Tuesday, May 28, 2013

দাস-প্রভূ চিন্তার বিদঘুটে পরিণতি by সারওয়ার চৌধুরী

রাজনীতি সচেতন থাকা আর দলীয় রাজনীতি করা এক নয়। এই ব্যাপারটা দাস-প্রভূ-চিন্তা-বলয়ে আটকে থাকা মানুষদের মাথায় সহজে ঢুকে না। তাদের সহজ বুঝ হল, কোনো-না-কোনো পক্ষে থাকতেই হয় বা আছে সকল মানুষ।

দেশে কি একদলীয় শাসন? by আমীর খসরু

সরকার সভা-সমাবেশের উপরে বিধি-নিষেধ আরোপ করার এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অবশ্য নজিরবিহীন বলাটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে সঠিক শব্দ প্রয়োগ বলে মনে হয় না। এ ধরণের বিধি-নিষেধের কঠিন এবং শক্ত বেড়াজালে ইতোপূর্বেও আমরা বার বার পড়েছি।

এটা হাসিনার পথ নয় by মতিউর রহমান চৌধুরী

এটা কি শেখ হাসিনার পথ? যদি কেউ তার অতীত নিয়ে গবেষণা করেন তাহলে চটজলদি জবাব দেবেন এটা তার পথ নয়। আমরা সবাই জানি, হাসিনার পথ লড়াইয়ের পথ। লড়াই-লড়াই-লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।

যুদ্ধোন্মাদনা ও যৌন অনাচার by ড. মাহফুজ পারভেজ

যুদ্ধের উন্মাদনা ও যৌন অনাচারের মধ্যে কি কোনও কার্যকর সম্পর্ক আছে? থাকাটাই স্বাভাবিক। সাইকোলজির বিশেষজ্ঞরা বিশদে ভাল বলতে পারবেন। সাধারণ চোখে আমরা দেখি, যুদ্ধের মাঠে সৈন্যরা উন্মাদনায় প্রতিপক্ষ নিধনের সঙ্গে সঙ্গে যৌন অপরাধেও জড়িত হয়।

সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে আবছা আলো by আলী ইদ্‌রিস

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে প্রধান দু’দলের মধ্যে মতানৈক্য, বাগবিতণ্ডা, সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটাকে ক্রান্তিকাল বা সুড়ঙ্গ পারাপার বল্লে ভুল হবে না। সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তের আলোটি কখনও জ্বলে উঠে, আবার কখনও নিভে যায়।

কঠোর আইন সংকটকে ঘনীভূত করতে পারে

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নভি পিল্লাই গতকাল সোমবার বলেছেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স কঠোর সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন করার চিন্তাভাবনা করছে। তবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সম্প্রতি লন্ডন ও প্যারিসে দুই সেনার হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স কঠোর সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন প্রণয়ন ও নজরদারির ব্যবস্থা জোরালো করার কথা বিবেচনা করছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিউবায় অবস্থিত গুয়ানতানামো বে আটক কেন্দ্র বন্ধ করার অভিপ্রায় পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বসন্তকালীন অধিবেশনের উদ্বোধনকালে নভি পিল্লাই এসব কথা বলেন। ওই অধিবেশনে পিল্লাই বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতাবিরোধী অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে আমি অভিযোগ পেয়েছি।’ তিনি বলেন, এ ধরনের অনুশীলন আত্মশৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল। এ ধরনের পদক্ষেপ সন্ত্রাসবাদকে সমূলে উৎপাটন করতে পারবে না, বরং আরও উসকে দেবে। লন্ডন ও প্যারিসে সেনা হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের অনেক রাজনীতিবিদ কঠোর সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া কিছু গণমাধ্যম প্রতিবেদনে এমন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা বাকস্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।নভি পিল্লাই বলেন, গুয়ানতানামো আটক কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধ করতে না পারার ব্যর্থতা এমন একটি উদাহরণ যেখানে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াই মানবাধিকারের মৌলিক নীতি মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে’। গুয়ানতানামোয় ২৩টি দেশের ১৬৬ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককেই কোনো অভিযোগ ছাড়াই এক দশকের বেশি সময় ধরে আটক রাখা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ওবামা গুয়ানতানামো আটক কেন্দ্র বন্ধের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন উল্লেখ করে নভি পিল্লাই বলেন, গুয়ানতানামো থেকে বন্দী হস্তান্তরের বিষয়টি অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনেই নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য অনেক কংগ্রেস সদস্যই ওবামার পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।

ওকলাহোমার টর্নেডো দুর্গতদের পাশে ওবামা

ওকলাহোমার টর্নেডো-বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দুর্গত ব্যক্তিদের সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আপনারা একা নন।’ ওবামা বলেন, ‘এটা মেনে নেওয়া কঠিন। আনাচে-কানাচের সব মার্কিনি আপনাদের জন্য প্রার্থনা করছে।’ টর্নেডোর ছোবলে একটি স্কুলের সাত শিক্ষার্থী মারা গেছে। ওবামা সেই স্কুলটিও পরিদর্শন করেছেন। গত সপ্তাহে ওকলাহোমার শহরতলি মুরে টর্নেডোর আঘাতে ২৪ জন নিহত হয়। আহত হয় কমপক্ষে ৩৭৭ জন। ধ্বংস হয়ে যায় অন্তত এক হাজার ২০০ ঘরবাড়ি। প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ তাণ্ডবে। আর্থিক হিসাবে ২০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ওবামা বলেন, এখানকার মানুষ খুবই শক্ত মনোবলের। তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাদের সাহায্য দরকার। দুর্গত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি স্থানের মার্কিনিরা আপনাদের জন্য প্রার্থনা করছে। তারা আপনাদের কথা ভাবছে, আপনাদের পাশে দাঁড়াতে চায়। আমি এখানে কেবল একজন বার্তাবাহক হয়ে এসেছি। আমি আপনাদের এটাই পরিষ্কার করতে চাই, আপনারা একা নন।’

রোহিঙ্গাদের জন্য দুই সন্তান নীতি মানবাধিকারের লঙ্ঘন

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি বলেছেন, দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের কর্তৃপক্ষ মুসলিম রোহিঙ্গাদের সর্বোচ্চ দুটি সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে যে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, তা মানবাধিকারের পরিপন্থী। নতুন নীতি অনুযায়ী, ওই রাজ্যের মুসলিম পরিবারগুলো দুটির বেশি সন্তান নিতে পারবে না। বৌদ্ধদের সঙ্গে দফায় দফায় ভয়াবহ সহিংসতার পর উত্তেজনা কমাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অং সান সু চি এই নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে বলেছেন, ‘এটি মানবাধিকারের পরিপন্থী।’ তিনি বলেন, ‘এ রকম বৈষম্য থাকা ভালো নয়। তা ছাড়া এটি মানবাধিকারের সঙ্গে যায় না।’ মিয়ানমারের মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকারের পক্ষে সম্ভবত এবারই প্রথম সক্রিয় প্রতিক্রিয়া জানালেন সু চি। গতকাল সোমবার ইয়াঙ্গুনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নীতিটি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা তিনি নিশ্চিত করতে পারছেন না। দুই সন্তান নীতি ছাড়াও বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে রাখাইনের দুই এলাকা বুথিডাউং ও মাউনডাউয়ে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই দুটি শহরের ৯৫ শতাংশ বাসিন্দাই মুসলিম। সরকারি এক কমিশনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এক সপ্তাহ আগে এসব পদক্ষেপ কার্যকর হয় বলে জানান রাখাইন রাজ্যের মুখপাত্র উইন মিয়াং। তিনি শনিবার জানান, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রশমন এবং সংখ্যালঘু মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এই কমিশনকে। সহিংসতা এড়াতে নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা দ্বিগুণ করারও পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। উইন মিয়াং বলেন, রাখাইনদের চেয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১০ গুণ বেশি। অতিরিক্ত জনসংখ্যাই অস্থিরতার কারণ। তিনি বলেন, বহুবিবাহ ও দুটির বেশি সন্তান ঠেকাতেই এই আইন করা হয়েছে। রাজ্যের মুসলিম-অধ্যুষিত দুটি এলাকায় ইতিমধ্যে আইনটির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাখাইন কর্তৃপক্ষের এই জনসংখ্যানীতিকে ‘জঘন্য অমানবিক’ বলে অভিহিত করেছে হিউমান রাইটস ওয়াচ। প্রতিষ্ঠানটি এই নীতিকে ‘সম্পূর্ণ মানবাধিকার পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেছে।

বাগদাদে বোমা হামলায় নিহত ৭০

ইরাকের রাজধানী বাগদাদজুড়ে শিয়া এলাকার বাজারগুলোতে কয়েক দফা বোমা হামলায় গতকাল সোমবার ৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও দেশটিতে সুন্নি মুসলিম জঙ্গি এবং আল-কায়েদার বোমা হামলা সম্প্রতি বেড়ে যাওয়ায় তারাই এ হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সদর সিটিতে জোড়া বোমা হামলাসহ বাগদাদজুড়ে বিভিন্ন বাজার এবং বিপণিকেন্দ্রগুলোতে কয়েক ডজন বোমা হামলা হয়েছে। সদর সিটিতে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ এবং হাসপাতালের কর্মকর্তারা। বাগদাদের কেন্দ্রস্থলে সাদোন স্ট্রিট, কাছের আরেকটি জায়গা আল মালিফ ও হাবিবিয়ায়ও বোমা হামলা হয়েছে এবং এসব জায়গায় ১৮ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ২০১১ সালে ইরাক ত্যাগের পর দেশটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সম্প্রদায় ও সুন্নি মুসলিমদের মধ্যে বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পাশের দেশ সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধ এই বিরোধকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। জাতিসংঘের হিসাবমতে, শুধু গত এপ্রিল মাসেই দেশটিতে সহিংসতায় শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। চলতি মে মাসেও হামলা ও বিস্ফোরণে কমপক্ষে ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছে। ২০০৩ সালে দেশটিতে মার্কিন আগ্রাসনে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ক্ষমতায় আসে মালিকি সরকার। গত ডিসেম্বর মাসে দেশটির সংখ্যালঘু সুন্নিরা তাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করে। গত এপ্রিল মাসে হায়িজা শহরে সুন্নিদের একটি বিক্ষোভ শিবিরে দেশটির সেনাবাহিনী অভিযান চালালে সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়।

ফিলিপাইনে দল গঠনের পরিকল্পনা মোরো বিদ্রোহীদের

ফিলিপাইনের প্রধান মুসলিম বিদ্রোহী গোষ্ঠী মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (এমআইএলএফ) দেশটিতে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা করছে। গোষ্ঠীটির প্রধান শান্তি মধ্যস্থতাকারী গতকাল সোমবার এ খবর জানান। এমআইএলএফ ২০০৩ সালে দেশটির সরকারের সঙ্গে এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণে প্রস্তাবিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা পাওয়ার বিনিময়ে একটি স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পরিত্যাগ করে। গোষ্ঠীর মধ্যস্থতাকারী মোহাঘের ইকবাল বলেন, ‘আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দল গঠন করিনি। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক পরামর্শ করছি।’ গুরুত্বসহকারে তিনি বলেন, মুসলিম স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পর আমাদের প্রস্তাবিত রাজনেতিক দল কেবলই একটি অফিস চাইবে। মুখ্য সরকারি শান্তি মধ্যস্থতাকারী তেরেসিতা দেলেস এমআইএলএফের এ পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেন, এটি শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে ‘সংগতিপূর্ণ’ এবং এতে গণতন্ত্রের প্রতি গোষ্ঠীটির প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বেনিগনো অ্যাকুইনোর মুখপাত্র অ্যাবিগাইল ভলতে বলেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনে এমআইএলএফের অংশগ্রহণের পরিকল্পনাকে সরকার স্বাগত জানায়। মোরো বিদ্রোহীরা সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ করে আসছে।

কবিতা বিষয়ক জটিলতা

সব সম্ভবের দেশে এটি অসম্ভব নয় যে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের বিষয় ও লেখকেরাও বদলে যাবেন। আগে ইতিহাসের পাঠ্যবই নিয়ে বহুবার তুঘলকি কাণ্ড ঘটতে দেখা গেছে। ইদানীং সাহিত্য বইয়েও সেই কু-অভ্যাস জেঁকে বসেছে বলে প্রতীয়মান হয়। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ২০১৩ সালের নবম ও দশম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য বইয়ে কবি আবদুল হাকিম ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর যথাক্রমে ‘বঙ্গবাণী’ ও ‘মাগো ওরা বলে’ কবিতা দুটি বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নবীন কবিদের কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে বর্তমান শিক্ষাসচিবও রয়েছেন। বিষয়টি সাহিত্য মহলে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তা সবারই জানা। সর্বশেষ গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কবিতা দুটি পুনঃস্থাপনের সুপারিশ করেছে। বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা প্রখ্যাত দুটি কবিতা পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কাছে আমরা কৈফিয়ত দাবি করছি। একই সঙ্গে কবিতা দুটি বাদ দিয়ে নতুন কবিতা অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে বইয়ের সম্পাদক ও সংকলকদের ব্যাখ্যা চাওয়া নিশ্চয়ই অনধিকার চর্চা হবে না। তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন, কোন বিবেচনায় বহুল আলোচিত কবিতা দুটি বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নিশ্চয়ই এ-ও অজানা নয় যে, পাঠ্যবইয়ের যেকোনো লেখা বিবেচনার ক্ষেত্রে পদাধিকারী নয়, লেখার উৎকর্ষই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পাঠ্যবইয়ের লেখক-শিক্ষাবিদেরা শিক্ষার্থীদের প্রতি সুবিচার করেছেন কি না, তা তাঁদের বিবেককেই জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। গত চার বছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনেক ভালো কাজ করেছে। কিন্তু শেষ বেলায় এসে কেন কবিতাবিষয়ক জটিলতা তৈরি করল, সেটাই আমাদের প্রশ্ন। কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, আরও অনেক পাঠ্যবইয়ে লেখক সংযোজন-বিয়োজনের ক্ষেত্রে দলীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনা কাজ করেছে বলে অভিযোগ আছে। সেসব খতিয়ে দেখার জন্য উচ্চপর্যায়ে একটি কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পাঠ্যবই পুনর্বিন্যস্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।

বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার

নিরীহ তরুণ বিশ্বজিৎ দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ছয় মাস পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলার ২১ জন আসামির মধ্যে ১৩ জনকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী বলেই কি তাঁদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে এই অনাগ্রহ?
বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড এই সরকারের আমলের ধিক্কৃত অপরাধগুলোর অন্যতম। কারণ, এমন সংঘবদ্ধ নৃশংসতার দৃষ্টান্ত নিকট অতীতে বিরল। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচির দিন সকালে পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কী নৃশংসভাবে কুপিয়ে বিশ্বজিৎকে হত্যা করেছেন, তার ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যখন জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার কথা বলে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালান, তখন সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের হাতে খুন হন নিরীহ তরুণ বিশ্বজিৎ দাস, যিনি একজন দরিদ্র দরজি; যদিও রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনোই সংস্রব ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেদিন বিশ্বজিতের জীবন রক্ষায় এগিয়ে যায়নি, বরং ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছে নীরব দর্শকের মতো। নিহত বিশ্বজিতের পরিবার যখন সন্তান হত্যার বিচার চাইছে, তখন আসামিদের গ্রেপ্তার না করে আইনের শাসনের সঙ্গে নিষ্ঠুর পরিহাস করছে সরকার তথা আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে আড়াই মাস আগে, কিন্তু এখন পর্যন্ত অভিযোগ গঠন করা হয়নি। ৫ মে অভিযোগপত্র আমলে নেওয়ার দিন ধার্য ছিল, কিন্তু কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই সেদিন শুনানি হয়নি। অভিযোগপত্র আমলে নেওয়া হয়েছে ১৯ মে। তারপর অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করা হলো ২৬ মে। কিন্তু এদিনও শুনানি হলো না; কারণ হিসেবে বলা হলো, হরতালের কারণে আসামিদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন মামলার আসামি বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের হরতালের দিনে আদালতে হাজির করতে সমস্যা হচ্ছে না, অথচ বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার আসামিদের বেলায় সমস্যা—এর সোজা মানে, এই আসামিরা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। তাঁদের বিচার-প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতেই এভাবে বিভিন্ন অজুহাতে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে।
বিশ্বজিৎকে যাঁরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে, লোহার রড, লাঠি ইত্যাদি দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন, তাঁদের সচল ছবি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। সেসবের ভিত্তিতেই সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, মোট ২১ জনকে হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাহলে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না কেন? কীভাবে তাঁরা মাসের পর মাস পালিয়ে থাকছেন? গোয়েন্দা পুলিশ তাঁদের সন্ধান পাচ্ছে না কেন? আসামি পলাতক রয়েছে বললেই কি সব দায়দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
দেশবাসী বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী বলে হত্যাকারীদের পার পেতে দেওয়া চলবে না। বাকি আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচার-প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হোক।

সংলাপ ও ইন্টারপোল পর্যালোচনা

পৃথিবীতে পতিত হয়ে আদম ও হাওয়া প্রথম যা করেন, তা হলো সংলাপ। তাঁদের মধ্যে সংলাপ হয় আগে, অন্যান্য কাজকর্ম আরও পরে। প্রথম প্রভাতে তাঁরা যে সংলাপ শুরু করেন, তাঁদের ছেলেমেয়ে ও সন্তানসন্ততি তা অব্যাহত রেখেছে আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত। সব রকমের কথাবার্তাই সংলাপ, তবে একা একা যদি কেউ কথা বলে, তা ঘরের মধ্যেই হোক বা মাইকের সামনে হোক, তা সংলাপ নয়—একালাপ। যার কথা বলার আছে কিন্তু শোনার কেউ নেই, সে একালাপ করে। নাটকের মঞ্চে স্বগতোক্তি চলে, কিন্তু জীবনের মঞ্চে, বিশেষ করে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে স্বগতোক্তি বা একালাপের চেয়ে সংলাপের মূল্যই বেশি। বাংলাদেশে সংলাপ জিনিসটির চেয়ে ওই শব্দটির মূল্য বেশি। দুগ্ধপোষ্য শিশু সদ্য যার দাঁত উঠেছে নিচের পাটিতে দুটি আর ওপরের পাটিতে দুটি—তারাও আজ এই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। কেবল হাঁটতে শিখেছে এমন শিশুও ‘সংলাপ’ শব্দটি জানে। প্রতিদিন, প্রতিমূহূর্তে টিভির পর্দায়, পত্রিকার পাতায়, অফিসকক্ষে, আলোচনার টেবিলে, মুদিদোকানে, বাস-ট্রেন-লঞ্চের খোলের মধ্যে, হাটবাজারে—এমন কোনো জায়গা নেই, এমন মানুষ নেই যেখানে ও যার মুখে ধ্বনিত হচ্ছে না সংলাপ শব্দটি। খবরের কাগজের পাতাজুড়ে সংলাপ, টিভি টক শোর সর্বজ্ঞদের মুখে সংলাপ। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত সংলাপ যে রোজকেয়ামতের আগে হবে, তা কোনো সাবালকের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন।
হুজুররা যখন প্রতিদিন প্রেস কনফারেন্স করে মাও ঝে দোঙের মতো ঢাকার দিকে লংমার্চের প্রস্তুতির কথা বলেছিলেন এবং তাঁদের সময়সীমা ৫ মে এগিয়ে আসছিল, তখন টিভির পর্দায় শুনলাম সংলাপের ‘আহ্বান’। ‘যেকোনো জায়গায়’ ‘যেকোনো বিষয়ে’ সংলাপ হতে পারে বলে শোনা গেল। ত্রিকালদর্শী প্রবীণদের কারও কারও কাছে দৌড়ালেন সাংবাদিকেরা। একমুহূর্ত ভাবনা-চিন্তা না করে তাঁরা শোকরানা আদায় করে বললেন, ‘এত দিনে আশার আলো দেখছি।’ আমার মতো দ্বিকালদর্শী ও দ্বিদলদর্শী নৈরাশ্যবাদীকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি প্রশ্নকর্তাদের হতাশ করে দিয়ে বললাম: এসব কিচ্ছু না, কথার কথা মাত্র।
আমার সামান্য আক্কেলে বুঝতে পেরেছিলাম সংলাপ ‘যেকোনো জায়গায়’ হওয়া সম্ভব নয়। যদি প্রথম পক্ষ থেকে বলা হয়, চলুন যাই নদীর মধ্যে, নৌকায় বসে হাওয়া খাই আর আলাপ করি। দ্বিতীয় পক্ষের স্ট্যান্ডিং কমিটির নেতারা দাঁড়িয়ে যাবেন। একবাক্যে বলবেন, সংলাপ নদীর মধ্যে হতেই পারে না। এ এক বিরাট চালাকি। নৌকা তাদের নির্বাচনী প্রতীক। সংলাপ কভার করতে গিয়ে চ্যানেলগুলো যখন লাইভ দেখাবে যে নৌকা দুলছে তখন নির্বাচনী প্রচার অর্ধেক হয়ে যাবে। যে লক্ষ্যে সংলাপ—দ্বিতীয় পক্ষের সেই উদ্দেশ্যটাই যাবে ভেস্তে।
দ্বিতীয় পক্ষ যদি প্রস্তাব দেয় যে চলুন পাকা ধানের খেতের আল দিয়ে হাঁটি আর আলাপ করি। তৎক্ষণাৎ অন্য পক্ষ খেপে যাবে। যাদের নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ। তাদের সঙ্গে নৌকাঅলারা পাকা ধানের খেতের ত্রিসীমানায় যেতেই পারেন না। বৃষ্টি-বাদলার দিনে কোনো ছাতিমগাছের তলায়ও সংলাপ হওয়া সম্ভব নয়। আদৌ হলে সংলাপ উপযুক্ত কক্ষেই হতে হবে। তবে লুই কানের ডিজাইন করা বড় দালানটির কক্ষে হওয়াই ভালো।
প্রথম পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন ছাড়া’ ‘যেকোনো বিষয়ে’ আলোচনা হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো বিষয়ে আলোচনা হওয়াও কঠিন। কোনো পক্ষ থেকে যদি বলা হয় বরইর আচার বড়ই মজা, শুনলেই জিহ্বায় পানি আসে; অপর পক্ষ বলবে, আমের কাশ্মীরি আচারের ওপর আচারই হয় না। তবে আমরা কিছুটা ছাড় দিতে পারি যদি তেঁতুলের আচার মেনে নেন। কোনো পক্ষই মানামানির মধ্যে নেই। সংলাপের শেষ পর্যায়ে খেতে বসে যদি এক পক্ষ দেখে প্লেটে টাকি মাছের ভর্তা, সঙ্গে সঙ্গে অন্য পক্ষ বলবে শুঁটকির ভর্তা কোথায়? আপ্যায়নে এত অবহেলা? খামু না। ওখানেই সংলাপের ভবিষ্যৎ শেষ।
মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতাদের ঘরবাড়ি, কাগজ-কলম বলে কিছুই নেই। সবই রাজপথে, জনসভায় ও মুখে মুখে। কাউকে চায়ের দাওয়াত চিঠিতে দুলাইন লিখে অথবা ফোনে দেওয়াই ভালো। বিশাল জনসভা থেকে ঘোষিত হলো চায়ের দাওয়াত। যে দাওয়াতের ভেন্যু গুলশানের কোনো বাড়ি না কোনো পাঁচতারা হোটেলের লবি, তা বলা হয়নি। সত্যি সত্যি যদি কাঙ্ক্ষিত অতিথি আমন্ত্রয়িতার বাসভবনে পরদিন সাড়ে সাতটায় গিয়ে হাজির হতেন—কী অবস্থা হতো? হোস্ট হয়তো তখনো থাকতেন ঘুমিয়ে। কাজের লোকেরা সম্মানিত অতিথিকে এক পেয়ালা চা আর বগুড়ার দই দিয়ে আপ্যায়িত করতেন, কিন্তু তাতে চা-ই খাওয়া হতো, সংলাপ হতো না।
রাজনৈতিক বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপের একটা রীতিনীতি আছে। উভয় পক্ষেরই প্রাথমিক কাজ দলীয় নেতাদের মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা। একটা সিদ্ধান্ত ও দ্বিতীয় বিকল্প সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা। তারপর হোমওয়ার্ক করা। কোন কোন নেতা আলোচনায় দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাঁদের নির্বাচন করা। একটি রাষ্ট্র কোনো ছেলেখেলার জিনিস নয়। জনগণ কোনো হেলাফেলার পাত্র নয়। মুখ দিয়ে খুশিমতো ধাঁ করে কিছু বললাম আর সব হয়ে গেল, তা নয়। সরকারি পক্ষ থেকে অব্যাহতভাবে বলা হচ্ছে, সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। সরকারের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলছেন, প্রায় প্রতিদিন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান থাকার প্রশ্নে কোনো আপস নেই।’ তাই যদি হয়, তাহলে দ্বিতীয় পক্ষ কী করে বলে—চলেন, আপনাদের সঙ্গে আপস করতে সংলাপে বসি। নির্বাচনে যদি আমরা ৩৫টি আসন পাই, তা হবে পরম পাওয়া। গতবারের তুলনায় গোটা পাঁচেক বেশি। বিচিত্র নামীয় সংগঠন প্রতিদিন আলোচনা সভার আয়োজন করছে। কোনো সংগঠন সরকারপক্ষীয় ও চেতনাপন্থী। কোনো সংগঠন বিরোধীপক্ষীয়—তারা মধ্যপ্রাচ্যপন্থী। কোনোটি প্রাক্-মধ্যযুগপন্থী। চেতনাপন্থী আলোচনা সভায় মহাজোটের কয়েকজন নেতা অবধারিতভাবে বক্তা থাকছেন। নেতারা বলছেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, সেভাবেই আগামী নির্বাচন হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন হবে। কখনো কখনো তাঁদের বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে এই সংসদই থাকবে, প্রধানমন্ত্রীও থাকবেন এবং ঠিক সময়ে নির্বাচন হবে। তাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে, যেদিন নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হবে, সেদিন আগের ৩৫০ এবং নতুন ৩০০ মোট আমাদের সাংসদ হবে ৬৫০। অবশ্য তা অল্প সময়ের জন্য। এসব কথার কথা। নেতাদের কথার কারণেই এসব কথা উঠছে।
কয়েক দিন টেলিভিশনের পর্দায় শোনা গেল, বাংলাদেশ ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইল অর্থাৎ ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার মতো চলবে। এর মধ্যে ধর্মের হেফাজতকারীরা জিহাদের ডাক দিলেন। সময়সীমাও বেঁধে দিলেন। চতুর্দিকে আকাশ-বাতাস মুখরিত হলো হুংকারে। যেসব অমূল্য দফা তাঁরা ঘোষণা করলেন তার যুগোপযোগিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করে এমন দুটো মাথা কার ঘাড়ের ওপরে আছে? কিন্তু তাঁরা ভুল করলেন অথবা তাঁদের বুদ্ধিজীবীরা ও দফা রচয়িতারা ভুল করলেন সংখ্যার ব্যাপারে। কিরো বলেছেন, ১৩ সংখ্যাটি আনলাকি। এদিকে সরকার মনে করল, হয়তো হেফাজতের জন্য ১৩ সংখ্যাটি লাকি। তাঁরা সাফ জানিয়ে দিলেন—বাংলাদেশ মুসলমানদের ‘স্তান’ সব মানুষের ‘দেশ’ নয়—সুতরাং তা চলবে ‘মদিনা সনদ’ অনুযায়ী। হতে পারে কথাটা কথার কথা! কিন্তু মহাজোটের সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধকারী বাম দলের নেতাদের কেউ প্রতিবাদ করলেন না। বাম নেতাদের অবস্থা এখন অনেকটা আওয়ামী নেতাদের পেয়াদার মতো। তাঁদের ভোট না থাকলেও তাঁদের যে শক্ত রাজনৈতিক আদর্শ ছিল, সে জন্য মানুষ তাঁদের শ্রদ্ধার চোখে দেখত, সে কথা তাঁরা ভুলে গেছেন। একজন মানুষের জীবনে ক্ষমতার রাজনীতিই সব নয়। তা যে নয় তার জন্য মহাত্মা গান্ধী, জয়প্রকাশ নারায়ণ বা মওলানা ভাসানীর দৃষ্টান্তের প্রয়োজন নেই। এই ভারতবর্ষে অগণিত আদর্শবান রাজনীতিক আগে তো ছিলেনই—আজও আছেন অনেকে। যাঁদের কাছে মন্ত্রিত্ব বা এমপিত্ব অতি তুচ্ছ। বামদেরও দোষ দিয়ে লাভ নেই। তাদের সাংগঠনিক শক্তি সীমিত। তাই তাদের কাছে পুরোনো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী তত্ত্বের চেয়ে সময়োপযোগী আম-ছালাতত্ত্ব বেশি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বড় দলের নেতাদের কী অবস্থা? যখন প্রতিদিন আলোচনা সভায় বিরোধীদলীয় নেতাকে গালাগাল করেন তখন তাঁরা মহাবীর আলেকজান্ডার। গর্জন করেন সিংহের মতো। যখন তাঁরা নিজের দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় যোগ দেন, দলীয় নেতার সামনে খরগোশের চেয়ে লাজুক ও শান্ত। দলের স্বার্থে, সরকারের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে সঠিক কথাটি বলাকে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ বলে না। এখন বরং বিশ্বাস হয়, উদ্দীনীয় প্রশাসনের সময় তাঁরা এমন কিছু করেছেন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে, যার জন্য এখন খোশামুদি করা ছাড়া মুখ খোলার সাহস নেই। একই অবস্থা বিএনপির নেতাদেরও।
বিএনপি বুঁদ হয়ে আছে ক্ষমতায় যাওয়ার নেশায়। খালেদা জিয়া আলটিমেটাম দিলেন। তিনি সময় বেঁধে দিলেন ৪৮ ঘণ্টা। একটা বাড়ি বদল করতেও এক সপ্তাহ সময় লাগে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাটা যে হেফাজতিদের হাতে তুলে দেবেন তার একটা গোছগাছ করতেও ১০-১৫ দিন সময় প্রয়োজন। ৪৮ দিন সময় দিলেও পারতেন। ৫ মে ঢাকায় আসা ‘মুসাফির ও মেহমানদের খাদ্য-পানীয় দিয়ে সহায়তার জন্য তাঁদের পাশে’ থাকতে ঢাকাবাসীকে আহ্বান জানালেন। ঢাকাবাসীর মধ্যে কিছু যে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের সমর্থকও আছেন তা তিনি জানেন। ৬ মে ভোররাতে ঢাকাবাসী তো দূরের কথা, নয়াপল্টনের কর্মীরাও তাঁদের পাশে দাঁড়ালেন না। বরং সেদিন সুবহে সাদিকের সময় নয়াপল্টনের অফিসের বাসিন্দারা জাতীয় কবির গজল গেয়েছেন। চত্বর থেকে মুসাফিররা ঘরে ওরফে মাদ্রাসায় ফিরে যাচ্ছিলেন চোখে পানি নিয়ে। তখন এক হাতে পানির বোতল ও আরেক হাতে খানার প্যাকেট নিয়ে জামায়াত-বিএনপি-জাতীয় পার্টির নেতারা গেয়েছিলেন নজরুলের গজল:
মুসাফির মোছ এ আঁখি-জল
ফিরে চল আপনারে নিয়া।
তাঁদের সবাই আপনারে নিয়া ফিরে যেতে পারেননি। অনেকের জায়গা হলো হাসপাতালের বারান্দায়। বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপে সরকার মারাত্মক আন্তরিক। সে কথা বান সাহেবের সুদর্শন সহকারীকে বলে দিয়েছেন। এখন যদি বিরোধী দল বলে, সংলাপে যামু। যেইখানে যাইবার কন সেইখানে বসুম গিয়া। তবে ইন্টারপোলের লোকদের কইয়া দেন আমাদের দলের ‘পলাতক’ আসামিকে সংলাপের দুই-চার দিন পরে যেন ধইরা ঢাকায় আনে। বিরোধী দলকে সংলাপে বসার আহ্বান আর ইন্টারপোলকে দড়ি নিয়ে এগিয়ে আসার আমন্ত্রণ—দুটো একসঙ্গে শোভন নয়। লন্ডনে ‘গেটিসবার্গ বক্তৃতা’র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দুদকের কর্মকর্তারা মালকোঁচা মেরে নামলেন। তাতে দুটি কাজ হলো: দুদকের চেয়ারম্যানের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ার সম্ভাবনা এবং সংলাপের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা। সব স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সরকারি দলের নেতাদের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিও শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ গরিব, কিন্তু তারা গণতন্ত্র পছন্দ করে। সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, হামলা-মামলা, ইন্টারপোল দিয়ে দলের নেতাকে পাকড়াও করার ইচ্ছা প্রকাশ—এসব মানুষ পছন্দ করে না। যে দেশে জনসংখ্যা বেশি এবং মানুষের মাথা গরম, সেখানে সরকারের মাথা ঠান্ডা না হলে বড় বিপত্তি এড়ানো সম্ভব নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামলেখক।

ক + লা = খাব by আনিসুল হক

মা ফলেষু কদাচন। ফল নাকি সব সময় পাওয়া যায় না। ফলের আশা না করেই তাই কাজ করে যেতে হয়। কিন্তু গ্রীষ্মকালে ফলের আশা কি আমরা খানিকটা করতে পারি না? আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস, কলার এইটাই তো মৌসুম। ফল বাজারে পাওয়া যাবে, টাকা থাকলে দেশি-বিদেশি যেকোনো ফলই বাজার থেকে কিনে আনা যায়, এমনকি মাঘ মাসেও পাওয়া যায় আম! এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য বাজারে ফরমালিন ছাড়া ফল আদৌ পাওয়া যাবে কি না, এই সন্দেহ আমাদের যাবে না! আমি একবার ফল কিনতে গিয়ে বিক্রেতাকে বললাম, ভাই, আমাকে কেমিক্যাল ছাড়া ফল দেন। তিনি বললেন, কেমিক্যাল ছাড়া কোনো ফল আমার দোকানে নাই। ফল কিনতে গিয়ে বিক্রেতাদের কাছ থেকে নানা রকম অপমানকর কথা আমি বহুবার হজম করেছি, কোনো জবাব দেওয়ার চেষ্টা করিনি। একবার হলো কি, হাতিরপুল বাজারে পেঁপে কিনতে গেছি। পেঁপে একটা বাছলাম, বললাম, কত দাম। দোকানি জানালেন, ১৩০ টাকা। আমি ১০০ টাকায় রফা করলাম।
তখন তিনি বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে কেজি হিসেবে কিনতে পারেন।
আমি বললাম, কত করে কেজি।
তিনি বললেন, ৬০ টাকা।
আমি বললাম, ৫০ টাকা করে কেজি দেন।
উনি বললেন, আচ্ছা।
এবার ওজন করে দেখা গেল, তিন কেজি। তিনি বললেন, দেন দেড় শ টাকা।
আমি হেসে আগের হিসাবে ১০০ টাকা দিলাম। উনি বললেন, না, আপনি তো আগের হিসাবে নেন নাই। ওজন করে নিতে চেয়েছেন। আপনাকে দেড় শ টাকাই দিতে হবে।
আমি হেসে বললাম, তাহলে তো আমি নেব না।
তিনি বললেন, আপনার মতো কাস্টোমারের কাছে আমি পেঁপে বেচি না।
আমি হেসে বললাম, ধন্যবাদ।
প্রায় ১০ বছর আগের ঘটনা। এখনো ভুলতে পারি না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয়, বেটা আমাকে অপমান করে নাই তো?
যা বলছিলাম, রাসায়নিক ছাড়া ফল কি এই বাংলাদেশে কেউ বিক্রি করে?
ফলের মৌসুমে আমাদের রাস্তার ধারে কতগুলো বিশেষ দোকান গড়ে ওঠে। তাতে বড় বড় ব্যানারে লেখা থাকে, কেমিক্যালমুক্ত আমের বিশাল মেলা। এর আগে একবার ভ্রাম্যমাণ আদালত এসব মেলায় অভিযান চালিয়ে দেখেছে, মোটেও এসব কেমিক্যালমুক্ত নয়। এদের চেয়ে তো আমার সেই ফল দোকানদার বেশি সৎ, যিনি আমাকে বলেছিলেন তাঁর দোকানে কেমিক্যালমুক্ত কোনো ফল নাই।
তাঁর কাছ থেকে ফল কিনে আমি গান গাইতে গাইতে ফিরব, আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান।
আর আপনি যদি কেমিক্যালমুক্ত দোকান থেকে কেমিক্যালযুক্ত ফল কেনেন, তখন আপনি কী বলবেন?
তখন আপনি আকবর আলি খানের লেখা পরার্থপরতার অর্থনীতি গ্রন্থের শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি প্রবন্ধের সেই কাহিনিটা মনে করতে পারেন। যেখানে একজন ইংরেজ কর্তাকে এক ভারতীয় বলেছিল, আমলারা আছে দুই ধরনের, এক ধরনের হলো যারা ঘুষ খায় আর কাজ করে, আরেক দল আছে শুয়োরের বাচ্চা, ঘুষ নেয়, কিন্তু কাজটা করে দেয় না।
আম নিয়ে পুরান ঢাকার পুরোনো কৌতুক দুটো পর পর বলে নিই।
আমওয়ালা আমের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে যাচ্ছে।
ক্রেতা: মিয়া, কী আম?
বিক্রেতা: ল্যাংড়া।
ক্রেতা: সত্যি কি তোমার আম ল্যাংড়া?
বিক্রেতা: আম যদি ল্যাংড়াই না হইব, তাইলে কি আর মাথায় কইরা বইয়া লইয়া যাই?
ক্রেতা বললেন, কী মিয়া, তোমার আম তো ছোট?
বিক্রেতা বললেন, আপনি শুধু আমার আমের বাইরেরটা দেখলেন। ভেতরটা দেখবেন না? আমার আমের আঁটি ছোট।
সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, একই কৌতুকের বিদেশি সংস্করণ হলো, ‘কী জন, আপনি নাকি রোজ দেরি করে অফিসে আসেন।’ ‘স্যার, আপনি শুধু আমার আসাটা দেখবেন, যাওয়াটা দেখবেন না? আমি রোজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে যাই।’
এখন তো রাসায়নিকের কারণে লিচুতে পোকা থাকে না। আগে আম আর লিচুতে খুব পোকা দেখা যেত। সাদা সাদা পোকা। বেশ নড়াচড়া করতে পারত। ওই সময় পোকা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় ছিল রাতের অন্ধকারে ফল খাওয়া। তখন আর ফলে পোকা থাকত না।
রবীন্দ্রনাথকে নাকি একবার গান্ধীজি বলেছিলেন, আপনি তেলে ভাজা খাচ্ছেন। আপনি জানেন, তেলে ভাজা মানে বিষ খাওয়া?
রবীন্দ্রনাথ তখন ঘোরতর বৃদ্ধ, হেসে বললেন, এই বিষ খেয়েই এত বছর বেঁচে আছি।
কাজেই ফরমালিন নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা করে কী করবেন? এই ফরমালিন খেয়েই তো আমরা এত বছর বেঁচে আছি। তবে ফরমালিন আর রাসায়নিকে শরীরের অনেক ক্ষতি হয়। আজকাল খুব ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষজন, এর সঙ্গে নিশ্চয়ই আমাদের খাদ্যের একটা সম্পর্ক আছে। কাজেই আমাদের ফল উৎপাদককে বলি, ফল পাকানোর কেমিক্যাল কেন দেন? কাঁচা ফল কিনে আনব। অসুবিধা কী?
আর ফরমালিন যাঁরা দেন, তাঁদের বলি, দেবেন না।
আর যাঁরা ফলের গায়ে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন, তাঁদের বলি, কতটা কীটনাশক কত দিন আগে দেওয়া যাবে, তার একটা বিধিনিষেধ আছে, ওটা মেনে চলুন। গত বছর দিনাজপুরে গাছের নিচে পড়ে থাকা লিচু খেয়ে অনেক বাচ্চা মারা যাওয়ার খবর এসেছিল, মনে আছে?
আমি জানি, এইসব কথা কেউ শুনবে না। ফরমালিন ছাড়া আম কিনে ট্রাকে তুলে বাজারে আনার আগেই যদি পচে যায়, তখন লোকসানের টাকাটা কে দেবে ব্যাপারীকে? কাজেই এই সমস্যার একটা বৈজ্ঞানিক সমাধান আমাদের খুঁজতে হবে। উন্নত দেশগুলোয় ফল কীভাবে আনা-নেওয়া, বাজারজাত করা হয়! আমরা সেটা দেখে সেই প্রযুক্তি আমাদের ফলফলাদি শাকসবজিতে প্রয়োগ করতে পারি।
থাক। অনেক কথা হলো। কোত্থেকে কোথায় চলেও গেলাম। কথা হচ্ছিল কর্মফল নিয়ে। প্রবাদ আছে, যেমন কর্ম, তেমন ফল। স্কুলে যেমন বার্ষিক পরীক্ষার শেষে একটা করে ফল আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। প্রগ্রেস রিপোর্ট। আমাদের সরকারগুলোও পাঁচ বছর পরে একটা করে প্রগ্রেস রিপোর্ট হাতে পায়। নির্বাচনের ফল। কিন্তু নির্বাচনের ফলকেও প্রথমে কীটনাশক দিয়ে পোকামুক্ত করে কার্বাইড দিয়ে পাকিয়ে শেষে ফরমালিন দিয়ে স্থায়ী করা যায়। এটাকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলে। সেটা ১৯৮০-এর দশকে দেখেছি, ’৯০-এর পরে দু-একটা উপনির্বাচনে দেখেছি, কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে তা সম্ভব হয়নি। এবার কী হবে, তা নিয়েই যত কাণ্ড। আম আর ছালা দুটোই রেডি করা হচ্ছে, দেখা যাক, আম ও ছালার কোনটা কোন দিকে যায়।
অনেকেই নাকি গাছে কাঁঠাল দেখে গোঁফে তেল দিচ্ছে। অনেকেই নাকি বলছে, আর অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে দেওয়া হবে না। কেউ কেউ নাকি প্রস্তুত হচ্ছে, রথ দেখতে গিয়ে কলা বেচে আসবে। আমরা এত কথা বলব না।
শিক্ষিকা বললেন, বলো তো, ক আর ল আকারে লা। কী হয়?
ছাত্র উত্তর দিল: খাব।
আমরা কলা খাই। মনে মনে।
আর ওঁরা খান গোগ্রাসে। কী রকম খাওয়ার শব্দ হচ্ছে—শুনতে পাচ্ছেন? ওঁরা খাচ্ছেন। গোগ্রাসে গিলছেন। সেই শব্দ শোনা যাচ্ছে—খাই খাই, খাই খাই...
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ওসাংবাদিক।

চীন-ভারতের সীমান্ত সমস্যা by কুলদীপ নায়ার

১৯৬২ সালে আমাদের সীমান্ত লঙ্ঘনের সময় কী শাস্তি দিয়েছিলাম তোমাদের, সেটা কি ভুলে গেছ?’ প্রায় এক দশক আগে বেইজিং সফরের সময় এক অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ চীনা সামরিক কর্মকর্তা আমাকে এই প্রশ্নটা করেছিলেন। এখন চীন যখন আমাদের এলাকার ওপর রাস্তা বানানোয় ভারত ঝাঁকুনি খেয়েছে, তখন আমার তাঁর হুঁশিয়ারির কথা মনে পড়ল। চীনা প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং চীনা প্রতিপক্ষ লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে সমস্যার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাহলেও চীনের বিজয়ের পরও তারা তাদের উদ্ধত ভাব ছাড়েনি। চীনের যুক্তি হলো, স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে একমাত্র সীমান্ত নিয়ে কথা না বললে। এর মানে হলো চীন আমাদের এলাকা দখল করা চালিয়েই যাবে। তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী সঠিকভাবেই বলেছেন, সীমান্ত সমস্যার মীমাংসা ছাড়া ‘কোনো শান্তি ও নিশ্চয়তা সম্ভব নয়’।
উভয় দেশের মানুষ সীমান্ত সমস্যাটা নিয়ে কতটা জানে, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। ১৯৬২ সালের যুদ্ধ যখন ভারতের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হলো, চীন একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। তারপর তারা বোঝাতে চাইল যেখানে দাঁড়িয়ে তারা যুদ্ধবিরতি করেছে, সেটাই হতে পারে সম্ভাব্য সীমান্ত। কিন্তু ভারত যারপরনাইভাবে চাওয়া সত্ত্বেও চীন কথা রাখল না, সীমান্ত সুস্পষ্টভাবে দাগিয়ে নিতে রাজি হলো না। তারা আবারও মতি পাল্টাল এবং ঘোষণা করল নিয়ন্ত্রণরেখাই হলো সীমান্তরেখা। চীন একতরফাভাবে সেনাদের সামনে বাড়াল।
বেইজিং যে এলাকায় অনধিকার প্রবেশ (মনমোহন সিং উত্তেজনা সীমিত রাখার স্বার্থে একে বলছেন ‘ঘটনা’) করেছে সেটা হলো লাদাখের দৌলাত বেগ ওল্ডি এলাকা। চীন কখনোই এই এলাকায় সীমান্ত চিহ্নিতকরণে রাজি হয়নি। কার্যত, দিল্লির সঙ্গে কোনো আলোচনা করা ছাড়াই চীন পুরো বিবাদপূর্ণ এলাকাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এমনকি বলছেও না যে, কোন কোন এলাকাকে তারা নিজেদের বলে দাবি করে। এমনকি ২৩ দিন ধরে চীন যে ভারতের দেসপাং এলাকায় থাকছে এবং সেখানে তাঁবু পুঁতে রাখছে, তার কোনো ব্যাখ্যাও তারা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। বেইজিং যেন বিশ্বকে বলতে চায় যে ‘নিজের এলাকায়’ প্রবেশের জন্য দুনিয়ার কাউকেই কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন তার নেই।
চীন পরিষ্কারভাবেই বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে তারা সুচিহ্নিত সীমান্ত চায় না। কারণ, অচিহ্নিত সীমান্ত দিয়ে সমগ্র অরুণাচল প্রদেশ দাবি করার পথ খোলা থাকে। যেমন অরুণাচল এবং জম্মু ও কাশ্মীরের লোকদের জন্য তারা কেন আলাদা ভিসা মঞ্জুর করে, সে বিষয়েও কোনো ব্যাখ্যা আসছে না। আসল ইস্যু হলো তিব্বত। বেইজিং হয়তো মুখে সেটা বলছে না, কিন্তু তারা সীমান্ত প্রশ্নকে তিব্বতের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করে, যে তিব্বতিরা দালাই লামার নেতৃত্বে হাজারে হাজারে ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছে। ভারত ও চীনের গোপন বৈঠকে তারা প্রসঙ্গটা তুলেছেও। কিন্তু যেই ভারতের পক্ষ থেকে বলা হলো, দালাই লামা ধর্মীয় নেতা ছাড়া আর কিছু নন, সেই তারা চুপ করে গেল।
বেইজিংয়ের ইচ্ছা যা-ই হোক, নয়াদিল্লি এ মুহূর্তে তিব্বত-অধ্যায় নতুন করে খোলার মতো অবস্থানে নেই। হিন্দুরা যাদের ভক্তি করে তার মধ্যে বুদ্ধও রয়েছেন। ভারতের উচিত হবে না, চীনকে খুশি করতে গিয়ে হিন্দুদের অনুভূতিকে আহত করা, যারা আবার ভারতের জনগণের ৮০ শতাংশ। অন্যভাবে দেখলেও তা করা যাবে না। ভারত ও চীন উভয়ই অতিকায় রাষ্ট্র। উভয়ের মধ্যে সংঘাত বাধলে তা থেকে কেবল দক্ষিণ এশিয়াই নয়, বাদবাকি বিশ্বেও তার অভিঘাত পড়বে। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর ভারতে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্বনেতাদের প্রত্যেককেই ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখে হুঁশিয়ারি করে দিয়েছিলেন যে ভারত ও চীন আলাদা ঐতিহ্যের অনুসারী এবং তাদের মতাদর্শও সাংঘর্ষিক। ভারত গণতান্ত্রিক দেশ আর চীন হলো একনায়কতন্ত্র। দক্ষিণ এশিয়ারই হিসাব করা উচিত, এদের কোনটিকে তারা সফল হিসেবে দেখতে চায়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, চীন ভারতকে পরাস্ত করেছে। কিন্তু চীনে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করা হয় স্বৈরতান্ত্রিকভাবে। এটা কি স্থায়ী সমাধানের পথ? সময়ই বলে দেবে। তাহলেও একটি জিনিস পরিষ্কার যে ভারতকে অবশ্যই তার প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে; এখন তা ৪ দশমিক ৬ অথচ চার বছর আগে তা ছিল ৯ শতাংশ।
চীন ও পাকিস্তান একই অক্ষে আছে। এই অভিযোগও রয়েছে যে চীন পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে দিয়ে ভারতকে ঘিরে রাখতে চায়। এমনকি যদি একটা যুদ্ধও বাধে, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হবে। ভারতের উচিত নয় সীমান্ত সমস্যা নিয়ে বেশি মগ্ন হয়ে থাকা; চীন চায় নয়াদিল্লি সেটাই করুক। সেটাই এর দুর্বলতা। তিব্বতিরা চীনের ঘাড়ে বোঝা হিসেবে আছে। অন্যভাবে দেখলে, তিব্বত শব্দটাই চীনাদের জন্য জুজুর ভয় নিয়ে আসে। তিব্বতের ওপর তাদের কর্তৃত্ব আছে, কারণ তারা একে দখল করে রেখেছে। কিন্তু দখলদারি আর স্বাধীনতার মধ্যে পার্থক্য আছে। যা হোক, তিব্বতিদের মানবাধিকারের বিষয়টি ভারত তুলতে পারে। খুবই অদ্ভুত কথা যে ডজন ডজন তিব্বতি স্বাধীনতার জন্য গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলেও বিশ্ব তা দেখেও দেখে না।
ভারত যে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে চায়, তাকে স্বাগত। কিন্তু অর্থনৈতিক সহযোগিতা জনগণের সঙ্গে জনগণের সহযোগিতার সমার্থক নয়। এবং কার্যত এর অস্তিত্বও নেই। দালাই লামার জীবদ্দশায় যদি তিব্বতের সমস্যার সমাধান করতে হয়, তাহলে তিনি চীনের অংশ হিসেবেই স্বায়ত্তশাসন মেনে নিতে রাজি। কিন্তু তিব্বতের তরুণেরা দালাই লামার সমাধানে রাজি না হলেও তারা বিরোধিতা করছে না। কারণ, দালাই লামা তাঁর সারা জীবন ধরেই তিব্বতের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন।
চীনের সাবেক নেতা চৌ এন লাই নেহরুকে বলেছিলেন, উভয় পক্ষের কেউই কাউকে আক্রমণ করবে না। কিন্তু বেইজিং কখনোই তার কথা রাখেনি। কোনো নিশ্চয়তা নেই যে ভবিষ্যতেও তারা কথা রাখবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

তামাকে উচ্চ হারে কর by সৈয়দ সাইফুল করিম

পৃথিবীতে বাংলাদেশেই সিগারেটের মূল্য সবচেয়ে কম, যেখানে বিড়ি আরও কম মূল্যে পাওয়া যায়। আসন্ন ২০১৩-২০১৪ বাজেটে সিগারেটের অতিরিক্ত দাম বাড়ালে তরুণেরা ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবেন এবং বর্তমান ধূমপায়ীদের অনেকে সিগারেট ছেড়ে দিতে উৎসাহিত হবে। তামাকের ওপর উচ্চহারে কর জীবন বাঁচাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। এ থেকে প্রায় ২৪ লাখ অকালমৃত্যু রোধ করা যাবে।
অন্যদিকে সরকারের বাড়তি রাজস্ব আয় হবে ৭২০ কোটি টাকা। তাই বিড়ির ওপর উচ্চ হারে একক সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হলে বিড়ির মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং বিড়ি সেবনের হার কমবে বলে আমরা আশা করছি।
সৈয়দ সাইফুল করিম
মিরপুর-১, ঢাকা।

অবৈধ পার্কিং by এম এ মুকিম সজিব

আমি রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের (ইউডা) বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমার বাসা মিরপুরে। প্রতি সপ্তাহে আমাকে চার থেকে পাঁচ দিন বাসা থেকে পাবলিক বাসে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস করতে হয়। আর প্রায় প্রতিদিনই ট্রাফিক জ্যামের পাশাপাশি অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে আমার মতো অনেক সাধারণ জনগণকে দুর্ভোগে পড়তে হয়। আমি সাধারণত দুটি রাস্তা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করে থাকি। আমার ক্যাম্পাস ধানমন্ডির শংকরে অবস্থিত। আমি কোনো কোনো দিন ধানমন্ডি ২৭ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে নেমে পুরাতন ২৭ নম্বর রোড দিয়ে রিকশায় অথবা লেগুনায় ক্যাম্পাসে যাই। আবার কোনো কোনো দিন সরাসরি বাসে আসাদগেটের আসাদ অ্যাভিনিউয়ের সড়ক দিয়ে মোহাম্মদপুর হয়ে ক্যাম্পাসে যাই। ধানমন্ডির পুরাতন ২৭ নম্বর সড়কে তিনটি স্বনামধন্য বেসরকারি স্কুল অবস্থিত। এসব স্কুলের সামনের সড়কে প্রায় প্রতিদিনই দুই সারি করে ছাত্রছাত্রীদের আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহূত তাদের অভিভাবকদের ব্যক্তিগত গাড়িগুলো রাখা হয়। আর এই সড়কে বাকি মাত্র একটি লেনের জায়গা দিয়ে পাবলিক পরিবহন চলাফেরা করে। ফলে এই সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। আর এর কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের মূল্যবান সময় দিনের পর দিন নষ্ট হচ্ছে। অপর দিকে আসাদগেট বাসস্ট্যান্ড থেকে আসাদ অ্যাভিনিউয়ের সড়কে অবস্থিত দেশের স্বনামধন্য আরও দুটি স্কুল।
এ সড়কেও প্রায় প্রতিদিন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদের ব্যক্তিগত গাড়ি দুই লেন করে পার্কিংয়ের কারণে সড়কের মাত্র একটি লেন দিয়ে পাবলিক পরিবহনগুলোকে চলাচল করতে হয়।
এতেও সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। অতএব সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে অতি শিগগির এ বিষয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছি।
এম এ মুকিম সজিব
ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা), ঢাকা।