Sunday, February 21, 2010

গন্তব্য ছাতিয়ানতলী by মোকারম হোসেন

ঢাকা থেকে বের হওয়ার আগেই মাহবুব রেজা পইপই করে বলে দিলেন প্রথমে আবদুল্লাহপুর, তারপর ধলেশ্বরী এক-দুই সেতু, নীমতলা, চালতীপাড়া থেকে চৌধুরী রোড হয়ে সোজা ছাতিয়ানতলী। তবুও পথ ভুলে কিছুটা সামনে হাসাড়ার দিকে চলে গেলাম। গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, নিশ্চিত হয়ে, তারপর আবার ফিরে এসে চৌধুরী রোড হয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। আমরা মানে আমি, নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া, বিপাশা চক্রবর্তী ও লায়লা। সাকল্যে চারজন। রমনাপার্কে গাছ দেখার অনুষ্ঠান শেষে আমরা মধ্যদুপুরে ঢাকা থেকে বেরিয়েছি। রাজধানীর বিরক্তিকর যানজট আর বিচিত্র দূষণ থেকে খুব সহজেই মুক্তি মিলল। এখন আমাদের চোখের সীমানায় বিস্তৃত শস্যের মাঠ। মুন্সিগঞ্জ অনেক কিছুর পাশাপাশি আলুর জন্যও বিখ্যাত। গ্রাম মানেই গ্রাম। এখানকার সবকিছুই দারুণ উপাদেয় ও উপভোগ্য। গ্রামের সতেজ বাতাস মেখে চলেছি আমরা।
ছাতিয়ানতলীর প্রবেশ পথেই ফজলুর রহমান হাত নেড়ে আমাদের থামিয়ে দিলেন। তিনি আমাদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা, পথ হারানোর কোনো সুযোগ নেই! ফজলু ভাইয়ের উচ্ছ্বাস দেখে আমরাও পুলকিত হয়ে উঠি। প্রকৃতিপাগল মানুষ। প্রকৃতির অতি ক্ষুদ্র সৌন্দর্যেও তিনি উদ্বেল হন। রাতে অফিস থেকে বের হয়ে দেখলেন জোছনায় ডুবে আছে চারপাশ। আহা, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে! একেবারে গৃহত্যাগ করার মতো জোছনা। তাত্ক্ষণিকভাবে মত বদলালেন তিনি, আজ আর বাড়ি ফিরবেন না। একটি পরিপূর্ণ চান্নিপসর রাত তাঁকে নিবিড় মমতায় ডাকছে। ছুটলেন ছাতিয়ানতলীর দিকে। ওখানে আগেই চলে গেছেন সাহিত্যিক মাহবুব রেজা।
আমরা মূল সড়ক থেকে কাঁচা পথে নেমে এলাম। এবার মাহবুব রেজাকে দেখা গেল। মোড়লদের মতো লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে হেঁটে এলেন। গ্রামের জন্য একেবারে উত্তম পোশাক। শীত এলে আমি যেমন গায়ে উত্তরীয় জড়ানোর সুযোগ খুঁজি। কিন্তু শহরের সাহেবি কেতায় শাল বড্ড বেমানান। মানান আর বেমানান যা-ই হোক, মন চায় যে! তাঁকে তো আর বাধা দিতে পারি না। এসব কথা এখন থাক, আগে দুপুরের গল্পটা বলি। বিপ্রদা তার কথার ঝাঁপি খুললেন। তাঁরা হাঁটছেন, কথা বলছেন, শুনছেন, দেখছেন। আমি কিছুটা পিছিয়ে। কারণ, ততক্ষণে আমার ক্যামেরার চোখ সচল হয়ে উঠেছে। ছবি তুলছি তো তুলছি।
এবার আমাদের একটি ছোট্ট সেতু পেরোতে হলো। খালে জল নেই তেমন। তারপর খেতের আইল ধরে হাঁটতে থাকি। হাঁটার মধ্যেই হঠাত্ আমার বয়সটা এক লাফে কমে গেল। এই গ্রামের সঙ্গে আমাদের লক্ষ্মণপুর গ্রামের কি কোনো মৌলিক তফাত্ আছে! তাই গ্রামের সব স্মৃতি তরতাজা হয়ে ভাসতে থাকে। আমার চারপাশের সবকিছু যেন আগেই দেখেছি বা দেখিনি। ডোলকলমির ফুলগুলো ছুঁয়ে দেখি, তার পাশেই মটমটিয়ার ঝোপ, তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়াচ্ছে। সরষে ফুলের জমাট গন্ধ পাচ্ছি। বিপাশা আর লায়লা ফুলগুলো ছুঁয়ে দেখল। সংস্কৃত কবির কবিতায় আছে, ‘সুন্দরী রমণীর পদস্পর্শে অশোক ফোটে।’ কিন্তু আমার মনে হলো ওদের কোমল জাদুস্পর্শে সরষে ফুটেছে। কিংবা এই সোনারং ফুলগুলো আজ সারা দিন ওদের অপেক্ষায় ছিল। আর কয়েক পা এগিয়ে আমরা ছবির মতো একটি বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ছিমছাম পুকুর পাড়, তার পাশে লাউয়ের মাচা, একপাশে সতেজ শাকসবজি বোনা। ঘরে বসতে না বসতেই খাবার আয়োজন। উপাদেয় সব রান্না। অতএব ভূরিভোজ। খাওয়া-দাওয়া সেরে গল্পের আসর বসল পুকুরঘাটে। ঘাটটাও বেশ বনেদি, ওপরে ইটের চৌচালা, তিন দিকে হেলানো আসন, সিঁড়িগুলো নেমে গেছে জলস্পর্শে। কোত্থেকে একটি বেনেবউ উড়ে এসে বসল পাশের আমগাছে। সবাই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলাম। বিপ্রদা সবাইকে বেনেবউয়ের গল্প শোনালেন। সেই গল্প শেষ হলে আরও কত গল্প! শিল্প-সাহিত্য-সংগীত কোনো কিছুই বাদ যায় না। এ ফাঁকে ফজলু ভাই হেঁড়ে গলায় গান ধরলেন। আমরা তাঁকে দশ টাকা বকশিশ দিয়ে আগেই গান থামানোর উদ্যোগ নিলাম।

প্রান্তিক ভাষা বাংলা ও মাতৃভাষার অধিকার by আনু মুহাম্মদ

একুশে ফেব্রুয়ারি যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তত দিনে বাজার অর্থনীতির চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যে বাংলাদেশেই বাংলা ভাষার বাজারদর একদম নিচের দিকে। অতএব যে বাংলা ভাষার জন্য লড়াইকে কেন্দ্র করে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ দিন হয়ে উঠল সেই ভাষা মোটামুটি পরিত্যক্ত পর্যায়ে আসার সময়েই দিনটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। যথার্থই একটি আনন্দের বিষয়, আবার একটি পরিহাসের বিষয়ও বটে।
এটা বলা অনাবশ্যক দেশে দেশে জনগণের যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, এর মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা থাকেই। প্রতিটি দেশে মানুষ লড়াই করেন তার নিজে দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে, অগণতান্ত্রিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে। প্রতিটি দেশের মানুষ লড়াই করেন নিজের ভূমিতে তার জায়গা তৈরির জন্য। কিন্তু এসব লড়াই ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে কখনো সঙ্গে সঙ্গে, কখনো একটু বিলম্বে। প্রতিটি দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক লড়াই অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে শক্তি জোগায়। এক দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অন্য দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।
আমরা সবাই জানি যে একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি জনগণের লড়াইয়ের দিবস। কিন্তু এটি শুধু বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল না। এটি ছিল সব জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় কথা বলা, লেখা ও ভাব প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও। সে জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকৃতপক্ষে প্রথম থেকেই একটি আন্তর্জাতিক বহুজাতিক দিবস। এই অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশই ঘটল এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে। এটা এমন এক সময় যখন মাতৃভাষায় শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও ভাব প্রকাশের অধিকার বিশ্বের অনেক মানুষই কার্যকর করতে পারছেন না। অধিকাংশ ভাষাই এখন হুমকির সম্মুখীন। অধিকাংশ ভাষাভাষী মানুষই বর্তমানে পরাজিত, বিপর্যস্ত অবস্থায় প্রাণপণে চেষ্টা করছেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। একুশে ফেব্রুয়ারি তাঁদের সে চেষ্টাতেই একটি প্রতীকী অবলম্বন।
বেশির ভাগ জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে এ রকম প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রধান উন্নয়ন ধারার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। এই প্রত্যক্ষ সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে গেলে আমরা এটাও উপলব্ধি করব যে যাকে আমরা বিশ্ব্বায়ন বলে জানি তা আসলে একচেটিয়াকরণ। কেননা বিশ্বের সব অঞ্চলের সব মানুষের জায়গা করে দিয়ে এই বিশ্বায়ন ঘটছে না। বর্তমান ধারার বিশ্বায়ন বস্তুত সব অঞ্চলের মানুষকে শৃঙ্খলিত করে ক্ষুদ্র অংশের একক ভাষা, সংস্কৃতি, মতাদর্শ, রুচি এবং একচেটিয়া মালিকানা সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেক নাম।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি, পুরো বিশ্বকে কতিপয় বহুজাতিক সংস্থার করতলগত করার মধ্যে; মতাদর্শিক ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি শ্রেণী, লিঙ্গ, জাতিগত, বর্ণগত নিপীড়ন ও মতাদর্শের স্পষ্ট-অস্পষ্ট একটি কাঠামোর আধিপত্য সৃষ্টির মধ্যে এবং আমরা এর প্রকাশ দেখি অন্য সব ভাষার ওপর কয়েকটি ভাষার বিশেষত একটি ভাষার একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উপনিবেশ-উত্তর দেশে ঔপনিবেশিক ভাষার যে আধিপত্য দেখা যায় তা এক ঐতিহাসিক আধিপত্যেরই ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে ফরাসি বা স্প্যানিশ ভাষাও প্রধান ভাষা হয়ে উঠতে পারত যদি এই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক প্রভু ফ্রান্স বা স্পেন ইত্যাদি হতো। ইংরেজি এ অঞ্চলে এখন প্রভুভাষা কারণ ব্রিটিশরা এখানে ঔপনিবেশিক প্রভু ছিল। ইংরেজি এখন সারা বিশ্বের প্রভুভাষা কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এখন কেন্দ্রীয় ও প্রধান শক্তি ইংরেজিভাষী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে মার্কিন ইংরেজিতে স্থানান্তরের পেছনেও বিশ্ব ক্ষমতার বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস সম্পর্কিত।
ইংরেজি ভাষা এখন শুধু একটি ভাষাই নয়, এটি একটি ক্ষমতার প্রতীকও। ইংরেজি ভাষা জানা মানে সেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া, এই ভাষা জানা মানে অনেক সুযোগের দরজা খুলে যাওয়া, এই ভাষা জানা মানে হীন দীন অবস্থা থেকে সমৃদ্ধ শক্তিধর অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া। বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা জানলে শুধু ক্ষমতার স্বাদই পাওয়া যায় তা নয়, কর্মসংস্থান ও উপার্জনের বিভিন্ন রাস্তার সঙ্গেও তার যোগ প্রত্যক্ষ। ইংরেজি ভাষা জানা না থাকলে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ, বিশ্বের খবরাখবর, এমনকি শিল্প সাহিত্য চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলা ভাষায় এগুলোর স্বচ্ছন্দ রূপান্তরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়নি।
বাংলা ভাষার তাহলে সমস্যা কী? বাংলা ভাষায় এই কাজগুলো হয় না কেন? এটা কি ভাষার গাঠনিক সমস্যা না এই ভাষা যে সমাজের, তার অবস্থান ও গতিপ্রকৃতির প্রকাশ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে অন্যান্য ভাষার এবং অন্য ভাষাভাষীদের অবস্থাও আমাদের দেখতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশের হিন্দি ভাষার কি একই অবস্থা? না। হিন্দি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অধিপতি ভাষা। বিশ্বেও তার প্রভাব বাড়ছে। হিন্দি ভাষাতে বিভিন্ন ভাষা থেকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত এবং শক্তিশালী থাকায় কেউ শুধু হিন্দি ভাষাভাষী হলেও তার বিশ্ব-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই। ইংরেজির দাপট সেখানেও আছে কিন্তু হিন্দি পাল্টা দাপটের জায়গাও তৈরি করেছে। পাশাপাশি হিন্দি ভাষা ভারতের মধ্যেও অন্যান্য ভাষার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। কারণ হিন্দিভাষী একচেটিয়া মালিকদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক আধিপত্য বাড়ছে।
আরবি ভাষাভাষীদের অবস্থাও অতটা করুণ নয়। এই ভাষাটিও সচল, সক্রিয় এবং বিশ্বের গতিধারাকে ধারণ করার মতো গতিশীলতা সেখানে আমরা দেখি। চীনা ও জাপানি ভাষা এখন বিশ্ব পরিসরে পাল্টা ক্ষমতার জায়গা তৈরি করছে। কম্পিউটার থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত সর্বত্র এই চেষ্টা উপলব্ধি করা যায়। এ ছাড়া কোরিয়া বা থাইল্যান্ডও ইংরেজি দিয়ে ভেসে যায়নি। এসব দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষা নিয়ে যুদ্ধ করে টিকে থাকছে, বিকশিত হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যে দেশ, পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক যে কাঠামোতেই হোক না কেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে বা করছে অথচ সে দেশের জনগণের ভাষা পরিত্যক্ত হয়েছে। চীন, জাপান তো বটেই এমনকি দুর্বলতর কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন বা লাতিন আমেরিকা সর্বত্রই আমরা দেখি জোরদারভাবে তাদের জনগণের ভাষা যথেষ্ট গুরুত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে টিকে আছে। আর সেসব দেশেই ঔপনিবেশিক প্রভুর ভাষার দাপট একচেটিয়া, যেসব দেশে উন্নয়নের কোনো শেকড় তৈরি হয়নি। যে দেশে শাসক শ্রেণী পরগাছার মতো ঝুলে থাকে, সে দেশে শাসক শ্রেণীর পরজীবী লুণ্ঠন/পাচারপ্রক্রিয়ায় মাতৃভাষা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভাষা হিসেবে কোণঠাসা হয়ে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এই ঘটনাই দেখি।
বাংলাদেশে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা যে রীতিমতো প্রান্তিক বা অপাঙেক্তয় ভাষায় পরিণত হয়েছে তার অনেকখানি ব্যাখ্যা তাই এ দেশের শাসকশ্রেণীর অবস্থান ও ঐতিহাসিক ধারা থেকে পাওয়া যাবে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রান্তিক এবং এই প্রান্তিক অবস্থান তৈরি হয়েছে ও টিকে থাকছে এ দেশের পরজীবী শাসকশ্রেণীর কারণে। এই শ্রেণী তার গঠনপ্রকৃতি ও বিকাশধারার কারণে দেশে উত্পাদনশীল ভিত্তি নির্মাণ করার চেয়ে দ্রুত লুণ্ঠন, দখল ও দুর্নীতি করে সম্পদ গঠন ও পাচারেই বেশি আগ্রহী।
উত্পাদনশীল ভিত্তি যে দেশে টেকসইভাবে নির্মিত হতে পারে না সে দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সাধারণ ভিত্তি নির্মাণের তাগিদও তৈরি হয় না। তৈরি হয় না দেশীয় কর্মসংস্থানের ভিত্তি। তৈরি হয় না জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সুতা দিয়ে ঝুলে থাকা শাসকশ্রেণী এ দেশে প্রতিনিধিত্ব করে বাইরের ক্ষমতার, এই ক্ষমতাই দেশের ভেতরে তার দাপট নিশ্চিত করে। নিজস্ব পরিচয়, নিজস্ব সক্ষমতা নিয়ে দাঁড়ানোয় তার ক্ষমতা নেই, ভরসা নেই। মধ্যবিত্তের আত্মবিনাশী হীনম্মন্যতাবোধ এর সঙ্গে যোগ হয়ে এই শেকড়বিচ্ছিন্নতা আরও বৃদ্ধি করে। সে জন্য তাদের আধিপত্য থাকা অবস্থায় সামগ্রিকভাবে যে নৈরাজিক ধ্বংসাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাতে দেশীয় ভাষা বা ভাষাসমূহ বাদ যায় না।
ক্ষমতার চর্চা হয় তার পরও। প্রান্তিক অবস্থানে কোণঠাসা বাংলা ভাষা দিয়ে আবার ক্ষমতার চর্চা হয় দুর্বলতর জাতিগোষ্ঠীর ওপর। মাতৃভাষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষাকে শাসকশ্রেণী অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার খর্ব করার কাজে লাগায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা এবং জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সাংবিধানিক অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনো নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ এখনো যথাযথভাবে সমর্থিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকৃতপক্ষে আমাদের সামনে অনেক প্রশ্ন হাজির করে। অনেক বিষয়কে সামনে আনে। শুধু উত্সব আর সংবর্ধনা দিয়ে এই প্রশ্নগুলো ঢাকা যায় না যে:
কেন এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী-পুরুষ এখনো নিজের মাতৃভাষার বর্ণমালা চেনেন না বা তার কার্যকর ব্যবহার করতে সক্ষম নন?
কেন এ দেশের মানুষ মাতৃভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করতে পারেন না?
কেন এ দেশে বাংলা ভাষা নিজেই একটি প্রান্তিক, কোণঠাসা এবং অবিরাম অপমানের ভাষা হিসেবে পরিগণিত?
বাংলা ভাষা কোনটি? তার অস্তিত্ব কোন জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য?
কেন এ দেশে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতি ও ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার আইনগতভাবেও স্বীকৃত নয়?
তরল আবেগ, প্রতারণা আর প্রহসনের আনুষ্ঠানিকতা থেকে বেরিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি ঠিকমতো উপলব্ধি করতে চাইলে এই প্রশ্নগুলোর জবাব সন্ধান করেই আমাদের এগোতে হবে।
আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

শাহরুখের কাছে পরাজিত শিবসেনা by শান্তনু মজুমদার

ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খানের কাছে হেরে গেছে দেশটির হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন শিবসেনা ও তার দোসরেরা। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া শাহরুখের মাই নেম ইজ খান দেখার জন্য ভারতজুড়ে সিনেমা হলমুখী মানুষের ঢল নেমেছে। শাহরুখ এই ছবির প্রধান অভিনেতা। কয়েক সপ্তাহ আগে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে (আইপিএল) পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের খেলতে দেওয়ার পক্ষে কথা বলার পর থেকেই শিবসেনা ও তার দোসরেরা ছবিটির প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার আস্ফাালন করেছিল। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, জনজোয়ারের তোড়ে প্রধান ঘাঁটি মুম্বাই শহর থেকেই আরব সাগরে ভেসে গেছে সেনাদল। গণমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ, সারা ভারতেই একই অবস্থা।
আর দশজন মৌলবাদীর মতো শিবসেনা নেতা বাল থাকরে হচ্ছেন মনোযোগ আকর্ষণে মরিয়া এক নির্লজ্জ ব্যক্তি। যেই না শাহরুখের মুখ দিয়ে আইপিএল-বিষয়ক মন্তব্যটি বেরিয়েছে, ওমনি হুঙ্কার ছাড়লেন থাকরে। মনে বড় আশা, নিজের ও শিবসেনার জন্য কিছু পাবলিসিটি বাগিয়ে নেওয়া। উসকানিমূলক কথাবার্তা আর নানা স্থানে মাই নেম ইজ খান-এর ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে দেশ-বিদেশে প্রচার পেলেও ছবিটি মুক্তির পর জনরায়ে তাদের চরম পরাজয়ের ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়েছে। ছবি বন্ধ করে দেওয়া তো দূরের কথা, সিনেমা হলমুখী মানুষের ক্ষোভের মধ্যে পড়ার আশঙ্কায়ই সম্ভবত সেনা কিংবা তাদের দোসর বজরংদের দুই-একটি বিচ্ছিন্ন স্থান ছাড়া তেমন কোথাও দেখা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি ছবিটি মুক্তি পাওয়ার দিন। মৌলবাদীদের শয়তানি প্রতিরোধে সংবাদ-মাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্যগুলো দেখে মনে হয়, এবারো এগিয়ে কলকাতা। তবে মুম্বাই ও নয়াদিল্লির মতো স্থানেও মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান দেখা গেছে।
খানের দোষটা কী? খানের কোন দোষ নেই। এবার আইপিএলের নিলামে তালিকাভুক্ত ১১ পাকিস্তানি ক্রিকেটারের জন্য দর হাঁকেনি কোনো দল। স্পষ্ট কোনো কারণ দেখানো হয়নি। দল-মালিকদের পক্ষে কেউ-কেউ জানিয়েছেন, পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের ভিসা পেতে সমস্যা হবে ভেবে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলারের ঝুঁকি নেওয়া হয়নি। তবে অনেকেই মনে করেন, পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের ভারতে আসতে দেওয়ার বিরুদ্ধে শিবসেনার হুমকিতে ভয় পেয়েই নিলামে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের কেনার আগ্রহ দেখায়নি দলগুলো। উল্লেখ্য, শাহরুখ খান নিজেই আইপিএলের অন্যতম দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক। কারণ যা-ই হোক, সিদ্ধান্তটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক কথাবার্তা হয়েছে এবং শাহরুখ খান নিজের মতটি দিয়েছেন।
খেয়াল করার মতো বিষয় হচ্ছে, অনেকেই এ নিয়ে কথা বললেও মৌলবাদীরা শাহরুখ খানকেই ‘সিঙ্গেল আউট’ করে এবং যথারীতি ধর্মীয় বিষ ছড়াতে শুরু করে। দলীয় মুখপত্র সামনায় থাকরে লেখেন : শাহরুখ নামের এক খান আমাদের বলছে পাকিস্তানকে ভালোবাসতে। এই ধর্মবাদীর মতে, শাহরুখ খান হচ্ছেন একজন ‘বিশ্বাসঘাতক’। ওস্তাদের বচনের মাজেজা স্পষ্টতর হয়েছে শিষ্য সঞ্জয় রাউতের কথায়। সামনায় সংশোধন-অযোগ্য এই হতভাগ্য মৌলবাদীটি লেখেন : আসলে শাহরুখ নয়, বরং তাঁর ভেতরে থাকা খানটিই এসব কথা বলাচ্ছে। আইপিএলে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের খেলার সুযোগ উন্মুক্ত থাকার পক্ষে কথা বলার কারণে শাহরুখকে লাহোর, করাচি বা ইসলামাবাদ চলে যেতে বলেছেন তিনি। এটাই হচ্ছে মৌলবাদীদের স্টাইল। শাহরুখ খানের নাম শাহরুখ খান হওয়ার সুযোগটি নিয়ে তাঁকে ‘সাইজ’ করে দিয়ে নিজেদের বাহুবল দেখাতে চেয়েছিল সেনারদল। এভাবেই সেকুলার শক্তির গুটিয়ে থাকার সুযোগে তারা বাজিমাত করে ফেলে অনেক সময়। কিন্তু শাহরুখ খানের বেলায় এটা সম্ভব হয়নি।
কীভাবে হবে? প্রথম কথা, মৌলবাদীদের ভয় না পেয়ে শাহরুখ খান প্রথম থেকেই অনড় মনোভাব দেখাতে পেরেছেন। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন না তোলার জন্যও আহ্বান জানান শাহরুখ। খান এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর পিতা তাজ মোহাম্মদ ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বাধীনতা সংগ্রামী, যিনি ১৯৪২ সালের ‘ভারত-ছাড়’ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
দ্বিতীয় কথা, বাজার। মৌলবাদীরা পেছনে লাগলে কী হবে, ভারতীয়রা শাহরুখ খানকে অনবরত দেখতে চায়। দেখতেই চায়। তিনি হিন্দি সিনেমার এক নম্বর হিরো এক দশকেরও বেশি সময়জুড়ে। সে জন্য গুজরাটের মতো রাজ্যের, যেখানে শীর্ষ মৌলবাদী নরেন্দ্র মোদি হচ্ছেন বারবার ভোট-জেতা মুখ্যমন্ত্রী, সেখানের হলগুলোতেও সাড়ম্বরে মুক্তি পেয়েছে মাই নেম ইজ খান। মুক্তির দিন শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বেঁকে থাকলেও সারা দেশে অভূতপূর্ব সমর্থনের খবর আসতে শুরু করলে দুপুর থেকে খানকে দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন হলমালিকেরা। শেষ পর্যন্ত টাকাই কথা বলে। সবাই জানে, মৌলবাদ পুঁজিবাদের উপজাত; কিন্তু মাল কামাইয়ে বিঘটন তৈরি করলে পুঁজিবাদ প্রথমে ঝেড়ে ফেলতে চায় মৌলবাদকে। তাতে কাজ না হলে লাথি মারে।
এবার শিবসেনাদের কলকে না পাওয়ার আরেকটা বড় কারণ আছে। শাহরুখ খান বহির্বিশ্বে সর্বাধিক পরিচিত ভারতীয় মুখ। লতা মুঙ্গেশকর, শচীন তেন্ডুলকার, অমিতাভ বচ্চনকে মনে রেখেও এটা সত্য। কেননা হিন্দি সিনেমার বিস্তৃতির তুলনায় হিন্দি গান বা ক্রিকেট অনেকটা পিছিয়ে। আর বিশ্ববাজারে অমিতাভের চেয়ে শাহরুখের জনপ্রিয়তাও একটি বাস্তবতা। উপনিবেশিক দাস্যভাব না কাটার কারণে উত্তর আমেরিকা বা পশ্চিম ইউরোপীয় ট্যাগ না থাকলে যাঁরা স্বস্তি পান না, তাঁরা ছাড়া সবাই মানবেন, শাহরুখ খানের জনপ্রিয়তা আসলে পৃথিবীর যেকোন সিনে-তারকার চেয়ে বেশি। সেদিন বিবিসির ফ্রাইডে ইভিনিং উইথ জোনাথন রস অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলেন শাহরুখ খান। উপস্থাপক রস দর্শকদের জানান, শাহরুখের ফ্যানের সংখ্যা মিলিয়নে নয়, বিলিয়নে গুনতে হয় এবং শাহরুখ খান হচ্ছেন পৃথিবীর জনপ্রিয়তম সিনে-তারকা। তো, এ ব্যাপারটা গুনতিতে না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকে বাবরি মসজিদ গুঁড়ানোর মতো ঘটনা এবার ঘটতে দেয়নি ভারতীয় প্রশাসন।
শান্তনু মজুমদার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক। বর্তমানে ইন্সটিটিউট অফ কমনওয়েলথ স্টাডিজে গবেষণারত।

ভাষার রাজনীতি, রাজনীতির ভাষা by সৌরভ সিকদার

সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় মানুষ রাজনৈতিক চরিত্র ও পরিচয় অর্জন করেছে। মানুষের সামাজিক সখ্য এবং রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে ভাষার অবদান। তাই ভাষা যেমন রাজনীতিকে প্রভাবিত করে, তেমনি রাজনৈতিক ভাষাও মানুষের মধ্যে নতুন স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। এ কারণে প্রায় সব দেশেই জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো যে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করে, সেখানে ভাষা বা শব্দ প্রয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময় নির্বাচনের ফলাফলকে এটি প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শব্দটি সমাজ ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মনস্তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞানের বিশ্লেষণের বিষয়বস্তু হতে পারে। আমরা একটু অতীতে ফিরে তাকাতে পারি। ১৯৩৩ সালে হিটলার যখন জার্মানির রাষ্ট্রনায়ক হলো, সে সময় রাইখ সংস্কৃতি সংসদ গড়ে উঠেছিল গোয়েবলসের নেতৃত্বে। সমগ্র জাতির চিন্তাধারা রাইখ নেতৃত্বের অনুগামী করতে শিল্প-সাহিত্য, সংবাদপত্র, বেতার, থিয়েটার সবকিছুতেই প্রচারণার কাজ করে তারা। এক জার্মান এক সংস্কৃতিপন্থী—এই ভাবনা সবাই মেনে না নিলেও শেষ পর্যন্ত ভাষিক অহংকার ও জাত্যাভিমানে ভয়ে ভক্তিতে শ্রদ্ধায় এক জার্মান হয়ে ওঠে। হিটলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে যে অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল তার নাম ভাষা, রাজনৈতিক ভাষা। এ প্রসঙ্গে তার বক্তৃতা এবং জীবনীগ্রন্থ মাইন ক্যাম্প-এর কথা উল্লেখ করাই যথেষ্ট। আমরা আমাদের বাংলাদেশের কথা যদি অলোচনা করি তবে দেখব, শুধু ভাষার রাজনীতি অনুধাবন করতে না পেরে পাকিস্তানি শাসকেরা অনেক সংগ্রাম করেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিয়ে বাংলাদেশ নামের নতুন মানচিত্র জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছিল। একইভাবে বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চের যে ভাষণ, সেটিও ছিল বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির আত্মচেতনা এবং ঐক্য প্রয়াসের অন্যতম ভিত্তি। ভাষা দিয়ে, শব্দ দিয়ে মানুষকে মুক্তির মিছিলে দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছিল। তাই ভাষার রাজনীতি না বুঝে পাকিস্তান ভেঙে গেল (আরও অনেক কারণও ছিল), পক্ষান্তরে রাজনীতির ভাষা দিয়ে মাতৃভাষা তথা মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্য তৈরির এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো সেদিন এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে। ইতিহাসে আমরা ভিন্নচিত্রও দেখি, জনমানুষের ভাষা ও ভাব না বুঝে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিণতিতে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। আমাদের দেশে মাঝেমধ্যেই রাজনীতিবিদেরা যথার্থ ভাষা ব্যবহার না করার পরিণতি তাঁদের দিতে হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
ভাষা যে কত বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার তার প্রমাণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন এ দেশের শাসনভার গ্রহণ করে, তখন তাদের সাদা চামড়ার প্রশাসনিক ব্যক্তিরা এ দেশের ভাষা শেখার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেছিলেন বাংলা শেখার জন্য। ‘নেটিভ’দের ভাষা না জানলে শাসন-শোষণ করা যায় না—তাই এ প্রচেষ্টা। রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে তাই শোষিত শ্রেণীর ভাষা জানা আবশ্যক। ইংরেজরা সেটা জানত বলেই রাজনীতিতে কাজে লাগিয়েছে ভাষাকে। পাকিস্তানি শাসকেরা ভাষা ভুলে ধর্মের রাজনীতিতে অগ্রসর হয়ে পাকিস্তান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ভাষার নিজস্ব শক্তি আছে। একে কাজে লাগাতে পারলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়। আবার জনগণের সঙ্গে ভাষিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করলে বৈরিতা তৈরি হয়। ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের দ্বন্দ্ব মূলত ভাষাকে কেন্দ্র করে, যা পরবর্তী কালে রাজনৈতিক সমস্যায় পর্যবসিত হয়। মুহাম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন, ‘ভাষা ব্যবহারে মানুষের যথেচ্ছ অধিকার থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রশ্নে মানুষকে এমনিভাবে সংকুচিত হয়ে যেতে হয়, মনের কথা মুখ পর্যন্ত এসে আটকে যায়। নিছক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে সহজভাবে নিজের ভাষার ওপরেও সে তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আর রাষ্ট্র! তার অনুসৃত আদর্শ প্রচারের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রচার বিভাগের মারফত ভাষা ব্যবহারের সব রকম মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে স্বদেশে ও বিদেশে তার মত বিস্তার করে দিতে মোটেও কুণ্ঠিত হয় না।’
কখনো কখনো রাজনীতিবিদ তথা রাজনৈতিক সরকার ভাষাকে ব্যবহার করে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে যেতে চায় নিজের শাসন ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘায়িত করার জন্য। কিন্তু একসময় আসল ঘটনা বেরিয়ে পড়লে বিপরীত ফলই ঘটে। ভাষা নিয়ে রাজনীতি করলে তার পরিণতি যে কী হয়, তা পাকিস্তান ছাড়া আর কে ভালো জানে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের এক কৃতী ব্যক্তিত্ব আহমদ রফিক এ বিষয়ে আমাদের বলেন, ‘আমাদের বাংলা ভাষা রাজনৈতিক কারণেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। ওরা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু ঘোষণা দিয়ে নিজেদের অদূরদর্শিতার পরিচয়ই প্রকাশ করেছিল। সে আমলে এ নিয়ে ইত্তেহাদ এবং আজাদ-এ অনেক লেখালেখিও হয়েছে। মুহম্মদ এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন তাঁদের লেখায় সতর্ক করে দিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাষার প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ল রাজনীতির বৃত্তের মধ্যে এবং এর পরিণতি আমাদের ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের জন্ম। এ কারণেই আমি বলি, ভাষা থেকে আমরা নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছে গেছি। ভাষা আন্দোলন তাই শুধু ভাষারই আন্দোলন নয়, এটি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনও।’
ভাষার ওপর মানুষের যেমন জন্মগত অধিকার, তেমনি দেশের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুসারেও তার ভাষা নিয়ন্ত্রিত অথবা বাধার সম্মুখীন হয়। রাজনীতির শক্তি তার ভাষার স্বাধীনতার সামনে দেয়াল তুলে দেয়। আবার অন্যভাবে মানুষের ভাষার স্বাধীনতা খর্ব হলে, ভাষা প্রতিরোধ করা হলে, তখন ভাষা ও রাজনীতি পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। আর এ যুদ্ধে ভাষার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি থাকে। কেননা ভাষার সঙ্গে মানুষের আবেগ এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত।
ভাষার শক্তি মূলত তার সৌজন্য এবং নমনীয়তার মধ্যে। গত নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দৃষ্টান্ত দিয়ে, এ বিষয়ের ইতি টানতে চাই। ওবামা তাঁর ভাষণে মানুষকে হতাশা থেকে স্বপ্নের জগতে টেনে আনেন, ভুল স্বীকার করতে ভালোবাসেন, বিরোধী পক্ষের প্রশংসা করতে চেষ্টা করেন, সবশেষে ‘আমিত্ব’ বর্জন করে একাকার হয়ে যান সাধারণ মানুষের মধ্যে। এখানেই তাঁর ভাষার শক্তি। ওবামার ভাষণগুলো পড়লে আমাদের রাজনীতিবিদেরা উপকৃত হবেন। তাঁরা আরও বেশি মানুষের কাছে আসতে পারবেন। আর যে যত সহজে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে আসতে পারে, সে তত আপন হয়ে ওঠে। এখন আর আমাদের ভাষা নিয়ে রাজনীতি করার অবকাশ নেই এই বাংলা ভাষা প্রধান রাষ্ট্রে। কিন্তু রাজনীতির ভাষা পরিবর্তন করার অবকাশ রয়ে গেছে। সরকার এবং বিরোধী দল ভেবে দেখলে একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহ্যময় এ দেশে শুধু ভাষা দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হতে পারে। অন্তত বাংলাদেশের জনগণ তাই প্রত্যাশা করে। সে ভাষা কি আপনারা পড়তে পারেন?
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একুশে ফেব্রুয়ারি সকল মানুষের জন্য by মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশির নয়
সে যে সকল বাঙালির—
যেখানেই তারা থাক না!
একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাভাষীর নয়
সে যে সকল ভাষাভাষীর—
যেখানেই তারা থাক না!

আরবি, রোমান, সিরিলিক;
হায়ারগ্লিফিকস—
বর্ণমালা, হরফ, চিত্রাক্ষর
যেভাবেই লেখা হোক না—
ক্রিওল, কোয়ান, পিজিন
ভাষা, মানভাষা
অপভ্রংশ, অপভাষা
যে ভাষার যোগেই যোগাযোগ করা হোক না—
জাতি, উপজাতি, আদিবাসী—
জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষনির্বিশেষে
যে ভাষাভাষীই তারা হোক না
জীবন্ত বিপন্ন বা মুমূর্ষু
একুশে ফেব্রুয়ারি সকল ভাষার জন্য।
একুশে ফেব্রুয়ারি তো সকল মানুষের জন্য।

০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১০
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা। সাবেক প্রধান বিচারপতি।

প্রধান বিচারপতির প্রশ্নবিদ্ধ সংবর্ধনা by মিজানুর রহমান খান

প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান’ হিসেবে সংবর্ধিত হয়েছেন। প্রথম আলোর ১৭ পৃষ্ঠায় এদিন এ বিষয়ে বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রদের সংগঠন বাংলাদেশ আইন সমিতি দ্বারা সাভারে আয়োজিত এক পিকনিকে যোগ দেন। সুপ্রিম কোর্টের সব বিচারক আমন্ত্রিত ছিলেন। তবে আপিল বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতি ও হাইকোর্ট থেকে পাঁচজন বিচারক যোগ দেন বলে জানা যায়। পরদিন গাজীপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ল অ্যাসোসিয়েশনের (রুলা) পিকনিকেও প্রধান বিচারপতি যোগ দেন। এ দুটি সংগঠনের নেতা ও সদস্যদের অনেকেই সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য হিসেবে আইন পেশায় সক্রিয়।
সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বিচারকদের উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন যে আচরণবিধি রয়েছে, এর সঙ্গে এসবের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ বিচারকেরা ব্যক্তিগত জীবনে স্ব-আরোপিত বিধিনিষেধ মেনে চলেন। পারতপক্ষে তাঁরা জনসমক্ষে উজ্জ্বল উপস্থিতি নিশ্চিত করেন না। একটা অলিখিত সীমারেখা মেনে চলেন।
১৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আমি ৩২ তোপখানায় যাই। চট্টগ্রাম ভবন ১০ তলা, সুরম্য অট্টালিকা। ১৯১২ সালে কলকাতায় ঐতিহ্যবাহী এ সমিতির সূচনা, তারা শতবর্ষ উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর সদস্যপদ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। ঢাকায় চট্টগ্রামের প্রভাবশালীদের প্রায় সবাই এই ‘অরাজনৈতিক ও সেবাধর্মী’ সংগঠনের সঙ্গে আছেন। এর সাধারণ সদস্য নেই। সবাই জীবনসদস্য। সংখ্যায় প্রায় তিন হাজার। সম্মানসূচক জীবনসদস্য আছেন। তাঁদের চাঁদা দিতে হয় না। জীবনসদস্যদের গোপন ভোটেই নির্বাহী পরিষদ এবং এর মনোনয়নের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ চূড়ান্ত করে ট্রাস্টি বোর্ড। এটা একটা পরোক্ষ নির্বাচনপদ্ধতি। সমিতির গঠনতন্ত্র বলেছে, ট্রাস্টি মানে সাধারণ পরিষদে মনোনীত/নির্বাচিত ব্যক্তি। প্রধান বিচারপতি ১৯৯৭ সালে জীবনসদস্য (নম্বর-৯৫৫) হন। ২০০৬-০৭ সালে তিনি আপিল বিভাগে ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এই সমিতির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি এ সময় সমিতির স্থাবর সম্পত্তি সংগ্রহ, ধারণ, সংরক্ষণ ও তা হস্তান্তর করার মতো দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষ তিনি সংবর্ধিত হলেন সমিতির সদস্য হিসেবেই।
সংবিধানের ৯৬(৪) অনুচ্ছেদের আওতায় আমরা ২০০০ সালে ১৪ দফার পরিমার্জিত আচরণবিধি পেয়েছি। এটা সাংবিধানিক আইন। প্রত্যেক বিচারকের জন্য তা মানা আবশ্যিক। বিচারক ট্রাস্টি হলে আচরণবিধির ১০ ধারার লঙ্ঘন ঘটে। এতে বলা আছে, ‘বিচারককে কোনো অনুদান নিতে বা তাঁর কাউকে অনুদান দিতে বলা উচিত নয় কিংবা তিনি নিজকে অন্য কোনভাবেই তহবিল সংগ্রহের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত হতে দিতে পারেন না।’ কিন্তু তিনি এখানে স্বীকৃতমতেই সমিতির জন্য স্থাবর সম্পত্তি সংগ্রহ করেছেন।
কোনো সংগঠনের সদস্য হতেও বিচারকদের জন্য বাধা আছে। বিধির ৪(গ)-এর আলোকে কর্মরত বিচারকের কোনো সংগঠনের সদস্য থাকার বৈধতা বিচার্য। এতে বলা আছে, ‘কোনো বিচারক কোনো সংগঠন বা সরকারি সংস্থার সদস্য, কর্মকর্তা বা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কিন্তু সেই সংগঠন ও সংস্থাকে অবশ্যই আইন, আইনের পদ্ধতি কিংবা বিচার প্রশাসনের উন্নয়নে নিবেদিত হতে হবে।’ চট্টগ্রাম সমিতি প্রধানত চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিবেদিত।
১৯৯৯ সালে ভারতের সব রাজ্যের প্রধান বিচারপতিদের সম্মেলন হয়। এতে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারকদের বিচারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে অনুসরণের জন্য গৃহীত হয় ১৫ দফা আচরণবিধি। এতে বলা আছে, ‘একজন বিচারক কোনো ক্লাব, সোসাইটি বা সমিতির কোনো পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। আইনের সংশ্লিষ্টতা ব্যতিরেকে অন্য কোনো সমিতি বা সংগঠনের মনোনীত বা নির্বাচিত পদেও বিচারক থাকবেন না।’ আমাদের আগের আচরণবিধিতে নির্দিষ্টভাবে বলা ছিল, ‘বিচারবহির্ভূত যাবতীয় কর্তব্য কিংবা দায়িত্বশীলতা তা অফিশিয়াল বা প্রাইভেট যা-ই হোক, বিচারক তা এড়াবেন। এমনকি সংগঠন যেমনই হোক না কেন, বিচারক সেখানে কোনো মনোনীত বা নির্বাচিত পদেও প্রার্থী হবেন না।’
বিচারককে তাঁর নিরপেক্ষতা শুধু বজায় রাখলেই চলে না, এই নিরপেক্ষতা জনগণের কাছে প্রতীয়মান হতে হয়। সে কারণেই আমাদের আইনের ১১ ধারা বলেছে, ‘একজন বিচারক অবশ্যই সর্বদা সচেতন থাকবেন যে, জনগণ তাঁর দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে এবং সে কারণে তাঁর দপ্তরের জন্য অশোভন প্রতীয়মান হয়, এমন কোনো কর্ম বা বিচ্যুতি থেকে সতর্ক থাকবেন।’
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম রায়দানকারী বিচারক তিনি। এ কারণেই তিনি এর আগে হাইকোর্ট থেকে অন্যদের ডিঙিয়ে আপিল বিভাগে এবং দুইবার অতিক্রান্ত হওয়ার পরও প্রধান বিচারপতি হয়েছেন বলে একটি ধারণা রয়েছে। তাঁর উপস্থিতিতে, ভরা সমাবেশে সুপ্রিম কোর্ট বারের তত্কালীন সভাপতি রোকনউদ্দিন মাহমুদের মন্তব্য বিস্মৃত হওয়ার নয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছিরকে সংবর্ধনা দিচ্ছিল বার। তাঁকে লক্ষ্য করে বলা রোকনের সেই কথাগুলো ছিল এ রকম: ‘প্রধান বিচারপতি হতে আপনি রাতের আঁধারে মন্ত্রীদের বাড়িতে গিয়ে তদবির করেননি, রায় লিখে কারও নজর কাড়তে ভি চিহ্ন দেখাননি এবং ভুয়া সনদ (মুক্তিযোদ্ধা) সংগ্রহ করেননি।’ এই আক্রমণ কাকে উদ্দেশ করে করা হয়েছিল তা আইনজীবীদের অজানা নয়। সেদিন দেখেছি, আওয়ামী লীগ সমর্থিত বার সভাপতি রোকন তাঁর ওই অভিমতের জন্য প্রশংসিত হন।
প্রধান বিচারপতি বৃহস্পতিবার আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর আল্লাহ আমাকে এ পদে অসীন করেছেন।’ (যুগান্তর, ১৯ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি-সৃষ্ট রহস্যপুরুষ আবু সাফার পক্ষে বেআইনিভাবে মামলা নিষ্পত্তিতে তিনি সায় দিয়েছিলেন। আগামী সেপ্টেম্বরে অবসরে যাবেন তিনি। এ সময়ে তিনি মোট কতজন এবং কাদের কী প্রক্রিয়ায় বিচারক হিসেবে বাছাই করেন, সেটাই হলো সবচেয়ে জ্বলন্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঈষত্ আশার রেখা আছে। অনেকে বলেন, তিনি বিচারক নিয়োগে সুষ্ঠু ভূমিকা রাখতেই সচেষ্ট হবেন। এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁদের মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক।
বুধবার রাতে চট্টগ্রাম সমিতির ১০ তলায় কথা হয় সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম খান ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নুরুল ইসলামের সঙ্গে। জাহাঙ্গীর খান ইউসিবিএলের অন্যতম পরিচালক, যখন তিনি সংবর্ধনার আমন্ত্রণপত্র বিলি করেন, তখন ছিলেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান। সৈয়দ ইসলাম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবেশবিষয়ক উপকমিটির সদস্য। ইউসিবিএল তার মালিকানা স্বত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধে জড়িয়ে। ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট অনেকে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, কেউ আদালত অবমাননার দায়ে দণ্ডিত।
চট্টগ্রাম সমিতির বৃহস্পতিবারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীর খান। ইউসিবিএলের লভ্যাংশ-সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি আপিল বিভাগে চলছে। সংবর্ধনার দিন সকালেও দীর্ঘ শুনানি হয়। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চেই তা হচ্ছে। রেজাউল করিম বনাম এ বি এম খালেকুজ্জামান (সিভিল আপিল নং ৩১৯, ৩২০ ও ৩২১/২০০৮) শীর্ষক এই মামলার শুনানি গত বুধ ও বৃহস্পতিবার হয়েছে। এরপর শুনানি হবে আগামী ১ মার্চ। ব্যাংকের পক্ষে এ এফ হাসান আরিফ ও রোকনউদ্দিন মাহমুদ মামলা পরিচালনা করছেন। অন্যান্য পক্ষে টি এইচ খান ও ব্যারিস্টার রফিক-উল হকও রয়েছেন।
এ রকম সময়ে প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনা এবং সেখানে আপনার সভাপতি হওয়ার কারণে একটা অপ্রয়োজনীয় বিভ্রম প্রতীয়মান হতে পারে কি? বুধবার রাতে ইউসিবিএলের পরিচালক ও সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান তা নাকচ করেন। তাঁর যুক্তি: ‘প্রধান বিচারপতি ও তাঁর সহধর্মিণী সমিতির জীবনসদস্য। তিনি আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাই এই সংবর্ধনা। চট্টগ্রামের মন্ত্রী ও সাংসদেরা সমিতির সদস্য হিসেবে আমন্ত্রিত, অতিথি হিসেবে নন। সমিতির কেউ উঁচু পদে যেমন মন্ত্রী, এমপি, সচিব বা ব্যাংকের এমডি হলে আমরা সংবর্ধনা দিই। এর আগে মন্ত্রীদের দিয়েছি।’ এ প্রসঙ্গে তিনি এক সাবেক সেনা ও নৌবাহিনীর প্রধানকে দেওয়া সংবর্ধনার কথাও বলেন। তবে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি আমীরুল কবির চৌধুরীও সমিতির জীবনসদস্য বহু বছর। প্রশ্নের জবাবে শুক্রবার তিনি নিশ্চিত করেন, সংবর্ধনার জন্য তিনি কখনো আমন্ত্রিত হননি। তদুপরি আমি খোলা মনে ধরেই নিচ্ছি, সমিতির সভাপতির ওই দাবিই সত্য। এমনকি একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা কাকতালীয় বলতে পারেন।’ কিন্তু এখানে খটকা হলো, অহেতুক কিছু একটা প্রতীয়মান হওয়ার ঝুঁকি কিংবা ধাঁধা সৃষ্টির প্রশ্ন। যা এ ধরনের সংবর্ধনা না নিলে প্রশ্ন তোলারই সুযোগ হয় না। শুধু জন্মস্থানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি একান্ত আঞ্চলিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আচরণবিধির উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব হয় না। ১৮ ফেব্রুয়ারিতে আমরা দেখলাম, তাঁর বেঞ্চে শুনানি চলছে এমন মামলায় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট একজনের কাছ থেকে প্রধান বিচারপতি ক্রেস্ট নিলেন। এই সংবর্ধনা, এই ক্রেস্ট গ্রহণও আচরণবিধিতে নির্দিষ্টভাবে বারণ করা। ৮ ধারা বলেছে, ‘বিচারক তাঁর পরিবার, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধুদের ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে কোনো উপহার বা অভ্যর্থনা নেবেন না।’ সমিতির তিন হাজার সদস্য কিংবা প্রায় ৪৫ সদস্যের যে নির্বাহী পরিষদ তাঁকে সংবর্ধনা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাঁদের নিশ্চয় ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ বলা যাবে না। অসংগতি প্রকট হয়ে ওঠে যখন তিনি চট্টগ্রাম সমিতির সদস্যদের সমাবেশে ‘মায়ের কোলে ফেরার’ অতিশায্যে চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলেন। আর সেখানে একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বিশৃঙ্খলা রোধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন সুপ্রিম কোর্টের জুডিশিয়াল কনডাক্ট অ্যাডভাইজারি কমিটির অভিমত এখানে প্রণিধানযোগ্য। ‘বিচারকও সামাজিক জীব। বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা বিজ্ঞোচিত বা সম্ভবও নয়। বিচারক যে কমিউনিটিতে বাস করেন, সেখান থেকে তাঁর বিচ্ছিন্ন হওয়া উচিত নয়। কুশলাদি বিনিময়, সাধারণ অভ্যর্থনা তিনি নেবেন। তবে বার ছাড়া অন্য আমন্ত্রণ তিনি এড়াবেন।’ তবে বিষয়টি যে চূড়ান্ত বিচারে ব্যক্তির ওপরই নির্ভর করে। কমিটি বলছে, ‘তিনি সব সময় নিজেকে প্রশ্ন করবেন, জনগণ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে? তিনি বেঞ্চের বাইরের সব কার্যক্রমে উচ্চ নৈতিকতা বজায় রাখবেন। বিচারকের নিরপেক্ষতায় জনগণের যে বদ্ধমূল আস্থা, তাতে তিনি এতটুকু আঁচড় কাটতে দেবেন না।’
চট্টগ্রাম সমিতি দ্বারা তাঁর কৃতী সদস্যদের সংবর্ধনা প্রদান সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু প্রধান বিচারপতির বিষয়টি সাধারণভাবে দেখার সুযোগ নেই। এই সমিতির সদস্যপদে প্রধান বিচারপতি ও তাঁর স্ত্রীর বহাল থাকা সংবিধানের ৯৬(৪) অনুযায়ী চ্যালেঞ্জযোগ্য প্রতীয়মান হয়। কারণ এতে আইনের ২(খ) ধারার চেতনা নষ্ট হয়। এই ধারা বলেছে, ‘কোনো বিচারক তাঁর পরিবার, সামাজিক বা অন্যবিধ সম্পর্কের দ্বারা বিচারিক আচরণ বা রায়কে প্রভাবিত করতে দিতে পারেন না। অন্যের ব্যক্তিগত স্বার্থ অগ্রসর করাতে কোনো বিচারকের তাঁর পদমর্যাদার গৌরবকে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়।’ প্রধান বিচারপতিকে সদস্যপদে বহাল রেখে একটি আঞ্চলিক সমিতি তাঁর পদমর্যাদার গৌরবকেই ব্যবহার করে যাবে বলে প্রতীয়মান হবে।
বারের সংবর্ধনাই প্রধান বিচারপতির একমাত্র সংবর্ধনা হওয়া উচিত। প্রধান বিচারপতি কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নন। সংবিধানে লেখা, তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। তিনি যদি আঞ্চলিক বিবেচনায় কোনো সংবর্ধনা নেন, তাহলে তা জনগণের চোখে লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

দায়িত্বহীনতার রেকর্ড -প্রকৃতির আইলা চলে গেলেও মানুষের দুর্দশা লাঘব হয়নি

আইলা এসেছে ও চলে গেছে আট মাস পার হলো। কিন্তু খুলনা-সাতক্ষীরার দুর্গত এলাকার চিত্র বলছে, যেন গতকালই আইলা হয়ে গেছে এবং আগামীকালও বিপর্যয় আসন্ন। সরকার উদাসীন, বিদেশি প্রতিশ্রুত সাহায্য আসেনি এবং সমুদ্রের প্লাবন ও ঝড়ের সামনে অরক্ষিত লাখ লাখ মানুষ। যে করুণ, অবহেলিত ও অমানবিক অবস্থায় মানুষকে সেখানে বাস করতে হচ্ছে, তা দেখে মনে হয় মানবতা শব্দটি তাদের জন্য নয়। সরকারি সেবা-সাহায্যহীন নির্মম বাস্তবতায় সেখানে চলছে মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কঠোর সংগ্রাম।
আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ৫০ লাখ মানুষ। তিন লাখ ২৩ হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, গবাদিপশু মারা গেছে দেড় লাখ। ৭০ শতাংশ চিংড়ির ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবার পুনর্বাসন হয়নি, জলাবদ্ধতার জন্য প্রধান ফসল আমনের চাষ হতে পারেনি। দুর্গত মানুষদের স্বাস্থ্য-বিপর্যয়, চরম অমানবিকতার মধ্যে থাকতে থাকতে মানসিক ভারসাম্য হারানোসহ মানববিপর্যয়ের সমস্ত লক্ষণ সেখানে স্পষ্ট। আইলার আঘাতে ৬৪৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মেরামত হয়েছে মাত্র ১০০ কিলোমিটার। তাতেও এত ফাঁকি যে এই ১০০ কিলোমিটার বাঁধও যেকোনো সময় বড় জোয়ার বা ঝড়ে বিলীন হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে নতুন করে ৪০টি গ্রাম তলিয়ে গেছে, আরও ১০০টি গ্রাম রয়েছে ভেসে যাওয়ার মুখে। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে যেখানে এ রকম পাতলা পর্দা ঝুলছে, সেখানে রাজধানীকেন্দ্রিক সরকারের ভূমিকা দুঃখজনকভাবে দায়িত্বহীন।
প্রথম আলো ধারাবাহিকভাবে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু সরকারের টনক নড়ছে বলে মনে হয় না। খাদ্য-পানি-বাসস্থান, চিকিত্সাহীন অবস্থায় সামুদ্রিক জোয়ার ও ঝড়ের মুখে লাখ লাখ মানুষের এ রকম বিপন্ন ও অরক্ষিত দশায় সরকার ছাড়া আর কারও পক্ষে সম্ভব নয় বিপুলসংখ্যক মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। দুর্গত এলাকার জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ছিল, দায়িত্ব ছিল সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর, এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর। অথচ কেউ কথা রাখেনি।
বর্ষা আসন্ন, তার আগেই উপকূলীয় বাঁধগুলো মেরামত ও পুনর্গঠন করে অঞ্চলটিকে তলিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে হবে। মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা পানিতে ঢালা বন্ধ করে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। যেসব ঠিকাদার ফাঁকি দিচ্ছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হচ্ছে—তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। দুর্যোগকে পুঁজি করে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা আর এক মুহূর্তও চলতে পারে না।
আইলাদুর্গত অঞ্চল ও মানুষকে রক্ষায় অবিলম্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। পানির নিশ্চয়তা, ইতিমধ্যে অসুস্থ ও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা মানুষের চিকিত্সার নিশ্চয়তাসহ জীবন চালানোর সব উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্ষা আসার আগেই কিংবা আরেকটি দুর্যোগে ভেসে যাওয়ার আগেই সরকার ও সাহায্য সংস্থাগুলোকে একযোগে নেমে পড়তে হবে, যাতে মানুষ বাঁচে।

ছাত্রদল নিয়ে খালেদা জিয়া -সংগঠনটি লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করুন

গত বুধবার রাজধানীতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের এক সভায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতি সম্পর্কে যেসব নির্দেশনামূলক কথাবার্তা বলেছেন, তা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন, ছাত্রদের দিয়েই ছাত্রদল চালানো হবে; ভবিষ্যতে ছাত্র সংগঠনটির সব কমিটিতে শুধু ছাত্রদেরই রাখা হবে। বয়স্ক, অর্থাৎ যাদের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে, তাঁরা যাবেন বিএনপি ও যুবদলে।
ছাত্ররাই ছাত্রসংগঠনের সদস্য বা নেতা হবেন, অছাত্ররা নয়—এই সাধারণ নিয়মটি যে মানা দরকার, খালেদা জিয়ার এ উপলব্ধিকে স্বাগত জানাতে হয়। মধ্যবয়সী, ছেলেমেয়ের বাবা হয়েছেন, এমন নেতাদের আর ছাত্রসংগঠনে থাকতে দেওয়া হবে না—এটি বেশ ভালো কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সঙ্গে বিএনপি বা যুবদলের কী সম্পর্ক? প্রশ্নটি উঠছে এ কারণে যে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, ছাত্র সংগঠনগুলো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগী বা অঙ্গসংগঠন হিসেবে থাকতে পারে না। তাহলে বিএনপির চেয়ারপারসন কী এখতিয়ারে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নির্দেশ জারি করতে পারেন।
তিন সপ্তাহের মধ্যে ছাত্রদলের একটি স্থায়ী গঠনতন্ত্র তৈরি করার নির্দেশ দেওয়ার সময় বিএনপির চেয়ারপারসন হয়তো খেয়াল করেননি, এ নির্দেশের মধ্য দিয়ে এই সত্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে যে ছাত্রদল নামের সংগঠনটি আগের মতোই বিএনপির হুকুমে চলবে। এভাবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনের একটি শর্তকে কার্যত অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের এদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। কমিশনের তরফ থেকে এ বিষয়ে একটা বক্তব্য প্রত্যাশিত। শুধু ছাত্রদলের বিষয়ে নয়, ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরও কার্যত আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন হিসেবেই সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বর্বরতার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সংশ্লিষ্টতার খবর বেরিয়েছে। ছাত্রলীগের ব্যাপারেও সরকারি দলের কর্তৃত্ব সুস্পষ্ট। তাহলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনের এ-সংক্রান্ত ধারার কী অর্থ থাকল?
দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার নির্দেশে ছাত্রদল থেকে সব অছাত্র যদি বিদায় নেন, অতঃপর শুধু ছাত্রদের দ্বারাই সংগঠনটি পরিচালিত হয়, তাহলে কি তাদের মধ্যে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে? অর্থাৎ শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, হল দখল, আসন-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ যেসব কর্মকাণ্ড এখন ছাত্র সংগঠনগুলোর মূল তৎপরতা হয়ে উঠেছে, ছাত্রদল কি সেগুলো পরিত্যাগ করবে? যেসব ছাত্র ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসতে চান, সংগঠনটির প্রতি তাঁদের অঙ্গীকার কী? কী তাঁদের চূড়ান্ত লক্ষ্য? তাঁরা কি ছাত্র সংগঠনটিকে ছাত্রসমাজের মঙ্গলকামী সংগঠনে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেবেন? পড়াশোনা, গবেষণা, খেলাধুলা, সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দ্বারা শিক্ষাঙ্গনকে প্রাণবন্ত করে তুলবেন? জাতীয় স্বার্থের কোনো বিষয় গোটা জাতিকে যখন নাড়া দেবে, তখন সমগ্র জাতির স্বার্থে জনগণের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে কথা বলবেন?
বলা বাহুল্য, এসব সিদ্ধান্ত ছাত্রদলকেই নিতে হবে। বিএনপির চেয়ারপারসনের নির্দেশ এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নয়। খালেদা জিয়া যদি আন্তরিকভাবেই ছাত্রদলের মঙ্গল চান, তাহলে বিএনপির লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে সংগঠনটিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়াই হবে সত্যিকারের কাজ।

জলদস্যুর কবলে পড়া ১১ ইন্দোনেশীয় নাবিক উদ্ধার

জলদস্যুর কবলে পড়া ১১ ইন্দোনেশীয় নাবিককে উদ্ধার করেছে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ। গতকাল শুক্রবার সাবাহ প্রদেশে মালয়েশিয়ান মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির প্রধান মোহাম্মদ তাহা ইব্রাহিম এ কথা জানান। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার বোর্নিও দ্বীপের কোটা কিনাবালু থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ওই নাবিদকদের উদ্ধার করা হয়েছে।
মোহাম্মদ তাহা জানান, নাবিকেরা গত ৬ ফেব্রুয়ারি একটি নৌযানে চড়ে সিঙ্গাপুর থেকে কম্বোডিয়া যাওয়ার পথে মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলবর্তী তিওমান দ্বীপে জলদস্যুদের কবলে পড়েন। জলদস্যুরা নাবিকদের নৌযানটি ছিনতাই করে তাঁদের সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়। আট দিন ধরে সমুদ্রে ভেসে থাকার পর তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। নাবিকেরা সুস্থ থাকলেও তাঁরা খুব দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
তাহা আরও বলেন, ‘নাবিকেরা ভাসতে ভাসতে পুলাউ লায়াং-লায়াংয়ে মালয়েশীয় নৌ-চৌকির কাছে পৌঁছালে মালয়েশীয় নৌবাহিনীর সদস্যরা তাঁদের দেখতে পান এবং উদ্ধার করেন।’
মোহাম্মদ তাহা জানান, টাগবোটের আরেক সদস্যের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানা যায়নি। উদ্ধারকৃতদের দেশে ফেরত পাঠাতে ইন্দোনেশীয় কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনাটির তদন্ত চলছে।

এক রুপিতে জমি

পশ্চিমবঙ্গের পৌর এলাকায় সরকারি খাস জমিতে বসবাস করছেন এমন নাগরিকদের পশ্চিমবঙ্গ সরকার এক রুপির বিনিময়ে ৯৯ বছরের জন্য জমির ইজারা দিচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার রাজ্য মন্ত্রিসভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
সাংবাদিকদের এ খবর জানিয়ে পুরমন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য বলেন, নিরাপদ জমির শর্ত প্রকল্পে প্রায় চার লাখ মানুষ এর ফলে উপকৃত হবেন। অবশ্য সরকারি খাস জমিতে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন এবং যাঁদের মাসিক আয় ছয় হাজার রুপির কম, তাঁদেরই ওই জমি দেওয়া হবে।

‘ইরান হয়তো পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাজ করছে’

জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ গত বৃহস্পতিবার বলেছে, তাদের আশঙ্কা, ইরান বর্তমানে সম্ভবত পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে ইরান পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এক প্রতিবেদনে জানায়, এই প্রথমবারের মতো তারা ধারণা করছে, ইরান সক্রিয়ভাবে পরমাণু অস্ত্রসমৃদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আইএইএর এ ধারণা, ইরানের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ শক্ত ভিত্তি দেবে।
প্রতিবেদনে নিশ্চিত করে আরও বলা হয়, ইরান প্রথম দফায় অল্প পরিমাণে সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। এ ছাড়া স্বল্প বিশুদ্ধ প্রচুর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য মজুদ রেখেছে।

পাকিস্তান-ভারত বৈঠক আস্থা তৈরির কাজ করবে

আগামী সপ্তাহে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার ভবিষ্যত্ সংলাপের জন্য আস্থা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে। তবে এর বেশির ভাগই নির্ভর করছে ইসলামাবাদের ওপর। ভারতের সরকারি সূত্রগুলো এ মন্তব্য করেছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্র বলেছে, পুরোনো ইস্যু সমাধানের লক্ষ্যে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে না। দুই দেশের সম্পর্ক জটিল হিসেবে আখ্যা দিয়ে সূত্রটি বলেছে, ভারতকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসবাদী হামলা এখনো মূল উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে। পুনেতে সাম্প্রতিক বোমা হামলা উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করে সূত্র জানায়, আসন্ন বৈঠকে ভারত সন্ত্রাসবাদের ওপর জোর দেবে। যদি পাকিস্তানের অন্য কোনো উদ্বেগ থাকে, তাহলে ভারত সেগুলোর সমাধান করতে প্রস্তুত। যদিও ভবিষ্যত্ আলোচনার পথ-পরিক্রমা নির্ভর করছে ভারতের উদ্বেগ সম্পর্কে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
সূত্র বলেছে, মুম্বাই হামলার পর সংলাপ স্থগিত করে দেওয়ার বৈধ কারণ রয়েছে। ওই কৌশল ভালোই কাজ দিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি বর্তমানে এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, কোনো ধরনের সংলাপ না হওয়া হিতে বিপরীত হতে পারে। এক বছর আগের চেয়ে বর্তমানে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরিস্থিতি অনেক ভিন্ন। সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন মূল প্রতিষ্ঠান নিজেদের আরও শক্তিশালী করেছে এবং তারা পাক-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা চায়।
বৈঠকে ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহভাজন সাতজন লস্কর-ই-তৈয়বা জঙ্গির কণ্ঠস্বরের নমুনা চাইবে ভারত। বৈঠকে ভারত যে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিষয় উত্থাপন করবে, সেগুলোর মধ্যে কণ্ঠস্বরের নমুনা চাওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
যেসব সন্দেহভাজন জঙ্গির কণ্ঠস্বরের নমুনা চাওয়া হবে তাঁরা হলেন জাকি-উর-রেহমান লাখভি, জারার শাহ, আবু আল কামা, শাহিদ জামিল রিয়াজ, হামাদ আমিন সাদিক, ইউনুস আঞ্জুম ও জামিল আহমেদ। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কণ্ঠস্বরের নমুনা সরবরাহ করা হলে, সেই নমুনা মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার সময় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ধারণ করা টেলিফোন কথোপকথনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা ইন্ডিয়ান মুজাহেদিন (আইএম) সদস্যদের প্রশিক্ষণ সম্পর্কেও পাকিস্তানের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে ভারত। ওই জঙ্গি গোষ্ঠীটি পুনে বোমা হামলার নেপথ্যে রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। হায়দরাবাদে গ্রেপ্তার সন্দেহভাজন জঙ্গি মোহাম্মদ আহমদ খাজা তদন্তকারীদের বলেছেন, আইএমের নিয়োগ দেওয়া জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তানে পাঠানো হয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে তারা আবার ভারতে ফিরে আসে। ওই জঙ্গি বলেন, আইএম জঙ্গি আমির রাজা খান ও রিয়াজ ভাটকালের সঙ্গে তাঁর করাচিতে দেখা হয়েছে।
সীমান্তে গোলাগুলি, অনুপ্রবেশ ও ভারতীয় মুদ্রা জাল করার মতো বিষয়গুলো বৈঠকে তুলে ধরবে ভারতীয় পক্ষ। ভারতের দাবি, জম্মু ও কাশ্মীরে অনুপ্রবেশের চেষ্টার ঘটনা বেড়ে গেছে।

নাইজারে সেনা অভ্যুত্থান প্রেসিডেন্ট তানজা বন্দী

আফ্রিকার দেশ নাইজারে সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। অভ্যুত্থানে দেশটির প্রেসিডেন্ট মামাদো তানজার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। অভ্যুত্থানকারী সেনারা প্রেসিডেন্ট তানজা ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের আটক করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারী দল সুপ্রিম কাউন্সিল ফর দ্য রেস্টোরেশন অব ডেমোক্রেসির (সিএসআরডি) এক মুখপাত্র বলেন, নাইজারের সংবিধান বাতিল করা হয়েছে। দেশ এখন তাঁদের নেতৃত্বে রয়েছে। ক্ষমতা দখল করার পর সামরিক জান্তার প্রধান হিসেবে গতকালশুক্রবার স্কোয়াড্রন প্রধান সালো জিবোর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, প্রেসিডেন্টকে সেনাছাউনিতে আটক রাখা হয়েছে। সেখানে সরকারের অনেক মন্ত্রীও আটক আছেন বলে বিবিসির খবরে বলা হয়।
টেলিভিশনে দেওয়া ঘোষণায় সামরিক অভ্যুত্থানের নেতাকে সামরিক বাহিনীর পোশাকে দেখা গেছে। তিনি বলেন, নাইজারে গণতন্ত্র ও সুশাসন সমুন্নত রাখতে সুপ্রিম কাউন্সিল ফর দ্য রেস্টোরেশন অব ডেমোক্রেসি (সিএসআরডি) দলকে শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
সংবিধান পরিবর্তন করার জন্য প্রেসিডেন্ট তানজা এর আগে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন। রাজধানী নিয়ামিতে গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্টের অনুগত সেনাদের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ব্যাপক গোলাগুলি চলে। সেখানে সেনারা চারটি ঘাঁটিতে অবস্থান নেন। গোলাগুলির সময় স্থানীয় লোকজন সেখান থেকে পালাতে থাকে।
কয়েকটি সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট তাঁর প্রাসাদে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। এ সময় অভ্যুত্থানকারী সেনারা সাঁজোয়া যান নিয়ে প্রাসাদটি ঘিরে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অনুগত সেনাদের সঙ্গে তাঁদের গোলাগুলি শুরু হয়। ওই সময় প্রাসাদ থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। ৭১ বছর বয়সী তানজা একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা। ১৯৯৯ সালে তিনি নাইজারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

তিব্বত ও দালাই লামার প্রতি সমর্থন দিয়েছেন ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে চীনের ক্ষোভ উপেক্ষা করে তিব্বতের নির্বাসিত আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার সঙ্গে বৈঠক করার মাধ্যমে তাঁর ও তাঁর জন্মস্থান তিব্বতের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র দালাই লামার সফরকে সতর্কভাবে ক্যামেরা থেকে আড়াল করতে চাইলেও দালাই লামা হোয়াইট হাউস থেকে বেরিয়ে সোজা অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের একটি বড় দলের কাছে যান এবং তাঁদের বলেন, ওবামার সঙ্গে তাঁর ৪৫ মিনিট ধরে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠক নিয়ে তিনি ‘খুবই খুশি’।
দালাই লামা তাঁর দাবিকে ‘ন্যায্য’ ও ‘শান্তিমূলক’ উল্লেখ করে আরও বলেন, ‘আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ছিলেন খুবই ইতিবাচক।’
দালাই লামা হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিং কক্ষের বাইরে তুষারে একটি বৃত্ত ও দুটি রেখা আঁকেন। এটি করে হয়তো তিনি তিব্বতের পতাকার প্রতীকের কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
চীনের ক্ষোভ প্রশমনের আশায় ওবামা ওভাল অফিসের বদলে হোয়াইট হাউসের মানচিত্র-কক্ষে দালাই লামার সঙ্গে ওই বৈঠক করেন। এ সময় ভেতরে কোনো ক্যামেরা নেওয়ার অনুমতি দেননি তিনি।
তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস পরে বলেন, চীনের শাসনের মধ্যে থেকে তিব্বতের জন্য বৃহত্তর অধিকার আদায়ে দালাই লামার মধ্যপন্থী অহিংস দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ওবামা সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
গিবস আরও বলেন, ‘তিব্বতের স্বতন্ত্র ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয় এবং চীনে তিব্বতিদের মানবাধিকার সংরক্ষণের প্রতি ওবামা তাঁর জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
গিবস বলেন, ‘দালাই লামার মধ্যপন্থী মনোভাব, অহিংসার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার এবং চীন সরকারের সঙ্গে তাঁর সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টারও প্রশংসা করেন ওবামা।’ যুক্তরাষ্ট্র চীন ও দালাই লামার মধ্যে নতুন এ সংলাপকে সমর্থন করে।
চীনের তীব্র সমালোচনা
দালাই লামার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার বৈঠকের তীব্র সমালোচনা করেছে চীন। গতকাল চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মা ঝাওজু বলেন, ওই বৈঠকের কারণে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। ঝাওজু আরও বলেন, চীনের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে বিবেচনা করে এমন ব্যক্তিকে সাক্ষাত্ দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ঝাওজু এসব কথা বলেন।
তিনি বিবৃিতিতে আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার স্বীকার করেছে যে তিব্বত চীনের অংশ এবং তারা তিব্বতের স্বাধীনতা সমর্থন করে না। এ ঘটনা সেই স্বীকৃতিরও পরিপন্থী।
ঝাওজু আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এখন উচিত হবে চীনের অবস্থান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা এবং অবিলম্বে (সাম্প্রতিক বৈঠকের) বিপজ্জনক প্রভাব দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে তাদের চীনবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দানও বন্ধ করতে হবে।

পাকিস্তানে আরও কয়েকজন তালেবান নেতা গ্রেপ্তার

মার্কিন গোয়েন্দা-সহায়তায় তালেবানের আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। গ্রেপ্তার হওয়া তালেবান নেতাদের মধ্যে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের পরিচিত সহযোগীও রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত বুধবার দিনের শেষে ও বৃহস্পতিবার ভোরে পাকিস্তানের বন্দরনগর করাচির কাছে তিনটি পৃথক অভিযান চালিয়ে আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়জন তালেবান জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। আফগান ও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, পৃথক অভিযান চালিয়ে তালেবানের দুজন ‘ছায়া গভর্নরকেও’ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ওই কর্মকর্তারা এর চেয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
পাকিস্তানের করাচিতে তালেবান-প্রধান মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের ডেপুটি মোল্লা আবদুল গনি বারাদারের গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে এসব গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেল। হোয়াইট হাউস ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বারাদারের গ্রেপ্তারের খবর নিশ্চিত করলেও বারাদার কীভাবে গ্রেপ্তার হয়েছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
তবে পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, আবদুল গনি বারাদার করাচির উপকণ্ঠে গাড়িতে করে যাওয়ার সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ধাওয়া করে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। ওই সময় তাঁর তিন দেহরক্ষীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, বারাদার ‘দরকারি’ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন, যা অন্য জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে সহায়তা করেছে।
তাঁরা জানান, মার্কিন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য সন্দেহভাজন জঙ্গিদের গতিবিধি অনুসরণ ও গ্রেপ্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র জিওফ মোরেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারে খুশি।
যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের আফগানিস্তানে বিদ্রোহ তত্পরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যরা পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য।
গজনি প্রদেশের আদিবাসী নেতা মোল্লা মামামুদ জানান, গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে ওসামা বিন লাদেনের সহযোগী আমির মুয়াবিয়াও রয়েছেন। তিনি পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় বিদেশি আল-কায়েদা জঙ্গিদের দায়িত্বে রয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আরও রয়েছেন আখুনজাদা পোপালজাই। তিনি মোহাম্মদ ইউনুস নামেও পরিচিত। কাবুলের সাবেক ওই পুলিশপ্রধান জাবুল প্রদেশের ‘ছায়া গভর্নর’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
করাচিতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তালেবান আমলের আফগান সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডার হামজা এবং পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় চেচেন ও তাজিক জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালনকারী আবু রিয়াদ আল-জারকাবিও রয়েছেন।
কুন্দুজের গভর্নর মোহাম্মদ ওমর জানান, কুন্দুজে তালেবানের ‘ছায়া গভর্নর’ মোল্লা আবদুস সালাম ও বাগলান প্রদেশের ‘ছায়া গভর্নর’ মোল্লা মোহাম্মদকে ১০-১২ দিন আগে পৃথক অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে তালেবানের একজন মুখপাত্র ওই গ্রেপ্তারের খবর নাকচ করে দিয়ে বলেন, মারজাহতে ন্যাটো ও আফগান বাহিনীর সঙ্গে লড়াইরত তালেবান যোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য ওই মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
পাকিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আফগান তালেবানের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার সিরাজ হাক্কানির ছেলে নিহত হয়েছে।
দুই কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার জানান, আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী উত্তর ওয়াজিরিস্তানের দান্দে দাপরা খেল এলাকার একটি বাড়িতে ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। হামলায় সিরাজ হাক্কানির ছেলে মোহাম্মদ হাক্কানি ও তাঁর তিন সহযোগী নিহত হয়েছে। ওই দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। কারণ সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁরা দায়িত্বপ্রাপ্ত নন।
কর্মকর্তারা বলেন, মনে হচ্ছে সিরাজ হাক্কানিকে লক্ষ্য করেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। তিনি ওই হামলায় আহত হয়েছেন কি না, সেটা জানা যায়নি।

মঠাধ্যক্ষের কারাদণ্ড

একজন বৌদ্ধ মঠাধ্যক্ষকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন মিয়ানমারের একটি কারা আদালত। গতকাল শুক্রবার বিরোধীদলীয় একটি সূত্র এ কথা জানায়।
তাইওয়ান সফর শেষে দেশে ফেরার পর গত আগস্টে মঠাধ্যক্ষ গাউ থিটাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গত বুধবার ইয়াঙ্গুনের কুখ্যাত ইনসেন কারাগারে স্থাপিত বিশেষ আদালত তাঁকে ওই কারাদণ্ড দেন। গাউ থিটাকে তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
গত ২৬ আগস্ট ইয়াঙ্গুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গাউ থিটার সঙ্গে আরও সাত ভিক্ষুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে কোনো অভিযোগ আনা ছাড়াই তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে কলকাতায় নানা আয়োজন

কাল অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উপলক্ষে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে নানা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। নগ্নপদযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রক্তদানেরও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সব ভাষাভাষীর মানুষকে নিয়ে কলকাতার মোহরকুঞ্জে একুশে দিবস পালন করবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উদ্যাপন কমিটি।
এদিন কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন এক পদযাত্রার আয়োজন করেছে। উপ-হাইকমিশনের লাইব্রেরির সামনে থেকে এই পদযাত্রা শুরু হবে। পদযাত্রা শেষে এক অনুষ্ঠানে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। সবশেষে হবে রক্তদান। এ ছাড়া উপ-হাইকমিশন দুই দিনব্যাপী এক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এতে কলকাতার প্রখ্যাত শিল্পীদের পাশে একসঙ্গে ছবি আঁকবেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিল্পী হাশেম খান, আবদুস শাকুর, বীরেন্দ্র সোম, শহীদ কবীর ও রেজাউল করিম।

পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা হবে না: উত্তর কোরিয়া

অর্থনৈতিক সহায়তার বিনিময়ে পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করবে না উত্তর কোরিয়া। গতকাল শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি এ কথা জানায়।
বার্তা সংস্থার এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘(যুক্তরাষ্ট্র) উত্তর কোরিয়ার প্রতি শত্রুতামূলক নীতি পরিহার না করলে এবং তাদের ওপর থেকে পরমাণু হুমকি সরিয়ে না নিলে কোনোভাবেই পিয়ংইয়ং পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করবে না।’
বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া কারও জন্য হুমকি সৃষ্টি বা অর্থনৈতিক আনুকূল্য পাওয়ার লক্ষ্যে নয় বরং নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মজবুত করতেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে। বহির্বিশ্ব যদি মনে করে, উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে আসবে, তাহলে তা হবে একটি ভুল।
এর আগে ব্যাপক অর্থনৈতিক সহায়তার বিনিময়ে পরমাণু কর্মসূচি পরিহার করার ব্যাপারে সিউলের দেওয়া একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল পিয়ংইয়ং।
পরমাণু সংকট নিয়ে ছয়-জাতি আলোচনায় ফিরতে দুটি শর্তের কথাও উল্লেখ করেছে পিয়ংইয়ং। শর্ত দুটি হলো, পিয়ংইয়ংয়ের ওপর থেকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং একটি আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
পিয়ংইয়ং বলেছে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা থেকে নিজেদের রক্ষার স্বার্থেই তারা পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে এবং আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি করতে হবে।

আত্মঘাতী বিমান হামলা চালিয়ে কর বিভাগের ওপর প্রতিশোধ

আত্মঘাতী বিমান হামলা চালিয়ে কর বিভাগের ওপর প্রতিশোধ নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক। বৃহস্পতিবার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিন নগরে ঘটেছে ওই ঘটনা। কর ভবনের ওপর ধসে পড়া বিমানের ওই চালকসহ দুজনের মৃত্যু ঘটেছে। আহত অপর ১৩ জনের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনার ‘নায়ক’ জোসেফ এ স্টেক (৫৩) পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী। অপরিশোধিত কর নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর ঝামেলা হয়। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার বাড়ির কাছের জর্জটাউন বিমানবন্দরে রাখা নিজের চার আসনের বিমানটি চালু করেন তিনি। পাইপার পিএ-২৮ বিমানটি নিয়ে উড্ডয়নের আগে এ ব্যাপারে তিনি বিমানবন্দরকেও কিছু অবহিত করেননি।
অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতায় বিমানটি চালিয়ে অস্টিন নগরের সাততলা কর ভবনে ঝাঁপ দেন জোসেফ। ক্ষুদ্রাকৃতির বিমানটি ভবনের ছাদেই বিস্ফোরিত হয়ে পুড়তে থাকে। পুরো ভবনে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণে ভবনটির দরজা-জানালার কাচ মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। ঘটনার সময় ভবনে কর বিভাগের ২০০ লোক কর্মরত ছিলেন। আতঙ্কিত লোকজন তখন দ্রুত এদিক-ওদিক ছুটতে থাকেন। ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লোকজনকে ভবন থেকে উদ্ধার করে। ঘটনাস্থলেই বিমানচালক জোসেফ স্টেকের পুড়ে যাওয়া লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। কর ভবনে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে পুলিশ। ৫০ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৩ জন এখনো চিকিত্সাধীন।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র আতঙ্ক দেখা দেয়। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে বিষয়টি জানানো হয়। পেন্টাগন থেকে দুটি সেনাবিমান দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। এফবিআই দ্রুত হামলার ‘নায়ক’ জোসেফকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। নিজের ঘরে অগ্নিসংযোগ এবং আত্মঘাতী বিমান হামলার আগে জোসেফ ইন্টারনেটে তাঁর জীবনযন্ত্রণার কথা লিখে যান। নিজের পেশা ও ব্যক্তিগত জীবনের দীর্ঘ বিড়ম্বনার বর্ণনা রয়েছে তাঁর এই লেখায়। সরকার, কর বিভাগ ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে তাঁর চরম ক্ষোভের কথা লিখে গেছেন ক্ষুব্ধ জোসেফ। জীবনের বিড়ম্বনা আর বহন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে জোসেফ লিখেছেন, ‘সহিংসতাই এখন একমাত্র সমাধান।’

হেলমান্দ নিয়ন্ত্রণে মাস লেগে যেতে পারে: নিক কার্টার

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর ব্রিটিশ কমান্ডার মেজর জেনারেল নিক কার্টার হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, হেলমান্দ প্রদেশে তালেবানের শক্ত ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও অন্তত এক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
প্রদেশের মারজাহ ও নাদ আলী এলাকা থেকে তালেবান জঙ্গিদের বিতাড়িত করতে ন্যাটো বাহিনী গত শনিবার থেকে জোরদার অভিযান শুরু করেছে। তালেবানের প্রবল প্রতিরোধের মুখে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ন্যাটো কর্তৃপক্ষ গতকাল শুক্রবার জানিয়েছে, দুই পক্ষের সংঘর্ষে তাদের আরও ছয় সেনা নিহত হয়েছে।
জেনারেল নিক কার্টার গতকাল শুক্রবার বলেন, তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে। ন্যাটো বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গত তিন মাসে আমাদের অগ্রগতিতে আমরা সাফল্যের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে বিজয় সম্পর্কে আগেভাগে বলার সময় এখনো আসেনি। মারজাহ ও নাদ আলী এলাকা ন্যাটোর নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও অন্তত এক মাস সময় লেগে যেতে পারে।’ বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন, ন্যাটো ও আফগান সেনা যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
চার হাজার ৪০০ আফগান সেনার কমান্ডার জেনারেল মোহাইদিন ঘোরি বলেন, ‘মারজাহ ও নাদ আলীর অধিকাংশ এলাকা এ সপ্তাহের মধ্যে ন্যাটোর নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করি।’ তিনি এও বলেন, নাদ আলীর চেয়ে মারজাহ এলাকায় অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে। তালেবান জঙ্গিরা বিভিন্ন বাড়ির ছাদে শিশু ও নারীদের দাঁড় করিয়ে আড়াল থেকে গুলি ছুড়ছে।
পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি জিওফ মোরেল বলেন, তালেবান যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তা সংঘবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু তারা মারজাহ এলাকায় অবস্থান করছে এবং ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই রয়েছে।
ন্যাটোর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার ন্যাটো বাহিনীর তিন সেনা মাইন বিস্ফোরণে এবং অপর তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। নিহত সেনারা কোন দেশের তা জানানো হয়নি। শনিবার ন্যাটো বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যে ১৯ বিদেশি সেনা নিহত হয়।

গড়কারির নেতৃত্বে ‘উদার’ পথে বিজেপি

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নতুন প্রধান নীতিন গড়কারি দলকে কট্টর হিন্দুত্ববাদী অবস্থান থেকে সরিয়ে এনে অপেক্ষাকৃত উদার ও প্রগতিশীল জায়গায় নিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশেষ করে দলের যেসব নীতি ও কর্মকাণ্ড সমাজের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ক্ষতির কারণ, সেগুলো থেকে তাঁরা সরে আসবেন বলে আভাস দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার দলের জাতীয় কাউন্সিলে নবনির্বাচিত সভাপতি হিসেবে তাঁকে প্রায় পাঁচ হাজার প্রতিনিধি সভাপতি হিসেবে অনুমোদন দেন।
২৪ পৃষ্ঠার লিখিত উদ্বোধনী ভাষণে তিনি ‘অন্ত্যদয়া’ (দরিদ্র শ্রেণীর কল্যাণ), ‘সামাজিক সমরাষ্ট্র’ (সামাজিক সাম্য) ও ‘বিকাশ’ (উন্নয়ন)—এ রকম বহু শব্দ ব্যবহার করেছেন। রামমন্দির ইস্যুতে বিজেপি নেতাদের দেওয়া গতানুগতিক কট্টর বক্তব্য থেকে সরে এসে তিনি নমনীয় ভাষায় কথা বলেছেন। গড়কারি বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে মুসলমানদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা উচিত। সন্ত্রাস, পাকিস্তান ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ থেকে তিনি দূরত্ব বজায় রেখেছেন। বিশেষ করে, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা নিশ্চিতকরণে প্রণীত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ করার বিষয়টি তিনি একেবারেই উল্লেখ করেননি। মূলত উন্নয়ন ও উদারপন্থী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়। সুসংগঠিত নয়—এমন খাতগুলোর শ্রমিক ও দরিদ্র কৃষকদের দুর্দশা তাঁর বক্তব্যে প্রাধান্য পেয়েছে।
দেনার দায়ে কৃষকদের আত্মহনন ঠেকাতে গড়কারি দলীয় কর্মীদের প্রতি তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিজেপি যদি অচ্ছুত দলিত সম্প্রদায়সহ নিম্নবর্ণের ১০ শতাংশ মানুষের সমর্থনও আদায় করতে পারে, তাহলে অচিরেই তাঁরা শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসতে পারবেন। সাধারণত উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতারা সাধারণ শ্রমিকশ্রেণীর কাছ থেকে বিশেষ শ্রদ্ধা আশা করেন। কিন্তু নীতিন গড়কারি নেতা-কর্মীদের শ্রমিকদের কাছ থেকে ষষ্ঠাঙ্গ প্রণাম না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণে অকারণে দিল্লির দিকে না ছুটে সাধারণ মানুষের সেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্যও তিনি তাঁদের পরামর্শ দেন। তিনি সরকারের ইতিবাচক কাজের প্রশংসা করার জন্যও নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
বিজেপির প্রচলিত যুদ্ধংদেহী মনোভাব থেকে সরে এসে তাঁর এ নমনীয় ভাষণ দেওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, জনসমর্থন বাড়াতে তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি অপেক্ষাকৃত উদারপন্থা বেছে নিচ্ছে।

মোসাদের প্রধানকে গ্রেপ্তারের দাবি জানালো দুবাই পুলিশ

দুবাইয়ের পুলিশপ্রধান লে. জেনারেল দাহি খালফান বলেছেন, তিনি চান হামাস কমান্ডার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মোসাদের প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হোক। দুবাই টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে তাঁর বরাত দিয়ে গত বৃহস্পতিবার দেশটির দ্য ন্যাশনাল পত্রিকা জানায়, ওই হত্যাকাণ্ডে মোসাদের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে দুবাই পুলিশ ৯৯ ভাগ নিশ্চিত।
এদিকে নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করায় ইউরোপের চারটি দেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্স তাদের দেশে নিযুক্ত ইসরায়েলি শীর্ষ কূটনীতিকদের বৃহস্পতিবার ডেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে।
দাহি খালফান বৃহস্পতিবার দেওয়া তাঁর সাক্ষাত্কারে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে শতকরা ৯৯ ভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে, হামাস কমান্ডার মাহমুদ আল-মাবুকে হত্যার পেছনে মোসাদের হাত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি তা-ই হয়, তাহলে আমি আশা করব মোসাদের প্রধান মেইর দাগানকে গ্রেপ্তার করা হবে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করবে।’
গত ২০ জানুয়ারি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি বিলাসবহুল হোটেল থেকে হামাসের ওই কমান্ডারের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। দুবাই পুলিশ দাবি করছে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ওই হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে। ইউরোপীয় নাগরিকদের জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে মোসাদের সদস্যরা দুবাইয়ে প্রবেশ করে।
জাল পাসপোর্ট ব্যবহারের ঘটনায় ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্স তাদের নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার দেশ চারটিতে নিযুক্ত ইসরায়েলি শীর্ষ কূটনীতিকদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিবান্ড এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তদন্তে ইসরায়েলের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন।

পুনের হামলায় জড়িত ছিল হিন্দুত্ববাদী ‘অভিনব ভারত’!

ভারতের পুনে শহরের রেস্তোরাঁয় ১৩ ফেব্রুয়ারি বোমা হামলার পেছনে উগ্র হিন্দু সংগঠনের জড়িত থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ওই ঘটনায় তদন্তকারীরা যদিও জিহাদি গ্রুপগুলোর সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, কিন্তু অনেকে মনে করছেন উগ্রপন্থী হিন্দু সংগঠন ‘অভিনব ভারত’ কিংবা অন্য কোনো সংগঠন এতে জড়িত থাকতে পারে।
এর আগে পাকিস্তানকে সরাসরি দোষারোপ না করে ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাই বলেছিলেন, ওই ঘটনার সঙ্গে লস্কর-ই-তৈয়বা নেতা আমেরিকান নাগরিক ডেভিড কোলম্যান হেডলির অবশ্যই যোগাযোগ আছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, উগ্র হিন্দুত্ববাদী বেশ কয়েকটি সংগঠন আছে ভারতে, যেগুলো এ রকম সন্ত্রাসী হামলা চালাতে পারে। এর মধ্যে অভিনব ভারত অন্যতম। মহাত্মা গান্ধীর খুনি গোপাল গডসের মেয়ে হিমানি সরকারের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা ট্রাস্টের আদলে ২০০৬ সালে জন্ম হয় অভিনব ভারতের।
আদালতে মহারাষ্ট্রের আইনজীবীদের উপস্থাপিত তথ্যে জানা যায়, শিক্ষা ট্রাস্ট গড়ার আড়ালে সংগঠনটি খুব দ্রুত অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের অন্যতম নেতা লে. কর্নেল প্রাসাদ শ্রীকান্ত পুরোহিত ২০০৭ সালে সংগঠনের কর্মীদের নির্দেশ দেন, সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে এখন মুসলমানদের আঘাত করার সময় এসে গেছে। তবে এতে অভিনব ভারতের অনেকেই তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
২০০৮ সালে মালেগাঁওয়ে বোমা হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এখন মামলায় লড়ছেন লে. কর্নেল প্রাসাদ শ্রীকান্ত। অভিযোগ মতে, ওই বছর এপ্রিলে মধ্যপ্রদেশভিত্তিক হিন্দুত্ববাদী ওই সংগঠনের কর্মীরা মালেগাঁওয়ে বোমা হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। এরপর থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে অভিনব ভারত। তারা চায় ভারতের সব রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে সমগ্রতাবাদ কায়েম করতে। অর্থাত্ পৃথক কোনো রাজ্যের অস্তিত্ব থাকবে না, ভারত হবে এক দেশ।
অনেকে মনে করেন, অভিনব ভারত নামে এই সংগঠনটি ইতিমধ্যে বহু সন্ত্রাসী ঘটনার জন্ম দিয়েছে। ২০০৭ সালের মে মাসে হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদ ও আজমির শরিফে তারা একযোগে বোমা হামলা চালায়। কিন্তু তখন উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে ঘটনা দুটির সঙ্গে সংগঠনটির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করা যায়নি।
হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক কার্যক্রম বিচার করলে মোটেই বোঝার উপায় নেই যে, তারা বড় কোনো সন্ত্রাসী হামলা চালাতে সক্ষম। এ অবস্থায় অনেক তদন্তকারী বলছেন, পুনের ঘটনায় অভিনব ভারতের সংশ্লিষ্টতা নাও থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অন্য কোনো হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এতে জড়িত নেই।

শ্রীলঙ্কা গেল বাংলাদেশ

জুনিয়র ডেভিস কাপ টেনিসের এশিয়া-ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রাক-বাছাইপর্বে খেলতে কাল কলম্বো গেল বাংলাদেশ টেনিস দল। প্রতিযোগিতার মূল পর্ব শুরু হবে ২২ ফেব্রুয়ারি। চলবে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এতে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, সিরিয়া ও স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা।
বাংলাদেশ দল: আবু সালেহ মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি (নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন), জামিল ভূইয়া, হাসিবুল হক, বিপ্লব রাম।

রবিনহো ২, সান্তোস ৬

ম্যানসিটি থেকে ধারে রবিনহোর সান্তোসে খেলতে আসার কারণ একটাই, বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নেওয়া। এই মিশনে যে সঠিক পথেই আছেন ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার পরশু সেটিই জানিয়ে দিলেন ব্রাগানটিনোর বিপক্ষে ২টি গোল করে। তাঁর জোড়া গোলের সুবাদে সান্তোস জিতেছে ৬-৩ ব্যবধানে। সান্তোসে ফেরা রবিনহোর এটি ছিল তৃতীয় ম্যাচ। এক অর্থে প্রথমও। ২০০৫ সালের পর পরশুই প্রথম খেলেছেন সান্তোসের ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামে। তিন ম্যাচে রবিনহোর গোল দাঁড়াল ৩।

উডস বললেন, ‘ক্ষমা চাই’

অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন টাইগার উডস, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও স্বার্থপর কর্মকাণ্ডের জন্য আমার পরিবার, বন্ধু, সতীর্থ, সংশ্লিষ্ট সবার কাছে হূদয়ের গভীর থেকে ক্ষমা চাই।’ ফ্লোরিডার টিপিসি সগ্রাস ক্লাব হাউসে বাছাই করা কয়েকজন সতীর্থ, বন্ধু ও সংবাদমাধ্যম কর্মীর সামনে মুখ খোলেন গলফের কিংবদন্তি। ১৩ মিনিটের বক্তব্যের বেশির ভাগ সময়ই কৃতকর্মের জন্য স্ত্রী ও পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। স্ত্রী প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘কোনো ভাষাতেই এলিনের কাছে ক্ষমা চাওয়ার উপায় নেই। ভবিষ্যতে আমার ব্যবহার দিয়েই এটি অর্জন করে নিতে হবে।’ গলফে ফেরার ব্যাপারে বলেছেন, ‘একদিন না একদিন আমি গলফে ফিরব, তবে সেটা কবে নিজেও জানি না।’ আপাতত, তিনি থেরাপি নিতে ফিরে যাবেন সেই পুনর্বাসন কেন্দ্রে, যেখান থেকে তাঁর স্ত্রী তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন বলে শোনা গিয়েছিল।

ইংল্যান্ডের কাছে হারল পাকিস্তান

 দল বদলেছে, কিন্তু পাকিস্তানের দুর্দশা কাটেনি। অস্ট্রেলিয়ায় সব ম্যাচ হেরে আসা পাকিস্তান কাল দুবাইতে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৭ উইকেটে হেরেছে ইংল্যান্ডের কাছে। ইংলিশদের দুর্দান্ত বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে ২০ ওভারে পাকিস্তান তুলতে পারে মাত্র ১২৯, টি-টোয়েন্টিতে তাদের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর। ১০ রানে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু ম্যাচসেরা মরগান ও পিটারসেনের ১১২ রানের জুটিতে সহজেই জিতে যায় ইংলিশরা। টি-টোয়েন্টিতে এটি ইংল্যান্ডের যেকোনো জুটির রেকর্ড। ওয়েবসাইট। সংক্ষিপ্ত স্কোর: পাকিস্তান: ২০ ওভারে ১২৯/৮ (মালিক ৩৩, ফাওয়াদ ২৩, রাজ্জাক ২২; সোয়ান ২/১৮, ব্রড ২/২৩, ব্রেসনান ২/৩০), ইংল্যান্ড: ১৮.৩ ওভারে ১৩০/৩ (মরগান ৬৭*, পিটারসেন ৪৩*; আরাফাত ১/১৮)।

দুই রেফারি পেলেন নান্নু স্মৃতি পুরস্কার

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মিলনায়তন যেন তখন পুরোনো দিনের খেলোয়াড়দের এক মিলনমেলা। একে একে অডিটোরিয়ামে ঢুকছেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান, বশির আহমেদ, মেজর হাফিজ (অব.), হাসানুল হক ইনু, তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন টিপু মুন্সী, সাদেক হোসেন খোকারা। তাঁদের এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছিল একটি অনুষ্ঠান।
জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রয়াত ফুটবলার মনোয়ার হোসেন নান্নুর স্মরণে রেফারি পুরস্কার অনুষ্ঠানেই এসেছিলেন তাঁরা। এ বছর মনোয়ার হোসেন নান্নু স্মৃতি রেফারি পুরস্কার পেলেন আবদুল হান্নান মিরন ও তৈয়ব হাসান। ক্রেস্ট ছাড়াও তাঁদের দুজনকেই দেওয়া হয়েছে ২৫,০০০ করে টাকা।
অনুষ্ঠানে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয় সাবেক রেফারি মনির হোসেন ও জেড আলমকে। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে মনোয়ার হোসেন নান্নুর খেলোয়াড়ি জীবনের স্মৃতিচারণা করেন বক্তারা, প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হয় তাঁর ক্যারিয়ারের সোনালি স্মৃতিসংবলিত স্থির ও চলমান কিছু ছবি। পুরো অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল সাবেক ফুটবলারদের সংগঠন সোনালী অতীত ক্লাব।

কমনওয়েলথ শ্যুটিংয়ে বাংলাদেশের ব্রোঞ্জ

দিল্লি যাওয়ার আগে নিজেদের লক্ষ্যের কথা শুনিয়েছিলেন আসিফ হোসেন খান, আবদুল্লাহ হেল বাকি, শারমিন আক্তাররা (রত্না)। বলেছিলেন, দক্ষিণ এশীয় গেমসে নিজেদের সাফল্যটা ধরে রাখার চেষ্টা করবেন অন্য কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। সেই চেষ্টা তাঁরা করছেন, যে জন্য নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠানরত প্রথম খেলাতেই পদক এল বাংলাদেশের। পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে বাংলাদেশকে কাল ব্রোঞ্জ জিতিয়েছেন আসিফ হোসেন ও শোভন চৌধুরী।
তবে ব্রোঞ্জ না হয়ে পদকটি রুপাও হতে পারত! মাত্র ৩ পয়েন্টের ব্যবধানে রুপা জিততে পারেননি আসিফ ও শোভন। আসিফ ৫৯৪ স্কোর করেছেন ও শোভন ৫৮৮। দুজনের মোট স্কোর ১১৮২। আর ইংল্যান্ডের দলীয় স্কোর ১১৮৫। দলীয় সর্বোচ্চ ১১৯৩ স্কোর করে স্বাগতিক ভারতকে সোনা জিতিয়েছেন গগন নারাং (৫৯৯) ও পিটি রঘুনাথ (৫৯৪)। কমনওয়েলথ গেমসের আগে এই ওয়ার্ম-আপ টুর্নামেন্টে খেলছেন না ভারতের অলিম্পিক সোনাজয়ী অভিনব বিন্দ্রা, রুপাজয়ী রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর, বিশ্ব রেকর্ডধারী রঞ্জন সোধিদের মতো অনেকেই। তবে গগন নারাং ও রঘুনাথদের টেক্কা দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে অন্যদের।
কদিন আগে এসএ গেমসে আসিফ হোসেন, আবদুল্লাহ হেল বাকি ও শোভন চৌধুরীর বাংলাদেশ ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে হারিয়েছিল ভারতকে। তবে কালকের কেউ ছিলেন না সেই দলে। আজ ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের ব্যক্তিগত ইভেন্টে খেলবেন আসিফ। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ওয়েলস্, জিব্রাল্টার, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের ১৬৩ জন শ্যুটার।

শেষ ম্যাচেও বড় হার গেইলদের

অস্ট্রেলিয়া থেকে বিশাল বিশাল সব পরাজয়ের ডালি সাজিয়ে ফিরছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সিরিজের শেষ ম্যাচেও ক্রিস গেইলের দল হারল ১২৫ রানে। অথচ সিরিজ শুরুর আগে গেইল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সিরিজটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতবে ৪-১ ব্যবধানে! শেষ পর্যন্ত বৃষ্টিতে এক ম্যাচ ভেসে যাওয়া সিরিজটার বাকি চার ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়িয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
নিজের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি প্রমাণ করতে হলে গেইলকেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হতো। সেই গেইল ৫ ইনিংসে করেছেন মোটে ৫৫ রান! কালও আউট হয়েছেন মাত্র ১৪ রান করে। ৩২৫ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরে গেছে প্রথম ১০ ওভারেই, ৩৯ রানের মধ্যে প্রথম চার উইকেট হারিয়ে।
চতুর্থ ওয়ানডেতেও ঠিক ৩২৪ রান তুলেছিল অস্ট্রেলিয়া। পর পর দু ম্যাচে একই স্কোর। পার্থক্য, আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন রিকি পন্টিং, এ ম্যাচে করেছেন ফিফটি। সেঞ্চুরি কেউই পাননি। ফিফটি আছে দুটো। এর মধ্যে জেমস হোপসের ২৬ বলে ১০ চারে তোলা ৫৭ রানের ইনিংসটি তাঁকে এনে দিয়েছে ম্যাচ-সেরার পুরস্কার। আর একটি সেঞ্চুরি, দুটো ফিফটিসহ ২৯৫ রান করে সিরিজ-সেরা হয়েছেন পন্টিং।
চোটের কারণে চন্দরপল-সারওয়ানের মতো ব্যাটসম্যানরা ছিলেন না। বোলিংয়েও ছিলেন না ফিদেল এডওয়ার্ডস, জেরোম টেলর। ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের আফসোস, সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে তারা গুটিয়ে দিয়েছিল ২২৫ রানে। সেই ম্যাচটাই পণ্ড হয়ে গেছে বৃষ্টিতে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: অস্ট্রেলিয়া: ৫০ ওভারে ৩২৪/৫ (ওয়াটসন ৫১, পন্টিং ৬১, ক্লার্ক ৪৭, হোপস ৫৭*; রামপল ২/৬৮, পোলার্ড ২/৫৯)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৩৬.৫ ওভারে ১৯৯ (পোলার্ড ৪৫, স্যামি ৪৭*; বলিঞ্জার ৩/৩৩, হ্যারিস ২/২৬, স্মিথ ২/৭৮)। ফল: অস্ট্রেলিয়া ১২৫ রানে জয়ী। সিরিজ: অস্ট্রেলিয়া (৪-০)। ম্যাচ-সেরা: জেমস হোপস। সিরিজ-সেরা: রিকি পন্টিং।

ক্রিকইনফো অ্যাওয়ার্ডে তিন দেশের সমতা

ক্রিকইনফো অ্যাওয়ার্ড ২০০৯ জিতেছেন ভারত, পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুজন করে ক্রিকেটার। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মুম্বাই টেস্টে ২৯৩ রানের ইনিংসটির জন্য সেরা টেস্ট পারফরম্যান্সের পুরস্কার জিতেছেন বীরেন্দর শেবাগ। ব্যাট হাতে ওয়ানডের সেরা পারফরমার শচীন টেন্ডুলকার, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হায়দরাবাদে ১৭৫ রানের ইনিংসটির জন্য। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ক্রিস গেইলের ৮৮ রানের ইনিংসটি নির্বাচিত হয়েছে টি-টোয়েন্টির সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে।
গেইলের সতীর্থ জেরম টেলর নির্বাচিত হয়েছেন টেস্টের সেরা বোলিং পারফরমার, কিংস্টনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১১ রানে নেওয়া ৫ উইকেটের জন্য। ওয়ানডের সেরা পারফরম্যান্স দুবাইতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শহীদ আফ্রিদির ৩৮ রানে ৬ উইকেট। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডকে ধসিয়ে দেওয়া উমর গুলের ৬ রানে ৫ উইকেট নির্বাচিত হয়েছে টি-টোয়েন্টির সেরা পারফরম্যান্স। স্ট্যাটসগুরু বর্ষসেরা ব্যাটসম্যান নির্বাচিত হয়েছেন গৌতম গম্ভীর, বর্ষসেরা বোলার স্টুয়ার্ট ব্রড। ২০০৯ সালে ক্রিকেটের তিন সংস্করণের সেরা ব্যক্তিগত পারফরমারদের নির্বাচিত করেছেন জিওফ বয়কট, ইয়ান চ্যাপেল, সঞ্জয় মাঞ্জরেকার, হার্শা ভোগলে, ড্যারিল কালিনান, ডেভিড লয়েড, টনি গ্রেগ, পিটার রোবাক, রমিজ রাজা এবং ক্রিকইনফোর সিনিয়র সম্পাদকদের সমন্বয়ে গঠিত জুরি বোর্ড।

ভারতকে ঝামেলায় তো ফেলা গেছে!

এক দক্ষিণ আফ্রিকানের মন্ত্রেই তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাল ভারত! গৌতম গম্ভীর, ভি ভি এস লক্ষ্মণরা তা-ই বলছেন। ভাবছেন তাই তো হওয়ার কথা, দলের কোচ গ্যারি কারস্টেন, বোলিং উপদেষ্টা এরিক সিমন্স, মনোবিদ প্যাডি উপটন—তিনজনই তো দক্ষিণ আফ্রিকান। কিন্তু এই তিনজন নন, গম্ভীররা বলছেন মাইক হর্নের কথা। ভদ্রলোক একজন ‘এক্সপ্লোরার’। নানা জায়গায় উত্সাহব্যঞ্জক বক্তৃতা দেওয়াই তাঁর পেশা। কলকাতা টেস্টের শেষ দিনে হর্নের সঙ্গে ৩০ মিনিটের একটি সেশন কাটিয়েছে ভারতীয় দল। একটি ভারতীয় টিভি চ্যানেলকে হর্ন বলেছেন, তাঁর বক্তব্যে উজ্জীবিত হয়েই নাকি দিনের শেষ পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছে ভারত। ভারতীয় ক্রিকেটাররাও স্বীকার করছেন হর্নের অবদান।
নয় বল বাকি থাকতে জয়, ইডেনে আরও একবার জয়ের নায়ক হরভজন সিং, জিতেই উসাইন বোল্টের গতিতে ছুট, জয়োত্সব—ভারতীয় শিবির এখনো আচ্ছন্ন হয়ে আছে ইডেনের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে। হাশিম আমলা ও মরনে মরকেল যখন একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে, ভারতের ক্রিকেটারদের মনোজগত্টা কেমন ছিল? ‘আমার হূদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল। যদিও জানতাম মাত্র এক বলের ব্যাপার, সঠিক জায়গায় বল ফেললেই হয়ে যাবে’—দ্বিতীয় কথাটা পেশাদার ক্রিকেটারের মতো বললেও প্রথম লাইনেই পরিষ্কার হরভজন সিংয়ের মানসিক অবস্থা কী ছিল।
এই ম্যাচের আগে সমালোচকদের মূল লক্ষ্যবস্তু ভারতকে জিতিয়ে উল্টো তুলোধুনো করেছেন সমালোচকদেরই, ‘সমালোচকদের আমি শ্রদ্ধা করি। তাদের তাই একটু সাহায্য করতে পারি, গত দু বছর ধরে যে বোলারটি র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে আছে, সে কি এতটা খারাপ বা স্টুপিড হতে পারে? আমি মূক নই, ইডিয়টও নই। একজন ইডিয়ট ১৩ বছর ধরে দেশের হয়ে খেলে যেতে পারে না বা ৩৫০ উইকেট পেতে পারে না।’ খারাপ সময়ে সব সময় পাশে দাঁড়ানোর জন্য হরভজন ধন্যবাদ জানিয়েছেন অনিল কুম্বলেকে। এই ম্যাচেই কুম্বলেকে (৪০ উই.) পেছনে ফেলে হয়েছেন ইডেনের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি (৪৬)।
আরও একবার ভারতের মাটিতে এগিয়ে থেকেও সিরিজ জিততে না পেরে দক্ষিণ আফ্রিকা সান্ত্বনা খুঁজছে ভারতকে ঝামেলায় ফেলতে পেরেই। ‘ভারতের মাটিতে সিরিজ ড্র করতে পারাটাও বড় এক কৃতিত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে আর কোনো দল ভারতে এসে তাদের এমন ঝামেলায় ফেলতে পারেনি। সিরিজ জিততে না পেরে হতাশ, তবে ইতিবাচক অনেক কিছুই পেয়েছি’—হারের পর বলেছেন গ্রায়েম স্মিথ। শেষে ভারতকে দিয়েছেন একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি, ‘বছরের শেষের দিকে ভারত দক্ষিণ আফ্রিকায় আসবে, দেখা যাক...।’

২০১১ বিশ্বকাপের ক্ষণ গণনা শুরু

অপেক্ষার বীজ তো বোনা হয়েছে কত আগেই। সবাই অপেক্ষা করে আসছে ২০১১ বিশ্বকাপের। অপেক্ষার সময় কমতে কমতে কাল সেটা নেমে এসেছে এক বছরে। অপেক্ষার এক বছর—দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বকাপের অপেক্ষার উল্টোগনাও আনুষ্ঠানিকভাবে কাল শুরু করে দিয়েছে আইসিসি।
আজ থেকে গুনলে আর মাত্র ৩৬৪ দিন বাকি। ১৯ ফেব্রুয়ারি ক্রিকেট বিশ্ব উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে থাকবে ঢাকার মিরপুরে। সেখানেই ২০১১ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক বাংলাদেশ ও ভারত। ২ এপ্রিল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে শেষ হবে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আয়োজন। আইসিসির প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাতের বিশ্বাস, আয়োজক তিন দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ মিলে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বকাপকে সাফল্যে ভরিয়ে দেবে, ‘আমার বিশ্বাস, সময়ের সবচেয়ে সেরা আয়োজনটাই করবে তারা।’ আর টুর্নামেন্টের পরিচালক রত্নাকর শেঠি জানালেন পুরোদমে এগিয়ে চলছে কাজ, ‘তিনটি আয়োজক দেশই তুমুল বেগে কাজ করে যাচ্ছে।’
দর্শক থেকে শুরু করে সবাই তীব্র আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছেন খেলোয়াড়েরাও। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের অপেক্ষা আরেকটি বিশ্বকাপে চুমো আঁকার, ‘এখনো অনেক কাজ করতে হবে। তবে আমি নিশ্চিত যে উপমহাদেশে আমরা টানা চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের জন্য তৈরি হয়েই যাব।’
বিশ্বকাপ ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছে স্বাগতিক ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, পাকিস্তানও। আর ছোট দলগুলোর স্বপ্ন ভালো কিছু উপহার দেওয়ার। বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান যেমন বলছেন, ‘বাংলাদেশের জন্য ২০১১ বিশ্বকাপটা বড় এক ব্যাপার। ওয়ানডেতে আমাদের কিছু খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে আশা করার মতো কিছু আমি দেখতে পাই।’

মিয়ানমার ‘দুঃখ’ এবং...

চোখের সামনে দিয়ে মিয়ানমারের খেলোয়াড়েরা ফুরফুরে মেজাজে ঘুরছেন, আর সেটি শেল হয়ে বিঁধছে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের বুকে!
দলনেতা বলে আমিনুলের কষ্টটা একটু বেশিই, ‘কাল রাতে (পরশু) ঘুম হয়নি। মনে হয় না, কোনো খেলোয়াড় ঘুমাতে পেরেছে। এত কষ্ট পেয়েছি সবাই। হয়তো সুস্থ আছি, কিন্তু মনের অবস্থা খুবই খারাপ।’
মন সবারই খারাপ ছিল কাল। খেলোয়াড়েরা কেউই তেমন কথা বলতে চাইছিলেন না। তবু আমিনুলকে কিছু বলতেই হলো, ‘নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির কারণে মিয়ানমারের কাছে হেরে গেলাম। ওভাবে দুটি গোল হওয়ার কথা নয়। ওরা হাফ চান্স থেকে গোল করল, আমরা সহজ সুযোগও নষ্ট করলাম। এখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আমাদের জিততেই হবে।’
অন্তর্বর্তীকালীন কোচ সাইফুল বারী আগের রাত থেকেই মিয়ানমার ম্যাচ নিয়ে শুরু করেছেন কাটাছেঁড়া। এএফসি টেকনিক্যাল গ্রুপের কাছ থেকে জেনেছেন, মিয়ানমার ম্যাচে বল পজিশনে বাংলাদেশ এগিয়ে ছিল (৫৪-৪৬)। ম্যাচ ভিডিও নিয়ে কাল সারা দিনই চেষ্টা করছেন ভুলগুলো বের করতে, যাতে শিক্ষা নেওয়া যায়।
‘আমাদের প্রেসিং ফুটবলের বিপরীতে মিয়ানমার শুধু দ্রুত প্রান্ত বদল করে খেলেনি, অনেক পেছন থেকে উঠে এসেছে। ওদের দ্রুত ওঠা খেলোয়াড়দের পাহারায় রাখার নির্দেশ ছিল, কিন্তু সেটা ঠিকমতো না হওয়ায় দ্বিতীয় গোলটা খেয়েছি আমরা। প্রথম গোলটার সময় আমিনুল পোস্ট না ছাড়লে ওয়ালি ফয়সাল হয়তো কাভার দিয়ে ফেলত, ওটা গোল হতো না। তা হোক, সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আমরাই তো ম্যাচটা জিততাম—’ বললেন বাংলাদেশ কোচ।
সুযোগ কাজে লাগাতে যার দিকে বেশি তাকিয়ে থাকে দল, সেই জাহিদ হাসান (এমিলি) টানা আট ম্যাচে গোল পেলেন না! কোচ যতই বলুন, ‘ও গোল না পেলেও গোল করতে সাহায্য করছে এবং আক্রমণ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে’, কিন্তু দলে জাহিদ হাসানের থাকা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে হয়তো শিগগিরই। এভাবে আর কত দিন! বিকল্প না থাকায় এমিলিকে একাদশের বাইরে রাখার চিন্তা করা হচ্ছে না, তবে কথা কিন্তু উঠছে। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনও চিন্তিত, ‘ওর অবস্থা তো ভালো মনে হচ্ছে না। দলেই তো বোধহয় আর টিকতে পারবে না।’
জাহিদ হাসান তা ভালো করেই জানেন। কিন্তু নতুন কিছু বলার নেই। পুরোনো কথাই তাঁর কণ্ঠে, ‘একটা গোল পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ একটা গোল কবে পাবেন—সেটাই প্রশ্ন। আরেক স্ট্রাইকার এনামুল গোল পেলেও নষ্ট করছেন সহজ সব সুযোগ।
কেন এমন হলো? এনামুলের উত্তর, ‘ইনশাআল্লাহ শ্রীলঙ্কা ম্যাচে হবে।’ এমন মিসের পরও এএফসির কর্মকর্তারা নাকি তাঁর সাফ দল থেকে বাদ পড়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ওই যে তেভেজের মতো যে ছেলেটা, সেই তো এই দল থেকে বাদ পড়েছিল!’
দুই হলুদ কার্ডের কারণে আজ স্টপার রেজাউল খেলতে পারছেন না। মামুন মিয়া অথবা নাসিরউদ্দিন আছেন, স্ট্রাইকার নাসিরকে প্রস্তুতি ম্যাচে জর্জেভিচ রক্ষণে খেলিয়েছেন বলে এই দলেও তাঁকে সেভাবেই ব্যবহার করার চিন্তা হচ্ছে।
উইংগার জাহিদকে নিয়ে সালাউদ্দিনের দেখা যাচ্ছে অনেক চিন্তা। নিজেই জানালেন, ‘মিয়ানমার ম্যাচের পর ওর “মগজ ধোলাই” করেছি। একটা গোল করল, আরও গোল পেত। ওর বয়সে আমিও এত ভালো প্লেয়ার ছিলাম না। ও কী করতে পারে ও নিজেও জানে না। আমি ওকে বলেছি, নিজের প্রতি উদাসীনতা কমাও। সব দিক দিয়ে তুমি ঠিক থাকলে কোচের ক্ষমতা কী তোমাকে একাদশের বাইরে রাখে!’
এমনিতে দলের পারফরম্যান্সে খুশি সালাউদ্দিন, ‘দল ভালো খেলছে।’ মিয়ানমার দুঃখটাই একটু কষ্ট দিয়েছে—এই যা!

সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সভা

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বোর্ড অব ট্রাস্টির ৩৩তম সভা গতকাল বৃহস্পতিবার সংস্থার নিজস্ব সংলাপকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান সভাপতিত্ব করেন। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে সভায় উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এপেক্স ট্যানারির চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য নূরুল হক।
এ ছাড়া সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ও সিপিডি বোর্ডের সদস্যসচিব মোস্তাফিজুর রহমান এবং সংলাপ ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ আমন্ত্রিত হিসেবে সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি সময়ে সিপিডির গবেষণা ও প্রকাশনা; জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংলাপ আয়োজন এবং অন্যান্য কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়।
ট্রাস্টি বোর্ড সিপিডির ২০০৯ সালের অর্ধবার্ষিক হিসাব ও চলতি ২০১০ সালের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করে। সেই সঙ্গে ২০১০—২০১৪ সময়ের জন্য তৈরি সিপিডির কার্যক্রমের কৌশল ও পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়।

গ্রামীণফোন ও ম্যারিকোর শেয়ারের তাত্ক্ষণিক লেনদেন হবে

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রামীণফোন লিমিটেড ও ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের শেয়ার স্পট মার্কেটে বা তাত্ক্ষণিকভাবে নগদ টাকায় লেনদেন করতে হবে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) গতকাল বৃহস্পতিবার এ নির্দেশ দিয়েছে। আগামী সোমবার থেকে এ নিয়ম কার্যকর হয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবত্ থাকবে।
এসইসি সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে এ দুটি বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতেই সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছে।
সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘স্পট মার্কেটে নগদ টাকায় শেয়ার লেনদেন করতে হয় বলে লেনদেনের দিনই তা নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এ কারণে পরের দিনই শেয়ার বিক্রিযোগ্য হয়। ফলে শেয়ারের তারল্য বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ সংকটজনিত কারণে কৃত্রিমভাবে দর বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে না।’
সাধারণ বাজারে শেয়ার বেচাকেনা হয় ব্যাংক চেকের মাধ্যমে। চেকের মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তি হতে শ্রেণীভেদে চার (টি+৩) থেকে ১০ (টি+৯) দিন লাগে। এর আগ পর্যন্ত শেয়ার বিক্রিযোগ্য হয় না। ফলে নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের পর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আটকে থাকে। এ কারণে অনেক সময় সরবরাহ-সংকট তৈরি হয়ে শেয়ারের দাম বেড়ে যায়।
বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম বাড়লেও ম্যারিকো বাংলাদেশের শেয়ারের দাম ছিল কমতির দিকে। এ অবস্থায় দাম বৃদ্ধির অজুহাতে কোম্পানিটিকে স্পট মার্কেটে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক।
তাঁরা মনে করেন, গ্রামীণফোনকে এককভাবে স্পট মার্কেটে নিয়ে গেলে সমালোচনা হতে পারে—এ কারণেই হয়তো কৌশল হিসেবে ম্যারিকো বাংলাদেশকেও সঙ্গী করা হয়েছে।
এর আগে এসইসি গ্রামীণফোনের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি কমাতে আর্থিক সমন্বয় সুবিধা বা নিটিং সুবিধা বন্ধ করে। গত বুধবার মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সমিতি বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) কোম্পানিটির শেয়ার কেনায় ঋণসুবিধা বন্ধ করে দেয়

টিফা নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ রূপরেখা চুক্তি (টিফা) স্বাক্ষর বা যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা ফোরাম (ইউবিইটিসিএফ) স্থাপনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকায় শেরাটন হোটেলে ‘ইউএস ট্রেড শো ২০১০’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এ কথা বলেছেন। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অ্যামচেমের সভাপতি আফতাব-উল-ইসলাম।
মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের জন্য জিএসপি-সুবিধা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন আর সাহায্যনির্ভর দেশ নয়, আত্মনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য জিএসপির মতো বাণিজ্যিক সুবিধা প্রয়োজন।’
দীপু মনি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়ার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বলেন, টিফা স্বাক্ষর বা ইউবিইটিসিএফ স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এবারের প্রদর্শনীটি ১৯তম। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ৭২টি প্রতিষ্ঠান ১৩৫ বুথে পণ্য প্রদর্শন করবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং, বিশ্বখ্যাত পেপসিকো ইন্টারন্যাশনাল, কোকাকোলা, জেরক্স, মাস্টার কার্ড ইন্টারন্যাশনাল, ভিসা কার্ড ইন্টারন্যাশনাল, ফোর্ড মোটর কোম্পানি, আইবিএম, আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ড, জর্দানা কসমেটিকস, ওয়াল স্ট্রিট ফিন্যান্স, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানিগ্রাম, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি।
প্রদর্শনীটি কাল শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলবে। আর প্রদর্শনীতে ঢুকতে হলে প্রত্যেক দর্শনার্থীকে ২০ টাকা প্রবেশ ফি দিতে হবে। তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কোনো প্রবেশ ফি লাগবে না।

মোবাইল ফোন সিমের কর হ্রাস করার আভাস মিলল

আগামী বাজেটে মোবাইল ফোনের সিমের ওপর থেকে কর কমানোর ইঙ্গিত দিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আগামী বাজেটের আগে সিম করের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আরও যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফআইসিসিআই) নিয়মিত মধ্যাহ্ন ভোজসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যের পর প্রশ্নোত্তর পর্বে নাসির উদ্দিন আহমেদ গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা বলেন।
এর আগে বাংলালিংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশব্যাপী মোবাইল সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সিম কর কমানোর ব্যাপারে এনবিআরের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বর্তমানে প্রতিটি সিমের বিপরীতে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোকে ৮০০ টাকা কর দিতে হয়।
এফআইসিসিআইয়ের সভাপতি এ এম হামিম রহমতউল্লাহ সভায় সভাপতিত্ব করেন। তিনি মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর ও শুল্ক ব্যবস্থার বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরে সেগুলো দূর করার আহ্বান জানান।
নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এনবিআর এরই মধ্যে ভ্যাট ও শুল্ক আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব কাজে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে তারা ব্যবসায়ীদের পক্ষে সুচিন্তিত মতামত দিয়ে আইন তৈরিতে সহযোগিতা করতে পারে।
নাসির উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, এনবিআরের কাজ শুধু রাজস্ব আহরণ করাই নয়, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও তাঁদের দায়িত্ব। তাই এনবিআরের বিধিবিধানগুলো ব্যবসাবান্ধব করার জন্য কাজ চলছে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান বলেন, রাজস্ব আদায়ে উপ-কর কমিশনারদের (ডিসিটি) কিছু ঐচ্ছিক ক্ষমতা দেওয়া আছে। করদাতাদের হয়রানি কমাতে তাঁদের এ ক্ষমতা আরও কমানো দরকার। এ জন্য এনবিআর ধীরে ধীরে অনলাইনে কর দেওয়ার দিকে যাচ্ছে। এটা করা গেলে হয়রানি কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আগামী বাজেটে যাতে তাঁদের মতামতগুলোর প্রতিফলন ঘটে, সে ব্যাপারে তিনি উদ্যোগ নেবেন। তবে মনে রাখতে হবে, বাজেট একটি রাজনৈতিক বিষয়। এনবিআর কেবল এর কারিগরি বিষয়ে কাজ করে।

স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন ভারাল্লো

শতবর্ষ পেরোলেন এই সেদিন। ঝাপসা হয়ে এসেছে চোখের দৃষ্টি। জড়িয়ে যায় কথা। কিন্তু ফ্রান্সিসকো ভারাল্লোর স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল ১৯৩০ বিশ্বকাপ। এখনো তাঁর স্পষ্ট মনে আছে চামড়ার ভারী একটা বল দিয়ে হয়েছিল খেলা। শরীরে আঘাত নিয়েও খেলতে যেতে হয়েছিল মাঠে, কারণ বদলি খেলোয়াড় নামানোর নিয়ম চালু হয়নি তখনো। আর সবচেয়ে বেশি মনে আছে, ২-১ গোলে এগিয়ে থেকেও প্রথম বিশ্বকাপটা জেতা হয়নি তাঁর আর্জেন্টিনার। উরুগুয়ের কাছে হেরে গিয়েছিল ৪-২ গোলে।
ভারাল্লো, ১৯৩০ বিশ্বকাপে খেলা একমাত্র জীবিত খেলোয়াড়, গত ৫ ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন করলেন তাঁর শততম জন্মবার্ষিকী। ফিফার পক্ষ থেকেও জানানো হলো বিশেষ সম্মাননা। আবেগে ভেসে যাওয়া ভারোল্লো অশ্রু আর কণ্ঠে খানিকটা শ্লেষ মেখে জানালেন, ‘আমার সারা জীবনে কখনোই এভাবে সম্মান পাইনি।’
বুয়েনস এইরেসের লা প্লাটায় আয়োজন করা হয়েছিল সম্মাননা অনুষ্ঠানের। শুরুতেই বড় পর্দায় ভেসে উঠছিল সাদা-কালো স্থির সব ছবি। ১৯৩০ বিশ্বকাপের স্মৃতি আঁকা যেগুলোর পটে। ইউরোপের খেলোয়াড়েরা ১৫ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে পৌঁছেছিলেন মন্টেভিডিওতে। সবার মাথায় হ্যাট, পরনে ব্লেজার। পর্দায় ভেসে উঠল ছবি: ট্যাঙ্গো কিংবদন্তি কার্লোস গারদেল আর্জেন্টিনা দলকে অনুপ্রাণিত করতে ফাইনালের দিন হাজির ড্রেসিংরুমে। ভেসে উঠল ২০ বছর বয়সী ভারাল্লোর ছবিও।
ফুটবল ক্যারিয়ারটাই শুরু করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে। নিজের শহরের ক্লাব জিমনাসিয়া ডি লা প্লাটার হয়ে। তাঁর সময়েই ১৯২৯ সালে ক্লাবটি তাদের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একমাত্র হয়ে থাকা লিগ শিরোপাটি জিতেছিল। পরের বছর ভারাল্লো চলে আসেন বোকা জুনিয়র্সে। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত খেলেছেন এখানে। বোকার হয়ে গোল করেছিলেন ১৮১টি। যে রেকর্ড ২০০৮ সাল পর্যন্ত অটুট ছিল।
১৯৩০ বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ও ছিলেন। ডান পায়ে গোলার মতো শট নিতে পারতেন বলে তাঁকে ডাকা হতো ‘লিটল ক্যানন’ নামে। বিশ্বকাপ চলার সময় চিলির বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সেমিফাইনালটা খেলা হয়নি তাই। অবশ্য ফাইনালে ঠিকই ফিরেছিলেন এই স্ট্রাইকার।
প্রথমার্ধে এগিয়ে থেকেও শিরোপা জিততে না পারার পেছনে আজও ভাগ্যকেই দোষ দেন ভারাল্লো, ‘চোটের কারণে আমরা ১০ জনের দল হয়ে পড়েছিলাম। এর পর আরও একজন মাঠের বাইরে চলে গেল, তার পরও আরও একজন। আমি চোট পেয়েছিলাম বারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে। হাঁটতেই পারছিলাম না। তখন থেকেই ওরা (উরুগুয়ে) ম্যাচে দাপট দেখাতে শুরু করল। অবশ্য আমার সতীর্থদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সেদিন আমরা যথেষ্ট সাহস নিয়ে খেলতে পারিনি। ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর আমি খুব কেঁদেছিলাম।’
ওই বিশ্বকাপে একটি মাত্র গোল করেছিলেন ভারাল্লো। কিন্তু তার পরও ফুটবলে তাঁর অবদানের জন্য ফিফার সর্বোচ্চ সম্মাননা ফিফা অর্ডার অব মেরিট দেওয়া হলো তাঁকে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান হুলিও গ্রন্ডোনা এদিন তাঁকে আকাশি-সাদা জার্সিও উপহার দিয়েছেন। জার্সির নম্বর—১০০!
বিশ্বকাপে আর খেলা হয়নি। শিরোপাও জেতা হয়নি তাই। এক বুক আশা নিয়ে ২০১০-এর দিকে তাকিয়ে আছেন ভারাল্লো। উত্তরসূরিরা যদি জেতে, তাতেই তৃপ্তি তাঁর!

নিজের অবস্থান জানালেন আজীবন বহিষ্কৃত জহিরুল

অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন আজীবন বহিষ্কার হওয়া প্রধান বিচারক জহিরুল হক। এসএ গেমস ম্যারাথনে রাস্তার দূরত্ব মাপের ভুলটাকে তিনি বলেছেন, ফেডারেশনের অসহযোগিতার ফল। দক্ষিণ এশীয় গেমসের শেষ দিনে ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে পরশু নির্বাহী কমিটির সভায় তাঁকে আজীবন বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় ফেডারেশন।
কাল এসএ গেমসের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য সচিব বরাবর লিখিত এক চিঠিতে জহিরুল হক বলেন, এমন সময়ে রাস্তার দূরত্ব মাপার সিদ্ধান্ত দেওয়া যখন তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না। রাস্তা মাপার জন্য গাড়ি, রেসিং সাইকেল ও মিটার হুইলের প্রয়োজন ছিল এবং সেসব সরবরাহ করার কথা অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের। ‘যথাসময়ে সরবরাহ (গাড়ি, রেসিং সাইকেল ও মিটার হুইল) না করায় এই বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে’—চিঠিতে বলেছেন জহিরুল।
জহিরুল হকের পাল্টা অভিযোগ, বিচারকদের তালিকা অনেক লম্বা থাকলেও বাস্তবে ৫-৬ জন ছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি। তবে রাস্তাটি একাধিকবার না মেপে দেখায় নিজের ভুলও স্বীকার করেছেন তিনি। ফেডারেশনের ‘অসহযোগিতার’ ব্যাপারে সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমের বক্তব্য জানার জন্য গতকাল তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

আশা ছাড়েননি শোয়েব আখতার

পাকিস্তান ক্রিকেট দলে ‘ব্রাত্য’ই হয়ে পড়েছেন শোয়েব আখতার। জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ খেলেছেন নয় মাস আগে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে। এর পর বাজে ফর্ম আর ইনজুরি—দুই মিলিয়ে শোয়েব যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্ষয়ে যাওয়া একটি নাম, তখনই পাকিস্তানি এই গতিতারকা বলছেন, আবার জাতীয় দলে ফিরবেন তিনি।
২০০৭ সালের ডিসেম্বরে শেষ টেস্ট খেলা শোয়েব পাকিস্তানের ঘরোয়া ওয়ানডে ক্রিকেটে নেতৃত্ব দিচ্ছেন খান রিসার্চ ল্যাবরেটরি দলের। দুটি ম্যাচে বোলিং করেছেন ১৩ ওভার। আহামরি কিছু করেননি, নিয়েছেন মাত্র ১ উইকেট। তার পরও আত্মবিশ্বাসী শোয়েব বলছেন, ‘আমার লক্ষ্য হলো পাকিস্তান দলে জায়গা ফিরে পাওয়া। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমি তা ফিরে পাব।’
দুবাইয়ে না গেলেও অনেক জটিলতার পর মোহাম্মদ আসিফ দলে ফিরেছেন। ভালো করছেন তরুণ পেসার মোহাম্মদ আমেরও। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকা শোয়েবের দলে ফেরার সম্ভাবনা তাই কমই। ৪৬ টেস্টে ১৭৮ আর ১৪৪ ওয়ানডেতে ২২৩ উইকেটের মালিক তারপরও বলছেন, ‘পাকিস্তান ক্রিকেটে অচিরেই পরিবর্তন আসছে। আবার সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী আমি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, কিংবা ইংল্যান্ড সফরে হবে কি না জানি না, কিন্তু আমার বিশ্বাস সুযোগ আসবে।

ঢাকার প্রথম হার

জয়ের জন্য এক দিনে প্রয়োজন ৩১৮ রান, তবে সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার অবস্থাই ঢাকার ছিল না। হাতে যে উইকেটই ছিল মাত্র ৬টি! তৃতীয় দিনেই ৪ উইকেট হারানো ঢাকা কাল বাকি ৬ উইকেট হারিয়েছে ২৮.১ ওভারেই। ২২৯ রানে অলআউট হয়ে মোহাম্মদ শরীফের দল খুলনার কাছে ম্যাচও হেরেছে ঠিক ২২৯ রানেই। এবারের লিগে ছয় ম্যাচে ঢাকার এটি প্রথম পরাজয়।
অপরাজিত ৩ রান নিয়ে আগের দিন শেষ করা নাদিফ চৌধুরী কাল আউট হয়েছেন আর এক রানও না করে, ৫২ রানে দিন শুরু করা শুভাগত চৌধুরী যোগ করেছেন মাত্র ১৫। শুভাগতর ৬৭ রানের ইনিংসে চার ৮টি, ছয় একটি। ৩ চার, এক ছয়ে ৩০ রান করেছেন অধিনায়ক শরীফ। প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা খুলনার পেসার রবিউল ইসলাম।
এই রাউন্ডের অন্য ম্যাচটিতে ফলাফল হয়ে গিয়েছিল তৃতীয় দিন শেষেই। সে ম্যাচে রাজশাহীকে ২৫ রানে হারিয়েছে চট্টগ্রাম। ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে জাতীয় লিগের পরের রাউন্ডের খেলা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
খুলনা: ২৪৪ ও ৩২৫
ঢাকা: ১১১ ও ২২৯ (শুভাগত ৬৭, আইয়ুব ৫৭, শরীফ ৩০; রবিউল ৫/৬২, ডলার ৩/৫২, তুষার ১/০, তাপস ১/৫০)।

ফুটবল যখন সমুদ্রশহরে

সমুদ্রের ঢেউ যেন হোটেলের দেয়ালে ধাক্কা মারছে অনবরত। আটটি দলই একই হোটেলে থাকায় সবার কাছেই তা এক রকম লাগার কথা। কিন্তু কারও কাছে উপভোগ্য, কারও কাছে একদমই হয়তো ভালো লাগছে না!
ভালো না লাগা দলগুলোর মধ্যে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কাই থাকবে সবার ওপরে। প্রথম ম্যাচে ১০ জন নিয়ে খেলে মিয়ানমারের কাছে ০-৪ গোলে বিধ্বস্ত, তারপর থেকে হোটেল গালাদারির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভুলেও বোধহয় সমুদ্রে চোখ ফেলেননি দলটির খেলোয়াড়েরা।
কাল মাঠে আসার আগে হোটেল লবিতে শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়দের অচেনা লাগছিল। পরিচিত মুখগুলো কোথায় যেন উধাও! এক খেলোয়াড় মেটালেন সেই কৌতূহল, ঢাকায় সাফ ফুটবলে ব্যর্থতার পর তিনজন ছাড়া বাকি সব সিনিয়র খেলোয়াড়কেই দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবার।
নতুন দলটাকে নিয়ে মিয়ানমারের পর তাজিকিস্তানও যেন ছেলেখেলা না করে, শ্রীলঙ্কা ফুটবল ফেডারেশনের সদা ব্যস্ত মিডিয়া কর্তা রুকমল পেরেরইরা তা নিয়ে বেশ রসিকতাই করলেন কাল শ্রীলঙ্কা-তাজিকিস্তান ম্যাচের বিরতির সময়, ‘ভাই (তাজিকিস্তান) গোল বেশি দিয়ো না, নতুন দল আমাদের!’ সেটিই হয়েছে শেষ পর্যন্ত। দুই গোলে পিছিয়ে পড়া ম্যাচ ১-৩ হলো। এই মঞ্চে স্থানীয় দল শ্রীলঙ্কা দল এখন শুধুই দর্শক।
অধিনায়ক চাতুরা মাথুরাঙ্গা দুবাইতে খেলছেন। স্ট্রাইকার কাসুন জয়াসুরিয়া কলম্বোতে থাকলেও দৃশ্যপটে নেই। নতুন দল গঠনে সমর্থন থাকলেও একযোগে এভাবে দল থেকে সব তারকাকে ছাঁটাই করা হবে, ভাবতে পারেননি স্থানীয় অনেকেই।
উত্তর কোরিয়া যেমন ভাবতে পারেনি পরশু নিজেদের প্রথম ম্যাচে তুর্কমেনিস্তানের কাছে ১-১ গোলে আটকে যাবে। তা না ভাবুক,
এবারের বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া দেশটির প্রায় যুবদলের সঙ্গে ড্র করারও তো কম প্রাপ্তি নয় তুর্কমেনিস্তানের কাছে।
কিন্তু প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির এতসব হিসাব-নিকাশ বোঝার উপায় কী? উপায় একটাই, দোভাষীর সাহায্য নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা। কিন্তু দোভাষীকে সময়মতো পাওয়া গেলে তো? তুর্কমেনিস্তানের ফুটবলাররা ইংরেজি জানেন না বলেই মনে হচ্ছে। কিছু জিজ্ঞেস করলে হাঁ করে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে নিজের কাজে চলে যান। ভাবটা এমন—কথাটথা বলার এত দরকার কী!
টুর্নামেন্টের ৮ দলের তিনটিই অংশ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের— তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান। এদের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে কষ্ট করে হিমালয়ের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করা ভালো। নিজেদের ভাষা ছাড়া আর কিছু যেন তারা বোঝেই না!
ভারতীয় দলটির কাছেও এটি ‘কষ্টকর’ এক টুর্নামেন্টই হয়ে উঠেছে। ঢাকায় সাফে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভারতের অনূর্ধ্ব-২৩ দলটি চ্যালেঞ্জ কাপের ধকল সামলাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। পরশু প্রথম ম্যাচে কিরগিজস্তানের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে পেনাল্টি থেকে একটা গোল ফেরত দিতে পারাই ১-২-এ হারা ম্যাচে সান্ত্বনা হয়ে রইল তাদের জন্য।
সাফ ফুটবলে জেতা ভারতীয় দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় আসা দলটার পার্থক্য অনেক। সাফ জয়ের নায়ক গোলরক্ষক অরিন্দমকে পুরস্কৃত করে সিনিয়র দলে নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারিতে দোহায় অনুষ্ঠেয় এশিয়ান কাপের জন্য তিনি এখন দুবাইতে জাতীয় দলের ক্যাম্পে।
সাফ দলের দু-তিনজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এই দলে নেই ইনজুরির কারণে। তা হোক, চ্যালেঞ্জ কাপে ভারত আছে, বোঝাই দায়!
সুগাধাদাসা স্টেডিয়ামের গ্যালারির দিকে তাকালেও বোঝা যায় না, এখানে একটা টুর্নামেন্ট চলছে। কাল টেনেটুনে হয়তো শ-দুয়েক লোক পাওয়া গেল, তাও শ্রীলঙ্কার খেলা ছিল বলে।
প্রচার-প্রচারণা খুবই কম। স্টেডিয়ামের বাইরে কালই শহরের এক জায়গায় টুর্নামেন্টের একটা প্লাকার্ড চোখে পড়ল। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়, শ্রীলঙ্কায় ফুটবল নিয়ে স্থানীয় মিডিয়ারও আগ্রহ কম। অনেক কাগজে টুর্নামেন্টের খবরই থাকে না! যা দেখে ১২ দিনের টুর্নামেন্টের টিভি মিডিয়া বিপণনের দায়িত্বে থাকা এএফসি প্রতিনিধি জাপানি তরুণ কেনতারো হিয়োশি ভীষণই হতাশ, ‘প্রচার, মাঠে দর্শক আনা—এসব নিয়ে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।’
শ্রীলঙ্কার ফুটবলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা মণিলাল ফার্নান্ডো ব্যস্ত ফিফা-এএফসি নিয়ে। সমুদ্রশহরে ক্রিকেট-রাগবির পর তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফুটবল তাই সেই পেছনের সারিতেই পড়ে রইল।