Saturday, February 15, 2025

আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমি একজন কবি ছাড়া এক সুতোও ওপরে কিছু নই’ by সালেহ উদ্দিন আহমদ

আজ সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের মৃত্যুদিন। তাঁকে শ্রদ্ধা।

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সাল। আল মাহমুদ মারা গেলেন। আমি তখন ঢাকায়। চোখ রাখলাম পত্রিকার পাতায়, কে কী লিখলেন এবং কে কী শোকবার্তা দিলেন। না, কেউ তেমন কিছু করলেন না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি—কারও কোনো বাণী দেখলাম না।

তখন ঢাকায় একুশের বইমেলা চলছিল। বইমেলায় গেলাম। সেখানেও আনুষ্ঠানিকভাবে আল মাহমুদের জন্য তেমনভাবে কোনো শোক প্রকাশ চোখে পড়ল না। একটা জায়গায় প্যান্ডেল টানিয়ে সভা হচ্ছে। গিয়ে দেখলাম, একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনদর্শন নিয়ে কেউ একটা বই লিখেছেন, তারই মহরত। আল মাহমুদের একটা ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন’ কিনে ফিরে এলাম। ভাবলাম, আমি আর কী করতে পারি? রাতে বাড়িতে এসে আনাড়ি হাতে একটা কবিতা লিখলাম। তারপর আল মাহমুদের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সংকলন খুলে বসলাম। একজন কবিকে শ্রদ্ধাতে তাঁর কবিতা পড়া ছাড়া উপায় কী!

আল মাহমুদ মনে করতেন, কবিতাঙ্গনে তাঁর কাজের জন্য তিনি যথেষ্ট স্বীকৃতি পাননি। তিনি তাঁর কবিতাতেই এ নিয়ে অভিযোগ করে গেছেন:

‘ধৈর্য ধরে থেকেছি বহুকাল

খাতির ধাপে উঠল বুঝি পা,

ভিতর থেকে বিমুখ মহাকাল

বলল, নারে, এখনো নয়, না।’

—‘ধৈর্য’: আল মাহমুদ

আল মাহমুদের কবিতার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় সমকাল–এর সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে। তখন আমি ঢাকা কলেজে পড়ি। নিয়মমাফিক যেতাম নিউমার্কেটের নলেজ হোম নামের বইয়ের দোকানে বইয়ের চেয়ে পত্র–পত্রিকার আকর্ষণে। ছোট– বড় সব পত্রিকাই রাখতেন এ দোকানের স্বত্বাধিকারী মজলিশ সাহেব। যাঁরা তাঁর দোকানে যেতেন, কেনাকাটার চেয়ে ঘাঁটাঘাঁটিই করতেন বেশি, কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ পড়তেন, যেন এদিনের ‘ব্যারনস অ্যান্ড নোবলেস’। মজলিশ সাহেব কখনো বাধা দিতেন না, পুনরায় ম্যাগাজিনগুলো ঠিকঠাক করে রাখতেন।

আমার বড় আকর্ষণ ছিল সিকান্দর আবু জাফরের সম্পাদনায় সাহিত্য পত্রিকা সমকাল। তখন প্রতি মাসেই নিয়মিত বের হতো, ঝকঝকে প্রচ্ছদ, তিন পাশে আধা ইঞ্চি বাড়তি মলাট ভেতরের লেখাগুলোর লজ্জা ঢেকে রাখত, খুললেই নতুন কাগজের গন্ধ অদ্ভুত অনুভূতি জাগাত। পত্রিকাটি একজন কবির অনেকগুলো কবিতা একই সংখ্যায় প্রকাশ করে কবিকে নিবিড়ভাবে পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করে দিত। সিকান্দর আবু জাফরের কথা বলতে গেলে আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। তাই তাঁকে নিয়ে আলোচনা অন্য সময়ের জন্য সরিয়ে রাখলাম। তো সেদিন সমকাল খুলে আল মাহমুদের কবিতাগুলো পড়লাম, একবার–দুইবার নয়, অনেকবার। পরিচয় হলো আমার অপরিচিত এক কবির সঙ্গে। সেই থেকে আল মাহমুদ হয়ে গেলেন আমার প্রিয় কবি এবং আরও অনেকের প্রিয় কবি। বাংলাদেশের শীর্ষ এক কবি।

কবিতা ও প্রেমের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেননি তিনি।

‘আধুনিক কবিতা বলতে আপনি কী বোঝেন?

আমি বলি, সে তো লালমাটিয়া মহিলা কলেজে

এখন মেয়েদের বাংলা পড়ায় আর পরীক্ষার খাতা দেখে

নিজের নৈসঙ্গ যাপন করছে।’

—‘আধুনিক কবিতা’: আল মাহমুদ

আল মাহমুদ বেঁচে থাকতেই বাংলাদেশে হাজারবার প্রশ্ন উঠেছে, ‘সোনালি কাবিন’–এর এই কবি কি রাজনীতি করতেন? তিনি কি জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন? তিনি কি ইসলামিক রাজনীতির সপক্ষে কাজ করেছিলেন? তিনি কি টাকা নিয়ে ফরমায়েশি লেখা লিখতেন? এসব প্রশ্ন যাঁরা করতেন, তাঁদের বলা যায়, আপনারা কি কখনো এ প্রশ্নও করেছিলেন, আল মাহমুদ অনেক ভালো কবিতা লিখতেন কি না?

একজন কবির পোশাকের কোনো দাম নেই। তিনি চে গুয়েভারার পোশাক পরলেই বিপ্লবী বনে যাবেন না, কিংবা আচকান টুপি পরলেই যে তিনি ধর্মে ঝুঁকবেন, এমনও নয়। তিনি জামা বদলাবেন, মত বদলাবেন, মোদ্দাকথা তিনি তাঁর অধিকার চর্চা করবেন। কিন্তু তিনি তাঁর কবিতা বদলাবেন না। আপনি কি দেখেছেন, ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের কবিতার দ্বিতীয় সংস্করণ? হ্যাঁ, এই বইয়ের সংস্করণ হয়েছে, কিন্তু কবিতার নয়।

একজন কবির কাছে জীবনটাই একরকম এক্সপেরিমেন্ট। যেমন একটা গাছ তার পাতার রং বদলায় বারবার আপন সৌন্দর্য ছড়াতে, আবার কখনোবা নিজের বাঁচার প্রয়োজনে; কিন্তু গাছটা শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে নিজের শিকড় আঁকড়ে। কবি আল মাহমুদও তেমন।

আল মাহমুদ চিরদিনই থাকবেন প্রেম, সুন্দর ও আনন্দের কবি হিসেবে। তিনি কবিতা লিখেছেন ইসলামের নবী (সা.)–কে নিয়ে, মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে লিখেছেন ‘ভাসানী স্মৃতি’, লিখেছেন ‘কৃষ্ণকীর্তন’। কিন্তু আধুনিকতাই তাঁর কবিতার মূল প্রতিপাদ্য।

মুক্তিযুদ্ধের পরপর ১৯৭২ সালে কয়েকজন যুবক কবিকে বের করে এনেছিল পত্রিকার বেজমেন্ট থেকে, হয়তোবা নিজেদের প্রয়োজনে। আল মাহমুদকে যখন জসদের গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক বানানো হলো, তিনি মনের আনন্দে ফিদেল কাস্ত্রোর পোশাকে ঘুরে বেড়াতেন। সবাই বলতেন, তিনি বিপ্লবী হয়ে গেছেন। সম্ভবত গণকণ্ঠ পত্রিকায় যোগ দেওয়ার পর তিনি রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। সমাজতন্ত্র, মার্ক্সবাদ, কমিউনিজম, ইসলামি রাজনীতি, বুর্জোয়া গণতন্ত্র—এসব নিয়ে নানা সময়ে তিনি বিভিন্ন কথা বলেছেন। খুব গভীর চিন্তা থেকে রাজনীতি নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন, সব সময় এমন না–ও হতে পারে। তিনি তো নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি অত রাজনীতি–সচতেন নই।’ তবে পরিতাপের বিষয় হলো, তাঁকে নিয়ে ‘রাজনীতি’ করার জন্যই অনেকে এ কবির কথাবার্তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

চিরদিন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন আল মাহমুদ। নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘খুব দুঃখপূর্ণ জীবন। একটা দরিদ্র লোকের জীবন যেমন হয়।’ শেষ বয়েসে তিনি হয়তো চেয়েছিলেন একটা সুন্দর ছোট্ট ঘর, যেখানে ভোরের রোদ উষ্ণতা ছড়াবে আর বসন্তের বাতাস হাওয়া দেবে। আরও থাকবে একটা টেবিল ও চেয়ার। এখানে বসে তিনি কবিতা লিখবেন। এ জন্য তাঁকে অনেক প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল। একজন কবিকে কে লালন করবে? কবিতা লিখে একজন কবি কি বেজমেন্ট থেকে খোলা ছাদে উঠতে পারবেন? রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’ কবিতায় দেখেছি কবির স্ত্রীর বিড়ম্বনা:

‘রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়ো,

রচিতেছ বসি পুঁথি বড়ো বড়ো,

মাথার উপরে বাড়ি পড়ো-পড়ো,

তার খোঁজ রাখো কি!’

সাহিত্যিক রাজু আলাউদ্দিন ২০১৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে খুবই ভদ্রভাবে অনেক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন আল মাহমুদকে। আল মাহমুদ কোনোটার উত্তর দিয়েছেন, কোনো কোনোটাতে ছিলেন খুব আত্মরক্ষামূলক, আবার কোনোটাতে বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন না করাই ভালো…।’ সত্যি তো, কী আর বলবেন তিনি? রাজু তো তাঁকে আধুনিক কবিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি। বলার বিষয় হলো, এসব আবার নিজের কবিতাতেও এনেছিলেন পঞ্চাশের দশকের এই শক্তিমান কবি:

‘প্রশ্নকারীরা আজকাল আমাকে খুব উত্ত্যক্ত করে মারে।

ভদ্রতার খ্যাতির আমি তাদের সব প্রশ্নের জবাব দিতে থাকি।

আধুনিক কবিতা বলতে আপনি কী বোঝেন?’

—‘আধুনিক কবিতা’: আল মাহমুদ

অথবা তিনি কি সেই ‘সোনালি কাবিন’–এর মধ্যে তো দিয়ে গেছেন সব প্রশ্নের উত্তর:

‘আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনোকালে সঞ্চয় করিনি

আহত বিক্ষত করে চারিদিকে চতুর ভ্রুকুটি।’

আল মাহমুদকে কেউ কেউ দুই ভাগ করেছেন, যেমন তাঁর ১৯৭০ পর্যন্ত কবিতাগুলো তাঁরা স্বীকার করেন, পরেরগুলো নয়। তবে আমার মতে, কবিতা হলো কবিতাই, কবিতার সঙ্গে ভাব ও মতের লেবেল লাগিয়ে তা স্বীকার-অস্বীকারের বিষয় নয়। প্রথমত কবিতা হলো ভালো লাগার, ভালোবাসার। সচরাচর রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা আমরা খুলি না, যেগুলো ভালো লাগে, সেগুলোই বারবার পড়ি। কমিউনিস্ট না হয়েও অনেকে নাজিম হিকমত আর সুকান্তের কবিতা পড়েন। কেন? ওই যে ভালো লাগার খাতিরে।

রাজু আলাউদ্দিনের নেওয়া সাক্ষাৎকারটিতে আল মাহমুদ নিজেই বলেছেন, ‘আমি একজন কবি ছাড়া এক সুতোও ওপরে কিছু নই।’

আল মাহমুদ সম্বন্ধে এটাই শেষ কথা। আজ তাঁর প্রায়াণদিবসে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

কবি আল মাহমুদ
কবি আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬—১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) ছবি: নাসির আলী মামুন

৮৪ বছর সংসার করে গিনেস বুকে রেকর্ড

শিল্পোন্নত নগরে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানবিক মূল্যবোধে চিড় ধরছে। বাড়ছে দাম্পত্য কলহ। এর জেরে বিশ্বব্যাপী বিবাহবিচ্ছেদের খবরের ভিড়ে দীর্ঘতম জীবিত দম্পতির আনুষ্ঠানিক খেতাব পেয়েছেন এক যুগল।

ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (ইউপিআই) শুক্রবারের (১৪ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে ওই যুগলের পরিচয় তুলে ধরে। এ দিন ছিল বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তরুণ-তরুণীর প্রেম ছাপিয়ে দীর্ঘতম জীবিত দম্পতির ভালোবাসা নজর কাড়ে পাঠকদের।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৪০ সালে বিবাহিত এক ব্রাজিলিয়ান দম্পতি আনুষ্ঠানিকভাবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান করে নিয়েছেন। এখন থেকে তারা দীর্ঘতম জীবিত দম্পতি।

শতবর্ষী এবং অতি-শতবর্ষী ব্যক্তিদের তথ্য ট্র্যাক করে এমন ওয়েবসাইট লংগেভিকোয়েস্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে অনুসারে ৮৪ বছর ৭৭ দিন ধরে সংসার করছেন ম্যানোয়েল অ্যাঞ্জেলিম ডিনো ও মারিয়া ডি সুসা ডিনো। ম্যানোয়েলের বয়স ১০৫ বছর এবং মারিয়া ১০১-এর ঘরে পা দিয়েছেন। ওয়েবসাইটটির তথ্য যাচাই-বাছাই করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ তাদের খেতাবে ভূষিত করে।

এই জুটির দেখা হয় ১৯৩৬ সালে। এরপর মনের আদান-প্রদানের পর ১৯৪০ সালে ব্রাজিলের সিয়েরায় বোয়া ভেনচুরার চ্যাপেলে তাদের বিয়ে হয়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে। এরপর প্রলয়ংকরী যুদ্ধ, কত কত মহামারি, মন্দা, খাদ্যাভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা পার করেছেন তারা। কিন্তু কোনো ভয়ংকর পরিস্থিতিই তাদের আলাদা করতে পারেনি। হাত ছাড়েননি একে অপরের।

এই দম্পতি ১৩ সন্তান লালন-পালন করেছেন। এখন তাদের ৫৫ জন নাতি-নাতনি, ৫৪ জন প্রপৌত্র-প্রপৌত্র এবং ১২ জন প্রপৌত্র-প্রপৌত্র-প্রপৌত্র রয়েছে।

এর আগে দীর্ঘতম বিবাহ ৮৮ বছর ৩৪৯ দিন স্থায়ী হয়েছিল। ডেভিড জ্যাকব হিলার এবং সারাহ ডেভি হিলার ১৮০৯ সালে কানাডায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

ম্যানোয়েল অ্যাঞ্জেলিম ডিনো ও মারিয়া ডি সুসা ডিনো। ছবি : সংগৃহীত

ডুবন্ত ব্যক্তিকে বাঁচানো সেই ঘোড়া মারা গেছে

দুর্ঘটনাবশত সেতু থেকে নদীতে পড়ে যান এক ব্যক্তি। খরস্রোতা নদীর গ্রাস থেকে ওই ব্যক্তির সাহায্য করতে এগিয়ে আসার মতো আশপাশে কেউ ছিলেন না। বাবার মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত ধরে নিয়েই তীরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকেন অসহায় মেয়ে। এমন সময় ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপ দেয় একটি ঘোড়া।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনের বরাতে এনডিটিভি জানায়, ঘটনাটি চীনের। ডুবে যাওয়া থেকে ওই ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য বীরত্বপূর্ণ সম্মান পায় ঘোড়াটি। কিন্তু উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন করার কয়েকদিন পর সাত বছর বয়সী সাদা ঘোড়াটি মারা গেছে।

ঘোড়াটির আদুরে নাম বেইলং। যার অর্থ সাদা ড্রাগন। তার মালিক ইলিবাই জানান, বেইলং আগে কখনও পানিতে পা রাখেনি। তা সত্বেও লোকটিকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু এর জন্য তাকে চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয়েছে।

ইলিবাই বলেন, ‘বেইলং এবং আমি একসঙ্গে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। দয়া করে আমার সামনে এটি নিয়ে কথা বলবেন না। তার কোনো কিছু স্মরণ করিয়ে আমাকে কাঁদাবেন না।’ পরক্ষণে তিনি কিছুটা স্থির হন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ।

উদ্ধারের ছয় দিন পর বেইলং হঠাৎ করে খাওয়া বন্ধ করে দেয়। মলত্যাগও করে না। এরপর তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয় ঘোড়াটি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পশুচিকিৎসকদের ডাকেন। ঘোড়াটিকে সুস্থ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু বেইলং আর সুস্থ হয়নি। আর ঘাস খায়নি। গত মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সেটি মারা যায়।

ইলিবাই বলেন, আমার আদেশ পাওয়ার পর ঘোড়াটি তা বাস্তবায়ন করে। অত্যন্ত সহযোগিতামূলক ছিল সে। উদ্ধার প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল আমার ঘোড়া ।

উদ্ধারের ঘটনাটি ৪ ফেব্রুয়ারির। চীনের হুবেই প্রদেশের জিয়ানতাও শহরে ইলিবাই ও বেইলং দুজনেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় এক ব্যক্তি সেতু থেকে নদীতে পড়ে যান। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মেয়ে যখন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সাহায্যের জন্য ডাকছিলেন তখন আগপিছ না ভেবে বেইলংকে পানিতে নামান ইলিবাই।

বেইলং ৪০ মিটারেরও বেশি সাঁতার কাটে। এ সময় এক হাতে ইলিবাই লাগাম ধরে অন্য হাতে লোকটিকে টেনে নিয়ে তীরে তোলে। ইলিবাই বলেন, যে বেইলং আগে কখনও পানিতে নামেনি তাকেই নদীতে নামাই। তখনই বুঝেছি ঘোড়ার জন্যও ঝুঁকি অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমি এটা নিয়ে দুবার ভাবিনি। একটি জীবন বাঁচাতে হলে আমাকে ওই পদক্ষেপ নিতেই হতো।

তিনি বলেন, বেইলং বুদ্ধিমান। আমি যখন তাকে চাবুক মারলাম, তখন সে বুঝে গিয়েছিল কীভাবে নদীতে নামতে হবে। আমি ও আমার ঘোড়া পরিবারের মতো। আমি তাকে বিশ্বাস করতাম এবং সে আমাকে বিশ্বাস করত।

এ ঘটনা নাড়া দিয়েছে জিয়ানতাও স্থানীয় সরকারকেও। তারা বলেছে, ইলিবাই এবং উদ্ধার অভিযানে জড়িত ঘোড়ার সাহসিকতা পুরস্কারের বিবেচনা প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া নদীর কাছে ঘোড়ার একটি মূর্তি স্থানীয় সরকার স্থাপন করবে।

বেইলং এবং ইলিবাই যে ব্যক্তিকে রক্ষা করেছিলেন তিনি বলেন, ঘোড়ার মৃত্যুর জন্য তিনি দোষী বোধ করছেন। তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। 

উদ্ধারের দৃশ্য ও সেই ঘোড়া। ছবি : সংগৃহীত
উদ্ধারের দৃশ্য ও সেই ঘোড়া। ছবি : সংগৃহীত

হঠাৎ ইউরোপ আমেরিকার মধ্যে ঠোকাঠুকি

ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে সম্প্রতি সম্পর্কের উত্তেজনা দেয়া দিয়েছে। শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে তা আরও স্পষ্ট হয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছেন। এতে ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সমস্যা উঠে এসেছে। তার সমালোচনামূলক বক্তব্যে ইউরোপের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ফলস্বরূপ ইউরোপের নেতারাও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

কী বলেছেন ভ্যান্স

সম্মেলনটি মূলত ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ ও ইউরোপে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনার জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু ভ্যান্স ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো তুলে ধরেন। বিশেষভাবে, তিনি ইউরোপের গণতন্ত্র ও মৌলিক মূল্যবোধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইউরোপে এখন ‘অভ্যন্তরীণভাবে’ সবচেয়ে বড় বিপদ রয়েছে।

ভ্যান্স বলেন, ইউরোপের সবচেয়ে বড় হুমকি রাশিয়া বা চীন নয়। বরং অভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ইউরোপের জন্য বড় হুমকি। তিনি বলেন, ইউরোপ তার মৌলিক মূল্যবোধ থেকে সরে যাচ্ছে, যা আমেরিকাের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমি ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইউরোপ আসলে কী রক্ষা করতে চায়? তারা কি শুধু নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করতে চায়?

ইউরোপীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া

জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বোরিস পিস্টোরিয়াস বলেছেন, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউরোপের পরিস্থিতিকে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন, এটি অগ্রহণযোগ্য। তিনি আরও বলেন, এটি সেই ইউরোপ নয়, যেখানে আমি থাকি। এটি সেই গণতন্ত্র নয়, যেখানে আমি নির্বাচন পরিচালনা করি।

ভ্যান্সের মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন মার্কিন সিনেটর অ্যান্ডি কিমও। তিনি বলেন, ভ্যান্সের বক্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াবে এবং আমাদের শত্রুদের উৎসাহিত করবে। তারা দেখবে যে আমেরিকা বিভক্ত ও দুর্বল।

কিম মনে করেন, এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষত ইউক্রেনের পরিস্থিতি নিয়ে যখন বিশ্ব জুড়ে আলোচনা চলছে।

ইউক্রেনবিষয়ক আলোচনা

সম্মেলনে আলোচনার মূল বিষয় ছিল ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ। ভ্যান্স ও অন্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও শান্তির জন্য স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়।

ভ্যান্স বলেন, আমরা চাই যুদ্ধ থেমে যাক। তবে শান্তি হতে হবে স্থায়ী ও নিরাপদ, যাতে ইউরোপ ভবিষ্যতে আবার সংঘাতে না জড়ায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আক্রমণ থামানোর জন্য কাজ করবেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পরিকল্পনা করবেন।

ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ভ্যান্স ইউক্রেনকে সাহায্য করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে এখন তিনি কিছুটা পরিবর্তিত মনোভাব পোষণ করছেন। তিনি বলেন, আমরা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের জন্য শান্তি চাই।

ইউরোপের নেতাদের উদ্বেগ

ইউরোপীয় নেতারা ভ্যান্সের বক্তব্যের প্রতি তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ওয়াল্টার স্টেইনমাইয়ার বলেছেন, নতুন আমেরিকান প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন, যা প্রতিষ্ঠিত নিয়ম, সহযোগিতা ও আস্থার প্রতি কোনো শ্রদ্ধা রাখে না। এটি আমাদের সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, আমরা এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারি। তবে আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থের পক্ষে ভালো নয়।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইনও ভ্যান্সের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সময়ের মধ্যে আছি, যখন আমাদের সম্মিলিতভাবে রাশিয়াকে জবাবদিহি করতে হবে। ইউক্রেনের জন্য আমরা কোনো শর্তহীন শান্তির পরিকল্পনা চাই না। কারণ এটি ইউক্রেনের জনগণের জন্য ক্ষতিকর হবে।

ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ ও শান্তি প্রক্রিয়া

মিউনিখ সম্মেলনে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ ও শান্তি আলোচনা নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়েছে। ইউরোপীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করে ভ্যান্স বলেছেন, রাশিয়া যদি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায় তবে দেশটি আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক পদক্ষেপের সম্মুখীন হবে।

এ দিকে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্নালেনা বেয়ারবক বলেন, যে কোনো শান্তি আলোচনা যদি ইউক্রেন ও ইউরোপীয়দের অংশগ্রহণ ছাড়া হয়, তা নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তার মতে, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই মতামত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্য: এনবিসি নিউজ 

ছবি : সংগৃহীত

ইন্টারনেট বন্ধ করে মিথ্যা কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী -জাতিসংঘের রিপোর্ট

জুলাইয়ে ছাত্রজনতার নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের সময় অন্যায়ভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে যথাযথ কোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়নি। ফলে ইন্টারনেট সার্ভিস ধীরগতির করা, ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশন বন্ধ করে দেয়া বা আংশিক, পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার ফলে অসংখ্যা মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিশেষ করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্য পাওয়ার স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সরাসরি মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছেন এর সঙ্গে জড়িত সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের অফিস (ওএইচসিএইচআর) থেকে বাংলাদেশ নিয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে এসব কথা বলা হয়েছে।

১১৪ পৃষ্ঠার ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ায় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ওপর গভীরভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, ব্যাঙ্কেট শাটডাউন বিশেষ পরিণতি বয়ে আনে। একে কোনোভাবেই বৈধতা দেয়া যায় না। নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা রাষ্ট্র যখন বিঘ্নিত করে তখন তার বৈষম্যমূলক ক্ষতিকর প্রভাব থাকে। তবে জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনশৃংখলা রক্ষার ক্ষেত্রে এটাকে ব্যতিক্রমভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিদ্যমান আইনের অধীনে দ্ব্যর্থহীনভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে আগে থেকে কোনো আদালত বা নিরপেক্ষ বিচারিক প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু কোনো রকম আগাম ঘোষণা না দিয়ে ১৫ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত ইন্টারনেট শাটডাউন করে দেয় সরকার। এক্ষেত্রে কোনো বৈধ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়নি। এতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। এ বিষয়ে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সিনিয়র কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার এবং সার্ভিস প্রোভাইডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওএইচসিএইচআর জানতে পেরেছে যে, ইন্টারনটে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল মন্ত্রী পর্যায় থেকে। তা জাহির করা হয়েছিল ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) মাধ্যমে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয় যে তদন্ত করেছে এবং তা ওএইচসিএইচআরের সঙ্গে শেয়ার করেছে, তার সঙ্গে এই তদন্ত মিলে যায়।

রিপোর্টে বলা হয়, ১৪-১৫ই জুলাই রাতে মধ্যরাতের সামান্য পরে মোবাইল অপারেটরদের ঢাকা ইউনিভার্সিটি, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী ইউনিভার্সিটি এবং শাহজালাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এসইউএসটি) এলাকার চারপাশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে নির্দেশনা দেয় বিটিআরসি। অনেক ক্ষেত্রে এই বার্তা দেয়া হয় হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজে। ১৫-১৬ জুলাই রাতের বেলা মোট ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এ বিষয়ে আবারও যোগাযোগ করে বিটিআরসি। ১৭ই জুলাই স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টায় এনটিএমসি অপারেটরদের নির্দেশ দেয় ফেসবুক ও ইউটিউব মধ্যরাত থেকে বন্ধ রাখতে। মধ্যরাতের সামান্য পর সব রকম ফোর জি সার্ভিস বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয় এনটিএমসি। একই সঙ্গে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেয়। ১৮ই জুলাই সন্ধ্যায় বিটিআরসি ক্যাবল কোম্পানি এবং ইন্টারনেট গেটওয়ে সরবরাহকারীদের নির্দেশনা দেয় ব্রডব্যান্ট ইন্টারনেট সুবিধা কর্তন করতে। ফলে ৫ দিন পুরো দেশ ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। জনগণ ব্যাংকিং খাত, স্বাস্থ্য খাত ও অন্যান্য অনলাইনভিত্তিক অত্যাবশ্যক সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। চলমান এই সঙ্কটের সময় তারা প্রিয়জনের কোনো খোঁজখবরও নিতে পারছিলেন না। এই শাটডাউনের কারণে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ভয়াবহ ক্ষতি হয়। একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ১০০০ কোটি ডলার। ২২শে জুলাই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক মিটিংয়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখার কারণে ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা। পরের দিন কিছু এলাকায় প্রথমে ব্রডব্যান্ড খুলে দেয়া হয়। পরে সারাদেশে তা ছাড়া হয়। তবে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগ বিষয়ক অ্যাপ্লিকেশনগুলো অব্যাহতভাবে বন্ধই ছিল। ২৮শে জুলাই বিকেল নাগাদ আস্তে আস্তে খুলে দেয়া হয় মোবাইল ইন্টারনেট। তবে ফেসবুক এবং টিকটক তখনও বন্ধ রাখা হয়। ২রা আগস্ট ইনটিএমসির নির্দেশনায় বন্ধ রাখা হয় টেলিগ্রাম এবং ম্যাসেঞ্জার। টু জি-এর বেশি মাত্রার ইন্টারনেট সেবা দেয়া হয় এমন মোবাইল ইন্টারনেট অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে ৪ঠা আগস্ট রাত ৮টার দিকে নির্দেশ দেয় এনটিএমসি। ৫ই আগস্ট সকাল সাড়ে দশটার দিকে ব্রাডব্যান্ড বন্ধ ছিল। ওইদিন আরও পরে পালিয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরেই কেন তা আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকারের এই শাটডাউনের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধতা দেয়া হয়নি। বিবৃতিতে তখনকার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী একটি বিবৃতিতে বিপরীত বর্ণনা দেন। তিনি মিথ্যাভাবে দাবি করেন, সহিংস বিক্ষোভকারীরা ঢাকায় ডাটাসেন্টারে আগুন দেয়ার কারণে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেছে। টেলিযোগাযোগ সেবাদানকারীরা এই ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়। সাবেক সরকারি সিনিয়র কর্মকর্তারা এবং এ বিষয়ে জানেন এমন ব্যক্তিরা ওএইচসিএইচআর’কে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রীর বস্তব্য তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে প্রযুক্তিগত ডাটা এবং বিশেষজ্ঞদের যে বিশ্লেষণ পেয়েছে ওএইচসিএইচআর তাতে দেখা যায়, মন্ত্রীর ওই বক্তব্য মিথ্যা। কারণ, ডাটা বলছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে অব্যাহতভাবে ইন্টারনেট ছিল। যেসব এলাকায় ডাটাসেন্টার অবস্থিত তার আশেপাশে ইন্টারনেট ছিল। আরেক বার সাবেক ওই প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল ইচ্ছাকৃতভাবে।

অন্যদিকে সাবেক একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার ফলেই বরং অধিক পরিমাণে ভুয়া তথ্য চড়িয়ে পড়েছিল। ভুয়া তথ্য বন্ধ করার পরিবর্তে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ায় জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ ব্যাহত হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আসলে বড় বিক্ষোভ এবং সহিংস দমনপীড়নকে চাপা দিতে। ১৪ থেকে ১৭ই জুলাই তখনও বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ। নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ভয়াবহভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্দেশ দেয় সরকার। এর আগে ব্রডব্যান্ড এবং মোবাইল ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রথমে ১৮ই জুলাই রাতে প্রথম পুরোপুরিভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অধিক পরিমাণ প্রাণঘাতী শক্তি মোতায়েনের নির্দেশ দেয়া হয় নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের। দ্বিতীয় পুরোপুরি শাটডাউন আরোপ করা হয় ৫ই আগস্ট সকালে। ওই সকালে সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল শক্তি প্রয়োগ করে ‘মার্চ অন ঢাকা’ থামাতে। এতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের সহিংসভাবে দমন করতে সরকার অন্যায়ভাবে এবং বেআইনিভাবে শাটডাউন করেছিল।  উপরন্তু এর ফলে বিক্ষোভকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সংগঠিত হতে পারছিলেন না। 

mzamin

৫ মাস আগে ইলন মাস্কের ১৩তম সন্তানের জন্ম দিয়েছি: বিস্ফোরক দাবি মার্কিন ইনফ্লুয়েন্সারের

মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের ১৩তম সন্তানের জন্ম দেয়ার দাবি করেছেন  ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাশলে সেন্ট ক্লেয়ার। যা নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে। এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করেন অ্যাশলে। সেখানেই ৩১ বছর বয়সী লেখিকা ও ইনফ্লুয়েন্সার বিস্ফোরক দাবি করেন। জানান, ৫ মাস আগে তিনি এক সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। যার বাবা নাকি এক্স কর্তা ইলন মাস্ক! এই পোস্ট ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই শোরগোল পড়ে যায়। এরপরই অ্যাশলে জানান, সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবেই নাকি গোটা বিষয়টা গোপন করেছিলেন তিনি।

সংবাদমাধ্যমের কাছে তার আর্জি, যেন সন্তানের ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশ্যে না আনা হয়। কারণ তিনি চান তার সন্তান বেড়ে উঠুক সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশে। ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় DOGE প্রধান যিনি এক্স প্ল্যাটফর্মে সেন্ট ক্লেয়ারকে অনুসরণ করেন, তার চাঞ্চল্যকর দাবির এক ঘণ্টার মধ্যে অন্যান্য বিষয়ের উপর বেশ কয়েকবার পোস্ট করেছেন। কিন্তু এবিষয়ে এখনও এক্স কর্তা মাস্ক কোনও মন্তব্য করেননি। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে রেকর্ড অর্থ দেয়া এই ধনকুবের এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চালাচ্ছেন— বিরোধীদের এমন দাবির মাঝে মাস্ক নিয়ে বড় দাবি করলেন মার্কিন এই লেখিকা।

অ্যাশলের দাবি, তিনি মাস্কের ১৩তম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ‘এলিফ্যান্ট আর নট বার্ডস’ নামের এক বই লিখে জনপ্রিয় হয়েছিলেন অ্যাশলে। টেসলার প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের প্রথম স্ত্রী জাস্টিন উইলসনের সঙ্গে তার পাঁচটি সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে— প্রথমে যমজ সন্তান ভিভিয়ান এবং গ্রিফিন এবং তারপরে তিন সন্তান কাই, স্যাক্সন এবং ড্যামিয়ান। পপ-তারকা গ্রিমসের সঙ্গে মাস্কের তিনটি সন্তান রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ছোট ছেলে এক্স, যাকে হোয়াইট হাউসে মাস্কের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল, মেয়ে এক্সা ডার্ক সাইডারেল এবং ছেলে টেকনো মেকানিকাস। এছাড়া নিউরা লিংকের নির্বাহী শিভন জিলিসের সঙ্গে মাস্কের যমজ সন্তান রয়েছে।  যদি অ্যাশলের দাবি সত্য হয়, তাহলে তিনিই মাস্কের জীবনের চতুর্থ নারী, যিনি তার সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন।

সূত্র : নিউ ইয়র্ক পোস্ট

mzamin

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত, শেষ হবে কবে?

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস।

বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) মিসরের কায়রোতে অনুষ্ঠিত আলোচনা শেষে হামাস নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির সমাপ্তির হুমকি আপাতত বন্ধ করেছে।

তবে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি একে একে নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা উপত্যকা দখলের পরিকল্পনার ফলে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকছে এবং গাজা উপত্যকাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও জোরালো হতে পারে।

ইসরায়েল এবং ইরানের উত্তেজনা

ইসরায়েল এবং ইরান, দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের পটভূমি অনেক পুরনো, তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এই উত্তেজনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে এসেছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলা ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দিলেও, এর ফলে পুরো অঞ্চলে বিশাল আকারের সহিংসতা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পূর্ববর্তী বোমা হামলার প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে এমন ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের শত্রু পক্ষগুলোর মধ্যে এই নতুন উত্তেজনা সারা অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে, যার ফলে নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং শান্তি আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু অস্ত্র বানানোর সুযোগ দিতে চান না। এদিকে ইরান যদি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করে, তবে ট্রাম্প অপেক্ষা করতে রাজি নন। এমন পরিস্থিতিতে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি শিগগিরই একটি শান্তিপূর্ণ চুক্তি প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে ইরান এবং ইসরায়েলকে ঘিরে আরও সংঘাত শুরু হতে পারে।

গাজা পরিস্থিতি ও আরব বিশ্বের উদ্বেগ

গাজা উপত্যকা ইসরায়েলের আক্রমণ এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা নিয়ে আরব লীগ এবং ইরান উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশিত, তবে এর মধ্যে নতুন সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে।

অবস্থা আরও জটিল হতে পারে

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া কঠিন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই অঞ্চলের সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করতে না পারে, তবে সংঘাতের সম্ভাবনা আরও বাড়বে এবং শান্তির আশা আরও দূরে সরে যাবে।

সর্বশেষ, গাজা উপত্যকা ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বিষয়ক উত্তেজনা মিলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। পরিস্থিতি যদি এমনভাবে চলতে থাকে, তবে আরও সংঘাত এবং অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ড, যেখানে প্রতিদিনের জীবনে নেমে এসেছে ভয়, আতঙ্ক এবং মানবিক সংকট। ছবি : সংগৃহীত
যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ড, যেখানে প্রতিদিনের জীবনে নেমে এসেছে ভয়, আতঙ্ক এবং মানবিক সংকট। ছবি : সংগৃহীত

জাতিসংঘের দলিল: হাসিনাকে আন্দোলন সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল, তিনি পাত্তা দেননি

ছাত্রদের নেতৃত্বে গণআন্দোলন সম্পর্কে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে অবহিত করেছিলেন সিনিয়র গোয়েন্দা এবং সরকারি কর্মকর্তারা। কিন্তু শেখ হাসিনা তাদেরকে পাত্তা দেননি। তার সরকার উল্টো প্রতিবাদী ছাত্রদের আন্দোলনে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। তাদেরকে অবৈধ করার চেষ্টা করে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে এসব কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের অফিস (ওএইচসিএইচআর) ১১৪ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ওই রিপোর্ট প্রকাশ করে। একে জাতিসংঘের একটি অনন্য দলিল হিসেবে দেখা হয়। শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছিলেন এমন সরকারি কর্মকর্তা ও সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সাক্ষাৎকারে উপরোক্ত তথ্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ২০২৪ সালে কোটা বিরোধী আন্দোলন ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় সরকারের ক্ষমতায় থাকার বিরুদ্ধে একটি বড় রাজনৈতিক হুমকি হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে তারা শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন। তারা সতর্ক করেছিলেন যে, ছাত্রদের এই আন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যুক্ত হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সমস্যার সমাধানের জন্য দ্রুততার সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে। কিন্তু শেখ হাসিনা কঠোর অবস্থান নেন। তিনি সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রাইভেটলি বলেন, শিক্ষার্থী জানতে পারবে যে তাদের প্রতিবাদ বিফলে যাবে। ৭ই জুলাই তিনি প্রকাশ্যে বলেন যে, হাইকোর্টের রায়ের পর কোটাবিরোধী আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ছাত্রদের আন্দোলনে বিরোধীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে নিন্দা জানাতে শুরু করেন। সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- তখনকার ডিজিএফআই মহাপরিচালক ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে ১০-১১ই জুলাই রাতের বেলা মিটিং করেন শেখ হাসিনা। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করার জন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে কর্তৃত্ব দেন হাসিনা।  ১১ই জুলাই বর্তমানে নিষিদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন দৃশ্যত একটি হুমকি দেন। তিনি বলেন- কেউ কেউ এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। তাদের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছাত্রলীগ। একই দিনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভে পুলিশ শক্তি প্রয়োগ করে। লাঠিচার্জ করে। কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। শাহবাগে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং চট্টগ্রামে ছাত্রদের বিক্ষোভের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশ। ১৩ই জুলাই প্রতিবাদ বিক্ষোভে অনুপ্রবেশের বিষয়ে পুলিশি তদন্তের ঘোষণা দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ। ২০২৪ সালের ১৪ই জুলাই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো উত্তেজনা ছড়িয়ে দেন একটি বক্তব্যের মাধ্যমে। তিনি বলেন, তাদের (ছাত্র আন্দোলনকারীরা) মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এত ক্ষোভ কেন? যদি মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা কোটা সুবিধা না পায়, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা সেই সুবিধা পাবে?

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে ব্যক্তিগতভাবে আহত হন ছাত্ররা। একই দিন সন্ধ্যায় বিপুল সংখ্যক ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী প্রতিবাদ করেন। তারা স্লোগান দেন- তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার। এই স্লোগানে র‌্যালি থেকে যেন কান্না ভেসে আসতে থাকে। পরে তারা এই স্লোগানকে আরো পরিষ্কার করে। যুক্ত করে- কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত ছাত্রী প্রতিবাদে যোগ দিতে রাতের নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ করে বেরিয়ে আসেন। শিক্ষার্থীদের রাজাকার স্লোগানের জবাবে সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী প্রকাশ্যে বলতে থাকেন যে, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মেনে নেয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে। ১৪ই জুলাই তখনকার শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল চৌধুরী বলেন, এসব বিশ্বাসঘাতকদের প্রতি সম্মান দেখানো রাষ্ট্রের পক্ষে আর সম্ভব নয়। এ সময় তিনি বিক্ষোভকারীদের এ যুগের রাজাকার আখ্যায়িত করেন। তখনকার তথ্যপ্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আরাফাত ঘোষণা দেন- যারা রাজাকার হতে চায়, তাদের কোনো দাবিই মেনে নেয়া হবে না। একইভাবে তখনকার সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী দিপু মনি ইঙ্গিত দেন যে, যারা নিজেদেরকে রাজাকার হিসেবে পরিচয় দিয়েছে তাদের মাথায় ওই (বাংলাদেশের) পতাকা বেঁধে মার্চ করার কোনো অধিকার নেই।
একপর্যায়ে ছাত্রলীগ, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। ১৪ই জুলাই সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র কর্মকর্তারা মাঠে নেমে পড়েন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরকে পরবর্তী দুই দিন বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালানোর উস্কানি দেন। ছাত্ররা তাদের প্রতিবাদ বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে থাকেন। মাঝে মাঝে ছাত্রলীড়ের বিরুদ্ধে তারা প্রতিরক্ষা গড়ে তোলেন। ওএইচসিএইচআর যেসব তথ্য পেয়েছে তাতে বলা হয়েছে, এসব পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। সাবেক একজন সিনিয়র কর্মকর্তা ওএইচসিএইচআরকে ব্যাখ্যা করেছেন যে, আমাদের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের আহ্বানের ভিত্তিতে আমাদের ছাত্ররা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়। যা ঘটেছে তা অপ্রত্যাশিত। শিক্ষার্থীরাও পাল্টা লড়াই করেছে। ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ বিক্ষোভকে দমিয়ে রাখতে একা ছাত্রলীগের যথেষ্ট শক্তি ছিল না। ফলে পুলিশ অধিক শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ও বাইরে পুলিশ কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। এর মধ্যে আছে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট। তবে তাদের কাছে প্রাণঘাতী ধাতব গুলি লোড করা শটান ছিল। এ সময় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সমর্থকরা পুলিশের সহায়তায় হামলা চালায়। শুধু ১৬ই জুলাই নিহত হন ৬ জন। তার মধ্যে অন্যতম রংপুরের আবু সাঈদ। তাকে হত্যার ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলন আরো ক্ষিপ্রতা পায়। যুক্ত হন বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী।

mzamin

জাতিসংঘের রিপোর্টে হাসিনা সরকারের নৃশংসতা: ১৪ বছরের বালকের শরীরে ৪০টি গুলি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নেতৃত্বাধীন সরকার, তার দল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কীভাবে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে নৃশংসতা চালিয়েছিল তার প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করেছে জাতিসংঘ। বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের অফিস (ওএইচসিএইচআর) যে ১১৪ পৃষ্ঠার ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তার পরতে পরতে আছে এমন বর্ণনা। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত কীভাবে শেখ হাসিনা নৃশংসতার নির্দেশ দিয়েছিলেন তা উল্লেখ করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, আন্দোলনের শেষ দিন ৫ই আগস্ট যখন লাখ লাখ মানুষ ‘মার্চ অন ঢাকা’ কর্মসূচিতে নেমে পড়েন, শুধু সেই একদিনেই হত্যা করা হয়েছে প্রায় ৪০০ মানুষকে। নিহতের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ওএইচসিএইচআর এই হিসাব করেছে। এতে তথ্য মিলেছে যে, বিক্ষোভে গুলি চালিয়ে যাদের হত্যা ও আহত করা হয়েছে, তার মধ্যে আছে শিশুও। গাজীপুরে ১৪ বছর বয়সী একটি বালককে গুলি করা হয়েছে। তার শরীরে বিদ্ধ হয়েছে ৪০টি গুলি। রিপোর্টে আরও বলা হয়, ১৪ থেকে ১৫ই জুলাই রাতে সশস্ত্র ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত বেশ কিছু নেতাকর্মী অবস্থান নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা পুরো ক্যাম্পাসে ভীতির পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ওই রাত তিনটার দিকে ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন রাজু ভাস্কর্যে নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ১৫ই জুলাই সোমবার থেকে বাংলাদেশের রাজপথে কোনো রাজাকার থাকবে না। প্রতিটি জেলা, শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেতাদের তিনি পরিষ্কার নির্দেশনা দেন যে, যারাই নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করবে, শহীদদের নিয়ে উপহাস করবে- তাদেরকে রাজপথে মোকাবিলা করতে হবে। ১৫ই জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তখনকার সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ছাত্ররা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। আমরা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, এদেরকে শায়েস্তা করতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এরপরই বেপরোয়া হয়ে ওঠে ছাত্রলীগ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেলে আরোহণের সময় ব্যবহৃত হেলমেট পরে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে এভাবে ভীতি প্রদর্শন করে। ১৪ই জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ধাতব বার ও কাঠ নিয়ে এ হামলা চালায়। বেশ কিছু নারী শিক্ষার্থীকে মৌখিকভাবে যৌন নির্যাতনের হুমকি দেয়। পরের রাতে আওয়ামী লীগের আরও কিছু নেতাকর্মী মাথায় হেলমেট পরে এবং কুঠার, ছুরি, আগ্নেয়াস্ত্র সহ ক্যাম্পাসে র‌্যালি করে। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবনের সামনে নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানেও তাদের ওপর হামলা হয়। ওই বাসভবনের গেট বন্ধ করে দেয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিবাদী নেতাদের প্রকাশ্য ঘোষণা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পাওয়া তথ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জানানো হয়। বলা হয়, ৫ই আগস্ট ঢাকামুখী বড় র‌্যালির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এমন অবস্থায় ৪ঠা আগস্ট তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেন। এতে অংশ নেন সেনাপ্রধান, বিমান বাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, বিজিবি’র প্রধান, ডিজিএফআই’র প্রধান, এসএসআই প্রধান, পুলিশ ও তার বিশেষ শাখার প্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। ৫ই আগস্ট ‘মার্চ অন ঢাকা’ প্রতিরোধ করতে তারা নতুন করে কারফিউ জারি করা নিয়ে আলোচনা করেন। মিটিং শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে কোনোরকম বিরতি না দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কঠোরভাবে কারফিউ থাকবে। অন্যদিকে প্রতিবাদীদেরকে এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যায়িত করেন। তিনি কঠোর হাতে এসব ‘সন্ত্রাসী’কে দমন করতে দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানান। ৪ঠা আগস্ট বেশ রাতে দ্বিতীয় আরেকটি মিটিং হয় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে। তাতে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসার/ভিডিপি’র প্রধানগণ, আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার,  সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল প্রমুখ। মিটিংয়ে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করা হয় যে, ঢাকাকে নিরাপদ রাখা যেতে পারে। ওই মিটিংয়ের একটি সূত্র বলেছেন, এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনায় সবাই একমত হন। তার অধীনে ঢাকার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশের সুযোগে বাধা দিতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং বিজিবি মোতায়েন থাকবে। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে এক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ করা হবে। সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে। এ জন্য ব্যবহার করা হবে সাঁজোয়া যান এবং সেনা, বিজিবি সদস্য। নিশ্চিত করা হবে বিক্ষোভকারীরা যাতে প্রবেশ করতে না পারেন। ওই মিটিংয়ে থাকা একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, এ সময়ে পুলিশের দায়িত্ব ছিল ‘মব নিয়ন্ত্রণ’ করা। এসব সাক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৪ঠা আগস্ট রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে অর্থাৎ ৫ই আগস্ট দিনের সূচনালগ্নে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সেসের সাবেক মহাপরিচালক বিজিবি মহাপরিচালককে হোয়াটসঅ্যাপে পর পর দু’টি বার্তা পাঠান। ওএইচসিএইচআর’কে ওই বার্তার হার্ডকপি সরবরাহ করা হয়েছে। তার মধ্যে প্রথম বার্তাটি ছিল একটি ব্রডকাস্ট মেসেজ। ঢাকার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে প্রবেশের রুটগুলোতে কীভাবে পৌঁছাতে হবে বিক্ষোভকারী নেতারা সে বিষয়ে এতে তথ্য দেন বলে মনে হয়।  দ্বিতীয় বার্তায় একটি ভিডিও ছিল। তাতে কীভাবে লড়াই চালাতে হবে, প্রতিরক্ষার প্রথম ও দ্বিতীয় লাইন নির্ধারণ হবে, একটি লং রেঞ্জের তৃতীয় ইউনিট থাকবে, একটি ব্যাকআপ ইউনিট থাকবে। ৫ই আগস্ট সকালে সেনাবাহিনী এবং বিজিবি সদস্যরা ব্যাপক অর্থে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরিকল্পনায় তাদেরকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তারা তা বাস্তবায়ন করেননি। সিনিয়র একজন কর্মকর্তা সাক্ষ্যে বলেছেন, যাদেরকে মোতায়েন করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল সেনাবাহিনী তাদেরকে মোতায়েন করেনি। অন্য একজন বলেন, বিজিবি সদস্যরা প্রতি ঘণ্টায় এন্ট্রি পয়েন্ট দিয়ে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার বিক্ষোভকারীকে প্রবেশ করতে দিয়েছিলেন। এসব পয়েন্ট তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল। তৃতীয় একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি কীভাবে জানতে পারেন যে কিছু ভুল হয়ে গেছে, যখন তিনি সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পারেন উত্তরা থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ বিক্ষোভকারী ঢাকার কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসছে। তাদেরকে সেনাবাহিনী বাধা দিচ্ছে না। চতুর্থ একজন সিনিয়র কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে তখনকার প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে ফোন করেন এবং তাকে জানান, পরিকল্পনামতো হচ্ছে না কিছুই। তা সত্ত্বেও তখনো পর্যন্ত ‘মার্চ অন ঢাকা’ থামাতে পুলিশ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে বিভিন্ন স্থানে। একজন পুলিশ কমান্ডার বলেন, ওইদিন দিনের শুরুতেই সেনাবাহিনী জেনে গিয়েছিল শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। কিন্তু পুলিশ জানতো না। তাই সরকারকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য তখনো তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

পুলিশ যে বিভিন্ন স্থানে গুলি করছিল তার বেশ কিছু ঘটনা প্রামাণ্য আকারে তুলে ধরেছে ওএইচসিএইচআর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তারা এবং পুলিশের অন্য সদস্যরা রাইফেল থেকে প্রাণঘাতী গুলি ছুড়েছে। বিক্ষোভকারীরা রাজধানীর শাহবাগে জড়ো হওয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদেরকে থামাতে তারা কম-প্রাণঘাতী অস্ত্রও ব্যবহার করেছেন।  একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, যাকে দেখেছে তাকেই গুলি করছিল পুলিশ। বাড্ডায় রামপুরা ব্রিজ অতিক্রমের চেষ্টা করছিলেন বিক্ষোভকারীরা। তাদের দিকে পুলিশ গুলি করেছে। কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে। এতে আহত হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। সকালে এসব ঘটনায় আহত অনেক ভিকটিমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আজমপুরে ১২ বছর বয়সী একটি বালককে পুলিশ গুলি করে। সে বলেছে, বৃষ্টির মতো সবদিক থেকে গুলি করছিল পুলিশ। একই সঙ্গে ওই লোকেশনে কমপক্ষে এক ডজন মৃতদেহ দেখেছে বলে জানায়। সাভারের আশুলিয়াতে বিক্ষোভকারীদের থামাতে এবং আটক করার জন্য শুরুতে বেশ কিছু চেকপয়েন্ট বসায়। কিন্তু বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ার পর তারা কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। তাতেও তাদেরকে দমাতে না পেরে তারা শটগান থেকে প্রাণঘাতী গুলি করে। আহত অন্য বিক্ষোভকারীকে সহায়তা করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন এক প্রত্যক্ষদর্শী। বিক্ষোভকারীদের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি করে পুলিশ। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ হতাহত হন। ওই এলাকায় বেশ কিছু পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন একজন সাংবাদিক। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে বলেন, সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারা তাদেরকে মোতায়েন করতে বাধ্য করেছেন। কিন্তু সাধারণ পুলিশ সদস্যরা কেউ হতাহত হোক এটা দেখতে চাননি। ওই এলাকার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী একটি বালকের মৃতদেহ দেখেছেন। তাকে ওইদিন ৫ই আগস্ট হত্যা করা হয়েছে। তিনি ওএইচসিএইচআর’কে বলেছেন, ৫ই আগস্ট ছিল আমাদের জন্য আনন্দের দিন। কিন্তু ওই বালকটির জন্য ছিল সবচেয়ে বেদনার।  ৫ই আগস্ট যাত্রাবাড়ী পুলিশ স্টেশনের পুলিশ ও আনসাররা থানা ও এর কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিতে বিক্ষোভকারীদের দিকে গুলি করার নির্দেশ পায়। বিপুল পরিমাণ বিক্ষোভকারী ওই থানার চারপাশে অবস্থান নিলে তারা রাইফেল ও শটগান দিয়ে প্রাণঘাতী গুলি চালাতে থাকে। এ সময় কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এদিন সেখানে বেশ কিছু বিক্ষোভকারী নিহত ও আহত হন। এর মধ্যে ছিলেন একজন অটিস্টিক ব্যক্তি। দু’টি গুলি বিদ্ধ করে তাকে। ওই এলাকায় মোতায়েন করা সেনাসদস্যরা বিকাল নাগাদ পরিস্থিতি শান্ত করেন। তারপর তাদেরকে প্রত্যাহার করা হয়। এর অল্প পরেই থানার গেটের বাইরে জমায়েত হওয়া বিক্ষোভকারীদের দিকে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এ সময় পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি করে এবং বেশ কিছু নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করে খুব কাছ থেকে। ৫ই আগস্ট বিকালে জনতা শেখ হাসিনার বিদায়কে উদ্‌যাপন করতে থাকেন। তখনো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি করছিল পুলিশ। এতে মারা যায় বেশ কিছু শিশু। উত্তরায় ৬ বছর বয়সী একটি শিশুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার পিতামাতা বিজয় র‌্যালি করতে তাকে নিয়ে বের হয়েছিলেন। ওই শিশুকে উরুতে গুলি করা হয়েছিল। পরে সে হাসপাতালে মারা যায়। কে তাকে গুলি করেছিল তা প্রত্যক্ষদর্শীরা বলতে পারেননি। কারণ, তখন পরিস্থিতি ছিল বিশৃঙ্খল। নিরাপত্তা রক্ষাকারী ও আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তখনো সাউন্ড গ্রেনেড মারছিল। মিরপুরে বিজয় র‌্যালিতে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা গুলি করে একজনকে। ৫ই আগস্ট বিকালে গাজীপুরে ১৪ বছর বয়সী বালককে ইচ্ছাকৃতভাবে পঙ্গু করে দেয়া হয়। শান্তিপূর্ণ র‌্যালিতে গুলি করা হয়। তাতে তার ডানহাতে গুলিবিদ্ধ হয়। প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা ছিলেন নিরস্ত্র এবং তারা বড় কোনো হুমকি ছিলেন না। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষাকারীরা কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই গুলি করা শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আনসার গেটে সমবেত জনতার মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা পালাতে থাকেন। ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণ মেলে যে, ওই বালকটিকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। এতে তার ডানহাতে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। তার শরীরে কমপক্ষে ৪০টি গুলি বিঁধে যায়। হাড় ও টিস্যুর মারাত্মক ক্ষতি করেছে। আরেকটি ঘটনা ঘটে গাজীপুরে। সেখানে এক অজ্ঞাত রিকশাচালককে ঘেরাও করে পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে। এরপর তার লাশ টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে নেয়। আর তা ফেরত দেয়নি। ফলে তার পরিবার প্রিয়জনের লাশ দাফন করার সুযোগ পায়নি। তাকে যে পুলিশ কর্মকর্তা গুলি করেছিল, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেপ্টেম্বরে। তার পরিবারের একজন সদস্য ওএইচসিএইচআর’কে বলেছেন- আমি ন্যায়বিচার চাই, পক্ষপাতিত্বহীন তদন্ত চাই ও তার মৃতদেহ ফেরত চাই। ওদিকে আশুলিয়াতে এদিন বিকালে পরিস্থিতি উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা আশুলিয়া পুলিশ স্টেশনে টার্গেট করেন। বিপুল সংখ্যক মানুষ থানা ঘেরাও করেন। তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। জবাবে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি করে। ব্যবহার করে প্রাণঘাতী গুলিভর্তি মিলিটারি রাইফেল। চলে যাওয়ার পর পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেয় পুলিশ। এ সময় গুলি চালাতে থাকে। উত্তেজিত জনতাকে ভয় দেখানোর জন্য এটা করা হয়েছে- এমনটা মনে হতে পারে। এর ফলে বিক্ষোভকারী ও পথচারীরা হতাহত হন। খুব কাছ থেকে ছোড়া গুলি একটি ১৬ বছর বয়সী বালকের মেরুদণ্ডে বিদ্ধ হয়। এতে তিনি প্যারালাইজড হয়ে গেছেন। সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশে পুলিশ পরে গুলিতে নিহতদের মৃতদেহ একটি ভ্যানে তোলে এবং তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর মধ্যদিয়ে তারা দেখাতে চায় যে, বিক্ষোভকারীরা এদেরকে হত্যা করেছে। এমন একটি মিথ্যা আবহ তৈরির বাসনা ছিল তাদের।

mzamin

ইসরায়েলের বাধায় আটকে আছে ফিলিস্তিনিদের ‘ভ্রাম্যমাণ বাড়ি’

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি সীমান্তে আটকে আছে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জন্য বরাদ্দ অস্থায়ী ‘ভ্রাম্যমাণ বাড়ি’। যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও ইসরায়েলের বাধায় এসব ত্রাণ ও সহায়তা গাজার জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।

শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) গণমাধ্যম আল-জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

এদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজার মানুষ এখনো অমানবিক পরিস্থিতির মুখে। খাদ্য, পানি এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের তীব্র সংকট চলছে। তীব্র শীত ও খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে অনেক ফিলিস্তিনি খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। গাজার বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করছেন।

এছাড়া, ইসরায়েলি সীমান্তে আটকে থাকা ত্রাণের মধ্যে রয়েছে- অস্থায়ী ঘর বা প্রিফ্যাব্রিকেটেড বাড়ি, যা যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে, এসব বাড়ি গাজায় পৌঁছানোর জন্য ইসরায়েলি অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।

গাজার রাফাহ সীমান্তে মিসর থেকে এসব প্রিফ্যাব্রিকেটেড বাড়ি ও ভারী যন্ত্রপাতি প্রবেশ করতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই বাড়িগুলো গাজার মানুষের জন্য আশ্রয় এবং পুনর্বাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে যে, ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে তারা ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার কিংবা নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করতে পারছে না।

এদিকে, ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেলআবিব মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছে যে, তারা ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিতে রাজি, তবে এর বিনিময়ে বন্দি বিনিময়ের দাবি জানিয়েছে।

পরিস্থিতি যখন এই, গাজা উপত্যকার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আশা করা যায়, মধ্যস্থতাকারীরা এ সংকট নিরসনে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবে, যাতে গাজার মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার ফিরে পায়। 

গাজা উপত্যকায় খাদ্য, পানি এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের তীব্র সংকট চলছে। ছবি : সংগৃহীত
গাজা উপত্যকায় খাদ্য, পানি এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের তীব্র সংকট চলছে। ছবি : সংগৃহীত

চোরতন্ত্র ও সাধুতন্ত্রের মাঝে... by মহিউদ্দিন আহমদ

পৃথিবীজুড়ে কত রকমের সরকার! আমাদের দেশেও দেখেছি নানা আকারের ও প্রকারের শাসন। এখন চলছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল। এটি অবশ্য দ্বিতীয়বার এসেছে। প্রথমবার এসেছিল ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। তখন সরকারের হাল ধরেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। ওই সরকার নির্বাচন দিয়েছিল তিন মাসের মধ্যে। এখন চলছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। কত দিন চলবে জানি না।

দুই অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে একটা ফারাক আছে। প্রথমবার এটি এসেছিল সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। সেবার সরকারের ‘পতন’ হয়নি। একনায়ক এরশাদ পদত্যাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। তারপর তাঁকে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢোকানো হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন দিয়ে দু–দুবার সংবিধান সংশোধন করিয়ে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন স্বপদে ফিরে গিয়েছিলেন

গত বছর ৫ আগস্ট সরকারের পতন হলো। বলা হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। প্রচণ্ড এক গণবিদ্রোহে তাঁকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। সরকার বলতে তখন রাস্তায় ছাত্র-জনতা আর গণভবন-বঙ্গভবনে সেনাবাহিনী। ৮ আগস্ট তৈরি হয় ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। বলা হলো, এ সরকার জমে থাকা জঞ্জাল সাফসুতরো করে নির্বাচন দেবে। সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে ইউনূস সরকারকে বৈধতা দিয়ে দেন।

অন্তর্বর্তী সরকার বলতে আমরা বুঝি দুটি ‘স্বাভাবিক’ সরকারের মধ্যবর্তী সময়ের একটি অস্থায়ী সরকার। এটির দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই এটি অন্তর্বর্তী সরকার। অনুমান করি, এই সরকারের অধীনে একটি সাধারণ নির্বাচন হবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা একটি ‘স্থায়ী’ সরকার গঠন করবেন। তখন সবকিছু চলবে শাস্ত্রমতে। শাস্ত্র হচ্ছে সংবিধান। তবে সংবিধান কোনো আসমানি কিতাব নয়। এটি প্রয়োজন ও সুবিধা অনুযায়ী কাটছাঁট কিংবা বানানো হবে। যাঁরা দেশের অভিভাবকত্ব দাবি করেন, এটি তাঁরাই করবেন।

তর্কের খাতিরে ধরে নিই, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। গণতন্ত্রের কথা বলে কিছু ব্যক্তি ও পরিবার সংবিধান যথেচ্ছ কাটাছেঁড়া করে তন্ত্র রেখে গণ বাদ দিয়েছিল। এটাকে আমরা নাম দিয়েছি স্বৈরতন্ত্র। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে হাঁটি–হাঁটি পা–পা করে স্বৈরবাবু যাত্রা শুরু করে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে তার ষোলোকলা পূর্ণ করেছিল। সরকার থেকে ‘আমরা’ উঠে গিয়েছিল। চালু হয়েছিল ‘আমি’।

১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রকল্প চালু হলো। কিন্তু জেঁকে বসল পরিবারতন্ত্র। পর্যায়ক্রমে দুই পরিবারের শাসন, রহমান অ্যান্ড রহমান। ২০১১ সালে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা নির্বাসনে পাঠিয়ে চালু হয় পুরোপুরি রাজতন্ত্র। এর সঙ্গে জুটে যায় নানা বর্ণের মৌ-লোভী স্তাবক-মোসাহেব। তাঁরা তাঁকে বলতেন ‘দেশরত্ন’।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই দেশরত্ন যখন তাঁর বোন আর কয়েকটি স্যুটকেস নিয়ে মন খারাপ করে গণভবন থেকে বেরিয়ে যান, স্তাবকেরা কেউ তাঁকে দেখতে আসেননি। ধীরে ধীরে আমরা জানতে পারলাম, রানির পরিবারের সবাই চোর। তাঁরা গণতন্ত্রকে মাটিতে পুঁতে চালু করেছিলেন চোরতন্ত্র। ১৯৭২ সালে শুরু হয়েছিল সামান্য কম্বল চুরি দিয়ে। শেষ হলো ব্যাংক লোপাট করে।

হাসিনাকে যেতে হবে, এটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর তাবৎ রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত লেঠেলদের বাইরে তিনি তাকিয়েছিলেন নয়াদিল্লির দিকে। নয়াদিল্লিও বুঝতে পেরেছিল, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া এই ঘোড়ার ওপর নতুন করে আর বাজি ধরা যায় না। হাসিনা এটা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি কিছুটা সময় পেয়েছিলেন। ওই সময়ে তিনি তাঁর পরিবার, স্বজন ও কাছের জ্ঞাতি-গুষ্টির লোকেদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন।

সবার শেষে যান তিনি। সঙ্গে বোন আর বোনের দেবর, যাঁর হাতে ছিল সশস্ত্র বাহিনী। নয়াদিল্লি তাঁর ভার আর না বইতে চাইলেও তাঁকে ফেলে দেয়নি। আশ্রয় দিয়েছে পরম মমতায়। এত কিছু পাওয়ার পর এতটা অকৃতজ্ঞ কি তারা হতে পারে? তবে একটা নিশ্চিত তালুক হারিয়ে নয়াদিল্লিরও মন খারাপ। আমরা এখনো অনেক কিছু জানি না, কীভাবে কী হয়ে গেল। পুরো ম্যাজিকটা বুঝতে আরও সময় লাগবে।

হাসিনার চলে যাওয়াটা ছিল একটা ‘নেগোশিয়েটেড সেটেলমেন্ট’। না গেলে তাঁর বিপদ হতো। যেভাবে লাখো মানুষ চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসছিল গণভবনের দিকে, ওই সময় সটকে না পড়লে তাঁর জান যেত। এটা হতো পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পুনরাবৃত্তি। নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধভাবে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নিঃশেষ করে দেওয়ার ফলে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো ছাড়া আর কোনো পথ রাখেননি তিনি। একই ভুল করেছিলেন তাঁর পূর্বসূরি শেখ মুজিবুর রহমান।

দেশে আগে একটা সরকার ছিল, এটা বোঝা যেত। এখন বোঝা যাচ্ছে না। অথবা আমরা অনেকেই বুঝতে পারছি না সরকারটা কোথায়? এটা কি ওয়াশিংটনে, প্যারিসে, শ্যামলীতে, নয়াপলটনে, মগবাজারে, হাটহাজারীতে নাকি মোনাইয়ের চরে। শাহবাগের চৌরাস্তা এখন পানিপথের ময়দান। সেখানে প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধ হচ্ছে। যাঁর যা দাবি আছে, তা–ই নিয়ে লোকেরা সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। এটা চাই, ওটা চাই। তাঁরা বলছেন এসব হলো ‘আন্দোলন’। সমস্যা কী? টাকা দেবে গৌরী সেন। গৌরী সেনের তো টাকা নেই। তো টাকা আসবে কোথা থেকে? ট্যাক্স-ভ্যাট বাড়িয়ে গলায় গামছা দিয়ে গরিব মানুষদের কাছ থেকেই টাকা আদায় করা হবে। ২০ লাখ লোককে পুষতে ১৭ কোটি লোক কাফফারা দেবে। রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার এই এক দায়।

যাহোক, এখন আমরা আছি অন্তর্বর্তী জমানায়। প্রশ্ন হলো, এটা চলবে কত দিন? আমরা জানি, এ রকম টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হলে তার জের চলে অনেক দিন ধরে। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে সেন্ট পিটার্সবার্গে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ঘটল রুশ বিপ্লব। তারপর গৃহযুদ্ধ চলল কয়েক বছর। স্থিতি আসতে সময় লেগেছিল অনেক। আশপাশের দেশ কম্বোডিয়ায় এটি চলেছে কয়েক বছর। পাশের দেশ মিয়ানমারে চলছে অনেক বছর ধরে।

এটাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়? চোখে যা দেখছি, মনে হচ্ছে একটা গণরাজ কায়েম হয়েছে। রাজনৈতিক সন্তরা অনেকেই অধীর হয়ে আছেন নির্বাচনের জন্য। ফেলে আসা চোরতন্ত্র আর আগামীর বহু আকাঙ্ক্ষিত সাধুতন্ত্রের অন্তর্বর্তী স্তরে এখন চলছে এক অভূতপূর্ব ‘মবতন্ত্র’। এই মবের মধ্যে আবার অনেক রঙের মানুষ আছেন। এই মব কোনোক্রমেই অবিভাজ্য নয়। এ নিয়ে একদিন হয়তো তৈরি হবে নতুন তত্ত্ব, লেখা হবে নতুন শাস্ত্র। অনেকে এ নিয়ে গবেষণা করবেন। তার তথ্য-উপাত্ত জোগাড়ের আয়োজন চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কিতাব লেখা হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আরও হবে। পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। শেষ কথাটি বলা যাচ্ছে না।

এ দেশে বাণী দেওয়ার জন্য পীর-মুরশিদের অভাব হয়নি কখনো। তাঁদের কেউ পলিটিক্যাল, কেউ আধ্যাত্মিক। দেশের এই উথালপাতাল সময়ে বেশ কজন ত্রাতার আবির্ভাব দেখছি। তাঁদের সমর্থকের অভাব নেই। তাঁরা ফতোয়া দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, এই মব হলো উচ্ছৃঙ্খল জনতা। এদের রুখতে হবে।

অন্যরা বলছেন, মব বলে গালি দেওয়ার অর্থ হলো পতিত স্বৈরাচারের গণবিরোধী ভূমিকাকে সমর্থন করা। উভয় দলই পরস্পরকে নির্মূল করার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে। আপনি যে আপনার মতটি নির্ভয়ে প্রকাশ করবেন, তার জো নেই। কিছু একটা বললেই আপনাকে কেউ না কেউ চেপে ধরবে। বলবে, ব্যাটা ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসর, সাম্রাজ্যবাদের দালাল, ধর্মদ্রোহী, সুবিধাবাদী। একদল আরেক দলকে বলছে তৌহিদি জনতা কিংবা নাস্তিক। ভিন্নমত মানেই শত্রু। অতএব তাকে ধরে পেটানো জায়েজ।

এরা আমাদের অতিপরিচিত। এদের ঠিকুজি, এদের অতীত আমাদের জানা। তাঁরা আগে কে কোথায় কী বলেছিলেন, কী করেছিলেন, সেসব এখনো স্মৃতিতে রয়ে গেছে তাজা। কী আর করা! শেষমেশ রবীন্দ্রনাথেই আশ্রয় নিয়ে মনে মনে বলি:

আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে—

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!

* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক

চোরতন্ত্র ও সাধুতন্ত্রের মাঝে...