Monday, February 12, 2018

হাইতিতে অক্সফাম প্রধানের পতিতা কানেকশন, ছিলেন বাংলাদেশেও

যেকোনো দুর্যোগ উপদ্রুত অঞ্চলের মতো হাইতিতেও ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর মানবিক সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। ক্ষুধা ও অভাবের তাড়নায় অনেকেই বাধ্য হন পতিতাবৃত্তিতে নাম লেখাতে। আর দুর্যোগ উপদ্রুত মানুষকে সহায়তা করতে যেসব সংস্থা কাজ করে, তাদেরই কর্তাব্যক্তি যখন অভাবক্লিষ্ট মেয়েদের পতিতা হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে বিষয়টি কী দাঁড়ায়? অনেকটা তেমনই হয়েছে বৃটেনের অন্যতম বৃহৎ দাতব্য সংস্থা অক্সফামের ক্ষেত্রে। হাইতিতে সংস্থাটির খোদ কান্ট্রি ডিরেক্টরই এই কাজ করেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি প্রকাশের বদলে ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল অক্সফাম।
রোল্যান্ড ভ্যান হাউওয়েরমেইরেন নামে ওই কর্মকর্তাকে সংস্থা থেকে বিদায় দেওয়া হলেও, ওই ব্যক্তিই পরবর্তীতে ‘অ্যাকশন অ্যাগেইন্সট হাঙ্গার’ নামে আরেকটি বৃহৎ ফরাসি দাতব্য সংস্থার বাংলাদেশ মিশন প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন।
ফরাসি দাতব্য সংস্থাটি জানিয়েছে, অক্সফামের কাছে রোল্যান্ডের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলেও, তারা তাদের সাবেক এই কর্মীর গুরুতর অসদাচরণের কথা জানায় নি। বরং, অক্সফামে কর্মরত রোল্যান্ডের সাবেক সহকর্মীরা তার ব্যাপারে ইতিবাচক সুপারিশই করেছিল। ফলে হাইতিতে অত বড় কা- ঘটানোর পর, আরেকটি অসহায় গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান ওই কর্মকর্তা। বৃটিশ পত্রিকা দ্য টাইমস এ খবর দিয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, রোল্যান্ড (৬৮) ২০১১ সালে হাইতিতে অক্সফামের কান্ট্রি ডিরেক্টর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তার আগে তিনি স্বীকার করেন যে, নিজের বাসায় তিনি পতিতাদের নিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অ্যাকশন অ্যাগেইন্সট হাঙ্গারে’র (এএএইচ) বাংলাদেশ মিশন প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
(এএএইচ) জানিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে রোল্যান্ডকে নিয়োগের আগে বিভিন্ন তথ্য যাচাই বাছাই করা হয়েছিল। কিন্তু তার পূর্বতন কর্মস্থল অক্সফাম রোল্যান্ডের গুরুতর নৈতিক অসদাচরণের বিষয়ে কোনো তথ্য জানায় নি। এমনকি যেই অভ্যন্তরীণ তদন্তের ফলে তার ওই কেলেঙ্কারির কথা জানা যায় ও তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, সেই ব্যাপারেও অক্সফাম কিছু জানায় নি। এএইচ’র এক মুখপাত্র বলেন, ‘বরং, অক্সফামে রোল্যান্ডের সাবেক অনেক সহকর্মীই তার ব্যাপারে ইতিবাচক সুপারিশ করেছেন। এদের মধ্যে মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করেছেন এমন এক কর্মকর্তাও রয়েছেন।’
দ্য টাইমসের তদন্তে বের হয়ে আসে যে, অক্সফাম হাইতির ওই তদন্ত ধামাচাপা দিয়েছে। পতিতা ব্যবহার, ‘পর্নোগ্রাফিক ও অবৈধ বিষয়াদি’ ইন্টারনেট থেকে নামানো, ভয়ভীতি প্রদর্শন সহ বিভিন্ন অভিযোগে অক্সফাম অভ্যন্তরীনভাবে তদন্ত করার পর, রোল্যান্ড সহ ৬ জন পুরুষ কর্মকর্তা সংস্থাটি থেকে পদত্যাগ করেন।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার অক্সফাম তাদের সাবেক ওই কর্মীর আচরণের নিন্দা জানিয়েছে। অক্সফাম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘২০১১ সালে হাইতিতে অক্সফামের কিছু কর্মীর যে অসদাচরণের কথা প্রকাশ পেয়েছে, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও আমাদের মূল্যবোধের পরিপন্থী।’ দ্য টাইমস পত্রিকা থেকে যখন অক্সফামের কাছে তাদের সাবেক কয়েকজন কর্মীর পতিতা সংসর্গের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়, তখন সংস্থাটি জানায়, ‘যখনই আমরা তাদের ওই আচরণের কথা জানতে পারি, আমরা তৎক্ষণাৎ অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করি। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক পতিতাদেরকে ব্যবহার করার অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি।’ সংস্থাটি জানায়, চারজন কর্মীকে ওই তদন্তের পর বরখাস্ত করা হয়। তদন্ত শেষের আগেই তিনজন পদত্যাগ করেন।
অক্সফাম অবশ্য দ্য টাইমসের খবর অস্বীকার করেনি। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ডেলমাসে একটি অতিথি শালায় কিছু অল্পবয়স্ক পতিতাদেরকে সেক্স পার্টিতে আমন্ত্রণ জানায় অক্সফামের ওই কর্মীরা। কিছু পতিতা এমনকি অক্সফামের টি-শার্টও পরে ছিল তখন।
২০১০ সালের ওই ভূমিকম্পের পর হাইতিতে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ নিহত হন। প্রায় লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। বৃটেনের চ্যারিটি কমিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, এ ধরণের ঘটনা দাতব্য ও ত্রাণ সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা খর্ব করার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। আমরা আশা করবো যে, অতীতের ঘটনা থেকে দাতব্য সংস্থাগুলো শিক্ষা নিয়েছে বলে আমাদেরকে নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।

ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্প চূড়ান্ত হবার পথে

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা পানিবন্টন চুক্তি নানা কারণে ঝুলে থাকায় গঙ্গার ভাটির দিকে অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলেছে৷ সম্ভবত বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর আগামী দিল্লি সফরে তাতে সিলমোহর পড়তে পারে৷
ভাটির দিকে গঙ্গা বেসিন বা অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা হয় গত সপ্তাহে৷ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী দিল্লি সফরে মোদী-হাসিনা বৈঠকের আলোচ্যসূচির শীর্ষে আছে এই প্রকল্পের খুঁটিনাটি দিক এবং তার অনুমোদন৷ দুই দেশের মধ্যে তিনটি বড় নদী গঙ্গা, ব্রম্মপুত্র ও মেঘনার অভিন্ন সঙ্গমমুখ বঙ্গোপোসাগরকে বলা যায় একই রিভার-সিস্টেম৷ বিশ্বের ১০ শতাংশ মানুষের বাস গঙ্গা-ব্রম্মপুত্র ডেলটা বা ব-দ্বীপ অঞ্চলে এবং জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশের জীবন ও জীবিকা৷
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রাক্তন হাইকমিশনার এবং এই প্রকল্পের একজন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জামির মনে করেন, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে যে পরিমাণ জল বাংলাদেশে ঢোকে তাতে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকাগুলির খরা, বন্যা, নদী গর্ভে পলি জমার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে৷ পদ্মা নদীর জলস্তর কমে গেছে৷ বেড়ে গেছে সুন্দরবনসহ গোটা এলাকার নোনা জলের মাত্রা৷ সেজন্য ফারাক্কা বাঁধ থেকে ছাড়া জল ধরে রাখতে দরকার বাংলাদেশে ফারাক্কার অনুরূপ আরেকটি বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করা৷ সেজন্য এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দিল্লির সাহায্য ও সহযোগিতা জরুরি৷ বাঁধ তৈরি হলে শুখা মরশুমে ভাটির দিকের জলপ্রবাহ ধরে রাখা সম্ভব হবে৷ এছাড়া অববাহিকা অঞ্চলে পলি সরাতে যৌথ ড্রেজিং হবে এই উন্নয়ন প্রকল্পের অঙ্গ৷ দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে ১৯৯৬ সালে সই হয় দ্বিপাক্ষিক গঙ্গা জল বন্টন চুক্তি৷ কিন্তু তাতে বাংলাদেশের পানি সমস্যার প্রকৃত সুরাহা হয়নি৷ তখন বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে অনুরূপ একটি বাঁধ নির্মানের সুপারিশ করেছিলেন৷ খরচ ধরা হয় ৪০০ কোটি ডলার৷
গঙ্গা অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্পের যৌক্তিকতার বিষয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে আলাপচারিতায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুগত হাজরা বললেন, জরুরি যে জায়গাটাতে সবথেকে বেশি অভিঘাত পড়বে, তা হলো এক অভিন্ন ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটিজি তৈরি করা৷  বেসিনের উজানের দিকে নয়, ভাটির দিকে যেখানটায় ভারত ও বাংলাদেশ শেয়ার করে৷ যেখানটায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বিশ্বে সবথেকে বেশি৷ যেখানকার  সমস্যাগুলি মোটামুটি একই ধরণের৷ সুতরাং দেশ-ভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট না করে যদি ডেলটা বা বেসিন-ভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট গড়ে তোলা যায়, তাহলে উভয় দেশ উপকৃত হবে সবথেকে বেশি বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চলে৷ যৌথ ম্যানেজমেন্টে জলের লবনাক্ততা কম করতে, জৈব-বৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে, মত্সচাষ ও তাজা জলের মাত্রা বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট সহায়ক হবে৷ সামগ্রিক প্রভাব পড়বে জলবায়ু পরিবর্তনের উপর৷ মূলত ইকো-সিস্টেমে যুক্ত হবে এক নতুন মাত্রা৷ সেটাই হবে সবথেকে বড় লাভ উভয় দেশের, ডয়চে ভেলেকে বললেন সমুদ্র বিজ্ঞানী অধ্যাপক সুগত হাজরা৷
এই প্রসঙ্গে তিনি তুলে ধরলেন এক কালের গুরুত্বপূর্ণ ইছামতী নদীর উদাহরণ৷ বললেন, ইছামতী নদী এমনই একটা নদী যা ভারত ও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একবার ঢোকে একবার বের হয়৷ শেষে নদীবক্ষেই চিহ্নিত হয় দুদেশের সীমান্ত৷ এই নদীকে যদি যৌথ ম্যানেজমেন্টে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তাহলে ইলিশ মাছ থেকে শুরু করে অনেক সুফল ভাগ করে নেওয়া সম্ভব উভয় দেশের পক্ষে৷  ব-দ্বীপ অঞ্চলের সহায় সম্পদ শেয়ার করাই হবে আসল লক্ষ্য৷  কাজেই যৌথ ম্যানেজমেন্ট একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গঙ্গা অববাহিকা উন্নয়ন প্রকলের৷ যেমন, মেকং নদী ৭টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত, সেখানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সহমতের ভিত্তিতে যৌথ ম্যানেজমেন্ট বিশেষ দরকার৷  তবে তিস্তা জলবন্টন প্রকল্পের সঙ্গে গঙ্গা অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্পের তুলনা চলে না৷ চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে পৃথক৷ মুশকিল হচ্ছে, এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষ করে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রক্রিয়াগত নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে৷ জল সংক্রান্ত ইস্যুগুলি পড়ে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারে৷
এই প্রকল্পের চিন্তাভাবনা প্রথম মাথায় আসে ২০১১ সালে সাবেক কংগ্রেস-জোট সরকারের আমলে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে৷  বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার আগামী দিল্লি সফরে মোদীর সঙ্গে বৈঠকে গঙ্গা বেসিন উন্নয়ন প্রকল্পটি আলোচনার শীর্ষ আলোচ্যসুচির অন্তর্ভুক্ত৷ হাসিনার দিল্লি সফরের দিনক্ষণ এখনও চুড়ান্ত হয়নি৷ গত বছর তাঁর আসার কথা ছিল কিন্তু তা পিছিয়ে যায়৷

লুঙ্গির দাম ৯৮ ডলার

দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা এবং আরব বিশ্বের মানুষের কাছে লুঙ্গি খুবই পরিচিত একটি পোশাক। যুগের পর যুগ ধরে এসব অঞ্চলে পুরুষের পারিবারিক পোশাক হিসেবে সমাদৃত এই লুঙ্গি। কিন্তু এই পোশাক এখন পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে ফ্যাশন জগতে ঠাঁই করে নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের ব্র্যান্ড জারা লুঙ্গি বিপণন শুরু করেছে।
প্রতিটার দাম হেঁকেছে তারা ৯৮ ডলার। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক আমজাদ চৌধুরী বলেন, ‘লুঙ্গি একটা দারুণ জাতীয় পোশাক। বাসায় আমি এটা আনন্দের সঙ্গেই পরি। কিন্তু যুক্তরাজ্যের সড়কে তা পরে হয়তো বের হতাম না আমি।’ তবে এখন দৃশ্যপট বদলাচ্ছে বলে মত দেন আমজাদ। তিনি জানান, আরামপ্রদ হওয়ায় তিনি লুঙ্গি পরেন। এ ছাড়া অতীত স্মৃতি আর সংস্কৃতিও মিশে আছে এই পোশাকের সঙ্গে।
আল আরাবিয়া, সৌদি আরব

মাতৃভাষায় পঠন-দক্ষতা প্রবৃদ্ধি বাড়ায় by আব্দুল কাইয়ুম

বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, আপনি যদি শুধু মাতৃভাষা বাংলা সুন্দরভাবে পড়তে পারে এমন শিশুর সংখ্যা ১০ শতাংশ বাড়াতে পারেন, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে। আপনি বলতে পারেন, অর্থ বুঝে পড়া মানে ব্যাকরণ, বিচার-বিশ্লেষণ, ভাবসম্প্রসারণ, সারাংশ বুঝতে পারা-এত সব তো কঠিন কাজ। আর এত দক্ষতা বাড়লে তো প্রবৃদ্ধি বাড়বেই, এটা আর এমনকি? না, এত কিছু জানার দরকার নেই। শুধু পড়তে জানার কথাই বলছি। একেবারে সাদামাটা ব্যাপার। আপনি দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশুদের শুধু বইয়ের একটি পাতা গড়গড় করে পড়ে যেতে বলুন। আর আপনার মোবাইলে স্টপওয়াচ চালু করে চোখ রাখুন। সেই শিশু যদি মিনিটে অন্তত ৪০টি শব্দ পড়তে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সেই শিশু পঠন-দক্ষতা অর্জন করেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। ইংরেজি ভাষা পাঠে এই মানদণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে অনুসরণ করা হয়। বাংলার ক্ষেত্রে যদিও সে রকম কোনো গৃহীত মানদণ্ড নেই, আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আপাতত ব্যবহার করতে পারি। মিনিটে ৪০টি শব্দ মানে সেকেন্ডে একটি শব্দেরও কম। এটা খুবই সম্ভব। আর যদি পঞ্চম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী অর্থ বুঝে মিনিটে ৬০-৬৫ শব্দ পড়তে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সে প্রাথমিক পর্যায়ে পঠন-দক্ষতা অর্জন করেছে বলে ধরে নেওয়া যায়। মনে করবেন না, তাকে কোনো বিদেশি ভাষায় কিছু পড়তে বলা হচ্ছে। একেবারে সোজা বাংলায়, আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় সে না থেমে, পদে পদে আটকে না গিয়ে, অর্থ বুঝে যদি একটানা মিনিটে ৪০টি শব্দ পড়তে পারে, তাহলে সে পঠন-দক্ষতায় উত্তীর্ণ। আর এ রকম পড়তে পারা শিশুর সংখ্যা যদি মাত্র ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতটা বাড়বে, তা সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে সামান্য নয়। আসুন, একটু অন্যভাবে দেখি। শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ! যদি ১০ শতাংশের ১০ গুণ, মানে ১০০ শতাংশ, অর্থাৎ সব শিশু মাতৃভাষা বাংলায় সুন্দরভাবে পড়তে পারে, যদি অর্থ বুঝে মিনিটে ৪০টি শব্দ পড়তে পারে, তাহলে তো প্রবৃদ্ধি বাড়বে ৩ শতাংশ। আর এই ৩ শতাংশের জন্য আমরা মাথা কুটে মরছি। আমাদের এখন গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬-৭ শতাংশ। ২০২১ সালে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে দরকার মাত্র আর ১-২ শতাংশ। আর আমরা তো ৩ শতাংশ অনায়াসেই বাড়িয়ে ফেলতে পারি। কারণ, সাত-আট মাস বয়সে আমরা মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলা শুরু করে দিই। তাহলে সাত-আট বছর বয়সের মধ্যে, মানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষালাভের পর শুধু মাতৃভাষায় ভালোভাবে পড়তে পারব না? এখন আপনি বলতে পারেন, কে বলেছে পড়তে পারলেই প্রবৃদ্ধি তরতর করে বাড়বে? না, এটা আমার বানানো কথা না।
গত ২০ জানুয়ারি প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে ইউএসএআইডি ও সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের সহযোগিতায় আমরা মাতৃভাষায় পঠন-দক্ষতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সেখানে বিভিন্ন আলোচকের কথায় বোঝা গেল, শুধু মাতৃভাষা দিয়েই মধ্য আয় তো বটেই, উচ্চ-মধ্য আয়, এমনকি উদীয়মান অর্থনীতির (ইমার্জিং ইকোনমিক) দেশে উত্তরণও কঠিন কিছু নয়। ইউএসএআইডির শিক্ষাবিষয়ক টিম লিডার কেট মেলনি বললেন, পড়তে পারা শিশুর সংখ্যা ১০ শতাংশ বাড়লে প্রবৃদ্ধি বাড়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি হিসাব। তিনি এটাও বললেন, বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হতে চলেছে। তাই তার মানবসম্পদ উন্নয়ন দরকার। এ ক্ষেত্রে পঠন-দক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি তা-ই হয়, তাহলে তো আমরা এগিয়ে যাওয়ার পরিষ্কার একটি দিকনির্দেশনা পেলাম। পঠন-দক্ষতার যে এত বড় ভূমিকা রয়েছে, তা কি আমরা সব সময় মনে রাখি? ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মঞ্জুর আহমেদ তাঁর গবেষণা প্রবন্ধে জানিয়েছেন, আমাদের শিশুদের মাতৃভাষা বাংলায় পঠন-দক্ষতা যাচাইয়ের এক সরকারি জরিপের ফল অনুযায়ী দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের মাত্র ৩০ ভাগ শিক্ষার্থী ঠিকভাবে বাংলা পড়তে পারে। সত্যিই দুঃখজনক। অথচ একটু চেষ্টা করলেই সংখ্যাটা ১০০ ভাগ করা যায়। সেভ দ্য চিলড্রেনের নির্ধারিত কয়েকটি প্রকল্প এলাকায় ১০০ ভাগ শিশু বুঝেশুনে বাংলা গড়গড় করে পড়তে পারে। ওরা স্কুলে পাঠাগার স্থাপন করেছে। ইউএসএআইডি সহযোগিতা দিচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বললেন, তাঁরাও উদ্যোগ নিচ্ছেন। সবাই আশাবাদী যে পঠন-দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। শুধু সবার, বিশেষভাবে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বিষয়টিকে রাখতে হবে। আমরা যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিশুর মা-কে বুঝিয়ে বলি, তিনি প্রতি সন্ধ্যায় তাঁর সন্তানকে বলবেন স্কুলের বাংলা বইয়ের এক পাতা পড়ে শোনাতে। মা হয়তো তেমন লেখাপড়া জানেন না। হয়তো তিনি শিক্ষাবঞ্চিত। তাতে কোনো সমস্যা নেই। তিনি শুধু লক্ষ করবেন, তাঁর সন্তান একবারও না থেমে পড়ে যেতে পারছে কি না। যদি না পারে, তাহলে পরদিন স্কুল থেকে শব্দগুলো অর্থসহ বুঝে আসতে বলবেন। শিক্ষককে বিশেষ আদর-যত্ন করে পড়াতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে। পরদিন মা আবার পড়া ধরবেন। এই পদ্ধতির পড়াশোনা চালু হয়ে গেলে আমাদের শিশুদের প্রায় সবাই বছরখানেকের মধ্যেই মাতৃভাষায় পঠন-দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। সেদিন গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এ রকম একটি সম্ভাবনার কথা প্রায় সবাই বলেছেন। মাতৃভাষায় পঠন-দক্ষতার গুরুত্ব এত বেশি কেন? কারণ যে শিশু মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সে সহজেই ইংরেজি বা অন্য এক বা দুটি বিদেশি ভাষা শিখে নিতে পারে। তখন তার সামনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শীর্ষে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এটাই তো আমরা চাই। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় এই দিকটির প্রতি গুরুত্ব অবশ্যই দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পরিবার ও স্থানীয় সমাজের একটা ভূমিকা পালন করতে হবে। মাতৃভাষায় শুধু অর্থ বুঝে সুন্দরভাবে পড়তে পারার দক্ষতা অর্জন তো কঠিন কিছু না। আমাদের পক্ষে এটা খুবই সম্ভব। আসলে এ দিকটায় সুনির্দিষ্টভাবে মনোযোগ দিলে আগামী বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে দেশের সব শিশু সগর্বে বলতে পারবে, ‘আমরা মাতৃভাষা বাংলা গড়গড় করে পড়তে পারি। আমরা মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছি।’
আব্দুল কাইয়ুম: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক
quayum@gmail.com

আব্বাসের বিমান কেনা ও ইসরায়েলের ভণ্ডামি by রবার্ট ফিস্ক

উড়োজাহাজটির নাম বোয়িং বিজনেস জেট ১ (সংক্ষেপে বিবিজে১। এটির রেজিস্ট্রেশন মার্ক হলো বি-৫২৮৬। এটি বোয়িং ৭৩৭-৭০০ মডেলেরই অন্য একটি সংস্করণ। এটি ঘণ্টায় ৫৪১ কিলোমিটার গতিতে চলে। একটানা ছয় হাজার মাইলের বেশি পথ পাড়ি দেয়। এই উড়োজাহাজটি নিয়েই এখন ইসরায়েলের নোংরা খেলা শুরু হয়েছে। প্রায় পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার দিয়ে উড়োজাহাজটি ফিলিস্তিন সরকার তার ৮২ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের জন্য কিনতে যাচ্ছে। ইসরায়েল বলছে, যেখানে তাদের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিজের একখানা ব্যক্তিগত জেট নেই, সেখানে ফিলিস্তিন কীভাবে এই বিলাসবহুল উড়োজাহাজ তাদের প্রেসিডেন্টের জন্য কিনছে? আহা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী কী ব্যয়কুণ্ঠ মানসিকতা দেখালেন! অথচ এই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর জন্যই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতো বিশেষ বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ কেনার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এটির দাম পড়ছে সাত কোটি ডলার। ফিলিস্তিনের এই উড়োজাহাজ কেনার দলিলপত্র ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার হাতে এসেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উড়োজাহাজটি কেনা সম্পন্ন হলে এটির মালিক হবে ফিলিস্তিনের সার্বভৌম তহবিল ‘প্যালেস্টাইন ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’। এই তহবিলটি যারা গঠন করেছে, তাদের বলা হয়, ‘দ্য পিপল অব প্যালেস্টাইন’। ফিলিস্তিনের কয়েকটি কোম্পানির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই তহবিল গঠিত। বাইরের দেশের অনুদানের অর্থ এই তহবিলে নেই। কিন্তু ট্রাম্প যখন সহায়তা বন্ধ করে দিয়ে ফিলিস্তিনিদের না খাইয়ে মারার হুমকি দিচ্ছেন, ঠিক এমন একসময় মাহমুদ আব্বাসের এই ‘বিলাসিতা’ নিয়ে ইসরায়েল শোরগোল বাধিয়ে দিয়েছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আগেই দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। শিগগিরই পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অভিযোগ উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। সেই তিনি নিজের জন্য ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ কিনতে যাচ্ছেন। আব্বাস যে উড়োজাহাজ কিনবেন, প্রায় একই ধরনের উড়োজাহাজ কিনবেন নেতানিয়াহু। কিন্তু তাঁর ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এর দাম পড়বে অনেক বেশি; সাত কোটি ডলারের মতো। ২০১৩ সালে মার্গারেট থ্যাচারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে নেতানিয়াহু লন্ডন যান।
তাঁকে বহনকারী ই১ এ ১ উড়োজাহাজে তখন ডবল বেড স্থাপন করা হয়। শুধু এটি করতেই ইসরায়েলি করদাতাদের পকেট থেকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ডলার নেওয়া হয়েছিল। এর প্রতিবাদে ইসরায়েলি জনগণ ব্যাপক বিক্ষোভ করেছিল। এ ছাড়া তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শিমোন পেরেজের জন্য বিমানে বাড়তি অক্সিজেন ট্যাংক বসাতে ৪ হাজার ৭০০ ডলার খরচ হয়েছিল। এখন তারাই ফিলিস্তিনকে ব্যয়কুণ্ঠ হওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রাইভেট উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়াটা অত্যন্ত জটিল। আব্বাসের উড়োজাহাজ কেনার কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল গত শরতে; অর্থাৎ ফিলিস্তিনকে ট্রাম্পের সহায়তা বন্ধের হুমকি দেওয়ার অনেক আগে। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার জেট ক্র্যাফট করপোরেশনের মাধ্যমে চায়নিজ নানশান জেট কোম্পানির কাছ থেকে পাঁচ কোটি ডলারে কেনার কথা ঠিক হয়। দুবাইভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠান ‘ডোনাল্ড এইচ বাঙ্কার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’-এর মাধ্যমে সৌজন্য অগ্রিম হিসেবে পাঁচ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়। বেশ কিছু দলিলে প্যালেস্টাইন ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরও রয়েছে।ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার পক্ষ থেকে প্যালেস্টাইন ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার হয়েছিল। তাঁরা এই দলিলপত্র নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এই চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ইয়াসির আরাফাতের আমল থেকেই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের অফিশিয়াল প্লেন রয়েছে। আর অফিশিয়াল এয়ারক্র্যাফট সব সময় প্যালেস্টাইন ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের বিপরীতে নিবন্ধিত হয়ে থাকে। ওই কর্মকর্তা বলেন, বেশির ভাগ দেশই ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টকে ভিআইপি মর্যাদার বলে মনে করে থাকে। তিনি বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রেসিডেন্ট বাণিজ্যিক ফ্লাইটে চড়তে পারেন না। আবার অফিশিয়াল উড়োজাহাজ কেনা না থাকলে তার বদলে নিয়মিত প্লেন ভাড়া নেওয়া অনেক বেশি ব্যয়সাধ্য। ওই কর্মকর্তা জানান, গত বছর প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজে বেশ কয়েকবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার স্বার্থে প্যালেস্টাইন ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের সহায়তা চাওয়া হয়। তারা এই তহবিল দিতে সম্মত হয়। সম্প্রতি ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়ে মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এই মুহূর্তে ইসরায়েল আব্বাসের বিরুদ্ধে যে ‘বিলাসিতার’ অভিযোগ তুলেছে, তা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ফিলিস্তিনের নিজেদের কোনো এয়ারলাইন নেই। জার্মানি, স্পেন, জাপান, মিসর, সৌদি আরব ও মরক্কোর সহায়তায় গাজায় তাদের একমাত্র বিমানবন্দর গড়ে তোলা হয়েছিল। ২০০১ সালে ইসরায়েল বোমা মেরে এটিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এখন তারাই ফিলিস্তিনের ‘ব্যয় বাহুল্যে’ উতলা হয়ে উঠেছে।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি

রূপার জন্য ন্যায়বিচার, একটা দৃষ্টান্ত by রোকেয়া রহমান

আজ আমাদের বড় আনন্দের দিন। বড় খুশির দিন। কারণ আজ রূপা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। যেসব নরপশুর হিংস্র নখরের আঘাতে রূপার দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, যারা রূপাকে চরম অবমাননার পর হত্যা করেছিল, তারা উপযুক্ত সাজা পেয়েছে। কিন্তু যে তরতাজা জীবনটা চলে গেল, যে পরিবার তাদের একটি আশা হারাল, তা কি আর ফিরে আসবে? বলছি টাঙ্গাইলের চাঞ্চল্যকর রূপা খাতুন ধর্ষণ ও হত্যার মামলার রায়ের কথা। আজ টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবুল মনসুর মিয়ার আদালত রূপা হত্যা ও ধর্ষণ মামলার রায়ে চারজনকে ফাঁসির আদেশ এবং একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। গত বছরের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রূপা খাতুনকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে দেয় নরপশুদের ওই দলটি। রূপা খাতুন সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের আসানবাড়ী গ্রামের মৃত জেলহক প্রামাণিকের মেয়ে। তিনি ঢাকা আইডিয়াল ল’ কলেজে পড়াশোনা করতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করতেন। মা, তিন বোন, দুই ভাইয়ের সংসারে রূপাই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করছিলেন তিনি। ছোট বোন ও ভাইদের পড়ালেখার খরচও চালাতেন। লেখাপড়া শেষ করে আইনজীবী হবেন এমনটাই আশা ছিল রূপার। কিন্তু মানুষরূপী হায়েনারা তাঁর সে স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি। সেই হায়নারা আজ উপযুক্ত সাজা পেয়েছে। এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কী হতে পারে? আমাদের মতো নিশ্চয়ই রূপার পরিবারও আজ অনেক খুশি। রূপার মায়ের সন্তান হারানোর বেদনা কিছুটা হলেও হয়তো লাঘব হয়েছে। তাঁর মন কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পেয়েছে। কিন্তু যে সান্ত্বনা আজ রূপার মা পেয়েছেন। সেই সান্ত্বনা তো তনুর মা পাননি। পাননি রিশার মা বা রুনি ও সাগর সারোয়ারের মা। সান্ত্বনা পাননি আরও অনেকের মা। প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, খুব দ্রুত রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এ মামলায় অভিযোগ গঠন, সাক্ষী ও যুক্তিতর্কের জন্য মাত্র ১৪ দিন সময় নেওয়া হয়। অর্থাৎ অভিযোগ গঠন থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত এ মামলার পেছনে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৪ কর্মদিবস! গত ২৯ নভেম্বর এই মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। এরপর গত ৩ জানুয়ারি মামলার বাদী মধুপুরের অরণখোলা ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলামের সাক্ষীর মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্ব শুরু হয়। পরে আট কর্মদিবসে বিচারিক হাকিম, চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে চার কর্মদিবসে আসামিদের পরীক্ষা এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক হয়। অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি, যে বাসের মধ্যে রূপাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়, সেই বাসটি রূপার পরিবারকে দেয়ার আদেশ দিয়েছে। সত্যিই এটাও একটা দৃষ্টান্ত বটে। আহা, সব ধর্ষণ ও হত্যা মামলার নিষ্পত্তি যদি এ রকম দ্রুতগতিতে হতো! কিন্তু সে রকম তো হয় না, হতে চায় না। কোথায় কোথায় যে বাধা পড়ে জানা যায় না। জানতে পারি না আমরা। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। দু বছর হতে চলল কিন্তু বিচার হওয়া তো দূর আজও তাঁর খুনিরা ধরাই পড়েনি। একই বছরের আগস্ট মাসে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী বখাটের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। সেই বখাটে গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আদালত অভিযোগ গঠন করেছেন। ব্যস এ পর্যন্তই। আর কোনো খবর নেই। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সাগর-রুনি দম্পতি হত্যাকাণ্ডের কোনো কূলকিনারা এখন পর্যন্ত হয়নি। যদিও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘোষণা করেছিলেন যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই খুনিদের ধরা হবে। কিন্তু সেই খুনিরা আজও ধরা পড়েনি। দীর্ঘ ছয় বছরে তদন্ত প্রক্রিয়ারও কোনো অগ্রগতি হয়নি। আবার অনেক হত্যা মামলার বিচার হলেও ন্যায়বিচার পাওয়া যায়নি।। যেমনটি পাননি বুশরার পরিবার। ২০০১ সালে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার বাসায় খুন হন সিটি কলেজের ছাত্রী রুশদানিয়া বুশরা। এ মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত চার আসামির মধ্যে তিনজনকে ২০০৩ সালে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে বাদী ও বিবাদী পক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ২০১৬ সালে মামলার সব আসামিকে খালাস দেন আদালত। একটি হত্যা মামলার সব আসামি খালাস পেয়ে গেল! এর চেয়ে বেদনার আর কী হতে পারে। আমরা চাই রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মতো সব মামলার বিচার এ রকম দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। অপরাধীরা যথোপযুক্ত সাজা পাবে। ন্যায় বিচারের এ রকম দৃষ্টান্ত আরও স্থাপিত হবে। এর বেশি কি কিছু আমরা চাই?
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক

যা থাকছে আর্তনাদ বইয়ে

নির্যাতন রোহিঙ্গাদের ব্যথিত হৃদয়ের অশ্রু নিয়ে রীনা আকতার তুলির লেখা ‘আর্তনাদ’ বইটি লোমহর্ষক অনেক ঘটনার খণ্ডচিত্র ফুটে উঠেছে। বইটিতে থাকছে রোহিঙ্গাদের শেকড়ের পরিচয়- কীভাবে তাদের জাতিগত অধিকার হনন করা হয়েছে। চালানো হয়েছে জুলুম-অত্যাচার; যেন পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ভিটেমাটি থেকে তারা বিতাড়িত হয়। বইটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্মি সেনাদের ভয়াবহ নির্যাতন, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ, সম্ভ্রম হারানো নারীদের বিয়োগব্যথা, বাবা-মা হারা শিশুদের ব্যথাভরা চোখ, নাফ নদীতে নৌকা ডুবে যাওয়া, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কষ্ট, বিধবা নারীর আর্তনাদ, রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভালোবাসা, মমতাময়ী মাতা শেখ হাসিনার কান্না এবং রোহিঙ্গা শিশুদের শীতবৃষ্টির দুর্ভোগসহ বিভিন্ন বিষয়। বইটির সব লেখা রোহিঙ্গাদের বাস্তবজীবন আর চোখে দেখা রোহিঙ্গা জীবন থেকে নেয়া। প্রতিটি বিষয় রোহিঙ্গাদের বাস্তবজীবনের ব্যথিত হৃদয়ের অশ্রু। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জাতির নাম রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন জাতি, যাদের কোনো ভোটের অধিকার নেই। যুগ যুগ ধরে নিজ জন্মভূমিতে বসবাস করলেও আজ তারা উদ্বাস্তু, পথের মানুষ এবং পথই হয়েছে তাদের ঠিকানা।
শর্তবর্ষ আগে পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ভিটেমাটিতে কেটেছে শৈশব, যৌবন। যেখানে শেকড়ের পরিচয়; সে দেশ তাদের নয়। নির্বিচারে চালানো হয়েছে গণহত্যা, গণধর্ষণের পর নারীদের করা হয়েছে জবাই ও আগুনে নিক্ষেপ। মানুষরূপী হায়েনার দল মায়ের কোল থেকে শিশুদের হেঁচকা টানে কেড়ে নিয়ে বুটের নিচে পিষে মেরেছে। শেষমেশ শেকড়ছাড়া করতে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বসতভিটা। বর্মি সেনাদের নির্যাতন থেকে বাঁচাতে প্রচণ্ড খরতাপ বা তুফানের মধ্যে ঠিকানার খোঁজে গন্তব্যহীন পথে অবিরত হাঁটছে তারা। মাতৃভূমি ছেড়ে আজ তারা ভিন দেশে আশ্রয়ী। বইটি প্রকাশ করেছে বেহুলা বাংলা প্রকাশনী। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে যারা বই কিনতে চান, তারা নিচের উল্লিখিত নম্বরটিতে যোগাযোগ করতে পারেন। একুশে বইমেলায় বইটি পাওয়া যাচ্ছে বেহুলা বাঙলা প্রকাশনীর ১৭৩ ও ১৭৪ নম্বর স্টলে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান গেট)। এ ছাড়া বইটি সংগ্রহের জন্য ফোন করতে পারেন ০১৭২৩৭৫২৮৯৪ নম্বরে।

মানবাধিকার কর্মী আসমা জাহাঙ্গীর আর নেই

পাকিস্তানের মানবাধিকার কর্মী আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীর (৬৬) মারা গেছেন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রোববার হাসপাতালে যাওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। দ্য ডন। একাত্তরে নির্যাতিত বাঙালির পক্ষে যেসব পাকিস্তানি দাঁড়িয়েছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন আসমার বাবা মালিক গোলাম জিলানী।
১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর তার মুক্তির দাবিতে জেনারেল ইয়াহিয়াকে খোলা চিঠি লেখেন তিনি। এ জন্য কারাবরণ করতে হয় তাকে। ২০১৩ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো ৬৯ জন বিদেশি বন্ধুকে সম্মাননা দেয়া হয়। তার মধ্যে যে ১৩ জন পাকিস্তানি ছিলেন, তাদের একজন মালিক গোলাম জিলানী। বাবা মালিক গোলাম জিলানীর সম্মাননা নিতে ঢাকায় আসেন আসমা। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে সংঘটিত বর্বরতার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে ছিলেন আসমা জাহাঙ্গীর। বাংলাদেশে দুই যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে পাকিস্তান সরকারের ‘দ্বৈতনীতির’ সমালোচনা করায় অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাকিস্তানিদের রোষের মুখেও পড়েছিলেন তিনি। খবরে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত নিপীড়ন ও নির্যাতনের মুখেও অটল এই আইনজীবী মানবাধিকার রক্ষায় বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। পাকিস্তানকে আরও গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করার সংগ্রামে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৯৫২ সালে লাহোরে জন্ম নেন আসমা জাহাঙ্গীর। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি নেন।
১৯৮০ সালে লাহোর হাইকোর্ট এবং ১৯৮২ সালে সুপ্রিমকোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরে তিনি নারী হিসেবে প্রথম সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টও হন। সামরিক শাসক জিয়াউল হকের আমলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে গিয়ে ১৯৮৩ সালে তিনি কারাবন্দি হন। ২০০৭ সালে আইনজীবীদের আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং তাকে গৃহবন্দি করা হয়েছিল। ২০১০ সালে হিলাল-ই-ইমতিয়াজ ও সিতারা-ই-ইমতিয়াজসহ একাধিক সম্মাননা পান আসমা জাহাঙ্গীর। মানবাধিকার সংস্কৃতির উন্নয়নে ভূমিকার জন্য তিনি ইউনেস্কো/বিলবাও পুরস্কার এবং ফরাসি সরকারের দে লা লিজিঅঁ ডি অনার পুরস্কার পান। তিনি ২০১৪ সালে রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড ও ২০১০ সালে পান ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড।

অনবদ্য মানবাধিকার সংগ্রামী আসমা জাহাঙ্গীরের চলে যাওয়া



আসমা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুতে মানবাধিকারের জন্য অনবদ্য লড়াই করে যাওয়া এক সংগ্রামীকে হারাল পাকিস্তান। তিনি দেশটির একজন খ্যাতিমান আইনজীবী ছিলেন। নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ারে তিনি হৃদয়ে যা ধারণ করতেন, সেটিকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একজন আইনজীবী হিসেবে নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কাজে লাগিয়েছেন। নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার আদায়ে তিনি সারাটা জীবন লড়াই করে গেছেন। দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করার আন্দোলনে তিনি নিজেকে সবসময় এগিয়ে রেখেছেন। নারীদের সমঅধিকার আদায়ে ‘উইমেন অ্যাকশন’ ফোরামের (ডব্লিউএএফ) সহপ্রতিষ্ঠতা ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সাল থেকে সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে। কর্মস্থল, বিশেষ করে আইন পেশায় নারীদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে ‘উইমেন অ্যাকশন’। ১৯৮৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক হুদদ অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করে ডব্লিউএএফ। পাঞ্জাবের নারী আইনজীবী ফোরামের সদস্য হিসেবে তিনি তাতে যোগ দেন। জেনারেল জিয়াউল হক ধর্ম ও আইনের মধ্যে যে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন, সেটির বিরুদ্ধে এটি ছিল প্রথম কোনো প্রতিবাদ। এর পর পাকিস্তানের নারী অধিকারের লড়াইয়ে ডব্লিউএএফ ও আসমা জাহাঙ্গীর সবচেয়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। মানববন্ধনে যোগ দিতে গেলে আসমা জাহাঙ্গীরসহ অন্য অ্যাকটিভিস্টদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়, পুলিশের পিটুনি ও গ্রেফতারের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। পাকিস্তানে অনার কিলিংয়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ২০০৩ সালে সায়মা ওয়াজেদ মামলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ওই মামলার কারণে দেশটির নারীরা নিজেদের পছন্দমতো বিয়ে করার অধিকার পায়। এর আগে বাবা কিংবা ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া কোনো মেয়ে বিয়ে করতে পারতেন না। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে গেছেন। বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। আশির দশকে জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। যে কারণে ১৯৮৩ সালে তাকে আটক হতে হয়েছিল। ২০০৭ সালে সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের সময় তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। ২০১২ সালে তিনি দাবি করেন, গোয়েন্দা সংস্থা তার জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সামরিক আদালতে বেসামরিক লোকজনের বিচারের বিরোধিতা করে গেছেন তিনি।
মৃত্যুদণ্ডসহ সামরিক আদালতে দেয়া বিভিন্ন সাজার বিরুদ্ধে তিনি সুপ্রিমকোর্টে আপিল করেছিলেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সামাজিক প্রান্তিক লোকদের অধিকার আদায়ে তিনি পক্ষপাতহীন ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯৩ সালে ১১ বছর বয়সী খ্রিস্টান বালক সালামাত মাসিহ ও তার চাচা মনজুর মাসিহ ও রেহমাত মাসিহ ধর্ম অবমাননার অভিযোগে লাহোর হাইকোর্টে অভিযুক্ত হন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- তারা মসজিদের দেয়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে লিখেছেন। আসমা জাহাঙ্গীর ওই খ্রিস্টান পরিবারের পক্ষে দাঁড়ান। ১৯৯৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নজিরবিহীন রায়ে ওই খ্রিস্টান পরিবারটি খালাস পায়। তিনি মানুষের বাকস্বাধীনতার গোড়া সমর্থক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে প্রচার ছিল, তিনি পাকিস্তান ও ইসলামবিরোধী। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন বলে সহকর্মী আইনজীবীরা তার ওকালতির সনদপত্র বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। কিন্তু তিনি নিজের নীতিতে অবিচল ছিলেন। কখনও পিছপা হয়েছেন এমনটি ঘটেনি। পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারপারসন আসমা জাহাঙ্গীর নিখোঁজ ও গুমের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। যেসব পরিবারের সদস্যরা গুমের শিকার হয়েছেন, ন্যায়বিচারের জন্য তাদের পক্ষ হয়ে তিনি লড়েছেন। পাকিস্তানে খুব কম আইনজীবী আছেন, যারা নিখোঁজ ও গুমের মামলা নিতে ইচ্ছুক ছিলেন। এ কারণেই তাকে সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। কোনো প্রক্রিয়া ও প্রমাণ ছাড়াই বিভিন্ন সময় তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। একান্ত তার চেষ্টার কারণেই অনেক পরিবার তাদের নিখোঁজ হওয়া সদস্যদের সন্ধান পেয়েছেন। ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট কোয়েটায় হামলা হলে তার ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ওই হামলায় ৭০ নিহত ও ১৩০ জনেরও বেশি আহত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে ভারতের উগ্রহিন্দুত্ববাদী নেতা বাল থ্যাকারের সঙ্গে তার বৈঠকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তিনি ব্যাপক নিন্দা ও ক্ষোভের মুখোমুখি হন। সর্বগ্রাসী কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধ ছিল অবিসংবাদিত। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের এই অগ্রদূত মানবাধিকার সংগ্রামীদের কাছে যুগযুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বলিভিয়ায় উৎসবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত ৮



বলিভিয়ার অরুরো শহরের উৎসবে গ্যাস সিলেন্ডার বিস্ফোরণে তিন শিশুসহ আটজন নিহত হয়েছেন। শনিবার সন্ধ্যায় ভাসমান এক দোকানির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় আরও ৪০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। আহতদের বিমানে ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে দেশটির প্রধান শহর লা পাজে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এটিকে দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণ বলেছে স্থানীয় গণমাধ্যম।-খবর বিবিসি অনলাইন। দেশটির পুলিশপ্রধান রোমেল রানা বলেন, গ্যাস সিলিন্ডারটির সঙ্গে সংযুক্ত একটি রাবারের নলে গরম তেল পড়লে সেটি পুড়ে যায়, তখন গ্যাস বের হয়ে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ অরুরো উৎসবে যোগ দেন। এই কার্নিভ্যালকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। প্রতি বছর প্রায় ছয় হাজার নর্তকীসহ প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ এই কার্নিভ্যালে অংশ নেন।

ভারতীয় কোম্পানির চাপের মুখে ডিএসই

চীনের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে শেয়ার বিক্রি নিয়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের চাপের মুখে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কর্তাব্যক্তিরা। ডিএসইর এ শেয়ার বিক্রি নিয়ে চাপ প্রয়োগের জন্য ভারতের অন্যতম শেয়ারবাজার ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিক্রম লিমা এখন ঢাকায়। রোববার তিনি ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাজেদুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে নানাভাবে তাদের দেশের প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার বিক্রিতে চাপ প্রয়োগ করেন। সূত্র বলছে, বৈঠকে বিক্রম লিমা যে ভাষা প্রয়োগ করেছেন, তা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বর্জিত। ডিএসই সূত্র বলছে, বিক্রম লিমার প্রস্তাব অন্যায় ও অযৌক্তিক। ভারতীয় এ কর্মকর্তার প্রস্তাব যে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় সে বিষয়টিও তাকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে। চীনের শেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসই। মঙ্গলবার এ ব্যাপারে প্রাথমিক এবং শনিবারের বোর্ড মিটিংয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ। স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশনের (ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা আলাদাকরণ) শর্ত অনুসারে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে তাদের কাছে এ শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের দাম ২২ টাকা দিচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এ শেয়ারের মূল্য চাপের মুখে ফেলে ১৫ টাকায় কিনে নিতে চাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জে চরম ক্ষোভ রয়েছে। সূত্র জানায়, চীনের কাছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্তের খবর পেয়ে রোববার সকালে ঢাকায় আসেন বিক্রম লিমা। উঠেন ওয়েস্টিন হোটেলে। সেখানে বসেই ডিএসইর এমডিকে তিনি ডাকেন। কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদের পরামর্শে ওয়েস্টিনে যেতে রাজি হননি মাজেদুর রহমান। পরে সকালে ডিএসইতে এসে এমডির সঙ্গে বৈঠকে করেন বিক্রম লিমা। বৈঠকে তিনি জানতে চান সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শনিবার ডিএসই বোর্ড মিটিং করতে পারে কিনা? শুধু তাই নয়, ভারতীয় এ কর্মকর্তা এ সময় নানা অশালীন মন্তব্য করেন। ডিএসইর এমডিও এর জবাব দেন। তিনি জানতে চান, কীভাবে ভারতীয় কোম্পানি শেয়ার পেতে পারে। ডিএসইর পক্ষ থেকে তাকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়, আর কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বিকালে ডেকে নিয়ে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে কৌশলগত অংশীদারের কাছে ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সদস্যদের মালিকানায় ৪০ এবং ৩৫ শতাংশ থাকবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। তবে সাড়ে চার বছরেও কৌশলগত বিনিয়োগকারী চূড়ান্ত হয়নি। এ অবস্থায় চীনের সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ নিয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক এবং ফ্রন্টিয়ার মিলে গঠিত কনসোর্টিয়াম ডিএসইর শেয়ার কেনার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব দুটি ৬ ফেব্র“য়ারি খোলে ডিএসইর পর্ষদ। এতে দেখা যায়, ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার চীনের সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ২২ টাকা দর প্রস্তাব করেছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি ৯৯২ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে ডিএসইর কার্যক্রমের মানোন্নয়নে বিনামূল্যে উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। যার বাজারমূল্য ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) নেতৃত্বাধীন জোট শেয়ারপ্রতি ১৫ টাকা দরে মোট ৬৭৬ কোটি টাকা দিতে চেয়েছে। তাছাড়া জোটে নাসডাক থাকলেও তারা কোনো শেয়ার নেবে না। জোটটি মোট ২৫ দশমিক ০১ শতাংশ কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে এনএসই ২২ দশমিক ০১ শতাংশ শেয়ার নিতে চায়। বাকি ৩ শতাংশ শেয়ার নেবে ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ। এছাড়াও আগামী ৫ বছরের মধ্যে যে কোনো প্রক্রিয়ায় তাদের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। এছাড়াও পর্ষদে মোট দু’জন সদস্য থাকার প্রস্তাব করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু আইনে আছে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মাত্র একজন সদস্য রাখা যাবে। ডিএসইর পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি কারণে চীনের প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয়া হয়েছে। প্রথমত আইন ও ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম অনুযায়ী সব ধরনের নিয়ম মেনে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হতে চায় সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ। দ্বিতীয়ত শেয়ার কেনার জন্য বেশি দাম প্রস্তাব করেছে তারা। তৃতীয়ত প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়টিও পরিষ্কার করেছে এ কনসোর্টিয়াম। সবশেষ যুক্তি হল কোনো ভায়ার মাধ্যমে নয়, তারা সরাসরি শেয়ার কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের নাম ব্যবহার করা হলেও সরাসরি তারা নয়। এ ক্ষেত্রে বিক্রম লিমা এক ধরনের দালালি করছেন। এছাড়া তিনি যে সব ভাষা ব্যবহার করেছেন তা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিবর্জিত। বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জানা গেছে, দেশের আর্থিক খাতে ভারতের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে আসছে ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ভারতের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইনডিয়ার (সেবি) মধ্যে সমঝোতা চুক্তি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর সেবির চেয়ারম্যান ইউকে সিনহা এবং বিএসইসির চেযারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন চুক্তিতে সই করেন। এই চুক্তির ফলে তথ্য বিনিময়, স্টেক হোল্ডারদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন পণ্য চালুর বিষয়ে সহায়তা দেবে সেবি। সরকারের পাশাপাশি ভারতের বেসরকারি উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে সম্পৃক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে ব্যবসা করার অনুমোদন পেয়েছে ভারতের বৃহত্তম এবং এশিয়ার ৬ষ্ঠ বীমা কোম্পানি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (এলআইসি)। ২০১৪ সালে বঙ্গোপসাগরের দুটি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেয়েছে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশনের (ওএনজিসি) এবং অয়েল ইন্ডিয়া। এদিকে বহুল আলোচিত রামপালের কয়লাভিত্তিক ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে কাজ পেয়েছে ভারতীয় কোম্পানি ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (ভেল)। এছাড়াও ভারতের বড় দুই শিল্প গ্র“প আদানি ও রিলায়েন্স- গ্র“প দুটি বাংলাদেশে ১১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানিয়েছে।

রায় নিয়ে প্রোপাগান্ডা by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আহা কী চমৎকার যুক্তি! আজ যদি হিটলারের প্রোপাগান্ডা-মিনিস্টার গোয়েবলস বেঁচে থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের (কলামিস্টরা কি বুদ্ধিজীবী? ইউরোপে তারা বুদ্ধিজীবী বলে স্বীকৃত নন) একাংশের মধ্যে যে নতুন গোয়েবলসদের আবির্ভাব ঘটেছে, তাদের যুক্তিতর্ক শুনলে তিনি লজ্জায় মুষড়ে পড়তেন। সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো না বলার যে অদ্ভুত দক্ষতা ও তর্কশক্তি তারা দেখাচ্ছেন, তা দেখে গোয়েবলস নিশ্চয়ই মনে মনে স্বীকার করতেন- নাহ্, তিনি এদের তুলনায় কিছুই ছিলেন না। গত আট ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুর্নীতির মামলার রায়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমানসহ দণ্ডিত হতেই এই বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্টরা রায়টি সম্পর্কে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার নামে যেসব কথা বলছেন, তাকে আহাম্মকি যুক্তি ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। তাদের প্রকাশ্যে একথা বলার সাহস নেই যে, এটা মিথ্যা মামলা এবং রায়টাও আওয়ামী সরকারের দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু তাদের অনেকে আকারে-ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করছেন, দেশে এত বড় বড় দুর্নীতি চলছে, অনেক আওয়ামী লীগারও তাতে জড়িত, তাদের বিচার না করে খালেদা জিয়ার বিচার করা কেন? এর পেছনে সরকারের অভিসন্ধি রয়েছে সন্দেহ করা যায়। বিএনপিরও এটাই প্রোপাগান্ডা। তারা সরাসরি বলছেন এটা মিথ্যা মামলা। খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। আর দেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট সে কথা না বলে প্রচ্ছন্নভাবে দেশের মানুষের মনে এই সন্দেহের বীজ বপন করছেন যে, দেশে এত বড় বড় দুর্নীতির ঘটনা ঘটতে থাকলেও তার বিচার না করে খালেদা জিয়ার বিচার কেন? এর পেছনে সরকারের নিশ্চয়ই হাত রয়েছে। বিএনপি নেতারাও যে বলছেন তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে এটা ছিল মিথ্যা মামলা, তা দেশের মানুষকে তারা বিশ্বাস করাতে পারেননি। কারণ, খালেদা ও তারেকের বিরুদ্ধে এই মামলা বর্তমান আওয়ামী লীগ করেনি। করেছে তাদের পূর্ববর্তী সেনাপ্রভাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারপর নয় বছর ধরে মামলাটি চলেছে এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রায় হয়েছে। এই রায়ে আওয়ামী লীগ নেতারা খুশি হতে পারেন, কিন্তু রায় প্রদানের ব্যাপারে সরকার বিচারকদের প্রভাবিত করেছেন তা ৬৭২ পৃষ্ঠার রায়টি ভালোভাবে পর্যালোচনা না করে বলাটা উদ্দেশ্যমূলক।
বিএনপি নেতারা তাদের দলীয় স্বার্থে এ প্রোপাগান্ডা ছড়াতে পারেন। কিন্তু যে বুদ্ধিজীবীরা অহরহ নিজেদের নিরপেক্ষ বলে প্রমাণ করার জন্য ব্যস্ত, তারা মামলার রায়টিতে একবার চোখ না বুলিয়ে, তার ত্রুটি উদ্ঘাটন না করে প্রচ্ছন্নভাবে বিএনপি নেতাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাবেন, তা আশা করা যায় না। বিএনপির প্রোপাগান্ডা অবশ্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করেনি। করলে খালেদা জিয়াকে আদালত থেকে জেলে পাঠানোর দিনই মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসত। তারা আসেনি। বিএনপির জনবল বলতেই জামায়াত। জামায়াত সবসময় বিএনপির মিছিলে জনসংখ্যা বাড়ায়। এবারও তাদের সাহায্যে বিএনপি ঢাকায় এবং অন্যান্য শহরে ছোট-বড় মিছিল-মিটিং করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সরকারের সঙ্গে কোনো শোডাউনে যেতে তারা সাহসী নয়। দলের নেতারা অনবরত বলছেন, নেত্রী বলে গেছেন আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালাতে। এ নেতারা জানেন, আগের মতো জনসমর্থনহীন আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস চালাতে গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের সম্পর্কে যেটুকু সহানুভূতি আছে, তাও থাকবে না। ৮ ফেব্রুয়ারির রায় সম্পর্কে বিএনপি যে সন্দেহটা মানুষের মনে জাগাতে পারেনি, সেটা জাগানোর দায়িত্ব নিয়েছেন ঢাকার একটি ‘নিরপেক্ষ বাংলা দৈনিক’। এ দৈনিকের দুটি চেহারা। দেশের অবস্থা যখন স্বাভাবিক, তখন এ পত্রিকা যথার্থই নিরপেক্ষ। কিন্তু এ অবস্থায় কোনো তারতম্য ঘটলেই তার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের ছোট-বড় ত্রুটি বড় করে তুলে ধরে। খুঁত না থাকলে তা আবিষ্কার করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতাগুলোর তুলনা টানার নামে ব্যর্থতাগুলো বড় করে দেখায়। বিএনপি যে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে সফল হয় না, প্রচ্ছন্নভাবে সেগুলো সফল করার দায়িত্ব নেয় পত্রিকাটি। ৮ ফেব্রুয়ারির রায় সম্পর্কে পত্রিকাটি একই কৌশল গ্রহণ করেছে। নিজেকে নিরপেক্ষ-নির্ভীক বলে পরিচয় দিলেও সরাসরি এ রায়ের সমালোচনা করার সাহস তার নেই। সে ‘পরের মুখে ঝাল খাওয়ার’ নীতি গ্রহণ করেছে। এ রায় নিয়ে দেশের বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের নামে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য যেসব বুদ্ধিজীবী কলম উঁচিয়ে বসে থাকেন, বেছে বেছে তাদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে ছেপেছেন। তাদের মধ্যে দু’একজনের যে নিরপেক্ষ কণ্ঠ নেই, তা নয়। কিন্তু বাজারি হৈচৈয়ে তাদের কণ্ঠও হারিয়ে গেছে। বিএনপি নেতারা রাতদিন চিৎকার করে মানুষের মনে যে সন্দেহটা জাগাতে পারেনি, এ ‘নিরপেক্ষ’ পত্রিকা সমাজের কিছু অংশের মধ্যে এ সন্দেহটা জাগাতে সফল হয়েছে। ঢাকায় আমার যে সাংবাদিক বন্ধু দু’দিন আগেও খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের দুর্নীতি ও অপশাসন সম্পর্কে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, তিনি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার পর ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিকে এ সম্পর্কে তথাকথিত সুধীজনের প্রতিক্রিয়া পাঠের পর আমাকে বলেছেন, ‘কথাটাতো সত্যি’, দেশে বড় বড় দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে, ব্যাংকে লুটপাট চলছে, যার কোনো কোনোটার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো হোমরা-চোমরা জড়িত বলে অভিযোগ আছে। তাদের না ধরে কেবল খালেদা জিয়াকে ধরা কেন? এটা কি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা নয়? সুধীজনরা তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তো ঠিকই কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য কী, তা আমি জানি না। তারা যদি মনে করেন, খালেদা জিয়া জেলে বন্দি থাকলে এবং বিএনপি দেশে এ ব্যাপারে কোনো বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলেই সমস্যা চলে যাবে তাহলে ভুল করবেন। বিএনপি সংগঠন হিসেবে দুর্বল হলেও তার প্রোপাগান্ডা শক্তিশালী। তাদের সহায়কশক্তি হিসেবে আছে নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশধারী একটি মিডিয়া গ্রুপ। আছেন যাদের কথা গোড়াতেই বলেছি সেই একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের কিছু শিক্ষকও আছেন তাদের মধ্যে। তারা যদি প্রচ্ছন্নভাবে মানুষের মনে এ সন্দেহটাও জাগ্রত করতে পারেন যে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলা এক-এগারোর সরকার করলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তা দীর্ঘকাল ঝুলিয়ে রেখে এখন নির্বাচনের বছরে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছেন এবং দেশে এত বড় বড় দুর্নীতি ও ব্যাংক লুটের ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও খালেদা জিয়াকেই শুধু বিচার ও দণ্ড দেয়ার জন্য টার্গেট করা হয়েছে, তাহলে আওয়ামী লীগ বেকায়দায় পড়বে। বিএনপিকে আন্দোলন করতে হবে না, তথাকথিত নিরপেক্ষ মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের এ প্রচারণাই বিএনপির অনুকূলে কাজ করবে। আওয়ামী লীগকে তাই আত্মসন্তোষে না ভুগে এ মামলা সম্পর্কে জনগণের একাংশের মন থেকে সব সন্দেহ দূর করার জন্য আন্তরিকতা ও সততা নিয়ে তাদের কাছে নিজেদের অবস্থা তুলে ধরতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসন দিয়ে বিএনপির আন্দোলন ঠেকানো যাবে, মানুষের মনের সন্দেহ ও বিভ্রান্তি দূর করা যাবে না। ঢাকার সাংবাদিক বন্ধুকে এ ব্যাপারে আমার কথা খুলে বলেছি। তাকে জানিয়েছি, আওয়ামী লীগের আমলেও বড় বড় দুর্নীতি ও সন্ত্রাস হয়েছে। সরকার কিছুই করেনি তা নয়।
হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের অভিযুক্তরা এখন জেলে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের আসামিরা র‌্যাবের অফিসার ও মন্ত্রীর জামাই হওয়া সত্ত্বেও রেহাই পায়নি। আওয়ামী লীগ দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনের জন্য চেষ্টা করছে। সবসময় সফল হয়নি। বিএনপির মতো বড় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও তারেক-কোকোর দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেনি। তারপরও আওয়ামী লীগের যেসব দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়াল এখনও বিচারের আওতার বাইরে রয়েছেন, তাদের বিচার ও দণ্ডদানের জন্য দাবি তোলা অবশ্যই দরকার। কিন্তু তার সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিচার ও দণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেত্রী। তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে দেশে স্বচ্ছ রাজনীতির স্বার্থে অবশ্যই তার ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর দশটা দুর্নীতি যত গুরুতর হোক, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা চলবে না, শুধু দেখতে হবে ন্যায়বিচারটা হয়েছে কিনা। ন্যায়বিচার না হয়ে থাকলে তখন অন্য কথা। একথা বলা চলবে না যে, আর দশটা দুর্নীতির মামলা না হলে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার করা যাবে না। এক মনীষী বলেছেন, ‘একটি অন্যায় দিয়ে আরেকটি অন্যায় ঢাকা দেয়া যায় না। একটি অন্যায়ের বিচার হয়নি বলে আরেকটি অন্যায়ের বিচার ঝুলিয়ে রাখা আরও বড় অন্যায়।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি এবং বিএনপি-সমর্থকরা একই ধুয়া তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের কেন বিচার হচ্ছে না একথা তুলতেই বিএনপির এক শীর্ষ নেতা বলেছিলেন, ‘দেশে তো শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করা হয়নি, আরও বহু হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সেগুলোর আগে বিচার হোক, তারপর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের কথা ভাবা যাবে।’ একদিকে এ বুলি আউড়িয়ে অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের আওতা থেকে ইনডেমনিটি দিয়ে উচ্চ কূটনৈতিক পদে নিযুক্তি দেয়া হয়েছিল। বিএনপি নিজেদের ইতিহাস নিজেরা ভুলেছেন এবং দেশের মানুষকেও ভোলাতে চাইছেন এবং তাতে সহযোগী হয়েছেন দেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এবং একটি তথাকথিত নিরপেক্ষ মিডিয়া গ্রুপ। তারা ৮ ফেব্রুয়ারির রায় নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করছেন। এ নির্বাচনী বছরে জনসাধারণের একাংশের মনের এ সন্দেহটা দূর করতে হবে যে, এ রায়ের পেছনে সরকারের কোনো কারচুপি নেই এবং আইনকে তার নিজস্ব পথে চলতে দেয়া হয়েছে।

মার মার কাট কাট ব্যবসার কবলে শিক্ষা by আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন একটা ‘কালাজ্বরে’ আক্রান্ত। নাম তার ‘প্রশ্নফাঁস’। বোর্ড পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা- সে যাই হোক, পাবলিক পরীক্ষা হলেই এখন, অনেকেই আগে প্রশ্ন পেয়ে যাচ্ছে। সেটা কখনও পুরো প্রশ্নপত্র, কখনও বা আংশিক। কখনও সরাসরি, কখনও প্রযুক্তির বরাতে (ফেসবুক, হোয়াটস্আপ, মেসেঞ্জার, ভাইবারে) প্রশ্ন পৌঁছে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীদের হাতে হাতে বা ল্যাপটপ-মোবাইলে। পরীক্ষার আগের রাতে বা সকালে শিক্ষার্থী বা অভিভাবকরা চড়ামূল্যে কিনে নিচ্ছে সেই প্রশ্নপত্র বা প্রশ্ন। এ বিকিকিনিতে ‘প্রশ্নফাঁস’ হয়ে উঠেছে এক ‘মার মার কাট কাট’ ব্যবসা। হয়ে উঠেছে শিক্ষাব্যবস্থার অনিবার্য গলার কাঁটা। হয়ে উঠেছে এক দুরোরোগ্য ‘গোদফোঁড়া’। গোদফোঁড়া বলছি, কারণ পাবলিক পরীক্ষাগুলো প্রায়ই এখন প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে দুষ্ট। তার সর্বশেষ নমুনা, চলমান এসএসসি পরীক্ষা। চলতি এসএসসি পরীক্ষার ১ম পাঁচটি পরীক্ষার প্রায় প্রত্যেক দিনই কোথাও না কোথাও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে এবং মোবাইলে প্রশ্নসহ একাধিক জনকে আটক করা হয়েছে। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, পরীক্ষা হবে, প্রশ্নফাঁস হবে না- এ যেন এখন ভাবনাতীত বিষয়। সরকার যে চেষ্টা করছে না, তা নয়। কিন্তু প্রশ্নফাঁসকারী চক্রটা এতটাই শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ, তাদের দৌরাত্ম্যের কাছে প্রশাসনকে রীতিমতো অসহায় মনে হচ্ছে। তারা কার্যত কাউকে, কোনো কিছুকে তোয়াক্কা করছে না। রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ নেয়ার নেশায় তারা এতটাই মত্ত ও বেপরোয়া যে, তারা এখন রীতিমতো প্রকাশ্যে এবং আগাম ঘোষণা দিয়ে প্রশ্নফাঁস করছে। তাদের আস্ফালন ও স্পর্ধা দেখলে রীতিমতো ভিরমি খেতে হয়।
বিষয়টিকে দুরোরোগ্য বলছি কারণ, রোগটি ওষুধে সারছে না। ওষুধের নাম, ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনের ৪ ধারা। ওই আইনে প্রশ্নফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণ দণ্ডনীয় অপরাধ। যার সাজা জরিমানাসহ ৩-১০ বছর কারাদণ্ড। অবিশ্বাস্য হল, আইনটি পাসের ২৭ বছরেও এ আইনে কারও সাজা হওয়ার দৃষ্টান্ত নেই। আরও অবিশ্বাস্য হল, ২০১৫ সালের প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়ায় প্রশ্নফাঁসের সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর থেকে কমিয়ে ৪ বছর করা হয়। অথচ, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা তখন নিয়মিত। লক্ষণীয় হল, ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। প্রশ্নফাঁসের সাজা কমানোয় তখন সমালোচনার ঝড় ওঠে। বাধ্য হয়ে তখন, আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পরিমার্জনের কথা বলে এক সপ্তাহের মধ্যে খসড়াটি সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর ১৬ মাস গেল। অথচ, আইন বাদ, খসড়াটিই এখনও আলোর মুখ দেখেনি। এরকম একটা জঘন্য অপরাধে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি যদি এমন গোলমেলে হয়, তাহলে সমাধানটা কোথায়? সত্যি বলতে কী, এ পর্যন্ত কোনো প্রশ্নফাঁসের ঘটনার কার্যকর কোনো সুরাহা হয়নি। প্রতিটি অঘটনের দৌড় তদন্ত কমিটি, সুপারিশ, দু-চারজন গ্রেফতার পর্যন্ত। আর এগোয় না বিষয়টি। কারা, কীভাবে কাজটি করে বা করছে, প্রশ্নফাঁসের মূল হোতা কারা, তা কখনও জানা যায়নি। চুনোপুঁটি যারা ধরা পড়ে, তারাও জামিনে বেরিয়ে আরও বীরদর্পে অপকর্ম চালায়। পত্রিকার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে ছয় বছরে (সেপ্টেম্বর, ২০১৫ পর্যন্ত) রাজধানীতে দায়ের হওয়া ৭০টি মামলায় কোনো আসামির সাজা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ একটি মামলাও প্রমাণ করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, ১১ মামলায় সব আসামিই অব্যাহতি পায়। বাকি মামলায় বেশিরভাগ আসামি মামলা থেকে অব্যাহতি ও খালাস পায়। অনেক আসামি জামিন নিয়ে আর আদালতে হাজিরা পর্যন্ত দেয় না। ওই ৭০টি মামলার সিংহভাগ ক্ষেত্রে আদালতের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ‘অভিযোগ গঠনের উপাদান না পাওয়ায় আসামিদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে।’ ওই ৭০টি মামলার অধিকাংশই হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির অভিযোগে (প্রথম আলো, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। অবশ্য আশার কথা, ৭ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ীতে এসএসসির ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র প্রশ্নফাঁসের সময় তিনজনকে হাতেনাতে ধরে মোবাইল কোর্ট দুজনকে ৬ মাস ও একজনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন। তবে বিষয়টি কার্যত গুরুপাপে লঘুদণ্ড। পরিহাস হচ্ছে, সরকার প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে তো পারছেই না, উল্টো অভিযোগ উঠলেই দায়িত্বশীল মহল বেশিরভাগ সময় বিষয়টিকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রেস কনফারেন্স, আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে সরকার মিথ্যা ঘোষণা পর্যন্ত করে। যেমনটি হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠল। একাধিকজন প্রশ্ন ও উত্তরপত্রসহ গ্রেফতার হল। তারপরও সরকার অভিযোগ অস্বীকার করল। ওই পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে তখন বিভিন্ন মহলের কত প্রতিবাদ! ভর্তিবঞ্চিতদের কত মিছিল-মিটিং, আন্দোলন। কিন্তু সব ‘লব ডঙ্কা’। অবশ্য, এবারের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। চলমান এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি সরকার আর সরাসরি ‘গুজব’ বলছে না। খবরে প্রকাশ পায়, শিক্ষামন্ত্রী দায়টা নিজের কাঁধে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদ থেকে সরে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। অথচ গত বছর এসএসসির সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘প্রমাণ মিললে চলতি এসএসসির গণিত পরীক্ষা বাতিল করা হবে’।
তবে সেখানে অনেক ‘কিন্তু’ জুড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, প্রশ্ন কখন ফাঁস হয়েছে, কীভাবে কতটুকু ফাঁস হয়েছে, পরীক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব কতখানি পড়েছে, তা খতিয়ে দেখার পর পরীক্ষা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে (কালের কণ্ঠ, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭)। তবে বাস্তবতা হল, ওই অভিযোগ সহজে প্রমাণিত হয় না। শিয়ালকে মুরগি চুরির তদন্ত দিলে, ঘটনার সত্যতা মিলবে নাকি? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেভাবে ‘প্রশ্নফাঁস’-এর ফাঁসে আটকা পড়েছে, তার পরিণতি ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী। এবারের এসএসসির কথাই ধরুন। এসএসসির ফল প্রকাশ পেলে হয়তো দেখা যাবে, ফাঁসকৃত প্রশ্ন পাওয়া পরীক্ষার্থীরাও জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তারপর হয়তো একদিন, ‘জিপিএ’ বা ‘এসএসসি’ মানে কী জিজ্ঞেস করলে বলবে, ‘জানি না’। কিংবা ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ কবে বা ‘রাষ্ট্রপতির নাম’ জানতে চাইলে তা-ও বলবে ‘সরি, জানি না’। ‘আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি’ এর ইংরেজি অনুবাদ বলবে, ‘I am GPA-5’, ‘I gave GPA-5’। বলবে ‘স্বাধীনতা দিবস হল ১৬ ডিসেম্বর’, ‘বিজয় দিবস হল ২৬ ডিসেম্বর’, ‘জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা নজরুল ইসলাম’, পীথাগোরাস একজন ঔপন্যাসিক ইত্যাদি ইত্যাদি..। কিংবা ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ কী জানতে চাইলে বলবে, অপারেশন করার সময় যে লাইটটা জ্বালানো হয়, সেটাই ‘অপারেশন সার্চলাইট’!! (তথ্যসূত্র-মাছরাঙা টিভির জিপিএ-৫ বিষয়ক প্রতিবেদন)। এ অবৈধ পন্থায় পাসের পরিণতি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। ওই পথের পথিকরা আগামীতেও সব পরীক্ষার (প্রাতিষ্ঠানিক বা চাকরি সংক্রান্ত) বৈতরণী একই পন্থায় পার হতে চাইবে। এমনকি অন্যদেরও বিপথগামী করবে। এ বিপথগামিতা, একটা সুষ্ঠু ও অগ্রসর শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ধ্বংস বা জাতিকে মেধাশূন্য করাই নয়; সাধারণ, নিরীহ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা ও বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। দুর্ভাগ্য, সেই প্রশ্নফাঁসই এখন আমাদের উদ্ধারহীন নিয়তি। তারপরও আমরা আশাবাদী। একটা সময় ছিল, নকলছাড়া পাবলিক পরীক্ষা ছিল অকল্পনীয়। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দেখিয়েছেন, নকলমুক্ত পরীক্ষা চাইলে এদেশেও তা সম্ভব। নকলের স্থানটা এখন প্রশ্নফাঁসের দখলে। তাই শিক্ষামন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা, তিনি এবার পরীক্ষাগুলোকে ‘প্রশ্নফাঁস’ মুক্ত করবেন। জাতিকে প্রশ্নফাঁসের ফাঁস থেকে উদ্ধার করবেন। দেশের শিক্ষাকে কলঙ্কমুক্ত করবেন। আর সেটা সম্ভব, যদি বিদ্যমান প্রশ্ন প্রণয়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও কঠোর নজরদারিতে রাখা যায়। সম্ভব, যদি প্রশ্নফাঁসকারীদের গলায় সর্বোচ্চ দণ্ডের ফাঁস পরানো যায়।
আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট
aftabragib2@gmail.com

বন্ধ হোক ফেসবুকের নেতিবাচক ব্যবহার by মুন্নাফ হোসেন

ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। মার্ক জুকারবার্গ তার কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ২০০৪ সালে এটি আবিষ্কার করেছিলেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। ফেসবুকের কল্যাণে অসংখ্য ভালো কাজ হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটি জরুরি। ফেসবুক ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের ওপর একধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বয়স বাড়িয়ে আইডি খুলে ব্যবহার করছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এতে তাদের পড়াশোনা মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষিত অভিভাবকরাই তার সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছে স্মার্টফোন। তারা বন্ধুদের প্ররোচনায় খুলছে আইডি, আর সারাক্ষণ ডুবে থাকছে ফেসবুকে। বাবা-মাকে ধোঁকা দিচ্ছে এই বলে যে, তারা ফেসবুকে পড়াশোনা করছে। ফেসবুক আসক্তির কারণে সন্তানরা বাবা-মা, প্রতিবেশী বা শিক্ষকদের সম্মান করে না। স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে পার্কে বা নদীর ধারে বসে ব্যবহার করছে ফেসবুক। এতে করে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হচ্ছে। বই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের উত্তমসঙ্গী। কিন্তু বই না পড়ে কতটুকু জ্ঞান অর্জন সম্ভব, তা আমার মাথায় আসে না। জ্ঞান অর্জনে বইয়ের চেয়ে উত্তম হাতিয়ার কিছু হতে পারে না। তাই ফেসবুক ছেড়ে বইয়ের পাতায় শিক্ষার্থীদের মগ্ন হওয়া উচিত। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হল ফেসবুক। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং ব্যবহারকারীর অধিকাংশই বয়সে তরুণ। নিজের কোনো অভিজ্ঞতা,
আনন্দ, অনুভূতি, স্মৃতি অথবা বিভিন্ন ধরনের ছবি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পেজে পোস্ট করে দিয়ে ফেসবুক বন্ধুদের মন্তব্য উপভোগ করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনা সংক্রান্ত মতামত শেয়ার করার কার্যকর মাধ্যম হল ফেসবুক। নিঃসন্দেহে এটি বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার আরেকটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। কিন্তু প্রতিটি উদ্ভাবনেরই যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক রয়েছে, সেটিও মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মধ্যে ফেসবুকের ব্যবহার কী অর্থে হচ্ছে তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা ফেসবুকের নেতিবাচক ব্যবহার প্রমাণ করে। প্রেম, বন্ধুত্ব কিংবা ভালোবাসা মানবিক জীবনে চিরন্তন বাস্তবতা। বিভিন্নকালে এর বিকাশ বিভিন্নভাবে হয়েছে এবং সবসময়ই বিশ্বাস, আস্থা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিল এ ধরনের মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি। আর এর জন্য প্রয়োজন উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক জানাশোনা, যেখানে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু ফেসবুকের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের মাঝে পারস্পরিক যে সম্পর্ক তৈরি হয় তার মধ্যে থাকে না কোনো পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস। কেবল সাময়িক আবেগনির্ভর এ ধরনের সম্পর্কের অশুভ পরিণতি সামাজিক জীবনে নানা ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। কারও সংসার ভাঙছে, কেউবা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে এবং কারও কারও জীবনটাই বিপন্ন হয়ে পড়ছে। আর এভাবেই দেশের সামাজিক মূল্যবোধের দ্রুত অবক্ষয় হচ্ছে। ফেসবুকে চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রায় সব প্রশ্ন পাওয়া যাচ্ছে, যা আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে অভিভাবকসহ সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।
মুন্নাফ হোসেন : সহকারী শিক্ষক, মোহাম্মদ নগর উচ্চ বিদ্যালয়, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ

সড়কে বাড়ছেই মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এত আলোচনার প্রেক্ষাপটে যান্ত্রিক যানের চালকরা ন্যূনতম সচেতনতার পরিচয় দিয়েছে এমন দৃষ্টান্ত বিরলই বলা চলে। বরং বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো যেন নিয়মেই পরিণত হয়েছে। চালকের অদক্ষতা এবং ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা যে বাড়ছে তা বলাই বাহুল্য। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, একজন যাত্রী ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কিনা অথবা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড শেষ করে নিরাপদে ফিরতে পারবেন কিনা এ নিয়ে প্রতি মুহূর্তে উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়। বিভিন্ন সংস্থার জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে বোরবারের যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৩ বছরে সড়কে ৫৯ হাজার ৯৪১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৮ হাজারের বেশি যাত্রী। উল্লিখিত সময়ে আহত হয়েছেন ২ লাখেরও বেশি যাত্রী। যেখানে একজন ব্যক্তির হতাহতের কারণে একাধিক পরিবারে নানারকম সমস্যা সৃষ্টি হয়, সেখানে এই বিপুলসংখ্যক আহত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কী অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। রাজধানীর একজন গাড়ির মালিক বিচক্ষণতার সঙ্গে গাড়ির চালক নিয়োগ প্রদান করেন। ফলে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম হওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের শহরাঞ্চলে মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৭৪ শতাংশই ঘটে রাজধানীতে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং অদক্ষ চালকের কারণে যে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে তাও বহুল আলোচিত। এছাড়া অন্য যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে তাও অজানা নয়। চিহ্নিত সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক এটাই বড় প্রশ্ন। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে আর কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাত হাজির করবে, এটা কতদিন চলবে? ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময়ও যদি দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে? এ নিয়ে কোনো জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনতে চায় না কেউ। সবাই চায় এর প্রতিকার। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষ কঠোর না হলে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা যে বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। চিহ্নিত সমস্যার সমাধানে দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি দুর্নীতির আশ্রয় নিলে তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা কমবে না। বস্তুত চালকের অসতর্কতা ও অবহেলার করণেই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। চালকদের তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে আলোচিত বিষয়ে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। চালকদের সার্বিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়াটাও অতি জরুরি।

২১ দিন পর সোনামসজিদে পাথর আমদানি শুরু

টানা ২১ দিন বন্ধ থাকার পর সোমবার থেকে আবারও পাথর আমদারি-রফতানি শুরু হয়েছে। সোনামসজিদ জিরো পয়েন্টে পাথর আমদানি-রফতানি জটিলতা নিরসন হওয়ায় সকাল থেকে পাথর আমদানি-রফতানি শুরু হয়। আমদানি-রফতানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক তোফিকুল রহমান জানান, গত রোববার সোনামসজিদ জিরো পয়েন্টে পাথর আমদানি-রফতানি জটিলতা নিরসনে বাংলাদেশ-ভারতের আলোচনা ও মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন মো. কবিরুর রহমান খান, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. তৌফিকুর রহমান, আল. মো. আমিনুল ইসলাম সেন্টু, কাজী মো. সাহাবুদ্দিন, শ্রী সুবাস কুমার মণ্ডল, মো. একরামুল হক, আল. মাও. মো. মামুন রশিদ, মো. আলমগীর হোসেন, মো. নূর আমীন, সোনামসজিদ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিনিধি মো. হারুন অর রশিদ, সোনামসজিদ শ্রমিক লীগ প্রতিনিধি মো. সাদিকুল রহমান। ভারতের পক্ষে ছিলেন মো. ফজলুল হক, শ্রী মানবেন্দ্র সরকার, হাজী মুঞ্জুর মোল্লা, শ্রী হৃদয় ঘোস, শ্রী মানব সিংহ, মো. সমিল উদ্দিন মোমিন, মো. সাহেব শেখ, মো. সাদেক শেখ, মো. সাজু শেখ। আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয় সোমবার থেকে পাথর আমদানি শুরু হবে। এখন থেকে সিএফটি মাপের ভিত্তিতে রফতানি মূল্য পরিশোধ করা হবে। এ ছাড়া রফতানিকৃত পাথরে কোনো প্রকার ভেজাল থাকবে না। অন্যান্য সমস্যাও দূর করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি

নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক ঋণ বিতরণে অনিয়ম, জালিয়াতি ও লুটপাটে অতীতের যে কোনো ব্যাংক কেলেঙ্কারি-অনিয়মকে ছাড়িয়ে গেছে। ঋণ জালিয়াতি, দুর্নীতি-অনিয়ম ও লুটপাট করেই কেবল ক্ষান্ত হননি ব্যাংকটির পদত্যাগ করা চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও পদত্যাগ করা অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী, গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে নিজেদের অ্যাকাউন্টে অর্থ সরিয়ে নেয়ার মতো গুরুতর অপরাধ করতেও পিছপা হননি তারা। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের যোগসাজশে আমানতকারীদের অর্থ লোপাটে অস্তিত্বের সংকটে পড়া ব্যাংকটির বড় লেনদেনে অনিয়মের তদন্ত করতে গিয়ে জঘন্য অপরাধটি খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আলমগীর ও চিশতীর নৈতিক স্খলন ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, কেবল প্রতিবেদন দিলেই হবে না, এ দু’জনসহ অনিয়মে জড়িত ব্যাংকটির সব সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি লোপাট হওয়া গ্রাহকের টাকাও তাদের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। কারণ, ব্যাংক হচ্ছে বর্তমান সময়ে অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর গ্রাহক হচ্ছে এর প্রাণ; কিন্তু একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান যদি রক্ষক হয়েও ভক্ষকের ভূমিকা নিয়ে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারে, তবে গোটা ব্যাংকিং খাত থেকে মানুষের আস্থা উঠে যাবে, তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া এ দু’জনের বিরুদ্ধে আরও যেসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে, তাহল- অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য, নিয়মবহির্ভূত ঋণ মঞ্জুর, ঋণ বিতরণ এবং ঋণের টাকা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া। এসব অনিয়ম করার জন্য ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের কেউ কেউ সরাসরি ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে কমিশনও নিয়েছেন।
এভাবে অনিয়ম করে একটি ব্যাংককে পঙ্গু ও আমানতকারীদের পথে বসানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন এখনও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, সেটাই বড় প্রশ্ন। বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংকের গুরুতর অনিয়ম ছাড়াও সরকারি সোনালী-রূপালী-জনতা-অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকসহ কিছু বেসরকারি ব্যাংকেও বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি, জালিয়াতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে চিহ্নিত অপরাধী ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়াতেই অপরাধীরা যে বেপরোয়া হয়ে আরও মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করেছে ফারমার্স ব্যাংকে, এটি সহজেই অনুমেয়। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম দূর করতে হলে তাই ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির হোতাদেরসহ এ খাতের সব অনিয়ম-দুর্নীতিকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয়, ব্যাংক লোপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা ও কঠোর নিয়ম-নীতি করার পরিবর্তে এ খাতে তিন মেয়াদে পরিচালক থাকা ও পরিবারতন্ত্র কায়েমের মতো সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম রোধ ও শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কমিশন, আর্থিক অনিয়মের বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ও আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিকল্প নেই। ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিসংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ-মূলধন লোপাটকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে। অন্যথায় একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারি থামানো সম্ভব হবে না। সরকারের শীর্ষমহল বিষয়টিতে দ্রুত উদ্যোগী হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

অতিথি আপ্যায়নে হাঁসের মালাইকারি

হাঁসের মাংস খেতে পছন্দ করেন না এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম। শীতকালে হাঁসের মাংস একটি জনপ্রিয় খাবার। বিশেষ করে হাঁসের মাংসের সঙ্গে রুটি অথবা চিতই পিঠা খেয়ে থাকেন অনেকে। অতিথি আপ্যায়নে হাঁসের মাংসের জুড়ি নেই। হাঁসের মাংস বিভিন্নভাবে রান্না করা যায়, তবে হাঁসের মালাইকারি খুব সুস্বাদু একটি খাবার, যা রুটি বা চিতই পিঠার সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে। আসুন জেনে নিই কীভাবে তৈরি করবেন হাঁসের মালাইকারি-
উপকরণ
হাঁসের মাংস ১ কেজি, নারিকেলের ঘন দুধ ২ কাপ, নারিকেল মিহি বাটা ১ টেবিল চামচ, টক দই আধা কাপ (দই বেশি টক হলে পানি ঝরিয়ে নিন), আদা বাটা ২ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ বাটা ২ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, জিরা বাটা ১ চা চামচ, মরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়া ১ চা চামচ, জয়ফল+জৈয়ত্রী গুঁড়া কোয়ার্টার চা চামচ, গরম মশলা গুঁড়া ১ চা চামচ, এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা ২-৩টি করে, তেল, ঘি, কোয়ার্টার কাপ, লবণ স্বাদমতো, ক্রিম ২+২ টেবিল চামচ, চিনি ১ চা চামচ।
প্রণালি
হাঁস চামড়াসহ টুকরো করে কেটে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে টকদই দিয়ে মেখে রাখুন ১ ঘণ্টা। কড়াইতে তেল, ঘি দিয়ে পেঁয়াজ ভেজে অর্ধেকটা ভাজা পেঁয়াজ তুলে রাখুন। গরম মসলা গুঁড়া, তুলে রাখা পেঁয়াজ ভাজা ও ক্রিম ছাড়া সব মসলা আধা কাপ পানি দিয়ে কষিয়ে নিন। মাংস দিয়ে কষিয়ে অর্ধেক নারিকেল দুধ ও ২ কাপ গরম পানি দিয়ে মাংস সিদ্ধ ও কষা কষা করে নিন। মাংস সিদ্ধ হওয়ার জন্য প্রয়োজনে আরও পানি দিন। মাংস সিদ্ধ হয়ে ঝোল মাখা মাখা হলে বেরেস্তা, গরম মসলা গুঁড়া ও ২ টেবিল চামচ ক্রিম দিয়ে কম আচে ২০ মিনিট দমে রাখুন। এর পর নামিয়ে পাত্রে অবশিষ্ট ক্রিম দিয়ে পরিবেশন করুন।

ঘরেই তৈরি করুন মুড়ির মোয়া

মুড়কি-মোয়া বাঙালির ঐতিহ্য। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শীতের সময়ে কৃষকের বাড়িতে নতুন ধান ওঠে। এই সময়ে মুড়ি ভাজা ও মুড়ির মোয়া বানানোর ধুম পড়ে। অতিথি আপ্যায়নে মুড়ির মোয়ার জুড়ি নেই। তবে শহরে যান্ত্রিক জীবনে মুড়ির মোয়ার খুব একটা দেখা মেলে না। সকালের নাস্তায় ও বিকালের চায়ের টেবিলে পরিবারের প্রিয়জনদের জন্য তৈরি করতে পারেন মুড়ির মোয়া। তাই যুগান্তরের পাঠকের জন্য থাকছে কীভাবে ঘরেই তৈরি করা যায় মুড়ির মোয়া। আসুন জেনে নিই কীভাবে তৈরি করবেন মুড়ির মোয়া-
উপকরণ
মুড়ি ২৫০ গ্রাম, আখ বা খেজুরের গুড় ১০০ গ্রাম, পানি সামান্য, ঘি (মোয়া গোল করার জন্য)।
প্রণালি
মৃদু আচে কড়াই বসিয়ে অল্প পানিসহ গুড় জ্বালাতে হবে। গুড় গলতে শুরু করলে সামান্য পানির ছিটা দিন। এবার গুড় কিছুক্ষণ জ্বাল দিয়ে আঠালো করতে হবে। গুড় আঠালো হয়ে গেলে মুড়ি দিয়ে দিন। গুড় ও মুড়ি ভালোভাবে নেড়ে নেড়ে মিশিয়ে নিতে হবে। এবার নামিয়ে হালকা ঠাণ্ডা হলে হাতের তালুতে সামান্য ঘি মেখে সহনীয় গরম থাকতেই ভালোভাবে চেপে হাতের তালুতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মোয়া বানাতে হবে।

রোহিঙ্গাদের কেউ চায় না!

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের একটি উপশহর হলো পুচং। সেখানকার একটি ঘিঞ্জি ফ্ল্যাটে গাদাগাদি করে থাকেন ১৩ জন রোহিঙ্গা। ফ্ল্যাটটির একমাত্র আসবাব বলতে স্তূপ করে রাখা বিছানাপত্র। দিনের কাজ শেষে মেঝেতে ঘুমানোর সময় কাজে লাগে এগুলো। দিনে এক বেলা, বড়জোর দুই বেলা খাবার জোটে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের এসব মানুষের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এভাবেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গারা। এসব দেশে মূলত ‘অবাঞ্ছিত’ হিসেবেই দেখা হয় রোহিঙ্গাদের। তাঁরা একদিকে যেমন সম্মানজনক কাজ পান না, অন্যদিকে সব সময় তাড়া করে ফেরে বিতাড়নের ভয়। গত পাঁচ মাসে সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। রাখাইনের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজনের অভিযোগ, মিয়ানমারের সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের কারণেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। অবশ্য মিয়ানমারের সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। গত বছরের আগস্ট মাসের আগেও সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে রোহিঙ্গারা। দ্য ইকোনমিস্টে সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সহিংসতার শিকার হয়েই এসব রোহিঙ্গা ঘর ছেড়েছেন। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা রয়েছেন। আনুমানিক হিসাবে পাকিস্তানে বাস করছে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা।
মালয়েশিয়ায় এই সংখ্যা এক লাখ এবং সৌদি আরবে প্রায় আড়াই লাখ। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকেরা এই তিন দেশে গেছেন মূলত অবৈধ উপায়ে, চোরাচালানিদের সহায়তায়। ভারতেও এভাবেই পৌঁছেছে রোহিঙ্গারা। দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সনদে এখনো স্বাক্ষর করেনি পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া। অথচ ওই সনদেই এই শরণার্থীদের সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা তাঁদের পরিচয়ও লুকাচ্ছেন। যেমন: পাকিস্তানে থাকা রোহিঙ্গারা নিজেদের পরিচয় দেন ‘ভারত থেকে আসা মুসলিম’ হিসেবে। কারণ, পাকিস্তানে সামাজিকভাবে ভারতীয় মুসলিমদের প্রতি যে সহানুভূতি আছে, রোহিঙ্গাদের প্রতি তা নেই। অন্যদিকে, মালয়েশিয়াতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) প্রায় ৬৬ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়েছে। তাঁদের বিশেষ পরিচয়পত্র দেওয়া হলেও ওই দেশে কাজ করার বা বসবাসের বৈধ অধিকার এটি নয়। ভারত: দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে আনুমানিক ৪০ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছেন। ধারণা করা হয়, সীমান্ত পেরিয়ে স্থলপথে তাঁরা ভারতে ঢুকেছেন। ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে এবং গত বছর রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়নের নীতিগত সিদ্ধান্তও নেয়। তবে এখন দেশটির সুপ্রিম কোর্টে এ নিয়ে মামলা চলছে। এর আগে ভারতের রাজ্যগুলোর প্রতি দেওয়া এক পরামর্শে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, রোহিঙ্গারা তাদের জন্য ‘বোঝা’ এবং দেশের ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’। মালয়েশিয়া: রোহিঙ্গারা বৈধভাবে কাজ করতে পারেন না মালয়েশিয়াতে। মূলত আবর্জনা কুড়িয়ে সেখানে জীবিকা নির্বাহ করেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। এর বাইরে নামমাত্র বেতনে কেউ কেউ কাজ করেন নির্মাণশ্রমিক বা কৃষিকর্মী হিসেবে। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগকর্তা ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা—উভয় পক্ষই রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালায়। শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ তাঁদের নেই। ইউএনএইচসিআরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা স্বাস্থ্যসেবায় কিছু ছাড় পান। তবে যাঁদের নিবন্ধন নেই, তাঁদের অসুখ হলে খরচের অন্ত নেই।
পাকিস্তান: পাকিস্তানে থাকা রোহিঙ্গারাও রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। ওই দেশের বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই নিজেদের পরিচয় বদলে ফেলার চেষ্টা করেন। ভারতীয় মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তাঁরা। কারণ, পাকিস্তানে রোহিঙ্গাদের সামাজিকভাবে খুব হেয় করা হয়। অবৈধভাবে জেলে, মিস্ত্রি বা পরিচারক হিসেবে কাজ করে জীবন চালান রোহিঙ্গারা। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা পরিচয় প্রকাশিত হলে পাকিস্তানে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা মেলে না।
সৌদি আরব: ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজ এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি জানানো হয়, সৌদি আরবে থাকা আড়াই লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই অবৈধ অভিবাসী। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের রয়েছে বিশেষ পরিচয়পত্র। এই পরিচয়পত্র দিয়ে তাঁরা সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণ ও কাজ করতে পারেন। আর যাঁদের পরিচয়পত্র নেই, তাঁদের থাকতে হচ্ছে খুব সাবধানে। কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়লেই যেতে হয় জেলে। সৌদি আরবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করেন—এমন এক মানবাধিকারকর্মীর বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সেখানে পৃষ্ঠপোষকদের কম মজুরির শর্তে কাজ করতে রাজি না হওয়ায় হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। গত বছরের আগস্ট মাসে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর অভিযোগ যখন উঠেছিল, তখন এর প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ হয়েছিল মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানের সরকার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক আনুষ্ঠানিক বৈঠকে তুলেছিলেন রোহিঙ্গা ইস্যু। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ রোহিঙ্গা সংকটকে ‘বিবেকের প্রতি চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের কঠোর নিন্দা জানিয়েছিল এ দুই দেশ। দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনকে সহজ করে তুলতে এই দুই দেশকে খুব বেশি পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। অর্থাৎ, তারা নিন্দায় যতটা মুখর ছিল, কাজে ততটা নয়। রোহিঙ্গাদের কাজ জোগাড় করে দিতে মালয়েশিয়ায় একটি পাইলট প্রকল্প চালু হলেও এতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা মাত্র ৩০০। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতারা মুখে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বললেও প্রাদেশিক সরকারগুলো তাতে অনাগ্রহের কথা জানিয়েছে। মূলত রোহিঙ্গাদের নিয়ে রাজনীতি চলছে পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ায়। বিদেশি সরকারগুলো রোহিঙ্গাদের মূলত ‘বোঝা’ হিসেবেই দেখে। এ কারণে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের থাকতে হচ্ছে বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হলে এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন হয়তো নিজেদের দেশে ফেরার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এখন ইচ্ছে থাকলেও ফিরতে পারেন না তাঁরা।

ইরাকে শিশুদের জন্য বিনিয়োগ চায় ইউনিসেফ

ইরাকে প্রতি চারজন শিশুর একজন দারিদ্র্যের শিকার। দেশটিতে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলে প্রায় ৪০ লাখ শিশুর জন্য সাহায্যের প্রয়োজন। জাতিসংঘের জরুরি শিশু তহবিল ইউনিসেফ গতকাল রোববার এ তথ্য জানায়। ইউনিসেফের এক বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ ১৫০টি শিক্ষাকেন্দ্র ও ৫০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। ইরাকের অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয় সংস্কার করা প্রয়োজন। সেখানে ৩০ লাখের বেশি শিশুর পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ডিসেম্বরে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ঘোষণা দেয় ইরাক। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আইএস-অধ্যুষিত এলাকা দখল করেছে রাষ্ট্রীয় সেনারা। দেশটির অর্থনীতিতে টিকিয়ে রাখা ও দেশ গঠনের জন্য যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে দেশটি ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ চায় ইরাক। ইউনিসেফ বলছে, চলতি সপ্তাহে ‘কুয়েত কনফারেন্স ফর ইরাক’ শীর্ষক সম্মেলনের মাধ্যমে শিশুদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের একটি সুযোগ হিসেবে নিতে পারেন বিশ্বনেতারা। শিশুদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে টেকসই ইরাক গঠনে ভূমিকা রাখতে তাঁরা আগ্রহী। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় জোটের নেতৃত্ব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র কুয়েত সম্মেলনের মাধ্যমে ইরাকের জন্য অর্থ সাহায্য দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করেনি বলেই জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা।

ব্যাংকে হঠাৎ টাকায় টান

দেশের ব্যাংক খাতে হঠাৎ করেই ঋণ দেওয়ার মতো অর্থের টান পড়েছে। বেশ কিছু ব্যাংক নতুন করে ব্যবসায়ীদের ঋণ দিচ্ছে না। প্রায় সব ব্যাংকই বাড়িয়েছে সুদের হার। এমনকি কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের দেওয়া ঋণের টাকা ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মাস দু-এক আগেও ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের ৮-৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিত, যা এখন ২-৩ শতাংশ বেশি দিতে হচ্ছে। একইভাবে বেড়ে গেছে ভোক্তা ও গৃহঋণের সুদের হারও। ব্যাংকাররা হঠাৎ এই সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাংকের আমানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণের সীমা কমিয়ে দেওয়া। এ ছাড়া সুদের হার কম হওয়ায় ব্যাংকে আমানত কমে যাওয়া, ডলার বিক্রি করে ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়া এবং বেসরকারি একটি ব্যাংকের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারিও পরোক্ষভাবে এ সংকটে ঘি ঢেলেছে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়াটা খুব আশঙ্কাজনক। আমরা এটি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চাই ঋণের সুদের হার সহনীয় থাকুক। নইলে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাবে এবং পণ্যের দাম বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
সুদহার আবার দুই অঙ্কে
দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য গত এক বছর ছিল সুসময়। এ সময়ে বড় গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকের ঋণের সুদের হার কমে ৮ শতাংশের নিচেও নেমেছিল। একইভাবে কমেছিল ব্যক্তিগত, গৃহ, গাড়ি ও পেশাজীবীদের ঋণের সুদের হার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, দেশের ব্যাংকগুলোতে ২০১১-১৩ সাল পর্যন্ত ঋণের গড় সুদের হার ছিল ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে। ২০১৭ সালে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর মাসে ঋণের সুদের গড় হার দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। ব্যবসায়ীরা এখন কত শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন, তা জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁরা প্রত্যেকে দাবি করেন, ব্যাংকগুলো সুদের হার আগের চেয়ে বেশি চাচ্ছে। বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিন আমরা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সাড়ে ৮ শতাংশের মধ্যে পেতাম। এখন সেটা ১০ শতাংশের ওপরে উঠেছে।’ চলতি মূলধনের সুদহার আরও কিছুটা বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি। একটি ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ২০টি ব্যাংক মিলে যদি বাজারে নামে, তাহলে আমানতের সুদের হার তো বাড়বেই। বাজার থেকে ব্যাংকগুলো এখন ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত সংগ্রহের চেষ্টায় আছে। স্থায়ী আমানত ৯ শতাংশ সুদে নিলে কারও পক্ষে ১৪ শতাংশের কমে ঋণ দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালক আবদুস সালাম মুর্শেদী প্রথম আলোকে বলেন, ঋণ-আমানতের অনুপাত ঠিক রাখতে গিয়ে ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে অনুমোদিত ঋণগুলো দিলেও নতুন ঋণের ক্ষেত্রে ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
লাগাম টানল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
২০১৭ সালে ব্যাংকগুলো আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ করে। বিপরীতে আমানত সংগ্রহ কমে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৭ সালের প্রথম ১১ মাসেই (জানুয়ারি থেকে নভেম্বর) ১ লাখ ১১ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে। যদিও এ সময়ে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ৭২ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতের চেয়ে দেড় গুণের বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে তারল্যে কিছুটা চাপ পড়েছে। এদিকে আমদানি দেনা চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে ব্যাংকগুলো। তাতে ডলারের দাম বাড়ছে। সংকট মেটাতে গিয়ে চলতি অর্থবছরে প্রায় ১২০ কোটি ডলার বিক্রি করে বাজার থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে তারল্যসংকট আরও তীব্র হচ্ছে। ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি হওয়ায় ঋণসীমা কমিয়ে লাগাম টেনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সীমা মানতে ব্যাংকগুলোকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকাররা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার কারণে অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। অনেকে নির্ধারিত ঋণসীমার মধ্যে আসতে দেওয়া ঋণও ফেরত আনছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে সবাই আমানত সংগ্রহে জোর দিয়েছে। বাজারে নতুন আমানত কম, তাই এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে বেশি সুদে স্থানান্তর হচ্ছে। এ কারণে আমানত ও ঋণ উভয়ের সুদহার বাড়ছে। আবার রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হচ্ছে, আমানতের চেয়ে ঋণ বেশি যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় হচ্ছে না। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকগুলোতে যে পরিমাণ আমানত আসছে, তার চেয়ে বেশি ঋণ যাচ্ছে। এ কারণে তারল্যসংকট শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তারল্য জোগাড় করতে সুদহার বাড়ছে। তিনি মনে করেন, এ জন্য তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বিগত বছরে ব্যাংকে ঋণের চেয়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল কম। ফলে ব্যাংকে এখন আর অতিরিক্ত তারল্য নেই। আবার ঋণখেলাপি পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ঋণ আদায় বাড়েনি। আবার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি হওয়ায় টাকা সেখানে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন আমানতের সুদের হার বাড়িয়ে টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করছে, এতে ঋণের সুদের হার বাড়বে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বিশেজ্ঞরা মনে করছেন, ঋণপ্রবাহ কমলে বাণিজ্য প্রসার, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে বাধা তৈরি হতে পারে। আর সুদের হার বাড়লে ব্যবসার খরচও বাড়বে। এসব কিছু অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো ফল আনবে না।

আমস্টার্ডামের নিষিদ্ধ পল্লী

আমস্টার্ডামের সন্ধ্যা নামে রঙিন হয়ে। সংকীর্ণ গলিপথে লাল, গোলাপী আলো ঠিকরে পড়ে। তাতে দেখা যায় অর্ধনগ্ন যুবতী দেহ দুলিয়ে নাচছেন। পথচারী পুরুষদের আহ্বান জানাচ্ছেন তার ডাকে সাড়া দিতে। সে ডাকে এগিয়ে যাচ্ছেন অনেক পুরষ। তার বেশির ভাগই সম্ভবত বৃটিশ।
তারা দল বেঁধে ছুটি কাটাতে যান আমস্টার্ডামে। এ ছাড়া আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটক। তারা যুবতী দেহের ঢলকানিতে বেসামাল হয়ে হারিয়ে যান অন্ধকার জগতে। তাদের মনোরঞ্জন করে, দেহ দান করে দিনে এসব যুবতী উপার্জন করেন সাড়ে তিন শত পাউন্ড পর্যন্ত। এরা দেহব্যবসায়ী। ঠাঁই হয়েছে আমস্টার্ডামের নিষিদ্ধ পল্লীতে। বাইরে থেকে দেখলে এদের জীবনযাত্রা খুব ঝকমকে মনে হতে পারে। কিন্তু ভিতরের খবর অনেক ভয়াবহ। অনেক নোংরা ও বিপদজনক। এ বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে লন্ডনের ডেইলি মেই। তারা বলেছেন, এই দেহ ব্যবসায় যেসব যুবতীকে নামানো হয়েছে তার বেশির ভাগই পূর্ব ইউরোপের। তারা দালালের ফাঁদে পা দিয়ে এই পথে এসেছে। এ নিয়ে ডাচ আদালতে অনেক মামলা চলছে। এসব মামলা মানব পাচারের। আমস্টার্ডামে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হয়েছে এক যুবতীকে। তিনি বলেছেন, আমাদেরকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। দোকানের সাবান যেভাবে বিক্রি করা হয় সেভাবেই আমাদেরকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এসব নারীর বেশির ভাগকেই এ পেশায় নামানোর আগে কসমেটিক সার্জারি করানো হয়। গর্ভপাত করানো হয়। এ জন্য তাদের বিপুল সংখ্যক এখন মারাত্মক দুর্ভোগে। হল্যান্ডে বা নেদারল্যান্ডসে যৌন ব্যবসা বৈধ হলেও এখন কিছু রাজনীতিক ও অধিকার কর্মী এ ব্যবসার বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছেন। একজন ডাচ এমপি তার দেশের সমাজ কল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বলেছেন, নিষিদ্ধ পল্লীগুলো বাণিজ্যিক ধর্ষণ ছাড়া আর কিছু নয়। সেখানে আগামী বছর নতুন একটি আইন আসার কথা। এ আইনের অধীনে এ ব্যবসাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। যদি জোর করে কাউকে পতিতাবৃত্তিতে নামানো হয় তাহলে শাস্তি হবে সর্বোচ্চ চার বছরের জেল। আমস্টার্ডামে কাচের জানালায় যেসব নারীকে নর্তকী হিসেবে দেখা যায় তেমন একজন রোমানিয়ার অ্যানজেলিকা। তিনি সেখানে পাঁচ বছর জিম্মি অবস্থায় ছিলেন। তার বয়স যখন ১৭ বছর তখন এক ব্যক্তি তাকে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যায় লন্ডনে। ওই ব্যক্তিকে তিনি একজন ভাল বন্ধু মনে করেছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, লন্ডনে নিয়ে তাকে হেয়ার স্টাইলিস্ট হিসেবে ভাল বেতনে কাজ দেয়া হবে তাকে। কিন্তু বিমানে ওঠার পরই তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয়া হয়। কার্যত তিনি হয়ে পড়েন বন্দি। অল্প সময়ের মধ্যে তাকে বিক্রি করে দেয়া হয়। তার ধারাবাহিকতায় তাকে পাঠানো হয় আমস্টার্ডামের ওই অন্ধকার জগতে। এ বিষয়ে অ্যানজেলিকা বলেন, প্রথমে আমার ওই বন্ধু আমাকে নিয়ে যায় ইংল্যান্ডে। সেখান থেকে টাকা দিয়ে মাংস কেনার মতো করে আমাকে নিয়ে যায় হল্যান্ডে। সেখানে আমি যখন জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম জানালায় নগ্ন নারীরা নাচছে, আমার বুঝতে বাকি রইল না এটা একটি পতিতালয়। এ দৃশ্য দেখে আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। আমি বুঝে গেলাম পরিণতি কি হতে চলেছে আমার।

বাংলাদেশের সামনে কিছু ঝুঁকি আছে by আ ন ম মুনীরুজ্জামান

প্রতিবছর আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিটি দেশের নিরাপত্তা, পরিবেশ ও পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। আমরা জানি, বিশ্বে ভূকৌশলগত পরিবর্তনের যে হাওয়া বইছে, তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের ওপরও পড়তে শুরু করেছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের ওপর কী কী নিরাপত্তা ঝুঁকি পড়তে পারে, সেদিকে এখনই বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করা প্রয়োজন। শুরুতেই ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করা গেলে সেগুলো মোকাবিলায় ভালো পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়। একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এ বছরের শেষে। ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের রাজনীতি ও নির্বাচন বেশ হিংসাত্মক। প্রায়শই সংঘাত-সহিংসতা ঘটে। এসব বিবেচনায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যথেষ্ট শান্ত ও স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ধরন সম্পর্কে ঐকমত্য না হলে সংঘাত-সহিংসতা এড়ানো যাবে না। নির্বাচন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে পারে। নির্বাচনকালীন সংঘাত-সহিংসতা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলতে পারে। হোলি আর্টিজান বেকারির ভয়ংকর স্মৃতি নিয়ে ২০১৭ সাল যখন শুরু হয়, তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছিল, ২০১৭ সালেও অনুরূপ ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ফলে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম স্তিমিত ছিল। কিন্তু এর মানে এই নয়, জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষণা বলছে, জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম সংগোপনে অব্যাহত আছে। প্রায়শই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে, অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো আবার তৎপর হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু নির্বাচন গণতন্ত্রের একটা শক্তিশালী উপাদান এবং লক্ষণীয় প্রকাশ, ফলে নির্বাচন যাতে নির্বিঘ্নে না হয়, সে লক্ষ্যে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো তৎপর থাকে। তা ছাড়া তারা অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের ফায়দা নেওয়ার সন্ধানে থাকে। ফলে নির্বাচনের আগে, নির্বাচন চলাকালে ও নির্বাচনের পরের দিনগুলোতে জঙ্গি তৎপরতা বাড়তে পারে। রোহিঙ্গা সংকট ২০১৮ সালেও আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। নির্মম অত্যাচারের শিকার রোহিঙ্গাদের প্রতি এ দেশের মানুষ সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই সহানুভূতি কমে আসবে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় মানুষজন ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের এই উটকো আগমনের কারণে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত মনে করছে। প্রায়শই তাদের ক্ষোভের কথা শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে ইতিমধ্যে চুক্তি হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরার অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। তা ছাড়া উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি না হলে রোহিঙ্গারাও ফিরে যেতে নারাজ। আর চুক্তি অনুসারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যদি এখন শুরু হয়ও, সব রোহিঙ্গার ফিরে যেতে কমপক্ষে এক দশক লেগে যাবে। মিয়ানমারে ভবিষ্যতে আরও সংঘাত হলে আরও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হবে। রোহিঙ্গাদের আসার ফলে বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু নিরাপত্তাঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। তাদের থাকা-খাওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর। ফলে এ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কক্সবাজারের ডিস্ট্রিক্ট কমিশনারের অফিসের দেওয়া তথ্য অনুসারে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ একর বনভূমি ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের আবাসনের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। পাহাড়ের গাছপালা কেটে স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। ফলে সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আসন্ন বর্ষায় পাহাড়ে ভূমিধসে বিরাট মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। রোহিঙ্গারা এ দেশে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে, তাদের মাদকদ্রব্য ও ক্ষুদ্রাস্ত্র কেনাবেচা ও বহনের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা পরিবার বাংলাদেশে এসেছে পুরুষ সদস্য ছাড়া, সেসব পরিবারের নারী ও শিশুরা আন্তরাষ্ট্রীয় পাচার চক্রের কবলে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ও দেশি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো জঙ্গি সংগ্রহের জন্য রোহিঙ্গাদের দিকে নজর দিতে পারে। এসব কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। নইলে এটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার ওপর একটা দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালেও পরিবেশগত ঝুঁকিতে থাকবে। দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, শক্তিশালী সাইক্লোন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ঘটতে পারে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং আবহাওয়ার ধরনেও পরিবর্তন ঘটবে। বাংলাদেশ শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের শহরগুলো অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী বিপর্যয় মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা খুবই সীমিত। ফলে ঢাকার কাছাকাছি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে। সাইবার নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই নাজুক। অধিকাংশ সাইবার নিরাপত্তাকাঠামো দুর্বল এবং এ-সংক্রান্ত সক্ষমতা সীমিত। ২০১৮ সালেও ঝুঁকি থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ বড় আকারে সাইবার ডাকাতির শিকার হয়েছিল। খোয়া যাওয়া অর্থের অধিকাংশই এখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া বিশ্বজুড়ে সাইবার আক্রমণ বাড়ছে। সাইবার আক্রমণকারীদের শনাক্ত করা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দুরূহ। ফলে সাইবার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাইবারস্পেসে নানা কারসাজির আশঙ্কা আছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজার আগের মতোই অস্থিতিশীল থাকবে। সম্প্রতি আমরা শেয়ারবাজারের আংশিক পতন হতে দেখেছি। দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খোয়া গেছে। বর্তমানে ফারমার্স ব্যাংক প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে। গ্রাহকেরা নিজেদের মূলধন পর্যন্ত তুলতে পারছে না। এ রকম অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিগ্রস্ত পরিচালনা অব্যাহত থাকলে এই সংকট বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। ব্যাংকিং খাতে ব্যর্থতার ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ সামগ্রিক আর্থিক খাতে পড়তে পারে। যদি অনতিবিলম্বে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে আমাদের পুরো আর্থিক খাত অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়বে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ নিজের অনিচ্ছায় আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের শিকার হতে পারে। আমরা দেখেছি, গত বছরের শেষের দিকে কয়েক মাস ধরে ভারত ও চীনের মধ্যে ভুটানের কাছের একটা ছোট জায়গা ‘দোকলাম’ নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এই অবস্থা যুদ্ধের দিকে মোড় নেওয়ার সমূহ আশঙ্কা ছিল। যদিও অচলাবস্থা আপাতত কেটে গেছে, কিন্তু ২০১৮ সালে নতুন করে আবার সংঘাত দেখা দিতে পারে। চীনের একটা সরকারি পত্রিকা লিখেছে, ২০১৮ সালে চীন সরকার আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে ‘দোকলাম’, জায়গাটা বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ৯০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে। জায়গাটা শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি অবস্থিত, যেটা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান এবং দেশ দুটির কোনোটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ফলে, আমরা নিজেরা না চাইলেও, সম্ভাব্য চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ভুক্তভোগী হতে পারি। যদিও ২০১৭ সাল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, কিন্তু ২০১৮ সালে বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে। এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে আমাদের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। বিকল্প পরিকল্পনাও তৈরি করে রাখতে হবে, যদি মূল পরিকল্পনা কাজে না আসে। তাহলেই নিরাপত্তাঝুঁকিগুলো পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলেও অনেকাংশেই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি।

চালের দাম বেড়েছে

ঢাকার বাজারে হঠাৎ করেই চালের দাম বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহের চেয়ে সব ধরনের চাল কেজি প্রতি দেড় থেকে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ঢাকার মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে কয়েক দিন আগে মোটা চালের কেজিপ্রতি দর ছিল ৩৮ টাকা, যা এখন দেড় টাকা বেশি। মাঝারি মানের বিআর-২৮ জাতের চালের দাম কেজিতে ২ টাকা বেড়েছে। ভালো মানের মিনিকেট চালের দামও কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৬০ টাকা ৫০ পয়সা ও ভারতীয় মিনিকেট ৫৬ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে এই দর আরও ২ থেকে ৩ টাকা বেশি পড়ছে। কৃষি মার্কেটের বরিশাল রাইস এজেন্সির মহিউদ্দিন রাজা বলেন, চালের দাম বেড়েছে মূলত ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায়। বেনাপোল থেকে আসতে প্রতি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৭ হাজার টাকা, যা এখন হয়েছে ২২ হাজার টাকা। অন্যদিকে একটি ট্রাকে ২০ টনের জায়গায় চাল আনা যাচ্ছে ১৩ টন। ঢাকা-বেনাপোল পথের পাশাপাশি অন্যান্য পথেও ট্রাকভাড়া বাড়তি দিতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাস্তার ক্ষতি এড়াতে সরকার অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করে। মহাসড়কের ওজন স্কেলগুলোতে অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহনকে জরিমানা করা হচ্ছে। গত বোরো মৌসুমে উৎপাদন কম হওয়ায় মার্চ-এপ্রিল থেকেই বাজারে চালের দাম বাড়তে থাকে। সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ওঠে ৫০ টাকায়, যা কয়েক বছর ৩৫ টাকার নিচে ছিল। এরপর আমদানি বাড়ায় দাম কিছুটা কমে যায়। জানুয়ারিতে আমন মৌসুমের চাল বাজারে আসার পর দাম এক দফা বেড়েছিল। এখন আবার এক দফা বাড়ল। কুষ্টিয়ার মোকামেও সরু মিনিকেট চালের দাম কেজিতে দুই টাকা বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পৌরবাজার চালের আড়তে গত সপ্তাহে মিলগেটে মিনিকেট চাল বিক্রি হয় ৫৮ টাকা কেজি দরে, যা এখন ৬০ টাকা হয়েছে। খুচরা বাজারে তা ভোক্তারা কিনছেন ৬২ টাকা দরে। মিলমালিকেরা বলছেন, ধানের দাম বেড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। পৌরবাজারের চাল ব্যবসায়ী শাপলা ট্রেডার্সের মালিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, পাঁচ দিন আগে কুষ্টিয়ার বড় চালকল বিশ্বাস অ্যাগ্রো ফুড হঠাৎ মিনিকেট চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতেই বাজারে প্রভাব পড়ে। বিশ্বাস অ্যাগ্রো ফুডের মালিক বায়েজীদ বিশ্বাস মূল্যবৃদ্ধির জন্য ধানের চড়া দামকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ধানের দাম বাড়লে চালের দামও বাড়ে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মিনিকেট চালের দাম আরও কিছুটা বাড়তে পারে।

ঋণের টাকা মখা আলমগীর ও চিশতীর হিসাবে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ব্যাংকটির সাবেক দুই শীর্ষ ব্যক্তির অনিয়ম। ফারমার্স ব্যাংকের গ্রাহকের ঋণের ভাগ নিয়েছেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী। এর মাধ্যমে দুজনের নৈতিক স্খলন ঘটেছে এবং তাঁরা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিদর্শনে উঠে এসেছে, ব্যাংকটির জনবল নিয়োগ হয়েছে মূলত এ দুজনের সুপারিশেই। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাঁরা নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া মাহবুবুল হক চিশতীর ছেলে রাশেদুল হক চিশতীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আরসিএল প্লাস্টিকের সঙ্গে ব্যাংকের গ্রাহকদের অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্যও বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনটি ফারমার্স ব্যাংকে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যোগাযোগ করা হলে মহীউদ্দীন খান আলমগীর এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব তথ্য পুরো অসত্য ও অবিশ্বাস্য। আমি চেয়ারম্যান হিসেবে কী এভাবে টাকা নিতে পারি। এর সত্যতা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংক তো আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারত। আবার যদি কেউ আমার নাম ব্যবহার করে থাকে, তার দায়ভার কি আমি নেব।’ মহীউদ্দীন খান আলমগীর দাবি করেন, তাঁর চার বছরে ব্যাংক ভালো চলেছে। এ সময়ে মুনাফাও হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে মাহবুবুল হক চিশতীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল তনুজ করপোরেশন ঋণের জন্য ফারমার্স ব্যাংকে আবেদন করে। কিন্তু ঋণ আবেদনটি নিষ্পত্তি হওয়ার আগে ওই দিনই তনুজ করপোরেশনের ব্যাংক হিসাবে জমা হয় ৫০ লাখ টাকা। পরে কোম্পানিটি সেই টাকা তাদেরই অন্য এক হিসাবে স্থানান্তর করে।
অর্থাৎ ঋণ অনুমোদনের আগেই গ্রাহককে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়, যার সঙ্গেজড়িত ছিলেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীম। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তনুজ করপোরেশনের ব্যাংক হিসাব থেকে গত বছরের ১৯ জুলাই ১ কোটি ২২ লাখ টাকা ফারমার্স ব্যাংকে খোলা তাদেরই অন্য এক ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এ ১ কোটি ২২ লাখ টাকার মধ্যে ওই দিন ৪২ লাখ টাকা নগদে তোলা হয়। আর ৮০ লাখ টাকার একটি পে-অর্ডার ইস্যু করে তনুজ করপোরেশন। যদিও পরে পে-অর্ডারটি বাতিল করা হয়। পরে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নামে ১৮ লাখ ও মাহবুবুল হক চিশতীর নামে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার পে-অর্ডার ইস্যু করা হয়। অবশিষ্ট ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদে তুলে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় জাকির হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে মখা আলমগীর ও মাহবুবুল হক চিশতী অর্থ গ্রহণ করায় তাঁদের নৈতিক স্খলন ঘটেছে। এদিকে জাহান ট্রেডার্স নামে অপর একটি ঋণ হিসাব থেকে গত বছরের ১৯ মার্চ ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা কোম্পানিটিরই আরেকটি হিসাবে পাঠানো হয়। ওই ঋণও দেওয়া হয় মহীউদ্দীন খান আলমগীরের একক সুপারিশে। তনুজ করপোরেশন ও জাহান ট্রেডার্স উভয় কোম্পানিই নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলেও পুরো টাকা তুলেছেন নগদে। এর ফলে ঋণের টাকা প্রকৃত খাতে ব্যবহার হয়নি। ২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ফারমার্স ব্যাংক কার্যক্রম শুরুর পরই অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ব্যাংকটিতে নগদ অর্থের চরম সংকট দেখা দেয়। সংকটে পড়ে ব্যাংকটি গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় গত নভেম্বরে পদ ছাড়তে বাধ্য হন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী। পরিচালকের পদ থেকেও পদত্যাগ করেন তাঁরা। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম শামীমকেও অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।