Thursday, July 30, 2015

স্বৈরাচার বাংলাদেশে টিকতে পারেনি : ড. কামাল

বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল ঈশা খাঁতে রাজনীতিবিদ ও
বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল
হোসেনের চা-চক্র আয়োজন করে : এ ওয়ান ফটো -নয়া দিগন্ত
কোনো স্বৈরাচার বাংলাদেশে টিকতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। রুগ্‌ণ রাজনীতি মানুষকে অমানুষ বানাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাকরাইলের একটি হোটেলে বিভিন্ন অঙ্গনের ব্যক্তিদের চা-চক্রে ডাক দেন সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল। সেখানে এসব কথা বলেন তিনি। ওই চা-চক্রে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আন্দোলন জাতীয় কমিটি’ নামে একটি কমিটির প্রস্তাবও দেওয়া হয়। ড. কামাল হোসেন তাঁর বক্তব্য বলেন, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন-আপনি এসে দেখে যান বাঙালি এখন মানুষ হয়েছে। সেই মানুষকে এখন অমানুষ বানাচ্ছে রুগ্‌ণ রাজনীতি। তিনি বলেন, কোনো স্বৈরাচার বাংলাদেশে টিকতে পারেনি। এটা আমাদের বেঁচে থাকার মধ্যেই হবে। বিগত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ২৪টি পেশাজীবী সংগঠন অংশ নিয়েছিল। সুতরাং এই অভিজ্ঞতা আমাদের মধ্যে আছে।
চা-চক্রে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ করে কামাল হোসেন বলেন, ‘কম্পিউটারের মতো হিসেব করে রাজনীতি করা উচিত না। যারা লাভের জন্য রাজনীতি করে তাঁরা ধ্বংস হয়। আমরা যেন বেশি বুদ্ধিমান না হওয়ার চেষ্টা করি।’
ড. কামাল বলেন, এক ব্যক্তি, এক ব্যক্তির শাসন সারা জীবন প্রত্যাখ্যান করেছি। এটা কোনো দিন মানেনি, মানতে পারি না। আজকে ভ্যাট দিয়ে শিক্ষা নিতে হবে। যা আমাদের স্বপ্নের মধ্যেও ছিল না।
জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জিএম কাদের বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি অনুপস্থিত। আস্থাহীনতার কারণে জনগণ ও রাজনীতি আজ বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশের সমাজ আজ পশ্চাতমুখি। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিও পশ্চাতমুখি। দেশের মালিক জনগণ অথচ সেই সম্পদ তাঁদের জন্য ব্যবহার হচ্ছে না। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে প্ল্যাটফর্ম শুরু হয়েছে, সেটা কন্টিনিউ করতে হবে। ইনশা আল্লাহ পাশে থাকব।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘মিলিটারি এবং সিভিল সোসাইটির দ্বারা রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান হবে না। রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি থাকতে হবে। তিনি বলেন, বলা হচ্ছে-বাংলাদেশ নাকি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। আয় যদি ভালো হবে তাহলে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের গণকবর পাওয়া যায় না। এখন চর দখলের মতো ক্ষমতা দখল করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে একটি সামগ্রিক জাগরণ দরকার। মুক্তিযুদ্ধের মতো আরেকটি চেতনা প্রয়োজন।
আলোচনা সভায় বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর আবদুল মান্নান বলেন, ‘অনেক রাজনীতিক মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনীতিকদের করার কিছু নেই। কিন্তু আমি মনে করি আছে। আজকের মতো আলোচনা সব বিভাগ ও জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।’
শহীদ ডা. শামসুল আলম মিলনের মা সেলিনা আখতার বলেন, ‘গণতন্ত্র যে অবস্থায় এসেছে তা দেখে আমরা আশাহত হই, হতাশায় ভুগি। কারণ গণতন্ত্র না থাকলে সুশাসন থাকবে না।
চা-চক্রে প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক উপস্থিত সবার মাঝে একটি কাগজে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আন্দোলন জাতীয় কমিটি’ নামে একটি কাগজ সরবরাহ করেন। সেখানে তিনি ওই কমিটির ২১টি দফার উল্লেখ করেছেন। ওই কাগজে প্রচারপত্র, আলোচনাসভা, সমাবেশ, অর্ধদিবস হরতালের মতো কর্মসূচির রূপরেখা দেন। পরে তাঁর বক্তৃতায় এ বিষয়ে সবার মতামত চান। গত ৯ জুলাই ফরওয়ার্ড পার্টির কার্যালয়ে এ প্রস্তাবগুলোর খসড়া হয় বলে কাগজটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চা-চক্রে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, আইটি বিশেষজ্ঞ মুহিবুল্লাহ চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, আইনজীবী শাহ খসরুজ্জামান, জাহিদুল কবির, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি লিটন নন্দী প্রমুখ। প্রত্যেক বক্তাই তাঁদের বক্তব্যে রাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য একটি আলাদা প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

জন্মদিনেই ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি কার্যকর

মুম্বাই বোমা হামলায় অভিযুক্ত ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি কার্যকর করেছে ভারত। নাগপুর সেন্ট্রাল জেলে তার এই দণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৯৩ সালের ওই ধারাবাহিক হামলায় ২৫৭ জন নিহত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি বুধবার রাতে তার প্রাণভিক্ষার দ্বিতীয় আবেদনও খারিজ করে দেয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালেই ইয়াকুব মেমনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগে ভারতে প্রায় সাড়ে বাইশ বছর আগেকার ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত ইয়াকুব মেমনের প্রাণভিক্ষার শেষ আবেদনও বুধবার সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেয়। ভারতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা খুবই দুর্লভ। ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ওই হামলার অর্থায়ন ও জঙ্গীদের প্রশিক্ষণের খরচ বহন করার জন্য ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির সাজা দিয়েছিল টাডা কোর্ট, এবং সুপ্রিম কোর্টও তা বহাল রাখে। ভারতে ১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত ইয়াকুব মেমনের ৫৩তম জন্মদিন বৃহস্পতিবার। আর এদিন সকালেই নাগপুর সেন্ট্রাল জেলে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তার মৃত্যু পরোয়ানাকে বেআইনি বলে দাবি করে ফাঁসি রদ করার জন্য ইয়াকুব যে আবেদন করেছিলেন, বুধবার বিকেল চারটা নাগাদ তিনজন বিচারপতির বেঞ্চ তা নাকচ করে দেয়। মহারাষ্ট্রের সরকারি কৌঁসুলি উজ্জ্বল নিকম জানান, যে সব যুক্তিতে ইয়াকুব মেমন তার মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন তার প্রতিটিই শীর্ষ আদালত খারিজ করে দিয়েছে। হামলার ষড়যন্ত্রে তার তেমন বড় ভূমিকা ছিল না এবং সে কারণে তাকে কঠোর সাজা থেকে রেহাই দেওয়া উচিত - ইয়াকুব মেমনের এই যুক্তিও সুপ্রিম কোর্ট মানেনি। কিন্তু ইয়াকুব মেমনের প্রাণভিক্ষার প্রশ্নে গত বেশ কদিন ধরে ভারতে যে তুমুল বিতর্ক চলছে, তা প্রায় নজিরবিহীন বলা যেতে পারে। দেশের বেশ কয়েকশো বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সিপিএম-এনসিপি-বিজেপিসহ বিভিন্ন দলের এমপি-রা সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লিখে বলেছেন, তার ফাঁসির সাজা মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। ওই পিটিশনে অন্যতম স্বাক্ষরকারী কে টি এস তুলসী বলছিলেন, ‘ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ষড়যন্ত্রে ইয়াকুব মেমন জড়িত ছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু এটাও ঠিক যে তদন্তে সে ভারতকে খুবই সাহায্য করেছে, পাকিস্তানের মিথ্যে ধরিয়ে দিতে তার বিরাট ভূমিকা ছিল। আমরা বলছি, শুধু এ কারণেই তার মৃত্যুদণ্ড লাঘব করা যেতে পারে।’ ইয়াকুবের স্ত্রী রাহিন মেমনও সুপ্রিম কোর্ট ও দেশের রাষ্ট্রপতির কাছে তার স্বামীর প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন। রাহিনের যুক্তি ছিল, গত ২১ বছর ধরে ইয়াকুব ও তার পরিবার চরম দুর্দশার মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছে, অনেক কষ্ট করেছে। তাই সরকারের কাছে তাঁর আবেদন, দীর্ঘ কারাবাসের পর আরও অনেকেরই যেমন ফাঁসি মকুব করা হয়েছে তেমনটা করা হোক ইয়াকুবের ক্ষেত্রেও। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই সব আবেদন-নিবেদনে কোনও ফল হয়নি। ওদিকে মুম্বাইতে ৯৩ সালের সিরিয়াল বিস্ফোরণে যারা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তারাও ইয়াকুবের ফাঁসি বহাল রাখার জন্য জোরালো প্রচার শুরু করেছিলেন। এমনই একজন হলেন তুষার দেশমুখ, যিনি ওই জঙ্গী হামলায় নিজের মাকে হারান। বুধবার মহারাষ্ট্রর মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি বলেছেন, ‘যেদিন আমি বোমায় মায়ের ছিন্নভিন্ন দেহটা দেখেছিলাম - সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কালো দিন। যারা ফাঁসি মওকুব করার কথা বলছেন তারা তো দেশের আইনবিরোধী কথা বলছেন। আর কজন সই করেছেন ওই আবেদনে? আমি তো মাত্র দুঘণ্টায় ফাঁসির পক্ষে ষোলোশো সই পেয়েছি।’ ফলে ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির পক্ষে আর বিপক্ষে, দুরকম যুক্তি নিয়েই চলছে তুমুল বাদানুবাদের মধ্যেই বৃহস্পতিবার ভোরে নাগপুর সেন্ট্রাল জেলে মুম্বাই বিস্ফোরণে প্রথম কোনও অভিযুক্তের ফাঁসি কার্যকর করা হলো। যদিও ওই হামলায় অভিযুক্ত টাইগার মেমন বা দায়ুদ ইব্রাহিমের মতো মূল ষড়যন্ত্রীরা এখনও রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরেই।- বিবিসি
জন্মদিনেই ফাঁসি
আজই তার ৫৩ তম জন্মদিন। জন্মদিনের জন্য গতকাল রাতে কেক পাঠানো হয় নাগপুর সেন্ট্রাল জেলে। মেমনের পরিবার জেল সুপারের হাতে এই কেক তুলে দেয়। তখনও পরিবার আশায় ছিল ফাঁসির আর্জি হয়তো রদ করা হবে। মেমনের আইনজীবীরা তখন বিচারপতির বাড়িতে। ১৪ দিনের জন্য প্রাণভিক্ষার আর্জি জানান তারা। এরপরই প্রধান বিচারপতি তিন বিচারপতির বেঞ্চ তৈরি করে দেন। বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে সেই বেঞ্চে ছিলেন আরও দুই বিচারপতি অমিতাভ রায় এবং বিচারপতি পিসি পন্থ। কেন ফের ইয়াকুব মেমনের প্রাণ ভিক্ষার শুনানি হবে সে নিয়ে আদালতের বাইরে বিক্ষোভ চলে। রাত তিনটে কুড়ি নাগাদ শুনানি শুরু হয় সুপ্রিম কোর্টের চার নম্বর এজলাসে। ইয়াকুবের পক্ষে আইনজীবী অশোক গ্রোভার আদালতে জানান, প্রাণভিক্ষার আর্জি নয়, ফাঁসি পিছনোর জন্যই তাঁরা নতুন করে আবেদন জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টে। অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগি এবং ইয়াকুবের আইনজীবীদের জন্য প্রায় দেড় ঘণ্টা চলে সওয়াল জবাব। বিচারপতিরা জানান, ইয়াকুব মেমনকে সময় দেওয়া হয়েছে। এরপরেও যদি তার ফাঁসি পিছানো হয়, তাহলে তা বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে খারাপ নজির তৈরি করবে। ভোর প্রায় পাঁচটা নাগাদ বিচারপতিরা ফাঁসি পিছনোর আবেদন খারিজ করে দেয়। সকাল সাড়ে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করার জন্য নাগপুর জেলে নির্দেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় চিরঘুমে শায়িত কালাম

এ পি জে আবদুল কালামকে স্যালুট দিয়ে শ্রদ্ধা প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদির। ভারতের তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও পরমাণুবিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামকে আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর জন্মস্থান তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে দাফন করা হয়েছে। হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিয়ে চিরনিদ্রায় গেছেন তিনি।
শেষ আনুষ্ঠানিকতার আগে রামেশ্বরমের একটি মাঠে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কালামের কফিনে স্যালুট দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরে তিনি কালামের কফিনের চারদিক প্রদক্ষিণ করেন।
শেষ আনুষ্ঠানিকতার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, বিরোধী দল কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এনডিটিভি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘জনতার রাষ্ট্রপতি’-খ্যাত আবদুল কালামকে শেষ বিদায় জানাতে সারা দেশ থেকে হাজারো মানুষ রামেশ্বরমে আসে। কেউ আসে পায়ে হেঁটে, কেউবা বাস, ট্রেন, নৌযানে। গন্তব্যে আসতে গিয়ে অনেকে সড়কে রাত কাটান। আজ সকাল নাগাদ রামেশ্বরমের পথঘাট লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। তাঁরা শেষবারের মতো তাঁদের প্রিয় মানুষকে শ্রদ্ধা জানান। জানান হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা।
দাফনসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার সময় প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতির ৯৯ বছর বয়সী বড় ভাই মোহাম্মদ মুথু মারাইকরসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ভারতের পরমাণু কর্মসূচির পথিকৃৎ ৮৪ বছর বয়সী আবদুল কালাম গত সোমবার সন্ধ্যায় মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে বক্তৃতা করার সময় হঠাৎ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন। হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। আবদুল কালাম চিরকুমার ছিলেন।
গত মঙ্গলবার সকালে সামরিক বাহিনীর বিশেষ বিমানে শিলং থেকে নয়াদিল্লিতে নেওয়া হয় কালামের মরদেহ। বিমানবন্দরে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকার ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিন প্রধান। প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে সেখানে তাঁকে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানী নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দর থেকে কালামের মরদেহ নিয়ে বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ তামিলনাড়ু যায়। এর আগে বিমানবন্দরে তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে এই ‘ভারতরত্ন’ খেতাবজয়ীকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে তামিলনাড়ুর মাদুরাই বিমানবন্দর থেকে তাঁর মরদেহ হেলিকপ্টারে করে রামেশ্বরমে নেওয়া হয়।
গতকাল বিকেলে রামেশ্বরম শহরের বাসস্ট্যান্ডের কাছে খোলা মাঠে সাবেক রাষ্ট্রপতির মরদেহ রাখা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ ‘ভারতের মিসাইলম্যানের’ কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এই অনন্যসাধারণ মানুষটিকে একনজর দেখার জন্য বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রামের বাড়ি নেওয়ার পথের দুই ধারে হাজারো মানুষ দাঁড়িয়ে থাকেন।

একই জায়গায় স্থির ‘কোমেন’

ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ কার্যত একই এলাকায় স্থির রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর বলছে, সকাল নয়টা ও দুপুর ১২টায় এটি একই অবস্থানে ছিল। সন্ধ্যার দিকে ‘কোমেন’ চট্টগ্রাম উপকূল পার হতে পারে। এরপর এটি পশ্চিম-উত্তর পশ্চিম দিকে এগিয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপগুলোতে ঝোড়ো হাওয়া বলছে। ‘কোকেন’-এর অগ্রভাগ গতকাল বুধবার মধ্যরাতেই কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ উপকূলে আঘাত হেনে উত্তর-পূর্ব দিকে চট্টগ্রাম উপকূলের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। এতে সেন্ট মার্টিনে গাছচাপায় একজন মারা গেছেন। পটুয়াখালীতে দুপুরের দিকে গাছ চাপায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় আবহাওয়া দপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, ‘কোকেন’ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৮০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ২০৫ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ পূর্বে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ১২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে অবস্থান করছিল। সকাল নয়টায়ও এটি একই অবস্থানে ছিল। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও কক্সবাজারে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত এবং মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে পাঁচ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রে ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে।
ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’-এর প্রভাবে চট্টগ্রাম উপকূলে বয়ে যাচ্ছে ​ঝড়ো হাওয়া। আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে সাত নম্বর এবং মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৫ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে। ছবি: প্রথম আলো
উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা জেলাসমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো সাত নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে পাঁচ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ পাঁচ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলাসমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি ও ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
আমাদের চট্টগ্রাম প্রতিবেদক জানান, ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে চট্টগ্রামে সাগর উত্তাল রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। কোমেন মোকাবিলায় প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র খোলার পাশাপাশি উপকূলের লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র উপকূলের লোকজনকে সরিয়ে নিতে সিটি করপোরেশন ও রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে মাইকিং চলছে। সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপজেলার উপকূলের লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসন আজ সকালে জরুরি সভা করেছে। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার পাশাপাশি লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে সভা সূত্রে জানা গেছে।
কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া ও পেকুয়াসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার লোককে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আমাদের মহেশখালী প্রতিনিধি জানান, সকাল থেকে উপজেলার উপকূলীয় দ্বীপ দর ঘাট, মাতার বাড়ি ও সোনাদিয়ার লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাচ্ছে। দর ঘাটের অনেকে পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল নাসের বলেন, ১২৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এরই মধ্যে অনেককে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অপেক্ষায় কক্সবাজার উপকূলের বাসিন্দারা। ছবি: প্রথম আলো
আমাদের পটুয়াখালী অফিস থেকে জানানো হয়, পটুয়াখালীতে গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে এবং সেখানে দমকা বাতাস বইছে। পটুয়াখালী নদীবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাগর উত্তাল থাকায় মাছ ধরার ট্রলারগুলো গভীর সাগর থেকে উপকূলে ফিরে আসছে।
মহিপুর মৎস্য বন্দরের আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিমাই চন্দ্র দাস জানান, ইতিমধ্যে অন্তত এক হাজার মাছ ধরার ট্রলার মহিপুর, আলপির, ফাতরা ও গঙ্গামতিসহ বিভিন্ন চ্যানেলে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে।
কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মো. ফসিউর রহমান বলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পর্যটকদের নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকেরা যাতে সাগরে নামা থেকে বিরত থাকেন, এ জন্য হ্যান্ডমাইক দিয়ে ঘোষণা চালিয়ে যাচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং শুনে বাড়ির শিশুদের সবার আগে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাচ্ছেন অভিভাবকেরা। ছবিটি কক্সবাজার থেকে তোলা। ছবি: প্রথম আলো
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঘূর্ণিঝড়-বিষয়ক একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রশাসনের সহায়তার সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য জেলার ৩৪১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
উপড়েপড়া গাছচাপায় দুজনের মৃত্যু
ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ এর প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়ে উপড়েপড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন ও পটুয়াখালীর গলাচিপায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
আমাদের টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ এর প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়ে উপড়েপড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে মো. ইসলাম (৫০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে এই ঘটনা ঘটে। ঝড়ে গাছপালা উপড়ে পড়ার পাশাপাশি শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান খন্দকার এই মৃত্যু ও ঘরবাড়ি বিধ্বস্তের খবর নিশ্চিত করে বলেছেন, ঝোড়ো বাতাসে দ্বীপের বেশ কিছুসংখ্যক নারকেল গাছ উপড়ে পড়েছে। তবে আর কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে আজ ভোরে ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে বৃষ্টির সময় গাছের চাপায় এক ব্যক্তি মারা গেছেন। জেলার টেকনাফে রাস্তার ওপর বড় বড় গাছ ভেঙে পড়ে। এতে মানুষের চলাচ​ল বিঘ্নিত হচ্ছে। ছবি: মো. গিয়াসউদ্দিন, টেকনাফ
পটুয়াখালীতে একজনের মৃত্যুঃ ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ এর প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়ে উপড়েপড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে জেলার গলাচিপায় একজন মারা গেছেন। তার নাম মো. নুরুল ইসলাম ফকির (৫২)।
আমাদের গলাচিপা প্রতিনিধি জানান, কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যাণ কলস গ্রামে বেলা ১১টার দিকে গাছের নিচে চাপা পড়েন নুরুল ইসলাম। দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে উদ্ধার করে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান। গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুব আলম এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

রোমাঞ্চের হাতছানি দিচ্ছে যে টেস্ট by পবিত্র কুন্ডু

ওয়ানডের মতো টেস্ট অভিষেকেও ম্যাচসেরা হয়ে
ঢুকে গেছেন ইতিহাসে। বলে চোখ মুস্তাফিজুরের,
তাঁর দিকে চোখ পুরো দেশের l শামসুল হক
চিরপরিচিত দৃশ্য। টেস্ট শুরুর আগের সকালে কিংবা দুপুরে উইকেটের দিকে ঝুঁকে থাকা কজোড়া চোখ।
মাঠ পাড়ি দিয়ে চলেই যাচ্ছিলেন মুশফিকুর রহিম। ইনডোরে নেট করে ফেরা বাংলাদেশ অধিনায়ককে পিছু ডাকলেন তিনজন। তা আট বছর ধরে নিবিড়ভাবে চেনা (সত্যিই কি?) উইকেটকে নতুন করে দেখার কী আছে! তবু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। সঙ্গে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে, নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন ও হাবিবুল বাশার। পাঁচ-ছয় দিন পর উইকেটটা যে মাত্রই ৪৮ ঘণ্টা হলো ঘোমটা খুলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা দল স্টেডিয়ামে ঢুকেই চোখ রাখল দূরের উইকেটে। ইনডোরে যাওয়ার পথে আরও কাছাকাছি গিয়ে।
সত্যিটা বললে উইকেট নয়, সবার সর্বক্ষণ চোখ রাখা উচিত আকাশের দিকে। চট্টগ্রামে প্রথম টেস্টটাকে গিলে খেয়ে, ঢাকায় দুদিন ধরে বৃষ্টি ঝরিয়ে এই আকাশই যে এ পর্যন্ত ‘নায়ক’! তো কাল দুপুর পর্যন্তও আকাশে ছিল ঝকঝকে রোদ। নীলের কোলে কোলে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ। তিন দিন ধরে বৃষ্টি শেষ বিকেলে ঝরে পড়ার একটা প্যাটার্ন তৈরি করেছে। সেটাই হোক। সারা দিন ক্রিকেটের পর রাতে যত খুশি সে ঝরুক। অনেক আকর্ষণ নিয়ে আজ শুরু হতে যাওয়া মিরপুর টেস্টের জন্য দর্শকেরও যে অধীর অপেক্ষা।
প্রথম টেস্ট সামর্থ্য আর সম্ভাবনার যুগলবন্দী একটা স্বপ্ন এঁকে হঠাৎই ডুব দিয়েছে বৃষ্টির তলে। মিরপুরে একাদশে সম্ভাব্য একটি পরিবর্তন এনে বাংলাদেশ সেই স্বপ্নটাকে ফিরে পেতে চায়। সেই স্বপ্ন থেকে গড়তে চায় টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের গৌরবসৌধ। সেটি কী, সবারই জানা। মুশফিকুর রহিম কাল যেমন আত্মবিশ্বাসজাত আকাঙ্ক্ষাটাকে তুলে নিলেন সর্বোচ্চ চূড়ায়, ‘১-০ ব্যবধানে সিরিজ আমরা জিততেও পারি।’ মুশফিক জানেন, জানেন তাঁর সব সহ-খেলোয়াড়, টেস্টের এক নম্বর দলটির বিপক্ষে এ এক কষ্ট-কল্পনা। তারা অভিজ্ঞতার সবটুকু ঢেলে, আগ্রাসনের চূড়ান্ত সীমায় উঠে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়টা যে তাদের কাছে রোজনামচার মতো। তারপরও ওয়ানডে সিরিজ জিতে বিবর্তিত বাংলাদেশ দল টেস্ট জয়েরও স্বপ্ন দেখতে পারছে। সেটি ওই মানসিক শক্তির কারণেই।
দক্ষিণ আফ্রিকা জানে, বাংলাদেশের মানসিক শক্তিটা পারদস্তম্ভের মাপে বেশ ওপরে। র্যাঙ্কিংয়ের নয়ে থাকা প্রতিপক্ষকেও তাই বেশ সমীহ। কিন্তু কে না জানে, সেই সমীহর চাদরের নিচে রয়েছে অহং। এটি ‘অবশ্যই জিততে হবে ম্যাচ’ কি না, পরিষ্কার করেননি হাশিম আমলা, সেটি করার দরকারই বা কী! এই একটি বাক্যেই যে বলা হয়ে যায় সবকিছু, ‘অবশ্যই আমরা এখানে জিততে এসেছি।’ দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক বাড়তি একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন বার কয়েক, ‘রোমাঞ্চিত। দলের সবাই “রোমাঞ্চিত”, আবহাওয়ার উন্নতি দেখে “আমরা রোমাঞ্চিত”।’ একটি রোমাঞ্চকর ম্যাচের অপেক্ষায় দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক।
রোমাঞ্চ শব্দটি মিরপুর স্টেডিয়ামের সঙ্গে বেশ যায়। ফিরে যদি দেখা যায়, এখানে সর্বশেষ বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্টটিকে, প্রথমে রোমাঞ্চ জাগিয়ে শেষটায় বাংলাদেশেরই ছিল অশ্রুত হাহাকার। শাহাদাত হোসেনের ২৭ রানে ৬ উইকেট তুলে নেওয়া আগুন ঝরানো বোলিংয়ে প্রথম ইনিংসে লিড নিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সেই ম্যাচটা সিংহের দাপটে বের করে নিয়েছিলেন স্মিথ, আমলা, ডি ভিলিয়ার্স, ক্যালিস, মরকেল, স্টেইন। স্মিথ-ক্যালিস অবসরে, ডি ভিলিয়ার্স নেই—এই দলে সেই স্মৃতি বয়ে এনেছেন শুধু আমলা, স্টেইন ও মরকেল।
প্রতিটি দিনের সূর্যই যেমন নতুন একটা দিন নিয়ে আসে, এই ম্যাচটিও নতুন। আরেকটি নতুন দিনে আমলাদের কাছে ভেসে উঠছে পুরোনো আকাঙ্ক্ষাই—জয়। চট্টগ্রাম টেস্টে উইকেটের ‘গন্ধ’ পেয়ে গেছেন ডেল স্টেইন। আর একটি পেলেই টেস্টের চার শ উইকেট ক্লাবের ত্রয়োদশ সদস্য হয়ে যাবেন। সেই উইকেটটি তাঁর কাছে নতুন প্রেরণা। কাল অনুশীলনে কালো ব্যান্ড মাথায় নেটে বল করে গেলেন হয়তো নিজেকে আরেকটু শাণিয়ে নিতেই। সফরে এখনো উইকেটশূন্য মরনে মরকেলের স্মৃতিতেও চলে আসবে সেই ২০০৮-এর মিরপুর টেস্ট—প্রথম ইনিংসে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। ওয়ানডে ও টেস্ট মিলিয়ে চার ম্যাচ খেলে আমলা এখনো কোনো অর্ধশত পাননি, এটা নিশ্চিত করেই কাঁটার মতো বিঁধছে। আর প্রোটিয়াদের কাছে এসবের যোগফল অবশ্যই রোমাঞ্চ জাগানিয়া, মানে শেষবারের মতো ফুঁসে ওঠার উপলক্ষ আরকি!
তাঁদের রোমাঞ্চে মুশফিকদের কিছু এসে যায় না। তাঁরা মগ্ন হয়ে আছেন পুরোনো স্মৃতিটাকে প্রোজ্জ্বল বর্তমানের নিচে মাটিচাপা দিতে। তাঁদের চোখে নতুন স্বপ্ন—টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠার কিংবা নতুন আত্ম-আবিষ্কারের। ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পর প্রথম টেস্টের আধিপত্যে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে এরই মধ্যে একটা মানসিক জয় তো পাওয়া হয়েই গেছে। এই টেস্টে জয় হোক, আরেকবার দেয়ালে ওদের পিঠ ঠেকিয়ে ড্র—সবই হবে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি উজ্জ্বল সিঁড়ি। স্টেইনের মতো অত বড় মাইলফলক না হোক, একটি ব্যক্তিগত মাইলফলক বাংলাদেশের একজনের সামনেও আছে। আর তিন উইকেট হলেই ১৫০ উইকেট হয়ে যাবে সাকিব আল হাসানের। ১৩ টেস্টে ৪৪ উইকেট—মিরপুরে প্রতি টেস্টেই গড়ে তিনের বেশি উইকেট পেয়েছেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টেস্ট উইকেটশিকারি বোলার। এই টেস্টে সাকিবের ঝাঁপিতে তিন উইকেট তো উঠতেই পারে।
তবে বাংলাদেশের চোখে ব্যক্তিগত এই প্রাপ্তির চেয়ে আরেকটি গৌরবময় দলীয় অর্জনই নিশ্চয় আলো ছড়াচ্ছে। কাল সেই আলোর রেখাই দেখা গেল মুশফিকদের চোখে।

মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ: শিশুটির সুস্থতার জন্য মাকে বড় প্রয়োজন

ঢাকা মেডিকেলে ‘বেবি অব নাজমা’
মাগুরায় মায়ের পেটের ভেতর গুলিবিদ্ধ শিশুটির ক্ষতস্থানে গতকাল বুধবার অস্ত্রোপচার করেছেন চিকিৎসকেরা। সময়ের আগে কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুটি ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। তাঁরা বলেছেন, এখন শিশুটির সুস্থ হয়ে উঠতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার মাকে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কানিজ হাসিনার অধীনে ভর্তি গুলিবিদ্ধ শিশুটির নাম হাসপাতালের খাতায় এখনো বেবি অব নাজমা বেগম (নাজমা বেগমের বাচ্চা)।
কানিজ হাসিনা প্রথম আলোকে বলেন, ‘শরীরের ভেতরের ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র অক্ষত থাকলেও শিশুটি সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছে। শিশুটিকে আংশিক অবশ করে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, সময়মতোই ও সাড়া দিয়েছে। অবশ ভাবটা কেটে যাওয়ার পরই কান্নাকাটি করেছে।’
শিশুটির সুস্থতার জন্য তার মাকে ঢাকায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন কানিজ হাসিনা। তিনি বলেন, শিশুটি অপরিণত অবস্থায় জন্মেছে। ওর শরীরে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কম। সাত দিনের এই শিশুটির মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে এবং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়াতে ওর মাকে দ্রুত ঢাকায় আনা দরকার। ওর পরিবারের সদস্যদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু তাঁরা বলছেন, শিশুটির মাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই।
অস্ত্রোপচারের পর শিশুটির ফুফু শিখা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটুখানি মেয়ে, আঠারোটা সেলাই লাগিছে। আল্লাহ জানে কী হবি। দেখেন না মুখ-চোখ কেমন হয়ি আছে।’
শিশুটিকে গতকাল কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। চিকিৎসকেরা বলেছেন, ক্ষতস্থানটিতে অস্ত্রোপচার করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না তাঁদের।
মাগুরা শহরের দোয়ারপাড় কারিগরপাড়ায় গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হন অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম (৩৫)। গুলি মায়ের পেটে শিশুর শরীরও এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলে। গুলি ও বোমায় আহত নাজমার চাচাশ্বশুর মমিন ভূঁইয়া পরদিন মারা যান।
গতকাল সকালে মাগুরা সদর হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ মা নাজমা খাতুন যন্ত্রণায় শুতে পারছেন না। তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
নাজমা বলেন, ‘আমার মামণি পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বুক পেতে আমার জীবন বাঁচাল। জন্মের পর ওর মুখটাও আমি দেখতে পারলাম না। যারা আমার মণির কচি বুক ঝাঁজরা করল, আপনারা তাদের ধরে ফাঁসি দেন।’ বললেন, ‘আমার মণিকে ঢাকায় নিয়ে গেছে, তা-ও আমি পরে শুনছি। আমারে কেউ বলেনি। আমারে নিয়েও যায়নি। জানি না আমার সোনামণি কেমন আছে!’
মাগুরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক শফিউর রহমান বলেন, মা ও নবজাতক দুজনের অবস্থাই সংকটাপন্ন ছিল। দুজনকেই ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।
গুলিবিদ্ধ শিশুটির বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বাচ্চু ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নাই। এসপি সাহেব আমাকে বলেছেন, বাচ্চাটাকে এখানে রেখে মেরে ফেলবেন? পরে তিনি বাচ্চাকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু বাচ্চার মাকে কেন নেওয়া হয়নি, তা আমি জানি না।’
মাগুরায় সদর হাসপাতালে মা নাজমা বেগম
এ ব্যাপারে মাগুরার পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহ্সান উল্লাহ বলেন, ‘আমি শিশুটিকে ঢাকায় পাঠিয়েছি। তবে মায়ের অবস্থা ভালো বলে তাঁকে পাঠানো হয়নি।’
ঢাকা ও মাগুরার চিকিৎসকেরা বলছেন, মা ও শিশু দুজনই দুজনকে রক্ষা করেছে। তাঁরা মনে করছেন, পেটে শিশুটি থাকায় মা কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মায়ের পেটের মাংসপেশির ভেতর গুলিটি আটকে ছিল। কিন্তু তার আগে গুলিটি মায়ের পেটে থাকা শিশুটির পিঠ দিয়ে ঢুকে বুকের ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। এরপর সেটি আবার গলার নিচ দিয়ে ঢুকে ডান চোখের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এ কারণে গুলিটি দুবর্লভাবে মায়ের মাংসপেশিতে আঘাত করেছে। গুলিটি শিশুটির শরীর ভেদ করায় সেটি আর মায়ের খাদ্যনালি ও নাড়িভুঁড়িতে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেনি। শিশুটি এক অর্থে মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে। অন্যদিকে শিশুটি মায়ের পেটের ভেতর পানিতে ভাসছিল। সে কারণে মায়ের পেট ভেদ করে গুলিটি যখন ঢোকে, তখন এর গতি কিছুটা কমে গিয়েছিল। এ ছাড়া শিশুটি মায়ের পেটে স্বাভাবিক অবস্থানে থাকার কারণে গুলিটি পিঠের ও বুকের ওপরের অংশে লাগে। হাড় বা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্ষা পায়।
ছাত্রলীগের দুই পক্ষের গোলাগুলির ঘটনার পরদিন নিহত মমিন ভূঁইয়ার ছেলে রুবেল ভূঁইয়া ১৬ জনকে আসামি করে মাগুরা সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সেন সুমনকে (৩২) প্রধান আসামি করা হয়। সেন সুমন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ রেজাউল ইসলামের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া আজিব্বর শেখ, মুহম্মদ আলীসহ মামলার অন্য আসামিরা সবাই ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মী। সংগঠনের পদ-পদবিতে না থাকলেও এঁরা বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে থাকেন। পুলিশ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সুমন ও সুবহানকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু গতকাল এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অন্য আসামিদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
জানতে চাইলে এসপি এ কে এম এহ্সান উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

দুই বছর আগেই মারা যান মোল্লা ওমর

মোল্লা ওমর
আফগানিস্তানে তালেবান বাহিনীর প্রধান মোল্লা মোহাম্মদ ওমর দুই বছর আগে মারা গেছেন। গতকাল বুধবার রাতে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার মুখপাত্র এ খবর নিশ্চিত করেন। গতকালই এর আগে পরস্পরবিরোধী খবরে তালেবানের এই নেতার অবস্থা নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন ছড়ায়। খবর বিবিসি, এএফপি ও গার্ডিয়ানের।
গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ডিরেক্টরেট অব সিকিউরিটির মুখপাত্র হাসিব সিদ্দিকী বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘মোল্লা ওমর মৃত। তিনি ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে করাচির এক হাসপাতালে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান।’
হাসিব সিদ্দিকীর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে আফগান সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তাও বলেছিলেন, দুই বা তিন বছর আগে মোল্লা ওমরের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এর পরপরই আবার প্রেসিডেন্টের একজন মুখপাত্র বিষয়টি নিশ্চিত না করে বলেন, মোল্লা ওমরের মৃত্যুর খবরের সত্যতা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
২০০১ সালে মার্কিন সামরিক অভিযানে তালেবান সরকারের পতনের পর থেকে মোল্লা ওমরকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে তাঁর গুরুতর অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর গুঞ্জন শোনা গেছে। তবে তালেবান কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি।
এর আগে মৃত্যুর খবর প্রথম প্রচারিত হওয়ার পরপরই প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণির মুখপাত্র সৈয়দ জাফর হাসেমি বলেছিলেন, ‘আমি যেটুকু বলতে পারি তা হলো, আমরা তাঁর মৃত্যুর খবর শুনেছি। আমরা এই খবরটাকে নিশ্চিত বা প্রত্যাখ্যান কোনোটাই করছি না। মোল্লা ওমরের মৃত্যুর খবর পুরোপুরি নিশ্চিত হলে গণমাধ্যম ও দেশবাসীকে জানিয়ে দেব।’
তখন তালেবানের মুখপাত্র কারি ইনসাফ আহমেদিকে উদ্ধৃত করে স্কাই নিউজ জানায়, মোল্লা ওমর জীবিত আছেন এবং এখনো দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সম্প্রতি তালেবানের সঙ্গে আফগান সরকারের শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। গত বছর নির্বাচিত আশরাফ গণি সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছিল। এ আলোচনার পেছনে মোল্লা ওমরের সমর্থন আছে বলে খবর প্রচারিত হয়েছিল।
মোল্লা ওমরের সঙ্গে আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের টুইন টাওয়ার হামলার পর মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে অভিযান চালায়। এরপর থেকেই ওমর পালিয়ে ছিলেন।
তালেবান সূত্র অনুযায়ী, মোল্লা ওমরের জন্ম ১৯৬০ সালে আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের চাহ-ই-হিম্মত গ্রামে। তিনি গত শতকের আশির দশকে দেশটিতে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল হন এবং যুদ্ধের সময় তাঁর ডান চোখে আঘাত পান। ১৯৯৬ সালে তিনি তালেবানের শীর্ষ নেতা হন। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য চলে যাওয়ার পর দেশটিতে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধে তালেবান বাহিনী মোল্লা ওমরের নেতৃত্বেই জয়ী হয়। গত কয়েক বছর ধরে তালেবানের পক্ষ থেকে যেসব বার্তা পাঠানো হয় বা তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়, এর সবই এই পলাতক নেতার নামেই দেওয়া হয়। এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ওমরের নামে দেওয়া সর্বশেষ এক বিবৃতিতে তালেবানের সঙ্গে আফগান সরকারের শান্তি আলোচনায় সমর্থন দেওয়া হয়। তবে এবারের তালেবানের ওয়েবসাইটে ওমরের নামে লিখিত বার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনো অডিও বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়নি। আর এর ফলেই ওমর মারা গেছেন, এমন গুঞ্জন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

ফাঁসিকাষ্ঠেই যেতে হবে

মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর পাশাপাশি আরও চারটি অভিযোগে তাঁর বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড বহাল রয়েছে। তবে একটি অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে সাকা চৌধুরীর পরিবার। অবশ্য এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধী কাদের মোল্লার মামলায় আপিলের রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছিলেন, আপিল এবং রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন এক নয়। বিচার-প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি দেখাতে না পারলে পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। এর আগে ট্রাইব্যুনালের কোনো মামলার আপিলের রায়ের পুর্নবিবেচনার আবেদন মঞ্জুর হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ৩৩ মাসের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের ওই রায়কে বিদ্রূপ করেছিলেন তিনি। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সেই ফাঁসির আদেশই বহাল রাখলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। অর্থাৎ, ফাঁসিকাষ্ঠেই ঝুলতে হবে সাকা চৌধুরীকে।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ গতকাল বুধবার সাকা চৌধুরীর আপিলের এই রায় ঘোষণা করেন। এ নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের পঞ্চম মামলার আপিলের রায় ঘোষণা করলেন আপিল বিভাগ।
জাতীয় রাজনীতিতে বহু বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচনার জন্ম দেওয়া সাকা চৌধুরী ১৯৭৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছয়বার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তাঁর আচরণ মোটেই আইনপ্রণেতাসুলভ ছিল না বলে অভিযোগ আছে। মুসলিম লীগ থেকে রাজনীতি শুরু করেন, পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনামলে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। প্রায় চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, তারপরও বারবার সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন মূলত ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে ভরা কথার জন্য।
মুক্তিযুদ্ধকালে সাকা চৌধুরী কাজ করতেন পাকিস্তানি দখলদার সেনাদের সহযোগী হিসেবে। তাঁর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি ও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ফজলুল কাদেরের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার অন্যতম অংশীদার ছিলেন তাঁর ছেলে সাকা চৌধুরী। বাবার নির্দেশ পালন করার জন্য একাত্তরের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজানে কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহকে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় হত্যা করেন। এটিসহ চারটি অভিযোগে সাকা চৌধুরীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এর প্রতিটিতে ফাঁসি বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার আপিলের রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এর মধ্যে কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। সাঈদী আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করছেন। আর মুজাহিদের ফাঁসি বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। সর্বশেষ গতকাল ঘোষিত হলো বিএনপির সাবেক সাংসদ সাকা চৌধুরীর আপিলের রায়।
আপিল বিভাগের এ রায়ের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিএনপির কোনো নেতার ফাঁসির সাজা বহাল থাকল। আর জামায়াত নেতা মুজাহিদের পর তিনি হলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি একসময় মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন।
ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়াকে ব্যঙ্গ করার পাশাপাশি প্রশ্নবিদ্ধ করারও চেষ্টা করেছেন সাকা চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালে তাঁর মামলার রায় ঘোষণার আগে ফাঁস হয়ে যায় ওই রায়ের খসড়া। এ ঘটনায় একটি মামলা এখনো নিম্ন আদালতে বিচারাধীন। এ মামলার আসামি তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও আইনজীবীসহ সাতজন।
সংক্ষিপ্ত রায়: গতকাল সকাল ৯টা ৫ মিনিটে সাকা চৌধুরীর আপিলের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। আপিল বিভাগের এ বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
মাত্র এক মিনিটে দেওয়া সংক্ষিপ্ত রায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপিল আংশিক মঞ্জুর করা হলো। ৭ নম্বর অভিযোগে আবেদনকারী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে এই অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হলো। ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে দণ্ডাদেশ বহাল রাখা হলো।’
রায় ঘোষণার সময় আদালত কক্ষে সাকা চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এস এম শাহজাহান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মোমতাজ উদ্দিন ফকির, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একরামুল হক প্রমুখ। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের অনেকে রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন।
চার অভিযোগে ফাঁসি বহাল: সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এ চারটি অভিযোগেই ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
তৃতীয় অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল সকালে সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে রাউজানের গহিরা গ্রামের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহের বাড়িতে অভিযান চালান। মন্দিরে প্রার্থনারত নূতন চন্দ্রকে টেনেহিঁচড়ে বের করার পর সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের বলেন, ‘একে হত্যার জন্য বাবার (ফজলুল কাদের চৌধুরী) নির্দেশ আছে।’ পাকিস্তানি সেনারা গুলি করলে নূতন চন্দ্র আহত অবস্থায় কাতরাতে থাকেন, তখন সাকা চৌধুরী নিজে গুলি করে নূতন চন্দ্রের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
ট্রাইব্যুনালে এ অভিযোগের পক্ষে চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও নূতন চন্দ্রের ছোট ছেলে প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ। ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছিলেন, নূতন চন্দ্র সিংহ চট্টগ্রামে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি অনেক স্কুল, কলেজ ও নামকরা কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষকসহ অনেককে কুণ্ডেশ্বরীতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠান কিংবা নির্বাচনে তাঁর মতের আলাদা গুরুত্ব ছিল। ধারণা করা যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ফজলুল কাদের চৌধুরীর পরাজিত হওয়ার একটি কারণ এটি। এর প্রতিশোধ হিসেবেই নূতন চন্দ্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল দুপুরে সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে রাউজানের সুলতানপুর গ্রামের বণিকপাড়ায় গিয়ে গণহত্যা চালান এবং বাড়িঘরে আগুন দেন। ষষ্ঠ অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল বিকেলে সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে রাউজানের হিন্দু-অধ্যুষিত ঊনসত্তরপাড়া গ্রামে সশস্ত্র অভিযান চালান। স্থানীয় ক্ষিতীশ মহাজনের বাড়ির পুকুরপাড়ে শান্তিসভার কথা বলে হিন্দুদের জড়ো করার পর সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে সেনারা এলোপাতাড়ি গুলি করে ৬০-৭০ জনকে হত্যা করে। অষ্টম অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় সাকা চৌধুরী চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরকে অপহরণ করার পর হত্যা করেন।
চার অভিযোগে ৫০ বছর কারাদণ্ড: সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২, ৪ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এগুলোতে তাঁকে ২০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগে রাউজানের মধ্য গহিরায় গণহত্যা, ৪ নম্বর অভিযোগে জগৎমল্লপাড়ায় গণহত্যা ও ৭ নম্বর অভিযোগে সতীশ চন্দ্র পালিতকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। আর ৭ নম্বর অভিযোগ থেকে সাকা চৌধুরীকে খালাস দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
১৭ ও ১৮ নম্বরে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে নিজামউদ্দিন ও সালেহউদ্দিনকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়। এ দুটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল সাকা চৌধুরীকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেন। আপিল বিভাগ এ দণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন।
ট্রাইব্যুনালে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২৩টি অভিযোগ এনেছিল। এর মধ্যে নয়টি প্রমাণিত হয়, ১৪টিতে তিনি খালাস পান। এ নয়টিতেই খালাস চেয়ে সাকা চৌধুরী আপিল করেন। সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ আর আপিল করেনি।
পুনর্বিবেচনার আবেদন করবে আসামিপক্ষ: রায়ের পর সাকা চৌধুরীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর আমরা রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করব। আশা করি, রিভিউয়ে এই সাজা থেকে মুক্তি পাব।’
খন্দকার মাহবুব হোসেন দাবি করেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যদি একাত্তরে রাউজানে এত বড় অপরাধ করতেন, তাহলে তিনি বারবার একই এলাকা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হতেন না। তাঁর দাবি, মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি করে রাজনৈতিক উদ্দেশে রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলা সাজিয়েছে।
এ সময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির কক্ষে উপস্থিত সাকা চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘রায়ে আমরা হতাশ হয়েছি। আমার বাবা যে নির্দোষ ছিলেন, সেটা একদিন না একদিন প্রমাণিত হবেই।’
আপিলের রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। রায় ঘোষণার পর নিজ কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই রায় আমরা আশা করেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ব্যাপারে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভূমিকা ছিল ভয়াবহ। তাঁর এই সাজা যদি না হতো, তাহলে আমরা প্রচণ্ড হতাশায় নিমজ্জিত হতাম।’
অপেক্ষা পূর্ণাঙ্গ রায়ের: মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এর আগের রায়গুলোতে দেখা গেছে, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা ট্রাইব্যুনালে পাঠান সুপ্রিম কোর্ট। সেটি হাতে পেলে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই মৃত্যু পরোয়ানা কারা কর্তৃপক্ষ আসামিকে পড়ে শোনায়।
একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে তা পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য আপিল বিভাগে আবেদন করতে পারবে আসামিপক্ষ। পুনর্বিবেচনার আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার পরেও যদি মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, তাহলে আসামিকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেবে কারা কর্তৃপক্ষ। সব শেষে আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ পাবেন। সেটা নিষ্পত্তি হলে সরকার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। এর আগে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় বাস্তবায়নের সময় এসব প্রক্রিয়া মেনে চলা হয়েছে। অবশ্য তাঁদের পুনর্বিবেচনার আবেদন নাকচ হয়ে যায়।

৯ অভিযোগ
ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের রায়
অভিযোগ
* মধ্য গহিরা গণহত্যা
* নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা
* জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা
* সুলতানপুর বণিকপাড়ায় গণহত্যা
* ঊনসত্তরপাড়ায় গণহত্যা
* সতীশ চন্দ্র পালিতকে হত্যা
* মোজাফফর ও আলমগীরকে হত্যা
* নিজামউদ্দিনকে নির্যাতন
* সালেহউদ্দিনকে নির্যাতন

ট্রাইব্যুনাল আপিল বিভাগ
২০ বছর ২০ বছর
ফাঁসি ফাঁসি
২০ বছর ২০ বছর
ফাঁসি ফাঁসি
ফাঁসি ফাঁসি
২০ বছর খালাস
ফাঁসি ফাঁসি
৫ বছর ৫ বছর
৫ বছর ৫ বছর