Wednesday, April 25, 2018

সমঝোতা ভেস্তে গেলে শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি জোরদার হবে: ড. রুহানি

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, পরমাণু সমঝোতা ভেস্তে গেলে দ্রুততার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। পূর্ব আযারবাইজান প্রদেশে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি আজ (বুধবার) এ কথা বলেছেন।
ড. রুহানি বলেন, পরমাণু সমঝোতা ইস্যুতে আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলো যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে ইরানের কোনো সম্পর্ক নেই। পাশ্চাত্যের দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা জেনে রাখুন ইরানের স্বার্থ নিশ্চিত করা না হলে কোনো সমঝোতাই টিকবে না।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, যেসব দেশ পরমাণু সমঝোতায় পরিবর্তন আনতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে বলছি পরমাণু সমঝোতায় কোনো পরিবর্তন মেনে নেয়া হবে না। পরমাণু সমঝোতা যেভাবে আছে সেভাবেই রাখতে হবে অন্যথায় তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরব বিশ্বের বিষয়ে অপমানজনক বক্তব্য রেখে গোটা মুসলিম বিশ্বকেই অপমান করেছেন বলে রুহানি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বেঁচে থাকার জন্য আরবদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে অর্থ দিতে হবে বলে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে তা গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্যই অপমানকর। মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যেক জাতির সম্মান ও মর্যাদাকে ইরান গুরুত্ব দেয় বলে তিনি জানান। ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমরা সব সময় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাব।
২০১৫ সালের জুলাই মাসে ছয় পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ইরান পরমাণু সমঝোতা সই করে যার বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে। কিন্তু ওই সমঝোতায় স্বাক্ষরকারী দেশ আমেরিকা শুরু থেকেই এটি বাস্তবায়নে গড়িমসি করে আসছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুবার এ সমঝোতাকে ‘ভয়ঙ্কর’ আখ্যায়িত করে এটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু তার এ দাবি আন্তর্জাতিক সমাজের কঠোর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে।

অসম প্রেম, তবে যৌন জীবন মধুময়

অনলাইনেই পরিচয়। অনলাইনেই প্রেম। তবে ভীষণ অসম সেই প্রেম। কারণ, প্রেমিকা আভালান গারভে মাত্র ১৯ বছর বয়সী বৃটিশ টিনেজার। আর তার প্রেমিক ক্যালিফোর্নিয়ার ৪৪ বছর বয়সী পুরুষ ডগ ট্রেসার। তিনি আভালান গারভের পিতার চেয়েও বয়সে বড়। শুধু তাই নয়। দু’বার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে তার। সেই পুরুষের প্রেমে সাড়া দিয়ে নতুন জীবন খুঁজে পেয়েছে বৃটেনের ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের ব্রাডফোর্ডের মেয়ে আভালান। তবে তাদের যৌন জীবন খুব সুখের বলে জানিয়েছেন আভালান নিজে। বলেছেন, তাদের যৌন জীবনের আনন্দ সীমাহীন। যখন সে সিক্সথ ফর্মে পড়ে তখনই অনলাইনে তাদের জানাশোনা হয়ে যায়। তারপর থেকে নিজের বয়ফ্রেন্ডকে ত্যাগ করে আভালান। অনলাইন ভিত্তিক একটি বার্তা আদানপ্রদান বিষয়ক বা ম্যাসেজিং ওয়েবসাইটে প্রথমে তাদের পরিচয়। তারপর তাদের একের প্রতি অন্যের আগ্রহ বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা সাক্ষাত করবে। তবে ডগ তার অবস্থানে সৎ বলে মন্তব্য করেছে আভালান। বলেছে, প্রেমের শুরুতে ডগ তাকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের বিষয়ে জানিয়েছে। আর তার বসবাস বৃটেন থেকে ৮৫০০ মাইল দূরে সান ফ্রান্সিসকোতে। তাতে কি প্রেম তো আর দূরত্ব বোঝে না। তাই কয়েক মাসের জানাশোনার পর ডগ সিদ্ধান্ত নেন তিনিই একটি ফ্লাইট ধরে চলে আসবেন লন্ডনের লিডস-এ। সেখানে সাক্ষাতকার করবেন তার নতুন প্রেমিকার সঙ্গে। সত্যি তিনি চলে আসেন। তাকে দেখার পর প্রথম অনুভূতি সম্পর্কে আভালান বলেছেন, তাকে দেখামাত্র আমি প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। ওই সময়েই এক ট্রিপে যান তারা এবং সে সময়েই তারা প্রথম যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। আভালান বলেন, তখন আমার বয়স ছিল ১৭ বছর। আইনগতভাবে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বয়স হতে হয় ১৬। সুতরাং আমি ডগের সঙ্গে যে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছি তা পুরোপুরি বৈধ। নিজেদের যৌন জীবন সম্পর্কে আভালান বলেন, যখন আমরা একে অন্যের কাছে আসি তখন তা হয়ে ওঠে অসীম আনন্দের। তাকে নিয়ে আমি খুশি। তাদের মধ্যে এই যৌন সম্পর্ক এখন অব্যাহত রয়েছে। প্রতি মাসেই তাদের সাক্ষাত হয়। হয়তো ডগ ট্রেসার ছুটে আসেন লিডসে তার প্রেমিকার কাছে। না হয় আভালান ছুটে যান সান ফ্রান্সিকোতে। এভাবেই চলছে দু’বছর। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আভালান। এক রাতে ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাত করাতে ডগকে ক্যাম্পাসে নিয়ে গিয়েছেন তিনি।

মোসাদ যেভাবে গুপ্তহত্যা চালায় by মাহমুদ ফেরদৌস

মালয়েশিয়ায় এক ফিলিস্তিনি বিজ্ঞানীর হত্যাকাণ্ডের ফলে ইসরাইলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের গুপ্তহত্যার প্রবণতা নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। ৩৫ বছর বয়সী বিজ্ঞানী ফাদি আল-বাতশ বসবাস করতেন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে। গাজায় তড়িৎ প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করার পর মালয়েশিয়ায় একই বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও জ্বালানি সিস্টেম ছিল তার বিশেষত্ত্ব। এই বিষয়ে তিনি বেশ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছেন।
গাজার শাসক হামাস বলেছে, আল বাতশ ছিলেন তাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সংস্থাটি শনিবারের ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরাইলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদকে দায়ী করে।
বাতশকে ‘বিশ্বস্ত সদস্য’ আখ্যা দিয়ে হামাস বলেছে, তিনি ছিলেন একজন ফিলিস্তিনি বিজ্ঞানী। তিনি জ্বালানি বিষয়ে আন্তর্জাতিক অনেক ফোরামে অংশ নিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বক্তব্যে আল বাতশের পিতা বলেন, তার সন্দেহ মোসাদই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তিনি মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের আহ্বান জানান।
ইসরাইলি গুপ্তচর সংস্থা নিয়ে দেশটির শীর্ষস্থানীয় একজন বিশেষজ্ঞ হলেন রনেন বার্গম্যান। তিনি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। সম্প্রতি তার লেখা বই ‘রাইজ অ্যান্ড কিল ফার্স্ট’ বেশ আলোচিত হয়েছে।
রনেন বার্গম্যান বলেন, আল বাতশের হত্যাকাণ্ড একটি মোসাদ অপারেশন হওয়ার সমস্ত বৈশিষ্ট্যই বহন করছে। তিনি বলেন, ‘ঘাতকরা একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করে তাদের টার্গেটকে হত্যা করে। মোসাদ বহু অভিযানে এভাবে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছে। ইসরাইল থেকে বহু দূরে একেবারে নিখাদ পেশাদারী কায়দায় হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। পুরো বিষয়টিই মোসাদের জড়িত থাকার দিকে নির্দেশ করে।’
টার্গেট বাছাই করা
ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা যখন কোনো টার্গেটকে হত্যার জন্য বাছাই করে, তখন সেই প্রক্রিয়া বেশ কয়েক ধাপে অনুমোদিত হতে হয়। মোসাদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ছাড়াও, সামগ্রিক ইসরাইলি গোয়েন্দা সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকেন। মাঝে-মধ্যে হত্যার জন্য কাউকে বাছাই করার কাজ ইসরাইলের ঘরোয়া ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাও করে থাকে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আল বাতশকে টার্গেট হিসেবে বাছাই করার কাজ ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর কোনো ইউনিট বা অন্য গোয়েন্দা সংস্থাও করে থাকতে পারে। হামাসকে অনুসরণ করা যেসব ইউনিটের কাজ, তাদের সাধারণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার সময় আল বাতশ নজরে এসে থাকতে পারেন। আবার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসরাইলি গুপ্তচর তৎপরতা ও গোয়েন্দাচক্রের মাধ্যমেও আল বাতশ চিহ্নিত হতে পারেন।
কিছু সূত্র জানিয়েছে, গাজা থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল ও বৈরুতে যেসব যোগাযোগ হয়, তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ফলে আল-বাতশকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এসব চ্যানেলের মাধ্যমেও হতে পারে। আল বাতশের বন্ধুরা জানান, তার সঙ্গে যে হামাসের সম্পৃক্ততা আছে, তা তিনি কখনও লুকানোর চেষ্টা করেননি। এক বন্ধু বলেন, তার সঙ্গে হামাসের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় জানে।
হত্যাকাণ্ডের প্রক্রিয়া
আল বাতশ যখন প্রাথমিক টার্গেট হিসেবে বাছাই হয়ে গেলেন, মোসাদ হয়তো এরপর তাকে হত্যা করা প্রয়োজন কিনা, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সংগ্রহে থাকা গোয়েন্দা তথ্য যাচাই-বাছাই করবে। হত্যা করা প্রয়োজন হলে, কোথায় তাকে হত্যা করা যায়, এবং হত্যা করার সেরা উপায় কী, তা নিয়ে আলাপ চলে।
মোসাদের বিশেষায়িত ইউনিট টার্গেটের ফাইল পড়া শেষ করলে, নিজেদের গবেষণার ফলাফল ইন্টিলিজেন্স সার্ভিস কমিটির প্রধানদের কাছে তুলে ধরা হয়। এই কমিটিতে রয়েছেন ইসরাইলের সকল গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। হিব্রুতে এই কমিটিকে বলা হয় ভার্শ। ভার্শ তারপর সম্ভাব্য অপারেশন নিয়ে আলাপ করবে। নতুন পরামর্শ ও তথ্য সরবরাহ করবে। তবে অপারেশন অনুমোদন দেয়ার আইনি কর্তৃত্ব এই কমিটির নেই।
শুধুমাত্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীই এই অনুমোদন দিতে পারেন। রনেন বার্গম্যান বলেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীরা সাধারণত রাজনৈতিক কারণে একাই এই সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি বলেন, ‘প্রায়ই দেখা গেছে যে প্রধানমন্ত্রী এই সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় এক বা একাধিক মন্ত্রীকে জড়িয়েছেন। প্রায়ই প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই দুই একজন মন্ত্রীর মধ্যে থাকেন।’
অনুমতি পাওয়ার পর, এই অপারেশন ফিরে যায় মোসাদের কাছে। শুরু হয় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কাজ। টার্গেট বিশেষে এজন্য কয়েক সপ্তাহ, মাস এমনকি বছরও লেগে যেতে পারে।
সিজারিয়া ইউনিট
মোসাদের অভ্যন্তরে সিজারিয়া ইউনিট হলো গোপন একটি অপারেশনাল শাখা। এই ইউনিটের দায়িত্ব হলো, বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে আরব দেশগুলোতে গুপ্তচর বসানো ও তাদের পরিচালনা করা। এই ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয় সত্তরের দশকের শুরুর দিকে। এই ইউনিটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাইক হারারি, যিনি কিনা পরে বেশ নাম কামিয়েছিলেন।
সিজারিয়া আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে বেশ বড়সড় একটি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ টার্গেটের ওপর তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি করা হয়।
মাইক হারারি সিজারিয়ার সবচেয়ে বিধ্বংসী ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হিব্রুতে এই ইউনিটের নাম ছিল কিদন (ইংরেজিতে বেয়নট)। এই ইউনিটের সদস্যরা ছিলেন পেশাদার খুনি, যারা গোপন হত্যাকাণ্ড ও নাশকতামূলক অভিযান পরিচালনায় অভিজ্ঞ ছিলেন। প্রায়ই ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখা, যেমন সেনাবাহিনী ও সেপশাল ফোর্স থেকে সদস্য নিয়ে থাকে কিদন। বিভিন্ন সূত্র আল-জাজিরাকে বলা হয়েছে, সম্ভাবনা বেশি যে এই কিদন ইউনিটের সদস্যরাই কুয়ালালামপুরে আল-বাতশকে হত্যা করেছেন।
উল্লেখ্য, মোসাদের বিভিন্ন ইউনিট শুধুমাত্র ফিলিস্তিনি নেতা ও কর্মীদেরই হত্যা করেনি। তাদের হাতে সিরিয়ান, লেবানিজ, ইরানি ও ইউরোপিয়ান অনেকেই খুন হয়েছেন।
টার্গেট করে চালানো হত্যার অভিযান
সিজারিয়াকে অনেকটা মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ’র সেপশাল এক্টিভিটিজ সেন্টার (এসএসি)-এর সমতুল্য ভাবা হয়। ২০১৬ সালে নাম পরিবর্তনের আগে এসএসি’র নাম ছিল সেপশাল অ্যাক্টিভিটিজ ডিভিশন।
সিআইএ তাদের টপ-সিক্রেট বা সর্বোচ্চ গোপনীয় হত্যাকাণ্ড বা আধাসামরিক অভিযান পরিচালনা করে সেপশাল অপারেশন গ্রুপের (এসওজি) মাধ্যমে। এসওজি হলো এসএসি’র একটি অংশ। এসওজি’র সঙ্গে মিল রয়েছে মোসাদের কিদনের।
রনেন বার্গম্যান তার বইয়ে লিখেছেন, ২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত, ইসরাইল ৫ শতাধিক গুপ্তহত্যার অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে মারা গেছে ১ হাজারেরও বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে টার্গেট যেমন আছেন, তেমনি আছেন পথচারী বা আশপাশের সাধারণ মানুষও। এ তো গেল ২০০০ সালের আগের হিসাব।
দ্বিতীয় ইন্তিফাদা চলার সময় ইসরাইল ১ হাজারেরও বেশি কিলিং মিশন পরিচালনা করে। এদের মধ্যে ১৬৮টি সফল হয়। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর ইসরাইল অন্তত ৮০০টি অপারেশন পরিচালনা করেছে। এগুলোর বেশির ভাগই ছিল গাজা ও বিদেশে অবস্থানরত হামাসের বেসামরিক ও সামরিক নেতাদেরকে হত্যার উদ্দেশ্যে। রনেন বার্গম্যান অসংখ্য দলিল দস্তাবেজ, মোসাদ ও ইসরাইলি সূত্রের বরাতে তার বইয়ে এই সংখ্যা দিয়েছেন।
আরব-মোসাদ সহযোগিতা
মোসাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক ও ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে বেশ কয়েকটি আরব গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো জর্দান ও মরক্কোর গোয়েন্দা সংস্থা।
অতি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে শত্রুতা ও মিত্রতার সংজ্ঞা বদলে গেছে। এছাড়া রাষ্ট্র নয় এমন গোষ্ঠীর হুমকিও বেড়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে, মোসাদ বেশ কয়েকটি আরব গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে কয়েকটি আরব উপসাগরীয় দেশ ও মিশর।
বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে অভিযান পরিচালনার জন্য জর্দানের রাজধানী আম্মানে মোসাদের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। ১৯৯৭ সালে আম্মানে হামাসের নেতা খালেদ মেশালকে তার কানে বিষ সেপ্র করে হত্যার চেষ্টা চালায় মোসাদ। তখন তৎকালীন জর্দানিয়ান বাদশাহ হোসেন হুমকি দেন, আম্মানে মোসাদের স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হবে। এই হুমকিতেই খোদ তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ওই বিষের অ্যান্টিডোট নিয়ে যান আম্মানে। ওই অ্যান্টিডোটেই প্রাণ বাঁচে খালেদ মেশালের।
তবে নিজের বইয়ে বার্গম্যান মোসাদ সূত্রকে উদ্ধৃত করে ওই ঘটনার এক ভিন্ন কাহিনীর অবতারণা করেছেন। তিনি দাবি করেন, খালেদ মেশালের ওপর হত্যাচেষ্টার পর জর্দানের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান সামি বাতিখি বেশ ক্ষুদ্ধ হন এজন্য যে, মোসাদ এই হত্যাচেষ্টার বিষয়ে আগে থেকে তাকে জানায়নি। তিনিও চেয়েছিলেন এই হত্যাপরিকল্পনায় সম্পৃক্ত থাকতে।
বার্গম্যানের গবেষণা অনুযায়ী, ষাটের দশক থেকে মোসাদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক রক্ষা করে চলছে মরক্কো। বার্গম্যান লিখেছেন, ‘ইসরাইল থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে মরক্কো। বিনিময়ে, দেশটির তৎকালীন বাদশাহ হাসান মরক্কোর ইহুদীদেরকে ইসরাইলে অভিবাসিত হওয়ার অনুমোদন দেন। পাশাপাশি, মোসাদ মরক্কোর রাজধানী রাবাতে একটি স্থায়ী স্টেশন স্থাপন করার অনুমতি পায়। সেখান থেকেই মোসাদ অন্যান্য আরব দেশে গোয়েন্দাগিরি করার সুযোগ পায়।’ এই সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় উঠে ১৯৬৫ সালে। সেবার রাবাতে অনুষ্ঠিত আরব লীগের সম্মেলন চলাকালে আরব রাষ্ট্রপ্রধান ও তাদের সামরিক কমান্ডারদের বৈঠককক্ষ ও ব্যক্তিগত কক্ষে রেকর্ডিং ডিভাইস রাখার সুযোগ দেয়া হয় মোসাদকে।
তৎকালীন সময়ে ওই সম্মেলন ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনটি ডাকার উদ্দেশ্য ছিল একটি যৌথ আরব সামরিক কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা। দুই বছর বাদেই ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে ইসরাইল। দখলে নিয়ে নেয় আল আকসা মসজিদ সমেত পূর্ব জেরুজালেম। যুদ্ধের প্রস্তুতির খবর আগেভাগে পেয়ে আরব দেশগুলোর আক্রমণের আগেই ইসরাইল ওই দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আক্রমণ করে সব ভেস্তে দেয়।
সিআইএ ও মোসাদের পদ্ধতি
হত্যা করার জন্য টার্গেট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মোসাদ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ব্যপক স্বাধীনতা ভোগ করে। কিন্তু আমেরিকার সিআইএ’কে এসব ক্ষেত্রে একাধিক ধাপের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব ধাপে সিআইএ’র আইনি উপদেষ্টার কার্যালয়, মার্কিন বিচার মন্ত্রণালয় ও হোয়াইট হাউজের আইনি উপদেষ্টার কার্যালয়কে সম্পৃক্ত করতে হয়। টার্গেটকে হত্যার ক্ষেত্রে সর্বশেষ প্রেসিডেন্সিয়াল ফাইন্ডিং অথরাইজেশনের প্রয়োজন হয় সিআইএ’র। এই অথরাইজেশন বা অনুমতিপত্র হলো একটি আইনি নথি যা সিআইএ’র আইনি উপদেষ্টার কার্যালয় ও বিচার মন্ত্রণালয় একসঙ্গে তৈরি করে থাকে।
প্রেসিডেন্সিয়াল ফাইন্ডিং অথরাইজেশনে প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করার আগে নানাবিধ সংস্থার পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়নের সুযোগ থাকে। এসব মূল্যায়নে জড়িত থাকেন মূলত বিচার মন্ত্রণালয়, সিআইএ ও হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরা। ধারণা করা হয় যে, বারাক ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এমন ৩৫৩টি হত্যাকাণ্ডের অভিযানে অনুমোদন দিয়েছিলেন। তবে এগুলোর বেশির ভাগ ড্রোন হামলার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। তার পূর্বসূরি জর্জ ডব্লিউ বুশ দিয়েছিলেন ৪৮টি।
আইনি প্রক্রিয়া
একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সিআইএ কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘কাকে হত্যা করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত সিআইএ নেয় না।’ তিনি বলেন, ‘সিআইএ কাউকে খারাপ মনে করলেই তাকে হত্যা করতে পারে না। যেই আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, তার কারণে এটি করা খুব কঠিন।’ সিআইএ’র বেশির ভাগ টার্গেট করে চালানো হত্যার অপারেশন ছিল মূলত ড্রোন হামলা। এর ভিত্তি ছিল প্রেসিডেন্টের অনুমতি।
সিআইএ’র সাবেক কর্মকর্তা রবার্ট বাএর বলেন, ‘যে কোনো টার্গেটেড কিলিং অপারেশনে অবশ্যই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর থাকতে হয়। টার্গেট যদি হয় উঁচু মাপের কেউ, তাহলে তো কথাই নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো, যদি এ ধরনের অভিযান কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে বা যুদ্ধ চলার সময় চালাতে হয়। এসব ক্ষেত্রে ফিল্ড অফিসাররা অনেক স্বাধীনতা ভোগ করেন।’
অপরদিকে মোসাদে, কোনো টার্গেটকে হত্যার ক্ষেত্রে সিআইএ’র মতো অত আইনি বিধিনিষেধ নেই। মোসাদের ক্ষেত্রে বাএর বলেন, ‘এটা তাদের জাতীয় নীতি।’
(আল-জাজিরায় প্রকাশিত সাংবাদিক আলী ইউনেসের ‘হাউ মোসাদ ক্যারিজ আউট ইটস অ্যাসাসিনেশন্স’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ।)

পার্কে নিরাপদ নন প্রেমিকযুগল by মারুফ কিবরিয়া

যান্ত্রিক শহরে ব্যস্ত সবাই। জীবনের জন্য রাত-দিন যুদ্ধ। তারপর সুযোগ পেলে কেউ কেউ কিছু সময় প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটাতে চান। ছুটে যান কোলাহলমুক্ত ও সবুজে ঘেরা কোনো পার্ক বা উদ্যানে। বিশেষ করে প্রেমিকযুগলদের পছন্দ পার্ক। কিন্তু পার্ক বা বিনোদনকেন্দ্রে এসে অনেককেই মুখোমুখি হতে হয় উটকো ঝামেলার। স্বস্তির নয় বরং বিরক্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় তাদের। ঘটে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনাও। আর এসব অপকর্মের বেশির ভাগই হয় ভবঘুরে কিশোর-তরুণদের মাধ্যমে। পাশাপাশি পার্কে আছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রাজধানীর বোটানিক্যাল গার্ডেন, রমনা পার্ক,  চন্দ্রিমা উদ্যানে ঘুরে একাধিক দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া যায়।
শুক্রবার ছুটির দিন। তাই প্রমা ও তার প্রেমিক শিহাব যান বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সকাল থেকেই দু’জন বসে উদ্যানের একটি নিরিবিলি স্থানে গল্প করছিলেন। ঘড়ির কাঁটায় বেলা ১১টা, তখনই এক উটকো ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয় প্রমা-শিহাবকে। গল্প করার ফাঁকে এক চা বিক্রেতা এসে হাজির। শিহাবকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞাস করলেন, ‘মামা চা দেবো’। শিহাব বললেন ‘না লাগবে না’। আবার একই প্রশ্ন মামা দু’জন এক কাপ চা নেন? এবার খানিকটা রাগের সঙ্গে শিহাব বললেন, বলেছি তো লাগবে না। বারবার কেন চায়ের কথা বলছেন? এরপর ওই চা হকার চটে বসলেন। বললেন ‘চা দিসি, বিলটা দ্রুত দেন। চইলা যাই’। শিহাব-প্রমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। চা পান করেনি অথচ বিল দিতে হবে। এ সময় চা বিক্রেতার সঙ্গে আরো কয়েকজন তরুণ এসে হাজির। তারা জানতে চাইলো কি হয়েছে। শিহাব তাদের বিষয়টা জানানোর পর, ওই তরুণরা হকারের পক্ষ নিয়ে বললো, ওই মামা তোমার চায়ের দাম কত? বললো, দুই কাপ চা ত্রিশ টাকা। এ কী! এবার আরো অবাক হলেন শিহাব-প্রমা। চা পান করেননি। তারওপর বিল দিতে হবে। আবার এত দাম! বিষয়টি নিয়ে শিহাব প্রতিবাদ করতে চাইলে প্রমার অনুরোধে ত্রিশ টাকা দিয়ে কোনো মতে উদ্যান থেকে বেরিয়ে এলেন। শিহাব বলেন, আগে জানতাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে কোনো হকার থাকে না। নিরাপদ জেনেই এসেছিলাম। কিন্তু এরা কিভাবে কার মাধ্যমে ঢুকেছে তা জানি না। উদ্যানের বাইরে এসে জানতে পারি, উদ্যানেরই লোকজন এসব হকার প্রবেশে সহায়তা করে। তাদের আর কিছু ছেলে আছে যারা প্রেমিকযুগল দেখলেই বিরক্ত করে। আর আশপাশে ঘুরঘুর করে। প্রমা শিহাবের মতোই ছুটির দিনে বেড়াতে এসেছিলেন সাইদ ও তার প্রেমিকা নওরীন। তবে তাদের হয়রানির ধরনটা ভিন্ন। বোটানিক্যাল গার্ডেনের একটি গাছতলায় বসা ছিলেন এই প্রেমিকযুগল। হঠাৎ করেই এক কিশোর এসে পা জড়িয়ে ধরলো সাইদের। বললো কিছু খাবে কয়টা টাকার দরকার। সাইদ সহানুভূতি দেখিয়ে ১০টাকা পকেট থেকে বের করে দিলেন। কিন্তু তাতে যেন মন ভরেনি ওই কিশোরের। চেয়ে বসলো একশ’ টাকা। তাতেই সন্দেহ হয় সাইদের। তিনি টাকা না দিয়ে চলে যেতে বললেন কিশোরটিকে। কিন্তু যাবে না সে। এরই মধ্যে ওর সঙ্গে যোগ দিয়েছে আরো কয়েকজন। তারা ঘিরে ফেললো এই প্রেমিকযুগলকে। এবার টাকা দিতেই হবে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে একশ’ টাকা বের করে দিয়ে উদ্যান থেকে বেরিয়ে এলেন সাইদ ও নওরীন। নওরীন বলেন, এমন ভয়াবহ অবস্থার সামনে কখনো পড়িনি। একটু ভালো সময় কাটাবো বলে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে দেখি দিনে দুপুরে ছিনতাই করে। দুপুর ১টা। আরিফ ও সোহানা উত্তরা থেকে আসেন চন্দ্রিমা উদ্যানে। উদ্যানের ভেতরে জিয়াউর রহমানের মাজারের পেছনেই একটি টুলের ওপর বসেছিলেন তারা। দু’জনের গল্পের মাঝে-মধ্যেই তিন তরুণের একটি দল আশপাশে ঘুর ঘুর করছে। একপর্যায়ে তাদের ইঙ্গিত করে আজেবাজে কথাও শুরু করেছে। জবাব দিতেই এগিয়ে যান আরিফ। ওই তরুণদের বলেন, কি ব্যাপার ডিস্টার্ব করছেন কেন? এ কথা বলতেই অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দিতে থাকে তারা। একপর্যায়ে হাতাহাতিও শুরু হয়। কিন্তু আরিফ একা থাকায় তাদের কাছ থেকে রেহাই পেতে দ্রুত উদ্যান থেকে বেরিয়ে আসেন সোহানাকে নিয়ে। পরে উদ্যানের গেটে থাকা পুলিশ সদস্যদের কাছে বিষয়টি অবহিত করেন। তারা আরিফকে জানান, এমন তো হওয়ার কথা না। আচ্ছা ঠিক আছে আপনারা চলে যান আমরা দেখছি। আরিফের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, উদ্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকলেও ওই পুলিশ সদস্যরা মূল ফটকেই বসে থাকেন। ভেতরে কি হয় তার খবরও রাখেন না।
এ বিষয়ে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, এখানে যারা বেড়াতে আসেন তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে। কোনো ঝামেলা হলেই আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিই।
প্রেমিকযুগলরা নিরাপত্তা পান না স্বয়ং রমনা পার্কে এসেও। এত নিরাপত্তাকর্মী আর পুলিশের আনাগোনা থাকলেও হকার আর বেপরোয়া তরুণ-কিশোরদের উৎপাতে কেউ ঠিকমতো বসতে পারেন না সেখানে। রমনা পার্কের ভেতরে দুপুর দুইটার দিকে বসে গল্প করছিলেন এক প্রেমিকযুগল। হঠাৎ তাদের মাথার ওপর থাকা একটি গাছ থেকে ঢাল পড়ে। প্রথমে ভেবেছিলেন আপনা-আপনি ভেঙে পড়েছে। কিন্তু না, কিছুক্ষণ পর আরেকটি ঢাল তাদের সামনে পড়ে। উপরে তাকিয়ে দেখেন একটি কিশোর ছেলে কাজটি করছে। প্রতিবাদ করায় গাছ থেকে নেমে আসে সে। একপর্যায়ে আরো দু’জন এসে ওই কিশোরের সঙ্গে যোগ দেয়। দুই পক্ষের মাঝে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরে মধ্যস্থতা করতে আসে আরেক যুবক। এ সময় ওই প্রেমিকযুগল বুঝতে পারেন পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। আর সেটা বুঝেই স্থান ত্যাগ করে বেরিয়ে যান পার্ক থেকে। প্রেমিকজুটির একজনের নাম ইশহাক এবং মেয়েটির নাম মীম। মীম জানান, প্রায়ই পার্কে ঘুরতে আসেন তারা। কোনোদিন বাদামওয়ালা, কোনোদিন চা-ওয়ালা  আর নয়তো কিশোর-তরুণরা এসে ঝামেলা পাকায়। এসব নিয়ে কেউ কিছুই বলে না। নিরাপত্তাকর্মীরা এসব দেখেও না দেখার মতো থাকে। বিষয়টি নিয়ে পার্কের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সোহাগ নামে এক নিরাপত্তাকর্মীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা আমাদের চোখে খুব একটা পড়ে না। আর ধরা পড়া মাত্রই আমরা কোনো না কোনো ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে তুরুপের তাস মাহাথির

বেশিরভাগ মানুষ ৯২ বছর বয়সে অবসর ভোগ করেন। তবে মালয়েশিয়ার প্রবীণ নেতা মাহাথির মোহাম্মদ ফিরেছেন নির্বাচনী প্রচারাভিযানে। বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেলেঙ্কারিতে বিধ্বস্ত প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে। তবে ৬ দশক ধরে মালয়েশিয়া শাসন করা জোট সরকারের বিরুদ্ধে তার জয়ের সম্ভাবনা কম। এরপরও অঘটন ঘটিয়ে যদি তিনি নিজের সাবেক শিষ্য নাজিব রাজাককে হটিয়ে বিজয়ী হয়েই যান, তবে তিনিই হবেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রধানমন্ত্রী। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। খবরে বলা হয়, ২২ বছর ধরে শক্ত হাতে মালয়েশিয়া শাসন করেছিলেন মাহাথির। তবে রাজনীতির পহেলা সারিতে মাহাথিরের প্রত্যাবর্তনকে বেশ নাটকীয়ই বলা চলে। বেশিদিন হয়নি প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ১এমডিবি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। আর তাতে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান মাহাথির। এর মাধ্যমেই যেন রাজনীতিতে পুনর্জন্ম হলো তার। তবে তার এই রাজনৈতিক ‘ডিগবাজি’ কয়েক বছর আগেও অচিন্তনীয় ছিল। তিনি বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়ে সেসব দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন যাদেরকে তিনি শাসক থাকাকালে দমন করেছেন। অপরদিকে যে দলের নেতৃত্বে ছিলেন বহুবছর, সেই দলের বিরুদ্ধেই প্রার্থী হয়েছেন।
বিরোধী পক্ষের জন্যও মাহাথিরকে প্রার্থী করা বাজি ধরার সমতুল্য। কারণ, দেশটিতে তিনি আর ঐক্যের প্রতীক নন। কেউ পছন্দ করেন, কেউ করেন না।
মুসলিম মালয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর অগ্রদূত ও আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক হিসেবে অনেকে তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার তখনকার দরিদ্র্য দেশকে তুলনামূলক সম্পদশালী দেশে পরিণত করার নেপথ্যে তাকে প্রায়ই কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তবে তিনি অনেকের কাছে একনায়ক হিসেবে পরিচিত, যিনি কিনা মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে বিচার বিভাগকে অবজ্ঞা করেছেন, বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জেলে পুরেছেন। পাশাপাশি, বহু সম্প্রদায়ের দেশটিতে তার বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে জাতিগত বিভেদও বেড়েছিল।
প্রতিপক্ষদের ব্যাপারে খুবই ধারালো বক্তব্য ব্যবহার করেন তিনি। কথিত পশ্চিমা নও-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে তিনি কড়া ভাষায় কথা বলতেন। একবার তিনি ইউরোপিয়ানদেরকে বলেছিলেন, লোভী, যুদ্ধপ্রিয় যৌনবিপথগামী হিসেবে। নেতা হিসেবে মাহাথিরের কিছু দুর্বলতা থাকলেও ‘আশার জোট’ বলে পরিচিত বিরোধী শিবির মনে করে, প্রত্যন্ত মালয় জনগোষ্ঠির সঙ্গে এখনও তার সংযোগ রয়েছে। এ কারণে নির্বাচনে তিনিই হবেন তুরুপের তাস।
শুক্রবার সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নাজিব। আগামী নির্বাচন সপ্তাহ কয়েকের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধী দলগুলোর প্রত্যাশা, মাহাথিরের কারণে শাসক জোট বারিসান নাশনালের কিছু মালয় ভোট তারা পাবে। এই ভোট বিরোধী জোটের সমর্থক, যেমন, শহুরে ভোটার ও সংখ্যালঘু (বিশেষ করে জাতিগত চীনা) ভোটের সঙ্গে যোগ হলে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। বেসরকারী নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান মার্দেকা সেন্টারের প্রধান ইব্রাহিম সুফিয়ান বলেন, ‘মাহাথিরকে জোটে নিয়ে বিরোধী দল কিছু মালয় সমর্থন ঘরে তুলবে। প্রশ্নটা হলো, কতটা? তবে আমি মনে করি, তারা অত সাফল্য পাবে না।’
ক্ষমতার ওপর সরকারি দল বিএন’র নিয়ন্ত্রণকে সংহত বলা চলে। এছাড়া সমালোচকরা মনে করেন, নির্বাচনী সীমানা পুনঃনির্ধারণের এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ক্ষমতার ভারকেন্দ্র ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ঠেলে দেবে। ফলে পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হবে বিরোধী শিবিরের জন্য। মাহাথিরের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো তারই সাবেক রাজনৈতিক চিরশত্রু আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার সবকিছু মিটমাট হয়ে যাওয়াটা। ১৯৯৮ সালে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জেরে আনোয়ারকে দল থেকে বহিষ্কার করেন মাহাথির। বহিষ্কারের আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন মাহাথিরের রাজনৈতিক উত্তরসূরি। বহিষ্কারের পর তাকে সমকামিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে কারান্তরীন করা হয়। ৬ বছর জেল খেটে আনোয়ার যখন মুক্তি পান, তখন তার নেতৃত্বে ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিরোধী জোট তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো ফল করে। তবে ২০১৫ সালে ফের নাজিব রাজাকের সরকার তাকে জেলে ঢুকায়। মাহাথির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে আনোয়ার মুক্তি পাওয়ার পর তার হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
মূলত, প্রধানমন্ত্রী রাজাকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ১এমডিবি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠলে অবসর ভেঙ্গে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার ঘোষণা দেন মাহাথির। রাজাকই ওই তহবিল গঠন করেছিলেন। তার দাবি তিনি কোনো অন্যায় করেন নি। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে মাহাথির ছিলেন পেশায় একজন ডাক্তার। তাকে এখনও ডাক্তার এম বলে ডাকা হয়। ১৯৬৪ সালে মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের সংসদ সদস্য হয়ে তার রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৮১ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।

বাংলাদেশের 'অপ্রত্যাশিত' সমৃদ্ধির নেপথ্যে: ভারতীয় অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে

অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অর্থনীতির ছাত্ররা 'বাংলাদেশ প্যারাডক্স' কথাটার সঙ্গে পরিচিত। বিশ্বের অনেক অর্থনীতিবিদ এর আগে এই ধাঁধাঁর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
কিভাবে 'তলাবিহীন ঝুড়ির' তকমা ঝেড়ে বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট অগ্রগতি অর্জন করেছে, সেই 'ধাঁধাঁর' উত্তর তারা দেয়ার চেষ্টা করেছেন নানা তত্ত্বে।
'হোয়াই ইজ বাংলাদেশ বুমিং' নামে একটি লেখায় এবার অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুও বাংলাদেশের সমৃদ্ধির রহস্য উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন।
কৌশিক বসু বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা অর্থনীতিবিদদের একজন । জন্ম কলকাতায়। বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক।
'চমকপ্রদ এবং অপ্রত্যাশিত'
তাঁর ভাষায় বাংলাদেশ এখন এশিয়ার সবচেয়ে 'চমকপ্রদ এবং অপ্রত্যাশিত' সাফল্যের কাহিনীগুলোর একটি। 'হোয়াই ইজ বাংলাদেশ বুমিং'' নামে তাঁর লেখাটি গতকাল প্রকাশ করেছে 'প্রজেক্ট সিন্ডিকেট' নামের একটি ওয়েবসাইট।
সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে একসময়ের দারিদ্র আর দুর্ভিক্ষ-পীড়িত এই দেশটি এখন শুধু পাকিস্তানকেই নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতকেও ছাড়িয়ে যেতে চলেছে।
কৌশিক বসুর মতে, মাত্র ১২ বছর আগে ২০০৬ সালেও বাংলাদেশের ভবিষ্যত এতটাই হতাশাচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল যে, সে বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন পাকিস্তানেরটা ছাড়িয়ে গেল, তখন সেটিকে একটি 'অঘটন' বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু সেই বছরটাই ছিল আসলে বাংলাদেশের 'টার্নিং পয়েন্ট', বলছেন কৌশিক বসু।
"২০০৬ সাল হতে পরবর্তী প্রতিটি বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল পাকিস্তানের চেয়ে মোটামুটি আড়াই শতাংশ বেশি। আর এ বছরতো এটি ভারতের প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।"
তবে এটি ভারতের অর্থনীতির শ্লথগতির কারণেই ঘটবে বলে তিনি মনে করেন।
কীভাবে সম্ভব হলো?
বাংলাদেশ কীভাবে এই অসাধারণ কাজটি করলো, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন কৌশিক বসু। তিনি স্বীকার করছেন যে এর কোন সুনির্দিষ্ট উত্তর কারও কাছে নেই, কারণ এ ধরণের ব্যাপক ঐতিহাসিক বিষয়ে সেটা থাকেও না। কিছু 'ক্লু' বা সূত্র খোঁজা যেতে পারে মাত্র।
কৌশিক বসুর মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পালাবদলের পেছনে বড় ভূমিকাটি পালন করেছে সামাজিক পরিবর্তন - বিশেষ করে সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন।
এক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্রাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার কথা। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকারও নারী শিক্ষার প্রসার এবং সমাজে মেয়েদের ভূমিকা জোরালো করতে ব্যাপক ভূমিকা নিয়েছে।
কৌশিক বসু বলছেন, এর ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু পৌঁছে গেছে ৭২ বছর, যেখানে ভারতে তা ৬৮ বছর এবং পাকিস্তানে ৬৬ বছর।বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পালাবদলে কৌশিক বসু দ্বিতীয় যে কারণটির কথা উল্লেখ করছেন, সেটি গার্মেন্টস শিল্প। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ যে ভারতের তুলনায় গার্মেন্টস শিল্পে অনেক বেশি ভালো করেছে, এর পেছনে অনেক কারণ আছে। তবে একটি কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের শ্রম আইন।
তার মতে ভারত এবং পাকিস্তানের যে শ্রম আইন, তা নানাভাবে এই দুই দেশের কারখানা মালিকদের শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। এর ফলে এসব দেশের কারখানাগুলো খুব বড় আকারে করা যায়নি, সেখানে বেশি সংখ্যায় শ্রমিকও নিয়োগ করা যায়নি।
কিন্তু বাংলাদেশে এরকম কোন আইনের অনুপস্থিতি বড় বড় গার্মেন্টস শিল্প স্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
কিন্তু বাংলাদেশ কি তার এই সাফল্য ধরে রাখতে পারবে?
কৌশিক বসু বলছেন, এখনো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। কিন্তু কিছু ঝুঁকির কথা তিনি উল্লেখ করছেন, যা নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এখনই সচেতন হওয়া দরকার।
তাঁর মতে, যখন কোন দেশের অর্থনীতি ভালো করতে থাকে, তখন সেদেশে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য - এসবও বাড়তে থাকে। যদি এসবের রাশ টেনে ধরা না যায়, তা সমৃদ্ধির গতি থামিয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও কোন ব্যতিক্রম নয়।
তবে তাঁর মতে এর চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো কট্টর ধর্মীয় এবং সামাজিক রক্ষণশীল শক্তি। এরা প্রগতিশীল সামাজিক খাতে বাংলাদেশের যে বিনিয়োগ, তার বিপক্ষে।
যদি বাংলাদেশ এই বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়, সেটি বাংলাদেশকে আবার অনেক পেছনে নিয়ে যাবে। কিভাবে ইতিহাসে এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে তার কিছু নজির তিনি টেনেছেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন হাজার বছর আগে যে বিশাল আরব খেলাফত বিরাট এক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। কিভাবে দামেস্ক আর বাগদাদের মতো নগরী হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতি, গবেষণা আর নতুন আবিস্কারের এক বিশ্ব কেন্দ্র।
তবে কৌশিক বসু একেবারে সাম্প্রতিককালের নজিরও দিয়েছেন। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের কাহিনীও একই। স্বাধীনতার পরের বছরগুলোতে পাকিস্তানের অর্থনীতি ভারতের চেয়ে ভালো করছিল। ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ছিল বেশি। সেসময় লাহোরের মত নগরী হয়ে উঠেছিল শিল্প-সাহিত্যের এক বহুমাত্রিক কেন্দ্র। কিন্তু তারপর এলো সামরিক শাসন। ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ। উত্থান ঘটলো ইসলামী জঙ্গীবাদের। ২০০৫ সাল নাগাদ ভারত সব দিক দিয়েই ছাড়িয়ে গেল পাকিস্তানকে।
ভারতও এখন এই বিপদের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন কৌশিক বসু। তিনি বলছেন, কয়েক বছর আগেও 'সেকুলার গণতন্ত্র' বলে পরিচিত ভারতের অর্থনীতি বাড়ছিল ৮ শতাংশ হারে। কিন্তু সেখানে হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থান, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এবং নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য এখন উচ্চ শিক্ষা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান গবেষণা - সবকিছুকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এসব উদাহারণ থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে। বলছেন কৌশিক বসু।
যদি বাংলাদেশ এই ধর্মীয় মৌলবাদ রুখে দিতে পারে, তাঁর মতে বাংলাদেশ হবে এশিয়ার এমন এক 'সাফল্য কাহিনী', যা দুই দশক আগেও ছিল অকল্পনীয়।
সূত্রঃ বিবিসি

চার নেতার মুখে কোটা আন্দোলনের নেপথ্য কথা by ফররুখ মাহমুদ

বেনজির এক ছাত্র বিক্ষোভ। স্বতঃস্ফূর্ত। লাখ লাখ ছাত্রের জমায়েত। ছিল না সুনির্দিষ্ট কোনো নেতৃত্ব। আন্দোলনের ফল অবশ্য এখনো পরিষ্কার নয়।  শুরুতে ছাত্রলীগ এ আন্দোলনে তেমন কোনো বাধা না দিলেও এখন এই সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে নানামুখী নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন কোটা আন্দোলনে যুক্তরা। হুমকি আর ভয়ভীতির মধ্যে দিন কাটছে আন্দোলনের নেতাদের। তিন নেতাকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে ছেড়েও দিয়েছে। কিন্তু এ ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন তারা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- কীভাবে গড়ে উঠলো এই আন্দোলন। আন্দোলনের মঞ্চ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের চার নেতার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছে মানজমিন। পেছনের দিনের ঘটনার বয়ানের পাশাপাশি তারা কথা বলেছেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে।
আন্দোলনকারীদের সমন্বয়ক হাসান আল মামুন বলেন, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই আলোচনা শুরু করলেও প্রথম জমায়েত হই ১৭ই ফেব্রুয়ারি। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খানের কোটা নিয়ে বক্তব্য শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পেজে শেয়ার হয়। এরপর থেকেই মূলত আলোচনা করতে থাকে শিক্ষার্থীরা। ১৭ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও পাবলিক লাইব্রেরি থেকে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে শাহবাগে যায়। মানববন্ধন করবে। কিন্তু পুলিশ বাধা দেয়। পরে রাজু ভাস্কর্যে মানববন্ধন করি। তিনি বলেন, আন্দোলনে অর্থ সহায়তা আসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। যারা লাইব্রেরিতে পড়ে এবং গ্রুপে যারা আছে তারা ৫ টাকা, ১০ টাকা দিয়ে সহায়তা করে। ওই টাকা দিয়ে ব্যানার করি। পুরো আন্দোলনটা এভাবেই পরিচালনা করি। মামুন বলেন, মানববন্ধনের পর আমরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে সভা করি। ৪/৫ জন ছিল। পরে কমিটি হয়। কমিটি করার সময় আমরা সতর্ক থেকেছি যেন জামায়াত-শিবিরের কেউ না ঢুকে পড়ে। কারণ আমরা জানতাম এক সময় আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এভাবে ব্লেইম দেবে। প্রথমদিকে ছাত্রলীগ থেকে সমর্থন দেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির দিন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতা হঠাৎ করে লাইব্রেরির সামনে বাধা দেয়। আমাকে মধুর ক্যান্টিনে নিয়ে যায়। বলা হয়, নেত্রী তো দাবি মেনেই নিছে। আবার আন্দোলন কেন? শূন্য পদ থেকে তো মেধাবীদের নিয়োগ দেয়া হবে। নেত্রীর আশ্বাসে আমরা শান্ত হই। হঠাৎ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো, শূন্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটাধারীদের প্রাধান্য দেয়া হবে। কোটাধারীদের মধ্য থেকে পাওয়া না গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে নেয়া হবে। পরে আমরা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করি। প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেই। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনি। আমরা সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করি এটা সময়ের দাবি। এটা প্রয়োজন। মামুন আরো বলেন, এরপর হাইকোর্টের মোড়ে পুলিশ আমাদের ওপর টিয়ারশেল মারে। আমরা একটা ইটও ছুড়িনি। একটা গাছের পাতাও ছিঁড়িনি। ৮ই এপ্রিল শাহবাগ মোড়ে বসার পেছনে একটা কারণ ছিল। সেদিন জাতীয় সংসদের অধিবেশন ছিল। আমরা চেয়েছি সেখানে এ বিষয়টি উঠুক। সবাই আলোচনা করুক। আমাদের একটা আশ্বাস দিক। কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গেও আলোচনা করি। সংসদে উপস্থাপনের জন্য বলি। কিন্তু তারা করেননি। পুলিশকে বলেছি, আমাদের আশ্বাস দেয়া হোক। কোটা সংস্কার করা হবে। এর মধ্যে আমরা অ্যাম্বুলেন্সসহ রোগীদের গাড়ি পারাপারের সুযোগ দেই। পরে সাড়ে ৭টার পর পুলিশ অ্যাটাক করলো। এমন ভাবে করলো ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমি ১০০টি রাবার বুলেট সংগ্রহ করি যেগুলো বিস্ফোরিত হয়নি। তিনি বলেন, আমরা এখন নিরাপদ নই। আমাদের নামে নানারকমের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। এসব অভিযোগের ভিত্তি নেই। বাংলাদেশে সবচেয়ে স্বচ্ছ একটা আন্দোলন করেছি। ভিসির বাসায় হামলার বিষয়েও আমরা জড়িত ছিলাম না। ভালো করে তদন্ত করলে সত্যটা বের হয়ে আসবে।
যুগ্ম সমন্বয়ক মোহাম্মদ রাশেদ খান বলেন, ১৭ই ফেব্রুয়ারির পর বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়েছি। ৮ই এপ্রিল কর্মসূচি দেয়ার আগে ১৪/১৫ দিনের একটা বিরতি দিই। বিরতি দেয়ার কারণ এই সময়টাতে দেশের মানুষকে আমরা আন্দোলন সম্পর্কে সচেতন করি। লিফলেট বিতরণ করি। পরে ৮ই এপ্রিল শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পুলিশ হামলা করে। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা অন্যরকম ইতিহাস তৈরি করেছে। এক ছাত্রের বিপদে আরেক ছাত্র এগিয়ে এসেছে। ছাত্রীরা এগিয়ে এসেছে। শাহবাগে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ টিয়ারশেল, গুলি ছুড়েছে এ খবর জানার পর হলে কেউ বসে থাকেনি। সবাই দলে বেঁধে শাহবাগে চলে এসেছে। যে তিন নেতাকে পুলিশ তুলে নিয়েছিল তাদের মধ্যে রাশেদ একজন। তিনি বলেন, গুম করার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। হাতকড়া পরানো হয়েছিল। কিন্তু মিড়িয়ায় প্রচার হওয়ার কারণে ছাড়া পেয়েছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুফিয়া কামাল হল থেকে ছাত্রীদের রাতের আঁধারে বের করে দিয়েছে হল প্রশাসন। এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী নির্যাতন। যেটা বাংলাদেশে আগে হয়নি। ঘটনার প্রতিবাদে লাইব্রেরির সামনে প্রোগ্রাম করতে চেয়েছিলাম। সেখানে একটি মহল আগে থেকে অবস্থান নেয়। আমরা পরে বাধ্য হয়ে প্রোগ্রাম রাজু ভাস্কর্যে স্থানান্তর করি। সেখানেও বাধা দেয়। আন্দোলন করার অধিকার তো সংবিধানে স্বীকৃত। তারপরও কেন বাধা? একটি মহল আমাদের ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয় দেখাচ্ছে। যাতে প্রোগ্রামে তারা না আসতে পারে। বিভিন্ন হল থেকে বের করে দিয়েছে। আতঙ্ক তৈরি করছে। ফেসবুকে একটা গ্রুপ খুলেছে। সেখানে আমাদের ছবি দিয়ে বলা হচ্ছে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে হামলা করা হবে। বিভিন্নভাবে গালিগালাজ করছে। রাশেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। নিরাপত্তা চেয়েছি। কিন্তু প্রশাসন নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থা করেনি। বাইরে বের হলে কিছু লোক ফলো করে।
আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। অনিরাপদ রয়েছি। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে না তাই সরকারের কাছ থেকে আমরা নিরাপত্তা চাই। আমাদের আন্দোলন কোনো সরকার বিরোধী আন্দোলন ছিল না। সরকার বিরোধী কোনো স্লোগান দিইনি। রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের মারধর করা হয়েছে। প্রোগ্রাম করতে দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, ফেসবুক আইডি খুলতে পারছি না। যে আইডি ছিল সেটি তারা রিপোর্ট করে, হ্যাকড করে নষ্ট করে দিয়েছে। পরে আইডি খোলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তারা রিপোর্ট করে বন্ধ করে দেয়। সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারছি না। গেজেটের বিষয়ে রাশেদ বলেন, আমরা অপেক্ষা করছি। প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি দেশে এসেছেন। গেজেট প্রকাশের জন্য আমরা যথেষ্ট অপেক্ষা করেছি। দ্রুত গেজেট প্রকাশ না করলে কেন্দ্রীয় কমিটি বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানানো হবে। মামলা উঠিয়ে নেয়ার জন্য আলটিমেটাম দেয়া আছে। কারণ অজ্ঞাতনামা মামলা দিয়ে রাঘব বোয়ালদের বাঁচিয়ে দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানি করবে। আলটিমেটাম শেষ হলে আমরা বসে সিদ্ধান্ত নেবো। আন্দোলনকে বানচাল করার জন্য ভিসির বাসায় হামলা চালানো হয়েছিল। এই হামলার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জড়িত না।
আরেক যুগ্ম সমন্বয়ক নূরুল হক নূর গেজেট প্রকাশের বিষয়ে বলেন, আমরা চেয়েছি কোটা সংস্কার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিল করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ওপর আমাদের আস্থা আছে। তিনি এতদিন বাইরে ছিলেন। আশা করি দ্রুত গেজেট প্রকাশ করা হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছে। কারণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, এইচ টি ইমামসহ আরো কয়েকজন বলেছেন, কোটা বাতিল হবে না। এটা সংস্কার করা হবে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বাতিল করা হয়েছে সেখানে ওনারা এটা কিভাবে বলেন। এ নিয়ে সবার মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা শঙ্কা রয়েছে। তবে আমরা বরাবরই বলে এসেছি মন্ত্রী বা সচিব কে কি বললো সেটা বিবেচনার বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন তাই আমরা ধরে নিচ্ছি কোট পদ্ধতি বাতিল হচ্ছে। মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা শুরু থেকেই বলে এসেছি সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত নয়। ভিসির বাসায় হামলার ঘটনায় মিড়িয়াতে অসংখ্য নিউজ হয়েছে। প্রমাণ এসেছে। ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। সেখানে অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের নামে মামলা দেয়া হোক। অজ্ঞাতনামা দিয়ে কোনো মামলা রাখা যাবে না। তিনি বলেন, ৮ই এপ্রিল রাতে পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসকে রণক্ষেত্র করা হয়েছে। বহিরাগত এনে রড, রামদা নিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। গুলি করা হয়েছে। যারা বহিরাগত নিয়ে এসেছে তাদের বিচার হওয়া উচিত। বহিরাগত কারা নিয়ে এসেছে সেটা মিড়িয়ায় এসেছে। এই বহিরাগতরাই ভিসির বাসায় হামলা চালিয়েছে। পুলিশের হামলার সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েও পাননি বলে জানান নূর। তিনি বলেন, রাত ৯টার দিকে ভিসির বাসার সামনে যাই। হ্যান্ডমাইক দিয়ে ভিসি স্যারকে আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে আহ্বান করি। আমরা বলেছি, স্যার আপনার সন্তানদের ওপর পুলিশ গুলি করছে, টিয়ারশেল মারছে। প্লিজ স্যার একটু আসেন। কিন্তু তিনি আসেননি। আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি। ১৫ মিনিট বাসার সামনে অবস্থান করে পরে আমরা চলে আসি।
অপর যুগ্ম সমন্বয়ক ফারুক হাসান বলেন, লাইব্রেরিতে যারা পড়তো তারাই এই আন্দোলন শুরু করে। পরে সবার মাঝে এটি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, আন্দোলনের এ পর্যায়ে এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। অনেকে বলেছেন তাদের হুমকি দেয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে সবার মাঝে আতঙ্ক কাজ করছে। কেউ আগের মতো পড়াশোনা বা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। আমাদের তিনজনকে তুলে নেয়ার পর এই আতঙ্ক আরো বেড়েছে। যে কাউকেই তুলে নিয়ে যেতে পারে- এমন আতঙ্ক সবার মধ্যে কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, মামলা প্রত্যাহারের আলটিমেটাম শেষ হলে কেন্দ্রীয় কমিটি বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবো।

গার্মেন্ট শিল্পে এখনো শ্রমিকদের কণ্ঠরোধ

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অগ্নিনিরাপত্তার উদ্যোগ শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে। গার্মেন্ট শিল্পে এখনো শ্রমিক ইউনিয়নের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। এখনো বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে এ শিল্পে মজুরি সর্বনিম্ন্ন। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি স্মরণ করে এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে লন্ডনের প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ান। ঢাকা থেকে মাইকেল সাফি ও নিউ ইয়র্ক থেকে ডোমিনিক রুশি এ নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন। তারা লিখেছেন, ৯০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে ধসে পড়ে রানা প্লাজা। এতে নিহত হন কমপক্ষে ১১৩৪ জন। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো একে শিল্পখাতে সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে। এ ঘটনার পর বৈশ্বিক বিভিন্ন ব্রান্ড ও খুচরা ক্রেতারা বাধ্য হয় অবস্থার পরিবর্তনে। তবে রানা প্লাজা থেকে কোন কোন কোম্পানি পোশাক তৈরি করতো তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিল প্রাইমার্ক, মাতালান ও অন্যরা। প্রায় ২৫০টি কোম্পানি এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পরিবর্তনে দুটি উদ্যোগে স্বাক্ষর করে। এর একটি হলো ‘অ্যাকোর্ড অন ফায়ার এন্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ’। অন্যটি ‘এলায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি’। বাংলাদেশের ২৩০০ গার্মেন্ট শিল্প থেকে পোশাক সরবরাহ নেয় পশ্চিমা ব্রান্ডগুলো। এসব কারখানায় নাটকীয়ভাবে নিরাপত্তার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে হাতে নেয়া হয় এ উদ্যোগ। দুটি উদ্যোগই এ বছর তাদের মেয়াদ পূরণ করছে। অ্যাকোর্ড ও এলায়েন্স হাতেগোনা কিছু বিরোধের নিষ্পত্তি করেছে। অ্যাকোর্ডের নির্বাহী পরিচালক রব ওয়েইস বলেন, আমার তো মনে হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে তৈরি পোশাক খাত রয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ হলো সবচেয়ে নিরাপদ। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা ব্রান্ডগুলো যেসব কারখানা থেকে পোশাক সরবরাহ নেয় না এমন কারখানার সংখ্যা কমপক্ষে ২০০০। এসব কারখানার শ্রমিকদের অগ্রগতি সামান্যই হয়েছে। এমনকি এসব কারখানায় বাংলাদেশ সরকার অনুসন্ধান বা ইন্সপেকশন করেছে বা মোটেও করে নাই। এখনো এ শিল্পের শ্রমিকদের কণ্ঠরোধ করে রাখা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন রাখেন, এই যে অগ্রগতি তা কতটা টেকসই? যখন অ্যাকোর্ড ও এলায়েন্সের কাজ শেষ হয়ে যাবে তখন কি হবে? পশ্চিমা ক্রেতারা যখন সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছিলেন তখন হাজার হাজার কারখানা মালিক অগ্নিকাণ্ডের ফলে জরুরি নির্গমন পথ, স্প্রিংকলার সিস্টেম, বৈদ্যুুতিক ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ করেন।  শ্রমিক অধিকার বিষয়ক গ্রুপ ওয়ার্কার রাইটস কনসোর্টিয়ামের নির্বাহী পরিচালক স্কট নোভা বলেন, এখন খুব কম গার্মেন্ট কারখানাই আছে যাকে মৃত্যু ফাঁদ বলা যাবে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির আগে প্রতি বছর অগ্নিকাণ্ডে অথবা ভবন ধসে প্রায় ৭১ জন করে শ্রমিক মারা যেতেন। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন সেন্টারের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই সংখ্যা এখন কমে বছরে ১৭-তে এসেছে। ব্রান্ডগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে দ্রুত উন্নতি ঘটেছে। অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক জেমস মরিয়ার্টি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কারখানাগুলোতে যে উন্নয়নের জন্য ৬০ বছর সময় লাগতো, বাংলাদেশ কয়েক বছরেই সে উন্নতি সাধন করেছে। তবে অ্যাকোর্ডের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনো বাংলাদেশের অনেক পোশাক শিল্প কারখানায় নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। এটি উদ্বেগজনক। এ সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত। উল্লেখ্য, অ্যাকোর্ড ও অ্যালায়েন্স যেসব কারখানার পোশাক গ্রহণ করে, তা দেশের মোট পোশাক কারখানার অর্ধেক।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেড় হাজারেরও বেশি তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়েছে। এই কারখানাগুলো মূলত রাশিয়া ও তুরস্কে পোশাক রপ্তানি করে থাকে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুয়ায়ী, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ১৫ শতাংশেরও কম কারখানা নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে। ওয়ার্কার রাইটস কনসোর্টিয়ামের লরা গুতারেজ বলেন, কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে উন্নতি হয়েছে, তা আসলে ‘ব্ল্যাক হোলের’ মতো।
একদিকে বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম হ্রাস পেয়েছে। শ্রমিকদের নতুন সংগঠন গড়ে ওঠার প্রবণতা কমে এসেছে। অন্যদিকে, পোশাক শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি শ্রমিকদের বেতনভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের সংগঠক মোহাম্মদ ইব্রাহিম নামের এক পোশাক শ্রমিক নেতার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে পুলিশ। তাকে ৬০ দিন জেলে আটকে রাখা হয়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ওই আন্দোলনের সময় পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেয় পুলিশ। আন্দোলনকারীদের নেতা মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে থানায় ডেকে পাঠানো হয়। তাকে বলা হয়, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মর্তারা তার সঙ্গে আলোচনা করবেন। কিন্তু থানায় পৌঁছানোর পর হাত-পা বেঁধে তার ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। ওইদিন রাতে তাকে একটি বনভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বাঁধন খুলে দিয়ে দৌড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু ইব্রাহিম দৌড়াতে অস্বীকৃতি জানান। পরে ইব্রাহিমকে জেলে আটকে রাখা হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সন্দেহভাজন অপরাধী পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে বাংলাদেশকে বারবার সতর্ক করেছে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও)। সংগঠনটির এশিয়া অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তুমো পাউতিয়ানেন বলেন, আমাদের অভিমত হলো- যেখানে শ্রমিকদের প্রতিবাদের অধিকার স্বীকৃত না, সেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তাও নেই।
শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে দুইটি বিখ্যাত ক্রেতা প্রতিষ্ঠান জারা ও এইচ অ্যান্ড এম ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি বাণিজ্যিক সম্মেলন বর্জন করে। এর পর ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে দায়ের করা কয়েকটি মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। দুটি মামলা এখনো চলছে।
তবে কারখানা মালিকরা বিদেশি ক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। তারা বলেছে, বিদেশি ক্রেতারা একদিকে কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার শর্ত দেয়, অন্যদিকে পোশাকের দাম কমানোর অনুরোধ করে। দেশের সবচেয়ে বড় পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদি গ্রুপের রুবানা হক বলেন, ক্রেতারা আমাদের কাছে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির বিষয়ে জানতে চায়। কিন্তু এসব মজুরি কোথা থেকে আসে? কে শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরি দেবে?

স্বজনদের কান্নায় ভারি সাভার by হাফিজ উদ্দিন

সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে স্মরণকালের ভয়াবহ রানা প্লাজা ধসে স্বজনহারাদের কান্না, প্রতিবাদী শ্রমিকদের খণ্ড খণ্ড মিছিল আর স্লোগানে পালিত হয়েছে পঞ্চম বর্ষ। গতকাল সকাল থেকেই ফুল হাতে শ্রমিকরা আসেন রানা প্লাজার পরিত্যক্ত জমিতে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ বেদির সামনে। কেউ এসেছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে, কেউ এসেছিলেন স্বজনদের মৃত্যুভূমি একনজর দেখার জন্য। আবার কেউ এসেছিলেন আর্থিক সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে। সকাল ৭টায় রানা প্লাজার সামনে নির্মিত শহীদ বেদিতে নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ঢাকা জেলা আওয়ামী  লীগের সহ-সভাপতি ও সাভারের সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান। এসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ রাসেল হাসান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণব কুমার  ঘোষসহ উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এরপর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, সাবেক এমপি শাহ আবু জাফর। এসময় রানা প্লাজা ধসে নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা পাঁচ বছর পূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে এখানকার আকাশ বাতাস। এর আগে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ ভবন ধসের ঘটনায় দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায় তারা। শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল  হোসেন বেতন-ভাতাসহ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে মালিক-শ্রমিক ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। পোশাক শিল্পকে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য দ্রুত তাদের দাবি মেনে নেয়ার কথা বলেন। এছাড়া রানা প্লাজা ধসের স্থানটির পবিত্রতা রক্ষার জন্য সেখানে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এছাড়া নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভসহ শ্রমিকদের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান ড. কামাল হোসেন। সুলতানা কামাল বলেন, রানা প্লাজা ধসকে অনেকেই দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করলেও আমি মনে করি এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। যারা এসব প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তারা তাদের দায়িত্বে অবহেলা করেছিল বলেই এতো বড় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এই ধরনের ঘটনার যাতে আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে  সেজন্য শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আহত শ্রমিকদের সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং নিহত-নিখোঁজ শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সেদিনের কথা মনে পড়লে শিওরে উঠেন রানা প্লাজার আহত শ্রমিক শিলা, বিউটি, মামুন, সাজু ও রাশিদা বেগমরা। ভবন ধসের পাঁচ বছর পার হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। মাথাব্যথা, হাত-পা ও পিঠের ব্যথা নিয়ে এখনো লড়ে যাচ্ছেন অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে। পূর্ণ চিকিৎসা সেবার অভাবে শারীরিক এবং মানসিক সমস্যার কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। নিখোঁজ আঁখি আক্তারের মা হেনা বেগম ডিএনএ টেস্ট করিয়েও মেয়ের লাশের সন্ধান পাননি। স্বামী শ্বাসকষ্টের রোগী হওয়ায় তেমন কোনো কাজ করতে পারে না। সংসারের উপার্জনকারী মেয়েকে হারিয়ে অভাব-অনটনে চলছে তার সংসার। এজন্য এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছোট মেয়ের পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষতিপূরণ কি চাইবেন তিনি তা নিয়ে ভাবেননি কখনও। মেয়ের লাশটি পেলেও মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতেন জানান হেনা বেগম। তবে স্বামীর চিকিৎসা এবং ছোট মেয়ের পড়ালেখার জন্য যদি সরকার  কোনো ব্যবস্থা করে দিতো তাহলে কোনো রকমে খেয়ে পরে চলে যেতে পারতেন বলে জানান এই মা। আহত শ্রমিক আল্পনা খাতুন ধসে পড়া রানা প্লাজার ৭ তলায় সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতো। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এ মা বেতনের জন্য সেদিন সকাল ৮টায় কাজে যোগ দেন কারখানায়। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে কিছুক্ষণ পর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ধসে পড়ে রানা প্লাজা। দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় উদ্ধার হলেও হাসপাতালে নেয়ার পথে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আগামী জুলাইয়ে ছেলে নীরবের ছয় বছর পূর্ণ হবে। মাথা, পা ও কোমরসহ শরীরের একপাশ অবশ থাকায় এবং ছোট ছেলেকে রেখে কোনো কাজই করতে পারেন না তিনি। এরপর ছেলে বড় হচ্ছে তাকে স্কুলে ভর্তি করানো এবং সংসার চালানোর চিন্তা সবসময় তাকে তাড়া করে বেড়ায়। অভাবের সংসারে নিজের ছেলেটাকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি দোষীদের শাস্তি দাবি করেন আল্পনা। এসময় আরো শ্রদ্ধা জানান গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, স্বাধীন বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ  এবং নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরাও শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অন্যদিকে রানা প্লাজার পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিহত ও আহত শ্রমিকদের স্মরণে সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনেও নিহতদের স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত নয় তলাবিশিষ্ট রানা প্লাজা ধসে পড়ে। ভবনটিতে থাকা ৫টি তৈরি পোশাক কারখানায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতো। পোশাক শিল্পের ইতিহাসে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় মারা যায় ১১৩৬ জন শ্রমিক, জীবিত উদ্ধার করা হয় ২৪৩৮ জনকে। এর মধ্যে গুরুতর আহত হয় ১১৬৯ জন। যারা প্রাণে বেঁচে আছে তারা জীবিত  থেকেও মৃত এবং অসহনীয় কষ্টে জীবনযাপন করছেন।

বুকলেট সংকট-পঞ্চাশ হাজার পাসপোর্টের জট by দীন ইসলাম

৫০ হাজার মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)- এর জট লেগেছে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে। নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন না অনেক আবেদনকারী। অতি জরুরি ফি জমা দিয়েও মেডিকেল বা জরুরি কাজে বিদেশ যেতে আগ্রহীরা নির্ধারিত সময়ে এমআরপি না পেয়ে ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। অনেক সরকারি কর্মকর্তাও এ ভোগান্তির তালিকায় আছেন। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে তারা দিনের পর দিন ঘুরছেন। পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য সাধারণ আবেদনকারীদের এ ভোগান্তি কবে কমবে তা কেউ বলতে পারছেন না। সূত্রমতে, এমআরপি বুকলেট সংকটের কারণে  এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই তড়িঘড়ি করে পাসপোর্ট চাইলেও প্রিন্ট করে দেয়া যাচ্ছে না। পাসপোর্ট দেরির বিষয়ে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে যোগাযোগ করলে বলা হচ্ছে, গত বুধবার থেকে পাসপোর্টের সংকট মেটাতে কাজ শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়ার টেকনিক্যাল এক্সপার্টরা এ বিষয়ে কাজ করছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ সংকট মেটার সম্ভাবনা রয়েছে। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পাসপোর্ট বইয়ের তেমন সংকট নেই। তবে গত মঙ্গল ও বুধবার এমআরপি প্রিন্ট করার মেশিনগুলো বন্ধ করে চালু করার পর বিপত্তি দেখা দেয়। দুইটি মেশিন ভালোভাবে চালু হলেও একটি মেশিনে বিপত্তি দেখা দিয়েছে। এ কারণে সমস্যার তৈরি হয়েছে। একাধিক পাসপোর্ট আবেদনকারীর সঙ্গে গতকাল আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে কথা বলে জানা গেছে, ডেলিভারির তারিখের পর এক সপ্তাহ পার হয়েছে। এখনও তারা পাসপোর্ট বুঝে পাননি। নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্টের এসএমএস না পেয়ে অফিসে খোঁজ নিতে ছুটে এসেছেন তারা। তবে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে কোনো সদুত্তর পাচ্ছেন না। সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পাসপোর্ট আবেদনকারীদের কর্মকর্তাদের কাছে দেন দরবার করতে দেখা যায়। সব কর্মকর্তাদেরই ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে বলা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসগুলোর এমআরপি প্রিন্ট করতে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। খুলনা ও যশোরসহ কয়েকটি বিভাগীয় অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাসপোর্টের আবেদন জমা নেয়ার সময় তারা সফটওয়্যার উল্লিখিত তারিখ বলে দিচ্ছেন। পাশাপাশি মৌখিকভাবে পাসপোর্ট পেতে দেরি হতে পারে এ বিষয়টিও জানিয়ে দিচ্ছেন। তবে যাদের খুব জরুরি দরকার তাদের আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে ঘুরাফেরা করতে দেখা যায়। তেমনই একজন ইমরান হোসেন। মাগুরা থেকে ঢাকায় পাসপোর্টের তদবির করতে আসা ইমরান হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমার মা হালিমা খাতুন গত ৩রা জানুয়ারি এমআরপি চেয়ে আবেদন করেছেন। মাগুরা অফিসে খোঁজ নেয়ার পর তারা ঢাকা সদর দপ্তরে যোগাযোগ করতে বলেছেন। এজন্য খোঁজ নিতে এসেছি। কর্মকর্তাদের বুঝাতে চাচ্ছি আমার মায়ের ভালো চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আশা করছি এ বিষয়টি সুরাহা হবে। বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আশা সহসাই এ সংকটের সমাধান হবে। তারা বলছেন, বুকলেট সংকট নেই। তবে প্রিন্টিং সংকট সহসাই কেটে যাবে।

চিঠিতে ভুল নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনেও হাস্যরস

ভুলে ভরা বৃটিশ হোম অফিসের কথিত চিঠি নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে রীতিমতো তোলপাড় চলছে। ঢাকা, লন্ডনসহ সর্বত্রই এখন  আলোচনায় হোম অফিসের চিঠি! চিঠিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের বদলে ‘বাংলাদেশি অ্যাম্বাসি, ৪টি পাসপোর্টকে ‘অ্যা পাসপোর্ট’ বলে উল্লেখ করা ইত্যাদি মোটা দাগে অন্তত অর্ধডজন ভুল রয়েছে।
ভুলের বিষয়ে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরাও হতবাক। তারা এটাকে ‘আনইউজুয়্যাল’ বলছেন। তবে এ নিয়ে তারা সরাসরি কোনো বক্তব্য দিতে চাইছেন না। অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়েও আগাগোড়ায় সতর্ক বাংলাদেশি কূটনীতিকরা। চিঠির উৎস বা সত্যতা নিয়ে তারা মুখ না খুললেও এটি যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং বিতর্ক তৈরি করেছে তা তাদের অনুমানের বাইরে ছিল বলে দাবি করেন দায়িত্বশীল এক  কূটনীতিক। তার মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেকোনো বিষয়ে কথা বলতে পারেন। এ বিষয়ে কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে তারাই জবাব দেবেন। সেখানে হাই কমিশনের কিছুই বলার নেই। তবে যে চিঠিকে প্রতিমন্ত্রী সামনে এনেছেন তা পৌনে চার বছরের পুরনো। তাছাড়া চিঠি ও পাসপোর্ট সংরক্ষণের বিষয়টি একান্তই গোপনীয়। তা এভাবে প্রকাশ করা কতটা সমীচীন হয়েছে তা বিচার বিশ্লেষণের দাবি রাখে বলেও মনে করেন তিনি। চিঠির ভুলগুলোর বিষয়ে ওই কূটনীতিকের দাবি ‘কুড়িয়ে পাওয়া বা স্বেচ্ছায় হোম অফিসে জমা করা বাংলাদেশি পাসপোর্টগুলো হাই কমিশনে পাঠাতে বৃটিশ সরকার এমন গৎবাঁধা ফরমেটে চিঠি দিয়ে থাকে। তবে অতীতে পাওয়া কোনো চিঠিতে এত ভুল দেখা যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
শুধু লন্ডনে থাকা ওই কূটনীতিকই নন, সেগুনবাগিচার একাধিক কর্মকর্তাকে গতকাল এ নিয়ে আলোচনা-উদ্বেগ ও হাস্যরস করতে দেখা গেছে। তাদের মতে, স্পর্শকাতর ইস্যুটি জনসমক্ষে প্রকাশের ঘটনা বৃটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বৃটেন ঐতিহ্যগতভাবে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সেগুনবাগিচা এবং লন্ডন মিশনের তরফে বহুবার তারেক রহমানের বৃটেনে অবস্থান ও বসবাসের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কখনই বৃটিশ সরকার বা ঢাকায় থাকা দেশটির কূটনীতিকরা বাংলাদেশের কাছে কোনো তথ্য বিনিময় করেনি।
কারও ব্যক্তিগত তথ্য বিনিময় না করার বিষয়ে বৃটেনের সর্বজনীন যে নীতি রয়েছে সেটি তুলে ধরে তারেক রহমানের বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশে বরাবরই অপারগতা দেখিয়েছেন তারা। গণমাধ্যমের তরফেও গত ৯ বছরে বহুবার এ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা ছিল। বৃটেনের তরফে প্রায় অভিন্ন জবাবই দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশেষ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যেভাবে বিষয়টি তুলে এনেছেন তা রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবেই দেখছেন পেশাদার কূটনীতিকরা। তারেক রহমানের লিগ্যাল নোটিসের খবর চাউর হওয়ার প্রেক্ষিতে গত সোমবার বিকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি যখন তার বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন মানবজমিনের তরফে পররাষ্ট্র সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু কেউই এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দেয়া এমনকি কথা বলতেও রাজি হননি। তারা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে বিস্তারিত শোনার পরামর্শ দেন। প্রতিমন্ত্রী অবশ্য ততক্ষণে তার লন্ডনে দেয়ার বক্তব্যের স্বপক্ষে হোম অফিসের ওই চিঠি এবং তারেক রহমানের পুরনো পাসপোর্টের কয়েকটি পাতা প্রমাণ হিসাবে প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনের আগেই এটি তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী চিঠির উৎস নিয়ে যা বলেছেন তার মোদ্দাকথা হলো- বিএনপির তরফে তার বক্তব্য অসত্য বলার পর তিনি প্রমাণ হাতে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। ঢাকায় ফেরার পরপরই তিনি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে হোয়াটসআপ বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে হোম অফিসের ওই চিঠি এবং তারেক রহমানের মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের পাতাগুলোর ছবি সংগ্রহ করেছেন। প্রতিমন্ত্রী সংগ্রহ করা সেই পাসপোর্টের অনেক পাতার ছবি শেয়ার করেছেন। যাতে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত তথ্য, পাসপোর্ট ইস্যুর তারিখ, মেয়াদ, এমনকি তার পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়ানো সংক্রান্ত পাতাও প্রতিমন্ত্রী শেয়ার করেছেন। কিন্তু তারেক রহমানের লন্ডন যাওয়ার সেই ভিসার পাতা শেয়ার করেননি। কনস্যুলার নিয়ে কাজ করা এক কূটনীতিক বলেন, তারেক রহমানের ওই পাসপোর্টেই সেই সময়কার ভিসা থাকার কথা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের বৃটেনে বসবাসের স্ট্যাটাস বিষয়ে সরকারের কাছে কি তথ্য রয়েছে তা জানার চেষ্টা করেছিলেন সাংবাদিকরা। প্রতিমন্ত্রী তা জানাতে চাননি বা পারেননি। তিনি সেই সময় তারেক রহমানের কাছেই তার স্ট্যাটাস বিষয়ে জানতে পরামর্শ দেন। অন্তত দু’বার তিনি তারেক রহমানের কাছে এ নিয়ে জিজ্ঞাসা করার কথা বলেন। তারেক রহমানের কথা, বক্তব্য, বিবৃতি বা সাক্ষাৎকার প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি জানার পরও সাংবাদিকদের তারেক রহমানের কাছে জানতে চাওয়ার তাগিদ দেন। এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক পেজে ওই চিঠি এবং পাসপোর্টের ছবিগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। এটি তিনি নিজে সরিয়ে নিয়েছেন নাকি হ্যাক করে সরিয়ে ফেলা হয়েছে তা নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। ফেসবুক ওয়ালে থাকা তার অন্য তথ্যগুলো ঠিকঠাক আছে কি-না? সেটিও স্পষ্ট নয়। অবশ্য প্রতিমন্ত্রী গতকাল এ নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন- ‘আমার ফেসবুকের ওপর অনেক অত্যাচার হয়েছে সারা রাত। হ্যাকিং। পোস্ট উধাও। বুঝতেই পারছেন এই বিনিয়োগ কারা করেছে।’

ভুলে ভরা নথি রহস্যজনক: ফখরুল

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে বৃটিশ স্বরাষ্ট্র বিভাগের অসংখ্য ভুলে ভরা এক লাইনের একটি চিঠি নিয়ে রহস্য    তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, তারেক রহমানের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ইস্যুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম যে নথি প্রকাশ করেছেন, তাতে ১৩টি বড় ভুল রয়েছে। এটি রহস্যজনক। গতকাল নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। নথিতে থাকা অসংগতি তুলে ধরে মির্জা আলমগীর বলেন, দেশের জনগণের কষ্টার্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে লন্ডন সফরকারী বিশাল বহরের একমাত্র অর্জন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সংগ্রহ করা তারেক রহমানের ২০০৮ সালে ইস্যু করা পাসপোর্টের তিনটি পাতা এবং ভুলে ভরা এক লাইনের একটি চিঠি। নথির যেসব স্থানে ভুল করা হয়েছে, বৃটিশ সরকারের পক্ষে এ ধরনের ভুল করা অস্বাভাবিক। বৃটিশরা এই ধরনের ভুল করতে পারে না। কি বিচিত্র এই সরকার! কি দুর্বল তাদের অপকৌশল! আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে জানাতে চাই, তারেক রহমান জন্মসূত্রে বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক। তিনি তার এই প্রিয় দেশের নাগরিক ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন ইনশাআল্লাহ। মির্জা আলমগীর বলেন, তারেক রহমান পাসপোর্ট জমা দিয়ে নাগরিকত্ব ছেড়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের এমন বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার পাসপোর্ট যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মাধ্যমে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা দেয়ার নথি দেখিয়ে বিনা ভোটে ক্ষমতা দখলকারী বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের দেয়া বক্তব্য অদ্ভুত, যুক্তিহীন ও বেআইনি। কি কি কারণে একজন নাগরিক জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নাগরিকত্ব হারাতে পারেন- এটাও যিনি জানেন না- তেমন একজন ব্যক্তির শুধু এধরনের অনির্বাচিত সরকারের মন্ত্রী পদে থাকা সম্ভব এবং তা জাতির জন্য লজ্জাজনক। দেশবাসী জানেন, বর্তমান সরকারের নৃশংস রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে পঙ্গু অবস্থায় আদালতের অনুমতিক্রমে সুচিকিৎসার জন্য তারেক রহমান লন্ডনে যান। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। ইতিমধ্যে তার অনুপস্থিতিতে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। অথচ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে মন্ত্রী, নেতা-পাতি নেতারা প্রতিনিয়ত তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে যাচ্ছেন। কিন্তু দেশের জনগণ যাতে তারেক রহমানের জবাব শুনতে না পারে সেজন্য সকল প্রচার মাধ্যমে তার বক্তব্য প্রকাশ ও প্রচার নিষিদ্ধ করেছে সরকার। সরকার ও সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে এটা স্পষ্টতই প্রমাণিত এখন বাংলাদেশে তারেক রহমানের জীবন নিরাপদ নয়। এমতাবস্থায় তিনি বিশ্বের অসংখ্য বরেণ্য রাজনীতিবিদ, সরকার বিরোধী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতোই সাময়িকভাবে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন এবং সঙ্গত কারণেই তা পেয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই তিনি যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র বিভাগে তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। সে দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার পাসপোর্ট জমা রেখে তাকে ট্রাভেল পারমিট দেয়া হয়েছে। কাজেই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পাসপোর্ট তার কোনো কাজে লাগছে না। যখনই তিনি দেশে ফেরার মতো সুস্থ হবেন তখনই তিনি দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতোই পাসপোর্টের জন্য আবেদন জানাতে এবং তা অর্জন করতে পারবেন। মির্জা আলমগীর বলেন, কাজেই স্রেফ জমা রাখার জন্য বৃটিশ স্বরাষ্ট্র বিভাগ থেকে তার পাসপোর্ট লন্ডন হাইকমিশনে পাঠানোর যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে তার মাধ্যমে কোনো আইন কিংবা যুক্তিতে প্রমাণ হয় না যে, তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন। এ ধরনের উদ্ভট ধারণাকে তত্ত্ব কিংবা তথ্য হিসেবে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন কিংবা ফেসবুকে প্রচার রাজনৈতিক মূর্খতা এবং উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। তিনি বলেন, তারেক রহমান মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্রই কেবল নন, তিনি নিজেও বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির অন্যতম সর্বোচ্চ একজন জনপ্রিয় নেতা। বাংলাদেশের এই গর্বিত নাগরিকের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রলাপ বকা এবং অপপ্রচার চালানো অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে যে আইনি নোটিশ দেয়া হয়েছে- দেশের জনগণ তার জবাব জানার জন্য অপেক্ষা করছে। আর দেশের মানুষ যখন দেশনেত্রীর মুক্তি আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ-ঠিক সেই সময় এসব অপরাজনীতি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা জনগণের ক্ষোভের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেবে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান  আবদুল আওয়াল মিন্টু, বরকত উল্লাহ বুলু, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উপস্থিত ছিলেন।

সরজমিন গাজীপুর: নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আলোচনা সর্বত্র by রুদ্র মিজান

শুরু হয়ে গেছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। ভোটারদের মধ্যে শুরু হয়েছে নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা আলোচনা। প্রার্থী, প্রতীক আর দলীয় অবস্থানের চেয়ে জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে। কেমন নির্বাচন হবে, ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন কিনা, নির্বাচন দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে কিনা- এমন প্রশ্ন আর শঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ ভোটারদের মাঝে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নয় জন প্রার্থী থাকলেও আলোচনায় মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। ১১ লক্ষাধিক ভোটারের এই সিটি করপোরেশনে জয়-পরাজয় নির্ভর করবে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের ভোটের ওপর। টঙ্গী কলেজগেট এলাকায় নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা হয় একজন মধ্য বয়সী নারীর সঙ্গে। আমেনা নামের ওই নারী বলেন, আমরা নানা কারণে ভয়ে আছি। ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা থাকবে কি-না, ভোট দিতে পারবো কি-না জানি না। একইভাবে বয়স্ক আব্বাস আলী বলেন, কারে ভোট দেবো বলতে পারি না। ভোট দিতে পারলেই হলো। ২০১৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি ৩২৯ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই সিটি করপোরেশনের অবকাঠামোগত অবস্থা বেহাল। জয়দেবপুরের রাজবাড়ী এলাকার নতুন ভোটার মানিক মিয়া জানান, গাজীপুর সিটি করপোরেশন হলেও অবকাঠামোগতভাবে কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমরা ভোট দেব উন্নয়নের জন্য। যে প্রার্থী মেয়র হলে এই এলাকার উন্নয়ন হবে তাকেই ভোট দেব।
মোহাম্মদ আশরাফ আলী রাজবাড়ী এলাকার বয়স্ক এক ভোটার। তিনি বলেন, গাজীপুরে নানা অনিয়ম, অপরাধ হচ্ছে। জুয়া, মাদক থেকে তরুণদের রক্ষা করা প্রয়োজন। যে ব্যক্তি মেয়র হলে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন আমরা তাকেই ভোট দিতে চাই। এজন্য ভোটকেন্দ্রে নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। গাজীপুরের রাজবাড়ী রোড, ছয়দানা এলাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকানে দেখা গেছে গরম চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরগরম নির্বাচনী আলোচনা। আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের বাসা ছয়দানা এলাকায়। এখানে সরব আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক। আঞ্চলিক কারণেই ওই এলাকার স্থানীয় ভোটারদের একটা অংশ তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ভোটাররা এখানে নীরব। মরিয়ম বেগম নামে একজন পোশাক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভোট দিয়ে গরিবের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।
জয়দেবপুর রেলস্টেশন এলাকার পান-সিগারেট বিক্রেতা সোহাগ বলেন, গত নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। কিন্তু সিটি করপোরেশনের কোনো উন্নয়ন হয়নি। মেয়র ছিলেন জেলে। এবার কাকে ভোট দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। সিটি করপোরেশনের পশ্চিম জয়দেবপুরের ভোটার অ্যাডভোকেট মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এই নির্বাচনে প্রার্থীদের জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। দীর্ঘদিন ধরে যারা সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন তাদেরকেই মানুষ ভোট দেবে। শঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। এই শঙ্কা দূর করার জন্য নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি। শঙ্কাটা কিসের এমন প্রশ্নের জবাবে ভোটাররা জানান, গাজীপুরে ভোটকেন্দ্র দখলের ইতিহাস আগে ছিল না। বিশেষ করে এরশাদের আমল ছাড়া প্রতিটি নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু গত উপজেলা নির্বাচনগুলোর পরিবেশ দেখে শঙ্কা জন্মেছে ভোটারদের মধ্যে।
বিএনপি’র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকারের বাড়ি টঙ্গীতে। টঙ্গীসহ পুরো সিটি এলাকাতে বিএনপি’র সমর্থকরা অনেক নীরব। রাজনৈতিক মামলায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে। গত রোববার বিকালে বিএনপি’র কার্যালয়ে নেতাকর্মী কাউকে পাওয়া যায়নি। কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন অফিস সহকারী রজব আলী।
বিএনপি নেতা আবু সাঈদ বলেন, মামলা-হয়রানির কারণেই বিএনপি কর্মীরা ভোটের মাধ্যমে জবাব দেবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করা, সাবেক মেয়র এমএ মান্নানের বিরুদ্ধে মামলা, তাকে কারাবন্দি করাসহ সকল হয়রানির জবাব দেবেন নেতাকর্মী-সমর্থকরা। এই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হবে বলে মনে করেন তিনি। একইভাবে আওয়ামী লীগ মহানগরের দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মনির হোসেন মিয়া মনে করেন একটি মডেল সিটি করপোরেশন গড়ার জন্যই নৌকায় ভোট দেবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মানুষ। তিনি বলেন, সুষ্ঠু পরিবেশেই ভোট হবে।
১৫ই মে অনুষ্ঠিত হবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। মেয়রপ্রার্থী ছাড়াও এই সিটির নির্বাচনে সাধারণ ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৮৭ কাউন্সিলর প্রার্থী। ১৯টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের বিপরীতে ৮৪ নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২৩শে এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন এবং ২৪শে এপ্রিল প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ হবে। গাজীপুর সিটিতে ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে  মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬। এতে পুরুষ ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৫ এবং মহিলা ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮০১।

হাতে ফুল চোখে পানি শোকাকুল জুরাইন by শুভ্র দেব

চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পড়ছে পানি। হাতে একগুচ্ছ ফুল। নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন নাতনির কবরের দিকে। ৭৫ বছর বয়সী হাজেরা খাতুন এসেছিলেন প্রিয় নাতনি হেলেনার কবর জিয়ারত করতে। রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় শুধু হেলেনাই নন, মারা গেছেন নাতির স্ত্রীও। দুজনই হাজেরা খাতুনের খুব  আদরের ছিলেন। হাজেরা মানবজমিনকে বলেন, আমার নাতনি হেলেনার সঙ্গে আমার মোবাইল ফোনে শেষ কথা হয়েছিল ঘটনার আগের রাতেই। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে হেলেনা আমাকে বলেছিলো নানী আগামী মাসে বেতন পেয়ে তোমাকে কিছু টাকা পাঠাবো। সেই টাকা দিয়ে তুমি চিকিৎসা করিয়ে নিও। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবা আর আমাদের জন্য দোয়া করবা। হেলেনা বলেন, এই ছিল আমার নাতনির সঙ্গে শেষ কথা। তার ওই কথাগুলো আজও আমার কানে বেজে ওঠে। সে হয়তো আর ফিরে আসবে না কিন্তু তার ওই কথাগুলো মরার দিন পর্যন্ত আমার মনে থাকবে।
আমার নাতবউ সুলতানা পারভিনও আমাকে অনেক পছন্দ করতো। নিয়মিত আমার খোঁজখবর নিতো। কিন্তু আজ তারা অনেক দূরে চলে গেছে। তাদের সঙ্গে থাকা অনেক স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সময় পেলে তাদের কবরে এসে বসে থাকি। আজকে ফুল কিনে তাদের কবরে দিতে চেয়েছিলাম। টাকার অভাবে সেটা আর সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিবেশী একজনের সহযোগিতায় কটা ফুল নিয়ে এসেছি।
গতকাল ছিল রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৫ বছর। ২০১৩ সালের এই দিনে ঘটে যায় ইতিহাসের এক ভয়াবহ ঘটনা। সেদিন সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রানা প্লাজা নামের ৮তলা ভবন ধসে পড়ে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল পোশাক খাতে  কর্মরত ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক। আহত হন আরো ১ হাজার ১৬৯ জন। এদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত করতে না পেরে ২৯১ জনের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরে ডিএনএ পরীক্ষা করে স্বজনরা কিছু কবর শনাক্ত করেছিলেন। তবে শনাক্ত হয়নি কিছু কবর। লাশও মিলেনি বেশ কয়েকজনের। তাদের স্বজনরা এখনো জানেন না তাদের প্রিয়জনের কি অবস্থা হয়েছিল। তাই প্রতি বছর ২৪শে এপ্রিল এলেই জুরাইন কবরস্থানে ছুটে আসেন স্বজনরা। প্রিয়জনের কবরে জিয়ারত করতে আসেন কেউ কেউ। কেউ আবার বেওয়ারিশ কবরে খোঁজেন স্বজনের অস্তিত্ব।
রুবি আক্তার আদরের ছোট বোন রোজিনার কবর দেখতে এসেছিলেন। অশ্রুসজল চোখে বিড় বিড় করে বলছিলেন ও আমার কলিজার টুকরা বোন ছিল। আমরা দুজনেই পোশাক কারখানায় কাজ করতাম। আবার একই বাসায় থাকতাম। সেদিন সকালে আমরা দুজনই একসঙ্গে কাজে বের হয়েছিলাম। কাজের ব্যস্ততায় হঠাৎ খবর আসে রানা প্লাজা ভেঙে পড়েছে। তখন যেন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়লো। কারণ আমার ছোট বোন ওই ভবনের ভেতরেই আছে। তারপর থেকে আর  রোজিনার খবর পাইনি। রুবি বলেন, উদ্ধারকর্মীরা যখন একে একে জীবিত ও মরদেহ উদ্ধার করছিল তখন ভাবতাম এখন বুঝি আমার বোনকে পাওয়া যাবে। একে একে সবাইকে উদ্ধার করা হলো। কিন্তু আমার বোনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে জুরাইন কবর স্থানে এসে তার কবরের সন্ধান পাই। শুধু নিহতদের স্বজনরাই নয়, রানা প্লাজার ঘটনায় নিহতদের স্মরণ করতে আরো এসেছিলেন পোশাক কারখানার মালিক সমিতির সংগঠন বিজিএমইএ’র একটি প্রতিনিধিদল। তাদের মধ্যে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির, পরিচালক আনম সাইফুদ্দিন, আশিকুর রহমান তুহিন ছিলেন। এ ছাড়া, নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে আসেন নিউ জেনারেশন গ্রুপ শ্রমিক কর্মচারী ও জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক শিল্প শ্রমিক লীগ, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, রি রোলিং স্ট্রিল মিলস শ্রমিক ফ্রন্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্যপরিষদ, গার্মেন্ট  শ্রমিক কর্মচারী ঐক্যপরিষদ, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম। সবাই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে দোয়া করেছেন।
জুরাইন কবরের সিনিয়র মহরার হাফিজ মোহাম্মদ শোয়াইব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, জুরাইন কবরের বর্ধিত অংশে রানা প্লাজায় নিহত ২৯১ বেওয়ারিশের মরদেহ দাফনের মধ্য দিয়ে এই অংশের উদ্বোধন করা হয়েছিল। ৫ই মে প্রথম ৪০টি মরদেহ এখানে আনা হয়েছিল। সেদিন এখানে উপস্থিত সবাই কেঁদেছিল। কান্না ধরে রাখতে পারে নাই কেউ। তার পর ২০ই মে পর্যন্ত বাকি মরদেহগুলো দাফন করা হয়। তবে সবক’টি মরদেহই বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হয়েছিল। পরে ডিএনএ মিলিয়ে কিছু মরদেহ শনাক্ত করেন নিহতদের স্বজনরা।
নিহতদের স্মরণ করতে এসে বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নাছির বলেন, রানা প্লাজার মতো ঘটনা আর বাংলাদেশে যাতে না ঘটে আমরা সেই লক্ষেই কাজ করছি। তবে যে ঘটনা ঘটে গেছে সেটা মর্মান্তিক। আমরা এই ঘটনায় বায়ার্স ও বিদেশি দাতা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত ২৪ কোটি টাকা ভুক্তভোগীদের পরিবারের জন্য দিয়েছি। এছাড়া আমাদের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ ছাড়াও আহদের চিকিৎসার ব্যবস্থা, তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করানো হচ্ছে। ৩৯ জন আহতদের সিআরপিসহ বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। নাছির বলেন, ওই ঘটনায় যারা প্রাণে বেঁচে গেছেন তাদের কেউ আর এখন বেকার নাই। কারণ এই আড়াই বছরে কেউ চাকরি নিতে আসেনি। এর বাইরে যদি এখনও কেউ বেকার থাকে তবে আমাদের সংগঠনের অফিসে যোগাযোগ করলে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে রানা প্লাজায় ওই ঘটনার পর অনেক সাক্ষী হয়ে আছেন জুরাইন কবরস্থানের আশে পাশের বাসিন্দারা। গতকাল তাদের ভিড়ও ছিল লক্ষণীয়। তাদেরও অনেকেই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করতে আগামী বৃহস্পতিবার দুপুরে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে তিনি সিডনিতে অনুষ্ঠেয় ‘২০১৮ গ্লোবাল সামিট অব উইমেন’ শীর্ষক সভায় অংশ নেবেন। সফরকালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী একথা জানান। মন্ত্রী জানান, জেন্ডার সমতা নিশ্চিতে ব্যাপক অগ্রগতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সিডনিতে ওই সভায় অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল। এ আমন্ত্রণ     গ্রহণ করে শেখ হাসিনা আগামী ২৬ থেকে ২৮শে এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ায় সরকারি সফর করবেন। ২৭শে এপ্রিল সন্ধ্যায় সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করবেন। পরদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সদস্য, পররাষ্ট্র সচিব এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনজিও ‘গ্লোবাল সামিট অব উইমেন’ বাংলাদেশ এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারী শিক্ষা এবং নারী উদ্যোক্তাদের কর্মকাণ্ড প্রসারে অভূতপূর্ব নেতৃত্ব প্রদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ‘গ্লোবাল সামিট অব উইমেন’ প্রতিবছর নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে উৎসাহিত এবং সারা বিশ্বে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে। এতে নারীর সামগ্রিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষভাবে সম্মাননা দেয়া হয়। এ বছর সভাটি সিডনিতে আগামী ২৬-২৮শে এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে। গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড একটি আজীবন সম্মাননামূলক স্বীকৃতি। গত বছর জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এ পদক পান। এ ছাড়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, ইউনেস্কোর সাবেক মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা, জাতিসংঘের সাবেক শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার সাদাকো ওগাতা, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেট, আয়ারল্যান্ডের সাবেক রাষ্ট্রপতি মেরি রবিনসনসহ অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তি এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা গ্রহণ করেছেন। শুক্রবার (২৭শে এপ্রিল) সম্মাননা গ্রহণ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়ন, সমসুযোগ, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীকে জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্তকরণের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের গৃহীত উদ্যোগ, অবদান এবং সাফল্য তুলে ধরে বক্তব্য দেবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অগ্রগামী ভূমিকা বিশ্বে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে। তা ছাড়া, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সন্ধিক্ষণে এই স্বীকৃতির ফলে বর্তমান সরকারের নারীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা আরো দৃশ্যমান হবে।’

ভারত বাংলাদেশের সব দলকে স্বাগত জানায় - হাইকমিশনার

পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, বাংলাদেশের যেকোনো রাজনৈতিক দল ভারত সফর করতে পারে। তাদের অবশ্যই স্বাগত জানানো হবে। আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলের সদ্য সমাপ্ত দিল্লি সফরের পর বিএনপি ভারত সফরে আগ্রহী। এমন প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল হাইকমিশনার এসব কথা বলেন। আওয়ামী  লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন দলটির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের দিল্লি সফরটি একান্তই পার্টি লেভেল, এর সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই জানিয়ে হাইকমিশনার বলেন, তবে এ সফরে ভালো মতবিনিময় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে। ভারতীয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। বিজেপির সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এমজে আকবর প্রতিনিধি দলটির সম্মানে সোমবার সন্ধ্যায় একটি নৈশভোজ আয়োজন করেছিলেন। সেখানেও অনেকের সঙ্গে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ কথাবার্তা হয়েছে। সব মিলে দলীয় পর্যায়ে পারস্পরিক বুঝাপড়ায় সফরটি ভালো হয়েছে। এবার বিএনপি দিল্লি সফরে আগ্রহী, তাদেরকেও একইভাবে স্বাগত জানানো হবে কি-না? এমন প্রশ্নে হাইকমিশনার পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়েন। বলেন, তারা কি বলেছে তাদের স্বাগত জানানো হবে না? হাইকমিশনার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ভারতের ইনসানিয়াত কর্মসূচির আওতায় প্রদত্ত ত্রাণ সামগ্রী আগামী মে মাসে পৌঁছাচ্ছে বলে জানান। রোহিঙ্গা ত্রাণসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে জানিয়ে হাইকমিশনার বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী পাঠাচ্ছে ভারত। আসন্ন বর্ষার কথা চিন্তা করে শুকনো খাবার, কেরোসিন স্টোপ, শুঁটকি, গামবুটসহ বিভিন্ন জিনিস পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিশু খাদ্যও সেখানে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলো প্যাক হয়ে গেছে। এখন শুধু পৌঁছানো বাকি। এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে মেডিক্যাল ক্যাম্প হবে। তবে এতে হয়ত একটু সময় লাগবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে নির্বাচনের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট সঠিক নয় বলে উড়িয়ে দেন হাইকমিশনার। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের বাংলাদেশ সফর বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন। বলেন, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রায় দুই বছরে আগে তিনি ভারত সফর করেছিলেন। তার সফরের ফিরতি হিসাবে এ সফরের আমন্ত্রণ গেছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বা নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের আলোচনার অনেক ম্যাকানিজম রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রী সচিব পর্যায়ে আলোচনার ফোরাম রয়েছে। বিএসএফ লেভেলে আলোচনা হয়। বর্তমানে বিএসএফ মহাপরিচালক ঢাকায় রয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন জানিয়ে ভারতীয় দূত বলেন, কূটনৈতিক চ্যানেলে এখন সেই সফরের তারিখ চূড়ান্ত হবে। এ নিয়ে কাজ চলছে। দেখা যাক কি হয়।

বিপাশার বিয়ের ব্যাপক প্রস্তুতি সিলেটে by ওয়েছ খছরু

একটি বিয়ের আয়োজন নিয়ে ধুম পড়েছে সিলেটে। প্রশাসনের কর্তারা ব্যতিব্যস্ত। বিয়েতে সবাই যেন আয়োজক। কেউ দিচ্ছেন বিয়ের শাড়ি, কেউবা আংটি। মহা ধুমধামে এই বিয়ের আয়োজন চলছে। সিলেটের রায়নগরের সরকারি বালিকা শিশু পরিবারে এখন বিয়ে নিয়ে সব আয়োজন। বড় বোনের বিয়ের এই আয়োজনে ওই শিশু পরিবারে থাকা শতাধিক বালিকারাও নিজের মতো করে ধুমধাম করছে। বিয়ের কনে বিপাশা আক্তার মুন্নি। পিতার নাম জামাল মিয়া। ঠিকানা- সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা), রায়নগর, সিলেট। দেখতে দেখতে বিপাশা বড় হয়ে উঠেছে। আটারো পেরিয়ে গেছে। ঘরে মেয়ে থাকলে অনেক পিতা-মাতার কপালে চিন্তার রেখা পড়ে। বিপাশা বড় হয়েছে। এখন তাকে বিয়ে দিতে হবে। এই চিন্তাও এসেছে ওই পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক জয়তি দত্তের। বিপাশার বিয়ে নিয়ে কথা বললেন সিলেটের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নিবাস রঞ্জনের সঙ্গেও। বিয়ে নিয়ে তারা কথা চূড়ান্ত করলেন। বর দেখাদেখি শুরু হলো। বরও তারা খুঁজে পেয়েছেন। গতকাল থেকে বিয়ের দাওয়াত কার্ড বিতরন শুরু হয়েছে।
সিলেটের সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনকে দাওয়াত দেয়া শুরু হয়েছে। সিলেটের বিভিন্ন হাউসেও এসেছে বিয়ের কার্ড। বর আব্দুল লতিফ। তিনি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বুড়াখালী রাজনগর (হালেয়া) গ্রামের মৃত আব্দুল আহাদের ছেলে। আগামী শুক্রবার বিপাশার বিয়ে। দাওয়াত কার্ডে অতিথিদের উপস্থিতি কামনা করেছেন শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক জয়তি দত্ত। কার্ডে লিখেছেন- ‘শুক্রবার সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) রায়নগর নিবাসী বিপাশা আক্তার মুন্নির শুভ বিবাহের দিন ধার্য করা হয়েছে। ওই শুভানুষ্ঠানে আপনার-আপনাদের উপস্থিতি ও দোয়া আন্তরিকভাবে কামনা করি।’ বিপাশা আক্তার মুন্নি শিশু পরিবারের একজন সদস্য। ২০১৫ সাল থেকে ওই পরিবারে বসবাস করছে। এখন শিশু পরিবারই তার সব। এই পরিবারের সব শিশুরাই তার বোন। বিপাশাকে বড় আপন করে নিয়েছেন সবাই। এ কারণে তার বিয়েতে এত আয়োজনের ধুম পড়েছে। চোখের কোনো জলও জমেছে অনেকের। বিপাশা চলে যাবে- যেন পিতার ঘর শূন্য হয়ে যাবে শুক্রবার থেকে। বিপাশার বয়স তখন ১০ কিংবা ১১। সেই সময় দিরাইয়ের পুলিশ ঠিকানা বিহীন অবস্থায় তাকে খুঁজে পেয়েছিল। বিপাশাকে পুলিশ উদ্ধারের পর তার পরিচয় জানার চেষ্টা করে। কিন্তু নিজের নাম ও পিতার নাম ছাড়া বিপাশা কিছুই বলতে পারেনি। পুলিশ প্রথমে বিপাশার পরিচয় সন্ধানে নানা চেষ্টা করে। কিন্তু কাউকে পায়নি। ঠিকানা বলতে না পারা বিপাশাকে শেষে পুলিশ আদালতে হস্তান্তর করে। আদালতের নির্দেশে বিপাশাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় সেইফহোমে। সেখানে প্রায় চার বছর কাটায় বিপাশা।
পরবর্তীকালে আদালত থেকে বিপাশাকে পাঠানো হয় সিলেটের রায়নগরের সরকারি শিশু বালিকা পরিবারে। এরপর থেকে বিপাশা ওই পরিবারে আছে। এখন বিপাশা প্রাপ্ত বয়স্কা তরুণী। বয়স হওয়ার সঙ্গে বিপাশাকে নিয়ে চিন্তা বাড়ে শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়কের। সমাজসেবা অধিদপ্তরের জেলা উপপরিচালক নিবাস রঞ্জনের সহযোগিতা নিয়ে বর খোঁজা শুরু করেন তারা। শিশু পরিবারের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী বরের খোঁজ নিতে থাকেন। এরমধ্যে এক ওই পরিবারে কর্মরত একজনের পরিচয়ের সূত্র ধরে খোঁজ মিলেছে বর আব্দুল লতিফের। সিলেটের রায়নগরের সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) উপ তত্ত্বাবধায়ক জয়তি দত্ত গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ‘আমরা বরের খোঁজ পাওয়ার পর উপ-পরিচালক সহ বরকে দেখতে যাই। বর সম্পর্কে খোঁজ খবর নিই। তাদের কাছে বিপাশার সব তথ্য জানাই। বর আমাদের পছন্দ হওয়ার পর বরের মা রাবেয়া বিবি সহ তাদের পক্ষের লোকজন এসে কনে দেখে গেছেন। আমরা তাদের নতুন আত্মীয়ের মতো সমাদর করি। তারাও কনে দেখে পছন্দ করেন। এরপর কথাবার্তা চূড়ান্ত করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের পুরো শিশু পরিবার এখন বিয়ে নিয়ে মহাব্যস্ত। বিপাশার বিয়ে নিয়ে সবাই মহা ধুমধামে মেতে উঠেছে। বিশেষ করে শিশু পরিবারের শিশু-কিশোরীরাও ব্যস্ত।’ তিনি জানান, ‘ওই পরিবারে যারা থাকে সবাই আমার পরিবারের সদস্য। বিপাশাকে নিজের মেয়ের মতো দেখি। এ কারণে এত আয়োজন।’ এদিকে বিপাশার বিয়েতে শুধু যে শিশু পরিবার কিংবা সমাজসেবা কর্মকর্তারা জড়িত তা নয়। এই বিয়েতে অংশ নিয়েছে সিলেটের গোটা প্রশাসনও। বিয়ে আয়োজনে কোনো কমতি নেই। প্রায় তিনশ’ মানুষের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর পক্ষ থেকে আসবেন ১০০ অতিথি। আর কনের পক্ষের দাওয়াতি থাকবেন ২০০ জন। সিলেটের প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক লোকজনও উপস্থিত থাকবেন বিয়েতে। সবাই একসঙ্গে বিপাশার নতুন জীবনের সঙ্গী হবেন। সিলেট সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপর পরিচালক নিবাস রঞ্জন মানবজমিনকে জানিয়েছেন, বিপাশার বিয়ের বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও এসপি মহোদয়কে জানানোর পর তারাও বিয়েতে উৎসাহী হয়েছেন। নিজের সন্তানের বিয়ের মতো উৎসাহী হয়ে সিলেটের প্রশাসনের কর্মকর্তারা এগিয়ে এসেছেন। সবাই শরিক হয়েছেন বিয়েতে। আর বিপাশার নবজীবনের শুভ কামনা জানাতে অভিভাবক হয়ে সবাই আসবেন। উপ পরিচালক জানান, বিপাশার বিয়ের বিষয়টি তাদের তরফ থেকে আদালতকেও অবগত করা হবে। দিরাইয়ের বুড়াখালী গ্রাম হচ্ছে প্রয়াত জননেতা আলহাজ আব্দুস সামাদ আজাদের নিজের এলাকা। বরের বাড়ি ওখানে। বিয়ের উকিল পিতা হয়েছেন সাইদুর রহমান।