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা তাদের জীবনযাত্রার মানও বাড়াবে। সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির সুফলও ভোগ করবে জনগণ। তাই দেশের শিল্প–বাণিজ্যের প্রসার সবারই কাম্য। সরকারও এ বিষয়ে সচেতন এবং বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। রয়েছে ট্যাক্স হলিডে ও রপ্তানি প্রণোদনা বোনাস। রপ্তানিমুখী শিল্পমালিকদের পণ্য বিক্রির পর্যায়ে অতি সামান্য অগ্রিম আয়কর নেওয়া হয়। আর তাই বিবেচিত হয় চূড়ান্ত আয়কর বলে। তৈরি পোশাকশিল্পসহ কতিপয় শিল্পে আমদানি পর্যায়েও কম সুদে ব্যাংক এলসি খোলে। এগুলো যৌক্তিক। সম্ভব হলে এসব প্রণোদনার আওতা আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
এখন বেশ কিছুদিন ধরে বলা হচ্ছে, ব্যাংকগুলো অলস টাকার ওপর বসে আছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্র পাচ্ছে না। তারা আমানতকারীদের মুনাফাও কমিয়ে দিয়েছে অনেক। তাই কস্ট অব ফান্ড কমে যাওয়ারই কথা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ স্প্রেড। ব্যাংক খাতে অস্বচ্ছতার অভিযোগ বেশ কিছুকাল যাবৎ শোনা যাচ্ছে। এমনকি বিদেশি ব্যাংকগুলোর কোনো কোনোটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশাবলি কৌশলে এড়িয়ে যায়—এমন অভিযোগও আছে। কস্ট অব ফান্ডের প্রকৃত হিসাব নিরূপণ আর নির্ধারিত সীমার মধ্যে স্প্রেড রাখা হচ্ছে কি না, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিবিড় তদারকি আবশ্যক। তা করা গেলে ঋণের সুদের হার কিছুটা কমেও আসবে। অবশ্য তা ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে। তবে এক অঙ্কে (১০ শতাংশের নিচে) নিয়ে আসা কতটা সম্ভব, সেটা আলোচনার দাবি রাখে।
জনগণকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগমুখী করতে ‘চঞ্চল টাকা অঞ্চলে বেঁধো না’ এরূপ বলা হতো ষাটের দশক থেকে। ঋণ দিতে এমনকি ব্যাংক চালাতে টাকা দরকার। আর তা আসে আমানতকারীদের কাছ থেকেই। সে আমানতকে উৎসাহ দিতে চালু হয় বিভিন্ন ধরনের মেয়াদি আমানতের ওপর মুনাফা। এটা সময়ে সময়ে কমে–বাড়ে। অবশ্য ব্যাংকব্যবস্থার সূচনার আগেই আমাদের দেশে ডাকঘরের মাধ্যমে বিভিন্ন সঞ্চয় স্কিম চালু করা হয়। কালের বিবর্তনে এটা জোরদার করতে একটি অধিদপ্তরও প্রতিষ্ঠা করা হয়। অবশ্য এটা একপর্যায়ে ছিল ব্যুরো, এরপরে পরিদপ্তর আর এখন অধিদপ্তর। ডাকঘর এবং এ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংগৃহীত সঞ্চয় থেকে সরকার ঋণ নেয় বাজেট ঘাটতি মেটাতে। সময়ে সময়ে ব্যাংক থেকেও ঋণ নিতে হয় সরকারকে। কিন্তু ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকব্যবস্থার ওপর সরকার অতিরিক্ত নির্ভরশীল হলে বেসরকারি খাত তহবিল সংকটে ভোগে। সে বিবেচনায় সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংগৃহীত অর্থই নিরাপদ। তবে সরকার এ দায়
শোধ করতে সুদ পরিশোধ করতে হয় একটু চড়া হারে। তাই গোটা ব্যবস্থায় একটা ভারসাম্য রাখতে হয়। ইদানীং বিশ্ববাজারে তেলের দামসহ অনেক পণ্যের দাম কমে গেছে। তেলের দাম তো কমেছে অস্বাভাবিক পরিমাণে। তাই ভর্তুকি খাতে সরকারের ব্যয় হ্রাস পেয়েছে অনেক। ফলে কমেছে ঋণনির্ভরতা। অন্যদিকে উদ্যোক্তা শ্রেণি ঋণের সুদ কমাতে দাবি জোরদার করছে। সেটা কীভাবে আর কতটুকু সম্ভব, তা খতিয়ে দেখছে সরকারের বিভিন্ন মহল। অবশ্য অর্থমন্ত্রী বলেই ফেলেছেন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এক মাসের মধ্যে কমিয়ে ফেলা হবে।
জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের আওতায় বেশ কয়েক ধরনের সঞ্চয়পত্র আছে। এগুলোতে সুদের হার বরাবর কমবেশি ১৩ শতাংশ ছিল। গত বছরের জুনে সরকার এক ধাপে সবগুলো সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়ে দিল শতকরা প্রায় ২ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর মেয়াদি আমানতের ওপর সুদের হার ৬ থেকে ৭ শতাংশে থাকছে। তাই অনেকে সে আমানতপত্রগুলো ভাঙিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। প্রশ্ন আসবে এরা কারা? এঁদের একটি বিশাল অংশ পেনশনভোগী, নারী এমনকি প্রতিবন্ধী প্রায় সবাই সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এ ধরনের সঞ্চয়পত্র ক্রেতার সংখ্যা কত তা সঞ্চয় অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে নেই। তবে জানা যায়, সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় বছরে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। হতে পারে এখানে লাভের অঙ্ক বেশি দেখে কোনো কোনো সম্পদশালী লোকও বিনিয়োগ করেছেন। তবে তঁাদের বিনিয়োগের পরিমাণ যা-ই হোক সংখ্যায় অতি কম, এটা জোর দিয়ে বলা যায়।
এ অধিদপ্তরের শাখাগুলোতে লেনদেনের সময় একটি জরিপ চালালে মোটামুটি তথ্যটির যথার্থতা পাওয়া যাবে। একতলা থেকে দোতলায় উঠতে কষ্ট হয়, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, ব্যাগে রাখা পানির বোতল থেকে মাঝেমধ্যে পানি খাচ্ছেন কিংবা নিচ্ছেন ইনহেলার এরূপ দৃশ্যই চোখে পড়বে অহরহ। কারও হয়তো সারা জীবনের সঞ্চয় এখানেই আছে। সংসার চলে এর মুনাফা থেকেই। প্রয়োজন হয় চিকিৎসা ব্যয়, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া ও বিয়ের খরচও। তাঁরা বিনিয়োগের মুনাফা আরও কমলে যাবেন কোথায়। একবার তো অনেকেই চলে গিয়েছিলেন শেয়ারবাজারে। এ অফিসগুলোর খাঁ-খাঁ করত—এ দৃশ্যও সেদিনের। সে শেয়ারবাজার আর বিনিয়োগকারীদের কী হয়েছে, এটা কি আলোচনার অপেক্ষা রাখে? সেখানে বিনিয়োগ করেও যদি নিয়মমতো ডিভিডেন্ড পাওয়া যেত, তবে অনেকেই হয়তো তাই করতেন। কিন্তু সে বাজারের ওপর আস্থা রাখার কোনো কারণ গত পাঁচ বছরে ঘটেনি। ভারতের অর্থনীতি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও সেখানে সঞ্চয়পত্রে প্রচুর বিনিয়োগ আছে। মুনাফার হার আমাদের চেয়ে কিছুটা কম হলেও সামাজিক নিরাপত্তাবলয় অনেক জোরদার। জীবনযাত্রার ব্যয় আমাদের চেয়ে বেশ কম।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের দীর্ঘ ধারাবাহিক ঐতিহ্য রয়েছে। এটা পরিচালিত হয় ১৯৪৪ সালের পাবলিক ডেবট অ্যাক্ট এবং ১৯৭৭-এর সঞ্চয়পত্র বিধিমালা অনুসারে। এ অধিদপ্তরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রধানত সঞ্চয়ের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ, ছড়িয়ে থাকা সঞ্চয় জাতীয় স্কিমের মাধ্যমে আহরণ, আহরিত অর্থ দ্বারা বাজেট ঘাটতি পূরণ, বিশেষ জনগোষ্ঠী যেমন মহিলা, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় আনা, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা। অধিদপ্তরটি নগণ্য জনবল ও অপ্রতুল অবকাঠামো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তবে তাদের প্রধান সম্পদ আমানতকারী জনগণ। এরা হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে সংস্থাটির কার্যকারিতা হ্রাস পাবে।
শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে বিভিন্ন ব্যবস্থায় কারও আপত্তি নেই। কিন্তু একটি সামাজিক নিরাপত্তাবলয় ভেঙে বিশাল জনগোষ্ঠীকে কার্যত পথে বসিয়ে এমনটা করা অসংগত হবে। বর্তমান অবস্থায় ব্যাংকগুলোও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেক ব্যাংক রয়েছে দেশে। সংখ্যা এখন ৫৬। জানা যায়, মালয়েশিয়ায় তা ষোলো থেকে ছয়ে হ্রাস করা হয়েছে। সেদিন এক সেমিনারে বিশিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদেরা মন্তব্য করেছেন, বেশি ব্যাংক হওয়ায় তাঁদের ব্যবসার পরিসর হ্রাস পেয়েছে। বেড়েছে ব্যয়। আর বিনিয়োগের সুদের হার না কমার এটাও একটা কারণ। যুক্তিটি না মানার সুযোগ নেই। আর ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এতে অবদান রাখে এমনটা বললেও বাহুল্য হবে না।
সুদের হার কমাতে গিয়ে প্রয়োজনে সরকার ভর্তুকির আকারে কিছু ছাড়ও দিতে পারে। যেমনটা দেওয়া হয় ফসলি ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পঋণ ইত্যাদি খাতে। আর অন্য দেশের মতো সুদের হার খুবই কম থাকতে হবে—এমনটাও কিন্তু প্রয়োজন নয়। রপ্তানিতে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর এসব দিকে কিছু সুবিধা থাকলেও শ্রমমূল্য বেশি। অদক্ষ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ভারতে আমাদের প্রায় দ্বিগুণ আর ভিয়েতনামে তিন গুণের কাছাকাছি। সময়ান্তরে আমাদেরও হয়তো আরও কিছু বাড়বে। কম মূল্যের শ্রমের সুফলও ভোগ করছেন আমাদের উদ্যোক্তারা। আমরা জনগণের স্বার্থেই একটি বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ চাই। পাশাপাশি সমাজের দুর্বল অংশের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাবলয়টি আর ক্ষয় না হোক এটাও চাই।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

শোক পালন, মাথা না নোয়াবার প্রত্যয়

পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গি হামলায় আহত এক শিক্ষার্থীকে
২০১৪ সালে পেশোয়ারের স্কুলে তালেবান হানায় নিহত সন্তানের
ছবি দেখিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এক মা। গতকাল চার
সাদার হাসপাতাল থেকে তোলা ছবি। এএফপি
পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গি হামলায় শিক্ষার্থীসহ ২১ জন নিহতের ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার এক দিনের শোক পালন করা হয়েছে। দেশটির সহিংসতাপ্রবণ খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের চারসাদা শহরের বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বুধবার ওই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার নেপথ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। খবর এএফপির। বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন উঁচু ভবনের ছাদে গতকালও সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল। সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকায় গতকাল সকালে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের কাছে একটি জনবহুল বাসস্টেশনে বোমা হামলার পরিকল্পনা ভন্ডুল করে দেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। বোমা পেতে রাখার সময় এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। বুধবারের হামলার ঘটনাস্থল চারসাদা শহর পেশোয়ারের মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরে। বুধবারের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের একজন ছিলেন বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক ফখর-ই আলম।
গতকাল তাঁর জানাজায় প্রায় এক হাজার মানুষ অংশ নেন। তাঁর বাবা শাহ হুসেইন বলেন, ‘আমি সন্ত্রাসীদের বলতে চাই, তারা কোনো দিন জিততে পারবে না। আমরা শান্তি চাই, সন্ত্রাস নয়।’ আহত শিক্ষার্থীদের একজন গতকাল মারা গেছেন। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগের দাফন বুধবারই হয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের শিক্ষামন্ত্রী আরিফ খান বলেন, ‘জঙ্গিরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চায়। কিন্তু আমরা তাদের কাছে এই বার্তা দিতে চাই যে শিক্ষা কার্যক্রম চলবেই।’ শোক পালন উপলক্ষে গতকাল রাজধানী ইসলামাবাদের সরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে মোনাজাত অনুষ্ঠানে পাকিস্তান ক্রীড়া বোর্ডের (পিএসবি) দুই শতাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। পিএসবির পরিচালক আখতার নওয়াজ বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত, পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম সন্ত্রাসের কাছে মাথা নত করবে না।’

সুরেলা গানে মিলল নতুন প্রজাতির পাখি

হিমালয়ের বন দামা, বিরল গেছো ব্যাঙ
সুরেলা গান শুনেই আবিষ্কৃত হলো হিমালয় অঞ্চলের গানের পাখির নতুন এক প্রজাতি। ভারতের উত্তরাঞ্চল ও চীনের বনাঞ্চলে থাকে বলে বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন হিমালয়ান ফরেস্ট থ্রাশ বা হিমালয়ের বন দামা। বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে জুথেরা সালিমআলী। ভারতের প্রয়াত খ্যাতনামা পক্ষীবিজ্ঞানী ড. সালিম আলীর স্মরণেই এই নামকরণ। খবর বিবিসির। সংশ্লিষ্ট পাখি পর্যবেক্ষকেরা লক্ষ করেন, পাথুরে পাহাড় চূড়া এলাকায় থাকা থ্রাশ বা দামা পাখির চেয়ে বনে থাকা দামার গান অনেক বেশি সুরেলা। তাদের মধ্যে শারীরিক পার্থক্যও চিহ্নিত হয়েছে। পাখিটির পাহাড়ে বসবাসরত প্রজাতির পুনর্নামকরণ করা হয়েছে ‘আলপাইন থ্রাশ’। এ গবেষণা কাজে সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পের আলস্ট্রাম একটি আন্তর্জাতিক দলের সঙ্গে কাজ করেছেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে নতুন প্রজাতির পাখি আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কাজেই এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।’ ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতে আবিষ্কার হওয়া নতুন মাত্র চতুর্থ প্রজাতির পাখি এটি। বিরল গেছো ব্যাঙ: ভারতে ১৩৭ বছর পর বিরল একধরনের গেছো ব্যাঙ আবার আবিষ্কৃত হয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, এটি বিলুপ্ত। ভারতের প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী সত্যভামা দাস বিজু ও একদল বিজ্ঞানী দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গলে এর সন্ধান পান। এই ছোট ব্যাঙটির আয়তন গলফ বলের সমান। মাটি থেকে বেশ ওপরে গাছের গর্তে থাকে এরা। গাছে কেবল থাকেই না, পোকামাকড়ের বদলে এরা খায়ও গাছপাতা।

পুলিশি তল্লাশি এবং তদন্তের নির্মমতা by গোলাম মাওলা রনি

বন্ধুর বাসায় নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে অদ্ভুত এক সমস্যার কথা শুনলাম। বন্ধুটি পেশায় উকিল এবং সরকারি দলের একজন মাঝারিগোছের নেতা। থাকেন উত্তরায়। দু’টি মেধাবী সন্তান নিয়ে তার গর্বের অন্ত নেই। উত্তরার রাজউক স্কুল অ্যান্ড কলেজে অধ্যয়নরত বড় ছেলেটি ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে এবং ছোটটি অষ্টম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। ছেলেরা প্রতি বিকেলে বাসার সামনে খেলতে যায় এবং সন্ধ্যা নামার আগেই বাসায় ফেরে। সব কিছু এভাবেই চলছিল। হঠাৎ করেই বিপত্তি দেখা দিলো কোনো এক সন্ধ্যায়। ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় ছেলেরা বাসায় ফিরল এবং পরপর কয়েক দিন মনমরা হয়ে থাকল। বাবা-মা অনেক প্রশ্ন করার পরও জবাব দিলো না। দিন দশেক পর তারা পুনরায় খেলতে যেতে শুরু করল অদ্ভুত এক পোশাক পরে। তারা পকেটবিহীন গেঞ্জি এবং ঢোলা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট কিনে আনলো এবং জাইঙ্গা ছাড়া প্যান্ট পরে খেলতে যেতে আরম্ভ করল।
পকেটবিহীন গেঞ্জি এবং পকেটবিহীন প্যান্ট জাইঙ্গা ছাড়া পরিধানের কী কারণ, এমনতরো প্রশ্ন বহুবার করার পরও সন্তানদের কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে আমার বন্ধু এবং তার স্ত্রী ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আমাকে পেয়ে তারা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। কারণ ছেলেরা আমাকে ভীষণ পছন্দ করে এবং তাদের অনেক গোপন কথা খোলামেলাভাবে আমার কাছে প্রকাশ করে। আমি ছেলেদের জিজ্ঞেস করে যা জানতে পারলাম তার সারমর্ম হলো- তারা যখন মাঠে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলে বাসায় ফিরছিল- ঠিক তখন দু-তিনজন পুলিশ এসে তাদের দুই বন্ধুকে ধরে ফেলে। তল্লাশির নামে পুলিশ কলেজপড়–য়া সেই দুই তরুণের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে- এই তো পেয়েছি, শালার পো শালারা ইয়াবা খাও। চলো, থানায় চলো। আমার বন্ধুর ছেলেরা এই দৃশ্য দেখে কালবিলম্ব না করে ভোঁ-দৌড় মেরে বাসায় চলে আসে। পরে তারা জানতে পারে যে, বেশ মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে তাদের বন্ধুরা ইয়াবা মামলার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল বটে, কিন্তু বিনিময়ে দু’জনকেই পিতার হাতে বেদম পিটুনি খেতে হয়েছিল এবং শাস্তিস্বরূপ চিরতরে মাঠে এসে ক্রিকেট খেলা বন্ধ হয়েছিল।
আমার বন্ধুর ছেলেরা বিষয়টি পরিবারকে জানায়নি এ কারণে যে, তাদের পিতামাতা হয়তো তাদের খেলতে যাওয়া বন্ধ করে দেবেন। তারা অনেক ভেবেচিন্তে বের করল যে, তাদের বন্ধুদের প্যান্টের যদি পকেট না থাকত তাহলে পুলিশ তো হাত ঢুকানোর সুযোগ পেত না। এ জন্য তারা দোকান থেকে পকেটবিহীন গেঞ্জি কিনল এবং মহল্লার টেইলারিং শপ থেকে বিশেষ ডিজাইনের পকেটবিহীন প্যান্ট বানিয়ে আনল। অতিরিক্ত এবং বাড়তি সতর্কতা হিসেবে তারা জাইঙ্গা ছাড়া প্যান্ট পরে খেলতে যেতে শুরু করল, যাতে কোনো পুলিশ তল্লাশির নামে জাইঙ্গার ভেতর হাত ঢুকিয়ে চিৎকার করে বলতে না পারে- গুপ্তস্থানে ইয়াবা রেখেছিস।
উপরি উক্ত ঘটনা ঘটেছিল প্রায় বছর দুয়েক আগে। এই সময়ে এসে অতীতের সেই কাহিনী মনে পড়ল বাংলাদেশের পুলিশপ্রধানের একটি বক্তব্যের কারণে। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীর প্রতি নির্মম পুলিশি নির্যাতনের বিষয়ে বলতে গিয়ে পুলিশপ্রধান অনেক কথার ফাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনকে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন- রাব্বী ফৌজদারি অপরাধ করেছেন। তিনি পুলিশকে তল্লাশি করতে দেননি। পুলিশের তদন্ত, তল্লাশি কিংবা যেকোনো কাজে বাধা প্রদান কিংবা বাধা প্রদানের চেষ্টা ফৌজদারি অপরাধ। পুলিশপ্রধানের বক্তব্যের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। সেই সাথে তারও উচিত জনগণের বাস্তব সমস্যা এবং পুলিশভীতির কারণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া।
বর্তমান সময়ে পুলিশ শব্দটি রীতিমতো একটি আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এই বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যের অদক্ষতা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, বাড়াবাড়ি, ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সৎ, দক্ষ, সাহসী এবং বিচক্ষণ পুলিশ সদস্যরা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ফলে পুরো বাহিনী মারাত্মক ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে। কিছু পুলিশ সদস্য যতটা না অপরাধ করছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রচার পাচ্ছে ইমেজ সঙ্কটের কারণে। অব্যাহত প্রচার-প্রপাগান্ডা ও গুজবের কারণে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে এবং এক ধরনের প্রবল ঘৃণা ও বিরক্তির সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় কোনো একটি ঘটনা ঘটা মাত্র সারা দেশের জনগণ, মিডিয়া, সুশীলসমাজ এবং বুদ্ধিজীবীরা একাট্টা হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। ফলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগটি পর্যন্ত পাচ্ছেন না।
পুলিশ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণা অত্যন্ত ইতিবাচক- যদিও আমার জীবনের সর্বাধিক নির্মম কয়েকটি ঘটনা পুলিশই ঘটিয়েছে। এমপি নির্বাচিত হওয়ার আগে আমি জীবনে কোনো দিন থানায় যাইনি- কোনো ওসির সাথে সখ্য ছিল না। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা পুলিশে চাকরি করতেন, তাদের সাথে হয়তো কালেভদ্রে দেখাসাক্ষাৎ হতো, কিন্তু ঘনিষ্ঠতা ছিল না। আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর কারো বিরুদ্ধে থানায় মামলা তো দূরের কথা, একটি সাধারণ ডায়েরিও ছিল না। তার পরও আমি পুলিশকে ভালোবাসি এবং শ্রদ্ধা করি বিভিন্ন কারণে। আমার এক দাদা ছিলেন পাকিস্তান পুলিশের আইজি। এক কাকা ছিলেন অতিরিক্ত আইজি। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে আরো অনেক নামকরা কর্মকর্তার সাথে যখন আবুল হাসনাত এবং মুজিবর রহমান ফারুকের নাম কেউ উচ্চারণ করেন তখন গর্বে আমার বুক ভরে ওঠে। অন্য দিকে পুলিশ নিয়ে কেউ মন্দ কথা বললেও আমার গায়ে লাগে।
ইদানীংকালের পুলিশের সার্বিক অধঃপতন, নৈতিক অবক্ষয় এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য শুধু পুলিশকে দায়ী করা ঠিক হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে নিয়োজিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, লোভী ও স্বার্থপর ধনিক শ্রেণী, পাপিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী এবং নীতিহীন দুরাচার প্রকৃতির ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্তারা একত্রে মিলে আমাদের পুলিশের সর্বনাশ করে ফেলেছেন। একজন পুলিশের সিপাহি পদে নিয়োগ লাভের জন্য তিন-চার লাখ টাকা এবং এসআই পদের জন্য ১০-১২ লাখ টাকার ঘুষ তো ওপেন সিক্রেট। অন্য দিকে, ওসি থেকে ডিআইজি পদে ভালো কোনো পোস্টিং পেতে ১০ লাখ টাকা থেকে কোটি টাকার কাজকারবার জড়িত বলে নানা কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। পুলিশের যে সদস্য অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে নিয়োগ লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে পদোন্নতি ও বদলির জন্য পুনরায় মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করেন, তিনি ঘুষ খাবেন না তো করবেনটা কী?
সবাই পুলিশকে দলবাজ পুলিশ বলে গালি দেয়। কিন্তু একবারের জন্য ভাবেন না- পুলিশকে দলবাজ বানাল কারা। দলীয় এমপি-মন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া বর্তমানের কোনো ওসি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে কোনো থানায় নিয়োগ দেয়া হয় না। অন্য দিকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোনো দিন পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলার উন্নতির জন্য চাপ দেন না। পুলিশের সততা-দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কোনো কর্মপরিকল্পনা এ দেশের কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডার মধ্যে নেই। বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতার পুলিশ বিভাগ সম্পর্কে স্বচ্ছ কোনো ধারণাই নেই। পুলিশ বলতে নেতারা সাধারণত দু’টি বিষয়কে ধর্তব্যের মধ্যে আনেন। প্রথমটি হলো- ক্ষমতায় থাকলে পুলিশকে পুরোপুরি বগলদাবা করতে হবে, পুলিশের অবৈধ আয়ে ভাগ বসাতে হবে এবং পুলিশি শক্তিকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঠেঙাতে হবে। দ্বিতীয়টি হলো- বিরোধী দলে থাকলে পুলিশের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে হবে। পুলিশের আনুকূল্য লাভের জন্য ঘুষ প্রদান করতে হবে এবং পুলিশ থেকে ৩৩ মাইল দূরে অবস্থান নিতে হবে।
আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পুলিশকে মানুষ বলে মনে করেন না। আমি নিজে দেখেছি, অনেক ওসি এমপি সাহেবের জন্য বাহারি মাছ, তরিতরকারি কিনে নিজ হাতে পৌঁছে দেন। অনেকে এমপিদের রাজনৈতিক কর্মীর মতো সারা দিন এমপির জনসভা, পথসভা এবং অন্য অনুষ্ঠানাদিতে যোগদান করেন। গভীর রাতে এমপি সাহেব বিছানায় যাওয়ার পর ওসি সাহেব থানায় ফেরেন। সরকারি দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশকে ব্যবহার না করলেও বেশির ভাগই ব্যবহার করে থাকেন নিজ নিজ রুচি, পছন্দ ও ইচ্ছেমাফিক। অন্য দিকে যেসব এমপি দুর্বল প্রকৃতির অথবা দলীয় রাজনীতির অন্তর্দ্বন্দ্বে দুর্বলতম অবস্থায় রয়েছেন, তাদের সাথে ওসি সাহেবরা প্রায়ই অমানবিক আচরণ করে থাকেন।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং পুলিশের পারস্পরিক সম্পর্কটির কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড না থাকার দরুন উভয় সম্প্রদায়ই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পুলিশ সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক নেতাদের এক হাত নিয়ে নেয়- অন্য দিকে নেতারা সুযোগ পেলে পুলিশকে দিয়ে এমন সব মন্দ কাজ করিয়ে নেন, যা সচরাচর কোনো মনুষ্য সম্প্রদায় করে না। যে পুলিশ গতকাল রাজনৈতিক নেতার প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে তার সীমা অতিক্রম করে বাজারসদাই পর্যন্ত করে দিয়েছে, সেই একই পুলিশ পরিস্থিতির কারণে ওই নেতাকে গ্রেফতার করে কিংবা রাজপথে ফেলে বেদম প্রহার শুরু করে। যেসব ঊর্ধ্বতন ও ক্ষমতাবান লোকদের নির্দেশে পুলিশ তার আচরণ পরিবর্তন করে, সেই কুশীলবরা একবারের জন্যও ভাবে না যে, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কী ভয়াবহ সর্বনাশ তাদের দ্বারা সংঘটিত হয়ে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হওয়ার পর থেকে সমাজে রাজনীতিবিদেরাই সবচেয়ে ক্ষমতাবান এবং প্রভাবশালী বলে বিবেচিত হয়ে আসছেন। আমাদের পুলিশ গত ৪৪ বছরে রাজনীতিবিদদের এত পিটুনি দিয়েছে এবং এত লাঞ্ছিত-অপমানিত করেছে যে, তাদের পক্ষে সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করা কোনো ব্যাপারই নয়। কোনো শিকারি যদি সারা জীবন বাঘ-সিংহ শিকার করে থাকেন, তবে তার কাছে ছাগল-ভেড়া শিকার যেমন মামুলি ঘটনা; তেমনি বড় বড় রাজনীতিবিদ এবং প্রভাবশালী হর্তাকর্তাকে পেটানো পুলিশের কাছে সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করা কোনো ঘটনাই নয়। গত ৪৪ বছরে পুলিশের মন্দকর্ম যেমন গাণিতিক হারে বেড়েছে, তেমনি তাদের শুভকর্মগুলো কমে গেছে জ্যামিতিক হারে।
২০১৬ সালে এসে বাংলাদেশ পুলিশ সত্যিকার অর্থেই একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পুলিশ আজ নিজেদের ভারেই ভারাক্রান্ত। নানা অনিয়ম, অপেশাদারিত্ব এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে যাচ্ছেতাই বানিয়ে ফেলেছে। পুলিশের অনেক ভালো ভালো কর্মকে তাদের মন্দকর্মগুলো মহাকাশের ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের মতো গিলে খাচ্ছে। এই নির্মম সত্য যদি দেশের পুলিশপ্রধান অনুধাবন করতে সক্ষম হন, তবেই সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল। অন্যথায় পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপের দিকে চলে যাবে, যেখান থেকে কোনো অবস্থাতেই ফেরত আসা সম্ভব হবে না। পুলিশকে ধীরে ধীরে তাদের মন্দকাজগুলো পরিহার করে পেশাদারিত্ব অর্জক রতে হবে। এ ক্ষেত্রে তল্লাশি এবং তদন্তে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নির্মমতা চলছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সর্বাগ্রে।
পুলিশের বদনাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাস্তায় যদি তারা কাউকে তল্লাশির জন্য থামতে বলে তবে লোকটির অন্তরাত্মায় কাঁপন ধরে যায়, আমাদের দেশের অপরাধীরা পুলিশকে একটুও ভয় পায় না। উল্টো বেশির ভাগ পুলিশ অপরাধীদের ভয় পায় এবং তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের রীতিমতো তোয়াজ করে চলে। নিরীহ ও নিরপরাধ সাধারণ মানুষ পুলিশকে যমের মতো ভয় পায় এবং তারাই পুলিশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয় সবচেয়ে বেশি। পুলিশ সব সময় প্রচলিত অপরাধগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মানুষজনকে হয়রানি করে থাকে। হরতালের সময় তল্লাশির নামে পাইকারি হারে লোকজনকে ধরে এবং বিরোধী দলের লোক আখ্যা দিয়ে ঘুষবাণিজ্য শুরু করে দেয়। অন্য সময়ে ইয়াবা, গাঁজা, অবৈধ অস্ত্র, বিভিন্ন মাদক, বিদেশী মুদ্রা এবং পেশাদার পতিতাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তল্লাশির নামে তাণ্ডব চালায়।
তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ সুযোগ পেলেই নির্মম আচরণ করে থাকে। নিম্ন আদালতের বেশির ভাগ মামলা থেকে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায় পুলিশের দুর্বল তদন্ত প্রতিবেদনের কারণে। খোদ প্রধান বিচারপতি এ ব্যাপারে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অন্য দিকে লাখ লাখ রাজনৈতিক মামলা তদন্তের নামে বছরের চর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়। যেখানে রাজনৈতিক চাপ দুর্বল থাকে ও বিবাদিরা বিত্তশালী হয়, সেখানে পুলিশের ফাইনাল রিপোর্ট দিতে ২৪ ঘণ্টাও লাগে না। অন্য দিকে টাকা-পয়সার লেনদেন না হলে কিংবা মামলাটিতে ক্ষমতাবানদের স্বার্থ জড়িত থাকলে থানা পুলিশ অন্ধ, বধির ও বোবা হয়ে যায়। থানায় দায়ের হওয়া লাখ লাখ মিথ্যা মামলার জন্য লাখ লাখ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় হাজির হয়ে পুলিশের নির্মমতার জন্য অভিশাপ দিয়ে থাকে, যার ভয়াবহ পরিণতি কল্পনাও করা যাচ্ছে না।
পুলিশি তদন্ত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা না গেলে আমাদের পুলিশ কোনো দিন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নীতিবোধ বা ইচ্ছাধীন জুডিশিয়াল মাইন্ড ব্যবহার না করলে পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমি সংসদ সদস্য হওয়ার পর দেখলাম, গলাচিপা থানায় অসংখ্য অদ্ভুত মামলা পাঁচ-সাত বছর ধরে চলে আসছিল। একজন ধনাঢ্য ও সম্মানিত ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে জনৈক পাগলকে দিয়ে ঝোলাগুড় চুরির মামলা দায়ের করা হয়েছিল। আরেকজন সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ছিল ডিম চুরির মামলা। এক মহিলাকে দিয়ে করানো হয়েছিল হাঁস চুরির মামলা। আমি পুলিশকে বলে সাত দিনের মধ্যে ওইসব মিথ্যা মামলার ব্যাপারে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। আমার কার্যকালীন আমার আওতাভুক্ত দু’টি থানায় মাত্র দু’টি রাজনৈতিক মামলা হয়েছিল। একটি মামলা ছিল গ্রাম্য একটি বাজারে ৫০-৬০ জন লোক নিয়ে একটি দোকান লুটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যে দোকানে তিন-চার হাজার টাকার বেশি মালামাল ছিল না এবং এখনো নেই। অন্য মামলাটিতে আসামির সংখ্যা ৩০-৩৫ জন, যারা একজন গ্রাম্য টাউটকে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে তার সর্বস্ব ছিনতাই করেছিল থানা পুলিশের সামনে। গলাচিপা থানার ওসি এবং পটুয়াখালী জেলার এসপিকে জিজ্ঞেস করলাম- এমন গাঁজাখোরি, মিথ্যা, গুজব ও অদ্ভুত কাজ করলেন কোন যুক্তিতে- কার হুকুমে এবং কার বুদ্ধিতে? তারা বললেন- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুকুমে মামলা নিতে বাধ্য হয়েছেন। আমি হেসে বললাম, একজন মন্ত্রীর হুকুমে একটা কাজ করলেন। একটু বুদ্ধিশুদ্ধি খরচ করে বিশ্বাসযোগ্যভাবে মামলাটি এজাহার হিসেবে নিলে ভালো হতো না? তারা কোনো জবাব না দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হাসতে লাগলেন। আমাদের আইজি সাহেব ইচ্ছে করলে গলাচিপা থানার মামলা দু’টির খোঁজখবর নিতে পারেন এবং তৎকালীন ওসি-এসপিকে পুরস্কৃত করতে পারেন চমৎকার সঠিক ইতিহাস রচনার কৃতিত্বের জন্য। অন্য দিকে বর্তমান ওসি-এসপিকে ধন্যবাদ দিতে পারেন মামলাটির চার্জশিট অথবা ফাইনাল রিপোর্ট না দিয়ে জিইয়ে রাখার জন্য।

পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় ভারতের প্রতিক্রিয়া

জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানের পেশোয়ারের বাচা খান
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা বের
করে নিচ্ছেন আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের। ছবি: এএফপি
পেশোয়ারের বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসী আক্রমণ ভারত ও পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় বাধ্য করবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাংশের ধারণা এমনই। এই মহলের তথ্য, দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা শিগগিরই সন্ত্রাসের মোকাবিলায় আলোচনায় বসবেন। ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের পর যেকোনো দিন এই আলোচনা হতে পারে। গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন। হামলায় নিহতদের পরিবারকে গভীর সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি মহলের মতে, ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশকেই এই বিপদের যৌথ মোকাবিলায় নামতে হবে। সে জন্য সন্ত্রাসকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাকি বিষয়গুলো থেকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। সন্ত্রাস মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টিও ভাবনায় রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের স্থগিত বৈঠক কবে ফের শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত হলেও ভারতের পাঞ্জাবের পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে হামলার তদন্তের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি দলকে ভারত স্বাগত জানিয়েছে। ইসলামাবাদ এখনো স্পষ্ট করে জানায়নি, তাদের দেশের বিশেষ তদন্তকারী দল কবে ভারতে আসবে। পাঠানকোট হামলার তদন্তে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এই বিশেষ দল গঠন করেন। ভারতীয় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রাও ইন্দ্রজিৎ সিং অবশ্য গত মঙ্গলবার জানিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তানের বিশেষ দলের তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করা হলেও তাদের পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে যেতে দেওয়া হবে না। পাকিস্তান সীমান্তের মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরত্বের এই বিমানঘাঁটিতেই আত্মঘাতী জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছিল।
ভারতের দাবি, জইশ-ই-মুহাম্মদ এই হামলা চালায়। পাঠানকোট ঘাঁটিতে যেতে না দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে পাকিস্তান অবশ্য আপত্তি করেনি। তারা জানিয়েছে, ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) আগে তাদের তদন্ত শেষ করুক। তারপর তারা দল পাঠাবে। সেই দল এনআইএর সঙ্গে প্রাথমিক কথা বলবে। তথ্য বিনিময়ও তারা এনআইএর সঙ্গেই করবে। এনআইএর তদন্ত কবে শেষ হবে তা এখনো অনিশ্চিত। কারণ, দুটি বিষয় তদন্তকারী দলকে এখনো ভাবাচ্ছে। হামলাকারীরা মোট কতজন ছিল এবং অভ্যন্তরীণ কোনো সাহায্য তারা পেয়েছিল কি না। এই সংশয়ের কারণ, নিহত সন্ত্রাসীরা দুটি দলে ভাগ হয়ে দুভাবে ঘাঁটিতে ঢুকেছিল। চারজনের দলটির সবার মৃতদেহ পাওয়া গেলেও বাকি দুজনের মৃতদেহ নিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে তারা পারছে না। এই দলটি আবার এক দিন আগেই বিমানঘাঁটিতে ঢুকে লুকিয়ে ছিল। পাঞ্জাবের যে জায়গা দিয়ে সন্ত্রাসীরা এসেছিল তা গুরুদাসপুর জেলায়। ওই জেলার পুলিশ সুপার সালবিন্দর সিং এখনো নিজেকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারেননি। এনআইএ তাঁকে বিভিন্নভাবে জেরা করছে। তাঁকে একাধিকবার ‘লাই ডিটেক্টর’ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। এসপি বলেছেন, জঙ্গিরা পথে গাড়ি থামিয়ে ‘অপহরণ’ করেছিল তাঁকে। পাঞ্জাবে মাদকের কারবার ব্যাপক। আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান হয়ে এই মাদক পাঞ্জাব হয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে যায়। এই মাদকের কারবারিদের সঙ্গে পাঞ্জাব পুলিশের একাংশের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসীরা পাঠানকোট হামলা ঘটিয়েছে কি না, সেটাই এনআইএর তদন্তের প্রধান বিষয়। এই সন্দেহ থেকে সালবিন্দর সিং এখনো মুক্ত নন।

ইন্টারনেট এখন মৌলিক চাহিদা

কম্পিউটার সিটি সেন্টারের মেলায় সেলফি প্রতিযোগিতার
আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল মেলার প্রথম দিনে সেখানে
চার দর্শককে সেলফি তুলতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: প্রথম আলো
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনার দেশ। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করার ব্যাপারে কাজ করছে। ইতিমধ্যে সারা দেশে কম্পিউটার ল্যাবসহ নানা ধরনের কাজ করেছে। ডিজিটাল সমাজ গড়তে হলে সরকারকে সাহায্য করতে হবে। গতকাল বুধবার রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের কম্পিউটার সিটি সেন্টার (মাল্টিপ্ল্যান) ডিজিটাল আইসিটি মেলা উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। তিনি আরও বলেন, ‘ইন্টারনেট এখন একটি মৌলিক চাহিদা, এটাকে সবার দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে সরকার। কম্পিউটারের ওপর যে ৪ শতাংশ ভ্যাট বসানো হয়েছে, সেটা প্রত্যাহার করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কাছে আমি অনুরোধ করব।’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন সাত কোটি তরুণ-তরুণী রয়েছে। তাদের সঠিক পথ দেখিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তরুণদের আরও বেশি উৎসাহী করে তুলতে হবে। কিছুদিন আগেও ওয়াই-ফাই শব্দটির সঙ্গে অনেকে পরিচিত ছিল না। কিন্তু এখন এই শব্দটি সবার কাছে পরিচিত।’ অনুষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ২০০৮ যখন রূপান্তরিত করার ঘোষণা দেওয়া হয় তখন বিষয়টি সবাই হাস্যকর হিসেবে নিয়েছিল।
এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ হাসি নয় বাস্তব রূপ। আমরা বলছি ইন্টারনেট হচ্ছে মৌলিক চাহিদা আর এই চাহিদা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতে হবে সরকারকে।’ সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘ডিজিটাল শব্দটি সকলের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকার ইতিমধ্যে হাইটেক পার্ক, বিপিও সামিট, ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডসহ বেশ কিছু কাজ করেছে এবং সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে।’ ‘ভিশন টু সার্ভ গো উইথ আইসিটি’ স্লোগান সামনে রেখে সপ্তমবারের মতো বড় পরিসরে শুরু হয়েছে ‘ডিজিটাল আইসিটি ফেয়ার-২০১৬’। মেলা চলবে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। কম্পিউটার সিটি সেন্টার দোকান মালিক সমিতি আয়োজিত এবারের মেলায় সাড়ে ছয় শতাধিক প্রতিষ্ঠান সর্বশেষ প্রযুক্তির কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, ক্যামেরা, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাসহ তথ্যপ্রযুক্তির নানা পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করছে। বাড়তি আয়োজনের পাশাপাশি মেলায় থাকছে বিশেষ ছাড় ও উপহার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর এলিফ্যান্ট রোড দোকান মালিক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা মোস্তফা মহসীন, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এস এ কাদের, কম্পিউটার সিটি সেন্টার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও মেলার আহ্বায়ক তৌফিক এহেসান ও সাধারণ সম্পাদক সুব্রত সরকার। মেলায় প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রদত্ত পরিচয়পত্র দেখিয়ে শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে মেলায় প্রবেশ করতে পারবে।

আগাম নির্বাচন দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী -সাক্ষাৎ​কারে জিএম কাদের

জি এম কাদের
জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ হঠাৎ করে ভাইকে দলের কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে মহাসচিব বদল করায় দলটিতে সৃষ্ট অস্থিরতা নিয়ে কিছুটা কৌতূহলও সৃষ্টি হয়। জাপা কি বিরোধী দলের পরিচিতি পেতেই বেশি আগ্রহী, নাকি নেপথ্যে অন্য কিছু? প্রথমআলোর কার্যালয়ে গতকাল এসব বিষয়ে কথা বললেন জি এম কাদের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো: এটা কিসের সংকট— স্ত্রী বনাম স্বামী–দেবর, নাকি গণতন্ত্রের সংকট?
জি এম কাদের: যেটা বাহ্যত সংকট, আসলে সেটা সংকট উত্তরণের উপায়। দল সংকটে আগেই ছিল। এটা থেকে বেরোতে এখন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
প্রথম আলো: রওশন এরশাদ সত্যিই পরিবর্তন চেয়েছেন?
জি এম কাদের: রওশন তিনজনের মন্ত্রিত্ব ছাড়তে ও নিজে বিরোধী দলের নেতার ভূমিকা পালনের পক্ষে, সেটা তিনি নিজেই বলেছেন। তাঁর মতের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই।
প্রথম আলো: আপনাকে কো-চেয়ারম্যান করার আইডিয়া কী করে এল? নেপথ্যের গল্পটা জানতে চাই।
জি এম কাদের: আমি দুই সপ্তাহ আগে একটি পারিবারিক কারণে রওশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তখন তিনি নিজেই বললেন, দল বাঁচাতে হবে। তোমার ভাই তোমাকে কো-চেয়ারম্যান করতে পারেন। আমি বললাম, এমন পদ তো গঠনতন্ত্রে নেই। তিনি বললেন, চেয়ারম্যানের ক্ষমতা আছে পদ সৃষ্টি করার। পরে তা আমি ভাইকে জানাই। আর সত্যি বলতে দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের প্রবল দাবি ছিল আমি একটা কার্যকর ভূমিকা পালন করি। দল আগে যেভাবে সম্মান ও গুরুত্ব পেত, সরকারের সঙ্গে থাকার জন্য এখন তা পাচ্ছে না। আমরা মানুষের ঠাট্টার পাত্র হচ্ছি।
প্রথম আলো: কো-চেয়ারম্যান মানে আপনি এখন দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। রওশনের অবস্থান?
জি এম কাদের: কো-চেয়ারম্যান হলো চেয়ারম্যানের কাছাকাছি মর্যাদা। প্রেসিডিয়াম ও মহাসচিবের ওপরে। সংসদীয় দলে চেয়ারম্যানের সমতুল্য দলে ওভাবে কাউকে ধরা হয় না।
প্রথম আলো: আপনি আসায় নতুন কিছু দেখা যাবে? দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চালু করবেন? পকেট কমিটি বন্ধ করবেন?
জি এম কাদের: অবশ্যই। আমি ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতি করিনি।
প্রথম আলো: আপনাকে আবার মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিলে?
জি এম কাদের: দিলে মনে হয় এ মুহূর্তে নিতে পারব না। দলের সিদ্ধান্তের ব্যাপার আছে।
প্রথম আলো: তার মানে দল চাইলে নেবেন?
জি এম কাদের: সেটা দল কী পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে বলবে, তা বুঝতে হবে। তবে দল এখন এমন সিদ্ধান্ত দেবে না। দিলেও আমার তা নেওয়া ঠিক হবে না। এ মুহূর্তে মানুষের যে প্রত্যাশা, তার সঙ্গে এটা যায় না।
প্রথম আলো: জাপার এই পরিবর্তনের সঙ্গে আগাম বা মধ্যবতী নির্বাচনের কোনো যোগসূত্র?
জি এম কাদের: এটাই মূল বিষয়। নির্বাচনের মাধ্যমেই কোনো দলের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক তৈরি হয়। সেখানে জাপাকে নিয়ে একটি বিভ্রান্তি চলছে। প্রতিদিন আমরা এ জন্য জনপ্রিয়তা হারাচ্ছি। সবশেষ নির্বাচনেও তাই ফুটে উঠেছে। সরকারি দলের পরিবর্তে ধানের শীষ বা অন্য দলকে বেছে নিয়েছে, জাপাকে নয়।
প্রথম আলো: এখনই আগাম নির্বাচন চান?
জি এম কাদের: ব্যক্তিগতভাবে চাই। দল সিদ্ধান্ত নেয়নি।
প্রথম আলো: এরশাদ ও রওশন চান?
জি এম কাদের: এরশাদেরটা শুনিনি। তবে যত দূর বুঝতে পারি, যাঁরাই জাপার সাংসদ, তাঁরা চান না। ৪০ জন এমপির মধ্যে ২৩-২৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছেন। সরকার বা ইসির প্রতি তাঁদের একটা আনুগত্য বা স্বাভাবিক কৃতজ্ঞতা থাকা স্বাভাবিক। জাপা এখন দুই ধারায় বিভক্ত। বলা চলে সংসদ রক্ষার দিকে ১০ ভাগ আর দ্রুত নির্বাচনের দিকে ৯০ ভাগ।
প্রথম আলো: সংখ্যাগরিষ্ঠ ধারাটি তাহলে সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবির দিকে ঝুঁকছে?
জি এম কাদের: এটা আমি এখনই বলতে পারব না। তবে এটা জোর দিয়ে বলতে পারি, জাপার প্রায় সবাই চাইছে সরকার থেকে সরে এসে সক্রিয় রাজনীতি করতে।
প্রথম আলো: জাপার তিন মন্ত্রী পদত্যাগ করলেই আপনারা সংসদে কার্যকর বিরোধী দল হবেন?
জি এম কাদের: চেষ্টা করব। সংসদ এমন একটি ফোরাম, যাকে বাইরে সহজে পাওয়া যায় না। বাইরে যা বলা যায় না, তা সংসদে বলা যায়। মন্ত্রী না থাকলেই বরং সংসদে আমরা সক্রিয় রাজনীতিটা করতে সচেষ্ট হব। অতীতের রাজনীতিতে আমরা শক্তিশালী ছিলাম বলে আওয়ামী লীগকে আমরা সহযোগিতা করতে পেরেছি। আমাদের সহযোগিতা ছাড়া আওয়ামী লীগ কখনো সরকার গঠন করতে পারেনি। জাপাকে তাদের লাগবে।
প্রথম আলো: কীভাবে, ব্যাখ্যা করুন?
জি এম কাদের: ১৯৯৬ সালে জাপাকে নিয়ে তারা সরকার গঠন করেছে। ২০০১ সালে আমাদের সঙ্গে তারা জোট করেনি, হেরেছে। ২০০৮ সালে মহাজোট করেছে, জিতেছে। ২০১৪ সালেও তারা জাপাকে নিয়েই সরকার গঠন করেছে। অ্যান্টি আওয়ামী লীগ ভোট ব্যাংক বিএনপিকে সঙ্গে পেয়েছিল বলে ১৯৯০ সালে তারা এরশাদের পতন ঘটাতে পেরেছিল। এখন জাপা পরিচয়-সংকটে ভুগছে। বিএনপিকে ভোট না দিলে মানুষ এখন আওয়ামী লীগ বা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে দিচ্ছে।
প্রথম আলো: তাহলে তো দেখছি, এটা গণতন্ত্রের কোনো ব্যাপার নয়। এটা ঘটছে এমন এক সময়, যখন জনপ্রিয়তা পড়তির দিকে। তখন কি সরকারি দলের বিপরীতে একটা অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিরোধী দল দরকার?
জি এম কাদের: আমি এভাবে বলব না।
প্রথম আলো: জাপার তিন মন্ত্রী না থাকলে জাপাই শক্তিশালী হবে, নাকি আওয়ামী লীগকে তা দুর্বল করবে?
জি এম কাদের: না, মন্ত্রিসভা ত্যাগ করলে সরকারের দুর্বল হওয়ার কারণ নেই। জাপার শক্তিশালী হওয়া মানে আওয়ামী লীগের দুর্বল হওয়া নয়। জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে আমরা তখন সংসদে ও বাইরে আন্দোলন করব।
প্রথম আলো: আগাম নির্বাচনকে দলীয় সিদ্ধান্ত করতে উদ্যোগী হবেন?
জি এম কাদের: আমি মনে করি, ধার ও ভারে নেতা হয় না। সবার মতামত নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রথম আলো: এর মানে আপনার উত্থানে সরকারকে অতটা সন্ত্রস্ত না হলেও চলবে। কারণ, জাপাকে আপনি দাবড়ে আগাম নির্বাচনে ঠেলতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন, এটা আপনার অবস্থান নয়?
জি এম কাদের: যেকোনো কাজ করতে গেলে একক ব্যক্তির পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয় না। কোনো নেতার চাপানো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না। তবে আমার মতে, যদি তারা প্রভাবিত হয় সেভাবে সিদ্ধান্ত হবে।
প্রথম আলো: এরশাদ বিশেষ দূত থেকে পদত্যাগ করলে অবাক হবেন?
জি এম কাদের: আমি অবাক হব না। যেকোনো মুহূর্তে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। তবে সেটা করে তিনি সরকারকে বিব্রত করতে চান না। সৌজন্য রক্ষা করতে চান।
প্রথম আলো: মন্ত্রীদের পদত্যাগে দলের সিদ্ধান্ত আসন্ন? সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য হলে?
জি এম কাদের: এটা নিয়ে দলের ভেতরে দাবি আছে। তবে আসন্ন কি না, তা এখনই বলতে পারব না। সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য হলে তাঁরা দল থেকে বহিষ্কার হতে পারেন।
প্রথম আলো: আপনার কো-চেয়ারম্যান হওয়া ছাড়া কোনো গুণগত পরিবর্তন? মহাসচিব অদলবদল তো আগেও হয়েছে?
জি এম কাদের: না, প্রক্রিয়াগত কোনো পরিবর্তন নেই।
প্রথম আলো: আপনি যে প্রক্রিয়ায় পদোন্নতি পেলেন, এটা গণতান্ত্রিক?
জি এম কাদের: গণতান্ত্রিক এই অর্থে যে চেয়ারম্যানকে ক্ষমতা দেওয়ার বিধানযুক্ত দলীয় গঠনতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন রয়েছে। দুই বড় দলেরও এমন বিধান আছে। তারাও ইসিকে বলেছে, শৃঙ্খলা মানতে এমনটাই জুতসই।
প্রথম আলো: ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার বিপক্ষে আপনার লেখালেখি, অথচ নিজের বেলায় অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেওয়া সিদ্ধান্তের সাফাই গাইছেন, এটা স্ববিরোধিতা নয় কি?
জি এম কাদের: কোনো একব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করায় ব্যক্তিগতভাবে আমার সায় ছিল না, এখনো নেই।
প্রথম আলো: প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে যাবেন?
জি এম কাদের: ত্রয়োদশ সংশোধনী বিলের পক্ষে আমরা ভোট দিয়েছিলাম। তবে ৫ জানুয়ারি ও পরের নির্বাচনগুলো এবং বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনার ও বিচারকদের অপসারণের বিধান সংসদের হাতে নেওয়া মানে প্রধানমন্ত্রীর বলয়ে যাওয়া এবং সাংবিধানিক পদগুলো দলীয়করণের প্রেক্ষাপটে অবস্থা বদলেছে। সবকিছু ব্যক্তির হাতে চলে গেছে। বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ চলছে কি চলছে না, সেটা আমি বলছি না, তবে ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের কারণে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী বিভাগের সামনে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রথম আলো: তার মানে ত্রয়োদশ সংশোধনী ফেরত চাইছেন?
জি এম কাদের: ব্যক্তিগতভাবে দুটি প্রস্তাব আছে। নির্দলীয় সরকার হতে পারে। আবার প্রধানমন্ত্রী থাকলে নির্বাচনকালে তাঁর ক্ষমতা কিছুটা নয়, ব্যাপকভাবে হ্রাস ও নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে। সংবিধান সংশোধন না করেও এটা পারা যায়। না হলে সরকার যেখানে চাইবে সুষ্ঠু হবে, যেখানে চাইবে না সেখানে সুষ্ঠু হবে না।
প্রথম আলো: নির্বাচনকালীন সরকারে জাপা মন্ত্রিত্ব নেবে?
জি এম কাদের: আমার মনে হয় এটা উত্তম প্রস্তাব। যেমন জনপ্রশাসন সরকারের হাতছাড়া করতে হবে।
প্রথম আলো: এরশাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো মামলা কি আছে, যা তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য করতে পারে?
জি এম কাদের: মঞ্জুর হত্যা মামলা। রায়ের অপেক্ষায় থাকার পর্যায় থেকে পুনরায় তদন্তে গেছে। তবে তাতে তিনি অযোগ্য হতে পারেন, তা আমি মনে করি না।
প্রথম আলো: জাপার ভাঙন কিংবা নতুন মেরুকরণ সম্পর্কে আপনার ভাবনা?
জি এম কাদের: ব্রাকেটবন্দী জাপার সম্ভাবনা নাকচ করি না, আওয়ামী লীগ আমলে আগেও হয়েছে। এটা আবার হলে জাপা আবার শক্তিশালী হবে। ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত একটা ধারা চলেছে, সেটা মরে গেছে। এখন সামনে নতুন ধারার সূচনার সম্ভাবনা দেখছি। তবে তাতে কে উপকৃত হবে, তা জানি না। তবে আসন্ন নির্বাচন জোটগত হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। কোনো বড় দলই এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে পারবে না।
প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, আপনারা কারও ইঙ্গিতে নড়াচড়া দিচ্ছেন। কারণ, একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিরোধিতার পরিবেশ সরকারের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত।
জি এম কাদের: (হাসি) আমার মনে হয় না এমন কিছু হচ্ছে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে আমি জানি, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। তিনি বর্তমান অবস্থাকে স্বস্তিকর মনে করছেন না। আমার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে যেতে পারেন।
প্রথম আলো: সেই সংসদে আপনাকে তিনি একজন অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দেখতে আগ্রহী হবেন? তিনি সংসদ নেতা, আপনি বিরোধী দলের নেতা, দৃশ্যটি কেমন লাগবে?
জি এম কাদের: (হাসি) তাঁর মনে কী আছে তা আমি জানি না। তাঁর মন তো আমি জানি না। তবে এমন দৃশ্য নিশ্চয় আমার খারাপ লাগবে না।
প্রথম আলো: ধন্যবাদ
জি এম কাদের: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিলুপ্তির পথে এগোতে পারে ইইউ by মাসুম খলিলী

২০১৬ সালকে অনেক বিশ্লেষকই দেখছেন পরিবর্তন ও অস্থিরতার বছর হিসেবে । এই অস্থিরতা শুধু উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যে সীমিত থাকছে না। এমনকি এটি শুধু এশিয়ায় বা আফ্রিকাতেই ছড়াবে তা-ও নয়, এর বড় শিকার হতে পারে খোদ ইউরোপ। যাদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ ও গোয়েন্দা মদদ দেয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকারের পতন ঘটিয়ে অস্থিরতাকে উসকে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তারাই এখন সেই অস্থিরতার শিকারে পরিণত হচ্ছে।
ইউরোপের গত অর্ধশতাব্দীর সবচেয়ে বড় অর্জন কী? এই প্রশ্নের জবাব হবে, একটি অভিন্ন ইউরোপ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রযাত্রা। এই অগ্রযাত্রার দু’টি প্রধান ক্ষেত্র হলো শেনজেন চুক্তির মাধ্যমে এই অঞ্চলের নাগরিকদের মুক্ত চলাচল এবং পণ্যের অবাধ প্রবাহ সৃষ্টি। একই সাথে নিশ্চিত করা হয়েছে ইউরোপের এক দেশের নাগরিকদের অন্য দেশে যাওয়া বা থাকার অধিকার। এর বাইরে দ্বিতীয় লক্ষ্যটি ছিল একটি অভিন্ন মুদ্রাঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক বিকাশ। এই দু’টি লক্ষ্য বা অর্জনই এখন হুমকির মুখে।
এখনো পর্যন্ত ইউরো জোনের বাইরে রয়েছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাজ্য। এখন দেশটি ইইউতে আর থাকবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে নাগরিকদের মধ্যে। ২০১৬ সালেই এ ব্যাপারে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। ‘ব্রেক্সিট’ অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিদায় নেয়ার ব্যাপারে অনুষ্ঠেয় এই গণভোটে ব্রিটিশ জনমত ক্রমেই জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে চলে যাচ্ছে। যদিও এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকার পক্ষে বেশি মত রয়েছে মর্মে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে ভোটের সময় ঘনিয়ে আসার আগেই যেকোনো পরিবর্তন ঘটতে পারে। জেরেমি কোরবিনের নেতৃত্বে বিরোধী লেবার পার্টি এখন বেশি ঝুঁকছে ইউরো ত্যাগের দিকে। প্রধানমন্ত্রী ডেভিট ক্যামেরন নিজেই ইউরোতে সংস্কার আনার ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ। যদিও তার প্রস্তাবিত সংস্কারের ব্যাপারে ব্রিটেনের প্রতি সবচেয়ে বেশি সহানভূতিশীল জার্মানিও একমত হচ্ছে না। আবার ইইউ থেকে ব্রিটেন বের হয়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
২০০৯ সালে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সঙ্কটের পর এই ফেডারেল ইউরোপ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ব্যাপারে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠতে থাকে। সর্বশেষ সিরীয় শরণার্থীদের ইউরোপমুখী প্রবাহ শুরু হওয়ার পর সঙ্কট তীব্র হয়েছে। উত্তর ইউরোপ ও দক্ষিণ ইউরোপের মধ্যে মতের ব্যবধান এখন প্রবল হয়েছে। উত্তর মনে করছে দক্ষিণের অদক্ষতা ও অক্ষমতা তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে, দক্ষিণের অভিযোগ উত্তরের বিরুদ্ধে তাদের বাজার একচেটিয়াভাবে দখল করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার সময় অনুদারতা প্রদর্শন ও কঠিন সব শর্ত আরোপ করার। এই টানাপড়েন উত্তর দক্ষিণ নির্বিশেষে সব দেশে জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সমর্থন বাড়িয়েছে, যাকে ইউরোপের সংহতির গোড়ায় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পথ ধরে ইইউ থেকে গ্রিসের বিদায় নেয়ার সম্ভাবনা একপর্যায়ে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এই জোন ত্যাগ করতে পারে ফিনল্যান্ডের মতো দেশও। অন্য দিকে, এই উদ্যোগে নতুন যারা অংশীদার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তাদের দরজা যেমন সহজে খুলছে না, তেমনি এই জোটে যোগ দেয়ার ব্যাপারে কোনো কোনো দেশ নিজেরাও আগ্রহ হারাতে বসেছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েই গেছে
ইউরোপে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন প্রবাহ ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ঐক্যের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাচ্ছে। জোটে যাওয়ার আগে থেকেই পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থায় ছিল ব্যাপক ব্যবধান। ইইউ গঠনের পর আশা করা হয়েছিল এই ব্যবধানে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু ইউরোপীয় জোনের ২৮টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৭টি দেশের জাতীয় আয় ইইউর গড় ২৭ হাজার ৪০০ ইউরোর চেয়ে কম। এর মধ্যে পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশের আয়ই ইইউ’র গড়ের ওপরে নেই। ইতালি, গ্রিস, পর্তুগালসহ পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশের আয় নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে। গোটা ইউরো জোনের ২৮টি দেশের মধ্যে ৫২ শতাংশের বেশি আয় হলো তিন দেশ- জার্মানি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের। এর মধ্যে জার্মানি ছাড়া আর কোনো দেশই অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারেনি।
২০০৫ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ১২ বছরের ইউরোপের অর্থনীতি পর্যালেচনা করে দেখা যায়, পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০০৪ সালের তুলনায় অর্থনীতির আকার বেড়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ইউরো জোনের ১২ বছরের ব্যবধানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। ২০০৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোল্যান্ড ছাড়া একটি দেশও ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। জোটের অনেক দেশ রয়েছে যেগুলোর অর্থনীতি বছরের পর বছর সঙ্কুচিত হচ্ছে। ইতালি, গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল ছাড়া বাকি দেশগুলো অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। এতে ফেডারেল ইউরোপ গঠনের ব্যাপারে হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে।
শেনজেন চুক্তির আওতায় ইউরো জোনের দেশগুলো যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিলোপ ঘটিয়েছে তার উল্টো পথে যাওয়ার দাবি উঠতে শুরু করেছে। ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গ ১৯৮৫ সালে যখন শেনজেন চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন তারা এমন এক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যেন সব দেশের মানুষ ও পণ্য কোনো বাধা ছাড়া এক দেশ থেকে অন্য এক দেশে চলাচল করতে পারে। একের পর এক বাধা অতিক্রম করে এই স্বপ্নের অনেকখানি বাস্তবায়ন হয়েছে। ১৯৯৫ সালে শেনজেন চুক্তি বাস্তবায়নের পর এই চুক্তির স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বিলোপ করা হয়েছে এবং ২৬ দেশের জন্য একটি সাধারণ ভিসা-নীতি তৈরি করা হয়েছে।
একটি ফেডারেল ইউরোপ সৃষ্টি ছিল শেনজেন চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে পৌঁছতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বিলোপ করে সদস্য দেশগুলো তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের একটি মৌলিক উপাদান ইইউর কাছে সমর্পণ করে। এ জন্য স্বাক্ষরকারীদের পরস্পরের প্রতি আস্থা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে শেনজেন অঞ্চলে প্রথম এন্ট্রি দেশের ওপর আগত বিদেশীদের পরিচয় এবং মালামাল চেক করার দায়িত্ব অর্পিত ছিল। কোনো ব্যক্তি একবার একটি শেনজেন দেশে প্রবেশ করলে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে অবাধে যেতে পারেন।
ঠাণ্ডা যুদ্ধের শেষে ১৯৯০-এর দশকে শেনজেন চুক্তি বাস্তবায়নকালে ইইউ সদস্যরা স্থায়ী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের প্রত্যাশায় অনেক সংবেদনশীল বিষয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দেয়। ইউরো জোনের সৃষ্টি সম্ভবত ছিল এই সময়ের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল চুক্তি। কিন্তু এর পর থেকে ইউরোপে কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে আর সদস্য দেশগুলো আগে নেয়া অনেক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন শুরু করেছে।
গত ছয় বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত ইউরোপের অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং তার বিভিন্ন উপজাত হিসেবে উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলোর উত্থান। ইউরোপে শরণার্থী উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর ঘটনা সাম্প্রতিক কালের হলেও এর বিশেষ চাপ পড়ে গ্রিস এবং ইতালির মতো ইইউর সীমান্তবর্তী এবং ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো অর্থনৈতিক শক্তিমান দেশগুলোর ওপর। শেনজেন চুক্তি এই প্রথমবারের মতো প্রশ্নবিদ্ধ না হলেও ক্রমবর্ধমান শরণার্থী সংখ্যা, শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী দলের উত্থান ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সমন্বিত অবস্থা বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। ইউরোপের নেতৃস্থানীয় সরকার নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক গ্রুপগুলো থেকে শেনজেন চুক্তির পুনর্গঠন এবং কিছু ক্ষেত্রে তা রদ করার দাবির মুখে পড়ছে।
উত্তর ইউরোপের দেশগুলো এখন সীমান্ত কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং ইইউ অঞ্চলে পৌঁছানোর পর শরণার্থীদের ঠিকভাবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিতে ব্যর্থতার জন্য ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী দেশগুলোর সমালোচনা করছে। এ কারণে এসব অভিবাসী আশ্রয়ের আবেদন করতে মহাদেশের অন্যত্র যেতে পারছে। ফ্রান্স এবং অস্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ইতালি ছেড়ে আসতে আশ্রয়প্রার্থীদের সুযোগ দেয়া এমনকি উৎসাহিত করার জন্য রোমকে অভিযুক্ত করে ইতালির সাথে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। জুনের শেষ দিকে ফ্রান্স সংক্ষিপ্তভাবে সীমানা বন্ধও করে দেয়।
অন্য দিকে, দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলো সংহতি প্রকাশে ব্যর্থতার জন্য উত্তর ইউরোপের প্রতিবেশীদের সমালোচনা করে। ইতালি ও গ্রিস ভূমধ্যসাগরীয় শরণার্থীদের উদ্ধারে টহল জোরদার ও অভিবাসীদের আশ্রয় দিতে অধিক তহবিল দাবি করেছে। এরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন কোটা প্রবর্তনেরও দাবি করেছে। অথচ এ দাবি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করে স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে শরণার্থী বিতরণ করা উচিত বলে মত প্রকাশ করছে।
অভিবাসন সঙ্কট শেনজেনের সদস্যদের মধ্যে এবং শেনজেন অ-সদস্য প্রতিবেশীদের মধ্য বিরোধ সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি অভিবাসীদের ফরাসি বন্দর থেকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে চেষ্টার জন্য ফ্রান্সকে অভিযুক্ত করে যুক্তরাজ্য। তবে সার্বিয়ার সাথে হাঙ্গেরির সীমান্তে বেড়া নির্মাণ এবং সীমানা সামরিকীকরণের হুমকি দেয়া ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার সবচেয়ে দৃশ্যমান একটি উদাহরণ ছিল।
অভিবাসন বেড়ে যাওয়া এবং শেনজেনের ত্রুটি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন দু’টি ওভারল্যাপিং সমস্যার মোকাবেলা করছে। এক দিকে ইইউকে একটি নতুন অভিবাসননীতি অবলন্বের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ইইউ সদস্যদের মধ্যে অভিবাসন আইন সংস্কারের জন্য একাধিক বৈঠক হয়েছে। জার্মানি কয়েক মাস আগেও এ সংক্রান্ত ডাবলিন প্রবিধান পরিবর্তনে অনিচ্ছুক ছিল। সে দেশটিই এখন তাতে পরিবর্তন আনতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়া অনুযায়ী অভিবাসী প্রথম যে দেশে এসেছেন, সেখান থেকে আশ্রয় প্রার্থনার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। জার্মানি নিজে এই বছরে আট লাখ শরণার্থী নেবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ এর মধ্যে সেখানকার অভিবাসী আশ্রয়ীর ওপর আক্রমণের ঘটনা বাড়ছে।
বার্লিনের প্রস্তাব হলো নিরাপদ বিবেচিত দেশের একটি সাধারণ তালিকা করতে হবে যেসব দেশের নাগরিকদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয় দেয়ার আবেদন মঞ্জুর করা হবে না। এ তালিকার মধ্যে আলবেনিয়া ও ম্যাসেডোনিয়ার মতো পশ্চিম বলকান অঞ্চলের দেশ অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যারা গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে আশ্রয়ের জন্য অনুরোধ জানানোর মতো গুরুতর মানবিক সঙ্কটের মুখোমুখি নয়। জার্মানির দ্বিতীয় প্রস্তাবটি হলো অভিবাসীদের চিহ্নিত করা, তাদের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের জন্য অধিক তহবিল বরাদ্দ এবং গ্রিস ও ইতালিতে এ সংক্রান্ত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। সবশেষে, বার্লিন ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে সব দেশে অভিবাসীর আনুপাতিক বিতরণের প্রস্তাবকে এগিয়ে নিতে চায়।
জার্মানির উত্থাপিত প্রতিটি পয়েন্ট নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। অভিবাসনের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কারা যুক্তিগ্রাহ্য আশ্রয়প্রার্থী এবং কারা অর্থনৈতিক অভিবাসী তা চিহ্নিত করা হয়। ভূমধ্যসাগরীয় ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের অর্থ ও জনবল সঙ্কটের জন্য অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়িত করা জটিল হয়ে দাঁড়ায়। উপরন্তু, ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলো শুধু মহাদেশজুড়ে অভিবাসীদের পুনর্বিতরণ করার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা ছাড়াই জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের সীমানায় অভিবাসন সেন্টার করেছে। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় বেশ কিছু দেশ অভিবাসীদের বাধ্যতামূলক কোটা প্রবর্তনে ইউরোপীয় কমিশনের সাম্প্রতিক পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। এই বিরোধিতার সহজে অবসান হবে বলেও মনে হচ্ছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় সমস্যা হলো, শেনজেন চুক্তি নিয়ে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা। এই চুক্তি অনুসারে অবৈধ অভিবাসীদের পক্ষে শেনজেন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ রয়েছে। আর এতে কিছু নিরাপত্তা প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। বেশ কিছু সদস্য দেশ ইউরোপে পৌঁছা হাজার হাজার অভিবাসীর মধ্যে কিছু সন্ত্রাসী থাকতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ফ্রান্সের সন্ত্রাসী ঘটনার পর এই উদ্বেগ আরো জোরালোভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ঘটনার আক্রমণকারী ফ্রান্স থেকে বেলজিয়ামে চলে গেছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বিলোপ করার ফলে বস্তুত সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি শনাক্ত করার একটি স্তর বিদায় হয়ে গেছে।
কট্টর জাতীয়তাবাদী দলের উত্থানও শেনজেন চুক্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিনল্যান্ডে একটি জাতীয়তাবাদী দল ইতোমধ্যে সরকারি জোটের সদস্য হয়েছে। ইউরো থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষের অভিবাসন-বিরোধী দল ডেনমার্ক, সুইডেন ও হাঙ্গেরির মতো দেশে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সে সব মতামত জরিপে উঠে আসছে ইউরো-বিরোধী ন্যাশনাল ফ্রন্ট ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যন্ত চলে যেতে পারে। এই জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সবাই বিশ্বাস করে, তাদের নিজ দেশের জাতীয় অভিবাসন আইন কঠোরতর করতে হবে এবং শেনজেন চুক্তি বিলুপ্ত না করলেও এতে বড় রকমের সংশোধনী আনতে হবে।
শেনজেন চুক্তির ভবিষ্যৎ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্ভবত শিগগিরই শেনজেন চুক্তি ছেড়ে যাবে না। সমালোচনা সত্ত্বেও চুক্তিটির কারণে ইউরোপজুড়ে পণ্য পরিবহনে খরচ কমে গেছে । আন্তর্জাতিক সীমানা পার করার জন্য ট্রাকের আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না। সীমানা পার হতে পাসপোর্ট এবং ভিসার আর প্রয়োজন হয় না বলে এটি পর্যটক এবং সীমান্ত শহরে বসবাসকারী মানুষের উপকারে আসে। সবশেষে এই চুক্তি সরকারগুলোর সামনে অনেক অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ এনে দিয়েছে। তাদের আর ভূখণ্ডের সীমানা পাহারা দেয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না।
এর পরও সম্ভবত দেশের সীমানা নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রবর্তন করার জন্য সংস্কার আনা হবে শেনজেন চুক্তির। শেনজেনে স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশগুলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকির মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে পুনঃপ্রবর্তন করার ব্যাপারে একমত হতে পারে। এর প্রথম পদক্ষেপ ২০১৩ সালে নেয়া হয়েছিল; কিন্তু তখনকার সংস্কারের আওতায় ইউরোপীয় কমিশনের সাথে পরামর্শক্রমে সর্বাধিক ১০ দিনের জন্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রবর্তন করার ব্যবস্থা করা হয়। সেটাকে স্পষ্টভাবে সীমিত করা হয়েছিল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে, অভিবাসন ঠেকানোর কোনো বিষয় সেখানে ছিল না।
২০১৬ সালেই ইইউ সদস্য দেশগুলোকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে আরো ক্ষমতা ও নিজস্ব সিদ্ধান্তের এখতিয়ার দেয়া হতে পারে। উত্তর ইউরোপে ইইউ দেশগুলো কার্যকরভাবে তাদের সীমানা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে তাদের সদস্যপদ স্থগিত রাখা অথবা তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমানার বাইরে ঠেলে দেয়া হতে পারে। এ সময় নতুন ইইউ সদস্য দেশগুলোর জন্য শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশ কঠিন হতে পারে। রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার মতো দেশগুলো প্রায় এক দশক ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও তারা এখনো শেনজেনে যোগদানের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের জোনে গ্রহণ করতে কিছু দেশ থেকে প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে।
এমনকি শেনজেন চুক্তির একটি যথোপযুক্ত সংস্কার না হলে সদস্য দেশগুলো ট্রেন ও বাসস্টেশনে এবং বিমানবন্দরে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ আরো ব্যাপকতর করতে পারে। বেশ কিছু দেশ আগে থেকেই, ট্রেন ও বাসে আকস্মিকভাবে পুলিশি নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যাচ্ছে । এটি সামনে আরো বাড়তে পারে। রক্ষণশীল দলগুলোর চাপে অনেক ইইউ দেশ বিশেষত উত্তর ইউরোপের দেশগুলো তাদের অভিবাসন আইন কঠোর করতে পারে, যাতে নতুনরা সহজে অভিবাসীদের ওয়েলফেয়ারের সুযোগ নিতে না পারে।
বলা যায়, শেনজেন চুক্তি দুর্বল হওয়ার অর্থ জনগণের অবাধ চলাচলের সুযোগও দুর্বল হয়ে পড়া, যেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি মুখ্য অর্জন ছিল। চুক্তি করা এবং অবাধ চলাচলের সুযোগ দেয়ার নীতিমালা এক জিনিস নয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক যেকোনো ইইউ নাগরিকের সদস্য রাষ্ট্রে থাকা বা ট্রানজিট লাভের অধিকার রয়েছে; কিন্তু শেনজেন চুক্তির নকশা তৈরি করা হয়েছিল মানুষের অবাধ চলাচল জোরদার এবং সীমানা ছাড়া একটি মহাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে। বলার অপেক্ষা রাখে না, শেনজেন চুক্তির সম্ভাব্য সংস্কার এই মৌলিক নীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। একবার যদি মৌলিক নীতি দুর্বল হয় তাহলে অন্যান্য অর্জন একইভাবে সঙ্কুচিত করার দরজা খুলে যাবে। এর মধ্যে ইউরোর পাশাপাশি আবার জাতীয় মুদ্রা চালুর দাবিও উঠেছে কোনো কোনো দেশে। তবে এখনকার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান হুমকি হলো জনগণের মুক্ত চলাচলের সুযোগ কমে যাওয়া। যার ফলে পণ্যের মুক্ত প্রবাহও দুর্বল হয়ে পড়বে, যার অনিবার্য পরিণতি হবে বর্তমান অবয়বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবসান ঘটা। আর ফেডারেল ইউরোপ গড়ার স্বপ্নও এতে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে পারে।
mrkmmb@gmail.com

‘আমার অনুতাপ নেই, কিন্তু লোকজন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়’

যৌন হয়রানির শিকার ২০ শিশুর একজন। পাকিস্তানের
পাঞ্জাব প্রদেশের কাসুর শহরের কাছে হুসনে খান ওয়ালা
গ্রামের পথ থেকে ২০ নভেম্বর ছবিটি তোলা। ছবি: এএফপি
‘এসব বলতে আমার কোনো অনুতাপ নেই, কিন্তু লোকজন আমার দিকে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়।’
কথাগুলো ১৬ বছরের শিশু ইরফানের। শিশুটি সেই ২০টি শিশুর একজন, যারা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের যৌন নির্যাতনের শিকার। চক্রটি শিশুদের যৌন নিপীড়ন করে ভিডিও ধারণ করত। পরে ওই ভিডিওগুলো দেখিয়ে অভিভাবকদের বেকায়দায় ফেলে অর্থ আদায় করত। সামাজিকভাবে হেয় হওয়া ও লোকলজ্জার ভয়ে এসব ঘটনা কাউকে বলতে পারতো না অভিভাবকেরা।
নির্যাতনের এ ঘটনা বহু বছর ধরে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কাসুর শহরের কাছে হুসনে খান ওয়ালা গ্রামে চলে আসছিল। তবে বিষয়টি গত বছরের জুনে গণমাধ্যমে চলে আসে। পুলিশ ওই সময় অভিযান চালিয়ে হুসনে খান ওয়ালার ২৮০ শিশুকে যৌন নির্যাতনের ১৫০টি ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করে। ওই শিশুদের বয়স ছিল ১৪ বছরের নিচে।
আলোচিত এ ঘটনার ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। পুলিশ জানায়, এখন অভিযুক্ত ১৭ জন বিচারের অপেক্ষায় কারাগারে রয়েছেন। তিনজন জামিনে মুক্ত।
কিন্তু যৌন নির্যাতনের শিকার ছোট্ট শিশুরা, যারা সমাজের লোকলজ্জার বেড়াজাল ভেঙে বিচার চাইছে, তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে এক নতুন আশঙ্কা। সমাজে অন্যদের মতো সাধারণ জীবন পাবে কি না—এ প্রশ্ন তাদের।
যৌন নির্যাতনের শিকার অন্য শিশুদের মতো ইরফানও সমাজের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পায়নি। নিজেকে তার কলঙ্কিত মনে হয়। সে বলে, ‘বন্ধুরা যখন আমার দিকে তাকায়, আমি নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাই। জানি, আমার সম্পর্কে তারা কী ভাবছে।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে গলাটা ধরে আসছিল তার। বলে, ‘আমার সহপাঠীরা ও শিক্ষকেরা আমার দিকে তাকায়। তাই আমি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।’
এই ২০ শিশুর পরিবারগুলো সন্তানদের জীবন নতুনভাবে গড়ে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। একজনের বাবা বলেন, তাদের ইসলামাবাদ বা বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। তারা এখানে পড়াশোনা পারবে না। তাদের অবশ্যই এই পরিবেশ থেকে বাইরে নিয়ে যেতে হবে।
দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইয়ে গণমাধ্যমে যৌন নির্যাতনের খবরটি এলেও এর আগেই পুলিশ এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে জানত, কিন্তু তারা দেখেও না দেখার ভান করে ছিল। যা শুধু অপরাধকে অবহেলা করা নয়, অপরাধকে প্রশ্রয়ও দেওয়া।
গত গ্রীষ্মে ঘটনাটি প্রকাশ পেলে অভিভাবকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষও হয়। আহত হন অনেকে। ওই বিক্ষোভের পরই রাজনৈতিক নেতারা নড়েচড়ে বসেন ও গ্রেপ্তারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
হুসনে খান ওয়ালা গ্রামের দৃশ্য এটি। এখান থেকে গত জুনে
ছেলে শিশুদের যৌন হয়রানির ১৫০টি ভিডিও উদ্ধার করে
পুলিশ। ছবিটি ২০ নভেম্বর তোলা। ছবি: এএফপি
পরে কর্তৃপক্ষ জানায় মাত্র ২০টি শিশু ধর্ষণ ও সমকামিতার শিকার হয়েছে। পাকিস্তানি আইন অনুযায়ী কেবল ধর্ষণ ও সমকামিতাই যৌন নির্যাতনের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এ ধরনের অন্যান্য ঘটনাগুলোকে অপরাধ হিসেবে এ আইনের আওতায় আনা হয়নি। তবে বর্তমানে এসব বিষয় ওই আইনের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে পাকিস্তানে সিনেটে বিতর্ক চলছে।
স্থানীয় একটি এনজিও গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট পাকিস্তানের পরিচালক ভেলেরাই খান বলেন, এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় যৌন হয়রানি সামাল দিতে বা শিশুদের সুরক্ষা দিতে দেশটিতে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো নেই।
শিশু অধিকার সংগঠন সাহিল জানায়, এ ধরনের ঘটনা যে হারে বেড়ে চলেছে সে ক্ষেত্রে সংস্কার খুব প্রয়োজন। এ সংগঠনের হিসেবে ২০০৮ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল দুই হাজারের কিছু কম। কিন্তু ২০১৪ সালে এ সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি দাঁড়ায়।
প্রবীণ মানবাধিকার কর্মী হিনা জিলানি বলেন, এ ধরনের ঘটনাগুলো সামনে আসছে এটি ভালো। তবে এ ঘটনাগুলোকে সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখতে হবে। তবে নির্যাতনের শিকার এসব শিশুদের কীভাবে প্রশ্ন করতে হবে সে সম্পর্কে মানবাধিকারকর্মী, বিচারক ও পুলিশ কারও প্রশিক্ষণ নেই।
জিলানি বলেন, এ ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ধরনের বাধা হলো ওই শিশুদের পরিবারগুলো। তারা মনে করে, বিষয়টি জানাজানি হলে তাদের সম্মানহানি ঘটবে।
সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে রক্ষণশীল মুসলিম এই দেশটিতে অভিভাবকেরা শিশুদের ওপর হওয়া যৌন নির্যাতনের বিষয়ে মুখ খোলার সাহস করেছে। কিন্তু এই সাহসী লোকরে সংখ্যা খুব কম। লোকলজ্জার ভয়, আইনের ফাঁকফোকর ও সচেতনতার অভাবে এখনো সমাজে এ ধরনের ঘটনা গোপনে ঘটেই চলেছে।

নারায়ণগঞ্জে ৫ খুন- আদালতে নৃশংস বর্ণনা ঘাতকের by বিল্লাল হোসেন রবিন

অবিশাস্য। ২০ বছরের যুবক মাহফুজই এক এক করে খুন করেছে ৫ জনকে। লোমহর্ষক এই ঘটনার বর্ণনা সিনেমা বা রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে। কাউকে ঘুমের মধ্যে, কাউকে ঘুম থেকে তুলে হত্যা করেছে সে। প্রথমে মোশারফকে খুন করে লাশ কাঁথা দিয়ে ঢেকে দেয়। তারপর তাসলিমাকে খুন করে দুই ভাই-বোনের লাশ এক সঙ্গে ফেলে রাখে। লামিয়াকে খুন করতে বেগ পেতে হয়েছে তার। সময়ও লেগেছে। তবে শিশু সুমাইয়া ও শান্তকে মারতে সময় লাগেনি। হত্যা মিশন শেষ করে শরীরের রক্ত ধুয়ে মুছে, পরিধেয় কাপড় পাল্টে বাইরে থকে ঘরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিই। এবং চাবি পানির রিজার্ভ ট্যাংকিতে ফেলে দিয়ে কারখানায় গিয়ে ঘুমিয়ে থাকি। নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ফাইভ মার্ডারের মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ভাগ্নে মাহফুজ ওরফে মারুফ (২০) আদালতে নিজের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ৫ জনকে খুন করার লোমহর্ষক ঘটনার এভাবেই বির্ণনা দিয়েছে। গতকাল বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৫ ঘণ্টা তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইদুজ্জামান শরীফ। জবানবন্দি শেষে আদালত মাহফুজকে জেলহাজতে পাঠনোর নির্দেশ দেন।
শহরবাসী বলছে, দেশে এটাই কোনো প্রথম ঘটনা যে, ২০ বছরের একটি যুবক ঠাণ্ডা মাথায় ধীরেসুস্থে এক এক করে ৫টি মানুষকে হত্যা করেছে।
মাহফুজকে সোমবার ৭ দিনের রিমান্ডে নেয় মামলার তদন্ত সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের ৪র্থ দিনের মাথায় তার এই জবানবন্দির মধ্য দিয়ে ৫ খুনের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।
এদিকে আদালতে মাহফুজের জবানবন্দি চলাকালে দুপুর সোয়া ১টার দিকে জেলা পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দীন ৫ খুনের তদন্তের আদ্যপান্ত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নিহত তাসলিমার স্বামী শফিকুল ইসলামের ভাগ্নে মাহফুজ একাই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে। এটা একটা বাজে ঘটনা। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মামলায় রিমান্ডে থাকা নাজমার কোনো সম্পৃক্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
যেভাবে ৫ জনকে খুন করা হয়:
মাহফুজের জবানবন্দির তথ্যমতে, ১৫ই জানুয়ারি শুক্রবার মাহফুজ নিশ্চিত হয় তার বড় মামা ও ছোট মামা বাসায় নেই। তাই সে মাগরিবের নামাজের আগ মুহূর্তে বাসায় আসে। দরজা নক করতেই তা খুলে দেয় শফিকুলের ছেলে শান্ত। এ সময় বাসার ভেতরে থাকা শফিকুলের স্ত্রী তাসলিমা ও মেয়ে সুমাইয়া এবং শরীফুলের স্ত্রী লামিয়া ভেতরের রুমে টিভি দেখছিল। তারা টিভি দেখায় মনোযোগী থাকায় বাসায় কে এসেছে টের পায়নি। এদিকে ঘরের ভেতরে ঢুকেই মাহফুজ পকেট থেকে ১০ টাকা বের করে শান্তর হাতে দিয়ে বলে ভাইয়া যে এসেছি তুমি কাউকে বল না। মাহফুজ এরপর লামিয়ার খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে। রাত ১০টার দিকে মোশারফ বাসায় আসে। খাওয়া-ধাওয়া করে সবাই আগের মতোই টিভি দেখতে থাকে। মোশারফ বাইরে যায় সিগারেট আনতে।  ওদিকে টিভি দেখতে দেখতে লামিয়া একসময় তাসলিমার রুমেই ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে তাসলিমা লামিয়ার রুমে ছোট ভাই মোশারফকে ঘুমানোর জন্য বিছানা করে দেয়। মোশারফ শুয়ে শুয়ে নিজের মোবাইলে নেটের মাধ্যমে হিন্দি ছবি দেখতে থাকে। খাটের নিচে বসে তা আঁচ করতে পারে মাহফুজ। রাত গভীর হয় কিন্তু মোশারফ ঘুমাচ্ছে না। রাত ২টার দিকে তার প্রস্রাবের বেগ হয়। কিন্তু খাটের নিচ থেকে বের হতে পারছে না। এক সময় বুঝতে পারে মোশারফ মনে হয় ঘুমিয়ে গেছে। তখন সে খাটের নিচ থেকে বের হতে গেলে মাথায় আঘাতে খাটে শব্দ হয়। শব্দ পেয়ে মোশারফ লাইট জ্বালিয়ে খাটের নিচে মাহফুজকে দেখতে পেয়ে বকাঝকা করে। বোন তাসলিমাকে ডেকে আনে। তাসলিমা রাতের কথা চিন্তা করে বলে কী আর করা তোর সঙ্গে শুইয়ে রাখ। সকালে দেখা যাবে। পরে মাহফুজ বাথরুম থেকে এসে মোশারফের পাশে শুয়ে পড়ে। কিন্তু মোশারফ ঘুমাচ্ছে না। সে এপাশ ওপাশ করতে থাকে। একসময় মাহফুজের মনে হলো মোশারফ ঘুমিয়ে পড়েছে। সে উঠে রান্নাঘর থেকে মসলা বাটার পুতা (শিল) নেয়। এবং মোশারফের পাশে এসে পুতা নিয়ে শুয়ে থাকে। তার কাছে মনে হচ্ছে মোশারফ পুরোপুরি ঘুমায়নি। রাত ৩টার দিকে মাহফুজ খাটের উপর উঠে বসে। এবং পুতা দিয়ে সজোরে মোশারফের মাথায় আঘাত করে। চারদিকে রক্ত ছিটিয়ে পড়ে। তার শরীরেও রক্ত লেগে যায়। এ সময় মোশারফ চিৎকার দিলে শব্দ বাইরে যাওয়ার আগেই তার মুখ চেপে ধরে মোশারফ। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে গোঙাতে থাকে মোশারফ। তখন পাশ থেকে একটা শার্ট এনে মোশারফের গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। কিন্তু পরক্ষণে মোশারফের রক্তাক্ত মুখ দেখে ভয় পেয়ে যায় মাহফুজ। তখন কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে রুমের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে। পরে লাশটা একটি কাঁথা দিয়ে ডেকে রেখে বাথরুমে যাওয়ার সময় দেখে কেউ টের পেয়েছি কী না? পরে আবার রান্না ঘরে যায়। রান্না ঘর থেকে সয়াবিন তেল নিয়ে কিছুটা নিজের মাথায় দেয় মাথা যেন ঠাণ্ডা হয়। কিছু তেল নিয়ে লাশের কাঁথার উপর দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে আবার দ্রুত নিভিয়েও ফেলে। যদি পুরো ঘরে আগুন লেগে যায় এই ভয়ে। এরপর শোকেসে দেখে মাথা ঠাণ্ডা করার তেল। তা নিয়ে আবার নিজের মাথায় দেয়। আবার পাঁয়চারি করে। আর চিন্তা করে আমি কী করলাম? কেউ দেখলে কী অবস্থা হবে। পাঁয়চারি করতে করতে ফজরের নামাজের সময় হয়ে যায়। তখন টের পায় কেউ একজন বাথরুমে গেছে। পরে বুঝতে পারে শান্ত বাথরুম থেকে আবার গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কখনো পাঁয়চারি কখনো বসে মাহফুজ। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ঘড়িতে অ্যালার্ম বেজে উঠে। তখন তাসলিমা ঘুম থেকে জেগে যায় এবং শান্তকে বলে উঠো স্কুলে যেতে হবে। তাসলিমা রান্না ঘরে যায়। ছেলেকে খাবার খাইয়ে রেডি করে স্কুলে পাঠায়। মাহফুজ টের পায় বড় মামী (তাসলিমা) আবার শুয়ে পড়েছে। তখন সে পুতা হাতে নিয়ে দরজাটা একটু ভিড়িয়ে দিয়ে বের হয়। বড় মামীর (তাসলিমা) কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে তাকে ডেকে ঘুম থেকে তোলে। এবং বলে মোশারফ আপনাকে ডাকে। তাসলিমা উঠে মোশারফের রুমের সামনে গিয়ে বলে, এই মোশা! মোশা। ভাইয়ের শব্দ না পেয়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে দেখে খাটের উপর কাঁথা দিয়ে ডাকা মোশারফ ঘুমিয়ে আছে। এ সময় কিছু বুঝে উঠার আগেই মুহূর্তেই পেছন থেকে তাসলিমার মাথায় পুতা দিয়ে আঘাত করে মাহফুজ। লুটিয়ে পড়ে তাসলিমা। রক্ত ঝরতে থাকে। দ্রুত একটা নেকরা এনে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাসলিমার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর মাহফুজ রক্তমাখা হাতে পুতা নিয়ে লামিয়ার রুমে যায়। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে লামিয়া এপাশ ওপাশ করছে। হঠাৎ লামিয়া চোখ মেলে দেখে মাহফুজ রক্তমাখা শরীরে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে চিৎকার দিতে দিতেই মাহফুজ পুতা ছুড়ে মারে লামিয়ার মাথায়। মাথা ফেটে রক্ত পড়তে থাকে। লামিয়া খাটের উপর দাঁড়িয়ে যায়। তখন ঘরের মধ্যে দড়ি খুঁজতে থাকে মাহফুজ। একপর্যায়ে পুতা নিয়ে মাহফুজের উপর ছুড়ে মারে লামিয়া। মাহফুজ সরে গেলে সেই পুতা গিয়ে পড়ে ঘুমিয়ে থাকা তাসলিমার মেয়ে সুমাইয়ার মাথায়। আঘাত পেয়ে সে কাঁদতে থাকে। এদিকে মাহফুজ পুতা নিয়ে পুনরায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লামিয়ার উপর। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে লামিয়া বাঁচার জন্য খামছে ধরে মাহফুজকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। পুতা দিয়ে লামিয়ার মাথায় একাধিক আঘাত করে মাহফুজ। অনেকটা নিস্তেজ হয়ে পড়লে খাটের উপর শুইয়ে নেকরা দিয়ে গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে লামিয়ার মৃত্যু নিশ্চিত করে। ওদিকে রক্তক্ষরণে অচেতন হয়ে পড়ে সুমাইয়া। পরে তার গলায় পেন্ট পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মাহফুজ। ওদিকে স্কুল থেকে বাসায় আসে শান্ত। সে বাইরে থেকে মা মা বলে ডাকতে থাকে। তখন মাহফুজের সম্বিত ফিরে আসে। হায় হায় আমি এতগুলো খুন করে ফেলেছি? তখন সে দ্রুত তাসলিমার লাশ টেনে মোশারফের রুমে নিয়ে যায়। এবং সাদা চাদর দিয়ে ভাই-বোনের লাশ ডেকে রাখে। দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে মেঝের রক্ত কিছুটা মুছে ফেলে। পরে দরজা খুলে দিলে শান্ত ঘরে ঢুকে। মাহফুজ তাকে বলে কী হয়েছে? মাকে ডাকছো কেন? এ সময় মেঝেতে রক্ত দেখতে পেয়ে শান্ত বলে ‘ভাইয়া’ এত রক্ত কেন? তখন মাহফুজ শান্তকে দেয়ালের সঙ্গে জোরে ধাক্কা মারে। এতে আঘাত পেয়ে অচেতন হয়ে পড়ে শান্ত। পরে গলা টিপে ও পুতা দিয়ে মাথায় আঘাত করে শান্তকে খুন করে। সবাইকে হত্যার পর বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধোয়। পরে পুতা ধুয়ে রান্না ঘরে রেখে দেয়। এবং রক্তমাখা কাপড় পাল্টিয়ে মোশারফের কাপড় পরে ঘরের তালা চাবি নেয়। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে  চাবি বাড়ির রিজার্ভ পানির ট্যাঙ্কির ভেতর ফেলে দিয়ে বাসার পাশে মোশারফের কারখানায় গিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। এভাবেই মাহফুজ তার হত্যা মিশন শেষ করে। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে যখন প্রচার পেয়ে যায় তালাবদ্ধ ঘরের ভেতর ৫ জন খুন হয়েছে। তখন স্বজনদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে মাহফুজ। এবং রাতেই মাহফুজকে সন্দেহজনকভাবে আটক করে পুলিশ। পরদিন রোববার সকালে নিহত তাসলিমার স্বামী শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে যে মামলা করেন সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, তার ভাগ্নে মাহফুজের সঙ্গে তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী লামিয়ার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে ঘটনার ১৫ দিন আগে। ওই ঘটনায় বড় মামী তাসলিমা ভাগ্নে মাহফুজকে বকাঝকা করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। এই কারণে সে ক্ষুব্ধ হতে পারে। এদিকে পুলিশ বুধবার রাতে রিজার্ভ ট্যাংকিতে ফেলে দেয়া চাবিটি ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পুতা উদ্ধার করেছে।
কেন হত্যাকাণ্ড?
সূত্রমতে, শফিকুল ইসলামের বড় বোন আছিয়া বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে মাহফুজ সবার বড়। ২ সন্তান ও স্বামী শরফুল মিয়াকে নিয়ে আছিয়া বেগম শহরের পাইকপাড়া এলাকায় বাস করেন। মাহফুজের বাবা শরফুল মিয়া ঝালমুড়ি বিক্রেতা। শফিক-তাসলিমা দম্পতি যখন ঢাকার কলাবাগানে বসবাস করতেন তখন মাহফুজও ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পিয়ন হিসেবে কাজ করতেন। দুই বছর আগে শরীফ বিয়ে করেন লামিয়াকে। শরীফ ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ঢাকার কলাবাগানে থাকাকালীন একদিন ফাঁকা ঘরে লামিয়াকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় মাহফুজ। এ নিয়ে পারিবারিকভাবে সালিশ হয়। তাসলিমা মাহফুজকে জুতাপেটা করে। এবং তাদের বাসায় না আসতে নিষেধ করে। এতে ক্ষুব্ধ হয় মাহফুজ। ঘটনার দিন মাহফুজ জানতো দুই মামা (শফিকুল-শরীফ) বাসায় নেই। রাতে লামিয়া একা তার রুমে থাকবে। সুযোগ কাজে লাগাতে গোপনে ঘরে ঢুকে মাহফুজ। এবং লামিয়ার খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু লামিয়া টিভি দেখতে দেখতে যখন তাসলিমার রুমে ঘুমিয়ে পড়ে, তখনই মাহফুজের ছক উলটপালট হয়ে যায়। তারপরও নিজেকে কিছুটা সামলে নিলেও মোশারফ তাকে দেখে ফেলায় নতুন করে ভয় জন্মায় তার মধ্যে। কারণ ১৫ দিন আগে তাকে জুতাপেটা করে শাঁসিয়ে দিয়েছিল বড় মামী (তাসলিমা)। আজ আবার ধরা পড়ে গেছে। সকালে কী জানি হয়। এই থেকে সে মোশারফকে হত্যা করে। মোশারফকে হত্যার পর মাথায় ঢুকে পালিয়ে গেলেও সবাই জানবে আমিই খুনি করেছি। তাই সে পর্যায়ক্রমে বাসার ভেতরের সবাইকে হত্যা করে। যাতে কোনো সাক্ষী না থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে গণমানববন্ধন! by ইলিরা দেওয়ান

১৮ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। পার্বত্য চুক্তির যথাযথ, দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে বান্দরবানের ঘুমধুম থেকে খাগড়াছড়ির দুদুকছড়া পর্যন্ত ৩০০ কিলোমিটার পথে গণমানববন্ধন রচনার মধ্য দিয়ে এ দিনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গণমানববন্ধন করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
চাকমা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে, ‘সুলস্নুগো ন মুরোদি য়ো যায়, বে-সুলস্নুগো ন পানি দি য়ো ন যায়’ অর্থাৎ একতা থাকলে স্থলেও নৌকা চলে, আর একতাবিহীন নৌকা জলেও চলে না। এই প্রবাদটি কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। এ প্রবাদের যথার্থতা মিলল ১৮ জানুয়ারি। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে এতগুলো বছর বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে আন্দোলন চললেও নজিরবিহীনভাবে এমন সাড়া পাহাড় এবং সমতলে একসঙ্গে কখনো হয়নি। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে এই ৩০০ কিলোমিটারের মানববন্ধনটি সরকারের উদ্যোগেও হতে পারত! ঘুমধুম থেকে দুদুকছড়া পর্যন্ত রচিত গণমানববন্ধনটি নিশ্চয় পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া চেঙ্গী, কর্ণফুলী, কাজলং, সাংগু কিংবা মাইনী নদীর মতো দেখতে হয়েছে!
পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিকামী মানুষগুলোর এই শান্তিপূর্ণ গণমানববন্ধনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার অভিযোগ এসেছে। খাগড়াছড়ির মাইসছড়িতে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করতে আসা লোকজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাস্তায় দাঁড়াতে দেয়নি। মানববন্ধনের ব্যানার, ফেস্টুন কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং সমবেত জনতার ওপর লাঠিপেটা করে কমপক্ষে নয়জনকে আহত করার খবরও পাওয়া গেছে। (সূত্র: প্রথম আলো, নিউএজ, ১৯ জানুয়ারি)। পার্বত্য চট্টগ্রামে, বিশেষত খাগড়াছড়ির প্রশাসন খাগড়াছড়িতে কোনো সংগঠনকেই কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের জন্য অনুমতি প্রদান করছে না! সমাবেশ করার অধিকার রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের অসহযোগিতামূলক আচরণ সেখানকার পরিস্থিতিকে বরং আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। কোনো এলাকার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে সেই এলাকায় শান্তি বজায় রাখা বা স্থাপন করার নজির খুব একটা নেই। যদি সেটি সম্ভবও হয় তাহলে ধরে নিতে হবে সেই এলাকাটি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে আছে! কারণ বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেখানে তুষের আগুন জ্বলে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আমাদের আহ্বান থাকবে চলমান শীতকালীন অধিবেশনে এই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এর সংশোধনী আইনটি উত্থাপন করে সংসদে পাস করা হোক।
পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের ১৮ বছর পরেও চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো এখনো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। চুক্তি স্বাক্ষরকারী পক্ষ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও পাহাড়ের মানুষেরা দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে এলেও কোনো সরকারের আমলেই বিশেষ করে চুক্তি স্বাক্ষরকারী সরকার হিসেবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার পরপর দুবার ক্ষমতায় থাকার পরেও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীরা এবং কতক ক্ষেত্রে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আজও আসেনি!
বর্তমােন দশম সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এ শীতকালীন অধিবেশনে বেশ কয়েকটি বিল উত্থাপন ও পাস করা হবে। কিন্তু সম্ভাব্য সেসব বিলের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনটি নেই। অথচ পার্বত্য চুক্তির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধারার মধ্যে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন একটি অন্যতম শর্ত ছিল। কিন্তু এ কমিশনের আইনে কতগুলো ধারা চুক্তির সঙ্গে বিরোধাত্মক হওয়ায় এই আইনের সংশোধনী আবশ্যক হয়ে পড়ে। আইন সংশোধন না হওয়ায় এ ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনটি বর্তমানে অথর্ব কমিশনে পরিণত হয়েছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এর বিরোধাত্মক ধারাগুলো সংশোধনের লক্ষ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৩ সালে এ আইনের ১৩টি বিরোধাত্মক ধারা সংশোধনের বিষয়ে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি একমত হলেও আজ পর্যন্ত এ সংশোধিত আইনটি সংসদে পাস হয়নি। আমাদের আহ্বান থাকবে চলমান শীতকালীন অধিবেশনে এই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এর সংশোধনী আইনটি উত্থাপন করে সংসদে পাস করা হোক।
পরিশেষে বলতে চাই, পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য অচিরেই যেন একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো ভূমি সমস্যা। এ ভূমি সমস্যাটি পাহাড় এবং সমতল উভয় ক্ষেত্রেই চলমান একটি সমস্যা। তাই পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের আইন সংশোধন করে এ কমিশনকে কার্যকর করে তোলা এবং সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জন্য আলাদা স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করা হোক।
ইলিরা দেওয়ান: হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
ilira.dewan@gmail.com