Saturday, August 15, 2015

রাজনীতিজীবীদের দিনবদল ও দলবদল by সৈয়দ আবুল মকসুদ

দলবদল দোষের নয়, অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপারও নয়। কোনো দল থেকে কিছু নেতা-কর্মী বেরিয়ে গিয়ে যদি নতুন সংগঠন করেন, তাতেও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। তা-ই যদি হতো, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো থাকত মাত্র দুটি দল: কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। কয়েক বছর আগে একবার শুনলাম দিনবদলের কথা। সেটা সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন লেখালেখি হচ্ছে দলবদল নিয়ে। সেটা মাত্র শুরু হয়েছে, সম্পন্ন হতে আরও কিছু সময়ের দরকার।
অনেক দিন যাবৎ সম্পাদকীয় পাতার সমসাময়িক বিষয়ের একজন লেখক হিসেবে রাজনীতিজীবীদের দলবদল আমি আন্তরিকভাবে সমর্থন করি। যদি শুনি আওয়ামী লীগের মধ্যে যাঁরা অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাস করেন, তাঁদের কয়েকজন নেতা তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে সিপিবি অফিসে গিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেছেন, সেটা হবে খুশির খবর। অথবা যদি টিভি চ্যানেলগুলোতে সন্ধ্যার খবরে দেখি বিএনপির লাগাতারে অবিশ্বাসী কয়েকজন প্রগতিশীল শীর্ষ নেতা বাসদ কার্যালয়ে গিয়ে খালেকুজ্জামানের হাতে একগুচ্ছ তাজা রজনীগন্ধা ও গ্ল্যাডিওলাস দিয়ে বাসদে যোগ দিচ্ছেন, তা হবে স্বাগত জানানোর মতো সংবাদ। সুতরাং দলবদল হলেই তা কোনো দুঃসংবাদও নয়, অস্বাভাবিক ব্যাপারও নয়।
উদ্বেগ অথবা বিবেচনার বিষয় হলো, দলবদলটা করছেন কে, কোন দল থেকে কোন দলে যাচ্ছেন এবং তা করছেন কোন সময়। রাজনীতিজীবীরা সম্পূর্ণ স্বাধীন মানুষ, তাঁরা কারও চাকর নন। তাঁরা কোনো দলে থাকতেও পারেন, এক দল থেকে অন্য দলে যেতে পারেন, এমনকি দলীয় রাজনীতি থেকে ইস্তফা দিয়ে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ও নেমে যেতে পারেন। তাতে যদি তাঁদের আমদানি দ্রব্যে কোকেনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কোনো রাজনীতিজীবী যদি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে অতীতের বিপুল অভিজ্ঞতা নিয়ে হপ্তায় তিন দিন বিভিন্ন কাগজে কলাম লিখতে থাকেন, তাতেও বাড়তে পারে দেশবাসীর রাজনৈতিক চেতনা ও জ্ঞানভান্ডার। ওটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় দেশ উদ্ধারের কাজ, সহজতরও বটে। সহজতর এ জন্য যে নিজের হাতে বলপয়েন্ট কলম দিয়ে লেখার ঝামেলা নেই, সহকারীকে মিনিট বিশেক ডিকটেকশন দিলেই খাড়া করা সম্ভব একটি উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ।
৫ জানুয়ারির বিশেষ নির্বাচনের পর থেকে গত দেড় বছরে বিএনপি-জামায়াতের ১৯ হাজারের বেশি নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। ‘গত দেড় বছরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এ রকম যোগদানের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৬২টি।’ [প্রথম আলো, ১১ জুলাই] বাংলাদেশে রাজনীতিজীবীর সংখ্যা যে বেশুমার, তা এই যোগদানের ঘটনা থেকে প্রমাণিত হলো। প্রথম আলোতে শরিফুজ্জামানের ওই প্রতিবেদন থেকে যা জানা যায়নি, ঘটেনি বলেই লেখা হয়নি, তা হলো বিএনপি-জামায়াতের আর কত নেতা আর কোন কোন দলে যোগ দিয়েছেন।
দলবদল বলতে বোঝায় এ-দল থেকে ও-দলে গিয়ে যোগদান করা। তাৎপর্যের বিষয় হলো, যোগদানের ব্যাপারটি ঘটেছে একতরফাভাবে। এই সময়ে নীতিগত কারণে অথবা ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের কেউ বিএনপি-জামায়াতে যোগ দেননি। বিএনপি-জামায়াতের দুই ঘাটের তীর থেকে দলে দলে নেতা-কর্মীদের আওয়ামী লীগের তরিতে উঠে পড়াটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে যোগ করল নতুন মাত্রা। এত দিন যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ ভারতপন্থী-পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির ভেদাভেদ ছিল, এই দলবদলে তা ঘুচে যাওয়ার প্রক্রিয়াটির সূচনা হলো। ধারণা করি, ২০১৯-এর আগেই বাংলার মাটির রাজনৈতিক স্লোগানও বদলে যাবে। জয় বাংলা ও বাংলাদেশ জিন্দাবাদ সমন্বয় করে ‘জয়-জিন্দা-বাংলা’ গোছের কিছু চালু হবে। আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর জামায়াতে ইসলামীও স্টেডিয়াম থেকে প্রেসক্লাব পর্যন্ত সড়কে ‘নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দেবে না। তারা আর বছর পাঁচেক ক্ষমতায় থাকতে পারলে অনুচ্চ স্বরে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’-এর বদলে পাকিস্তানি আদলে ‘বাংলাদেশ পায়েন্দাবাদ’ স্লোগান প্রবর্তন করত বলে ধারণা করি।
মলম পার্টি থেকে অজ্ঞান পার্টিতে যোগদান আর বিএনপি-জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান এক জিনিস নয়। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে কেউ কোনো দল ছেড়ে দেওয়া এক কথা, আর এক দল ছেড়ে দিয়ে ঘটা করে আর এক দলে যোগদান আর এক কথা। কেউ যখন কোনো দলের ছায়ার নিচে আশ্রয় নেন তখন সেই দলের নীতি-আদর্শ-কর্মসূচি সবকিছুতে পূর্ণ আস্থা স্থাপন করেই তা করেন। কেউ এ কথা বলেন না যে যোগ আমি বিপদে পড়ে আত্মরক্ষার জন্য দিলাম বটে, তবে আমি আপনাদের দলের নীতি-আদর্শ পুরোপুরি নয়, আট আনার মতো বিশ্বাস করি।
যে ১৯-২০ হাজার রাজনীতিজীবী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন, তাঁরা আগে ইসলামি/মুসলিম জাতীয়তাবাদের ঝান্ডা নিয়ে ঘুরতেন, এখন থেকে তাঁরা তুলে ধরবেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকা। আগে তাঁরা চক্ষু নিমীলিত করে শুনতেন পাকিস্তানি কাওয়ালদের কাওয়ালি, এখন থেকে হাতে তাল ঠুকে তাঁরা শুনবেন কবিগুরুর ‘তুমি যেও না এখনই, এখনো আছে রজনী’। আগে তাঁরা নাভি বের করে নিতম্ব দুলিয়ে নাচের ব্যাপারটায় ঘোর আপত্তি তুলতেন, এখন ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে গিয়ে কথাকলি বা ভরতনাট্যম উপভোগ করবেন। এত দিন নীলো ও সাবিহার পুরোনো ছবিগুলো না দেখলে মন ভরত না, এখন শিল্পা শেঠি, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, মল্লিকা শেরাওয়াতের ফিল্ম ছাড়া মন ভরবে না। আগে তাঁরা রাস্তাঘাটে মেয়েদের বেলেল্লার মতো বেপর্দাভাবে চলাফেরা নাজায়েজ বলতেন, এখন তাঁরা আওয়ামী লীগের নারীনীতির পক্ষে বক্তৃতা দেবেন। দলবদলের দুদিন আগেও তাঁরা ভারতের নাম শুনলে চোখ লাল করতেন, এখন থেকে তাঁরা করবেন মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের তারিফ। আগে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি শুনলেই তাঁরা খুশিতে কান খাড়া করতেন, এখন পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ৩০ লাখ নিহত হওয়ার কথা যেকোনো বক্তৃতায় শ্রোতাদের অনিবার্যভাবে স্মরণ করিয়ে দেবেন। আগে শেখ মুজিবের দুঃশাসনের কথা প্রতিদিন মানুষকে মনে করিয়ে দিতেন, এখন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণের আগে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ কথাগুলো যোগ করতে ভুল করবেন না, যদি নিজের ও বাবার নামটি ভুলে যান তবু।
দলবদল শুধু জেল-জুলুম-ক্রসফায়ার থেকে বাঁচা নয়, টেন্ডারের ভাগ পাওয়া নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনয়ন পাওয়াও নয়—অতীতের নীতি-আদর্শ ও বিশ্বাসের খোলনলচে বদলে পুরোনো দেহে নতুন জীবন পাওয়া।
ব্রাহ্ম মতাবলম্বী রবিঠাকুর একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করতেন, তাই তিনি মনটা উতলা হলে গাইতেন: ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা/ প্রভু, তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে।/ যায় যেন মোর সকল গভীর আশা/ প্রভু, তোমার কানে, তোমার কানে, তোমার কানে।।’ রাজনীতিতে এই ধারণা অচল। বহুদলীয় গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্যই হলো বহু দল ও মতাদর্শের সহ-অবস্থান।
সব মতাদর্শ জনগণের মধ্যে প্রচারের সমান সুযোগ। তার ভেতর থেকে বেশির ভাগ মানুষ যেটা গ্রহণ করবে সেটাই প্রাধান্য পাবে।
আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে অথবা ভয়-ভীতিবশত এক দিকে ধাবিত হলে গণতন্ত্রকে যে শুধু কবর দেওয়া হয় তা-ই নয়, দেশে রাজনীতি বলেও কিছু থাকে না।
আগেই বলেছি, দল থেকে চলে যাওয়া, অন্য দলে যোগ দেওয়া অথবা নতুন দল গঠন করা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়।
বরং বহুদলীয় গণতন্ত্রে সেটা খুবই স্বাভাবিক। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি গঠন করেছিলেন রামমনোহর লোহিয়ারা। মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেছিলেন মাওলানা ভাসানী ও তাঁর অনুসারীরা। সেই আওয়ামী লীগ যখন কেন্দ্রে ও পূর্ব বাংলায় ক্ষমতায়, তখন আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ভাসানী ও বামপন্থীরা গঠন করেন ১৯৫৭-তে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। শেখ মুজিব ভাসানীকে কতভাবে অনুরোধ করেছেন দল ছেড়ে না যেতে। মাওলানা বলেছেন, দ্যাখো, এটা আদর্শগত ব্যাপার। তোমরা তোমাদের মতো থাকো, আমরা আমাদের মতো রাজনীতি করি। ভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্ব দিলেও ভাসানী-মুজিবের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ভারতে দল পরিবর্তন বা নতুন দল গঠন আরও ব্যাপক। সে জন্যই গণতন্ত্র প্রাণবন্ত ও টেকসই। মোরারজি দেশাইরা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে গঠন করেন ভারতীয় জনতা দল। গঠিত হয়েছে আরও কত দল, যেমন: রাষ্ট্রীয় জনতা দল, তৃণমূল কংগ্রেস, জনতা দল ইউনাইটেড, জনতা দল সমতা প্রভৃতি।
পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে যে রাজনীতিজীবীর সংখ্যা বেশি, তা দলবদলের ঘটনা থেকে বোঝা যায়। সবাই বনপোড়া হরিণের মতো ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে সরকারি দলের দিকে। দেশে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতা বা রাজনীতিবিদ থাকলে এমনটি হতো না। ক্ষমতাসীন দল হোক বা বিরোধী দল হোক, কোনো বড় দল থেকে নীতি-আদর্শের প্রশ্নে বেরিয়ে গিয়ে জনগণের প্রয়োজনে, জাতীয় স্বার্থে, গণতন্ত্র রক্ষায় কোনো নতুন সংগঠন গড়ে তোলা দল ভাঙা নয়। ভাসানী, লোহিয়া, দেশাই, ভিপি সিং, লালু প্রসাদ—কেউই দল ভাঙেননি, নতুন দল গঠন করেছেন গণতন্ত্রের স্বার্থে।
কোনো দেশ থেকে রাজনীতিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে সম্পূর্ণ বিরাজনীতি করার বিভিন্ন ধাপ আছে। প্রথমত, রাজনীতিকদের সুবিধাবাদী করে রাজনীতিজীবীতে পরিণত করা। তারপর আমলাদের ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা ও অনাবশ্যক প্রমোশন দিয়ে সুবিধাভোগী বানিয়ে বশে রাখা। বিভিন্ন পেশাজীবীকে কিনে ফেলা। জীবনের অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে ক্রিকেট খেলাকে দিয়ে যুবসমাজকে শান্ত রাখা। একই সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমা ও জেল–জুলুমের ভয় দেখিয়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করা অথবা দলে টেনে আনা। বর্তমান দলবদলের মহাযজ্ঞে প্রমাণিত হলো প্রবঞ্চনা, স্বার্থপরতা ও সুবিধাবাদিতায় বাঙালি পৃথিবীতে অদ্বিতীয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

‘কামারুজ্জামানের চিঠি এবং জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গ’

কামারুজ্জামানের চিঠি এবং জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গ- শীর্ষক বইটির সম্পাদনা করেছেন সমাজ ও সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান পরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। সমাজ ও সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র থেকেই বইটি প্রকাশিত হয়েছে। ওই বইয়ের ভূমিকায় মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক লিখেছেন-
বাংলাদেশ ও সমকালীন বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ইসলাম, রাজনীতি, ধর্মীয় রাজনীতি, রাজনৈতিক ইসলাম, মৌলবাদ, ইসলামী আন্দোলন এ ধরনের কনসেপ্ট নিয়ে জানা ও গবেষণার কাজে যারা আগ্রহী হবেন তাদের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সিনিয়র সেক্রেটারী জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের একটি চিঠি ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে বিবেচিত হবে।
প্রধানত যুক্তরাজ্য প্রবাসী জামায়াত নেতৃত্বের উদ্যোগে Bangladesh: Reclaiming the Narrative শীর্ষক একটি সংস্কার প্রস্তাবনা ২০০১ সালের পরে বাংলাদেশের শীর্ষ জামায়াত নেতৃবৃন্দের কাছে পেশ করা হয়। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান কর্তৃক জেলখানা থেকে পাঠানো সুদর্ঘি চিঠিটি দৃশ্যত এই ধারণাপত্রের আলোকে লিখিত। জামায়াত সংশ্লিষ্ট নানা মহলে সাথে যোগাযোগ করে ইংরেজিতে লেখা প্রবন্ধটির এক ধরনের অথেনটিসিটির আভাস পাওয়া যায়। আলোচিত পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশানের ঘটনা জামায়াত ঘরানার অনেকেই জানেন। এ নিয়েও প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ নাই। জেল থেকে পাঠানো জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সংস্কার প্রস্তাবনা সম্পর্কে জামায়াতের জনশক্তির মাঝে স্বভাবতই ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রধান শামসুন্নাহার নিজামী কোরআন-হাদীসের ব্যাপক উদ্ধৃতিসহ বিবেচনায় আনতে হবে সবকিছু শিরোনামে একটা পাল্টা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এই সাঁড়াশি আক্রমণে কামারুজ্জামানের সংস্কার প্রস্তাবনাটি ক্রমেই থিতিয়ে পড়ে।
জনাব শাহ আবদুল হালিমের Do Islamists Need a Way out? শীর্ষক প্রবন্ধটি নেতৃত্বকে সংগঠনের যুগোপযোগী সংস্কার গ্রহণের জন্যে সম্মত করানোর কাজে জামায়াতের বুদ্ধিজীবী মহলের দৃশ্যত ধারাবাহিক ব্যর্থতার অন্যতম নজির। শীর্ষ জামায়াত নেতৃত্ব কখনও এসব সংস্কার প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করেনি। বরং এ ধরনের লেখালেখিকে সুবিধাবাদীতা ও আপসকামীতা হিসাবে বিবেচনা করে তাদেরকে সাংগঠনিক রীতি-নীতি ভঙ্গের অভিযোগে তিরস্কার করেছে।
রিফর্ম ইস্যু নিয়ে এই পর্যাযে সুপরিচিত আইনজীবী ও কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আরব বসন্ত ও দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলন শীর্ষক একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। জামায়াত মহলে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কারণে এবং জামায়াতপন্থী দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত হওযায় প্রবন্ধটি নিয়ে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে যায়। সংস্কারের এই ক্রমবর্ধমান চাপকে নিষ্ক্রিয় করার লক্ষ্যে এ পর্যায়ে পাল্টা বক্তব্য দিতে এগিয়ে আসেন অধ্যাপক এ কে এম নাজির আহমদ। জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় তিনি ব্যারিস্টার রাজ্জাক উপস্থাপিত সংস্কার প্রস্তাবকে খ-ন করে বক্তৃতা করেন। জামায়াত নেতৃত্বের মন-মানসিকতা বুঝার জন্য এটি সহায়ক হতে পারে। তিনি জামায়াতের সিনিয়র দায়িত্বশীল ছিলেন। আমৃত্যু তিনি ছিলেন জামায়াতের সম্ভবত একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ফোরাম বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার এর পরিচালক। অঘোষিতভাবে তিনি ছিলেন জামায়াত-শিবিরের যে কোনো অভ্যন্তরীণ শীর্ষ পর্যাযের নির্বাচনের একচ্ছত্র পরিচালনাকারী। ব্যক্তি জীবনের ছিলেন অত্যন্ত নির্মোহ। সংগঠনের ব্যাপারে ছিলেন সংগঠনবাদিতার মূর্তপ্রতীক।
যাহোক, জামায়াতের সংস্কার ইস্যুর ওপর একটি সিদ্ধান্তমূলক নিবন্ধ লিখে পাঠান সংগঠনটির কারান্তরীণ এক নম্বর ব্যক্তি মাওলানা নিজামী। আবু নকীব ছদ্মনামে লেখা ইসলামী আন্দোলনে হীনমন্যতাবোধের সুযোগ নেই শিরোনামে প্রত্যুত্তরমূলক এই নিবন্ধটি জামায়াতপন্থী পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামে ছাপানো হয়। এটি লিফলেট আকারে জনশক্তির মাঝে ব্যাপকভাবে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করা হয়।
জনাব কামারুজ্জামানের সংস্কার প্রস্তাবনাটির সূত্রগত সত্যতা নিয়ে নানা মহলে, বিশেষ করে সংগঠন-প্রাণ জামায়াতের জনশক্তির মাঝে কিছুটা সংশয় ছিলো। এর কারণ হলো মূলধারার জামায়াত নেতৃত্ব কর্তৃক একে যথাসম্ভব অস্বীকার করার প্রবণতা। ইতোমধ্যে এই চিঠির পা-ুলিপি অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে।
কোরআন ও হাদীস মোতাবেক সামষ্টিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে দ্বিমতের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে উপস্থাপন করার সীমা বা ক্ষেত্র যা-ই হোক না কেন, জামায়াত যে কোনো বিষযে তাবৎ দ্বিমত ও সমালোচনাকে যথাসম্ভব নিরুৎসাহিত করে। উপরন্তু এসব বিষয়কে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গোপনীয় হিসেবে বিবেচনা করে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার মারফতে এর ভিতরকার অনেক কিছুই এখন প্রকাশ হয়ে পড়ছে। স্বীয় বৃহত্তর জনশক্তির নির্দোষ সেন্টিমেন্ট এবং পরীক্ষিত ও ত্যাগী বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর সময়োপযোগী ও বিশ্লেষণমূলক কোনো পরামর্শকে সংগঠনটির শীর্ষতম নেতৃবৃন্দ কখনও সুনজরে দেখে নাই। সংগঠনবাদী ও সংস্কারপন্থীদের এই দৃশ্যমান দ্বন্দ্ব নিরসনে জামাযাত ভবিষ্যতে কি করবে তা কেবলমাত্র ভবিষ্যতেই জানা যাবে।
জামায়াত কখনো স্বতঃস্ফূর্ত ও স্থায়ী সংস্কারে ব্রতী হবে না আজ থেকে পাঁচ/সাত বছর আগে খুব কম লোকেই তা বিশ্বাস করতো। আমি তাদের অন্যতম। ২০১০ সালে আমি সোনার বাংলাদেশ ব্লগে জামায়াত সম্পর্কে আমার বক্তব্য তুলে ধরেছিলাম, যা ফোর পয়েন্টস হিসাবে পরিচিত। তখন আমার বিভিন্ন লেখায় নানাভাবে তা তুলে ধরেছি। এর মূল কথা হলো- (ক) জামায়াত কখনো কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ও মৌলিক পরিবর্তনকে গ্রহণ করবে না। (খ) নানা কারণে এই মুহূর্তে বিকল্প জামায়াত প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও বাস্তবসম্মত নয়। (গ) ইসলামী আন্দোলনের ধারণা মোতাবেক দেখি না কী হয়, অন্যরা করুক, আমি তো বলেছি বা সবাই করলে আছি নয়তো নাই এই ধরনের মনোভাবও গ্রহণযোগ্য নয়। (ঘ) অতএব, সংশ্লিষ্টদের উচিত নতুন শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের ধারণাকে পুনর্গঠনের কাজ করে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত কী হবে তা সময়ই বলে দিবে।

মারধরে বিনষ্ট হয় শিশুর ভবিষ্যৎ by শেখ হাফিজুর রহমান

কিছুদিন আগে আরাফাত শাওন নামের ১৫-১৬ বছরের এক বালক আত্মহত্যা করে। যত দূর মনে করতে পারি এসএসসি পরীক্ষায় তার জিপিএ ছিল ৪.৮৩। তার বিদ্যালয় থেকে যারা এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল, শাওন ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। তিন মাস ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ওই ফলাফলেই সে সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু তার বাবা-মায়ের প্রত্যাশা ছিল জিপিএ–৫। বাবা-মায়ের বকাঝকা ও পারিবারিক অসন্তোষের মুখে শাওন আত্মহত্যা করে বসে। শাওনের আত্মহত্যা তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ ঘটনাটি আবার মনে পড়ে গেল ৬ জুলাই প্রথম আলোর প্রথম পাতার প্রধান প্রতিবেদনটি দেখে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল: ‘দুই-তৃতীয়াংশ শিশুকে মারধর করেন মা-বাবা’। অর্থাৎ পড়াশোনার স্বার্থে এবং শৃঙ্খলা ও আদবকায়দা শেখাতে গিয়ে বাবা ও মায়েরা শিশুদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন।
ইউনিসেফের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ৫৯ হাজার ৮৯৫টি পরিবারের ওপর একটি জরিপ করেছে এবং এতে ৭৫ হাজার ৯০৭ জন শিশুর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ওই জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে সবচেয়ে বেশি মারধর করা হয় তিন-চার বছরের শিশুদের—৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চিন্তা করা যায়, তিন-চার বছরের শিশুদের পেটাচ্ছেন তাদেরই মা ও বাবারা! তিন অথবা চার বছর বয়স, যখন একটি শিশু আধো আধো বোলে কথা বলতে শুরু করেছে, যখন সে সবে হাঁটতে ও ছুটতে শুরু করেছে, যখন এইটুকুন এক শিশু তার বোধ, দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ ও স্বাদ দিয়ে চারপাশের অবাক পৃথিবীকে আবিষ্কারের নেশায় মেতে উঠেছে, তখনই তার বাবা-মা তাকে চড়-থাপড় মারছেন, অথবা পিঠে কিল-ঘুষি দিচ্ছেন!
আমরা শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নতি করেছি, সামাজিক উন্নয়ন সূচকের অনেকগুলোতে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছি, সম্প্রতি মধ্যম আয়ের দেশের প্রাথমিক স্তরে উন্নীত হয়েছি, কিন্তু এখনো আমাদের সমাজ যথেষ্ট পরিমাণে সভ্য নয়। ওই অর্থে যে এখনো আমরা নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। আরও যেসব ক্ষেত্রে এ সমাজের গুরুতর গলদ আছে, তার একটি হচ্ছে, শিশুদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। কেমন পরিবেশে শিশুরা বেড়ে উঠবে, শিশুদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয়ে এ সমাজের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো মানবিক নয়। জরিপের ফলাফল থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, প্রতি তিনজন মায়ের মধ্যে একজন বিশ্বাস করেন, নিয়মকানুন শেখাতে সন্তানদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে মায়েদের চেয়ে বাবারা আরও বেশি ‘নিষ্ঠাবান’! সমাজের পুরুষ সদস্যরা—বাবা, মামা, চাচা, ও শিক্ষকেরা শিশুদের আদবকায়দার পাঠ দিতে ও শৃঙ্খলা শেখাতে ‘প্রহারকেই শ্রেষ্ঠ ওষুধ’ বলে মনে করেন!
বাংলাদেশের মা-বাবারা কি জানেন, শিশুকে মারধর করা ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৭০ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ? যে শিশু আপনার তত্ত্বাবধানে বা হেফাজতে রয়েছে, অথবা যে শিশুর আপনি দেখভাল করছেন, তাকে মারধর করা, তাকে কষ্ট দেওয়া বা তাকে মানসিক নির্যাতন করার কোনো অধিকার আপনার নেই, এমনকি আপনি তার বাবা-মা হলেও। এ জন্য দায়ী ব্যক্তির পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এ তো গেল আইন ও দণ্ডের দিক। বকাঝকা, গালমন্দ ও মারধর শিশুর মানসিক বিকাশ, শেখার সক্ষমতা, ও বুদ্ধিবৃত্তির পরিপক্বতার জন্যও ভালো নয়। জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শারীরিক শাস্তি শিশুর উন্নয়ন, শেখার ক্ষমতা ও বিদ্যালয়ের পারদর্শিতা বাধাগ্রস্ত করে। নানা রকম সমীক্ষা ও গবেষণা দ্বারা এটা এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত যে শিশুদের গালমন্দ বা মারধর করা অথবা তাদের ওপর কোনো জোর-জবরদস্তির পরিণতি হয় নেতিবাচক ও ভবিষ্যদ্বিনাশী। ফলে সভ্য সব দেশেই আইন করে শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করা হয়েছে। সারাক্ষণ বকাঝকা করলে শিশুর মধ্যে পর্যাপ্ত আস্থার অভাব দেখা দেয়, গালমন্দ করলে মনের ওপর চাপ পড়ে, আর মারধর করলে শিশুর সংবেদনশীলতা নষ্ট হয় অথবা শিশু হয়ে পড়ে মারাত্মক রকম একগুঁয়ে। জগদ্বিখ্যাত মনঃসমীক্ষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছেন, জন্মের পর প্রথম পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে একটি শিশুর ব্যক্তিত্বের গঠন সম্পন্ন হয়ে যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শিশুদের মারধর বা নির্যাতন না করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে গিয়ে আনন্দের সঙ্গে শিশুদের পাঠদানের কথা বলেছেন।
আরাফাত শাওনের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সে তার ‘সুইসাইডাল নোট’-এ লিখেছে, ‘আমি আদৌ জানি না যে আমি কে? এই পরিবারের বা আমার মা-বাবার সন্তান? তা না হলে এ রকম...কড়া শাসনের ওপর আমাকে রাখা হয়েছে...এভাবেই প্রতিনিয়ত আমাকে বকাঝকা করা হয়।’ রেজওয়ানুল নাফিস, যিনি কিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দিতে গিয়ে ধরা পড়ে মার্কিন আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তিনি বিচারকের অনুকম্পা চেয়ে যে চিঠি লিখেছিলেন, ওই চিঠিতে তিনি ছোটবেলা তার বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত মনোযোগ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক টেড বান্ডির শৈশব ছিল ভয়াবহ। প্রতিনিয়ত দুর্ব্যবহার, গালমন্দ, মায়ের মমতা না পাওয়া ইত্যাদি কারণে টেড বান্ডির মধ্যে মানসিক বিকৃতি ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। একসময় টেড বান্ডি হয়ে ওঠে এক ভয়াবহ সিরিয়াল কিলার। যদিও টেড বান্ডি ২৭ জন নারী ও বালিকাকে খুন করার কথা কবুল করেছেন, কিন্তু অনেকেই আশঙ্কা করেন, তিনি শতাধিক নারী হত্যার সঙ্গে জড়িত।
এযাবৎ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিশুদের ওপর যেসব গবেষণা ও সমীক্ষা হয়েছে, তার মোদ্দা কথা হচ্ছে, শিশুদের গালমন্দ বা মারধর করা তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য শুভ ও ইতিবাচক নয়। এ ছাড়া ভয়াবহ অপরাধী ও অনেক সিরিয়াল কিলারের জীবনবৃত্তান্ত ঘেঁটে দেখা গেছে যে তাদের শৈশব ছিল ত্রুটিপূর্ণ। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাংলাদেশের মা-বাবা, অভিভাবক ও শিক্ষকেরা শিশুদের গালমন্দ ও মারধর করার পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি ও নিষ্ঠুর অভ্যাস থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসবেন। ওতেই শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত হবে, ভবিষ্যতের সমাজ হয়ে উঠবে সুস্থ ও সভ্য।
শেখ হাফিজুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক, মানবাধিকার ও অপরাধবিজ্ঞান গবেষক।

সফট ড্রিংকসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয় দুই কিশোরীকে

বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা। চারদিকে নীরবতা। মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর ছোট্ট বাজারের পাশে পুকুর পাড়ে নীরবতা ভেদ করে চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে! কিছুক্ষণ পরে এলাকাবাসী দেখতে পায় দুটি ছেলে দুটি মেয়েকে পাঁজাকোল করে ভ্যানে তুলে নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালে। হাসপাতালে নেয়ার পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অষ্টম শ্রেণীপড়ুয়া দুই স্কুলছাত্রী। এ ঘটনায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে ও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়েছে। নিহত এক কিশোরীর পিতা বিল্লাল শিকদার বাদী হয়ে গতকাল সদর থানায় মামলা করেছেন। গতকাল সকালে সরজমিন মস্তফাপুর গ্রামে গিয়ে জানা গেছে, সুমাইয়া ও হেপী মস্তফাপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। সুমাইয়া মস্তফাপুর গ্রামের বেল্লাল শিকদারের মেয়ে এবং হেপী একই এলাকার হাবিব খানের মেয়ে। দুজনে এক সঙ্গে স্কুলে যেত, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল দুজনের সঙ্গে। বৃহস্পতিবার দুপুরে খাবার খেয়ে প্রাইভেট পড়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় দুই বান্ধবী। এরই মধ্যে সন্ধ্যার মধ্যে আকাশ ভেঙে দুই পরিবারের কাছে খবর আসে মৃত্যুর। দুই স্কুলছাত্রী নিহত হওয়ার ঘটনা এখন রহস্য দানা বেঁধেছে। উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ধর্ষণের পরেই জোরপূর্বক বিষপানে হত্যা করা হয় দুই স্কুলছাত্রীকে। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে রহস্য উদঘাটনের কাজ শুরু করেছে পুলিশ ও সিআইডি। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, সফট ড্রিংকসের সাথে বিষ মিশিয়ে হত্যা হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় রানাকে প্রধান আসামি করে ৬ জনের নামে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মস্তফাপুর বাজারের দর্জি দোকানদার সূর্য বেগম বলেন, বিকালে আমি দোকানে এসে চিৎকারের শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি দুইটি ছেলে দুটি মেয়েকে অচেতন অবস্থায় কোলে তুলে ভ্যানে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী আরেক দোকানদার জাহাঙ্গীর নাগাছি জানান, বিকালে আমি দেখি দুইটি ছেলে দুটি অসুস্থ মেয়েকে ভ্যানে তুলে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
নিহত সুমাইয়ার মা আসমা বেগম জানান, আমার এক সুমাইয়া মারা গেছে। যদি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার হয় তাহলে হাজারো সুমাইয়া বেঁচে যাবে। আমি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যেন আমার সুমাইয়ার মতো কোন মেয়েকে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়। নিহত হেপীর চাচি কেয়া বেগম ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
সুমাইয়ার পিতা বেল্লাল শিকদার দাবি করেন, তার মেয়েকে শারীরিক নির্যাতন করে খুন করা হয়েছে।
মস্তফাপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বোরহান উদ্দিন খান জানান, গত তিন দিন ধরে তারা স্কুলে অনুপস্থিত। তবে তারা মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছিল।
ঘটনার পর পুলিশ শুক্রবার সকালে একই গ্রামের রানার মা সালমা বেগম এবং মেহেদির মা রহিমা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে সদর থানার পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই মেহেদি ও রানাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা পলাতক আছে। ধারনা করা হচ্ছে এই ঘটনার সাথে রানা ও মেহেদি জড়িত। রানা একই এলাকার শওকত খলিফার ছেলে এবং মেহেদী ফজলুল কবিরের ছেলে।
গতকাল আটককৃত শিপন ও রাকিব জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, মেহেদি ও রানা নিহত দুই স্কুলছাত্রীকে ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে দেখে তারা হাসপাতালে আসে।
মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শফিকুল ইসলাম রাজিব বলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে সুমাইয়ার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
মাদারীপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন জানান, এ ঘটনায় সুমাইয়ার পিতা বেল্লাল শিকদার বাদী হয়ে রানা ও মেহেদীসহ ৬ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক ময়নাতদন্তে জানা গেছে, সফট ড্রিংকসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়েছে। এতেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের লাশ ময়নাতদন্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. কামাল উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হবে। যাতে কোন নিরীহ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।

কেক কাটেননি খালেদা জিয়া

দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে ২০১৪ সালে জন্মদিনের
কেক কাটলেও এবার ১৫ আগস্টের প্রথম ক্ষণে কেক
কাটেননি খালেদা জিয়া। ছবিটি গত বছরের জন্মদিনের
প্রতিবছর ১৪ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে নেতা-কর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে কেক কেটে জন্মদিন উদ্‌যাপন করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এই রেওয়াজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে, বিএনপি বিরোধী দলে যাওয়ার পর থেকে। এবার হঠাৎ এই উদ্‌যাপনে ছন্দ পতন হয়েছে। এ বছর তিনি ১৫ আগস্টের প্রথম ক্ষণে কেক কাটেননি।
তবে খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে শনিবার মহিলা দল কেক কাটবে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা।
বিএনপির দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আজ শনিবার রাতে গুলশান কার্যালয়ে জন্মদিনের কেক কাটতে পারেন খালেদা জিয়া।
এদিকে বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও বড় ছেলে তারেক রহমান খালেদা জিয়াকে ফোন করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এ সময় তারেক রহমানের সন্তানেরা দাদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের গঠনের পর ১৯৯৩ সাল থেকে ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালনের রেওয়াজ চালু হয়। তবে তা ছিল ঘরোয়াভাবে ও অনাড়ম্বরভাবে। বিএনপি ক্ষমতা হারিয়ে বিরোধী দলে যাওয়ার পর ১৯৯৬ সাল থেকে এ দিনটিতে কেক কেটে জন্মদিন পালন শুরু হয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীয় মিন্টুরোডের সরকারি বাসভবনে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো নেতা-কর্মীদের নিয়ে কেক কেটে জন্মদিন পালন করা শুরু করেন। সেসময়ের একজন যুবদল নেতা ও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর পরামর্শে এ আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় বলে বিএনপির কয়েকজন নেতা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
তবে ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সরকারিভাবে গণমাধ্যমে তাঁর যে জীবনবৃত্তান্ত পাঠানো হয়েছিল তা ২১ মার্চ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। তাতে বলা হয়েছিল, খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৯ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু সংখ্যক বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে জীবন দিয়েছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি ও আওয়ামী লীগের সেসময়ের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর এ দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হয়। একই দিনে খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালনের কঠোর সমালোচনা করে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা। বিএনপির নেতাদের অনেকেও এই দিনে জন্মদিন পালন করা নিয়ে ভেতরে-ভেতরে নাখোশ।
২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোন করেছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে। এই টেলিফোন সংলাপের একপর্যায়ে শেখ হাসিনা ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গত ১ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে খালেদা জিয়াকে আবারও জন্মদিন পালন না করার আহ্বান জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ। তিনি বলেছিলেন, ১৫ আগস্ট যদি সত্যিকারের জন্মদিন হয়ে থাকে তাহলেও ১৬ বা ১৭ আগস্ট যেন খালেদা জিয়া জন্মদিন পালন করেন।
এমন পরিস্থিতিতে এ বছর ১৫ আগস্টের প্রথম ক্ষণে কেক কাটা নিয়ে বিএনপির মধ্যেও ধোঁয়াশা ছিল। গতরাতে বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, সাধারণত শুক্রবার ও ছুটির দিনে বিএনপির চেয়ারপারসন তাঁর কার্যালয়ে যান না।
গত ২০০৯ সালে ১৪ আগস্ট ছিল শুক্রবার। ওই দিন দিবাগত রাতে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে যুবদলের নেতা-কর্মীরা দলের নয়াপল্টন কার্যালয়ে ৬৫ পাউন্ড ওজনের কেক কেটে খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন করা হয়।
বিএনপির পক্ষ থেকে সব সময় বলা হয়, খালেদা জিয়া নিজ থেকে জন্মদিন পালন করেন না। এটি নেতা-কর্মীদের আবেগের বিষয়। সম্প্রতি দলের মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপনও এই বক্তব্য দিয়েছেন। এমন বক্তব্যের পর যদি এবার শুক্রবারে খালেদা জিয়া কার্যালয়ে যান আর তখন কেক কাটা হয় তাহলে এই সমালোচনাও উঠবে যে, খালেদা জিয়া শুধু জন্মদিনের কেক কাটার জন্যই শুক্রবারে কার্যালয়ে গিয়েছেন। তবে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে কেক নিয়ে যাওয়ার জন্য কার্যালয় থেকে এক ধরনের নির্দেশনা তাঁরা পেয়ে থাকেন।

‘আপনার পায়ে ধরি খালু, মাইরেন না’

রাজশাহীর কাটাখালিতে নির্যাতনের শিকার
শিশু রত্না। হাতে খুন্তির ছ্যাঁকার দাগ। ছবিটি
আজ শুক্রবার তোলা। ছবি: প্রথম আলো।
নির্যাতনের শিকার শিশু রত্না। ছবিটি
শুক্রবার তোলা। ছবি: প্রথম আলো।
‘আপনার পায়ে ধরি খালু, মাইরেন না! ’—রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালি এলাকার জিল্লুর রহমান-রীতা খাতুন দম্পতির বাসার ভেতরে এমন কাতর আর্তনাদ প্রায়ই শুনতে পেতেন প্রতিবেশীরা। আর্তনাদ করত ১১ বছর বয়সী গৃহকর্মী রত্না বেগম। তাকে বাসায় আটকে রেখে রুটি বানানোর বেলুন দিয়ে পেটানো হতো। দুই মাস আগে একবার গরম খুন্তি দিয়ে তার গায়ে ছ্যাঁকাও দেওয়া হয়। পুলিশ শুক্রবার এসব অভিযোগে গৃহকর্তা জিল্লুর রহমানকে আটক করেছে। তারা শিশুটিকেও উদ্ধার করেছে। শিশু রত্না বেগম শুক্রবার প্রথম আলোকে বলে, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকেও মিষ্টি চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে রীতা খাতুন তাকে রুটি তৈরির বেলুন দিয়ে পিটিয়েছে। সে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলে তিনি তাকে থাপড় দেন। চুল ধরে তুলে আছাড়ও দেন। একপর্যায়ে তাকে বাড়ির একটি কক্ষের ভেতরে তালা দিয়ে আটকে রাখা হয়। এর পর কান্নার শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। পরে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে গৃহকর্তা জিল্লুর রহমানকে আটক করে। তবে গৃহকর্ত্রী রীতাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। আটক জিল্লুর রহমানের কাছে শিশুটিকে কেন মারা হতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সামান্য ব্যাপার। এ নিয়ে সাংবাদিক কেনো? কিছু বলতে হলে তিনি থানায় গিয়ে বলবেন।’
শিশু রত্না আরও জানায়, তার বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে। বাবার নাম আব্দুর রহিম। তারা চার বোন। সে মেজ। বাড়িতে থাকতে স্কুলে পড়ত। সেখান থেকে ছয় বছর আগে এনজিও কর্মী জিল্লুর রহমান তাকে বাসায় কাজ করার জন্য নিয়ে আসেন। কাজের বিনিময়ে তাকে থাকা-খাওয়ার বাইরে প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে দেওয়া হতো । কিন্তু ওই বাড়িতে কারণে অকারণে প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলে রত্না। সে বলে, গৃহকর্তা জিল্লুর রহমান, তাঁর স্ত্রী রীতা খাতুন এবং তাঁদের দুই সন্তানও কথায় কথায় তাকে মারত। সে কাঁদলে চড়-থাপড় মারত। চুল ধরে তুলে আছাড় দিত। দুই মাস আগে জিল্লুর রহমান তাকে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়েছিল। তাতে তার গা পুড়ে যায়। কিছুদিন আগে সেই ঘা শুকিয়েছে। তবে আজ ওই বাড়িতে গিয়ে তার কচি শরীরে এখনো সে নির্যাতনের চিহ্ন দেখা যায়।
তবে এ ঘটনা নিয়ে থানায় এখনো মামলা হয়নি। মামলা হবে কি না জানতে চাইলে মতিহার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কাজল রেখা বলেন, ‘জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট’ থানা পরিদর্শনে এসেছেন। তিনি যাওয়ার পরে সিদ্ধান্ত হবে। ওসি স্যার বলতে পারবেন।

নির্বাচনকালীন সরকার: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ- সব দল নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার হতে পারে

আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন রূপরেখা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। দশম সংসদে অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সাংসদদের বৈধতার বিষয়ে এক মামলায় আদালত একটি পর্যবেক্ষণে এই রূপরেখা দেন। এতে নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রীসহ যেকোনো মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নাকচ করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়ার পক্ষেও যুক্তি দিয়েছেন আদালত।
২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পরে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এই প্রথম দুটি নির্দিষ্ট রূপকল্প পাওয়া গেল। আদালতের রায়ের এই পর্যবেক্ষণের বিষয়ে রাজনীতিবিদ এবং আইন বিশেষজ্ঞরা অনেকেই সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
আর কেউ কেউ তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করতে চাননি। যাঁরা সতর্ক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তাঁরা বলছেন যে এই পর্যবেক্ষণ এ কথাই প্রমাণ করে যে দেশে রাজনৈতিক সংকট রয়েছে এবং এর সমাধান প্রয়োজন।
২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট হয়েছিল। ২০১৪ সালের ১৯ জুন ওই দুটি রিট খারিজ করে দেন বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ। সম্প্রতি তার পূর্ণাঙ্গ রায় বেরিয়েছে। এই মামলায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, রফিক-উল হক, মাহমুদুল ইসলাম, রোকন উদ্দিন মাহমুদ ও বদিউল আলম মজুমদার।
‘খন্দকার আবদুস সালাম বনাম বাংলাদেশ’ এবং ‘শাহরিয়ার মজিদ বনাম বাংলাদেশ’ শীর্ষক দুটি রিট নিষ্পত্তি করে আগামী নির্বাচন কীভাবে হতে পারে সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ প্রদানকে আদালত তাঁদের ভাষায় ‘অন্তর্গতভাবে প্রাসঙ্গিক’ বিবেচনা করেছেন। তবে আইনজ্ঞদের অনেকেই এ ধরনের পর্যবেক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, রিট আবেদনটি হয়েছিল ১৫৩ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বৈধতার প্রশ্নে। হাইকোর্ট বলে দিয়েছেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তবে তিনি বলেন, দেশে যে রাজনৈতিক সংকট আছে এবং তার যে সমাধান প্রয়োজন, সেটি উচ্চ আদালতও অনুভব করছেন। যদিও তিনি মনে করেন, এটি নির্বাহী বিভাগের বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে একটি ঝামেলা যে রয়েই গেছে তার প্রমাণ বিচার বিভাগ থেকে বিভিন্ন সময়ে আদেশ নির্দেশ ও পর্যবেক্ষণ দেওয়া। তিনি মনে করেন, হাইকোর্ট তাঁর মত দিয়েছেন, এটি যে পালন করতেই হবে তা নয়।
হাইকোর্ট বেঞ্চ তাঁদের রায়ে প্রথম রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করেন, নির্বাচনকালে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যেতে পারে। সংসদের মেয়াদ পুরো হলে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সংসদ ভেঙে যাওয়ার দিন থেকে ৯০ দিনের জন্য সব দল থেকে ৫০ জন নতুন মন্ত্রী নেওয়া হবে। বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে মন্ত্রীর সংখ্যা ঠিক হবে।
রায়ে আরও বলা হয়, ‘উদাহরণস্বরূপ, বর্তমান সংসদ বয়কট করার কারণে বিএনপি ও জামায়াত একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো মন্ত্রী দিতে পারবে না। জাতীয় পার্টি গত নির্বাচনে ৭ ভাগ ভোট পেয়েছে, সেই অনুপাতে তারা মন্ত্রিত্ব পাবে। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদের আওতায় বয়কটকারী দলগুলো সর্বোচ্চ পাঁচজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী দিতে পারবে। সম্ভাব্য বিতর্ক এড়াতে স্বরাষ্ট্র, অর্থ, পররাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দপ্তর লটারির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। নির্বাচন কমিশনকে প্রধানমন্ত্রীসহ যেকোনো মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ‘জোরালো কারণ’ দেখিয়ে প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নাকচ করার ক্ষমতা দিতে হবে।
দ্বিতীয় রূপরেখা হিসেবে বলা হয়, কোনো নির্বাচনে বিজয়ী দল প্রথম চার বছর দেশ শাসন করবে। এরপর প্রধান বিরোধী দল শেষ এক বছর দেশ চালাবে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রাপ্ত মোট ভোটের অন্তত অর্ধেক সমান ভোট প্রধান বিরোধী দলকে পেতে হবে। কোনো নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল তা না পেলে তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পাঁচ বছরের দেশ শাসনের ম্যান্ডেট মেনে নিতে হবে। তবে নির্বাচনকালে প্রথম রূপকল্পমতে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রথম বিকল্প সংবিধান সংশোধন ছাড়াই চলবে। কিন্তু দ্বিতীয় বিকল্পের জন্য সংবিধান সংশোধন লাগতে পারে। কারণ, এক বছরের জন্য যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়।
রায়ে বলা হয় যে আমাদের সাংবিধানিক স্কিমে ভোট প্রদানের অধিকার সরাসরি সাংবিধানিক অধিকার বলে প্রতীয়মান হয় না। নির্বাচন ও ভোট-সংক্রান্ত ১২২ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয় যে এই বিধানগুলো একজন নাগরিকের ওপর ভোট প্রদানের বিষয়টিকে কোনো কর্তব্য হিসেবে চাপিয়ে দেয় না। বরং ভোট দেওয়া না দেওয়া নাগরিকের স্বেচ্ছাধীন রাখা হয়েছে।
রায়ে বলা হয় যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১৯ ধারার আওতায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ দশম সংসদ নির্বাচনে কোনো ভোটকেন্দ্র, পোলিং এজেন্ট বা ভোটারদের উপস্থিতির প্রশ্ন ছিল না। সুতরাং আরপিওর ১৯ ধারা সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে না। এতে বলা হয়, আমাদের আইনি গণ্ডিতে একটি ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনুষ্ঠিত হতে পারে। আরপিওর ১৯ ধারা না থাকলে একটি অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নস্যাৎ হতে পারত উল্লেখ করে রায়ে বলা হয় যে এর ফলে পুরো ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়তে পারত।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হয়, এই মামলায় ৩০০ আসনের নয়, ১৫৩ আসনের এমপি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আবেদনকারী ও তিন অ্যামিকাস কিউরি (কামাল হোসেন, রফিক-উল হক, বদিউল আলম মজুমদার) বলেছেন, ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। ভোট কারচুপি ও সহিংসতা ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ১৫৩ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি বেআইনি নয় বলা হলেও নীতির প্রশ্নে, রুচির প্রশ্নে ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে এটি চরম প্রশ্নবিদ্ধ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিবিরোধী ওই নির্বাচন নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতরাই প্রশ্ন তুলতে পারতেন। বিরোধীরা কেন, অনির্বাচিত সাংসদেরাই যদি এই প্রশ্ন তুলতেন তাহলে তাঁদের আত্মসম্মানবোধের দৃঢ় পরিচয় পাওয়া যেত।
রায়ে বলা হয়, যারা নির্বাচন বয়কট করেছে তাদের উচিত ছিল নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদের দাবিকে (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) নির্বাচনী ইশতেহারের এক নম্বর দফায় অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু তারা নির্বাচনে না এসে বরং তা প্রতিহত করতে সচেষ্ট হয়েছে। তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য হরতাল দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। সরকারের পদত্যাগ চেয়ে তারা একটি উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নিয়ে সংঘাতমূলক রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে। তারা অকল্পনীয় ধ্বংসযজ্ঞ করেছে। অনেক গাছ কেটেছে, মসজিদ ও বাজার ধ্বংস করেছে এবং পবিত্র কোরআন ও অন্যান্য বই পুড়িয়েছে। বাসে যাত্রীদের হত্যা করেছে।
হাইকোর্টের এ রায়ে ব্যালটে না ভোট প্রথা চালুর পক্ষে অভিমত দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা বিষয়ে হাইকোর্টের দুটি ফর্মুলা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ বলেছেন, এই পর্যবেক্ষণের আইনগত ভিত্তি নেই। তাই এটি গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতাও নেই।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, সংবিধান হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন। তাতেই বলা আছে, কার কী কাজ এবং নির্বাহী বিভাগ কীভাবে পরিচালিত হবে। এর বাইরে কেউ কোনো মত বা পর্যবেক্ষণ দিলেও তা গ্রহণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
শাহদীন মালিক বলেন, সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে যেমন বিভিন্ন মত দেওয়া হয়, এটি তেমনই একটি মত বা পর্যবেক্ষণ বলে মনে হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের এই পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে তিনি তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে চান না। এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার আগে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তিনি কথা বলবেন।

শোকাবহ আগস্ট: ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠা এক বাড়ি by আশীষ-উর-রহমান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি।
এটি স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছে l প্রথম আলো
দোতলার খাবার জায়গায় সাদামাটা একটি টেবিল, চারপাশে আটটি কাঠের চেয়ার। তার ওপর কয়েকটি থালা-বাটি, পেয়ালা, চামচ সাজানো। পাশেই কালো রেক্সিনে বাঁধানো হাতল ছাড়া কয়েকটি সোফা। আহারের পরে এখানেই বসে খানিকটা সময় বিশ্রাম নিতেন তিনি। পাইপে তামাক সাজাতেন। সে রকম একটি ছবিও টাঙানো আছে পাশের দেয়ালে।
এসব দেখে খুবই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল সামাহ্ বিনতে আলম। মেহেরপুরের দশম শ্রেণি পড়ুয়া সামাহ্ ঢাকায় এসেছে চিকিৎসা নিতে। উঠেছে মামাবাড়ি, কল্যাণপুরে। গত মঙ্গলবার মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে এসেছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। তার ধারণা ছিল, যিনি স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছেন, ছিলেন রাষ্ট্রপতি, তাঁর বাড়ির জিনিসপত্রও নিশ্চয় খুব জমকালো ধরনের হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির আসবাব দেখে তার আগের ধারণা ভেঙেছে। বলছিল, ‘ওনার খাটটাও তো খুবই সাধারণ। অন্য সব জিনিসও তেমন দামি না। এ রকম হবে আগে ভাবি নাই।’
সামাহ্র মতো অনেকেরই পূর্বধারণা বদলায়, অনেকের বুক ভরে ওঠে বেদনায় এই বাড়িটিতে এলে। দেয়ালে, দরজায়, কপাটে, বইতে, মেঝেতে অজস্র বুলেটের ক্ষত। রক্তের ছোপ লাগা পোশাক। সব সাজিয়ে রাখা হয়েছে ঘরে ঘরে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের নিদর্শন। অথচ এই বাড়ি থেকেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন বাঙালির স্বাধীনতা। এখান থেকেই সেই রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। আরও নানান ঘটনায় জাতির ইতিহাসের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে এই বাড়ি।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাড়িটি সিলগালা করে রাখা হয়েছিল। এরপর বাড়িটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে ১৯৯৪ সালের ১৫ আগস্ট থেকে। এখন এর নাম ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় শ লোক আসে। সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্য বিশেষ দিবসগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বহু বেড়ে যায় বলে জানালেন জাদুঘরের কর্মকর্তারা।
ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়িটি তিনতলা। এটিকে হুবহু আগের মতোই রেখে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। মোট নয়টি কক্ষে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন নিদর্শন। নিচের তলায় ড্রয়িংরুমের দেয়ালগুলোতে রয়েছে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র। এক পাশে রাখা একটি শোকেস। পাশে পড়ার ঘর। গুলিবিদ্ধ বই ও আলমারি। দুই সারি ঘরের মাঝের দেয়ালে ১৫ আগস্টে নিহতদের তেলচিত্র।
দোতলায় এক পাশে বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষ। বিছানার পাশে ছোট্ট টেবিলে সাজানো পাইপ, তামাকের কৌটা। মাথার কাছে রাখা টেবিলে সাদা, সবুজ ও কমলা তিনটি টেলিফোন সেট। একটি রেডিও। আসবাব বলতে এই। আর আছে রক্তমাখা কিছু পোশাক।
এই কক্ষের সামনেই খাবারের জায়গা। এক কোনায় রাখা শেখ রাসেলের একটি বাইসাইকেল আর মাছের অ্যাকুয়ারিয়াম। উল্টো দিকে শেখ জামালের কক্ষ। সেখানে তাঁর সামরিক পোশাক। ড্রেসিং টেবিল, তাঁর স্ত্রীর কিছু প্রসাধনী, অলংকার। বিছানা, পোশাক-আশাক। দেয়ালে আলোকচিত্র আর গুলির ক্ষত। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার কক্ষও এই তলায়। শেখ রেহানার কক্ষটিতে নিদর্শনগুলো সাজানোর কাজ চলছিল। বিপরীত পাশে সিঁড়ি। যেখানে লুটিয়ে পড়েছিলেন গুলিতে ঝাঁঝরা বুক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ধাপগুলো বেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল রক্তধারা। সিঁড়িটি চলাচলের জন্য বন্ধ করা। পাশের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা জাতীয় পতাকা। ফুলদানিতে রক্ত গোলাপগুচ্ছ।
বাড়ির তৃতীয় তলায় শেখা কামালের কক্ষ। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে ছিলেন সংগীতানুরাগী। তিনি ঘরটি যেভাবে সাজিয়েছিলেন, তেমন করেই রাখা হয়েছে। বিছানার পেছনে তাঁর সস্ত্রীক ছবি। সামনে কার্পেটের ওপর রাখা তানপুরা। এক পাশে অর্গান। শোকেসে রাখা শেখ কামালের সংগ্রহ করা বিভিন্ন ধরনের গানের রেকর্ড। সব অবিকল আছে, কেবল মানুষগুলো নেই।
বাড়ির সামনের জায়গায় এখন মৌসুমি ফুলের বাগান। উত্তর দিকের কোনায় টিনের ছাউনি দেওয়া কবুতরের ঘর। বঙ্গবন্ধুর খুব প্রিয় ছিল। এখন তারা সংখ্যায় অনেক। এর পাশেই রান্নাঘর। পেছনে জাদুঘরের সম্প্রসারিত নতুন ভবন। এর নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর বাবা-মায়ের নামে ‘শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সায়েরা খাতুন প্রদর্শনী গ্যালারি’। সহকারী কিউরেটর কাজী আফরিন জাহান জানালেন, ২০১১ সালের ২০ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে এই অংশটি। ছয়তলা ভবনের পঞ্চম তলায় পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র। চতুর্থ থেকে দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত (ক্রম অনুসারে ওপর থেকে নিচে) বঙ্গবন্ধুর জীবনের শৈশব থেকে জীবনের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র ও বিভিন্ন নিদর্শনের প্রদর্শনী। এক হাজারের বেশি আলোকচিত্র রয়েছে এখানে। এ ছাড়া এই ভবনে আছে একটি ছোট্ট মিলনায়তন। বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাদুঘর সবার জন্য খেলা।
ফটক পেরিয়ে ভেতরে এলে বাড়ির নিচের তলার বসার ঘরের সামনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি আবক্ষ প্রতিকৃতি। সেখানে সবাই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাঙালির এই অবিসংবাদিত নেতার প্রতি। এই বাড়িতেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল ৪০ বছর আগে। কিন্তু তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে আছেন।

দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট by আনিসুল হক

আঁকা: তুলি
বস বললেন, ‘আপনার উচিত ছিল ক্লায়েন্টকে ফোন করা। জিজ্ঞেস করা যে তিনি ফ্ল্যাটটা কেনার ব্যাপারে সেকেন্ড থট দেবেন কি না।’
আমি বললাম, ‘জি বস।’
‘কী জি জি করছেন? জি মানে কী?’
‘আমার উচিত ছিল ক্লায়েন্টকে আরেকবার ফোন করে জিজ্ঞেস করা।’
‘তাহলে করেননি কেন?’
‘গতবার করেছিলাম, বস। তখন ক্লায়েন্ট দাম কমিয়ে দিল। ভাবল, আমাদের আগ্রহ বেশি। আমরা কম দামে ছেড়ে দেব। তখন আপনি বললেন, ক্লায়েন্টকে সেকেন্ড টাইম ফোন দেবেন না। আর ক্লায়েন্ট যে ফ্ল্যাটটা পছন্দ করবে, সেটাকে সোল্ড আউট দেখাবেন। তখন সে তাড়াতাড়ি কিনে ফেলবে।’
‘গতবারের কেস আর এবারের কেস এক হলো? আগেরটা ছিল রেইনি সিজন। এখন শরত্কাল। কী বুঝলেন?’
‘বস, আপনার কাছ থেকে আমি রোজ নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারি। আপনার মতো বস পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার।’
‘এখন যান, নতুন ক্লায়েন্টদের এসএমএস করেন। অফার জানান।’
‘জি বস।’
বস ফেসবুকে আছেন। চ্যাট করছেন। খুব জরুরি কাজ। তাঁকে এখন যন্ত্রণা করা উচিত না।
আমার টেবিলের সামনের ডিসপ্লে বোর্ডে আমি একটা বাণী ঝুলিয়ে রেখেছি।
রুল নম্বর ওয়ান: দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট।
রুল নম্বর টু: ইফ দ্য বস ইজ রং, সি রুল নম্বর ওয়ান।
একজন ক্লায়েন্ট এসেছেন। দরকারি ক্লায়েন্ট। বিদ্যুৎ বিভাগের মিটার রিডার। এর মধ্যে তিনটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছেন। আরেকটা কিনবেন। এসে বললেন, ‘আরশাদ সাহেব কই?’
আরশাদ সাহেব আমার বস। তিনি ফেসবুক করছেন।
আমি ক্লায়েন্টকে বললাম, ‘স্যার, আমাকে বলেন, আমি দেখছি আপনাকে কীভাবে হেল্প করতে পারি।’
‘আরশাদ সাহেবকে ডেকে দেন।’
আমি গেলাম বসের রুমে। বস ইউটিউবে হিন্দি নাচ দেখছেন। ‘চিতিয়া কালাইয়া বে’... খুব জরুরি কাজ, জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজের নাচ দেখা। তাঁকে ডিস্টার্ব করা উচিত না।
আমি ফিরে এলাম। বললাম, ‘বস খুব বিজি। আপনি কাইন্ডলি বসুন। কফি খান। আধা ঘণ্টা পরে আমি তাঁকে ডেকে দেব।’
এরই মধ্যে বসের ফোন, ‘মাসুম, একটু আসবা?’
গেলাম বসের কাছে। বস বললেন, ‘মাসুম, শোনো, একটা সমস্যা হয়ে গেছে, আমি একটা সেফটিপিন মুখে নিয়ে চাবাচ্ছিলাম, ওটা পেটে চলে গেছে। এই সমস্যার কোনো সমাধান জানো?’
‘আপনি সেফটিপিন কোথায় পেলেন?’
‘তোমার পিয়া আপু একটা কার্ড দিয়েছিল। তার সঙ্গে একটা সোনালি রঙের সেফটিপিন ছিল। ওটা দাঁতে নিয়ে চাবাচ্ছিলাম।’
‘ও হো!’ আমি বললাম, ‘মাছের কাঁটা গলায় বিঁধলে বিড়ালের পা ধরে মাফ চাইতে হয়। কিন্তু সেফটিপিন খাওয়ার চিকিত্সা তো জানি না।’
‘কী করা যায় বলো তো?’
আমি বললাম, ‘বাইরে মিটার রিডার স্যার বসে আছেন। ওনাকে কি বিদায় করে দেব?’
তিনি বললেন, ‘অবশ্যই। আমার জীবন-মরণ প্রশ্ন। আমি মারা গেলে তিনটা ফ্ল্যাট বেশি সেল করে আমি কী করব?’
আমি ক্লায়েন্টকে বিদায় করে দিলাম। ইন্টারনেটে সেফটিপিন খাওয়ার পরিণতি মৃত্যু কি না, সার্চ দিয়ে দেখলাম। ব্যাপক জ্ঞানচর্চা হলো।
বসের রুমে গেলাম কৌতূহলবশত। সেফটিপিনটা কি তাঁর পেটে ঢুকে নাড়িভুঁড়ি ফুটো করে দিতে পারবে? ওটা কি খোলা ছিল?
আশার ছলনে ভুলি উঁকি দিলাম।
তিনি সুস্থই আছেন। তবে তাঁকে চিন্তিত দেখা যাচ্ছে।
‘বস, সেফটিপিনটা কি পেটে খোলা ছিল?’
‘হুঁ। দাঁত খোঁচাচ্ছিলাম।’
গ্রেট নিউজ। সেফটিপিন খোলা ছিল। মুখটায় কাতর ভঙ্গি করার চেষ্টা করলাম, ‘খোঁচা দিচ্ছে?’
‘না।’
‘বস, ইন্টারনেটে সার্চ দিয়েছি। পিন খাওয়ার ব্যাপারে নানা কিছু জানতে পারলাম। জানার কোনো শেষ নাই, বস। আপনি পিন না খেলে জানতেই পারতাম না যে আমি জ্ঞানসমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়াচ্ছি।’
‘ইন্টারনেট ঘেঁটে কী জানলা তাই বলো।’
‘এক ফ্যাশন ডিজাইনার মহিলা সেফটিপিন খেয়ে ফেলেছিলেন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এক্স-রে করা হলো, দেখা গেল, তিনি পিন খাননি, তিনি পিন ইনহেল করেছেন, এটা তাঁর ফুসফুসে গিয়ে বসে আছে। প্রথম অপারেশন ফেইল করল। দ্বিতীয়বার পাঁজর কেটে তারপর ফুসফুস পর্যন্ত ছুরি চালাতে হয়েছে।’
বস বললেন, ‘না না, আমি ইনহেল করিনি, আমি গিলে ফেলেছি।’
‘সর্বনাশ।’
‘কেন?’
‘ওটা আপনার পেটের নাড়ি ফুটো করতে পারে।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। এই রকম দুটো ঘটনা দেখাচ্ছে ইন্টারনেটে। একটা বাচ্চার জ্বর আর জ্বর। ভালো হয় না। পরে দেখা গেল পেটে পিন ঢুকে ইনফেকশন হয়ে গেছে। আরেকটা কেসে এটা গলায় আটকে ছিল। মুখের ভেতরে মেশিন ঢুকিয়ে ওটাকে বের করা গেছে।’
তিনি ঘামতে লাগলেন।
আমি বললাম, ‘বস, চিন্তা করবেন না। চলেন, হাসপাতালে যাই।’
‘হাসপাতালে যাব?’
‘জি, চলেন।’
‘শোনো, পিয়াকে কিন্তু খবর দিয়ো না। পিয়া জানতে পারলে খুব ভয় পাবে। ও খুব ভিতু মেয়ে।’
পিয়া বসের গার্লফ্রেন্ড। আমি রুম থেকে বের হয়েই তাঁকে ফোন দিলাম, ‘পিয়া আপু, তাড়াতাড়ি আসেন। বস আপনার সেফটিপিন খেয়ে ফেলেছেন। আমার কথা বলবেন না। তিনি চান না আপনি জানুন। তবে, কেস খুব জটিল। পেটে গেঁথে গেছে। এই সমস্যায় এর আগে পৃথিবীতে তিন শ তেত্রিশ জন মারা গেছে বলে ইন্টারনেটে দেখলাম।’
পিয়া আপু এলেন। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি হাইট, একহারা গড়ন, ঘাড়ে কাজী নজরুল ইসলামের মতো বাবরি দোলানো চুল। নীল রঙের কামিজ। এত সুন্দর দেখতে এই আপুটা, কিন্তু তাঁর মেজাজ কেন এত তিরিক্ষি!
তিনি এসেই ক্ষিপ্ত স্বরে বললেন, ‘তোমার পেটে সেফটিপিন, তুমি আমাকে বলো নাই কেন?’
‘কে বলল?’
‘আমি তোমার পেটের খবর জানি।’
বস বললেন, ‘এইটা কোনো দেবার মতো খবর হলো?’
পিয়া আপু বললেন, ‘মাসুম, মোটরবাইক রেডি করো, আমরা ক্লিনিকে যাব।’
আমার বাইকের পেছনে পিয়া আপু, তার পেছনে বস। আমরা ক্লিনিকে গেলাম। পিয়া আপুর পারফিউমের গন্ধটা বড়ই মিষ্টি। মনে হয় ফরাসি সৌরভ।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ।
‘কী সমস্যা?’ ডাক্তার বললেন।
আমি বললাম, ‘উনি আমার বস। পিন খেয়ে ফেলেছেন।’
ডাক্তার খিক করে হেসে ফেললেন, ‘কী পিন?’
‘কী পিন মানে?’ আমি বললাম।
‘আলপিন, বোর্ডপিন, সেফটিপিন...’
‘সেফটিপিন!’ বস বললেন।
‘খোলা ছিল।’ আমি বললাম।
এক্স-রে করতে পাঠানো হলো।
এর মধ্যে পিয়ন আলাউদ্দিন ফোন করেছে আমার মোবাইল ফোনে, ‘স্যার, বস মনে হয় সেফটিপিনটা খায় নাই। ওনার টেবিলে একটা চাবানো সেফটিপিন পড়ে আছে।’
‘সোনালি রঙের?’
‘জি স্যার।’
আমি বললাম, ‘চুপ হারামজাদা। খাইছে কি খায় নাই, এক্স-রেতে ধরা পড়বে।’
এক্স-রেতে কিছু পাওয়া গেল না।
পিয়া আপু বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব এখন উপায়?’
ডাক্তার বললেন, ‘এমআরআই করতে হবে।’
আমি মিটমিট করে হাসছি। এমআরআই জিনিসটা বেশ মজার। এর আগে একজন বিতর্কিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমআরআই করে এসে টিভিতে সাক্ষাত্কার দিয়েছিলেন, ‘আমার শত্রুরও যেন এমআরআই করতে না হয়।’
আমার এক কাজিনের এমআরআই হয়েছিল, আমি দেখেছি।
বসের এমআরআই হচ্ছে। তাঁকে হেলমেটের মতো একটা জিনিস পরানো হলো। এরপর তাঁকে কফিনের মতো একটা জিনিসে ঢোকানো হলো। তারপর সেটা ঢুকে গেল একটা বিশাল লোহার তাঁবুর ভেতরে।
তাঁর হাতে একটা কলবেল। কোনো অসুবিধা হলে তিনি বেল টিপবেন।
মেশিন চালুর আগেই তিনি বেল টিপলেন। টিংটং।
‘কী হয়েছে?’ এমআরআইয়ের ডাক্তার ছুটে গেলেন ভেতরে।
‘ভয় লাগে।’
পিয়া আপু বললেন, ‘সেফটিপিন খাওয়ার সময় খেয়াল ছিল না?’
প্রবল শব্দ হলো। তাঁকে ওই লোহার গুহায় আটকে রাখা হলো পুরো আধা ঘণ্টা। তারপর তাঁকে বের করে আনা হলো। এমআরআই, এক্স-রে মিলে বিল এল ১২ হাজার টাকা মাত্র।
ডাক্তার রিপোর্ট দেখে বললেন, ‘না, কিছু নাই।’
‘এখন তাহলে আমরা কী করব?’ পিয়া আপু বললেন ডাক্তারকে।
ডাক্তার বললেন, ‘একটা কাজ করা যায়। পেটটা আমরা ওয়াশ করে দিই। বেশিক্ষণ তো হয়নি। নিশ্চয়ই স্টোমাকেই রয়ে গেছে। ওয়াশ করলেই বের হয়ে যাবে।’
‘আচ্ছা তাই করেন।’
বসের পাকস্থলী ওয়াশ করা হচ্ছে। ভয়াবহ দৃশ্য। আমি এটা দেখতে পারব না। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আহা, কী কষ্টই না পাচ্ছে লোকটা!
ওয়াশ করেও কাজ হলো না। সেফটিপিন বের হলো না পেট থেকে।
পিয়া আপু বললেন, ‘এখন? সেফটিপিন বের হলো না কেন?’
ডাক্তার বললেন, ‘মনে হয় এবডোমেনে চলে গেছে!’
‘এখন কি কিছুই করার নাই?’ পিয়া আপুর কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘আপনার কিছু করার নাই। পেশেন্টের আছে।’ ডাক্তার বললেন।
‘কী?’ পিয়া আপু চোখের হালকা সানগ্লাসটা খুলে জিজ্ঞেস করলেন।
‘আপনাকে বলব না। রোগীকে বলব।’ ডাক্তার হাসছেন।
‘আমাকেই বলেন।’ পিয়া আপু গম্ভীর।
‘উনি কি কমোড ব্যবহার করেন, নাকি ইন্ডিয়ান প্যান? ওনাকে বাচ্চাদের পটি ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহার করে ওনাকে খেয়াল রাখতে হবে এটা বের হলো কি না...’
পিয়া আপু খেপে গেলেন, ‘এই রকম একটা পচা কথা আমাকে বলতে পারলেন?’
ডাক্তার মিষ্টি হেসে বললেন, ‘আমি তো বলতে চাই নাই...’
তিন দিন পরে আমি পিয়া আপুকে ফোন করলাম। সেফটিপিন পাওয়া গেছে।
পিয়া আপু বললেন, ‘আমি এই প্রসঙ্গ শুনতে চাই না।’
আমি বললাম, ‘শোনেন। ভালো গল্প। পচা গল্প না। সেফটিপিনটা বসের টেবিলে একটা কাগজের সঙ্গে গাঁথা আছে। আজকে আলাউদ্দিন খুঁজে পেয়েছে।’
পিয়া আপু বললেন, ‘তোমার বসের সঙ্গে আজ থেকেই আমার সমস্ত রিলেশন শেষ।’
পিয়া আপুর ফেসবুকে দেখলাম, সম্পর্ক দেখাচ্ছে ‘সিঙ্গেল’।
পিয়ন আলাউদ্দিন বলল, ‘স্যার, আপনে বসরে ক্যান কইলেন না তিনি সেফটিপিন খান নাই।’
আমি বললাম, ‘আলাউদ্দিন, আমার টেবিলের ডিসপ্লে বোর্ডে দেখ কী টাঙিয়ে রেখেছি। পড়।
রুল নম্বর ওয়ান: দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট।
রুল নম্বর টু: ইফ দ্য বস ইজ রং, সি রুল নম্বর ওয়ান।
বস বলেছেন, তিনি সেফটিপিন খেয়েছেন, তুই-আমি কে রে ভুল ধরার? তিনি যখন বলেছেন যে তিনি পিন খেয়েছেন, তিনি অবশ্যই পিন খেয়েছেন। দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট।’

নৃশংস! বীভৎস! by সত্যজিৎ ঘোষ

মুক্তা বেগম কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন।
নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে মেয়ে হ্যাপি আক্তারকে।
মাদারীপুর সদর হাসপাতালের বারান্দায় গতকাল সন্ধ্যায়।
(ডানে) মেয়ে সুমাইয়া আক্তারকে হারিয়ে মাদারীপুর
সদর হাসপাতালের বারান্দায় শোকে মুহ্যমান
বাবা বিল্লাল শিকদার l ছবি: প্রথম আলো
আবারও বীভৎস ও নৃশংস ঘটনা ঘটল। এবারের ঘটনাস্থল মাদারীপুর। সেখানে দুই স্কুলছাত্রীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, তাদের ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
দেশে কিছুদিন ধরেই শিশু নির্যাতন ও হত্যার একের পর এক ঘটনা ঘটছে। বর্বর নির্যাতন চালিয়ে একাধিক শিশুহত্যার ঘটনার পর এবার এই দুই কিশোরীকে হত্যা করা হলো। সাম্প্রতিক সময়ে একসঙ্গে দুই কিশোরীকে এভাবে হত্যার ঘটনা দেখা যায়নি। বৃহস্পতিবার ঘটনার শিকার দুই ছাত্রী হলো সুমাইয়া আক্তার ও হ্যাপি আক্তার। তাদের বয়স মাত্র ১৪। দুজনই মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মোস্তফাপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
এ ঘটনায় শিপন শিকদার (১৮) ও রফিক শিকদার (২১) নামের দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। নিহত শিক্ষার্থীদের দুই পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সুমাইয়া ও হ্যাপি গতকাল বেলা তিনটার দিকে কোচিং করতে বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে স্কুলের উদ্দেশে বের হয়। পরে বিকেল চারটা থেকে সোয়া চারটার মধ্যে ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী চারজন যুবক তাদের অচেতন অবস্থায় মাদারীপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ও কর্মচারীরা বলেছেন, সুমাইয়া ও হ্যাপিকে নিয়ে এসে চার যুবক প্রথমে জানান যে তারা বিষ খেয়েছে।
প্রাথমিক চিকিৎসা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে হ্যাপি মারা গেলে ওই চার যুবক পালিয়ে যান। এরপর সেখানে শিপন শিকদার ও রফিক শিকদার নামে দুই যুবক উপস্থিত হলে হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীরা তাঁদের আটক করে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ওই দুজনকে আটক করে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সুমাইয়া মারা যায়। এরপর দুই পরিবারের সদস্য, স্বজন ও প্রতিবেশীরা খবর পেয়ে হাসপাতালে আসেন।
সুমাইয়ার বাবা বিল্লাল শিকদার মোস্তফাপুর বাসস্ট্যান্ডে চা বিক্রি করেন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সুমাইয়া বড়। সুমাইয়ার বাবা জানান, আটক দুই যুবক সুমাইয়াকে উত্ত্যক্ত করতেন। বিষয়টি তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মিন্টু শিকদারকে জানিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ধর্ষণের পর মুখে বিষ ঢেলে সুমাইয়াকে হত্যা করা হয়েছে।
একই অভিযোগ করে হ্যাপির মা মুক্তা বেগম বলেন, আটক হওয়া রফিক তাঁর মেয়েকে উত্ত্যক্ত করতেন। বিষয়টি তিনিও মিন্টু শিকদারকে জানিয়েছিলেন। তিন বোনের মধ্যে হ্যাপি বড়। তার বাবা হাবিব খান বাহরাইনপ্রবাসী।
সুমাইয়া ও হ্যাপির মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রাত আটটার পর হাসপাতালে উপস্থিত হন মিন্টু শিকদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দুই পরিবারের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি শিপনের বাবা কুদ্দুস শিকদার ও রফিকের বাবা কামাল শিকদারকে এ বিষয়ে সতর্ক করেন। আর দুই মেয়ের অভিভাবকদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, সুমাইয়ার শরীরে বেশ কিছু আঘাতের চিহ্ন থাকলেও হ্যাপির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। আজ শুক্রবার লাশ দুটোর ময়নাতদন্ত হবে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে ধর্ষণের বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
কিশোরী দুটির লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন মাদারীপুর সদর থানার একজন উপপরিদর্শক (এসআই)। পরে রাত সোয়া ১১টার দিকে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সুমাইয়ার গলা, হাত ও পায়ের আঙুলে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। হ্যাপির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উত্তম কুমার পাল একই সময়ে প্রথম আলোকে জানান, ‘মেয়ে দুটি কীভাবে মারা গেল জানার জন্য আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। যাঁরা মেয়ে দুটিকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, তাঁদের পরিচয় জানা গেছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।’
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল মোর্শেদ বলেন, আটক দুই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাঁরা এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করে দিয়েছেন।
সুমাইয়া ও হ্যাপিকে শান্তশিষ্ট স্বভাবের উল্লেখ করেন মোস্তফাপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বোরহান খান। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। এ জন্য স্কুলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
রাত সাড়ে আটটার পর মাদারীপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের পাশে একটি কক্ষের মেঝের ওপর দুই কিশোরীর লাশ পড়ে আছে। খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন তাদের স্কুলের শিক্ষক ও প্রতিবেশীরা। স্বজনদের আহাজারিতে তাঁদের অনেকেই কান্না সামলে রাখতে পারেননি।
পৌনে নয়টার দিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মোহাম্মদ জাকি সেখানে উপস্থিত হন। মধ্যরাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাই হাসপাতালে অবস্থান করছিলেন।
গত ১৩ দিনে ধর্ষণের পর খুন ৬
প্রথম ছয় মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার
৩৭৮
এ বছর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে কমপক্ষে
৪৪
৮ জুলাই, ২০১৫
সিলেটে নিহত
শেখ সামিউল আলম রাজন
২৩ জুলাই, ২০১৫
মাগুরায় মাতৃজঠরে গুলিবিদ্ধ সুরাইয়া
৩ আগস্ট, ২০১৫
খুলনায় নিহত
রাকিব
৪ আগস্ট, ২০১৫
বরগুনায় নিহত
রবিউল আউয়াল

রুপালি ইলিশে ব্যস্ত ফিশারিঘাট

সারি সারি রুপালি ইলিশ।
জেলেদের জালে ধরা পড়ছে রুপালি ইলিশ। যদিও এর সুফল ভোক্তার পাতে উঠছে না। খুচরা বাজারে এর মূল্য কেজি প্রতি ৮০০-১০০০ টাকা। চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে ট্রলার ভর্তি মাছ এসেছে। সাগর উত্তাল থাকায় কয়েক দিন মাছ শিকারে যেতে পারেননি মাঝিরা। তবে জেলেরা আশা করছেন সামনে পূর্ণিমাতে আরও ইলিশ ধরা পড়লে দামও কমবে। ছবিগুলো বুধবার (১২ আগস্ট, ২০১৫) সকালে চট্টগ্রাম নগরের ফিশারিঘাট এলাকা থেকে তুলেছেন সৌরভ দাশ
ট্রলার থেকে নামিয়ে ঝুড়িতে ইলিশ মাথায় নিয়ে সারিবদ্ধভাবে শ্রমিকেরা। মাছ তোলায় ব্যস্ত শ্রমিকেরা। এ সময় দম ফেলার ফুরসত নেই।
সারি সারি ইলিশ ট্রলার থেকে নামাচ্ছেন শ্রমিকেরা।
ট্রলার থেকে ইলিশ তোলা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে ইলিশের ট্রলার এসেছে। এতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিকেরা।

চীনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ

চীনের বন্দরনগরী তিয়ানজিনের একটি বাণিজ্যিক এলাকায় গত
বুধবার রাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে পুরো
এলাকা। পোড়া কঙ্কালের মতো অবস্থা হয় বন্দরের অনেক
ভবন ও বিস্ফোরণস্থলের কাছে রাখা শত শত নতুন গাড়ির। রয়টার্স
চীনের উত্তরাঞ্চলের বন্দরনগরী তিয়ানজিনের একটি বাণিজ্যিক এলাকায় গত বুধবার রাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দুই দফায় ওই বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে পুরো এলাকা। এতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। এঁদের মধ্যে ১২ জন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী। আহত হয়েছেন আরও সাত শতাধিক। খবর রয়টার্স ও বিবিসির।  গতকাল বৃহস্পতিবার তিয়ানজিন স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাণিজ্যিক এলাকার ওই গুদামে রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ ও গ্যাস মজুত করা হতো। বুধবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিকট শব্দে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। এর কয়েক মুহূর্ত পরেই আরও একটি বিস্ফোরণ হয়। এতে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে। তিয়ানজিনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভয়ংকর এই বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই ১২ জন অগ্নিনির্বাপণ কর্মীসহ ৫০ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন অন্তত ৭০০ জন। তাঁদের মধ্যে ৬০ জনের অবস্থা গুরুতর। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সহস্রাধিক অগ্নিনির্বাপণ কর্মী গতকালও আগুন নেভানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ভয়াবহ এই বিস্ফোরণের ফলে ঘটনাস্থল থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত ভবনের দরজা-জানালা উড়ে যায়। এমনকি কয়েক কিলোমিটার দূরের বহুতল ভবন থেকেও এর প্রভাব টের পাওয়া যায়। মহাকাশে পাঠানো কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা যায়।
ইন্টারনেটে পোস্ট দেওয়া ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাস্থল থেকে আগুনের গোলা আকাশের দিকে ছুটে ছুটে যাচ্ছে। বিস্ফোরণে পৃথিবীর দশম বৃহত্তম এই বন্দরে নোঙর করা বেশ কয়েকটি জাহাজের অনেক কনটেইনার দেশলাইয়ের কাঠির মতো দপ করে জ্বলে ওঠে। প্রায় ১০ হাজার নতুন গাড়ি পুড়ে যায়। বন্দরের অনেক ভবন পোড়া কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক সেন্টার জানিয়েছে, প্রথম বিস্ফোরণের মাত্রা ছিল তিন টন টিএনটি (ট্রাই নাইট্রো টলুইন) বিস্ফোরকের সমান। দ্বিতীয়টি ২১ টন টিএনটির সমান। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, বড় বিস্ফোরণ দুটির পর আশপাশে আরও কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটে। এগুলো পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ কি না, একজন আরেকজনের কাছে জিজ্ঞেস করেন। আতঙ্কিত অনেক বাসিন্দা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। এ সময় বিস্ফোরণের ফলে উড়ে আসা কাচে অনেকে রক্তাক্ত হন। দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের বাসিন্দা গুয়ান জিয়াং বলেন, ‘আমি তখন ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ বিস্ফোরণের বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। আমাদের ঘরের জানালা ও দরজা প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায়। প্রথমে ভেবেছিলাম, ভূমিকম্প হচ্ছে।’ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, কর্তৃপক্ষ আটকে পড়াদের উদ্ধার ও আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে। এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন দলের প্রধানকে অপসারণ

শোয়ে মান
মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) প্রধান শোয়ে মানকে অপসারণ করা হয়েছে। দলটির একজন কর্মকর্তা গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছেন। এতে করে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হলো। খবর এএফপির। মিয়ানমারে আগামী ৮ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সামরিক জান্তাদের শাসনে পিষ্ট দেশটিতে কয়েক দশকের মধ্যে এটাই সবচেয়ে অবাধ ও নিরেপক্ষ নির্বাচন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ওই নির্বাচন নিয়ে ইউএসডিপির ভেতরে প্রচণ্ড অন্তঃকোন্দল শুরু হয়েছে। কয়েক মাস ধরেই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন এবং ইউএসডিপির চেয়ারম্যান ও পার্লামেন্টের স্পিকার শোয়ে মানের মধ্যে বিরোধ নিয়ে জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। এই দুজনই সাবেক জেনারেল। দেশটিতে ২০১০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দৃশ্যত একটি বেসামরিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে সংস্কার কর্মসূচি শুরু হয়, তার গুরুদায়িত্ব পড়ে তাঁদের ওপরেই। প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তা জাউ তাই জানান, শোয়ে মানকে দলীয় পদ থেকে অপসারণে রাজি হয়েছেন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। তবে শোয়ে মানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এমন গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কেবলই একটা দলীয় নেতৃত্ববিষয়ক ব্যাপার।
এখানে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই।’ এর আগে শোয়ে মানের ছেলে তোয়ে নাইং মান অভিযোগ করেন, বুধবার গভীর রাতের নাটকীয়তার পর নেপিডোতে তাঁর বাবার বাড়িটি ঘিরে রেখেছে ‘তথাকথিত প্রহরীরা’। এমন সময়ে এসব ঘটনা ঘটল, যখন মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থিতা নিবন্ধন করার জন্য সময় হাতে ছিল মাত্র একদিন। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের অনুগত প্রার্থীদের সমর্থন করতে পার্লামেন্ট স্পিকার শোয়ে মানের অনীহা রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। দেশটির প্রভাবশালী সেনাবাহিনী থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া কিছু সেনাসদস্য প্রার্থী হতে চাইলেও তা গ্রহণ করেননি তিনি। ইউএসডিপির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মূল পরিকল্পনাটা হচ্ছে, শোয়ে মানকে অপসারণ করা এবং ‘একটি নতুন দলীয় কাঠামো’ গড়ে তোলা। তিনি বলেন, ‘আমরা এটা প্রত্যাশা করিনি। কিন্তু সেটা ঘটেই গেল। তবে এটা ভালো নয়। দলের জন্যও নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্যও নয়।’

তাকে কেউ আর মনে করে না by পীর হাবিবুর রহমান

হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী
আমরা কেউ তাকে আর মনে রাখি না। এমনকি যে রাজনৈতিক দলে থেকে জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন সেই দলও না। দক্ষিণ এশিয়ার জাঁদরেল কূটনীতিক, পররাষ্ট্র সচিব, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্পিকার মরহুম হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর কথা বলছি। আজ ১০ জুলাই তার মৃত্যুবার্ষিকী। সিলেট অন্তপ্রাণ এই মহান মানুষটির স্মরণে স্থানীয়ভাবেও কোন আয়োজন নেই। অথচ সিলেটের উন্নয়নে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ মানুষ। রাজটিকা কপালে নিয়ে জন্মেছিলেন সুনামগঞ্জের এক অভিজাত পরিবারে। মানুষের কল্যাণে তার হৃদয়খানি ছিল খোলা। সিলেটের অনেকেই তার আনুকুল্য নিয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে পরিবার পরিজনসহ নির্মমভাবে হত্যা করার পর বাংলাদেশে এক অন্ধকার বিভীষিকাময় পরিস্থিতি নেমে এসেছিল। বঙ্গবন্ধুর দুইকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন দেশের বাইরে থাকায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। যেখানে শিশুপুত্র রাসেলকে ঘাতকরা রেহাই দেয়নি, সেখানে মুজিব কন্যারা দেশে থাকলে খুনিচক্র রেহাই দিত না। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ছিলেন দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ছিল তার অকুণ্ঠ সর্মথন। সেই আগস্টের কালো রাতে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ছিলেন পশ্চিম জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। বঙ্গবন্ধুই তাকে সেখানে পাঠিয়ে ছিলেন। আর বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট বন্ধু সানাউল হককে বেলজিয়ামে রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়েছিলেন। সেই রক্তার্ক্ত আগস্টের দিনে গোটা পরিবার হারানো বেদনায় শোক বিহ্বল শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায়। সঙ্গে ছিলেন শেখ হাসিনার স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী মরহুম ড. ওয়াজেদ আলী মিয়া। কিন্তু সানাউল হক সেদিন চোখ পাল্টে ছিলেন। জাতির জনকের কন্যাদের তার বাড়িতে আশ্রয় দিতে চাননি। অসহায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের জীবিত দুইকন্যাকে যার জার্মান পাঠিয়ে দিতে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ফোন করেছিলেন সানাউল হককে। সেখান থেকে সানাউল হক তার গাড়িটি পর্যন্ত দেননি সীমান্তে আসার জন্য। কিন্ত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জার্মান সীমান্ত থেকে গাড়ি পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যাদের তার কাছে এনেছিলেন। সেখানে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গেও তাদের দেখা হয়েছিল। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও তার স্ত্রী গভীর সমাবেদনা ও মমতা নিয়েই তাদের পাঁশে দাঁড়াননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধির সঙ্গে যোগাযোগ করে দিল্লি পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। কারণ তার জার্মানের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বাসভবনে বঙ্গবন্ধুর দুইকন্যা আছেন শুনে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়া জাসদের কর্মীরা হামলা করেছিল। জার্মান পুলিশ ডেকে তিনি তাদের সরিয়ে দিয়েছিলেন। এদিকে অবৈধ খুনি মোশতাক সরকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় তলব করেছিলেন।
দীর্ঘ কূটনীতিক জীবনের চাকুরি শেষে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ও পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। সৌদি রাজ পরিবারের আপনজন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আরব দুনিয়াও রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি সিলেটের হযরত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়টি আদায় করেছিলেন সেনাশাসক এরশাদের কাছ থেকে। এরশাদের ভূমিমন্ত্রী হয়েছিলেন সাবেক আইজিপি মরহুম এমএ হক। কিন্তু এমএ হক সিলেট গেলে মানুষের চেয়ে পুলিশের উপস্থিতি থাকত বেশি। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এরশাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার পর সিলেট পৌরসভার জনপ্রিয় চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আফম কামালকে তার সঙ্গে টানেন ব্যক্তিগত সর্ম্পকের সুবাদে। সিলেটের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আন্তরিক ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সিলেটে তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। এরশাদ সিলেটে নামতে পারছেন না। কারাবন্দি ও কারামুক্ত নেতাদের সঙ্গে আফম কামালকে দিয়ে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এরশাদকে সিলেট নিয়ে প্রথম জনসভা করান। আর বিনিময়ে এরশাদ সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং নগরীর উন্নয়নে পৌরসভায় এককোটি টাকা অনুদানের ঘোষণা দেন। অথচ সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও একটি হল বা ভবন তার নামে আজও প্রতিষ্ঠা করেনি। '৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি সিলেট সদর ও সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিজয়ী হন। প্রতিনিধিত্ব করেন সিলেট সদর থেকে। '৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার অনুরোধে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদেন। ওই নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে সিলেট সদরে তিনি আরেক কৃত্বি সন্তান মরহুম অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে পরাজিত করেন। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে '৭৩ সালের পর এই আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে তার ঘাঁটি শক্তিশালী করে এবং একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তাকে সপ্তম সংসদে স্পিকার নির্বাচিত করা হয়। উচ্চশিক্ষিত দিল দরাজ উদার ভদ্র বিনয়ী এই মানুষটি সংসদ পরিচালনায় দক্ষতাই দেখাননি। তিনি সবকটি মোনাজাত নিজে পরিচালনা করতেন। আরবী, ফার্সি, বাংলা মিলিয়ে করা তার মোনাজাত সংসদকে তন্ময় করে দিত। তরুণ বয়সে বোম্বে চলচ্চিত্রের অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন এই সুদর্শন মানুষটি। পেশার তারে জড়ানো জীবনে সংসদ কাভার করতে গিয়ে তার স্নেহসান্নিধ্য লাভের সুযোগ হয়েছিল। বলা যায়  পুত্রস্নেহ লাভ করেছিলাম তার কাছে। তিনি আমাকে আইপিইউ-এর জর্ডান কনফারেন্সে পার্লামেন্টারি ডেলিগেশনের সঙ্গে সফরসঙ্গী করেছিলেন। সেইকটা দিন ছিল আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। অতন্ত সৌখিন, স্মার্ট, অভিজাত এই রুচিশীল মানুষটিকে দেখেছি কাছ থেকে। আমার ছেলে অন্ত ছোট বেলায় তার সংসদের কার্যালয়ে যেত। তিনি তার জন্য আলাদা বিস্কুট রাখতেন। আপনি করে তাকে সম্বোধন করায় বলেছিলাম, "স্যার এই বাচ্চা শিশুটিকেও যদি আপনি বলেন তাহলে কিভাবে হয়? উত্তরে তিনি বলেছিলেন আমরা যদি আপনি না বলি তিনি শিখবেন কি করে।"
আমার একান্ত সান্নিধ্যে থেকে দেখা এমন বনেদি মানুষ দু'চারজনের বেশি চোখে পড়েনি। জর্ডানের সেই কনফারেন্সে অনেকগুলো ডিনারে আমরা অংশ নিয়েছি। তিনি আমাদের বলতেন দুনিয়ার প্রায় সব দেশ থেকে পার্লামেন্টারিয়ানরা এসেছেন। আপনারা যান, আপনাদের এখন লবিং করার বয়স। আমার পড়ন্ত কাল আমি রুমেই রাতের ডিনার সেরে নেব। সাতপাহাড়ের নগরী আম্মানের রেডিসন সাস হোটেল থেকে যখনই নামতেন খাবার জন্য আমাকে তার পাশে চাই। রেস্টেুরেন্টে নিয়ে ম্যানু ধরিয়ে বলতেন আপনি আপনার মতো অর্ডার দেন। আমি আমার মতো অর্ডার দেব। খাব সবাই মিলে। কোরআন শরীফ দারুন তেলাওয়াত করতেন। তর্জমা জানতেন। কোরআনে উল্লেখিত অনেক ঘটনাস্থল তিনি আমাদের ঘুরিয়েছেন। ভ্রমণ পিপাসু মানুষটি হাত ধরে জর্ডানের সেই ডেড সী বা লুত নদী দেখিয়েছিলেন। মাউন্ড নেভোতে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছিলেন ওপারে ইসরাইল। হযরত মুসা (আঃ) ইসা(আঃ) জন্মের আগে হন্যে হয়ে খুজঁছিলেন কোথায় জেরুজালেম। মুসা যেখানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর গায়েবি আদেশ শুনলেন। ওই দ্যাখ জেরুজালেম। কিন্তু তুমি সেখানে যেতে পারবে না। সেই জায়গাটিতেই দাঁড়িয়েই হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আমাদের অনেক গল্প শুনাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে জুলিয়াস সিজারের দূর্গ খ্যাত জেরাস শহর ঘুরিয়ে এনেছিলেন। সেন্স অব হিউমার তার ছিল প্রবল। তার হোটেল কক্ষে একদিন সুলতান মুনসুর, পান্না কায়সার, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফসহ আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময় সাদা ব্র“ক্যাটের শেহরওয়ানি সেটের সঙ্গে সাদা জুতো পরে প্রবেশ করলেন নওগাঁর বিএনপি দলীয় এমপি শামছুল আলম প্রামানিক। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তাকিয়ে শুধু বললেন এখন দরকার একজন পাত্রী, একটি পাগড়ি আর একখানি রুমাল। আমরা সবাই হাসলাম। তার হৃদয়খানি দেহের চাইতেও বড় ছিল। সংসদ সদস্যরা দেশের বাইরে ডেলিগেশনে গেলে সংসদ সচিবালয়কে তিনি বলতেন কতবেশি টাকা তাদের দেয়া যায় দেখেন। সংসদ চলাকালীন বিএনপি দলীয় যেসব এমপি তার দিকে ফাইল ছুঁড়েছেন গালিগালাজ করেছেন তাদের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন উদার। তাই আড়াঁলে তার অফিসকক্ষে গিয়ে অনেককেই দেখতাম শ্রদ্ধায় তাকে কদমবুচি করতে। জর্ডানের সেই সফরে একরাতে পছন্দের রেস্তোরায় গেলাম ডিনার সারতে। তার সঙ্গে আমি ও তার একান্ত সচিব আজকের রাজ্বস বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বসলাম। উচ্চশিক্ষিত, সৎ বিনয়ী নজিবুর রহমান তার শক্ত ইংরেজি ভাষার ডিকটেশন নিতেন সহজভাবে। ফাইল ওর্য়াক করতেন। অন্যদিকে হাসিমুখে তার অতিথিদের আপ্যায়ন করাতেন। নজিবুর রহমানকে তিনি অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে পাঠিয়েছিলেন গবেষণায়। তাই নয় এই সৎ মানুষটি যাতে বাড়তি উর্পাজন করতে পারেন সেজন্য তিনি ওভার টাইম কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। রাত নয়টা দশটা পর্যন্ত তিনি অফিস করতেন। সেই রাতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এমপিরা বিভিন্ন টেবিলে খেতে বসেছেন। আমাদের খাবারের মধ্যে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বললেন, যখন ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম। তখন এক দুপুরে রেস্টেুরেন্টে ঢুকেছি খেতে। অনেক কিছু খেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু পকেট হাতড়ে হিসেব করেই অর্ডার দিলাম। খাওয়া শেষে এক মুরুব্বি এসে গল্প জুড়ালেন। পরিচয় নিলেন। বিল দেয়ার সময় দিতে আর দিলেন না। বললেন দেশের ছেলে পড়ালেখা করছেন। বিল কিসের। রেস্টুরেন্টের মালিকও একজন সিলেটি। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বলছিলেন তখন তার মনে হয়েছিল যদি জানতেন তাহলে ইচ্ছা মতো অর্ডার দিতেন। খাবার শেষে ওয়েটারকে ডেকে বললেন অন্যান্য সব টেবিলের বিল তিনি দেবেন। বিল দানের পর বাংলাদেশের সব এমপিরা এসে বলছিলেন স্যার। আগে বলবেন না আপনি খাওয়াবেন। তাহলে আমরা হিসাব না করে অনেক কিছুর অর্ডার দিতাম। এই মানুষটি আমাকে জাতিসংঘের মিলেনিয়াম সেশন কাভার করতে নিয়ে গিয়েছিলেন তার সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য করে। সেবার নেশন প্লাজা হোটেল থেকে তার স্ত্রীসহ লিফটে নামছি। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির বাসভবনে ডিনারে যাব। লিফটে এক যুগল উঠেছে। তরুণটির চাইতে তার গার্লফেন্ড্রের বয়স অনেক বেশি। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রী বললেন এত সুন্দর ছেলে এই বুড়ির সঙ্গ নিল কেন? ওপরের দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জবাব দিলেন গণতন্ত্রের দেশ।
পীর হাবিবুর রহমান
সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ ছিল এক অবহেলিত জনপদ। যোগাযোগ বলে কিছুই ছিল না। ছিল না স্বাস্থ্য, শিক্ষার ব্যবস্থা। এই থানাকে নিজে গড়ে গেছেন স্বপ্নের মতো। এই গুণী মানুষটিকে তার পরিবার বা দল কেউ স্মরণ করে না। তার জন্মদিন অথবা মৃত্যুবার্ষিকীতেও। তার কন্যা নাসরিন রশীদ করিমের ক্যানসারে আকস্মিক মৃত্যু ঘটায় কেউ আর কোন স্মরণ সভারও উদ্যোগ নেয় না। এখনও শাহজালালের মাজারে গেলে আমি তার কবরখানি জিয়ারত করে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করি এই সম্মানিত মানুষটির জন্য তুমি জান্নাতের দরজা খুলে দাও।

‘হাসিমুখে’ শোকাবহ শ্রদ্ধাঞ্জলি! by একরামুল হুদা

ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাঈল চৌধুরী সম্রাট। ছবি: প্রথম আলো
ঢাকা-৭ আসনের সাংসদ হাজি মো. সেলিম। ছবি: প্রথম আলো
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র
সাঈদ খোকন। ছবি: প্রথম আলো
‘কাঁদো বাঙ্গালী কাঁদো’—১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের ব্যানারের এক জায়গায় লেখা। এই লেখাটির পাশেই ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের হাসিমুখ ছবি। আরেকটি ব্যানারে বঙ্গবন্ধুসহ সেদিন নিহত বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবার ছবি। লেখা ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি’। এর পাশেই ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজের হাসিমুখ ছবি। শুধু একটি বা দুটো ব্যানারে নয়। ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য ব্যানার যেখানে শোক দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং বাণীর পাশে নেতা-কর্মীদের হাসিমুখ ছবি। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, নেতা-কর্মীরা কি শোক দিবসের মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে পারেন না, নাকি নিছক প্রচারের জন্য এই আয়োজন যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে শোক দিবসকেও।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে, পলাশী মোড় ও আজিমপুরে এমন অন্তত ১০০টি ব্যানার রয়েছে। আছে এমন পোস্টারও। এ সব ব্যানার ও পোস্টারে হাসিমুখে শোক দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি বায়জিদ আহম্মেদ খান, আওয়ামী প্রজন্ম লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সারোয়ার রহমান চৌধুরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ও ঢাকা-৭ আসনের সাংসদ হাজি মো. সেলিমসহ আরও অনেক নেতা-কর্মী। সব ব্যানারেই বঙ্গবন্ধু ও এসব নেতার ছবি ছাড়াও আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় অনেক নেতার ছবি আছে। আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিও। একটি ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীরও হাসিমুখের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।  এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাঈদ খোকন ও ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট তাঁদের অনুমতি ছাড়া কর্মীরা তাঁদের ছবি ব্যবহার করেছেন বলে জানান। সাঈদ খোকন বলেন, এ ধরনের ছবি ব্যবহার করাটা অরুচিকর একটা ব্যাপার। নিজের হাসিমুখের ছবি ব্যবহার করার বিষয়টি সম্পর্কে জানেন হাজি মো. সেলিম। তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি। কিন্তু আমি এগুলো করি নাই, আমার কর্মীরা করেছে। তবে আমরা কর্মীদের বলছি। আগামী বছর থেকে এ রকম ছবি আর দেখা যাবে না।’ তবে এ ব্যাপারে কথা বলতে বায়জিদ আহমেদ খান ও এম এ আজিজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মীজানূর রহমান শেলী বলেন, ‘একদিকে আপনি বলবেন কাঁদো বাঙালি, কাঁদো। অন্যদিকে এমন হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেবেন, সেটা কাম্য নয়। যাঁরা এটা তৈরি করেছেন হয় তাঁদের যথেষ্ট মনযোগ ছিল না, বা তাঁরা এর গুরুত্ব বুঝে উঠতে পারেননি।’ তিনি বলেন, হাসিমুখ থাকবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। কিন্তু সেটা শোক দিবসের ব্যানারে নয়। সেটারও আলাদা দিবস বা সময় আছে।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজ। ছবি: প্রথম আলো
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি বায়জিদ আহমেদ খান। ছবি: প্রথম আলো
২৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম রাডো। ছবি: প্রথম আলো
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি বায়জিদ আহমেদ খান। ছবি: প্রথম আলো