Wednesday, June 29, 2016

সহমর্মিতার মাস রমজান

ইসলাম সাম্য ও মৈত্রীর ধর্ম। মৈত্রীর জন্য প্রয়োজন সাম্য, সাম্যের জন্য প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সমবেদনা বা সম উপলব্ধি ও সম অনুভব। রমজান মাস সাম্য, মৈত্রী, সমবেদনা ও সহমর্মিতা সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রাখে। হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) বলেন: ‘রমজান হলো সমবেদনা ও সহমর্মিতার মাস।’ (বায়হাকি)। রমজান মাসে ধনীরা গরিবের দুঃখ বুঝবে; ক্ষুধায় জঠর জ্বালা অনুভব করবে। ইফতারে অনুভব করবে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর অসহায় মানুষের খাবারের প্রতি কী দুর্নিবার আকর্ষণ। সম্মান করতে শিখবে খাদ্যকে; মর্যাদা দিতে শিখবে ক্ষুধার্ত মানুষকে। বুঝবে কেন অসহায় গরিব মানুষ দুমুঠো অন্নের জন্য অন্যের ঘরে কাজ করে। কেন প্রসূতি মা তাঁর নাড়িছেঁড়া বুকের ধনকে কয়েকটি টাকার বিনিময়ে অচেনা কারও কাছে বিক্রি করে দেন। উপলব্ধি করবে দুস্থ-গরিব অসহায় মানুষ ফুটপাতে ফেলে রাখা বর্জ্যের স্তূপ থেকে পচা খাবার কেন তুলে মুখে পুরে দেয়। অনুভব করবে ক্ষুধায় কাতর মানুষ কীভাবে তার আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়, মর্যাদা ভুলে যায়, মান-ইজ্জত বিকিয়ে দেয় খাবারের জন্য। তাদের ঘৃণা ও উপেক্ষা নয়, তাদের জন্য ভালোবাসা ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। এটুকু অনুভূতি যদি জাগ্রত না হয় তাহলে রোজা ও রমজান উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
জাকাতের শাড়ি কাপড়
অনেক জায়গায় দেখা যায় ‘এখানে জাকাতের শাড়ি কাপড় ও লুঙ্গি পাওয়া যায়’ মর্মে ব্যানার ঝুলিয়ে কিছু কম দামি নিম্নমানের শাড়ি কাপড় ও লুঙ্গি বিক্রি করা হয়। কিছু জাকাতদাতা আছেন যাঁরা এগুলো কিনে গরিব মানুষের মাঝে বিতরণ করেন। এতে জাকাতকে অসম্মান করা হয়, জাকাত গ্রহীতাকে অসম্মান করা হয়; মানবতাকে অসম্মান করা হয়। এসব শাড়ি ও লুঙ্গি দেখলেই চেনা যায় এটি করুণার দান; যাতে ব্যবহারকারীর আত্মমর্যাদা বিনষ্ট হয়। যা পরে কোনো ভালো জায়গায় যেতে দ্বিধা বোধ করেন। রমজানের শিক্ষা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ করবে না, কালোর ওপর সাদার প্রাধান্য নেই, আরব-অনারবের পার্থক্য নেই; ক্রীতদাস ও কর্মচারীকে নিজ ভাইয়ের সমান মর্যাদা দেবে; তোমরা যা খাও তাদের তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরিধান করো তাদেরও তা পরিধান করাবে।’ (বুখারি)।
কাউকে অসম্মান করা কবিরা গুনাহ
জাকাত প্রদান ফরজ ও সদকা আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু কোনো মানুষকে হেয় জ্ঞান করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, কারও সম্মানহানি করা নাজায়েজ, হারাম ও কবিরা গুনাহ। সুতরাং ফরজ জাকাত ও ওয়াজিব সদকা আদায় করতে গিয়ে এই কবিরা গুনাহের মতো হারাম ও নাজায়েজ কাজ করা মোটেই উচিত নয়। প্রকারান্তরে যা বাস্তবে ঘটে থাকে।
ধনীর সম্পদে গরিবের পাওনা
অনেকেই জাকাত ও সদকা দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। এটা মোটেই সমীচীন নয়। কারণ জাকাত ও সদকা দয়ার দান নয়, এটি ধনীর সম্পদে গরিবের প্রাপ্য অংশ। যা তারা দাবি না করলেও বা না চাইলেও পরিশোধ করতে হবে; তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। যেহেতু এটি তার পাওনা, সুতরাং প্রাপককে সসম্মানে তা প্রদান করতে হবে; যাতে তিনি তা পেয়ে সন্তুষ্ট হন। মুজতাহিদ ফকিহগণের মতে, সদকা ও জাকাত এমনভাবে দেওয়া উত্তম, যা গ্রহীতা স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে টাকাই অগ্রগণ্য। কেননা, এর দ্বারা গ্রহণকারী নিজের রুচিমতো প্রয়োজন মেটাতে পারেন। যদি কোনো কাপড় বা খাদ্যদ্রব্য অথবা অন্য কোনো বস্তু কিনে দেন তাহলে মানসম্পন্ন জিনিসই দেওয়া উচিত। এমন শাড়ি বা লুঙ্গি দেওয়া উচিত, যা পরে তিনি কোনো উন্নত পরিবেশে একটি ভালো মজলিশে বা কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারেন এবং স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ বোধ করেন। (আল ফিকহুল ইসলামি)।
ইতিকাফ অবস্থার কী করা যায় বা যায় না
ইতিকাফকারী মসজিদের মধ্যে ইতিকাফরত অবস্থায় চাইলে বা প্রয়োজন হলে ও আয়োজন করা গেলে বিয়েশাদি করতে বা করাতে পারবেন। কারণ এটি একটি সুন্নত আমল, যা ইতিকাফের পরিপন্থী নয় এবং এর দ্বারা ইতিকাফ ভঙ্গ হবে না। এমনকি ইতিকাফ অবস্থায় বিবাহ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আলোচনা ও সিদ্ধান্ত মসজিদে হতে পারে। (আল বাদায়ে ওয়াস সানায়ে)। ইতিকাফ অবস্থায় ইতিকাফকারী প্রয়োজনে মসজিদের ভেতরে মোচ ছাঁটতে ও নখ কাটতে পারবেন। তবে এই মাসআলা তাঁদের জন্য যাঁরা দীর্ঘ সময় তথা ১০ দিন, ২০ দিন, ৩০ দিন বা ৪০ দিন একাধারে ইতিকাফ করবেন। তাঁদের জন্য মসজিদের বাইরে গিয়ে ক্ষৌরকর্ম করাও জায়েজ আছে। কিন্তু অল্প সময় অর্থাৎ ১০ দিনের চেয়ে কম সময় ইতিকাফকারীর জন্য এসব উচিত নয়। এগুলো ইতিকাফের পরেও করতে পারবেন।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্‌ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com

ছেলেশিশুকে রান্নাবাটি খেলতে শেখান

জীবনসঙ্গীর প্রতি কর্মজীবী নারীর অনেক অভিযোগ। গৃহব্যবস্থাপক নারীকেও মুখ বুজে অনেক কিছু হজম করতে হয়। অভিযোগের মধ্যে অন্যতম, ঘরের কাজে পুরুষ হাত দিতে চান না। ভাবেন, ওটা নারীদের একচেটিয়া। কিন্তু যে নারী তাঁর সঙ্গী পুরুষটির মতোই কর্মক্ষেত্রে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ঘরে ফেরেন, তাঁরও তো শরীর। না, তাঁকে ঘরে ফিরেই সঙ্গীর হুকুম তামিল করতে হবে। রান্নাবান্না, খাবার পরিবেশন, সন্তান ও বয়স্কদের দেখাশোনা, অতিথি আপ্যায়ন, ঘর গোছানো—সবই নারীর কাজ। এসব কি নারীশরীরের মতোই ঈশ্বর-নির্ধারিত? নারীকে এসবের দায়িত্ব কে দিয়েছে? এই সমাজ, এই পুরুষসমাজ। পুরুষেরও দুটি হাত, নারীরও। কোনো কাজ পারা না-পারা অভ্যাস ও অনুশীলনের বিষয়। একসময় যখন নারীরা শুধুই ঘরের কাজ করতেন, তখন না হয় এসব অত্যাচার কিছুটা মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু স্বনির্ভর-সচেতন নারীর প্রশ্নের কী জবাব দেওয়া যাবে? তাঁদের বোঝালে তো চলবে না যে এগুলো পুরুষের কাজ, ওগুলো নারীর। যুক্তি কোথায়? জেন্ডার ধারণার উন্মেষ ও বিকাশের ধারাবাহিকতায় নারী বুঝতে শিখেছেন ধর্ম-সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে নিজেদের সুযোগ-সুবিধার জায়গাটা পাকা করে রাখার জন্য ক্ষমতাধর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আরোপিত অনুশাসন ছাড়া এখানে অন্য কোনো বিধিবিধান নেই। উন্নত বিশ্বে তালাকের হার অনেক বেশি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ তালাকই নাকি নারীর তরফ থেকে আসে। কেন?
প্রধান কারণগুলোর মধ্যে পুরুষ সঙ্গীরা এখনো নারী সঙ্গীর কাছে সংসারের সব কাজ ও সন্তান লালনের যাবতীয় কর্তব্য আশা করেন। বিয়ে বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম এইচ ডরোথির মতে, আমেরিকায় ৭৩ শতাংশ বিয়েই ভেঙে যায় অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে। অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে অন্যতম সংসার ও সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব ভাগাভাগির ব্যাপারে পুরুষ সঙ্গীর অপারগতা। এই সেদিন একজন নারীবিষয়ক গবেষক বলছিলেন, নারীদের আত্মত্যাগের কারণেই সংসারগুলো টিকে আছে। তিনি শিক্ষিত, কর্মজীবী নারীদের সংসারের দিকেই মূলত ইঙ্গিত করেছিলেন। এখনো আমাদের মজ্জায়-মননে নারী-পুরুষের শ্রমবিভাজনের ধারণা সমানভাবে বিদ্যমান। এমনকি শিক্ষিত নারীও ভাবেন, পুরুষের পেশিবহুল হাত সংসারের কোমল কার্যক্রমের জন্য উপযুক্ত নয়। একজন উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবী মা বিদেশে ছেলের বাসায় গিয়ে দেখেন, পুত্রবধূ রান্না করছেন আর পুত্র বাসন মাজছেন। দেখে তিনি আড়ালে চোখের পানি মুছে পুত্রের হাত থেকে বাসনপত্র কেড়ে নিয়ে ‘এসব কি পুরুষ মানুষের কাজ?’ বলে নিজেই লেগে পড়লেন সে কাজে। যেমনটি পোশাকশিল্প কারখানায় নমনীয় আঙুলকে সুই-সুতোর সূক্ষ্ম কাজের উপযোগী বিবেচনা করে নিম্ন মজুরির শ্রমিক পর্যায়ে কেবল নারীকেই নিযুক্ত করা হয়। অপরদিকে শ্রমবিভাজনের প্রচলিত প্রথায় কৃষিকাজ বা নির্মাণশ্রমে পুরুষের একাধিপত্য বিবেচনা করা হলেও নারীকে এসব কাজে অন্তর্ভুক্ত করাতে সুবিধাভোগী পুরুষ সম্প্রদায়ের উৎসাহের কমতি নেই।
কিন্তু নারীর জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ নৈব নৈব চ। জেন্ডার সমতায় বিশ্বাসী স্বামীও বুক ফুলিয়ে বলেন, ‘আমি ঘরের কাজে আমার স্ত্রীকে সাহায্য করি।’ আহা! যেন ঘরটা কেবল তাঁর স্ত্রীর। তিনি সাহায্য করে নারী জাতিকে উদ্ধার করছেন। সংসার নারী-পুরুষ উভয়েরই। সন্তানও উভয়ের। নারীকে দশভুজা, সর্বংসহা ধরিত্রী, প্রকৃতিতুল্য ইত্যাদি গালভরা নামে আখ্যায়িত করলে নারী আর আহ্লাদিত হন না। তিনি চান সমান সমান। তিন বোনের একটা ছোট ভাই। ছোটবেলায় বোনেরা রান্নাবাটি খেললে ভাইটাও বল-বন্দুক ফেলে বোনদের সঙ্গে রান্নাবাটি খেলাতেই অধিক উৎসাহ বোধ করত। মা আতঙ্কিত। ছেলের আবার একি মেয়ে-মেয়ে খেলা! অথচ বড় হয়ে সংসারী হলে সেই ছেলেটির স্ত্রীর মতো সুখী খুব কম মেয়েই হয়েছেন। একটা পরিবারে ছেলে ও মেয়েশিশু পাশাপাশি বড় হলে তারা অভিভাবকদের মানসিকতায় বেড়ে ওঠে। বাবা-মা নিজেদের মধ্যে যেমন আচরণ করেন, শিশুরাও সেটাই শিখে নেয়। মেয়েশিশুটিকে মায়ের মতো নতমুখী মেয়েমানুষ হিসেবে তৈরির যাবতীয় শিক্ষা দেওয়া হয়। আর ছেলেটিকে বলা হয় বাবার মতো হতে, যে বাবা গটমটিয়ে ময়লা জুতো পরে পরিষ্কার ঘরে বীরদর্পে প্রবেশ করেন, বাইরে পরা জামা-জুতো ইতস্তত ছুড়ে ফেলেন, নানা পদে সাজানো খাবার টেবিলে বসে প্রতিটা পদের খুঁত বের করে চেটেপুটে খান, টিভির রিমোট কন্ট্রোল নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে চায়ের হুকুম চালাতে থাকেন।
বেশির ভাগ পুরুষেরই ধারণা, ঘরের কাজ কোনো কাজই না। যেন ওগুলো রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে নারীরা করে থাকেন। গৃহিণী নারীকেও ‘আপনি কী করেন’ জিজ্ঞাসা করলে তিনি লাজনম্র বদনে ‘আমি কিছু করি না’ বলেন। এ শুনে নারীবাদীরা গোস্যা করেন, বলেন, কী অন্যায় কথা! আরে, আপনি গৃহব্যবস্থাপক। উদয়াস্ত পরিশ্রম করছেন আবার বলছেন কিছু করেন না? কিন্তু যে কাজের বিনিময়ে কোনো অর্থ উপার্জিত হয় না, তাকে তো অর্থনীতির সংজ্ঞায় কাজ বলা যাবে না। নারীর দোষ কোথায়? কেবল গালভরা পদবিতে তাঁর চিড়ে ভিজবে? পুরুষও ভাবেন যে কাজে পয়সা আসে না, তা করে লাভ কী? কিন্তু নারী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হচ্ছেন দিন দিন। স্বনির্ভরতা তাঁকে আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদাবান করে তুলছে। শুধু বাইরের কাজই নয়, এ ডিজিটাল যুগে ঘরে বসেও নারীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। কাজের পরিধি বাড়ছে। এরই সঙ্গে মজ্জায়-মননে জমে থাকা চিরকালীন ধারণা পুষে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ কখনো কখনো অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়লেও তা মোটা দাগে খুব সুফল বয়ে আনছে না দেশে-বিদেশে কোনখানেই, বিশেষ করে সন্তানদের জন্য। ঘরের কাজ কোনো অংশেই সামান্য নয়। এ কাজ ভাগাভাগি না করার কারণে যদি সংসার ভাঙে, তার ভার কেন বইবে সন্তানেরা? একটা কুমানসিকতা ভাঙা কি সংসার ভাঙার চেয়েও কঠিন? ছেলেশিশুর হাতে খেলনা পিস্তল তুলে দিয়ে কী পরিণতি হচ্ছে পৃথিবীর, তা প্রতিদিনের সংবাদমাধ্যমই বলে দিচ্ছে। তাই ছেলেশিশুকেও খেলনা-পাতিল দিয়ে ঘরকন্নার কাজ শেখাতে হবে। না হলে কবি আর কত কাল গাইবেন—
‘সংসার মানে ব্যর্থ বাসনা বেদনার জলাভূমি,
সংসার মানে সংসার ভাঙা সংসার মানে তুমি’।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।
muslima.umme@gmail.com

ইইউ পার্লামেন্টে তোপের মুখে নাইজেল ফারাজ

নাইজেল ফারাজ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যের গণভোটের রায়ের পর এ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। পুরো আলোচনায় দেশটির ইইউ ত্যাগের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টির (ইউকিপ) নাইজেল ফারাজ ছিলেন সমালোচনা ও ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। গত বৃহস্পতিবার গণভোটের পর গতকালই প্রথম এ নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গৃহীত এক প্রস্তাবে ইইউ থেকে বিদায়প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার জন্য লিসবন চুক্তির আর্টিকেল ফিফটি দ্রুত সক্রিয় করতে যুক্তরাজ্যের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এদিকে ব্রেক্সিট ভোটের পর গৃহ–বিবাদে জর্জরিত যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টিতে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়ে হেরে গেছেন দলনেতা জেরেমি করবিন। তঁার বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৭২টি, পক্ষে ৪০টি। তবে করবিন বলছেন, দলের প্রতি ‘বেইমানি’ করে তিনি পদত্যাগ করবেন না।
ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের অধিবেশনের পর গতকাল রাতে ইইউর সদর দপ্তর ব্রাসেলসে জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। গণভোটের পর তাঁদের মধ্যে এটাই প্রথম বৈঠক। ব্রাসেলসে পৌঁছে ক্যামেরন বলেন, ‘আমি ইউরোপের নেতাদের জানাব যে, যুক্তরাজ্য আর ইইউতে থাকছে না। তবে আশা করব এই বিদায়প্রক্রিয়া হবে গঠনমূলক।’ আজ সকালে ইইউ নেতারা আবার প্রাতরাশ আলোচনায় বসবেন। তবে সেই বৈঠকে ক্যামেরনের না থাকার সম্ভাবনা বেশি। নাইজেল ফারাজ গতকাল ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সমালোচনার বাণে বিদ্ধ হন। তাঁকে উদ্দেশ করে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জঁ-ক্লদ জাঙ্কার বলেন, ‘আপনারা ইইউ থেকে বের হয়ে যেতে লড়াই করেছেন। ব্রিটিশ জনগণও বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাহলে আপনারা এখানে কেন?’
জঁ-ক্লদ জাঙ্কার যুক্তরাজ্যকে জোট ত্যাগের বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলেন এ সময়। তাঁর তোপ এখানেই থামেনি, তিনি নাইজেল ফারাজের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ইইউর সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যের দেওয়া আর্থিক সহায়তা নিয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগ তোলেন। পার্লামেন্টে উদারপন্থী গ্রুপের প্রতিনিধিত্বকারী বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গাই ভেরোফস্টাড বলেন, গণভোটে ফারাজ নাৎসি ধারায় প্রচারণা চালিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি অভিবাসীদের নিয়ে একটি পোস্টারের বক্তব্যও পড়ে শোনান। নাম উল্লেখ না করে ভেরোফস্টাড ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালানো বরিস জনসনকেও তীব্র আক্রমণ করেন। বরিস জনসন ইতিমধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের স্থলাভিষিক্ত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ভেরোফস্টাড বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হতে একজন স্বার্থপর মানুষ সবকিছু করতে পারে।’
তোপের মুখে নাইজেল ফারাজ তাঁর বক্তব্যে পার্লামেন্ট সদস্যদের বলেন, ‘আপনাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। যুক্তরাজ্যই ইইউ ত্যাগকারী সর্বশেষ দেশ হবে না।’ ম্যার্কেলের হুঁশিয়ারি: ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ ঝড় বয়ে যাওয়ার আগে নিজ দেশের পার্লামেন্টে কঠোর ভাষায় কথা বলেন জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল। তিনি বলেন, ‘গণভোটের রায়ের বিষয়ে আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশরা ইইউ ছাড়ার আলোচনায় নিজেদের পছন্দ বা সুবিধামতো সবকিছু করলে চলবে না।’ ইউরোপিয়ান কমিশনের রাশ টানা দরকার: পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্র বলছে, সময় এসেছে ইউরোপিয়ান কমিশনের রাশ টেনে ধরার। জঁ-ক্লদ জাঙ্কারকে বরখাস্ত করার দাবি করেছে পোল্যান্ড। ব্রেক্সিটের ফলে সামরিক শক্তি খর্ব হওয়ার আশঙ্কায় ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোঘেরিনি সংস্থাটির প্রতিরক্ষা আরও সুসংহত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

‘যুদ্ধ করে কাশ্মীর জয়’ সম্ভব নয়

পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খার বলেছেন, পাকিস্তানের পক্ষে ‘যুদ্ধ করে কাশ্মীর জয় করা’ সম্ভব নয়। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতেই এই বিষয়ে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। দেশটির বেসরকারি জিও টেলিভিশনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। হিনা রব্বানি বলেন, প্রতিবেশী দুটি দেশের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্কের মাধ্যমে কোনো সমাধানে পৌঁছানো যাবে না। কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সামনে এগোনো সম্ভব। তিনি দাবি করেন,
পাকিস্তান পিপলস পার্টি ক্ষমতায় থাকার সময় ভিসা সহজীকরণ, বাণিজ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করাসহ বিভিন্ন উপায়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সব ধরনের চেষ্টা করেছে। যেহেতু নওয়াজ শরিফ আরও বেশি জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আছেন, তাঁর পক্ষে আরও বেশি অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হিনা রব্বানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দিকে ‘ঝুঁকে থাকে’ মূলত দেশটির শক্তিশালী অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের ঐতিহ্যের কারণে।

এখনই বড় রকমের নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র

সুসান রাইস
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যবাসীর রায়ে এখনই বড় রকমের কোনো নিরাপত্তাগত উদ্বেগ দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস গত রোববার বলেন, যুক্তরাজ্যের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায়ের কারণে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা উদ্বেগ ‘তুলনামূলকভাবে কম’। সুসান রাইস বলেন, সন্ত্রাস দমন ও অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের অব্যাহত সহযোগিতা নিশ্চিত করতে তাঁর দেশ কাজ করে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে ‘অ্যাসপেন আইডিয়াস ফেস্টিভাল’-এ দেওয়া বক্তৃতায় রাইস এ মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পরস্পর ঘনিষ্ঠ অংশীদার ও মিত্র হয়ে থাকবে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদের সম্পর্ক আরও নিবিড় করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও আলোকপাত করেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের আলোচিত গণভোটের ফল জানার পরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রথম কী বলেছিলেন—জানতে চাইলে রাইস হতাশা প্রকাশের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এর আগে বিভিন্ন সময় দুই নেতা নিজেদের আলাপে গণভোটের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে কথা বলেছেন। গত এপ্রিলে যুক্তরাজ্য সফরের সময় ও গত মে মাসে জাপানে জি-৭ বৈঠকে ওবামা ইইউর সঙ্গে থেকে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের বাকি মেয়াদে এ দুই নেতা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবেন এবং আগামী জুলাইয়ে ওয়ারশতে অনুষ্ঠেয় ন্যাটো শীর্ষ বৈঠকে তাঁরা সাক্ষাৎ করবেন বলেও সুসান রাইস জানান।