Thursday, July 30, 2026

মুসলিম নেতার গড়া মোহাম্মদ আলী বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলতে কেন উঠেপড়ে লেগেছে বিজেপি সরকার

আল–জাজিরাঃ ভারতের উত্তর প্রদেশে একটি এলাকায় শতাধিক মানুষ মাটিতে বিছানো চাটাইয়ের ওপর পা গুটিয়ে বসে আছেন। জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে তাঁরা স্লোগান দিচ্ছেন এবং জাতীয় পতাকা নাড়াচ্ছেন।

রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে ২০০ কিলোমিটার (১৩২ মাইল) দূরের ওই এলাকাটির নাম রামপুর। কয়েক দিন আগে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে নয়াদিল্লিতে হাজারো তরুণের বিক্ষোভের মুখে দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগে বাধ্য হন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর নয়াদিল্লির বিক্ষোভকারীরা ঘরে ফিরে গেলেও রামপুরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে।

সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি দল অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। তাদের দাবি, মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ভেঙে ফেলার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা স্বাধীনতা সংগ্রামী মোহাম্মদ আলী জওহরের নামানুসারে বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের রামপুর জেলায় বিশিষ্ট মুসলিম রাজনীতিক আজম খান এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

আজম খান ২০০৩ সালে মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্ট গঠন করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫ জুলাই রামপুর জেলা প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিকাংশ ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ জারি করেছে। অথচ সে সময়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের তুমুল বিক্ষোভ চলছিল।

রামপুর প্রশাসনের অভিযোগ, এ ভবনগুলো নির্মাণে প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা ও বিধিমালা ঠিকমতো মানা হয়নি।

কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ ভবনসহ মাত্র দুটি স্থাপনা বৈধ অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হয়েছে। এ দাবি তুলে তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে কথিত ‘অবৈধ’ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে।

প্রশাসন আরও জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনগুলো অপসারণে ব্যর্থ হলে তারা বুলডোজার নিয়ে অভিযান চালাবে এবং ভাঙার পুরো খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকেই আদায় করা হবে।

গত সোমবার রাজ্য প্রশাসন তাদের আদেশের ওপর একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ (ইন্টারিম স্টে) জারি করেছে। তবে এতে স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে ভবন ভাঙার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করা হয়েছে কি না।

জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন আল–জাজিরাকে বলেন, এই স্থগিতাদেশের অর্থ এই নয় যে ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।

উপাচার্য বলেন, ‘এর অর্থ হলো, আরডিএ (রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) নির্ধারিত ৫ আগস্টের সময়সীমার মধ্যে ভবন ভাঙার কাজ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় এখন এমন একটি রায়ের চেষ্টা করছে, যাতে ভাঙার আদেশটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যায়।

‘ভাঙচুর বন্ধ করুন’

২৫০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন। তাঁদের কাছে সরকারের এই পদক্ষেপ একেবারেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অপ্রত্যাশিত আঘাত হিসেবে এসেছে।

১৫ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রধান ফটকের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাঁদের দাবি, ভবন ভাঙার আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।

জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করা উসামা তাইয়্যাব প্রশ্ন তোলেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের ফলে যদি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা যায়, তাহলে এখানে এত শিক্ষার্থী আন্দোলন করার পরও উত্তর প্রদেশ সরকারকে কেন বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করা যাবে না?’

প্রায় ২৪ কোটি মানুষের আবাসস্থল উত্তর প্রদেশে ২০১৭ সাল থেকে হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শাসন চলছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী। তিনি মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতির জন্য পরিচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবনের চ্যান্সেলর ৭৭ বছর বয়সী আজম খান উত্তর প্রদেশে বিজেপির অন্যতম কড়া সমালোচক। তিনি সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন।

এই রাজনৈতিক দলটি রাজ্যের ৩ কোটি ৮০ লাখ মুসলিমের মধ্যে জনপ্রিয়। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত হিন্দু জাতিভুক্ত ভোটারদের একটি বড় অংশও দলটিকে সমর্থন করে।

‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’

সমাজবাদী পার্টির আইনপ্রণেতা জাভেদ আলী খান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রায় সব ভবন) ভেঙে ফেলার নির্দেশটি শিক্ষাবিরোধী এবং মানুষকে অশিক্ষিত রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির অংশ।’

জাভেদ আলী খান আরও বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিশানা করার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি আজম খান প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্বিতীয়ত, এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির শীর্ষ নেতা মুলায়ম সিং যাদব। তৃতীয়ত, এর উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। আর চতুর্থত, এটি একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়।’

সমাজবাদী পার্টির প্রধান প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং যাদব ২০২২ সালে মারা যান। তাঁর ছেলে অখিলেশ যাদব বর্তমানে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তিনি বিজেপিবিরোধী জোটের এক সদস্য। এই জোটে ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসও রয়েছে।

এ বিষয়ে বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী বলেন, ভবন ভাঙার নির্দেশটি ‘অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’। তিনি সমাজবাদী পার্টির বিরুদ্ধে ‘তোষণমূলক রাজনীতি’ করার অভিযোগও তোলেন।

রাকেশ ত্রিপাঠী আল–জাজিরাকে বলেন, ‘কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন, আজম খান অবৈধ জমির ওপর এই বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছেন? সমাজবাদী পার্টির সরকার থাকাকালে তিনি নিজের পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে দখল করা জমিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেছেন এবং অবৈধ ভবনও তৈরি করেছেন। আমরা যা করছি, তা হলো অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। আর এর অর্থ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলা উচিত।’

‘মেয়েরা জীবনে আর দ্বিতীয় সুযোগ পাবে না’

রামপুরের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলার আশঙ্কায় জনমনে ক্ষোভ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সাক্ষরতার হারের দিক থেকে উত্তর প্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে রামপুরের অবস্থান নিচের দিক থেকে মাত্র চারটি জেলার চেয়ে ভালো।

এ ছাড়া জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই নারী বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রক্টর গুলরেজ নিজামী।

আইন বিষয়ের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ইকরা আল–জাজিরাকে বলেন, তিনি একটি নির্দিষ্ট কারণেই এই বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিলেন। সেটা হলো নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ।

এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এখানকার পরিবেশ ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় নারী শিক্ষার্থীদের এখানে যে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাতে আমাদের অভিভাবকেরা সন্তুষ্ট। এই বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে আমাদের মতো মেয়েরা আর কোথাও পড়াশোনা করার সুযোগ পাব না। আমাদের অন্য কোথাও পড়ার জন্য পাঠাতে অভিভাবকদের রাজি করানো সম্ভব হবে না। তাঁরা এই জায়গা বেছে নিয়েছিলেন, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন, এখানে মুসলিম মেয়েরা নিরাপদে থাকতে পারবে।’

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অন্য কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিতে সরকার একটি কাউন্সেলিং ক্যাম্প পরিচালনা করছে বলে জানান ইকরা।

এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘কিন্তু আমরা সেখানে যেতে চাই না। আমরা একটি নির্দিষ্ট কারণেই এই প্রতিষ্ঠান বেছে নিয়েছিলাম।’

শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, এমনটি নয়। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক–তৃতীয়াংশের বেশি হিন্দু।

প্যারামেডিক্যালে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর আল–জাজিরাকে বলেন, ‘তারা এটিকে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারে এবং হ্যাঁ, আইনি মর্যাদার দিক থেকে এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, এখানে অন্যরা পড়াশোনা করে না।’

চাঁদনি দিবাকরও বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। অবস্থান কর্মসূচির স্থানে তিনি বলেন, ‘আমি এক বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকেও একবারের জন্যও আমার নিজেকে অমুসলিম বলে মনে হয়নি। এখানকার সবাই বন্ধুত্বপূর্ণ—শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, সবাই।’

আরডিএ বলছে, এক আঞ্চলিক কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ওই কর্মকর্তা অনিয়মগুলোর বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।

১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ও আরডিএ—উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা আইনজীবীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। সেদিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও আরডিএর ভাইস চেয়ারম্যান অজয় কুমার দ্বিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং এরপর তারা লিখিত জবাবও দিয়েছে। জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত ৪০টি ভবনের মধ্যে মাত্র দুটিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাকি ৩৮টি ভবন অবৈধ বলে প্রমাণিত হয়েছে।’

কিন্তু উপাচার্য জহিরউদ্দিন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, রামপুরের সিঙ্গনখেড়া গ্রামে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান আরডিএর আওতায় আসে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থাৎ ভবনগুলো নির্মাণের বহু বছর পর। তাই নির্মাণের সময় সেসব অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না এবং এখন তা দাবি করা যেতে পারে না।

উপাচার্য আল–জাজিরাকে আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় সিঙ্গনখেড়া এলাকায় আরডিএর কোনো এখতিয়ার ছিল না। আমরা বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদিত কোর্স পরিচালনা করছি, আর এসব সংস্থা তাদের সব শর্ত পূরণ করার পরই অনুমোদন দেয়।’

উপাচার্য জহিরউদ্দিন আরডিএর এই পদক্ষেপকে শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, তারা শুধু দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী আজম খানের বিরুদ্ধে এটিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নতির জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কথিত এ অনিয়মগুলোকে বৈধ করা সম্ভব নয়। ফলে আইনগতভাবে একমাত্র সমাধান হিসেবে ভবন ভেঙে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

আল–জাজিরা রামপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিবেদীর বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে, এমনকি রামপুরে তাঁর কার্যালয়েও গিয়েছে। কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ করতে বা সাক্ষাৎকারের অনুরোধের কোনো জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান।

‘পুলিশ আমাদের বাড়িতে আসছে’

ভবন ভেঙে ফেলার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরডিএর আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতক উসমান আলী আল–জাজিরাকে বলেন, ‘অন্যরা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের দাবি আদায় করতে পারে, তাহলে আমরা মুসলিম শিক্ষার্থীরা কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলা বন্ধ করার বৈধ দাবি পূরণ করতে পারব না? এর জন্য যদি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, আমরা তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে এই অন্যায় আমরা আর মেনে নেব না।’

উসমান আলী অভিযোগ করেন, ধর্মঘটে থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়ে পুলিশ পরিবারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে তারা আন্দোলন বন্ধ করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে।

উসমান বলেন, ‘পুলিশ আমাদের বাড়ি আসছে এবং আমাদের অভিভাবকদের পরিণতির হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু আমরা পিছু হটব না।’

গত শনিবার সমাজবাদী পার্টির আইনপ্রণেতাদের একটি প্রতিনিধিদল বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেয়। ওই দলে ছিলেন জাভেদ আলী খান, সাম্ভল আসনের জিয়া উর রহমান বার্ক ও কৈরানার ইকরা চৌধুরী।

বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসা ও নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, দোকান ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপের প্রভাব অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মুসলিমদের ওপরই বেশি পড়ছে।

তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা শুধু ‘অবৈধ দখল’ উচ্ছেদের লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এ নিয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি সাহিত্যের শিক্ষক অপূর্বানন্দ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘বিষয়টিকে (ভবন ভাঙার পদক্ষেপ) একাধিক দিক থেকে দেখা যায়। প্রথমত, এটি হিন্দু ভোটারদের সামনে মুসলিমদের প্রভাবকে দমন করার একটি প্রদর্শনী। দ্বিতীয়ত, এই সরকারের মেয়াদজুড়ে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক প্রচার চালানো হয়েছে। আর তৃতীয়ত, তারা হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মেলামেশা চায় না, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এমন মেলবন্ধনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।’

জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আবদুল কালিম আনসারি যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সদ্য তিনি রামপুরে ফিরেছেন।

উভয় আন্দোলনে অংশ নেওয়া আনসারি বলেন, তিনি বিস্মিত যে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নামা ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ আন্দোলনের কর্মসূচিতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলার আসন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

আনসারি বলেন, ‘এটা বিস্ময়কর যে তারা শিক্ষা সংস্কারের কথা বলছে। কিন্তু দিল্লি থেকে মাত্র কয়েক শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জারি করা ভবন ভাঙার নোটিশ নিয়ে তারা কিছুই বলছে না।’

আনসারি আরও বলেন, ‘এর ফলে বর্তমান ও প্রাক্তন সব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর এখন আমরা জানি না, এখান থেকে আমাদের কোথায় যেতে হবে।’

মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মুমতাজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি
মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মুমতাজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি। ছবি: আসাদ আশরাফের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া।

ঝুঁকিতে বিশ্ব, এখন বাঁচার উপায় মাত্র একটি!

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ বুধবার (২৯ জুলাই) নতুন হামলার পরও পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।

এর আগে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করে যে সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) নিয়ে আশাবাদী ছিলেন, সেটিও শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। ফলে এখন ওয়াশিংটনের সামনে দুটি কঠিন পথই যেন খোলা রয়েছে- একদিকে স্থলযুদ্ধে নেমে শত শত মার্কিন সেনার জীবন ঝুঁকিতে ফেলা, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে “ভালো কোনো বিকল্প নেই”- এ কথাটি প্রায় ক্লিশে হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের এশিয়া এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক লাইল গোল্ডস্টেইন বলেন, আমরা সত্যিই একটি কঠিন সংকটে পড়েছি।

যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব কেবল যুদ্ধরত দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর ওপর নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়ার চাপও বাড়ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য অকার্যকর থাকে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে তেলের মজুত কমে আসবে, ডিজেল ও সারসহ তেলনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে এবং আগামী শীতে ইউরোপে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংকটও দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন ও প্রবাসী বিনিয়োগের পরিবেশও এই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতিগুলোও যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন চাপের মুখে পড়েছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও চাপে
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। বুধবার প্রকাশিত সিএনএন/এসএসআরএস জরিপে দেখা গেছে, ইরান নীতি ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন ৩০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প ভোটারদের সমর্থন পেয়েছিলেন, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সমাধানের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সংঘাতের অবসান সম্ভব। সম্ভাব্য একটি কাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সমাধান চাইতে পারে যাতে তারা কৌশলগত পরাজয় স্বীকার না করেও সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে ইরানও দাবি করতে পারবে যে যুদ্ধের পরও তারা নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এমন অবস্থানে পৌঁছানো সহজ হবে না। এর জন্য হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে।

এই সংকটের মধ্যে নতুন একটি ধারণা সামনে এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো- ইরানসহ একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও এর অর্থনৈতিক সুবিধা ভাগাভাগি করতে পারে।
মজার বিষয় হলো, ভেস্তে যাওয়া সমঝোতা স্মারকেও ইরান ও ওমানকে অন্যান্য উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
এদিকে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আবারও সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওমানের মধ্যস্থতা
বর্তমানে প্রকাশ্যে চলমান একমাত্র কূটনৈতিক উদ্যোগ হলো ইরান ও ওমানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা। সেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে কীভাবে জাহাজ চলাচল পরিচালিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
জানা গেছে, ইরান যেখানে তেলবাহী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি আরোপ করতে চায়, সেখানে ওমান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রণালিতে অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে “সামুদ্রিক সেবা ফি” নামে একটি সমঝোতার পথও আলোচনায় রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে “হরমুজ ফি” ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। এটি সরাসরি টোল নয়; বরং উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি আর্থিক অবদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রস্তাবটি মালাক্কা প্রণালির যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেলের মতো হতে পারে, যেখানে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অংশ নেয়।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের রটারডাম বন্দরের মতো প্রতি গ্রস মেট্রিক টনে প্রায় ০.০৮ ডলার হারে ফি নেয়া হলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় হতে পারে। এমনকি ব্যারেলপ্রতি কয়েক ডলার অতিরিক্ত খরচও বর্তমান অস্থিতিশীল বাজারের তুলনায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কারণ যুদ্ধের কারণে একদিনেই তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

এই বিশ্লেষণের অন্যতম লেখক এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজ বলেন, ইরানের জন্য মূল লক্ষ্য শুধু অতিরিক্ত অর্থ আয় নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তেল রপ্তানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারই তাদের বড় স্বার্থ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের মার্কিন প্রশাসনগুলো এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক সহায়তা চাইত। ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নেও ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, কঠোর ভাষা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে এখন সেই সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। উপরন্তু, যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরুর আগে অনেক মিত্র দেশের সঙ্গে পরামর্শও করেনি।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের ব্রাসেলসভিত্তিক বিশ্লেষক ইয়ান লেসার বলেন, ইউরোপকে কোনো কৌশলে সহায়তা করতে বলা এক বিষয়, কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলটাই স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজের মতে, তেহরান ওমানের প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সময় ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সহজে ছেড়ে দেবে না।
তার ভাষায়, ইরান শেষ পর্যন্ত প্রণালিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে। কারণ সেটি তাদেরও স্বার্থে। তবে তারা তখনই তা করবে, যখন তাদের মনে হবে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শিক্ষা পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কোনো সমঝোতা হলেও সেটি কেবল বর্তমান সংকটের একটি অংশের সমাধান করবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের সমাধান তখনও বাকি থাকবে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, সামরিক ও রাজনৈতিক বিকল্প সীমিত হয়ে আসায় শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরান- উভয় পক্ষকেই কোনো না কোনো সমঝোতার পথেই এগোতে হতে পারে। অন্যথায় এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য শুধু দুই দেশ নয়, গোটা বিশ্বকেই আরও দীর্ঘ সময় ধরে বহন করতে হবে।

ঝুঁকিতে বিশ্ব, এখন বাঁচার উপায় মাত্র একটি!

ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পর ইরানে মার্কিন হামলা, উত্তেজনা নতুন মাত্রায়

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার পর এই প্রতিশোধমূলক অভিযান চালানো হয় বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে আলোচনার সুযোগ করে দিতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিলেন, তার পর এটিই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি হামলা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে হামলা শুরু হয়।

এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানি হামলার জবাবে এটি একটি শক্তিশালী জবাব। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর জবাব দেয়ার ঘোষণা দেন। ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অশালীন শব্দ ব্যবহার করে বলেন, আমরা তাদের কঠোরভাবে আঘাত করব। এবার আমাদের পালা। তারা বড় ধরনের মূল্য দেবে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হামলার দায় স্বীকার করে ইরান কৌশলগত ভুল করেছে।

শুক্রবার ট্রাম্প সামরিক অভিযান স্থগিত করে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ দেয়ার ঘোষণা দেন। তবে পাঁচ দিন পর জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে সেই বিরতি ভেঙে যায়। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটি এবং একটি কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ছোড়া সব ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনোটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যতদিন হুমকি ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখবে, ততদিন তেহরানের প্রতিরোধও চলবে। একই সঙ্গে তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দিকে ইরানের অনুমোদনহীন পথ ব্যবহার করে এগিয়ে আসা তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারকে তারা লক্ষ্যবস্তু করেছে। সর্বশেষ এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পর ইরানে মার্কিন হামলা, উত্তেজনা নতুন মাত্রায়

যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়ছে গাজার হাসপাতাল, চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

গাজার আল-শিফা হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটে প্রতিদিন একই দৃশ্য। এক মুহূর্তের জন্যও থামে না ডায়ালাইসিস মেশিন। সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা রোগীদের শরীরে সংযুক্ত থাকে চিকিৎসা-যন্ত্রের নল। সীমিত সময়ের জন্য হলেও এসব মেশিনই তাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখছে। সেই সারির এক কোণে বসে আছে উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার ১৪ বছর বয়সী রুওয়া মুনতাসির আবদুল করিম। ছোট্ট শরীরের মেয়েটি ভরা ওয়ার্ডেও আলাদা করে চোখে পড়ে। তার বাম হাত ডায়ালাইসিস মেশিনের সঙ্গে যুক্ত। চিকিৎসাকর্মীদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও পুরো সময়টায় একটি কথাও বলে না সে। দীর্ঘ চিকিৎসা আর অসুস্থতা তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। পাশেই বসে আছেন পিতা মুনতাসির। তিনি বলেন, অসুস্থ হওয়ার আগে আমার মেয়ে হাঁটত, খেলত। অস্ত্রোপচার আর ডায়ালাইসিস শুরু হওয়ার পর তার পুরো জীবন বদলে গেছে। প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেশনই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। একটি সেশন বাদ গেলেই সে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

রুওয়াকে বাঁচিয়ে রাখা হাসপাতালের এই বিভাগটিও এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছে। ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বারবার হামলা এবং গাজায় চিকিৎসা-সরঞ্জাম প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে চিকিৎসাসেবা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোডিয়াম বাইকার্বোনেটের তীব্র সংকটের কারণে গাজার ৫০ শতাংশ ডায়ালাইসিস মেশিন সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে কিডনি রোগীদের চিকিৎসার জন্য গাজায় সাতটি হাসপাতাল ছিল। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে চারটিতে।

নোরা আল-কাবি ডায়ালাইসিস সেন্টারের মতো কিছু কেন্দ্র যুদ্ধেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে কিডনি রোগীদের মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের আগে গাজায় কিডনি বিকল হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০। ফিলিস্তিন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ডায়ালাইসিস না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে ৪৭০ জনের বেশি রোগী মারা গেছেন। বর্তমানে বেঁচে আছেন প্রায় ৭০০ জন।
মধ্য গাজার আল-আকসা হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান ওসামা আবু রাহমা জানান, তাদের হাসপাতালে ৫১টি ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও ২৫টি সম্পূর্ণ বিকল। তিনি বলেন, ২৪০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালকে সপ্তাহে ডায়ালাইসিসের সংখ্যা এবং প্রতিটি সেশনের সময় দুটিই কমিয়ে দিতে হয়েছে। এর ফলে রোগীদের মধ্যে দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতা এবং রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় পটাশিয়াম বেড়ে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। আবু রাহমার ভাষায়, এই পরিস্থিতি শত শত রোগীর জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
আল-শিফা হাসপাতালে রুওয়া চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ওয়ার্ডের অনেক বয়স্ক রোগী ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার পিতা মুনতাসির চিকিৎসা যন্ত্রের মনিটরের দিকে তাকিয়ে মেয়ের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করেন। তিনি জানান, একসময় রুওয়ার ওজন ছিল ৬৫ কেজি। এখন তা কমে ৩৫ কেজিতে নেমে এসেছে। আগে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস হতো, এখন মাত্র দু’বার করা সম্ভব হচ্ছে। রুওয়ার স্থায়ী চিকিৎসা হলো কিডনি প্রতিস্থাপন। মুনতাসির বলেন, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। তার মা কিডনি দিতে রাজি। সব পরীক্ষাও মিলে গেছে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার অনুমতি এখনো দেয়নি ইসরাইল। ছয় মাস ধরে আবেদন ঝুলে আছে। গাজার বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়। তাই রুওয়াকে শুধু অপেক্ষা করেই থাকতে হচ্ছে।

ডায়ালাইসিসের সংকট গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার একমাত্র সমস্যা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, যুদ্ধে ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ এমনভাবে আহত হয়েছেন, যা তাদের জীবন স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে। এদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। চিকিৎসার পরও তাদের সামনে নতুন সংকট পুনর্বাসন এবং কৃত্রিম অঙ্গের অভাব। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট আয়া আল-শালতুনি বলেন, কৃত্রিম অঙ্গ, হুইলচেয়ার এবং ক্রাচের ঘাটতি এখন রোগীদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। তিনি বলেন, অনেক রোগী দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও কিছুই পান না। তার মতে, এটি শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, মানুষের পুরো জীবনই বদলে দিচ্ছে।

উত্তর গাজার ৬০ বছর বয়সী কৃষক জাকি জুমা সালেম আবু হারব ২০২৫ সালের মার্চে এক হামলায় একটি পা হারান। তিনি বলেন, এক মুহূর্তেই আমার পুরো জীবন বদলে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সম্প্রতি তিনি একটি কৃত্রিম পা পেয়েছেন। তবে তিনি জানান, হাজারো মানুষ এখনো সেই সুযোগ পাননি। ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধের কারণে ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন। জাকি বলেন, অনেকের হুইলচেয়ার নেই, ক্রাচও নেই। তারা গাছের গুঁড়ি বা কাঠের টুকরো ভর করে চলাফেরা করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, অনেক শিশু তাদের হাত-পা হারিয়েছে। তাদের ঠিকমতো হাঁটার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রও নেই। এটা দেখলে মনে হয়, তাদের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়েছে।

যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়ছে গাজার হাসপাতাল, চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

গাজায় সীমানা বাড়াচ্ছে ইসরাইল, ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার

বিবিসির অনুসন্ধানঃ গাজায় নিজেদের প্রভাব তৈরি করতে প্রতিনিয়ত নতুন মাটির দেয়াল ও কনক্রিটের বেড়া তৈরি করছে ইসরাইল। সামরিক বাহিনীর এমন পদক্ষেপের কারণে গাজা উপত্যকার শত শত পরিবার আবারও ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক শর্ত তোয়াক্কা না করে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ সীমানা গাজার ভেতরের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের স্থান দিন দিন আরও সংকুচিত হয়ে আসছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

ক্রমান্বয়ে এলাকা দখলের নতুন কৌশল: উত্তর গাজার আল-তুফাহ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা দেখতে পান, তাদের চলাচলের প্রধান সড়ক সালাহ আল-দিনের ওপর আগের চেয়ে পশ্চিম দিকে সরিয়ে আনা হয়েছে হলুদ রঙের কনক্রিটের ব্লক। সেই সাথে প্রায় তিন মিটার উঁচু একটি বিশালাকার মাটির বাঁধ তৈরি করে তার ওপর উড়ানো হচ্ছে ইসরাইলি পতাকা। বাস্তুচ্যুত হওয়া মোহাম্মদ আল-শাওইশ আফসোস করে জানান, বোমার আঘাতে তাদের আসল বাড়িটি আগেই ধ্বংস হয়েছিল। এরপর তাঁবু টাঙিয়ে কোনোমতে পরিবার নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেও তাদের সরে যাওয়ার বার্তা দেওয়া হয় এবং হামলায় সেই তাঁবুটিও ধ্বংস হয়ে যায়।

যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, সেখানে ইসরাইলি বাহিনীকে একটি নির্দিষ্ট সীমানার পেছনে অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী গাজার ৫৩ ভাগ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি প্রকাশ্যে দাবি করেন, তাদের বাহিনী বর্তমানে গাজার ৬০ ভাগেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি একে ৭০ ভাগে উন্নীত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত চিত্রে দেখা গেছে, গাজায় বর্তমানে ৪২ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে মাটির বাঁধ ও সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।

ধ্বংসযজ্ঞ ও তীব্র মানবিক সংকট: নিরাপত্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ মেয়াদী সামরিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্যই এসব স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলছে। এসব সীমান্ত ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের রাস্তা পরিষ্কার করতে খান ইউনূস, দেইর আল-বালাহ ও জেইতুন এলাকায় নিয়মিত বুলডোজার চালানো হচ্ছে। ভেঙে ফেলা হচ্ছে হাজারো ঘরবাড়ি, গ্রিনহাউস ও শতবর্ষী জলপাই বাগান। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্থায়ী আশ্রয়ের অভাবে বর্তমানে গাজার ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিত্যদিনের এই স্থানান্তরের কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ ফিলিস্তিনিরা।

গাজায় সীমানা বাড়াচ্ছে ইসরাইল, ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার

তিন ফ্রন্টে হুমকি, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে সৌদি

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে গত পাঁচ মাস ধরে সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। এমনকি ইরানি ড্রোন দেশটির তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল রিয়াদ।

কিন্তু এখন সৌদি আরব নিজেকে তিন দিক থেকে হুমকির মুখে দেখতে পাচ্ছে। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ইরান সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা।
গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলা এবং তেহরানের নতুন হুমকির মুখে পড়েছে সৌদি আরব।
সর্বশেষ, রিয়াদের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদির এই সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি কম নয়।

গত এক দশকে সৌদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর নীতি গ্রহণ করে রিয়াদ। এর ফল হিসেবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তি হয়।
কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই কৌশলকে কার্যত সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, তিন দিক থেকে অসম যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়া যে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো।
সৌদি আরব অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক দশক ধরে কয়েক শ’ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। কিন্তু বিশাল ভূখণ্ড, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং বিস্তৃত তেল অবকাঠামো রক্ষা করা দেশটির জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

হুতিদের বাড়তে থাকা হুমকি
গত সপ্তাহান্তে হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। স্যাটেলাইট ছবি ও ভূ-অবস্থানভিত্তিক ভিডিও বিশ্লেষণে ইয়েমেন সীমান্তবর্তী সৌদির জাজান অঞ্চলের একটি স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে।
এর আগে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজ অবরোধের ঘোষণা দিয়ে হুতিরা লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। পরবর্তীতে গত সোমবার তারা আরও একটি সৌদি জাহাজে হামলার দাবি করে।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে সৌদি ইতোমধ্যে তেলের বড় অংশের রপ্তানি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে পরিচালনা করছে। ফলে বাব আল-মান্দেবে হুতিদের অবরোধ রিয়াদের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী তিন বছরে লোহিত সাগর হয়ে দৈনিক প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে সৌদি আরবের। তবে ইয়ানবু থেকে এশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করা ট্যাংকারগুলোকে বাব আল-মান্দেব অতিক্রম করতে হয়, যা হুতিদের হামলার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০১৫ সালে হুতিদের উৎখাত করতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল সৌদি। সাত বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না এলেও বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয় দেশটিতে।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অর্থনৈতিক ও আকাশপথে অবরোধ অব্যাহত রাখে সৌদি আরব।
চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা অভিযোগ করে, তেহরান থেকে সানায় আসা একটি বিমানকে অবতরণে বাধা দিতে রাজধানীর বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালিয়েছে সৌদি।

বিমানটিতে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির জানাজা শেষে ফেরা হুতিদের একটি প্রতিনিধিদল ছিল। তবে লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক গবেষক নাওয়াফ ওবেইদের মতে, বিমানটিতে আর কী কী আনা হচ্ছিল, সে বিষয়েও নজর ছিল।
বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল বাশার ভাষায়, হুতিরা সৌদি আরবের সব রেড লাইন অতিক্রম করেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে পূর্ব ইয়েমেনের মরুভূমিতে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি যোদ্ধাদের একটি বড় বাহিনী জড়ো হচ্ছে। তারা অগ্রসর হলে সৌদি বিমানবাহিনী, বিশেষ করে অ্যাপাচি যুদ্ধহেলিকপ্টারের সহায়তা পেতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত সৌদি আরবের জবাব মূলত বিমান হামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ইতোমধ্যে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন হোদেইদা বন্দরে সৌদি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে সরকারি কর্মচারী ও মিলিশিয়াদের বেতন দেয়ার জন্য হুতিরা বারবার অর্থ দাবি করেছে।
মোহাম্মদ আল বাশার বলেন, উত্তর কোরিয়ার মতো কৌশল অনুসরণ করছে হুতিরা। তারা বারবার উত্তেজনা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। তবে সৌদি আরবের আর্থিক প্রস্তাবের বিনিময়ে তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরাক থেকেও বাড়ছে হামলা
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা সোমবার ও মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে দুই দফায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব হামলায় হুতিরা প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। এর পরই সৌদি আরবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। মঙ্গলবার ভোরে পূর্ব ইরাকে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার সঙ্গে জড়িত মিলিশিয়া ঘাঁটিগুলোতে “নির্ভুল ও লক্ষ্যভিত্তিক” বিমান হামলা চালায় দেশটি।

দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সৌদি আরব সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেবে। মিলিশিয়াদের জোট পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) জানিয়েছে, ওই হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নির্দেশনায় পরিচালিত ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে।
সৌদি কর্মকর্তারা এখনো ২০১৯ সালে তাদের আবকাইক তেল শোধনাগারে চালানো হামলার কথা ভুলে যাননি। ওই হামলায় দেশটির প্রায় অর্ধেক তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন হামলার দায় স্বীকার করেছিল হুতিরা।
তবে গোয়েন্দা সূত্রগুলো মনে করেছিল, হামলার উৎস ছিল ইরাক এবং এর পেছনে ছিল ইরানের ভূমিকা। সে সময় সৌদি সামরিক জবাব না দিলেও হামলার জন্য ইরানকেই দায়ী করেছিল।

সরাসরি হুমকি ইরানও
যুদ্ধ শুরুর পর গত মার্চ ও এপ্রিলে ইরানি শাহেদ ড্রোন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করলে দেশটি দ্রুত ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও রিয়াদ সফর করে ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেয়ার প্রস্তাব দেন।
তবে এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাতারাতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ফলে পারস্য উপসাগরের ওপার থেকে ইরানের ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি এখনো বহাল রয়েছে।

এপ্রিলের পর থেকে ইরান সরাসরি সৌদিতে হামলা চালায়নি। তবে চলতি সপ্তাহেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ স্বাধীনভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আবারও যদি ইরান সরাসরি সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালায়, তাহলে রিয়াদের সামনে দুটি কঠিন পথ থাকবে- সরাসরি পাল্টা আঘাত হেনে যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া, অথবা সংযম দেখিয়ে ইরানকে আরও সাহসী করে তোলা।
এদিকে ইতোমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব সৌদি অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক বাজেট ঘাটতির মুখে পড়েছে দেশটি। যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি ব্যয় বেড়ে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ।

তেলের উচ্চমূল্যের কারণে কিছুটা রাজস্ব বাড়লেও উৎপাদন বা রপ্তানিতে নতুন কোনো বিঘ্ন ঘটলে সেই সুবিধাও ঝুঁকিতে পড়বে। এরই মধ্যে সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের পরিসর কমিয়ে আনা হয়েছে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখন সৌদি অনেক বেশি অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবেশে অবস্থান করছে। ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান ও গাজা-সংক্রান্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল নীতিও রিয়াদকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির সামরিক সহযোগিতা ঘনিষ্ঠ রয়েছে, তবু ওয়াশিংটনের আগ্রহ কমে গেলে আরও আক্রমণাত্মক ইরানের মুখোমুখি একা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে রিয়াদ।
এদিকে ইয়েমেন, ইরান ও জ্বালানি নীতিকে ঘিরে মতপার্থক্যের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতেও এখনো সময় লাগছে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরব এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে বারবার হামলার শিকার হওয়ার পর আর নীরব থাকা সম্ভব নয় বলে মনে করছে দেশটির নেতৃত্ব।
তাই রিয়াদ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- প্রয়োজন হলে এবার তারা পাল্টা আঘাত হানবে। 

তিন ফ্রন্টে হুমকি, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে সৌদি

মা তুলে রেখেছিলেন সুপারম্যান কমিকসের কপি, বিক্রি হলো ১১১ কোটি টাকায়

প্রকাশ ২৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ গত ২০২৪ বড়দিনের সময়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজ বাড়ির চিলেকোঠা ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করছিলেন তিন ভাই। ঘরটির এক কোণে ছিল পুরোনো সংবাদপত্রের স্তূপ। তা সরাতেই বেরিয়ে এল ধুলায় ঢাকা একটি কার্ডবোর্ডের বাক্স। চারপাশে মাকড়সার জাল। পরিষ্কার করার পর বাক্সটিতে যা মিলেছিল, নিমেষেই তা বদলে দিয়েছে তিন ভাইয়ের ভাগ্য।

ওই বাক্সের মধ্যে ছিল কমিকসের মোট ছয়টি বই। সেগুলোর একটি অতিমানব চরিত্র ‘সুপারম্যান’–এর প্রথম সংস্করণ। প্রকাশ করা হয়েছিল ১৯৩৯ সালের জুন মাসে। কমিকসের ওই বইটি সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন তিন ভাইয়ের প্রয়াত মা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন মহামন্দা চলছিল, তখন বইটি কিনেছিলেন ওই নারী ও তাঁর ভাই।

পুরোনো বিরল জিনিসের কদর বিশ্বজুড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে এ নিয়ে আগ্রহ আরও বেশি। তাই তো সুপারম্যান কমিকসের প্রথম সংস্করণটি বিক্রির জন্য লুফে নিয়েছিল টেক্সাসের নিলামকারী প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ। সেখানে গত বৃহস্পতিবার বইটি বিক্রি হয়েছে ৯১ লাখ ২০ হাজার ডলারে। বাংলাদেশের হিসাবে তা ১১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। এত দামে কখনোই কোনো কমিকসের বই বিক্রি হয়নি।

অবিশ্বাস্য এই দাম পাওয়ার কারণ শুধু বইটি পুরোনো ও বিরল, তা নয়। সেটি বেশ নিখুঁত অবস্থায়ও ছিল। অক্ষত থাকার কারণেই কমিকসের মান নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান সিজিসি সুপারম্যানের বইটিকে ১০–এর মধ্যে ৯ দিয়েছে। আগে অন্য একটি কমিকসের বইয়ের সর্বোচ্চ রেটিং ছিল ৮ দশমিক ৫। আর এর আগে সুপারম্যানের আরেকটি কমিকসের বই নিলামে বিক্রি করে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ ডলার পাওয়া গিয়েছিল।

যে তিন ভাই সুপারম্যানের ওই কমিকসটি নিলামে তুলেছিলেন, তাঁরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাঁদের বয়স পঞ্চাশ ও ষাটের কোঠায়। আর বইটি পাওয়ার পরপরই তাঁরা বিক্রির জন্য তাড়াহুড়া করেননি। বরং কয়েক মাস অপেক্ষার পর হেরিটেজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই সান ফ্রান্সিসকোয় তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন হেরিটেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট লন অ্যালেন।

সুপারম্যানের বইটি এত দামে বিক্রিকে হেরিটেজ উল্লেখ করেছে ‘কমিসক বিক্রি করে সর্বোচ্চ সাফল্য’ হিসেবে। লন অ্যালেন বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার ওই ভাইদের মা তাঁদের বলেছিলেন যে তাঁর কাছে মূল্যবান কমিকস আছে। তবে সেগুলো কখনোই দেখাননি। আর উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার শীতল আবহাওয়ায় পুরোনো কাগজপত্র টিকে থাকে। টেক্সাসের মতো আবহাওয়া হলে অনেক আগেই নষ্ট হয়ে যেত।

মায়ের সংরক্ষণ করা এই কমিকস নিয়ে কথা বলেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার তিন ভাইয়ের সবচেয়ে কনিষ্ঠজন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই করতে করতে লড়াইটায় জীবনের মূল জায়গাটা দখল করে নিয়েছিল। ফলে অনেক যত্ন করে তুলে রাখা কমিকসের বাক্সটির কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। অন্তত গত বছরের বড়দিন পর্যন্ত এর অস্তিত্বের কথা আমরা জানতাম না।’

নিলামকারী প্রতিষ্ঠান হেরিটেজের মাধ্যমে ওই ভাই আরও বলেন, ‘এটি শুধু কাগজের ওপর কালি দিয়ে লেখা গল্প নয়। এটি কখনোই শুধু সংগ্রহের একটি বিষয় ছিল না। অতীত স্মৃতি যে অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদের কাছে ফিরে আসতে পারে, এটি তার একটি প্রমাণ।’

সুপারম্যান কমিকসের প্রথম সংস্করণের এই কপিটি বিক্রি হয়েছে ১১১ কোটি টাকায়
সুপারম্যান কমিকসের প্রথম সংস্করণের এই কপিটি বিক্রি হয়েছে ১১১ কোটি টাকায়। ছবি: হেরিটেজ অকশনের সৌজন্যে

চীনের তৈরি যে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (ম্যানপ্যাডস) কিনতে যাচ্ছে ইরান। এ বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্রের বরাতে বুধবার (২৯ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম চালানে চীনের তৈরি সর্বোচ্চ ৪০০টি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইরানের কাছে পৌঁছাতে পারে।

প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি ডলারের এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ইরানের নেওয়া সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর একটি। যুদ্ধের সময় সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষায় ইরানের সক্ষমতার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চুক্তির আওতায় চীনের তৈরি কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ মডেলের ৩০০ থেকে ৪০০টি ম্যানপ্যাডস কেনা হবে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।

তাদের মতে, হংকংভিত্তিক ঝংছিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ইরান ও চীনা সরবরাহকারীর মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

কয়েক মাসের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। জবাবে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

এই সংঘাতে উন্নত যুদ্ধবিমান ও নির্ভুল নির্দেশিত অস্ত্রের বিরুদ্ধে স্থায়ী সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা রক্ষা কতটা কঠিন, তা স্পষ্ট হয়েছে।

গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই টানা দুই সপ্তাহের বোমা হামলা স্থগিত করে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনায় সমাধান না এলে আবারও হামলা শুরু হবে। যদিও এপ্রিল থেকে তাত্ত্বিকভাবে সংঘাতটি যুদ্ধবিরতির অবস্থায় রয়েছে।

শত শত ম্যানপ্যাডস সরবরাহ ইরানের স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। একই সঙ্গে এটি চীনের সঙ্গে তেহরানের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে সূত্রগুলো সতর্ক করে বলেছে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সরবরাহের সময়সূচি, পরিমাণ ও বাস্তবায়নের অন্যান্য বিষয় এখনও পরিবর্তিত হতে পারে।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম দফার চালান পশ্চিম চীনের উরুমকি থেকে আকাশপথে পাঠানো হবে। এরপর পাকিস্তান হয়ে ইরানে পৌঁছাবে। তবে পাকিস্তান অংশে পরিবহন আকাশপথে হবে নাকি স্থলপথে, তা স্পষ্ট করেনি সূত্রগুলো।

পশ্চিমা দুই গোয়েন্দা সূত্র ও এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনা সামরিক সরঞ্জাম ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য উপকরণ আরও গোপনে পরিবহনের জন্য স্থলপথ ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে তেহরান।

গত দুই দশকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাডার প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করলেও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো দ্রুত বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা যায়, ছোট দল পরিচালনা করতে পারে এবং সহজে স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব। ফলে স্থায়ী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারির তুলনায় এগুলো কম ঝুঁকিপূর্ণ।

এক ইউরোপীয় নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছেন, তার দেশের কর্তৃপক্ষ কিউডব্লিউ সিরিজের বিভিন্ন ম্যানপ্যাডস; বিশেষ করে কিউডব্লিউ-১২, কিউডব্লিউ-১৮ ও কিউডব্লিউ-১৯ ইরানের কাছে বিক্রির সম্ভাব্য কয়েকটি চুক্তির বিষয়ে অবগত।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আরেক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছেন, ইরান কিউডব্লিউ-১২ ও কিউডব্লিউ-১৮ ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে আগ্রহী ছিল। তবে চুক্তি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ হলো কাঁধে বহনযোগ্য ইনফ্রারেড-নির্দেশিত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলো নিম্ন উচ্চতায় উড্ডয়নকারী বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম। বহনযোগ্য হওয়ায় সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও সংবেদনশীল এলাকায় দ্রুত মোতায়েন করা যায়।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কিউডব্লিউ-১২ নতুন কিউডব্লিউ-১৮ বা কিউডব্লিউ-১৯-এর তুলনায় কম সক্ষম হলেও ড্রোন ও নিম্ন উচ্চতার লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করতে এটি কার্যকর প্রতিরক্ষার একটি স্তর তৈরি করতে পারে।

নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিতে দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশি সরবরাহকারীর ওপরও ইরানের নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে নতুন এই ক্রয়চুক্তি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, চীনের কাছ থেকে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার আরেকটি পৃথক চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল ইরান। তবে সেই চুক্তি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সূত্র : রয়টার্স 

ম্যানপ্যাডস থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছেন দুই চীনা সৈনিক। ছবি : সংগৃহীত
ম্যানপ্যাডস থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছেন দুই চীনা সৈনিক। ছবি : সংগৃহীত

ইউক্রেনে পাল্টা হামলার পরিকল্পনা করেছিল ইরান

কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের একটি বাণিজ্যিক মালবাহী জাহাজে ইউক্রেনের হামলার জবাবে পাল্টা আক্রমণ চালানোর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিল ইরান। তবে জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে আপাতত সেই পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছে দেশটি। ইরানি ও পশ্চিমা সূত্রের বরাতে মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে আমেরিকার সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

গত শনিবার কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ওই হামলায় ইরানের এক বেসামরিক নাবিকও নিহত হন। এর পরদিনই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইউক্রেনের এই পদক্ষেপকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান যে এই ঘটনা ‘জবাবহীন রাখা সম্ভব নয়।’

পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, ইরান হয়তো বড় ধরনের ক্ষতি না করে একটি প্রতীকী জবাব দিতে ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরে কম ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়ারহেডযুক্ত ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি ইরান থেকে ইউক্রেন ভূখণ্ডে যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বড় ধরনের যুদ্ধের রূপ দিতে পারত।

কূটনৈতিক তৎপরতায় বরফ গলার ইঙ্গিত

তবে চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার ইউক্রেনীয় কূটনীতিকদের উদ্যোগে আলোচনা শুরু হলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সাথে টেলিফোনে কথা বলেন। ফোনালাপের পর ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সিবিহা কাস্পিয়ান সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাটিকে ‘অনিচ্ছাকৃত ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ফোনালাপ প্রসঙ্গে আরাঘচি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেন, ‘ইরানও সংঘাত বৃদ্ধি করতে চায় না, তবে আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে আমাদের নাগরিক বা স্বার্থের ওপর যেকোনো হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এই ঘটনার সঠিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ পরবর্তীতে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কাল্লাসের সাথেও আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেহেদী রহমতি জানান, ইরানি সরকারের একটি অংশ শুরুতেই ইউক্রেনের ওপর পাল্টা সামরিক হামলার বিরোধিতা করেছিল। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন কোনো ছোট বা দুর্বল দেশ নয়। তাদের সামরিক অভিজ্ঞতা আছে এবং তারা আমেরিকা ও ইউরোপের লজিস্টিক সহায়তা পাচ্ছে। নতুন একটি যুদ্ধের ফ্রন্ট তৈরি করে ইরানের কোনো লাভ হবে না।’

ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও রাশিয়ার ভূমিকা:

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারস্য উপসাগরীয় ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপের পর রাশিয়ার সাথে কাস্পিয়ান সাগর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও রসদ সরবরাহ তেহরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সময়ে, রাশিয়ার কাছে ইরানি ড্রোন বিক্রির অভিযোগ এনে কিয়েভ দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানের ওপর ক্ষুব্ধ।

ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এক বৈঠকে অংশ নেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সেখানে জেলেনস্কি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের নজরদারির সুবিধার্থে রাশিয়া কর্তৃক স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহের বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করেন বলে জানা গেছে।

আপাতত দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আলোচনার মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী পাল্টা আক্রমণের হুমকি এড়ানো গেলেও, অঞ্চলটির বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই ক্ষণস্থায়ী শান্তি কতদিন স্থায়ী হবে—তা নিয়ে সংশয় কাটেনি। 

ইউক্রেনে পাল্টা হামলার পরিকল্পনা করেছিল ইরান

ইসরাইলে দুই নারী সেনার আত্মহত্যা, এক বছরে প্রাণ গেল ১৬ জনের

গাজা যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে দুই নারী সেনাসদস্য আত্মহত্যা করলে ২০২৬ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ জনে।

বুধবার মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়, মিসর-ইসরাইল সীমান্তে মোতায়েন বারদেলাস ব্যাটালিয়নের এক নারী সেনাসদস্য মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ ইসরাইলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে আত্মহত্যা করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে রোববার মধ্য ইসরাইলের রামাত হাশারনের কাছে গ্লিলট সামরিক ঘাঁটিতে আরেক নারী সেনাসদস্যও আত্মহত্যা করেন। তিনি ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের একজন সদস্য এবং একটি গোপনীয় দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

হারেৎজ জানায়, ঘটনা দুটির কারণ অনুসন্ধানে ইসরাইলি সামরিক পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

পত্রিকাটির সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কর্মরত ১৬ জন ইসরাইলি সেনাসদস্য আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া গাজা যুদ্ধে অংশ নেওয়া নিয়মিত ও রিজার্ভ বাহিনীর আরও ৯ জন সদস্য দায়িত্বের বাইরে থাকা অবস্থায় আত্মহত্যা করেছেন।

এর আগে হারেৎজের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে আত্মহত্যায় ২২ জন কর্মরত ইসরাইলি সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়, যা বিগত ১৫ বছরের মধ্যে ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে এক বছরে আত্মহত্যার সংখ্যা সর্বোচ্চ।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে গাজা যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং সেনাসদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আত্মহত্যার এসব ঘটনার সঙ্গে যুদ্ধজনিত চাপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইসরাইলে দুই নারী সেনার আত্মহত্যা, এক বছরে প্রাণ গেল ১৬ জনের
ছবি: সংগৃহীত।

ফিলিস্তিনের স্কুল ও বসতবাড়ি ভাঙার পথ খুলে দিল ইসরাইলি আদালত

অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন অঞ্চলের দক্ষিণে অবস্থিত মাসাফের ইয়াত্তা এলাকার একটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং তিনটি বসতবাড়ি ধ্বংসের প্রক্রিয়া থামানোর আবেদন খারিজ করে দিয়েছে ইসরাইলের একটি সামরিক আদালত। এর ফলে যেকোনো সময় অবকাঠামো ও বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি বাহিনীকে আইনি পথ তৈরি করে দেওয়া হলো। খবর আলজাজিরার।

আলজাজিরাকে দেওয়া সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় মেয়েদের একটি মাধ্যমিক স্কুল ভেঙে ফেলার যে সামরিক নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, তা স্থগিত করার আর্জি বাতিল করে দিয়েছে আদালত। ২০১৬ সাল থেকেই স্কুলটি ধ্বংসের হুমকির মুখে ছিল।

এর পাশাপাশি, মাসাফের ইয়াত্তার স্থানীয় ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের তিনটি বসতবাড়ি ধ্বংসের বিরুদ্ধে আনা পৃথক তিনটি পিটিশনও একই আদেশে খারিজ করে দেওয়া হয়।

সংবাদ মাধ্যমকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আদালতের এই রায়ের ফলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এখন যেকোনো মুহূর্তে স্কুলটি ও ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

ফিলিস্তিনের স্কুল ও বসতবাড়ি ভাঙার পথ খুলে দিল ইসরাইলি আদালত
ছবি: সংগৃহীত।

ফেই-ফেই লি কে, কীভাবে হয়ে উঠলেন ‘এআই গডমাদার’

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, প্রকাশ ২৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ অধ্যাপক ফেই-ফেই লি সাধারণ কোনো নারী নন। তাঁর পড়াশোনার যোগ্যতা অসাধারণ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে অধ্যাপক। এক বছর আগে ‘ওয়ার্ল্ড ল্যাবস’ নামের একটি এআই স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন তিনি, যার অর্থমূল্য ইতিমধ্যে ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

‘এআই গডমাদার’ হিসেবে পরিচিত লি সম্প্রতি কুইন এলিজাবেথ প্রাইজ ফর ইঞ্জিনিয়ারিং সম্মাননা অর্জন করেছেন। এআই খাতে বিশেষ অবদানের জন্য যে সাত ব্যক্তি এই সম্মাননা পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি সম্ভবত একমাত্র নারী।

ড. হিন্টন, অধ্যাপক বেনজিও এবং ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার সাবেক প্রধান এআই বিজ্ঞানী ইয়ান লেকানকে ‘এআই গডফাদার’ বলা হয়। কিন্তু নারীদের মধ্যে একমাত্র লি–ই ‘এআই গডমাদার’ বলা হয়। কর্মজীবনের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে তাঁকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।

লি–এর জন্ম চীনে। ১৫ বছর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। স্ট্যানফোর্ডের এই অধ্যাপক একটি সাধারণ পরিবারেই বেড়ে উঠেছেন। কিশোর বয়সে তিনি নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের পারসিপ্যানি শহরে মা-বাবাকে ড্রাই-ক্লিনিং ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা করতেন। স্নাতকে পড়ার মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সাত বছর তিনি এই দোকান কাজ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর।

ব্লুমবার্গকে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে লি বলেন, ‘আমরা আর্থিকভাবে মোটেই সচ্ছল ছিলাম না। আমার মা-বাবা ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। আমি চায়নিজ রেস্টুরেন্টে কাজ করতাম। বেঁচে থাকার জন্য সামান্য আয়রোজগার করতে আমার পরিবার ও আমি একটি ছোট ড্রাই ক্লিনারের দোকান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’

লি স্নাতকে পড়াশোনা করেছেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যালটেকে পিএইচডি করেন। তিনি গুগলেও কাজ করেছেন। সেখানে তিনি ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গুগল ক্লাউডের প্রধান এআই কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সেই বছর বিতর্কিত ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’–সংক্রান্ত ই–মেইল ফাঁসের ঘটনায় লি পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি স্ট্যানফোর্ডের হিউম্যান-সেন্টার্ড এআই ইনস্টিটিউটের সহপরিচালক। মানবকল্যাণের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণা, শিক্ষা, নীতি ও অনুশীলন উন্নত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি ওয়ার্ল্ড ল্যাবসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।

২০০৬ সালে শুরু করা ‘ইমেজনেট’ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে লি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন। প্রকল্পটি কোটি কোটি ডিজিটাল ছবিকে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল এবং আধুনিক এআই ভিশন ব্যবস্থার প্রশিক্ষণের পটভূমি তৈরি করেছিল।

ইমেজনেট প্রকল্পের মধ্য দিয়েই মূলত সারা বিশ্বে ‘ডিপ লার্নিং’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ডিপ লার্নিং এআইয়ের একটি শাখা, যা নিউরাল নেটওয়ার্কের বহুস্তরযুক্ত মডেল ব্যবহার করে ডেটা থেকে জটিল নকশা বা ছক (প্যাটার্ন) শেখে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক এবং এআই কোম্পানি ওয়ার্ল্ড ল্যাবসের সিইও ফেই-ফেই লি
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক এবং এআই কোম্পানি ওয়ার্ল্ড ল্যাবসের সিইও ফেই-ফেই লিফাইল। ছবি: ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে