Thursday, September 27, 2018

পাঁচ জেলা থেকেই সেসময় ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল ২৯,৯০০ জন

আইনটি নামেই বদলেছে। কখনো ‘শত্রু সম্পত্তি’। কখনো ‘অনাবাসী সম্পত্তি’। ১৯৬৯ সালে আইনটি করেছিল পাকিস্তান সরকার। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হলে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের। পূর্ব পুরুষের ভিটেমাটিতে নিজেদের শান্তি অন্বেষণের। স্বপ্নভঙ্গ হলো অচিরেই। হিন্দুরা ভেবেছিল স্বাধীন দেশে ধর্মীয় সহনশীলতা থাকবে। রাষ্ট্র ধর্ম নিরপেক্ষ হবে। অতীতের দুঃখভোগ শেষ হবে। সকলেই আইনের চোখে সমান বিবেচিত হবে। হলো উলটো। দেশ স্বাধীন হলে আইনগুলো বদলাতে থাকে। নতুন নতুন আইন প্রণীত হয়। কিন্তু পাকিস্তান আমলে প্রণীত অবৈধ সরকারের করা ‘শত্রু সম্পত্তি’ আইন নামে বদলালেও একই থাকে। হিন্দুদের সম্পত্তি ওয়েস্টেড বা অনাবাসী সম্পত্তি বলে শত্রু সম্পত্তি হিসাবেই ব্যবহার হয়ে আসে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা প্রকাশিত ‘ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ বইতে সময়চক্রে শাসক বদলের সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যেভাবে দেশ ত্যাগ করেছিল তার উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন সূত্রের বরাদ দিয়ে তিনি লিখেছেন, ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু নাগরিকের সংখ্য ছিল ১৮.৫ শতাংশ। ১৯৭৪ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১৩.৫ শতাংশে। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার পর ১৯৯৮ সালে হিন্দু জনগোষ্ঠী দাঁড়ায় ১০.৫ শতাংশে। সেসময় পাঁচ জেলা থেকেই ভারতে আশ্রয় চেয়েছিল আনুমানিক ২৯,৯০০ মানুষ। জেলাওয়ারি এই হিসাবটি দাঁড়ায় কুমিল্লা থেকে ১০,০০০, নাটোরে ১২,০০০, চট্টগ্রামে ৫,০০০, পবনায় ৬০০ ও ঝিনাইদহের ৫০০ মানুষ। এই সময়কালে নয় জেলায় ত্রিশটি মন্দির ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ১৯৭৭ সালে ২৭শে মার্চ সংবাদ প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৭০২,৩৩৫ একর বা ২৮৮২ বর্গকিলোমিটার চাষযোগ্য জমি এবং ২২,৮৩৫টি বাড়ি শত্রু সম্পত্তি (রনরফ) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।
অধ্যাপক আবুল বারাকাত তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, ৯২,০৫০৫০ হিন্দু পরিবার (বাংলাদেশে হিন্দু পরিবারের ৪০%) শত্রু সম্পত্তি আইন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। যার মধ্যে ৭৪৮,৮৫০টি পরিবারের কৃষি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক কাজের কারণে হিন্দু পরিবারের হারিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ ১.৪ মিলিয়ন একর (৬,৬৪০ বর্গকিলোমিটার)। যা হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন মোট ভূমি ৫৩ শতাংশ এবং মোট এলাকার ৫.৩ শতাংশ। আর হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি দখলদারদের তালিকায় রয়েছে সকল রাজনৈতিক দল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৪৪,২%, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ৩১.৭%, জাতীয় পার্টি ৫.৮%, জামায়াতে ইসলামী ৪.৮% এবং অন্যান্য ১৩.৫%।
অগণিত সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায় শুধু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তেমনটি নয় শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সম্পত্তি এবং অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী অমর্ত সেনের পরিবারের সম্পত্তিও দখলের তালিকায় রয়েছে। পাকিস্তান আমলে প্রণীত আইনের আদলে হিন্দু সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি রাখার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই উল্লেখ করে সিনহা বলেন, আইনটি বাতিলের জন্য আন্দোলন করলেও সরকার এ ব্যাপারে মনযোগ দেয়নি।

নুরুন্নাহার এখন কোথায় যাবে? by মরিয়ম চম্পা

এটা শুধু একদল নারীর স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প নয়। বরং তাদের নিয়তি আর জীবন কীভাবে তছনছ হয়ে গেছে এটা সেই গল্প। বর্ণনা করা যায় না, বলা যায় না, লেখা যায় না। অসহ্য আর দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে ফিরছে ওরা। বিমানবন্দরে নেমেই ভেঙে পড়ছে কান্নায়। কেউবা লজ্জায় মুখ ঢাকছে। কেউবা করছে আত্মহত্যার চেষ্টা। সৌদি ফেরত নারীদের জীবনের অবর্ণনীয় পরিস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার মরিয়ম চম্পা
নুরুন্নাহার বেগম।  গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর ইটাখোলায়। ১০ বছর আগে একই গ্রামের ভ্যানচালক সাগরের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তাদের সংসারে ৭ বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। স্বামী মাদকাসক্ত হওয়ায় বিয়ের কয়েক বছর পর ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান তিনি। ভাগ্য পরিবর্তনের আসায় চলতি বছরের ১০ই এপ্রিল স্থানীয় দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হয়নি। তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এসেছেন দেশে। বলেন, দেশে ফিরেও ভালো নেই। সমাজ তাকে ভালো চোখে দেখছে না। বাইরে বের হতে পারি না। মানুষ নানা বাজে কথা বলে। এই অবস্থায় কি করবো বুঝতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি সৌদি আরবে নারীকর্মীদের ভিসা বন্ধের দাবিও জানান। 
নুরুন্নাহার মানবজমিনকে বলেন, ভালো নেই। খুব অসুস্থ। গলা দিয়ে রক্ত পড়ছে। জোরে কথা বলতে পারি না। শরীর ব্যথা। পায়ের ঘা এখনো শুকায় নি। গত ১৩ই সেপ্টেম্বর রাতে ৬৫ জন নারী গৃহকর্মীর সঙ্গে আমিও দেশে ফিরেছি। সৌদি থেকে কেনো ফেরত এসেছেন জানতে চাইলে বলেন, এসব বলে আর কি হবে! আমার যা ক্ষতি হওয়ার, তা তো হয়ে গেছে। ৪ বোন ও ২ ভাইয়ের মধ্যে আমি তৃতীয়। বাবা মোহাম্মদ আলী ফুটপাথে পিঠা বিক্রি করেন। মা আউশি বেগম গার্মেন্টে সুতা কাটার কাজ করেন। আমাদের নিজস্ব ১ ডেসিমেল জায়গাও নেই। বাবা আমাদের নিয়ে সরকারি জমিতে থাকেন। অভাবের সংসারে এলাকার পরিচিত দালালের হাত ধরে বিদেশে পাড়ি জমাই। দালাল মিথ্যা কথা বলে নিয়ে গিয়ে খারাপ মালিকের বাসায় কাজে দেয়। সৌদিতে অন্যান্য গৃহকর্মী নারীদের ভাগ্যে যা ঘটেছে আমার ভাগ্যে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
তিনি বলেন, ১ মাস ১৫ দিন কাজ করার পর মালিক আকামা বানাতে আমাকে মেডিকেলে নিয়ে যায়। মেডিকেল থেকে বাসায় ফিরে মালিক জানায় আমার শরীরে সমস্যা পাওয়া গেছে। কি সমস্যা সেটা বলেনি। বাসার ম্যাডাম ছিল খুবই খারাপ। সে কথায় কথায় খুন্তি গরম করে ছেঁকা দিতো। তেল গরম করে মাথায় ঢেলে দিতো। গরম পানি করে শরীরে ঢেলে দিতো। এভাবে দুই মাস চলে যায়। এরপর মালিকের কাছে বেতনের টাকা চাই। বলি, দেশে আমার একটা ছোট ছেলে আছে। গরিব মা-বাবা আছে। বেতনের টাকা পাঠালে তারা ভালো মন্দ একটু খেতে পারবে। হঠাৎ একদিন মালিক আমাকে মক্তবে (অফিসে) রেখে আসে।
এরপর মক্তবে শুরু হয় অমানবিক ও ভয়ঙ্কর নির্যাতন। সেখানে সৌদির লোকেরা আমাকে প্রায় দুই মাস বাথরুমে আটকে রাখে। পায়ে তারকাঁটা (লোহার পেরেক) ঢুকিয়ে দেয়। মাথায় ও শরীরে বৈদ্যুতিক শক দেয়। কাঁচামরিচ চিবিয়ে খাওয়ায়। বুট জুতা দিয়ে গলা চেপে ধরে। কেনো এভাবে নির্যাতন করে তার কারণ খুঁজে পেতাম না। আমাকে অত্যাচার করতো আর ওরা উল্লাস করতো। শুধু আমাকেই না মক্তবে আরো বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীকে এভাবে মারা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের চোখের সামনে সিলেটের বৃষ্টিকে হত্যা করে ফ্রিজে ভরে রেখেছে। যার খবর আমরা অনেকেই জানি না। শত শত বৃষ্টি এভাবে খুন ও জখমের শিকার হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নুরুন্নাহার বলেন, মক্তবে টানা দুই মাস নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর ওখান থেকে পালিয়ে রিয়াদে বাংলাদেশের দূতাবাসে চলে যাই। সেখানে দুই মাসের বেশি সময় ছিলাম। তিনি সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেন। বলেন, সেখানে তারাও আমাদের ওপর অত্যাচার করে। এক সময় আমাদের মাহারা কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে বসেই আমাদের অত্যাচারের ভিডিও বাংলাদেশে পাঠাই।
নুরুন্নাহার বলেন, দেশে আসার পরে নতুন বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। ঘরের বাইরে বের হতে পারি না। মানুষজন বাজে কথা বলে। স্বামী ভালো হলে আজ আমার এই করুণ পরিণতি হতো না। ছেলেকে মাদরাসায় ভর্তির চেষ্টা করছি। পারবো কি-না জানি না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমাদের দেশ থেকে সৌদিতে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর সকল ভিসা যেনো বন্ধ করে দেয়া হয়। অন্যথায় শত শত নারীকে তাদের সম্ভ্রম, সম্মান এমনকি নিজের প্রিয় জীবনটাকে হারাতে হবে।

এক পুরুষ বেশ্যার জবানবন্দি

একটা হলুদ ট্যাক্সিতে চেপে বড় লোকদের পাড়ায় একটা বাড়ীতে পৌঁছি। বসার ঘরে ঢুকে দেখলাম, একটা বিরাট বড় টিভি, আর ফ্রিজ আছে। ফ্রিজে মদের বোতল ভর্তি। আমার ক্লায়েন্ট ৩২-৩৪ বছর বয়সী এক বিবাহিতা নারী। মদ খেতে খেতেই ওই মহিলা হিন্দি গান চালিয়ে দিয়ে নাচ করতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পরে বসার ঘর থেকে আমাকে বেডরুমে নিয়ে গেলেন। সবকিছু শেষ হওয়া পর্যন্ত বেশ নরম সুরে আদুরে গলায় কথা বলছিলেন। কিন্তু যেই কাজ শেষ হল, তখনই হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এবার ভাগ এখান থেকে।’
নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার আমাদের। জন্মের পরেই বাবার চাকরীটা চলে গিয়েছিল। যত বড় হচ্ছিলাম ওঁর সঙ্গে দূরত্বটা বেড়েই চলেছিল। আমার স্বপ্ন ছিল এমবিএ পড়ব, কিন্তু জোর করে আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হল। চাকরী পেলাম কলকাতায়।
অফিসে সবাই বাংলা বলে। আমি বলতে পারি না। তার ওপরে রয়েছে অফিসের রাজনীতি। আমি সেই চক্রের শিকার হলাম। অভিযোগ করেছিলাম, কোনও লাভ হয় নি।
বাথরুমে গিয়ে কাঁদতাম। আমি যতক্ষণ সীটে থাকতাম না, সেই সময়টাও কেউ নোট করে বসকে বলে দিত যে ‘এ এই সময় থেকে এই সময় অবধি সীটে ছিল না।’
আমার আত্মবিশ্বাসটা ভেঙ্গে যাচ্ছিল। ডিপ্রেশন শুরু হল আমার মধ্যে। ডাক্তারও দেখিয়েছিলাম কিন্তু কোনও লাভ হয় নি। তখনই ঠিক করি যে এমবিএ পড়তেই হবে। তার জন্য চাই টাকা। কীভাবে রোজগার করা যায় বাড়তি টাকা, ইন্টারনেটে সেসবই সার্চ করতাম। পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হবে।
ইন্টারনেটেই প্রথম দেখতে পাই ‘মেল এসকর্ট’ বা জিগোলো হওয়ার রাস্তা। ফিল্মে দেখেছি জিগোলো ব্যাপারটা কী। কয়েকটা ওয়েবসাইট আছে, যেখানে জিগোলো হতে চাইলে নিজের প্রোফাইল দেওয়া যায়। নিজের প্রোফাইল লিখতে বেশ ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলাম। ভেবে পাচ্ছিলাম না, কী লিখব। কিন্তু আমার সামনে তখন দুটো পথ, আত্মহত্যা করা বা জিগোলো হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিলাম।
ইন্টারনেটে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে জায়গায় পৌঁছে গেলাম। বয়সে অনেক বড় এক মহিলা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুমি জানো কোথায় এসেছ? এখানে শরীর কেনাবেচা হয়, বুঝেছ?’
সব জেনেশুনেই গিয়েছিলাম ওখানে। তাই জবাব দিয়েছিলাম, ‘হ্যাঁ। দেখতেই পাচ্ছি। তবে রোজগারের জন্য আমি সব কিছু করতে পারি।’ ওই মহিলা যখন জবাব দিলেন, তখন খেয়াল করলাম ভাল করে, উনি নারী নন, হিজড়া। বলেছিলেন, ‘বেশ ভাব নিচ্ছ তো! এসব এখানে চলবে না, বুঝলে!’
আমি যে পরিবার থেকে এসেছি, সেখানে কেউ কখনও ভাবতেই পারবে না যে আমি এই জায়গায় নিজেকে ঁেবচতে এসেছি। দিনের বেলায় নয়-দশ ঘন্টা একটা আইটি কোম্পানিতে চাকরী করতাম। কিš‘ আমি বাধ্য হয়েছিলাম ওখানে যেতে। ওই হিজড়া বলেছিলেন, ‘যা, অফিসই কর তাহলে। এখানে কী করছিস?’
বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ফেরার উপায় হয়তো ছিল, কিন্তু আমি তো ফিরে যাবার জন্য আসি নি! হঠাৎই ওই হিজড়া বেশ নরম হয়ে আমাকে বলেছিল, ‘তোর ছবি তুলতে হবে। ছবি না পাঠালে কেউ কথাও বলবে না এই মার্কেটে।’
ছবি তোলার কথা শুনে বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। যদি কোনও আত্মীয় স্বজনের হাতে আমার ছবি পড়ে, তাহলে তো সর্বনাশ!
কিš‘ যে কাজে নেমেছি, সেই নিয়ম তো মানতেই হবে। একবার ডানদিকে মুখ করে, একবার বাঁদিকে মুখ করে কয়েকটা ছবি তোলা হল। কয়েকটা ‘বোল্ড‘ ছবিও তোলা হল।
আমার সামনেই ওই ছবিগুলো হোয়াটস্অ্যাপে পাঠানো হল কাউকে। সঙ্গে লেখা হল, ‘নতুন ‘মাল’। রেট বেশী লাগবে। আমার দর ঠিক হল পাঁচ হাজার টাকা।
আমার রেট ঠিক হচ্ছিল। মুহুর্তেই আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা, আই টি কোম্পানীতে চাকরী করা এক যুবক, ওদের কাছে নতুন পরিচিতি পেলাম, ‘মাল’ বলে। ক্লায়েন্টের সঙ্গে সব কিছু করতে হবে - এমনই নির্দেশ। কোনও ফিল্ম নয়, এটা যে আমার নিজের জীবনেই ঘটতে চলেছে, সেটাই ভাবছিলাম তখন।
এই বাধ্য হয়ে এই লাইনে আসার শুরুটা কলকাতা থেকে অনেক দূরে আমার বাড়ী থেকেই শুরু হয়েছিল। যেসব নারীদের সঙ্গে আমাকে কাজ করতে হয়েছে, তাদের মধ্যে যেমন বিবাহিতা মহিলা ছিলেন, তেমনই ডিভোর্সী, বিধবা বা অবিবাহিত মেয়েরাও ছিল।
সবার কাছেই আমি ‘মাল’ হয়ে উঠেছিলাম। মানুষ বলে গণ্যই করত না কেউ। যতক্ষণ তাদের সব ইচ্ছে পূরণ করতে না পারতাম, ততক্ষণ ছাড়া পেতাম না।
তবে সবাই কত ভাল ভাল কথা বলত! কেউ কেউ বলত স্বামীকে ডিভোর্স করে আমার সঙ্গেই নাকি থাকবে। তবে বেডরুমে যতটা সময় কাটাতাম, তারপরেই সব ভাব-ভালবাসা শেষ।
সব প্রেম ভুলে গিয়ে কেউ বলত, ‘চল বেরো এখান থেকে’, কেউ বলত ‘টাকা ওঠা, কেটে পড়।’ গালিগালাজও কম খাই নি। এই সমাজ আমাদের কাছ থেকে মজাও লুটবে, আমার প্রস্টিটিউট বলে গালিও দেবে!
একবার স্বামী-স্ত্রী - দুজনে একসঙ্গে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। লোকটি সোফায় বসে মদ খাচ্ছিল, আর আমি তার স্ত্রীর সঙ্গে বিছানায় ছিলাম। দুজনে যে ভেবে চিন্তেই আমাকে একসঙ্গে ডেকেছে, সেটা বুঝতেই পারছিলাম। হয়তো কোনও গোপন ডিজায়ার থাকবে এদের মনে।
কয়েকদিন পরে, বেশ মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম। জীবন যুদ্ধে লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আমি। মাথাও গরম ছিল। সেদিন নিজের মাকে ফোন করেছিলাম।
জোর গলায় মাকে বলেছিলাম, ‘তুমি জিজ্ঞাসা করতে না মা, এত টাকা কীভাবে পাঠাচ্ছি তোমাদের! শুনে রাখ, ধান্দা করি আমি... ধান্দা!’ মা বলেছিল, ‘তুই চুপ কর। মদ খেয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলিস না।’
মা ফোন রেখে দিয়েছিল। আমি তো সত্যিটাই বলেছিলাম। কিন্তুমা শুনেও বিশ্বাস করল না। আমার পাঠানো টাকাগুলো বাড়ীতে ঠিক সময়ে পৌঁছিয়ে যেত তো!
সেই রাতে আমি ভীষণ কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল, মায়ের কাছেও আমার দাম শুধুমাত্র কত টাকা পাঠাচ্ছি, সেটাই? তারপর আর কোনওদিন মাকে এ বিষয়ে কিছু বলি নি।
তবে আমি পেশায় রয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে আরও টাকা রোজগার করতে হবে যে! মার্কেটে আমার চাহিদাও বাড়ছিল। ঠিক করেছিলাম, চাকরী তো করতেই হবে, তার সঙ্গে যতক্ষণ না এম বি এ পড়ার সুযোগ পাচ্ছি, এই কাজটাই চালিয়ে যাব।
তবে আঘাতও আসত শরীর, মন দুয়ের ওপরেই। সমাজ যে চোখেই দেখুক না কেন, এই আঘাত যে কী, সেটা যারা শরীর বিক্রী করে, একমাত্র তারাই বোঝে।
তবে এখন আর আফসোস করি না ওই পেশায় ছিলাম বলে। আমি এম বি এ পাশ করেছি। আর সেই রেজাল্টের জোরেই কলকাতা থেকে অনেক দূরে একটা নতুন শহরে চাকরী করছি। ভালই আছি। নতুন বন্ধু হয়েছে। আমার একসঙ্গে ঘুরতে যাই, সিনেমা দেখি। ওই সময়টায় যা করতে হয়েছে, তা নিয়ে এখন আমার খারাপ লাগে। তবে আমি মারা যাওয়ার পরেও ওই পেশাটা এরকমই থেকে যাবে হয়তো।
সূত্র : বিবিসি বাংলা

নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ সরকারের বিকল্প নেই -ঐক্যপ্রক্রিয়ার আলোচনা সভা

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আলোচনাসভায় বক্তারা বলেছেন, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকারের কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে  অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনেরও কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশের মানুষের আস্থাও নেই। সংবিধানের অজুহাত দিয়ে বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করলে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তাই প্রয়োজনে নির্বাচনের আগেই সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।
গতকাল বুধবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় পেশাজীবীরা এসব মত প্রকাশ করেন। ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকারের অপরিহার্যতা’- শীর্ষক আলোচনা সভায় রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত সংবিধানে দেশের মালিক জনগণ। কিন্তু অনেকদিন ধরে জনগণ সেই আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে। সেই ক্ষমতা থেকে দেশের মালিককে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ সেই সংবিধান এখনও আছে। অনেক কাটাছাঁটার পরও চার মূলনীতি এখনও বজায় আছে। এর মধ্যে ১ নম্বর হচ্ছে- গণতন্ত্র। প্রত্যেক নাগরিকের চাওয়া হলো গণতন্ত্র। ভোটের দিন সবাই তোয়াজ করে। তারপর দিন আমরা আর মালিক থাকি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগে ৪০ জন অধ্যাপক রয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
এ সময় তিনি আরো বলেন, রাজনীতি থেকে এখন নীতি সরে গেছে। এটা একটা ঘাটতি। এখন দেশে দালানের ঘাটতি নেই। অনেক গাড়ি-ঘোড়া হয়েছে। কীসের ঘাটতি রয়ে গেছে। তা ভাবতে হবে। এখন ভোটটা সঠিক হতে হবে। ৯ মাস যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। এখন আমাদের প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে।
এ সময় তিনি আরো বলেন, এমপিদের মাননীয় বলা হয়। মাননীয় অনেক বড় কথা। কিন্তু মাননীয় এমপিরা যদি অন্ধ- বোবা হয়ে থাকেন। তারা সংসদের জনগণের আশা-প্রয়োজন, ঘাটতি নিয়ে কী বলেন? সংসদে অর্থপূর্ণ কোন আলোচনা হচ্ছে? অংশগ্রহণমূলক প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মেধাবীদের নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিতে হবে।  কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ দেশপ্রেমিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের পরিশ্রমেই দেশের উৎপাদন বেড়েছে। দেশের এক নম্বর রোগ হচ্ছে দলীয়করণ। দলীয় সরকার হয়। কিন্তু দলীয়করণ ও সরকার এক নয়। দলের লোক সব পাচ্ছে। দলের নয় বলে গণ্য হচ্ছে এমন লোক কিছু পাচ্ছে না। জনগণের ঐক্যের মধ্য দিয়ে সব মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু যারা অনৈক্য চায় তারা সংগঠিত। তারা কালো টাকার মালিক। এটা বোঝার সময় এসেছে। আমি কালো টাকার মালিক না। অনেক রাজনীতিবিদ সংকটের কথা বলে। সংকটের কথা বলে তারা সংকট সৃষ্টি করে। তাদের কাছ থেকে মুক্তি হলে সংকট মুক্ত হবো। আমরা অবশ্যই ভোট দাবি করি। 
দেশে মনোনয়নে পায়ের ধুলো নেয়ার রাজনীতি চলছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা স্বাধীন দেশের কালচার হতে পারে না। এটাকে কবর দিতে হবে। টাকা দিয়ে মনোনয়ন হবে না।
অবাধ নির্বাচনের দাবিতে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, আমি লেগে থাকব। আপনারা সবাই পাড়া, মহল্লায় যুক্তি দিয়ে কথা বলুন। লুট হয়ে যওয়ার কোটি কোটি টাকার হিসাব চান। বলা হয় জবাবদিহিতার সরকার। কীসের জবাব দিয়েছে। এখন আমরা উত্তর চাই। শুধু দেশে থাকলেই হয় না। দেশে থেকে আমরা কী করছি। এখন দরকার জনগণের ঐক্য।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি’র সভাপতি আ স ম আবদুর রব ড. কামাল হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এই মানুষটা ব্যক্তি নয়। একটা ইনস্টিটিউশন। তিনি এমন এক ব্যক্তি। যার ডাকে সবাই আসেন। তিনি প্রায় সময় বলেন, দেশের মালিক জনগণ। কিন্তু সেই মালিকানা চুরি হয়ে গেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ নেই। ধনী ও গরিবের মধ্যে ৮০ ভাগ পেশাজীবী। কৃষক-শ্রমিকদের কেউ কী পার্লামেন্টে আছে। বিদ্যমান অঢ়লাবস্থা, স্বৈরাচার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, হাতুড়ি তন্ত্র, হেলমেট বন্ধ করতে হবে। এখন ড. কামালের বিরুদ্ধে গালাগালি শুরু হয়েছে। সরকারি দলের লোক এ কী বলে? একলাখ লোক মারা যাবে। জীবনের নিশ্চয়তা কোথায়। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, একটা বিপদ আসছে। রক্তপাত হবে। বলা হচ্ছে, লাখ লাখ লোক মারা যাবে। দেশে থাকতে পারবে না। এত কিছুর দরকার নেই। শান্তিপূর্ণভাবে ড. কামালের নেতৃত্বে একটা উপায় বের করে নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হবে।
আলোচনা সভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, গত কয়েকদিনের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী উদ্বিগ্ন। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, কিন্তু সবার অধিকার স্বীকার করেন না। দল নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে গেলে কার কী ভূমিকা প্রয়োজন। রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। জামিন দিতে হবে। কোর্টের বিচার কারাগারে, তা ন্যায়বিচার নয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ১০ দিনে ১৪টা আইন প্রণয়ন করলেন। তাহলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য সংবিধান আর একবার সংশোধন করতে অসুবিধা কোথায়। 
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, জনগণের সরকার করতে হবে। দেশের মানুষ আজকে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে যেমনি আমরা অতীতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম। আমার বিশ্বাস জনগণেরই জয় হবে। আওয়ামী লীগ যারা করে তাদের বলবো, জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আপনারাও আসেন। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন।
এফবিসিসিআিই-এর সাবেক সভাপতি বিএনপি’র ভাইস  চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, দেশে গণতন্ত্র না গুণ্ডাতন্ত্র তা বোঝা যায় না। কতিপয় সুবিধাতন্ত্র চলছে। আজকে আমরা গণতন্ত্রের নামে স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিষ্ঠা করেছি। এর থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না- মন্তব্য করে তিনি বলেন, যে সমাজ নিজেদের গণতান্ত্রিক করেছে, তাদেরকে সেটার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম ও অনেক ত্যাগ করতে হয়েছে। দেশের ‘ক্রান্তিকালে’ ‘অভিভাবক’ হিসেবে এগিয়ে আসায় ড. কামাল হোসেনকে অভিনন্দন জানান মিন্টু।
ডাকসু’র সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, জাতীয় ঐক্য হচ্ছে জনগণের মনের, হৃদয়ের প্রতিধ্বনি।  বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিয়ে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। টেকনাফ  থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত জনগণ জাতীয় ঐক্যের পক্ষে। আমি সরকারকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি ঢাকার ১২টি আসনে যদি একটি দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন দেখবেন আপনাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। এটা না হলে আমি আর রাজনীতি করবো না।
ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তাফা আমীনের পরিচালনায় আলোচনা সভায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন, সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারী, অধ্যাপক সি আর আবরার, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, সুপ্রিম কোর্ট গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট, সুব্রত চৌধুরী, জগলুল হায়দার আফ্রিক, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা মোশতাক আহমেদ, হাবিবুর রহমান, এটিএম গোলাম মওলা  চৌধুরী, নুরুল হুদা নিলু চৌধুরী, ব্যবসায়ী নেতা মশিউর রহমান বাবু, এমএ হানিফ শরীফ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের এমএ রকীব, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ন্যাপ-ভাসানীর আজহারুল ইসলাম,  জাগপা’র খোন্দকার লুৎফর রহমান, আসাদুর রহমান খানসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

যুবলীগ নেতার চাঁদা দাবি, আঞ্জুমানের ভবন নির্মাণ বন্ধ by রুদ্র মিজান

আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম। সবার কাছে পরিচিত বেওয়ারিশ লাশ দাফনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এ কাজ ছাড়াও এতিম শিশুদের লালন-পালনসহ নানা দাতব্য কাজ করে আসছে সেবামূলক এ সংস্থাটি। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দান আর অনুদানে চলে এর কার্যক্রম। অথচ মানুষের দানের সেই অর্থ থেকেই চাঁদা দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও তার লোকজন। শুধু তাই নয়, চাঁদা না পাওয়ায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আঞ্জুমানের নির্মাণাধীন নিজস্ব ভবনের নির্মাণকাজ। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও।
ঘটনার অভিযোগ পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত। এতে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযুক্তদের বিষয়ে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা ব্যক্তিগতভাবে আঞ্জুমানে নিয়মিত দান করে থাকেন। ওই প্রতিষ্ঠানে নিজ দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাদের চাঁদা দাবির অভিযোগ পাওয়ায় তিনি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে যুবলীগ নেতাদের ডেকে পাঠান। নির্দেশ দেন তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার। আঞ্জুমান সূত্র জানায়, কাকরাইলে অবস্থিত আঞ্জুমানের যে অস্থায়ী কার্যালয় ছিল ওই জায়গাটি জামিলুর রহমান নামের একজন প্রতিষ্ঠানটিকে দান করেছিলেন। প্রায় ৩০ কাঠা পরিমাণ ওই জমিতে ১৮ তলা নিজম্ব ভবন নির্মাণের প্রকল্প নেয় আঞ্জুমান। জমিদাতার নামে ভবনটির নামকরণ করা হয় জেআর টাওয়ার। ২০১৪ সালে এ ভবনের কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দান ও অনুদানে ভবনের নির্মাণকাজ চলছিল। এর মধ্যেই আঞ্জুমানের কাছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের পক্ষে তার লোকজন মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেন তারা। দফায় দফায় হুমকি আসায় গত এপ্রিলের শেষদিকে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় আঞ্জুমান কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে ওই ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ দেন। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে নিউ ইয়র্কে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ আসলে তিনি যুবলীগ নেতাদের গণভবনে ডেকে ঘটনার বিষয়ে জানতে চান। তিনি নির্দেশ দেন ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে। চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুন-অর-রশীদ মানবজমিনকে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কাছে সম্রাটের চাঁদা দাবির বিষয়ে নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) কাছে অভিযোগ এসেছে।
জাতিসংঘ অধিবেশনে যাওয়ার আগে নেত্রী যুবলীগের চেয়ারম্যানকে ডেকে নেন। তিনি চেয়ারম্যানকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। পাশাপাশি নেত্রীর নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিষয়টি দেখছে বলে জানান তিনি। হারুন-অর-রশীদ বলেন, আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম আর্ত মানবতার সেবায় নিয়োজিত একটি সংস্থা। এই সংস্থার কাছে যেই চাঁদা দাবি করুক, সন্ত্রাস করুক সে রেহাই পাবে না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর বলে জানান তিনি। ঘটনার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বিশেষ সংস্থার পক্ষ থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আমাদের বলা হয়েছে। খুব গুরুত্ব নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
বুধবার দুপুরে কাকরাইলে নির্মাণাধীন ওই ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, ১৫তলাবিশিষ্ট ওই ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ। গেইটে দাঁড়িয়ে আছেন নিরাপত্তাকর্মী। ভেতরে নিচ তলার একটি কক্ষে অফিসের কাজ চলছে। গেইট দিয়ে ঢুকতেই নিরাপত্তাকর্মী পথ আগলে দাঁড়ান। তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। একই অবস্থা অফিস কক্ষে দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যেও। তবে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি তারা। ফকিরাপুলের হাজী সাবেদ আলী লেনে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কেন্দ্রীয় অফিসে গেলে কথা হয় এই সংস্থার সহকারী পরিচালক তানিম হোসেনের সঙ্গে। চাঁদা দাবির ঘটনার সত্যতা জানালেও এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি তিনি। একইভাবে অজানা আতঙ্কে কথা বলতে চাননি সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইলিয়াস আহমেদ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, সম্রাটের লোকজন হুমকি দিয়েছে টাকা দিতে হবে নতুবা জান দিতে হবে। চাঁদা ছাড়া এখানে ভবন নির্মাণ হবে না। চাঁদা দাবি করা হয়েছে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। বাধ্য হয়ে বিষয়টি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবগত করা হয়েছে।
সূত্রমতে, গত ২১শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় গণভবনে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তাকে বিদায় জানাতে যান। তাৎক্ষণিকভাবে সম্রাটের চাঁদা দাবির বিষয়টি আলোচনায় উঠে। এসময় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তখন সম্রাটের পক্ষ নিয়ে আওয়ামী লীগের এক নেতা কথা বললে তাকে থামিয়ে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। এখানে বেওয়ারিশ লাশ দাফন হয়। এখানে আমি ও শেখ রেহানাও সাহায্য করি। এ প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা দাবি করা ও চাঁদা না দেয়ায় ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেয়া- এটা আমি সহ্য করবো না।’
আঞ্জুমান কর্তৃপক্ষ জানায়, বহুতল জে আর টাওয়ারে থাকবে আঞ্জুমানের অফিস, টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, ডিউটি অফিসারের রুম। এ ছাড়াও বিভিন্ন ফ্লোর ভাড়া দেয়া হবে। ভবনে থাকবে চারটি লিফট, দুটি সিঁড়ি, অত্যাধুনিক গ্লাস সজ্জিত কক্ষ। ২ লাখ বর্গফুটের এই ভবনে নির্মাণ ব্যয় হবে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার খান। বিভিন্ন ব্যক্তিদের অনুদানে দ্রুতগতিতেই চলছিলো এই টাওয়ারের নির্মাণকাজ। ১৫ তলার ছাদ ঢালাই দেয়া হয়েছে গত ১৬ই জানুয়ারি। নির্মাণকাজ হয়েছে মার্চ মাস পর্যন্ত। এপ্রিলে হঠাৎ করেই কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। কেন কাজ বন্ধ করা হলো তা জানেন এই সেবামূলক সংস্থার প্রায় সবাই। কিন্তু অজানা আতঙ্কে তারা মুখ খুলতে চান না। কাজ কেন বন্ধ করা হলো- জানতে চাইলে প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন সবাই জানে, আপনি জানেন না?
এক পর্যায়ে চাঁদা দাবির ঘটনা স্বীকার করে বলেন, কার নাম বলবো, আমাদের জীবনের নিরাপত্তা দেবে কে? তবে তিনি জানান, চাঁদা দাবি করা হয়েছে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। বিষয়টি তারাই দেখছেন। এ বিষয়ে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বক্তব্য জানতে বারবার তার ফোনে কল দেয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। মানবজমিনের পক্ষ থেকে বক্তব্য নেয়ার জন্য মোবাইলফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে একদিন অপেক্ষা করলেও তিনি সাড়া দেননি।

দুর্নীতি প্রসঙ্গে এস কে সিনহা

সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বই ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল’, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ নিয়ে এখন তোলপাড় সারা দুনিয়ায়। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির কিছু অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সদ্য প্রকাশিত বইয়ে এসব অভিযোগের জবাব দিয়েছেন এস কে সিনহা। সাবেক এই প্রধান বিচারপতি লিখেছেন-
আশুলিয়া রোডের সঙ্গেই উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে রাজউকের বরাদ্দ করা একটি প্লট ছিল আমার। বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং করপোরেশন থেকে ঋণ নিয়ে সেখানে একটি ছয়তলা ভবন নির্মাণ করেছি। ঋণের টাকা ও আমার হাতের অর্থ মিলিয়ে যখন নির্মাণ খরচ মেটাতে পারছিলাম না, তখন দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আত্মীয়ের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা ধার করি। এক্ষেত্রে শর্ত ছিল বিনিময়ে তাদেরকে দিয়ে দেবো দুটি এপার্টমেন্ট। নির্মাণকাজ চলাকালে আমার স্ত্রী ও আমার জীবননাশের জন্য চারবার টার্গেট করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমি সিলেট সার্কিট হাউজে রক্ষা পাই। আর আমার স্ত্রী বেঁচে যান আমার গ্রামের বাড়িতে। তারপর থেকে আমার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আমার গ্রামের বাড়ি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়। আমাদের অনুপস্থিতিতেও গ্রামের বাড়ি পাহারা দেয়ার জন্য শক্তিশালী একটি পুলিশ ফোর্স স্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হয়। বাড়িতে দু’দফা হামলা হলেও সরকার পুরো নিরাপত্তা রক্ষাকারী ওই টিমকে প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে আমাকে এই বাড়িটি রক্ষা করতে একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। কারণ, বাড়িটি গ্রামের একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে। এর দক্ষিণে আর কোনো বসতি নেই। যেকোনো সময় দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দিতে পারে বাড়িটি। তবে বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মীদের মোতায়েন রাখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে নতুন নির্মাণ করা ভবনটিতে থাকা অনিরাপদ মনে হতে লাগলো আমার কাছে। কারণ, ওই এলাকায় দিনের বেলায়ও সশস্ত্র ডাকাতি হচ্ছিল, যদিও আমার বাড়িটির চারপাশে সীমানা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে এ জন্য যে, ভেবেছিলাম অবসর নেয়ার পর আমি গ্রামের ওই বাড়িতে বসবাস করবো। কিন্তু তা এখন নিরাপদ নয়। আমি যদি গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করি তাহলে কে আমাকে নিরাপত্তা দেবে? কেন আমি ও আমার স্ত্রীর জীবন বারবার হুমকির মুখে পড়ছে? কেন আমাকে বারবার টার্গেট করা হচ্ছিল। সরকারে থাকলেও কোনো মন্ত্রীকে তো এভাবে টার্গেট করা হয় না। যদি কেউ দেশের জন্য জীবনবাজি রেখে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন এবং তার কাজের স্বীকৃতি দেয়া না হয়, তাহলে কেউই দেশের স্বার্থে কাজ করবে না। এটা কোনো রাজনৈতিক দলের ইচ্ছার বিষয় নয়। তবে এটা দেশের স্বার্থে করতে হয়। যেসব নাগরিক দেশের স্বার্থে, দেশের কারণে এবং দেশের নিরাপত্তার জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করছেন, তাদের সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যারা এমন কাজ করেন তারা ক্ষমতায় থাকা কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থের জন্য তা করেন না। তারা এসব করেন রাষ্ট্রের স্বার্থে।
এসকে সিনহা টাকা ধার নেয়া সম্পর্কে লিখেছেন, আমি যেসব নিকটজনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলাম বাড়িটি বানাতে, তাদের বলেছিলাম ওই অর্থের বিনিময়ে তারা এপার্টমেন্ট কিনেছেন। কিনেছেন এই আশা নিয়ে যে, তারা আমাদের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস করবেন। তাই ছয় কোটি টাকায় তা বিক্রিতে সম্মত হয়ে একটি বিক্রির চুক্তিতে রাজি হই এবং বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করতে চাই। কিন্তু ক্রেতা একটি রেজিস্টার্ড চুক্তি করতে চাইছিলেন। এবং চাইছিলেন তাদের অংশ বিক্রির পাওয়ার অব এটর্নি। তিনি ও তার স্বামী বললেন যে, তারা লাভজনক (প্রফিট্যাবল) হিসেবে কিনেছেন এপার্টমেন্ট। কিন্তু যদি চুক্তিটি নিবন্ধিত হয়, তাহলে তাদেরকে রাজউকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হবে ট্রান্সফার ফি ও রেজিস্ট্রেশন খরচ বাবদ। হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের যে বিপুল পরিমাণের ঋণ পেয়েছিলেন ক্রেতা তা আবার তারা পরিশোধ করলেন। ফলে তারা পেলেন নন-এনকামব্রেন্স সার্টিফিকেট। দুটি এপার্টমেন্টের বিপরীতে দুজনে বাকি টাকা দিয়ে দিলেন। ব্যালান্ডস এমাউন্ট চার কোটি টাকা দেয়া হলো পে-অর্ডারের মাধ্যমে। ওই পে-অর্ডার আমার একাউন্টে জমা করেছি। আমার জন্য একটি ডুপ্লেক্স এপার্টমেন্ট, বড় মেয়ের জন্য একটি আরেকটি ডুপ্লেক্স এপার্টমেন্ট কিনলাম। আমার একাউন্ট থেকে চেকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করলাম। বাকি অর্থ সুপ্রিম কোর্ট শাখা সোনালী ব্যাংকে আমার ও ছোট মেয়ের নামে ফিক্সড একাউন্টে রাখা হলো। ছোট মেয়ে ঢাকায় এপার্টমেন্ট কিনতে রাজি ছিল না।
এসকে সিনহা লিখেছেন, আমি এবং আমার স্ত্রী নিয়মিত আয়কর বিভাগে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছি। যে অর্থ পেয়েছি এবং ফিক্স জমাসহ সব পেমেন্ট আমাদের আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করেছি। আমি প্রায় ৩৯ বছর ধরে অফিসিয়াল ওই একাউন্টটি ব্যবহার করছি তখন। সেই একাউন্ট ব্যবহার করে আমি চার কোটি টাকার পে-অর্ডর রিসিভ করবো আমি কি এতই বোকা? একজন প্রধান বিচারপতি হওয়ার কারণে প্রয়োজনের সময় আমি সম্পদ বিক্রি করার অধিকার রাখি না? আমি কি আমার আয়কর রিটার্নে কিছু লুকোচুরি করেছি?
তিনি লিখেছেন, যদি আমি আয়কর রিটার্নে কোনো কিছু এড়িয়ে যাই তাহলে কেন ওইসব প্রচারণাকারীরা আমার আয়কর রিটার্ন নিয়ে কথা বলছেন না? কেন তারা বলছেন না যে, আমার আয়কর রিটার্নে অসামঞ্জস্যতা আছে, ব্যাংকের স্টেটমেন্টে অসামঞ্জস্যতা আছে? এটা না করে তারা একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে গুজব ও প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এটা কতটা নৈতিক? দৃশ্যত এমন প্রচারণা তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা ক্ষমতা ব্যবহার করতে চান, অব্যাহতভাবে ক্ষমতায় থাকতে চান জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া। এক্ষেত্রে তারা একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন রাষ্ট্রীয় মেশিনারি। কারণ, তিনি (প্রধান বিচারপতি) কথা বলেন, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র নিয়ে।
তিনি আরো লিখেছেন, এ পর্যন্ত আমি যেসব মামলায় রায় দিয়েছি তা যখনই তাদের পক্ষে গেছে তখন আমি তাদের কাছে একজন ভালো মানুষ ছিলাম। কিন্তু যখনই আমি সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলেছি, তখনই আমি দুর্নীতিবাজ হয়ে গিয়েছি। তারা কি পানামা পেপারস ইস্যুতে কোনো তদন্তের পদক্ষেপ নিয়েছেন? এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রথম প্রকাশিত হওয়ার ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় পরে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, ইউক্রেনের একজন রাজনীতিক তাদের প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের প্রস্তাব রেখেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে পদত্যাগ করিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট, নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে অস্ট্রিয়া ও অস্ট্রেলিয়ান সরকার। কিন্তু আমরা চোখে পড়ার মতো নীরব রয়েছি। আমাদের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের অজ্ঞাতে ব্রাজিল থেকে পচা গম কিনেছেন খাদ্যমন্ত্রী।
এ বিষয়ে আমরা তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করিনি। গম কেনায় দূতাবাসকে জড়িত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু যখন খবর প্রকাশিত হলো তখন খাদ্যমন্ত্রী দূতাবাসকে জড়িত করতে চাইলেন। কিন্তু দূতাবাস তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দুর্নীতির বিষয়ে আমি অনেক কিছু বলতে চাই না। আমি অভিযোগ জমা হওয়ার একটি বাক্স সংরক্ষণ করি। বাস্তবে তাতে অনেক ডকুমেন্ট পেয়েছি।
আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে, কীভাবে মো. আবদুল ওয়াহ্‌্‌হাব মিয়ার মতো একজন বিচারক, যার ওপর আমি আস্থা রেখেছিলাম, যাকে একটি আলাদা বেঞ্চ দিয়েছি, সব বিচারিক কর্মসূচিতে যেসব কমিটি গঠন করেছি আমি সেখানে তাকে চেয়ারম্যান বানিয়েছি, যা আমার পূর্বসূরিরা তাদের ক্ষমতার মেয়াদে করেননি, সেই ওয়াহ্‌্‌হাব মিয়া কীভাবে আমাকে না জানিয়ে আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে পারেন। তিনি এটা করেছেন দুজন সিনিয়র আইনজীবী ও আনিসুল হকের পরামর্শে। আইনমন্ত্রী, যার আগে থেকেই ওইসব অভিযোগ ওয়েবসাইটে প্রকাশের প্রস্তুতি ছিল, তার হাতের খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্‌্‌হাব মিয়া।
তবে এসব দুর্নীতির অভিযোগ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির কোনো নির্দেশনা, কোনো সার্কুলার ছিল না। কোনো সংবাদ জানানো হয়নি। তখনও আমি প্রধান বিচারপতি। কিন্তু বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্‌্‌হাব মিয়া প্রধান বিচারপতিকে ডিঙ্গিয়ে ওই অভিযোগগুলো আইনমন্ত্রীর খায়েশ অনুযায়ী প্রকাশ করে দিলেন।

যুক্তিতর্ক ছাড়াই খালেদার বিরুদ্ধে রায় চায় দুদক

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আসামিপক্ষ আদালতকে অসহযোগিতা করছেন- এমন অভিযোগ করে যুক্তিতর্কের শুনানি অসমাপ্ত রেখেই রায়ের তারিখ চান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল।
নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারে স্থাপিত বিশেষ আদালতে গতকাল এ মামলার রায়ের তারিখ ধার্যের আবেদন করেন তিনি। আবেদনটি গ্রহণ করে এর ওপর আদেশের জন্য রোববার (৩০শে সেপ্টেম্বর) দিন ধার্য করেছেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান। একই সঙ্গে এই মামলায় খালেদা জিয়া ও মনিরুল ইসলাম খানের জামিন বর্ধিত করেছেন বিচারক। গতকাল আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া ও মাসুদ আহমেদ তালুকদার। মনিরুল ইসলামের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. আখতারুজ্জামান। জিয়া চ্যরিটেবল ট্রাস্ট মামলাটি যুক্তিতর্কের পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের ৩০শে জানুয়ারি প্রসিকিউশনপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। পরে আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্নার পক্ষে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তিতর্কের আংশিক শুনানি করেন আইনজীবী আমিনুল ইসলাম। এরপর আর এ মামলায় যুক্তিতর্কের শুনানি হয়নি।
গত ২০শে সেপ্টেম্বর এক আদেশে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ চলবে বলে আদেশ দেন এই আদালতের বিচারক। পরে ২৪শে সেপ্টেম্বর আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানের পক্ষে তাদের আইনজীবীরা আদালতের প্রতি অনাস্থা জানান। অনাস্থা জানানোর পরই জিয়াউল ইসলাম মুন্নার অন্তর্বর্তীকালীন জামিন বাতিল করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারের ভেতরে প্রশাসনিক ভবনের একটি কক্ষে স্থাপিত বিশেষ আদালতে চলছে। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের রায় হওয়ার পর থেকে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে পরিত্যক্ত এই কারাগারে।
গতকাল সকাল ১১টা ১০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া খালেদা জিয়ার জামিন বর্ধিতকরণ ও তার অনুপস্থিতিতে বিচারের আদেশের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে উল্লেখ করে শুনানি মুলতবির আবেদন করেন। সানাউল্লা মিয়া বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনা করেন তার সিনিয়র আইনজীবীরা। এই মামলায় খালেদা জিয়ার দুই সিনিয়র আইনজীবী আব্দুর রেজাক খানের নামে ১০টি এবং খন্দকার মাহবুব হোসেনের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা দেয়া হয়েছে। রেজাক খান অসুস্থ। এসব কারণে তাঁরা আদালতে আসতে পারছেন না। আমরা শুনানি মুলতবি চাই।’ একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে সরাসরি একটি আদেশ দেয়ার আর্জি জানান সানাউল্লা মিয়া।
শুনানিতে মাসুদ আহমেদ তালুকদার আদালতের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা আপনাকে সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এ মামলায় যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে আপনি সময় দিলে সে বিষয়গুলোর সমাধান আশা করি হয়ে যাবে। খালেদা জিয়াও আমাদের জানিয়েছেন সুস্থ হয়েই তিনি আদালতে আসবেন। এজন্য আমরা যৌক্তিক সময় চাই।’
শুনানিতে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘মামলার এই পরিস্থিতিতিতে যুক্তিতর্কের শুনানির কোনো সুযোগ নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির চ্যাপ্টার ২০ অনুযায়ী এই মামলায় যুক্তিতর্কের শুনানি উপস্থাপনের সুযোগ না থাকলেও আসামিপক্ষকে সে সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁরা যুক্তিতর্কের শুনানি করছেন না।’ তিনি বলেন, ‘মামলার রেকর্ডে যা আছে তা দেখেই তো রায় হবে। আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক প্রদর্শন করলো কি করলো না তাতে কিছু যায় আসে না। এই মামলায় যুক্তিতর্ক নিয়ে যে বিতর্ক হচ্ছে সেটি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’ খালেদা জিয়া ও মনিরুল ইসলাম খানের জামিন বৃদ্ধির বিষয়ে আপত্তি জানান দুদকের আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া এখন কাস্টডিতে আছেন। এখন তার জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি মানেই তাকে আরো সুযোগ দেয়া।’ আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ‘একগুয়েমি’ আচরণ করছেন অভিযোগ করে মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘আসামিপক্ষ আদালতকে সহযোগিতা করছে না। বাইরের পরামর্শে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। মামলার কার্যক্রম বিঘ্নিত ও বাধাগ্রস্ত করছে তারা। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপনি তাদের জামিন বর্ধিত না করে রায়ের তারিখ ধার্য করেন।’
খালেদা জিয়ার আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, ‘ন্যায় বিচার ব্যাহত হোক তা আমরা চাচ্ছি না। আমরা আদালতে সহযোগিতা করছি না বলে দুদকের কৌঁসুলি যে অভিযোগ করেছেন সেটি সঠিক নয়। আমরা প্রতিটি ধার্য তারিখে এই আদালতে আসছি।’ তিনি বলেন, ‘এই মামলায় যুক্তিতর্ক ?উপস্থাপনের সুযোগ আমাদের নেই বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। কিন্তু আপনিই তো যুক্তিতর্ক শুনবেন বলে রুলিং দিয়েছেন। এখন যুক্তিতর্ক ছাড়া রায় ঘোষণার আবেদন গ্রহণ করা হলে বিচার সম্পর্কে জনগণের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাতে পারে। আর তাড়াহুড়া করতে গিয়ে যদি এই মামলার বিচার স্টিগমায় পড়ে যায়, প্রহসনের বিচারে পরিণত হয় তাহলে এর দায় দায়িত্ব কে নেবে?’ মাসুদ আহমেদ তালুকদার অভিযোগ করে বলেন, ‘পিপি আদালতে একপেশে আচরণ করেন। তিনি মামলার চেয়ে রাজনৈতিক কথা বেশি বলেন। অথচ আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে, ওনার নেই। তার পরও আমরা আদালতে রাজনৈতিক কথা বলি না। আমরা বারবার বলছি, কারো কারণে এই বিচার যেন প্রহসনের বিচারে পরিণত না হয়।’
মোশাররফ হোসেন কাজল খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনাদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে, আমার নেই এটা ঠিক। কিন্তু আমার পরিচয় আমি একজন পেশাদার আইনজীবী। আর আপনারা যেভাবে আক্রমণ করে কথা বলেন তাতে আমি কষ্ট পাই।’ শুনানি শেষে প্রসিকিউশনের করা রায়ের তারিখ ধার্যের আবেদনের বিষয়ে ৩০শে সেপ্টেম্বর আদেশ দেয়া হবে বলে জানান বিচারক। পাশাপাশি মামলার দুই আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খান আদালতের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে যে আবেদন করেছিলেন সে বিষয়ে ওই দিন (৩০শে সেপ্টেম্বর) আদেশ দেয়া হবে বলে আইনজীবীদের জানান আদালতের বিচারক।

শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর by মিজানুর রহমান

প্রশংসায় ভাসছে বাংলাদেশ। সব ফোরামেই বাংলাদেশের মহানুভবতার প্রশংসা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশ এ প্রশংসা পাচ্ছে বিশ্বসভায়। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন ১০২ জন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার থেকে তারা বক্তৃতা দিতে শুরু করেছেন। উদ্বোধনী দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভাষণ দিয়েছেন।
তার ভাষণে অবশ্য অভ্যাগতরা খুশি হতে পারেননি। কারণ ট্রাম্প তার গ্রেট অ্যামেরিকার জন্য বহুপক্ষীয় ফোরামের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন। ট্রাম্পের বক্তৃতার পর ফ্রান্স প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রো বক্তৃতা করেছেন। তিনি প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জানিয়েছেন, যে দেশ এ চুক্তিতে নেই, তার সঙ্গে অন্যান্য বিশেষত অর্থনৈতিক চুক্তির বিষয়ে ভাববে ফ্রান্স। সংবাদ সম্মেলনেও তিনি তার অবস্থানের ওপর অনড় থাকেন। ইরানী প্রেসিডেন্ট রুহানী এবং তার্কিশ প্রেসিডেন্ট এরদোগানও এ দিন বক্তৃতা করেছেন। রুহানীর বক্তৃতার বড় অংশজুড়ে ছিল নিউক্লিয়ারের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার প্রশ্নে বৈশ্বিক চাপ প্রশ্নে তেহরানের অবস্থান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশন বক্তৃতা করছেন আগামী ২৭শে সেপ্টেম্বর। ওই দিনেই মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে তার বৈঠক হবে। গতকাল তিনি দিনভর ব্যস্ত কর্মসূচিতে কাটিয়েছেন। ওইদিন বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিষয়ক এক সভায় বক্তৃতা করেছেন। যোগ দিয়েছিলেন অর্থনৈতিক ফোরামের সবচেয়ে বড় ফোরামেও। সেখানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ যা করেছে তাকে মিরাকল বলা হচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখ থেকে এ শব্দটি প্রথম শোনা যায় চলতি বছরের সূচনায়। এখন অন্যরাও তা স্বীকার করছেন। দুর্নীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাংলাদেশের।
এ নিয়ে উদ্বেগও আছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকছে? না কী নির্বাচনকে ঘিরে এটি অস্থিতিশীলতা এবং অনিশ্চয়তার দিকে যাবে? এমনটি হলে অর্থনৈতিক অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে তা নিয়ে বিশ্বসভার প্রতিনিধিরা সতর্ক পর্যবেক্ষণ দিচ্ছেন বিভিন্নভাবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ এর সংস্কারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাহিনীতে সেনা ও পুলিশ সদস্য পাঠানোর দিক থেকে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সংস্কারের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা একটি বৈশ্বিক জনকল্যাণমুখী সেবা। এই বাহিনীর মর্যাদা ধরে রাখতে আমাদের সবাইকে অবশ্যই ইতিবাচক চিন্তাধারা নিয়ে কাজ করে যেতে হবে।
এটা অনেকের জীবনের আশার আলো জ্বালিয়েছে। আমাদের অবশ্যই এই আশার আলোকে সম্মান জানাতে হবে।’ বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘এই বাহিনীতে সেনা ও পুলিশ সদস্য পাঠানোর দিক থেকে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশ হিসেবে আমরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।’
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে অ্যাকশন ফর পিসকিপিং (এফোরপি) এর ওপর একটি উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথা বলেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে অ্যান্তোনিও গুতেরেসও বক্তব্য রাখেন। শেখ হাসিনা বলেন, শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের এখন নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে মোতায়েন করা হচ্ছে। ওই সব স্থানে শান্তি বজায় রাখার মতো পরিস্থিতি নেই। রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে তারা ক্রমবর্ধমান হুমকির শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের মিশনগুলো প্রায়ই বিভিন্ন মান ও ধরনের বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে থাকে। আর এটা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানগুলোকে আরো জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলছে। তিনি আরো বলেন, ‘এজন্য শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া উচিত। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের মতো ক্ষমতা ও সরঞ্জামাদি তাদের দেয়া উচিত।’
শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, কোনো রাষ্ট্রের সদস্যদের মোতায়েনের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিশ্রুতি এবং সেই অনুযায়ী কতটা নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে তা বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, ‘তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে হবে। আমরা আশা করছি এ ফোর পি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীকে তাদের ‘লক্ষ্য পূরণে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে’ সহায়তা করবে।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দি ডিক্লিয়ারেশন অব শেয়ার্ড পিসকিপিং কমিটমেন্টস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল বয়ে এনেছে। এতে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং যা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে রাজনৈতিক অগ্রগণ্যতাকে পুনঃনিশ্চিত করেছে। জীবন রক্ষার জন্যই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বিনিয়োগ একথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যয় ও শান্তিরক্ষী কমালে মাঠ পর্যায়ে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। শেখ হাসিনা বলেন, এতে ফ্রন্টলাইনে যারা আছেন তাদের কথা অবশ্যই শুনতে হবে।
শান্তিরক্ষা মিশনে যে সব দেশের সেনা ও পুলিশ অবদান রাখছে নিরাপত্তা পরিষদ এবং জাতিসংঘ সচিবালয়কে তাদের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘোষণায় অর্থবহ অগ্রগতির পাশাপাশি অঙ্গীকারের মূল্যায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ এতে শরিক হতে প্রস্তুত রয়েছে। শান্তিরক্ষাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শান্তিরক্ষায় জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিতে আমরা কখনো পিছপা হইনি। চলতি বছর আমরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ৩০ বছরের অবদান উদযাপন করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশি অনেক শান্তিরক্ষী দায়িত্বরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন। এখনো এই দায়িত্ব পালনে আমরা কুণ্ঠিত নই। এখন আমরা সম্ভাব্য সবচেয়ে কম সময়ে আমাদের শান্তিরক্ষীদের মোতায়েন করতে পারি। তিনি বলেন, আমরা তাদের ভালো এবং অগ্রসর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে। তারা জনগণের হৃদয় ও মন জয়ের লক্ষ্যে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিজেদের পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে আমরা নিজস্ব সম্পদে মালীতে আমাদের শান্তিরক্ষী বাহিনীকে সুরক্ষিত যানবাহন সরবরাহ করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই নীতি অন্যান্য মিশনেও অনুসরণ করবো। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ব্যক্তিগত আগ্রহে নারী শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন। ‘আমরা প্রথমে আমাদের নারী হেলিকপ্টার পাইলটদের কঙ্গোতে মোতায়েন করেছি, এটি আমাদের জন্য একটি মাইলফলক। তিনি বলেন, আমরা সদর দপ্তর এবং মাঠ পর্যায়ে আরো সিনিয়র নেতৃত্ব নিয়োগ দিতে পারলে বাংলাদেশ খুশি হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যৌন অপরাধ ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ অনুসরণ করছে। ‘আমি মহাসচিবের সার্কেল অব লিডারশিপে কাজ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ রয়েছি।’
প্রযুক্তি হস্তান্তরকে সহজ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান: ওদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্প খরচে প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলোর কাছে স্বল্প ব্যয়ে প্রযুক্তি স্থানান্তরে বিশ্ব সমপ্রদায়ের একটি দায়িত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার বিকেলে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের প্লেনারি হলে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক এক প্লেনারি সেশনে প্রদত্ত ভাষণে একথা বলেন। বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতো, হল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট, জনসন এন্ড জনসন এর সিইও এবং মজিলা ফায়ার ফক্সের সিইও এই প্লেনারি সেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
বক্তারা সেশনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আবহের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বিভিন্ন দেশের কর্মকাণ্ডের প্রতি বিশেষ করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রতি দৃষ্ট্পিাত করেন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে সে সম্পর্কে তাদের চিন্তা-ভাবনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী এর উত্তরে বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশ। আমাদের সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা এবং সুশিক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রযুক্তি সমৃদ্ধ করা, যাতে করে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা বিধান করতে পারে।’ ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকারের লক্ষ্যই হচ্ছে বাংলাদেশকে সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাতে করে সকলে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুফল পেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য স্বল্প ব্যয়ে এবং সহজে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা বৃহৎ প্রযুক্তি উৎপাদনকারী দেশ নই, তাই আমরা যাতে করে সহজে এবং স্বল্পমূল্যে প্রযুক্তি পেতে পারি সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে এর জনশক্তিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতায় যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। তাই তার সরকার বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যাতে করে শিল্প বিপ্লবের আমলে তাদের কর্মচ্যুত হবার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে না হয়। প্রধানমন্ত্রী এ সময় শিক্ষার প্রসারে তার সরকারের পদক্ষেপ সমূহ তুলে ধরেন, যারমধ্যে রয়েছে-বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, নানা বৃত্তি ও উপবৃত্তি প্রদান এবং নারী শিক্ষাকে উৎসাহ প্রদান।
‘এখন প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে বৃত্তি-উপবৃত্তি পাচ্ছে’ বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার শুরুতেই তাকে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট প্রায় ১০ লাখের অধিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় প্রদানের জন্য অভিনন্দিত করেন। এ সময় উপস্থিত সকল অংশগ্রহণকারীগণ জোরে করতালির মাধ্যমে এই অভিনন্দনকে স্বাগত জানান। উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিওইএফ) প্রেসিডেন্ট বোর্গে ব্রেনডি আগামী জানুয়ারি মাসে সুইজারল্যান্ডের দ্যাভোসে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় যোগদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালীন হোটেল গ্রান্ড হায়াতে সৌজন্য সাক্ষাতে ব্রেনডি এই আমন্ত্রণ জানান।

ট্রাম্পের সঙ্গে কখনই বৈঠকে বসতে চাই নি: সাক্ষাৎকারে রুহানি

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, তিনি কখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চান নি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসা ‘সঠিক’ হবে না।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম বার্ষিক অধিবেশনের অবকাশে মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন-‘র সাংবাদিক ক্রিশ্চিয়ানা আমানপুরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট রুহানি এসব কথা বলেছেন। এর আগে গতকাল (মঙ্গলবার) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটার বার্তায় দাবি করেন, “ইরানি প্রেসিডেন্ট অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি তার সঙ্গে বৈঠক করতে চান নি। তবে তিনি ভবিষ্যতে কোনো একদিন বৈঠকে বসবেন।”
ট্রাম্পের এ দাবিকে জোরালোভাবে নাকচ করেছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তাকে কোনো বৈঠকের জন্য অনুরোধ করে নি।” ড. রুহানি বলেন, “না চলতি বছর, না গত বছর- আমরা কখনো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করার অনুরোধ করি নি।”
প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, “বৈঠক করার জন্য আমরা মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আটটি চিঠি পেয়েছি কিন্তু আমরা তখন কিংবা এখন- কোনো সময়ই দুপক্ষের মধ্যে বৈঠক করাটা সঠিক বলে মনে করি নি।” 
টুইটারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ড. রুহানিকে ‘সুন্দর মানুষ’ বলে যে মন্তব্য করেছেন সে সম্পর্কে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট শব্দ নিয়ে খেলেন কিন্তু সেগুলো আমাদের সমস্যা সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখবে না।”

আধার কার্ড নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ধাক্কা খেল মোদি সরকার, খুশি মমতা

ভারতে ‘আধার’ কার্ড নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। ‘প্যান’ কার্ডে ‘আধার’ সংযোগ করা বাধ্যতামূলক থাকলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা পরে ব্যাংকে আধার সংযোগের প্রয়োজন নেই বলে বুধবার জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বিচারপতির সমন্বিত বেঞ্চ।
এর পাশাপাশি শীর্ষ আদালত আধার আইনের ৫৭ নম্বর ধারা খারিজ করে দেয়ায় কোনো বেসরকারি সংস্থা আধারের তথ্য চাইতে পারবে না। এছাড়া স্কুলে ভর্তি হওয়া, ইউজিসি, নিট বা সিবিএসই’র মতো পরীক্ষাতেও আধার বাধ্যতামূলক নয় বলে শীর্ষ আদালত রায় দিয়েছে।
এরআগে কেন্দ্রীয় সরকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, মোবাইলের সিমকার্ড নেয়া, পাসপোর্ট, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো ক্ষেত্রে আধার সংযোগ বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা করেছিল। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন পরিষেবা পাওয়ার জন্যও আধার কার্ড অবশ্যই প্রয়োজন বলে জানিয়েছিল। আজ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কার্যত সরকারি ওই নির্দেশ আর কার্যকর থাকছে না বলে আইনজীবীরা বলছেন। এরফলে কেন্দ্রীয় সরকার বড় ধাক্কা খেলো বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আধার সংযোগ নিয়ে সরকারি নির্দেশের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সেসময় বিরোধিতা করেছিলেন। আধারের মাধ্যমে সরকার অহেতুক নাগরিকদের ওপর নজরদারি করতে চাচ্ছে এবং এরফলে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনসহ ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠায় ২৭টি মামলা দায়ের হয় সুপ্রিম কোর্টে।
সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘মোবাইল ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার যোগ করার নির্দেশের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন তৃণমূল এমপি মহুয়া মৈত্র। আমরা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানাচ্ছি। এই রায়ে সাধারণ মানুষের জয় হয়েছে।’
তৃণমূলের সর্বভারতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও. ব্রায়েন ওই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রথম থেকে মোবাইল ফোন, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আধার সংযোগের বিরোধিতা করেছিলেন।
আজ ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীও সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ওই রায়কে 'ঐতিহাসিক' বলে অভিহিত করে একে স্বাগত জানিয়েছেন।

জাহাজ-বিধ্বংসী সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা করল রাশিয়া

রাশিয়া প্রথমবারের মতো পি-৮০০ অনিক্স সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। সিরিয়ার আকাশে আইএল-২০ বিমান ধ্বংস হওয়ার পর ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে যখন টানাপড়েন চলছে তখন রাশিয়া এ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালালো।
রুশ নৌবাহিনীর সরবরাহ করা এক ভিডিওতে দেখা যায়- আর্কটিকের কোটেনলি দ্বীপের একটি উপকূল থেকে ভ্রাম্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমে পি-৮০০ অনিক্স সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর সেটি ল্যাপটেভ সাগরে থাকা কৃত্রিম শত্রুর কয়েকটি জাহাজের দিকে ছুঁটে যায়।  
রুশ নৌবাহিনী জানিয়েছে, এ ক্ষেপণাস্ত্র ঘণ্টায় ৩,১৮০ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি গতিতে ছুঁটতে পারে এবং ৩০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। পি-৮০০ অনিক্স সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রটি মধ্যম মানের উচ্চতা কিংবা খুব নিচু দিয়ে উড়তে পারে। যদিও এ ক্ষেপণাস্ত্র জাহাজ ধ্বংসের জন্য তৈরি করা হয়েছে তবে শত্রুর স্থল অবস্থানেও হামলা করতে সক্ষম।

আইনগত সহায়তা ব্যতিরেকে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ অর্জন সম্ভব নয়: প্রধান বিচারপতি

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে আইনগত সহায়তা  ব্যতিরেকে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ অর্জন কখনোই সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। একই সঙ্গে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান, প্রচার ও জনমনে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিগ্যাল এইড বিষয়ক আইন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের মূলভবনের কনফারেন্স রুমে ‘লিগ্যাল এইড ও আইন  সাংবাদিকতা’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধান বিচারপতি। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা সুপ্রিম কোর্ট কমিটি ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন  করে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকার একটি সার্বজনীন মৌলিক মানবাধিকার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সংরক্ষণে সরকারি আইনগত সহায়তা প্রদানের ভূমিকা  অপরিসীম।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে আইনগত  সহায়তা ব্যাতিরেকে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ অর্জন কখনোই সম্ভব নয়।’ সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম ইতিমধ্যে সর্বমহলে অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছে এবং এর সুফল ক্রমান্বয়ে দেশের সর্বত্র বিস্মৃত হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘মানুষের তথ্য জানার এবং গণমাধ্যমের তথ্য  জানানোর গভীর দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সামাজিক অঙ্গীকার নিয়ে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে। আইন, আদালত, আইনশৃঙ্খলা মানবাধিকার ও আইনি সেবা সংক্রান্ত তথ্য আইন সাংবাদিকতার মাধ্যমে উঠে আসে। তাই সরকারি অর্থায়নে লিগ্যাল এইড সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি  করতে তাদের ভূমিকা অপরিসীম।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের সবার নিজ নিজ অবস্থান হতে সহযোগিতা এবং দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমে মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত হতে পারে।’
এজন্য  অসহায় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিক সমাজসহ সবাইকে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান প্রধান বিচারপতি। লিগ্যাল এইড সংক্রান্ত আইন, বিধি ও সার্কুলার যথাযথভাবে অনুসরণ করার তাগিদ দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘লিগ্যাল এইড বিষয়ক আইনকে প্রতিটি ল স্কুলে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যেন শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে পারে।’ একই সঙ্গে সরকারি খরচে পরিচালিত মামলাগুলো অত্যন্ত যত্ন ও দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রধান বিচারপতি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শুধু জেল আপিল শুনানির জন্য পৃথক ডিভিশন বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। ফলে এখন জেল আপিল মামলার শুনানি অন্তে দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ায় মামলার নিষ্পত্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ পরিত্রাণ পাবে।
সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্য সচিব ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল  টাইটাস হিল্লোল রেমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয়  আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার সুপ্রিম কোর্ট কমিটির চেয়ারম্যান ও হাইকোর্ট  বিভাগের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহীম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার  জেনারেল ড. জাকির হোসেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকট জয়নুল আবেদীন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম প্রমুখ।

যৌনাঙ্গে মরিচের গুড়া ঢুকিয়ে নারকীয় অত্যাচার

শ্বশুরকে গাছে বেঁধে, পুত্রবধূকে নগ্ন করে চলে মারধর। এতই ক্ষ্যান্ত হয়নি নরপিশাচরা। শেষে যৌনাঙ্গে মরিচের গুড়া ঢুকিয়ে দিয়ে চালায় নারকীয় অত্যাচার। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে মহিলা। এমন অবস্থায় মহিলাকে সাহায্য না করে, মোবাইলে তুলে ধারণ করতে থাকে ঘটনাটি। সঙ্গে ছড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এই নির্মম অমানবিক ঘটনাটি ঘটে ভারতের আসামের করিমগঞ্জে। ১০ই সেপ্টেম্বর ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হওয়ায় পুলিশ প্রশাসনের নজরে আসে। নির্যাতিতা অভিযোগ দায়েরকৃত অভিযোগে ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নির্যাতিতা মহিলা অভিযোগপত্রে লিখেছেন, ‘১০ই সেপ্টেম্বর সকালে আচমকাই দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে পড়ে ৬-৭ জন যুবক। দাবি করে, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় পাওয়া ৮৫ হাজার টাকা তাঁদের দিয়ে দিতে হবে। আমি অস্বীকার করতেই বেআইনি মদ বিক্রির অভিযোগ তুলে মারধর শুরু করে। তার মধ্যেই বাড়িতে জড়ো হন গ্রামবাসীরাও। আমার শ্বশুরকে গাছে বেঁধে ফেলে ওরা। তাঁর সামনেই আমাকে নগ্ন করে চলে মারধর। শেষে আমার যৌনাঙ্গে মরিচের গুঁড়া ঢুকিয়ে দেয়। টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ওই অবস্থাতেই আমাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় সবাই।’
সূত্র- আনন্দবাজার