Sunday, August 3, 2014

সংঘাত নয়, সমঝোতাই প্রত্যাশিত by বদিউল আলম মজুমদার

বিএনপি প্রবল গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের ঘোষণা দিয়েই চলছে। প্রায় প্রতিদিনই দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, আর তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন তাঁর সহকর্মীরা। এ ব্যাপারে সরকার অবশ্য নির্বিকার। বরং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেউ কেউ বিরোধী দলকে নানাভাবে উসকানি দিচ্ছেন। এমনকি কেউ কেউ বিএনপির আন্দোলন করার মুরোদ নেই বলেও দায়িত্বহীন উক্তি করছেন। এই বলে তাঁরা হুমকিও দিচ্ছেন যে বিরোধী দল রাস্তায় নামলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বসে থাকবে না।
এ ধরনের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে নাগরিকেরা উদ্বিগ্ন। কারণ, বিরোধী দল রাস্তায় নামলে সরকারি দল তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবে। এ কাজে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করবে। সাম্প্রতিক সময়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির ঘরোয়া বৈঠকও সরকার করতে দেয়নি। এমনকি রাস্তায়ও তাদের দাঁড়াতে দেয়নি। তাই অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে বিরোধী দল শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি দিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা ছত্রভঙ্গ করে দেবে। আর বিরোধী দল হরতাল-অবরোধ ডাকলে সরকার তা কঠোরভাবে দমন করবে। নিঃসন্দেহে এর ফলে সহিংসতার সৃষ্টি হবে। এর পরিণতিতে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হবে। তাই শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে আমরা রাজপথে আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা চাই না।
আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের শক্তির মূল উৎস হলো রাজপথে তাদের সহিংসতা সৃষ্টির ক্ষমতা। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার। গত দুই দশকের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রমবর্ধমান দলীয়করণের কারণে এখন ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে বল প্রয়োগের বৈধ সরকারি ক্ষমতা অবৈধভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভবপর হচ্ছে। ফলে পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই এখন দলীয় ক্যাডারদের পরিবর্তে বিরোধী দলের দমন-পীড়নে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই হয়তো সরকারি দল এখন নিজেদের অপ্রতিরোধ্য ভাবতে শুরু করেছে। প্রসঙ্গত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুবিধা হলো যে তাদের হামলা-মামলা দুই কাজেই ব্যবহার করা যায়, যা ক্রমবর্ধমান হারে ঘটছে।
আমাদের জানমালের নিরাপত্তার খাতিরে বিরোধী জোটকে রাজপথে সহিংসতা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করব। অনুরোধ করব তাদের কর্মকাণ্ড যেন অশান্তি সৃষ্টি ও জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে। কিন্তু বিরোধী জোট আন্দোলন থেকে বিরত থাকলেই আমাদের বিরাজমান বিরোধের, বিশেষত নির্বাচন নিয়ে বিরোধের অবসান হবে না। বরং তাতে সমস্যা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে, যা আমাদের এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বর্তমান রাজনৈতিক বিরোধের মূল কারণ গত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন, যে নির্বাচনে ১৫৩ সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন এবং এসব নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী ৫২ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোট প্রদানের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক কালে উচ্চ আদালত ভোটাধিকারকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এ ছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৪১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ১২টি অর্থাৎ ২৯ শতাংশ দল অংশ নিয়েছে। ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ব্যালট বইয়ের মুড়ি গুনে তৈরি হিসাব অনুযায়ী, ১৪৭ আসনের নির্বাচনে ৩০ শতাংশ বা সার্বিকভাবে তথা ৩০০ আসনের বিপরীতে ১৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচন ঘিরে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে। অর্থাৎ ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সাল থেকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের কলঙ্কজনক নির্বাচন ছাড়া, যে নির্বাচনের ফলাফল স্থায়িত্ব অর্জন করেনি—মোটামুটিভাবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদানের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, ৫ জানুয়ারি তা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা বিনষ্ট হয়ে গেছে। এটাই বর্তমান রাজনৈতিক বিরোধের মূল উৎস।
প্রসঙ্গত, বর্তমান রাজনৈতিক বিরোধ শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই বিরাজ করছে না, দেশের বিরাট জনগোষ্ঠীও এ বিরোধের অংশ। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষও ‘ভাত ও ভোটের’ অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিদার আওয়ামী লীগকেই ৫ জানুয়ারির কারসাজিমূলক নির্বাচনের জন্য দায়ী করছে।ভোটাধিকার-বঞ্চিত এই বিরাট জনগোষ্ঠী ক্ষুব্ধ, কিন্তু তাদের অনেকেই চায় না আন্দোলনের মাধ্যমে শান্তিশৃঙ্খলার অবনতি ঘটুক এবং তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হোক। এ ছাড়া এদের অনেকের কাছেই বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা নেই। তঁারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অপকর্মের মধ্যে তেমন তফাত নেই; বরং আওয়ামী লীগের বর্তমান অপশাসন বিএনপির অতীতের অপশাসনের ধারাবাহিকতারই ফসল।তদুপরি জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির আঁতাত, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে তাদের দোদুল্যমানতা এবং দলে পরিবারতন্ত্রের প্রভাবও বহু গণতন্ত্রকামী নাগরিককে বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। উপরন্তু অনেকের মতে, অদূর ভবিষ্যতে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই জাতির জন্য একটি সর্ব-রোগ-হর মহৌষধ নয়। তঁারা বিরাজমান সমস্যার একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান চান। তঁারা চান কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার। আওয়ামী লীগের ‘দিনবদলের’ অঙ্গীকারে প্রলুব্ধ হয়ে তঁারা প্রতারিত হয়েছেন, কিন্তু তঁারা বিএনপির ব্যাপারেও চরমভাবে সন্দিহান। কারণ, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে কী করবে, সে ব্যাপারে বিএনপি সম্পূর্ণ নিশ্চুপ।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ নাগরিকদের অধিকাংশের অনীহার কারণে বিএনপি আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমানে হয়তো রাজপথে পরাস্ত করতে পারবে না। তবে এ জন্য আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীরা যদি মনে করে যে তারা অপ্রতিরোধ্য, তাহলে তারা ভুল করবে বলেই আমাদের ধারণা। কারণ, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের ‘জন্মই’ শুধু বিতর্কিত নয়, তাদের গত ছয় মাসের ‘কর্মও’ হতাশাব্যঞ্জক।
অতীতের দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মহোৎসব এখন যেন নতুন উদ্যমে অব্যাহত রয়েছে। এ মহোৎসব ভবিষ্যতেও চলমান থাকলে সরকারের জনপ্রিয়তা আরও কমবে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সরকারকে ক্রমাগতভাবে বলপ্রয়োগ এবং নাগরিকের অধিকার হরণ করতে হবে, যার আলামত ইতিমধ্যেই আমরা লক্ষ করছি।ব্যক্তিতন্ত্র, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সত্যিকারের বিরোধী দলবিহীন রাজনৈতিক অঙ্গন সরকারের বাড়াবাড়ি করার ক্ষমতাকে এখন যেন অনেকটা সীমাহীন করে তুলেছে। তবে পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে কোনো দেশেই কোনো সরকার বল প্রয়োগ করে চিরকাল ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। তাই বর্তমানে বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
অস্থিতিশীল পরিস্থিতির আরেকটি কারণও রয়েছে। সরকারি দলের নেতারা বারবার বলছেন যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুসংহত হয়েছে—যদিও সরকারের সমর্থকদের কারও কারও মতে এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে ‘গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব’ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছে। তবে আমরা মনে করি যে সাম্প্রতিক তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একধরনের ‘টক্সিক’ বা ‘বিষাক্ত গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
একটি রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতির কার্যকারিতার ওপর। আমাদের এক সাবেক প্রধান বিচারপতির মতে, আমাদের বিচারাঙ্গনে ইতিমধ্যেই প্রলয় ঘটেছে। আমাদের নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দলীয় ক্যাডারের মতো আচরণ করছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও এখন পর্যন্ত তাদের নিরপেক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। এদিকে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা খর্ব করার পাঁয়তারা চলছে। এসব প্রতিষ্ঠান আরও কার্যকারিতা হারালে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হতে বাধ্য। এটা অনেকটা আগুন নিয়ে খেলা, যা পুরো জাতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এমনি পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের কাছে আমাদের নিবেদন থাকবে, তারা যেন সহিংস আন্দোলন থেকে বিরত থাকে। একই সঙ্গে সরকারি দলের কাছে আবেদন থাকবে, তারা যেন বিরাজমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সংলাপের আয়োজন করে, যাতে বিবদমান বিষয়গুলোর ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছা যায় এবং সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান হয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

রাজনীতিতে রাজনীতি কোথায়? by শান্তনু মজুমদার

বিএনপির সরকার পতনের হুমকি আর আওয়ামী লীগের পাল্টা হুমকি আগামী কয়েক দিনে বাড়তেই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। বিএনপি জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘অবৈধ’ বলতে চায়। আওয়ামী লীগ ‘অবৈধ’ দূরের কথা, এই নির্বাচন যে সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুশীলনে একটি বড়সড় ‘অস্বাভাবিকতা’, তা স্বীকারে নারাজ। প্রধান দুই দলের এমন অবস্থান যে স্থিতিশীলতার বিপক্ষে যায়, তা কে না বোঝে? কেবলই সংবিধানের ধারা-উপধারায় ভর করে রাজনীতির ব্যাখ্যা করনেওয়ালারা এই দুই অনড় অবস্থানের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিতে পেরে রাজনীতিকদের ‘মন-মানসিকতার উন্নতি ঘটাতে হবে’-মার্কা বায়বীয় বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন, তাও অনেক দিন। আর এই ফাঁকে রাজনীতি দিনকে দিন নেই হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে। রাজনীতি নেই হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে? এ রকম একটা কথা বললে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবেন এমন মানুষের সংখ্যা, আশার কথা, এখনো অনেক। কিন্তু মোটা দাগে মানবকল্যাণ অর্থে রাজনীতিকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশে রাজনীতি থেকে সত্যিই তো রাজনীতি নেই হয়ে যাচ্ছে। বড় দুই দলের কথার লড়াইয়ে সত্যিকারের রাজনীতি কোথায়? রাজনীতি যদি সত্যিই থাকত তাহলে তোবা গ্রুপের শ্রমিকেরা আমরণ অনশনে ঈদ যাপন করেন? শ্রমিকের মজুরি, শ্রমিকের পাওনা না দিয়ে পুরোনো-পাপী মালিকের বহাল তবিয়তে থাকার মধ্যে কি রাজনীতির দেখা মেলে? দেখা হয়তো মেলে, তবে তা রাজনীতির কদর্থে। নোয়াখালীতে আবার সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে।প্রশাসন ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। দৃশ্যত পরিস্থিতি ঠান্ডা। কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তিরা টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে রোদন করতে করতে মিডিয়া নজর সরে গেলে আবার আক্রান্ত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা জানিয়েছেন। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুকে নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্ক ও অস্বস্তির জীবন যাপন করতে হয়—এ কেমন রাজনীতি?
সামরিক শাসকেরা বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে রাজনীতিকে নেই করে দেওয়ায় বিপুল সাফল্য দেখিয়েছিলেন। নব্বই-পরবর্তী সংসদীয় গণতান্ত্রিক আমলে পুরোনো বুদ্ধিজীবীদের স্থলাভিষিক্ত হওয়া সুশীল সমাজের একাংশ এই ধারাটিকে জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতে বেশ পুষ্ট করছেন। মূলধারার রাজনীতির একটি অংশের ওপরে ক্রোধবর্ষণ করতে গিয়ে এঁরা রাজনীতি শব্দটিকেই ঘৃণিত করে তুলছেন; আর রাজনীতিকমাত্রই খারাপ, এ ধরনের একটা ধারণা নিরন্তর নির্মাণ করে চলেছেন। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে এই ধারণা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। এঁদের সঙ্গে আছেন শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সেই অংশটি, যাঁরা তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের মাটিতে দেখতে এতটুকু প্রস্তুত নন। খারাপ রাজনীতিকের কাছ থেকে খারাপ-খারাপ সুযোগ নেওয়া (কথার কথা, অন্যায় প্রমোশন-পোস্টিং ব্যবসা) এই অংশটি সুযোগ পেলেই রাজনীতিক ও রাজনীতিকে গালাগাল করে এবং অন্যদেরও একই কর্ম করতে শেখায়। নিজের সন্তানকে শেখায় সবার আগে। এসব নেতিবাচকতার নিট-ফল হচ্ছে খুব রাজনীতিবিমুখ, রাজনীতিবিরোধী আত্মকেন্দ্রিক ভোগসর্বস্ব একটি তরুণ সম্প্রদায়, যাদের চোখের ভাষা পড়লে ভয় লাগে। রাজনীতিতে ‘মেধাবীদের’ প্রবেশে রাস্তা বন্ধ থাকা নিয়েও আহাজারি ও ক্রোধ করতে দেখা যায় রাজনীতি ঘৃণাকারীদের। ‘মেধাবী’ বলতে কী বোঝানো হয় কে জানে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি আসনের জন্য ৬০-৭০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। যারা ভর্তি হয়, তারা কি ‘মেধাবী’ নয়? তাহলে এই ‘মেধাবীদের’ মধ্যে মূলধারার রাজনীতিতে আসা অনেকেই কীভাবে বখে যায়? মেধার অভাবে মূলধারার রাজনীতির এই দশা এমন সরল সমীকরণ বিরক্তির উদ্রেক করে মাত্র; কাজের কাজ কিছু হয় না। আর রাজনীতির ময়দানে গোলাপ ফুল ছিটিয়ে রাখা হবে আর মেধাবীরা এসে রাজনীতি করে ধন্য করে দেবে, এমন হাস্যকর কথা আমাদের দেশেই সম্ভবত বলা হয়। আসলে তথাকথিত ‘মেধা’ নয়, দরকার কমিটেড রাজনৈতিক কর্মী।
এখন কাজের কাজ হচ্ছে, রাজনীতিতে রাজনীতি ফিরিয়ে আনা। তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করা; রাজনীতিক মাত্রই খারাপ, এ রকম একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ধারণা না দেওয়া। তা না হলে রাজনীতির নামে কোন্দল, উপদলে-উপদলে হানাহানি, সিন্ডিকেটবাজি, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদী তৎপরতা চলতেই থাকবে। বিএনপি সরকার ফেলে দিতে চায়, তাতে সাধারণ মানুষের কী? নির্বাচনের অসংগতি এতটুকু স্বীকার না করার আওয়ামী অবস্থানে সাধারণ মানুষের স্বার্থ কোথায়?
শান্তনু মজুমদার: রাজৈনতিক বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

অনশনের মানুষ ও ক্ষমতার বিকার by আনু মুহাম্মদ

গত এক-দেড় মাসে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রতিদিনের খবরের বড় অংশজুড়ে ছিল আন্দোলন নিয়ে বিএনপি ও সরকারের হুমকি-পাল্টাহুমকি। বৈচিত্র্যহীন একঘেয়ে একই কথা প্রতিদিন শুনতে হয়েছে, ‘ঈদের পর আন্দোলন হবে’ আর ‘আন্দোলন ঠেকানো হবে’। দুই পক্ষেরই গলাবাজি করে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা।
অন্যদিকে জনগণের জীবন চলেছে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা, যানজট, দ্রব্যমূল্য, খুন, গুম, ক্রসফায়ার, রিমান্ড, চাঁদাবাজি, ছিনতাই নিয়ে আতঙ্কে-উদ্বেগে। সরকারের এখন একচেটিয়া ক্ষমতা। বিরোধী দল নেই, সুতরাং দখল, চাঁদাবাজি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলেরই বিভিন্ন গ্রুপের মরণপণ সংঘাত চলছে দেশের নানা প্রান্তে। সরকারের নানা সিদ্ধান্তও চলছে একতরফা। সুন্দরবন ধ্বংসের নানা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। বিশাল সমুদ্রসম্পদ জনগণের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে অতীতেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, এখনো সে রকম কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
অথচ ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া ও চীনের কোম্পানিগুলোর লবিস্টদের প্রচার-প্রচারণার তৎপরতা বেড়েছে। সরকারের লোকজন তাদের সুরেই কথা বলছে। জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও ভুল নীতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন যাতে কেউ না তুলতে পারে, কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া যায়, তার জন্য সরকার আবারও দায়মুক্তি আইনের মেয়াদ আরও চার বছর বৃদ্ধি করছে। পরীক্ষায় দুর্নীতি, নিয়োগ-বাণিজ্য, সন্ত্রাস—সবকিছুতেই সরকারের অস্বীকারের প্রবণতাও এখন আরও বেড়েছে।
পোশাকশ্রমিকসহ অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের কাজ ও মজুরি নিয়ে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাহীনতা তো বরাবরের বিষয়। এর চরম চেহারা দেখা গেছে তোবা গ্রুপে। বিশ্বকাপের জার্সির কাজ পেয়েছিল এই গ্রুপের কয়েকটি কারখানা। শ্রমিকেরা কাজও করেছেন। মজুরি বকেয়া থাকায় এর আগেও শ্রমিকেরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে আবার কাজে যোগও দিয়েছেন। গত ১৭ মে তোবা ফ্যাশনসের কারখানার ম্যানেজার তাঁর স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্যে শ্রমিকদের গত এপ্রিল মাসের বেতন ২০ মের মধ্যে এবং মে মাসের বেতন ১০ জুনের মধ্যে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু মে মাসের বেতন আবার বকেয়া হয়।
২৬ জুন তোবা গ্রুপের পাঁচটি কারখানার পরিস্থিতি নিয়ে বিজিএমইএর প্রতিনিধিসহ তাদের অডিটরিয়ামে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী মে মাসের মজুরি ৩ জুলাই, জুন মাসের মজুরি ১৫ জুলাই, ঈদ বোনাস ও জুলাই মাসের ১৫ দিনের মজুরি ২৬ জুলাই দেওয়ার কথা। এই চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিকেরা ২৭ জুন থেকে আবারও বিপুল উদ্যমে কাজ শুরু করেন। কিন্তু এবারও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়। এর মধ্যে অর্ডারের সব কাজ শেষ হয়, সেগুলো বিশ্বকাপের আনন্দ বৃদ্ধি করে। আর তখনই মালিকপক্ষ জানায়, তাদের টাকা নেই। ব্যবসা হয় ৬০ কোটি টাকার, চার কোটি টাকার মজুরি দেওয়ার টাকার আকাল! মালিক, বিজিএমইএ ও সরকারের যৌথ প্রযোজনার নির্মম খেলায় বলি হন শ্রমিকেরাই। যে ছুটির সময় স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা, সে সময় তাঁদের থাকতে হলো অনশনে। পোশাকমালিকদের রক্ষার জন্য আছে শিল্প পুলিশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদের পাওনা অধিকার থেকে যখন বঞ্চিত হয়, তখন তাই সরকারের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
এখনো রানা প্লাজায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। নীতিমালাও হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে শ্রমিকদের সহায়তার নামে তোলা ১০০ কোটি টাকার ওপর এখনো পড়ে আছে। এর মধ্যে বিজিএমইএ সরকারের কাছ থেকে তিন হাজার কোটি টাকার বাড়তি সুবিধা আদায় করেছে, মার্কিন সরকার সাত হাজার কোটি টাকার শুল্ক আদায় করেছে, ব্র্যান্ডগুলো তাদের মুনাফা আরও বাড়িয়েছে। আর শ্রমিকদের জন্য ঈদের ‘উৎসব’ গেল রানা প্লাজায় বিপর্যস্ত কয়েক হাজার পরিবারের সঙ্গে মজুরি ও বোনাস না পাওয়া অসংখ্য শ্রমিকের আহাজারি ও ক্ষোভ নিয়ে।
আমাদের দেশে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে এত উৎসাহ, এত উচ্ছ্বাস, এত পতাকাযুদ্ধ! কিন্তু নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য সারা দেশের খেলার মাঠ দখলমুক্ত করার দাবি ওঠে না ঠিকমতো। এত উচ্ছ্বাস জার্সি নিয়ে, অথচ সেই জার্সি সেলাই করেন যে শ্রমিকেরা, তাঁদের মজুরি যে মাসের পর মাস অনাদায়ি থাকে, সে বিষয়ে সমাজে মনোযোগ দেখা যায় না।
উন্নয়নের ঢাকঢোল পিটিয়ে নদী, বন, মাঠসহ দেশের সম্পদ দখল ও বিনাশ করে দেশি-বিদেশি গোষ্ঠী। অথচ এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য চিন্তা ও শ্রমে সারা সমাজে এখনো অনেক আলস্য।নিজেদের স্বার্থ নিয়ে এই অমনোযোগ আর নিষ্ক্রিয়তার ফাঁকেই তৈরি হয় ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার ক্যারিকেচার।কৃত্রিম গলাবাজি আর স্বার্থের ঐক্যের রাজনীতির ডিগবাজি।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

তোবা শ্রমিকের অনশন- এ কেমন দেশ হলো আমাদের? by ফারুক ওয়াসিফ

অপহরণকারীরা নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। যুদ্ধে দেখা যায় বন্দিবিনিময়। কিন্তু তোবা গ্রুপের এটা কেমন মুক্তিপণ, যেখানে ষোলো শ শ্রমিক হলেন জিম্মি? তারা বলছে, তাদের সহমালিক বন্দী দেলোয়ার হোসেনের জামিন না হলে শ্রমিকদের বেতন দিতে পারবে না। কোম্পানি আইনের কোথাও নেই যে একজন মালিকের অনুপস্থিতিতে অন্য অংশীদারেরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারবেন না। তোবা গ্রুপ এই ফাঁদ পেতেছে এবং দেলোয়ার হোসেনের জামিন মঞ্জুর হয়েছে। যুদ্ধে যেমন নিরীহ মানুষদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা অপরাধ, তেমনি ক্ষুধার্ত ও বেতনবঞ্চিত শ্রমিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তোবা গ্রুপও অপরাধ করেছে। এই ব্যবহারকে বৈধতা দিচ্ছেন স্বয়ং শ্রম প্রতিমন্ত্রী। শামীম ওসমানদের ভরসা ক্ষমতাসীন দল, গার্মেন্টস মালিকদের ভরসা সরকার। এ কেমন দুর্দশা আমাদের?
উচ্চ আদালতের অবকাশকালীন বেঞ্চ থেকে দেলোয়ার হোসেন জামিন নেন ঈদের আগের কার্যদিবসের শেষ দিনে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, যেদিন এই জামিনের শুনানি চলছে, সেদিন আদালতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল উপস্থিত ছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর দায়িত্ব ছিল এই চাঞ্চল্যকর মামলার প্রধান আসামির জামিনে আইনানুগ বাধা দেওয়া। সেটাই নিয়ম। ক্রিমিনাল মামলার জামিনের শুনানি করতে হলে আগে সরকারপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক। সুতরাং যা ঘটেছে সরকারের গোচরেই ঘটেছে।
তাজরীন ফ্যাশনসে ১১১ জন শ্রমিকের পুড়ে মৃত্যুর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই তৈরি করা তদন্ত কমিটি দেলোয়ার হোসেনকে আটক করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ধাক্কা-তত্ত্বের জনক তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেই সুপারিশ আমলে নেননি। তা হলেও নিহতদের আত্মীয়রা লোকটির বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালত সেই মামলা আমলে নেন এবং একপর্যায়ে তাজরীন ফ্যাশনসের মালিক দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। আশা ছিল, বিচার হবে।
এর মধ্যে ঈদ এল। যে শ্রমিকেরা ছুটি পান না, ঈদ তাঁদের জন্য আনন্দের খনি। যাঁরা মাসের পর মাস পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকেন, ঈদই তাঁদের সঙ্গে মেলার সুযোগ। ঈদ তাঁদের উৎসব-বিলাস না, অতিপ্রয়োজনীয়। যাঁরা সারা বছর ঋণ করেন, ছেলেমেয়েদের ভালো কিছু দিতে পারেন না, ঈদের বোনাসে তাঁরা ঋণ শোধ করেন, ভালোমন্দ খান ও পুত্রকন্যা-ভাইবোনদের নতুন জামা পরান। তোবা গ্রুপ শুধু শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন ও ঈদের বোনাসই আটকে দেয়নি, ঈদের ছুটিটাকেও জিম্মি করেছে। অথচ বেতনের টোপ দিয়ে তিন মাস কাজ করিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ইতিমধ্যে করা সারা। অতি পরিশ্রমে শ্রমিকের ঘাম আজকাল শুকায় না, তাই ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি দেওয়ার ধর্মীয় বিধানও কেউ মানে না!
ঈদের দিন থেকে আজ পর্যন্ত ষোলো শ শ্রমিক জীবনের দাবিতে অনশন করছেন। এ পথে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এটা তাঁদের সেলফ ডিফেন্স, আত্মরক্ষার হাতিয়ার। এই ষোলো শ শ্রমিক যখন অনশন করছেন, তখন প্রধানমন্ত্রী ঈদ সংবর্ধনা নিচ্ছেন ও দিচ্ছেন। একের পর এক শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে যখন হাসপাতালে যাচ্ছেন, তখন শ্রম প্রতিমন্ত্রী গ্রামের বাড়িতে ঈদ করছিলেন। এত কিছু যখন ঘটছে, তখন বিজিএমইএর সভাপতি কানাডানিবাসী পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে গেছেন। অনেক মালিকই তখন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশে বেড়াতে গেছেন। তাঁদের অনেকেরই ঈদের বাজার দেশে হয় না, বিদেশে হয়।
এহেন দেশের শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক শ্রমিকের কান্না শুনতে পান না। তিনি শুনেছেন তাজরীনের মালিক দেলোয়ার হোসেনের ডাক। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেনের জামিন হয়েছে। আশা করছি, আগামী রোববার-সোমবারের মধ্যে তিনি যদি মুক্ত হয়ে আসেন, তাহলে সমস্যাটা সমাধান হয়ে যাবে।’ আরও বলেছেন, ‘আমার দৃঢ়বিশ্বাস, রোববার-সোমবারের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন নিশ্চয়ই মুক্ত হবেন।’ পাঠক খেয়াল করেন, এটা তাঁর ‘আশা’ এবং শত শত মানুষের মৃত্যুর দায়ে বিচারাধীন আসামির জামিন হওয়ায় তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস। এরপর শ্রম মন্ত্রণালয়ের নাম হওয়া উচিত মালিক কল্যাণ মন্ত্রণালয়। কখনো এই মন্ত্রণালয় শ্রমিকের কাজে আসে না।
প্রথম আলোর ওই সংবাদে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বিজিএমইএ ও তোবা গ্রুপের কর্মকর্তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ঈদের আগেই শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করবেন। তবে খুবই দুঃখজনক, আজকে পর্যন্ত পাওনা পরিশোধ হয়নি।’ পাওনা পরিশোধ করেনি, আবার জামিনও দেওয়া হলো। মালিকদের জন্য তাঁর অপার আশা, অপরাধীর প্রতি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস।তাই বলতে পারেন, ‘জেল থেকে বেরিয়ে আসলেই শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা হবে। আর যদি না করেন, তবে সরকারপক্ষ থেকে যে সমস্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সবই করা হবে। এ ব্যাপারে সরকার অত্যন্ত সজাগ।’ তিন মাসের বেতন আটকে রাখার পরও আপনারা ব্যবস্থা নেননি। ঈদের আগে বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরও আপনি তাঁদের বিরুদ্ধে আঙুল নড়াননি। এখন বলছেন, ‘সরকার অত্যন্ত সজাগ’!!! জি, মালিকদের বাঁচাতে তাঁদের অঢেল মুনাফা নিশ্চিত করতে মন্ত্রী মহোদয় সজাগ বটে।
তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লাগানোর সময় কোনো অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা কাজ করেনি। আগুনের তাপে ছটফট করা শত শত শ্রমিককে আটকে রাখা কলাপসিবল গেটের তালা কেউ খুলে দেয়নি। অথচ দেলোয়ার হোসেনের জন্য জেলের তালা খোলার ব্যবস্থা হলো। রানা প্লাজার কুখ্যাত রানা একের পর এক মামলায় জামিন পাচ্ছেন। তাঁর বেলায় আইন কাজ করছে না, কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলন দমাতে আইনের হাত পুলিশ অত্যন্ত কঠোর। রানা প্লাজায় সরকারিভাবে বারো শ, বেসরকারিভাবে দুই হাজারের ওপর শ্রমিকের মৃত্যুর পরও অনুশোচনা জাগেনি যাঁদের মনে, তাঁরা মানুষ নন। তাঁরা হলো মুনাফা মেশিন। এই মেশিনের একদিকে মানুষ ঢোকে, অন্যদিকে বের হয় মুনাফার ঢল। নিচে, উচ্ছিষ্ট হিসেবে পড়ে থাকে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম-রক্ত-লাশ।
ডুবন্ত বিপন্ন মানুষের জন্য একটিও লাইফবোট নেই। নেই আইনের জীবনবিমা। নেই আস্থার সনদ। এবং নেই আশা। এ দেশে গডফাদার আর মুনাফামত্তরাই শুধু আশাবাদী। এ কেমন দেশ হলো আমাদের?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

কেন বারবার লক্ষ্যবস্তু গাজা?

ইসরায়েলি হামলায় গাজা উপত্যকায় প্রতিদিন হতাহত হচ্ছে
অনেক শিশু। গতকাল আহত এক শিশুকে রাফা শহরের
একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ছবি: এএফপি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় বারবার অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। বড় অভিযানগুলোর মধ্যে ২০০৮ ও ২০১২ সালের পর গত ৭ জুলাই থেকে আরেকটি রক্তাক্ত অভিযান শুরু করেছে তারা। প্রশ্ন হলো, কেন বারবার গাজায় অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। ভৌগোলিকভাবে ইসরায়েল ও মিসরের মাঝখানে অবস্থান গাজা উপত্যকার। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর দখল করা ভূখণ্ডের মধ্যে শুধু গাজা থেকেই সেনা ও বসতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা একেই গাজা থেকে নিজেদের দখলদারির অবসান বলে মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
এখনো গাজার অধিকাংশ সীমান্তই নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েলি বাহিনী। শুধু দক্ষিণের সীমান্তচৌকির নিয়ন্ত্রণ মিসরের হাতে। ইসরায়েল গাজার সীমান্ত, নৌ ও আকাশপথগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো মানুষ বা মালামাল গাজায় ঢোকা কিংবা বের হওয়া—সবই হচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যে। ইসরায়েলের দাবি, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ইসরায়েলের এ তৎপরতার কারণে গাজার বাসিন্দারা কার্যত অবরুদ্ধ। গাজাবাসী তাদের আর্থসামাজিক দুরবস্থার জন্য দায়ী করে ইসরায়েলকে। আর হামাসসহ কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের এ তৎপরতাকে অসহনীয় ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। নিজেদের সনদ অনুযায়ী হামাস ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংগঠনটি বলেছে, তারা ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রবিরতির বিষয়টি বিবেচনা করবে। হামাস বলছে, পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারি অব্যাহত থাকায়ই বিভিন্ন সময়ে তারা দেশটি লক্ষ্য করে রকেট ছোড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০০৮ সালে গাজায় বড় ধরনের অভিযান চালায় ইসরায়েল। ডিসেম্বরে শুরু করে ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২২ দিনের ওই অভিযানে এক হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়। বিপরীতে নিহত হয় ইসরায়েলের ১৩ সেনা। চার বছর পর ২০১২ সালের নভেম্বরে ‘অপারেশন পিলার অব ডিফেন্স’ নামে আবারও রক্তাক্ত অভিযান চালায় ইসরায়েল। এতে ১৬৭ ফিলিস্তিনি ও ছয় ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়।
এ অভিযানের স্থায়িত্ব ছিল আট দিন। হামাসকে দমনের নামে এসব অভিযান পরিচালনা করা হলেও এর মূল্য দিতে হয়েছে ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষকে। ইসরায়েল সর্বশেষ ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে গাজায় যে অভিযান শুরু করেছে, তার স্থায়িত্ব ও ধ্বংসযজ্ঞ আগের দুটি অভিযানকে ছাড়িয়ে গেছে। নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ১৪ শ ছাড়িয়েছে। এদের অধিকাংশই শিশুসহ সাধারণ মানুষ। ইসরায়েলের দাবি, নিহত হয়েছে তাদেরও ৬৩ সেনা ও সাধারণ নাগরিক। অপারেশন প্রটেক্টিভ এজের শুরু ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। গত জুনে ইসরায়েলি তিন তরুণকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার জন্য ইসরায়েল হামাসকে দায়ী করে। এরপর গত ২ জুলাই জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনি এক কিশোরকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। অভিযোগ ওঠে, ইসরায়েলি তরুণদের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ফিলিস্তিনি ওই কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার পর হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামাস ইসরায়েল লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালাচ্ছে অভিযোগ তুলে ৭ জুলাই থেকে গাজা অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েল বলছে, হামাসের রকেট হামলা বন্ধ করতে এ অভিযান শুরু করেছে তারা। হামলার জন্য ব্যবহৃত গাজার সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, হামাস গাজায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। ঘনিষ্ঠ মিত্র সিরিয়া ও ইরানের কাছ থেকে সহায়তা কমে যাওয়া, মিসরে সমমনা সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের পতন এবং মিসর-ইসরায়েলের অবরোধে গাজার অর্থনৈতিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে হামাস।
এ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানো শুরু করে তারা। তাদের প্রত্যাশা, এতে করে হয়তো হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়া যাবে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েলের অবরোধ প্রত্যাহারের পথ তৈরি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব শিগগির দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ৭ জুলাই হামলা শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এ পর্যন্ত কয়েক দফা সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি হলেও তা কার্যকর হয়নি। ইসরায়েল বলছে, গাজা থেকে ইসরায়েলে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহৃত সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান চলবে। এমনকি যুদ্ধবিরতি হলেও লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত কিছু জায়গায় তাদের অভিযান চলবে। অন্যদিকে হামাস বলছে, গাজার ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে যাবে না তারা। তারপরও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। মিসরের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই প্রক্রিয়া চলছে। যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে। তাই হামাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে হামাসকে সমর্থনকারী তুরস্ক ও কাতার এই যুদ্ধবিরতির আলোচনায় সম্পৃক্ত রয়েছে। বিবিসি।

কেড়ে নিয়েছে শিশুর প্রাণ -যুদ্ধবিরতি ভেঙে হামলা জোরদার

সর্বশেষ দফা যুদ্ধবিরতিও ভেঙে যাওয়ার পর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নতুন করে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। তাদের নির্বিচারে গোলাবর্ষণ কেড়ে নিয়েছে আরও ১০৭ জনের প্রাণ। বিধ্বস্ত হয়েছে গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অংশ।

গাজার রাজনৈতিক নিয়ন্তা হামাসও থেমে নেই। ইসরায়েলের দিকে তারাও রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে। তবে সেসব হামলায় প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে এ রকম একটি নাজুক পরিস্থিতিতে মার্কিন কংগ্রেস ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আয়রন ডোমে’র জন্য ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তহবিল অনুমোদন করেছে। আয়রন ডোমের সাহায্যে ইসরায়েল হামাসের ছোড়া রকেট আকাশেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতার যুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ইতিমধ্যে সে দেশেই মজুত মার্কিন সমর উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। খবর এএফপি, বিবিসি ও আল-জাজিরার।
গত ৭ জুলাই থেকে চলা ইসরায়েলের এ অভিযানে গাজা উপত্যকায় এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৬৫০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় নয় হাজার। হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। পক্ষান্তরে ইসরায়েল ৬৬ জনকে হারিয়েছে; যাঁদের মধ্যে ৬৩ জনই সেনাসদস্য।
জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল আটটায় আরেক দফা মানবিক যুদ্ধবিরতিতে যায় ইসরায়েল ও হামাস। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক যেতে না-যেতেই গাজার দক্ষিণে রাফা শহরে ফের আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামাসের চোরাগোপ্তা হামলায় তাদের দুজন সেনা নিহত হওয়া ছাড়াও এক সেনা অপহৃত হয়েছে। তবে হামাস এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কথিত অপহৃত সেনাটি সংঘর্ষে নিহত হয়ে থাকতে পারে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানান, রাফা শহরে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো শুরু হয়। গতকাল সকালেও তা অব্যাহত ছিল। হামলায় গাজা শহরে অবস্থিত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ওই হামলার ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থল থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক ইমতিয়াজ তায়েব বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন হামলা চালানো হলো, তা স্পষ্ট নয়। তবে গাজার পরিস্থিতি কতটা অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এ ঘটনা এটাই প্রমাণ করে।’
দুই পক্ষকে ওবামার আহ্বান: মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘নিখোঁজ’ ইসরায়েলি সেনার ‘নিঃশর্ত’ মুক্তি দাবি করেছেন। পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন, গাজার বেসামরিক লোকজনকে রক্ষায় ইসরায়েলকে আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে ইসরায়েলের এ অভিযানকে ‘বোকামি’ ও ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাজ্যের জোট সরকারের অংশীদার লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টির সাবেক নেতা লর্ড অ্যাশডাউন। তিনি উভয় পক্ষকে সহিংসতার পথ ছেড়ে শান্তি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। অ্যাশডাউন বলেন, ‘বিশ্বের সেরা ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা হাতে থাকার পরও সামরিক অভিযান শুরু করা ইসরায়েলের জন্য বোকামি হয়েছে।’ পাশাপাশি সাবেক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী রক্ষণশীল দলের এমপি পিটার লাফ প্রধানমন্ত্রীকে চলমান গাজা-সংকটের বিষয়ে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ক্ষমতাসীন দলটির আরও কয়েকজন এমপি অনুরূপ আহ্বান জানিয়েছেন।
অস্ত্রবিরতির আহ্বান মিসরের: দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি গতকাল বলেছেন, মিসরের অস্ত্রবিরতি পরিকল্পনাই গাজায় সংঘাত নিরসনের ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হতে পারে। তিনি এই অস্ত্রবিরতি পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘এটাই উপযুক্ত সময়। ফিলিস্তিনে রক্তপাত বন্ধে ও গাজার আগুন নেভাতে আমাদের দ্রুত এর সুবিধা নিতে হবে।’

তিনটি যুদ্ধ দেখেছে গাজার ছয় বছরের শিশুরাও

হাসপাতালে চিকিৎসকদের এক টেবিলে যন্ত্রণাকাতর তিন শিশু।
গাজার রাফা শহরের আল-নজর হাসপাতালে গতকাল চিকিৎসা
দেওয়া হয় ইসরায়েলি হামলায় আহত শিশুদের। এএফপি
গত সপ্তাহে জাতিসংঘ উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় প্রতি ঘণ্টায় একটি শিশু মারা গেছে। পুরো গাজায় শিশুদের জন্য হামলা থেকে পালানোর ঠাঁই নেই। নেই জেইতুন এলাকার বাসিন্দা চার বছরের শিশু দিমারও। এরই মধ্যে সে দুটি যুদ্ধ দেখেছে। পরিসংখ্যান বলছে, গাজার ছয় বছর বা এর বেশি বয়সী অধিবাসী মাত্রই তিনটি বা এর বেশি যুদ্ধ দেখেছে। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, গাজায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানে এত বেশি শিশু হতাহত হওয়ার কারণ হচ্ছে উপত্যকার জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশই শিশু।
আর ইসরায়েল ঘনবসতিপূর্ণ জনপদটিতে হামলাও চালাচ্ছে নির্বিচারে। নিহত একটি শিশুর চাচা আবদেল করিম বাকের বলছিলেন, ‘এটা ঠাণ্ডা মাথার গণহত্যা। ইসরায়েল নাকি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ওদের এসব প্রযুক্তি কী শিশুদের দেখে না?’ গাজায় একের পর এক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাচ্ছে। আবার শুরু হচ্ছে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ইসরায়েলি হামলা। এর অর্থ, আরও অনেক শিশুর মৃত্যু, আসলে হত্যাদৃশ্য দেখতে হবে বিশ্বকে। টেলিগ্রাফ।

কেড়ে নিয়েছে শিশুর প্রাণ -যুদ্ধবিরতি ভেঙে হামলা জোরদার

সর্বশেষ দফা যুদ্ধবিরতিও ভেঙে যাওয়ার পর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নতুন করে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। তাদের নির্বিচারে গোলাবর্ষণ কেড়ে নিয়েছে আরও ১০৭ জনের প্রাণ। বিধ্বস্ত হয়েছে গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অংশ।

গাজার রাজনৈতিক নিয়ন্তা হামাসও থেমে নেই। ইসরায়েলের দিকে তারাও রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে। তবে সেসব হামলায় প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে এ রকম একটি নাজুক পরিস্থিতিতে মার্কিন কংগ্রেস ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আয়রন ডোমে’র জন্য ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তহবিল অনুমোদন করেছে। আয়রন ডোমের সাহায্যে ইসরায়েল হামাসের ছোড়া রকেট আকাশেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতার যুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ইতিমধ্যে সে দেশেই মজুত মার্কিন সমর উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। খবর এএফপি, বিবিসি ও আল-জাজিরার।
গত ৭ জুলাই থেকে চলা ইসরায়েলের এ অভিযানে গাজা উপত্যকায় এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৬৫০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় নয় হাজার। হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। পক্ষান্তরে ইসরায়েল ৬৬ জনকে হারিয়েছে; যাঁদের মধ্যে ৬৩ জনই সেনাসদস্য।
জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল আটটায় আরেক দফা মানবিক যুদ্ধবিরতিতে যায় ইসরায়েল ও হামাস। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক যেতে না-যেতেই গাজার দক্ষিণে রাফা শহরে ফের আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামাসের চোরাগোপ্তা হামলায় তাদের দুজন সেনা নিহত হওয়া ছাড়াও এক সেনা অপহৃত হয়েছে। তবে হামাস এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কথিত অপহৃত সেনাটি সংঘর্ষে নিহত হয়ে থাকতে পারে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানান, রাফা শহরে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো শুরু হয়। গতকাল সকালেও তা অব্যাহত ছিল। হামলায় গাজা শহরে অবস্থিত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ওই হামলার ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থল থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক ইমতিয়াজ তায়েব বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন হামলা চালানো হলো, তা স্পষ্ট নয়। তবে গাজার পরিস্থিতি কতটা অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এ ঘটনা এটাই প্রমাণ করে।’
দুই পক্ষকে ওবামার আহ্বান: মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘নিখোঁজ’ ইসরায়েলি সেনার ‘নিঃশর্ত’ মুক্তি দাবি করেছেন। পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন, গাজার বেসামরিক লোকজনকে রক্ষায় ইসরায়েলকে আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে ইসরায়েলের এ অভিযানকে ‘বোকামি’ ও ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাজ্যের জোট সরকারের অংশীদার লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টির সাবেক নেতা লর্ড অ্যাশডাউন। তিনি উভয় পক্ষকে সহিংসতার পথ ছেড়ে শান্তি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। অ্যাশডাউন বলেন, ‘বিশ্বের সেরা ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা হাতে থাকার পরও সামরিক অভিযান শুরু করা ইসরায়েলের জন্য বোকামি হয়েছে।’ পাশাপাশি সাবেক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী রক্ষণশীল দলের এমপি পিটার লাফ প্রধানমন্ত্রীকে চলমান গাজা-সংকটের বিষয়ে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ক্ষমতাসীন দলটির আরও কয়েকজন এমপি অনুরূপ আহ্বান জানিয়েছেন।
অস্ত্রবিরতির আহ্বান মিসরের: দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি গতকাল বলেছেন, মিসরের অস্ত্রবিরতি পরিকল্পনাই গাজায় সংঘাত নিরসনের ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হতে পারে। তিনি এই অস্ত্রবিরতি পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘এটাই উপযুক্ত সময়। ফিলিস্তিনে রক্তপাত বন্ধে ও গাজার আগুন নেভাতে আমাদের দ্রুত এর সুবিধা নিতে হবে।’

একতরফা প্রেমে নার্গিস ফকরি

একে একে রণবীর কাপুর ও শহিদ কাপুরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে আবার তা ভেঙেছেন নার্গিস ফকরি। মূলত অন্য নারীদের পাশে নিজের প্রেমিককে সহ্য করতে পারেন না বলেই কোন সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি নার্গিসের। তবে এবার যেন বলিউড সুপারস্টার সালমান খানের প্রেমে মজেছেন এই অভিনেত্রী। তবে তার প্রেমটাও কিন্তু একতরফাই। কারণ, বলিউডের ভাই খ্যাত সাল্লু কাটরিনার পর আর কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়াননি। জড়াবেন না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে সালমানের ‘কিক’ ছবির আইটেম গানে অংশ নিয়ে দারুণভাবে আলোচিত হচ্ছেন নার্গিস। গানটিতে সালমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পারফর্মও করেছেন তিনি। গানটির জন্য সাল্লুই নার্গিসকে নির্বাচন করেছিলেন। পরিচালক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালাও বন্ধু সালমানের কথামতো নার্গিসকে গানটির জন্য নিয়ে সুফল পেয়েছেন। এরই মধ্যে গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ‘কিক’ এরই মধ্যে প্রথম চার দিনে আয়ের দিক দিয়ে এক শ’ কোটির ঘর অতিক্রম করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছর তথা বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসা সফল ছবিতেই শেষ পর্যন্ত পরিণত হবে এটি। আর এসব মিলিয়ে সালমানকে ঘিরেই এখন স্বপ্ন দেখছেন নার্গিস। জানা গেছে, ঈদের উপহারও সাল-মানকে পাঠিয়েছেন এই অভিনেত্রী। তাছাড়া ঈদের দিন ফোন করে সাল্লুকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন তিনি। এর আগে সালমানের সঙ্গে একাধিকবার আবিষ্কার করা গেছে নার্গিসকে। নার্গিস নিজেও সালমানের প্রেমে পড়ার কথা স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে তার খোলামেলা বক্তব্য হচ্ছে, সালমানের প্রেমে পড়েছিলাম যখন প্রথমবার ‘হ্যালো ব্রাদার’ ছবিটি দেখি। এরপর তার সব ছবিই আমার দেখা হয়েছে। আমার স্বপ্নের নায়ক তিনি। স্বপ্নের নায়কের সান্নিধ্য অবশেষে আমি পেয়েছি ‘কিক’ ছবিতে। এটা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার। তবে আমি সাল-মানের সান্নিধ্য আরও পেতে চাই। পরবর্তীতেও আমি সালমানের সঙ্গে কাজ করতে চাই। তাহলে আমার লুকায়িত ও একতরফা প্রেম কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছে বলেই মনে করবো।

এরশাদের নাটক

একের পর এক নাটক। মঞ্চে অভিনেতা একজনই। তিনি সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান  হিসেবে তার দ্বৈত অবস্থান জন্ম দিচ্ছে নানা নাটকীয়তার। জাতীয় পার্টি সরকারে আছে। বিরোধী দলেও আছে। দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করছে দলটি। কখনও সরকারের পক্ষে, কখনও সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পার্টির চেয়ারম্যান, বিরোধী দলের নেতাসহ দলের নেতারা কথা বলছেন। এমন দ্বৈত ভূমিকার কারণে জাতীয় পার্টি এখন অনেকের কাছে হাসির পাত্র। দলের নেতাদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ, হতাশ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তৃণমূলই ছিল এক সময় এরশাদের রাজনীতির কেন্দ্র এখন সেই তৃণমূলেই তিনি সমর্থনহীন। দল এবং নিজের জনপ্রিয়তা তলানিতে। ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর এরশাদ ও তার দলের একের পর এক নাটকীয় আচরণ ও ঘটনাক্রমে খাদের কিনারে দাঁড় করিয়েছে জাতীয় পার্টিকে। দলের নেতারা দলকে পুনর্গঠনের কথা বললেও ক্রমে তৃণমূলে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে এরশাদের হাতে গড়া এই দল। দলের নেতাদের দ্বৈত ভূমিকার কারণে দলে এবং বাইরে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সন্দেহ ও সংশয়। সূত্র বলছে, একই সঙ্গে সরকারে থাকা এবং বিরোধী দলে অবস্থান এ দুটিকে দেখাতেই নেতারা দ্বৈত অবস্থানে অবতীর্ণ হচ্ছেন। একই সঙ্গে তারা সরকারের প্রশংসা করছেন। কখনও কখনও সরকারের ভাষায় সাবেক বিরোধী দলের সমালোচনা করছেন। আবার কখনও তারা সরকারের সমালোচনায় মুখর হচ্ছেন। গতকাল দুপুরে এরশাদ বলেছেন, যে সরকার জনগণের নিরাপত্তা ও সুশাসন দিতে পারে না সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোন অধিকার নেই। ব্যর্থ সরকারের বিরুদ্ধে তারা প্রয়োজনে রাজপথে নামবেন। পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদের এরশাদ সরকারের ব্যর্থতা এলাকায় গিয়ে তুলে ধরার নির্দেশ দেন। জাতীয় পার্টি নেত্রী রওশনও সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে মাঝে মধ্যে বক্তব্য রাখেন। আর দলটির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু সম্প্রতি অভিযোগ করেন, দেশে সুশাসন নেই। এভাবে চললে ইতিহাসই সরকারকে মূল্যায়ন করবে। তবে সহসা কিংবা মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রশ্নে তাদের কারও অবস্থান পরিষ্কার নয়। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ একাধিকবার বলেছিলেন, নির্বাচনও করবো না, শপথও নেবো না। রওশনের নেতৃত্বে তার দলের একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নেয়। তিন জন মন্ত্রী হন। আর নানা নাটকীয়তার পর এরশাদ এমপি হিসেবে শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে বাসায় ফেরেন। একটি বেসরকারি টিভির ঈদের অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেছেন, যে কোন সময় জাপার তিন মন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে পারেন। এ প্রশ্নে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মানবজমিনকে বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান কখন কি বলেছেন তা পরিষ্কারভাবে টিভিতে প্রচার করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিন মন্ত্রী পরে সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের যদি পদত্যাগই করতে হয়, তাহলে সবার আগে পদত্যাগ করা উচিত প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদের। এরশাদের ভাই জিএম কাদের সরকারের কড়া সমালোচনা করায় জাপার একটি অনুষ্ঠান থেকে উঠে যান মহাসচিব বাবলু। জাপার একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এরশাদসহ দলটির নেতারা নাটক করছেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসলে সরকারের সমালোচনা নয়, সরকারের নির্দেশেই তারা এমন বক্তব্য দিচ্ছেন। সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বক্তব্য প্রচার করার জন্য অনেক গণমাধ্যম কর্মীকেও তারা অনুরোধ করছেন।

মতবিনিময় সভায় এরশাদ যা বলেন: শনিবার দুপুরে বনানীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এরশাদ বলেন, যে সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সুশাসন দিতে পারে না সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। দেশের মানুষ দুই দলকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। সরকারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে জাতীয় পার্টি রাস্তায় নামবে। তিনি বলেন, মানুষ এখন পরিবর্তন চায়, স্বস্তিতে থাকতে চায়, বাঁচতে চায়, নির্ভয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে চায়। তিনি বলেন, কত মানুষ নিরুদ্দেশ। ছেলে-মেয়েরা তাদের জন্য অপেক্ষায়। তারা ফিরে আসবে কিনা, তা কেউ জানে না। কে কখন কাকে তুলে নিয়ে যাবে তা-ও কেউ জানে না। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়ে বলেন, আমরাও সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নামবো। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতন্ত্রের মূল্য থাকবে না। মানুষ এখন নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করছে। দখলদারী, দুঃশাসন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসের কারণে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মানুষ এ থেকে পরিত্রাণ চায়। দু’টি দল জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাদের ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার কোন অধিকার নেই। বিএনপির মতো পেট্রল দিয়ে মানুষ মেরে বা জ্বালাও-পোড়াও করে আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই না। আমাদের আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ। সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ বলেন, পেট্রল দিয়ে মানুষ মেরে ক্ষমতায় যাওয়া যায় না। আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। এজন্যই এখন মানুষ বিএনপিকে দেখতে পারে না। তবে মানুষ পরিবর্তন চায়। তিনি বলেন, নতুন করে আমাদের সংগঠিত হতে হবে। অতীতে কি হয়েছে তা ভুলে যেতে হবে। সময় এসেছে। আমরাও রাস্তায় নামবো। আমরা মানুষকে অনেক দিয়েছি। এবার ক্ষমতায় গিয়ে নিরাপত্তা দেবো। এরশাদ বলেন, আমার বিরুদ্ধেও আন্দোলন হয়েছে। তবে সারা দেশে হয়নি। আন্দোলন হয়েছে শুধুমাত্র ঢাকায়। হাতে রক্ত লাগিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া যায় না। আমরা কাকে মারবো? ওরা তো আমাদেরই ভাই, সন্তান। এরশাদ দুঃখ করে বলেন, এখন নিঃশ্বাস নেয়ার মতো অবস্থা নেই। মুখেই সংসদীয় গণতন্ত্র। মানুষ এ থেকে বাঁচতে চায়। আমরা সুশাসন দিয়েছিলাম। আর এই সরকারের সময় ! ব্যাংক থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। এই লুটপাটের কারণেও সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে এরশাদ বলেন, সরকারের ব্যর্থতা এলাকায় গিয়ে তুলে ধরতে হবে। খুন, গুম, দলীয়করণ আর দখল ছাড়া কিছুই নেই সরকারের। এ ভাবে দেশ চলতে পারে না। মানুষকে এসব বলতে হবে। আগামীতে আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই। আমাদের লক্ষ্য ১৫১ আসন। এই জন্য দল গোছাতে হবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। সভায় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আবদুস সবুর আসুদ, শরীয়তপুর জেলা জাতীয় পার্টি নেতা এডভোকেট মাসুদুর রহমান ও জাফর খান কামাল বক্তব্য রাখেন। এ সময় পার্টির প্রেসডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়, দফতর সম্পাদক সুলতান মাহমুদ, যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন শিকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।