Monday, June 16, 2014

বিচারিক আদেশের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন- র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানা র্যাবের বিরুদ্ধে মামলা নিতে অস্বীকার করায় শাহীনুর আলমের পরিবার এখন উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর আগে তারা নিম্ন আদালতের দ্বারস্থ হলেও প্রতিকার পায়নি৷ র্যাবের বিরুদ্ধে একটি মামলা গ্রহণ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিচারিক হাকিম, মুখ্য বিচারিক হাকিম এবং জেলা ও দায়রা জজের তিনটি পৃথক আদেশের যথার্থতা নিয়ে যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।
পত্রিকান্তরে র্যাবের কতিপয় সদস্যের দ্বারা শাহীনুর আলমকে সাদাপোশাকে গ্রেপ্তার ও পরে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর বিবরণ ছাপা হয়েছে। নিহত ব্যক্তির পরিবারের দাবি, ৪৩ বছর বয়সী শাহীনুর অজাতশত্রু ছিলেন। তবে তাঁকে গ্রেপ্তার থেকে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় র্যাবের কতিপয় সদস্যের আচরণ অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে। কিন্তু র্যাব নীরব। আর আদালতে প্রতিকারের সুযোগ সৃষ্টি না হতেই তা বাধার মুখে পড়ল। এতে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ল না।
শাহীনুরের ভাই বাদী হয়ে নবীনগর থানায় সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। অথচ মামলা নেওয়ার ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রে যেমনটি অনুমান করা যায়, ঠিক তেমনটিও এ ক্ষেত্রে ঘটে থাকতে পারে। অর্থাৎ পুলিশ র্যাবের বিরুদ্ধে এজাহার নিতে চায়নি। আর সে কারণে শাহীনুরের সংক্ষুব্ধ পরিবার অধস্তন আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল। আদালত-ব্যবস্থার কোনো স্তরের মধ্যেই বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের প্রশ্নে কোনো ধরনের জ্যেষ্ঠতার নীতি নেই। তাই সকল পর্যায়ের বিচারক নিজ নিজ এখতিয়ারের মধ্যে স্বাধীন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আমলি আদালতের বিচারিক হাকিম নবীনগরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আলোচ্য মামলা গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর এটা যথাযথ এবং আইনানুগ ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু এই আদেশ আরও দুটি আদেশের জন্ম দিল। সেটাই দুঃখের বিষয়। কারণ এর দরকার ছিল না, একে যথাযথও বলা যাবে না।
বিচারিক হাকিম কথিতমতে ওই ‘হত্যাকাণ্ডের’ ঘটনায় নবীনগর থানাকে মামলা নিয়ে তদন্ত করতে ৪ জুন আদেশ দেন। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট হাকিমের আমলি ক্ষমতা প্রত্যাহার করার আদেশ দিয়েছেন মুখ্য বিচারিক হাকিম। এটা আইনের চোখে অসংগতিপূর্ণ ও এখতিয়ারবহির্ভূত। তদন্ত না করে কথিত হত্যা মামলার এজাহারই নেওয়া যাবে না, এমন আদেশ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ন্যায়পরায়ণতার ধারণাকে পর্যুদস্ত করে। উপরন্তু র্যাব-১৪-এর পক্ষে ৫ জুন ওই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন চাওয়ার পরে জেলা ও দায়রা জজ সেটা সংশোধন করে এই মামলার তৃতীয় আদেশটি দিয়েছেন। এতে এখন ‘তদন্ত সাপেক্ষেÿ র্যাবের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণের’ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত কতটা কী হবে, সে বিষয়ে জনমনে সংশয় দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়৷ এই প্রেক্ষাপটে বাদীপক্ষ যে প্রতিকারের আশায় উচ্চ আদালতে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেই খবর আমাদের আশ্বস্ত করে৷ কেননা ন্যায়বিচারপ্রার্থী মানুষের উচ্চ আদালতই শেষ ভরসা৷

বিহারি ক্যাম্প কালশী বস্তি: আমাদের জীবন, তোমাদের জীবন by ফারুক ওয়াসিফ

ওরা এখন কী করবে? ওদের ১০ জন মানুষ নিহত হয়েছে৷ জীবিতদের অনেককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে৷ বাকিরা পুলিশ-সাংবাদিক সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করছে, তারা পরিস্থিতির শিকার৷ এক প্রৌঢ় নারী পুলিশের কানে ঢোকাতে চাইছেন মানবতার সবচেয়ে পুরোনো বাণী, ‘আমাদের শরীরে যে রক্ত আপনাদের শরীরেও তো সেই রক্ত!’ প্রিজন ভ্যানে আটক আরিফ নামের এক যুবক লোহার শিকের খুপরির পেছন থেকে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘আমি কিছু করি নাই, বাচ্চারে খুঁজতে আসছিলাম ভাই৷’ এক সাংবাদিক মুখ খিঁচিয়ে জবাব দিলেন, ‘বাচ্চারে খুঁজতে আসছ, নাকি পাকিস্তান থাইক্যা আসছ?’ এসব পোড়া ও রক্তাক্ত লাশ, পোড়ানো ঘর, ভাঙা দোকানপাট আর বৈরী বাঙালিদের বিদ্বেষ আর রাষ্ট্রের পুলিশের টিয়ার-গুলির সামনে তারা কী করবে? কালশীর মানুষেরা যদি প্রতিরোধ না করত, তাহলে হয়তো পুরো বস্তিটাই আগুনে ছাই হতো৷ উচ্ছেদ–আক্রমণ প্রতিরোধ করলে তারা হয় সন্ত্রাসী, না করলে পুড়ে মরে, তাহলে তারা কী করবে?
কেবলার চর থেকে কালশী বস্তি
১০ জনের সাতজন পুড়ে কয়লা হয়েছে৷ এরা বেঁচে থাকা ইয়াসিনের স্ত্রী বেবী (৪০), তিন মেয়ে শাহানা (২৬), আফসানা (১৯) ও রোকসানা (১৬), যমজ দুই ছেলে লালু (১৪) ও ভুলু (১৪) এবং মেয়ে শাহানার ছেলে মারুফ (২)। এরা আগুনে পুড়ে মারা গেছে নিজ ঘরে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেওয়া অবস্থায়৷ এই নারী ও শিশুরা কেউই কোনো গোলমালে ছিল না৷ যে বহিরাগত যুবকেরা পেট্রল ঢেলে আগুন লাগায়, তারা ছিল অপ্রতিরোধ্য৷ পুলিশি পাহারায় এ কাজ হয়েছে বলে ক্যাম্পবাসীদের অভিযোগ৷ যত বড় আগুনই হোক, পোড়াতে তো সময় লাগে৷ তাহলে আগুন লাগানো থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তারা কেন কেউ বেরতে পারল না? শত শত প্রতিবেশীই বা কেন তাদের বাঁচাতে ব্যর্থ হলো? ইয়াসিন বলেছেন, খবর পেয়ে দৌড়ে এসে তিনি দেখেন দাউদাউ জ্বলা ঘরটায় বাইরে থেকে তালা দেওয়া৷ পুলিশের লাঠি-টিয়ার-গুলির কারণে কারও সাধ্য ছিল না হতভাগ্যদের ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ আর্তনাদে সাড়া দেওয়ার৷ কালশীর বিহারি ক্যাম্পের আরিফ, আসিফ, সুমনসহ যতজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, সবারই অভিযোগ একটাই: এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড৷ দুই বছর আগে রাজধানীর আমিনবাজারের কেবলার চরে নিহত ছয় ছাত্রের দুজনকে হত্যা করা হয়েছিল পুলিশের উপস্থিতিতেই৷ সেটাও ছিল এ রকমই এক শবে বরাতের পবিত্র রাত৷ এবারের শবে বরাতের রাত শেষের ভোরে কালশীতে যখন হত্যা-আগুন-ভাঙচুর চলে, তখনো পুলিশ ছিল জীবনের বিপক্ষে৷ নৈরাজ্যের দেশের আনাচকানাচে এভাবে কত কত গণমৃত্যুর কেবলার চর জেগে উঠছে, তার খোঁজ কি সরকার রাখে?

মহাসড়ক বনাম দুটি পোড়া ঘর
পোড়া দুটি ঘরই মহাসড়কের পাশে৷ ফলে বলা যাবে না গোলমালের মধ্যে বস্তির অলিগলি পেরিয়ে আগুন নেভাতে যাওয়া সম্ভব হয়নি৷ আর একে যদি আতশবাজির ‘উৎপাত’ থামাতে কারও ক্রোধের প্রকাশ বলা হয়, তাহলে দোকানপাটে লুটপাট-ভাঙচুর করা হলো কেন? আর পুলিশই বা কেমন পুলিশ, তাদের গুলি-টিয়ার আর ধরপাকড়ে কেবল বিহারিরাই পড়ল, হামলাকারী বহিরাগতদের কাউকে তারা আটকাতে পারল না?
ভোর ছয়টায় যারা মাস্তানদের আক্রমণ রুখে দাঁড়িয়েছিল ইটপাটকেল হাতে, বেলা ১১টা-দুপুর ১২টা নাগাদ তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে৷ পুলিশ যাকে–তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে৷ ওদিকে নয়জনের লাশ রাখা হয়েছে বিহারি ক্যাম্পের ভেতরের আটকে পড়া পাকিস্তানিদের কার্যালয়ে। শত শত মানুষ ঘরটা ঘিরে রেখেছে৷ মাইকে একজন চিৎকার করে বাংলা আর উর্দুতে বলছে, ‘আলোচনা চলছে, আপনারা বিশৃঙ্খল হবেন না৷’ কথা শুনে মনে হলো, কী করা উচিত, কী করতে হবে, কী করা সম্ভব তার কিছুই তারা বুঝতে পারছে না৷ শুধু দুটি দাবি তাদের: আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দিতে হবে আর হত্যার বিচার করতে হবে৷
ওদিকে পুলিশ আইন মোতাবেক অপঘাতে নিহত ব্যক্তিদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যেতে চায়৷ কিন্তু লোকজন কোনোভাবেই লাশ দেবে না৷ এরই মধ্যে মহিলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক বিহারিদের লাশ দিতে রাজি করাতে এসেছেন৷ অবশেষে ঢাকার জেলা প্রশাসকের মধ্যস্থতায় লাশ হস্তান্তরিত হয়৷ প্রশ্ন জাগে, এলাকার নির্বাচিত সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ কেন আসেননি?

বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার ও একজন সাংসদ
ঘটনার শুরু তিন দিন আগে৷ কালশী ক্যাম্পের মধ্যে দিয়ে নতুন রাস্তা করতে গিয়ে অনেকে উচ্ছেদ হয়৷ তাদের জায়গা দেওয়া হয় একটু দূরের পাকা বস্তিতে৷ সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না৷ দিন তিনেক আগে এলাকার সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ কালশীতে গিয়ে বলেন ওই বস্তিতে বিদ্যুৎ দিতে হবে৷ কিন্তু কালশীবাসীর ভয়, তাঁদের ৪১২ পরিবারের জন্য একটি মাত্র ট্রান্সফরমার এত চাপ নিতে পারবে না৷ তাই তঁারা সাংসদকে বলেন, ট্রান্সফরমার ঠিক রাখার দায়িত্ব তিনি নিলে তাঁরা নতুন বিদ্যুৎ-সংযোগ নিতে দেবেন৷ ওয়াসা তাঁদের পানি দেয় না, তিতাস তাঁদের গ্যাস দেয় না৷ এই বিদ্যুৎটুকুই তাঁরা সরকারের কাছ থেকে পান৷ সেটুকু তাঁরা হারাতে চান না৷ এদিকে রহস্যময় কিছু লোক তাঁদের বুঝিয়েছেন, বিদ্যুৎ নিয়ে আপসহীন থাকলে কালশী বস্তিরই লাভ৷ এ নিয়ে বাদ-বিবাদের মধ্যে সাংসদ এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়েন, বকাবাদ্যও শুনতে হয় তাঁকে৷ ক্যাম্পবাসীদের অভিযোগ, সাংসদের লোকজন এ জন্যই আতশবাজির অছিলায় তাঁদের ওপর হামলা চালায়৷ এ ঘটনায় স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির প্রধান আবদুর জব্বার খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্যাম্প থেকে আটকে পড়া বিহারিদের উচ্ছেদের জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এ ঘটনা আজই প্রথম নয়। আগেও এ ধরনের ঘটনা ছোট ছোটভাবে ঘটেছে।’ সুতরাং একদিকে পটকা ফোটানো নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের গল্প, অন্যদিকে জমির প্লট, বিদ্যুতের টানাটানি, আগ্রাসী নগরায়ণের মুখে বস্তি উচ্ছেদের পরিকল্পনার গল্প; কোনটা বিশ্বাস করব?

সমাজ যখন মাইনফিল্ড
দেশে এখন নতুন খলনায়ক গজিয়েছে৷ তাদের নাম ‘দুর্বৃত্ত’৷ বেশির ভাগ সময় সেই দুর্বৃত্তদের গোড়াটা আমরা ধরতে পারি না৷ নারায়ণগঞ্জে বিপথগামী একদল র৵াব কর্মকর্তার নামে ‘দুর্বৃত্ত’দের পরিচয় ফাঁস হওয়া বিরল ঘটনা৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তদের নাম–ধাম জানা যায় না৷ এখানে-সেখানে কেবল আমরা ‘দুর্বৃত্ত’দের কার্যকলাপের কথা শুনতে পাই৷ কিন্তু তাদের পরিচয়, তাদের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা ধরতে পাির না৷ একটি দেশে যদি জমি, ক্ষমতা ও বিত্তের ‘আগ্রাসন’ চলতে থাকে, যদি আইনের হাত দুর্বলকে পরিত্যাগ করে, যদি রাজনৈতিক নেতারা সম্পদ অর্জনের জন্য যেকোনো কিছু করতে রাজি থাকেন, মাফিয়াতন্ত্র যদি রাজনৈতিক দস্যুতন্ত্র চালু করে প্রশাসন ও আইনকে কবজা করে; তখনই দেশটা হয়ে ওঠে যুদ্ধের মাইনফিল্ডের মতো৷ তখন কারও না কারও পা সেসব মাইনের ওপর পড়বে আর আচমকা বিস্ফোরণে অনেকের প্রাণ যাবে৷ এটা ঘটছে এবং ঘটবে কিন্তু প্রতিকারের আশা থাকবে না এ কেমন দেশ!

উন্নয়নের সোনালি গল্প আর কিছু পতঙ্গ
যখন ফিরছি তখন দুপুর৷ পল্লবী পার হলে কালশী৷ এদিকে বনানী-গুলশান-সেনানিবাস৷ জলাভূমি ভরাট হয়ে বিলাসী ভবন-আবাসন তৈরি হচ্ছে৷ ফ্লাইওভার হওয়ার পর শৌখিন খাবারের দোকান, শপিং মল ইত্যাদি জমে উঠছে৷ চারদিকে উন্নয়নের দাপটের মধ্যে এক ছোট্ট দ্বীপের মতো বিহারিদের বস্তি৷ চোখ বন্ধ করে বলা যায়, এরকম বস্তি কিছুতেই টিকতে পারবে না৷ তারা গরিবদের মধ্যে গরিবতর, তারা বস্তিবাসীদের মধ্যেও দুর্বলতর, তারা দুর্বল অবাঙালি বিহারি, তাদের ওপর একাত্তর-পূর্ব পাকিস্তানি শাসকদের অভিশাপ৷ তাদের জীবন পতঙ্গের জীবন, ভাসমান, উড়ন্ত এবং খরচযোগ্য৷
কিন্তু আইনের স্বার্থে, সত্যের খাতিরে, মানবিকতার প্রয়োজনে সত্য প্রকাশ ও ন্যায়বিচার তবু প্রয়োজন৷ কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, কারা ঘটিয়েছে—এটা যদি আমরা না জানতে পারি, তাহলে আরও অনেক ‘দুর্বৃত্তের’ বেপরোয়া আক্রমণের বিরুদ্ধে আসলেই কি কিছু করার থাকবে আমাদের?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

বাংলাদেশে উর্দূভাষী : কতটা মিশতে পারছে মূলস্রোতে by ফারহানা পারভীন

ঢাকার মিরপুরে উর্দুভাষী ও স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে ১০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় আজ ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাকে ঘিরে ক্যাম্পের ভেতরে থাকা লোকজন এবং স্থানীয়দের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। রবিবার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে বিহারী নামে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী বিক্ষোভ করেছেন হতাহতের প্রতিবাদ জানিয়ে।
সম্পর্কিত বিষয়

বাংলাদেশ
বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাম্পে চার দশকের বেশি সময় ধরে বাস করা এসব উর্দুভাষীদের সাথে ও স্থানীয় বাঙ্গালীদের মধ্যেকার সম্পর্ক কোন পর্যায়ে রয়েছে?

ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার জন্ম খালেদ হোসেনের। জন্মসূত্রেই বাংলাদেশের নাগরিক মি. হোসেন পড়াশোনা শেষে এখন আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন।

তিনি বলছিলেন উর্দুভাষী হিসেবে জেনেভা ক্যাম্পে জন্ম নেওয়াই তাকে এই পর্যন্ত আসতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবে সেসব প্রশাসনিক জটিলতা।

ক্যাম্পে বা ক্যাম্পের বাইরে বসবাসের সময় স্থানীয় বাঙ্গালীদের সাথে সম্পর্কের তেমন কোন টানাপোড়েনের মধ্যে তিনি পড়েননি।

মি: হোসেন বলেন, জন্মের পরেই দেখলাম আমি জেনেভা ক্যাম্পে, বাবা-মা আটকে পরা পাকিস্তানী। আমি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলাম, গ্রাজুয়েশন করলাম এখন ল প্রাকটিস করছি। অনেক ডিসক্রিমিনেশনের শিকার হতে হয়েছে। তবে কিছু ভাল মানুষ অবশ্যই ছিল যাদের অনেক সাহায্য পেয়েছি।

ঢাকায় যে কয়টি ক্যাম্প রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম মিরপুরের কালসির বিহারী ক্যাম্প। দীর্ঘদিন ধরে এর পাশেই বাস করছেন মেহেরুন্নিসা হক।

তিনি বলছিলেন ১৯৭৩ সালে যখন তারা এখানে থাকা শুরু করেন তখন কিছুটা অস্বস্তি কাজ করলেও সময়ের আবর্তে তাদের সম্পর্ক একে অপরের কাছে খুব ভাল প্রতিবেশী হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে।

মিসেস হক বলছিলেন,১৯৭৩ সালে যখন থাকতে আসি তখন সম্পর্ক খুব ভাল না থাকলেও খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু এখন অনেক ভাল। আমাদের বাজার এক, আমরা একই কলের পানি খায়। কখনো আলাদা কিছু মনে হয়নি।

বাংলাদেশের এসব উর্দুভাষী যারা বিহারী নামেই বেশি পরিচিত তাদের জন্য সারা দেশে ১১৬ টি ক্যাম্প রয়েছে। ক্যাম্পের ভিতরে ও বাইরে আনুমানিক ছয় লাখের মত উর্দুভাষী এসব মানুষ বাস করছেন।

বাংলাদেশে গত চার দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করছে এসব উর্দুভাষী মানুষ- যাদের কেও কেও নিজেদের নিজেদের আটকে পড়া পাকিস্তানী হিসেবে পরিচয় দেন।
এদের বেশির ভাগেরই জন্ম বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। এসব উর্দুভাষী মানুষ বাংলাদেশের মূল সমাজের সাথে তারা কতটা মিশতে পেরেছেন?

উর্দুভাষীদের সংগঠন উর্দু স্পিকিং পিউপিলস ইয়ুথ রিহেবিলিটেশন মুভমেন্টের সভাপতি সাদাকাত খান বলছিলেন স্থানীয় বাঙ্গালিদের সাথে তাদের সম্পর্ক ভাল।

তবে ১৯৯৫ সালের তাদের ক্যাম্পের জমির ওপর স্থানীয় বাঙালিদের জন্য তৎকালীন সরকারের দেওয়া প্লট বরাদ্দের কারণেই তার ভাষায় বহিরাগতদের সাথে তাদের এই সমস্যাগুলোর সূত্রপাত হয়।

মি: খানের বর্ণনায়,আমাদের বাড়িঘর যেখানে ছিল সেখানে সরকার ক্যাম্প করে। কিন্তু ১৯৯৫ সালে এই জমির ওপর স্থানীয় বাঙ্গীদের প্লট অ্যালোটমেন্ট দেওয়া হয়।

তারপর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলার লোকজন এসে এখানে স্থানীয় মাস্তানদের ভাড়া করে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এ অবস্থা দূর করার জন্য সরকারকে জমি সংক্রান্ত ঝামেলা দূর করতে হবে।২০০৩ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে উর্দুভাষী এ জনগোষ্ঠীর ভোটার তালিকায় নাম নিবন্ধন করা হয়। ক্যাম্প ও ক্যাম্পের বাইরে অনেকেই রয়েছেন যারা পড়াশোনা শেষে কর্মজীবন শুরু করেছেন মিশে গেছেন সমাজের মুল স্রোতে। তবে জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে মূলত স্থানীয়দের সাথে তাদের এই সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে বলে মনে করেছেন উর্দুভাষী এই জনগোষ্ঠী।
সুত্র- বিবিসি

এমপি ইলিয়াস মোল্লাকে অপমানের জেরে বিহারি ক্যাম্পে আগুন!

কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে আগুনের ঘটনার তিন দিন আগে অপমানিত হয়েছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা। সবাইকে দেখে নেবে- এই মর্মে হুমকি দিয়ে ক্যাম্প ত্যাগ করেছিলেন এমপি। ওই ঘটনার বদলা নিতেই শনিবার ভোরে আতশবাজির ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে রাজু বস্তি এবং স্থানীয় যুবলীগ নেতারা আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তায় কুর্মিটোলা ক্যাম্পে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ে সৃষ্ট রাজু বস্তিবাসীর ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছেন স্থানীয় এমপি ও তার ক্যাডাররা। এছাড়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আছে ক্যাম্পের জমি দখলের ষড়যন্ত্রও।
এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পবাসী। আগুন ও নিহতের ঘটনায় স্থানীয় এমপির জড়িত থাকার অভিযোগ এনে রোববার ক্ষুব্ধ ক্যাম্পবাসী তার কুশপুত্তলিকা দাহ করে। পাশাপাশি এমপির ফাঁসি দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দেন বিহারিরা। এদিকে ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় এমপি ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করায় তার দিকে সন্দেহের তীর আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিহারিদের নেতা মোস্তাক আহমেদ অভিযোগ করেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও মাস্তানরা বিহারিদের জমি দখলের পাঁয়তারা করছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের পল্লবী জোনের পুলিশ কর্মকর্তা এসি কামাল অতি উৎসাহী হয়ে কাজ করেছেন। তার বিরুদ্ধে দখল অপরাধী চক্রকে শেল্টার দেয়ার অভিযোগ করেছেন আরও অনেকে। তবে এ অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন এসি কামাল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এমপিকে যে রাতে অপমান করা হয়, ওই রাতের পরদিন রাজু বস্তির নেতা মোঃ নিয়াজ বাদী হয়ে ২০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। বৃহস্পতিবার এ মামলা দায়েরের পর শুক্রবার বিকালে পুলিশ গিয়ে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সতর্ক করে। এ সময় পুলিশ জানায়, ‘রাজু বস্তির বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ নিয়ে কেউ বাড়াবাড়ি করলে তার খবর আছে। এমপি সাহেবের নির্দেশে এখানে তারা এসেছেন বলেও পুলিশ জানায় বাসিন্দাদের।’
বিহারি ক্যাম্পের রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন ভল্টু বলেন, এ ঘটনার পেছনে ইলিয়াস আলী মোল্লা ও তার লোকজন জড়িত। তিনি প্রতিশোধের বদলা নিতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। এতে তার সন্ত্রাসী বাহিনী ও যুবলীগের কতিপয় নেতা জড়িত রয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসবে। ভল্টু বলেন, রাজু বস্তির বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ দেয়ার জন্য এমপি আমাকে ডেকেছিলেন। আমি মিটিংয়ের কারণে যেতে পারিনি। এর জন্য আমাকেসহ ২০ জনকে মামলায় ফাঁসানো হয়।
ক্যাম্পের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, রাজু বস্তিতে বিদ্যুৎ লাইন ছিল না। তাই স্থানীয় যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা ও রাজু বস্তির লোকজন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার প্রভাব খাটিয়ে পাশের মূল বিহারি ক্যাম্প থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ লাইনের সংযোগ নেয়। চাঞ্চল্যকর তথ্য হল, রাজু ক্যাম্পের লোকেরা বিদ্যুৎ সুবিধে নিলেও বিহারি ক্যাম্প থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার কারণে তাদের বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে হতো না। কিন্তু এমপির লোকজন রাজুর বস্তির প্রতিটি বাড়ি থেকে বিদ্যুৎ বিলের টাকা নিত। এ টাকা অনেকের মাঝে ভাগ-ভাটোয়ারা হতো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইলিয়াস মোল্লার ক্যাডার বাহিনীর অন্যতম ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা এ রাজু বস্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে অবৈধভাবে টাকা উত্তোলন করে। এ নিয়ে বিহারি নেতাদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা বিদ্যুৎ কোনোভাবেই রাজু বস্তিতে দেবে না বলে কঠোর অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে তারা রাজু বস্তিতে দেয়া বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে এমপির লোকজন কুর্মিটোলা ক্যাম্পের বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করে। এ ঘটনায় রাস্তায় নেমে পড়েন ক্যাম্পের লোকেরা। শনিবারের অগ্নিসংযোগের ঘটনার তিন দিন আগে বিহারিরা বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দাবি করে। সেই দিন পুলিশের কাছে খবর পেয়ে এমপি ইলিয়াস আলী মোল্লা সেখানে গেলে তার সঙ্গে অনেকের তর্কাতর্কি হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে গভীর রাত পর্যন্ত এমপি সেখানে অবস্থান করেন। পরিস্থিতি প্রতিকূল হওয়ায় ক্যাম্পবাসীকে দেখে নেয়া হবে- এই মর্মে হুমকি দিয়ে চলে আসেন। এরই জের হিসেবে শনিবার ভোরে কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে আগুন লাগানো হয় বলে ক্যাম্পবাসীর অভিযোগ।
বিহারি ক্যাম্পের মুন্না হোসেন অভিযোগ করেন, অগ্নিকাণ্ডের তিন দিন আগে রাতে এমপি ইলিয়াস আলী মোল্লা ক্যাম্পের সামনে হাজির হন। তিনি সেখানে এলাকার লোকদের উদ্দেশে বলেন, ‘রাজু বস্তিতে বিদ্যুৎ লাইন থাকবে। এ লাইন বৈধ না অবৈধ এবং কোথা থেকে এসেছে এটি দেখার দরকার নেই। তিনি আরও বলেন, কে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দিলেন সেটিও বিবেচনায় আনার দরকার নেই। শেখ হাসিনার সরকার জনগণের সরকার। তাই জনগণের জন্য যেটি মঙ্গল হবে সেটিই করা হবে।’ ওই সময় লোকজন বলাবলি করে রাজু বস্তি থেকে আপনার নেতারা বিদ্যুতের বিল তুলছে এ বিষয়ে ইলিয়াস মোল্লা কোনো ধরনের কর্নপাত করেননি। এমপির বক্তব্যের পর ক্যাম্পের লোকজনের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মুন্না আরও দাবি করেন, ওই রাতে বিক্ষুব্ধ লোকজন ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার পাঞ্জাবির কলার ছিঁড়ে ফেলে। ধাক্কাধাক্কিতে ইলিয়াস মোল্লা পড়ে যান।
এ ঘটনার পর রাজু বস্তির বাসিন্দা মাদক ব্যবসায়ী মোঃ রিয়াজ বাদী হয়ে বিহারি ক্যাম্পের লোকজনের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৫। এ মামলায় কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের সভাপতি জালাল উদ্দীন আহমেদ ভল্টু ও সেক্রেটারি মোঃ ফিরোজসহ ২০ জনকে আসামি করা হয়। জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এ বিষয়ে যুগান্তরকে জানান, তিনি ভল্টুকে ডেকে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করেন। কিন্তু সে ঘটনাস্থলে আসেন না। পরে তিনি সেখান থেকে চলে যান। তিনি দাবি করেন, ‘আমি রাজনীতি না করলেও এ ধরনের পচা নির্দেশ দিই না। তদন্ত করে দেখা হোক আমার লোক জড়িত থাকলে তাদের আইনের আওতায় নেয়া হোক।’
বিহারিদের নেতা স্ট্রান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির (এসপিজেআরসি) কুর্মিটোলা ক্যাম্পের সভাপতি নিজামুদ্দিন বলেন, বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে একই পরিবারের ৯ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ গুলি করে মেরেছে একজনকে। তাদের লাশ মর্গ থেকে ক্যাম্পে নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের ক্যাম্পে আমাদের দুঃখের কথা শুনতে না আসেন, স্থানীয় এমপি আমাদের ওপর কি অত্যাচার শুরু করেছেন তা জানতে না আসেন তাহলে আমরা লাশগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ করব। একই কমিটির প্রচার সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, আগুনে পুড়িয়ে আমাদের ক্যাম্পের লোকদের হত্যার দায়ে এমপি ইলিয়াস মোল্লার যথাযথ বিচার করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলাতে হবে।

বার থেকেই পুলিশি জালে by কৃষ্ণকুমার দাস

নিয়মিত মদ্যপান এবং বারে টাকা উড়াতে গিয়েই পুলিশের জালে ধরা পড়ে নারায়ণগঞ্জে ‘সেভেন মার্ডার’ মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন। সঙ্গীসহ নূর হোসেনকে আট দিনের পুলিশ রিমান্ডে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড (এটিএস)। শনিবার রাতে নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে পশ্চিমবঙ্গের এটিএস। রোববার রাতে নূর হোসেন এবং অন্য দু’জনকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাট ছাড়াও আরও কয়েকটি জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে এটিএস। নূর হোসেনরা প্রাথমিক জেরায় কলকাতায় কিভাবে বেআইনিভাবে ঢুকেছে এবং কোথায় ছিল সেই কথা জানালেও নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার নিয়ে এখনও পর্যন্ত মুখ খুলেননি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত মদ্যপান এবং বারে গিয়ে মুঠো মুঠো টাকা উড়ানোর নেশাই কলকাতা পুলিশের জালে ধরা পড়ে সাত খুনের আসামি নূর হোসেন। গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে মাস আড়াই আগে কলকাতায় এসে প্রথমে উঠেছিল উল্টোডাঙার কাছে একটি গেস্ট হাউসে। দিন পনের পরেই আসে আজিজুর শামীম এবং এরপর সীমান্ত পেরিয়ে আসেন সুমন। এই উল্টোডাঙা গেস্ট হাউস থেকেই মাঝেমধ্যে বাগুআইটির চিনারপার্কে স্পাইসগার্ডেনে বার-রেস্তোরাঁয় যেতেন। সেখানে নর্তকীদের উচ্ছৃৃংখল নাচ শেষে খুশি হয়ে বান্ডিলে বাল্ডিলে টাকা উড়িয়ে দিতেন তিনি। সেই কারণে এই বারের কর্মী এবং নর্তকীদের কাছে নিজের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন ’নূর ভাই’। কিন্তু গোল বাধে শনিবার সন্ধ্যায় অন্য দুই গোষ্ঠী মারপিটের জেড়ে পুলিশ আসায়। পুলিশের সামনেই মদ্যপ অবস্থায় ’হিরো গিরি’ করতে গিয়ে ভাষা এবং শব্দের উচ্চারণে পুলিশের কাছে চিহ্নিত হয়ে যায় নূর একজন বাংলাদেশী। পুলিশকে মিথ্যা পরিচয় দিলেও পরে অনুসরণ করে বাড়ি দেখে আসে অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াডের সদস্যরা। কিন্তু সাড়ে ৯টা নাগাদ দেখে এলেও তখন গ্রেফতার করেনি পুলিশ। এরপর বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ইন্টারপোলের মারফত ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে প্রায় চমকে উঠেন এসিপি অনিশ সরকার। পরে বিশাল বাহিনী নিয়ে গিয়ে গোটা বাড়ি ঘিরে ফেলেন। এটিএসের প্রথম সন্দেহ হয়েছিল নূর হোসেনের কাছে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। সেই কারণে বাড়ির সিকিউরিটিকে দিয়ে নক করিয়ে দরজা খোলানো হয়। বাইগুটির এই বাসা ভাড়াও নিয়েছিল বারের কর্মীদের সহায়তায়। তারাই বাড়ির মালিকের প্রতিনিধির সঙ্গে নূর হোসেনের পরিচয় করিয়ে দেন।
বাংলাদেশী উঠতি যুবক থেকে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে পালিয়ে থাকার জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে কলকাতার অদূরে নতুন উপশহর রাজারহাট-নিউটাউন এলাকা। কৈখালি, ভিআইপি, বাইগুটি, জোড়ামন্দির, নারায়নতলা, চালপট্টিসহ রাজারহাটের দশদ্রুণ এলাকায় এখন ব্যাঙের ছাতার মতো আবাসন গড়ে উঠছে। সেই সঙ্গে আবাসনগুলোতে চলছে নানা রকম অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য। বাইগুটির এমন একটি ভবন থেকেই সঙ্গীসহ গ্রেফতার হন নূর হোসেন।

অন্যদিকে নূর হোসেন ধরা পড়ার পর রোববার বাংলাদেশ সরকার দিল্লি মারফত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ভারতের বন্দি বিনিময় চুক্তি থাকায় দ্রুত এই অভিযুক্তকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য সক্রিয় হয়েছেন কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম। ২৭ মে বাংলাদেশ সরকারের বার্তা পেয়ে দিল্লি ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্সে উইং বৃহস্পতিবার কৈখালিতে এসেছিল। কিন্তু দিল্লির গোয়েন্দারা নূরের হদিস না পেলেও পশ্চিমবঙ্গে এটিএস নূর হোসেনদের গ্রেফতার করে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে।
চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলার অন্যতম আসামি নূর হোসেন এবং তার দুই সহযোগী আজিজুর রহমান শামীম এবং খান সুমনকে উত্তরচব্বিশ পরগনা জেলার আদালত আট দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। কলকাতার লাগোয়া নতুন উপশহর বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের বাইগুটি থানার পুলিশ ১৪ দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করেছিল। দ্বিতীয় মুখ্য বিচার বিভাগীয় বিচারক এস লেপচা ধৃতদের ২৩ জুন পরবর্তী বারাসতে আদালতে হাজিরার নির্দেশ দেন।
নূর হোসেনের গ্রেফতারের বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরেছেন বলে জানান কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের উপরাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম। রোববার সরকারি ছুটির দিন, তাই হয়তো রাজ্য সরকারের তরফে আমরা কিছু জানতে পারিনি। আজ সোমবার অফিস খুললে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে কিছু জানতে পারলে আমরা সেই বার্তা আমাদের সরকারের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেব। তখন থেকেই কার্যত তাকে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ শুরু হয়ে যাবে।
জুন মাসের আট তারিখের আগে নিজেকে বাপি সাহা বলে পরিচয় দিয়ে কৈখালির ওই আবাসনের চার তলায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন নূর হোসেন এবং তার দুই সহযোগী আজিজুর রহমান শামীম এবং খান সুমন। শামীমের নাম বলা হয়েছিল ‘সৈকত কর্মকার’ এবং খান সুমন নিজে ‘সুমন সাহা’ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।
বাড়ির মালিক অবাঙালি অজয় সিং এবং মিনা সিং মাসে ১১ হাজার টাকা চুক্তিতে ভাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র আট দিনের মধ্যে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট নোটিশ জারি হওয়া নূর হোসেনকে কলকাতার বিধাননগর সিটি পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াডের (এটিএস) গোয়েন্দারা পাকড়াও করলেন। পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই আবাসনে ভাড়া দেয়ার অপরাধে পুলিশ বাড়ির মালিক অবাঙালি অজয় সিং এবং মিনা সিংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বলে জানা গেছে।
নূর হোসেন সম্প্রতি উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। গোয়েন্দারা গ্রেফতারের সময় নূর হোসেন ভারতে প্রবেশের বৈধ কাজগপত্র দেখাতে পারেননি। যদিও তিনি প্রথমে নিজেকে ভারতীয় এবং বাপি সাহা বলে গোয়েন্দাদের কাছে পরিচয় দিয়েছিলেন।
রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় বিধাননগর পুলিশ প্রিজনভ্যানে নূর হোসেন ও তার দুই সঙ্গীকে দমদম মিউনিসিপ্যাল হাসপাতালে শারীরিক চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বারাসত আদালতে প্রথমে আদালতের গারদখানায় রাখা হয় এবং বেলা ২টায় বিচারকের সামনে দাঁড় করানো হয়। সাত খুনের মামলার অন্যতম ফেরার নূর হোসেনের পক্ষে এদিন কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের তরফেও কেউ পুলিশের রিমান্ড আবেদনের বিরুদ্ধে সওয়াল জবাবও করেননি।
>>কৃষ্ণকুমার দাস @কলকাতা

বিদ্যার কথায় বলিউডে বিস্ময়

‘ডার্টি পিকচার’ ছবির ব্যাপক আবেদনময়ী উপস্থিতি, সঙ্গে কিছু আইটেম গানে পারফরমেন্স আকাশছোঁয়া দর্শকপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল বিদ্যা বালানকে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বলিউডের অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন নায়িকায় পরিণত হন তিনি। কিন্তু সেই ব্যাপক খোলামেলা ইমেজের বিদ্যা তার ইমেজ পাল্টানোর কথা বললেন সম্প্রতি। তিনি জানিয়েছেন, আর আইটেম গানে পারফরমেন্স করবেন না। সম্প্রতি ‘ববি কো সব মালুম হ্যায়’ নামের একটি ব্লগ চালু করেছেন বলিউডের এই অভিনেত্রী ৷ এটা অবশ্যই নিজের আপকামিং ছবি ‘ববি জাসুস’কে প্রমোট করার জন্যই করা ৷ ছবিতে গোয়েন্দাগিরি করবেন বিদ্যা ৷ এক ইভেন্টে তিনি সাফ জানিয়েছেন, তিনি আইটম সং আর করবেন না। যে বিদ্যা খোলামেলা হওয়ার কারণেই আজকের  এ জায়গায় এসেছেন  আর তার খোলামেলা হওয়ার অন্যতম মাধ্যম ছিল আইটেম গান। সেই বিদ্যার  মুখে আইটেম গান না করার ইচ্ছের কথা শুনে বিস্মিত হয়েছে বলিউডের সবাই। তবে সকলের মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কি এমন হলো যে আইটেমে না জানিয়ে দিলেন তিনি ৷ এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য বিদ্যাই ভাল দিতে পারবেন ৷ এদিকে ‘ববি জাসুস ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে আগামী ৪ঠা জুলাই৷ ছবিতে বিদ্যার বিপরীতে দেখা যাবে আলি ফৈজলকে৷ উল্লেখ্য, সর্বশেষ ‘ফেরারি কি সাওয়ারি’ ছবিতে আইটেমে নাম্বারে দেখা গিয়েছিল বিদ্যা বালনকে ৷ এরপর আর আইটেম সংয়ে নাম লেখান নি তিনি৷

ইরাকে এমন নৃশংসতা!

মরুভূমির মধ্যে একটি অগভীর পরিখা। সেই পরিখায় সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছেন বেশ কয়েকজন মানুষ। এরপর খুব কাছ থেকে নিরস্ত্র এই মানুষগুলোকে গুলি করা হয়। রক্তে ভিজে যায় মরুর লাল মাটি। সম্প্রতি ইরাকে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আল-কায়েদা-সমর্থিত সুন্নিপন্থী জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএসের সদস্যরা এ নৃশংসতা ঘটিয়েছে। ঠান্ডা মাথায় পরিচালিত এই গণহত্যার বেশ কিছু ছবি গত শনিবার নিজেদের টুইটারে ওই সংগঠনটি প্রকাশ করেছে বলে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়। তবে নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে ছবিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি বলে বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়। বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে অভিযান শুরু করে ইরাকের একটি প্রদেশ ও কয়েকটি প্রদেশের অংশবিশেষ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে আইএসআইএস জঙ্গিরা। তাদের প্রতিরোধে দেশটির সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি বাহিনী কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। অনেকে অস্ত্র-শস্ত্র ছেড়ে পালিয়েছে। ওই সব এলাকা থেকে আটক দেশটির সেনাবাহিনীর এক হাজার ৭০০ সদস্যকে হত্যার দাবি করেছে আইএসআইএস।

>>ইরাকে এভাবে মানুষ হত্যার ছবি প্রকাশ করেছে আল-কায়েদা-সমর্থিত সুন্নিপন্থী জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএস। ছবি: ডেইলি মেইল
দাবির সমর্থনে নিজেদের টুইটারে গণহত্যার একাধিক ছবি প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগেরই পরনে ছিল বেসামরিক পোশাক। তবে কারও কারও পরনের প্যান্ট ছিল সামরিক।
একটি ছবিতে দেখা গেছে, সারিবদ্ধভাবে থাকা একদল লোক তাঁদের মাথা নিচু করে রেখেছেন। আসামির মতো তাঁদের দুই হাত একসঙ্গে পেছনের দিকে বা পিঠে বা মাথায় রাখা। তাঁদের ঘিরে আছে আইএসআইএসের অস্ত্রধারী সদস্যরা। একটি ছবিতে দেখা যায়, অজ্ঞাত একটি এলাকায় খোলা জায়গায় একদল লোক দাঁড়ানো। তাঁদের অধিকাংশের পরনে বেসামরিক পোশাক। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তাঁদের কারও কারও দুই হাত মাথায় রাখা। তাঁদের চারদিকে মুখোশপরা অস্ত্রধারীরা দাঁড়িয়ে। অন্য একটি ছবিতে বেসামরিক পোশাকে থাকা একদল লোককে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের সবার দুই হাত পিঠে রাখা। আর তাঁদের পাশেই দাঁড়িয়ে অস্ত্রধারীরা। সবচেয়ে হূদয়বিদারক ছবিটিতে দেখা যায়, মরুভূমির মধ্যে একটি অগভীর পরিখার মধ্যে সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছেন বেশ কিছু মানুষ। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে মুখোশপরা একদল অস্ত্রধারী। পরিখার মধ্যে পড়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাঁদের অস্ত্র তাক করা। পরে এই মানুষগুলোকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ডেইলি মেইলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহর দখলের যুদ্ধের সময় ইরাকের সেনাবাহিনীর সদস্যদের আটক করে আইএসআইএস জঙ্গিরা। এরপর তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। একপর্যায়ে গাড়িতে করে তাঁদের মরুভূমিতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ইরাক সরকারের পক্ষ থেকে ছবিগুলোর ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লে. জেনারেল কাসিম আল মৌসাবির ভাষ্য, ছবিতে বর্ণিত গণহত্যা ইরাকের সালাউদ্দিন প্রদেশে ঘটেছে। নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে ছবিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি বলে বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়। তা ছাড়া সালাউদ্দিন প্রদেশের কোথাও এত মানুষের দাফনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জঙ্গিদের দাবি সত্য হলে, ২০০৩ সালে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর ইরাক আগ্রাসনের পর এটাই হবে এককভাবে বড় কোনো নৃশংসতা।

এবার শিবির নেতার পায়ের গোড়ালি কর্তন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে গুলি করে ও কুপিয়ে পা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। গুরুতর অবস্থায় রাসেল আলম নামের শিবিরের ওই নেতাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আজ সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলা ভবনে এ ঘটনা ঘটে।

>>রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল লতিফ হল শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলমকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। ছবি: শহীদুল ইসলাম
রাসেল আলম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি নবাব আবদুল লতিফ হল শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক।
পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিকেল পৌনে চারটার দিকে শহীদুল্লাহ কলা ভবন থেকে ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক জিয়াউদ্দিন বাবলু ওরফে হাসিবুর রহমান হাসিবকে গ্রেপ্তার করে মতিহার থানা পুলিশ। এর আধা ঘণ্টা পর আরেক নেতার গোড়ালি কর্তনের ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক লাবিব আবদুল্লাহ এ ঘটনার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেন। প্রথম আলোর কাছে তিনি দাবি করেন, ‘আমাদের এক নেতা হাসিব পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন। পুলিশ তাঁকে আটক করে নিয়ে যায়। আরেক নেতা রাসেলকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগ নেতারা দুই পায়ে গুলি করে ও ডান পা গোড়ালি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান রানা বলেন, ‘এই ঘটনায় ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত থাকতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। এটি শিবিরের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল।’
জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (সদর) তানভীর হায়দার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ এক শিবির নেতাকে গ্রেপ্তার করে থানায় রেখে ক্যাম্পাসে গিয়ে গুলির শব্দ শুনতে পায়। দুর্বৃত্তরা রাসেল নামের একজনের ডান পা গোড়ালি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক রয়েছে।
এর আগে ২৯ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতা আবদুল্লাহেল মাসুদের পায়ের পাতা বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া তাঁর সঙ্গে থাকা ছাত্রলীগের অপর নেতা সালেহ মো. টগরকে কুপিয়ে জখম করা হয়। ওই ঘটনায় ছাত্রলীগ শিবিরকে দায়ী করে আসছিল।

ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট দফতরের সামনে বোমা

অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পোত্রো পেরোশেঙ্কো। শনিবার রাতে কিয়েভে তার দফতর থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করল নিরাপত্তা বাহিনী। বিশ্বস্ত সূত্রে এই খবর পাওয়া গেছে। সরকারিভাবে অবশ্য এ নিয়ে কিছু জানানো হয়নি। সূত্রের খবর, বোমাটি রাস্তার ধারে রাখা ছিল। সাধারণভাবে প্রেসিডেন্ট এই সড়ক দিয়ে যাওয়া-আসা করেন। পরে সেটি নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয়। প্রেসিডেন্টকে নিশানা করেই বোমাটি রাখা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। কোনো সংগঠন এই বোমা রাখার খবর দায় স্বীকার করেনি।
তবে পূর্বের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এর পেছনে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের পূর্বাঞ্চলের রুশপন্থীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জেরে এই মুহূর্তে উত্তাল ইউক্রেনের রাজনীতি। এদিনই লুহানাস্ক শহরে গুলি করে একটি যুদ্ধ বিমান ধ্বংস করেছে বিদ্রোহীরা। বিমান ভূপাতিতকারীদের কঠিন শাস্তি হবে : ইউক্রেন ইউক্রেনে বিমান ভূপাতিতকারীদের কঠিন শাস্তি দেয়া হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট পেরোশেঙ্কো। শুক্রবার রাতে রাশিয়াপন্থী যোদ্ধারা দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর লুহানস্কে ইউক্রেনীয় সেনাবাহী একটি বিমান ভূপাতিত করেন। লুহানস্ক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা ছিল এটির। এতে যুদ্ধ সরঞ্জামও ছিল। বিমানটি ভূপাতিত করায় ৪৯ জন সেনা মারা গেছে। রাশিয়াপন্থীদের দমনে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের পর ইউক্রেনের জন্য এটিই এককভাবে সবচেয়ে বড় বিয়োগাÍক ঘটনা। বিবিসি।

সাংবাদিক কল্যাণ, না আনুগত্য আদায়?

সাংবাদিকতা তেমন অর্থকরী পেশা নয়, তবু এই পেশার প্রতি তরুণদের আগ্রহ ও আকর্ষণের কমতি নেই৷ সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাংলাদেশে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে চালু পত্রপত্রিকা ও অনলাইন সংবাদ প্রকাশনা এবং রেডিও-টিভির পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন৷ সংখ্যা বিবেচনায় এসব প্রতিষ্ঠানের বেতনভোগী অথবা অবৈতনিক কিংবা শৌখিন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর সংখ্যা লাখের কোঠা ছাড়িয়ে গেলেও বিস্মিত হব না৷ আগেই বলেছি যে সাংবাদিকতার আর্থিক পুরস্কার সাধারণভাবে মোটেও আকর্ষণীয় নয় এবং সে কারণে প্রায়ই তরুণ সাংবাদিকদের মুখে নানা ধরনের হতাশার কথা শোনা যায়৷ এসব হতাশার মধ্যে একটি হচ্ছে বাড়িওয়ালারা নাকি সম্ভাব্য ভাড়াটে পেশায় সাংবাদিক শুনলে বলেন যে ‘দুঃখিত! বাসা ভাড়া হয়ে গেছে, নোটিশটা খুলতে যাচ্ছিলাম৷’ আর বিয়ের বাজারে তাঁদের অবস্থা নাকি আরও করুণ৷ অসুখ-বিসুখ কিংবা বিপদে-আপদে তাঁদের অসহায়ত্বের শেষ নেই৷ যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের মন্ত্রী, সাংসদ, নানা পর্যায়ের নেতা-উপনেতা-পাতিনেতা, ছাত্র-যুব-শ্রমিক-স্বেচ্ছাসেবকসহ নানা অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের লাঠিয়ালদের হাতে মারধর এবং লাঞ্ছনারও কোনো অন্ত নেই৷ সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের এই দীনতায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী দারুণভাবে ব্যথিত৷ তাই দলের লাঠিয়ালদের হিংসা পরিহারের শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের বাড়াবাড়ি নিয়ন্ত্রণের কঠিন পথ অনুসরণ না করে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল গঠনের৷ নিয়োগকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী তথ্যমন্ত্রী এই তহবিল গঠনের জন্য একটি আইনের খসড়াও তৈরি করে ফেলেছেন৷ অবশ্য সাংবাদিক কল্যাণে উদ্গ্রীব তথ্যমন্ত্রীর সেই সংবাদ সম্মেলনটি এখনো আমার চোখে ভাসছে, যাতে তিনি এক তরুণ সাংবাদিককে ধমকে বলছিলেন, ‘আমি হাসানুল হক ইনু, এটা মনে রাখবেন৷’ (সূত্র: নিউজ আনকাট: এটিএন নিউজ)৷
নির্বাচনের সময় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নকর্তার প্রশ্নকে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার একপর্যায়ে তিনি শুধু ধমক দিয়েই ক্ষান্ত হননি, নিজের পরিচয়টি ইঙ্গিতবহভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন গত ২৮ জুলাই অসুস্থ, আহত ও অসচ্ছল ১৫৮ জন সাংবাদিককে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে (যুগান্তর, ২৯ জুলাই, ২০১৩ ‘জয়ের বক্তব্য সমর্থন করলেন প্রধানমন্ত্রী’)৷ তথ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত এক কোটি টাকার একটি তহবিল থেকে তখন ওই সাহায্য দেওয়া হয়েছিল৷ অন্যান্য সূত্রে জেনেছি যে যাঁদের সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন বিএনপির মুখপত্র দৈনিক দিনকাল-এর৷ আর অন্যদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ-সমর্থক সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য, যার মূল নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা৷ ইউনিয়নের এই অংশের সরকার ঘনিষ্ঠতার আলামত তাঁদের লাভজনক সরকারি চাকরিতে নিযুক্তি এবং টেলিভিশনের লাইসেন্সপ্রাপ্তিতেই দৃশ্যমান৷ সাংবাদিক ইউনিয়নের অপর অংশও যে রাজনীতিমুক্ত, তা নয়৷ তাদের নেতাদের মধ্যেও আছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং দলীয় সমর্থক৷ সুতরাং, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে ওই অংশের নেতারাই যে আবার সরকারি পদ-পদবির অধিকারী হবেন, তাতে সন্দেহ নেই৷ স্বল্প-আয়ের বিপদাপন্ন কলমসেবীরা প্রয়োজনের সময় যেকোনো সূত্র থেকে সাহায্য পেলে তাকে স্বাগত জানানোই স্বাভাবিক৷ ফেনীর সাংবাদিক টিপু সুলতান কিংবা ফরিদপুরের প্রবীর শিকদার যে জীবন ফিরে পেয়েছেন এবং এখনো পেশায় টিকে আছেন, তা তো সম্ভব হয়েছে সামাজিক সহানুভূতি এবং সহায়তার কারণে৷ সময়ে-অসময়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে যাঁরা এ ধরনের সাহায্য পেয়েছেন, তাঁদের প্রতি কোনো ধরনের অসম্মান না করেও যে কথাটা বলা প্রয়োজন, তা হলো এ ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার এমন একটি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যা হবে রাজনীতি-নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক৷ সাধারণ বিবেচনাতেই বোঝা যায় যে সরকারের সমালোচক বা বিরোধী মতাবলম্বী পত্রিকা বা গণমাধ্যমই সব সময়ে প্রতিকূলতার মুখে পড়ে এবং সাধারণত সেসব প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকেরাই আর্থিক টানাপোড়েনে জীবন যাপন করতে বাধ্য হন৷
অথচ যে ধরনের প্রস্তুতি চলছে, তাতে শেষ পর্যন্ত সুবিধাভোগী সরকার-সমর্থকদেরই আরও বেশি সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা হবে৷ সরকারের প্রস্তাবিত সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগের কারণেই এসব সর্বজনবিদিত তথ্যের পুনরুল্লেখ এখানে প্রাসঙ্গিক৷ প্রস্তাবিত যে খসড়া আইন সংসদে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে, তাকে সাংবাদিকদের আনুগত্য ক্রয়ের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচনা করা যায়৷ আর সে কারণেই সুস্থ সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ চিন্তায় বিচলিত না হয়ে উপায় নেই৷ আইনের খসড়া বিশ্লেষণে যে বিষয়টি পরিষ্কার, তা হলো সাংবাদিক কল্যাণ নয়, বরং সরকারের জন্য আনুগত্য ক্রয়ই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য৷ ক্ষমতায় থাকাকালে রাজনীতিকেরা যে ক্ষমতার বাইরের জীবনটির কথা ভুলে যান, এখানেও সেই মোহাচ্ছন্নতার বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট৷ এই আইন অনুযায়ী কল্যাণ তহবিল গঠিত হলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ক্ষমতা হারানোর পরই আওয়ামী লীগ সরকারের আনুগত্য কেনার ক্ষমতা টের পাবে৷ প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় ৬ নম্বর ধারায় ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তার প্রধান হবেন তথ্যমন্ত্রী, সচিব ভাইস চেয়ারম্যান, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন প্রতিনিধি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের দুজন প্রতিনিধি, সরকার-মনোনীত তিনজন সাংবাদিক এবং ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক৷ এই একই ধারার একটি উপধারায় ইউনিয়নের দুজন এবং সরকার-মনোনীত তিনজনের মেয়াদ তিন বছর বলা হলেও কোনো কারণ না দেখিয়ে তাঁদের যেকোনো সময়ে অপসারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে দেওয়া হয়েছে৷ যার অর্থ দাঁড়ায় ট্রাস্টের মোট ১৩ জনের সবাই সরকারের নির্দেশনা মানতে বাধ্য৷ আর ট্রাস্ট পরিচালনার জন্য যে পদ্ধতি এই খসড়ায় বলা আছে, তা গণতান্ত্রিক কোনো কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, সেই আলোচনা একেবারেই অবান্তর৷ কেননা, সভা শুরুর সময় কোরাম প্রয়োজন হলেও মুলতবি সভায় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে কোনো কোরামের প্রয়োজন হবে না৷ সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল এবং ট্রাস্ট গঠনের বিষয়টিকে সরকারের আনুগত্য ক্রয় প্রকল্পে রূপান্তর থেকে বাঁচানোর জন্য সাংবাদিক সমাজের নিজেদের যেমন সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন, তেমনি সরব হওয়া উচিত বিবেকবান পাঠকদের৷
সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল গঠনের ধারণাটি উন্নত বিশ্বেও আছে৷ তবে সেগুলোর কোনোিটই সরকারের উদ্যোগ নয়, এমনকি সেগুলোতে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টও নেই৷ নিউইয়র্কভিত্তিক অধিকার গোষ্ঠী, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস অথবা নাইটস ফাউন্ডেশনের মতো বেসরকারি সংগঠন বা এনএজিওসমূহ এ ধরনের তহবিল পরিচালনা করে থাকে এবং তাদের কার্যক্রম কোনো দেশভিত্তিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক৷ গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে, কিংবা নিদেনপক্ষে, ওয়েজ বোর্ডের কাঠামো অনুকরণেও অনেক কার্যকর ট্রাস্ট গঠন সম্ভব৷ সরকারের পক্ষ থেকে সাংবাদিক কল্যাণের তহবিল গঠনের উদ্যোগগুলো মূলত দেখা যাচ্ছে আমাদের উপমহাদেশে যেখানে রাজনীতি ব্যাপকভাবে কলুষিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত৷ আর সে কারণেই তাদের প্রয়োজন গণমাধ্যমের আনুগত্য ক্রয়৷ ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার এ ধরনের একটি কার্যক্রম শুরু করেছে মাত্র গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে৷ এর আগে ভারতের ওডিশা, গোয়া, পাঞ্জাবের মতো কয়েকটি জায়গায় রাজ্য সরকারগুলো এ ধরনের সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল চালু করে৷ ২০১৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হওয়া ভারতের সাংবাদিক কল্যাণ স্কিম পরিচালনায় গঠিত কমিটির পৃষ্ঠপোষক হলেন তথ্যমন্ত্রী, সভাপতি হলেন তথ্যসচিব এবং বাকি চারজনের সবাই সরকারি কর্মকর্তা৷ একইভাবে পাকিস্তানে এ ধরনের একটি কল্যাণ তহবিল গঠনের উদ্যোগ গৃহীত হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি তহবিল অবমুক্ত করা হয়নি৷ তবে প্রেসক্লাবের উদ্যোগে সেখানে এ ধরনের একটি তহবিল গঠিত হয়েছে, যারা বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা পরিচালনা করছে৷ অসহায়ত্বের শিকার সাংবাদিকদের সহায়তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, তাতে সন্দেহ নেই৷ অন্তত পাকিস্তানের বহুল আলোচিত গোপনীয় সরকারি ভাতা কেলেঙ্কারি অথবা ভারতের পেইড নিউজ-এর মতো ব্যাধি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে এই পেশাকে মুক্ত রাখার জন্য এ ধরনের কল্যাণ তহবিল কেবল তখনই সহায়ক হতে পারে, যখন তাতে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না এবং স্বচ্ছতার ব্যবস্থা থাকবে৷
পাকিস্তানের কেলেঙ্কারির কথাই ধরা যাক৷ সেখানে সরকার বছরের বছর পর বহু সাংবাদিককে বিভিন্ন কারণে নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা দিয়ে আসছিল৷ তথ্য মন্ত্রণালয় তার গোপন তহবিল থেকে একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে ৩০ কোটি রুপি দেওয়ার তথ্য প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জাওয়াদ এস খাজার আদালতে৷ এরপর সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের দাবির মুখে আদালতের নির্দেশে আরও ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা প্রকাশিত হয়, যাতে দেখা যায় সাংবাদিকদের হোটেলভাড়া, বিমান ও ট্যাক্সিভাড়া থেকে শুরু করে প্রয়াত সাংবাদিকের পরিবারকে এককালীন অনুদান দেওয়ার মতো খাতে তথ্য মন্ত্রণালয় ওই গোপন তহবিল থেকে টাকা দিয়েছে (সূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, ২২ এপ্রিল, ২০১৩)৷ ভারতেও সম্প্রতি শুরু হয়েছে কথিত পেইড নিউজ-এর সংস্কৃতি, যা সেখানকার গণতন্ত্রকে কলুষিত করছে বলে অভিযোগ ওঠায় নির্বাচন কমিশন প্রথমবারের মতো তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে৷ বিষয়টি প্রথমবারের মতো ফাঁস হয় ২০০৯ সালে এবং তাতে রাজনৈতিক ছাড়াও বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলোর এ ধরনের অনৈতিক কৌশল অনুসরণ করতে দেখা যায়৷ রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজ্য পর্যায়েই এ ধরনের অপকর্ম হয়েছে বেশি৷ তবে সেখানকার গণমাধ্যমে সাংবাদিক ছাড়াও প্রতিষ্ঠানগত দুর্নীতিও একিট বড় সমস্যা৷ সরকার, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতার চল যে বাংলাদেশেও একেবারে নেই, সে রকমটি হয়তো দাবি করা যাবে না৷ সে জন্যই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, সেটা যেমন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রয়োজন, তেমনি তা ব্যক্তিপর্যায়েও প্রত্যাশিত৷ সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশ্বপরিক্রমণের রেকর্ড সম্পর্কে এক নিবন্ধে আমি বলেছিলাম যে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের সফরসঙ্গীদের ব্যয়নির্বাহের বিষয়েও স্বচ্ছতার নীতি চালু করা প্রয়োজন৷ উন্নত দেশগুলোয় সাংবাদিক বা সংবাদকর্মীরা কোনো সফর বা অনুষ্ঠানের খবর সংগ্রহে আর সরকারের ওপর নির্ভরশীল নন, বরং নিজ নিজ পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠানের খরচেই তা করে থাকেন৷ রাজনীতিকেরা যেসব পৃষ্ঠপোষকতা দেন, তা কখনোই নিঃশর্ত হয় না, বিনিময়ে তাঁরা চান আনুগত্য৷ গণতন্ত্রে মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীনতার মূল্য অনেক৷ সেটাকে এত ক্ষুদ্র স্বার্থে বিপণন কারও জন্যই শুভ নয়৷
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন৷

অনন্য সাংবাদিক মাহবুবুল আলম

মাহবুবুল আলম
সাংবাদিক এবিএম মূসা প্রয়াত হলেন গত এপ্রিল মাসে। তার মাত্র দুই মাসের মধ্যে চলে গেলেন মাহবুবুল আলম। বাংলাদেশে এখন আমাদের সময়ের পঞ্চাশের দশকের আর কোনো সাংবাদিক রইলেন কি না জানি না৷ তবে প্রবীণ সাংবাদিকের সংখ্যা নিঃশেষিতপ্রায়। মাহবুবুল আলম বয়সে আমার চার বছরের ছোট, কিন্তু তাঁর সঙ্গে বয়সের বেড়া অতিক্রম করে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে সময় লাগেনি খুব একটা। তাঁর সাংবাদিকতার শুরু ১৯৫৭ সালে তখনকার বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তানের (এপিপি) রিপোর্টার হিসেবে। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় সে সময়েই৷ তবে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ হয় সত্তরের দশকে, যুক্তরাষ্ট্রে। আমি তখন ওয়াশিংটনে ভয়েস অব আমেরিকার বেতার সাংবাদিকতায় নিয়োজিত, আর মাহবুবুল আলম বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস কাউন্সিলরের দায়িত্বে।
তার আগে মাহবুবুল আলম ঢাকায় সাংবাদিকতা করেছেন ইংরেজি পত্রপত্রিকায় এবং ষাটের দশকে আলতাফ হোসেন সম্পাদিত করাচির ইংরেজি দৈনিক ডন-এর নয়াদিল্লি সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন বেশ কিছুকাল। সে সময় তরুণ সাংবাদিক মাহবুবুল আলম বিশেষ খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন ১৯৬৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের এবং ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ভারতীয় লোকসভার উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্কের খবরাখবর পরিবেশন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে তাঁর সঙ্গে কলকাতায় যান ঐতিহাসিক ইন্দিরা-মুজিব বৈঠক উপলক্ষে। ওই বৈঠকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সম্মত হন বাংলাদেশ থেকে সব ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার এবং এই সুখবর অপেক্ষমাণ বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের কাছে প্রথম প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রেস সেক্রেটারি মাহবুবুল আলম। মাহবুবুল আলম ১৯৭৮ সালে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস কাউন্সিলরের দায়িত্বে যোগ দেওয়ার আগে ১৯৭৬ সালে প্রেস কাউন্সিলর ছিলেন লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে। তিনি তাঁর অর্ধশতাব্দীকালেরও বেশি সময়ের সাংবাদিকতার জীবনে বার্তা সংস্থা ও পত্রপত্রিকা ছাড়াও নিয়োজিত থেকেছেন দূতাবাসের, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এবং সরকারি তথ্য সংস্থার নানা দায়িত্বে। ১৯৮০-৮৩ সালে তিনি ছিলেন ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও বহিঃপ্রচার বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল এবং ১৯৮৩-৮৬ সালে দায়িত্ব পালন করেছেন ভুটানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে। তারপর এক বছর সম্পাদক ছিলেন ঢাকার ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশন পত্রিকার এবং দুই বছরের জন্য ছিলেন বাংলাদেশের বার্তা সংস্থা বিএসএসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মাহবুবুল আলম ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার ছিলেন ১৯৮৯ থেকে ৯২ সাল পর্যন্ত। ইতিপূর্বে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পত্রপত্রিকার কিংবা বেতার টেলিভিশনের যোগাযোগ সম্পর্ক একরকম ছিল না বললেই চলে। ফলে এ দেশের পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের কোনো খবরাখবর দেখা যেত না।
কেবল ঘূর্ণিঝড় কিংবা আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলে বড়জোর দু-তিন লাইনের একটা সংক্ষিপ্ত খবর স্থান পেত এখানকার সংবাদপত্রগুলোয়। মাহবুবুল আলম দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। মাহবুবুল আলম অত্যন্ত কার্যকরভাবে সক্ষম হন ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস-এর মতো যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সংবাদপত্রগুলোর এবং নিউজ উইক ও টাইম ম্যাগাজিনের মতো সংবাদ-সাময়িকীর সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসের সংযোগ সম্পর্ক স্থাপনে। ওই সময় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচারের ব্যবস্থা করেন এসব প্রখ্যাত পত্রপত্রিকায়। মাহবুবুল আলম যখন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার, তখন রাষ্ট্রদূত ছিলেন প্রথমে আতাউল করিম ও পরে আবুল আহসান। এই দুজনই মাহবুবুল আলমের কর্মদক্ষতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন আমাদের কাছে৷ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ দূতাবাস এখন আমেরিকান বার্তামাধ্যমের সুদৃষ্টিতে।’ পরে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কিছু সময় এবং ঢাকার ইংরেজি দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন ১৮ বছর। মাহবুবুল আলমের সঙ্গে সুদীর্ঘকালের বন্ধুত্বের সুবাদে তাঁকে যতটা জেনেছি, তাতে তাঁর পরিচয় পেয়েছি অমায়িক, পরিশীলিত, বন্ধুবৎসল, হাসিখুশির এক উজ্জ্বল সরল ব্যক্তিত্বের। এ ছাড়া, সাংবাদিকতার পেশাদারির দিক থেকে তিনি ছিলেন এক অনন্যদৃষ্টান্ত। পঞ্চাশের দশকের সাংবাদিকদের এবং সম্ভবত পরবর্তীকালেও এই পেশায় যোগদানের শুরুতে বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আদর্শ মেনে চলার বাধ্যবাধকতার কথা। অর্থাৎ যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক মতাদর্শেই বিশ্বাস থাক না কেন, সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনে কখনোই তা প্রতিফলিত হবে না। মাহবুবুল আলম তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তা মেনে চলেছেন। আমাদের সাংবাদিকেরা তাঁর এই দৃষ্টান্ত থেকে যথার্থই অনুপ্রাণিত হতে পারেন।
সৈয়দ জিয়াউর রহমান: সাংবাদিক, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের সাবেক সিনিয়র এডিটর।