Saturday, July 26, 2025

গাজায় কুকুরেরা মরদেহ ভক্ষণ করছে, পশু অধিকার নিয়ে সোচ্চাররা কোথায় by ওদেহ বিশারাত

গাজা উপত্যকায় গড়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন মানুষ নিহত হয়। এটা অবশ্য সাধারণ দিনের কথা। আশীর্বাদপুষ্ট দিনগুলোতে ‘ফলন’বেশিই হয়— ১০০ থেকে ১৫০জন মারা পড়ে! দুনিয়ার আর কোনো কসাইখানায় এত বিপুল পরিমাণ মরদেহ মেলে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুসারে ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ থেকে মানে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল যেদিন থেকে আবার আক্রমণ শুরু করল সেদিন থেকে এখন পর্যন্ত (২২ জুলাই, ২০২৫) উপত্যকায় অন্তত ৮,২৬৮ জন নিহত হয়েছ আর এর তিনগুণ আহত হয়েছে।

স্বীকৃত সংজ্ঞা [হিব্রু বাইবেলের আদি পুস্তক] অনুসারে, গাজার ভুক্তভোগীরা অন্য সব মানুষের মতোই জন্ম নিয়েছে এবং তা ‘তাঁর প্রতিমূর্তি’ হিসেবে। এটা এক বিরাট সমস্যা। কারণ, যারা ‘তাঁর প্রতিমূর্তি’ হিসেবে জন্ম নিয়েছে, তাদের হত্যা করা জঘন্য পাপ। যদি ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি ধ্বংস করা হয়, তাহলেতো ঈশ্বর খুনিদের হৃদয় পরিত্যাগ করবেন।

বিষয়টা তাহলে উভয়সংকট তৈরি করেছে। আমি অবশ্য ধারণা করি যা সময়ের পরিক্রমায় তা কেটে যাবে। তার আগে অবশ্য এক চাতুর্যপূর্ণ ব্যবধানের তত্ত্ব হাজির করা হবে এই ব্যাখ্যা দিয়ে যে সকল মানুষ ঠিক ‘তাঁর প্রতিমূর্তি’ হিসেবে জন্ম নেয়নি; কিছু মানুষ ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে জন্ম নিয়েছে, আর বাকিদের জন্ম হয়েছে কোনো দানবের প্রতিমূর্তিতে।

এখানে অবশ্য একটা প্রশ্ন করা যেতে পারে যে আমালেক জাতির মানুষেরা কার প্রতিমূর্তিতে জন্ম নিয়েছিল? [আমালেক হচ্ছে মুসা নবীর সময় কেনানে (আজকের ইসরায়েল, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের কিছু এলাকা) বসবাসকারী এক শক্তিধর জনগোষ্ঠী যাদের হিব্রু বাইবেলে ইহুদির অন্যতম শত্রু হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।]

বলতে গেলে উল্লিখিত উভয়সংকট উত্তরণের কাজ শুরু হয়ে গেছে। নতুন ইসরায়েলি অভিধানে ঈশ্বরকে তাঁর প্রতিমূর্তি থেকে আলাদা করার জন্য একের পর এক পরিভাষা যোগ করা হয়েছে। এসব নতুন সংজ্ঞা অনুসারে, ফিলিস্তিনিরা তো ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি হওয়া থেকে অনেক দূরে; তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে ’সন্ত্রাসী’, ’জঙ্গি’, ‘গাজায় নিরীহ কেউ নেই’ ইত্যাদি হিসেবে। বেশি দিন আগের কথা নয়, ফিলিস্তিনিদের ‘দু’পেয়ে জানোয়ার’ হিসেবেও পরিচয় দেওয়া হয়েছে। কারণ, জৈবগত এক মারাত্মক ভুলে তাদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে!

হিব্রু ভাষা বিকশিত হচ্ছে। আর ফিলিস্তিনি জনগণকে বিবর্ণ ও কলঙ্কিত করার গতিও বেড়ে চলেছে। ইসরায়েল সরকারের অনানুষ্ঠানিক মুখপত্র হিসেবে পরিচিত চ্যানেল ফোরটিন দেখলেই যে কেউ বুঝবে যে ঘটনাটা কী ঘটছে।

তারপর এখানে-সেখানে সমস্যা লেগেই আছে। গাজার কসাইখানায় এত বিপুল সংখ্যক জবাই করা দেহ সামাল দেওয়ার মতো কোনো সুব্যবস্থা নেই। ফলে  স্বাস্থ্য বিধিগত ও পরিচ্ছন্নতাজনিত বিরাট সমস্যা দেখা দিয়েছে।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে কুকুররা ফিলিস্তিনিদের মরদেহ ভক্ষণ করছে। একটি আধুনিক রাষ্ট্র হোক বা তৃতীয় বিশ্বের দেশ হোক, আজকে এ ধরনের ঘটনা কি লজ্জাজনক নয়? পশু অধিকার রক্ষায় সোচ্চার সংগঠনগুলো আজ কোথায়? কীভাবে আমরা এমন একপর্যায়ে পৌঁছালাম যে কুকুরের মানুষের মরদেহের স্তূপে খাবার খুঁজে বেড়ায়?

কিন্তু আমাদেরতো উচিত মূল বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া। খবরে একশজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার বিষয়টি শোনা তাদের পরিণতি দেখার বিকল্প হতে পারে না। ঘটনার সত্যিকার গভীরতা উপলব্ধির জন্য স্বচক্ষে দেখাও যথেষ্ট নয়। ‘একশজন নিহত হয়েছে’ বলার মানে হলো মুখ থেকে কানে পৌঁছাতে কথাটি বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়ার পর দ্রুত তা উবে যাওয়া।

একটি ভিডিও হয়তো [জনমানসে] শক্তিশালী ছাপ ফেলতে পারে। কিন্তু নরকের বিবরণ নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে হলে সেখানে আসলে সাংবাদিকদের যেতে হবে এবং দেখতে হবে ক্ষতবিক্ষত দেহ, প্রবহমান রক্ত আর দেয়ালে ঝুলে থাকা একটি হাত। এটি কার হাত? বা কার ছিন্নভিন্ন পা? দেখতে হবে যে মাথাতো আর মাথা নেই, নিজ কানে শুনতে হবে অসহনীয় যন্ত্রণার কাতর আর্তনাদ। দেখতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত-বিকৃত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রদর্শনীর মাঝে প্রাণের স্পন্দন আর লক্ষ্য করতে হবে কীভাবে তাদের নিচে বালু রক্ত শুষে নেওয়া থামিয়ে দিয়েছে। এটাই প্রতীয়মান হবে যে সোনার বালু এহেন নিষ্ঠুর কাজের জন্য জন্ম নেয়নি।

আরেকটি প্রশ্ন হলো: কীভাবে কেউ এই শ খানেক মৃত ও আহতদের সামাল দেবে? আমরা কি নিশ্চিত যে একটি দেহ সত্যিই প্রাণহীন হয়ে পড়েছে? অথবা এটি আহত কোনো ব্যক্তির যে অজ্ঞান হয়ে পড়লের প্রাণের স্পন্দন ফুরিয়ে যায়নি? তাছাড়া গাজাতো বিশ্বের সবচেয়ে গরম স্থানগুলোর একটি। তাহলে এটা ভাবা যে এহেন উত্তাপ মরদেহগুলোর, জমাট বাধা রক্তের এবং মশা ও মাছি ঘিরে ধরা আহতদের কী অবস্থা করেছে? ঠিক এখানেইতো নরক।

গাজায় হত্যার ময়দানগুলো এবং সারা দুনিয়া আচ্ছন্ন হয়ে আছে এক রহস্যদাঘটন আবহে। [১৯৯৮ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী] পর্তুগিজ লেখক হোসে সারামাগো তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস বালতাসার অ্যান্ড ব্লিমুডা-তে লিখেছিলেন: ‘কেউ স্বর্গ ও নরক আবিষ্কার করতে চাইলে তাকে অবশ্যই মানবদেহ সম্পর্কে জানতে হবে।’ গাজা উপত্যকায় নরক তার জায়গা খুঁজে পেয়েছে; আর স্বর্গ এই এলাকা থেকে অনেক দূরে রয়েছে।

* ওদেহ বিশারাত, আরব-ইসরায়েলি লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী। ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজে  প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছন আসজাদুল কিবরিয়া

খাদ্য সহায়তা নিতে গিয়েও ইসরায়েলি হামলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন গাজাবাসী।
খাদ্য সহায়তা নিতে গিয়েও ইসরায়েলি হামলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন গাজাবাসী। ছবি: এএফপি

গাজায় ‘অনাহারের মাধ্যমে জাতিগত নিধন’ চালাচ্ছে ইসরায়েল, দ্রুত মারা যাবে শিশুরা: দুর্ভিক্ষ–বিশেষজ্ঞ ডি ওয়াল

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েল ‘অনাহার সৃষ্টির মাধ্যমে জাতিগত নিধন’ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন খ্যাতনামা দুর্ভিক্ষ–বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যালেক্স ডি ওয়াল। উপত্যকাটিতে অবরোধের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ২১ মাসের বেশি সময়ে গাজায় অন্তত ১২২ ফিলিস্তিনি অনাহার ও অপুষ্টিতে মারা গেছেন, তাঁদের অধিকাংশই শিশু। এ ছাড়া গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) নামের বিতর্কিত একটি সংস্থার ত্রাণকেন্দ্র থেকে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি।

গাজায় জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। উপত্যকাটিতে টানা ১১ সপ্তাহের অবরোধের পর গত ২৬ মে কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। শুরু থেকেই সংস্থাটির কার্যক্রমের সমালোচনা করে আসছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। জিএইচএফের দেওয়া খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত মঙ্গলবার মিডল ইস্ট আইয়ের এক অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ডি ওয়াল বলেন, গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করার মতো অবস্থায় নেই জাতিসংঘ। কারণ, ইসরায়েলের বাধার কারণে ত্রাণকর্মী ও অনুসন্ধানকারীরা সেখানে প্রবেশ করতে পারছেন না। এর ফলে ক্ষুধার ভয়াবহতা যাচাই করে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে না।

ডি ওয়াল বলেন, ‘আপনি যদি কোথাও পরিকল্পিতভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে চান, তাহলে তুলনামূলকভাবে সহজ কাজটা হলো, আপনি প্রথমে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করে দেবেন। তারপর বলবেন, দেখুন, কেউ তো দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেনি।’ তিনি আরও বলেন, দুর্ভিক্ষ গোপন করাও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করার একটি কৌশল। গাজায় ঠিক যেভাবে অনুমান করা হয়েছিল, সেভাবেই দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে।

অ্যালেক্স ডি ওয়াল ওয়ার্ল্ড পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। এই প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গে সংযুক্ত। তিনি ‘মাস স্টারভেশন: দ্য হিস্টরি অ্যান্ড ফিউচার অব ফ্যামিন’ বইয়ের লেখক।

এই বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যা করে বলেন, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো ধরনের খাবার না পেলেও ৬০ থেকে ৮০ দিন পর্যন্ত বাঁচতে পারেন। পুরোপুরি অনাহারে না থাকলে আরও বেশি দিন বাঁচা সম্ভব। কিন্তু অনাহারের কারণে শিশুরা অনেক দ্রুত মারা যাবে। খাবার না পেলে তাদের ছোট শরীর খুব দ্রুত শুকিয়ে যেতে থাকে।

ডি ওয়াল বলেন, অনেক শিশু ডায়রিয়াজনিত সংক্রমণ বা অপুষ্টিতে ভোগে, যার কারণে তারা ঠিকমতো খাবার হজম করতে বা পরিপাক করতে পারে না। এরপর পানিশূন্যতা দেখা দেয়। আর অপুষ্টি ও রোগ—দুইয়ের কারণে তাদের অধিকাংশই মারা যায়।

অ্যালেক্স ডি ওয়াল বলেন, অনাহারে থাকা একজন মানুষ প্রথমে নিজের শরীরে থাকা চর্বি থেকে শক্তি সংগ্রহ করে। তারপর ধীরে ধীরে শক্তি সংগ্রহ করে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে। অনাহারের ফলে বিভ্রম ও মস্তিষ্কবিকৃতির মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

‘সূক্ষ্মভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করছে ইসরায়েল’

ডি ওয়াল বলেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ইতিহাসের অন্যান্য দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি চেয়ে আলাদা। কারণ, আধুনিক ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ নেই, যেখানে এক ঘণ্টা বা তার কম সময়ের দূরত্বে একটি সক্ষম আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও এত সূক্ষ্মভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি ইসরায়েল চাইত যে গাজার প্রতিটি শিশু আগামীকাল সকালে নাশতা করবে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্দেশ দিলেই তা ঘটতে পারত।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক শরণার্থী সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, গত চার মাসের বেশি সময় ধরে তাঁরা মিশর ও জর্ডানে প্রায় ছয় হাজার ট্রাক খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত করে রেখেছেন। কিন্তু ইসরায়েলের অনুমতি না পাওয়ায় সেগুলো এখনো গাজায় প্রবেশ করতে পারেনি।

ইসরায়েলের অবরোধের আগে সহায়তা সংগঠনগুলো গাজায় প্রতিদিন প্রায় ৬০০ ট্রাক ত্রাণ পাঠাতে পারত। ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজ্জারিনি গত মে মাসে বলেছিলেন, এই ত্রাণ দিয়ে উপত্যকাটির বাসিন্দাদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ হতো।
মাদুরের ওপর শুয়ে আছে অপুষ্টিতে ভোগা দুই বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু ইয়াজান। গাজা নগরীর পশ্চিমে আল-শাতি শরণার্থীশিবিরে। ২৩ জুলাই, ২০২৫
মাদুরের ওপর শুয়ে আছে অপুষ্টিতে ভোগা দুই বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু ইয়াজান। গাজা নগরীর পশ্চিমে আল-শাতি শরণার্থীশিবিরে। ২৩ জুলাই, ২০২৫ ছবি: এএফপি
বাবার কোলে অপুষ্টিতে ভোগা ১৩ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি শিশু। গাজার বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে। ১২ এপ্রিল ২০২৫
বাবার কোলে অপুষ্টিতে ভোগা ১৩ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি শিশু। গাজার বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে। ১২ এপ্রিল ২০২৫ ছবি: এএফপি

'আমরা হয়তো মারা যাব, কিন্তু আমাদের খাবার জোগাড় করতেই হবে' -গাজার বাসিন্দা

‘ক্ষুধা এবং অভাব আমাদের সেখানে যেতে বাধ্য করে। জানি আমরা যেকোনো সময় আহত বা নিহত হতে পারি। তবুও সেখানে যাই এক কেজি আটা আনতে।’ বলছেন গাজার বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-কেদরা। বৃটিশ দাতব্য সংস্থা ইউকে-মেড পরিচালিত ফিল্ড হাসপাতালে আনা অনেক রোগীর মধ্যে তিনিও একজন, যারা খাবার চেয়েছিলেন কিন্তু পেয়েছিলেন সহিংসতা।

মোহাম্মদ বলেন, ইসরাইল ও মার্কিন সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) পরিচালিত নিকটবর্তী একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে পরিবারের জন্য খাবার আনতে যাওয়ার সময় তার হাতে ও পায়ে গুলি লাগে। বিবিসিতে কর্মরত একজন সাংবাদিককে তিনি বলেন, ‘আঘাত লাগার পর কেউ একজন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। মোহাম্মদের কথায়,  জিএইচএফ সাইটে পৌঁছানোর চেষ্টা করে তিনি যে ঝুঁকি নিচ্ছেন তা তিনি জানেন, কিন্তু তার কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল না।’ দুর্ভিক্ষ আমাদের সকলের বেঁচে থাকা দুর্বিসহ করে তুলেছে। আজ, আমি হাসপাতালে আছি । একবার সুস্থ হয়ে উঠলে, যাই হয়ে যাক না কেন, আমি এই কেন্দ্রগুলোতে আবার যাব। আমি পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। বলছেন, গাজার এই হতভাগ্য বাসিন্দা।

জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে খাদ্য সহায়তা পেতে গিয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গুলিতে এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৭৬৬ জনকে জিএইচএফের চারটি বিতরণ কেন্দ্রের আশেপাশে হত্যা করা হয়েছে, যেগুলো  মার্কিন বেসরকারি নিরাপত্তা ঠিকাদারদের দ্বারা পরিচালিত এবং ইসরাইলি সামরিক অঞ্চলের অভ্যন্তরে অবস্থিত।

জাতিসংঘ এবং অন্যান্য ত্রাণ কনভয়ের কাছে আরও ২৮৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরাইল হামাসকে ত্রাণ কেন্দ্রের কাছে বিশৃঙ্খলা উস্কে দেয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছে। তারা বলেছে যে, তাদের সৈন্যরা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক লোকদের গুলি করে না। বৃটিশ প্যারামেডিক স্যাম সিয়ার্স বলেন, উপকূলীয় আল-মাওয়াসির ইউকে-মেড হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতি মাসে প্রায় ২,০০০ রোগী ভর্তি হচ্ছেন, যাদের অনেকেই সাহায্য নিতে গিয়ে আহত হয়েছেন। প্রায় এক বছর ধরে হাসপাতালে কর্মরত ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ডা. আসিল হোরাবিকে নিজেই এই মারাত্মক সাহায্য কেন্দ্রগুলোতে যেতে হয়েছে, তিনি এটিকে ‘মৃত্যুর পথ’ বলে উল্লেখ  করেছেন।

হোরাবি বলছেন, 'আমার স্বামী একবার অথবা দুবার গিয়েছিলেন এবং তারপর গুলিবিদ্ধ হন। এটাই শেষ! যদি আমাদের ক্ষুধায় মারা যেতে হয়, তাহলে তাই শ্রেয়। আমি প্রচুর আহত মানুষকে হাসপাতালে আসতে দেখছি। মাঝে মাঝে আমরা প্রতিদিন ৫০ জন পর্যন্ত আহতকে চিকিৎসা দিচ্ছি। দিনের বেলায়, আমাদের চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেয়ার, এমনকি এক কাপ চা পান করারও সময় থাকে না।

রাফায় তার বাড়ি ধ্বংস হওয়ার কারণে তার পরিবারের সাথে কাছের একটি তাঁবুতে বসবাসকারী হোরাবি বলেন, এমন অনেক দিন গেছে যেদিন কিছুই হয়তো খাননি। হোরাবির কথায়, আমি এক কেজি আলু কিনেছিলাম যার দাম ছিল ১২০ শেকেল (৩৬ ডলার )। দাম স্বাভাবিক নয়। জিনিসপত্র জোগাড় করা কঠিন। মাত্র এক বেলার খাবারের জন্য আপনি প্রতিদিন ১০০ ডলার কিভাবে জোগাড় করবেন?  হাসপাতালে, বর্তমানে রোগীদের  কোনও খাবার দেয়া হয় না। যদি   খাবার থাকে, তবে রোগীদের অল্প পরিমাণে দেয়া হয়। আমাদের ক্ষুধার্ত রোগীদের সাথে মোকাবিলা করতে হয় এবং আমরাও ক্ষুধার্ত।

বুধবার ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা এবং মানবাধিকার গোষ্ঠী ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজায় ‘অবরোধ’ আরোপের অভিযোগ এনেছে, যার ফলে গাজায় পণ্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ডঃ টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস এ বিষয়ে বলেন, ‘গাজার জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ অনাহারে রয়েছে। এটা মানুষের তৈরি। আর এটা খুব স্পষ্ট। এর কারণ অবরোধ।’

তিনি আরও বলেন,১,০০০ এরও বেশি মানুষ নিজেদের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে মারা গেছে। অনাহার মেটাতে   তারা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে। মার্চের শুরুতে ইসরাইল গাজায় ত্রাণ সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয় এবং দুই সপ্তাহ পর হামাসের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করে, যার ফলে দুই মাসের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। যদিও প্রায় দুই মাস পর অবরোধ আংশিকভাবে শিথিল করা হয়েছিল, তবুও  দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার মধ্যে খাদ্য, ওষুধ এবং জ্বালানির ঘাটতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে যে, ২১ লাখ জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে এবং প্রায় ১,০০,০০০ নারী ও শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। আজাদের হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে রবিবার থেকে অপুষ্টির কারণে কমপক্ষে ৪৫ জন মারা গেছে। বুধবার এক ব্রিফিংয়ে ইসরাইল সরকারের মুখপাত্র ডেভিড মেনসার বলেন, ‘আজ গাজায় ইসরাইলের কারণে কোনও দুর্ভিক্ষ হয়নি। তবে, হামাসের তৈরি মানবসৃষ্ট ঘাটতি রয়েছে।  দুর্ভোগের কারণ হল হামাস’।

মেনসার বলেন, গত দুই মাসে ৪,৪০০ টিরও বেশি লরি বোঝাই ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করেছে, কিন্তু জাতিসংঘ এবং তার মানবিক অংশীদারদের ত্রাণ লুট করার জন্য দুটি ক্রসিং পয়েন্টে প্রায় ৭০০ লরি  অপেক্ষা করছে। এটি গাজায় মানবিক সাহায্যের ধারাবাহিক প্রবাহ বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো  বলেছে যে ইসরাইলি সেনাদের সাথে তাদের ত্রাণবাহী কনভয়গুলো নিরাপদে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। যার ফলে ফিলিস্তিনিরা  দুর্ভিক্ষের  মধ্যে পড়ছে এবং গাজার প্রতিটি পরিবারকে গ্রাস করছে অনাহার।

সূত্র : বিবিসি

mzamin