Monday, October 13, 2025

গাজা যুদ্ধ থামিয়েও ট্রাম্প নোবেল পেলেন না কেন by জনাথন ফ্রিডল্যান্ড

অগণিত মৃত্যু ও ধ্বংসের দৃশ্যের পর এবার পর্দায় দেখা গেল আনন্দের ছবি। সে ছবি যেন কিছুটা স্বস্তি এনে দিল। বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে টেলিভিশনের পর্দা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এক ভাগে গাজার মানুষের উল্লাস, অন্য ভাগে ইসরায়েলের মানুষের। দুই দিকেই করতালি আর উচ্ছ্বাস। যেন মানুষ নিজেরাই জানিয়ে দিচ্ছে, এ যুদ্ধের শেষ তারা অনেক আগেই শেষ দেখতে চেয়েছিল।

তবে এ দৃশ্যও কিন্তু একদম নতুন নয়। এর আগেও জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলে এমনই উল্লাস করা হয়েছিল। কিন্তু মার্চের মধ্যভাগে ইসরায়েল সেই চুক্তি ভেঙে আবার গাজায় হামলা চালায়। তাই এবারও আশা থাকলেও মানুষ সাবধান—যেকোনো সময় পরিস্থিতি আবার মোড় নিতে পারে। তবু মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে নিরাশাবাদীরাও স্বীকার করছেন, এবার চুক্তিটা বেশ টেকসই মনে হচ্ছে।

সাধারণত এমন কোনো বড় অগ্রগতি হয় দুই পক্ষের সমান সমঝোতার ফলে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এখানেও তা–ই ঘটেছে। হামাস দুর্বল হয়ে পড়েছিল, ইসরায়েল তার শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেছে, ইরানের মতো পৃষ্ঠপোষককেও দুর্বল করেছে।

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাসের ওপর প্রভাব আছে এমন দেশগুলো, যেমন কাতার, তুরস্ক, মিসরকে হামাসকে রাজি করানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন। এমনকি কাতারের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে তাদের ন্যাটো স্তরের নিরাপত্তাসুবিধাও দিয়েছেন।

তবু হামাসের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠদের দাবি সত্ত্বেও হামাস তার মৌলিক অবস্থান থেকে সরে যায়নি। ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় হামাসকে অস্ত্র সমর্পণের কথা বলা হলেও বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে এর কোনো উল্লেখ নেই।

শুরু থেকেই হামাসের অবস্থান ছিল পরিষ্কার—যদি ইসরায়েল ফিলিস্তিনি বন্দীদের ছাড়ে, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে এবং যুদ্ধ বন্ধ করে, তাহলেই তারা জিম্মিদের মুক্তি দেবে। এখন ইসরায়েল মোটামুটি সেটিই মেনে নিয়েছে, যদিও সেনা প্রত্যাহার করা হবে ধাপে ধাপে। ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্নেল মাইকেল মিলস্টেইন বলেছেন, সত্যি বলতে, হামাস তার মৌলিক অবস্থানে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনেনি।

অর্থাৎ আসল অবস্থান বদল ঘটেছে ইসরায়েলের দিকেই। কয়েক দিন আগেও নেতানিয়াহু জাতিসংঘে বলেছিলেন, হামাস পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। আর এখন তিনিই এমন চুক্তিতে রাজি হয়েছেন, যেখানে হামাস টিকে থাকছে। যেটা আগে অসম্ভব বলেছিলেন, এখন সেটাই মেনে নিচ্ছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, নেতানিয়াহুকে কীভাবে রাজি করালেন ট্রাম্প? সোজা উত্তর—ট্রাম্প অবশেষে তাঁর ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করলেন এবং যুদ্ধ থামাতে চূড়ান্ত নির্দেশ দিলেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, তাঁর ধৈর্যের সীমা শেষ। নেতানিয়াহুর আর কারও কাছে যাওয়ার পথ খোলা ছিল না।

গত দুই বছরে তিনি প্রাচীন মিত্রদেশগুলো পর্যন্ত দূরে ঠেলে দিয়েছেন। ফলে তাঁর নির্ভরতা এখন কেবল ট্রাম্পের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন বললেন, ‘যুদ্ধ শেষ করতে হবে’, তখন আর কোনো বিকল্প ছিল না। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সরাসরি বলেছিলেন, ইসরায়েল পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ৯ সেপ্টেম্বর দোহায় হামাসের আলোচনাকারী দলের ওপর ইসরায়েলের ব্যর্থ হামলাই ট্রাম্পের ধৈর্য শেষ করে দেয়। ট্রাম্পকে সে বিষয়ে আগেভাগে কিছু জানানো হয়নি, অথচ হামলাটা হয়েছে কাতারের ভূখণ্ডে। কাতার হলো সেই দেশ, যে দেশ ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার।

মনে রাখতে হবে, কাতার ট্রাম্পকে নতুন প্রেসিডেন্ট বিমান বা এয়ারফোর্স ওয়ানও উপহার দিয়েছিল। ফলে কাতারে ইসরায়েলের হামলাকে ট্রাম্প ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নিয়েছেন। যেন কোনো মাফিয়া বসের সহযোগীর ওপর হামলা হয়েছে এবং বস নিজে দেখিয়ে দিতে চান, সবকিছুর কলকাঠি আসলে কার হাতে।

ট্রাম্পের যুদ্ধ থামানোয় আগ্রহী হওয়ার আরও একটি কারণ আছে। ট্রাম্প লক্ষ করেছেন, খোদ ইসরায়েলে রাস্তায় বিক্ষোভ বেড়ে যাচ্ছে, মানুষ যুদ্ধের অবসান চায়। বিশ্বের নানা প্রান্তে ইসরায়েলের গাজা ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জেগে উঠেছে।

ট্রাম্প বুঝলেন, এখন যদি তিনি যুদ্ধবিরতি ঘটাতে পারেন, তবে তাঁর ভাবমূর্তি অনেক উজ্জ্বল হবে। এটিকে তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ বলে মনে হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

সব মিলিয়ে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে যে বিশাল ক্ষমতা থাকে, ট্রাম্প সেটি এবার পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন। আর ফলও মিলল—সব টুকরা দ্রুত জায়গামতো বসে গেল।

তাহলে ট্রাম্প কি এখন এ যুদ্ধবিরতির নায়ক? যাঁরা এত দিন ট্রাম্পের বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের জন্য এটা মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু সত্যটা হলো এ মুহূর্তে তিনি এ কৃতিত্বের দাবিদার। তাঁর কঠোর মনোভাব, চাপপ্রয়োগের ক্ষমতা, বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণের দক্ষতা—সবকিছু এবার তিনি প্রয়োগ করেছেন রক্তপাত থামানো এবং জিম্মিদের মুক্ত করার এক মহৎ লক্ষ্যে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষদের জন্য আপাতত সেটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তির বার্তা।

ট্রাম্প যখন ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে ফিরে এলেন, তখন এ রকমই এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত প্রস্তুত অবস্থায় ছিল। কিন্তু মার্চে নেতানিয়াহু যখন সেই যুদ্ধবিরতি ভাঙলেন, তখন ট্রাম্প চাইলে সোজাসুজি বাধা দিতে পারতেন। বলতে পারতেন ‘না, এটা চলবে না।’ এর বদলে তিনি বরং সবুজ সংকেত দিলেন। তার পরের ছয় মাসই হলো যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। অর্থাৎ ট্রাম্পের হাতে যুদ্ধ থামানোর ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তিনি সেটি ব্যবহার করেননি।

অবশ্য এ সমালোচনার চেয়েও বড় দায় নেতানিয়াহুর নিজের। কারণ, তিনি যে চুক্তিতে এখন রাজি হয়েছেন, তার প্রায় একই রকম প্রস্তাব ২০২৪ সালের জুনেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আর পরের অনুরূপ প্রস্তাবগুলোও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। প্রতিবারই তিনি ভেবেছেন, চলমান যুদ্ধই তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে।

জো বাইডেনেরও কিছু দায় আছে। তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ব্যবহার করে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করেননি।

শুধু মার্চের ওই সময়ের দিকেই যদি তাকাই, তাহলে বোঝা যায়, এর মধ্যে কত কিছু নষ্ট হয়ে গেছে।

গাজায় অগণিত ফিলিস্তিনি জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। ত্রাণ বন্ধ করে দেওয়ার কারণে তীব্র ক্ষুধা ও বঞ্চনায় গাজাবাসী চরম কষ্ট পেয়েছেন।

আর ইসরায়েলও যথেষ্ট ক্ষতির শিকার হয়েছে। সাত মাস ধরে জিম্মিদের বন্দিদশায় থাকতে হয়েছে, যুদ্ধে অনেক সেনা নিহত হয়েছেন, গাজায় মানবিক সাহায্য বন্ধ করায় ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ভেঙে পড়েছে এবং দেশটি কার্যত একঘরে হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক মাইকেল মিলস্টেইন বলছেন, ‘এটা সত্যিই এক বিপর্যয়। কারণ, আমরা যেন এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আবার ঠিক একই জায়গায় ফিরে এসেছি।’

অবশ্য হামাসকেও দায়মুক্ত বলা যায় না। কারণ, তারা চাইলে অনেক আগেই সব জিম্মিকে ছেড়ে দিয়ে গাজার এ দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে পারত।

ট্রাম্প আপাতত নোবেল পুরস্কার পাননি, অন্তত এ বছর নয়। কিন্তু যদি সত্যিই সেটি চান, তবে এখন তাঁর করণীয় স্পষ্ট।

ট্রাম্পকে আসন্ন মাসগুলোতেও, এমনকি বছরজুড়ে সেই একইভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হবে, যেমন গত ১০ দিন তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। কারণ, তাঁর ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনার প্রতিটি দফায় এমন সব জটিলতা আছে, যা যেকোনো সময় পুরো চুক্তিকে ধসিয়ে দিতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর ওপর নজর রাখতে হবে। কারণ, নেতানিয়াহু চুক্তির এই প্রথম ধাপটুকু বাস্তবায়ন করে থেমে যেতে পারেন, পরের ধাপে আর না–ও এগোতে পারেন।

যদি ট্রাম্প সত্যিই ‘নোবেল পুরস্কার’ চান, তবে এটাই তাঁর একমাত্র পথ।

* জনাথন ফ্রিডল্যান্ড, দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স

এ–ই যদি হয় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা... by মিশেল এলনার

‘মারিয়া কোরিনা মাচাদো শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন’—এ শিরোনাম প্রথম যখন দেখলাম, তখন খুশি হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি; কারণ, এতে খুশির কিছু নেই। যাঁর রাজনীতি অগণিত মানুষের জীবনে অনন্ত দুর্ভোগ এনেছে, সেই ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা নিছক ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়।

মাচাদো আসলে কিসের প্রতীক, তা যাঁরা বোঝেন, তাঁরা জানেন, তাঁর রাজনীতির সঙ্গে ‘শান্তি’ শব্দটির কোনো সম্পর্কই নেই। যদি ২০২৫ সালের ‘শান্তি’ বলতে এটাই বোঝানো হয়, তাহলে বলা যেতে পারে, নোবেল পুরস্কার তার সব বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে।

আমি ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণকারী একজন আমেরিকান। আমি খুব ভালো জানি মাচাদো কিসের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি হলেন ওয়াশিংটনের রেজিম চেঞ্জ যন্ত্রের (কোনো দেশের এক সরকারকে ফেলে দিয়ে অন্য সরকারকে বসানোর ব্যবস্থা) হাস্যোজ্জ্বল মুখ। তিনি হলেন নিষেধাজ্ঞা, বেসরকারীকরণ ও বিদেশি হস্তক্ষেপকে ‘গণতন্ত্র’ নামে সাজিয়ে তোলার এক সুশীল কণ্ঠস্বর। মাচাদোর রাজনীতি সহিংসতায় ভরপুর। তিনি প্রকাশ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপকে আহ্বান জানিয়েছেন।

এমনকি গাজা ধ্বংসের খলনায়ক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও তিনি বলেছেন, তিনি যেন বোমা মেরে ভেনেজুয়েলাকে ‘মুক্ত’ করেন। তিনি নিজের দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়েছেন; অথচ তিনি জানেন, অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা নীরব যুদ্ধেরই একটি রূপ।

মাচাদোর জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিভাজন সৃষ্টি করে, ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ক্ষয় করে এবং জনগণের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার কেড়ে নিয়ে তিনি তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবন কাটিয়েছেন।

মারিয়া কোরিনা মাচাদো ২০০২ সালের সেই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন প্রেসিডেন্টকে অল্প সময়ের জন্য উৎখাত করেছিল। তিনি ‘কারমোনা ডিক্রি’-তে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা কিনা রাতারাতি সংবিধান বিলুপ্ত ও সব সরকারি প্রতিষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছিল। তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘রেজিম চেঞ্জ’কে ন্যায্যতা দিতে কাজ করেছেন। তিনি বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ‘বলপ্রয়োগের মাধ্যমে’ ভেনেজুয়েলাকে ‘মুক্ত’ করা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী বক্তব্য ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর যে সিদ্ধান্ত ‘মাদকবিরোধী অভিযানের’ নামে এক সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধের ইন্ধন জুগিয়েছে, মাচাদো সেই বক্তব্য ও সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।

ট্রাম্প যখন ভেনেজুয়েলার সম্পদ জব্দ করছিলেন, মাচাদো তখন ট্রাম্পের স্থানীয় প্রতিনিধি হতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ট্রাম্পের হাতে তুলে দিতে তৈরি ছিলেন।

মাচাদো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কাজ করেছেন। অথচ তিনি ভালো করেই জানতেন, গরিব, অসুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষদের এর মূল্য দিতে হবে। তিনি সেই তথাকথিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন, যা আসলে ওয়াশিংটনের অর্থায়নে পরিচালিত এক পুতুল প্রশাসনের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট দ্বারা পরিচালিত। দেশে শিশুরা অনাহারে যখন মারা যাচ্ছিল, তখন সেই প্রেসিডেন্ট দেশের সম্পদ লুট করে বাইরে পাচার করছিলেন।

মাচাদো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি জেরুজালেমে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস পুনরায় চালু করবেন। অর্থাৎ তিনি সেই একই বর্ণবাদী রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াবেন, যারা ‘আত্মরক্ষা’র কথা বলে হাসপাতালে বোমা মারে। এখন তিনি দেশের তেল, পানি ও অবকাঠামো বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চান।

যে নব্য–উদার ফর্মুলা নব্বইয়ের দশকে লাতিন আমেরিকাকে দুর্ভোগের পরীক্ষাগারে পরিণত করেছিল, তিনি ঠিক সেই ফর্মুলা অনুসরণ করেন।

২০১৪ সালের ‘লা সালিদা’ নামে যে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল, মাচাদো তার অন্যতম স্থপতি ছিলেন। ওই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারের পতন ঘটানো। বিদেশি সংবাদমাধ্যম এগুলোকে ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ’ বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে তখন রাস্তা অবরোধ করে, বিভিন্ন স্থাপনা জ্বালিয়ে, শ্রমিকবাহী বাস পুড়িয়ে সহিংস বিক্ষোভ করা হচ্ছিল।

সে সময় কাউকে হুগো চাভেজের অনুসারী মনে হলে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা পর্যন্ত হয়েছে। চিকিৎসক, অ্যাম্বুলেন্স, এমনকি কিউবার চিকিৎসা ব্রিগেডকেও সে সময় আক্রমণ করা হয়েছিল। কেউ কেউ তখন আগুনে পুড়ে মরতে বসেছিল। ধ্বংস করা হয়েছিল সরকারি ভবন, খাদ্যবাহী ট্রাক, স্কুল। পুরো এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটিয়েছে। আর সেই সময় মাচাদো টেলিভিশনে তাকে ‘প্রতিরোধ’ বলে প্রশংসা করেছেন।

ট্রাম্প যে পদক্ষেপের মাধ্যমে অভিবাসী শিশুদের খাঁচায় আটকে রেখেছিলেন, অনেক পরিবারকে আলাদা করে দিয়েছিলেন এবং ট্রাম্পের যে নীতির কারণে আজ হাজারো ভেনেজুয়েলান মা তাঁদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খুঁজে ফিরছেন, সেই কুৎসিত উদ্যোগ ও নীতিকে মাচাদো ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’ বলে প্রশংসা করেছেন।

এ–ই যদি হয় শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের যোগ্যতা, তবে শান্তি শব্দটা অপমানিত হবে। আসলে মাচাদো শান্তির প্রতীক নন। তিনি আসলে বৈশ্বিক এক জোটের অংশ, যেখানে ফ্যাসিবাদ, জায়নবাদ ও নব্য–উদারনীতি (নিওলিবারালিজম) জড়িত।

এই জোট মুখে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘শান্তি’র কথা বলে, কিন্তু তাদের আসল লক্ষ্য হলো দমন ও আধিপত্য। ভেনেজুয়েলায় এই মতবাদ মানে ছিল অভ্যুত্থান, নিষেধাজ্ঞা ও বেসরকারীকরণ। গাজায় এর মানে হলো গণহত্যা ও জাতিগতভাবে ফিলিস্তিনিদের সত্তাকে মুছে ফেলা। দুই জায়গায় নীতিটা এক। এই নীতির কাছে কিছু জীবন তুচ্ছ; সার্বভৌমত্ব বিক্রিযোগ্য আর সহিংসতাকে ‘শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা’ বলে বিক্রিও করা যায়।

তবে হেনরি কিসিঞ্জার যদি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন, তবে মারিয়া কোরিনা মাচাদো কেন পাবেন না? ‘অধিকার দখলের মধ্যেও সহানুভূতি’ দেখানোর জন্য হয়তো আগামী বছর ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ও এই পুরস্কার পেয়ে যেতে পারে। প্রতিবার যখন এই পুরস্কার কোনো সহিংসতার স্থপতিকে ‘কূটনীতিক’ সাজিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা প্রকৃত শান্তিকর্মীদের মুখে থুতু ছিটানোর মতো মনে হয়।

অথচ প্রকৃত শান্তিকর্মীরা হলেন গাজার ধ্বংসস্তূপে লাশ তোলা চিকিৎসকেরা, জীবন বাজি রেখে সত্য তুলে ধরা সাংবাদিকেরা আর সেই মানবিক ত্রাণকর্মীরা, যাঁরা ফ্লোটিলায় করে শিশুদের জন্য খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দিতে গিয়ে ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু আসল শান্তি কোনো পুরস্কার বা বড় সম্মেলনে তৈরি হয় না। সেই পুরস্কার গড়ে ওঠে অবরোধের সময় মানুষকে খাওয়াতে এগিয়ে আসা নারীদের হাতে, নদী রক্ষায় লড়াই করা আদিবাসীদের ঐক্যে, শ্রমিকদের অবিচল সংগ্রামে আর সেই ভেনেজুয়েলান মায়েদের প্রতিবাদে, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির কারণে হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের ফেরত চান।

এই শান্তি পুরস্কার প্রাপ্য ভেনেজুয়েলা, কিউবা, ফিলিস্তিন ও পুরো বৈশ্বিক দক্ষিণের—যে শান্তি আত্মসমর্পণের নয়, বরং স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ায়।

* মিশেল এলনার, কোডপিংক নামের নারী আন্দোলনমূলক একটি শান্তি ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ক
- যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত বামপন্থী ধারার ওয়েবসাইট কমন ড্রিমস থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-10%2Fv609zu56%2Fmaria-noble.JPG?rect=1%2C0%2C6500%2C4333&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ফাইল ছবি: রয়টার্স

কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক চিকিৎসক সাফিয়াকে কেন মুক্তি দেবে না ইসরায়েল

যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের আটক দুই চিকিৎসককে মুক্তি দেবে না। তাঁদের মধ্যে শিশুবিশেষজ্ঞ হুসাম আবু সাফিয়াও রয়েছেন। হামাসের এক কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

গত বছরের ডিসেম্বরে গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের সময় চিকিৎসক সাফিয়াকে মারধর ও অপহরণ করা হয়। কারণ, তিনি অবরুদ্ধ রোগীদের ছেড়ে যেতে রাজি হননি।

হামলার পরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাফিয়া সাদা মেডিকেল অ্যাপ্রোন পরে ধ্বংসস্তূপে ভরা রাস্তা পার হচ্ছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, সাফিয়াকে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে আটক রাখা হয়েছে। ‘সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ থাকার অভিযোগে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তখন থেকেই চিকিৎসক সাফিয়াকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে।

এই সপ্তাহের শুরুতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে বন্দী বিনিময় চুক্তি হলেও হামাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, চিকিৎসক সাফিয়াকে মুক্তি দেওয়া হবে না।

গত শুক্রবার হামাসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, দখলদার বাহিনী চিকিৎসক হুসাম আবু সাফিয়াকে মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

গত জুলাইয়ে আইনজীবী ঘাইদ ঘানেম কাসেম জানান, ইসরায়েলের কুখ্যাত ওফার কারাগারে বন্দী অবস্থায় সাফিয়ার শরীরের ওজন এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেছে। তাঁকে নৃশংসভাবে মারধর করা হয়েছে এবং তাঁর চিকিৎসার জন্য বারবার করা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

কাসেম ফেসবুকে এক পোস্টে বলেন, ‘চিকিৎসক হুসাম আবু সাফিয়া ভালো নেই। আমি তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ দেখা করি কয়েক দিন আগে, ৯ জুলাই। তিনি ৪০ কেজির বেশি ওজন হারিয়েছেন, যা তাঁর মোট ওজনের এক-তৃতীয়াংশের বেশি।’

আইনজীবী আরও বলেন, গ্রেপ্তারের সময় তাঁর ওজন ছিল ১০০ কেজি। এখন তাঁর ওজন ৬০ কেজির বেশি নয়। তাঁকে গত ২৪ জুন প্রচণ্ড মারধর করা হয়েছিল।

আইনজীবী কাসেম আরও বলেন, চিকিৎসক সাফিয়া ‘অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনে’ ভুগছেন। আইনজীবীর মাধ্যমে সম্প্রতি আনা তাঁর চশমাটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে।

হামাসের কর্মকর্তার মতে, রাফার আবু ইউসুফ আল-নাজ্জার হাসপাতালের পরিচালক এবং গাজার ফিল্ড হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মারওয়ান আল-হামসকেও মুক্তি দেওয়া হবে না।

এই বছরের জুলাইয়ে বেসামরিক পোশাকে থাকা একদল ছদ্মবেশী ইসরায়েলি বাহিনী হামসকে অপহরণ করে।

প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের (পিসিএইচআর) সংগৃহীত প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ২১ জুলাই চারজন সশস্ত্র ব্যক্তি বেসামরিক পোশাকে রাফার পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকার আল-রশিদ সড়কে অবস্থিত রেড ক্রসের ফিল্ড হাসপাতালের কাছে সি ক্যাসল ক্যাফেতে অভিযান চালান।

ওই ইসরায়েলি দলটি গুলি চালালে হামস আহত হন। সেখানে স্বাধীনভাবে কাজ করা ফটোসাংবাদিক তামের রেভি রফিক আল-জানিন ও ইব্রাহিম আতেফ আতিয়াহ আবু আশেইবাহ নিহত হন।

পিসিএইচআর জানিয়েছে, আল-জানিন ও হামসের যৌথ উদ্যোগে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় এই হামলা চালানো হয়।

এরপর হামসকে একটি সাদা গাড়ির পেছনে অনেকটা ছুড়ে ফেলে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাঁর আটকের বিষয়ে কোনো কিছু না জানানোয় তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

প্যালেস্টিনিয়ান হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ২৮ জন চিকিৎসক ইসরায়েলি কারাগারে আটক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আটজন সার্জারি, অর্থোপেডিকস, ইনটেনসিভ কেয়ার, কার্ডিওলজি ও পেডিয়াট্রিকসের সিনিয়র কনসালট্যান্ট।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনি বন্দীরা ইসরায়েলি কারাগারে ব্যাপক ও গুরুতর দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন, যাকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো পরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বন্দীদের অনাহারে রাখা, চিকিৎসায় অবহেলা, শারীরিক নির্যাতন, অপমান, যৌন নিপীড়ন, চুরি এবং নজিরবিহীনভাবে নির্জন কারাবাস রাখার মতো নির্যাতনের বিবরণ উঠে এসেছে।

একজন বেসামরিক চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও আবু সাফিয়াকে ইসরায়েলি আইনে ‘বেআইনি যোদ্ধা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার অর্থ হলো তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ আইনটিকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। এই আইন কোনো আদালতের আদেশ বা আইনি সহায়তা ছাড়াই কোনো ব্যক্তিকে আটক রাখার এবং তাঁদের অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে তথ্য গোপন করার ক্ষমতা দেয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে।

হুসাম আবু সাফিয়া
হুসাম আবু সাফিয়া। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ঘরে ফিরে গাজাবাসী দেখছেন চারদিকে শুধুই ধ্বংসস্তূপ

আল–জাজিরা ও রয়টার্সঃ টানা প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলি হামলা থেকে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে বেড়ানো আমির আবু ইয়াদেহর জীবনে আপাত স্বস্তি এনেছে যুদ্ধবিরতি। গতকাল শনিবার গাজার এই তরুণ বলেন, দুঃখ-কষ্ট যতই হোক, অবশেষে নিজের বাড়িতে ফিরতে পেরেছেন। এ জন্য তিনি মহান আল্লাহকে ধন্যবাদ জানান। আসলে বাড়ি বলতে এখন আছে শুধু ধ্বংসস্তূপ।

ইতিমধ্যে গাজায় যুদ্ধবিরতির এক দিন পার হয়েছে। গত শুক্রবার দুপুরে উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর উদ্বাস্তু লাখো ফিলিস্তিনি তাঁদের বিধ্বস্ত বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেন। ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হওয়ায় বাড়ির ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও শুক্রবার রাতটি অনেকটা নির্ভয়ে কাটিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অনেক ফিলিস্তিনি।

গাজায় সংঘাত বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ ঘোষণা করেন। ইসরায়েল ও গাজার স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এই পরিকল্পনায় রাজি হলে স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

দুই বছরে গাজায় প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা দখল করে নেয় ইসরায়েল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রথম দফায় সেনা সরানোর পর গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। গতকাল ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, প্রথম ধাপের সেনা সরানোর কাজটি শেষ করেছে তারা। তবে এ বিষয়ে হামাসের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫ লাখ ফিলিস্তিনি উত্তর গাজায় তাঁদের বাড়িঘরে ফিরেছেন। এ সময়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হয়েছে দেড় শতাধিক মরদেহ।

যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আগামীকাল সোমবার দুপুরের মধ্যে হামাসের কাছে থাকা সব জিম্মিকে ছেড়ে দিতে হবে। আর ১ হাজার ৯৫০ ফিলিস্তিনি বন্দী ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন।

হামাসের কাছে থাকা ৪৮ জিম্মির মধ্যে জীবিত আছেন ২০ জন। হামাস নেতাদের বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, মুক্তি দিতে এই ২০ জিম্মিকে এক জায়গায় করেছে হামাস। অন্যদিকে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ গতকাল সন্ধ্যায় জানায়, ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করেছে তারা।

এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য সফরে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আগামীকাল দুপুরে ইসরায়েলে পৌঁছাবেন তিনি। মিসরে গাজা চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সোমবারই ট্রাম্প দেশটিতে যাবেন। মিসরের পর্যটন শহর শারম আল শেখে এই অনুষ্ঠান হবে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে থাকবেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরাও। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর এ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গতকাল নিশ্চিত করেছে ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিসি প্রাসাদ। বিবিসি জানিয়েছে, ইতালি ও স্পেনের প্রধানমন্ত্রীও এতে অংশ নেবেন।

‘আর যেন পালাতে না হয়’

ইসরায়েলের হামলার মুখে গত প্রায় দুই বছরে গাজার বাসিন্দাদের বহুবার বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তেমন একজন আরিজ আবু সাদায়েহ। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী বলেন, ‘ইসরায়েল আমার ছেলেমেয়েকে কেড়ে নিয়েছে। তাদের হারানোর বেদনা খুব গভীর। কিন্তু খুশি যে যুদ্ধ থেমেছে। আমি ঘরে ফিরতে পেরেছি।’

বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, লাখো ফিলিস্তিনি দক্ষিণ থেকে গাজার উত্তর দিকে যাচ্ছেন। বাড়িঘর হারানো এসব মানুষ সঙ্গে যা আছে, তাই কাঁধে করে হাঁটছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাঁদের অনেকেই ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে নিজেদের বসতভিটায় ফিরছেন। সেখানে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তাঁবুতে রাত যাপন করেন অনেক ফিলিস্তিনি।

৩৯ বছর বয়সী মুহাম্মদ মুর্তজার বাড়ি গাজা নগরীতে। আরও অনেকের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। তাঁর একমাত্র আশা, চূড়ান্তভাবে যেন এ যুদ্ধ শেষ হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু চাই, এই যুদ্ধটা চিরতরে শেষ হোক। আমাদের যেন আর কোনো দিনও পালিয়ে যেতে না হয়।’

গাজা নগরীর আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আজ রাতের আকাশে বোমা নেই, ড্রোন নেই, নেই কমলারঙা আকাশ। চারপাশে সুনসান নীরবতা, যা বহুদিন এখানে দেখা যায়নি।’

ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৫৫ মরদেহ উদ্ধার

যুদ্ধবিরতি শুরুর পর গাজার জরুরি সেবা বিভাগের কর্মীরা ধসে পড়া ভবনগুলোতে জীবিত অথবা মৃত মানুষের খোঁজে অভিযান চালাচ্ছেন। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে থাকা অন্তত ১৫৫টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাশাল সিএনএনকে বলেন, এখনো ১০ হাজার মরদেহ ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় টানা নৃশংসতা চালায় ইসরায়েল। এর মধ্যে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ মাত্র দুই মাস সময় গাজায় যুদ্ধবিরতি ছিল। বাকি সময় উপত্যকাটিতে নির্বিচার হামলা চালিয়ে ৬৭ হাজার ৬৮২ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার। এটাকে জাতিগত নিধন বলে গত মাসে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পর্যাপ্ত ত্রাণ ঢোকেনি গাজায়

নির্বিচার হামলার পাশাপাশি গাজা অবরোধ করে রাখে ইসরায়েলি বাহিনী। খুবই সামান্য পরিমাণ ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করতে দেয় তারা। এতে ২৩ লাখ বাসিন্দার এ উপত্যকায় তীব্র খাদ্যসংকট চলছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার কিছু অংশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে।

প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, গাজায় প্রতিদিন ত্রাণবাহী ৬০০টি ট্রাক ঢুকতে দেওয়ার কথা। কিন্তু যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী শুক্রবার সেই সংখ্যায় ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢুকতে শুরু করেছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ গতকাল জানিয়েছে, গাজায় পাঠানোর জন্য ত্রাণবাহী শত শত ট্রাক তারা প্রস্তুত করে রেখেছে। আজ রোববার থেকে ত্রাণবাহী গাড়ি গাজায় নিয়ে যাওয়ার আশা করছে তারা। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সিএনএনকে জানানো হয়েছে, শনিবার গাজায় ত্রাণের ট্রাক প্রবেশ শুরু হয়েছে।

ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের জন্য আগামী মঙ্গলবার থেকে রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রসেত্তো। গতকাল তিনি বলেন, মিসর সীমান্ত লাগোয় রাফা ক্রসিং যত দ্রুত সম্ভব চালু করার জন্য ইসরায়েল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে অনিশ্চয়তা

ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দ্বিতীয় ধাপের শর্তগুলো নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। বিশেষ করে হামাসের অস্ত্রসমর্পণ ও গাজা শাসনে কারা যুক্ত হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন। এতে দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

হামাস এবং গাজার অপর দুই প্রতিরোধ সংগঠন ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ ও পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি) গতকাল যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে সংগঠন তিনটি বলেছে, গাজার ভবিষ্যৎ শাসনে বিদেশিদের মেনে নেওয়া হবে না।

এদিকে ইসরায়েল বারবার বলে এসেছে, হামাস অস্ত্রসমর্পণ না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানবে না তারা। যেভাবেই হোক হামাসকে নির্মূল করবে। এ ছাড়া যুদ্ধপরবর্তী গাজা শাসনে হামাসের কোনো সংশ্লিষ্টতা মেনে নেবে না বলেও জানিয়েছে ইসরায়েল।

তবে প্রথম ধাপের পরও যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকেরা এ নিয়ে প্রশ্ন করেন ট্রাম্পকে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটা (যুদ্ধবিরতি) কার্যকর থাকবে। লড়াই করতে করতে তারা সবাই (ইসরায়েল ও হামাস) ক্লান্ত।’

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করেছে ত্রাণবাহী ট্রাক। ফিলিস্তিনিরা সংগ্রহ করছেন জরুরি ত্রাণসহায়তা। গতকাল দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করেছে ত্রাণবাহী ট্রাক। ফিলিস্তিনিরা সংগ্রহ করছেন জরুরি ত্রাণসহায়তা। গতকাল দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে। ছবি: রয়টার্স

‘ভারত আমাদের হাত বেঁধে, মুখ ঢেকে বন্দীদের মতো করে নিয়ে যায়—এরপর সমুদ্রে ফেলে দেয়’

বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনঃ নুরুল জানতে পেরেছেন, তাঁর ভাই কায়রুল ও আরও চার স্বজনসহ ৪০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে বিতাড়িত করেছে ভারত সরকার। প্রাণ বাঁচাতে কয়েক বছর আগে এই রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে ভারতে পালিয়েছিলেন শরণার্থী হয়ে।

মিয়ানমারে এখন একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলছে। ২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করা জান্তার অনুগত বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষুদ্র–জাতিগোষ্ঠীর মিলিশিয়া ও সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। এ পরিস্থিতিতে নুরুলের আবার তাঁর পরিবারকে দেখার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোটায়।

‘আমি মানতেই পারি না যে আমার মা–বাবা ও যাঁদের বিতাড়ন করা হয়েছে, তাঁরা কী কষ্টে আছেন’, দিল্লিতে বিবিসিকে বলছিলেন ২৪ বছর বয়সী নুরুল।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে বিতাড়নের তিন মাস পর, বিবিসি মিয়ানমারে থাকা ওই শরণার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে লড়াইরত ‘বা হ্‌তু আর্মি (বিএইচএ)’ প্রতিরোধ দলের সঙ্গে থাকছেন।

‘আমরা মিয়ানমারে নিরাপদ বোধ করি না। এখানে পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো’, ভিডিও কলের মাধ্যমে বলেছেন সৈয়দ নুর। একটি বিএইচএ সদস্যের ফোন থেকে কল করেছেন তিনি। নুর একটি কাঠের তৈরি আশ্রয়শিবিরে ছিলেন। তাঁর চারপাশে ছিলেন আরও ছয়জন শরণার্থী।

বিবিসি এসব শরণার্থীর সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছে, দিল্লিতে থাকা তাঁদের আত্মীয়দের কথা শুনেছে এবং তাঁদের অভিযোগ তদন্ত করা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এই প্রতিবেদন সাজিয়েছে।

জানা গেছে, এই ব্যক্তিদের দিল্লি থেকে বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপে উড়োজাহাজে করে নেওয়া হয়, পরে নৌযানে রাখা হয়। এরপর জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট পরিয়ে আন্দামান সাগরে ফেলা হয়। তীরে পৌঁছে এখন মিয়ানমারে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি তাঁরা। নিষ্ঠুর নির্যাতন–নিপীড়নের মুখে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বহু রোহিঙ্গা মুসলিম দেশটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

‘তারা (ভারতীয় কর্তৃপক্ষ) আমাদের হাত বেঁধে, মুখ ঢেকে বন্দীদের মতো করে নিয়ে গেছে। তারপর (নৌকায় উঠিয়ে) সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে’, ওই শরণার্থী দলের এক সদস্য জন তাঁর ভাইকে ফোনে বলেছেন।

‘মানুষকে কীভাবে শুধু সমুদ্রে ফেলা যায়?’, প্রশ্ন করেছেন নুরুল আমিন। ‘বিশ্বে মানবিকতা বেঁচে আছে, কিন্তু আমি ভারত সরকারের মধ্যে কোনো মানবিকতা দেখিনি।’

মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার থমাস অ্যান্ড্রু বলেছেন, (ভারতের বিরুদ্ধে) এ অভিযোগের সপক্ষে ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ’ রয়েছে। তিনি এ তথ্য জেনেভায় ভারতের মিশনপ্রধানের কাছে উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাননি।

বিবিসিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছে। তবে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের অবস্থা ভারতে শঙ্কাজনক। ভারত রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না; বরং ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করে।

ভারতে রোহিঙ্গাদের একটি বড়সংখ্যক জনগোষ্ঠী রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় রয়েছে বাংলাদেশে। সেখানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করেন। বেশির ভাগই ২০১৭ সালে মিয়ানমারে শুরু হওয়া নিষ্ঠুর সেনা অভিযান থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছেন। মিয়ানমারে বহু প্রজন্ম ধরে বসবাস করা সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি নেই।

ভারতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ২৩ হাজার ৮০০। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করছে, প্রকৃত সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি।

গত ৬ মে দিল্লির বিভিন্ন অংশে বসবাসকারী ও ইউএনএইচসিআরের শরণার্থী কার্ডধারী ৪০ জন রোহিঙ্গাকে স্থানীয় থানা থেকে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা পর একটি আটক শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁদের। বিবিসিকে তাঁরা এ তথ্য জানান।

নুরুল বলেন, তাঁর ভাই তখন তাঁকে ফোন করে জানায়, তাঁকে মিয়ানমারে নেওয়া হচ্ছে এবং তাঁকে (নুরুল) আইনজীবী নিযুক্ত করতে ও ইউএনএইচসিআরকে জানাতে বলে।

৭ মে শরণার্থীদের দিল্লির পূর্বে হিন্দন বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে তাঁরা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জন্য উড়োজাহাজে ওঠেন।

‘উড়োজাহাজ থেকে নামার পর আমরা দেখেছি, দুটি বাস আমাদের নেওয়ার জন্য এসেছে’, ভিডিও কলের মাধ্যমে বললেন সৈয়দ নুর। তিনি আরও বলেন, বাসের পাশে লেখা ছিল ‘ভারতীয় নৌসেনা’। এটি ভারতীয় নৌবাহিনীকে বোঝায়।

‘যত দ্রুত সম্ভব আমরা বাসে উঠলাম, আমাদের হাত প্লাস্টিক দিয়ে বাঁধা হলো এবং মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হলো’, বলেন নুর।

বাসে থাকা লোকজনের পরিচয় জানা যায়নি, তবে সামরিক পোশাক পরিহিত এই ব্যক্তিরা হিন্দি ভাষায় কথা বলছিলেন।

সংক্ষিপ্ত বাসভ্রমণের পর শরণার্থী দলকে বঙ্গোপসাগরে একটি নৌযানে ওঠানো হয়; সেখানে হাত খোলা ও মুখের কাপড় সরানোর পর বিষয়টি বুঝতে পারেন তাঁরা। শরণার্থীরা নৌযানটিকে একটি বড় যুদ্ধজাহাজ হিসেবে বর্ণনা করেন—দুই তলা, দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার (৪৯০ ফুট)।

‘অনেকেই টি-শার্ট, কালো প্যান্ট ও কালো সেনা বুট পড়ে ছিলেন’, ভিডিও কলে বলেন মোহাম্মদ সাজ্জাদ। ‘সবাই একই রকম পোশাক পরেননি—কেউ কালো, কেউ বাদামী।’ সাজ্জাদ ভিডিও কলে নুরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সৈয়দ নুর বলেন, নৌকায় তাঁরা ১৪ ঘণ্টা ছিলেন। খাবার দেওয়া হয়েছিল চাল, ডাল, পনির।

কিছু পুরুষ শরণার্থী জানিয়েছেন, নৌকায় তাঁদের ওপর নির্যাতন ও অপমান করা হয়েছে।

‘আমাদের সঙ্গে খুব খারাপভাবে আচরণ করা হয়েছিল’, বলেন নুর। ‘কিছু মানুষকে মারধর করা হয়েছে, একাধিকবার থাপ্পড় মেরেছে।’

ভিডিও কলের সময় ফয়েজ উল্লাহ নামের আরেকজন তাঁর ডান কনুইয়ে ক্ষত দেখান। বলেন, তাঁকে বারবার পেটানো, থাপ্পড় মারা ও বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। তাঁরা জিজ্ঞাসা করছিলেন, তিনি অবৈধভাবে কেন ভারতে আছেন।

রোহিঙ্গারা প্রধানত মুসলিম। কিন্তু মে মাসে ভারত থেকে বিতাড়ন করা এই ৪০ জনের মধ্যে ১৫ জন খ্রিষ্টান ছিলেন।

‘দিল্লি থেকে যাওয়ার সময় শরণার্থীদের আটক করা ব্যক্তিরা বলতেন, “তুমি হিন্দু হওনি কেন? খ্রিষ্টান হওয়ার কারণ কী?”’, বলেন নুর। বলেন, ‘খৎনা হয়েছে কি না দেখার জন্য আমাদের বিবস্ত্র হতে বাধ্য করা হয়েছে।’

অন্য এক শরণার্থী ইমান হোসেন বলেন, সেনাসদস্যরা তাঁকে কাশ্মীরের পেহেলগাম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। গত ২২ এপ্রিলের এ হামলার ঘটনায় প্রধানত হিন্দু পর্যটকসহ ২৬ জন নিহত হন।

ভারত সরকার বারবার পাকিস্তানি নাগরিকদের এ হামলার জন্য দায়ী করেছে; যা ইসলামাবাদ অস্বীকার করেছে। এ হত্যাকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের সংশ্লিষ্ট থাকার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

পরের দিন ৮ মে, সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ শরণার্থীদের নৌযানের পাশে থাকা একটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে বলা হয়। নিচে চারটি ছোট নৌকা দেখতে পান, কালো রাবারের।

শরণার্থীদের দুটি নৌকায় স্থানান্তর করা হয়। প্রতিটিতে ২০ জন। বড় নৌযানে যাঁরা তাঁদের সঙ্গে ছিলেন, সেই কর্মীরাও সঙ্গে ওঠেন। বাকি দুটি নৌকা নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সেখানে আরও এক ডজনের বেশি মানুষ ছিলেন। সাত ঘণ্টার বেশি হাতবাঁধা অবস্থায় ভ্রমণ করতে হয়।

‘একটি নৌকা সৈন্যদের নিয়ে তীরে পৌঁছে এবং একটি লম্বা দড়ি গাছের সঙ্গে বেঁধে দেয়। তারপর সেই দড়ির অপর মাথা আমাদের নৌকায় আনা হয়’, বলেন নুর।

এরপর জীবন রক্ষাকারী জ্যাকেট দেওয়া হয় এবং হাতের বাঁধন খুলে পানিতে ঝাঁপ দিতে বলা হয়। ‘আমরা দড়ি ধরে ১০০ মিটারের বেশি সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছেছি’, বলেন নুর। তিনি আরও বলেন, এ সময় তাঁদের বলা হয়, তাঁরা ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছেন। তারপর তাঁদের এভাবে নিয়ে আসা ব্যক্তিরা চলে যান।

বিবিসি এ অভিযোগ ভারত সরকার ও নৌবাহিনীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

৯ মে ভোরে, স্থানীয় জেলেরা শরণার্থী দলটিকে খুঁজে পান এবং জানান, তাঁরা মিয়ানমারে আছেন। জেলেরা শরণার্থীদের ফোন ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন; যেন তাঁরা ভারতে অবস্থানরত স্বজনদের ফোন করতে পারেন।

তিন মাস ধরে বিএইচএ মিয়ানমারের তানিনথারি অঞ্চলে খাবার ও আশ্রয় দিয়ে বিতাড়িত এই শরণার্থীদের সহায়তা করছে। কিন্তু ভারতে থাকা পরিবার তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছে।

জাতিসংঘ বলেছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যখন এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আন্দামান সাগরে পাঠায়, তখনই তাঁদের জীবন চূড়ান্ত ঝুঁকিতে ফেলে।

১৭ মে নুরুল আমিন ও অন্যান্য পরিবারের সদস্যরা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করেছেন। সেখানে তাঁদের বিতাড়ন করা স্বজনদের দিল্লিতে ফিরিয়ে আনা, অনুরূপ বিতাড়ন বন্ধ করা এবং ৪০ জনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে।

‘এটি রোহিঙ্গা বিতাড়নের ভয়াবহতার কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে’, বলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কলিন গঞ্জালেস।

‘যুদ্ধক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট পড়িয়ে কেউ মানুষকে সমুদ্রে ফেলে দিতে পারে, তা স্বাভাবিকভাবে বিশ্বাস করা কঠিন’, বলেন এই আইনজীবী।

তবে পিটিশনের জবাবে দুই-সদস্যের বেঞ্চের এক বিচারক এ অভিযোগকে ‘কাল্পনিক ধারণা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ‘প্রসিকিউশন তাদের দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ দেখায়নি।’

শরণার্থীদের নিয়ে এমন আচরণ ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। গত বছরজুড়ে তাঁরা দাবি করে আসছিলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের রোহিঙ্গা বিতাড়ন বেড়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই।

ভারতে থাকা রোহিঙ্গাদের কিছু এখন লুকিয়ে আছেন। যেমন নুরুলের মতো কেউ বাড়িতে আর ঘুমান না। তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তানকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন।

‘আমার মনে শুধু এই ভয় যে ভারত সরকার আমাদেরও নিয়ে যাবে ও সমুদ্রে ফেলে দেবে। এখন আমরা বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাই’, বলেন নুরুল আমিন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-29%2F0slg4lr1%2FROHINGYA-01.avif?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
থাইল্যান্ডের নৌসীমার কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বহনকারী একটি নৌকার পাশে ভিড়েছে থাইল্যান্ডের নৌবাহিনীর একটি নৌযান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জিম্মিরা মুক্ত হওয়ামাত্রই গাজার সুড়ঙ্গগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ইসরায়েলের

গাজা থেকে জিম্মিরা মুক্ত হওয়ার পরপরই সেখানকার ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের অবশিষ্টাংশ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আজ রোববার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এ কথা বলেছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, যে দেশটির উদ্যোগে তিন দিন আগে গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে, সেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি ‘আন্তর্জাতিক’ তদারকিতে এই অভিযান চলবে।

এক বিবৃতিতে কাৎজ বলেছেন, ‘জিম্মিদের মুক্তি পাওয়ার ধাপটি শেষ হলে ইসরায়েলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জটি হবে গাজায় হামাসের সব সুড়ঙ্গ ধ্বংস করা। এ অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত থাকতে আমি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি।’

ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস গাজায় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। এ ধরনের সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে ইসরায়েলের গোয়েন্দা নজরদারির বাইরে থেকে কাজ করার সুযোগ পায় তারা। এর মধ্যে কিছু সুড়ঙ্গ সীমানার বেড়ার নিচ দিয়ে ইসরায়েলে ঢুকে পড়েছে। এগুলো ব্যবহার করে ইসরায়েলে আকস্মিক হামলা চালানোর সুযোগ পায় হামাস।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস সীমান্ত পার হয়ে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ঢুকে হামলা চালায়। জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এর পর থেকে দুই বছর ধরে ইসরায়েলি হামলা চালিয়ে বেশ কিছু সুড়ঙ্গ ধ্বংস করে দিয়েছে।

কাৎজ বলেছেন, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও সংগঠনটির সামরিক ক্ষমতা কমানোর রূপরেখা অনুযায়ী বাকি সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস করা হবে। গাজায় যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

হামাস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মেনে নিয়েছে। এর আওতায় গত শুক্রবার থেকে গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামীকাল সোমবার ৪৮ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে হামাস। এর মধ্যে যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁদের জীবিত অবস্থায় তুলে দেওয়া হবে। আর যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের লাশ হস্তান্তর করা হবে।

ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েল ২৫০ জন কারাবন্দীকে মুক্তি দেবে। এর মধ্যে প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া কয়েকজন ব্যক্তিও আছেন। গাজা থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে আটক হওয়া ১ হাজার ৭০০ জন ফিলিস্তিনিও মুক্তি পাবেন।

তবে হামাস এখনো পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণের জন্য রাজি হয়নি। আজ রোববার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হোসাম বাদরান বলেছেন, মার্কিন পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে অনেক জটিলতা এবং সমস্যার বিষয় আছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-12%2Fokrf4y05%2FTunnel.jpg?rect=9%2C0%2C608%2C405&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজা উপত্যকার গাজা সিটিতে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি এলাকা। ছবি এএফপি ফাইল ছবি

ট্রাম্পের সঙ্গে শির বৈঠকের আগে কেন দুর্লভ খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করছে চীন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক সামনে রেখে চীন আবারও দুর্লভ খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। চলতি মাসের শেষের দিকে দুই নেতার মধ্যে ওই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্বের প্রক্রিয়াজাত দুর্লভ খনিজ ধাতু এবং খনিজ চুম্বকের ৯০ শতাংশের বেশি চীনে পাওয়া যায়। দেশটি এ ধরনের উপকরণ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে এর সরবরাহ সীমাবদ্ধ করেছে।

ইলেকট্রিক গাড়ি থেকে শুরু করে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন এবং সামরিক রাডার পর্যন্ত নানা যন্ত্রে ১৭ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দুর্লভ খনিজ ধাতু ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

দুর্লভ খনিজ উপকরণ রপ্তানির ওপর চীন নতুন যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, সে সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

চীন কী ঘোষণা দিয়েছে

চীন আগে থেকেই দুর্লভ খনিজের রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছিল। গত বৃহস্পতিবার তারা আরও পাঁচটি নতুন উপকরণকে এই তালিকায় যুক্ত করেছে। এতে এখন মোট ১২টি দুর্লভ খনিজ উপকরণ রপ্তানির সীমাবদ্ধতার আওতায় পড়েছে।

এ ছাড়া দেশটি এমন অনেক যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের রপ্তানিতেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যেগুলো দুর্লভ খনিজ আহরণ ও পরিশোধনের কাজে লাগে। দুর্লভ খনিজ আহরণ ও পরিশোধন—দুই ক্ষেত্রেই চীনের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষে।

নতুন বিধিনিষেধের আওতায় রপ্তানিকারকদের এখন থেকে বিশেষ লাইসেন্স নিতে হবে। এর আগে গত এপ্রিলে একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ জারির কারণে বিশ্বে দুর্লভ খনিজ চুম্বকের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এতে বিশ্বের অনেক গাড়ি কারখানাকে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

এখন একই পরিস্থিতি দেখা দেয় কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে চীন বলছে, লাইসেন্স অনুমোদন প্রক্রিয়াটি সহজ করা হবে। তবে প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের জন্য রপ্তানির আবেদন করা হলে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে। অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি ও সুনির্দিষ্ট ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–সংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আবেদনগুলো খুবই সতর্কভাবে যাচাই করা হবে।

বিদেশি উৎপাদনকারী বলতে কী বোঝানো হচ্ছে

চীন প্রথমবারের মতো বলেছে, তারা বিদেশি উৎপাদনকারীদের বিধিনিষেধের আওতায় আনছে। চীনা উপকরণ বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ধরনের দুর্লভ খনিজ পণ্য তৈরি করে—এমন বিদেশি উৎপাদনকারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

১৯৫০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের নিয়ম চালু আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বিদেশি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোকে চীনে চিপ বিক্রি করতে বাধা দিয়েছে, যদিও ওই চিপগুলো মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের কোনো দুর্লভ খনিজ পণ্যের উৎপাদনকারী যদি তাদের পণ্যে চীনের দুর্লভ খনিজ উপকরণ ব্যবহার করে, তবে সে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে তাদের এখন থেকে বেইজিংয়ের অনুমতি নিতে হবে। আর চীনা উপকরণ ব্যবহার করে ‘দুর্লভ খনিজ চুম্বক’ প্রস্তুতকারীদেরও একই প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে।

মূলত চীনের ‘দুর্লভ খনিজ’ সরবরাহ শৃঙ্খলে আধিপত্য বজায় রাখার কথা মাথায় রেখে এসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ অন্য দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে চীনের পণ্যের বিকল্প তৈরি করতে না দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যেকোনো বিদেশি উৎপাদনকারীর ওপরই কি এ নিয়ম কার্যকর হবে

না। চীন শুধু নির্দিষ্ট কিছু দুর্লভ খনিজ উপকরণ ও সংশ্লিষ্ট চুম্বক উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বে কড়াকড়ি আরোপ করে রেখেছে।

যেমন জার্মানিতে তৈরি একটি ওয়াশিং মেশিনে চীনের ‘দুর্লভ খনিজ চুম্বক’ থাকলেও তা অন্য ইউরোপীয় দেশে বিক্রি করতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।

কিন্তু যদি কোনো জার্মান প্রতিষ্ঠান চীনা ‘দুর্লভ খনিজ’ উপকরণ ব্যবহার করে দুর্লভ খনিজ চুম্বক তৈরি করে, তবে চীনের কাছ থেকে তাদের অনুমতি নিতে হবে।

চীন নতুন নিয়ম কীভাবে কার্যকর করতে পারে

এটা এখনো নিশ্চিত নয়। চীনের আইন অনুযায়ী, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন ভাঙলে শাস্তি হিসেবে জরিমানা থেকে শুরু করে কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবে বিদেশি উৎপাদনকারীদের বিচারের মুখোমুখি করাটা কাজটি কঠিন।

যেসব বিদেশি ‘দুর্লভ খনিজ’ প্রতিষ্ঠান চীনা উপকরণ বা যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল, তারা নিয়ম লঙ্ঘন করলে চীনা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আর এই ঝুঁকি বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করবে। এতে চীনের ‘দুর্লভ খনিজ’ সরবরাহের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ইতিমধ্যে যে তৎপরতা চলছে, তা আরও ত্বরান্বিত হবে।

চীনের একটি দুর্লভ খনিজ ধাতুর খনিতে কাজ করছেন এক শ্রমিক
চীনের একটি দুর্লভ খনিজ ধাতুর খনিতে কাজ করছেন এক শ্রমিক। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক কেন ছাড়লেন ‘বিস্ময় বালক’ কাইরান কাজী? কারণ জানালেন তার মা জুলিয়া কাজী

মাত্র ১৪ বছর বয়সে ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের স্টারলিংক প্রকল্পে যোগ দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল কাইরান কাজী। দুই বছর পর স্টারলিংক ছাড়ার ঘোষণায় আবার আলোচনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই কিশোর। তাঁর মা জুলিয়া কাজীর কাছ থেকে এই বিস্ময়কর প্রতিভা সম্পর্কে আরও জানলেন তোফাজ্জল হোসেন

জুলিয়া কাজীর সঙ্গে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ। তাঁর ছেলে কাইরান কাজী স্টারলিংক ছেড়েছে জানার পর পেশাগত পরিচয় দিয়ে মেসেজ দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আলাপ করতে চাই। উত্তরে তিনি মিনিট পাঁচেক সময় দিলেন।

ওয়াল স্ট্রিটের সাবেক ফিন্যান্সিয়াল কর্মকর্তা জুলিয়া কাজী শুরুতেই বিনীত কণ্ঠে ছোট ছোট বাক্যে বললেন, ‘বাংলা বুঝতে পারি, ভালো বলতে পারি না।’ তবে কথা বলতে বলতে বুঝতে পারি, বাংলা তিনি ভালোই বলেন। কুশল বিনিময় করে জানতে চাইলাম, ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান কেন ছাড়ল কাইরান?

জুলিয়া কাজী বললেন পেছনের গল্প। কাইরানের কর্মস্থল ওয়াশিংটনের সিয়াটলে। আর তার কেমিক্যাল প্রকৌশলী বাবা মুজতাহিদ কাজী থাকেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। কাইরান চাকরি পাওয়ার পর নিজের চাকরি ছেড়ে ছেলের সঙ্গেই আছেন জুলিয়া। তবে সিয়াটলে মা-ছেলে ছাড়া তাঁদের নিকটাত্মীয় কেউ নেই। কমিউনিটিও ছোট। এই বিচ্ছিন্নতা মা-ছেলের ভালো লাগছিল না।

জুলিয়া কাজী বলেন, ‘এ ছাড়া কাইরান সপ্তাহে ৮০ থেকে ৯০ ঘণ্টা কাজ করত। স্টারলিংকের দায়িত্ব উপভোগ করলেও দুই বছর পর এসে সে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে চাচ্ছিল।’

বিশ্বের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানই কাইরানকে চায়। তবে কাইরানের পছন্দ নিউইয়র্কের থাকা যাবে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠান। এই শহরে তার নানি থাকেন। আছেন আরও আত্মীয়স্বজন। এসব বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিটাডেল সিকিউরিটিজে কোয়ান্ট ডেভেলপার হিসেবে যোগ দিচ্ছে কাইরান। ম্যানহ্যাটন পার্ক অ্যাভিনিউতে তার অফিস। অভিজাত একটি অ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছে সে। অফিস থেকে যার হাঁটার দূরত্ব মিনিট দশেক। জুলিয়া কাজী বললেন, ‘বেতনের পরিমাণও সন্তোষজনক।’

কতটা সন্তোষজনক? পাঠকের আগ্রহের কথা ভেবে শিষ্টাচার ভেঙেই জানতে চাইলাম। জুলিয়া বললেন, প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তার নিয়ম অনুযায়ী এই তথ্য বলা বারণ।

তবে আমরা সিটাডেল সিকিউরিটিজে কাইরানের সমতুল্য পদের বেতনের খোঁজ করে জানতে পেলাম, বছরে এক মিলিয়ন ডলারের বেশি।

এসব আলাপে মিনিট পাঁচেকের সময় দ্রুতই ফুরিয়ে যায়। আরও কিছুটা সময় চাই বলে আবদার করলে জুলিয়া কাজী হাসিমুখে সায় দেন।

কাইরানের ছেলেবেলা

কাইরানের বাবা মুজতাহিদ কাজীর আদি নিবাস মানিকগঞ্জে হলেও তাঁর জন্ম ঢাকায়। বেড়ে ওঠা আর পড়াশোনা ব্রুনেই ও মালয়েশিয়ায়। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি ইউনিভার্সিটিতে আসেন পড়াশোনা করতে। জুলিয়া কাজীদের বাড়ি মৌলভীবাজারে। তিন বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

জুলিয়া ও মুজতাহিদের বিয়ে হয় ২০০০ সালে। কাইরানের জন্ম ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি। তার মা-বাবা তখন ক্যালিফোর্নিয়ার বে-এরিয়ায় থাকতেন। বড় হতে থাকলে দেখা গেল, কাইরানের আচরণ সমবয়সীদের চেয়ে আলাদা, স্মরণশক্তিও তীক্ষ্ণ। তার সামনে যে কথাই বলা হয়, টেলিভিশনে সে যা দেখে, সব মনে রাখতে পারে এবং বলতে পারে।

দুই বছর বয়স থেকেই মা-বাবার সঙ্গে বিজ্ঞান, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো কথা বলত কাইরান। তিন বছর বয়সে কাইরানকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান জুলিয়া। চিকিৎসক সব জেনে বললেন, ‘আপনাদের ছেলে অতিমানবীয় মেধাবী। এমন ‘‘রোগী’’ আমি আমার ক্যারিয়ারে আগে দেখিনি!’

জুলিয়া বলেন, ‘তারপর তো আপনারা জানেন। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ৯ বছর বয়সে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাইরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করে। তারপর ১১ বছর বয়সে গণিতশাস্ত্রে অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি নেয়। ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে ১৪ বছর বয়সে।’

১৭৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটির সর্বকনিষ্ঠ গ্র্যাজুয়েট কাইরান। স্নাতক পড়ার সময়ই বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ইন্টেলে ইন্টার্নশিপ করে সে। পরে ব্ল্যাকবার্ড নামের একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানেও ইন্টার্নশিপ করেছে। আর দুই বছর আগে ১৪ বছর বয়সে স্টারলিংকে চাকরি পেয়ে তো বড় বড় গণমাধ্যমের শিরোনামই হয়েছে।

জুলিয়া কাজী বলছিলেন, কাইরান অত্যন্ত কৌতূহলী ছেলে। ছোটবেলায় যদি তাকে শেখার সুযোগ না দেওয়া হতো বা দিন-রাত আলোচনা করতে না দেওয়া হতো, তবে সে বিরক্ত হয়ে যেত। এখনো তার ইচ্ছেমতো পরিবেশ–পরিস্থিতি না হলে বিরক্ত হয়।

কাইরান কাজীকে সামাল দিতে গিয়ে তাঁর মা-বাবা আর দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেননি। সে জন্য অবশ্য জুলিয়ার মনে কষ্ট নেই। এত বিরল মেধাবী সন্তানের মা হিসেবে যে সম্মান পান, তা–ইবা কজনের ভাগ্যে জোটে!

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-30%2Fu21afqkb%2F518224832101717358735855761680864372928337399n.jpg?rect=52%2C0%2C794%2C529&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
১৪ বছর বয়সে স্টারলিংক প্রকল্পে যোগ দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল কাইরান কাজী। ছবি: জুলিয়া কাজীর সৌজন্যে