Thursday, February 6, 2025

৩২ নম্বরে ভাঙচুর অনভিপ্রেত: হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যে গভীর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ: সিএ প্রেস উইং

ভারতে বসে জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে জনমনে গভীর ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙচুর প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৩২ নম্বর বাড়িটিতে কোনো ধরনের আক্রমণ, ধংসযজ্ঞ হয়নি। গতকাল (বুধবার) রাতে এটি ঘটেছে পলাতক শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে, যার দুটো অংশ আছে। একটা অংশ হলো, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা আত্মদান করেছেন শেখ হাসিনা তাদেরকে অপমান করেছেন, অবমাননা করেছেন। শহীদের মৃত্যু সম্পর্কিত অবান্তর, আজগুবি ও বিদ্বেষমূলক কথা বলে পলাতক শেখ হাসিনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অবজ্ঞা করেছেন ও অশ্রদ্ধা জানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অমানবিক প্রক্রিয়ায় নিপীড়ন চালিয়ে ক্ষমতায় থাকাকালীন যে সুরে কথা বলতেন গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়ার পরেও তিনি একই হুমকি-ধামকির সুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে, গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়া প্রতিটি মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলে চলেছেন। হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। শেখ হাসিনা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির হুমকি দিয়েছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মানুষের মনে জুলাই গণহত্যা নিয়ে যে ক্ষত রয়েছে সে ক্ষততে শেখ হাসিনা একের পর এক আঘাত করে চলছেন। তার এই সহিংস আচরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দেশ ও জনগণের জানমালের রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্ক আছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বাত্মকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার যথাযথ চেষ্টা করছে।

হাসিনা বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকলে এমন ঘটনার এড়ানো সম্ভব উল্লেখ করে আরও বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধে একজন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি শেখ হাসিনা বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব। সরকার আশা করে, ভারত যেন তার ভূখণ্ডকে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে এমন কাজে ব্যবহৃত হতে না দেয় এবং শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ না দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না।

এতে আরও বলা হয়, জুলাই হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিল তাদের বিচারকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এই বিচার নিশ্চিত করে গণহত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কী কী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া যায় তা সরকার খতিয়ে দেখবে।

উল্লেখ্য, গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারকে ঘিরে ভাঙচুরের মুখে পড়ে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর-এ শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটি। এর আগে গতকাল বুধবার রাতে আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা হয়। পলাতক অবস্থায় তার এই বক্তব্য প্রচারকে ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়াদের মাঝে। দিনেই ঘোষণা দেয়া হয় শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের সময় ধানমন্ডির ৩২-এর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।

mzamin

‘ট্রাম্প একজন উন্মাদ’: যুক্তরাষ্ট্রের গাজা দখলের পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনির প্রতিক্রিয়া -আল জাজিরা

লাঠিতে ভর দিয়ে ৭২ বছর বয়সী ফাতি আবু আল-সাঈদ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার খান ইউনিসের আল-কাতিবা মহল্লায় ধ্বংসস্তূপে একাকার হয়ে যাওয়া রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গত ১৯ জানুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে হামাসের যুদ্ধবিরতি শুরুর পর গাজার উপকূলীয় আল-মাওয়াসি এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় খান ইউনিসে ফেরেন তিনি। এর পর থেকে এভাবে হাঁটা তাঁর নিত্যদিনের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টানা ১৫ মাস ধরে ইসরায়েলের ভয়াবহ বোমা হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপের ওপর সাবধানে পা ফেলে হাতের লাঠি উঁচিয়ে বিধ্বস্ত একটি বাড়ির দিকে ইঙ্গিত করলেন সাঈদ। বললেন, ‘আপনি কি ওই মূল্যহীন ধ্বংসস্তূপ দেখতে পাচ্ছেন? ওটা যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির ভেতরে থাকা সবকিছুর চেয়ে বেশি মূল্যবান।’

আবু আল–সাঈদের ৫০ সন্তান ও নাতি-নাতনির কয়েকজনসহ একদল শিশু তাঁর শ্রোতা। ভারী বৃষ্টি ও বাতাসের পূর্বাভাসেও বিচলিত না হয়ে তারা মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শোনে। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকটি শিশু যোগ দেয়। বাস্তুচ্যুত এসব শিশুর পরিবারও নিজেদের এলাকায় ফিরেছে। কিন্তু ফিরে ঘরবাড়ি অক্ষত পায়নি। একসময়ের সাজানো-গোছানো বাড়িঘরগুলো এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ। পরিবারগুলো এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নতুন করে জীবন শুরুর চেষ্টা করছে।

প্রতিদিন সকালে সাঈদ তাঁদের জীবন আবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানো নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু গাজা দখল করে নেওয়া প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক মন্তব্য সাঈদের জন্য নতুন করে ব্যঙ্গাত্মক কথাবার্তার খোরাক হয়েছে। ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে গাজায় ‘মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসৈকত’ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন।

আবু আল-সাঈদ ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, ‘ট্রাম্প এমনভাবে কথা বলছেন, যেন তিনি লোকজনের কাছে জমি বিলানো একজন রাজা। তাঁর উচিত ইসরায়েলি বন্ধুদের ফিলিস্তিনের বাইরে কোথাও স্থানান্তর করা ও গাজাকে ছেড়ে দেওয়া।’

গাজার দখল নেওয়া বিষয়ে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছেন, তা ব্যাপক নিন্দা–সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি গাজার ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র পুনর্বাসনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গাজার নিয়ন্ত্রণ ও এটির মালিকানা নেবে। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘দুর্ভাগ্যের’ চেয়ে ভালো কিছু ফিলিস্তিনিদের প্রাপ্য।

গতকাল বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্পের মন্তব্যকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের ‘স্থায়ীভাবে’ পুনর্বাসিত করা হবে। তিনি বলেছেন, গাজা পুনর্নির্মাণের সময় সেখানকার বাসিন্দাদের অন্য কোথাও থাকতে হবে।

টানা ১৫ মাস ধরে ইসরায়েলি বোমা হামলায় হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলসহ গাজার ৬০ শতাংশের বেশি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনের অধীন ওয়াশিংটন ছিল ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সমর্থক। তারা যুদ্ধের প্রথম বছরে ইসরায়েলে ১ হাজার ৭৯০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পাঠিয়েছে, যা দেশটিকে এযাবৎকালে দেওয়া সর্বোচ্চ বার্ষিক সহায়তা।

ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আবু আল-সাঈদ বলেন, ‘এটি পাগলের প্রলাপ। আমরা আরবরা যেমনটা বলি, যদি বক্তা পাগল হয়, তবে শ্রোতাকে বুদ্ধিমান হতে দিন। লোকটি (ট্রাম্প) স্বদেশ, সংগ্রাম, বিদ্রোহ, গৌরব কিংবা ফিলিস্তিন সম্পর্কে কিছুই জানেন না।’

ট্রাম্পের মন্তব্যকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়ে সাঈদ মাথা নাড়েন। অবিশ্বাসের হাসি হেসে বলেন, ‘এটা যেকোনো বিশ্বনেতার করা সবচেয়ে সেরা কল্পনা। ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে জানেন এমন যেকোনো বিবেকবান মানুষ বোঝেন, মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়া আমাদের কাছে মৃত্যুর সমান। ট্রাম্প কি সত্যিই ভেবেছেন যে আমরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে সবকিছু পেছনে ফেলে চলে যাব?’

সাঈদের জন্য ফিলিস্তিনিদের গণহারে ঘরছাড়া করার বিষয়টি নতুন নয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় তাঁর বাবাকে বন্দরনগরী জাফা থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়েছিল। নগরীটি এখন ইসরায়েলের অংশ। তাঁর মায়ের পরিবারকে কাছের সারাফান্দ গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। তিনি সেই প্রথম বিপর্যয়- ‘নাকবা’র গল্প শুনে বড় হয়েছেন এবং এখন অন্য একটি বিপর্যয়ের মধ্যে বেঁচে আছেন।

সাঈদ বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের দিকে ইশারা করে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই জানি, সব হারানোর মানে কী। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে আঁকড়ে রাখার অর্থ কী।’

ইসরায়েলি হামলায় গাজার ২৩ লাখ মানুষের ৯০ শতাংশই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির পর অনেকে উত্তরে নিজ এলাকায় ফিরেছেন। কিন্তু এসে নিজের বাড়ি অক্ষত পাননি, পেয়েছেন ধ্বংসস্তূপ। তাঁরা এখন ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করছেন, যা সম্ভব তা উদ্ধার করছেন কিংবা ধ্বংসস্তূপের ওপরে তাঁবু টানাচ্ছেন।

আবু আল-সাঈদ দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘গণহত্যার মধ্যেও আমরা চলে যাইনি। এ কারণে নয় যে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই—এটি আমাদের জন্মভূমি। আমাদের ভূখণ্ড। এখানকার প্রতিটি ইট আমাদের কাছে যতটা মূল্যবান, ততটা মূল্যবান কিছুই যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দিতে পারবে না।’

ট্রাম্প তাঁর গাজা পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনাকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরে এক সপ্তাহ ধরে মিসর ও জর্ডানের ওপর উপত্যকাটির বাসিন্দাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু কায়রো, রিয়াদ, আবুধাবি ছাড়াও তাঁর অন্য মিত্ররা এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আবু আল-সাঈদ বলেন, ‘ট্রাম্প হয়তো ভাবতে পারেন যে আমরা একটি হোটেলে বসবাস করছি, যেটি তিনি চাইলেই বন্ধ করে দিতে পারেন। কিন্তু গাজা কোনো রিয়েল এস্টেট প্রকল্প নয়, এটি আমাদের ভূমি।’

ধ্বংসস্তূপের ওপর হাতের লাঠি ঠুকে সাঈদ বললেন, ‘আমাদের ঘাম ও রক্তে মিশে আছে এই পৃথিবী (গাজা)। এখান থেকে কেউ যাবে না—যত হুমকি বা প্রতিশ্রুতিই থাকুক।’

‘তিনি কি পাগল নাকি বোকা’

একসময় ধ্বংসস্তূপের ওপর বসেন আবু আল-সাঈদ। তাঁকে ঘিরে তখনো উৎসুক শিশুরা। সাঈদ হাসিমুখে তাঁর ১০ বছর বয়সী নাতির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ট্রাম্প বলছেন, আমাদের গাজা ছেড়ে মিসর বা জর্ডানে চলে যাওয়া উচিত। তোমার কী মনে হয়?’ ছেলেটা হাসিতে ফেটে পড়ে বলল, ‘সে কি পাগল নাকি বোকা? আমরা কেন চলে যাব? গাজা ফিলিস্তিনের অংশ!’

এ সময় অন্য শিশুরা চিৎকার করে উঠল। সমস্বরে বলে উঠল, ‘কে নিজেদের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়? আমরা থাকব, আবার গড়ব ও লড়াই করব।’

সাঈদ হেসে উঠে বললেন, ‘ট্রাম্প, আপনি আপনার উত্তর পেয়ে গেছেন। এমনকি আমাদের বাচ্চারাও আপনার চেয়ে ভালো জানে।’

যুদ্ধের পুরোটা সময় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ, অনাহারে রাখার কৌশল ও হাসপাতালে হামলার ফলে ১৭ হাজার ৪০০–এর বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। এতিম হয়েছে হাজারো শিশু।

সাঈদ প্রশ্ন করেন, ‘এটা কেমন যুক্তি? তারা আমাদের অনাহারে রাখে, বোমা মারে। আর আমরা যখন দেশ ছেড়ে চলে যেতে অস্বীকার করি, তখন এমন আচরণ করে, যেন অবাক হয়েছে।’

নিজেদের ভূমির সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অটুট বন্ধনের কথা উল্লেখ করে সাঈদ বলেন, ‘আপনি কি জানেন, কোন ঘটনা কখনোই ঘটবে না। তা হলো, আমরা ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’

সাঈদ বিশ্বাস করেন, ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের বা তাঁদের সংগ্রামকে বোঝেন না। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু আমরা এখানে আছি, এখানেই থাকব।’

নেতানিয়াহুর মতো ট্রাম্পের জন্যও একমাত্র সমাধান হলো, ফিলিস্তিনিদের নিঃশেষ করে দেওয়া—বলতে বলতে সাঈদের চোখ তেতে ওঠে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়লেও পিঠ সোজা করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমরা তা হব না।’

‘আমরা মরব, তা–ও গাজা ছাড়ব না’ -দ্য গার্ডিয়ান

ফিলিস্তিনের গাজা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপত্যকার বাসিন্দারা। তাঁদের কাছে ট্রাম্পের পরিকল্পনা রীতিমতো অবিশ্বাস্য লাগছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গাজা নিয়ে এক বিস্ময়কর পরিকল্পনা তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উপত্যকাটির মালিক হবে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁরা গাজার উন্নয়ন করবেন। গাজা হবে সারা বিশ্বের মানুষের বাড়ি। তবে কীভাবে ও কোন কর্তৃত্ববলে গাজার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র নিতে পারে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি ট্রাম্প।

ইসরায়েল-হামাসের ১৫ মাসের গাজা যুদ্ধে ৪৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন লক্ষাধিক। ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ।

৫২ বছর বয়সী আবু ফিরাস গাজার বাসিন্দা। তিনি এখন থাকছেন উপত্যকার উপকূল এলাকার একটি তাঁবুতে। তাঁর বসতবাড়ি খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলে। ইসরায়েলি হামলায় তাঁর বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যুদ্ধে তিনি ৮০ জন আত্মীয়স্বজনকে হারিয়েছেন।

বাড়িঘর পুনর্নির্মাণে সাহায্য চান ফিরাস। কিন্তু তিনি গাজা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চান না।

দ্য গার্ডিয়ানকে ফিরাস বলেন, ‘আমরা মরব, তা–ও এই ভূমি ছেড়ে যাব না।’

মাতৃভূমির বিনিময় অর্থ দিয়ে হয় না বলে মন্তব্য করেন ফিরাস।

গাজাকে দুর্ভাগ্য, মৃত্যু ও ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, এই জায়গা ছেড়ে যেতে আগ্রহী ফিলিস্তিনিরা। তবে গাজাবাসী ট্রাম্পের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের আগেও গাজাবাসীর জীবন কঠিন ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোর একটি গাজা। ইসরায়েলি অবরোধ, হামাসের কঠোর শাসন, অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে বছরের বছর বছর কাটিয়ে এসেছেন গাজাবাসী। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও গাজাবাসী উপত্যকার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করে এসেছেন।

৫০ বছর বয়সী রামজ গাজার বাসিন্দা। তিনি চার সন্তানের পিতা। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যেখানেই চলে যান না কেন কিংবা সুন্দর শহরে বসবাসের যতই চেষ্টা করুক না কেন, নিজ শহর, নিজ ভূমি ছাড়া তিনি কখনোই শান্তি পাবেন না।

রামজ বলেন, ‘এত ধ্বংসের পরও আমরা শেষ পর্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে ও মরতে এখানে, আমাদের ভূমিতেই থাকব।’ 

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ঘরে ফিরছেন বাস্তুচ্যুত গাজার বাসিন্দারা
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ঘরে ফিরছেন বাস্তুচ্যুত গাজার বাসিন্দারা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর রাফায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা হাঁটছেন
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর রাফায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা হাঁটছেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিরতির পর উত্তর গাজার জাবালিয়ার এই নারী বাড়ি ফিরে দেখেন তাঁর ঘরটি আর অক্ষত নেই। ইসরায়েলি বোমা হামলায় সেটি মাটিতে মিশে গেছে
যুদ্ধবিরতির পর উত্তর গাজার জাবালিয়ার এই নারী বাড়ি ফিরে দেখেন তাঁর ঘরটি আর অক্ষত নেই। ইসরায়েলি বোমা হামলায় সেটি মাটিতে মিশে গেছে ফাইল। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও এ উপত্যকা ছেড়ে কোথাও যেতে চান না ফিলিস্তিনিরা
ইসরায়েলি হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও এ উপত্যকা ছেড়ে কোথাও যেতে চান না ফিলিস্তিনিরা। ছবি: রয়টার্স


৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা চলছে, গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সামনের অনেকটা

রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আজ বৃহস্পতিবার সকালেও শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙা চলছে। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ভারী যন্ত্র দিয়ে বাড়িটি ভাঙতে দেখা গেছে। বাড়ির সামনের অংশে তিনতলা পর্যন্ত অনেকটাই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাতে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেককেই সকালেও বাড়ির সামনে দেখা গেছে। ফজরের নামাজের পর থেকেও অনেককেই ৩২ নম্বরের বাড়ির দিকে যেতে দেখা যায়। সেখানে জড়ো হওয়া কয়েকজন বলেছেন, স্বৈরাচারের কোনো চিহ্ন তাঁরা রাখতে চান না। ভবনের বড় অংশ ভাঙলে মানুষকে উল্লাস করতে দেখা গেছে।

সকালে ক্রেন ও এক্সকাভেটর দিয়ে বাড়িটির বিভিন্ন অংশ ভাঙতে দেখা গেছে। কিছু জায়গায় আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। বাড়ির বিভিন্ন অংশে লাল কালি দিয়ে লেখা ছিল, ‘স্বৈরাচার সাবধান।’

ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা গতকাল বুধবার রাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা ছাড়াও গতকাল রাতে ধানমন্ডির ৫ এ-তে অবস্থিত শেখ হাসিনার বাড়ি সুধা সদনেও আগুন দেওয়া হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অভ্যুত্থানের ছয় মাস ছিল গতকাল। এদিন রাত ৯টায় নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ফেসবুক পেজে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গতকাল দিনভরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা চলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক ছাত্র-জনতা ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফেসবুকে ধানমন্ডি ৩২ অভিমুখে ‘বুলডোজার মিছিল’ এবং ‘মার্চ টু ধানমন্ডি ৩২’ কর্মসূচির ডাক দেন।

গতকাল রাত আটটার দিকে বিক্ষোভকারীরা শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করেন। তাঁরা বাড়ির সামনে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালও ভাঙচুর করেন। এর পর থেকেই সেখানে ভাঙচুর চলছে।

গতকাল বিকেলে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে ফেসবুকে একাধিক পোস্ট দেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য শরিফ ওসমান হাদি। সন্ধ্যা সাতটার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘আজ (বুধবার) রাতে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমিমুক্ত হবে।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছিলেন বিক্ষুব্ধ জনতা। এর পর থেকে বাড়িটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।

৩২ নম্বরের বাড়িতে আজ বৃহস্পতিবার সকালেও ভাঙচুর  চলছে। সকাল সাড়ে আটটা
৩২ নম্বরের বাড়িতে আজ বৃহস্পতিবার সকালেও ভাঙচুর চলছে। সকাল সাড়ে আটটা। ছবি: জাহিদুল করিম

৩২ নম্বরের বাড়ির অনেকটাই গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টা
৩২ নম্বরের বাড়ির অনেকটাই গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টা। ছবি: জাহিদুল করিম

বাড়িটির কিছু জায়গায় আগুন জ্বলছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টা।
বাড়িটির কিছু জায়গায় আগুন জ্বলছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টা। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

বাড়িটির সামনের অংশে তিনতলা পর্যন্ত অনেকটা গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টা
বাড়িটির সামনের অংশে তিনতলা পর্যন্ত অনেকটা গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টা। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা চলছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টা
৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা চলছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টা। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটা
৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটা ছবি: জাহিদুল করিম

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙা হচ্ছে সকালেও। গতকাল বুধবার রাত থেকে বাড়িটি ভাঙা শুরু হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টার ছবি
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙা হচ্ছে সকালেও। গতকাল বুধবার রাত থেকে বাড়িটি ভাঙা শুরু হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টার ছবি। ছবি : তানভীর আহাম্মেদ


মেয়েদের খেলায় ট্রান্স নারীদের অংশগ্রহণ চান না ট্রাম্প, সই করলেন নির্বাহী আদেশে

মেয়েদের খেলায় ট্রান্স নারীদের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নে ইতিমধ্যেই স্কুল গুলোকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। যদি কোনো স্কুল এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাহলে তাদের ফেডারেল অনুদান বন্ধ করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, বুধবার স্বাক্ষরিত নির্বাহী ওই আদেশে বলা হয়েছে, যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলায় অংশ নেয়া মেয়েদের জন্য লকার কক্ষে ট্রান্স নারীদের ঢুকতে অনুমতি দেয়া হয় তাদের ফেডারেল সরকারের তহবিল বন্ধ করে দেয়া হবে। এই আদেশের আলোকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে ‘নারী ক্রীড়াবিদদের সর্বোত্তম নিরাপত্তা নীতি’ নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপটি প্রচারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এছাড়া ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা গ্রহণকারী প্রতিটি স্কুলে নোটিশ দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, আমরা অর্থ সহায়তা গ্রহণকারী প্রতিটি স্কুলে নোটিশ দিচ্ছি: যদি তারা পুরুষদের নারী ক্রীড়া দল দখল করতে দেন বা নারীদের লকার কক্ষে আক্রমণ করতে দেন- তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯ লঙ্ঘনের জন্য তদন্ত করা হবে। এছাড়া তাদের তহবিল ঝুঁকির মুখে পড়বে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প যেই আইনের কথা উল্লেখ করেছেন সেটি ১৯৭২ সালে প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাঙ্গনে লিঙ্গ বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

‘নারী ক্রীড়াবিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শেষ করার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, পুরুষরা নারী ক্রীড়াবিদদের মারধর করবে সেজন্য তার প্রশাসন চুপ করে বসে থাকবে না। তিনি আরও বলেন, আমরা এটা হতে দেব না এবং এটা শেষ হতে যাচ্ছে। এখনই এ বিষয়টি শেষ হচ্ছে। কেউই এ বিষয়ে আর কিছুই করতে পারবে না, কেননা আমি যখন বলি তা কর্তৃত্ব নিয়েই বলি।

মেয়েদের খেলায় ট্রান্স নারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিকে চাপ দেবেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। যাতে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে ২০২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের আগেই লিঙ্গভিত্তিক অংশগ্রহণ স্পষ্টভাবে সমর্থন করা যায়। অলিম্পিক কমিটি খেলাধুলায় ট্রান্স নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বাইআউটের প্রস্তাব ট্রাম্পের

এবার মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে ফেডারেল কর্মীদের এই প্রস্তাব দিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন তিনি। তবে তা উপেক্ষা করে এবার মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সহ আরও চারটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মীদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ বা বাইআউটের অফার দিয়েছেন ট্রাম্প। এই সংস্কারের নেতৃত্বে রয়েছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। এতে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনগণের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই মাস্কের বিরুদ্ধে সরকারকে দখলে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, যে চারটি অতিরিক্ত সংস্থার কর্মীদের এই স্বেচ্ছা পদত্যাগের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- ইউএস অফিস অফ দ্য ডাইরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি, ন্যাশনাল জিওস্পেশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এবং দ্য ন্যাশনাল রিকনাস্যান্স অফিস। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তার এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে ঠিক কতজন কর্মকর্তাকে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা রয়েছে।

মঙ্গলবার রাতে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, তাদের কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সংস্থাগুলোর নতুন পরিচালক র‌্যাটক্লিফের লক্ষ্যের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে দেশের শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বাইআউট অফার দিলেন ট্রাম্প।

mzamin


ধানমন্ডি ৩২ নম্বর: বই, রড, লোহা যে যা পাচ্ছেন নিয়ে যাচ্ছেন

রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটির পেছনে (উত্তর দিকে) ছয়তলা ভবনটি ভাঙা হচ্ছে। ভবনটির ভেতর থেকে বই, স্টিল, লোহা, টিন, কাঠসহ বিভিন্ন জিনিস ভেঙে নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে এমন চিত্র দেখা গেছে। এ সময় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ভাঙা হচ্ছিল। বেলা ১১টা পর্যন্ত বাড়িটির অনেক অংশই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, পেছনের ওই ছয়তলা ভবনে শত শত মানুষ ঢুকছেন। কেউ কেউ ভেতর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসছেন। আর ভবনটির ভেতর থেকে হাতুড়ির আঘাতে নানা কিছু ভাঙার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

ওই ভবন থেকে যেসব জিনিস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এর মধ্যে বেশির ভাগই শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে লেখা কিংবা পরিবারের সদস্যদের লেখা বই রয়েছে। কেউ এসব বইয়ের কার্টন নিয়ে বের হচ্ছিলেন, কারও কারও হাতে ছিল কয়েকটি করে বই।

এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভলিউম-৩’, ‘জনসমুদ্রে এক মহামানব’, ‘জাতির জনক ও শেখ রাসেল’ ইত্যাদি।

ভেতর থেকে ভাঙারি পণ্য হিসেবে বিক্রয় করা যাবে—এমন স্টিল, লোহা ও কাঠের নানা কাঠামো ভেঙে যে যাঁর মতো নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। স্টিল ও লোহার কাঠামো ভবন থেকে ভেঙে ভেঙে কয়েকজনকে নিচে ফেলতে দেখা যায়। নিচে থাকা কয়েকজন এগুলো রিকশায় করে অন্যত্র সরিয়ে নেন। যাঁরা এসব লোহালক্কড় নিচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ।

আল আমিন নামের এক ব্যক্তি লোহার কিছু কাঠামো নিচ্ছিলেন। এসব নিয়ে কী করবেন, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই, বিক্রি করে দিমু। সেই টাকায় ভালোমন্দ খামু। মুরগি পাইলে মুরগি, গরু মাংস পাইলে গরু মাংস কিনে খামু। এই ছাড়া আর কিছুই না।’

ভাঙা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি বলেন, ‘এই মহিলা নিজের জিদ দিয়ে দলটাকে একেবারে শেষ কইরা দিয়া গেল।’

সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটির সামনে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। শত শত মানুষ ওই বাড়ির সামনে আসছিলেন। ভিডিও করছিলেন। ছবি তুলছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকেও একটি এক্সকাভেটর দিয়ে বাড়িটি ভাঙার কাজ হচ্ছিল। তবে মাঝে ঘণ্টাখানেক সময় ভাঙার কাজ সাময়িক বন্ধ ছিল।

ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা গতকাল বুধবার রাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা ছাড়াও গতকাল রাতে ধানমন্ডির ৫/এ-তে অবস্থিত শেখ হাসিনার বাড়ি সুধা সদনেও আগুন দেওয়া হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অভ্যুত্থানের ছয় মাস ছিল গতকাল। এদিন রাত ৯টায় নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ফেসবুক পেজে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গতকাল দিনভরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা চলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক ছাত্র-জনতা ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফেসবুকে ধানমন্ডি ৩২ অভিমুখে ‘বুলডোজার মিছিল’ এবং ‘মার্চ টু ধানমন্ডি ৩২’ কর্মসূচির ডাক দেন।

গতকাল রাত আটটার দিকে বিক্ষোভকারীরা শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করেন। তাঁরা বাড়ির সামনে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালও ভাঙচুর করেন। এর পর থেকেই সেখানে ভাঙচুর চলছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছিলেন বিক্ষুব্ধ জনতা। এর পর থেকে বাড়িটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।

সুধা সদনে আগুন জ্বলছে, ‘নিরাপত্তার কারণে’ নেভাতে যায়নি ফায়ার সার্ভিস

ধানমন্ডি–৫ এর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদনে আজ বৃহস্পতিবার সকালেও আগুন জ্বলছে। ‘নিরাপত্তা না থাকায়’ সেই আগুন নেভাতে যায়নি ফায়ার সার্ভিস। আজ সকালে ভবনটি থেকে যে যেভাবে পারছেন, সেখানে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যও সেখানে নেই।

গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ১০টার পর সেখানে আগুন দেওয়া হয় বলে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর এ আগুন দেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ঢাকা) মো. ছালেহ উদ্দিন আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওখানে (সুধা সদন) যাওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। তাই ওখানে যাওয়া হয়নি।’

আজ সকালে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা কন্ট্রোল রুমের মবিলাইজিং অফিসার খালেদা ইয়াসমিন বলেন, ‘রাত সাড়ে ১১টার দিকে সুধা সদনে আগুনের খবর পাই আমরা। আমাদের নিরাপত্তা ছিল না। তাই সুধা সদনে আগুন নেভাতে যাওয়া সম্ভব হয়নি।’

আজ সকাল পৌনে ১১টার দিকে সুধা সদনে গিয়ে এই প্রতিবেদক দেখেন, ভবনের দোতলায় আগুন জ্বলছে। বাড়িটির সামনে পড়ে আছে ফ্রিজ, খাট, ওয়ার্ডরোব, সোফাসহ নানা সামগ্রী। নিচতলা থেকে চারতলার বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে আগুন ও ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা গেছে। কোথাও কোথাও টাইলস খুলে ফেলা হয়েছে। পোড়া গন্ধ চারদিকে।

সুধা সদনের নিচতলার কক্ষের সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তোশক, লেপ এসব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কাচের টুকরা পড়ে আছে অনেক স্থানে। বিভিন্ন তলার জানালার কাচগুলো পড়ে যাচ্ছে। বাড়িটির বিভিন্ন স্থানে বই পড়ে আছে। অনেক বই পুড়ে গেছে।

বাড়িটির সামনে এখন উৎসুক কয়েক শ মানুষের ভিড়।

তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ যেসব অক্ষত জিনিসপত্র আছে, সেগুলো নিয়ে যাচ্ছেন।

বেলা ১১টার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউকে দেখা যায়নি।

ওই এলাকায় দায়িত্বরত ধানমন্ডি সোসাইটির নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, ‘রাত সাড়ে ১০টার পর ১০ থেকে ১২টি ছেলে এসে সুধা সদনে আগুন দেয়। আগুন ভবনটিতে ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লোকেরা এসে এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে আশপাশের ভবনের বাসিন্দারা এসে পানি দিয়ে নিচতলার আগুন কিছুটা কমিয়েছেন।’

দিবাগত রাত ১২টার সময় ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলার বিভিন্ন কক্ষে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে অবস্থান নেওয়া শেখ হাসিনা গতকাল রাতে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভাষণ দেন। একে কেন্দ্র করে বিকেলে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে ফেসবুকে একাধিক পোস্ট দেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য শরিফ ওসমান হাদি। পরে সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘আজ রাতে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমিমুক্ত হবে।’

এরপর রাত ৮টার দিকে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তাঁরা বাড়িটির ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করেন। পরে ওই ভবনে আগুন দেওয়া হয়। রাত ১২টার দিকে এক্সকাভেটর ও ক্রেন দিয়ে ভবনটি ভাঙা শুরু হয়।

গতকাল রাত ১১টার দিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে একটি ক্রেন নিয়ে আসেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। পরে আনা হয় একটি এক্সকাভেটর। মধ্যরাতে এই ভারী যন্ত্র দিয়ে ভবন ভাঙা শুরু হয়। রাত দুইটা নাগাদ বাড়িটির বড় অংশ ভাঙা শেষ হয়। ভবন ভাঙার কাজ চলার মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, মুজিববাদ ও আওয়ামী লীগবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। রাতভর ভবন ভাঙার কাজ চলে। আজ ফজরের নামাজের পর বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যান। ভবনের বড় অংশ ভাঙা হয়ে গেছে দেখে মানুষ উল্লাস করেন। সকাল থেকে দেখা যায়, ভারী যন্ত্র দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ভবনটি ভাঙা হচ্ছে। তখনো বাড়ির সামনে মানুষের ভিড় দেখা যায়। আজ বেলা ১১টার দিকে দেখা যায়, বাড়িটির অনেক অংশই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।


গল্প- নোনাজল by সৈয়দ মুজতবা আলী

সেই গোয়ালন্দ চাঁদপুরী জাহাজ৷ ত্রিশ বৎসর ধরে এর সঙ্গে আমার চেনাশোনা৷ চোখ বন্ধ করে দিলেও হাতড়ে হাতড়ে ঠিক বের করতে পারব, কোথায় জলের কল, কোথায় চা-খিলির দোকান, মুর্গীর খাঁচাগুলো রাখা হয় কোন জায়গায়৷ অথচ আমি জাহাজের খালাসী নই—অবরের-সবরের যাত্রী মাত্র৷

ত্রিশ বৎসর পরিচয়ের আমার আর সবই বদলে গিয়েছে, বদলায় নি শুধু ডিসপ্যাচ স্টীমারের দল৷ এ-জাহাজের ও-জাহাজের ডেকে-কেবিনে কিছু কিছু ফেরফার সব সময়ই ছিল, এখনও আছে, কিন্তু সব কটা জাহাজের গন্ধটি হুবহু একই৷ কীরকম ভেজা-ভেজা, সোঁদা-সোঁদা যে গন্ধটা আর সব-কিছু ছাপিয়ে ওঠে, সেটা মুর্গী-কারি রান্নার৷ আমার প্রায়ই মনে হয়েছে, সমস্ত জাহাজটাই যেন একটা আস্ত মুর্গী, তার পেটের ভেতর থেকে যেন তারই কারি রান্না আরম্ভ হয়েছে৷ এ-গন্ধ তাই চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোয়ালন্দ, যে কোন স্টেশনে পৌঁছানো মাত্রই পাওয়া যায়৷ পুরনো দিনের রূপরসগন্ধস্পর্শ সবই রয়েছে, শুধু লক্ষ্য করলুম ভিড় আগের চেয়ে কম৷
দ্বিপ্রহরে পরিপাটি আহারাদি করে ডেকচেয়ারে শুয়ে দূর-দিগন্তর দিকে তাকিয়ে ছিলুম৷ কবিত্ব আমার আসে না, তাই প্রকৃতির সৌন্দর্য আমার চোখে ধরা পড়ে না, যতক্ষণ না রবি ঠাকুর সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন৷ তাই আমি চাঁদের আলোর চেয়ে পছন্দ করি গ্রামোফোনের বাক্স৷ পোর্টেবলটা আনব আনব করছি, এমন সময় চোখে পড়ল একখানা মর্দিতা ‘দেশ’—মালিক না আসা পর্যন্ত তিনি যদি পরহস্তে কিঞ্চিৎ ‘ভ্রষ্টা’ও হয়ে যান, তা তাঁর স্বামী বিশেষ বিরক্ত হবেন না নিশ্চয়ই৷

‘রূপদর্শী’ ছদ্মনাম নিয়ে এক নতুন লেখক খালাসীদের সম্বন্ধে একটি দরদ-ভরা লেখা ছেড়েছে৷ ছোকরার পেটে এলেম আছে, নইলে অতখানি কথা গুছিয়ে লিখল কী করে, আর এত সব কেচ্ছা-কাহিনীই বা যোগাড় করল কোথা থেকে? আমি তো একখানা ছুটির আর্জি লিখতে গেলেই হিমসিম খেয়ে যাই৷ কিন্তু লোকটা যা সব লিখেছে, এর কি সবই সত্যি? এতবড় অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে খালাসীরা লড়াই দেয় না কেন? হুঁঃ! এ আবার একটা কথা হল! সিলেট নোয়াখালির আনাড়ীরা দেবে ঘুঘু ইংরেজের সঙ্গে লড়াই—আমিও যেমন!

জাহাজের মেজো সারেঙের আজ বোধ হয় ছুটি৷ সিল্কের লুঙ্গি, চিকনের কুর্তা আর মুগার কাজ-করা কিস্তি টুপি পরে ডেকের ওপর টহল দিয়ে যাচ্ছে৷ মাঝে মাঝে আবার আমার দিকে আড়নয়নে তাকাচ্ছেও৷ ডিসপ্যাচের পুঁটি ও মানওয়ারির তিমি দুই-ই মাছ—একেই জিজ্ঞাসা করা যাক না কেন, ‘রূপদর্শী’ দর্শন করেছে কতটুকু আর কল্পনায় বুনেছে কতখানি!

একটুখানি গলা খাঁকারি দিয়ে শুধালুম, ‘ও সারেঙ সাহেব, জাহাজ লেট যাচ্ছে না তো?’

লোকটা উত্তর দিয়ে সবিনয়ে বলল, ‘আমাকে ‘‘আপনি’’ বলবেন না সাহেব৷ আমি আপনাকে দু-একবারের বেশী দেখি নি, কিন্তু আপনার আব্বা সাহেব, বড় ভাই সাহেবেরা এ-গরিবকে মেহেরবানি করেন৷’

খুশী হয়ে বললুম, ‘তোমার বাড়ি কোথা? বস—না, তার ফুরসত নেই?’ ধপ করে ডেকের উপর বসে পড়ল৷

আমি বললুম, ‘সে কী? একটা টুল নিয়ে এসো৷ এসব আর আজকাল—’ কথাটি শেষ করলুম না, সারেঙও টুল আনল না৷ তারপর আলাপ পরিচয় হল৷ দ্যাশের লোক—সুখ-দুঃখের কথা অবশ্যই বাদ পড়ল না৷ শেষটায় মোকা পেয়ে ‘রূপদর্শী-দর্শন’ তাকে আগাগোড়া পড়ে শোনালুম৷ সে গভীর মনোযোগ দিয়ে তার জাতভাই চাষারা যেরকম পুঁথিপড়া শোনে, সেরকম আগাগোড়া শুনল, তারপর খুব লম্বা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল৷

আল্লাতালার উদ্দেশে এক হাত কপালে ঠেকিয়ে বললে, ‘ইনসাফের (ন্যায়ধর্মের) কথা তুললেন, হুজুর, এ-দুনিয়ায় ইনসাফ কোথায়? আর বে-ইনসাফি তো তারাই করেছে বেশী, যাদের খুদা ধনদৌলত দিয়েছেন বিস্তর৷ খুদাতালাই কার জন্যে কী ইনসাফ রাখেন, তাই বা বুঝিয়ে বলবে কে? আপনি সমীরুদ্দীকে চিনতেন, বহু বছর আমেরিকায় কাটিয়েছিল, অনেক টাকা কামিয়েছিল?’

আমেরিকার কথা মনে পড়ল৷ ‘চৌতলি পরগণায় বাড়ি, না, যেন ওই দিকেই কোনখানে৷’

সারেঙ বললে, ‘আমারই গাঁ ধলাইছড়ার লোক৷ বিদেশে সে যা টাকা কামিয়েছে ওরকম কামিয়েছে অল্প লোকই৷ আমরা খিদিরপুরে সইন (Sign) করে জাহাজের কামে ঢুকেছিলাম—একই দিনে একই সঙ্গে৷’

আমি শুধালুম, ‘কী হল তার? আমার ঠিক মনে পড়ছে না৷’

সারেঙ বললে, ‘শুনুন৷’

‘যে লেখাটি হুজুর পড়ে শোনালেন, তার সব কথাই অতিশয় হক৷ কিন্তু জাহাজের কাজে, বিশেষ করে গোড়ার দিকে যে কী জান মারা খাটুনি তার খবর কেউ কখনও দিতে পারবে না যে সে জাহান্নামের ভিতর দিয়ে কখনও যায় নি৷ বয়লারের পাশে দাঁড়িয়ে যে লোকটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কয়লা ঢালে, তার সর্বাঙ্গ দিয়ে কী রকম ঘাম ঝরে দেখেছেন—এই জাহাজেই যার দুদিক খোলা, পদ্মার জোর বাতাসের বেশ খানিকটা যেখানে স্বচ্ছন্দে বেশ আনাগোনা করতে পারে৷ এ তো বেহেশৎ৷ আর দরিয়ার জাহাজের গর্ভের নীচে যেখানে এঞ্জিন-ঘর, তার সব দিক বন্ধ, তাতে কখনও হাওয়া-বাতাস ঢোকে না৷ সেই দশ বারো চোদ্দ হাজার-টনী ডাঙর ডাঙর জাহাজের বয়লারের আকারটা কত বড় হয় এবং সে কারণে গরমিটার বহর কতখানি, সে কি বাইরের থেকে কখনও অনুমান করা যায়? খাল বিল নদীর হাওয়ার বাচ্ছা আমরা—হঠাৎ একদিন দেখি, সেই জাহান্নামের মাঝখানে, কালো-কালো বিরাট-বিরাট শয়তানের মত কলকব্জা, লোহালক্কড়ের মুখোমুখি৷

‘পয়লা পয়লা কামে নেমে সবাই ভিরমি যায়৷ তাদের তখন উপরে টেনে জলের কলের নীচে শুইয়ে দেওয়া হয়, হুঁশ ফিরলে পর মুঠো মুঠো নুন গেলান হয়, গায়ের ঘাম দিয়ে সব নুন বেরিয়ে যায় বলে মানুষ তখন আর বাঁচতে পারে না৷

‘কিংবা দেখবেন কয়লা ঢেলে যাচ্ছে বয়লারে ঠিক ঠিক, হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই, বেলচা ফেলে ছুটে চলেছে সিঁড়ির পর সিঁড়ি বেয়ে, খোলা ডেক থেকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে৷ অসহ্য গরমে মাথা বিগড়ে গিয়েছে, জাহাজী বুলিতে একেই বলে ‘‘এমখ’’—’

আমি শুধালুম ‘একেই কি ইংরাজীতে বলে এমাক (amuck)? কিন্তু তখন তো মানুষ খুন করে!’

সারেঙ বললে, ‘জী হাঁ৷ তখন বাধা দিতে গেলে হাতের কাছে যা পায়, তাই দিয়ে খুন করতে আসে৷’ তারপর একটু থেমে সারেঙ বললে, ‘আমাদের সকলেরই দু-একবার হয়েছে, আর সবাই জাবড়ে ধরে চুবিয়ে আমাদের ঠাণ্ডা করেছে—শুধু সমীরুদ্দী কখখনো একবারের তরেও কাতর হয় নি৷ তাকে আপনি দেখেছেন, সায়েব? বাং মাছের মত ছিল তার শরীর, অথচ হাত দিয়ে টিপলে মনে হত কচ্ছপের খোল৷ জাহাজের চীনা বাবুর্চির ওজন ছিল তিন মণের কাছাকাছি—তাকে সে এক থাবড়া মেরে বসিয়ে দিতে পারত৷ লাঠি খেলে খেলে তার হাতে জমেছিল বাঘের থাবার তাগদ৷ কিন্তু সে যে ভিরমি যায় নি, ‘‘এমখ’’ হয় নি, তার কারণ তার শরীরের জোর নয়—দিলের হিম্মৎ—সে মন বেঁধেছিল, যে করেই হোক পয়সা সে কামাবেই, ভিরমি গেলে চলবে না, বিমারি পাকড়নো সখৎ মানা৷’

সারেঙ বললে, ‘কী বেহদ তকলীফে জানপানি হয়ে যে কুলুম শহরে পৌঁছলাম—’

আমি শুধালাম, ‘সে আবার কোথায়?’

বললে, ‘বাংলায় যারে লঙ্কা কয়৷’

আমি বললুম, ‘ও, কলম্বো!’

‘জী৷ আমাদের উচ্চারণ তো আপনাদের মত ঠিক হয় না৷ আমরা বলি কুলুম শহর৷ সেখানে ডাঙায় বেড়াবার জন্য আমাদের নামতে দিল বটে, কিন্তু যারা পয়লা বার জাহাজে বেরিয়েছে, তাদের উপর কড়া নজর রাখা হয়, পাছে জাহাজের অসহ্য কষ্ট এড়াবার জন্যে পালিয়ে যায়৷ সমীরুদ্দী বন্দরে নামলেই না৷ বললে, নামলেই তো বাজে খরচা৷ আর সে-কথা ঠিকও বটে, হুজুর, খালাসীরা কাঁচা পয়সা বন্দরে যা ওড়ায়! যে জীবনে কখনও পাঁচ টাকার নোট দেখে নি, আধুলির বেশী কামায় নি, তার হাতে পনের টাকা৷ সে তখন কাগের বাচ্চা কেনে৷

‘আমরা পেট ভরে যা খুশি তা খেলাম৷ বিশেষ করে শাক-সবজি৷ জাহাজে খালাসীদের কপালে ও জিনিস কম৷ নেই বললেও হয়—দেশে যার ছড়াছড়ি৷

‘তারপর কুলুম থেকে আদন বন্দর৷’

আমার আর ইংরিজী ‘এইডন’ বলার দরকার হল না৷

তারপর লাল-দরিয়া পেরিয়ে সুসোর খাড়ি—দু দিকে ধু-ধু মরুভূমি, বালু আর বালু, মাঝখানে ছোট্ট খাল৷’

বুঝলুম, ‘সুসোর খাড়ি’ মানে সুয়েজ কানাল৷

‘তারপর পুর্সই৷ সেখানে খালের শেষ৷ বাড়িয়া বন্দর৷ আমরা শাক-সবজি খেতে নামলাম সেখানে৷ ঝানুরা গেল খারাপ জায়গায়৷’

পোর্ট সঈদের গণিকালয় যে বিশ্ববিখ্যাত, দেখলুম, সারেঙের পো সে খবরটি রাখে৷

‘পুর্সই থেকে মার্সই, মার্সই থেকে হামবুর—জর্মনির মুলুকে৷’

ততক্ষণে সিলেটী উচ্চারণে বিদেশী শব্দ কী ধ্বনি নেয়, তার খানিকটা আন্দাজ হয়ে গিয়েছে, তাই বুঝলুম, মারসেইলজ, হামবুর্গের কথা হচ্ছে৷ আর এটাও লক্ষ্য করলুম যে, সারেঙ বন্দরগুলোর নাম সোজা ফরাসী-জর্মন থেকে শুনে শিখেছে, তারা যে-রকম উচ্চারণ করে, ইংরিজীর বিকৃত উচ্চারণের মারফতে নয়৷

সারেঙ বলল, ‘হামবুরে সব মাল নেমে গেল৷ সেখান থেকে আবার মাল গাদাই করে আরা দরিয়া পাড়ি দিয়ে গিয়ে পৌঁছলাম নুউক বন্দরে—মিরকিন মুলকে৷

‘নয়া ঝুনা কোন খালাসীকে নুউক বন্দরে নামতে দেয় না৷ বড় কড়াকড়ি সেখানে৷ আর হবেই বা না কেন? মিরকিন মুলুক সোনার দেশ৷ আমাদের মত চাষাভূষাও সেখানে মাসে পাঁচ-সাত শো টাকা কামাতে পারে৷ আমাদের চেয়েও কালা, একদম মিশকালা আদমীও সেখানে তার চেয়েও বেশী কামায়৷ খালাসীদের নামতে দিলে সব কটা ভেগে গিয়ে তামাম মুলুকে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণভরে টাকা কামাবে৷ তাতে নাকি মিরকিন মজুরদের জবর লোকসান হয়৷ তাই আমরা হয়ে রইলাম জাহাজে বন্দী৷

‘নুউক পৌঁছবার তিন দিন আগে থেকে সমীরুদ্দীর করল শক্ত পেটের অসুখ৷ আমরা আর পাঁচজন ব্যামোর ভান করে হামেশাই কাজে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করতাম, কিন্তু সমীরুদ্দী এক ঘণ্টার তরেও কোন প্রকারের গাফিলি করে নি বলে ডাক্তার তাকে শুয়ে থাকবার হুকুম দিলে৷

‘নুউক পৌঁছবার দিন সন্ধ্যেবেলা সমীরুদ্দী আমাকে ডেকে পাঠিয়ে কসমকিরে খাইয়ে কানে কানে বললে, সে জাহাজ থেকে পালাবে৷ তারপর কী কৌশলে সে পারে পৌঁছবে, তার ব্যবস্থা সে আমায় ভাল করে বুঝিয়ে বললে৷

‘বিশ্বাস করবেন না সায়েব, কী রকম নিখুঁত ব্যবস্থা সে কত ভেবে তৈরী করেছিল৷ কলকাতার চোরা-বাজার থেকে সে কিনে এনেছিল একটা খাস নীল রঙের সুট, শার্ট, টাইকলার, জুতা, মোজা৷

‘আমাকে সাহায্য করতে হল শুধু একটা পেতলের ডেগচি যোগাড় করে দিয়ে৷ সন্ধ্যার অন্ধকারে সমীরুদ্দী সাঁতারের জাঙিয়া পরে নামল জাহাজের উলটো ধার দিয়ে, খোলা সমুদ্রের দিকে৷ ডেগচির ভিতরে তার সুট, জুতো, মোজা আর একখানা তোয়ালে৷ বুক দিয়ে সেই ডেগচি ঠেলে ঠেলে বেশ খানিকটা চক্কর দিয়ে সে প্রায় আধ-মাইল দূরে গিয়ে উঠবে ডাঙায়৷ পাড়ে উঠে, তোয়ালে দিয়ে গা মুছে, জাঙিয়া ডেগচি জলে ডুবিয়ে দিয়ে শিস দিতে দিতে চলে যাবে শহরের ভিতর৷ সেখানে আমাদেরই এক সিলেটী ভাইকে সে খবর দিয়ে রেখেছিল হামবুর থেকে৷ পুলিসের খোঁজাখুঁজি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে গা-ঢাকা দিয়ে থাকবে কয়েকদিন, তারপর দাড়িগেঁাফ কামিয়ে চলে যাবে নুউক থেকে বহুদূরে, যেখানে সিলেটীরা কাঁচা পয়সা কামায়৷ পালিয়ে ডাঙায় উঠতে পুলিসের হাতে ধরা পড়ার যে কোন ভয় ছিল না তা নয়, কিন্তু একবার সুটটি পরে রাস্তায় নামতে পারলে পুলিস দেখলেও ভাববে, সে নুউকবাসিন্দা, সমুদ্রপারে এসেছিল হাওয়া খেতে৷

‘পেলেনটা ঠিক উতরে গেল, সায়েব৷ সমীরুদ্দীর জন্য খোঁজ-খোঁজ রব উঠল পরের দিন দুপুরবেলা৷ ততক্ষণে চিড়িয়া যে শুধু উড় গিয়া তা নয় সে বনের ভিতর বিলুকুল উধাও৷ একদম না-পাত্তা৷ বরঞ্চ বনের ভিতর পাখিকে পেলেও পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু নুউক শহরের ভিতর সমীরুদ্দীকে খুঁজে পাবে কোন পুলিসের গোঁসাই?’

গল্প বলায় ক্ষান্ত দিয়ে সারেঙ গেল জোহরের নমাজ পড়তে৷ ফিরে এসে ভূমিকা না দিয়েই সারেঙ বললে, ‘তারপর হুজুর আমি পুরো সাত বচ্ছর জাহাজে কাটাই৷ দু-পাঁচবার খিদিরপুরে নেমেছি বটে কিন্তু দেশে যাবার আর ফুরসৎ হয়ে ওঠে নি৷ আর কী-ই বা হত গিয়ে, বাপ-মা মরে গিয়েছে, বউ-বিবিও তখন ছিল না৷ যতদিন বেঁচে ছিল, বাপকে মাঝে মাঝে টাকা পাঠাতাম—বুড়া শেষের ক বছর সুখেই কাটিয়েছে—খুদাতলার শুকুর—বুড়ী নাকি আমার জন্য কাঁদত৷ তা হুজুর দরিয়ার অথৈ নোনা পানি যাকে কাতর করতে পারে না, বুড়ীর দু ফোঁটা নোনা জল তার আর কী করতে পারে বলুন!’

বলল বটে হক কথা, তবু সারেঙের চোখেও এক ফোঁটা নোনা জল দেখা দিল৷

সারেঙ বললে, ‘যাক সে কথা! এ সাত বছর মাঝে মাঝে এর মুখ থেকে ওর মুখ থেকে খবর কিংবা গুজব, যাই বলুন, শুনেছি, সমীরুদ্দী বহুত পয়সা কামিয়েছে, দেশেও নাকি টাকা পাঠায়, তবে সে আস্তানা গেড়ে বসেছে মিরকিন মুলুকে, দেশে ফেরার কোন মতলব নেই৷ তাই নিয়ে আমি আফসোস করি নি, কারণ খুদাতালা যে কার জন্য কোন মুলুকে দানাপানি রাখেন, তার হদিস বাতলাবে কে?

‘তারপর কল-ঘরের তেলে-পিছল মেঝেতে আছাড় খেয়ে ভেঙে গেল আমার পায়ের হাড্ডি৷ বড় জাহাজের কাম ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে এসে ঢুকলাম ডিসপ্যাচারের কামে৷ এ-জাহাজে আসার দুদিন পরে, একদিন খুব ভোরবেলা ফজরের নমাজের ওজু করতে যাচ্ছি, এমন সময় তাজ্জব মেনে দেখি, ডেকে বসে রয়েছে সমীরুদ্দী! বুকে জাবড়ে ধরে তাকে বললাম, ভাই সমীরুদ্দী! এক লহমায় আমার মনে পড়ে গেল, সমীরুদ্দীকে এককালে আমি আপনার ভাইয়ের মতন কতই না প্যার করেছি৷

‘কিন্তু তাকে হঠাৎ দেখতে পাওয়ার চেয়েও বেশী তাজ্জব লাগল আমার, সে আমার প্যারে কোন সাড়া দিল না বলে৷ গাঙের দিকে মুখ করে পাথরের পুতুলের মত বসে রইল সে৷ শুধালাম, ‘‘তোর দেশে ফেরার খবর তো আমি পাই নি৷ আবার এ জাহাজে করে চলেছিস তুই কোথায়? কলকাতা? কেন? দেশে মন টিঁকল না’’?

‘কোন কথা কয় না৷ ফকির-দরবেশের মত বসে রইল ঠায়, তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে, যেন আমাকে দেখতেই পায় নি৷

‘বুঝলাম কিছু একটা হয়েছে৷ তখনকার মত তাকে আর কথা কওয়াবার চেষ্টা না করে, ঠেলেঠুলে কোন গতিকে তাকে নিয়ে গেলাম আমার কেবিনে৷ নাশতার পেলেট সামনে ধরলাম, আণ্ডা ভাজা ও পরটা দিয়ে সাজিয়ে—ওই খেতে সে বড় ভালবাসত—কিছু মুখে দিতে চায় না৷ তবু জোর করে গেলালাম, বাচ্চাহারা মাকে মানুষ যে-রকম মুখে খাবার ঠেসে দেয়, কিন্তু হুজুর, পরের জন্য অনেক কিছু করা যায়, জানতক কুরবানি দিয়ে তাকে বাঁচানো যায়, কিন্তু পরের জন্য খাবার গিলি কী করে?

‘সেদিন দুপুরবেলা তাকে কিছুতেই গোয়ালন্দে নামতে দিলাম না৷ আমার, হুজুর, মনে পড়ে গেল বহু বৎসরের পুরনো কথা—নুউক বন্দরেও আমাদের নামতে দেয় নি, তখন সমীরুদ্দী সেখানেই গায়েব হয়েছিল৷

‘রাত্রের অন্ধকারে সমীরুদ্দীর মুখ ফুটল৷

‘হঠাৎ নিজের থেকেই বলতে আরম্ভ করল, কী ঘটেছে৷’

সারেঙ দম নেবার জন্য না অন্য কোন কারণে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল বুঝতে পারলুম না৷ আমিও কোন খোঁচা দিলুম না৷ বললে, ‘তা সে দুঃখের কাহিনী—ঠিক ঠিক বলি কী করে সায়েব? এখনও মনে আছে, কেবিনের ঘোরঘুট্টি অন্ধকারে সে আমাকে সব-কিছু বলেছিল৷ এক-একটা কথা যেন সে-অন্ধকার ফুটো করে আমার কানে এসে বিন্ধেছিল, আর অতি অল্প কথায়ই সে সব কিছু সেরে দিয়েছিল৷

‘সাত বছরে সে প্রায় বিশ হাজার টাকা পাঠিয়েছিল দেশে তার ছোট ভাইকে৷ বিশ হাজার টাকা কতখানি হয়, তা আমি জানি নে, একসঙ্গে কখনও চোখে দেখি নি—’

আমি বললুম, ‘আমিও জানি নে, আমিও দেখি নি৷’

‘তবেই বুঝুন হুজুর, সে-টাকা কামাতে হলে কটা জান কুরবানি দিতে হয়৷

‘প্রথম পাঁচশো টাকা পাঠিয়ে ভাইকে লিখলে, মহাজনের টাকা শোধ দিয়ে বাড়ি ছাড়াতে৷ তার পরের হাজার দেড়েক বাড়ির পাশের পতিত জমি কেনার জন্য৷ তারপর আরও অনেক টাকা দিঘি খোদাবার জন্য, তারপর আরও বহুত টাকা শহুরী ঢঙে পাকা চুনকাম করা দেয়ালওলা টাইলের চারখানা বড় ঘরের জন্য, আরও টাকা ধানের জমি, বলদ, গাই, গোয়ালঘর, মরাই, বাড়ির পিছনে মেয়েদের পুকুর, এসব করার জন্য এবং সর্বশেষে হাজার পাঁচেক টাকা টঙ্ঘিরের উল্টোদিকে দিঘির এপারে পাকা মসজিদ বানাবার জন্য৷

‘সাত বছর ধরে সমীরুদ্দী মিরকিন মুলুকে, অসুরের মত খেটে দু শিফট আড়াই শিফটে গতর খাটিয়ে জান পানি করে পয়সা কামিয়েছে, তার প্রত্যেকটি কড়ি হালালের রোজকার, আর আপন খাই-খরচার জন্য সে যা পয়সা খরচ করেছে, তা দিয়ে মিরকিন মুলুকের ভিখারীরও দিন গুজরান হয় না৷

‘সব পয়সা সে ঢেলে দিয়েছে বাড়ি বানাবার জন্য, জমি কেনার জন্য৷ মিরকিন মুলুকের মানুষ যে-রকম চাষবাসের খামার করে, আর ভদ্রলোকের মত ফ্যাশানের বাড়িতে থাকে, সে দেশে ফিরে সেই রকম করবে বলে৷

‘ওদিকে ভাই প্রতি চিঠিতে লিখেছে, এটা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে—করে করে যেদিন সে খবর পেল মসজিদ তৈরি শেষ হয়েছে, সেদিন রওয়ানা ছিল দেশের দিকে৷ নুউক বন্দরে জাহাজে কাজ পায় আনাড়ী কালা আদমিও বিনা তকলিফে৷ তার ওপর সমীরুদ্দী হরেক রকম কারখানার কাজ করে করে কলকব্জা এমনি ভাল শিখে গিয়েছিল যে, তারই সার্টিফিকেটের জোরে, জাহাজে আরামের চাকরি করে ফিরল খিদিরপুর৷ সন্ধ্যের সময় জাহাজ থেকে নেমে সোজা চলে গেল শেয়ালদা৷ সেখানে প্লাটফর্মে রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরে চাটগাঁ মেল ধরে শ্রীমঙ্গল স্টেশনে পৌঁছল রাত তিনটেয়৷ সেখান থেকে হেঁটে রওয়ানা দিল ধলাইছড়ার দিকে—আট মাইল রাস্তা, ভোর হতে না-হতেই বাড়ি পৌঁছে যাবে৷

‘রাস্তা থেকে পোয়াটাক মাইল ধানক্ষেত, তারপর ধলাইছড়া গ্রাম৷ আলের উপর দিয়ে গ্রামে পৌঁছতে হয়৷

‘বিহানের আলো ফোটবার সঙ্গে সঙ্গে সমীরুদ্দী পৌঁছল ধানক্ষেতের মাঝখানে৷

‘মসজিদের একটা উঁচু মিনার থাকার কথা ছিল—কারণ মসজিদের নকশাটা সমীরুদ্দীকে করে দিয়েছিলেন এক মিশরী ইঞ্জিনিয়ার, আর হুজুরও মিশর মুলুকে বহুকাল কাটিয়েছেন, তাদের মসজিদে মিনারের বাহার হুজুর দেখেছেন, আমাদের চেয়ে ঢের বেশী৷

‘কত দূর-দূরান্ত থেকে সে-মিনার দেখা যায়৷ সে আপনি জানেন, আমিও জানি, সমীরুদ্দীও জানে৷

‘মিনার না দেখতে পেয়ে সমীরুদ্দী আশ্চর্য হয়ে গেল, তারপর ক্রমে ক্রমে এগিয়ে দেখে—কোথায় দিঘি, কোথায় টাইলের টঙ্ঘির!’

আমি আশ্চর্য হয়ে শুধালাম, ‘সে কী কথা!’

সারেঙ যেন আমার প্রশ্ন শুনতে পায় নি৷ আচ্ছন্নের মত বলে যেতে লাগল, ‘কিচ্ছু না, কিচ্ছু না, সেই পুরনো ভাঙা খড়ের ঘর, আরও পুরনো হয়ে গিয়েছে৷ যেদিন সে বাড়ি ছেড়েছিল, সেদিন ঘরটা ছিল চারটা বাঁশের ঠেকনায় খাড়া, আজ দেখে ছটা ঠেকনা৷ তবে কি ছোট ভাই বাড়ি-ঘরদোর গাঁয়ের অন্য দিকে বানিয়েছে? কই, তা হলে তো নিশ্চয়ই সেকথা কোন-না-কোন চিঠিতে লিখত৷ এমন সময় দেখে গাঁয়ের বাসিত মোল্লা৷ মোল্লাজী আমাদের সবাইকে বড্ড প্যার করে৷ সমীরুদ্দীকে আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন৷

‘প্রথমটায় তিনিও কিছু বলতে চান নি৷ পরে সমীরুদ্দীর চাপে পড়ে সেই ধানক্ষেতের মধ্যিখানে তাকে খবরটা দিলেন৷ তার ভাই সব টাকা ফুঁকে দিয়েছে৷ গোড়ার দিকে শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, মৌলবীবাজারে, শেষের দিকে কলকাতায়—ঘোড়া, মেয়েমানুষ আরও কত কী!’

আমি থাকতে না পেরে বললুম, ‘বল কী সারেঙ! এ-রকম ঘা মানুষ কি সইতে পারে? কিন্তু বল দিকিন, গাঁয়ের কেউ তাকে চিঠি লিখে খবরটা দিলে না কেন?’

সারেঙ বললে, ‘তারাই বা জানবে কি করে, সমীরুদ্দী কেন টাকা পাঠাচ্ছে৷ সমীরুদ্দীর ভাই ওদের বলেছে, বড় ভাই বিদেশে লাখ লাখ টাকা কামায়, আমাকে ফুর্তি-ফার্তির জন্য তারই কিছুটা পাঠায়৷ সমীরুদ্দীর চিঠিও সে কাউকে দিয়ে পড়ায় নি—সমীরুদ্দী নিজে আমারই মত লিখতে পড়তে জানে না, কিন্তু হারামজাদা ভাইটাকে পাঠশালায় পাঠিয়ে লেখাপড়া শিখিয়েছিল৷ তবু মোল্লাজী আর গাঁয়ের পাঁচজন তার টাকা ওড়াবার বহর দেখে তাকে বাড়িঘরদোর বাঁধতে, জমি-খামার কিনতে উপদেশ দিয়েছিলেন৷ সে নাকি উত্তরে বলেছিল, বড় ভাই বিয়ে শাদি করে মিরকিন মুলুকে গেরস্থালী পেতেছে, এ দেশে আর ফিরবে না, আর যদি ফেরেই বা, সঙ্গে নিয়ে আসবে লাখ টাকা৷ তিন দিনের ভিতর দশখানা বাড়ি হাঁকিয়ে দেবে৷’

আমি বললাম, ‘উঃ! কী পাষণ্ড! তারপর?’

সারেঙ বললে, ‘সমীরুদ্দী আর গাঁয়ের ভিতর ঢোকে নি৷ সেই খানক্ষেত থেকে উঠে ফিরে গেল আবার শ্রীমঙ্গল স্টেশনে৷ সমীরুদ্দী আমাকে বলে নি কিন্তু মোল্লাজী নিশ্চয়ই তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন, কিন্তু সে ফেরে নি৷ শুধু বলেছিল, যেখান থেকে এয়েছে, সেখানেই আবার ফিরে যাচ্ছে৷

‘কলকাতার গাড়ি সেই রাত আটটায়৷ মোল্লাজী আর গাঁয়ের মুরুব্বীরা তার ভাইকে নিয়ে এলেন স্টেশনে—টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে সে গাঁয়েই ছিল৷ সমীরুদ্দীর দু পা জড়িয়ে ধরে সে মাপ চেয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে৷ আরও পাঁচজন বললেন, বাড়ি চল, ফের মিরকিন যাবি তো যাবি, কিন্তু এতদিন পরে দেশে এসেছিস, দুদিন জিরিয়ে যা৷’

আমি বললুম, ‘রাস্কেলটা কোন মুখ নিয়ে ভাইয়ের কাছে এল সারেঙ?’

সারেঙ বললে, ‘আমিও তাই পুছি৷ কিন্তু জানেন সায়েব, সমীরুদ্দী কী করলে? ভাইকে লাথি মারলে না, কিছু না, শুধু বললে সে বাড়ি ফিরে যাবে না৷

‘তার পরদিন ভোরবেলা এই জাহাজে তার সঙ্গে দেখা৷ আপনাকে তো বলেছি, শা-বন্দরের বারুণীর পুতুলের মত চুপ করে বসে৷’

দম নিয়ে সারেঙ বললে, ‘অতি অল্প কথায় সমীরুদ্দী আমাকে সব-কিছু বলেছিল৷ কিন্তু হুজুর, শেষটায় সে যা আপন মনে বিড়বিড় করে বলেছিল, তার মানে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি৷ তবে কথাগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে৷ সে বলেছিল, ‘‘ভিখিরী স্বপ্নে দেখে সে বড়লোক হয়ে গিয়েছে, তারপর ঘুম ভাঙতেই সে দেখে সে আবার দুনিয়ায়৷ আমি দেশে টাকা পাঠিয়ে বাড়িঘরদোর বানিয়ে হয়েছিলাম বড়লোক, সেই দুনিয়া যখন ভেঙে গেল তখন আমি গেলাম কোথায়’’?’

বাস্তব ঘটনা না হয়ে যদি শুধু গল্প হত, তবে এইখানেই শেষ করা যেত৷ কিন্তু আমি যখন যা শুনেছি তাই লিখছি তখন সারেঙের বাদবাকি কাহিনী না বললে অন্যায় হবে৷

সারেঙ বললে, ‘চৌদ্দ বছর হয়ে গিয়েছে কিন্তু আমার সর্বক্ষণ মনে হয় যেন কাল সাঁঝে সমীরুদ্দী আমার কেবিনের অন্ধকারে তার ছাতির খুন ঝরিয়েছিল৷

‘কিন্তু ওই যে ইনসাফ বললেন না হুজুর, তার পাত্তা দেবে কে?

‘সমীরুদ্দী মিরকিন মুলুকে ফিরে গিয়ে দশ বছরে আবার তিরিশ হাজার টাকা কামায়৷ এবারে আর ভাইকে টাকা পাঠায় নি৷ সেই ধন নিয়ে যখন দেশে ফিরছিল তখন জাহাজে মারা যায়৷ ত্রিসংসারে তার আর কেউ ছিল না বলে টাকাটা পৌঁছল সেই ভাইয়েরই কাছে৷ আবার সে টাকাটা ওড়াল৷’

ইনসাফ কোথায়?

ধানমন্ডি-৩২-এ ভাঙচুর, আগুন

ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারকে ঘিরে ফের ভাঙচুরের মুখে পড়েছে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি। বুধবার রাতে শেখ হাসিনার বক্তব্য আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে প্রচার করা হয়। পলাতক অবস্থায় তার এই বক্তব্য প্রচারকে ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থী ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়াদের মাঝে। দিনেই ঘোষণা দেয়া হয় শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের সময় ধানমন্ডির ৩২ এর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। রাত আটটার দিকে দলে দলে শিক্ষার্থী ও বিক্ষুব্ধ মানুষ ধানমন্ডি-৩২ এর দিকে যেতে থাকেন। ফটক ভেঙে শিক্ষার্থী ও জনতা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। তাদের কেউ কেউ হাতে থাকা লাঠি ও ভারি বস্তু দিয়ে স্থাপনার বিভিন্ন অংশে ভাঙচুর করেন। লোহার জিনিস খুলে নিতে দেখা যায় কাউ কাউকে। বাড়ির সামনে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাঙা ম্যুরালটিতে ভাঙচুর করা হয়। রাত নয়টার দিকে ভবনের একটি অংশে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। শিক্ষার্থী-জনতা বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে অবস্থান করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের কেউ কেউ ‘মুজিববাদের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ ‘মুজিববাদের আস্তানা বাংলাদেশে হবে না’ ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা’ এমন স্লোগান দেন। কাউকে কাউকে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার বলেও মিছিল করতে দেখা যায়। ওদিকে, ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদনে আগুন দিয়েছে ছাত্র-জনতা। বুধবার রাত পৌনে ১১টার দিকে ওই বাড়িতে আগুন দেয়া হয়।

বিক্ষোভ-ভাঙচুর চলার সময় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আশপাশে দেখা যায়নি। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ৩২ নম্বরের বাড়িতে প্রবেশ করেন। এসময় উপস্থিত ছাত্র-জনতা হইচই শুরু করেন এবং সেনা সদস্যদের চলে যাওয়ার দাবি জানান। এক পর্যায়ে সেনা সদস্যরা সেখান থেকে বের হয়ে মিরপুর রোডে অবস্থান নেন। রাত ১১টার দিকে একটি ক্রেন নেয়া হয় ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে।

৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের দিনেই শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত বাসস্থান ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয় ছাত্র-জনতা। ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের কারণে এই ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের পারিবারিক এই বাসস্থান সর্বশেষ ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে পরিচিত ছিল।

বুধবার রাত নয়টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ভাষণ দেবেন এমনটি আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে প্রচার করা হয়। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা এই ভাষণ দেবেন বলে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও প্রচার করা হয়। নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি প্রচার করা হয়। শেখ হাসিনার এই বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে কড়া বার্তা দেয়া হয় বৈষম্য বিরোধী ছাত্রআন্দোলনের পক্ষ থেকে।

শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ঘোষণার পর জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের মুখপাত্র ফানতাসির মাহমুদ বলেন, আমরা বুলডোজার দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম স্বৈরাচারের চিহ্ন মুছে দিতে চাই। অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ঘোষণা দেন ঠিক যে সময়ে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেয়া শুরু করবেন, তখনই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ভবনে ভাঙচুর চালানো হবে।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এক ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, হাসিনাকে বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ দেয়াকে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী জনগণের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ হিসেবে দেখি। সন্ধ্যায় ফেইসবুকে আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, আজ রাতে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমি মুক্ত হবে। এছাড়া আরো অনেকে ধানমন্ডি-৩২ এর বাড়ি ভেঙে দেয়ার প্রচারণা চালান।

খুলনায় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় ‘শেখ বাড়ি’: ওদিকে খুলনায় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় স্থানীয় শেখ বাড়ি। বুধবার রাত নয়টার দিকে নগরের ময়লাপোতা এলাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচার বাড়িতে ভাঙচুর চলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা ঘোষণা দিয়ে ওই ভাঙচুর চালান। পরে তারা সিটি করপোরেশনের দুটি বুলডোজার নিয়ে বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়া শুরু করেন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন।

খুলনা নগরের ময়লাপোতা এলাকায় অবস্থিত ওই বাড়িতে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন, শেখ সোহেল উদ্দিনসহ আরও কয়েক ভাই থাকতেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তারা পলাতক রয়েছেন। গত ৪ই আগস্ট প্রথম দফায় বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন ছাত্র-জনতা। সেদিন বাড়িতে কেউ ছিলেন না। ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর আবারও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়।

ওদিকে, কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফের বাড়িতে ভাংচুর চালানো হয়েছে।

mzamin

আগুন দেওয়া হয়েছে ৩২ নম্বরে, নেওয়া হয়েছে ক্রেন

ভাঙচুরের এক পর্যায়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির তৃতীয় তলায় আগুন দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার রাত পৌনে ৯টার দিকে সেখানে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে চলছে ভাঙচুর। রাত ১১টার সময়ও সেখানে আগুন জ্বলছে।

ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাত পৌনে ১১টার দিকে সেখানে বড় একটি ক্রেন আনা হয়েছে। ৩২ নম্বরের এই বাড়ির পাশের একটি ভবনের এক পাশেও আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।

৩২ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলা ও দোতালায় অনেক মানুষ রয়েছে। বাড়িটির দেয়াল ভাঙছে কেউ কেউ। অনেকে হাতুড়ি বা লাঠি দিয়ে বাড়িটির সীমানা দেয়াল ভাঙছেন। কিছু মানুষকে জানালার গ্রিল, কাঠ এসব নিয়ে যেতে দেখা গেছে। অনেক মানুষ বাড়িটির সামনে আসছেন, কিছুক্ষণ দেখে, ছবি তুলে ও ভিডিও করে কেউ কেউ চলে যাচ্ছেন।

রাত ১১টার সময়ও বাড়িটির সামনে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী অবস্থান করছেন। তারা স্বৈরাচারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। ‘স্বৈরাচারের আস্তানা, ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও’ স্লোগান বেশি দিতে শোনা গেছে।

এর মধ্যে ৩২ নম্বর বাড়ির উল্টোপাশে লেকের সেতুর পাশ দিয়ে খোলা জায়গায় প্রজেক্টরে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হচ্ছে। এর আয়োজন করেছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, ধানমণ্ডি থানা শাখা। স্পিকারে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, ‘আমরা আন্দোলনের প্রামাণ্যচিত্র দেখাচ্ছি। আপনাদের যাদের ভাঙার আছে, তারা সামনে গিয়ে ভেঙে আসেন। এখানে যারা প্রামাণ্যচিত্র দেখতে চায়, তাদের সুযোগ দেন।’

এর আগে রাত আটটার দিকে কয়েক শ বিক্ষোভকারী ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। এক পর্যায়ে তারা বাড়িটর ফটক ভেঙে ফেলেন। পরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করা হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে অবস্থান নেওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা আজ রাতে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভাষণ দেন। একে কেন্দ্র করে বিকেলে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে ফেসবুকে একাধিক পোস্ট দেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য শরিফ ওসমান হাদি। আর সন্ধ্যা সাতটার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘আজ রাতে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমি মুক্ত হবে।’

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর এই বাসভবন থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগের দিনগুলোতে দিকনির্দেশনা দিতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু, তাঁর স্ত্রী–পুত্র, পুত্রবধূসহ আত্মীয়দের হত্যা করা হয়েছিল এখানে। এই বাড়িটিকে স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছিল বিক্ষুব্ধ জনতা। এর পর থেকে বাড়িটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর চলার মধ্যে আগুন দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার রাতের চিত্র
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর চলার মধ্যে আগুন দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার রাতের চিত্র। ছবি: ড্রিঞ্জা চাম্বুগং