Monday, August 8, 2016

আকাশে মাথা তুলবে জাপানের ‘স্কাই মাইল টাওয়ার’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন ‘বুর্জ আল খলিফা’র তুলনায় দ্বিগুণ উচ্চতার ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে জাপান। ভূমি থেকে এক মাইল বা ১৬০০ মিটার পর্যন্ত উপরে উঠে যাওয়া এই ভবনের নাম ‘স্কাই মাইল টাওয়ার’। সিএনএন জানায়, নেক্সট টোকিও ২০৪৫ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই আবাসিক দালানটি নির্মাণ করা হবে। উপকূলবর্তী শহরগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনছে- তেমন দৃষ্টান্তই স্থাপন করা হবে এটি স্থাপনের মাধ্যমে। একটি শহরের আদলে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রেখে ৫৫ হাজার মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে ভবনটিতে। তবে খাড়া এক মাইল উঁচু পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা অনেক ব্যয়বহুল হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্কাইক্যাপার বিশেষজ্ঞরা। তারা আরও বলছেন,
এমারল্যান্ডের ভূমিকম্প প্রবণ উপকূলটি এ ধরনের ভবন নির্মাণের জন্য কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া বাতাসের গতিপথ ঠিক রাখার জন্য ভবনের মাঝে মাঝে বাতাস চলার রাস্তা না রাখলে তা ভবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু এই আশংকাগুলো উড়িয়ে দিয়েছেন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দুই প্রতিষ্ঠান। কন পেডারসন ফক্স অ্যাসোসিয়েশন এবং লেসলি ই রবার্টসন অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজকের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য গড়ে তোলা হচ্ছে এই জাপানকে। সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা জয় করে এক ভবনেই একটি শহর গড়ে তোলা হবে। পানি, ভূমিকম্প, বায়ুপ্রবাহ- কোনোকিছুই সমস্যার কারণ হবে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, টাইফুন মোকাবেলাসহ দুর্যোগ সামলানোর সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকবে স্কাই মাইল টাওয়ারটির। ভবিষ্যতের শহর বলতে ভিন্ন ধারার এই প্রকল্পের নতুন শহরের নাম হিসেবে প্রস্তাব করা আছে ‘নেক্সট টোকিও’ নামটি। তাহলে আকাশ ফুঁড়েই কি মেঘের উপর উঠে যাবে ভবিষ্যতের পৃথিবী।

আলেপ্পোর অস্ত্রাগারে অতর্কিত হামলা

সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে অস্ত্র ও সরঞ্জাম নিয়ে একটি
পরিখার ভেতরে অবস্থান নিয়েছে বিদ্রোহী আল নুসরা
ফ্রন্টের (বর্তমান নাম ফাতেহ আল শাম) যোদ্ধারা -এএফপি
সরকারি বাহিনীর অবরোধ ভাঙার চেষ্টারত সিরীয় বিদ্রোহীরা আলেপ্পো শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রাগারে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছে। শুক্রবার রাতে ওই অস্ত্রাগারে হামলা চালিয়ে সেটির কিছু অংশ দখলে নিয়েছে বলে দাবি করছে বিদ্রোহীরা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘দ্য সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস’ বলছে, ওই ঘাঁটির কিছু অংশ দখলে নিয়েছে বিদ্রোহীরা। তবে সিরীয় সেনাবাহিনী পাল্টা দাবি করেছে, তারা বিদ্রোহীদের ওই হামলা ব্যর্থ করে দিয়েছে এবং শত শত বিদ্রোহীকে হত্যা করেছে। বিবিসির খবরে বলা হয়, আল কায়দা সমর্থিত ‘জেইস আল ফাতাহ’সহ বেশ ক’টি বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিলে শুক্রবার প্রথমে আলেপ্পোর দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় রামৌসাহ এলাকার অস্ত্রগুদামে হামলা চালায়। পরে তারা নিকটবর্তী আরও একটি অস্ত্রাগারে হামলা চালায়। এ সময় সরকারি সেনারা তাদের প্রতিহত করে বলে স্থানীয় পত্রিকা দাবি করেছে। ওই অস্ত্র ঘাঁটির দখলকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে এখনও লড়াই চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সিরিয়ার বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর পূর্বাংশের আবাসিক এলাকগুলোর সাতটি অংশ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এসব অংশে প্রায় আড়াই লাখ লোকের বাস। বিদ্রোহীদের দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে গোলন্দাজ ঘাঁটিটি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। এ ঘাঁটিতে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রের মজুদ আছে। এখান থেকে আলেপ্পোর বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত অংশগুলোত নিয়মিত গোলাবর্ষণ করা হতো।
বিদ্রোহীদের প্রকাশিত একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিদ্রোহী যোদ্ধারা ওই স্থাপনার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে এবং অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নিয়েছে। অবশ্য সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, ওই গুদামটি দখলে নেয়ার চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে সরকারি সেনারা এবং তাদের হামলায় বহু বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। আইএসের কাছ থেকে মানবিজ দখলে নিল বিদ্রোহীরা : মার্কিন সমর্থিত কুর্দি ও আরব বিদ্রোহী যোদ্ধাদের জোট দ্য সিরিয়া ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দখলে থাকা মানবিজ শহরের ওপর ‘প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে দাবি করেছে। বিবিসির খবরে বলা হয়, ভৌগোলিক কারণে মানবিজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শহরটি তুরস্ক সীমান্তে অবস্থিত। দুই বছর ধরে এটি আইএসের দখলে রয়েছে। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, মানবিজ শহরে এখনও কিছু আইএস সদস্য রয়েছে। মানবিজের মধ্য দিয়ে রাকা থেকে তুর্কি সীমান্ত এবং আলেপ্পোর আইএসের দখলে থাকা এলাকায় জঙ্গিগোষ্ঠীটি সংযুক্ত থাকত এবং রসদ সরবরাহ করত। সিরীয় বাহিনী দুই মাস আগে আইএসের কাছ থেকে মানবিজ শহরের দখল নিতে লড়াই শুরু করে। জুনের মানবিজের একাংশের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বিদ্রোহীদের দখলে। সিরিয়ান অবজারভেটরি জানিয়েছে, শহরের ভেতর থেকে সাধারণ সিরীয়রা বেরিয়ে আসছেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, আইএস শহর ছাড়ছে।

পুঁজি, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন

পুঁজি বিত্তবানদের হাত থেকে দরিদ্র মানুষের কাছে স্থানান্তরিত হলেই শিল্পায়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন হবে- সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদদের এই ধারণাটি পুঁজির স্বাভাবিক চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ পুঁজির ধর্মই হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বা কতিপয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে কেন্দ্রীভূত হওয়া। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয়, পুঁজির ধর্ম হচ্ছে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে বিত্তবানদের ভাণ্ডারে কেন্দ্রীভূত হওয়া। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদরা সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বিপরীত স্রোতে ধাবিত করতে চান। অন্যদিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তারা মনে করেন, যিনি সৃজনশীলতা প্রয়োগ করে পুঁজি আহরণ করবেন, এর উপর সম্পূর্ণ অধিকার তারই। এখানে রাষ্ট্র বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ করার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। কারণ ইচ্ছা করলেই সবাই বিত্ত আহরণ করতে পারেন না। এটা একটি বিশেষ যোগ্যতাও বটে। তাই যিনি নিজ যোগ্যতা বলে সম্পদ আহরণ করবেন তিনি তার ভাগ কেন অন্যকে দেবেন? তারা আরও বলেন, পুঁজির স্বাভাবিক যে প্রবণতা অর্থাৎ দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে বিত্তবানদের ভাণ্ডারে স্থানান্তরিত হওয়া, সেটাও সব সময় খারাপ নয়। কারণ বিত্তবানরাই জানে কিভাবে পুঁজির সর্বোত্তম ব্যবহার বা প্রয়োগ নিশ্চিত করে আরও সম্পদ তৈরি করা যায়। সম্পদই সম্পদ সৃষ্টি করে এটা তারা বিশ্বাস করে। প্রচুর টাকা একজন সাধারণ দরিদ্র মানুষের কাছে প্রদান করা হলেই তিনি অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন সাধন করতে পারবেন এমনটি নাও হতে পারে। কারণ পুঁজি কিভাবে আরও লাভজনকভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটা তার জানা নাও থাকতে পারে।
কিন্তু যিনি বিত্তবান তিনি বিত্ত আহরণের কোনো না কোনো কৌশল সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন। কাজেই তিনি চেষ্টা করলেই প্রাপ্ত নতুন পুঁজি ব্যবহার করে আগামীতে তার বিত্ত আরও স্ফীত করতে পারবেন। এছাড়া সম্পদ বা পুঁজি সামান্য বিত্তবান মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হওয়াটাও সব সময় খারাপ নয়। কারণ বিত্তবানের হাতে যদি পুঁজি সঞ্চারিত হয় তাহলে তিনি তার কোনো অপব্যবহার করবেন না, বরং তিনি এই পুঁজিকে বিত্ত বাড়ানোর কৌশল হিসেবে কাজে লাগাবেন। এতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। সাধারণ দরিদ্র মানুষ বিত্তবানের সৃষ্ট শিল্প-কারখানায় কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান কিছুটা হলেও উন্নত করতে পারবেন। অন্যদিকে পুঁজি যদি সাধারণ দরিদ্র মানুষের হাতে পতিত হয় তাহলে তার অপব্যবহার হওয়ার আশংকা থাকে। কারণ সাধারণ দরিদ্র মানুষের মৌলিক ভোগ চাহিদা বেশি থাকায় তারা প্রাপ্ত পুঁজি উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না করে ভোগবিলাসে ব্যয় করতে পারেন। কারণ সাধারণ মানুষ সব সময়ই মৌলিক ভোগ চাহিদাজনিত সংকটে ভোগেন। এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য রেমিটেন্স আয় করেছে। গত অর্থবছরেও সমপরিমাণ বা তারও বেশি রেমিটেন্স অর্জন করবে বলে আশা করা যায়। এই বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্সের প্রায় সবটুকুই এসেছে গ্রামাঞ্চল থেকে বিদেশে গমনকারী দরিদ্র মানুষের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। তারা বিদেশে ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠিয়েছেন।
কিন্তু স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিরা সেই টাকা খুব বেশি উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করেননি। বরং তারা এ অর্থ দিয়ে ফ্রিজ, টেলিভিশন বা এ ধরনের বিলাস সামগ্রী ক্রয় করেছেন। তারা নিজেদের সামাজিক অবস্থান বাড়ানোর জন্য যা কিছু করা দরকার তার সবই করেছেন। জমি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। প্রচুর ব্যয় করে ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রাপ্ত অর্থের পুরোটাই তারা নানা অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু শিল্প-কারখানা স্থাপন করে এই পুঁজির দ্বারা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নতির পথ সুগম করেননি। ফলে মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার বর্তমান অবস্থায় দৃশ্যত অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করলেও তারা ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য তেমন কিছুই রেখে যেতে পারছেন না। এমনকি দেশ ও জাতির জন্যও তাদের অবদান খুবই সামান্য। কিন্তু এই রেমিটেন্স যদি কোনোভাবে দেশের বিত্তবানদের হস্তগত হতো, তাহলে তারা তা দিয়ে নানা ধরনের শিল্প-কারখানা স্থাপন করতেন। এই শিল্প-কারখানা স্বীয় পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণেও ব্যবহৃত হতে পারত। কারণ এসব শিল্প-কারখানায় প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারত। কাজেই পুঁজি শুধু দরিদ্র মানুষের হাতে গেলেই তা কল্যাণ বয়ে আনবে তা নাও হতে পারে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুঁজি বিত্তবানদের হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার মধ্যেও কল্যাণ নিহিত থাকতে পারে। অবশ্য নিয়ন্ত্রণবিহীনভাবে পুঁজির ব্যবহার কোনোভাবেই কল্যাণজনক হতে পারে না। আমরা যদি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনা করি তাহলে যে চিত্র পাই, তা কোনোভাবেই আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশে পুঁজি স্থানান্তরের মিশ্র প্রভাব লক্ষ করা যায়।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে বিত্তবান ও বিত্তহীনের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র দু’জন। বর্তমানে দেশে কোটিপতির সংখ্যা সঠিকভাবে কেউই বলতে পারবে না। কারণ অবৈধপথে অনেকেই কোটিপতি হয়েছেন। যাদের আয় দিয়ে দিন চলার কথা নয় তারাও কোটিপতি হয়েছেন। দেশের অর্জিত সম্পদ সামান্য কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। আমরা যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছি তার সুফল সবাই পাচ্ছে না। আগে গ্রাম থেকে পুঁজি শহরের দিকে ধাবিত হতো। কিন্তু এখন পুঁজি শহর থেকে গ্রামের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। তারপরও জাতীয় অর্থনীতিতে শহরের অবদান এখনও বেশি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৯ শতাংশ গ্রামে বাস করে। কিন্তু অর্থনীতিতে এখনও শহরের অবদান ৬০ শতাংশের বেশি। পুঁজি বিত্তবানদের হাতে পুঞ্জীভূত হলে উৎপাদনশীল খাতে তা ব্যবহৃত হবে- পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের এই সাধারণ ধারণা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে। দেশের সামান্য কিছু মানুষের হাতে পুঁজির পাহাড় গড়ে উঠছে ঠিকই, কিন্তু সেই পুঁজি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। বরং তা দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই পাচারকৃত টাকা আর কখনোই উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশীদের জমাকৃত টাকা ১০ শতাংশ বেড়েছে এক বছরের ব্যবধানে। সুইজারল্যান্ডে যে টাকা জমা হয়েছে তার সবই অবৈধভাবে উপার্জিত বলে মনে করা যেতে পারে। বস্তুত বৈধ বা অবৈধ পথে কিছু মানুষের হাতে প্রচুর টাকা পুঞ্জীভূত হচ্ছে। কিন্তু এ টাকা দেশের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে পাচার হচ্ছে।
পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের দেয়া সূত্রানুযায়ী, পুঁজি বিত্তবানদের হাতে সঞ্চারিত হলেই যদি বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পাওয়া যেত তাহলে বাংলাদেশ তো বিনিয়োগে ভরে যেত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। পুঁজি বিনিয়োগের জন্য সাধারণ যেসব শর্ত পরিপালিত হতে হয় তার বেশির ভাগই আমাদের দেশে অনুপস্থিত। তাই চেষ্টা করলেও বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় হচ্ছে না। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের মাধ্যমে যে পুঁজি গঠিত হয় তা বিনিয়োগের জন্য প্রচলিত বিনিয়োগ সুবিধার বাইরেও কিছু বিশেষ সুবিধা দিতে হয়। যেমন, তাদের উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগকালে উপার্জনের পদ্ধতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না এ ধরনের একটি নিশ্চয়তা তারা আশা করে। কোনো কারণেই পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা হবে না এটাও তারা কামনা করে। বাংলাদেশের বিত্তবানদের মাঝে কিছুটা হলেও নেতিবাচক অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে পল্লী এলাকা থেকে শহরে পুঁজি প্রবাহিত হতো। সেই পুঁজি শহরে এসে নানা ধরনের শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ হতো। কিন্তু এখন শহর থেকে পুঁজি গ্রামের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু সেই পুঁজি ভোগবিলাসে যতটা ব্যবহৃত হচ্ছে ততটা বিনিয়োগে আসছে না। অন্যদিকে শহুরে মানুষের কাছে যে পুঁজির পাহাড় গড়ে উঠছে, তা স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ না হয়ে দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের মতামত ভ্রান্ত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। চূড়ান্ত বিবেচনায় আমরা বলতে পারি, পুঁজি শুধু বিত্তবানদের হাতে গেলেই তা বিনিয়োগের নিশ্চয়তা বিধান করে না। এজন্য আরও অনেক কিছু করার আছে।
এমএ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

কেন বন্ধু দিবস

হঠাৎ রাস্তায় অফিস অঞ্চলে হারিয়ে যাওয়া মুখ চমকে দিয়ে বলে বন্ধু কী খবর বল কত দিন দেখা হয়নি। পৃথিবীর অন্যতম নিষ্পাপ সম্পর্কের একটি হল ‘বন্ধুত্ব’। একে অন্যের সুখে-খুশিতে লাফিয়ে ওঠার; একে অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর। মন খুলে কথা বলা, হেসে গড়াগড়ি খাওয়া আর চূড়ান্ত পাগলামি করার একমাত্র আধার এ ‘বন্ধুত্ব’। বন্ধুত্ব কোনো বয়স মেনে হয় না, ছোট-বড় সবাই বন্ধু হতে পারে। তবে হ্যাঁ, বয়সের ব্যবধানের কারণে ছোটদের প্রতি স্নেহ আর বড়দের প্রতি সম্মানটা থাকা অত্যাবশ্যকীয়। বন্ধুত্বের মধ্যে যে জিনিসটা থাকা চাই তা হল ‘ভালোবাসা’। আত্মার সঙ্গে আত্মার টান থাকতেই হবে। আজকাল আধুনিকতার স্পর্শে এ ‘বন্ধু’ শব্দটির বদলে মানুষ ইংরেজি ‘ফ্রেন্ড’ শব্দটিতেই বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলা ‘বন্ধু’ শব্দটির মাঝে যে আবেদন আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ছোটকালে বাংলা ব্যাকরণে আমরা সবাই শিখেছি- বন্ধু (পুংলিঙ্গ) ও বান্ধবী (স্ত্রীলিঙ্গ)। তবে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ‘বন্ধু’ শব্দটি প্রয়োগযোগ্য।
বন্ধুত্বের জন্য কোনো ক্ষণ লাগে না। তবুও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে একটি নির্দিষ্ট দিনে ‘বন্ধু দিবস’ পালন করা হয়ে থাকে। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও প্রতিবছরের আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে বন্ধু দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে এ দিবসটির প্রচলন বিগত শতাব্দীর শেষাংশে হলেও এখন তা সারা দেশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে গেছে। বন্ধু দিবসের সূচনা নিয়ে ভিন্ন দুটি তথ্য আছে। একপক্ষের মতে, বন্ধু দিবসের ধারণা ও উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে প্রথম ‘বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়েছিল। এ দিনটির মধ্য দিয়ে পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের মধ্যে কার্ড, উপহার বিনিময় করত। আর তখন থেকেই নাকি বন্ধু দিবসের উৎপত্তি। অন্যপক্ষের মতে, ১৯৩৫ সালে আমেরিকান সরকার এক ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ওই ব্যক্তির এক বন্ধু আত্মহত্যা করে। সেই দিনটি ছিল আগস্ট মাসের প্রথম রোববার। তখন থেকেই জীবনের নানা ক্ষেত্রে বন্ধুদের অবদান আর আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে আমেরিকান কংগ্রেস ১৯৩৫ সালের আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে ‘বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে বেশকিছু দেশ বন্ধু দিবসের সংস্কৃতিকে সাদরে গ্রহণ করে। এভাবেই বন্ধু দিবস পালনের প্রসার ঘটতে থাকে।
বন্ধু দিবসের সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে হলুদ গোলাপ আর ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডের মতো বিষয়গুলোও। এ ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডের ধারণাটিও এসেছে আমেরিকা থেকে। আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই বন্ধুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যান্ড দেয়ার রীতি চালু ছিল। তারা তাদের বন্ধুদের জন্য নিজেরাই ব্যান্ড তৈরি করত। আর যাকে ব্যান্ড দেয়া হতো, সে কখনোই ব্যান্ডটি খুলে রাখত না। অপরদিকে, বন্ধুত্বের প্রতীক হলুদ গোলাপের হলুদ রংটি হল আনন্দের প্রতীক। হলুদ গোলাপ মানে যে শুধু আনন্দই তা কিন্তু নয়; এটি প্রতিশ্র“তিরও প্রতীক। এমন তথ্যও রয়েছে যে, বন্ধুদের মাঝে জিনগত সাদৃশ্য থাকে! এক গবেষণার মাধ্যমে একদল বিজ্ঞানী এ তথ্য জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ফার্মিংহাম হার্ট স্টাডির ওই গবেষণায় বলা হয়, মানুষ নিজের সঙ্গে জিনগত সাদৃশ্যপূর্ণ মানুষকে সাধারণত বন্ধু হিসেবে বাছাই করে থাকে। আর সেই মিল এতটাই বেশি যে তা অনেকটা কাজিন ভাইবোনের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনীয়। জানা যায়, গবেষকরা ১ হাজার ৯৩২ মানুষের ওপর জরিপ চালান। আত্মীয়দের বাইরে তাদের বন্ধু-বান্ধব ও অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণও করা হয়। একই সামাজিক পরিমণ্ডলের মানুষের জিনে প্রায় এক শতাংশ মিল পাওয়া যায়। আর অনাত্মীয় বন্ধুদের মধ্যে জিনগত মিল অনেকটা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে বিদ্যমান মিলের মতো। প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তবে গবেষণায় অংশগ্রহণকারী মানুষের অধিকাংশই ছিল শ্বেতাঙ্গ।
কালে কালে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। শোনা যায়, এখনকার শিশুদের বাসা থেকে বলে দেয়া হয় ভালো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে। বন্ধুত্বের সম্পর্ক তো যে কোনো ধরনের স্বার্থের ঊর্ধ্বে। স্বার্থান্বেষী মানুষ কখনও কারও বন্ধু হতে পারে না। যদি তিনি কারও বন্ধুও হন তবে তিনি ‘সময়ের বন্ধু’; সময় ফুরোলেই শেষ। বসন্তের কোকিল অর্থাৎ সুসময়ের বন্ধুরা মানসিক দীনতায় ভোগে। বন্ধুত্বের সত্যিকার আনন্দ থেকে এরা বঞ্চিত। বন্ধুত্বের ভালোবাসায় কোনো শর্ত বসে না। দুঃসময়ে হাত বাড়িয়ে দিতে সময় লাগে না। বন্ধুর প্রয়োজনে এক দৌড়ে ছুটে যাওয়াই ‘বন্ধুত্ব’। এবার একটু অন্য কথায় আসি। ধরুন, একটি সুযোগ পেলেন অতীতে ফিরে যাওয়ার। জীবনের কোন পর্যায়ে ফিরে যাবেন? শৈশব নাকি কৈশোরে? জানি, বেশিরভাগ মানুষই নিজ নিজ শৈশবের সময়টাতে ফিরে যেতে চাইবেন। কারণ, বয়স ২০ পেরিয়ে ২২ কিংবা ২৩ এলেই মনটা কেমন যেন পেছনে তাকাতে চায়। ফিরে যেতে চায় সেই চেনা শৈশবে। সময় যত বাড়তে থাকে শৈশবে ফিরতে চাওয়ার আকাক্সক্ষাটাও সমান তালে মনে ঘুরতে থাকে। সশরীরে তো আর অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না; কিন্তু মনে মনে ঘুরে আসতে দোষ কী? মানুষ এ জন্যই হয়তো স্মৃতিভ্রমণ করে। খুব আবেগী মানুষ হলে চোখে জল এসে যেতেই পারে। সবাই জানে, স্কুল-বন্ধুদের ওপর কোনো বন্ধু হয় না। স্কুলের বন্ধুরা খুব আপন হয়। একজন মানুষকে খুব বেশি জানার সুযোগ হয় স্কুল বন্ধুদেরই। বেশ একটা লম্বা সময় একসঙ্গে সবাই পাড়ি দিয়ে থাকে। মনের টানটাও কিন্তু কম নয়। জীবনে ভালো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এ পৃথিবীতে সব সম্পর্কই যত্নের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বন্ধুত্বের সম্পর্কও এর ব্যতিক্রম নয়। ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া যেমন কঠিন, এর চেয়েও বেশি কঠিন এ সম্পর্ককে রক্ষা করা। নিজে ভালো হওয়া খুব জরুরি। মনকে শুদ্ধ রাখা প্রয়োজন। ভালো মনের মানুষরা ভালো বন্ধু হয়ে থাকে।
এ পৃথিবীতে সবার বন্ধুত্ব অমর হোক। ভালো থাকুক বন্ধুত্ব।
প্রীতি রাহা : প্রাবন্ধিক
preetiraha@ymail.com