Saturday, April 20, 2024

কারদাশিয়ানদের ভীড়ে শুনে নিন একজন নাঙ্গেলি’র গল্প by তাজবীর তন্ময়

এখন থেকে প্রায় ২০০ বছরেরও আগের কাহিনী।
সময়টা ১৮০৩ সালের দিকে, ভারতের কেরালা অঙ্গরাজ্যের ত্রিভাঙ্কুরের (এখনকার কেরালা ও তামিলনাড়ুর কিছু অংশ) খেয়ালী রাজা অদ্ভুত অদ্ভুত সব করের প্রচলন শুরু করেছেন। এই করগুলো মূলত নিম্নবর্ণের মানুষ এবং শ্রমজীবি মানুষদের উপর আরোপ করতো রাজা। এই মানুষগুলোর উপর জুলুম করে জোরপূর্বক কর আদায় করে নিজেরা গড়তেন সম্পদের পাহাড়। কেউ যদি অলঙ্কার পড়তো, তাকে কর দিতে হতো। পুরুষদের মধ্যে যদি কেউ গোঁফ রাখতে চাইতো, তাকে তার গোঁফের জন্য কর দিতে হতো।
তবে সবচেয়ে অদ্ভুত এবং বর্বর কর আরোপ করা হয়েছিলো তৎকালীন নিম্নবর্ণের নারীদের উপর। নিয়ম ছিলো, কেউই তাদের স্তন ঢেকে রাখতে পারবেন না। শুধু ব্রাহ্মণ নারীদের অনুমতি ছিলো, এক টুকরা সাদা কাপড়ে তারা স্তন ঢাকতে পারতো। অন্য বর্ণের নারীদের বলা হয়েছিল, তারা যদি সমাজের অন্যদের মতো সম্মানের সাথে চলাফেরা করতে চায়, তাহলে তাদেরকে স্তনের মাপে কর দিতে হবে। করের বিনিময়ে স্তন ঢাকতে পারবে তারা। এই বর্বর ও ঘৃণিত করটির নাম ছিলো “স্তনশুল্ক” (Breast Tax), স্থানীয় ভাষায় যা পরিচিত ছিলো ‘মুলাক্করম’ নামে।
“স্তনশুল্ক” বা মুলাক্করম থেকে প্রাপ্ত করের বড় অংশই চলে যেতো ত্রিভাঙ্কুরের রাজার পদ্মনাভ মন্দিরে। শুনে হয়তো হাসি পাবে, গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’র হিসেবে এই মন্দিরটিই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মন্দির। যে মন্দিরে মিশে আছে দলিত সম্প্রদায়, নিম্নবর্ণ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শ্রমজীবি মানুষদের মেহনতের টাকা, তাদের উপর আরোপিত বর্বরোচিত করের দীর্ঘশ্বাস। চলতে থাকা এই সব প্রথা হয়তো অনেকেই মেনেই নেয় নিয়তির অংশ হিসেবে। শাসনকর্তার কথার উপরে কথাও বলা যায় না। তাই মনের বিরুদ্ধে তাদের নারীসুলভ সকল প্রকার মান সম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে স্তন উন্মুক্ত করে রাখতে হতো!
পদ্মনাভ মন্দির
কিন্তু, প্রতিটি বর্বরতার একসময় অবসান হয়। কিন্তু কেউ কেউ থাকে যারা স্রোতের বিপরীতে চলতে থাকে, ভাবে ‘হারানোর আর কি বাকি আছে!’, রুখে দাঁড়ায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ত্রিভাঙ্কুরে চলতে থাকা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেও বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন একজন।
আলাপুঝার এঝাওয়া সম্প্রদায়ের ৩৫ বছর বয়স্ক একজন নারী তিনি। বিশ্বাস করতেন ঈশ্বরপ্রদত্ত সৌন্দর্য কখনো অভিশাপ হতে পারে না। কিন্তু, বাস্তবতা ও বর্বরতা যে তখন অন্য কথা বলছে, নিজের সৌন্দর্যই হয়ে দাঁড়ালো অভিশাপ। বিদ্রোহ করলেন সাহসী সেই নারী। নাম তার নাঙ্গেলি। রাজার করকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি তার মতো থাকলেন। স্তন উন্মুক্ত রাখার ব্যাপারটি তার কাছে অসুস্থ চর্চা মনে হয়। কিন্তু, যিনি একজন দরিদ্র নারী, জীবিকার তাগিদে তাকে ঘরের বাইরে যেতে হতো। বাইরে যখন যেতেন, তখন স্তন উন্মুক্ত না রাখার অপরাধ এবং আবৃত রাখার কর মিলিয়ে তার মুলাক্করম দিনে দিনে অনেক জমে গেলো। কিন্তু তাতে তিনি খুব একটা চিন্তিত না। এইদিকে রাজার লোকজন করের টাকা আদায়ের জন্য বের হয়। তারা খুব তাগাদা দিতে থাকে, হুমকি ধামকি দিতে থাকে। করের টাকা অমান্য করার ঘটনা খুব একটা যে ইতিহাসে নেই।
প্রতিবাদী নারী স্তনকর সংগ্রাহকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু তিনি কর দিবেন কেন? অবশেষে একদিন তিনি অত্যাচারে টিকতে না পেরে ঠিক করলেন কর দিবেন। রাজার কর্মচারীদের বাইরে অপেক্ষায় রেখে তিনি ঘরে গিয়ে মেঝেতে একটা কলাপাতা বিছিয়ে প্রদীপ জ্বালালেন। গৃহদেবতার সামনে আপনমনে প্রার্থনা করলেন। প্রার্থনা শেষ করে ধারালো এক অস্ত্র দিয়ে নিজের দুইটি স্তন কেটে ফেললেন। কাঁটা স্তন কলাপাতায় মুড়ে নিয়ে স্তনকর সংগ্রাহকের হাতে তুলে দিলেন! তারপর বললেন, যে জিনিসের জন্য আমাকে অতিরিক্ত শুল্ক গুনতে হয়, সেই জিনিসই আমি রাখবো না…

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় শুল্ক সংগ্রাহকসহ পাড়াপ্রতিবেশী সবাই! স্তন কাটার পর ভীষণ রক্তপাত হল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এই ঘটনা, ফুঁসে ওঠে জনগণ। কয়েকদিন পর রাজা ত্রিভাঙ্গুর স্তনশুল্কসহ সকল প্রকার অবৈধ শুল্ক বাতিল করতে বাধ্য হন! নাঙ্গেলির মৃত্যুর পর তাঁর শোকাতুর স্বামী, চিরুকান্ডন তাঁরই জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন এবং নাঙ্গেলির আবাস যে অঞ্চলে ছিল তার নাম পরবর্তীতে হয়ে যায় ‘মুলাচিপারাম্বু’ (Land of the Breasted Woman)
কতটা দৃঢ়চেতা হলে একজন নারী প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এমন কাজ করে ফেলতে পারেন! তিনিও পারতেন বাকী সব নারীদের মতো স্তনশুল্ক মেনে নিতে! শুল্ক দেওয়ার মতো সক্ষমতাও তার ছিলো! কিন্তু পৃথিবীতে কেউ কেউ বুকে আগুন নিয়ে জন্মায়! নাঙ্গেলি নিজের নারীত্ব অভিশাপ হয়ে বেঁচে থাকুক সেটা চাননি। চাননি ভোগ্যপণ্যের মতো তার শরীরের উপর কর আরোপিত হোক। নাঙ্গেলির এই আত্মদানের ইতিহাস নিজের ক্যানভাসে তুলে এনেছেন কান্নরভিত্তিক চিত্রকর টি মুরালি ( চিত্রকরণ মুরালি)  তবে তার ছবিটি আঁকার জন্যে মুরালিকে সমালোচিতও হতে হয়। অনেক ব্রাহ্মণবাদী মুরালির সমালোচনা করেন।অনেক স্থানে মুরালির প্রতিকৃতি পোড়ানো হয়।
কিন্তু যে আগুন নাঙ্গেলি জ্বালিয়ে দিয়েছিলো ভারতীয় নারীদের মনে, সে আগুন আর নেভানো যায়নি। নিজের অজান্তেই নাঙ্গেলি ১৮৫৯ সালে ভারতে সংগঠিত কাপড় দাঙ্গা’র বীজ বপন করে গিয়েছিলেন! সে দাঙ্গার বিষয় ছিলো, নারীদের শরীর আবৃত রাখার অধিকার। যে অধিকারের জন্যে দাঙ্গার অনেক বছর আগেই প্রথমবারের মতো প্রাণ দিয়েছিলেন এক হতভাগ্য নারী নাঙ্গেলি!

Friday, April 19, 2024

গুনাহ হয়ে গেলে করণীয় by মুনতাজ আল জাইদি

এখনকার সময়ে গুনাহ করা একেবারেই সহজ। আপনি যখন ঘর থেকে বের হলেন তখন রাস্তায় বেপর্দা কোনো নারী দেখলেন। তখনই মনের মধ্যে যদি খারাপ কোনো চিন্তা আসে তাহলেই গুনাহ হয়ে গেল।
যখন আপনি কলেজের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন তখন তারা তাদের গার্লফ্রেন্ড নিয়ে আলাপ করছে বা আরো অনেক কিছু।
যখন আপনি নির্জনে গিয়ে মোবাইল থেকে অশ্লীল কিছু দেখে ফেললেন তখন গুনাহ হয়ে গেল। যখন মিথ্যা বললেন, ধোঁকাবাজি করলেন বা আমানত নষ্ট করলেন তখন গুনাহ হয়ে গেল। এভাবেই নিয়মিত আমাদের ভালো আমল থেকে বদ আমল বেশি হচ্ছে।

এখন গুনাহ হয়ে গেলে আপনি কী করবেন?
ক্ষমার কোনো পথ আছে? হ্যাঁ নিশ্চয়ই আছে। কারণ আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং তাওবা কবুলকারী।
-একজন মুসলিম যখন গুনাহ করে ফেলে তখন তার প্রথম কাজ হলো তওবা করা, প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা যদি পাপাচার করতে, এমনকি তোমাদের পাপ আকাশের সীমা পর্যন্ত পৌঁছে যেত, অতঃপর তোমরা তওবা করতে, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের তওবা কবুল করবেন।
সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর ৪২৪৮

-গুনাহ করে ফেললে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। সে যদি ভালো কাজ করে। আর সে ভালো কাজগুলো প্রকৃতিগতভাবেই খারাপ আমলগুলো মিটিয়ে দেয়। আল্লাহ পাক সূরা হুদের ১১৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘আর তুমি সালাত কায়েম করো দিবসের দুই প্রান্তে এবং রাতের প্রথম অংশে। নিশ্চয়ই ভালো কাজ মন্দ কাজকে মিটিয়ে দেয়। এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ’।
-ওই ব্যক্তি জীবিত বা মৃত থাকা অবস্থায় কোনো মুমিন তার জন্য দোয়া করলে তার গুনাহ ক্ষমা হয়।

মুমিনদের জন্য দোয়া করা নবীদের সুন্নত ছিল। নবী নূহ আ: আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি জালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না।’ সূরা নূহ ২৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা ‘আব্বাস রা: বলেন, বানু সাঈদাহর নেতা সা’দ ইবনু উবাদাহ রা:-এর মা মারা গেলেন। তখন তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা আমার অনুপস্থিতিতে মারা গেছেন। এখন আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে তা কি তার কোনো উপকারে আসবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। সা’দ রা: বললেন, ‘তাহলে আপনাকে সাক্ষী করে আমি আমার মিখরাফের বাগানটি তার উদ্দেশ্যে সদকা করলাম। সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ২৭৬২

- দুনিয়া জীবনে অশান্তি-দুঃখ-কষ্ট দিয়েও গুনাহ ক্ষমা করা হয়।

উম্মুল মুমিনিন মা আয়েশা রা: বলেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে সব বিপদ-আপদ আসে এর দ্বারা আল্লাহ তার পাপ দূর করে দেন। এমনকি যে কাঁটা তার শরীরে ফুটে এর দ্বারাও। সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৫৬৪০

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি কেউ গুনাহ করে ফেলে, তারপর পবিত্রতা অর্জন করে দুই রাকাত সালাত আদায় করে আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। তিরমিজি হাদিস নম্বর ৩২৭৬
আমাদের সবার দ্বারাই গুনাহ হচ্ছে। কেউ কম, কেউ হয়তো বেশি।

আল্লাহ পাক সূরা জুমার ৫৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘সব আদম সন্তান পাপী’।

আমরা গুনাহ করলেও আল্লাহ তায়ালা আমাদের আশার বাণী শুনিয়ে বলেছেন, ‘বলুন, হে আমার গোলামেরা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করছ, তোমার আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল। পরম দয়ালু’। সূরা জুমাহ ৫৩

আসুন গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে পবিত্রতা অর্জন করে, দুই রাকাত সালাত আদায় করে তওবা করে ফিরে আসি। ক্ষমা প্রার্থনা করি।

>>>লেখক: প্রবন্ধকার

Tuesday, April 16, 2024

যন্ত্রণার আইবিএস : কিভাবে চিনবেন, কী করবেন? by ডা: মোঃ হুমায়ুন কবীর

আমাশয়ের সমস্যার মধ্যে একটি হলো আইবিএস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম। এটি অন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের একটি জটিল সমস্যা। এটি একটি যন্ত্রণাদায়ক রোগ। হঠাৎ পেটে কামড় তারপর সাথে সাথে মলত্যাগ করা জরুরি। এ রোগে পেট অধিকতর স্পর্শকাতর হয় বলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল থাকে। পাশ্চাত্য দেশে প্রতি ১০ জনে একজন অন্তত তার জীবদ্দশায় এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। সমীক্ষায় দেখা যায়, একটি দেশের লোকসংখ্যার ২০ শতাংশ আইবিএসের লক্ষণ বহন করে এবং ১০ শতাংশ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। পুরুষদের চেয়ে নারীরা দুই থেকে তিন গুণ বেশি এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। অন্ত্রের ক্যান্সারের সাথে এ রোগের মিল পাওয়া যায়। তবে আইবিএস থেকে ক্যান্সারের সৃষ্টি হয় না।
আইবিএস কী
সিনড্রোম শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো একটি রোগের বিভিন্ন উপসর্গ। তাই আইবিএসকে পেটের বিভিন্ন উপসর্গের সংজ্ঞা হিসেবে ধরা হয়। মানবদেহে অন্ত্র ও খাদ্যনালী মাংসপেশি দ্বারা তৈরি টিউব বা নল। এই মাংসপেশির যখন অতিরিক্ত সংকোচন ও প্রসারণ হয় তখন অন্ত্রের মধ্যে থাকা ও মলের গতি ব্যাহত হয়। এরপর পালাক্রমে শুরু হয় কোষ্টকাঠিন্য বা ডায়রিয়া।
আইবিএসের কারণ কী
আইবিএসের প্রকৃত কারণ এ পর্যন্ত জানা যায়নি। অনেক কারণে এ রোগ হয় বলে চিকিৎসার আন্তর্নিহিত কারণ উদঘাটন সম্ভব হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা কারণও প্রভাবক হিসেবে অনেক বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। সেগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা :
শারীরবৃত্তীয় কারণ
এর মধ্যে অন্ত্রনালীর বেশি স্পর্শকাতরতা, অন্ত্রনালীর অস্বাভাবিক নাড়াচাড়া, এলার্জি ও ইনফেকশন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ গম ও দুধ জাতীয় খাবার সহ্যক্ষমতা কম অর্থাৎ এ জাতীয় খাবার খাওয়ার পরই আমাশয়ের সমস্যা তথা আইবিএস শুরু হয়।
মনোসামাজিক কারণ
এ সমস্যায় প্রথমেই আছে হতাশ ও দুশ্চিন্তা ইত্যাদি। এ ছাড়া অধিক মানসিক চাপ ও আইবিএসকে প্রভাবিত করে থাকে। আইবিএসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অল্প সমস্যা হলেই মানসিকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে ফলে তারা পরিস্থিতি সহজে মানিয়ে নিতে পারে না।
এ ছাড়া খাদ্যাভ্যাস, অন্ত্রের প্রদাহ, অন্ত্রের সংক্রমণ, মাদক গ্রহণ, পেটের অপারেশন, বংশগত কারণ, হরমোনজনিত কারণ বিশেষ করে মহিলাদের মাসিক চক্রের সমস্যা এবং অনেক সময় এন্টিবায়োটিকসহ অনেক ওষুধ সেবনও আইবিএসের সমস্যাকে ত্বরান্বিত করে।
আইবিএস কোন বয়সে হয়
এ রোগে পুরুষ ও মহিলা উভয়ই ভুগে থাকেন। পুরুষের তুলনায় মহিলারা আনুপাতিক হারে বেশি ভুগে থাকেন। সাধারণত ১৮-৪০ বছরের মহিলা ও পুরুষের মধ্যে রোগের উপসর্গ দেখা দেয়।
উপসর্গ বা লক্ষণাবলি
পাতলা পায়খানা ও কোষ্টকাঠিন্য উভয়ই দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু দিন কোষ্টকাঠিন্য আবার কিছু দিন পাতলা পায়খানা হচ্ছে। তবে কোনটি বেশি হচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে আইবিএসকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। কোষ্টকাঠিন্য প্রধান এবং আমাশয় প্রধান। এসব ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উপসর্গাদি দেখা যায়।
পেটে ভুটভাট শব্দ হয়।
যাদের কোষ্টকাঠিন্য তাদের পেট ব্যথার সাথে ছোট ছোট কষ্টকর মলত্যাগ।
আমাশয় প্রধান আইবিএসে ঘন ঘন কিন্তু অল্প পরিমাণ পায়খানা হয়। এ ক্ষেত্রে ওজন ঠিক থাকে। আর মলের সাথে আম যায়। রক্ত যায় না।
খাদ্য গ্রহণের পরে পেটে অশান্তি বোধ এবং পেট ফুলে যায়।।
ডায়রিয়া সাধারণত সকালে মলত্যাগের সময় হয়ে থাকে।
পিচ্ছিল পদার্থ যা চর্বিযুক্ত মলত্যাগ।
মলত্যাগের পর ও মলত্যাগের ইচ্ছা অনুভব।
এ সমস্যাগুলো ৬ মাসের বেশি সময় থাকলে চিকিৎসকরা আইবিএস হয়েছে বলে সন্দেহ করেন। এ ছাড়াও যাদের এ সমস্যা আছে, তারা পোলাও, কোর্মা, বিরিয়ানি, তেহারি ইত্যাদি তেলযুক্ত খাবার এবং দুধ, দই, দুধ-চা, পায়েস, সেমাই ইত্যাদি খাবার খেলেই পেট খারাপ হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে লিভার সেন্টারের গবেষণা হতে দেখা গেছে, যেসব রোগীর দীর্ঘমেয়াদি লিভার প্রদাহ থাকে এবং ফ্যাটি লিভার থাকে তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো সময় আইবিএসে আক্রান্ত হয়। আবার যেসব রোগীর পায়খানার অভ্যাসের পরিবর্তন, পেট ফোলা, পেটে ব্যথা, পেটে শব্দ, খাদ্য হজমে সমস্যা নিয়ে আসে তাদের অধিকাংশই পরবর্তীতে লিভার সিরোসিস ধরা পড়ে।
বলা বাহুল্য, বমিভাব, বমি, ঢেঁকুর ওঠা, ক্ষুধামন্দা, ঘাম হওয়া, মাথাব্যথা, অনিদ্রা, জ্ঞান হারানো, রক্ত মিশ্রিত পায়খানা এগুলো আইবিএসের উপসর্গ হিসেবে সুনির্দিষ্ট নয়। উপসর্গগুলো কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাসও থাকতে পারে। যদিও উপসর্গগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ঘটে থাকে।
রোগ নির্ণয়
আইবিএস সাধারণত উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা হয়। তবে আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত পরীক্ষাগুলো করা প্রয়োজন।

*মল পরীক্ষা
*পেটের এক্স-রে
*রক্ত পরীক্ষা
*বেরিয়াম এনেমা
*কলোনোস্কোপি ইত্যাদি।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
আইবিএস সাধারণত উপসর্গভিত্তিক রোগ আর এর চিকিৎসাও উপসর্গানুসারে প্রদান করা হয়। আইবিএসের উপসর্গগুলো কমানোর জন্য বাজারে নানা রকম ওষুধ আছে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনো ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।।
ওষুধ খাওয়ার আগে আপনার রোগ সম্পর্কে চিকিৎসকের কাছে বিস্তারিত বলুন।
আইবিএস একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ।

খাদ্যভ্যাস : আঁশযুক্ত খাবার আইবিএসকে প্রতিহত করে। ধীরে ধীরে আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
শাকজাতীয় যেসব খাবার গ্যাস উদ্রেক করে তা বর্জন করতে হবে।
দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার রোগীর উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়। তাই এগুলো পরিহার করতে হবে।
চর্বিযুক্ত খাবার, তৈলাক্ত খাবার ও ভাজাপোড়া খাবার বর্জন করতে হবে।
অতিরিক্ত মসলাযুক্ত ও গুরুপাক খাবার বর্জন করতে হবে।
ইসবগুলের ভূষি ও অন্য আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
মানসিক চাপের সাথে সম্পর্কযুক্ত :
মানসিক চাপ কমাতে হবে। সহনীয় পর্যায়ের মানসিক চাপ মানুষকে উদ্বিগ্ন করে কিন্তু অসহনীয় মানসিক চাপ মানুষকে বিষাদগ্রস্ত করে, ফলে আইবিএসের উপসর্গাদি দেখা দেয়।
আইবিএস হতে মুক্তি পেতে হলে মানসিক চাপ কমাতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে মানসিক চাপ কমানো যায় না তবে আয়ত্তের মধ্যে রাখা সম্ভব। মানসিক চাপ কমানোর জন্য ব্যায়াম একটি উপকারী প্রভাবক। তাই ব্যায়াম করতে এবং মনকে আনন্দ ও প্রশান্তি দিতে পারে এমন কিছু করতে হবে। রিলাক্সেশন থেরাপি, হিপনোথেরাপি, বায়োফিতব্যাক মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানো সম্ভব।
আইবিএস একটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। তাই এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য রোগীর মানসিক শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ জীবনযাত্রায় যথেষ্ট।

>>>লেখক : হোমিও বিশেষজ্ঞ, ফোন : ০১৭১৭৪৬১৪৫০

Friday, April 12, 2024

ইসরায়েল কীভাবে এত শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হলো? by অর্চি অতন্দ্রিলা

মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মাঝখানে ছোট্ট একটি দেশ ইসরায়েল। ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ফিলিস্তিন ছেড়ে যায় ব্রিটেন, আর ইহুদিরা ঘোষণা করে নিজস্ব রাষ্ট্র ইসরায়েলের। তখন থেকেই ইসরায়েল রাষ্ট্র শুধু টিকেই থাকেনি, বরং তাদের পরিধি আরো বাড়িয়েছে। গত ৭৫ বছরে ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে একদিকে যেমন শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে আরব রাষ্ট্রগুলোর মাথা ব্যথার কারণ হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ ইসরায়েল। তারাই একমাত্র দেশ যারা শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে সরাসরি নাগরিকত্ব দেয়, সেটা পৃথিবীর যে প্রান্তেরই ইহুদি হোক না কেন।

৭৫ বছরে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি বা সামরিক দিক দিয়ে বিশ্বে একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে ইসরায়েল। এটা সম্ভব হওয়ার পেছনে কাজ করেছে বেশ কয়েকটি বিষয়।

পশ্চিমা সাহায্য

ইসরায়েলের এতটা শক্তির পেছনে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত আমেরিকার একটা বড় অবদান আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার বৈদেশিক সহায়তার সবচেয়ে বড় অংশ পেয়ে আসছে ইসরায়েল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ফিলিস্তিন অঞ্চলটিতে ৪০০ বছরের অটোমান শাসনের অবসান ঘটিয়ে উপনিবেশ গড়েছিল ব্রিটিশরা। ফ্রান্সও এর মাঝে ছিল যদিও এই অঞ্চলটি সমঝোতার ভিত্তিতে ব্রিটেন শাসন করে।

ইহুদিদের নিজস্ব একটি ভূখণ্ড থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে এসেছিলো ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকেই।

তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে আসতে থাকে। এনিয়ে আরব ও ইহুদিদের দ্বন্দ্বও বাড়তে থাকে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে তখন মুসলিমরা ছাড়াও খ্রিস্টানদেরও বসবাস ছিল।

ইহুদিদের বসতি গড়ে তোলার প্রেক্ষাপটে আরবরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এই বিক্ষোভ দমনে ব্রিটেন নির্যাতনও চালায় আরবদের উপর। পরবর্তীতে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণার পরও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নানাভাবে তাদের সাথে ছিল ফ্রান্স ও ব্রিটেন।

“মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র ইসরায়েল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় এবং সে গনতন্ত্রকে সমর্থন দেয় ফ্রান্স এবং ব্রিটেন,” বলেন মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ছিল সেই দেশ যারা ইসরায়েলকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। ইসরায়েল রাষ্ট্র যেদিন প্রতিষ্ঠা হয়, ঠিক সেদিনই স্বীকৃতি দিয়েছিল আমেরিকা।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ‘অফিস অফ দা হিসটোরিয়ানসে’ উল্লেখ রয়েছে , হ্যারি এস ট্রুম্যান ১৯৪৬ সালেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই ইহুদি রাষ্ট্রের ব্যাপারে তার সমর্থন ঘোষণা করেন।

আর ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা হলেও, এ অঞ্চলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্রভাবটাই বেশি ছিল। কিন্তু আমেরিকার সাথে সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয় ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। ইসরায়েল পশ্চিমাদের মদদে যখন মিশরে হামলা চালায়, তখন মিশরের পক্ষে থাকা দেশগুলোকে সহায়তা করতে আগ্রহ দেখায় সোভিয়েত ইউনিয়ন আর মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকাতে ব্রিটিশ সেনাদের হটিয়ে অবস্থান নেয় আমেরিকা।

“ইসরায়েলের জন্মই হয়েছে মূলত পরাশক্তিদের বিশাল সমর্থনে যেটা ইসরায়েলের ক্ষমতায়নে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন লন্ডনের স্কুল অব আফ্রিকান এন্ড ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের আওতাধীন মিডলইস্ট ইন্সটিটিউটের শিক্ষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক ড. সেইয়েদ আলী আলাভি।

এছাড়া এটাও মনে করা হয় যে ইহুদিদের সাথে শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক এমন নানা দিক পশ্চিমা চিন্তাধারার সাথে মিলে যেটা আরবদের থেকে ভিন্ন, এজন্য ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে একটুকরো পশ্চিমা দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর সত্তরের দশক থেকে আমেরিকার উদ্যোগে আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসরায়েলের একরকম সমঝোতার পথও তৈরি হতে থাকে।

সামরিক ও প্রযুক্তির বিকাশ

ইসরায়েলের প্রতিবেশী মিশর, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন - সব কয়টি দেশ শত্রু হওয়া সত্ত্বেও ঠেকানো যায়নি ইসরায়েলের উত্থান। প্রতিবেশীদের সাথে তিনটি পুরোদমের যুদ্ধ (১৯৪৮, ১৯৬৭ এবং ১৯৭৩) এবং আরো বেশ কয়েকটি ছোটখাটো যুদ্ধ করেছে ইসরায়েল।

ড. মাহমুদ আলীর মতে টিকে থাকার লড়াই আরো শক্ত করেছে ইসরায়েলকে। যদিও ড. আলাভি মনে করেন, ইসরায়েলের সামরিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য পশ্চিমাদের কারণেই সম্ভব হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরানের প্রযুক্তিগত বিকাশ ঘটেছে প্রায় আমেরিকার বিপরীতে, আর ইসরায়েলের বিকাশ হয়েছে আমেরিকার বন্ধু থেকে।

তবে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে দক্ষতার মাত্রাটা ভিন্ন। আধুনিক অস্ত্র, সাইবার সিকিউরিটি, আকাশ প্রতিরক্ষা, মিসাইল ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা তৎপরতা - এসব দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছে ইসরায়েল।

আমেরিকার কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস-এর রিপোর্ট বলছে, ইসরায়েলের প্রযুক্তিকে অত্যাধুনিক করতে প্রভাব রেখেছে আমেরিকা। ২০২৩ অর্থবছরে যৌথ সামরিক প্রকল্পে ৫২ কোটি মার্কিন ডলারের অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেস যার মাঝে ৫০ কোটি শুধু মিসাইল তৈরির খাতের জন্য।

আমেরিকার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক এবং বিনিয়োগ ইসরায়েলকে সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভবান করেছে বলে মনে করেন তুরস্কের বিশেষজ্ঞ বুশরা নূর ওযঘুলার আকতেল, যিনি ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক। মিস্ আকতেল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।

মিস্ আকতেল বিবিসি বাংলাকে বলেন, এভাবেই ইসরায়েল ‘স্টার্ট আপ রাষ্ট্র’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে।

রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল শুরু থেকেই চেয়েছে সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে। কারণ, আরব রাষ্ট্রগুলোর মাঝখানে তাদের টিকে থাকার জন্য এটাই ছিল একমাত্র পথ। ইসরায়েল তাদের সামরিক শক্তির বিকাশও ঘটিয়েছে কৌশলে এবং দূরদৃষ্টি মাথায় রেখে।

দেশটিতে অসুস্থ এবং বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া সব নাগরিকদের ১৮ বছর বয়সের পর বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হয়। তবে এটি শুধু ইহুদিদের জন্য বাধ্যতামূলক। সামরিক প্রশিক্ষণ পুরুষদের জন্য ৩২ মাস ও নারীদের জন্য ২৪ মাস।

ষাটের দশক থেকেই পরমাণু শক্তিধর হয় দেশটি। ড. মাহমুদ আলী বিবিসি বাংলাকে বলেন, ইসরায়েলের পারমানবিক অস্ত্রের প্রকল্পে ফ্রান্স সাহায্য করেছিল।

ইসরায়েল তাদের পারমানবিক কর্মসূচী নিয়ে বেশ গোপনে এগিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো যাতে পারমানবিক শক্তি অর্জন করতে না পারে সেজন্য আমেরিকা ছিল বদ্ধ পরিকর।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ২০১৪ সালের ১৫ই জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে ইসরায়েলের পারমানবিক কর্মসূচীর ব্যাপারে আমেরিকা এবং ব্রিটেন অনেকটা চোখ বন্ধ করেই ছিল। পশ্চিমা দেশগুলো বিষয়টি জেনেও না জানার ভান করেছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ

শুধু সামরিক দিক থেকে নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমানভাবে দক্ষতার দিকে এগিয়েছে। ইসরায়েলের চমক জাগানো সাফল্যগুলোর মধ্য অন্যতম হচ্ছে তাদের কৃষি খাত।

ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করার মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রের যখন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন সেখানে পানি এবং উর্বর ভূমির সংকট ছিল।

কৃষি-ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে একটি হাই-টেক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে ইসরায়েল। অত্যাধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মরুভূমিতে নানা ধরণের শস্য ফলানোর সাফল্য দেখিয়েছে দেশটি।

আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর মতে ইসরায়েলের ফুড প্রসেসিং শিল্প ক্রমাগত নতুন নতুন জিনিস উদ্ভাবন করছে।

ইসরায়েলের ফুড প্রসেসিং শিল্প ২০২০ সালে ১৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে এবং এই আয় ক্রমাগত বাড়ছে।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দিক থেকে ইসরায়েলের প্রভাব রয়েছে। দেশটিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে এমন স্টার্ট আপের সংখ্যা লাখের উপরে।

নেতৃত্ব

নেতৃত্বের দিক দিয়ে শুরু থেকেই বিচক্ষণতা দেখিয়েছে ইসরায়েল, যেটা তাদের এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

দেশটির নেতৃত্ব সামরিক, কৃষি, শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করেছে।

মিস্ আকতেলের মতে তাদের নেতৃত্বের স্টাইল এবং নীতি নির্ধারণ একটু ভিন্ন ধরণের।

“তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয়” বলেন মিজ আকতেল।

ইসরায়েলের ইহুদিরা মূলত এ অঞ্চলে এসেছিল বাইরের ভূখণ্ড, বিশেষত ইউরোপ থেকে।

ড. মাহমুদ আলীর মতে অষ্টাদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে জ্ঞানের যে ব্যাপক বিকাশ ঘটে সেটার অংশ ছিল ইহুদি জ্ঞানী বা পান্ডিত্য সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ যারা অতি জ্ঞানী, আধুনিক, শিক্ষিত একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করেন।

“তারা ৩০ ও ৪০ এর দশকে ইসরায়েল অঞ্চলে এসেছিলেন এবং তাদের সহযোগিতায় ইসরায়েল উচ্চ শিক্ষিত একটি বৈজ্ঞানিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও শিক্ষার অভাব ছিল সেখানে ইসরায়েল একটি ভিন্ন সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় উপনীত হয়,” বলেন ড. আলী।

তবে যতই আধুনিক বা শক্তিধর হোক না কেন, মিজ আকতেলের মতে এর পেছনে তাদের আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দখল এবং মানুষের উপর সহিংসতার বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। 

৭৫ বছরে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি বা সামরিক দিক দিয়ে বিশ্বে একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে ইসরায়েল।
ফিলিস্তিনিদের হটিয়ে নিজস্ব রাষ্ট্র গড়তে ইহুদিদের সমর্থন দিয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো।