Showing posts with label সাক্ষাৎকার. Show all posts
Showing posts with label সাক্ষাৎকার. Show all posts

Sunday, June 28, 2026

এ বছরই দেশে ফিরব: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। এ সময় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি এ বছরই দেশে ফিরব।’ তার ভাষায়, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি ‘শক্তি’। তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার ওপর আঘাত।

প্রশ্ন: আপনি একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং আপনার সমর্থকেরাও আশাবাদী যে, আপনি শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরবেন। এমনকি দলের কয়েকজন নেতা বলেছেন, আপনি এ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

শেখ হাসিনা: আমার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোন বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য।

আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা ন্যায়বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অতীতেও এ ধরনের চেষ্টা হয়েছে। তখনও তারা ব্যর্থ হয়েছে, এবারও ব্যর্থ হবে।

আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র ভেদ করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। বাংলাদেশের জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি এবং দেশের নজিরবিহীন উন্নয়নে কাজ করেছি।

আমার জীবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং দেশের উন্নয়ন। তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই। সব বাধা ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব।

প্রশ্ন: অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ আবার জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে। এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি বর্তমানে আওয়ামী লীগের রয়েছে?

শেখ হাসিনা
: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোন কাগুজে সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগ বহুবার হামলার শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অন্য কারও ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আওয়ামী লীগ নিজের পথ তৈরি করে। জনগণের সমর্থন সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই শক্তি নিয়েই সরকারে থেকে আমরা মানুষের উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছি।

বাংলাদেশবিরোধী শক্তি জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। কিন্তু সব চেষ্টা করেও তারা মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকারের পর এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনে মানুষ বাস্তবতা নিজের চোখে দেখছে। দেশে গণতন্ত্র নেই, আইনের শাসন নেই, নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হচ্ছে। উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন।

মানুষ তুলনা করতে জানে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা থাকে।

সাংগঠনিক শক্তির প্রশ্নে বলতে চাই, বাংলাদেশের রাজনীতির অলিগলি আওয়ামী লীগ হাতের তালুর মতো চেনে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই এই দল বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জনগণের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার সক্ষমতা আওয়ামী লীগের রক্তে মিশে আছে।

আগুনে যেমন সোনা আরও খাঁটি হয়, তেমনি শাসকের নিপীড়ন ও নির্যাতন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করছে।

দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আমার বার্তা খুবই সহজ। ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান। প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আপস করবেন না।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়। এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ মানুষের সঙ্গে ছিল, আছে এবং থাকবে। জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে এবং দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজারো মামলা হয়েছে বলে খবর রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক পুনরুত্থান কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না। এটি জনগণের ওপর নির্ভর করে।

অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে একটি সাজানো নির্বাচন থেকে দূরে রেখেছে। দলের কার্যালয় বন্ধ করেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে দমন করেছে। কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। সে কারণেই আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। শুধু নেতা-কর্মীরাই নয়, সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন। মায়েরা তাদের সন্তানদের সাহস জোগাচ্ছেন। এগুলোই আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণের লক্ষণ।

বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে, তারা আওয়ামী লীগের শক্তিকে ভয় পায়। সে কারণেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এটি তাদের দুর্বলতার প্রমাণ।

আওয়ামী লীগকে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা যাবে না। যে দল জনগণের জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে থামানো যায় না। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ কখনো শাসকের রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি। বরং সেই রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করেই বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে।

বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের ওপর অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু যারা এখন ক্ষমতা দখল করে আছে, তারা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও বন্ধ রাখে, তাহলে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ, বেদনা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের মতো একটি মডেলের দিকে এগিয়ে গেছে। এই পরিবর্তন বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?

শেখ হাসিনা: আমি কখনোই কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণের স্বার্থে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই পরিষ্কার ছিল, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ তবে সেই সম্পর্ক অবশ্যই রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে সামরিক শাসন, বৈষম্য, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা এবং গণতন্ত্র অস্বীকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলাম, তার ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করা মানেই বাংলাদেশের মৌলিক পরিচয়ের ওপর আঘাত হানা।

৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা চালানো হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হয়েছে। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। সুফি দরগা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করে উগ্রবাদ বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এক কথায়, বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা একটি স্থিতিশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং উন্নয়নশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় পৌঁছেছিল ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলারে। ২৯ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছিল ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল।

আমরা দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিশুমৃত্যুর হার চার গুণ কমেছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আট গুণ বেড়েছিল এবং শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছিল। সাক্ষরতার হার বেড়ে হয়েছিল ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৩ দশমিক ৪৪ শতাংশে। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা ১৪ হাজার ৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছি।

আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসন করেছি। প্রায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ১১৫ জনকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ বাড়ির মালিকানা দিয়েছি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পেলে বাঙালি জাতি নিজ শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা ধ্বংস করা হয়েছে। দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে একমাত্র আওয়ামী লীগই দেশকে মুক্ত করতে পারে। জনগণ তা বুঝতে পেরেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই বিজয়ী হবে। ইউনূস এবং বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এটি খুব ভালোভাবে জানে। এ কারণেই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে ধ্বংস করেছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রশ্ন: এমন একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আপনার জন্য ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আপনার পর্দার আড়ালে আলোচনা হয়েছে। এসব দাবির কোনো সত্যতা আছে কি?

শেখ হাসিনা: জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা প্রায়ই ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের প্রচারণা চালায়। এ বিষয়ে আমার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার এসব কোনো গোপন দরকষাকষির বিষয় নয়। এগুলো দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।

আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। একইভাবে ন্যায়বিচারও কোনো দান বা করুণা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। রাজনৈতিক নির্দেশনায় পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা সাক্ষ্য কিংবা বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কখনো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না।

আমি সবসময় রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে। তবে সেই সমাধান হতে হবে প্রকাশ্য, নীতিনিষ্ঠ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে নয়। আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া বা অনুগ্রহ চায় না। আওয়ামী লীগ সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার, জনগণের সমর্থন এবং মানুষের শক্তির ভিত্তিতেই রাজনীতি করবে।

প্রশ্ন: সম্প্রতি মন্দির ও হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা, পাশাপাশি কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর বিক্ষোভ ও হুমকির খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শেখ হাসিনা: বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গভীরভাবে উদ্বেগজনক। দুঃখজনক হলেও এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে যখনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দুর্বল হয়েছে, যখনই সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করেছে, তখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন নেমে এসেছে। তাদের বাড়িঘর, উপাসনালয়, ব্যবসা, জীবন ও মর্যাদা সবই হুমকির মুখে পড়েছে।

৫ আগস্টের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া সম্প্রদায় এবং সুফি সংশ্লিষ্ট কেউই নিরাপদ নন। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিমা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাড়িঘরে লুটপাট হয়েছে। চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বাধা অব্যাহত রয়েছে।

সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এখনও একটি মিথ্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে, সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নয়, তারা বাংলাদেশের সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। সেই বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও উগ্রবাদের জিম্মি হতে দেওয়া যায় না।

যারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়, মন্দির ভাঙচুর করে কিংবা ধর্মের নামে মানুষকে হুমকি দেয়, তারা শুধু একটি সম্প্রদায়ের শত্রু নয়। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু। যখন কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ে থাকে, তখন রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। আজ অনেক সংখ্যালঘু পরিবার সেই ভয়ের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছে। নিরাপত্তার দাবিতে তাদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মন্দির ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যারা শান্তিপূর্ণভাবে সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা বা হয়রানি করা চলবে না বরং তাদের কথা শুনতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমঅধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ব্যক্তিগতভাবে এই সময়টা আপনি কীভাবে কাটাচ্ছেন? আপনার মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হচ্ছে, নাকি নির্বাসিত জীবন বেশ সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে?

শেখ হাসিনা: দীর্ঘ সময় ধরেই আমার জীবনে ব্যক্তিগত বলে আলাদা কিছু নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। ১৯৭৫ সালে আমি সবকিছু হারিয়েছি। তারপরও আমাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। পরে দেশে ফিরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াই করেছি। আজ আবার বাংলাদেশ একটি কঠিন সময় পার করছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি সেখানে থাকতে পারছি না এটাই আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।

আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে বাংলাদেশে। যে মাটিতে আমার বাবা শায়িত, যে দেশের মাটির সঙ্গে আমার পরিবারের রক্ত মিশে আছে, যে দেশের মানুষের জন্য আমি সারাজীবন কাজ করেছি। নিজের দেশের মানুষের থেকে দূরে থাকা, নিজের মাটির গন্ধ থেকে দূরে থাকা, এবং প্রতিদিন আমার নেতা-কর্মীদের কষ্টের খবর শোনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

আজ আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে অনেক বড় বিষয় হলো বাংলাদেশের মানুষের অধিকার। দূর থেকেও আমি প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। আমাদের নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর নিই। নির্যাতিত পরিবারের গল্প শুনি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমার সংগ্রাম থেমে নেই।

আমার শক্তি বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং জাতির পিতার আদর্শ। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে আমি প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছি । আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। জনগণের শক্তিতে আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। আমি সেই সংগ্রামের সঙ্গেই আছি এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকব।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

Sunday, February 15, 2026

আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন -সাক্ষাৎকারে রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রুমিন ফারহানা ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরে দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর বিপরীতে বিএনপি সমর্থন দিয়েছিল মিত্র দলের এক প্রার্থীকে। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর গ্রামে নিজ বাসায় প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন আলোচিত এই নারী প্রার্থী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভংকর কর্মকারবদর উদ্দিন

প্রথম আলো: শুরুতেই এই বিজয়ের বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই।

রুমিন ফারহানা: প্রথমেই আমি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আমাকে মাঠে টিকে থাকার শক্তি ও সাহস দিয়েছেন। আমার এলাকার নেতা–কর্মী ও আসনের প্রত্যেক ভোটারের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁরা আমাকে সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন। তাঁরা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন; শ্রম দিয়েছেন। একেকজন কর্মী কতটা কষ্ট করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দিনের পর দিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাননি। এই জয় আমার একার নয়, এটি আমার নেতা–কর্মীদের জয়। এমনকি যাঁরা আমাকে ভোট দেননি, কঠোর সমালোচনা করেছেন বা অশোভন ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তাঁদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁদের আচরণ অনেক সাধারণ মানুষকে আমার পক্ষে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার আসনের প্রায় পাঁচ লাখ ভোটারের প্রত্যেকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
প্রথম আলো: ভোট নিয়ে আপনার সন্তুষ্টি কতটা?

রুমিন ফারহানা: আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া এই এলাকায় সুষ্ঠু ভোট সম্ভব হতো না। প্রশাসন পুরোপুরি আমার বিপক্ষে ছিল। প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বিএনপির জোটের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করেছে। শুরু থেকেই প্রশাসন আমার সঙ্গে বৈষম্যমূলক, অবমাননাকর আচরণ করেছে। বিএনপির নেতা–কর্মীরা সমানে আইন ভঙ্গ করলেও প্রশাসন চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। প্রশাসন কানা–বোবা হয়ে ছিল। তবে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকায় না থাকলে আমি ভোট করতে পারতাম না। পুলিশও সহযোগিতা করেছে। যেখানেই অনিয়ম হয়েছে, আমি সেনাবাহিনীকে জানিয়েছি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে। কেউ আমার কাছে কোনো অনৈতিক সুবিধা দাবি করেনি, আমিও কাউকে কিছু দিইনি।
প্রথম আলো: আপনি বিএনপির রাজনীতি করতেন। দল মনোনয়ন না দেওয়ায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করলেন। ধানের শীষে নির্বাচন না করায় ভোটের মাঠে কি কোনো প্রভাব পড়েছিল?

রুমিন ফারহানা: নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তার কারণ, গত ১৮ মাসে বিএনপি যা করেছে, আমি যদি তাদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতাম, সেই কর্মকাণ্ডের দায় আংশিকভাবে আমার ওপরও আসত। তবে আমি ওই সময় প্রকাশ্যে অনেক বিষয়ে সমালোচনা করেছি। ফলে দল মনোনয়ন না দেওয়াটা আমার জন্য এক অর্থে আশীর্বাদই হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত কাজ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও এলাকার মানুষের আস্থা—এসব মিলিয়েই আমি জয় পেয়েছি। বিএনপির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকাটা আমার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে বলেই মনে করি।

প্রথম আলো: নির্বাচনের সময় আপনাকে ও আপনার সহযোগীদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে দল ফেরাতে চাইলে আপনার অবস্থান কী হবে?

রুমিন ফারহানা: এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কিছু ভাবিনি। সময়ই সিদ্ধান্ত দেবে।
প্রথম আলো: আপনার জয়ে নারী ভোটারদের ভূমিকা কতটা ছিল?

রুমিন ফারহানা: নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেকে বলছেন, স্বামী হয়তো অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন, তবে স্ত্রী বলেছেন, তিনি আমাকে ভোট দেবেন। আমি নারী ভোটারদের আশ্বাস দিয়েছি, তাঁরা সহজে আমার কাছে আসতে পারবেন; নিজেদের সমস্যা জানাতে পারবেন এবং আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াব, যা অন্য অনেক প্রার্থীর পক্ষে কঠিন। নারীরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। বলা যায়, তাঁদের একচেটিয়া সমর্থন আমি পেয়েছি। তাই তাঁদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাও অনেক বেশি।
প্রথম আলো: ভোটের প্রচারণায় আপনি অনেক সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে যদি বলেন...

রুমিন ফারহানা: গত দুই সপ্তাহে আমার এলাকায় ৪০-৫০টি কর্মসূচি হয়েছে। সপ্তাহে দু-তিনটিও হয়েছে। একটি টাকাও নেতা–কর্মীরা আমার কাছ থেকে নেননি। নির্বাচনের সময় দরিদ্র মানুষ এক হাজার টাকা এনে দিয়েছেন। মধ্যবিত্তরা এক-দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। অনেক প্রান্তিক মানুষ তাঁদের এক বছরের সঞ্চয় এনে দিয়েছেন। আমি নিতে চাইনি, তবু তাঁরা জোর করে দিয়েছেন। এ কারণে আমি বলি, আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন।
প্রথম আলো: সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার কাজের তালিকায় অগ্রাধিকার কী থাকবে?

রুমিন ফারহানা: আমার প্রথম অগ্রাধিকার অবকাঠামো, বিশেষ করে রাস্তাঘাট। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। আমাদের এখানে গ্যাসক্ষেত্র আছে, কিন্তু অনেকের ঘরে গ্যাস নেই। আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ গ্যাস পাবে, এটা নিশ্চিত করতে চাই। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দির-মসজিদসহ শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন করতে চাই। আশুগঞ্জ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে গ্যাস, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও বন্দর আছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই, যাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
প্রথম আলো: সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা সদরকে পৌরসভা করার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাবে?

রুমিন ফারহানা: অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাই।
প্রথম আলো: এবারের সংসদেও নারী প্রতিনিধিত্ব কম থাকছে। নারীর অধিকার ও সম–অধিকার নিয়ে আপনি কতটা সোচ্চার থাকবেন?

রুমিন ফারহানা: আমি অবশ্যই সোচ্চার থাকব। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে কারও অধিকার কেউ কাউকে এনে দেয় না, অর্জন করে নিতে হয়। ধরুন, আমাকে তো দল মনোনয়ন দেয়নি। দল কি জানত না, আমার এলাকায় আমার কী অবস্থান? আর যদি না জেনে থাকে, সেটা দলের ব্যর্থতা। কিন্তু দল মনোনয়ন দেয়নি। আমাকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছে আল্লাহ্‌র ওপর ভরসা করে; মানুষের ওপর ভরসা করে। বিএনপি নারীদের বিষয়ে খুব সম–অধিকারের কথা বলে। আমরা তো দলে এ কারণেই গিয়েছিলাম যে নারী হিসেবে আমি বৈষম্যের শিকার হবে না। তারা কেন ৩ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেয়? বিএনপিতে নারীদের এই অবস্থান জানলে আমি কখনোই বিএনপি করতাম না।
প্রথম আলো: জাতীয় সংসদে আপনি স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে থাকবেন। সরকারি দলে থাকলে কি সুবিধা বেশি হতো?

রুমিন ফারহানা: আমি তা মনে করি না। বরাদ্দ সবার জন্য সমান। সততার সঙ্গে কাজ করতে চাইলে স্বতন্ত্র হিসেবেও সম্ভব। কেউ যদি অযথা বাধা দেন, তার জবাব জনগণ দেবে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
রুমিন ফারহানা: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

রুমিন ফারহানা
রুমিন ফারহানা

Thursday, February 12, 2026

সবাই সরকারে চলে এলে দেশ চলবে কীভাবে : -ডয়চে ভেলেকে তারেক রহমান

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের পর তাঁরা এককভাবে সরকার গঠনে সক্ষম হবেন বলে আশা করছেন। জার্মানির সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎকারে তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং গুম-খুনের বিচার নিয়েও কথা বলেছেন। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে মায়ের মৃত্যু এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি—দুটোর সামঞ্জস্য রাখাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে জানান তারেক রহমান

প্রশ্ন: ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট৷ তো এই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে বলে আপনি আশাবাদী?

তারেক রহমান: আমরা আশা করছি যে নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে। মানুষেরও তা–ই প্রত্যাশা। আমরা আশাবাদী।
প্রশ্ন: ১৭ বছর পর আপনি এই বাংলাদেশে এসেছেন। আপনি নির্বাসনে ছিলেন নানা কারণে। এই ১৭ বছর পর আসার পরে আপনার দল গোছানো নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটা ছিল?

তারেক রহমান: চ্যালেঞ্জটা হয়তো কিছুটা খুব সম্ভবত আমারই ছিল। এত বছর পরে এসেছি, আসার পরে মানুষের চোখেমুখে একটা প্রত্যাশা দেখেছি। এটা হলো রাজনৈতিক দিক, অন্যদিকে আসার পাঁচ দিন পরেই আম্মা মারা গেলেন। উনি অসুস্থ ছিলেন অনেক দিন ধরে। স্বাভাবিকভাবে এটাও একটা খুব কষ্টকর বিষয় আমাদের সবার জন্য। আমরা পরিবার যে একসাথে বসে নিজেদের কষ্টটা ভাগ করে নেব, সেই সুযোগটা বা সময়টা হয়নি। কারণ, আমরা একদম নির্বাচনের ডামাডোলের ভেতরে। একদিকে নির্বাচনী ডামাডোল অন্যদিকে ব্যক্তিগত বিষয়টা—দুটোর সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এটাই আসলে আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে হয়তো এই চ্যালেঞ্জটা মোটামুটিভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি আমি।
প্রশ্ন: এবার তো অনেক ভোটার যাঁরা হচ্ছেন তরুণ এবং প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। গত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত নির্বাচন আপনি জানেন। ফলে মানুষের মধ্যে একটা বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। তরুণদের আগ্রহী করতে বা তরুণদের কাছে পৌঁছাতে, আপনার দলের পক্ষ থেকে কি আলাদা করে বা বিশেষ করে কোনো কিছু করা হয়েছে, যেটাতে তরুণেরা একটু আকৃষ্ট হতে পারেন?

তারেক রহমান: দেখুন, আপনি যদি আমাদের মেনিফেস্টোটা দেখে থাকেন, যেটা আমরা কয়েক দিন আগে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছি, সেখানে কিন্তু আমরা সমাজের তরুণদের জন্য, একইভাবে এখানে বয়স্ক যাঁরা আছেন, তাঁদের জন্য, একই সাথে দেশে যে ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী আছেন, তাঁদের জন্য, একই সাথে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক যে নারী, তাঁদের ক্ষমতায়নের জন্য আমরা পরিকল্পনা রেখেছি, কর্মসূচি রেখেছি, বিশেষ করে শুধু তরুণদের জন্য না, সবার জন্য। কারণ, দেশটা গঠন করতে হবে সবাইকে নিয়ে।
প্রশ্ন: জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং তার পর থেকে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমশ অবনতি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। এই যে সম্পর্ক এবং অতীতে দেখা গেছে যে গত এক দশকে অনেকে মনে করেন যে ভারতের সঙ্গে বিএনপির একটা দূরত্ব রয়ে গেছে এবং সেই দূরত্বটা ঘোচানো যায়নি। ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কী হবে?

তারেক রহমান: দেখুন, আপনি যেটা বললেন যে দেখা গেছে যে বিএনপির সাথে তাদের একটা দূরত্ব আছে। অবশ্যই আমরা যদি দেখি যে এমন কোনো চুক্তি হচ্ছে, যেটা বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী, বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী, সেটা যেকোনো দেশের সাথেই হোক না কেন তাদের সাথে স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব হবে। কারণ, আমি তো প্রতিনিধিত্ব করি আমার দেশের মানুষকে। কাজেই যেকোনো দুই দেশের মধ্যে যদি কোনো চুক্তি হয়, যেটা আমার দেশের স্বার্থের সাথে যাবে না, সে ক্ষেত্রে যে কারও সাথেই আমাদের এ রকম দূরত্ব হতে পারে।
প্রশ্ন: ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে যে চীনের একটা বাড়তি আগ্রহ আছে বাংলাদেশ নিয়ে। আপনাদের কি চীনের জন্য আলাদা কোনো নীতি বা কোনো পদক্ষেপ আছে?

তারেক রহমান: বর্তমান বিশ্বে যদি আমরা চিন্তা করি আমাদের সাথে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক থাকবে, আমরা একা বসবাস করতে পারব না। গ্লোবাল ভিলেজ বলা হয় এখন পৃথিবীকে। কাজেই আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা–বাণিজ্য করবে। আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন দেশে যাবে চাকরি–বাকরি বিভিন্ন কারণে। কাজেই আমার দেশের স্বার্থ যেখানে বজায় থাকবে, দেশের মানুষের স্বার্থ যেখানে বজায় থাকবে, আমাদের সাথে তাদের সম্পর্ক ভালো হবে।
প্রশ্ন: একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে আপনি কয়েক দিন আগেই বলেছেন যে বিএনপি কোনো রকম ঐক্যের সরকার বা জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা নেই জামায়াতের সঙ্গে৷ কিন্তু জামায়াত বলছে যে তারা যদি সুযোগ পায় তারা বিএনপির সঙ্গে এখনো ঐক্যের সরকার করতে রাজি এবং তারা আমন্ত্রণ জানাবে। সে ক্ষেত্রে কি আপনি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন?

তারেক রহমান: আমরা কনফিডেন্ট যে ইনশা আল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের রায় আমরা পাব৷ আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হব—এককভাবে। সে ক্ষেত্রে তো কাউকে অপজিশনে থাকতে হবে। কারণ, একটা ব্যালেন্সড রাষ্ট্র যদি হতে হয়, ব্যালেন্সড সরকার যদি হতে হয়, তাদের সে ক্ষেত্রে অপজিশনে থাকতে হবে কাউকে। সবাই সরকারে চলে এলে কেমন করে দেশ চলবে?
প্রশ্ন: বাংলাদেশে প্রায় ১৩ কোটি ভোটার এবং তার অর্ধেকের মতোই নারী। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছেন, তার মধ্যে নারীর সংখ্যা খুবই কম এবং এটা নিয়ে একটা আলোচনা হচ্ছে দেশে–বিদেশে যে নারীকে কেন এতটা কম সুযোগ দেওয়া হচ্ছে ভোটের রাজনীতিতে? কারণ, যে জুলাই বিপ্লবের কথা বলা হয়, গণ–অভ্যুত্থানের কথা বলা হয়, সেখানেও তাঁরা বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন। বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

তারেক রহমান: বিষয়টাকে আমি অন্যভাবে দেখি। বেগম খালেদা জিয়া যখন এর আগে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন উনি একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন এবং সেটা হচ্ছে মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা। ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত উনি ফ্রি করে দিয়েছিলেন। এটি হচ্ছে নারী সমাজকে এমপাওয়ার করার প্রথম একটি পদক্ষেপ৷ অর্থাৎ আপনি একজনের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করলেন। আমরা সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে নারীদের এই শিক্ষার সুযোগটা আরও হায়ার ক্লাস পর্যন্ত আমরা নিয়ে যাব। এটা হলো এক নম্বর। দ্বিতীয়ত, আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন বা জানেন আমরা দেশের প্রত্যেক হাউসওয়াইফ–এর জন্য, বিশেষ করে শুরু করব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর থেকে, আমরা একটি ফ্যামিলি কার্ড দিতে চাই, যার মাধ্যমে আমরা তাকে একটি রাষ্ট্র বা সরকার থেকে একটা সহযোগিতা দেব। এই ফ্যামিলি কার্ডটা যখন পাবে, মানসিকভাবে সে এমপাওয়ার্ড ফিল করবে এবং সহযোগিতা যখন বজায় থাকবে, আস্তে আস্তে অর্থনৈতিকভাবে সে স্বাবলম্বী হবে। একদিকে আমরা চেষ্টা করছি নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে। একই সাথে আমরা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছি৷ আমরা শুধু কথার কথা বলে কিছু নমিনেশন বা কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কিছু নারীকে দিয়ে দিলাম না৷ কিন্তু আপনি যদি সত্যিই নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলেন তা এভাবে আনতে হবে। তাদের শিক্ষা এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে। আমরা চাইছি শিক্ষার পাশাপাশি নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে৷ তাহলে সে তার নিজ যোগ্যতাতেই যেকোনো পর্যায়ের নির্বাচন হোক—স্থানীয় হোক বা জাতীয় নির্বাচন, সে তার নিজ যোগ্যতাবলে নমিনেশন আদায় করেই নিতে সক্ষম হবে। বিষয়টিকে আমরা লংটার্মে নিয়ে যেতে চাইছি। ধীরে ধীরে স্থায়ীভাবে জিনিসটাকে গড়ে তুলতে চাইছি আমরা।
প্রশ্ন: আমরা যখন কথা বলি নারী ভোটারদের সঙ্গে, তাদের কারও কারও মধ্যে একধরনের ভয় বা উৎকণ্ঠাও কাজ করছে যে ১২ তারিখের পরে কী হবে, তারা কতটা নিরাপদ থাকতে পারবেন বা তাদের ওপরে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ হবে কি না, তাদের জীবন সংকুচিত করার কোনোরকম পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না৷ এ রকম একধরনের ভয়, একধরনের উৎকণ্ঠা কাজ করছে৷ তাদের উদ্দেশে আপনার কি কোনো বার্তা আছে?

তারেক রহমান: আপনি যে বিষয়গুলো বললেন এটি অবশ্যই আমাদের পক্ষ থেকে নয়। এটি বাংলাদেশে কিছু কিছু অন্য রাজনৈতিক দল আছে যাদের বিভিন্ন কথাবার্তা বা সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের বিভিন্ন স্টেটমেন্টের মাধ্যমে এই ধারণাগুলো জন্ম নিয়েছে মানুষের মাঝে বা নারীদের মাঝে। আমরা সব সময়ই নারীদের এম্পাওয়ারমেন্ট এর কথা বলেছি৷ কারণ, আমরা যত যাই পরিকল্পনা করি না কেন, যখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হয়ে থাকেন, তাদের আলাদা রেখে আমরা দেশকে সামনে নিতে পারব না। আমাদের সকলকে নিয়েই সেটি করতে হবে। সে জন্যই আমরা তাদের শিক্ষার আরও এমন ব্যবস্থা করতে চেয়েছি, যাতে তারা আরও উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে সহজে। আমরা এমন ব্যবস্থা করতে চাইছি, যাতে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে৷ অর্থাৎ তাদের কনফিডেন্স আমরা আরও স্ট্রং করতে চাইছি৷ তাদের আত্মবিশ্বাসটা আমরা দৃঢ় করতে চাইছি৷ শুধু তা–ই নয়, আমরা এরই মধ্যে বলেছি যে আমরা দেশে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে আমরা দেশে এমন শিল্পও নিয়ে আসতে চাই, যেখানে নারীরা তাদের কর্মসংস্থান বেশি হবে। কর্মসংস্থানে নারীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে, সেই জন্য কেয়ার সেন্টারসহ অন্যান্য বিষয়গুলো আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে। আমরা এটাও বলেছি যে নারীরা যাতে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে, ঢাকা শহরসহ বড় শহরগুলোতে আমরা নারীদের জন্য ইলেকট্রিক বাস ইন্ট্রোডিউস করব, যেটা শুধু নারীরাই ব্যবহার করবে এবং সেই বাস পরিচালনাও করবে নারীরা। কাজেই আমাদের দলীয় অবস্থান থেকে আমরা পরিকল্পনা রেখেছি যেগুলো আমরা ইনশা আল্লাহ বাস্তবায়ন করব সুযোগ পেলে যাতে করে নারীরা তাদের জন্য যত বেশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
প্রশ্ন: গণ–অভ্যুত্থানের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না এবং কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এ রকম মত দিচ্ছেন যে আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় এই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। এই বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

তারেক রহমান: দেখুন এটা তো পুরো রাজনীতি৷ আমরা রাজনীতি করি মানুষের জন্য, মানুষের সমর্থন নিয়ে৷ কাজেই আমি মনে করি, রাজনীতিতে মানুষ যাকে গ্রহণ করবে তাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না৷ আর যাকে মানুষ গ্রহণ করবে না, যত শক্তিই থাকুক না কেন, শক্তি প্রয়োগ করে সে ধরে রাখতে পারে না, ৫ অগাস্ট যার উদাহরণ৷
প্রশ্ন: দুর্নীতি দমনের যে উদ্যোগের কথা আপনি বলছেন এবং আপনার ম্যানিফেস্টোতে সেটা রয়েছে, ইশতেহারে রয়েছে৷ কিন্তু টিআইবি এবং একাধিক সংগঠন নানা রকম পরিসংখ্যান দিচ্ছে এবং তাতে দেখা যাচ্ছে যে বিএনপির বেশ কয়েকজন প্রার্থী ঋণখেলাপি৷ তারা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে তারপরে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এবং অনেকে আছেন যাঁরা ঋণগ্রস্ত৷ এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?

তারেক রহমান: দেখুন দুর্নীতি এবং ঋণগ্রস্ত বা ব্যাংক ডিফল্ট দুটো ভিন্ন জিনিস৷ আমাদের দলের লক্ষ নেতা–কর্মীর নামে বিগত স্বৈরাচার সরকার কেস দিয়েছিল৷ আমাদের দলের মধ্যে যাঁরা আছেন, যাঁরা আমাদের দলীয় রাজনীতির সাথে আছে, যারা ব্যবসা–বাণিজ্য করে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে৷ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে৷ তাদের ব্যবসা–বাণিজ্য চলতে দেওয়া হয়নি৷ তাদের বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে৷ তাঁদের ন্যায্য ব্যাংক লোন যেটা আছে সেটা তাঁদের দেওয়া হয়নি৷ কাজেই এ রকম একটি অবস্থার মধ্যে আমাদের লোকজন, আমাদের ব্যবসায়ীরা, আমাদের নেতা–কর্মীরা যাঁরা ব্যবসা–বাণিজ্য করতেন, তাঁদের জন্য তো এ রকম ডিফল্ট হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার৷ দুর্নীতি এবং ডিফল্ট হয়ে যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক তো নেই৷ দুটো একদম ভিন্ন জিনিস৷
প্রশ্ন: সম্পূর্ণভাবে গণ–অভ্যুত্থানের কথা আপনি যেটা বলছেন যে বিএনপির অনেক নেতা–কর্মী হতাহত হয়েছেন বলে আপনার দল থেকে জানানো হয়েছে৷ গত ১৫-১৬ বছরে গুম খুনের শিকার হয়েছেন অনেকে৷ যারা ভুক্তভোগী, তাদের পরিবারকে বা তাদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

তারেক রহমান: অবশ্যই আমাদের পরিকল্পনা আছে, কারণ আমাদের নেতা–কর্মীরা যে রকম গুম–খুনের শিকার হয়েছেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল যাঁরা আমাদের সাথে আন্দোলন–সংগ্রামে ছিলেন, তাঁরা গুম–খুনের শিকার হয়েছেন। হয়তো সংখ্যা কমবেশি হবে৷ এমনকি অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা রাজনীতির সাথে জড়িত না৷ কিন্তু তাঁরা অত্যাচার–নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, গুম–খুনের শিকার হয়েছেন৷ এটি একটি অন্যায় ব্যাপার৷ একটি সভ্য দেশে মানুষ গুম হয়ে যাবে, দেশের মানুষ খুন হয়ে যাবে কিন্তু তার কোনো বিচার হবে না, এটা তো হতে পারে না৷ কাজেই দেশের আইন অনুযায়ী অবশ্যই প্রত্যেকটা মানুষ কারও সাথে যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাঁর বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।

ডয়চে ভেলেকে সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান

Wednesday, February 4, 2026

শেখ হাসিনাকে ছাড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগোনো উচিত: মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আরও বেশি নির্ভর করছে অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের ওপর। তাদের মধ্যে অন্যতম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিবারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং দলের একজন জ্যেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কসুলভ নেতা। শেখ হাসিনা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট করেছেন, নির্বাচন-পরবর্তী কোনো জোটে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দ্য উইক’কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বিএনপির সংস্কার এজেন্ডা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দলের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ এখানে প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো-

আর মাত্র কয়েক দিন দূরে নির্বাচন। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ভোট নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
বাংলাদেশের মানুষ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। প্রায় ১৫ বছর ধরে নাগরিকরা কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী একটি পুরো প্রজন্ম আছে, যারা কখনো সত্যিকারের ভোট দেয়ার অভিজ্ঞতা পায়নি। ফলে ভোটারদের মধ্যে সেই অধিকার প্রয়োগের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমার বিশ্বাস ভোটার উপস্থিতি ভালোই হবে। বড় ধরনের কোনো অস্থিরতা বা গুরুতর প্রতিবন্ধকতা হবে বলে আমি মনে করি না, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। নির্বাচন কমিশন দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে। সরকারও নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে। আমাদের উপমহাদেশে নির্বাচনী প্রচারের সময় কিছু সমস্যা থাকেই। কিন্তু সেগুলো এমন নয় যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে, সবকিছুই ভোটের জন্য প্রস্তুত।

নির্বাচনের আগে বা পরে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের জোট নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
১৫ বছর ধরে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা বাম ও ডান- উভয় ধারার বেশ কয়েকটি সমমনা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট গড়ে তুলেছিলাম। মোটামুটি ২০ থেকে ২৪টি রাজনৈতিক দল সেই আন্দোলনে বিএনপির পাশে ছিল। আমরা যখন আমাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব ঘোষণা করি, তখনই স্পষ্ট করে বলেছিলাম- সরকার গঠন করতে পারলে সেই আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে থাকা দলগুলোর অংশগ্রহণে একটি ঐকমত্যভিত্তিক সরকার হবে। সেই অঙ্গীকার এখনো বহাল আছে। তবে যারা সেই সংগ্রামের অংশ ছিল না, তারা এতে অন্তর্ভুক্ত হবে না।

এর মধ্যে কি জামায়াতে ইসলামিও রয়েছে?
না। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের কোনো সমঝোতা নেই এবং আমি জামায়াতকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো জাতীয় সরকারের অংশ হিসেবে দেখছি না।

ছাত্রদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বিএনপি কেন জোট করল না?
আমরা চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এনসিপি বিপুল সংখ্যক আসন দাবি করেছিল, যা বাস্তবসম্মত ছিল না। আমরা নিশ্চিত যে আমাদের প্রার্থীরা ওই আসনগুলোতে জিততে পারবেন। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন প্রতীক নিয়ে এনসিপির প্রার্থীরা জিততে পারবেন কি না, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রতীকের গুরুত্ব অনেক।

এই নির্বাচন ভিন্ন রকম, কারণ আওয়ামী লীগ এতে অংশ নিচ্ছে না।
আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে এটুকু জানি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আগে যুক্ত ছিলেন এমন কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, শেখ হাসিনা নিজেই তার দলকে নির্বাচনে অংশ না নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মানুষ ভোট দিতে প্রস্তুত। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। আদর্শগতভাবে তাদের নতুন নেতৃত্ব ও নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে ফিরে আসা উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। এখন আর সেই সুযোগও নেই। কারণ শেখ হাসিনা দলের ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের সুযোগ দেন না।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এতে বিশাল উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। তার প্রত্যাবর্তনে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে প্রকৃত উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। তার প্রথম ভাষণেই তিনি মানব উন্নয়নকেন্দ্রিক একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষকের কল্যাণ এবং কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রস্তাবিত ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি উপকরণের ন্যায্য মূল্য এবং উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। তিনি ১৮ মাসের মধ্যে অন্তত এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থান তৈরির অঙ্গীকার করেছেন এবং তা বাস্তবায়নের পথ নকশাও তুলে ধরেছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তার আরেকটি মূল প্রতিশ্রুতি। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখা এবং প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। শিক্ষা সংস্কারে প্রয়োজনভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা এবং মেধাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। একটি কার্যকর ও সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

রাজনৈতিক বক্তব্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। কোন কোন বিষয় দ্রুত সমাধান প্রয়োজন?
প্রথমত, শুধু আলোচনা নয়, পানিবণ্টন সমস্যার আন্তরিক সমাধান হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। কোনো সভ্য সমাজে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলো ন্যায্যভাবে পরিচালিত হতে হবে। সাম্প্রতিক ক্রিকেটসংক্রান্ত ঘটনাটি দুঃখজনক ও অপ্রয়োজনীয় ছিল, যা দুই পক্ষেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। বেগম খালেদা জিয়ার শোকের সময়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সফর একটি ইতিবাচক উদ্যোগ ছিল।

ভবিষ্যতে, বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে?
তিনি একটি ফ্যাক্টর, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য নন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়ে এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এই সংকট শেখ হাসিনাই তৈরি করেছেন। দীর্ঘমেয়াদে তিনি রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক তার বাইরেও এবং তাকে ছাড়িয়েও এগোতে পারে। এগোনো উচিত।

সবশেষে, ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও কি বাংলাদেশ পাকিস্তানের ব্যাপারে নরম অবস্থান নিয়েছে?
পাকিস্তানকে অবশ্যই ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে- এটাই আমাদের অবস্থান। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে সব প্রতিবেশী দেশের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201612_Abul-7.webp

Sunday, February 1, 2026

আল–জাজিরাকে শফিকুর রহমান: জামায়াতের আমির পদে নারী সম্ভব নয়

‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’ শিরোনামে প্রচারিত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল–জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন

জামায়াতে ইসলামীর আমির পদে নারী আসা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার আল–জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়েছে।

‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’ শিরোনামে প্রচারিত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল–জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। সাক্ষাৎকারের ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর এবং জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

আল–জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত আমিরের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা, ইসলামিক আইন চালুর বিষয়ে দলের অবস্থান, নারী, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চান।

নারীদের নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির জানান, এবার নির্বাচনে তাঁদের দল থেকে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে তাঁরা এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জামায়াতের প্রধান পদে নারী আসতে পারেন কি না, সে প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি সম্ভব নয়।’ এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেককে তাঁর নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবে না বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে, তাঁরা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিছু শারীরিক অসুবিধা আছে, যা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তিনি কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন? এটি সম্ভব নয়।’

জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশে ইসলামি আইন চালু করা হবে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি দেশের মঙ্গলের জন্য এটি অপরিহার্য হয়, তবে সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এটি আমি নই, সংসদই বিষয়টি স্থির করবে।’ তিনি এটাও বলেন যে তাঁরা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবেন না।

জামায়াতের উত্থান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুজন নেতা দুটি সংবাদমাধ্যম এবং উদীচী ও ছায়ানটের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে এ বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান জানতে চান সাংবাদিক। জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা এটা সমর্থন করেন না, এর নিন্দা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের কোনো অঙ্গসংগঠন নয়; এটি জামায়াতের আইনি কাঠামোর অংশ নয়। মানুষ ভুল করতে পারে, তাকে সংশোধন করতে হবে। যদি তারা এটি পুনরায় করে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জামায়াতে ইসলামীর যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির আমির। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের কেউ কখনো এ ধরনের ভাঙচুর বা হামলায় জড়িত ছিল না। গত ১৫ বছরে যা–ই ঘটেছে, তারা জামায়াতকে দায়ী করেছে, কিন্তু আদালতে কোনো একটি মামলাও প্রমাণিত হয়নি। আগস্টের অভ্যুত্থানের পরের হামলা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টটিও আমি প্রত্যাখ্যান করছি। এগুলো সব মিথ্যা অপপ্রচার।’

১৯৭১ সালে বাঙালির ওপর চালানো নৃশংসতার ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন দলটির আমির। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের নেতারা মনে করেছিলেন ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সেটি বাংলাদেশের ওপর ভারতের আরেকটি আধিপত্য তৈরি করবে।’ এ পর্যায়ে আল–জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত–সংশ্লিষ্ট আধা সামরিক বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ থাকার কথা উল্লেখ করেন। তার জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সেই বাহিনীগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, কোনো সংগঠনের দ্বারা নয়। যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তবে স্বাধীনতার পর কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হয়নি? শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করেছিলেন, যারা সবাই ছিল পাকিস্তানি সেনা; এই ভূখণ্ডের কেউ নয়।’

ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করলে জামায়াত কী করবে, সে প্রশ্নে দলটির আমির বলেন, ‘আমরা ভারতের সাথে ফলপ্রসূ সংলাপ করব। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, আমরা প্রতিবেশীদের কোনো অস্বস্তিতে ফেলব না এবং বিনিময়ে তাদের কাছ থেকেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আশা করি।’

তরুণ প্রজন্ম জামায়াতকে গ্রহণ করবে বলে আশাবাদী শফিকুর রহমান। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে শিক্ষার্থীরা আমাদের ছাত্রসংগঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, তরুণদের মর্যাদা ও অধিকার আমাদের মাধ্যমেই রক্ষিত হবে।’

শফিকুর রহমান
শফিকুর রহমান। আল–জাজিরার ভিডিও থেকে

Thursday, January 1, 2026

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে জাপানের প্রতি আহ্বান মাহমুদ আব্বাসের

আসাহি সিম্বুনকে সাক্ষাৎকারঃ ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আশা করছেন ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে জাপান এবং গাজা উপত্যকার পুনর্গঠনে অবদান রাখবে। এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরও জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন শান্তি উদ্যোগ এবং দীর্ঘ দুই বছরের সংঘর্ষে বিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৯০ বছর বয়সী আব্বাস ২৫ ডিসেম্বর পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে জাপানের আসাহি শিম্বুন-এর সাংবাদিককে বলেন, আমরা চাই আপনাদের সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিক। আমার মনে হয় না এতে অস্বীকৃতির কোনো কারণ আছে। এই স্বীকৃতি ইসরাইলের বিরুদ্ধে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির স্বার্থে।

গত ১০ই অক্টোবর ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটি ছিল কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাথে তার প্রথম এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করার কথা রয়েছে। জিম্মি ও বন্দি বিনিময়কে কেন্দ্র করে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ প্রায় সমাপ্ত বলে ধরা হচ্ছে। এখন পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নিতে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা। এতে সম্ভাব্য আলোচ্যসূচির মধ্যে রয়েছে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি বোর্ড অব পিস বা অন্তর্বর্তী শাসন কাঠামো গঠন, গাজায় নিরাপত্তা ও যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স মোতায়েন।

এই উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানালেও আব্বাস বলেন, এসব পদক্ষেপ অবশ্যই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সম্মতি এবং তার সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান বজায় রেখে বাস্তবায়িত হওয়া উচিত।

যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও ইসরাইলি হামলায় আরও ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। ফলে গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। এখনও কিছু সীমান্ত পারাপার বন্ধ রয়েছে এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বিরাজ করছে। তিনি ট্রাম্প এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করলেও গাজার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বলেন, ক্রমাগত নিয়ম লঙ্ঘন, বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা- এসবই এই চুক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আব্বাস জানান, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে গাজা শাসন ‘বৈধ ফিলিস্তিনি সরকার’-এর হাতে ফিরিয়ে আনার পক্ষে তারা প্রস্তুত অর্থাৎ হামাসের শাসনের অবসান চান তিনি। ২০০৭ সাল থেকে গাজা কার্যত হামাসের নিয়ন্ত্রণে। আর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসন সীমিত কেবল পশ্চিম তীরেই। তিনি বলেন, এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন এবং এক বৈধ অস্ত্র- এই নীতির ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষই বৈধ শাসন কাঠামো। হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি না থাকলেও তিনি বলেন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং তাদের শাসনের অবসান শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের অপরিহার্য অংশ। শান্তি পরিকল্পনায় গাজার ভবিষ্যৎ শাসন যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে যাবে- এমন নিশ্চয়তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, যা ফিলিস্তিন ও আরব দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়- যুদ্ধবিরতির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে দক্ষিণ ইসরাইলে গঠিত সিভিল-মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (সিএমসিসি)। প্রায় ৫০টি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধি থাকলেও সেখানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আব্বাস বলেন, সিএমসিসি-এর ক্ষেত্রে আমরা স্পষ্ট করছি, যে কোনো পুনর্গঠন বা সমন্বয় কাঠামো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকাকে সম্পূরক হবে, বিকল্প নয়। কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটানো স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সফলতার সম্ভাবনা দুর্বল করে। বোর্ড অব পিস কাজ চালিয়ে যাবে- যতদিন না ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সুশাসন, আইনের শাসন ও স্বচ্ছতাসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে, যা আন্তর্জাতিক মহল দাবি করে আসছে। তিনি একটি ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০০৬ সালের পর থেকে নির্বাচন না হওয়ায় ফিলিস্তিনি আইন পরিষদের দ্রুত নির্বাচন আয়োজনেরও আহ্বান জানাচ্ছে। আব্বাস তার পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হবে। তবে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। এক কর্মকর্তা জানান, দুই বছরের সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হওয়ায় ভোটার নিবন্ধন ও যাচাইয়ে সময় লাগবে। ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান করলে এ কাজ সম্ভব নয়। শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী কোনোভাবেই সরাসরি, পরোক্ষ বা অন্য কোনোভাবে গাজার শাসনে অংশ নেবে না।

আব্বাস পরিষ্কার করেন, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী শাসন বা প্রশাসনে অংশ নিতে পারবে না। তবে হামাস রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হলে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খোলা রয়েছে। তিনি বলেন, যে কোনো ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর জন্য রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক জীবনে অংশগ্রহণের দরজা খোলা। শর্ত শুধু একটাই- তারা যেন রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়ে ফিলিস্তিনি আইন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চলে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইল পশ্চিম তীরেও অভিযান জোরদার করেছে, পাশাপাশি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলাও বেড়েছে। আব্বাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বলেন, বসতি সম্প্রসারণ, কার্যত ভূমি দখল এবং বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসী হামলা- এসবই আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে নস্যাৎ করার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা। প্রায় ১৬০টি দেশ দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি জানালেও, সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে বৃটেন, কানাডা ও ফ্রান্স স্বীকৃতি দেয়।

mzamin

Saturday, November 29, 2025

তিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার: ছাত্র–জনতা হত্যাকাণ্ডে ক্ষমা চাইলেন না শেখ হাসিনা

গত বছর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার একযোগে শেখ হাসিনার তিনটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারগুলো প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট। সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয়েছে ই–মেইলে।

সাক্ষাৎকারগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যায় তাঁর দায়, আসন্ন নির্বাচন, দেশে ফেরা, ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে লিখিত প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এগুলোই পলাতক জীবনে তাঁর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকার।

তিনটি সাক্ষাৎকারেই শেখ হাসিনা একই ভাষায় কথা বলেছেন। নিজে কোনো কিছুর দায় নেননি, কোনো কিছুর জন্যই অনুশোচনা করেননি। ছাত্র-জনতার হত্যার জন্য মাঠপর্যায়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়ী করেছেন। এমনকি গণ–অভ্যুত্থানকে ‘সহিংস বিদ্রোহ’ দাবি করে এর দমনকে সাংবিধানিক অধিকার বলেও বর্ণনা করেছেন তিনি।

আবার নিজে পরপর তিনটি একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চেয়েছেন। নিজে প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বিভেদ বাড়ালেও এখন বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে দেশে বিভেদ বাড়বে।

ক্ষমা চাইতে অস্বীকার

দ্য ইনডিপেনডেন্ট তাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে বলেছে, ১৫ বছরের বেশি সময় কঠোরভাবে দেশ শাসন করা হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, গত বছর নিহত আন্দোলনকারীদের পরিবারের কাছে তিনি ক্ষমা চাইবেন কি না, তখন হাসিনা বলেন, ‘আমি আমাদের জাতি হিসেবে হারানো প্রতিটি সন্তান, ভাই-বোন, আত্মীয় ও বন্ধুর জন্য শোক প্রকাশ করি এবং তা করতে থাকব।’

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা গত বছরের বিক্ষোভ দমনের সময়কার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন। তবে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তিগত দায় স্বীকার করেন না, আর ওই আন্দোলন ছিল একটি সহিংস বিদ্রোহ।

শেখ হাসিনার দাবি, বেশিসংখ্যক প্রাণহানির জন্য দায়ী ছিল ‘মাঠপর্যায়ে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন নেতা হিসেবে আমি অবশ্যই সামগ্রিক দায় স্বীকার করি, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে—যে আমি নিজে নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালাতে বলেছিলাম, এটা ঠিক নয়।’

শেখ হাসিনা দাবি করেন, প্রথম দিকের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাঁর সরকারই একটি স্বাধীন তদন্ত শুরু করেছিল, কিন্তু পরে তা বন্ধ করে দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমি ব্যক্তিগতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছি, এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘চেইন অব কমান্ডের মধ্যে কিছু ভুল অবশ্যই হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে, সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত ছিল পরিমিত, সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এবং যতটা সম্ভব প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যে।’ তিনি এ প্রসঙ্গে ইনডিপেনডেন্টকে আরও বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা, যাঁদের সুপ্রতিষ্ঠিত কার্যক্রম পরিচালনাবিষয়ক নির্দেশিকা মেনে চলার কথা ছিল। এসব নির্দেশিকায় বিশেষ পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া ছিল। এমনটা হতে পারে যে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যেগুলো ভুল ছিল।’

নিজের বিচার প্রসঙ্গে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের। শেখ হাসিনাকে ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে, শেখ হাসিনা ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ফলে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, ছাত্র আন্দোলনের সময়ের ১ হাজার ৪০০ মৃত্যুর সংখ্যাটি ‘অতিরঞ্জিত’। তাঁর ভাষায়, ‘এই সংখ্যা ট্রাইব্যুনালের প্রচারণার কাজে লাগে, কিন্তু বাস্তবে তা বাড়িয়ে বলা।’

এ নিয়ে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, ‘যদি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তাতে আমি অবাক হব না বা ভয়ও পাব না। এটি একটি প্রহসনের বিচার, যার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করছে। এই ট্রাইব্যুনাল একটি প্রহসনের আদালত, যেটি পরিচালনা করছে আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে গঠিত একটি অনির্বাচিত সরকার। এই প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকেই আমাকে সরাতে যেকোনো কিছু করতে পারে।’

ইনডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, আদালতে এমন অডিও রেকর্ডিং বাজানো হয়েছে, যেখানে হাসিনাকে বলতে শোনা যায় যে তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে বলছেন। তবে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, এই রেকর্ডিংগুলো প্রসঙ্গের বাইরে কেটে নেওয়া ও বিকৃত করা হয়েছে। হাসিনা এ নিয়ে বলেছেন, ‘সহিংসতা ঘটেছে মাঠপর্যায়ে থাকা কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে, সরকারের আদেশে নয়।’

দ্য ইনডিপেনডেন্ট এ পর্যায়ে মন্তব্য করে বলেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা হবে এবং সম্ভবত তিনি জানেন ইতিহাস তাঁকে সদয়ভাবে বিচার করবে না। যদিও শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সহিংস বিদ্রোহের মুখে দেশ রক্ষায় সাংবিধানিক কর্তব্য পালনের জন্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কোনো নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত নয়।’

শেখ হাসিনা সব দায় অস্বীকার করলেও দ্য ইনডিপেনডেন্ট মন্তব্য করেছে যে গত বছর বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, তা বিশ্বকে শোকার্ত করে তুলেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উপ–আঞ্চলিক পরিচালক বাবু রাম পান্ত তখন বলেছিলেন, বাড়তে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের বিক্ষোভকারী বা ভিন্নমতের প্রতি একেবারেই অসহিষ্ণুতাকে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক তখন বলেছিলেন, ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ বিশেষভাবে দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনেও বলা হয়, বাংলাদেশে গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভ চলাকালে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন, আহত হন কয়েক হাজার। এসব হতাহতের বেশির ভাগ হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে। এটি ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে সহিংস ঘটনা। পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শেখ হাসিনা সরকারকে বিরোধীদের দমন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার ও একতরফা নির্বাচনের জন্য অভিযুক্ত করেছিল।

দেশত্যাগ ও উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে

দেশত্যাগ প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট দেশে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ায় তিনি চলে যান। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘থেকে গেলে আমার জীবন যেমন ঝুঁকিতে পড়ত, আশপাশের মানুষদের জীবনও তেমনি বিপদে পড়ত।’ তবে নির্বাসনে থাকলেও তিনি বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর ভাষায়, ‘শুধু অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই দেশকে ঠিক করতে পারে।’

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো সরকার যদি এমন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়, যেখানে তাঁর দল থাকবে না, তবে তিনি সেই সরকারের অধীনে বাংলাদেশে ফিরবেন না। তিনি ভারতে থাকার পরিকল্পনা করেছেন।’

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ একদিন আবার বাংলাদেশের ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখবে, সরকারে থাকুক বা বিরোধী দলে। আর এই দল পরিচালনার জন্য তাঁর পরিবার দরকার নেই। তিনি বলেন, ‘এটা আমার বা আমার পরিবারের বিষয় নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সংবিধান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর। কোনো ব্যক্তি বা পরিবার দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।’

তবে এ ক্ষেত্রে রয়টার্স উল্লেখ করে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী তাঁর ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ গত বছর রয়টার্সকে বলেছিলেন যে দল চাইলে তিনি নেতৃত্বের কথা বিবেচনা করতে পারেন।

ভোট বর্জন

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে তাদের লাখ লাখ সমর্থক নির্বাচন বর্জন করবে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অবিচারই নয়, এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। পরবর্তী সরকারের অবশ্যই নির্বাচনী বৈধতা থাকতে হবে। লাখ লাখ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। এখন যে অবস্থা রয়েছে, তাতে তারা ভোট দেবে না। আপনি যদি একটি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা চান, তাহলে আপনি লাখ লাখ ভোটারকে বঞ্চিত করতে পারেন না।’

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়া হবে সে আশা প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের অন্যান্য দলকে সমর্থন করতে বলছি না। আমরা এখনো আশা করি, বোধোদয় হবে এবং আমাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হবে।’

আর এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগসহ সব বড় রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা মানে দেশে ভবিষ্যৎ বিভেদের বীজ বপন করা।

গুম নিয়ে কথা বলেননি

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুতির পর তাঁর সমর্থকদের ওপর বড় ধরনের দমন অভিযান চালানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে একটি অভিযানে হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা রাষ্ট্র অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে।

এ নিয়ে রয়টার্স সবশেষে বলেছে, তবে নিজের শাসনামলে গোপন বন্দিশালায় নিখোঁজ হওয়া শত শত মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে শেখ হাসিনা কিছুই বলেননি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-29%2Ftkvckt24%2FUntitled-4.jpg?rect=0%2C0%2C1377%2C918&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গত বছর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Thursday, October 30, 2025

বিদেশি মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার: ক্ষমা চাইবেন না, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে গঠিত সরকারের অধীনে দেশে ফিরবেন না শেখ হাসিনা

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পরিবারের ওপর নির্ভর করবে না। দলটিকে নির্বাচনে অংশ নেয়া নিষিদ্ধ করার পর, লাখ লাখ সমর্থক আগামী জাতীয় নির্বাচন বর্জন করবেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন দলটির নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ওদিকে লন্ডনের ইন্ডিপেন্ডেন্টকে আলাদাভাবে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি গত বছর ছাত্রদের নেতৃত্বে বিক্ষোভের সময় নিহতদের বিষয়ে ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, তার দলকে বাদ দিয়ে যে সরকার গঠিত হবে, এমন যে কোনো সরকারের অধীনে দেশে ফিরে আসবেন না। ভারতেই অবস্থান করবেন। গত বছর ৫ই আগস্ট পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর এবারই প্রথম বিদেশি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিলেন তিনি। তিনি পালিয়ে যাওয়ার পর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে। হাসিনার অপসারণের পর থেকেই বাংলাদেশ শাসন করছেন তারা। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা শুধু অন্যায় নয়, বরং সেলফ-ডিফিটিং। তিনি বলেন, পরবর্তী সরকারে অবশ্যই নির্বাচন-তাৎপর্য থাকা চাই। কোটি কোটি মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাই এ অবস্থায় তারা ভোটে যাবে না। কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য কোটি কোটি মানুষকে নির্বাচন থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

রয়টার্স লিখেছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা সাড়ে ১২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দীর্ঘদিন ধরেই মূল দুই দল। আগামী নির্বাচনে বিএনপিকেই বিজয়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশন মে মাসে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। তার আগে ইউনূস সরকারের অধীনে জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধাপরাধ তদন্তের জন্য ওই দলের সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা আমাদের সমর্থকদের অন্য কোনো দলকে সমর্থন করতে বলছি না। আমরা এখনও আশা করি, সাধারণ বিবেক জয়ের পথে ফিরে আসবে এবং আমাদের দল নিজে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে।

রয়টার্স লিখেছে- তিনি জানালেন না, নিজে কিংবা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে তারা গোপনে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছেন কি না, যাতে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। ইউনূস সরকারের মুখপাত্ররা এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে কমপক্ষে ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন, যা স্বাধীনতার পর থেকে দেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সহিংসতা ছিল। হাসিনা এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি নিজে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ বা অন্যান্য অভিযোগের অপরাধে অংশ নেননি। তিনি বলেছেন, তার দেশে ফেরা এখনো পরিকল্পনায় নেই।

তিনি জানিয়েছেন, দল ভবিষ্যতে- সরকারে হোক বা বিরোধীদলে হোক- ভূমিকা নেবে, এবং দলের নেতৃত্ব তার পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হবে না। তিনি বলেন, এটা আমার বা আমার পরিবারের ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের জন্য যে ভবিষ্যত আমরা সবাই চাই, সেজন্য সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসতেই হবে। কোনো এক ব্যক্তি বা পরিবার আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। তিনি বলেন, অবশ্যই আমি দেশে যেতে চাই, শুধু যদি সরকার বৈধ হয়, সংবিধান রক্ষা পায়, এবং আইন ও শৃঙ্খলা সত্যিকারভাবে বজায় থাকে।

আলাদাভাবে তিনি বৃটেনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে গণআন্দোলনে নিহতদের জন্য ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট তার এই বক্তব্যই তাদের শিরোনাম করেছে। হাসিনা বলেন, গত বছরের রাস্তায় বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী অভিযানের জন্য তিনি ক্ষমা চাইবেন না।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট লিখেছে, ১৫ বছরেরও বেশি সময় ‘লৌহ মুষ্টিতে’ দেশ শাসন করা শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের নির্বাসনে রয়েছেন। সাক্ষাৎকারে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারের কাছে তিনি ক্ষমা চাইবেন কি না? জবাবে হাসিনা বলেন, আমি আমাদের প্রতিটি সন্তান, ভাই, বোন ও বন্ধুর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছি, যাদের আমরা জাতি হিসেবে হারিয়েছি। আমি তাদের প্রতি আমার সমবেদনা জানাতে থাকব। তবে হাসিনা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন যে, তিনি কখনো পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেননি। বরং তার দাবি, ‘অনির্বাচিত’ অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে তার দল আওয়ামী লীগকে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। হাসিনা গত বছরের আন্দোলনের সময় তার পদক্ষেপগুলোর সাফাই দিয়ে বলেন, তিনি কোনো হত্যাকাণ্ডের দায় ব্যক্তিগতভাবে নেন না। বরং তিনি ওই ঘটনাকে বলেন ‘একটি সহিংস বিদ্রোহ’। তার দাবি, বেশির ভাগ হতাহতের কারণ ছিল মাঠ পর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ এবং তিনি বলেন, একজন নেতা হিসেবে আমি সার্বিকভাবে দায় স্বীকার করি। কিন্তু এই অভিযোগ যে আমি গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলাম- এটি সম্পূর্ণ ভুল। তিনি বলেন, তার সরকার প্রথম হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করেছিল, যা পরে ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বন্ধ করে দেয়।

গত বছরের বাংলাদেশের বিক্ষোভ দমন বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক বাবুরাম পান্ট তখন বলেন, বিক্ষোভ দমনে নিহতের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা বাংলাদেশ সরকারের প্রতিবাদ ও মতবিরোধের প্রতি সম্পূর্ণ অসহিষ্ণুতার নির্মম উদাহরণ। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক মন্তব্য করেন, ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য।  তবে হাসিনা ছাত্র আন্দোলনের সময় উল্লেখিত মৃতের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ১৪০০ নিহতের সংখ্যাটি সম্ভবত অতিরঞ্জিত। হাসিনা বলেন, সরকারের পদক্ষেপ তখন ছিল- ‘সৎ উদ্দেশ্যে নেয়া ব্যবস্থা, যাতে প্রাণহানি কমানো যায়, কারণ আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল।’

নিজের দেশত্যাগের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় হাসিনা বলেন, ‘আমি ৫ আগস্ট দেশ ছেড়েছিলাম বাধ্য হয়ে। দেশে থাকলে শুধু আমার নয়, আমার আশপাশের মানুষের জীবনও বিপন্ন হতো।’ দেশত্যাগ ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পরও হাসিনা বলেন, তিনি বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘শুধু মুক্ত, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই দেশকে সুস্থ করবে’।

ওদিকে ড. ইউনূস জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে। তবে আওয়ামী লীগ তাতে অংশ নিতে পারবে না।
নিজের উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, ‘আমি চাই মানুষ আমাকে সেই নেতা হিসেবে মনে রাখুক, যিনি ১৯৯০-এর দশকে সামরিক শাসনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করেছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘এই অর্জনগুলো এখন উল্টে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’

Thursday, October 23, 2025

বিপ্লব আপস করেছে -ড. সলিমুল্লাহ খান by কাজল ঘোষ ও পিয়াস সরকার

জুলাই আন্দোলনের এক বছর। নতুন বাংলাদেশে ঘটনা প্রবাহের অন্ত নেই। অন্তহীন প্রবহমান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। প্রতিটি পদক্ষেপের হিসাব রাখছে বাংলাদেশ। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব কষছেন আন্দোলনে সম্পৃক্তরা। জুলাইয়ের অভূতপূর্ব পরিবর্তনে আমরা কি পেলাম বা কি পাইনি- এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই পট পরিবর্তনের সাক্ষী এবং যোদ্ধা অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান। তাত্ত্বিক, বিশ্লেষক, চিন্তক, অনলবর্ষী বক্তা ড. সলিমুল্লাহ খানের মুখোমুখি হয়েছিল ‘জনতার চোখ’। ফিরে দেখা রক্তাক্ত জুলাই নিয়ে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “পুরনো চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে ক্ষমতা। বড় আকারের মৌলিক পরিবর্তনের আশা করা যাবে না। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে বিপ্লব। ইতিহাসের বিচারে শেখ হাসিনার অপরাধের দায় আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটা কর্মীকে নিতে হবে।” সর্বোপরি তিনি বললেন, “বিপ্লব আপস করেছে। আওয়ামী লীগের নৈতিক পরাজয় হয়েছে, দৈহিক পরাজয় হয়নি।”

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খানের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, “সংস্কার প্রক্রিয়া অনেকটা ধীরগতিতে শুরু হয়েছে। সার্চ কমিটি গঠনটাকেই শুরু হওয়া বলছি না। আসল কাজের কাজ এক বছরে কিছুই হয়নি। বিপ্লবের পরের মুহূর্তে এক বছর অনেক সময়। এক বছর আগে ছাত্ররা অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। অনেকে বলেন, এটা কোটা আন্দোলন। এটা অনেকটা লক্ষণ দেখা, কারণ না দেখা। কোটা ছিল একটা লক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পার হয়ে যাবার পরেও যখন মুক্তিযোদ্ধা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের নাতি-পুতি বা আরও নিচের পুরুষের লোকজনদের কাজে লাগাতে চেয়েছিল হাসিনা সরকার।”

তিনি প্রশ্ন রাখেন, বৈষম্যের গোড়া কোথায়? ১৯৭২ সালে যে সংবিধান আমরা গ্রহণ করেছিলাম তাতেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের যে ঘোষণাপত্র ১০ই এপ্রিল দেয়া হয়েছিল, সেটাই প্রথম সরকারি ঘোষণাপত্র। এটাকে আমি প্রকৃত ঘোষণাপত্র বলতে চাই। জিয়াউর রহমানেরটাও নয়। শেখ মুজিবের নামে প্রচারিত মিথ্যা দলিলটাও নয়। জিয়াউর রহমান যেটা করেছেন সেটা হলো কনটিনজেন্সি (বিকল্প ব্যবস্থা) ম্যানেজমেন্ট। যুদ্ধের জন্য তো একটা ঘোষণা লাগে, জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালন করেছেন। ১০ই এপ্রিল প্রথম বলা হয়েছে, আমরা একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে যাচ্ছি। এর মূল ভিত্তি হবে তিনটি শব্দ- সাম্য মানে বৈষম্য থেকে মুক্তি, মানবিক মর্যাদা মানে পাকিস্তান আমলে যে মানবিক মর্যাদা বা সমতা অস্বীকার করা হয়েছিল সেটা ফিরিয়ে আনা এবং সামাজিক সুবিচার। আমার প্রশ্ন ১৯৭১ সালের ঘোষণাপত্র ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রিয়ম্বল (ভূমিকা) আকারে যোগ হলো না কেন? পরে পরিশিষ্ট আকারে দেয়া হলো। এখানেই তো বৈষম্যের গোড়া।

জুলাই সনদের বিষয়ে বলেন, জুলাই সনদ আমরা রক্ত দিয়ে লিখেছি। তার ভাষাটা অনুবাদ করার বিষয়। ঘটনাটাই আসল ঘোষণাপত্র- ‘আমরা শেখ হাসিনাকে বিদায় দিয়েছি, আমরা শহীদ হয়েছি।’ ৩৬ দিনে- জাতিসংঘের হিসাবে ১৪০০’র বেশি লোক নিহত, ২০ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। মানুষ ট্রমাটাইজড হয়েছে। এটাই ঘোষণাপত্র। এর আগে কতো লোক গুম-খুন হয়েছে। শেখ হাসিনা দেশটাকে আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা দুটো ঘোষণা দিয়েছি। ‘প্রথমত এদেশে একটা আইয়ামে জাহেলিয়াত কায়েম হয়েছিল, দ্বিতীয়ত আমরা তা মেনে নেইনি।’
সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বললে আমার ১৯৯০ সালের কথা মনে পড়ে। জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান সম্পন্ন হয়েছিল সেটার নাম লোকেই দিয়েছিল ‘নাগরিক অভ্যুত্থান।’ এবারেরটার নাম ‘গণ-অভ্যুত্থান’। নাগরিক অভ্যুত্থানের সময় কয়েকটা টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছিল। সে সময় অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রভৃতি মণীষী বস্তাপচা রিপোর্ট লিখেছিলেন। ওগুলোর খবর কি কেউ জানেন? এগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। এখনকার সংস্কার কমিশনের ত্রুটি হচ্ছে তারা ত্রুটি অনুসন্ধান করছেন না। হাসিনার আমলে তিনবার নির্বাচন হয়নি। সুুতরাং হাসিনা অবৈধভাবে ক্ষমতায় ছিলেন। এরকম সরকারকে হটাতে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। সেটাও আমাদের এখানে করা প্রায় নিষিদ্ধ। জনগণ গ্রহণ করবে না। বাকি পথ হচ্ছে গণ-অভ্যুত্থান। জনগণ তার সার্বভৌমত্ব নিজেই দাবি করে। সেটাই ঘটেছে। এটাই জুলাই সনদ।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, এর আগে ছিল গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি, গণঅধিকার পরিষদ ইত্যাদি। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হয়েছে। গতবছর জুলাই আন্দোলনের মাঝামাঝি সময়ে বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছিলেন, ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা এটাকে নৈতিক সমর্থন দিচ্ছি মাত্র। ছাত্রদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন সেটা ছাত্রদের ওপর আস্থার জন্য নয়। হাসিনার বিরুদ্ধে মানুষের যে ঘৃণা আর ক্ষোভ তার কারণেই মানুষ রাজপথে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বলছিল- হাসিনার বিরুদ্ধে একটা কলাগাছকে দাঁড় করালেও কলাগাছকেই ভোট দেবো। ছাত্ররাই ছিল প্রকৃতপক্ষে কলাগাছ। তাদের গুণ হচ্ছে সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা। সেটাও বেশি নয়। তারা শেষ কথাটা বলছে গত বছরের আগস্টের এক কি দুই তারিখে। কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৯ দফা দাবি। এরপর কমতে কমতে একদফা। হাসিনা বিদায় নেয়ার পর আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
তিনি বলেন, বর্তমানে ফিরে আসি। বর্তমান সরকার যে অব্যবস্থিত চিত্ত বা আনডিসাইটেড মাইন্ড তার প্রমাণ হচ্ছে ৮ই আগস্টকে তারা নতুন বাংলাদেশ দিবস ঘোষণা করেছিলেন। শ্রদ্ধা রেখে বলছি, এ থেকে বোঝা যায় রাজনীতি সম্পর্কে ড. ইউনূসের কোনো ধারণাই নেই। যদি থাকতো তিনি একথা বলতেন না। পরে বুঝতে পেরেছেন, ভাগ্য ভালো যে তাকে বোঝানোর মতো পাশে কিছু লোক আছে। শেখ মুজিবের পাশে সিপিবি ছিল। এখন ড. ইউনূসের পাশে কারা আছে জানি না। তিনি যদি এই সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন এটা আত্মঘাতী হতো। আসল ঘটনা ঘটেছে ৫ই আগস্ট। তিনি তার নিজের আরোহণ দিবসকে নতুন বাংলাদেশ দিবস বলে ঠিক করেন নাই। প্রত্যাহার করেছেন এটা বুদ্ধিমানের কাজ।

সংস্কার কমিশন প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান বলেন, এগুলোর তুলনা করা যায় টাস্কফোর্সের সঙ্গে। বাংলাদেশের অবনতির আরেকটা কারণ হলো- তারা বাংলা ভাষায় কিছু বলতে পারেন না। যত গর্জে তত বর্ষে না। কিন্তু যেটুকু বর্ষণ হয়েছিল সেটাও ছিল ভুল চিন্তা। প্রথমে শুরু হলো প্রধানমন্ত্রী পদ্ধতি নিয়ে। যেটাকে ক্যাবিনেট সিস্টেম বলে। বাহাত্তরে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্মে গেলেন, ’৭৫ সালে জিয়াউর রহমানও প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিতে থেকে গেলেন। সেই সুখকে কেউ উৎখাত করেননি। জেনারেল জিয়াউর রহমান, এরশাদ কেউ করেননি। সকলেই মনে করলেন প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্মই হচ্ছে আমাদের দেশে গণতন্ত্রহীনতার একমাত্র কারণ।

১৯৯০ সালের অভ্যুত্থানের ফলাফল হলো, চারটা জোট লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে আন্দোলন করলেন। এরপর বললেন, আমরা সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাবো। সেটার পরিণতি আরও খারাপ হলো। ’৯১ সালে নতুন যাত্রা শুরু হলো- নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। এটা যে একটা ভুয়া কথা তা হাসিনা প্রমাণ করেছেন। এখন নতুন আলোচনা চলছে আমরা কি প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে ফেরত যাবো? নাকি প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য করবো? এগুলো লক্ষণ দেখে বিচার করা, কারণে যেতে না পারা। দারিদ্র্য কীভাবে দূর করা যাবে, এটা নিয়ে অনেক কথা। কিন্তু দারিদ্র্য কি কারণে হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয় না। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ সরকার কেউই এ নিয়ে আলোচনায় রাজি নয়।


একটা গল্প রয়েছে- ঘরে সূঁচ হারিয়েছে সে তা রাস্তায় গিয়ে খুঁজছে। কারণ রাস্তায় আলো আছে। যেখানে সূঁচটা হারিয়েছে সেখানে সে খোঁজে না। তাদের দশাও তাই। সংসদে একটা উচ্চকক্ষ যোগ করতে হবে। এটাই কি প্রধান কারণ দেশের ক্ষতির? দেশে গণতন্ত্র না থাকার প্রধান কারণ কি জিজ্ঞাসা করতে তারা রাজি নন। নতুন ধনদৌলত সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিল্প গ্রুপগুলো কীভাবে এত ধন সঞ্চয় করলো? কীভাবে গড়ে উঠলো? এরা দেশের গণতন্ত্রকে কীভাবে প্রভাবিত করছে? কোন পার্টিকে চাঁদা দিচ্ছে? কোনো সংস্কার কমিশনে তার উল্লেখ নেই। উল্লেখ আছে, আমরা কি প্রধানমন্ত্রী শাসিত থাকবো, ৭০ ধারা থাকবে কি থাকবে না ইত্যাদি। এগুলোকে আমি খারাপ বলছি না। এগুলো সব অর্ধসত্য। তাদের বোধদয় হয়েছে সংসদে এককক্ষ থাকার কারণে বুঝি একনায়কতন্ত্রের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু এই এককক্ষেরই নির্বাচন হয়নি।

তিনি বলেন, পৃথিবীর অর্ধেক দেশ আছে যাদের সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট। যেসব দেশ ফেডারেল গোত্রের যেমন ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য তারা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। কোনো দেশ রাজাপ্রধান, কোনো দেশ প্রেসিডেন্ট প্রধান। লক্ষণটা কি? তারা বলছেন, এককক্ষ থাকার কারণে গণতন্ত্র ব্যাহত হচ্ছে। হতে পারে একদলীয় ব্যক্তি যখন সংসদের প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং পার্টি প্রধান হন তখন তা হতে পারে। এটা রোধ করার অনেক পথ আছে। দ্বিকক্ষের বিরোধী আমি নই। কিন্তু এটা আমাদের প্রধান সমস্যা না। প্রধান সমস্যা হচ্ছে- স্থানীয় শাসন বলতে কিছু নেই। যেমন ঢাকা একটা বড় শহর যার মেয়রকে বলা যেতে পারে মন্ত্রীর থেকেও শক্তিশালী। চট্টগ্রাম কি ছোট শহর? তাহলে তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদা কেন দেয়া হবে না। বলা হয় অমুক খারাপ লোক, সন্ত্রাসী। তাহলে আপনি খারাপ লোককে মেয়র নির্বাচিত করেছেন কেন? এটাকেই বলে স্বৈরাচার।

স্বৈরাচার নিয়ে একটা বিখ্যাত সংজ্ঞা আছে। ফ্যাসিবাদ সেটা নয় যে, সে কতো লোককে হত্যা করেছে। ফ্যাসিবাদ সে কোন পদ্ধতিতে হত্যা করেছে তার মাপে মাপতে হয়। বিনা বিচারে হত্যা, গুম, টর্চার করে হত্যা, ধরে নিয়ে ভারতের ওপারে পার করে দেয়া ইত্যাদি। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদ বলা জাস্টিফাইড কিনা? আমি বলবো শতভাগ জাস্টিফাইড। সামরিক শাসক আসলে সংবিধান বাতিল করে। শেখ হাসিনা করলো সংবিধানের ভেতর থেকে খেয়ে ঝাঁঝরা। একটা উদাহরণ দেই, সংবিধানে লেখা আছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু দেশের উচ্চতম আদালতে বাংলা চলে না। ডেইলি স্টার ইংরেজি মিডিয়াম পাস করা শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেয়। তারা চায় ইংরেজি মিডিয়ামে, বৃটিশ সিলেবাসে পড়ুক। এটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অনাস্থা জানানো। তারা তো এসএসসি, এইচএসসি পাস করাদের সংবর্ধনা দিচ্ছেন না। তারা এ লেবেল, ও লেবেলকে দিচ্ছেন।


অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, হাসিনার আমলে কীভাবে সংবিধানকে ফোকলা করে দেয়া হয়েছে এটা আমরা হাসিনার আমলেই বহুবার বলেছি। অনেকেই বলতেন, ধরে নিয়ে যাবে। ধরলে ধরবে, ধরা তো সম্মানের বিষয়। ফ্যাসিবাদের আরেকটা ধরন হচ্ছে ধরবে কিনা তার গ্যারান্টি নেই। হয়তো দেখা যাবে লাশ পড়ে আছে তুরাগের চরে। ফ্যাসিবাদ হচ্ছে, ভয়ে রাখা, ভয়ে থাকা। ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির জন্য আমরা কি করতে পারি? প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া মোটেও সমাধান নয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ্ধতির ভেতরে কি কি সমস্যা ছিল সেগুলো খুঁজে বের করা। অনেকেই আবার সমালোচনা করেন, ড. আলী রীয়াজ তো বিদেশ থেকে আসছেন। এসব কথা অন্যায্য। বলা উচিত ওনার যুক্তির ত্রুটিটা থাকলে কোথায় আছে? সবাইকে নিয়ে ঐকমত্য করার প্রশ্নটা কোথায়? বলা হচ্ছে কোনো ব্যক্তি একইসঙ্গে দলের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না? এগুলোকে আমি তুচ্ছ কথা মনে করি। কারণ, ছদ্মবেশেও শাসন করা যায়। যেমন ইয়াজউদ্দীন, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে প্রেসিডেন্ট করে দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ চালানো যায়।

পাকিস্তানে উপরের কক্ষ, নিচের কক্ষ আছে। কিন্তু সেখানেও নানান রকম পরিবর্তন হয়। আমেরিকার এক আমলা নাকি তারেক আলীকে বলেছিলেন, পারভেজ মোশাররফ আমাদের এখানে আসতেন, নানা বিষয়ে একমত হতেন, পাকিস্তানে গিয়ে ঠিক তার উল্টোটা করতেন। বলতেন, প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক কারণে পালন করতে পারছি না। আর আসিফ জারদারি বলার আগেই বাস্তবায়ন করতেন। ঐকমত্য কমিশন লক্ষণ নিয়ে টানাটানি করছে, আসল কারণ বের করতে পারছে না।

অবৈধ ক্ষমতার উৎসে হাত দিতে হবে। উৎসটা হচ্ছে, দেশের পুঁজির আদিম সঞ্চয়ন প্রক্রিয়াটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পুঁজি ধর্মঘট যখন চলে, তখন পুঁজি প্রত্যাহার করে বিনিয়োগ বন্ধ করে রাখে। এখন যেমন বিনিয়োগ কমে গেছে। বিদেশিরা আসছে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, অতিরিক্ত ভারতের উপর নির্ভরশীলতা, বিদেশি বাজারের উপরে নির্ভরশীলতা। যেভাবে আমরা অর্থনীতি গড়ে তুলেছি, যেটাকে নিওলিবারেলিজম বলে। মানে রপ্তানি করা আয়ের উপর ভিত্তি করেই মাত্র অন্যান্য জিনিস আমদানি করতে পারবেন। দেশীয় বাজার বলতে এদেশে শতকরা ৫০ ভাগও কিছু গড়ে ওঠেনি। এরকম দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে কোনো স্বকীয় রাজনৈতিক তত্ত্ব তৈরি করা যায় না।

তিনি বলেন, ছয়টা সংস্কার কমিশন অনেক কথা বলেছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন রিপোর্টের বিষয়ে বলেন, সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা আছে। কিন্তু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো কথা নেই। শুধু সরকার আর সংবাদপত্রের কো-রিলেশন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।  অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফলস্বরূপ। এই সরকার গণ-অভ্যুত্থানের পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই সরকারের অধিকাংশ লোকই গণ- অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এখানে আরও অনেক লোক আছে। তাদের নেয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞ আকারে। তারা যা করছেন তারা অক্ষমতার প্রকাশ। যারা সরকারে এসেছেন সবাই অভিজ্ঞ নন। সব দায়দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টাকে নিতে হবে। প্রথমদিকে, তিনি ক্ষমতা নেবেন কিনা তা নিয়েও চিন্তা করেছেন। এরপর শপথ নিয়ে নিজের বিরুদ্ধে রুজু মামলাগুলো প্রত্যাহার করেছেন। তার সব কাজকে আমি খারাপ বলবো না। তার ম্যান্ডেট গণ-অভ্যুত্থান। গণ-অভ্যুত্থানের যারা সাক্ষাৎ নেতা, যেমন নাহিদ ইসলাম- তারা ড. ইউনূসের কথা বলেছেন। অন্যরা মেনে নিয়েছেন। আমরা নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেয়েছি। এখন যেটা চলছে সেটা মবোক্রেসি। মব হচ্ছে কারণ জনগণ ঐক্যবদ্ধ নয়। এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে মারামারি করে। এখন আওয়ামী লীগ গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে।

বিভিন্ন দেশের মবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রুশবিপ্লবী লেনিনকে কিন্তু গুলি করেছিল মবেরই একজন লোক। এই মব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কারণ অব্যবস্থিত চিত্ততা বা আনডিসাইটেড মাইন্ডের জন্য। সব বিপ্লব তার প্রতিপক্ষ তৈরি করে। অবাক লাগে নবনীতা চৌধুরীর মতো সাংবাদিক কেন দেশ ছেড়ে পালালেন? তাদের বিদেশে পালিয়ে গিয়ে কেন প্রোপাগান্ডা করতে হচ্ছে? গণহারে মামলা হচ্ছে এই সরকারের ত্রুটি। এগুলো সরকার স্বীকারও করেছে। শেখ হাসিনা যেসব টেনডেন্সি দমন করেছিলেন সেগুলোর এখন বিস্ফোরণ হচ্ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই জঙ্গি বলা শুরু করেছিলেন। তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। কওমী জননী উপাধি নিয়েছিলেন তিনি। শেষ মুহূর্তে জামায়াত নিষিদ্ধ করেছিলেন। জামায়াতের বহু নেতাকে যুদ্ধাপরাধী হওয়ার কারণে শাস্তি দিয়েছেন। এসব কারণে একদম বন্ধ আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল। দেশে যেহেতু গণতন্ত্র ছিল না এজন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারগুলো যে নিরপেক্ষ তা তিনি প্রমাণ করতে পারেননি। বেশ কিছু স্ক্যান্ডাল তৈরি হয়েছিল, একজন বিচারপতিকে সরিয়েও দিতে হয়েছিল। বিপ্লবের ভ্যাকুয়ামটা হচ্ছে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের। কারণ তাদের দেশব্যাপী কোনো সংগঠনই ছিল না। যার কারণে সম্ভাবনা ছিল নৈরাজ্য তৈরি হওয়ার অথবা সামরিক শাসন জারি করার। সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত ছিল না। অন্তত তাদের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা ছিলেন। ডিজিএফআই কলঙ্কিত হয়েছিল গুম, খুন, আয়নাঘরের সঙ্গে জড়িত হয়ে। তাদের পায়ের তলায় মাটি ছিল না। জনরোষ সামরিক বাহিনীকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়- এটা তার প্রমাণ। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তারা কতোগুলো শক্তির উপর নির্ভর করেছে।

সংগঠিত শক্তি হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। বিএনপি বড় দল, কিন্তু জামায়াত অধিক সংগঠিত। এই কারণে নানারকমের মব তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি কিছু ইসলামিক শক্তি রয়েছে, তারা সক্রিয় হয়েছে। পিপল আর মব এক জিনিস নয়। পিপলের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে অনেক মব হয়েছে। এখন সুবিধাবাদী একটা গোষ্ঠী শাপলা বনাম শাহবাগ- এরকম কিছু কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করছে। আমার মনে হয়, এগুলো ধোপে টিকবে না। যেগুলোকে মব বলা হয়েছে। তাদের আমি বলবো বুদবুদ। তবে এগুলো লক্ষণ হিসেবে ভালো না। দেশে নানাধরনের যে শক্তি আছে তাদের মোকাবিলা করতে হবে রাজনৈতিক পদ্ধতিতে।


ছাত্র নেতাদের বিষয়ে বলেন, তাদের বয়স কম হতে পারে কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সাহসের প্রশংসা না করলে অন্যায় করা হবে। রাজনীতি হচ্ছে শেষ বিচারে ক্ষমতার জন্য লড়াই। আমি একদিন বলেছিলাম, উপদেষ্টা পরিষদে ছাত্রদের শতকরা ৫০টা আসন নেয়া উচিত। কিন্তু তাদের মাত্র দুটা বা তিনটা আসন দিয়েছে। পুরনো সরকারের যে প্রেসিডেন্ট তাকে রাখার যৌক্তিকতা কি? সংসদ বিলুপ্ত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেছেন। ওই সরকার বিলুপ্ত হয়েছে। সংসদ বিলুপ্ত হলে ওই সংসদের স্পিকার আর থাকে না। দেশ চলছে প্রেসিডেন্টের অর্ডিন্যান্সে অথচ সেই প্রেসিডেন্টেরই কোনো বৈধতা নেই। সুতরাং দেশ একটা নৈরাজ্যের মতো চলছে। আমরা ধারাবাহিকতায় চলছি। ১৯৯০ সালে বলতো, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় চলতে হবে। বর্তমান বিপ্লবের অসম্পূর্ণতাটা এখানেই। বিপ্লবটাকে আর বিপ্লব বলা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এটাকে আমি প্রতিবিপ্লব বলবো না। আমি বলবো, বিপ্লব আপস করেছে। দুই বা তিনজন ছাত্রকে স্থান দেয়া হয়েছিল সরকারে। তারা একজনও না থাকতেন; যেটাকে বলা হয় প্রেশার গ্রুপ সেটা হতেন তাহলেও তাদের সনদ বাস্তবায়িত হতো। বিপ্লব যে হয়নি তার প্রমাণ তথাকথিত জুলাই সনদ চূড়ান্ত হতে অনেক বেশি সময় লেগেছে।
একাত্তরে আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো প্রস্তুতি ছিল না স্বাধীনতার জন্য। ইন্দিরা গান্ধীর অনুমতি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হয়েছে। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ থেকে ১০ই এপ্রিল পর্যন্ত এত সময় লাগলো? এটাতেই প্রমাণ, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের জন্য দল হিসেবে প্রস্তুত ছিল না। ব্যক্তি হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ থাকতে পারেন। অনেকে বলবেন, তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কেন দেখা করলেন? দেখা করা ছাড়া উপায় কি? আওয়ামী লীগের সময় ছিল। ’২৪ বিপ্লবীদের সময় ছিল না। তাদের যখন ধরে নিয়ে যেয়ে পেটানো হলো: তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাদের রাজনৈতিক সংগঠন না থাকলেও গোটা দেশ তাদের নেতৃত্বের অপেক্ষায় ছিল। জিয়াউর রহমান যেভাবে ’৭১ সালে নেতা হয়েছেন শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে। তাজউদ্দীনও বলেছিলেন, জিয়াউর রহমানের বক্তব্য শুনে তিনি উজ্জীবিত হয়েছেন। যিনি পরবর্তীতে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন, যার অধীনে তিনি সেক্টর কমান্ডার হবেন তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ওই বিপ্লবের মুহূর্তে সেক্টর কমান্ডার নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখানেও তাই। এই বিপ্লবের প্রকৃত নেতা নাহিদ ইসলাম। ক্ষমতায় নাহিদ ইসলামের প্রধান উপদেষ্টা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা এই: তিনি ইউনূসকে ডেকেছেন। বলেছেন, আমি পারবো না। নাহিদের চেয়ে সামান্য বেশি বয়স ছিল ফিদেল ক্যাস্ট্রোর। ক্যাস্ট্রোর হাতে বন্দুকও ছিল। ফিদেল ক্যাস্ট্রো প্রথমে আরেকজনকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেছিলেন। এই আন্দোলনের কাঠামোগত দুর্বলতা হলো, জনগণ যাদের নেতা মেনে হাসিনাকে পরাজিত করেছে তারা নিজেরাই নেতৃত্ব নিতে সাহস করেননি। তারা আরেকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছেন। তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া আছে। এক বছর পর মনে হচ্ছে ক্ষমতা আবারো পুরনো নহরে, পুরনো চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে। বড় আকারে মৌলিক পরিবর্তন আশা করা যাবে না। আহা! যে অন্যায় হাসিনা করেছে এই অন্যায় ’৭১ সালে পাকিস্তান আর্মিরাও করেনি।


গত বছরের ৩১শে জুলাই ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বক্তব্যে আইয়ুব খানের উন্নয়ন দর্শন ও শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন আমি বর্ণনা করেছিলাম। কিন্তু আইয়ুব খান এত লোক খুন করেনি। শুধু ৩৬ দিনের কথা বলছি না, রাজত্বকালে যত খুন করেছে, যত জঙ্গি নাটক করেছে- তা আইয়ুব খানকে করতে হয়নি। শেখ হাসিনাসহ যারা হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তাদের বিচার না করলে বিপ্লব ব্যর্থ হবে। কিন্তু তাদের বিচার হলে বিপ্লব অর্ধেক সফল হবে। বাকিটা বাস্তবায়ন করার জন্য জনগণের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। মূল আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে- জনগণ তাদের অধিকার ফেরত চায়। যে সরকারই হোক সরকার তাদের অধিকার বদলাতে পারবে না। মাইনোরিটিদের অধিকার বদলাতে পারবে না। মেজোরিটির শাসনকে গণতন্ত্র বলা হয়। কিন্তু মেজোরিটির জোরে মাইনোরিটির অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। ভারতে এখন হিন্দুত্ববাদ চলছে। আমি মৌলভীদের সম্মানের সঙ্গে বলি আপনারা ভারতে যদি সেক্যুলারিজম চান তো বাংলাদেশে চান না কেন? বাংলাদেশে যেহেতু মুসলিম মাইনোরিটি না তাই সেক্যুলারিজম চান না। বাংলাদেশ উপমহাদেশে তখনই নেতৃত্ব দিতে পারবে যখন মাইনোরিটি, মেজোরিটি ভাগ থাকবে না। হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান বলে যাতে কাউকে নির্যাতন করা না হয়। এমনকি কাদিয়ানি বলেও যাতে নির্যাতন করা না হয়। আমাদের দরকার নাগরিক অধিকার।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, শেখ হাসিনার আরেকটা ফ্যাসিবাদী চরিত্রের নজির হচ্ছে রাষ্ট্রভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় উন্নীত না করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলা। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন হয়েছিল। শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করে বোঝানো হয়েছে এটা একটা বিশাল অর্জন। কোনো লেখককে যদি বলা হয়- মহিলা লেখক। তা ওই লেখকের ডিমোশন। এটাও একটা ফ্যাসিবাদের প্রকাশ।

গণতন্ত্র চাইলে সবাইকে ভোটাধিকার দিতে হবে। ভোটের দিন মারামারি না হয়, কেউ যাতে কারও ভোট কেড়ে নিতে না পারে। এককক্ষ হোক, দ্বিকক্ষ হোক সেটা বড় কথা নয়। প্রত্যেকটা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে হবে। আমার একটা প্রস্তাব আছে- পিআর নয় প্রয়োজন স্থানীয় প্রতিনিধি পদ্ধতি। বাংলাদেশের ৬৪ জেলা আছে। প্রত্যেক জেলা থেকে ২ জন করে সদস্য নেয়া হবে। ১২৮ জন সদস্য নিয়ে একটা জাতীয় পরিষদ হবে। ঢাকায় জনসংখ্যা বেশি, তার সংসদীয় আসন সংখ্যা যাই হোক উচ্চকক্ষে সদস্য দুইজন হবে। কুড়িগ্রাম থেকেও দুইজন হবে। তাহলে উন্নয়নের বৈষম্যে লাগাম টানা হবে। উচ্চকক্ষ যা  হবে সেটা হবে সরাসরি ভোটে। এখন এনজিওতন্ত্র বেশে দানা বাঁধছে মেরিটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করা নিয়ে। এটা সাংঘাতিক ফ্যাসিবাদে যাবার পথ। বিনাভোটে বা তথাকথিত পিআর পদ্ধতিতে ভোটে উচ্চকক্ষে নির্বাচনের চক্রান্তটা অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল, গণতন্ত্রহীন। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটা হতে হবে জেলা অনুসারে। প্রতি জেলা থেকে ২ এর জায়গায় ৩ হতে পারে। একসঙ্গে সকল কক্ষের নির্বাচন করা যাবে না। আলাদা আলাদা সময়ে নির্বাচন হতে হবে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য এটা ভালো পথ হতে পারে। উচ্চকক্ষের বিষয়টি এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রমোট করছে। এটা সুকৌশলে আলী রীয়াজের ঐকমত্য কমিশনও চালানোর চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, ভারত এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো প্রভেদ দেই। ওবায়দুল কাদের সেনাপ্রধানকে মীর জাফরের সঙ্গে তুলনা করে ফেলেছেন। আওয়ামী লীগের বড় পরাজয় হচ্ছে নৈতিক পরাজয়, হয়তো দৈহিক পরাজয় হয়নি। এসবি’র রিপোর্ট বলছে, দেশে একটা গৃহযুদ্ধ হতে যাচ্ছে। এসবি’র এক পরিচিত লোক আমাকে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার আমলেও আন্দোলন হতে যাচ্ছে বলে তিনি রিপোর্ট দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করেনি। আওয়ামী লীগ ভারতের পার্টি এবং সেটা বিজেপি-কংগ্রেস একসঙ্গেই প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপিও এক্সপোসড হয়েছে। বিএনপি যে একটা প্রো-ইন্ডিয়ান পার্টি সেটাও প্রমাণিত পেয়েছে। শুধু সালাহউদ্দিন নয়, পুরো বিএনপি চাইছে যাকে প্রয়োজন তাকে তোষণ করে ক্ষমতায় যাওয়া। আওয়ামী লীগ এখন রটাচ্ছে এই আন্দোলনটা আমেরিকা ঘটিয়েছে। যেটা ডাহা মিথ্যা কথা। প্রকৃতি শূন্যতা সহ্য করে না। বাংলাদেশে এখন নতুন আন্তর্জাতিক খেলা চলবে এর মধ্যে আমেরিকা আছে, চীন আছে, ভারত তো আছেই। রাশিয়া দূরে হলেও ইনভলব। আওয়ামী লীগের গায়ের কাপড় খুলে গেছে। দলটা পুরোপুরি ভারতনির্ভর। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। ’৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি পরিত্যাগ করেছিল তারা। আওয়ামী লীগকে প্রথম হত্যা করে কে? শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি এটার নাম বাকশাল দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা নামটা বদলাননি। কিন্তু চরিত্র একই ছিল।

ইতিহাসের বিচারে শেখ হাসিনার অপরাধের দায় আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটা কর্মীকে নিতে হবে। তাকে কেন্দ্র করে কীসব স্লোগান দেয়া হয়েছে! আওয়ামী লীগাররা হাততালি দিয়েছে। প্রত্যেককে ইতিহাসের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কথা বলছি না। অন্যদিকে বিএনপি ১৬ বছর আন্দোলন করেছে। অনেক নির্যাতন, অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কিন্তু তারা আখেরে ধরে রাখতে চাইছেন পুরনো সংবিধান। যেটাতে তাদের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী ও দলনেতা রাখতে চায়। যদিও সেটাতে তারা ছাড় দিচ্ছেন- পরে যে তারা সরে যাবেন না- এটার গ্যারান্টি কি?
তিনি বলেন, জুলাই সনদের মানে হচ্ছে ‘লেজিটেমেসি অব জুলাই রেভ্যুলুশন’। জুলাই সনদ না হলে এদের হাসিনা এসে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে। সুতরাং ইট শুড বি লিগ্যালাইজড। শুধু অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে নয়, সর্বদলীয়ভাবে হলে ভালো। এটা এরকম হবে যে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা ছিল জাতির পক্ষে কর্তব্য। যারা অংশ নিয়েছে তারা নায়ক। কিন্তু একদল এটা নিয়ে পড়ে আছে। ’২৪ কি দ্বিতীয় স্বাধীনতা? ’২৪ কি ’৭১ বিরোধী? হ্যাঁ, এখানে জামায়াতের একটা টেনডেন্সি আছে; ’৭১কে অস্বীকার করার। জামায়াতের বিচার হয়েছে কেন? তারা একটা সামরিক শক্তি গঠন করেছিলেন আল বদর নামে। নেজামে ইসলাম ও যারা এখন কওমীপন্থি হয়েছেন তারা গঠন করেছিলেন আল শামস। রাজাকার, আল বদর, আল শামস এই পার্টিগুলো যারা করেছেন তাদের বিচার হয়েছে। আমার মনে হয় জামায়াতের পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে ’৭১ বিষয়ে তারা এমবিগুয়াস। জামায়াতের একটা তরুণ সমাজ আছে। যারা মনে করে আমার বাংলাদেশ নামকরণের মধ্যেই একটা অনুশোচনা আছে। কিন্তু তারা কি কারণে ক্ষমা চেয়েছেন সেটা পরিষ্কার না। জামায়াতের ’৭১ বিষয়টি নিয়ে স্পষ্টকরণ করা উচিত। তাতে নতুন যাত্রা হতে পারে।

দক্ষিণপন্থা যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে মূলত মধ্যমপন্থার লোকেরা বেশি ছিল। তাতে বামেরও কিছু হিস্যা ছিল। বামেদের রাজনীতি হচ্ছে না। তারা হয় নিষ্ক্রিয় কিংবা শেখ হাসিনার সহযোগীতে পরিণত হয়েছিলেন। যেমন, সিপিবি, বাসদ। তাদের রাজনীতিতে আমরা হতাশ। বামের রাজনীতি বলতে গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্য এনারা মধ্য বামপন্থি। বিএনপিতে ডান-বাম দুটোই আছে। বিএনপিকে মধ্যপন্থি ধরতে পারেন। ডানে আছে জামায়াত। তাদেরও ডানে আছে ইসলামী ব্যানার বহনকারী দল। আগে তারা কথা বলতে পারেনি। তাদের শেখ হাসিনার আমলে দমন করা হয়েছে। যেহেতু তারা বিপ্লবে অংশ নিয়েছেন সরাসরি কিংবা পরোক্ষ সেহেতু তাদের কথা আপনাকে শুনতেই হবে। তাদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ করলে লাভ হবে পরাজিত ফ্যাসিস্টদের। বাংলাদেশকে একটা স্থিতিশীল করতে চাইলে আমরা গৃহযুদ্ধ চাই না। তবে আমরা ভারত বা পাকিস্তান কারও অধীনস্থতা মেনে নিতে প্রস্তুত নই। ভারতকে মনে রাখতে হবে তার পেছনে চীন লেগে আছে। বাংলাদেশের সঙ্গেও লড়াই করবে, চীনের সঙ্গেও লড়াই করবে এটা ভারতের জন্য সহজ নয়। ভারত যখন ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের পানি বন্ধ করেছে; ভেবেছে এটা তার অধিকার। আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হলেও ভারত পানি দেয়নি। কিন্তু চীন যখন বাঁধ দিয়েছে তখন মাথাব্যথা হয়েছে। এখন ভারত বাংলাদেশকে টানতে চাইছে। চীন বাঁধ দেয়াতে ভারত-বাংলাদেশ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা শক্তের ভক্ত নরমের যম।

তিনি বলেন, নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধিতা নতুন নয়। এটা পাকিস্তান আমলেও ছিল। যখন পরাধীন ছিলাম তখন পরাধীনতার বিরুদ্ধে আমরা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছি। পাকিস্তান আমলে ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের সময় কয়েকটা আইনগত কাঠামো গঠন করেছিলেন। ইয়াহিয়া খান একটা বিপ্লবই করেছিলেন। এক মাথা এক ভোট। চার মাসের মধ্যে সংবিধান রচনা করতে হবে। এমন কোনো আইন করা যাবে না কোরআন-সুন্নাহর বিরোধী হবে। পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র হবে। এগুলো শেখ মুজিব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ’৭০ নির্বাচনে এগুলোর কথা আর কেউ বলে না। মানে ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র করার পক্ষে তো তিনি ছিলেন না। তবু মেনেছিলেন কারণ না মানলে তো আর নির্বাচনে যেতে পারবে না। মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ ভাসানীপন্থিরা স্বাধীনতার স্লোগান দিলেও শেখ মুজিব দিতে পারেননি।  বাংলাদেশ বহু জাতির দেশ। আমরা বলছি সকল জাতির অধিকার রাখতে হবে। ঠিক তেমনি সকল ভাষার অধিকার রাখতে হবে। চাকমা, গারো, মারমা, সাঁওতাল সবার অধিকার-ভাষা রাখতে হবে। নারীরা কিন্তু সংখ্যাগুরুদের অংশ।

প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র আনতে চাইলে শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা চালু করতে হবে। সকল ধর্ম বাংলা ভাষায় শেখাতে হবে। কেন বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেন বা স্কুলগুলো ইংরেজি মাধ্যমে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অন্য বিষয়। বর্তমান সরকার শিক্ষা নিয়ে কোনো কমিশনই গঠন করলো না। ভবিষ্যতে হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশে কয়েকশ’ বিলিয়নিয়ার হয়েছে। দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে তারাই। তারা মিডিয়া, করপোরেট, আন্তর্জাতিক পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইংরেজি মাধ্যম চালু রাখা। শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ব্যয় করছে সরকার তা লজ্জাজনক। মাত্র ২ শতাংশ। এটা ১০ শতাংশে না গেলে ব্যাপক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে পারবে না। আমাদের দেশে ৩৫ রকমের প্রাথমিক শিক্ষা রয়েছে। যেকোনো রকমের প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করলেই সে নিজ উদ্যোগে বই পড়বে। সুশিক্ষিত ব্যক্তি মানেই স্বশিক্ষিত। স্কুলে কয়েকদিন থাকা মানে জেলখানায় থাকা তো। জেলখানায় থাকার একটা উপকারও আছে। জীবনে শৃঙ্খলা চলে আসে।

তিনি বলেন, সব থেকে বড় সংস্কার করা উচিত ছিল সবার জন্য বিনা পয়সায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সুযোগ করে দেয়া। এটা হবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। পরিচালনা হতে পারে বেসরকারি।  যারা অর্থের অভাবে পড়তে পারে না তাদের পরিপূর্ণ বৃত্তি দেয়া উচিত। দেশে ‘এ’, ‘ও’ লেবেল নিষিদ্ধ করা উচিত। ইংরেজি মিডিয়াম উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা উচিত। মাদ্রাসা ছাত্ররা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসায় হিন্দুরাও পড়তে পারে। ওখানে মাদ্রাসা হাইস্কুলের মতো। আরবি, ফারসি বিষয় আছে। পড়লে পড়বেন না পড়লে নেই। আমাদের দেশে ইংরেজি পড়ানো বাধ্যতামূলক। ২০০ নম্বরের ইংরেজি না পাস করে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করতে পারছে না। কিন্তু গণিত কেন ইংরেজিতে পড়াচ্ছেন? ইংরেজি মিডিয়ামে কেন ভারতের বই পড়াচ্ছেন? নারীদের অধিকার আসবে তখনই যখন গণতন্ত্রের বিজয় হবে। নারীদের নিয়ে যে আলোচনা এগুলো মূল সমস্যা, গণতন্ত্রের সমস্যা লুকানোর জন্য মুখরোচক আলোচনা। মেয়েদের ভাগ্য মেয়েদেরই নির্ধারণ করার অধিকার দিতে হবে।

শেষ কথায় এই চিন্তাবিদ বলেন, ইতিহাসে যত বিপ্লব দেখেছি কোনো বিপ্লব সম্পূর্ণ ব্যর্থ বা সম্পূর্ণ সফল হয়নি। বিভিন্ন বিপ্লবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমন কোনো পরিপক্ব ধনিক শ্রেণি তৈরি হয়নি যারা জনগণের উপর কর্তৃত্ব করতে পারেন নৈতিক অধিকারে। তারা এজন্য একটা পরিবারের উপর নির্ভর করেন। আমার বাবা দেশটা স্বাধীন করে দিয়েছে। তার মানে ক্ষমতায় এসেছেন বাবার অধিকারে, নিজের অধিকারে না। একইভাবে বিএনপিও তাই। এটাই বিপ্লবের ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের পোশাক

আমরা ’৭১-এ আংশিক সফল হয়েছি। একটা দেশ পেয়েছি, একটা পাসপোর্ট পেয়েছি। কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ছদ্মবেশী রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেছি। পরিবারতন্ত্র দক্ষিণ এশিয়ায় আছে। আমি বিপ্লব নিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখি না। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার যেন থাকে। ফ্যাসিবাদ যাতে না ফিরে আসে।

’৭২-এর সংবিধান পরিবর্তন করা ছাড়া কোনো পথ নেই। অবাক কাণ্ড। বর্তমান সরকার এই সংবিধান বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জুলাই বিপ্লব আংশিক সফল হয়েছে। কারণ আমরা ’৭২ এর সংবিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারছি। ’৭১-এর এপ্রিল সনদের আলোকে ’২৪-এর জুলাই সনদ বহাল হতে হবে। ইতিহাস এটাকে প্রগতি বলে। আমি অবশ্য প্রগতিতে বিশ্বাস করি না। আমি বলি, ইতিহাসে গতি আছে, প্রগতি নেই। আর বিপ্লব কখনো ব্যর্থ হয় না। অন্য বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে।

(জনতার চোখ থেকে ) সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজল ঘোষপিয়াস সরকার

Friday, October 3, 2025

পৃথিবীর সব সরকারের ভেতরে সরকার থাকে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: আসিফ নজরুল

অধ্যাপক আসিফ নজরুল অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা। এক বছরে সরকারের সাফল্য–ব্যর্থতা, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, ঢালাও মামলা, গ্রেপ্তার, মব–সন্ত্রাস, রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ, সমাজে বৈষম্য, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কমিশন, নির্বাচন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। ১ আগস্ট আইন উপদেষ্টার সরকারি বাসভবনে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রাজীব আহমেদ

প্রথম আলো: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আপনি কি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, সরকারের পতন আসন্ন?

আসিফ নজরুল: ধারণা করতে পেরেছিলাম। মিছিলে, সমাবেশে এমন পরিচিত মানুষদের দেখতে পারছিলাম, যাঁরা আগে কখনো আসেননি। তারপর শত নির্যাতনের পরও ছাত্রনেতাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় মানুষের ঢল, দ্রোহযাত্রা, সেনাসদরে সেনাপ্রধানের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিল, শেখ হাসিনা এবার আর টিকতে পারবেন না। ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে ছাত্র–জনতার বিশাল সমাবেশে বলেছিলাম, জয় তোমাদের সুনিশ্চিত।

প্রথম আলো: সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কি আপনার সঙ্গে ৫ আগস্টের আগেই যোগাযোগ করা হয়েছিল? তারা কী বলেছিল?

আসিফ নজরুল: জুলাইয়ের একদম শেষ দিকে রাতের বেলায় সেনাবাহিনীর পরিচয় দিয়ে সিভিল ড্রেসে একজন এসেছিলেন আমাদের পাড়ায়।

আমাকে খুব সাবধানে থাকতে এবং রাতে বাসায় না ঘুমাতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি আদৌ সেনাবাহিনীর কি না, তা নিয়ে তখন সংশয় ছিল। ভয়ে অবশ্য তাঁর পরিচয় ভেরিফাই করার চেষ্টা করিনি। এরপর ৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার ফোন করে তাঁর পরিচয় জানিয়ে আমাকে ক্যান্টনমেন্টে আসার আমন্ত্রণ জানান। আমি রিজওয়ানা হাসান আর মির্জা ফখরুল ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার স্ত্রী খুবই ভয় পেয়েছিল। সে দোয়া পড়ছিল, সেনাবাহিনী যে গাড়ি পাঠিয়েছিল, সে সেটার ছবি তুলে রেখেছিল। তারা তাকে বারবার অভয় দিচ্ছিল। এরপর ৫ তারিখ সারা দিন যে অভিজ্ঞতা হলো, তা অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্য।

প্রথম আলো: অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্তিতে আমি আপনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তখন বলেছিলেন, মানুষের নিয়ত যদি সৎ হয়, দেশপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি থাকে, তাহলে যেকোনো কাজ করা সম্ভব। এখন এক বছর পূর্তিতে আমি জানতে চাই, সরকার আসলে কী করতে পারল, আপনার মন্ত্রণালয় কী করতে পারল?

আসিফ নজরুল: আপনাকে যেটা বলেছিলাম, তা অনেকাংশে সত্যি। যেকোনো কাজ করা সম্ভব না হলেও অনেক কিছু করা যায়। আমার মন্ত্রণালয় কী করেছে, তার একটা হিসাব দিয়েছি ৩১ জুলাই। আমরা ১৬-১৭টি আইন (নতুন ও সংশোধন) করেছি। দেওয়ানি ও ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা, লিগ্যাল এইড সার্ভিসকে সম্প্রসারিত করা, অনলাইন বেল (জামিন) বন্ড দেওয়ার আইন করা, ডিজিটালাইজেশনের পদক্ষেপ—এমন অনেক কিছু আছে। কিছু কাজ আমরা করেছি, যেটা আগের কোনো সরকারের আইন মন্ত্রণালয়কে করতে হয়নি। আমরা ১৬ হাজারের বেশি হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছি। এটা শুধু বৈঠক করে হয় না, মামলার নথি ধরে ধরে পর্যালোচনা করতে হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম নেই যে একটা মন্ত্রণালয় এক বছরে প্রায় পাঁচ হাজার সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে, সেটি করেছি।

আমি মনে করি, সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্থনৈতিক খাতের শৃঙ্খলা আনা। আমরা শেখ হাসিনার আমলে শুনতাম, তিনি নিজেও বলেছিলেন, দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে। অর্থনীতিতে ধস নামার লক্ষণ ছিল। সেটা ঠেকানো গেছে। আমি সব সময় শুনতাম যে এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বিনিময় হার (ডলারের দাম) অত্যন্ত বেড়ে যায়। সেটা বাড়েনি, বরং এখন কমতির দিকে। আমাদের রিজার্ভ (বৈদেশিক মুদ্রার মজুত) বেড়েছে, ব্যবস্থাপনা ভালো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা আসছে, মানুষের আস্থা ফিরছে। রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য কিছু কিছু কম রাখা গেছে। হজ ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে। অপচয় কমানো গেছে। ফাওজুল কবির ভাইয়ের (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান) হাতে যেসব মন্ত্রণালয় আছে, সেখান থেকে তিনি ৪৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করেছেন। এটা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিয়ে করা হয়েছে।

বিপ্লব-উত্তর পরিস্থিতিতে যে বিশৃঙ্খল একটা অবস্থা থাকে, সেটা যদি না থাকত, আরও বেশি কিছু করা যেত।

প্রথম আলো: নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আপনি ৩০ বছর বিভিন্ন সরকারের অন্যায় কাজের সমালোচনা করেছেন। এখন সরকারে আছেন। আসলে কী করতে পারেননি?

আসিফ নজরুল: আমাদের দুটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে ‘মব–সন্ত্রাস’ ও ঢালাও মামলা। মব–সন্ত্রাস দমন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, পুলিশ মোরাল (নৈতিক অবস্থান) ছিল না। যে পুলিশ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিপক্ষ ছিল, সেই পুলিশ যখন দেখে গণ-অভ্যুত্থানের দাবিদার বলে কিছু মহল মব করছে, তখন সেটা দমন করতে পারেনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অসহায় হয়ে মাঝেমধ্যে বলেন, ‘আপনারা আমাকে ক্লিয়ারলি (পরিষ্কারভাবে) বলেন কী করব, বল প্রয়োগ করব, নাকি করব না।’ আমরা পুলিশের ভয়াবহ বলপ্রয়োগের স্মৃতির পর সেটা করতে বলতে পারি না। দেখবেন, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ উল্টো মার খেয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে শৃঙ্খলা একটু কমে যায়। কারণ, তারা একটা অন্য রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট রেজিমের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। হঠাৎ করে সবাই সুশৃঙ্খল হয়ে যায় না। আপনি মহান মুক্তিযুদ্ধের পরের অবস্থা দেখেন, সেখানে তো একটা দলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারপরও তো শৃঙ্খলা আনতে পারেনি। তবে আমরা বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি।
প্রথম আলো: আপনি মুক্তিযুদ্ধের পরের কথা বললেন। সেটার মাশুল তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দিতে হয়েছে। তাঁর সরকার খুব দ্রুত অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি নৃশংস হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হন।

আসিফ নজরুল: সেই সময় তো অনেক সন্ত্রাস হয়েছে সরকারের স্বার্থ পূরণের জন্য। যেমন রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ড বা সিরাজ শিকদারের মতো নেতাদের হত্যা। এখনকার সময়ে আপনি কী দেখেছেন, আসিফ নজরুল বা অন্য কোনো উপদেষ্টা মব–সন্ত্রাস করাচ্ছেন? কিংবা ক্ষমতায় থাকার জন্য আমরা বাহিনী লেলিয়ে দিচ্ছি। তখন এক দলের দুঃশাসন ছিল। এখন তো পার্সপেকটিভটা ডিফারেন্ট (পটভূমি ভিন্ন)।
প্রথম আলো: আসিফ নজরুলকে মব করাতে দেখিনি, তবে আমরা দেখেছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারা মব দমন করতে চেয়েছেন। পরে তাঁদের প্রত্যাহার করা হয়েছে।

আসিফ নজরুল: দু-একটা ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থে প্রত্যাহার করতে হয়েছে। আপনি তো জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কী রকম বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো কর্মকর্তাকে আরও ভালো জায়গায় (প্রত্যাহার করে) নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা শাস্তি হিসেবে নয়।
প্রথম আলো:

ঢালাও মামলার কথা আপনি বলছিলেন।

আসিফ নজরুল: দেখেন, মামলা সরকার করেনি, করেছেন ভুক্তভোগীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে মামলা–বাণিজ্যের প্রত্যাশী একশ্রেণির আইনজীবী জুটে গেছেন।
প্রথম আলো: কিছু দলের কিছু নেতাও জড়িত।

আসিফ নজরুল: প্রশ্ন হলো, পুলিশ ফিল্টার (যাচাই করে আসামি করা) করতে পারে না কেন? প্রথম দিকে পুলিশকে আমরা বলেছিলাম। পুলিশ যখন ফিল্টার করতে গেছে, তখন তাদের বলা হয়েছে যে তারা সারা জীবন ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছে। এখন সমস্যা কী? পুলিশের ওই নৈতিক মনোবলটাই নেই। সারা হোসেন (সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী) বললেন, ‘আপনারা পারছেন না কেন?’ আমি বললাম, আপনি আমাকে সলিউশন (সমাধান) দেন। আজকে তিন মাস হয়ে গেছে। তারপর আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করেছি।
প্রথম আলো: দুঃখিত স্যার। আপনাকে থামিয়ে একটা প্রশ্ন করি। সেটা হলো, আপনি বলছেন সরকার একটা মামলাও করেনি। কিন্তু সরকারের পাবলিক প্রসিকিউটর, সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল মামলাগুলোয় জামিনের বিরোধিতা করছেন। কেউ হাইকোর্টে জামিন পেলে আপিল করে আটকে দেওয়া হচ্ছে। এক মামলায় জামিন পেলে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

আসিফ নজরুল: মামলাগুলো হত্যার ঘটনার। এসব মামলায় আওয়ামী লীগের লোকেদের সংশ্লিষ্টতা বা মদদ নিয়ে সন্দেহ করার অবকাশ কম। কিন্তু এর বাইরে যাঁরা নিরীহ সাধারণ মানুষ আছেন, তাঁদের অনেকে জামিন পাচ্ছেন। কয়েকজন নেতাও পেয়েছেন। আমি কয়েকটা নাম চট করে বলি, প্রফেসর আবদুল মান্নান জামিন পেয়েছেন, সাবের হোসেন চৌধুরী জামিন পেয়েছেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে গ্রেপ্তারই করা হয়নি। এ রকম কিছু উদাহরণ কিন্তু আছে।
প্রথম আলো: আমিও যোগ করি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকও জামিন পেয়েছেন। এ রকম কয়েকটি ঘটনা আছে। কিন্তু সেটা সমালোচনা হওয়ার পর। এটাও বলা হয় যে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের তো হত্যা মামলায় আটকে রাখার কারণ নেই। তাঁদের দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি খতিয়ে দেখাই সমীচীন।

আসিফ নজরুল: বোধ হয় শতাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমার জানামতে, সাত-আটজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। আপনাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, মামলাগুলোর পেছনে সরকারের কোনো পক্ষের মদদ নেই। এখন আপনাকে বলি, ধরেন, যারা সাধারণ ভুক্তভোগী, তারা যখন দেখেছে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, তখন কোনো সাংবাদিক যদি রক্তপিপাসু প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আপনি যা করছেন ঠিক আছে। আমরা আপনার সঙ্গে আছি,’ সেটা কি মদদ নয়?
প্রথম আলো: সেটার বিচার তো ট্রাইব্যুনালে হতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট হত্যা মামলায় তাঁদের আসামি করা কি যৌক্তিক?

আসিফ নজরুল: যাঁরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে অভিযুক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে তো কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ব্যাপার আসবে। কিন্তু তার বাইরে যেটা আছে, এই ইনস্টিগেশন করা (উসকানি দেওয়া), এটা কেউ কেউ করেছে। এটা তো গুরুতর অপরাধ।
প্রথম আলো: তাহলে আপনি কি বলছেন, বিচার যত দিন চলবে, তাঁরা কারাগারে থাকবেন?

আসিফ নজরুল: সেটা তো আমি বলতে পারব না। বিচার চলাকালে যদি বিচারক মনে করেন...এটা বিচারকের বিবেচনার বিষয়।

প্রথম আলো: বিচারক কি স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন? বলা হচ্ছে, বিচারালয়ে ভয়ের পরিবেশ আছে। ধরুন, আজকে বিচারক সাংবাদিক শ্যামল দত্তকে জামিন দিলেন। পরের দিন বিচারক মবের শিকার হবেন না, সেটা নিশ্চিত?

আসিফ নজরুল: আমি তো বিচারকের মানসিক অবস্থা বলতে পারব না। তবে আপনাকে একটা জিনিস বলি, ১৫ বছর বিচারকদের ভয়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে, কাকে জামিন দেবেন, কাকে দেবেন না। সেই বিচারকেরও নিজের অতীতের কথা মনে পড়ে যে অতীতে আমি কী করেছি বা কীভাবে ইউজড (ব্যবহৃত) হয়েছি। ১৫ বছর ভয়ের পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে এবং ওই রাজনৈতিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়ে এখন হঠাৎ করে তাঁর মানসজগতে নিজের অতীত বিবেচনা বা বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনা উঠে যাবে, এটা সবার ক্ষেত্রে না–ও হতে পারে।
প্রথম আলো: কিন্তু স্যার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তো একটা বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল ন্যায়বিচার।

আসিফ নজরুল: ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা কার কাছে কী? কমপক্ষে হাজার লোক মারা গেছেন, কমপক্ষে এক লাখ কোনো না কোনোভাবে আহত হয়েছেন, ১৫ বছরে লাখ লাখ মানুষ জীবিকা থেকে বঞ্চিত হওয়া, গুমসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁরা যদি মনে করেন, এটাই (মামলায় আসামি করা) তো আমার এখন ন্যায়বিচার। আমাকে একটা আইন দেখান যে আমরা কাউকে মামলা করা থেকে বিরত করতে পারি। আপনাকে আবার বলি, পুলিশ কেন স্ক্রুটিনি (যাচাই-বাছাই) করে না। আগের আমলে পুলিশ এক পক্ষের মামলা নিত, আরেক পক্ষের নিত না। এখন পুলিশ মামলা নিচ্ছে। ১৫ বছরের যে অপরাধবোধ, যে সংস্কৃতি, সেই একই পুলিশ, একই বিচারালয়, রাতারাতি মুক্ত হয়ে যাবে, এটা এত সহজ না। আরেকটা কথা আপনাকে বলি, মামলা তো ভুয়া না। আপনি অভিযোগ করতে পারেন যে মামলায় অনেক লোককে জড়ানো হয়েছে, যাঁরা এই মামলায় জড়িত হওয়ার কথা নয় এবং এর মাধ্যমে বাণিজ্য করা হচ্ছে।
প্রথম আলো: মামলা ভুয়া, সেটা বলছি না। আগের সরকারের আমলে ছিল ‘গায়েবি মামলা’। এখন ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি।

আসিফ নজরুল: হ্যাঁ, বলতে পারেন। তবে পার্থক্য হলো, আগের সরকারের সময় সরকার মামলা করত। এখন ভুক্তভোগী মানুষ মামলা করছেন। আগের আমলে পুরো মামলাই ছিল গায়েবি, পুরোপুরি কল্পিত। এখন মামলার অভিযোগটা সত্যি, অনেক লোককে যে জড়ানো হচ্ছে, এটা হয়তো সত্যি নয় অনেক ক্ষেত্রে।
প্রথম আলো: কিন্তু স্যার, বিগত সরকারের আমলে মামলা দিয়ে দিনের পর দিন জেলে আটকে রাখা হতো, জামিন দেওয়া হতো না, এখনো আমরা সেটাই দেখি।

আসিফ নজরুল: পার্থক্য আছে। আগের সরকারের আমলে গায়েবি মামলা দিয়ে অনেক আসামি করা এবং প্রচুর আসামিকে ধরা হতো। আমরা পুলিশকে কড়াভাবে বলে দিয়েছি, প্রমাণ পেলেই কেবল আসামি ধরা যাবে। আমার ধারণা, আমাদের সরকারের সময় মোট আসামির বড়জোর ১০ শতাংশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রথম আলো: সর্বশেষ উদাহরণটি দেখি। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি (খায়রুল হক), যাঁর বিরুদ্ধে চরম বিতর্কিত রায় দেওয়া, রায় পরিবর্তনের অভিযোগ আছে। কিন্তু হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা কি যৌক্তিক মনে হচ্ছে?

আসিফ নজরুল: ওনার বিরুদ্ধে তিনটা মামলা রয়েছে। পুলিশ তাঁকে আদালতে তুলেছে হত্যা মামলায়। পরে তাঁকে রায় পরিবর্তন–সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং রিমান্ডও এই মামলায় শুধু চাওয়া হয়েছে। আপনাকে একটা কথা বলি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে চূড়ান্ত রায় যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে দুজন বিচারপতি লিখেছেন, বিচারপতি খায়রুল হক সংক্ষিপ্ত রায়ের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায়ের ব্যত্যয় করেছেন। এটা তো আইনসিদ্ধ নয়। তাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা, রিমান্ডে নেওয়া নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন না।
প্রথম আলো: না স্যার, তাঁকে গ্রেপ্তার-রিমান্ড নিয়ে আমার প্রশ্ন নেই। আমার প্রশ্ন, কেন রায় জালিয়াতির বদলে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার?

আসিফ নজরুল: ১৫ বছর পুলিশ নিয়োগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিবেচনা ছিল আওয়ামী লীগ করে কি না, অনেক ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জ বাড়ি কি না। সেই পুলিশের সবাই আমাদের জন্য শতভাগ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করবে—এটা বোধ হয় একটু বেশি চাওয়া। পুলিশে দক্ষতার ঘাটতিও আছে। পুলিশে আবার অনেকেই আছেন, যাঁরা দায়িত্বশীল ও আন্তরিক।
প্রথম আলো: জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিচার কতটা এগোল?

আসিফ নজরুল: দুই জায়গায় বিচার হচ্ছে। একটা হলো সাধারণ আদালতে। অন্যটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা যথেষ্ট ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের তদন্ত ও প্রসিকিউশন দলের কাছে প্রথম থেকে প্রত্যাশা ছিল, মামলা যেন যেনতেনভাবে পরিচালিত না করা হয়। শক্ত প্রমাণ যাতে থাকে এবং তা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। আপিলের আদালতে রায় যেন টিকে থাকে। শেখ হাসিনার আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যে বিচার হয়েছিল, সেখানে টেলিফোনে-স্কাইপে রায় লিখে নিয়ে আসত। এখানে এ রকম কিছু হবে না। আমরা গত নভেম্বরে কাজ শুরু করেছি। আট মাসের মাথায় মামলার বিচার শুনানি পর্যায়ে চলে গেছে। আমি মনে করি, এটা যথেষ্ট অগ্রগতি।

আমি জানি, আপনি প্রশ্ন করবেন যে আমি বলছি বিচার এত দিনে হয়ে যাবে। দেখেন, এ বিষয়ে আমি আমার ধারণা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে কথা বলি। যখন শহীদ পরিবারগুলো কাঁদতে থাকে, তখন খুব ইচ্ছা করে যে আমি নিজের ধারণার কথা বলি। প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখি। আমি জানি, মামলা কোন জায়গায় রয়েছে। সেটার ভিত্তিতে অ্যানালাইজ করে (বিশ্লেষণ) বলেছি। প্রথমবার বিচারে যথেষ্ট অগ্রগতি ছাড়াই বলেছি, অক্টোবরের মধ্যে হয়তো রায় হবে। এখন বিচারের গতি দেখে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, অক্টোবরে না হলেও ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে হবে। আমি যখন অক্টোবরের মধ্যে বলেছিলাম, তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারপতিরা আমাকে সতর্ক করেছিলেন। এটাই তো প্রমাণ যে আমাদের আদালত কতটা নিরপেক্ষ।
প্রথম আলো: বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের অগ্রগতি কতটা?

আসিফ নজরুল: পৃথক সচিবালয় মানে শুধু চেয়ার-টেবিল দেওয়া নয়। কয়েক দিন আগে একটা রুলস (বিধি) পাস হয়েছে, যেখানে বিচার বিভাগের পদ সৃজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে হওয়ার কথা বলা হয়েছে। পদায়ন বিধিমালা হয়েছে। আরও কিছু বিধিমালা করতে হবে। আমি মনে করি, আমাদের যে গতিপথ ও কর্মপরিকল্পনা রয়েছে, এটা (পৃথক সচিবালয়) ডিসেম্বরের আগে হয়ে যাবে।

প্রথম আলো: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরে গণ-অভ্যুত্থান হলো। সমাজে যে আয়বৈষম্য ও বৈষম্য, সেটা কমাতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সারা জীবন দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকারের কি আরও ভূমিকা রাখা উচিত ছিল? এই সরকার এক বছরে দরিদ্র মানুষের জন্য বাড়তি কী করেছে?

আসিফ নজরুল: আমি আসলে অর্থনৈতিক বিষয়টা খুব কম বুঝি। কিন্তু আমি সব সময় দেখতাম, বলা হতো যাতে কোনোভাবেই দ্রব্যমূল্য না বাড়ে। আর কর্মসংস্থান যেন বৃদ্ধি পায়। দুটি জিনিস উনি (অধ্যাপক ইউনূস) সব সময় বলতেন। এখন ধরেন দ্রব্যমূল্য তো অনেক ক্ষেত্রে সহনীয় রাখা গেছে।
প্রথম আলো: মূল্যবৃদ্ধি আগে হতো ১১-১২ শতাংশ, এখন সেটা ৮ শতাংশে নেমেছে।

আসিফ নজরুল: এটা সাকসেস (সফলতা) নয়?
প্রথম আলো: সফলতা নয়, সেটা বলছি না। বলছি, দরিদ্রদের জন্য এই মূল্যস্ফীতিও সহনীয় নয়।

আসিফ নজরুল: কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, আমাদের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগপদ্ধতিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। এখানে হয়তো আমাদের আরও কিছু করার ছিল।
প্রথম আলো: বাজেটে আমরা দেখলাম, দরিদ্র মানুষের ভাতা বেড়েছে ৫০ টাকা, কোনো ক্ষেত্রে ১০০ টাকা; যে হারে শেখ হাসিনাও বাড়াতেন। শ্রম কমিশনের প্রতিবেদন হিমাগারে পড়ে আছে।

আসিফ নজরুল: অনেকেই প্রশ্নটা তোলেন যে এই পাঁচটা কমিশন করা হলো কেন (জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় না থাকা পাঁচ কমিশন—নারী, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, শ্রম ও স্থানীয় সরকার)। এসব কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ আমি নিজে স্যারের (অধ্যাপক ইউনূস) নির্দেশে দু-এক মাস আগে মন্ত্রণালয়গুলোয় পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, এটা ফলোআপ করার এখতিয়ার আমার নেই। তবে স্যার উপদেষ্টাদের সঙ্গে কিছুদিন পরপর বসছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন যে তাঁদের ক্ষেত্রে সংস্কারকাজের অগ্রগতি কী।
প্রথম আলো: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছেন শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। সরকারি চাকরিজীবীরা বিগত সরকারকে শেষ সময়েও অসহযোগিতা করেননি। আমলাদের হাতে রাখতে শেখ হাসিনা গাড়ি কেনা, ফ্ল্যাট কেনায় ঋণসুবিধা দিয়েছিলেন। আপনারা সেটা বাতিল করেননি। আপনারা এসে সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি ইনক্রিমেন্ট (বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি) দিলেন, এখন আবার বেতন কমিশন গঠন করা হলো। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হোক, কিন্তু শ্রমজীবীদের জন্য কী করেছেন?

আসিফ নজরুল: বেতন কমিশনের বিষয়ে আমি আপনাকে ঠিক বলতে পারব না। কারণ, এটা জনপ্রশাসনের ব্যাপার। আর এই সরকারের প্রতি সবার (আমলাদের মধ্যে) লয়ালিটি (আনুগত্য) নিয়ে প্রশ্ন আছে, দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এখন হঠাৎ করে বলব, আপনার ব্যবহৃত গাড়ি-বাড়ি সব ফেরত দেন, এটা কি বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্ভব?
প্রথম আলো: প্রকল্পের যে গাড়ি সরকারের পরিবহন পুলে জমা না দিয়ে আমলারা ব্যবহার করেন, সেগুলো তো ফেরত নিতে পারতেন।

আসিফ নজরুল: এটার ডিটেইল (বিস্তারিত) তথ্য আপনাকে দিতে পারব না। কিন্তু প্রকল্পের গাড়ির ক্ষেত্রে খুবই কড়া মনোভাব আমাদের রয়েছে।
প্রথম আলো: সরকারের ভেতরে কি কোনো সরকার আছে?

আসিফ নজরুল: আচ্ছা, পৃথিবীতে কোন দেশে সরকারের ভেতর সরকার থাকে না? পৃথিবীর সব সরকারের ভেতরে সরকার থাকে, যাকে ‘কিচেন কেবিনেট’ (যাঁদের প্রভাব বেশি) বলা হয়। তবে সরকারের বাইরের কেউ সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না।

প্রথম আলো: সরকারের এক বছর পূর্তি হচ্ছে ৮ আগস্ট। এখন কি পারদর্শিতা মূল্যায়ন করে কোনো রদবদলের সম্ভাবনা আছে? আপনি হয়তো স্বীকার করবেন যে কোনো কোনো উপদেষ্টা ভালো করেছেন, কেউ কেউ সেটা পারেননি।

আসিফ নজরুল: আমাদের অনেক সমালোচনা হয়, যেটা খুব নির্দয়। তো আমি যখন ইনডিভিজুয়ালি (ব্যক্তি ধরে) দেখি, আমাদের অনেকেই খুব ভালো করছেন। আমাদের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ভাই, জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির ভাই, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ভাই ভালো করছেন। আমাদের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন ভাই হজ ব্যবস্থাপনায় সেরা কাজ করেছেন। এ রকম আরও কারও কথা বলতে পারি। ব্যর্থতার কথা আমার বলা শোভনীয় নয়, এটা আপনাদের ব্যাপার।

স্যারের (অধ্যাপক ইউনূস) যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ (শরীরী ভাষা) থাকে, তাঁর যে কার্যপদ্ধতি, এটার মধ্যে কিন্তু আমরা প্রত্যেকে জানি, কার কাজের ব্যাপারে স্যারের মূল্যায়ন কতটুকু আছে।

প্রথম আলো: একটা সম্পূরক প্রশ্ন করে নিই। বিগত সরকারের আমলে আমরা দেখতাম, যত সমালোচনাই হোক, শেখ হাসিনা কাউকে বদলাননি। কোনো সমালোচনাকে তিনি পাত্তা দেননি। এই সরকারের আমলেও কি সেটাই হবে?

আসিফ নজরুল: না, কিছু সমালোচনা তো খুবই নির্দয়। এ রকম সমালোচনার কারণে যদি কাউকে বাদ দিতে হয়, তাহলে তো সবার বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হবে।

প্রথম আলো: যৌক্তিক সমালোচনা কি নেই?

আসিফ নজরুল: সে ক্ষেত্রে সামগ্রিক বিবেচনা করতে হয়। ধরেন, যৌক্তিক সমালোচনা মনে হচ্ছে, কিন্তু ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের (গোয়েন্দা প্রতিবেদন) ভিত্তিতে বা অন্য কোনো তথ্যের ভিত্তিতে স্যার (অধ্যাপক ইউনূস) যদি কনভিন্স (সামগ্রিক বিষয় অনুধাবন করে সম্মত হওয়া) না হন, তাহলে তো ব্যবস্থা নেওয়াটা তাঁকে ডিসকারেজ (নিরুৎসাহিত) করবে। আমাদের কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো অদক্ষতা, অনভিজ্ঞতার অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ শোনেন? একজন-দুজন সম্পর্কে হয়তো ক্যাম্পেইন (প্রচার) আছে, সেটা তো প্রমাণিত তথ্য নয়। আমরা অফিস করি না, এটা তো শোনেন না, স্বজনপ্রীতি করি, এটা শোনেন না।

প্রথম আলো: আমরা তো শুনি, কেউ কেউ বেলা দুইটার পরে অফিসে যান। আমরা তো দু-একজনের কথাই বলব। কেউ তো বলছে না, পুরো উপদেষ্টা পরিষদ চলে যাক।

আসিফ নজরুল: আমি এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে অবগত নই।
প্রথম আলো: উপদেষ্টা পরিষদে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে, আলোচনার ক্ষেত্রে বাইরের কেউ জেনে যাবে, এই ভয়ে থাকেন কি না।

আসিফ নজরুল: আমার মনে হয় না।
প্রথম আলো: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচনে বাধা আসার আশঙ্কা—এ দুই পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে জানতে চাই, আপনারা কি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন তুলে আনতে পারবেন।

আসিফ নজরুল: অবশ্যই পারব।

প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, সেনাবাহিনীর আরও সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হবে না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব আছে বলে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে।

আসিফ নজরুল: মোটেও দূরত্ব নেই, এটা নিশ্চিত থাকেন। এগুলো সম্পূর্ণ বাইরের স্পেকুলেশন (অনুমান); বরং বাইরের শক্তিগুলো কেউ কেউ সেনাবাহিনীকে অন্যায়ভাবে কিছু ক্ষেত্রে দোষারোপ করার চেষ্টা করে। আমি গণ-অভ্যুত্থানের মাঠে থাকা একজন কর্মী হিসেবে বলি, সেনাবাহিনী সরকারের একটি বাহিনী হয়েও সামগ্রিকভাবে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে যে ভূমিকা রেখেছে, সেটা সম্পর্কে সমাজের কিছু কিছু স্তরের শ্রদ্ধাবোধের অভাব আছে। ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্নভাবে সেনাবাহিনীর কেউ কেউ জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমার কথা হলো, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব নেই। তবে নির্বাচনের সময় আরও বেশি দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে সেটা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়।
প্রথম আলো: নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি কি আপনাদের কোনো পক্ষপাত আছে? সরকারের দুজন উপদেষ্টা তাদের লোক বলে অনেকে বলে থাকেন।

আসিফ নজরুল: গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তে তো অবশ্যই ছাত্রদের নেতৃত্ব ছিল, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। যখন আমাদের সরকার গঠিত হয়, তখন তো আমি সমালোচনা শুনেছি যে এত কম ছাত্র উপদেষ্টা কেন। ছাত্র উপদেষ্টাদের বন্ধুরা যখন দল গঠন করলেন, তখন কিছু ক্ষেত্রে মনে হতে পারে, সরকার এনসিপিকে প্রিভিলেজ (বিশেষাধিকার) দিচ্ছে। আসলে প্রিভিলেজ দিচ্ছে না। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কারণে এনসিপি খুব বেশি ‘ভালনারেবল’ (নাজুক)। সে জন্য গোপালগঞ্জ বা কোনো কোনো জায়গায় তাদের বাড়তি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি বা জামায়াত অনেক পুরোনো দল, অনেক সুসংগঠিত। এনসিপি সেটা নয়। তাদের ওপর যদি কোথাও হামলা হয়, কোনো ঘটনা ঘটে, কেউ কি আমাদের ক্ষমা করতে পারবে?

প্রথম আলো: এনসিপির নেতাদের কথায় কিন্তু মনে হয় না তাঁরা ‘ভালনারেবল’।

আসিফ নজরুল: আমার বিচারে একটা সদ্য ভূমিষ্ঠ দলের অনেক সমর্থক থাকতে পারে, কিন্তু তাদের তো বেশি কর্মী নেই, অভিজ্ঞতা নেই। আরেকটা কারণে তাদের সুরক্ষা দেওয়া দরকার; সেটা হলো, পতিত আওয়ামী লীগের প্রথম টার্গেট (নিশানা) হওয়ার কথা এনসিপির নেতারা।
প্রথম আলো: বিএনপির সঙ্গে আপনাদের দূরত্ব আছে, সখ্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে—এ বক্তব্যের জবাবে কী বলবেন? বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি কথা বলেছেন। সেটি হলো, দক্ষিণপন্থীদের উত্থানে তিনি উদ্বিগ্ন।

আসিফ নজরুল: আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে ধর্মভিত্তিক দলগুলো প্রচণ্ড অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েছে।
প্রথম আলো: অন্যায়-অবিচারের শিকার বিএনপিও হয়েছে।

আসিফ নজরুল: মধ্যপন্থী দলের মধ্যে বিএনপি, আর সংখ্যায় বেশি ধর্মভিত্তিক দল। তারা অসীম নির্যাতন, গ্রেপ্তার, গুমের শিকার হয়েছে এবং তারা এই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। তাদের সঙ্গে তো আমাদের বসতে হয়।

প্রথম আলো: বৈঠক তো হবেই। বলছি, বিএনপির চেয়ে তাদের সঙ্গে সখ্য বেশি কি না।

আসিফ নজরুল: কেউ বলেন এনসিপির সঙ্গে আমাদের সখ্য, কেউ বলেন ধর্মীয় দলের সঙ্গে। লন্ডনে অধ্যাপক ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকের পর কেউ কেউ বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে সরকারের সখ্য। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সচেতনভাবে বা জ্ঞাতসারে কোনো দলের পক্ষ অবলম্বন করা হয় না।
প্রথম আলো: কোনো কোনো সমাবেশে নাগরিক সমাজের কারও কারও ‘কল্লা ফেলে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হলো। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। কেন?

আসিফ নজরুল: আমার মনে হয় যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেই পুলিশ হয়তো ভাবছে, এটা জাস্ট ‘পলিটিক্যাল রেটরিক’ (রাজনৈতিক বক্তব্য)। ব্যবস্থা নেওয়া হলে উগ্রবাদকে উসকে দেওয়া হবে এবং ওনাদের নিরাপত্তার জন্য জিনিসটা ভালো হবে না। আমি তো হুমকির পরও কারও কর্মকাণ্ড কম দেখছি না। অনেক সময় রাষ্ট্র পরিচালনার সময় বিবেচনায় রাখতে হয়, ব্যবস্থা নিলে আরও উসকে দেওয়া হয় কি না।
প্রথম আলো: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। বিচার শেষ হওয়ার আগে তাদের কার্যক্রম চালাতে না দেওয়ার পক্ষে অনেক মানুষ রয়েছেন। কিন্তু কারও কারও প্রশ্ন, নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম স্থগিত রেখে যদি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হয়, সেই নির্বাচন নিয়ে বিদেশে প্রশ্ন উঠবে কি না?

আসিফ নজরুল: প্রশ্ন যারা তোলার, তারা তুলবে। কিন্তু দেখেন, আওয়ামী লীগের কারও মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই; বরং আওয়ামী লীগের নেত্রী ও অন্য নেতারা বলছেন, এই গণহত্যা নাকি আমরা করেছি এবং তাঁরা ফিরে এলে প্রতিশোধ নেবেন, আমাদের ফাঁসিতে ঝোলাবেন। এ ধরনের কথাবার্তা যে দল বলে এবং যে দল সুযোগ পেলেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা চালাতে দিলে আপনি দেশ চালাতে পারবেন? তাদের বিচার করতে পারবেন? অসম্ভব একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে এবং মারামারি-খুনোখুনি করে বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করা হবে। বাংলাদেশে অন্যান্য যে অপশক্তি আছে, তাদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তৈরি করা হবে। এই আশঙ্কা সত্যি, যৌক্তিকভাবেই আমাদের মধ্যে আছে।

প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ না করে জনগণকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ দেওয়াই কার্যকর পন্থা হবে।

আসিফ নজরুল: এটা ঠিক, জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়া আরও বেশি ইমপ্যাক্টফুল (কার্যকর)। কিন্তু আমাদের তো সত্যি সত্যি আশঙ্কা আছে যে আওয়ামী লীগ নির্বাচন তো দূরের কথা, রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় থাকলে দেশে কোনো দিন নির্বাচন করা যাবে না, দেশ পরিচালনা করাই যাবে না। আমাদের ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট (গোয়েন্দা প্রতিবেদন) আছে যে সরকারের বিরুদ্ধে আনসারের বিক্ষোভসহ বিভিন্ন বিক্ষোভে আওয়ামী লীগের ইন্ধন ছিল। ক্রেডিবল এভিডেন্স (বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ) আছে সেখানে।
প্রথম আলো: সরকার ভারতে আম পাঠাল। ভারত যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর চিকিৎসক পাঠাল। উপদেষ্টাদের মধ্যে ভারতবিরোধী বক্তব্য ইদানীং কম দেখছি। দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের কী অবস্থা?

আসিফ নজরুল: আমরা ভারতের শত্রু হতে চাই না, কিন্তু ভৃত্যও হতে চাই না। আমরা সমমর্যাদাভিত্তিক একটা সম্পর্ক চাই।
প্রথম আলো: তিস্তা প্রকল্প চীনা ঋণে করার জন্য দেশটিকে চিঠি দিয়েছে সরকার। এটা কি উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা হয়েছে?

আসিফ নজরুল: মাঝে মাঝে উপদেষ্টা পরিষদে, মাঝে মাঝে কিচেন কেবিনেটে (কয়েকজন উপদেষ্টা) আলোচনা হয়, মাঝে মাঝে স্যার ডেকে নিয়ে কথা বলেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো উপদেষ্টা এককভাবে নেন না।
প্রথম আলো: আপনি বা আপনার সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কি ফেসবুকার বা ইউটিউবারদের দ্বারা প্রভাবিত হন, চাপে থাকেন? আপনি নিজেই বলেছিলেন, তদবির না শুনলেই অপপ্রচার চালানো হয়।

আসিফ নজরুল: সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ সারা পৃথিবীতেই কমবেশি আছে। এখন তো যা ইচ্ছা লিখে দেওয়া যায়। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের প্রয়োগ নেই, গ্রেপ্তারের ভয় নেই, হুমকির ভয় নেই। তবে আমি নিজে ফেসবুক-ইউটিউব দেখে সিদ্ধান্ত নিই না। হতে পারে দু-একজন ফেসবুকে কোনো একটা নির্দিষ্ট প্রচারণা দ্বারা পীড়িত হন। সেটা দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সিদ্ধান্ত না নেওয়ার চেষ্টা করেন।

প্রথম আলো: ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের মিশন খোলা হচ্ছে। কিন্তু আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আট মাস ধরে কোনো চেয়ারম্যান নেই।

আসিফ নজরুল: আপনি একটা ভালো সমালোচনা করেছেন। এখনকার যে মানবাধিকার কমিশন, তা প্রায় নখদন্তহীন বলতে পারেন। আইনের মধ্যে অনেক সমস্যা রয়েছে। অন্য অনেক সংস্কারকাজ করতে গিয়ে মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার করা যায়নি। এই কমিশনের আইনে ব্যাপক সংস্কার করা দরকার, তারপর নিয়োগ। খালি খালি কাউকে চাকরি দিয়ে তো লাভ নেই। তবে এটা আমরা খুব দ্রুত দেব।

প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশে আসলে রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন দরকার। আপনি রিকনসিলিয়েশন কমিশনের কথা বলেছেন। প্রধান বিচারপতি ও আপনি দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে এসেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিচার হয়েছে, পরস্পর পরস্পরের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। আমরা কি রিকনসিলিয়েশনে যাব, নাকি অনন্ত বিভাজন ও সংঘাতের মধ্যে থাকব?

আসিফ নজরুল: দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী সত্যি সত্যি অনুতপ্ত ছিল। অনুতপ্ত থেকে তারা রিকনসিলিয়েশন করতে চেয়েছিল। আমাদের যারা হত্যাকারী, তাদের মধ্যে আপনি কোনো অনুতাপ দেখেন? আপনি তাদের সঙ্গে কীভাবে রিকনসিলিয়েশন করবেন?
প্রথম আলো:

আপনি যাঁদের কথা বলছেন, তাঁরা তো বিচারের আওতায় চলে আসবেন। এর বাইরে আওয়ামী লীগের বিপুল নেতা-কর্মী রয়েছেন, সমর্থক রয়েছেন।

আসিফ নজরুল: সারা দেশের মানুষের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। রিকনসিলিয়েশনের অনেকগুলো কনসেপ্ট আছে। একটা হচ্ছে ট্রুথ সিকিং (সত্য সন্ধান), সেটা আমরা করছি। দ্বিতীয়, মেমোরিয়ালাইজেশন (স্মরণ রাখার ব্যবস্থা)। সে জন্য জুলাই জাদুঘর করছি। তৃতীয়, ক্ষতিপূরণ। সেটা দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ, জাস্টিস (ন্যায়বিচার)। এই চারটা প্রক্রিয়ার পর রিকনসিলিয়েশন হয়। জাস্টিসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটার পরে রিকনসিলিয়েশন করার পরিবেশ-পরিস্থিতি এলে আমাদের সরকার না হোক, পরবর্তী সরকার বিবেচনা করবে।
প্রথম আলো: রিকনসিলিয়েশন ছাড়া কি আমরা বিভাজন ও প্রতিশোধের চক্রে পড়ে থাকব?

আসিফ নজরুল: যেকোনো ক্ষেত্রে খুব ভালো কনসেপ্ট রিকনসিলিয়েশন। মুক্তিযুদ্ধের পরেই রিকনসিলিয়েশন দরকার ছিল। নব্বইয়ের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পর রিকনসিলিয়েশন দরকার ছিল। কিন্তু রিকনসিলিয়েশন করার একটা পরিবেশ-পরিস্থিতি লাগে। আপনার যারা ক্ষতি করেছে, তাদের সঙ্গে আপনি সদ্ভাব কীভাবে রাখবেন, যদি তারা অনুতপ্ত না হয়।
প্রথম আলো: আমাদের তো একজন নেলসন ম্যান্ডেলা দরকার। অধ্যাপক ইউনূস ছাড়া এই নেতা কে হবেন?

আসিফ নজরুল: নেলসন ম্যান্ডেলাদের অপর দিকে তো ডি ক্লার্কের মতো নেতাও ছিলেন। আপনি ডি ক্লার্কের (এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক শ্বেতাঙ্গদের নেতা ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ভূমিকা দেখেন, নেলসন ম্যান্ডেলা তো একা একা সেটা (বর্ণবাদ বিলোপ ও রিকনসিলিয়েশন) করতে পারেননি। আমরা দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের উদ্যোগের কথা জানছি। পরে একটা উদ্যোগ সম্ভবত প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে নেওয়া হবে। আলোচনাটা থাক সমাজে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

আসিফ নজরুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন আসিফ নজরুল
সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন আসিফ নজরুল। ছবি: জাহিদুল করিম