Showing posts with label আলী রীয়াজ. Show all posts
Showing posts with label আলী রীয়াজ. Show all posts

Thursday, August 6, 2026

পলাতক স্বৈরশাসকদের পরিণতি কী হয় by আলী রীয়াজ

অনিবার্য কিন্তু অভাবনীয় একটি ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে দুই বছর আগে, ৫ আগস্ট ২০২৪—স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার পতন এবং পলায়ন। প্রায় ১৬ বছর ধরে নিপীড়ন–নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশের মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছিল এর আগের ৩৫ দিনের আন্দোলনে।

জনগণ যখন স্বৈরাচারী শাসকের অত্যাচারের ভয়কে জয় করে, তখন ওই শাসকের পতন হয়ে ওঠে অনিবার্য; ৫ আগস্টের আগেই বাংলাদেশ সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। ফলে ৫ আগস্ট ছিল তারই শেষ পর্ব। হাসিনার পলায়নও একার্থে অবশ্যম্ভাবীই ছিল। দেশে দেশে স্বৈরশাসকেরা জনগণের ক্ষোভের মুখে পালিয়েই যান। শেখ হাসিনা দম্ভোক্তি করতেন, ‘শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ কখনো পালায় না, পালিয়ে যায়নি কখনো।’

হাসিনার পলায়নের দুই বছর হয়েছে। ইতিমধ্যে পলাতক অবস্থায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এই সময়ে তিনি ভারতে আশ্রিত অবস্থায় আছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিত হন, বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন। কিন্ত তাঁর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কী? অতীতে বিভিন্ন দেশে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক শাসকদের কী হয়েছে, সম্ভবত তা আমাদের ধারণা দিতে পারবে, শেখ হাসিনার জন্য ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করতে পারে।

লোকচক্ষুর আড়ালে জীবনাবসান

যেসব স্বৈরশাসক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগে সক্ষম হন না বা তাঁর সমর্থকদের নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন, তাঁরা নির্মম হত্যাকাণ্ডের সম্মুখীন হন। লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির ইতিহাস ২০১১ সালের; রোমানিয়ার নিকোলাই চচেস্কু ১৯৮৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পলায়নের সময় সস্ত্রীক বিক্ষোভকারীদের হাতে ধরা পড়েন এবং তাঁদের হত্যা করা হয়।

যাঁরা পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন, তাঁদের কারও কারও পরিণতি হয় নীরবে-লোকচক্ষুর আড়ালে জীবনাবসান। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর, পলাতক রেজা শাহ পাহলভি অসুস্থ অবস্থায় কায়রোতে মৃত্যুর আগপর্যন্ত মাত্র দেড় বছরে ছয়টি দেশে আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরেছেন। ফিলিপাইনে ২০ বছর দেশ শাসনের পর ১৯৮৬ সালে ফার্দিনান্দ মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে আশ্রয় নেন, সেখানে তিনি ১৯৮৯ সালে মারা যান।

আফ্রিকার দেশ চাদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেন হাবরের ১৯৯০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যান সেনেগালে; সেখানেই ২০২১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিউনিসিয়ার শাসক জেইন বেন আলী ২০১১ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর সৌদি আরবে আশ্রয় নেন, ২০১৯ সালে তিনি মারা যান। এসব শাসক তাঁদের শাসনকালে নিজ দেশ ও সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেও তাঁদের মৃত্যুসংবাদ মোটেই গুরুত্ব পায়নি, তাঁদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন বা খবরও অনেকের অজ্ঞাতেই ঘটেছে।

নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন

পলাতক শাসকদের এক বড়সংখ্যকই অন্য দেশে আশ্রয়লাভের পর রাজনৈতিক জীবন থেকে কার্যত অবসর গ্রহণ করেন এবং সবার অজ্ঞাতে নিষ্ক্রিয় জীবন যাপন করেন। সিরিয়ার বাশার আল–আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, কিন্তু তার পর থেকে তাঁর অবস্থান বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি, তাঁর কাছ থেকে কোনো ধরনের বক্তব্যও শোনা যায়নি।

আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান আশরাফ গনির ক্ষেত্রেও তা–ই। তালেবান কাবুল দখল করলে ২০২১ সালের আগস্টে তিনি পালিয়ে আশ্রয় নেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ইউক্রেনে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে; প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় পলায়ন করেন। এত দিন বলা হচ্ছিল যে তিনি রোস্টভ শহরে বাস করছেন।

কিন্তু এ বছরের জুলাই মাসে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে তিনি ছদ্মনাম ধারণ করে সোচি শহরে বাস করছেন। ধারণা করা হয় যে আশ্রয়দাতা দেশগুলো কূটনৈতিক বিবেচনায় পলাতকদের এই শর্তেই আশ্রয় দিয়ে থাকে।

পরাজিত, পর্যুদস্ত এবং কার্যত তাঁর সমর্থকদের থেকে বিচ্ছিন্ন এসব সাবেক শাসক নিজেরাও আর রাজনীতিতে ফিরতে আগ্রহী হন কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। তা ছাড়া ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত ব্যাপক সম্পদ দিয়ে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতেই তাঁরা সম্ভবত স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

প্রত্যর্পণ

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পলাতক এসব শাসককে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে বিচারের সম্মুখীন করার চেষ্টা হলেও এর সাফল্য বেশি নয়। ১৯৯১ সালে গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে ইথিওপিয়ার শাসক মেঙ্গেতসু হাইলে মারিয়াম জিম্বাবুয়ে পালিয়ে গেলে তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করা হয়।

ইথিওপিয়া সরকার তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও জিম্বাবুয়ের সরকার তাতে রাজি হয়নি। জিম্বাবুয়ের শাসক রবার্ট মুগাবের পতনের পর এ রকম ইঙ্গিত ছিল যে হাইলে মারিয়ামকে প্রত্যর্পণ করা হবে। কিন্তু তা ঘটেনি।

পেরুর শাসক ফুজিমোরি ২০০০ সালে পালিয়ে জাপানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পেরু সরকারের প্রত্যর্পণের অনুরোধ জাপান প্রত্যাখ্যান করে এ যুক্তিতে যে তিনি একই সঙ্গে জাপানের নাগরিক। তবে ফুজিমোরি ২০০৫ সালে স্বেচ্ছায় চিলিতে আসেন, পেরু সরকারের জারি করা একটি আন্তর্জাতিক ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে তাঁকে সেখানে আটক করা হয়। ২০০৭ সালে চিলি তাঁকে পেরুর কাছে প্রত্যর্পণ করে।

কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভ ২০১০ সালে বেলারুশে পালিয়ে যান। কিরগিজ সরকার তখন থেকে বাকিয়েভের প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে, বেলারুশ তাতে কর্ণপাত করছে না; বেলারুশে বাকিয়েভ সরকারি আতিথ্যেই আছেন।

বিচার

পলাতক ব্যক্তিদের নিজ দেশে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচারের ঘটনা স্বাভাবিক বলেই বিবেচিত। ইথিওপিয়ার হাইলে মারিয়ামের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে বিচার শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। ২০০৬ সালে এই মামলার শেষে তাঁকে আদালত যাবজ্জীবন দণ্ড প্রদান করেন। ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতে করা আপিলের রায়ে তাঁর যাবজ্জীবন দণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

তিউনিসিয়ার আদালত ২০১২ সালে একাধিক মামলায় সাবেক শাসক বেন আলী ও তাঁর স্ত্রীকে বিচার করে যাবজ্জীবন, ৩৫ বছর এবং ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন। কিরগিজস্তানের পলাতক রাষ্ট্রপ্রধান কুরমানবেক বাকিয়েভকে ২০১০ সালের অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ব্লেইস কম্পাওরে ২৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৪ সালে এক গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে আইভরিকোস্টে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ২০২২ সালে দেশের আদালত তাঁকে তাঁর পূর্বসূরিকে হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ব্লেইস কম্পাওরে ইতিমধ্যে আইভরিকোস্টের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।

অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বিশ্বের কয়েকজন স্বৈরশাসক। ইরানের রেজা শাহ পাহলভি, সিরিয়ার বাশার আল আসাদ, রোমানিয়ার নিকোলাই চচেস্কু, তিউনিসিয়ার শাসক জেইন বেন আলী এবং বাংলাদেশের শেখ হাসিনা।
অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বিশ্বের কয়েকজন স্বৈরশাসক। ইরানের রেজা শাহ পাহলভি, সিরিয়ার বাশার আল আসাদ, রোমানিয়ার নিকোলাই চচেস্কু, তিউনিসিয়ার শাসক জেইন বেন আলী এবং বাংলাদেশের শেখ হাসিনা। কোলাজ: প্রথম আলো

Saturday, February 14, 2026

সংস্কার বাস্তবায়নে সব দলের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আছে: -আলী রীয়াজ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনি বিবেচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকেই বড় করে দেখছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘আইনগত বিবেচনার চেয়েও রাজনীতিতে প্রথম এবং প্রধান বিবেচনাটা আপনাকে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। …আমরা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, জনরায় হয়েছে, আবার রাজনৈতিক দলের প্রতিও জনগণের সমর্থন দেখা গেছে। ফলে এর মধ্যে একটি সমন্বয় করতে হবে। সমন্বয়ের দায়িত্বটা রাজনীতিকদের।’

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আলী রিয়াজ এ কথা বলেন। সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফলের বিষয়ে জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার গঠন করতে যাওয়া দল বিএনপির কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, সার্বভৌম জনগণের অভিপ্রায় হিসেবে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলেরই এ বিষয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আছে। তিনি বলেন, ‘কেবল লিখিত আইনের বিবেচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সেভাবেই বিবেচনা করবেন বলে আশা করি।’

আলী রিয়াজ আরও বলেন, গণভোটে যে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই জনরায় এসেছে। বিএনপি সব সময় জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তাই আশা করা যায়, দেশ পরিচালনা ও সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে দলটি জনগণের এই প্রত্যাশা বিবেচনায় নেবে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, দলগুলো যেমন নিজেদের ইশতেহার দিয়েছে, তেমনি দলের শীর্ষ নেতারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেও জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন। সুতরাং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া কেবল সরকারের এজেন্ডা নয়; এটি রাষ্ট্রের এবং সব রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা।

আলী রীয়াজ বলেন, দলগুলোর ইশতেহারের মধ্য দিয়ে মানুষ যেটা অনুমোদন করেছে, সেটা কিছুটা পরোক্ষ; কিন্তু গণভোটের মধ্য দিয়ে সংবিধানের বড় রকমের সংস্কারের যে প্রস্তাব, সেটা দেশের জনগণ সরাসরি অনুমোদন করেছে। এটাকে জনরায় হিসেবে দেখতে হবে। সংস্কারের জন্য জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি হিসেবে দেখতে হবে।

সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, কাজটি কীভাবে এগোচ্ছে তার ওপরই অগ্রাধিকার নির্ভর করবে। তবে সুনির্দিষ্ট আদেশে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা থাকায় এটি ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবেন ক্ষমতাসীন দল ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আলী রিয়াজ বলেন, ‘গণভোটের মধ্য দিয়ে সংস্কারের বিষয়ে যে সুস্পষ্ট গণরায় প্রকাশিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্ষমতাসীন দল এবং জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো এবং সংসদের বাইরেও যেসব রাজনৈতিক দল আছে তাদের সবার প্রতি আহ্বান হচ্ছে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যম ঐক্যবদ্ধভাবে এই গণরায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’

নতুন কোনো ভূমিকায় তাঁকে দেখা যাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমি আমার পেশায় ফিরে যেতে চাই এবং সেটা যত দ্রুত সম্ভব।’

সংবাদ সম্মেলনে শুরুতে গণভোটের প্রচার ও জনসচেতনতা তৈরির কাজে সহযোগিতা করার জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আলী রীয়াজ। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার ও প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল নিয়ে সংবাদ সম্মেলন। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে
সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল নিয়ে সংবাদ সম্মেলন। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, January 18, 2026

রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা দেওয়া দরকার: আলী রীয়াজ

প্রকাশ ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ঃ প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়ার কথা রাষ্ট্রপতির। অথচ এটি করা হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। দেশে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা দেওয়া দরকার। এ জন্য সংবিধান সংশোধন জরুরি।

আজ বৃহস্পতিবার গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে চট্টগ্রামে বিভাগীয় মতবিনিময় সভা ও ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন আলী রীয়াজ। চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে পৃথক এই দুই সম্মেলনের আয়োজন করে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

গণভোট–সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোটের প্রচারণায় আইনগত বা সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। আমরা বিচারপতি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে আদেশের অধীনে এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হচ্ছে, সেখানে কোথাও বলা হয়নি যে আপনি “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে বলতে পারবেন না।’

আলী রীয়াজ বলেন, এবার গণভোটে বলা হচ্ছে, এই যে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল (জুলাই সনদ), এটি আপনি গ্রহণ করছেন কি না। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে, আপনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে নতুন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে প্রস্তুত। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশের ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত সংস্কার বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হবে।

সংবিধান সংস্কার বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশে গত ১৬ বছরে একজন ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা অভাবনীয়ভাবে পুঞ্জীভূত হয়েছে। নিজের ইচ্ছেমতো তিনি দেশ চালিয়েছেন। কিন্তু তাঁকে সাহায্য করেছে, তাঁকে বৈধতা দিয়েছে সংবিধান। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি ইচ্ছেমতো সংবিধানও বদল করেছেন। সে জন্যই আমরা বলছি সংবিধানে পরিবর্তন, সংশোধন ও সংস্কার প্রয়োজন।’

জুলাই জাতীয় সনদ প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানের বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলো পরিবর্তন, সংশোধন ও সংস্কারের জন্য এই দলিল তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি, বিচার, সরকারি কমিশন, নির্বাচনী ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন—এই সব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে একমত হয়েছে। উচ্চকক্ষ, সংবিধান সংশোধন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশন—সবই এই সনদের মধ্যে উল্লেখ আছে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আগামী প্রজন্মের জন্য একটা ভবিষ্যৎ তৈরি করার দায় স্মরণ করানোর জন্য আমরা এখানে এসেছি। এটাই হলো “হ্যাঁ” এবং “না” ভোটের বিষয়। এটি নির্ধারণ করবে যে আপনি একটা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ চান কি না। যে বাংলাদেশে ইনসাফ হবে, যার ভিত্তি মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতিতে এবং ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মধ্যে রয়েছে।’

বিকেলে সম্মেলনে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ ও নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান তিনটি লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ। গত ৫৪ বছরে এ লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এ কারণে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান অপরিহার্য। পতিত ফ্যাসিস্টরা তাদের পাচার করা টাকাগুলো ব্যবহার করছে গণভোট নিয়ে অপপ্রচার ছড়াতে।

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য পুলিশ প্রশাসন প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ ও নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রামে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। গতকাল বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম মাঠে
চট্টগ্রামে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। গতকাল বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম মাঠে। ছবি- সৌরভ দাশ

Sunday, April 27, 2025

রাষ্ট্র সংস্কার সরকারের একক সিদ্ধান্তে নয়, জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন -আলী রীয়াজ

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা কেবল সরকারের একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তা জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। রাজনৈতিক দল, ছাত্র সমাজ, সাধারণ মানুষ সবার পক্ষ থেকেই এ প্রক্রিয়ার তাগিদ এসেছে। আপনারা আন্তরিকভাবে তাতে অংশ নিয়েছেন, এজন্য আবারও ধন্যবাদ জানাই।’

শনিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বৈঠক শুরু আগে তিনি এসব কথা বলেন।

আলী রীয়াজ বলেন, ‘আপনাদের কর্মী-নেতৃবৃন্দ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, অত্যাচার সহ্য করেছেন। এরপরও আপনারা সাহসিকতার সঙ্গে তা মোকাবিলা করেছেন, সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন সেজন্য আপনাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপনাদের অবদান নিঃসন্দেহে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা আশা করি, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথচলায় আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।’

আলী রীয়াজ স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় জামায়াতের নেতাকর্মীরা সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন। কেউ কেউ প্রাণও দিয়েছেন, অনেকে কারাগারে থেকেও আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা আজ আলোচনা শুরু করব। প্রয়োজনে তা অব্যাহত থাকবে। আমাদের লক্ষ্য একটি জাতীয় সনদে পৌঁছানো। কিন্তু এই মুহূর্তটিকে ঐতিহাসিক জ্ঞান করে আমরা যেন সুযোগ হাতছাড়া না করি। যেন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায় যেখানে কেউ যেন নিপীড়নের শিকার না হয়, বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থা না থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এই পথচলায় সবাই অংশীদার। রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ, সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যম। আমাদের সবার দায়বদ্ধতা ও যৌথ প্রচেষ্টাই আমাদের সাফল্য নির্ধারণ করবে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া কারও একার বিষয় নয়, এটি পুরো জাতির বিষয়।’

আশা প্রকাশ করে আলী রীয়াজ বলেন, ‘সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাবের মূল দিকগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। প্রয়োজনে তা চলমান থাকবে। লক্ষ্য একটাই একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন।’

mzamin

Friday, March 21, 2025

সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে: আলী রীয়াজ

বিভিন্নভাবে সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা বাইরে থেকে হচ্ছে, ভেতর থেকেও হচ্ছে।

‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে আলী রীয়াজ এ কথা বলেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আজ বৃহস্পতিবার এই বৈঠকের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

এই গোলটেবিল আলোচনায় বক্তাদের কথায় উঠে আসে, দেশের শাসনব্যবস্থার বিদ্যমান কাঠামো স্বৈরাচার তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক, কাঠামোগত সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে সংস্কারের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো বিরোধ নেই। এটা একসঙ্গেই চলতে পারে। কিছু জরুরি সংস্কার করে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কেউ কেউ বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতার এত বছরে প্রয়োজনীয় সংস্কার করেনি। তাই সংস্কার না করে কোনোভাবেই নির্বাচন দেওয়া যাবে না।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, বিভিন্নভাবে সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। বাইরে থেকে হচ্ছে, ভেতর থেকেও হচ্ছে। যারা মনে করে, বর্তমান কাঠামো অব্যাহত রাখা দরকার। বিশেষ করে যারা পরাজিত শক্তি, তারা এটা মনে করে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

আলী রীয়াজ আরও বলেন, নাগরিকদের অংশগ্রহণ, চাপ ও অন্তর্ভুক্তি ছাড়া কোনোভাবেই সংস্কারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর পর নাগরিকদেরও মতামত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘যে অভাবনীয় রক্তপাতের মধ্য দিয়ে এ জায়গায় এসেছি, সেখান থেকে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

আলী রীয়াজ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্বল ও ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে গত ১৬ বছরের ব‍্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন ধ্বংস করে দিয়েছে। সংস্কারের প্রশ্ন উঠেছে সে কারণেই। বিচার বিভাগ কার্যত ধ্বংস করে দিয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করা না গেলে নির্বাচন হলেও আগের পরিস্থিতি হবে। তাই কাঠামোগত সংস্কারের আর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান কাঠামোগত ব্যবস্থায় স্বৈরতন্ত্রের মোকাবিলা করা যাবে না।

সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবিত সুপারিশে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়ে বহুত্ববাদ ও রাষ্ট্রধর্ম রাখার মধ্যে স্ববিরোধিতা আছে, বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশে মতপার্থক্য আছে; এ নিয়ে এক বক্তার প্রশ্নের উত্তরে আলী রীয়াজ বলেন, সব কমিশন স্বাধীন সুপারিশ করেছে। রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত হবে। আর বিদ্যমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছে। বহুত্ববাদ সবার প্রতিনিধিত্ব করবে। বিভিন্ন সময় প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করেনি। এর একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা আছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্যরা সব বিষয়ে ঐকমত্য হলেও রাষ্ট্রধর্ম রাখার বিষয়ে সবাই একমত হননি।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মূলত তিনটি দায়িত্ব। স্বৈরাচার যাতে আর ফিরতে না পারে, তাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার করা। যারা অন্যায় করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচার করা। আর নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এ তিনটা একটা আরেকটার প্রতিবন্ধকতা নয়, একসঙ্গে সমান্তরালে চলতে পারে। নির্বাচনের জন্য কিছু সংস্কার এখনই করতে হবে। কিছু নির্বাচনের পরে করলেও হবে। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও দায়বদ্ধ করতে হবে। নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ সরকার দরকার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ সংস্কার চায়। রাজনৈতিক দলগুলোও চায়। তারা প্রস্তাব দিচ্ছে। এটা জাতীয় দাবি। স্বৈরাচার জন্ম নেয় ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্র হবে না। এগুলো ঠিক করতে হবে। না হলে সংকটে থাকা রাষ্ট্র আরও গভীর সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের অনেক দোষ আছে, কিন্তু রাজনৈতিক দল ছাড়া দেশ চালানো যাবে না। দলে সংস্কার করতে হবে। তবে নির্বাচনের দিকে না গিয়ে সংস্কারের দিকে গেলে, তা হবে বিরাজনীতিকরণ। যৌক্তিক কিছু সংস্কার করে নির্বাচনের দিকে যেতে হবে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, বিচার বিভাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো সংস্কারে কমিশনের সুপারিশে এসেছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। নাগরিকদের মতামত পেলে এটি আরও সমৃদ্ধ হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ২০০৭-০৮ সালের পর সংস্কার শব্দটা গালিতে পরিণত হয়েছিল, এখন আর সেটা মনে করা হচ্ছে না। অনেক কমিশন করা হয়েছে, সহস্র সুপারিশ এসেছে। তবে সাংবিধানিক সংস্কারটাই আসলে মূল সংস্কার। পাকিস্তান সরকারের সময়কার নির্বাচনে বিজয়ী সদস‍্যদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করে ১৯৭২ সালে সংবিধান করা হয়েছিল, যা বাংলাদেশের উপযোগী হয়নি। এরপর সংবিধান সংশোধন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থে হয়েছে।

সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে ওই সময় কোনো বিতর্ক হয়নি, শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এম এন লারমা। সংবিধানে সব জাতিগোষ্ঠীকে রাখা দরকার। সংবিধানে পরে কালাকানুন ঢুকে গেছে, এটার সংশোধন দরকার, পুনর্লিখন নয়। তিনি বলেন, লাখো শহীদের বিনিময়ে পাওয়া সংবিধান কলমের খোঁচায় কেউ বদলে দিতে পারে না। সংস্কার প্রস্তাবে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়ে রাষ্ট্রধর্ম রেখে দেওয়া যৌক্তিক হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষতা আওয়ামী লীগের বিষয় নয়। এটা সবার আন্দোলন ছিল। প্রজাতন্ত্রের জায়গায় নাগরিকতন্ত্র নিয়ে আসাটাও অযৌক্তিক।

রাজনৈতিক দলকে সংস্কারে বাধ্য করতে হবে

গোলটেবিলে অংশ নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির নাগরিক প্রতিনিধিরা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো অতীতে সংস্কার করেনি। এ কারণেই আন্দোলন হয়েছে। ঐকমত্য কমিশন রদ করে গণভোটের ব্যবস্থা করা হোক, জনগণ সিদ্ধান্ত দেবে। রাজনৈতিক দল কখনো ঐকমত্যে আসবে না, তবু সংস্কার করতে হবে। নির্বাচন হলে একদল গেছে আরেক দল আসবে, কোনো কিছু বদলাবে না। তাই দলগুলোকে বাধ্য করতে হবে সংস্কার মানতে।

২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, সংস্কার করেই এ সরকার গদি ছাড়ার কথা বলুক। জীবনের বিনিময়ে এ সরকার এসেছে। তবে একটি সুপারিশের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ২১ বছরে একজনের লেখাপড়া শেষ হয় না, তিনি কীভাবে সংসদ সদস্য হয়ে দেশ চালাবেন!

কেউ কেউ বলেন, এখন যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে নাগরিক সমাজের ভূমিকা রাখতে হবে। এ সরকারের শুরুর দিকে শোনা গেলেও দায় ও দরদের কথা এখন শোনা যাচ্ছে না। যাঁরা বলেছেন, তাঁরা কি নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন! এই অস্বস্তিকর পরিবেশ কেউ চায়নি। ঘাত–প্রতিঘাত ও প্রতিহিংসার কথা বেশি শুনতে থাকলে পরের ধাপে যাওয়া কঠিন। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের কথা ভাবতে হবে।

ঢাবির সহযোগী অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান বলেন, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চাপ অব্যাহত না থাকলে সংস্কার কমিশনও একসময় চুপ হয়ে যাবে।

রাষ্ট্র সংস্কারের বিকল্প নেই

গোলটেবিল আলোচনার শুরুতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। এতে বলা হয়, ১১টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে ৬টি কমিশন পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সংক্ষেপে ছয়টি কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশ তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে স্বল্প সময়ের মধ্যে সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ঐকমত্যে আসবে বলে বিশ্বাস করে সুজন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে আশা সৃষ্টি হয়েছে, আর যেন কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী শাসনের উদ্ভব না হয়। গণতন্ত্র যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সর্বোপরি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে যাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়। আর এ স্বপ্নকে বাস্তব রূপায়ণ ঘটাতে হলে রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প নেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন। সিরডাপ মিলনায়তন, ঢাকা, ২০ মার্চ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন। সিরডাপ মিলনায়তন, ঢাকা, ২০ মার্চ। ছবি: দীপু মালাকার

Monday, February 3, 2025

সাক্ষাৎকার: বিদ্যমান সংবিধান এক ব্যক্তির শাসনের পথ তৈরি করেছে -আলী রীয়াজ

আলী রীয়াজ। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কমিশনগুলোর অন্যতম সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। ইতিমধ্যে সংস্কার নিয়ে তার কমিশন প্রধান উপদেষ্টাকে একটি প্রস্তাবনাও দিয়েছে। যে প্রস্তাবনার আলোকে আলোচনা হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের মধ্যে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলোর যৌক্তিকতা কী, আগের সংবিধানে গলদ কোথায় ছিল- এসব বিষয়ে কথা বলেছেন ‘জনতার চোখ’-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: দেশের নাম পরিবর্তন করে জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। সংবিধান সংস্কার কমিশন কেন এটি পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছে?
আলী রীয়াজ: দু’টো কারণে। এক নম্বরে রিপাবলিক শব্দের বাংলা ‘প্রজাতন্ত্র’ বলে আমাদের কাছে সঠিক মনে হয় না। প্রজা কথাটার মাঝে এক ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব আছে। আর ইংরেজি নামটা হচ্ছে পিপলস রিপাবলিক। সেই ক্ষেত্রে আমরা জনগণের কথাটা আগে আনতে চেয়েছি। তদুপরি বাংলাদেশের ইতিহাস যদি আপনি দেখেন, ১৯৬৯ সালে যখন প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলা হয় তখন কিন্তু ‘জনগণতান্ত্রিক স্বাধীন পূর্ব বাংলা’র কথাই বলা হয়েছে। আমরা যেটা প্রস্তাব করেছি সেটার ভিত্তি হচ্ছে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
প্রশ্ন: জাতি হিসেবে বাঙালি কেন পরিবর্তন করতে বলছে কমিশন?
আলী রীয়াজ: জাতি হিসেবে সবাই বাঙালি হওয়া তো অবাস্তব। সকলকে আপনি বাঙালি বানানোর চেষ্টা করছেন কেন? এটার মধ্যে এক ধরনের জাতিবাদী চেতনা থাকে- যে আমাদের সবাইকে বাঙালি হতে হবে। বাংলাদেশ একটা বহুজাতিক দেশ। এখানে বহু জাতি, বহু ধর্ম, বহু ধরনের মানুষ আছে। আমরা কেউ সমতলে থাকি, কেউ পাহাড়ে থাকি। আমরা এক ধরনের বিশ্বাসের মধ্যে থাকি। কিন্তু জাতিগতভাবে বড় জাতির পরিচয় চাপিয়ে দেয়া তো অগ্রহণযোগ্য। আমরা কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে যে পরিচয় বিদ্যমান সংবিধানে আছে তাই রেখেছি। আমরা বলছি যে, জাতি হিসেবে যিনি চাকমা, মারমা, গারো, তারা কিন্তু বাঙালি না। তাহলে সাংবিধানিকভাবে জোর করে আপনি বাঙালি বলছেন কেন? আমরা মনে করি, সেটা সঠিক নয়। আমাদের অংশীজনরা যারা এসেছেন তারাও এটা বলেছেন। এটা সঠিক নয়। আমরা নাগরিকের পরিচয় নিয়ে কোনো প্রশ্নই তুলিনি, এটা আমাদের পরামর্শও নয়। সেটা সংবিধানে সঠিক আছে- বাংলাদেশের নাগরিকরা বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবেন।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ বাদ দেয়া কেন জরুরি বলে মনে করছেন, আর বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
আলী রীয়াজ: আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে যেতে চেয়েছি। আমাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে- প্রথম সংবিধান যেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। সেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার। আমরা মনে করি, এটাই রাষ্ট্রের মূলনীতি হওয়ার কথা ছিল। ১৯৭২ সালে এটাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এটা আমাদের কাছে মনে হয়েছে অগ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়ত আপনি যদি দেখেন যে, চারটা মূলনীতির কথা বলা হয়েছে- গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের কথা। এ চার নীতি প্রকৃতপক্ষে একটি দলীয় নীতি। সেটাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবর্তন করা হয়। এটার উদাহরণ হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশের সংবিধান লেখা শেষ হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বলা হচ্ছিল এগুলো চারটি মূলনীতি। তখনো কিন্তু ড্রাফটিং হয়নি। তাছাড়া এই চার নীতি যে আদর্শের লক্ষ্য সেটা হচ্ছে মুজিববাদ। সেই মুজিববাদের পরিণতি কী হয়েছে আমরা জানি। একবার যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে একদলীয় ব্যবস্থা ও এক ব্যক্তিতান্ত্রিক একটা স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে গেছি। সে সময় এক নেতায় এক দেশে পরিণত করা হয়েছিল। আবার আওয়ামী লীগের সেই চার নীতির ভিত্তিতে একটা স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে গেছি। আবার দেশে একনায়কতান্ত্রিক একটা শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়। মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। তাহলে সংবিধানের এগুলো রাখার কোনো যৌক্তিকতা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নটা অনেকেই তুলছেন। আমরা প্রস্তাব করেছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে ভিত্তি, তিনটাকে আমরা যুক্ত করতে বলেছি। আমরা চতুর্থ প্রস্তাবে বলেছি গণতন্ত্রের কথা। কারণ গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার জন্যই বাংলাদেশের মানুষ লড়ে যাচ্ছে। গত ১৬ বছর লড়েছে, অতীতে লড়েছে। আর যেটা বলেছি বহুত্ববাদের কথা। কারণ বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে একটা বহু জাতের সমাজ। এটা বলার মধ্যদিয়ে যেটা হয় সেটা হচ্ছে ধর্মের বাইরেও আমরা চলে যাচ্ছি। একটি ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন রকমের জাত-পাত আছে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, বহুত্ববাদী সমাজ সমস্ত ভিন্নতাকে ধারণ করতে পারে। শুধু ধারণ করে না, সম্মানের সঙ্গে ধারণ করে। কেউ যেন রাষ্ট্রের চোখে অসমভাবে বিবেচিত হতে না পারে। আমরা বলছি- আমাদের দ্বিতীয় মূল আদর্শ মানবিক মর্যাদা। তাহলে মানবিক মর্যাদাকে আমরা যেন আরও বিশালভাবে দেখতে পারি। সকলকে যেন অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। সেটা শুধু ধর্মের ভিত্তিতে নয়, জাতির ভিত্তিতে, সংস্কৃতির ভিত্তিতে। হিন্দু ধর্মের মধ্যেও তো বিভিন্ন রকম জাত-পাত আছে। ইসলাম ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন রকম মাযহাব আছে। তাহলে সবকিছুকে আমরা ধারণ করতে চাই। বাংলাদেশের মধ্যে এটা শত শত বছর ধরে আছে। আমরা বলছি যে, আসুন সবাইকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসি। রাষ্ট্র সকলকে সমান মর্যাদায় যেন অভিষিক্ত করতে পারে।
প্রশ্ন: মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে ভোটাধিকার, ইন্টারনেট ও তথ্য প্রাপ্তি, ভোক্তা সুরক্ষা, গোপনীয়তাসহ বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
আলী রীয়াজ: গণতান্ত্রিক সমাজে ভোটের অধিকার হচ্ছে একটা মৌলিক অধিকার। খুব বিস্ময়কর যে, এখনকার বিদ্যমান সংবিধানে সেটা নাই। আমরা দেখেছি এই মৌলিক অধিকারটা কীভাবে লুণ্ঠিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। আমরা যে আদালতে গিয়ে বলবো যে, আমার অধিকার লুণ্ঠিত হয়েছে। আমার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছে। আদালত যদি এটা আমাকে বলতো যে, এই অধিকার তো আপনার ছিলই না। আমরা মনে করি ভোটাধিকার একটা নাগরিকের থাকতেই হবে। রিপাবলিক যদি আপনি তৈরি করেন সেখানে অধিকারটা থাকতেই হবে। ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের কথা আমরা বলছি এই কারণে যে, আজকের যুগে তথ্যপ্রাপ্তির একটা বড় জায়গা হচ্ছে ইন্টারনেট। বেশিদিন আগের কথা না, এই জুলাই মাসে কী পরিস্থিতি হয়েছিল সেটা কি আমরা জানি না। সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে এখানে একটা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এগুলো তো অধিকার মানুষের। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংবিধানেও আপনি যদি দেখেন এগুলোকে একেবারে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। একটা গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিক হিসেবে এগুলো আমাদের পাওয়ার কথা।
প্রশ্ন: নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ন্যূনতম বয়স ২৫ থেকে কমিয়ে ২১ করার প্রস্তাব করেছেন, এটি কি খুব আরলি হয়ে যাচ্ছে? আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এটা করা হয়েছে কি-না?
আলী রীয়াজ: কাউকে সুবিধা দেয়ার জন্য এটি করা হয়নি। বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফির দিকে তাকান দেখবেন বিশাল সংখ্যক তরুণ। তাদের কীভাবে রাজনীতিতে আনবেন। তাদের কণ্ঠস্বর কি শুধু রাজপথেই থাকবে না সংসদেও আসবে। আমরা সেই পথটা আনতে চাচ্ছি। আমরা চাচ্ছি তাদের যেন প্রতিবার রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবির কথা বলতে না হয়। জুলাই মাসের আন্দোলনেও সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে বেশির ভাগ তরুণ মাঠে নেমে এসেছেন। তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯০-এর আন্দোলনেও একই বিষয় ছিল। তাদের সেই কণ্ঠস্বর কি শুধু রাজপথে থাকবে, কেন তারা আইন প্রণয়নে যুক্ত হতে পারবে না। তাদের আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত করুন। কারণ ভবিষ্যৎ রাজনীতিটা তারাই করবে। কোন ধরনের দেশ তারা দেখতে চান তাদের সেই জায়গাটা তৈরি করে দিতে হবে। স্থায়ীভাবে বলার জায়গাটা করে দিতে হবে। এর মানে তো এমন না যে, ৩০০ আসনে সবাই ২১-২২ বছর বয়সে নির্বাচন করবেন। আমরা কেবল পথটা তৈরি করে দিতে চেয়েছি। যেন তরুণদের অংশগ্রহণটা নিশ্চিত করা যায়। রাজনৈতিক দলের কাছেও আমাদের আহ্বান থাকবে যে আপনাদের এক দশমাংশ পারলে তরুণ দেন। যেন তরুণদের অংশগ্রহণের একটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকে। আমরা আশা করছি, রাজনৈতিক দলগুলো এটা বিবেচনায় নেবে। বিশেষ কারও পক্ষপাতের ব্যাপার নেই। কে সংসদে আসবে- সেটা জনগণ নির্ধারণ করবে।
প্রশ্ন: আইনসভার স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দল থেকে মনোনীত করার প্রস্তাব করেছেন। বাস্তবায়ন কতোটুকু সম্ভব বলে মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আমরা আশাবাদী। করবেনই এমন মনে করার কারণ নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত সরকার আলোচনা করবেন, রাজনৈতিক দলগুলোও এ বিষয়ে তাদের মত দেবে। তবে এটার উদ্দেশ্য হচ্ছে জবাবদিহিতা। স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারি করে। আমরা দেখেছি এ নজরদারিটা নেই। সেটি গত বছরগুলোতেই নয়, আমরা যদি দেখি একেবারে শুরু থেকেই ছিল না। আমাদের সংবিধানে এতটা শক্তিশালী বিষয় নেই যে, কমিটিগুলো নজরদারি করবে। তাই আমরা নজরদারির কথা বলেছি। একটা স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় সরকারের তো কোনো বিষয় লুকানোর কথা না। তাদের প্রতিনিধিও তো থাকবেন। তারা চাইলে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর প্রধানদের ডাকতে পারবেন। এ ছাড়া সারা পৃথিবীতে যেখানে ওয়েস্ট মিনিস্টার স্টাইলে সরকার আছে সেখানে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসসি) সব সময় বিরোধী দলের হয়। এর মূল কারণ হচ্ছে যাতে করে সরকারের ওপর একটি নজরদারি ব্যবস্থা থাকে। আমরা এ নজরদারি বাড়াতে চাচ্ছি।
প্রশ্ন: অর্থ বিল ছাড়া অন্যসব বিলে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়ার প্রস্তাব রেখেছেন।
আলী রীয়াজ: বাংলাদেশের সংবিধানে যে ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। বৃটেনে দেখেন সর্বশেষ কতোজন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। দল ক্ষমতায় আছে কিন্তু ব্যক্তি সরে যেতে হয়েছে। কারণ সে সব দেশে ঐরকম ব্যবস্থা তারা গড়ে তুলেছে। আমাদের সংবিধানের আর্টিকেল ৭০-এ সে রকম ব্যবস্থা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। এ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অপসারণ মানেই তো সে দল ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া নয়। কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ২/৪ জন চলে গেলেন। কিন্তু দল ক্ষমতায় থেকেছেন। আমরা জবাবদিহিতার জায়গা থেকে এটা অপসারণের জন্য বলেছি। প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহিতার আওতায় থাকতে হবে, এমনকি তার নিজ দলের কাছেও জবাবদিহি থাকতে বাধ্য হবে। বাজেটের বিষয়টা পুরোপুরি লোয়ার হাউজের, কোনোভাবেই এটা আপার হাউজে যাবে না। জনগণকে কোনোভাবেই জিম্মি করা যাবে না। একটা দল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আছে। কিন্তু তার কিছু সদস্য বাজেটের বিপক্ষে ভোট দিলো তাহলে তো বাজেট আটকে যাবে। জনগণ ভোগান্তির শিকার হবে। তাই এক্ষেত্রে আমরা বলেছি, না অর্থ বিলে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া যাবে না।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের ক্ষেত্রে নানা প্রস্তাবনা থাকলেও সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য কোনো সংরক্ষিত আসনের কথা বলা হয়নি। যদিও দাবিটি পুরনো?
আলী রীয়াজ: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শব্দটিই আপত্তিকর। আমরা যে উচ্চকক্ষে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে ৫ জনের মনোনয়নের কথা বলেছি- আশা করছি প্রেসিডেন্ট সেটি বিবেচনায় নেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা বলেছি যে, তারাও যেন ৫ শতাংশ সমাজে বঞ্চিত শ্রেণি থেকে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু তালিকায় তো সবাইকে যুক্ত করা যাবে না। যুক্ত করতে গেলে এটা তো অনেক লম্বা হয়ে যাবে। আমাদের সেন্সটা হলো যারা সুবিধাবঞ্চিত, যাদেরকে আমরা সংখ্যালঘু বলি। শুধু সংখ্যালঘুর বিষয়টি একটি ধর্মীয় বিষয় হয়ে যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের সংসদে দলিতদের প্রতিনিধিত্ব থাকুক এটি চাই। এই সমাজে তাদের একটা স্টেক আছে। তাহলে এ রকম অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত আছে। আমরা বলছি রাষ্ট্রপতি যখন দেবেন তখন এবং রাজনৈতিক দল যখন দেবেন তারা যেন অন্তত পাঁচজনকে দেন। নারীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও বলতে গেলে সকলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সকলের প্রতিনিধিত্ব করা। আসুন, আমরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করি, সকলের প্রতিনিধিত্ব করি। আমরা যে ৪০০ জন প্রতিনিধির কথা বলেছি; তার মধ্যে ১০০ জন নারীর বিষয়টা অনেকদিন থেকে আলোচিত। অতীতে যে ৫০ জনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তারা প্রতিনিধিত্বশীল নয়। আমি মনে করি নারীদের অবমাননার মধ্যদিয়ে গেছে। এই ১০০ জনের প্রতিনিধিত্ব একই জাতি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে- এমন নয়। সকলের অংশগ্রহণের সব জায়গায় তার প্রতিনিধিত্ব থাকবে। আমাদের এই জায়গায় এসে দেখুন কেন বহুত্ববাদের কথা বলেছি। একটা বহুত্ববাদের সমাজ সবাইকে প্রমোট করবে। আইনের মধ্যে করবে, সংসদের মধ্যে ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে করবে- সব জায়গায় সমান প্রতিনিধিত্ব করবে।
প্রশ্ন: প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী দুইবারের বেশি নয় প্রস্তাব করেছেন। একই সঙ্গে তাদের ক্ষমতার ভারসাম্যের দাবি ছিল। সেটি কতোটুকু বাস্তবায়ন হবে?
আলী রীয়াজ: আমাদের বিদ্যমান সংবিধানে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় না থাকার বিধান রয়েছে, নতুন করে এ বিষয়ে কোনো সুপারিশ করিনি। আমরা সুপারিশ করেছি প্রধানমন্ত্রীর দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় রাখা যাবে না। যেটি দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচনা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে ক্ষমতার এককেন্দ্রিক শাসন চলে আসে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি প্রস্তাব করেছি যে, তিনি দলের প্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন না। এটার কারণ হচ্ছে যাতে করে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণ না হয়। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা যেন এক ব্যক্তির হাতে চলে না যায়। সে বিবেচনা থেকে আমরা বলেছি যে, প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়াদের বেশি থাকা ঠিক নয়। এটা নাগরিকদের মধ্যেও চাওয়া আছে। আমরা সেটিরই প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছি। এটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে; কারণ আমরা ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণ দেখেছি। তাই ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণের বিভাজনটা আমরা করতে চেয়েছি। ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে বিগত বছরে বলা হয়েছে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ভাগ করে দেয়া হলেই ভারসাম্য হবে আমরা সেদিকে যাইনি। প্রেসিডেন্টের কিছু ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কারণ সংবিধানে আছে সকল  ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেবেন। প্রেসিডেন্টের সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই তার প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেয়ার দরকার নেই। এর বাইরে ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য আমরা ন্যাশনাল কন্সটিটিউশনের কথা (এনসিসি) বলেছি। এনসিসি বলার দুটো কারণ রয়েছে, এক নম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের সঙ্গে কখনোই বসে না। পার্লামেন্টে যখন বসে একে অপরকে আক্রমণ করে কথা বলেন। এর জন্য আমরা রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেছি। নির্বাহী বিভাগের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট আসছেন, আবার আইনসভার দিক থেকে বিরোধীদলীয় নেতা আসছেন। আবার প্রধানমন্ত্রীও আসেন সেখান থেকে। আমরা প্রধান বিচারপতির কথা বলেছি। সংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের  ক্ষেত্রে আমরা বিষয়টি এনসিসিতে নিয়ে গিয়েছি। যাতে সবাই পরামর্শ করে সবকিছু করতে পারেন। প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিন বিভাগের নিয়োগের বিষয়টিও আমরা এনসিসিতে যুক্ত করেছি। যাতে ন্যাশনাল ইস্যুতে আমরা একসঙ্গে কাজ করবো।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের সুপারিশ করেছেন। এটি নিয়ে তো বিতর্কও ছিল। আবার কেন অনির্বাচিত সরকারের পরামর্শ করতে হয়েছে। আমরা কি স্থায়ী কোনো ব্যবস্থায় যেতে পারি না?
আলী রীয়াজ: বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্রের কাঠামোগুলো তৈরি হয়নি। হঠাৎ করে একটি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। গণতন্ত্র চর্চার বিষয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে অনেক ভুলভ্রান্তির মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে। আমি তো বলি যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ২৫০ বছরের দিকে আগাচ্ছে আমরা প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি ৫০ বছরে। তাতে আমাদের প্রাণ দিতে হয়েছে, লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু দুর্বল জায়গাগুলো হচ্ছে আমরা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারিনি। গণতন্ত্রের চর্চাটা প্রতিষ্ঠান দিয়ে করতে হয়। একটা স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকতে হবে। যে কারণে আমরা বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সেক্রেটারিয়েট দেয়ার কথা বলেছি। আমরা বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা দরকার। এগুলো যখন আস্তে আস্তে দাঁড়াবে তখন আর এটার প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পৃথিবীতে একটি ইউনিক জিনিস বাংলাদেশ অফার করেছে। অন্যত্র কিন্তু ছিল না। এরপর কোথাও কোথাও এটি অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা এত সব সমস্যার মধ্যে থেকেও একটা পথ বের করেছেন। অনেকে রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করেন। কিন্তু আমি বলি তারা তো সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটা পথ বের করেছেন। এটার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ লাগেনি। তাহলে আমরা এখন ওটা থেকে বের হতে পারছি না কেন, কারণ আমরা এখনো প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করতে পারিনি। ধরুন, আগামী দশ বছর যদি এনসিসি (জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ) ঠিকমতো কাজ করে, দুটো ভালো নির্বাচন হয়, বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারি দলের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক হয়, আস্থার জায়গা তৈরি হয়, তখন এটার দরকার হবে না। এটা তারাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কারণ পথ কেউ বন্ধ করেনি। দশ বছর পর বিরোধী দল, সরকারি দল সবাই যদি দেখেন যে, আমার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এত শক্তিশালী যে তত্ত্বাবধায়কের দরকার নেই, তুলে দেবেন। কিন্তু এ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার যে সংকট গত ৩০ বছর ধরে চলছে সে জায়গা থেকে বের হতে এটা প্রয়োজন। যখন প্রয়োজন হবে না, তখন বাতিল হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি করতে পারাটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হবে রাষ্ট্রের জন্য...
আলী রীয়াজ: আমরা মনে করি এটি বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশনের কথা বলেছি এ কারণে যে, আমরা যদি জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি করতে চাই তখন দেখতে হবে এমন প্রতিষ্ঠান আছে কিনা- যারা এ প্রশ্নটা তুলতে পারে। আমাদের দেশে গুম হয়েছে, বিচার বহির্ভূত হত্যা হয়েছে- মানবাধিকার কমিশন কিচ্ছু করতে পারেনি। আমি আবার তাকে প্রশ্নও করতে পারি না। এখন মানবাধিকার কমিশন যদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হয়, তার যদি জবাবদিহিতা থাকে, সে জবাবদিহিতার ক্ষেত্র যদি সংসদ হয়, আমরা যদি একটি ভালো সংসদ পাই। তাহলে বিরোধী দল সেই প্রশ্নটা সত্যিই করতে পারবে। রাষ্ট্র যদি সত্যি নিপীড়ক হয়ে ওঠে তখন বিরোধী দল মানবাধিকার কমিশনকে প্রশ্ন করতে পারবে। আমরা এটাও বলছি- মানবাধিকার কমিশন যেকোনো জায়গা থেকে তথ্য চাইলে সরকার দিতে বাধ্য থাকবে। তাতে করে আমরা চেয়েছিলাম, তারা দেননি এ বলে পার পাওয়ার সুযোগ হবে না। সংবিধান, প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা করা। নাগরিকের সবচেয়ে বড় অধিকার হচ্ছে বেঁচে থাকার অধিকার। একটা  গণতান্ত্রিক সমাজে সে যেন কথা বলতে পারে, সমাবেশ করতে পারে। যখন সেটি লঙ্ঘিত হবে তখন মানবাধিকার কমিশন বলবে এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের জুডিশিয়ারি ক্ষমতা নেই। কিন্তু নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে আদালতে যেতে পারবেন।
প্রশ্ন: অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন, এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো কতোটা শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আমি পুরোপুরি আশাবাদী। এই কারণে যে, গত ১৬ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা, প্রাণঘাতী অভিজ্ঞতা। কী মর্মান্তিক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আমরা গেলাম। আমরা কি শিখিনি? নিশ্চয় শিখেছি। রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি সবাই তো শিখেছে। তাহলে এ রকম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করার ক্ষেত্রে তারা কেন প্রতিবন্ধক হবেন। তারাও তো চান। আজকে যারা রাজনীতিক আছেন তারা তো বিরোধী দলে ছিলেন ৫ই আগস্ট পর্যন্ত। কী নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যদিয়ে তারা গেছেন- তারা জানেন না। আমার থেকে তো তারা বেশি জানেন। কারণ তারা সেটির শিকার হয়েছেন। তাই তারাই তো এরকম পরিস্থিতি বন্ধ করার পথ খুঁজবেন। ভবিষ্যতে তাদেরও তো সে জায়গায় যেতে হবে। সবাই তো অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকে না। যারা স্বপ্ন দেখেন তাদের কী হয় তা তো আমরা ৫ই আগস্ট দেখেছি। যারা অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখেন তাদের শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে হয়।
প্রশ্ন: আপনাদের প্রস্তাবনা নিয়ে তো রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্টদের অনেকের আপত্তি আছে। এ বিতর্কের অবসান হবে কীভাবে?
আলী রীয়াজ: আলোচনা তো হবেই। আলোচনা করার জন্যই তো আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। ৫২ বছর আমরা সংবিধান নিয়ে কথা বলতে পারিনি। আজকে যদি আমরা একটু বেশিই বলি, সে বলার তো আমার অধিকার রয়েছে। যতগুলো সংশোধনী হয়েছে কারও সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনীতে অধিকাংশ মানুষ বলেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করবেন না। কারও কথায় কর্ণপাত করা হয়নি। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সবকিছু হয়েছে। আজকে সারা দেশ কথা বলতে পারে। আপনি, আমি সবাই কথা বলতে পারছি। আসুন আলাপ আলোচনা করি। আমি যেকোনো সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখি। তার মানে এটার একটা গুরুত্ব বিবেচিত হচ্ছে। আমার প্রস্তাব হিসেবে নয়, বিষয় হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে সকলে যুক্ত হচ্ছে। তাহলে আসুন সকলে কথা বলি।
প্রশ্ন: ছাত্ররা ১৯৭২-এর সংবিধানকে মুজিববাদী সংবিধান বলছে, যেটি শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার করে তুলেছে। আপনারা কী মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আজকের বিদ্যমান সংবিধান ৭২-এর সংবিধান নয়। ৭২-এর সংবিধানের প্রথম পুনর্লিখন হয়েছে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিব যখন চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে একদলীয় ব্যবস্থা প্রেসিডেন্সিয়াল রুল চালু করেছেন। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রথম লঙ্ঘিত হয়েছে আওয়ামী লীগ দ্বারা। যারা ’৭২-এর সংবিধানের মর্যাদা নিয়ে কথা বলেন তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ ’৭৫-এর চতুর্থ সংশোধনী কি ’৭২-এর সংবিধানের লঙ্ঘন নয়। আবার পঞ্চদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আপনি সমস্ত ব্যবস্থা বদলে দিচ্ছেন। জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই। নির্বাচনের আগে কোনো ম্যান্ডেট নেই, সংবিধান সংশোধনীর জন্য কোনো গণভোট হচ্ছে না। ছাত্ররা রাজনৈতিক শক্তি। তাদের কথা বলার অধিকার রয়েছে। এটা বাস্তবতা যে, বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান এক ব্যক্তির শাসন তৈরির পথ তৈরি করেছে। অন্যথায় বাংলাদেশ এই পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যেতো না। সংবিধানকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেটা ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৬ বছর বাংলাদেশের মানুষ তা হাড়ে হাড়ে, শিরায় শিরায় অনুভব করেছে।
প্রশ্ন: সংবিধান সংস্কার কমিশনে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি- এ নিয়েও তো বিতর্ক রয়েছে।
আলী রীয়াজ: এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক আমাদের কমিশনে কাঠামোগতভাবে সকলের প্রতিনিধিত্ব আমরা অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। এটা আমাদের দুর্বলতা। এতে ধর্মীয়ভাবে যারা সংখ্যালঘু, জাতি গোষ্ঠীর বিবেচনায় যারা তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এই কমিশনের এ দুর্বলতা থেকে গেছে। এটা আমি প্রথম দিন থেকেই স্বীকার করি। কিন্তু অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করতে হয়েছে। তাতে ওই দুর্বলতা শেষ হয়ে যায় না। তারপর আমরা কী করেছি। আমরা যখন জানি এটা আমাদের দুর্বলতা, আমরা চেষ্টা করেছি সে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সমস্ত রকম মানুষকে যুক্ত করার। তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। যারা ভিন্ন ভিন্ন জাতি গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করেন তাদেরকে আমরা ডেকেছি, তাদের কথা শুনেছি। ধর্মীয় বিবেচনায় যারা সংখ্যালঘু বিবেচিত হন তাদেরকেও ডেকেছি। তাদের কথা তো শুনতে হবে। তারা তো এ দেশের নাগরিক। সংবিধান তো তাদের জন্যও।
প্রশ্ন: জাতীয় ঐকমত্য গঠনের প্রক্রিয়া কবে থেকে শুরু হবে?
আলী রীয়াজ: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রধানরা নিয়মিত আমরা বসছি। কিছু ভিন্নমত থাকলে সেটার সমন্বয় করছি। যাতে আমাদের সুপারিশগুলোতে সামঞ্জস্য থাকে। এটার কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে শেষ করতে পারবো। অন্তত চার পাঁচটি কমিশনের পুর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে পারবো। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে। তার আগে রাজনৈতিক দলগুলো পুরো প্রতিবেদন পেয়ে যাবে। সে আলোকে তারা তাদের মত দিতে পারবে। 

mzamin


Monday, November 4, 2024

৭ উদ্দেশ্যে সংবিধান সংস্কার -ড. আলী রীয়াজ

দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাসহ ৭ উদ্দেশ্যে সংবিধান সংস্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. আলী রীয়াজ। আর এ সংস্কার করা সংবিধান পাস বা অনুমোদন দিতে কোনো নির্বাচিত সরকার বা পার্লামেন্টের প্রয়োজন হবে না, এটি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এ সংবিধানের বৈধতা দেবে বলে জানিয়েছেন সংস্কার কমিটির অন্যতম সদস্য শিক্ষার্থী প্রতিনিধি মাহফুজ আলম। ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা দেখতে চায় না সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে গঠিত কমিশন। একই সঙ্গে সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অভাবনীয় এককেন্দ্রিকক্ষমতা হ্রাস করা, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ করার মতো সুপারিশ থাকবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের।  রোববার বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংবিধান সংস্কার কমিশনের লক্ষ্য ও রূপরেখা তুলে ধরেন কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ সময় কমিশনের সদস্য ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম, সদস্য অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক, ড. শরীফ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী, ফিরোজ আহমেদ ও মো. মুসতাইন বিল্লাহ প্রমুখ।

সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলী রীয়াজ বলেন- ক. দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। খ. ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। গ. রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বস্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা। ঘ. ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার উত্থান রোধ। ঙ. রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ- নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন। চ. রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের বিকেন্দ্রীকরণ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন। ছ. রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক এবং আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
তিনি আরও বলেন, আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ করবো লিখিত মতামত এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠানোর জন্য। সরকার বিভিন্ন কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে। ফলে কমিশনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবে না। কিন্তু তাদের দেয়া প্রতিটি লিখিত প্রস্তাব ও মতামত কমিশন নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করবে এবং কমিশনের সুপারিশে তার যথাসাধ্য প্রতিফলন ঘটাতে সচেষ্ট থাকবে।
লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ সংস্কারের পরিধি নিয়ে বলেন, সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত হবে বর্তমান সংবিধান পর্যালোচনাসহ জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের লক্ষ্যে সংবিধানের সামগ্রিক সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন, পুনর্বিন্যাস এবং পুনর্লিখন। সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে  বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো হবে সুপারিশে। পাশাপাশি রাজনীতি এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় সর্বস্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের পৃথক্‌করণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতায়নের সুপারিশ থাকবে কমিশনের। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক এবং আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ থাকবে বলে জানায় কমিশন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, কমিশন সংস্কারের সুপারিশ তৈরিতে বিভিন্ন অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করবে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মতামত ও প্রস্তাব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। সংস্কারের অংশ হিসেবে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের লিখিত মতামত এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ করবে। সুপারিশ পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবে কমিশন। এ ছাড়া সংবিধান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সিভিল সোসাইটির সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, তরুণ চিন্তাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করবে। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনায় বসবে কমিশন। তবে, যেসব ব্যক্তি, সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, বা দল জুলাই-আগস্ট ছাত্র- জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সক্রিয়ভাবে হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিল, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নকে সমর্থন করেছে, ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে বৈধতা প্রদানে সহযোগিতা করেছে কমিশন তাদের সংস্কার প্রস্তাবের সুপারিশ তৈরিতে যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

mzamin

Thursday, September 19, 2024

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হয়ে আলী রীয়াজের ফেসবুক স্ট্যাটাস

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক আলী রীয়াজ। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। দায়িত্ব পাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন তিনি।

ফেসবুক পোস্টে আলী রীয়াজ দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে লিখেছেন, পনেরো বছর ধরে যারা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, আত্মদান করেছেন, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অংশগ্রহণ করেছেন তাদের আত্মদানের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা; তাদের কাছে আমি ঋণী।

তিনি লিখেছেন, এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্যে আমার এবং কমিশনের সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দেশের সর্বস্তরের মানুষের, গণমাধ্যমের, রাজনৈতিক দলসমূহের, নাগরিক সমাজের সহযোগিতা, তাদের এই সহযোগিতাই হবে নির্ণায়ক।

আলী রীয়াজ লিখেন, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণমানুষের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যা প্রতিফলিত হয়েছে তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ।

কালবেলা পাঠকদের জন্য অধ্যাপক আলী রীয়াজের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হল-

“সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আমাকে দায়িত্ব প্রদানের জন্যে অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। পনেরো বছর ধরে যারা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, আত্মদান করেছেন, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অংশগ্রহণ করেছেন তাদের আত্মদানের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা; তাদের কাছে আমি ঋণী।

এই উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে যারা আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন তাদের প্রতিটি বার্তা আমি পাঠ করেছি। ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রত্যেককে উত্তর দিতে না পারলেও তাদের বার্তাগুলো আমি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করেছি। এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্যে আমার এবং কমিশনের সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দেশের সর্বস্তরের মানুষের, গণমাধ্যমের, রাজনৈতিক দলসমূহের, নাগরিক সমাজের সহযোগিতা, তাদের এই সহযোগিতাই হবে নির্ণায়ক। অতীতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংগ্রামে অংশগ্রহণের সূত্রে গণমাধ্যমসহ সকলের যে সহযোগিতা আমি লাভ করেছি আশা করি তা আপনারা অব্যাহত রাখবেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণমানুষের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যা প্রতিফলিত হয়েছে তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ।

সকলের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বলতে পারলে আমি আনন্দিত হতাম, কিন্তু পেশাগত এবং ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আশা করি শিগগিরই আপনাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হবে। সবাইকে ধন্যবাদ।”

অধ্যাপক আলী রীয়াজ। ছবি : সংগৃহীত

Friday, August 30, 2024

‘সংবিধান পুনর্লিখন করতে হবে’ -ড. আলী রীয়াজ

বর্তমান সংবিধান সংশোধনের উপায় সীমিত উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিসটিংগুইশ অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিক করতে সংবিধান পুনর্লিখন করা জরুরি। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান পুনর্লিখনের কথা বলছি এই কারণে যে সংবিধান সংশোধনের উপায় নেই।  

বর্তমান সংবিধান সংশোধনের উপায় সীমিত। কারণ, সংবিধানের এক-তৃতীয়াংশ এমনভাবে লেখা যে তাতে হাতই দেয়া যাবে না। এর মধ্যে এমন সব বিষয় আছে, যেগুলো না সরালে কোনোকিছুই করতে পারবেন না। এ কারণে পুনর্লিখন শব্দটা আসছে। পুনর্লিখনের পথ হিসেবে গণপরিষদের কথা বলছি। আর কোনো পথ আছে কিনা, আমি জানি না।

সরকার প্রধান হিসেবে একজন সর্বোচ্চ কতো মেয়াদে থাকতে পারবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দুই মেয়াদ, নাকি তিন মেয়াদ-এই প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সরকার প্রধান হিসেবে একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ থাকতে পারেন।
টিআইবি’র প্রস্তাবিত একই ব্যক্তি দলীয় প্রধান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না’-এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আলী রীয়াজ বলেন, ক্ষমতা যাতে একহাতে কেন্দ্রীভূত না হয়, সেটাই টিআইবি বলেছে। এসব সংস্কার জরুরি। ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত করার এসব পথ সাংবিধানিকভাবে বন্ধ করা না হলে ভবিষ্যতে আরও একজন স্বৈরাচার তৈরির পথ বন্ধ করা যাবে না।
ভারতীয় গণমাধ্যমের অপতথ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো ৫ই আগস্ট থেকে যেসব অপতথ্য ও ভুল তথ্য প্রচার করছে, সেগুলোর বড় জবাব হচ্ছে সত্য ঘটনা তুলে ধরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। আমি তাদের বলেছি, আপনারা ঢাকায় যান, দেখুন, তারপর তা তুলে ধরুন। একই কথা আপনাদের জন্যও। আপনারা সত্য তথ্য তুলে ধরুন।
তিনি বলেন, টেকসই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংলাপের আয়োজন করবে সিজিএস। সেগুলোর মাধ্যমে দেশব্যাপী নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ সংগ্রহ করা হবে। তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন সম্ভব হবে, যা গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে সহজতর এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
আলী রীয়াজ বলেন, জাতীয় পর্যায়ের সংলাপের অংশ হিসেবে ঢাকায় ৮টি জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিষয়বস্তুর মধ্যে থাকছে সংবিধান, মানবাধিকার ও গুরুতর আইন লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগীদের বিচার নিশ্চিতকরণ, বিচার ব্যবস্থা, নাগরিক প্রশাসন, সাংবিধানিক সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, অর্থনৈতিক নীতিমালাসহ ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক ঋণ এবং গণমাধ্যম। তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনায় ৪টি আঞ্চলিক সংলাপ হবে। এতে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবনা ও সুপারিশ খোলাখুলি প্রকাশ করতে পারবেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের কারণে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন ব্যবস্থা-সবই পরিকল্পিতভাবে রাজনীতিকরণ হয়েছে।
আলী রীয়াজ বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নীতিমালা জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও জ্বালানি খাতে স্বার্থবাদী একটি নেটওয়ার্ক গঠিত হয়েছিল, যারা নিজেদের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঋণখেলাপিদের বিচার থেকে রক্ষা করা হয়েছে। বিগত সরকারের সঙ্গে যুক্ত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী জ্বালানি খাতের ভর্তুকি পকেটে ভরেছে। এই সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সংবিধানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গণজাগরণের মাধ্যমে তৈরি হওয়া আশা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে সরকারের ওপর বিশাল দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত প্রতিটি সংলাপের আলোচনা ও নির্দিষ্ট সুপারিশের সার সংক্ষেপ সিজিএস প্রকাশ করবে এবং গণমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে তা সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করবে।
সংবাদ সম্মেলনে সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, আমাদের অনেক কিছু করার আছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে চাই। সে লক্ষ্যে সিজিএস ধারাবাহিক সংলাপের আয়োজন করেছে।

Saturday, August 24, 2024

আদালত প্রাঙ্গণে এবং আদালতে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলী উদ্বেগজনক by আলী রীয়াজ

আদালত প্রাঙ্গণে এবং আদালতে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে আমি উদ্বেগজনক বলে মনে করি। যে কোনও অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার প্রাপ্তি যেমন অধিকার তেমনি তার নিরাপত্তা বিধান সরকারের দায়িত্ব। আটক ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করার সময় এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার যাতে করে এই ধারণা তৈরি না হয় যে, তিনি ন্যায়বিচার বঞ্চিত হতে পারেন। তদুপরি অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ চাওয়া মাত্রই  অভিযুক্তদের রিমান্ডে দেবার ব্যবস্থাও বিচার বিভাগের জন্যে খুব ভালো কাজ নয়।

মনে রাখা দরকার যে, সারা বিশ্বের চোখ এখন বাংলাদেশের দিকে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে আমার আলাপ-আলোচনায় যে প্রশ্নটি আমি শুনতে পাচ্ছি তা হচ্ছে, যে ব্যাপক আকারে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার ন্যায়বিচার হবে কীনা, যারা এই ধরণের অপরাধ করেছেন তাদের বিচার করা সম্ভব হবে কীনা। বিশ্বের কমবেশি সকল দেশেই এটা এখন আলোচিত যে, বাংলাদেশ গত ১৫ বছরে এক ভয়াবহ এক-ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচারী শাসনের মধ্য দিয়ে গেছে যখন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এখনকার কোনও আচরণ যেন এই জায়গা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে না নেয় সেটা মনে রাখা দরকার। তদুপরি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক সমাজের এবং মিডিয়ার সহযোগিতা দরকার হবে।  

প্রাসঙ্গিকভাবে গণমাধ্যমগুলো রিমান্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তি কী বলেছেন, কী করেছেন বলে যা প্রচার করছে সেগুলো যে পুলিশের সূত্রে পাওয়া ‘খবর’ সেটা সহজে বোঝা যায়। এগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের কোনও উপায় নেই, ফলে সাংবাদিকরা এই ধরণের সূত্রের দেয়া ‘তথ্য’কে যদি সংবাদ বলে প্রচার করেন তা জনপ্রিয়তা লাভে সাহায্য করতে পারে, কিন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়না। এই ধরণের সাংবাদিকতার কেবল সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুন্ন করেনা, গণমাধ্যমের ওপরে আস্থারও অবসান ঘটায়।

[লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট। লেখাটি ফেসবুক থেকে নেয়া]

Monday, August 5, 2024

জনগণের ভয় ভেঙেছে -আলী রীয়াজ

জুলাই মাসের পুরো সময় জুড়ে সারা বিশ্বের চোখ ছিল বাংলাদেশের উপর। ১৭ কোটি নাগরিকের দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে  পড়েছে প্রতিটি জনপদে। প্রাথমিকভাবে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলেও তা এক পর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে এবং দেশের সর্বস্তরের জনগণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন। বলা হচ্ছে আন্দোলনটি দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ছাত্র আন্দোলন, যা এখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বল প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো  বেসামরিক ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার করে দমনপীড়ন চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এত দমনপীড়নের পরও বিক্ষোভ থেকে বিন্দুমাত্র সরে যাননি ছাত্র-জনতা। শনিবার ও রোববার ঢাকা সহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার মিছিলে উত্তাল ছিল বাংলাদেশ।

দেশের চলমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এ বিষয়ে ইলিয়ন স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিঙ্গুইশড অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের সঙ্গে কথা বলেছে ভারতীয় গণমাধ্যম স্ক্রল ইন। অধ্যাপক রীয়াজ আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশদভাবে কথা বলেছেন।

স্ক্রল ইন: আমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ থেকে কিছু অবিশ্বাস্য এবং করুণ দৃশ্য দেখেছি। আপনি কী এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণ ব্যাখ্যা করবেন: আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান পরিস্থিতি? হঠাৎ এই ছাত্র-জনতার বিস্ফোরণের কারণ কী?
আলী রীয়াজ: সবার আগে আমাদের বুঝতে হবে গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে দু’টি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনি প্রথমে যেটি উল্লেখ করেছেন তা হলো কোটা সংস্কার আন্দোলন। জুলাইয়ের শুরু থেকেই এই আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে আমি পরে ফিরে আসবো...১৬ই জুলাই থেকে বিক্ষোভের আরেকটি মাত্রা শুরু হয়েছে। যেটি বাংলাদেশে বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে বেশ জনপ্রিয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। যদিও দুটি পরিস্থিতি একই সময়ে উদ্ভূত কিন্তু এখানে ভিন্নতা রয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বললেও দুটি পরিস্থিতির ভিন্নতা আমাদের বুঝতে হবে।

বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন ধরে ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল। অর্থাৎ, সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ চাকরি কোটার ভিত্তিতে এবং বাকি ৪৪ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে। এই ৫৬ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ প্রাথমিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখেছি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধা এবং পরে তাদের উত্তরসূরি পর্যন্ত এই কোটার নিয়োগ পৌঁছেছে। ২০১০ সালে আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। বাকি ২৬ শতাংশ কোটা নারী, আদিবাসী সম্প্রদায়, দুর্গম অঞ্চলের জনগণের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি আন্দোলন হয়েছিল। সেটিও ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। মূলত ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে রাজনৈতিকভাবে দলীয়করণ হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ যারা শাসনকে সমর্থন করে এই কোটার ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দেয় সরকার। সে সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একমত হয়ে পুরো কোটা ব্যবস্থা বাতিল করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর কয়েক বছর পর মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের দাবিতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আদালতে যান। যা এ বছরের জুনে, হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে ২০১৮ সালের কোটা ব্যবস্থা বাতিলের পরিপত্রকে বাতিল করে দেয়া হয়। মূলত হাইকোর্টের ওই রায়কে কেন্দ্র করেই ১লা জুলাই থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। সারা বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু করে। তবে এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বাধার সম্মুখীন হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে শুরু করে সরকারের ছাত্র সংগঠন। এরপরেও এই আন্দোলনে অনেকটা শান্তি বজায় ছিল। কারণ ছাত্ররা সহিংসতার পথ পরিহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১২ই জুলাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করেন এবং কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভকারীদের ইঙ্গিত করে একটি মন্তব্য করেন, যার পর থেকেই আন্দোলন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন: তিনি কি রাজাকার বলেছিলেন নাকি পাকিস্তানি সেনাদের দোসর?
আলী রীয়াজ: হ্যাঁ, বিষয়টা এমনই। তার ওই মন্তব্যকে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত অবমাননাকর ও আপত্তিকর বলে মনে করেছে। এরপর রাতেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। পরের দিন, সারা দেশে বিক্ষোভ আরও জোরালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়। পুলিশের গুলিতে একদিনে ছয় শিক্ষার্থী নিহত হন। এতেই মূলত আন্দোলনের দ্বিতীয় পরিস্থিতির সূচনা হয়। কার্যত এরপর থেকেই শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় দেশের সাধারণ নাগরিকরা।
এখানে বুঝতে হবে তাদের অভিযোগটা কি ছিল? বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীরা দেখেছে বাংলাদেশে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তবুও বেকারত্বের হার অনেক বেশি। অন্যদিকে তারা ব্যাপক দুর্নীতি দেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, তারা দেখেছে যে, সাবেক পুলিশ প্রধান অবৈধভাবে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুর্নীতির দায়ে সাবেক সেনাপ্রধানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

প্রশ্ন: তাহলে কোটা সংস্কার আন্দোলন আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেছিল?
আলী রীয়াজ: আমার সেটাই মনে হয়। এই কোটা সংস্কার আন্দোলন অন্যান্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জাগিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে তিনটি নির্বাচন হয়েছে, যাতে কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে জনগণের ক্ষোভ প্রকাশের কোনো উপায় ছিল না। তাই কোটা আন্দোলন যখন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে তখনই এই মেলবন্ধন তৈরি হয়। কমবয়সী বাংলাদেশি এবং সর্বস্তরের জনগণ এই আন্দোলনে শরিক হয়েছে এবং দেশ একটি গণঅভ্যুত্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন?
আলী রীয়াজ: না, আমি এমনটা মনে করছি না। দেশের ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু হলেও তা এখনো সীমিত আকারে রয়েছে। প্রায় এক কোটি প্রবাসী দেশের বাইরে রয়েছেন। ইন্টারনেট না থাকায় তারা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। মূলত এই প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখে। তাই তাদের উপেক্ষা করা যায় না। আন্দোলন দমাতে ছয় ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে দু’জনকে হাসপাতাল থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। পুলিশের দাবি তারা ছাত্রনেতাদের হেফাজতের জন্য তাদের জিম্মায় নিয়েছে। তবে পরিবারগুলোর দাবি তাদের ওই নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি। তাই এই হেফাজতের বিষয়টি জোরপূর্বকভাবে তুলে নেয়া হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে তাদের তুলে নিয়েও আন্দোলন দমাতে পারেনি। অন্যান্য ছাত্রনেতারা আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
এরপর শিক্ষার্থীরা নয় দফা দাবিতে তাদের আন্দোলন শুরু করে। তাদের নয় দফা দাবি ছিল: প্রধানমন্ত্রীর অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হবে এবং পদত্যাগ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ উপাচার্যদের পদত্যাগ ইত্যাদি। তাই এমন অনেক দাবি রয়েছে যা পূরণ হয়নি। তাই কয়েকজন ছাত্রনেতা যখন আন্দোলন প্রত্যাহার করে বিবৃতি দেন, তখন সকলের কাছে স্পষ্ট হয় যে, এটি স্বেচ্ছায় করা হয়নি।
আন্দোলন প্রত্যাহার করার পরও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে। অনেক শহরের ছাত্ররা যেখানে পারছে রাস্তায় নেমে এসেছে। যদিও কারফিউ শিথিল করা হয়েছে, আমরা জানি যে রাতের কারফিউ বাড়ি-ঘরে অভিযান চালানো এবং লোকদের গ্রেপ্তার করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দশ হাজারের বেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বেশির ভাগই তরুণ। তাই সরকার সবকিছু স্বাভাবিক বলে দাবি করলেও বাস্তবে স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি।

প্রশ্ন: শেখ হাসিনা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তাতে তিনি তার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ফলাও করে প্রচার করছেন। আপনি কি মনে করেন এই আন্দোলনকে টপকে যাওয়া তার জন্য কঠিন হবে?
আলী রিয়াজ: হ্যাঁ, ‘গণতন্ত্রের আগে উন্নয়ন’-এর যে আখ্যান তিনি প্রচার করেন তা এখন আর কাজ করবে না। আসলে এই আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই তার আখ্যান জনগণের কাছে উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল। এই আন্দোলন দানা বাধার পেছনে এটিও একটি কারণ। গত দুই বছরে দেশের অর্থনীতির যে হাল হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার উন্নয়নের আখ্যান যে একটি ফাঁপা দাবি ছিল তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। অধিকাংশ মানুষ এই তথাকথিত উন্নয়নের কোনো সুফল পাচ্ছে না বলে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ফলে তার উন্নয়নের আখ্যান ভেসে গেছে। হাসিনার জন্য এটা কোনো বৈধ আদর্শ হতে পারে না। ২০১৪ সাল থেকে, এই সরকার তার নৈতিক বৈধতা হারিয়ে ফেলেছে; কারণ নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে তখন থেকেই। মূলত এই জালিয়াতি ঢাকতেই তারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফাঁকা বুলি প্রচার করেছে। কিন্তু এ বিষয়টি দ্রুতই জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। যার পরিণতি আমরা এখন রাজপথে দেখতে পাচ্ছি। সরকার পুলিশ, সেনাবাহিনী দিয়ে কারফিউ জারি রেখেছে।
সরকার যত বেশি দমনপীড়ন করবে ততই তারা জনগণের ক্ষোভের আগুনে জ্বলবে। ইতিমধ্যেই এই আন্দোলন এই শাসনের মূলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এই আন্দোলন ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায় কিনা সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ক্ষমতার ভিত্তি কী তা আমাদের বুঝিয়ে বলুন? দৃশ্যত অত্যন্ত অজনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি কীভাবে ক্ষমতায় থাকবেন?
আলী রীয়াজ: সরকার ব্যবসায়ী এবং আমলাতন্ত্রের ওপর টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। যেখানে তারা একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি করেছে। আর তাদের ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে পুলিশ ও সামরিক বাহিনী। গোটা পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রের যন্ত্র না হয়ে ক্ষমতাসীন দলের দোসর হয়ে উঠেছে। এবং এই বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে, সরকারকে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
সরকার ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে শাসন করছেন। ভয়ই হয়ে উঠেছে সবাইকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যন্ত্র। মনে রাখবেন, বিগত এক দশকে, বাংলাদেশি রাষ্ট্র মানুষের উপর নজরদারি করার জন্য প্রচুর ক্ষমতা সঞ্চয় করেছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুম সহ বিভিন্ন ধরনের দমনমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, তাই এই সমস্ত কিছু ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে যেভাবে খুশি সেভাবেই দেশ চালাচ্ছে।
এখন অবশ্য বাঁধ ভেঙে গেছে। জনগণের মন থেকে এই শাসনের ভয় কেটে গেছে। কারণ তরুণ বাংলাদেশিরা রাস্তায় নেমে তাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এই আন্দোলনের আগ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করা নিষিদ্ধ ছিল। কেউ শাসন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করলে সাধারণ জনগণ তা এড়িয়ে যেত। এখন সে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এটাই এই আন্দোলনের বড় অর্জন। লোকেরা তাকে নাম ধরে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তাকে স্বৈরাচারী বলে ডাকতে পারে- যা আগে লোকেরা এড়িয়ে যেতেন।

প্রশ্ন: গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে যা বিশ্বের নজর কেড়েছে। আপনি কি মনে করেন যে এই ধরনের অস্থিতিশীলতা এখন এটিকে বিপন্ন করতে পারে?
আলী রীয়াজ: দেখুন, বাংলাদেশ যে ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি করেছে, সেই দাবিটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। এটি দুটি কারণে। প্রথমত- অনেক ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক তথ্য তৈরি করা হয়েছে। সরকার, অন্য যেকোনো স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার মতো, প্রজেক্ট করার চেষ্টা করেছিল যে, তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাদের কৃতিত্ব। আমরা জানি, কর্তৃত্ববাদীরা পরিসংখ্যান পছন্দ করে। তার মানে কী কোনো অগ্রগতি হয়নি? না এটা সত্য না। হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। কিন্তু সেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সমবণ্টন হয়নি। ফলে এই সরকারের অধীনে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। এই সরকারের আমলে আমরা নিরবচ্ছিন্ন দুর্নীতি দেখেছি, আমরা পুঁজির উড্ডয়ন দেখেছি, আমরা দেখেছি শাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা তাদের ঋণখেলাপি এবং অর্থ ফেরত দিচ্ছেন না, বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ব্যয়ের দিক থেকে আকাশচুম্বী হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় যথেষ্ট কাজ করেছে?
আলী রীয়াজ: না, আমি তা মনে করি না। এখানে তারা গণতন্ত্রকে পেছনে ফেলেছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। ২০২১ সাল থেকে তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কথা বলে আসছে। আমরা বাংলাদেশ সরকারের ওপর এই ব্যাপক বাগাড়ম্বরপূর্ণ চাপ দেখেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের কথা এলে তারা চুপ হয়ে যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও তাই। মানবাধিকারের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও তারা আসলে শাস্তিমূলক  কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এক্ষেত্রে তারা কঠোরের পরিবর্তে নমনীয় ছিল।
এই বিষয়ে পশ্চিমাদের চিন্তাভাবনা হচ্ছে হাসিনাকে গণতন্ত্রের প্রশ্নে খুব বেশি চাপ দেবেন না; কারণ তখন তিনি চীনের সঙ্গে মিত্রতা করবেন। আমি মনে করি এটি একটি মূর্খতা। আপনি যদি গত ১০ বছরের দিকে তাকান, হাসিনাকে ঠেলে দেয়ার জন্য পশ্চিমাদের অলসতা সত্ত্বেও তিনি চীনের আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। বাংলাদেশে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক পদচিহ্ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার সবচেয়ে বিরক্তিকর দিকটির জন্য আমি ভারতকে সবার আগে যুক্ত করতে চাই। কারণ বাংলাদেশে কী ঘটছে তা জানা সত্ত্বেও একটি অগণতান্ত্রিক শাসনকে লাগাতার সমর্থন দিচ্ছে দিল্লি। ভারতের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে তারা এই শাসনকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চায়। কিন্তু, আমার মতে, ভারতের এই আচরণের কারণে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা আরও প্রকট হচ্ছে।

Saturday, July 27, 2019

ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন টেকায় হাইব্রিড শাসন by আলী রীয়াজ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজের বইয়ে আটটি চ্যাপ্টার আছে। প্রথমটিতে তিনি ১৯৯০ এর দশক থেকে কী করে হাইব্রিড রেজিম বা সংকর শাসনভুক্ত দেশগুলোতে একত্রে গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদী প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বিশ্বে এ রকম দেশের সংখ্যা বহু।
দ্বিতীয় চ্যাপ্টারে সংকর শাসনের মধ্যকার বৈচিত্র্য বা পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে। গণতন্ত্রায়নের স্টাডিজের মধ্যেই সংকর শাসনের উৎপত্তি এবং তার পরম্পরা ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকে মত ও পথনির্ভর ক্রান্তিকাল তত্ত্ব এটা অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের ফলে যারা বেনিফিসিয়ারি হয়েছে, তাদের দ্বারাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গলা টিপে ধরার ঘটনা ঘটতে পারে।

রীয়াজ লিখেছেন, দি এন্ড অব দ্যা হিস্ট্রির মতো ফরমান দেখে আমরা গণতন্ত্রায়নের উদ্দীপনা বিষয়ে
বেশ মেতেছিলাম। কিন্তু এখন এটা পরিষ্কার যে, ওই ফরমানের মধ্যে ১৯৭০-এর দশকে ল্যাতিন আমেরিকার দেশগুলো কি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল, সেবিষয়ে সামান্য মনোযোগই দেয়া হয়েছিল। আর সেকারণেই পরে ও’ ডোনেল ও স্মিটার হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে সরে আসার প্রক্রিয়ার ফল এই দাঁড়াতে পারে যে, দেখা যাবে, সেটা একটি উদারনৈতিক কর্তৃত্ববাদ কিংবা একটি রক্ষণশীল, উদারনৈতিক গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি কিছু নয়।

উল্লেখ্য যে, দি এন্ড অব দ্য হিস্ট্রি হলো একটি রাজনৈতিক মতবাদ। এর অর্থ হলো মানুষের পক্ষে যতখানি সম্ভব একটি সরকার ও শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, তার সমাপ্তি টানা। এর থেকে উত্তম আর কিছুই করতে না পারা।
এটা ধরে নেয়া যে, মানুষ যতদূর সম্ভব তার সামাজিক সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব, সেটা তারা অর্জন করার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছে।
উইকিপিডিয়ার মতে, এন্ড অব হিস্ট্রি কথাটি ১৮৬১ সালে ফরাসি দার্শনিক কারনেট প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। এরপর হেগেল ও কার্ল মার্ক্সও যে যার মতো ব্যবহার করেছেন। তবে ১৯৯২ সালে ফ্রান্সিস ফুকুওমা ‘দি এন্ড অব হিস্ট্রি এন্ড লাস্ট ম্যান’ লিখে বিশেষভাবে ধারণাটি আলোচনায় আনেন।

আলী রীয়াজ তার ওই চ্যাপ্টারের আলোচনায় এটা ফুটিয়ে তুলেছেন যে, হাইব্রিড রেজিমের বহু চেহারা। এর কোনো একটি নির্দিষ্ট রূপ নেই। সোজা কথায়, এর ছলাকলার অন্ত নেই। যখন যেমন তখন তেমন। তবে মূল কাজটা হলো, প্রকৃত ভোটাধিকার এবং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থেকে শঠতার আশ্রয় নিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা। কোনো একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরনের হাইব্রিড রেজিমের অভিঘাত বিচিত্র। আলী রীয়াজ লিখেছেন, এটা কন্টিনজেন্ট। মানে অপ্রত্যাশিত, আগে থেকে অনুমান করা চলে না, এমন কিছু।

এই চ্যাপ্টারে তিনি এই বিষয়টির স্বরূপ উন্মোচনে বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশকেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন এটা পরিষ্কার করতে যে, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাটা কিভাবে হাইব্রিড রেজিমের বৈশিষ্ট্যকে গভীরভাবে ধারণ করছে।
আলী রীয়াজ তৃতীয় চ্যাপ্টারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পরীক্ষা করেছেন। বিশেষ করে তিনি এরশাদের পতনের পরে ১৯৯১ সাল থেকে রাজনৈতিক উন্নয়নে আলো ফেলেছেন। তবে তাতে রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের কোনো ফিরিস্তি নেই। শাসন ব্যবস্তা রূপান্তরকরণের প্রধান মুহূর্তগুলো তিনিই মূর্ত করতে সচেষ্ট থেকেছেন।

তার যুক্তি হলো, দুই দশকের সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ একটি নির্বাচনী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর সেই থেকেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তাতে ছন্দপতন ঘটে। এবং বছরের পর বছর ধরে চলা ওই রূপান্তর যথাক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নির্ভর শাসন ব্যবস্তার জন্ম দেয়। এভাবে তিনি রেজিম রূপান্তরের চশমা দিয়ে রাজনৈতিক ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছেন।

রীয়াজ লিখেছেন, ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদিতা থেকে আধা কর্তৃত্ববাদী এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ কর্তৃত্ববাদিতা থেকে নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। দুই দলের কোনোটিই যারা নিজেদের মধ্যে রাষ্ট্র ক্ষমতার অদলবদল ঘটিয়েছে, তারা কেউ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেনি। বরং তারা স্বল্প মেয়াদি ফায়দা তুলতে সংবিধানের অপব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এবং দুই দলের মধ্যে সাপে নেউলে সম্পর্ক আস্থার ঘাটতি প্রকট করেছে, যার পরিণতিতে গণতান্ত্রিক সমন্বয়ের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে। যখন পার্লামেন্টসহ অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান সম্পূণরূপে অকার্যকর থেকেছে, তখন সংবিধানে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ সাধারণ নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে, আর সেগুলোই বিদ্যমান সিস্টেমকে ধরে রেখেছিল। ২০০৬ সালে বিএনপি বিদ্যমান সিস্টেম অপব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছিল। এবং তারা এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যা বিদ্যমান কার্যকর ব্যবস্থাটির ওপর একটি সর্বাত্মক আক্রমণ রচনার অনুকূল হয়েছিল। ২০১১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গোটা ব্যবস্থাটিকেই নির্মূল করে দিয়েছিল। এবং সর্বশেষ তারা এমন একটি অবস্থা তৈরি করেছে যেখানে নির্বাচন আর গণতন্ত্রের হাতিয়ার নয়, নির্বাচন হয়ে পড়েছে কর্তৃত্ববাদিতার হাতিয়ার। ২০১১ সালের পর থেকে যে রূপান্তরকরণ শুরু হয়েছিল সেটা বিরোধী দলের বয়কটের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালে উদগ্র রূপ নিয়েছিল।

আলী রীয়াজ লিখেছেন, হাইব্রিড রেজিম রূপান্তরকরণের ওই প্রক্রিয়ায় শুধু যে সাচ্চা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের খোঁড়া যুক্তিকে ধীরে ধীরে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেটা শুধু সাংবিধানিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। এই উদ্দেশ্য সাধনে বহু ধরনের আইনগত এবং আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
আলী রীয়াজ বইয়ের চতুর্থ পরিচ্ছেদে বিরোধী দলগুলোর উপর কি করে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তাই আলোচনা করেছেন। এরমধ্যে রয়েছে ব্যাপকভিত্তিতে বিদ্যমান কালাকানুন ব্যবহার, সংবাদপত্রের কণ্ঠ চেপে ধরা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং আইনকে আরও কঠোর করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। রীয়াজ অবশ্য এ পর্যায়ে বলেন, এটাও উল্লেখ করা সঠিক হবে যে বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি লক্ষ্যহীনভাবে অগ্রসর হয়েছিল এবং সেকারণে তারা নাগরিকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর সেটাই বাংলাদেশে রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা এবং তাঞ্জানিয়ার মতো একটি হাইব্রিড রেজিম সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। আর এভাবেই চতুর্থ চ্যাপ্টারে কি করে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তার বিবরণ ফুটে উঠেছে।

তিনি তার বইয়ের পঞ্চম চ্যাপ্টারে বাংলাদেশের রাজনীতির এই সংকট আলোচনা করেছেন যে, ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি এবং বিরোধীদলগুলোর অংশগ্রহণ ভুল কি শুদ্ধ ছিল। তার কারণ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ কিংবা সাংগঠনিক পরিস্থিতির কোনোটাই বিরোধী দলের পক্ষে ছিল না। তারা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে অংশ নিয়েছিল, সেখানকার অভিজ্ঞতাও কোনোভাবে আশাপ্রদ ছিল না।

আলী রীয়াজ নিজেই প্রশ্ন করেছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ছাড়া তাদের সামনে আদৌ কোনো বিকল্প ছিল কি না? কারণ তারা দেখেছেন যে ২০১৪ সালের বয়কট তাদের উপরে বিরাট বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। তবে এই প্রশ্নের সঙ্গে বৃহত্তর যে তাত্ত্বিক প্রশ্নটি গভীরভাবে জড়িত, সেটি হলো হাইব্রিড রেজিমের কাছে নির্বাচন আসলেই কোন ম্যাটার করে কিনা?
হাইব্রিড রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে নির্বাচনের যে গুরুত্ব বিবেচনায় নেয়া হয়, সেই ধরনের নির্বাচন তো রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে সবরকমভাবে অপব্যবহার করার জন্য খোলা থাকে।

এই বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে গিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ লিখেছেন, আমি এটা দেখিয়েছি যে হাইব্রিড রেজিমের ক্ষেত্রে এর আগে পণ্ডিত লিন্ডবার্গ এবং তার সহকর্মীরা যে যুক্তি দেখিয়েছিলেন, তার বিপরীতে গিয়ে আমি বলেছি, এমন বহু নির্বাচন হতে পারে, যা কোনো গণতন্ত্রায়নের পথ তৈরি করে না। বরং ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হাইব্রিড রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। চলবে

Tuesday, February 19, 2019

আলী রীয়াজের বিশ্লেষণ: জামায়াতের সামনে ৪ বিকল্প

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংস্কার ও দলটির ১৯৭১-এ স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য ক্ষমা না চাওয়ায় গত শুক্রবার পদত্যাগ করেন দলটির অন্যতম নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। এরপর এই প্রশ্ন যেন মাথাচাড়া না দেয়, সে জন্য দল থেকে বহিষ্কার করা হয় আরেক কেন্দ্রীয় নেতাকে। তখন থেকে ভীষণভাবে আলোচনায় এসেছে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত দলটির সংস্কার নিয়ে।
এ প্রসঙ্গে দলটির ভেতরের মতভেদ কীভাবে কমবে? দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ কি দলের দ্বন্দ্বকে বাড়িয়ে দিলো? এসব বিষয়ে বিবিসির প্রত্যুষা অনুষ্ঠানে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর আলী রীয়াজ।
প্রফেসর আলী রীয়াজ: দ্বন্দ্ব বেড়েছে কিনা সেটা আমরা আরো খানিকটা সময় নিয়ে বুঝতে পারবো। তবে এটা স্পষ্ট যে, ধরুন ২০০১ সাল থেকে যে সমস্ত পারস্পরিক ভিন্নমত বা দ্বন্দ্ব ছিল, সেগুলো এখন অনেক বেশি খোলামেলা হয়ে দাঁড়ালো। দ্বিতীয় বিষয় যেটা, ২০০১ সালের পর থেকে জামায়াতের ভেতর যে এই সমস্ত আলোচনা চলছিল, সংস্কারের আলোচনা, ১৯৭১ সালের তাদের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, এই বিষয়গুলো নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল, তখন এ বিষয়ে বাইরে কথা বলার লোক ছিল না। এখন যেটা হলো, এই বক্তব্যগুলো সুস্পষ্টভাবে বলার মতো একজন প্রতিনিধি আমরা দেখতে পাচ্ছি। আবদুর রাজ্জাক যেটা করছেন বা একসময়ের শিবির নেতা, মজিবুর রহমান তিনিও যেটি করছেন, এখন তাদের কাছে আমরা প্রশ্ন করতে পারছি।
তারা এই সংস্কারের প্রশ্নগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারছেন। যেটা আগে ছিল না। ফলে দলের ভেতরেও যে সমস্ত কর্মী সমর্থক, সংগঠক আগে এগুলোর ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না, তারা এখন পাবেন। ফলে দল ও দলের বাইরে এর আলোচনার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, প্রতিনিধি তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন: আপনি  বলছেন, এই পদত্যাগ বা বহিষ্কারের যে ঘটনা সেটির ফলে জামায়াতে ইসলামীর দলের ভেতরেই এক ধরনের আলোচনার জায়গা তৈরি হলো। এবং একটি মতভেদও তৈরি হলো। এই মতভেদের সমাধান কীভাবে হবে?
আলী রীয়াজ: মতভেদের সমাধান কয়েকভাবে হতে পারে। সেটা নির্ভর করছে যে, জামায়াতের নেতৃবৃন্দ কী করতে চান। একটা হচ্ছে সংস্কার, যেটার প্রস্তাব আবদুর রাজ্জাক ও অন্যরা তুলেছেন। সেগুলো যদি জামায়াতের নেতারা গ্রহণ করেন, সেটা একটা সমাধান। দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে তারা কিছুই না করতে পারেন। তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে, তাদের অন্যরকম সংস্কার হতে পারে। অর্থাৎ, তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে, সরকারি যে দল আছে তাদের সঙ্গে এক ধরনের আপস-সমঝোতা করে তাদের রাজনীতি অব্যাহত রাখবেন। চতুর্থ বিকল্প যেটা হতে পারে, তারা রাজনীতি থেকে সরে আসবেন এবং সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। সেটাও তারা করতে পারেন। ফলে বিভিন্ন রকম সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত যে ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে না, যে সমস্ত সংস্কারের কথা আবদুর রাজ্জাক ও অন্যরা বলেছেন, আমি অনুমান করছি, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের একটি বড় প্রভাবশালী অংশ সেটা গ্রহণ করছেন না। ফলে সমাধানের পথগুলো তারা কীভাবে বিবেচনা করবেন, তাদের প্রক্রিয়া কী হবে এবং তারা তা কোথায় নিয়ে যেতে চান সেটা এখন আগামী কয়েক দিনে বোঝা যাবে বলে আমি মনে করি না। তবে ভবিষ্যতে তার একটা প্রতিফলন আমরা দেখতে পাবো।
প্রশ্ন: মিশর, তিউনেশিয়ার মতো বিভিন্ন  দেশে দেখা গেছে যে, টিকে থাকার জন্য ইসলামী দলগুলো তাদের শক্ত অবস্থান থেকে সরে এসে সংস্কার এনেছে দলে, সেটি যদি জামায়াত করে, আপনি যেটি বলছিলেন যে, বেশ কয়েকটি উপায় তাদের সামনে খোলা রয়েছে, তাহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে?
আলী রীয়াজ: দেখুন, মিশর বা তিউনেশিয়ার কথা বলছিলেন। সেখানে সংস্কার যেগুলো হয়েছে, তাতে দু’টো বিষয় আপনাকে মনে রাখতে হবে। একটা হচ্ছে আদর্শিক সংস্কার। তিউনেশিয়ার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, সেটা একটা আদর্শিক সংস্কার। রশীদ ঘানুচি, যিনি তিউনেশিয়ার আন্নহাদা দলের নেতৃত্ব দেন, আদর্শিকভাবেই ইসলামপন্থি রাজনীতি রাষ্ট্রকে কীভাবে দেখবে, নাগরিকের অধিকার কীভাবে দেখবে, নারীর অংশগ্রহণকে কীভাবে দেখবে, এসমস্ত বিষয়ে অতীতে যে সমস্ত ইসলামপন্থি নেতা ছিলেন, যেমন আবুল আ’লা মওদুদী বলুন, সাঈদ কুতুব বলুন, তাদের থেকে সরে এসে তিনি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এবং সেটা গৃহীত হয়েছে, একভাবে অগ্রসর হয়েছে। দ্বিতীয় আরেকটি পদ্ধতি, যেটা সাংগঠনিক বিষয়। সেটা হচ্ছে, আমরা আদর্শিকভাবে কিছুই পরিবর্তন না করে এখন সাময়িকভাবে রাজনীতি থেকে সরে এসে সামাজিক কাজে যুক্ত থাকবো। সেটা মুসলিম ব্রাদারহুড একসময় করেছে, এখনো করছে। হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে আমরা সেই প্রক্রিয়া দেখতে পেয়েছি, হামাসের ক্ষেত্রে দেখতে পেয়েছি। ফলে কোন ধরনের সংস্কার তারা গ্রহণ করছে। জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা কেবল ১৯৭১ সালে তাদের কৃতকর্মের অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়ই না। সংস্কারের বিষয়টা তাদের দলীয়ভাবে আদর্শিক অবস্থানের পরিবর্তন। যদি এখন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেন, তারা আসলে সংস্কার করতে চান।
তাহলে কোন ধরনের সংস্কার করতে চান, আদর্শিক সংস্কার? তাহলে তাদের নেতা মওদুদীর যে পথ, সেখান থেকে তাদের সরে আসতে হবে। তবে সে অবস্থান তারা গ্রহণ করবেন কিনা, সেটা আসলে অনেক বেশি আলোচনার বিষয়। যেটা আলোচনা হওয়া উচিত ছিল, যেকোনো ইসলামপন্থি দলগুলোর ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীতে যেটা ঘটেছে, ঘটছে, জামায়াত সেটা করেনি। সেগুলো যদি তারা করতে পারতেন, তাহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতো কিনা বা হবে কিনা, সেটা নির্ভর করছে তারা কোন সংস্কারটা করছেন, কোন অবস্থান তারা নিচ্ছেন। সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতার জন্য কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করছেন। আদর্শিক অবস্থানকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র সাংগঠনিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, আমার কাছে তা মনে হয় না। সেটার অন্যত্র হয়নি।

Friday, December 21, 2018

ইসলামপন্থিদের ওপর কেন ভর করছে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো by ড. আলী রিয়াজ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোট পাওয়ার আশায় ইসলামপন্থিদের কদর বেড়েছে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। কিন্তু ধর্ম কিভাবে দেশটিতে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? 
২০০৫ সালের মার্চ। ওই সময়ে প্রচ- কট্টর ইসলামপন্থি মুফতি ফজলুল হক আমিনী দাবি করেছিলেন, মাদরাসাগুলোর সমর্থন ছাড়া বাংলাদেশে জাতীয়পর্যায়ে কোনো দলই ক্ষমতায় আসতে পারবে না। সারা দেশে ছড়িয়ে আছে এমন অনেক মাদরাসা। তাতে আছেন কমপক্ষে ১৪ লাখ শিক্ষার্থী। তারা দেওবন্দের অনুসারী। দেওবন্দ হলো ইসলামের একটি রক্ষণশীল অংশ।
আগামী ৩০শে ডিসেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এ নির্বাচনকে সামনে রেখে মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বেপরোয়াভাবে ইসলামপন্থিদের কাছে টানছে। তাহলে এর অর্থ কি, ফজলুল হক আমিনীর পূর্বাভাষই সত্য?
ইসলামপন্থিদের দলে টানা
১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে সেনা শাসকদের সময়ে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতির উত্থান ঘটে। ওই সময়ে সেনা শাসকরা তাদের বৈধতার সংকটে ভুগছিলেন। আর তাই ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে তারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন ধর্মকে। সেনা শাসকগোষ্ঠী রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনার জন্য দায়ী হলেও দেশে ইসলামপন্থি গ্রুপগুলোকে রাজনৈতিক আইনগত বৈধতা দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।
নির্বাচনে সফলতা পাওয়ার জন্য ১৯৮০’র দশক থেকে বর্তমানের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি ইসলামপন্থিদের দ্বারস্থ হচ্ছে। যুক্তি দেখানো হচ্ছে যে, এসব গ্রুপ ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক। কিন্তু প্রাপ্ত পরিসংখ্যান এই যুক্তিকে সমর্থন করে না।
১৯৭৯ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল মাত্র দুটি ইসলামপন্থি দল। কিন্তু ১৯৯১ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হয় আরো একটি দল। কিন্তু ২০০১ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১১। ২০০৮ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০। ১৯৯১ সালে তারা শতকরা ১৪ ভাগের সামান্য বেশি ভোট পায়। কিন্তু ২০০৮ সালে তাদের সেই ভোট কমে দাঁড়ায় শতকরা প্রায় ৬ ভাগে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পুরনো ইসলামপন্থি দলগুলোর একটি জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করার দায়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযুক্ত হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ফাঁসি দিয়েছে ওই আদালত। বছরের পর বছর ইসলামী ঐক্যজোট খ- বিখ- হয়েছে। অন্যদিকে, নিজেদেরকে রক্ষণশীল রাজনৈতিক এজেন্ডা সম্বলিত সামাজিক আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করে রহস্যময় (অবসকিউরেনটিজম) হেফাজতে ইসলাম। এবার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উঠে এসেছে তারা। বর্তমানে কমপক্ষে ৭০টি সক্রিয় ইসলামপন্থি দল আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ১০টি।
মিথ্যা ধারণা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ২০১৪ সাল থেকে এক কঠিন অবস্থার মুখে পড়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে বেশ সময় জেলে বন্দি রয়েছেন তিনি। যাহোক, বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছে বিএনপি। অনেকেই আশা করেছিলেন যে, দীর্ঘদিনের ইসলামপন্থি মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে ত্যাগ করবে তারা। নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে, আসন্ন নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দিতে পারে নি জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন ২২ জন রাজনীতিককে নির্বাচনে লড়ার জন্য মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি তার প্ল্যাটফরম থেকে।
অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। ৭০টি ইসলামপন্থি দলের মধ্য থেকে ৬০টিরও বেশি এই ক্ষমতাসীন দল ও তাদের মূল মিত্র জাতীয় পার্টির ঘনিষ্ঠ। জাতীয় পার্টিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক স্বৈরশাসক থেকে রাজনীতিকে পরিণত হওয়া এইচ এম এরশাদ। বিস্ময়কর হলো যে, বিএনপিকে অধিকমাত্রায় ইসলামপন্থিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে দেখা হয়। সেই বিএনপির সঙ্গে রয়েছে মাত্র ৫টি ইসলামপন্থি দল।
‘এ ম্যারিজ অব কনভেনিয়েন্স?’
আওয়ামী লীগকে পশ্চিমের অনেকে বিবেচনা করে থাকেন ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে। তারা কেন ইসলামপন্থিদের দ্বারস্থ হলো?
বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, আওয়ামী লীগের আদর্শের এই পটপরিবর্তনের অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা সার্বিকভাবে ইসলামীকৃত হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটিতে বেড়ে ওঠা মধ্যম শ্রেণী ইসলামপন্থি রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তারা ধর্মের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য করেন না।  ২০১৪ সালে বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে বিতর্কিত ও একপেশে একটি নির্বাচন হয় বাংলাদেশে। এরপর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। তাই আওয়ামী লীগ ধর্মীয় গ্রুপগুলোর সমর্থন ব্যবহার করছে। এর মধ্য দিয়ে তারা তাদের রাজনৈতিক তাৎপর্য প্রমাণ করতে চাইছে।
ক্ষমতাসীন দলের মিত্রে পরিণত হয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এ দলটির মতো ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে জোট হিতকর হতে পারে। কারণ, ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তারা ভূমিকা রাখতে পারে।
(আলী রিয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর। তার এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্মান সরকার পরিচালিত অনলাইন ডয়েচে ভেলে’তে)

Monday, October 22, 2018

নতুন শ্রেণী বিন্যাস এবং রাজনীতি by ড. আলী রীয়াজ

বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবৃদ্ধির ফলে আপাতদৃষ্টে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আকার বৃদ্ধি পেয়েছে। এইসব তথ্য আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। এই নিয়ে উৎসব আয়োজনের কথাও আমরা জানি। বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের গচ্ছিত রাখা অর্থের পরিমাণ, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশীদের সেকেন্ড হোমের সংখ্যা এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) তৈরি করা হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ এই সবই বাংলাদেশে বিত্তবানদের সংখ্যা এবং সম্পদের প্রমাণ দেয় (রীয়াজ ২০১৭)। এ কথাও আমরা জানি যে, প্রবৃদ্ধির ফলে মাথাপিছু আয় বেড়েছে।
কিন্তু এই সব তথ্যের পাশাপাশি যদি আমরা অন্যান্য তথ্য বিবেচনায় নেই তবে যে চিত্র আমরা পাই তা আমাদের দেখিয়ে দেয় যে এই প্রবৃদ্ধির সুবিধা কারা ভোগ করছেন। প্রথমত সাধারণ মানুষের প্রকৃত মজুরি হ্রাস পাচ্ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরো সম্প্রতি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের কর্মীদের প্রকৃত আয়ের যে সূচক প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, ‘অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মজুরি ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ সময়ে বেড়েছে ২৪.৭ শতাংশ। কিন্তু এ সময়ে ভোক্তামূল্য সূচক বেড়েছে ৩২.৬ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১০-১১-এর তুলনায় শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমেছে ৭.৯ শতাংশ। এ থেকে প্রতীয়মান যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার দাবি করা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ তাদের আয়-বৃদ্ধি থেকে শুধু বঞ্চিত হয়নি, বরং তাদের আয়ও হারিয়ে যাচ্ছে’ (তিতুমীর ২০১৮)। দ্বিতীয়ত, সম্পদ জমা হচ্ছে এক ছোট গোষ্ঠীর হাতে।
খানা আয় ও ব্যয় জরিপ-২০১৬ অনুযায়ী ‘দেশের সব মানুষের যত আয়, এর মাত্র ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ আয় করেন সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষ। ছয় বছর আগেও মোট আয়ের ২ শতাংশ এই শ্রেণির মানুষের দখলে ছিল। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয় বেড়ে মোট আয়ের ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ছয় বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশের মালিক ওপরের দিকে থাকা ৩০ শতাংশ মানুষ। এই ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে জিনি সূচকে।
আয়বৈষম্য নির্দেশক জিনি সূচক ২০০০ সালের দশমিক ৪৫১ থেকে ২০১৬ সালে দশমিক ৪৮৩ হয়েছে’ (তিতুমীর ২০১৮)। তৃতীয়ত এই ধরণের উন্নয়ন বেকারত্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, প্রকৃত বেকার মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। ব্যুরোর আরেক জরিপ অনুযায়ী ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ দুই বছরে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ৪৮ লাখ। দেশের সব তরুণের স্বপ্ন যে বিসিএস পরীক্ষায় সফল হওয়া তাঁর কারণ হচ্ছে তাঁরা অন্যত্র আর কোনো সুযোগ দেখতে পান না।
এই যে উন্নয়নের ধারা তার নেতিবাচক দিকের সবচেয়ে বড় প্রকাশ দেখতে পাই ব্যাংকিং খাতে; ব্যাংকিং খাতের অবস্থাকে জনগণের অর্থে ফুটো চৌবাচ্চা ভরার এক প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই বলার অবকাশ নেই (রীয়াজ ২০১৮)। কেননা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সরকার ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে ১৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা দিয়েছে। আর অন্য দিকে ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ‘২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য হয়ে পড়ায় ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলাভুক্ত হয়েছে ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকার অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ। এ ঋণ যোগ করলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে’ (বণিক বার্তা ২০১৮)।
বিরাজমান উন্নয়নের ধারা যে সম্পদের অবাধ লুন্ঠনের ব্যবস্থা তৈরি করেছে তার ফলে বিত্তবান শ্রেণীর পাশাপাশি ‘চুইয়ে পড়া’র মতো করে এই সম্পদের কিছু সমাজে এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটিয়েছে, যারা বিত্তের বিবেচনায় মধ্যবিত্ত বলে বিবেচিত হলেও আচার-আচরণে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিবেচনায় অতীতে মধ্যবিত্ত যে ধরনের ভূমিকা পালন করত, তা পালনে আগ্রহী নয় (রীয়াজ ২০১৭)। বাংলাদেশে অতীতে মধ্যবিত্তের ভেতরে গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা এবং অংশগ্রহণমূলক সমাজের স্বপ্ন ছিল, এখন তা প্রায় অবসিত। ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, স্বাধীন নির্বাচনব্যবস্থা, স্বাধীন বিদ্যাচর্চা-সংস্কৃতিচর্চা’ এদের কাঙ্খিত নয় (মুহাম্মদ ২০১৮)। এই শ্রেণী যে বিরাজমান হাইব্রিড রেজিমের
রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষে থাকবেন সেটাই স্বাভাবিক, তাঁদের অস্তিত্ব কার্যত নির্ভর করছে এই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকার সঙ্গে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিরাজমান দুর্নীতি এবং লুন্ঠনের প্রক্রিয়াকে বৈধতা প্রদানের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে এই নতুন শ্রেণী। এই শ্রেণীর রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনা করলে বলা যায় যে, আগামীতে যেকোনো ধরনের অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্ভাবনাকে এই শ্রেণী ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এই নতুন ধনিক শ্রেণীর উদ্ভবের আলোচনায় আমাদের স্মরণে রাখতে হবে যে, রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীনদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এই ধরণের সুযোগ সুবিধা লাভ সম্ভব নয়। তার অর্থ হচ্ছে, এই ব্যবস্থায় এক শ্রেণীর মানুষ যারা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন তাঁরা যে কেবল সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছেন তাই নয় তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন, ফলে অভাবনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই শ্রেণীর মানুষেরা এক ধরণের অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনুকূলেই অবস্থান নেবেন।
উৎস:  সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর জন্য আলোচনাপত্র 
লেখক পরিচিতি :  লেখক, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

Sunday, October 21, 2018

রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের প্রভাব by ড. আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের সমাজে ধর্মের উপস্থিতি এবং প্রভাব নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ইসলাম সবসময়ই এক ধরণের ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে সমাজ জীবনে ইসলামের দৃশ্যমান উপস্থিতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজের ইসলামীকরণ গত এক দশকে যতটা ঘটেছে আগের কোনো সময়েই তা ঘটেছে বলে মনে হয় না। পোশাক-আচরণ-দৈনন্দিন জীবনাচারণ-কথোপথন এগুলোর দিকে তাকালেই সমাজে ও সংস্কৃতিতে ইসলামী ভাবধারার ব্যাপক প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। (বিস্তারিতভাবে আলোচনার জন্যে দেখুন, রীয়াজ ২০১৭-এ)। যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত তা হচ্ছে বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে যে স্থানীয় ও সমন্বয়বাদী (সিনμেটিক) ইসলামের প্রাধান্য ও প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা হতো তাঁর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, বিপরীতক্রমে একটি রক্ষণশীল আক্ষরিক (লিটারালিস্ট) ব্যাখ্যা এবং একই সঙ্গে একটি বৈশ্বিক ব্যাখ্যার ইসলামেরই প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এবং তা ক্রমবর্ধমান।
সমাজে ইসলামের এই প্রভাব এবং এক বিশেষ ধরণের ব্যাখ্যার প্রতি জনসাধারণের সম্মতির একটি কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম ধর্মের প্রতি পক্ষপাত, অন্যদিকে তা হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মানস গঠনে বড় ধরণের পরিবর্তন। রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় এই পরিবর্তনের সূচনা হয় কার্যত ১৯৭৪ সালেই, তবে সত্তরের দশকের মাঝমাঝি থেকে বিভিন্ন ঘটনা তাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।
এর মধ্যে আছে ক্রমান্বয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অপসারণ, রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে সেক্যুলারিজমের/ধর্মনিরপেক্ষতার অবসান, রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের আবির্ভাব, রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি এবং দল-নির্বিশেষে ধর্মীয় প্রতীক ও রেটরিকের ব্যবহার। নব্বইয়ের দশক থেকে ইসলামপন্থী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন ধরণের ইসলামপন্থী দলের সংস্কারবাদী, রক্ষণশীল, উগ্রপন্থী, সহিংস চরমপন্থী বিকাশ লাভ করে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করলেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থেকেছে, এবং ধর্মের প্রশ্নে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার কোনো লক্ষণই আর উপস্থিত নেই। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ধরণের ইসলামপন্থী জঙ্গী সংগঠনের উপস্থিতি ঘটতে শুরু করে।
অন্য যে কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মতোই বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির বিভিন্ন ধারা উপস্থিত ছিল এবং আছে। যদিও দীর্ঘদিন বাংলাদেশের অনেক বিশেষজ্ঞ ইসলামপন্থী রাজনীতি বলতে কেবলমাত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামকেই বিবেচনা করেছেন। এই রাজনীতি বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হলেও প্রবণতার দিক থেকে আমরা একে দুইভাগে ভাগ করতে পারি তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল এবং সংস্কারপন্থী। গত কয়েক বছরে, বিশেষত ২০১১ সালের পর থেকে, বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের মধ্যেকার তুলনামূলকভাবে সংস্কারপন্থী ধারা দুর্বল হয়েছে; অতীতের ভুল রাজনীতি, সাংগঠনিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত, বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশ ইত্যাদি তাঁর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল এই সংস্কারপন্থীদেরকেই তাঁদের চ্যালঞ্জ বলে বিবেচনা করায় এই ধারাটিকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে ফেলার চেষ্টা করেছে এবং তাতে বড় ধরণের সাফল্য অর্জন করেছে। এই জন্যে শক্তি প্রয়োগ, বিচারিক ও বিচার বহির্ভূত ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে এবং সিভিল সোসাইটির একটি অংশ ও গণমাধ্যম তাতে অংশ নিয়েছে। কিন্তু এই প্রচেষ্টার ফলে দলগতভাবে জামায়াতে ইসলামী কার্যত বিপর্যস্ত হয়েছে ঠিকই কিন্তু আদর্শিকভাবে ইসলামপন্থার আবেদন হ্রাস পায়নি, ইসলামপন্থীদের শক্তিও খর্ব হয়নি।
ইসলামপন্থীদের সংস্কারপন্থী বলে পরিচিত অংশের অনুপস্থিতির সুযোগে গত কয়েক বছরে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীরা রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে রাজনীতির কেন্দ্রে আসতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীরা কেবল শক্তি সঞ্চয় করেছেন তা নয়, তাঁরাই এখন রাজনীতির এজেন্ডা নির্ধারণের মতো শক্তি রাখেন। এই রক্ষণশীল ধারার সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতে ইসলামের উত্থান, তাঁদের বক্তব্য, তাঁদের সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের সখ্যের আগ্রহ, ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠতা এবং এই গোষ্ঠীর দাবি দাওয়া মেনে নেয়ার ব্যাপারে সরকারের দ্বিধাহীনতা প্রমাণ করে যে এখন বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রধান প্রতিনিধি তারাই। তবে মনে রাখা দরকার যে, তাঁরাই এই ধারার একমাত্র প্রতিনিধি নয়, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার।
ক্ষমতাসীন দল গত দুই/তিন বছরে এই শক্তিকেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। এটিকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, বাস্তবোচিত পদক্ষেপ, জনসাধারণের মনোভাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, কৌশল, কো-অপটেশন - যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন এতে করে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে কট্টর রক্ষণশীল ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে এবং রাজনীতিতে তাঁদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদের নির্বাচন যদি সকল দলের অংশগ্রহণমূলক হয় তবে প্রধান প্রধান দল বা জোটের কাছে ইসলামপন্থী দলগুলো গুরুত্ব পাবে, সেই গুরুত্ব ভোটারদের মধ্যে তাঁদের সমর্থনের অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশিই হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। প্রধান জোটগুলো তাঁদের ইসলামী পরিচিতিকে প্রাধান্য দেবার জন্যেই এই ধরণের দলের দ্বারস্থ হবেন। এই প্রভাবের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাবে যদি এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যাতে বিএনপি এবং অন্যান্য পরিচিত দল অংশগ্রহণ না করে। কেননা নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক হিসেবে উপস্থাপন, তৃণমূল পর্যায়ে ভোটারদের মোবিলাইজ করা এবং একপাক্ষিক নির্বাচনকে দৃশ্যত বৈধতা দেয়ার জন্যে ইসলামপন্থীদের প্রয়োজন দেখা দেবে। এই রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করার রাজনৈতিক উদ্যোগ এখনও অনুপস্থিত, আর আদর্শের লড়াইয়ে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের চেষ্টার পরিণতি ইতিবাচক হয় না।
ভারতের ভূমিকা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও নিকট প্রতিবেশী হিসেবে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার কারণে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব সময়ই একটা ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে উপস্থিত থেকেছে। যদিও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলাদেশে-ভারত সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো ‘অম্ল-মধুর’ তথাপি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত প্রসঙ্গ উপস্থিত থেকেছে আলাপ-আলোচনায়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধিতায়। অযৌক্তিক ও উগ্র ভারত-বিরোধী এবং ভারতের প্রতি অতিমাত্রায় সহানুভূতিশীল ও ভারত বিষয়ে স্পর্শকাতর জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে সব সময়ই ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করার প্রবণতাই প্রধান ধারা।
একথা সাধারণের কাছে স্পষ্ট যে, ভারতের পক্ষপাত সব সময়ই আওয়ামী লীগের অনুকূলে ছিল। অন্যদিকে বিএনপি’র রাজনীতির একটি অন্যতম উপাদান হচ্ছে ভারত-বিরোধিতা। ভারতের নীতি নির্ধারকরা স্ট্র্যাটেজিক বিবেচনায় বাংলাদেশকে তাঁদের পেছনের উঠোন বা ব্যাকইয়ার্ড বলে বিবেচনা করে এসেছেন। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে হুমকি হতে পারে এমন যে কোনো কিছুকেই ভারত মোকাবেলা করার তৎপর থেকেছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যাপারে ভারতের উৎসাহ কেবলমাত্র উৎসাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
অতীতে ভারতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব সীমিত থাকার কারণে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর আগ্রহ ও নির্বাচনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার ফলে ভারত প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পর্দার আড়ালে ভারতের নীতি-নির্ধারকরা তাঁদের প্রভাব বৃদ্ধি করে (মুখার্জী ২০১৭) এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনুকূলে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা নেয়, তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফরই কেবল তাঁর প্রমাণ নয়, এই একপাক্ষিক নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার বিরুদ্ধে ভারত বাংলাদেশ সরকারের বর্ম হিসেবেই কাজ করেছে। গত কয়েক বছরে ভারত বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে যা পেয়েছে তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় ‘সারা জীবন মনে রাখবার’ মত (বাংলা ট্রিবিউন ২০১৮)। কিন্তু বিনিময়ে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যে তার প্রাপ্যও পায়নি সেটা এমন কি ভারতীয় বিশেষজ্ঞরাও খোলাখুলিভাবেই স্বীকার করেন।
২০১৮ সালে এসে চার বছর আগের পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। ভারত বাংলাদেশে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র সরকার চায় চারটি কারণে; প্রথমত বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি; দ্বিতীয়ত এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবেলা; তৃতীয়ত দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মিত্রের অভাব এবং চর্তুত ইতিমধ্যে ভারতের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হয়েছে তা রক্ষা করা। ফলে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যাপারে এখন ভারতের আগ্রহ বেশি। এই আগ্রহ এবং সেই মর্মে সক্রিয় থাকার কারণে এটা এখন আরো স্পষ্ট যে ভারত বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ও সেই সূত্রে বাংলাদেশের রাজনীতির এক নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদের ভারত সফর, মে মাসে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে শান্তি নিকেতনে নরেন্দ্র মোদির আলোচনা বিষয়ে আনন্দবাজারের প্রতিবেদন (চট্টোপাধ্যায় ২০১৮), জুন মাসে বিএনপি প্রতিনিধি দলের নয়া দিল্লি সফর এবং জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের সফর এই ইঙ্গিতই দেয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবকে কেউ আর অস্বীকার করছেন না।
বিএনপির প্রতিনিধিদের ভারত সফর যতটা দৃষ্টিকটুই হোক না কেন, দলের ভারত-বিরোধিতার নীতির পরিত্যাগের আন্তরিকতা নিয়ে যত প্রশ্নই উঠুক না কেন এবং এতে আদৌ ফলোদয় হবে কিনা সেই বিষয়ে যত সংশয়ই থাকুক না কেন, এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ভারতের প্রভাব স্বীকৃত হল তেমনি আরেকটি প্রশ্নও উত্থিত হল - যারা ভারত-বিরোধিতার জন্যে বা ভারতের সঙ্গে অসম সম্পর্কের বিরোধী শক্তি হিসেবে বিএনপিকেই বিবেচনা করতেন বিএনপি’র সেই সমর্থক গোষ্ঠী কোথায় আশ্রয় নেবে? (আহমেদ ২০১৮)। বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী দিনে এই গোষ্ঠী কোন পথে অগ্রসর হয় তা লক্ষ্য করার বিষয়।
গত বছরগুলোতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মাত্রা ও প্রকৃতি বাংলাদেশে ভারতের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে কিনা সেই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত আমাদের হাতে নেই, কিন্তু অব্যাহতভাবে এই প্রভাব বিস্তার দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের জন্যে ইতিবাচক হবে বলে মনে করার কারণ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে ভারতের নীতি নির্ধারকদের বিবেচনা করা দরকার।
উপসংহার
বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি ব্যাখ্যার জন্যে আমি এই প্রবন্ধে চারটি বিষয়ের দিকে মনোনিবেশ করেছি। প্রথমত বর্তমান শাসন ব্যবস্থা, যাকে আমি হাইব্রিড রেজিম বলে বর্ণনা করেছি এবং যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দৃশ্যত গণতান্ত্রিক উপাদানের পাশাপাশি শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার উপস্থিতি এবং শাসন পরিচালনার জন্যে শক্তি প্রয়োগের ওপরে নির্ভরতা। এই ধরণের শাসন ব্যবস্থা স্থিতাবস্থায় থাকেনা বলেই পৃথিবীর অন্যত্র দেখা গেছে; সেসব ক্ষেত্রে আরো বেশি ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ঘটেছে এবং আরো বেশি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যেও সেটা বিবেচ্য হওয়া দরকার। এই ধরণের শাসনের বৈধতা ক্ষমতাসীনদের পরিকল্পিত নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হয় যাকে তাঁরা এক ধরণের আনুষ্ঠানিকতা বলেই বিবেচনা করেন। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের সমাজে এক নতুন শ্রেণী বিন্যাস ঘটেছে এবং নতুন ধণিক শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে। রাষ্ট্রের আনূকূল্যে ও ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শ্রেণীর মধ্যে জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার আকাঙ্খার ঘাটতি আছে, যা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে। নিকট ভবিষ্যতের জন্যে তা ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয় না। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সুবিধা বঞ্চিতদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হওয়াই স্বাভাবিক। তৃতীয়ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের প্রভাব বেড়েছে। আগামীতে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ক্ষেত্র যতই সীমিত হবে, এই শক্তির প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়বে। সকলের অংশগ্রহণমূলক অবাধ নির্বাচনের বিকল্প কিছু চেষ্টা করা হলে এই শক্তিই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। চর্তুত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত প্রায় নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, যা কার্যত সব প্রধান দলই স্বীকার করে নিয়েছে; কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে যে এতে করে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের লাভবান না হবার সম্ভাবনাই বেশি।
উৎস: সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর জন্য আলোচনাপত্র 
লেখক পরিচিতি :  লেখক, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর