Monday, December 2, 2024

সিরিয়ায় কারা কোন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, মানচিত্রে আদ্যোপান্ত

আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত হামলা চালানোর মাত্র তিন দিনের মধ্যে সিরিয়ার উত্তর–পশ্চিমের আলেপ্পো দখল করে নিয়েছেন হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী যোদ্ধারা। তাঁরা এখন দক্ষিণে হামা শহরের দিকে এগোচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদের অনুগত বাহিনীর বিরুদ্ধে এ আক্রমণ দেশটিতে ১৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সম্ভবত একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী গত শনিবার দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পো থেকে ‘অস্থায়ীভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের’ ঘোষণা দিয়েছে। সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে পুনরায় সংগঠিত হবে।

সিরিয়ায় ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর ২০১৬ সালে রুশ বিমান বাহিনীর সহায়তায় আলেপ্পোয় ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়ে শহরটি পুনরুদ্ধার করে প্রেসিডেন্ট আসাদের বাহিনী। এর পর থেকে গত নভেম্বর পর্যন্ত ইরান, রাশিয়া ও লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সমর্থন নিয়ে আলেপ্পো নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা। এ শহরের জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখ।

সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় চারটি প্রধান দল বা পক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এগুলো হলো আসাদের অনুগত সরকারি বাহিনী, সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস, এইচটিএস ও অন্যান্য সহযোগী বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং তুর্কি ও তুরস্ক-সমর্থিত সিরিয়ার বিদ্রোহী বাহিনী।

সিরিয়ার সেনাবাহিনী সরকার–সমর্থক আধা সামরিক গোষ্ঠী ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সেস–এর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে।

সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত কুর্দি-অধ্যুষিত গোষ্ঠী। এটি পূর্ব সিরিয়ার কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

এইচটিএস হলো আল-নুসরা ফ্রন্টের নতুন সংস্করণ। এটি একসময় আল-কায়েদার প্রতি অনুগত ছিল। ২০১৬ সালে ফ্রন্টটি এ সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। পরে এইচটিএস অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত হয়।

তুর্কি ও তুরস্ক-সমর্থিত বিদ্রোহী বাহিনী সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি উত্তর সিরিয়ার তুর্কি-সমর্থিত একটি বিদ্রোহী বাহিনী।
বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক আক্রমণের শুরু যেভাবে

ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যেদিন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, সেদিন অর্থাৎ গত বুধবার এইচটিএস নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার বিদ্রোহী বাহিনী তাদের উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের ঘাঁটি থেকে হামলা পরিচালনা করে।

এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী বলেছে, সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর হামলার প্রতিশোধ নিতেই তারা সাম্প্রতিক আক্রমণ শুরু করেছে। সম্প্রতি ইদলিবের আরিহা, সারমাদাসহ বিভিন্ন শহরে আসাদ অনুগত সরকারি বাহিনীর হামলায় শিশুসহ বেসামরিক অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া তাদের ঘাঁটিতে (বিদ্রোহী বাহিনীর) ভবিষ্যতে যেকোনো হামলা রুখে দেওয়ার লক্ষ্যে ওই আক্রমণ (আলেপ্পোতে) চালানো হয়।

ইদলিবে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে ২০২০ সালে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর এ অঞ্চলে আসাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে এটিই (বুধবার শুরু করা বিদ্রোহীদের হামলা) প্রথম বড় কোনো অভিযান বলে মনে করা হচ্ছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ওই মধ্যস্থতায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ এইচটিএসের যোদ্ধারা সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে আলেপ্পোর অন্তত ১৯ এলাকা দখল করে নেন। মাত্র তিন দিনে পুরো আলেপ্পো দখল করেন তাঁরা। এখন তাঁরা হামা প্রদেশের দিকে এগোচ্ছেন।

এদিকে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গোলাবর্ষণের মাধ্যমে এসব হামলার জবাব দিয়েছে সিরিয়ার সরকার। রাশিয়াও আসাদের পক্ষে আলেপ্পোতে বিমান হামলা চালিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বিদ্রোহীরা আরও বেশি এলাকা দখলে নেন এবং পূর্ব ইদলিবের গ্রামগুলো থেকে সরকারি বাহিনীকে বিতাড়িত করেন। এরপর এমফাইভ মহাসড়ক ধরে সামনে এগোতে থাকেন। এটি একটি কৌশলগত সড়ক, যা সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী দামেস্কের দিকে চলে গেছে।

সিরিয়া যুদ্ধের পর্যবেক্ষক ও যোদ্ধাদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের মধ্যে বিদ্রোহী বাহিনী দুটি গাড়িবোমার বিস্ফোরণ ঘটায় এবং আলেপ্পো শহরের পশ্চিম প্রান্তে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়। এরপর তারা শহরের বিভিন্ন অংশে প্রবেশ করে। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বলেছে, সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে বিমান হামলায় সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া।

গত শনিবার অনলাইনে বিদ্রোহী বাহিনীর বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, শহরের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় বিদ্রোহী যোদ্ধারা আলেপ্পোর প্রাচীন দুর্গের পাশে ছবি তুলছেন।

আলেপ্পো দখল করার পর বিদ্রোহীরা দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছেন। তবে তাঁরা হামার কেন্দ্রীয় শহরে পৌঁছেছেন কি না, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে।

ইতিমধ্যে বিদ্রোহীরা তাঁদের জন্য নিরাপদ এলাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি ইদলিবের বাস্তুচ্যুত বেসামরিক নাগরিকদের সম্প্রতি মুক্তাঞ্চল হিসেবে ঘোষিত এলাকায় নিজেদের বাড়িতে ফেরানোর প্রচেষ্টার কথাও জানিয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ

সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার করে যাতে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত বা এর অপব্যবহারে নীতিভ্রষ্ট না হয়, সে জন্য ১৬ বছরের কম বয়সীদের এটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়া। এটি আগামী এক বছর পর কার্যকর করা হবে। যে প্রযুক্তি কোম্পানি এই আইন ভঙ্গ করবে তাদের অন্তত ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার জরিমানা করা হবে।

বৃহস্পতিবার (২৮ নভেম্বর) দেশটির সংসদের উচ্চকক্ষ সিনেট এই আইনের অনুমোদন দিয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, ‘ক্ষতিকর’ সামাজিকমাধ্যম থেকে শিশুদের রক্ষায় এই আইন প্রয়োজন। তার এই মতকে দেশটির অনেক বাবা-মা ই সমর্থন করেন।

তবে সমালোচকরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কীভাবে কার্যকর করা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এ ছাড়া প্রাইভেসি এবং সামাজিক সংযোগের ওপর এটির প্রভাব কেমন হবে সেটিও স্পষ্ট নয়।

গত সপ্তাহে সংসদের নিম্নকক্ষে আইনটি উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ। ওই সময় তিনি বলেন, ‘এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আমরা চাই তরুণ অস্ট্রেলিয়ানরা সত্যিকার অর্থে একটি শৈশব পাক। আমরা চাই বাবা-মায়েরা যেন শান্তি পান।’

এই আইনে উল্লেখ করা হয়নি কোন কোন সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী এ সিদ্ধান্তগুলো নেবেন। এক্ষেত্রে ই-নিরাপত্তা কমিশনারের কাছ থেকে পরামর্শ নেবেন তিনি।

তবে গ্যামিং এবং ম্যাসেজিং প্লাটফর্মগুলো নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। এ ছাড়া ইউটিউবের মতো যেসব সাইটে অ্যাকাউন্ট ছাড়াই প্রবেশ করা যায় সেগুলোও হয়ত নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।

সমালোচকরা আরও বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ভিপিএন ব্যবহার বেড়ে যেতে পারে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার যে কেউ ভিপিএন ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে সহজে প্রবেশ করতে পারবেন। এ ছাড়া বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকার যেসব প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে সেগুলোও ঠিক মতো কাজ করবে কি না সেটিও নিশ্চিত নয়।

এখন পর্যন্ত বিশ্বের আর কোনো দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ নিয়ে এত কঠিন আইন করা হয়নি। এ আইনের ফলে অস্ট্রেলিয়ায় ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার পাশাপাশি টিকটকও ১৬ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে নিজেদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে । অন্যথায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি



আলেপ্পোর দখল নেওয়া বিদ্রোহীদের ওপর হামলা রাশিয়ার

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সমর্থনে আবারও এগিয়ে এসেছে রাশিয়া। আলেপ্পোতে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। সম্প্রতি সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এ শহরটি দখলে নেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শামের যোদ্ধারা। এর পরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তোলে রাশিয়া ও ইরান।

রোববার এক প্রতিবেদনে রুশ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস নিউজ জানিয়েছে, আলেপ্পোসহ সিরিয়ার আরও কয়েকটি এলাকায় বিদ্রোহীদের আস্তানা, কমান্ড পোস্ট ও অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। এতে অন্তত ৩০০ জন বিদ্রোহী যোদ্ধা নিহত হয়েছে।

সিরিয়ায় কার্যক্রম চালানো একটি রুশ এজেন্সি বলছে, আলেপ্পো এবং ইদলিব প্রদেশে বিদ্রোহীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। গত বুধবার থেকে এ হামলা শুরু করেছে রুশ বাহিনী। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও সিরিয়ান সেনাবাহিনীর সমর্থনে হামলা চালিয়েছে রুশ বিমান বাহিনী।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (এসওএইচআর) বলেছে, হায়াত তাহরির আল শামের বিদ্রোহীরা সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় রোববার ভোরে রাশিয়ার বিমান হামলার মুখে পড়ে। এতে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

এসওএইচআর বলেছে, ইদলিবের পাশাপাশি হামার গ্রামীণ এলাকাতেও রুশ বাহিনী হামলা চালিয়েছে। সিরিয়ার সরকারবিরোধী হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া বিদ্রোহীরা ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে।

সিরীয় এই পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী বলেছে, দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সিরিয়ার সরকার। গত কয়েক বছরের মধ্যে সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা শুরু করেছে বিদ্রোহীরা। এই হামলায় তারা আলেপ্পোর পাশাপাশি অন্যান্য এলাকারও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

বিদ্রোহীরা আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরেই তাদের অবস্থানে হামলা শুরু করে রাশিয়া। রাশিয়া ও ইরান সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে আসছে। ২০১১ সালে আসাদবিরোধী বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকেই সিরিয়া সরকারের পাশে দাঁড়ায় দেশদুটি। এমনকি আসাদ সেনাদের সমর্থন দেওয়ার জন্য সিরিয়ায় সেনা মোতায়েন করেন পুতিন। 

ছবি : সংগৃহীত

প্যারাশুটে চেপে ৮০ কিমি পথ পাড়ি

রীতিমতো আটঘাট বেঁধে নেওয়া হচ্ছে প্রস্তুতি। লক্ষ্য- নতুন ইতিহাস গড়া। ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে রুশ এয়ারক্রাফট অ্যান্তোনভ এন-৭২। হঠাৎ খুলে গেল এয়ারক্রাফটের হ্যাচ। আগে থেকেই প্রস্তুত ৫ স্কাইডাইভার। একে একে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তারা।

রুশ এই স্কাইডাইভাররা নিছক ঝাঁপ দেননি। এর মাধ্যমে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন তারা। এই স্কাইডাইভে ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন তারা। এর আগে প্যারাশুটে চেপে এত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারেনি কেউ।

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রযুক্তি নির্মাণকারী সংস্থা রোস্টেক জানিয়েছে, মাইনাস ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে ওই স্কাইডাইভাররা ১০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে ঝাঁপ দিয়েছেন। রাশিয়ার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘দালনোলেত’ প্যারাশুট সিস্টেম ব্যবহার করেছেন তারা। এই প্যারাশুটে চেপে কোনো ইঞ্জিনের সহযোগিতা ছাড়াই ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড গড়েন ডাইভাররা।

রোস্টেক জানায়, রাশিয়ার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘দালনোলেত’ প্যারাশুট সিস্টেমের সাহায্যে প্যারাট্রুপাররা স্কাইডাইভ সম্পন্ন করেন। এটা সম্ভব করেছে নতুন প্রযুক্তির এই ‘দালনোলেত’ প্যারাশুট।

ধারণা করা হচ্ছে, নতুন এই প্যারাশুট সিস্টেম আকাশে ডাইভের ক্ষেত্রে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে। এটি সবচেয়ে বেশি কাজে দেবে সামরিক ক্ষেত্রে। এছাড়া অ্যাডভেঞ্চার প্রেমিদের জন্যও এটা হবে অন্যতম আকর্ষণ। 

অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে প্যারাশুট ভ্রমণ খুবই আকর্ষণীয় একটি বিষয়। ছবি : সংগৃহীত
অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে প্যারাশুট ভ্রমণ খুবই আকর্ষণীয় একটি বিষয়। ছবি : সংগৃহীত

দিল্লির পরিবর্তে তৃতীয় দেশ থেকে ভিসা নেওয়ার উদ্যোগ

ভারতের পর্যটন ভিসা এখন বন্ধ রয়েছে। তবে সীমিতভাবে জরুরি মেডিকেল ও শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় দেশের ভিসা চালু রয়েছে। এ দুটি খাতে ভিসা চালু থাকলেও অনেকেই ভারতের ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছেন না। সে কারণে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা বেশি বিপাকে পড়েছেন।

একইভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ওয়ার্ক ভিসা পেতেও সমস্যা হচ্ছে। এসব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে দিল্লির বিকল্প হিসেবে তৃতীয় দেশ থেকে ভিসা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

পশ্চিম ইউরোপের প্রায় সব দেশের ভিসা বাংলাদেশি নাগরিকরা ঢাকা থেকেই পেয়ে থাকেন। আর পূর্ব ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের ভিসা দিল্লি থেকে নিতে হয়। তবে গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ রয়েছে। আর সীমিতভাবে দেওয়া হচ্ছে জরুরি মেডিকেল ও শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় দেশের ভিসা। তবে অনেক শিক্ষার্থীই ভারতের ভিসা না পেয়ে ইউরোপে তাদের গন্তব্যের দেশে যেতে পারছেন না।

পূর্ব ইউরোপের বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড প্রভৃতি দেশের ভিসা নিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের দিল্লি যেতে হয়। কারণ, এসব দেশের দূতাবাস ঢাকায় নেই। তবু এসব দেশে প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থী পড়তে যান। এ ছাড়া রোমানিয়ায় এখন বাংলাদেশের প্রচুর কর্মীও যান। তবে ভারতীয় হাইকমিশন ভিসা সীমিত করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।

তবে রোমানিয়ার ভিসার জন্য শিক্ষার্থীরা থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে দেশটির দূতাবাসে আবেদন করতে পারবেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও কাজাখস্তানে বুলগেরিয়ার ভিসার আবেদন করা যাবে।

এদিকে দিল্লিকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে যেন শিক্ষার্থীরা তৃতীয় দেশের ভিসা পেতে পারেন, সে উদ্যোগ নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষ উদ্যোগে ভিয়েতনামের হ্যানয় এবং ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার দূতাবাসে এরই মধ্যেই ৮৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করেছেন।

সূত্র জানায়, দিল্লিকে পাশ কাটিয়ে ইউরোপের ভিসা তৃতীয় কোনো দেশ থেকে যেন নেওয়া যায়, সে উদ্যোগ নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের কাছাকাছি অন্য দেশগুলো থেকে যেন ভিসা পেতে পারেন, সে প্রচেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ ছাড়া ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া প্রভৃতি দেশের ভিসা যেন বাংলাদেশ থেকেই পাওয়া যায়, সে প্রচেষ্টাও রয়েছে সরকারের।

জানা গেছে, রোববার (১ ডিসেম্বর) ইউরোপের তিন দেশ সফরে গেছেন পররাষ্ট্র সচিব এম জসীম উদ্দিন। দেশগুলো হলো, জার্মানি, চেক রিপাবলিক ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনা। বাংলাদেশি নাগরিকরা সহজেই যেন চেক রিপাবলিক ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ভিসা পেতে পারেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ইস্যুটি তুলতে পারেন পররাষ্ট্র সচিব।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা জানান, এখন যাদের জরুরি প্রয়োজন, তাদের ভিসা দেওয়া হচ্ছে। কারণ, আমাদের লোকবল কম। আমাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে এটি (ট্যুরিস্ট ভিসা) শুরু করা সম্ভব হবে। তবে এখন যাদের জরুরি, তাদের মেডিকেল ভিসা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ভারতে গিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের ভিসার আবেদন যারা করছেন, তাদের আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমরা চাই না এ ধরনের ভ্রমণে কেউ কষ্ট পাক। সে জন্য সর্বোচ্চ যতটুকু সম্ভব জরুরি প্রয়োজনীয় ভিসা দেওয়া হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক হাসান জানান, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যেন তৃতীয় দেশের ভিসা ভারতের পরিবর্তে অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এরই মধ্যেই বেশ কয়েকটি বিকল্প দেশ থেকে ভিসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা পাওয়ার বিষয়ে সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা (ভারত) বলেছে যে জনবল সংকটের কারণে কয়েক ধরনের ভিসার প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ রেখেছে।

প্রতীকী ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বে প্রথম যৌনকর্মীদের জন্য পেনশন আনছে বেলজিয়াম, সঙ্গে মাতৃত্বকালীন ছুটি

যৌনকর্মীদের জীবন সুনিশ্চিত করে নয়া আইন আনল বেলজিয়াম। যৌনকর্মীরা পাবেন পেনশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সামাজিক সুরক্ষার বেশ কিছু সুযোগ। তাঁদের দীর্ঘ দিনের দাবিকে স্বীকৃতি দিয়ে আইন আনল বেলজিয়াম, যা বিশ্বে প্রথম এবং ঐতিহাসিকও বটে। অসুস্থতার সময় নিতে পারবেন সিক লিভ-ও। শুধু তাই নয়, যৌনপল্লির নিরাপত্তার দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে নয়া আইনে। অপরাধের রেকর্ড রয়েছে, এমন লোকজনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে বলা হয়েছে। যৌনকর্মীদের ঘরে অ্যালার্ম বসাতে বলা হয়েছে, যাতে বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে পারেন তাঁরা। অপরাধের রেকর্ড রয়েছে, এমন ব্যক্তিকে যৌনপল্লি চালানোর অনুমতি দেওয়াও হবে না বলে জানানো হয়েছে। বেলজিয়ামে যৌনকর্মীদের জন্য যে আইন আনা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, প্রত্যেকের কাজের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকা উচিত। কর্মক্ষেত্রে বঞ্চনা দূর করতে নয়া আইনে যৌনকর্মীদের দেওয়া হবে কর্মসংস্থানের শংসাপত্র। সেটা দেখিয়ে তাঁরা স্বাস্থ্যবিমা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা পাবেন।

২০২২ সালে বেলজিয়ামে যৌনবৃত্তি অপরাধমুক্ত হয়।  আর তার পরই নাগরিক হিসেবে যৌনকর্মীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা নিয়ে শুরু হয় ভাবনা-চিন্তা। আসলে অতিমারি করোনার সময়ে রুজিরুটি নিয়ে সংশয়ের মধ্যে পড়েছিলেন যৌনকর্মীরা। ওই সময়ে বেলজিয়ামে আন্দোলনও হয়। সেই নিয়ে লাগাতার প্রতিবাদ, আন্দোলনের জেরেই নায় আইন পাস হল বেলজিয়ামে। যৌনকর্মীদের প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দিতে নয়া আইন চালু হল। এই আইন তৈরির আগে বিরোধিতাও ছিল। সমালোচকেরা যুক্তি দেন, আইন এনে যৌনকর্মীদের সুরক্ষা প্রদানের অর্থই হল দেহব্যবসা এবং নারী  পাচারের মতো সমস্যাগুলিকেও আইনি বৈধতা দেওয়া। এদিক স্বেচ্ছাসেবী সংঘটনগুলির দাবি,  যৌনকর্মীদের জন্য এই আইন আনলে এই পেশায় যাঁরা ‘নিয়োগকর্তা’, তাঁদের জুলুম বন্ধ করা যাবে।  বেলজিয়ামে ইউনিয়ন অফ সেক্স ওয়ার্কার্স-এর প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া সংবাদমাধ্যমে বলেন, "পেশা যদি বেআইনি হয়, সেখানে সুরক্ষা  থাকে না। এতদিনে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ পেলাম আমরা।" ভিক্টোরিয়ার পাঁচ সন্তান রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, টাকার জন্য গর্ভাবস্থাতেও কাজ করে যেতে হয়েছে তাঁকে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

mzamin


বিচার রাজনীতিকরণ হওয়া উচিত নয় -শিশির মনির by শরিফ রুবেল

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা-মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির মানবজমিনকে বলেছেন, কোনো অপরাধ অথবা কোনো বিচার, এমনকি কোনো তদন্ত প্রক্রিয়াকেও কখনো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে যার যতটুকু অপরাধ আছে তাকে যদি সঠিকভাবে আইডেন্টিফাই করা যায়, তবে তার ততকুটুই বিচার করা উচিত। ততটুকু সাজা দেয়া উচিত। এখানে পরিকল্পিতভাবে ও রাগের বশবর্তী হয়ে যদি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করা হয় অথবা কাউকে যদি রাজনৈতিকভাবে শিক্ষা দেয়ার জন্য শাস্তি দেয়া হয় তাহলে এর শেষ পরিণতি কারও জন্যই ভালো হবে না। এতে যার যখন সুযোগ হবে, সে তখন তার ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করবেন।

২১শে আগস্টের ঘটনা থেকে সকলকে শিক্ষা নেয়া উচিত। আমি মনে করি বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের যে অভিপ্রায় চলমান আছে, তা থেকে সকলের সরে আসা উচিত। বিচারকে বিচারের মতো করে চলতে দিতে হবে। এখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মোটেও সমীচীন নয়। কোনো বিচারকে কখনো রাজনীতিকরণ করা উচিত নয়। কোনো হত্যাকাণ্ড বা মামলা যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলকভাবে বিচার করা হয়, তাহলে মামলার প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায়। শাস্তি থেকে পার পেয়ে যায়। গ্রেনেড হামলা প্রসঙ্গ টেনে সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, ২১শে আগস্টের ঘটনা দেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বিরল। ২০০৪ সালে যখন এই ঘটনাটি ঘটেছে, তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুনামি ঘটেছিল। এই ধরনের ঘটনা দেশের জন্য মোটেও কাম্য নয়। এই ধরনের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের জন্যও সুখকর নয়। তারপরেও এই ঘটনা ঘটেছে। আমরা ২১শে আগস্ট মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় গিয়ে দুটি তদন্ত রিপোর্ট দেখেছি। একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে মঈনুদ্দিন- ফখরুদ্দীন সরকার। আরেকটি দিয়েছে শেখ হাসিনা সরকার। ২০০৮ সালের তদন্তে ২৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার তদন্ত রিপোর্টে আরও ৩০ জনকে এজাহারভুক্ত করা হয়। এটাই বিচারের অন্যতম ভুল ছিল। মূলত মুফতি হান্নানের দ্বিতীয় জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে এদেরকে আসামি করা হয়। এখানেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যেমন তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আব্দুস সালাম পিন্টু, কায়কোবাদসহ আরও অনেককে আসামির তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। মুফতি হান্নান প্রথমে একটি স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পরে সেটা প্রত্যাহার করে নেন। তিনি দ্বিতীয়বার স্বীকারোক্তি দেন। সেটাও পরে প্রত্যাহার করে নেন। ওই স্বীকারোক্তি ছিল দীর্ঘদিন অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা। প্রায় ৪১০ দিন তাকে টিএফআই সেলে রেখে নির্যাতন করে মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করা হয়। যা বিচার বিভাগের জন্য একটি কালো অধ্যায়। তারপরে ওই নির্যাতনে আদায় করা স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করেই সাজা দেয়া হয়। আর এই পুরো কাজটি সফলতার সঙ্গে শেষ করেন শেখ হাসিনার নিয়োগ করা তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দ। যিনি পরে আওয়ামী লীগ সরকারের নৌকার মনোনয়ন পান। নির্বাচনও করেন। তারেক রহমানকে জড়ানোর কারণে কাহহার আকন্দকে নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয়। আমি একটি কথা বলতে চাই তা হচ্ছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতাদের মিথ্যা গল্প সাজিয়ে অপরাধের সঙ্গে জড়ানোর যে অপচেষ্টা, এটা দেশের জন্য একটি বড় ধরনের অশনি সংকেত। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটির ফলে রাজনীতির প্রতি মানুষকে বিমুখ করে তুলবে। রাজনীতি যদি এ ধরনের প্রতিহিংসামূলক হয় তাহলে দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হবে। কেউ আর রাজনীতিতে আসতে চাইবে না। তদন্ত পাল্টে দেয়ার বিষয়ে এডভোকেট শিশির মনির বলেন, এই মামলায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো প্রথম চার্জশিট দেয়ার পরে ৬১ জন সাক্ষীর জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে যাওয়ার পরেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে পুনরায় তদন্ত দেয়া। এটা বিচার বিভাগের জন্য নজিরবিহীন। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে আর ঘটেনি। এমন ঘটনা একমাত্র এই মামলায় হয়েছে, একইভাবে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা কাহহার আকন্দের বিষয়ে আসামিরা কোনো পদক্ষেপ নিবে কিনা জানতে চাওয়া হলে এই আইনজীবী বলেন, আসলে আপিলে তদন্ত কর্মকর্তার বিষয়ে আলাদাভাবে কিছু চাওয়া যায় না। তবে তার মিথ্যা তদন্ত রিপোর্টে যারা এতদিন জেলে ছিলেন, সীমাহীন নির্যাতন ভোগ করেছেন, ফাঁসির সেলে থেকেছেন, জীবন থেকে ১৩ বছর সময় হারিয়েছেন তারা আলাদাভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবেন। বিচার চাইতে পারেন। তারা রাষ্ট্রের কাছে এর ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবেন। তদন্ত কর্মকর্তার শাস্তি চাইতে পারবেন। পরিশেষে বলবো, একটি বিচারকে রাজনীতিকরণ এবং আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে রাজনীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছে সেখান থেকে দ্রুত সরে আসতে হবে। এটা দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পদক্ষেপ। সাক্ষীকে যদি ২০০ দিন ৩০০ দিন আটকে রেখে নির্যাতন করে জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। এবং সেই স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে সাজা দেয়া হয়, তাহলে সবাই খালাস পাবে এটাই স্বাভাবিক। অপরাধীরাও পার পেয়ে যাবেন। এতে অপরাধ আরও বাড়বে ছাড়া কমবে না।

mzamin

বছরে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার: অর্থনীতির শ্বেতপত্র কমিটির রিপোর্ট জমা

অর্থনীতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ শাসনামলে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতি ডলার ১২০ টাকা দরে দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। গতকাল শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রমুখ।

শ্বেতপত্র প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রস্তাবিত শ্বেতপত্রে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার আওতায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ, সরকারি ব্যয় (সরকারি বিনিয়োগ, এডিপি, ভর্তুকি ও ঋণ) এবং বাজেট ঘাটতির অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উৎপাদন, সরকারি সংগ্রহ এবং খাদ্য বণ্টন ছাড়াও রপ্তানি, আমদানি, রেমিট্যান্স, এফডিআই, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ ও বৈদেশিক অর্থ প্রবাহের বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া চাহিদা, সরবরাহ, মূল্য নির্ধারণ, খরচ ও ক্রয় চুক্তিসহ ব্যক্তিগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রেডিট, বিদ্যুৎ, সংযোগ এবং লজিস্টিকসে অ্যাক্সেস ছাড়াও দেশ ও বিদেশে কর্মসংস্থান, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মজুরি এবং যুব কর্মসংস্থানের বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব করেছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই প্রতিবেদন আমাদের জন্য একটা ঐতিহাসিক দলিল। আর্থিক খাতে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তা ছিল একটা আতঙ্কিত বিষয়। আমাদের সামনে এ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কেউ এটা নিয়ে কথা বলেননি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কমিটির প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে। প্রতিবেদন জমার সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে তিনি অর্থনীতি সংস্কারে সব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে পূর্ণাঙ্গ উপস্থাপনের সুপারিশ করেছেন। ড. দেবপ্রিয় বলেন, আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করেছি এবং সরকারের কোনো প্রভাব ছিল না। শ্বেতপত্রটি ৩০টি অধ্যায়ে এবং ৪০০ পৃষ্ঠার বিশদ বিবরণীসহ প্রকাশিত হবে বলেও জানান তিনি।

বিগত সরকারের শাসনামলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এই শ্বেতপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সময় বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতি, লুটপাট ও পরিসংখ্যানগত কারসাজির মাত্রা ছিল ভয়াবহ।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তারা ২৯টি বড় প্রকল্পের মধ্যে সাতটি বিশ্লেষণ করেছেন। প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা পরে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। কমিটির অন্য সদস্য প্রফেসর একে এনামুল হক বলেন, গত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৭ লাখ কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়েছে, যার ৪০ শতাংশ লুটপাট হয়েছে।

কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, কর মওকুফের পরিমাণ ছিল দেশের মোট জিডিপি’র ছয় শতাংশ। এর পরিমাণ অর্ধেক কমালে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট দ্বিগুণ-তিনগুণ করা যেত।

উল্লেখ্য, গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই মাসের শেষ সপ্তাহে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটিকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কমিটি বিভিন্ন দলিলপত্র পর্যালোচনা করে ও নানা অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। সেই ধারাবাহিকতায় রোববার ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

mzamin

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা-মামলা খালাস পেলেন তারেক রহমানসহ সবাই: যে কারণে সাজার রায় বাতিল by রাশিম মোল্লা

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারিক আদালতের রায় অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে এই রায় দেন। আদালত আসামিদের আপিল গ্রহণ করে রুল যথাযথ ঘোষণা করেন এবং ডেথ রেফারেন্স বাতিল করে মোট ৪৯ জনকে খালাস  দেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. জসিম সরকার, রাসেল আহমেদ এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল লাবনী আক্তার। বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টুসহ দণ্ডিত বেশ কয়েকজনের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান ও আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রায়ের পর্যবেক্ষণে উচ্চ আদালত বলেছেন, শোনা সাক্ষীর ভিত্তিতে বিচারিক আদালত রায় দিয়েছিল।

রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রায়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি’র পক্ষ থেকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় রায়কে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করা সব মামলা ছিল ষড়যন্ত্রমূলক।

খালাসপ্রাপ্ত ৪৯ আসামি হলেন: ২০১৮ সালের ১০ই অক্টোবর বিচারিক আদালত দণ্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ছিলেন, লুৎফুজ্জামান বাবর, আব্দুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টির আহ্বায়ক মাওলানা শেখ আবদুস সালাম (কারাগারে মারা যান), আব্দুল মাজেদ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. উজ্জ্বল, এনএসআই’র সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম (কারাগারে মারা যান) ও হানিফ পরিবহনের মালিক বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ।

এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী (প্রয়াত), বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হুজি সদস্য হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ (কারাগারে মারা যান), মাওলানা সাব্বির আহমেদ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, মো. খলিল ওরফে খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল ওরফে ইকবাল হোসেন, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই ও রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু।

এ ছাড়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, ডিএমপির সাবেক উপকমিশনার (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, আরেক সাবেক উপকমিশনার (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক বিশেষ সুপার মো. রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ, সাবেক এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমানকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। অপর  আরেকটি ধারায় খোদা বক্স চৌধুরী, রুহুল আমিন, আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমানকে তিন বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে কারাদণ্ড দেন আদালত। এই মামলায় এখন ২৯ জন কারাগারে আছেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:
হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, মুফতি হান্নানের দ্বিতীয় স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে যে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। বিচার চলা অবস্থায় আগের সমস্ত ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে নতুন ঘটনার জন্মদিয়ে দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আইনসম্মত নয়। দ্বিতীয় যে তদন্ত রিপোর্ট সেটা জমা হয়েছে বিচারিক আদালতে। এটা জমা হওয়ার কথা ছিল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। আইনে আছে আগে ম্যাজিস্ট্রেকে আমলে নিতে হবে। তারপর বিচারিক আদালতে পাঠাতে হবে। এই কারণে আমলে গ্রহণের আদেশটা এটা শুরু করে পরবর্তীতে যা হয়েছে তার সবই আইন বহির্ভূত। হাইকোর্ট আরও বলেছেন, আসামিদের যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া হয়েছে তা স্বেচ্ছায়ও না এবং সত্যও নয়। কারণ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি একটার সঙ্গে আরেকটাকে সমর্থন করে না বা মিল নেই।  এ ছাড়া আদালত বলেছেন, এই ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই। যে নাকি কাউকে গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে দেখেছে। এখানে সাজা দেয়া হয়েছে ষড়যন্ত্র করার জন্য। সাক্ষ্য আইনের ১০ ধারা প্রয়োগ করে সাজা দেয়া হয়েছে। ষড়যন্ত্র করার কারণে। এখানে উচ্চ আদালত দেখিয়েছেন ১০ ধারা প্রয়োগ করতে হলে ওই ষড়যন্ত্রে যারা অংশ নিয়েছে তাদের কারও সাক্ষ্য প্রয়োজন হবে। যারা মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন। আদালত বলেছেন এই ধরনের কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ এখানে নেই। এখানে আদালত মোবাইল কাদের ও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রেফারেন্স দিয়েছেন। ওই মামলাতেও সাক্ষ্য আইনের ১০ ধারা ব্যাখ্যা করে আদালত বলেন, ওই মামলাগুলোতেও আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত রায়ে ষড়যন্ত্রকারীর দায়ে সাজা দেয়া হয়নি।  আদালত বলেছেন, যারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে তারা তাদের সবাই কোন না কোনো সময়  টিএফআই (ট্রাক্সফোর্স ইন্টেলিজেন্স) সেলে ছিল। কেউ ৬০ দিন, কেউ ২৬১ দিন ছিল। আদালত এ প্রশ্ন তুলেছেন, টিএফআই সেল গঠনের আইনগত ভিত্তি নেই। টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে এই মর্মে কোনো আইন নেই। আসামিকে সাজা দিতে হলে ডকুমেন্টারি এভিডেন্স, মৌখিক সাক্ষ্য প্রয়োজন হবে এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য লাগবে। এই মামলায় এই তিন প্রকারের এভিডেন্সের কোনো মানদণ্ড রক্ষা করা হয়নি। না মৌখিক সাক্ষ্য আছে, না ডকুমেন্টারি এভিডেন্স বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য আছে।

আইনে আছে ডেথরেফারেন্স নিষ্পত্তি করতে গিয়ে যদি দেখা যায় কোনো ব্যক্তি আপিল করেনি কিন্তু মামলায় আছে তারাও বেনিফিট পেতে পারেন। যদিও তারা আপিল না করেন। এজন্য এই মামলায় তারেক রহমানসহ যারা আপিল করেননি তাদের সবাই খালাস পেয়েছেন বলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান।   

যে প্রক্রিয়ায় আসামিরা মুক্তি পাবেন: এ মামলায় খালাস পাওয়া আসামিদের মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, প্রথমত আদালত যদি অ্যাডভান্স আদেশ দেন যে তাদের বিরুদ্ধে অন্য মামলা নেই। তারা অ্যাডভান্স দিয়ে মুক্তি পেতে পারেন। এটা বেইল অর্ডারের মতো। চাইলে আজও নিতে পারেন। এ ছাড়া আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর আসামিরা মুক্তি পাবেন। হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, অপর একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুফতি আবদুল হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও ২৫ জন শ্রুতসাক্ষীর জবানবন্দির ভিত্তি করে বিচারিক আদালত এই রায় দিয়েছেন।  এই ২৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দির একটি আরেকটিকে সমর্থন করেনি। কোনো চাক্ষুষ সাক্ষীও ছিল না। মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কোনো প্রমাণযোগ্য বা আইনগত মূল্য নেই, কারণ জীবদ্দশায় তিনি তার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে গেছেন। এই স্বীকারোক্তি জোর করে নেয়া হয়েছিল দাবি করা হয়েছে। তাছাড়া মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিটি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা যথাযথ পরীক্ষা এবং গ্রহণ করা হয়নি। রায়ে বলা হয়, মামলার অভিযোগ আইনের ভিত্তিতে গঠন করা হয়নি।

অ্যাটর্নি জেনারেল যা বলেন: ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা-মামলায় হাইকোর্টের রায়ের কারণ দেখে ও নির্দেশনা নিয়ে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কিনা, জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রায়ের কারণ দেখে ও নির্দেশনা নিয়ে তারপরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে আপিল করা উচিত বলে মনে করি।

যে কারণে খালাস পেলেন আসামিরা: আসামি পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান রায়ের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেছে কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অন্য আসামিকে সাজা দেয়া যায় না। আর দ্বিতীয় অভিযোগপত্র ছিল অতিমাত্রায় বেআইনি। দ্বিতীয় অভিযোগপত্রটি আমলে নেয়ার ক্ষেত্রে আইন অনুসরণ করা হয়নি। তাছাড়া প্রথম অভিযোগপত্রটিও গ্রহণযোগ্য না, কারণ ওই অভিযোগপত্রটিও মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে। যা তিনি পরে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট বাদ দিয়ে ২২৫ জন সাক্ষীর কেউই বলেননি গ্রেনেড ছুড়েছি বা ছুড়তে দেখেছি। ফলে, প্রকৃত খুনিকে সেটি নাই। ফলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুসারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায় না। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসএম শাহজাহানের মতে, এ মামলার দ্বিতীয় অভিযোগপত্রে যাদের আসামি করা হয়েছে, সেটি আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, দ্বিতীয় অভিযোগপত্র ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেয়া হয়নি, সরাসরি জজ আদালতে দেয়া হয়। সেজন্য এ অভিযোগপত্র ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী গৃহীত হতে পারে না। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে কে গ্রেনেড ফাটালো, তা নিয়ে কারও সাক্ষ্য নেই বা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেই। এর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিষয়ে বলেন, আমি এটি উল্লেখ করেছি। যদিও তার কোনো আপিল নেই। কিন্তু আপনি (আদালত) যদি মনে করেন যে, এ মামলার কোনো আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ হয়নি, বা দায়সারা গোছের চার্জশিট দেয়া হয়েছে, মামলা প্রমাণ না হলে, খালাস পাওয়ার যোগ্য হলে আদালত খালাস দিতে পারেন। ভারত, পাকিস্তান ও আমাদের সুপ্রিম কোর্টে এর নজির আছে।

বিএনপি’র শীর্ষ আইনজীবীরা যা বলেন:
হাইকোর্টের রায় ঘোষণার সময় বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, বিএনপি’র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও বিএনপি’র আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী কামরুল ইসলাম সজল উপস্থিত ছিলেন। পরে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে তারেক রহমান ন্যায়বিচার পেয়েছেন। প্রমাণ হয়েছে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তাকে এই মামলায় সাজা দেয়া হয়েছিল। আজ তিনি বেকসুর খালাস পেয়েছেন। গত দুই দশক এই মামলা দেশের রাজনীতিতে প্রভাব রেখেছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রপাগান্ডার শিকার হয়েছেন তারেক রহমান। আমরা ও দেশবাসী মনে করে আজ তারেক রহমান ন্যায়বিচার পেয়েছেন। ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, রাজনৈতিকভাবে এ মামলাটা পরিচালিত হয়েছে তারেক রহমান এবং বিএনপি’র বিরুদ্ধে। যখন শেখ হাসিনা ওয়াজেদ ১৬১ ধারা (জবানবন্দি) দেন, সেখানেও তারেক রহমানের নাম ছিল না। পরে ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য তারেক রহমানকে এ মামলায় সম্পৃক্ত করা হয়। এ কারণে সব কিছু কনসিডার করে এ মামলার কোনো এভিডেন্স নেই, দ্বিতীয় ১৬৪ যে করা হয়েছিল (মুফতি হান্নানের) তার কোনো সাক্ষ্যমূল্য নেই, কোনো সাক্ষী তারেক রহমানের নাম বলেননি। সব বিবেচনা করে তারেক রহমানসহ সবাইকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

এডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, চার্জশিটে তারেক রহমানের নাম কোথাও ছিল না। পরে আব্দুল কাহহার আকন্দকে (সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা) দিয়ে তারেক রহমানকে এ মামলায় সম্পৃক্ত করে সাজা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তিনি আরও বলেন, সরাসরি সাক্ষ্য না থাকলে কাউকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা দেয়া যায় না। সে সমস্ত দিক বিচার বিশ্লেষণ করে আদালত মনে করেছে এ মামলায় যারা আপিল করেছে এবং যারা আপিল করতে পারেনি, প্রত্যেককে খালাস দেয়া প্রয়োজন। জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, সারা বছর আওয়ামী লীগ এটাকে ব্যবহার করেছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তারা চেয়েছিল তারেক রহমানকে এ মামলা দিয়ে চিরজীবন বাইরে রাখবে। এমনকি তাকে মৃত্যুদণ্ডও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আদালত কোনো এভিডেন্স পাননি যে, তারেক রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন। যাই হোক আজকের রায়ের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কোনো দণ্ডই থাকলো না।  

মামলার পূর্বাপর: ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ২৪ জন মারা যায়। আওয়ামী লীগের দাবি এ হামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হামলার পরদিন মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। থানা পুলিশ, ডিবি’র হাত ঘুরে সিআইডি এই মামলার তদন্তভার পায়। ঘটনার চার বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালের ১১ই জুন হত্যার অভিযোগ এবং বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি অভিযোগপত্র দেন সিআইডি’র জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। ২০০৮ সালের ২৯শে অক্টোবর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করে তাদের বিচারও শুরু হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে। সিআইডি’র বিশেষ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩রা জুলাই আসামির তালিকায় আরও ৩০ জনকে যোগ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন। সেখানে বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ চারদলীয় জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের নাম আসে। দুই মামলায় মোট ৫২ আসামির বিচার শুরু হলেও অন্য মামলায় তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় মোট ৪৯ আসামির বিচার শুরু করেন বিচারিক আদালত। ২০১৮ সালের ১০ই অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিন ওই মামলার রায় দেন। রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বিএনপি’র চেয়ারপারসনের তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব প্রয়াত হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। সেইসঙ্গে ১১ পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দেয়া হয়। রায়ের পর ওই বছরের ২৭শে নভেম্বর বিচারিক আদালতের রায় প্রয়োজনীয় নথিসহ হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছে। দণ্ডিতরাও রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল করেন। ২০২১ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম ও আসামি শেখ আবদুস সালাম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বিচারিক আদালতের রায়ের পর একই বছর বিচারিক আদালতের রায়সহ মামলা দুটির নথিপত্র হাইকোর্টে পৌঁছে। 

mzamin

পাচারের সুবিধার্থে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপানো হয়েছিল -প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের ব্রিফিং

এস আলম গ্রুপকে পাচারে সাহায্য করতে আওয়ামী লীগের পতনের কিছুদিন আগে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপানো হয়েছিল। পাচার হওয়া এসব টাকা দেশে ফেরত আনার চেষ্টা শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ বিষয়ে আগামী ১০ই ডিসেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক শুরু হবে। প্রথমে পাচার হওয়া টাকা কোথায় রয়েছে- তা শনাক্ত করে টাকাগুলো দেশে আনা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম।

রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান। এসময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আজাদ মজুমদার ও অপূর্ব জাহাঙ্গীর।

শফিকুল আলম বলেন, যে টাকাগুলো বাইরে চলে গেছে এটা আমাদের সরকারের অন্যতম কমিটমেন্ট যে টাকাগুলো আমরা দেশে আনার চেষ্টা করব। এ কারণে ১০ই ডিসেম্বর থেকে আমাদের কাজ শুরু হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল যেসব প্রতিষ্ঠানে যারা এগুলো নিয়ে কাজ করেন, তাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হবে। আগে তো ট্রেস করতে হবে এই টাকাগুলো কোথায় তারা চুরি করে নিয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, কীভাবে টাকাগুলো ফেরত আনা যায়? এটা অবশ্যই কষ্টসাধ্য কাজ। তবে এটা আমাদের টপ প্রায়োরিটির মধ্যে একটা, যে টাকাগুলো আমাদের আনতেই হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বৈরাচার পতনের ছয় মাস আগে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছিল। আমাদের গভর্নর বলেছেন যে, ওই পুরো ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল এস আলমকে পাচারে সাহায্য করা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার তারল্য-সহায়তার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই টাকা কিছু ব্যাংককে সাপোর্ট দেয়ার জন্য ছাপানো হচ্ছে। এটা অনেকটা চৌবাচ্চার পানির মতো। একদিক থেকে আসবে, অন্যদিক থেকে বেরিয়ে যাবে। এটা মার্কেটে অতিরিক্ত টাকা হিসেবে থাকবে না। বিধি মেনেই এটা করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে দেশের অর্থনীতির শ্বেতপত্র হস্তান্তর বিষয়ে তিনি বলেন, উনারা এই রিপোর্টটার নাম দিয়েছেন ডিসেকশন অব অ্যা ডেভেলপমেন্ট ন্যারেটিভ। উন্নয়নের যে গল্পটা হয়েছিল, উনারা এটাকে পোস্টমর্টেম করেছেন। এর মাধ্যমে একটা ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে একটা লুটপাট চলেছে। এটা মানুষের ট্যাক্সের টাকা। খুব যে বেশি লোক এটা করেছেন তা নয়, এখানে পলিটিশিয়ান, আমলা ও কিছু ব্যবসায়ী ছিলেন। সবার যোগসাজশে এটা করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এটাকে অনেকে বৈধতা দিয়েছে। আপনারা হয়তো জানেন, আমাদের মধ্যে অনেক সাংবাদিক এটার বৈধতা দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, প্রফেসর ড. ইউনূস বলেছেন- এই লুটপাটের চিত্র আমাদের টেক্সটবুকে আসা উচিত। কলেজে কিংবা ইউনিভার্সিটিতে জানা উচিত, গত ১৫ বছর কীভাবে লুটপাট চলেছে।
ড. ইউনূসের বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের সমাজের একটা অংশের অনেকে এই সময়টায় নিশ্চুপ ছিলেন। তারা হয়তো বুঝছিলেন কি হচ্ছে। আমাদের মনে আছে, কথিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা যখন প্রেস কনফারেন্স করলেন, উনি একরকম বীরত্বের সুরেই বলছিলেন, তার পিয়নও ৪০০ কোটি টাকা বানিয়েছে। স্যার (ড. ইউনূস) বলেছেন, এটা একটা হিস্টোরিক ডকুমেন্ট, ল্যান্ডমার্ক ডকুমেন্ট। আমরা আশা করছি, ডকুমেন্টটা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা হবে। এটা ৪০০ পৃষ্ঠার একটা ডকুমেন্ট। এখানে ৩০টা অধ্যায় আছে। প্রত্যেকটা অধ্যায় বাংলাদেশে ইকোনমির বিভিন্ন সেক্টর ধরে করা হয়েছে।
এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে ড. ইউনূসের মিটিং হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা জানেন আমরা অনেক কিছু ডিজিটালাইজেশনে যাচ্ছি। এটা এনবিআর চেয়ারম্যান আপনাদের জানাবেন।

mzamin


গুলিতে মৃত্যু: বাবা-মায়ের কষ্ট দূর করতে চেয়েছিলেন আরিফ by ফাহিমা আক্তার সুমি

আরিফ হোসেন। আঠারো বছরের এই তরুণ গত ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হন। তার ডান চোখের নিচে গুলিটি বিদ্ধ হয়ে মাথার পেছন  দিক থেকে বেরিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আরিফ চতুর্থ। সে তার বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান। পড়তেন ভোলার লালমোহনের একটি মাদ্রাসায়। তার বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। আরিফ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কষ্ট ঘোচাতে এসেছিলেন ঢাকায়। অভাবের সংসারে হাল ধরতে যাত্রাবাড়ীর একটি খাবারের হোটেলে চাকরিও নিয়েছিলেন। পরিবারকে নিয়ে সেই ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি তার। সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তার বাবা-মা। বোনেরা তাদের একমাত্র ভাইকে দিন-রাত খুঁজে ফিরছেন।

আরিফের বাবা মো. ইউসুফ মানবজমিনকে বলেন, আমার একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল আরিফ। তার চিন্তায় একেবারে ভেঙে পড়েছি। ওর মা সারাক্ষণ কাঁদতে থাকে, এখনো ঠিকমতো খেতে চায় না। অভাবের সংসারে পরিবারের হাল ধরতে তাকে ঢাকা পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তার মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে হোটেলে কাজ করতো। শেষ ঢাকায় যাওয়ার ১৭-১৮ দিন পর গুলিতে মারা যায়। আরিফ ভোলার লালমোহনে একটি মাদ্রাসায় পড়তো। আমি কোনোমতে কৃষিকাজ করে সন্তানগুলোকে বড় করেছি। সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হতো, সন্তানদের পড়াশোনার অনেক খরচ হতো। এদিকে আমার দুই মেয়ে এখনো পড়াশোনা করে- সবমিলিয়ে আমি হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলাম। আমার ছয় সন্তানের মধ্যে আরিফ একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল। আমি চেয়েছিলাম আমার সন্তান ঢাকায় চাকরি করে আমাকে সহযোগিতা করবে, আমি কখনো ভাবিনি আমার সন্তান এভাবে হারিয়ে যাবে। এটা যদি জানতাম তাহলে আমার হাজার কষ্ট হলেও আমি তাকে ঢাকায় পাঠাতাম না। গ্রামে রেখেই আমি কাজ করে তাকে পড়াশোনা শেষ করাতাম। আরিফও চাইতো আমাদের সংসারের অভাব ঘোচাতে।

তিনি আরও বলেন, ওর মাকে কোনোভাবে বুঝাতে পারছি না; তাকে নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকতে হয়। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছে। আমিও বয়সের কারণে বিভিন্নভাবে অসুস্থ। এখন বেশি পরিশ্রমের কাজ করতে পারি না। দুইটা মেয়ে এখনো পড়াশোনা করছে; আমি একা কীভাবে তাদের সামলাবো। সরকার যদি আমার মেয়েদের দিকে একটু সুদৃষ্টি দেন তাহলে আমাদের পরিবারের জন্য অনেক ভালো হবে। হয়তো ছেলে সন্তানের অভাব পূরণ হবে না কিন্তু আমি মেয়েদেরও মানুষের মতো মানুষ করতে চাই। আরিফ থাকলে তো আমাদের এই বয়সে এসে মেয়েদের জন্য চিন্তা করতে হতো না- সে সবই সামলে নিতো। আমি মাঠে-ঘাটে কাজ করলেও আমার সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছি। ওর মা চিন্তা করে মেয়েরা তো সব শ্বশুর বাড়িতে চলে যাবে; বৃদ্ধ বয়সে আমাদের কী হবে। আরিফ ছোটবেলা থেকে অনেক ভদ্র-শান্ত স্বভাবের ছিল। সে খেলাধুলায় অনেক সময় দিতো।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আরিফের মামাতো ভাই সাহাবউদ্দিন বলেন, গত ১৯শে জুলাই শুক্রবার দুপুরের পর নামাজ ও খাওয়া-দাওয়া শেষে আরিফ যাত্রাবাড়ীতে ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যায়। কিছুক্ষণ পরে সেখানে থাকা শিক্ষার্থীরা খবর দেন আমার ভাই গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে ভাইকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে চিকিৎসা না পেয়ে আমরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে নেয়ার পরে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গুলিটি তার ডান চোখের নিচ থেকে ঢুকে মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। আরিফ কোরবানির ঈদের পরে ঢাকায় এসে ঢাকার যাত্রবাড়ীতে একটি খাবার হোটেলে চাকরি নেয়। ওর বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালান। বর্তমানে বয়সের ভারে তেমন কিছু করতে পারেন না। সন্তান হারানোর শোকে এখন বাবা-মা দুজনেই অনেকটা ভেঙে পড়েছেন। এত দ্রুত কি সন্তান হারানোর শোক পরিবার ভুলতে পারে। বোনগুলোও অনেক ভেঙে পড়েছে। পাঁচবোনের একমাত্র ভাই ছিল আরিফ। ওর বাবা-মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল আরবি লাইনে পড়াশোনা শেষ করানোর। বাবার কষ্ট দেখে আরিফের স্বপ্ন ছিল ঢাকায় এসে চাকরি করবে- সেই টাকা দিয়ে বাবা-মা ও বোনকে দেখবে, নিজের পড়াশোনার খরচ চালাবে। ১৯শে জুলাইয়ের আগেও সে আন্দোলনে গিয়েছিল কিন্তু এইদিন আর ফিরে আসেনি।

তিনি বলেন, আরিফ আমার সঙ্গেই ঢাকায় থাকতো। ভাইবোনের মধ্যে ও ছিল চতুর্থ। ঘটনার দিনে আমরা একসঙ্গে দুপুরে নামাজ পড়ে খাবার খেয়েছি। ওইদিন আন্দোলনে যাবে সেটি জানতাম কিন্তু গিয়েছিল এটি আর জানতাম না। বিকাল তিনটার দিকে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর আসে। সেদিন ঘটনাস্থলেই গুলিতে সে মারা যায়। পরের দিন রাত নয়টায় তার মরদেহ হাসপাতাল থেকে গ্রামের বাড়ি ভোলাতে নিয়ে যাওয়া হয়। ওর বাবা-মা এখনো কাঁদতে থাকে সন্তানের স্মৃতি নিয়ে। তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, কাকে নিয়ে থাকবে- সেই চিন্তা করে দিন-রাত পার করেন। 

mzamin