Saturday, March 3, 2018

কেন আড়ালে থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশে ছেলে শিশুদের উপর চালানো যৌন নির্যাতন?

বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ১৪টি ছেলে শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে খবর এসেছে। বছর জুড়ে ১০ টি সংবাদমাধ্যমের খবর পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য দিচ্ছে শিশু অধিকার ফোরাম।
যদিও শিশু অধিকার সংগঠনগুলো মনে করে বাস্তবে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। কিন্তু ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের বিষয়টি বাংলাদেশের সমাজে বা দেশের আইনে একেবারেই গুরুত্ব পাচ্ছে না।
অথচ এমন ঘটনা সমাজে ঘটছে। ঢাকার কেন্দ্রে একটি আবাসিক এলাকায় কথা হচ্ছিলো ত্রিশোর্ধ এক যুবকের সাথে।
তিনি বলছেন একের অধিকবার বার তিনি এমন ঘটনার শিকার। আমার বয়স তখন আট। আমরা যে বাসায় থাকতাম তার দোতলায় একটি ছেলে থাকতো।
সে প্রায়ই আমাকে সিঁড়িতে চেপে ধরত। দুই পায়ের মাঝখানে হাত দিতো। আমার খুবই খারাপ লাগতো"
যে যুবক তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন তার অনুরোধে এখানে পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে। তিনি বলছিলেন ছোটবেলায় একটু দুষ্টুমি করতেন।
তাকে মনোযোগী করতে বাবা-মা তার জন্য একজন গৃহশিক্ষক রেখেছিলেন। তার দ্বারাই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন এই ব্যক্তি।
"আমার জীবনের সবচাইতে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাটি হয় আমার বয়স যখন ১২ বছর তখন। আমার বাবা মা আমার জন্য একজন গৃহশিক্ষক রেখেছিলেন, কারণ আমি পড়াশুনো করতে চাইতাম না। তাকে খুব মেধাবী বলে মনে করা হতো। সে আমাদের বাসায় থেকেই আমাকে পড়াতো এবং আমার সাথে এক ঘরেই তাকে থাকতে দেয়া হয়েছিলো। একদিন রাতে হঠাৎ টের পেলাম আমার সারা শরীরে কারোর হাত"।
বাকি কথাটুকু বলতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন তিনি। এর পর তিনি যা বললেন তার মর্ম হল ঐ গৃহ শিক্ষক তার উপর টানা তিনমাস নানা ধরনের যৌন নির্যাতন চালিয়েছে।
ধর্ষণের শিকারও হয়েছেন তিনি। কিন্তু সেটি তিনি বাবা মায়ের কাছে একেবারেই বলতে পারেন নি। 'দুষ্ট' বালক গৃহ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছে তাই পাছে যদি তার কথা কেউ বিশ্বাস না করে সেই ভয়ে। বয়স ৩০ হওয়ার পরই শুধুমাত্র তিনি নিজের কষ্টের কথা বন্ধুদের বলতে সক্ষম হয়েছেন।
কিন্তু বাবা-মা বিষয়টি কখনো বুঝতেও পারেন নি যে তাদের ছাদের নিচেই ছেলের উপর কি ভয়াবহ অন্যায় ঘটে গেছে।
অভিভাবকেরা ছেলে সন্তানদের যৌন নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে কতোটা চিন্তা করেন - সেটি বুঝতে আমি কথা বলছিলাম ধানমন্ডিতে এক মায়ের সাথে।
খুব অল্প কদিন বাদেই তার মেয়েটি কিশোরী হয়ে উঠবে। সাড়ে সাত বছর বয়সী একটি ছেলেও রয়েছে তার।
তিনি বলছিলেন, "আমার মেয়েকে নিয়ে আমি ওর খুব কম বয়স থেকেই উদ্বিগ্ন। যখন ও খুব ছোট ছিল তখন কেউ কোলে নিলে তাকিয়ে থাকতাম। আট সাড়ে আট হওয়ার পর থেকেই ওকে শেখাতে শুরু করলাম ক্লাসের বড় কোন ভাইয়া, কোন ছেলে টিচার বা এরমক কেউ যদি তোমাকে কোথাও একা ডাকে, যাবে না। মুখের ওপর বলে দিও যে মা বারণ করেছে। কিন্তু ছেলের বেলায় এমন চিন্তা আমার মাথায় কখনো আসেনি বা এখনো আসে না"
জানতে চেয়েছিলাম ছেলে বাচ্চাকে নিয়ে তিনি কেন চিন্তা বোধ করেন নি?
তিনি বললেন, "এটা হয়ত কোন সামাজিক বিষয়। হয়ত মানসিক বিষয়ও হতে পারে। যেহেতু আমরা শুনি মেয়েরাই এই ঘটনার শিকার হয়। আমার ছেলের ক্ষেত্রে কেউ তুলে নিয়ে যাবে, হয়ত এমন ভেবেছি কিন্তু সেক্সুয়াল কিছু কখনো ভাবি নি"
তার মানে ছেলেরা যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সেটি নিয়ে কি সেভাবে ভাবছে না বাংলাদেশের সমাজ?
যদিও এ নিয়ে বাংলাদেশে তেমন কোন গবেষণা নেই কিন্তু ঘটনার খবর নানা সময়ে সংবাদমাধ্যমে আসছে।
২০১৭ সালে এমন অন্তত ১৪ টি ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করে সংখ্যাটি এর চেয়ে আরো অনেক বেশি হবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের শিশু অধিকার ইউনিটের প্রধান মকসুদ মালেক। তিনি একই সাথে একজন মনোরোগ চিকিৎসকও।
তিনি বলছেন ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয় না, সেটি নিয়ে সামাজিক ধারনা আগে ভাঙা দরকার।
তিনি বলছিলেন, "ছেলে হোক, মেয়ে হোক তারা একটা সামাজিক ধারণা নিয়ে বড় হয়। যেমন প্রথমত হল এই ধারণা তার মধ্যে থাকে না যে ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে। সেই মেসেজটা ছেলে শিশুর কাছে আছে। আর ধরেই নেয়া হয় নির্যাতনের শিকার মেয়েরাই হয়।"
তার মতে এই ধারণা আসলে মিথ।
তিনি বলছেন, "আমাদের সমাজে মায়েরা মেয়েদের শেখায় কোনটা খারাপ স্পর্শ কিন্তু ছেলেটাকে কেউ শেখায় না। এই পুরো বিষয়টা আমাদের ভাঙা দরকার। ছেলে শিশু হোক বা মেয়ে শিশু দুজনেই কিন্তু সমান ভালনারেবল। সবাইকে জানানো উচিত যে আপনার ছেলে শিশুটিও যে কোন সময় ভালনারেবল হতে পারে"।
মকসূদ মালেক বলছেন, ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই কাছের কারো দ্বারাই শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার যেমন আত্মীয়, শিক্ষক, পারিবারিক বন্ধু, প্রতিবেশী। ছেলেদের ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম নেই।
মি: মালেক বলছেন দরিদ্র ছেলে শিশুরা একটু বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তিনি পথ শিশুদের নিয়ে তাদের নিয়মিত কাজ করেন। সেখানে ছেলেদের মধ্যে এই ধরনের ঘটনা তারা মাঝে মধ্যেই পান।
তিনি বলছেন তাদের সাথে মেয়ে শিশুদের মানসিক ট্রমার কোন তফাত নেই। বরং ছেলেদের বাড়তি চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
মি: মালেক বলছেন, "ট্রমা যখন সংজ্ঞায়িত করা হয় তখন সেটি ছেলে বা মেয়েদের জন্য আলাদা করে বলা হয়না। এর কনসেকোয়েন্স সবার জন্যেই একই রকম। তার ফ্ল্যাসব্যাক হতেই পারে, ডিপ্রেশন, ফোভিয়া, উদ্বেগ হতেই পারে। নির্যাতনের শিকার ছেলে শিশুর মধ্যে এই বিষয়গুলো কিন্তু থাকবেই। মানুষ হিসেবে তার শরীর, মন, আচরণ, বিশ্বাস ও কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। ছেলে বলে তাতে কোন ভিন্নতা নেই। সে একই ভাবে সাফার করবে"।
একই সাথে তিনি নিজেই বলছেন মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো কিশোরী ও মেয়ে শিশুদের নিয়েই কাজ করে। ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের বিষয়টি তারাও কখনো বিবেচনায় আনে না।
এই প্রতিবেদনটি তৈরি করতে শিশুদের নিয়ে কাজ করে এরকম দশটি সংস্থার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে।
কিন্তু তাদের সেনিয়ে কোন ধরনের কাজ পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশে মাত্র একটি গবেষণা পাওয়া গেছে যদিও সেটি হয়েছে খুব স্বল্প পরিসরে এবং একটি শিক্ষার্থীদের তৈরি সংগঠনের দ্বারা।
নিরাপদ শৈশবের উদ্দেশ্যে বা নিশু নামের এই সংগঠনটি ঢাকা ও সাতক্ষীরায় ৯ টি স্কুলে এক জরিপ চালায়।
সেখানে তারা ১২শ শিশুর সাথে কথা বলেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রতি দশজনের একজন ছেলে যৌন নির্যাতন বা অশোভন আচরণের শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে।
কিন্তু কেন বাংলাদেশে সমাজে বিষয়টি নিয়ে খুব একটা কথা হয় না? জিজ্ঞেস করেছিলাম সমাজবিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদেকা হালিমের কাছে। তিনি বলছেন, "যুগে যুগে আমরা এটাই দেখে এসেছি নারী পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে সেটি আরো শক্তিশালী করার জন্য যৌন নির্যাতনকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধর্ষণ যৌন নির্যাতনের মধ্যে সর্বোচ্চ একটি ধরন। এর মাধ্যমে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আর সেটা করে পুরুষ। কিন্তু আমাদের সমাজে আমরা যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইনা সেটি হল নারী শিশুকেই শুধু ব্যবহার করা হয়না। পুরুষ শিশুকেও যৌন আকাঙ্ক্ষা হাসিল করার জন্য বা যৌন উত্তেজক ছবির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে"।
ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে কথা বার্তা বলার ক্ষেত্রে এমন সামাজিক অনীহার কারণে এমন ঘটনা ঘটলেও সেটির বিচার একদমই হচ্ছে না।
কারণ বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে পুরুষের বা ছেলে শিশুর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন সম্পর্কে কিছুই বলা নেই, বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান।
তিনি বলছেন, "যদি স্পষ্ট করে বলতে চান পুরুষের বিরুদ্ধে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট হলে তার শাস্তি কি? এইভাবে বাংলাদেশে কোন আইন নেই। পুরুষকে ভিক্টিম করার জন্য কোন শাস্তি বাংলাদেশে এখনো দেয়াও হয়নি"
তার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম এর মানে কি কোন ছেলেকে যদি কেউ যৌন নির্যাতন করে বা ধর্ষণ করে সেটি কি আদৌ ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়?
তিনি বলছেন, "না......বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে রেপ বা যৌন নির্যাতনের যে ক্রাইটেরিয়া সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রতিটি যায়গাতেই নারী ও মেয়েদের কথাই বলা আছে"।
বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধে যে আইন রয়েছে তার নাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। সেখানে শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনের শিকার হিসেবে শুধু কন্যা শিশুর কথাই বলা হয়েছে।
তাদের কথা মাথায় রেখেই এমন নির্যাতনকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
এর বিচার ও শাস্তির কথাও বলা হয়েছে শুধু নারী ও কন্যা শিশুদের কথা মাথায় রেখেই।
যদিও পাশের বাড়ির ছেলেটি তার থেকে কম বয়সী কোন বালকের দু পায়ের মাঝখানে চেপে ধরার ঢের নমুনা বাংলাদেশে পাওয়া যাবে। অথবা শিক্ষক বা আত্মীয়র কাছে ধর্ষণের খবর।
কিন্তু ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের বিচারের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।
বরং ছেলে বা কোন পুরুষ যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তা নিয়ে কথা বললে উল্টো তাকে হাসির পাত্র হতে হচ্ছে।
সূত্রঃ বিবিসি

গণতন্ত্র কি মৃতপ্রায়?

যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র কি মুমূর্ষ অবস্থা পার করছে? কেন কিংবা কেন নয়? যদি সত্যিই বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের আবেদনে ভাটা পড়ে, তাহলে এ নিয়ে কী করা যেতে পারে? বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট ফর টেকনোলজি’র ক্যাম্পাসে সোমবার রাতে আয়োজিত এক ফোরাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ঠিক এই প্রশ্নগুলো। এই আলোচনায় অংশ নিয়েছেন আমেরিকার প্রথিতযশা কিছু শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভগ্নদশা নিয়ে আলাপ করেছেন তারা। গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে রেখেছেন কিছু সুপারিশও। স্টাটা সেন্টারে আয়োজিত এই পাবলিক ফোরামে অংশ নিতে হাজির হয়েছিলেন তিন শতাধিক শ্রোতা।
এমআইটি’র অর্থনীতির অধ্যাপক ও ‘হোয়াই ন্যাশন ফেইল’ নামে বিশ্বজুড়ে আলোচিত বইটির সহ-লেখক ড্যারন এইসমোগলু তার বক্তব্য শুরুই করেন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে।
তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র কি এখন মুমূর্ষ দশা পার করছে? আসলে, আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, গণতন্ত্র এখন এক কঠিন সময় পার করছে।’
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রভাষক ও ‘দ্য পিপল ভার্সাস ডেমোক্রেসি: হোয়াই আওয়ার ফ্রিডম ইজ ইন ডেঞ্জার অ্যান্ড হাউ টু সেইভ ইট’ বইয়ের লেখক ইয়াচা মৌঙ্ক বলেন, ‘উদারপন্থী গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল রাখতে হলে যেসব নিয়মনীতি প্রয়োজন হয়, ঠিক তার ওপরেই আক্রমণ করা হচ্ছে।’
প্যানেল আলোচকরা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন যে, গণতন্ত্রের এখন যে ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা, তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বরং বিশ্বব্যাপী প্রতিভাত হচ্ছে। হাঙ্গেরি, কেনিয়া, পোল্যান্ড, রাশিয়া, তুরস্ক ও ভেনেজুয়েলা সহ বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি ও অধিকার এখন মারাত্মকভাবে বিপন্ন। এছাড়া খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই সরকারী নিয়মনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে তিক্ত বিতর্ক চলছে।
ইউনিভিশন টিভি চ্যানেলে কর্মরত সাংবাদিক মারিয়া রামিরেজের কাজের ক্ষেত্র হলো মার্কিন রাজনীতি। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে অকার্যকর প্রমাণ করতে রাশিয়া যেসব তৎপরতা চালিয়েছে, সেই ব্যাপারে অনেক বিস্তারিত তথ্য এখন সহজেই পাওয়া যায়। এই বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি সমাজের যেসব দুর্বলতাকে বহিঃশক্তি পুঁজি করতে চায়, তা মানুষকে বুঝতে হবে।
অধ্যাপক এইসমোগলু জোর দিয়ে বলেন, অব্যাহত নাগরিক সংহতি ব্যতিত কোনো কিছু দিয়েই গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, মার্কিন সংবিধানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষমতা বলয়ের মধ্যে যেসব ভারসাম্যের (চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স) ব্যবস্থা সংযোজিত রয়েছে, সেসবও বাস্তবে অতটা শক্তিশালী নয়। তিনি বলেন, ‘ওই ব্যবস্থা অত শক্তিশালী নয়। গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখা ওই ব্যবস্থাসমূহ সংযোজনের উদ্দেশ্যও ছিল না। গণতন্ত্রকে একমাত্র সমাজই রক্ষা করতে পারে।’
কারণ: বৈষম্য ও আরও অনেক কিছু
স্টার ফোরাম শীর্ষক এই আলোচনা অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আয়োজন করে আসছে এমআইটি। এই অনুষ্ঠান পৃষ্ঠপোষকতা করে বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুতে এমন বহু আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করে এই কেন্দ্র।
এমআইটির মানবিক, শিল্প ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক মেলিসা নোবলস এই অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বলেন, গণতন্ত্রের অবস্থা এখন কী, এই প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, বিশ্বব্যাপী অনেককেই ভাবাচ্ছে।
অধ্যাপক এইসমগলু বলেন, গণতন্ত্রের বেহাল দশার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক ফ্যাক্টর। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী আয়-বৈষম্য, বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্বপরায়ণ নেতাদের হাতে সংবাদমাধ্যমের অপব্যবহার এবং উৎপাদনমুখী খাত ও শ্রমিক ইউনিয়নের পড়তি। শ্রমিক ইউনিয়নের আদর্শগত অবস্থান এখানে বড় প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু এসব ইউনিয়ন একসময় নাগরিকদেরকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিল। কিন্তু এখন নাগরিক সম্পৃক্ততা কমছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও এর ফলে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়, তা এখানে বড় ফ্যাক্টর। তবে এইসমগলুর ভাষায়, গণতন্ত্রের এই পড়তি দশার জন্য শুধু অর্থনৈতিক দুর্দশাকে দায়ী করলে ভুল হবে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক নিয়ে অনেক লেখালেখি করা এই অধ্যাপক আরও বলেন, এই মুহূর্তে খারাপ সময় পার করলেও, গণতন্ত্রের পতন ঘটানো অত সহজ নয়। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন।
প্রভাষক মৌঙ্ক বলেন, গণতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণুতার সঙ্গে সঙ্গে, গোটা একটি প্রজন্মের মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণ ও সামরিক শাসন সহ্য করার প্রবণতা দেখা গেছে। যেমন, বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে যে, ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই মনে করতেন, গণতন্ত্র অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আশির দশক ও তার পরে জন্ম নেওয়া মানুষের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এই ধারণা পোষণ করেন। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিককালেও রাজনীতি বিজ্ঞানীরা হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডকে গণতান্ত্রিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করতেন। এসব দেশের নাগরিকদের আয় বেড়েছে। একাধিকবার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন, এসব দেশ স্থিতিশীলতার একটি মাত্রায় পৌঁছেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এসব দেশে জনগণের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।
মৌঙ্ক আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার রেকর্ড আশ্চর্য্যজনক। কিন্তু অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এক্ষেত্রে তিনি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত নর্থ ক্যারোলাইনা আইনসভার নেওয়া পদক্ষেপের কথা উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন। ২০১৬ সালে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী রয় কুপার রাজ্যের গভর্নর নির্বাচিত হলেও, রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত আইনসভা তার কিছু ক্ষমতা রদ করে দেয়।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের ইতিহাস বেশ পোক্ত। কিন্তু আমরা এখনও জানি না, বহুজাতিক দেশে দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্র কিভাবে পরিচালিত হবে এবং সেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। কারণ, এ ধরণের গণতন্ত্র তুলনামূলকভাবে কম সময় ধরে স্থায়ী হয়েছিল।
গণতান্ত্রিক মানদ- বজায় রাখা
দর্শকদের প্রশ্নের জবাবে আলোচকরা বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রকে পুনরায় সুদৃঢ় করতে কিছু সুপারিশ রাখেন। সাংবাদিক রেমিরেজ যেমন বলছিলেন, আমার বার্তা হলো, সাংবাদিকদের সমর্থন দিন। তার মতে, ভালো সাংবাদিকতা একটি জনসেবা, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি জরুরী।
আরেক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক এইসমগলু বলেন, আমেরিকায় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণে কারচুপি কমানো, মার্কিন রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো ও মার্কিন সরকারী চাকুরিতে রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস করা গেলে গণতন্ত্রের জন্যই মঙ্গলজনক হবে। তবে তিনি তারপরও মনে করেন, সামাজিক সংহতিই হলো গণতন্ত্রের আসল সুরক্ষাকবচ।
(এমআইটি নিউজ থেকে অনূদিত।)

তখনই লিঙ্গ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন অত্রি

স্কুলবেলায় তিনি বরাবরের প্রথম। তবু বন্ধুদের টিপ্পনী শুনে যেতে হয়েছিল। কিন্তু হাল ছাড়েননি। জামা-প্যান্ট থেকে তিনি যখন শাড়ি-ব্লাউজে, ‘লড়াই’ চলেছে ঘরে-বাইরে। তিনি পালাননি।
রূপান্তরকামী হিসেবে গত বছর মামলা করে ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় বসতে পেরেছিলেন। কিন্তু আইএএস (ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস) পরীক্ষায় বসতে পারেনননি। হতাশও হননি।
এ বার ওই পরীক্ষায় বসতে চেয়ে সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিলেন। দিনকয়েক আগে পেলেন ওই পরীক্ষায় বসার ছাড়পত্র। কারণ, ওই পরীক্ষায় তাঁর সরাসরি বসার অধিকার ছিল না। ফর্মে যে শুধু ‘মেল’ আর ‘ফিমেল’-এর উল্লেখ!
তিনি—হুগলির ত্রিবেণীর ক্যাম্পগেট এলাকার বাসিন্দা, রূপান্তরকামী অত্রি কর। যাঁর কথায়, ‘‘জীবনে কম লড়াই করতে হচ্ছে না! আমি চাই, সমাজ যাবতীয় অবজ্ঞা ঝেড়ে ফেলে আমার সম্মানটা অন্তত দিক। ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছে, ‘আদার সেক্স’ (অন্য লিঙ্গ) হিসেবে ফর্ম ফিল-আপ করতে পারব। সংশ্লিষ্ট দফতরে রায়ের প্রতিলিপি পাঠিয়ে দিয়েছি।’’
বাবা পরিমল কর গৃহশিক্ষকতা করেন। অত্রি তাঁর ছোট সন্তান। স্কুলে অত্রি ‘ফার্স্ট’ হলেই পরিমলবাবু ছেলেকে ব্যাট-বল বা ক্যারম কিনে দিতে চাইতেন। অত্রির হাত যেত পুতুলে। তাঁর শরীর পুরুষের। কিন্তু মন যে নারীর! ছোট থেকেই ‘মেয়েলিপনা’র জন্য প্রিয়জন, বন্ধুদের কাছে কথা শুনতে হয়েছে তাঁকে। এমনকী, বাড়িতেও। ‘‘বউদির বাপের বাড়ির লোক এলে আমাকে ঘর থেকে বেরোতে দেওয়া হতো না’’— এখনও স্পষ্ট মনে আছে অত্রির।ধীরে ধীরে পাল্টেছে বাড়ির পরিবেশ। বড় হয়েছেন অত্রি। রিষড়ার বিধানচন্দ্র কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ-তে ভর্তি হয়েছিলেন। পার্ট-১ পরীক্ষা দিয়ে ছেড়ে দেন। চাকরির পরীক্ষা দিতে শুরু করেন। গুপ্তিপাড়ার একটি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পান ২০১৪ সালে। তখনই লিঙ্গ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। সেই প্রক্রিয়া এখন শেষ পথে। বাড়ির লোকজন, পাড়া-পড়শিরাও মেনে নিতে শুরু করেন ‘মেয়ে অত্রি’কে।
এখন বৌদি চুল বেঁধে দেন। মা শাড়ি পড়তে সাহায্য করেন। বাবা পরিমলবাবু বলেন, ‘‘ওর জন্য একসময় নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছি। কিন্তু ভেবে দেখেছি, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজে যা ভাল মনে করবে, সেটাই করুক। তাই আপত্তি করি না।’’
কিন্তু আটপৌরে সংসারে বড় হওয়া অত্রির আইএএস হওয়ার স্বপ্ন কেন? ‘‘প্রতিশোধ স্পৃহা বলতে পারেন। সব হেনস্থার যোগ্য জবাব দিতে চাই। ’’— আচমকা কঠিন হয়ে ওঠে অত্রির চোয়াল।
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

অপ্রতিরোধ্য পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আসছেন পুতিন

পারমাণবিক অস্ত্রে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে রাশিয়া। তাদের হাতে আসছে অত্যাধুনিক সুপারসনিক গতির পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র। বিশ্ববাসীকে এ বিষয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (ডিফেন্স সিস্টেম) দিয়েও সনাক্ত করা যাবে না। ফলে অপ্রতিরোধ হবে এই ক্ষেপণাস্ত্র। পুতিন নিজেই এ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে কয়েক রকমের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।
এর মধ্যে রয়েছে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। তার দেশের ফেডারেল কর্মকর্তাদের সামনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে পুতিন বলেন, এসব ক্ষেপণাস্ত্র একাধারে নতুন। অন্যদিকে তা শুধু রাশিয়ায়ই পাওয়া যাবে। এরই মধ্যে নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম), যার কোড নাম হলো স¤্রাট, তার পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি। এর ওজন ২০০ টনেরও বেশি। এর আগে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হয়েছিল তার চেয়ে এর পাল্লা অনেক বেশি। যতটা সম্ভব কম উচ্চতা দিয়ে তা উড়ে যেতে সক্ষম। পুতিন বলেছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রকে সনাক্ত করা কোনো এন্টি মিসাইল সিস্টেম দিয়ে করা সম্ভব নয়। এমন কি ভবিষ্যতেও তাকে সনাক্ত করা যাবে না। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও তার পারমাণবিক অস্ত্রের পরিধি এবং তার সক্ষমতার বিষয়ে কথা বলেছেন। তার চেয়ে পুতিনের এমন বক্তব্যকে কেউ খাটো করে দেখছে না। ট্রাম্প প্রশাসন যখন সম্প্রতি নতুন প্রযুক্তিতে তৈরি পারমাণবিক অস্ত্রের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন, তখন পুতিনের এমন ঘোষণাকে ওয়াশিংটনের জন্য একটি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এতে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে সম্পাদিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির ভবিষ্যত নিয়ে। এ বিষয়ে পেন্টাগনের মুখপাত্র ডানা হোয়াইট বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখে আসছি রাশিয়াকে। তাদের এমন ঘোষণায় আমরা বিস্মিত নই। অন্যদিকে পুতিনের এমন মন্তব্যকে উড়িয়ে দিয়েছে হোয়াইট হাউজ। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স বলেছেন, সম্পদিত চুক্তিতে যে বাধ্যবাধকতা আছে তা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লঙ্ঘন করে আসছে রাশিয়া। তাদের উদ্দেশ্য অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে এমন অস্ত্র ব্যবস্থার উন্নয়ন। কিন্তু রাশিয়া এমন কথা অস্বীকার করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার যা জানে, সে বিষয়টিই নিশ্চিত করলেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। পুতিন বলেছেন, পারমাণবিক বোমা বহনে সক্ষম পানির নিচে চলতে পারে এমন নতুন একটি ড্রোন উদ্ভাবন করেছে রাশিয়া। এর নাম দেয়া হয়েছে স্ট্যাটাস-৬। এই ড্রোনটি গভীর পানির নিচ দিয়ে চলাচল করতে পারে। বলা হয়েছে, বর্তমানে যেসব সাবমেরিন আছে, অধ্যাধুনিক যেসব টর্পেডো আছে, এমনকি পানির উপরিতলে চলাচল করে যেসব সর্বোচ্চ গতির বোট তা চেয়ে বহুগুন বেশি গতি এই ড্রোনের। একটি এনিমেশনে দেখানো হয়েছে, ন্যাটোর একটি বিমানবাহী বাহিনীতে ও সমুদ্রপাড়ের একটি শহরে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে নতুন একটি সাবমেরিন। এ অবস্থায় সারাহ স্যান্ডার্সের মতো একই রকম মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিদার নুয়ার্ট। তিনি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া দেখিয়ে দিচ্ছে তারা ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। পুতিনের বক্তব্যের সময়ে দেখানো এনিমেশন করা একটি ভিডিওরও সমালোচনা করেছেন হিদার নুয়ার্ট। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ওই ভিডিওতে এনিমেশনের মাধ্যমে যেন দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক হামলা করা হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল একজন নেতার কাছ থেকে আমরা এমন আচরণ প্রত্যাশা করি না। লন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক থিংকট্যাংক
রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউটের সামরিক বিশেষজ্ঞ ইগোর সুতাগিন। তিনি পুতিনের মন্তব্যকে ‘হরর’ কাহিনীর চেয়ে কিছুটা বেশি বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, উৎপাদন রেখা, আর্থিক ও বিজ্ঞান এসবই প্রযুক্তিগত অনেক দাবিকেই সংশয়ে ফেলে। কারণ, বেশির ভাগ প্রযুক্তিই নতুন নয়। এটা হলো সস্তা মার্কেটিং। পুরনো পণ্য, নতুন প্যাকেজ আকারে বাজারে ছাড়া। আর গায়ে লাগিয়ে দেয়া হয় নতুন দামের লেবেল। ইগোর সুতাগিন বলেন, পুতিন অনুচ্চ উচ্চতা বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। তবে আন্তঃমহাদেশীয় বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সেই ১৯৮০র দশক থেকে কম উচ্চতায়ই উড়ে থাকে। অন্যদিকে স্ট্যাটাস-৬ ড্রোনটি রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনার দর্শনের বিরুদ্ধে যায়। এ ক্ষেত্রে রাশিয়া যা বলেছে, তাতে এ অস্ত্রের ওপর মোটামুটি এক সপ্তাহের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে রাশিয়া।

যেমন করে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে পর্নোগ্রাফি

প্রযুক্তির কল্যাণে হাতের মুঠোয় দুনিয়া। যা চাইবেন, তাই এসে হাজির। কঠিন সমস্যার সমাধান থেকে শুরু করে কাঁচা বাজার- সব কিছু চলে এসেছে দ্বোরগোড়ায়। অনলাইনেই অর্ডার দিলে বাড়িতে এসে হাজির কোরবানির পশু। প্রযুক্তি এই যে মানুষের জীবনকে এত সহজ করে দিচ্ছে, এর উল্টো পিঠও আছে। মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়ার উপকরণও সেখানে বিদ্যমান।
আছে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দেয়ার উপাদান। আছে রগরগে যৌন জীবন সম্পর্কিত বিষয়াবলি। এক্ষেত্রে সন্তানদের নিয়ে সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় পিতামাতারা। তাদের সেই টেনশন আরো একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে একটি পর্নো কোম্পানি। তারা পর্নো তারকাদের হুবহু নকল করে তৈরি করছে ভার্চুয়াল ছবি। খ্যাতনামা পর্নো তারকাদের অবিকল আকৃতি দেয়া হচ্ছে কম্পিউটারে। আর এর মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে ভার্চুয়াল অ্যাপ। একজন পর্নো তারকার শরীর যেমন অবিকল তেমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে তাদেরকে এ অ্যাপের ভিত্তিতে। তাতে কোথাও কোন খুঁত ধরার মতো ত্রুটি নেই। এ অ্যাপ ব্যবহারকারীর সঙ্গে সামনে থাকা একজন পর্নো তারকার মতো কথা বলবে ওই এনিমেটেড পর্নো তারকা। পর্নো বিষয়ক এ বছরের এক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে এই অ্যাপটি প্রকাশ করা হয়েছে। এটি করতে ওই কোম্পানি একটি বিশাল ক্যামেরা ব্যবহার করেছে একজন পর্নো তারকার শারীরিক গঠনের থ্রি ডি মডেল তৈরি করার জন্য। থ্রি ডি স্ক্যান করা এসব ছবি ব্যবহার করে তাদেরকে গেমে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই একজন পর্নো তারকার মতো সম্ভাব্য আচরণ করে ওই গেমের মডেল। এসব সামাজিক অবক্ষয়মুলক গেম বা অ্যাপ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ইন্টারনেটে। তা থেকে আপনার সন্তানকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনার।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা বেশি বঞ্চিত, বেশি গরিব: অমর্ত্য সেন

পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার ২৭ ভাগ হলো মুসলিম। কিন্তু আনুপাতিক হারে এই সম্প্রদায়ের বেশ বড় একটি অংশই গরিব। এমন পর্যবেক্ষণ ভারতের প্রতিথযশা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ‘লিভিং রিয়েলিটি অব মুসলিমস ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশের অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন তিনি। এই প্রতিবেদন করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে। এ খবর দিয়েছে ভারতের পত্রিকা দ্য হিন্দু।
অধ্যাপক সেন আরও বলেন, ‘জীবনযাত্রার অবস্থার (লিভিং কন্ডিশন) দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা আনুপাতিক হারে বেশি বঞ্চিত ও দরিদ্র্য।
এই তথ্য এখন গবেষণামূলক স্বীকৃতি পেয়েছে। এ কারণেই এই প্রতিবেদন নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি ভিত্তিতে চিন্তা করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।’
প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে একাধিক অধ্যায় রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ৩৪১টি ব্লকের মধ্যে ৬৫টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন মুসলমানরা। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের ওপর এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। মোট ৩২৫টি গ্রাম ও ৭৫টি ওয়ার্ডে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। অধ্যাপক সেনের ট্রাস্ট প্রতিচি ইন্ডিয়ার সহযোগিতায় ৩৬৮টি পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে অ্যাসোসিয়েশন স্ন্যাপ ও গাইডেন্স গিল্ড নামে কলকাতা ভিত্তিক দুইটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) দাবি করেছে, তাদের সরকার ২০১১ সালের পর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের আর্থসামাজিক উন্নতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, স্বাক্ষরতা, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের দিক থেকে মুসলমানদের অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই। যেমন, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের স্বাক্ষরতার হার রাজ্যের গড় স্বাক্ষরতার হারের চেয়ে এখনও সাত শতাংশ কম।
প্রতিবেদনের সারাংশতে বলা হয়, ‘যেসব মুসলিম পড়ালেখা বন্ধ করেছেন তাদের ৫ শতাংশ বলেছেন আগ্রহের অভাবই স্কুল থেকে তাদের ঝরে পড়ার মূল কারণ। পড়ালেখা করে ভবিষ্যতে কোনো লাভ হবে বলে তাদের মনে হয়নি।’ এসব বলা হলেও, কোনো নির্দিষ্ট দল বা সরকারি সংগঠনকে মুসলিমদের অনগ্রসরতার জন্য প্রতিবেদনে দায়ী করা হয়নি।
স্বাস্থ্যের দিক থেকেও মুসলিমদের অবস্থা ভালো নয়। এক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের উপাত্ত ও মাঠপর্যায়ের জরিপ ব্যবহার করে বলা হয়েছে, যেসব ব্লকে মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে, সেখানে হাসপাতাল সুবিধা কমেছে। এতে বলা হয়, ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি মুসলিম যেসব ব্লকে বসবাস করেন, সেখানে যত শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল আছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে সেসব ব্লকে, যেখানে মুসলিমদের জনসংখ্যার হার ১৫ শতাংশের কম। এই ধরণের বৈষম্য এই বিশাল প্রতিবেদনের প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই তুলে ধরা হয়েছে।
দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্যের জন্য কাউকে দায়ী করা না হলেও, বিধানসভা নির্বাচনের আগে আগে এ নিয়ে রাজনীতির জল ঘোলা হতে পারে। তবে এই প্রতিবেদন নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে কিছু স্থানীয় মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠন। রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী মুসলিম সংগঠন জামাতে ইসলামি-হিন্দ (জেআইএইচ) বলেছে, তৃণমূলের শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা ‘মোটামুটি লাভবান হয়েছে’। উল্লেখ্য, এই সংগঠনটি নির্বাচনে অংশ নেয় না বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। জেআইএইচ-এর গণমাধ্যম ও জনসংযোগ প্রধান মশিউর রহমান তৃণমূলের শাসনামলে কীভাবে সংখ্যালঘুরা মোটামুটি উপকৃত হয়েছে, তা তুলে ধরেন। সরাসরি ওই প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, আগের বছরগুলোর তুলনায় এখন পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিসে মুসলিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। এ বছর ২৪ জন। দ্বিতীয়ত, বাম শাসনামলে শুরু হওয়া আলিয়াহ বিশ্ববিদ্যালয়কে এই সরকার ৩০০ কোটি রুপি দিয়েছে। মুসলিম মেয়েদের জন্য জেলায় জেলায় বহু হোস্টেল তৈরি করা হয়েছে।’

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে নতুন পন্থা অবলম্বন করছে আইএস -ব্রেইটবার্থের রিপোর্ট

ইরাক এবং সিরিয়ায় কথিত খেলাফত কায়েমে ব্যর্থ হয়ে নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করছে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট ( আইএস বা আইসিস বা আইসিল)। তারা বাংলাদেশ, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন অংশে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এ কথা বলেছেন সাংবাদিকদের। বৃহস্পতিবার টেলিকনফারেন্সে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাস বিরোধী সমন্বয়ক যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নাথান সেলস। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ব্রেইটবার্থ। এতে বলা হয়Ñ  তিনি বলেন, রণক্ষেত্রে আমরা আমরা পরাজিত করছি আইসিসকে।
কিন্তু আমাদের এই সফলতায় তারা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে। এখনও তাদের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয়ে যায় নি। এই লড়াই এখন নতুন একটি মাত্রা ফেয়েছে। তা হলো সামরিক সমাধান থেকে মোড় নিয়েছে আইন প্রয়োগের মতো ব্যবস্থায়। তিনি আরো বলেন, আইসিসের মূল কাঠামো সিরিয়া ও ইরাকে মারাত্মকভাবে ভেঙে গেছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আইসিসের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন আনুষ্ঠানিকভাবে বেশ কিছু আইসিস সমর্থিত গ্রুপ ও তাদের নেতাদের নাম উল্লেখ করেছেন। এসব গ্রুপের নাম দেয়া হয়েছে আইসিস বাংলাদেশ, আইসিস পশ্চিম আফ্রিকা, আইসিস সোমালিয়া, আইসিস ফিলিপাইন, দ্য মাউত গ্রুপ ইন দ্য ফিলিপাইন, জান্দ আল খিলাফাহ তিউনিশিয়া। এ ছাড়া যেসব আইসিস নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে মাহাদ মোয়ালিম। তিনি সেমালিয়ায় আইসিস মদতপুষ্ট গ্রুপের নেতা। পশ্চিম আফ্রিকায় শীর্ষ জিহাদী নেতা আবু মুসাব আল বারনাবী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন ঘোষণার পর ওই সতর্কতা উচ্চারণ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক নাথান সেলস। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ওয়ার্ল্ডওয়াইড থ্রেট এসেসমেন্টে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও সতর্কতা উচ্চারণ করেন। তারা বলেন, সন্ত্রাসী গ্রুপটি বিশ্বজুড়ে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে। তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হামলার পরিকল্পনা করছে। সদস্যদের এবং সমমনাদেরকে নিজের দেশেই হামলা চালাতে উৎসাহিত করছে।

চাঁদেও থাকবে মোবাইলের ৪জি নেটওয়ার্ক!

চাঁদের দেশেও পৌঁছে যাবে ৪ জি মোবাইল নেটওয়ার্ক। তবে সে জন্য বেশি দেরি করার দরকার নেই। আগামী বছর নাগাদ এই নেটওয়ার্ক সেখানে পৌঁছে যাবে। ফলে চাঁদে অবস্থানকারী কোনো প্রাণী চাইলেই পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। এমন খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, পৃথবীর দিকে মুখ কারে থাকা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে এমন উচ্চ প্রযুক্তিতে সংজ্ঞায়িত নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে পৃথিবী পর্যন্ত।
সেই ১৯৬৯ সালের ২০ শে জুলাই নিল আর্মস্ট্রং প্রথম চাঁদের গায়ে পা রেখেছিলেন। তারপর কেটে গেছে ৫০ বছরেরও বেশি সময়। এরপরই সেখানে নতুন করে একটি মিশন পরিচালনা করা হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগে। তাতে যুক্ত রয়েছে ভোডাফোন জার্মানি, মোবাইল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নকিয়া ও গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি অডি। সেই মিশনের একটি অংশ হিসেবে এই নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হচ্ছে। ভোডাফোন বলেছে, তারা মহাশূন্যভিত্তিক একটি মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার জন্য প্রযুক্তি বিষয়ক অংশীদার করেছে নকিয়াকে। বলা হয়েছে, ওই নেটওয়ার্কে যে হার্ডওয়্যার ব্যবহার করা হবে তা এক ব্যাগ চিনির চেয়েও ছোট হবে দেখতে। এসব কোম্পানি এ উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেছে বার্লিনভিত্তিক কোম্পানি পিটিসায়েন্টিস্টস-এর সঙ্গে। ভোডাফোন বলেছেন, এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে তারা। তাদের সামনে শিডিউল সময় ২০১৯ সাল। এ সময়ের মধ্যেই স্পেস এক্স ফলকন ৯ রকেট ছুটে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের কেপ ক্যানাভেরাল থেকে। এ বিষয়ে ভোডাফোন জার্মানির একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, এখনও পরবর্তী প্রজন্মের নেটওয়ার্ক রয়েছে পরীক্ষাধীন এবং ট্রায়াল পর্যায়ে। সেই নেটওয়ার্কের নাম দেয়া হচ্ছে ৫জি নেটওয়ার্ক। তা চাঁদের গায়ে কাজ করবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। এ জন্যই তারা বেছে নিয়েছেন ৪জি নেটওয়ার্ক।

ভারী তুষারপাতে বিপর্যস্ত ইউরোপ

ভারী তুষারপাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইউরোপের বেশিরভাগ অংশের জনজীবন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এরইমধ্যে নিহতের সংখ্যা ৫৫ জনে ঠেকেছে। পোল্যান্ডেই মারা গেছেন ২১ জন; তাদের মধ্যে অনেকেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যেও খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করেছিলেন।
শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বিবিসি অনলাইন জানিয়েছে, হিমবাহ ও ভারী তুষারপাতের কারণে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা-ঘাট, রেল পরিসেবা এবং স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। এর প্রভাবে বাতিল হয়েছে বিভিন্ন বিমানবন্দরের কয়েকশ' ফ্লাইট। অস্বাভাবিক ঠাণ্ডার প্রকোপ অনুভূত হচ্ছে ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণেও। এরইমধ্যে এ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। তারা বলছে, এই তীব্র ঠাণ্ডায় হতদরিদ্র, গৃহহীন ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর একটা বড় বিপদ আসছে। কারণ আশ্রয়ের অভাবে তারা খোলা আকাশের নিচেই থাকছেন। ফলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় এসব লোকজন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যারা ঠাণ্ডাজনিত রোগে ভুগছেন, বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুরা এবং দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি বা যাদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা রয়েছে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তুষারপাতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরে তুষার সরিয়ে ফের বিমানবন্দরের কার্যক্রম চালু করা হয়। অপরদিকে ফ্রান্সের মনপেল্লিয়ের শহরের কাছে একটি সড়কে প্রায় দুই হাজার গাড়ি নিয়ে আটকা পড়েন চালকরা। বেশিরভাগ চালকই অভিযোগ করেছেন, ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাদের রাস্তায় আটকা থাকতে হয়েছে।

খোঁজ মিলল 'সবচেয়ে পুরনো' উল্কির

বর্তমান বিশ্বে শরীরে উল্কি আঁকানো বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন অঙ্গনের অনেক তারকার শরীরেও দেখা মেলে এই উল্কির। তবে বর্তমান বিশ্বের এই উল্কি বেশ জনপ্রিয় হলেও এর ইতিহাস কিন্তু বেশ প্রাচীন। অন্তত তেমন ইঙ্গিতই পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকদের দাবি, বিশ্বের 'সবচেয়ে পুরনো' উল্কির খোঁজ পেয়েছেন তারা।
আর তা পাওয়া গেছে প্রাচীন মিসরের দুই মমিতে। তারা আরও বলছেন, শরীরে উল্কি আঁকা বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয় হলেও এটি নতুন কিছু নয়। অনেক দেশে উল্কি সুপ্রাচীন সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত। তবে মিশরে ফারাওরাও যে উল্কি করাতেন সে তথ্য এবারই উঠে এলো প্রথমবারের মতো। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকদের তথ্য অনুযায়ী, মিসরের একটি শহর থেকে প্রায় একশ' বছর আগে উদ্ধার হওয়া 'গ্যাবেলিন ওম্যান' নামে এক মমির শরীরে উল্কি পাওয়া গেছে। একটি লাইন এবং ইংরেজি 'এস' বর্ণের উল্কি রয়েছে মমির দেহে। আরও একটি মমির ('গ্যাবলিন ম্যান') শরীরে দেখা গেছে একটি ষাঁড় ও একটি ভেড়ার ছবি। তারা বলছেন, বর্তমানে লুক্সোরে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে গ্যাবেলিন শহরে খ্রিস্টপূর্ব ৩ হাজার ৩৫১ থেকে ৩ হাজার ১৭ সালের মধ্যে বসবাস করতেন মমি বানানো ওই দু'জন। ওই সময় মিসরের প্রথম ফারাওয়ের শাসনকাল হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বিজ্ঞানীরা বলছেন, নারীদের শরীরে আঁকা উল্কি সাধারণত তার ত্যাগ, সাহস ও জ্ঞানের স্বীকৃতি। আর পুরুষের শরীরের আঁকা উল্কি তার শক্তির পরিচয় দেয়। সূত্র: জিনিউজ

'প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য' by আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

আজ পাঁচ দিন ধরে গৃহবন্দি হয়ে আছি। সরকারি আদেশে নয়, প্রকৃতির আক্রোশে। লন্ডনে আছি ৪৪ বছর হয়ে গেল। আজ পাঁচ দিন ধরে সেই লন্ডনে (সারা ব্রিটেন) যে বরফপাত দেখছি, কয়েক বছর আগে তার চেয়েও ভয়াবহ বরফপাত দেখেছি, রাস্তায় হাঁটু পর্যন্ত বরফে গেড়ে গেছে; কিন্তু এ রকম একটানা দিনের পর দিন বরফপাত দেখিনি। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এবং মাঝেমধ্যে তুষারঝড়। বিশ্ব আবহাওয়ায় একটা অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটছে। এ সম্পর্কে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ যথাসময়ে সতর্ক না হলে, ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কোনো পরমাণু যুদ্ধের দরকার হবে না, বিশ্ব এমনিতেই ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাবে। গত কয়েক বছর ব্রিটেনের সারা বছরের আবহাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল, উইন্টারেও বুঝি আর ছিটেফোঁটা বরফপাত ছাড়া বড় রকমের কিছু হবে না। কিন্তু এবারের উইন্টার জানিয়ে দিয়ে গেল, বিশ্বের আবহাওয়া এখন সত্যই অত্যন্ত অস্থিরমতি। বিশ্বের রাজনৈতিক নেতারা প্রকৃতিবিশারদ আধুনিক বিজ্ঞানীদের সহায়তায় প্রকৃতির এই পাগলামি দূর করা, জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে না পারলে বা না চাইলে ইসরাফিলের শিঙা সহসা একদিন বেজে উঠবেই। তা বহুদূরে ভাবলে ভুল করা হবে। ব্রিটেনে এ ক'দিনের তুষারপাতেই (প্রায় সারা ইউরোপ) স্কুল, কলেজে ছুটি দিতে হয়েছে।
ট্রেন টিউব চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। বিভিন্ন এয়ারপোর্ট থেকে অসংখ্য ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের যুদ্ধে বিজ্ঞান জয়ী হতে থাকলেও মাঝেমধ্যে প্রকৃতিও পরাজয়ের শোধ নেয়। আমরা প্রকৃতির কল্যাণ হস্ত দেখেছি, আবার তার ধ্বংসের বাহুও দেখেছি। এই বাহু একটি নয়, অনেক। ইউরোপ-আমেরিকায় যেমন আছে ভূমিকম্প, তুষারঝড়, বন্যা ও ভূমিধস; তেমনি এশিয়া ও আফ্রিকাতে আছে বন্যা, সাইক্লোন, খরা, আবহাওয়াজাত নানা রকম ব্যাধি। সেই সঙ্গে ভূমিধস ও নদীভাঙন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিজস্ব কৃতকর্মও তার নিজের ধ্বংসের যে নতুন বীজ তৈরি করেছে তা হলো, মারণাস্ত্র ও পরিবেশ দূষণ। পৃথিবী একদিন ধ্বংস হবে- এটা ধর্মবিশ্বাসী মানুষ মাত্রই অবধারিত সত্য বলে জানে। ছোটবেলায় শুনতাম, একটি পুঁথির বয়ান, যা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল- 'শোন মুমিন মুসলমান/করি আমি নিবেদন/এ দুনিয়া ফানা (ধ্বংস) হবে কিছুই রবে না।' বিজ্ঞানীরাও বহুকাল বিশ্বাস করেছেন, পৃথিবী একদিন ধ্বংস হবে। এখন কেউ কেউ ভাবছেন, শত বিপর্যয়ের মধ্যেও মানুষ তার বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনী বুদ্ধি দ্বারা পৃথিবী নামক গ্রহটিকে বাঁচাবেন। মানবসভ্যতা হয়তো রক্ষা পাবে; কিন্তু এই আশাবাদে বিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ কোথায়? সম্প্রতি ইউরোপ ও আমেরিকারই কয়েকজন বুদ্ধিজীবী সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, 'পৃথিবীতে একটি পরমাণু ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি।' ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এই আশঙ্কা বেড়েছে বলে তারা মনে করেন। আমি পণ্ডিত নই, বিজ্ঞানীও নই; একজন নগণ্য সাংবাদিক। আমার ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই দুষ্টবুদ্ধির লোক হন; তার আমলে পরমাণু যুদ্ধ বাধার আশঙ্কা কম। আঞ্চলিক ও প্রচলিত অস্ত্রের যুদ্ধ বাড়তে পারে; কিন্তু পরমাণু অস্ত্রের যুদ্ধ নয়। ট্রাম্প বাক্যবাগিশ লোক, যুদ্ধবাগিশ লোক নন। তাছাড়া হোয়াইট হাউসে বসার পর থেকেই তিনি নানা চাপের মধ্যে আছেন। একদিকে নারীঘটিত কেলেঙ্কারি; অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকালে রাশিয়ান কানেকশনের তদন্ত। তিনি বাগাড়ম্বরপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। বাগাড়ম্বরপ্রিয় ব্যক্তিরা কখনও সাহসী হন না। তার হোয়াইট হাউস প্রশাসনেও এখন স্থিতিশীলতা নেই। তার নিজস্ব ব্যক্তিদেরই তিনি হয় একের পর এক বরখাস্ত করছেন অথবা তারা চলে যাচ্ছেন। একটি পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার। আশঙ্কাটি যে এখনও নেই তা বলছি না। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যুদ্ধ ও বাগ্‌যুদ্ধে আপাতত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরাজয় হয়েছে। এই পরাজয়ের পরিণতি- দক্ষিণ কোরিয়ায় আমেরিকার প্রভাব আরও হ্রাস এবং দুই কোরিয়ার মধ্যে বৈরিতার বদলে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি। উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট নায়ক কিমকে রণোন্মাদ, বর্বর স্বৈরাচারী, বুদ্ধি-বিবেচনাহীন ডিক্টেটর হিসেবে পশ্চিমা বিশ্ব যে প্রচারণা চালাচ্ছে, তা যে কত অতিরঞ্জন তা শিগগিরই প্রমাণ হবে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এবার যে উইন্টার অলিম্পিক হয়ে গেল, তাতে উত্তর কোরিয়ার সৌজন্য দূত হয়ে এসেছিলেন কিমের বোন। তাকে বসতে দেওয়া হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের কন্যা ইভাঙ্কা এবং সেখানকার মার্কিন আঞ্চলিক সেনাবাহিনী প্রধান এক জেনারেলের পাশে। কিমের বোনকে দেখে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ বিপুলভাবে অভিনন্দন জানিয়েছে। তিনি যখন বলেছেন, 'উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ একই জাতি এবং একই রক্ত তাদের ধমনিতে প্রবাহিত'; তখন করতালিতে স্টেডিয়াম ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। এই দৃশ্য দেখে একাধিক মার্কিন মিডিয়াতেই বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার দিন শেষ হয়ে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ, এমনকি বর্তমান ক্ষমতাসীন নেতাদের অনেকেও বুঝতে পেরেছেন, দুই কোরিয়াকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে রেখে আমেরিকা এই অঞ্চলে তার সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকা কোনো হামলা চালাতে চাইলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে এবং প্রথম ধ্বংস হবে দক্ষিণ কোরিয়া।
আমেরিকার এই অভিসন্ধি বুঝতে পেয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো থেকে প্রায় প্রতিমাসেই ছাত্রছাত্রীরা বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বের করেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মাটি থেকে মার্কিন যুদ্ধঘাঁটি অপসারণের দাবি জানান। এই দাবির মুখে আমেরিকাকে একদিন দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়তে হবে। সন্দেহ নেই, আমেরিকা এখনও যদি বিশ্বে পরমাণু শক্তিধর একমাত্র রাষ্ট্র হতো, তাহলে আরও অনেক হিরোশিমা, নাগাসাকির মতো ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করে ছাড়ত। কিন্তু আমেরিকা এখন আর পরমাণু মারণাস্ত্রের একক অধিকারী দেশ নয়। কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ছাড়াও রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েলের হাতে রয়েছে ছোট-বড় এই মারণাস্ত্র। উত্তর কোরিয়ার হাতে আছে এই মারণাস্ত্র, যা বোতাম টিপলেই আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ইরানকে আমেরিকা চাপে রেখেছে। ইরান পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারলে বিশ্বে আরেকটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং নিউক্লিয়ার ক্লাবের আরেক সদস্য হতে চাইবে, তাতে সন্দেহ নেই। এই অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই হম্বিতম্বি করুন, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সহসা পরমাণু যুদ্ধে নামবেন- এটা বিশ্বাস করা কঠিন। মার্কিন এস্টাবলিশমেন্ট ডোনাল্ড সাহেবের মতো মাথা মোটা নয়। তারা জানে, ১৯৪৫ সালের জাপানের মতো উত্তর কোরিয়ার অবস্থা নয়। সেখানে হামলা চালাতে গেলে পল্টি খেতে হবে। ফলে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অনেক হুমকি-ধমকি দিলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের কন্যা ও জেনারেলকে দক্ষিণ কোরিয়ার অলিম্পিকে পাঠিয়ে এবং উত্তর কোরিয়ার নেতার বোনের পাশে বসিয়ে প্রীতি সম্ভাষণ বিনিময়ের সুযোগ গ্রহণ করেছেন। তাই ইউরোপ-আমেরিকার অনেক সুধীজনের মতো আমারও ধারণা, বর্তমান বিশ্বে সহসা পরমাণু যুদ্ধ শুরু হবে, এই আশঙ্কা কম। আঞ্চলিক ও প্রচলিত অস্ত্রের যুদ্ধ বাড়তে পারে, দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে- সে কথা আগেই বলেছি। কিন্তু তাতেও পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়নি এবং এই আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে। পরমাণু হামলা ঠেকানোর তবু পথ আছে। কিন্তু প্রকৃতির এই আকস্মিক ভয়াবহ হামলা প্রতিরোধের কোনো কার্যকর পন্থা এখনও আবিস্কৃত হয়নি। ঝড় আসছে, ভূমিকম্প হবে- এ সম্পর্কে আবহাওয়া বিভাগ আগাম সতর্কবাণী সবাইকে জানাতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির ছোবল এড়াতে পারে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত অভাবনীয় উন্নতির যুগেও 'বিস্ট ফ্রম দ্য ইস্ট' নামের প্রাকৃতিক এই মহাপ্রলয় থেকে ইউরোপ বাঁচতে পারল কি? তবে বৈজ্ঞানিক উন্নতির ফলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমাতে পেরেছে। আমার ধারণাটা সঠিক কিনা জানি না; কিন্তু এ ধারণাটা হলো, সহসা একটি পরমাণু যুদ্ধ বাধার আশঙ্কা বর্তমানে অনেক কম এবং পরমাণু যুদ্ধ দ্বারা পৃথিবী ধ্বংস হবে- এই আশঙ্কার চেয়েও বড় আশঙ্কা, প্রাকৃতিক মহাপ্রলয়েই পৃথিবী একদিন ধ্বংস হবে। আর মানুষই নিজেদের লোভের বশে প্রকৃতিকে খেপিয়ে তুলেছে। তার কল্যাণশক্তিকে সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে তার ধ্বংসশক্তিকে আবাহন করছে। রোদ, জ্যোৎস্না, ফুল-ফল, শ্বাস নেওয়ার বাতাস, পানি, ফসল সবই তো প্রকৃতির কল্যাণের দান। আবার ঝড়, বন্যা, মহামারী, ভূমিকম্প, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, অগ্নিঝড়, তুষারঝড় প্রকৃতিরই ধ্বংসশক্তির প্রকাশ। আমরা প্রকৃতির কল্যাণ হস্তের অবদানকে বিশ্বময় সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করিনি। ক্যাপিটালিজম তাকে কিছু মানুষের ভোগের ও লোভের বস্তু করেছে। আর প্রকৃতির ধ্বংসশক্তি থেকে নাপাম বোমা, পরমাণু বোমা, কেমিক্যাল অস্ত্র বানিয়ে মানব ও মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের ভয়াবহ ব্যবস্থা করে রেখেছি। আমরা সুন্দরবন ধ্বংস করছি। কিন্তু একটা সুন্দরবন তৈরি করতে পারছি না। নানা বিষাক্ত অস্ত্রের বিস্ম্ফোরণ ঘটিয়ে পৃথিবীর আলো, বাতাস, জল দূষিত করছি। তা থেকে বিস্তার ঘটছে ভয়াবহ রোগের। তার প্রতিকারের পথ না খুঁজে আধিপত্যবাদী স্বার্থে নিত্যনব মারণাস্ত্র তৈরি করে মানবসভ্যতা ও সমগ্র জীবজগতের অস্তিত্ব ধ্বংসের পথে এগোচ্ছি। পৃথিবী আজ রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- 'মানুষ জন্তুর হুঙ্কারে' পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রকৃতির আর দোষ কী? পরিবেশবান্ধব দুনিয়া তো গড়তে চান না রাষ্ট্রপতি ও রাজনৈতিক নেতারা। যারা চান তারা সংখ্যালঘু। আধুনিক সভ্যতার একটি শীর্ষ দেশ ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনে বরফ আর তুষারঝড়ে গৃহবন্দি হয়ে ভাবছি, বিশ্ব কি কোনো একদিন নিজেদের লোভ ও প্রকৃতির রোষ থেকে মুক্ত নতুন দুনিয়া গড়ার পথে এগোতে পারবে, নাকি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব উন্নতি, সভ্যতার এত অগ্রগতি সত্ত্বেও ধ্বংসের পথে এগোবে? এই প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। বহু বছর আগে এ ধরনের এক সংকট সম্পর্কে লেখা আমার একটি কলামের শিরোনাম দিয়েছিলাম কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটি বিখ্যাত কবিতার পঙ্‌ক্তি ধার করে। এই লেখাটিও সেই একই শিরোনাম দিয়ে শেষ করছি- 'প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা...।'

শিক্ষাক্ষেত্রে অশুভ ছায়া by মুস্তাফা নূরউল ইসলাম

খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, অব্যাহতভাবে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে চলেছে। কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না প্রশ্ন ফাঁস। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে নানা রকম পদক্ষেপ নেওয়ার পরও অশুভ শক্তি যেন অনেকটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েই সরকার ও প্রশাসনের শক্তিমত্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের শক্তিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে। এই বিষয়টি শিক্ষার সামগ্রিক মানের ক্ষেত্রে কতটা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। শিক্ষাক্ষেত্রে যে নানামুখী সংকট সৃষ্টি হচ্ছে এ নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক কথা হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যবস্থার পরিবর্তন করে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধসহ শিক্ষার মান নিশ্চিত করার কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েই কি এই গুরুতর ব্যাধির নিরসন করা যাবে? তারপরও যদি দৃশ্যমান অগ্রগতি হয় তাতেই মঙ্গল। তবে এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করাই শ্রেয় মনে করি। শিক্ষার মানের বিষয়টি খুব বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়ে এ পর্যন্ত সচেতন মহল থেকে অনেক কথাই বলা হয়েছে। সম্প্রতি এ ব্যাপারে পত্রিকায় কয়েকটি প্রতিবেদনও চোখে পড়েছে। সরকার শিক্ষার মানোন্নয়নে আন্তরিক নয় কিংবা প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেনি এমনটি বলা যাবে না। কিন্তু তারপরও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়নি। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রথম ও প্রধান শর্ত হচ্ছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। এই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার অতীতে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এর সুফলও পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দু'ভাগে ভাগ করে শিক্ষার ভিতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগটি বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করে উপস্থাপনের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, এর ইতিবাচক প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু তাই বলে যে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সব সমস্যা দূর হয়ে গেছে তা নয়। এখনও বেশ কিছু সমস্যা বিদ্যমান এবং এসবের নিরসনে অত্যন্ত দ্রুত সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া অপরিহার্য। কিন্তু এখন এই প্রাথমিক পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যন্ত ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। তারপর আসে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে বেশ কিছু নেতিবাচকতার কথা এখনও শোনা যায়। এর মধ্যে শিক্ষকসহ অবকাঠামোগত সংকটের বিষয়টি গুরুত্ববহ। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে দক্ষ-প্রশিক্ষিত শিক্ষকের বিকল্প নেই। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে যতটা গুরুত্বের সঙ্গে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন, ততটা দেওয়া হচ্ছে না- এমন অভিযোগ কোনো কোনো মহল থেকে উত্থাপিত হয়। এ দুই স্তরেই পাসের হার আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেড়েছে, তা অসত্য নয়; কিন্তু কতটা মানসম্পন্ন হয়েছে এ দুই স্তরের শিক্ষা তা নিয়ে কথা ওঠাটাও অমূলক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফল করেও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য পরীক্ষায় বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী সফল হতে পারছে না। এ অবস্থায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। গত কয়েক বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এ পরিবর্তন সব ক্ষেত্রে সমভাবে ঘটেছে কি-না এটিও একটি প্রশ্ন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তন মানে তো সামগ্রিক পরিবর্তন নয়। এ দুই স্তরের শিক্ষার মানোন্নয়নে তাই বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক। মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা রীতিমতো ভয়ঙ্কর চিত্র উপস্থাপন করেছে। সামনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। এ নিয়ে সঙ্গত বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। তারপর আসে উচ্চশিক্ষার বিষয়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা কতটা এগিয়েছি এবং মান কতটা উন্নত করা সম্ভব হয়েছে, তাও প্রশ্নের বিষয়। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতিসহ নানা বিষয়ে এ পর্যন্ত কম আলোচনা-পর্যালোচনা হয়নি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসার দেশে উচ্চশিক্ষার হার বাড়িয়েছে, তা অসত্য নয়; কিন্তু কোনো কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে মাঝে ব্যাপক গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছিল। সরকার কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছিল। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড- এটি বহুল প্রচলিত একটি বাক্য। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে শিক্ষা খাতে দুর্নীতির ব্যাপক ডালপালা ছড়িয়ে ছিল এবং এ নিয়ে রীতিমতো বাণিজ্য শুরু হয়েছিল। এমন অভিযোগ যথেষ্ট পুষ্ট। অতীতের তুলনায় অনেকটাই তা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। এ ব্যাপারে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ দায়িত্বশীল সব মহলকে। আমাদের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বৈশ্বিক জ্ঞানকাণ্ডের সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত ঘটনা শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তো সৃষ্টি করেছেই, একই সঙ্গে সৃষ্টি করছে আস্থার সংকটও। নিকট অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার (ঘ ইউনিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি অনেক প্রশ্ন, বিস্ময় ও শঙ্কার সৃষ্টি করে। জেএসসি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এমনকি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাবলি এক ভয়াবহ ব্যাধির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্র অনেক দিন ধরেই এ ভয়ঙ্কর অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং চাকরি, পরীক্ষা পাসের প্রলোভন ইত্যাদি দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা। শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসই নয়, উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অতীতে কেলেঙ্কারি হয়েছে। এ পরিস্থিতি গ্লানি এবং লজ্জার বিষয় তো বটেই, সমগ্রিকভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নের পথেও বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আস্থা সংকট দেখা দিতে পারে। এমনটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হবে না।
এ পর্যন্ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কম ঘটেনি এবং অব্যাহতভাবে ঘটেও চলেছে। কিন্তু এর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়নি। এর পেছনে যেসব দুর্বৃত্ত কলকাঠি নাড়ে, সেই মূল হোতাদের খুঁজে বের করা যায়নি। দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার দাঁড় করানো সম্ভব হলে হয়তো এত ভয়াবহভাবে এই ব্যাধির বিস্তার ঘটত না। এখন পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের যে চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে এ সম্পর্কে আরও আগে কেন নেওয়া হয়নি, প্রশ্ন হলো সেটি। আমাদের দেশে এখনও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা অনেক। বেকারত্ব জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তির আশায়, বিশেষ করে একটি সরকারি চাকরির প্রলোভন সবারই থাকে। সরকারি চাকরি নামের সেই সোনার হরিণ শিক্ষিত বেকার যারা, তারা সবাই ধরতে চান। যোগ্যতার মাপকাঠিতে প্রত্যাশিত চাকরি হয়তো সবার জোটে না; কিন্তু তারপরও একটি সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা সবাই পেতে চান। ইতিমধ্যে যারা এ চাকরির প্রলোভনে প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন তারা কোনো কিছু না জেনেই একটি নিশ্চিত জীবনের জন্য বক্রপথে পা রেখেছিলেন। সংঘবদ্ধ দুষ্টচক্র তাদের জীবন চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। এমন দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে অনেক। এ দুষ্টচক্র শিক্ষাক্ষেত্রেও ছোবল বসাচ্ছে। এই শত্রুদের মূলোৎপাটনে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। এরা দেশ ও জাতির শত্রু। এ শত্রুদের শিকড়-বাকড় যে চারদিকে ছড়িয়ে গেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতি এ সাক্ষ্যই দিচ্ছে। ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো ঘটনা আর না ঘটে, সেটিই নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবস্থা বদলের এখন যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে অবস্থা বদলের চেষ্টা কতটা সফল হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। নতুন ব্যবস্থা কিংবা পদ্ধতি চূড়ান্ত করার আগে আরও ব্যাপক বিশ্নেষণ এবং ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। তবে কোনোভাবেই যাতে আস্থার সংকটের ছায়া বিস্তৃত না হয়, এ জন্যও সজাগ থাকতে হবে। আস্থা সংকট, আস্থাহীনতা, অবিশ্বাস এসবের নেপথ্যের একটিমাত্র কারণ বোধ হয় সামাজিক অবক্ষয়। এ অবস্থা থেকে ফিরতে না পারলে আস্থার সংকট থেকে মুক্তি নেই। এ সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ সামাজিক মূল্যবোধগুলো নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষাক্ষেত্রে এই যে সংকট দেখা দিয়েছে এবং যে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, তা নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষা মানের নিম্নগতি ঘটবে এবং তা রোধ করা দুরূহ হয়ে পড়বে। শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন করে পরিকল্পনার ভিত্তিতে সুদূরপ্রসারী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা যাতে কোনোভাবেই মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে, সে জন্য সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে যথাযথ দায়িত্ব পালনে অবশ্যই নিষ্ঠ হতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, উত্তরপত্র কেলেঙ্কারিসহ শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব নেতিবাচকতা বিরাজ করছে, সেসব নিরসনে শুভবোধসম্পন্ন সবার ঐকান্তিক প্রয়াস জরুরি। ইতিমধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে। কিন্তু সব কথার শেষ কথা হলো, আগে রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যাধিটির উৎস চিহ্নিত করে যথাযথ দাওয়াই প্রয়োগ করতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নের সঙ্গে দেশ ও জাতির অগ্রগতির বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জাতির অগ্রগতি-উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অন্যান্য খাতের চেয়েও অধিক গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টি দিতে হবে শিক্ষাক্ষেত্রে। শিক্ষাক্ষেত্রে যে অশুভ ছায়া পড়েছে এর নিরসনে যূথবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া গত্যন্তর নেই।
শিক্ষাবিদ

মস্তিস্ক ঠিক রাখার ৪০ উপায় by সালেহা চৌধুরী

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটার আমাদের ব্রেন। কিন্তু শরীরের মতো আমাদের মস্তিস্কেরও ব্যায়াম দরকার। এখানে ৪০টি বিভিন্ন ব্যায়ামের কথা বলা হলো, যার ফলে আমাদের মস্তিস্ক দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকতে পারে। মায়েদের কাছে অনুরোধ রচনাটি পড়ার। কারণ এই রচনা কেবল বড়দের নয়, এটি ছোটদের জন্যও বটে।
১. ড. রাচেল ভিকার্স বলেছেন, আমাদের প্রচুর মাছ খেতে হবে। মাছের দেশের লোকের জন্য এ সংবাদ অবশ্যই সুখবর। তৈলাক্ত ছোট মাছ মস্তিস্কের জন্য সবচেয়ে উপকারী। এখানে আছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা তিন ফ্যাটি এসিড আছে, যা আমাদের মস্তিস্ককে তাজা ও সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। তাতে আমাদের মনোসংযোগ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এখানে ছোট শিশুদের ওপর ওমেগা তিনের পরীক্ষা করা হয়েছে। ছয় সপ্তাহ তাদের ওমেগা তিন দেওয়ার পর দেখা গেছে, তাদের মনে রাখার ক্ষমতা বেড়ে গেছে।
২. সবচেয়ে দরকারি খাবার হলো সকালের খাবার; যা আমাদের মস্তিস্কের জন্য অত্যন্ত ভালো। দশ-বারো ঘণ্টা না খেয়ে থাকার পর মস্তিস্ক ও শরীরে জ্বালানির দরকার হয়। সকালের খাবার না খাওয়া কেবল আমাদের মেটাবলিজমের জন্যই খারাপ নয়, তা আমাদের মস্তিস্ককে একেবারে ভোঁতা বানিয়ে দিতে পারে। যে শিশু সকালে নাশতা খেয়ে স্কুলে যায়, সে খুব ভালো মনোসংযোগ করতে পারে।
৩. সবকিছু একরকম নয়, অন্যরকম করে করতে হবে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বাঁ হাত দিয়ে দাঁত মাজার চেষ্টা করা উচিত। কম্পিউটার মাউস বাঁ হাত দিয়ে ধরা। টেবিলের খাবারগুলো একটু অন্যরকম করে সাজানো। বাড়ি ফিরতে গিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে বাড়িতে আসা। হাঁটতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলা। তাতে আমাদের ব্রেনের সেলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
৪. তরকারিতে যে হলুদ আছে তা আমাদের আলঝেইমার থেকে বাঁচায়। কাজেই দেখা গেছে, পশ্চিমের লোকেরা আলঝেইমারে ভোগে বেশি। পশ্চিমে 'কারি' এবং হলুদের ট্যাবলেট এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। শিশুরা ছোট থেকে হলুদ দেওয়া তরকারি খাবে, ভালো কথা।
৫. আমাদের নতুন কিছু শেখা প্রয়োজন। শেখার কোনো বয়স থাকে না। নতুন ভাষা, নতুন মিউজিক, বাদ্যযন্ত্র, নাটক বা যে কোনো বিষয়ে শেখা আমাদের ব্রেন সেলগুলোকে সক্রিয় রাখে। কাজেই গান শেখা বা শোনা, ভাষা শেখা, অরিগামি, ইকিবানার সঙ্গে আমাদের হাঁটাচলার গতিও বাড়িয়ে দিতে হবে। শিশুরা অনায়াসে দুই-তিনটি ভাষা শিখতে পারে।
৬. লাল মদ নাকি আমাদের ব্রেনের জন্য ভালো। এটা হারাম। তাই পাকা টমেটোর রস একই ফল দেবে।
৭. বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, গান করার ক্ষমতা আমাদের ব্রেনের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। গান আমাদের ব্রেনে অনেক বেশি অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যায়। আর যখন গান বা কবিতার চরণ আমরা মুখস্থ করি, তা মস্তিস্কের একটি ভালো ব্যায়ামের কাজ করে।
৮. প্রোটিন ব্রেনের জন্য ভালো। এসব ভালো প্রোটিনের ভেতর বরবটি, ডিম, চর্বিবিহীন মাংস, বাদাম, ডাল এবং মাছ প্রধান। অনেক প্রোটিনে আছে আমিনো এসিড এবং টিপটোফ্যান, যা আমাদের 'নিউরোট্রানফিটার' বাড়াতে সাহায্য করে। এই নিউরোট্রানফিটার আমাদের মুড ভালো করে দেয়।
৯. অল্পবিস্তর ক্যাফিন আমাদের ব্রেনের জন্য ভালো। দিনে তিন কাপ চা বা কফি আমাদের ব্রেনকে জাগিয়ে রাখতে পারে। এর মধ্যে যে নিউরোট্রানফিটার বিরাজ করে, তা ডোপামাইন নামে পরিচিত। এ জিনিস আমাদের জাগায়।
১০. সঙ্গীত বিশেষত ধ্রুপদী সঙ্গীত আমাদের মস্তিস্কের কাজ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বিদেশে এর অনেক পরীক্ষা হয়েছে। অল্প বয়স থেকে যে শিশু গান শোনে, তার মনোসংযোগ ক্ষমতা বেড়ে যায় ও সে ধীরস্থির হয়।
১১. একটা হবি থাকা ভালো। দেখা গেছে, যেসব বয়স্ক মানুষ মধ্য বয়সেও একটি হবি নিয়ে ভাবছে, তাদের আলঝেইমারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। টিকিট জমানো, সেলাই, জিগস, ক্রশওয়ার্ড পাজল, বাগান করা এসব থাকতে পারে।
১২. যে কোনো হার্বস বা গাছগাছড়া মানুষের জন্য অত্যন্ত উপকারী। যুগ যুগ ধরে স্মরণশক্তি বাড়ানোর জন্য এসব গাছগাছড়া ব্যবহার করা হয়। ধনে পাতা, পুদিনা পাতা, লেটুস পাতা, নিমপাতা, সেজ, মিন্ট এবং আরও যাবতীয় গাছগাছড়া আমাদের খাদ্য তালিকায় সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
১৩. বারবার বলা হয়েছে টেলিভিশন কম দেখতে। যখন টেলিভিশন দেখা হয়, ব্রেনের তেমন কিছু করার থাকে না। তখন ব্রেন চলে যায় নিউট্রাল অবস্থায়। ক্লিভল্যান্ডের ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিন পরীক্ষা করে দেখেছে, ব্রেন হেলথের জন্য টেলিভিশনের চেয়ে বাজে জিনিস আর কিছু নেই।
১৪. বাড়ির পুরনো অ্যালবাম দেখা এই কারণে ভালো, যা আমাদের দীর্ঘদিনের নানা স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়; যা ব্রেনের জন্য উপকারী। এর ফলে ব্রেনের মধ্যে অনেক বেশি উপকারী 'সেরোটিন' উৎপাদিত হতে পারে।
১৫. হাঁটা ও দৌড়ানো ব্রেনের জন্য অত্যন্ত ভালো। কারণ হাঁটা ব্রেনের গ্লুকোস এবং অক্সিজেন বাড়িয়ে দেয়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ঘরে বসে থাকেন আর টেলিভিশন দেখেন। দেখা যায়, বুড়ো বয়সের সমস্ত রোগ এতে বেড়ে গেছে। হাঁটার বিকল্প নেই। কেবল একটু আলস্য ত্যাগ। তাতে যা লাভ হয় তা হাজার হাজার টাকার ওষুধেও হয় না।
১৬. ঘুম আমাদের সেই জিনিস, যা আমাদের শরীরের ব্যাটারিগুলোকে চার্জ করে তাকে সক্রিয় করে তোলে। এক রাত ভালো ঘুমের বিকল্প নেই। এতে আমাদের মনোসংযোগ ও শেখার ক্ষমতা বেড়ে যায়। যে ছাত্র পরীক্ষার আগের রাতে ভালো করে ঘুমোয়, তার পরীক্ষা ভালো হতে বাধ্য। কারণ, সে তখন অনেক বেশি মনোসংযোগ করতে পারছে।
১৭. প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ফল আমাদের ব্রেনের জন্য ভালো। কেবল ব্রেনের জন্যই ভালো নয়, শরীরের জন্যও ভালো। এ হলো 'আন্টিওক্সাইডান্ট' নামের প্রয়োজনীয় জিনিসের সরবরাহকারী। এ শরীরের টক্সিন বা বিষ বের করে দিতে সাহায্য করে। যেসব বিষ বা টক্সিন আমাদের ব্রেনকে ড্যামেজ করে দেয়।
১৮. নানা জায়গায় ঘোরা এবং এক্সপ্লোর করা আমাদের ব্রেনের জন্য ভালো। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ সবকিছুই ব্রেনের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। পশ্চিমে হলিডের যে নিয়ম আছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের মাঝে মাঝে 'স্টাডিটুরে' যাওয়া জরুরি।
১৯. ক্রশওয়ার্ড পাজল আমাদের ব্রেনের একটি উপকারী ব্যায়াম। এ ব্রেনের ক্ষমতা বাড়ায় ও আমাদের ভাষার শব্দভাণ্ডারকেও সমৃদ্ধ করে।
২০. সুডোকো নামের যে খেলা এখন বাজারে, বিশেষজ্ঞের অভিমত- এ আমাদের ব্রেনের জন্য উপকারী। এ হলো সমস্যা সমাধানের গেম বা কঠিন ভাবনার গেম।
২১. বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা ও কথা বলা আমাদের ব্রেনের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। যে লোক সমাজের নানা লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করে, দেখা যায় তাদের স্মরণশক্তি অনেকখানি বেড়ে গেছে। যে শিশু বাড়িতে একা বড় হয়, তার সঙ্গে যারা স্কুলে যায় তার পার্থক্য থাকে।
২২. কোনো একটি নতুন ইলেকট্রিক গ্যাজেট সম্বন্ধে জানা ভালো। ইন্টারনেট জানা ও বোঝা ভালো। কম্পিউটার, সার্ফিং সব ভালো। যারা মনে করে, এই বয়সে এসব শিখে আর কী হবে, তারাই নিজের ক্ষতি করে বেশি।
২৩. নাচ একটি ভালো জিনিস। ঘরের দরজা বন্ধ করে গান ছেড়ে দিয়ে নাচতে থাকুন। যদি মনে করেন, নাচটাচ আমাকে দিয়ে হবে না, হাঁটুন।
২৪. প্রচুর পানি পান করতে হবে। যখন শরীর শুকিয়ে যায় পানির অভাবে, তা গিয়ে মাথায় আঘাত করে। আমাদের ব্রেন তৈরি হয়েছে আশিভাগ পানি দিয়ে। কাজেই খুব কম করে হলেও আমাদের প্রতিদিন দুই লিটার পানি পান করতে হবে।
২৫. গিংকোবিলোবা নামের যে জিনিসটি ওষুধের দোকানে পাওয়া যায়, তা আমাদের সারা শরীরের রক্ত চলাচল ভালো রাখে। ভালো রক্ত চলাচল ক্ষমতা আমাদের ব্রেনের জন্য অত্যন্ত দরকারি।
২৬. সঠিক ওষুধ খেতে হবে। ডাক্তারদের অভিমত, ডোনেপেজিল নামের যে ওষুধটি আলঝেইমার সারাতে ব্যবহার করা হয়, তা একটি ভালো ওষুধ। এ হলো স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা, মনোসংযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। আমপাকিনসও আর একটি ভালো ওষুধ। একটি নতুন ঘুমের ওষুধ বের হয়েছে, যার নাম ওরেকসিন আর-এ-ওয়ান, যা আমাদের ঘুমের ভেতর নানা স্বপ্ন এনে আমাদের স্মৃতিশক্তিকে প্রখর করে। (চেষ্টা করিনি) এসব শিশুদের জন্য নয়।
২৭. ধূমপান একেবারে বর্জন করতে হবে। ভালোবেসে কেউ কাউকে সিগারেট উপহার দেবেন না। বিদেশে এখন লুকিয়ে এ কাজ করে, যে করতে চায়।
২৮. ব্লাডপ্রেসারের সমস্যা না থাকলে লেবু চিপে শরবত, মিছরির শরবত, আখের গুড়ের শরবত আমাদের জন্য অত্যন্ত ভালো। কারণ আমাদের ব্রেনের মাঝে মাঝে মিষ্টির দরকার হয়।
২৯. স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম খাওয়া ভালো। স্যাচুরেটেড ফ্যাট আমাদের কলেস্টেরোল লেভেল বাড়িয়ে দেয়। বেশি কলেস্টেরোল হার্টের সমস্যা।
৩০. মদ ভালো নয়। আমাদের ধর্মে নেই। ওকে ফিরিয়ে আনার দরকার নেই।
৩১. লবণ বেশি খাবেন না। বিশেষ করে যারা পাতে লবণ খান, তা বাদ দিতে হবে। লবণে 'ভাসকুলার ডিমেনশিয়া' বাড়ে। মানে হাত জানে না বা ভুলে গেছে, তাকে কী করতে হবে আর পা জানে না, তাকে কী করতে হবে।
৩২. বিয়ে করুন। শোনা গেছে, যারা বিবাহিত ও সুখী, তাদের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিশক্তি লোপ কম হয়।
৩৩. ব্লাডপ্রেসার এবং আমাদের শরীরের গ্লুকোস কেমন আছে, তার পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অনেকে বুঝতেও পারে না তার রক্তে ব্লাড সুগার লেভেল বেড়ে গেছে। আমি ব্রিটেনে প্রচুর 'চাইল্ড ডায়াবেটিক' দেখেছি।
৩৪. প্রচুর হাসুন। প্রাণ খুলে হাহা করে। শরীর ও মনের জন্য ভালো।
৩৫. মাথায় যেন কোনো আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মাথায় হঠাৎ করে আঘাত লাগলে তা ভালো করে পরীক্ষা করাতে হবে। আজ যা কিছু না, পরে তা ব্রেনের কঠিন সমস্যা।
৩৬. স্ট্রেস বা চাপ থাকা ভালো। মানে স্বাস্থ্যকর চাপ। তবে খুব বেশি চাপ ক্ষতিকর।
৩৭. হরমোন খাবার আগে সাবধান। ওসট্রেজন বা টেসটসটেরোন আলঝেইমার থেকে রক্ষা করে, এমন কথা অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু ভালো ফল পেতে হলে একজনের জন্য সঠিক ডোজ খেতে হবে।
৩৮. ভালোমতো ধর্মচর্চা আমাদের আত্মশক্তি বাড়িয়ে দেয়। তবে অন্ধত্ব আমাদের জন্য ভয়াবহ ফল আনতে পারে। হরমোনের মতো ধর্মের সঠিক ডোজ কতটুকু হবে, জানা দরকার।
৩৯. কিছু জটিল গেম চর্চা ভালো। কনট্রাক্ট ব্রিজ, দাবা, ব্যাকগেমন এমন কোনো খেলা আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতাকে বাড়ায়। ফলে নতুন ব্রেন সেল জেগে ওঠে।
৪০. একটু সৃষ্টিশীল হোন। কল্পনাশক্তি বাড়ূক। তাতে আপনার ব্রেনের জন্য ভালো। মায়েরা খেয়াল রাখবেন, সকালে বাচ্চারা যেন নাশতা খেয়ে স্কুলে যায়। আর যেসব কথা লেখা হয়েছে মন দিয়ে পড়া এবং শিশুদের বড় করে তোলা।
ব্রিটেন প্রবাসী কথাসাহিত্যিক

ব্যাংক ডুবিয়ে জাহাজ ভাসালেন তিনি

রাষ্ট্র খাতের বেসিক ব্যাংক ডুবিয়ে শেখ আবদুল হাই বাচ্চু সাগরে ভাসিয়েছেন মাছ ধরার আটটি জাহাজ। বাচ্চুর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ইডেন ফিশারিজের নামে ছয়টি এবং তাঁর ভাই শেখ শাহরিয়ার ওরফে পান্নার প্রতিষ্ঠান ক্রাউন ফিশারিজের নামে কেনা হয়েছে দুটি জাহাজ। এসব জাহাজের বাজারদর প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন তিনি। আর জাহাজ কোম্পানি খোলেন পরের বছরের ডিসেম্বরে। সাগরে চলাচল করা মাছ ধরার নৌযান তদারকির দায়িত্ব নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন নৌবাণিজ্য বিভাগের। এই বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ইডেন ফিশারিজ লিমিটেডের মালিকাধীন ছয়টি জাহাজ হচ্ছে এফভি ক্রিস্টাল-১, এফভি ক্রিস্টাল-২, এফভি কর্ণতরী, এফভি ইডেন-১, এফভি ইডেন-২, এফভি সিলভার সি-০১।
ক্রাউন ফিশারিজের মালিকানাধীন জাহাজ দুটি হচ্ছে এফভি স্পিড-১ ও এফভি স্পিড-২। সাগরে মাছ ধরার জাহাজকে ফিশিং ভ্যাসেল বা এফভি বলা হয়। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাতীয় পার্টির সাংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) মাহজাবীন মোরশেদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের ছিল এফভি ক্রিস্টাল-১ ও এফভি ক্রিস্টাল-২ নামের দুটি জাহাজ। ২০১২ সালের ৫ জুন ইডেন ফিশারিজের নামে দুটি জাহাজের মালিকানা স্থানান্তর করা হয়। সাংসদ মাহজাবীন এবং তাঁর স্বামী চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের কাছে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ২৭৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের কারণে স্বামী-স্ত্রীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গত ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামে দুটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অন্য তিন আসামিদের মধ্যে আছেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক দুই ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ফখরুল ইসলাম, এবং সাংসদ মাহজাবীনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আইজি নেভিগেশন লিমিটেডের পরিচালক সৈয়দ মোজাফফর হোসেন। তবে এই মামলায় বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। এ ছাড়া দিলকুশা শাখা থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার কারণে গত ১৭ জানুয়ারি আরও একটি মামলা হয়। এ মামলায় আগের আসামিদের সঙ্গে মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের ছোট ভাই ফয়সল মুরাদ মোরশেদকেও আসামি করা হয়। এই মামলায়ও ছাড় দেওয়া হয় বাচ্চুকে। দুটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে স্পষ্ট করে তিনি কিছু বলতে চাননি। তাঁর মন্তব্য, তদন্ত চলছে। এর বেশি কিছু বলার নেই। বাচ্চুর কাছে জাহাজ বিক্রি করার বিষয়ে মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম এবং তাঁর স্ত্রী সাংসদ মাহজাবীনের বক্তব্য জানতে এক সপ্তাহ ধরে মুঠোফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুজনের মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে। বাচ্চুর মালিকানাধীন ইডেন ফিশারিজের স্থানীয় কার্যালয় প্রথমে ছিল চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাট এলাকার ৩৩১, স্ট্র্যান্ড রোডের মনোয়ার টাওয়ারের তৃতীয় তলায়। বছর দুয়েক আগে কার্যালয়টি আগ্রাবাদের আখতারুজ্জামান সেন্টারের অষ্টম তলায় স্থানান্তর করা হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সেখানে গিয়ে কার্যালয়টি বন্ধ পাওয়া যায়।
বাণিজ্যিক এই ভবনের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মী প্রথম আলোকে জানান, ইডেন ফিশারিজের কার্যালয়টি বেশ কয়েক মাস ধরে বন্ধ রেখেছে এর মালিকপক্ষ। তবে কার্যালয়ের ভাড়া পরিশোধ করা হয় নিয়মিত। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ইডেন ফিশারিজের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ (অপারেশন) সালাহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, পরিচালনাসংক্রান্ত ঝামেলার কারণে ইডেন ফিশারিজের জাহাজগুলো দিয়ে সাগরে আপাতত মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পান্না সাহেবের জাহাজ দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, তাঁদের কোম্পানির (ইডেন) জাহাজ ছয়টি নয়, সাতটি। আবদুল হাই বাচ্চু, তাঁর স্ত্রী শেখ শিরিন আখতার, পুত্র শেখ সাবিদ হাই অনিক ও মেয়ে শেখ রাফা হাই-এর নামে ইডেন ফিশারিজ লিমিটেড খোলা হয়। এ প্রতিষ্ঠানের নামে একটি ব্যাংকে খোলা হিসাবে মাত্র ১১ মাসেই জমা হয় ১৩ কোটি টাকা। এই তথ্য ব্যাংক সূত্র থেকে পাওয়া। চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গভীর সাগরে মাছ ধরার জাহাজ ইস্পাতের কাঠামো (স্টিল বডি) দিয়ে তৈরি হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের জাহাজ রয়েছে ১১৬টি। গভীর সাগরে এসব জাহাজ একটানা সর্বোচ্চ ২৮ দিন অবস্থান করে মাছ নিয়ে ফিরে আসে। বাচ্চু ও তাঁর ভাই পান্নার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জাহাজগুলো ইস্পাতের তৈরি। প্রতিটি জাহাজের বর্তমান বাজারদর ১০-২৫ কোটি টাকা। গভীর সাগর থেকে ধরে আনা মাছের পাইকারি ক্রেতাদের সংগঠন কর্ণফুলী ফিশ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, আবদুল হাই বাচ্চু ও তাঁর ভাই পান্না পাঁচ-ছয় বছর আগে জাহাজ কিনে সমুদ্রে মাছ ধরছেন। তাঁদের সংগঠনের মাধ্যমেই ওই জাহাজগুলোর মাছ বাজারজাত করা হয়। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন বাচ্চু। তাঁর সময়ে কোনো নিয়মনীতি ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয় ব্যাংক থেকে। এর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্র খাতের সবচেয়ে ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই ব্যাংকটির এখন ডুবন্ত অবস্থা। বেসিক ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুদকের করা ১৮ মামলার কোনোটিতেই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও ব্যাংকটিতে ‘হরিলুটের’ পেছনে আবদুল হাই জড়িত বলে একাধিকবার উল্লেখ করেন। উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিমের সুসময়

ডিম খেতে যাঁরা পছন্দ করেন, তাঁদের এখন সুসময়। বাজারে ফার্মের ডিমের দাম কমে এখন ডজনপ্রতি ৭০ টাকায় নেমেছে। একই সঙ্গে কমেছে হাঁস ও দেশি মুরগির ডিমের দামও। ডিমের দাম কমলেও বাজারে মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে পাইকারি বাজারে চিনির দর বেড়েছিল, তার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। অন্যদিকে দেশি পেঁয়াজের দামও কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় উঠেছে। অন্যান্য পণ্যের দাম স্থিতিশীল আছে। দেশের বাজারে দীর্ঘ সময় ধরেই ডিমের দাম কম। এ সপ্তাহে তা আরও কমেছে। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে ডিমের দাম এ পর্যায়ে নেমে এসেছিল। বিক্রেতারা বলছেন, দাম এভাবে কমে যাওয়ার কারণ বাড়তি উৎপাদন। দেশে এখন ছোট-বড় খামারে দৈনিক যে পরিমাণ ডিম উৎপাদিত হয়, যা চাহিদার তুলনায় বেশি বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। ঢাকার কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতি ডজন ফার্মের লাল ডিম বিক্রি করেন ৭০ টাকা দরে। অন্যদিকে দেশি মুরগি ও হাঁসের ডিম বিক্রি হয় ১২০ টাকা ডজন। ছোট বাজার ও পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে সাধারণত দাম কিছুটা বেশি হয়। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের সামনের ডিম বিক্রেতা আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পাইকারি বাজারে এখন ডিমের দাম কম। তেজগাঁওয়ের আড়তে গতকাল প্রতি ১০০টি ফার্মের ডিম ৪৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়, যা গত সপ্তাহে ৪৮৫ টাকার মতো ছিল।
স্থানীয় আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হানিফ মিয়া বলেন, মাস দেড়েক আগে ১০০টি ডিমের দাম ৫৪০-৫৫০ টাকায় উঠেছিল। এরপর থেকেই কমছে। তিনি বলেন, দাম কমে যাওয়ার বড় কারণ সরবরাহ বেশি। এখন বিদেশ থেকে এসেই গ্রামের মানুষেরা মুরগির খামার করছে। এতে উৎপাদন অনেক বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, কৃত্রিম ডিমের একটা অপপ্রচারও আছে। এসব কারণেও বাজার পড়তি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। ছয় বছর আগে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন ছিল ৫৭৪ কোটি। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, ২০০৯ সালে প্রতি হালি ডিমের গড় দাম ছিল ২৮ টাকা। ২০১৬ সালে এ দাম দাঁড়ায় ৩৪ টাকায়। ২০১৭ সালে আবার তা কমে ৩২ টাকায় নামে। গত সপ্তাহে ঢাকার পাইকারি বাজারে চিনির দর কেজিতে দুই টাকার মতো বেড়েছিল। খুচরা পর্যায়ে বৃদ্ধি সেটার প্রভাব বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। দেশি পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দর ৫ টাকা বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। অবশ্য ভারতীয় পেঁয়াজের দাম বাড়েনি। বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৫০-৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে নতুন দেশি রসুন এসেছে, কেজিপ্রতি দর ৭০-৮০ টাকা। আর চীনা রসুন বিক্রি হচ্ছে ১১০-১২০ টাকা কেজি দরে। সবজির দর এখন কম। প্রতি কেজি শীতের সবজি ২০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। আলু মিলছে ২০ টাকা কেজি দরে। সব মিলিয়ে সবজির বাজারে স্বস্তি আছে। আটা, মসুর ডাল, ভোজ্যতেল, লবণ, মুরগি, গরুর মাংসসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে বিশেষ কোনো হেরফের হয়নি। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, চিনির দাম খুচরা বাজারে ২-৩ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি ৫৫-৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আত্মপীড়ন, তামাশা নাকি অন্য কিছু by কামাল আহমেদ

‘ব্যাটলিং বেগমস’ শব্দযুগল ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনীতির সংকট বর্ণনায় অভ্যস্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আজ পর্যন্ত তাঁর কোনো জায়গা হয়নি। বিদেশি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সফরের সময়ও রাষ্ট্রাচারের আনুষ্ঠানিকতায় তিনি সব সময়ই উপেক্ষিত। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদি ও সুযোগ-সুবিধা যতটা পান, তার পুরোটাই সরকারের কৃপানির্ভর। দলের ভেতরেও যে বড় ধরনের প্রভাববলয় তৈরি করতে পেরেছেন, তা-ও নয়। সুতরাং, হতাশা থেকে মুক্তির উপায় কী? নিশ্চয়ই সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর কৃপা! যাঁর সম্পর্কে এত কথা খরচ করছি, তিনি সরকারি ভাষ্যে বাংলাদেশের সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি সংসদে তাঁর এই হতাশা প্রকাশ করে যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর আরও কৃপা প্রার্থনা করেছেন, তা নজিরবিহীন। বিশ্বের আর কোনো দেশে কোনোকালে বিরোধী দলের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর করুণা কামনার আর কোনো দৃষ্টান্তের কথা আমাদের জানা নেই। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা সরকারি, না বিরোধী দল? বিদেশে গেলে বলতে পারি না আমরা কী।’ প্রশ্নটি করার আগে অবশ্য বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেওয়া বেতন-ভাতা তিনি ফেরত দিয়েছেন কি না, সে কথাটি বলেননি। ওগুলো ফেরত দিলে তাঁর আত্মপীড়ন কতটা আন্তরিক, সেটা বোঝা যেত। বিনা ভোটের সংসদে তাঁর দলের সাংসদ আছেন তাঁর হিসাবে ৪০ জন। তাঁদের মধ্যে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী আছেন এবং আছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এসব ব্যক্তিকে মন্ত্রিত্ব ও মন্ত্রিত্বের মর্যাদা ত্যাগ করতে বললেও যে তাঁরা তা শুনবেন, তাঁর স্বামী ও দলীয় সহকর্মীদের প্রতি তাঁর সে আস্থা নেই। নিরুপায় রওশন তাই বলেছেন, ‘আপনি (প্রধানমন্ত্রী) যদি বলতে পারতেন, মন্ত্রিত্ব ছাড়েন। আমরা বলতে পারি না। এটা আপনি করলে জাতীয় পার্টি বেঁচে যেত। সম্মানের সঙ্গে থাকতে পারত। আমরা সম্মানের সঙ্গে নাই। এক বছর আছে আরও, সেটা দেখেন।’ সরকারি দলের সাংসদেরা মাইক ছাড়াই যখন বলতে থাকেন যে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পার্টির নেতাদের মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বলেছেন, তখন রওশন বলেন, ‘আপনি নির্দেশ দিলে মানবে না কে? না, দেন নাই।’ এরপর অনেকটা দাবি জানানোর সুরে তিনি বলেন, তাহলে সবাইকে মন্ত্রী বানিয়ে দেন। হয় বিরোধী দল হতে হবে, না হয় সরকারি দল হতে হবে। বিরোধী দলের দরকার নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর কৃপানির্ভর বিরোধীদলীয় নেতার পদে আসীন রওশন এরশাদের এই আত্মোপলব্ধিতে চার বছর সময় লাগল কেন? তা ছাড়া উপলব্ধিটি কি শুধুই তাঁর ব্যক্তিগত, নাকি দলেরও? তাঁর কথায় জাতীয় পার্টির অন্যদের সায় আছে বলে তো আলামত মেলে না। কেউ কেউ এটিকে নিতান্তই তামাশা বলে তির্যক মন্তব্য করে বিষয়টিকে গুরুত্বহীন হিসেবে নাকচ করে দিয়েছেন।
কিন্তু বিষয়টি ততটা উপেক্ষণীয় না-ও হতে পারে। রওশনের কথায় ধারণা হয়, জাতীয় পার্টিও চলে প্রধানমন্ত্রীর কথায়। যার মানে দাঁড়ায়, তাঁরা চাইলেই আওয়ামী লীগে বিলীন হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু বিশেষ কোনো কারণে তাঁদের আলাদা পরিচয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। পুতুলনাচের অদৃশ্য সুতার নিয়ন্ত্রণ নেপথ্যের অদৃশ্য কারও কাছে থাকে, সে কথা সবারই জানা। রওশনের কথায় স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, তাঁর দলের নিয়ন্ত্রক অদৃশ্য কেউ নয়, খুবই দৃশ্যমান। সুতরাং তাঁদের কারও পুতুল বলাটা যথার্থ নয়। কেননা, তাঁরা তো নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে সরকারের জন্য কাজ করছেন, যার জন্য প্রযোজ্য অভিধা নতুন করে উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। প্রধানমন্ত্রী হয়তো রওশনের দাবি পূরণ করবেন। আগামী নির্বাচনে বিএনপি না এলে অথবা বিএনপিকে না চাইলে আবারও তো একটি বিরোধী দলের প্রয়োজন হবে। সুতরাং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে উজ্জ্বলতর করার লক্ষ্যে বিরোধী দলের ভূমিকায় জাতীয় পার্টির যেটুকু অনুশীলন প্রয়োজন, তাকে সেটুকু সুযোগ দেওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। বিএনপির অনেকেই জাতীয় পার্টিতে আসবেন বলে এরশাদের সাম্প্রতিক দাবির ভিত্তিও সম্ভবত এই আশাবাদ যে সরকার ভবিষ্যতেও তাদের বিএনপির বিকল্প হিসেবে পেতে চায়। তা ছাড়া সরকার থেকে জাতীয় পার্টিকে বিদায় দেওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ যে এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, সেটাও প্রমাণ করা সম্ভব হবে। জাতীয় রাজনীতিতে আসল প্রতিপক্ষ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচার এবং সাজার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের জন্য এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ কাজে লাগানোই স্বাভাবিক। খালেদা জিয়ার কারামুক্তি এবং সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ সরকার এখন যতটা দুরূহ করে তুলতে পেরেছে, সে রকমটি আর কারও ক্ষেত্রে অতীতে দেখা যায়নি। আমাদের ক্ষমতাসীন রাজনীতিকেরা যেভাবেই ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, সংসদীয় পরিভাষায় বিরোধী দলের সংজ্ঞা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি বা অস্পষ্টতা নেই। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সংসদীয় পরিভাষার তালিকায় অপজিশনের সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে: বিরোধী দল বলতে হাউস অব কমন্সে সরকারে নেই যে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল তাকে বোঝাবে। আরও সাধারণভাবে, যে দল সরকারের অংশ নয়, তাকেই একটি বিরোধী দল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সরকারের একটি অংশকে বিরোধী দল বলার কোনো অবকাশ নেই। অবশ্য স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে গণমাধ্যমে আমরাও স্পষ্ট করে বলতে পারিনি যে তিনি সরকারি বিবরণে বিরোধীদলীয় নেতা হলেও বাস্তবে সরকারের প্রতিনিধি। গণমাধ্যম কথাগুলো পরিষ্কার করে বললে হয়তো তাঁকে এই আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তিতে ভুগতে হতো না। রওশন এরশাদের এই আকুতির অবশ্য আরও কয়েকটি দিক রয়েছে, যেগুলো গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তাঁর কথায় যেসব স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল মোটাদাগে সেগুলো হচ্ছে-প্রথমত, এটি এখন আর অস্বীকারের কোনো উপায় নেই যে বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদটি হচ্ছে বিরোধী দলবিহীন সংসদ। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলের নামে এই সংসদে যা হয়েছে, তা মূলত হয়েছে সংসদ নেত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়। তৃতীয়ত, বিরোধী দল বা বিরোধীদলীয় নেতার পরিচয় ব্যবহারের মাধ্যমে সবাইকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। বিএনপির বিকল্প হিসেবে জাতীয় পার্টিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা কয়েক বছর ধরেই চলছে। গত নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ স্বতঃর্স্ফূত এবং সর্বাত্মক ছিল না; বরং দলীয় প্রধান জেনারেল এরশাদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং তাঁর নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি রহস্যে ঘেরা। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও দুর্নীতির একাধিক মামলা ঝুলে আছে। সুতরাং সরকারের আনুকূল্য ছাড়া তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। সুতরাং কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণে তাঁর সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ-সংশয় সহসা দূর হওয়ার নয়। বার্ধক্য আড়াল করায় অভ্যস্ত হলেও রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা কত দিন থাকবে, তা-ও একটি বড় প্রশ্ন। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎও যে অনিশ্চিত, সে কথা বললে খুব একটা ভুল হবে না। সাংগঠনিক দুর্বলতা, জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটের খেসারত এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় বিএনপির অসহায়ত্ব দীর্ঘায়িত হওয়া সত্ত্বেও সরকার যে তাদেরই প্রধান প্রতিপক্ষ গণ্য করে, তা তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রমাণিত। তাদের কথায় দেশের সব সমস্যারউৎস বিএনপির ১২ বছর আগের অপশাসন এবং সভা-সমাবেশ না করতে পারলেও উন্নয়নের পথে বাধাও তারাই। এমনকি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রেষারেষি, দলাদলি ও খুনোখুনিতেও দোষী দলে অনুপ্রবেশকারী বিএনপির সমর্থকেরা। এ রকম প্রতিপক্ষ রাতারাতি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে-সেই ধারণাকে ভিত্তি করে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা সফল হওয়ার ভাবনা আদৌ কি বাস্তবসম্মত?
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক

ভালো থেকো মারমা মেয়ে by সঞ্জীব দ্রং

হলিউড ছায়াছবি হোয়াট ড্রিমস্ মে কাম নিশ্চয় খুব কম পাহাড়ি মানুষ দেখেছেন। দেখলেও ওই ছায়াছবির বিখ্যাত ডায়ালগ ‘সামটাইমস্ হোয়েন ইউ উইন, ইউ লুজ’ মনে থাকার কথা নয়। মানুষ সাধারণভাবে হারতে চায় না। সবাই সব সময় জয়ী হতে চায়। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় যে কখনো কখনো সে জয়ী হলেও প্রকৃত অর্থে হেরে যায়। আমরা যখন মানুষকে দুঃখ দিই, ক্ষমতার দম্ভে অন্য মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, অপমান করি, তখন আড়ালে মানবতা কাঁদে। তখন মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি, সম্মান, স্নেহ-প্রেম-ভালোবাসা, সৌজন্য-শ্রদ্ধাবোধ, মায়া-মমতা নীরবে অশ্রু ফেলে। তখন মনুষ্যত্বের পরাজয় ঘটে। আজ যারা ক্ষমতার দম্ভে দিশেহারা, তাদের অবশ্যই এই সংলাপ মনে রাখা দরকার: হোয়েন ইউ উইন, ইউ লুজ। বিলাইছড়ির ফারুয়া অঞ্চলের নির্যাতিত দুই মারমা কিশোরীর প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রের নির্দয়তা ও দম্ভই প্রকাশিত হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে যখন অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়ে চাকমা সার্কেলের রানিসহ পাহাড়ি নারীদের লাঞ্ছিত হতে হয়, তাঁদের অপমান-অপদস্থ করা হয় এবং তারপরও রাষ্ট্রযন্ত্র নীরব থাকে, তখন সাধারণ পাহাড়ি মানুষের অসহায়ত্ব আমরা সহজে অনুমান করতে পারি। তখন মনে হয় এই ভূমি থাকে, দেশ থাকে; কিন্তু গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের হত্যাসহ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হয়নি। লংগদুর পাহাড়ি মানুষের জীবনে হাহাকার থামেনি। এই ধারা চলতে থাকলে রাষ্ট্রের কাছে বিচারের আশা ছেড়ে দিয়ে শুধু বিনীতভাবে এই প্রার্থনাই নিবেদন করতে পারি, মারমা দুই বোন অন্তত যেন ভালো থাকে, নিরাপদে থাকে।
দুই. আমি একবার বিলাইছড়ি গিয়েছিলাম। সম্ভবত ১২ বা ১৩ বছর আগে। তখন এই মারমা বোন দুটির বয়স হয়তো তিন বা পাঁচ বছর। আমার সঙ্গে আমেরিকান এক বন্ধু ছিলেন। বিলাইছড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে, পাহাড়ি মানুষের সঙ্গে কথা বলে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তখন অবশ্য আশা ছিল পাহাড়দেশে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত হবে, পাহাড়ি মানুষের জীবনে সুখ, শান্তি আর আনন্দ ফিরে আসবে। সাধারণ বাঙালিদের জীবনেও সমৃদ্ধি আসবে। চুক্তির ২০ বছর পরও পাহাড়ে হাহাকার থামেনি। আমার সেই বন্ধুকে এখন আমি কী করে এই বীভত্স গল্প বলি, যেখানে পাহাড়ি দুই বোনকে লাঞ্ছিত হওয়ার পরও বিচারের কোনো আশা দেখি না! ঘটনাটি আমরা এখন সবাই জানি, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে। আমরা গভীর দুঃখ ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, মূলধারার গণমাধ্যম, প্রিন্ট ও টেলিভিশন এই মারমা মেয়েদের নির্যাতনের ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই মূল ভরসা। সাঁওতালদের ওপর যখন বর্বরোচিত হামলা হয় এবং পুলিশ নিজেই আগুন ধরিয়ে দেয় সাঁওতালদের বাড়িঘরে, সেই ভিডিও বিদেশি চ্যানেল প্রচার করার পর আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করে। এই-ই হলো মিডিয়ার অবস্থা এখন। আমরা এক কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আর দেখছি, দেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন ও অত্যাচার বাড়ছে, কিন্তু বিচারের আশা দুরাশা। আমরা ৩০ টির বেশি মানবাধিকার সংগঠন মারমা দুই বোনের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে সমাবেশ করেছিলাম। সমাবেশ চলাকালীন আরও ১০ টির বেশি সংগঠন সংহতি জানিয়েছিল। আমরা তখন বলেছিলাম, আমাদের বিভিন্ন বাহিনীর নানা কাজের সুনাম রয়েছে দেশে ও বিদেশে। শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবতার কাজে এসব বাহিনীর সদস্যরা প্রশংসনীয় অবদান রাখছেন। কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের দায় প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না। আমরা চাই ঘটনার যথাযথ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হোক।
তিন. মারমা মেয়ে দুটির ভবিষ্যৎ জীবন যেন কোনোভাবেই ছারখার না হয়। তাদের মনোবল জাগিয়ে তুলতে হবে। তাদের পাশে পার্বত্য নারীসমাজসহ সবাইকে দাঁড়াতে হবে। সরকারকে এই পরিবারের নিরাপত্তাসহ সব প্রয়োজনে এগিয়ে আসতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করবে বলে জেনেছি। তদন্ত রিপোর্ট অনেক সময় জানা যায় না। এই ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে এবং এর সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে তদারক করতে হবে। এই মারমা পরিবার কি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে? জুমচাষ করে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারবে? মেয়ে দুটির পড়াশোনা বা পুনর্বাসনের কী হবে? চাকমা রানির সঙ্গে যে অশোভন ও নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে, তার বিচারের জন্য সরকার নিজে কি এগিয়ে আসবে? সত্যি বলতে কি, আমি বিদ্যমান বাস্তবতায় কোনো আশা দেখি না। প্রেরণার কথা হলো রানি নিজে শক্ত আছেন এবং বলেছেন তিনি হাল ছাড়বেন না। মনে রাখা দরকার, যারা তাঁকে অপমান করেছে, পরাজিত হয়েছে তারাই। মানুষের ধিক্কার ও ঘৃণা বেড়েছে তাদের প্রতি। আর রানির প্রতি বেড়েছে মানুষের ভালোবাসা। বিরসা মুন্ডাকে নিয়ে আজও মানুষ গান গায়, কবিতা লেখে। নিপীড়ক শাসককে নিয়ে কোনো দিন কোনো গান ও কবিতা রচিত হবে না। তাই এই ক্রান্তিকালেও মানুষের শক্তির কাছে আস্থা রাখি। অশুভ শক্তি চায় আমরা যেন হাল ছেড়ে দিই। কিন্তু ওরা জানে না, পাহাড়ে বারবার বসন্ত আসে, বনে ফুল ফোটে, পাখি গান গায়, ছমছম রাতের আঁধার চিরে দিনের আলো দেখা যায়। আপনি নদীতে ঢেউ দেখতে চান, নদীর ঢেউ হয়তো মিলিয়ে যায়। কিন্তু একসময় নদীতে আবার জোরে বাতাস বইবে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভরে উঠবে নদী। রাষ্ট্র যদি মানুষের পাশে না দাঁড়ায়, মানুষ দাঁড়াবে মানুষের পাশে। এই আশায় প্রিয় মারমা দুই বোন আমার, পাহাড়দেশে ভালো থেকো, নিরাপদে থেকো। মনে রেখো, কিছু মানুষ নির্দয় হলেও সবাই নয়। এই পাহাড়, এই জন্মভূমিতে তোমাদের আছে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার।
সঞ্জীব দ্রং: সংস্কৃতিকর্মী ও কলাম লেখক
sanjeebdrong@gmail.com

চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু জ্বর

চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নেওয়া উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। এটা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। বৃহস্পতিবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ডিএসসিসি এবার আগেভাগেই মশার উপদ্রব কমাতে দুই সপ্তাহব্যাপী ‘স্পেশাল ক্রাশ প্রোগ্রাম’ কর্মসূচি শুরু করেছে। ক্রাশ প্রোগ্রামের অধীনে ডিএসসিসির ৫৭টি ওয়ার্ডে টানা দুই সপ্তাহ ধরে মশার ওষুধ ছিটানো হবে। গত বছর ঢাকা মহানগরে চিকুনগুনিয়া মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঢাকায় দেখা দিতে থাকে। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা আগে জানা থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়টিতে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। রোগটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়নি উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ। ফলে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আকারে। এডিস মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া জ্বরে ভুগেছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। ঢাকা শহরে যে বাসায়ই এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে, সে বাসায় গড়ে দুজনের বেশি চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যু না হলেও এর ভয়াবহতা ব্যাপক। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রচণ্ড জ্বরের পাশাপাশি শরীরে নিদারুণ যন্ত্রণা হয় আর জ্বর সেরে যাওয়ার পরও গিঁটে গিঁটে অসহ্য ব্যথা হয়। এই জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির সঞ্জীবনী শক্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়। তারা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা পর্যন্ত করতে পারে না।
এ রোগ থেকে উপশমও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। চিকুনগুনিয়ার মতো ডেঙ্গুও একটি সংক্রামক ব্যাধি। ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর এবং সেই সঙ্গে শরীরে, বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়। এ ছাড়া মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা হতে পারে। শরীরে র‍্যাশ দেখা দেয়। এই জ্বরে অনেক ক্ষেত্রে বুকে বা পেটে পানি আসা, যকৃতে আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিসসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। ফলে এতে মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকে। কাজেই এসব রোগ প্রতিরোধের জন্য শুধু ডিএসসিসির উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরও যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকতে হবে। চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা মহানগরের বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকতে হবে। এডিস মশা সাধারণত বাসাবাড়িতে ফুলের টব, টায়ার, ফ্রিজ, এসিতে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। এসব পরিষ্কারে নগরের প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে। নিজ বাড়ির আঙিনা ও চারপাশও পরিষ্কার রাখতে হবে। তাহলে মশা জন্মাবে না। মশার ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি ঘুমানোর সময় মশারি টানাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে অন্য কোনো মশা তাকে কামড়াতে না পারে। কারণ অন্য মশার মাধ্যমে এ রোগ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আলু ও টমেটোর দাম

শস্যের ফলন ভালো হলে কৃষকের মুখে হাসি ফোটার কথা, কিন্তু বাংলাদেশে প্রায়ই তার উল্টোটা ঘটে। এ দেশে ‘বাম্পার ফলন’ হলে কৃষকের মুখ কালো হয়, কারণ ফসলের দাম এত কমে যায় যে চাষবাসের খরচই ওঠে না। আলু আর টমেটো নিয়ে কৃষকের সেই দুঃখের দিন শুরু হয়েছে। গত বছর জুলাই-আগস্ট মাসে যে টমেটোর দাম কেজিপ্রতি উঠেছিল ১৫০ টাকায়, সেই টমেটোর দাম এখন পাঁচ টাকার নিচে। সিলেটের টমেটোচাষিরা গরুকে টমেটো খাওয়াচ্ছেন-এমন ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আলু নিয়েও কৃষকদের একই দুর্দশা; কৃষক পর্যায়ে আলুর কেজিপ্রতি পাইকারি দাম পাঁচ টাকায় নেমে গেছে। অবশ্য রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে ভোক্তাপর্যায়ে টমেটো ও আলুর দাম এখনো একটু বেশি, কিন্তু তাতে কৃষকদের কোনো লাভ হচ্ছে না। এই বাড়তি টাকা চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। তা ছাড়া পরিবহন খরচ এবং পথে পথে চাঁদাবাজি, টোল ইত্যাদির ফলেও শহরগুলোর বাজার পর্যন্ত আসতে অন্যান্য কৃষিপণ্যের মতোই আলু ও টমেটোর দাম কিছু বেশি হয়। কোনো পণ্যের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে যাওয়া বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম। ধান, আলু, টমেটো ইত্যাদি কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সেটা যখন ঘটে, তখন কৃষকদের জন্য অসহায় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেই পরিস্থিতি থেকে কৃষকদের উদ্ধার করার কার্যকর সরকারি ব্যবস্থা থাকে না বললেই চলে। ফলে এ দেশে এটি একটি চিরাচরিত সমস্যা; যেনবা এ থেকে উদ্ধারের কোনো উপায় নেই। কিন্তু আসলে কি তাই? আমাদের মাটি উর্বর, কৃষকেরা পরিশ্রমী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক না এলে মাঠে মাঠে শস্যের বিপুল সম্ভার সৃষ্টি হয়-এটা তো আমাদের সৌভাগ্যের বিষয়। এই সৌভাগ্য কেন আমাদের কৃষকদের জন্য দুর্ভাগ্য হয়ে ওঠে? এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষিব্যবস্থার বনিয়াদি কিছু বিষয়।
কৃষি প্রযুক্তির উন্নতি ঘটেছে, ফলন বেড়েছে এবং ক্রমেই বাড়ছে, কিন্তু কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা এখনো সেকেলে রয়ে গেছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য আমরা কী করব, সে বিষয়ে চিন্তা ও পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে আলুর বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। কয়েক বছর ধরে আলুর ফলন ক্রমে বাড়ছে। দেশে মোট আলুর চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ টন, কিন্তু গত অর্থবছরে মোট উৎপাদিত আলুর পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ২০-২২ লাখ টন বেশি আলু উৎপাদিত হচ্ছে। এই উদ্বৃত্ত আলু আমরা কী করব? রপ্তানি করতে হবে। যেসব দেশে আলুর চাহিদা আছে, সেসব বাজারে আমাদের আলু রপ্তানি করার চেষ্টা করতে হবে। এ লক্ষ্যে কিছু চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। কারণ, আলু আমদানিকারক দেশগুলোতে আমাদের আলু গুণগত মানসম্পন্ন বলে বিবেচিত হচ্ছে না। আলু থেকে চিপস, স্টার্চ ইত্যাদি তৈরি করা হয়, আমাদের আলু সেসবের উপযোগী নয়। কৃষিভিত্তিক শিল্পে ব্যবহার্য কৃষিপণ্যের আকার, জাত, গুণগত বৈশিষ্ট্যের ধরন ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা সম্পর্কে আমাদের ধারণার অভাব রয়েছে। আমাদের কৃষিকে শিল্প-বাণিজ্যের স্তরে উন্নীত করতে হবে। এ জন্য সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক, বেসরকারি শিল্প-ব্যবসায়িক, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি অর্থনীতিবিদ ও জাতীয় নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমাদের উর্বর মাটি আছে, সেই মাটিতে বিশ্ববাজারের চাহিদাসম্পন্ন ও উন্নত গুণগত মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন করে তা রপ্তানি করার মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক উন্নয়নের সুযোগ আমাদের নিতে হবে।

স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সড়ক সংস্কার

দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে যে সব সমস্যার সমাধান করা যায়, তা দেখিয়ে দিয়েছেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাগাবলা গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খানাখন্দে ভরা একটি সড়ক প্রায় সংস্কার করে ফেলেছেন। আমরা এ জন্য তাঁদের অভিনন্দন জানাই। প্রথম আলোয় বুধবার প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ছয় বছর আগে কাগাবলা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আপার কাগাবলা-পানিউন্দা সড়কটি সংস্কার করা হয়। এরপর আর এ সড়কে কোনো কাজ হয়নি। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সড়ক দিয়ে কোনো রিকশা-গাড়ি চলাচল করতে পারছিল না। শুকনো মৌসুমে হেঁটে চলাচল করা গেলেও বর্ষা মৌসুমে মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ পাঁচ-ছয়টি গ্রামের মানুষ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন এই সড়ক দিয়ে। যানবাহন চলাচল করতে না পারার কারণে অনেক রোগীকে কাঁধে-কোলে করে গ্রামের বাইরে নিয়ে যেতে হয়। বৃষ্টির মৌসুমে অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়া করতে পারে না। এ অবস্থায় চলাচলের দুর্ভোগ থেকে এলাকাবাসীকে মুক্তি দিতে আপার কাগাবলা গ্রামের বেশ কয়েকজন সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত মধ্য জানুয়ারি থেকে শুরু হয় কাজ। তাঁদের সঙ্গে শামিল হলেন এলাকার আরও অনেকেই। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে তাঁরা সড়কটি সংস্কার করে চলেছেন। এলাকাবাসী সড়ক সংস্কারে এগিয়ে এসে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যাদের এ কাজটি করার কথা, সেই ইউনিয়ন পরিষদ কী করেছে? দীর্ঘদিন ধরে একটি সড়ক এ রকম চলাচলের অনুপযোগী হয়ে রয়েছে, মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, অথচ তারা নির্বিকার। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের উচিত ছিল এ সমস্যার সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। গ্রামবাসী জানিয়েছেন, সড়কের দুই পাশের পানি চলাচলের জন্য সড়কে অন্তত পাঁচটি কালভার্ট প্রয়োজন। কিন্তু তা করতে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন; যার জোগান দেওয়া গ্রামবাসীর পক্ষে সম্ভব নয়। ইউনিয়ন পরিষদের উচিত এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা। মূল সমস্যাটি হচ্ছে আমাদের কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির অভাব। একটি সড়ক বছরের পর বছর ধরে চলাচলের অনুপযোগী থাকার জন্য যদি ইউপি চেয়ারম্যানকে জবাবদিহি করতে হতো, তাহলে হয়তো তাঁর পক্ষে জনদুর্ভোগে এতটা নির্বিকার থাকা সম্ভব হতো না। কাগাবলা ইউপির চেয়ারম্যান মো. আজির উদ্দিন অবশ্য কথা দিয়েছেন, তিনি কালভার্ট করে দেবেন। আশা করি তিনি তাঁর কথা রাখবেন এবং ভবিষ্যতে এলাকার সড়ক সংস্কারে উদ্যোগী হবেন।

নোবেল বিজয়ী তিন নারীর সফর

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী তিন নারী ম্যারিয়েড ম্যাগুয়ার, শিরিন এবাদি ও তাওয়াক্কল কারমান রোহিঙ্গা সংকট গভীরতর হওয়ার অনেক আগেই নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির প্রতি রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। শুধু তাঁরা তিনজনই নন, আরও অনেক নোবেল বিজয়ী বিভিন্ন সময় বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে মিয়ানমারের নেত্রীর কাছে সহমর্মিতা আশা করেছিলেন। এখন বাংলাদেশ সফরে সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করে তিন নোবেল বিজয়ী নারীর আবেদন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কতটা বাড়তি গুরুত্ব পায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এই নোবেল বিজয়ী তিন নারী যে মিয়ানমার ইস্যুকে অসম্ভব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, তা পরিষ্কার। বাংলাদেশ থেকে ফিরেই তাঁরা মিয়ানমারে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করবেন। তাঁদের উদ্দেশ্য সু চির সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁর কাছেই কৈফিয়ত চাওয়া। নোবেলজয়ী এই তিন নারীই মনে করেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা গণহত্যার সংজ্ঞায় পড়ে। শরণার্থী শিবিরে তাঁরা যে ১০০ জন নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁরা সবাই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাই তাঁরা অকপটে বলতে পেরেছেন যে মিয়ানমারে যা ঘটেছে, তা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে বিচার হওয়ার যোগ্য। আমরা এ-সংক্রান্ত বিচারের দিকে শুরু থেকেই গুরুত্বারোপ করে আসছি। তবে বিষয়টি মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষেধাজ্ঞাসহ কঠোর মনোভাব কখন কীভাবে কতটা কাজ করে তার ওপর নির্ভরশীল। এ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর তরফে যতটা চাপ এসেছে, তা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রাধান্যনির্ভর সরকারের ঘুম ভাঙানোর জন্য যথেষ্ট বলে প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো দুর্ভাগ্যজনকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা থেকে বিরত রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার শরণার্থী প্রত্যাবাসন চুক্তি করলেও বাস্তবে পদ্ধতিগতভাবে রোহিঙ্গাবিরোধী রাষ্ট্রীয় নীতি এবং কালাকানুনে কোনো মৌলিক পরিবর্তন লক্ষণীয় নয়। নোবেল বিজয়ী তিন নারী বলেছেন, চিঠির পর চিঠি লিখেও তাঁরা সু চির কোনো জবাব পাননি।
তবু তাঁরা হাল ছাড়বেন না। অং সান সু চির মানবাধিকার রক্ষায় একসময় বিশ্ব সম্প্রদায় সোচ্চার ছিল, তারই সতীর্থ তিন নোবেলজয়ী নারী যখন তাঁর সাক্ষাৎ চাইবেন তখন এর ফলাফল কী হবে তা দেখার জন্য বিশ্ববাসী অপেক্ষা করবে। বন্দী সু চিকে দেখতে এই তিন নোবেলজয়ীর দুজন ভিসা চেয়েও ভিসা পাননি। এবার রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষায় তাঁদেরই ভিসার আবেদন নাকচ হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত সুচিকেই দিতে হবে। কারণ, তিনি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নোবেল বিজয়ী তিন নারীর বাংলাদেশে ছুটে আসার ঘটনাকে আমরা ‘মানবতার প্রতি একটি মাইলফলক সাড়া’ হিসেবে গণ্য করি। নারীপক্ষের আলোচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে মানবাধিকার রক্ষায় তাঁরা বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণকে স্যালুট জানান। বাংলাদেশে আসার জন্য আমরাও তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমরা আশা করব, নোবেল বিজয়ী এই তিন নারীর বাংলাদেশ সফর রোহিঙ্গাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে গণহত্যাকারীদের কাঠগড়ায় তুলতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস হওয়া দরকার বলে ইরানের শিরিন এবাদি যথার্থই মন্তব্য করেছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সুদানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ তাই করেছিল। মিয়ানমার রোম সংবিধিতে সই করেনি বলে সেখানে তাদের কারও বিচার হবে না, সেটা আসলে কোনো যুক্তির কথা নয়। মিয়ানমারের গণহত্যার বিচারে ব্যর্থ হওয়ার পরিণাম বিশ্বকে আরও চরম মূল্যে শোধ দিতে হতে পারে।

দলীয় প্রধানও ঠিক করে দেবেন আদালত? by মাহফুজার রহমান

তিন-তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তিনি। নিজের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের একটি পরিচালনা করেছেন দীর্ঘদিন। তবে শেষবার আদালতের রায়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর তাঁকে দলীয় প্রধানের পদও ছাড়তে হয়েছে। তিনি পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) সদ্য সাবেক প্রধান নওয়াজ শরিফ। দলীয় প্রধানের পদ ছাড়ার পর দলীয় সিদ্ধান্তেই তিনি ‘দলটির আজীবন নেতা’ মনোনীত হয়েছেন। আদালতের যে রায়ে নওয়াজকে দলীয় প্রধানের পদ ছাড়তে হয়, তাতে বলা হয়, সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অযোগ্য কোনো ব্যক্তি পার্লামেন্ট সদস্য হতে পারেন না, প্রয়োজনীয় দলিলপত্রে সই ও জাতীয় পরিষদে বা সিনেটে কাউকে মনোনয়ন দিতে পারেন না। এই দুই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি অযোগ্য ঘোষিত হলে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলেরও প্রধান থাকতে পারবেন না। কারণ, পার্লামেন্টে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকলে সেই দলের প্রধানের নানা সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টের কাজে ভূমিকা রাখে। গত বছর পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নওয়াজ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে সম্পদের উৎস জানাতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালতের রায়ে প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষিত হন নওয়াজ। এরপর গত জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপরও পাকিস্তানের ‘নির্বাচনী আইন ২০১৭’ অনুযায়ী নিজের দলের প্রধানের পদে থাকার সুযোগ ছিল নওয়াজের। কিন্তু এই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা নিয়ে আদালতে রিট করে দেশটি কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায়ে নিজ দলের প্রধান হিসেবে থাকারও যোগ্যতা হারান নওয়াজ। আদালতের রায়ের পর একটি পক্ষ উল্লাস করেছে। নওয়াজের দলসহ অনেকেই এই রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সেই প্রশ্ন হলো, একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান কে হবেন, তা কি আদালতের রায়ে নির্ধারিত হবে? নওয়াজ অভিযোগ তুলেছেন, তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে আদালতকে দিয়ে এসব করানো হচ্ছে।
যদিও কারা এগুলো করছে, তা উল্লেখ করেননি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। আর নওয়াজকে ‘দলটির আজীবন নেতা’ মনোনীত করার পর দলটির নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসি বলেন, ‘“এটা জনগণের” সিদ্ধান্ত। এটা আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত—আদালতের কোনো অধিকার নেই এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার।’ নওয়াজ দলীয় প্রধানের পদেও থাকার অযোগ্য—আদালতের এই রায়ের পর পাকিস্তানের ডন পত্রিকা সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। তার যার শিরোনাম—‘দুঃখজনক রায়’। যেখানে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে। বিচার বিভাগ ছাড়া আইনের শাসন অসম্ভব। কিন্তু আদালতকে আইনের শাসন ও সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে হবে। কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা উচিত হবে না। আদালতের এই অস্বাভাবিক রায়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকারে ধাক্কা দিয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। পাকিস্তানের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিককে সংগঠন করার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার সঙ্গে সংগঠন করার স্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই। পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়টিও সংবিধানে রয়েছে। এখন এই প্রশ্ন তোলাই যায়, পাকিস্তানের একজন নাগরিক হিসেবে নওয়াজ কি মৌলিক অধিকার পেলেন? তিনি কি সংগঠন করার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন না? কোনো দল বা সংগঠনের প্রধান নির্বাচন করবেন সেই দল বা সংগঠনটির সদস্যরা। এটা তো আদালত ঠিক করে দিতে পারেন না। নওয়াজ শরিফ দুর্নীতি দায়ে অভিযুক্ত হলে তাঁর সাজা হবে। সেই সাজায় তাঁর কারাদণ্ড বা জরিমানা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হবে। এটাই তো হওয়ার কথা।পাকিস্তানে গণতন্ত্র কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু তাদের সংবিধান অনুযায়ী গণতান্ত্রিকভাবেই নির্বাচিত সরকারের দেশ শাসন করার কথা। যদিও দেশটির প্রায় ৭০ বছরের বেশির ভাগ সময় কেটেছে সামরিক উর্দি পরা এক নায়কদের হাতে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো প্রধানমন্ত্রীই নিজের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ প্রথমবার ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার পরেরবার ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। এবার ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। প্রথমবার ও শেষবার তিনি ক্ষমতা হারান দুর্নীতির অভিযোগে। দ্বিতীয়বার ১৯৯৯ সালে রক্তপাতহীন সেনা–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন নওয়াজ।
মাহফুজার রহমান: সাংবাদিক
manik.mahfuz@gmail.com