Showing posts with label দূর পরবাস. Show all posts
Showing posts with label দূর পরবাস. Show all posts

Wednesday, April 1, 2026

ইতিহাস আর বরফ পাহাড়ে মোড়ানো অনিন্দ্যসুন্দর ‘আসিয়াগো’ by ইসমাইল হোসেন স্বপন

প্রকাশ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ইতালির উত্তরাঞ্চলে ভেনেতো অঞ্চলের ভিছেন্সা প্রদেশে অবস্থিত এক শান্ত পাহাড়ি জনপদ—আসিয়াগো। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজ আর বরফে মোড়ানো এক নিস্তব্ধ স্বর্গভূমি। চারপাশে পাহাড়, বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, কাঠের ঘর আর মেঘ ছোঁয়া আকাশ—যেন প্রকৃতি এখানে নিজ হাতে ছবি এঁকেছে।

শীতকালে এই অঞ্চল ঢেকে যায় ঘন সাদা তুষারে। তখন আসিয়াগো প্ল্যাটো রূপ নেয় ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় শীতকালীন পর্যটন গন্তব্যে। স্কি ট্র্যাক, স্নোবোর্ডিং, কেবল কার আর পাহাড়ি রিসোর্টে ভিড় জমান পর্যটকেরা। ইতালি ছাড়াও অস্ট্রিয়া, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের নানা দেশ থেকে মানুষ ছুটে আসেন বরফ পাহাড়ের আহ্বানে।

তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ইউরোপীয় ইতিহাসের এক গভীর ও রক্তাক্ত অধ্যায়—যে ইতিহাস আজও পাহাড়ের নীরবতায় কথা বলে। আজ যে পাহাড়ে শিশুরা স্লেজ চালায়, যে উপত্যকায় পর্যটকেরা ছবি তোলে—ঠিক সেই জায়গাগুলোই এক শতাব্দী আগে ছিল মৃত্যুভয় আর গোলার শব্দে কাঁপতে থাকা ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্র।

আসিয়াগো প্ল্যাটো ছিল ইতালিয়ান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ফ্রন্ট। দুর্গম পাহাড়ি এই অঞ্চল দখল নিয়ে দীর্ঘদিন চলে ভয়ংকর লড়াই। প্রবল তুষারপাত, তীব্র শীত আর পাহাড়ি দুর্গমতায় অসংখ্য সৈন্য যুদ্ধ না করেই প্রাণ হারান।

আজও পাহাড়ি পথে হাঁটলে চোখে পড়ে সেই সময়কার ট্রেঞ্চ, বাংকার, গোলাবারুদের গর্ত আর পরিত্যক্ত সামরিক কাঠামো। প্রকৃতি অনেক ক্ষত ঢেকে দিলেও ইতিহাস পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেনি তার চিহ্ন।

আসিয়াগোর সামরিক স্মৃতিসৌধে সংরক্ষিত আছে প্রায় ৫৪ হাজার শহীদের নাম ও স্মৃতি। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই স্মৃতিসৌধ যেন নীরবে জানিয়ে দেয়—এই সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত তরুণের অপূর্ণ জীবন।

আসিয়াগোর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এখানে প্রকৃতি কথা বলে নীরব ভাষায়। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে কোনো কোলাহল নেই, নেই শহরের ব্যস্ততা। শুধু বাতাসের শব্দ, দূরের গাছের ফিসফিস আর বরফের ওপর হাঁটার মৃদু আওয়াজ। এই নীরবতার মাঝেই ইতিহাস আরও গভীর হয়ে ওঠে। অনেক পর্যটক শুধু স্কি করতে আসেন, আবার কেউ কেউ আসেন ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে। বিশেষ করে ইউরোপের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা আসিয়াগোকে বেছে নেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পাহাড়ি যুদ্ধকৌশল ও মানবিক বিপর্যয় বোঝার জন্য।

যুদ্ধের ইতিহাসের বাইরেও আসিয়াগোর রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়। একসময় এই অঞ্চলে বসবাস করত Cimbrian জনগোষ্ঠী—যাদের ভাষা ও জীবনধারা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। জার্মানিক উৎস থেকে আসা এই জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে পাহাড়ে বসবাস করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাষা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

তবু লোকগান, উৎসব, কাঠের ঘর নির্মাণশৈলী ও গ্রামীণ রীতিনীতিতে আজও সেই প্রাচীন সংস্কৃতির ছাপ রয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষজন এখনো গর্বের সঙ্গে বলেন—আসিয়াগো শুধু একটি জায়গার নাম নয়, এটি একটি জীবনধারা।

আসিয়াগোর কথা বলতে গেলে একটি নাম আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়—আসিয়াগো চিজ। বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই চিজ শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, বরং পাহাড়ি মানুষের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতীক। স্থানীয় গরুর দুধ থেকে তৈরি এই চিজের স্বাদে যেমন রয়েছে প্রকৃতির ছোঁয়া, তেমনি আছে পাহাড়ি জীবনের ইতিহাস। আজও অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চিজ তৈরি করে আসছে। পর্যটকেরা আসিয়াগো ভ্রমণে এসে স্থানীয় খামার ঘুরে দেখেন, চিজ তৈরির প্রক্রিয়া শেখেন এবং সেই স্বাদ সঙ্গে করে নিয়ে যান স্মৃতি হিসেবে।

সময় বদলেছে, যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু আসিয়াগো অতীতকে ভুলে যায়নি। বরং ইতিহাসকে ধারণ করেই আধুনিক পর্যটনের পথে এগিয়েছে এই পাহাড়ি জনপদ। এখানে রয়েছে মিউজিয়াম, স্মৃতিপথ, যুদ্ধভিত্তিক হাইকিং ট্রেইল—যেখানে হাঁটতে হাঁটতে পর্যটকেরা ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারেন।

একদিকে আধুনিক স্কি রিসোর্ট, আরেক দিকে শতবর্ষ পুরোনো ট্রেঞ্চ—এই বৈপরীত্যই আসিয়াগোকে করে তুলেছে অনন্য। এখানে প্রকৃতি যেমন মানুষের মন ছুঁয়ে যায়, তেমনি ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের ভয়াবহতা আর শান্তির মূল্য।

বরফে ঢাকা পাহাড়, সবুজ উপত্যকা, স্মৃতিসৌধ আর পাহাড়ি মানুষের সহজ জীবন—সব মিলিয়ে আসিয়াগো যেন সময়ের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক গল্প।

Friday, July 25, 2025

আলহামরা: স্পেনে মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন by মো. রাশেদুল আলম

স্পেনের গ্রানাডা প্রভিন্সে মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন ঐতিহাসিক আলহামরার আয়তন ৩৫ একর। বিশাল এই কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হয় ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ শতকে। আরবি শব্দ আল-কালাত-আল-হামরা থেকে আলহামরা নামটি এসেছে, যার অর্থ লাল দুর্গ।

ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিক কথা—

গ্রানাডা শহর থেকে দূরে একটি মালভূমিতে নির্মিত আলহামরা তখন গ্রানাডার গভর্নর মুহাম্মেদ ইবনে আল আহমার, তিনিই আলহামরা নির্মাণের প্রদর্শক ও নাসরিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। প্রধানত ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ সালের মধ্যে, ইবনে আল-আহমার ও তাঁর উত্তরসূরিদের শাসনামলে নির্মিত হয় আলহামরা। অভ্যন্তরের চমৎকার অলংকরণগুলো নির্মাণ করেন প্রথম ইউসুফ (মৃত্যু ১৩৫৪)। ১৪৯২ সালে মুরদের পরাজয়ের পর, অভ্যন্তরটির বেশির ভাগ অংশ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং মূল্যবান আসবাব ধ্বংস বা অপসারণ করা হয়। স্পেনের শাসক চার্লস পঞ্চম (১৫১৬-৫৬) একটি ইতালীয় প্রাসাদ নির্মাণের জন্য আলহামরার কিছু অংশ খুলে নিয়ে যান। ১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়। ১৮২১ সালের ভূমিকম্পে কমপ্লেক্সের আরও ক্ষতি সাধিত হয়।

আলহামরা বিরল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আলয়ে অবস্থিত। যে মালভূমিতে এটি নির্মিত, সেটি গ্রানাডার মুরিশ মুসলিমদের পুরোনো শহর। মালভূমির গোড়ায় দারো নদী উত্তরে গভীর খাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। প্রাসাদের বাইরের উদ্যানটি মুররা গোলাপ, কমলা ও চিরহরিৎ বৃক্ষ রোপণ করে সাজিয়েছিল। উদ্যানের নিচের প্রবেশদ্বার, বাংলায় বলা যায় ডালিমের গেট, ১৬ শতকে তৈরি বিশাল বিজয়ের খিলান। ১৫৫৪ সালে তৈরি করা হয়েছিল, আলহামরার প্রধান প্রবেশদ্বার। আরও একটি বর্গাকার টাওয়ার ঘোড়ার নালের মতো খিলানপথ, যা মুররা বিচারের স্থান বা আদালত হিসেবে ব্যবহার করত।

অভ্যন্তরে সিংহাসন কক্ষ বা ‘হল অব দ্য অ্যাম্বাসেডরস’ আলহামরার বৃহত্তম কক্ষ। কক্ষটি ৩৭ ফুট এবং শীর্ষে একটি গম্বুজ, যার কেন্দ্র ৭৫ ফুট উচ্চ। বিশাল অভ্যর্থনাকক্ষ এবং সুলতানের সিংহাসনটি প্রবেশদ্বারের বিপরীতে স্থাপন করা হয়েছিল। গ্রানাডার শেষ সুলতান বোবদিল এই কক্ষে একটি ভোজসভায় আমন্ত্রিত অতিথিদের গণহারে হত্যা করেছিলেন। সিলিংটি নীল, বাদামি, লাল এবং সোনায় চমৎকারভাবে সজ্জিত। হলের মাঝখানে একটি ফোয়ারা এবং পুরো কক্ষটি উপদেশমূলক বাক্য ও কোরআনের সুরায় উৎকীর্ণ মুরিশ স্ট্যালাকটাইটের কাজের একটি অসামান্য উদাহরণ। এ ছাড়া আলহামরায় রয়েছে তিনটি প্যালেস, প্যালেস অব লায়ন্স, পোর্টাল প্যালেস ও কোমারেস প্যালেস। রয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা, হল অব দ্য কিংস, কোর্ট অব লং পন্ডস, কোর্ট অব মিরলেস ইত্যাদি।

স্পেনে মুসলিম সভ্যতা ও স্থাপনাগুলো দেখার ইচ্ছা ছিলো স্কুলজীবন থেকেই। বিশেষ করে আলহামরা। বছর কয়েক আগে মুসলিম সভ্যতায় উদ্ভাসিত ঐতিহাসিক টলেডো দেখে এসেছি। টলেডোকে বলা হয় ‘স্পেনের আত্মা’। পবিত্র জেরুজালেম নগরীর পরই টলেডোর স্থান, যেখানে খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলিম সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করে টলেডোকে ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে গেছেন। ভোর ছয়টায় স্টকহোম থেকে উড়াল দিয়ে আন্দালুসিয়ার প্রধানতম বিমানবন্দর মালাগায় এসে যখন নামলাম, তখন সকাল সাড়ে ১০টা বেজে গেছে। সঙ্গে খুব একটা লাগেজ নেই, শুধু দুজনার দুটি ব্যাগ। দ্রুত ইমিগ্রেশন পার হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেই আমাদের গাইডের সঙ্গে দেখা হলো। ৪০–৪২ বছর বয়েসের সুঠাম দেহি এক নারী আনিকা এলওইং। আনিকা জন্মগতভাবে সুইডিশ তবে ২৩ বছর ধরে স্পেনেই বসবাস, তাই সুইডিশ ও স্প্যানিশ—দুটি ভাষাতেই দক্ষ। স্পেনে ভাষাগত অসুবিধে ব্যাপক। স্প্যানিশরা স্প্যানিশ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় বলে না বোঝেও না, ইংরেজি তো নয়ই। স্কুল–কলেজে সরকারিভাবে স্প্যানিশ ভাষাটিই শিক্ষা দেওয়া হয়, ইংরেজি নয়। ইংরেজি শিখতে হলে প্রাইভেট ‍শিখতে হয় আর তা ব্যয়বহুল বলে স্প্যানিশরা এড়িয়ে গেছে। রাস্তাঘাটের দিকনির্দেশনাগুলোও স্প্যানিশ ভাষায়, বোঝার উপায় নেই তাই আনিকাই আমাদের ভরসা।

মালাগা থেকে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা ট্যুরিস্ট বাস যাত্রার পর এলাম ঐতিহাসিক গ্রানাডায় আমাদের নির্ধারিত হোটেলে। ঝকঝক তকতকে বিশাল কামরা। উষ্ণ সাওয়ার নিতে নিতেই আলহামরা দেখার সময় হয়ে এল। দীর্ঘ প্লেন–যাত্রার জন্যই হোক বা অন্য উপসর্গ হোক ডান দিকের পায়ে পেইন অনুভব করছিলাম। হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল। শুনেই আনিকা ছুটে এলেন। ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে গেলাম ফার্মাসিস্টের কাছে। আনিকা স্প্যানিশ ভাষায় সব বুঝিয়ে বলার পর ফার্মাসিস্ট একটি ইলাস্টিক ব্যান্ড ও মাসল রিল্যাক্সের ট্যাবলেট দিলেন। এখানেও ইংরেজি কোনো কাজে এল না, স্প্যানিশ ছাড়া। মাসল রিল্যাক্সের যে প্যাকেট পেলাম, সেখানে সবই স্প্যানিশে নির্দেশনা দেওয়া,কী বিপদ! হোটেলের কাছেই আলহামরা, ১০–১৫ মিনিটের হাঁটা রাস্তা। ঠিক হলো, সবাই আনিকার সঙ্গে পায়ে হেঁটে চলে যাবে আর আমি একা ট্যাক্সি নিয়ে যাব। ট্যাক্সি ভাড়া খুবই কম, মাত্র পাঁচ ইউরো, সুইডেনের কোথাও পাঁচ ইউরোতে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না।

নির্ধারিত সময়ে হোটেল থেকে ট্যাক্সি নিয়ে আলহামরায় চলে এলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার নির্ধারিত স্থানে নামিয়ে সামনে একটি পথ দেখিয়ে দিলেন। বাঁধানো চত্বরটি পেরিয়ে গাছের নিচে বেদির কাছে এসে দাঁড়ালাম। বিভিন্ন দেশের প্রচুর ট্যুরিস্ট আলহামরা দর্শনে এসেছেন। বেশ গরম তবে হাওয়া ঝিরঝিরে। ভিড়ের মধ্যে সবুজ মার্জিত পোশাকে এক স্প্যানিশ মেয়ে দাঁড়িয়ে। ভিড়ের মধ্যেও সতন্ত্র সে। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে মনে হলো, সে ট্যুরিস্ট নয় বা কারও জন্য অপেক্ষা করছে না, মেয়েটি পেছনে ফিরতেই দেখা গেল পেছনে ইংরেজি অক্ষরের ‘আই’ সিম্বলটি, অর্থ্যাৎ ইনফরমেশন। গাছের নিচে বেদিতে বসে আনিকা ও অনান্যদের অপেক্ষা করছিলাম।

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে আলহামরার আর্কশনে আরেকজন এসেছিলেন তবে ট্যাক্সিতে নয়, খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে। সালটা ১৮২৯ এর বসন্ত। আমেরিকান লেখক ওয়াসিংটন আরভিং, স্পেনের মুসলিম অতীত ইতিহাসে আগ্রহ জাগাতে যাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। মুরদের তৈরি সাজানো উদ্যান ডালিম গেটের ঠিক ভেতরে ‘টেলাস অব আলহামরা‘ লেখকের একটি মূর্তি রয়েছে। লেখক সেভিলা থেকে পাহাড়ি পথ পারি দিয়ে খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে গ্রানাডায় পৌঁছান। লেখক লিখেছেন সে সময়কার কথা, ‘স্পেনের বৃহত্তর অংশ কঠোর, বিষণ্ন। রুক্ষ পাহাড় ও দীর্ঘ বিস্তৃত সমভূমি, গাছপালাশূন্য এবং অবর্ণনীয়ভাবে নীরব ও একাকী। শকুন ও ঈগলকে পাহাড়ের চালে ঘুরে বেড়াতে ও সমভূমির ওপর উড়তে দেখা যায়, প্রকৃতি যেন আফ্রিকার বর্বর ও নির্জন চরিত্রের অংশীদার।

‘স্প্যানিশ খচ্চরচালকের কাছে গান ও ব্যালাডের এক অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে, যা দিয়ে তারা ভ্রমণের ক্লান্তিকে বিভ্রান্ত করে। খচ্চরচালকেরা উচ্চস্বরে এবং দীর্ঘ টান টান তালে গানগুলো উচ্চারণ করে আর খচ্চরের ওপর বসে অসীম গুরুত্বের সঙ্গে সময়কে তার গতিতে সুরের সঙ্গে ধরে রাখে। এই গানগুলো প্রায়ই মুরদের সম্পর্কে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী রোমান্স অথবা কোনো সাধুর কিংবদন্তি অথবা কোনো প্রেমের কবিতা অথবা একজন সাহসী চোরাচালানকারী অথবা কঠোর ব্যান্ডোলেরো সম্পর্কে কিছু ব্যালাড। কারণ, চোরাচালানকারী ও ডাকাত স্পেনের সাধারণ মানুষের কাব্যিক নায়ক। প্রায়ই খচ্চরওয়ালাদের গান মুহূর্তের মধ্যে রচিত হয় এবং স্থানীয় দৃশ্য বা যাত্রার কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। গান গাওয়া ও ইম্প্রোভাইজ করার এই প্রতিভা স্পেনে প্রায়ই দেখা যায় এবং বলা হয় যে তারা মুরদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তারা যে অভদ্র এবং একাকী দৃশ্যগুলো চিত্রিত করে তার মধ্যে এই গানগুলো শোনার এক অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি আছে; যেমনটি হয় মাঝেমধ্যে খচ্চরের ঘণ্টার ঝনঝন শব্দও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। খচ্চরগুলো সারিবদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে খাড়া খাড়া পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসে।

প্রাচীন গ্রানাডা রাজ্য, যেখানে আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম, স্পেনের সবচেয়ে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি। বিশাল সিয়েরা বা পাহাড়ের শৃঙ্খল, ঝোপঝাড় বা গাছবিহীন এবং বিভিন্ন মার্বেল এবং গ্রানাইট দিয়ে সজ্জিত, তাদের রোদে পোড়া চূড়াগুলোকে গভীর নীল আকাশের বিরুদ্ধে উঁচু করে তোলে; তবুও তাদের রুক্ষ বুকে সবুজ এবং উর্বর উপত্যকা, যেখানে মরুভূমি ও বাগান লড়াই করে ডুমুর, কমলা ও লেবু উৎপাদন করতে এবং গোলাপ ফুল ফোটাতে বাধ্য হয়।

এই পাহাড়ের জঙ্গলে পাহাড়ের মাঝখানে ঈগলের বাসার মতো নির্মিত প্রাচীর ঘেরা শহর ও গ্রাম, মুরিশ যুদ্ধক্ষেত্র অথবা উঁচু চূড়ায় স্থাপিত ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রহরী টাওয়ারের দৃশ্য, মনকে খ্রিষ্টীয় ও মুসলিম যুদ্ধের শৌর্যের দিনগুলোতে এবং গ্রানাডা বিজয়ের রোমান্টিক সংগ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই উঁচু সিয়েরা অতিক্রম করার সময় ভ্রমণকারীকে প্রায়ই নেমে যেতে হয় এবং তার খচ্চর বা ঘোড়াটিকে খাড়া খাড়া আরোহণ এবং অবতরণ বরাবর ওপরে ও নিচে নিয়ে যেতে হয়, যা সিঁড়ির ভাঙা ধাপের মতো। কখনো কখনো রাস্তাটি মাথা ঘোরানো খাড়া খাড়া, অন্ধকার ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নেমে যায়। কখনো কখনো পথটি জলের স্রোত দ্বারা পরিপূর্ণ, চোরাচালানকারীদের অস্পষ্ট পথের মধ্য দিয়ে সংগ্রাম করে; রাস্তার কোনো এক নির্জন অংশে পাথরের ঢিবির ওপর নির্মিত ডাকাতি ও খুনের স্মৃতিস্তম্ভ, অশুভ ক্রুশ ভ্রমণকারীকে সতর্ক করে যে সে ডাকাতদের আড্ডার মধ্যে আছে, সম্ভবত সেই মুহূর্তেই কোনো ব্যান্ডোলেরোর চোখের সামনে চলে আসবে। কখনো কখনো সরু উপত্যকা দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় সে একটি কর্কশ চিৎকারে চমকে ওঠে এবং তার ওপরে পাহাড়ের কোনো সবুজ ভাঁজে হিংস্র আন্দালুসীয় ষাঁড়ের একটি পাল দেখতে পায়। এই সবে আমি ভয়াবহতা অনুভব করেছি।

স্প্যানিশ ও ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি আরভিংয়ের আগ্রহ, অতীতের প্রতি রোমান্টিক আকর্ষণের পাশাপাশি তিনি গ্রানাডা ভ্রমণে আসেন। তিনি বিশেষ করে আলহামরা এবং এর গল্প, কিংবদন্তি ও ইতিহাসের প্রতি আকৃষ্ট হন। গ্রানাডা ও আলহামরায় তাঁর সময়কাল তাঁর লেখায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, যার ফলে‘টেলস অব দ্য আলহামরার’ সৃষ্টি, যা প্রাসাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ণনা, পৌরাণিক কাহিনি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে উদ্ভাসিত করে। 

১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়
১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়। ছবি: লেখকের পাঠানো

Thursday, February 1, 2018

ব্রেইন ড্রেইন নাকি ব্রেইন গেইন?

বিজ্ঞান গবেষণার আর্টিকেল প্রকাশের সংখ্যায় চীন এই প্রথমবারের মতো আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৬ সালে চীন প্রায় সোয়া চার লাখ আর্টিকেল প্রকাশ করেছে। আমেরিকা করেছে চার লাখ নয় হাজার। বিজ্ঞান ইতিহাসের এই স্বর্ণযুগে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে শুধু চীনই এমন অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই চীনের প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ ভাগ সেরা সেরা তরুণ-তরুণী সারা দুনিয়াতে কাজ করে। তাহলে চীনের কি ব্রেইন ড্রেইন হচ্ছে না? যদি হয়েই থাকে, তাহলে এত ব্রেইন ড্রেইনের পর কী করে চীন এতটা হুংকার দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াল? আপনি যেটাকে দেখছেন সিক্স, সেটাকেই উল্টিয়ে কেউ দেখছেন নাইন। দুনিয়াতে কেউ যখন কোনো কিছুতে সমস্যা দেখে, কেউ দেখে সম্ভাবনা। আমরা যেটাকে বলি ব্রেইন ড্রেইন, চীন সেটাকে বলে ব্রেইন গেইন! চীন সরকার চায় তাদের আরও বেশি ছেলেমেয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ুক।
সে লক্ষ্যে তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। চীনের তরুণেরা নিজ দেশে পড়াশোনা করে ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে হিমশিম খায় না। চীন সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে মেধাবী তরুণদের আমেরিকায় পাঠায়। সে দেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় দশ হাজার তরুণ-তরুণী শুধু আমেরিকায়  আসে এক্সচেঞ্জ রিসার্চ প্রোগ্রামে। চীনের ছেলেমেয়েরা গড়ে ২৬–২৭ বছর বয়সে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে পিএইচডি শেষ করে। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা গড়ে ৩০–৩২ কিংবা আরও বেশি। চীনের প্রায় নব্বই ভাগ ছেলেমেয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে এসে সফলতার সঙ্গে শেষ করে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সেটা অনেক কম (সম্ভবত পঞ্চাশেরও নিচে)। অজস্র ছেলেমেয়ে দেশের পাট চুকিয়ে বিদেশে এসে ঝরে পড়ে। কারণ, শিক্ষার মানে ব্যাপক ভারসাম‍্যহীনতা!চীন সরকার তার দেশের সেরা মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে নিতে বহু প্রকল্প চালু করেছে। মেধাবীরা বিদেশ থেকেই সেসব প্রকল্পের ফান্ডের জন্য আবেদন করতে পারে। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে মেধাবীদের গবেষণার জন্য অর্থ প্রদান করা হয়। তাদের জন্য দেওয়া হয় অধিক সুযোগ-সুবিধা। সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো লাল-নীল দল দিয়ে পূর্ণ করে রাখা হয়নি। চীনের পরিকল্পনা হলো, তাদের ছেলেমেয়েরা সারা দুনিয়ার সেরা সেরা প্রতিষ্ঠান থেকে শিখবে। সেসব তৈরিকৃত ছেলেমেয়েদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে চীন তার নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে কাজে লাগাবে।আমার মতে, এই বিশ্বায়নের যুগে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বলে কিছু নেই। জ্ঞান অর্জন করতে পারলে, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সমাজের কাজে আসা যায়। তা ছাড়া যে সমাজ তার সম্ভাবনাকে পরিচর্যা করে না, সে সমাজে পড়ে থেকে নিজের সম্ভাবনাকে খুন করার নাম দেশপ্রেম নয়! বরং যেখানে গেলে মেধাকে বিকশিত করা যায় সেখানে গিয়ে বড় হয়ে, নিজের দেশের জন্যও নানা ভাবে কাজ করা যায়। অধিকন্তু, বিকশিত না হয়ে দেশকেও কিছু দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের জাহিদ হাসান যদি আমেরিকায় না আসত, তাহলে জাহিদ হাসান হতে পারত না। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হতে পারত না। ফার্মিয়ন আবিষ্কার করতে পারত না। সাইফ ইসলাম যদি আমেরিকায় না আসতেন, তাহলে ইউসি-ডেভিসের প্রফেসর হতে পারতেন না। তেমনি, সাইফ সালাহউদ্দিন এই তরুণ বয়সে হতে পারতেন না ইউসি-বার্কলের প্রফেসর।উন্নয়নশীল দেশের সরকার সকল শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জোগান দিতে পারে না। সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে না। সুতরাং উন্নয়নশীল দেশের ছেলেমেয়েদের মেধার বিকাশের জন্য উন্নত দেশের দ্বারস্থ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। চীনের অসংখ্য ছেলেমেয়ে সারা দুনিয়া থেকে এই সুযোগটা নিয়েছেন। এখনো নিচ্ছেন। তাদের যোগ্যতা দিয়েই তারা এই সুযোগ নিচ্ছেন। তাদের দেশ তাদের এই সুযোগ লুফে নেওয়ার জন্য উপযুক্ত করে তৈরি করছে। গত পঞ্চাশ বছরে চীন এভাবেই দাঁড়িয়েছে। ভারত এভাবেই দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশকেও এভাবেই দাঁড়াতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়ন করলে, প্রচুর ছেলেমেয়ে অনায়াসে বিদেশে পড়তে যেতে পারবে। বিদেশে পড়তে গিয়ে প্রচুর ছেলেমেয়ে ঝরে পড়বে না। তরুণেরা তাদের নিজের প্রচেষ্টা, মেধা ও শ্রম দিয়ে উন্নত দেশ থেকে শিখবে। রাষ্ট্র যদি তাদের সামান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে নিতে না চায়, তাহলে নিজ ভাগ্য হত্যা করে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া যাবে। তাতে ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। রাষ্ট্র উদ্যোগ নিলে, ব্রেইন ড্রেইন না হয়ে বহুগুণে ব্রেইন গেইন হবে। সে লক্ষ্যেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে হবে।
ড. রউফুল আলম, গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn), যুক্তরাষ্ট্র।
ইমেইল: <rauful.alam15@gmail.com>; ফেসবুক: <facebook.com/rauful15>

Monday, January 8, 2018

চিরশত্রু মায়া! by সারা বুশরা

কাল রাগ করে দুটো প্লেট আর একটা গ্লাস ভেঙেছে সে। প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল। রগচটা মানুষ সে। যা মুখে আসে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে শুধু বলতেই থাকে। একটা পর্যায়ে যখন অপমান চরম শিখরে উঠল আমিও বাধ্য হলাম প্রত্যুত্তর দিতে। সে এক বিশ্রী প্রতিযোগিতা। একজনকে কথায় আর চিৎকারে হারাতে পারলেই যেন আরেকজনের উদ্দেশ্য শিথিল হবে। যখন একপর্যায়ে বুঝতে পারল আমার যুক্তিতে সে কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে তখন টেবিল থেকে দুটো প্লেট নিয়ে জোরে জোরে আছাড় মেরে ফেলে নিজের জেদটা প্রকাশ করল। আমিও শুনিয়ে দিলাম এ রকম আনকালচার্ড লোকের সঙ্গে আর একদিনও নয়। এই বিশ্রী সম্পর্ক বয়ে বেড়িয়ে নিজেকে আর মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে রাখব না আমি। বিয়ে হয়ে গেছে দেখে সেটা টিকিয়ে রাখা পরম ধর্ম মনে করে স্বামীর পায়ের পাপোশ হয়ে পড়ে থাকা আমার পোষাবে না। সেও বীরদর্পে আরেকবার চেঁচিয়ে ঘোষণা করল, তাহলে চলে যাও। আমিও মরে যাচ্ছি না তোমার জন্য। যা খুশি করো, যেখানে যেতে চাও যাও। আই ডোন্ট কেয়ার! কান খুলে শুনে রাখো, আমি এবার মরে গেলেও সরি বলব না। আমি তীব্র ঝাঁজের সঙ্গে বললাম, তোমার ওই এক পয়সা দামের সরির জন্য আমি বসে আছি নাকি? ওতে আমার অরুচি হয়ে গেছে। ছি, তোমার ওই সরি ময়লার বিনে ফেলারও যোগ্য নাই আর। ব্যস অমনি আরেক দফা ঝনঝন শব্দ। তাকিয়ে দেখি এবার আমার পানি খাবার বড় গ্লাসটা শেষ। শখ করে কী সুন্দর ডিজাইনের এই গ্লাসটা কিনেছিলাম। সে খুব ভালো করে জানে এটা আমার প্রিয়। তাই ইচ্ছে করে নিজেরটা না ভেঙে আমারটা ভেঙে প্রতিশোধ নিল। আর থাকতে পারলাম না আমি। বললাম, জংলি, বর্বর...তোমার মতো ছোটলোকের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ভাবতেও ঘেন্না লাগছে। তোমার মুখ দেখতে চাই না কোনোদিন। জোর পায়ে এসে রুমে ঢুকে সশব্দে দরজা লাগিয়ে দিলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত দুটো বাজে। ভয়ানক মেজাজ খারাপ লাগতে লাগল। পুরো পৃথিবী এখন বাঁধ সাধছে। এই রাতে বের হব কী করে? মানুষটা ইচ্ছে করে রাতে বেলাটাই বেছে নিল এ রকম জঘন্য ব্যবহার করার জন্য? কোন জন্মের শত্রু সে আমার কে জানে? মনের ভেতর হাজারো বিষ জমিয়ে রেখেছে আমার প্রতি। শুধু সুযোগের অপেক্ষা। সেটা পেলেই ফণা তুলে ছোবল মারতে আসে। নাহ, এভাবে সংসার করতে পারব না আমি। আজকে এটা মেনে নিলে কালকে আরেক ডিগ্রি বাড়বে। পরশু তারও বেশি। পুরো জীবন যাবে মেনে আর মানিয়ে নিতে। নো ওয়ে! হোক, সকালটা হোক। এবার ওকে একটা শিক্ষা আমি দেবই দেব। এমন করে সে পার পেতে পারে না। ভাবতে ভাবতে চোখে পানি চলে এল। মানুষ কী করে এত বদলে যায়? বিয়ের আগে কী পাগল ছিল আমার জন্য! আমি হ্যাঁ বললে হ্যাঁ, না বললে না। আমি একটু মন খারাপ করলে দুনিয়া অন্ধকার দেখত। কী করে আমার মন ভালো করা যায় সেই চেষ্টা করত সারাক্ষণ। ওকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখতাম আমি। আমার দিক থেকে কোনো প্রেম ছিল না। ওর ভালোবাসা আর পাগলামো দেখে বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম। আমাকে নিজের করে পেয়ে সে সেই দিন প্রতিজ্ঞা করেছিল সারা জীবন ঠিক এভাবেই ভালোবাসবে আমায়। কোনো দিন আমার কোনো অযত্ন করবে না। কোনো দিন আমার কোনো দুঃখের কারণ হবে না। যে মানুষটার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল আমার হাসি মুখ দেখা সেই মানুষটা আজ আমাকে এভাবে কাঁদাচ্ছে? প্রচণ্ড অভিমানে আমার বলতে ইচ্ছা করল এই পৃথিবীর সব মিথ্যা। সব, সব, সব! ওর বালিশটা নিয়ে ড্রয়িংরুমে ছুড়ে ফেলে এলাম। তারপর বেডরুমের দরজাটা শব্দ করে লাগলাম। যদিও জানি চাইলে বাইরে থেকে সে দরজাটা খুলতে পারবে। তবে আমি বালিশ দিয়ে আসার পর মনে হয় না আর এ রুমে আসবে। মানসিক উত্তেজনায় ক্লান্ত ছিলাম। শোয়া মাত্রই ঘুম এসে গিয়েছিল। যখন উঠলাম দেখি সকাল সাড়ে নয়টা বাজে। বুঝলাম সে অফিস চলে গিয়েছে। ভালোই হলো। সে থাকলে তার সামনে দিতে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে আরও একবার ঝগড়া হতো। ঘর ছাড়ার মুখে কটু কথা শুনলে মনটা তিতা হয়ে যেত। এর চেয়ে ফাঁকা বাড়ি থেকে বের হওয়া বেটার। ওঠার পর থেকেই মাথা ভার হয়ে আছে। জ্বর জ্বর ভাবটা টের পাচ্ছি। টেম্পারেচার দেখতে ইচ্ছে করছে না। দুটো প্যারাসিটামল খেয়ে নেব নাকি? না থাক, চটপট কিছু জরুরি জিনিস ব্যাগে ভরে বাসা থেকে বার হয়ে নেই, তারপর চা-পানি-ওষুধ সব খাওয়া যাবে। চোখে মুখে পানি দিয়ে দ্রুত রেডি হলাম। ড্রেসিং টেবিল থেকে চিরুনি নিতে গিয়ে দেখি একটা প্লেটে দুটো স্যান্ডউইচ ঢেকে রাখা। পাশে এক প্যাকেট প্যারাসিটামল আর ছোট একটা চিঠি...। চিঠিতে লেখা— ‘সকালে রুমে ঢুকে দেখলাম গভীর ঘুমে আছ, তাই ডাকিনি। স্যান্ডউইচ দুটো খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিয়ো। নিশ্চয়ই মাথা ধরে আছে? তোমারতো একটু অনিয়ম হলেই মাথা ধরে যায়। স্যান্ডউইচ ভালো হয়নি জানি, তবু যা পারি করলাম। গোল মরিচের গুঁড়া দিয়েছি স্যান্ডউইচে, ঝাল ঝাল খেয়ে দেখ ভালো লাগবে। খালি পেটে ওষুধ খেয়ো না আবার প্লিজ।’ পড়া শেষ করে একবার ভাবলাম ছিঁড়ে ফেলি চিঠিটা। জুতো মেরে গরু দান! নাম সম্বোধন ছাড়া চিঠি লিখে দেখানো হচ্ছে খুব কেয়ার আমার জন্য। ভাবটা এমন যেন কিছুই হয়নি। গতকালের ঘটনার জন্য কোনো আক্ষেপ নেই, অপরাধবোধ নেই, উল্লেখ পর্যন্ত নেই। এসেছেন উনি স্যান্ডউইচ আর ওষুধ খাওয়াতে। কী ভেবেছে এসব করলে আমি সব ভুলে যাব? এত সোজা? ব্যাগ নিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দেখি মেঝে পরিষ্কার। কখন উঠেছিল সে? এত কিছু করল কখন? ভাঙা কাচের টুকরোগুলো কী তাহলে রাতেই সরিয়েছে? ঘুমাল কখন আর উঠল কখন? আমি তো কোনো সাউন্ডই শুনতে পেলাম না। মনটা কেন জানি হু হু করে উঠল হঠাৎ। এ রকম পরিস্থিতিতে কী করা উচিত? আত্মসম্মান নিয়ে যে এখানে আর কোনোভাবেই থাকা যায় না। যে মানুষ নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না, যখন-তখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আজেবাজে কথা বলে, নিম্ন শ্রেণির লোকজনের মতো চিৎকার দেয়, জিনিস ভাঙে, নষ্ট করে, সেই আবার মাথা ঠান্ডা হলে এমন অদ্ভুত সব কাজ করে যে তখন মনটা নরম হয়ে আসে। মানুষটা বহুবার প্রমিজ করেছে আর রেগে উল্টোপাল্টা কথা বলবে না। বিশ্রী ব্যবহার করবে না। তবু সে সেটা বারবার ভুলে যায়। কিছুতেই কথা রাখতে পারে না। সেই অগ্নিমূর্তি দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস হয় না সে আমায় আর ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষকে কি এভাবে যখন-তখন আঘাত করা যায়? ভালোবাসার মানুষের চোখের পানি দেখেও না দেখার ভান করে থাকা যায়? উঁহু, সে আর ভালোবাসে না আমায়। একসঙ্গে আছি হয়তো সেই বন্ধনটার প্রতি কিছু অনুভূতি অবশিষ্ট আছে তার...হয়তো আমি তার অভ্যাস পরিণত হয়েছি। আমি না থাকলে এত শত্রুতা কার সঙ্গে করবে? কাকে জ্বালাবে এত? কাকে কষ্ট দেবে? আচ্ছা, আমিই বা কেন সব জেনেও ভেতর থেকে সায় পাচ্ছি না এভাবে চলে যাওয়ার? বিকেলে বাড়ি ফিরে খালি ঘরটা দেখে অস্থির হবে, একটা শাস্তি দিতে পারব এটা ভেবে তো আমার ভালো ফিল করার কথা। কিন্তু তার বদলে এত অস্বস্তি কেন লাগছে? তাহলে কী আরেকটা সুযোগ দেব? একটু অপেক্ষা করে দেখব এবার মন থেকে নিজের ভুলটা উপলব্ধি করতে পারে কিনা? সত্যি সত্যি নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করে কিনা? ঠিক আছে, তাই হোক তবে। দিন গড়িয়ে যায়। উফ, আজ যেন অন্য দিনের চেয়েও বেশি দেরি করছে বাড়ি ফিরতে। কোনো মানে হয়? আবারও ইচ্ছে করে জ্বালাতে চাইছে! জানে দেরি করা আমি পছন্দ করি না তাই এমন করছে। ওহ, তার মানে কালকের রেশ এখনো আছে? প্রতিশোধ নেওয়া এখনো শেষ হয়নি। ওই ওষুধ, খাবার এগুলো সব প্ল্যান ছিল আমাকে বাসায় আটকে রাখার জন্য। যেন আরেকটু বেশি করে আমাকে কষ্ট দিতে পারে। আর আমি বোকার হদ্দ, ভেবে বসে আছি এবার হয়তো তার মধ্যে অনুশোচনা হবে। ঠিকই আছে, আমার মতো ইডিয়টের সঙ্গে এমনি হওয়া উচিত। ঘরে ছেড়ে চলে যাচ্ছিলাম, যেতাম। তা না, পুরোনো আমলের সিনেমার নায়িকাদের মতো ঢংয়ের কল্পনায় মজে গেলাম। আমি নিজেই আসলে একটা অসহ্য! বেল বাজল অবশেষে। একরাশ রাগ আর তিক্ততা নিয়ে দরজা খুলে দিলাম। দেখি মুখ কাঁচুমাচু করে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—কি হয়েছে? চেহারার দুঃখী দুঃখী ভাবটা আরও প্রকট হলো তার....মুখটা করুন করে আমার হাতে একটা প্যাকেট দিল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? আর এটা কি? বলল, আমি অনেকগুলো দোকানে খুঁজলাম। ওটার মতো পেলাম না। কি পেলে না? কি বলছ এসব? বিশ্বাস করো। সত্যি অনেক খুঁজেছি। ওই ডিজাইনটা আর দেখলাম না কোথাও। এটাই শুধু অনেকটা ওই রকম লাগল তাই এটা কিনেছি। প্লিজ রাগ করো না। আমি নেটে খুঁজব এবার। কোথাও না কোথাও ওটা পাওয়া যাবেই। তখন আবার কিনে দেব তোমাকে। প্যাকেট খুলে দেখি একটি গ্লাস। কিম্ভূতকিমাকার এক ডিজাইন। অন্য সময় হলে হয়তো রাগই হতো কিন্তু এখন মনটা বিষণ্ন বেদনা বিধুর হয়ে গেল। পুরুষের অসহায় মুখ বড়ই মায়াময়। কিছুটা দুর্লভও বটে। আর তাই বুঝি উপেক্ষা করা এত কঠিন। তারা এই অস্ত্র ব্যবহার করে অতীতে মেয়েদের দুর্বল করেছে। ভবিষ্যতেও করবে। আমি খুব ভালো করে জানি, ও আবারও আমাকে বিভিন্নভাবে কষ্ট দেবে। মিথ্যে প্রতিজ্ঞা করবে। আমার হতাশার কারণ হবে। বুঝে না বুঝে অপমানও করবে। তবু ওই করুণ মুখটা দেখে বারবার আমার ওর কাছেই রয়ে যেতে ইচ্ছে করবে, বিশ্বাস করতে মন চাইবে।
লোকে বলে এটাই ভালোবাসা।
আমি বলি মায়া।
অদ্ভুত শক্তিশালী এক মায়া।
আমি যে ভালোবাসার সংজ্ঞা জানি তার সঙ্গে তো এটা মেলে না...মেলে হৃদয় আর্দ্র করা মায়ার সঙ্গে।
ভালোবাসাতে তিক্ততা আসলে ভালোবাসা সৌন্দর্য হারায়, মিষ্টতা হারায়, গভীরতা হারায়।
কিন্তু মায়ায় কিছু হারানোর নেই, নষ্ট হওয়ার নেই।
ভালোবাসা দিয়ে বাঁধা না গেলেও মায়া দিয়ে ঠিকই মানুষকে বেঁধে ফেলা যায়।
বড় কঠিন জিনিস এই মায়া!
হায়রে মায়া...।
সবচেয়ে বড় শত্রুই এই মায়া...।
আবার পরম মিত্রও ঘুরে ফিরে সেই মায়াই...যুগে যুগে সম্পর্কগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে এই সর্বনাশি মায়া...।
সারা বুশরা: যুক্তরাজ্যপ্রবাসী।

Monday, April 3, 2017

মাহমুদ হাসানের মৃত্যুতে মালয়েশিয়ায় দোয়া

মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রবাসী কমিউনিটি নেতা মাহমুদ হাসানের মৃত্যুতে দোয়া ও মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার বাদ মাগরিব তিতিওয়াংসা সুরাউ বায়তুল মোকাররামে এ দোয়া মাহফিল হয়। এ সময় মোনাজাত পরিচালনা করেন হাফেজ মাওলানা মহিউদ্দিন। দোয়া মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন- আওয়ামী লীগের সাবেক আহবায়ক সোহরাওয়ার্দী হোসেন সোহরাব, মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি মকবুল হোসেন মুকুল, সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান কামাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, বিএনপি নেতা তালহা মাহমুদ, জাতীয় পার্টির সভাপতি এস এম রহমান পারভেজ, শ্রমিক লীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম বাবুল, সিনিয়র সহসভাপতি শাহ আলম হাওলাদার, সেচ্ছাসেবক লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জালাল উদ্দিন সেলিম প্রমুখ। গত শনিবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের একটি ক্লিনিকে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মাহমুদ হাসান (৬২) মারা যান।

মালয়েশিয়ায় নিয়োগকারীদের সঙ্গে হাইকমিশনারের মতবিনিময়

মালয়েশিয়ার মালাক্কার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম। ৫০টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে শনিবার মালাক্কার হোটেল রামাদায় এ মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়া সফররত বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশী হাইকমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক দক্ষতার ফলে দেশটিতে শ্রমবাজার উম্মুক্ত হয়েছে এবং অবৈধরা বৈধ হওয়ার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এ সময় তিনি অবৈধ শ্রমিকদের দ্রুত বৈধ হওয়ার পরামর্শ দেন। মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন- হাইকমিশনারে কাউন্সিলর (শ্রম) মো. সায়েদুল ইসলাম, মিনিস্টার (পলিটিক্যাল) রইছ হাছান সারোয়ার, মালয়েশিয়াস্থ জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ড. আহমেদ আল ওয়ালি, অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নূরুল ইসলাম চৌধুরী, অর্থ সম্পাদক ফারুক আহমেদ প্রমুখ।

Wednesday, November 9, 2016

দেশ থেকে দূরে থাকা দেশকন্যারা!

দশের বোঝা একের লাঠি গল্প শুনে বড় হওয়া আমাদের দেশকন্যারা কেমন থাকেন দেশের বাইরে? মায়ার অন্দর থেকে জগৎ জানার বন্দরে যারা নোঙর ফেলেন, হয়ে যান দেশ থেকে দেশান্তর। কেমন করে তাদের অন্তর? যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নেপাল, আয়ারল্যান্ড—কোথায় নেই তারা! কেমন থাকেন তারা দশ থেকে যখন এক হয়ে যান? একা, কখনো হয়তো সঙ্গী থাকে। মায়ের বুকের বারান্দায় চাঁদ মামা গান শোনা চেনা মুখটি মা কিংবা মাতৃভূমিকে ছেড়ে অচেনা আকাশে তারা কিংবা নক্ষত্র হওয়ার চেষ্টায় কি করে? দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও তাদের ভাবনায় কেমন করে। যেমন করেই হোক, আমার বাংলাদেশকে মুখর করে তুলব আমি আমার কর্মে, আমার অর্জনে। সেই ভাবনায় ভোর এসে স্নান করায় জীবনের। একটা নতুন দেশ। একটা ভিন্ন মহাদেশ। তবু এক নেশা। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা। নাহ, বাবার আদুরে মেয়েটির জন্য এখানে কোনো বিশেষ কাজের সহকারী নেই। করেই খেতে হয়। আশ্চর্য এক দিন, দুই দিন, তিন দিন পর তারা চা করা থেকে শুরু করে ড্রাইয়ারে শুকানো চাদরের ভাঁজ সবই করতে শিখে যায়। জেনে যায় নিজের কাজ নিজে করায় আছে ভিন্ন এক আনন্দ। মাঝে মধ্যে দেশে থাকা আদুরে বোনটিকে তাই বলতে ভোলে না, বুয়া নেইতো কী হলো, কিসের কান্নাকাটি এত? নিজের কাজ নিজে করাতে যে সুখ আছে, এটা কখন বুঝবেন নন্দ ঘোষ। সেই ঘোষণা দিতে না দিতেই রেফ্রিজারেটরে চোখ। আয় হায় বাজার তো করতেই হবে। বহুদিন হয় দেশে বাজার করে দেওয়া তাজুল কাকাদের কথা মনে পড়ে না আর। ছুট ছুট এখনই। নাহ এখানে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাস্তায় বসে নেই কোনো ড্রাইভার। নিজেই ধরে গাড়ির স্টিয়ারিং। কি পারে না আমাদের দেশকন্যারা। কিন্তু গাড়িটা কী আর ভাত খায়?
তার খাবার ভিন্ন। তার জন্য লাগে তেল। এই তেল সেই তোষামোদের তেল নয়। এই তেলের জন্য দেশকন্যাদের পার্টটাইম কাজ করতে হয়। উপার্জন করতে হয়। এই করতে করতে তারা বেমালুম ভুলে যান পরনির্ভরশীলতা। অন্যদিকে কন্যারা সংসার নামের বিনি সুতোর মালায় জড়ানো থাকলে তাদেরও সন্তান থাকে। থাকতে পারে। জীবনসঙ্গীসহ দুয়ে মিলে সামলাতে হয় সন্তানদের। কখনো বা একা। একান্নবর্তী পরিবারের সকলে মিলে দেখভাল করবার সুযোগ যে নেই। নেই যে প্রাইভেট টিউটর। সন্ধ্যা নামলেই সন্তানদের হোমওয়ার্ক নিয়ে বসতে হয় তাদের। অতপর কবেকার কথা। বেগম রোকেয়া বলে গিয়েছিলেন, জাগো গো ভগিনী। ছুট ছুট এখনই। পড়াশোনা করতেই হবে। নতুন ভাষা। নতুন কলেজের করিডর। তবু সব ডর ডিঙিয়ে অন্য এক যুদ্ধ। আয়ত্ত করতে হবে সব। দেশের বাইরে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করা খুব কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু পড়াশোনার মাধ্যমেই যে ভিন দেশের মানুষদের জানিয়ে দিতে হবে, ধনী না হতে পারি, শিক্ষার দৈন্যতা আমাদের নেই। আমরা উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের মাঝেই তবু আছে রবীন্দ্রনাথ–ইউনূসদের আবেশ। আবেশের সেই ছোঁয়ায় কেউ কেউ ছুঁয়ে যায় বিশ্বময় অন্য দিকেও। পৃথিবীর সব সৌন্দর্যকে হারিয়ে বিশ্বকে দেখায় নিজস্ব রূপ। কেউ কেউ হন মিস আয়ারল্যান্ড। কেউবা বাঁচিয়ে রাখেন দেশীয় সংস্কৃতি। নিজেদের গ্র্যাজুয়েশনের দিনে শত বিদেশির মাঝে শনাক্ত করা যায়। ওই, ওইতো আমার দেশের কন্যা। তার অঙ্গে যে জড়ানো দেশীয় শাড়ি। কখনোবা বুকে জড়ানো থাকে লাল সবুজ পতাকা। বুকের উনুনে মাতৃভাষায় কথা বলতে না পারার জন্য কারও জাগে ব্যাকুলতা। তাই কেউবা ভিন্ন ভাষা আয়ত্ত করবার প্রতিকূল অবস্থানে থেকেও, সময়ের অনুকূলে ধরে রাখে কলম। যে কলম অবিরল লিখে যায় আমার ভাষা। বাংলা ভাষা। আশা এই, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু শিক্ষণীয় নাও, গ্রহণ করো। আমার কথা শোনো। হোক ভিন্ন দেশের ভিন্ন চিন্তা। ভিন্নভাবে ভালোর কাজের প্রয়োগ দেখে তা নিজেদের মাঝে আত্মস্থ করতে অহম করতে নেই। এমন অচিন্তনীয় সব কর্মে কেটে যায় তাদের এক একটা ব্যস্ততম দিন। দিন শেষে ঘুম যখন দুয়ারে ঠিক তখনই মন বলে, এই ভোর হলো। না, না। এখানে নয়, আমার দেশে। তারপর ভীষণ কর্মব্যস্ত দিনের সব ক্লান্তি কোমল হয়ে যায় দেশে রেখে আসা প্রিয় স্বজনের স্বরে। ওতেই এই একলা চলতে হয়, জীবনে আরেকটি ভোর নিয়ে আসে জীবনের স্নান! এই জল, এই পুকুর ভিন্ন। তবু কোথায় যেন এক হয়ে রয়, জলের একই রং।