Showing posts with label কিশোরগঞ্জ. Show all posts
Showing posts with label কিশোরগঞ্জ. Show all posts

Sunday, February 15, 2026

সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে: জামায়াত আমির

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশ আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই না।’

আজ রোববার দুপুরে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।

সড়ক দুর্ঘটনা ও অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া দলের দুই কর্মীর স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে কিশোরগঞ্জে এসেছিলেন জামায়াতের আমির।

শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশটা তো সংসদ থেকেই পরিচালিত হবে ইনশা আল্লাহ। সংসদে একটা দল সরকারি দল হিসেবে, আরেকটা দল বিরোধী দল হিসেবে থাকবে। সমাজে এক চাকায় কোনো গাড়ি চলে না, মিনিমাম দুই চাকা লাগে। সরকারি দল যদি ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করে, আমাদের সহযোগিতা থাকবে। জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে আমরা তো জনগণের পক্ষে অবস্থান নেব। আমাদের অবস্থান হবে ক্লিয়ার।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘তারেক সাহেব কী নিয়ে আলাপ করবেন, এটা উনার মনের ব্যাপার। আমি তো উনার মনের ব্যাপার বলতে পারব না। উনি যদি আমার সঙ্গে আলাপ করেন, দেশ এবং জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইনশা আল্লাহ আমরা আলাপ করব।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংসদ চলতে হলে তো সরকারি দল ও বিরোধী দল লাগবে। সরকারি দল, বিরোধী দল হাতে হাত রেখে চলবে, যদি দেশ সঠিক পথে চলে। যদি বেঠিক পথে চলে, তাহলে ওই চাকা চালাব না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি তো এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এরা তো এখন ভূগোলে নাই। কেন নাই? তারা (জাতীয় পার্টি) তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। এখন তারা শুধু ভোটের জগৎ থেকে যায়নি, জনগণের মন থেকেও উঠে গেছে। এটা ওই কারণে—তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি। জামায়াতে ইসলামী ওই ভুল করবে না।’

এর আগে রোববার সকালে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায় জামায়াত সমর্থক শাহ আলমের স্মরণসভায় তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে সম্মান করা আমার ইমানি দায়িত্ব। কৃষক-শ্রমিকেরা কঠোর পরিশ্রম করে হালাল রুজি উপার্জন করেন। তাঁদের ঘামের গন্ধ আমার কাছে আতরের মতো মনে হয়। অনেক সময় দেখি কেউ কেউ গরিব মানুষের সঙ্গে হাত মেলানোর পর আড়ালে গিয়ে হাত মুছে ফেলেন। কিন্তু আমি তাঁদের সেই ঘামকে সম্মানের চোখে দেখি, ভালোবাসার সঙ্গে গ্রহণ করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দুই শ্রেণির মানুষের সান্নিধ্যে বিশেষ আনন্দ পাই। একদল হলো নিষ্পাপ শিশু, যাদের কাছে গেলে ফেরেশতার সান্নিধ্যে থাকার অনুভূতি হয়। আরেক দল হলো দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হালাল খাবার তুলে দেন।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি কোনো ধনী পরিবারে জন্ম নেইনি। আল্লাহর রহমতে আমি একজন কৃষক পরিবারের সন্তান। তাই কৃষক-শ্রমিকদের সম্মান না করলে তা আমার বাবাকে অপমান করার শামিল হবে।’ স্মরণসভায় তিনি শাহ আলমের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন।

প্রসঙ্গত, ৮ ফেব্রুয়ারি ইটনা মিনি স্টেডিয়ামে আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে যাওয়ার পথে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে জামায়াতের সমর্থক শাহ আলম (৫০) মারা যান।
ইটনার স্মরণসভা শেষে জামায়াতের আমির সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালামের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিকলী উপজেলার ছাতিরচরে যান। এর আগে সকাল ৮টার দিকে তিনি সড়কপথে কিশোরগঞ্জ শহরে পৌঁছান।

৩ ফেব্রুয়ারি কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভা শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালাম (৬০) নিহত হন।
জামায়াতের আমিরের কিশোরগঞ্জ সফরের সময় তাঁর সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি সামিউল হক ফারুকী, জেলা জামায়াতের আমির মো. রমজান আলী, জেলা জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির মোসাদ্দেক ভূঞা, কাপাসিয়ার নবনির্বাচিত এমপি সালাউদ্দিন আইয়ুবী, ঢাকা উত্তর মহানগর জামায়াতের মজলিশে শুরা সদস্য রোকন রেজা শেখ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

স্মরণসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। রোববার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায়
স্মরণসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। রোববার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায়। ছবি: সংগৃহীত

Sunday, June 29, 2025

চলে গেলেন শেষ ঠিকানার কারিগর মনু মিয়া

শেষ ঠিকানার একজন নিঃস্বার্থ কারিগর ছিলেন মনু মিয়া। মনের গহিনের পরম দরদ আর অপার ভালোবাসা দিয়ে তিনি সাজাতেন মুসলিম সম্প্রদায়ের শেষ ঠিকানা-কবর।  কোনো ধরনের পারিশ্রমিক কিংবা বকশিশ না নিয়ে খনন করেছেন ৩ হাজার ৫৭টি কবর। অকৃত্রিম আবেগে আর শেষ ঠিকানা সাজানো হবে না মনু মিয়ার। শনিবার (২৮শে জুন) সকাল পৌনে ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। (ইন্না লিল্লালি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শোকে ভাসে নেট দুনিয়া। ব্যতিক্রমী পন্থায় মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ সেবাপরায়ণতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠা মনু মিয়া কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর উপজেলা ইটনার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। এর মধ্যে জীবনের সুদীর্ঘ ৪৯টি বছর তিনি নিরবছিন্নভাবে কবর খননের কাজ করেছেন। মানুষের শেষ বিদায়ে হয়ে উঠেছেন ভরসার প্রতীক। শেষ ঠিকানার একজন নিপুণ কারিগর ছিলেন তিনি। কারও মৃত্যু সংবাদ কানে আসামাত্রই খুন্তি, কোদাল, ছুরি, করাত, দা, ছেনাসহ সহায়ক সব যন্ত্রপাতি নিয়ে ছুটে যেতেন কবরস্থানে। মানুষের অন্তিম যাত্রায় একান্ত সহযাত্রীর মতো তিনি বাড়িয়ে দিতেন তার আন্তরিক দু’হাত। নিখুঁত সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে মনু মিয়ার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে। দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের ধানিজমি বিক্রি করে বেশ কয়েক বছর আগে কিনেছিলেন ঘোড়াটিকে। আদর করে নাম দিয়েছিলেন, ‘বাহাদুর’। এই ঘোড়ার পিঠে তিনি তুলে নিতেন তার যাবতীয় হাতিয়ার-যন্ত্র। সেই ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই শেষ ঠিকানা সাজাতে মনু মিয়া ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে। ঘোড়াটিই যেন তার বয়সের বাধা অতিক্রম করে দিয়ে তাকে সচল রেখে চলেছিল। নানা জটিল রোগে কাবু হয়ে সমপ্রতি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। এ রকম পরিস্থিতিতে গত ১৪ই মে তাকে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার চিকিৎসা চলার সময়ে নিঃসন্তান মনু মিয়ার সন্তানসম ঘোড়াটি বর্বরতার বলি হয়। তার প্রিয় ঘোড়াটিকে হত্যার ঘটনা মানবজমিন-এ ছাপা হলে দেশ জুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়। সমপ্রতি চিকিৎসা শেষে স্ত্রী রহিমা বেগমকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেও প্রিয় ঘোড়াটির শূন্যতা সব সময় অনুভব করছিলেন তিনি।

mzamin

Wednesday, December 4, 2024

ফরমায়েশি মামলা তদন্ত করে পুরস্কার পেয়েছিলেন কাহ্‌হার by আশরাফুল ইসলাম

১৯৭২ সালে এসআই (সাব-ইন্সপেক্টর) পদে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন আবদুল কাহ্‌হার আকন্দ। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯ বছরেরও বেশি সময় চুক্তিতে পুলিশে চাকরি করেছেন তিনি। এ সময় পেয়েছেন পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে ‘বিরল’ পদোন্নতি। এর সবই সম্ভব  হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আশীর্বাদে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জেলহত্যা মামলা, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, বিডিআর বিদ্রোহ মামলাসহ রাজনৈতিক বিভিন্ন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন কাহার আকন্দ। মামলা তদন্তের নামে শেখ হাসিনার মিশন বাস্তবায়নই ছিল তার কাজ। এর মাধ্যমে তিনি শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। ফলে পুলিশ বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক পাঁচবার বিপিএম এবং পিপিএম পদক দেয়া হয়েছে কাহার আকন্দকে।

২০১৯ সালে পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর থেকেই তিনি এমপি পদে প্রার্থী হতে এলাকায় জনসংযোগ শুরু করেন। অথচ ওই মেয়াদে তার কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাবেক আইজিপি, রাষ্ট্রদূত ও সচিব নূর মোহাম্মদ। কিন্তু সবাইকে অবাক করে এবং সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদকে বাদ দিয়ে বিগত নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পান কাহার আকন্দ। তবে নির্বাচনী দৌড়ে সফল হতে পারেননি তিনি। আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে ধরাশায়ী হন। শেখ হাসিনার কাছের মানুষ হওয়ায় এরপরও তাকে নিয়ে এলাকায় আলোচনা ছিল- কাহার আকন্দ মন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও মন্ত্রিত্ব পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। তার কাছের মানুষজনকে বলেছিলেনও, নেত্রী (শেখ হাসিনা) তাকে মন্ত্রী করবেন। কিন্তু ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লব তার সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়। কিশোরগঞ্জ ও কটিয়াদী থানায় দায়ের হয় ৩ মামলা। অপকর্মের দায় থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরদিন ৬ই আগস্ট কাহার আকন্দ নিরাপদে দেশ ছেড়েছেন বলেও তার কাছের অনেকগুলো সূত্র জানিয়েছে। তবে অনেকেই বিষয়টি বিশ্বাস করছেন না। তারা মনে করছেন, দেশেই কোথাও আত্মগোপনে রয়েছেন কাহার আকন্দ।
এদিকে মানবজমিনের অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সামান্য একজন দারোগা হিসেবে চাকরি শুরু করা কাহার আকন্দের পারিবারিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। বাবা মৃত মেহেদি আকন্দ ছিলেন কটিয়াদী উপজেলার সহশ্রাম ধূলদিয়া ইউনিয়নের পূর্বপুরুড়া গ্রামের একজন দরিদ্র কৃষক। বনগ্রাম আনন্দ কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। বাড়ি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরের এ বিদ্যালয়ে তিনি হেঁটে যাতায়াত করতেন। সেখান থেকেই ১৯৬৭ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন মহকুমা সদরের গুরুদয়াল সরকারি কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পাস করেন। তখন তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে তিনি পুলিশে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসআই পদে চাকরি নেন। চাকরির ধারাবাহিকতায় ধাপে ধাপে হন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) তিনি পদোন্নতি লাভ করেন। চাকরির বেশিরভাগ সময়ই তার কেটেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ জামানায় শুরু হয় তার স্বর্ণযুগ। ১৯৯৬ সালের ১৪ই নভেম্বর সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান আবদুল কাহার আকন্দ। এরপর তিনি জেলহত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফেরে। একই সঙ্গে চাকরিতে ফেরানো হয় চাকরিচ্যুৎ সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) কাহার আকন্দকে। ২০০৯ সালের ২৮ই জানুয়ারি চাকরি ফেরত পাওয়ার একদিন পরই তিনি অবসরে যান। কিন্তু অবসর থেকে ফিরিয়ে এনে আবদুল কাহার আকন্দকে চুক্তিতে সিআইডিতে বিশেষ পুলিশ সুপার করা হয়। চুক্তিতে ফিরেই কাহার আকন্দ ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব নেন। ২০১১ সালের ৩রা জুলাই আসামির তালিকায় আরও ৩০ জনকে যোগ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন কাহার আকন্দ। সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমানসহ চারদলীয় জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও বিএনপি-জামায়াত নেতাদের নাম ঢুকিয়ে দেন কাহার আকন্দ।
অনুসন্ধান এবং কাহার আকন্দের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, কাহার আকন্দের ফর্মুলা ছিল তদন্তে শেখ হাসিনার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। শেখ হাসিনার মিশন বাস্তবায়ন করাই ছিল তার কাজ। এর মাধ্যমে তিনি শেখ হাসিনার আনুকুল্য পাওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ফ্লাট-প্লট ও বাড়ি করা ছাড়াও কানাডাতেও তিনি একাধিক বাড়ি করেছেন। এ ছাড়া গড়েছেন বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। একটি সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-এর জামানায় খিলগাঁওয়ের তালতলার কাহার আকন্দ একটি বহুতল ভবন করেছেন। আওয়ামী লীগের বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে তিনি রাজধানীর বসুন্ধরাসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় একাধিক ফ্লাট-প্লট ও বাড়ি করেছেন। এক সময় তিনি তালতলা’র বাসায় থাকলেও সর্বশেষ তিনি বসুন্ধরা এলাকার ফ্লাটে থাকতেন। দেশ ও দেশের বাইরে মিলিয়ে অন্তত হাজার কোটি টাকার মালিক বনেছেন কাহার আকন্দ। এ ছাড়া তার ভাই স্থানীয় সহশ্রাম ধূলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম আকন্দের নামেও বিপুল পরিমাণ সহায়-সম্পদ করেছেন।

mzamin

Tuesday, December 3, 2024

পাগলা মসজিদে এ পর্যন্ত কত টাকা জমা হলো, কোথায় ও কীভাবে খরচ হয় by তাফসিলুল আজিজ

কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানের সিন্দুক তিন মাস পরপর খুলে পাওয়া যায় কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা। এখন পর্যন্ত কত টাকা পাওয়া গেল, এই টাকা কোথায় জমা রাখা হয় বা কীভাবে খরচ হয়—এ নিয়ে মানুষের মনে স্বভাবতই এসব প্রশ্ন জাগে। দানের সিন্দুক খোলার কয়েক দিন পর্যন্ত চলে এসব আলোচনা।

সর্বশেষ গত ৩০ নভেম্বর দানের ১১টি সিন্দুক খুলে পাওয়া যায় ৮ কোটি ২১ লাখ টাকার ওপরে। এখন পর্যন্ত মসজিদের কত টাকা জমা হয়েছে, সাংবাদিকেরা সেটা জানতে চেয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি ফৌজিয়া খানের কাছে। তিনি প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। আগের জেলা প্রশাসকদেরও এই প্রশ্ন করা হলে তাঁরা উত্তর দিতেন না। এ নিয়ে মসজিদ কমিটির লোকজনও কথা বলতে রাজি হন না।

সর্বশেষ যেদিন মসজিদের দানবাক্স খোলা হয়, সেদিন জেলার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ইকরাম হোসেন মসজিদে এসে আয়-ব্যয়ের সব হিসাব জনসমক্ষে উত্থাপন করার দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, পাগলা মসজিদের টাকা জনসাধারণের দেওয়া টাকা। তাই জনগণ এ টাকার হিসাব জানার অধিকার রাখে। তবে এ ব্যাপারে মসজিদ কর্তৃপক্ষের যুক্তি, তিন থেকে চার মাস অন্তর অন্তর যখন দানের সিন্দুক খোলা হয়, তখন নগদ কত টাকা পাওয়া যায়, সেটা গণমাধ্যমের কল্যাণে মানুষ জানতে পারে। এ ছাড়া প্রতিদিন মসজিদে মানুষের দান করা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ নানা জিনিসের নিলাম থেকে হাজার হাজার টাকা পাওয়া যায়। দানের সিন্দুকে টাকার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আর স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়, সেটার হিসাবও কখনো কাউকে জানানো হয় না। ফলে মানুষের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে জানার আগ্রহ বাড়ছে।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে যখন থেকে টাকার পরিমাণ বেশি হচ্ছে ও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, সেই ৯ বছরে পাগলা মসজিদের সিন্দুকে টাকা জমা পড়েছে ৭৫ কোটি টাকার ওপরে। এই ৯ বছরে অন্তত ২৩ বার দানের সিন্দুক খোলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন মসজিদে দেওয়া প্রাণী, অন্যান্য জিনিস, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার নিলামে তুলে আরও ২৫ কোটি টাকার ওপরে পাওয়া গেছে। এভাবে সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত পাগলা মসজিদে শতকোটি টাকার ওপরে জমা পড়েছে।

তবে এই টাকা থেকে মসজিদের ৩৭ কর্মীর বেতন ও মাদ্রাসার এতিম শিশুদের ভরণপোষণ বাবদ ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা প্রতি মাসে ব্যয় হয়। আবার ওয়াক্‌ফ স্টেটের হিসাব বাবদ ৫ শতাংশ হারে বছরে টাকা কাটা হয়। তবে কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে জমা রাখায় প্রতি মাসে লভ্যাংশও আসছে।

২০১৫ সালের শুরুর দিকে আটটি লোহার সিন্দুক খুলে একসঙ্গে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। তখন ছয় মাস পরপর সিন্দুক খোলা হতো। এর পরেরবার পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ৭৮ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের শেষের দিকে দানসিন্দুকে সর্বোচ্চ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ওপরে মিলেছিল। দিন দিন টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা জমার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তিন মাস পরপর সিন্দুক খোলার প্রথা চালু হয়। এভাবে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে দানের সিন্দুক খুলে সর্বমোট ৭৫ কোটি ৪৭ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩৮ টাকা পাওয়া গেছে। আর যে বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়, তা জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে গচ্ছিত রাখা হয়।

মসজিদ কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়ার ভাষ্য ও সরেজমিনে নিলামের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। নিলামে শুক্রবার বাদে প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার টাকার জিনিস বিক্রি হয়। আর প্রতি শুক্রবার দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকার জিনিস বিক্রি হয়। এ হিসাবে প্রতি মাসে নিলামের ডাক থেকে ২০ লাখ টাকার ওপরে পাওয়া যাচ্ছে। আর বছরে নিলামের এ হিসাব দাঁড়ায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার মতো। এভাবে গত ৯ বছরে নিলাম থেকে পাওয়ার কথা ২২ কোটি টাকার ওপরে।

শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, মসজিদের দানসিন্দুক থেকে যে স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়, তা সর্বশেষ ২০২০ সালে এসবের একবার নিলাম হয়েছিল। তখন এ থেকে আরও প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা পাওয়া যায়। তবে এর পর থেকে পাওয়া স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে জমা আছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত ১৫ বার সিন্দুক খোলা হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, ট্রেজারিতে জমা থাকা ১৫ বারের স্বর্ণালংকার আর বৈদেশিক মুদ্রা মিলে আরও সাত থেকে আট কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে। দানসিন্দুকের ৭৫ কোটি টাকার ওপরে, নিলামের প্রায় ২২ কোটি টাকা, চার বছর আগের স্বর্ণালংকারের নিলাম থেকে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা, ট্রেজারিতে জমা থাকা গত চার বছরের স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে থাকা প্রায় সাত থেকে আট কোটি টাকা মিলিয়ে ১০০ কোটি টাকার বেশি হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৯ সাল থেকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পাগলা মসজিদের কার্যক্রম চলে আসছে। সেই থেকে পদাধিকার বলে কিশোরগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকেরা পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

মসজিদ কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে পাগলা মসজিদের আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। এ মসজিদের টাকা দুটি ব্যাংকে আছে। মসজিদের আয় দিয়ে এই কমপ্লেক্সে অবস্থিত নুরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসার ১৩০ এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীর বিনা মূল্যে পড়াশোনা ও ভরণপোষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এখানে দায়িত্বরত কর্মীদের বেতনও মসজিদের আয় থেকে দেওয়া হয়।

মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, দানের অর্থ দিয়ে মসজিদের পাঁচ একর জায়গায় একটি দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এতে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। মূল মসজিদটি ছয়তলাবিশিষ্ট হবে। প্রতি তলায় একসঙ্গে পাঁচ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। পাশাপাশি আরও পাঁচ হাজার নারী মুসল্লির জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা থাকবে। সব মিলিয়ে ৪০ হাজার লোক যাতে একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া থাকবে একাডেমিক ভবন ও অতিথিশালা। অতিথিশালায় রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবস্থানের ব্যবস্থা থাকবে।

জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি ফৌজিয়া খান বলেন, পাগলা মসজিদ ও ইসলামি কমপ্লেক্সের খরচ চালিয়ে দানের বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। জমা টাকার লভ্যাংশ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তাও করা হয়ে থাকে।

কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে পাগলা মসজিদ অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান। শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মসজিদটি গড়ে ওঠে। কথিত আছে, খাস নিয়তে এ মসজিদে দান করলে মানুষের মনের আশা পূরণ হয়। সে জন্য দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে এসে দান করে থাকেন।

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, December 1, 2024

পাগলা মসজিদের দানবাক্সে রেকর্ড আট কোটি টাকা

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দান সিন্দুকে এবার রেকর্ড ৮ কোটি ২১ লাখ ৩৪ হাজার ৩০৪ টাকা পাওয়া গেছে। শনিবার মসজিদের ১০টি দানসিন্দুক ও একটি ট্রাঙ্ক খুলে বস্তার হিসাবে রেকর্ড ২৯ বস্তা টাকা পাওয়া যায়। দান হিসেবে পাওয়া বস্তার এসব টাকা গণনা করে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ এ টাকার হিসাব পাওয়া গেছে। এছাড়া পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার। তবে এ মসজিদে দান হিসেবে পাওয়া টাকার আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবার পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলার পর দানবাক্সে পাওয়া টাকার পরিমাণ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এখান থেকে পাওয়া কি পরিমাণ টাকা ব্যাংকে জমা রয়েছে কিংবা কোন কোন খাতে কি পরিমাণ টাকা ব্যয় করা হয়েছে, সেটি কখনোই প্রকাশ করা হয় না। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দাবি উঠলেও সেটি মসজিদ কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করে আসছেন। এবার এ নিয়ে সরব হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কিশোরগঞ্জ জেলার সমন্বয়ক ইকরাম হোসাইন পাগলা মসজিদের টাকা সরিয়ে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগ করেছেন।

শনিবার পাগলা মসজিদের টাকা গণনার সময় সকালে সমন্বয়ক ইকরাম হোসাইন গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি, অতীতে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, তারা বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে বিভিন্ন ছলচাতুরির মাধ্যমে পাগলা মসজিদের টাকা সরিয়েছে। যারা মসজিদ প্রশাসনে রয়েছেন তারা ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হয়েছেন। তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তাদের আয়ের উৎস কি? কীভাবে তাদের এতো অঢেল সম্পদ হয়েছে, এসব খতিয়ে দেখা উচিত। সমন্বয়ক ইকরাম হোসাইন বলেন, বছরের পর বছর পাগলা মসজিদের দানবাক্সে কোটি কোটি টাকা আসছে। কিশোরগঞ্জসহ সারা দেশের মানুষ জানতে চাচ্ছিলো এই টাকা কোথায় রাখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত পাগলা মসজিদের কত কোটি টাকা রয়েছে, এই টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে। দেশের মানুষ এবং কিশোরগঞ্জের আপামর ছাত্র-জনতা প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ এবং পরিতাপের বিষয়, এখন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের প্রশাসন যারা পাগলা মসজিদের দায়িত্বে রয়েছেন, তারা এটা ক্লিয়ার করেননি। কত টাকা আসছে, সোনা-রুপা কি আসছে, বৈদেশিক মুদ্রা কি আসছে, ওই টাকা কোথায় রাখা হচ্ছে। কাদের মাধ্যমে রাখা হচ্ছে, কোথায় ব্যয় করা হচ্ছে। পাগলা মসজিদ নিয়ে মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাসের যে জায়গা রয়েছে, সেটি নিয়ে লুকোচুরি করা হচ্ছে। এ সময় সমন্বয়ক ইকরাম হোসাইন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই, যারা পাগলা মসজিদের দায়িত্বে রয়েছেন, তারা যদি অনতিবিলম্বে দেশবাসীর কাছে পাগলা মসজিদের অর্থের বিষয়টি স্পষ্ট না করেন, তাহলে কিশোরগঞ্জের ছাত্র-জনতাসহ এ দেশের মানুষ এই হিসাব নিবে ইনশাআল্লাহ্‌। তবে টাকা গণনা চলার সময়ে ওয়াক্‌ফ হিসাব নিরীক্ষক মো. আলাউদ্দিন জানান, ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদটি ওয়াক্‌ফ এস্টেটের তালিকাভুক্ত। এখানে ১২ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কমিটি রয়েছে।

কমিটির কাজগুলো ওয়াক্‌ফ প্রশাসন তদারকি করে। মানুষের মানতের অর্থ সুষ্ঠুভাবে রেজিস্ট্রারভুক্ত হচ্ছে কি-না, কোন খাতে খরচ হচ্ছে, সেগুলো তদারকি করা হয়। প্রতিবছর আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে হয়। ওয়াক্‌ফ প্রশাসন ৫ শতাংশ ওয়াক্‌ফ ট্যাক্স নিয়ে থাকে। গত অর্থবছরে পাগলা মসজিদ থেকে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৭ টাকা ওয়াক্‌ফ কন্ট্রিবিউশন নেয়া হয়েছে। পাগলা মসজিদের অ্যাকাউন্টে মোট কত টাকা রয়েছে সাংবাদিকদের এ প্রশ্নে ওয়াক্‌ফ হিসাব নিরীক্ষক মো. আলাউদ্দিন বলেন, বিষয়টি আমি এখন আপনাদের বলবো না। জেলা প্রশাসক মহোদয় কিছুক্ষণ আগে আপনাদের এই প্রশ্নের উত্তর দেননি, আমিও দেবো না। এটা সরকারের সিকিউরিটির ব্যাপার। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খান মানবজমিনকে বলেন, পাগলা মসজিদে দান হিসেবে যে টাকা আসে, তার সবটাই ব্যাংকে জমা রাখা হয়। ব্যাংক থেকে টাকার যে লভ্যাংশ আসে, সেটি দিয়ে পরিচালনা ব্যয়সহ অন্যান্য কার্যক্রম করা হয়। জমা রাখা মূল টাকাতে হাত দেয়া হয় না। এটি একটি সরকারি ব্যবস্থাপনা। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোন সুযোগ নেই।

এদিকে শনিবার সকাল ৭টায় মসজিদটির ১০টি দানসিন্দুক এবং একটি ট্রাঙ্ক খোলার মধ্য দিয়ে টাকা গণনার কাজ শুরু করা হয়। প্রথমে টাকাগুলো লোহার সিন্দুক থেকে বস্তায় ভরা হয়। পরে মসজিদের দোতলায় নিয়ে মেঝেতে ঢালা হয়। এরপর শুরু হয় টাকা গণনার কাজ। সর্বশেষ গত ১৭ই আগস্ট টাকা গণনা করতে ৩২০ জনের প্রায় ১২ ঘণ্টা লেগেছিল। এবার টাকা গণনা আরও দ্রুত করতে আরও ৩৫ জন শিক্ষার্থী এবং রূপালী ব্যাংকের আরো ৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গণনার কাজে যুক্ত করা হয়। পাগলা মসজিদ মাদ্রাসা ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার মোট ২৮৫ জন ছাত্র এবং রূপালী ব্যাংকের ৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট ৩৬০ জন টাকা গণনার কাজ করেন। সেনাবাহিনীর ১০ জন, পুলিশের ২০ জন, র‌্যাব’র ৫ জন ও আনসারের ১৫ জন সদস্য ছাড়াও মসজিদ-মাদ্রাসার ৪৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের সহায়তা করেন। এবার তিন মাস ১৩ দিন পর মসজিদের দানসিন্দুক খোলা হয়। এর আগে সর্বশেষ গত ১৭ই আগস্ট এ মসজিদের দানসিন্দুকগুলো খোলা হয়েছিল। তখন ২৮ বস্তা টাকা পাওয়া গিয়েছিল। পরে টাকা গণনা করে ৭ কোটি ২২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া পাওয়া যায় বৈদেশিক মুদ্রা, সোনা, রুপা ও হীরার গয়না। তবে এ মসজিদের দানসিন্দুক থেকে গত ২০শে এপ্রিল বৈদেশিক মুদ্রা, সোনা, রুপা ও হীরার গহনা ছাড়া এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ৭ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৭ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। এবার মসজিদের নির্দিষ্ট ৯টি দানসিন্দুক অন্তত দুই সপ্তাহ আগেই দানের টাকায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। পরে দান অব্যাহত রাখার সুবিধার্থে আরও একটি দানসিন্দুক এবং একটি ট্রাঙ্ক যুক্ত করা হয়। ফলে বস্তার হিসাবেও এবার সর্বোচ্চ ২৯ বস্তা টাকা পাওয়া যায়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে এসব টাকা গণনার কাজ শেষ হয়।

সকাল ৭টায় কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খান ও মোহাম্মদ হাছান চৌধুরীর নেতৃত্বে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মিজাবে রহমত এর উপস্থিতিতে দান সিন্দুক খোলা হয়। এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রুবেল মাহমুদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. এরশাদ মিয়া, রূপালী ব্যাংকের এজিএম রফিকুল ইসলাম, মসজিদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণসহ মসজিদ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা শহরের নরসুন্দা নদী তীরের ঐতিহাসিক এ মসজিদটিতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসে দান করছেন। যারা দান করতে আসেন তারা বলে থাকেন, এখানে দান করার পরে নাকি তাদের মনের আশা পূরণ হয়েছে। আর এ কারণেই দিন দিন দানের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে পাগলা মসজিদ অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান। শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মাত্র ১০ শতাংশ ভূমির ওপর এই মসজিদটি গড়ে উঠেছিল। সময়ের বিবর্তনে আজ এ মসজিদের পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এর খ্যাতি ও ঐতিহাসিক মূল্যও। বর্তমানে ৩.৮৮ একর ভূমির উপর সমপ্রসারিত পাগলা মসজিদ এলাকায় মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি অত্যাধুনিক ধর্মীয় কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। স্বভাবতই ঐতিহাসিক এই মসজিদকে নিয়ে জেলার ধর্ম-বর্ণ-সমপ্রদায় নির্বিশেষে সকলেই গর্ববোধ করেন।

mzamin

Saturday, November 2, 2024

কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩৬ কোটি টাকার অবকাঠামো তালাবদ্ধ

প্রশাসনিক অনুমোদন মিলছে না ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত ভবন কাজে আসছে না। মূল ফটকে তালা। ৫০ শয্যার কাঠামোতেও জনবল সংকট। রয়েছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা। স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত। জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রায় চার বছর পূর্বে ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণের কার্যক্রম শুরু হয়। অত্র উপজেলার কৃতীসন্তান সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. আব্দুল মান্নানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ছত্রিশ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ শয্যা হাসপাতাল হিসেবে উন্নীতকরণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করেন। চলতি বছর মে মাসের মাঝামাঝি বাস্তবায়িত প্রকল্প হস্তান্তর করা হয়। সেখানে রয়েছে একটি চারতলা একটি সাততলা বিশিষ্ট সুবিশাল ভবন। ভবনে রয়েছে অপারেশন থিয়েটার, পরীক্ষা নিরীক্ষার ল্যাব, এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিনসহ আধুনিক সুযোগ সুবিধা। উন্নত বিদ্যুৎ সঞ্চালনসহ জেনারেটর ব্যবস্থা। আছে অক্সিজেন প্লান্ট। কমপ্লেক্স সীমানার ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে ডাক্তার এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে এলাকাবাসী চিকিৎসা সেবা নিয়ে আশান্বিত হয়েছে। কিন্তু ছয় মাস  পেরিয়ে গেলেও ১০০ শয্যার হাসপাতালের প্রশাসনিক অনুমোদন না হওয়ায় তালাবদ্ধ রয়েছে সকল কার্যক্রম। সেই আগের ৫০ শয্যা হাসপাতাল কাঠামোর ভিত্তিতেই ঠাসাঠাসি ঘিঞ্জি পরিবেশে চলছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। ৫০ শয্যার হাসপাতাল কাঠামোতে যে পরিমাণ লোকবল প্রয়োজন তাও নেই। ফলে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। কাঙ্ক্ষিত সুফল এখনো পাচ্ছে না এলাকাবাসী। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কাঠামোতে চারটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ চিকিৎসক পদ রয়েছে ৩১জনের। এর মধ্যে ১৭জন চিকিৎসক পদায়ন থাকলেও ৫জন চিকিৎসক  ডেপুটেশনে রাজধানী ঢাকা কিংবা তাদের সুবিধাজনক স্থানে রয়েছেন। মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও প:প: কর্মকর্তা।

ফলে ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও প:প: কর্মকর্তাসহ ১১জন ডাক্তার দিয়ে চলছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। এর মধ্যে একজন আবাসিক ও চারজন মেডিকেল অফিসার, দুইজন কনসালটেন্ট ও একজন ইউনানী চিকিৎসক, একজন  হোমিও চিকিৎসক (সপ্তাহে ৩দিন)। সরজমিন দেখা যায় টিকেট কাউন্টারের অব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টিকেট কাউন্টারে ভিড় লেগেই আছে। কাউন্টার কক্ষটি খুবই ছোট। একই কক্ষে নারী-পুরুষ ঠেলাঠেলি করে টিকেট নিতে হয়। ফলে চুরিসহ নানারকম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে অহরহ। সোমবার সকালে তাছলিমা (২৮) নামে এক নারী টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কখন যে তার গলার স্বর্ণের চেইন চুরি হয়ে গেছে, টের পাননি। বাড়িতে গিয়ে দেখেন গলার চেইন নাই। মঙ্গলবার সকালে হাসপাতাল বারান্দায় বসে কান্না কাটি করেছেন। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। টিকিটের মূল্য ৫ টাকা। কাউন্টার থেকে ভাঙতি দিতে চায় না। ভাঙতি টাকা না দিলে কাউন্টারে দায়িত্বে থাকা আউট সোর্সিং এর লোকজন রোগীর সঙ্গে অসদাচরণ করেন। শিক্ষক নিলুফা ইয়াসমি (৩৫) বলেন, টিকেটের জন্য ১০ টাকার নোট দিয়েছি। কাউন্টার থেকে বলে ৫টাকা ভাংতি নাই। কাউন্টারে ভাঙতি রাখবেন বলাতে তার সঙ্গে অসদাচারণ শুরু করে বলে ভাঙতি টাকা নিয়ে আসেন। তারপর টিকেট নিবেন। শেষে ১০টাকা দিয়েই টিকিট নিয়েছেন। ভাঙতি নাই বলে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার এমন অনেক অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়,  দৈনিক ৭-৮শ’ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। তাছাড়া অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন ধারণ ক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী। তাদেরকে ফ্লোরে বা বারান্দায় রেখে চিকিৎসা করাতে হয়।

১০০ শয্যা অনুমোদন হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারসহ ৫০ জনের অধিক ডাক্তার পদায়ন হবে। নবনির্মিত ভবনে রোগী স্থানান্তর হলে ঘিঞ্জি পরিবেশ থাকবে না। এতে সেবার মান বাড়বে। সকল ধরনের রোগী উন্নত চিকিৎসা  সেবা নিতে পারবেন। এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে তালাবদ্ধ আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় তালাবদ্ধ থাকায় হয়তো কোটি টাকার এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুপোযোগী বা অকেজো হয়ে যাবে। এগুলোর ব্যবহার শুরু হলে দরিদ্র, হত দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা সেবা নিতে পারতো। যা বর্তমানে অধিক মূল্যে বেসরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করাতে হয়। যে পরীক্ষা- নিরীক্ষার উপর মানুষের আস্থা কম। উপজেলার মুমুরদিয়া থেকে চিকিৎসা নিতে আসা পারুল, ফেকামারা গ্রামের ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘বড় বড় বিল্ডিং অইছে। কিন্তু ডাক্তার কম, লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট নেওন লাগে, আবার ডাক্তারের রুমে গিয়া লাইনে খাড়ান লাগে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করন লাগে বাইরের ক্লিনিক থাইক্ক্যা। ওষুধ কিছু দেয়। বাকিগুলো বাইরে থাইক্ক্যা কিনুন লাগে।’ দৃক আলোকচিত্র গ্রন্থাগারের আলোকচিত্র বিভাগ এবং ইমেজ আর্কাইভের প্রাক্তন প্রধান ও কটিয়াদী সাহিত্য সংসদের সদস্য মইন উদ্দিন বলেন, ১০০ শয্যা হাসপাতালের অবকাঠানো নির্মাণ শেষ হয়েছে। দ্রুত এর অনুমোদন ও কার্যক্রম চালুকরণের দাবি জানাই। এটি চালু হলে মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলোর সঠিক ব্যবহার এবং এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসা সেবা পাবে। কিশোরগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. সাইফুল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, আমরা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। ১০০ শয্যা হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করতে জনবল, লজিস্টিক সাপোর্ট ইত্যাদি কিছু বিষয় রয়েছে। আমরা মানসিকভাবে তৈরি আছি। অনুমোদন পেলেই কার্যক্রম শুরু করতে পারবো। এ ব্যাপারে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। আশাকরি দ্রুত সময়ের মধ্যেই অনুমোদন হয়ে যাবে।
mzamin

Thursday, October 31, 2024

শহীদ রেফায়েত উল্লাহর শিশুকন্যা লামিয়ার মানবেতর জীবন by মুহাম্মদ শাহ্‌ আলম

মা-বাবা হারা এক অনাথ শিশু লামিয়া। বর্তমান বয়স ১৬ মাস। বাবা রেফায়েত উল্লাহ সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। মা রাজিয়া আক্তার মিম নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শিশু লামিয়াকে দাদা-দাদির আশ্রয়ে রেখে পিত্রালয়ে চলে যান,  তখন লামিয়ার বয়স মাত্র ৫ মাস। পুত্রশোকে কাতর কাউসার দম্পতি এখন ওই শিশুর পিতা-মাতা, দাদা- দাদি সবকিছু। দাদা কাওসার মিয়া চা বিক্রেতা, দাদি মোছা. হাসনা  বেগম গৃহিণী। জন্মের পর লামিয়া বাবার স্পর্শ পেয়েছিল মাত্র ৪ মাস। বাবা এবং মায়ের আদর, স্নেহ ভালোবাসা উপলব্ধি করার মতো বয়স হওয়ার আগেই লামিয়া পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে এতিম।

গত বছর এদিন বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের একদফা দাবিতে বিরোধী জোটের ডাকা ৭২ ঘণ্টার অবরোধের প্রথমদিনে কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ডে বিএনপি নেতাকর্মী ও তার বন্ধুদের সঙ্গে অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে রেফায়েত উল্লাহ। আন্দোলনে অংশগ্রহণের আগে রেফায়েত উল্লাহ তার দাদি সখিনা বেগমের কাছে  দোয়া চেয়ে বলেছিল ফিরে আসতেও পারি না-ও আসতে পারি। আগের দিন রাতে তার নিজস্ব ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল আগামীকাল আন্দোলনে যাচ্ছি বাঁচতেও পারি মরতেও পারি। সকলের নিকট দোয়া চাই। ৩১শে অক্টোবর সকালে অবরোধ কর্মসূচির শুরুতেই উপজেলার ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশ কর্মসূচিতে বাধা  দেয়। বাধা উপেক্ষা করে অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল ৮ কিংবা সাড়ে ৮টার দিকে কুলিয়ারচর থানা পুলিশ আন্দোলনরত বিএনপি নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি ছুড়ে। এতে উপজেলার বড়ছয়সূতী গ্রামের কাউসার মিয়ার বড় ছেলে ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ তনয় (২৪) এবং মাধবদী গ্রামের কাজল মিয়ার ছেলে কৃষকদলের  নেতা বিল্লাল হোসেন রনি (৪০) ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ডে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ সময় পুলিশের গুলিতে আরও বেশক’জন গুরুতর আহত হন। এই হত্যাযজ্ঞের পর পুলিশ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তড়িঘড়ি করে নিহতদের জানাজা  শেষে দাফন কার্য সম্পন্ন করতে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বাধ্য করে। ফলে অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে মধ্যরাতে তড়িঘড়ি করে নামাজে জানাজা শেষে শহীদদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। এমনকি বিএনপি  নেতাকর্মীরা যাতে জানাজায় অংশগ্রহণ করতে না পারে সেইজন্য জানাজার স্থানে পুলিশের একাধিক গাড়ি অবস্থান নেয়। তাছাড়া পুলিশের গুলিতে নিহত ও আহত  বিএনপি’র নেতাকর্মীদের নামে পুলিশ বাদী হয়ে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করে। মামলায় পুলিশের গুলিতে নিহত রেফায়েত উল্লাহ তনয় (২৪) ও বিল্লাল হোসেন রনি (৪০), বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি মো. শরীফুল আলমসহ ৪৩জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১৫০০/১৬০০ জনকে আসামি করে মামলা করে। মামলায় পুলিশ শরীফুল আলম সহ প্রায় ৫০জনকে গ্রেপ্তার করে। নিহত  রেফায়েত উল্লাহ তনয় (২৪) ও বিল্লাল হোসেন রনি (৪০) সাধারণ পরিবারের সন্তান। রেফায়েত উল্লাহ বিয়ের এক বছরের মাথায় একমাত্র সন্তান লামিয়াকে রেখে এবং বিল্লাল  হোসেন ৩ সন্তান, ছেলে টুটুল (১০),  মেয়ে জান্নাত (৬) সবার ছোট ছেলে জাকির (২) ও স্ত্রী আন্না বেগম (২৭)কে রেখে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে দেশের গণতন্ত্র মানবাধিকার আইনের শাসন বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। এই অবস্থায় অসহায় দুই পরিবারের শিশুসন্তানের ভরণ- পোষণের জন্য বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত  চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং  কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি মো. শরীফুল আলম প্রতি মাসে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার দিনটিতে আজ দুপুরে শহীদ  রেফায়েত উল্লাহর গ্রামের বাড়িতে এক মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে হয়েছে এবং ওইদিনই বিকালে ছয়সূতী ইউনিয়ন বিএনপি’র কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠিত হবে। এতে উপজেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করবেন।

mzamin

Saturday, October 5, 2024

হাসিনা গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড: রাশেদ খান

শেখ হাসিনাকে গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড আখ্যা দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খাঁন বলেছেন, আজকে কাউকে কাউকে আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বলা হচ্ছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে একক কাউকে মাস্টারমাইন্ড বলা মানে অন্যদের অবদান অস্বীকার করা। এই আন্দোলন ছিল সার্বজনীন আন্দোলন। সকল দল মত পথের মানুষ ছিল। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে এই ২য় মুক্তি আমরা পেয়েছি। এটাতে আওয়ামী লীগের মত কেউ একক অর্জন মনে করলে তাদের অবস্থাও আওয়ামী লীগের মত হবে। এখন সময় এসেছে দেশকে গড়ার। কর্তৃক ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে স্বাধীনতাকে কেউ নস্যাৎ করবেন না। আগামীতে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির সরকার গঠন করে এই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে গণঅধিকার পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত তারুণ্যের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে আসতে গিয়ে রাস্তায় যে অবস্থা দেখলাম, এতে মনে হলো উন্নয়নের নামে কিশোরগঞ্জবাসীর সাথে বেইমানি করা হয়েছে। পুরো রাস্তা ভাঙাচোরা, কর্দমাক্ত। যে জেলা থেকে তিনজন রাষ্ট্রপতি হয়েছে, সেই জেলার এই হাল কেন? আপনাদের এলাকার জনপ্রতিনিধি ছিল জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। সে তো জাতীয় বেইমান। সে জাতীয় পার্টিকে শেখ হাসিনার দোসর বানিয়েছে। জিএম কাদেরকে ব্লাকমেইল করে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে নিয়ে গিয়েছে। এই বেইমানকে আপনাদের উচিত তাড়াইলে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা। তিনি বলেন, আমরা ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছি। এরপর দল গঠন করে রাষ্ট্র সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছি। আমরা তো সেই ২০২১ সালেই বলেছি, দলীয় প্রধান রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না, ২ বারের বেশি কেউ রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। এই রাষ্ট্র সংস্কারের বাণী পৌঁছে দিতেই আমরা তাড়াইলে এসেছি।

তাড়াইল উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি জহিরুল হকের সভাপতিত্বে তারুণ্যের সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ, উচ্চতর পরিষদের সদস্য কৃষিবিদ শহিদুল ইসলাম ফাহিম, বৈদেশিক শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন এবং সহ দপ্তর সম্পাদক মোখলেসুর রহমান উজ্জ্বল। গণঅধিকার পরিষদের তাড়াইল উপজেলার সদস্য সচিব জাকিরুল ইসলাম বাকির সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে জেলা ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

mzamin

Wednesday, September 4, 2024

কটিয়াদী পাকুন্দিয়ায় সুলতানের সাম্রাজ্য by আশরাফুল ইসলাম

কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক এডভোকেট মো. সোহ্‌রাব উদ্দিনের একমাত্র ছেলে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এসএম তৌফিকুল হাসান সাগর। কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়ার মানুষের কাছে তিনি ‘সুলতান’ নামেই বেশি পরিচিত। দীর্ঘদিন আগে তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি ভয়ঙ্কর সশস্ত্র বাহিনী, যার নাম সুলতান বাহিনী। আস্থাভাজন ৩০-৪০ জন তরুণ-যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় এই বাহিনী। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে বিনা ভোটে এমপি হন তার বাবা এডভোকেট সোহ্‌রাব উদ্দিন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলে বঞ্চিত হন সোহ্‌রাব। নূর মোহাম্মদ এমপি থাকার সময়ে বেশ কয়েকবার তার লোকজনের সঙ্গে পাকুন্দিয়ায় সুলতান বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সুলতান বাহিনী এতটাই ভয়ঙ্কর ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকতো যে, এমপি নূর মোহাম্মদ সমর্থক এবং পুলিশকে তারা মাঠেই দাঁড়াতে দিতো না। এই বাহিনীর উপর ভর করেই বিগত ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনে কেন্দ্রের পর কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য হন সোহ্‌রাব।

স্থানীয়রা বলছেন, নির্বাচনের পর আরও ভয়ঙ্কররূপে আবির্ভূত হয় সুলতান বাহিনী। এই বাহিনী হয়ে ওঠে কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়ার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। এমপি বাবাকে সামনে রেখে দুই উপজেলার সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন সুলতান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ম্যানেজিং কমিটি, কালিয়াচাপড়া সুগার মিলের যন্ত্রাংশ ও মালামাল পাচার, বালুমহাল, টিসিবি ডিলারসহ সবকিছুই হতো সুলতানের হাতের ইশারায়। সুলতান নিজেই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদ দখল করেন। মাত্র ৭ মাসেই এসব খাত থেকে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন সুলতান। এ ছাড়া তার নেতৃত্বে কিশোরগঞ্জ জেলা জুড়ে গড়ে ওঠে ভারতীয় চোরাই চিনির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। চোরাই এসব চিনি যেতো রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে। চিনি চোরাচালান থেকে সুলতান বিপুল অঙ্কের টাকা কামালেও সংসদ সদস্য বাবার সুবাদে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান তিনি। গত ৮ই মে অনুষ্ঠিত পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে এমপি’র সমর্থনের জন্য তৎকালীন পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এমদাদুল হক জুটনের কাছ থেকে সুলতান ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। সে সময় বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়। সুলতানকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে এমপি’র সমর্থন লাভের পরপরই মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ১৬ই এপ্রিল এমদাদুল হক জুটন ইউপি চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। নির্বাচনের দিন সুলতান বাহিনী তার পক্ষে ভোটে ব্যাপক অনিয়মসহ একাধিক কেন্দ্র দখলে ভূমিকা রাখে। এরপর ফলাফল ঘোষণার সময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে এমদাদুল হক জুটনকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। এ ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থী নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করলে ভোটভর্তি ব্যালটবাক্স আদালতের জিম্মায় রাখা হয়। সর্বশেষ ছাত্র আন্দোলনের সময় গত ৪ঠা আগস্ট সোহ্‌রাব ও তার ছেলে সাগরের নেতৃত্বে পাকুন্দিয়া থানার ওসি আসাদুজ্জামান টিটুসহ থানা পুলিশ ও সুলতান বাহিনী মিলে পাকুন্দিয়া সদরে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। ৫ই আগস্ট পটপরিবর্তনের পর সুলতান বাহিনী উপজেলার দরগা বাজারে সোহ্‌রাবের বাসভবনকে ঘিরে শক্ত অবস্থান নেয়। সুলতান বাহিনীর পাহারায় গত ১২ই আগস্ট সেখানে একটি সভাও হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার ক্ষোভের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে গত আগস্ট পিতা-পুত্র পাকুন্দিয়া ত্যাগ করেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০১৪ সালের পর সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাতসহ ব্যাপক টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি ছিল সুলতান বাহিনীর নিত্যনৈমত্তিক কাজ। এমপির ক্ষমতার প্রভাবে মামলার জালে ঘায়েল করা হতো প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের। এমপিকে প্রধান অতিথি করা ছাড়া এলাকায় কোনো অনুষ্ঠান করা যেতো না। রাজনৈতিক, ক্রীড়া, সামাজিক প্রতিটি অনুষ্ঠানে সোহ্‌রাবকে প্রধান অতিথি করতে হতো। এর ব্যত্যয় হলে সে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দেয়া হতো। এ ছাড়া সোহ্‌রাবের সেই মেয়াদে সড়কবাতি প্রকল্পের টেন্ডার বাগিয়ে নিয়ে তার ছেলে সাগর কয়েক কোটি টাকা কামাই করেন। ২০১৯ সালের মে মাসে সাগর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের শোভন-রাব্বানী কমিটিতে টাকার বিনিময়ে সহ-সভাপতি পদ বাগিয়ে নেন। সে সময় এ নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়। এর প্রেক্ষিতে সহ-সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন সাগর। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৪ই নভেম্বর প্রকাশিত কেন্দ্রীয় যুবলীগের ২০১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে স্থান পান তিনি। যুবলীগের এই পদকে পুঁজি করে সাগর তার সুলতান বাহিনীর মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখেন। ৫ বছর বিরতির পর সোহ্‌রাবের সর্বশেষ এমপির মেয়াদে মাত্র ৭ মাসেরও কম সময়ে অন্তত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তার ছেলে সাগর। এর মধ্যে কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া এই দুই উপজেলার বালু খাত থেকেই আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। পিতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর পরই নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে সাগর জানিয়ে দেন, ‘টাকা খরচ করে আমরা এমপি হয়েছি, এখন আমি সুদে-আসলে সে টাকা তুলবো। এ নিয়ে যেন কারও কোন কথা না শুনি।’ এরপরই শুরু হয় সুলতানের টাকা কামানোর মিশন। এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য সোমবার বিকাল ৫টা ৩৬ মিনিটে এসএম তৌফিকুল হাসান সাগর এর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।


Tuesday, August 20, 2024

দখলমুক্ত হয়নি আনন্দমোহন বসু’র বাড়ি

ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা উপমহাদেশের প্রথম ‘র‌্যাংলার’ আনন্দমোহন বসুর জন্মভিটার এখন বেহালদশা। বাঙালি রেনেসাঁর অন্যতম স্থপতি বিখ্যাত এই সমাজ সংস্কারকের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি বেদখল হয়ে আছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষকতা আর ভূমি বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় লিজের নামে বাড়িটি দখলে রেখেছেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিবার। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে আনন্দমোহন বসুর এই জন্মভিটাটি সংরক্ষণের জন্য এলাকাবাসী ও সুধীজনদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২রা জানুয়ারি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরদিন ৩রা জানুয়ারি মন্ত্রণালয় থেকে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসককে আনন্দমোহন বসুর বাড়ি থেকে অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে গত ৬ই ফেব্রুয়ারি ইটনা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা ও সরজমিন তদন্ত করে উচ্ছেদের বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন প্রেরণের কথা বলা হয়। কিন্তু অদ্যাবধি বাড়িটি অবৈধ দখলমুক্ত হয়নি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতার নির্দেশে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সোমবার দুপুরে বাড়িটিতে গিয়ে সেখানে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের সাইনবোর্ড ও নোটিশ ঝুলিয়েছেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টোডিয়ান সাইফুল ইসলাম এ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। এসময় স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার রায় এবং স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

সরজমিন দেখা গেছে, আনন্দমোহন বসুর অরক্ষিত জন্মভিটায় অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে বসতবাড়িটি। ৩.১১ একর আয়তনের বাড়িটিতে রয়েছে কয়েকটি বিশাল ভবন, খোলা মাঠ ও একাধিক পুকুর। বিশাল বসতবাড়িটি পরিণত হয়েছে পরগাছা উদ্ভিদের বাসস্থানে। চারদিকে নির্মিত প্রতিরক্ষা দেয়ালের অনেক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। দেয়ালের অনেক জায়গার ইট-পাথর দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে গেছে। আনন্দমোহন বসুর আতুড়ঘরটিকে বানানো হয়েছে গোবরের গর্ত। এ অবস্থায় ঐতিহ্যের নিদর্শন এসব স্থাপনা বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও উপমহাদেশে ছাত্ররাজনীতির গোড়াপত্তনকারী আনন্দমোহন বসুর জন্মস্থান ও বসতবাড়ি দেখার জন্য দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায়ই দর্শণার্থীরা আসেন। কিন্তু বসতবাড়িটি বেদখল হয়ে থাকায় বাড়িটিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকারও সংরক্ষিত পর্যায়ে চলে গেছে। অথচ সপ্তদশ শতাব্দীর স্থাপত্যশৈলীর অনুপম নিদর্শন এ বাড়িটি। বলাকুট নদীর তীরে অবস্থিত বাড়িটির ভবনগুলো আয়তাকার ভূমি নকশায় নির্মিত, যাতে ইটের গাঁথুনিতে চুন-সুরকির ব্যবহার করা হয়েছে। মূল ভবনটি ইংরেজি বর্ণ ‘ইউ’ আকৃতির একতলা বিশিষ্ট স্থাপনা। কক্ষগুলোর সম্মুখ বারান্দার ছাদ হিসেবে ঢেউটিন ব্যবহার করা হয়েছে। প্রত্যেকটি বারান্দার সামনে একটি করে সিঁড়ি রয়েছে। উত্তর পাশের সিঁড়িতে হাতির মাথা সদৃশ নকশা করা। তিনটি কক্ষের প্রবেশ দরজায় ফুল, লতাপাতা, প্রাণি ও জ্যামিতিক নকশা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি কক্ষে ভোল্টেড ছাদ এবং ফুল ও লতাপাতার নকশা এবং একটি কক্ষের ছাদে লোহার ভিম ও কাঠের কড়িবর্গা রয়েছে। এ বাড়িতেই ১৮৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন ভারতীয় উপমহাদেশে অটোক্রোম লুমিয়ের স্লাইড ব্যবহার করে রঙিন ছবির পথিকৃৎ আলোকচিত্রী হেমেন্দ্রমোহন বসু। দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে বাড়িটি বন্দোবস্ত মোকদ্দমামূলে স্থানীয় প্রভাবশালী হাজী আমির উদ্দিনের পরিবারের দখলে রয়েছে। বাড়িটি দখল করার সময় বাড়িটির বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জিনিসপত্র তখন তারা নিজেদের অধিকারে নিয়ে যান। বর্তমানে তার ছেলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবদুল হাই বাড়িটি দখলে রেখেছেন।

Saturday, August 17, 2024

বাবা মুক্তিযোদ্ধা না হলেও ডিবি হারুনের চাকরি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় by আশরাফুল ইসলাম

ডিএমপি’র সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ভাগিয়ে নেন তিনি। ভুয়া এই সনদ ব্যবহার করে হারুন ২০তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশে চাকরি নেন। কেবল হারুন নয় তার অপর ছোট তিন ভাইও মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়েছেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় জিয়াউর রহমান মাদকদ্রব্যে ও তৃতীয় জিল্লুর রহমান পুলিশে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেন। এ ছাড়া সবার ছোট এবিএম শাহরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা কোটায় মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। বর্তমানে জিয়াউর রহমান মাদকদ্রব্যের এসআই ও জিল্লুর রহমান পুলিশের ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া ডা. এবিএম শাহরিয়ার বড় ভাই হারুনের প্রতিষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুরে হারুনের টাকায় একটি হাসপাতালের অংশীদার হিসেবে সেটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদের প্রভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় জায়গা পান হারুনের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার ফজলুল হক চাপে পড়ে আবুল হাশেম হাসিদকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন দেন। তখন তৎকালীন মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড থেকে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জামুকাতে লিখিতভাবে অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিবাদ ও অভিযোগ আমলে নেয়া হয়নি।

মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার কোরবান আলী বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ ঘাগড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পক্ষে বা বিপক্ষে তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি। সে সময় গ্রামের খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন আবুল হাশেম হাসিদ। তার গোষ্ঠীর লোকজন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় ভূমিকা রেখেছিলেন। এগুলো এলাকার সবাই জানে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ডেপুটি স্পিকার থাকার সময়ে আবুল হাশেম হাসিদকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। ঘাগড়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার ফজলুল হক চাপে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবুল হাশেম হাসিদকে প্রত্যয়ন দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা এর বিরোধিতা করেছিলাম। তৎকালীন মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এডভোকেট রফিকুল আলম রতন এবং আমি জামুকাতে লিখিতভাবে অভিযোগও করেছিলাম। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাবের কারণে আমাদের সেই অভিযোগের ফাইলই খুঁজে পাইনি। তবে আমরা যেটি সত্য, সেটি সব সময় বলে এসেছি। আবুল হাশেম হাসিদ মারা যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় যখন দাফন করা হয়, তখন আমরা অনেকেই সে সময় যাইনি। অনেকে আবার চাপে পড়ে গিয়েছেন। জানা গেছে, গাজীপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত থাকার সময় হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ ২০১৬ সালের ৭ই এপ্রিল মারা যান। পরদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন কিশোরগঞ্জের আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলে থাকতেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদ এডভোকেটের স্নেহভাজন হওয়ার কারণে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০০০ সালে হারুন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশে চাকরি নেন। তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদ এডভোকেটের সুপারিশে তিনি ভাইভাতে শতভাগ নাম্বার পান। এ নিয়ে সে সময় পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়।


Friday, August 21, 2020

‘তার মতো এমন মানবদরদি খুবই বিরল’ by আশরাফুল ইসলাম

আইভি রহমান। পুরো নাম জেবুন্নাহার আইভি। ২১শে আগস্টে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২৪শে আগস্ট আজন্ম রাজনৈতিক এই নেতা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তার চির প্রস্থানে জন্মস্থান ভৈরবের মানুষ হারায় তার একান্ত সুহৃদ, প্রিয় আইভি আপাকে। পৈশাচিক গ্রেনেড হামলায় প্রিয় আইভি আপার গুরুতর আহত হওয়ার খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো ভৈরব। পরদিন ২২শে আগস্ট ভৈরবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। হরতালে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আবদুল কুদ্দুস (৩২) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী।
নিহত কুদ্দুসের পরিবার বিচার না পেলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা হয় ৩টি মিথ্যা মামলা।

ওই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে দৈনিক মানবজমিন-এর ভৈরব প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ২২শে আগস্ট দিনটি ভৈরববাসীর জন্য এক কালোদিন। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান আহতসহ হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদে ২২শে আগস্ট ভৈরবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ এ হরতাল আহ্বান করে। হরতালের সমর্থনে ভোর থেকে নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ভৈরব বাজার আওয়ামী লীগ অফিসে জড়ো হন। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনটি ভৈরব বাজার রেলজংশনের মনমরা রেলসেতুর কাছে পিকেটারদের কবলে পড়ে। উত্তেজিত জনতা ট্রেনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ আওয়ামী লীগ কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ও টিয়ার শেল ছোড়ে। গুলিতে আবদুল কুদ্দুস নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন। ঘটনার পর উত্তাল হয়ে পড়ে ভৈরব। এ ঘটনায় পুলিশ ভৈরবের ২ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৩টি মিথ্যা মামলা করে। মিথ্যা মামলা করায় আওয়ামী লীগ লাগাতার কর্মসূচি দেয়। পুলিশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালায়। গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেকে ভৈরব ছাড়তে বাধ্য হন। পুলিশ দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ অফিস অবরুদ্ধ করে রাখে।

সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম বলেন, সর্বদা পরিশ্রমী, অক্লান্ত ছুটে চলা আইভি রহমান আজ স্মৃতির সাদা ফ্রেমে বাঁধা নিশ্চুপ ছবি হলেও, ভৈরববাসী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার কাছে তিনি জীবন্ত, চলমান। তিনি বেঁচে আছেন তার কর্মের মধ্য দিয়ে।

ভৈরব মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক উলফাত আরা জাহান জানান, ১৯৯৬ সালে তিনি যখন ভৈরব মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন, আইভি রহমান তখন কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান। ভৈরবে আসলেই তিনি ডাকতেন। কথা ও কাজে এক ছিলেন তিনি। দেশীয় খাবার খেতে পছন্দ করতেন তিনি। শুঁটকির ভর্তা ছিল তার প্রিয় খাবার। ১৯৯৮ সালে মহিলা সংস্থার অফিস নির্মাণ ছাড়াও মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তিনি ভৈরব বাজারে মহিলা সমবায় মার্কেটের জন্য জায়গা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। উলফাত আরা জাহান বলেন, নারী উন্নয়ন ও নারী অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার এমন মানুষ আর দেখা যায় না। গ্রেনেড হামলার ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তিনি ভৈরবে এসেছিলেন।

সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উলফাত আরা জাহান বলেন, ওই বছর ভৈরবে বন্যা হয়েছিল। নিজ এলাকার দুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে জলাবদ্ধ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাড়ি বাড়ি ছুটে গিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ত্রাণসামগ্রী। জন্মস্থান ভৈরবে তিনি আজীবন এভাবে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভানেত্রী ও জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতির অবৈতনিক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে এখানকার নারীদের উন্নয়ন এবং সমাজের অবহেলিত শিশু, প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে তিনি ব্যাপক কাজ করেন। সেসব অসহায় মানুষের কাছে আইভি রহমান এখনো দেবীতুল্য। উলফাত আরা জাহান জানান, একেবারেই সাধারণ জীবনযাপন করতেন আইভি রহমান। পরতেন সুতির শাড়ি। আমৃত্যু মানুষকে ভালোবেসে গেছেন, তাদের ভালোবাসা পেয়েছেন। মানুষকে অকাতরে দান করলেও সেসব প্রচার করতেন না তিনি। তার মতো এমন মানবদরদি খুবই বিরল।

১৯৪৪ সালের ৭ই জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব শহরের চণ্ডিবের গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সভ্রান্ত এক পরিবারে তার জন্ম। পিতা মরহুম জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ এবং ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ। মা হাসিনা বেগম ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। ৮ বোন ও ৪ ভাইয়ের মধ্যে আইভি পঞ্চম। ছেলেবেলা থেকেই আইভি ছিলেন শান্ত স্বভাবের, তবে প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তার ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বভাবের জন্য তাকে বাইরে থেকে খুব কঠিন মনে হলেও, আদতে তিনি ছিলেন খুবই দরদি মনের মানুষ। যারা মিশেছে, কাছে গেছে তারাই পেয়েছে অপরিসীম ভালোবাসা, আদর, মমতা আর সহযোগিতা। প্রথম দর্শনেই আইভিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে নবম শ্রেণি পড়ুয়া আইভির সঙ্গে ১৯৫৮ সালের ২৭শে জুন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমানের বিয়ে হলে নামের পরে ‘রহমান’ যুক্ত হয়। এ নামেই তিনি পরিচিতি পান দেশব্যাপী। শুধু আওয়ামী রাজনীতির জন্য নয়, আইভি রহমান বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে পারিবারিকভাবেও জড়িত ছিলেন। তার বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার শাশুড়ি। একমাত্র ছেলে বিসিবি সভাপতি ও সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন, দুই মেয়ে তানিয়া বখ্‌ত ও তনিমা রহমান ময়না এবং তাদের ছেলেমেয়ে ও স্বামী জিল্লুর রহমানকে নিয়ে তার পারিবারিক জীবন ছিল খুবই গোছানো। গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে আইভি রহমানের মৃত্যুর পর তাই বিষাদভরা কণ্ঠে মো. জিল্লুর রহমান জানিয়েছিলেন, ‘আইভিকে ছাড়া আমি জীবন্মৃত।’ ভৈরবের বাড়ির ‘গৃহকোণ’ নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘আইভি ভবন’। এই বাড়িটিতে ভৈরববাসীর সঙ্গে আইভি রহমানের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আইভির অসামপ্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একই সঙ্গে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালে আইভি রহমান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে জাতীয় মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী হন। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সালে কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আইভি রহমান চলে গেছেন বার বছর হলো। কিন্তু ভৈরবে ‘আইভি ভবন’ আছে আগের মতোই। সেখানে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে এসে অশ্রু-পুষ্পে ভৈরববাসী স্মরণ করেন তাদের প্রিয় নেত্রী আইভি রহমানকে। বাংলার এই কৃতী সন্তানের স্মরণে ভৈরবের কমলপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নির্মাণ করা হয়েছে ‘আইভি রহমান গেইট’। চণ্ডিবের গ্রামের নিজ বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। ভৈরব জিল্লুর রহমান সরকারি মহিলা কলেজের একটি ছাত্রীনিবাসের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। আইভি রহমান নিহত হওয়ার পর তার নামে ভৈরবে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিল এলাকাবাসী। কিন্তু সেটি আজও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

Friday, April 17, 2020

অষ্টগ্রামে মাটির নিচ থেকে উঠে আসা কুতুব শাহ মসজিদ! by শাহরিয়ার খান নোবেল

কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলা অষ্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কুতুব শাহ মসজিদের সুখ্যাতি আছে দেশজুড়ে। এর কোনও শিলালিপি অবশিষ্ট নেই। তবে নির্মাণশৈলী অনুযায়ী ষোড়শ শতকের সুলতানি আমলের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হয় এটি। যদিও স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, ঐশ্বরিক মহিমায় মাটির নিচ থেকে উঠে এসেছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা!
কুতুব শাহ মসজিদ
কুতুব শাহ মসজিদের চারকোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ রয়েছে। প্রতিটির ওপর একটি করে মিনার। এছাড়া আছে পাঁচটি গম্বুজ। দেয়ালে চোখে পড়ে সুলতানি আমলের বিভিন্ন কারুকাজ। এর কার্নিশ বক্রাকার। পশ্চিম ছাড়া তিন দিক থেকে মসজিদে প্রবেশ করা যায়। পাশে সমান্তরালে আছে কয়েকটি কবর। এর মধ্যে একটি কুতুব শাহের সমাধি হিসেবে প্রচলিত।
কুতুব শাহ মসজিদ
৯০৯ সালে তৎকালীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর কুতুব শাহ মসজিদকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে নথিভুক্ত করে। বর্তমানে এতে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। এছাড়া অনেকে সুলতানি আমলের এই স্থাপত্যশৈলী দেখতে সমবেত হন।
কুতুব শাহ মসজিদ
এমনই একজন দর্শনার্থী সারোয়ার জাহানের সঙ্গে কথা হলো। তিনি মনে করেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদ দেখতে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে।
সত্যিকার অর্থেই কুতুব মসজিদ দেখতে হলে একটু ঝক্কি পোহাতে হয়। কারণ অষ্টগ্রাম উপজেলায় যাওয়ার একমাত্র উপায় জলপথ। যারা নদী পথে ভ্রমণ উপভোগ করেন তাদের জন্য এটি হতে পারে চমৎকার গন্তব্য। একইসঙ্গে অষ্টগ্রাম হাওর ভ্রমণও হয়ে যাবে।
কুতুব শাহ মসজিদ
কুতুব মসজিদ যেতে হলে ঢাকা থেকে সকালবেলার কিশোরগঞ্জগ্রামী ট্রেনে চেপে কিংবা বাসে চড়ে নামতে হবে কুলিয়ারচর। তারপর লঞ্চঘাট। সেখান থেকে দুপুর ১২টা-১টা নাগাদ মিলে যাবে অষ্টগ্রামগামী দুটি লঞ্চ। একটু সাহসীদের জন্য বিকল্প হিসেবে আছে স্পিডবোট।
কুতুব শাহ মসজিদ
হাওরের সুন্দর হিমেল হাওয়া, স্বচ্ছ জল ও পানকৌড়ি দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যাবে। বিকাল ৩টা নাগাদ লঞ্চ পৌঁছে যাবে অষ্টগ্রাম ঘাটে। এরপর রিকশা কিংবা অটোরিকশায় চড়ে কুতুব শাহ মসজিদ। ফিরে আসার পথ একই। অবশ্য চাইলে আগে থেকে যোগাযোগ করে থাকা যাবে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয়।
>>>লেখক: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

Wednesday, October 16, 2019

কিশোরগঞ্জে ধান ক্ষেতে নবজাতককে ফেলে গেল মা: ময়মনসিংহের রাস্তায় ফুটফুটে নবজাতক

ময়মনসিংহের রাস্তায় নবজাতক
সদ্যজাত শিশুটিকে ফেলে রাখা হয়েছিল একটি ধান ক্ষেতে। কান্না শুনে আশপাশের লোকজন গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। জন্মদাতা বাবা-মায়ের কাছে হয়তো ফেলনা আর অসম্মানের মনে হয়েছিল শিশুটিকে। হয়তো কাজ করছিলো সমাজ আর লোকলজ্জার ভয়! ধান ক্ষেতে ফেলে রেখে যাওয়ার সময় জন্মদাত্রী মায়ের দু’চোখ কি অশ্রুসিক্ত হয়নি। এমন পৈশাচিকতা মানুষই দেখিয়েছিল! তবে রাতের আঁধার ভেদ করে ভোরের রেখা ফুটতেই শিশুটিও পেয়েছে নবজীবনের পরশ। কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার পুরুড়া উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি ধান ক্ষেতে কাঁদছিল শিশুটি। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নবজাতকের কান্না শুনে গ্রামের সুফিয়া খাতুন নামে এক নারী খোঁজেন কান্নার উৎস। পরে তিনি পাশের ধান ক্ষেতে গিয়ে দেখতে পান, সদ্যোজাত ফুটফুটে এক শিশু সেখানে পড়ে রয়েছে।
পরম মমতায় তিনি বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নেন। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে শুরু করে শিশুটির সেবা-শুশ্রুষা। ধান ক্ষেতে নবজাতক পাওয়ার খবরে এলাকাবাসী তার বাড়িতে ভিড় করেন। বাড়িতে নেয়ার পর থেকেই শিশুটি স্নেহ কাড়ে সবার। ঠাঁই পায় এক কোল থেকে আরেক কোলে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সুফিয়া খাতুন ধান ক্ষেতে নবজাতকের কান্নার শব্দ শুনতে পান। তিনি ছুটে গিয়ে মাতৃস্নেহে কোলে তুলে নেন শিশুটিকে। নবজাতক এই ছেলে শিশুটিকে জন্মের পরই মা ফেলে রেখে গেছেন বলে এলাকাবাসী ধারণা করছেন। অনেকেই শিশুটিকে দত্তক নেয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ধান ক্ষেতে পরিত্যক্ত অবস্থায় নবজাতক উদ্ধারের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে শিশুটিকে দুপুরে তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এসে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।
এ ব্যাপারে তাড়াইল থানার ওসি মো. মুজিবুর রহমান জানান, সুফিয়া খাতুনের পরিবারের কাছ থেকে শিশুটির খবর পেয়ে তাঁরা শিশুটিকে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রেখেছেন। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, উদ্ধারের সময় শিশুটির বয়স একদিন বা দেড়দিন হবে। তিনি বলেন, শিশুটির বিষয়ে সমাজসেবা কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বুধবার সমাজসেবার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শিশুটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক কামরুজ্জামান খান কুড়িয়ে পাওয়া এ শিশুটির বিষয়ে তিনি জেনেছেন জানিয়ে বলেন, শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী স্থানীয় শিশু কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কাউকে পরিচর্যার জন্য দেওয়া হবে। বুধবার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে শিশুটিকে স্থায়ীভাবে কাউকে হস্তান্তর বা ছোটমণি নিবাসে পাঠানোর জন্য আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত ফয়সালা হবে।
ময়মনসিংহের রাস্তায় ফুটফুটে নবজাতক
ময়মনসিংহ শহরের একটি সড়ক থেকে একদিন বয়সী ফুটফুটে এক নবজাতক উদ্ধার করেছে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে সিটি করপোরেশনের ১নং ওয়ার্ডের ঢোলাদিয়া সালেহা মার্কেটের জামে মসজিদের পাশ থেকে ‘একদিন বয়সের’ শিশুটিকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মাহমুদুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার  ভোরে স্থানীয়রা শিশুটিকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে থানায় খবর দেয়। পরে পুলিশ গিয়ে ওই নবজাতকটিকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।  নবজাতকটি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে উল্লেখ করে ওসি বলেন,  কে বা কারা নবজাতককে ফেলে গেছে। তাদের খোঁজ খবর  নেয়ার চেষ্টা চলছে। যদি নবজাতকের প্রকৃত অভিভাবক খুঁজে পাওয়া না যায় তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে ময়মনসিংহের ফুলপুরের এক রাস্তা থেকে আরেকটি নবজাতককে উদ্ধার করেছিল পুলিশ।
কিশোরগঞ্জে ধান ক্ষেতে নবজাতক

Sunday, October 6, 2019

শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে কুলিয়ারচরে মণ্ডপে মণ্ডপে প্রাণের উচ্ছ্বাস

ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে আনন্দঘন পরিবেশে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের ছয়টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় এ বছর ৩৩টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন ও বিশ্বব্যাপী অবারিত মঙ্গলধ্বনি বয়ে যাক এমন বার্তা নিয়ে দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে এবার লোকালয়ে আসছেন। দেবী দুর্গার আগমনী বার্তায় আনন্দে মাতোয়ারা ভক্তবৃন্দ। পূজায় কোনো কিছুই যেন কমতি না থাকে এই নিয়ে ব্যস্ত প্রতিটি পূজামণ্ডপ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় এই উৎসবকে ঘিরে এ অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে মহাআনন্দ, সাজ সাজ রব। আলোকসজ্জা গেট, ব্যানার, ফেস্টুন ইত্যাদি বিভিন্ন রং-বেরংয়ের উপাদান দিয়ে সজ্জিত করেছে পূজামণ্ডপের স্থান ও আশেপাশের এলাকা। পূজারি, ভক্তবৃন্দ, শিশু-কিশোররা নতুন বিভিন্ন ডিজাইনের জামা-কাপড় পরিধান করে উৎসবে অংশগ্রহণ করছে। গত বৃহস্পতিবার পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বোধনের মধ্য দিয়ে আসনে স্থাপন হয়েছে দেবীর প্রতিমা।
শুক্রবার ঢাকের তালে ধূপের সুগন্ধে দেবী বন্দনায় ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সর্বজনীন শারদীয় দূর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। যা প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। ষষ্ঠীতে কল্পারম্ভ এবং দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস শেষে মাতৃরূপে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ঠাঁই করে নেন। কৈলাস ছেড়ে মর্ত্যে আসে মা দুর্গা।
মূলত দুর্গাপূজা হয় আশ্বিনের শুক্লাষষ্ঠী থেকে শুরু করে দশমী পর্যন্ত। এ বছর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে উপজেলার পৌর এলাকায় বিশেষ করে কুলিয়ারচর বাজারে এক ধরনের উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এ উপজেলার সকল শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশিল সমাজের সহযোগিতায় ধুমধামের সঙ্গে শারদীয় দুর্গাপূজা পালন করা হচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বী সমপ্রদায়ের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, শিশু-কিশোর নির্বিশেষে সকল স্তরের ভক্তবৃন্দের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে পূজামণ্ডপগুলো।
শারদীয় দুর্গাপূজা পালনে এ বছর উপজেলার পৌর এলাকায় ১১টি, সালুয়া ইউনিয়নে ৯টি, রামদী  ইউনিয়নে ৫টি, ফরিদপুরে ২টি, উছমানপুর ইউনিয়নে ২টি, গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে ১টি ও ছয়সূতী ইউনিয়নে ৩টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পূজা অনুষ্ঠানের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতি মণ্ডপে ৫০০ কেজি করে চাল সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নির্বিঘ্নে পূজাঅর্চনা পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া সার্বক্ষণিকভাবে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন কুলিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ইয়াছির মিয়া, কুলিয়ারচর পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইমতিয়াজ বিন মুছা জিসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউসার আজিজ,  কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল হাই তালুকদার, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি নিশিকান্ত দাস, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনমথ চন্দ্র দাস। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা পূজামণ্ডপগুলো পরিদর্শন করে ভক্তদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন।
এ বছর কুলিয়ারচর পৌর এলাকার কুলিয়ারচর শ্রী শ্রী কালীবাড়ী দাসপাড়া সর্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা, দাসপাড়া শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা বাবু জয়কৃষ্ণ দাস মহাশয়ের বাড়ী, ঘোষপাড়া শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা রামানন্দ ঘোষের বাড়ী, সনাতন যুব সংঘ শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা পূর্বগাইলকাটা ডাকবাংলার সামনে, কুলিয়ারচর বাজার শ্রী শ্রী কালীবাড়ী, ছয়সূতী ইউনিয়নের হাজারিনগর স্বর্গীয় নিবারন ভৌমিক ও স্বর্গীয় সুরেশ ভৌমিক মহাশয়ের বাড়ি, ছয়সূতী দাসপাড়া শ্রী শ্রী দুর্গা মণ্ডপ অমৃত দাসের বাড়িসহ এ বছর গত বছরের চেয়ে ২টি বেশী অর্থাৎ ২টি স্থানে নতুন করে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

Monday, September 30, 2019

নতুন ঘরে সেই ‘মা’

অবশেষে গোয়ালঘর থেকে নতুন ঘরে ঠাঁই পেলেন ৯০ বছরের বৃদ্ধা সমলা খাতুন। মানবিক এক পুলিশ কর্মকর্তার উদ্যোগে পেলেন এক নিরাপদ আশ্রয়। হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলীর উদ্যোগ আর তত্ত্বাবধানে সমলা খাতুনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে পরিপাটি একটি ঘর। শনিবার বিকালে সেই ঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে উঠেন সমলা খাতুন। চার ছেলে ও চার মেয়ের জননী সমলা খাতুন হোসেনপুর উপজেলার সাহেদল গ্রামের নবী হোসেনের স্ত্রী। তার চার মেয়েই স্বামীর সংসারে। স্বামী নবী হোসেন আরেক স্ত্রী গ্রহণ করায় খোঁজ নিতেন না সমলা খাতুনের। তার নামে থাকা দুই শতক জায়গাও লিখে দিয়েছেন ছোট দুই ছেলে হেলাল উদ্দিন ও নিজাম উদ্দিনের নামে।
এরপর থেকে ছেলেরাও আর তার কোন খোঁজ নিত না। স্বামী-সন্তান থেকেও যেন কেউ ছিল না সমলা খাতুনের। অগত্যা পরিত্যক্ত মালামালের মতো তারও ঠাঁই হয় বাড়ির গোয়ালঘরে। গোয়াল ঘরের এক কোণে মাথা গুজে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছিল সমলা খাতুনের।
গত ১৪ই সেপ্টেম্বর একটি অভিযোগের সূত্র ধরে বিষয়টি জানতে পারেন হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী। অভিযোগ দেখে হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী সেই মাকে দেখতে হোসেনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও অফিসার ফোর্সসহ ওইদিন বিকালেই ছুটে যান উপজেলার সাহেদল গ্রামে। তিনি স্থানীয় দুই ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে সমলা খাতুনকে ছোট ছেলে নিজাম উদ্দিনের ঘরে তুলে দেন। সমলা খাতুনের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন দ্বিতীয় ছেলে ইমান উদ্দিনের ব্যবসায়ী ছেলে ওমর ফারুক। এছাড়া চার ছেলে গিয়াস উদ্দিন, ইমান উদ্দিন, হেলাল উদ্দিন ও নিজাম উদ্দিন দশ দিনের মধ্যে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়ার লিখিত অঙ্গীকার করেন। কিন্তু ছেলেদের নতুন ঘর নির্মাণ করা নিয়ে সংশয় থাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী নিজেই পুলিশের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেন এই দুখিনী মায়ের থাকার জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়ার। বিষয়টি জানতে পেরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার)। বৃদ্ধা সমলা খাতুনের জন্য নতুন ঘর নির্মাণে তিনি দেন আর্থিক সহায়তা। হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী এবং ওসি শেখ মো. মোস্তাফিজুর রহমান ছাড়াও সহযোগিতার হাত বাড়ান জেলা পরিষদ সদস্য মাসুদ আলম। সবমিলিয়ে ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সমলা খাতুনের জন্য নির্মাণ করা হয় একটি সুন্দর-পরিপাটি ঘর। শনিবার বিকালে সেই ঘর আনুষ্ঠানিকভাবে সমলা খাতুনকে হস্তান্তর করতে সাহেদল গ্রামে যান হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী এবং ওসি শেখ মো. মোস্তাফিজুর রহমান। সেখানে জেলা পরিষদ সদস্য মাসুদ আলম ও পৌর মেয়র আব্দুল কাইয়ুম খোকনসহ সমলা খাতুনকে নিয়ে তারা ফিতা কেটে ঘরটির উদ্বোধন করেন। পরে সেই ঘরে তুলে দেয়া হয় সমলা খাতুনকে। নতুন ঘরে সমলা খাতুনকে তুলে দেয়ার পর তাকে মিষ্টিমুখ করান হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী। শতবর্ষী স্বামী নবী হোসেন আর চার ছেলের চোখে তখন আনন্দাশ্রু। অভিভূত সমলা খাতুন নিজেও। জীবন সায়াহ্ণে এসে নিজের ঘরে মাথা রেখে মরতে পারবেন, এই ভেবে এক অন্যরকম আভা ঠিকরে পড়ছিল তার চোখে-মুখে।
হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী বলেন, সমলা বিবি’র মতো একজন অসহায় মায়ের মুখে হাসি ফিরেছে এটিই আমাদের পরম পাওয়া। পুলিশের পক্ষ থেকে এই মায়ের জন্য নতুন ঘর তৈরি করে দিতে পেরে আমরা ভীষণ আনন্দিত। ছেলেরাও তাদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত। এখন তারাও তাদের সাধ্যমতো তাদের মা-র পাশে থাকবে বলে অঙ্গীকার করেছেন।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে গত ১৬ই সেপ্টেম্বর দৈনিক মানবজমিন এ সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত এই সংবাদের মাধ্যমে বৃদ্ধা সমলা খাতুনের চরম অসহায়ত্বের কথা জেনে ওইদিন দুপুরেই তার বাড়িতে ছুটে যান হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শেখ মহি উদ্দিন। ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধা সমলা খাতুনের হাতে ইউএনও শেখ মহি উদ্দিন সেদিন তুলে দেন বয়স্ক ভাতার বই ও কিছু নগদ অর্থ। এরপর গত ২৩শে সেপ্টেম্বর সমলা বিবি’র খোঁজখবর নিতে আবারও উপজেলার সাহেদল গ্রামে যান হোসেনপুরের ইউএনও শেখ মহি উদ্দিন। এ সময় ইউএনও শেখ মহি উদ্দিন সাথে নিয়ে যান তার গরবিনী মা তাহেরা খাতুনকে। মা-ছেলে মিলে নেন সমলা খাতুনের ভাল-মন্দের খোঁজখবর। বয়সের ভারে ন্যূজ সমলা খাতুনের চলাফেরার জন্য ইউএনও’র উদ্যোগে তখন দেয়া হয় একটি হুইল চেয়ার।

Friday, September 27, 2019

পাকুন্দিয়ায় ‘ট্রাইকো কম্পোস্ট’ সারে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে by সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেট ব্যবহারে কৃষকদের মধ্যে দিনদিন আগ্রহ বাড়ছে। এ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহারে উপকৃত হচ্ছেন কৃষকরা। ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ব্যবহারে মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, পানির অপচয় রোধ করে। মাটির অম্লত্ব ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করে ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়িয়ে কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়াও ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের সময় যে লিচেট (তরল জাতীয়) সংগ্রহ করা হয় তা বিভিন্ন সবজি ও পান বরজে ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তাই স্বল্প খরচে ও সহজ পদ্ধতিতে উৎপাদিত এ সার ও লিচেট ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম ফেজ-২ প্রজেক্ট (এনএটিপি-২) প্রকল্পের আওতায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ‘ট্রাইকো কম্পোস্ট’ উৎপাদন প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে উৎপাদিত সার জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পেয়েছেন এখানকার কৃষকরা।
ইতিমধ্যেই উপজেলার খামা, আংগিয়াদী ও আদিত্যপাশা গ্রামের বেশ কয়েকজন কৃষক এ প্রযুক্তিতে সার উৎপাদন ও ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের সময় যে লিচেট সংগ্রহ করা হয় তা পান বরজ ও বিভিন্ন সবজি চাষে ব্যবহার করে ভালো ফলন পাচ্ছেন। এতে উপজেলার অন্য কৃষকের মধ্যেও এ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহারে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। টিন বা খড়ের চালাসহ একটি পার্শ্ব ছিদ্র বিশিষ্ট পাকা চৌবাচ্চা অথবা স্যানিটারি রিং দ্বারা বানানো হাউজে ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরি করতে হয়। এতে গোবর-২৮%, মুরগির বিষ্ঠা-৩৬%, সবজির উচ্ছিটাংশ-৫%, কচুরিপানা-২৫%, কাঠের গুঁড়া-৩%, নিমপাতা-১% ও চিটাগুড়-২% এই অনুপাতে মিশ্রণ তৈরি করা হয়। একটন মিশ্রণ পচাতে ৫০০মিলি ট্রাইকো ড্রামা অণুজীব মিশাতে হয়। এতে ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই জৈব পদার্থ পচে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদিত হয় ও লিচেট পাওয়া যায়।
খামা গ্রামের কৃষক নিজাম উদ্দিন বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করি। আমার দুটি চেম্বার হতে প্রথমবার ২০ লিটার লিচেট সংগ্রহ করি। যা জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পেয়েছি। ফলন ভালো হওয়ায় অন্য কৃষকরাও আমার কাছ থেকে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেট কিনে নিয়ে তাদের জমিতে ব্যবহার করছেন।
আংগিয়াদী গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম জানান, পানের বরজে ট্রাইকো লিচেট ব্যবহার করে পানের পচন রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এতে পানের ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। যা বাজারে ভালো দরে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছি।
আংগিয়াদী ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ হামিমুল হক সোহাগ বলেন, ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদনে কৃষক দুইভাবে লাভবান হচ্ছেন। প্রথমত, এ সার জমিতে ব্যবহার করে কৃষকরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। অপরদিকে ট্রাইকো লিচেট ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগবালাই দমনে তা ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে কৃষকদের রোগবালাই দমনে কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল হাসান আলামিন মানবজমিনকে বলেন, এনএটিপি-২ প্রকল্পের আওতায় সিআইজিভুক্ত কৃষকদের ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে। তা থেকে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহার করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। এতে অন্য কৃষকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। তাই ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন ও লিচেট ব্যবহারে কৃষকদের পর্যাপ্ত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

Monday, September 16, 2019

গোয়ালঘরে মা by আশরাফুল ইসলাম

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার শাহেদল বড়বাড়ির অশীতিপর বৃদ্ধা শমলা বিবি। ৪  ছেলে ও ৪ মেয়ের জননী তিনি। ৪ মেয়ে থাকেন স্বামীর সংসারে। ছেলেদের সবাই  মোটামুটি  স্বচ্ছল । রয়েছেন স্বামীও। কিন্তু তিনি আরেক স্ত্রী গ্রহণ করায় খোঁজ  নেন না শমলা বিবির।

৯০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধার নামে দুই শতক জায়গা ছিলো। সেটিও লিখে দিয়েছেন ছোট দুই ছেলে হেলাল উদ্দিন ও নিজাম উদ্দিনের নামে। এরপর থেকে ছেলেরাও আর তার কোন খোঁজ নেন না। স্বামী-সন্তান থেকেও যেন কেউ নেই শমলা বিবির।

শমলা বিবির ছেলেরা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন আর পরিপাটি সুন্দর ঘরে বসবাস করেন। কিন্তু মায়ের স্থান হয়নি তাদের সঙ্গে। অগত্যা পরিত্যক্ত মালামালের মতো তারও ঠাঁই হয়েছে বাড়ির গোয়ালঘরে। গোয়ালঘরের এক কোণে মাথা গুজে খেয়ে, না খেয়ে দিন কাটে তার।

গত দু’বছর ধরে গোয়ালঘরে গরুর পাশাপাশি নোংরা পরিবেশের মধ্যে একটি ভাঙা চৌকিতে শুয়ে দিন পার করছেন এই সর্বংসহা নারী। সেই গোয়ালঘরে জ্বলে না কোন বৈদ্যুতিক বাতি। এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মতোই সেখানে দিন-রাত কাটে তার। গোয়ালঘরের গোমূত্রের গর্ত, আবর্জনা আর নোংরা পরিবেশে মশার অসহনীয় উৎপাতকে সঙ্গী করে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন এই জনমদুঃখী মা।

শমলা বিবির এই অসহায়ত্ব পীড়া দেয় ঢাকা থেকে স্বামীর সঙ্গে বাড়িতে বেড়াতে আসা মেয়ে নূরজাহান বেগমকে। ভাই হেলাল উদ্দিনকে তার বৈদ্যুতিক মিটার থেকে মায়ের থাকার ঘর গোয়ালঘরে বৈদ্যুতিক বাতির সংযোগ দিতে বলেন। কিন্তু মাস শেষে তার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বহন করতে হবে বলে বৈদ্যুতিক বাতির সংযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান হেলাল। মায়ের দুর্ভোগ আর দুর্দশা সইতে না পেরে স্বামী মানিক মিয়াকে হোসেনপুর থানায় অভিযোগ দিতে পাঠান নূরজাহান।

গতকাল শনিবার দুপুরে মানিক মিয়া অভিযোগ নিয়ে হোসেনপুর থানায় গেলে বিষয়টি জানতে পারেন হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী। অভিযোগ শুনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী সেই মাকে দেখতে হোসেনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও অফিসার ফোর্সসহ বিকালেই ছুটে যান উপজেলার শাহেদল বড়বাড়িতে।

হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলীকে শমলা বিবি জানান, দুই বছর ধরে তিনি গোয়ালঘরে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। সারাদিন গোয়ালঘরে, একবারও কেউ তার খোঁজ নিতে আসে না। এই বয়সটাই যেন তার কাছে এক বিরাট অভিশাপ।

এ সময় হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী স্থানীয় দুই ইউপি সদস্যকে ডেকে আনেন। দুই ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে শমলা বিবিকে ছোট ছেলে নিজাম উদ্দিনের ঘরে তুলে দেন তারা। শমলা বিবির ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন দ্বিতীয় ছেলে ইমান উদ্দিনের ব্যবসায়ী ছেলে ওমর ফারুক। এছাড়া ৪ ছেলে গিয়াস উদ্দিন, ইমান উদ্দিন, হেলাল উদ্দিন ও নিজাম উদ্দিন ১০ দিনের মধ্যে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়ার লিখিত অঙ্গীকার করেন।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী বলেন, শমলা বিবির চার ছেলে নতুন ঘর নির্মাণ করার অঙ্গীকার করেছেন। তবে সেই অঙ্গীকার তারা কতটা রাখেন সেটি বলা যাচ্ছে না। এ কারণে পুলিশের পক্ষ থেকে তারা এই দুখিনী মায়ের থাকার জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়া ছাড়াও এই মায়ের থাকার জন্য যাবতীয় জিনিসপত্রের ব্যবস্থাও করে দেবে পুলিশ।

২৫ বছর ধরে শিকলবন্দি রতন

রতন মিয়া। বয়স ৫৫। কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার পাটুয়াভাঙা ইউনিয়নের দক্ষিণ সাটিয়াদী গ্রামের মৃত আবদুল মমিনের ছেলে। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রতন মিয়া তৃতীয়। প্রায় ২৫ বছর ধরে বসত বাড়ির বারান্দার একটি অন্ধকার কক্ষে শিকলবন্দি অবস্থায় রয়েছেন তিনি। ওই অন্ধকার কক্ষটাই তার পৃথিবী। রাতদিন। এ কক্ষেই তার খাওয়া-দাওয়া, প্রশ্রাব-পায়খানা ও ঘুমানোসহ যাবতীয় সবকিছু।

জানা যায়, রতন মিয়া অবিবাহিত। তিনি কোনো পড়াশোনা করেননি। বাড়িতেই কৃষিকাজ করতেন। প্রায় ৩০বছর আগে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। এ কারণে বছর তিনেক পর ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন তিনি। এর কিছুদিন পর থেকেই তাঁকে শিকলবন্দি করে রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে রতন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পূর্বপাশের বসতঘরের বারান্দার একটি ছোট অন্ধকার কক্ষের মাঝখানে একটি পাকা পিলার। পিলারের সঙ্গে রতন মিয়ার ডান পা শিকল দিয়ে বাঁধা। মেঝেতে একটি বিছানায় তিনি দু’হাঁটু ঘেঁরে মাথা নিচু করে বসে আছেন। মাঝে মধ্যে হালকা একটু মুখ নাড়িয়ে কথা বলেন। এ কক্ষেই তার খাওয়া-দাওয়া, প্রশ্রাব-পায়খানা ও ঘুমানোসহ যাবতীয় সবকিছু।

রতন মিয়ার বড় ভাই আঙ্গুর মিয়া বলেন, রতন মিয়া আর দশজন বালকের মতোই সুস্থ ও সবল ছিল। সংসারের কাজকর্ম স্বাভাবিক নিয়মেই করে যেত। কিন্তু প্রায় ৩০বছর আগে তাদের জমিতে পাশের বাড়ির হযরত আলীর একটি গরু ছুটে গিয়ে ধান গাছ খাচ্ছিল। খবর পেয়ে রতন মিয়া ওই গরুটিকে ধরে নিয়ে বাড়ি নিয়ে আসছিল। এসময় হযরত আলী দৌড়ে এসে রতন মিয়ার হাত থেকে গরুটি নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। এসময় দুজনের মধ্যে তর্ক বিতর্ক ও দস্তাদস্তির ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে হযরত আলী গরু বাঁধার একটি খুঁটি দিয়ে রতন মিয়ার মাথার একপাশে সজোরে আঘাত করে। এতে রতন মিয়ার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। পরে স্থানীয়ভাবে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছুদিন পর রতন মিয়া অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি হাসপাতালে নিয়ে কয়েক দফা চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

চিকিৎসক বলেছেন, রতন মিয়া কোনদিনই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে না। পরে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়।

আঙ্গুর মিয়া আরও বলেন, বাড়িতে আনার পর তাঁর অস্বাভাবিক আচরন বাড়তে থাকে। বাড়ির বাইরে গেলেই লোকজনের ওপর চড়াও হয় এবং লোকজনকে মারতে শুরু করে। তাই তাঁকে বাধ্য হয়ে বাড়িতে শিকলবন্দি করে রাখা হয়েছে। তবে তাঁর সেবাযত্নে কোন কমতি নেই।

হযরত আলীর বিষয়ে জানতে চাইলে আঙ্গুর মিয়া বলেন, বিষয়টি তখন গ্রামীণ দরবার শালিসের মাধ্যমে মিমাংসা হয়ে যায়।

তবে ঢাকার কোন হাসপাতাল এবং কোন চিকিৎসকের অধীনে রতন মিয়ার চিকিৎসা করিয়েছিলেন সে ব্যাপারে সঠিক কোন তথ্য দিতে পারেননি বড় ভাই আঙ্গুর মিয়া।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো.রুহুল আমীন বলেন, মানসিক ভারসাম্যহীনদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোন ব্যবস্থা নেই। তবে রতন মিয়ার যদি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড না থাকে তাহলে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা করে দিতে পারব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.নাহিদ হাসান বলেন, বিষয়টি আমি সাংবাদিকদের মাধ্যমে অবগত হয়েছি। খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টি দেখা হবে।

Monday, September 9, 2019

শতবর্ষী আয়েশার ভাগ্যে জুটেনি ভাতার কার্ড

সহায় সম্বলহীন শতবর্ষী বৃদ্ধ আয়েশা খাতুন। নিজস্ব জমি নেই, ভিটে নেই। নেই কোনো আয়ের উৎস্য। নেই বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাহায্য সহযোগিতায় কোনোদিন একবেলা ভাত জোটে তো অন্যবেলা নেই। প্রতিবন্ধী দুই ছেলে আর স্বামী পরিত্যক্তা এক মেয়েকে নিয়ে বয়সে ন্যুব্জ আয়েশা খাতুন থাকেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের বানিপাট্টা গ্রামে ভাইপুত্র চান মিয়ার বাড়িতে। এত কষ্টের পরেও একটি ভিজিডি বা বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড না পাওয়ায় তার বড় মেয়ে জাহানারা আক্ষেপ করে বলেন, “আর কত বয়স হলে বয়স্ক ভাতার কার্ড পাবেন আমার মা”।
কষ্টে ভরা আয়েশার জীবনের গল্প। জানা যায়, ১৯৪২ সালে ১২ বছর বয়সে আয়েশার বিয়ে হয় একই উপজেলার পার্শ্ববর্তী ডিক্রিরচর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান খুরশিদ উদ্দিনের সঙ্গে। বিয়ের পর আয়েশার ঘরে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। মেয়ে জাহানারা ও হেনা সুস্থ থাকলেও ছেলে মমিন ও আমিন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ১৯৬০ সালে স্বামী খুরশিদ এক দুর্ঘটনায় মারা যান। ১৯৬২ সালে দেবর সুরুজ মিয়ার পরামর্শে উন্নত জীবন গড়ার আশায় স্বামীর রেখে যাওয়া সহায় সম্বলটুকু বিক্রি করে ডিক্রিরচর গ্রাম থেকে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে দেবরের সঙ্গে রংপুরে পাড়ি জমান। সেখানে গিয়ে রংপুরে জাহানারা ও হেনার বিয়ে হয়। বছর দুয়েক পর ছোট মেয়ে হেনা দুরারোগ্য রোগে মারা যায় এবং জাহানারা খাতুনকে স্বামী ছেড়ে চলে যান। জাহানারা ফিরে আসেন মায়ের কাছে। রংপুরেও আয়েশার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সহায় সম্বলহীন হয়ে ১৯৬৮ সালে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ফের চলে আসেন পৈতৃক ভিটা বানিপাট্টা গ্রামে। সেখানে বর্তমান আশ্রয়দাতা ভাইপুত্র চান মিয়ার ভিটায় একচালা টিনের একটি ভাঙ্গাচুড়া জীর্ণ ঘরে বাস করেন। সে ঘরেই আয়েশা বর্তমানে বড় মেয়ে জাহানারাকে নিয়ে বাস করছেন। দুই ছেলে প্রতিবন্ধী হওয়ায় বাহাদিয়া গ্রামে ফুফুর বাড়িতে থাকেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আয়েশা স্পষ্ট ভাষায় কোনো কথা বলতে পারেন না।
মেয়ে জাহানারা খাতুন জানান, মাকে নিয়ে জাহানারা খুবই কষ্টে আছেন। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী দুই ভাই ফুফুর বাড়িতে থেকে খাবারের বিনিময়ে কাজ করে। তাই ফুফুর বাড়িতে তারা থাকেন। নির্দিষ্ট আয় না থাকায় আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাহায্য সহযোগিতায় কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের। শতবর্ষী মায়েরও কোনো বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার কার্ড নেই। জাহানারারও কোনো বিধবা ভাতার কার্ড নেই। একটি ভাতার কার্ডের জন্য মেম্বার ও চেয়ারম্যানের পিছনে অনেক ঘুরেছেন জাহানারা। দেই দিচ্ছি করে এখনো কোনো কার্ডের ব্যবস্থা করে দেননি বলে জানান। সুখিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য উজ্জ্বল মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। সুখিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আঃ হামিদ টিটুর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বৃদ্ধ আয়েশা ও মেয়ে জাহানারার কাছে বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড করার জন্য কয়েকবার গিয়েছি। তাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র চেয়েছি। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র না দেয়ায় আমি তাদের ভাতার কার্ড করে দিতে পারছি না।