Thursday, March 19, 2015

‘এমন বাজে আম্পায়ারিং জীবনে দেখিনি’

বাংলাদেশের বিপক্ষে বাজে আম্পায়ারিংয়ে ক্ষুদ্ধ আতহার। ফাইল ছবি
রোহিত শর্মাকে রুবেল হোসেনের করা ৪০তম ওভারের চতুর্থ বলে আম্পায়ারের ‘নো’ ডাকা নিয়ে ক্রিকেট দুনিয়ায় ঢের বিতর্ক। আম্পায়ার ইয়ান গৌল্ডের দেওয়া ‘নো’ বলটা যে স্পষ্ট ভুল ছিল, তা প্রমাণ হয়েছে এরই মধ্যে। প্রশ্ন আছে মাহমুদউল্লাহর আউটটি নিয়েও। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এমন আম্পায়ারিংয়ে ক্ষুদ্ধ, স্তব্ধ বাংলাদেশের দর্শক-সমর্থকেরা। একই প্রতিক্রিয়া জানালেন বাংলাদেশ দলের সাবেক তারকা ও বর্তমানে ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খানও।
ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে। ঘরোয়া ক্রিকেট, কখনো কখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও বাজে আম্পায়ারিং দেখেছেন। তাই বলে বিশ্বকাপে এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে! সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে ক্ষোভের সঙ্গেই আতহার বললেন, ‘কোয়ার্টার ফাইনালে এমন বাজে আম্পায়ারিং! বিশ্বাসই করতে পারছি না এমন প্রশ্নবিদ্ধ আম্পায়ারিং দেখতে হবে। আই অ্যাম শকড!’
কেন ওই সময় তৃতীয় আম্পায়ারের সহায়তা নিলেন না মাঠের দুই আম্পায়ার, প্রশ্ন আতহারের, ‘জানি হাতে প্রযুক্তি আছে। তবুও কেন মাঠের দুই আম্পায়ার তৃতীয় আম্পায়ারের সহযোগিতা নিলেন না? বিশ্বাসই হচ্ছে না ব্যাপারটা! রুবেলের বলটা দুই আম্পায়ারই ‘নো বল’ ডেকেছেন। প্রথমে গৌল্ড ডাকলেন, এরপর আলিম দারও। যে কোনো আউটের সময় কিন্তু ব্যাটসম্যানকে দাঁড় করিয়ে দেন আম্পায়াররা। কারণ, সিদ্ধান্ত পরিষ্কার হতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু রোহিতের বেলায় কিছুই করলেন না দুজন! যদি তারা একটু সময় নিতেন, টিভি রিপ্লে দেখতেন, তাহলে সিদ্ধান্ত বোলারের পক্ষেই থাকত। ধারাভাষ্যে থাকা শেন ওয়ার্ন পর্যন্ত বললেন, এটা বাজে সিদ্ধান্ত। কিছুতেই নো বল হয়নি।’
আইসিসিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখারও দাবি জানালেন আতহার, ‘জানি না, আইসিসির আইনে কী বলা আছে। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত আইসিসির। ‘‘বেনেফিট অব ডাউট’’ কখন হয়? যখন বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যায় না। তখনই থার্ড আম্পায়ারের সহায়তা নেওয়া হয়। এ ম্যাচে তা হলো কি? তবে দেখেন, মাহমুদউল্লাহর আউটটা আবার তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে গিয়েছে। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তের সময় বারবার ক্যামেরা জুম করে দেখতে হয়। প্রশ্ন ছিল, ধাওয়ানের পা দড়ি স্পর্শ করেছে কি করেনি। এমন প্রশ্নের উত্তর পেতে দূর থেকে দেখার মানে হয় না! ক্যামেরা জুম করে বারবার ধাওয়ানের বাঁ পা দেখতে পারতেন তৃতীয় আম্পায়ার। কিন্তু তিনি ওই অ্যাঙ্গেলে দেখলেনই না। কী অবাক কাণ্ড!’
এটা ঠিক, রোহিতের আউটটা হলেই যে বাংলাদেশ জিতত, তা নয়। তবে ম্যাচের চেহারাটা নিশ্চয় অন্য রকম হতে পারত। কারণ, আম্পায়ারের ওই ভুল সিদ্ধান্তের সময় রোহিতের রান ছিল ৯০। এরপর বাকি ৪৭ রান করলেন ২৫ বলে। আতহার তাই বললেন, ‘সন্দেহ নেই, ভারত আমাদের চেয়ে শক্তিশালী দল। বলছি না, সিদ্ধান্ত ভিন্ন হলেই বাংলাদেশ জিতে যেত। কিন্তু রোহিত ওই সময় আউট হলে ভারতের সংগ্রহ কম থাকত। ৩০০ রানের বেশি তাড়া করা আর ৩০০ রানের কম তাড়া করা—দুটো ভিন্ন বিষয়।’
তবে এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রাপ্তি অনেক। যে লক্ষ্যে খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ, সেটি পূরণ হয়েছে। এ কারণে মাশরাফিদের ‘স্যালুট’ দিচ্ছেন আতহার, ‘আমাদের নায়কদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতেই হবে। কখনো ভাবিনি, বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবে। যে খেলা তারা উপহার দিয়েছে, সাধুবাদ জানাতেই হবে। হ্যাটস অফ টু আওয়ার হিরোজ!’

শিশু সাঈদ হত্যায় ফের রিমান্ডে গেদা : আরো দুই ঘাতকের সন্ধানে পুলিশ by এনামুল হক জুবের

সিলেটে শিশু আবু সাঈদ অপহরণ ও খুনের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত কথিত র‌্যাবের সোর্স আতাউর রহমান গেদাকে আরো তিনদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তাকে প্রথম দফায় রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করতে পারেনি পুলিশ। তবে, সে যেসব তথ্য দিয়েছে তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাহ মোঃ ফজলে আজিম পাটোয়ারী। তিনি বৃহস্পতিবার আতাউর রহমান গেদাকে রিমান্ড শেষে সিলেট চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জহিরুল গনি চৌধুরীর আদালতে হাজির করেন ও আরো ৭দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান। শুনানী শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে, শিশু আবু সাঈদ অপহরণ ও খুনের ঘটনায় জড়িত আরও দুইজনকে হণ্য হয়ে খুঁজছে পুলিশ । তাদেরকে গ্রেফতারে পুলিশ নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে। এই দুই কিলারের মধ্যে একজন জেলা ওলামা লীগের প্রচার সম্পাদক মুহিবুর রহমান ওরফে মাছুম, অপরজনকে এখনো সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। হত্যাকান্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃত ৩ জনের মধ্যে পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর রহমান ও জেলা ওলামালীগের সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম রাকিব (আবদুর রাকিব) এর দেয়া ১৬৪ ধারা জবানবন্দি থেকে এ দুই ‘কিলারের’ তথ্য উঠে এসেছে। আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে এবাদুর ও রাকিব জানায়, তাদের সাথে অপহরণ ও কিলিং মিশনে অংশ নেয় জেলা ওলামালীগের প্রচার সম্পাদক মুহিবুর রহমান ওরফে মাছুম ও আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী এক যুবক। ওই যুবকটি লম্বা ও শ্যামলা বলে জবানবন্দিতে উল্লে¬খ করেছে এবাদুর ও রাকিব। অপহরণের পরিকল্পনা বৈঠক থেকে শুরু করে অপহরণ, চাঁদাদাবি ও খুনের সাথে ওই যুবক জড়িত ছিল সরাসরি। তবে, জবানবন্দিতে যুবকটির নাম পরিচয় জানায়নি তারা। গ্রেফতার হওয়া আতাউর রহমান গেদা ওই যুবকটিকে নিয়ে এসেছিল বলে জানিয়েছে তারা। জবানবন্দিতে এবাদ ও রাকিব জানায়, শিশু সাঈদকে অপহরণ করে মোটর সাইকেলে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় রায়নগর এলাকার গেদার বাসার পাশের একটি বাসায়। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে সাঈদকে নিয়ে আসা হয় কুমারপাড়া ঝর্ণারপাড়ে এবাদুরের বাসায়। জবানবন্দিতে ওই অটোরিকশা চালকের পরিচয় জানাতে না পারলেও রাকিব তাকে হালকা-পাতলা গড়নের বলে উল্লেখ করেছে। পুলিশ ওই অটোরিকশা চালককেও খুঁজছে। তাকে পাওয়া গেলে অপহরণকারীদের সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।
উল্লখ্য, নিহত শিশু আবু সাঈদ সিলেট নগরীর রায়নগর দর্জিবন্ধ বসুন্ধরা ৭৪ নম্বর বাসার আবদুল মতিনের পুত্র ও শাহী ঈদগাহ এলাকাধীন হযরত শাহ মীর (রহ.) সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র। মামার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার পথে ১১ মার্চ বুধবার সকাল ১১টার দিকে নগরীর রায়নগর এলাকা থেকে অপহৃত হয় আবু সাঈদ (৯)। এরপর শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর কুমারপাড়া ঝর্ণারপার এলাকায় পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর রহমানের বাসা থেকে তার গলিত লাশ উদ্ধার করে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বিশেষ কৌশলে এসএমপি’র বিমানবন্দর থানার কনস্টেবল এবাদুর ছাড়াও আটক করা হয় জেলা ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাকিব ও র‌্যাব-পুলিশের কথিত সোর্স গেদা মিয়াকে।
হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন
সিলেট নগরীর হাজী শাহমীর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র আবু সাঈদের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি সিলেট মহানগর শাখা।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা সাঈদ হত্যারকারীদের দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানিয়ে বলেন, আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর যাতে কোন মায়ের বুক খালি না হয়।
সমিতির সভাপতি জেসমিন সুলতানার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক হাফছা আক্তারের পরিচালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন মতি লাল গুপ্ত, নুরুল ইসলাম, নিকেতন দাস, সেলিনা বেগম, সালমা জাহান, কানিজ আয়েশা, হুছনা বেগম, সংকরী কর, শাহনারা বেগম, রোজিনা বেগম, অজিত পাল, আজাদ মিয়া, শামীম আহমদ প্রমুখ।

সিটি নির্বাচনের তফসিল রাজনৈতিক সঙ্কটকেই আরো জটিল করবে : জামায়াত

ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনে দখলদার ফ্যাসিবাদী সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবিতে ২০ দলীয় জোটের ডাকে দেশব্যাপী চলমান অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি সফল করায় নগরবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, যখন সরকারের অব্যাহত গুম-খুন আর গণগ্রেফতারের কারণে বিরোধীজোটের নেতা-কর্মীরা বাসায় থাকতেই পারছে না, বিরোধীজোটের নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হচ্ছে তখন প্লেয়িংলেভেল ফিল্ড তৈরী না করেই ৫ জানুয়ারির সরকারি ফর্মুলায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের এই তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সরকারের নিয়ন্ত্রিত নিপীড়কযন্ত্রের ভূমিকা রাখছে।
রাজশাহী ও সিলেটে নিবাচিত মেয়রদের বরখাস্ত করে সরকারদলীয় লোকদের মেয়রের চেয়ারে বসাচ্ছে আর ঢাকা, চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশন ইলেকশনের তফসিল ঘোষণা শাসকদলের প্রতি নির্বাচন কমিশনের নির্লজ্জ আজ্ঞাবহের নিকৃষ্ট নমুনা। দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় বিরোধীজোট সমর্থিত বিজয়ী চেয়ারম্যান্যাদের রাজনৈতিক কারণে বরখাস্ত করে যখন জনগণের ভোটাধিকার বিলুপ্ত করা হচ্ছে এমন সময় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটকেই আরো জটিল করবে।
প্রধানমন্ত্রী বিরোধীজোটের আন্দোলনকে কলুষিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতেই বলেন, সন্ত্রাসীদের জনগণ ভোট দিবে নাকি? ঢাকা বার ও সুপ্রীম কোর্ট বারের নির্বাচনে ভোটাররা কাদের ভোট দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী কী তা লক্ষ করেননি? জনগণ কাদের ভোট দিবে সেটা দেখার জন্যই শাসকগোষ্ঠীর উচিত এখনি পদত্যাগ করে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া।
তিনি বলেন, গণমানুষের প্রতিবাদী কন্ঠ স্তব্ধ করে দিতে সারাদেশে বিরোধী নেতা-কর্মীদেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা ও গুম করার নীল নকশা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে বর্তমান নিষ্ঠুর শাসকগোষ্ঠী। ৫ জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে জোর করে রাষ্ট্রীয় মতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে, তাদের পক্ষে কোনো জনসমর্থন নেই, আর তাই তারা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো হরণের পাশাপাশি নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য হত্যা, গুম, খুন, অপহরণ, মানুষের বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ এবং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে দেশে দ্বিতীয় বাকশালী শাসন কায়েম করেছে। যেকোনো ধরণের অপকর্ম সংঘটন এখন বর্তমান অবৈধ সরকারের অনুষঙ্গ হয়ে গেছে। অবৈধ মতাসীনদের দ্বারা পরিচালিত গুম খুনের পাশাপাশি চরম দাম্ভিকতা এবং রাষ্ট্র শাসনে জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন দেশবাসীকে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। আর তাই জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করতেই ২০ দলীয় জোটের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতন উপো করে রাজপথে নেমে এসেছে গণতন্ত্রকামী জনতা। এই অবৈধ-ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচারি সরকারের পতনের মাধ্যমে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্রকামী জনতা আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
সরকারের পদত্যাগই চলমান সংকট সমাধানের একমাত্র পথ উল্লেখ করে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাজনৈতিক সঙ্কট রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। কিন্তু সংকট সমাধানের পথে না গিয়ে একগুয়েমি ও হঠকারিতার যে পথ তারা অবলম্বন করছে তা চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরো ঘনীভূত করে তুলেছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে রাস্ট্রিয় শক্তির ব্যবহার কারোই কাম্য নয়। রাজনৈতিক সংকট সমাধান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়। কিন্তু আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার অতি-উৎসাহী ভূমিকা এবং সরকারের তাবেদারী মনোভাব এসব বাহিনীর সম্মানকে প্রশ্নের সম্মূখীন করছে। সরকার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই পুলিশ বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। জনমানুষের মনের ভাষা বুঝে এ অবৈধ, অনির্বাচিত সরকারের গদি রক্ষার জন্য জনগণের বুকে গুলি চালানোর অসাংবিধানিক ও অমানবিক পথ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান আওয়ামী লীগ যা বলে এবং প্রচার চালায় ঠিক তার উল্টোটাই জনগণ বিশ্বাস করে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন যৌক্তিক পরিণতির দিকে না যাওয়া পর্যন্ত অব্যহত থাকবে।
সরকারের তীব্র বাধা, হুমকি-ধমকি, জুলুম-নির্যাতন, গণগ্রেফতার সত্ত্বেও লাগাতার অবরোধ ও হরতাল রাজধানীর মৌচাক, রমনা, পল্লবী, মতিঝিল, বাংলামোটর, মোহাম্মদপুর, শাহজাহানপুর, ডেমরা, কদমতলী, কোতয়ালী, লালবাগসহ বিভিন্ন থানা ও এলাকায় অবরোধ সমর্থনে জামায়াতের কর্মীরা মিছিল, পিকেটিং ও রাজপথ অবরোধ করে। গণতন্ত্র ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অংশ হিসাবে অবরোধ এবং রাজধানীসহ সারাদেশে শুক্রবার ভোর ৬টা পর্যন্ত হরতালসহ সব কর্মসূচী সফল করতে তিনি কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল, সাংবাদিক, ব্যাংক-বীমার কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-ছাত্র, চাকরিজীবি, সাংস্কৃতিকর্মী, আইনজীবীসহ সব পেশা ও শ্রেণীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে এসে এই অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সূত্র : প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

সিলেটে যৌথবাহিনীর অভিযান নিয়ে ধুম্রজাল : দরজায় গুলির দাগ, মাটিতে ছোপ ছোপ রক্ত

সিলেট নগরীর দুটি স্থানে র‌্যাব ও যৌথবাহিনী পরিচয়ে অভিযান ও ‘গোলাগুলি’র ঘটনা নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। এসব স্থানে গুলাগুলির পাশাপাশি আটকের ঘটনা ঘটলেও অস্বীকার করছে যৌথবাহিন। নগরীর চৌকিদেখী ও ঘাসিটুলায় গুলিবর্ষনের ঘটনা ও চারজনকে আটক করে নিয়ে যেতে দেখেছেন স্থানীয় লোকজন। ঘাসিটুলার একটি বাসার দরজায় গুলির দাগ, চৌকিদেখীতে মাটিতে আহত এক ব্যক্তির শরীর থেকে ঝরা ছোপ ছোপ রক্তের দাগও পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ভোররাতে নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমানের ঘাসিটুলার বাসায় যৌথবাহিনী পরিচয়ে অভিযান চালায় একটি বিশেষ দল। তারা বাসায় ঢুকার সময় পর পর ৮ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে স্টিলের দরজায়। বাসা তল্লাশি করে সাইদকে না পেয়ে তারা চলে যায়। সাইদুর রহমানের মেয়ে মণু বেগম জানান, বাবার খোঁজে তারা গুলি করে বাসায় ঢুকে। তল্লাশি করার নামে বাসা তছনছ করে। যাওয়ার সময় রান্না ঘরের দরজা-জানালা ভেঙে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, স্টিলের দরজায় ৮ রাউন্ড গুলির দাগ। তবে, বিষয়টি অস্বীকার করছে পুলিশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট কতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ঘটনা সঠিক নয়। এটা তারা নিজেরা গুলি করে যৌথবাহিনীর ইমেজ নষ্ট করার জন্য করতে পারে।
বিএনপি নেতা সাইদুর রহমানের মেয়ে মনু বেগম ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটার সময় যৌথবাহিনীর সদস্যরা আমাদের বাসায় এসে দরজা খোলার জন্য ডাকাডাকি করে। এ সময় তারা উগ্র আচরণ শুরু করে। ঘরের মধ্যে ছিলো আমার দুই চাচাতো ভাই ও আমরা দুই বোন এবং বাসার ছোট সদস্যরা। তারা কোন ধরনের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নয়। যৌথবাহিনীর সদস্যরা এ সময় চিৎকার করে গালিগালাজ করতে থাকে। দরজা না খুললে গুলি করার হুমকি দেয়। আমরা তাদের কাছে আকুতি করে বলিÑ‘আমাদের ঘরে রাজনীতি করে এমন কেউ নেই’। কিন্তু তাঁরা এরপরই দরজার উপর একেরপর এক গুলি করে। বিকট শব্দে ষ্টিলের দরজার উপর গুলি লাগে। এতে বাসার মহিলা ও শিশুরা কান্নাকাটি শুরু করেন। যৌথবাহিনী সদস্যরা বাড়ির সব জানালায় লাথি মারতে থাকে। ভয়ার্ত এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এক সময় যৌথবাহিনীর সদস্যরা রান্নাঘরের জানালা ভেঙ্গে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে পড়ে। বাসার মহিলাদের হুমকি-ধামকি দেয়। ঘরের ভেতর তন্নতন্ন করে খুজেও কিছু পায়নি তাঁরা। যাওয়ার সময় আমার চাচাতো ভাই রমজান আলীকে আটক করে নিয়ে যায়।’
এদিকে অভিযানে গুলি চালানো সম্পর্কে কোতোওয়ালী থানার ওসি বলেন, ওই বাসা থেকে আটক হওয়া রমজানের বিরুদ্ধে মামলা আছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া চলমান মামলাগুলোতে সেও আসামী। বাসার দরজার উপর ৮ রাউন্ড গুলির কথা অস্বীকার করেন ওসি আসাদুজ্জামান । তিনি বলেন, ‘ওই বাসায় ১ রাউন্ড গুলিও হয়নি। ৮ রাউন্ড তো দূরের কথা। ওই খানে কোন গুলিটুলিই হয়নি।’
এদিকে, অভিযানকালে গুলির ও বাসার দরজা জানালা ভাঙ্গা সম্পর্কে এসএমপির মিডিয়া অফিসার এডিসি রহমত উল্যাহ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কারো বাসার ঢুকতে চাইলে অবশ্যই তাকে দরজা খোলে সহযোগিতা করতে হবে। আর যদি দরজা না খোলা হয় তাহলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বল প্রয়োগ করে বাসায় ঢুকতে পারবে। এটা আইনে আছে।
এদিকে, বুধবার রাতে ১০টার দিকে নগরীর চৌকিদেখির রঙধনু ৪ নম্বর বাসার পাশে গুলির শব্দ শোনেন এলাকাবাসী। ওই সময় স্থানীয়রা দেখেন, র‌্যাবের পোশাক পরা একটি দল গুলিবিদ্ধ একজনসহ তিনজনকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। অভিযান সম্পর্কে তারা জানতে চাইলে বলা হয়, ঢাকা থেকে র‌্যাবের একটি টিম এখানকার একটি ছিনতাইকারী গ্রুপকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ঘটনাস্থলে মাটিতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখেছেন এলাকাবাসী।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, একটি পিলারে এক রাউন্ড গুলির দাগ। রঙধনু ৪ নম্বর বাসার গ্যাস লাইনের রাইজারে গুলিটি লাগলে তাতে আগুনও ধরে যায়। বাসার মালিক জুবেন আহমদ একজন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, গুলির শব্দ পেয়ে কিছু সময় পর আমি বাসা থেকে বের হই। গ্যাস রাইজারে আগুন লাগলে তা নিভাই। এই ঘটনাটি অস্বীকার করেছে পুলিশ ও র‌্যাব-৯। র‌্যাবের এএসপি (মিডিয়া) জালাল উদ্দিন জানান, এ ধরনের ঘটনা তার জানা নেই। গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবি নগরীতে টহল দিচ্ছে। তালিকাভুক্ত আসামি ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। জামায়াত-শিবিরের নেতাদের ধরতে যৌথবাহিনী মাঠে কাজ করছে। তবে, সিলেটের কোথাও এখনো গুলি করে যৌথবাহিনী আসামি ধরেনি। বিএনপি-জামায়াত নিজে গুলি করে যৌথবাহিনীর ওপর দোষ চাপাতে পারে।
চৌকিদেখীর গুলির ঘটনা সম্পর্কে এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গৌছুল হোসেন বলেন, গুলি ছোঁড়ার ঘটনা আমি শুনেছি। তবে, কি কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা আমার জানা নেই।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ by আ ক ম মোজাম্মেল হক

আজ ঐতিহাসিক ১৯ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গাজীপুরের (সেই সময়ের জয়দেবপুর) জনগণ সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। মনে পড়ে মার্চের সেই এক অবিস্মরণীয় গণ-অভ্যুত্থানের কথা। ১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ দুপুরে হঠাৎ এক বেতার ভাষণে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন। এ কথা শোনামাত্রই সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। দেশের সর্বত্রই স্লোগান ওঠে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা’, ‘পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা-বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি-বাঙালি’।
বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পূর্বাণী হোটেলে এক সভায় ইয়াহিয়ার ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ঢাকায় ২ মার্চ ও সারা বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন এবং ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা আহ্বান করেন।
জয়দেবপুরে আমার পরামর্শে ২ মার্চ রাতে তৎকালীন থানা পশু পালন কর্মকর্তা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের সরকারি বাসায় মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিব উল্লাহ সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। সভায় আমাকে (আ ক ম মোজাম্মেল হক) আহ্বায়ক করে এবং মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিকনেতা নজরুল ইসলাম খানকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট এক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সদস্য হন আয়েশ উদ্দিন, মো. নুরুল ইসলাম (ভাওয়ালরত্ন), মো. আবদুস ছাত্তার মিয়া (চৌরাস্তা), থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম হজরত আলী মাস্টার (চৌরাস্তা), মো. শহীদ উল্লাহ বাচ্চু (মরহুম), হারুন-অর-রশিদ ভূঁইয়া (মরহুম), শহিদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ (মরহুম), শেখ আবুল হোসেন (শ্রমিক লীগ), থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাঈদ বকস ভূঁইয়া (মরহুম)। কমিটির হাইকমান্ড (উপদেষ্টা) হন মো. হাবিব উল্লাহ (মরহুম), শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এম এ মুত্তালিব এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নেতা বাবু মনীন্দ্রনাথ গোস্বামী (মরহুম)।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার আগেই আমরা এ কমিটি গঠন করেছিলাম। আমি ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। নিউক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা, যা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৬২ সালেই ছাত্রলীগের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যেই সশস্ত্র যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে বাঙালি সৈন্যদের মধ্যেও নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে, যার বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যাবে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের দায়ের করা ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ মামলায়।
স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই বুঝতে পেরেছিলাম যে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। জয়দেবপুরে (গাজীপুরে) সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ৩ মার্চ গাজীপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের বটতলায় এক সমাবেশ করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
আমরা ৭ মার্চ জয়দেবপুর (গাজীপুর) থেকে হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে করে এবং শতাধিক ট্রাক ও বাসে করে মাথায় লাল ফিতা বেঁধে সোহরাওয়ার্দী (তৎকালীন রেসকোর্স) উদ্যানে জনসভায় যোগ দিলাম। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। আজকে ভাবতেও অবাক লাগে, কীভাবে এ জনস্রোত এসে মিশে গিয়েছিল ৭ মার্চের মহাসমুদ্রে। ৭ মার্চ উজ্জীবিত হয়ে আমরা সম্ভবত ১১ মার্চ গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা (অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) আক্রমণ করি। গেটে বাধা দিলে আমি হাজার হাজার মানুষের সামনে টেবিলে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছি মাইকে। পাকিস্তানিদের বুঝতে পারার জন্য ইংরেজিতে বলি ‘I do hereby dismiss Brigadier Karimullah from the directorship of Pakistan Ordnance Factory and do hereby appoint Administrative officer Mr Abdul Qader (বাঙালি) as the director of the ordnance Factory’. এ ঘোষণায় কাজ হয়েছিল।
পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার পেছনের গেট দিয়ে সালনা হয়ে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসে। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আর পরবর্তী সময়ে ১৫ এপ্রিলের আগে গাজীপুরে যায়নি। পাকিস্তান সমরাস্ত্র কারখানা ২৭ মার্চ পর্যন্ত আমাদের দখলেই ছিল। সম্ভবত ১৩ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি সাহেবজাদা ইয়াকুব আলী জয়দেবপুর রাজবাড়ি মাঠে হেলিকপ্টারে অবতরণ করতে চেষ্টা করলে শত শত মানুষ হেলিকপ্টারের প্রতি ইটপাটকেল ও জুতা ছুড়তে শুরু করলে হেলিকপ্টার না নামতে পেরে ফেরত চলে যায়।
সেদিন ১৭ মার্চ বুধবার, মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে মানুষের ঢল নেমেছিল ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। আমাদের নির্বাচনী এলাকার এমএনএ সামসুল হক (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য), হাবিব উল্লাহসহ আমি গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার সংবাদ দিতে। সন্ধ্যায় আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেয়ে কিছু বলতে চাই কি না বঙ্গবন্ধু জানতে চান। কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রের মজুত কমে গেছে অজুহাতে দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে রক্ষিত অস্ত্র আনার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংবাদ জানাই।
সামসুল হক সাহেবের ইশারায় আমি তরুণ হিসেবে এ অবস্থায় আমাদের কী করণীয় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তুই একটা আহাম্মক, কী শিখেছিস যে আমাকে বলে দিতে হবে?’ একটু পায়চারি করে বললেন, ‘বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে দেওয়া যাবে না। রেসিস্ট দ্য কস্ট অব অ্যানিথিং।’ নেতার হুকুম পেয়ে গেলাম।
১৯ মার্চ শুক্রবার আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহান জেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি রেজিমেন্ট জয়দেবপুরের (গাজীপুর) দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য পৌঁছে যায়। একজন জেসিও (নায়েব সুবেদার) জয়দেবপুর হাইস্কুলের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে (জকি স্মৃতির প্রাইমারি স্কুলের সামনে) গোসল করার সময় জানান যে ঢাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চলে এসেছে। খবর পেয়ে দ্রুত আমাদের তখনকার আবাসস্থল মুসলিম হোস্টেলে ফিরে গিয়ে উপস্থিত হাবিবউল্লা ও শহীদউল্লাহ বাচ্চুকে এ সংবাদ জানাই। শহীদউল্লাহ বাচ্চু তখনই রিকশায় চড়ে শিমুলতলীতে, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্ল্যান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসার খবর দিলে এক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ চারদিক থেকে লাঠিসোঁটা, দা, কাতরা, ছেন, দোনলা বন্দুকসহ জয়দেবপুরে উপস্থিত হয়।
সেদিন জয়দেবপুর হাটের দিন ছিল। জয়দেবপুর রেলগেটে মালগাড়ির বগি, রেলের অকেজো রেললাইন, স্লিপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি, কাঠ, বাঁশ, ইট ইত্যাদি যে যেভাবে পেরেছে তা দিয়ে এক বিশাল ব্যারিকেড দেওয়া হয়। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরও পাঁচটি ব্যারিকেড দেওয়া হয়, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ফেরত যেতে না পারে। দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন মেজর কে এম সফিউল্লাহ (পরবর্তীকালে প্রধান সেনাপতি)। আমরা যখন ব্যারিকেড দিচ্ছিলাম, তখন টাঙ্গাইল থেকে রেশন নিয়ে একটি কনভয় জয়দেবপুরে আসছিল। সে সময় কনভয়ে থাকা পাঁচজন সৈন্যের চায়নিজ রাইফেল তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়।
এদিকে রেলগেটের ব্যারিকেড সরানোর জন্য দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গলের রেজিমেন্টকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আদেশ দেয়। কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্যদের অবস্থান নিয়ে মেজর সফিউল্লাহকে জনগণের ওপর গুলিবর্ষণের আদেশ দেয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা আমাদের (জনতা) ওপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে সামনে আসতে থাকলে আমরা বর্তমান গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওপর অবস্থান নিয়ে বন্দুক ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করি।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে জয়দেবপুরে শহীদ হন নেয়ামত ও মনু খলিফা, আহত হন ডা. ইউসুফসহ শত শত মানুষ। পাকিস্তানি বাহিনী কারফিউ জারি করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে আমাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। আমরা পিছু হটলে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিষ্কার করে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চান্দনা চৌরাস্তায় এসে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সৈন্যকে পেছন দিয়ে আক্রমণ করেন। আমরা সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নেই। কিন্তু পেছনে আর এক পাঞ্জাবি সৈন্য হুরমতের মাথায় গুলি করলে হুরমত সেখানেই শাহাদত বরণ করেন। বর্তমানে সেই স্থানে চৌরাস্তার মোড়ে ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নামে ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।
পরদিন বঙ্গবন্ধু আলোচনা চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে ১৯ মার্চের নিহতের কথা উল্লেখ করলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান উল্লেখ করেন যে জয়দেবপুরে জনতা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আধুনিক অস্ত্র ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে আক্রমণ করেছে এবং এতে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক সৈন্য আহত হয়েছে।
১৯ মার্চের পর সারা বাংলাদেশে স্লোগান ওঠে, ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো, সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করো’।
১৯ মার্চের সশস্ত্র যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক মাইলফলক। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯ মার্চ জাতীয় জীবনে এক স্মরণীয় দিন। তাই জাতীয়ভাবে এই দিবসটি পালিত হলে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যায়ন যথার্থভাবে হবে বলে আমি মনে করি।
আ ক ম মোজাম্মেল হক: মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটাই ফাইনাল!

পাকিস্তানের বিপক্ষে শুক্রবার এ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিতব্য তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটাকেই এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল হিসেবে মানছেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। তার মতে মিসবাহ-উল-হকের দলের কাছ থেকে কঠিন চ্যালেঞ্জই আশা করছে তার দল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গত ১০টি ওয়ানডে ম্যাচের মধ্যে নয়টিতেই পরাজিত হয়েছে পাকিস্তান। কিন্তু এসব পরিসংখ্যানকে আমলে নিতে নারাজ ক্লার্ক। বৃহস্পতিবার এ্যাডিলেড ওভালে অনুশীলনের পরে ক্লার্ক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি মনে করি পাকিস্তানকে দীর্ঘ সময় ধরে নীচু মানের দল হিসেবে গননা করা হয়েছে। বিশেষ করে ছোট ভার্সনের ক্রিকেটে। কিন্তু তাদের দলে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে। তাদের বোলিং আক্রমনও দারুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের দলে তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার চমৎকার সংমিশ্রন রয়েছে। এটা আমাদের জন্য অবশ্যই কঠিন চ্যালেঞ্জ। আমি বিশ্বাস করি তাদের পরাজিত করতে হলে আমাদের সেরাটা দিতে হবে। মূলত এই ম্যাচটাকে আমরা বিশ্বকাপের ফাইনাল হিসেবে দেখছি। পরাজিত হলে দর্শক হয়ে বাকি ম্যাচগুলো উপভোগ করতে হবে, তাই কিভাবে ম্যাচে সাফল্য লাভ করা যায় তার দিকেই এখন আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।’
গ্রুপ পর্বে চারবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শুভ সূচনা করে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয় এবং পরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ১৫১ রানে অল আউট হবার পরে এক উইকেটে পরাজিত হয়। এরপর তারা টানা তিনটি ম্যাচ জিতে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট দল হিসেবেই নক আউট পর্বে উন্নীত হয়। যদিও ক্লার্ক বলেছেন গ্রুপ পর্বের ফলাফলের এখন আর কোন মূল্য নেই, নক আউট পর্বে বিদায় নিলে এই ফলাফল কোন কাজে আসবে না। তিনি বলেন, কালকের দিনটি নতুন একটি দিন। ব্যাট হাতে আমাদের শুন্য থেকে শুরু করতে হবে এবং বল হাতেও তাই। আগে যা ঘটেছে তা এখানে কেউ আমলে নিবে না। আগের ম্যাচের পারফরমেন্সও এখানে কাজে দিবে না। শুধুমাত্র ঐ দিনটির উপর জোড় দিতে হবে এবং এর জন্য প্রস্তুতিও সেভাবেই নিতে হবে। ব্যাটিং, বোলিংয়ের সাথে ফিল্ডিংয়েও নিজেদের শতভাগ উজাড় করে দিতে হবে।
ক্লার্ক আশা করছেন এ্যাডিলেড ওভালের সবুজ পিচ উভয় দলের ফাস্ট বোলাররাই সুবিধা পাবে। মাঠটিকে চমৎকার আখ্যা দিয়ে অসি অধিনায়ক বলেছেন এই উইকেটের পিছনে গ্রাউন্ডসম্যানদের অনেক অবদান আছে। আর তাই কালকের ম্যাচে ফাস্ট বোলাররা বিশেষ সুবিধা পাবে।
অস্ট্রেলিয়া দলে তিনজন বাঁহাতি পেসার মিশেল স্টার্ক, মিশেল জনসন এবং জেমস ফকনারের খেলা প্রায় নিশ্চিত। তবে এদের সাথে প্যাট কামিন্স অথবা জোস হ্যাজেলউডকেও দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তান দলে রয়েছেন ওয়াহাব রিয়াজ, রাহাত আলী এবং সোহেল খানের মত বিশ্বকাপে নিজেদের প্রমান করা পেসাররা।
বিশ্বকাপে একে অপরের মোকাবেলায় শেষ আট ম্যাচে পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়া চারটি করে ম্যাচ জিতেছে। সর্বশেষ চার বছর আগে কলম্বোতে পাকিস্তান চার উইকেটে জয়ী হয়েছিল।
এদিকে কালকের ম্যাচকে সামনে রেখে পাকিস্তানীয় অধিনায়ক মিসবাহ-উল-হক বলেছেন অস্ট্রেলিয়া ফেবারিট হলেও ফেবারিটরাই সবসময়ই ম্যাচে জয়ী হয়না। আর তার প্রমান পাকিস্তান ইতোমধ্যেই দিয়েছে। প্রথম দুই ম্যাচে বাজেভাবে হারার পরেও টানা চার ম্যাচে জয়ী হয়ে শুধুমাত্র কোয়ার্টার ফাইনালই নিশ্চিত করেনি বরং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদেরকেও সমান ফেবারিট মানা হচ্ছে। ক্লার্কের মতই তিনি বলেছেন, নক আউট পর্বের দিনটি একদিনের ম্যাচ, নির্দিষ্ট ঐ দিনটিতে যে দল ভালো খেলবে তাদেরই ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা বেশী। মিসবাহ অবশ্য নিজেদের বোলিং লাইন-আপ নিয়ে বেশী আশাবাদী। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ বলে দল কোনভাবেই শঙ্কিত নয় উল্লেখ করে পাক অধিনায়ক বলেন বিশ্বকাপের শিরোপা জয় করতে হলে যেকোন দলকেই মোকাবেলা করতে হবে। তবে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া কঠিন প্রতিপক্ষ, সে কারনেই সবাই তাদেরকে ফেবারিট মানছে।
অস্ট্রেলিয়ান স্কোয়াড : মাইকেল ক্লার্ক (অধিনায়ক), জর্জ বেইলি, ডেভিড ওয়ার্নার, এ্যারন ফিঞ্চ, শেন ওয়াটসন, স্টিভেন স্মিথ, ব্র্যাড হ্যাডিন (উইকেটরক্ষক), গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, মিশেল মার্শ, জেমস ফকনার, মিশেল জনসন, মিশেল স্টার্ক, জোস হ্যাজেলউড, প্যাট কামিন্স, জেভিয়ার দোহার্তি।
পাকিস্তান : মিসবাহ-উল-হক (অধিনায়ক), আহমেদ শেহজাদ, নাসির জামশেদ, সারফরাজ আহমেদ, ইউনিস খান, হারিস সোহেল, উমর আকমল, শোয়েব মাকসুদ, শহীদ আফ্রিদী, ইয়াসির শাহ, রাহাত আলী, এহসান আদিল, সোহেল খান, ওয়াহাব রিয়াজ।

নিখোঁজের তিন দিন আগে আটক হন গাড়িচালক

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে গ্রেপ্তারের জন্য বেশ কিছুদিন ধরেই চেষ্টা করছিল পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ জন্য একাধিকবার তাঁর গুলশানের বাড়িতে পুলিশ গেছে, তল্লাশিও চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন নিখোঁজ এই বিএনপি নেতার স্ত্রী হাসিনা আহমদ। তিনি বলেছেন, সালাহ উদ্দিন নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে তাঁর দুই গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত কর্মীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বাসাবাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়।
সালাহ উদ্দিন আহমদের ঘটনায় দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে গতকাল বুধবার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংগঠনটি সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজ হওয়াকে গুম বলে অভিহিত করেছে।
হাসিনা আহমদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত কিছুর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া অন্য কে তাঁকে (সালাহ উদ্দিন) ধরে নিয়ে যেতে পারে, তার জবাব তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর পক্ষ থেকেই আসা উচিত। তারা তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। এর মধ্যেই একদল তাঁকে ধরে নিয়ে গেল। অথচ এখন সবাই বলছে, তারা কেউই সালাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেনি। তাহলে তিনি কোথায় গেলেন। এর মধ্যেই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারদলীয় লোকজন বলা শুরু করেছেন, তিনি কোথাও লুকিয়ে আছেন, আর আমরা নাটক করছি।’ তিনি বলেন, বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে বক্তব্য-বিবৃতি পাঠানোর কাজ শুরুর পর থেকেই সালাহ উদ্দিনকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল পুলিশ। একাধিকবার গুলশান ২ নম্বরে তাঁর বাসায় পুলিশ হানা দিয়েছে। সালাহ উদ্দিনকে ধরে নেওয়ার দুই সপ্তাহ আগে ডিবির একটি দল গুলশানের বাসার বিভিন্ন ঘর দেখেছে, তল্লাশি করেছে। প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের লোক এসে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে সালাহ উদ্দিনের বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেন। তিনি বলেন, ‘সব সময়ই যে একটা নজরদারি চলেছে, তা আমরা বুঝতে পারতাম।’
হাসিনা আহমদ বলেন, এর মধ্যেই ৭ মার্চ সালাহ উদ্দিনের দুই গাড়িচালক শফিক ও খোকনকে গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। একই দিনে বাড্ডা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সালাহ উদ্দিনের ব্যক্তিগত সহকারী ওসমান গণিকে। ৯ মার্চ তাঁর ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর বাড়িতেও অভিযান চালানো হয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর কার্যালয়ের দুই কর্মীকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।
পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার খন্দকার লুৎফুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, সালাহ উদ্দিন আহমদের দুই গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারীকে ডিবি গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁরা এখন কারাগারে রয়েছেন।
বিভিন্ন জায়গায় সালাহ উদ্দিনের খোঁজ করেও কোনো তথ্য পাননি বলে জানান হাসিনা আহমদ। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। হাসিনা আহমদ বলেন, ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) খুবই উদ্বিগ্ন। কিন্তু কারও কাছেই কোনো তথ্য নেই। তাঁকে কোথায় নেওয়া হলো, তিনি এখন কী অবস্থায় আছেন, এসব বিষয়ে কেউ ন্যূনতম তথ্যও দিতে পারছেন না। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে আছে। চারটা ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমি কী করব, কী জবাব দেব ওদের, জানি না। বাড়িতে ১০ দিন ধরে রান্না হয় না। প্রতিবেশীরা খাবার-দাবার রান্না করে দিচ্ছেন।’
এইচআরডব্লিউর বিবৃতি: এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের গুমের ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ সরকারের ব্যর্থতার অতীত নজির আছে। সালাহ উদ্দিন আহমদের গুমের ঘটনায় একটি গ্রহণযোগ্য এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার। আর এই তদন্ত দ্রুত হওয়া দরকার। ৮ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা অনেক দেরি হয়ে যাবে।’
বিবৃতিতে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়ে বলা হয়, ১০ মার্চ সালাহ উদ্দিনকে শেষবার দেখা যায়। ওই দিন সন্ধ্যায় পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচয়ে একদল লোক তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। তবে সরকার এ ঘটনায় জড়িত থাকার বা এ সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকার কথা অস্বীকার করছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশের কাছে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করার এবং আদালতে সালাহ উদ্দিনের স্ত্রীর রিট আবেদনের পরও তাঁকে আদালতের সামনে হাজির করা হয়নি। ১৬ মার্চ পুলিশের মহাপরিদর্শক আদালতকে জানান, তাঁর বাহিনীর হাতে সালাহ উদ্দিন নেই। এ বিষয়ে পুলিশ যথেষ্ট তদন্ত করেছে, এমনটা আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়নি। সালাহ উদ্দিনের বিষয়ে শুনানি ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি রাখেন আদালত।
বিবৃতিতে অ্যাডামস বলেন, ‘গুমের অনেক ঘটনার প্রমাণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকার এসব গুমের কোনো তদন্ত করেনি। সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এসব গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যকে কখনো ধরা হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তবে অপরাধ করেও ক্ষমা পাওয়ার যে সংস্কৃতি আগে চলছিল, তা এখনো রয়ে গেছে।
বিবৃতিতে অ্যাডামস বলেন, ‘সালাহ উদ্দিনের গুমের ঘটনা একটি বিস্তৃত প্রবণতার অংশ। দুর্ভাগ্যক্রমে এ বিষয়ে জড়িত থাকার ক্ষেত্রে সরকারের অস্বীকৃতি এবং তদন্তের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ায় অনীহা প্রকাশও সেই একই ধরনের প্রবণতার অংশ।’

দুই নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ড্যানিশ মন্ত্রী by মিজানুর রহমান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন সফররত ডেনমার্কের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা মন্ত্রী মগেন্স জেনসেন। সন্ধ্যা সাতটায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে তার সাক্ষাতের সূচি রয়েছে বলে জানাগেছে। তার আগে সন্ধ্যা ছয়টায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার গুলশানের কার্যালয়ে জেনসেন সাক্ষাৎ করবেন বলে বিএনপি সূত্র জানিয়েছে। সাক্ষাতে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে কূটনীতিক সূত্র দাবি করেছে। গতকাল সকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠক শেষে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের পরামর্শ দিয়েছিলেন ডেনমার্কের মন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, কেবল তার দেশই নয়, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবাই উদ্বিগ্ন। আমরা বিশ্বাস করি, অর্থনীতির স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার ডেনমার্ক সরকারের ওই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি বলেন, যে কোন কোন দেশের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ কতৃপক্ষের ওপর আমাদের আস্থা রয়েছে। আশা করি সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সরকার অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করবে।
সংলাপের পরামর্শ ড্যানিশ মন্ত্রীর
দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন ডেনমার্ক। সঙ্কট উত্তরণে সরকার অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা সফররত ডেনমার্কের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা মন্ত্রী মগেন্স জেনসেন। গতকাল সকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মন্ত্রীর হেয়ার রোডের সরকারি বাসায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকের পর বেরিয়ে যাওয়ার পথে গণমাধ্যমের মুখোমুুখি হন ডেনিশ মন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, কেবল তার দেশই নয়, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবাই উদ্বিগ্ন। আমরা বিশ্বাস করি, অর্থনীতির স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার ডেনমার্ক সরকারের ওই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি বলেন, যে কোন দেশের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের ওপর আমাদের আস্থা রয়েছে। আশা করি, সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সরকার অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করবে। এক প্রশ্নের জবাবে মগেন্স জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিরাপত্তাহীন বোধ করছেন না। বৈঠকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার বিষয়টি স্বীকার করেন অর্থমন্ত্রী। বলেন, হ্যাঁ, এসব (রাজনৈতিক পরিস্থিতি) নিয়ে কথা হয়েছে। তারা তাদের কথা বলেছে। আমিও আমাদের কথা বলেছি। এ অবরোধ-হরতালের কোন কার্যকারিতা নেই। অর্থনীতির চালকরা (ইকোনমিক অ্যাক্টর) নিজস্ব স্টাইল বের করে নিয়েছে, কিভাবে কাজ করতে হবে। সরকার তাদের সহযোগিতা করছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে দাবি করে অর্থমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কর্মকাণ্ডকে ‘ননসেন্স’ বলে মন্তব্য করেন। তিন দিনের সফরে একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে মঙ্গলবার ঢাকায় এসেছেন ডেনিশ ওই মন্ত্রী। সফরের প্রথম দিনে দেশটির সরকারের সহায়তায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বরিশালে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্প পরিদর্শন করেন তারা। গতকাল অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও গাজীপুরের একটি কারখানার কর্মপরিবেশ সরজমিন পর্যবেক্ষণ করেন মন্ত্রী ও সফরসঙ্গীরা। আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছাড়াও সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করবেন ডেনিশ সরকারের প্রতিনিধিরা। দিনের শুরুতে রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠেয় ‘বাংলাদেশ-ফ্রেমিং দ্য ফিউচার’ শীর্ষক তৈরী পোশাক নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনেও অংশ নেবেন। তার সফর নিয়ে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন। এ ছাড়া ডেনিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রতিনিধিদের সফরে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য (ওএসএইচ) খাতে সহযোগিতায় নতুন উদ্যোগের বিষয়ে দুই সরকারের মধ্যে একটি সম্মতিপত্র সইয়ের প্রস্তুতি রয়েছে। তার বিদায়ের আগে এটি সই হতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়নে আগামী পাঁচ বছরে ৬০০ কোটি টাকা সহায়তার আশ্বাস দেন মগেন্স জেনসেন। এদিকে অপর এক বিবৃতিতে ডেনিশ মন্ত্রী বলেছেন, রানা প্লাজা ধসের পর তৈরী পোশাকশিল্পের শ্রমমান ও কারখানার উন্নয়নে বাংলাদেশ আরেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিদেশী বন্ধুদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশ নতুন স্ট্যান্ডার্ড সেট করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তার মতে, এটাই চূড়ান্ত নয়, বাংলাদেশকে অনেক দূর পথ যেতে হবে।

সালাহউদ্দিন নিখোঁজ: ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত

গতকাল জাতিসংঘের নিয়মিত সংবাদ-সম্মেলনে উঠে এলো বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হকের কাছে প্রশ্ন রাখেন বাংলাদেশী সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী। সম্প্রতি বিএনপি’র মুখপাত্র ও যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের নিখোঁজের বিষয়ে জাতিসংঘের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান তিনি। অবশ্য, জাতিসংঘের কাছে নতুন কোন তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন মুখপাত্র। তবে সব রাজনৈতিক দলের সংলাপে অংশ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উল্লেখ করেন মুখপাত্র। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি মতপ্রকাশ ও সভা-সমাবেশের অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন ফারহান হক। জাতিসংঘের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ অংশটুকু এখানে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ, ফারহান। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের সাবেক এক প্রতিমন্ত্রী  এবং বিরোধী দলের (বিএনপি) মুখপাত্রকে (সালাহউদ্দিন আহমেদ) অপহরণ করেছেন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। তার পরিবার দাবি করছে, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা অপহরণ করেছে তাকে। কিন্তু, সরকার তা অস্বীকার করছে। আজ ৮ দিন পার হচ্ছে। কিন্তু, কেউ জানেন না তিনি কোথায় আছেন। সব জায়গায় এটা চলছে। এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ কি? জাতিসংঘ এ বিষয়ে কোন কিছু করছে কি?
মুখপাত্র: সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার আলোচনা করেছি আমরা। বাংলাদেশ ইস্যুতে জাতিসংঘের উদ্বেগ ও সংগঠনটির প্রচেষ্টার ব্যাপারে স্টিফেন (স্টিফেন ডুজাররিক) ও আমি কি বলেছি, তা আপনি জানেন। আজ তার সঙ্গে যোগ করার মতো আর নতুন কোন তথ্য নেই আমার কাছে। তবে আমরা যে বিষয়ে আলোচনা করছি, তার সঙ্গে আপনার উল্লেখিত উদ্বেগের বিষয়টি সঙ্গতিপূর্ণ। সব পক্ষের সংলাপে অংশ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে সভা-সমাবেশ করার অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের সুযোগ করে দেয়ার বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। এ পয়েন্টগুলোতে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছি আমরা। অবশ্যই এ বিষয়গুলো লঙ্ঘনের ব্যাপারে আমরা দৃষ্টি রাখবো।

তুচ্ছ ঘটনা, ভয়াবহ ফলাফল- সাংবাদিককে থানায় আটকে নির্মম নির্যাতন

প্রথম আলোর সাংবাদিক মিজানকে পিটুনির পর ভ্যানে তুলে
হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। ছবিটি মঙ্গলবার মাঝরাতে তোলা
তুচ্ছ ঘটনায় দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি। তাঁদের একজন সাংবাদিক, অন্যজন পুলিশ। তবে পরিচয় জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার মিটমাট হয় এবং দোকানে বসে একত্রে দুজন চাও পান করেন। অথচ এ ঘটনাকে পুঁজি করেই পুলিশের কর্তাব্যক্তির নির্দেশে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে থানায় আটকে চালানো হলো নির্মম নির্যাতন। ভুক্তভোগী এই ব্যক্তি হলেন প্রথম আলোর বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি এ বি এম মিজানুর রহমান।
বাউফল উপজেলার কালাইয়া বন্দর এলাকায় মঙ্গলবার রাতে হাতাহাতির ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য হলেন কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মো. হালিম খান। তাঁকে মারধর ও সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে বাউফল থানায় মিজানের বিরুদ্ধে মামলাটি তিনিই করেন। রাতেই মিজানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গতকাল বুধবার সকালে পটুয়াখালীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম-২ ফাইজুর রহমানের আদালতের মাধ্যমে মিজানকে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। আদালতের হাজতখানা থেকে পুলিশ তাঁকে ধরে গাড়িতে তোলার সময় তিনি ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। হাঁটতে পারছিলেন না। আদালত চত্বরে তাঁর সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে দেয়নি পুলিশ। পরে আইনজীবী লুৎফর রহমান তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। আদালতের বারান্দায় ছেলে মিজানকে দেখে বৃদ্ধ বাবা আবদুস ছালাম কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, মিজানের শারীরিক অবস্থা দেখলে পুলিশের অমানুষিক নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের অনিয়ম তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় তাঁকে এখন নির্যাতন করা হচ্ছে।
যেভাবে ঘটনার শুরু: লুৎফর রহমান সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ল্যাংরা মুন্সির পোল এলাকায় সড়কের ওপর একটি বাসের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। মামলার বাদী উপপরিদর্শক মো. হালিম সাদাপোশাকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে স্থানটি অতিক্রমকালে এই যানজটে পড়েন। সে সময় বিপরীত দিক থেকে মোটরসাইকেলে আসছিলেন মিজান। তখন গালাগাল দিয়ে তাঁকে পেছনে সরে যেতে বলেন ওই পুলিশ সদস্য। মিজান প্রতিবাদ করলে দুজনের মধ্যে শুরু হয় কথা-কাটাকাটি; হাতাহাতি। পরে পরিচয় জেনে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে বলে মিলে যান তাঁরা এবং সড়কের পাশে একটি দোকানে বসে চা খান। এরপর হালিম খানকে মিজান নিজ মোটরসাইকেলে ফাঁড়িতে পৌঁছে দিতে গেলে সেখানে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, মিজানকে থানায় আটকে রেখে রাত ১০টার পর শুরু করা হয় নির্যাতন। একপর্যায়ে মিজান অচেতন হয়ে পড়লে নির্যাতন বন্ধ হয়। লুৎফর রহমান জানান, পুলিশি হেফাজতে কোনো আসামিকে নির্যাতন করা যায় না। ৪ এপ্রিল মামলার শুনানির তারিখ ধার্য করা হয়েছে।
সাজানো মামলার সংক্ষেপ: বাদী মোটরসাইকেলে ফোর্সসহ কালাইয়া বন্দর এলাকায় যানজটে পড়েন। এ সময় বিপরীত দিকে থেকে মোটরসাইকেলে আসামি মিজান আসছিলেন। তখন আসামির সামনে অপর এক মোটর সাইকেলচালককে রাস্তা ক্লিয়ার করতে বললে মিজান বাদীকে কিল-ঘুষি মেরে রক্তাক্ত জখম করেন। খবর পেয়ে ফাঁড়ি থেকে ফোর্স এসে তাঁকে উদ্ধার ও মিজানকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকালে ধস্তাধস্তিতে মিজান সামান্য আহত হন।
এদিকে পুলিশের নির্যাতনে গুরুতর আহত মিজানকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে লিখেছেন, ‘ফিজিক্যাল ইনজুরি (শারীরিকভাবে জখম)’। বাউফল থানার ওসি নরেশ চন্দ্র কর্মকারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
উদ্বেগ: মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার ও পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বরিশাল প্রেসক্লাব। গতকাল এক বিবৃতিতে তাঁকে গ্রেপ্তার ও তাঁর বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগের বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান প্রেসক্লাবের নেতারা।

যেভাবে তুলে নেয়া হয় সালাহউদ্দিনকে

বিএনপির মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে বলপূর্বক গুমের ঘটনায় অবিলম্বে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে অতীতের বলপূর্বক সকল গুমের তদন্তের তাগিদ দিয়ে সংস্থাটির এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, প্রধান বিরোধী দলের সদস্যদের জোরপূর্বক গুমের ঘটনা তদন্তে ব্যর্থ হওয়ার ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। সালাহউদ্দিন আহমেদের জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। জরুরিভিত্তিতে সেটা করতে হবে। কারণ, ৮ই এপ্রিল পর্যন্ত তা অনেক দেরি হয়ে যাবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে সালাহউদ্দিন আহমেদকে তুলে নেয়ার ঘটনার বিবরণও দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, যে বাড়ি থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদকে তুলে নেয়া হয়, ওই বাড়ির কেয়ারটেকারের বক্তব্যমতে ১০ই মার্চ রাত ১০টার দিকে সাদা পোশাকের একাধিক সদস্য ওই বাড়ির সামনে যায়। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয় এবং তাদের ব্যাজ দেখায়। তারা বাড়ির ভেতরে প্রবেশের আধ ঘণ্টা পর নিচে নামে। তাদের সঙ্গে হাতকড়া পরা অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমেদও ছিলেন। তারা তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা মতে, এলিট ফোর্স র‌্যাবের একটি গাড়িও সেখানে ছিল। এরপর থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদ নিখোঁজ রয়েছেন। তার নিখোঁজের ঘটনায় সরকার তাদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে বা এ মুহূর্তে সালাহউদ্দিন কোথায় অবস্থান করছেন, সে ব্যাপারেও কোন তথ্য নেই বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে সালাহউদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ জানান। সালাহউদ্দিন আহমেদকে আদালতে হাজির করার দাবি জানিয়ে তার স্ত্রী এ ব্যাপারে একটি মামলাও করেন। তা সত্ত্বেও, তাকে প্রকাশ্যে আনা হয় নি। ঢাকায় হাইকোর্টের নির্দেশের প্রেক্ষিতে গত ১৬ই মার্চ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি) জানান, তার আওতাধীন নিরাপত্তা বাহিনীসমূহ সালাহউদ্দিনকে আটক করে নি। পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত পরিচালনা করার পক্ষে আদালতে তেমন কোন তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারে নি। শেষ পর্যন্ত আদালতের শুনানি আগামী ৮ই এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যে সহিংসতার সূত্রপাত হয়, চলমান সহিংসতা তারই ধারাবাহিকতা। নির্বাচনের আগে ও পরে বেশ কয়েক শ’ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭ সাল থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্যান্য সংগঠন বাংলাদেশে বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করেছে। বেশির ভাগ গুমের ঘটনা ঘটিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ২০১২ সালে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। তার ভাগ্যে কি ঘটেছে, তা নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে ৭ জনকে অপহরণ ও সুস্পষ্টভাবে চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র‌্যাবের সন্দেহভাজন সদস্যদের ভূমিকা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। তবে সেটাও হয়েছিল গণমাধ্যমের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের কারণে। প্রথমদিকে র‌্যাব কর্মকর্তারা এ ঘটনায় তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু হঠাৎ নিহতদের লাশ যখন নদীতে ভেসে ওঠে তখন সব ফাঁস হয়ে যায়। এ বছর জানুয়ারির শুরুতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে সহিংসতা চলছে তারই মাঝে গুম করা হয়েছে সালাহউদ্দিন আহমেদকে। এ বছরের এই সহিংসতায় দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শত শত মানুষ। বিরোধী দল যখন হরতাল বা অবরোধ পালনের পক্ষে নেমেছে তখনই এসব ঘটনা ঘটেছে বেশি। সারা দেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে। ব্রাড অ্যাডামস তার বিবৃতিতে বলেন, কর্তৃপক্ষ বলপূর্বক গুমের বহু ঘটনা গুরুত্ব সহকারে নথিভুক্ত করেছে। তা সত্ত্বেও, এ ঘটনাগুলো সরকার তদন্ত করেছে, সে ব্যাপারে যৎসামান্য ও এমন কি বহু ক্ষেত্রে কোন তথ্য-প্রমাণও নেই। তিনি বলেন, জনগণের কাছে সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনীর কোন সদস্যকে তাদের ভূমিকার জন্য জবাবদিহি করতে হয় নি। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিলেন নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু, বাংলাদেশে দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি তার শাসনামলের আগে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল, তিনি ক্ষমতায় আসার পরও তাতে কোন পরিবর্তন আসে নি। ব্রাড অ্যাডামস বলেন, সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের ঘটনা বড় একটি রীতির একটি অংশ। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোন ধরনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অস্বীকৃতি এবং তদন্তের জন্য অর্থবহ কোন ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করা একই ধরনের আচরণের অংশ।

মেয়েকে মোটর সাইকেলে বেঁধে স্কুলে নেয়ায় বাবা গ্রেফতার

স্কুলে না যাওয়ায় প্রথমে মেয়ের হাত-পা বাঁধেন বাবা। এরপর তাকে
মোটরসাইকেলের সঙ্গে ​বেঁধে স্কুলে নিয়ে যান তিনি।
ছবিটি এক পথচারী তুলেছেন। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
ভারতে এক ব্যক্তিকে তার ৮ বছরের মেয়েকে মোটর সাইকেলে বেঁধে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করেছে সেদেশের পুলিশ।
৪০ বছর বয়সী ঐ ব্যক্তি এ কাজ করার সময় পথচারীর তোলা ছবি উত্তর প্রদেশের স্থানীয় সংবাদপত্রে ছাপা হলে পুলিশ তাকে আটক করে। তবে বর্তমানে জামিনে রয়েছেন তিনি।
নিজের মেয়ের সঙ্গে এমন নিষ্ঠুর আচরণ কেন?
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানতে চাইলে ঐ ব্যক্তি বলছিলেন, মেয়ের পরীক্ষা আছে, কিন্তু সে স্কুলে যেতে চাইছে না। ভারতে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ব্যাপক প্রচারণা কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাঝে দেশটির উত্তর প্রদেশে মথুরার একটি গ্রামে এমন ঘটনা ঘটল। অভিযুক্ত ব্যক্তির দুই ছেলে ও তিনটি মেয়ে রয়েছে। একটি স্বায়ত্তশাসিত স্কুলে নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ করেন তিনি।
পুলিশ বলছে, ছোট্ট মেয়েটিকে পরীক্ষা দিতে স্কুলে যেতে রাজী করতে চেষ্টা করেছিলেন তার বাবা।
এজন্য শিশুটিকে মিষ্টি এবং উপহারের প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু মেয়েটি কোনোভাবেই রাজী না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে দড়ি দিয়ে তাকে মোটর সাইকেলের পেছনে বেঁধে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন ঐ ব্যক্তি।
তার বিরুদ্ধে শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানান মথুরার পুলিশ সুপার শৈলেশ পান্ডে।
কৃতকর্মের জন্য একদিন জেলে কাটাতে হলেও ঐ ব্যক্তি মনে করেন, তিনি ঠিকই করেছেন।
‘আমার মেয়েকে স্কুলে নিয়ে গেলে সে মরে যাবে না। কিন্তু লেখাপড়া না শিখলে সে অবশ্যই মারা যাবে,’ টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলছিলেন শিশুটির বাবা।
ভারতে পুরুষ শিক্ষার হার ৮১ শতাংশ হলেও সে তুলনায় নারী শিক্ষার হার ৬৪ শতাংশ।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি নারী শিক্ষার হার বাড়াতে অভিভাবকদের সচেতন করতে প্রচারণা বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছেন।
তবে এসব প্রচারণায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনও স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন অনেক মেয়ে শিশুর জন্যই অনেক দুরে।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে অনেক অভিভাবকই মনে করে থাকেন, তাদের কন্যা সন্তানের শিক্ষার কোনও প্রয়োজন নেই।
সূত্র : বিবিসি

সঙ্কট উত্তরণে বেগম জিয়ার নির্দেশনা by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

দ্বন্দ্বনিরসন তাত্ত্বিক জন ডব্লিউ বার্টন মনে করেন, সমাজ ও রাষ্ট্রে এমন কিছু দ্বন্দ্ব-বিগ্রহ আছে যা কোনো অ্যাকাডেমিক প্রক্রিয়ায় নিরসন সম্ভব নয়। ‘অ্যাকাডেমিক প্রক্রিয়া’ বলতে তিনি জ্ঞাত সঙ্কট নিরসন কৌশলের প্রায়োগিক বাস্তবতা বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে সমঝোতা অসম্ভব। এসব দ্বন্দ্বকে সম্ভবত ‘যুদ্ধ’ বলাই শ্রেয়। এসব দ্বন্দ্ব নিরসনে মধ্যস্থতাকারীরা কোনোভাবেই সার্থকতা লাভ করেন না। কবির ভাষায় হয়তো এভাবে বলা যায়, ‘যত দিন ভবে না হবে না হবে তোমার অবস্থা আমার সম, ঈষৎ হাসিবে বুঝে না বুঝিবে দেখে না দেখিবে যাতনা মম।’ বাংলাদেশ ‘ভিলেজ পলিটিকস’-এর জন্য বিখ্যাত। বিশ্বায়নের বদৌলতে গ্রাম যখন বিশ্বের অংশ হয়েছে, তখন বাংলাদেশে উল্টোটি ঘটেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ‘ন্যাশনাল পলিটিকস’ ভিলেজ পলিটিকসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে বংশপরম্পরায় মামলা করে করে অনেক বংশকে নির্বংশ হতে দেখেছি। মামলার নৃশংসতা এত দূর গড়ায় যে, নিজ সন্তানকে হত্যা করে প্রতিপক্ষের নামে মামলা দিতেও দ্বিধা করা হয় না। মিথ্যাচার, জালিয়াতি ও প্রতারণার মতো বিষয় খুবই স্বাভাবিক হয়ে দেখা দেয় ভিলেজ পলিটিকসে। এক পক্ষ যতক্ষণ পর্যন্ত না নিঃশেষ হচ্ছে, ততদিন কোনো সমঝোতা নয়। এ দিকে প্রতিপক্ষের বারোটা বাজাতে গিয়ে নিজ পক্ষ নিজেদেরই প্রায় বারোটা বাজিয়ে দেয়। এখন যে কেউ বর্তমান রাজনীতির চালচিত্র বিশ্লেষণ করে ভিলেজ পলিটিকসের বিষয় বৈশিষ্ট্য দেখতে পাবেন।
অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘ছোট আয়না দিয়েও দেখা যায়; বড় আয়না দিয়েও দেখা যায়।’ ভিলেজ পলিটিকসের ছোট আয়না দিয়ে আমাদের রাজনীতি দেখলাম। এখন বড় আয়নায় ন্যাশনাল পলিটিকস দেখতে চাই। দুই মাস ধরে একপক্ষীয় খুন-গুম, পঙ্গুকরণ, হামলা-মামলা, নিপীড়ন-নির্যাতনে গোটা দেশ অত্যাচারের উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। যেখানে সরকারের পক্ষ থেকে এক লাইনের একটি ঘোষণাই সঙ্কট উত্তরণের উপায় হতে পারে, সেখানে অসংখ্য মৃত্যু, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা এবং গণযোগাযোগের বিপর্যস্ত অবস্থা সত্ত্বেও সরকারের তরফ থেকে কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যচ্ছে না। সত্য বটে, জনসাধারণকে অবরোধ আন্দোলনের ফলে বেশ কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। জনগণের এই কষ্টের জন্য কারা দায়ী? সরকার না বিরোধী দল? পাকিস্তানিরা গণতন্ত্রকে হত্যা করে এবং সংলাপকে ষড়যন্ত্রে পরিণত করে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল। ঠিক তদ্রুপ ক্ষমতাসীনেরা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অবলম্বন করে সঙ্কটকে অনিবার্য করে তুলছে। অথচ এই সঙ্কটের জন্য দায়ী তারাই। তারা যেমন সঙ্কটের পটভূমি নির্মাণ করেছে, তেমনি বর্তমান আন্দোলনকে বিপজ্জনক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।
৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে যদি তারা বোগাস নির্বাচনটি না করতেন, তাহলে বিরোধী দলকে জনগণের ভোটাধিকার উদ্ধারের আন্দোলনে যেতে হতো না। ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’ বলে তারা যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পাঁয়তারা করছেন, তা প্রতিহত করা নাগরিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। এক বছর সময় দেয়ার পরই বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারকে আলটিমেটাম দিলেন। সাত দফা কর্মসূচি পেশ করলেন। সংলাপের মাধ্যমে খুঁজলেন উত্তরণের উপায়। সমাবেশ করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন জোরদার করতে চাইলেন। সরকার আইনানুগ পথে বেগম জিয়াকে হাঁটতে দিলো না। সরকারি হরতাল ডেকে সমাবেশ পণ্ড করা হলো। তাতেও সাধ মিটল না। বিরোধী নেত্রীকে অবরুদ্ধ করা হলো। তার সব যোগাযোগ বন্ধ করা হলো। বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়া হলো। ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হলো গণতন্ত্র। এসব করে সরকারের কোনো অপরাধ হলো না। অপরাধ হলো তখনই, যখন এসব অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে বেগম জিয়া অবরোধ আন্দোলনের ডাক দিলেন। আন্দোলনকে ভায়োলেন্সে পরিণত করার জন্য সরকার তাদের চিরাচরিত শঠকৌশল অবলম্বন করেছে। পেট্রলবোমা দিয়ে আন্দেলনকে বিপথগামী করা হলো। রীতিমতো একটা মানবিক বির্পযয় ঘটল। সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই সরকার বলতে শুরু করল- এসব বিএনপি-জামায়াতের কাজ। নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো সরকার বিএনপির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাঝে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসযুদ্ধ বা ‘ওয়ার অব টেরর’ সমকক্ষতা খুঁজে পেল। যে সরকার বন্দুকযুদ্ধের নামে গত দুই মাসে ৬৬ জনকে বিনা বিচারে হত্যা করেছে, মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো নেতাকে গুম করার চেষ্টা করেছে এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনকে অপহরণ করা হয়েছে। তাদের কাছে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন করা যায়, বিশ্বসন্ত্রাসের সাথে কাদের মিল রয়েছে? গোয়েবলসীয় কায়দায় মিথ্যাচারের মাধ্যমে মিথ্যাকে সত্য আর সত্যকে মিথ্যা করার প্রয়াস পাচ্ছে সরকার। গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর প্রয়াস পাচ্ছে তারা।
এই দুঃসহ সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে সিভিল সোসাইটি যখন সংলাপের জন্য বারবার আহ্বান জানাল তখন শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সব নেতা-পাতিনেতা বুদ্ধিজীবীদের গালমন্দ করলেন। বিদেশী কূটনীতিকেরা যখন শান্তির আহ্বান জানালেন, তখন সৈয়দ আশরাফের মতো উঁচু দরের নেতাও তাদের ‘তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী’ বলে উপহাস করলেন। বেগম জিয়া যতবারই সংলাপের আহ্বান জানান, ততবারই তাকে আরো অপমান, আরো অসম্মানের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অবশেষে তাকে জেলে পুরার সব আয়োজন সম্পন্ন করে প্রকারান্তরে ‘দ্বিতীয় বাকশাল’ কায়েমের প্রান্তসীমায় উপনীত হয়েছে সরকার। সব ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং সিভিল সোসাইটির আবেদনকে অগ্রাহ্য করে সংলাপের পরিবর্তে দেশকে স্থায়ী সংঘর্ষের দিকে ধাবিত করা হচ্ছে। সংলাপ তো নয়ই, বরং আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার জন্য সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিলের অনুমতিও পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ পুলিশের ছত্রছায়ায় সরকারি দল সব ধরনের সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছে। অপর দিকে বিএনপির সব শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তৃণমূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত সব নেতাকর্মীকে গ্রেফতার অথবা বাড়িছাড়া করা হয়েছে। কয়েক হাজার মামলা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে রীতিমতো একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। ‘সব ক’টা জানালা খুলে’ না দিয়ে যে রুদ্ধদ্বার নীতি সরকার অবলম্বন করছে তা অনিবার্যভাবেই একটি ভয়ঙ্কর ঝড়ের আশঙ্কা সৃষ্টি করছে।
এর বিপরীতে, বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একটি যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সঙ্কট উত্তরণের জন্য ১৯৯৬ সালের মতো সংবিধান সংশোধন করে নতুন নির্বাচনের পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বেগম জিয়া আরো বলেন, এখন শেখ হাসিনা যদি তার আবার নির্বাচন করার অঙ্গীকার পূরণ করেন তাহলেই দেশে শান্তি, স্বস্তি ও সমঝোতার পরিবেশ ফিরে আসবে। তিনি আন্দোলন কর্মসূচির পাশাপাশি সংলাপ-সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তিন দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। ১. গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের নামে সারা দেশে গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের অবিলম্বে মুক্তি দেয়া, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, পুলিশ ও যৌথবাহিনীর হয়রানি বন্ধ করা, সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা এবং বিচারবহির্ভূত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদান। ২. সভা সমাবেশ ও মিছিলসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ অবিলম্বে প্রত্যাহার। ৩. সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে অবিলম্বে জাতীয় সংসদের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দ্রুত সংলাপের আয়োজন করা। বিএনপি চেয়ারপারসন স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ২০ দলীয় জোটপ্রধান বেগম খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যকে সঙ্কট উত্তরণের একটি নিয়মতান্ত্রিক ফর্মুলা বলে মনে করেন। তারা বলেন, তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বল সরকারের কোর্টে ছুড়ে দিয়েছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ সঙ্কটের নিয়মতান্ত্রিক উত্তরণ না ঘটলে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আরো মনে করেন, বেগম জিয়ার ওই প্রস্তাবের মধ্যে সমঝোতার আভাস রয়েছে। বিশ্লেষকেরা আরো বলেন, সমঝোতা না হলে দেশে কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এ দিকে জাতিসঙ্ঘ আবারো সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। অপর দিকে, প্রধানমন্ত্রী আগের মতোই অনড় থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন- জঙ্গি নেত্রীর সাথে কিসের সংলাপ? তবে খালেদার অনড় অবস্থানে অওয়ামী লীগ আশাহত হয়েছে বলে সংবাদ ভাষ্যে প্রকাশ।
ড. আবদুল লতিফ মাসুম
লেখক : প্রফেসর জা: বিশ্ববিদ্যালয়
‘বিনাশকালে বিপরীত বুদ্ধি’ বলে একটি প্রবাদ আছে। সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন এবং ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও জনপ্রিয়তার কথা জানে না এমন নয়। পক্ষকাল আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়া গ্রেফতার হতে চাচ্ছেন, জনগণের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য।’ গ্রেফতারের রাজনৈতিক তাৎপর্যই প্রধানমন্ত্রীর কথায় ফুটে উঠেছে। এ সপ্তাহে তিনি বলেছেন, ‘ওনার (খালেদা জিয়া) বিরুদ্ধে সমন জারি হয়েছে। তিনি যেন কোর্টে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সেটাই ওনার কল্যাণ। নইলে সরকার কোর্টের নির্দেশ পালনে বাধ্য হবে। ওনার স্থান ওখানেই।’ স্মরণ করা যেতে পারে, প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, খালেদা জিয়া মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার মতো অপরাধ করেছেন। তাহলে সহজেই বোঝা যায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের সব হিংসা, ক্রোধ এবং পাশবিকতা কার বিরুদ্ধে পরিচালিত? বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২৫ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়া অনন্য বৈশিষ্ট্য, কর্তৃত্ব এবং মহত্ত্বে¡ সমাসীন। তিনি স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী। এই রাষ্ট্র তরীর সফল কাণ্ডারি তিনি। শহীদ জিয়ার আবেগময় উত্তরাধিকার তিনি বহন করেন। ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, খালেদা জিয়া আছেন দেশ জুড়িয়া’। এভাবে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। গণতন্তের অতন্দ্র প্রহরী। সুতরাং তাকে স্পর্শ করা অত সহজ নয়। যেকোনো অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠবে। বিনাশকালে যদি সত্যি সত্যিই ‘বিপরীত বুদ্ধি’ হয়, তাহলে তা ক্ষমতাসীন সরকারেরই বিনাশ ডেকে আনতে পারে।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কখনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হতে পারে না by ডক্টর কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীরবিক্রম

৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফলে দেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় ৯৩-৯৫ ভাগ জনগণ এই নির্বাচনে ভোটদান থেকে বিরত ছিল। সরকার পরিচালনায় জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই। জনগণ এখন সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে সমগ্র পৃথিবীর কাছে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটকে সন্ত্রাসী জোট বা দল হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে বিএনপির জন্ম হয়েছিল। বিএনপি কখনো অসাংবিধানিক-অনিয়মতান্ত্রিক বা জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত ছিল না, বর্তমানেও নেই। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম ১৯৭৫ সালের পরে এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে করে জনগণের মতায়ন নিশ্চিত হয়, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। অনুরূপভাবে ১৯৯১ সালের পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির আইন পাস করা হয়। সুতরাং বিএনপির জন্মলগ্ন থেকে এই পদক্ষেপগুলোর সুষ্ঠু বিশ্লেষণ করলে এটি সহজেই অনুমেয় বিএনপি বা ২০ দলীয় ঐক্যজোট সদাসর্বদা জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল এবং এখনো এই নীতিতে অটল আছে।
আমি দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৭৬ সালে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অনেক সদস্য ভারতে আশ্রয় নেন। তারা তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। সরাসরি অস্ত্র হাতে নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে বি’বাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত পর্যন্ত একধরনের যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। সীমান্ত এলাকার জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজেই বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং তৎকালীন বিজেপি (ভারত) সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সাহায্যে এই ধরনের হামলাগুলো বন্ধের ব্যবস্থা নেন। ধীরে ধীরে তারা (আওয়ামী লীগ নেতারা) দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং এটা আমাদের জানা ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা বা প্রতিশোধ নেননি। বরং সুনাগরিক হিসেবে দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান।
সরকার বারবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে দেশের জনগণের মতামতের কোনো তোয়াক্কা না করে বিনা ভোটে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করছে, সরকার গঠন করছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল দেশকে স্বৈরশাসকের হাত থেকে মুক্ত করা। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয় বর্তমানে সরকার এই নীতি থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। তাদের একমাত্র এজেন্ডা হচ্ছে বিরোধী দলগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা, সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই গুলি করা, জোরজবরদস্তি করে মতার অপব্যবহার করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
বারবার বলা হচ্ছে ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ সাল। এতে করে তাদের মন-মানসিকতা জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কেউ বা আর কোনো দলকে কখনো ক্ষমতায় আসতে দেয়া হবে না। এ ধরনের মন-মানসিকতা এবং মতা কুক্ষিগত করার পরিকল্পনা থেকে আমাদের সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
আমরা কথায় কথায় বলি দেশ সবার কিন্তু আমাদের কর্মকাণ্ডে আমরা মনে করি দেশ আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। আমি যা বলি তা সবাইকে মেনে চলতে হবে। দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কোনো মতামত দেয়ার অধিকার থাকবে না। জনগণ পুতুলের মতো আমাদের হাতের ইশারায় চলবে।
মুসলমান হিসেবে আল্লাহর ওপরে আমাদের বিশ্বাস কতটুকু আছে তা এখন আমাদের চিন্তাভাবনার বিষয়। আমাদের সবার মধ্যে একধরনের দাম্ভিকতা এবং অহঙ্কার কাজ করছে, যার কারণে দেশে আজ নৈরাজ্য, দলীয়করণ, অশান্তি এবং সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
বর্তমানে দেশে কারো জান এবং মালের কোনো নিরাপত্তা নেই। আমাদের অদূরদর্শিতা এবং লোভের কারণে দেশের জনগণ হতাশাগ্রস্ত, তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা কখনো সুখকর এবং কারো জন্য কাম্য নয়। জোর করে কখনো কেউ পৃথিবীতে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি তবে জনগণের ভোগান্তি হয়তো দীর্ঘায়িত হতে পারে। বর্তমানে দেশের রাজনীতি সম্পূর্ণ মিথ্যার ওপর ভর করে চলছে, যা ধর্মীয়ভাবেও মহাপাপ। শুধু নামাজ আর কালেমা পড়লেই মুসলমান হয় না। আমাদের সবাইকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সা:-এর নির্দেশিত পথে চলতে হবে এবং জীবনধারণ করতে হবে। এতেই সবার মুক্তি।
সরকারবিরোধী আন্দোলন করার অর্থ জঙ্গিবাদ হতে পারে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কখনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হতে পারে না। দেশে যখন আন্দোলন সংগ্রাম চলে তখন কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী তাদের নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে লিপ্ত হয়। বিরোধী দলকে ধ্বংস করে কখনো গণতন্ত্র সুসংহত কিংবা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যে যখনই সরকারে থাকে তার উচিত হবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়া। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেয়া।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ আগুনে পুড়ে মরছে, গুপ্তহত্যার শিকার হচ্ছে। দেখামাত্র গুলির ভয়ে মানুষ আতঙ্কে আছে। কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছে এবং বিরোধী দলকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। সর্বতোভাবে বিরোধী দলগুলোর রাজনীতি ধ্বংসের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের এই দুরবস্থা, দুঃশাসন এবং একদলীয় শাসনের জন্য দায়ী ভারতের কংগ্রেস সরকার। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণারে লিবিদ্ধ হয়ে থাকবে। তারা আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু। কিন্তু কংগ্রেসের সমর্থনের কারণে বাংলাদেশে আজ একদলীয় শাসন কায়েম হয়েছে। এখন বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ ভারতবিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করছে। প্রায় ৯০-৯৫ ভাগ বাংলাদেশী জনগণ মনে করে কংগ্রেস সরকারের ভুল অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের জনগণের এই দুরবস্থা। আশা করি ভারতের ইতিহাসের সর্বকালের জনপ্রিয় সরকার এবং জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশের জনগণের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশের জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করার বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকবেন।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি

সরকারি দল ও বিএনপি এখন কী করতে পারে? by আলী রীয়াজ

গত কয়েক সপ্তাহে, বিশেষত এক সপ্তাহে, দেশে সহিংসতার মাত্রা কমে এসেছে। বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্নভাবে পেট্রলবোমা বা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ডাকা অবরোধ ও হরতালের এখন আর কার্যকারিতা নেই; যদিও জোটের পক্ষ থেকে এখনো হরতাল বা অবরোধ কোনোটাই তুলে নেওয়া হয়নি এবং মানুষের মধ্যে শঙ্কা দূর হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে অনেকের আশা ছিল যে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া তাঁর ‘সংবাদ সম্মেলনে’ হয়তো এই ধরনের কর্মসূচি তুলে নেবেন কিংবা নতুন কর্মসূচি দেবেন। এর কোনোটিই ঘটেনি। তবে তাঁর বক্তব্যে যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেটা ভালো করে তাকালেই বোঝা যায়। তাঁর দাবিনামায় এখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা নেই, সরকার পতনের ডাক নেই। যা আছে তা হলো, ‘আন্দোলনের যৌক্তিক পরিণতি’, আছে ‘সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণে অনতিবিলম্বে জাতীয় সংসদের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সুনির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সংলাপের আয়োজন’ করার দাবি। এগুলো নিঃসন্দেহে বিএনপির পিছিয়ে আসার লক্ষণ। একে বিএনপির নমনীয় অবস্থান বলেও কেউ কেউ চিহ্নিত করেছেন। খালেদা জিয়া যে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে, পরিস্থিতি তাঁর অনুকূলে জেনে এসব কথা বলছেন, আমি তা মনে করি না। মাস খানেক আগে হলে আমরা হয়তো সেভাবেই বিবেচনা করতে পারতাম। বিএনপির পক্ষে থেকে আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা বলা হলেও কৌশলের দিক থেকে এমন কিছু বলা হয়নি, যা বিএনপির আন্দোলনের এত দিনকার ঘাটতি মোচন করে নতুনভাবে তাকে এগিয়ে নেবে। ফলে দাবি বিষয়ে অবস্থান বদলালেও কৌশলের দিক থেকে, ‘আন্দোলনের’ গতি-প্রকৃতি পরিচালনার দিক থেকে বিএনপি যে জায়গায় ছিল এখনো সেখানেই আছে। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি এখন কী করতে পারে? সরকারি দলের করণীয় কী? কী ঘটতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে পরিস্থিতির দিকে তাকানো দরকার, কী কী বিবেচনা মাথায় রেখে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজব সেটা নির্ধারণ করা।
গত জানুয়ারি মাস থেকেই সরকারি দল বলে আসছে যে তার অবস্থান অপরিবর্তনীয়। বিএনপির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতার সূচনা হয়েছে, তা তারা রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে চায়। সরকারি দল মনে করেছে, সব সহিংসতার দায় বিএনপির—এই মনোভাব সমাজে যত বেশি প্রতিষ্ঠিত হবে, তত বেশি অবস্থা সরকারের অনুকূলে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিকেরা জীবন-জীবিকার তাগিদেই বিএনপির কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করবে। সহিংসতায় যে ১২১ জন মারা গেছেন, তার অধিকাংশ যেহেতু মারা গেছেন পেট্রলবোমা হামলায়, ফলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপরে। সরকারের এই কৌশল কার্যত সফল হয়েছে যে একসময় সাধারণ মানুষের কাছেই আর এই পরিস্থিতি সহনীয় মনে হবে না। সহিংসতার জন্য তারা দায়ী নয় বলে দাবি করলেও বিএনপি এটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি যে এর সব দায় তাদের নয়। এর অন্যতম কারণ হলো সহিংসতা ছাড়া আর কোনো ধরনের কার্যক্রম বিএনপি দেখাতে পারেনি। বিএনপির দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকার কারণে নাগরিকদের সম্পৃক্ততার অভাব ঘটেছে, এমন প্রমাণ করা যাবে না, কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে জনসম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি না করতে পারা যে তার কারণ, সেটা মানতেই হবে।
তদুপরি, রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর আচরণ সমাজে ভীতির সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছে। সংবাদপত্রের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি মাস থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছে কমপক্ষে ৩১ জন; মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে শুধু গত ফেব্রুয়ারি মাসেই বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় মারা গেছে ৩৭ জন, জানুয়ারি মাসে ১৭ জন। আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর হাতে আটক অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার তালিকা মোটেই ছোট নয়—আটকের পর হাঁটু লক্ষ৵ করে গুলি করার ঘটনার খবর সবার জানা। জানুয়ারি মাসে ১৪ জন নিখোঁজ হয়ে যায়, যাদের মধ্যে নয়জনকে পরে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে, দুজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে; ফেব্রুয়ারি মাসে গুম হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল সাত, তাদের মধ্যে একজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, তিনজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। মার্চ মাসের হিসাব না থাকলেও বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদের ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়ার ঘটনা জানেন সবাই; ফেব্রুয়ারি মাসে মাহমুদুর রহমান মান্নার আটকের সময়েও ২১ ঘণ্টার জন্য তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই সময়ে আটকের সংখ্যা কম করে হলেও ১৮ হাজার। ফলে জানুয়ারির শুরু থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকারের অনমনীয় অবস্থান এবং রাষ্ট্রশক্তির লাগামহীন ব্যবহার।
এখন সরকার ও সরকারি দলের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হবে, যেহেতু রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে তারা বিএনপিকে দুর্বল এবং আন্দোলনকে অকার্যকর করে ফেলেছে, এই অবস্থা অব্যাহত রাখতে পারলে তাদের পক্ষে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা সম্ভব হবে। এই চূড়ান্ত বিজয় বা লক্ষ্য কী? সেটা সরকারি দলের আচরণে স্পষ্ট, যদিও তারা সুস্পষ্ট করে বলে না। তবে আমরা বিএনপি–জায়ামাতবিরোধী এবং সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবীদের কথায় একটা ধারণা পাই। এর সর্বসাম্প্রতিক ভাষ্যটি পাওয়া যায় এম এম আকাশের লেখা একটি নিবন্ধে। এই সময়ে, যাকে তিনি প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে মনে করেন, তাদের করণীয় নির্দেশ করে বলেছেন, ‘ঘটনা যা-ই ঘটুক, প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির এ ক্ষেত্রে যা করণীয়, সেটা হচ্ছে ১৯৭১ সালের পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল সন্ত্রাসী শক্তিকে যদি আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করেও দুর্বল ও নিঃশেষিত করতে পারে, তাতে বাগড়া না দেওয়া।’ (ড. এম এম আকাশ, ‘এই রাউন্ডেও কি শেখ হাসিনা জয়ী হবেন?’ সমকাল, ১৬ মার্চ ২০১৫)। এম এম আকাশের বিবেচনায় যেহেতু বিএনপি ১৯৭১ সালের পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল সন্ত্রাসী শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধেছে, সেহেতু তার ওপর বলপ্রয়োগ করা অন্যায় নয়।
সামগ্রিকভাবে প্রতিপক্ষকে নিঃশেষিত করাই হচ্ছে লক্ষ্য এবং তার কৌশল হচ্ছে রাষ্ট্রশক্তির নির্বিচার ব্যবহার, যার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র আমি একটু আগেই তুলে ধরেছি। কিন্তু এই লক্ষে৵ সরকার, সরকারি দল এবং তাদের সমর্থকদের কার্যক্রম পরিচালিত হলে তার পরিণতি কী হতে পারে, তার একটা ধারণা আমার ড. আকাশের লেখায়ই পাই। তিনি বলছেন, ঘটনা যা-ই ঘটুক ‘একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আপসকামিতা, দুর্নীতি, অনাবশ্যক বাড়াবাড়ি ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে’। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীনদের মধ্যে হয় এখনই ‘অনাবশ্যক বাড়াবাড়ি ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ উপস্থিত বা রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহারের ফলে এই প্রবণতা তৈরি হবে। যে উদ্দেশ্যে বা যার বিরুদ্ধেই পরিচালিত হোক না কেন, রাষ্ট্রের জবাবদিহিহীন ‘বলপ্রয়োগ’ এবং ‘ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারে না, সেটা সহজেই বোধগম্য। আর গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি বিশেষ করে বিএনপির জন্যই প্রযুক্ত হবে, এমন মনে করার কারণ নেই। কোনো দেশে গণতন্ত্র যেমন ‘কারও জন্য আছে কারও জন্য নেই’, এমন হতে পারে না, তেমনি গণতন্ত্রহীনতাও ‘বাছবিচার করে প্রযুক্ত’ হয় না। উদার গণতন্ত্রের একটি দিক এই যে গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে যাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ, তারাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু ‘ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ যেখানে উপস্থিত, সেখানে গণতান্ত্রিক শক্তিও (কিংবা গণতান্ত্রিক শক্তিই) তার অধিকারবঞ্চিত হয়, নাগরিকদের প্রশ্ন না হয় বাদই দিলাম।
রাষ্ট্র যখন কেবল বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যে রাজনৈতিক শক্তি তা পরিচালনা করে, তার মধ্যে যদি ‘দুর্নীতি, অনাবশ্যক বাড়াবাড়ি ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ বহাল থাকে, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি দুর্বল অবস্থানে থাকে এবং অন্যান্য শক্তির প্রকাশ্য কার্যকলাপ সীমিত হয়ে পড়ে, তখন সমাজে উগ্রপন্থা প্রসারের পরিবেশ তৈরি হয়, চরমপন্থী শক্তির জন্য সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে অনুকূল আবহাওয়া। বাংলাদেশে সে ধরনের শক্তি অনুপস্থিত নয়। ক্রমাগতভাবে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি, যাদের সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক বলে বিবেচনা না করলেও, তাদের রাজনৈতিকভাবে পরাজিত না করে নিঃশেষ করে ফেললে এই চরমপন্থী শক্তি বিস্তারের পথই তৈরি হবে। এই বিবেচনা মাথায় রেখেই আমাদের দেখা দরকার সরকারি দল এবং বিএনপির করণীয় কী।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে? by আব্দুল কাইয়ুম

বিএনপির ভাষায় দোষ করেছে আওয়ামী লীগ। ওরা গত বছর বিএনপিকে বাদ দিয়ে একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতার ধারা অব্যাহত রেখেছে। তাই তাদের ‘শাস্তি’ পেতে হবে। কিন্তু কী ব্যবস্থাপত্র দিল ওরা? একটানা অবরোধ, তার সঙ্গে সপ্তাহে পাঁচ দিন হরতাল। শাস্তি পাচ্ছে কে? আওয়ামী লীগ বা সরকারকে তো কাবু করতে পারছে না। প্রায় আড়াই মাস হতে চলল। গদিচ্যুত হওয়া তো দূরের কথা, গদি নড়েও না। তাহলে এই দাওয়াইয়ে লাভ কী? মাঝখান থেকে মানুষ পেট্রলবোমায় পুড়ে মরছে। গাড়ি পুড়ছে। রেলগাড়ি লাইনচ্যুত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছেন। বিএনপি সরকার পতনের আন্দোলন করে, আর শাস্তি পায় জনগণ। পাঁচ-সাত-দশ দিন ধুমসে আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটিয়ে সব ঠিকঠাক করে ফেললেও না হয় একটা সান্ত্বনা ছিল। মানুষ বলত, যাক, নাশকতার আন্দোলন থেকে বাঁচা গেল! কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না।
এ অবস্থায় আন্দোলনের কৌশল নিয়ে বিএনপির চিন্তা–ভাবনা করা প্রয়োজন। দলের চেয়ারপারসন যদি তাঁর ভাষণে যুদ্ধবিরতির মতো একধরনের অবরোধ-বিরতির ঘোষণা দিতেন, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি সমাধানের দিকে যেতে পারত। তিনি বলতে পারতেন, ২৬ মার্চের মধ্যে আলোচনায় বসতে হবে, সে জন্য এই সময়টুকু অবরোধ-হরতাল স্থগিত থাকবে। তার পরও যদি সরকার গা না লাগাত, ধরপাকড়, জেল-জুলুম একই কায়দায় চালিয়ে যেত, তখন বিএনপির পক্ষে জনমত আরও বেশি সোচ্চার হতো।
প্রশ্ন উঠবে, বিএনপি এত নরম হলে আওয়ামী লীগ কি ছেড়ে দিত? আরও দমন-পীড়ন চালিয়ে বিএনপিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিত না? কিন্তু তাদের দলের অবস্থা কি এতই খারাপ? তাহলে কোন শক্তিতে ওরা টানা অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি দিয়ে চলেছে? দেখছে লোকে মানে না, তাও যান্ত্রিকভাবে অবরোধ চালিয়ে যেতে হবে?
অবরোধ ও হরতালের মতো চূড়ান্ত ধরনের আন্দোলন একটানা বেশি দিন চালিয়ে যাওয়া যায় না। এটা আমাদের নিকট অতীতে অনেক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে গণ-আন্দোলনে বিরতি দিতে হয়। এক-দেড় মাসের প্রস্তুতি নিয়ে এক দিনের হরতালেও অনেক সময় অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু হরতাল-অবরোধে যখন মানুষ রাস্তায় নামে না, বরং জনজীবন প্রায় স্বাভাবিক থাকে, তখন বুঝতে হবে কোথাও গড়বড় আছে। বুদ্ধিমান হলে আন্দোলনের কৌশল নিয়ে নতুন কিছু চিন্তাভাবনায় বসতে হবে। বিএনপির মধ্যে সেই মুনশিয়ানার খুব অভাব।
সরকার নিস্তেজ হরতাল বন্ধ করার জন্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের হাজার হাজার কর্মীকে পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করছে। মামলা দিচ্ছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিনকে সাদাপোশাকের লোকজন ধরে নিয়ে গেল। পুলিশ বলছে, তারা জানে না। তারাও খুঁজে বের করার মহান দায়িত্ব নিয়েছে। এসব কেউ সমর্থন করে না। কিন্তু পেট্রলবোমা মেরে বিএনপিই সরকারের হাতে এ ধরনের জোর-জুলুম নির্বিবাদে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এখন ওদের চিন্তা করে দেখতে হবে, এই সুযোগ আর কত দিন দেবে!
তাহলে কি বিএনপি আন্দোলন-প্রতিবাদ করবে না? নিশ্চয়ই করবে। কিন্তু মানুষকে সঙ্গে নিতে না পারলে সব মাঠে মারা যাবে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। আজ হয়তো মানুষ নানা কারণে রাস্তায় নামছে না। তার মানে এই নয় যে কাল নামবে না। উপযুক্ত রাজনৈতিক কৌশল নিলে মানুষ অবশ্যই নামবে।
এখন সবাই বলে, গত বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপি ভুল করেছে। তাদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী ছিল। এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এটা তো ঠিক যে গত বছর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষে জনমত যতটা সোচ্চার ছিল, আজ ততটা নেই। কেন নেই? বিএনপির ভুল চালের জন্যই আজ এ অবস্থা।
খালেদা জিয়া তাঁর দীর্ঘ ভাষণে একবারও জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গ তুললেন না। জামায়াত তাদের জোটে আছে। ঠিক আছে। কিন্তু যখন পেট্রলবোমা মারা হয়, রেললাইনের ফিশপ্লেট তুলে নিরীহ যাত্রী হত্যা করা হয়, তখন তো এটা পরিষ্কার যে নাশকতা চলছে। খালেদা জিয়া সব দায় চাপিয়েছেন সরকারের ঘাড়ে। তিনি নিজের দলের ওপর দায় না নিয়ে অন্তত জামায়াতের ওপর কিছু দায় দিতে পারতেন। সবাই জানে, এ ধরনের নাশকতায় জামায়াত-শিবির সিদ্ধহস্ত। পেট্রলবোমার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে জোট থেকে জামায়াতকে বের করে দেওয়ার কথা বলতে পারতেন। তাহলে পরিস্থিতি আজ অন্য রকম হতে পারত।
জামায়াতে ইসলামীর কথা আসে এ জন্য যে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় এমন কথা বলেছে। জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করলে সংলাপের কথা চিন্তা করবে বলে তারা বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলেছে। বিএনপি সংলাপের কথা এত বলে, অথচ এ সুযোগটা নিতে তাদের খুব অনীহা। তার মানে, বিএনপি মনে করে জামায়াত ছাড়া তাদের চলবে না।
এটা খুব ভালো কথা নয়। যে দলটি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা চালিয়েছে, বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছে, তাদের ছাড়া বিএনপির চলে না, এ রকম ভাবতে খুব অবাক লাগে। কারণ, বিএনপি নিজেরাই বলে ওরা স্বাধীনতার পক্ষের দল।
এখানে অবশ্য বিএনপি বলবে, জামায়াতের সঙ্গে মিলে আওয়ামী লীগও তো ১৯৯৬ সালে আন্দোলন করেছে। হ্যাঁ, সেটা করে খুব খারাপ করেছে। ক্ষমতার রাজনীতির সংকীর্ণ কানাগলিতে আওয়ামী লীগও একসময় আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়েছে। এর পরিণতিতে তাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়েছে। এর খেসারত তাদের দিতে হয়েছে এবং আগামী বহুদিন পর্যন্ত দিতে হবে।
কিন্তু বিএনপি কেন আওয়ামী লীগের সেই খারাপ রাজনীতিই গ্রহণ করে? প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় গিয়ে জিয়াউর রহমানই প্রথম জামায়াত-মুসলিম লীগকে ক্ষমতার অংশীদার করে রাজনীতিতে খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সেই ধারাতেই এখনো বিএনপি চলছে।
সুতরাং, সংলাপ একতরফাভাবে আওয়ামী লীগের কাছে আশা করলে সুফল পাওয়া যাবে না। আজীবন অবরোধ-হরতাল চালানোর ভুল সিদ্ধান্ত নিলে আরও ঠকতে হবে। তাই একটা পথ বের করার জন্য মধ্যবর্তী ‘অবরোধ-বিরতি’ দরকার। তখন মানুষ দেখবে, আওয়ামী লীগ কী করে। যদি অবিবেচকের মতো দমননীতি চালিয়ে যায়, মানুষ তা ভালো চোখে দেখবে না। সেটাই হবে বিএনপির বড় মূলধন। আর যদি সরকার নরম হয়, তাহলে সংলাপের রাস্তা খুলবে।
বিএনপি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলে খুব দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। এটা সব মানুষের মনের কথা। কিন্তু গত বছর নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপি পানি এত দূর এত ঘোলা করেছে যে সেখানে এখন আওয়ামী লীগ আরামসে মাছ মারছে। তাই হয়তো বিএনপিকে এক কদম পিছিয়ে গিয়ে বলতে হবে, সংবিধান আর কাটাছেঁড়া না করে, বিগত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নির্বাচনকালীন সরকারের যেসব প্রস্তাব দিয়েছিল, সেগুলো নিয়ে সংলাপ হোক। নির্বাচনকালীন সরকারে যদি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব থাকে, যদি স্বরাষ্ট্র ও আরও দু-চারটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেওয়া হয়, যদি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হয়, যদি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এর চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য সরকার আর কী হতে পারে?
এ ধরনের প্রস্তাব বিএনপির নিজস্ব কিছু নয়, খোদ আওয়ামী লীগের। ওরাই গত নির্বাচনে বিএনপিকে আনার জন্য বিভিন্ন সময় সংবিধানের মধ্যে থেকেই একটু এদিক ওদিক করে নানা বিকল্পের কথা বলেছিল।
বিএনপি আজ আওয়ামী লীগের সেই প্রস্তাবগুলোই তাদের সামনে হাজির করুক। তারপর দেখি সংলাপ হয় কি হয় না। এর পরও যদি সংলাপে বাগড়া দেওয়া হয়, তাহলে দায়ী থাকবে আওয়ামী লীগ। এর পরিণাম তাদের জন্য শুভ হবে না।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

আট বছর আগের ওই দিনটা নিশ্চয়ই ধোনি ভুলে যাননি

২০০৭ সালের ১৭ই মার্চ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে ভারতের প্রথম ম্যাচ। ওই ম্যাচে তারুণ্য দীপ্ত বাংলাদেশের কাছে ৫ উইকেটে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছিল ভারত। আট বছর দুইদিন পর আজ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আবারও বাংলাদেশের সামনে ভারত। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের এই ম্যাচ নিয়ে একটু বেশি সতর্ক ভারতীয়রা। বিশেষ করে ভারতের সাবেক ক্রিকেটাররা। বার বার তারা ২০০৭ সালের ওই ম্যাচটিকে সামনে আনছেন, ভারতের ক্রিকেটারদের সতর্ক করছেন। এই তালিকায় রয়েছেন তৎকালিন প্রধান নির্বাচন দীলিপ ভেংসরকার।  তিনি তার কলামে ধোনিদের সতর্ক করে লিখেন- 
আমি দেশের প্রধান নির্বাচক। দারুণ আগ্রহ নিয়ে বাড়ির টিভিতে বাংলাদেশ ম্যাচটা দেখতে বসেছিলাম। টস জিতে যখন ভারত আগে ব্যাট করতে নামলো, তখনও বুঝতে পারিনি কী বিপর্যয় অপেক্ষা করে আছে দেশের ক্রিকেটের জন্য। ম্যাচ শেষে আমার অনুভূতি কী ছিল, সেটা বোঝাতে একটা শব্দই যথেষ্ট শক্‌। আর শুধু আমি কেন। ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত সবাই তখন বিধ্বস্ত। দেশ জুড়ে জ্বলছে প্রচণ্ড ক্ষোভের দাবানল। যেটা আরও উস্কে দিলো কয়েক দিন পরেই শ্রীলঙ্কার কাছে হার। আমাদের দেশে ক্রিকেট একটা ধর্ম। সেখানে বিশ্বকাপের মতো একটা টুর্নামেন্ট ঘিরে আবেগ কোন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে, আপনাদের নতুন করে বলার দরকার নেই। শুধু বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে যাওয়ার দুঃখ তো নয়। তার সঙ্গে ছিলো বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কার মতো টিমের কাছে হেরে ছিটকে যাওয়ার জ্বালা। পড়শি দেশের যে দুটো টিমকে খেলে খেলে ইন্ডিয়ান টিম অভ্যস্ত ছিলো। আসলে ওই বিশ্বকাপের ফর্মেটটাই এমন ছিল যে, মাত্র দুটো ম্যাচ হারা মানেই একেবারে দেশে ফেরার টিকিট কাটা।
যাই হোক, পুরনো বিপর্যয়ের প্রসঙ্গটা আর টানবো না। আর সত্যি বলতে কী, বৃহস্পতিবারের কোয়ার্টার ফাইনালের সঙ্গে আট বছর আগেকার ওই ম্যাচটার তুলনা করার জায়গাও  নেই। ওটা ছিল সে বারের বিশ্বকাপে শচীন-সৌরভদের প্রথম ম্যাচ। এখানে বিশ্বকাপের সাত নম্বর ম্যাচ খেলতে নামবে মহেন্দ্র সিংহ ধোনিরা। তাও আবার পরপর ছ’টা ম্যাচ জিতে উঠে। বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ের টুর্নামেন্টে অপরাজেয় থেকে। ধোনির টিমটাকে যত দেখছি তত মনে হচ্ছে, এদের থামানো ভীষণ কঠিন। এদের কাছে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ সামলে দেয়া কোনও সমস্যাই নয়।
তার মানে কিন্তু আমি মোটেই বলছি না যে বাংলাদেশ খারাপ টিম। ওদের ব্যাটিং লাইনআপ বেশ ভাল। মাহমুদুল্লাহ   পরপর দুটো সেঞ্চুরি করে দুর্দান্ত ফর্মে আছে। তার উপর ওদের বোলিংটাও খারাপ না। বিশেষ করে ইনিংসের শুরুর দিকে ওরা দ্রুত উইকেট ফেলে দিতে পারে। তা ছাড়া টিমটার মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস দেখতে পাচ্ছি। ইংল্যান্ডের মতো টিমকে হারানো, ঘরের মাঠে অন্যতম ফেভারিট নিউজিল্যান্ডকে কোণঠাসা করে ফেলা, ৩০০ কাছাকাছি রান তুলে দেয়া দারুণ ছন্দে আছে মাশরাফির টিম। আর ওরা এখন প্রচুর ওয়ানডে খেলে খেলে যথেষ্ট অভিজ্ঞও। স্মার্ট ক্রিকেট খেলতে পারে তরুণ টিমটা।
তাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলবো, এই ভাবনাটা থেকে যেন ধোনিদের মধ্যে একটুও আত্মতুষ্টি না থাকে। খুব সতর্ক থাকতে হবে ভারতকে। আসলে কী জানেন, অস্ট্রেলিয়ার মতো টিমের মোকাবিলা করতে নামলে সবার মধ্যে একটা চিন্তা ঢুকে যায় যে, নিজেদের খেলাটাকে আজ অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। যে চিন্তাটা আপনাআপনি একটা বাড়তি মোটিভেশনের কাজ করে। সবাইকে তেতিয়ে রাখে। কিন্তু  র‌্যাঙ্কিংয়ে হেভিওয়েট নয় এমন টিমের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে সে রকম চিন্তা আসার চেয়ে না আসার সম্ভাবনাই বেশি। আর সে জন্য বারবার করে ধোনিদের বলতে চাই, আত্মতুষ্টি থেকে সাত হাত দূরে থেকো।
আমাদের টিমও ১৯৮৩ আর ১৯৮৭ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা ম্যাচ খেলেছে। তখনকার ক্রিকেট পৃথিবীতে যাদের দুর্বল টিম হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু ওই ম্যাচগুলোর আগে টিম মিটিং বা এমনি সাধারণ আলোচনায় আমরা কখনও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়িনি। বরং সবাইকে বলা হতো বাড়তি সতর্ক থাকতে। বিপক্ষ টিমকে হালকা ভাবে না নিয়ে নিজেদের একশো শতাংশটাই দিতে।
তাই বৃহস্পতিবারের কোয়ার্টার ফাইনাল নিয়ে ধোনিকে যদি কোনও পরামর্শ দিতে হয় তা হলে এটাই বলবো যে, ড্রেসিংরুমে আত্মতুষ্টিকে একদম ঢুকতে দিও না। তবে এই ব্যাপারটা যে ধোনি ভাবেনি, সেটা হতে পারে না। ভুলে যাবেন না, ২০০৭ বিশ্বকাপের ওই ম্যাচটাতে কিন্তু ধোনিও খেলেছিল। সেই স্মৃতি ভুলে যেতে পেরেছে বলে মনে হয় না। তাই আত্মতুষ্টি বা গা-ছাড়া ভাব নিয়ে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে ও কখনওই নামবে না।

পুলিশের আটক-বাণিজ্য, স্বজনদের কান্না

গ্রেপ্তার আর হয়রানির আতঙ্কে দিন কাটছে মানুষের। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেক নিরপরাধ মানুষও। কোন কারণ ছাড়াই ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অনেককে। আটকের পর অর্থ আদায় করে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে হরহামেশা। আবার কখনও পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে চালান দেয়া হচ্ছে কোর্টে। রাজধানীর থানাগুলোর এমন চিত্র এখন নিত্যদিনের। রাতে থানায় থানায় দেখা যায় উদ্বিগ্ন স্বজনদের অপেক্ষা, কান্না। যদিও থানা পুলিশের আটক-বাণিজ্য ও হয়রানির কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘থানায় নিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা আটকের নামে বাণিজ্য করা হয় না। এ রকম কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।’ সোমবার রাতে রাজধানীর কয়েকটি থানায় রাতভর অবস্থান করে পাওয়া গেছে সাধারণ মানুষের হয়রানির বেশ কয়েকটি ঘটনা।
পল্লবী থানা: রাত গভীর হলেই ব্যস্ত হয়ে উঠে ঢাকা মেট্রোপলিটনের পল্লবী থানা। নিস্তব্ধ নীরব থানায় ঘটতে থাকে নানা ঘটনা। পুলিশের অভিযানে আটককৃতদের রাখা হয় থানাহাজতে। ভোরের আলো ফোটার আগেই চৌরাস্তার মোড়ে বাড়তে থাকে আটককৃতদের স্বজনদের ভিড়। পল্লবী থানা পুলিশের দেয়া তথ্য মতে গতকাল থানা এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই তাদের আদালতে হাজির করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চমকে ওঠার মতোই তথ্য পাওয়া গেছে আটককৃতদের স্বজন ও তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। আটককৃতদের মধ্যে রয়েছেন শহীদুল ইসলাম ও রাজু আহমেদ নামে দুই ব্যক্তি। ভোরে শহীদুলকে নাশতা দিতে দেড় বছরের শিশুসন্তানসহ থানায় যান তার স্ত্রী জুলি ও বৃদ্ধা মা। জুলি জানান, শনিবার রাত ১০টায় বাসা থেকে আটক করা হয় শহীদুল ইসলামকে। সঙ্গে তার বন্ধু রাজু আহমেদকেও আটক করে পুলিশ। শনিবার রাতে আটক করলেও তাদের আদালতে হাজির করা হয়েছে গতকাল দুপুরে। এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে ৬০ ঘণ্টা। জুলি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। টাকা-স্বর্ণ সব নিয়ে গেছে পুলিশ। এখন একটা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাসেলের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয় বলে জানান তিনি। জুলি বলেন, ‘দুই দিনে থানায় রেখে যেই মারা মারছে। সেইটা চোখে না দেখলে বুঝতে পারবেন না। গত দুই দিন ধরে থানায় ঘুরতেছি ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু শুধু টাকা চায় আর মামলার ভয় দেখায় পুলিশ। গত সোমবারে স্বামী শহীদুলকে ছাড়াতে পল্লবী থানা পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত সিডি শামীমকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন জুলি। তবু ছাড়াতে পারেননি। মিরপুরের এক নম্বর এভিনিউয়ের ত-ব্লকের ৩৩৫ নম্বর বাসায় স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে থাকেন শহীদুল ইসলাম। তার পিতার নাম সেলিম বেপারি।’
একইভাবে শহীদুলের সঙ্গে আটক তার বন্ধু রাজুর বোন পুতুল জানান, রাজু একজন গাড়িচালক। মিরপুর ডিওএইসএস এলাকার এক ব্যক্তির প্রাইভেট গাড়ির চালক তিনি। বন্ধুত্বের সম্পর্কের কারণেই ওই রাতে শহীদুলের বাসায় গেলে রাজুকেও আটক করে পুলিশ। থানার সামনে কথা হয় পুতুলের সঙ্গে। রাজুকে ছাড়াতে টাকা দিয়েছেন বলে পুতুল দাবি করেন। তবু তার ভাইকে ছাড়েনি পুলিশ। পুতুল বলেন, ‘ভাইকে ছাড়বে বলছে। সোমবার রাত ১১টায় ৪ হাজার টাকা দিছি। প্রথম বলছে ১০ হাজার টাকা লাগবে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ থানা পুলিশের যন্ত্রণায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। একটা মানুষ গাড়িতে ওঠাতে পারলেই ৫ হাজার টাকা।
গতকাল ভোরে শহীদুল ও রাজুকে দেখতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হন তাদের স্বজনরা। থানার গেটে তখন দায়িত্ব পালন করছিলেন পুলিশ কনস্টেবল মোবারক ও আনসার সদস্য হারুন। টাকা দিয়েই শহীদুল ও রাজুর সঙ্গে দেখা হয় স্বজনদের। এ সময় তাদের সকালের নাশতা পৌঁছে দেন তারা। মিরপুর-১২-এর সি-ব্লকের তিন নম্বর লাইনের ১৭ নম্বর বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকেন রাজু আহমেদ।
এদিকে, টাকা লুট বা উৎকোচ হিসেবে গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে এসআই রাসেল বলেন, আওয়ামী লীগের মহানগরের নেতা নগর ইসমাইলের পল্লবীর বাসা থেকে মোবাইল ফোন ও স্বর্ণ চুরি হয়েছে। ওই মামলায় শহীদুল ও রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বাসা থেকে একজোড়া স্বর্ণের দুল আনা হয়েছিল চোরাইকৃত স্বর্ণ কি-না তা যাচাই করার জন্য। যাচাই করে এটি চোরাই না হওয়ায় ফেরত দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। এসআই রাসেল জানান, গতকাল তাদের দুজনকে আদালতে সোপর্দ করে একদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
এদিকে শহীদুলের স্ত্রী জুলি বলেন, কিছুদিন আগে দোকানের জন্য আড়াই হাজার টাকায় একটি পুরনো মোবাইল ফোন কিনেন শহীদুল। এটি যে চোরাই তা জানা ছিল না তার।
পল্লবী থানার পাশের দোকান থেকে স্বামীর জন্য কলা কিনতে কিনতে কাঁদছিলেন কোহিনূর বেগম। তার স্বামী জাহাঙ্গীর হোসেনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের অভিযোগ, তিনি বিএনপির রাজনীতি করেন। চোখের জল ফেলতে ফেলতে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা কোহিনূর বেগম বলেন, আমার স্বামী কোন দিন কোন দলের মিটিং-মিছিলে যাননি। আমি তো গত নির্বাচনে ভোট দিছি আওয়ামী লীগকে অথচ আজ আমার এ পরিণতি।
কোহিনূর বেগমের সঙ্গে গিয়েছিলেন আটক জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাই আলমগীর হোসেন। তিনি জানান, তার ভাই কাঁচামালের ব্যবসা করেন। পরিবারের সঙ্গে থাকেন মিরপুর-১১-এর স্বর্ণপট্টি এলাকায়। সোমবার বিকাল ৪টায় রিকশাযোগে দোকানে যাওয়ার পথে তাকে আটক করে পুলিশ।
প্রায় একই রকম অভিযোগ আটককৃত ইসমাইল হোসেনের স্বজনদের। পুলিশ জানিয়েছে, ইসমাইল হোসেন রাজনৈতিক নাশকতায় জড়িত। হরতালের সমর্থনে গাড়ি ভাঙচুর করছেন তিনি। তার হাতে খালেদা জিয়ার ছবিসংবলিত ব্যনার ও পেট্রলবোমা পাওয়া গেছে। তাকে সোমবার সকাল ১০টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের এসব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে ইসমাইলের স্বজনরা জানিয়েছেন, ইসমাইল রাজনীতি করেন না। তিনি একজন পোশাকশ্রমিক। তার ভাইঝি শাহীনূর মানবজমিনকে বলেন, রাতে পুলিশ মূলত কালশী এলাকায় অন্য আসামিকে ধরতে যায়। সেখানে ওই আসামিকে না পেয়ে পাশের বাসা থেকে চাচাকে (ইসমাইল হোসেন) ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায় থানায়। আমার চাচা কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী কিংবা নেতা নন। শাহীনূর অভিযোগ করেন, ইসমাইলকে রোববার রাত সাড়ে ৯টায় গ্রেপ্তার করলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে তাকে সোমবার সকালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা মামলায় গতকাল ইসমাইলের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় থানার সামনে কথা হয় ইসমাইলের স্ত্রী রুনা ও ভাইঝি শাহীনূরের সঙ্গে। থানার সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন নূর হোসেনের স্ত্রী মর্জিনা বেগম। নূর হোসেন রাজনীতি করেন না। বুঝেনও না। তার বন্ধু তাহেরের ভাষায়, নূর হোসেন খুব সহজ-সরল ছেলে। রাজনীতি কি জিনিস ভাল বুঝে না। তিনি জানান, নূর হোসেন মিরপুর ডিওএইচএসের এক ব্যক্তির প্রাইভেট কার চালান। সোমবার বেলা ২টায় তাকে আটক করে প্রথমে গাড়িতে তুলে বিভিন্ন স্থানে ঘোরায়। এ সময় তার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে পারলে তখনই ছেড়ে দিতো। টাকা না পেয়ে নাশকতার মামলায় ঢুকিয়ে দিছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নূর হোসেনের স্ত্রী মর্জিনা বেগম জানান, সোমবার ৩টার পর থেকে তার ফোন বন্ধ। মিরপুর সিরামিকের পাশে বাসা থেকে বের হন মালিকের বাসা মিরপুর ডিওএইচএসের উদ্দেশে। তার ফোন বন্ধ পেয়ে মালিক তাকে ফোন দিয়েছিলেন। পরে মালিক খুঁজতে খুঁজতে তার বাসায় আসেন। সারাদিন খোঁজার পর সন্ধ্যায় তারা জানতে পারেন নূর হোসেনকে পুলিশ আটক করেছে। মর্জিনা বলেন, এমন একটা মানুষ ডিউটি করে সোজা বাসায় ঢোকে। রাজনীতি, নাশকতা তো দূরের কথা পান-সিগারেটও খায় না এই মানুষ। বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়েরকৃত মামলায় তার স্বামীকে আসামি করা হয়েছে জেনে থানার সামনেই চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে নূর হোসেনে স্ত্রী মর্জিনা বলেন, ছোট দুটি বাচ্চা। একটা স্কুলে। আরেকটা কোলে। বাচ্চাদের এখন কে দেখবে, এখন আমরা বাঁচবো কেমনে?
পল্টন থানা: ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা। মশার কয়েলের প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন আরিফ (২৫)। কিছুক্ষণ পরপর রাজধানীর পল্টন মডেল থানা ফটকে পায়চারী করছেন। তার সঙ্গে এসেছেন আরও চার নিকটাত্মীয়। সবার চেহারায় উৎকণ্ঠার ছাপ। তাদের একজন অনবরত মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। পরিচিত প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্নজনের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছেন না। আরিফের বড় ভাই শরীফ (৩০) থানাহাজতে আটক। সোমবার সকালে রাজধানীর নয়া পল্টনের মা স্টোরের কর্ণধার মো. শরীফকে ভিজিটিং কার্ড দিয়ে পল্টন মডেল থানায় দেখা করতে বলেন ওই থানার এক দারোগা। ঘণ্টাখানেক পর সাহস নিয়ে তিনি থানায় যান। তার পরই ঘটে বিপত্তি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে হাজতে ঢুকিয়ে দেয় পুলিশ। এ সময় কারণ জানতে চাইলে থানার ওসি মোর্শেদ আলম তাকে জানান, আপনার দোকানের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি আমাদের তদন্ত করতে হবে। তদন্তের স্বার্থে আপনাকে থানায় থাকতে হবে। শরীফের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে জানতে তার গ্রামের বাড়িতে চাঁদপুর সদর থানার মাধ্যমে খোঁজ নেয় পুলিশ। কিন্তু তার কোন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায়নি পুলিশ। এমনকি রাজধানীর কোন থানায় তার বিরুদ্ধে একটি জিডি কিংবা মামলাও নেই। তার পরও থানাহাজত থেকে তাকে ছাড়েনি পুলিশ। থানা থেকে বলা হচ্ছে, শরীফকে কোর্টে চালান দেয়া হবে। এদিকে রাতেই থানা ফটকে কয়েকজন দালাল শরীফকে ছাড়াতে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়ার প্রস্তাব দেয় তার ভাইকে। তবে তাদের প্রস্তাবে রাজি হননি তিনি। থানার সামনেই কথা হয় আরিফের সঙ্গে। তিনি মানবজমিনকে জানান, নয়া পল্টনস্থ আনন্দ ভবনের গলিতে আমার ভাইয়ের একটি কনফেকশনারির দোকান (মা স্টোর) রয়েছে। রোববার ওই এলাকায় একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় পরদিন সকালে দোকান খোলার পরপরই পল্টন মডেল থানার এক দারোগা আমার ভাইকে একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে আসেন এবং থানায় দেখা করতে বলেন। ঘণ্টাখানেক পর সরল মনে আমার ভাইও থানায় যান। কিন্তু ওসি তাকে থানাহাজতে ঢোকানোর নির্দেশ দেন। আরিফ বলেন, আমার ভাই যেহেতু ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, তাই সৎ সাহস নিয়ে থানায় যান। তিনি যদি ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতেন তাহলে থানায় যেতেন না। ওই ঘটনার পর তিনি পালিয়ে যেতেন। কিন্তু পুলিশ তাকে হাজতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। থানার ওসির কাছে আমার ভাই আটকের কারণ জানতে চাইলে ওসি বলেন, দোকানের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় তদন্ত চলছে। এ ব্যাপারে আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। তদন্তের স্বার্থে আরিফকে থানায় থাকতে হবে। ওই ঘটনা শোনার পরপরই আমরা থানার সামনে আসি। সকাল ১০টা থেকে রাত পর্যন্ত এখানে অবস্থান করছি। মাঝে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে দুপুরের ও রাতের খাবার দিয়ে এসেছি। তিনি বলেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির এপিএস ভাইকে ছেড়ে দেয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন। এ ছাড়া পুলিশের উচ্চপদস্থ কয়েক কর্মকর্তাও পল্টন থানার ওসিকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি কারও কথা শুনেননি। ছেলের আটকের খবর শোনার পর বৃদ্ধ মা বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন জানিয়ে আরিফ বলেন, মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার আবুল হোটেলের পেছনে একটি ভাড়া বাসায় মা-ভাবীসহ পুরো পরিবার নিয়ে থাকি। সকাল থেকে আমাদের বাসার সবার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ রয়েছে। আমার মা বারবারই মূর্ছা যাচ্ছেন। ভাবি কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে গেছেন। ভাইয়ের দুই বছরের একটি ছেলে বাবার জন্য কান্নাকাটি করছে। আত্মীয়স্বজন সবাই টেনশনে আছেন। পেশায় মাইক্রোবাসচালক আরিফ বলেন, আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকেন। আমার ভাই কনফেকশনারি দোকানে ব্যবসা করেন। আমি একটি কোম্পানির গাড়ি চালাই। আমাদের পরিবারের কেউই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। এমনকি কোনদিন কোন দলের মিছিলেও যাইনি। তিনি বলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর সদরে। ভাইয়ের সম্পর্কে খোঁজখবর চাঁদপুর সদর থানায় ফোন দেয়া হয় পল্টন থানা থেকে। কিন্তু ওই থানা থেকে আমার ভাই সম্পর্কে ভাল রিপোর্ট দিয়েছে। তারা কোন ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি। এর পরও আমার ভাইকে তারা ছাড়েনি। তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর দুই লোক আমাকে টাকার বিনিময়ে ভাইকে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। একজন ১৫ হাজার টাকা ও আরেকজন ২০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। বিশ্বাস না হওয়ায় তাদের টাকা দেইনি। আরিফকে গতকাল সকালে কোর্টে হাজির করার কথা থাকলেও করা হয়নি। এমনকি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে ছাড়েনি পুলিশ। পল্টন থানার ওসি মোর্শেদ আলম মানবজমিনকে বলেন, এক এসআই তিনজন লোককে সন্দেহজনকভাবে ধরেছেন। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, আমার থানায় কোন পুলিশ কর্মকর্তা আটক-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নয়। যদি কেউ জড়িত প্রমাণিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোন ছাড়া দেয়া হবে না। এ বিষয়ে সরাসরি মতিঝিল জোনের পুলিশের ডিসি অবগত রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। শরিফের আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে।
লালবাগ থানা: মধ্যরাত। রাজধানীর লালবাগ থানার সামনে কয়েকজনের জটলা। সমবয়সী তিন কিশোর সোহাগ, রনি ও শুভ দাঁড়িয়ে আছে। তিনজনই বন্ধু। কিছুক্ষণ আগেই নবাবগঞ্জের ঢাল থেকে লালবাগ থানার টহল পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে আসে। পুলিশের অভিযোগ, শুভর পকেটে এক পোঁটলা গাঁজা ছিল। সোহাগ জানায়, শুভর কাছে সে কিছু টাকা পেতো। ওই টাকা ফেরত দেয়ার জন্য শুভ তাকে রাত ২টার দিকে ফোন করে ডেকে আনে। এ সময় শুভর সঙ্গে ছিল তাদের আরেক বন্ধু রনি। রনির বাড়ি সাভারে। সে মাঝেমধ্যে তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে আসে। সোহাগ ও শুভর বাড়ি কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। কামরাঙ্গীরচর এলাকায় তারেক সাউন্ড সিস্টেম নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সোহাগ। তিন বন্ধু একসঙ্গে হওয়ার পর সোমবার রাত ৩টায় নবাবগঞ্জ ঢাল এলাকা থেকে তাদের আটক করে পুলিশ। এরপর সাড়ে তিনটার দিকে তাদের থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশের গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-১১-০৭৬২) থেকে নামিয়ে শুভকে সোজা থানার ভেতরে নিয়ে যান পুলিশ কর্মকর্তারা। অপর দুজন সোহাগ ও রনিকে গাড়িতে বসিয়ে রাখা হয়। থানার সামনে সোহাগ জানায়, তাদের বন্ধুর কাছে যে গাঁজা ছিল তার তারা দুজন জানতো না। সোহাগ ও রনি আরও জানায়, এই প্রথমবার তারা এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। থানায়ও এটাই তাদের প্রথমবার। তবে তাদের দুজনের কাছে কিছু না পাওয়া গেলেও কেন তাদের ধরে নিয়ে এসেছে তা তারা জানে না। একটু পরেই থানার ভেতর থেকে ডাক আসে তাদের দুজনেরও। পরে থানা থেকে বের হয়ে জানায়, তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলেছে, শুভর বিরুদ্ধে মামলা হবে। শুভর কাছে গাঁজা পাওয়া গেছে এই মর্মে সাক্ষী দিলে তাদের দুজনকে ছেড়ে দেয়া হবে। তারা সাক্ষী দিতে সম্মতও হয়েছে। কিন্তু তার পরও তাদের ছাড়া হয়নি। রাতভর থানার সামনেই অবস্থান করতে হয় তাদের। তবে এর মধ্যেই দফায় দফায় থানার ভেতর থেকে ডাক পড়ে তাদের।
এদিকে ওই টহলে অংশ নেয়া পুলিশ কনস্টেবল মুক্তার জানান, আমরা তাদের ধরতাম না। কিন্তু পুলিশ দেখেই তারা পালানোর চেষ্টা করেছিল। এ সময় সন্দেহবশত তাদের আটক করা হয়। তিনি আরও জানান, যার পকেটে গাঁজা পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে সকালে কোর্টে চালান করে দেয়া হবে। বাকিদের ছেড়ে দেয়া হবে। পরে অবশ্য সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সোহাগ ও রনিকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। আর শুভকে কোর্টে চালান দেয়। সোহাগ অভিযোগ করে বলে, পুলিশ তাদের রাতেই ছেড়ে দিতো কিন্তু সোর্স ফয়সাল তাদের আসতে দিচ্ছিল না। সে বারবার তাদের বলছিল ১৫০০ টাকা দিলেই ছেড়ে দেয়া হবে।
প্রতিবেদন তৈরি করেছেন- নুরুজ্জামান লাবু, মাহমুদ মানজুর, রোকনুজ্জামান পিয়াস, কাজী সুমন, রুদ্র মিজান, নূর মোহাম্মদ ও আল আমিন।