Wednesday, October 28, 2015

মেন্যুতে গরুর মাংস পুলিশের অভিযান

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কেরালা রাজ্য সরকারের অতিথিশালার মেন্যুতে গরুর মাংস রাখার অভিযোগ পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালানোয় ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কট্টর একটি হিন্দু সংগঠন পুলিশের কাছে এই অভিযোগ করে। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। তবে অতিথিশালার কর্মচারীরা পুলিশের কাছে জানায়, তাদের মেন্যুতে গরুর মাংস নয়, মহিষের মাংস ছিল। রাজ্য অতিথিশালায় এ ধরনের পুলিশি হানার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন স্বয়ং কেরালার মুখ্যমন্ত্রী। ক্রুদ্ধ ওমেন চান্দি বলেন, গরুর মাংসের খোঁজে সরাসরি রেস্তোরাঁয় তল্লাশির আগে দিল্লি পুলিশের উচিত ছিল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা।
গরুর মাংসের খোঁজে কেরালা হাউসে পুলিশি হানার তীব্র নিন্দা করেছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ভারতের অল্প যে কটি রাজ্যে এখনও গরু জবাই নিষিদ্ধ হয়নি, কেরালা সেগুলোর একটি। তবে দিল্লিতে সোমবার রাতের এই ঘটনার পর কেরালা রাজ্য অতিথিশালার মেন্যু থেকে গরুর সব আইটেম প্রত্যাহার করা হয়েছে। অতিথিশালার কর্মচারীরা পুলিশের নিরাপত্তা চেয়েছেন। চাপে পড়ে দিল্লির পুলিশ অবশ্য এখন দাবি করছে, তারা গরুর মাংসের খোঁজে কেরালার অতিথিশালায় যায়নি। বরঞ্চ অভিযোগের সূত্র ধরে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির যেন সৃষ্টি না হয় সেই চেষ্টাই তারা করছেন। পুলিশ জানিয়েছে, হিন্দু সেনা নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত যে ব্যক্তি টেলিফোনে অভিযোগ করেছিলেন, তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন গরুর মাংস পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার জন্য তীব্র আন্দোলন শুরু করেছে। তাদের এই আন্দোলন বিভিন্ন সময় মুসলমানদের প্রতি সহিংসতায় গড়াচ্ছে। সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে রাজ্যের একটি গ্রামে বাড়িতে গরুর মাংস রাখার গুজবে ৫০ বছরের এক মুসলিমকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। দিল্লিতে কেরালার অতিথিশালায় পুলিশি হানার ঘটনা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি ইন্টারনেটে সামাজিক গণমাধ্যমেও বিস্তর বিতর্ক শুরু হয়েছে।

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার টাকার দাবি

শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা সংশোধন এবং
ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের
সামনে বিক্ষোভ মিছিলের অাগে বাংলাদেশ ট্রেড
ইউনিয়ন কেন্দ্রের সমাবেশ। ছবি: প্রথম আলো
শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা সংশোধনের পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। আজ বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশে এ দাবি জানানো হয়।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম খান সমাবেশে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পে-কমিশন করা হয়েছে, এর জন্য আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়নি, এমনকি সেরকম কোনো আভাসও দেওয়া হয়নি। অথচ জীবন ধারণের জন্য শ্রমিক-কর্মচারীরাও একই বাজারে যায়। কাজেই শ্রমিকদের জন্য জাতীয় মজুরি কমিশন গঠন এবং ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার টাকা ঘোষণা করতে হবে।’
ওয়াজেদুল ইসলাম খানের মতে, বিদ্যমান শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালায় শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের স্বার্থ না দেখে মালিকদের স্বার্থ অগ্রাধিকার পেয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের এ নেতা আরও বলেন, ‘সাবেক শ্রমমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও কয়েকজন মন্ত্রীসহ আমরা শ্রম বিধিমালার কিছু সংশোধনী নিয়ে একমত হয়েছিলাম। চূড়ান্ত খসড়া নিয়ে আরও বৈঠক হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু পরে আর হয়নি। একদিন রাতের অন্ধকারে এ বিধিমালা দেওয়া হয়েছে। যার অনেকটাই শ্রমিক স্বার্থবিরোধী।’
তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘আমাদের দাবি যদি না মানা হয়, তাহলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে তা আদায় করা হবে।’
এর আগে সমাবেশে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ সংগঠনটির ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে বলা হয়, শ্রম বিধিমালায় ৩০ শতাংশ শ্রমিকের সদস্য হওয়ার বিধান ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে জটিল ও কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া ঠিকাদারি সংস্থার মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করার মাধ্যমে শ্রমিকদের তৃতীয় পক্ষের ইচ্ছা মাফিক মজুরি দাসে পরিণত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয় এতে​। ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনুসরণ করে শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা সংশোধনের দাবি জানানো হয়।
পরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। এতে অন্যান্যের মধ্যে সংগঠনের সভাপতি সহিদুল্লাহ চৌধুরী, সহসভাপতি এ কে এম মাহবুব আলম ও ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক অংশ নেন।
মিছিলটি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শুরু হয়ে কদম ফোয়ারা-তোপখানা রোড-পুরান পল্টন প্রদক্ষিণ করে আবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এসে শেষ হয়।

ইরাক-সিরিয়ায় সম্মুখযুদ্ধ করবে মার্কিন বাহিনী

ইরাক-সিরিয়ায় সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সিনিয়র জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা এ সংক্রান্ত একটি সুপারিশ করেছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-ইতিহাস আরও দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরাক-সিরিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যুদ্ধে হোয়াইট হাউসের হতাশা থেকে নতুন এই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ আরও প্রসারিত করতে পেন্টাগন চিন্তা-ভাবনা করছিল। সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তাবটি এখন প্রেসিডেন্ট ওবামার অনুমোদনের অপেক্ষায়। চলতি সপ্তাহেই ওবামা এই প্রস্তাবটি অনুমোদন করবেন বলে একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
নতুন এই পরিকল্পনার অধীনে প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনাসদস্য বিশেষ অভিযান পরিচালনায় সরাসরি গোলাগুলির অপারেশনে নামবে শত্রুপক্ষের কাছাকাছি গিয়ে যুদ্ধ করবে তারা।
সিরিয়ায় মার্কিন জোটের হামলা বন্ধ : সিরিয়ার বিমান হামলা চালাতে আগ্রহ পাচ্ছে না মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। ২২ অক্টোবরের পর থেকে সোমবার পর্যন্ত কোনো হামলা চালায়নি তারা। অন্যদিকে রাশিয়া তাদের বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। কয়েকদিন পরেই তাদের বিমান হামলার মাসপূর্তি হবে। পরিস্থিতি এখন রাশিয়ার দখলে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের বিমান হামলা রাশিয়ার কারণে বন্ধ হয়নি। পেন্টাগন মুখপাত্র ক্যাপ্টেন জেফ ডেভিস বলেন, আমরা হামলা করার মতো টার্গেট নির্ধারণে গোয়েন্দা তথ্যের অপেক্ষা করছি, যাতে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়।
সিরিয়ার তিন শহর থেকে পালিয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ : চলতি মাসে সিরিয়ার তিন শহর থেকে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সমন্বয়ক সংস্থা বলেছে, আলেপ্পো, হামা ও ইদলিব থেকে ১ লাখ ২০ হাজার সিরীয় পালিয়ে গেছে। গত সপ্তাহেই ঘরবাড়ি ছেড়েছে ৫০ হাজার মানুষ।

বাঘাইছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির বারান্দায় নষ্ট হচ্ছে ভিজিএফের জব্দ চাল

আমতলী পুলিশ ফাঁড়ি বারান্দায় পড়ে আছে জব্দ করা
ভিজিএফের চাল। ২০ অক্টোবর -প্রথম আলো
বাঘাইছড়িতে দুস্থ গোষ্ঠীর সহায়তা কর্মসূচির (ভিজিএফ) পাঁচ মেট্রিক টন চাল (১০০ বস্তা) জব্দ করা হয় চলতি বছরের ১ জুলাই। উপজেলার আমতলী ইউনিয়নে বিতরণের জন্য এসব চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আত্মসাতের উদ্দেশ্যে বরাদ্দ করা চাল ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয়ে না নিয়ে অন্য স্থানে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ আনা হয়। জব্দ হওয়ার পর থেকে বস্তাভর্তি চালগুলো ফেলে রাখা হয়েছে আমতলী পুলিশ ফাঁড়ির বারান্দায়। ফলে এসব চাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আমতলী পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুল সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ফাঁড়িতে ১০০ বস্তা চাল রাখার জায়গা নেই। তাই বারান্দায় রাখা হয়েছে। আগে ছেঁড়া বস্তা দিয়ে পড়া চাল পাখি ও মুরগি খেত। এখন চাল নষ্ট হওয়ায় পাখিও খাচ্ছে না। বর্ষার সময় পানি পড়ে কিছু চালের বস্তা ভিজে যায়। এরপর আমরা কিছু চাল পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরীক্ষা করে দেখেছি পানিও নীল হয়ে গেছে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুলিশ ফাঁড়ির বারান্দায় রাখা হয়েছে চালের বস্তা। এর মধ্যে ১০ থেকে ১৫টি বস্তা ফুটো হয়ে চাল বের হয়ে পড়ে যাচ্ছে। কিছু চালে পোকাও দেখা গেছে।
থানা ও ইউপি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আমতলী ইউনিয়নে গত ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ৫০০ হতদরিদ্র পরিবারকে পাঁচ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই চালগুলো বিতরণের জন্য গত ৩০ জুন দুরছড়ি খাদ্যগুদাম থেকে তোলা হয়। এরপর এসব চাল ইউপি কার্যালয়ে না রেখে মাইল্যা বাজারের দুটি দোকান ও আমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় রাখা হয়। পরদিন ওই তিন স্থান থেকে চালগুলো জব্দ করে পুলিশ। এ ব্যাপারে উপপরিদর্শক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বাদী হয়ে বাঘাইছড়ি থানায় মামলা করেন। এতে আমতলী ইউপি চেয়ারম্যান সাহেব আলীসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়। পরে মামলা তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাঙামাটি কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়।
ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাহেব আলী বলেন, ইউপি সদস্যদের পরামর্শে গ্রহীতাদের সুবিধার জন্য চালগুলো তিন স্থানে রাখা হয়। ওই স্থানগুলো থেকেই চাল বিতরণ করা হতো। কিন্তু পুলিশ এসে চাল জব্দ করে নিয়ে মামলা করেছে। এখন তদন্ত চলছে। তদন্তে প্রমাণ হবে এসব চাল আত্মসাৎ, নাকি বিতরণের সুবিধার জন্য রাখা হয়েছিল।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আব্দুল আলীম বলেন, ‘আমার কাছে তথ্য আছে চাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বলেছি। কিছু রাখা হয়েছে বিতরণ করার জন্য।’ তিনি আরও জানান, পাহাড়ি এলাকায় বিতরণের সুবিধার জন্য চাল ইউপি কার্যালয়ে না রেখে অন্য স্থানে রাখা যায়।
থানার ওসি মো. জাকির হোসেন ফকির বলেন, ‘জব্দ চাল আমরা বিতরণ করতে পারি না। যেহেতু থানায় একটি মামলা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা অনুমতি দিলে কিছু রেখে বিতরণ করা যায়। এই চালগুলো নিয়ে পুলিশ ফাঁড়িতেও ঝামেলায় থাকতে হয়।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুফিদুল আলম বলেন, জব্দ করা চালের বিষয়টি মাসিক সমন্বয় সভায় উত্থাপন করা হয়েছে। সেখানে নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আইনে আছে তদন্ত কর্মকর্তা কিছু আলামত রেখে বাকিগুলো বিলি করে দিতে পারেন।
এদিকে দুদক মামলার তদন্ত এখনো শুরু হয়নি। এ ব্যাপারে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে দুদকের রাঙামাটি কার্যালয়ের পরিচালক মো. শফিকুল আহম্মেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘ভিজিএফ চাল নিয়ে আমাদের কাছে একটি অভিযোগ রয়েছে। অতি দ্রুত এর তদন্ত শুরু হবে।’

গো-মাংস খাওয়া বেআইনি নয় by কুলদীপ নায়ার

মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) বুঝতে পেরেছে, তারা যদি গরুর মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান বজায় রাখে, তাহলে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার অজানা বিপদের মুখে পড়তে পারে। এর ফলে মুসলমানরা আরও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। আরএসএস সেটা বুঝতে পেরে মুখ বন্ধ করেছে। বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা এল কে আদভানি বলেছিলেন, বিজেপি হিন্দুদের সমর্থন নিয়ে লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে, কিন্তু মুসলমানদের সহযোগিতা ছাড়া দেশ পরিচালনা করা কঠিন। তারপরও ব্যাপারটা শুধু কাগজে-কলমে রয়ে গেছে।
সংঘ পরিবার মুসলমানদের সমর্থন লাভের ব্যাপারটা যদি সত্যিই তীব্রভাবে অনুভব করত, তাহলে তারা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিত। তারা মনে করে, প্রকৃত অর্থে দেশ পরিচালনায় মুসলমানদের ভূমিকা নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার দিকেই লক্ষ করুন, সেখানে শুধু একজন মুসলমান মন্ত্রী রয়েছেন, তা-ও আবার অগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে।
সম্প্রতি ভারতে এক অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, গরুর মাংস কি নিষিদ্ধ করা উচিত, নাকি উচিত নয়। যে দেশের হিন্দুদের সঙ্গে গরুর আবেগের সম্পর্ক রয়েছে, সেখানে এই প্রশ্ন তোলাটাই ভুল। হিন্দুরা গরু পূজা করে। আসল প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষকে গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে মেরে ফেলা হবে কি না। আবার এই অভিযোগটাও তোলা হয়েছে মিথ্যা গুজবের ভিত্তিতে। ব্যাপারটা যেন এমন, হিন্দু চরমপন্থীরা সেই মানুষদের ধর্মবোধ কেমন হবে, তা নির্দেশ করা শুরু করেছে।
গরুর মাংস খাওয়া–বিষয়ক বিতর্কটা বেশি দিন চলেনি, এটা একরকম আশীর্বাদই বটে। এই আলোচনা সমাজকে বিভক্ত করেছে। হয়তো এই উপলব্ধি থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য হিন্দু-মুসলমানকে একত্র হতে হবে, তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করা চলবে না। তিনি এক সপ্তাহের মতো নিশ্চুপ ছিলেন, আর জনগণের চাপ না থাকলে হয়তো তিনি এই দ্ব্যর্থবোধক অবস্থান নিতেনও না। আর শেষমেশ তিনি যা বললেন তা এত ঈষদুষ্ণ যে মনে হয়েছে, তিনি স্রেফ অনুশীলন করছেন।
দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে, সেটা আরও খারাপ ব্যাপার। তাদের মধ্যে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। মনে হয়, তারা উভয়ই নিজেদের জগতে বাস করে। এর মুখ্য কারণ হচ্ছে এই ক্রমেই গভীর হওয়া বিভাজন, সংঘ পরিবার উদ্দেশ্যমূলকভাবে যে বিভাজনের গোড়ায় পানি দিয়ে যাচ্ছে।
কয়েকজন বিশিষ্ট সাহিত্যিকের আকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় এই ব্যাপারটি সামনে এসেছে, পুরস্কার ফেরত প্রদানকারীদের মধ্যে আছেন জওহরলাল নেহরুর ভাগনি নয়নতারা সেগাল। কর্তৃপক্ষকে দেওয়া চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, ভারতে বাক্স্বাধীনতার ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। হ্যাঁ, তাঁরা ভারতীয় মূল্যবোধের কথাই বলেছেন। যে প্রজন্ম বাক্স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের আবহে বেড়ে উঠেছে, তাদের কাছে বিজেপির এই গেরুয়াকরণ গ্রহণযোগ্য হবে না।
দিল্লির কাছে দাদরিতে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, সেখান থেকে সাবেক আরএসএস প্রচারক মোদির শিক্ষা নেওয়া উচিত। একজন মুসলমান গরুর মাংস খেয়েছেন—এই গুজবের ভিত্তিতে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি যদি তা খেয়েও থাকেন, তাতেই বা কী, ভারতে তো এমন কোনো আইন নেই যে গরুর মাংস খাওয়া যাবে না। এটা ঠিক যে দু-তিনটি রাজ্য বাদে সব রাজ্যেই গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু গো-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করে আইন করা হয়নি।
মোদি যদি এখনো বুঝে না থাকেন, তাহলে তাঁর বোঝা উচিত, বহুত্ববাদ ভারতীয় সমাজের প্রাণ। সংঘ পরিবারের অনেক চরমপন্থী সেটা পছন্দ না-ও করতে পারে, কিন্তু বিপুলসংখ্যক ভারতীয়ের কাছে ভারত হলো গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমতার নামান্তর। সন্দেহ নেই, ভারতের অনেক ছোট ছোট জায়গায় সংখ্যাগরিষ্ঠরা লাগামহীন হয়ে পড়েছে, তারা বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে। কিন্তু এটা ভারতের জন্য সার্বিকভাবে প্রযোজ্য নয়। ভারত সংখ্যালঘিষ্ঠদের মুক্তবাকে বিশ্বাস করে, তাদের এই অধিকার সে রক্ষাও করবে।
ওদিকে যাঁরা টিভির পর্দায় গরুর মাংস খাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন, তাঁরা কিন্তু বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধকে পুষ্ট করছেন না। ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাসের কথা বুক চাপড়ে বলতে গিয়ে তাঁরা প্রকারান্তরে এর ক্ষতিই করছেন।
গুরুর মাংস খেয়েছেন—এই গুজবের ভিত্তিতে মোহাম্মদ ইকলাখকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে খুন করা হয়েছে, এ ঘটনাটির প্রতি জাতির দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকা উচিত। সেটা সত্যি হলেও এ প্রশ্ন উঠবে: কোনো মানুষ গো-মাংস খেলেই কি তাঁকে খুন করতে হবে? ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংবিধানের দিকনির্দেশনামূলক নীতিতে বলা হয়েছে, ‘রাজ্যগুলোকে কৃষি ও প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, আর বিশেষ করে, প্রজাতির সংরক্ষণ ও উন্নয়নে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে, গরু, বাছুর, অন্যান্য দুগ্ধদাত্রী প্রাণী ও মালবাহী পশু হত্যা নিষিদ্ধ করতে হবে।’
গো-মাংসের বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা হয়েছে। আদালত রায়ে বলেছেন, কেউ গো-মাংস খাবেন কি খাবেন না, সেটা তাঁর একান্ত নিজস্ব ব্যাপার, আর তিনি তা খেলে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হবেন না।
আসল কথা হলো, হিন্দু চরমপন্থীরা নির্বাচনকে সামনে রেখে গো-মাংসের ভিত্তিতে সমাজে মেরুকরণ ঘটিয়েছে। একইভাবে মহারাষ্ট্রভিত্তিক হিন্দু চরমপন্থী সংগঠন শিবসেনার কারণে রাজ্যটির বদনাম হয়েছে। শিবসেনা শুধু ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোরই মানহানি করেনি, সে ভারতের মুখে কালি লেপ্টে দিয়েছে। শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরে বুঝতে পেরেছেন, সহিংসতা করে লাভ নেই। তিনি এর নিন্দাও করেছেন। ফলে শিবসেনা কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, আর মুখ্যমন্ত্রীর পদের জন্য নিজেদের মানুষকে মনোনীত করেছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও শিবসেনার তরুণ তুর্কিরা গণতান্ত্রিক রীতিনীতি পছন্দ করেন না। শিবসেনা বিজেপি ঘরানার মানুষ ও সম্মানিত সাংবাদিক সুরিন্দর কুলকার্নির মুখে কালি মেখে দিয়েছে, তারা এখন এভাবেই কাজ করে। এই ঘটনার পর যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সংঘ পরিবারের বোঝা উচিত, ভারতের আত্মায় ধর্মনিরপেক্ষতার অধিষ্ঠান।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

বায়ার্স ফোরামের বৈঠক অনিশ্চিত by এম এম মাসুদ

বিদেশী দুই নাগরিক হত্যার ঘটনা প্রায় এক মাস হতে চলেছে। এর মধ্যে আবারও তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলায় একজন নিহত হয়েছে। ফলে বিদেশীদের বাংলাদেশে চলাফেরার ক্ষেত্রে নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের আরও কঠোরভাবে সতর্ক করেছে বেশ কয়েকটি দেশ। এ অবস্থায় নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আগামী মাসের ক্রেতা প্রতিনিধিদের সংগঠন বায়ার্স ফোরামের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক না হওয়ায় ক্রেতারা বাংলাদেশে না এসে তারা তাদের নিজ নিজ দেশে বৈঠক করতে ডাকছেন উদ্যোক্তাদের। এতে অনেকটা চাপের মধ্যে পড়েছেন দেশের কারখানা মালিকরা। বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে দেশে অবস্থানরত পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তাকে আগের মতোই সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে তাদের প্রধান কার্যালয় থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
জানা গেছে, বায়ার্স ফোরামের নিয়মিত বৈঠক হয় প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রথম সোমবার। সে অনুযায়ী ২রা নভেম্বর বৈঠক করার কথা সংগঠনটির। কিন্তু একের পর এক হত্যাকাণ্ডে তাদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে তারা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী সোমবার বৈঠক আয়োজন করা নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, বিদেশী দুই নাগরিক খুনের ঘটনায় এ মাসের বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ফলে আগামী মাসের সোমবারের বৈঠকটি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে দুই বিদেশী নাগরিক খুন হওয়ায় ৫ই অক্টোবরের নিয়মিত বৈঠকটি স্থগিত করে বায়ার্স ফোরাম। গুলশানে এইচঅ্যান্ডএমের কার্যালয়ে মাসিক বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আবারও এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে তাজিয়া মিছিলে আরেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরও আশঙ্কা বোধ করছেন সংগঠনটি। ফলে তারা বাংলাদেশ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। এতে আগামী মওসুমের পোশাক তৈরির কার্যাদেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে হতাশা প্রকাশ করেন শিল্পমালিকরা।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, পোশাকশিল্প বিশাল চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। একটার পর একটা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বিদেশী দুই নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই তাজিয়া মিছিলে বোমা হমালার ঘটনা পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তিনি জানান, যেসব বায়ার্স বাংলাদেশে আসতে চাইছে না ব্যবসার স্বার্থে তাদের দেয়া পছন্দ মতো জায়গায় গিয়ে বৈঠক করতে হচ্ছে। তবে ক্রেতারা ভীতির মধ্যে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বায়ার্স ফোরামের বৈঠক হবে কি না তা তার জানা নেই। তবে অনেকেই এই সময়ে বাংলাদেশে আসতে রাজি হচ্ছে না। এটি বাংলাদেশের জন্য মোটেই ভালো সংবাদ নয়। শিল্পের স্বার্থে দ্রুত এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, বিদেশী নাগরিক হত্যায় ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক এখনও কাটেনি। তিনি বলেন, আমাদের অবস্থা এখন হলো- এক পা এগুলে দুই পা পিছিয়ে যেতে হচ্ছে। গত মাসের বায়ার্স ফোরামের বৈঠক স্থগিত হয়েছে। আগামী মাসের বৈঠক হবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে আবারও পোশাক শিল্প সংকটের দিকে যাবে; যা পোশাক শিল্পের নতুন চ্যালেঞ্জ হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, বায়ারদের অর্ডার দেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। কিন্তু এ সময়ই তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটা আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য ভাল লক্ষণ নয়। আর এমন পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধিও কমবে। তিনি বলেন, এতে শুধু উদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সার্বিক রপ্তানি খাতকেই এর মূল্য দিতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে বছরে ১-২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক ক্রয় করে, এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এইচঅ্যান্ডএম, ওয়ালমার্ট, ইন্ডিটেক্স, লিডল ও লিঅ্যান্ডফাং। ১ বিলিয়ন ডলারের কম পণ্য কেনে টার্গেট, বেস্ট সেলার, ভিএফ করপোরেশন, সিয়ার্স, ক্যারিফোর, জেসি পেনি, গ্যাপ, লিভাইসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। এমন পরিস্থিতিতে বড় সব ক্রেতাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ সফর স্থগিতের তালিকায় আছেন দেশের শীর্ষ সারির অনেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ক্রেতারা। অন্যতম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এভিন্স গ্রুপ। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের দুটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এই গ্রুপের বড় ক্রেতা। এরা বড় ধরনের অর্ডার নিয়ে এভিন্স গ্রুপ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছিল।

কৈশোরেই শারীরিক সম্পর্কে রীতা ওরা

মাত্র ১৪ বছর বয়সে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বৃটিশ গায়িকা রীতা ওরা। তখন তিনি এটি শারীরিক নির্যাতন হিসেবে দাবি করলেও এখন বলছেন ভিন্ন কথা। নির্যাতন নয়, রীতার নিজেরও সায় ছিল তাতে। আর সেটা এত দিন পরে এসে স্বীকার করেছেন গায়িকা নিজেই। তিনি জানিয়েছেন, সে সময় লন্ডনের সিলভিয়া ইয়ং থিয়েটার স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। ২৬ বছরের একটি ছেলের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। কিন্তু সেই সম্পর্কে তারও মত ছিল। রীতার ভাষ্যে, আমার তখন ১৪ বছর বয়স। ওর বয়স ছিল ২৬। সেটা আমার প্রথম শারীরিক সম্পর্ক। তাতে আমার সম্পূর্ণ সায় ছিল। আমিও আনন্দ পেয়েছিলাম। তাই কখনও এটা আমি বলব না যে নাবালিকা বয়সে আমি ধর্ষিতা হয়েছি। রীতার দাবি, সেই প্রথম তার মনে হয়েছিল পুরুষের চোখে তিনি ‘সেক্সি’। ওই বয়সে একজন পুরুষ আমার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে এটাই আমাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। বৃটিশ এক গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে নিজের যৌন জীবনের কথা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন রীতা।

আইএস জড়িত-ফের সাইটের দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যাখান by কাউসার মুমিন

বাংলাদেশে সম্প্রতি তিনটি নৃশংস হামলায় আইএস জড়িত থাকার প্রমাণ আছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা সাইট (এসআইটিই) ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ। সংস্থাটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে আইএসের কোন অস্তিত্ব নেই।
ইতালিয়ান নাগরিক সিজার তাভেলা ও জাপানি নাগরিক হোশে কুনিও হত্যা এবং হোসনি দালানে বোমা হামলার পর আইএস এর দায় স্বীকার করে বলে এসআইটিইর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছিল। যদিও বাংলাদেশ সরকার বরাবরই তা প্রত্যাখান করে আসছে। এর পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সর্বশেষ এসআইটিই’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইসিসের হামলা নিয়ে স্বীকারোক্তির বিষয়ে বাস্তবতা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সাইটের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত এক মাসে আইএস বা আইসিস বাংলাদেশে তিনটি হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর মধ্যে ২৮শে সেপ্টেম্বর ঢাকায় হত্যা করা হয় ইতালির নাগরিক সিজার তাভেলাকে। ৩রা অক্টোবর হত্যা করা হয় জাপানি নাগরিক কুনিও হোসিকে। ২৪শে অক্টোবর ঢাকায় শিয়াদের একটি সমাবেশে বোমা হামলা করা হয়। এসব হামলায় আইসিস জড়িত থাকার অভিযোগ আক্রমণাত্মকভাবে (এগ্রিসিভলি) প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার। আইসিসের হামলার দাবিকে অবজ্ঞা করার জন্য যে চেষ্টা করা হয়েছে তা ব্যর্থ হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সাইট-এর সুনাম হানীর জন্য সরকার ভিত্তিহীন প্রচারণা চালাচ্ছে। আইএসের দাবির বিষয়টি প্রথম রিপোর্ট করে সাইট ও এর পরিচালক রিটা কাটজ। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে তিনটি হামলার দায় স্বীকার করে আইসিসÑ এ বিষয়ে রিপোর্টের পক্ষে শক্ত অবস্থান সাইট-এর। আইসিসের ওই দাবি সঠিক। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এ দাবি যাচাই করে এর বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে সাইট। উপরন্তু ওই দাবি আইএস মিডিয়ার বিভিন্ন চ্যানেলে পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে টেলিগ্রাম ম্যাসেঞ্জার ও গ্রুপটির আল বায়ান রিপোর্টে। আইসিসপন্থি বাংলা ব্লগেও বাংলা ভাষায় এ দাবি পড়তে পারেন বাংলাদেশের নাগরিকরা ও সরকারের কর্মকর্তারা। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার আইসিসের হামলার দায় স্বীকারকে প্রত্যাখ্যান করছে এবং অব্যাহতভাবে সাইট-এর সুনাম ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ গ্রুপের কাছে নিখুঁত রেকর্ড আছে। তাই তারা আইসিসের হামলার দায় স্বীকারের বাস্তবতার রেকর্ড পরিবর্তন করবে না। এতে বলা হয়, বাংলাদশে সরকারের এমন প্রচেষ্টায় সাইট-এর সুনাম ক্ষন্ন করতে পারবে না। এটি জিহাদী কর্মকা- নজরদারি ও বিশ্লেষণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র। এই সাইট বাস্তবতা অনুধাবনের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে আরও সহযোগিতা করে যাবে এবং তার আসল শত্রু আইসিসের আগ্রাসী কর্মকা- সম্পর্কে তথ্য দেবে।

দ. চীন সাগরে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ইঁদুর-বিড়াল খেলা

দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমায় চীনের তৈরি করা একটি কৃত্রিম দ্বীপের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার এই যুদ্ধজাহাজটি কৃত্রিম দ্বীপটির ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্য দিয়ে টহল দিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের ওই এলাকাটির উপর চীনের একচ্ছত্র মালিকানার দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য সেখানে মার্কিন জাহাজ পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের মতে, আন্তর্জাতিক নৌ-সীমায় যে কোনো জায়গায় জাহাজ চলাচলের অধিকার (ফ্রিডম অব নেভিগেশন) যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের এই এলাকাটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্র-বাণিজ্যপথগুলোর মধ্যে অন্যতম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্যার্টলি দ্বীপমালার সুবি ও মিসচিফ শৈলশ্রেণীর কাছ দিয়ে ইউএসএস লাসেন জাহাজটি টহল দিয়েছে। সুবি ও মিসচিফ শৈলশ্রেণী পূর্ণ জোয়ারের সময় ডুবে যেত। কিন্তু ২০১৪ সালে চীন বালু ফেলে এই শৈলশ্রেণী দুটিকে দ্বীপে পরিণত করেছে।
জাহাজটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর পি-৮এ নজরদারি বিমান ও পি-৩ নজরদারি বিমানও থাকতে পারে বলে এর আগে জানিয়েছেন দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।
কৃত্রিম এই দ্বীপ দুটির চারদিকের ১২ নটিক্যাল মাইল এলাকাকে চীন তার জলসীমা বলে দাবি করছে। ওই সীমার ভেতরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের টহল চীনা দাবির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিকে, দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নজরে রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বেইজিং। মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু কাং বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে নজরে রাখছে। তিনি বলেন, চীন সরকারের অনুমতি ছাড়াই ইউএসএস লাসেন অবৈধভাবে চীনা নৌ-সীমায় ঢুকেছে। এটা চীনের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। যে কোনো দেশের উদ্দেশ্যমূলক উসকানির কঠোর জবাব দেবে বেইজিং। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তার প্রতি হুমকিমূলক কোনো তৎপরতা চীন মেনে নেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের প্রতিবাদে দক্ষিণ চীন সাগরের নির্মাণ কর্মসূচি দ্রুততর করতে বাধ্য হবে বেইজিং। ওয়াশিংটনের চীনা দূতবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, পেশি প্রদর্শনীর অজুহাত হিসেবে ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ ব্যবহার করা উচিত নয়।
ফ্রিডম অব নেভিগেশন কী : দক্ষিণ চীন সাগরের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ পরিভাষাটি সবসময় উচ্চারিত হয়। এর মাধ্যমে দেশটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা ও আকাশসীমায় জাহাজ ও বিমান চলাচলের স্বাধীনতাকে বোঝায়।
২০১৩ ও ২০১৪ সালে চীন, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ অপারেশন জোরদার করে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (১৯৮২) অনুযায়ী, কোনো দেশ তার প্রাকৃতিক উপকূলীয় সীমান্ত থেকে ১২ নটিক্যাল মাইলের বেশি জলসীমার মালিক হবে না। মানবসৃষ্ট কৃত্রিম উপকূল থেকে এ মালিকানা কার্যকর হবে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখনো জাতিসংঘের এই আইনটি অনুমোদন করেনি।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে প্রাণান্তকর উদ্ধার চেষ্টা

আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশের কাশিম জেলায় ধ্বংসস্তূপের
ভেতর থেকে ব্যবহারের উপযোগী জিনিসপত্র খুঁজছেন দুই
ব্যক্তি। গত সোমবারের শক্তিশালী ভূমিকম্প তাঁদের
সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ভূমিকম্পে হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে গতকাল মঙ্গলবার জোর তৎপরতা শুরু করেছেন উদ্ধারকারীরা। সোমবারের ওই শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গেছে। গতকাল সন্ধ্যায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত যে ৩৬৩ জনের প্রাণহানির কথা জানা গেছে, তার মধ্যে পাকিস্তানেরই ২৪৮ জন। খবর এএফপি ও ডনের। রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। কারণ, ভূমিকম্পের ফলে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে ভবন ধস হয়েছে ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পাশাপাশি অনেক স্থানে ভূমিধস ও পদদলনের ঘটনার খবর দিয়েছে উদ্ধারকারী দলগুলো।পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পেশোয়ারের একজন পুলিশ কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, খোয়িস্তান জেলার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গতকালও তাঁরা যোগাযোগ করতে সক্ষম হননি। তাই প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই প্রত্যন্ত জনপদে কী ঘটেছে, তা জানা যাচ্ছে না। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘খোয়িস্তানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। যোগাযোগব্যবস্থাগুলো বন্ধ হয়ে পড়েছে। আবার রাস্তাগুলোও অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। ফলে সেখানে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, আমরা তার কিছুই বলতে পারব না।’
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় শহর চিত্রালের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতেও হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। চিত্রালের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ভূমিকম্পে সেখানকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কমবেশি ৮০ হাজার লোক এখন নিরাপদ পানি পাচ্ছে না। এখন আমরা পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় চালুর ওপরেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’ অন্যান্য প্রত্যন্ত এলাকায় শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিসহ স্থানীয় বাসিন্দারাও সরকারি কর্মীদের সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতায় লেগে পড়েছে। তারা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। পাকিস্তানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে ডন পত্রিকা যে হিসাব দিয়েছে, সে অনুযায়ী গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভূমিকম্পের ফলে শুধু পাকিস্তানেই মৃতের সংখ্যা ছিল ২৪৮। এর মধ্যে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশেই (কেপি) প্রাণ হারিয়েছে ২০২ জন। এর বাইরে গিলগিট বালতিস্তানে নয়জন, কেন্দ্রশাসিত উপজাতি অঞ্চলে (এফএটিএ) ৩০ জন, পাঞ্জাবে পাঁচজন এবং পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে দুজন রয়েছে। আর এসব এলাকায় আহতের সংখ্যা ১ হাজার ৬৬৫ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে চার হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে গতকাল দেশে ফিরেছেন। তিনি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের শাংলা জেলায় পরিদর্শনে যান। এদিকে আফগানিস্তানের কর্মকর্তারা বলেছেন, গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা সোমবারের ভূমিকম্পে ১১৫ জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছেন। দেশটির ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ছয়টি থেকে হতাহতের খবর এসেছে।

গীতাকে সন্তান দাবি আরেক পরিবারের

গীতা
হিন্দি চলচ্চিত্র বজরঙ্গি ভাইজান-এর চরিত্র মুন্নির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে টানটান উত্তেজনা থাকলেও সংশয় ছিল না। অথচ বাস্তবের বজরঙ্গি ভাইজানের গীতা ভারতে চলে আসার পর উত্তেজনার সঙ্গে কিছুটা সংশয় আর বিতর্কও জুড়ে গেছে। আর তা যেন কেবল ঘনীভূতই হচ্ছে। গীতা গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে দেখা করে ইন্দোর রওনা হয়ে যান। তাঁর দিল্লি ত্যাগের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর প্রদেশের রামপুর থেকে এক পরিবার রাজধানীতে এসে হাজির। বিহারের মাহাতোদের মতোই এ পরিবারের দাবি, হারিয়ে যাওয়া গীতা তাঁদেরই মেয়ে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যাঁরাই গীতার অভিভাবকত্বের দাবি জানাবেন, তাঁদের সবারই ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। যাঁদের সঙ্গে তা মিলবে, গীতাকে তুলে দেওয়া হবে তাঁদেরই হাতে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, স্মৃতির সঙ্গে বাস্তবের মিল না হলে গীতা যদি কিছুতেই যেতে না চান, তাহলে কী হবে? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলে, এখনই এতটা সংশয়ী হওয়ার কোনো কারণ নেই। অন্তত ১৫ দিন অপেক্ষা সবাইকে করতে হবে। ডিএনএ পরীক্ষার ফল বের হোক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে গত সোমবার দেখা করেন গীতা। এরপর টুইট করে প্রধানমন্ত্রী জানান, গীতাকে এত বছর ধরে যারা আগলে রেখেছিল, পাকিস্তানের করাচির সেই ইধি ফাউন্ডেশনকে তিনি এক কোটি রুপি দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই দান ইধি ফাউন্ডেশন ‘ধন্যবাদের সঙ্গে ফিরিয়ে দিচ্ছে’ বলে গতকাল খবর দিয়েছে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা।

রাজবর্মের আড়ালে সৌদি যুবরাজদের মাদক ব্যবসা

সৌদি আরবের রাজপরিবার এখন সীমাহীন অপরাধ, দুর্নীতি, যৌন কেলেঙ্কারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত। তাত্ত্বিকভাবে ইসলামী আইনে পরিচালিত এই রাষ্ট্রটির ক্ষমতাসীনরা আদতে ইসলামবিরোধী অপকর্মে সিদ্ধহস্ত। সম্প্রতি সৌদি যুবরাজদের মাদক ব্যবসা ও যৌন কেলেঙ্কারির খবরে পুরো মুসলিম বিশ্ব অস্বস্তিতে পড়েছে। মুসলিম বিশ্বের অঘোষিত মোড়ল ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যের কাছে টাকার কুমির হওয়ায় তাদের অপরাধকে আলোচনার বিষয়বস্তু করতে চায় না কেউ। ধর্মীয় আবেগ আর রাজবর্মের কাছে ঢাকা পড়েছে সৌদির ক্ষমতালোভী, ভোগবাদী অন্ধকার অপরাধ জগৎ। সোমবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে দুই টন মাদকসহ এক সৌদি যুবরাজের আটক হওয়ার ঘটনায় সামনে এসেছে যুবরাজদের মাদক ব্যবসা। সৌদি যুবরাজ আবদেল মোহসেন বিল ওয়ালিদ বিন আবদুল আজিজ বৈরুত বিমানবন্দর দিয়ে দুই টন ‘ক্যাপটাগন’ বড়ি ও কিছু কোকেন পাচারের সময় এদিন চার সঙ্গীসহ আটক হন। লেবাননের জাতীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত বিমানে ৪০টি স্যুটকেসে করে ক্যাপটাগন বড়ি বৈরুত থেকে রিয়াদে নেয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। দেশটিতে সবচেয়ে বড় মাদক চোরাচালানের নজির এটি, যা বৈরুত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নস্যাৎ করে দেয়। ক্যাপটাগন হল অ্যাম্ফিটামাইন ফেনেথিলাইনের বাজারি নাম। ক্যাপটাগন শরীরে কৃত্রিম উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যে কারণে তা যৌন উত্তেজক বড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বজুড়ে ক্যাপটাগন নিষিদ্ধ। তবে মধ্যপ্রাচ্যের লোকরা যৌন উত্তেজক বড়ি হিসেবে নিষিদ্ধ এই ক্যাপটাগনকেই বেশি পছন্দ করে। বলা হচ্ছে, সিরিয়ার যোদ্ধারা বর্তমানে এর বড় ভোক্তা।
সৌদি যুবরাজ চোরাচালানের এই অন্ধকার রাজত্ব পরিচালনা করেন। এর আগে ১৯৯৯ সালে সৌদি প্রিন্স নায়েফ বিন সুলতান বিন ফায়েজ আল সালান ভেনিজুয়েলা থেকে ফ্রান্সে কোকেন চোরাচালানিতে অভিযুক্ত হন। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের বেভারলি হিলস ম্যানশনে এক সৌদি যুবরাজ জোর করে এক নারীর সঙ্গে যৌনাচার করতে গিয়ে গ্রেফতার হন। বৃহস্পতিবার ৩ লাখ ডলার জরিমানা দিয়ে মুক্তি পান সাবেক সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর ছেলে মাজেদ আবদুল আজিজ আল সউদ। ২০১৩ সালে আরেক যুবরাজ মিশাইল আলাইবান ক্যালিফোর্নিয়ায় এক কেনীয় নারীকে জোর করে দাসী বানিয়ে রাখার অপরাধে অভিযুক্ত হন। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও শেষ পর্যন্ত কোনো বিচারিক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ২০১০ সালে প্রিন্স সউদ বিন আবদুল আজিজ বিন নাসির আল সউদ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়ে লন্ডনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। বিচারক তার রায়ে বলেন, রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে আপনাকে সাজা বাড়িয়ে দেয়া বা কমিয়ে দিলে তার ভুল বিচার হবে। ২০১০ সালের উইকিলিকস ফাঁস করা এক তারবার্তায় বলা হয়, সৌদি প্রিন্স ১৫০ নারী-পুরুষ নিয়ে উচ্চমাত্রার অ্যালকোহল সেবন করে হ্যালুয়িন পার্টির আয়োজন করেছিলেন। উইকিলিকসের ওই বার্তায় আরও বলা হয়েছে, ইসলামবহির্ভূত অবৈধ প্রক্রিয়ায় সৌদি আরবের শাসন ক্ষমতা আঁকড়ে রয়েছে এই সউদ পরিবার। থাকা রাজপরিবারের সদস্যরা এমন হাজারও অপকর্ম করলেও তার রাজতান্ত্রিক বিধানে তাদের কোনো বিচার নেই। অথচ দেশটিতে একেবারে লঘু অপরাধে গুরুদণ্ড দেয়া হয়। দেশটির মাদক আইনে গত জুন ও আগস্টে দুই পাকিস্তানিসহ অনেককেই শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। আর ভোগবাদী সউদ রাজপরিবারের ১৫ হাজার রাজকুমার-রাজকুমারীরা সব আইনের ঊর্ধ্বে।

জিংক সমৃদ্ধ ধান

চাঁদপুরের মতলবে জিংক সমৃদ্ধ ধানের এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। দেশে উদ্ভাবিত হয়েছে নতুন জাতের ব্রি ৬২ ধান। মানবদেহে জিংকের চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এটি।
সে লক্ষ্যেই এ বছর কৃষকদের হাতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে নতুন জাতের এই ধান। প্রথমবারের মতো উচ্চ ফলনশীল জাতের এই ধান চাষ করে কৃষকরা আশাতীত ফলন পেয়েছেন। চলতি মৌসুমে ৩০ জন কৃষক এবারই প্রথম উচ্চ ফলনশীল জাতের এ ধানটি চাষ করেন -চাঁদপুর প্রতিনিধি

শীর্ষেই সাকিব

পাকিস্তান-ইংল্যান্ড দ্বিতীয় টেস্টের পর মঙ্গলবার আইসিসি সর্বশেষ র‌্যাংকিং প্রকাশ করেছে। র‌্যাংকিংয়ে একনম্বর টেস্ট দল আফ্রিকা। আর একনম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন ইংল্যান্ডের জো রুট। একনম্বর টেস্ট বোলার দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার ডেল স্টেইন। টেস্ট অলরাউন্ডারদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান।
১২৫ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে প্রোটিয়ারা শীর্ষ টেস্ট দল। দ্বিতীয় স্থানে আছে ১০৬ রেটিং পাওয়া অস্ট্রেলিয়া। ১০২ রেটিং নিয়ে তিনে সদ্য পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচ টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে হেরে যাওয়া ইংল্যান্ড। দুই ম্যাচ শেষে ১-০তে এগিয়ে থাকা পাকিস্তান ইংলিশদের পরে চতুর্থ স্থানে। ১০১ রেটিং পয়েন্ট তাদের। এরপর রয়েছে ভারত (১০০), নিউজিল্যান্ড (৯৯), শ্রীলংকা (৯৩) ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ (৭৬)। তালিকায় নয় নম্বরে মুশফিকুর রহিমের বাংলাদেশ।
টাইগারদের রেটিং ৪৭। দশম স্থানে রয়েছে জিম্বাবুয়ে (রেটিং পয়েন্ট ৫)। এক ধাপ এগিয়ে টেস্টের সেরা ব্যাটসম্যান জো রুট। ৯১৩ রেটিং পয়েন্ট পাওয়া রুটকে জায়গা ছেড়ে দিতে এক ধাপ নিচে নেমে গেছেন অস্ট্রেলিয়ার স্টিভেন স্মিথ (৯১০)। তিনে রয়েছেন ৮৯০ রেটিং পাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স। শীর্ষ দশের পরের জায়গাগুলোতে যথাক্রমে হাশিম আমলা, ইউনুস খান, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস, কেন উইলিয়ামসন, অ্যালিস্টার কুক, ডেভিড ওয়ার্নার এবং ক্রিস রজার্স। বোলার ক্যাটাগরিতে শীর্ষে রয়েছেন ৯০৫ রেটিং পাওয়া প্রোটিয়া পেসার ডেল স্টেইন। দুইয়ে পাকিস্তানের ইয়াসির শাহ এবং তিনে ইংলিশ বোলার জেমস অ্যান্ডারসন। শীর্ষ দশে এরপর যথাক্রমে রয়েছেন স্টুয়ার্ট ব্রড, ট্রেন্ট বোল্ট, মিচেল জনসন, ভারনন ফিল্যান্ডার, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, রঙ্গনা হেরাথ এবং টিম সাউদি। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ক্যাটাগরিতে টেস্টে নিজের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন সাকিব। সর্বোচ্চ ৩৮৪ পয়েন্ট নিয়ে টাইগার অলরাউন্ডার শীর্ষে। তার পরের স্থানে রয়েছেন ভারতের অশ্বিন। তিনে প্রোটিয়া ভারনন ফিল্যান্ডার, চারে ইংলিশ তারকা স্টুয়ার্ট ব্রড এবং পাঁচে মিচেল জনসন। ওয়েবসাইট।

হাইওয়েতে মৌ-নোবেলের অভিসার!

গত রোজার ঈদের একটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন মৌ-নোবেল। দর্শকপ্রিয় এ জুটিকে এরপর আর কোনো নাটকে আর দেখা যায়নি ইতিমধ্যে। তবে আবারও তারা দুজন একসঙ্গে নতুন একটি নাটকে অভিনয় করেছেন সম্প্রতি। নাটকটির নাম ‘হাইওয়ে’। রচনা ও পরিচালনা করেছেন মো. মেহেদী হাসান জনি। নাটকটিতে নোবেলকে ‘ধ্রুব’ ও মৌকে দেখা যাবে ‘মেঘলা’ চরিত্রে। ধ্রুব শিল্পপতি বাবার একমাত্র ছেলে। আর মেঘলা শিল্পপতি বাবার একমাত্র মেয়ে। দুজনের বাবা শিল্পপতি হওয়া সত্ত্বেও তারা বাসা থেকে পালিয়েছে। তবে কেউ কারও জন্য নয়। ঘটনাচক্রে দুজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তারপর ঘটতে থাকে নানা নাটকীয় ঘটনা। নাটকটি নিয়ে নোবেল বলেন,
কাজের ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত অভিনয় করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। তবে গল্প ভালো হলে হাত ছাড়া করি না। তবে এক কথায় বলব অসম্ভব ভালো একটি কাজ করেছি। অন্যদিকে মৌ বলেন, ‘অনেক দিন পর সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্পে কাজ করলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘দ্য হাইওয়ে’ নাটকটিতে অভিনয় করে বেশ তৃপ্তি পেয়েছি। অনেক পরিশ্রম করে এবং রোদেপুড়ে সারা দিন আমরা শুটিং করেছি। আশা করছি আমার পরিশ্রম সার্থক হবে। নাটকটি সম্পর্কে নির্মাতা মো. মেহেদী হাসান জনি বলেন, নোবেল ও মৌ আমার অনেক প্রিয় একটি জুটি। অনেক স্বপ্ন ছিল প্রিয় জুটিকে নিয়ে কাজ করার। অবশেষে আমার স্বপ্নপূরণ হল। সম্প্রতি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন মনোরম লোকেশনে নাটকের শুটিং সম্পন্ন হয়েছে। শিগগিরই যে কোনো একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নাটকটি প্রচারিত হবে।

নাশকতার ছক জামায়াতের by সৈয়দ আতিক

সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নাশকতার পরিকল্পনা করেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ‘জামায়াত-শিবির’। এজন্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকাকে টার্গেট করে একটি ছকও এঁকেছে তারা। এরই অংশ হিসেবে হত্যা করা হয় ঢাকা ও রংপুরে দুই বিদেশী নাগরিক ও রাজধানীর গাবতলীর চেক পোস্টে পুলিশ সদস্যকে। এরপর ঘটানো হয় ঢাকার হোসনি দালানে শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া শারদীয় দুর্গোৎসবের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে হামলার পরিকল্পনাও ছিল সরকারবিরোধী চক্রের। কিন্তু এটি ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতায়। এসব ঘটনা ঘটিয়ে ভারতসহ বিদেশীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করাও তাদের অন্যতম টার্গেট। জামায়াতের এ অপতৎপরতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তাদের নাশকতার ছক বাস্তবায়নে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের কাজে লাগানো হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে এসব তথ্য পেয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা। তবে নাশকতার সঙ্গে জড়িতরা তাদের কৌশল বারবার পাল্টাচ্ছে। কাশিমপুর কারাগারের ভেতর থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি নাশকতা ঘটানোসংক্রান্ত বিভিন্ন পরামর্শ বাইরে তাদের লোকদের দিচ্ছে বলেও নিশ্চিত হয়েছে বলে দাবি করেছে গোয়েন্দা সূত্র। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের আইনশৃংখলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। নেয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল মঙ্গলবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যতই কৌশল অবলম্বন করুক না কেন আমাদের আইনশৃংখলা বাহিনী ও গোয়েন্দারা আরও কৌশলী ভূমিকা পালন করছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে জামায়াত-শিবির এবং তাদের অপ্রকাশ্য গোষ্ঠী জেএমবি-আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এক হয়েছে, এরাই একগোষ্ঠী। তাদের রুখতে কিছু এলাকা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। এসব এলাকায় জামায়াত-শিবির যে নাশকতার ছক তৈরি করেছে তা প্রতিহত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নাশকতার অভিযোগে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা ধরাও পড়ছে। আইনশৃংখলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত-শিবির প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কিছু এলাকায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রাজধানীতে রয়েছে তাদের নানা পরিকল্পনা। এছাড়া অন্য যেসব এলাকায় নাশকতা ঘটনানোর পরিকল্পনা করেছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, সাতকানিয়া, বান্দরবান, পর্যটন শহর কক্সবাজারের রামু, রংপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, টঙ্গী, বগুড়ার আদমদীঘি, জয়পুরহাট। পরিস্থিতি সামাল দিতে এসব এলাকায় ঢাকা থেকে আইনশৃংখলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকটি টিম গিয়ে সেখানে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। অপরাধীগোষ্ঠী যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তা শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় সব আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে গেছে তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র যুগ্ম-কমিশনার (ডিবি ও প্রসিকিউশন) মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবে বড় ধরনের থ্রেট ছিল। কিন্তু আইনশৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা ও নজরদারির কারণে জামায়াত-শিবির তাদের নাশকতা চালাতে পারেনি। এ গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে দেশকে সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের কোনো চক্রান্ত করে লাভ হবে না। কারণ, গোয়েন্দারা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছেন। জামায়াত-শিবির বা সরকারবিরোধী চক্র পূজায় হামলা করে ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিল। তাদের ধারণা, হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে হামলা করলে ভারতের কাছে বার্তা যাবে যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যর্থ হচ্ছে।
মনিরুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত-শিবির তথা স্বাধীনতা বিরোধীগোষ্ঠী নানা কৌশলে নাশকতার চেষ্টা করছে। এসব এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা ও হোসনি দালানের হামলার পর আইএসের দায় স্বীকারের পেছনেও স্বাধীনতাবিরোধীরা কাজ করেছে। পাশাপাশি আইএসের নামে দায় স্বীকারের যেসব বার্তা আসছে, তার পেছনেও একই গোষ্ঠী জড়িত। এদের একটি চক্র পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টির অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রামুর বৌদ্ধবিহারে হামলার চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি তোফায়েল বান্দরবান ও কক্সবাজারে হামলার পরিকল্পনা করছে। তার বাসা থেকে আইএসসংক্রান্ত বেশকিছু তথ্য উদ্ধার করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। সম্প্রতি এ অভিযানটি পরিচালিত হলেও তা এখনও গোপন রাখা হয়েছে। সূত্রটি জানিয়েছে, তোফায়েল ফেসবুকে একটি ক্লোজ গ্রুপ তৈরি করেছে। যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের জামায়াত-শিবিরের নাশকতাকারীদের যোগসূত্রের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রযুক্তিগত মনিটরিংয়ে এসব তথ্য হাতে পাওয়ার পর তা স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়কেও অবগত করা হয়েছে বলেও জানায় ওই সূত্র। আরও জানা গেছে, কক্সবাজারের রামু ও বান্দরবান থেকে তোফায়েল এবং তার একটি বিশেষ চক্র তিনটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করছে। যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আগামীতে যে কোনো সাম্প্রদায়িক কর্মসূচিতে হামলার বিষয়টি এসব সাইটে উল্লেখ আছে। সাইট তিনটি হচ্ছে- নাইক্ষ্যংছড়িবাসী, বান্দরবানবাসী ও রক্তাক্তপ্রান্তর। জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তথ্য পাওয়ার পর সোমবার থেকে বিমানবন্দরে সতর্কতার বিষয়ে পুলিশের বিশেষ শাখাকে অবগত করা হয়। তারপরই বিমাবন্দরগুলোতে কড়া তল্লাশি ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, যে কোনো নাশকতা ঠেকাতে দেশের সব জেলার পুলিশ সুপারদের কাছেও বার্তা পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি ওই বার্তার বিষয়ে কয়েকজন পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ বিষয়ে জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, পূজায় বড় ঝুঁকি ছিল, কিন্তু তা প্রতিহত করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। এজন্য সাম্প্রদায়িক কমিটি করা হয়েছিল তার জেলায়। তিনি বলেন, জামায়াত নাশকতা চালাতে পারে। এ বিষয়ে তার কাছে বার্তা দেয়া হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। বান্দরবানের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, এ এলাকায় জামায়াত-শিবিরসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর নাশকতা প্রতিরোধে বিভিন্ন বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
দেশে জামায়াত-শিবির অস্থিরতা ও নাশকতার চেষ্টা করছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, এটা ঠিক যে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে তাদের অপ্রকাশ্য গোষ্ঠী জেএমবি ও অন্য জঙ্গিরা যোগ দিয়েছে। তিনি বলেন, জামায়াতের একটা গোপন শক্তি হিসেবে কাজ করে জঙ্গিরা। এটা তাদের অপ্রকাশ্য দিক। আর প্রকাশ্যে জামায়াত রাজনীতি করে। কিন্তু এ গোষ্ঠী রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও নাশকতার ছক করছে। যা এখন আইনশৃংখলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের জন্য চ্যালেঞ্জ।
জেনারেল রশীদ বলেন, এ মুহূর্তে গোয়েন্দাদের পূর্ব সংকেত পাওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। আর তার পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করতে পারলে ঝুঁকি কমে আসবে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা, পুলিশ সদস্য খুন, তাজিয়া মিছিলে হামলা একই গোষ্ঠীর কাজ- তাই অভিযুক্তদের কঠোর আইনের মুখোমুখি করতে হবে। আর এর মাধ্যমে তাদের বোঝাতে হবে নাশকতা করলে রেহাই নেই।
সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা যুগান্তরকে বলেন, প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে বেশ কয়েকটি স্থানে নাশকতার ছকের তথ্য সরকারের আইনশৃংখলা বাহিনীকে জানানো হয়েছে। এসব এলাকায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নাশকতার পরিকল্পনা করছে। তবে কিছু স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের প্রতিহত করা গেছে। তিনি বলেন, কাশিমপুর কারাগারের ভেতর থেকেও বাইরে পরামর্শ পৌঁছানো হচ্ছে। এটিও সরকারসংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। প্রযুক্তিগত মেটাডাটার মাধ্যমে এ ধরনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

একই নাটকের পুনঃপ্রচার by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

যেন একই নাটকের পুনঃপ্রচার। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয় একই। ঘটনাস্থল ও দুই পরিচালকের নামও অভিন্ন। শুধু দু-একটি চরিত্রের উপস্থিতির হেরফের হতে পারে, কিন্তু দুই বছরের ব্যবধানে যে দুটি দৃশ্য প্রত্যক্ষ করল চট্টগ্রামের মানুষ, তাতে নতুনত্ব নেই কোনো।
২০১৩ সালের ২৪ জুন পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সদর দপ্তর সিআরবি এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুটি পক্ষ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছিল। যুবলীগের নেতা হেলালউদ্দিন চৌধুরী ওরফে বাবর ও ছাত্রলীগের নেতা সাইফুল আলম ওরফে লিমনের নেতৃত্বে দুই দলের সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটেছিল দুজনের। নিহত ব্যক্তিদের একজন ছাত্রলীগের সদস্য হলেও অন্যজন এলাকারই একটি শিশু, খেলতে এসে ঘটনার শিকার হয়েছিল সে।
দুই বছর আগের সেই ঘটনা ভুলতে বসেছিলাম আমরা। কিন্তু সেই একই বিষয় নিয়ে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি নতুন করে মনে করিয়ে দিল পুরোনো দিনটিকে। ১২ অক্টোবর সেই সিআরবি এলাকায় আবার প্রকাশ্যে সশস্ত্র মহড়া দিল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুটি গ্রুপ। নগরের তুলনামূলক নির্জন সিআরবি এলাকা আরও একবার কেঁপে উঠেছে গুলির শব্দে। ভীতি-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মধ্যে। ২০১৩ আর ২০১৫—দুই বছরের ব্যবধানে দুটি ঘটনাই ঘটেছে একই স্বার্থকে কেন্দ্র করে। রেলওয়ের টেন্ডার দখল। লিমন বলেছেন, ‘সিআরবিতে বাবর এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। সম্প্রতি আমি ও আমার বন্ধু গোফরান সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার রেললাইন মেরামতের কাজ পেয়েছি। বাবরের দাবি হলো, সেই কাজ আমরা করতে পারব না।’
একসময় বাবর ও লিমনের নামের আগে পদবি হিসেবে ব্যবহার করা হতো যথাক্রমে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ২০১৩ সালের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এই দুজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে কমিটি থেকে। কিন্তু পদ-পদবি থেকে বাদ পড়লেও ক্ষমতার দাপট যে তাঁদের এতটুকু কমেনি, ১২ অক্টোবরের ঘটনা তার বড় প্রমাণ।
ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এক বিবৃতিতে ‘আজীবন বহিষ্কৃত’ ব্যক্তির নামের আগে পত্রপত্রিকায় ‘ছাত্রলীগ নেতা’ পদবি ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্রলীগের পরিচয় উল্লেখ করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আরও সতর্ক হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। ছাত্রলীগ নেতৃদ্বয়ের এই ক্ষোভ ও পরামর্শ যুক্তিসংগত। কিন্তু এত বড় সংঘর্ষের ঘটনায় আটক হয়ে, দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও যাঁরা টেন্ডার দখলের জন্য লড়াই করেন এবং সেই টেন্ডার বাগিয়েও নিতে পারেন, তখন এটা মনে হওয়া কি স্বাভাবিক নয় যে কাগজে-কলমে বহিষ্কৃত হলেও তাঁরা দলের কোনো না কোনো নেতার সমর্থন বা আশীর্বাদপুষ্ট? সর্ষের ভেতেরই যদি ভূত থাকে, তাহলে ভূত তাড়াবে কে?
এখন ছাত্রলীগ বা যুবলীগের ভাবমূর্তি নিষ্কলুষ রাখতে হলে নিঃস্বার্থ আদর্শবান নেতা-কর্মীদেরই তো খুঁজে বের করা উচিত বহিষ্কৃত নেতা-কর্মীরা দলের কোনো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইন্ধন পাচ্ছেন কি না, কেন তাঁরা আইন ও বিচারের আওতায় আসছেন না, কেন এখনো তাঁরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন টেন্ডার–বাণিজ্য! এমনকি দলের হাইকমান্ডও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের বর্তমান কমিটির সদস্যদের ডেকে নিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইতে পারেন। তাতে সংঘর্ষে জড়িত নেতা-কর্মীদের (দলে আছেন বা বহিষ্কৃত) পেছনে কারও সমর্থন বা ইন্ধন আছে কি না, তা বেরিয়ে আসবে। ছাত্রলীগের ‘বহিষ্কৃত’ নেতা লিমন স্বীকার করেছেন যে তিনি রেলের রাস্তা মেরামতের সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার কাজ পেয়েছেন। কী পেশাদারি যোগ্যতাবলে তিনি এই বড় অঙ্কের মেরামতকাজের ঠিকাদারি পেলেন, তা-ও তো তদন্ত করে দেখতে পারেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা।
কয়েক দিন আগে টাঙ্গাইলের মধুপুরে বনে নিয়ে গিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণের জন্য ছাত্রলীগের আরিফ হোসেন নামের এক তরুণকে অভিযুক্ত করা হলে মধুপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বলেছেন, ‘আরিফকে সভাপতি করে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেটি এখনো পাস হয়নি।’ অপকর্মের দায়ে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে কখনো ‘বহিষ্কৃত’, কখনো বা ‘অননুমোদিত’ ইত্যাদি যুক্তি হয়তো সংশ্লিষ্ট নেতারা তুলে ধরছেন, কিন্তু এতে সাধারণ মানুষের মন থেকে এই সংগঠনের নেতিবাচক ভাবমূর্তি মুছে ফেলা যাচ্ছে না।
২০১৩ সালের ঘটনার বিচার হলে ২০১৫ সালে নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা যে ঘটত না, এ কথা আজ নিঃসংশয়ে বলা যায়। কিন্তু আগের ঘটনায় জোড়া খুনের মামলার তদন্তে ২৭ মাসেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তখন কোতোয়ালি থানার একজন উপপরিদর্শক বাদী হয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩০-৪০ জনকে আসামি করে মামলা করেছিলেন। সংঘর্ষে নিহত সাজু পালিতের মা-ও দায়ের করেছিলেন হত্যা মামলা। বাবর-লিমনসহ ৫৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তবে শনাক্ত করতে পারেনি অস্ত্রধারী এবং উদ্ধার হয়নি সংঘর্ষে ব্যবহৃত অস্ত্র। ঘটনার চার মাসের মাথায় উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে যান ৫৬ আসামি। সেই সময় (২০১৩) ৫২ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হলে ৪৪ জনকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন বিচারক। এত অল্প সময়ে আসামিদের কাছ থেকে হত্যার কারণ বের করা যাবে কি না—এ নিয়ে তখন সংশয় প্রকাশ করেছিলেন আইন বিশেষজ্ঞরা। মহানগর আদালতের সাবেক সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুস সাত্তার তখন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘এ ধরনের হত্যা মামলার জন্য এক দিনের রিমান্ড যথেষ্ট নয়। এত অল্প সময়ের মধ্যে আসামিদের কাছ থেকে জোড়া খুনের কারণ বের করা সম্ভব হবে না। অথচ চুরির মামলার আসামিরও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।’
এ বক্তব্য যে সঠিক ছিল, তা প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৪ জুনের ঘটনায় আটক সবাই বেরিয়ে এসেছেন জামিনে। এসে নতুন করে সংঘর্ষে জড়ানোর শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করেছেন। সেবারের ঘটনায় তবু ৫২ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ, কিন্তু এবার (১২ অক্টোবর) একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি তারা, এমনকি শনাক্তও করতে পারেনি কাউকে। পত্রপত্রিকায় ধারালো অস্ত্রসহ সংঘর্ষে লিপ্ত তরুণদের ছবি ছাপা হয়েছে, কিন্তু কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলছেন, ‘তারা কারা, শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জনপ্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন। জেলা প্রশাসক বলেছেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করা হবে। পুরো ব্যাপারটিই কেমন যেন ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’ বলে মনে হচ্ছে।
সংঘর্ষের সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। সেখানে চারটি ফাঁকা গুলি করে বিবদমান দুই পক্ষকে সরিয়ে দিয়েছে তারা। কিন্তু কাউকে আটক করার চেষ্টা করেছে, এমন কোনো তথ্য দেননি প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকেরা। বরং এবারের সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, এতেই যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন তাঁরা।
পুলিশ কি সেদিন দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য দেখিয়েছে? ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের ক্যাডারদের ধরপাকড় করেও শেষ পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে না—এমন কোনো ধারণা কি তাদের মধ্যে কাজ করেছে? আমরা জানি না। তবে এটা জানি, বিভিন্ন সরকারের আমলে দলীয় সন্ত্রাসীরা যে ক্ষতি দলের করেছে, প্রতিপক্ষও ততটা করতে পারেনি। এই সহজ বিষয়টি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় উচ্চপর্যায়ের নেতারা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করতে পারেন, ততই ভালো। তবে ঘটনাচক্রে আমাদের এক কবি-ছড়াকার বন্ধুর একটি ছড়ার দুটি লাইন বারবার মনে পড়ছে: ‘ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছি শেষে/ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না কেউ।’
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।

জবানবন্দিতে যা বলেছে রুবেল by নুরুজ্জামান লাবু ও রুদ্র মিজান

ইতালিয়ান নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যা মামলায় আটক তামজীদ আহমেদ রুবেল ওরফে মোবাইল রুবেল ওরফে শুটার রুবেল সোমবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, ওই জবানবন্দিতে রুবেল নিজের দোষ স্বীকার করেছে। তবে ওই জবানবন্দিতে কথিত বড় ভাই বা ওই ভাইয়ের নির্দেশ সম্পর্কেও কিছু বলেনি। ওই জবানবন্দিতে রুবেল বলেছে, আমি বাড্ডার হল্যান্ড সেন্টার হোসেন মার্কেটের ৩য় তলায় ২১৭ নম্বর দোকান মোবাইল সলিউশনে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করতাম। আমি কালা রাসেল ভাইয়ের বাসার কাছেই থাকতাম। কালা রাসেল ভাইয়ের বোন আর আমার খালাত বোন বান্ধবী। আমি কালা রাসেল ভাইয়ের বাসায় আসা-যাওয়া করতাম এবং তার সঙ্গে আড্ডা দিতাম।
আমার এক বন্ধু দক্ষিণ বাড্ডার জনি ইয়াবা ব্যবসা করতো। কালা রাসেল ভাই আমাকে ৫শ’ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট দেয় বেচে দেয়ার জন্য। আমি ওই ইয়াবাগুলো জনিকে দেই। জনি প্রথম এক শ’ পিস ইয়াবা বিক্রি করে টাকা দিলেও ৪ শ’ পিস ইয়াবার কোন টাকা দেয় নাই। সে পালাইয়া যায়। ঐ ইয়াবা বেচার পঞ্চাশ হাজার টাকা কালা রাসেল ভাই চাইতো। এই টাকা নিয়ে আমি একটু পেরেশানির মধ্যে ছিলাম। গত কোরবানির ঈদের দিন আমার বন্ধু বিপুসহ আমি আর কালা রাসেল ভাই তার বন্ধু চাক্কী রাসেল ভাইয়ের বাসায় যাই দক্ষিণ বাড্ডা বাজার গলিতে। সেখানে কালা রাসেল ভাই আমাদেরকে আইসক্রিম খাওয়ায়। চাক্কী রাসেল ভাই এক ফাঁকে আমাকে বলে, ‘একটা কাজ আছে থাইকো, কালা রাসেল তোমাকে পরে বিস্তারিত বলবে।’ এরপর আমি আর বিপু তাদের বাসায় যাই। বিপুর বাসায় রাতে দাওয়াত খাই। আমি কালা রাসেলের বোনের ফ্ল্যাটে মাঝে মধ্যে ঘুমাইতাম। ঐ রাত অনুমান সাড়ে ১১টার দিকে আমি ঐ ফ্ল্যাটে ঘুমাইতে যাই। ফ্ল্যাটটা কালা রাসেলের বাসার পেছনে জেনারেটরের গলিতে।
কোরবানির ঈদের পরের দিন অর্থাৎ ২৬শে সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কালা রাসেল ভাই এবং চাক্কী রাসেল ভাই এসে আমাকে ঘুম থেকে তুলে। আমাকে বলে জরুরি কথা আছে। আমি বাসায় যাইয়া নাস্তা করে আসলে তারা দুজনই আমারে বলে যে, গুলশান-২ এ গুলি কইরা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে হবে। তারা দুজন আমার সঙ্গে থাকবে বলে। চাক্কী রাসেল আমাকে বলে কালা রাসেল ভাই ইয়াবা বিক্রির যে চল্লিশ হাজার টাকা আমার কাছে পায় সেটা আর দিতে হবে না। এর আগে ঈদের আগে আমি দশ হাজার টাকা কালা রাসেল ভাইকে দিই।
গত ২৭শে সেপ্টেম্বর দুপুর ১ ঘটিকার সময় আমি কালা রাসেল ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার সময় কমার্স কলেজের গলিতে কালা রাসেল ভাই এবং চাক্কী রাসেল ভাইকে দেখতে পাই। তারা দাঁড়াইয়া ছিল। চাক্কী রাসেল আমাকে বলে, কাজটা দ্রুত করতে হবে। কালা রাসেল ভাই আমাকে বলে মধ্য বাড্ডা বাজারের কসাই গলি থেকে ভাঙ্গারি সোহেল এর কাছ থেকে একটা পিস্তল নিয়ে আসার জন্য বলে। ভাঙ্গারি সোহেলের সঙ্গে গলিতে দেখা করতেই সে আমাকে পিস্তল দিবে। আমি কসাইগলিতে যাইয়া ভাঙ্গারি সোহেল থেকে পিস্তলটা নেই। ঐটা কাগজে মোড়ানো ছিল। সে ঐ সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করে পিস্তলটা কোন এলাকায় যাবে। আমি কিছু জানি না- বলি তাকে। আমি কালা রাসেল ভাইয়ের বাসার নিচে এসে পিস্তলটা চাক্কী রাসেল ভাইয়ের নিকট দিই। আমি তার কাছে কিছু খুচরা টাকা চাইলে সে আমাকে বিশ টাকা দেয় এবং আমি ঐ টাকা নিয়া বাসায় চইলা আসি।
গত ২৮শে সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টার দিকে আমি প্ল্যান অনুযায়ী কালা রাসেল ভাইয়ের বাসার সামনে যাই। যাইয়া খাম্বার সামনে তারা দুজনকে হোন্ডা নিয়া দাঁড়ানো দেখি। এফজেড হোন্ডা সাদা রংয়ের। ঐ হোন্ডাটা শরীফ ভাইয়ের। চাক্কী রাসেল ভাই কালা রাসেল ভাইয়ের বাসার নিচে পিস্তল থেকে কিভাবে গুলি করতে হবে আমাকে অনেকবার দেখাইয়া দেয়। পিস্তলে পাঁচটা গুলি আছে। ঐটাও দেখাইয়া দেয়। সে বলে, ‘কোন চিন্তা করিও না। কালা রাসেল যে টাকা পাইত সেটা তোমাকে দিতে হবে না। কামটা হইলে আরও কিছু বাড়তি টাকা পাইবা।’ সে এ কথা বইলা চইলা যায় এবং বলে সিটি করপোরেশনের গেটে দেখা হবে।
আমি আর কালা রাসেল ভাই কিছুক্ষণ সেখানে থাইকা হোন্ডা নিয়া গুলশান-২ এর সিটি করপোরেশনের গেটের সামনে যাই। কালা রাসেল ভাই হোন্ডা চালাইছে। সেখানে যাইয়া চাক্কী রাসেল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। কালা রাসেল ভাই আর চাক্কী রাসেল ভাই অনেকক্ষণ নিজেরা কথা বলে। এর কিছুক্ষণ পর চাক্কী রাসেল একটা বিদেশী লোকরে দেখাইয়া দেয় ৯০ নম্বর রোডে। ঐ লোকটা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল। সে বলে ঐ লোকটারে গুলি করতে হবে। তখন আমি কালা রাসেল ভাইয়ের হোন্ডায় উঠি। কালা রাসেল ভাই হোন্ডা চালায়। আমরা ঐ লোকটিকে ওভারটেক কইরা ঘুইরা আসি। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। ৬টা থেকে সাড়ে ৬টা হবে। ঈদের পর হওয়ায় মানুষজনও তেমন একটা ছিল না। হোন্ডা ঘুরাইয়া ঐ বিদেশী লোকটার কাছাকাছি আসলে আমি হোন্ডা থেকে নেমে ঐ লোকটাকে পরপর চারটা গুলি করি। তারপর হোন্ডায় উইঠা চাক্কী রাসেলরে নিয়া গলি গলি ঘুইরা দ্রুত চইলা আসি। আমি ১২ নম্বর গলির মাথায় নাইমা যাই। তারা দুজন কালা রাসেল ভাইয়ের বাসার নিকট যায়। আমি সেখানে যাইয়া দুজনকে দেখি। আমি পিস্তলটা চাক্কী রাসেলকে দিয়া বাসায় চলে আসি।
পরেরদিন দুপুর বেলা আমাকে কালা রাসেল ভাই খবর দেয়। আমি সন্ধ্যার দিকে প্রাণআরএফএলের মাঠে যাইয়া কালা রাসেলকে দেখতে পাই। আমরা দুজন কথা বলতে বলতে কালা রাসেল ভাইয়ের বোনের ফ্ল্যাটের গলিতে যাই। সেখানে চাক্কী রাসেল আমাকে পিস্তলটা ভাঙ্গারি সোহেলকে দিয়া আসতে বলে। আমি কসাই গলিতে পিস্তলটা সোহেলকে দিয়ে আসি। আবার তাদের কাছে গেলে হাসতে হাসতে বলি ‘আমাকে দিয়া অনেক বড় কাজ করাইয়া ফেলাইছেন কিছু টাকা-পয়সা কি পাবো না?’ তখন তারা একজনের দিকে আরেকজন তাকাইয়া হাসে। বলে, টাকা তারা পায় নাই। পাইলে আমাকে দিবে। ঘটনার পরও কালা রাসেল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। এরপর পুলিশ আমাকে ধরে। পুলিশ ধরার আগ পর্যন্ত আমি এলাকায়ই ছিলাম। আমি এ ধরনের কাজ করার জন্য দুঃখিত। এই আমার বক্তব্য।
সেই প্রত্যক্ষদর্শী এখন নেই: সিজার তাভেলা হত্যাকাণ্ডের পর প্রত্যক্ষদর্শীরা গণমাধ্যমে এ বিষয়ে নানা তথ্য দেন। কিন্তু গত সোমবার এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের গণমাধ্যমের সামনে নিয়ে আসার পর প্রত্যক্ষদর্শীরা আগের মতো আর তথ্য দিচ্ছেন না। এমনকি আগে যে তথ্য দিয়েছেন তাও স্বীকার করতে চান না তারা। গতকাল দুপুরে গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কে ঘটনাস্থলে গেলে কথা হয় রিকশা মেরামতকারী জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে। সিজার তাভেলা হত্যার পর সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন জয়নাল। কিন্তু গতকাল সুর পাল্টে কথা বলেন তিনি। জয়নাল জানান, ২৮শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন তিনি। এসময় গুলির শব্দ শুনে ৯০ নম্বর সড়কের ঘটনাস্থলের দিকে তাকান। দৌড়ে দুই যুবক তখন মুহূর্তের মধ্যে ৮৩ নম্বর সড়কে রাখা মোটরসাইকেলে উঠে বসে তারা। মোটরসাইকেলে আগ থেকে অবস্থান করছিলো এক যুবক। তারা ওই সড়ক দিয়ে চলে যায়। এরআগে জয়নাল চেহারার বর্ণনা দিলেও গতকাল জানান, সন্ধ্যার সময় তাই চেহারা ও মোটরসাইকেল সেভাবে দেখতে পাননি তিনি।
এ ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সেতারা বেগম। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ৯০ ও ৮৩ নম্বর সড়কের মোড়ে ভিক্ষা করেন তিনি। পঙ্গু এই নারী রাতদিন সেখানেই থাকেন। গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে সেতারা বেগম সেখানে নেই। আশপাশের লোকজন জানান, সোমবার সকাল থেকেই তাকে দেখা যাচ্ছে না। পরবর্তীতে ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকায় আছেন তিনি। মা অসুস্থ থাকায় তাকে দেখতে সেখানে গিয়েছেন বলে জানান তিনি।  সেতারা বেগম জানান, ওইদিন মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলো যে ব্যক্তি তার পরনে ছিলো দুই দিকে লাল ও মধ্যে সামান্য সাদা রঙের ডোরাকাটা শার্ট। অন্য দুজনের পরনে ছিলো কালো গেঞ্জি। তবে মোটরসাইকেলের রঙের বিষয়টি তার মনে নেই বলে জানান।

ঘুমন্ত রেলওয়ের ঘুম ভাঙুক- অবিলম্বে শূন্যপদ পূরণ করুন

যাত্রীসাধারণের সুবিধার্থে প্রতিবেশী ভারত যেখানে রেলব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন করেছে, সেখানে আমরা এই যোগাযোগ মাধ্যমটির প্রতি ক্রমাগত অবহেলা ও উপেক্ষা দেখিয়ে আসছি, যা অগ্রহণযোগ্য। স্বাধীনতার পর রেলপথের রুট ও দৈর্ঘ্য দুটোই কমেছে। অভিযোগ আছে, বেসরকারি পরিবহন মালিকদের সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই বিভিন্ন রুটে রেলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অনেক জায়গায় এমনভাবে ট্রেনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে মানুষ বাসযাত্রায়ই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
রেলওয়ে মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করে এটিকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্তটি ছিল মারাত্মক ভুল। শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সরকারের আমলে আলাদা রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পর ধারণা করা গিয়েছিল, এই যোগাযোগ মাধ্যমটি হৃত গৌরব ফিরে পাবে। কিন্তু সাবেক রেলমন্ত্রী রেলওয়ের কালোবিড়াল ধরতে গিয়ে নিজেই এক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে পদত্যাগে বাধ্য হন। নতুন মন্ত্রী এসে নানা কারণে পত্রিকার শিরোনাম হলেও রেলওয়ের কোনো উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না।
ঘুমানোর সময়ও নেই চালকদের!
হালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে লোকবল ও অবকাঠামোগত সমস্যা প্রকট রূপ নিয়েছে। পত্রিকায় প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর আসে। গতকাল প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্যবাহী দুটি ট্রেনের চালককে একনাগাড়ে যথাক্রমে ১৭ ও ২০ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। আগে যেখানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা লাগত, এখন লাগে সাত ঘণ্টা।
আর পণ্যবাহী ট্রেনের পরিচালন সময়ও ১৪-১৫ ঘণ্টার স্থলে হয়েছে ২০-৩০ ঘণ্টা। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, রেলওয়েতে মাস্টার পদে ১৭১টি, সাব লোকোমাস্টার পদে ৫৩টি এবং সহকারী লোকোমাস্টারের ৮৮টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব শূন্য পদে অবিলম্বে দক্ষ ও যোগ্য লোক নিয়োগ করা প্রয়োজন। অন্যথায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ট্রেনচালকদের ঘুমানোর সময় দিতেই রেলওয়ের ঘুম ভাঙাতে হবে। তবে ফের যাতে রেলওয়েতে কালোবিড়াল আসন গেড়ে না বসতে পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

আইএসের দায় স্বীকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

বিদেশী নাগরিক হত্যাসহ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলায় আইএসের দায় স্বীকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলার পেছনে দায়ীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে দেশটি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র জন কিরবি এসব কথা বলেছেন। আইএসের দায় স্বীকার নিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের দায় স্বীকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। বাংলাদেশে আইএসের অবস্থান কতটা বাস্তব বা তারা কতটা সক্রিয়- এমন প্রশ্নের জবাবে কিরবি বলেন, বাংলাদেশে আইএস কতটুকু সক্রিয় বা আদৌ সক্রিয় কি-না তা বলা কঠিন। এটা নিশ্চিত করে বলার মতো অবস্থানে আমি নেই। তবে এখন তদন্ত চলছে। সেখানে যদি সহায়তার প্রয়োজন পড়ে আমরা তা দিতে চাই। দায় স্বীকারের বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। কিন্তু আমি মনে করি আমাদের জন্য বিচক্ষণতা হলো আইসিলের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া এবং আমরা সেভাবেই নিচ্ছি। এখানে প্রশ্নোত্তর পর্বের বাংলাদেশ অংশটুকু হুবহু তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইতালিয়ান এনজিওকর্মীসহ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। বাংলাদেশের ভেতরে আইসিস কতটা অনুপ্রবেশ করেছে এ বিষয়ে আপনার কাছে কোন তথ্য আছে কি?
উত্তর: হামলায় আইসিলের দায় স্বীকারের দাবি আমরা উদ্বেগের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছি। আর অন্য জায়গার মতো আমরা এসব দাবি গুরুত্বের সঙ্গে নিই। এসব হামলার পেছনে দায়ীদের শনাক্ত এবং বিচারের আওতায় আনতে আমরা বাংলাদেশ সরকার এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে তাদের অবস্থান গুরুতর কিনা?
উত্তর: আমি দুঃখিত, বুঝতে পারিনি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি কি বাস্তব?
উত্তর: বাংলাদেশে আইসিল কি মাত্রায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে বা তারা আদৌ তা করছে কি না সেটা বলা কঠিন। এটা নিশ্চিত করে বলার মতো অবস্থানে আমি নেই। কিন্তু এখন এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। এতে আমাদের সহায়তা দেয়ার প্রয়োজন হলে আমরা তা দিতে চাই। দায় স্বীকারের বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী বাহিনীর। এটা তাদেরই দায়িত্ব। কিন্তু আমি মনে করি আইসিলের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া আমাদের জন্য সমীচীন এবং আমরা সেভাবেই নিচ্ছি। কিন্তু প্রকৃত দায় স্বীকারের বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোন কিছু আমার কাছে নেই। বাংলাদেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর এটা তদন্ত করতে দেয়া এবং নিজেদের একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেয়া প্রয়োজন।

কুকুর ও মুগুর by সৈয়দ আবুল মকসুদ

পত্রিকায় খবরটি পড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমি লোকটিকে দেখতে যাই। কৌতূহলবশত নয়, সান্ত্বনা দিতেও নয়, একটি লম্পটকে শুধু স্বচক্ষে দেখতে। ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডের একটি বেডে লোকটি শুয়ে ছিল। তার মুখ চাদরে ঢাকা। ও রকম মুখ কেউই মানুষকে দেখাতে চায় না। তার পায়ের কাছে তার স্ত্রী মাথা নিচু করে বসে। তার ক্ষতিও সামান্য নয়।
ঘটনাটি হলো, লোকটির বিয়ের পর থেকেই তার অবিবাহিত শালির ওপর চোখ পড়ে। তাকে কুপ্রস্তাব দিতে থাকে। ফুসলানোতে কাজ না হওয়ায় সে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অতিষ্ঠ হয়ে একদিন শালি সম্মত হয়। লোকটি খুবই খুশি, তবে বুঝতে পারেনি যে শালির হাতে রয়েছে লুকানো নতুন ব্লেড। এক পোঁচ দিয়ে দুলাভাইয়ের যৌনাঙ্গ গোড়া থেকে কেটে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়। কর্তিত প্রত্যঙ্গটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ওই ওয়ার্ডে রোগী দেখতে এক বৃদ্ধাও গিয়েছিলেন। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘এই সব ছেলেদের মাদের উচিত জন্মের পরই...কেটে ফেলা।’
মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে ভদ্রমহিলা যৌনাঙ্গের কথ্য শব্দটি বলে ফেলেন। আমি তাঁকে বলতে চেয়েছিলাম, মা জানবেন কীভাবে যে তাঁর পুত্র ভবিষ্যতে শরীরের কোন প্রত্যঙ্গ দিয়ে পৈশাচিক অপরাধ করবে? কিন্তু হাসপাতালের করিডরে হালকা কথাবার্তার পরিবেশ ছিল না।
এভাবে কেউ কারও কোনো অঙ্গ কেটে ফেলা নির্মমতা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো নারীকে ধর্ষণ করা বা ধর্ষণে উদ্যত হওয়া জঘন্য ফৌজদারি অপরাধ। ওখানে দাঁড়িয়ে আমি সেদিন ভাবতে চেষ্টা করি, মেয়েটি এ কাজ না করে আর কী করতে পারত। কার অপরাধ বেশি? লোকটির নাকি তার শালির? মেয়েটি তার বোনের অবিশ্বাসী লম্পট স্বামীকে প্রশ্রয় দিলে কী হতে পারত? তাকে দুলাভাইয়ের লালসার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হতো। এবং লোকটি আরও অনেক মেয়ের সর্বনাশ ঘটাতে পারত। সেসবই গ্রহণযোগ্য হতো, নাকি এই অঙ্গচ্ছেদ সঠিক হয়েছে। আর একটি বিকল্প হতো, মেয়েটি দুলাভাইয়ের লাম্পট্যের কথা তার অভিভাবকদের কাছে প্রকাশ করে প্রতিকার চাইতে পারত। তা মারাত্মক পারিবারিক অশান্তি ডেকে আনত।
নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি। কিন্তু বর্তমানে যে উপসর্গ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা হলো, মেয়েশিশুর ওপর পৈশাচিক যৌন নিপীড়ন। গত চার মাসে তিন থেকে আট বছর বয়সী শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে অন্তত ১৫টি। পত্রপত্রিকায় আসেনি এমন আরও ঘটনা থাকা সম্ভব। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে কয়েকটি শিশু মারাও গেছে।
মারা না গিয়ে যারা বেঁচে আছে, তারাও আমৃত্যু এমন এক বীভৎস স্মৃতি বয়ে বেড়াবে, যা তাদের জীবনকে করে দেবে দুর্বিষহ।
যৌন অপরাধ ঠেকাতে বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন কঠোর আইন তৈরি হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার সরকার শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে নির্যাতনকারীকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে নপুংসক করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশে এ পদ্ধতি হবে খুবই উপযোগী।
আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ, ২১ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ প্রোসেতিও জানিয়েছেন, যৌন নির্যাতনকারীদের নপুংসক করে দেওয়ার জন্য সরকার আইন প্রণয়ন করছে। ইন্দোনেশিয়ায় সম্প্রতি মেয়েশিশুর ওপর কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়।
ওই দিন প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় এই নতুন আইন করার সিদ্ধান্ত হয়। অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট যৌন নির্যাতনকারীদের এই শাস্তির আদেশ জারি করবেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পার্লামেন্টে কোনো ভোটাভুটি ছাড়াই এটি আইনে পরিণত হবে। আইনের বিধানে বলা হয়েছে, অপরাধীর শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে স্ত্রী হরমোন ঢুকিয়ে দিয়ে শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনকারীকে নপুংসক করে দেওয়া হবে। এই শাস্তি কার্যকর হলে লম্পটেরা ওই জঘন্য অপরাধ করার আগে হাজারবার চিন্তা করবে পরিণতি সম্পর্কে, বলেন প্রোসেতিও।
যৌন নির্যাতনকারীদের নপুংসক করে দেওয়ার শাস্তির বিধান পোল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্যে রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশে শিশুর ওপর পৈশাচিকতার প্রবণতা ক্রমাগত বাড়ছে, তার প্রতিবিধানও হতে হবে কঠোরতর ও দৃষ্টান্তমূলক। প্রথাগত শাস্তি জেলে ঢুকিয়ে এ-জাতীয় অপরাধ দমন সম্ভব নয়। যেমন কুকুর তেমন মুগুর দরকার। আমাদের জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকেরা যত তাড়াতাড়ি ইন্দোনেশিয়ার মতো আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবেন, বাংলাদেশের মেয়েশিশুদের জন্য তত মঙ্গল। কারণ, বুনো ওলের জন্য বাঘা তেঁতুলের বিকল্প নেই।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

‘গরু বিতর্ক’ এবার দিল্লিতে by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলের পর ‘গরু বিতর্ক’ এবার ঢুকে পড়ল খোদ রাজধানী দিল্লিতে। এতে শুরু হলো নতুন এক কেন্দ্র-রাজ্য বিতর্ক।
রাজধানীতে কেরালা সরকারের নিজস্ব ভবনের ক্যানটিনে গরুর মাংস পরিবেশনের অভিযোগ পেয়ে দিল্লি পুলিশ সোমবার সন্ধ্যায় সরাসরি সেখানে গিয়ে রাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। ভবনের ভেতর ও বাইরে প্রচুর বাহিনীও মোতায়েন করা হয়।
এতে কেরালার কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী ওমেন চণ্ডী আজ মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশের এই আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। সমালোচনায় মুখর হন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সবার অভিযোগ, রাজ্য সরকারকে না জনিয়ে রাজ্য সরকারের ভবনে ঢুকে দিল্লি পুলিশ তার ঔদ্ধত্যের পরিচয় দিয়েছে। ব্যাপক এ সমালোচনার মুখে দিল্লি পুলিশ কমিশনার বি এস বাসসি অবশ্য জানিয়েছেন, তাঁরা আইন অনুযায়ীই কাজ করেছেন।
দিল্লিতে গরুর মাংস বা ‘বিফ’ বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় মহিষের মাংস। আর সেটা হয় আইন মেনেই। কেরালা ভবনের ক্যানটিনে সোমবারের মেন্যুতে ‘বিফ ফ্রাই’ বলে যা লেখা ছিল তা ওই মহিষের মাংসই। ‘হিন্দু সেনা’ নামে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা মেন্যুতে ‘বিফ ফ্রাই’ দেখে পুলিশকে ফোন করেন। পুলিশও বিরাট এক বাহিনী নিয়ে ওই ভবন ঘিরে ফেলেন। তারা সরাসরি ক্যানটিনে গিয়ে অভিযোগ নিয়ে খোঁজখবর শুরু করে। কেরালা ভবনের কর্তারা পুলিশকে জানান, মেন্যুতে বিফ ফ্রাই লেখা থাকলেও মহিষের মাংসই পরিবেশন করা হচ্ছে। সরকার অনুমোদিত কসাইখানা থেকেই তাঁদের মাংস সরবরাহ করা হয়। বেআইনি কিছু করা হচ্ছে না। নিষেধাজ্ঞাও অমান্য হয়নি।
ক্ষুব্ধ কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ওমেন চণ্ডী অভিযোগ করেন, দিল্লি পুলিশ তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করেছে। তারা রাজ্য সরকারের কর্তাদের জানিয়ে কেরালা ভবনে যেতে পারত। তা না করে রাজ্য সরকারের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দোষী পুলিশদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন ওমেন চণ্ডী।
এদিকে কেজরিওয়াল বলেন, দিল্লি পুলিশ বিজেপি-সেনার মতো আচরণ করেছে। মমতা নিন্দা জানিয়ে টুইটে বলেছেন, মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার এ এক অবিবেচক ছক।
অন্যদিকে ‘গরু বিতর্ক’ রাজনৈতিক মোড় নিচ্ছে দেখে দিল্লির পুলিশ কমিশনার তাঁর আচরণের ব্যাখ্যায় বলেন, আইন-শৃঙ্খলার স্বার্থেই তাঁরা গিয়েছিলেন। দিল্লি এগ্রিকালচারাল ক্যাটল প্রেজারভেশন অ্যাক্ট (১৯৯৪) অনুযায়ী চাষের কাজে ব্যবহৃত গরু বা বাছুর বা বলদের মাংস বিক্রি করা নিষিদ্ধ। অভিযোগ পেয়েই তাঁরা তদন্তে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল যাতে এ নিয়ে অশান্তি না ছড়ায়। কেরালা ভবনে যাওয়ার আগে পুলিশ কেন রাজ্য সরকারের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলেনি সেই ব্যাখ্যা পুলিশ কমিশনার দিতে পারেননি।
দিল্লির পুলিশ রাজ্য সরকারের অধীনে নয়। তারা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আজ্ঞাবহ। এ নিয়ে কেজরিওয়ালের সঙ্গে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সরকারের লড়াই লেগেই রয়েছে। গরু ও গো-মাংস নিয়ে বিজেপি ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা সারা দেশে অহেতুক উত্তেজনা ছড়াচ্ছে বলে কংগ্রেস, বাম ও অবিজেপি দলগুলোর অভিযোগ। দিল্লি পুলিশের এ আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে সাংবাদিকেরা আজ মঙ্গলবার কেরালা ভবনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।
সেপ্টেম্বর ৩০,বুধবার ২০১৫ -গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে গুজবের পরিণতিতে পিটিয়ে মারা হলো এক মুসলমান বৃদ্ধকে এবং গুরুতর আহত হলেন তাঁর পুত্র। রাজধানী দিল্লি থেকে ঢিল-ছোড়া দূরত্বে উত্তর প্রদেশের বৃহত্তর নয়ডার বিসাদা গ্রামে গত সোমবার রাতে এ ঘটনা ঘটে।
প্রতিবাদে পাঁচ কিলোমিটার দূরের মুসলিম প্রধান এক গ্রামের লোকজন বিক্ষোভ জানায়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তি দিতে হবে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িতে থাকার সন্দেহে মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আপাত শান্ত এই অঞ্চলে এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।যে এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে, সেই বিসাদা গ্রাম ও তল্লাটে কোনো দিন সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। গ্রামটিও সচ্ছল। নিহত মুহম্মদ আখলাখ (৫৮) শিক্ষিত ও মিশুক বলেই এলাকায় পরিচিত। শুধু তাই নয়, এবার কোরবানির ঈদেও নিহতের বাড়িতে গ্রামের হিন্দু প্রতিবেশীরা এসেছেন এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।
শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত এই গ্রামে এমন ঘটনা সবাইকে চমকে দিয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। আখলাখের মেয়ে সাহিবার মতে, একটা গুজবের ভিত্তিতে শতাধিক মানুষ বাড়িতে চড়াও হয়ে এভাবে তাদের আক্রমণ করবে, কোনো দিন তারা কল্পনাও করেননি।
গ্রামে একটা বাছুর দু দিন ধরে নিখোঁজ ছিল। সোমবার হঠাৎই গুজব ছড়ায়, আখলাখের জমিতে নাকি গরুর হাড় এবং বাড়ি থেকে গরুর মাংস পাওয়া গেছে।
গুজব ছড়ানোর কিছু পর স্থানীয় একটি মন্দির থেকে উসকানিমূলক কিছু ঘোষণা হয়। তার পরই শতাধিক লোক আখলাখের বাড়ি আক্রমণ করে। তারা ৫৮ বছর বয়সী আখলাখকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তার ২২ বছরের ছেলে দানিস গুরুতর আহত হন। একলাখের বাড়ির ফ্রিজে ছাগলের মাংস রাখা ছিল। আক্রমণকারীরা সেটাকে গরুর মাংস বলে দাবি করে। পুলিশ সেই মাংস আটক করে। বুধবার নয়ডা প্রশাসন জানায়, আটক মাংস গরুর নয়, ছাগলের।
বিজেপি শাসিত কিছু রাজ্যে গরুর মাংস কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন অংশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টি-শাসিত উত্তর প্রদেশে গরু জবাই ও মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এমন ঘটনায় প্রশাসন উদ্বিগ্ন। বিজেপির রাজ্য নেতারা গোটা ঘটনার জন্য রাজ্য পুলিশকে দোষী ঠাওরেছে।
আখলাখের পরিবারেরও অভিযোগ, ঘটনার এক ঘণ্টা পর পুলিশ আসে। বিসাদা গ্রাম ও তার আশপাশের এলাকায় ৮০০ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে। আহত দানিসের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার রুপি মঞ্জুর করা হয়েছে।
হামলার সময় বাড়িতে থাকা আখলাকের মেয়ে সাজিদা বলেন, ‘ওই রাতে গ্রামের শতাধিক বাসিন্দা আমাদের বাড়িতে আসে। তারা আমাদের বাড়িতে গরুর মাংস রয়েছে বলে অভিযোগ করে এবং দরজা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে আমার বাবা ও ভাইকে পেটাতে শুরু করে। তারা আমার বাবাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায় এবং ইট দিয়ে আঘাত করতে থাকে। পরে আমরা জানতে পেরেছি মন্দির থেকেই আমাদের বাড়িতে গরুর মাংস রয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।’
গৌতম বুদ্ধ নগরের জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার কিরন এস জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই মন্দিরের পুরোহিতকে প্রথমে আটক করা হলেও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নিহত আখলাকের ঘর থেকে পাওয়া মাংস গরুর কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

১৩ নভেম্বর পৃথিবীতে আছড়ে পড়বে স্পেস জাঙ্ক

পাঁচ লাখেরও বেশি আবর্জনা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে
ঘুরছে বলে দাবি করেছে নাসা। ছবি: স্পেস ডটকম
১৩ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে ৪০ মাইল দূরে ভারত সমুদ্রে একটি ‘রহস্যময় স্পেস জাঙ্ক’ আছড়ে পড়তে পারে। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। মহাকাশীয় বস্তুটি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় একে রহস্যময় বলা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা বলছেন, এর আকার হতে পারে ৭ ফুটের মতো। এই স্পেস জাঙ্ক বা মহাকাশ আবর্জনাটি অবশ্য কোনো গ্রহাণু নয়। এটি মানবসৃষ্ট কোনো যানের ধ্বংসাবশেষ হতে পারে। সম্প্রতি মহাকাশে বিস্ফোরণের শিকার হওয়া কোনো রকেটের টুকরা কিংবা অ্যাপোলো মিশনে ব্যবহৃত কোনো যন্ত্রের টুকরাও হতে পারে এটি।
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার ক্যাটালিনা স্কাই সার্ভের গবেষকেরা বস্তুটি প্রথম শনাক্ত করেছেন। তাঁরা পৃথিবীর সন্নিকটে আসা গ্রহাণু ও ধূমকেতু খোঁজার সময় এই বস্তুটির সন্ধান পান। তাঁরা একে ডাকছেন ‘ডব্লিউটি১১৯০এফ’ বা ‘ডব্লিউটিএফ’ নামে।
নেচার সাময়িকীকে হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফল অ্যাস্ট্রোফিজিকসের গবেষক জোনাথন ম্যাকডাওয়েল বলেছেন, ‘মহাকাশ ইতিহাসের হারানো একটি টুকরো যা আবার পৃথিবীতে ফিরে আসছে।’
জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সফটওয়্যার নির্মাতা বিল গ্রে দাবি করেছেন, ‘ডব্লিউটি১১৯০এফ’ উপবৃত্তকার কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ লাখেরও বেশি আবর্জনা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এর মধ্যে প্রতি বছরই কিছু আবর্জনা কক্ষচ্যুত হয়ে পৃথিবীতে পড়ে। এ ধরনের আবর্জনার বেশির ভাগই পৃথিবীতে ফেরার আগেই বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। তবে পৃথিবীতে পড়লে তা বিপদ ঘটাতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, স্পেস জাঙ্কটি বায়ুমণ্ডলে পুড়ে বেশির ভাগ ধ্বংস হয়ে যাবে। যেটুকু অবশিষ্ট থাকবে তা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়বে, যেখানে কোনো মানববসতি নেই। (তথ্যসূত্র: এক্সপ্রেস, ডেইলি মেইল, জিনিউজ)

চীন-জাপানের স্মৃতির লড়াই by মনজুরুল হক

স্মৃতি হচ্ছে মানব ইতিহাসের চমৎকার এক সম্পদ। মানুষের স্মৃতিচারণা ইতিহাসের অজানা অনেক ঘটনার ভেতরের কাহিনি আমাদের সামনে উন্মোচন করে দিতে সক্ষম। সেদিক থেকে স্মৃতি আবার মানুষের শত্রুও বটে। অপ্রীতিকর অতীতকে ঢেকে রাখার জন্য স্মৃতি নিধনের খেলাও তাই মানবসভ্যতায় নতুন কিছু নয়। ফলে আগামীর অনাগত প্রজন্মের জন্য স্মৃতিকে ধরে রাখা হচ্ছে ইতিহাসের সঠিক পথের দিশা, ভবিষ্যতের বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার বিশ্বাসযোগ্য একটি উপায়।
সে রকম ভাবনা থেকেই জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান সংগঠন ইউনেসকো ১৯৯২ সালে বিশ্বের স্মৃতি নামের একটি স্মৃতি সংরক্ষণ কর্মসূচি চালু করে, যার লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের দালিলিক নানা রকম ঐতিহ্য একক একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংরক্ষণ করে সারা বিশ্বের জন্য সেগুলোর প্রাপ্তি সহজ করে দেওয়া। প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ও এর কাঠামো ঠিক হয়ে যাওয়ার পর ১৯৯৭ সাল থেকে ইউনেসকো নথিবদ্ধ হওয়া সংরক্ষিত স্মৃতির তালিকা প্রকাশ করতে শুরু করে। সেই তালিকা এরপর থেকে প্রতিবছর দীর্ঘায়িত হয়ে এখন বিশাল এক ভান্ডারে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসের নানা রকম যেসব উপাদান এখন এতে যুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে খ্রিষ্টপূর্ব ১৭ শতকের প্রামাণিক দলিলপত্র থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্সের কমিউনিস্ট ইশতেহারের মূল কপি এবং চিলিতে ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার দলিলপত্র অন্তর্ভুক্ত আছে। ফলে বিস্তৃতি আর বিষয়বস্তু উভয় দিক থেকে বিশ্বের স্মৃতি ক্রমেই হয়ে উঠছে অতীতের পৃথিবীকে জানতে পারার নির্ভরযোগ্য এক সূত্র।
বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে পাওয়া সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র পরীক্ষা করে দেখার পর বিশ্ব স্মৃতি প্রকল্পের একটি উপদেষ্টা পরিষদ বছরে একবার নতুন সংযোজনার তালিকা ঘোষণা করে থাকে। এ বছর উপদেষ্টা কমিটির তিন দিনের দ্বাদশ বৈঠকটি বসেছিল আবুধাবিতে চলতি মাসের ৪ তারিখ থেকে। প্রায় ৫০টি নতুন নথিপত্র এবারের বৈঠকে উপদেষ্টা কমিটি অনুমোদন করেছে, সেগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে জমা দেওয়া বান্দুংয়ে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশিয়া বৈঠকের সংরক্ষিত দলিল এবং সার্বিয়ার পক্ষ থেকে জমা দেওয়া দেশটির বিরুদ্ধে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের যুদ্ধ ঘোষণা করে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই পাঠানো টেলিগ্রাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সব রকম অনুমোদন যে সব সময় সব কটি দেশকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না, সেই প্রমাণও অবশ্য এবারের অনুমোদন অনেক বেশি স্পষ্ট করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়।
চীনের পক্ষ থেকে যে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনাবলির দালিলিক প্রমাণপত্র বিশ্বের স্মৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ বছর জমা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে, ১৯৩৭ সালের নানজিং গণহত্যা এবং জাপানের সামরিক বাহিনী ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকের প্রথমার্ধে চীনের বিস্তৃত এলাকা দখল করে নেওয়ার পর সৈনিকদের যৌনসেবা দেওয়ার জন্য যৌনদাসী নামে পরিচিত জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া চীনা রমণীদের বিষয়টি। চীনের এ দুটি মনোনয়ন নিয়েই জাপান অবশ্য শুরু থেকেই প্রবল আপত্তি জানাতে থাকে।
জাপানের অবস্থান হচ্ছে এ রকম যে যৌনদাসীর বিষয়টি বিশ্বজুড়ে যুদ্ধকালীন প্রচলিত থাকা নিয়মের বাইরের কিছু নয় এবং বিশ্বের অনেক দেশই অতীতে তা করেছে। ফলে শুধু জাপানকে দায়ী করা হলে তা পক্ষপাতমূলক হতে বাধ্য। এ ছাড়া জাপান আরও মনে করে যে চীন কিংবা অন্যান্য দেশের সেই সব রমণীকে জোর করে ধরে এনে যৌনদাসী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়নি, বরং অর্থ উপার্জনের জন্য স্বেচ্ছায় তাঁরা সেই পথে পা বাড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে, নানজিং গণহত্যা নিয়ে জাপান সরকার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে ইউনেসকোকে জানিয়েছিল যে বেসামরিক কিছু চীনা নাগরিক সেই ঘটনায় নিহত হলেও নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কোনো অবস্থাতেই চীনের দাবি করা তিন লাখের কাছাকাছি নয়। সন্দেহ নেই, অতীতের সেই কলঙ্ককে জাপান কলঙ্ক বলে মেনে নিতে রাজি নয়, বরং অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই জাপানের বর্তমান নেতৃত্ব সেটাকে দেখে থাকে। ফলে কলঙ্কের দায়মুক্ত হতে চীনের সুপারিশ করা বিশ্বের সেই স্মৃতি মনোনয়নের বিরুদ্ধে প্রচারযুদ্ধে জাপান সরকার অবতীর্ণ হয়।
গত বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে জাপানের সরকারি পর্যায়ের সম্পর্কের ক্রমাবনতি এখন দেশ দুটিকে অনেকটা যেন উত্তপ্ত বাগ্যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছে, যার সর্বশেষ উন্মুক্ত প্রকাশ আমরা দেখছি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। স্মৃতি তাই কারও জন্য ইতিহাসের আবশ্যকীয় উপাদান বিবেচিত হলেও কারও কাছে তা যে বিড়ম্বনা হয়ে দেখা দেয়, জাপানের এই সাম্প্রতিক আচরণ সেই প্রমাণ আবারও আমাদের সামনে তুলে ধরছে। নানজিং গণহত্যা কিংবা যৌনদাসী—কোনোটাকেই জাপানের ক্ষমতাসীন মহল ঘটে যাওয়া ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়। জাপানের এ রকম জোরালো আপত্তির মুখে ইউনেসকোর উপদেষ্টা কমিটি শেষ পর্যন্ত চীনের দুটি সুপারিশ থেকে একটিকে গ্রহণ করে নিয়ে অন্য আবেদনটি নাকচ করে দিয়েছে। বিশ্বের স্মৃতিতে সর্বশেষ অন্তর্ভুক্ত চীনের সেই সুপারিশটি হচ্ছে নানজিংয়ের গণহত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত দলিলপত্র।
তবে জাপান কিন্তু এতেও সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আবুধাবি বৈঠকের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পর জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রচারিত এক বিবৃতিতে উষ্মা প্রকাশ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ইউনেসকোর বিরুদ্ধে আনা হয়। জাপানে জাতীয়তাবাদী চেতনার নবজাগরণ–প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব প্রদানকারী দেশের বর্তমান প্রশাসন মনে হয় অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব মেনে নিতে রাজি নয়। জার্মানির দৃষ্টান্ত জাপানের সামনে থেকে গেলেও সেই একই পথে পা বাড়াতে দেশের নেতৃত্ব নারাজ। ফলে ইতিহাসের নিজস্ব ব্যাখ্যা তুলে ধরাকেই টোকিওর নীতিনির্ধারকেরা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। তবে সে রকম অনমনীয় অবস্থান যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সুনাম বৃদ্ধিতে সহায়ক নয়, জাপানের নেতৃত্ব মনে হয় সেটা বিবেচনায় নিচ্ছে না।
নানজিং গণহত্যায় ঠিক কতজন নিহত হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তাই বলে ঘটনার গুরুত্বকে অস্বীকার করা হলে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি এবং নিপীড়নের শিকার হওয়া একটি জাতির প্রতি অসম্মানই এর মধ্য দিয়ে করা হয়। জার্মানি যেমন নাৎসি অপরাধের জন্য নতজানু হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেই বসে থাকেনি, বরং আইন করে যেকোনো রকম নাৎসি তৎপরতা দেশজুড়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, জাপানের বেলায় সে রকম কিছুই কিন্তু দেখা যায় না। ফলে যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের অপরাধের বিষয়টিও যেন হয়ে ওঠে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। আর সে রকম পরিবেশ নতুন করে উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে জুগিয়ে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় ইন্ধন।
ইউনেসকোর বিশ্বের স্মৃতি প্রকল্পে বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের নানা রকম উপাদান ইতিমধ্যে সংযুক্ত হলেও বাংলাদেশ কিন্তু এখন পর্যন্ত তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। এ বছরও কোনো রকম সুপারিশ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করা হয়নি। এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধকালীন পাকিস্তানি শোষণ ও গণহত্যার বিষয়েও কোনো দলিলপত্র বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বিবেচনার জন্য দাখিল করেনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা না অজ্ঞতা, তা এই নগণ্য কলাম লেখকের বোধগম্য নয়।
তবে আমাদের সেই মহান ঐতিহ্য আর সাম্প্রতিক ইতিহাসের পাশাপাশি অতীতের আরও অনেক কিছু বিশ্বের স্মৃতিতে কীভাবে যুক্ত করে নেওয়া যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরুর প্রক্রিয়ায় মনে হয় আর বিলম্ব করা উচিত নয়।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।