Friday, June 27, 2025

গোপনে ইরানে ঢুকে যেভাবে হামলা করেছিল ইসরায়েল

১২ দিন ধরে চলা সংঘাতে শত শত যুদ্ধবিমান, সশস্ত্র ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তবে এ সংঘাতে ইসরায়েলকে সবচেয়ে বেশি সাফল্য এনে দিয়েছে অভিনব একটি কৌশল। আর তা হলো, গোপনে ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকে সেখান থেকে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করা।

১৩ জুন ভোরের আলো ফোটার আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানে হামলা শুরু করে। এর কয়েক ঘণ্টা পর এমন কিছু ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে, যেগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, ইরানের বিভিন্ন অজ্ঞাত স্থান থেকে রাতের বেলা এসব ধারণ করা হয়েছে।

একটি ঝাপসা ভিডিওতে দেখা যায়, ছদ্মবেশী পোশাক, নাইট-ভিশন চশমাসহ সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন সরঞ্জামসজ্জিত মোসাদ সদস্যরা মরুভূমির মতো জায়গায় বসে অস্ত্র স্থাপন করছেন। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য এসব অস্ত্র বসানো হয়, যাতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে হামলা চালাতে পারে।

অন্যান্য ভিডিওতে দেখা যায়, ক্যামেরা লাগানো ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্ল্যাটফর্মে আছড়ে পড়ছে। আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্র বলে মনে হয়েছে। এগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট ও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী। শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে এগুলো ব্যবহৃত হয়। এসব ক্ষেপণাস্ত্র দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

ইরানের কর্তৃপক্ষও এসব অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম একটি খোলা জায়গা থেকে পাওয়া স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপকের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে, এসব অস্ত্রে ‘ইন্টারনেটভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও দূরনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ সংযুক্ত ছিল। এগুলো পরিচালনা করছিলেন মোসাদ সদস্যরা।

এ ধরনের হামলার সঙ্গে ২০২০ সালের নভেম্বরে চালানো একটি ইসরায়েলি অভিযানের মিল পাওয়া যায়। ওই অভিযানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির শীর্ষ ব্যক্তি মোহসেন ফাখরিজাদেহকে তেহরানের কাছে একটি চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সময় তাঁর স্ত্রী ও দেহরক্ষীরাও নিহত হন।

ওই সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে যে দূরনিয়ন্ত্রিত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, এক টন ওজনের একটি বন্দুক খণ্ড খণ্ড করে ইরানে পাচার করে মোসাদ। বন্দুকটি ছোট ট্রাকের পেছনে বসানো হয়। পরে ফাখরিজাদেহ নিহত হওয়ার পর ট্রাকটিও বিস্ফোরিত হয়।

ইরান দেশটির উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ পশ্চিম আজারবাইজানে গত বুধবার তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তাঁদের বিরুদ্ধে ফাখরিজাদেহ হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য গুপ্তহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল।

ইরানের অভ্যন্তরে ড্রোন উৎপাদন

ইরানের সঙ্গে চলা ১২ দিনের সংঘাতে ইসরায়েল বিস্ফোরকবাহী বহু ছোট ছোট ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলের বহুমুখী হামলা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পরাস্ত করতে এসব ড্রোন ব্যবহার করা হয়।

ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ছোট ড্রোনের পাশাপাশি হারমেস ৯০০–এর মতো বড় সামরিক ড্রোন প্রতিহত করতে দেশজুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় ছিল। বেশ কয়েকটি হারমেস ৯০০ ড্রোন ভূপাতিত করা হয় বলেও দাবি করে ইরান। তবে ঠিক কতগুলো ড্রোন উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এবং সেগুলো কতটা সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, তা আল–জাজিরা নিশ্চিত করতে পারেনি।

এ সংঘাতে ছোট ড্রোনগুলো ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। এগুলো নিষ্ক্রিয় করতে ইরানি কর্তৃপক্ষ বড় পরিসরে তল্লাশি চালাতে বাধ্য হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই কর্তৃপক্ষ এমন কিছু পিকআপ ট্রাক খুঁজে পায়, যেগুলো ছোট ড্রোন বহনের উপযোগী করে বিশেষভাবে তৈরি। কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব ট্রাকে করে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি নিয়ে ড্রোনগুলো ছোড়া হতো।

এর আগে ইউক্রেন এ ধরনের যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে সফলভাবে রাশিয়ার বোমারু বিমান ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।

ইরানি কর্তৃপক্ষ ড্রোনবাহী এসব ট্রাক খুঁজে বের করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে কিছু অনুসন্ধান দল গঠন করে। এসব দল বিশেষ করে রাতে তল্লাশি চালাত। তারা সন্দেহভাজন ট্রাকের গতিবিধি নজরে রাখতে কখনো মোটরসাইকেল, আবার কখনো গাড়িতে করে টহল দিত।

সশস্ত্র ও মুখোশধারী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তেহরানজুড়ে এবং সারা দেশে অসংখ্য রাস্তায় ব্যারিকেড ও তল্লাশিচৌকি স্থাপন করেন। তাঁরা সাধারণত কার্গো বেড ঢেকে রাখা পিকআপ ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি চালান।

ইসরায়েলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতির পর তাঁদের গুপ্তচরেরা ইরানের ভেতরে ড্রোন তৈরির ছোট ছোট কারখানা বা উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে।

তেহরানের দক্ষিণে শাহার-এ-রেই এলাকায় এমন একটি কারখানার খোঁজ পাওয়া যায়। সেখানে তিনতলা একটি ভবনজুড়ে ড্রোন, হাতে তৈরি বোমা ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উৎপাদন করা হতো বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন একই রকম আরেকটি কার্যক্রমের চিত্র দেখায়। সেখানে ছয়জন ইরানি ‘মোসাদ সদস্য’ কোয়াডকপ্টার তৈরি করছিলেন। এসব কোয়াডকপ্টারের নিচে ছোট ছোট বোমা লাগানো ছিল। তাঁরা টাইমারসহ বোমা, গ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্রও তৈরি করছিলেন। বিস্ফোরক বসানো যানবাহনেরও কিছু খবর পাওয়া গেছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখা যায়, হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় গ্রেপ্তার কয়েক সন্দেহভাজন স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন। বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেন মোহসেন-এজেই ও তেহরানের সরকারি কৌঁসুলি আলী সালেহি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নাম না জানা এক সন্দেহভাজনকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। ওই ব্যক্তি বলেন, মোসাদের জন্য তিনি বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেছেন।

‘আমরা সবাই নজরদারির আওতায়’

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াল জামির গত বুধবার এক ভিডিওতে বলেন, ‘কমান্ডো বাহিনী শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে গোপনে কার্যক্রম চালিয়েছে। তাদের এমন কার্যক্রম আমাদের স্বাধীনভাবে অভিযান চালাতে সহায়তা করেছে।’ তবে তিনি কি প্রথম রাতে শুরু হওয়া অভিযানে দেখা যাওয়া কমান্ডোদের কথা বলেছেন, নাকি অন্য সম্ভাব্য অভিযানের কথা বলেছেন, তা স্পষ্ট করেননি।

ইরানের কর্মকর্তারা দেশটির ভেতর থেকে পরিচালিত কথিত ইসরায়েলি কমান্ডো অভিযানের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে কর্তৃপক্ষ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে ইরানজুড়ে ডজনের বেশি লোককে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অভিযুক্ত অন্তত ছয়জনের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হয়েছে।

ইসরায়েল ১৩ জুন ভোররাতে তেহরানে যে ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তাতে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণুবিজ্ঞানী নিহত হন। আর এ হামলার সফলতার পেছনে ইরানের অভ্যন্তরে মোসাদের গোয়েন্দা অভিযানগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইরান যাতে বড় কোনো প্রতিশোধ নিতে না পারে, সে জন্য দেশটির কিছু আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অচল করে দেওয়া হয়। আঘাত হানা হয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলোতে।

ইসরায়েলপন্থী হ্যাকিং গ্রুপগুলোও ইরানে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালায়। এতে ইরানের সবচেয়ে বড় দুটি ব্যাংক ও ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে।

চলতি সপ্তাহে ইরানি গণমাধ্যমে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মহাকাশ বিভাগের প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ এক বক্তব্যে বলছেন, ‘মোসাদ মুঠোফোন ও অন্যান্য যোগাযোগ যন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের ওপর নজরদারি করছে।’

পরে হাজিজাদেহ তেহরান বা এর আশপাশের কোনো এক বাংকারে শীর্ষস্থানীয় মহাকাশ কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক চলাকালে নিহত হন। তিনি ওই বক্তব্যে অন্যদের সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানান এবং সবাইকে মুঠোফোন বন্ধ রাখতে ও নিয়মিতভাবে ফোন বদলাতে বলেন।

ইরান সরকার এক পর্যায়ে দেশের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। এতে প্রায় ৯৭ শতাংশ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস।

ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন
ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি: রয়টার্স

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কোনো দল নিষিদ্ধ করা সমাধান নয়

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর  বাংলাদেশে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয় তা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মাত্র চার বছরেই বিলিন হয়ে যায়। গত বছরও বাংলাদেশে এক গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে। যাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন শান্তিতে নোবেলজয়ী বাংলাদেশি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। যার প্রায় এক বছর হয়ে গেছে, তবে এখনও ভারসাম্য প্রচেষ্টার নিক্তিতে ঝুলে আছে বাংলাদেশ।

সত্যি কথা বলতে এক্ষেত্রে ড. ইউনূস এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা দুঃশাসনে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। দুর্নীতির বিস্তার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সরকার বাহিনী বিরোধীদলগুলোকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। এক সময়ের চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধির পর বাংলাদেশ অর্থনীতির গতি হারাতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে, দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরুণ বেকার হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল বিদ্রোহ করে দেশের জনগণ । আগের তুলনায় নতুন সরকার কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। তারা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করবে তারা। অর্থনীতির গতি মন্থর হলেও স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে ঋণ দিতে শুরু করেছে।

তবে সরকারের অন্যান্য অনেক পদক্ষেপকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন স্পষ্টভাবে চীনমুখী অবস্থানে। এর পেছনে রয়েছে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও সস্তায় অস্ত্রের আমদানি। এই কূটনৈতিক কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে চীনের দিকে ঝোঁকার পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোয় দিল্লিও ঢাকার ওপর নাখোশ। গত গ্রীষ্ম পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নতির পথে থাকলেও সম্প্রতি তা অবনতির দিকে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্স-শিপমেন্ট চুক্তি বাতিল করেছে, যা বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য লাভজনক ছিল। পাশাপাশি (কথিত) বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক সীমান্তে ঠেলে দিতে শুরু করেছে দিল্লি। এছাড়া পানিবণ্টন চুক্তি পর্যালোচনার দাবিও জানিয়েছে প্রতিবেশী এই দেশ।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিকে পুনর্গঠন করাই ড. ইউনূসের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর অর্থ হচ্ছে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে নির্বাচনের নতুন কলা-কানুনসহ মৌলিক সংস্কারগুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছানো। তবে বাস্তবতা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো অধৈর্য হয়ে পড়ছে। সড়কে সড়কে ছড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক বিরোধ।  জুনের মাঝামাঝি সময়ে একদল উৎসুক জনতা সাবেক এক নির্বাচন কমিশনারের ওপর আক্রমণ করে।  ২০১৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে সহায়তা করার অভিযোগে তার ওপর মবলিঞ্চিং করা হয়।

চলতি বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্ভবত বড় ধরনের ভুল করেছে: তারা দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলত দলটি আগামী  নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু করেছে আদালত। যা তারা সঠিকভাবেই করছেন। তবে এতদিন যে আশা ছিল- আওয়ামী লীগের কর্মীরা রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে নতুন করে ফিরে আসার আন্দলোন গড়ে তুলবে সে সুযোগ হারিয়েছে তারা।

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি সংশোধনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, যা আইনগত দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। এতে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রচলিত কূটনৈতিক কৌশল ও অস্থিরতার আভাস পাওয়া যায়। কেননা এর মাধ্যমেই বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশকে পুনরায় সেই প্রতিশোধ যুদ্ধে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিরোধী দলগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।  

বাংলাদেশের নেতাদের উচিত আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আরো ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করা।  অনেকেই হয়তো এই ধারণার সঙ্গে এক মত হবেন না।  তবে দেশের সবথেকে পুরনো এই দলের সবাই নৈতিকভাবে কলঙ্কিত নয়। আওয়ামী লীগ এখনও ব্যাপক সমর্থন পায়, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে। দীর্ঘ বছর ধরে বিতর্কিত ও অবৈধ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর, এই ভোটাররাও নিজের পছন্দের প্রার্থী বা দলকে ভোট দেয়ার অধিকার রাখে।

আওয়ামী লীগ স্বাধীনভাবে প্রচারণা চালালেও হয়তো জয়ী হবে না। তবে সংসদে তাদের উপস্থিতি বিরোধী শিবিরকে শক্তিশালী করতে পারে, যা বিজয়ীদের সতর্ক রাখবে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রতিশোধ নয়,  প্রয়োজন পুনর্মিলন।

- দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন



ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী

ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিমান হামলা চালানোর ৭২ ঘণ্টা না যেতেই দেশটির ফর্দো ও নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএন মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিআইএ) একটি প্রাথমিক গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদন ফাঁস করে জানিয়েছে, হামলায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা মাঝারি থেকে গুরুতর হতে পারে। যদিও এটি প্রাথমিক মূল্যায়ন হওয়ায় প্রতিবেদনটিতে ‘কম আত্মবিশ্বাস’-এর কথা বলা হয়।

অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওই কেন্দ্রগুলো ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে।

এ মতভেদ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা অন্তত কয়েক বছরের জন্য হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নষ্ট করতে পেরেছে কি না, সেই বিষয়টি।

ইসরায়েল বহু বছর ধরে প্রমাণ ছাড়াই দাবি করে আসছে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির পরিকল্পনা করছে। কিন্তু ইরান বরাবরই বলে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। চলতি বছর মার্চে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, তেহরান পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে না। তবে জুনের শুরুতে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষয়ক্ষতি এবং ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় কি না, সেসব নিয়ে সাংঘর্ষিক দাবি ও মূল্যায়নের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—তেহরান বলছে, তারা পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে পিছু হটবে না।

তাহলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী? এ পর্যন্ত কতটা ক্ষতি হয়েছে? যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি ইরানকে আবারও কর্মসূচিটি শুরু করতে দেবে? আর ২০১৫ সালের যে চুক্তিটি ট্রাম্প বাতিল করার আগপর্যন্ত কার্যকর ছিল, সেটি কি পুনরুজ্জীবিত হতে পারে? উঠে আসছে এমন নানা প্রশ্ন।

ইরান কী চায়

ইরানে মার্কিন হামলার পর প্রথমবার প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি বলেছেন, হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ‘গুরুতর কিছু হয়নি’।

তেহরান থেকে আল–জাজিরার সংবাদদাতা রেসুল সেরদার জানান, খামেনি বলেন, ‘বেশির ভাগ পারমাণবিক স্থাপনাই অক্ষত রয়েছে এবং ইরান তার কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।’

ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি গত মঙ্গলবার বলেন, ‘(পারমাণবিক কর্মসূচি) পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি আগেই নেওয়া হয়েছিল এবং আমাদের পরিকল্পনা হলো, উৎপাদন বা সেবায় যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে।’

নাতাঞ্জ ও ফর্দো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র পুরোপুরি ধ্বংস না হলেও, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জুন শুরু করা একাধিক হামলায় ইসরায়েল ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানীকেও হত্যা করেছে।

তবে, ডিআইএর প্রাথমিক প্রতিবেদনকে ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্ব না দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাতে বলা হয়, এ হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে পড়েছে মাত্র। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান আগেই ওই সব কেন্দ্র থেকে ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলেছিল। একই দাবি করেছেন ইরানি কর্মকর্তারাও।

জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ অভিযোগ করেছে, ইরান ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে। এই মাত্রা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ থেকে বেশি দূরে নয়।

গত বুধবার ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কি মনে করেন, হামলার আগে ইরান ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছিল? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, সবকিছু ওখানেই ছিল, ওরা সরাতে পারেনি।’ পরে আবার জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এত দ্রুত ও জোরালোভাবে আঘাত করেছি যে সরানোর সময়ই পায়নি।’

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার সুযোগ না থাকায় কেউই এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছে না।

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ)’ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ বুধবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সেগুলো পুনর্গঠনে কয়েক বছর লেগে যাবে।’ অথচ এর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিআইএর প্রাথমিক মূল্যায়নে ভিন্ন সময়রেখা তুলে ধরা হয়েছে।

তবে মনে রাখা জরুরি, ২০০৩ সালে ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে কি না, তা নিয়েও ডিআইএ ও সিআইএর মূল্যায়ন এক রকম ছিল না।

ডিআইএ জাতিসংঘের সঙ্গে একমত হয়ে বলেছিল, পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, সাদ্দামের কাছে এমন অস্ত্র নেই। অন্যদিকে, সিআইএ এমন গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক আক্রমণের অবস্থানকে সমর্থন করেছিল। এ তথ্য পরে ভুল প্রমাণিত হয়। সেই সময় সিআইএকে ডিআইএর চেয়ে রাজনৈতিকভাবে আরও নমনীয় মনে হয়েছিল।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে, ট্রাম্পের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডও প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করেছেন।

সামাজিকমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) গ্যাবার্ড লিখেছেন, ‘ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরান যদি পুনর্নির্মাণে আগ্রহী হয়, তাহলে তাদের নাতাঞ্জ, ফর্দো ও ইসফাহানের সব স্থাপনা একেবারে নতুন করে গড়তে হবে। তাতে সম্ভবত কয়েক বছর লাগবে।’

তবে গ্যাবার্ড ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এর আগেও নিজের বক্তব্য পাল্টেছেন।

গত মার্চে মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দা সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সামনে গ্যাবার্ড তাঁর সাক্ষ্যে বলেছিলেন, ‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ করছে না এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ২০০৩ সালে যে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন, সেটি আবার চালুর অনুমোদন দেননি।’

পরে ২০ জুন ট্রাম্পের কাছে গ্যাবার্ডের এ মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি (গ্যাবার্ড) ভুল বলছেন।’

সেই দিনই গ্যাবার্ড পোস্ট করে বলেন, ‘অসৎ গণমাধ্যম’ তাঁর বক্তব্য বিকৃত করেছে এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে ইরান যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তারা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম।’

তবে গ্যাবার্ডের এ ব্যাখ্যা তাঁর আগের বক্তব্যের বিরোধিতা করে না। কেননা, তিনি বলেছিলেন, ইরান বর্তমানে সক্রিয়ভাবে বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না।

একটি ফরাসি রেডিও নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে কি না, জানতে চাইলে, আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, ‘আমি মনে করি ‘‘ধ্বংস’’ শব্দটা বাড়াবাড়ি হবে। কিন্তু এটা যে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিশ্চিত।’

গত বুধবার ইসরায়েলের পারমাণবিক শক্তি কমিশন সিআইএর সঙ্গে একমত প্রকাশ করে জানায়, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ অকার্যকর’ হয়ে গেছে এবং ‘ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টাকে বহু বছরের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে’।

ওই দিনই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরানের ইসফাহানে স্থাপনার উপরিভাগের ধ্বংসই প্রমাণ করে যে ইরান আর পারমাণবিক বোমা বানাতে পারবে না। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘কনভার্সন ফ্যাসিলিটি ছাড়া পারমাণবিক অস্ত্র বানানো যায় না। আমরা তো খুঁজেই পাচ্ছি না, সেটা এখন কোথায়, আগের মানচিত্রে যে জায়গায় ছিল, সেখানে তা আর নেই।’

২০১৫ সালের চুক্তি কি আবার কার্যকর করা সম্ভব

২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সই হওয়া ‘যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা’ বা জেসিপিওএ ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে একমাত্র সফল আন্তর্জাতিক চুক্তি।

এ চুক্তির আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারত, তবে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রা ৩ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হতো। ইসরায়েলের অনুরোধে ২০১৮ সালে ট্রাম্প এ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং পরের বছর ইরানও চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে। এর আগপর্যন্ত এটি কার্যকর ছিল।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ওবামার করা জেসিপিওএ-তে আর ফিরবেন না। কিন্তু এমন একটি নতুন চুক্তি করতে পারেন, যা মূলত জেসিপিওএর মতোই হবে। মূল প্রশ্ন হলো, এবার ইসরায়েল কি এমন চুক্তির পক্ষে থাকবে? আর ইরানকে কি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তার অধিকার মেনে অন্তত শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে?

অবশ্য, বুধবার দ্য হেগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্পের মন্তব্যে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ‘আমরা হয়তো কোনো চুক্তি করব। জানি না। আমি মনে করি, সেটা ততটা জরুরি নয়’, বলেন তিনি।

জেসিপিওএ ধরনের যেকোনো চুক্তির জন্য ইরানকে আবার আইএইএর পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার দিতে হবে; যাতে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেন—তেহরান পারমাণবিক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি মানছে।

মঙ্গলবার আইএইএ জানায়, (ইসরায়েল–ইরান) সংঘাতকালীন সময়েও তাদের পরিদর্শকেরা ইরানে অবস্থান করছিলেন এবং দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শন ও পারমাণবিক উপাদানের মজুদ যাচাই করার জন্য আবার কাজ শুরু করতে প্রস্তুত।

এরই মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিল পার্লামেন্টে গৃহীত এক বিল অনুমোদন করেছে। বিলে আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করার কথা বলা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, বর্তমানে তেহরান জাতিসংঘের কোনো তদারকি গ্রহণে আগ্রহী নয়।

ইরান যদি আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে

‘ইরান যদি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে চায়, তারা সেটা চালাতে পারে; বিশ্বের অনেক দেশ যেমনটা চালায়। এর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান আমদানি করলেই হয়’, গত এপ্রিল মাসে পডকাস্ট ‘অনেস্টলি’-তে সাংবাদিক বারি ওয়েইসকে বলেছিলেন মার্কো রুবিও।

‘কিন্তু তারা যদি নিজেরাই সমৃদ্ধকরণে (ইউরেনিয়াম) অনড় থাকে, তাহলে তারা হবে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যাদের কোনো অস্ত্র কর্মসূচি নেই, কিন্তু নিজেরাই সমৃদ্ধকরণ করছে—যা সত্যিই সমস্যার’, বলেন রুবিও।

যুক্তরাজ্যের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিষয়ক ইতিহাসবিদ আলী আনসারি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের ভেতর থেকেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের আহ্বান উঠেছে।’

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানি কর্মকর্তারা যেসব জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন, বিশেষত গতকাল বৃহস্পতিবার খামেনি যা বলেছেন—সেসব শুনে মনে হচ্ছে, তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পরিত্যাগ করার মতো অবস্থায় নেই।

গত কয়েক দিনে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি চান, ইরান পুরোপুরি পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করুক। মঙ্গলবার নিজ মালিকানাধীন সামাজিকমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি পোস্ট করেন, ‘ইরান আর কখনোই তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুনর্গঠন করতে পারবে না!’

বুধবার ওই অবস্থানে আরও জোর দেন ট্রাম্প। ‘ইরান খুব সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। তাদের রয়েছে দারুণ তেলসম্পদ, তারা অনেক কিছু করতে পারে। আমি মনে করি না, তারা পারমাণবিক কর্মসূচিতে ফিরবে। ওদের সেই পথ শেষ হয়ে গেছে’, দ্য হেগে ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিন সাংবাদিকদের বলেন তিনি।

এরপর ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরান পারমাণবিক বোমা না বানালেও যুক্তরাষ্ট্র আবার তাদের স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। ‘যদি ইরান পারমাণবিক পথে ফেরে, আমরা তো আছি—তখন কিছু একটা করতে হবে’, বলেন তিনি। আর যদি তিনি না করেন, তাহলে কেউ একজন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেবে বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।

বিশ্লেষকেরা বলেন, এই ‘কেউ একজন’ ইসরায়েল; যারা বহুদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে চাচ্ছে।

ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে আবার যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে কি না। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, একদিন তা হতে পারে। এমনকি খুব শিগগির শুরু হয়ে যেতে পারে।’

- আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে ও পরে স্যাটেলাইটে তোলা ইরানের ফর্দো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার দৃশ্য। কোম, ইরান, ২০ জুন ২০২৫ (বাঁয়ের ছবি) ও ২২ জুন ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে ও পরে স্যাটেলাইটে তোলা ইরানের ফর্দো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার দৃশ্য। কোম, ইরান, ২০ জুন ২০২৫ (বাঁয়ের ছবি) ও ২২ জুন ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ইরানকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের গোপন প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় গোপনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং মার্কিনদের কথামতো চালাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন নানাভাবে চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে চারটি সূত্র সিএনএনকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে বেসামরিক-শক্তি উৎপাদনকারী পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহায়তা করার জন্য ৩০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ প্রদান, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিশ্বব্যাপী ইরানের ফ্রিজ হওয়া তহবিলের বিলিয়ন ডলার মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করেছে। আর এ সবই করা হচ্ছে অত্যন্ত গোপনে।

যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের মূল খেলোয়াড়রা গত দুই সপ্তাহে ইরান ও ইসরায়েলে সামরিক হামলার মধ্যেও পর্দার আড়ালে ইরানিদের সঙ্গে কথা বলেছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এই সপ্তাহেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। এগুলো প্রাথমিক ও ক্রমবর্ধমান। তবে একটি অ-আলোচনাযোগ্য শর্ত বহাল রয়েছে। তা হলো, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্য হতে হবে। যদিও ইরান ধারাবাহিকভাবে বলেছে, তাদের প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করা হচ্ছে তবুও চাপ প্রয়োগকারীরা এ শর্তে ছাড় দিতে নারাজ। দুটি সূত্র সিএনএনকে অন্তত একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব সরবরাহ করেছে। এতে ইরানের জন্য বেশ কয়েকটি প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপসাগরীয় অংশীদারদের মধ্যে একটি গোপন বৈঠকে কিছু বিবরণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক হামলার আগের দিন ছিল কয়েক ঘণ্টার সেই বৈঠক সম্পর্কে জানা দুটি সূত্র সিএনএনকে এসব নিশ্চিত করেছে।

আলোচিত শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইরানের একটি নতুন অ-সমৃদ্ধকরণ পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য আনুমানিক ২০-৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এ কেন্দ্র বেসামরিক শক্তি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং প্রস্তাব সম্পর্কে জানা সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে, অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবে না; বরং আরব অংশীদাররা এই বিল পরিশোধ করার পথ খোঁজা হচ্ছে। ইরানের পারমাণবিক শক্তি সুবিধাগুলোতে বিনিয়োগের বিষয়টি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পারমাণবিক আলোচনার পূর্ববর্তী রাউন্ডগুলোতেও আলোচিত হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনাগুলোর নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক। পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে কারও না কারও অর্থ প্রদান করতে হবে। তবে আমরা সেই প্রতিশ্রুতি দেব না।

অন্যান্য প্রণোদনার মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা অপসারণের সম্ভাবনা এবং ইরানকে ৬ বিলিয়ন ডলার ফ্রিজ সম্পদ ব্যবহার করতে দেওয়া, যা বর্তমানে বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে এবং তারা বহু বছর তা অবাধে ব্যবহার করতে পারছে না।

সূত্র সিএনএনকে বলেছে, বিভিন্ন মানুষের দ্বারা অনেক ধারণা উত্থাপিত হচ্ছে এবং তাদের অনেকেই সৃজনশীল হওয়ার চেষ্টা করছে। এখানে কী ঘটবে, তা সম্পূর্ণরূপে অনিশ্চিত। ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে প্রথম পাঁচ রাউন্ডের আলোচনা সম্পর্কে জানা একটি পৃথক সূত্রও একই তথ্য দিয়েছে।

উইটকফ বুধবার সিএনবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি শান্তি চুক্তি চায়। সব প্রস্তাব ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রাপ্তি থেকে বিরত রাখার জন্য নকশা করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে , ইরান শান্তিপূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি চালু রাখতে পারে। তবে সেই কর্মসূচির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না। পরিবর্তে ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্বল্প মাত্রায় আমদানি করতে পারবে। কতটুকু খরচ হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষকদের নিয়মিত জানাতে হবে।

উইটকফ বলেন, এখন ইরানের সঙ্গে আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা কীভাবে ইরানকে উন্নত বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালু রাখার সুযোগ দেব, সেটিই মুখ্য। 

খামেনি ও ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
খামেনি ও ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

ইসরায়েল নিজেই পরমাণু অস্ত্র বানাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ধোঁকা দিয়েছিল

‘স্মরণ রাখবেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারবে না। খুব সহজ কথা। এতে আর গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। তাদের হাতে এই অস্ত্র থাকা চলবে না’—ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ১৭ জুন ২০২৫।

‘ইরানের নেতাদের বোঝা উচিত, আমি কোনোভাবেই “দমননীতি” মেনে চলি না। আমার নীতি হলো, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ইরানকে প্রতিরোধ করা’—বারাক ওবামা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ৪ মার্চ ২০১২।

‘আমি বিশ্বাস করি, তারা (ইরান) পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ও জ্ঞান অর্জন করতে চায়। আর আমি নিশ্চিত, পুরো বিশ্বের স্বার্থে তাদের এটা করতে না দেওয়া জরুরি’—প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, ১৭ অক্টোবর ২০০৭

২০০২ সালে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্টরা দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করে যাচ্ছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।

ইরান ১৯৭০ সাল থেকে পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য। এই চুক্তির শর্ত হলো, অস্ত্র না থাকা দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অধীনে থাকবে।

তবে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের অনেক আগেই ইরানের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি পারমাণবিক শক্তি অর্জনের আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র তখনই সন্দেহ করেছিল, তিনি গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইছেন।

রেজা পাহলভির পতনের মাত্র পাঁচ বছর পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র গোপনে পারমাণবিক জ্বালানি ও অস্ত্র তৈরির উপাদান প্রস্তুতের চেষ্টা শুরু করে।

এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ ‘লুকোচুরি’র খেলা—আলোচনা, চুক্তি ও পর্যবেক্ষণ। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়, যাতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার স্থায়ী প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বাড়তি নজরদারিতে রাজি হয়।

এই চুক্তি নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল (বিশেষ করে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে)। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন এবং বলেন, তিনি আরও ভালো চুক্তি করবেন। কিন্তু সেই চুক্তি আর হয়নি।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে সেই ট্রাম্পই আবার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। কার্যত ওই হামলার মাধ্যমে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করেছিলেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনিই আবার যুদ্ধবিরতি বলবৎ করতে ভূমিকা নেন।

ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সত্যিই প্রতারণার পথ অনুসরণ করে থাকে, তবে সেই পথের প্রথম এবং আসল পথপ্রদর্শক ছিল ইসরায়েল নিজেই।

ইসরায়েলের অস্ত্রভান্ডার

ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস-এর গবেষকেরা মনে করেন, ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে। এগুলো বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সম্ভবত সমুদ্রপথেও বহনযোগ্য।

ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি ভাবতে শুরু করেন, তাঁর দেশের নিরাপত্তার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র অপরিহার্য।

তখন থেকেই ইসরায়েল গোপনে পারমাণবিক প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে থাকে। এ সময়ে তারা বহুবার যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশকে বিভ্রান্ত করেছিল।

১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল সংকটের পর ফ্রান্স ইসরায়েলকে পরমাণু কর্মসূচিতে সহায়তা করতে চায়। গোপনে তারা ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করতে সহায়তা করে।

ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তির আওতায় ডিমোনায় একটি ভূগর্ভস্থ রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্টও গড়ে তোলা হয়। অবশ্য এই পারমাণবিক স্থাপনার কথা কোনো নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়নি।

ফরাসিরা পরে প্রকল্পটি চালু রাখবে নাকি বন্ধ করে দেবে, সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়। ইসরায়েল তখন তাদের আশ্বস্ত করে, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর ইচ্ছা তাদের নেই। ফ্রান্সও আর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের জন্য চাপ না দিয়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে সাহায্য করে।

এদিকে নরওয়ে ভারী পানি (হেভি ওয়াটার) সরবরাহ করে, যা পারমাণবিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কারণ, ইসরায়েল তাদের জানিয়েছিল, তাদের পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ।

ধোঁকাবাজি

১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা ডিমোনার গোপন পরমাণু স্থাপনাটি আবিষ্কার করেন। ইসরায়েল তখন মার্কিন দূতাবাসকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বলেছিল, এটা শুধু একটি টেক্সটাইল কারখানা।

পরে যখন ইসরায়েলের মিথ্যা ধরা পড়ে যায়, তখন তারা আবার বলে, এটা ধাতুবিদ্যার গবেষণাগার। সেখানে অস্ত্র তৈরির রাসায়নিক প্ল্যান্ট নেই, যা দিয়ে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা যায়।

১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে বেন-গুরিয়ন ইসরায়েলের পার্লামেন্টে বলেন, এটা ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি গবেষণা চুল্লি। এই পরমাণু কর্মসূচি একমাত্র শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হবে।

নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি পরমাণু অস্ত্রের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ইসরায়েলের পরমাণু কর্মসূচি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেন।

১৯৬১ সালে এক মার্কিন পরিদর্শক দল জানায়, এখানে পরমাণু অস্ত্র তৈরির মতো কিছু নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এরপরও দাবি থাকে, পরিদর্শন চলতে থাকুক, যাতে আরব দেশগুলো বিশেষ করে মিসরকে আশস্ত করা যায় যে ইসরায়েলের কোনো গোপন পরমাণু বোমা বানানোর কর্মসূচি নেই।

১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী লেভি ইশকোলকে কড়া বার্তা পাঠান, ‘ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না পেলে আমাদের সম্পর্ক গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

উত্তরে ইশকোল বলেন, পরমাণু স্থাপনাটি শুধু শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৬৪ সালে একটি মার্কিন দল আবার ইসরায়েলের পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শন করে। তবে তারা প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের কোনো স্থাপনা খুঁজে পায়নি।

মার্কিন প্রতিনিধিদলটি বুঝতেই পারেনি, আসলে ভূগর্ভে ইসরায়েল গোপনে প্লুটোনিয়াম প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট বানিয়ে ফেলেছে আগেই। ইসরায়েল লিফটের চারপাশে এমনভাবে দেয়াল তৈরি করেছে, যাতে পরিদর্শকেরা বুঝতেই পারেননি, সেই লিফট দিয়ে পরমাণু স্থাপনায় যাওয়া যায়।

ভুয়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ

১৯৯১ সালে সাংবাদিক সেমুর হার্শের বই ‘দ্য স্যামসন অপশন’ বইয়ে ইসরায়েলের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। ডিমোনায় একটি ভুয়া নিয়ন্ত্রণকক্ষ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে ভুয়া বোর্ড ও কম্পিউটারচালিত পরিমাপ যন্ত্র বসানো হয়েছিল, যাতে মনে হয়, সেখানে ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন চুল্লি (যেমনটা ইসরায়েল দাবি করেছিল) পুরো শক্তিতে চলছে।

ইসরায়েলি কারিগরেরা এই ভুয়া কক্ষে দীর্ঘদিন ধরে মহড়া চালিয়েছিলেন, যাতে মার্কিন পরিদর্শকেরা এলেও যেন তাঁদের চোখে ধুলা দেওয়া যায়।

এই ভুয়া ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল, মার্কিন পরিদর্শকদের বুঝিয়ে দেওয়া যে সেখানে কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট নেই। এমনকি সেখানে এমন কিছু তৈরি করাও সম্ভব নয়।

নিক্সন-গোল্ডা মেয়ার গোপন চুক্তি

১৯৬৮ সালে সিআইএ নিশ্চিত হয়, ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে। তখনই মাত্র পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি) তৈরি হচ্ছিল। পরে এতে জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর অনেকে স্বাক্ষর করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বুঝে গেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইসরায়েলকে তার পরমাণু কর্মসূচি থেকে এখন ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব নয়।

১৯৬৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার একটি গোপন চুক্তি করেন।

এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল তার পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালাবে না বা পরমাণু অস্ত্র আছে, এমনটা স্বীকার করবে না। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ডিমোনা পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শন করবে না এবং ইসরায়েলকে এনপিটিতে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের এক নোটে বলা হয়েছে, নিক্সন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারকে বলেছিলেন, ইসরায়েল যেন মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রকাশ্যে আনার মতো কোনো কাণ্ড না করে।

১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উপগ্রহ (যার নাম ভেলা ৬৯১১) তৈরি করে। ১৯৬৩ সালের আংশিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তি (পিটিবিটি) মানা হচ্ছে কি না, তা নজরদারির জন্য তৈরি করা হয়েছিল এই স্যাটেলাইট।

ভেলা ৬৯১১ স্যাটেলাইটে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলের কাছে একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক বিস্ফোরণের বিষয়টি ধরা পড়ে।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এবং অন্য কর্মকর্তারা সন্দেহ করেন, এটা ইসরায়েলেরই পারমাণবিক পরীক্ষা হতে পারে। যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে, তবে সেটা নিক্সন-মেয়ার গোপন চুক্তির লঙ্ঘন হতো।

তবে কংগ্রেসের একজন সহকারী লিওনার্ড ওয়েইস ২০১১ সালে লেখেন, কার্টার ও পরে রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসন—দুই প্রশাসনই ইসরায়েলকে ইঙ্গিত করা গোয়েন্দা তথ্যগুলো উপেক্ষা করে বা গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছিল।

ওয়েইস বলেন, ‘ভেলা উপগ্রহে ধরা পড়া ঘটনাটি যে ইসরায়েল-দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ পারমাণবিক পরীক্ষা ছিল, তার পক্ষে প্রমাণ এতটাই ভারী ও স্পষ্ট যে অস্বীকার করা কঠিন।’

ওয়েইস আরও বলেন, শীর্ষ গোয়েন্দা ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতামত এবং কার্টারের প্রকাশিত ডায়েরিতেও এই ইঙ্গিত রয়েছে।

তবে ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরীক্ষার কথা স্বীকার করেনি। অনেক বিশেষজ্ঞ এখনো সন্দেহ পোষণ করে থাকেন, আদৌ এমন কোনো পরীক্ষা বা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল কি না।

২০১১ সালে কংগ্রেস সহকারী লিওনার্ড ওয়েইস লেখেন, সব তথ্যই বলছে, এটি ছিল ইসরায়েলের পারমাণবিক পরীক্ষা। তবে ইসরায়েল আজও এটি স্বীকার করেনি।

শেষ কথা

ইসরায়েল তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও শক্তিশালী মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকেও ধোঁকা দিয়েছে। কারণ, তারা বিশ্বাস করে পারমাণবিক বোমা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার বিমা।

কিন্তু ইসরায়েল প্রতারণা করলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষেত্রে নমনীয়। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে কোনো রকম দায়মুক্তি দিতে রাজি নয় তারা। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ক্ষেত্রে যে নমনীয়তা দেখিয়ে আসছে, তার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বহু দশক ধরে তাদের বিরুদ্ধে ‘দ্বিমুখী নীতির’ অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

আজ ইরান এমন একটি অঞ্চলে আছে, যেখানে তার চারপাশ ঘিরে আছে রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।

একসময় যেভাবে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি পারমাণবিক বিমা চাইতেন, তেমনি আজকের ইরান সরকারও তা চায়।

এমনকি ভবিষ্যতে যদি ইরানে শাসক পরিবর্তন হয়, তবু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না, তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চাইবে না। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন দাবি করেছে, ইরানের সব পরমাণু স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে তৈরি ডিমোনা পরমাণু স্থাপনা। ২০০০ সালের ৬ আগস্ট
ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে তৈরি ডিমোনা পরমাণু স্থাপনা। ২০০০ সালের ৬ আগস্ট। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েল-ভারত যেভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে চেয়েছিল by ইমরান মোল্লা

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র সাবেক প্রধান জর্জ টেনেট তাঁকে ‘ওসামা বিন লাদেনের মতোই বিপজ্জনক’ বলে মনে করতেন এবং মোসাদের সাবেক প্রধান শাবতাই শ্যাভিট তাঁকে হত্যা না করার জন্য আফসোস করেছিলেন। তিনি হচ্ছে আব্দুল কাদির খান, পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক। পাকিস্তানের প্রায় ২৫০ মিলিয়ন পাকিস্তানি নাগরিকদের কাছে একজন কিংবদন্তি, একজন জাতীয় বীর। এই পরমাণুবিজ্ঞানী ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮৫ বছর বয়সে ২০২১ সালে মারা যান।

আব্দুল কাদির খান ইরান, লিবিয়া এবং উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহায়তার জন্য একটি গোপন অত্যাধুনিক নেটওয়ার্কও পরিচালনা করেছিলেন। এ দেশগুলোর মধ্যে উত্তর কোরিয়াই শুধু পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে সক্ষম হয়েছে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তারা পাকিস্তানকে পারমাণবিক শক্তি হওয়া থেকে বিরত রাখতে নানা গুপ্তহত্যার চেষ্টা করেছিল এবং হুমকি দিয়েছিল। ইসরায়েল নিজেও পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশ, যদিও তারা তা কখনো স্বীকার করে না।

১৯৮০-এর দশকে ইসরায়েল ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা ফেলার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। যদিও ভারত সরকার সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল করে দেয়।

আব্দুল কাদির খান বিশ্বাস করতেন যে একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে তিনি তাঁর দেশকে বিদেশি হুমকি থেকে বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত থেকে রক্ষা করেছেন। আজ পাকিস্তানি নাগরিকেরা তেমনটিই মনে করে।

‘কেন একটি ইসলামিক বোমা নয়?’

প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরি করে পাকিস্তানও তখন এমন বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৪ সালের ১৮ মে ভারত তার প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা করে, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’। এরপর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো অবিলম্বে তাঁর নিজের দেশের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির শপথ নেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ঘাস বা লতাপাতা খাব, এমনকি ক্ষুধার্ত থাকব, কিন্তু আমরা নিজেদের জন্য একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করব।’

তিনি ঘোষণা করেন, ‘একটি খ্রিষ্টান বোমা আছে, একটি ইহুদি বোমা আছে এবং এখন একটি হিন্দু বোমাও আছে। কেন একটি ইসলামিক বোমা থাকবে না?’

ব্রিটিশ ভারতে জন্মগ্রহণ করা আব্দুল কাদির ১৯৬০ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান নিয়ে ডিগ্রি নেন। এরপর বার্লিনে মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (ধাতু প্রকৌশল বিদ্যা) নিয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামেও পড়াশোনা করেন।

১৯৭৪ সালে আব্দুল কাদির আমস্টারডামের অন্যতম পারমাণবিক জ্বালানি সংস্থা ইউরেনকোর একজন সাবকন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছিলেন। কোম্পানিটি ইউরোপের পারমাণবিক চুল্লির জন্য পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করত।

আব্দুল কাদির ইউরেনকোর গোপন এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন, যেখান ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সেরা সেন্ট্রিফিউজের ব্লুপ্রিন্ট। সেখানে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য সমৃদ্ধ করা হতো এবং তা পারমাণবিক বোমার জ্বালানিতে রূপান্তরিত করা হতো।

১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি নেদারল্যান্ডস থেকে হঠাৎ করে পাকিস্তানে চলে যান। বিষয়টি ছিল অনেকটা রহস্যময়। যাওয়ার সময় তিনি বলে যান, ‘পাকিস্তানে এমন একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যা আমি প্রত্যাখ্যান করতে পারি না।’

পরে আব্দুল কাদিরের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডস থেকে ইউরেনিয়াম সেন্ট্রিফিউজের একটি ব্লুপ্রিন্ট চুরি করার অভিযোগ ওঠে, যা ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র-গ্রেডের জ্বালানিতে পরিণত করতে পারে।

সেই বছরই জুলাই মাসে তিনি পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে একটি গবেষণা পরীক্ষাগার স্থাপন করেন, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করা শুরু হয়।

কয়েক বছর ধরে এই কার্যক্রম চলে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে। ডামি কোম্পানি বানিয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান আমদারি করা হতো। সরকারি ভাষ্য ছিল, নতুন একটি টেক্সটাইল কারখানা তৈরির জন্য এসব উপাদান আমদানি করা হচ্ছে। যদিও উল্লেখযোগ্য প্রমাণ রয়েছে যে পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠান আব্দুল কাদিরের এক কাজকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছিল। তবে এই উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন যিনি, প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো, একমাত্র তিনি ছাড়া সরকারের সবাই ছিল এ ব্যাপারে অন্ধকারে।

এমনকি ভুট্টোর কন্যা, যিনিও পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, প্রয়াত বেনজির ভুট্টোকেও তার জেনারেলরা ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তি আদান-প্রদানের একটি কর্মসূচির বিষয়ে কোনো কিছুই জানাননি। ১৯৮৯ সালে তেহরানে গিয়ে ঘটনাক্রমে এ বিষয়ে জানতে পারেন তিনি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে তাঁরা ‘বিশেষ প্রতিরক্ষা বিষয়’ নিয়ে দুই দেশের চুক্তিটি পুনর্বহাল করতে পারেন কিনা। বেনজির ভুট্টো অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি ঠিক কী বিষয়ে কথা বলছেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব?’

ইরানি প্রেসিডেন্ট তখন উত্তর দিলেন, ‘পারমাণবিক প্রযুক্তি, ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টার, পারমাণবিক প্রযুক্তি’। বেনজির ভুট্টো তখন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।

গুপ্তহত্যার চেষ্টা এবং হুমকি

১৯৭৯ সালের জুনে ‘এইট ডেজ’ ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায়। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচন্ড উত্তেজনা তৈরি হয়। ইসরায়েল তখন ডাচ সরকারের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানায়, যেহেতু আমস্টারডামে ইউরেনকোতে চাকরি করতেন আব্দুল কাদির। ডাচ সরকার তখন এ ব্যাপারে তদন্তের নির্দেশ দেয়।

নেদারল্যান্ডসের একটি আদালত ১৯৮৩ সালে আব্দুল কাদিরকে গুপ্তচরবৃত্তির প্রচেষ্টার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে। যদিও পরবর্তীতে কারিগরি নিয়মের কারণে রায়টি বাতিল হয়ে যায়। অন্যদিকে তখন পাকিস্তানে পারমাণবিক কর্মসূচির কাজ চলতে থাকে। ১৯৮৬ সালের মধ্যে আব্দুল কাদির নিশ্চিত হয়ে গেলেন, পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা তৈরি হয়ে গেছে।

কয়েকজনকে গুপ্তহত্যাসহ পাকিস্তানের এ পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার জন্য জোরালোভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয়। ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয় এর পেছনে যুক্ত ছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।

পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে নিতে আব্দুল কাদিরের সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত থাকা ইউরোপের বিভিন্ন কোম্পানির কর্মকর্তাদের টার্গেট করা হয়। পশ্চিম জার্মানিতে একজনের কাছে একটি লেটার বোমা (খামবন্দী বিস্ফোরক) পাঠানো হয়েছিল, তিনি রক্ষা পেলেও তার কুকুরটি মারা যায়।

আরেকটি বোমা হামলা চালানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের কোম্পানি কোরা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর লক্ষ্য করে, যে কোম্পানিটি পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে কাজ করছিল।

একটি কোম্পানির মালিক সিগফ্রিড শের্টলার সুইস ফেডারেল পুলিশকে বলেছিলেন যে মোসাদ এজেন্টরা তাঁকে এবং তাঁর বিক্রয়কর্মীদের বারবার ফোন করেছিলেন। তিনি বলেন জার্মানিতে ইসরায়েলি দূতাবাসে কর্মরত ডেভিড নামে এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে তাঁকে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে ‘এই ব্যবসা’ বন্ধ করতে বলেছিলেন।

ইতিহাসবিদ আদ্রিয়ান লেভি, ক্যাথরিন স্কট-ক্লার্ক এবং আদ্রিয়ান হ্যানি যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন যে মোসাদ পারমাণবিক বোমা তৈরিতে পাকিস্তানকে আটকাতে ব্যর্থ গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল।

পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সাবেক কর্মকর্তা ফিরোজ খানের মতে, ‘একটি মুসলিম দেশের কাছে পারমাণবিক বোমা থাকবে এটি চাইত না ইসরায়েলিরা।’

ইসরায়েল ও ভারতের অভিযানের পরিকল্পনা

১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে ইসরায়েল ভারতকে প্রস্তাব দেয় যে উভয় দেশ মিলে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির সেই পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়ে ধ্বংস করার।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন।

ইসরায়েলি এফ-১৬ এবং এফ-১৫ বিমান নিয়ে এ হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ভারতের গুজরাটের জামনগর বিমানঘাঁটি থেকে উড়ে গিয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের সেই পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হবে।

কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী পরে পিছিয়ে আসেন এবং পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয়।

১৯৮৭ সালে ইন্দিরার ছেলে রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখনও আরেকবার পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করা হয়। ভারতের তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল কৃষ্ণস্বামী সুন্দরাজি পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করেছিলেন, যাতে ভারত পাকিস্তানের সেই পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা ফেলতে পারে। তিনি সামরিক মহড়ার জন্য পাঁচ লাখ ভারতীয় সেনা ও কয়েক শ ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান পাকিস্তান সীমান্তে পাঠিয়েছিলেন। এটি ছিল পাকিস্তানের জন্য বড় একটা উসকানি।

কিন্তু শত্রুতা উসকে দেওয়ার এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কারণ প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সেনাপ্রধানের সেই পরিকল্পনা সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত ছিলেন না। তিনি তখন পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপই নিয়েছিলেন।

স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহায়তা  

ভারত এবং ইসরায়েলের নানা বিরোধিতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই গোপনে পাকিস্তানকে পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে নিতে সহায়তা করেছিল। চীন পাকিস্তানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, ট্রিটিয়াম এবং এমনকি বিজ্ঞানীও সরবরাহ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র এ কাজে সহায়তা করেছিল কারণ সেসময় পাকিস্তান ছিল সোভিয়েতের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধে তার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।

পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর এর প্রতিক্রিয়ার ফলে ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার পাকিস্তানকে সহায়তা বন্ধ করে দেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে আক্রমণ করার কয়েক মাস পরে সিদ্ধান্তটি বাতিল করেন।

১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে পাকিস্তানের পরমাণুবিজ্ঞানীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেয় এবং পাকিস্তানের এ কর্মসূচির এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলে যায়। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতিবাদে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। পাকিস্তান তখন জানায় যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন বন্ধ করে দেবে।

তবে আব্দুল কাদির পরে প্রকাশ করেন যে তখনও উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উৎপাদন গোপনে চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা।

সপ্তম পারমাণবিক শক্তি


১৯৯৮ সালের ১১ মে ভারত তার পারমাণবিক ওয়ারহেড পরীক্ষা করে। এরপর পাকিস্তান সেই মাসের শেষের দিকে বেলুচিস্তানের মরুভূমিতে সফলভাবে তাদের নিজেদের পরীক্ষা চালায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এর প্রতিক্রিয়া জানায়।

পাকিস্তান বিশ্বের সপ্তম পারমাণবিক শক্তি হয়ে ওঠে। আব্দুল কাদির খান পরিণত হন একজন জাতীয় বীরে। কোথাও গেলে প্রধানমন্ত্রীর মতোই বড় শোভাযাত্রাসহ নিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো। তাঁর প্রহরায় থাকতো সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা। তাঁর নামে রাস্তা, স্কুল এবং একাধিক ক্রিকেট দলের নামকরণ করা হয়। নিজের অর্জনের বিষয়েও কোনো লুকোছাপা করতেন না তিনি। জাতীয় টিভি চ্যানেলে ঘোষণা দিয়েছিলেন এইভাবে, ‘কে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে? আমিই সেটি তৈরি করেছি’, ‘কে মিসাইল তৈরি করেছে? আমি আপনাদের জন্য সেগুলো তৈরি করেছি।’

তবে আব্দুল কাদির আরও একটি বিশেষ দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি একটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন, যার মাধ্যমে ইরান, উত্তর কোরিয়া ও লিবিয়াতে প্রযুক্তি ও নকশা পাঠানো হতো।

তিনি পাকিস্তানি পারমাণবিক কর্মসূচির প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ অর্ডার করতেন এবং তারপর গোপনে অতিরিক্তগুলো বিক্রি করে দিতেন।

১৯৮০-এর দশকে ইরানের সরকার পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউল হকের কাছে পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ে সহায়তা চেয়ে যোগাযোগও করে। যদিও আয়াতুল্লাহ খোমেনি এ বোমা তৈরির বিরোধিতা করতেন, তাঁর যুক্তি ছিল এমন বোমা বানানো ইসলাম অনুসারে নিষিদ্ধ। ১৯৮৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে, পাকিস্তান ইরানকে বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মূল উপাদান সরবরাহ করেছিল।

১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে আব্দুল কাদির খান যখন মধ্যপ্রাচ্যে যেতেন, তখন তাঁর ওপর নজরদারি চালাতো মোসাদ। কিন্তু এই বিজ্ঞানী তখন কী করছেন তা জানতে ব্যর্থ হয় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাটি।

তৎকালীন মোসাদ প্রধান শ্যাভিট পরে বলেছিলেন যে তিনি যদি আব্দুল কাদিরের উদ্দেশ্য বুঝতে পারতেন, তবে তিনি আব্দুল কাদিরকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার কথা বিবেচনা করতেন।

পাকিস্তানের কথা ফাঁস করে দেন গাদ্দাফি

লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০০৩ সালে আব্দুল কাদির খানের গোপনে পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ফাঁস করে দেন। গাদ্দাফি তখন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছিলেন।

গাদ্দাফি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং এমআই সিক্সের কাছে এও প্রকাশ করে দেন যে আব্দুল কাদির খান তাঁর (গাদ্দাফি) সরকারের জন্যও পারমাণবিক স্থাপনা তৈরি করছিলেন। কিছু মুরগির খামারের আড়ালে সেটি নির্মাণ করা হচ্ছিল।

সিআইএ তখন লিবিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো যন্ত্রপাতি জব্দ করে। সুয়েজ খাল দিয়ে সেগুলো লিবিয়ায় পাঠানো হচ্ছিল। ইসলামাবাদের একটি ড্রাই ক্লিনার থেকে আনা ব্যাগের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্লুপ্রিন্টও খুঁজে পান তদন্তকারীরা।

লিবিয়ার এ বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর মার্কিনিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘আপনি যখন এটি ভাবতে যাবেন আপনার কাছে তা অতি আশ্চর্যজনক মনে হবে। এমন কিছু যা আমরা আগে কখনো দেখিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমত আব্দুল কাদির খান প্রয়োজনীয় উপাদানের ছোট ছোট বাজারকে কাজে লাগিয়ে বেশ উন্নত পারমাণবিক অস্ত্রাগার তৈরি করেছিলেন। তারপর তিনি পুরো সরঞ্জাম এমনকি বোমার নকশা পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ কিছু সরকারের কাছে বিক্রি করার উপায় খুঁজে বের করেন।’

দ্বিতীয়বার পাকিস্তানকে বাঁচালেন তিনি

২০০৪ সালে আব্দুল কাদির খান পারমাণবিক বিস্তার নেটওয়ার্ক পরিচালনার কথা স্বীকার করেন এবং বলেন যে তিনি ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করেন। সে বছর ফেব্রুয়ারিতে তিনি টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে দাবি করেন যে তিনি একা এ কাজ করেছেন এবং এ কাজে পাকিস্তান সরকারের কোনো সমর্থন ছিল না।

পাকিস্তান সরকারও তাঁকে এ ব্যাপারে দ্রুত ক্ষমা করে দেয়। প্রেসিডেন্ট মোশাররফ তাঁকে ‘আমার নায়ক’ বলে সম্বোধন করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে তিনি আব্দুল কাদির খানকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইসলামাবাদে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখেন।

পরে আব্দুল কাদির খান বলেন যে, একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ বানিয়ে পাকিস্তানকে তিনি প্রথমবার রক্ষা করেছিলেন এবং আবারও রক্ষা করেছিলেন যখন তিনি সব দায় নিজে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, সব দোষ নিজের ওপর নিয়েছিলেন।

২০০৬ সালে তাঁর প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়েছিল কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। যারা তাঁকে চিনতেন তাঁরা বলেন যে আব্দুল কাদির খান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে তিনি যা করেছেন তা সঠিক ছিল।

তিনি পশ্চিমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং অ-পশ্চিমা, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোকে পারমাণবিক প্রযুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাঁর পরিচিত একজন ব্যক্তি বলেন, ‘তিনি আরও বলেছিলেন যে একটি মুসলিম দেশকে প্রযুক্তি দেওয়া কোনো অপরাধ নয়।’

২০২১ সালে আব্দুল কাদির খান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁকে ‘জাতীয় আইকন’ বলে অভিহিত করে প্রশংসা করেছিলেন। এভাবেই তিনি আজও পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

এই পরমাণুবিজ্ঞানী ২০১৯ সালে ঘোষণা করেছিলেন, ‘জাতি নিশ্চিত থাকতে পারে যে পাকিস্তান এখন একটি নিরাপদ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, কেউ এর দিকে কুনজর দিতে পারবে না।’

* ইমরান মোল্লা, মিডল ইস্ট আই-এর সাংবাদিক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব

আব্দুল কাদির খান সরকারি টিভি চ্যানেলে ঘোষণা করেছিলেন,  ‘কে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে? আমিই সেটি তৈরি করেছি’, ‘কে মিসাইল তৈরি করেছে? আমি আপনাদের জন্য সেগুলো তৈরি করেছি।’
আব্দুল কাদির খান সরকারি টিভি চ্যানেলে ঘোষণা করেছিলেন, ‘কে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে? আমিই সেটি তৈরি করেছি’, ‘কে মিসাইল তৈরি করেছে? আমি আপনাদের জন্য সেগুলো তৈরি করেছি।’ ছবি: এক্স (টুইটার) থেকে নেওয়া

হারেৎজ পত্রিকার বিশ্লেষণ: নাটকীয় যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে ঘিরে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন by আমির তিবোন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন— এমনকি তার কিছু শীর্ষ সহকারীকেও — যখন তিনি গভীর রাতে সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দেন যে ইসরাইল ও ইরান ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ শেষ করতে একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্পের আত্মপ্রশংসামূলক পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পর পর্যন্তও ইসরাইলি সরকার কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। সেই সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বেয়ার শেভা শহরে পড়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে চলছিল।

শেষ পর্যন্ত সকাল নাগাদ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের উত্তরের বাসিন্দাদের আবারও বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাতে বাধ্য করে। এর জবাবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেন, আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) জোরালো প্রতিশোধ নেবে এবং তেহরানের কেন্দ্রে শাসকগোষ্ঠীর টার্গেটগুলোর ওপর শক্তিশালী হামলার প্রতিশ্রুতি দেন।

অতএব, এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এবং ইসরাইল, ইরান ও আঞ্চলিক অন্যান্য শক্তিগুলোর ওপর এর প্রভাব নিয়ে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এখানে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরা হলো, যেগুলো আগামী দিনের বাস্তবতা নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখবে।

১. যুদ্ধবিরতির নির্ভুল শর্তগুলো কী?
আগে আন্তর্জাতিক আলোচনা মানে ছিল অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও আইনজীবী প্রণীত দলিল। সেই যুগ শেষ। যেমন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির চুক্তি সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পই ঘোষণা দেন। এখানেও তাই হয়েছে। ট্রাম্পের বর্ণনা ছিল সরল— উভয় পক্ষ গুলি ছোড়া বন্ধ করবে, যুদ্ধ শেষ। তবে আমরা জানি, তিনি এই পোস্ট দেওয়ার আগে ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলেছে। পাশাপাশি, কাতার সরকার হোয়াইট হাউস ও তেহরানের মধ্যস্থতা করেছে। এই আলোচনার প্রকৃত বিষয়বস্তু এখনো গোপন। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে? কাতার ইরানকে কী দিয়েছে? কোনো পক্ষ কি ভবিষ্যতে নিজেদের আচরণ সীমিত করতে সম্মত হয়েছে? যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ হলে প্রতিশোধের কোনো সীমা নির্ধারণ হয়েছে? ইরান কি তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ছাড় দিয়েছে? এসব প্রশ্ন এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছে। ট্রাম্প বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি চিরদিন চলবে এবং ইসরাইল-ইরান আর কখনো যুদ্ধ করবে না। কিন্তু শর্তাবলী না জেনে তার এই দাবি সন্দেহজনকই বলা চলে।

২. ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ক্ষতি কতটা?
ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করে মূলত এক লক্ষ্য নিয়ে— ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি রুখে দেওয়া। এই উদ্দেশ্যেই ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রথম আঘাত, এরপর পারমাণবিক স্থাপনায় নিখুঁত হামলা এবং পরে ট্রাম্পের নির্দেশে ফরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে বোমাবর্ষণ করা হয়। তবে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে এসব স্থাপনার কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং সেগুলো পুনর্গঠনে ইরানের কত সময় লাগবে। ইরান দাবি করেছে, ফরদোর স্থাপনায় কেবল সামান্য ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়েছে। এই দুই দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তাই সাবধানতা অবলম্বন করাই ভালো। পারমাণবিক পর্যবেক্ষক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতি হয়েছে বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। যদি কোনো উপাদান রক্ষা পেয়ে থাকে এবং ইরান তা ব্যবহার করে পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়, তবে শান্তির সময়সীমা হয়তো খুবই অল্প হবে।

৩. ইরানের ৬০ ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথায়?
এই প্রশ্নটি আগের প্রশ্নের সরাসরি ধারাবাহিকতা। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের আগেই কিছু ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে উভয় পক্ষ এবং ইরানই দাবি করেছে। কিন্তু কতটা সরানো হয়েছে এবং তা কোথায় রাখা হয়েছে — সেটি এখনো অজানা। ইরান রক্ষা পাওয়া ইউরেনিয়ামকে বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইবে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের জন্য এটি একটি কৌশলগত বিপদ। কারণ, যদি স্বীকার করতে হয় যে ইউরেনিয়াম ধ্বংস হয়নি, তাহলে তাদের বিজয় ঘোষণার ভিত্তিই ভেঙে পড়বে। ইসরাইল ইরানের ভেতরে গোয়েন্দা অভিযান চালিয়ে এসব তথ্য জানার চেষ্টা করবে— এমনকি ইউরেনিয়াম জব্দ বা ধ্বংসও করতে পারে। এতে আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

৪. যুদ্ধবিরতিতে ইয়েমেনের হুতিরাও কি অন্তর্ভুক্ত?
১২ দিনের ইসরাইল-ইরান যুদ্ধে হুতিরা বেশিরভাগ সময় নিষ্ক্রিয় ছিল। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ব্যবহার করতে হয়নি, কারণ ইরানই পুরো ইসরাইলের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল।  তবে এখন যুদ্ধ শেষ হলেও গাজার যুদ্ধ চলছেই। তাই প্রশ্ন উঠেছে— ইয়েমেন থেকে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র আসবে কি না। হুতিরা, যদিও ইসরাইলের সবচেয়ে দুর্বল শত্রু, গত ২০ মাসে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছে। এলাত বন্দর বন্ধ করে দিয়েছে, বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়ার পর অনেক বিদেশি বিমান সংস্থা সরে গেছে। তাই হুতিরা এই যুদ্ধবিরতির অংশ কি না— এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতির কথা মাথায় রেখে।

৫. গাজার যুদ্ধের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এটি। ইরান ফ্রন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও, এখন ইসরাইল পুরোপুরি গাজার দিকে মনোযোগ দেবে, যেখানে হামাস এখনো ৫০ জন জিম্মি ধরে রেখেছে— যাদের মধ্যে অন্তত ২০ জন জীবিত বলে ধারণা। ট্রাম্প কি নেতানিয়াহুর কাছ থেকে গাজায় যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন ইরান হামলার অনুমতির বিনিময়ে? ইসরাইল কি অবশেষে তাদের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধ শেষ করতে রাজি হবে?
একটি তত্ত্ব হলো— ইরানের দুর্বলতা দেখে হামাস আরও নমনীয় হবে। কিন্তু জিম্মিদের পরিবারের মধ্যে এক ভয় আছে— তারা আশঙ্কা করছে, আমেরিকা-ইসরাইল মিলে যেভাবে ইরানকে ফাঁকি দিয়েছে, তা দেখে হামাস আরও অবিশ্বাসী হয়ে পড়বে।
মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের জীবন এখন অনিশ্চয়তার মাঝে ঝুলে আছে।

(অনলাইন হারেৎজ থেকে অনুবাদ) 

mzamin

ইসরায়েলি গুপ্তচরদের সঙ্গে আরও যাঁরা ইরানকে দুর্বল করছেন

বহু বছর ধরে ইসরায়েলি গুপ্তচরেরা ইরানের ভেতর যে বিস্তৃত তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটিরই ফলাফল ‘শত্রু দেশের’ ওপর এতটা নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে ইসরায়েল। ১৩ জুন ইরানে আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো এভাবেই নিজেদের গুপ্তচরদের প্রশংসা করে খবর প্রচার করে।

ওই খবরে বলা হয়, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর বড় একটি অংশে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন।

সেদিন ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শীর্ষ কয়েকজন সামরিক কমান্ডার ও পরমাণুবিজ্ঞানী নিহত হন।

ইসরায়েলের হয়ে ইরানে শুধু ইসরায়েলি গোয়েন্দারাই গুপ্তচরের কাজ করছেন না; বরং অনেক ইরানি তাঁদের দোসর হিসেবে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছেন। এমনটাই বলেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজা আত্তার।

হামজা আত্তার লুক্সেমবার্গ থেকে আল–জাজিরাকে বলেন, সম্ভবত ইরানের ভেতর ইসরায়েলের ৩০ থেকে ৪০টি গুপ্তচর সেল সক্রিয় রয়েছে।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘তাঁদের অধিকাংশই সরাসরি ইসরায়েলের গোয়েন্দা নন; বরং তাঁদের স্থানীয় সহযোগী। তাঁরাও ইসরায়েলকে দুর্বল করছেন। এসব দলের মধ্যে কেউ ইসরায়েল থেকে অস্ত্র পাচারের দায়িত্বে থাকেন, কেউ হামলার কাজে নিয়োজিত এবং অন্যরা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেন।’

ইসরায়েলের সঙ্গে সর্বশেষ সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান এখন পর্যন্ত তেল আবিবের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করেছে। তাঁদের মধ্যে ইদ্রিস আলী, আজাদ শোজাই ও রসুল আহমদ নামের তিন ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার সকালে।

ইরানের বিচার বিভাগের এক বিবৃতিতে বলা হয়, হত্যাকাণ্ড চালানোর উদ্দেশ্যে তাঁরা দেশটির ভেতর সরঞ্জাম প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। জায়নবাদী শাসকদের (ইসরায়েল) সহযোগিতা করার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করে বিচার করা হয়। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর উরমিয়ায় ওই তিন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তুরস্কের সীমান্তের কাছে উরমিয়ার অবস্থান।

এ ছাড়া ইসরায়েলের গুপ্তচর নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে গত ১২ দিনে ৭ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ করা হয়েছে।

এই সন্দেহভাজনদের মধ্যে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইরানের খুজেস্তান প্রদেশ থেকে। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে।

ইরানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তৎপরতার ধরন

১৩ জুন ইরানে হামলার পরপরই, ‘নজিরবিহীন’ এ হামলার পেছনে থাকা ইসরায়েলি গোয়েন্দা অভিযানের নানা বিবরণ দেশটির সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা মহলের শীর্ষ সদস্যরা একাধিক সাক্ষাৎকারে কীভাবে এ হামলা পরিচালনায় একসঙ্গে মানব গোয়েন্দা (হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)  ব্যবহার করা হয়েছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব হয়।

১৭ জুন, হামলার কয়েক দিন পর, সংবাদ সংস্থা এপি ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও সামরিক বাহিনীর অন্তত ১০ জন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে, যাঁরা ওই হামলার বিষয়ে জানতেন।

মোসাদের সাবেক গবেষণা পরিচালক সিমা শাইন এপিকে বলেন, ‘এ হামলা মোসাদের বহু বছরের পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের ফল।’

কীভাবে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা পর্যায়ক্রমে তাঁদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের ভেতরে পাচার করতে সক্ষম হয়েছেন, সে বিষয়ে প্রতিবেদনটিতে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। এরপর এসব অস্ত্র ব্যবহার করে কীভাবে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয় সে সম্পর্কেও বর্ণনা দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেলের মাধ্যমে। ইরানের ভেতরে অবস্থানরত ইসরায়েলি এজেন্টদের সরবরাহ করা তথ্য এবং আগের হামলাগুলো থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে লক্ষ্যবস্তু ঠিক করা হয়েছিল।

গত শনিবার ইসরায়েল দাবি করেছে, গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা ইরানের কুদস বাহিনীর দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাঈদ ইজাদি ও বেহনাম শাহরিয়ারির অবস্থান শনাক্ত করে। পরে সুনির্দিষ্টভাবে হামলা চালিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়।

এ হামলার আগে, ১৭ জুন ইসরায়েল ইরানের অন্যতম শীর্ষ সামরিক ব্যক্তিত্ব মেজর জেনারেল আলী শাদমানির অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। শাদমানিকে হত্যার মাত্র চার দিন আগে সুপরিকল্পিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তাঁর পূর্বসূরিকে হত্যা করেছিল ইসরায়েল।

যুক্তরাজ্যের দ্য অবজারভার পত্রিকাকে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ মিরি আইসিন দম্ভভরে বলেছেন, ‘ইসরায়েলি গোয়েন্দা কতটা দুর্ধর্ষ, সেটা মানুষ বুঝতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। কোনো লক্ষ্যবস্তুকে শনাক্ত হওয়া এড়াতে অবশ্যই সব ইলেকট্রনিক যন্ত্র ও ইন্টারনেট সংযোগ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। নতুবা তার অবস্থান ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের কাছে ধরা পড়বেই।’

এই সামরিক গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষই গ্রিডের (ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা) বাইরে নিজেদের রাখতে পারেন না। এভাবে আপনি যে কারও কাছে পৌঁছে যেতে পারেন।’

ইরানও এ কথা খুব ভালো করে জানে। এ কারণেই কয়েক দিন আগে ইরান সরকার দেশটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর কমান্ডারদের ইন্টারনেট সংযুক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার না করতে নির্দেশ দিয়েছিল, যেন ইসরায়েল তাঁদের ফোন হ্যাক করে অবস্থান শনাক্ত করতে না পারে।

এই গুপ্তচরবৃত্তির শেষ কোথায়

ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলার পর দেশটির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১২ দিনে প্রায় ৭০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে ইরান। এ ধরপাকড় আরও বেশ কিছুদিন অব্যাহত থাকবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগও প্রকাশ করতে শুরু করেছে।

ইরানের ভেতর ইসরায়েলের গোয়েন্দা কার্যক্রম নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের সময় থেকেই দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় নজরদারি, গোপনে প্রবেশ, নাশকতা এবং সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে গোয়েন্দা অভিযান চলে আসছে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী লারিজানি দেশটির সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ–কে বলেছিলেন, ‘গত কয়েক বছরে গুপ্তচরবৃত্তি অত্যন্ত গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে।’

এ জন্য আগের কয়েক বছরে কিছু অবহেলার ঘটনা ঘটেছে বলে স্বীকার করেন ইরানের পার্লামেন্টের সাবেক এই স্পিকার ও পারমাণবিক বিষয়ের আলোচক।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে পরিকল্পিত হামলা চালিয়ে হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা করে ইসরায়েল। হানিয়াকে হত্যার কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি তেহরানে যে বাসভবনে ছিলেন, সেখানে বিস্ফোরক যন্ত্র স্থাপন করা হয়। দূর থেকে যার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে।

গত দুই দশকে, ইসরায়েল ইরানের বেশ কয়েকজন পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে। সেই দলে মোহসেন ফখরিজাদেও রয়েছেন। তাঁকে একটি পিকআপ ট্রাকের পেছনে সংযুক্ত রিমোট কন্ট্রোলড বন্দুক দিয়ে হত্যা করা হয়।

শুধু মানব গুপ্তচরবৃত্তি নয়; প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ইরানকে দুর্বল করেছে ইসরায়েল। তারা স্টাক্সনেট নামে একটি কম্পিউটার ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে ২০১০ সালে ইরানের অন্তত ১৪টি পারমাণবিক স্থাপনায় প্রায় ৩০ হাজার কম্পিউটার অকার্যকর করে দিয়েছিল।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

গুপ্তচরবৃত্তি তো গোপন অভিযান, তবে এ নিয়ে কেন এত প্রচার। বিশ্লেষকদের মতে, প্রচার-প্রচারণাও একটি গোয়েন্দা সংস্থার কার্যকর অস্ত্র।

শত্রু দেশের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা অনায়াসে ভেদ করা ও ধ্বংস করা যায়—এটি প্রকাশ্যে আনলে সেই দেশের মনোবল দুর্বল হয়। একই সঙ্গে নিজের দেশের জনগণের কাছে রাজনৈতিক বা কৌশলগতভাবে সুবিধা অর্জন করা যায়।

আত্তার বলেন, ‘এটি মানসিক যুদ্ধও। আমি যদি বারবার বলি, আমি আপনার ঘরে ঢুকেছি, আর আপনি সেটা অস্বীকার করতে থাকেন; এরপর একদিন আমি প্রমাণ দিই যে, আমি সত্যিই ঢুকেছিলাম—তখন আপনাকে দুর্বল দেখাবে।’

ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের উদ্ধার তৎপরতা। তেহরান, ইরান, ১৩ জুন
ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের উদ্ধার তৎপরতা। তেহরান, ইরান, ১৩ জুন। ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানি অভিনেত্রীর কারণেই কি সিনেমা থেকে বাদ পড়তে চলেছেন দিলজিৎ

পাঞ্জাবি গায়ক-অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ বিবাদের মধ্যে ক্রমে জড়িয়ে পড়ছেন। ‘সরদারজি ৩’ ছবির ট্রেলার মুক্তির পর থেকে দিলজিৎকে নিয়ে বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কারণ, এই ছবিতে তিনি পাকিস্তানি অভিনেত্রী হানিয়া আমিরের সঙ্গে অভিনয় করেছেন।

পাকিস্তানি অভিনেত্রীর সঙ্গে অভিনয়ের কারণে চরম বিতর্কের মুখে এই পাঞ্জাবি তারকা। আর এ বিবাদের পানি অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়ে চলেছে। এবার নাকি দিলজিৎ ‘বর্ডার ২’ ছবি থেকে বাদ পড়তে চলেছেন। ফেডারেশন অব ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনে এমপ্লয়িজ (এফডব্লিউআইসিই) ‘বর্ডার ২’ ছবির নির্মাতাদের চিঠি লিখে দিলজিতের কাস্টিং নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার কথা জানিয়েছে।

এফডব্লিউআইসিইর অভিযোগ, ‘সরদারজি ৩’ ছবির নায়িকা হানিয়া আমির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিকবার ভারতবিরোধী পোস্ট করেছেন। ফেডারেশনের বক্তব্য যে পেহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সারা দেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে, আর এ সময়ে একজন ভারতীয় অভিনেতার পাকিস্তানি অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করা মানে রাষ্ট্রীয় চেতনার বিরুদ্ধাচরণ করা। আর তাই এফডব্লিউআইসিই ‘বর্ডার ২’ ছবির অভিনেতা ও প্রযোজক সানি দেওল, টিসিরিজের চেয়ারম্যান ভূষণ কুমারকে আলাদা আলাদা চিঠি লিখে দিলজিৎকে ছবি থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছেন।

 চিত্রনির্মাতা ইমতিয়াজ আলী তাঁর আগামী ছবি দিলজিতের সঙ্গে করতে চলেছেন। ইমতিয়াজের এক প্রেমের ছবিতে তাঁর অভিনয় করার কথা। ফেডারেশন ইমতিয়াজকেও এক চিঠি লিখে দিলজিতের নির্বাচন নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে। এর আগে দিলজিৎকে ইমতিয়াজের ‘অমর সিং চমকিলা’ ছবিতে দেখা গিয়েছিল। ছবিটি দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল।

এফডব্লিউআইসিই সানি দেওলকে চিঠি লিখে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে ‘বর্ডার ২’-এর মতো ছবি দেশভক্তি আর বলিদানের প্রতীক, আর তাই এ ছবিতে দিলজিতের উপস্থিতি দেশের মানুষের কাছে বিভ্রান্তিমূলক বার্তা দেবে। ফেডারেশন সানিকে অনুরোধ করেছে যে এ ছবিতে দিলজিতের সঙ্গে কাজ করা নিয়ে তাঁরা যেন পুনরায় চিন্তাভাবনা করেন। সানিকে ফেডারেশন আরও লিখেছে, যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অভিনেতা পর্দায় ও পর্দার বাইরে মূল্যবোধ তুলে ধরেন, দেশের মঙ্গলের কারণে এবারও সানি সত্যের পাশে দাঁড়াবেন বলে তারা আশাবাদী।

ফেডারেশন টিসিরিজের চেয়ারম্যান ভূষণ কুমারকে চিঠি লিখে ‘বর্ডার ২’ ছবিতে দিলজিতের কাস্টিং নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ‘বর্ডার’-এর এই সিকুয়েল ছবিটি আগামী বছর এপ্রিলে মুক্তি পাওয়ার কথা। তবে এফডব্লিউআইসিইর চিঠি নিয়ে দিলজিৎ ও চিত্রনির্মাতাদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো বিবৃতি আসেনি।

‘সরদারজি ৩’ সিনেমায় দিলজিৎ ও হানিয়া আমির। এক্স থেকে
‘সরদারজি ৩’ সিনেমায় দিলজিৎ ও হানিয়া আমির। এক্স থেকে