Wednesday, August 1, 2018

ইসরায়েলের অন্যায্য বিচারে থামবে না তাতুরের লেখনী

ফিলিস্তিনি কবি দারিন তাতুর
ইসরায়েলি আদালতে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া বিচারকে অন্যায্য আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি কবি দারিন তাতুর। ঘোষণা দিয়েছেন যে ভাষা আর শব্দ তার পছন্দ তাতেই লেখা চালিয়ে যাবেন তিনি। আদালতে দণ্ড ঘোষণার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় এই ঘোষণা দেন তিনি। ওই বার্তায় ইসরায়েলে বসবাস করা এই ফিলিস্তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলি আদালতের ‘অন্যায্য বিচারের’ কারণে গত তিন বছরে অনেক ভুগতে হয়েছে তাকে।
৩৬ বছরের তাতুরকে ২০১৫ সালের ১১ অক্টোবরে নাজারেতের কাছের গ্যালিলি গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ‘রুখে দাঁড়াও,  আমার জনগণ,  তাদের রুখে দাঁও’ শিরোনামের একটি কবিতা প্রকাশের জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই কবিতার অনুবাদের কারণে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে জেল দিয়েছে আদালত। তার আইনজীবীর দাবি, ইসরায়েলি অনুবাদকেরা কবিতাটির যথাযথ অনুবাদ করতে সক্ষম হয়নি। সহিংসতায় উস্কানির প্রবণতা নয় বরং তাতে শিল্প-সম্মত প্রকাশই বেশি ছিল বলেও দাবি তার।
মঙ্গলবার দণ্ড ঘোষণার আগে ভিডিও বার্তায় তাতুর বলেন, ‘কারাদণ্ডের আশা করছি। ইহুদি জাতিরাষ্ট্র আইন পাশের পর সবকিছুই ঘটতে পারে। ইসরায়েলে ন্যায়বিচার আছে বলে মনে করি না আর আমি যে ভাষা আর শব্দে চাইবো তাতেই আমার কবিতা লেখা চালিয়ে যাবো। এমন কোনও আইন মানি না যা আমাকে বলে দেবে আমি কোন ভাষা আর শব্দে কবিতা লিখবো।’
গত মে মাসে আদালতে তাকে দোষী ঘোষণার পর সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, তার বিচার ইসরায়েলি গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের ‘মুখোশ খুলে দিয়েছে’। দেড়শোরও বেশি আমেরিকান বুদ্ধিজীবী তাতুরকে মুক্তি দিতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানায়। এদের মধ্যে ছিলেন পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী অ্যালিস ওয়াকার, ক্লদিয়া র‍্যানকিন, নওমি ক্লেইন ও জ্যাকুলিন উডসন। তবে তাতে সাড়া না দিয়ে কারাদণ্ডের আদেশ দিল ইসরায়েলের আদালত।
ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করার পর ২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর আটক হন তাতুর। মে মাসে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে তাতুর বলেছিলেন, ইতিমধ্যেই ইসরায়েলি কারাগার আর গৃহবন্দিত্বের অস্থিরতার মধ্যে আড়াই বছর কাটিয়ে ফেলেছেন।
১৯৪৮ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর অল্প যে কয়েকজন ফিলিস্তিনি সেখানে থেকে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন তাতুরের পূর্ব প্রজন্মরা। ইসরায়েলে এই ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সংখ্যা এখন প্রায় ১৬ লাখ। ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ এই ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা।
ইসরায়েলি নাগরিকত্ব থাকলেও ইসরায়েলে এসব ফিলিস্তিনিরা ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালের সামরিক প্রশাসনের অধীনে বাস করে। আর ওই প্রশাসনের অধীনে তাদের কার্ফু, মত প্রকাশে বাধা, রাজনৈতিক অধিকার হরণ ও সামরিক আদালতের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।
১৯৪৮ সালে প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে জোর করে বের করে দেয় জায়নবাদী যোদ্ধারা। ইসরায়েলে নিজেদের ভূমিতে ফিরতে না পেরে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছে।

ক্রিকেট তারকা, ‘সেক্স সিম্বল’ থেকে প্রধানমন্ত্রী

বিশ্ব ক্রিকেটের পিচ আর লন্ডনের নাইটক্লাব- সব খানেই বেশ নাম করেছিলেন ইমরান খান। তবে পাকিস্তানে রাজনীতির উঁচু পদে যেতে তার দুই দশকব্যাপী সংগ্রামের সময়টুকু তিনি এক জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছেন। ইমরান খানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, সাম্প্রতিককালে তিনি কিছুটা রক্ষণশীল ইসলামকে আলিঙ্গন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। পাশাপাশি, নিজের পার্টি-জীবন থেকে দূরে সরেছেন। অবশ্য এখনও তার রাজনৈতিক দলের প্রতীক হলো ক্রিকেট ব্যাট।
দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকার ফল তিনি অবশেষে পেয়েছেন। সাধারণ নির্বাচনে তার দল সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে। এখন পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রটির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তারই সবচেয়ে বেশি।
দেশজুড়ে ইমরান খানের সত্যিকার জনপ্রিয়তা রয়েছে। আবার দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গেও রয়েছে তার দহরম মহরম। ‘সেলিব্রেটি’ ইমেজ, ক্যারিশমা ও অর্থ- এই তিনের মিশেলে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন। পাকিস্তানের মতো দরিদ্র দেশে মানুষ নানা কারণে বিভক্ত। কিন্তু দুর্নীতি হলো গুটিকয়েক ইস্যু যার বিরুদ্ধে বেশিরভাগ মানুষই ঐক্যবদ্ধ।
মানুষ দেখেছে দেশ যখন ঝুচছে, দেশের রাজনৈতিক বংশগুলো নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করছে। সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। শিশুমৃত্যুর হার এশিয়ায় পাকিস্তানের চেয়ে বেশি খুব কম জায়গায় আছে। দেশ থেকে প্রতি বছর অসংখ্য যুবক বিদেশে যায় গাড়িচালক ও নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে, কেননা দেশে ভালো কর্মসংস্থানের ভীষণ অভাব। ইমরান খান নিজেকে এই সকল রোগের প্রতিষেধক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
কর্নেল ইন্সটিটিউট অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক রেজা রুমি বলেন, ‘তার সঙ্গে সরাসরি কোনো দুর্নীতি কেলেঙ্কারির সংশ্লেষ নেই। যেটি পাকিস্তানি রাজনীতিকদের বেলায় বিরল একটা ব্যাপার।’ তবে এবার ইমরান খান যেই নির্বাচনী সাফল্য পেলেন, তার নেপথ্যে তার ক্লিন ইমেজই একমাত্র অনুঘটক ছিল না।
দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে প্রভাব খাটিয়েছে। এমন প্রমাণ আছে ভুরিভুরি। ইমরানের প্রতিপক্ষরাই নয় শুধু, মানবাধিকার কর্মীরাও অভিযোগ করছেন, সামরিক বাহিনী বেছে বেছে ইমরানের প্রতিপক্ষ দলগুলোকেই টার্গেট করছে। গণমাধ্যম সমালোচনামুখর হলে তাদের টুঁটি চেপে ধরেছে।
বিদায়ী ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে দুই সপ্তাহ আগে কারান্তরীণ করা হয়েছে। এক বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট তাকে অপসারণ করে। উচ্চ আদালত সেনাবাহিনীর চাপে ওই রায় দিয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন।
নওয়াজ শরীফের দলের অনেক সদস্যই পক্ষত্যাগ করেছেন। অনেকেই মনে করেন, নওয়াজের দলকে পঙ্গু করে দিতে নিরাপত্তা বাহিনী এর পেছনে কলকাঠি নেড়েছে।
ইমরান খান ভারী গলায় কথা বলেন। কণ্ঠ থেকে আত্মবিশ্বাসের স্ফুরণ দেখা যায়। খুব বিনয়ীও। আবার তিনি সম্ভবত কারও রিমোট কন্ট্রোলের অধীন। তবে ইমরান জোর গলায় বলেন, তিনি সেনাবাহিনীর পকেটস্থ নন। যদিও তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থক। মাস কয়েক আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি একটি গণতান্ত্রিক সরকার নৈতিক কর্তৃত্ব থেকে দেশ শাসন করে। আপনার যদি ওই নৈতিক কর্তৃত্ব না থাকে, তাহলে যাদের পেশীশক্তি আছে তারাই উঠে আসে। আমার মতে, এটা পাকিস্তান সেনাবাহিনী। কোনো শত্রু সেনাবাহিনী নয়। আমি সেনাবাহিনীকে আমার সঙ্গে রাখবো।’
পাকিস্তানের ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় সরাসরি সেনাশাসন বিরাজ ছিল। বেসামরিক সরকারের সময়ও সেনাবাহিনী রাজনৈতিক বিষয়ে গুরুতর হস্তক্ষেপ করেছে। ফলে ইমরান যখন নিজেকে স্বাধীন দাবি করেন, তখন অনেক বিশ্লেষকই সংশয় পোষণ করেন।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী সি. ক্রিস্টাইন ফেয়ার বলেন, ‘সে হলো তাদের পুতুল। তিনি এখন যেখানে তা হলো আর্মি আর আইএসআই (সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা)-এর কারণে। নির্বাচনের আগে ব্যাপকভাবে আর্মি আর আইএসআই ব্যাপক সক্রিয় ছিল। নির্বাচনের দিন থেকে শুরু করে পরের সময়গুলোতেও সক্রিয় থাকবে, যাতে ইমরান খানের নেতৃত্বে জোট সরকার ক্ষমতায় আসে।’
ইমরান খান তাহলে শাসন করবেন কিভাবে?
পাকিস্তানের জনসংখ্যা বিশ্বে ৬ নম্বর। আছে পারমাণবিক শক্তি। ভৌগোলিক দিক থেকেও উত্তপ্ত অঞ্চলে দেশটির অবস্থান। দেশটির সঙ্গে ভারতের রেষারেষি দীর্ঘদিনের। এছাড়া আফগান তালেবান সহ জঙ্গি প্রক্সিগুলোকে সমর্থন দেয় পাকিস্তান।
ইমরান বলেছেন, তিনি ভারতের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান। তালেবানের কিছু কিছু সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। তবে প্রকাশ্যেই আবার এই গোষ্ঠী ও এর লক্ষ্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার অবস্থান বেশ কঠোর। পাকিস্তানে আমেরিকার ড্রোন হামলা নিয়ে তার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধকে তিনি পাগলামি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক ওমর ওয়ারাইস বলেন, ‘তার পররাষ্ট্রনীতির মূলে রয়েছে আমেরিকা-বিরোধিতা।’
তবে ঘরোয়া বিষয়াদিতে তাকে বেশ বেগ পেতে হবে। দেশের অর্থনীতির অবস্থা ক্রমেই অবনতিশীল। দেশের বিদ্যুত ও পানি সরবরাহ সহ রাষ্ট্রীয় অনেক সেবাখাতে সংকট চলছে।
ইমরান খান কেমন শাসক, সেই ব্যাপারে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে তার দল ২০১৩ সাল থেকে স্বল্প জনসংখ্যার খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ শাসন করে আসছে। সেখানে দলটির পারফরম্যান্সের মান মিশ্র। তবে সরকারি সেবায় উন্নতি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন।
ইমরান বলেছিলেন, শীর্ষ দুই দল তথা পিপিপি ও পিএমএল (এন)-এর সঙ্গে জোট গঠন করবেন না। কারণ, তার মতে, এই দলগুলো প্রচ- দুর্নীতিগ্রস্ত। ফলে ইমরান যদি স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর সঙ্গে মিলে জোট গঠন করেন, তাতে পার্লামেন্ট হবে খুব দুর্বল ও খ-বিখ-।
৬৫ বছর বয়সী ইমরানের জীবন বেশ বর্ন্যাঢ্য। তবে প্রায়ই বদলেছে ধরণ।
জন্মেছিলেন বেশ অভিজাত পরিবারে। পড়াশুনা করেছেন অক্সফোর্ডে। বহু সুন্দরী ও বিখ্যাত নারীর প্রেমিক ছিলেন। আবার খেলোয়াড় হিসেবেও সুপারস্টার তকমাধারী। ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার ভাবা হয় তাকে। ফলে বেশিরভাগ পাকিস্তানীর সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার ব্যবধান আকাশ-পাতাল।
১৯৯২ সালে তার নেতৃত্বে পাকিস্তান যখন বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারায়, তখন দেশে নায়কোচিত মর্যাদা পান তিনি। ওই মুহূর্ত ছিল তীব্র জাতীয় গৌরবের। আর এর কেন্দ্রে ছিলেন ইমরান। তখন তার বয়স ছিল ৩৯।
এর কয়েক বছর পরই ইমরানের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। গরিব মানুষের জন্য ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে তিনি লাখ লাখ ডলার সংগ্রহ করেন। তার মা মারা গিয়েছিলেন ক্যান্সারে। এরপর তিনি ইসলাম নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেন। মনোযোগের কেন্দ্রে থাকা প্রেমে মত্ত সেলিব্রেটি জীবন থেকে সরে আসেন। বললেন, এই ধরণের জীবনে কখনও সন্তুষ্টি নেই।
এক বৃটিশ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের প্রাক্তন রঙিন জীবন সম্পর্কে বলেন, ‘বাইরে থেকে এ জীবন দারুণ গ্ল্যামারাস মনে হয়। তবে আসলে তা এমন নয়। ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কগুলো খুবই ফাঁপা।’
১৯৯৬ সালে ইমরান প্রতিষ্ঠা করেন জাস্টিস মুভমেন্ট। প্রথম কয়েক বছর তার এই দলকে কেউ চিনতোই না। আইনসভায় কোনো আসনই জিততো না। একটা সময় ইমরান সুপারস্টার থেকে হয়ে পড়লেন কৌতুকের পাত্র। ব্যাঙ্গ করে কেউ কেউ বলতেন, ‘ওসৎধহ কযধহ’ঃ।’ বরং, শীর্ষ দুই দল, অর্থাৎ নওয়াজের পিএমএল ও ভুট্টো পরিবারের পিপিপি ছিল সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। দেশজুড়ে তাদের ছিল বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী। অনেক অঞ্চলে এখনও ভূস্বামী ও উপজাতি প্রধানদের প্রভাব ব্যাপক। এই বিশেষ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবিশেষকে যদি কাক্সিক্ষত সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে ভোট পাওয়া যায় অনেক। ইমরানের নতুন রাজনৈতিক দল এখানটায় পিছিয়ে ছিল দীর্ঘদিন।
তবে ওই কঠিন সময়েও ইমরান কিছু ভক্ত জুটিয়েছিলেন। তার সমাবেশে অনেকে চিৎকার করে শ্লোগান দিতেন, ‘কে বাঁচাবে পাকিস্তান? ইমরান খান! ইমরান খান!’ আজ অনেক রক্ষণশীল মুসলিম তার বেয়াড়া অতীত জীবনকে অগ্রাহ্য করতে প্রস্তুত।
তানভীর হায়দার নামে এক পাকিস্তানী ক্রেন অপারেটর কাজ করেন মধ্যপ্রাচ্যে। এই সপ্তাহে তিনি দেশে উড়ে গেছেন শুধু ইমরানের দলকে ভোট দেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, ‘তিনি অতীতে কী ধরণের জীবনযাপন করতেন, সেটা তার ব্যাপার। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের জন্য তিনি কী করবেন। সব রাজনীতিকের চেয়ে তিনিই বেশি করবেন।’
পাকিস্তানের অনেক বিশ্লেষক বলছেন, মানুষজন পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। ইমরান এই পরিবর্তনেরই প্রতিনিধি। সাংবাদিক রেজা রুমি বলেন, ‘সবাই না হলেও শহুরে বাসিন্দাদের অনেকেই দুই শীর্ষ দলের ওপর বিরক্ত।’
তবে আর যা-ই হোক, নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হলেও, ইমরান সেসব বেশ দৃঢ়ভাবেই মোকাবিলা করেছেন।
ইমরানের প্রথম স্ত্রী ছিলেন জেমিমা গোল্ডস্মিথ। ইহুদী বংশোদ্ভূত জেমিমা ধনকুবেরের মেয়ে। তাকে বিয়ের পরপরই পাকিস্তানের অনেকে ইমরানের বিরদ্ধে যায়নবাদীদের হাতে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার অভিযোগ তোলে। এই অভিযোগ হেসেই উড়িয়ে দিতেন তিনি। ইমরানের দ্বিতীয় স্ত্রী সম্প্রতি আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি ইমরানের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক অধ্যায় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তবে এসবকে পাত্তাই দেননি ইমরান। তার তৃতীয় ও বর্তমান স্ত্রী আধ্যাত্মিক হিসেবে পরিচিত। ইতিমধ্যে অনেক পাকিস্তানী বলাবলি শুরু করেছেন ইমরান ও তার স্ত্রীর কথিত আরাধনা পদ্ধতি নিয়ে।
ইমরান আসলে কীসের প্রতিনিধিত্ব করেন? এই প্রশ্নের জবাবে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক দক্ষিণ এশিয়া সেন্টারের পরিচালক আশুতোষ ভার্শনে বলেন, ইমরান উন্মাদনা মাখা অসাধারণ এক খেলোয়াড়ি প্রতিভা। সংশোধনাতীত প্লেবয়। আর প্রতিশোধপরায়ণ উচ্চাকাঙ্খী এক রাজনীতিক। তিনি পাকিস্তানে গণতন্ত্র আনতে পারবেন না। গণতন্ত্রকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে হয়, সেনাবাহিনীকে অবশ্যই পিছু হটতে হবে।’ শেষ কথা হিসেবে ভার্শনে বলেন, ‘কোনো গণতন্ত্রই এভাবে কাজ করে না। নির্বাচন হোক, আর না হোক।’

‘৯ টাকায় এক জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই’ by শামীমুল হক

ওরা কাঁদছে। বিক্ষোভে ফুঁসছে। মুখে প্রতিবাদী স্লোগান। যে যেভাবে পারে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছে। দাবি তাদের যন্ত্রদানবের বিরুদ্ধে। প্রতিদিন যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট হয়ে অকালেই ঝরছে একের পর এক প্রাণ। অবস্থা এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখন আর পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই। তাই সহপাঠীর মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাতে কলেজ ছেড়ে শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছে রাজপথে। নটরডেম কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজসহ রাজধানীর নামিদামি কলেজের ছাত্ররা রাজপথে দাঁড়িয়ে কেঁদেছে। দাবি জানিয়েছে, ঘাতক চালকের বিচারের। তাদের হাতে ছিল নানা ধরনের দাবি সংবলিত স্লোগান। একজনের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে স্লোগান ‘আমরা ৯ টাকায় এক জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই।’ তাদের মুখে উচ্চারিত হয়েছে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল ঢাকার মিরপুর, মতিঝিল, উত্তরা, সায়েন্সল্যাব এলাকা, ফার্মগেট, বিমানবন্দর সড়কসহ গোটা ঢাকাই ছিল গতকাল বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দখলে। সহপাঠীর মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিল শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা এই প্রথম কোনো দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছে। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা থেকে দেশকে বাঁচাতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্নস্থানে সড়ক অবরোধ করে।
তারা নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ, ঘাতক বাসচালকের ফাঁসি, দুর্ঘটনাস্থলে স্পিডব্রেকার তৈরি, নিহত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণসহ নয় দফা দাবি তুলে ধরে। গত রোববার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের জন্য অপেক্ষারত শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই ছাত্রছাত্রীকে হত্যা করে। এ ঘটনায় ১২ জন আহত হয়। এ ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। ওই দিনই সচিবালয়ে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বক্তব্য হাসিমুখে দেয়া ভারতের উদাহরণে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। কোথাও কোথাও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। অহিংস আন্দোলনে পুলিশের হামলা নিয়েও বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। শোকাহত শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল-‘টনক কবে নড়বে তোমাদের’, ‘আর কত মায়ের বুক খালি হলে তোমরা শান্ত হবে’, ‘আমরা সবাই মরতে রাজি, তবুও বিনা বিচারের সংস্কৃতি মানতে রাজি নই’, ‘এমন দুর্ঘটনার পরও নৌমন্ত্রীর হাসিমুখো প্রতিক্রিয়ার কারণ কি?’, ‘সন্তান হত্যার বিচার চাই’, ‘লাশের গন্ধ বাতাসে’, কে সে নরপিশাচ আজো হাসে’। শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দর সড়কে কালোব্যাজ ধারণ করে মানববন্ধন করেছে। শনিরআখড়ার দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থীরাও কলেজ ছেড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মানববন্ধন করে। বাসচাপায় নিহত দিয়ার পিতা ত্রিশ বছর ধরে বাস চালান।
তিনি ঘোষণা দিয়েছেন আর কখনোই বাস চালাবেন না। স্টিয়ারিং ধরবেন না। এমন করুণ মৃত্যুতে কাঁদছে গোটা দেশ। পথেঘাটে, হাটবাজারে এখন আলোচনায় উঠে আসছে মর্মান্তিক এ মৃত্যুর কথা। সবার কথা এমন মৃত্যু আর দেখতে চাই না। তাই তো তরুণ কলেজ শিক্ষার্থীর করুণ আকুতি ‘আমরা ৯ টাকায় এক জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই।’ অবুঝ এ শিক্ষার্থী যখন রাজধানীর রাজপথে এ প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন কুমিল্লায় বাসের চাপায় নিহত হয়েছে আরেক কলেজ শিক্ষার্থী। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দ্রুত বসা হোক। সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে যা যা করা প্রয়োজন শিগগিরই তা করা হোক। এমন বিমর্ষ, মর্মান্তিক অঘটন আর নয়। এখনই এর প্রতিকারে ব্যবস্থা নেয়া হোক।

স্বামীর পরকীয়ায় স্ত্রীর মিশন by রুদ্র মিজান

আমিনুল ইসলাম তপু ওরফে ইমন ও শারমিন নুসরাত প্রভা ওরফে ওয়ালী চৌধুরী। দু’জন স্বামী-স্ত্রী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের বেশ পরিচিতি। সুখী পরিবার হিসেবেই জানেন পরিচিতজনরা। কিন্তু তপুর সঙ্গে একাধিক সুন্দরীর সম্পর্ক। প্রভা শুধু বিষয়টি জানেন, তা নয়। সহযোগিতাও করেন স্বামীর পরকীয়া প্রেমে। একইভাবে স্ত্রী প্রভাকে সহযোগিতা করেন তপু। এক সময় দু’জনে মিলে ফাঁদ পাতেন এবং ফাঁদে পা দেয়াদের হেনস্তা করেন। আদায় করেন অর্থ। এভাবেই তপু স্ত্রী প্রভার সহযোগিতায় একের পর এক মেয়ের জীবন বিপন্ন করেছেন। কিন্তু শেষরক্ষা আর হয়নি। এক তরুণীর অভিযোগে তপু এখন কারাগারে। এক্ষেত্রেও তপুকে রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তার স্ত্রী প্রভা। সুন্দরী প্রভার সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে অনেক প্রভাবশালীর। তাদের মাধ্যমে তদবির করিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের কাছে।
তপুকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের আদেশে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এছাড়াও তার মোবাইলফোন ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন তপু। এমনকি গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে বিভিন্ন নারীর নগ্ন ছবি, তাদের সঙ্গে কাটানো অন্তরঙ্গ সময়ের ভিডিও ক্লিপ জব্দ করা হয়েছে। বেরিয়ে এসেছে তপু ও প্রভার প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য। তপুর প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক মেয়ে যেমন সর্বস্ব হারিয়েছেন, তেমনি কেউ কেউ জীবন থেকে পালাতেও চেষ্টা করেছেন। প্রায় ১৪ বছর আগে প্রভার সঙ্গে বিয়ে হয় তপুর। তপু ও প্রভার সংসারে দুটি সন্তানও রয়েছে। তপু এক সময় থাকতেন ফার্মগেটের গ্রীন রোড এলাকায়।
২০১০ সালের দিকে ওই এলাকার একটি মেডিকেল কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন এক তরুণী। তপুর নজর পড়ে ওই সুন্দরী তরুণীর দিকে। ফ্লেক্সিলোডের দোকান থেকে সংগ্রহ করেন তার ফোন নম্বর। তাকে আয়ত্তে নিতে স্ত্রী প্রভার সহযোগিতা নেন। প্রভা কল দেন তরুণীর ফোনে। রং নম্বর- বুঝিয়ে কয়েক বাক্যের মধ্যেই কথা শেষ করেন তখন। তারপর আবার কল। নিজেকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রী পরিচয় দিয়ে প্রভা বারবার কথা বলেন। একটা বন্ধুতার সম্পর্ক গড়ে তোলেন তরুণীর সঙ্গে। এভাবেই নিজ স্বামীর প্রেমিকা জুটিয়ে দেয়ার মিশনে নামেন প্রভা। এ পর্যায়ে প্রভা ওই তরুণীকে জানান, তার এক কাজিন আছে। নাম তপু। একটি টেলিকম কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তপুর কাছে তার ব্যাপারে অনেক গল্প করেছেন। তপু তার সঙ্গে কথা বলতে চায়। যদি সে আগ্রহী হয়। ভদ্রতার খাতিরে ওই তরুণী রাজি হন। ফোনে তরুণীর সঙ্গে কথা হয় তপুর। এরপর থেকে কারণে-অকারণে তরুণীকে ফোন দিতে থাকে।
এক পর্যায়ে তারা কাছাকাছি চলে আসে। দেখা হয় দু’জনের। এভাবেই তপুর সঙ্গে গড়ে উঠে প্রেমের সম্পর্ক। দেখা হয় বিভিন্ন স্থানে। পার্কে, বাসায়। ঢাকার বাইরেও ঘুরতে যান তারা। অন্তরঙ্গ সময় কাটান। ছবি ধারণ করেন। এমনকি গোপনে অন্তরঙ্গ সময়ের ভিডিও ধারণ করে তপু। তরুণীকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে গোপনে বিয়েও করেন। কিন্তু কখনো নিজের বাসায় নিয়ে যেতেন না তাকে। এমনকি বাসার ঠিকানা তরুণীকে জানতে দিতেন না তপু। তাছাড়া সময়ে-অসময়ে যখন তখন তরুণীর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন তপু, যা একজন চাকরিজীবীর পক্ষে সাধারণত দুষ্কর। এরকম বিভিন্ন কারণে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় নির্যাতিতা তরুণী অভিযোগ করেছেন, ‘২০১৫ সালের শেষের দিকে আমি বুঝতে পারি ভুয়া নাম ঠিকানা দিয়ে, স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও আমার সঙ্গে প্রতারণামূলক সম্পর্ক করেছে তপু। তাই আমি পড়ালেখা শেষ করে জীবন গঠনের একটি ভালো পরিকল্পনা করি।
তপুর সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার চিন্তা ভাবনা করি। কিন্তু তপু তখন মরিয়া হয়ে উঠে। আমার জীবনের সব অতীত ইন্টারনেটে প্রকাশ করে দিবে বলে ক্রমাগত ভয় দেখায়। অনলাইনে ড্রপবক্সে সকল পর্ণ ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রেখেছে বলে জানায়। বিভিন্ন ফেক ফেসবুক আইডি থেকে নমুনা ছবি পাঠিয়ে ভয় দেখায়। আমি যদি তার ইচ্ছামতো আমার নুড ছবি না পাঠাই তাহলে সে আমার সব অতীত খারাপ স্মৃতি প্রকাশ করে আমার কারিয়ার নষ্টসহ জীবননাশের হুমকি দেয়।’
প্রতারক তপুকে তখন আর সহ্য করতে পারেন না। তবু বাধ্য হয়েই তার সঙ্গে কথা বলতে হয়। তার আবদার অনসুারে নগ্ন ছবি তোলে হোয়াটস অ্যাপ, ইমু, আই মেসেজসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাঠাতে হয়। কথা না শুনলে হুমকি একটাই, ভাইরাল করে দেবে। এর মধ্য দিয়েই ভুক্তভোগী তরুণী একটি সরকারি মেডিকেল থেকে এমবিবিএস পাস করেন। একদিকে সম্ভাবনাময় জীবন, অন্যদিকে হুমকি। ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল তার বেঁচে থাকা। বাবা ও ভাইয়ের কাছে ফোনে ও ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে হুমকি দিচ্ছিল তপু। ভাইরালের হুমকি। এক পর্যায়ে তরুণীর ঘনিষ্ঠ ক’জন তার পাশে দাঁড়ান। প্রথমে সাধারণ ডায়েরি, পরে মামলা করা হয় শেরে বাংলানগর থানায়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইউনিট। গত ১৩ই জুলাই বিকালে মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তপুকে। জব্দ করা হয় নগ্ন ছবি ও ভিডিও। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তপু জানিয়েছে, তার স্ত্রী প্রভার মাধ্যমেই তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সূত্রপাত। তারা খুব ভালো বন্ধু। স্বামী-স্ত্রী হলেও পরকীয়া প্রেমের ক্ষেত্রে একে-অন্যকে সহযোগিতা করে তারা।
সূত্র মতে, তপু ও প্রভাবর চ্যাটে প্রায়ই আলোচনা হতো বিভিন্ন তরুণীকে নিয়ে। এমনকি প্রায়ই বিভিন্ন মেয়ের ছবি স্ত্রী প্রভার ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে তাকে ‘ম্যানেজ’ করে দিতে বলতো তপু। আবার কখনো কখনো প্রভা জানাতো, ‘আমি বুইড়াদের সঙ্গে আছি। তুমিতো আমাকে দিয়ে টাকা ইনকাম করাতে চাও শুধু।’ এরকম নানা কথা হয় তাদের মধ্যে।
এ বিষয়ে শারমিন নুসরাত প্রভার কাছে জানতে চাইলে, নিজের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি। বলেন, তপু যা করেছে তা আমরা কেউ সমর্থন করি না। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাইবার সিকিউরিটি এন্ড ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, কিছু ছবি ও ভিডিও জব্দ করা হয়েছে। আসামি তপুর কাছে আরো ভিডিও ও ছবি রয়েছে বলে নির্যাতিতা জানিয়েছেন। এতে তার স্ত্রী প্রভার সহযোগিতা রয়েছে। গ্রেপ্তার আমিনুল ইসলাম তপু (৩৮) মিরপুরের পল্লবীর বি ব্লকের ১২ নম্বর সেক্টরের সি-১, ট্রাস্ট গার্ডেনের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসলামের ছেলে।

‘এক কলমের খোঁচায় ৪০ লাখ মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে দেয়া হয়েছে’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল এমপি সুখেন্দ শেখর রায় বলেছেন, ‘এক কলমের খোঁচায় ৪০ লাখ মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে দেয়া হয়েছে।’ ভারতের অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে (এনআরসি) ৪০ লাখ মানুষের নাম থাকা প্রসঙ্গে তিনি গতকাল (মঙ্গলবার) সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ওই মন্তব্য করেন।
সুখেন্দু বাবু বলেন, ‘গত ছয় মাস আগে সরকারি হিসাবে অসমে দুই লাখ চল্লিশ হাজার লোককে ‘ডি-ভোটার’ বা সন্দেহজনক ভোটারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৬ মাসের মধ্যে ২ লাখ ৪০ হাজার সংখ্যাটা কীভাবে, কোন জাদুবলে, কোন মায়াবলে, চল্লিশ লাখে পৌঁছল তা আমরা সরকারের কাছে জানতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিশালসংখ্যক মানুষকে আসলে রাষ্ট্রহীন করা হচ্ছে। যেভাবে এক কলমের খোঁচায় চল্লিশ লাখ মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে দেয়া হয়েছে, তা আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে কোথাও কখনো ঘটেনি।’
সুখেন্দু বাবু এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে বিবৃতি দেয়ার দাবি জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসঙ্ঘ সনদ, যেখানে ভারত সই করেছে, ১৯৫১ সালের, ১৯৬৭ সালের জাতিসঙ্ঘের প্রোটোকল এবং ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের যে প্রস্তাব নেয়া হয়েছিল তাতে ভারত সই করেছে। নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনায় জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত কনভেনশন লঙ্ঘিত হয়েছে।
এদিকে, আজ (বুধবার) বেলা ১১ টায় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার অধিবেশন শুরু হলে চেয়ারম্যান এম বেঙ্কইয়া নাইডু সবাইকে শান্ত থেকে সভার কাজ চালানোর জন্য সহায়তা করার আবেদন জানান। 
গতকাল (মঙ্গলবার) এনআরসি ইস্যুতে বিরোধীদের তুমুল হট্টগোলের জেরে অধিবেশনের কাজ কয়েক দফায় স্থগিত হয়ে যায় এবং অবশেষে সারাদিনের জন্য অধিবেশন মুলতুবি করে দিতে হয়।
বিজেপি সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য অমিত শাহ গতকাল সংসদে বিরোধী সদস্যদের তীব্র প্রতিবাদ বিক্ষোভের মুখে তার ভাষণ দিতে পারেননি। চেয়ারম্যান আজ তাকে বক্তব্য রখার কথা বলতেই বিরোধীসদস্যরা হৈ চৈ শুরু করে দেন। চেয়ারম্যান সদস্যদের শান্ত হওয়ার আবেদন জানান কিন্তু তাতে সাড়া না মেলায় অবশেষে তিনি অধিবেশনের কাজ বেলা ১২ টা পর্যন্ত মুলতুবি করে দিতে বাধ্য হন।

পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ by মিজানুর রহমান

পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বেলারুশ, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর মধ্য দিয়ে (কাছাকাছি অবস্থানে থাকা) দু’টি অঞ্চলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারই সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশী পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ। কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সেই তিমিরেই রয়েছে। এটি বাড়ানোর উদ্যোগ যে ছিল না, তা কিন্তু নয়। তবে সেই সব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় বা গতি আনা সম্ভব হয়নি নানা কারণে। বর্তমান সরকারের আমলেও বহুবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সম্পর্কটাকে কাঠামোবদ্ধকরণ বা প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া যায়নি। সরকারের শেষ সময়ে হলেও সেগুনবাগিচা পুরনো সেই সম্পর্ককে একটি ‘ঝাঁকুনি’ দিতে চায়। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী মাসের শেষের দিকে বেলারুশ, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে ফরেন অফিস কনসালটেশন বা পরামর্শ সভার আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
ওই প্রস্তুতি বিষয়ে গত সপ্তাহে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। যেখানে সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক অঞ্চলে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথাই জানান দেন। কর্মকর্তা বলেন, পূর্ব ইউরোপের দেশ রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতা অর্জন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পূণর্গঠনে মস্কোর অবস্থান অনস্বীকার্য। ৪৭ বছরে বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী, কাছের এবং দূরের অনেক বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অংশীদারিত্ব, কৌশলগত অংশীদারিত্ব কিংবা তার চেয়েও বেশি উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধবন্ধু রাশিয়ার সঙ্গে সেটি হয়নি। যদিও গত বছর এবং চলতি বছরের এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী মস্কো সফর করেছেন। চলতি মাসে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ইউরি বরিসত। রাশিয়ার সহায়তায় পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এগিয়ে চলেছে। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দু’দেশ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ব্যাপারে মনোযোগ দিয়ে আসছে। ওই সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানির পাশাপাশি প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দু’দেশের সহযোগিতা অনেক বেড়েছে।
সেদিন এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব বলেন- ‘শক্তিমান’ রাশিয়া এশিয়ায় কীভাবে তাদের উপস্থিতির জানান দেবে এবং স্বল্প শক্তির ছোট দেশগুলোকে সাহায্য করবে সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ও রাশিয়ার ভবিষ্যৎ সম্পর্ক বহুলাংশে নির্ধারিত হবে। তার মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া জোরেশোরে ফিরে এসেছে। সচিব শহীদুল হক বলেন, রূপান্তরিত বিশ্বে সব কিছু দ্রুত আমূল পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে রাশিয়াসহ অন্য শক্তিগুলো কোন পথে যাচ্ছে তা সবাই অনেক আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. এস এম সাইফুল হক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাশিয়ার সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। রাশিয়ান দূতাবাসের মিনিস্টার (কাউন্সিলর) সার্গেই এ পোপোভ বলেন, বাংলাদেশ ও রাশিয়া সময়ের পরীক্ষিত বন্ধু এবং উভয় দেশ নিয়মিত রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে।
ঢাকার কর্মকর্তা জানান, কেবল রাশিয়া নয় বরং দেশটির প্রতিবেশী ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর বাস্তব পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা। কর্মকর্তাদের মতে, পূর্ব ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বেলারুশ বরাবরই বাংলাদেশে সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মিনস্ক সফর করেছেন। বেলারুশের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে ১২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই হয়েছে। সম্পাদিত চুক্তিগুলোর মধ্যে ছিল বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও পারস্পরিক সুরক্ষা, দু’দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কূটনীতিবিদদের ভিসা ছাড়া ভ্রমণের সুযোগ, বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন বোর্ড ও বেলারুশের সেন্টার ফর অ্যাক্রিডিটেশনের মধ্যে সহযোগিতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহযোগিতা বিনিময়, দু’দেশের মধ্যে সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়, শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইএসএস) ও বেলারুশ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যে সহযোগিতা। এছাড়া, দু’দেশের মধ্যে আইনগত সহযোগিতা বৃদ্ধি, ঢাকা ও মিনস্ক মহানগরীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন, সামুদ্রিক প্রাণিসম্পদ রপ্তানির ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স ও বেলারুশের জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির মধ্যে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ও বেলারুশের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে পৃথক পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ১৯৯১ সালে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর দু’দেশের মধ্যে ২০১২ সালেই ছিল প্রথম সর্বোচ্চ পর্যায়ের সফর। ওই সফরে বাংলাদেশকে জৈব ও পরমাণু প্রযুক্তি সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছিল বেলারুশ। পরের বছরে প্রধানমন্ত্রী মিনস্ক সফর করেন। এবং আগের বছরের সফরের ফলোআপ হিসেবে ফিরতি সেই সফর হয়।
লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক: ওদিকে বাল্টিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দেশ লাটভিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তেমন এগুয়নি। ঢাকায় দেশটির এবং লটভিয়ায় বাংলাদেশের অনারারি কনস্যুলেট খোলার সিদ্ধান্ত হয় ২০১২ সালে। সেই বছরে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি দেশটি সফর করেন। দু’দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারকও সই করতে রাজি হয়েছিল ১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন সত্তা লাভ করা লাটভিয়া। সেই থেকে দেশটির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার এবং শিক্ষা, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টায় রয়েছে ঢাকা। লাটভিয়ায় অত্যন্ত স্বল্পব্যয়ে ইউরোপীয় মানের চিকিৎসা, প্রকৌশল-প্রযুক্তি এবং ব্যবসা প্রশাসনে উচ্চ শিক্ষার বিশাল সুযোগ আছে জানিয়ে এক কমকর্তা বলেন, দেশটিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগ্রহণ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজ করার ভালো অবস্থান অর্জন করতে পরে। লাটভিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। এ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের একজন সচিবের নেতৃত্বাধীন আসন্ন পরামর্শ সভায় আলোচনা হবে। ওদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ লিথুয়ানিয়ায় ইইউর সঙ্গে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশ লিথুয়ানিয়ায় বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। মস্কোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় দেখাশোনা করে। বাংলাদেশে লিথুয়ানিয়ার একটি মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে তা এখনও পূর্ণতা পায়নি।
লিথুয়ানিয়ার শীর্ষ নেতত্বের একটি সফর নিয়ে অনেকদিন ধরে আলোচনা চলছে। ওই সফরটি হলে ঢাকায় দূতাবাসসহ কৃষিক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানিক রূপ পেত। ১৯৯২ সাল থেকে লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক চলে আসছে। দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কও রয়েছে। বাংলাদেশ লিথুয়ানিয়া থেকে দুগ্ধ সামগ্রী, বস্ত্র, সুতা ও প্রকৌশল সামগ্রী আমদানি করে এবং লিথুয়ানিয়ায় নিটওয়্যার, ফুটওয়্যার সামগ্রী, চামড়া, হস্তশিল্প, খেলনা সামগ্রী ও সিগারেট রপ্তানি করে। গত তিন বছরে লিথুয়ানিয়ায় বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি ছিল ৩.৫ মিলিয়ন ডলার, আমদানি প্রায় ৬ মিলিয়ন ডলার। দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আশা করে এক কর্মকর্তা বলেন, আসন্ন এফওসিতে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

হুদায়দা বন্দরে মানবিক বিপর্যয় ধেয়ে আসছে: জাতিসংঘের হুঁশিয়ারি

দারিদ্রপীড়িত ইয়েমেনে বিশেষ করে বন্দরনগরী হুদায়দাতে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
আজ (বুধবার) ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিতা এইচ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের বন্দর এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে সব পক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এসব অবকাঠামোর ওপর হামলা অগ্রহণযোগ্য, অমানবিক এবং যুদ্ধের মৌলিক নীতির পরিপন্থি।
তিনি বলেন, চলমান সংঘর্ষ এবং হুদায়দা বন্দরের বেসামরিক অবকাঠামোতে যেভাবে অব্যাহতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে তাতে হাজার হাজার শিশু এবং তাদের পরিবারের জীবনের জন্য চরম হুমকি হয়ে উঠছে। গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন অবকাঠামোতে  যেভাবে হামলা চালানো হচ্ছে তাতে শিশু এবং তাদের পরিবারগুলোকে রক্ষা করা অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি হুদায়দা শহরের জাবিদ এলাকায় ইউনিসেফ পরিচালিত স্যানিটেশন কেন্দ্রে এবং আল মিনা শহরের পানি ব্যবস্থার ওপর ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতি ইঙ্গিত করেন হেনরিতা। তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জনগণের মৌলিক অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলার ফলে এসব এলাকায় কলেরা এবং ডায়রিয়ার মতো মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কে জানতো এটাই ছিল রাজীবের শেষ বিদায় by মরিয়ম চম্পা

দিয়া খানম মিম। সদা প্রাণোচ্ছল এক তরুণী। দিয়া ও রিয়া। যেন একই বৃত্তে দুটি ফুল। ছোট সময় খেলার ছলে বড় বোন রিয়াকে বলতো বড় হয়ে আমি ব্যারিস্টার হবো। দিয়ার বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়ে পড়লেখা শেষ করে সরকারি ব্যাংকের একজন ব্যাংকার হবে। আর বাবাহারা এতিম রাজীবের স্বপ্ন ছিল গ্র্যাজুয়েশন শেষে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে চিরদুখী মায়ের মুুখে একটু হাসি ফোটাবেন। কিন্তু গত রোববার দুপুরে কালশী ফ্লাইওভার থেকে নামার মুখে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস এই দুটি পরিবারের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। শহীদ রমিজউদ্দীন কলেজের গেটে কালো ব্যানারে শোকবাণী ঝুলছে তাদের দুই শিক্ষার্থীর তিরোধানে। মেয়েকে হারিয়ে বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলম ও মা রুকশানা বেগম বাকশূন্য। বাবা ক্ষণে ক্ষণে আহারে আমার মা, কোথায় গেল আমার মায়ের স্বপ্ন! বলে আর্তনাদ করতে থাকেন। মা রুকশানা বলেন, আমি নিজ হাতে ধরে আমার মাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসেছি। দিয়া গাড়িতে ওঠার পরে আমাকে হাত নাড়িয়ে টাটা বলল। চোখের সামনে দিয়ে গাড়িটা চলে যায়। কে জানতো যে ওটাই ছিল আমার দিয়ার শেষ বিদায়ের টাটা। আমি জানলে তো দিয়াকে যেতে দিতাম না।
দিয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার মা বলেন, ও ছিল আমার ঘরের বাত্তি। সারাক্ষণ সবাইকে আনন্দ দিয়ে মাতিয়ে রাখাই ছিল ওর কাজ। বড় বোন রুবাইয়া খানম রিয়া ও তার বাবা ছিল দিয়ার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। দিয়া কলেজের প্রথম বর্ষে। রিয়া পড়ে দ্বিতীয় বর্ষে। দিয়া শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। রিয়া পড়ে মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি কলেজে। রিয়া বড়, দিয়া বছর দেড়েকের ছোট। এক বিছানায় ঘুমায়। এক টেবিলে পড়তে বসে। শত বকাঝকা করলেও দিয়া কখনো মন খারাপ করে থাকতো না। আমার ঘরে অনেক প্রাচুর্য না থাকলেও শান্তির অভাব ছিল না। আমার তিন ছেলে মেয়ের তেমন কোনো চাওয়া পাওয়া ছিল না। ওরা একটা ভালো কলেজে পড়বে এটাই ছিল ওদের চাওয়া। দিয়ার বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলম পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার মানুষ। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি গাড়ির সঙ্গে, ২৭ বছর ধরে বাস চালান। এখন বাস চালান ঢাকা-রাজশাহী-চাঁপাই নবাবগঞ্জ রুটে। মহাখালীর দক্ষিণপাড়ার মসজিদ গলির ভেতরে তার বাসা।
দিয়ার বাবা বলেন, আমার জীবনে আমি কোনো দিন কাউকে মারিনি। হাসপাতাল, বাজার, স্কুলের সামনে সাবধানে গাড়ি চালাই। হর্ন বাজাই না। অথচ আমার মাকে সেই গাড়ি দিয়েই চাপা দিয়ে নির্মমভাবে মারা হলো। আমার তো বাড়ি গাড়ি করার স্বপ্ন ছিল না। দুই মেয়ে সরকারি চাকরি করবে, ছেলেটাকে মানুষ করবো। ওরা প্রতিষ্ঠিত হবে- এটাই ছিল আমার চাওয়া। আমি মোটর শ্রমিক ইউনিয়নে নির্বাচন করেছিলাম, নির্বাচিতও হয়েছিলাম। অ্যাক্সিডেন্ট তো হতেই পারে। কিন্তু এটা তো অ্যাক্সিডেন্ট না। এটা হলো ইচ্ছাকৃত খুন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছিলেন। তাকে বলেছি- আমি আর কিছু চাই না আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই। পাশাপাশি আমার বড় মেয়েটাকে একটা সরকারি চাকরির কথা বলেছি। আমার ছোট ছেলে রিয়াজুল ইসলাম আরাফাত মন্ত্রীকে বলেছে, রজিমউদ্দীন কলেজের সামনে রাস্তা পারাপারের জন্য একটি ওভারব্রিজ তৈরি করে দিতে।
এদিকে নোয়াখালীর চৌমুহনী-হাতিয়ার সন্তান রাজীবের খালাতো ভাই মেহরাজ উদ্দিন বলেন, দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল করিম রাজীবকে তার নানার পাশে সমাহিত করা হয়েছে। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে রাজীব ছিল তৃতীয়। বাবা মো. নূর ইসলাম ছিলেন পেশায় দিনমজুর। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর মা মহিমা খাতুন ৪ ছেলে মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতেই থাকতেন। পরবর্তীতে সবার সহযোগিতায় বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দেন। ছোট ছেলে আল-আমিনকে তার মামা ও বড় ছেলে রাজীবকে তার বড় খালাতো ভাই ঢাকায় এনে স্কুলে ভর্তি করে দেন। আল-আমীন আসকোনা আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। রাজীবকে তার খালাতো ভাই-ভাবী মোটেও তাদের ছোট ছেলে মিয়াদের থেকে আলাদা কিছু ভাবতেন না। মিয়াদও রাজীবকে পাপা বলে ডাকতেন। দুর্ঘটনার আগের দিন রাতে রাজীব তার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে অনেক রাত করে খেলা দেখার পর মেহরাজ তাকে ঘুমাতে যেতে বলেন। এটাই ছিল রাজীবের সঙ্গে তার শেষ কথা। সকালে ভাবীর হাতে তৈরি নাস্তা খেয়ে কলেজে যায়। কে জানতো এটাই তার শেষ বিদায়।

রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা, চ্যালেঞ্জের মুখে জামায়াতের রাজনীতি: আরিফের চমক by রোকনুজ্জামান পিয়াস ও ওয়েছ খছরু

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৩২ কেন্দ্রের ফলে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৯০৪৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৫৮৭০ ভোট। এ সিটির ১৩৪ টি কেন্দ্রের মধ্যে গোলযোগের কারণে দুটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত রয়েছে। এ দুই কেন্দ্রের মোট ভোটার ৪৭৮৭। দুই কেন্দ্রে ভোট স্থগিত থাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আরিফুল হক চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন। রিটার্নিং কর্মকর্তা আলীমুজ্জামান জানিয়েছেন মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। দিনভর দখল অনিয়মের অভিযোগের পর রাতে ফল ঘোষণা নিয়ে অনেক নাটকীয়তা হয়েছে। নগরীর ইনডোর স্টেডিয়ামে নির্বাচন কমিশনের ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্রে থেকে ফল ঘোষণা শুরুর পর থেকেই এ নাটকীয়তার শুরু। সর্বশেষ রাত ১১টায় রির্টারিং কর্মকর্তা ১১১টি কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করার পর দীর্ঘক্ষণ আর ফল ঘোষণা হয়নি। এই ১১১কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী সাড়ে চার হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন। এসময় ফল ঘোষণা কেন্দ্রে উপস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ প্রত্যাশিত ফল আসছে না জানিয়ে ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখতে ইসি কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন। তিনি বের হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই রিটার্নিং কর্মকর্তা ১৩২ কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করেন। ফল ঘোষণার পর বিজয়ী আরিফুল হক চৌধুরী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ বিজয় সিলেটের জনগণের। তিনি তার নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, সবকিছু ভুলে আমাদের আবার সিলেটবাসীকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে। সব কেন্দ্রের ফল ঘোষণার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা নগরীতে বিজয় মিছিল করেন। দিনের শুরুতে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেয়া এবং কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। তবে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন শাহাদাৎ বরণ করলেও তিনি মাঠ ছেড়ে যাবেন না। দুপুরের পর ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ আসা নির্বাচন স্থগিত করার দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। যদিও সন্ধ্যায় ফলাফল আসা শুরুর পর ফল ঘোষণা কেন্দ্রে হাজির হন বিদায়ী এ মেয়র। তিনি ফল ঘোষণার শেষ পর্যন্ত ইনডোর স্টেডিয়ামেই অবস্থান করেন।  এদিকে নির্বাচনে নিজের কেন্দ্রেই হেরেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। তিনি সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ভোটার। এই কেন্দ্রের ভোটের ফলে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে ১৩০ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন তিনি। সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন ৭৭৬ ভোট। নৌকা প্রতীকে কামরান  পেয়েছেন ৬৪৬ ভোট।
এদিকে, সিলেটের এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র ব্যানারে লড়া জামায়াতের প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের পেয়েছেন ১০,৯৫৪ ভোট। এতো প্রচার-প্রচারণার পরও জামায়াত প্রার্থীর এতো কম ভোট পাওয়া দলটির রাজনীতিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
এমন ভোট আগে দেখেনি সিলেট
‘শান্তির’ শহরে আজব কিসিমের এক নির্বাচনের সাক্ষী হলো সিলেটের মানুষ। ভোটের মাঠে এবার এমন কিছু দেখলো, যা আগে কখনো দেখেনি তারা। কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, বিরোধীপক্ষকে মারধর, পুলিশের সহযোগিতায় জালভোট, প্রতিপক্ষ এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা, দুপুরেই ব্যালট পেপার শেষÑ কি ছিল না এই নির্বাচনে। নগরবাসী বলছে, এমন ভোট তারা আগে কখনো দেখেনি। হামলার শিকার হয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। দায়িত্বরত সাংবাদিকরাও এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। একের পর এক কেন্দ্র দখলের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান গণমাধ্যম কর্মীরা। কিন্তু ক্যামেরা তাক করা মাত্রই পুলিশসহ সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের ওপর। এসব ঘটনার নির্বাক দর্শক হওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না তাদের। গতকাল সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়েছে। ভোট দিতে না পেরে হা-হুতাশ করে অনেকেই ক্ষোভ নিয়ে কেন্দ্র ছেড়েছেন।
সকাল সাড়ে ৮টা। পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের পুরুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ২টি ছাড়া আর কোনো বুথেই নেই ধানের শীষের এজেন্ট। জিজ্ঞেস করলে পোলিং অফিসারের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীর কক্ষে নির্দিষ্ট সময় পরপর তিন দফা গিয়ে দেখা যায় তার কক্ষটি ছিল তালাবদ্ধ। পনের মিনিট পর চতুর্থবারের মতো তার কক্ষে গেলে দেখা মেলে। এ সময় ধানের শীষের এজেন্ট নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা তিনি বলতে পারবেন না। তাদেরকে কার্ড দেয়া হয়েছে, না আসলে তার কিছুই করার নেই। একই বিদ্যালয়ের মহিলা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো কক্ষেই ধানের শীষের এজেন্ট নেই। এদিকে ওই কেন্দ্রে অবস্থানকালীন একের পর এক বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে নৌকার প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে বের করে দেয়ার খবর আসতে থাকে।
নগরীর ২০নং ওয়ার্ডের হাতেম আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানেও কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি। বুথের সামনে জটলা পাকিয়ে একদল যুবক বুথের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এ সময় ওই কেন্দ্রে থেকে একা বের হচ্ছিলেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জানান, ২০নং ওয়ার্ডের কোনো কেন্দ্রেই তার এজেন্টদের আসতে দেয়া হয়নি।
সোয়া ১০টার দিকে টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের ভোট কেন্দ্রে ঢুুকতেই পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়। পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সাংবাদিকদের কেন্দ্রে ঢোকা নিষেধ। তাদেরকে তেমন নির্দেশনাই দেয়া হয়েছে। পরে বাধা উপেক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও বুথে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এ সময় দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তার কক্ষেও ঢুকতে দেয়া হয়নি। আনসার সদস্যরা তার রুমের সামনে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। তাদের সাফ জবাব, স্যারের সঙ্গে দেখা করা যাবে না। ভোট কেন্দ্রের কয়েকজন অভিযোগ করেন, তার রুমেই জাল ভোট দেয়া হচ্ছে। শাহজালাল উপশহর একাডেমিতে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের মহড়া। কেন্দ্রের ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রে ভোটারের লম্বা লাইন থাকলেও ৫নং বুথের সামনে জটলা। এ সময় ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট লিয়াকত হোসেনকে বের করে দেয় নৌকার সমর্থকরা। এ নিয়ে কিছু সময়ের জন্য সেখানে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। পরে একে একে সব প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। এই অবস্থায় ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মহিম উদ্দিন বলেন, কেন্দ্র শান্ত রয়েছে। এজেন্টদেরকে বের করে দেয়ার বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, কেউ স্বেচ্ছায় বেরিয়ে গেলে তার কিছুই করার নেই। ওই কেন্দ্রে অবস্থানের সময়ই খবর পাওয়া যায়, নগরীর পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামীয়া কামিল (এমএ) মাদরাসায় সংঘর্ষ চলছে।
১২টার দিকে ওই কেন্দ্রে পৌঁছলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সোয়া ১১টার দিকে কেন্দ্রের বাইরে আখালিয়ার দিক থেকে কামরান সমর্থকরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে করতে কেন্দ্রের দিকে এগুতে থাকে। এ সময় উল্টো দিক থেকে ঘড়ি প্রতীকের সমর্থক ছাত্রশিবিরের লোকজনও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ছোঁড়ে। এতে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির এলাকা থেকে সরে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরপরই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর একদল সমর্থক কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। এ সময় পুলিশের সহযোগিতায় তারা কেন্দ্রের ভেতর থেকে সব ভোটারকে বের করে দেয়। কেন্দ্রের সব বুথ তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ওই কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, দোতলা ও তিনতলার সব ক’টি বুথ দখলে। বুথের বাইরে একদলের জটলা, ভেতরে আরেকদল জাল ভোটের মহোৎসব চালাচ্ছে। এ সময় জটলা ঠেলে ছবি তুলতে গেলে নয়া দিগন্তের ফটো সাংবাদিক বাপ্পির ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয় বুথের সামনে অবস্থান করা পুলিশের এসআই রহমাতুল্লাহ মিয়া। পরে তোলা ছবিটি ডিলিট করে তার ক্যামেরা ফেরত দেন তিনি। ধাক্কা দিয়ে সাংবাদিক বাপ্পিকে নিচ তলায় নামিয়ে দেন। শুধু পুলিশ কর্মকর্তা রহমাতুল্লাহই নন, বেশির ভাগ পুলিশ সদস্যই ক্যামেরা তাক করা মাত্রই সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। পরে আবারো জাল ভোটের মহোৎসব দেখতে ভবনের তিনতলায় ওঠে ছবি তোলার চেষ্টা করলে এই প্রতিবেদকের মোবাইল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ ও নৌকার সমর্থকরা। ছবি না ওঠানোর শর্তে সেখানে অবস্থান করলে দেখা যায়, ভেতরে একদল ব্যালটে সিল মারছে, আর দরজা বন্ধ করে পাহারায় আছে সুঠামদেহি এক যুবক। পুলিশ সেখানে ভোটারদের যেতে বাধা দিচ্ছেন। বিশেষ করে এসআই রহমাতুল্লাহ ও কয়েকজন কনস্টেবল এ ব্যাপারে অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করছিলেন। সাংবাদিকরা নির্বাক দর্শক হয়ে জাল ভোটের মহোৎসব চেয়ে চেয়ে দেখেন। আধাঘণ্টা পর নিচ তলার একটি বুথে এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক যুবক জাল ভোটের ব্যালট সাংবাদিকদের দেখাতে উদ্যত হন। এ সময় নৌকার সমর্থক ও পুলিশ গিয়ে তাকে রুমে আটকে রাখে। পুলিশ ওই রুমে ঢুকে তাকে বেদম মারধর করে। পরে তাকে পুলিশি ভ্যানে তুলে দেয়া হয়। এরও আধাঘণ্টা পর জালভোট দিয়ে দলে দলে লোকজন নিচে নামে। এ সময় আরেক যুবক জাল ভোট দেয়ার কথা সাংবাদিকদের জানালে পুলিশ তাকে বেদম মারধর করে। ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করায় এই প্রতিবেদকের মোবাইল আরেক দফা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। ঘটনার শুরুতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সিলেটের এক স্থানীয় সাংবাদিক জানান, ঘটনা শুরুর কিছুক্ষণ পর এরশাদুল হক ও আশিক নামে দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনার প্যানিক ছড়াচ্ছেন।’ ঘটনার পর থেকে ওই কেন্দ্রে আর কোনো সাধারণ ভোটারকে প্রবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। অনেকে ভোট দিতে গেলে জানানো হয়, ব্যালট পেপার শেষ!
বেলা দুইটার আগে-পরে বিভিন্ন কেন্দ্র দখলের খবর আসতে থাকে। সুবিদবাজার এলাকার ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কোনো ভোটারকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ওই কেন্দ্রের ভেতরে তখনো জাল ভোট চলছিল। এ সময় ছবি তুলতে গেলে আবারো সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ঘণ্টাখানেক পরে সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয় পুলিশ। তবে আইডি কার্ড দেখিয়ে। অনেকে ভোটার নাম্বার বললেও কার্ড দেখাতে না পারায় কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. নাবিল আহমেদ অভিযোগ করেন, তাকে একঘণ্টা ধরে কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এ সময় ওই প্রতিষ্ঠানের মহিলা ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, দু’জন করে ভোটার ভেতরে ঢুকবে। তারা ভোট দিয়ে বাইরে বের হয়ে গেলে পরবর্তী দু’জন ঢুকবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুপুর একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার ভোট কেন্দ্রে পুলিশ সাধারণ ভোটারদের প্রবেশে বাধা দেয়। ওই সময়ই কেন্দ্র দখল করে জালভোটের মহোৎসব চলে। এদিকে এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরিবেশ দেখে নগরবাসী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, অতীতে সিলেটে এমন ভোট কেউ দেখেনি। এতে ভোটারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই ভোট সিলেটের ঐতিহ্য ‘সম্প্রীতি’কে নষ্ট করে দিয়েছে।

বিক্ষোভে উত্তাল ঢাকা

বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে গতকালও বিক্ষোভ হয়েছে রাজধানীজুড়ে। সকাল থেকে  বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করলে কার্যত প্রধান প্রধান সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে ক্রমে নগরীতে গণপরিবহন চলাচল কমে আসে। দফায় দফায় বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এদিকে দুপুরে অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভা শেষে নগরীতে চলাচলকারী পরিবহনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অবৈধ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। রোববার শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় মারা যান। এতে আহত হন আরও ১০ থেকে ১২ শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সড়ক বন্ধ করে বিক্ষোভ করে। তারা শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করে। শিক্ষার্থী মৃত্যুর বিষয়ে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া দেন। যা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা হয়।
পরের দিন শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকে নৌ-মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠে। মন্ত্রী গতকাল হাসিমুখে কথা বলায় দুঃখ প্রকাশ করেন। সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অনেকটা অচলাবস্থা ছিল। গতকালও সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামে। গতকাল সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধও রাখা হয়। আজও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে বন্ধ করার তথ্য জানিয়েছে অভিভাবকদের। মঙ্গলবার নগরীর মতিঝিল, উত্তরা, ফার্মগেট, মিরপুর, ধানমন্ডিসহ আরো কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। ব্যস্ততম সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করায় আশপাশের এলাকায় যানজট লেগেছিল চরমে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা অনেক গাড়ি ভাঙচুর করেন।
বেশকিছু বাসে আগুন লাগিয়ে দেয়। ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর খবর পেয়ে অনেক মালিক-চালকরা ভয়ে যানবাহন বের করেননি। যানবাহন কম থাকায় ও যানজটের কারণে সাধারণ যাত্রীদের দিনভর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। একাধিক এলাকায় বিক্ষোভ চলায় অনেকটা অচল হয়ে পড়ে ঢাকা। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনেন।
সরজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিয়েই বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। আর সঙ্গে ছিল তাদের ৯ দফা দাবি। গতকাল দুপুরে মতিঝিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা শাপলা চত্বর ঘেরাও করেছেন। এ সময় তারা নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ ও ঘাতক বাস চালকদের ফাঁসির দাবি জানান। প্রায় ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী শাপলা চত্বর এলাকায় অবস্থান নেয়ায় ব্যস্ততম ওই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে ওই সড়ক দিয়ে কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। ওই সময় তারা একটি বাস ভাঙচুর করেন। পূর্ব-ঘোষণা অনুযায়ী সকাল ১০টার দিকে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা ফার্মগেটে সড়ক আটকে রেখে অবরোধ করেন। এতে ব্যস্ততম ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রায় ২ ঘণ্টা কাওরান বাজার, বিজয় সরণি সড়কে যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। এ সময় শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দর সড়কে বাস দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর নিহতের ঘটনায় ঘাতক জাবালে নূর পরিবহনের চালককে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে ফাঁসি দেয়া, নৌ পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ ও নিরাপদ সড়কের দাবি জানান।
অবরোধে প্রায় ৫-৬ শ’ শিক্ষার্থী অংশ নেন। এদিকে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সাইন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন সিটি কলেজ এবং ধানমন্ডি আইডিয়ালসহ বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে মিরপুর রোড, নীলক্ষেত এবং শাহবাগ থেকে সাইন্সল্যাব এলাকায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের অবরোধ ভেদ করে হিমাচল পরিবহনের একটি বাস সাইন্সল্যাব মোড়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ১১টায় মিরপুর-১ নম্বর সড়ক অবরোধ করেন কমার্স কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা দু’টি বাসে ইটপাটকেল ছুড়ে ভাঙচুর চালায়। মিরপুর-১০ নম্বর চত্বরেও বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক আটকে রেখে অবরোধ করেন। এ সময় তারা জসীম উদ্‌দীন রোডে এনা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেন। এছাড়া ৫টি বাস এবং একটি পিকআপ ভাঙচুর করা হয়। এ সময় বিমানবন্দর সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিক্ষার্থী ও পুলিশ-র‌্যাব’র সঙ্গে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
দুপুরের পরে রামপুরা ব্রিজে শিক্ষার্থীদের অবরোধ করতে দেখা যায়। এতে ওই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের ব্যাপক ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়।
ট্রাফিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যস্ততম সড়কে অবস্থান নেয়ায় যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। কর্মদিবস থাকায় পুরো নগরীতেই ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। গাড়ি ভাঙচুর, যানবাহনে আগুন লাগানোর কারণে বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়। কিছু কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে অবস্থান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। আর যেসব স্থানে শিক্ষার্থীরা অনড়ভাবে অবস্থান নিয়েছিল সেখান থেকে তাদের সরাতে বেগ পেতে হয়েছে। কর্মদিবসে শিক্ষার্থীদের এমন অবস্থানের কারণে পুরো নগরীতে ব্যাপক যানবাহন সংকট দেখা যায়। ট্রাফিক কর্মকর্তাদের এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেক হিমশিম খেতে হয়।
অবৈধ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ: বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর ক্ষোভ-বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ঢাকায় গণপরিবহনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়েছে বিআরটিএ এবং ডিএমপিকে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভাকক্ষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিআরটিএ ও বিআরটিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি সভা হয়। ঢাকা শহরের বর্তমান গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা বিষয়ক ওই সভায়ই এই নির্দেশ দেয়া হয় বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
গত রোববার দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যাওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন- শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব। ওই ঘটনায় জাবালে নূরের তিন গাড়ির দুই চালক ও দুই হেলপারকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১। এর আগে নিহত মিমের বাবা ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

কামরান শিবিরে হতাশা by ওয়েছ খছরু

গতকাল কামরানের বাসায় যান আরিফ
সিটি নির্বাচন ওলটপালট করে দিয়েছে সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতি। পরাজয়ের পর অবিশ্বাসের দোলাচলে হাবুডুবু খাচ্ছেন শীর্ষ নেতারা। কামরানের পরাজয় ঝাঁকুনি দিয়েছে দলের তৃণমূল কর্মীদের। কেন্দ্র দখল, টেবিলকাস্ট, প্রভাব বিস্তার যা করা প্রয়োজন সবই করা হয়েছে নির্বাচনে। তবুও জয় ঘরে ওঠেনি। এর কারণ কী- গতকাল দলের জেলা ও মহানগর পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের প্রশ্ন করা হলে জবাবে জানান- বড় ধরনের ‘ষড়যন্ত্র’ হয়েছে সিলেটের নির্বাচনে। এই ষড়যন্ত্রও সিলেটে নতুন। এর প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপকভাবে পড়বে বলে জানান কেউ কেউ। এদিকে- দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এ হারের জন্য সিলেটের দুর্বল সাংগঠনিক ব্যবস্থাকে দুষলেও স্থানীয় নেতারা সেটি মানতে নারাজ। সিলেটে আওয়ামী লীগ তিনভাগে বিভক্ত। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও মহানগর সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান- এই তিন নেতা তিন বলয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই এই বলয়গুলো দৃশ্যমান হয়। পাশাপাশি সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদও নতুন আরেকটি বলয় গড়ে তুলেছেন। যতই দিন যাচ্ছে বিবদমান এই বলয়গুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। ২০০৩ সালের সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কামরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল আওয়ামী লীগের সব বলয়। এ সময় তারা অনেকটা প্রকাশ্যেও নামেন। এতে করে একা লড়াই করে হেরে যান কামরান। ওই নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের ভেতরে দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়ে উঠেছিল। তবে- কামরান দ্বন্দ্বকে অদৃশ্য করে রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। সব বলয়ের সঙ্গে সমান সখ্য গড়ে তিনি চলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। দলের নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন- গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি দলীয় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে ‘উন্নয়ন’ সম্পর্ক গড়ে উঠে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের। এই সম্পর্কের কারণে অর্থমন্ত্রীর আনুকূল্য নিয়ে সিলেটে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটান আরিফুল হক চৌধুরী। আরিফের উন্নয়ন নিয়েও আওয়ামী লীগের ভেতরে নানা অসন্তোষ দেখা দেয়। চলতি বছরের ৩০শে জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেটে সফরকালে প্রকাশ্য জনসভায়ও সেটি জানানো হয়। এতসবের পরও শেষ মুহূর্তের বিএনপি দলীয় মেয়র আরিফের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি অর্থমন্ত্রী বলয়ের। ভোটের দিন সিলেট নগরীর দুর্গাকুমার ভোটকেন্দ্রে নিজের ভোট প্রদান করে সাংবাদিকদের কাছে আরিফ সম্পর্কে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেননি অর্থমন্ত্রী। বরং তিনি বলেছেন- আরিফ সিলেটের উন্নয়ন করেছেন। একই সঙ্গে কামরানও উন্নয়ন করেছে। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়ে কামরান বলয়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। আর সোমবার অর্থমন্ত্রী ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার যোগে সিলেটে এসে ভোট দিয়ে গেলেও তার সঙ্গে কামরান কিংবা দলের শীর্ষ নেতাদের দেখাও হয়নি। এ সময় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কেবল তার বলয়ের নেতারাই উপস্থিত ছিলেন। সিলেটের রাজনীতিতে প্রায় তিন বছর ধরে বিচরণ করছেন অর্থমন্ত্রীর ছোটো ভাই ড. একে আবদুল মোমেন। তিনিও সিলেটে অর্থমন্ত্রীর বলয়কে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। কামরানের সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব পুরনো। সিলেটে এখন কামরান থেকে সিনিয়র নেতা অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। বর্তমান সরকারের শাসনের শুরুতে কামরান যখন অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তখন মহানগর সভাপতি ছিলেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। ওই সময় সিলেট আওয়ামী লীগের ‘চার’ খলিফার মধ্যে চতুর্থ ছিলেন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। কিন্তু দলীয় সভানেত্রী হঠাৎ করে তাকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক করায় সিলেট আওয়ামী লীগের নেতারা প্রথমে সেই সিদ্ধান্ত মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি। অবশ্য পরপর দুই টার্ম মিসবাহ সিরাজ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সিলেটে নিজের শক্তি বাড়াতে বলয় গড়ে তুলেছেন। আর এই বলয় সিলেটে অর্থমন্ত্রী ও কামরান বলয়ের রাজনীতি বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। মিসবাহ সিরাজের অংশের নেতারা সিলেটে অর্থমন্ত্রীকে নানাভাবে বিতর্কিত করারও চেষ্টা চালায়। এরপর থেকে সিলেটের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ‘সতর্ক’ হয়েছেন মন্ত্রী বলয়ের নেতারা। এবারের সিটি নির্বাচনেও অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও তার বলয়ের নেতা-কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে ‘অসন্তুষ্ট’ কামরান অংশের নেতারা। এর কারণ- সিটি নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হলেও হঠাৎ করে ১০ দিনের জন্য বৃটেনে চলে যান অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। এ সময় তার বলয়ের নেতারাও সিলেটে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরে এসে অবশ্য মিসবাহ সিরাজ নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। তবে তার বলয় ততটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেনি। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে- অ্যাডভোকেট মিসবাহ সিরাজের ঘনিষ্ঠজন কাউন্সিলর আফতার হোসেন খান বিপুল ভোটে এবারো কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু আফতাব হোসেনের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে নৌকা ভোট পেয়েছে কম। আবার নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিনের সিরাজের ভাগিনা তারেক আহমদ তাজ। এ ওয়ার্ডেও নৌকা ভোট পেয়েছে কম। অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের নেতাকর্মীরাও নির্বাচনের দিন নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন। এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সঙ্গে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। পরবর্তীতে গণভবনে ডেকে নিয়ে গিয়ে দলের সভানেত্রী কামরানের হাতেই তুলে দেন নৌকা প্রতীক। ওই সময় অবশ্য দলের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি স্বাগত জানান আসাদ উদ্দিন আহমদ। এরপর দলের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ সিলেটে এসে কামরানের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব করেন আসাদকে। আর দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই বদলে যায় দৃশ্যপট। আসাদ উদ্দিন আহমদ প্রথম দিকে ভোটের মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও পরে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। শেষ পর্যায়ে এসে তিনি প্রায় চুপ হয়ে যান। নির্বাচনী মাঠ থেকে হঠাৎ আসাদের নিষ্ক্রিয়তা নানা সমালোচনার জন্ম দেয়। আসাদ উদ্দিন আহমদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সদস্য সচিব হলেও নির্বাচনের দিন বিকেল থেকে তিনি বাসায়ই ছিলেন। দলীয় কার্যালয়ে কিংবা ফলাফল ঘোষণার সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাননি। এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবার মনিটরিং করেছেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) আহমদ হোসেন। তিনি নির্বাচনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন। এ কারণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে ভোটের আগের দিন দলের শীর্ষ নেতাদের একসঙ্গে নিয়ে বৈঠক করলেও তাদের মধ্যে মান-অভিমান কমেনি। সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নজিরবিহীন জাল ভোটের পরও জয় ঘরে তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ভোট গেল কোথায় এ নিয়ে এখন সিলেটে আলোচনা তুঙ্গে। তবে ভোটের দিন আওয়ামী লীগের কর্মীরাই ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ভোট দিয়েছে ধানের শীষে। গতকাল সিলেট আওয়ামী লীগেরই বেশ কয়েকজন নেতা এ অভিযোগ জানিয়ে বলেন- নৌকায় নয়, জাল ভোট বেশি হয়েছে ধানে। কেন্দ্র দখলকারী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা নৌকার পরিবর্তে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। এই জালভোট দেয়া লোকজন কারা এ প্রশ্নের উত্তর এখনও মিলেনি। এদিকে সিলেটে সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল থাকার কারণে কামরানের পরাজয় হয়েছে বলে গতকাল স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। বলেন, এই দুর্বলতা ভোটকে প্রভাবিত করেছে। এ কারণে তারা সার্বিক বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন। তিনি বলেন, ৭ হাজারের বেশি ভোট বাতিল হয়েছে। এই ভোট নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন তারা। আর সিলেটে সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টি মানতে নারাজ সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কামরানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের প্রভাব আগামীতে পড়বে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ ছিল বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে- সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে গতকাল বিকাল ৫টায় কামরানের নির্বাচনী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল আওয়ামী লীগ। পরে অবশ্য সেটি বাতিল করা হয়েছে। সিলেট আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক জগলু চৌধুরী জানিয়েছেন, অনিবার্য কারণে এই সংবাদ সম্মেলনটি বাতিল করা হয়েছে।

কোটা সংস্কারের দাবি ন্যায্য

সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের দাবি ন্যায্য বলে মন্তব্য করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, কোটা সংস্কারে আন্দোলনকারীরা রাজাকারের সন্তান নয়, তারা এদেশেরই সন্তান। প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ৮৭তম জন্মদিন উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া আয়োজিত ‘কয়লা চুরি, ব্যাংক ডাকাতি, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বন্ধ করে ভোটাধিকার গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্য’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আজকে যারা কোটা আন্দোলন করছে এরা কারা? এরা কোনো রাজাকারের বাচ্চা নয়, এরা এই দেশেরই সন্তান। যারা এই আন্দোলনকারীদের অপমান করে, তারা আসো, আমার সামনে এসে দাঁড়াও। আমাকে গুলি করে মারার আগে তাদের গালে দুই চড় মারবো আমি।’ তিনি বলেন, এসব শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নামে নিজেদের পকেট ভারি করছে না। এরা নিজেদের ন্যায্য দাবির প্রস্তাব করেছে। তারা কোটা বাতিল নয় বরং কোটার সংস্কার চেয়েছে। আর এই ন্যায্য দাবি প্রস্তাব করা তাদের মৌলিক অধিকার। আর লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই অধিকার অর্জন করেছি। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত দলিল আজও জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তার নাম ভাঙিয়ে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ না করে, যান দলিলটিতে কী লেখা আছে গিয়ে পড়ুন। তাতে উল্লেখ আছে এই দেশের মালিক কোনো ব্যক্তি না। এই দেশের মালিক এই দেশের জনগণ। এখনো সময় আছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। ইতিমধ্যে একটি ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাচ্ছে এমন দাবি করে কামাল হোসেন বলেন, ‘এদেশের মানুষ নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেন আমরাই মালিক। তারা প্রশ্ন করে, আমরা কী করে মালিক? আমাদের কথা তো কেউ শোনে না। আমি বলি, আপনারা ঐক্যবদ্ধ হন, তারপর দেখেন শোনা যাবে কি যাবে না।
ইতিমধ্যে একটি ঐক্যপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাচ্ছে, এরমধ্যেই টনক নড়ে যাচ্ছে। শক্তভাবে আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন আমরা দাঁড়াই।’ এই আইন বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, তরুণ সমাজের ওপর আক্রমণ খুবই লজ্জার। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রথম গণকবর কোথায় খোঁড়া হয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, চলুন আমার সঙ্গে আমি দেখাবো। প্রত্যেকটা শিক্ষককে টেনে টেনে বের করা হয়েছিল, আর পাইকারিভাবে ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছিল। প্রথম কাতারের মুক্তিযোদ্ধারা ছাত্র ছিল? না তরুণ ছিল? তিনি বলেন, এই ইতিহাসকে কেন আজ মুছে দেয়া হবে? তাদের উত্তরসূরিই আজকের এই ছাত্ররা। কোনো কিছু পাওয়ার জন্য কেউ মুক্তিযুদ্ধ করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার পরিষ্কার মনে আছে, যখন স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু বললেন, সবাইকে দুই লাখ করে টাকা দেবো, তখন অনেকেই আমার দেয়া চেক সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। যারা আজকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করে, তারা এ কথা ভুলে গেছে যে, মুক্তিযোদ্ধারা কী মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। আজ মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি-ঘর দেয়া হয়েছে কিন্তু আমরা বাড়ি-ঘর পাওয়ার জন্য বা ব্যবসা করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। এসময় জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সভাপতি আ স ম শফিউল্লাহ বলেন, সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, দেশের প্রতিটি নাগরিকই সমান অধিকার পাবে।
তাহলে এখানে কোটার প্রয়োজনটা কোথায়। যুদ্ধের সময় থেকে এখন দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। তিনি বলেন, আমার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের বয়স মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর ছিল তারা আজ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাচ্ছেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লিস্টে না থাকলেও টাকার বিনিময়ে অনেকেই আজ মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা সেই সংবিধানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও কোনো কোটার কথা উল্লেখ নেই। লেখা আছে, যোগ্যতার প্রাধান্য সবার আগে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এসব কোটা পদ্ধতি বাদ দিয়ে আন্দোলন ও এই রাজনীতির অবসান ঘটান। আর সম্মান যদি দিতে হয় আহত ও যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান দেখান। আর সেই সম্মান হবে, তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করা।
অনুষ্ঠানে ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন করায় তাদের রাজাকারের সন্তান বলা হয়। এটি দুঃখজনক। কলকাতায় ঘুমিয়ে আসলেই কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় না। গুটি কয়েক দালাল ছাড়া এদেশের বাকি সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিল। কোটা সংস্কার নিয়ে ছাত্ররা যৌক্তিক দাবি করেছে। তারা তো সংস্কার চেয়েছে, বাতিল না। ক্ষোভের বশে কেউ বাতিলের কথা বললেই তা বাতিল হয়ে যায় না। কোটার পরিবর্তন, সংশোধন হতে পারে।
চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাটি যে বার্তা এসেছে তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজিমুল ইসলাম প্রমুখ।

নারায়ণগঞ্জে মডেল কন্যার লাশ উদ্ধার

নারায়ণগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে মাহমুদা আক্তার (৩০) নামে এক মডেল ও অভিনেত্রীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। লাশটি কয়েক দিন আগের বলে পুলিশ জানিয়েছে। সোমবার রাতে সদর থানার গোগনগর আলামীননগর এলাকার মোহাম্মদ আলী আকবরের তিনতলা ভবনের নিচ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। নিহত মাহমুদা শহরের দেওভোগ নাগবাড়ী এলাকার আক্কাছ আলীর মেয়ে। শহরের উকিলপাড়া এলাকার ‘টপটেন’ নামে একটি মেগাশপে কাজ করতেন তিনি। ইতিপূর্বে তিনি একাধিক শর্টফিল্মেও কাজ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানান, সোমবার রাতে নিচ তলার ওই ফ্ল্যাট থেকে পচা দুর্গন্ধ ছড়ালে এলাকাবাসী পুলিশকে জানায়। পরে পুলিশ গিয়ে ফ্ল্যাটের দরজার বাইরের তালা ভেঙে প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে মাহমুদার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
এদিকে ওই নারীর ফ্ল্যাট তল্লাশি করে উদ্ধার করা হয় তার একটি পরিচয়পত্র। সেই পরিচয়পত্রের সূত্র ধরেই পুলিশ তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। খবর পেয়ে মঙ্গলবার বিকালে মাহমুদার পরিবারের লোকজন মর্গে ছুটে যায়। তবে কেন এবং কী কারণে মাহমুদাকে হত্যা করা হয়েছে তারা তার কিছুই বলতে পারেননি। এমনকি মাহমুদা যে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করছিল, তাও তারা জানেন না।
ওসি কামরুল ইসলাম আরো জানান, ইতিপূর্বে মাহমুদার বিয়ে হয়েছিল। সেই সংসারের সাত বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক বয়ফ্রেন্ডকে স্বামী পরিচয় দিয়ে আলামীননগর এলাকার মোহাম্মদ আলী আকবরের বাড়ির ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিল মাহমুদা। ধারণা করা হচ্ছে, দুই-তিন দিন আগে দ্বিতীয় স্বামী মাহমুদাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে তালা দিয়ে পালিয়ে গেছে। তবে তার সেই কথিত স্বামীর পরিচয় এখনো জানা যায়নি। পুলিশ তার পরিচয় জানার চেষ্টা করছে। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলে মাহমুদার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি আরো জানান, এ ব্যাপারে তদন্তের পাশাপাশি মামলার প্রস্তুতি চলছে।
তবে নিহত মাহমুদার পারিবারিক একটি সূত্র জানায়, মাহমুদার একমাত্র সন্তান জারা (৭)-এর জন্মের পর স্বামী হাবিবের সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর জারা তার নানা আক্কাস ও নানী সুফিয়ার সঙ্গেই বড় হয়ে উঠছে। মাহমুদা কখনো মেগা শপ ‘টপটেন’ আবার কখনো অনেক দিনের জন্য সুটিংয়ের কথা বলে বাড়ির বাইরে থাকত। বাবা-মা কিংবা পরিবারের কেউ জানতো না মাহমুদা পৃথক বাসা ভাড়া নিয়ে নারায়ণগঞ্জে থাকতো। এদিকে মাহমুদার মৃত্যুর কথা শুনে শিশু জারা খুঁজে বেড়াচ্ছে মাকে ।
অপরদিকে মাহমুদার ফেসবুক আইডির কিছু ছবিতে অনেক বন্ধুদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো ও আড্ডার অসংখ্য চিত্র পাওয়া গেছে। হয়তো এদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মাহমুদার হত্যাকারী। যা পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসবে। এমনটাই বলছেন এলাকাবাসী। তার ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা যায় ৩রা জুলাইয়ের পর ২০শে জুলাই সে তার তিনটি ছবি আপলোড দিয়েছে। এবং ২৬শে জুলাই তাকে ফেসবুকে অ্যাকটিভ দেখা যায়। এরপর তাকে আর ফেসবুকে অ্যাকটিভ দেখা যায়নি।

নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা ৪০০০ কোটি টাকা পাচারের তথ্য

সাম্প্রতিক সময়ে দেশ থেকে রপ্তানির নামে চার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান। তবে কত দিনের মধ্যে এই অর্থ পাচার হয়েছে তা উল্লেখ করেননি তিনি। গতকাল ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে তিনি এ তথ্য জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ভবনের কনফারেন্স হলে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর ফজলে কবির। এক প্রশ্নের জবাবে রাজী হাসান বলেন, আমরা চার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছি। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। অনুসন্ধান শেষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজখবর নেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
একটি গ্রুপের আমদানি পণ্য দেশে না আসায় একটি ব্যাংককে জরিমানা করা হয়েছিল। চাপে পড়ে তা মাফ করা হয়েছে। এভাবেই তো অর্থ পাচার হচ্ছে? জবাবে ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল বলেন, পণ্য দেশে আসা নয়, জরিমানা করা হয়েছিল সময়মতো আমদানি নথি জমা না দেয়ায়।
গভর্নর ফজলে কবির এ সময় বলেন, ব্যাংকটি জরিমানা মওকুফের জন্য আবেদন করেছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিষয়টি দেখবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা কি ভেঙে পড়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, পরিদর্শনে যেসব অনিয়ম ধরা পড়ছে, এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আমাদের যে সীমারেখা রয়েছে, এরমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এদিকে বছরের প্রথমার্ধে লক্ষ্যের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হওয়ায় ভোটের আগে ‘সংযত’ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণায় সুদহার ও নীতিনির্ধারণীতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহও ১৬.৮ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি একই ছিল।
গভর্নর বলেন, মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬.৮ শতাংশ, সরকারি খাতে ১০.৪ শতাংশ। এক প্রশ্নের উত্তরে ফজলে কবির বলে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি যদিও গতবারের মুদ্রানীতির মতো ১৬.৮ শতাংশ ধরা হয়েছে, কিন্তু সরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা কম থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণের উচ্চতর প্রবৃদ্ধি হওয়ার সুযোগ থাকবে।
মুদ্রানীতিতে বিধিবদ্ধ জমার (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নগদ জমা রাখার হার) অনুপাত বা সিআরআর এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তহবিল আহরণের রেপো সুদের হারও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বর্তমানে সিআরআর আছে ৫.৫ শতাংশ। রেপো সুদের হার ৬ শতাংশ।
গভর্নর বলেন, আগের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫.৫ শতাংশ, তা অর্জিত হয়নি। এ বছরের জুনে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৫.৭৮ শতাংশ। এজন্যই মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাবাচন সামনে রেখে সংযত মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে কি না- এ প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেন, সরকার বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্য ধরেছে, তা বাস্তবায়নে সহায়তা করতেই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে।
স্বর্ণ নিয়ে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে কাস্টমস কর্মকর্তারা স্বর্ণ যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন ঠিক সেই অবস্থাতেই রয়েছে। ভল্টে কাস্টমসের কর্মকর্তাদের রাখা স্বর্ণের কোনো হেরফের হয়নি।
রিজার্ভের টাকা নিয়ে গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া পুরো টাকাই ফেরত আসবে। তার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান এসময় বলেন, ফিলিপাইনের উচ্চ আদালতে একটা রায় আপিল অবস্থায় আছে। ওই আপিলের সুরাহা হলেই প্রায় ৫১ মিলিয়ন ডলার ফেরত আসবে। আর যে টাকাটা এখনও সনাক্ত হয়নি, তাও সনাক্তের বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে।
গভর্নর বলেন, ব্যাংকগুলো কী হারে আমানত সংগ্রহ করছে এবং ঋণ কী হারে দিচ্ছে, তা নজরদারি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজারকে করপোরেট গ্রাহক ও প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে আরো গ্রহণযোগ্য ও বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার প্রয়াসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ব্যাংককে অভিনন্দন জানিয়েছে। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজারের প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

যেভাবে ভোট স্থগিত হয় দুই কেন্দ্রে: সব হিসাবই আরিফের পক্ষে by রোকনুজ্জামান পিয়াস

বিজয়ী হতে কোনো হিসাবই আর বাধা নয় বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর। সোমবার নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা তাকে  বিজয়ী ঘোষণা না করলেও সকল হিসাব-নিকাশই এখন তার পক্ষে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অবস্থা থেকে আরিফের পিছিয়ে পড়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। বিজয়ের আনুষ্ঠানিকতা বাকি মাত্র। যে দুটি কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিতের কারণে চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি, সেখানেও রয়েছে আরিফের আধিপত্য। সূত্র বলছে, কেন্দ্র দুটির প্রায় ৪০ ভাগ ভোট কাস্ট হওয়ার পর নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ওই সময়ও কেন্দ্রে ছিল ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। বিএনপি বলছে, এই ফলাফলের পেছনে সিলেটের মানুষের আওয়ামী লীগ বিরোধী মনোভাব কাজ করেছে। একইসঙ্গে ভোট কেন্দ্রে এজেন্টদের দৃঢ় অবস্থান অনেকটা ইতিবাচক ভূমিকা  রেখেছে। তারা বলছে, ১৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রে তাদের এজেন্ট ছিল না। নির্বাচনের সার্বিক ফলাফল বিবেচনায় এনে জামায়াতের ব্যাপারেও কেন্দ্রে একটি মেসেজ দিতে চায় দলটি। এদিকে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আলীমুজ্জামান বলছেন, স্থগিত দুই কেন্দ্রের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন। আগামী সপ্তাহেই পুনঃনির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে এমনটাও আভাস দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। সব ঠিক থাকলে, আবারও নগরপিতার আসনে বসতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না আরিফুল হকের।
সিলেট সিটি করপোরেশনে ১৩৪টি কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৪৪ জন এবং নারী ১ লাখ ৫০ হাজার ২৮৮ জন। ফল ঘোষিত হয়েছে ১৩২টি কেন্দ্রের। এতে দেখা গেছে, ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫৬ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন। ৭ হাজার ৩৬৭টি ভোট বাতিল হয়েছে। বাকি দুই কেন্দ্র ২৪নং ওয়ার্ডের ১১৬নং কেন্দ্র বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাদরাসা ও ২৭নং ওয়ার্ডের ১৩৪নং কেন্দ্রের হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট স্থগিত করা হয়। ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে জোরপূর্বক জালভোট দেয়ার অভিযোগে কেন্দ্র দুটির ভোট স্থগিত করা হয়।  প্রাপ্ত ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই দুই কেন্দ্র ছাড়াই ভোট কাস্ট হয়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। গতবার অর্থাৎ ২০১৩ সালের নির্বাচনেও কাস্ট হওয়া ভোটের হার ছিল ৬২ শতাংশ।
১৩২ কেন্দ্রে আরিফুল হক চৌধুরীর ধানের শীষ পেয়েছে ৯০ হাজার ৪৯৩ ভোট। অন্যদিকে নৌকা প্রতীকে কামরান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৮৭০ ভোট। প্রধান এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের ব্যবধান ৪ হাজার ৬২৬। ভোটের এই ব্যবধান এবং স্থগিত কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা এক জটিল সমীকরণ সৃষ্টি করেছে। জটিল এই সমীকরণে আরিফুল হক চৌধুরীকে হারিয়ে সিলেটের মেয়র হতে পারেন বদর উদ্দীন কামরানও। তবে সেটি একদিকে যেমন জটিল, তেমন অসম্ভবও বটে। ভোটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কামরানকে জয়ী হতে হলে স্থগিত দুটি কেন্দ্রের সব ভোটার ভোট দিতে হবে এবং ১৬১ ভোট বাদে সব ভোট পেতে হবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে স্থগিত কেন্দ্রের ভোট সংখ্যা কম হলে সোমবারই চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হতো আরিফুল হক চৌধুরীকে। কিন্তু সিলেটে দুই স্থগিত কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা ৪৭৮৭টি। অর্থাৎ দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে ১৬১টি ভোট বেশি। এ কারণেই বিধি মোতাবেক আরিফুল হককে বিজয়ী ঘোষণা করা যায়নি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী গাজী সৈয়দ বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাদরাসা কেন্দ্রে  ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ২২১ জন এবং হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৫৬৬ জন। এই দুই কেন্দ্রে আবারো ভোট দিতে হবে ভোটারদের। তাদের ভোটেই চূড়ান্ত হবেন নগরপিতা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৩২ কেন্দ্রের মতো এই দুই কেন্দ্রে ৬২ শতাংশ ভোট কাস্ট হলে আরিফই হবেন চূড়ান্ত বিজয়ী। এমনকি এই ৬২ শতাংশের সব ভোট যদি কামরান পান তারপরও। অন্যদিকে শতভাগ ভোট কাস্ট হলে সেখানে মাত্র ৮১ ভোট পেলেই জয় নিশ্চিত ৪ হাজার ৬২৬ ভোটে এগিয়ে থাকা আরিফের। আর শতভাগ কাস্ট হওয়ার পর আরিফ যদি তার কম পায় তবে কামরানই পরবেন বিজয়ের মালা।
তবে ওই দুই কেন্দ্রের ভোটারদের সমর্থনের বাস্তবতায় সে সম্ভাবনা একেবারেই নেই। ওই এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১১৬নং কেন্দ্রে আরিফের আধিপত্য অনেক আগে থেকেই। সেখানে অন্য কোনো প্রার্থী এগিয়ে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। একই অবস্থা ১৩৪নং কেন্দ্রেও। এখানেও বরাবরই আরিফের সমর্থন বেশি। এ কারণেই ওই কেন্দ্রে আরিফের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ভোট ডাকাতি করতে যায়, এ অভিযোগ সেখানকার ভোটারদের।
নির্বাচনের দিনের ঘটনা বর্ণনা করে বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাদরাসার ১১৬নং কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার ইমন চন্দ্র দাস মানবজমিনকে জানান, সকাল থেকেই তার কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ চলছিল। সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক বুথের বাইরে হট্টগোল সৃষ্টি করে। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে না গেলেও বোঝানোর চেষ্টা করে। এ সময় তাদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে তারা বুথের মধ্যে গিয়ে জোরপূর্বক ব্যালট ছিনিয়ে নেয়। বুথের এজেন্টরা তাৎক্ষণিকভাবে জানালে কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে দুইটার দিকে কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ওই সময় কত ভোট কাস্ট হয়েছিল তিনি জানান, ৩৫-৪০ শতাংশ মতো ভোট কাস্ট হয়েছিল। এ ছাড়া ভোটারের লম্বা লাইন ছিল। এরা কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এজেন্টরা তাকে জানিয়েছেন নৌকার পক্ষে সিল মারছিল তারা।
স্থগিত অপর কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার সারোয়ার জাহান মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, ১২টার কিছু সময় আগে কেন্দ্রের ভেতর আগে থেকেই অবস্থান করা দুষ্কৃতকারীরা হঠাৎ বুথে প্রবেশ করে। তারা ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়। পরে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। প্রিজাইডিং অফিসার বলেন, হট্টগোল হওয়ার পূর্বপর্যন্ত প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছিল।
বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে দলটির সিলেট মহানগর সহসভাপতি সালেহ আহমেদ খসরু বলেন, ভোট ডাকাতি সত্ত্বেও বিএনপির জয়ের পেছনে সিলেটের মানুষের আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করার কারণে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। আপামর ভোটার নীরব ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছে। তিনি এই জয়ের পেছনে এজেন্টদের ভূমিকাকে প্রাধান্য দেন। তিনি বলেন, অনেক কেন্দ্রে মারধর করে তাদের এজেন্ট বের করে দেয়। তারপর আবারও তারা বুথে গিয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি বলেন, ভোট ডাকাতি না হলে, বিএনপির সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় আসতো না আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, এই নির্বাচন প্রমাণ করে, সিলেটের বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা দেশের অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় আলাদা। জামায়াতের ব্যাপারে তিনি বলেন, তারা নিজেদেরকে অনেক বেশি প্রভাব সৃষ্টিকারী মনে করেছিল। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের জনসমর্থন দেখা গেছে। সিলেটের ভোটের মাঠের এই চিত্র জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে গড়ে ওঠা জোটে প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সিদ্ধান্ত নেবেন।
উল্লেখ্য, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি কামরানের সঙ্গে এটি ছিল আরিফুল হকের দ্বিতীয় ভোটযুদ্ধ। ২০১৩ সালে প্রথম লড়াইয়ে কামরানকে ৩৫ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন তিনি।

দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা সমগ্র বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারছি এবং আমাদের সন্তানরা মহাকাশ বিজ্ঞান , পরমাণু প্রযুক্তি, সমুদ্র বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্র, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে- যা দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন। গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র এবং তার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে গাজীপুর ও বেতবুনিয়াতে দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের’ (স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন) উদ্বোধন করেন। গ্রাউন্ড স্টেশন দুটির নামকরণ করা হয়েছে সজীব ওয়াজেদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র গাজীপুর এবং সজীব ওয়াজেদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র বেতবুনিয়া। এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ১৪ই জুন এই বেতবুনিয়াতে ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন এবং সেখান থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু হয় এবং তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা এখন মহাকাশ জয় করেছি। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমাদের বেতবুনিয়াতে এই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটি দিয়ে গেছেন। আর সজীব ওয়াজেদ জয় তার পরামর্শ এবং উদ্যোগে আমরা মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম হয়েছি। কাজেই সেই মুজিব থেকে সজীব- সেখানেই আমরা পৌঁছেছি। গত ১২ই মে বাংলাদেশ সময় ভোর ২টা ১৪ মিনিটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে সফলভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট এবং পরমানু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে পরমাণু ক্লাবের ৩৪তম সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইতিমধ্যেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ তার কার্যক্রম শুরু করেছে। এই দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে স্যাটেলাইট সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহীতাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর গাজীপুরের তেলীপাড়ার ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র প্রাইমারি গ্রাউন্ড স্টেশন এবং রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র ব্যাকআপ গ্রাউন্ড স্টেশন হিসেবে যুগপৎ ব্যবহৃত হবে। শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের কাছে দোয়া চাই। দোয়া করবেন যাতে দেশ ও জাতির সেবার আমরা সবসময় নিয়োজিত থাকতে পারি। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের সেবায় কাজ করে। জনগণের সেবায় কাজ করে যাবে। জনগণের কল্যাণই আমাদের একমাত্র চিন্তা। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার বক্তব্য দেন। বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন দুটির নাম সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে নামকরণ করার প্রস্তাব করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। পরে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের অন্যতম রূপকার বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রাউন্ড স্টেশন দুটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিকবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটে থাকছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার সক্ষমতা। প্রতিটি ট্রান্সপন্ডার প্রায় ৩৬ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গের সমপরিমাণ। অর্থাৎ ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থেকে পাওয়া যাবে প্রায় এক হাজার ৪৪০ মেগাহার্টজ পরিমাণ বেতার তরঙ্গ। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনে ব্যবহার করবে। আর ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে ভাড়া দেয়ার জন্য রাখা হবে। ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২৬টি হচ্ছে কেইউ ব্যান্ডের এবং ১৪টি সি ব্যান্ডের। গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বেতবুনিয়ায় স্থাপিত দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট দূরত্বে দ্রাঘিমাংশে (প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে) স্যাটেলাইটটি অবস্থান করছে। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্স-ইতালি থেকে স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণভাবে কন্ট্রোল করা হলেও বর্তমানে গাজীপুর গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে ট্র্যাকিং এবং কন্ট্রোলিং করা হচ্ছে। প্রকৌশলীরা এখান থেকে স্যাটেলাইটে সিগন্যাল পাঠিয়ে আবার তা রিসিভ করছে। প্রয়োজন হলে সিগন্যাল পাঠিয়ে স্যাটেলাইটটিকে (১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পজিশনে) নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখার জন্য যা যা করা দরকার তা করছে। নিয়মিত ট্র্যাকিং ও কন্ট্রোলিং করা হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর নাম কেউ মুছে ফেলতে পারবে না: জয়
এদিকে অনুষ্ঠানে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, বঙ্গবন্ধুর নাম এখন মহাকাশে চলে গেছে, আর কেউ চাইলেও তা মুছতে পারবে না। ’৭৫-এর পর দেশের ইতিহাস বিকৃতির ষড়যন্ত্রের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ওই সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ইতিহাস বিকৃতির ষড়যন্ত্রও হয়েছিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন শুধু দেশের মধ্যে সীমাবন্ধ থাকবে না। বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জ, দ্বীপ ও নদী বা সমুদ্রের মধ্যে থেকে সারা বিশ্ব দেখবে। এটাই ছিল আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠিয়েছি। তিনি বলেন, স্যাটেলাইট তৈরি করতে বাজেটের চেয়েও কম ব্যয় হয়েছে। এখন আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রীরা স্যাটেলাইটের ওপর লেখাপড়া করে এক্সপার্ট হতে পারবে। তারা এটার ওপর ডিগ্রিও নেবে।

‘খাইবার পাই না! আমারে কার্ড দিলাইন না?’

আফজান বিবির অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঘরে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা একমাত্র ছেলেটাও গত সপ্তাহে মারা যায়। এর আগে আরেকটি পুত্র ছিলো সেও বিদায় নেয়। গতকাল আফজান বিবির সঙ্গে কথা বলতে গেলে মুখে বিড়বিড় করে শুধু এইটুকুই বলে, আমি মইরা যাইয়াম, খাইবার পাই না। আমার ভাতা অইনা কেয়া? একই কথা বার বার বিড়বিড় করে বলতেই থাকে। ক’দিন আগেও কিছু কথা বলতে পেরেছেন। সেই কথাগুলো ছিলো এমন! বাবা! হোন্ডার নিচে পইরা একটা পা ভাইংগা গেছে। উঠবার পায়না বাবা! আডাচাড়া (নড়াচড়া) করবার পায়না! মাইনসে টাইন্যা (টেনে) নিয়া গেলে যাইবার পাই! এক পোলা অসুখে মইরা গেছে! আরেক পুলা আছে সেও কঠিন অসুগে ঘরে পইরা আছে! মাইয়া একটা তার স্বামীও ফালাইয়া রাইখা গেছে। ঐ মাইয়াডাই আমারে দেহে। মাইয়াই তো খাইবার পায় না। আমারে কেমনে দেখবো। আমারে একটা কার্ড দিলাইন না। আইন্যেরা না দিলে দেখবো কেডা! বয়স অইছে। মইরা যামুগা! ভালাতো কিছু পাই না! চেয়ারম্যানের কাছে কয়বার গেলাম! দেয় না কিছু! তার বাড়ি উপজেলার ৩নং কৈচাপুর ইউনিয়নের দর্শারপাড় গ্রামে। কিছু জিজ্ঞেস করলে কথা বলতে গিয়ে অবাক দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। একপর্যায়ে নীরব হয়ে যায়। একপর্যায়ে ভাঙা পা দেখিয়ে নিশ্বাস ছাড়ে।

শিল্পপতি মুন্নুর ১ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বিশিষ্ট শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদ হারুনার রশিদ খান মুন্নুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। গেল বছর এইদিনে সকলকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাকে সমাহিত করা হয় মানিকগঞ্জে মুন্নু সিটিতে স্থাপিত মসজিদের পাশে। মানিকগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে এক দৃষ্টান্ত উদাহরণ ছিলেন চার বারের সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নু। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা চারবার বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে একই সঙ্গে নির্বাচন করে দুটি আসনেই জয়লাভ করে তার কারিশমা দেখান। দলের সুসময়ে ও দুঃসময়েও মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন। আর ব্যবসায়ী হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের একজন আইকন। সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করায় তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও। শিল্প বিপ্লবের অগ্রদূত ও সুনামধন্য ব্যবসায়ী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পান এই মানুষটি।
বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের বড় কন্যা মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফরোজা খান রিতা। পিতার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমার আব্বা হচ্ছেন একজন আদর্শবান মানুষ এবং আদর্শবান পিতা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সততা থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটেননি। একজন আদর্শবান পিতার সন্তান হয়ে আমি গর্বিত। তিনি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন। আল্লাহ আমার আব্বার প্রায় স্বপ্নই পূরণ করেছেন।
তার স্বপ্ন ছিল মানিকগঞ্জের বুকে একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের। গ্রামে একটি আন্তর্জাতিকমানের স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করার। সে স্বপ্নও বাস্তবায়ন হয়েছে। মানবকল্যাণে কাজ করতে তার আরো অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু তার আগেই আমাদের একা করে চলে গেলেন। তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে আমার মূল লক্ষ্য।
একজন মুন্নু হয়ে উঠার গল্প: হারুনার রশিদ খান মুন্নু মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার পদ্মার ভাঙনকবলিত আজিমনগর ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। এখানেই কেটেছে তার শৈশব আর কৈশোর। তখন বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর। পৃথিবীর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবাকে হারান। তখন থেকেই মায়ের কোলে-পিঠেই বড় হন তিনি। মা কখনোই তার বাবার অভাব বুঝতে দেননি। যখন একটু বড় হচ্ছিলেন তখন গ্রামের স্কুলে ভর্তি করা হয় তাকে। ছোটবেলা থেকেই ছাত্র হিসেবে ভালো ছিল বলেই স্কুলের শিক্ষকরা তাকে আর সবার চাইতে বেশি আদর করতেন ও ভালোবাসতেন।
গ্রামের ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে বাণিজ্য শাখায় প্রথম বিভাগ পেয়ে মেট্রিক পাস করেন। এর পর ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। সে কলেজ থেকে ১৯৫৪ সালে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ডিপিআই অফিসে হিসাব শাখায় ৬০ টাকা বেতন আর ৩০ টাকা অ্যালাউন্সসহ মোট ৯০ টাকা বেতনের একটি চাকরিও করেন। বেতনের সেই টাকা থেকে মাসে ২০-৩০ টাকা করে বাড়িতে মায়ের কাছে পাঠাতেন। যখন বিকম ফার্স্ট ইয়ারে তখন মায়ের ইচ্ছা এবং পছন্দের পাত্রীর (হুরুন নাহার) সঙ্গে ১৯৫৫ সালের ৩রা আগস্ট বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া অবস্থায় বেশ কয়েকটি ভালো চাকরির অফারও পেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে বি.কম পাস করেন এবং এরপর চার্টার্ড একাউন্টস কোর্স সমাপ্ত করেন। ১৯৫৮ সালে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা যখন অস্থির ছিল তখন লন্ডনে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির অফার আসলেও তার মা না চাওয়ার কারণে সেদিন আর লন্ডনে যাওয়া হয়নি। তখন তিনি জেদ ধরলেন ব্যবসা করবেন। আদমজীতে অডিটর হিসেবে কাজও করেন। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সেখানে অডিট করতেন। তার টার্গেট ছিল কীভাবে ব্যবসা শুরু করবেন। ছোট থেকেই ব্যবসা শুরু করলেও স্বপ্নটা ছিল আকাশ সমান। ঢাকার ওয়ারীতে তার প্রতিষ্ঠিত প্রথম ব্যবসা শুরু হয় মুন্নু আর্টপ্রেস দিয়ে। সেই প্রেসই তার উপরে উঠার প্রথম সিঁড়ি। এরপর মুন্নু আর্ট প্রেস অ্যান্ড প্যাকেজিং, মুন্নু জুটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মুন্নু স্ট্যাম্পস লিমিটেড, মুন্নু সিরামিক্স, বন চায়না, মুন্নু ট্রেনিং কমপ্লেক্সসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান করেন। সুনামধন্য ব্যবসায়ী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান এই মানুষটি। এরপর নিজ জেলা মানিকগঞ্জের গিলন্ড এলাকায় তার ব্যবসার প্রসার বৃদ্ধি করেন। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী হিসেবে দেশ- বিদেশে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তবে মুন্নু সিরামিক্স সারা দুনিয়ায় একটি ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায়। মানিকগঞ্জের গিলন্ড এলাকার মুন্নু সিটিতে ২০১১ সালে গড়ে তুলেছেন স্বপ্নের মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। যা জেলার মানুষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল। দেশ-বিদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা মনোরম পরিবেশে সেখানে ডাক্তারি পড়ছেন। সেখানে রয়েছে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক হাসপাতাল। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে স্থাপন করা হয়েছে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। যেখানে উন্নত মানের দেশি-বিদেশি খাবার তৈরি হয়। প্রতিদিন দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন। রয়েছে শপিংমলও। এছাড়া ২০১৩ সালে মুন্নু সিটিতে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। মুন্নু সিটিতে আরো প্রতিষ্ঠা করেছেন মুন্নু মেডিকেল নার্সিং ইনস্টিটিউট কলেজ। আরো রয়েছে মুন্নু ফেব্রিক্স ও মুন্নু অ্যাটোয়ার। যেখানে কয়েক হাজার বেকার নারী-পুরুষ কাজ করছেন।
প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে মুন্নু টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি। শুধু তাই নয়, মুন্নু সিটির মাঠজুড়ে রয়েছে ফুল- ফসলের সমারোহ। সারি সারি আম বাগান, ফুলের সৌরভ এবং পুকুর ভরা মাছ। দেশি-বিদেশি পাখির সমাহার। ক্যাম্পাসের ভেতরে রয়েছে সৌন্দর্য্যমণ্ডিত একটি মসজিদ ও ফুলের বাগান।
জীবদ্দশায় হারুনার রশিদ খান মুন্নু সব সময় কিছু কথা বলতেন। তা হচ্ছে কোনো মানুষ প্রতিষ্ঠিত হতে হলে প্রথমে তার মধ্যে থাকতে হবে সততা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার প্রত্যেকটি চাওয়া পূরণ হয়েছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের যারা অপমান করে তাদের চড় মারবো: ড. কামাল

‘কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের যারা অপমান করে, তাদের দুই চড় মারবো’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংবিধান প্রণেতা এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন। মঙ্গলবার (৩১ জুলাই) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আজকে যারা কোটা আন্দোলন করছে এরা কারা? এরা রাজাকারের বাচ্চা নয়, এরা এই দেশের সন্তান। যারা এই আন্দোলনকারীদের অপমান করে, তারা আসো, আমার সামনে দাঁড়াও। আমাকে গুলি করে মারার আগে তাদের দুই চড় মারবো।’
ড. কামাল আরও বলেন, ‘আমাদের যে ছেলেরা ন্যায্য প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছে, সংস্কারের প্রস্তাব করার তাদেরও মৌলিক অধিকার আছে। লাখ লাখ জীবন দিয়ে এই অধিকার অর্জন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত দলিল— যেটা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে, তাতে লেখা আছে। তার নাম ভাঙিয়ে যারা সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে, দেখো সেই দলিলটাতে কী লেখা আছে। এই দেশের মালিক এই দেশের জনগণ। এই দেশের মালিক কোনও ব্যক্তি না। তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।’
ইতোমধ্যে একটি ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাচ্ছে এমন দাবি করে কামাল হোসেন বলেন, ‘এদেশের মানুষ নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেন—আমরা মালিক। তারা প্রশ্ন করে, আমরা কী করে মালিক? আমাদের কথা তো কেউ শোনে না। আমি বলি, আপনারা ঐক্যবদ্ধ হন, তারপর দেখেন শোনা যাবে কী যাবে না। ইতোমধ্যে একটি ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাচ্ছে, এরমধ্যেই টনক নড়ে যাচ্ছে। শক্তভাবে আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন আমরা দাঁড়াই।’
তরুণ সমাজের ওপর আক্রমণ লজ্জার বিষয় উল্লেখ করে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রথম গণকবর কোথায় খোঁড়া হয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, চলুন আমার সঙ্গে আমি দেখাবো। প্রত্যেকটা শিক্ষককে টেনে টেনে বের করা হয়েছিল, আর পাইকারিভাবে ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছিল। প্রথম কাতারের মুক্তিযোদ্ধারা ছাত্র ছিল না? তরুণ ছিল না? এই ইতিহাসকে কেন মুছে দেওয়া হবে? তাদের উত্তরসূরি আজকের ছাত্ররা। এই ছাত্ররা কোনও কিছু নিজের পকেট ভারি করার জন্য চাচ্ছে? কোনও লুটপাটের ভাগ চাচ্ছে? কোটার ব্যাপারে তাদের কথা হচ্ছে— সংস্কার করো।’
কোনও কিছু পাওয়ার জন্য কেউ মুক্তিযুদ্ধ করেনি উল্লেখ করে কামাল হোসেন আরও বলেন, ‘‘আমার পরিষ্কার মনে আছে, যখন স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু বললেন, সবাইকে দুই লাখ করে টাকা দেবো, তখন অনেকেই আমার দেওয়া চেক সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। যারা আজকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করে, তারা এ কথা ভুলে গেছে যে, মুক্তিযোদ্ধারা কী মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। বাড়িঘর দেওয়া হয়েছে, আমরা বাড়িঘর পাওয়ার জন্য, ব্যবসা করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি।’
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় কয়লা চুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কয়লা চুরির পর কয়েকদিন পর মাটি চুরি হবে। লক্ষ্য করবেন চুরি ডাকাতির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু আইনানুগ কোনও ব্যবস্থা কি নেওয়া হচ্ছে? আমি প্রশ্ন রাখলাম।’