Saturday, March 2, 2019

অভিনন্দনের প্রত্যাবর্তন উত্তেজনা কমছে

পাকিস্তানে আটক ভারতীয় পাইলট অভিনন্দন বর্তমান ভারতে ফিরে গেছেন। তার আটক হওয়া নিয়ে তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পর অবশেষে আনন্দ-উল্লাসে মেতেছেন ভারতীয়রা। পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবও তুলনামূলক কমে এসেছে। অভিনন্দনকে বিকালে হস্তান্তরের কথা থাকলেও সকাল থেকেই ওয়াঘা সীমান্তে জড়ো হতে থাকেন ভারতীয়রা। তারা হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে, চেহারায় পতাকা অঙ্কন করে অধীর আগ্রহে অভিনন্দনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। ভারতের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন তারা। কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে ‘শান্তির ইঙ্গিত’ হিসেবে অভিনন্দনকে ফেরত পাঠায় পাকিস্তান। সন্ধ্যা ছয়টায় অভিনন্দনকে হস্তান্তর করার কথা থাকলেও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে খানিকটা বিলম্ব হয়।
ভারতে অভিনন্দনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা: শুক্রবার সন্ধ্যায় অভিনন্দনকে নিয়ে কনভয় এসে পৌঁছায় ওয়াঘা-আটারি সীমান্তের চেকপোস্টে। পরে পাকিস্তান ‘বিটিং দ্য রিট্রিট সিরিমনির’ পরই অভিনন্দনকে তুলে দেয় ভারতের হাতে। ভারত অবশ্য এদিন এই ‘বিটিং দ্য রিট্রিট সিরিমনি’ বাতিল করে দেয়। প্রথমে পাকিস্তান সীমান্তে শুল্ক ও অভিবাসনের কাজ শেষ করে অভিনন্দন প্রবেশ করেন ভারতীয় ভূমিতে। সেখানেও একদফা শুল্ক ও অভিবাসনের কাজ শেষ হওয়ার পর উইং কমান্ডার অভিনন্দনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন সেনা চিকিৎসকরা। ভারত সীমান্তে অভিনন্দনকে স্বাগত জানান এয়ার ভাইস মার্শাল আর জি কে কাপুর সহ ভারতীয় বিমান সেনার শীর্ষ কর্মকর্তারা। অভিনন্দন বর্তমান ভারতের মাটিতে পা দেয়ার খবর প্রকাশের পরই সীমান্তে উপস্থিত মানুষ উন্মাদনায় ফেটে পড়েন। অনেকে ঢাকঢোল বাজিয়ে অভিনন্দনকে বীরের অভ্যর্থনা জানান।
‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল সীমান্ত এলাকা। এরা বৃহস্পতিবার রাত এবং শুক্রবার সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলেন অভিনন্দনকে স্বাগত জানাতে। তবে সবচেয়ে আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন অভিনন্দন তার পিতা ও মাতার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। তারা গতকাল রাতেই চেন্নাই থেকে নয়া দিল্লি এসে পৌঁছেছিলেন। গতকাল দুপুরেই তারা পৌঁছান অমৃতসর। সেখান থেকে সীমান্তে। অভিনন্দনের আগমন উপলক্ষে সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সদ্য মুক্তি পাওয়া পাইলট ওয়াগা সীমান্তে ছিলেন।  সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সীমান্ত থেকে বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা ও পাইলটের পিতা-মাতাসহ অভিনন্দনকে অমৃতসরে নেয়া হবে। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে নয়া দিল্লিতে।
বৃহস্পতিবার বিকালে পাক প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তান সংসদের যৌথ অধিবেশনে ঘোষণা করেন যে, শান্তির পদক্ষেপ হিসেবে শুক্রবারই অভিনন্দনকে মুক্তি দিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হবে।  ভারত অবশ্য মুক্তি পাওয়া পাইলটকে সরাসরি বিমানে উড়িয়ে নয়া দিল্লি নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তা নাকচ করে দিয়ে জানায়, ওয়াঘা-আটারি সীমান্ত দিয়েই ভারতীয় পাইলটকে ফেরত দেওয়া হবে।
সে অনুসারে, শুক্রবার সকালে পাইলট অভিনন্দনকে প্রথমে রাওয়ালপিন্ডি থেকে লাহোরে আনা হয়। সেখানে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেড ক্রস (আইসিআরসি)-এর হাতে তুলে দেয়া হয় বিমান বাহিনীর এই উইং কমান্ডারকে। সেসময় উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানে ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধিরাও। তার পরে সন্ধ্যা নাগাদ তাকে নিয়ে আসা হয় ওয়াঘা-আটারি সীমান্তে। পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রকের এক সূত্র ডন টিভি নিউজ-কে জানিয়েছে, ভারতীয় হাইকমিশনের অ্যাটাশে জে টি ক্যুরিয়েন অভিনন্দনের সঙ্গে রয়েছেন। এর আগে কার্গিল যুদ্ধের সময়ও ভারতীয় পাইলট নচিকেতাকে পাকিস্তান রেডক্রসের মাধ্যমেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল ঘটনার আটদিনের মাথায়। ভারত অবশ্য দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক স্তরে প্রবল চাপ ও  জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ীই পাকিস্তান পাইলটকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে।  বিজেপির সভাপতি শুক্রবার পাইলটের মুক্তিকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য বলে বর্ণনা করেছেন।
পাকিস্তানে যেভাবে আটক হন অভিনন্দন: গত ২৭শে  ফেব্রুয়ারি সকালে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে প্রায় সাত কিলোমিটার ভারতের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছিল পাক ফাইটারগুলো।
তাদের মোকাবিলায় আকাশে ওড়ে ভারতের দু’টি জেট। তারই একটির ককপিটে ছিলেন অভিনন্দন। সূত্রের খবর, নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় থাকা পাক ফাইটারকে টার্গেট ‘লক ইন’ করে অভিনন্দনের বাইসন জেট। সেকেন্ডের মধ্যে মিগ-২১ থেকে আর-৭৩ এয়ার টু এয়ার মিসাইল আঘাত করে পাক ফাইটারকে। কিন্তু তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অভিনন্দনের মিগে আঘাত করে পাক জেটের গুলি। বিমান নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে রেডিও বার্তা দিয়েই ‘ইজেক্ট’ করে বিমানের বাইরে চলে আসেন তিনি। কিন্তু হাওয়ার গতি উল্টো দিকে থাকায় অভিনন্দনকে নিয়ে প্যারাশুট ভেসে যায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের দিকে। তার পরই পাক সেনারা তাকে আটক করেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে দু’জন প্রত্যক্ষদর্শীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বিমান থেকে পাকিস্তানি ভূ-খণ্ডে পড়ার পর অভিনন্দন ভারতের পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। কিন্তু যখন বুঝতে পারেন যে, তিনি এখন শত্রুর ভূ-খণ্ডে, তখন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পাকিস্তানি গ্রামবাসী তাকে দেখে ফেলে, ধাওয়া করতে থাকে। তাদের ভয় দেখানোর জন্য অভিনন্দন শূন্যে গুলি করতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ রাজ্জাক চৌধুরি বলেন, আধা কিলোমিটার দৌড়ানোর পর, সে শূন্যে আরো গুলি করতে থাকে। কিন্তু এতে গ্রামবাসীর মনে ভয় ধরাতে না পেরে সে একটি ছোট নদীতে লাফ দেয়। পরে পালানো সম্ভব না এটা বুঝতে পেরে ইউনিফর্ম থেকে কিছু দলিল ও মানচিত্র বের করে গিলে ফেলার চেষ্টা করে, বাকিগুলো পানিতে ভাসিয়ে দেয়। আব্দুল মজিদ নামের আরেক প্রত্যক্ষ্যদর্শী জানান, ভারতীয় পাইলটকে মারধর করা ও পাথর নিক্ষেপকারী গ্রামবাসীদের মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন।  তিনি বলেন, নদী থেকে সে যখন আবারো তার রিভলবার আমাদের দিকে তাক করে, সরাসরি গুলি করতে পারে ভেবে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। পরে গ্রামবাসী তাকে ধরে ফেলে। কেউ কেউ তাকে মারধরও করে। কেননা আমাদেরকে কঠিন ভোগান্তিতে ফেলেছিল সে। কিন্তু পরে আমরা তাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করি।
উন্নতি নেই কূটনৈতিক সম্পর্কে: অভিনন্দনের ফেরত পাঠানোকে কেন্দ্র করে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমলেও কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো অগ্রগতি আসেনি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মোহাম্মদ কোরেশি জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতীয় পক্ষকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে এ সপ্তাহে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিতব্য ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না তিনি।  পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানান, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বার্তা নিয়ে শিগগিরই ইসলামাবাদ সফর করবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধুবাদ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ইতিমধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃত্বকে আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই সংঘর্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছে। অভিনন্দনকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনাকে সাধুবাদও জানিয়েছেন তারা। ইতিমধ্যেই জাতিসংঘ ইমরান খানের বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে। এ ছাড়া, জর্দান ও রাশিয়া প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে ইতিমধ্যেই ট্রেন্ডিং হয়েছে যুদ্ধবিরোধী হ্যাশট্যাগ ‘সে নো টু ওয়ার’। ভারত-পাকিস্তান দুই দেশের নাগরিকরাই আওয়াজ তুলছেন শান্তির পক্ষে। অন্যদিকে পিছিয়ে নেই ‘ওয়েলকাম হোম অভিনন্দন’ শিরোনামের টুইটও।

একজন ডাকাতের বয়ান: এসব টাকা আমার কোনো কাজে আসেনি by রুদ্র মিজান

পরনে পুলিশের পোশাক। পদবি সাব ইন্সপেক্টর। সঙ্গী দু’জন কথায় কথায় ‘স্যার স্যার’ বলে সন্বোধন করেন। তাদের একজনের সাদা পোশাক, অন্যজনের পোশাক কনস্টেবলের। প্রায় রাতেই এভাবেই ডিউটিতে বের হতেন আলী হোসেন। না, সরকারি কোনো ডিউটি। তারা পুলিশের কোনো সদস্য না। পুলিশে কর্মরত বলেই পরিচয় দিয়ে থাকেন।
গাজীপুর, টঙ্গী ও উত্তরা এলাকায় দেখা মিলতো তাদের। কাজ ছিল পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি। ডাকাতি তার পেশা। কিশোর বয়স থেকেই মিশে গেছেন ডাকাত দলের সঙ্গে। শুরুতে ডাকাতি শিখতে হয়েছে তাকে। ডাকাতিও শেখার বিষয় বলেই মনে করেন আলী হোসেন। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ডাকাতি করেছেন, বারবার কারাভোগ করেছেন তিনি। অনেক টাকাও পেয়েছেন। কিন্তু কাজে লাগাতে পারেন নি। খারাপ কাজের টাকা হাতে থাকে না, কাজে লাগে না বলে বিশ্বাস করেন। তাই এখন ডাকাতি ছেড়ে দিয়েছেন। তবু ডাকাত হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে রাজি না তিনি। তার ছেলে-মেয়েদের কেউ ডাকাতের বাচ্চা বলুক এটি চান না এই পিতা।
সম্প্রতি আলী হোসেনের ডাকাত জীবন নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, গ্রামের বাড়ি পদ্মার তীরবর্তী এলাকায়। ছোটবেলায় মা মারা যান। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। একে তো বাবার দ্বিতীয় সংসার, তারমধ্যে ছিল অভাব। গ্রামে থাকতেই ছোটখাটো চুরি করতেন। তবে, গ্রামে চোর হিসেবে পরিচিতি গড়ে উঠেনি। একপর্যায়ে মা-বাবাকে না জানিয়েই পা দেন ঢাকায়। এখানে সদরঘাটে, কমলাপুরে থেকেছেন দীর্ঘদিন। শিখেছেন গাড়ি চালানো। প্রাইভেট কার চালাতেন। গাড়ি চালাতে গিয়েই পরিচয় হয় গাজীপুরের এক ছিনতাইকারীর সঙ্গে। সময়টা ২০০০ সাল।
যোগ দেন এ চক্রে। আলী হোসেনের কাজ ছিল, যততত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানো। গাড়িতে আগেই কয়েক যাত্রীবেশী ছিনতাইকারী বসে থাকতো। কখনো কখনো রাস্তা থেকে যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীদের তোলা হতো। প্রথম কাজেই প্রায় ৩০ হাজার টাকায় পেয়েছিল তাদের দল। একেক দিন একক এলাকা টার্গেট করতো তারা। কখনো ফার্মগেট, কখনো মতিঝিল। গণপরিবহনের জন্য মানুষ সড়কে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অতিষ্ঠ হয়ে যেত। তখন প্রাইভেট কার নিয়ে ডাকলে সহজেই যাত্রী মিলতো। এ বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি জানান, রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফামর্গেট থেকে এক পুরুষ ও এক নারীকে গাড়িতে তোলেন। তারা যাবেন মিরপুর-১১তে। গাড়িতে আগে থেকেই তার দু’জন লোক ছিল। খামার বাড়ি থেকে নেন আরো দু’জনকে। এই চারজনই তাদের দলের সদস্য। গাড়িতে খেলনা পিস্তল আর ধালালো অস্ত্র ছিল।
গাড়িটি সংসদ ভবন এলাকা পেরিয়ে যেতেই ভেতরে দুই যাত্রীকে জিম্মি করা হয়। পুরুষ লোকটি চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার মুখ চেপে হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাদের এক সদস্য। রক্ত দেখার সঙ্গে সঙ্গেই অজ্ঞান হয়ে যায় ওই লোকের স্ত্রী। এরমধ্যেই ওই নারীর পরনে থাকা স্বর্ণালঙ্কার ও পুরুষ লোকটির মানিব্যাগ রেখে আগাওগাঁও এলাকায় ফেলে চলে যায় তারা। এভাবেই একের পর এক ডাকাতি-ছিনতাই করছিল এই চক্র। একপর্যায়ে তারা খোঁজ পান পুলিশের পোশাক কিনতে পাওয়া যায়। অন্য একটি গ্রুপের মাধ্যমে ঢাকার একটি মার্কেট থেকে তিন সেট পুলিশের পোশাক ক্রয় করেন। আলী হোসেন জানান, গাড়ি চালাতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সখ্যতা হয়েছিল তার। মাঝে-মধ্যে তার গাড়ি রিকুইজিশন করতো তারা। সেখান থেকেই পুলিশের ব্যাজ সম্পর্কে ধারণা পান। সেই অনুসারেই এএসআই ও কনস্টেবলের পোশাক কেনেন। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটেন। ডাকাতির প্রস্তুতি থেকে ডাকাতির সময় পর্যন্ত র‌্যাঙ্ক অনুসারেই ‘স্যার’ সম্বোধন করে কথা বলতো তারা। আশপাশের কেউ দেখে বুঝতেই পারবে না তারা পুলিশের সদস্য না। এমনকি কনস্টেবলের কোমরে থাকতো হ্যান্ডকাপ।
ডাকাতির কৌশল সম্পর্কে তিনি আরো জানান, পুলিশের পোশাক পরে গাড়ি ছিনতাই শুরু করেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা দেখে হাত ইশারায় ডেকে থামাতেন। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত তিনজন অংশ নিতো। সঙ্গে রাখতো নেশা জাতীয় ওষুধ মিশ্রিত খাবার। পুলিশের পোশাক পরিহিত দেখে বিশ্বাস করে সহজেই তাদের দেয়া খাবার খায়। এ ছাড়া যেকোনো নির্জন স্থানে থামাতে বললে থামাতে আপত্তি করে না। এমনকি কিছু কেনার অজুহাতে চালককে গাড়ি থেকে নামিয়ে পাশের দোকানে পাঠিয়ে নির্বিঘ্নে গাড়ি চুরি করা যেত বলে জানান আলী হোসেন। এরকম নানা কৌশল খাটিয়ে চুরি-ছিনতাই করা গাড়িগুলো বিক্রি করতো আরেক পার্টি। গাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করে দিতো। এমনকি গাড়ির চেসিস নম্বর পরিবর্তনসহ ভুয়া কাগজপত্র তৈরির কাজটিও করতো তারা। পাঞ্চ মেশিনের গাড়ির চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর পরিবর্তন করে বিআরটিএ’র মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে গাড়ি বিক্রি করতো এই চক্র। তবে, তাদের সবাইকে চিনতেন না বলে জানান আলী হোসেন। দু’এক জনের সঙ্গে যোগাযোগ হতো। তাদের মাধ্যমেই এই কাজগুলো করানো হতো। আলী হোসেন বলেন, এই লাইনে কেউ নিজের আসল পরিচয় দেয় না। গোপন রাখে। আমরা একে অন্যের বাড়ির ঠিকানা পর্যন্ত জানতাম না।
নেশা জাতীয় ওষুধ মেশানো সম্পর্কে তিনি জানান, ওষুধ গুঁড়া করে ঢুকানো হতো ডিমের ভেতরে। এ জন্য কাঁচা ডিমের কিছু অংশ ভেঙে জুস পানের পাইপের মাধ্যমে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো। পরবর্তীতে ডিমটি ভাত রান্নার সময় উপরে রেখে সিদ্ধ করে ডিমের ভাঙা অংশে আটা দিয়ে খোসা লাগানো হতো। তখন  বোঝার উপায় থাকে না এই ডিমটি ভেঙে ওষুধ ঢোকানো হয়েছে। তারপর ওষুধ মেশানো ডিমটি দেয়া হতো নির্ধারিত ডিম বিক্রেতার কাছে। চক্রের সদস্যরা চালককে নিয়ে ডিম খেতে গেলে ওষুধ মেশানো ডিমটি বের করে দেয় বিক্রেতা। এভাবেই চালককে অজ্ঞান করে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যেত তারা। এ ছাড়াও মাস্টার কিউ ব্যবহার করে গাড়ি নিয়ে যেত চক্রের সদস্যরা। আলী হোসেন জানান, গত বছরের মে মাসে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তারপর দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়েছেন তিনি। আলী হোসেন বলেন, এসব টাকা আমার কোনো কাজে আসেনি। শুধু বদনাম হয়েছে। তাই এই পথ ছেড়ে দিয়েছি। এখন নিজের পাপের জন্য মাফ চাই। নামাজ পড়ি। এখন গাড়ি চালক হিসেবে সৎভাবে বাকিটা জীবন কাটাতে চান বলে জানান তিনি।

নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে শাস্তি হয়নি কারো by শুভ্র দেব

রাজধানীর নিমতলী এলাকার ৪৩ নম্বর বাড়ি। এই বাড়িতেই ২০১০ সালের ৩রা জুন রাতে এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ভয়াল এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি হয় ১২৪ জন নারী-শিশু ও পুরুষের। বর্তমানে ওই বাড়ির নিচতলার একটি গোডাউন ভাড়া নিয়ে ডেকোরেটর্সের ব্যবসা করছেন ৭০ বছর বয়সী হাজী সাদেক খান। প্রায় ৯ বছর আগের অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর সাদেক খান অনেকটা উত্তেজিত হয়ে বলেন, কী হবে এসব শুনে। কেউ কিছু করতে পারব না। কেউ মা হারিয়েছে, কেউ বাবা আবার কেউবা সন্তান।
যার গেছে সেই বুঝে। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হলো না।
বাড়ির মালিক, কেমিক্যাল গোডাউনের মালিকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি। এ ঘটনায় আমি নিজেও এক ছেলে এবং এক মেয়েকে হারিয়েছি। প্রতি বছর ৩রা জুন এলে আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেক দাবি দাওয়ার কথা তুলে ধরি। কিন্তু কোনও দাবি আর মেনে নেয়া হয়নি।
২০১০ সালের ৩রা জুন থেকে ২০১৯ সালের ১লা মার্চ। কেটে গেছে লম্বা এক সময়। আর তিন মাস পরে নিমতলী ট্র্যাজেডির নয় বছর পূর্ণ হবে। লম্বা এই সময়ে এ ঘটনায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাতো দূরের কথা থানায় একটি মামলা দায়ের করাও হয়নি। বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহিদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, ওই ঘটনায় নিয়মিত কোনো মামলা হয়নি। একই থানার আগের ওসি আবদুল কুদ্দুস ফকির বলেন, আমার জানামতেও কোনো মামলা হয়নি। শুধুমাত্র ওই সময় একটা জিডি হয়েছিল। নিমতলীর এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা বলছেন, এত মানুষের প্রাণহানির পরেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এছাড়া সরানো হয়নি কেমিক্যালের কারখানা-গুদাম। বরং এখনও গোপনে এই এলাকার কিছু লোভী বাড়ির মালিক বেশি মুনাফার জন্য কেমিক্যাল গুদামের জন্য বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন। ওই এলাকার বাসিন্দা সাদেক খান বলেন, মানুষ থাকার জন্য বাড়ি বাড়া দিলে দুই মাসের অগ্রিম ও মাসে মাসে ৭-৮ হাজার টাকা করে ভাড়া পাওয়া যায়। তাই কিছু কিছু বাড়ির মালিক কেমিক্যালের গুদামের জন্য ভাড়া দিয়ে মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা ভাড়া ও কয়েক লাখ টাকা অগ্রিম নিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর সিটি করপোরশেন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল একাধিক তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছিল ওই এলাকায় মোট ২ হাজার ৭৯টি কেমিক্যাল গুদাম ছিল। এর মধ্যে আট শতাধিক বৈধ ছিল। বাকি ১ হাজার ২৭৯টি অবৈধ। ওই সময় তদন্ত কমিটি বৈধ-অবৈধ সব গুদামই কেরানীগঞ্জের আশেপাশে নেয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু সেগুলো এখনও সরানো হয়নি।
এছাড়াও নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করেছিল। মূলত আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে দেয়ার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে ১৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে আরো তিনটি উপকমিটি করা হয়েছিল। কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছিল, কেমিক্যাল গুদাম ও কারখানা করার ক্ষেত্রে যে সব নীতিমালা মানা প্রয়োজন তার কোনোটিই মানা হচ্ছে না। এসব নীতিমালার মধ্যে রয়েছে এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, এসিড নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, বিস্ফোরকদ্রব্য আইন, পরিবেশ আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। ওই সুপারিশে কিভাবে বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ আমদানি, মজুত, বিক্রি ও পরিবহন করা হচ্ছে সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আভাস দেয়া হয়েছিল। তারপরও রাসায়নিক  কেমিক্যালের গুদাম ও কারখানা সরানো হয়নি। এছাড়া কারখানা পরিচালনার কোনো নীতিমালাও মানা হয়নি। নিমতলীর মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মতো আর যাতে কোনো ঘটনা না ঘটে সেজন্য নিমতলী নবাব কাটারা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মো. হুমায়ুন গোলা মানবজমিনকে বলেন,  আমিও জানি কোনো মামলা করা হয়নি। কাউকে কোনো শাস্তি দেয়া হয় নাই। এত বড় একটা ঘটনার পর কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করা ও শাস্তি না দেয়া খুবই দুঃখজনক। জড়িতদের শাস্তির ব্যাপারে আমরা এখনও দাবি তুলে যাচ্ছি। তিনি বলেন, এতগুলো মানুষের প্রাণহানি কেমিক্যাল কারখানা ও গুদামের জন্যই ঘটেছে। অথচ এখন পর্যন্ত এগুলো সরানো হয়নি। নিমতলীতে এখনও অনেক কেমিক্যালের গুদাম, প্লাস্টিক কারখানা রয়েছে। এগুলো সরানোর ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নাই। আমরা প্রথম প্রথম বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হানা দিয়েছি। অনেক কারখানা অন্যত্র সরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এক সময় গিয়ে থেমে যায়। তিনি বলেন, শুধু নিমতলীবাসীই নয় পুরো পুরান ঢাকাই ঝুঁকির মধ্যে আছে।
নিমতলীর মায়ের দোয়া লেডিস টেইলার্সের মালিক মো. সেলিম মানবজমিনকে বলেন, অনেক কিছুই বলতে চাই কিন্তু বলে কোনো লাভ নাই। বলতে বলতে এখন ক্লান্ত হয়ে গেছি। তিনি বলেন, চোখের সামনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যে বাড়িতে আগুন লেগেছে। কত মানুষ যে আগুনে পুড়ে মারা গেছে তার হিসাব নাই। আমার দোকানের একজন কর্মচারীও মারা গেছে। অনেকে বলেছেন বিদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণ হয়ে এই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মূল ঘটনা ঘটেছে কেমিক্যাল থেকে। ঘটনার তদন্তে এমন সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও এই এলাকায় এখনও অনেক কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম ও প্লাস্টিক কারখানা রয়েছে। নিমতলী এলাকার বাসিন্দা রিপন বলেন, সে দিনের অগ্নিকাণ্ডে আমি আমার মা, বোন, ভাগ্নে, মামি, মামাত ভাই, খালাকে হারিয়েছি। তাই এখন আমরা কেমিক্যালের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। এলাকার যেখানেই কেমিক্যালের দোকান দেখছি সবাই মিলে গিয়ে সেটা সরানোর চেষ্টা করছি।

একজন আনু মুহাম্মদের চোখে উন্নয়ন ও গণতন্ত্র by মরিয়ম চম্পা

মা। মানুষের জীবনে শৃঙ্খলার প্রতীক। খুব অল্প বয়সে মা’কে হারান। এই দুর্ভাগ্য তাকে তাড়া করে ফিরেছে বহুদিন। মুক্তিযুদ্ধ তাকে আলোড়িত করেছিল ভীষণভাবে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে যোগ দেন মিছিলে। স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি চেষ্টা করে যুদ্ধে যোগ দেয়ার। ধরা পড়েন রাজাকারদের হাতে। বেঁচে যান অলৌকিকভাবে। সেই যে যুদ্ধ শুরু তা আর থামেনি।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ থেকে সুন্দরবন। দেশের সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। আক্রান্তও হয়েছেন। চিরকালের লড়াকু আনু মুহাম্মদ। তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব। ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক। পেশা শিক্ষকতা। বাংলাদেশের প্রচলিত উন্নয়ন আর গণতন্ত্র নিয়ে রয়েছে তার নিজস্ব ভাবনা। মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কথা বলেছেন, জীবনের প্রায় সব অধ্যায় নিয়েই।
আনু মুহাম্মদ বলেন, আমার জন্ম নানা বাড়ি। ১৯৫৬ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর। বাংলায় আশ্বিন মাস। সময়টা ছিল অভাবের। দুই বছরের মধ্যেই ঢাকায় আসা। আমরা থাকতাম কমলাপুর। বাবা ছিলেন কলেজ শিক্ষক। একপর্যায়ে চলে আসি খিলগাঁও আবাসিক এলাকায়। সেখানে থাকতেই আমি স্কুলে ভর্তি হই। প্রথম স্কুল সিদ্ধেশ্বরী প্রাথমিক স্কুল। ওখানে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পর খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় নিউ মার্কেটের কাছে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে কয়েকটি সিট খালির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। এই স্কুল ছিল তখন দেশ সেরা। আব্বা আমাকে ওখানে ভর্তি করার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পাস করে ওখানে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। এর আগে আমার জীবনে বড় ধরনের একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে বার্ষিক পরীক্ষা দেয়ার পরে আমার মা মারা যান। তখন আমার বয়স মাত্র ১১ বছর। আমরা ৭ ভাই-বোন। আমি তৃতীয়। সবার ছোট বোনের বয়স ছিল তখন মাত্র দুই বছর। মাকে হারিয়ে আমরা ৭ ভাইবোনসহ পরিবারের সবাই একটি দুর্যোগের মধ্যে পড়ে যাই।
মা না থাকার কারণে পড়ালেখা ও স্কুলের তদারকির বিষয়টি কিছুটা কমে যায়। তাই আমি যখন ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হই তখন আমার বাউণ্ডুলে অবস্থা। এর ফলে স্কুলে আমার অনিয়ম হতো অনেক। বাসে করে স্কুলে একা একাই যেতাম। তবে বই পড়ার অভ্যাস ছিল ছোটবেলা থেকেই। স্কুলে অনিয়মিত হলেও বইপড়া বাড়তে থাকে। অনিয়মিত হবার কারণে ক্লাসে আমার নাম কাটা যায়। তখন হেড স্যার ছিলেন খুব বিখ্যাত লোক খান মোহাম্মদ সালেক। অনুরোধ করলে ক্ষমা চাইলে হয়তো কাজ হতো। কিন্তু তখন অনুরোধ করতে ইচ্ছা করলো না। এরপর ১৯৭০ সালে ভর্তি হলাম ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। সেখানে এসে অতো বেশি ভালো লাগেনি। ওখানেও অনিয়ম হতে লাগলো। ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চে একটি বড় ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িয়ে গেলাম। সেসময় আমি স্কুলে যাচ্ছিলাম। তখন রামপুরা থেকে সদরঘাটগামী একটি বাসে করে স্টেডিয়ামের সামনে গেলে দেখি ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে। বাস থেকে নেমে গিয়ে দেখি ওখানে পাকিস্তান এবং নিউজিল্যান্ডের খেলা হচ্ছে। পুরো স্টেডিয়ামের দর্শকরা তখন পাকিস্তানের পক্ষে।
ওইদিন দুপুর ১২টায় ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন ‘জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত’। কয়েক মিনিটের মধ্যে স্টেডিয়ামের পরিবেশ বদলে গেলো। যে পাকিস্তান টিমের পক্ষে পুরো স্টেডিয়ামের মানুষের সাপোর্ট ছিল সেই পুরো স্টেডিয়াম দেখা গেলো পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে গেছে। তখন পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের পেছনে বাঁশ-আগুন ইত্যাদি নিয়ে দৌড়াচ্ছে মানুষ। ওখান থেকেই প্রথম মিছিল বের হয়। আমিও মিছিলের সঙ্গে বেরিয়ে গেলাম।
কোথায় কোথায় গেলাম মনে নেই। সারা দিন মিছিলে মিছিলে ছিলাম। ওইদিন থেকেই শুরু হয়ে গেল স্বাধীনতার সংগ্রাম। ২৫শে মার্চ পর্যন্ত চলল। ২৫শে মার্চ এলাকার বড় ভাইদের সঙ্গে মিলে আমরা ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করলাম। অনেক রাতে যখন প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হলো তখন আমরা বাসায় গেলাম। তারপরতো ৭১ সালে অনেক ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। রাজাকারদের হাতে বন্দি হলাম। মার খেলাম। এরপর একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। রাজাকাররা যে ঘরে আমাদের বন্দি করে রাখে সেই বাড়ির এক মহিলা রাতের বেলা আমাদের দুজনকে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। অথচ দুদিন আটকে রেখে পরের দিন খুব সকালে আমাদেরকে ক্যান্টনমেন্টে হস্তান্তরের কথাবার্তা শুনেছি। সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলাম।
১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে মেট্রিক পরীক্ষা শুরু হয়। নকলে পরিপূর্ণ খুবই খারাপ একটি পরীক্ষা ছিল সেটা। ’৭৩ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। সেসময় আমার একটি সাইকেল ছিল যেটা দিয়ে ঢাকা কলেজে যেতাম, শহরে ঘোরার একটি স্বাধীনতা ছিল। সাইকেলে করে অনেক সেমিনারে যেতাম, লাইব্রেরিতে যেতাম। মুক্তিযুদ্ধের কারণে অনেকের মতো আমারও মানসিক বয়স বেড়ে গিয়েছিল। অনেক বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয় তখন। যেটা ওই বয়সে হওয়ার কথা না। রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ পরিবর্তন ইত্যাদি। বিভিন্ন দলের অফিসে যেতাম। স্টাডি সার্কেলে যেতাম। লেখালেখি করতাম। লেখালেখির সূত্রে বিচিত্রার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে বিচিত্রায় আমি নিয়মিত লেখালেখি করি। ৭৪ সালে দেশে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় তখন সাইকেল দিয়ে ঢাকা শহরে ঘুরতাম আর দুর্ভিক্ষের ওপর বিচিত্রায় সিরিজ লিখতাম। সিরিজের নাম ছিল ‘আপনারা কেমন আছেন।’
১৯৭৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে ৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। জাহাঙ্গীরনগরে যাওয়াটা আমার পরিকল্পিত ছিল না। আম্মা আব্বার ইচ্ছা অনুযায়ী আমার ভর্তি হওয়ার কথা মেডিকেল কলেজে। ডাক্তার হওয়ার কথা ছিল। মেডিকেল কলেজে গিয়ে মনে হলো আমি এটার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারব না। দ্বিতীয়বার ভর্তি নোটিশ পেয়ে জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হই। কারণ আমার হলে থাকার ইচ্ছা। তারপর বিভিন্ন লেখালেখি, সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই। ৮১ সালে মাস্টার্স পাস করি। এরপরতো শিক্ষকতা শুরু হয়।
যৌবনে রোমান্টিকতা প্রসঙ্গে বলেন, রোমান্টিক সময়তো মানুষের সবসময়ই থাকে। রোমান্টিকতার কি কোনো বয়স লাগে না কী। এটা সবসময় সব বয়সেই থাকে। স্কুল জীবনে দু-একজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগটা বেশি হয়। মাস্টার্স পরীক্ষা দেয়ার পর আমার বর্তমান জীবনসঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। এবং আমরা ১৯৮৫ সালে বিয়ে করি। বর্তমান ও আগের সময়ের সম্পর্কের সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে টেকনোলজির কারণে এখনকার ছেলে মেয়েদের সম্পর্কগুলো অনেকটা পজেটিভ। কারও জন্য কোনো বিরতি বা সময় থাকে না। সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা ভাবনার সময়ও নেই। আগে যেটা ছিল একজন আরেকজনকে চিঠি দিতে গিয়ে একবার লিখলো দুইবার তিনবার। চিঠিটা পাঠালো।
এর মাঝে একবার ভাবার সময় পেলো। এরপর দু-জনের দেখা হলো। সম্পর্কটা টিকে থাকা না থাকার জন্য যে সময়গুলো দরকার সে সময়গুলো উভয়পক্ষই পেতো। এখনকার সময়ে মোবাইলে ফেসবুকে একটি মেসেজ লিখে সরাসরি পাঠিয়ে দিচ্ছে। রিভাইজ বা চিন্তা করারও সময় নেই। সারাক্ষণই কথা বলছে। সম্পর্কেও ভাঙন সবসময় খারাপ নয়। জোর করে বা সমাজের ভয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। এ ছাড়া ছেলেদের পাশাপাশি এখনকার মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। তার ফলে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বেড়েছে।  
আনু মুহাম্মদ বলেন, বর্তমান সময়ে সারা দুনিয়াতে বেকারত্ব বিশেষ করে স্থিতিশীল কাজের সংকট অনেক বেড়েছে। অনেকরকম কাজ আছে ঠিকই কিন্তু গুণগত দিক থেকে ভালো নয়। আমাদের সমাজে এখন যাদের হাতে ক্ষমতা বা প্রচুর টাকা আছে তাদের জমি দখল করতে হয়। বন দখল করতে হয়। এই ক্ষমতাবানদের জন্য দরকার হয় বড় বাহিনী। যারা তাদের কাজের সাহায্য করবে। এভাবে কিন্তু সন্ত্রাসী তৈরি হয়। তরুণদের যে মাস্তানি ও সন্ত্রাস আমরা দেখি এর বড় পৃষ্ঠপোষক থাকে ক্ষমতাবান লোকেরা। থানার সোর্স, ডেসটিনির মতো জালিয়াতি ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, নারী শিশু পাচার ইত্যাদিতে কর্মসংস্থান তো বেকারত্বেও সমাধান বলা যায় না। কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ, অনিশ্চিত, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সম্মানজনক নিরাপদ কাজের অভাব অনেক বেশি। লেখাপড়া শিখেও একটি টেকসই, স্থিতিশীল ও সম্মানজনক কাজের বড় সংকটের জায়গা তৈরি হয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরে যে কাজগুলো তৈরি হচ্ছে এসব কাজের কিন্তু নিশ্চয়তা নেই। যেকোনো সময় কাজ চলে যেতে পারে। সেখানে কাজের চাপ অনেক বেশি।
সম্মানজনক বেতন নিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এর ফলে একজনকে দুই থেকে তিনটি কাজ খুঁজতে হয়। অথচ একটি চাকরি করে পুরো একটি পরিবার চালানোর কথা। কিন্তু সেটা এখন সম্ভব নয়। বাঁচার মতো বেতন মজুরি কাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে সমাজের মধ্যে বড় একটি টেনশন তৈরি হয়েছে। এর ওপর নিয়োগ বাণিজ্য গত কয়েক বছরে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে।
দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার যেগুলোকে উন্নয়ন বলছে সেগুলোকে আমি উন্নয়ন বলতে রাজি না। সরকার এখন উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, সেতু এগুলোকেই বোঝায়। কোনো চিন্তা ভাবনা না করে খরচ, পরিবেশগত চিন্তাভাবনা, যে টাকায় করা হচ্ছে সে টাকায় এরচেয়ে ভালো কাজ করা যেত কিনা এসব কিছুই ভাবা হচ্ছে না। শিক্ষা চিকিৎসার বেশি বেশি বাণিজ্যিকীকরণ, সর্বজনের সম্পদ নদীনালাখালবিল বন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে স্থানান্তরই উন্নয়ন হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। নির্মাণকেন্দ্রিক উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের যে আগ্রহ এর একটি বড় কারণই হচ্ছে এই প্রকল্প নিয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই। যে কাজ ১শ’ টাকায় করা যায় সেটা ৫শ’ টাকায় করা হচ্ছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীনের থেকে ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি খরচে প্রকল্প ব্যয় হচ্ছে। এক পদ্মা সেতুর বিজ্ঞাপনে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে পুরো দেশের প্রচুর ভাঙ্গাচুরা রাস্তাঘাট আর সেতু। এটাকে উন্নয়ন প্রকল্প না বলে বিজ্ঞাপন প্রকল্প বলাই সঙ্গত। যেসব ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়েছে সেগুলো আরো কম খরচে আরো ভালোভাবে করা যেত। চট্টগ্রামে এমন ফ্লইওভার আছে যেটা ব্যবহারই হচ্ছে না।
সুন্দরবন শেষ হয়ে যাবে এমন প্রকল্প করা হচ্ছে রামপালে। যেটা নিয়ে গত ৭ থেকে ৮ বছরে অনেক আন্দোলন হয়েছে। দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে এটা দেশের জন্য ভয়ঙ্কর ও ক্ষতিকারক। এটার সঙ্গে ভারতের অনেকগুলো কোম্পানি জড়িত। এ ছাড়া সুন্দরবন এলাকায় যারা জমি ও বন দখল করে তারা বন দখল করার প্রকল্প নিয়েছে। পুরো সুন্দরবনটি দেশি বিদেশি দস্যুতার শিকার হচ্ছে। রূপপুরে পারমাণবিক প্রকল্প শুরু হয়েছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা দিয়ে। সেটা এখন চলে গেছে ১ লাখ কোটি টাকায়। কেন বেড়েছে এটা নিয়ে জনগণের কাছে সরকারের কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই প্রকল্প নিয়ে সরকার গৌরবের গাঁথা তৈরি করছে। অথচ এটি বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদ প্রকল্প। সড়ক সেতু যোগাযোগ সেগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে যেখানে ভারতের ট্রানজিট সম্পর্কিত। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজিক স্বার্থ আর দেশি বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যবসাই বিভিন্ন প্রকল্পের পেছনের শক্তি। এরজন্য দেশ বেশি বেশি ঋণ আর পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় বিপদে।
যেগুলোকে উন্নয়ন প্রকল্প বলা হচ্ছে সেগুলো স্বল্প মেয়াদেই দেশের জন্য অনেকগুলো বোঝা হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি আর্থিক বিপদ ও পরিবেশগত মহাবিপদ তৈরি হবে। এখনই বায়ুদূষণ পানিদূষণ জীবনমানে বাংলাদেশ বিশ্বেও একেবারে নিচের সারিতে। একে কীভাবে উন্নয়ন বলবো?  প্রকল্পগুলো যারা তৈরি করছে তারা লাভবান হবে। দেশি বিদেশি অনেক গোষ্ঠি এর থেকে অনেক মুনাফা লাভ করবে। পক্ষান্তরে দেশের মানুষ দীর্ঘ মেয়াদের বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবে। এই ধরনের উন্নয়নের সুবিধাভোগী ও সহযোগীরাই ব্যাংক লুট করছে। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৫০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বিদেশে। আমাদের শিক্ষা খাতে বা চিকিৎসা খাতে যে ব্যয় ধরা হয় তার থেকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে যায় প্রতিবছর। 
তিনি বলেন, গত নির্বাচন কোনো নির্বাচন ছিল না। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হবে যে কিভাবে নির্বাচনের নামে কতো ভয়াবহ তামাশা করা যায়। এই ধারা বিশ্লেষণ করেই এখন আন্তর্জাতিকভাবে একটি তত্ত্ব আলোচনা হচ্ছে- ‘নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ’। নির্বাচনকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেখে পুরো ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচন, পুলিশ, আইন-আদালত, আমলাতন্ত্র কোনোটারই কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। সবগুলোই হচ্ছে সরকারের কর্তৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান। যার ফলে একটি একচেটিয়া কর্তৃত্ববাদ জন্ম নিয়েছে যা এই মাত্রায় বাংলাদেশে এর আগে দেখা যায়নি।
দীর্ঘ ৪৭ বছরে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাংলাদেশে ঠিকমত দাঁড়াতেই পারেনি। কিন্তু এখন একচেটিয়া কর্তৃত্ববাদ যে মাত্রায় দেখা যাচ্ছে তার কোনো পূর্বদৃষ্টান্ত নেই। সেটারই ধারাবাহিকতায় এখন যে উপজেলা নির্বাচন এবং ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে সেটার যে ভিন্ন ফল হবে না তা বোঝার জন্য খুব বড় ব্যাখ্যার দরকার হয় না। সরকার অতুলনীয় দক্ষতা দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তামাশায় পরিণত করেছে। এরকম দক্ষতা যদি তারা অন্য কোনো কাজে লাগাতো তাহলে বাংলাদেশ অনেক ভালো অবস্থায় থাকতে পারতো। নদী বন শিক্ষা চিকিৎসা সন্ত্রাস মাদক সড়ক দুর্ঘটনা এসব ক্ষেত্রে তো কোনো দক্ষতা দেখা যায় না।
তিনি বলেন, আমার লেখা প্রথম বই হচ্ছে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ। এ পর্যন্ত আমার লেখা প্রায় ৩৫টি বই বেরিয়েছে। পুরো নাম আনু মুহাম্মদ আনিসুর রহমান হলেও আনু মুহাম্মদ নামেই অধিক পরিচিত তিনি। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। ঢাকায় লেখাপড়া শেষ করে ১৯৮২ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগদান করেন। এছাড়া একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগেও শিক্ষকতা করেছেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন ও আধিপত্য বিরোধী তত্ত্বচর্চ?া ও লড়াইয়ে সক্রিয় অংশ নেন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ যেকোনো প্রকার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে তিনি তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব।

রেজাউলের বন্ধুর আক্ষেপ

চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ রেজাউল করিম (২১) নামে আরেক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ভোর ৫টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। নিহত রেজাউলের শরীরের ৫১ শতাংশ আগুনে দগ্ধ ছিল। রেজাউলের বন্ধু মো. মফিজুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার দিন রেজাউল অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পরে চুড়িহাট্টা থেকে ইসলামপুর পর্যন্ত রাস্তায় এলোমেলোভাবে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। চিৎকার করে সে সবার সাহায্য চায়। তাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে বলেন। কিন্তু উপস্থিত সকলেই রেজাউলের ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। একবারের জন্যও কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন নি।
এ সময় একজন রিকশাচালক তাকে পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে দেখে নিজ রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই আমি রেজাউলকে বারবার ফোন দিতে থাকি। অনেকবার ফোন দেয়ার একপর্যায়ে উক্ত রিকশাচালক ফোন রিসিভ করে জানায় রেজাউলকে তিনি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে এসেছেন। তার অবস্থা ভালো নয়। যত দ্রুত সম্ভব তাকে ভর্তি করতে হবে। আমি তৎক্ষণাত হাসপাতালে আসি। এবং রেজাউলকে হাসপাতালে ভর্তি করে তার পরিবারের সদস্যদের খবর দিই। সঠিক সময়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে পারলে হয়তো সে বেঁচে যেতো। রেজাউল মিটফোর্ডের একটি সিরামিকের দোকানে কাজ করতো। আমি একটি পলিথিন ব্যাগ প্রস্তুতকারক ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। গত ৫ বছর ধরে তার সঙ্গে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব। অবসর পেলেই দুই বন্ধু মিলে আড্ডা দিতাম। অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পরে তার সঙ্গে আমার আর কোনো কথা হয় নি। অনেক চেষ্টা করেছি।
কিন্তু আইসিইউতে ভর্তি থাকায় শেষ বারের মতো বন্ধুর সঙ্গে একটি কথাও বলতে পারিনি। খুব কাছের বন্ধুকে হারিয়ে এভাবে শোক প্রকাশ করেন মফিজুল। এতদিন বন্ধুর শারীরিক অসুস্থতা এবং নিজের কাজের ব্যস্ততার কারণে হাসপাতালে নিয়মিত যেতে পারেন নি। ইচ্ছা ছিল গতকাল বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবে। কিন্তু সেটা আর হলো না। কিছু না বলেই ওপাড়ে চলে গেলেন রেজাউল। তিনি বলেন, রেজাউলের বাবার নাম বিল্লাল ব্যাপারি। তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছোট পরিসরে ফাস্টফুডের ব্যবসা করতেন। তিন ভাই বোনের মধ্যে রেজাউল মেজ। মা গৃহিণী। গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মোহাম্মদপুরের ঘাটারচর এলাকায় থাকতেন। পরিবারের অভাব অনটনের কারণে এসএসসি পাস করার পর আর পড়ালেখা করতে পারেনি রেজাউল। বাবা ও ছেলের উপার্যনের টাকায় চলতো তাদের ৫ সদস্যের সংসার। রেজাউলের মৃতদেহ রায়েরবাজারে দাফন করা হয়েছে।       
উল্লেখ্য, রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৭০ জনে। এর আগে সোমবার রাতে ঢামেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিকশাচালক আনোয়ার হোসেন ও সোহাগ নামে দু’জনের মৃত্যু হয়। গত ২০শে ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার পর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের আবাসিক ভবনে। ঘটনার দিনই ৬৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া দগ্ধদের ঢামেকসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সড়কে যে কারণে মৃত্যুর মিছিল

এ মিছিলের কোনো শেষ নেই। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। সড়কে কেন এই মৃত্যুর মিছিল। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো যদি আমরা খুঁজে বের করতে পারি তাহলে এর সমাধান করাটা খুব সহজ হবে। প্রথম কথা হচ্ছে, একটি আদর্শ সড়কে  বিজ্ঞানসম্মতভাবে যে ৬টি উপাদান থাকা দরকার সেটা এখনো আমরা তৈরি করতে পারিনি। প্রথমত পর্যাপ্ত লেন থাকতে হবে। রাস্তায় ডিভাইডার থাকতে হবে। যাতে মুখোমুখি সংঘর্ষ না ঘটে।
রাস্তার পাশে একটি সোল্ডার থাকতে হবে। একটি সফট পার্ট থাকতে হবে যেখান দিয়ে মানুষ হাঁটা চলা করতে পারবে।
কিন্তু আমাদের অধিকাংশ সড়কগুলো হচ্ছে টু ওয়ে ও টু লেন সড়ক। একদিক দিয়ে গাড়ি যায় আরেক দিক দিয়ে আসে। কোনো ডিভাইডার নেই। ফলে মুখোমুখি সংঘর্ষ অহরহ ঘটে। রাস্তার সোল্ডার যেটা আছে সেটা অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত। আবার অনেক ক্ষেত্রে থাকে না। আবার থাকলেও ভাঙাচুরা বা গুল্ম লতাপাতায় মোড়ানো ব্যবহার অনুপোযোগী। ফলে মানুষ কিন্তু বাধ্য হয়ে মূল সড়কেই চলে আসে। আবার সড়কে পর্যাপ্ত সাইনের অভাব রয়েছে। অথচ সাইন হচ্ছে রাস্তার ভাষা। রাতের বেলা রাস্তার বেরিয়ার লাইন কিন্তু সাহায্য করে গাড়ি কতটুকু যেতে পারবে অথবা পারবে না। ফলে অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় যে গাড়ি ব্যালেন্স করতে না পেরে উল্টে পড়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া রাস্তায় একটি গাইড পোস্ট থাকতে হবে। সামনে স্কুল-কলেজ বা কোনো বাজার আছে কি না এ বিষয়ে গাইড পোস্ট অনেকক্ষেত্রে থাকে না। থাকলেও ভাঙা থাকে। যেটাকে লাল কালো রং দিয়ে কালার করতে হয়। যেটায় রাতের বেলা আলো পড়লে জ্বলে। ব্রিজের ক্ষেত্রে গার্ড রেলিং দিয়ে এটার বেষ্টনী তৈরি করতে হয়। না হলে গাড়ি ১০ ফিটের জায়গা থেকে ৮ ফিটের ব্রিজে যখন চলে আসে তখন গাড়ি হয় ব্রিজের রেলিংয়ে বাড়ি লাগে অথবা ব্রিজ থেকে উল্টে খাদে পড়ে যায়। এক্ষেত্রে গার্ড রেল বা রেলিং না থাকলে ব্রিজে দুর্ঘটনাগুলো বেশি ঘটে। ডিভাইডার না থাকলে মহাসড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষগুলো বেশি হয়। রাস্তায় মার্কিং না থাকলে গাড়ি উল্টে পড়ে যায় অথবা পার্শ্ববর্তী গাছের সঙ্গে বাড়ি খায়।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশের মহাসড়কের সঙ্গে প্রচুর ইন্টার সেকশন বা আন্তঃসংযোগ রয়েছে। ফলে এসব জায়গাগুলোতে প্রচুর হাটবাজার গড়ে ওঠে। অথচ ভূমি আইন বা ল্যান্ড রুল অনুযায়ী মহাসড়কের পাশে অন্তত ৪০ ফিট বাই ৪০ ফিট দূরে বাজার, স্কুল-কলেজ, মসজিদ হওয়া উচিত। অথচ এগুলো আমরা মহাসড়কের খুব পাশেই করি। ফলে এসব জায়গায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। কারণ এসব পথে মানুষের আনাগোনা বেশি হয়ে থাকে। এসব স্থানে বাজার তৈরি করতে হলে বাজারের মুখ দিতে হবে রাস্তার ঠিক উল্টা পাশে। রাস্তার দিকে নয়। রাস্তার এই কিছু কিছু বিষয়গুলো সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
এ ছাড়া সড়ক ব্যবহারকারী অর্থাৎ চালক এবং পথচারী এদের কারণেও বেশি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। আমাদের চালকরা মানসিকভাবে খুব চাপের মধ্যে থাকে। কারণ চালককে সকালে বাসা থেকে কয়েকটি টেনশন নিয়ে বের হতে হয়। প্রথমত তার গাড়িটি হচ্ছে মালিকের। যাত্রী পাক বা না পাক প্রত্যেকদিন গাড়ির মালিককে চালকের ২ হাজার টাকা জমা দিতেই হবে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে চালকের রাস্তার কিছু খরচ আছে। তাকে প্রতিদিন অবৈধ কিছু চাঁদা দিতে হয়। এই মানসিক প্রেসার নিয়ে যখন চালক গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে বেপরোয়া হয়ে গতি বাড়িয়ে আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে সামনের যাত্রীকে নিতে চায়। গাড়ির গতি বাড়ায়। জ্যামের ফলে আটকে থাকায় জ্যাম ছাড়লে ৪ ঘণ্টার পথ দু ঘণ্টায় যাওয়ার চেষ্টা করে। এবং দুর্ঘটনা ঘটায়। কারণ চালক জানে যে এটা না করলে দিন শেষে হয়তো সে ২শ’ টাকা নিয়েও বাসায় ফিরতে পারবে না। অর্থাৎ চালকদের এখন পর্যন্ত আমরা ট্রিপ বেইস ইনকামে রেখে দিয়েছি। তাকে ২০ দিনের টাকা দিয়ে ৩০ দিন চলতে হয়। সুতরাং এই সিস্টেমটিকে যদি আমরা বদলাতে না পারি এবং সমস্যার মূলে যদি হাত না দেই তাহলে শুধু চালকদের ধরে লাভ নেই। এটা কোনো সমাধান নয়। কারণ তাদেরকে আমরা একটি বেতন কাঠামোয় বা সুস্থ সিস্টেমে আনতে পারিনি।
এ ছাড়া চালকদের তৈরি করারও একটি বিষয় থাকে। গাড়ি চালানো এমন একটি বিষয় যেখানে খুব ঠাণ্ডা মেজাজে থাকতে হয়। আমরা জানি বিমান ও লঞ্চ চালানো সহজ। কারণ এক্ষেত্রে অনেক দূরের এরিয়া নিয়ে তারা দেখতে পায়। এবং তাদের প্রতিযোগী নেই। আর গাড়ি হচ্ছে প্রতি নিয়ত প্রতিযোগিতা করতে হয়। পথচারী, অন্য গাড়ি, ট্রেন, রিকশা ইত্যাদির সঙ্গে চালককে প্রতিযোগিতা করতে হয়। অথচ আমাদের চালকরা একদম না শিখেই চলে আসে। কারণ তাদের যে ড্রাইভিং স্কুল সেখানে শিখতে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে চালক আসলেই মালিকরা তাকে নিয়ে নিচ্ছে। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনাটা অসুস্থ। প্রথমত চালকদের কোনো নিয়োগ পত্র বা পদ্ধতি নেই। আজ যে গাড়ি চালাচ্ছে কাল সে গাড়ি চালক পাবে কি না সে বিষয়টি সে জানে না। মালিক অন্য কাউকেও দিতে পারে। অতএব তারা আজকের দিনে যা কামাতে পারি এই মানসিকতায় থাকে। চালকের নিয়োগপত্র ও রাস্তায় চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে ঢাকা শহরে অনেকেই একটি মাত্র বাস নিয়ে একজন মালিক হয়ে থাকেন। এটা না করে একজন মাত্র মালিক বা কোম্পানির অধীনে সকল বাসকে নিয়ে আসতে পারলে তখন সুস্থ এবং শিক্ষিত মানুষ ব্যবসা করতে আসবে। এখন হচ্ছে অনেক মালিক এবং অনেক চালক। প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের প্রতিযোগিতা। অথচ আমরা একটি রুটে একটি ভালো কোম্পানি বা বড় কোম্পানিকে আনতে পারি। যারা কি না ৫টি কোম্পানির ১শ’ কিংবা ২শ’ বাসকে নিয়ন্ত্রণ করবে। ৫টি মিলিয়ে ১টি কোম্পানি করে তারা কিন্তু গাড়ির একই কালার করে এক টিকিটে একই সিস্টেমে চালাতে পারে। এতে যাত্রী পাওয়া নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকবে না। কারণ যাত্রীরা যে গাড়িতে উঠুক দিন শেষে টোটাল মুনাফা যা হোক না কেন প্রত্যেকেই পেয়ে যাবে। কারণ এতদিন ১টি গাড়ির মুনাফা পেলেও এখন সেটা গড়ে পাবে।
এ ছাড়া আমরা ট্রাফিক পুলিশের সিগন্যাল দিয়ে থামাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করি না। আমরা ইচ্ছামতো রাস্তা পার হতে চাই। হাত দিয়ে গাড়ি থামাতে চাই। নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে পার হই না। একেকজন একেক জায়গা দিয়ে পার হই। পথচারীরাও যেমন ঠিকমতো রাস্তা পার হই না। একইভাবে যেকোনো জায়গা দিয়ে উঠতে চাই এবং নামতে চাই। এ ছাড়া আমাদের নির্দিষ্ট বাস স্টপিসও নেই। আর থাকলেও নির্দিষ্ট স্থানে থামে না।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালকের ড্রাইভিং স্কুল, লাইসেন্স, বয়সসীমা ৩৫ বছর ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ একজন শিক্ষিত চালক নিয়োগ দিতে হবে। ড্রাইভিং স্কুল থেকে আসছে কি না একজন চালক সেটা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে আমাদের পথচারী যাত্রীরা একেবারেই অসচেতন। আমরা রাস্তার সব জায়গা দিয়ে পার হতে চাই। একমাত্র রেল আর প্লেন ছাড়া সব কিছুকেই হাত দিয়ে থামাতে চাই। ট্রেন পারি না ভয় লাগে। অনেক বড়। আর প্লেন পারি না কারণ এটা অনেক ওপর দিয়ে যায়। না হলে যাত্রীরা এগুলোও থামাতেন। আর বাকি সবগুলো কিন্তু হাত দিয়ে থামায়। কথায় আছে যে, ‘আইনের হাত অনেক লম্বা, তার চেয়ে লম্বা পথচারীর হাত’। ৭০ থেকে ১শ’ কিলোমিটার বেগে চলা গাড়িটিকে যদি হঠাৎ করে থামাতে চাই ওই মুহূর্তে চালক বুঝে উঠতে না পারার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। কাজেই একজন পথচারীর বোঝা উচিত রাস্তা পারাপারের নিয়মটা কি হবে। ফুট (ওভারব্রিজ), আন্ডার পাস এগুলো দিয়ে পার হবে।
এগুলো যদি না থাকে তাহলে অপেক্ষা করবে সিগন্যালের জন্য। কাজেই যাত্রীদের উচিত যেখানে সেখানে না ওঠা এবং না নামা। এবং পুলিশের করণীয় হচ্ছে যে ইন্টার সেকশন বা বাস স্টপিস ছাড়া যেন কোনো গাড়ি না দাঁড়ায় এটা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত চালক যেন রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যাত্রী না ওঠায় এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রত্যেকটি রাস্তায় সেফটি অডিট সম্পন্ন করতে হবে। চালকদের নিয়োগপত্রের আওতায় নিয়ে আসা। একই কোম্পানির অধীনে সব গাড়িকে নিয়ে আসতে হবে। বাস বে রাখতে হবে। পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ফুটপাথ ক্লিয়ার রাখতে হবে। পর্যাপ্ত জেব্রাক্রোসিং ও আন্ডারপাস রাখতে হবে। এতে করে সড়ক দুর্ঘটনা কমার পাশাপাশি যানজটও কমতে পারে।

অভিনন্দনের প্রত্যাবর্তন উত্তেজনা কমছে

পাকিস্তানে আটক ভারতীয় পাইলট অভিনন্দন বর্তমান ভারতে ফিরে গেছেন। তার আটক হওয়া নিয়ে তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পর অবশেষে আনন্দ-উল্লাসে মেতেছেন ভারতীয়রা। পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবও তুলনামূলক কমে এসেছে। অভিনন্দনকে বিকালে হস্তান্তরের কথা থাকলেও সকাল থেকেই ওয়াঘা সীমান্তে জড়ো হতে থাকেন ভারতীয়রা। তারা হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে, চেহারায় পতাকা অঙ্কন করে অধীর আগ্রহে অভিনন্দনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। ভারতের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন তারা। কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে ‘শান্তির ইঙ্গিত’ হিসেবে অভিনন্দনকে ফেরত পাঠায় পাকিস্তান। সন্ধ্যা ছয়টায় অভিনন্দনকে হস্তান্তর করার কথা থাকলেও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে খানিকটা বিলম্ব হয়।
ভারতে অভিনন্দনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা: শুক্রবার সন্ধ্যায় অভিনন্দনকে নিয়ে কনভয় এসে পৌঁছায় ওয়াঘা-আটারি সীমান্তের চেকপোস্টে। পরে পাকিস্তান ‘বিটিং দ্য রিট্রিট সিরিমনির’ পরই অভিনন্দনকে তুলে দেয় ভারতের হাতে। ভারত অবশ্য এদিন এই ‘বিটিং দ্য রিট্রিট সিরিমনি’ বাতিল করে দেয়। প্রথমে পাকিস্তান সীমান্তে শুল্ক ও অভিবাসনের কাজ শেষ করে অভিনন্দন প্রবেশ করেন ভারতীয় ভূমিতে। সেখানেও একদফা শুল্ক ও অভিবাসনের কাজ শেষ হওয়ার পর উইং কমান্ডার অভিনন্দনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন সেনা চিকিৎসকরা। ভারত সীমান্তে অভিনন্দনকে স্বাগত জানান এয়ার ভাইস মার্শাল আর জি কে কাপুর সহ ভারতীয় বিমান সেনার শীর্ষ কর্মকর্তারা। অভিনন্দন বর্তমান ভারতের মাটিতে পা দেয়ার খবর প্রকাশের পরই সীমান্তে উপস্থিত মানুষ উন্মাদনায় ফেটে পড়েন। অনেকে ঢাকঢোল বাজিয়ে অভিনন্দনকে বীরের অভ্যর্থনা জানান।
‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল সীমান্ত এলাকা। এরা বৃহস্পতিবার রাত এবং শুক্রবার সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলেন অভিনন্দনকে স্বাগত জানাতে। তবে সবচেয়ে আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন অভিনন্দন তার পিতা ও মাতার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। তারা গতকাল রাতেই চেন্নাই থেকে নয়া দিল্লি এসে পৌঁছেছিলেন। গতকাল দুপুরেই তারা পৌঁছান অমৃতসর। সেখান থেকে সীমান্তে। অভিনন্দনের আগমন উপলক্ষে সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সদ্য মুক্তি পাওয়া পাইলট ওয়াগা সীমান্তে ছিলেন।  সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সীমান্ত থেকে বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা ও পাইলটের পিতা-মাতাসহ অভিনন্দনকে অমৃতসরে নেয়া হবে। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে নয়া দিল্লিতে।
বৃহস্পতিবার বিকালে পাক প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তান সংসদের যৌথ অধিবেশনে ঘোষণা করেন যে, শান্তির পদক্ষেপ হিসেবে শুক্রবারই অভিনন্দনকে মুক্তি দিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হবে।  ভারত অবশ্য মুক্তি পাওয়া পাইলটকে সরাসরি বিমানে উড়িয়ে নয়া দিল্লি নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তা নাকচ করে দিয়ে জানায়, ওয়াঘা-আটারি সীমান্ত দিয়েই ভারতীয় পাইলটকে ফেরত দেওয়া হবে।
সে অনুসারে, শুক্রবার সকালে পাইলট অভিনন্দনকে প্রথমে রাওয়ালপিন্ডি থেকে লাহোরে আনা হয়। সেখানে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেড ক্রস (আইসিআরসি)-এর হাতে তুলে দেয়া হয় বিমান বাহিনীর এই উইং কমান্ডারকে। সেসময় উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানে ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধিরাও। তার পরে সন্ধ্যা নাগাদ তাকে নিয়ে আসা হয় ওয়াঘা-আটারি সীমান্তে। পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রকের এক সূত্র ডন টিভি নিউজ-কে জানিয়েছে, ভারতীয় হাইকমিশনের অ্যাটাশে জে টি ক্যুরিয়েন অভিনন্দনের সঙ্গে রয়েছেন। এর আগে কার্গিল যুদ্ধের সময়ও ভারতীয় পাইলট নচিকেতাকে পাকিস্তান রেডক্রসের মাধ্যমেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল ঘটনার আটদিনের মাথায়। ভারত অবশ্য দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক স্তরে প্রবল চাপ ও  জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ীই পাকিস্তান পাইলটকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে।  বিজেপির সভাপতি শুক্রবার পাইলটের মুক্তিকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য বলে বর্ণনা করেছেন।
পাকিস্তানে যেভাবে আটক হন অভিনন্দন: গত ২৭শে  ফেব্রুয়ারি সকালে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে প্রায় সাত কিলোমিটার ভারতের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছিল পাক ফাইটারগুলো।
তাদের মোকাবিলায় আকাশে ওড়ে ভারতের দু’টি জেট। তারই একটির ককপিটে ছিলেন অভিনন্দন। সূত্রের খবর, নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় থাকা পাক ফাইটারকে টার্গেট ‘লক ইন’ করে অভিনন্দনের বাইসন জেট। সেকেন্ডের মধ্যে মিগ-২১ থেকে আর-৭৩ এয়ার টু এয়ার মিসাইল আঘাত করে পাক ফাইটারকে। কিন্তু তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অভিনন্দনের মিগে আঘাত করে পাক জেটের গুলি। বিমান নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে রেডিও বার্তা দিয়েই ‘ইজেক্ট’ করে বিমানের বাইরে চলে আসেন তিনি। কিন্তু হাওয়ার গতি উল্টো দিকে থাকায় অভিনন্দনকে নিয়ে প্যারাশুট ভেসে যায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের দিকে। তার পরই পাক সেনারা তাকে আটক করেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে দু’জন প্রত্যক্ষদর্শীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বিমান থেকে পাকিস্তানি ভূ-খণ্ডে পড়ার পর অভিনন্দন ভারতের পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। কিন্তু যখন বুঝতে পারেন যে, তিনি এখন শত্রুর ভূ-খণ্ডে, তখন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পাকিস্তানি গ্রামবাসী তাকে দেখে ফেলে, ধাওয়া করতে থাকে। তাদের ভয় দেখানোর জন্য অভিনন্দন শূন্যে গুলি করতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ রাজ্জাক চৌধুরি বলেন, আধা কিলোমিটার দৌড়ানোর পর, সে শূন্যে আরো গুলি করতে থাকে। কিন্তু এতে গ্রামবাসীর মনে ভয় ধরাতে না পেরে সে একটি ছোট নদীতে লাফ দেয়। পরে পালানো সম্ভব না এটা বুঝতে পেরে ইউনিফর্ম থেকে কিছু দলিল ও মানচিত্র বের করে গিলে ফেলার চেষ্টা করে, বাকিগুলো পানিতে ভাসিয়ে দেয়। আব্দুল মজিদ নামের আরেক প্রত্যক্ষ্যদর্শী জানান, ভারতীয় পাইলটকে মারধর করা ও পাথর নিক্ষেপকারী গ্রামবাসীদের মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন।  তিনি বলেন, নদী থেকে সে যখন আবারো তার রিভলবার আমাদের দিকে তাক করে, সরাসরি গুলি করতে পারে ভেবে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। পরে গ্রামবাসী তাকে ধরে ফেলে। কেউ কেউ তাকে মারধরও করে। কেননা আমাদেরকে কঠিন ভোগান্তিতে ফেলেছিল সে। কিন্তু পরে আমরা তাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করি।
উন্নতি নেই কূটনৈতিক সম্পর্কে: অভিনন্দনের ফেরত পাঠানোকে কেন্দ্র করে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমলেও কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো অগ্রগতি আসেনি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মোহাম্মদ কোরেশি জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতীয় পক্ষকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে এ সপ্তাহে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিতব্য ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না তিনি।  পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানান, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বার্তা নিয়ে শিগগিরই ইসলামাবাদ সফর করবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধুবাদ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ইতিমধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃত্বকে আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই সংঘর্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছে। অভিনন্দনকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনাকে সাধুবাদও জানিয়েছেন তারা। ইতিমধ্যেই জাতিসংঘ ইমরান খানের বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে। এ ছাড়া, জর্দান ও রাশিয়া প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে ইতিমধ্যেই ট্রেন্ডিং হয়েছে যুদ্ধবিরোধী হ্যাশট্যাগ ‘সে নো টু ওয়ার’। ভারত-পাকিস্তান দুই দেশের নাগরিকরাই আওয়াজ তুলছেন শান্তির পক্ষে। অন্যদিকে পিছিয়ে নেই ‘ওয়েলকাম হোম অভিনন্দন’ শিরোনামের টুইটও।

আসুন দেশটাকে দখলে নেই: ড. কামাল

৩০ শে ডিসেম্বরের তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটা যে বেদখল হয়ে গেছে সেটাকে দখলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন দিবস উপলক্ষে আজ জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল-জাসদ এর আয়োজনে এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন,  এই দেশটা আমাদের সকলের দখলে ছিল। সেটা এখন বেদখল হয়ে গেছে। আসুন আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের যে দেশটা বেদখল হয়েছে এটা দখলে নেব। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নেব। সংবিধানের মধ্যে থেকে শাসন করব। যে ঐক্যের ভিত্তিতে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল সেই ঐক্যের ভিত্তিতে দেশ শাসন করব।
ড. কামাল হোসেন বলেন, বাংলার মাটি কোনদিন কোন স্বৈরাচারীকে মেনে নেয়নি। এখনো নেয়না। এ দেশের  স্বাধীনতা এমনি আসেনি। যারা মানুষকে বঞ্চিত করে রাখতে চায়। তারা আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের ঘোল খাওয়াতে পারে না।  আজ এখানে তরুণ-প্রবীণ যারা এসেছেন, তারা আপনাদের বাড়িতে গিয়ে বলেন,  আমরা সবাই গিয়ে এক জায়গায় বসি। আমরা সকলে মালিক হিসেবে পাড়াই পাড়াই, মহল্লায় মহল্লায়, জেলায় জেলায় গিয়ে বলি জনগণ দেশের মালিক।
তিনি বলেন,  জেলে আর জায়গা নেই। এটা একটা সুখবর। পত্রিকায় খবর এসেছে জেলে আর জায়গা নেই। এখন প্রস্তাব এসেছে নতুন করে জেল বানাতে হবে। কিন্তু একটা জেল বানাতেও তো ২/৩ বছর সময় লাগে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন,  ৩০ তারিখে যে তথাকথিত একটা নির্বাচন হয়ে গেল। কেউ কি এটাকে গুরুত্ব দিয়েছেন? যারা বলে এটা একটা নির্বাচন হয়েছে। আমি বলব আল্লাহ তাদের সুস্থতা দাও। তারা অসুস্থ। তারা সুস্থ হতে পারে না।
জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ২৯ ও ৩০ শে ডিসেম্বর সরকার  জনগণকে অপমান করেছে। আর গতকাল জনগণ সরকারের গালে থাপ্পড় মেরেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন আর রাষ্ট্র নয়। ২৯ তারিখে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটা নিহত হয়েছে। ২৯ ও ৩০ তারিখে প্রশাসন, ইউনিফরম পরিহিত বাহিনী ভোট চুরির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে বিলীন করে দিয়েছে। এটা আর এখন রাষ্ট্র নেই।
রব বলেন,  আওয়ামী লীগ একটি স্বৈরাচারের দল। কোন স্বৈরাচার সরকার থাপ্পড়ে বিদায় হয় না। তাদেরকে বিদায় করাতে হবে।
তিনি বলেন, এই সরকার আপশে বিদায় হবে না।  শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও এই সরকার বিদায় হবে কি না আমি জানিনা। তবে তাদেরকে আমাদের বিদায় করাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে রব বলেন, মিথ্যা কথা বলে হাসির জন্য নোবেল প্রাইজ কে পাবে? মোনালিসা পাবে? না। মিথ্যা কথা বলে হাসি দেয়ার জন্য নোবেল দেয়া হলে বাংলাদেশের একজন এই পুরষ্কার পাবে।
তিনি বলেন, অসুস্থ ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে দেয়া হয়নি। অসুস্থ খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রাখা হয়েছে। একের পর এক তার নামে মামলা দেয়া হচ্ছে।  তার জামিন বিলম্ব করা হচ্ছে।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন,  সমস্ত পত্রিকায় দেখেছি ভোট কেন্দ্র শূন্য ছিল। মানুষ দেখিয়ে দিয়েছে তোমরা ভোট চোর। এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে আওয়ামী লীগ মেধাশূন্য, কর্মী শূন্য ও মানুষের ভালোবাসা শূন্য। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে আমারা পরাজিত কারণ আমাদের বোঝার কিছু ভুল ছিল। আমাদের ধারণা ছিল না আওয়ামী লীগের মতো একটা দলের নীতিহীনতা এতো নিচে নামতে পারে।  আমরা সেটা বুঝতে পারিনি।
জেএসডি নিনিয়র সহ সভাপতি এম এ গোফরানের সভাপতিত্বে আরো উপস্থিত ছিলেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু প্রমুখ।

শেষ মুহূর্তে জটিলতা, রাতে ভারতীয় পাইলটকে হস্তান্তর

পাক হেফাজতে থাকা ভারতীয় পাইলট উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানকে মুক্তি দিয়েছে পাকিস্তান। শুক্রবার সন্ধ্যার সূর্য্য যখন পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়েছে ঠিক তখনই অভিনন্দনকে নিয়ে কনভয় এসে পৌঁছেছে ওয়াঘা-আটারি সীমান্তের চেকপোস্টে। বিটিং দ্য  রিট্রিট সেরিমনির পরই পাকিস্তান অভিনন্দনকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও তার হস্তান্তরের কাগজপত্র ঠিক না থাকার অজুহাতে গোটা প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। সীমান্তে এসে পৌঁছানোর পর তিন ঘন্টা ধরে নানা টানাপোড়েনের পর তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওযা হয়েছে।
তবে পাকিস্তানের এই ঢিলেমির জন্য প্রবল সমালোচনার ঝড় উঠেছে ভারতে। মিডিয়া সুত্রে বলা হয়েছে, ভারতের হাতে অভিনন্দনকে তুলে দেবার আগে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জোরপূর্বক তার বক্তব্য ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছে। সেই ভিডিও নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। শুক্রবার  সন্ধ্যার দিকে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম সুত্রে জানানো হয়েছিল অভিনন্দন ভারতের মাটিতে পা রেখেছেন। টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজেও এই খবর প্রচার করা হয়েছিল।
কিন্তু রাত যত বেড়েছে ততই অনিশ্চয়তার কথা জানানো হয়েছে। শেষপর্যন্ত বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৪০ মিনিটে পাকিস্তান সীমান্তে শুল্ক ও আভিবাসনের কাজ শেষ করে অভিনন্দন প্রবেশ করেছেন ভারতীয় ভূমিতে । সেখানেও একদফা শুল্ক ও আভিবাসনের কাজ শেষ হওয়ার পর উইং কমান্ডার অভিনন্দনকে সেখানেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন সেনা চিকিৎসকরা।
ভারত সীমান্তে অভিনন্দনকে স্বাগত জানান এয়ার ভাইস মার্শাল আর জি কে কাপুর সহ ভারতীয় বিমান বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা। অভিনন্দন বর্তমান ভারতের মাটিতে পা দিয়েছে জানার পরই  সীমান্তে উপস্থিত মানুষ উন্মাদনায় উদ্বেল হয়ে উঠেছেন। অনেকে ঢাক ঢোল বাজিয়ে অভিনন্দনকে বীরের অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল সীমান্ত এলাকা। এই জনতা বৃহষ্পতিবার রাত এবং শুক্রবার সকাল থেকেই অপেক্ষা করেছেন অভিনন্দনকে স্বাগত জানাতে। তবে সবচেয়ে আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যখন অভিনন্দন তার পিতা ও মাতার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। তারা গতকাল রাতেই চেন্নাই থেকে নয়াদিল্লি এসে পৌঁছেছিলেন। আজ দুপুরেই তারা পৌঁছে গিয়েছিলেন অমৃতসর। সেখান থেকে সীমান্তে। অভিনন্দনের আগমন উপলক্ষ্যে সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সীমান্ত থেকে বিমান বাহিনী ও পাইলটের পিতা-মাতাকে নিয়ে অভিনন্দনকে অনা হবে অমৃতসরে।
সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে নয়াদিল্লিতে।  বৃহষ্পতিবার বিকেলেই পাক প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তান সংসদের যৌথ অধিবেশনে ঘোষনা করেছিলেন, শান্তির পদক্ষেপ হিসেবে শুক্রবারই অভিনন্দনকে মুক্তি দিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হবে।  ভারত অবশ্য মুক্তি পাওয়া পাইলটকে সরাসরি বিমানে উড়িয়ে নয়াদিল্লি নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্ত পাকিস্তান সরকার তা নাকচ করে দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল যে ওয়াঘা-আটারি সীমানÍ দিয়েই আটক পাইলটকে ফেরত দেয়া হবে। সংবাদমাধ্যম সুত্রের খবর, শুক্রবার সকালে পাইলট অভিনন্দনকে প্রথমে রাওয়ালপিন্ডি থেকে লাহোরে আনা হয়। সেখানে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেড ক্রস (আইসিআরসি)-এর হাতে তুলে দেয়া হয় বিমান বাহিনীর এই উইং কম্যান্ডারকে। সেসময় উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তনে ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধিরাও। তার পরে সন্ধ্যা নাগাদ তাঁকে নিয়ে আসা হয় ওয়াঘা-আটারি সীমান্তে। পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক সূত্রে ডন টিভি নিউজ-কে জানিয়েছে, ভারতীয় হাইকমিশনের অ্যাটাশে জে টি ক্যুরিয়েন অভিনন্দনের সঙ্গে রয়েছেন।
এর আগে কার্গিল যুদ্ধের সময়ও ভারতীয় পাইলট নচিকেতাকে পাকিস্তান রেডক্রসের মাধ্যমেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল ঘটনার আট দিনের মাথায়। ভারত অবশ্য দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক স্তরে প্রবল চাপ এবং জেনেভা কনভেনশন অনুয়ায়ীই পাকিস্তান আটক পাইলটকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে।  বুধবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে উইং কম্যান্ডার অভিনন্দনের ধরা পড়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পরই তার মুক্তির জন্য দেশ জুড়ে প্রার্থনা করেছিলেন মানুষ। কন্দহরের মতোই পাকিস্তান এ ক্ষেত্রেও শর্ত রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ভারত আগেই বলেছিল কোনও শর্তেই তারা রাজি নয়। সেই সঙ্গে পাকিস্তানকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, জেনেভা কনভেনশনের কথা। শেষপর্যন্ত অবশ্য শান্তির বার্তা দিয়েই অভিনন্দনকে মুক্তি দেবার কথা জানিয়েছেন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এদিকে বিজেপির সভাপতি শুক্রবার পাইলটের মুক্তিকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য বলে বর্ণনা করেছেন। বিমান বাহিনীর সূত্রে খবর, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে প্রায় সাত কিলোমিটার ভারতের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছিল পাক ফাইটারগুলি। তাদের মোকাবিলায়  আকাশে উড়ে ভারতের দু’টি বাইসন জেট।
তারই একটির ককপিটে ছিলেন অভিনন্দন। সূত্রের খবর, নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় থাকা পাক ফাইটারকে টার্গেট ‘লক ইন’ করে অভিনন্দনের বাইসন জেট। সেকেন্ডের মধ্যে মিগ-২১ থেকে আর-৭৩ এয়ার টু এয়ার মিসাইল আঘাত করে পাক ফাইটারকে। কিন্তু তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অভিনন্দনের মিগে আঘাত করে পাক জেটের গুলি। বিমান নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে রেডিও বার্তা দিয়েই ‘ইজেক্ট’ করে বিমানের বাইরে চলে আসেন তিনি। কিন্তু হাওয়ার গতি উল্টো দিকে থাকায় অভিনন্দনকে নিয়ে প্যারাশুট ভেসে যায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের দিকে। তার পরই পাক সেনারা তাকে আটক করেন।

ভারত-পাকিস্তান, সর্বাত্মক যুদ্ধ হলে ব্যবহার করবে যেসব বিমান

পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ হলে দুই বিবদমান এবং পরমাণু শক্তিধর দেশ কি ধরণের বিমান ব্যবহার করবে তার একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশংকা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে প্রবল হয়ে উঠেছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ তালিকা প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার এক সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা।
ভারত সম্প্রতি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বল্পকালীন আকাশ যুদ্ধে অন্তত একটি মিগ বিমান হারিয়েছে ভারত। পাকিস্তানের হাতে বন্দি হয়েছেন মিগ-২১-এর বৈমানিক এবং সূর্য কিরণ অ্যাক্রোবেটিক টিম (এসকেএটি)’র সদস্য  উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান।
এ অবস্থায়, পাক-ভারত সংঘর্ষ সর্বাত্মক লড়াইয়ের রূপ নিলে উভয় দেশ কি ধরণের বিমান নিয়ে আকাশ যুদ্ধে নামতে পারে তার একটি খতিয়ান দিয়েছেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল এবং সামরিক বিশ্লেষক মিখাইল খোদারেনোক।
সম্ভাব্য যুদ্ধে ভারতকে প্রধানত নির্ভর করতে হবে সোভিয়েত জামানার মিগ-২৯ বিমানের ওপর। ১৯৭০’র দশকে তৈরি এ বিমানকে প্রধানত এফ-১৫ এবং এফ-১৬’র মতো মার্কিন জঙ্গিবিমান মোকাবেলার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছিল। প্রথমে আকাশ যুদ্ধে আধিপত্য বিস্তারের জন্য তৈরি করা হলেও পরে মিগ-২৯কে বহুমুখী যুদ্ধবিমান হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এতে বসানো যাবে আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে ছোঁড়ার উপযোগী নানা ক্ষেপণাস্ত্র । এ ছাড়া, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানার উপযোগী বোমা বসানোর অবকাশও এতে রয়েছে।
ভারতের আকাশ যুদ্ধভাণ্ডারের অন্যতম বিমান এসইউ-৩০এমকেআই। দুই ইঞ্জিনের উন্নতমানের এ যুদ্ধবিমান ১৯৯০-এর দশকে তৈরি করেছে রাশিয়ার সুখোই কোম্পানি। ২০০২ সাল থেকে এ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে শুরু করে ভারত। হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড বা এইচএএল বর্তমানে ভারতের জন্য তৈরি করছে এ বিমান। একে ভারতের অন্যতম অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে গণ্য করা হয়। রাশিয়ার তৈরি এসইউ-৩৫ বিমানের অনেক বিশেষত্বই এতে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ফ্রান্সের তৈরি মিরেজ-২০০০ বিমানের ওপরও ভারতকে নির্ভর করতে হবে। চতুর্থ প্রজন্মের এ মিরেজ বিমানকে মিগ-২৯-এর সমতুল্য বলে ধরে হয়।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের কাছে রয়েছে মিরেজ ৪ এবং মিরেজ ৫ যুদ্ধবিমান। ১৯৬০-এর দশকে তৈরি এ বিমান প্রতিপক্ষ দেশের যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক পুরনো। এ সব বিমানকে ঐতিহ্য অনুযায়ী আকাশ থেকে আকাশে ছোঁড়ার উপযোগী নানা ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত করা হয়।
এ ছাড়া, পাকিস্তানের রয়েছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বহর। একে পাকিস্তানের কাছে থাকা পশ্চিমাদের তৈরি অত্যাধুনিক বিমান হিসেবে গণ্য করা হয়। চীনে তৈরিও কিছু বিমান পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কাছে আছে। তবে এগুলো সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, বিমান প্রতিরক্ষার দিক থেকে দেশ দুইটির গর্ব করার মতো প্রায় কিছুই নেই বলেই এ সামরিক বিশ্লেষক মনে করেন। দুই দেশেরই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংখ্যায় অপ্রতুল। আজকের যুগে যে সব অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয় সে তুলনায় এগুলোকে মান্ধাতার আমলের বললেও কম বলা হবে।
ইসলামাবাদের হাতে রয়েছে সোভিয়েত এস-৭৫ উঁচু আকাশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সোভিয়েত বাহিনী এ ব্যবস্থা ১৯৫৭ সালে প্রথম তৈরি করেছিল। ন্যাটো বাহিনীর কাছে এটি  এসএ-২ গাইডলাইন নামে পরিচিত। অবশ্য চীনে তৈরি এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য নেই। এ ছাড়া, পাকিস্তানের কাছে রয়েছে ১৯৭০'র দশকের শেষ দিকে তৈরি ফ্রান্সের ক্রোতেল বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। সব ঋতুতে ব্যবহার উপযোগী এ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো ব্যবহার করছে ফ্রান্স।
অন্যদিকে, ভারতের রয়েছে দেশে তৈরি মধ্যমপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র 'আকাশ'। পাকিস্তানের এস-৭৫'র থেকে এটিকে তুলমানূলক কম মানের বলেই ধারণা করা হয়। অবশ্য ভারতের কাছে সোভিয়েত আমলে তৈরি এস-১২৫ নেভা/পেচোরা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। একে ফ্রান্সের ক্রোতেল বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি পাল্লার বলে ধরে নেয়া হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব বিমান বা অস্ত্র কোনোটাই হয়ত ব্যবহার করা হবে না বলে মনে করেন রুশ সামরিক বিশ্লেষক। তিনি বলেন, উভয় পক্ষই মুখে মুখে গরম গরম কথা বললেও কেউই সর্বাত্মক যুদ্ধ ডেকে আনতে চায় না। তারা বরং উত্তেজনা কমানোর দিকে নজর দেবে বলে তিনি আশাবাদী।

গোলানকে ইসরাইলি ভূখণ্ডের অন্তর্ভূক্ত করার বিরোধিতা করল জাতিসংঘ

জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি গেইর ও. পেডেরসেন বলেছেন, গোলান মালভূমির ওপর সিরিয়ার সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। গোলান মালভূমির একাংশের ওপর ইসরাইলি দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়ার লক্ষ্যে মার্কিন কংগ্রেসে আনা প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়া বিষয়ক এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিং করতে গিয়ে এসব কথা বলেন পেডেরসেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট আর তা হলো গোলান সিরিয়ার ভূখণ্ড।
গোলান মালভূমিকে ইসরাইলি ভূখণ্ডের অন্তর্ভূক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা যে বিল উত্থাপন করেছেন সে ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি এসব কথা বলেন।
বিলটি কংগ্রেসে উত্থাপন করেছেন সিনেটর টেড ক্রুজ, টম কটন ও প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য মাইক গ্যালাগার। তারা বিলে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সিরিয়ায় ইরানের সামরিক উপস্থিতি হুমকি সৃষ্টি করেছে।
বিল উত্থাপনকারী আইনপ্রণেতারা বলেন, গোলান মালভূমি ব্যবহার করে যাতে কেউ হামলা করতে না পারে গত ৪০ বছর ধরে আমেরিকা তা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।

নারী অধিকারের সূত্রপাত করেছেন হযরত ফাতেমা (রা.) : সাগুফতা ইয়াসমিন

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন বলেন,  ইসলামই নারীদের সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে। পর্দা রক্ষা করেও যে নারীদের ক্ষমতায়ন করা যায় তার প্রমাণ দিয়েছে ইরান। আর নারী অধিকারের সূত্রপাত করেছেন হযরত ফাতেমা (রা.)।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা হযরত ফাতেমা (সা. আ.)’র শুভ জন্মবার্ষিকী ও নারী দিবস উপলক্ষে আজ (শুক্রবার) বিকেলে রাজধানীর ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভা ও আনন্দ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ‘হযরত ফাতেমা জাহরা (সা. আ)’র আদর্শ ও বিশ্বের নারীদের কর্তব্য’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও জাহরা অ্যাসোসিয়েশন।
জাহরা অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারপারসন সেলিনা পারভীনের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, ইরান থেকে আগত মেহরী মাশায়েখী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুনীরা সুলতানা, ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কাউন্সিলরের স্ত্রী শামানান মামুনি প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সাগুফতা ইয়াসমিন আরও বলেন,  নারীরা হল আল্লাহর নিয়ামত। একজন নারী মা হতে পারেন কিন্তু পুরুষরা কখনো তা পারে না।
হযরত ফাতেমা (রা.) নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) -এর পুরুষ সন্তান ছিল না। এজন্য তার অভাব পূরণ করতেন ফাতেমা (রা.)। তিনি ইচ্ছা করলেই আরাম আয়েশের জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে ত্যাগ ও সততার জীবন বেছে নিয়েছিলেন। নিজে না খেয়ে এতিমদের খাওয়াতেন। তিনি একজন আদর্শ স্ত্রীও ছিলেন। আমাদেরকে তার আদর্শ অনুসরণ করা উচিত।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি মেহরী মাশায়েখী বলেন, ইসলাম নারীদের সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে। এজন্য নারীদেরকে নারী হিসেবে থেকেই নিজেদের অধিকার চর্চা করতে হবে। যারা নিজেদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে পুরুষের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করেন তারা না পুরুষ হতে পারেন আর না হতে পারেন আদর্শ নারী।
তিনি আরো বলেন, ইসলামের যথাযথ মডেল ছিলেন হযরত ফাতেমা (সা. আ.)। পবিত্র কোরআনে নারী জাতির অনুসরনের জন্য যতগুলো আয়াত নাজিল হয়েছে তার জীবন্ত রূপটি ছিল হজরত ফাতেমার চরিত্রে ও কাজকর্মে। হজরত ফাতেমা কেবল নবীদুলালী বা নারীদেরই আদর্শ নন; তিনি এক কথায় মানবিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
হিজরি-পূর্ব আট সনের ২০ জমাদিউসসানি উম্মুল মোমেনীন হযরত খাদিজার গৃহ আলোকিত করে পৃথিবীতে আগমন করেন শ্রেষ্ঠ মহামানবী হযরত ফাতিমা যাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা। তাঁর জন্মদিনকে ইরানে ‘মা ও নারী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।