Wednesday, February 3, 2010

ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের ওপর স্থগিতাদেশ

ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের নতুন অস্থায়ী কমিটির কার্যক্রমকে ছয় মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন আদালত। বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এবং বিচারপতি নাঈমা হায়দারের বেঞ্চ গত পরশু এই আদেশ দিয়েছেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি গঠিত নতুন অস্থায়ী কমিটিকে কেন অবৈধ এবং আইনবহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছেন আদালত। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সচিব, পরিচালকদ্বয়কে (প্রশাসক ও অর্থ) এর জবাব দিতে বলা হয়েছে।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ। এরপর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বেগম রুবাবা দৌলাকে সভাপতি ও মাহবুবুর রবকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন এই অস্থায়ী কমিটির প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। কিন্তু মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দিলেন আদালত।

বড় করুণ সেই পরিবর্তন by শেগুফ্তা তাবাস্সুম আহমেদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ২৩/বি বাড়িটির সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় একদিন হঠাত্ বাবা মাকে বলেন, ‘দেখো, একটা প্রজাপতি।’ মা দেখে বললেন, ‘এটা তো মরা।’ বাবা প্রজাপতিটিকে টবের একটি ফুলগাছে সযত্নে রেখে দিয়ে বললেন, ‘এর প্রাণ রক্ষা করা যাবে।’
আরেকটি ঘটনা। টিকাটুলিতে আমার নানাবাড়ির উঠানে একদিন একটি চিল ধপাস করে এসে পড়ল। সবাই তো ভয়ে অস্থির। বাবা বালতিতে করে পানি নিয়ে এসে চিলটির গায়ে পানির ছিটা দিলেন। কিছুক্ষণ পর ঠিকই চিলটি নড়েচড়ে উঠল এবং আস্তে আস্তে উড়ে গেল তার গন্তব্যে।
আমার বাবা, যিনি একটি প্রজাপতি ও পাখির কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না, তাঁকে কিনা লোমহর্ষকভাবে হত্যা করা হলো!
সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবার শিক্ষা গ্রহণ। ১৯৬৮ সালে ভূতত্ত্ব ও খনিজবিদ্যা বিভাগ থেকে এমএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে শীর্ষস্থান লাভ করেছেন। ১৯৬৯ সালে তত্কালীন অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনে (ওজিডিসি) যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। নতুন কিছু আবিষ্কার ও জ্ঞান বণ্টনের স্পৃহা নিয়ে তিনি ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৫ সালে ভূতত্ত্ব ও খনিজবিদ্যা বিভাগ তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস এবং ১৯৮২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি করেন। তিনি জার্মান ভাষায় দক্ষ ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিভাগে জার্মান ভাষা শেখাতেন তিনি। ভূতত্ত্ব ও খনিজবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ফ্যাকালটি অব লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্সের। প্রতিটি দায়িত্বের ক্ষেত্রে বাবা যে জিনিসটি কখনো ত্যাগ করেনি, তা হলো সততা এবং নিয়মানুবর্তিতা। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই বাবা তাঁর একজন ছাত্রের (পরে সহকর্মী) হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন।
গরিব ও অসহায় ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বাবা খুব সহানুভূতিশীল ছিলেন। সব সময় তিনি গরিব অসহায় শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রাখতেন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ বাবার হত্যাকারী মহিউদ্দিন। মহিউদ্দিন ছিলেন গরিব ছাত্র। তিনি ভূগোল বিভাগের শিক্ষক সেলিমা খাতুনের আত্মীয় ছিলেন। তবে তাঁর পালক পুত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন মহিউদ্দিন। সেলিমা খাতুনের বাসা ছিল ৮ নম্বর বিল্ডিংয়ে; আমাদের ১ নম্বর বিল্ডিংয়ে। বাবা সব সময় চাইতেন, মহিউদ্দিন সফল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করুক। কিন্তু মহিউদ্দিন আমার সেই বাবাকে খুন করে একজন খুনি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ২৩/বি, বাড়িটির (যে বাসায় বাবা খুন হন) ল্যান্ডফোনে আমার মা এখনো ফোন করেন প্রতিদিন। বাবার মতো নিরীহ একজন মানুষকে যে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মা বিশ্বাস করতে পারছেন না। বিভাগের কাজ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাবার কাছে। মা আমাদের দুটি ভাই-বোনকে আগলে রাখতেন। বাবা সেই বিভাগের একজন শিক্ষকের হাতে খুন হয়েছেন।
বাবার লাশ খুঁজে পাওয়ার পর শুরু হয় মায়ের নতুন ভোগান্তি। একজন বিধবা আমাদের সমাজে এমনিতেই নানাভাবে অসহায়ত্বের শিকার হন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা। সবচেয়ে হতাশাজনক ছিল তখনকার উপাচার্যের আচরণ। তিনি আমাদের পরিবারের কোনো ধরনের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি। বাবার পেনশন ও ইনস্যুরেন্সের টাকা নিয়েও শুরু হয় ভোগান্তি। আজও তা শেষ হয়নি।
৩০ বছরে তিলে তিলে গড়া সংসারের একটি জিনিসও এখন মায়ের কাছে নেই। সে সব জিনিস ২৩/বি, বাড়িটিতে পড়ে আছে। কিছু জিনিস চুরি হয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো আমাদের সেখানে যাওয়ার মতো নিরাপত্তা দিতে পারছে না!
আমার ভাইয়ের বরাবর একটি অভিযোগ ছিল, বাবা তাঁর কনভোকেশনে যেতে পারেননি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নেওয়ার কারণে। আমার কনভোকেশনেও বাবা আসতে পারবেন না। কারণ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তাঁকে হত্যা করেছেন। এই সব বোঝার মতো বোধ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আছে কি?
আমার বাবাকে যখন হত্যা করা হয়, তখন আমার ভাইয়ের বয়স যা, ১৯৭১ সালে সেই বয়সের ছেলেরা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে, অস্ত্র ধরেছে। আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আইনের দিকে তাকিয়ে বসে আছি। আইনের শরণাপন্ন হয়ে অসম্পূর্ণ বিচার পেয়েছি।
২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ রাতের কথা মনে পড়লেই সব এলোমেলো হয়ে যায়। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এ জীবনের কথা তো কখনো কল্পনাও করিনি। শুধু বাবা নয়, সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে হারিয়েছি। যেকোনো কাজে আটকে গেলে মনে হয়, ইস! যদি বাবা থাকত, তাহলে কত ভালো হতো। বাবা ছাড়া চারটি বছর কী বেদনাদায়ক, মর্মান্তিকভাবে কাটালাম। কষ্টে বুক ফেটে যায়, যখন ভাবি সততাই তাঁর মৃত্যুর কারণ।
আমার বাবার অসংখ্য শিক্ষার্থী-সহকর্মী, যাঁরা বাবার হত্যার পর নানাভাবে প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। সঙ্গে একটা অনুরোধ, আপনাদের আমার বাবা অনেক বেশি ভালোবাসতেন। আপনারাই পারেন আপনাদের প্রিয় শিক্ষক ও সহকর্মীর স্মৃতি ধরে রাখতে।
চারটি বছর বাবা অধ্যাপক ড. তাহের আহমেদের অনুপস্থিতি আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনচিত্র পাল্টে দিয়েছে। শুধু বলি, বড় করুণ সেই পরিবর্তন।
শেগুফ্তা তাবাস্সুম আহমেদ
অধ্যাপক তাহের আহমেদের মেয়ে

বাঞ্ছারামের বাগান -গদ্যকার্টুন by আনিসুল হক

 বাঞ্ছারামের বাগান নামে একটা অপূর্ব ছবি আছে, বাংলা ছবি। বাঞ্ছারাম এক ঘাটের মড়া। সাতকুলে তার কেউ নেই। থাকার মধ্যে আছে তার একটা বাগান। ফুলে-ফলে শোভিত বিশাল বাগান। কত গাছ তাতে। নানা মৌসুমে নানা ফল ফলে সেই বাগানে। বুড়ো বাঞ্ছারাম সেই বাগান পাহারা দেয়। লোভী মানুষেরা তক্কে তক্কে থাকে, কবে মারা যাবে বাঞ্ছারাম। তারা বাগানটা দখল করবে। বাগানের ফল পেড়ে নেবে। তা হয় না। বাঞ্ছারাম মরে না।
সেই রকম একটা বাগানের গল্প এটা। এক গ্রামে এক বুড়োর ছিল একটা ফলের বাগান। বুড়োর আপন কেউ ছিল না। একাই সারা দিন বুড়ো বাগান পাহারা দিত। কিন্তু রাতে যখন সে ঘুমিয়ে পড়ত, চোর এসে বাগান থেকে ফলফলান্তি পেড়ে নিয়ে যেত।
রোজ রোজ কত আর এই চুরি সহ্য করা যায়? বাগানের মালিক গেল পাড়ার সবচেয়ে বুদ্ধিমান আর সদাশয় মানুষটির কাছে। আমি আমার বাগান রক্ষা করতে চাই। এই বাগানই আমার সব। বাগানই আমার সন্তান। সেই বাগান রোজ রাতে চুরি হয়ে যায়। কী করব?
জ্ঞানী লোক বললেন, তোমাকে একটু পয়সা খরচ করতে হবে। তোমাকে দুটো কুকুর দেব। প্রতিটা কুকুরের দাম এক হাজার টাকা। দুই হাজার টাকা খরচ করো। দুটো কুকুর নিয়ে যাও। ওরা সারা রাত বাগান পাহারা দেবে।
বুড়ো বলল, আমার যা বাগান, তা পাহারা দিতে দুটো কুকুর লাগবে না। একটাতেই হবে। আমি এক হাজার দিচ্ছি।
না বুড়ো, তোমার দুটো কুকুরই লাগবে। একটা বড় কুকুর, আরেকটা ছোট কুকুর। দুই কুকুর দুই জাতের। দুই ধরনের কাজ তার।
বুড়ো বলল, আমি এক হাজার দিচ্ছি। একটা কুকুরই দিন। বড়টা দিন।
বুড়ো বড় কুকুরটা আনল আর বাগানে ছেড়ে দিল।
রাতের বেলা যেই না চোর আসে, অমনি কুকুরটা তেড়ে যায়। দশাসই কুকুর। চোরের পায়ের গোঁড়ালি কামড়ে ধরেছে, লাঠির বাড়ি খেয়েও ছাড়েনি, শেষে গোঁড়ালির মাংস ছিঁড়ে যাওয়ায় পালিয়ে বাঁচল চোর। আর তারা আসে না ওই বাগানে।
বুড়ো খুশি। জ্ঞানী মানুষটিকে বলল, বলেছিলাম কিনা, আমার একটা কুকুরেই হবে।
তিনি বললেন, হলে তো ভালোই।
কয়েক দিন পর। দেখা গেল, কুকুরটা রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। চোরেরা প্রায়ই আসে বাগানে, কুকুরটাকে নীরব দেখে তারা একদিন নেমে পড়ে বাগানে। ঠিকই চুরি করতে সক্ষম হয় বাগানের ফল।
বুড়ো পরদিন সকালে বাগানে গিয়ে হায় হায় করে, নিজের চুল ছেঁড়ে। এ রকম ঘটনা প্রায়ই হয়। কুকুর ঘুমোয় আর চোর চুরি করে।
বুড়ো আবার গেল জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে। ‘এই কুকুরে হবে না। আমাকে ছোট কুকুরটাই দিন।’ বড়টা ফেরত দিয়ে সে নিয়ে এল ছোট কুকুরটা।
ছোট কুকুরটা খুব ঘেউ ঘেউ করে। সারা রাত বাগান আর তার আশপাশের এলাকার সবার ঘুম হারাম। চোরেরাও দেখল, এবার আর সুবিধা করা যাবে না। তারা চুরি থেকে বিরত রইল।
বুড়ো গেল জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে। বলল, দেখলেন, একটা কুকুরেই কেমন চলছে আমার। আমি খুব খুশি।
জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, চললে তো ভালোই। দেখা যাক।
কিছুদিনের মধ্যেই চোরেরা আবিষ্কার করল, ছোট কুকুরটার কামড়ানেভর শক্তি নেই। সে তেড়ে আসে, ঘেউ ঘেউ করে, কিন্তু কামড় তো কামড়, আঁচড়টি পর্যন্ত দেয় না।
চোরেরা ঢুকে গেল বাগানে। কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করল। তেড়ে এল। থাবা বা দাঁত বসাল না। নির্বিঘ্নে চুরিকর্ম সেরে চোরেরটা কেটে পড়ল।
এক দিন দুই দিন। বুড়ো গেল আবার সেই বুদ্ধিমান সদাশয় মানুষটার কাছে। কী করব এখন?
তিনি বললেন, দুটো কুকুরই নিতে হবে তোমাকে, বলেছিলাম কিনা।
আরও এক হাজার টাকা দিয়ে বড় কুকুরটাও সঙ্গে করে নিয়ে এল বুড়ো।
এবার দেখা গেল, বড় কুকুরটা ঘুমায়। আর চোর আসার সঙ্গে সঙ্গে ছোট কুকুরটা এমন ঘেউ ঘেউ করে যে বড়টার ঘুম ভেঙে যায়। বড়টা তখন ওঠে, চোরের পেছনে ধাওয়া করে। আর তার ধাওয়া মানে কেবল তেড়ে আসা না, একেবারে মাথা বরাবর ঝাঁপিয়ে পড়া।
এর পর থেকে ওই বাগানে আর চোর আসে না।
এই গল্প আমাকে কোপেনহেগেনের জলবায়ু সম্মেলনস্থল বেলা সেন্টারে শুনিয়েছিলেন আমার প্রিয় শিক্ষক আইনুন নিশাত। গল্পটি শুনিয়ে তিনি বলেছিলেন, সরকার হলো রাষ্ট্রের আসল চালক। তার ক্ষমতা বেশি, কাজ করলে সে-ই করতে পারে, কিন্তু সে বড় ঘুমায়।
আর এ কারণেই দরকার এনজিও, সুশীল সমাজ, নাগরিক ফোরামের নজরদারির। তাদের আসলে করার ক্ষমতা কম, কিন্তু আওয়াজ করার ক্ষমতা অনেক বেশি। আর তারা ঘুমোয় না, ঘুমোতে দেয় না। তারা চিত্কার-চেঁচামেচি করলে সরকারের ঘুম ভাঙে এবং সরকার সক্রিয় হয়।
কথাটা আইনুন নিশাত বলছিলেন, কোপেনহেগেন শহরে এনজিও ও পরিবেশবাদী হাজার হাজার মানুষের প্রতিবাদী মিছিল-সমাবেশ আন্দোলন প্রসঙ্গে। এরা মূল দরকষাকষির ঘরে ঢুকতেও পারে না। কিন্তু তাদের চিত্কারটার দরকার আছে। সরকারগুলোকে তাদের কর্তব্যের কথা তারা মনে করিয়ে দেয়।
আমার মনে হয়, কেবল এনজিও বা নাগরিক সমাজ বা প্রতিবাদী জনগোষ্ঠী নয়, সংবাদমাধ্যমেরও একই ভূমিকা। সংবাদমাধ্যমকে তো বলাই হয় ওয়াচডগ। সরকার বা রাজনীতিকেরা বা কোনো প্রতিষ্ঠান কোথাও কোনো ভুল করলে তারা ওয়াচডগের মতো সেটাকে ফলাও করে প্রচার করবে। সরকার ঘুমিয়ে পড়লে তারা জাগিয়ে তুলবে। সরকার যদি না জাগে জনগণকে জাগাবে সংবাদমাধ্যম। জনগণ ঠিকই নেতাদের বুঝিয়ে দেয়, এক মাঘে শীত যায় না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তাই যেমন সরকারকে সজাগ ও সক্রিয় থাকতে হয়, তেমনি সরকারের ঘুম ভাঙানোর জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম, বিবেকবান ও পক্ষপাতহীন নাগরিক সমাজ ও নানা ধরনের বেসরকারি সংগঠন ও ফোরামও দরকার হয়।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক।

বন্দুকের নল সরিয়ে নিন -সরল গরল by মিজানুর রহমান খান

একটি কবির লড়াই হলে কেমন হয়। সেখানে একদিকে থাকবেন পঞ্চম সংশোধনী সমর্থক আইনবিদেরা, অন্যদিকে এর বিরোধীরা। টস নয়, সমর্থক পণ্ডিতেরা আগে বলার সুযোগ পাবেন। জানা কথা, তাঁরা তারস্বরে বলবেন, পঞ্চম সংশোধনী খুবই জরুরি বিষয়। সুপ্রিম কোর্টের সাধ্যি নেই এর গায়ে আঁচড় কাটে।
হয়তো তাঁরা বলবেন, পঞ্চম সংশোধনী আরও জাতে ওঠে ১৯৯১ সালে। তখন আমরা রাষ্ট্রপতি-পদ্ধতি বাতিল করেছি, এনেছি সংসদীয় গণতন্ত্র। আমরা গণভোট করেছি। সুতরাং পঞ্চম সংশোধনীর গায়ে সামরিক শাসনের কালিঝুলি যদি লেগেও থাকে, তা তো এখন ফকফকা। এর গায়ে আর কোনো দুর্গন্ধ নেই। বারুদের গন্ধ নেই।
এ ধরনের যুক্তিতে কাল্পনিক ওই ‘কবির লড়াই’ বেশ জমে উঠবে। জনতা মুখ চাওয়াচাওয়ি করবে। হয়তো বিরোধী শিবিরেও কিছুটা নীরবতা নামবে। সত্যিই তো, ১৯৯১ সালে গণভোট হয়েছে। জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান দিয়ে গণভোটের বিধান সংবিধানে ঢোকান। তাঁরা দূরদর্শী ছিলেন। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০০৫ সালে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে যে রায় দেন, তেমন দুর্যোগ তাঁরা ১৯৭৯ সালে কল্পনা করেছিলেন। তাই সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদে তাঁরা সামরিক ফরমানগুলোর জন্য একটি বাড়ি বানান।
সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদটা একটা ব্যতিক্রম। নামেই এর পরিচয়। শিরোনাম: অস্থায়ী ও ক্রান্তিকালীন বিধানাবলি। এখানে লেখা: চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত বিধানাবলি সংবিধানের অন্যান্য বিধানাবলি সত্ত্বেও কার্যকর হবে। পঞ্চম সংশোধনী দিয়ে এখানে ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফ যুক্ত করা হয়। এই প্যারাগ্রাফটিতে সব ধরনের সামরিক ফরমানকে নির্বিচারে বৈধতা দেওয়া হয়।
সবারই জানা যে সংসদ যখন কোনো আইন পাস করে, তখন তার বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। কেউ এমন কোনো আইন দেখাতে পারবেন না যে যেখানে লেখা আছে, এই আইনটা কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। কিন্তু জেনারেল জিয়া তেমন আইন তৈরি করলেন। আদালতের এখতিয়ার খর্বকারী আইন বিষয়ে বিএনপিপন্থী আইনবিদেরা কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান, তা আমরা সম্প্রতি লক্ষ করেছি। জরুরি অবস্থায় প্রণীত আইনে লেখা ছিল, দ্রুত বিচারের স্বার্থে বিচার চলাকালে অভিযুক্তরা জামিন পাবেন না। এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপিপন্থীসহ আইনজীবীরা হাইকোর্টে হাত-পা ছুড়ে চিত্কার জুড়ে দিয়েছিলেন। কী সর্বনাশ, কী সর্বনাশ। উচ্চ আদালতের হাত-পা বাঁধা। কেউ কেউ এতে মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের তাণ্ডব দেখলেন। বললেন, এই হলো জংলি আইন।
বিএনপিপন্থী এই আইনজীবীরাই এখন আবার আদালতের ক্ষমতা খর্বকারী ওই ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের সমর্থক। এখানে বন্দুকের নল থেকে বেরোনো আইনকে বিরাট মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বলা হলো, সংসদে পাস হওয়া আইনই কেবল আইন নয়, বন্দুকের নল থেকে বেরোলেও তা ‘আইন’। নির্দিষ্ট করে লেখা হলো, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল সেনাশাসন তুলে নেওয়া পর্যন্ত সময়ে, যেখানে যত প্রকার ফরমান ও প্রবিধান তো বটেই, এমনকি যত প্রকার ‘আদেশ ও বিজ্ঞপ্তিসমূহ’ জারি করা হয়েছে, তাও আইন হিসেবে টিকে থাকবে। এমনকি ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের মাধ্যমে যুক্ত ৩ক অনুচ্ছেদের ১০ দফায় স্পষ্ট বলা হলো, সামরিক আদেশ ও বিজ্ঞপ্তিসমূহ এমনভাবে বিবেচিত হবে যেন এগুলো সবই সংসদের আইন ছিল!
জেনারেল জিয়ার আইন-বিষয়ক সহযোগীরা তখন বন্দুকের নলের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই সংসদ নিজেদের মনের মাধুরী দিয়ে সাজিয়েও তাঁরা স্বস্তি পাননি। মনে ডর ছিল। পঞ্চম সংশোধনী বিল পাস করা হলো সামরিক আইন বহাল রেখে। অতঃপর শেষ ফরমান হিসেবে মহা আজব সামরিক ফরমানটি জন্ম নিলো। সংবিধান ও গণতন্ত্রের ওপর এটা ছিল একটা মরণছোবল। মওদুদ আহমদ আদালতে বলেছেন, চতুর্থ সংশোধনীর কারণেই পঞ্চম সংশোধনী অনিবার্য হয়ে পড়ে। মুজিব যদি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আগের তুলনায় ঢের বেশি মাত্রায় সাংবিধানিক স্বৈরশাসক হন, তাহলে বলব তাঁর হত্যা-পরবর্তী শাসকেরা শুধু স্বৈরশাসক নন, ভয়ংকর দানব হয়ে উঠেছিলেন। শেষ ফরমানের মাধ্যমে জেনারেল জিয়া সংবিধান এফোঁড়-ওফোঁড় করেন। শেষবারের মতো ট্রিগারে চাপ দেন। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে চিরকালের জন্য বন্দুকের নলের কাছে নতমুখ করে রাখার ব্যবস্থা পাকা করেন। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এই ব্যবস্থাটা হাস্যকরভাবে হলেও আক্ষরিক অর্থে এখনো টিকে আছে।
জিয়া সামরিক আইন তুলে নেন ৬ এপ্রিল ১৯৭৯ রাত আটটায়। ঠিক এ দিন লে. জে. জিয়া প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে একটি ফরমান জারি করেন। সম্ভবত এটিই ছিল তাঁর শেষ ফরমান। বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর রায়ে এই ফরমানটি সম্পর্কে ‘সম্ভবত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি গেজেটে ছাপা হয় ৭ এপ্রিল ১৯৭৯। এ দিনই সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে। এবারে আমরা ৭ এপ্রিলের ওই প্রজ্ঞাপনের কথাটি মনে রেখে ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফটি লক্ষ করব। এতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান....বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তত্সম্পর্কে কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোন কারণেই কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিলের সর্বশেষ ফরমানটির রাজনৈতিক ও আইনগত তাত্পর্য অপরিসীম ও সংবেদনশীল।
জিয়া মুজিব হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, এটি একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। কিন্তু এই সামরিক ফরমানটি সাক্ষ্য দিচ্ছে যে তিনি ১৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানকে ‘দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বার্থে’ প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করেছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেলের সই করা এই দলিলটি নতুন প্রজন্মকে মুজিব হত্যাকাণ্ডে জিয়ার ভূমিকা মূল্যায়নে পথ নির্দেশ করতে পারে।
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পরবর্তী পাঁচ দিন দেশে সংবিধান বা সামরিক আইন কোনোটিই ছিল না। ২০ আগস্ট সামরিক আইন জারি করেন মোশতাক। জিয়া ছিলেন মোশতাক ও সায়েমের পর তৃতীয় সিএমএলএ। ১৫ আগস্টের পরিবর্তন ‘জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য’ আনা হয়েছিল—এই ঘোষণা মোশতাক-ফারুক-রশিদ চক্রের দ্বারা ৩ নভেম্বরের আগেই এসেছিল। চার বছর পর তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক জিয়ার সামনে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার কোনো দরকার ছিল না। উপরন্তু, তখন তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। ওই ফরমানেই তিনি বলেন, ‘আমি ৩ জুন ১৯৭৮ অনুষ্ঠিত ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়েছি।’ সুতরাং কোনো বিচারেই প্রায় চার বছর পর ১৯৭৯ সালের ৬ জুলাই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সম্পর্কে ওই মন্তব্য করে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না। উপরন্তু, তখনো দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি আওয়ামী লীগই ছিল। ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের’ সময় কোনো রাষ্ট্রনায়কের পক্ষে এ রকম একটা কৌশলগত ঝুঁকি কবুল করা কি স্বাভাবিক মনে হয়? তবে কি তিনি বিশেষ দায় থেকেই ১৫ আগস্টকে সমর্থন করেছিলেন? এই দলিলটি তিনি সংবিধানের অংশে পরিণত করতে সচেষ্ট হন। ১৫ আগস্টের প্রতি জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়নের এটি একটি দালিলিক প্রমাণ। শুধু দালিলিক নয়, সাংবিধানিক প্রমাণ!
তবে এর তাত্পর্যের কাহিনি এখানেই শেষ নয়, এই সেই সামরিক ফরমান, যেখানে বাংলাদেশের সংবিধান পঞ্চম সংশোধনীর পর কাগজে-কলমে কার্যকর হওয়ার পরও সেখানে ছদ্মবেশী প্রধান সামরিক আইন প্রশাসককে টিকিয়ে রাখা হয়। পঞ্চম সংশোধনী পাসের পরেও জেনারেল জিয়া যাতে সব সময় সংবিধানের ওপরে থাকেন, সে জন্য একটি বিশেষ রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়। কী পরিহাস, মুজিব কত বড় স্বৈরশাসক ছিল, সেই গল্প বিএনপির মুখে শুনতে হয়। ১৯৭৯ সালে জিয়া তাঁর সর্বশেষ ফরমানে লিখেন, ‘সংবিধান বা অন্য আইনে যা আছে তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি যেকোনো অসুবিধা দূর করার স্বার্থে সময়ে সময়ে আদেশ দিয়ে বিধান জারি করতে পারবেন।’ পাঠক লক্ষ করবেন, জিয়া এক হাতে সামরিক আইন তুললেন, সংবিধানের প্রাণ দিলেন আর চুপিসারে যা তিনি লিখে নিলেন, তার সরল মানে দাঁড়াল: পঞ্চম সংশোধনী পাস হলেও কুছ পরোয়ানা নেই। চেনা সাফারিতে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির লেবাস নিলে কি হবে, উর্দিটাই আসল। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের চাবিটা নেয় কে? আগের মতোই তিনি জাতির ‘অসুবিধা’ দূর করবেন। সময়ে সময়ে সংবিধানের শ্রাদ্ধ ঘটিয়ে হলেও নতুন বিধান দেবেন।
বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর রায়ে মন্তব্য করেন যে ‘সংবিধান অগ্রাহ্য করে যখন খুশি তেমন আদেশ জারি করার ক্ষমতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কখনো ছিল না। বাহাত্তরেও নয়, এখনো নয়। কিন্তু বাংলাদেশের তখনকার রাষ্ট্রপতির (জিয়া) হাতে ওই ক্ষমতা ছিল।’ কিন্তু তিনি যা বলেননি, সেটাই কাল্পনিক কবির লড়াইয়ে পঞ্চম সংশোধনী বিরোধী আইনজ্ঞরা তাঁদের প্রতিপক্ষের বন্ধুদের শুনিয়ে দিতে পারেন। সমর্থকেরা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঈষত্ রঙ্গ করে বলতে পারেন, ‘‘আচ্ছা, তর্কে আপনাদেরই জিত হলো। মানলাম, আপনারাই বড় পণ্ডিত। কিন্তু এটা তো ঠিক যে, ওই ফরমানটা আপনাদের যুক্তিমতেই সংবিধানের অংশ। সত্য বটে শাসনপদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু সেই আজব ফরমান তো রাষ্ট্রপতিকে সংজ্ঞায়িত করেনি। এখন বর্তমান রাষ্ট্রপতি যদি বলেন, আমি সেই ‘পবিত্র ফরমান’ অনুযায়ী ‘রাষ্ট্রপতি’ হব। জাতির ‘অসুবিধা’ দূর করব। সংবিধান বেঁটে উপযুক্ত বিধান দেব। তাহলে প্রতিপক্ষের বন্ধুরা কী বলবেন?’’ সেই কাল্পনিক লড়াইয়ের পর্বে পঞ্চম সংশোধনী সমর্থকদের একই সঙ্গে আরেকটি মোক্ষম দাওয়াই দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির জারি করা উক্তরূপ ‘নতুন বিধানের’ বৈধতার প্রশ্নে আপনারা কী কহেন? আপনাদের এবং সংবিধানের কথামতোই এ বিষয়ে ‘কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।’
এ রকম একটা কবির লড়াই এই তীব্র শীতে বেশ জমবে এবং দারুণ উপভোগ্য হবে বলেই কল্পনা করা চলে!
কখনো মনে হয়, পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টে ফারুক-রশিদরা যে ট্যাংক বের করেছিলেন, সে ট্যাংক ফিরে গেছে, তাঁরাও পরপারে গেলেন, কিন্তু তাঁদের বন্দুকের নল আজও তাক করা। পঞ্চম সংশোধনীর রায় আপিলে টিকলে ওই ১৮ প্যারাগ্রাফ হয়তো বিলোপ হতে পারে। বিশিষ্ট সংবিধান-বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম গতকাল আপিল বিভাগে আলোচ্য প্যারাগ্রাফটির সংযোজনকে ‘সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রবর্তন থেকে সংবিধানের সঙ্গে এ যাবত্ যত প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, তা এক রায়ে কিংবা আদালতে নিঃশেষ হওয়ার নয়। রায়ে যদি ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের বিলোপ ঘটে, তাহলেও বন্দুকের নল তাক করা থাকবে। সেটা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ঘাতক ফারুক রহমানের সাবেক রানিংমেট জেনারেল এরশাদের বন্দুকের নল। ১৯ নম্বর প্যারাগ্রাফে বিএনপির নির্বাচিত সরকার উত্খাত-পরবর্তী আমলের (১৯৮২-১৯৮৬) সামরিক ফরমান ও আদেশগুলোকে অভিন্ন ভাষায় রক্ষাকবচ দেওয়া আছে। এই বন্দুকের নলও সরাতে হবে। এক এগারোতে পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের আত্মমর্যাদার স্বার্থে বর্তমান সংসদেরই সেটা করা উচিত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

বাংলা ভাষার ব্যাকরণ তৈরি হবে কবে -আমার ভাষা আমার একুশ by সৌরভ সিকদার

বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে হাজার বছরেরও আগে এটা যেমন সত্য, তেমনি অবিশ্বাস্য আরেকটি সত্য হচ্ছে, বাংলা ভাষার নিজস্ব কোনো ব্যাকরণ নেই। সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের ক্রাচে ভর দিয়েই আমরা এতটা পথ পার হয়ে এসেছি। অথচ আমাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে গিয়ে ব্যাকরণের সংজ্ঞা শিখেছে, ‘যে বিদ্যা পাঠ করিলে ভাষা শুদ্ধ করে লিখিতে, পড়িতে ও বলিতে পারা যায় তাকে ব্যাকরণ বলে।’ প্রকৃতপক্ষে, আমাদের শিক্ষার্থীরা এসব ব্যাকরণ পাঠ করে ভাষা শুদ্ধভাবে শেখে না, তারা অধিকাংশ আঞ্চলিক উচ্চারণে কথা বলে এবং বানান শুদ্ধ লিখতে পারে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষার প্রভাবে শিশুপাঠ্য ব্যাকরণগুলোও স্বাবলম্বী হতে পারেনি; এমনকি সেখানে ভাষার প্রমিত রূপ বিষয়ে ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক কোনো জ্ঞান লাভের সুযোগ নেই। ব্যাকরণবিদ জ্যোতিভূষণ চাকী লিখেছেন, ‘এত দিন গ্রামার বলতে শুধু লেখার ব্যাপারটাই বোঝাত, এখন নব্য-ব্যাকরণ বলতে মুখের ভাষার ব্যাকরণই বোঝায়।’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এখনো পর্যন্ত চলিত বাংলায় বা মুখের ভাষার উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যাকরণ রচিত হয়নি। প্রচলিত ব্যাকরণ বাংলা ভাষায় কোন কোন ধ্বনি আছে তা উল্লেখ করলেও ‘এ’ ধ্বনি কখন ‘এ্যা’ উচ্চারিত হবে তা শেখায় না, আমাদের প্রতিদিনের ভাষায় ক্রিয়াপদ বা বাক্যের যে রূপান্তর ঘটছে তার বিশ্লেষণ নেই।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ ও অভিধান রচনা শুরু হয় ইউরোপীয় ধর্মযাজক, বণিক ও আগন্তুকদের হাতে প্রথমে ইংরেজিতে, পরে বাংলায়। ১৭৪৩ সালে পর্তুগিজ ফাদার মনোএল দা আস্সুম্পসাঁও রোমান হরফে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনার সূচনা করলেও প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনা করেন ১৭৭৮ সালে হ্যালহেড। উনিশ শতকের শুরু থেকে ধরলে ২০০ বছরেরও অধিক কাল ধরে উইলিয়াম কেরি বা মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারের ‘ভাষাকথাক্রম’ (১৮১০)-এর পর কম করে হলেও কয়েক হাজার ব্যাকরণগ্রন্থ রচিত হয়েছে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে। কিন্তু সেগুলো বাংলা ভাষার গতি-প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য যতটা না ধারণ করেছে, তার চেয়ে বেশি সংস্কৃত কারক-বিভক্তি-সন্ধিতে বন্দী হয়েছে।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাংলা ভাষার ব্যাকরণ বিষয়ে বলেন, ‘পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষার আঞ্চলিক ও প্রমিত রূপ থাকে। শিক্ষক প্রমিত রূপ ব্যবহার করেন এবং শেখান। আমাদের বাংলায় প্রমিত রূপ আছে; কিন্তু দুর্ভাগ্য, ক্লাসে শিক্ষক আঞ্চলিক ভাষায় পড়ান, এমনকি বাংলা ব্যাকরণও। ফলে শিক্ষার্থীর ভাষাজ্ঞান প্রমিত হয় না। স্বাধীনতার আগে শহীদ মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীরা মোটামুটি ভালো একটি ব্যাকরণ তৈরি করেছিলেন। টেক্সট বুক বোর্ডের এই ব্যাকরণ পরে অন্যরা নষ্ট করেছে। সত্যি বলতে কি, বাংলা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি হয়নি, শিশুপাঠ্য তো নয়ই। আমাদের ধ্বনি, ধ্বনির উচ্চারণ, ধ্বনি ও লিপির সম্পর্ক, প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষার পার্থক্য, উচ্চারণ, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি শেখার উপযোগী ব্যবহারিক ব্যাকরণ রচনা খুবই জরুরি। বাংলা ব্যাকরণ হবে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানসম্মত। ভাষার প্রমিত রূপটি শিক্ষার্থীদের শেখার উপযোগী। অনেক পরে হলেও বাংলা একাডেমী কাজটি শুরু করেছে। আর এ পর্যন্ত রচিত ব্যাকরণের মধ্যে আমি সুনীতি কুমারের ‘ভাষা-প্রকাশ বাংলা ব্যাকরণ’কে সেরা মনে করি।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলা ব্যাকরণ একটি নিরস ও ভীতিপ্রদ বিষয়। সে কারণে তারা ব্যাকরণ পড়ে ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা শেখে না, শূন্য বিভক্তি প্রয়োগের দৃষ্টান্তের জন্য মুখস্থ করে ‘পাগুটাদীপতি’। টেক্সট বুক বোর্ড বিষয়টি নিয়ে ভেবেছে সে প্রমাণ এখনো আমরা পাইনি।
অনেক দেরিতে হলেও ২০০৯ সালে এসে বাংলা একাডেমী ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ তৈরিতে হাত দিয়েছে দুই বাংলার গবেষক-ভাষাবিদদের নিয়ে। এবার হয়তো আমরা সংস্কৃত ব্যাকরণের আঁচল ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব। শহীদ মুনীর চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষার অস্তিত্ব প্রকৃতিবাদ অভিধানের ভেতর নয়, বাঙালির মুখে।’ সেই মুখের ভাষার ব্যাকরণ এবং শিশু-কিশোরদের জন্য ব্যাকরণের আনন্দপাঠ এ মুহূর্তে বাংলা ভাষায় খুব জরুরি।
সেই ১৮৮৫ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ একখানিও প্রকাশিত হয় নাই।...বাংলা ব্যাকরণের অভাব আছে, ইহা পূরণ করিবার জন্য ভাষাতত্ত্বানুরাগী লোকের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।’ ১০০ বছরেরও অধিক সময় পার হলেও আমরা এখনো বাংলা ব্যাকরণ রচনা করতে পারিনি। আশা করি, বাংলা একাডেমী এই লজ্জা থেকে বাংলাভাষীদের এবার মুক্তি দেবে।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য আততায়ী -সহজিয়া কড়চা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

ব্রিটিশ দার্শনিক বারট্র্যান্ড রাসেল ছিলেন দুর্মুখ প্রকৃতির ও দুঃসাহসী। কাউকে প্রশংসা করার চেয়ে কঠোর সমালোচনা করায়ই ছিলেন অভ্যস্ত। তিনি তাঁর হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফিতে আড়াই হাজার বছরের পাশ্চাত্য দার্শনিকদের অনেকেরই শক্ত সমালোচনা করেছেন। কিন্তু হল্যান্ডের সতের শতকের ইহুদি দার্শনিক বারুচ স্পিনোজার তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। স্পিনোজা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তিনি শুরুতেই লিখেছেন, ‘স্পিনোজা ইজ দ্য নোবলেস্ট অ্যান্ড মোস্ট লাভএবল অব দ্য গ্রেট ফিলসফার্স’ অর্থাত্ মস্তবড় দার্শনিকদের মধ্যে মহত্তম ও সবচেয়ে ভালোবাসার যোগ্য।
ইহুদি মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হন স্পিনোজা। তাঁকে তাঁর যুক্তিবাদী দার্শনিক বক্তব্যের জন্য হত্যা করারও চেষ্টা করা হয়। মারতে না পেরে নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। আমস্টারডাম ও হেগেতে নির্জন জীবনযাপন করতেন। টাকাপয়সায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। চশমা মেরামত করে যে সামান্য আয় হতো, তাতে চলে যেত। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে যক্ষ্মারোগে ১৭৭৭ সালে তিনি মারা যান।
তত্ত্ববিদ্যা বা ম্যাটাফিজিকসই তাঁর মূল বিষয়, তবে স্পিনোজা একজন মস্তবড় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীও ছিলেন। তাঁর ট্র্যাকটাটাস থিওলজিকো-পলিটিকাস বাইবেলের সমালোচনা ও রাজনৈতিক তত্ত্ববিষয়ক বই। ট্র্যাকটাটাস পলিটিকাস-এ শুধু রাজনৈতিক তত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। উদার রাজনৈতিক নীতির তিনি ছিলেন আপসহীন প্রবক্তা। তবে স্পিনোজার তুলনাহীন কীর্তি তার Ethics বা নীতিদর্শন। তাঁর মৃত্যুর পর এটি প্রকাশিত হয়। ইহুদি যাজকরা মনে করতেন, তিনি নিরীশ্বরবাদী। মানুষ তার জৈবিক প্রবৃত্তি ও পরিবেশের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে কীভাবে সুন্দর জীবন যাপন করতে পারবে, সেটাই ছিল তাঁর প্রধান আলোচ্য বিষয়। স্পিনোজার অভিমত, আবেগ মানুষকে দাসে পরিণত করে এবং বুদ্ধি ও যুক্তি মানুষকে সেই দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে উন্নত ও আনন্দময় জীবনযাপনে সহায়তা করে। জৈবিক আবেগকে বশে আনাই মানুষের কর্তব্য। অর্থহীন আবেগ একজন মানুষ ও একটি জনগোষ্ঠীকে শেষ করে দিতে পারে—তাদের অগ্রগতির পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে।
নিজের বাড়ির বাইরে স্পিনোজা কোথাও বিশেষ যাননি। সুতরাং বাংলায় এসে বাঙালিদের মধ্যে বসবাস করার কোনো অভিজ্ঞতা থাকার প্রশ্নই আসে না। বঙ্গের কোথাও এসে থাকলে তিনি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারতেন, অতিরিক্ত আবেগের ফলে একটি জনগোষ্ঠীর কী দশা হতে পারে। ’৭৫-এর পনেরোই আগস্টের হত্যাযজ্ঞের আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। কেউ তাদের পিটিয়ে মারেনি, আদালতের বিচারেই তাদের ফাঁসি হয়েছে। ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় আমাদের গণমাধ্যম ও একশ্রেণীর মানুষ যে আচরণ করেছে তা স্বাভাবিক নয়।
দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে: ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে ছিল উত্সবের আমেজ। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের চোখমুখ ছিল উচ্ছল। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা দপ্তরে আসামাত্রই কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে কোলাকুলি ও করমর্দন করেছেন। মন্ত্রীদের কেউ কেউ স্বেচ্ছায় কর্মকর্তাদের ডেকে এ ব্যাপারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। সবারই চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ। এ উপলক্ষে সচিবালয়ের কর্মচারীদের মধ্যে সরকারসমর্থক সাজার প্রতিযোগিতা ছিল লক্ষণীয়। সরকারসমর্থক কর্মচারীরা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আনন্দমিছিল করেছেন। জোহরের নামাজের পর অনেকে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন।’ [দৈনিক ডেসটিনি]
শুকরিয়া আদায় করেই যে কর্মচারী ও কর্মকর্তারা অফিসের কাজে মনোযোগ দিয়েছেন, তা নয়। আনন্দ প্রকাশ করতে ‘অনেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেছেন।’ একা একা আনন্দ প্রকাশ করায় অনেকেই তৃপ্তি পাননি, দেড়টা বাজার আগেই অনেকে চলে গেছেন বাড়ি। শুক্র ও শনিবার ছুটি থাকায় সপরিবারে শুকরিয়া আদায়ের জন্য অথবা আনন্দ প্রকাশের জন্য অনেকে দুপুরেই সচিবালয় থেকে সোজা চলে গেছেন বাস টার্মিনালে। রোববার দুপুরের আগে আনন্দ-ফুর্তি করে যে তাঁরা ঢাকা ফিরবেন সে সম্ভাবনা আদৌ নেই।
একশো বছর পর যদি কোনোদিন এই বাংলায় সত্যিকারের জ্ঞানবিভাসিত আলোকযুগের সূচনা হয়, তখন আর্কাইভসের শেলফ থেকে এখনকার পত্রপত্রিকার ফাইল নিয়ে গবেষণা হবে। ঘাঁটাঘাঁটি করা হবে ১৯৭৫-এর ১৬ আগস্ট থেকে পরবর্তী বছরগুলোর খবরের কাগজ। সেই অনাগত গবেষকরা নোট নিতে গিয়ে ভাববেন: একটি দেশের ১৪ কোটি মানুষ গয়রহ কতটা কপট, শঠ, অবিশ্বাসী, সুবিধাবাদী ও প্রবঞ্চক ছিল। হিতার্থীর সঙ্গেও প্রবঞ্চনা করতে তাদের দ্বিধা হতো না। সামান্য জাগতিক সুবিধার আশায় দীর্ঘদিনের বন্ধুর পাশ থেকে আলগোছে সরে যেতে তাদের বিবেকে বাধত না।
১৯৭২-৭৫-এর সরকারের কাছ থেকে অঢেল সুবিধা নিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা সরকারি-আধাসরকারি কর্মকর্তা ও বিদ্বানদের মধ্যে অগণিত। তাঁদের অনেকে আজ পরলোকে। আমরা তাঁদের চিনতাম। যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের অনেকের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে তাঁদের আমরা দেখেছি টিভি স্টুডিওতে, সেমিনার কক্ষে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, বাংলা একাডেমী চত্বরে, রমনা বটমূলে এবং মাঝেমধ্যেই বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো সমিতি-সংগঠন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি করে সংস্থাপন সচিব বা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে কোনো স্মারকলিপি দিয়েছেন তা শুনিনি। ফাঁসিতে আনন্দ প্রকাশের পরিমাণ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যেই বেশি। ১৯৭৫-এর আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহেও পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদেরই তত্পরতা ছিল বেশি।
কোনো কোনো কলাম লেখক মুজিব হত্যার সঙ্গে গান্ধী হত্যার তুলনা করেছেন। পৃথিবীর কোনো দুটি ঘটনাই এক রকম হয় না। কিছু মিল থাকে, অমিলের পরিমাণই বেশি। গান্ধী হত্যার বিচার এবং মুজিব হত্যার বিচারও এক রকমভাবে হয়নি। দুটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মিল শুধু ওইটুকু যে, দুটিই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং মুজিব-গান্ধী উভয়েই তাঁদের দেশের স্বাধীনতার শীর্ষ নেতা। গান্ধী হত্যার বিচার শেষ হয় কয়েক মাসের মধ্যে। তাঁর আততায়ী নাথুরাম গডসের ফাঁসি হয় ১৯৪৯ সালে। মুজিবের আততায়ীদের ফাঁসি হলো ৩৫ বছর পর। এই ৩৫ বছর তাঁরা দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশের সরকার ও অন্য দেশের সরকারের সীমাহীন আতিথিয়েতায় জীবনকে উপভোগ করেছেন।
গান্ধীর জীবন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমাকে তাঁর হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকারীদের সম্পর্কেও কিছু পড়াশোনা করতে হয়। নাথুরাম গডসের ওপর বহু বই বেরিয়েছে। বিশ্লেষণমূলক বইয়ের সংখ্যা যথেষ্ট। ভারতের বিদ্বানদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ আর আমাদের খবরের কাগজের লেখকদের কাজের মধ্যে ব্যবধান আকাশ-পাতাল। তাঁরা গান্ধীর ঘাতককে কখনোই তুই-তোকারি করেননি। তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কেন তাঁরা গান্ধীর মতো একজন নিষ্পাপ মানুষকে গুলি করে হত্যা করলেন।
ভারতের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদ আশীষ নন্দীর লেখা আমি বিশেষভাবে বিবেচনা করে দেখেছি। আমি জানি না, পনেরোই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মামলার বিচারক, আইনজীবী এবং ওই বিষয়ের লেখকেরা তপন ঘোষের দ্য গান্ধী মার্ডার ট্রায়াল, রবার্ট পেইনের লাইফ অ্যান্ড ডেথ অব মহাত্মা গান্ধী, এরিখ এরিখসনের গান্ধী’স ট্রুথ, জি ডি খোসনার দ্য মার্ডার অব মহাত্মা, আশীষ নন্দীর এট দ্য এডজ অব সাইকোলজি এবং নন্দীর প্রবন্ধ ‘ইনভাইটেশন টু আ বিহেডিং: আ সাইকোলজিস্ট’স গাইড টু অ্যাসোসিয়েশন ইন দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড’ প্রভৃতি মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছেন কি না। তবে অনেকেই যে করেননি তা তাঁদের বয়ান থেকে বোঝা যায়।
পনেরোই আগস্টের রক্তপাতের পরপর Quest সাময়িকীতে আশীষ নন্দী তাঁর প্রবন্ধে যা লিখেছিলেন তা তাঁর নিজের বাংলা তর্জমায় এ রকম:
‘সব রাজনৈতিক হত্যাই একটা যৌথ ঘোষণাপত্রের মতো, ঘাতক ও তার শিকার যুক্তভাবে এই বিবৃতি রচনা করে। কোনো সময় এই যৌথ কর্মসূচির পরিণতি প্রকাশে সময় লাগে, কোনো সময় তা তাত্ক্ষণিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডই একজন ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। এমনকি হত্যাকারী মানসিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় একা সব কাজ করলেও বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তির প্রতিনিধি হয়ে সেই কাজ করে। এই শক্তি তাঁকে তাঁর শিকার ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত করে।’
রবার্ট পেইনও মনে করেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডে গান্ধী ও তাঁর অনুগত অথচ গুপ্ত-ঘাতকেরা ছাড়াও গান্ধীর রক্ষাকর্তা ভারতীয় পুলিশ ও তার গুপ্তচর শাখা, আমলাতন্ত্র এবং গান্ধীর অতি বিশ্বস্ত নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।’
গান্ধীর গবেষকেরা গান্ধীর এবং তাঁর আততায়ীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। গডসে বলেছেন, তিনি যা করেছেন এবং ‘তাঁর যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার জন্যই করা হয়েছে।’ মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ নাথুরাম গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের (১৯২৯-৩০) অব্যবহিত পরে হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সক্রিয় সদস্য হন। অর্থাত্ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে যোগ দেন। পনেরোই আগস্টের খলনায়কেরাও সবাই কমবেশি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং দেশকে পাকিস্তানি হানাদারদের থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন।
কোনো সাধারণ খুনি গান্ধীকে হত্যা করতে পারত না, তার হাত কাঁপত, বুক কাঁপত। তাঁর খুনিও রাজনৈতিক ব্যক্তি। গোপাল গডসে তার গান্ধী হত্যা আনি মে নামক মারাঠি ভাষায় লেখা গ্রন্থে নাথুরাম গডসের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এভাবে:
‘জাতির পিতা হিসেবে দায়িত্ব পালনে গান্ধী ব্যর্থ। কার্যত তিনি পাকিস্তানের পিতায় পরিগণিত হয়েছেন। শুধু এ কারণেই ভারতমাতার সন্তান হিসেবে তথাকথিত জাতির পিতার জীবন শেষ করা আমার দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। তিনি আমাদের মাতৃভূমি খণ্ডনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।’
অর্থাত্ বিষয়টি রাজনৈতিক—ব্যক্তিগত শত্রুতার নয়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে দৃশ্যমান আততায়ীর চেয়ে অদৃশ্য আততায়ীর সংখ্যা বহু গুণ বেশি এবং তাঁরাই প্রবল। গান্ধীকে যাঁরা হত্যা করেন এবং যাঁরা সেই হত্যার পরিকল্পনাকারী, যেমন—নারায়ণ আপ্তে বা বিষ্ণু কারকার গান্ধীর ব্যক্তিগত শত্রু ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুকে যাঁরা হত্যা করেছেন তাঁদের দু-একজন ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিবের ওপর বিরূপ থাকতে পারেন, কিন্তু ওই বিরূপতাটুকুর জন্য কেউ কারও প্রাণনাশ করে না। ১৫ আগস্ট ভোররাতে যারা ৩২ নম্বরে গিয়েছিল তারা ভাড়াটে ‘বিদ্রোহী’, যাদের হাতে অস্ত্র ছিল তারা মজুর, ষড়যন্ত্রকারীরা কেউ আসেনি। তারা ছিল দূরে—বহু দূরে—নিরাপদ দূরত্বে। আমি একশো ভাগ নিশ্চিত যে, সেদিনের ষড়যন্ত্র বা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে তারাই এবং মোশতাক, ঠাকুর ও তিন বাহিনীর প্রধান পনেরোই আগস্ট সকাল ১০টায় শাহবাগে বেতারকেন্দ্রে না গিয়ে বঙ্গবন্ধু ভবনে অথবা গণভবনে যেতেন। তাঁরা বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষা পাওয়ায় শুকরিয়া আদায় করে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করতেন, যেমন এখন করছেন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে সবার আগে গণভবনে যেতেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
পঁয়ত্রিশ বছর ধরে অব্যাহতভাবে বলা হচ্ছে যে, পনেরই আগস্ট রক্তপাত ঘটিয়েছে সেনাবাহিনীর নিচের পর্যায়ের কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত অথবা চাকরিচ্যুত অফিসার। এর চেয়ে সত্যের অপলাপ হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত একটিও নেই যে, নিচের স্তরের কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত বা বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তার নির্দেশ নতমস্তকে গোটা সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, সচিবরা ৮১ দিন ধরে পালন করছেন। ঘাতকদের কাজে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের সায় না থাকলে পনের মিনিটের মধ্যে বিদ্রোহীদের ইহজগত্ ত্যাগ করতে হতো। তাদের লাশ পনেরোই আগস্ট সকালে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে পড়ে থাকত, সেদিন জেনারেলরা সুবোধ বালকের মতো চাকরিচ্যুত সেই মেজরদের কথায় ওঠাবসা করেছেন। বঙ্গভবনে একত্রে খানাপিনা করেছেন। ভাড়াটে ঘাতকদের লম্ফঝম্ফ করতে দেখা গেলেও, তাদের দেশি ও বিদেশি প্রভুরা মুখোশ পরে ছিলেন অথবা ছিলেন পর্দার পেছনে।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও বিরক্তিকর সত্য হচ্ছে, পনেরোই আগস্টের রক্তপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রধানত আওয়ামী লীগ এবং আংশিক সিপিবি ও ন্যাপ (মোজাফফর)। তা ছাড়া প্রায় সব দক্ষিণপন্থী, ইসলামপন্থী ও চীনপন্থী উগ্র বাম দলগুলোর নেতারা উপকৃত হন। তাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষমতার স্বাদ পান। পনেরই আগস্ট পটপরিবর্তন না ঘটলে তাঁরা কোনোদিন ক্ষমতার রাজনীতির ধারে-কাছে আসতে পারতেন না। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের অভ্যুত্থানে উত্থান ঘটল পাকিস্তানপন্থীদের।
আজ যত আনন্দ, সুখ, মিষ্টি বিতরণ, জুতা নিক্ষেপ বা খুনিদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ হোক না কেন, নির্মম সত্য হলো—শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না গেলে কোনো দিনই মুজিব হত্যার বিচার হতো না। জিয়া ও এরশাদ করেননি, কোনোকালেই করতেন না। কারণ, পনেরোই আগস্টের কুশীলবদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল আত্মার পরম সখার। তাঁরা ক্ষমতায় যেতে পারেন ফাঁসিওয়ালাদের কল্যাণে। বুধবার রাতে যাঁরা ফাঁসিতে ঝুললেন তাঁদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক ছিল অনেকটা দেবর-ভাবির। কোনো ভাবি চাইতে পারেন না যে, তাঁর দেবররা খুনের আসামি হয়ে বিচারের মুখোমুখি হোক এবং তাঁরা ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে উঠুক।
ফাঁসি হওয়া মানুষগুলোর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকার কথা তখনকার তিন বাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসারদের। পনেরোই আগস্ট খুলে যায় তাঁদের জীবনের নতুন দরজা। তাঁরা পেশাজীবী থেকে পদোন্নতি পান দেশের শাসক বা মালিকে। আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ন বা হিটলারের জেনারেলদের যে প্রাপ্তিযোগ ঘটেনি, আমাদের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের তা ঘটেছে। রাজধানীর ডিওএইচএস বা নিউ ডিওএইচএস মহল্লায় গেলে তা বোঝা যায়। সিভিল অফিসারদের প্রসন্ন ভাগ্যের কথা না বলাই ভালো।
সাধারণ খুনের মামলা আর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড একেবারেই এক জিনিস নয়। একজন সাধারণ মানুষ যখন খুন হয়, তখন মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে শেষ হয়ে যায়। একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা বা রাষ্ট্রনায়ক যখন নিহত হন তখন তিনি শারীরিকভাবে শেষ হলেও তাঁর কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকেন। কিন্তু নিহত হওয়ার পর যখন তাঁর কর্মের অবমূল্যায়ন করা হয় বা তাঁর অবদান অস্বীকার করা হয়, তখন তাঁকে দ্বিতীয়বার হত্যা করা হয়। এভাবে দেখলে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর রাজনৈতিক শত্রুরা বারবার হত্যা করেছে। ১৯৭৭ সালে আমি কোনো রকমে সংবাদ-এ লিখেছিলাম, ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা সম্ভব, কিন্তু তাঁকে মেরে ফেলা যায় না, কারণ তাঁর প্রাণ মৃত্যুহীন।’
দুঃখের বিষয়, তাঁর অতিভক্তরা অথবা সুবিধাবাদী ভক্তরাও তাঁকে হত্যা করেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আত্মীয়স্বজনের ওপর যদি এখন, এতদিন পরে, হামলা হয়; তাঁদের বাড়িঘরে আগুন লাগানো হয়, তা হবে শেখ হাসিনার সরকারের জন্য খুবই ক্ষতিকর। একটি পরিণতবুদ্ধি জাতির কর্তব্য তার প্রধান নেতাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে মানুষের অন্তরে বাঁচিয়ে রাখা। আতিশয্যে আদৌ কাউকে মহিমান্বিত করা যায় না। প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা থেকে তিনি যেন বঞ্চিত না হন সেদিকে তাঁর অনুসারীদের দৃষ্টি রাখা উচিত। বঙ্গবন্ধুর দৃশ্যমান আততায়ীদের আমরা চিনি। কিন্তু তাঁর অগণিত অদৃশ্য আততায়ী সরকারের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা যেন তাঁকে পুনর্বার হত্যা করার সুযোগ না পায়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

প্রবাসী নারীকর্মীদের দুর্দশা -শ্রমিক ও পাচারের শিকার নারীদের জন্য সত্বর কিছু করুন

প্রবাসে কাজের হাতছানিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও দলে দলে বিদেশে গিয়েছেন। তাঁদের প্রেরিত অর্থ জাতীয় অর্থনীতিতে উজ্জ্বল অবদান রাখছে। পুরুষদের মতো নারীশ্রমিকেরাও কর্মস্থলে অন্যায় ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেকেই প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন; কেউ কেউ ফিরেছেন লাশ হয়ে। প্রবাসের সহায়-স্বজনহীন বৈরী পরিবেশে যাঁরা রক্ত পানি করে অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্জীবন করছেন, তাঁদের অধিকার ও নিরাপত্তার দেখভাল করা সরকারের জরুরি করণীয় হওয়া উচিত।
গত সোমবারের প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোট এক লাখ ২৪ হাজার ২৭৩ জন নারীশ্রমিক বিদেশে গেছেন; কেবল ২০০৯ সালেই গেছেন ২২ হাজার ২২৪ জন। সবচেয়ে বেশি নারীশ্রমিক গেছেন দুবাই, সৌদি আরব ও লেবাননে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে তাঁদের নিপীড়নের যে চিত্র ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা এক কথায় হতাশাজনক। লেবাননে তাঁদের অবস্থা শোচনীয়। তাঁদের সইতে হচ্ছে বেতন-বৈষম্য, প্রহার, এমনকি যৌন নিপীড়ন। সইতে না পারা এমন কয়েকজন লাশ হয়েও ফিরেছেন।
প্রথমত, তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক; দ্বিতীয়ত, তাঁরা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা আর নিয়োগদাতাদের বৈরী আচরণ থেকে তাঁদের বাঁচানোর দায়িত্ব একমাত্র সরকারের। লেবানন ছাড়া শ্রমিক গ্রহণকারী মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশেই বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে। এসব ঘটনায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তো বটেই, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রদূতদেরও অনেক কিছু করার ছিল। অথচ সরকারি তত্পরতা সমস্যার মরুতে এক আঁজলা জল ছাড়া আর কিছু নয়।
অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার পাশাপাশি আরও ভয়াবহ শিকার হন পাচার হয়ে যাওয়া নারীরা। সম্মানজনক কর্মসংস্থানের কথা বলে ফাঁদে ফেলে অনেককেই যৌনদাসত্বে বাধ্য করা হয়। গত ৩০ বছরে পাচার হওয়া এমন নারীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। ইউনিসেফ বলছে, প্রতি মাসে ৪০০ জন নারী পাচারের শিকার হন এবং বছরে এক লাখ ২০ হাজার শিশুকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আরেকটি সমীক্ষা বলছে, গত ১০ বছরে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় তিন লাখ শিশু ও নারী ভারতে বিক্রি হয়ে পাচার হয়েছেন। পাকিস্তানেও বিক্রি হয়ে গেছে প্রায় দুই লাখ নারী ও শিশু।
বঞ্চিত অভিবাসী শ্রমিকদের পাশাপাশি পাচার হয়ে যাওয়া নারীদের দুর্বিষহ জীবন থেকে উদ্ধারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের টনক নড়া উচিত। বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দূতাবাস, আইনশৃঙ্খলা সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও দরকার। সরকারের লোকবল যেখানে কম, সেখানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোকেও জড়িত করা যায়। পরিস্থিতি যেহেতু গুরুতর, সেহেতু দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।

মন্ত্রী বড় না দল বড় -তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভায় মন্ত্রী ও সাংসদদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির যে অভিযোগ উঠেছে, তা নতুন নয়। তবে এ কারণে প্রশ্নটি তাত্পর্যহীন বলেও উপেক্ষা করা যাবে না। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাই সারা বছর জনগণের সঙ্গে থেকে কাজ করেন। এভাবে এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে তাদের পাশে থেকে এক একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সেতুবন্ধ গড়ে ওঠে। নির্বাচনের সময় দলের কার্যক্রম ও তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে যোগসূত্র জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মন্ত্রী ও সাংসদেরা এলাকার কর্মীদের কাছ থেকে দূরে সরে যান। এর ফলে একধরনের জনবিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। কোনো রাজনৈতিক সরকারের জন্য এটা বিপর্যয় সৃষ্টির মূল কারণ হয়ে উঠতে পারে।
মানুষ ভোট দিয়ে কোনো দলকে সরকারে পাঠায় মূলত তাদের কর্মসূচি, নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি ও এলাকায় সেই দলের কাজের সামগ্রিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে। সুতরাং সরকারের প্রাণ হলো সেই দল, যা জনগণকে ভোটদানে অনুপ্রাণিত করেছে। সে জন্যই বলা হয়, দল সরকার পরিচালনা করবে, সরকার দলকে নয়। আমাদের দেশে সাধারণত এর ঠিক উল্টো ব্যাপারটিই ঘটতে দেখা যায়। সাংসদ বা মন্ত্রীরা মনে করেন তাঁরাই সর্বেসর্বা, দল তুচ্ছ। এভাবে সরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়। সরকার ও দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
মন্ত্রী বা সাংসদ যখন নিজেকে দলের ঊর্ধ্বে স্থাপন করেন, তখন নেতা-কর্মীদের মধ্যে নানা রকম অনৈতিক প্রবণতা উত্সাহিত হয়। দেখা যায়, প্রতিদিন মিন্টো রোড-হেয়ার রোডের মন্ত্রিপাড়ায় এবং সাংসদদের আবাসিক ভবনগুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এলাকার নানা স্তরের নেতা-কর্মীদের ভিড়। মন্ত্রীদের সঙ্গে একবার দেখা করতে পারলে অনেক সময় বিরাট কোনো সুবিধা আদায় করা সম্ভব হয় বলেই এই সংস্কৃতি চালু হয়েছে। মন্ত্রী-সাংসদেরাও এ প্রবণতাকে উত্সাহিত করেন। কারণ, দল তাঁদের কাছে প্রাধান্য পায় না। একদল চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে মন্ত্রীরা কার্যত একটি ছোট্ট জগতে বন্দী হয়ে পড়েন। এভাবে অনৈতিক লেনদেনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বর্ধিত সভায় একটি উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের মন্তব্য ছিল অসাধারণ। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, ‘দল ও সরকারকে আলাদা করতে হবে।’ এ মন্তব্যের আসল তাত্পর্য হলো, মন্ত্রীর কথায় দল চলবে না, বরং দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মন্ত্রীকে কাজ করতে হবে। এই নীতি কার্যকর করা না হলে সরকারের ওপর দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা যাবে না।
সবচেয়ে ভালো হয়, যদি দলের সাধারণ সম্পাদক মন্ত্রিত্বে না থাকেন। ১৯৫৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দল গোছানোর কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকেই দাবি ওঠে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যেন প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে দলের সভাপতি হন। তখন সেটা কার্যকর না হলেও বাকশাল গঠনের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের সভাপতির দায়িত্ব দেন এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে।
সরকার ও দলকে আলাদা রাখার অর্থ এই নয় যে দুটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে তারা কাজ করবে। বরং দল ও সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের জন্যই এটা দরকার।

কুকুরকে মাসিক বেতনে নৈশপ্রহরী নিয়োগ

আহত একটি পথকুকুরকে মাসিক বেতনে নৈশপ্রহরী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে নেপাল রেডক্রস সোসাইটি। প্রতি মাসে কুকুরটির বেতন ধরা হয়েছে এক হাজার রুপি। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটিতে কাজ করলে তাকে ওভারটাইমও দেওয়া হবে। এএফপি।
নেপাল রেডক্রসের সভাপতি মান বাহাদুর বুদ্ধকি গতকাল সোমবার বলেন, কুকুরটিকে অফিস প্রাঙ্গণে রাখা হয়েছে। যেকোনো অপরিচিত লোক দেখলেই এটি ঘেউ ঘেউ করে সবাইকে সচেতন করে। এটি আসলে দারুণ কাজ করছে।

ভেরোনিকার মুখোমুখি হলেন বারলুসকোনি

দীর্ঘ নয় মাস পর ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি গত রোববার তাঁর স্ত্রী ভেরোনিকা ল্যারিওর মুখোমুখি হয়েছিলেন। এদিন তিনি ভেরোনিকার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেন। এ সময় দুই পক্ষের আইনজীবীরা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে এ বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
ভেরোনিকা তাঁর স্বামী বারলুসকোনির বিরুদ্ধে বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ এনে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করেন। তারা গত ৯ মাস ধরে আলাদা বসবাস করছেন।
৭৩ বছর বয়সী বারলুসকোনির নারী কেলেঙ্কারি নিয়ে বিভিন্ন সময় বহু সংবাদ বেরিয়েছে। সর্বশেষ তিনি তাঁর এক তরুণী মডেল নাওমি লেতিসিয়াকে জন্মদিনে মহা মূল্যবান উপহার দেন। এ কারণে ভেরোনিকা ল্যারিও (৫৩) বারলুসকোনির বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তোলেন।
মিলান শহরের পুলিশপ্রধানের কার্যালয়ে বারলুসকোনি ও ল্যারিও দেখা করে বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে কথা বলেন। সেখানে দুই পক্ষের আইনজীবীরা বিবাহ বিচ্ছেদ ও ল্যারিওর তোলা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। ল্যারিওর এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে লন্ডনের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর খবরে বলা হয়, বিচারকের সামনে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে ওই বিয়ে টিকবে না। বিবাহ বিচ্ছেদ এখন অবশ্যম্ভাবী।

নৌ-দুর্ঘটনা

ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে গভীর সমুদ্রে গত বৃহস্পতিবার একটি স্পিডবোট ডুবে যায়। এতে ২৫ চীনা নাগরিকসহ ৩৩ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল সোমবার মালুকু প্রদেশের পুলিশের মুখপাত্র জন হুওয়েই জানান, বৃহস্পতিবার ১২ মিটার দীর্ঘ ওই স্পিডবোটটি আরু থেকে তুয়াল দ্বীপে যাওয়ার সময় খারাপ আবহাওয়ার কারণে ডুবে যায়। এ ঘটনায় চীনা এক যাত্রীকে জীবিত এবং ইন্দোনেশীয় এক নাগরিকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদের উদ্ধার চেষ্টা চলছে।

ইরাকে আত্মঘাতী হামলায় নিহত ৪১

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে গতকাল সোমবার এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ৪১ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১০৬ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। কারবালা অভিমুখী একদল শিয়া তীর্থযাত্রীর ওপর এক আত্মঘাতী নারী হামলাকারী হামলা চালালে ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ইরাকি কর্মকর্তারা এ কথা জানান।
শিয়া মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উত্সবে যোগ দেওয়ার জন্য পবিত্র শহর কারবালা যাওয়ার পথে তীর্থযাত্রীরা একটি বিশ্রামকেন্দ্রে থামলে তাদের ওপর ওই হামলা চালানো হয়।
বাগদাদ অপারেশনাল কমান্ডের মুখপাত্র মেজর জেনারেল কাশিম আতা বলেন, বেলা পৌনে ১২টার দিকে শরীরে বিস্ফোরক বেল্ট বাঁধা এক নারী কারবালা অভিমুখী একদল শিয়া তীর্থযাত্রীর ঠিক মাঝখানে গিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, আহত ব্যক্তিদের বাগদাদের পাঁচটি হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পরিবেশিত খবরে বলা হয়, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন নারী ও ছয়টি শিশু রয়েছে।
আরবাইন ধর্মীয় উত্সবে যোগ দেওয়ার জন্য দিয়ালা প্রদেশ থেকে হেঁটে কারবালা যাচ্ছিল হতাহত ব্যক্তিরা। কারবালা অভিমুখী তীর্থযাত্রীদের জন্য স্থাপন করা একটি বিশ্রাম ও খাবার কেন্দ্রে থামার পর তাদের ওপর ওই হামলা চালানো হয়।
আশুরা উদ্যাপনের ৪০ দিন পর আরবাইন পালন করা হয়ে থাকে। পবিত্র ওই অনুষ্ঠানের নিরাপত্তায় কারবালায় ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৩০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কারবালাকে অন্যতম একটি পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন শিয়া মুসলিমরা।

শাহরুখের বাড়ির সামনে শিবসেনার বিক্ষোভ

আইপিএলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের খেলানোর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক বলিউডের তারকা শাহরুখ খানের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ করেছে শিবসেনার কর্মীরা।
হামলার আশঙ্কায় মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকায় শাহরুখের বাড়ি ‘মান্নাত’-এর চারপাশে আগে থেকেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। তার পরও পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে বিক্ষোভ করে শিবসেনার কর্মী-সমর্থকেরা। তারা শাহরুখের উদ্দেশে ‘ইসলামাবাদের একটি প্রতীকী টিকিট’ ধরিয়ে দেয় এবং শাহরুখের পরবর্তী ছবি মাই নেম ইজ খান-এর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে। এ সময় পুলিশ কমপক্ষে ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে।
শিবসেনার নেতা অনিল পারাব জানিয়েছেন, শাহরুখ ক্ষমা না চাইলে মাই নেম ইজ খান ছবির প্রদর্শনীও বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
দলের সাংসদ মনোহর যোশী জানিয়েছেন, শাহরুখ খান অনেক বছর ধরে মুম্বাইতে বসবাস করলেও তিনি মারাঠি ভাষায় কথা বলেন না।
আইপিএলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের খেলাতে শাহরুখ আগ্রহ দেখানোয় তাঁর সমালোচনায় নেমে পড়ে শিবসেনা। শিবসেনার মুখপাত্র সঞ্জয় রাউত বলেছিলেন, ‘শাহরুখের যদি পাকিস্তানিদের সঙ্গে এতই খেলার শখ থাকে, তাহলে উনি করাচি কিংবা ইসলামাবাদে চলে যাচ্ছেন না কেন?’ এএফপি।

তিন মাস ধরে প্রতিবাদ, অতঃপর...

চীনা নাগরিক ফেং ঝেংঘু। মানবাধিকার কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে বেশ পরিচিত। এ কারণে চীনে তিন বছর জেলও খাটতে হয়েছে তাঁকে। বোনের সঙ্গে দেখা করতে জাপানে গিয়েছিলেন তিনি। এখন আর তাঁকে দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না চীন সরকার।
ফেং গত আট মাসে আটবার দেশে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। সর্বশেষ গত নভেম্বরে ফেং সাংহাই পুডং বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দর থেকেই তাঁকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন চীনা কর্মকর্তারা। এরপর জাপানে ফিরে যান। ঠাঁই নেন নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। চীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তিনি ওই বিমানবন্দরেই আছেন গত তিন মাস ধরে। সেখানে বসেই তিনি ইন্টারনেটে নিজের ব্লগ ও টুইটারে বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তাঁর বিষয়টা বেশ প্রচারও পেয়েছে। কিন্তু জাপানে চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা সম্প্রতি বিমানবন্দরে তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি প্রতিবাদী অবস্থান ছেড়ে জাপানে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওই কর্মকর্তারা তাঁকে চীনে প্রবেশ করতে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ফেংয়ের কাছে চীনা বৈধ পাসপোর্ট এবং জাপানে ঢোকার ভিসা আছে। তারপরও তিনি এতদিন বিমানবন্দর ছেড়ে জাপানে ঢোকেননি। খাওয়া, ঘুম সবই চলেছে নারিতা বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনালের ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’। সঙ্গে আছে শুধু একটি মোবাইল ও একটি ল্যাপটপ। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ওই দুটি যন্ত্র দিয়েই। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ টার্মিনালে তাঁকে দেখতে দেখতে জাপানে ঢুকেছে, নয়তো দেশের বাইরে চলে গেছে। তিনি রয়ে গেছেন বিমানবন্দরেই। বিষয়টি অনেকটা হলিউডের চলচ্চিত্র দ্য টার্মিনালের মতো। যদিও তিনি মনে করেন, তাঁর অবস্থা চলচ্চিত্রের ওই চরিত্রের চেয়েও খারাপ।
নারিতা বিমানবন্দর থেকে ফেং ফোনে বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা কয়েকবার আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। মনে হচ্ছে তাঁরা আমার সমস্যা বুঝতে পেরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখন জাপানে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে আগামী চীনা নববর্ষে আমি আবার সাংহাইয়ে ফিরে যাব। আশা করি, পরের বার আমি দেশে ফিরতে পারব। চীনা নাগরিক হিসেবে আমার অধিকার আছে দেশে ফেরার।’

১২ সেনা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন রাজাপক্ষে

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে গতকাল সোমবার সেনাবাহিনীর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন। ওই কর্মকর্তারা ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ ছিলেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে অভিযোগ করেছেন, পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সাবেক সেনাপ্রধান শরত্ ফনসেকা তাঁকে সপরিবারে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সেনাবাহিনীর এক সূত্র জানিয়েছে, সেনাবাহিনীতে ফনসেকার সমর্থকেরা অভ্যুত্থান করতে পারে, এই আশঙ্কায় ঊর্ধ্বতন ১২ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি বিবেচিত হওয়া তাঁদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে বরখাস্ত করা কর্মকর্তাদের সংখ্যা জানানো হয়নি।
গত ২৬ জানুয়ারির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরপরই সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের রদবদল করেছেন রাজাপক্ষে। আনেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। আবার সরকারের প্রতি অনুগত অনেককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গত বছরের চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় ফনসেকা ছিলেন সেনাপ্রধান। তখন ফনসেকা ও রাজাপক্ষের মধ্যে সম্পর্ক ছিল খুবই ভালো। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দুজনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় দুজনে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে যান।

আহতদের নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লাইট আবার চালু

ভূমিকম্পে গুরুতর আহতদের চিকিত্সার জন্য হাইতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ফ্লাইট আবার চালু করা হয়েছে। এদিকে শিশু পাচারের অভিযোগে হাইতিতে আটক ১০ মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে গত রোববার দেখা করেছেন পোর্ট অ প্রিন্সে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা।
গত বুধবার থেকে মার্কিন সেনারা হাইতি থেকে ফ্লোরিডাগামী ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, সরবরাহজনিত সমস্যার কারণে ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে গত রোববার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যেই ফ্লাইট চালু হবে। যেসব আহত ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হবে, তাদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাইতিতে নিযুক্ত মার্কিন চিকিত্সকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, শিগগিরই চিকিত্সাসেবা না পেলে হাইতিতে বহু লোক মারা যাবে।
মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হাইতির অভিবাসন আইন ভঙ্গের অভিযোগে আটক মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে কূটনীতিকেরা দেখা করেছেন এবং এ বিষয়ে হাইতি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও রাখা হচ্ছে।
হাইতির সমাজকল্যাণবিষয়ক মন্ত্রী ইভেস ক্রিস্টালিন গত রোববার জানান, ৩১টি শিশুকে নিয়ে ডোমিনিকান রিপাবলিকে ঢোকার সময় শুক্রবার রাতে মার্কিন পাসপোর্টধারী পাঁচ পুরুষ ও পাঁচ নারী এবং হাইতির দুই নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। ওই শিশুদের দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাদের বয়স দুই মাস থেকে ১২ বছরের মধ্যে।
হাইতির জননিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আরামিক লুইস জানান, ওই ১০ মার্কিন নাগরিকের বিষয়ে সরকার দু-এক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেবে। দেশের আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাইতির প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ-ম্যাক্স বিল্লেরিভ বলেন, ‘মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা খুবই গুরুতর।

চীনের গণমাধ্যমে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ

তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করায় ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘ঔদ্ধত্য’ ও ‘দ্বিমুখী নীতি’র অভিযোগ তুলেছে চীনের সরকারি গণমাধ্যম। গতকাল সোমবার চীনা সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি খুবই বাস্তব।
তাইওয়ানের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র, ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারসহ ৬৪০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব ওয়াশিংটন অনুমোদন করার পর চীনের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত যোগাযোগ স্থগিত করার ঘোষণা দেয় বেইজিং। অস্ত্রচুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেয় চীনা কর্তৃপক্ষ। তাইওয়ানকে নিজস্ব ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে বেইজিং।
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত চায়না ডেইলি ও গ্লোবাল টাইমস মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ তুলেছে যে তিনি আন্তরিক নন। গত নভেম্বরে চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছিলেন, চীনকে তিনি ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে চান না।
চায়না ডেইলিতে বলা হয়, চীনের প্রতিক্রিয়া কতটা প্রবল, সেটা কোনো ব্যাপার নয়, ব্যাপার হচ্ছে চীনের অবস্থান ন্যায়সংগত। পত্রিকাটিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওই পদক্ষেপ চীনের মূল স্বার্থসংশ্লিষ্ট বড় বড় বিষয় সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও ‘ভণ্ডামিপূর্ণ’ আচরণ উন্মোচন করে দিয়েছে।
পত্রিকায় বলা হয়, ওয়াশিংটনের ঔদ্ধত্য এ কঠিন বাস্তবতারও প্রতিফলন ঘটিয়েছে যে কীভাবে একটি জাতির স্বার্থ অন্য জাতির মাধ্যমে পদদলিত হতে পারে।
চীনের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক জবাবে বলা হয়, ওয়াশিংটনের ওই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে দুই দেশের সহযোগিতাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
বেইজিংয়ের ওই বক্তব্যের আর কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে মন্তব্যটি এমন সময় করা হলো, যখন ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরতে ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের সহায়তা কামনা করছে।
চীন বরাবরই ইরানের বিরুদ্ধে কড়া নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে। দেশটি জোর দিয়ে বলে আসছে, দীর্ঘদিনের ওই বিতর্কের অবসানে কূটনীতিই একমাত্র পন্থা।
কিন্তু তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির চুক্তি প্রসঙ্গে গ্লোবাল টাইমস বলেছে, কূটনৈতিক বিবাদ নিরসনে অন্যান্য কড়া ব্যবস্থার বদলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
পত্রিকাটিতে আরও বলা হয়, তাইওয়ান প্রশ্নে চীনা ঐক্যকে খাটো করে দেখা বোকামি হবে। তাইওয়ানের কাছে যেসব কোম্পানি অস্ত্র বিক্রি করবে, তাদের শাস্তি দেওয়ার পদক্ষেপ অধিকাংশ চীনা নাগরিকই সমর্থন করবে।

গাজায় জাতিসংঘ ভবনে হামলার জন্য দুই সেনা কর্মকর্তাকে ইসরায়েলের তিরস্কার

গাজায় গত বছরের যুদ্ধে সাদা ফসফরাসের গোলা ছোড়ার দায়ে ইসরায়েল তাদের ঊর্ধ্বতন দুজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা প্রকাশ করেছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং কর্নেল পদমর্যাদার ওই দুজন কর্মকর্তা গাজা সিটিতে জাতিসংঘের মূল গুদামের দিকে সাদা ফসফরাসের গোলা ছুড়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। ওই গোলা ছোড়ার পরপরই জাতিসংঘ গুদামটিতে আগুন ধরে গিয়েছিল। খবর বিবিসির।
গাজা ভূখণ্ডে যুদ্ধের সময় বেসামরিক লোকদের জীবন বিপন্ন করার জন্য ইসরায়েল সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছিল—এ মর্মে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা যে অভিযোগ করে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল আংশিকভাবে হলেও এই প্রথম তা স্বীকার করল।
অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তারা হলেন: গাজা ডিভিশনের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াল আইজেনবার্গ ও গিভাটি ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল আয়ান মালকা।
বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক সংবাদদাতা পল উড জেরুজালেম থেকে জানান, এ সংঘর্ষে এটা ছিল অন্যতম ন্যক্কারজনক ঘটনা। গত বছর ২২ দিন ধরে চলা ওই সংঘর্ষের সময় ছবি বেরিয়েছিল যে জাতিসংঘের ওই স্থাপনায় আগুনের গোলা এসে পড়ছে। জাতিসংঘ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছিল। তবে ইসরায়েল এক তদন্ত করার পর প্রথমে বলেছিল, তারা কোনো অন্যায় করেনি। ওই তদন্ত করেছিলেন এক ইসরায়েলি জেনারেল। এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে দেওয়া ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছে এ ধরনের হামলা করা যাবে না—এ নিয়ম লঙ্ঘন করে এ ধরনের কয়েকটি গোলা ছোড়া হয়েছিল। এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই ঘটনার দায়ে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী দুই ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাকে শাস্তি দিয়েছে।
ইসরায়েলের সরকারের মুখপাত্র মার্ক রেজেভ জানিয়েছেন, ওই দুই সেনা কর্মকর্তাকে শুধু তিরস্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি জানান, প্রায় ১৫০টি ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৬টি ঘটনা ফৌজদারিভাবে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ বিশেষ ক্ষেত্রে তা ফৌজদারি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়নি। ফৌজদারি অপরাধ করা হয়েছে—এমন যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া না যাওয়ায় ঠিক করা হয়, তাঁরা তিরস্কৃত হওয়ার যোগ্য।
ইসরায়েলের দৈনিক হারেজ-এর সামরিক সংবাদদাতা বিবিসিকে বলেন, এর মানে হলো, তাঁদের ব্যক্তিগত রেকর্ডে কোনো এক ধরনের মন্তব্য লেখা হয়েছে যে তাঁরা নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেননি। আর এ ধরনের গোলা হামলার আগে তাঁদের নিয়ম মেনে কাজ করা উচিত ছিল।
গাজা যুদ্ধের সময় এক ফিলিস্তিনির ক্রেডিট কার্ড চুরির জন্য এক ইসরায়েলি সেনাকে সাত মাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর ফলে জাতিসংঘের কিছু কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার এড়ানোর জন্য ইসরায়েল যথেষ্ট কিছু করছে কি না।
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এ সপ্তাহে গাজায় যুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর প্রতিবেদন সাধারণ পরিষদে পেশ করবেন।
জাতিসংঘের যুদ্ধাপরাধ-বিষয়ক বিচারক গোল্ডস্টন এক বিস্তারিত তদন্তের প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। গোল্ডস্টনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েল ও হামাস গোষ্ঠী উভয় যুদ্ধাপরাধ করেছে। ইসরায়েল এবং হামাস উভয়কে তাদের নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করতে বলা হয়। তা না করা হলে আন্তর্জাতিক আদালত ব্যবস্থা নিতে পারে। হামাস বলছে, তার বাহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে বেসামরিক লোকজনের ওপর রকেট হামলা করেনি।
এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, জাতিসংঘের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মানে এই নয় যে উডস্টনের প্রতিবেদনে যে অভিযোগ করা হয়েছে ও ঘটনার কথা বলা হয়েছে, তার বিস্তারিত জবাব দেওয়া হলো। বরং ইসরায়েলি বিচারব্যবস্থা কেন বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ, তা ব্যাখ্যা করা হলো।

যবের ওপর থেকে নির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি কিমের

যব বা ভুট্টাজাতীয় খাদ্যের ওপর থেকে দেশের নাগরিকদের নির্ভরতা কমিয়ে আনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং ইল। গতকাল সোমবার সরকারনিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র রোডং সিনমুন এ কথা জানিয়েছে। নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে তার সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়ার একটি দুর্লভ উদাহরণ এটি।
পত্রিকাটি জানায়, কিমের এ মুহূর্তের লক্ষ্য হচ্ছে, যবের ওপর থেকে জনগণের নির্ভরতা কমিয়ে এর পরিবর্তে চাল ও গম থেকে তৈরি খাদ্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলা।
কিমকে উদ্ধৃত করে দক্ষিণ কোরীয় বার্তা সংস্থা ইয়োনহাংপ বলেছে, ‘আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি এটা জেনে, আমাদের নাগরিকেরা এখনো যবের ওপর নির্ভরশীল। এখন আমি অবশ্যই নাগরিকদের জন্য সাদা ভাত, রুটি ও নুডলস সরবরাহ করব।’
গত মাসে কিম বলেছিলেন, খাবারের তালিকায় ‘সাদা ভাত ও মাংসের ঝোল’ উত্তর কোরীয়দের জন্য দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন। পাশাপাশি দেশের নাগরিকদের জীবনমানের উন্নয়নে তাঁর সরকারের ব্যর্থতার বিষয়টিও স্বীকার করে নেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে দুর্ভিক্ষের পর থেকে ব্যাপক খাদ্যসংকটে রয়েছে উত্তর কোরিয়া।

উত্তর কোরিয়া আরও ৫টি এলাকায় নৌ চলাচল নিষিদ্ধ করেছে

উত্তর কোরিয়া আরও পাঁচটি এলাকায় নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অতীতে ওই সব এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। গতকাল সোমবার এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। খবর এএফপির।
সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়ো হ্যাপ জানায়, গত রোববার থেকে আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত আটটা পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া আরও পাঁচটি এলাকায় নৌযান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এর আগে গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়া দুটি এলাকায় দুই মাসের জন্য নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ওই এলাকাগুলো দক্ষিণ কোরিয়ার পশ্চিম উপকূলে বিতর্কিত সীমানার কাছে অবস্থিত।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নৌ চলাচল নিষিদ্ধ করা নিয়ে প্রতিবেদনটি পরীক্ষা করছেন তাঁরা।
ইয়োনহ্যাপ জানায়, নিষিদ্ধ পাঁচটি এলাকার মধ্যে রয়েছে কিয়োদং দ্বীপের পশ্চিমাংশ, নর্থ পিয়োংগান প্রদেশের চুলসান, সুঞ্চন কাউন্টির উপকূল এবং সাউথ হ্যামকিয়ং প্রদেশের কুমিয়া কাউন্টির পূর্বাংশ।
উত্তর কোরিয়া অতীতে চুলসান, সুঞ্চন ও কুমিয়া এলাকায় স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে।
উত্তর কোরিয়া গত সপ্তাহে পশ্চিম উপকূলে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বিতর্কিত সমুদ্রসীমার কাছে কয়েক শ গোলা নিক্ষেপ করে। দক্ষিণ কোরিয়াও গোলা ছুড়ে পাল্টা জবাব দেয়। এতে কেউ হতাহত না হলেও এ ঘটনায় প্রতিবেশী দুটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইয়েমেনি শিশুদের দুঃখগাথা

বালিকাটির বয়স মাত্র আট বছর। ২২ বছর বয়সী চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করা হয়। শেষ পর্যন্ত বিয়েও হয়ে যায়। বধূবেশে বাসরঘরে যায় বালিকাটি। যদিও বাসরঘর কী, সে সম্পর্কে বোঝার বয়সই হয়নি মেয়েটির। বাসররাতে স্ত্রীকে একান্তভাবে কাছে পেতে চাইলেন তার স্বামী। কিন্তু এ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ বালিকাবধূটি। একপর্যায়ে ভয়ে চিত্কার করে উঠল সে। দৌড়ে বাসরঘর থেকে পালানোর চেষ্টা করল নববধূটি। কিন্তু ওই সময় বাসরঘরে গিয়ে হাজির বালিকাবধূটির চাচি অর্থাত্ তার স্বামীর মা। তার বাধায় আর পালানো হয়নি মেয়েটির। মুখোমুখি হতে হয় এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার।
বালিকাবধূটি এখন বাবার বাড়িতে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বালিকাবধূটির মা চান তাঁর মেয়ে স্বামীর কাছে ফিরে যাক। বধূটি যদি স্বামীর ঘরে ফিরে না আসে, তাহলে বিয়ের সময় দেওয়া যৌতুক ফেরত দাবি করবে বরের পরিবার। সব মিলিয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে বালিকাবধূ ও তার পরিবারের সদস্যরা। আতঙ্কজনক এ চিত্রটি ইয়েমেনের।
বড়দিনে যুক্তরাষ্ট্রগামী বিমান উড়িয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টার পর প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে উঠে আসছে ইয়েমেনের নাম। শুধু আল-কায়েদার ক্রমবর্ধমান হুমকি নয়, আরও অনেক সমস্যায় জর্জরিত দেশটি। দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে সানাকে।
ইয়েমেনের আয়ের প্রধান উত্স তেল নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশটির তেলের মজুদ নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ইয়েমেনে তীব্র পানির সংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। পানি নিয়ে ইতিমধ্যেই সেখানে অনেক দাঙ্গা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি শহরের পানির কলে পানি নেই দুই মাস ধরে। ট্রাকে করে সেখানে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
এমন নানা সংকটে ভুগছে ইয়েমেন। সরকার ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চোখ ওসব সমস্যার দিকে। কিন্তু সেখানকার শিশুরা যে অনেক সংকটে ভুগছে, সেদিকে নজর নেই কারোরই। শিশুদের উদ্বেগজনক অবস্থা সেভাবে আলোচনায় উঠে আসছে না।
ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৫ বছরের নিচে। অর্থাত্ দেশটিতে শিশুর সংখ্যা এক কোটি।
রাজধানী সানার অলিগলি সব সময় মুখরিত থাকে শিশুদের কলকাকলিতে। তারা হাসছে, খেলছে। ইয়েমেনের আবহাওয়াও খুব চমত্কার। কখনোই তীব্র গরম কিংবা তীব্র শীত পড়ে না দেশটিতে। যেন এক স্বর্গপুরী।
সানার খুব কম বাড়িতেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আছে। কারণ এর দরকারই পড়ে না সেখানে। সানায় রয়েছে ছবির মতো সুন্দর অনেক টাওয়ার হাউস, যেগুলো চারতলা থেকে শুরু করে ১০ তলা পর্যন্ত উঁচু। ইট-পাথরের তৈরি কোনো কোনো টাওয়ার হাউস ৯০০ বছরের পুরোনো।
এসব সানার সৌন্দর্যের গল্প। আলোর নিচে রয়েছে অন্ধকার। সুন্দর এই ছবির পাশাপাশি সানার রয়েছে অন্ধকার দিকও।
এসব চমত্কার বাড়িতে বাস করে এমন অনেক শিশুই স্কুলে যেতে পারে না। তাদের স্কুলের বদলে যেতে হয় কাজে। কিংবা তাদের কাজ ও পড়াশোনা দুটোই চালাতে হয় একসঙ্গে। অনেক শিশু রাস্তায় সেদ্ধ ডিম বিক্রি করে। বাবাকে কাজে সাহায্য করতে হয় অনেক শিশুকে।
এ তো গেল শিশুদের কষ্টগাথা। নারীরাও কম দুঃখে নেই সেখানে। ২০০০ সালে নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ইয়েমেনের অর্ধেক নারীই পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। বিবাহের পর যৌন নির্যাতনের শিকার হন ২০ শতাংশ নারী।

মার্কিন ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস মেহসুদ মারা গেছেন

পাকিস্তানি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, মার্কিন পাইলটবিহীন বিমানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাকিস্তানি তালেবানের প্রধান হাকিমুল্লাহ মেহসুদ মারা গেছেন। গত রোববার নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।
পত্রিকাটি জানায়, ওই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তবে ইসলামাবাদ ও পেশোয়ারে সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের বিশ্বাস, হাকিমুল্লাহ মেহসুদ মারা গেছেন, তবে মেহসুদের মৃত্যুর পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি কর্মকর্তারা।
ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, সপ্তাহান্তে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য থেকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যায় যে গত ১৪ জানুয়ারির ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আহত তালেবান নেতা হাকিমউল্লাহ মেহসুদ মারা গেছেন, এটা প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত।
পত্রিকাটিতে আরও বলা হয়, ধারণা করা হচ্ছে, মেহসুদকে পাকিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় দাফন করা হয়েছে।
পাকিস্তানি তালেবানের প্রধান মেহসুদ গত বছরের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাসংস্থা সিআইএর একটি ঘাঁটিতে আত্মঘাতী হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেন। এর পর তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে যুক্তরাষ্ট্র। ওই ওই আত্মঘাতী হামলায় সিআইএর পাঁচ কর্মকর্তা ও দুই বেসামরিক ঠিকাদার প্রাণ হারান।

যুক্তরাজ্য শিক্ষার্থী ভিসা আবেদন স্থগিত করায় নেপালে বিক্ষোভ

যুক্তরাজ্য শিক্ষার্থী (স্টুডেন্ট) ভিসার আবেদন নেওয়া স্থগিত করার প্রতিবাদে গতকাল সোমবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিক্ষোভ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘মানুষের জীবন নিয়ে খেলার’ অভিযোগ তুলে নানা স্লোগান দেন। তাঁদের অনেকে অভিযোগ করেন, তাঁরা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য অগ্রিম হাজার হাজার পাউন্ড পরিশোধ করেছেন। এখন তাঁদের ভবিষ্যত্ শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রবিন ভট্টরাই (২২) নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি গোটা বছরটাই কাটিয়েছি যুক্তরাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার আবেদন করার পেছনে ছোটাছুটি করে। এখন আমি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য তিন হাজার ৬০০ পাউন্ড পরিশোধ করেছি। আমার ক্লাস শুরু হবে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে। ভিসার আবেদন স্থগিত করায় এখন আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।
যুক্তরাজ্য গত রোববার ঘোষণা করে, মাত্রাতিরিক্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউকে বর্ডার এজেন্সি (ইউকেবিএ) উত্তর ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পয়েন্টভিত্তিক বিশেষ ক্যাটাগরিতে ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া অভিযোগ পাওয়া গেছে, ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করায় অনেক প্রার্থী এর অপব্যবহার করছেন। সবকিছু খতিয়ে দেখার এক মাস পর সাময়িক এ স্থগিতাদেশ পুনর্বিবেচনা করা হবে।
২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় নেপাল থেকে ধারণার চেয়েও বেশি শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করতে থাকেন। নেপালের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করায় যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার পরিবর্তে নেপালি শিক্ষার্থীরা যুক্তরাজ্যের দিকে ঝুঁকতে থাকেন

সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে তিব্বতকে ছাড় দেয়নি চীন

তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার প্রতিনিধিদের সঙ্গে চীনা কর্মকর্তাদের আলোচনা শেষ হয়েছে। আলোচনার ফল কী দাঁড়াল, সেটা এখনো দুই পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। তবে চীন সরকারের একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিব্বতকে কোনো ছাড় দেয়নি সরকার। যদিও তিব্বতের প্রবাসী সরকার গতকাল সোমবার জানিয়েছে, তারা সার্বভৌমত্ব নয়, চায় স্বায়ত্তশাসন।
দালাই লামার প্রতিনিধি লোদি জি গায়ারি ও কেলসাং গায়ালতসেন আলোচনার জন্য গত ২৫ জানুয়ারি চীনে যান। প্রথমে তাঁরা হুনান প্রদেশে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তাঁরা বেইজিংয়ে চলে আসেন এবং সেখানেও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দালাই লামার জ্যেষ্ঠ সচিব ছিমি চোকয়াপা জানিয়েছেন, দুই প্রতিনিধি গতকাল সোমবার ভারতের ধর্মশালায় ফিরে প্রবাসী তিব্বত সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে বৈঠকের বিষয়ে অবহিত করবেন। যদিও আলোচনার ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
চীন সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চীনের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস নয় এবং জাতীয় বা আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগই নেই।’
চীন ও দালাই লামার প্রতিনিধিদের মধ্যে গত ১৪ মাসের মধ্যে এ ধরনের আলোচনা ছিল এটিই প্রথম। তিব্বতের বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক বছর ধরে থেমে থেমে আলোচনা চলছে। দালাই লামা তিব্বতের জন্য ‘কার্যকর স্বায়ত্তশাসন’ দাবি করে আসছেন।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির একটি শাখা ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট দালাই লামার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি দেখে। তাদের ওই বিবৃতি থেকে পরিষ্কার হয়েছে, আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
যদিও আলোচনার বিষয়ে চীন সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি বা সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো মন্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে সরকার জানিয়েছে, এ বিষয়ে আজ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানানো হবে।
তবে ভারতের ধর্মশালায় প্রবাসী তিব্বত সরকারের মুখপাত্র থুবতেন সামফেল গতকাল জানিয়েছেন, সরকার তাঁদের দাবিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। তাঁরা তিব্বতের স্বাধীনতা নয়, চান স্বায়ত্তশাসন।
সামফেল বলেন, ‘আমরা তাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি, তিব্বত চায় স্বায়ত্তশাসন।’
এর আগে ২০০৮ সালের নভেম্বরে সর্বশেষ আলোচনার সময় তিব্বতের পক্ষ থেকে চীন সরকারকে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। তাতে জানানো হয়, চীনা সংবিধানের সঙ্গে সংগতি রেখে তারা শুধু তিব্বতের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন চায়।
বেইজিং তখন বলেছিল, তিব্বত চীনেরই অংশ। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস নয়। তবে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য সত্ত্বেও তারা আলোচনার পথ খোলা রাখবে।

প্রেমিকার সন্তানের বাবা হওয়ায় সমালোচনার মুখে জুমা

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার প্রেমিকার সন্তানের বাবা হওয়ার খবরে দেশটিতে জোর বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। গত রোববার স্থানীয় পত্রিকায় ওই খবর বের হওয়ার পর বিরোধী রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স জুমার তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, দেশের এইচআইভি/এইডসবিরোধী কর্মকাণ্ডে সরকার জনগণের কাছে অনিরাপদ যৌন-সংসর্গ এড়িয়ে চলার যে বার্তা দিয়েছে, জুমার কর্মকাণ্ড সেই নীতির বিরোধী। এক বিবৃতিতে ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স গতকাল সোমবার এ কথা জানায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনে বহুবিবাহ বৈধ। বিশেষ করে জুলু সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনো বহুবিবাহ প্রথা ব্যাপকভাবে চালু আছে। প্রেসিডেন্ট জুমাও ওই সম্প্রদায়ের লোক। ঘরে দুই স্ত্রী থাকার পরও কিছুদিন আগে তিনি আরেকটি বিয়ে করেন। গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দক্ষিণ আফ্রিকা বিষয়ে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে জুমা বহুবিবাহের পক্ষে তাঁর জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেন। এ খবরে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। এর মধ্যে প্রেমিকার সন্তানের বাবা হওয়ার খবরে সেই সমালোচনার আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।
স্থানীয় দ্য সানডে টাইমস-এর খবরে গত রোববার বলা হয়, জুমার ওই প্রেমিকার নাম সোনোনো খোজা (৩৯)। সোনোনোর স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে অনেক আগেই। সোনোনোর বাবা দেশের প্রখ্যাত ক্রীড়া সংগঠক আরভিন খোজা। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান তিনি।
পত্রিকার খবরে বলা হয়, সোনোনো তাঁর সদ্যোজাত সন্তানের নাম রেখেছেন থানদেকিলে মাতিনা জুমা। এ নিয়ে ৬৭ বছর বয়সী জুমা ২০ সন্তানের বাবা হলেন। তবে এ ব্যাপারে জ্যাকব জুমার কার্যালয় কিংবা সোনোনোর পরিবার কোনো মন্তব্য করেনি। জুমার তাঁর সন্তানের প্রকৃত সংখ্যা কত—সে ব্যাপারেও কখনো মুখ খোলেন না।
এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট জুমার বহুগামিতা নিয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল দ্য ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বলেছে, জ্যাকব জুমা বহু নারীর সঙ্গে অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে সরকারের এইচআইভি/এইডসবিরোধী কর্মকাণ্ডকে খাটো করেছেন।

করপোরেশনের মাধ্যমে এক লাখ টন চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত

চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের মাধ্যমে এবার এক লাখ টন চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার শিল্প মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিও সুপারিশ করেছে।
শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী রমজান মাস সামনে রেখে দেশে চিনির দর স্থিতিশীল রাখতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। তিনিও সম্মতি দিয়েছেন।’
মন্ত্রী গতকাল সোমবার তাঁর দপ্তরে সাংবাদিকদের এ তথ্য দেন।
এদিকে দেশে চিনির উত্পাদন বাড়ানো ও পাশাপাশি চিনিকলগুলোতে সহযোগী পণ্য তৈরিরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে দুটিতে ‘ডিস্টিলারি প্লান্ট’ স্থাপন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দুটি চিনিকলে পরিশোধন করতে ‘ক্রাশিং প্লান্ট’ স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। মোবারকগঞ্জ চিনিকল, নর্থ বেঙ্গল চিনিকল ও ফরিদপুর চিনিকলের মধ্যে দুটিতে এই ক্রাশিং প্লান্ট স্থাপন করা হবে। বাকি একটি এবং রাজশাহী চিনিকলে ডিস্টিলারি প্লান্ট হবে বলে জানান শিল্পমন্ত্রী।
দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা চিনি উত্পাদনের পাশাপাশি আরও কিছু পণ্য উত্পাদনের জন্য এসব পরিকল্পনা করেছি। এগুলো না করতে পারলে এসব শিল্পকে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা যাবে না।’
এদিকে চলতি চিনি উত্পাদন মৌসুমে ১৫টি চিনিকলে গত ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৫৪ হাজার মেট্রিক টন চিনি উত্পাদন হয়েছে। মন্ত্রী বলেছেন, গত মৌসুমের সমপরিমাণ অর্থাত্ ৬০ হাজার মেট্রিক টন চিনি এ বছর দেশে উত্পাদন হবে।
দেশে বার্ষিক চিনির চাহিদা আনুমানিক ১২ লাখ মেট্রিক টন। কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতেই এসব চিনি আমদানি হয়ে আসছে। তার আগে বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে সরকারের চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের মাধ্যমে বড় অংশ চিনি আমদানি হতো। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে বেসরকারি খাতের হাতে গোনা সাত-আটটি প্রতিষ্ঠানকে চিনি আমদানির সনদ দেওয়া হয়। কয়েক বছর ধরে বিশেষত রোজার মাসে স্থানীয় বাজারে চিনির ব্যাপক মূল্য বৃদ্ধি পায়। এ সময় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন সরকারের একাধিক মন্ত্রী।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, চলতি মৌসুমে এক লাখ এক হাজার টন চিনি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে দেশের ১৫টি চিনিকল উত্পাদন শুরু করে। কিন্তু গত ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত তথ্যে জানা যায়, আটটি মিল ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। এই মিলগুলো হলো—শ্যামপুর, রংপুর, জয়পুরহাট, রাজশাহী, নাটোর, নর্থ বেঙ্গল, পাবনা ও কুষ্টিয়া চিনিকল।
এ মিলগুলোর কোনোটিই লক্ষ্যমাত্রার ধারে-কাছে পৌঁছাতে পারেনি। যেমন নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের এ বছর চিনি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭ হাজার ৫০ টন। কিন্তু মিলটি সাত হাজার ৪৪৮ টন চিনি উত্পাদন করেই বন্ধ হয়ে গেছে। আটটি মিলই কমবেশি লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক চিনি উত্পাদন করেই বন্ধ হয়ে গেছে।
মন্ত্রী বলেন, চাষিরা দাম ভালো না পাওয়ায় আখ উত্পাদনে আগ্রহ হারায়। সরকার এবার মণপ্রতি আখের ক্রয়মূল্য বাড়িয়ে ৮০ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা আগে ছিল ৬৪ টাকা। তিনি জানান, দাম বাড়ানোর পর এবার আখের চারা উত্পাদন গতবারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে চিনি উত্পাদনও আগামী মৌসুমে বাড়বে বলে ধারণা করা যায়।

খুলনা পাওয়ার ও ওশেন কনটেইনার বাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত হবে

বেসরকারি খাতের কোনো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডিরেক্ট লিস্টিং) মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসতে দেওয়া হবে না—এমন সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা সরে এসেছে সরকার। তবে দুটি কোম্পানি এ সুযোগ পাবে।
ওশেন কনটেইনার লিমিটেড ও খুলনা পাওয়ার লিমিটেড নামের দুই কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ৬৪ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়বে বাজারে। তবে শেয়ারের মূল্য নির্ধারিত হবে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (এসইসি) সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি দুটিকে বাজারে আনার ব্যবস্থা করে দিতে বলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সদ্য গঠিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গতকাল সোমবার এসইসিকে এ ব্যাপারে একটি চিঠি দিয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বরের আগে যেসব বেসরকারি কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারে আসতে স্টক এক্সচেঞ্জে আবেদন করেছিল, শুধু সেসব কোম্পানিকেই শেয়ার ছাড়ার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
ওশেন কনটেইনারস লিমিটেড ২০০৯ সালের ২৩ জুন এবং খুলনা পাওয়ার লিমিটেড একই বছরের ১ অক্টোবর সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার ছাড়তে স্টক এক্সচেঞ্জে আবেদন করেছিল। আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের দুই সপ্তাহ পর ১৯ নভেম্বর সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার ছাড়ার আবেদন করে ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড (ওয়েস্টিন হোটেল) নামে আরেকটি কোম্পানি।
ওশেন কনটেইনার শেয়ার ছাড়বে ১১ কোটি ৯০ লাখ টাকার। আর খুলনা পাওয়ার লিমিটেড শেয়ার ছাড়বে ৫২ কোটি ১৪ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকার। আবেদন অনুযায়ী উভয় কোম্পানিরই অভিহিত মূল্য (ফেস ভ্যালু) ১০ টাকা। ওয়েস্টিন হোটেল কর্তৃপক্ষ ৫০ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়ার আবেদন করলেও অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
গত ৫ নভেম্বর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত পুঁজিবাজারকে অধিকতর স্বচ্ছ, দক্ষ ও গতিশীল করতে যে কয়টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বেসরকারি খাতের কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসতে না দেওয়া। ওই দিন আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে বাজারে যেহেতু শেয়ার সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে, তাই সরাসরি তালিকাভুক্তি থাকবে। তবে তা শুধু সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে।
২৩ নভেম্বর এই সিদ্ধান্তে অনুমোদন দেন অর্থমন্ত্রী। এর দুই দিন পর ২৫ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে একই বিষয়ে আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ ভবনে।
সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, আ হ ম মুস্তফা কামাল বৈঠকে বলেছিলেন, সরাসরি তালিকাভুক্তির নামে যা ঘটেছে বা ঘটতে চলেছে, তাতে সবাই অবহিত। ওশেন কনটেইনার, খুলনা পাওয়ার, সামিট, ওয়েস্টিনের নামে বাজারে কী ঘটছে, এসইসি তা পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এসব কোম্পানিকে কারা অনুমোদন দিয়েছে এবং কারা এদের মূলধন ও শেয়ারের মূল্যমান নির্ধারণ করে দিল? এসইসির নীরবতা জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
এই সিদ্ধান্তের কারণে বিভ্রান্তিতে পড়ে যায় এসইসি। গত ২১ ডিসেম্বর এসইসির নির্বাহী পরিচালক এ টি এম তারিকুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক আবেদনে বেসরকারি খাতের তিনটি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির ব্যাপারে অর্থসচিব মোহাম্মদ তারেকের কাছে জানতে চাওয়া হয়। এরই জবাবে গতকাল নতুন নির্দেশনা দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
প্রসঙ্গত, পুঁজিবাজারে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন সিকিউরিটিজের সরবরাহ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ২০০৬ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম উভয় স্টক এক্সচেঞ্জকেই সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধি প্রণয়নের অনুমোদন দেয় এসইসি। এতে সরকারি খাতের পাওয়ার গ্রিড, ডেসকো, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল ও তিতাস গ্যাস এবং বেসরকারি খাতের এসিআই ফরমুলেশন, শাইনপুকুর সিরামিক্স ও সবর্শেষ নাভানা সিএনজি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।
বিধি অনুযায়ী, সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মালিকদের ছাড়া শেয়ার সরাসরি বাজারে বিক্রি হয় এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ কোম্পানির খাতে জমা না হয়ে কোম্পানির মালিকদের হিসাবে জমা হয়। অর্থাত্ এই টাকা মালিকেরা পেয়ে যান।
স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে করা আবেদন অনুযায়ী, ওশেন কনটেইনারের বিক্রয়লব্ধ অর্থ উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডাররা সামিট এলায়েন্স পোর্ট লিমিটেড নামে তালিকাভুক্ত কোম্পানির হিসাবে জমা করবেন। আর খুলনা পাওয়ারের অর্থ জমা হবে উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার সামিট ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড মার্কেন্টাইল কো-অপারেশনস লিমিটেড এবং ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড নামের দুই কোম্পানিতে।
প্রসঙ্গত, ওশেন কনটেইনার ও খুলনা পাওয়ারের অন্যতম উদ্যোক্তা হচ্ছে সামিট গ্রুপ। আর ওয়েস্টিন হোটেলের উদ্যোক্তা ইউনিক গ্রুপের বোরাক রিয়েল এস্টেট, বোরাক ট্রাভেলস, মো. নূর আলী, সেলিনা আলী, নাবিলা আলী ও নাদিয়া আলী।

পাঠকদের চাহিদা ও পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে প্রথম আলোর অর্থ ও বাণিজ্য পাতায় শেয়ারবাজারের দৈনিক লেনদেনের ছকে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই ছকে আজ থেকে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও মূল্য-আয় (পিই) অনুপাত প্রকাশ করা হচ্ছে।
তবে এ দুটিই হবে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সর্বশেষ ইপিএস ও পিই। এ ক্ষেত্রে অনুপাতগুলো নিরীক্ষিত, ত্রৈমাসিক বা অর্ধবার্ষিক কি না, তাও পাশে সাংকেতিকভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ছকের আয়তন বাড়িয়ে চার কলাম থেকে পাঁচ কলাম করা হয়েছে, যেন আগের তুলনায় আরও স্বচ্ছভাবে তথ্য-উপাত্তগুলো বোঝা যায়। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারগুলোকে ১৯টি খাতে বিভক্ত করে পরিবেশন করা হচ্ছে। এই ছকসংক্রান্ত কোনো পরামর্শ থাকলে পাঠকেরা ই-মেইল ঠিকানায় (bis@prothom-alo.info) লিখিতভাবে তা জানাতে পারেন।

আমিনুর রহমান পুনরায় জনতা ব্যাংকের এমডি ও সিইও নিযুক্ত হলেন

এস এম আমিনুর রহমান জনতা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দুই বছরের জন্য পুনরায় নিয়োগ পেয়েছেন।
সম্প্রতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় সর্বসম্মতভাবে তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আমিনুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৬ সালে সোনালী ব্যাংকে যোগ দিয়ে ব্যাংকিং কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি জনতা ব্যাংক ছাড়াও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।
আমিনুর রহমান ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি জনতা ব্যাংকে দুই বছরের জন্য এমডি ও সিইও হিসেবে যোগ দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি, জার্মানি, ভারত, কুয়েত, সৌদি আরব, চীনসহ অন্যান্য দেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে যোগ দেন।

শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে নতুন সফটওয়্যার চালু

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে অনলাইনে নিলামের মাধ্যমে প্রাথমিক শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
গতকাল সোমবার ডিএসইর কার্যালয়ে এ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও সাংবাদিকদের সামনে নতুন এ সফটওয়্যারের ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইনফোটেক এ সফটওয়্যারটি তৈরি করেছে।
এ সময় ডিএসইর সভাপতি রকিবুর রহমান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সতিপতি মৈত্র বক্তব্য দেন।
ডিএসই জানায়, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোনো শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নতুন এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। এর আগে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধন নিতে হবে। এ নিবন্ধনের বিপরীতে প্রতিটি কোম্পানির নিলামের আগে অনুমোদিত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি গোপন নম্বর পাবে। ওই নম্বরের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলো সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিলামে অংশ নিতে পারবে।
নিলামে অংশ নেওয়ার আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারের বিপরীতে ৮০ শতাংশ টাকা ব্যাংকে আগাম জমা দিতে হবে। টাকা জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলে ওই প্রতিষ্ঠানকে নিলামে অংশ নেওয়ার জন্য গোপন নম্বর বা পাসওয়ার্ড বরাদ্দ দেওয়া হবে।

শেয়ারের দাম আয়ের ৫০ গুণ হলেই ঋণসুবিধা বন্ধ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের বিপরীতে ঋণ বিতরণের নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে যেসব কোম্পানির শেয়ারের আয় অনুপাতে দাম বা পিই ৫০ পয়েন্ট বা এর বেশি হবে, সেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনার জন্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো বিনিয়োগকারীদের ঋণসুবিধা দিতে পারবে না।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) এক সভায় গতকাল সোমবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে গত ৯ ডিসেম্বর এসইসি পিই অনুপাত ৭৫ পয়েন্টের বেশি হলে ঋণসুবিধা না দেওয়ার জন্য আদেশ জারি করেছিল।
এ ব্যাপারে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আনোয়ারুল কবীর ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে তারল্যপ্রবাহ এমনিতেই বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ঋণসুবিধা বাজারের তারল্যপ্রবাহকে আরও বাড়িয়ে দেবে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারের ঝুঁকিই বাড়াবে। তা ছাড়া অনেক ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক গ্রাহকদের ঋণসুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব কারণেই ঋণসুবিধা দেওয়ার জন্য সীমা আরও কমিয়ে এনেছে এসইসি। আজ মঙ্গলবার থেকেই এ নির্দেশ কার্যকর হবে বলে জানান তিনি।
তবে কিসের ভিত্তিতে সীমা নির্ধারণ করা হলো—এ প্রশ্নে আনোয়ারুল কবির ভূঁইয়া বলেন, ‘যাঁরা (কমিশন) এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরাই এর ব্যাখ্যা ভালো দিতে পারবেন।’
এ ছাড়া এসইসি ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে তাদের গ্রাহকদের মূলধনের সর্বোচ্চ দেড় গুণ বা ১: ১.৫ অনুপাতের বেশি ঋণ না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাত্, কোনো গ্রাহকের নগদ এক লাখ টাকা থাকলে তাঁকে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণসুবিধা দেওয়া যাবে। এর আগে ব্রোকারেজ হাউসগুলো মূলধনের দ্বিগুণ বা ১:২ অনুপাতে ঋণ দিতে পারত। এসইসির নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মধ্যে ঋণসুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমতা এল। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১:১.৫ হারেই ঋণ দিতে পারে।
নিয়মানুযায়ী ব্রোকারেজ হাউসগুলো তাদের গড় প্রকৃত মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি কোনো একক কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য ঋণসুবিধা দিতে পারে না। গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ নিয়মের কোনো ব্যতয় ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসইসি। এর অংশ হিসেবে ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলেছে সংস্থাটি।
এসইসি সূত্র বলছে, কোম্পানির সর্বশেষ ইপিএসের ভিত্তিতে পিই অনুপাত হিসাব করা হবে। এটি নিরীক্ষিত বার্ষিক ইপিএস হতে পারে, আবার অনিরীক্ষিত ত্রৈমাসিক ইপিএসও হতে পারে। এটা নির্ভর করবে কোম্পানির সব শেষ কোন ইপিএসটি প্রকাশ করা হয়েছে, তার ওপর।
উল্লেখ্য, কোম্পানির শেয়ারের সর্বশেষ বাজারমূল্যকে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস দিয়ে ভাগ করলে পিই অনুপাত পাওয়া যায়। যে কোম্পানির পিই যত বেশি, সেই কোম্পানিকে বিনিয়োগের জন্য তত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ ঘোষিত ত্রৈমাসিক ইপিএসের ভিত্তিতে নির্ণিত পিই প্রকাশ করে থাকে।

অধিনায়ক পন্টিং

ছিল ১৪৫, পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের পর হয়ে গেল ১৫০। বলা হচ্ছে অধিনায়ক হিসেবে রিকি পন্টিংয়ের ওয়ানডে জয়ের সংখ্যা। ওয়ানডে ইতিহাসে এই প্রথম ১৫০ ম্যাচ জয়ের মাইলফলক স্পর্শ করলেন কোনো অধিনায়ক। জয়ের রেকর্ডে পন্টিংয়ের ধারেকাছেও নেই কেউ, জয়ের সেঞ্চুরিই আছে আর কেবল একজনের। পন্টিংয়ের পূর্বসূরি অ্যালান বোর্ডারের নেতৃত্বে ১০৭ ম্যাচ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়েছিলেন হানসি ক্রোনিয়ে ও স্টিভেন ফ্লেমিং। ম্যাচ পাতানোর অভিযোগে অধিনায়কত্ব চলে যাওয়ার আগে ক্রোনিয়ের অধিনায়কত্বে দক্ষিণ আফ্রিকা জিতেছিল ৯৯টি ম্যাচ। আর কিউই ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক ফ্লেমিং অধিনায়ক হিসেবে জিতেছেন ৯৮ ম্যাচ। ভারতকে ৯০টি ম্যাচ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, ম্যাচ গড়াপেটায় অভিযুক্ত না হলে হয়তো ক্রোনিয়ের মতো বাড়তে পারত তাঁর জয়ের সংখ্যাও।

আর্সেনালের দিকেই তাকিয়ে ফার্গুসন

‘আর্সেনাল এখনো শিরোপা লড়াইয়ে টিকে আছে এবং আমি আশা করব আগামী রোববার স্টামফার্ড ব্রিজে তারা চেলসির চেয়ে এগিয়ে থাকবে। আশা করব, তারা চেলসির পয়েন্ট কেড়ে নিতে পারবে’—পরশু আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচের পর কথাটা বললেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন। একটু আগেই যাদের উড়িয়ে দিয়েছে ৩-১ গোলে, হঠাত্ করেই তাদের এত বড় সমর্থক হয়ে গেলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ! ঘটনা কী?
ঘটনা হলো, ম্যানইউর শিরোপা লড়াইটা তো এখন চেলসির সঙ্গেই। আর্সেনাল চেলসির পয়েন্ট কেড়ে নিতে পারলে তো ম্যানইউরই বেশি লাভ। চেলসির থেকে এক ম্যাচ বেশি খেলেও ১ পয়েন্ট পিছিয়ে ম্যানইউ, তবে পরশু আর্সেনালের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলে রেড ডেভিলরা এই বার্তা দিয়েছে, লড়াইয়ে তারা ভালোমতোই আছে। ৩ গোলের দুটি ওয়েন রুনি এবং পার্ক জি সুংয়ের, বাকিটি গানার গোলরক্ষক আলমুনিয়ার আত্মঘাতী। জয়ের পর প্রিমিয়ার লিগে শততম গোল করা রুনির প্রশংসায় উচ্চকিত ছিলে ফার্গুসন, ‘ওয়েন অবিশ্বাস্য খেলেছে। ওরা ওকে সামলাতেই পারেননি, ও আসলেই গ্রেট ফুটবলার।’

নিউজিল্যান্ডেও মাশরাফিকে ছাড়া বাংলাদেশ

সিদ্ধান্তটা নেওয়াই ছিল একরকম। তার পরও কী কারণে যেন সেটা জানাতে সময় নিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অবশেষে কাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হলো, নিউজিল্যান্ড যাওয়া হচ্ছে না মাশরাফি বিন মুর্তজার। কারণটাও জানাই—জ্বর থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে তাঁর সময় লাগবে আরও।
মাশরাফির বিকল্প হিসেবে কাউকে পাঠানো হবে না বলেও জানানো হয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। বিসিবির আগেই অবশ্য নিউজিল্যান্ডের রেডিও লাইভকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বাংলাদেশের কোচ জেমি সিডন্স বলেছেন, ‘ও (মাশরাফি) আসছে না। সে জ্বরে আক্রান্ত, অনুশীলনের মধ্যেও নেই। পুরোপুরি সুস্থ হতে হয়তো আরও এক সপ্তাহ লেগে যাবে। কাজেই তাকে আনার তো কোনো কারণ নেই।’
সাক্ষাত্কারে বাংলাদেশ দলের উন্নতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে সিডন্স বলেছেন, ‘দল হিসেবে আমরা এখনো নবীন। তবে উন্নতির লক্ষণ দেখাতে শুরু করেছে দলটা।’ উদাহরণ হিসেবে দেশে খেলে যাওয়া সাম্প্রতিক ত্রিদেশীয় আর টেস্ট সিরিজকে সামনে এনেছেন কোচ। কিন্তু সিডন্স যতই উন্নতির কথা বলুন, আসন্ন সিরিজে বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করারই ইচ্ছা কিউইদের। দলের পক্ষে ফাস্ট বোলার ড্যারিল টাফি বলেছেন, ‘সামনের মাসে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে সব ধরনের ক্রিকেটেই বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করতে চাই।’
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আগামীকাল সিরিজের একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচটি খেলবে বাংলাদেশ দল। ওয়ানডে সিরিজ শুরু হবে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে।

সাকিব শীর্ষেই, ধোনিকে সরিয়ে দিলেন হাসি

ছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনির ১১ পয়েন্ট পেছনে, পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে ৭৩.৩ গড়ে ২২০ রান করে ধোনির চেয়েও এগিয়ে গেলেন ৩ পয়েন্ট। মাইক হাসি এখন আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ব্যাটসম্যান। এই দুজনের জায়গা অদলবদল ছাড়া ব্যাটসম্যানদের র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দশে আর কোনো পরিবর্তন নেই। বাংলাদেশে ত্রিদেশীয় সিরিজ না খেললেও সাত নম্বরে জায়গা ধরে রেখেছেন শচীন টেন্ডুলকার।
বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে আগের মতোই সবার আগে সাকিব আল হাসান, ২৭ থেকে এক ধাপ এগিয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। বোলিংয়ে সেরা দশে পরিবর্তন একটিই, ১৩ থেকে ৯-এ উঠে এসেছেন পাকিস্তানের অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদি। আফ্রিদিকে জায়গা দিতে যুগ্মভাবে নয়ে থাকা জেমস অ্যান্ডারসন ও ডেল স্টেইন একসঙ্গেই নেমে গেছেন দশে। শীর্ষ দুইয়ে আগের মতোই আছেন ড্যানিয়েল ভেট্টোরি ও রেমন্ড প্রাইস, তিনে সাকিব। ইনজুরির জন্য দীর্ঘদিন মাঠে নেই, কিন্তু তার পরও ১৯ থেকে এক ধাপ এগিয়েছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। অলরাউন্ডারদের র্যাঙ্কিংয়ে কোনো পরিবর্তন নেই, সাকিব আগের মতোই শীর্ষে।
পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে শীর্ষ অবস্থানটা আরেকটু সংহত করেছে অস্ট্রেলিয়া, ভারতের সঙ্গে ব্যবধান এখন ১২।

বড় জয়ে শুরু বাংলাদেশের

গেমসের আগে বাংলাদেশ যে সম্ভাবনার ফিরিস্তি দিয়েছিল, সেখানে হ্যান্ডবল বড় জায়গা পায়নি। তাই হ্যান্ডবলকে ঘিরে নেই পাওয়া না-পাওয়ার দোলাচলও। তবে খেলাটির প্রথম দিনেই বড় জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। নেপালের বিপক্ষে পাওয়া জয়টি ৪০-১৮ গোলের। দিনের প্রথম ম্যাচে ফেবারিট ভারত শ্রীলঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়েছে ৫৮-১০ গোলে।
গোলরক্ষক বাদে বাংলাদেশের মোট ১৩ জন। এর মধ্যে গোল করেছেন ১০ জন। সর্বোচ্চ ৮ গোল করেছেন মির্জা সাইদুজ্জামান। ৬ গোল করেছেন কামরুল ইসলাম। মাহবুবুল আলমের গোল ৫টি। নেপালের পক্ষে সর্বোচ্চ ৫ গোল অমর শ্রেষ্ঠর।
ভারতের স্কোরশিটেও প্রায় একই রকম অবস্থা। গোলরক্ষক ছাড়া খেলেছেন ১৩ জন। গোল করেছেন ১২ জন। সর্বোচ্চ ১০ গোল দীপকের। এর পর ৮ ও ৭ গোল করেছেন যথাক্রমে ফিরোজ আহমেদ ও শচীন। ৬টি করে গোল আছে পারশিদ ও সিদ্ধার্থের। শ্রীলঙ্কার পক্ষে সর্বোচ্চ ৪ গোল নালাকার।
আজ হ্যান্ডবলে দুটি ম্যাচ। তবে বাংলাদেশের খেলা নেই। দুটি ম্যাচের একটিতে খেলবে পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা এবং অন্যটিতে মুখোমুখি নেপাল-আফগানিস্তান।

দুটি সোনার বদলে ১টি রুপা!

জুডোতে প্রত্যাশা ছিল নিদেনপক্ষে দুটো সোনা। কিন্তু দুটি সোনা দূরে থাক দুটি রুপাও জোটাতে পারল না তারা। কাল শেষ দিনে এল একটি মাত্র রুপা। ঊর্ধ্ব-১০০ কেজিতে যেটি জিতেছেন মামুনুর রশিদ। অথচ এই রশিদকে নিয়ে সোনার স্বপ্নই দেখেছিল ফেডারেশন।
ফাইনালে অবশ্য পাকিস্তানের জাহিদ ইকবালের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়েছেন মামুনুর রশিদ। এমন ফলাফলে হতাশ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের, ‘আমরা তো অন্তত দুটো সোনা আশা করেছিলাম। কিন্তু সেটা পেলাম না। খুবই হতাশ আমি।’
পুরুষ-মহিলা দুই বিভাগেই ৭টি ওজন শ্রেণীতে খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ছেলেদের ৫টি শ্রেণীর মধ্যে সর্বোচ্চ সাফল্যই কাল এল বিকেএসপিতে। এই একটি রুপা ছাড়াও ৩টি ব্রোঞ্জ জিতেছে বাংলাদেশ। একেবারে শেষ মুহূর্তে অন্তর্ভুক্ত হওয়া মেয়েদের ইভেন্টেও এসেছে ব্রোঞ্জ। কাল ৬৩ কেজির নিচের শ্রেণীতে এটি জিতেছেন নাইস।
ব্যাডমিন্টনের প্রথম পদক ব্রোঞ্জ
এর আগে দক্ষিণ এশীয় গেমসে কোনো পদকই জোটেনি ব্যাডমিন্টনে। এবার অবশ্য রুপা জয়ের লক্ষ্য নিয়েই নেমেছিল পরশ-রইসরা। কিন্তু ব্রোঞ্জের বেশি এল না। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও অর্জন ব্রোঞ্জ। পদকটি অবশ্য পরশুই নিশ্চিত হয়েছিল। কাল তা হাতে উঠল আনুষ্ঠানিকভাবে। উডেনফ্লোর জিমনেসিয়ামে কাল ফাইনালে লড়েছে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। পুরুষ দলগত বিভাগে ভারত ৩-০ ব্যবধানে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সোনা জিতেছে। মেয়েদের বিভাগেও একই ফল। সোনা ভারতের, রুপা শ্রীলঙ্কার। সেমিফাইনালে ওঠা বাংলাদেশ ও নেপালের ছেলেমেয়ে দুই দলকেই ব্রোঞ্জজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।
স্কোয়াশে সেই পাকিস্তান
জানশের খানের দেশ পাকিস্তানেই যে স্কোয়াশের সোনা যাবে, সেটা নিশ্চিত হয়েছিল পরশুই। ফাইনালে উঠেছিলেন দুই পাকিস্তানি আমির আটলাস খান ও ফারহান মেহবুব। কাল ঢাকা ক্লাব কোর্টে ফারহানকে ৩-০ সেটে হারিয়ে শেষ হাসিটা হেসেছেন আটলাস খান। ব্রোঞ্জ পেয়েছেন ভারতের সন্দীপ জাংরা এবং গৌরব নানদ্রাজগ।
ভলিবলের সেমিতে শ্রীলঙ্কা
ভলিবলের সেমিফাইনালে উঠেছে শ্রীলঙ্কা। কাল মিরপুর শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে তারা ২৫-১৪, ২৫-১৫, ২৫-১৯ পয়েন্টে হারিয়েছে আফগানিস্তানকে। দিনের অন্য ম্যাচে মালদ্বীপ ২৫-২০, ২৫-২৫, ২৫-১৫ পয়েন্টে জিতেছে নেপালের বিপক্ষে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ম্যাচটি চলছিল।
হার দিয়ে শুরু বাস্কেটবলের
অন্তত একটা পদক হলেই চলবে—এই প্রত্যাশায় খেলতে নেমে বাংলাদেশ কাল প্রথম ম্যাচেই হেরে বসেছে। ধানমন্ডি ইনডোরে কাল তারা উত্তেজনায় ঠাসা ম্যাচে ৭৪-৭২ পয়েন্টে হেরে গেছে নেপালের বিপক্ষে। দিনের অন্য ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ১০৬-৪৬ পয়েন্টে পাকিস্তানকে এবং আফগানিস্তান ৯৫-৬৪ পয়েন্টে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছে।

মালদ্বীপও ক্রিকেট খেলে

ইমাদ ইসমাইল কি একটু বিব্রত হলেন? মাত্র ৮৮ রান করে পাকিস্তানের কাছে ১০ উইকেটে হারের পর বাংলাদেশি সাংবাদিকের কাছে ‘আপনার দল তো ভালো খেলল’ জাতীয় প্রশংসায় বিব্রত হওয়ারই কথা মালদ্বীপের ক্রিকেট কোচের। এই যদি ভালো খেলা হয়, খারাপ খেলা কোনটা!
বাস্তবতা হলো, ইমাদ ইসমাইল একটুও বিব্রত হননি। লাজুক মুখে মৃদু হাসি ছড়িয়ে বললেন, ‘এ ম্যাচে আমাদের টার্গেট ছিল ১০০ রান করা আর অন্তত ১০ ওভার বল করা। দুটোতেই মোটামুটি সফল বলতে পারেন।’ কথা সত্যি। মালদ্বীপ ক্রিকেট খেলে শুনেই যদি কেউ চমকে উঠে থাকেন, তাঁদের জন্য তথ্য—মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে কাল একেবারে খারাপ করেনি দ্বীপবাসী ব্যাটসম্যানরা। ১০০ রান না হলেও ২০ ওভারের ম্যাচে তারা ৮৮ রান করেছে, তাও হাতে ৩ উইকেট রেখে। ওপেনার মুশাম ইব্রাহিমের সর্বোচ্চ ২৭ রানে ছিল দৃষ্টিনন্দন একটা ছক্কা। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া পাকিস্তান কোনো উইকেট না হারিয়েই ৯.৪ ওভারে ম্যাচ জিতে নিলেও ফাঁকা গ্যালারিতে বসে পুলিশ আর অন্যান্য নিরাপত্তা সদস্যরা মালদ্বীপের ক্রিকেট ভালোই উপভোগ করেছেন।
অথচ ইমাদ ইসমাইল জানালেন, মালদ্বীপে ক্রিকেটের চর্চা ৫০ বছর আগে থেকে হলেও খেলাটা এখনো শৌখিন সেখানে। ক্রিকেট খেলে মূলত রাজধানী মালের শ দেড়েক ছেলে। মালেতে মাঠ একটাই। এই মাঠেই ঘুরেফিরে হয় টি-টোয়েন্টি, এক দিন আর দুই দিনের ঘরোয়া ম্যাচ। টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে সাত-আটটা দল হয়, যে দলগুলোর বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই মালদ্বীপ প্রবাসী ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান বা পাকিস্তানি। এক দিনের ম্যাচ হয় দুই বিভাগে। প্রথম বিভাগে খেলে ছয়টা দল, দ্বিতীয় বিভাগে চারটা। আর দুই দিনের ম্যাচ খেলে কেবল প্রথম বিভাগের ছয়টা দল। ‘ছেলেরা ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ক্রিকেট খেলে। খেলার জন্য কেউ কোনো টাকা পায় না। এমনকি খেলার সরঞ্জামও তাদের নিজেদের’—মালদ্বীপ অনূর্ধ্ব-২১ দলের কোচ ইমাদ ইসমাইল সংক্ষেপে তুলে ধরলেন সে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের চিত্র।
কিন্তু এভাবে কতদূর যাওয়া সম্ভব? ফুটবল জনপ্রিয়তার দেশে মালদ্বীপ ক্রিকেট বোর্ডেরই বা খেলাটা নিয়ে ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কী? ইমাদ ইসমাইল আশাবাদী, ‘এসিসি আমাদের ওখানে ক্রিকেট উন্নয়নের কাজ করছে। বোর্ডও চেষ্টা চালাচ্ছে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করে তুলতে। এ ধরনের টুর্নামেন্টে যত বেশি অংশ নেব, ততই আমাদের ক্রিকেট এগিয়ে যাবে।’ এসএ গেমস ক্রিকেটের কথাই বললেন কোচ, মালদ্বীপ অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়ক আহমেদ হাসানের কাছে যেটা কি না মালদ্বীপের এযাবত্কালে অংশ নেওয়া সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট, ‘এত বড় টুর্নামেন্টে আমরা আগে কখনো খেলিনি। আজ (গতকাল) পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে খেললাম, এরপর আরও বড় বড় ম্যাচ আছে। এই টুর্নামেন্ট ভালো একটা অভিজ্ঞতা দেবে আমাদের।’
অভিজ্ঞতাটাই সবচেয়ে জরুরি এখন মালদ্বীপের তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য। শুনলে অবাক হবেন, এসএ গেমস খেলতে আসার আগে মালদ্বীপের তরুণদের অভিজ্ঞতা বলতে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় খেলে আসা পাঁচটা প্রস্তুতি ম্যাচ মাত্র। আর আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা? সেটা তো কালই প্রথম খেলল মালদ্বীপ অনূর্ধ্ব-২১ দল!
শ্রীলঙ্কা-নেপাল: আমাদের রাজশাহী অফিস জানিয়েছে, রাজশাহী বিভাগীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দিনের অন্য ম্যাচে শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-২১ দল ৬৪ রানে হারিয়েছে নেপাল অনূর্ধ্ব-২১ দলকে। শ্রীলঙ্কার ৮ উইকেটে করা ১৬৬ রানের জবাবে ৩ উইকেটে ১০২ রান করেছে নেপাল। শ্রীলঙ্কার দিলশান মুনাবিরা ২৮ বলে সর্বোচ্চ ৬৩ রান করেছেন। নেপালের রুপেশ শ্রীবাস্তব ২৯ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট।

আমি তো হাসছি, হাসব’ by আবিদুল ইসলাম

বিকেলের সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে তখন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের ওপর দিয়ে তির্যক আলো এসে পড়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) ভবনের দুয়ারে। সে আলোকে মনে হচ্ছিল কারও ঠোঁটে লেগে থাকা একচিলতে বিজয়ীর হাসি। তখন সেখানে সত্যিই যে ঠোঁটে একচিলতে হাসি নিয়ে বিজয়মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন ভারোত্তোলক হামিদুল ইসলাম। একটু আগেই বাংলাদেশের ভারোত্তোলনের ইতিহাসকে নতুন করে লিখিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের ভারোত্তোলন দক্ষিণ এশীয় গেমস থেকে প্রথম সোনা পেল তাঁর হাত ধরে।
শেষ বিকেলের সূর্যের হাসি ছড়িয়ে পড়েছে হামিদুলের মুখে। আর তাঁর মুখের হাসিটা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে। এই হাসিটা ছড়িয়ে দিতে পেরে ভালো লাগছে হামিদুলের। তবে সবচেয়ে ভালো লাগছে মায়ের বাবা-মায়ের মুখের হাসিটা, ‘জানেন বাবা-মাকে ফোন করেছিলাম। প্রথমে ওনারা কাঁদলেন। এটা আবেগের কান্না। এর পর হাসলেন। আমি এখান থেকেই যেন দেখতে পেয়েছি, মায়ের মুখটা গর্বে কী উজ্জ্বলই না হয়ে উঠেছে!’
সোনা জয়ের ঘোষণাটা কানে বাজতেই বাবা-মায়ের মুখটাই প্রথম ভেসে উঠেছে হামিদুলের মনের পর্দায়। বাবা-মায়ের জন্যই তো আজকের এই সাফল্য। আবদুল মান্নানের ছিল অভাবের সংসার। তিন ছেলেকে তাই কাজ করতে দিয়েছিলেন মামা হাবিবুর রহমানের খাবার হোটেলে। সেখানে কাজ করতে করতেই একসময় ভারোত্তোলনের শখে পেয়ে বসে হামিদুলকে। নিজেদের কষ্ট হলেও বাবা-মা ছেলের শখের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াননি।
মেহেরপুরেরই ছেলে মোয়াজ্জেম হোসেনের ভারোত্তোলনের প্রতি ছিল তীব্র টান। মোয়াজ্জেমের ধনী বাবা চাননি ছেলে এটা করুক। তাই বাবার চোখ এড়িয়ে রাতে কুপির আলোয় অনুশীলন করতেন মোয়াজ্জেম। সেখানে তাঁর শিষ্য ছিলেন হামিদুল। মোয়াজ্জেম হামিদুলকে স্বপ্ন দেখাতেন—একদিন তুমি বড় অ্যাথলেট হবে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সোনা জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। অভাব দূর করবে পরিবারের। মোয়াজ্জেমের কথা সত্যি হয়েছে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন মোয়াজ্জেম। তার আগেই অভাব দূর করেছেন পরিবারের। ভারোত্তোলনের কারণে চাকরি পেয়েছেন সেনাবাহিনীতে। ছোট দুই ভাই আশরাফুল ইসলাম ও একরামুল হককেও নিয়ে এসেছেন ভারোত্তোলনে। চাকরি করেন তাঁরাও।
হামিদুল এখন আরেকটা স্বপ্ন দেখেন। দেশের পতাকা নিয়ে বিজয়মঞ্চে যখন হাত নাড়ছিলেন, তিন ছেলের ছোটটির কথা মনে পড়েছে তাঁর। তাঁর বিশ্বাস, দুই বছরের মোহাম্মদ রোহানই তাঁর পতাকাটা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে।
হামিদুলের স্বপ্ন—ছোট ছেলেটা একদিন বড় ভারোত্তোলক হবে। তাঁর মতো কিংবা তাঁকে ছাপিয়ে আরও বড় বিজয়মঞ্চে দাঁড়াবে। সেই বিজয়ের খবর পেয়ে তাঁর বাবার মতোই কাঁদবেন তিনি, হাসবেন তিনি। অনাগত সেই বিজয়ের কথা মনে করে এখনই কি চোখে জল এল হামিদুলের! আঙুল দিয়ে কি চোখের জল মুছলেন? হামিদুল হেসে জবাব দিলেন, ‘কই? কাঁদছি না তো। আমি তো হাসছি। আমি তো হাসব!’