Showing posts with label ইসলামী ছাত্রশিবির. Show all posts
Showing posts with label ইসলামী ছাত্রশিবির. Show all posts

Sunday, August 9, 2026

পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা

ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগীর জবানবন্দিঃ যশোর সরকারি এমএম কলেজের শিক্ষার্থী ও শিবির নেতা রুহুল আমিন ও ইসরাফিল হোসেনকে ২০১৬ সালে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। থানায় অবর্ণনীয় নির্যাতনের পর গভীর রাতে নির্জন স্থানে নিয়ে বন্দুক যুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে পুলিশ। এরপর ক্ষতস্থানে বালি ঢুকিয়ে বেধে দেয় তারা। চিকিৎসা না দিয়ে ফেলে রাখলে পচন ধরে গেলে পা কেটে ফেলতে হয়।

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ভুক্তভোগী রুহুল আমিনের জাবানবন্দিতে এসব তথ্য ওঠে আসে। এ ঘটনায় যশোরের তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে রুহুল আমিন বলেন, বর্তমান বয়স আনুমানিক ২৯ বছর। বর্তমানে যশোরের ইবনে সিনা হাসপাতালে কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত আছি। ২০১৬ সালে আমি যশোর সরকারি এমএম কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে আমি চৌগাছা উপজেলার ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমার বন্ধু ইসরাফিল হোসেন তখন একই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র এবং চৌগাছা উপজেলার ছাত্র শিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরে পর আমি এবং ইসরাফিলকে মোটরসাইকেল করে গ্রামের বাড়ি নারায়ণপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা পথে ওৎ পেতে থাকা চৌগাছা থানা পুলিশ আমাদের গতিরোধ করে থানায় নিয়ে যায়।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ওইদিন রাতে ওসির রুমে নিয়ে আমাদেরকে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে আমরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে ওসি ভিডিওকলে আমাদেরকে এসপি আনিসুর রহমানকে দেখায়। তখন এসপি সাহেব বলেন, তাদের আগামীকালকে আমার এখানে পাঠিয়ে দাও; তারপর আমার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে। ওসির রুমে থাকা পুলিশ সদস্যরা আমাদের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে কে কে আন্দোলন করছে তাদের নাম ও পরিচয় জানতে চায়। তখন এসআই আকিকুল ইসলাম, ওসি মশিউর রহমানকে বলেন, স্যার এদের ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছে, এরা কিছুতেই কোনো নাম বলছে না, এদেরকে গুলি করে দেই।

জবানবন্দিতে ভুক্তভোগী রুহুল বলেন, পরদিন আমাদের যশোর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন ডিবি কর্মকর্তা আমাদের জানায়, তোদের আজকে গুলি করা হবে, এমন আদেশ আছে। ওদিন রাতে চৌগাছা থানার উদ্দেশে গাড়িতে করে আমাদের নিয়ে রওয়ানা করে পুলিশ। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িটি থামিয়ে আমাদের চোখ বেঁধে পিছ মোড়া করে হ্যান্ডকাফ লাগানো হয়। এরপর বুন্দলীতলা মাঠের দিকে নিয়ে যায়। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর আমাদের গাড়ি থেকে নামায়। তখন আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। পুলিশ সদস্যরা চিৎকার চেঁচামেচি করে ওই স্থানে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। এসময় ওসি মশিউর রহমান বলেন, সাজ্জাদ, জহুরুল ফায়ার। এরপর আমার ডান পায়ের হাটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। এ পর্যায়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এর পরপরই আরেকটি গুলির শব্দ শুনতে পাই। তখন আমার বন্ধু ইসরাফিলের কান্নাকাটির শব্দ শুনতে পাই। আমাদের চোখের গামছা খুলে, ক্ষতস্থানে বালু ভরে ওই গামছা দিয়ে ক্ষতস্থান বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর পুলিশের গাড়ির আলোতে ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, কনেস্টেবল সাজ্জাদ ও জহিরুলসহ আরো অনেক পুলিশ সদস্যদের দেখতে পাই।

জবানবব্দিতে এই সাক্ষী বলেন, এরপর আমাদের চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর আমাদের পুলিশি প্রহরায় এ্যাম্বুলেন্সে করে যশোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুইদিন বিনা চিকিৎসায় রাখার পর আমাদের ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে রেফার্ড করে। পঙ্গু হাসপাতালে সপ্তাহখানেক চিকিৎসার পর হাঁটুতে পচন ধরার কারণে আমার এবং আমার বন্ধুর পা কেটে ফেলা হয়। এরপর আমাদের নামে পুলিশ দুটি মামলা দিয়েছিলো। ৪২ দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পাই। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, কনেস্টেবল সাজ্জাদ ও জহুরুলসহ সবার বিচার চাই।

পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা
পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা। ছবি: সংগৃহীত

Monday, January 12, 2026

ডাকসু–জকসু: শিবিরের জয়, ওল্ড স্কুল পলিটিকসের মৃত্যুঘণ্টা ও জেন–জি মনস্তত্ত্ব by হেলাল মহিউদ্দীন

বাংলাদেশের বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোর ফলাফল কৌতূহলোদ্দীপক হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। যাঁরা ভোটার, তাঁরা বুঝতে পারছিলেন ফলাফল কী রকম হতে পারে।

ফেসবুকে প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছি। প্রতিটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর এ রকম ফলাফল কেন হয়েছে, জানতে চেয়ে তাঁদের কয়েকজনের কাছে নির্মোহ মতামত দেওয়ার অনুরোধ রেখেছি। উত্তরদাতাদের নির্বাচনের আগে তাঁদের প্রোফাইল ও পোস্টগুলো ভালোমতো পর্যালোচনা করেছি। যাঁদের চিহ্নিত করতে পেরেছি ছাত্রশিবির, ছাত্রদল বা বাম সংগঠনগুলোর কর্মী-সমর্থক হিসেবে, তাঁদের নির্বাচিতদের তালিকায় রাখিনি। আপাতনীরব, আপাতনিরপেক্ষ, ফেসবুকে তেমন সক্রিয় নন, খুব বেশি পোস্ট দেন না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেন, তাঁদের বেছে নিয়েছি।

আমার ইমেইল দিয়ে জানিয়েছি, ইচ্ছা করলে তাঁরা তাঁদের মতামত জানাতে পারেন। বেশির ভাগই মতামত দিয়েছেন। সবশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন বিষয়েও কয়েকটি মতামত পেয়ে গেছি।

বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষক ও ছাত্রছাত্রীরা এ বিষয়ে চমৎকার গবেষণা শুরু করতে পারেন। চমকপ্রদ ফলাফল পাবেন, সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বুঝতেই গবেষণা দরকার।

আমার অনুরোধে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা সাড়া দিয়েছেন বেশি। তাঁদের বিষয়বস্তুর গভীরে গিয়ে পর্যালোচনার শক্তিও ছাত্রদের চেয়ে শক্তিশালী মনে হয়েছে। যা–ই হোক, উত্তরদাতাদের ভাষ্যগুলোর সংযোগ-সমন্বয় ও পুনঃপর্যালোচনা করার পর নিশ্চিত হলাম, ছাত্রশিবিরের জয়জয়কারকে শুধু সাময়িক বিস্ময়-ঘোরজাগানো ঝাঁকুনি ভাবলে বাংলাদেশের সামাজিক রাজনীতির নতুন গতিপথ ও বাঁক-সন্ধিগুলো চেনা যাবে না।

২.

বাংলাদেশে গ্রাম-সমাজ ও মফস্সলের নিম্নমধ্যবিত্তদের সন্তানেরা দ্রুত শহুরে মধ্যবিত্তের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন। আমরা যাঁদের জেন-জি বলি, এঁরা তাঁরাই। বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির গতিপথও তাঁরাই নির্ধারণ করবেন। কারণ, তাঁদের ভুবনদৃষ্টি তাঁদের আগের দুটি প্রজন্ম (মিলেনিয়াল ও জেনারেশন এক্স) থেকে আলাদা। আলাদা হওয়ার পরও জেন-জিদের সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ, জানাশোনা ও বোঝার মিথস্ক্রিয়া এই দুই প্রজন্মের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি। জেন-জিদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন মানস গড়ে উঠেছে এই দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাব-ভাবনার ঠিক-বেঠিক, ভুলভ্রান্তি দেখেশুনেও পর্যালোচনা করে।

জেন-আলফারা এখনো বয়সে ছোট। মাত্র বারো-তেরো বছরে বা কৈশোরে পড়েছে জেন-আলফাদের প্রথম সারিটি। জেন-জিদের অন্য রকম শক্তির বড় উৎস জেন-আলফাদের সঙ্গেও জেন-জিদের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতাই থাকবে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ জেন-জিরাই একমাত্র প্রজন্ম, যারা চারটি জেনারেশনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় সক্রিয়। জেন-আলফাদের ওপরও তাদের প্রভাব হবে অপরিসীম।

এ আলাপকে আপাতদৃষ্টে খাপছাড়া বা ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ মনে হলেও পাঠক শেষ পর্যন্ত পাঠ করলে বুঝবেন, কীভাবে বিষয়গুলো অঙ্গাঙ্গি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।

৩.

উত্তরদাতাদের একজনের মতামত ছিল দীর্ঘ। মতামত না বলে একটি চোখ খুলে দিতে পারা কেস স্টাডি বলাই ভালো। সেটিই সংক্ষেপে গুছিয়ে লিখছি।

লিখেছেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যাকে পছন্দ হবে, তাকেই ভোট দেব। কিন্তু মা বললেন—যেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিই। মাকে ভালোবাসি, তাঁর কথা ফেলার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। তেমন সচ্ছল নই। বাবা মফস্সলে একটি ওষুধের দোকান চালান। একসময় জাসদ করতেন, পরে খানিকটা আওয়ামী লীগপন্থী। মা প্রাইমারি স্কুলে পড়ান। কখনোই শুনিনি জামায়াত-শিবির পছন্দ করতেন। বড় ভাই আমার চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড়। ছাত্রদল করতেন সক্রিয়ভাবে। দুজনকেই জিজ্ঞেস করলাম—মা বলছেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিতে। তোমাদের কী মত? দুজনই বললেন—তোমার যেটা ভালো মনে হয়, সেটাই করো।

‘বাবা ও বড় ভাই স্বভাবে বেশ কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়ার পরও আমার বিবেচনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন দেখে নিজেকে সম্মানিত লাগছিল। কিন্তু মার অনুরোধের কারণ জানার কৌতূহলটি গেল না। তাই তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম—তুমি আবার কবে জামায়াত-শিবির হলে?

‘মা জানালেন—কখনো হননি, এখনো না। কিন্তু ওনার স্কুলেরই আরেক সহকর্মী নারীর পরিবার জামায়াতের রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট। শেখ হাসিনার শাসনকালের কোনো এক সময় তাঁর পুরো পরিবার ও স্বজন যেভাবে নির্যাতিত-নিগৃহীত হয়েছে, ভাষায় প্রকাশের অতীত। সবচেয়ে কষ্টকর ঘটনা, ভদ্রমহিলার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেটিকে তার চার বন্ধুসহ ছাত্রলীগের পান্ডারা তুলে নিয়ে যায় এবং এমনই নির্যাতন চালায়, ছেলেটি এখনো ট্রমাগ্রস্ত। ছেলেটি ক্লাস টেনেও সেরা তিনজন ছাত্রের একজন ছিল। কিন্তু আর পরীক্ষাই দিতে পারেনি। সে এবং তার চার বন্ধুর চারজনই একসময় মার প্রাইমারি স্কুলেরই ছাত্র ছিল। মার ভাষায়, পাঁচজনই ছিল ভালো ছাত্র, ভদ্র, শান্তশিষ্ট ও অমায়িক। ছাত্রশিবিরও করত না। কিন্তু মাত্র একজনের পারিবারিক জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অপরাধে পাঁচটি ছেলের জীবন, ভবিষ্যৎ, পাঁচটি পরিবার তছনছ হয়ে গেল।

‘মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—তোমার কলিগ ভদ্রমহিলাই কি তোমাকে অনুরোধ করেছেন আমাকে বলতে যেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিই? মা জানালেন—না! ভদ্রমহিলাকে স্কুলে দেখামাত্রই তাঁর নিজ থেকে মনে হতো আমাকে বলবেন। কিন্তু বলতে ভুলে যান। সেদিন আর ভোলেননি। মার তীব্র অপরাধবোধ—ভদ্রমহিলার জন্য নামাজে বসে দোয়া করা ছাড়া কিছুই করতে পারেননি। আমাকে অনুরোধ জানানোকে তিনি সামান্য হলেও সামাজিক দায়িত্ব পালন করা হবে ভেবে নিয়েছেন।

‘আগে জানতাম ভোট দিতে পারলে বাবা-মা কোন দলকে ভোট দিতেন। এবার সংসদ নির্বাচন নিয়ে বলছেন—কোনো দলকে নয়, ব্যক্তিকে—সত্যিকারের যোগ্যজনকেই ভোট দেবেন। আমিও সেভাবেই ভোট দিয়েছি।’

৪.

কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়? কোথাকার ভোট কোথায় এসে কীভাবে কোন প্রার্থীর বাক্সে জমা হয়! ঘটনাটি আবারও দেখায়, বাংলাদেশের সমাজ এখনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী, নিকটজনের পারস্পরিক বিজড়নের একটি মানবিক সত্তা, একটি নেটওয়ার্ক। কান টানলে মাথা আসার মতো। ছাত্রীটি জেন-জি। তাঁর বড় ভাই মিলেনিয়াল বা জেন-ওয়াই। মা–বাবা জেন-এক্স। তিন প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। তাঁর মানস গঠনও তাই অনেক পরিণত।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। প্রথম সংসদীয় সরকারটি জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি মেটাতে না পারলেও ভালো-মন্দ, ভুলত্রুটি মিলিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে খুব একটা হতাশ করেনি। সম্ভাবনা বাড়ছিল।

ছিয়ানব্বই হতেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধঃপতনের শুরু। তারপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড খারাপ থেকে খারাপতর এবং চব্বিশে এসে চূড়ান্ত খারাপতম হয়েছিল। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গেল দুর্নীতির বরপুত্র, পুঁজিপতি, বেনিয়া, লুটেরা, টাকা পাচারকারী ঋণখেলাপিদের হাতে।

মফস্‌সল থেকে উঠে আসা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক শ্রেণি হয়ে ওঠা দূরে থাক, বড় অংশই ছিটকে দূরে সরে গেল। যারা রাজনীতিতে নামল, তারা সরাসরি উচ্চবিত্তের খাতায় নাম লেখাল। পদ্ধতি অবশ্যই লুটপাট, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। প্রমাণ প্রধানমন্ত্রীর নিজ মুখে স্বীকারোক্তি তাঁর পিয়নের চার শ কোটি টাকার মালিকানা। রূপপুর প্রকল্পের এক বালিশের মূল্য পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা হওয়া। হাদির হত্যাকারী ফয়সালের মতো ওয়ার্ড পর্যায়ের সন্ত্রাসীর ঘরে পৌনে তিন শ কোটি টাকার ব্যাংক চেক মেলা। সম্রাটদের ঘরে সিন্দুকে, ফ্রিজে হাজার কোটি টাকা মেলা। ব্যাংক থেকে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা লোপাট। গুন্ডাতন্ত্রের ছোবল থেকে বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও নিস্তার না মেলা। আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড।

জেন-এক্স (ছাত্রীটির পিতার প্রজন্ম) তিনটি পর্বের প্রত্যক্ষদর্শী হলেও কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। জেন-এক্স অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হওয়ার মতো কিছু করতে পারেনি। ফলে তাদের নৈতিক শক্তিও সামান্যই। তাই জেন-জিদের চোখে তারা ব্যর্থ। পুরোনো রাজনীতিতে তাদের বলিদান জেন-জিদের তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন সম্পর্কে ভাবনা গড়ে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, শক্তি দিয়ে সবকিছু পদানত রাখার চেষ্টা বুমেরাং হয়েছে। অন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া মতামতেও একই সুর পেলাম। প্রায় সবাই জানালেন, আত্মীয়স্বজন পরিমণ্ডলে একই রকম ঘটনা দেখেছেন, শুনেছেন, জেনেছেন।

৫.

ছাত্রশিবিরের জয় মানে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির জয় ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। বরং বিষয়টির বড়সড় বার্তা—‘ওল্ড স্কুল পলিটিকস’ বাংলাদেশে আর কাজ করবে না। মতামতদাতাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটদানের পেছনে বিবেচনায় ছিল কোন প্রার্থী কতটা গোছানো, সুশৃঙ্খল এবং নির্ভরযোগ্য; কারা কতটা বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি করতে পেরেছেন। কোন দল কোন রাজনৈতিক আদর্শবাদ প্রতিষ্ঠা করবে বা না করবে, তাদের বিবেচনায় ছিল না। কারা ধর্মাশ্রয়ী কারা নয়, কারা জাতীয়তাবাদী কারা সমাজতন্ত্রী, বিষয়গুলো তাঁদের মধ্যে কোনো আবেদন তৈরি করেনি। কোন ব্যানারে ভোট করছেন, তা-ও নয়। তাঁদের যাপিত জীবনের সমস্যা সমাধানে কোন প্রার্থীকে সত্যিকার আন্তরিক, সৎ, নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে, সেটিই দেখেছেন বেশি।

আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক আলাপ পেয়েছি। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ছাত্রসংগঠনের মূল পিতৃপ্রতিম রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তারা যেন ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়। ‘ঘরপোড়া গরুদের সিঁদুরে মেঘ দেখে আগুন ভাবা’র মতো। আওয়ামী শাসনামলে ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য তাঁরা দেখেছেন। ভয়—এখানেও ক্ষমতা, সরকারেও ক্ষমতা; এত বেশি ক্ষমতার আঁচে তারাও যদি ছাত্রলীগের মতোই দানবীয় ক্ষমতায় ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। সেটি হতে না দেওয়াও শুদ্ধির একটি পথ।

একটা সময় ছিল যখন ভাবা হতো, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্র সংসদে এলে বরাদ্দ পেতে, সরকারি আনুকূল্য পেতে, উন্নয়ন ও ছাত্রকল্যাণের কাজগুলো করতে ঝক্কিঝামেলা কমবে। এ ভাবনা কখনোই সঠিক প্রমাণিত হয়নি। জেন-জিরা সেটি জেনেছে। জানার আলোকে নতুন পথ ধরতেও শিখেছে। ‘নিউ স্কুল পলিটিকস’ অনেকটা এ রকম শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিণত হয়ে উঠবে সম্ভবত।

৬.

জেন-জিদের চোখে বর্তমান সময়টি একটি ‘কারেকশন ফেজ’। আর ‘ভুল করা যাবে না’ প্রতিজ্ঞার সময়। তাই সক্রিয় রাজনীতির বাইরের আপাত-অরাজনৈতিক জেন-জিরাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুদ্ধি আনতে অবদান রাখছে। শুদ্ধি পর্বটি চলছে পাঁচটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। যাতে শেষমেশ একটা সময়ে গিয়ে মোটামুটি পরিশুদ্ধ একটি রাজনীতির পথ তৈরি হয়।

দেখা যাক প্রক্রিয়া পাঁচটি কী কী:

এক. নিরীক্ষণ (স্ক্রুটিনি) ও পরীক্ষণ (এক্সপেরিমেন্ট) : ‘গতানুগতিক পথে হেঁটে বাপ-দাদারা অনেক তো দেখেছে। এবার একটু ভিন্নভাবেই না হয় হেঁটে দেখি—কী হয় দেখা যাক’ ভাবনা। জেন-জিদের মধ্যে এই মনোভাব প্রবল। আমরা জেন-এক্সরা ভাবতাম—ওকে ভোট দেব? সে তো জিতবে না। মাঝে ভোটটিই নষ্ট হবে। জেন-জিরা ‘ভোট নষ্ট’ ধরনের সেকেলে তত্ত্বটির ধার ধারে না। কালোকে কালো, সাদাকে সাদাই দেখে!

দুই. মূল্যায়ন (ইভালুয়েশন): ‘দেখলাম তো কে কতটা কী করেছে না করেছে; আমাদের হিসাব-নিকাশ যথেষ্টই করা হয়ে গেছে’—এই ভাবনা। এরা অতীতের ক্ষমতাসীনদের ভালো-মন্দের মূল্যায়ন দলান্ধ জেন-এক্সদের চেয়ে অনেক বেশি নির্মোহভাবে করতে পারে।

তিন. পর্যবেক্ষণ (অবজারভেশন) ও পরিবীক্ষণ (মনিটরিং): ‘সবকিছুতেই চোখ রাখছি, কোনো কিছুই নজর এড়াচ্ছে না’, ‘সবকিছু মনে রাখা হবে’ ভাবনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দখল থাকার সুবাদে প্রজন্মটির এক বড় অংশ নিত্যদিনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখে এবং বিশ্লেষণ করে নিজ নিজ অবস্থান তৈরি করে। দল-মত-পথ অন্ধভাবে মেনে নেয় না।

চার. বর্জন (রিজেকশন) : চিরাচরিত উত্তরাধিকারের রাজনীতি বর্জন বড় উদাহরণ। পুরোনো রাজনীতির একটি ধারাবাহিকতা ছিল বাবা যে দল করে, পুরো পরিবার সে দলই করে। তিনজন মতামত দানকারী জানিয়েছেন, তাঁদের বংশপরম্পরা আওয়ামী লীগ রাজনীতির। তবু তারা পরিবারকে অসন্তুষ্ট করেই লীগের রাজনীতিকে সজ্ঞানে বর্জন করেছে।

পাঁচ. শুদ্ধীকরণ (কারেকশন) : ‘রাজনীতিবিদেরা ভুল করলে ছাড় দেওয়া হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, লিখে-এঁকে, ট্রল করে যতভাবে সম্ভব তাদের শুদ্ধির পথে ঠেলে দিতে হবে’ মনোভাব। মতামত দানকারীদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটদানের বিবেচনা ছিল—তাকেই ভোট দেব, যে চুরিদারি করবে না, টাকা মেরে খাবে না, লাইসেন্স-পারমিট নেবে না, নেতার পেছনে ছুটবে না, নেতার নামে স্লোগান দেবে না, কাউকে মিছিলে যেতে বাধ্য করবে না, গেস্টরুম আর সিট বরাদ্দের রাজনীতি করবে না, গুন্ডামি-মাস্তানি-দাদাগিরি ও ক্ষমতার দাপট দেখাবে না।

রাজনীতিতে বড় ব্যবসায়ী ও কালোটাকার মালিকদের সংসদীয় আসনের সিট কেনাবেচা, টাকাপয়সায় দৌরাত্ম্য, রাজনীতির মাঠ দখল আবারও শুরু হয়েছে। জেন-জিদের ভোটিং বিহেভিয়ার এ বার্তাও দিচ্ছে—এই আয়োজনগুলো কিছুদিনের জন্য সাময়িক সাফল্য দিলেও জেন-জিরা তাদেরও বেশি দিন টিকতে দেবে না। কারণ, আগামী কয়েকটি বছর বাংলাদেশের রাজনীতি বিচিত্র ধরনের শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। এই নতুন প্রক্রিয়া আমাদের চিরাচরিত রাজনীতির পূর্বানুমান ও হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করেই এগোবে।

* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব

৭ জানুয়ারি, বুধবার দিবাগত রাত ১টায় জকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নির্বাচিত ভিপি, জিএস ও এজিএস। তাঁরা তিনজনই ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের।
৭ জানুয়ারি, বুধবার দিবাগত রাত ১টায় জকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নির্বাচিত ভিপি, জিএস ও এজিএস। তাঁরা তিনজনই ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের। ছবি: প্রথম আলো

Monday, September 15, 2025

ডাকসুর কী প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়তে যাচ্ছে by এ কে এম জাকারিয়া

ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বড় জয়ের নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। একেক জন একেক দিককে গুরুত্ব দিয়ে এই ফলাফলকে ব্যাখ্যা করছেন। নিজের বিচার-বিবেচনা, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও অবস্থান এবং উইশফুল থিংকিং বা নিজের চাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে এগুলো মানুষ গ্রহণ করবে বা করবে না। এমন কোনো সঠিক ব্যাখ্যা আমরা পাব না যা সব মানুষের কাছে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হবে। এসব আলোচনা চলতেই থাকবে।

ডাকসু কার দখলে থাকল, জাতীয় রাজনীতিতে তা কোনো প্রভাব ফেলে কিনা তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। কিন্তু ‘জাতীয় রাজনীতি’ সব সময়েই ডাকসুকে গুরুত্ব দেয়। এ জন্য জোর জবরদস্তির ঘটনাও ঘটেছে। তা ব্যালট বক্স ছিনতাই (১৯৭৩ সালের নির্বাচন) বা আগে ব্যালট বক্স ভরে রাখাসহ নানা কৌশলে( ২০১৯ সালের নির্বাচন) যেভাবেই হোক না কেন। আবার ক্ষমতাসীন দল যখন মনে করে ডাকসুতে তাদের জেতার সুযোগ নেই তখন তারা নির্বাচনই দেয় না।

এবারের ডাকসু নির্বাচন হয়েছে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবং একটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ পরিস্থিতি নানা সময়ে তৈরি হয়েছে এর কোনোটির মাত্রাগত গভীরতাই জুলাই অভ্যুত্থান বা শেখ হাসিনাকে উৎখাতের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সেই ঘটনার এক বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে আমরা দেখলাম পুরোনো বা প্রচলিত কোনো হিসাব-নিকাশ কাজ করেনি।

বাংলাদেশে সব আমলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের কার্যক্রম ‘নিষিদ্ধ’ ছিল। ছাত্র সংগঠনগুলো মিলে মিশে সিদ্ধান্ত নিয়েই তা ‘কার্যকর’ করেছে। কিন্তু গত ১৫ বছরে কীভাবে কী ঘটেছে তা ছিল আমাদের জানা বোঝার বাইরে। শিবিরের লোকজন যে ‘গুপ্ত শিবির’ হিসেবে ছাত্রলীগে আশ্রয় নিয়ে কাজ করে গেছে তা আমরা জেনেছি গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে-পরে। সেই অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরে প্রকাশ্য কার্যক্রমের বয়স মাত্র ১ বছর। তাদের এই বিপুল বিজয় অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত।

গত ১৫ বছরে দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। একতরফা নির্বাচন ও দিনে-রাতে ব্যালট বাক্স ভরে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থন বা শক্তি-সামর্থ্য মাপার কোনো সুযোগ হয়নি।

এই দলের এত ভাগ ভোট, ওই দলের কম-বেশি এত ভাগ ভোট বা অমুক পন্থীদের ভোট এত ভাগ- এমন একটি হিসাব-নিকাশ যে আমরা করি তার ভিত্তি আসলে ২০০৮ সাল বা এর আগের নির্বাচনগুলো। গত ১৬ বছরে নতুন ভোটার হিসেবে একটি বড় জনগোষ্ঠী যুক্ত হয়েছে এবং তাদের অধিকাংশই কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এই নতুন ভোটারেরা কোনো রাজনৈতিক দল বা শক্তিকে ভোট দেবে তা আমাদের জানা-বোঝার বাইরে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি একসময় নানা মহল থেকে উঠেছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারেনি। দেশ এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ভাগে নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে শুধু কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ডাকসুর নির্বাচন হয়েছে। জাকসুর নির্বাচন গতকাল হয়েছে। রাকসু ও চাকসুর নির্বাচন বাকি আছে। বলা যায় জাতীয় নির্বাচনের আগে ছোট এবং ভিন্ন পরিসরে হলেও এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদের নির্বাচনই এক অর্থে দলগুলোর সমর্থন ও রাজনৈতিক শক্তি-সামর্থ্য ও সাংগঠনিক ক্ষমতা পরীক্ষার একটি ক্ষেত্র। এর মধ্যে ডাকসুর প্রভাব স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি।

প্রথম আলো শিরোনাম করেছে, ‘ডাকসুর ফলাফলে বিএনপি বিব্রত, জামায়াত উচ্ছ্বসিত’। কিন্তু ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল কি শুধু দল দুটির  ‘উচ্ছ্বাস’ আর ‘বিব্রত’ হওয়ার মধ্যেই আটকে থাকবে? নাকি জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন হিসাব নিকাশের সূচনা ঘটাবে? বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের সময় যখন এগিয়ে আসছে।

আমরা জানি যে গণ-অভ্যুত্থানের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তার কথা শোনা যায়। গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশিত সংস্কার বা জুলাই সনদ নিয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়ে গেছে। ডাকসুর ফলাফল অন্তত বিএনপি ও জামায়াতের কৌশল ও চিন্তা-ভাবনায় কতটা পরিবর্তন আনে সেটাই এখন দেখার বিষয়। এই দল দুটির রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের যে কোনো পরিবর্তন সামগ্রিক রাজনৈতিক হিসাব নিকাশে পরিবর্তন ঘটাবে।

আগেই বলেছি ডাকসুর নির্বাচনের ফলাফল ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের বড় জয় নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে। এর মধ্যে সংগঠনটির কৌশল বদল, প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে নিজেদের উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নেওয়া নানা উদ্যোগের বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।

বলা হচ্ছে, শিবিরের এসব কৌশল কাজে দিয়েছে। এমনকি আমরা দেখলাম ডাকসুর শিবির প্যানেলের নির্বাচিতরা রায়ের বাজারে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গিয়ে দোয়া-খায়ের করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতও কি এসব কৌশলকে দস্তুর মানবে? মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে, নারী ইস্যুতে জামায়াতের রাজনীতিতে কি কোনো পরিবর্তন আসবে?

ছাত্রদলের পরাজয়ের বিভিন্ন কারণের মধ্যে তাঁদের প্রস্তুতিহীনতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার অভাব যেমন আলোচিত হয়েছে তেমনি সংগঠনটির ভাবমূর্তির সমস্যার বিষয়টিও অনেকের আলোচনায় পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে চরিত্রগত বিবেচনায় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল একই সঙ্গে উচ্চারিত দুটি নাম। তবে গত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অপকর্ম ও অত্যাচার-নির্যাতন সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেই দুঃসহ সময় ক্যাম্পাসে ফিরে আসুক তা শিক্ষার্থীরা কোনো ভাবেই চাইবে না।

কিন্তু এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা সম্ভবত ছাত্রদলের ওপর ভরসা করতে পারেনি। কারণ ছাত্রদলের ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে খুব ভালো নয়। তা ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের বিরুদ্ধে দখলদারি ও চাঁদাবাজির যত অভিযোগ উঠেছে সেটাও শিক্ষার্থীদের ছাত্রদল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণ বলে অনেকে মনে করেন। এসব নানা বিবেচনায় ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা বিকল্প হিসেবে ছাত্র শিবিরকে বেছে নিয়েছে।

জাতীয় রাজনীতিতে যদি একই হিসাব-নিকাশ কাজ করে তবে দল হিসেবে বিএনপির জন্য তা বিপদের বিষয়। নির্বাচনের আর ৫ মাসের মতো সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে তারা নিজেদের কতটা বদলাতে পারবে? দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নানা অপকর্ম সম্ভাব্য ভোটারদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখে গেছে দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকলেও গত ১ বছরে বিএনপি এই নেতা-কর্মীদের ঠেকাতে বা থামাতে পারেনি। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলের পর এটা বলা যায় যে, বড় দল হিসেবে বিএনপি আগামী নির্বাচনে জয়ী হবেই—   এমন আত্মবিশ্বাসও দলটির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

রাজনৈতিকভাবে যারা জামায়াত ও শিবিরের ঘোরতর বিরোধী তাদের অনেকে মনে করেন ডাকসুতে শিবিরের জয় ঠেকাতে শিবির বিরোধী সংগঠনগুলোর জোট গড়ে মাঠে নামা উচিত ছিল। জাতীয় নির্বাচনে জোট গড়ার ক্ষেত্রে ডাকসুর এই অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনী জোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও আলোচনা চলছিল ডাকসু নির্বাচনের পর সেই আলোচনা নিশ্চিতভাবেই ভিন্ন মাত্রা পাবে। ডাকসুতে এনসিপির ছাত্র সংগঠনের খারাপ ফল জাতীয় রাজনীতিতেও তার দর-কষাকষির ক্ষমতা কমাতে পারে।

ডাকসুতে শিবিরের জয়ের সুবিধা জাতীয় বা নির্বাচনী রাজনীতি জামায়াত পেতে পারে বা নাও পেতে পারে। কারণ তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বিএনপির মতো বড় দল এখন আর জামায়াতের শক্তিকে খাটো দেখবে বলে মনে হয় না। তারা এখন  নিশ্চয়ই হিসাব-নিকাশ করেই জামায়াতকে মোকাবিলার কৌশল নেবে। বোঝা যাচ্ছে, সামনের জাতীয় নির্বাচনে ডাকসুর ফলাফল প্রভাব হতে পারে নানামুখী।

* এ কে এম জাকারিয়া, প্রথম আলোর উপসম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের উল্লাস। রাজু ভাস্কর্যের সামনে, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের উল্লাস। রাজু ভাস্কর্যের সামনে, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: প্রথম আলো

Sunday, September 14, 2025

জাকসু নির্বাচনে ২৫ পদের ২০টিতেই জিতল ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে বিজয়ী হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির–সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের প্রার্থীরা। তাঁরা জাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক (জিএস), দুটি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২০টি পদে জয় পেয়েছেন।

এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদ এবং দুটি করে পদে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস)–সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

৩৩ বছর পর ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। এরপর গতকাল শুক্র ও আজ শনিবার দিনভর গণনার পর বিকেলে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

ভিপি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেলের জিতু

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ফলাফল অনুযায়ী, ভিপি পদে ৩ হাজার ৩৩৪টি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের’ প্রার্থী আবদুর রশিদ (জিতু)। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। আন্দোলনের আগে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের আরিফ উল্লাহ পেয়েছেন ২ হাজার ৩৯২ ভোট।

এ ছাড়া ভিপি পদে বাগছাস–সমর্থিত প্যানেলের আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল পেয়েছেন ১ হাজার ২১১ ভোট। ভোটের দিন বিকেল চারটার দিকে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল–সমর্থিত প্যানেলের শেখ সাদী হাসান পেয়েছেন ৬৪৮ ভোট।

জিএস-এজিএসসহ ২০ পদে শিবির জয়ী

জিএস পদে ৩ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের মো. মাজহারুল ইসলাম। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের আবু তৌহিদ মো. সিয়াম পেয়েছেন ১ হাজার ২৩৮ ভোট। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের মো. শাকিল আলী পেয়েছেন ৯৫৯ ভোট। নির্বাচন বর্জন করা ছাত্রদলের তানজিলা হোসাইল বৈশাখী পেয়েছেন ৯৪১ ভোট।

এজিএস (পুরুষ) পদে বিজয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের ফেরদৌস আল হাসান। তিনি ২ হাজার ৩৫৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের জিয়া উদ্দিন পেয়েছেন ২ হাজার ১৪ ভোট। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের তৌহিদুল ইসলাম ভূঁঞা পেয়েছেন ৭১৫ ভোট। ছাত্রদলের মো. সাজ্জাদ উল ইসলাম পেয়েছেন ৭০১ ভোট। এজিএস (নারী) পদে ৩ হাজার ৪০২ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের মালিহা নামলাহ পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৬ ভোট। ছাত্রদলের আঞ্জুমান আরা ইকরা পেয়েছেন ৭৬৪ ভোট।

শীর্ষ তিন পদের বাইরে ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে আবু উবায়দা উসামা (২ হাজার ৪২৮ ভোট), পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক পদে সাফায়েত মীর (২ হাজার ৮১১ ভোট), সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে জাহিদুল ইসলাম (১ হাজার ৯০৭ ভোট), সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিন (১ হাজার ৯৮৬ ভোট), নাট্য সম্পাদক পদে রুহুল ইসলাম (১ হাজার ৯২৯ ভোট), সহক্রীড়া সম্পাদক পদে মো. মাহাদী হাসান (২ হাজার ১০৫ ভোট), সহক্রীড়া (নারী) সম্পাদক পদে ফারহানা আক্তার (১ হাজার ৯৭৬ ভোট) জয়ী হয়েছেন।

এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে মো. রাশেদুল ইসলাম (২ হাজার ৪৩৬ ভোট), সহসমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) পদে তৌহিদ হাসান (২ হাজার ৪৪২ ভোট), সহসমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে নিগার সুলতানা (২ হাজার ৯৬৬ ভোট), স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক পদে হুসনী মোবারক (২ হাজার ৬৫৩ ভোট), পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে তানভীর রহমান (২ হাজার ৫৫৯ ভোট), কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে নুসরাত জাহান ইমা (৩ হাজার ১৪ ভোট), ফাবলিহা জাহান নাজিয়া (২ হাজার ৪৭৫ ভোট), নাবিলা বিনতে হারুন (২ হাজার ৭৫০ ভোট) এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে হাফেজ তারিকুল ইসলাম (১ হাজার ৭৪৬ ভোট), মো. আবু তালহা (১ হাজার ৮৫৪ ভোট) জয়ী হয়েছেন।

বিজয়ী অন্য যাঁরা

ছাত্রশিবিরের প্যানেলের বাইরে সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক পদে বাগছাস–সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের প্রার্থী আহসান লাবিব (১ হাজার ৬৯০ ভোট), ক্রীড়া সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মাহামুদুল হাসান (৫ হাজার ৭৭৮ ভোট), সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মুহিবুল্লাহ শেখ (২ হাজার ১৮ ভোট) এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) মোহাম্মদ আলী চিশতী (২ হাজার ৪১৪ ভোট) পেয়ে জয় পেয়েছেন।

জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। শিক্ষার্থীদের রায়ের প্রতি সবাইকে সম্মান দেখাতে হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন, সেই প্রত্যাশা থাকবে। নির্বাচন করার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা নির্বাচনটি সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এটি তাঁদের জন্য গৌরবের ব্যাপার।

ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের এক সদস্যের পদত্যাগ

নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য রেজওয়ানা করিম পদত্যাগ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগমুহূর্মুতে তিনি তাঁর বিভাগের একজন স্টাফকে দিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। আমি বিস্মিত হয়েছি, গতকাল পর্যন্ত তিনি আমাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। রাতের মধ্যে কি এমন হলো যে তিনি পদত্যাগ করলেন! এটি আমাদের সবাইকে বিস্মিত করেছে।’

অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম আরও বলেন, রেজওয়ানা করিম কয়েকদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর তিনি কাজ করেছেন, মিটিং করেছেন। তাঁর কোনো বিষয় আপত্তি থাকলে সেগুলো জানাতে পারতেন। কিন্তু নির্বাচনের পর ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে পদত্যাগ করা বিস্ময়কর।

Saturday, February 22, 2025

ছাত্রদল-শিবির দ্বন্দ্ব প্রকট

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক সময়ের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হচ্ছে। কোথাও কোথাও অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানে দেখা গেছে এই দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের। ঘটেছে সংঘর্ষের ঘটনাও। চলছে দোষারোপের রাজনীতি। ছাত্রদল দায়ী করছে শিবিরকে, আর শিবির দায়ী করছে ছাত্রদলকে। সংগঠন দু’টির কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও পাল্টাপাল্টি পোস্ট দিতে দেখা গেছে।

সম্প্রতি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় গত বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। এই সংবাদ সম্মেলনের একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ছাত্রদলের সভাপতি সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদককে বলছেন, ‘শিবিরের ওপর দায় দিয়ে দাও’। ছাত্রদলের সভাপতির এই বক্তব্যকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহযোগিতা ও বন্ধুভাবাপন্ন ছাত্র রাজনীতির পথে অন্তরায় বলে মনে করছে শিবির। সংগঠনটি বলছে, নিজেদের অপরাধমূলক কার্যকলাপের দায় ছাত্রশিবিরের ওপর চাপিয়ে দেয়ার যে প্রবণতা ছাত্রলীগের ছিল, তা আজ ছাত্রদলের মধ্যেও বিদ্যমান। এ ধরনের আচরণ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ এবং সুস্থ ধারার রাজনীতির পরিপন্থি।

ওদিকে, ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে আসে ছাত্রশিবির। কয়েকটি বাম সংগঠন এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এ নিয়ে ছাত্রদলও প্রশ্ন তুলেছে। পরবর্তীতে ৭ই নভেম্বর ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ উপলক্ষে বিএনপি’র দলীয় পোস্টার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে সাঁটিয়ে দেয় ছাত্রদল। পোস্টার লাগানোর পর ছাত্রদের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তারা এর বিরুদ্ধে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে।
ঢাকা এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ এবং ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে সিলেটের এমসি কলেজের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর টঙ্গীতে ছাত্রশিবিরের ওয়ার্ড সভাপতির ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনারও অভিযোগ রয়েছে।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র করছে। আর ছাত্রদল সবসময় শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশেষ অনুরোধ- ছাত্রশিবিরের উদারতাকে দুর্বলতা ভাববেন না। ছাত্রশিবির কোনো ব্যক্তি বা দলের পূজা করে না। এক আল্লাহর গোলাম হিসেবে শুধুমাত্র রবের কাছেই মাথানত করে। আর ছাত্রদলকে আমরা শত্রু মনে করি না। আমাদের লড়াই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। তাদেরকে সরাসরি কিংবা কৌশলে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি- অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে গঠনমূলক ছাত্ররাজনীতির ধারায় ফিরে আসুন। কিন্তু বন্ধুপ্রতিম সংগঠনটি আমাদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বিগত ফ্যাসিস্ট ও তাদের শাহবাগী দোসরদের পরামর্শে অগ্রসর হচ্ছে। যার প্রতিফলন কুয়েটে প্রমাণিত হলো। আজকের ঘটনা আর জুলাই-আগস্টে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

এদিকে, টঙ্গীতে ছাত্রশিবিরের ওয়ার্ড সভাপতির ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল শুক্রবার কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম এক যৌথ বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার আলিম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবিরের ওয়ার্ড সভাপতি ফজলে রাব্বিকে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা দীর্ঘ সময় আটকে রেখে নির্যাতন করে এবং হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করে। ঘটনা জানতে পেরে শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা মামুন নামে ছাত্রদলের এক কর্মীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। মূলত কুয়েটে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করার কারণে পরিকল্পিতভাবে তার ওপর এই নির্যাতন চালানো হয়।

mzamin

Thursday, January 30, 2025

৩৫ বছর পর যে কলেজে প্রকাশ্যে এল শিবির by ফাহিম আল সামাদ

ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিন ছাত্র। এরপর কলেজটির রাজনীতির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রলীগ। প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও কলেজটিতে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করেছে ছাত্রশিবির। পালন করা হচ্ছে নানা কর্মসূচি।

কলেজটির নাম চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ। চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত এই কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৭ সালে। তখন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘চট্টগ্রাম কলেজ অব কমার্স’। গত সোমবার কলেজটিতে শেষ হয়েছে শিবিরের আয়োজন করা দুই দিনের প্রকাশনা উৎসব।

১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরব দেখা গেছে এই কলেজের শিক্ষার্থীদের। কলেজটির ছাত্র সংসদে নেতৃত্ব দিয়েছেন—এমন অনেকেই দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েরও। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কলেজটিতে সব ছাত্রসংগঠনের অংশগ্রহণে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়ার রীতি ছিল। তবে সেই দৃশ্যপট পাল্টে যায় নব্বইয়ের দশকে।

কলেজটির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন—এমন নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৮ ও ১৯৮৯ সালের দিকে কলেজে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয় ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে। এতে প্রাণ হারান তিন ছাত্র। এরপর কলেজটি পুরোপুরি ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। একসময় প্রকাশ্যে রাজনীতি করা ছাত্রশিবিরের কার্যক্রমও কলেজে বন্ধ হয়ে পড়ে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কলেজের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আবারও পাল্টে গেছে। কলেজটিতে আবারও প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। গত বছরের নভেম্বরে প্রথম প্রকাশ্যে আসে সংগঠনের কলেজ শাখার কমিটিও। গত রোববার থেকে গত সোমবার পর্যন্ত এই কলেজে আয়োজন করা হয় ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা উৎসব। আয়োজক ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম নগর দক্ষিণ শাখা।

গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের ফটকের উল্টো দিকে সড়কের পাশে বসানো হয়েছে তিনটি স্টল। পাশে ‘রিডিং কর্নার’। বইয়ের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের ছবিযুক্ত ক্যালেন্ডারও প্রদর্শন করা হচ্ছে এসব স্টলে। এ ছাড়া পাশে একটি বুথে ছাত্রশিবিরের সমর্থক ফরম পূরণের সুযোগ রাখা হয়েছে। জানতে চাইলে মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শিবির নিয়ে মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছিল। এই বিভ্রান্তি দূর করতেই সংগঠনের প্রকাশনা নিয়ে উৎসবের আয়োজন।

ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা জানান, কলেজটিতে দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে শিবিরের রাজনীতি না থাকলেও সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল না। সাংগঠনিক থানা হিসেবে প্রতিবছর কমিটিও করা হয়।

শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্টের আগে কমার্স কলেজের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। এরপর সেখানে গত সেপ্টেম্বর মাসের দিকে আহ্বায়ক কমিটি দেয় ছাত্রদল। গত ২৩ নভেম্বর কলেজের উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিবির। সেখানে প্রথম প্রকাশ্যে আসেন কমার্স কলেজ শাখা শিবিরের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম। এরপর গত ডিসেম্বর মাসে বিজয় শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয়। এ বছর কমার্স কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের সাদনান ফাহিম।

কমার্স কলেজ শাখা শিবিরের সভাপতি সাদনান ফাহিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাঁদের জন্য কাজ করতে চাই। ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে যে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের, আমরা সেটি দূর করতে চাই। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলেজে শিবিরের কার্যক্রম চলছে।’

কলেজ ছাত্রলীগের নেতাদের অধিকাংশই বর্তমানে আত্মগোপনে। তাই তাঁদের কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম নগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক সহাবস্থানে থাকতে চাই। আমরা চাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়। পাশাপাশি শিবিরকেও গুপ্ত রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতি করার আহ্বান জানাই’

---প্রথম আলো

Friday, September 27, 2024

‘রগ কাটা’ নিয়ে ঢাবি শিবির সেক্রেটারির জবাব

‘রগ কাটা’ অভিযোগ নিয়ে মুখ খুললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শাখা ছাত্রশিবিবের সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ।

বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ৩টার দিকে ঢাবির টিএসসিতে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে ফরহাদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিষয়ে কাউকে হ্যাঁ বা না বলা অথোরিটি তিনজনের। সিনেট, সিন্ডিকেট এবং একাডেমিক কাউন্সিল। এ ৩টির বাহিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কোনো অথোরিটি হ্যাঁ বা না বলার অধিকার রাখে না। আর ছাত্রশিবির যাতে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে সেখানে এ প্রশ্ন কখনোই আসবে না।

‘রগ কাটা’ অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে জবাবে সেক্রেটারি বলেন, এটা আমি সহজ করে বলি, আপনি রগকাটা লিখে গুগুলে সার্চ করেন দেখবেন সব ক্রাইম ছাত্রলীগের নামে। সেখানে শিবির নামে কোনো ডকুমেন্ট পাবেন না।

এ নামটা (রগ কাটা) আপনাদের সঙ্গে এত জড়িত কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা খুবই স্বাভাবিক, ফ্যাসিবাদরা যখন একটা ব্যাপারকে রিপিটেটলি এস্টাবলিশ করতে চাইবে যেখানে আপনি কথা বললে আপনাকে ট্যাগ দিয়ে মেরে ফেলবে। আপনি এখানে একটা বয়ান এস্টাবলিশ করবেন এটা খুবই স্বাভাবিক। এখানে (রগ কাটা) বিষয়টাকে প্রত্যেকটা উপাদান হেল্প করছে। কেউ এ উপাদনটাকে বিরোধিতা করতে পারেনি। নেগেটিভ বিষয় যে এস্টাবলিশ করুক না কেন, কেউ হয়তো সমর্থন দেয় নাই, কিন্তু কেউ এর বিরোধিতা করতে পারেনি। সমন্বিত সামগ্রিক এফোর্ড দিয়ে যখন কোনো কিছু দাঁড় করায় তখন সেখানে নেগেটিভ এস্টাবলিশ হতে বাধ্য। এখন এ নেগেটিভ রাইট অর রং এটার ডিসিশন দিবেন আপনারা। আপনারা সাংবাদিক যারা আছেন তারা এ বিষয়টাকে যাছাই অথবা অ্যানালাইসিস করবেন এটা সত্য কি না।’

এরআগে রোববার (২২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতির পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর এবার আলোচনায় এসেছেন শিবিরের সেক্রেটারি।

সমন্বয়ক আব্দুল কাদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফা সম্পর্কে একটি স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সেক্রেটারির প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। এর পরই শুরু হয় তুমুল আলোচনা।

আব্দুল কাদের ওই স্ট্যটাসে ফরহাদ নামের একজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেও বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র বলছে, শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ফরহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৭-১৮ সেশনের এবং কবি জসিম উদদীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি ২০২২-২৩ সেশনে জসীম উদদীন হল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতিও ছিলেন।

এ ছাড়া এস এম ফরহাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

ঢাবির টিএসসিতে সাংবাদিক সম্মেলনে শাখা ছাত্রশিবিবের সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ। ছবি : সংগৃহীত
ঢাবির টিএসসিতে সাংবাদিক সম্মেলনে শাখা ছাত্রশিবিবের সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ। ছবি : সংগৃহীত

অবশেষে আঁতুড়ঘরেই শিবিরের আত্মপ্রকাশ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতিক অঙ্গন থেকে চায়ের দোকান, টিভি টকশো, সর্বত্রই চলছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নিয়ে নানান আলোচনা-সমালোচনা। দীর্ঘ সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকলেও শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর সারা দেশে বেড়েছে শিবিরের মুক্ত বিচরণ।

সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদিক কাইয়ুম ও সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ। এতে বেশ নড়েচড়ে বসেছে অন্যান্য রাজনীতিক দলের ছাত্রসংগঠন। অনেকটা নাটকীয়ভাবে তাদের আত্মপ্রকাশ। আত্মগোপনে থেকে ভেতরে ভেতরে সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাড়াতে সক্ষম শিবিরকে অনেকে তুলনা করছেন বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে।

নেটিজেনরা বলছেন, তারা ক্যাম্পাসেই ছিলেন। কিন্তু তার সহপাঠী, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব এমনকী রুমমেট যার সঙ্গে রাতের পর রাত কাটিয়েছেন, সেই ছেলেটিও বিন্দুমাত্র টের পাননি। আর এতেই অবাক হচ্ছেন তারা।

সাধারণত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঘাঁটি। বিশেষ করে চার দলীয় জোট সরকারের আমলে তাদের ক্যাম্পাসভিত্তিক কার্যক্রম বেশ জোরে শোরেই চলছিল। পরবর্তীতে আওয়ামী সরকারের ব্যাপক দমনপীড়নে স্থবির হয়ে পড়ে শিবিরের প্রকাশ্য কার্যক্রম। তালা মারা হয় কেন্দ্রীয় দপ্তরসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সব কার্যালয়।

ঢালাওভাবে হামলা-মামলা ও নির্যাতনের মুখে সাংগঠনিক পরিচয় গোপন রেখে ক্যাম্পাস বা ক্যাম্পাসের আশেপাশে থাকতে শুরু করেন শিবিরের নেতাকর্মীরা। অন্য ছাত্র সংগঠনের কাছে ধরা না দিয়ে কীভাবে শিবির নেতাকর্মীরা সংগঠনের বিস্তৃতি ঘটান, তা যেন এক মহাবিস্ময়। বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেই সংগঠনের গঠনতন্ত্র মেনে প্রতিবছর যথারীতি হয়েছে তাদের নেতৃত্ব বদল, পর্যালোচনা আর নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই মাস যেতে না যেতেই ক্যাম্পাসে নিজেদের অবস্থান জানান দেয় ছাত্রশিবির। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এর মধ্য দিয়ে নিজেদের আঁতুড়ঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রকাশ্যে এল তারা।

অনেকেই মনে করতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে শিবিরের আঁতুড়ঘর হয়? সংগঠনটির ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন মীর কাশেম আলী।

জানা গেছে, গত ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের পাশাপাশি ছাত্রশিবিরকেও নিষিদ্ধ করা হয়। এর চারদিন পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে ২৮ আগস্ট জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠা লাভ করে সেই ক্যাম্পাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে জামায়াতে ইসলামীর ভাতৃপ্রতীম এ সংগঠন। তবে শিবিরে ছাত্রীদের প্রবেশাধিকারের কেনো সুযোগ নেই।

ছাত্রশিবিরের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মঞ্জুরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে জাহিদুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৭৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই সংগঠনে ৩৩ জন সভাপতি এবং ২৬ জন সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন।

সংগঠন পরিচালনার অর্থ কর্মী, সাথী, সদস্য প্রার্থী, সদস্য ও শুভাকাঙ্খীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে আদায় করা হয়। শিবিরের এই তহবিলকে বলা হয় বায়তুলমাল। সাংগঠনিক প্রকাশনীর মুনাফা ও শরিয়াত অনুমোদিত অন্যান্য খাত এই তহবিলের অন্যতম উৎস। দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ২১ সেপ্টেম্বর ফেসবুক বার্তায় নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকেই ছাত্রশিবিরের যাত্রা শুরু হয়। সেই ঢাবিতে শিবিরের কার্যক্রম থাকবে না এটা কীভাবে সম্ভব!

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সভাপতি ও সেক্রেটারির আত্মপ্রকাশকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে একজন একজন করে নয়, ক্যাম্পাসে সবার পরিচয় প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

ছাত্রশিবিরের লোগো। ছবি : সংগৃহীত

Monday, September 23, 2024

৯ দফার পেছনের গল্প জানালেন সমন্বয়ক আব্দুল কাদের

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ঘোষিত ৯ দফার পেছনের গল্প জানিয়েছেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। এ বিষয়ে রোববার নিজের ফেসবুক আইডিতে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।

আব্দুল কাদের বলেন, ‘৯ দফা প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল শিবির। যেহেতু নেট নেই, গোলাগুলি-কারফিউয়ের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সশরীরে হাউসে হাউসে পৌঁছে দিয়েছে, বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা তারাই করেছে।’

শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শিবির সেক্রেটারি ফরহাদের সাথে আলোচনা করে এই ৯ দফা তৈরি হয়েছিল বলেও জানান এই সমন্বয়ক।

স্ট্যাটাসে আব্দুল কাদের বলেন, ‘শুক্রবার যাত্রাবাড়ী এলাকায় যখন আন্দোলন করছিলাম, তখন শিবিরের ঢাবি সেক্রেটারি ফরহাদ ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, “আন্দোলনরত কয়েকজন সমন্বয়ক সরকারের মন্ত্রীদের সাথে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। এতো এতো শহিদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করতেছে তারা। আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে। কিছু দাবি-দাওয়া দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। মানুষের সাথে বেইমানি করা যাবে না”। আমি সম্মতি জানাই। আমাদের তো আগেই অবস্থান ছিল আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার। তাছাড়া মঙ্গলবার রাতের মিটিংয়ে ঠিক করা কিছু দাবি দাওয়া আমার মাথায় আছে।’

আব্দুল কাদের বলেন, আন্দোলন চালিয়ে নেওয়ার মতো মাঠে কোনো সিনিয়র নেই। আসিফ-নাহিদ ভাইকে গুম করে রেখেছে। আমি সাত-পাঁচ না ভেবে রিস্ক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ওইদিন জুমার নামাজের পর পরই যাত্রাবাড়ীতে কয়কজন শহিদ হন, সবগুলা আমার চোখের সামনেই ঘটতেছে। মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলছে, এটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। তাছাড়া দীর্ঘদিন জেল-জুলুম, হামলা-মামলার শিকার হয়ে হাসিনার এমন অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছি; মাথা নত করিনি। আমার পরিণতি কী হবে, সেটা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করিনি। চোখের সামনে মানুষ মেরে ফেলছে, মানুষের কথা চিন্তা করে নিজের জীবনের কথা ভাবার সময় পাইনি। গত ৪/৫ বছর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই আমাদেরকে দৃঢ়তা ধরে রাখার শিক্ষাই দিয়েছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে হাল ধরার সিদ্ধান্ত নিই।’

‘যাইহোক, কিছুক্ষণ বাদে শিবিরের সেক্রেটারি আমাকে আবারো ফোন দিলেন। বললেন, “কিছু দাবি দাওয়া খসড়া আকারে করছি, তোমার সঙ্গে আলোচনা করি”৷ আমাদেরও যেহেতু আগেই আলোচনা হয়েছিল অনেকগুলো দাবির ব্যাপারে সেগুলো তখন উনার সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বিতভাবে তৈরি হয় ৯ দফা।’

‘তিনি একে একে কিছু দাবি বললেন। যেগুলা খুব কমন দাবি দাওয়া- যেমন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ, ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িত পুলিশ প্রশাসনকে বরখাস্ত, সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনা, ভিসির পদত্যাগ। যেগুলা ৬ জন শহিদ হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতের বৈঠকের আলোচনাতেই আমরা ভেবেছিলাম। এছাড়া মানুষজনও সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কিছু দাবিদাওয়া জানিয়ে আসছিল। শেষের দিকে গিয়ে শিবিরের সেক্রেটারি একটা দাবি অ্যাড করলেন, “ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে” এটা আমি মানি নাই, দীর্ঘক্ষণ আলাপ আলোচনা হলো। পরে আমি বললাম, ঢালাওভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা যাবে না, এক্ষেত্রে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলতে পারেন। পরে সেটাই ঠিক হল, “লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে”।

‘এই হইলো ৯ দফা তৈরির পেছনের গল্প। তবে ৯ দফা প্রচার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল শিবির। যেহেতু নেট নেই, গোলাগুলি-কারফিউয়ের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সশরীরে হাউসে হাউসে পৌঁছে দিয়েছে, বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা তারাই করেছে।’
৯ দফার পেছনের গল্প জানালেন সমন্বয়ক আব্দুল কাদের - ছবি : সংগৃহীত

এবার জানা গেল ঢাবি শিবিরের সেক্রেটারির পরিচয়

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতির পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর এবার আলোচনায় এসেছেন শিবিরের সেক্রেটারি।

রোববার (২২ সেপ্টেম্বর) সমন্বয়ক আব্দুল কাদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফা সম্পর্কে একটি স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সেক্রেটারির প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। এর পরই শুরু হয় তুমুল আলোচনা।

আব্দুল কাদের ওই স্ট্যটাসে ফরহাদ নামের একজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেও বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র বলছে, শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ফরহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৭-১৮ সেশনের এবং কবি জসিম উদদীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি ২০২২-২৩ সেশনে জসীম উদদীন হল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতিও ছিলেন।

এ ছাড়া এস এম ফরহাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এর আগে, শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে সাদিক কায়েম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সভাপতি হিসেবে দাবি করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।

ফেসবুক পোস্টে সাদিক বলেন, ফ্যাসিস্ট শোষণ শুধু ছাত্র রাজনীতি নয়, রাজনীতির সংজ্ঞাই পালটে দিয়েছে। ফ্যাসিবাদে কোনো রাজনীতি থাকে না। বিরাজনীতি ফ্যাসিবাদের ভাষা।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারে অবশ্যই চব্বিশের শহীদদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকতে হবে, তা না হলে ভেস্তে যাবে আমাদের এই স্বাধীনতা। আমরা চাই ছাত্র রাজনীতির সংস্কার গবেষণা, পলিসি ডায়ালগের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়িত হোক।

ঢাবি ছাত্রশিবির সভাপতি দাবি করা সাদিক কায়েমের স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো :

ফ্যাসিস্ট শোষণ শুধু ছাত্র রাজনীতি নয়, রাজনীতির সংজ্ঞাই পালটে দিয়েছে। ফ্যাসিবাদে কোনো রাজনীতি থাকে না। বিরাজনীতি ফ্যাসিবাদের ভাষা। ফ্যাসিবাদ ছাড়া সব বাদ, ইজম ও রাজনীতি ফ্যাসিবাদে অনুপস্থিত থাকে। ফ্যাসিবাদে কোনো রাজনীতি নাই, শুধু ফ্যাসিবাদই আছে। টেন্ডারবাজি, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, ফাঁসি, ধর্ষণ, রাহাজানি, দুর্নীতি এসব রাজনীতি না। এগুলো ফ্যাসিবাদ।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের গত ষোল বছরের ভয়ংকর দিনগুলো কিংবা তারও পূর্বের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো রাজনীতির প্রতি তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করেছিল তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সব ভুল ভেঙে দিয়েছে। রাজনীতি সম্পর্কে তৈরি হয়েছে নতুন সচেতনতা। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হচ্ছে, ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’।

আমরা জানি এই স্বাধীনতার জন্য শহীদ হয়েছে রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট এবং দলের আওতামুক্ত রাজনীতি সচেতন ছাত্র-জনতা। ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানোর চেয়ে বড় রাজনীতি আর কোনো রাজনীতিই না। আমরা চাই সেই রাজনীতির আদর্শে ছাত্র রাজনীতির ব্যাপক ইতিবাচক সংস্কার হবে। ভবিষ্যতের ছাত্র রাজনীতিতে মত-দ্বিমত হবে, যুক্তির পাথরে সবাই বিক্ষিপ্ত হবে, কিন্তু কোনো হকিস্টিক কিংবা স্ট্যাম্প থাকবে না। কোনো গেস্টরুম, গণরুম থাকবে না। চব্বিশের আকাঙ্ক্ষাকে বুকে নিয়ে এগিয়ে যাবে এই ছাত্র রাজনীতি। মধুতে ভিন্নমতের কেউ চা খেলে অপর পক্ষের কেউ তেড়ে আসবে না। একাডেমিক পরিবেশে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে ছাত্র সংসদ ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি।

গণতান্ত্রিক দেশে ভিন্ন মতের প্রতি থাকবে সম্মান কিন্তু কেউ যেন স্বৈরাচারী না হয়ে উঠতে পারে সে ব্যাপারে রাখতে হবে সজাগ ও পূর্ণ দৃষ্টি। এই রাজনৈতিক সংস্কারে অবশ্যই চব্বিশের শহীদদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকতে হবে, তা না হলে ভেস্তে যাবে আমাদের এই স্বাধীনতা। আমরা চাই ছাত্র রাজনীতির সংস্কার গবেষণা, পলিসি ডায়ালগের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়িত হোক। এ লক্ষ্যে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

এর আগে গত ১২ আগস্ট সন্ধ্যায় ঢাবির ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে সব ছাত্র সংগঠনের মতবিনিময় সভায় ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক আহনাফ আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া মতবিনিময় সভায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও ছাত্রপ্রতিনিধি নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদও উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে সর্বশেষ প্রকাশ্যে কার্যক্রম ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্র শিবিরের। 

এস এম ফরহাদ। ছবি : সংগৃহীত
এস এম ফরহাদ। ছবি : সংগৃহীত

‘কয়েকজন সমন্বয়ক বেইমানি করতে চেয়েছিল’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কয়েকজন সমন্বয়ক বেইমানি করতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ।

রোববার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে এ তথ্য জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের।

স্ট্যাটাসে আব্দুল কাদের ফরহাদ নামে এক ব্যক্তিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। কাদের লিখেছেন, আন্দোলন চলাকালে ফরহাদ তাকে জানিয়েছেন, ‘আন্দোলনরত কয়েকজন সমন্বয়ক সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে, এত এত শহীদের রক্তের সাথে বেইমানি করতেছে তারা। আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে। কিছু দাবি-দাওয়া দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে, মানুষের সাথে বেইমানি করা যাবে না।’

কালবেলার পাঠকদের জন্য সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের পোস্টটি তুলে ধরা হলো-

কোটা সংস্কারকে উদ্দেশ্য করে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল; কিন্তু সরকার পরিস্থিতি ঘোলাটে করলে আন্দোলন ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় নয় দফার অবতারণা হয়। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিলাম; কিন্তু ১৬ তারিখ মঙ্গলবার আবু সাঈদসহ ছয়জন যখন শহীদ হয়, ওই দিন রাত ১২টায় সামনের সারির সমন্বয়করা মিলে আমরা একটা অনলাইন মিটিং করি। মিটিংয়ে প্রথম এজেন্ডা-ই ছিল, আজকে যে ছয়জন শহীদ হলো, এই ছয়টা লাশের বিনিময়ে শুধু কোটা সংস্কার কি না? তখন সবাই হই হই করে বলে উঠে, ছয়টা লাশের বিনিময়ে শুধু কোটা সংস্কার হতে পারে না। পরবর্তীতে দীর্ঘক্ষণ আলাপ আলোচনা করা হয়। এই আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিসহ আরও কিছু দাবি দাওয়া উঠে আসে।

বলে রাখা ভালো, আমরা এতদিন ‘বাংলা ব্লকেড’ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি পেশসহ নানা সফট এবং হার্ড কর্মসূচি নিয়ে মাঠে অবস্থান করেছিলাম; কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে একেবারে নির্বিকার-নির্লিপ্ত মনোভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল। আলাপ-আলোচনার ধার ধারেনাই সরকার, কেবল হাইকোর্টের কাঁধে বন্দুক রেখে চুপচাপ দেখে যাচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি যখন বেগতিক হয়ে যায়, ছয়জন শহীদ হয়, ঐদিনই সরকার আলোচনার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেয়, আমাদেরকে বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ দিতে থাকে আলোচনায় বসার জন্য। কিন্ত আমরা আলোচনার আহ্বানকে বারাবরের মতোই প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করি। যদিও ভিতর বাহির থেকে আলোচনায় বসার নানারকম চাপ আসছিল।

সরকার সংলাপের আহ্বান ফরমালি জানিয়েছিল কিন্ত সেটার প্রেক্ষিতে আমরা আমাদের অবস্থান ফরমালি ক্লিয়ার করি নাই। ক্লিয়ার করার সুযোগও পাই নাই। বুধবার গায়েবানা জানাজায় ঢাবি ক্যাম্পাসে পুলিশ আমাদের ওপর গুলি চালায়, আমিসহ কয়েকজন আহত হই। হান্নান মাসউদ গুলিবিদ্ধ হয়। তখন থেকেই আমরা আন্দোলন পরিচালনা করে যাবার স্বার্থে কৌশলী অবস্থান নিয়ে গ্রেপ্তার এড়ানোর সিদ্ধান্ত নেই। যদিও সরকারের সংলাপকে প্রত্যাখ্যান করে মঙ্গলবার রাতে আমরা কিছু দাবি দাওয়া ঠিক করেছিলাম কিন্তু পরবর্তীতে সবাই মিলে আলাপ-আলোচনা করে যে সেই দাবিগুলো ফাইনাল করব সে সময় পাইনি। তবে আমরা বৃহস্পতিবার মাঠের কর্মসূচি (কমপ্লিট শাটডাউন) দিয়ে নিজেদের অবস্থান ক্লিয়ার করেছিলাম।

বৃহস্পতিবার আমি আর আসিফ ভাই এক বাসা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্যে চলে যাই। ওই দিন ১৮ তারিখ রাতেই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় সরকার। আমরাও কর্মসূচি চলমান রাখতে, গ্রেপ্তার এড়াতে বার বার জায়গা পরিবর্তন করে বেড়াচ্ছি। কারও সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগ করতে পারতেছি না।

আন্দোলনের শুরুতেই নাহিদ ভাই আমাকে ডেকে নিয়ে এক লোকের সঙ্গে মিট করায় এবং পরবর্তীতে আন্দোলনের পারপাসে একাধিকবার ওই লোকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়; পরবর্তীতে জানতে পারি তিনি ঢাবি শিবিরের ছাত্র আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। কিন্ত তখনো শিবিরের সভাপতি এবং সেক্রেটারির সঙ্গে ওইভাবে যোগাযোগ হয় নাই।

শুক্রবার যাত্রাবাড়ী এলাকায় যখন আন্দোলন করছিলাম তখন শিবিরের ঢাবি সেক্রেটারি ফরহাদ ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বলল, ‘আন্দোলনরত কয়েকজন সমন্বয়ক সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে, এত এত শহীদের রক্তের সাথে বেইমানি করতেছে তারা। আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে। কিছু দাবি-দাওয়া দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে, মানুষের সাথে বেইমানি করা যাবে না।’ আমি সম্মতি জানাই। আমাদের তো আগেই অবস্থান ছিল আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার। তাছাড়া মঙ্গলবার রাতের মিটিংয়ে ঠিক করা কিছু দাবি দাওয়া আমার মাথায় আছে। আন্দোলন চালিয়ে নেওয়ার মতো মাঠে কোনো সিনিয়র নাই। আসিফ-নাহিদ ভাইকে গুম করে রেখেছে। আমি সাত-পাঁচ না ভেবে রিস্ক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ঐদিন জুমার নামাজের পর পরই যাত্রাবাড়ীতে কয়কজন শহীদ হয়, সবগুলা আমার চোখের সামনেই ঘটতেছে। মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলতেছে, এটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারতেছিলাম না। তাছাড়া দীর্ঘদিন জেল-জুলুম, হামলা-মামলার শিকার হয়ে হাসিনার এমন অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছি; মাথা নত করি নাই। আমার পরিণতি কী হবে, সেটা ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করি নাই। চোখের সামনে মানুষ মেরে ফেলতেছে, মানুষের কথা চিন্তা করে নিজের জীবনের কথা ভাবার সময় পাই নাই। গত ৪/৫ বছর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই আমাদেরকে দৃঢ়তা ধরে রাখার শিক্ষাই দিয়েছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে হাল ধরার সিদ্ধান্ত নিই।

যাইহোক, কিছুক্ষণ বাদে শিবিরের সেক্রেটারি আমাকে আবারও ফোন দিল। বলতেছে, ‘কিছু দাবি দাওয়া খসড়া আকারে করছি, তোমার সঙ্গে আলোচনা করি।’ আমাদেরও যেহেতু আগেই আলোচনা হয়েছিল অনেকগুলো দাবির ব্যাপারে সেগুলো তখন উনার সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বিতভাবে তৈরি হয় ৯ দফা।

তিনি একে একে কিছু দাবি বললেন। যেগুলা খুব কমন দাবিদাওয়া- যেমন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ, ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িত পুলিশ প্রশাসনকে বরখাস্ত, সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনা, ভিসির পদত্যাগ। যেগুলা ৬ জন শহীদ হওয়ার পরে মঙ্গলবার রাতের বৈঠকের আলোচনাতেই আমরা ভেবেছিলাম। এ ছাড়া মানুষজনও সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কিছু দাবিদাওয়া জানিয়ে আসছিল। শেষের দিকে গিয়ে শিবিরের সেক্রেটারি একটা দাবি এড করল, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে’ এটা আমি মানি নাই, দীর্ঘক্ষণ আলাপ আলোচনা হইল। পরে আমি বললাম, ঢালাওভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা যাবে না, এক্ষেত্রে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলতে পারেন। পরে সেটাই ঠিক হইলো- ‘লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে’।

এই হলো নয় দফা তৈরির পেছনের গল্প। তবে নয় দফা প্রচার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল শিবির। যেহেতু নেট নাই, গোলাগুলি-কারফিউর মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সশরীরে হাউজে হাউজে পৌঁছে দিয়েছে, বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা তারাই করেছে।

আমাকে নতুন একটা সিম এবং মোবাইল কালেক্ট করার পরামর্শ দিল তারা। আমি স্টুডেন্ট এর বাসা থেকে সিম নিয়ে ওই নাম্বারটা নয় দফা সংবলিত প্রেস বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে দিয়ে দিলাম। ঐদিন সন্ধ্যায় বাসা থেকে ৪-৫ কিলো দূরে হেঁটে গিয়ে পরিচিত সাংবাদিকদেরকে ফোন দিয়ে নয় দফার বিষয়টা জানাইলাম। টুকটাক ছাত্র রাজনীতি করার সুবাদে ক্যাম্পাসের সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। তো ওই রাতে তাদের অনেককে একটা একটা করে দফা বাটন ফোন দিয়ে ম্যাসেজের মাধ্যমে দাবিগুলা লিখে পাঠাইছি। পুরা নয়টা দাবি একসঙ্গে ম্যাসেজে পাঠানো যায় না। কাউকে আবার মুখে বলে দিছি, সে লিখে নিছে। কেউ আবার রেকর্ড করে নিছে। কনফার্ম হওয়ার জন্য অনেকেই ফোন দিছে, এটা আসলেই আমি দিছি কি না। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলাকেও ফোন দিয়ে কনফার্ম করা লাগছে, ‘আমার পক্ষ থেকে এটা যাচ্ছে, আপনাকে একজন পেনড্রাইভের মাধ্যমে পৌঁছে দিবে।’ এইভাবে চলল রাতের ১১টা পর্যন্ত।

প্রতিদিন রাতের বেলায় বাসা থেকে দূরে চলে যেতাম। ফোন অন করে সাংবাদিকদের সঙ্গে ২-৩ ঘণ্টা কথাবার্তা বলে, তাদেরকে কনফার্ম করে, ফোন বন্ধ করে আবার বাসায় ফিরতাম। সিনিয়ররা গুম অবস্থায় ছিল, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না বাকিদের সঙ্গেও। এইভাবেই চলতে থাকল। আমার বাসা ছিল যাত্রাবাড়ী থানার পাশেই। গ্রেপ্তারের আতঙ্ক, তারপরও বাসায় থাকতে হতো। শুরুতেই যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। কোনো রাত মসজিদে কাটাইছি, কোনো রাত অর্ধেকটা বাহিরে কিংবা বাসার ছাদে কাটিয়ে শেষ রাতে বাসায় ফিরেছি।

এইতো ঐতিহাসিক নয় দফা, আমাদের নয় দফা, ফ্যাসিস্ট হাসিনা থেকে মুক্তি লাভের সনদ! 

বাঁ দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ও ডান দিকে ঢাবি শিবিরের সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ। ছবি : সংগৃহীত
বাঁ দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ও ডান দিকে ঢাবি শিবিরের সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ। ছবি : সংগৃহীত

শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি প্রকাশ্যে এলেন, নানা আলোচনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কমিটি আছে এবং সেই কমিটির সভাপতি সাদিক কায়েম—সেটা অবশেষে প্রকাশ্যে এল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে গতকাল শনিবার মতবিনিময় সভায় যোগ দেওয়ার পর গণমাধ্যমে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে বক্তব্য দেন সাদিক। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে।

কেউ কেউ সাদিকের সঙ্গে পরিচয় থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় না জানা ও বুঝতে না পারা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। কেউ কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ জানান।

কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের মিথস্ক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম পরিবেশ পরিষদে ১৯৯০ সালে শিবির ও জাতীয় পার্টির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে না দেওয়ার বিষয়ে মতৈক্য হয়েছিল।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন হয়। তাদের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করত। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে শিবিরকে কোনো কার্যক্রম চালাতে দেয়নি। শিবির সন্দেহে তারা অনেককে মারধর ও হল ছাড়তে বাধ্য করেছে। অবশ্য সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গত জুলাইয়ে ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস ছাড়া করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে শনিবার আলোচনার প্রথম পর্বে অংশ নেন শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সাদিক। এই পর্বে ছিলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের নেতারা।

মতবিনিময় সভায় শিবিরের পক্ষ থেকে উপাচার্যের কাছে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পরিবর্তে সংস্কার ও অবিলম্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দাবি করা হয়।

সভা শেষে সাদিক প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা কোনো প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নয়। তাঁরা সব ছাত্রসংগঠনকে নিয়ে সংলাপের আয়োজন করতে বলেছেন, যেখানে ফ্যাসিবাদের দোসর ছাড়া সব ছাত্রসংগঠন আসবে। শিবির মেধাভিত্তিক রাজনীতি চায় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেকে প্রত্যেকের রাজনৈতিক চর্চা করবে, সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না, সেটাই আমাদের চাওয়া।’

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠনকে ফ্যাসিবাদের দোসর উল্লেখ করে সাদিক বলেন, তাদের রাজনীতি করার অধিকার নেই।

সাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। তাঁর স্নাতকোত্তর শেষ। তিনি থাকতেন মাস্টারদা সূর্য সেন হলে। গত জানুয়ারিতে শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হওয়ার আগে তিনি সংগঠনের সূর্য সেন হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

সাদিকের সঙ্গে শনিবার মতবিনিময় সভায় শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আরেক নেতা রেজাউল ইসলাম অংশ নেন। তবে রেজাউলের ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়নি। সাদিক ও রেজাউল ছাড়া শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অন্য নেতাদের কারও পরিচয় এখনো সামনে আসেনি।

কমিটির বিষয়ে সাদিক আজ রোববার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের কমিটি খুব দ্রুত প্রকাশ করা হবে। বিগত সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী সরকার তাঁদের আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিকস (গোপনে রাজনীতি) করতে বাধ্য করেছে।

ছাত্রলীগ বিতাড়িত হওয়ার পর এখন শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন ব্যানারে রাজনীতি করছে এবং হলগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে—কারও কারও এমন বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাদিক বলেন, শিবিরের সমর্থকদের বেশির ভাগ হলের বাইরে থাকেন। কিছু নিয়মিত শিক্ষার্থী হলে থাকতে পারেন। গোপনে শিবির সব নিয়ন্ত্রণ করছে, এটা ঠিক নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শনিবারের সভাটি পরিবেশ পরিষদের ব্যানারে ডাকা হয়নি। শিবিরের দুজন নেতা সভাটিতে অংশ নেওয়ার পর এ নিয়ে উপাচার্যের সামনে প্রশ্ন তোলেন কয়েকটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতারা।

ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ শনিবারের মতবিনিময় সভায় উপাচার্যকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি কীভাবে তাঁকে (শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি) খুঁজে পেলেন?’

উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান তাঁর এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন মাঈন আহমেদ। মাঈন ছাড়াও গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ (বাসদ) কয়েকটি বাম ছাত্রসংগঠনের নেতারা সভায় শিবিরের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

১৯৯০ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদে জাতীয় ছাত্রসমাজ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়, তখন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের অন্যতম নেতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে বিএনপি নেতা খায়রুল কবির খোকন। তিনি আজ সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, স্বৈরাচারের সহযোগী হওয়ায় জাতীয় ছাত্রসমাজ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে সব ছাত্রসংগঠনের মধ্যে তখন ঐকমত্য হয়েছিল। সিদ্ধান্তটি ছিল, এই দুই সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না৷

খায়রুল কবির আরও বলেন, ‘শিবির ও ছাত্রসমাজের বিষয়ে এখনকার ছাত্রসংগঠনগুলো কী আচরণ করবে, সে ব্যাপারে আমরা এখনকার ছাত্রসমাজের ওপরই আস্থা রাখতে চাই। আমরা দলীয় বা সাংগঠনিকভাবে এ বিষয়ে কিছু বলছি না৷’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ কলেজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাড়ে তিন দশকে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও বাম ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষ হয়েছে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিচার করা হয়। কারও কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বিগত সাড়ে ১৫ বছরে বিভিন্ন সময় বিএনপি ও জামায়াত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপি জামায়াতের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। গত ৩০ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের জোট অনেক আগেই অকার্যকর হয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখন প্রভাব আছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের। ছাত্রদলের সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে। বাম ছাত্রসংগঠনগুলোও সক্রিয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান হলো, তারা ক্যাম্পাসে কোনো দলের ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি চায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের আপত্তি আছে। তবে নেতারা এখনই প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলতে রাজি নন।

ছাত্রদলের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা আজ নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে তাদের অবস্থান প্রকাশ করতে হবে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো এবং অন্যান্য অংশীজন মিলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

সাদিক কায়েম
সাদিক কায়েম। ছবি: সংগৃহীত

ঢাবি শিবির সভাপতিকে নিয়ে ফেসবুকে বাহাস

প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে এসেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে ঢাবি শাখার বর্তমান সভাপতি হিসেবে নিজেকে দাবি করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সাদিক কায়েম। পোস্টটি মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর থেকে ফেসবুকে শুরু হয় আলোচনা, সৃষ্টি হয় বাহাস।

জামায়াত ইসলামের আলোচিত এই ছাত্র সংগঠন নিয়ে নেটিজেনরা নতুন করে আলোচনা শুরু করেন। অনেককে পক্ষে, আবার অনেককে বিপক্ষে নানা রকম মন্তব্য করতে দেখা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিবিরের এই শীর্ষ নেতাকে বেশ সরব দেখা গিয়েছে। এজন্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলেন আসেন তিনি।

ঢাবির শিবির সভাপতি হিসেবে হঠাৎ প্রকাশ্যে আসায় এর তীব্র সমালোচনা করেছেন আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক শাহেদ আলম। তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘সাদিকের শিবিরের সভাপতি ঘোষণা নিয়ে আমার আপত্তি নেই, আপত্তি যে সে নিজের পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ ছাত্রদের সাথে ও জনতার ঈমানের প্রতি বেঈমানি করেছে। সমন্বয়করা অরাজনৈতিক জেনেই তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছে সবাই। শিবিরের কারো ডাকে সাড়া দেয়নি। ছাত্রদের মধ্যে বাদবাকী কেউ শিবির থেকে থাকে তারাও ঘোষণা দিয়ে বের হয়ে যাক। অন্য দলের থাকলেও বের হয়ে যাক। এ ধরনের কাজ মোনাফেকি কাজ কারবার। সাদিক নিজে মোনাফেক, তার পরিচয় গোপন রেখে জামায়াত ও দল হিসেবে জাতির সাথে মোনাফেকি করেছে বলে আমি মনে করি।’

ফ্রান্সে থাকা মানবাধিকারকর্মী ডা. পিনাকী ভট্টাচার্য বিষয়টি বেশ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। ঢাবিতে শিবিরের রাজনীতি প্রকাশ্যে শুরু হলে বিরাজনীতিকরণের পরিকল্পনা ঠেকিয়ে দেয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।

ফেসবুকে তিনি লেখেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনীতি মুক্ত করার চক্রান্তের মুখে সাদিক কায়েম খুবই সঠিক পলিটিক্যাল স্ট্যান্ড নিয়েছেন। ঢাবিতে শিবিরের রাজনীতি প্রকাশ্যে শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজনীতিকরণের পরিকল্পনা ঠেকিয়ে দেয়া যাবে। ছাত্র রাজনীতিকে ভিলেইন বানানোর সুশীল চক্রান্ত আমাদেরকেই রুখে দিতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশের ছাত্ররা একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিরোধের শক্তি। এই শক্তিকে নির্বীর্য করে দেয়ার চেষ্টা অনেক দিন থেকে চলছে। সকল ছাত্র সংগঠন তাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিকে সচল করুক। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচনি উৎসব দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুখরিত হোক।

অন্যদিকে আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান সামি বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। কারণ প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ না পেয়েও সাদিক কায়েমের মতো একজন নেতা তৈরি করতে পেরেছে শিবির ।

ফেসবুকে তিনি লিখেন, একটা স্ট্যাটাস লেখার জন্যে দুপুর থেকেই চিন্তা করছিলাম, বানরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উঠার মতো অবস্থা হয়েছিলো আমার সিদ্ধান্তের। এক ফুট উঠে, তো আবার দুই ফিট স্লিপ করে নিচে নামে। স্বভাব যেহেতু এ ধরনের মতামত চেপে রাখার বিপক্ষে, তাই আমিও আর চেপে রাখতে পারলাম না। তৈলাক্ত বাঁশটা পার করেই ফেললাম।

ছেলেটাকে আমি চিনতাম সালমান নামে। পরিচয় জুলাইর ২৫ তারিখ থেকে। তারপর নিয়মিতই কথা হতো। আমার খুব কাছের বন্ধুদের একটা নেটওয়ার্ক অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমন্বয়ককে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করে। মূলত সালমানের সাথে কো-অর্ডিশন করেই সব আয়োজন করা হয়। বয়সে বেশ ছোট সালমানের সাথে বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ একটা সম্পর্ক তৈরি হয় আমার ও আমার বন্ধুদের। ডিবি কার্যালয় যখন সমন্বয়কদের শীর্ষ নেতৃত্ব আটক, তখন সালমান ও অন্যান্য সমন্বয়করা পুরো আন্দোলনের নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। নিরাপদ আবাসে থাকা সবার সাথেই আমার নিয়মিত যোগাযোগ হতো, সত্যি বলতে কী সালমানের পুরো পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ দেখে আমি বেশ অবাকই হচ্ছিলাম। কতইবা বয়স তার হয়তো ২৪/২৫ হবে, তারপরও এই ছেলে যেভাবে সকল পরিস্থিতি আমার বন্ধুদের পরামর্শে ম্যানুভার করেছে এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ সব স্ট্রাটেজিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

এই তো কয়েকদিন আগেই কথা হলো সালমানের সাথে, কোনো পরিবর্তনই নেই ছেলেটার মধ্যে, নিরহংকার সেই একই সালমান। অন্য সকল সমন্বয়কদের থেকে সালমান ও কাদের এই দুটো ছেলে একেবারেই ভিন্ন। দু'জনের নেতৃত্বই অত্যন্ত বলিষ্ঠ। তো আজকে দুপুরে জানলাম সালমানের প্রকৃত নাম সাদিক কায়েম এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি। অবশ্যই অবাক হয়েছি, বেশ অবাক হয়েছি। কিন্তু প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ না পেয়েও শিবির যে সালমানের (আমার কাছে সে সালমানই থাকবে) মতো একটা নেতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে তার জন্যে সাধুবাদ জানাই। ছাত্র রাজনীতি সুষ্ঠু ধারার গণতন্ত্রের জন্যে অত্যাবশ্যক এবং তার সদ্ব্যবহার করে যে কোন রাজনৈতিক দলই যদি সালমান কিম্বা কাদেরের মতো তরুণ-তরুণীদের এত ম্যাচিউরড নেতা/নেত্রী হিসেবে তৈরি করতে পারে, তাহলে মন্দ কি?

সাংবাদিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক শিক্ষার্থী আবির হাকিম ফেসবুকে লেখেন, কোভিডের পরে সূর্যসেন হল ছাত্রলীগের এক বড় ভাই একদিন সাদিকরে (Shadik Kayem) পরিচয় করাইয়া দিছিলো। বলছিলো, সাদিক আমাদের এলাকার ছোটো ভাই। ছাত্রলীগের ফ্রেশ ইমেজের ছেলে। সামনে ওরে হলের নেতা বানাইতে হবে। আমি যেন দেখে রাখি। সবকিছুই মানা যায় ভাই। কিন্তু ওরা যে শিবির হয়ে ফিরে আসতে পারে তা ভাবতে পারি নাই।

ঢাবি শাখার বর্তমান সভাপতি হিসেবে দাবি করা সাদিক কায়েমের বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলায় বলে জানা গেছে। পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত সংগঠন হিল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার দা সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। কোনো ধরনের প্রকাশ্য কার্যক্রম ক্যাম্পাসে ছিল না বলে জানান সে সময় থেকে ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

mzamin

Sunday, September 22, 2024

ঢাবিতে প্রকাশ্যে ছাত্রশিবির,ক্যাম্পাস জুড়ে আলোচনা-কৌতূহল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় পর প্রকাশ্যে এসেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।জামায়াত ইসলামের আলোচিত এই ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ্যে আসার ঘোষণার পরে ক্যাম্পাস জুড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে চলছে আলোচনা। সদ্য ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থানে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়েও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে কৌতূহল।

শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে সাদিক কায়েম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সভাপতি হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,এই শিবির নেতার বাড়ি চটগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলায়। পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত সংগঠন হিল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার দা সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ।

আজ বিকেল তিনটার দিকে নিজের ফেসবুক একাউন্ট থেকে দেওয়া এক পোস্টে সাদিক লিখেন,ফ্যাসিস্ট শোষণ শুধু ছাত্র রাজনীতি নয়, রাজনীতির সংজ্ঞাই পালটে দিয়েছে। ফ্যাসিবাদে কোনো রাজনীতি থাকে না। বিরাজনীতি ফ্যাসিবাদের ভাষা।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারে অবশ্যই চব্বিশের শহীদদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকতে হবে, তা না হলে ভেস্তে যাবে আমাদের এই স্বাধীনতা। আমরা চাই ছাত্র রাজনীতির সংস্কার গবেষণা, পলিসি ডায়ালগের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়িত হোক।নতুন গণতান্ত্রিক দেশে কেউ যাতে ফের স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে সেদিকেও সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান এই শিবির নেতা।

তার এই পোস্ট মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যম গুলোতে ভাইরাল হয়ে যায়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেই পোস্টে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।শেয়ার হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার বার।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সংগঠিত গণঅভ্যুত্থানে জামায়েত ইসলামী ও ছাত্রশিবিরে ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক  আলোচনা ছিল সবমহলে।আওয়ামী লীগের শুরু থেকে বরাবরই দাবি করে আসছিল এ আন্দোলনের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে জামায়াত-শিবির। যদিও ছাত্রসংগঠনটি পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের এ দাবির বিরোধিতা বা সমর্থন করে কিছু বলা হয়নি

বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি দাবী করা সাদিক বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। সাম্প্রতিক সময়ে প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে  শিবিরের এই শীর্ষ নেতাকে বেশ সরব দেখা গিয়েছে।

প্রসঙ্গত ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।২০১১-১২ শিবিরের কোন ধরনের প্রকাশ্য কার্যক্রম ক্যাম্পাসে ছিল না বলে জানান সে সময় থেকে ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির প্রকাশ্যে আসা নিয়ে শিক্ষার্থীরা নানা মন্তব্য করছেন।ক্যাম্পাসে সাদিক কাইয়ুম পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি এতদিন বিষয়টি কিভাবে লুকিয়ে রেখেছেন তা নিয়েও অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন হল ও অনুষদে কারা সংগঠনটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তা নিয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পরে ছাত্রশিবিরের নতুন এই আত্মপ্রকাশ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

শিবিরের প্রকাশে আসা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন অন্যান্য ছাত্র সংগঠন। ছাত্রদল কেন্দ্রীয়ভাবে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও সংগঠনটির নেতাকর্মীরা গোপন রাজনীতি বাদ দিয়ে শিবিরের প্রকাশে আসাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।তারা প্রত্যাশা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি ইউনিট ও হলের সব শিবির নেতাকর্মী প্রকাশ্যে এসে আগামীতে ছাত্ররাজনীতি করবেন।

mzamin

১০ ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে ঢাবি প্রশাসনের আলোচনা, অংশ নিল শিবিরও

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১২ দিন পর আগামীকাল রোববার ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে। ক্লাস শুরুর আগে আজ শনিবার ক্যাম্পাসের ১০টি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দুই পর্বে অনুষ্ঠিত এই সভার প্রথম পর্বে অংশ নেয় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরও।

মতবিনিময়ে অংশ নেওয়া প্রায় সব ছাত্রসংগঠনের নেতারা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পরিবর্তে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ছাত্র সংসদ কার্যকর করার দাবি জানান।

সভার দুই পর্বে ছাত্রসংগঠনগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন দাবিদাওয়া ও প্রস্তাব তুলে ধরেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিসহ সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে—এমন আলোচনা সামনে আসার পর আজ ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খানের কার্যালয়ে এই সভায় দুই সহ–উপাচার্য মামুন আহমেদ ও সায়মা হক বিদিশা, কোষাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন।

বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত প্রথম পর্বে আলোচনায় অংশ নেয় ইসলামী ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল ও বিপ্লবী ছাত্র–যুব আন্দোলন। বেলা দুইটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত আলোচনায় অংশ নেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী), সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (বাসদ), ছাত্র ফেডারেশন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।

জানতে চাইলে উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘সব ছাত্রসংগঠনের কথাগুলো শুনলাম। আমাদের মূল অগ্রাধিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা। সেটিকে সামনে রেখেই সবার সঙ্গে বসলাম।’
ছাত্রদল যা বলল

বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় ও সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন আলোচনায় অংশ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সিন্ডিকেটকে ‘খুনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রতিনিধিত্বকারী দালালদের সিন্ডিকেট’ আখ্যা দিয়ে তা ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সভা শেষে গণেশ চন্দ্র সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীদের ভাবাবেগ (সেন্টিমেন্ট) ধারণ করেই রাজনীতি পরিচালিত হবে। বিগত ১৫ বছরের যে নির্যাতনের আতঙ্ক (ট্রমা) ছাত্রলীগ গেস্টরুম ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে তৈরি করেছে, সেটাকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ছাত্ররাজনীতি বলে মনে করছেন। এই ট্রমা কাটতে সময় লাগবে। ফ্যাসিস্টদের নির্মিত এই ট্রমা নিবারণে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের রাজনীতি যে ছাত্ররাজনীতি নয়, তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে। ক্যাম্পাসে ভয়মুক্ত ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। আমরা চাই, রাজনীতি হবে মেধা ও শিক্ষার্থীদের চাওয়ার ভিত্তিতে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা একটি চরিত্র রয়েছে উল্লেখ করে নাহিদুজ্জামান বলেন, সেই চরিত্র রাজনীতিবিমুখ বা রাজনীতির বাইরে নয়। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভয় ও শঙ্কামুক্ত ছাত্ররাজনীতি নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। আগামীকাল ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হতে যাচ্ছে। সবাই কীভাবে একত্র হয়ে কাজ করবেন, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নাহিদ আরও বলেন, ‘প্রশাসন আমাদের বলেছে, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিবর্তিত অবস্থায় ছাত্ররাজনীতির গুণগত পরিবর্তন করতে হবে। সেটি কীভাবে হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
সংলাপ চায় শিবির

সভায় সব ছাত্রসংগঠনকে নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ছাত্রশিবির। শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সাদিক কায়েম প্রথম আলোকে বলেন, সভায় তাঁরা বলেছেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা কোনো প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নয়। তাঁরা উপাচার্যের কাছে ছাত্ররাজনীতির সংস্কার চেয়েছেন।

সাদিক কায়েম বলেন, ‘আমরা সব ছাত্রসংগঠনকে নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন করতে বলেছি, যেখানে শুধু ফ্যাসিবাদের দোসর ছাড়া সব ছাত্রসংগঠন আসবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খুব দ্রুতই সংলাপ আয়োজন করার কথা বলেছে। সেই সংলাপ এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার আলোকে তাঁরা একটা সিদ্ধান্তে আসবেন।’

সাদিক আরও বলেন, ‘ছাত্রলীগ ও ১৪ দলভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠন—এরা ফ্যাসিবাদের দোসর। তাদের রাজনীতি করার অধিকার নেই। তারা বাদে বাকি সব সংগঠনের কনসেনসাসের (ঐকমত্য) ভিত্তিতে আমরা সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি করতে চাই।’

এদিকে ছাত্রশিবিরকে সভায় ডাকা নিয়ে এবং ১৯৯০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদের চুক্তি বাতিল হয়ে গেল কি না, সে বিষয়ে সভায় প্রশ্ন তোলেন ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ। তবে উপাচার্য এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেননি বলে জানান তিনি।

শিবিরসহ ধর্মীয় সংগঠনকে সভায় ডাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ছাত্র ফ্রন্টের (বাসদ) বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা সোহাইল আহমেদও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তত ১৭ বছর পর ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করল।
আরও যত দাবি–প্রস্তাব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বায়ত্তশাসিত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কারের আলোচনা এগিয়ে নিতে অংশীজনদের নিয়ে কনভেনশন করার প্রস্তাব দেন ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংবিধান অনুসারে ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি থাকবে না, তা বিতর্কের বিষয় হতে পারে না। সেটি আমরা বলেছি। ছাত্ররাজনীতির নামে যে অপকর্মগুলো হয়েছে, সেগুলো ঠেকানোর জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। প্রশাসন এ বিষয়গুলো কীভাবে আটকাবে, কীভাবে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে প্রতিরোধমূলক আইন বা নীতিমালা হতে পারে। এ ছাড়া একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আগের সরকারের সময়ে প্রণীত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত মহাপরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছি।’

ছাত্র ফ্রন্টের নেতা সোহাইল আহমেদ সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদ কার্যকর করা, হলগুলোতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাস–দখলদারত্বের বিষয়টি নজরদারি করতে হল পর্যায়ে ও কেন্দ্রীয়ভাবে সেল গঠনের দাবি জানান।

পেশিশক্তি ও দখলদারত্বের রাজনীতি বন্ধ করার দাবি জানান ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আরমানুল হক। তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে নই, যৌক্তিক সংস্কার চেয়েছি।’

১০ ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে ঢাবি প্রশাসনের আলোচনা, অংশ নিল শিবিরও