Saturday, April 19, 2014

পশ্চিমবঙ্গের ভোটচিত্র by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

কী হয়েছে কে জানে, এল নিনো নাকি মানুষের পাপের বোঝা, পশ্চিমবঙ্গ ফুটিফাটা হয়ে রয়েছে। চৈত্র গেল, বৈশাখও নয় নয় করে কটা দিন কাটিয়ে দিল। হাওয়া অফিস নিত্যদিন কালবৈশাখীর আশা দেখিয়ে দেখিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে রয়েছে। কলকাতাসহ গোটা রাজ্যে ‘নাই রস নাই, দারুণ দাহন বেলা’। প্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বেড়ে চলেছে নির্বাচনী তাপ-উত্তাপ। এরই মধ্যে দেশের পঞ্চম ও রাজ্যের প্রথম দফার ভোটটা হয়ে গেল। উত্তরবঙ্গের মাত্র চারটি আসনে এই দাবদাহেও ভোট পড়ল ৮০ শতাংশের বেশি। গ্রীষ্মের ভ্রুকুটি ভোটারদের ভয় দেখাতে ব্যর্থ।

রানা প্লাজা- শ্রমিকের কান্না এখনো থামেনি by জলি তালুকদার

গত বছরের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজায় ঘটে গেল একটি বর্বর হত্যাকাণ্ড। সবাই দেখল, যাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরান, তাঁদের জীবনের চাকাকে কীভাবে থামিয়ে দেওয়া হলো। মুনাফালোভী মালিকদের উদগ্র বাসনার নিচে চাপা পড়ে পিষ্ট হয়ে গেল এক হাজার ১৩৫টি তাজা প্রাণ। অসংখ্য মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হলো।

মোদিকে নিয়ে বিভক্ত বলিউড

নন্দিতা দাস -সেলিম খান
ভারতীয় ভোটারদের কাছে একটি আবেদন জানিয়ে খোলা চিঠি লিখেছেন বলিউডের কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্য লেখক ও সংগীতশিল্পী। এতেই ঘটে গেল বিপত্তি। চিঠিতে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে সরাসরি কিছুই বলা হয়নি। এতে শুধু ধর্মনিরপেক্ষ দলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এটা যে প্রকারান্তরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা মোদির বিরুদ্ধাচরণ, তা বুঝতে বাকি থাকেনি। ফলে চিঠি প্রকাশের পর দুই ভাগে বিভক্ত বলিউড। খোলা চিঠিতে বলা হয়, ‘এখন সময়ের দাবি হচ্ছে, আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে রক্ষা করা। সন্দেহ নেই, দুর্নীতি ও শাসনপদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে...ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আপসের মতো কোনো বিষয় নয়।’ এতে আরও বলা হয়, ‘আমরা আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা নিজেদের আসনে যে ধর্মনিরপেক্ষ দলের জেতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, সেই দলকে ভোট দিন।’
চিঠিতে সই করা বলিউডের ৬০ জন ব্যক্তিত্বের মধ্যে রয়েছেন পরিচালক ইমতিয়াজ আলী, পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্য লেখক বিশাল ভরদ্বাজ, অভিনেত্রী ও পরিচালক নন্দিতা দাস, পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্য লেখক গোবিন্দ নিহালনি, পরিচালক জয়া আক্তার, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার কবির খান, পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্য লেখক মহেশ ভাট, সংগীতশিল্পী শুভা মুডগাল প্রমুখ। নন্দিতা দাস বলেন, এটি কেবল মোদির বিরুদ্ধে নয়, বরং সেই সব দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান, যারা অতীতে লোকজনকে সাম্প্রদায়িকভাবে বিভাজিত করেছে এবং এখনো তা করে যাচ্ছে। বলিউডের আরেকাংশ অবশ্য এসব অভিযোগ নাকচ করছে। অভিনেতা সালমান খানের বাবা প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার সেলিম খান বলেন, ‘মোদির সঙ্গে আমার সম্পর্কে ভিত্তি হচ্ছে আমার উর্দু লেখালেখি। আমার মতে, কেউই অস্পৃশ্য নয়।’ পরিচালক মধুর ভান্ডারকার টুইটারে লেখেন, ‘কিছু সহকর্মী তথাকথিত বিভাজনকারী শক্তিকে থামানোর লেবাসের আড়ালে থেকে নিজেরাই বলিউডের মতো ধর্মনিরপেক্ষ স্থানে বিভাজন সৃষ্টি করছেন। এটা ভাবতেই কষ্ট লাগছে।’ এনডিটিভি।

রেহাইও নয়, প্রতিহিংসাও নয়

রবার্ট ভদ্র -অরুণ জেটলি
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পরবর্তী সরকার গঠন করলে কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর জামাতা রবার্ট ভদ্রকে নিষ্কৃতিও দেওয়া হবে না, আবার তাঁকে প্রতিহিংসার শিকারও বানানো হবে না। এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা অরুণ জেটলি। বিজেপি নেতা জেটলি পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসর থেকে প্রথমবারের মতো লোকসভা নির্বাচনে লড়ছেন। ওই আসনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন কংগ্রেসের অমরিন্দর সিং, যিনি রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। সাক্ষাৎকারে অরুণ জেটলি বলেন, ‘আপনাকে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়াই সংস্থাগুলোকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আপনি কাউকেই নিষ্কৃতি দেবেন না, আবার আপনি কারও প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণও নন। যদি তিনি (রবার্ট ভদ্র) অন্যায় কিছু করে থাকেন—কারণ, এ রকম বেশ কিছু দৃঢ় প্রমাণ রয়েছে। তবে সংস্থাগুলোকে তা নিরপেক্ষভাবে বের করার সুযোগ দিন।’ রবার্ট ভদ্র কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়ার মেয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর স্বামী। তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীরা পাঞ্জাবের হরিয়ানায় কংগ্রেস সরকারের সহায়তায় ভূমি চুক্তির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা বানানোর অভিযোগ করে আসছে। এ ছাড়া সরকারি আনকূল্যে বিভিন্নভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠার অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিশেষ করে আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভুপিন্দর সিং এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
তিনি দাবি করেছেন, ভদ্রের চুক্তিগুলো ছিল বৈধ ও ন্যায়সংগত। ওই চুক্তির বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করার দাবি উঠলেও গত অক্টোবর মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তা নাকচ করে দেন। আদালত বলেন, একজন মানুষকে কেবল তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে অপরাধী বলা যাবে না। সাক্ষাৎকারে অরুণ জেটলি আরও বলেন, ‘রবার্ট ভদ্র ক্ষমতার অপব্যবহারের একটা প্রতীক। তবে আমাদের নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে তিনি একটি ক্ষুদ্র ইস্যু।’ গত সপ্তাহে বিজেপি নেতা উমা ভারতী ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) ক্ষমতায় গেলে প্রিয়াঙ্কার স্বামী ভদ্রকে জেলের ঘানি টানতে হবে। তবে অরুণ জেটলি জোরের সঙ্গে জানিয়ে দিলেন, ‘রাজনীতিকেরা নন, তদন্ত সংস্থাগুলোই নির্ধারণ করবে, কারা জেলে যাবেন।’ সম্প্রতি পাঞ্জাবের গুরগাঁ এলাকায় একটি জনসভা করেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি। রবার্ট ভদ্র তাঁর বিতর্কিত ওই চুক্তিগুলোর মধ্যে কিছু চুক্তি করেছেন এই গুরগাঁতেই। মোদি ওই জনসভায় ভদ্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন। জনসভায় ভাষণের সময় প্রশ্ন করেন, একজন ব্যক্তি একটি পয়সা ছাড়াই মাত্র তিন মাসের মধ্যে কীভাবে ৫০ কোটি রুপি আয় করলেন? সোনিয়া গান্ধীর ছেলে ও কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারণায় নেতৃত্ব দেওয়া রাহুল গান্ধীকে এ বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন মোদি। এনডিটিভি।

মা হচ্ছেন চেলসি

চেলসি ক্লিনটন
 যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের মেয়ে চেলসি ক্লিনটন অন্তঃসত্ত্বা। তিনি চলতি বছরের শেষ দিকেই মা হতে যাচ্ছেন। নিউইয়র্কে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে গত বৃহস্পতিবার এ খবর জানান চেলসি। এরপর টুইটারে এক বার্তায় বিল ক্লিনটন দাদা হতে যাওয়ার খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি এবং হিলারি মেয়ে চেলসি ও তাঁর স্বামী মার্ক মেজভিনস্কিকে নিয়ে অনেক সুখী বলেও ওই বার্তায় উল্লেখ করেন ক্লিনটন। এপি।

আবু বকর ফিরলেন, বাকিরা?

শুক্রবার পত্রিকা খুলে পাওয়া গেল পরম আনন্দ আর স্বস্তির একটি সংবাদ। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক (এবি) ফিরে এসেছেন অপহূত হওয়ার ৩৫ ঘণ্টা পর। এই রহস্যময় অপহরণ ঘটনার কোনো কূল-কিনারা অবশ্য এখনো হয়নি। তবু এবি ভাগ্যবান, আমরা যারা এই ঘটনায় বিচলিত হয়ে ছিলাম, আমরাও ভাগ্যবান যে তিনি সুস্থ অবস্থায় ফিরেছেন তাঁর পরিবারের কাছে। আমাদের মধ্যে যাঁরা চালাক-চতুর বা যাঁরা সরকারের বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছেন, তাঁরা এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা শুরু করবেন অচিরেই। কিন্তু এবির ফিরে আসার এই আনন্দময় সময়েও আমাদের মনে রাখতে হবে, তিনি এই দায়িত্বে থাকা অবস্থায় গত প্রায় তিন মাসে অপহূত বা গুম হয়েছেন ৩৯ জন। তাঁদের মধ্যে মাত্র চারজন ফিরেছেন জীবিত অবস্থায়, ১২ জনের লাশ পাওয়া গেছে, ২৩ জনের কোনো খোঁজ মেলেনি। গত চার বছরে অপহূত ২৬৮ জনের মধ্যে এভাবে গুম হয়ে গেছেন ১৮৭ জন। এবি সিদ্দিকের ফিরে আসার ছবি দেখে তাঁদের পরিবার কি একটুও আশান্বিত হতে পারে? একবারও কি তাদের মনে হবে, একদিন ফিরে আসবেন তাদের প্রিয়জনও?
গুম বা উধাও হওয়ার ঘটনা অনেক দিন ধরে ঘটে চলেছে বাংলাদেশে। দেশের বিভিন্ন প্রেসক্লাবের সামনে গুম হওয়া মানুষের ছবি নিয়ে পরিবারের আহাজারির বহু ছবি আমরা দেখেছি। প্রান্তিক পরিবারের মানুষ উধাও হয়েছেন, মফস্বলের যুবক উধাও হয়েছেন, রাজনৈতিক কর্মী উধাও হয়েছেন। আমরা শহরের সুশীল আর সম্পন্ন নাগরিকেরা তাতে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হইনি, রাষ্ট্র এসব গুমের অভিযোগের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেনি। বরং এমন অভিযোগ উচ্চারিত হচ্ছে যে রাষ্ট্র নিজেও এসব গুমের ঘটনায় জড়িত। সরকারের বাহিনী কিছু গুমের ঘটনায় সরাসরি জড়িত—এ ধরনের আলামত-সংবলিত অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন বা কোনো সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তাতে নড়েচড়ে বসেনি। এসব গুরুতর অভিযোগ শুনে আমাদের নাগরিক সমাজেরও রাতের ঘুম হারাম হয়নি।
এবির অপহরণের পর আমাদের চৈতন্যোদয় হয়েছিল। এবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। আমার অনুজপ্রতিম, আমাদের সবার প্রিয় হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও নির্বিরোধ একজন মানুষ। তিনি পত্রিকার পাতায় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হয়েছেন কিছুটা হলেও রিজওয়ানার স্বামী হওয়ার কারণে। রিজওয়ানা এ দেশের পরিবেশ আন্দোলনে একনিষ্ঠভাবে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন বহু বছর ধরে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁর নিরপেক্ষ ও মেধাদীপ্ত উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। রিজওয়ানার সুখ্যাতি, নাগরিক সমাজ আর গণমাধ্যম সোচ্চার হওয়ার ফলে হয়তো তাঁর স্বামী সশরীরে ফিরে আসতে পেরেছেন। কিন্তু এ ঘটনার মধ্য দিয়ে জনজীবনের সার্বিক নিরাপত্তাহীনতা আবারও যেভাবে ফুটে উঠেছে, তার কোনো সুরাহা হবে কি? বন্ধ হবে কি রহস্যময় অপহরণ, উধাও আর গুমের অসুস্থ আতঙ্কজনক ও নৈরাজ্যকর প্রবণতা?
দুই গুম বা উধাওয়ের অনেক ঘটনায় সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় গুম হওয়া ব্যক্তি আর ফেরত আসেননি। আমরা স্বস্তি পেয়েছিলাম এটি ভেবে যে রিজওয়ানার স্বামীকে সম্ভবত সরকারের কোনো বাহিনী অপহরণ করেনি। আমরা পত্রিকায় সরকারের বিভিন্ন মহলকে বরং উদ্বিগ্ন হতে দেখেছি এ ঘটনায়। রিজওয়ানা নিজেও সরকারের কোনো মহলকে এ ঘটনার জন্য দোষারোপ করেননি। কিন্তু তিনি যাদের দিকে অভিযোগের অঙ্গুলি হেলন করেছিলেন, তারা সরকারের মতোই ক্ষমতাশালী, এক অর্থে তারা সমান্তরাল সরকার। তারা পরিবেশ-সংক্রান্ত রিজওয়ানার বিভিন্ন মামলা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রায় সবাই ‘ভূমিদস্যু’ হিসেবে সমাজে পরিচিত ছিল। কারও কারও বিরুদ্ধে খুন-খারাবির প্রামাণ্য অভিযোগ রয়েছে। এ দেশের রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশকে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা প্রদান করে, ক্ষমতাশালী অন্যান্য মহলকে বশীভূত করে এবং কয়েকটি গণমাধ্যম স্রেফ কিনে নিয়ে তারা এখন সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়েছে। এবিকে যদি সত্যি তারাই অপহরণ করে নাগরিক চাপে পড়ে ফিরিয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় সরকার আনতে পারবে কি না সন্দেহ। শুধু তারা কেন, সমাজের যেকোনো দুর্বৃত্ত (পেশাদার অপরাধী, স্থানীয় গডফাদার, মাদক ব্যবসায়ী, নারী বা শিশু অপহরকারী) এখন খুন-খারাবি, গুম বা অপহরণের মতো অপরাধ করলে তা রোধ করার মনোবল বা সক্ষমতা কি সরকারের আছে?
তিন গুরুতর ও সংঘটিত অপরাধ দমনের সক্ষমতা ও নৈতিকতা সরকার হারিয়েছে বহুভাবে। এক. বহু গুম বা খুনের ঘটনায় সরকার ও তার বাহিনীগুলো নিজেরা জড়িত ছিল, এমন অভিযোগ থাকলেও তার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি কখনো। সরকারের পছন্দনীয় ব্যক্তিদের নিয়ে গড়া মানবাধিকার কমিশন পর্যন্ত কয়েকটি গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরকারের বাহিনীগুলোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে। দুই. নিজেরা অপরাধ সংঘটন না করলেও অনেক ক্ষেত্রে সরকার গুম বা খুনের ঘটনা তদন্ত বা বিচারে সুস্পষ্ট গাফিলতি বা অনীহা দেখিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুমের ঘটনা সম্পর্কে স্রেফ অজ্ঞতা প্রকাশ করে সরকারের কর্মকর্তারা নিজেদের দায়িত্ব সেরেছেন। সরকারের কোনো অংশ যদি কিছু গুমের ঘটনায় নিজেই জড়িত হয় বা সরকার যদি এসব ঘটনার বিচারে অনিচ্ছুক হয়, তাহলে এ রকম আরও ঘটনা ঘটাতে অপরাধীরা বহু গুণে আত্মবিশ্বাসী ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও তা-ই হচ্ছে। এবির অপহরণ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হলে এসব আরও ঘটবে। এবির মতো আরও যাঁরা উধাও বা গুম হয়েছেন, সেসব ঘটনার সুরাহাও তাই সরকারকে করতে হবে। মানুষের জীবনের এতটুকু মূল্য থাকলে সরকারকে সার্বিকভাবে নাগরিক জীবনে বিরাজমান ভয়ভীতি আর আতঙ্ক দূর করতে হবে। সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে যে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে পুলিশ ও অন্য বাহিনীগুলোকে প্রধানত নিজেদের গদি রক্ষার প্রয়োজনে ব্যবহার করলে, প্রশাসন ও পুলিশের চেইন অব কমান্ড রাজনৈতিক স্বার্থে বিনষ্ট করলে এবং সরকারি দলের অপরাধ সংঘটনকারী নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও বিচারে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি শুধু নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যও বিনষ্ট হয়, দেশ অপরাধীদের চারণভূমিতে পরিণত হয়। এই অপরাধভূমিতে একদিন না একদিন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে সরকার নিজেই।
চার আমি আগেও লিখেছি, গুম সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি। গুমের প্রতি সারা বিশ্বের সচেতন মানুষের তীব্র আপত্তি সংগঠিত রূপ নিতে শুরু করেছে অনেক বছর ধরে। গুম থেকে সব মানুষকে রক্ষা করা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক একটি রেজুলেশন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯২ সালে গ্রহণ করে। ২০০৭ সালে এ সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি (কনভেনশন) সম্পাদন করা হয়। এই চুক্তিতে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং যুদ্ধ, জরুরি অবস্থা, চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়—কোনো অবস্থাতেই কাউকে গুম করার বৈধতা নেই বলা হয়। ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৪২টি রাষ্ট্র এর পক্ষ হয়েছে, ৯৩টি রাষ্ট্র এটি স্বাক্ষর করেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই আন্তর্জাতিক চুক্তিটি অনুসমর্থন তো দূরের কথা, এটি স্বাক্ষরই করেনি বাংলাদেশ (দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও মালদ্বীপ এটি স্বাক্ষর করেছে)। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে এই সরকার আগের নির্বাচনের সময় নির্বাচনী ইশতেহারে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এবার গত ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের আগে সেই প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেনি তারা। এটি হয়তো তাই আশ্চর্যজনক নয় যে নতুন সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়েছে,
বেড়েছে গুম আর অপহরণের ঘটনাও। এবিকে উদ্ধারের জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করেই তাই আমাদের নাগরিক সমাজকে থেমে থাকলে চলবে না। এই সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে প্রত্যেক মানুষের জীবন রক্ষা করার। সেই দায়িত্ব প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে (সে যে দলেরই হোক, যত দরিদ্র আর ক্ষমতাহীন হোক) পালন করার জন্য সরকারের ওপর নিরন্তর চাপ সৃষ্টি করার সব পদ্ধতি আমাদের অবলম্বন করতে হবে। দেশের পুলিশ আর প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণকৃত, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বলে কার্যত কিছু নেই। এই পরিস্থিতিতে বাঁচতে চাইলে নাগরিক সমাজকে গুম, অপহরণ আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে। এই সরকারের আমলে নিরাপত্তার আশঙ্কা নেই বলে যাঁরা ভাবেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, গুম করার মতো অন্য বহু শক্তি রয়েছে, আরও বহু শক্তি জন্মাবে ভবিষ্যতে। বাঁচতে চাইলে তাই আমাদের গুম-উধাও আর বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। স্বাধীনতার পর সাংবাদিক নির্মল সেন লিখেছিলেন, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। আওয়ামী লীগ-বিএনপির কুশাসনে এত দিনে আরও অন্ধকার হয়েছে দেশ। আমাদের দুর্ভাগ্য, কিছু পরিবারকে এখন বলতে হচ্ছে, স্বাভাবিক মৃত্যু না হোক, অন্তত সৎকারের গ্যারান্টি চাই। এমন পরিবার একটিও যেন না বাড়ে আর।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটচিত্র

কী হয়েছে কে জানে, এল নিনো নাকি মানুষের পাপের বোঝা, পশ্চিমবঙ্গ ফুটিফাটা হয়ে রয়েছে। চৈত্র গেল, বৈশাখও নয় নয় করে কটা দিন কাটিয়ে দিল। হাওয়া অফিস নিত্যদিন কালবৈশাখীর আশা দেখিয়ে দেখিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে রয়েছে। কলকাতাসহ গোটা রাজ্যে ‘নাই রস নাই, দারুণ দাহন বেলা’। প্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বেড়ে চলেছে নির্বাচনী তাপ-উত্তাপ। এরই মধ্যে দেশের পঞ্চম ও রাজ্যের প্রথম দফার ভোটটা হয়ে গেল। উত্তরবঙ্গের মাত্র চারটি আসনে এই দাবদাহেও ভোট পড়ল ৮০ শতাংশের বেশি। গ্রীষ্মের ভ্রুকুটি ভোটারদের ভয় দেখাতে ব্যর্থ।
পশ্চিমবঙ্গকে যাঁরা ভাগ হতে দেব না বলে চিল চিৎকার করেন, সেই কবে তাঁরাই কিন্তু অজান্তে রাজ্যটাকে ভাগ করে দিয়েছেন। একটি পশ্চিমবঙ্গ, অন্যটি উত্তরবঙ্গ। দক্ষিণের তুলনায় তারা ব্রাত্য, এটাই উত্তরের চিরকালীন অভিমান। সেই অভিমানে প্রলেপ আজও কেউ সেইভাবে দিতে পারেননি। উত্তরের সব কিছুই কম কম। জনসংখ্যা কম, জমি কম, বৈভব কম, প্রভাব কম, লোকসভা-বিধানসভার আসনও কম। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও দার্জিলিংয়ের চারটি আসন বাদ দিলে বাকি থাকে রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, মালদহের দুটি আসন। উত্তর ও দক্ষিণের সেতু হিসেবে মুর্শিদাবাদ জেলার আসন আরও তিনটি। এই ১১টা আসনই ঐতিহাসিকভাবে
কংগ্রেস ও বামপন্থীদের অকাতরে দাক্ষিণ্য বিলি করে এসেছে এত দিন। এই প্রথম দিদি মমতার দাপাদাপিতে সেখানেও ঘাসফুল ফোটার প্রতীক্ষা। দক্ষিণের পাশাপাশি উত্তরেও আধিপত্য বিস্তারে তৃণমূল কংগ্রেস মুখিয়ে আছে।
মুখিয়ে রয়েছে আরও একটি দল। বিজেপি। সারা দেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির উচ্ছ্বাস চোখে পড়ছে। শ্যামপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্য হলেও পশ্চিমবঙ্গ কোনো দিনই ভারতীয় জন সংঘ কিংবা ভারতীয় জনতা পার্টিকে কোল পেতে দেয়নি। বরং গোটা রাজ্যটাই আড়ে-বহরে বিভাজিত ছিল বামপন্থা ও কংগ্রেসের মধ্যে। কংগ্রেস ক্রমে দুর্বল হয়ে জন্ম দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের, বামপন্থীরাও ভাঙতে ভাঙতে দুর্বল হয়ে গত কবছরে নখদন্তহীন সিংহে পরিণত। সেই ফাঁক দিয়ে নরেন্দ্র মোদির চওড়া কাঁধে চেপে টুক করে এ রাজ্যে ঢুকে পড়ে বিজেপি প্রবল চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এতটাই প্রবল সেই চাপ যে এযাবৎ ‘আমি কি ডরাই সখি ভিখারি রাঘবে’র মতো হাবভাব করে আসা মমতা প্রতিদিন নিয়ম করে বিজেপির বাপবাপান্ত শুরু করেছেন। যে-দলের সঙ্গে তাঁর গোপন সম্পর্কের কাহিনি তুলে ধরে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা এতদিন কটাক্ষ করে আসছিলেন, সেই দলকেই তুলাধোনা করতে মমতা এখন ছাড়ছেন না মুসলমান ভোট হারানোর আশঙ্কায়।
সত্যি বলতে কি, পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে বিজেপিই হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল আকর্ষণ। দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে জমিয়ে রাখা বাঙালি এই রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেও বামপন্থাকে আঁকড়ে বাঁচার রসদ খুঁজে পেতে ভালোবাসছিল। অযোধ্যা আন্দোলনেও তাই তারা সেভাবে আন্দোলিত হয়নি। ১৯৯৮, ১৯৯৯ সালের লোকসভা ভোটে দমদম কেন্দ্র থেকে তপন সিকদার এবং ১৯৯৯ সালে কৃষ্ণনগর থেকে সত্যব্রত মুখোপাধ্যায় জিতে কেন্দ্রে মন্ত্রী হয়েছিলেন। ’৯৮ সালে অশোকনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপির বাদল ভট্টাচার্য জিতে বিধানসভাতেও গিয়েছিলেন। হাবড়া পুরসভাও দখল নিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ওই পর্যন্ত। বিজেপির পদ্ম রাজ্যে আর প্রস্ফুটিত হয়নি। সেই নিরুত্তেজ, নির্বিষ বিজেপির হঠাৎ কী হলো, এই প্রবল বিক্রমে উঠে আসার কারণগুলো কী, সেসব নিয়ে রীতিমতো শুরু হয়ে গেছে গবেষণা। প্রধান কারণ হিসেবে যা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, সেটাই এত দিন ছিল মমতার ‘ইউএসপি’। নরেন্দ্র মোদির ‘কঠোর কঠিন নেতৃত্ব’।
২০০৯ কিংবা তারও আগে থেকে বামপন্থী নেতৃত্ব যে-চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যায়, তার নাম ছিল মমতা। আজ গোটা রাজ্যে বামপন্থীদের নেতৃত্বহীনতার জন্য দায়ীও তাঁরাই। সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সেই বিমান বসু, সেই গৌতম দেব, সেই শ্যামল চক্রবর্তী ছাড়া সিপিএম বা অন্যরা নতুন নেতা তুলে আনতে পারল না। কংগ্রেসকে খান খান করে ভেঙে মমতা তাঁর দল ভারী করার পাশাপাশি শতাব্দী-প্রাচীন দলটিকেও তিনি অনাথ করে দিয়েছেন। রাজ্যে নেতা বলতে তিনিই এক থেকে ১০ নম্বরে। এই নেতৃত্বহীনতায় হঠাৎই জাতীয় স্তরে নরেন্দ্র মোদির উত্থান এবং তাঁর ডানায় ভর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আচমকাই বেড়ে ওঠা। মমতার শরীরী ভাষার সঙ্গে মোদির শরীরী ভাষার দুর্দান্ত মিল। দুজনেই বোঝাতে সফল যে তাঁদের নেতৃত্ব পলকা নয়। তাঁরা কঠিন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ নন। তাঁরা সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা প্রথম প্রজন্মের রাজনীতিক, তাঁরা সোনা বা রুপার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি। তাঁদের ‘পেডিগ্রিও’ অতি সাধারণ। বাপ-চাচার উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁরা রাজনীতিতে আসেননি। এই যে আমি তোমাদেরই লোক, আমি নির্লোভ, আমি স্বজন-পোষণ করি না (দুজনেই অবিবাহিত), আমি চোরচোট্টা নই ভাবমূর্তি, এ থেকেই তাঁরা এক অন্য ধরনের স্বপ্ন বেশ ভালোভাবেই ফেরি করতে পেরেছেন। ফলে, বর্ষায় লাউগাছের লকলকিয়ে ওঠার মতো রাতারাতিই বিজেপি এই রাজ্যে আগাপাছতলায় ছড়িয়ে পড়েছে। সেটাই হয়েছে মমতার শিরঃপীড়ার কারণ।
বিজেপি এই রাজ্যে পাঁচ-ছয় শতাংশের বেশি ভোট সাধারণত পায় না। ১৯৯১ সালের অযোধ্যা আন্দোলন এ রাজ্যে বিজেপিকে ১১ শতাংশ ভোট এনে দিলেও কোনো আসন দিতে পারেনি। কংগ্রেসের প্রায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হাল, তৃতীয় ফ্রন্টের অকালমৃত্যু, ফেডারেল ফ্রন্টের আঁতুড়ঘরেই শেষ হয়ে যাওয়ার কাহিনি ও মোদি-রাজত্ব কায়েম হওয়ার জনপ্রিয় ধারণা এ রাজ্যে বিজেপিকে আশাতীত স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এতটাই যে এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ৪২টি আসনেই প্রার্থী দিয়ে অন্তত ১০-১২টিতে শাসক দলকে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। বিজেপি এতটাই আশাবাদী যে অন্তত আটটি আসনে তারা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে। স্বপ্ন দেখছে অন্তত তিন-চারটি আসন জেতারও।
উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং ও আলিপুরদুয়ার, দক্ষিণবঙ্গের কৃষ্ণনগর, বসিরহাট, বারাসাত, দমদম, কলকাতা (উত্তর), হাওড়া, শ্রীরামপুর ও আসানসোলে বিজেপি কার পৌষ মাস ও কারই বা সর্বনাশের কারণ হবে, এই মুহূর্তে তা বলা যাচ্ছে না। বিভিন্ন জরিপে অন্তত ১৫ শতাংশ ভোট বিজেপি পাবে বলা হয়েছে। এই পরিমাণ ভোট পেয়ে জেতা যে যায় না তা ঠিক, কিন্তু এটাও ঠিক যে এবার চতুর্মুখী লড়াই। ১০ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে বিজেপি কার জমি ঝুরঝুরে করে কাকে জেতাবে, সে কথা জোর দিয়ে কেউ বলতে পারছে না। বসিরহাটে দেখলাম, সিপিএম করা একদল লোক বিজেপির প্রার্থী শমীক ভট্টাচার্যকে বলে গেলেন, তাঁরা বংশপরম্পরায় বামপন্থী হলেও এবার ভোট দেবেন বিজেপিকে। আবার শ্রীরামপুরে দেখলাম তৃণমূলে ভোট দেওয়া মুসলমানরা দলে দলে কংগ্রেসের পতাকা হাতে নিয়ে আবদুল মান্নানের মিছিলে পা মিলিয়ে আগেরবারের তৃণমূলের জেতা প্রার্থী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গালমন্দ করছেন। এই কেন্দ্রে বিজেপির বাপ্পী লাহিড়ী সকাল ও সন্ধে ছাড়া হোটেলের বাইরে পা না ফেললেও লোকজন বলাবলি করছে, শাসক দলের লড়াইটা নাকি বাপ্পীরই বিরুদ্ধে। আসানসোলে বিজেপির আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী গায়ক বাবুল সুপ্রিয়র প্রভাব এমনই যে তৃণমূলের লোকজন হিমশিম খেয়ে একটার পর একটা অভিযোগ এনে বাবুলকে হেনস্তা করতে চাইছে। বিজেপি যেন নদীর কামট। নিঃসাড়ে কার পা কেটে নিয়ে যাবে জানা নেই। কেউ টেরও পাচ্ছে না ১৫ শতাংশ ভোট টেনে নিজের নাক কেটে কার যাত্রা ভঙ্গ করবে।
বিজেপি প্রথম ‘ফ্যাক্টর’ হলে দ্বিতীয় ‘ফ্যাক্টর’ মুসলমান মন। রাজ্যের ৪২টা আসনের মধ্যে ১৬টায় মুসলমান ভোট হারা-জেতার মালিক। তাদের দল বা গোষ্ঠীবদ্ধতাই ঠিক করে দেবে কে জিতবে কে হারবে। এই ১৬ আসনের মধ্যে ছয়টিতে মুসলমানরা বরাবর কংগ্রেসকে সাথ দিয়ে আসছে। বাকিগুলোতে তৃণমূল কংগ্রেসকে। বিজেপির সঙ্গে মমতার গোপন আঁতাতের খবর প্রচার করে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা মমতাকে প্রাথমিকভাবে ব্যাকফুটে ফেলেছিল। আশঙ্কিত মমতাও শেষ পর্যন্ত রাখঢাক না রেখে মোদিকে আক্রমণ শুরু করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলমান মন অনেকটা পেন্ডুলামের মতো দুলছে। বারাসাত, বসিরহাট, হাওড়া, উলুবেরিয়া, শ্রীরামপুরের মতো কেন্দ্রে মুসলমান ভোটে টাল খেলে মমতার কপালের ভাঁজ বাড়তে পারে।
এটা ঠিক, ভোটের বাজারে ক্ষমতাসীন দল বাড়তি সুবিধা পায়। তৃণমূল কংগ্রেস তা পাচ্ছেও। আবার এটাও ঠিক, বিভিন্ন জেলায় অন্তর্দ্বন্দ্ব তাদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোণঠাসা করে রেখেছে। রাজনৈতিক লোকজনের ওপর ভরসা না রেখে মমতা এই যে বিনোদনের জগৎকে প্রাধান্য দিলেন, তারও একটা অঙ্ক রয়েছে। ঘাটাল, বাঁকুড়া বা মেদিনীপুরে গোষ্ঠীবাজি এতই তীব্র যে শেষ পর্যন্ত দেব, মুনমুন, সন্ধ্যা রায়কে বেছে মমতা দল সামলালেন। রাজনীতিটা হলো, যুযুধান শিবির এটা বুঝবে যে মুনমুন, দেব বা সন্ধ্যা রায়েরা জিতে আর সেভাবে কেন্দ্রমুখী হবেন না। গোষ্ঠীপতিরা তাঁদের রাজত্ব চালিয়ে যাবেন, যেমন চালাচ্ছেন এখন।
গতবারের ভোটে তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট ছিল। এবার কংগ্রেস একার শক্তিপরীক্ষায় নেমেছে। তারা যেটুকু ভোট পাবে, সেটুকুই কাটা যাবে তৃণমূলের ভোট। বামপন্থীরা কতটা শক্তি সঞ্চয় করেছে বা আরও হীনবল হয়েছে কি না, হবে তার পরীক্ষাও। বিজেপি কার পাকা ধানে মই দেবে জানা নেই। তবু তৃণমূল কংগ্রেস গতবারের ২০টা (জয়নগর আসন পেয়েছিল জোটসঙ্গী এসইউসিআই) আসন বাড়িয়ে ২৫-২৬টা পাবেই বলে ধরে নিয়েছে। চমক সেটা অবশ্য হবে না। কেন্দ্রে মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গড়লে এবং এ রাজ্যের সমতলে বিজেপি বহু বছর পর ফের খাতা খুললে (সঙ্গে ১৫-১৬ শতাংশ ভোট) রাজ্যে আগামী দিনের রাজনীতির রংটাই কিন্তু পাল্টে যাবে। সীমান্ত-রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের কাছে সেটা আশীর্বাদ, না অভিশাপ—ভবিষ্যৎই তার জবাব দেবে।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

ভয়ংকর সেই ৩৫ ঘণ্টা-আবু বকর সিদ্দিকের জবানি by ইফতেখার মাহমুদ

‘ওই বাড়িতে আমাকে দুজন পাহারা দিত। তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বাড়িটি কার, কারা এখানে আসে, থাকে। উত্তরে একজন বেশ ভয়ে ভয়ে জানিয়েছিল, “এখানে আপনার মতোই অনেককে নিয়ে আসা হয়। কাউকে মেরে ফেলা হয়, আবার কাউকে তিন-চার দিন রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।”’
কথাগুলো বলছিলেন অপহরণের ৩৫ ঘণ্টা পর মুক্ত আবু বকর সিদ্দিক। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডের বাসভবনে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন শেষে তাঁর সঙ্গে প্রথম আলোর একান্তে কথা হয়। হাতে সামান্য আঘাতের চিহ্ন আর শরীরজুড়ে ক্লান্তি সামলে সেই ভয়ংকর বন্দিজীবনের বর্ণনা দেন তিনি। এ সময় কিছুক্ষণ পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী, ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

আলোকশিখা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস- আদিয়োস্, মায়েস্ত্রো গাবো by রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

এই দুনিয়া ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। ১৯৮২ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত কলম্বিয়ান এই ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও সাংবাদিক ছিলেন সিয়েন আনিয়োস দে সোলেদাদ (হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড), এল আমোর এন লোস তিয়েম্পোস দেল কলেরা (লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা), এল কোরোনেল নো তিয়েনে কিয়েন লা এস্ক্রিবা (নো ওয়ান রাইটস টু কর্নেল), এল ওতোনিয়ো দেল পাত্রিয়ার্কা (অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক) আর ক্রোনিকা দে উনা মুয়ের্তে আনুন্সিয়াদা (ক্রনিকেল অব এ ডেথ ফোরটোল্ড) ইত্যাদি ক্লাসিক উপন্যাসের স্রষ্টা।

পাঁচ সৈনিকের চাক্ষুষ বর্ণনা- মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড: নেপথ্য কাহিনি by লরেন্স লিফশুলৎজ

ফেব্রুয়ারি ২০১৪-এর শেষ দিকে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ আমার চার খণ্ডের একটি রচনা প্রকাশিত হয়। ফেব্রুয়ারির ২২ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত পর পর চার দিন সেটি এ দুই পত্রিকায় যথাক্রমে বাংলা অনুবাদ ও মূল ইংরেজিতে বের হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় ১ জুন ১৯৮১ রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, রচনাটি ছিল সে হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখা।