Tuesday, December 27, 2016

বিচ্ছিন্ন মানব by সাজেদুল হক

১৪ বছর বয়সী নরওয়েজিয় কিশোরী সোফি এমুন্ডসেন। একদিন তার ঠিকানায় আশ্চার্য এক চিঠি আসে। যে চিঠিতে প্রশ্ন ছিল একটাই- তুমি কে? যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যদিয়ে ইয়স্তেন গার্ডার আসলে দর্শনের ইতিহাস বর্ণনা শুরু করেন। সোফির জগতের চারশ’ পৃষ্ঠায় আবদ্ধ করা হয়েছে তিন হাজার বছরের চিন্তাকে। যে গ্রন্থকে দর্শনের পক্ষ থেকে স্টিফেন হকিং রচিত এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইমের জবাব বলে মনে করা হয়। তবে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন প্রশ্নের জবাব আজও মিলেনি। আপনি, আমি, তুমি এবং সে সবাই খুঁজছেন সে উত্তর। কেউ কি তা পেয়েছেন? কেউ কি কখনও তা পাবেন? না কি মানুষ নিজেই নিজের কাছে রহস্য থেকে যাবে। গর্ডন ই বিগেলো তার অস্তিত্ববাদের প্রথম পাঠ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, মানুষ জাতির সংজ্ঞা কি? গ্রিক দর্শনের এই প্রশ্নের মধ্যে ‘বিশ্বের যুক্তি আবদ্ধ শৃঙ্খলাকে উপলব্ধি করতে পারলে তার মধ্যে মানুষেরও একটা নির্দিষ্ট স্থান ও সংজ্ঞা নিশ্চয়ই থাকবে- এরকম একটা বিশ্বাস জড়িত আছে, যা অস্তিত্ববাদ স্বীকার করে না। তার পরিবর্তে সে জব এবং সেন্ট অগাস্টাইনের মতো প্রশ্ন রাখে ‘আমি কে?’ য়োহান ভোলফ গাঙ ফন গ্যোতে তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, আমি কোথায় চলেছি তা আমি জানি না। শৈশব হতে বাল্য, বাল্য থেকে যৌবন, আমার সারাজীবন ধরে আমি কি খুঁজে চলেছি, পাহাড় প্রান্তরে জলে স্থলে সুন্দর, অসুন্দরে, রূপে অরূপে ইন্দ্রিয় ও অতীন্দ্রীয়ের মাঝে কি খুঁজেছি আমি? যা খুঁজেছি তা কি আমি পেয়েছি কোনদিন। তা কি কেউ পায়। বিখ্যাত গীতিকাব্য ফাউস্টে গ্যোতে অনুসন্ধান করেছেন মানুষের স্বরূপ। ফাউস্টের বর্ণনা, মানুষ হচ্ছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নির্বোধ এক সত্ত্বা। আমি আসলে একজন ক্রীতদাস। যারই হই না কেন আমি আসলে একজন ক্রীতদাস।ফাউস্টেই আবার ফ্রয়েডের তত্ত্ব ধ্বনিত হতে দেখি আমরা। যেখানে বলা হয়েছে-বহিরঙ্গের কিছু রূপান্তর সত্ত্বেও মানুষের জীবনের মূল ধাতুর কোন পরিবর্তন হয় না। তবে শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ওপরই আস্থা রেখেছেন গ্যোতে- শোন বন্ধু একমাত্র জীবনকে উপভোগ কর। জীবনের সোনালী গাছটাই হলো একমাত্র সবুজ আর সজীব। বাকি সব তত্ত্ব হলো মিথ্যা, ধূসরবর্ণ, সব নিরস।দর্শনের গোটা ইতিহাস জুড়ে দার্শনিকেরা আবিষ্কার করতে চেয়েছেন মানুষ কি বা মানবপ্রকৃতি কি। কিন্তু জাঁ পল সার্ত্র বিশ্বাস করতেন যে মানুষের এ ধরনের কোন শাশ্বত প্রকৃতি নেই যার ওপর ভরসা করা যেতে পারে। কাজেই সাধারণভাবে জীবনের মানে খোঁজার চেষ্টা অর্থহীন। আরও কিছু জীবনে সার্ত্র বর্ণনা করেছেন সে অর্থহীনতা ‘পরাজয়ের স্বাদ রণক্ষেত্রে যেমন কেউ পছন্দ করুক আর না করুক জীবন ক্ষেত্রেও তেমনি। আইভিচ পছন্দ করুক বা না করুক জীবনের তাতে কিছু আসে যায় না।’ একইগ্রন্থে বলা হয়েছে , আমি চঞ্চল। সবসময় চলছি, সবসময় নতুন করে শুরু করছি। সবসময় কোন না কোন কিছু থেকে পালিয়ে যাচ্ছি। যখনই মনে হয় কোন এক জায়গায় একটু ভাল লেগে গেছে ওর তখন অস্বস্তি লাগে, অপরাধী মনে হয়, নিজেকে মনে হয় ও নিরাপদ নয়।দার্শনিক কিয়েকগার্ড বলেন, যে নিজের থেকে, নিজের চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নয়, বরং চিন্তার দ্বারা মানুষের পথ বেঁছে নেয়া, তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া, বেছে নেয়ার সঙ্গে জড়িত যন্ত্রণা এবং নিজের আবিষ্কৃত পথে নিবিষ্টভাবে চলার এবং যা ফেলে এলাম তার জন্য সমস্ত বেদনা- এতেই প্রকাশ হয় আমাদের আসল রূপ। কিয়ের্কগার্ডের দৃষ্টিতে নিজের এই সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রত্যেক মানুষের জীবনকে করে অন্যসব জীবন থেকে আলাদা। ডিএইচ লরেন্সের আবেগময় বক্তব্যও স্মরণ করা যায়, মানুষকে আদর্শ অবস্থায় নিয়ে আসা! কোন মানুষকে আদর্শ অবস্থায় নিয়ে আসা। আমিতো অনেক মানুষ। কোনটিকে আপনারা আদর্শ অবস্থায় নিয়ে আসবেন? আমিতো একটা যন্ত্র বিশেষ নই। মানুষের অন্তর বড়ই অদ্ভুত। এই তার সবকিছু, তার মধ্যে লুকিয়ে অনেক জানা আর অজানা। মানুষের ভিতরটা একটা গভীর অন্ধকারময় বিশাল অরণ্য। তার নিজস্ব বন্যপ্রাণীরাও আছে সেখানে। গর্ডন ই বিগেলোর বর্ণনায় আবার ফিরে যাই। তিনি লিখেছেন, অস্তিত্ববাদীরা গভীরভাবে অনুভব করেছেন যে আধুনিক মানুষ সৃষ্টিকর্তা থেকে, প্রকৃতির থেকে, চারপাশের অন্য মানুষদের থেকে এবং নিজের আসল পরিচয় থেকেও নিজে বিচ্ছিন্ন। মানুষের সৃষ্টিকর্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এই অভিজ্ঞতার সব থেকে যন্ত্রণাময় প্রকাশ রয়েছে নিটশের রচনার তীব্র অভিব্যক্তিতে-ঈশ্বর মারা গেছেন!
শেরউড আন্ডারসনের স্টোরিট্রেলার স্টোরিতেও শোনা যায় সে হাহাকার। তার বর্ণনায় তিনি একদিন এক জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে একাকি রাস্তায় হাঁটছিলেন, যখন ‘সহসা অমানুষিক কিছুর সামনে প্রণত হওয়ার অদ্ভুত বাসনা জেগে উঠলো আমার মধ্যে। এটা হাস্যকর জেনেও আমি এগিয়ে গেলাম। আর প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাঁটুগেড়ে বসলাম জ্যেৎস্নাপ্লাবিত পথের ধুলিতে।কিন্তু আমারতো কোন ঈশ্বর নেই, আমার চারপাশের জীবন আমার কাছ থেকে সমস্ত ঈশ্বরকেই কেড়ে নিয়েছে, যেমনভাবে প্রত্যেক আধুনিক মানুষের কাছ থেকে মানুষের আত্মগত বুদ্ধি নামে দুর্বোধ্য শক্তি কেড়ে নিয়েছে তার ঈশ্বরকে- তাই পথের মধ্যে জানু পেতে বসা আমার চেহারার কথা ভেবে আমার নিজেরই হাসি পেল।সেদিন আকাশে কোন ঈশ্বর ছিলেন না, আমার নিজের মধ্যেও কোন ঈশ্বর ছিলেন না, ঈশ্বরে বিশ্বাস করার মতো শক্তি আছে আমার এই প্রত্যয়ও ছিল না আমার মধ্যে, তাই শুধুই পথের ধুলোয় জানু পেতে রইলাম আমি, আমার মুখে প্রার্থনার কোন শব্দই ছিল না চিন্তার জগতে উলট-পালট সৃষ্টি করা এক চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো। কারাগার আর হাসপাতালকে ইতিহাসের নতুন আঙ্গিকে উপস্থান করেছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে ফুকো বলেছিলেন, আমার ভূমিকা হলো- এবং তা হয়তো বাড়িয়ে বলা হবে- মানুষকে দেখানো যে, তারা যেটুকু অনুভব করে তারচেয়েও তারা বেশি স্বাধীন। মিশেল ফুকোর বিচিত্র জীবনের মাধ্যমে মানুষের প্রকৃতি অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন তার সমকামী বন্ধু এর্ভে গিবের। মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে নিয়মিত ফুকোর শয্যার পাশে বসে থাকতেন তিনি। বন্ধুকে শয্যাপাশে দেখে ফুকো বেশ শান্তি পেয়েছিলেন। পরে যখন তিনি পুরোপুরি প্রলাপ বকছেন, তখন গিবের কাগজ কলম নিয়ে কাঁপা-কাঁপা হাতে সেগুলো টুকে রাখতেন। এর ওপর ভিত্তি করেই তিনি লিখেন ছোট গল্প, লে সোক্রে দ্যাঁনম-একজন মানুষের রহস্য। গল্পের শুরুতে আমরা দেখি এক নিউরো সার্জন জনৈক মহান দার্শনিকের খুলি চিরে মস্তিষ্কটি পরীক্ষা করছেন-যেন এক গোপন অজেয় দুর্গে ঢুকেছে কোন অবাঞ্চিত হানাদার। গল্পে বর্ণিত তৃতীয় স্মৃতিচিহ্নে দেখা যায় কিশোর দার্শনিক এক সাদামাটা উঠানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অনুভব করেন, বাড়িটি দুঃসহ কলঙ্কে শিহরিত হয়ে আছে। বাড়ির ভিতরে কোথাও একটা অন্ধকার ঘরে খড়ের বিছানায় এক অসহায় মহিলা চেনে বাঁধা রয়েছেন; খবরের কাগজের ভাষায় তার নাম ‘সেকুয়েসত্রে দ পোয়াতিয়ে পোয়াতিয়ে-র নির্জনবাসিনী। অভিজিৎ চক্রবর্তী তার ‘মিশেল ফুকো’ শীর্ষক লেখায় লিখেছেন, পোয়াতিয়ে শহরে নির্জনবাসিনী একজন সত্যিই ছিলেন। তাকে অবশ্য ফুকো স্বচক্ষে দেখেননি। ঘটনাটি ফাঁস হয় ১৯০১ সালে। পুলিশ কর্তৃপক্ষ এক উড়ো খবরের ভিত্তিতে শহরের এক গৃহস্থবাড়িতে হানা দিয়ে মেলানি বাস্তিয়ান নামে জনৈকা উন্মাদিনীকে আবিষ্কার করে। ওই ভদ্র পরিবারেই মহিলার জন্ম। যৌবনে এক অবৈধ প্রণয়ে জড়িয়ে পড়ে তিনি সন্তান সম্ভবা হন। বাচ্চাটি অবশ্য নষ্ট হয়ে যায়। তখন তার মা ও ভাই লোকলজ্জা এড়াতে মেলানিকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেন। কিছুদিন পর তার স্বাভাবিক আচরণ দেখে কতৃপক্ষ তাকে মুক্তি দেন। তখন মা ও ভাই মেলানিকে একটি অন্ধকার ঘরে চেন বেঁধে আটকে রাখেন। সেখানে ২৫ বছর আটক থাকার পর সম্পূর্ণ উন্মাদ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। সুদীর্ঘ ২৫ বছরের কোন এক অজ্ঞাত মুহূর্তে আকাটা নখর দিয়ে দেয়াল আঁচড়ে-আঁচড়ে মেলানি দু’ একটি অসংলগ্ন কথা লিখে রেখেছেন: ‘সুন্দরের জন্ম দিতে হলে- প্রেম নয়, স্বাধীনতা নয়-অবিনাশী একাকিত্বের ভিতর এক ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষে তোমাকে বাঁচতে হবে মরতে হবে......’ এই কথাগুলো ভিতরেই কি কোথাও উন্মোচিত হয়েছেন প্রকৃত মিশেল ফুকো। ’ গর্ডন ই বিগেলো লিখেছেন, ঈশ্বর থেকে, তার চারপাশের মানুষ থেকে এবং নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের জন্য শেষে শূন্যতা ছাড়া আর কি পড়ে থাকে? এলিয়ট তার Hollowman ফাঁপা মানুষ এ লিখেছেন- Shape without form, shade without color Paralyzed force, gesture without motion জীবনের সংক্ষিপ্ততা শেক্সপীয়ারের চিন্তাকে আছন্ন করে রেখেছিল। তার সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি ছিল- টুবি অর নট টু বি। হ্যামলেটের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সেই হাহাকার- একদিন আমরা এই পৃথিবীর ওপর হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি তো পরেরদিন হারিয়ে যাচ্ছি, মিশে যাচ্ছি মাটিতে।

Monday, December 19, 2016

জর্ডানে গুলিতে কানাডীয় পর্যটকসহ নিহত ১০

জর্ডানে কয়েকজন বন্দুকধারীর গুলিতে কানাডীয় পর্যটক, পুলিশসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিতে চার হামলাকারীও নিহত হয়। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার কয়েক ঘণ্টা ধরে জিম্মি নাটক চলে। এএফপির খবরে জানা যায়, দেশটির রাজধানী আম্মান থেকে ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে কারাক এলাকার ঐতিহাসিক একটি দুর্গের ভেতর এ ঘটনা ঘটে। হামলায় প্রাথমিকভাবে কোনো জঙ্গি দলের সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যায়নি। জর্ডানের নিরাপত্তা বিভাগ বলছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজন পুলিশ সদস্য,
কানাডীয় এক নারী পর্যটক ও জর্ডানের দুজন সাধারণ নাগরিক রয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৭ জন। তাঁদের মধ্যে পুলিশ ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন। তাঁরা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, হামলাকারীরা তাদের জিম্মি করে রাখে। কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলাকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিবিনিময় চলে। এতে চার হামলাকারী নিহত হয়। কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির একজন নাগরিক নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে। হামলায় আরেক কানাডীয় আহত হয়েছেন।

আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেছে নেবেন নির্বাচকেরা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের বিজয়ী প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আজ সোমবার এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। মার্কিন নির্বাচনের ব্যতিক্রমধর্মী নিয়ম অনুসারে ৫৩৮ জন ইলেকটর বা নির্বাচক ১৯ ডিসেম্বর দেশজুড়ে কংগ্রেস ভবনগুলোয় ভোট দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরেই ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট নিছক একটা আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হলেও ৮ নভেম্বরের ভোটে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত বিজয় এ পদ্ধতিকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে। মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ সেই আলোচনাকে করেছে জোরদার। ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে হিলারি ক্লিনটন বেশ এগিয়ে থাকলেও অধিকাংশ ইলেকটোরাল ভোট জিতে নেওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে জিতে যান।
আজ সেই নির্বাচকেরা ঠিকমতো নিজ নিজ দলের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিলে ট্রাম্প পাবেন ৩০৬ ভোট, যা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে প্রয়োজনীয় ২৭০-এর চেয়ে অনেক বেশি। তবে ট্রাম্পের জন্য শঙ্কার বিষয় হলো, তাঁর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নির্বাচক ‘বিদ্রোহ’ করে বসলে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারে। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, তাঁদের বেশ কয়েকজন এ ধরনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। নির্বাচনে রুশ সরকার ট্রাম্পকে জেতাতে কলকাঠি নেড়েছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত ৬৭ জন নির্বাচক এ বিষয়ে আরও তদন্ত দাবি করেছেন। এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি ভোটার রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্প ও ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারিকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি দেশজুড়ে অঙ্গরাজ্যগুলোতে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ৫৩৮ জন ইলেকটর বা নির্বাচককে বেছে নিয়েছেন। যে প্রার্থী কোনো অঙ্গরাজ্যের সাধারণ জনগণের ভোট (পপুলার ভোট) বেশি পাবেন, তিনিই ওই অঙ্গরাজ্যের সব ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকদের ভোট পেয়ে যান। হিলারির ঝুলিতে রয়েছে ২৩২টি ইলেকটোরাল ভোট। ট্রাম্পের ইলেকটরদের মধ্যে ৩৮ জন তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে হিলারিকে সমর্থন দিলে জানুয়ারিতে তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। এরই মধ্যে ক্রিস্টোফার সাপরান নামে রিপাবলিকান দলের একজন নির্বাচক নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, তিনি তাঁর দলের প্রার্থী ট্রাম্পকে সমর্থন দেবেন না। আরও কয়েকজন রিপাবলিকান নির্বাচক ট্রাম্পকে ভোট দেবেন না বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া ‘হ্যামিলটন ইলেকটর’ হিসেবে পরিচিত কিছুসংখ্যক রিপাবলিকান নির্বাচকের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন ডেমোক্র্যাট নির্বাচকেরা। ‘হ্যামিলটন ইলেকটররা’ ট্রাম্পের পরিবর্তে অন্য কাউকে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
আজকের ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে তিন ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। প্রথমত, ট্রাম্প তাঁর কাঙ্ক্ষিত ভোট পেয়ে বিজয়ী হবেন। দ্বিতীয়ত, রিপাবলিকান নির্বাচকদের বেশ কয়েকজন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন, যার ফলে হিলারি জিতে যেতে পারেন। তৃতীয়ত, কোনো প্রার্থীই যদি ন্যূনতম ২৭০টি ভোট নিশ্চিত না করতে পারেন, তাহলে ন্যূনতম ২৬টি অঙ্গরাজ্যে বিজয়ী প্রার্থী হবেন প্রেসিডেন্ট। এ ক্ষেত্রেও বিষয়টা অমীমাংসিত থেকে গেলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর কংগ্রেসে ভোট হবে। ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত দফায় দফায় ভোট হওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা না গেলে নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। তবে ট্রাম্পের জন্য সুসংবাদ হলো, ইলেকটোরাল ভোট পদ্ধতির সংস্কার চাওয়া সংগঠন ফেয়ারভোটের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র ১৫৭ জন নির্বাচক বিদ্রোহ করেছেন। তাঁদের আবার অর্ধেকই নিজ দলের প্রার্থীর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে অন্য একজনকে ভোট দিয়েছিলেন। ১৮৭২ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হোরাস গ্রিলি বিজয়ী হওয়ার পর ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের আগেই মারা যান। সে সময় এই দলের নির্বাচকেরা নিজ দলের অপর একজন প্রার্থীকে ভোট দেন। ৬৭ জন নির্বাচকের দাবি: নির্বাচনে রুশ সরকার ট্রাম্পকে জেতাতে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে কলকাঠি নেড়েছে বলে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত ৬৭ জন নির্বাচক আরও তদন্ত দাবি করেছেন। সিআইএর তদন্তের তথ্যমতে, রুশ সরকারের সমর্থনে হ্যাকাররা ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিলারির কয়েকজন নির্বাচনী কর্মকর্তার কম্পিউটার হ্যাক করে তথ্য চুরি করেছিল। তবে এই ৬৭ জন নির্বাচকের একজন বাদে বাকি সবাই ডেমোক্রেটিক দলের।
মাইকেল মুরের আহ্বান: বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর ট্রাম্পকে ঠেকাতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, প্রতিরোধ, বিপর্যয় সৃষ্টি এবং গণ-অবরোধের আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন স্যাটেলাইট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এমএসএনবিসির গত শুক্রবারের ‘অল ইন’ অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান। এ সময় মুর বলেন, হোয়াইট হাউসে প্রবেশের কোনো অধিকার ট্রাম্পের নেই।

লোকজন সরাতে গড়িমসিতে ক্ষোভ

সিরিয়ার অবরুদ্ধ জনপদ আল ফুয়া ও কেফরায়া থেকে
অসুস্থ ও আহত লোকজনকে সরিয়ে নিতে যাওয়া দুটি
বাসে আগুন জ্বলছে। পথে ইদলিব প্রদেশে বাসগুলোর
ওপর হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। রয়টার্স
সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত আলেপ্পো থেকে বিদ্রোহী ও আটকে পড়া বেসামরিক লোকদের বের হতে দেওয়া নিয়ে গড়িমসি চলছেই। এতে অসুস্থ ও নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে আটকে পড়া মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে অবরুদ্ধ আলেপ্পোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সেখানে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববারই এ ভোট হওয়ার কথা ছিল। সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীদের দুটি সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানায়, লোকজনকে সরে আসার সুযোগ করে দিতে দুই পক্ষে শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, লোকজনকে সরিয়ে নিতে অনেক বাস আলেপ্পোর বিভিন্ন এলাকায় ঢুকতে শুরু করেছে। প্রায় ১০০ বাস এ জন্য প্রস্তুত আছে। তবে ফুয়া ও কেফরায়া এলাকায় ঢোকা কিছু বাসে আগুন দেয় বন্দুকধারীরা। এএফপির এক সাংবাদিক জানান, প্রায় ২০টি বাস থেকে চালকদের নামিয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বাসে আগুন দেওয়ার এ ঘটনা লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অন্তরায় হবে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ফ্রান্স এক প্রস্তাবে বলেছে, আলেপ্পোর লাখো মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিদ্রোহী যোদ্ধা ও বেসামরিক লোক সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং বেসামরিক লোকদের নিরাপত্তার ওপর নজর রাখতে একটি পর্যবেক্ষক দল পাঠানো দরকার।
এ প্রস্তাবের ওপর গতকাল ভোট হওয়ার কথা। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মিত্রদেশ আরেক স্থায়ী সদস্য রাশিয়া প্রস্তাবটির ব্যাপারে ভেটো দেবে বলে জানিয়ে​ দিয়েছে। ২০১১ সালে সিরিয়া সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে  নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত ছয়টি প্রস্তাব মস্কো ভেটো দিয়ে আটকে দিয়েছে। শনিবার আলেপ্পোর বহু লোক গরম কাপড় ছাড়াই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে। সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হওয়ায় অনেককেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে দেখা যায়। ফ্রান্সের প্রস্তাবের খসড়ায় সিরিয়ায়, বিশেষ করে আলেপ্পোয় চিকিৎসক, হাসপাতাল এবং রোগীবা​হী গাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।  গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত সিরিয়ার সরকারি বাহিনী হাজার ছয়েক লোককে এত দিন বিদ্রোহীদের দখলে থাকা পূর্ব আলেপ্পো থেকে বের হতে দিয়েছিল। শুক্রবার সকালে পথ আটকে দিয়ে সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্রোহীরা সন্ধির শর্ত ভেঙে ভারী অস্ত্র ও জিম্মিদের নিয়ে সটকে পড়ার চেষ্টা করায় তারা আবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আলেপ্পোর পূর্ব অংশ কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহীদের দখলে ছিল। সম্প্রতি সরকারি বাহিনী বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে নগরের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

আলেপ্পোতে পুতিনেরই জয় হলো?

বাশার আল-আসাদের হাতকে শক্তিশালী করতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত বছর সিরিয়ায় যখন ক্রেমলিনের সমরাভিযানের সূচনা করেন, তখন বাশার ছিলেন চরম কোণঠাসা। আইএস, পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী, কুর্দি বাহিনী—এ রকমের বিভিন্ন শক্তি চারদিক থেকে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুগতদের ঘিরে ফেলছিল। বাশারের পতন আসন্ন মনে করে পশ্চিমা শক্তিগুলো সিরিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন, নতুন সরকারে কোন পক্ষের কতটুকু অংশীদারি সে ভাগ-বাঁটোয়ারাও প্রায় ঠিকঠাক করে ফেলেছিল। কিন্তু বাশারবিরোধীদের আশার আগুনে জল ঢেলে দৃশ্যপটে হাজির হন পুতিন। তাঁর নির্দেশে লাগাতার বিমান হামলা চলতে থাকায় একের পর এক এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে বিদ্রোহীরা। এখন বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি পূর্ব আলেপ্পোর পতনের আনন্দ উদ্‌যাপন করছে দামেস্ক। পাঁচ বছর আগে এই এলাকার দখল নেওয়া বাশারবিরোধীরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য মরিয়া। আলেপ্পো পুনর্দখলের এই বিষয়টিকে বাশার আল-আসাদ গৃহযুদ্ধ অবসানের একটি ‘বৃহৎ পর্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রকৃত অর্থে এই জয় যতখানি না বাশারের, তার চেয়ে অনেক বেশি পুতিনের। মস্কোর কার্নেগির সেন্টারের বিশ্লেষক আলেক্সি মালাশেঙ্কো বলেন, ‘রাশিয়ার সহায়তা ছাড়া আলেপ্পোতে কোনো অগ্রগতি অর্জন সম্ভব ছিল না। আলেপ্পোর ওপরই সব পক্ষের দৃষ্টি ছিল।’ মস্কো বরাবরই বলে এসেছে তারা সেখানে পদাতিক সেনা পাঠায়নি। তবে প্রেসিডেন্ট বাশারের অনুগত পদাতিক বাহিনীকে তারা সামরিক পরামর্শ ও বিমান অভিযানে সহায়তা দিয়েছে। তবে মালাশেঙ্কো মনে করেন, বাশার বাহিনীকে রাশিয়া পরামর্শের চেয়েও বেশি কিছু দিয়েছে।
বিশেষত, আলেপ্পোতে একজন রুশ ট্যাংক কমান্ডারের নিহত হওয়ার খবর সে রকমই আভাস দেয়। এই বিশ্লেষক মনে করেন, আলেপ্পোতে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি বাশার আল-আসাদকে এ বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত করতে পেরেছিল যে সেখানে পশ্চিমা বাহিনীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি থাকবে না। রাশিয়া পর্যায়ক্রমে সেখানে বিমান হামলা তীব্র করেছে এবং সর্বশেষ সেখানে একটি রণতরীও পাঠিয়েছে। পুতিনের এই আলেপ্পো অভিযান তাঁর ১৯৯৯-২০০০ সালের চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনিতে চালানো রক্তক্ষয়ী অভিযানের কথা মনে করিয়ে দেয়। আলেপ্পো জয়কে রাশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের জন্য এক বড় জয় বলে মনে করতেই পারে। ওয়াশিংটন ও অন্য পশ্চিমাদের সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহীদের পরাজিত করার মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করায় মস্কোর সঙ্গে যে পশ্চিমাদের সম্পর্কের অবনতি হবে, তা নিশ্চিত। কিন্তু এর বিপরীতে পুতিন পেয়েছেনও অনেক। এ মুহূর্তে তিনি সিরিয়ার একচ্ছত্র ‘কিং মেকার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির মাঠেও তিনি অন্যতম খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। আলেপ্পো নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে সরাসরি আলাপ-আলোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে তিনি পাশ কাটিয়ে গেছেন। এ কারণে পশ্চিমারা পুতিনের ওপর প্রথম থেকেই নাখোশ। রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ আলেকসান্দার গোল্টস বলেছেন, রাশিয়ার সিরিয়া অভিযানের প্রধান লক্ষ্য হলো পশ্চিমাদের পুতিনের সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করা। তিনি মনে করেন, আলেপ্পো জয়ের ফলস্বরূপ রাশিয়া এখন সিরিয়া ইস্যুতে পশ্চিমাদের থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ অবস্থা সামাল দেওয়াই এখন পুতিনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন সেনাপ্রধান নিয়ে ভারতে বিতর্ক

ভারতের নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দল কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিপিন রাওয়াতকে সেনাপ্রধান করার ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেসের মুখপাত্র মনীশ তিওয়ারি বলেছেন, তাঁদের দল লে. জে. রাওয়াতের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না। তবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে তালিকার চার নম্বরে থাকা কর্মকর্তাকে সেনাপ্রধান করা হলে প্রশ্ন ওঠেই। তিওয়ারি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘তাহলে কি যাঁদের ডিঙিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাঁরা যথেষ্ট সক্ষম নন, নাকি পছন্দের ভিত্তিতে কাউকে বেছে নেওয়া হয়েছে?’ তিওয়ারি বলেন, এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি চিফ ভিজিল্যান্স অফিসার (সিভিসি) নিয়োগ, দুর্নীতির ওপর নজরদারি করা প্রতিষ্ঠান ইডির পূর্ণকালীন পরিচালক ‘নিয়োগ না করা’র কথা উল্লেখ করেন। সিপিআই নেতা ডি রাজা বলেন,
সেনাবাহিনী এবং সিভিসিসহ বিভিন্ন শীর্ষ সরকারি পদে নিয়োগ বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক। ডি রাজা আরও বলেন, সেনাবাহিনী গোটা দেশের। কীভাবে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সরকারকে সে প্রশ্নের জবাব দেওয়া উচিত। জ্যেষ্ঠ এ বাম নেতা আরও বলেন, দেশবাসীকে এ বিষয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে। ক্ষমতাসীন বিজেপি এ সমালোচনার পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছে, নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশ্ন তোলা দেশপ্রেমের পরিচায়ক নয়। দলটির মুখপাত্র জি ভি এল নরসীমা রাও বলেন, ‘এ ধরনের মন্তব্য সশস্ত্রবাহিনীর নৈতিক মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমরা সশস্ত্রবাহিনীকে রাজনীতিতে টেনে আনার চেষ্টার নিন্দা জানাই।’ সরকারি সূত্র বলেছে, ভারতের চলমান চ্যালেঞ্জ, যেমন: আন্তসীমান্ত সন্ত্রাস, পশ্চিম সীমান্তের ‘ছায়াযুদ্ধ’ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি মাথায় রেখে বিপিন রাওয়াতকে নিয়োগ করা হয়েছে। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা, চীন সীমান্তসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তাঁর তিন দশক কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ক্যামেরায় ধরা পড়ল ‘ভুতুড়ে’ হাঙর

নামটা গ্রিক পুরাণের সেই ‘কাইমেরা’র সঙ্গে মিলে যায়। মানে ভুতুড়ে হাঙর। অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের বিরল এই জলজ প্রাণী নিয়ে অনেক রহস্য আছে। সাগরের অনেক গভীরে এদের বাস। চোখ জোড়া ভাবলেশহীন, যেন মৃত। দাঁতগুলো যেখানে থাকার কথা, সেখানে নেই। মাথার গঠনও অন্য রকম। যেন পুরোনো ভোঁতা কোনো সুচের অবশেষ। পুরুষ কাইমেরার জননাঙ্গ থাকে কপালে! যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী দাবি করছেন, তাঁরা এই প্রথম কাইমেরার একটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও চিত্র ধারণ করেছেন। এটা ২০০৯ সালের। মনটেরি বে অ্যাক্যুরিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউট সম্প্রতি তা প্রকাশ করেছে। প্রকাশ করা হয়েছে একটা গবেষণাপত্রও। প্রাণিবিজ্ঞানী লোনি লান্ডস্টেন ও তাঁর সহযোগীরা এটি লিখেছেন।
ছয় বছর আগে গবেষকেরা দূরনিয়ন্ত্রিত একটি যানের সাহায্যে ক্যালিফোর্নিয়া ও হাওয়াইয়ের মাঝামাঝি প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর থেকে প্রাণীটির ছবি তোলেন। সাগর ওই জায়গায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ ফুট গভীর। গবেষকেরা আশ্চর্য হয়ে দেখতে পান, ভিডিওর ছবিটি এক অদ্ভুতুড়ে হাঙরের। কেবল প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমেই একে দেখা গিয়েছিল। তবে প্রাণীটা আসলেই কাইমেরা কি না, সে বিষয়ে তখনো প্রাণিবিজ্ঞানী লান্ডস্টেন ও তাঁর সহযোগীরা শতভাগ নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। কারণ, সে জন্য প্রাণীটিকে ধরে ডাঙায় আনতে হবে। গবেষকেরা বলছেন, কাজটা করা হবে খুব কঠিন। কারণ এই হাঙর অনেক বড় আকারের এবং দ্রুতগামী। সরু নাকওয়ালা নীল কাইমেরা ২০০২ সালে প্রথম ধরা পড়েছিল। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও নিউ ক্যালিডোনিয়ার কাছাকাছি সাগরের গভীর থেকে গবেষক দমিনিক দিদিয়ের দাজি এটি আবিষ্কার করেছিরেন। আজব সামুদ্রিক প্রাণী কাইমেরাকে র্যা টফিশ, র্যা বিটফিশ, স্পুকফিশ ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়।

বিমান দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত

ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে একটি সি-১৩০ সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হয়ে গতকাল রোববার ১৩ জন নিহত হয়েছেন। উড়োজাহাজটি পাপুয়া প্রদেশের তিমিকা শহর থেকে ১৩ জন বিমানসেনা ও একজন যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পথে একটি প্রত্যন্ত পার্বত্য এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।
এতে তিনজন পাইলট, আটজন প্রকৌশলকর্মী, একজন দিকনির্দেশক ও একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। এ ছাড়া পণ্য হিসেবে কিছু খাদ্যসামগ্রী ও সিমেন্ট ছিল। ১৩ জনের লাশই উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত চলছে। বোর্নিও দ্বীপ এলাকায় গত নভেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার একটি সামরিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তিন আরোহী নিহত হন।

বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন আরাকানি জঙ্গিগোষ্ঠী!

ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ আইসিজির সদ্য প্রকাশিত ৩৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি আমাদের জন্য গভীর শঙ্কা বয়ে এনেছে। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, সামনের দিনগুলোতে যেন হারাকা আল-ইয়াকিন ধরনের কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর নাম আমাদের গণমাধ্যমের শিরোনামে পরিণত না হয়। এই নামে আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে এই প্রথমবারের মতো পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা একটি ইসলামি গোষ্ঠীর সক্রিয় থাকার কথা প্রকাশ পেয়েছে। গত ৯ অক্টোবর ও পরে নভেম্বরে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর ওপর ওই গোষ্ঠী জঙ্গি হামলা চালায় বলেই আইসিজির দাবি। যদি ভৌগোলিকভাবে দেখি তাহলে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি হামলার পরে কাছাকাছি কোনো দূরত্বে এটাই কোনো ইসলামি গোষ্ঠীর বড় হামলা। দুইয়ের মধ্যে একটা মিল হলো, হলি আর্টিজানের পরে আমরা যখন আইএস থেকে বেঁচে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছিলাম, তখন রোহিঙ্গা স্রোত আমাদের বিচলিত করল। ভারতের সঙ্গে মিলে আমরা নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি করেছিলাম। এবারের অন্যতম সমস্যা হলো ভারতের মতো মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সম্পর্ক ও বোঝাপড়া শক্তিশালী নয়। আইসিজির রিপোর্ট স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে আল-ইয়াকিনের সঙ্গে আইএস বা আল-কায়েদার একটা যোগসূত্র ঘটে যেতে পারে।
আপাতত এই রিপোর্ট মিয়ানমার সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে কিছুটা সহায়ক হতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়। অং সান সু চি এর আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দোষারোপ করেছিলেন। সু চির যুক্তি ছিল অনেকটা এ রকম, ৯ অক্টোবর ৯ পুলিশ নিহত হয়েছে। ১২ নভেম্বর এক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সুতরাং এরপর সেখানে যা ঘটেছে সেটা হলো সু চির কথায় ‘আইনের শাসন’। ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার কারণে ২৭ হাজার রোহিঙ্গা কেবল বাংলাদেশেই পালিয়ে এসেছে। কতজন নিহত হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। সবকিছুর মূলে ৯ অক্টোবরের তথাকথিত ‘আল-ইয়াকিন’ পরিচালিত হামলা। নোবেলজয়ী সু চির দেশের নেতারা হয়তো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। কারণ, নয়া বিশ্বনেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর মিত্ররা হয়তো আগের চেয়ে একটু ভালোভাবেই উপলব্ধি করবেন যে হেলিকপ্টার থেকে হামলা, মানুষ হত্যা ও গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করার ঘটনা হলো সু চি বর্ণিত ‘আইনের শাসনের’ নমুনা। আইসিজি একটি মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব সুশীল সমাজের একটি নির্ভরযোগ্য সংস্থা হিসেবে তার একটি পরিচিতি আছে। গণহত্যা শব্দটি তারা কীভাবে ব্যবহার করেছে, সেটা খুব খেয়াল করে লক্ষ করলাম। ৭ নোবেলজয়ী আরেক নোবেলজয়ীর দেশে ‘পদ্ধতিগত গণহত্যার’ কথা উল্লেখ করেছিলেন গত বছর। অথচ আইসিজি তার রিপোর্টে একটিবার ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। সেটাও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বরাতে। আর ইয়াঙ্গুন ও ব্রাসেলস থেকে একই সঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি যে ঘটনা নিয়ে এতটা তুলকালাম, সেই ৯ অক্টোবরের ঘটনার পুরো বিবরণ শুধু সরকারি ভাষ্যের বরাতে ব্যবহার করেছে।
এমনকি ওই ভাষ্যের সত্যতা নিরূপণের বা তৃতীয় কোনো সূত্রে যাচাই করার উদ্যোগ তারা নিয়েছে বলে রিপোর্টে অন্তত উল্লেখ পাই না। আইসিজি খুবই সতর্কতা ও বিনয়ের সঙ্গে বলেছে, সামরিক বাহিনী যে শক্তি (ব্রিটিশ ইনডিপেনডেন্ট যদিও বলেছে, হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি করে গণহত্যা হয়েছে) প্রয়োগ করেছে তা ‘ডিসপ্রপোরশনেট’ (মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ অর্থে)। আইসিজির মতে, সামরিক বাহিনী জঙ্গি ও নিরীহ মানুষের ফারাক করতে পারেনি! এর আগের লেখায় আমরা যে সংশয় প্রকাশ করেছিলাম, আইসিজি সেটা নিশ্চিত করেছে। তারা বলেছে, অং সান সু চির কিছুটা প্রভাব থাকলেও সামরিক বাহিনীর ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমাদের ঘরের কাছে একটি সামরিক বাহিনী থেকে যাবে, যার ওপর আগের মতোই কোনো কার্যকর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। একটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জঙ্গিবাদ তারাই মোকাবিলা করবে, যার ওপর পেশাদার রাজনীতিবিদদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। আইসিজি বলেছে, ২০১৫ সালের আগে ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির শেষ সম্পর্কটা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার (জিএনএলএম) মিয়ানমার সরকারের মুখপত্র। আইসিজির ৩৪ পৃষ্ঠার রিপোর্টে জিএনএলএম শব্দটির ২৬ বার উল্লেখ আছে। এই পত্রিকার মতে, ৯ অক্টোবরের পরে ৮৬ রোহিঙ্গা মরেছে। আইসিজির ওয়েবসাইট প্রধান শিরোনাম করেছে, রাখাইনে নতুন মুসলিম ইনসারজেন্সি। আইসিজি তার ওয়েবসাইটে যে এক্সিকিউটিভ সামারি বড় হরফে প্রদর্শন করেছে, সেখানে তারা কিন্তু মিয়ানমারের সরকারি বিবরণী নিজেদের বক্তব্য হিসেবে প্রচার করেছে। আমরা অবশ্যই মানব যে বাস্তবে এই ভাষ্যই যথার্থ হতে পারে। কিন্তু যেহেতু আমরা জানি যে কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বিদেশি নাগরিকদের রাখাইনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না,
তাই আইসিজি কীভাবে তথ্য পেল তা জানানোটা দরকার ছিল। আইসিজি কি আমাদের বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখ খুলে দিল? আমরা তো এই ধারণা করছিলাম যে ‘বাঙালি’ বলে মিয়ানমার যাদের তাড়াতে চেয়েছিল, তাদের ওপর তাদের ধারাবাহিক হামলার একটা পর্যায়ে ৯ অক্টোবরের ঘটনা ঘটে থাকবে। আরাকান রূপান্তরিত রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা বিশ্বের দেশে দেশে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। আইসিজি বলছে, সাম্প্রতিক যে সহিংসতা ঘটে গেল, সেটা গত কয়েক দশক থেকে ‘কোয়ালিটিভলি ডিফারেন্ট’ (গুণগতভাবে আলাদা)। তার মানে কী দাঁড়ায়? এটা আলাদা হলো মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর জড়িত হওয়ার কারণেই? নাকি সামরিক বাহিনীর কোনো অংশের জাতিগত নির্মূল অভিযান বেপরোয়া হওয়ার কারণেই? নিশ্চয় উভয়ের মিশ্রণ হতে পারে। এটুকু বুঝলাম, বাংলাদেশের উচিত হবে রোহিঙ্গা বিষয়টিকে আর কেবলই মানবিক কিংবা ১৯৭৮ বা ১৯৯১-৯২ সালের পর্বের মতো করে না দেখা। জাতীয় প্রতিরক্ষার দিক থেকে খুব গভীরভাবে খতিয়ে দেখা। ওই জঙ্গি গ্রুপ নাকি ‘ওয়েল ফান্ডেড’। এবং তারা ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বিশ্বরাজনীতিতে ‘গেম চেঞ্জার’ কথাটি খুব নিরীহ নয়। তা নিয়ে আমাদের খুব সতর্ক হওয়ার দরকার আছে। আল-ইয়াকিন সম্পর্কে যে তথ্য মিয়ানমারের বিশ্বকে নির্দিষ্টভাবে জানানোর কথা, সেটা আইসিজি জানাল। দারফুরের সংঘাত সম্পর্কে তারাই প্রথম বিপদ-ঘণ্টা বাজিয়েছিল। সে কারণে কলিন পাওয়েল তাদের প্রশংসা করেছিল। আইসিজির বিবরণ এ রকম: ‘গত ৯ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ কথিতমতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হামলা চালিয়ে ৯ পুলিশকে হত্যা করেছিল। এখন জানা গেছে হামলাকারীরা সৌদি আরব ও পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত। হারাকা আল-ইয়াকিন নামের একটি গোষ্ঠী এক ভিডিও বার্তায় বর্মি পুলিশের ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছে।’ আমরা মনে রাখব যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা চালাতে বিক্ষুব্ধ মানুষের কোনো ঘাটতি থাকার কথা নয়। সুতরাং প্রতিকারটি হলো মুসলিম জঙ্গি ও রাষ্ট্রের জঙ্গিত্ব একসঙ্গে বন্ধ করা। এই দিকটিকে এখন থেকেই কি বড় করে দেখা হবে? নাকি ‘গেম চেঞ্জাররা’ তা হতে দেবে না! আইসিজি প্রতিবেদন বলেছে, ‘২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১০০-এর বেশি নিহত এবং প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরে হারাকা আল-ইয়াকিন গঠিত হয়। অনলাইনে প্রচারিত নয়টি ভিডিওতে এই গ্রুপটির নেতা হিসেবে যাকে দেখা যায়, তার নাম আতা উল্লাহ। পাকিস্তানের করাচিতে জন্মের পরে শৈশবেই তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
তাঁর বাবা ছিলেন এক অভিবাসী রোহিঙ্গা। আইসিজি নিশ্চিত হতে না পারলেও ইঙ্গিত দিয়েছে যে আতা উল্লাহ পাকিস্তানসহ “অন্যত্র” সফর করেছিলেন। আর সেখানে তিনি আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। তিনি রাখাইনের হামলায় সৌদি আরব থেকে অংশ নেওয়া ২০ জন রোহিঙ্গার একটি গোষ্ঠীর অন্যতম কুশীলব। এ ছাড়া ২০ জন জ্যেষ্ঠ রোহিঙ্গার একটি পৃথক গ্রুপ ওই গোষ্ঠীর তদারক করে থাকে। তাদের সদর দপ্তর মক্কায় অবস্থিত।’ এ ছাড়া সৌদিতে বেড়ে ওঠা ও ফতোয়া জারির ক্ষমতাসম্পন্ন সেখানকার এক রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত মুফতির নাম জানা গেল। তিনি জিয়াবুর রহমান। টাইম সাময়িকীতে আইসিজির এই প্রতিবেদন বিষয়ে ১৩ ডিসেম্বরে একটি রিপোর্ট ছাপা হয়। সেখানে লক্ষণীয়ভাবে এই তথ্য উল্লিখিত হয়েছে, ‘বাংলাদেশ থেকে কয়েক শ রোহিঙ্গা ইয়াকিনে যোগ দিতে আরাকান গেছে।’ আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে এর আগে ছোটখাটো সশস্ত্র গ্রুপ কাজ করেছে। কিন্তু তারা সেভাবে র্যা ডিকালাইজড ছিল না। তার মানে আমরা এখন নিরীহ রোহিঙ্গাই পাচ্ছি না। পাচ্ছি তেমন রোহিঙ্গাও, যারা ইতিমধ্যে র্যা ডিকালাইজ হতে পারে। আর আমাদের সমাজের র্যা ডিকালিস্টদের সঙ্গে তাদের নৈকট্য স্বাভাবিক। ফলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে কোনো আশা–ভরসা দেখাতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিতে পারে বলে আইসিজির আশঙ্কার সঙ্গে একমত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মূল সমাধান অং সান সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমারের রাজনৈতিক উত্তরণ। দেশটির সামরিক বাহিনীর ওপর পূর্ণ ও কার্যকর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। আর বাংলাদেশের উচিত বিশেষ করে চীন ও ভারতকে অনুরোধ করা, যাতে তারা এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

এত দিন কোথায় ছিলেন?

প্রায় পাঁচ বছর ধরে সরকারবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পো এখন আবার সরকারি বাহিনীর দখলে এসেছে। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশের সমর্থন পাওয়া সরকারবিরোধী জোটের এখন লেজ গুটিয়ে পিছু হটা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। তাদের অধিকাংশ সেই পথটাই বেছে নিয়ে সরকারের সরবরাহ করা সবুজ বাসের আরোহী হয়ে আলেপ্পো ছেড়ে চলে গেছে। তবে পেছনে রেখে গেছে বিধ্বস্ত এক শহর আর অবরুদ্ধ নগরবাসীকে, যাদের জীবন এখন সম্ভবত গত পাঁচ বছরের ‘মুক্ত’ জীবনের চেয়েও আরও বেশি অনিশ্চিত। ধারণা করা যায়, নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া সেখানে আবারও ধীরে শুরু হবে এবং গৃহযুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিকতায় ফিরে যেতে কয়েক দশক লেগে যাবে। তবে সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই আলেপ্পোর পতন নিয়ে হাহাকার আর কান্নার রোল এখন বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে শোনা যাচ্ছে। সেই হাহাকার আবার বেশ কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার তাড়না থেকে এই লেখার অবতারণা। আলেপ্পোতে গত পাঁচ বছরে আসলে কী হচ্ছিল? শহরটিতে তথাকথিত ‘আরব বসন্তের’ হাওয়া এসে লেগেছিল উত্তর আফ্রিকায় সেই প্রক্রিয়ার সূচনার অল্প কিছুদিন পর। আরব বসন্তকে তথাকথিত এ কারণে উল্লেখ করতে হয় যে বসন্তকালটা আরব বিশ্বের দেশগুলোর জন্য উর্বরা কিংবা সুসময়ের আগমন বার্তা বয়ে আনা সময় হিসেবে বিবেচিত নয়, যেভাবে বসন্তকালকে দেখা হয় পশ্চিমের দেশগুলোতে। ফলে আরব বিশ্বে সূচনা হওয়া আন্দোলনের নামকরণ পশ্চিম করে নিয়েছিল নিজের পছন্দমাফিক, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে যার ছিল না তেমন কোনো সম্পর্ক। আরব বিশ্বে পরিবর্তনের বার্তাবাহক হাওয়া বয়ে যাওয়ার সেই প্রক্রিয়ার সূত্র ধরে সিরিয়ায়ও একসময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে।
পশ্চিম যেন সেই অপেক্ষাতেই ছিল। আর তাই দেখা যায়, সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর রাজপথে নেমে আসা তরুণদের পেছনে সব রকম মদদ জোগাতে সক্রিয়ভাবে যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা হচ্ছেন পশ্চিমের সেই সব দেশের নেতারা—লিবিয়ায় যাঁরা আগুন ধরিয়ে দিয়ে দেশটিকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছেন, ইরাকের ভবিষ্যৎকে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে যাঁরা করে তুলেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং আফগানিস্তানে যাঁদের আগমনে কপাল পুড়ছে দেশের মানুষের। বিশ্বের পরাক্রমশালী সেই সব নেতা আলেপ্পোর প্রতিবাদ–বিক্ষোভ এবং সেই বিক্ষোভ দমনে নেওয়া সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব আরও বিস্তৃত করার সুযোগ হিসেবে গণ্য করে অস্ত্র আর যোদ্ধার ঢালাও চালান দিয়ে সেখানে তৈরি করে দেন গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি। আর পশ্চিমের সে রকম মদদে উৎসাহিত হয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের ধর্মান্ধ উন্মাদেরাও ধর্মযুদ্ধের আগমন বার্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে আড্ডা গেড়েছিল জিহাদের সেই অভয়ারণ্যে। ফলে একসময় দেশের সেই অংশটি সিরিয়ার সরকারের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং সেখানে গড়ে ওঠে নিজস্ব এক উদ্ভট প্রশাসন, শত্রু বধের সব রকম শিক্ষা যে প্রশাসন অবরুদ্ধ নগরবাসীকে দিতে শুরু করে। সে রকম ধর্মযুদ্ধের বহমান সেই বাতাসে আন্দোলিত হতে থাকা আলেপ্পো এবং বিদ্রোহীকবলিত সিরিয়ার অন্য কয়েকটি শহরে গত পাঁচ বছরে শত্রু নিধনের নামে চালানো হয়েছে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, যে হত্যাযজ্ঞে শামিল হতে শিশুদেরও বিদ্রোহীরা অনুপ্রাণিত করেছিল, যার পরিণতিতে ভিডিও ফুটেজে রাইফেলধারী অপ্রাপ্তবয়স্কদের দেখা গেছে হাত আর চোখ বাঁধা শত্রুপক্ষের সৈনিকদের তাক করে গুলি ছুড়তে, দেখা গেছে জিহাদি জন নামের এক উন্মাদকে ছুরি হাতে জীবন্ত মানুষের কল্লা কেটে নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়তে, দেখেছি আমরা ধর্মীয় উন্মাদনায় নেশাগ্রস্ত এক পাগলকে সিরিয়ার নিহত সৈনিকের কলজে ছিঁড়ে নিয়ে তা চিবিয়ে খেতে। আরও দেখা গেছে প্রাচীন সভ্যতার অমূল্য সব নিদর্শন বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে, অন্য ধর্মের মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করতে। আর এই সবকিছুর মধ্যেও জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সামান্থা পাওয়ারের মতো স্বঘোষিত মানবাধিকারের সন্তদের আমরা দেখেছি নিশ্চুপ বসে থেকে জাবর কেটে যেতে, যেন নিজের সাঙাতেরা ভুল কিছু করছে না বরং সব নষ্টের গোড়া হচ্ছেন আসাদ আর তাঁর মিত্ররা। তবে দাবার ঘুঁটি উল্টে যেতেই এখন কেবল আড়মোড়া ভেঙেই নয়, বরং মাজা খাঁড়া করে দাঁড়িয়ে আবারও তাঁরা গাইতে শুরু করেছেন মানবাধিকার রসাতলে যাওয়ার হাহাকার তুলে গাওয়া বুক চাপড়ানো গান। সিরিয়া নিয়ে অন্তঃপ্রাণ এই সন্তদের কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্তে আরও যেসব মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র উচ্চবাচ্য করতে শোনা যায় না। যেন কিছুই হচ্ছে না এঁদেরই কল্যাণে মগের মুলুকে পরিণত হওয়া দেশ লিবিয়ায়; ইয়েমেনে সৌদি আরবের নির্বিচার বোমাবর্ষণ করে যাওয়া যেন হচ্ছে দেশটির জন্মগত অধিকার; চৌদ্দপুরুষের বসবাসের ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে চারদিকটা কাঁটাতারের বেড়ায় ঘিরে ফেলে ‘মালিকের প্রবেশ নিষেধ’ নোটিশ সেখানে সেঁটে দেওয়া যেন ইহুদিদের জন্য হচ্ছে স্বয়ং ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া এমন এক গ্যারান্টি, যা নিয়ে কথা বলতে নেই। অন্যদিকে সিরিয়া নিজের শিবিরের কিংবা নিজেদের দখলে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হওয়া একটি দেশ বলেই সিরিয়ার মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে এত উৎকণ্ঠা, এত মায়াকান্না এদের। এবার দেখা যাক চোখের জল ফেলা সেই সব ‘মানবাধিকার রক্ষাকারী’দের নিজেদের ঠিক করে নেওয়া আইনের চোখে কীভাবে দেখা যায় আলেপ্পোকে। ইরাক কিংবা ইয়েমেনের মতো ধর্মীয় বিভাজনের বড় দাগে ভাগ করে নিয়ে সিরিয়ার দিকে আলোকপাত করার সুযোগ খুব একটা নেই।
ধর্ম সিরিয়ার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনি, যেমনটা তা করে আসছে ইরাক, বাহরাইন এমনকি সৌদি আরবে। দেশের সংখ্যালঘু আলাভি সম্প্রদায়, শিয়াদের দূরসম্পর্কীয় জ্ঞাতি ভাই হিসেবে যাদের ধরে নেওয়া যায়, গত চার দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মূলত এদের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলেও শিয়া ও সুন্নিদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশও এদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলায় প্রথমে হাফেজ আল-আসাদ এবং তাঁর মৃত্যুতে পুত্র বাশার আল-আসাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে শক্ত হাতে দেশ শাসন করে যাওয়া। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সেখানেও নিয়মিত ঘটে চললেও বন্দীদের উলঙ্গ করে নিয়ে সেলফিতে তাদের ছবি তুলে সেই সব ছবি বন্ধুদের মধ্যে বিতরণ করার মতো জংলি তৃপ্তি ভোগের খবর অবশ্য সিরিয়া থেকে পাওয়া যায়নি, যেমনটা আমরা পেয়েছিলাম ইরাকের আবু গারাইব বন্দিশালা মার্কিনদের কবজায় আসার পর। এসব কিছুর বাইরে আরও যা বলতে হয় তা হলো, আলেপ্পো হচ্ছে সিরিয়ারই একটি শহর, যে শহরের ওপর রয়েছে দেশটির সরকারের সব রকম অধিকার। শহরটির কিছু মানুষের রাজপথে নেমে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন কোনো অবস্থাতেই এ রকম বোঝায় না যে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এদের লেলিয়ে দেওয়ার অধিকার অন্য কোনো দেশ কিংবা গোষ্ঠীকে সেই পদক্ষেপ দিচ্ছে। সে রকম উদ্ভট অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হলে ঠিক এমনটাও বোঝাতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব শহরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-শোভাযাত্রা হতে দেখা যাচ্ছে, সেই সব শহরের ভিন্নমত পোষণকারীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে এদের লেলিয়ে দেওয়ার অধিকারও বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের আছে। যুদ্ধ, যুদ্ধের পরিণতিতে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো খুনখারাবি সব দেশেই সাধারণ মানুষের জীবন সংকটাপন্ন করে তোলে। সে রকম সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে শুরুতেই যা প্রয়োজন তা হলো ঘৃণার মোড়ক থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসা। যুদ্ধের বদলে যুদ্ধের হুংকার তুলে যাওয়ায় সমস্যার সমাধান নেই। সমাধান নেই পক্ষপাতমূলকভাবে চোখের জল ফেলে যাওয়ার মধ্যেও। লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া—এরা সবাই সেই প্রমাণ আমাদের সামনে রেখে গেলেও আমাদের জীবন যেন বাধা পড়ে আছে সেই একই চক্রে, যেখানে আমরা সবাই পরে আছি রং-চশমা এবং জগৎকে দেখছি সেই রং-চশমার রঙের ফাঁক দিয়ে। ফলে দেখেও না দেখার ভান করে মটকা মেরে পড়ে থেকেছি নিজের দলের একদল মানুষকে তরতরিয়ে মানবতার সিঁড়ির ধাপ পার হয়ে নিচে নেমে যেতে দেখেও। আর এদেরই পরাজয়ে এখন আমাদের কারও চোখে আসছে জল, কেউ করছি হাহাকার। অবাক হয়ে তাই ভাবতে হয়, এত দিন কোথায় ছিল মানবতার জন্য কান্না, কিংবা মানুষের অবমাননায় আকাশ বিদীর্ণ করে তোলা আর্তনাদ?
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

Sunday, December 18, 2016

পুতিনকে আগেই সতর্ক করেছিলাম: ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে ই-মেইল হ্যাকিং থেকে বিরত থাকার জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে তিনি গত সেপ্টেম্বরেই সাবধান করে দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এটাই তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন। পুতিন নিজে ওই হ্যাকিংয়ের ঘটনা জানতেন—এমন অভিযোগের পক্ষে যুক্তি দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবামা বলেন, ‘রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের অগোচরে খুব বেশি কিছু ঘটে না। এই কাজের পরিণাম সম্পর্কে সেপ্টেম্বরে এক সম্মেলনেই আমি তাঁকে হুঁশিয়ার করেছিলাম।’ ওই সম্মেলনের এক মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনধিকার চর্চা করছে রাশিয়া। সংবাদ সম্মেলনের কিছু আগে ওবামা বলেছিলেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং দলটির পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল হ্যাকিংয়ের ঘটনায় রাশিয়াকে ‘সমুচিত জবাব’ দেওয়া হবে। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ ও প্রেসিডেন্ট ওবামার হ্যাকিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর শুক্রবারই বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি ‘অশোভন’। তারা নিজেদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ থাকলে দেখাক বা এ ধরনের কথাবার্তা বন্ধ করুক। ওবামা তাঁর উত্তরসূরি রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করে সমালোচনা না করলেও বলেছেন,
রিপাবলিকানরা মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার জড়িত হওয়ার গুরুত্ব বা ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। হিলারি পক্ষের অভিযোগ, রাশিয়ার হ্যাকিং কার্যকলাপ ট্রাম্পকে জিততে সহায়তা করেছে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে মার্কিন গোয়েন্দারা বলেন, রাশিয়ার হ্যাকাররা ট্রাম্পকে নির্বাচনে জয়ী হতে সাহায্য করেছে। সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, এসব কথা হাস্যকর এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক। হিলারি ক্লিনটন নিজে তাঁর পরাজয়ের জন্য প্রথমবারের মতো রাশিয়ার হ্যাকিংয়ের ঘটনাকে দায়ী করেছেন। শুক্রবার তিনি দলীয় তহবিলদাতাদের উদ্দেশে বলেছেন, রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে পাঁচ বছর আগে অনিয়ম হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই পুতিন ওই হ্যাকিংয়ের কৌশল নিয়েছেন। হিলারি মন্তব্য করেন, এটা কেবল একজন প্রার্থী বা তাঁর প্রচার কার্যক্রমের ওপর হামলা নয়, বরং গোটা দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ। এটা যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্য ও নিরাপত্তার ব্যাপার।

তুরস্কে আবারও আত্মঘাতী হামলা, নিহত ১৩ সেনা

তুরস্কের কায়সেরি শহরে সেনাদের বহনকারী
বাসটিতেবোমা হামলার কিছুক্ষণ পরের দৃশ্য। রয়টার্স
তুরস্কে গাড়িবোমা বিস্ফোরণে কমপক্ষে ১৩ জন সেনা নিহত হয়েছেন। আনাতোলিয়ার কায়সেরি শহরে গতকাল শনিবার সেনাসদস্যদের বহনকারী একটি বাসে আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলা চালানো হয়। এতে আরও ৫৫ জন আহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তুরস্কের বৃহত্তম নগর ইস্তাম্বুলে জোড়া আত্মঘাতী হামলায় ৩৭ জন পুলিশসহ ৪৪ জন নিহত হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় এই হামলার ঘটনা ঘটল। ১০ ডিসেম্বরের সেই ঘটনার দায় স্বীকার করেছিল কুর্দি বিদ্রোহীরা। তবে গতকালের হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ দায় স্বীকার করেনি। তবে আগের হামলার মতো এই ঘটনার জন্যও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টিকে (পিকেকে) দায়ী করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গতকালের বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৮ জন সেনাসদস্য। এ ছাড়া কয়েকজন বেসামরিক লোকও আহত হয়েছেন। ওই বাসের যাত্রীরা নবীন সেনা। তাঁরা কমান্ডো ব্রিগেডের সদস্য। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাঁরা সাপ্তাহিক ছুটিতে যাচ্ছিলেন। আর বাসটি ছিল কায়সেরি পৌরসভা কর্তৃপক্ষের। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, বিস্ফোরণের পর সেনাদের বহনকারী বাসটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং তার ভেতরে আগুন জ্বলছে।
কায়সেরির গভর্নর সুলেমান কামচি বলেন, বোমা বহনকারী গাড়িটি বাসের পাশেই ছিল। হঠাৎ করে সেটি বিস্ফোরিত হয়। উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন। আহত ৫৫ জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২ জনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাঁদের ছয়জনের অবস্থা সংকটাপন্ন। হামলার পর অনেক বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েন। তাঁরা কায়সেরি শহরে কুর্দিপন্থী রাজনৈতিক দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (এইচডিপি) কার্যালয়ে হামলা করে ভাঙচুর চালান। তবে এ ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এইচডিপি। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই হামলার জন্য দায়ী। তিনি বলেন, সিরিয়া ও ইরাকে যা হচ্ছে, এ ধরনের হামলা সেটির প্রতিক্রিয়াও বটে। বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে এরদোয়ান মূলত পিকেকে সংগঠনকেই ইঙ্গিত করেন। এটিকে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মনে করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় বেশ অনিরাপদ হয়ে উঠেছে তুরস্ক। পিকেকে ও জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হামলায় প্রায়ই কেঁপে উঠছে বিভিন্ন শহর। এ বছর ইস্তাম্বুল শহরে কমপক্ষে পাঁচটি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ায় সংগঠনটির হামলার শিকার হতে হচ্ছে দেশটিকে।

সাদ্দাম থাকলেই ভালো হতো

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং হবু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুজনেই মনে করেন, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলা চালানো উচিত হয়নি। দীর্ঘ ইরাক যুদ্ধের পরিণামেই মধ্যপ্রাচ্যের নানা বিশৃঙ্খলা এখনো মানুষকে ভোগাচ্ছে—এ উপলব্ধি থেকেই দুই নেতার এ ধারণা। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা জন নিক্সন তাঁর লেখা নতুন বইয়ে লিখেছেন, ইরাক শাসনের জন্য দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে বাঁচিয়ে রাখাই উচিত ছিল। ইরাকি স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন জন নিক্সন। তাঁর নতুন বই চলতি মাসেই প্রকাশিত হবে। বইটির অংশবিশেষ টাইম সাময়িকীর অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি সাদ্দামকে উৎখাতের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। জেরার সময় সাদ্দাম বলেছিলেন, ইরাক দখল করা সহজ হবে না। তবে ওয়াশিংটনের নব্য রক্ষণশীলেরা তখন সেটা সম্ভব বলেই ভেবেছিলেন।
নিক্সনের ভাষ্য: জিজ্ঞাসাবাদে সাদ্দাম বলেছিলেন, ‘তোমরা ব্যর্থ হতে চলেছ। বুঝতে পারবে, ইরাক শাসন করা এত সোজা না। কারণ, তোমরা ভাষাটা জানো না। ইতিহাস জানো না। আর তোমরা আরব মনন-মানসও বোঝো না।’ নিক্সন বইটিতে স্বীকার করেছেন, সাদ্দামের ওই কথা যুক্তিসংগত ছিল। আর ইরাকের মতো বহু জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্র চালাতে তাঁর মতো কঠোর শক্তিশালী শাসকই দরকার। সুন্নি চরমপন্থা এবং শিয়া নেতৃত্বাধীন ইরাকি ক্ষমতাকাঠামো—দুটোই ছিল সাদ্দামের শত্রু। আর তাদের দমিয়ে রেখেই ইরাক শাসন করতেন তিনি। নিক্সন লিখেছেন, সাদ্দামের নেতৃত্বের ধরন এবং নির্মমতা ছিল তাঁর সরকারের অনেক ত্রুটির একটি। কিন্তু তিনি নিজের ক্ষমতার ভিত্তিতে কোনো ধরনের হুমকি এলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। সে কারণেই গণবিক্ষোভ বা আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর সরকারের পতন ঘটানো সুদূর পরাহত ছিল। অনুরূপভাবে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো কোনো জঙ্গি সংগঠনের পক্ষে তাঁর শাসনামলে এতটা প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনাও ছিল না। জন নিক্সনের ভাষায়, ‘সাদ্দামকে আমার মোটেও ভালো লাগেনি। তবে তাঁর প্রতি একপর্যায়ে আমার একধরনের তিক্ত সম্মানবোধও জন্ম নেয়। কারণ তিনি ইরাকি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছিলেন। সাদ্দাম আমাকে একবার বলেন, “আমার আগে ইরাকে কেবলই বাগ্বিতণ্ডা ও ঝগড়া চলত। আমি এসবের অবসান ঘটিয়ে সবাইকে একমত করাতে পেরেছি”।’

ঘটনাচক্রেই ধরা পড়ে অ্যান ফ্রাঙ্করা?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় আমস্টারডামে আশ্রয় নেওয়া ইহুদি বালিকা অ্যান ফ্রাঙ্ককে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে নাৎসি বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেয়নি। সম্ভবত রেশন প্রতারণা নিয়ে পুলিশি তল্লাশির সময় ঘটনাচক্রেই ধরা পড়ে যান বিশ্বযুদ্ধের সময়কার দিনলিপির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া কিশোরী অ্যান ফ্রাঙ্কদের পরিবারসহ আট ইহুদি। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের অ্যান ফ্রাঙ্ক হাউস মিউজিয়াম একটি গবেষণা শেষে এমন একটি তত্ত্ব দিয়েছে। গবেষকেরা বলেছেন, প্রিনসেনগ্রাখটের গোপন আশ্রয় থেকে ধরে নিয়ে অ্যান ফ্রাঙ্কদেরকে অশউইৎজ ডেথ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁরা বলেছেন, বরাবরই যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খেয়েছে, সেটি হলো অ্যান ফ্রাঙ্ক ও অন্যদের পালিয়ে থাকা কুঠুরির খবর কে বিশ্বাসঘাতকতা করে নাৎসি বাহিনীর কাছে জানিয়ে দিয়েছিল?
এখন ওই গবেষকেরা বলেছেন, ১৯৪৪ সালের ১০ মার্চ থেকে পরের কয়েক দিন ধরে ডায়েরিতে অ্যান ফ্রাঙ্ক তাদের কাছে গোপনে রেশন কুপন সরবরাহ করতেন এমন দুই ব্যক্তির গ্রেপ্তারের কথা বেশ কয়েকবার লিখেছে। প্রিনসেনগ্রাখটের যে বাসায় অ্যান ফ্রাঙ্করা লুকিয়ে ছিল, সেখানে গ্রেপ্তার হওয়া ওই দুই ব্যক্তি বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ১৪ মার্চ অ্যান তার ডায়েরিতে লেখে, ‘বি (মার্টিন ব্রুভার) এবং ডি (পিটার ডাটজিলার) গ্রেপ্তার হয়েছে। তাই আমরা আর কুপনও পাচ্ছি না।’ ডেথ ক্যাম্পে বন্দী থাকা অবস্থায় অ্যান ফ্রাঙ্ক টাইফাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার বয়স তখন মাত্র ১৫। যে আটজন ইহুদিকে ওই কুঠুরি থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে একমাত্র অ্যানের বাবা অটো ফ্রাঙ্ক জীবিত অবস্থায় ফিরতে পেরেছিলেন। অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরিতে হিটলারের কুখ্যাত নাৎসি বাহিনী অধিকৃত নেদারল্যান্ডসে ইহুদিদের ওপর নির্যাতনের মর্মস্পর্শী বর্ণনা রয়েছে।

রাজনৈতিক দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ায় প্রশ্ন

ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার কালোটাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ সুবিধা দিল। পুরোনো ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট সাধারণ মানুষ আর ব্যাংকে জমা দিতে না পারলেও রাজনৈতিক দলগুলো তা পারবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবং সে জন্য দলগুলোকে কোনো কর দিতে হবে না।
শুক্রবার রাতে সরকারের দেওয়া এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা প্রশ্ন তুলেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সরকার ও শাসক দলের দুরভিসন্ধি প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। আম আদমি নেতা ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলের তহবিল বৃদ্ধি কীভাবে হয় ও হয়ে আসছে তা খতিয়ে দেখতে একটা কমিটি গঠন করা হবে। এত প্রশ্ন ওঠার কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোতে ২০ হাজার রুপি পর্যন্ত কোনো রকম প্রমাণ ছাড়াই চাঁদা দেওয়া যায়। যাঁরা চাঁদা দেবেন তাঁদের কোনো পরিচয় বা প্রমাণপত্রও দাখিল করতে হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোকে করও দিতে হয় না। তবে এ ক্ষেত্রে সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর জমা দেওয়া অর্থে অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়লে তাদের জবাবদিহি করতে ডাকা হতে পারে। অতএব দলগুলো যেন তাদের কাগজপত্র ও হিসাব ঠিক রাখে। নির্বাচন সংস্কারের জন্য নির্বাচন কমিশন একাধিকবার এ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নোটবন্দীর সিদ্ধান্ত নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোকে এই সুযোগ পাইয়ে দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এমনিতেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার আগেই বিজেপি ও তাদের ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিরা বাতিল নোটের উপযুক্ত বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন।
এবার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই ব্যবস্থা নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করল। যেসব সাধারণ মানুষের কাছে বাতিল নোট এখনো রয়ে গেছে, তাঁরা রাজনৈতিক দলে সেই টাকা জমা দিতে আরও ১৫ দিন সময় পেয়ে যাচ্ছেন। এরই পাশাপাশি একই সঙ্গে সরকার বাড়তি কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগও নতুন করে পাইয়ে দিল। কর না দেওয়া অর্থ যাদের রয়েছে তারা আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তা জমা দিতে পারবে। তবে সে জন্য প্রায় ৫০ শতাংশ কর দিতে হবে। বাকি ৫০ শতাংশের অর্ধেক চার বছর বিনা সুদে জমা থাকবে প্রধানমন্ত্রীর গরিব কল্যাণ প্রকল্পে। চলতি বছরেই এ ধরনের এক প্রকল্পে সরকারের ৬৫ হাজার কোটি রুপি কর বাবদ আয় হয়েছে। তবে সেই প্রকল্পের থেকে এবারেরটি আলাদা। এবার আগে করের টাকা জমা দিতে হবে, তারপর অনলাইনে ছাড়ের আবেদন জানাতে হবে। একের পর এক এ ধরনের প্রকল্পের মধ্য দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ অসাধু ব্যবসায়ীদের পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও সরকারকে সমালোচনা শুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি আয়কর বিভাগ ইতিমধ্যে প্রায় তিন হাজার জনকে নোটিশ পাঠিয়েছে যাদের ব্যাংকের খাতায় ৮ নভেম্বরের পর মাত্রাছাড়া টাকা জমা পড়েছে। নোটবন্দীর গত পাঁচ সপ্তাহে আয়কর বিভাগ ইতিমধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি রুপি বাজেয়াপ্ত করেছে।

সরকারকে আর কীভাবে জানাতে হবে? by আলী ইমাম মজুমদার

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার মামলা ছাড়া
আর কোনোটির ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেই
সম্প্রতি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে একটি সেমিনার হয়। এ ধরনের সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম খুবই গতানুগতিক। খবর হওয়ার মতো কিছু থাকে না। তবে আলোচ্য সেমিনারে অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রীর একটি বক্তব্য এটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি বড় বাধা।’ বক্তব্যটি খুবই মূল্যবান আর এর সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এ প্রসঙ্গে তাঁর পরবর্তী মন্তব্যটি আমাদের জন্য কিছুটা বিস্ময়ের। বিভিন্ন সংবাদপত্রের মতে, তিনি বলেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে কেউ সংশ্লিষ্ট থাকা সম্পর্কে সরকারের নজরে আনা হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিস্ময়টা এ কারণে যে বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্পর্কে এত যে অভিযোগ, এগুলো কি সরকারের নজরে নেই? এগুলোর মাঝে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার মামলা ছাড়া আর কোনোটি এমনভাবে তদন্ত করে দেখা হয়েছে?
নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটি সেখানে প্রবল আলোড়ন তুলে প্রশাসনকে প্রায় অকার্যকর করে দেয়। উচ্চ আদালতে বিষয়টি উপস্থাপিত হলে মামলা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে আমলে নিয়ে তদন্ত ও বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। এমন কিছু না হলে তা হতো কি না, এ সম্পর্কে অনেকে সন্ধিহান। আর এ ধরনের সন্ধিহান থাকাকে অমূলকও বলা যাবে না। অক্ষত অবস্থায় আসামিকে ধরা হচ্ছে। তাকে বা তাদের নিয়ে সহযোগীদের গ্রেপ্তারের নামে রাতের আঁধারে কোথাও যাওয়া আর দুই পক্ষের মাঝে ‘ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে’ সে হতভাগ্য ব্যক্তিদের মৃত্যুকে আমরা কীভাবে আখ্যায়িত করব! ধৃত আসামিরা হয়তো মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধও করতে পারে। তবে সে দণ্ড দেওয়ার কর্তৃত্ব তো আদালতের। সেদিনই বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একটি প্রতিবেদনের প্রতি আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এ বক্তব্য দেন বলে জানা যায়। তাঁদের তথ্যানুসারে গত নভেম্বরে গড়ে প্রতিদিন একজন করে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এর সংখ্যা ১৮৪। সংখ্যাটি গত বছরে একই সময়কালে ছিল ১৭১। আর ২০১৪ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ১৫৪। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সে প্রতিবেদন অনুসারে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালে বন্দুকযুদ্ধ ছাড়াও বলপূর্বক অপহরণ,
ধর্মান্ধ ব্যক্তিদের দ্বারা নিহত এবং জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত ব্যক্তির সংখ্যাও দেওয়া হয়েছে। এর সংখ্যা যথাক্রমে ৮ হাজার ৯৪২ এবং ৩৩। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে হতাহত হতেই পারে। এ ছাড়া হামলায় নিহত জঙ্গি ঘাতকদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার দায়িত্বও আইন প্রয়োগকারী সংস্থারই। এ ক্ষেত্রে তারা ঈপ্সিত মাত্রায় সাফল্য দেখাতে পারছে না, এমন অভিযোগ রয়েছে। আর বলপূর্বক অপহরণ! কখনো কখনো অপহৃত ব্যক্তিকে বেশ কিছুদিন পর বিধ্বস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। বেশ কয়েক দিন পর কাউকে দেখানো হয় গ্রেপ্তার। আর কেউ-বা থেকে যায় অপহৃতই। ধারণা করা হয়, এদের মেরে ফেলা হয়েছে। আরও বেদনাদায়ক যে সরকারি কোনো সংস্থাই এর দায় স্বীকার করে না। যদিও-বা অপহরণের সময় কোনো না কোনো সংস্থার পরিচয় ব্যবহৃত হয়। হতে পারে কোনো সরকারি সংস্থার নাম ব্যবহার করে কোনো ক্ষেত্রে অন্য কেউ অপহরণ করে। কাউকে বিপদে ফেলতে বা নিজের কোনো অপকীর্তিকে আড়াল করতে স্বেচ্ছায়ও কেউ ‘গুম’ হয়ে যায়। আর এগুলোর সবই তো আইন প্রয়োগকারী সংস্থারই তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য বের করার কথা। আর তারাই বেশ কিছু গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, এটা মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও সুশীল সমাজ ব্যাপকভাবে ধারণা করে।
এ ধরনের অভিযোগই অপহৃত ব্যক্তির স্বজনেরা করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর খবর এখন ডাল-ভাত হয়ে গেছে। চাঞ্চল্যকর কিছু না হলে খবরের কাগজের এ-সংক্রান্ত সংবাদের শিরোনামের নিচের অংশ অনেকে পড়েন না। যেমন পড়েন না সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যার নিত্যকার ঘটনাগুলো। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বিচারবহির্ভূত হত্যা কত দ্রুত আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাব্যবস্থার অঙ্গ হয়ে গেছে। সরকার চাইলে এসব ঘটনার অন্তত কয়েকটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের ব্যবস্থা নিতে পারে। সীমিত কিছু রহস্য উদ্ঘাটিত হলেও আইনমন্ত্রী প্রতিশ্রুত, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। আর এ রকম হলে সর্বত্র সংযমী হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আর প্রকৃত অর্থে বন্দুকযুদ্ধ করে আসামি বা তাদের সহযোগী কারও মৃত্যু হলে কিছু বলারও থাকবে না। তবে বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্ভবত ছিল সব সময়ই। অবশ্য সেগুলো ছিল নিতান্তই সীমিত। রাখঢাকও ছিল ওগুলোতে। এ প্রক্রিয়াটি অনেকটা খোলামেলা রূপ পায় অপারেশন ক্লিন হার্ট চলাকালে। এ জন্য তাদের দায়মুক্তিও দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গঠিত হয় র্যাব। এটা পুলিশ বাহিনীর একটি ইউনিট হলেও সামরিক বাহিনী, পুলিশসহ আরও কিছু সংস্থার প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এতে। তারা ভালো কাজ করেছে এবং করছে অনেক।
 তবে ক্রসফায়ার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা তখনই ব্যাপকতা পায়। ইদানীং এ ধরনের ঘটনা র্যাবের চেয়ে পুলিশের হাতেই ঘটছে বেশি। এটা ভুলে গেলে চলবে না, আইন প্রয়োগ করতে হবে আইনানুগভাবে। বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনায় অনেককে গ্রেপ্তারই দেখানো হয়নি। অথচ বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্বজনেরা বলছেন তাঁদের তুলে নিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। সুষ্ঠু তদন্ত হলে এটাও বের করা সম্ভব। আর যাঁরা গ্রেপ্তারকৃত, তাঁদের পূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্ব তো গ্রেপ্তারকারী সংস্থার। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্যও তো ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এগুলো সম্পর্কে সরকার কার্যত নির্বিকার বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এ নির্লিপ্ততায় এসব বাহিনীর মাঝে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা কী বিপর্যয় ঘটাতে পারে তার নজির আমরা বিভিন্ন স্থানে দেখেছি। এটা লক্ষণীয় যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ততটা দৃঢ় নয়। এর কারণ হিসেবে রয়েছে দলীয়করণসহ আরও কিছু বিষয়। এতে ক্ষেত্রবিশেষে এসব সংস্থার কতিপয় সদস্য বেপরোয়া আচরণ করেন। এর ফলেই বিচারবহির্ভূত হত্যা। তা ছাড়া,
সংস্থাগুলোর মাঝে অভাব রয়েছে সমন্বয়ের। র্যাব পুলিশের অঙ্গ হলেও শীর্ষ পর্যায়ে ছাড়া এর নিচে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নেই। র্যাব গঠন ও পরিচালনা অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো কোনো স্বল্পকালীন ব্যবস্থা নয়। ইতিমধ্যে সংস্থাটি এক যুগ পার করেছে। এর কার্যকারিতাও রয়েছে আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থায়। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য যে বা যারা আইনানুগভাবে মূল দায়িত্বে, তাদের সঙ্গে র্যাবের কার্যক্রম সমন্বয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। আইনমন্ত্রী একজন সফল আইনজীবী। তিনি সজ্জন ব্যক্তি বলেই সবাই বিবেচনা করেন। দায়িত্ব পালনেও যত্নশীল। বিচারবহির্ভূত হত্যা যে আইনের শাসনের জন্য বড় বাধা, তাঁর এ বক্তব্য সময়োচিতও বটে। তবে এ উপলব্ধিটা আনতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মাঝে। মানবাধিকার বিষয়ে তাদের কিছু প্রশিক্ষণ কিংবা এ ধরনের কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। আনীত অভিযোগগুলো থেকে গুটিকয় বেছে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার। তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে প্রতিশ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিন। আর চালু রাখুন এ প্রক্রিয়াটি। এতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর ‘ট্রিগার হ্যাপি’ সদস্যরা লাল সংকেত পাবে। আর এ বিষয়ে সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর আবশ্যকতাই-বা কোথায়? সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য প্রাথমিক পর্যালোচনা করে এর ভিত্তিতেই তো ব্যবস্থা নেওয়া যায়। উচ্চ আদালতও তো স্বীয় বিবেচনায় কোনো কোনো ঘটনা আমলে নেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এ প্রতিবেদনটি সরকারের নজর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নতুন করে সরকারের নজরে আনার প্রয়োজনই-বা কোথায়?
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

Saturday, December 17, 2016

হারের জন্য রাশিয়া ও এফবিআই-বসকে দুষলেন হিলারি

নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য প্রথমবারের মতো রাশিয়ার হ্যাকিংকে দায়ী করেছেন হিলারি ক্লিনটন। সদ্য সমাপ্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হন এই ডেমোক্রেটিক প্রার্থী। এই হারের জন্য মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) পরিচালক জেমস কোমির প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন হিলারি। আজ শনিবার বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, দলের তহবিলদাতাদের উদ্দেশে হিলারি বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ রয়েছে। পাঁচ বছর আগে সে দেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলার কারণেই পুতিন তাঁর (হিলারি) প্রতি ক্ষুব্ধ।
নির্বাচনের আগে আগে ই-মেইল কেলেঙ্কারি নিয়ে জেমস কোমি নতুন করে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ বিষয়ও উল্লেখ করেন হিলারি। ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ওই চিঠির কারণে অনেক রাজ্যে তিনি ভোট হারান। ডেমোক্রেটিক পার্টির ই-মেইল হ্যাকিংয়ে ব্যক্তিগতভাবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে রাশিয়া এ অভিযোগ নাকচ করেছে। পুতিনের মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগকে ‘অশোভন’ বলেছেন।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ওবামার ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, তাঁর দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং তা নেওয়া হবে’। মার্কিন গোয়েন্দারা হ্যাকিংয়ের জন্য সরাসরি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দায়ী করার পর ওবামা এমন হুঁশিয়ারি দেন। তবে ওবামার হুঁশিয়ারির জবাবে পুতিনের একজন মুখপাত্র বলেছেন ‘প্রমাণহীন’ এই অভিযোগ ‘খুবই নোংরা’। গত বুধবার মার্কিন টেলিভিশন এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণেই পুতিন হিলারির সহযোগীর ই-মেইল হ্যাক করেন। হোয়াইট হাউসও ওই হ্যাকিংয়ের ঘটনায় পুতিনের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করে। এ বিষয়ে ওবামা বৃহস্পতিবার হুঁশিয়ারি দেন, যুক্তরাষ্ট্র মস্কোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ওবামা বলেন, ‘মি. পুতিন আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারবেন কারণ এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি কথা হয়েছে।’ ওবামা বলেন, হ্যাকিং সংক্রান্ত কিছু তথ্য প্রকাশ করা হতে পারে, কিছু গোপন রাখা হতে পারে।
কথিত হ্যাকিংয়ে পুতিনকে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ করেছে, ক্রেমলিন গতকাল শুক্রবার তার কঠোর নিন্দা করেছে। পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেস্কভ জাপানে সফরকালে সাংবাদিকদের বলেন, এই পরিস্থিতিতে তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) এ বিষয়ে কথাবার্তা বন্ধ করা উচিত অথবা কোনো ধরনের প্রমাণ থাকলে সেটা দেখানো উচিত। অন্যথায় এমন অভিযোগ খুবই নোংরা দেখায়। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ওবামার মন্তব্যে বিশ্বের শীর্ষ দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে বিরোধ নতুন করে চরমে পৌঁছেছে। এনবিসি নিউজ জানায়, কীভাবে ডেমোক্র্যাটদের তথ্য হ্যাক করা হবে এবং তা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে ব্যাপারে পুতিন নিজেই নির্দেশনা দিয়েছিলেন। হ্যাকিং নিয়ে নতুন এ পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে তাঁরা অনেকটাই নিশ্চিত এবং এ নিয়ে তাঁদের ‘যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস’ আছে। এর আগে ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছিল, রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুকূলে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু ই-মেইল হ্যাক করেছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামার শীর্ষস্থানীয় পরামর্শক বেন রোডস বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আমি মনে করি না রাশিয়ার সরকার পুতিনের অগোচরে এমন কিছু করেছে।’

কংগ্রেস সুযোগ পেয়েও কালো টাকার বিরুদ্ধে লড়েনি

দুর্নীতি ও কালো টাকার বিরুদ্ধে ‘লড়াই না করার জন্য’ বিরোধী দল কংগ্রেসকে দুষলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল শুক্রবার সকালে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের শেষ দিন বিজেপির সংসদীয় দলের বৈঠকে দেওয়া ভাষণে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ১৯৭১ সালেই এই সুযোগ কংগ্রেসের কাছে এসেছিল। কিন্তু তখন তারা সেটি গ্রহণ করেনি। গতকালও যে সংসদীয় অধিবেশন ভেস্তে যাবে বিজেপি নেতৃত্বের তা জানা ছিল। সেই কারণেই সকালে সংসদীয় দলের বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করেন। বলেন, কালো টাকার বাড়বাড়ন্ত ঠেকানোর জন্য এ ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। এই ধরনের সুযোগ যে কংগ্রেসের কাছেও এসেছিল, সে কথা জানাতে সাবেক আমলা মাধব গোডবলের লেখা একটি বই থেকে উদ্ধৃতি দেন মোদি। বলেন, ১৯৭০ সালের গোড়ার দিকে ওয়াংচু কমিটির রিপোর্টে বড় নোট বাতিলের পরামর্শ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে রাখা হয়েছিল। সেই রিপোর্টের রেশ ধরেই পরের বছর শীর্ষ নেতা ওয়াই বি চবন ইন্দিরার কাছে নোট বাতিলের প্রস্তাব রাখেন। সে কথা শুনে চবনকে ইন্দিরা বলেছিলেন, কংগ্রেস কি আর কোনো নির্বাচনে লড়বে না?
সেই একাত্তর সালে এই কাজটা ইন্দিরা করলে আজ দেশের হাল এমন হতো না বলে মন্তব্য করেন মোদি। তিনি আরও বলেন, সেই সময় সিপিএম নেতারাও নোট বাতিলের পক্ষে ছিলেন। অথচ আজ সেই দল বিরোধিতায় নেমেছে। নোট বাতিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আলোচনা ও প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটির দাবিতে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন পুরোটাই ভেস্তে গেল। এত কম কাজ এবং নিত্য সভা মুলতবি অতীতে আর কখনো হয়নি। এর দায় পুরোপুরি বিরোধীদের ওপর চাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে মনমোহন সিং বারবার দুর্নীতি দূর করা ও কালো টাকার বিরুদ্ধে কথা বলতেন, তিনি দশ বছরের শাসনে এই বিষয়ে কিছুই করেননি। কংগ্রেসকে আক্রমণ করে মোদি বলেন, কংগ্রেস আমলে বোফর্স, টু-জি কিংবা কয়লা নিয়ে কেলেঙ্কারি হতো বলে বিরোধীরা আলোচনার দাবিতে সংসদ অচল রাখত। এখন সরকার পক্ষ কালো টাকা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে বিরোধীরা সংসদে অচলাবস্থা সৃষ্টি করছে। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ সাংসদদের বলেন, ‘টানা এক সপ্তাহ ধরে আপনারা যে যার নির্বাচনী কেন্দ্রে চলে যান। মানুষদের বোঝান, নোট-বন্দির প্রয়োজন কতটা এবং এতে দেশের মানুষদের কী উপকার হবে।’ মোদি সরকারের ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিলের উদ্যোগ নোট-বন্দি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

শশীকলা বনাম শশীকলা

তামিলনাড়ুর দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী জনপ্রিয় নেত্রী জয়ললিতা জয়রামের মৃত্যুর পর এবার দলে তাঁর উত্তরাধিকারী নিয়ে আইনি লড়াই বেধে গেল। অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে) দলের মুখপাত্র সি পনায়ান গত বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছিলেন, জয়ললিতার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শশীকলা নটরাজনই সাধারণ সম্পাদক হতে যাচ্ছেন। কিন্তু তা ঠেকাতে মাদ্রাজের হাইকোর্টে গতকাল শুক্রবার একটি মামলা ঠুকে দিয়েছেন দলটির বহিষ্কৃত সাংসদ শশীকলা পুষ্প। তিনি গত ১ আগস্ট দল থেকে বহিষ্কৃত হন। এআইএডিএমকের পরবর্তী সম্মেলনে শশীকলা নটরাজনকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা ঠেকাতে মামলাটি করেছেন শশীকলা পুষ্প। নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী এ বছরের মধ্যেই এআইএডিএমকের সম্মেলন হওয়ার কথা। যদিও সম্মেলনের দিনক্ষণের ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।
শশীকলা পুষ্পের আইনজীবী কে এম বিজয়া বলেন, দলের গঠনতন্ত্র এই পদে শশীকলা নটরাজনকে নির্বাচিত করার অনুমতি দেয় না। স্থানীয় গণমাধ্যমকে শশীকলা পুষ্প বলেন, ‘শশীকলা নটরাজনকে আম্মা (জয়ললিতা) দলের কাউন্সিলর বা এমএলএর আসনই দেননি। আম্মাকে হত্যার চেষ্টা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁকে একবার দল থেকে খোদ আম্মাই বিতাড়িত করেছিলেন।’ জয়ললিতার মৃত্যুর বিচারিক তদন্তেরও দাবি জানান শশীকলা পুষ্প। এবার অন্নপূর্ণা রসুই: এনডিটিভি জানায়, তামিলনাড়ুতে জয়ললিতা জয়রামের প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া ‘আম্মা ক্যানটিনের’ আদলে রাজস্থানে ‘অন্নপূর্ণা রসুই’ করলেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে। এর কার্যক্রম প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার চালু করা ভর্তুকিপ্রাপ্ত ক্যানটিনটির মতোই। গত বৃহস্পতিবার বসুন্ধরা রাজে দরিদ্রদের জন্য নামমাত্র মূল্যে খাবার সরবরাহের উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি দলিত ও গুজার সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তির সঙ্গে খিচুরি ও রসুনের চাটনি ভাগ করে খান। সরকার প্রচুর পরিমাণে ভর্তুকি দেওয়ায় অন্নপূর্ণা রসুইয়ে চার ভাগের এক ভাগ দামে খাবার মিলবে। এখানে খাবারের দাম ধরা হয়েছে পাঁচ থেকে আট রুপি।

রাষ্ট্রপতির কাছে যাবেন খালেদা, ফল কী হবে?

২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো.
আবদুল হামিদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটাই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধান আলোচ্য বিষয়। দেশের গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের আশা আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হোক। তবে তাদের মনে এই ভয়ও আছে যে, অতীতে আলোচনার টেবিলে খুব কম প্রশ্নের ফয়সালা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি জনগণের মনের ভাষা উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে তাদের অকুণ্ঠচিত্তে অভিবাদন জানাব, আর যদি অপারগ হয়, বুঝতে হবে জাতির কপালে আরও অনেক দুর্ভোগ আছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশন গঠনকল্পে ১৩ দফা রূপরেখা দিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে জানানো হয়, তিনি নিবন্ধিত সব দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন। প্রথম পর্যায়ে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও জাসদকে (ইনু) আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আগামীকাল ১৮ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দল। আসলে আলোচনাটি সরাসরি সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে হওয়াটিই ছিল উত্তম। গণতান্ত্রিক দেশে সেটাই হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পরিবেশ আছে বলে মনে হয় না। এর আগে বিএনপি সরকারি দলের প্রতি আলোচনার আহ্বান জানালে আওয়ামী লীগের নেতারা সাফ জানিয়ে দেন, জামায়াতের দোসর বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত রেখেছে। আর আদালত জানিয়ে দিয়েছেন, দাঁড়িপাল্লা কোনো দলের প্রতীক করা যাবে না (শুরু থেকে দাঁড়িপাল্লাই ছিল জামায়াতের দলীয় প্রতীক)। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির আলোচনার উদ্যোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার বলে মন্তব্য করে বলেছেন, ‘তিনি যে সিদ্ধান্ত দেন সেটা আমরা মেনে নেব।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে অনেকে সমঝোতার সবুজসংকেত বলে মনে করেন। আবার কারও মতে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে ফায়দা হবে না। আসল চাবি সরকারের হাতে। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির এটাই প্রথম আলোচনা নয়। ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বরে যখন দশম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অগ্নিকোণে ঝড় বইছিল, তখনো খালেদা জিয়া জোটের নেতাদের নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছিল, যাতে জামায়াতের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির নাজির আহমদও ছিলেন। এবার তিনি বিএনপির ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। জোটের শরিক কেউ থাকবেন না। ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের আমন্ত্রণে বিএনপির নেতারা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। দুবারই তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে অনড় ছিলেন। এবার তাঁদের মুখ্য দাবি যোগ্য ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা হোক।  ২০১৩ সালের বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নেওয়া যেতে পারে পত্রিকার পাতা থেকে। ২০ ডিসেম্বরের যায়যায়দিন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের ২০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হয়ে চলে প্রায় এক ঘণ্টা। বৈঠকে জোটপ্রধান তাঁর দলের অবস্থান জানিয়ে লিখিত বক্তব্য দেন।’ বৈঠক শেষে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব এহসানুল করিম (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব) সাংবাদিকদের বলেন, ‘১৮ দলীয় জোট নেতারা চলমান সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতিকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, কোনো সরকারই অতীতে সংবিধানে এমন কোনো বিধান রাখেনি, যাতে কোনো সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতি ভূমিকা রাখতে পারেন।’ রাষ্ট্রপতির মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯১ সালে যখন দেশ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় পুনরায় ফিরে এল, তখন প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’ রাখা হলো। বিএনপি তখন ক্ষমতায়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, কবর জিয়ারত ও মিলাদ মাহফিলে যোগ দেওয়া ছাড়া তাঁর কোনো কাজ নেই।’ সংবিধান অনুযায়ী সব কাজই তাঁকে করতে হবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে। পৃথিবীর সব দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীই নির্বাহী ক্ষমতার মালিক। অথচ তিনি জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ নন, দায়বদ্ধ পুরো মন্ত্রিসভা। অর্থাৎ ক্ষমতাহীন হয়েও মন্ত্রীরা দায়বদ্ধ। আবার যিনি প্রধানমন্ত্রী তিনিই সংসদ নেতা। ১৯৭২ সালের সংবিধানে অনেক ভালো নীতি ও বিধানের কথা থাকলেও ৭০ ধারার মাধ্যমে সাংসদদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করা হয়েছে। কোনো সাংসদ দলের বিপক্ষে ভোট দিতে এমনকি কথা বলতেও পারেন না। ২০১২ সালে যখন রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখার বিপক্ষে শক্ত যুক্তি তুলে ধরেও ১৪ দলের শরিক জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাংসদেরাও পঞ্চদশ সংশোধনীতে সই দিতে বাধ্য হন। তখনো পর্যন্ত তাঁরা সরকারের অংশীদার না হলেও ভোট দিতে বাধ্য হলেও নৌকার সহযাত্রী ছিলেন। বায়াত্তরের সংবিধানে বর্ণিত সংসদীয় ব্যবস্থার পুরোটাই বিএনপি লুফে নিয়েছিল এই ভরসায় যে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলেও রাষ্ট্রপতি পুরো ক্ষমতা ভোগ করবেন। গত ২৫ বছর সেই ধারাবাহিকতা চলছে। আমরা রাষ্ট্রপতির আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কথা না বলার চেয়ে কথা বলা ভালো। দীর্ঘদিন সভা-সমাবেশ করার অধিকার বঞ্চিত বিএনপির নেতারা অন্তত মনের কথাগুলো রাষ্ট্রপতিকে বলে আসতে পারবেন। বিএনপির প্রধান নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে ১৩ দফা দাবি পেশ করার পর থেকেই তারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে আসছিল। বিএনপির দাবি বা অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি ত্বরিত সাড়া দিয়েছেন, অনেক দুঃসংবাদের মধ্যে এটি সুসংবাদ হতে পারে। কীভাবে? প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীতের বৈরিতা ও অবিশ্বাস দূরে ঠেলে দিয়ে খোলা মন নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ‘সালিস মানি তালগাছটি আমার’ এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। নির্বাচন কমিশন অবশ্যই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্তরিক হলে ১৬ কোটি মানুষের মধ্য থেকে সিইসি বা ইসি পদে পাঁচজন যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে দুই দলেরই দায় আছে। ক্ষমতাসীন হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়টা হয়তো বেশি। কিন্তু বিএনপিকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিএনপির রাজনীতি শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ বিরোধিতা দিয়ে।
এখন আর বিরোধিতার রাজনীতি কল্কে পাবে না। গত আড়াই দশকের ক্ষমতার পালাবদলে ও সমীকরণে কে কার থেকে কী নিয়েছে, সেটি হিসাব-নিকাশ করে দেখতে হবে। মুখে যে যাই বলুন না কেন দুটি দলের মধ্যে ফারাকটি ক্রমেই কমে আসছে। একসময় আওয়ামী লীগ বিএনপির যেসব নীতির বিরোধিতা করত, এখন সেগুলো দলের অলিখিত নীতি হিসেবে নিয়েছে। আবার আওয়ামী লীগেরও অনেক নীতি বিএনপি আত্মস্থ করেছে। পেশিশক্তি লালন ও কালোটাকা পালনের বদনাম দুই দলের গায়েই লেগেছে। রাষ্ট্রপতির আলোচনার উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা তাঁর ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ওপর। অন্যরা নিজ নিজ দল ও জোট প্রধানের নামে কোরাস গাইবে। বিএনপি বলেছে, সার্চ কমিটিতে তাদের তালিকা থেকে অন্তত দুজনকে নেওয়া হোক। আমরা যদি ধরে নিই পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি হবে, বাকি তিনজনের নাম ক্ষমতাসীন জোট ও দল দিতে পারে। উভয় পক্ষের সমঝোতামাফিক সার্চ কমিটি হলে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাথাব্যথাও কমবে। সার্চ কমিটিই ঠিক করবে কে সিইসি ও কারা কমিশনার হবেন। সার্চ কমিটি যদি ১০টি নাম দেন (গতবারও যেভাবে দেওয়া হয়েছিল) রাষ্ট্রপতি তার থেকে পাঁচজনকে বেছে নেবেন। এবার দাবি উঠেছে নির্বাচন কমিশনার পদের মধ্যে একজন নারীকে নেওয়া হোক। অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি। আশা করি, বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি এসেছে বলে আওয়ামী লীগ নাকচ করে দেবে না।
কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ নির্বাচন কমিশন গঠন নয়। নির্বাচন কমিশনকে তার আইন ও বিধান অনুযায়ী কাজ করতে দেওয়া। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। নির্বাচন কালে দল, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা কী হবে—সেসব বিষয়ও একটি সমঝোতায় আসতে হবে। তিন জোটের রূপরেখার মতো যার সাংবিধানিক ভিত্তি না থাকলেও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকবে। পুরো আলোচনায় অনুসন্ধান করতে হবে অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে কেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কেন অকার্যকর হলো, কেন নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে কখনো​ই রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারছে না। রাজনৈতিক বিবাদ সত্ত্বেও আশির দশকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কাছাকাছি আসতে পেরেছিল। ১৯৯১ সালে দুই দল মিলেই যত ভঙ্গুরই হোক, একটি সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করেছিল। সেটি কেন কাজ করল না? বর্তমান সংসদে বিএনপি নেই, মানলাম। বিগত চারটি সংসদে (১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬-২০০১, ২০০১-২০০৬, ২০০৯-২০১৪) তো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই ছিল। কখনো ক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলে। তারপরও সংসদ পুরোপুরি কার্যকর করা গেল না কেন? এর পেছনে নীতি না উগ্র ক্ষমতাবাসনা কাজ করেছে, যৌক্তিক আন্দোলন না গোঁয়ার্তুমি সক্রিয় ছিল—সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি বলে মনে করি। নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী বিএনপি কাছাকাছি আসতে পারলে সুড়ঙ্গের শেষে মৃদু আলো দেখা যেতে পারে। অন্যথায় কী হবে কেউ বলতে পারে না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

Thursday, December 15, 2016

‘মোদির বেলুন চুপসে যাবে বলে আমাকে কথা বলতে দিচ্ছে না’

দিন কয়েক আগে বলেছিলেন, মুখ খুললে ভূমিকম্প হয়ে যাবে। গতকাল বুধবার রাহুল গান্ধী বললেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত দুর্নীতির এমন তথ্য তাঁর কাছে আছে, যা জানাজানি হলে ওঁর বেলুন চুপসে যাবে। সেই জন্যই তাঁকে সংসদে বলতে দেওয়া হচ্ছে না। নোট-বন্দী নিয়ে এক মাস ধরে অচল সংসদ বুধবারও সচল না হওয়ায় অন্য বিরোধী নেতাদের পাশে নিয়ে কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের এই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে কী কী তথ্য আছে, তা প্রধানমন্ত্রী জানেন। সবই তাঁর ব্যক্তিগত দুর্নীতির কাহিনি। এর মোক্ষম প্রমাণ আমার কাছে রয়েছে। এসব জানেন বলেই তিনি ভয় পেয়ে গেছেন। তাই আমাকে সংসদে বলতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ আমরা সব বিরোধী এক জোট হয়ে আলোচনা চেয়েই আসছি।’ রাহুল বলেন, ‘আমি এসব তথ্য বাইরে প্রকাশ করতে চাই না। চাই নির্বাচিত সদস্য হিসেবে লোকসভায় বলতে। কারণ, এ দেশের গণতন্ত্র সেই অধিকারই আমাকে দিয়েছে। আমার অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী শুনুন। তারপর তাঁর জবাব দিন। মানুষ বুঝে নিন কে সত্য কে মিথ্যা। কিন্তু ভয়ে থরথর বিজেপি তা শুনতে চায় না। তাই আমাদের বলতেও তারা দিচ্ছে না।’ সারা দেশে ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করার পর পাঁচ সপ্তাহ কেটে গেছে। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেরও এক মাস হয়ে গেল। এই এক মাসে ১৯টা কাজের দিন এই নোট-বন্দী নিয়েই ভেস্তে গেল। বাকি আর মাত্র দুই দিন। সেই দুই দিনেও নোট-বন্দী নিয়ে কোনো আলোচনাই যে হবে না, তা প্রায় নিশ্চিত হয়েই বলা যায়। বিরোধী ও সরকার দুই পক্ষই একে অপরকে সন্দেহ করছে। মনে করছে, এক পক্ষের বক্তব্য শেষ হলে তারা অন্য পক্ষকে কিছুতেই বলতে দেবে না।
এই কারণেই নোট-বন্দী নিয়ে কোনো কক্ষেই আর কোনো পক্ষ আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও আলোচনার রাস্তায় হাঁটতে চাইছে না। বুধবার অধিবেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই তাই রাহুল সংবাদ সম্মেলন করে এই কথা বলেন। রাহুলের বক্তব্যকে বিজেপি উড়িয়ে দিয়েছে। দলের দুই নেতা অনন্ত কুমার ও প্রকাশ জাভড়েকর বলেছেন, রাহুল যা-ই বলুন, ওর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। তাঁরা বলেন, রাহুল ও কংগ্রেস এসব আজগুবি কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন অগস্তা হেলিকপ্টার দুর্নীতি থেকে চোখ ফেরাতে। এই দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক বায়ুপ্রধান এস পি ত্যাগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কংগ্রেসের ভয়, এই দুর্নীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং জড়িয়ে পড়বেন। তা চাপা দিতেই রাহুল এসব কল্পিত কাহিনি শুরু করেছেন। বিহার থেকে বিজেপির সদস্য নিশিকান্ত দুবে সন্ধ্যায় বলেন, রাহুল এত কথা না বলে যা তথ্য-প্রমাণ আছে তা প্রকাশ করুন। দেখা যাক সত্য-মিথ্যার মিশেল কতটা। নোট-বন্দী নিয়ে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও সরকারের বিরুদ্ধে সরব। কিন্তু রাহুলের বক্তব্যের পর তিনি বুধবার বলেছেন, কংগ্রেসের সহসভাপতির কাছে মোদির দুর্নীতির কোনো তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা তিনি প্রকাশ করুন। হেঁয়ালির কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু তা তিনি করছেন না। বিজেপি যেমন অগস্তা ওয়েস্টল্যান্ড নিয়ে কংগ্রেসকে চাপে রাখতে চাইছে, কংগ্রেসও তেমন করছে। এটা আসলে ‘গট আপ গেম’।

জয়ললিতার দ্বিতীয় শেষকৃত্য!

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম জয়ললিতার দ্বিতীয় শেষকৃত্য করার দাবি করেছেন তাঁর জ্ঞাতিভাই বলে দাবি করা এক ব্যক্তি। ৬ ডিসেম্বর মারা যাওয়া জয়ললিতাকে হাজারো শোকার্ত ভক্তের উপস্থিতিতে সমাহিত করা হয়েছে। জয়ললিতার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মরদেহ দাহ করার বদলে সমাহিত করা হয়। এর মধ্যে বিশ্লেষকদের অনেকে ভারতের হিন্দু সমাজে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী জাতপাতের সংস্কৃতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছেন। জয়ললিতাকে প্রথা ভেঙে সমাহিত করায় বিবিসি হিন্দির সাংবাদিক ইমরান কোরেশিকে নিজ অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন তাঁর জ্ঞাতিভাই দাবি করা কে ভরদারজন নামের ওই ব্যক্তি।
ভরদারজন বলেন, তিনি জয়ললিতার কুশপুতুল তৈরি করে ধর্মীয় প্রথামতে তা দাহ করেছেন। আর এর মধ্য দিয়ে বিপুল জনপ্রিয় এই প্রয়াত নেত্রীর দ্বিতীয় শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছেন তিনি। তবে জয়ললিতার ভাগনি দীপা জয়রাম প্রয়াত এই মুখ্যমন্ত্রীর জ্ঞাতিভাই হওয়া নিয়ে ভরদারজনের দাবির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন। দীপা বলেন, ‘আমার মনে হয় না, কর্ণাটকের মহীশুরে আমাদের কোনো আত্মীয় আছেন, যিনি এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন। আমাদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য দেশের বাইরে থাকেন।’

এক নম্বরে পুতিন

মার্কিন বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস ২০১৬ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ৭৪ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে।
এতে এক নম্বরে রয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফোর্বস-এর তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছেন যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল। এই নিয়ে পরপর চার বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ফোর্বস-এর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের তালিকায় শীর্ষস্থান পেলেন। পত্রিকাটির কথায়, পুতিন তাঁর নিজের দেশ, সিরিয়া এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই যা চেয়েছেন তা-ই পেয়েছেন।

দাভাওতে নিজের হাতেই হত্যা করেছি: দুতার্তে

নিজ হাতে মানুষ খুন করার কথা স্বীকার করলেন বেফাঁস কথাবার্তার জন্য পরিচিত ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে। গত সোমবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলার সময় দুতার্তে বলেন, দক্ষিণের শহর দাভাওয়ের মেয়র থাকার সময় পুলিশের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য সন্দেহভাজন অপরাধীদের তিনি নিজেই খুন করেছিলেন। কিছুদিন আগেই তাঁর এক সাবেক সহযোগীও এ রকম দাবি করেছিলেন।
গত জুনে ক্ষমতায় আসার পর দুতার্তের শুরু করা কঠোর মাদকবিরোধী ও অপরাধ দমন অভিযানে নির্বিচার সন্দেহভাজনদের হত্যা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে প্রসঙ্গে সোমবার রাতে প্রেসিডেন্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। দুতার্তে তাঁদের বলেন, ‘দাভাওতে এমনটা (হত্যা) আমি নিজে হাতেই করতাম। শুধু তাদের (পুলিশ) দেখানোর জন্য যে যদি আমি পারি, আপনারা নয় কেন? ...দাভাওতে আমি মোটরসাইকেল নিয়ে বের হতাম, সড়কে সড়কে ঘুরতাম, দেখতাম কোথাও কোনো ঝামেলা হচ্ছে কি না।’ রদ্রিগো দুতার্তে তাঁর অপরাধ দমন কৌশল নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার জবাব দিয়ে বলেন, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলবেই। গত অক্টোবরে দুতার্তে নিজেকে অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, ৩০ লাখ নেশাখোরকে হত্যা করতে পারলে তিনি খুশি হবেন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গণমানুষের আবেগের ফসল

আসাদুজ্জামান নূর
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া
প্রথম আলো : আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, ডিসেম্বর মাস আপনার কাছে বিশেষ কী নিয়ে হাজির হয়?
আসাদুজ্জামান নূর : ডিসেম্বর তো অবশ্যই বিশেষ। আসলে আমার কাছে শুরুটা তো বেশ আগে থেকেই। সেই ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ঘূর্ণিঝড়, ত্রাণ নিয়ে যাওয়া, সংসদ অধিবেশন বাতিল হওয়া। এরপর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ৮ মার্চ আমার নিজের এলাকায় ফিরে আসা, এরপর মুক্তিযুদ্ধের শুরু—এসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্য দিয়েই একাত্তরের ডিসেম্বর এসেছে আমাদের জীবনে। এখনো ডিসেম্বর আসে এগুলো নিয়েই। কোনোটিই বাদ দিতে পারি না।
প্রথম আলো : আপনারা কী বিবেচনা থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন?
আসাদুজ্জামান নূর : আসলে প্রথমে আমাদের ভাবনা ছিল বধ্যভূমিগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। এই চিন্তা থেকে আমরা কুল্লাপাথার বধ্যভূমি পরিদর্শনে যাই। তারপর খুলনার চুকনগরসহ আরও কিছু বধ্যভূমিতে যাই। সেসব দেখার পর আমাদের মনে হয়েছে কাজটি সরকার বা সরকারি উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়। তখন আমরা অন্যভাবে চিন্তাভাবনা করা শুরু করি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখার মতো কোনো উদ্যোগ তখনো ছিল না, অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে ও হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। তখন একটা জাদুঘর গড়ে তোলার ভাবনা নিয়ে আমরা এগোই। আটজনের একটি ট্রাস্টি গঠন করা হয়। আমরা প্রত্যেকে ২৫ হাজার করে টাকা দিই। সেগুনবাগিচার বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়। এটি আক্কু চৌধুরীর বোনের শ্বশুরবাড়ি। সেই পরিবারের লোকজনও আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। তাঁরা অনেক কম ভাড়াতেই বাড়িটি আমাদের দিয়েছেন।
প্রথম আলো : আপনাদের এই উদ্যোগের প্রতি সমাজের সাড়া কেমন ছিল?
আসাদুজ্জামান নূর : উদ্যোগ সফল করতে আমরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। সব মহল থেকেই ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব দলের নেতা-কর্মীরা সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন। সবাই টাকা দিয়ে সহায়তা করতে পেরেছেন এমন নয়, কিন্তু আমাদের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। যুদ্ধের স্মারক উপাদান সংগ্রহের ক্ষেত্রেও আমরা সব পর্যায়ে সহযোগিতা পেতে শুরু করি।
প্রথম আলো : আনুষ্ঠানিক যাত্রা কবে?
আসাদুজ্জামান নূর : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্বোধন হয় ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ। সেগুনবাগিচায় আমরা জাদুঘরের সামনে প্যান্ডেলসহ একটি মঞ্চ করেছিলাম। সেদিন এমন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল যে আমরা আর সেখানে অনুষ্ঠান করতে পারিনি। জাদুঘরের ভেতরের প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে সবাইকে ভিজতে হয়েছে। পরে যখন সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া শুরু হলো, তখন আমাদের অনেকেরই চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছিল। দর্শক-শ্রোতাদেরও অনেকেই আবেগ সামলাতে পারেননি। এই জাদুঘরের সঙ্গে আমাদের সবার একটি আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। অনেক দেশেই হয়তো ওয়ার মিউজিয়াম আছে, কিন্তু এ ধরনের একটি উদ্যোগ বা জাদুঘর খুব কমই আছে। এ জাদুঘরে দর্শনার্থীদের জন্য একটি মন্তব্য খাতা রয়েছে। সেখানে লেখা বিভিন্ন দর্শনার্থীর মন্তব্য পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন এই জাদুঘরকে ঘিরে মানুষের কত গভীর আবেগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কতটা সংরক্ষণ করতে পেরেছি তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে আবেগ রয়েছে, তা এই জাদুঘরের মাধ্যমে ধারণ করা গেছে।
প্রথম আলো : ১৯৭৫ সালের পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার বিষয়টি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। বরং এসব বিষয় চেপে রাখার উদ্যোগই লক্ষণীয় ছিল। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সূচনা পর্বের যে আবেগের কথা আপনি বললেন, দীর্ঘ সময়ের সেই বদ্ধ পরিস্থিতিই কি মানুষকে এত আবেগাক্রান্ত করেছিল?
আসাদুজ্জামান নূর : বলতে পারেন দীর্ঘ সময় একটি পাথর চাপা দেওয়া ছিল। আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার উদ্যোগ নিই, তখন এটা যেন ছিল ঝরনার মুখ থেকে পাথর সরিয়ে দেওয়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘ সময় আমরা কোনো কথা বলতে পারিনি। টেলিভিশনে একধরনের বিধিনিষেধ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নাটক ও অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বাধা ছিল। বঙ্গবন্ধু তো তখন বাংলাদেশ টিভিতে কার্যত নিষিদ্ধ। পত্রপত্রিকায়ও বঙ্গবন্ধুর ছবি তেমন ছাপা হতো না। একটা দীর্ঘ সময় আমরা একটি দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি।
প্রথম আলো : আপনারা যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ও কাজ শুরু করেছিলেন, তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। তখন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছেন কি?
আসাদুজ্জামান নূর : তারা এ ব্যাপারে কোনো উৎসাহ দেখায়নি, তবে বাধাও দেয়নি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ১৯৯৬ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়েছে আর সে বছরই ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু স্মারক জাদুঘরে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগ এবং আজ এ পর্যায়ে আসার পেছনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বড় অবদান রয়েছে। বর্তমানে আমরা সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত অনুদান পাই। এর বাইরেও বিশেষ অনুদান পেয়ে থাকি।
প্রথম আলো : আগারগাঁওয়ে বর্তমানে বৃহত্তর পরিসরে ও নিজস্ব জায়গায় যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তৈরির কাজ চলছে, তার শুরুটা কীভাবে? আর বর্তমান অবস্থা কী?
আসাদুজ্জামান নূর : বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমরা জমির জন্য আবেদন করেছিলাম। নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে জমিটি পেয়েছি। নামমাত্র দামে সরকার আমাদের জমিটি দিয়েছে। এই জাদুঘর বানানোর উদ্যোগের জন্য বড় তহবিলের প্রয়োজন ছিল। জনগণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় আমরা কাজটি এগিয়ে নিয়েছি। সাধারণ মানুষ অর্থ জুগিয়েছেন। ধনী ব্যক্তিরা ও বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ভবনের জন্য আমরা নকশা আহ্বান করেছিলাম। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ও একটি কমিটির মাধ্যমে সেই নকশা চূড়ান্ত করা হয়। আগারগাঁওয়ে সেই জাদুঘর তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পথে। এখন গ্যালারি সাজানোর কাজ চলছে। দুজন মার্কিন কিউরেটর কাজ করছেন। আগামী মার্চে উদ্বোধন করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা উদ্বোধনের জন্য তারিখ চেয়েছি।
প্রথম আলো : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি—এসব পরিচয়ের বাইরে আপনি এখন বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী। সেদিন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গসংগীতের অনুষ্ঠানে আপনি দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্বের কথা বলেছিলেন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো আপনার।
আসাদুজ্জামান নূর : আসলে সংস্কৃতিচর্চা শুরু হয় প্রথমে বাড়ি থেকে, তারপর স্কুল থেকে। এখন আমরা দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখতে পাচ্ছি। সামগ্রিকভাবে মূল্যবোধের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আয়-রোজগারের দিকটিই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। শিক্ষার সবকিছু পাঠ্যপুস্তকনির্ভর হয়ে পড়েছে। শিক্ষার মান কমেছে। গ্রামের অনেক স্কুলে শিক্ষকদের মান ভালো নয়। আগে একজন শিক্ষক যে দায়িত্ব নিয়ে একজন ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা ও বিকাশে ভূমিকা রাখতেন, সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। পরিবেশটাই বেশ বদলে গেছে। সংস্কৃতির চর্চা মানে তো শুধু নিজে গান গাওয়া বা অভিনয় করা নয়। গান শোনা বা নাটক দেখাও সংস্কৃতিচর্চার অংশ। স্কুল পর্যায়েই কাজটি করতে হয়। তবে মন্ত্রণালয় হিসেবে সংস্কৃতিচর্চা বাড়াতে নানা পর্যায়ে আমরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সাংস্কৃতিক অবকাঠামো যথেষ্ট আছে। উপজেলা পর্যায়েও আমরা মুক্তমঞ্চ বা গণগ্রন্থাগার গড়ে তুলছি। ফলে সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে আমাদের নানা উদ্যোগ অব্যাহত আছে।
প্রথম আলো : আপনি পরিবার ও স্কুল পর্যায়ে সমস্যার কথা বললেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংস্কৃতিচর্চা নিশ্চিত করার দায়িত্বটা তো সরকারের।
আসাদুজ্জামান নূর : আমরা বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গান শেখানোর কর্মসূচি বর্তমানে চালু আছে। তা ছাড়া ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যায়ে যাঁরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত, আমরা তাঁদের সহায়তা করার চেষ্টা করছি। সরকারের কাঠামোর বাইরেও অনেক প্রতিষ্ঠানকে আমরা নানাভাবে সম্পৃক্ত করছি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই আমরা কাজ করছি। ঢাকায় দেখবেন কত অনুষ্ঠান হচ্ছে। হল খালি পাওয়া যায় না। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে আমরা উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখার উদ্যোগ হোক বা জঙ্গিবাদ মোকাবিলার চেষ্টা হোক, সংস্কৃতির চর্চা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রথম আলো : সরকার কি এই দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে? সরকারের নীতির ক্ষেত্রে কি এর প্রতিফলন রয়েছে?
আসাদুজ্জামান নূর : সংস্কৃতিচর্চা বাড়ানোর বিষয়টি সরকার খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এই খাতে বাজেট বাড়ানো হচ্ছে। নিয়মিত বাজেটের বাইরেও আমরা বরাদ্দ পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর এসব ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ আছে। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবেও খোঁজখবর রাখেন। সংস্কৃতির চর্চা যে বাড়ানো দরকার, তা এখন নতুন করে বেশ আলোচনায় এসেছে। আমার মনে হয়, পাঠ্যক্রমের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। আমরা সম্ভবত স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি। ছাত্রছাত্রীরা সময় পাচ্ছে না। তারা যে মনের আনন্দে একটু খেলাধুলা করবে, ছবি আঁকবে, সেই সুযোগগুলো তাদের দিচ্ছি না। পরীক্ষা আর ফলাফলের চাপ তাদের সব সময় কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের সময়ে মনে আছে পরীক্ষার ফলাফলে ভূমিকা না থাকলেও খেলাধুলার ক্লাস হতো, দ্রুত পঠনের ক্লাস হতো। এসব নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
আসাদুজ্জামান নূর : ধন্যবাদ।