Friday, March 28, 2014

দেশটার মালিক কারা? by ফারুক ওয়াসিফ

জীবনে যাদের কিছুই হয়নি, তাদেরও বলার মতো অনেক কথা থাকে। যার কিছু নেই, তার কেবলই আছে অভিজ্ঞতা, স্মৃতির বুদ্বুদ তাদের মনে ওঠে আর ফেটে পড়ে। আমাদের স্বাধীনতার গৌরবমাখা ইতিহাস আছে, অমর আত্মদানের শোক আছে, কিন্তু স্বাধীনতার সোনালি হাসি দেখি না তো ১৬ কোটি মানুষের মুখে। স্বাধীনতা তাহলে কি আসেনি? জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত আর একটি রাষ্ট্র আমাদের আছে। আমরা দেশের মানুষ থুয়ে গিনেস বুকে রেকর্ড গড়ি। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের সত্যিকার রেকর্ড তো গড়া হয় মানুষের মনে। সেখানে কোন রেকর্ড গঠিত হচ্ছে, কোন হতাশার রেকর্ড বাজছে, সে খবর রাখে কে?

ইউক্রেন: ঠান্ডা লড়াই, গরম লড়াই by হাসান ফেরদৌস

প্রায় ৪০ বছর আগের ঘটনা, কিন্তু দিন-তারিখ স্পষ্ট মনে আছে। ৬ মে। আমি তখন কিয়েভে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তার নাম ছিল ইউক্রেনের জাতীয় কবি তারাস শেভচেনকোর নামানুসারে। রুশ জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন শেভচেনকো। তাই তাঁকে কারাবন্দী করা হয়, নিষিদ্ধ করা হয় তাঁর গ্রন্থ। শেভচেনকো মারা যান ১৮৬১ সালের ১০ মার্চ। জারের নির্দেশ ছিল, মৃত্যুর পরেও তাঁর মরদেহ ইউক্রেনে নেওয়া চলবে না। অনেক দেনদরবারের পর শেভচেনকোর মরদেহ ইউক্রেনে নেওয়া হয় ৬ মে। তাই দিনটি জাতীয়তাবাদী ইউক্রেনিদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

নানা উৎপাতে বিপন্ন শিক্ষাঙ্গন by আলী ইমাম মজুমদার

২৩ মার্চ প্রথম আলো পাশাপাশি পৃষ্ঠায় দুটি সচিত্র প্রতিবেদন ছেপেছে। একটি একজন প্রতিমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানাতে একই উপজেলার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে চৈত্রের খরতাপে শিক্ষার্থীদের রাস্তার দুই পাশে দাঁড় করিয়া রাখা। অপরটি একজন সাংসদ তাঁর নির্বাচনী এলাকায় একটি অঞ্চলে গেলে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের রোদে একইভাবে দাঁড়িয়ে রাখার দৃশ্য। এ বিষয়ে বহু খবর হয়েছে। পাঠকেরাও হয়তো ক্লান্ত হয়ে গেছেন এসব পড়ে পড়ে। তাও সংবাদপত্র নাছোড়বান্দার মতো পিছু লেগে রয়েছে। প্রত্যাশা, একসময় টনক নড়বে। অবসান ঘটবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত উৎপাতের।

মানবিক ব্যাংকিং সোনার পাথরবাটি? by ফারুক মঈনউদ্দীন

অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবা কিংবা ইনক্লুসিভ ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের পাশাপাশি মানবিক ব্যাংকিং সেবার একটা ধারণা সম্প্রতি আলোচনায় চলে আসছে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে মানবিক কথাটা হয়তো খাপছাড়া শোনাতে পারে, এ যেন সোনার পাথরবাটি। সে জন্যই বোধ হয় আমেরিকান ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন কৌতুক করে মন্তব্য করেছিলেন, ব্যাংকার হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আকাশে সূর্য থাকলে ছাতাটি ধার দেন, কিন্তু বৃষ্টি শুরু হওয়ামাত্র সেই ছাতা ফেরত চান।

দ্বিতীয় বয়ানের আগে by মুহম্মদ সবুর

সেই কবে দেখেছি তাকে, বয়ঃসন্ধিকালে। কনিষ্ঠ এই আমি পেয়েছি ঠাঁই তার কাছে অনায়াসে দূরত্ব-দূর ব্যবধান সত্ত্বেও। গণঅভ্যুত্থানের সেই ঊনসত্তর সালে চট্টগ্রাম থেকে এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়া শহীদুল হককে পেয়েছিলাম পরবর্তী বছর সত্তর সালে। যখন আমি প্রথম বর্ষে, তখন তিনি দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র। কী সপ্রতিভ, মিষ্টিহাসি আর লাবণ্যমাখা শহীদুলের মধ্যে তখন থেকেই গুরু-গম্ভীরভাব মাঝে মাঝেই ফুটে উঠত। ‘আমরা হেঁটেছি যারা পৌষের সন্ধ্যায়’ তাদের একজন ছিলেন আমাদের শহীদুল হক কিংবা শহীদুল জহির। হিম হিম সন্ধ্যায় খড়ের গাদার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে সোঁদা গন্ধের আমেজ তাকে কাবু করত কিনা কখনও স্পষ্ট হতো না। বহুদিন-বহু রাত একই ছাদের নিচে কিংবা খোলা আকাশের নিচে মুখোমুখি বসে নির্বাক কাটিয়ে দিয়েছি যে যার ভাবনার জগতে। এবাড়ি-ওবাড়ি গিয়ে নানা ভোজে অংশ নেয়া দু’জনের মাঝে কথা হতো যেন কার্টুনের ভাষায়। সংক্ষিপ্ত শব্দ, বাক্য ব্যবহারের অনুশীলন চলত। সেই সত্তর সাল থেকে নানা সময়ে নানা আয়োজনে দেখেছি তাকে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের স্কুল জীবন শহীদুলের কেমন কেটেছিল জানি না। কাছাকাছি স্কুলের ছাত্র হিসেবে জানা ছিল সে সময়কাল, অস্থিরতার দিন-রাত। দেশজুড়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল তখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশে। সেই সময় পেরিয়ে স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে ঢাকা কলেজ পড়ার সময়টি ছিল উত্তাল আন্দোলনের দিন-রাত। সত্তর সালের আগস্টেই সম্ভবত শহীদুলের সঙ্গে পরিচয়পর্ব ঢাকা কলেজ ক্যান্টিনে। সহপাঠী কালাম চৌধুরীর সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলাম। একই টেবিলের একপাশে বসে সিঙ্গারা চিবুচ্ছিল শহীদুল। কথার ঢেউ তার কর্ণকুহরে অবলীলায় ঢুকে পড়ে এবং তাগাদা দেয় তাকেই পরিচয় হতে। শহীদুলই প্রশ্ন তোলেন,- ‘অ’নেরা কি পইট্টাত্তন আইস্সনদে’?
এরপর কিছু বাক্যালাপ, স্কুল জীবন কোথায় কেটেছে ইত্যাদি। এসএসসিতে প্রথম বিভাগ পেয়ে কলেজে ভর্তি হন তিনি। মাঝেমাঝে ক্যান্টিনে দেখা হতো, ‘কেন্ আছন দে’ কিংবা উত্তর হতো ‘গম ন’লা’র’। পুরনো ঢাকায় তখন শহীদুল থাকতেন। একবার আমাদের বাসায় এসেছিলেন, সম্ভবত সত্তরের অক্টোবরে। ভাগ্নের জন্মদিনে সতীর্থের মধ্যে তাকেও বলেছিলাম। যথারীতি এসেছিলেন; ফ্রাঙ্কলিন পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ‘বিশ্বের সেরা রূপকথা’ বই হাতে। যাওয়ার সময় আমার সংগ্রহ থেকে নিয়েছিলেন দস্তয়ভয়স্কির ইডিয়ট উপন্যাসের ইংরেজি সংস্করণ আর নরেন্দ্রনাথ মিত্রর উপন্যাস কাঠগোলাপের গন্ধ। ততোদিনে অসহযোগ আন্দালন শুরু। কলেজ বন্ধ। তারপর মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আগরতলায় চলে গেলে শহীদুল হক বিস্মৃত হতে থাকেন আরও অনেক কিছুর মতো।
স্বাধীন দেশে কলেজে ফিরে এসে শহীদুল হককে আর পাইনি। তিনি ততোদিনে কলেজ ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে গেছেন। ৭৩ সালে আবার দেখা, আমিও তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিউমার্কেটে মনিকো রেস্তোরাঁয় হঠাৎ দেখি শহীদুলকে। সম্পর্কটা আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসা সম্ভব হয়নি উভয়ের স্বভাবগত কারণেই। ‘বদ্দা ক্যান আছন’ জানতেই ‘গম আছি’ বলে সহাস্যে করমর্দন করেছিলেন। হাতে কলকাতার মাসিক চতুরঙ্গ ছাড়াও দেখেছিলাম একটি বই। সম্ভবত অমিয় ভূষণ মজুমদারের কোনো উপন্যাস। এখন মনে পড়ছে না। আলাপচারিতায় প্রসঙ্গ ছিল কারা কারা যুদ্ধে গেছেন, সেসবও। তারপর মাঝে মাঝে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন কিংবা মধুর ক্যান্টিনে দেখা হয়েছে। কুশলাদি ছাড়া আলোচনা তেমন আর এগুতো না।
এইচএসসি, বিএ সম্মান এবং এমএতে ভালো রেজাল্ট ছিল। সম্ভবত ’৭৭ সালে ক্যাম্পাস ছেড়েছিলেন শহীদুল, তারপর যোগাযোগহীন। ’৮১ সালে আবার দু’জনে দেখা অগ্রজ সহপাঠী এবার সতীর্থের সারিতে পড়ে গেলেন।
বিসিএস ’৮১ ব্যাচের সতীর্থ শহীদুল ২২০০ নম্বরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডার পেয়েছিলেন। পদোন্নতির ভাগ্যও ছিল সুপ্রসন্ন। অনেক মেধাবী সহকর্মী তার অগ্রযাত্রার সারিতে পৌঁছতে না পেরে রয়ে গেছে পশ্চাতে। হয়তো এ পদোন্নতি তাকেও করত বিব্রত। পদোন্নতি না পাওয়া ব্যাচমেটদের প্রতি তার মনোভাবটা ছিল সহানুভূতিশীল।
’৮১ সালে ৬ মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে দেখা তার সঙ্গে। শাহবাগের কোটায় আবাসিক প্রশিক্ষণকালে একসঙ্গে ক্লাস করেছি কত সকাল, বিকাল, দুপুর, সন্ধ্যায় একসঙ্গে হেঁটেছি, রাত জেগেছি। কোর্সের বিষয়, প্রশিক্ষকদের জ্ঞানদান পদ্ধতি, চাকরি জীবনের পোস্টিং ইত্যাকার বিষয়াদি আলোচনায় এলেও সাহিত্য সচরাচর আসেনি। প্রশাসন ক্যাডারের শহীদুল আর ট্রেড ক্যাডারের এ আমি স্বল্পবাক হওয়ার কারণে আড্ডাবাজ হওয়ার সুযোগ কম ছিল। শাহবাগের আকাশের নক্ষত্র চিনিয়েছিল শহীদুল অনেক রাত জেগেও। গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে তার আগ্রহ অপরিসীম, মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রসঙ্গ মাঝে মাঝে তিনিই তুলতেন। বিশ্বজুড়ে তখন সমাজতান্ত্রিক জাগরণ তুঙ্গে। শহীদুল যে বামঁেঘষা তা স্পষ্টতই বুঝতে পারতাম। তবে সেটা যে সক্রিয় কোন সাংগঠনিক আবরণের নয়, তা-ও বোঝা যেত। নির্লোভ-নির্মোহ এ ব্যক্তি সমাজকে দিতে চেয়েছিলেন অনেক।
‘৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি শহীদুল সহকারী সচিব হিসেবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও সড়ক পরিবহন বিভাগে যোগ দেন। ’৮৪ সালের ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। এ সময়ে আর দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি, ’৮৪ সালের মার্চে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন সহকারী সচিব পদে। ছিলেন ’৮৭ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ’৮৭ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ৯১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব। ’৯১ সালের ১ আগস্ট থেকে ৯২ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত ওএসডি থাকার পর পল্লী উন্নয়ন সমবায় বিভাগে (১৮/৭/৯২-২৯/৯/৯৪), সিনিয়র সহকারী সচিব, ৩০/১২/৯৫ পর্যন্ত সাভার বিপিএটিসিতে অপারেটিভ বিভাগের ডেপুটি ডাইরেক্টর ছিলেন। এরপর যোগ দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে (২৫/৩/৯৯-১৪/৪/৯৯)। ’৯৯ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ওএসডি থাকার পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব পদে যোগ দেন (১৫/৪/৯৯-৭/১১/০১)। ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর যোগ দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক পদে। ছিলেন ২০০৩ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত। যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে ২০০৩ সালের ৩০ আগস্ট অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগ দেন, ছিলেন ২০০৫ সালের ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত। মাস খানেক ওএসডি থাকার পর অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে ২০০৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর যোগ দেন টিসিবির চেয়ারম্যান পদে। ৬ মাস এই পদে থাকার পর ২০০৬ সালের ৩ মার্চ বীমা অধিদফতরের প্রধান বীমা নিয়ন্ত্রক পদে যোগ দেন। প্রায় ৪০ দিন এ পদে ছিলেন। এরকম একটি পদ যে আছে, তা আর জানা ছিল না। এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে তিনি ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর যোগ দেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পদে। ছিলেন ২০০৮ মাসের ৮ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত। ২০০৮ মাসের ১০ ফেব্র“য়ারি ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে যোগ দেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। প্রতিটি কর্মস্থলে ছিল এক ধরনের সফলতা।
১৯৫৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্ম নেয়া শহীদুল হক ১৯৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি চাকরিতে যোগ দেন। বাবা নুরুল হক এবং মা জাহানারা বেগমের জ্যেষ্ঠ সন্তানটি ৯১ ও ২০০১ সাল আমেরিকা ও ব্রিটেনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পরিকল্পনা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে। ফরাসি ভাষা শিখেছেন ৯০ সালে। ফরাসি সাহিত্য পাঠের জন্য সম্ভবত। সে সময় নিয়মিত অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে যেতেন এবং ফরাসি চলচ্চিত্র ও দেখতেন। এ তথ্য নিজেই জানিয়েছিলেন।
’৯০ সালে শহীদুলের সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা গোড়ানে শ্বশুরালয়ে। ওই দিন জানা গেল, তিনি আমার স্ত্রীর বড় বোনের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী শুধু নন, শ্বশুরের এলাকায় বাড়ি। সেই সুবাদে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে পূর্ব পরিচয় তাদের। ঢাকা কলেজের শহীদুল সেই থেকে আমার কাছে হয়ে গেলেন শ্বশুরবাড়ির লোক। মাঝে মাঝে আমাকে ঠাট্টা করে ‘জামাই বাবাজী’ সম্বোধনও করেছেন। পারিবারিক অনেক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত হতো। শ্বশুরবাড়িতেই শহীদুল জহিরের লেখা ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ গ্রন্থটি প্রথম দেখেছিলাম। কিন্তু সেটি যে তারই লেখা, জেনেছিলাম অনেক পরে। যখন তিনি তার ‘পারাপার’ গ্রন্থটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। শহীদুলের বাসায় আমাদের কখনও যাওয়া হয়নি, তিনিই এসেছেন বিভিন্ন আমন্ত্রণে। এসে চুপচাপ থাকতেন। তবে সবার কুশলাদি জানতে চাইতেন। বেশিরভাগ সময় বইপত্র নাড়াচাড়া করেই কাটাতেন।
কর্মজীবনে ৬ বছর কানাডায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মরত থাকা অবস্থায় কয়েকবার ফোনে তার সঙ্গে কথা হয়েছিল; হয়তো সে সময়টায় তিনি আমার শ্বশুরবাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলেই। আমার শ্বশুর আলহাজ এফাজুদ্দিন মল্লিক লেখালেখি করতেন। ৪ খানা বই নানা বিষয়ে প্রকাশিত হয় তার। ব্যাংকার জীবনের অবসরে সমাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে রীতিমতো পোস্টারিংও করেছেন এলাকায়। শ্বশুরের সঙ্গে শহীদুল জহিরের সখ্য ছিল বলা যায়। শহীদুল হক তার লেখালেখি নিয়ে আলাপ করতে চাইতেন না। বরং অনেক সময় নতুন কিছু লিখছেন কিনা জানতে চাইলে মৃদু হেসে বলতেন, এই আর কি। আমার সঙ্গে চাটগাঁর ভাষায় কথা বলাটা ছিল তার সহজাত।
হয়তো শহীদুল হক কিংবা শহীদুল জহির নেই। হয়তো আছেন, হয়তো ঘুমিয়ে আছেন, হয়তো আছেন সতীর্থ, সহকর্মী, সহমর্মী, সহযোদ্ধাদের মনে এবং দীর্ঘদিন জুড়ে থাকবেন পাঠকের মনে অন্য আলোড়নে। সতীর্থের পুরাণ কাহিনী শেষ হওয়ার নয়। মানুষের হৃদয়ে মননে, চিন্তায় নবজাগরণে আরও বেশি আলোড়িত হবেন শহীদুল জহির। ছিলেন যিনি আমাদের সতীর্থ। শহীদুলের লেখায় চট্টগ্রাম এসেছিল নানাভাবে। ডলু-শঙ্খ-কর্ণফুলী নদী তাকে আলোড়িত করেছে। তার লেখায় এর প্রতিফলন ঘটেছে। সতীর্থ শহিদুল তার কর্মে, শ্রমে, মেধায়-মননে চিরজাগরুক থাকবেন। তার বিষয়ে অদূর ভবিষ্যতে আরও গবেষণা হবে। বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে তার অবস্থান অটুট থাকবে।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা by ফজলুল হক সৈকত

সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ শিক্ষক ছিলেন। ছিলেনশিক্ষা-সংগঠকও। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে যেমন শিক্ষার প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করেছেন, তেমনই সেই বিদ্যাপীঠে লেকচার প্রদান করে হয়েছেন অনুকরণীয় বিদ্যোৎসাহী। শিক্ষা-বিষয়ক নিবন্ধ রচনা করেও তিনি সমকালে ও উত্তরকালে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। স্বদেশ-সমাজ নিয়ে ভাবনার নানাবিধ প্রবণতায় রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা আমাদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে বহুকাল। ‘শিক্ষা’ নামক গ্রন্থে তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের, বিশেষ করে, বাঙালির অনুসৃত শিক্ষা-কাঠামো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, শিক্ষা-পরিস্থিতি এবং শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মতামত প্রকাশ করেছেন। ‘শিক্ষার হেরফের’, ‘শিক্ষা-সংস্কার’, ‘শিক্ষাসমস্যা’, ‘জাতীয় বিদ্যালয়’, ‘আবরণ’-এই ৫টি অভিভাষণ ও নিবন্ধে স্থান পেয়েছে সমকালীন শিক্ষার দুরবস্থার বাস্তব ছবি। অবশ্য লেখক কেবল সংকটের কথা উপস্থাপন করেই থেমে থাকেননি, সমস্যা থেকে উত্তরণের বিচিত্র পথেরও সন্ধান দিয়েছেন। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, রবিঠাকুর আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং কাক্সিক্ষত উন্নয়নের জন্য পথ বাতলিয়েছেন।
শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ মনে করেন বাঙালি সমাজ শিক্ষাদীক্ষায় বাস্তবে অনেক পিছিয়ে। আর খুব বেশি পরজাতিনির্ভর। অন্তত ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আমাদের অহেতুক ঝোঁককে তিনি কখনও ভালো চোখে দেখেননি। শিক্ষা-ব্যবস্থাপনায় যে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকমিটির ওপর নির্ভরশীল আমাদের সিলেবাস ও কারিকুলাম, সেই কাঠামো ও পদ্ধতির ঘোর বিরোধী ছিলেন শিক্ষা-সংগঠক রবীন্দ্রনাথ। তার মতে, কমিটি দ্বারা ‘পাঠ্যপুস্তক’ নির্বাচন বা মনোনয়ন করা গেলেও ‘শিক্ষাপুস্তক’ নির্ধারণ করা আদৌ সম্ভব নয়। বিশেষত শিক্ষা-পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের দিকে তিনি সতর্কভাবে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। কেবল পরীক্ষা পাসের পড়াশোনায় কোনো ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তাশক্তির যে বিকাশ হয় না, তা হয়তো চিন্তাবিদ রবীন্দ্রনাথের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আর তাই তিনি পাঠ্যবইয়ের বাইরেও অনেক বই পড়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যে শিক্ষায় কোনো আনন্দ নেই, সেই শিক্ষা কাউকে সাফল্য এনে দিতে পারে না- এ কথা রবীন্দ্রনাথের কল্পনাকে প্রভাবিত করেছিল। তাই তিনি শিক্ষাকে ‘গ্রহণশক্তি-ধারণাশক্তি-চিন্তাশক্তি’র সমাবেশস্থল ভেবেছেন।
লেখাপড়ার মাধ্যম যে মাতৃভাষাই হওয়া উচিত- এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছেন। শিক্ষার্থীর কল্পনাশক্তি, স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তাশক্তি প্রকাশ কিংবা বিকাশের জন্য মাতৃভাষার কোনো বিকল্প তিনি দেখতে পাননি। কাজেই বাঙালির ইংরেজিপ্রীতি ছেড়ে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও আসক্তি স্থাপনে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তার শিক্ষা-বিষয়ক চিন্তা পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। টেনেটুনে পরীক্ষায় পাস করা অথবা ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠ পাড়ি দিয়ে প্রকৃতপক্ষে যে কোনো জ্ঞান অর্জনই সম্ভব নয়, তা তিনি জানতেন। কাজেই শিক্ষাগ্রহণের সঙ্গে অন্তর-বাহির, নানান বর্ণ ও গন্ধ, পৃথিবীর বিচিত্র গতি ও গীতি এবং প্রীতি ও প্রফুল্লতার নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের দিকে তিনি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। শিক্ষালাভের পথে শৃংখলা-সৌন্দর্য ও সুষমার সত্যিকারের সংযোগ স্থাপন করতে চেয়েছেন শিক্ষা-উদ্যোক্তা রবীন্দ্রনাথ। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা হবে মানুষের জীবনের আশ্রয়স্থল। আর ওই আশ্রয়স্থলটিকে সবার জন্য উপযোগী করার প্রয়াসে, ‘মানব-জনম’ আবাদের অবিরাম কর্ষণ-পীড়ন ও রসবোধ সৃষ্টির প্রয়োজনে তিনি শিক্ষার সময় ও পরিবেশ-প্রতিবেশকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তার মতে, সময় ফুরিয়ে গেলে অনেক বৃষ্টি ঝরলেও তাতে বৃক্ষরাজির কোনো উপকার হয় না। সে কারণেই শিক্ষা-সংগঠক রবি শিশুর শিক্ষা ও মনোবিকাশের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আর নবীন বয়সে শিক্ষাগ্রহণের প্রতি সবার আগ্রহকে আকর্ষণ করতে চেয়েছেন তিনি।
ভিনদেশী শিক্ষাদর্শন-বিজ্ঞানভাবনা-ন্যায়চিন্তা এবং সংস্কারমুক্তি যে প্রতিটি নাগরিকের জন্য কত প্রয়োজন, তা চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছেন- ধন নয় জ্ঞান উপার্জন করতে হবে। প্রথাগত চিন্তা কিংবা পুরুষানুক্রমে লালিত সংস্কার থেকে মুক্তিলাভের প্রত্যাশাও প্রকাশ করেছেন কবি। ভাবের সঙ্গে ভাষার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শিক্ষা-অর্জনের পথে হাঁটতে বলেছেন। মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা ঝেড়ে ফেলার পরামর্শও প্রদান করেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘আমাদের এই শিক্ষার সহিত জীবনের সামঞ্জস্যসাধনই এখানকার দিনের সর্বপ্রধান মনোযোগের বিষয় হইয়া দাঁড়াইছে।’ বিধাতাকে অনুরোধ জানিয়েছেন এই বলে- ‘আমাদের ক্ষুধার সহিত অন্ন, শীতের সহিত বস্ত্র, ভাবের সহিত ভাষা, শিক্ষার সহিত জীবন কেবল একত্র করিয়া দাও।’ রবীন্দ্রনাথ আশা করেছিলেন শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচলিত হেরফের বা অব্যবস্থাপনা দূর হয়ে ‘পানি’ ও ‘পিপাসা’র মধ্যে তৈরি হবে মেলবন্ধন।
বিশেষ করে ইউরোপের শিক্ষা-সমস্যা ও শিক্ষা-আন্দোলনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের শিক্ষা-সংক্রান্ত সুবিধা-অসুবিধার একটা তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছেন। আর দেশীয় বাস্তবতায় তার সমাধানের দিকও বাতলে দিয়েছেন। আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কারের মধ্যে থেকেই যে শিক্ষা-সম্পর্কিত সমস্যার নিরসন সম্ভব, তা তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন। শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষার পারিভাষিক শব্দ প্রয়োগ, প্রকৃতির সঙ্গে বিদ্যালয়ের সম্পর্কস্থাপন, মাতৃভাষার ওপর নির্ভরতা, দরকারি বাজেট বরাদ্দ প্রভৃতির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। কমিটিনির্ভর কিংবা কারখানা-জাতের বিদ্যালয় নির্মাণের চেয়ে তিনি প্রকৃতির ছায়াঘেরা পরিবেশে মনের বিকাশের উপযোগী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন। নকল ও উদাহরণকে লেখাপড়ার আশ্রয় না ভেবে তিনি শিক্ষাকে স্বাধীন মতপ্রকাশের লীলাভূমি করতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জানতেন, রাজনীতির প্রভাব ও শাসনবিভাগের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শিক্ষা-প্রদান ও বিস্তারে প্রধান সমস্যা। আর তাই, শিক্ষাকে সর্বতভাবে অন্যের দাসত্ব করার প্রবৃত্তি থেকে দূরে রাখতে বলেছেন। ‘চাকরির অধিকার নহে, মনুষ্যত্বের অধিকারের যোগ্য হইবার প্রতি’ শিক্ষার লক্ষ্যকে প্রসারিত করতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাসনা ও সৃজনশীলতাকে ক্রিয়াশীল রেখে চারু ও কারুবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার প্রতি অভিনিবেশ স্থাপন করেছেন শিক্ষা-সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ। একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা-কাঠামো তৈরি করার আগে যে দেশের সর্বসাধারণের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তার বাস্তবতাকে ধারণ করতেন তিনি। তার মতে, ‘কী কী বই পড়ানো হইবে’, তার চেয়ে ঢের বেশি দরকার ‘কোন ভাবে এই শিক্ষাকার্য চলিবে’। ‘অর্ডার অনুযায়ী সাপ্লাই দেওয়া হয়’ জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানিয়ে শিক্ষার্থীদের তেমন কিছুই শেখানো যায় না। আর প্রকৃত অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে মানুষ তার প্রতিবেশ এবং পরিবার ও সমাজ থেকে শিক্ষা লাভ করে অনেক বেশি। কাজেই শিক্ষা-কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাকে আমাদের পরিচিত সমাজ-কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা না গেলে শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। আবার অর্জিত শিক্ষাকে যদি প্রায়োগিক জীবনে কাজে লাগানো না যায়, তাতেও শিক্ষা মূলত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিক্ষাকে আদর্শ ও রসসমৃদ্ধ হতে হবে। যাকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তার মনে যদি তা ঠিকমতো প্রবেশ না করে, তাহলে কমিটি-সভা-পাঠদান ও অধ্যাপকের সব প্রচেষ্টা অচিরেই বিনষ্ট হবে। শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথের মতে বিদ্যালয় পরিপূর্ণভাবে আবাসিক হওয়া আবশ্যক। এবং প্রকৃতির মনোরম আবহঘেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফসলের জমি, বাগান-খামার প্রভৃতির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি। অবসরে কিংবা পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে কৃষি-উৎপাদনেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সমবেত সম্পৃক্তির দিকে জোর দিয়েছেন। নীতি-উপদেশের প্রাবল্যকে দূরে রেখে, অসত্য ও ভান পরিহার করে শ্রদ্ধার সঙ্গে, মুক্ত আলো-বাতাসের ভেতর দিয়ে শিক্ষাকে আত্মস্থ করতে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘নৈতিক জ্যাঠামি’র চেয়ে তিনি গুরুর আদর্শকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি ভিনদেশী আদর্শে আসবাবনির্ভর শিক্ষা-ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলেও বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই, আজকের বাস্তবতায় প্রযুক্তির ব্যাপক প্রবাহের কালে আমরা তার চিন্তার সঙ্গে সমকালীন প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগে আন্তরিক থাকলে উপকার বৈ ক্ষতি হবে না। শিক্ষার সঙ্গে পণ্য ও দোকানদারির যে সম্পর্ক, তাকে তিনি যথাসম্ভব পরিহার করার পরামর্শ প্রদান করেছেন। আর ‘বিদ্যালাভ’ ও ‘জ্ঞানলাভের’ পার্থক্য বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন। কারণ ‘মনুষ্যত্ব টাকায় কেনা যায় না’। রবীন্দ্রনাথ বিশেষত, পুঁথি-মাস্টার-সিনেট-সিন্ডিকেট নির্ভরতার বাইরে অধ্যাপকদের পাঠমুখিতা ও জ্ঞানচর্চার ওপর শিক্ষার ভিত তৈরির দিকে সচেতনমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তার শিক্ষাভাবনামূলক নিবন্ধে।
জাতীয় পাঠ্যক্রম কিংবা জাতীয় বিদ্যালয়ের উপযোগিতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মতামতও সমকালে এবং উত্তরকালে বেশ প্রাসঙ্গিক। কেবল লাভ-সুবিধা-প্রয়োজনকে বিবেচনায় না রেখে জাতীয় শক্তির তেজ এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ-তিতিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান করে যে বৃহৎ আয়োজন করা সম্ভব এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে যে জাতীয় গৌরব অর্জন করা যেতে পারে, তা নিবন্ধকার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ইংরেজ শাসনামলে তখনকার বাংলাদেশে নিজস্ব ভাব-সম্পদে পরিপূর্ণ শিক্ষাভাবনা যে কী পরিমাণ উপকার আমাদের জন্য বয়ে এনেছে, সেই ইতিবাচকতা তিনি পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। শৈলিথ্যকে প্রশ্রয় দিলে শিক্ষার পথচলা কঠিন হয়ে পড়ে; তখন তা পরিহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশ গুণী লোকের কদর করতে না পারায় ভয়ানক ক্ষতি হয়েছে। তবে জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সারা দেশ থেকে শিক্ষিত-যোগ্য-অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনেও এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এছাড়া দেশের পরিবেশ ও সামর্থ্য উপযোগী ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর প্রদানে আহ্বান জানিয়েছেন। দাতা বা ডোনার এবং গ্রহীতা বা শিক্ষার্থীর চেতনা ও কর্মের মেলবন্ধন তৈরির দিকেও রবীন্দ্রনাথের তীক্ষè দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল। শিক্ষালাভের মধ্য দিয়ে মানুষ আত্মরক্ষার যে প্রচেষ্টা আয়ত্ত করে এবং শেষত যে জাতীয় ও ব্যক্তিক আত্মসম্মান অর্জন করে, তাতেই শিক্ষা-ব্যবস্থাপনার মূল মনোযোগ স্থির থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেছেন। তার মতে, ‘সুশিক্ষার লক্ষণ এই যে তাহা মানুষকে অভিভূত করে না, তাহা মানুষকে মুক্তিদান করে।’ আপন ইতিহাস ও পলিটিক্যাল ইকোনমির ওপর নির্ভর করে যে শিক্ষা-কাঠামো গড়ে ওঠে, তার ভিত অনেক মজবুত হয়। অবশ্য একথাও ঠিক যে জ্ঞানসামগ্রীর কোনো সীমা নেই; দেশান্তর ও যুগান্তর পর্যন্ত এর পরিসীমা প্রসারিত।
মননশক্তির চর্চায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং শিক্ষকের পারফরম্যান্সের গুরুত্বকে বিবেচনায় রেখেছেন প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষকের ভাষাভঙ্গি ও বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ যে পাঠদানের আদর্শ, তা তিনি বিশ্বাস করতেন। আর কেবল বই পাঠ ও অনুকরণ দ্বারা জ্ঞানলাভের দিকে ঝুঁকে না পড়ে বিশ্বপ্রকৃতির দরবারে শিক্ষার জন্য দৃষ্টি ও মন প্রসারিত রাখতে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ।

লন্ডনে প্রেমোপাখ্যান

সেঞ্চুরির দুয়ারে এসে থেমে গেলেন খুশবন্ত সিং। জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫, মৃত্যু ২০ মার্চ ২০১৪। পাঞ্জাবের পাকিস্তান অংশে হাদালিতে তার জন্ম। বাবা স্যার শোভা সিং প্রখ্যাত ভবন নির্মাতা, চাচা সর্দার উজ্জ্বল সিং পাঞ্জাব ও তামিলনাড়ুর গভর্নর। ভারতীয় ইংরেজি লিখেয়েদের মধ্যে খুশবন্ত সিংয়ের জনপ্রিয় আর যে কেউ ছিলেন না তা জোর দিয়েই বলা যায়। তিনি পাঞ্জাবি ভাষায়ও লিখেছেন, তার সুখপাঠ্য কলাম অনেক খবরের কাগজের প্রচারসংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি যখন ইলাসট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া সম্পাদনার দায়িত্ব নিলেন এর প্রচারসংখ্যা ৬০ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছে। বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব খুশবন্ত সিং যে দায়িত্বই নিয়েছেন তাতেই সুফল ফলেছে। ১৯৫০-এ প্রকাশিত হয় তার প্রথম বই ‘বিষ্ণুর চিহ্ন ও অন্যান্য গল্প’, শেষ বই ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘অভেয়বাদী খুশবন্ত সিং, কোনো ঈশ্বর নেই’; তার আত্মজীবনী ‘সত্য, ভালোবাসা ও একটুখানি ঈর্ষা’ প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। ভারত বিভাজনের রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক অধ্যায় নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ দাঙার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর একটি। এ উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়নও সফল হয়েছে বলে মনে করা হয়। খুশবন্ত সিংয়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : এ্যা হিস্ট্রি অব শিখ, দ্যা ট্র্যাজেডি অব পাঞ্জাব, দ্য ভয়েস অব গড অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, ওমেন অ্যান্ড মেন ইন মাই লাইফ, দিল্লি, ব্ল্যাক জ্যাসমিন, দ্য সানসেট ক্লাব। খুশবন্ত সিং দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির রেসিপিও লিখে গেছেন ৯৮ বছর বয়সে- মেজাজ খারাপ করবেন না, মিথ্যাচার করবেন না। অন্যের সমালোচনার গুরুত্ব দেবেন না। শুকনো রুটি ও ঠাণ্ডা পানি খাবেন। নিজের মৃত্যু নিয়েও অসাধারণ রসিকতা করে গেছেন খুশবন্ত সিং। ‘লন্ডনে প্রেমোপাখ্যান’ অনূদিত গল্পটি প্রকাশ করে প্রয়াত এই লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে। বি.স.
‘‘আমি আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। আর পনের মিনিটের মধ্যে আমরা লন্ডন এয়ারপোর্টে অবতরণ করতে যাচ্ছি। দয়া করে সিটবেল্ট বাঁধুন এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। ধন্যবাদ।”
দরজার উপরের প্যানেলে আরও বেশি সতর্কবার্তা। লাল হরফে জ্বলছে : ‘সিটবেল্ট বাঁধুন, ধূমপান নিষেধ।’
কামিনী জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। এখনও মেঘের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে আর নিচে তুলতুলে তুলার বিশাল সাগরের মতো বিছিয়ে আছে মেঘ। আর সিকিঘণ্টার মধ্যে সে ইংল্যান্ডে পৌঁছবে, এটা বিশ্বাসই হতে চাচ্ছে না- যে ইংল্যান্ডের কথা সে বইয়ে পড়েছে বন্ধু ও আত্মীয়দের কাছে শুনেছে, ছবিতে দেখেছে, সেই ইংল্যান্ডে নিজে কখনও আসবে বিশ্বাসই হয়নি। অলৌকিক ঘটনার দিন ফুলিয়ে যায়নি। আর বৃত্তি নিয়ে মাসভর বড্ড পীড়াদায়ক সিদ্ধান্তহীনতা, পাসপোর্ট, ভিসা, বিদেশী মুদ্রা, আয়কর ছাড়পত্র ও হেলথ সার্টিফিকেট সবার ঝামেলা চুকিয়ে সে সত্যিই লন্ডন যাচ্ছে।
এয়ার হোস্টেস বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দিল, ‘আপনার সিটবেল্ট ম্যাডাম।’ কোমর ঘিরে সিটবেল্ট লাগাতে গিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘হ্যাঁ, তাই তো, দুঃখিত।’ ইংল্যান্ডে থাকাটা আনন্দদায়ক হবে কি-না ভাবছিল। যতটুকু পড়েছে, যা শুনেছে এ এক সুন্দর দেশ। তবে মানুষের ব্যাপারে তার সন্দেহ ছিল। তাদের হাতে তার পরিবার অনেক ভুগেছে। অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সময় তার বাবা ও ভাইয়েরা জেলে গিয়েছে, জেলখানায় তাদের পেটানো হয়েছে। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষের ছাত্রী সে তখন নিজেও সাত দিনের ডিটেনশন খেটেছে। কোনো ইংরেজের সঙ্গে দেখা হওয়া বলতে যা বোঝায় ম্যাজিস্ট্রেট রবার্ট স্মিথ ছাড়া আর কারও সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি।
এ এক দুর্বোধ্য ঘটনা।
ঘটনাটি ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সময়কার। কলেজছাত্রীদের দলের সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সেও দেশাত্মবোধক গান গেয়েছে, কোনো বিদেশীকে দেখামাত্রই চেঁচিয়ে ‘ভারত ছাড়’ স্লোগান দিয়েছে। পুলিশ তাদের পাকড়াও করে এবং তাদের দ্রুত বিচারের জন্য সোপর্দ করার প্রস্তুতি নেয়া হয়। সে ছাড়া মেয়েদের আর সবাই দোষ স্বীকার করে এবং তাদের সতর্ক করে ছেড়ে দেয়া হয়। তাকে থানা হাজতে নেয়া হয়। পরদিন তাকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রবার্ট স্মিথ, আইসিএস এর এজলাসে হাজির করানো হয়।
দৃশ্যটি কামিনী বেশ ভালোই স্মরণ করতে পারছে। বর্ষাকাল তখন প্রবল দাপট দেখাচ্ছে। খাম, কাগজ আর কালির ভ্যাপসা গন্ধ আদালতে ছড়িয়ে আছে। ম্যাজিস্ট্রেটের টেবিলে আলোর বৃত্তাকার ছায়া, আর একটি আলো একদিকে হলদে কাগজের ফাইলের স্তূপের পাশে বসা পেশকারের টেবিলে- এ ছাড়া আর সব অন্ধকার। ম্যাজিস্ট্রেট হালকা লাল চুলের এক যুবক। পরনে ছোট-হাতা শার্ট, আর ঢিলে টাইয়ের গিঁটটা বুকের মাঝামাঝি টেনে নামানো। বিশ্ববিদ্যালয়, নৌকাবাইচ আর রাগবি ম্যাচের একটি আভা তখনও তাকে ঘিরে আছে। তিনি তখন একটি বইয়ে ডুবে আছেন। যাদের বিচার হচ্ছে তাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না।
পেশকার কামিনীর নাম, তার বাবার নাম এবং তার অপরাধের ধরন পড়ে শোনায়।
হিন্দুস্তানি ভাষায় পেশকার জিজ্ঞেস করে, ‘দোষী না নির্দোষ?’
‘নির্দোষ।’
তার দিকে না তাকিয়ে টেনে টেনে ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, ‘তার বয়স কত জিজ্ঞেস কর।’
দোভাষীর অনুবাদের অপেক্ষা না করে কামিনী নিজেই বলল, ‘সেভেনটিন-সতর। আর তাকে বলুন, ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে তার নিজ দেশের জন্য কাজ করুন!
ম্যাজিস্ট্রেট চোখ তুলে তাকান। ম্যাজিস্ট্রেটের স্ফাত-ধূসর চোখ কাক-কালো চুলঘেরা মুখমণ্ডল থেকে নেমে চুলের গোছা যেখানে পড়েছে সেই খোলা কাঁধ ও লম্বা গলা বেয়ে তার তারুণ্যভরা দেহ পরিক্রমণ করে আর চোখে এসে মিলিত হয়।
তিনি বিড়বিড় করে বলেন, ‘অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্য মিল।’ তার চোখ থেকে চোখ না সরিয়ে তিনি পেশকারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী যেন তার নাম।’
‘কামিনী... কামিনী গার্ভে।’
‘মিস গার্ভে, তোমার স্কুলে কি কোনো কবিতা পড়ায়?’
‘হ্যাঁ... না’ কামিনী তোতলায়। তারপর আক্রমণাÍক কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘এর সাথে এই মামলার কি সম্পর্ক? ওরা কি আদালতে বসে উপন্যাস পড়ার জন্য আপনাকে বেতন দেয়?’
‘উপন্যাস নয়, ইয়ং লেডি, কবিতা। জেলখানায় পড়ার জন্য বইটা তোমাকে ধার দেব। দণ্ড ৭ দিন, এ ক্লাস। তারপরও যদি রূঢ় আচরণ করতে থাকো তাহলে আদালত অবমাননার দায়ে আরও সাত দিন বেশি খাটতে হবে।’
পরদিন কামিনী চমৎকার বাঁধাই হিলারি বেলকের সংগৃহীত কবিতার একটি খণ্ড হাতে পেল। তাতে লিখা : জেলখানায় সুখকর পাঠ। যে মানুষটি তোমাকে এখানে পাটিয়েছে তার শুভেচ্ছাসহ।
এক চিলতে কাগজে পৃষ্ঠা চিহ্নিত করা, সেখানে একটি কবিতার দুটি পঙ্ক্তি, নিচে লাল কালিতে দাগানো। পাশে কামিনীর নামের দুটি আদ্যক্ষর ‘কে জি’। সেই লাইন দুটি :
তার মুখ যেন রাজার আদেশ
কখন একসাথে সব তরবারি বেরিয়ে আসে।
কামিনী ঠিক করল স্মিথের এ আচরণের কথা সংবাদপত্রগুলোকে জানাবে। সে নিশ্চিত, এতে তার চাকরি যাবে। কিন্তু সাত দিন পেরোবার আগে তার নিজের সম্পর্কে নিশ্চয়তাই কমে গেল। যখন বাড়ি ফিরে এলো, শুনল স্মিথ পদত্যাগ করেছেন। ক’দিন পর তিনি ইংল্যান্ড ফিরে গেলেন।
কবিতার পঙ্ক্তি দুটির মানে যে খুব বুঝতে পেরেছে তা নয়, তবে এতে যে তার চেহারার প্রশংসা করা হয়েছে এটা ঠিক। আর এ প্রথম কেউ একজন এমন প্রশংসা করল। এরপর যতবারই সে আয়নার দিকে তাকিয়েছে, ততবারই শব্দগুলো তার কাছে ফিরে এসেছে : তার মধ্যে এমন একটা অনুভূতি কাজ করেছে যেন স্মিথ তার দিকে তাকিয়ে আছেন, যা তার উদীয়মান দায়িত্ব সম্পর্কে বিব্রতকর সচেতনতার সৃষ্টি করছে। এ ঘটনাটি ইংরেজদের সম্পর্কে তার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটায়নি, তবে তাদের যে লাজুক মনে করা হতো, এ বিশ্বাস তার আর রইল না।
বায়ুস্তরে উড়োজাহাজের লাগাতার ঝাঁকুনিতে কামিনী তার দিবাস্বপ্ন থেকে ছিটকে পড়ল। মেঘের স্তর কেটে বহু লাল ছাদের বাড়ি আর টারমাকের কাটাকাটি করে যাওয়া রাস্তা এবং গুবরে পোকার মতো হামাগুঁড়ি দিয়ে চলা সারি সারি গাড়ির উপর দিয়ে উড়োজাহাজ নেমে আসছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে রানওয়ে স্পর্শ করল এবং চাকার ওপর ভর করে শুল্ক বিভাগের শেডের কাছে গিয়ে থামল।
জাহাজের জানালার পাশে বসে দীর্ঘ সময় ধরে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ড দেখল। শরতের উষ্ণ অপরাহ্নে তার হোটেলের উল্টোদিকের পার্কভর্তি মানুষ লালচে সূর্যালোকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আগে যত সবুজ দেখেছে তার চেয়েও সবুজ পার্কের ঘাস আর বেষ্টনী ধরে বহু বিচিত্র গ্ল্যাডিওলাস ফুল ফুটে আছে। পার্কের প্রবেশপথে এক বুড়ো ভিখারি তার ব্যারেল অর্গানে বহুদিন আগে ভুলে যাওয়া মধুর সুর তুলছে। জায়গাটা শান্তিপূর্ণ ও বান্ধব মনে হল। কামিনী নিজেই বাইরে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে এলো।
কামিনীর খানিকটা আশংকা ছিল শাড়ি পরার কারণে লোকজন তার দিকে তাকিয়ে থাকবে, কিন্তু কেউ সেদিকে কোনো নজরই দিল না। তার চোখে পড়ল ছোট ছেলেমেয়েরা পার্কের পুকুরে নৌকা চালাচ্ছে, মহিলারা হাঁসকে খাওয়াচ্ছে আর ছেলেরা দর্শকদের বৃত্তের মাঝখানে শব্দকরা খেলনা উড়োজাহাজ চালাচ্ছে। তার চোখে পড়ল বেশকিছু জোড় তাদের চারপাশের পৃথিবীকে বেমালুম ভুলে গিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘাসের ওপর জায়গা করে নিয়েছে।
সে নিজেও পার্কে স্বঘোষিত বক্তাদের ঘিরে রাখা জনতার সঙ্গে যোগ দিয়ে তাদের বক্তৃতা আর তাদের উত্ত্যক্ত করা শ্রোতাদের প্রশ্নবান শুনল।
যখন সে হোটেলে ফেরার জন্য পা বাড়ায় নৈঃসঙ্গের অনুুভূতি তাকে পেয়ে বসে। সে বুঝতে পারল তার জীবনে এ প্রথম একটি অপরাহœ কাটল যেদিন কেউ তার সঙ্গে কথা বলেনি। সে ছাড়া আর সবারই কথা বলার মতো কেউ না কেউ আছে। নিজেকেই সে প্রশ্ন করল, এই নির্বান্ধব দেশে সে কেন আসতে গেল?
পরের দিনগুলোতে কামিনী তার প্রশ্নের কোনো জবাব পায়নি। তার জীবন দ্রুত একটি ছকে বৃত্তাবদ্ধ রুটিনে বাঁধা হয়ে গেল- এক বা আধ পেনি ভাড়ায় বাসে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে যাওয়া, জনাকীর্ণ ট্রেনে স্ট্যাপ ধরে আধঘণ্টা ঝুলে থাকা, আবার বাস ধরা, লেকচার শোনা, ক্যাফেটেরিয়াতে মধ্যাহ্নভোজ, আরও লেকচার, আবারও বাস ধরা, স্ট্যাপ ধরে ঝুলে বাড়ি ফেরা- অবশ্য হোটেলকে যদি বাড়ি বলা যায়- যেখানে মামুলি শুভেচ্ছা বিনিময় ছাড়া কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না। সেখানে প্রয়োজনীয় কথোপকথন ফিসফিস করে সেরে নিতে হয়। যেখানে সংবাদপত্রের পাতা উল্টানোর শব্দ চারদিকে ছড়ানো শেষকৃত্যের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দেয়, সেখানে।
ভারত ছেড়ে আসার পর কামিনী মনের ভেতর একটি অস্পষ্ট প্রত্যাশা লালন করেছে যে একদিন রবার্ট স্মিথের সঙ্গে তার দেখা হয়েও যেতে পারে। সে জানে এই প্রত্যাশা হাস্যকর। কারণ সে জানে তিনি আফ্রিকা কিংবা আমেরিকাতেও থাকতে পারেন। এমনকি তিনি যদি ইংল্যান্ডে থেকেও থাকেন লন্ডনের ঘূর্ণায়মান আশি লাখ মানুষের মাঝে অকস্মাৎ ঘটনাচক্রে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা মোটেও উজ্জ্বল নয়। আর যদি তার সঙ্গে দেখাই হয় তিনি কি তাকে চিনতে পারবেন? সে তাকে কি বলবে? কিংবা তিনি তাকে কি বলবেন? সে টেলিফোন বইতে তার নাম খুঁজতে চেষ্টা করে। কিন্তু ডিরেক্টরিতে পাতার পর পাতা স্মিথ নামে ভর্তি দেখে সে নিরাশ হয়ে পড়ে। আর আদ্যক্ষরের বহু নাম। আর যদি সে তাকে ফোনে পেয়েই যায় সে জানে না কোন অজুহাতে তাকে ফোন করবে।
তা সত্ত্বেও চিন্তাটা তার মাথায় রয়েই গেল এবং তা বাতিলে পরিণত হল। সে বিশ্বাস করতে শুরু করল সে যদি ইচ্ছে করে, যে কোনো ভাবে যে কোনো স্থানে তার সঙ্গে দেখা হয়েই যাবে। সে বইয়ে পড়েছে মানুষ যদি একই বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয় তাহলে তাদের পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসাটাই স্বাভাবিক। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে এরপর কি ঘটবে সবটাই তার মনের মধ্যে সাজানো। তিনি হ্যাট তুলে জিজ্ঞেস করবেন, ‘মিস গার্ভে, আমার মনে হয় না আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?’
‘আমি যদি ভুল না করে থাকি আপনি মিস্টার স্মিথ। হ্যাঁ, অবশ্যই, আগে আমাদের নিশ্চয়ই দেখা হয়েছে। তবে সেটাকে দেখা পেয়ে আনন্দিত হওয়া বলা যায় কি-না আমার সন্দেহ আছে। তা কেমন আছেন মিস্টার স্মিথ?’ তারপর এক আলাপ নিয়ে যাবে অন্যটাতে।
তার পলিটেকনিক টার্ম প্রায় শেষ হয়ে আসছে। তার ইচ্ছেশক্তি কিংবা কোনো ঘটনাচক্র কামিনী ও রবার্ট স্মিথকে মুখোমুখি করাতে পারেনি। অন্য যে কোনো দিনের মতোই একদিন সে টিউব স্টেশনে যাওয়ার বাস ধরল। আবার আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বেরিয়ে অন্য প্রান্তে যখন পরের বাস ধরতে এলো, দেখল রাস্তা লোকারণ্য, গাড়ি সরিয়ে দেয়া হয়েছে। দূর থেকে তার কানে এলো ব্যাগপাইপের সুর আর বড় ড্রাম বাজানোর শব্দ। সে নিজের হাতের খবরের কাগজটিতে চোখ ফেলল, দেখল সফররত কোনো রাজাবাদশাহকে এ সময় রানীর এ পথ অতিক্রম করার কথা। সে ঠিক করল ক্লাস বাদ দেবে, তারপর জনতার সঙ্গে যোগ দিল।
দলপতি তার নির্দেশের দণ্ড উঁচু-নিচু করছে, পেছনে বাজিয়ে যাচ্ছে স্কটিশ কামিনীর বাদকদল। তাদের পেছনে ধীর গতিতে রাজকীয় চালে আসছে গার্ভের দল। তাদের উঁচু পশমি টুপি, জ্বলজ্বলে পিতলের বোতাম লাগানো টকটকে লাল কোট, বেয়নেটসহ রাইফেল সবই বর্শার অরণ্যের মতো দ্যুতি ছড়িয়ে তার মধ্যে একটি উত্তেজনার সঞ্চার করছে। গার্ভ সদস্যরা তার সামনে এসে বিরতি দিয়ে রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু পরই এলো অশ্বারোহী সৈন্যদল আর তাদের একডজন কালো ঘোড়ায় টানা রানীর সোনালি কোচ। গার্ডসদস্যরা সোজা হয়ে আনত হল। রানী এবং তার রাজকীয় অতিথি ব্যান্ডের সঙ্গে যোগ দিয়ে উঁচু গলায় সুর মেলানো জনতার দিকে হাত নেড়ে চলে গেলেন।
ব্যান্ড মিছিল চলে যেতেই জনতার শৃঙ্খল ভেঙে পড়ল। অফিসের পথে ছুটে যাওয়া মানুষের ধাক্কার পর কামিনী মোহগ্রস্তের মতো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। দেখল, কেবল তার সামনের মহিলাটিই যেমন ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে। কামিনী তার ফোঁপানোর শব্দ শুনল, যখন ঘুরে দাঁড়াল দেখল হাতের ঠিক উল্টো পিঠ দিয়ে তিনি চোখ মুছছেন। হাতব্যাগের ভেতর থেকে রুমাল বের করার জন্য সবকিছু তছনছ করে ফেলছেন। কামিনী যে তাকে দেখছে এটা নজরে আসার পর তিনি বিব্রতবোধ করলেন। তিনি বললেন, সৈন্যবাহিনী আর শোভাযাত্রার কথা উঠলে আমি যে কী রকম বোকামি শুরু করে দিই। এরা সবসময় আমাকে কাঁদিয়ে ছাড়ে।’
কামিনী বলল, ‘এটা খুব আবেগময় একটা ব্যাপার! আর দেখতে কী চমৎকার! একসঙ্গে এত বেশি সৈন্য খুব সুন্দর দেখায়, তাই না?’
তিনি বললেন, ‘তোমার কথা অদ্ভুত শোনাচ্ছে। আমার বন্ধু সবসময় বলত, একজন সুন্দরী মহিলাকে দেখায় খোলা তরবারি হাতে সহস্র সৈন্যের মতো। আসলে আমার বন্ধু সবসময় এই কথাটা আমাকেই বলত। সে ভারতেও গিয়েছিল, ভারতকে পছন্দও করত। তিনি তার রুমাল খুঁজে পেলেন এবং তা দু’চোখে চেপে ধরলেন। কামিনী অনুভব করল তার পাজোড়া ভারী হয়ে এসেছে।
সে জানে একজন আগন্তুককে এ ধরনের প্রশ্ন করার অধিকার তার নেই, কিন্তু কোনো একটা কিছু জোর করে তাকে দিয়ে প্রশ্ন করানো, ‘আপনার বয়ফ্রেন্ড এখন কোথায়?’
তিনি অশ্র“ভেজা মুখ ফেরালেন।
বললেন, যুদ্ধে নিহত হয়েছে, ডি-ডেতে।
(উ-উধু : দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বিজয়ের দিন।)
‘যবন’ মানে গ্রিস জাতি। অভিধানে যবনের অর্থ নির্ধারিত হয়ে আছে দীর্ঘকাল থেকে। যবন যদি গ্রিস জাতির নাম হয়, তাহলেও তো অন্য কোনো জাতিকে সে নামে ডাকার অবকাশ নেই। যদি ডাকা হয় তাহলে তাতে হীনম্মন্যতারই কেবল পরিচয় বহন করে। রামপ্রসাদ রায় রচিত ‘সঙ্গীত জিজ্ঞাসা’ সঙ্গীত-গ্রন্থখানা পড়ে এ ধরনের একটা বিভ্রান্তিকর তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। গ্রিস জাতিকে মুসলিম জাতিতে পরিণত করে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে যেন তিনি অস্বীকার করতে চেয়েছেন। ‘হিন্দুস্তানি রাগসঙ্গীতে যবন-সংস্কৃতির প্রভাব’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এককালে যবন বলিতে একমাত্র গ্রিকদিগকেই বুঝাইত। সঙ্গীতে যবন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যবন শব্দটি সংকীর্ণ অর্থে প্রধানত মুসলমান সম্প্রদায়কেই বুঝায়।’ এটাকে অনায়াসে সত্যের অপলাপ বলে আখ্যায়িত করা যায়। কেননা, মুসলমানদের আগমন ভারতবর্ষে না ঘটলে রাগসঙ্গীতের আবির্ভাবই ঘটত না। যে জাতি রাগসঙ্গীত সৃষ্টি করে সমগ্র ভারতবর্ষের সঙ্গীতকে আকণ্ঠ সমৃদ্ধ করেছে তাদের সংকীর্ণ অভিধায় অভিহিত করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে, তা কিছুতেই স্বীকার করা যায় না। এ কথা অবশ্য সত্য, ভারতবর্ষের সঙ্গীতে মিসর, গ্রিস, আরব, পারস্য প্রভৃতি দেশের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছে আমীর খসরুর রাগসঙ্গীত সৃষ্টির পর, তার আগে নয়। রামপ্রসাদ রায় সে কথা নিজেই স্বীকার করে লিখেছেন, “... যেসব ব্যক্তির অবদান ভারতীয় সঙ্গীতের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করিয়াছে তাহাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য নাম হইল অসামান্য শ্র“তিধর, সঙ্গীত স্রষ্টা আমীর খসরু। তিন প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় সঙ্গীতের সহিত পারস্য দেশীয় সঙ্গীতের সুসামঞ্জস্য সংমিশ্রণ করে ভারতীয় সঙ্গীত ধারাকে মাধুর্যমণ্ডিত করিবার কাজে পথপ্রদর্শক। বর্তমানের হিন্দুস্তানি সঙ্গীতপদ্ধতি আমীর খসরুর নিকট সীমাহীন ঋণে আবদ্ধ। ভারতীয় ধ্র“পদ গানের সহিত পারস্য দেশের গজল গানের সংমিশ্রণ ঘটাইয়া ‘খেয়াল’ গান প্রবর্তনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাহারই।”
<a href='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/ck.php?n=acd94d5f' target='_blank'><img src='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/avw.php?zoneid=780&n=acd94d5f' border='0' alt='' /></a>
খেয়াল গান ও খেয়াল গানের প্রকৃত রূপকারের কথা বলতে গিয়েই অত কথার অবতারণা। তার আগে খেয়াল গানের কিছু কথা। ফার্সি ভাষায় ‘খেয়াল’ অর্থ ‘কল্পনা’। নানাবিধ তান-বিস্তার ইত্যাদির দ্বারা বিভিন্ন তালে রাগ গানকে বলা হয় খেয়াল। বলা যায় সুরের ‘বিহার’ খেয়াল গানের মূল বৈশিষ্ট্য। খেয়াল গানের বিষয়বস্তু প্রধানত শৃঙ্গার রসাত্মক, তবে সঙ্গীতের শিল্প-সৌন্দর্যের মাধ্যমে এর প্রকাশ। আমীর খসরু খেয়ালের আবিষ্কর্তা। তবে তিনি সৃষ্টি করেন ‘ছোট খেয়াল’ (Slow kheyal)। এ প্রকার খেয়ালের গতি চপল। রচনা খুব সংক্ষিপ্ত। স্থায়ী ও অন্তরাতে এ গান সীমাবদ্ধ। স্থায়ী ও অন্তরা দুটিই দু’চরণে রচিত হয়। পরবর্তীকালে জৌনপুরের সুলতান হুসেন শাহ্ শর্কী আরেক ধরনের খেয়াল প্রচলন করেন, যার নাম ‘বড় খেয়াল’ (ঝষড়ি শযবুধষ)। এ ধরনের খেয়ালের গতি বিলম্বিত। চাল গম্ভীর। মন্থরগতিতে এর বিস্তার। এ গানের রচনাপদ্ধতি ছোট খেয়ালের মতোই। স্থায়ী ও অন্তরার মাধ্যমেই এ খেয়াল পরিবেশিত হয়। অষ্টাদশ শতকে মোগল-সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র আমলে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ নিয়ামত খাঁ এ খেয়াল গান নবরূপে সমৃদ্ধ করেন। ফলে খেয়ালের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। তিনি খেয়ালে বিভিন্ন ধরনের বিস্তার, বোলতান ইত্যাদি সংযোজন করে নতুনরূপে খেয়ালের গান করতেন।খেয়াল গানকে প্রচলিত করার নেপথ্য কাহিনী হিসেবে প্রচলিত আছে যে, নিয়ামত খাঁ ছিলেন মূলত বীণাবাদক। তিনি মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহর দরবারে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মোগল দরবারের প্রথামাফিক গায়কদের সঙ্গে অনুসঙ্গ যন্ত্রী হিসেবে বীণা বাজাতেন। শিল্পী হিসেবে এ কাজটা তার মনঃপূত ছিল না। তিনি এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে সঙ্গীতের গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং রাজদরবার থেকে ছুটি নিয়ে ‘খেয়াল’ গানের সাধনায় একনিষ্ঠভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি দুটি কাওয়াল বালককে তার গবেষণালব্ধ খেয়াল গানে পারদর্শী করে তোলেন। বালকদ্বয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খেয়াল পরিবেশন করে বিশেষ সুনাম অর্জন করে।তাদের সুখ্যাতির কথা অচিরেই মোগল দরবারে পৌঁছে। মোগল সম্রাট বালক-শিল্পীদ্বয়কে দরবারে খেয়াল পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। নতুন পদ্ধতিতে পরিবেশিত খেয়াল গান শুনে সম্রাট অভিভূত হয়ে পড়েন এবং বালক দু’জনকে রাজদরবারে নিয়োগ করেন। অনতিকালের মধ্যেই তিনি জানতে পারলেন, বালক দুটির গুরু নিয়ামত খাঁ। তার কাছে তালিম নিয়েই বালকদ্বয় সুখ্যাতি অর্জন করেছে। নিয়ামত খাঁ নতুন পদ্ধতির এ খেয়াল গানের উদ্ভাবক। তিনি নিয়ামত খাঁকে আমন্ত্রণ করে এনে রাজদরবারে সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ গদান করেন। নিয়ামত খাঁ সম্রাটের আহ্বানে রাজদরবারে যোগ দেন। সঙ্গীত-প্রেমিক সম্রাট নেয়ামত খাঁর নতুন রীতির খেয়াল গান শুনে এত মুগ্ধ হন যে, তাকে ‘শাহ’ উপাদিতে ভূষিত করেন। বিশিষ্ট সঙ্গীত শাস্ত্রকার ও গোস্বামী লিখেছেন, তানসেন ও মিশ্রী সিং (নবাৎ খাঁ) ছাড়া এর আগে আরও কোনো সঙ্গীতজ্ঞ এ দুর্লভ উপাধিতে ভূষিত হননি।নিয়ামত খাঁর শিষ্য কাওয়াল বালকের দু’জনের পরিচয় সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ড. করুণাময় গোস্বামী লিখেছেন, পূর্বে প্রচলিত মত এই যে, কাওয়াল বালকদ্বয় গোলাম রসুল ও মিঞা জানী। গোলাম রসুল (১৭০০-১৭৭০) ছিলেন দিকপাল খেয়ালগুণী। লখনৌয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। ... গোলাম রসুলের পুত্র টপ্পা গানের প্রচলয়িতা গোলাম নবী ওরফে শৌরী মিঞা। ... অপর কাওয়াল বালক বলে কথিত মিঞা জানীও গোলাম রসুলের সমকালে লখনৌয়ে বিখ্যাত খেয়ালগুণীরূপে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু কাওয়াল বালকদ্বয় যে গোলাম রসুল ও মিঞা জানী নন এ কথাই বর্তমানে অধিকতর গৃহীত। সেই বালকদের শনাক্ত করা হয় বাহাদুর ও দুলহে বলে। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে বাহাদুর-দুলহে বিশিষ্ট খেয়াল গায়করূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং তারা একটি খেয়াল গীতিধারা সৃষ্টিতে সক্ষম হন বলে জানা যায়।খেয়াল গানের আধুনিক রূপায়ণের মধ্য দিয়েই শুরু হয় নিয়ামত খাঁর সঙ্গীত জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়।নিয়ামত খাঁ ছিলেন তানসেনের কন্যাবংশীয় একজন সুবিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। খেয়াল গানের অসামান্য রূপান্তরের কৃতিত্বের জন্য মোগল-সম্রাট মুহাম্মদ শাহ্ তাকে ‘সদারঙ্গ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বীণাবাদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করার ফলে তিনি বীণাবাদনে পারদর্শিতা অর্জন করেন। পরে তিনি খেয়াল গানের আমূল পরিবর্তন সাধন করে খেয়াল গানের আধুনিক রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।খেয়াল গানের সঙ্গে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সদারঙ্গের খেয়াল আজও সদারঙ্গের খেয়াল নামেই পরিচিত। খেয়াল এখনও নতুনত্ব-সন্ধানী সঙ্গীতরীতি, শুধু ক্লাসিক বা পুরাতনরীতি সর্বস্ব নয়।সদারঙ্গ মোগল-সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে আনুমানিক ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম-সময়ের তথ্য তার রচিত একটি গানে পাওয়া যায় :আবন কহ গয়ে অগম ভঈলওয়াউনকো, ভুজ ফরকত হৈ অঁখি মোরীবাঈ।সগুন বিচারো রেখোরে বখনাবেগ মিলনবা হোয় সদারঙ্গীলে ‘আলমগীর’ সাঈ॥নিয়ামত খাঁ বা ন্যামৎ খাঁর পিতার নাম লাল খাঁ সানী। তার পিতামহের নাম খুশহাল খাঁ। খুশহাল খাঁ বিলাস খাঁর জামাতা। বংশপরম্পরায় তারা সঙ্গীতজ্ঞ। সদারঙ্গ দিল্লির মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র রাজত্বকাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। সদারঙ্গ ছিলেন একজন কুশলী বীণকার, গায়ক ও গীতিকার। তিনি একদিকে যেমন অজস্র খেয়াল রচনা করেছেন, তেমনি আবার বহু ধ্র“পদ ও ধামারও রচনা করেছেন। সদারঙ্গ রচিত ধ্র“পদ, ধামার ও খেয়ালগুলো কাব্যের দিক দিয়ে খুবই রসোত্তীর্ণ ছিল। তার রচিত গানের মধ্যে ধামার ও খেয়াল গানের আধিক্যই বেশি। তিনি সরগম ও তেলানা দিয়েও ধ্র“পদাঙ্গের গান রচনা করেছেন। তবে খেয়াল গানের আধুনিক রচয়িতা ও প্রবর্তক হিসেবেই তিনি সমধিক প্রসিদ্ধ। তার রচিত খেয়াল সম্পর্কে বলা চলে, ‘বিলাস স্রোতে ভাসমান বাদশাহ্রা যখন চটুলতার সঙ্গে মিশ্রিত করে এমন এক অপরূপ বস্তু সৃষ্টি করলেন, যা তরলতাকে দ্রবীভূত করে অন্তত ক্ষণিকের জন্যও জীবন সম্বন্ধে একটা মূল্যবোধ এনে দিতে সমর্থ হয়েছিল। সেই অপরূপ বস্তু হল কলাবন্তী খেয়াল।বাদশাহ্ মুহম্মদ শাহ্র দরবারে নিয়ামত খাঁ নামে তিনি রবাবী ও বীণকার ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘সদারঙ্গ’ নামে খেয়াল রচনা করেন। মাঝখানে তিনি দরবার ছেড়ে চলে যান এবং খেয়াল গানে পারদর্শিতা লাভ করেন। দু’জন কাওয়াল বালককে তালিম দিয়ে খেয়াল গানে নতুনত্ব এনে জনপ্রিয় করেন এবং সম্রাট মুহম্মদ শাহ্কে খেয়াল গানে মুগ্ধ করে আবার রাজদরবারে ফিরে আসেন। সম্রাট তাকে ‘শাহ সদারঙ্গ’ সম্মানে ভূষিত করেন। সদারঙ্গের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফলেই কণ্ঠসঙ্গীতে খেয়ালের স্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।সদারঙ্গ খেয়াল গানে যুগান্তর এনে দিয়েছিলেন। তিনি খেয়াল গানের স্থায়ী ও অন্তরার মধ্যে প্রতি গানে এক একটি বিশেষ ভাবকে কেন্দ্র করেছেন। ফলে সে গান হয়ে উঠেছে মোহনীয়। সহজ মানবিক-প্রেম, নায়ক-নায়িকার ভাব অবলম্বন করেই তিনি গান রচনা করেছেন। তিনি গানে এনেছেন সংক্ষিপ্ত ও সহজ ঋতু বর্ণনা, মানসিক গুণবর্ণনা, কোথাও একটুখানি জীবনচিত্র, আবার কোথাও ভক্তি ভাব। বাণী গানের সুরকে কোথাও ভারাক্রান্ত করেনি। সদারঙ্গ খেয়ালকে শুধু বিশিষ্ট রূপদানই করেননি, এমন একটি ভাষা ও কার্যকরী রীতি সৃষ্টি করেছেন যার দরুন আজও অভিজাত খেয়াল-সদারঙ্গী খেয়াল এ দুই দিক থেকে বিশিষ্ট। সদারঙ্গের খেয়ালে ভাষা খেয়াল-আঙ্গিকের বিশিষ্ট ফর্মরূপে ব্যবহৃত। পরবর্তী খেয়াল রচয়িতারা এ বিশিষ্ট ফর্মেই গান রচনা করেছেন। তিনি ব্রজভাষা, লখনৌর ভাষা ও পাঞ্জাবি ভাষাতে দক্ষ ছিলেন বলে তার কবিতায় এ ভাষা ইচ্ছামতেি ব্যবহার করতে তার কিছুমাত্র অসুবিধা হতো না।হিন্দুস্তানি সঙ্গীতে যেসব দিকপাল, সঙ্গীতজ্ঞ নিজের উদ্ভাবিত রীতিপদ্ধতি সংযোজন ঘটিয়ে সঙ্গীতের উৎকর্ষ সাধন করে গেছেন তাদের মধ্যে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গ অন্যতম। খেয়াল রীতির গান উদ্ভাবন করেও কয়েক শতাব্দী আগে আমীর খসরু ও হুসেন শাহ্ শর্কী যে কাজ অসমাপ্ত রেখে গিয়েছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রূপদান করে সদারঙ্গ তাকে যুগ-যুগান্তরের অমূল্য সম্পদে পরিণত করে দিয়ে গেছেন। খেয়াল গানের বিকাশের ক্ষেত্রে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে।সদারঙ্গ রচিত খেয়াল গানে সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার কারণ হয়তো, তিনি মুহম্মদ শাহ্র দরবারের সঙ্গীতজ্ঞ এবং বাদশাহ্র প্রিয়পাত্র হওয়ার নিদর্শনস্বরূপ তার রচনায় মুহম্মদ শাহ্র নাম উল্লেখ করেছেন। নিয়ামত খাঁ তার রচিত গানে ভণিতা হিসেবে ‘সদারঙ্গীলে’ ব্যবহার করতেন।সদারঙ্গ ধ্র“পদ, ধামার ও খেয়াল গান রচনা ছাড়াও বীণাবাদ্যের প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিলেন এবং এতে কণ্ঠসঙ্গীতের অনুরূপ আলাপচারীর প্রবর্তন করেছিলেন।সদারঙ্গের বহুমুখী অবদান সঙ্গীত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। সর্বোপরি খেয়ালের আধুনিক গীত রূপের উদ্ভাবন ও তার প্রতিষ্ঠার মাঝেই সদারঙ্গের সর্বোচ্চ সঙ্গীতগৌরব নিহিত। - See more at: http://www.jugantor.com/literature-magazine/2014/02/28/73229#sthash.y2Shbdcy.dpuf

ক্রিকেট: মা, তোর বদনখানি মলিন হলে... by আনিসুল হক

খুব মন খারাপ করে শেরেবাংলা স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিলাম। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হেরে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। রাতের অন্ধকার চিরে গাড়ি করে বাড়ি ফিরছি। হাতে একটা পতাকা-স্ট্যান্ড। সেটা কামড়াচ্ছি। নানা কথা মনে হচ্ছে। আমরা কেন এত ক্রিকেট নিয়ে মেতে আছি? আমরা কেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে এত সমর্থন দিই? কেন দল হারলে আমরা মুষড়ে পড়ি।

নতুন জোট নিয়ে শঙ্কাও কম নয় মোদির বিজেপির

নরেন্দ্র মোদি
আসন্ন লোকসভা নির্বাচন সামনে রেখে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জোট গঠনের প্রতিযোগিতায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে হারিয়ে দিয়েছে। তবে এই জোট নিয়ে কিছুটা শঙ্কাও রয়েছে। কারণ, জোটের কিছু শরিকের কারণে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি এনডিএ জোটের জন্য নতুন মিত্রদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থও হতে পারেন। ব্যাংক অব আমেরিকা মেরিল লিঞ্চের (বফএএমএল) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে। গত বুধবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিহারে রাম ভিলাস পাসওয়ানের দল লোক জনশক্তি পার্টির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বিজেপি। এই রাজ্যে ৪০টি আসন রয়েছে। অন্যদিকে হরিয়ানায়ও কুলদীপ বিষ্ণয়ের দল হরিয়ানা জনহিত কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপি জোট বেঁধেছে। সেখানে আসনসংখ্যা ১০টি।
আর তামিলনাড়ুতে ছয়দলীয় মহাজোট গড়লেও এই রাজ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বিজেপি। সেখানে ৩৯টি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, তামিলনাড়ুতে বিজেপির নেতৃত্বাধীন ছয়দলীয় জোটের প্রতি মাত্র ২৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে জয়ললিতার এআইএডিএমকের প্রতিও সমান সংখ্যক ভোটারের সমর্থন রয়েছে। আর এম করুণানিধির ডিএমকের প্রতি সমর্থন রয়েছে ২৫ শতাংশ ভোটারের। তাই বড় জোট গড়েও বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এখানে বড়সড় ধাক্কা খেতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনডিএ কেরালা, ওডিশা ও পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া সব বড় রাজ্যে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। ফলে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৪২৫টি আসনেই এনডিও জোট লড়াই করার সুযোগ পাচ্ছে। অন্ধ্র প্রদেশে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর সঙ্গে জোট গড়ার ব্যাপারে বিজেপি আলোচনা করছে বলে শোনা যাচ্ছে। পক্ষান্তরে কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্র প্রদেশে নতুন কোনো জোটই গড়তে পারেনি। অথচ ঐতিহ্যগতভাবে দলটি এসব রাজ্যে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে এসেছে। এনডিটিভি।

এবার থাই উপগ্রহে ৩০০ বস্তুর ছবি

এবার থাইল্যান্ড মালয়েশিয়ার নিখোঁজ উড়োজাহাজের সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের ছবি পাওয়ার দাবি করেছে। দেশটি গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছে, তাদের উপগ্রহে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে ভাসমান প্রায় ৩০০ বস্তুর ছবি ধরা পড়েছে। এসব বস্তু নিখোঁজ উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ হতে পারে। এদিকে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উড়োজাহাজ অনুসন্ধানের কাজ আবারও ব্যাহত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে ছয়টি দেশ এই অনুসন্ধান অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ফরাসি স্যাটেলাইটের ছবিতে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে ভাসমান ১২২টি বস্তু দেখতে পাওয়ার কথা প্রকাশের পরদিন গতকাল থাইল্যান্ডের উপগ্রহের ছবিতে একই মহাসাগরে ৩০০ ভাসমান বস্তু দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের জিও-ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড স্পেস টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি জানায়, গত সোমবার স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবিতে অন্তত ৩০০ বস্তু ভাসতে দেখা গেছে। এগুলোর আকার ২ থেকে ১৫ মিটার (সাড়ে ৬ থেকে ৫০ ফুট) পর্যন্ত দীর্ঘ। অস্ট্রেলিয়ার পার্থ বন্দর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে দুই হাজার ৭০০ কিলোমিটার (এক হাজার ৬৮০ মাইল) দূরে ওই বস্তুগুলোকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভাসতে দেখা যায়। থাই সংস্থাটি আরও জানায়, থাই স্যাটেলাইটের ছবির ভাসমান বস্তুগুলো ফরাসি উপগ্রহের ছবিতে দেখতে পাওয়া ভাসমান বস্তুগুলো থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে। উড়োজাহাজ অনুসন্ধান অভিযানের সমন্বয়ক প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক কর্তৃপক্ষ (এএমএসএ) গতকাল সকালে জানায়, উড়োজাহাজ অনুসন্ধানে ছয়টি সামরিক ও পাঁচটি বেসামরিক উড়োজাহাজের সঙ্গে পাঁচটি জাহাজ অংশ নিচ্ছে। অভিযান শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর এএমএসএ এক টুইটার বার্তায় জানায়, জাহাজগুলো অনুসন্ধান এলাকায় অবস্থান করে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উড়োজাহাজগুলো ফিরে আসছে।
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টাও প্রতিকূল আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এএমএসএর মুখপাত্র স্যাম কার্ডওয়েল জানান, অভিযানে অংশ নেওয়া ১১টি উড়োজাহাজের মধ্যে আটটিই অনুসন্ধান এলাকায় পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দুই ঘণ্টা পরই সেগুলো ফিরে আসতে শুরু করে। অনুসন্ধান এলাকায় দৃষ্টিসীমা এত কম যে উড়োজাহাজগুলো অভিযান বাদ দিয়ে ফিরতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ২৪ ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর গত বুধবার আবার উড়োজাহাজ উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। এর এক দিন পর গতকাল আবার প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হলো। অভিযানে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ এইচএমএএস সাকসেসের সঙ্গে চীনের চারটি জাহাজ যোগ দিয়েছে। অভিযানে অংশ নেওয়া অন্য দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিবেক ল জানিয়েছে, তারা নিখোঁজ উড়োজাহাজের অন্তত অর্ধেক আরোহীর পরিবারের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস ও বোয়িং কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলায় প্রতিনিধিত্ব করবে। ইতিমধ্যে মামলার জন্য প্রাথমিক আবেদন করা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, চীনের বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো উড়োজাহাজের সংশ্লিষ্ট আরোহীদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর উড়োজাহাজটি ২৩৯ জন আরোহী নিয়ে ৮ মার্চ নিখোঁজ হয়। কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাওয়ার উদ্দেশে যাত্রার এক ঘণ্টা পরই রাডারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় উড়োজাহাজটির। তার পর থেকেই এটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখনো এর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এএফপি ও বিবিসি।

ওবামার ওপর রুশদের একি অবরোধ!

বারাক ওবামা
ইউক্রেনের ক্রিমিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। চুপচাপ বসে নেই ক্ষুব্ধ রুশরাও। তাঁরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে নানা কৌতূহলোদ্দীপক প্রচারণায় নেমেছেন। রাশিয়ার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ভদকা নিয়ে ওবামার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। ইনসট্যাগরাম কস৭৭ নামের একটি ওয়েবসাইটে এ রকমই এক প্রচারণায় ওবামার খুব চিন্তিত ও বিষণ্ন একটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ভদকার বোতলের ছবি দিয়ে বলা হয়, ‘বারাক ওবামা এবং তাঁর পাশাপাশি মার্কিন প্রশাসন, সিনেট ও কংগ্রেস সদস্যরা আমাকে (ভদকা) জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারে নিষিদ্ধ।’
পোপ-ওবামা বৈঠক: ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে হোয়াইট হাউস সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। গতকাল বৃহস্পতিবার ভ্যাটিকানসিটিতে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাঁদের মধ্যে একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রয়টার্স।

চণ্ডীগড়ের বাসে অভিনেত্রী গুল পানাগ

চণ্ডীগড়ে প্রচারণা চালাতে বাসে উঠেছেন গুল পানাগ
লোকসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির (এপিপি) হয়ে চণ্ডীগড়ে লড়ছেন সাবেক মিস ইন্ডিয়া অভিনেত্রী গুল পানাগ (৩৫)। গতকাল বৃহস্পতিবার হঠাৎই চণ্ডীগড়ের একটি পাবলিক বাসে উঠে পড়েন এপিপির এই প্রার্থী। যাত্রীদের অবাক হওয়ার সুযোগ না দিয়ে কন্ডাক্টরের উদ্দেশে তিনি বলে ওঠেন, ‘আমি অন্যদের কথা জানি না। কন্ডাক্টর সাব, আপনার অবশ্যই আমার টিকিটটি কিনতে দেওয়া উচিত।’
এই আসনে গুল পানাগের প্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেতা কিরণ খের এবং বর্তমান সাংসদ পবন বানশাল। যাত্রীদের গুল পানাগ বলেন, ‘আমি কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে পড়তাম। প্রতিদিন এখান থেকে বাসে যাতায়াত করতাম। তখন যাত্রীসেবা ছিল বিশ্বমানের। এখন তা খুব নাজুক হয়ে পড়েছে।’ তিনি পবন বানশালকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমি জানি না, তিনি এ জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন কি না। কিন্তু চণ্ডীগড় এখন সত্যিই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।’ এনডিটিভি।

সংগীতে বিশ্বরেকর্ড জাতিগঠনে কোনো ভূমিকা রাখবে কি? by মাহফুজ আনাম

আবেগ দিয়ে চিন্তা করলে ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’ মনের জন্য প্রশান্তিদায়ক একটি কর্মসূচি। কিন্তু জাতিগঠনে কি এটি কোনো ভূমিকা রাখবে? আমরা সাংবাদিকেরা একটু রূঢ় প্রকৃতির হয়ে থাকি। আমাদের সঙ্গে তর্ক করা কিংবা আমাদের কোনো কিছু বোঝানো যেমন একটু কঠিন, তেমনি যেকোনো কিছু বুঝিয়ে আমাদের সন্তুষ্ট করা আরো বেশি কঠিন। বিশেষ করে যখন কোনো বিষয়ে বিন্দুমাত্র প্রচারণার আভাস থাকে, তখন আমাদের চরিত্রের ‘অনুসন্ধিৎসু’ দিকটি আরো খানিকটা প্রখর হয়ে ওঠে।