Showing posts with label শেখ রোকন. Show all posts
Showing posts with label শেখ রোকন. Show all posts

Friday, February 27, 2015

তিস্তা আর নেই তিস্তায় by শেখ রোকন

তিস্তা নদীর বুকে এখন আর পানি নেই। এর বুকে জেগে উঠেছে বিশাল চর
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিন দিনের 'বহুল প্রত্যাশিত' ঢাকা সফর শেষ হয়েছে। বহুল প্রত্যাশিত কেন? ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিভক্ত বাংলার দুই অংশের নেতৃত্ব একত্রে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন বলে? ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের আয়োজনে 'বৈঠকি বাংলা' অনুষ্ঠানে দুই বাংলার রাজনীতিক ও সুধী সমাজ আনন্দঘন মুহূর্ত কাটাবেন বলে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরসঙ্গী সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বাংলাদেশের পেশাগত বন্ধুদের ভাব বিনিময় হবে বলে? রফতানি বন্ধ থাকা ইলিশ আবার ওপার বাংলার বাঙালিদের রসনা তৃপ্ত করবে বলে? এপাশের আগ্রহ ও আন্তরিকতার কেন্দ্রে ছিল তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যু। বস্তুত সীমান্তের এপাশ এর জন্য অপেক্ষায় ছিল অন্তত ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে তখন রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছিলেন। কথা ছিল মমতাও আসবেন এবং দুই দেশের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি সফরটি বাতিল করেছিলেন। ফলে চূড়ান্ত খসড়া পর্যায়ে থাকা চুক্তিটি আর স্বাক্ষরিত হয়নি।
তিস্তা ইস্যুটি যারা মনোযোগের সঙ্গে অনুসরণ করেন, তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে_ প্রায় ছয় দশকের দরকষাকষির পর ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো ১৫ বছরের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে উপনীত হওয়ার কাছাকাছি পেঁৗছেছিল দুই প্রতিবেশী। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছিল, মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননের ঝটিকা সফরের সময়ই তিস্তার পানি বণ্টনের হার চূড়ান্ত হয়েছিল। তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশচন্দ্র সেন ও সচিব শেখ ওয়াহিদুজ্জামানও তখন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ প্রত্যাশামতো ৫০ শতাংশ পানিই পাচ্ছে। তবে সেটা ভারতীয় অংশের গজলডোবা ব্যারাজ থেকে কি-না, তা কোনো পক্ষ নিশ্চিত করেনি। ওই বছর জুন মাসে নয়াদিলি্লতে খসড়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন দুই দেশের পানিসম্পদ সচিব। খসড়া চুক্তিতে বলা হয়েছিল, নদীর নাব্যতার জন্য ৪৬০ কিউসেক রেখে বাকি পানি ভারত ৫২ শতাংশ ও বাংলাদেশ ৪৮ শতাংশ পাবে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাপেই শেষ পর্যন্ত পিছু হটে মনমোহন সরকার।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের তরফে অভিযোগ ছিল, শিবশঙ্কর মেনন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ায় তা মানা হয়নি। সফর শুরুর একদিন আগে ঢাকায় না যাওয়ার ঘোষণা দিলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং বাংলাদেশের পক্ষে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হলে মমতা বলেছিলেন, তিনিও বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক চান; কিন্তু রাজ্যের স্বার্থ তার অগ্রাধিকার। ঢাকা ছাড়ার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কথা দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি সহযোগে অচিরেই চুক্তিটি হবে।
সেই অচিরে আর চিড় ধরেনি। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জানিয়েছিল, তারা তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়ে স্বতন্ত্র সমীক্ষা করবে। তার পর চুক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত। এ জন্য সেখানকার শীর্ষস্থানীয় নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে প্রধান করে একটি কমিটিও করা হয়। ওই বছরই নভেম্বরের মধ্যে সেই কমিটির কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল। পরে আরও কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত, শোনা কথা, এ বছর কল্যাণ রুদ্র তার সমীক্ষা প্রতিবেদন দিয়েছেন। কিন্তু সমীক্ষাটি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ডিপ ফ্রিজে সুরক্ষিত। পরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বরফ গলানোর চেষ্টা চলেছে। বলা বাহুল্য, কাজ হয়নি।
পরের ইতিহাস সবার জানা। তিস্তা দিয়ে কেবল অনেক পানি অথবা পানিশূন্যতা প্রবাহিত হয়নি; দিলি্লতে কংগ্রেস জমানা শেষ হয়ে বিজেপি যুগ শুরু হয়েছে; ঢাকাতেও আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। সীমান্তের এপাশ এবং ওপাশে পানিসম্পদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও এসেছে পরিবর্তন। কেবল পরিবর্তন ছিল না তিস্তাচিত্রে। যখনই সুযোগ মিলেছে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পানিসম্পদমন্ত্রী ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পানিসম্পদমন্ত্রীর কাছে আগের মতোই তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যু 'দ্রুত নিষ্পত্তি' করার আবেদন জানিয়ে এসেছেন। তারাও আগের সরকারের মতোই আশ্বাস দিয়ে গেছেন। সর্বশেষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ঢাকার 'বহুল প্রত্যাশিত' ঢাকা সফর করলেন বটে; একুনে আশ্বাস ছাড়া কিছুই মিলল না।
সফরের শুরুতে ২০ ফেব্রুয়ারি 'বৈঠকি বাংলা'য় সুধীজনদের উদ্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'ল্যান্ড বাউন্ডারি প্রবলেম যেমন সল্ভ করে দিয়েছি, তিস্তা নিয়েও কোনো সমস্যা হবে না_ আমার ওপর আস্থা রাখুন। আগামীকাল (শনিবার) হাসিনাদির (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হবে। আমাদের ওপরই ছেড়ে দিন। তিস্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।' ( সমকাল ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)।
প্রশ্ন হচ্ছে, কয়েক মাস আগ পর্যন্ত তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নে বিরূপ মমতা হঠাৎ এমন নরম হলেন কেন? তিস্তার পানি নিয়ে এই আশ্বাস আসলে কতটা বাস্তব? বিষয়টি বোঝা যায় কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় বুধবার প্রকাশিত সম্পাদকীয় পড়লে_ 'দুর্জনে বলিতে পারে, মুখ্যমন্ত্রীর বাংলাদেশ যাত্রার প্রকৃত উদ্দেশ্যটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং গূঢ় :তিনি সে দেশের সরকারকে জামায়াত-আদি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে তৎপরতার মাত্রা কমাইবার অনুরোধ জানাইতে গিয়াছিলেন, কারণ সেই তৎপরতার ফলে সীমান্তের এ পারে তাঁহার দলের অসুবিধা হইতেছে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনও নাগরিক আশা করিবেন, ইহা দুর্জনের অপপ্রচারমাত্র, এমন কোনও দুষ্টচিন্তা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁহার সহকর্মী তথা সফরসঙ্গীদের অন্তরের ত্রিসীমানাতেও স্থান পায় নাই। কিন্তু সেই কারণেই আরও বেশি করিয়া প্রশ্ন উঠিবে :এই সফর শেষে তাঁহার হাতে কী রহিল? তিস্তা লইয়া তিনি 'ভাবিয়া দেখিবেন', এই পরম দৈববাণীটুকু বাদ দিলে নূতন কথা শূন্য। তিস্তার জল-ভাগ লইয়া তাঁহার ধনুর্ভঙ্গ পণ ছাড়িয়া মুখ্যমন্ত্রী ভাবিয়া দেখিতে প্রস্তুত, এই সংবাদ বাংলাদেশের পক্ষে আশাব্যঞ্জক হইতে পারে, কিন্তু সত্য ইহাই যে, নদীর জলের মোট পরিমাণ বাড়াইবার উপায় নাই, সুতরাং বাংলাদেশের ভাগ বাড়িলে পশ্চিমবঙ্গের কমিবে।'
তার মানে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের এই অবস্থান পরিবর্তনের কারণ নিছক রাজনৈতিক। বিধানসভা নির্বাচনে যাতে তার মুসলিম ভোটব্যাংক বিব্রত না হয়, যাতে বাংলাদেশের প্রতি নস্টালজিক হিন্দু ভোট ঠিক থাকে, যাতে সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার তাকে আরও বেকায়দায় না ফেলে। আগে কেন তিস্তা নিয়ে কড়া কড়া কথা বলেছিলেন? সাড়ে তিন দশকের বাম শাসন হটিয়ে ক্ষমতায় আসা মমতাকে মসনদ পোক্ত করতে হলে সাধারণ ভোটারের সামনে 'রাজ্যের স্বার্থ রক্ষায়' অনড় ভাবমূর্তি অটুট রাখা জরুরি ছিল। সেদিক থেকে তিস্তা আকর্ষণীয় ইস্যু, সন্দেহ নেই। বিজেপিও এখন তিস্তার ব্যাপারে নরম। ক্ষমতায় আসার আগে কেন বিরোধিতা করেছিল? সেখানেও রাজনীতি। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার যাতে কূটনৈতিক সাফল্য ভোটের বাজারে ভাঙাতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
তিস্তা যদিও সীমান্তের এপাশের জন্য কৃষি, পরিবেশ, প্রতিবেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; এখানেও রাজনীতি কম ছিল না। তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করতে পারলে নিঃসন্দেহে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেটা আওয়ামী লীগের জন্য 'সাফল্যগাথা' হতে পারত। বিএনপি নির্বাচনে এলে 'তিস্তা ব্যর্থতা' একটি বড় নির্বাচনী ইস্যু হতো, সন্দেহ নেই। গত বছর এপ্রিলে বিএনপি যখন তিস্তা অভিমুখে লংমার্চ করেছিল, তখন হঠাৎ নদীটিতে পানি বেড়ে গিয়েছিল। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দাবি করেছিলেন, এ তাদের লংমার্চের 'সুফল'!
তার মানে, তিস্তা ইস্যু আর নিছক তিস্তা নদীতে নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই দেশের বহুমাত্রিক রাজনীতি। জটিলতা আরও আছে। রাজনীতির বাইরে খোদ তিস্তার প্রাকৃতিক পরিস্থিতি ভালো নয়। কয়েক বছর আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বিশ্বের বিপন্ন আটটি নদী নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। অতি ব্যবহারের কারণে পানিশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ওই নদীগুলোর মধ্যে আমাদের তিস্তাও রয়েছে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, 'উন্নয়ন' প্রকল্প প্রভৃতি কারণে তিস্তার উজান অংশ সিকিমে যে দক্ষযজ্ঞ চলছে, তার নেতিবাচক প্রভাবও পড়ছে তিস্তায়। পানির প্রাকৃতিক জোগান কমে যাচ্ছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। হিমবাহ চক্রে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। তাহলে তিস্তার মতো নদীর ভবিষ্যৎ অন্ধকার। রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক জটিলতার বাইরে সীমান্তের দুই পাশে ২৫ হাজার কিউসেক সামর্থ্যের দুটি সেচ প্রকল্প থাকায় পাহাড়ি নদীটির পানি বণ্টন সংক্রান্ত জটিলতা অবধারিত। পাহাড়ি নদীর প্রবাহে নাটকীয়তার অন্ত থাকে না। ওই অঞ্চলে কিংবা উজানে বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে এর প্রবাহ। সব মিলিয়ে পানিই যদি না থাকে_ রাজনীতি, কূটনীতি, জাতীয়তা, প্রাদেশিকতা, নির্বাচন পেরিয়ে চুক্তি হলেই কী বা না হলেই কী?
সাংবাদিক ও গবেষক
skrokon@gmail.com

Thursday, February 26, 2015

ব্রহ্মপুত্রে চীনের তৈরি বাঁধ বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য ক্ষতিকর হবে না by অধ্যাপক ড. প্রণবকুমার রায়

অধ্যাপক ড. প্রণবকুমার রায় কলকাতাভিত্তিক সিএইচএমআর (সেন্টার ফর হাইড্রো-মেটিওরোলজিক্যাল রিসার্চ) প্রতিষ্ঠা করেন ২০১০ সালে। বর্তমানে তিনি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে দিলি্লভিত্তিক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। সিএইচএমআর প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। প্রণবকুমার রায় ১৯৬৭ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৯৬৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২-৭৬ সালে তিনি ইংল্যান্ডের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পানিসম্পদ বিষয়ে পিএইচডি করেন। একই সময়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন। তার জন্ম ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায়। ড. রায়ের সর্বসাম্প্রতিক বই 'আন্তঃরাষ্ট্রীয় নদী ব্যবস্থা :প্রসঙ্গ ভারত ও বাংলাদেশ' ২০১৩ সালে প্রকাশিত...
সমকাল :আমরা জানি, আপনি দীর্ঘ দিন ধরে পানিসম্পদ, বাংলাদেশ-ভারত ও ভারত-চীন আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন ইস্যুতে কাজ করছেন। আপনার সর্বশেষ বইয়ে বাংলাদেশ-ভারত নদী ব্যবস্থায় বিশেষত গঙ্গা ও তিস্তা নদী প্রাধান্য পেয়েছে। আপনি এবার ঢাকা সফরে একটি গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থাপিত নিবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। কিন্তু আমরা এই সাক্ষাৎকারে মূলত জোর দিতে চাই দুই দেশের অপর প্রধান নদ ব্রহ্মপুত্র বিষয়ে। প্রবাহের পরিমাণ ও দৈর্ঘ্য বিবেচনায় এই নদ ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে প্রধানতম হলেও আলোকপাত হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম। বলে রাখতে চাই যে, আমার সুযোগ হয়েছে মূলত ব্রহ্মপুত্র সামনে রেখে ভারত ও চীনের মধ্যে পানি বণ্টন বিষয়ে আপনার প্রণীত সমীক্ষাটি দেখার। আমরা জানি, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে স্বীকৃত অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪। আপনার কাছে জানতে চাইব, চীন ও ভারতের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও আর কয়টি অভিন্ন নদী রয়েছে?
প্রণব কুমার রায় :শুধু চীন ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদী নেই বললেই চলে। দুই দেশের সব আন্তঃসীমান্ত নদী আসলে হিমালয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও যুক্ত। যেমন ব্রহ্মপুত্র চীন, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিস্তৃত। এর বাইরে সিল্পুুব্দ ও সাতলাজ চীন, ভারত ও পাকিস্তানে বিস্তৃত। কোশি, অরুণ, বরুণ, কার্নালি_ এই নদী চারটি চীন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে প্রবাহিত। তার মানে, এক অর্থে ভারত ও চীনের মধ্যে সরাসরি সাতটি বড় আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে।
সমকাল :ব্রহ্মপুত্র ভুটানের সঙ্গে যুক্ত বোধ হয় উপনদীর মাধ্যমে?
প্রণব রায় : হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। এ ছাড়া মানস নদী চীন হয়ে ভুটানের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। নিচের দিকে এসে বিভক্ত হয়ে এটি বেকি নদী নামে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয়েছে। লোহিত নদী চীন থেকে এসে অরুণাচলে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয়েছে। সুবনছিরি নদীও চীন থেকে এসে ভুটানের মধ্য দিয়ে অরুণাচলে প্রবেশ করেছে ও ব্রহ্মপুত্রে পড়েছে।
সমকাল :২০০৫ সালে আমার সুযোগ হয়েছিল একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অরুণাচলে গিয়ে সুবনছিরি নদী দেখার। সেখানে নির্মীয়মাণ একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছিলাম আমরা।
প্রণব রায় :ওই জলবিদ্যুৎ বাঁধটি নির্মাণ এখন বন্ধ আছে।
সমকাল :তাহলে তো ব্রহ্মপুত্রের জন্য মন্দের ভালো। আপনার কাছে জানতে চাইব ব্রহ্মপুত্রের চীন অংশ সম্পর্কে।
প্রণব রায় :লাখ লাখ বছর আগে ব্রহ্মপুত্র কিন্তু ভারতের দিকে প্রবেশ করত না। তিব্বত হয়ে চীন সাগরে পতিত হতো। তিব্বতে এর নাম ইয়ারলুং-সাংপো। উৎপত্তি আংসি হিমবাহের তামলুং হ্রদ থেকে। অনেকে নদটির উৎস হিসেবে চেমইয়ুংদাং হিমবাহের কথা বলেন, যা ভুল। তিব্বতে সাংপো কমবেশি ১ হাজার ২১৭ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়েছে। তার পর এটি অরুণাচলে প্রবেশ করে সিয়াং বা ডিহং নাম ধারণ করেছে। একটি অংশে এর নাম ডিবাং। আসামে প্রবেশ করে এই নদের নাম হয় ব্রহ্মপুত্র। চীন, ভুটান, ভারত, বাংলাদেশ মিলে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার অর্ধেকের বেশি চীনে; কিন্তু মোট প্রবাহের মাত্র ২৯ শতাংশ চীন থেকে আসে। এর কারণ তিব্বতের শীতল মরু জলবায়ু।
সমকাল :ব্রহ্মপুত্র নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে কি কোনো চুক্তি বা সমঝোতা আছে?
প্রণব রায় : না, নেই। কোনো সমঝোতা স্মারক নেই, প্রটোকল নেই। চুক্তি তো নেই-ই। তবে দু্ই দেশের মধ্যে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ সম্পর্কে তথ্যবিনিময় হয়। চীনের পররাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয় সেই তথ্য ভারতের পররাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দেয়। ভারতের পররাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয় তা সেন্ট্রাল ওয়াটার বোর্ড, আসাম ওয়াটার বোর্ড, ব্রহ্মপুত্র বোর্ডের কাছে সরবরাহ করে। এ ধরনের তথ্য সাধারণত বন্যা সতর্কীকরণের জন্য প্রয়োজন হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, তিব্বতে সাংপো নদীতে বন্যার কোনো আশঙ্কা থাকে না। কারণ সেখানে নদীটি প্রবাহিত হয়েছে গিরিখাতের মধ্য দিয়ে। প্রায় তিন হাজার মিটার গভীর গিরিখাত। যত বৃষ্টিপাতই হোক, বন্যার আশঙ্কা থাকে না।
সমকাল :ওই গিরিখাতেই তো চীন একটি ড্যাম তৈরি করছে? আমাদের এখানে আশঙ্কা রয়েছে যে, সেই ড্যাম দিয়ে চীন ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ ঘুরিয়ে দেবে। আমরা দেখেছি, ভারতীয় পক্ষগুলোর মধ্যেও একই আশঙ্কা রয়েছে।
প্রণব রায় :ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়ার কোনো আশঙ্কা আমি অন্তত দেখছি না। কারণ সেটা কারিগরিভাবেই সম্ভব নয়। কারণ যেখানে চীন জাংবো ড্যাম তৈরি করছে, সেটা এত গভীর গিরিখাত যে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়া প্রবাহ ঘুরিয়ে অন্যদিকে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা ড্যামটি তৈরি করছে নদীর দুই পাশের দুটি পর্বতের মধ্যে। পর্বত দুটির নাম নেইলা পেরি। আর প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন তখনই হয়, যখন সেচ প্রকল্প থাকে। তিব্বতে চীন কোনো সেচ প্রকল্প করছে না। তারা ওই অঞ্চলে শিল্পায়ন করতে চায়। সে জন্য তাদের বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। যে কারণে কেবল সাংপোতে ড্যাম তৈরি করছে না। এর উপনদীগুলোতে আরও ১৩টি ড্যাম তৈরি করেছে। জাংবো ড্যামের ভাটিতে আরও চারটি রানঅফ রিভার ড্যাম তৈরি হবে। চীন বরং সিন্ধু ও সাতলাজ থেকে তিব্বতের দিকে পানি নিতে চায়। সেখানে তারা ব্যারাজ তৈরি করার কথা ভাবছে। ফলে ভারতের মূল চিন্তা হওয়া উচিত সিন্ধু ও সাতলাজ নিয়ে; ব্রহ্মপুত্র নিয়ে নয়।
সমকাল :কিন্তু আমরা তো দেখেছি, ভারতের পরিবেশকর্মী ছাড়াও সরকারি নীতিনির্ধারকরা ব্রহ্মপুত্রে চীনের ড্যাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এমনকি এই ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশ যৌথভাবে কাজ করার কথাও বলা হচ্ছে।
প্রণব রায় :আমার ধারণা, সেটা প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে। আগেই যেমনটি বললাম, কারিগরিভাবেই এটা সম্ভব নয়। একটা হতে পারে, জাংবোর ভাটিতে আরও ড্যাম ও রিজার্ভার তৈরি করে পানি ধরে রাখলে। একবার জলবিদ্যুৎ বাঁধের মধ্য দিয়ে আসা পানি ধরে রেখে আবার সেই পানি ঘুরিয়ে নিয়ে বাঁধের উজানে ফেলা। তাহলেই কেবল ব্রহ্মপুত্রে চীন থেকে আসা পানি কমতে পারে। কিন্তু সেটা ওই পার্বত্য অঞ্চলে কারিগরিভাবে প্রায় অসম্ভব। সম্ভবত হলেও খরচ এত বেশি পড়বে যে, তা কুলানো যাবে না। বড় কথা, ব্রহ্মপুত্রের যে প্রবাহ তিব্বত থেকে আসে, তা সামান্য। কারণ তিব্বত হচ্ছে প্রায় বৃষ্টিহীন অঞ্চল। মূল বৃষ্টিপাত হয় আসাম অঞ্চলে। এই বৃষ্টির ফলেই ব্রহ্মপুত্রে বিপুল পানি থাকে। এ ছাড়া উপনদীগুলো নেপাল ও ভুটানের মধ্য দিয়ে এসে ব্রহ্মপুত্রে পড়েছে। চীনের তুতিং পয়েন্টে যেখানে মাত্র চার হাজার কিউসেক পানি প্রবাহ থাকে, সেখানে ভারতের পাসিঘাট পয়েন্টে থাকে ৩২ হাজার কিউসেক পানি। আপনি দেখবেন, এখন ভারত আর আগের মতো এ নিয়ে কথা বলছে না। আমি নিজে বিষয়টি নিয়ে আমাদের পানিসম্পদমন্ত্রী উমা ভারতী, উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিষয়ক মন্ত্রী, অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বুঝেছেন। সরকারি আমলারাও বিষয়টি বুঝেছেন। ভারত এখন আসলে চাইছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চীন যেন সাংপোতে ২০ শতাংশ পানি নদীর জন্য রাখে। তাহলেই চলবে।
সমকাল :এখন তাহলে চীনের সঙ্গে পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারতকে এবং পাকিস্তানকে সিন্ধু নদ ও সাতলাজ নিয়ে ভাবতে হবে?
প্রণব রায় :আমি তাই মনে করি। ওই অঞ্চলে চীন যেসব প্রকল্প নিতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে মনোযোগ দেওয়া দরকার।
সমকাল :ব্রহ্মপুত্রে চীনের বাঁধ নিয়ে তাহলে বাংলাদেশের উদ্বেগের কিছু নেই? কয়েক দিন আগে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের নতুন রাষ্ট্রদূত কিন্তু এই কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, চীন ব্রহ্মপুত্রে এমন কিছু করবে না, যা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হয়। আপনি বলছেন, ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহার চীনের জন্য কারিগরিভাবেই সম্ভব নয়?
প্রণব রায় :তিনি এক অর্থে ঠিকই বলেছেন। কিন্তু সে জন্য বসে থাকা উচিত হবে না। আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, নজর রাখতে হবে।
সমকাল :ব্রহ্মপুত্র নিয়ে তাহলে বাংলাদেশের উদ্বেগের কেন্দ্র ভারত ও ভুটান? কারণ বহুল আলোচিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত ব্রহ্মপুত্রের পানি সরিয়ে নিতে চাইছে। ভুটান দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবস্থার উপনদীগুলোতে ড্যাম তৈরি হচ্ছে।
প্রণব রায় :আমি নিজে এভাবে পানির বেসিন ট্রান্সফারের বিপক্ষে। তবে জলবিদ্যুৎ প্রশ্নে অভিন্ন অববাহিকার মধ্যে ড্যাম হতে পারে। কারণ উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে।
সমকাল :কিন্তু এতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের কী লাভ? বরং ক্ষতি হবে। কারণ ড্যামের কারণে নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট হবে। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হবে। মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হবে। ভাটিতে ভাঙন ও পলিপতন বাড়বে।
প্রণব রায় :এ জন্যই আমি অববাহিকাভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনার কথা বলি। যাতে সুফল অববাহিকার সব দেশ পেতে পারে। কুড়িগ্রাম ও ধুবড়ির কাছে একটি ব্যারাজ তৈরি করে ব্রহ্মপুত্রের উদ্বৃত্ত পানি দিয়ে রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ অঞ্চলের নদীগুলোতে পানি দেওয়া যেতে পারে। সেখানে সেচের কাজে লাগবে। কৃষি উৎপাদন বাড়বে। ওইসব অঞ্চলে ছোট ছোট অনেক নদী আছে। ফলে নতুন করে সেচখাল খননের প্রয়োজন নেই। নদীগুলোই সেচখাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। একই কাজ টিপাইমুখের ভাটিতেও করা যায়।
সমকাল :আপনি জানেন, অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা তখনই সম্ভব, যখন উজানের দেশ অভিন্ন নদীগুলোতে ভাটির দেশের অধিকার স্বীকার করে নেবে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রসহ অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে তো কোনো পানি বণ্টন বা অধিকার চুক্তিই সম্ভব হচ্ছে না! অভিন্ন নদীগুলোর কোথায় কোথায় কী ধরনের স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে, সে সম্পর্কেও খুব বেশি তথ্য বাংলাদেশ পাচ্ছে না। অথচ গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী এসব সম্পর্কে বাংলাদেশকে বিস্তারিত জানানোর কথা।
প্রণব রায় :সে জন্যই আমি বলছি, পানি বণ্টন চুক্তি নয়; অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা চুক্তি করতে হবে। যৌথ ব্যবস্থাপনায় বন্যার সময় পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হবে, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, ভাঙন কমবে, নৌপথে নাব্য থাকবে।
সমকাল :ভারতের বেসরকারি পর্যায় থেকে অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথা বিভিন্ন সময়েই শুনেছি আমরা। কিন্তু সরকারি পর্যায় কি সেটা উপলব্ধি করে?
প্রণব রায় :আসলে বেসরকারি পর্যায় থেকেই এতদিন বিষয়টি ভাবা হয়নি। এখন হচ্ছে। এর প্রভাব সরকারি পর্যায়েও পড়বে। সবার প্রয়োজন মেটাতে সেদিকেই যেতে হবে।
সমকাল :ব্রহ্মপুত্র নিয়ে কি মেকংয়ের মতো চুক্তি সম্ভব? যেখানে বাংলাদেশ-ভারত ছাড়াও চীন ও ভুটান বা নেপাল থাকবে?
প্রণব রায় :আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব। নেপাল, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তো সম্ভবই। সব পক্ষ রাজি হলে চীনও থাকতে পারে। এ নিয়ে আরও বেশি বেশি আলোচনা হতে হবে। সরকারি পর্যায়ের আগে বেসরকারি পর্যায়ে বেশি আলোচনা হতে হবে।
সমকাল :আপনার প্রত্যাশা বাস্তবে পরিণত হোক। আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
প্রণব রায় :আপনাকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শেখ রোকন

Sunday, February 8, 2015

অবরোধে নৌপথই ভরসা হতে পারত! by শেখ রোকন

সংসদের বাইরে থাকা বিরোধীদলীয় জোটের দেশব্যাপী টানা অবরোধ এবং খণ্ড খণ্ড হরতাল চলাকালে নৌপথে কতটা হামলার ঘটনা ঘটেছে? হতাহত হয়েছেন কতজন? একই সময়ে সড়কপথে সংঘটিত হামলা ও হতাহতের হিসাব প্রায় পুঙ্খানুপুঙ্খ পাওয়া সম্ভব। বিভিন্ন সংবাদপত্র প্রতিদিনই সর্বশেষ আপডেট দিচ্ছে পাঠকের জন্য। বুধবার পর্যন্ত হতাহতের হিসাব দেখা যাক_ 'গত ৬ জানুয়ারি থেকে চলা লাগাতার অবরোধ সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫১ জন। তার আগের দুই দিনে নিহত হয়েছেন আরও দু'জন। ... এসব হিসাবের বাইরেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন আরও সাতজন' (সমকাল, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)। যদিও সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই, এই সময়ে আহত হয়েছে এক হাজারের বেশি, নিদ্বর্িধায় আশঙ্কা করা যায়। অবরোধের এই সময়ে ৪৩৬টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, ভাংচুর হয়েছে আরও ৪৭৮টি। রেলে নাশকতার হিসাবও কড়ায় গণ্ডায়_ ৯ বার (প্রথম আলো, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)।
বলাই বাহুল্য, অবরোধের এই অসহনীয় কালে অপেক্ষাকৃত সহনীয় নৌপথে হামলা ও হতাহতের হিসাব পাওয়া সহজ নয়। ফলে একেক দিনের পত্রিকা ধরে ধরে খুঁজতে হয়েছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রসূত্রে দেখা যাচ্ছে, অবরোধের দ্বিতীয় দিনে ৭ জানুয়ারি রাতে বরিশাল নদীবন্দরে নোঙর করা এমভি জনতা লঞ্চে আগুন দিয়েছিল 'দুর্বৃত্তরা'। বরিশাল থেকে কালাইয়া অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করা লঞ্চটিতে রাত সাড়ে ৮টায় কেরোসিন দিয়ে লঞ্চে আগুন দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়রা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ২০ জানুয়ারি বরিশাল থেকে ঢাকাগামী সুন্দরবন-৭ ও পারাবত-১০ লঞ্চে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পারাবত-১০ লঞ্চের স্টাফ ও যাত্রীরা জানান, লঞ্চটি রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘাট ছাড়ার ১০ মিনিট পরই হঠাৎ করে ১০১ কেবিনের ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। বিষয়টি দেখতে পেয়ে অন্যান্য যাত্রী ও স্টাফরা ছুটে এসে কেবিনের দরজা তালাবদ্ধ দেখতে পায়। পরে ডুপিল্গকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে আগুন নিভিয়ে ফেলে স্টাফরাই। ওই সময় কেবিনে কেউ না থাকলেও পেট্রোলের বোতল উদ্ধার করা হয়। লঞ্চটি না থামিয়ে ঢাকা চলে যায়। অপরদিকে ঘাট ছাড়ার ১০ মিনিট পর সুন্দরবন-৭ লঞ্চের তৃতীয় তলার ৩১৬ নম্বর কেবিনেও একই পদ্ধতিতে আগুন দেওয়া হয়। পাশের একটি কেবিনেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অঘটনের পর লঞ্চটি ঘাটে ফিরিয়ে নিয়ে পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে রাতেই লঞ্চটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
২৪ জানুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার সদরঘাট টার্মিনালের ৬নং পন্টুনে বিকেলে এমভি টিপু-৬ নামে এক যাত্রীবাহী লঞ্চের কেবিনে আগুন দেওয়া হয়। লঞ্চটি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছিল। খবর পেয়ে সদরঘাট ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই লঞ্চের তৃতীয় তলার সবক'টি কেবিন পুড়ে যায়। অগি্নকাণ্ডের খবর পেয়ে যাত্রীরা সদরঘাট পন্টুনে নেমে যাওয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। একই দিন বিকেলে বরিশালের গাবখান চ্যানেলে বিআইডবিল্গউটিসির বিলাসবহুল যাত্রীবাহী জাহাজ এমভি বাঙালির ওপর গাবখান সেতু থেকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নিভিয়ে ফেলায় উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি হয়নি। ঘটনার পরপরই পানির পাম্প চালিয়ে পাইপের মাধ্যমে বোমায় ছড়িয়ে পড়া আগুন নিভিয়ে ফেলে জাহাজ কর্তৃৃপক্ষ।
যদি আমার নিজের চোখ বা সংবাদমাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়ে না থাকে, তাহলে অবরোধের নৌপথে নাশকতার হিসাব মোটামুটি এ রকম_ ৩০ দিনের মধ্যে ৩ দিন নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। আগুন দেওয়া হয়েছে মোট পাঁচটি লঞ্চে_ এমভি জনতা, এমভি সুন্দরবন-৭, এমভি পারাবত-১০, এমভি টিপু-৬ ও এমভি বাঙালি। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সড়কপথে নাশকতার ঘটনার তুলনায় হতাহত কেবল শূন্য নয়, এমভি টিপু ছাড়া অন্য লঞ্চগুলোতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। নৌপথে নাশকতার এই হিসাব দিয়েই পুরো চিত্রায়ন সম্ভব ছিল। কিন্তু ওপরের দুই অনুচ্ছেদে লঞ্চ পাঁচটিতে আগুন দেওয়ার ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কয়েকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
প্রথমত, পাঁচটি লঞ্চের দুটিই বন্দরে বা ঘাটে নোঙর করা অবস্থায় আগুন দেওয়া হয়েছে। অপর দুটি লঞ্চ বরিশাল বন্দর থেকে ছাড়ার কয়েক মিনিটের মাথায় আগুন দৃশ্যমান হয়েছে। এমভি বাঙালিতে যদিও আগুন দেওয়া হয়েছে চলন্ত অবস্থায়, দুর্বৃত্তদের অবস্থান ছিল গাবখান সেতুর ওপরে। তার মানে, সড়কপথে যেমন চলন্ত অবস্থায় আগুন দেওয়া হয়, নৌপথে সেটা কারিগরিভাবেই সম্ভব নয়। ফলে সিদ্ধান্তে আসা যায়, লঞ্চে যদি তল্লাশি করে যাত্রী তোলা যায়, তাহলে নাশকতার সুযোগ থাকে না। নৌবন্দর বা ঘাটে কিংবা সংলগ্ন সেতুতে যদি প্রহরা বসানো যায়, তাহলে লঞ্চে নাশকতা ঠেকানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, পাঁচটির মধ্যে চারটিতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে সন্ধ্যায় বা রাতে। কেবল এমভি বাঙালিতে বিকেলে আগুন দেওয়া হয়েছে। ওই লঞ্চও বরিশাল পেঁৗছতে পেঁৗছতে সন্ধ্যা বা রাত হয়ে যেত, বলাই বাহুল্য। তার মানে বাসে বা সড়কপথের অন্যান্য যানবাহনে যেমন 'দিনে-দুপুরে' বোমা মারা সম্ভব, লঞ্চের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। নদীপথের যে প্রশস্ততা এবং অনেক দূর পর্যন্ত সমান্তরাল নজরদারিতে আনা যায়, তাতে করে সড়কপথের মতো বোমা মেরেই পালানোর বা লুকিয়ে পড়ার সুযোগ নেই দুর্বৃত্তদের। সড়কপথের যানবাহনে অনেক ক্ষেত্রে নাশকতাকারীরা যাত্রীবেশে উঠে নামার সময় বোমা ফাটিয়ে চলে গেছে। লঞ্চের ক্ষেত্রে সেটা কার্যত অসম্ভব।
তৃতীয়ত, লঞ্চের চারপাশেই থাকে আগুনের যম পানি। আগুন দিলেও খুব দ্রুতই ফায়ার সার্ভিস ছাড়াই লঞ্চের নিজস্ব পাম্প ব্যবহার করে আগুন নেভানো সম্ভব। এমভি বাঙালির ক্ষেত্রে সেভাবেই নিজস্ব পাম্প চালিয়ে আগুন নেভানো হয়েছে। এমভি টিপু ছাড়া হামলার শিকার অন্যান্য লঞ্চেও ফায়ার সার্ভিসের দরকার পড়েনি।
এটা স্পষ্ট যে, অবরোধ বা হরতালে নাশকতার যে 'ধ্রুপদী' চিত্র আমরা সড়কপথজুড়ে দেখে থাকি বা শিকারে পরিণত হই, নৌপথে তা কার্যত অচল। সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, সড়কপথের নেটওয়ার্ক যেমন দেশজুড়ে বিস্তৃত, নৌপথ তেমন নয়। এমন নয় যে, আমরা সেই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারিনি। বরং একসময় গোটা দেশে সড়কপথের চেয়ে বহুগুণে বেশি বিস্তৃত ছিল নৌপথ; নিজেরা সেই সৌভাগ্যের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলেছি। ১৯৬০ সালে নৌপথ ছিল ১২ হাজার মাইল বা প্রায় কুড়ি হাজার কিলোমিটার। এখন সেটা দাঁড়িয়েছে সাড়ে আট হাজার কিলোমিটারের মতো। তার মানে, গত অর্ধশতকে হারিয়ে গেছে ১২ হাজার কিলোমিটারের মতো নৌপথ। কিন্তু এখনও যতটুকু নৌপথ আছে, তা সংরক্ষণ ও সংস্কার করলে অন্তত দেশের বিভাগীয় শহর ও বৃহত্তর জেলা শহরগুলোকে যূথবদ্ধ করা সম্ভব। আর কিছু না হোক 'মহাসড়ক' যেখানে যেখানে বিস্তৃত হয়েছে, সে পর্যন্ত নৌপথে চলাচল তো সম্ভবই।
দুর্ভাগ্যবশত, প্রকৃতির অমূল্য উপহার নৌপথ আমরা ধরে রাখতে পারিনি, পারছি না। সড়কপথে যেখানে প্রতি কিলোমিটারে বিপুল নির্মাণ ও সংস্কার খরচ, নৌপথে সেখানে কেবল প্রয়োজন ছিল নজরদারি ও সংরক্ষণ। তার চেয়েও বড় কথা, একদা প্রধান রুট নৌপথ যে এখনও অন্তত বিকল্প হতে পারে, আমাদের নীতিনির্ধারকরা সেটা ভাবছেনই না! সড়ক ধর্মঘট বা রেল অবরোধের কারণে পায়ে হাঁটা জনতার মিছিল দেখে আমরা উদ্বিগ্ন হই, যে কোনো মূল্যে 'মোবিলিটি' বজায় রাখার চেষ্টাও চলে। কিন্তু নৌপথও যে দেশের বিপুলসংখ্যক যাত্রীর একমাত্র ভরসা, সেটা আমাদের অনভ্যস্ত চোখে ধরাও পড়ে না।
অবরোধের এই কালে সড়ক ও নৌপথের চিত্র যদি তুলনা করা যায়, তাহলে দীর্ঘদিন মুখ ফিরিয়ে থাকার পরও আমাদের নীতিনির্ধারকরা এখন থেকে নৌপথ নিয়ে মনোযোগী হতে পারেন বৈকি। সন্দেহ নেই, নদীমাতৃক বাংলাদেশের গোটা নৌপথই যেখানে চরম অব্যবস্থাপনার শিকার, সেখানে এটা সহজ নয়। গত সাড়ে তিন দশকে নৌপথ সংরক্ষণের জন্য কোনো ড্রেজারও কেনা হয়নি। অভ্যন্তরীণ বন্দর ব্যবস্থাপনায় এখনও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। মালপত্র ও যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে এখনও সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। নৌপথে নিরাপত্তা ও বেশকিছু নিয়ন্ত্রণমূলক কাজে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর এবং বিআইডবিল্গউটিএর মধ্যে চলছে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু আর কিছু না হোক, অবরোধ-হরতালের মতো জনসংকটের সময় বিকল্প হিসেবে নৌপথ ভরসা হতেই পারে। তাতে করে আর যাই হোক, আগুনের লেলিহান শিখায় সাধারণ নাগরিককে প্রাণ দিতে হবে না।
সাংবাদিক ও গবেষক
skrokon@gmail.com

Friday, January 3, 2014

গাছ নয়, শ্বাসনালি কাটছে ওরা by শেখ রোকন

যে কারণেই হোক, রাজনৈতিকভাবে যে পক্ষেরই হোক; 'আশরাফুল মাখলুকাত' মানুষের জানমালেরই যখন তোয়াক্কা করা হচ্ছে না, তখন গাছ নিয়ে উদ্বেগ কতটা সঙ্গত_ অন্ধ বিভাজনের শিকার এই সমাজে এমন প্রশ্ন তোলার লোকের অভাব নেই, বলা বাহুল্য। পাল্টা প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক যে সংকট সৃস্টি হয়েছে গাছ বলি দিয়ে কি তার সুরাহা মিলেছে? মহাসড়কে মহাসড়কে নির্বিচারে গাছ কেটে যে 'অবরোধ' সৃষ্টি করতে চেয়েছিল একটি গোষ্ঠী, তাও কি টিকিয়ে রাখতে পেরেছে?
স্বীকার করতে হবে, ক্রমবর্ধমান হারে বিসবুজায়নের এই দেশে কেবল রাজনৈতিক জিঘাংসাবশত গাছ কাটা হলো, এমন নয়। আমরা বেদনার সঙ্গে দেখে এসেছি, গাছ কাটতে ছলের অভাব হয় না। রাস্তাঘাট সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে 'উন্নয়ন' কর্মকাণ্ড বা নগরের 'সৌন্দর্য' বর্ধন, শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ছলে করাত উঁচিয়ে প্রস্তুত থাকে কিছু লোক। ইটভাটার খোরাক জোগাতে কিংবা পাহাড় কাটতে গিয়েও নির্বিচারে বন ধ্বংস হচ্ছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলো তো রক্ষক ও ভক্ষকদের যোগসাজশে বাইরে থেকে নিবিড় বনানী দেখা গেলেও ভেতরে ফোকলা হয়ে গেছে। এর মধ্যে মহাসড়ক ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির গাছগুলোই তুলনামূলক অক্ষত ছিল। এর একটি কারণ হচ্ছে, এসব বৃক্ষের টিকে থাকার সঙ্গে বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রশ্নটি জড়িত। তারাই দিন-রাত পাহারা দিয়ে কুড়ালের কোপ থেকে মহাসড়কের গাছগুলো টিকিয়ে রেখেছিল। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যে আমলেই হোক, মহাসড়কের গাছের প্রতি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালীদের লোলুপ দৃষ্টির ছাপও বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। দেখা গেছে, রাতের আঁধারে, এমনকি দিনের আলোতেও ঝপাঝপ কোপ দিয়ে গাছ নিয়ে উধাও তারা। ছায়াঘন সড়ক হঠাৎই ন্যাড়া, মুখব্যাদান করে পড়ে থাকে কাটা গাছের গুঁড়ি। বন বিভাগ, সড়ক ও জনপথ কিংবা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলের ছোট ও মাঝারি কর্তাদের 'বিধিমতো ব্যবস্থা' নেওয়ার আশ্বাসই সার। না মেলে গাছের হদিস, না পায় কেউ শাস্তি। কিন্তু এবার বিরোধীদলীয় জোটের হরতাল, অবরোধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ডাকা হরতাল-ধর্মঘট 'সফল' করতে গিয়ে যেভাবে নির্বিচারে মহাসড়কের গাছ কাটা হয়েছে, তা অতীতে কখনও দেখা গেছে কি?

এ বিষয়ে সমকালের ১৫ ডিসেম্বরের সম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃতি_ "বিরোধীদলীয় জোটের গত কিছু দিনের 'কর্মসূচি' যেন হয়ে উঠেছে বৃক্ষ নিধনের মচ্ছব। দিনের আলোতে বা রাতের অন্ধকারে উন্মত্ত কিছু গোষ্ঠী বহু যত্নে লালিত চারা থেকে বৃক্ষ হয়ে ওঠা গাছগুলো কয়েক মিনিটেই কেটে রাস্তায় ফেলছে। আমরা দেখেছি, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো যখন রাজধানীতে তাদের জমায়েত করেছিল, তখন এখানকার সড়কদ্বীপের লাবণ্যময় গাছগুলোও তাদের কঠোর করাত থেকে রেহাই পায়নি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারসাজিতে মহাসড়কের বৃক্ষবন ফোকলা হওয়ার অঘটন এ দেশে বিরল নয়; কিন্তু এমন কদমছাঁট কে কবে দেখেছে! সরেজমিন না দেখেও আশঙ্কা করা কঠিন নয় যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলে সবুজ নদীর আকার ধারণ করা আমাদের মহাসড়কগুলো এখন ন্যাড়া হয়েছে। সড়কের পাশে সামাজিক বনায়ন করে বাংলাদেশ বিশ্বে যে নজির সৃষ্টি করতে পেরেছিল, তা এখন বোধহয় অতীত।"

ঠিক কত গাছ কাটা হয়েছে বিরোধীদলীয় জোটের দেশব্যাপী প্রায় টানা অবরোধ ও খুচরা হরতালের দিনগুলোতে? সড়কে-মহাসড়কে বন বিভাগ ছাড়াও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রকল্পের গাছ রয়েছে। বলা বাহুল্য, গাছ-ঘাতকরা এসব বিচার করেনি। সামনে যা পড়েছে উন্মত্তের মতো কেটেছে। বন বিভাগের একটি হিসাবে জানা যাচ্ছে কমবেশি ১৫ হাজার। আমার ধারণা, সংখ্যাটা আরও বেশি। কতটা ব্যাপক তা গুগলের ইঞ্জিনে গিয়ে 'মহাসড়ক+অবরোধ+গাছ' লিখে সার্চ দিলেই বোঝা যায়। দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর প্রভৃতি 'বৃক্ষ বধ্যভূমি' তো আছেই; অন্তত ৩২টি জেলার নাম পাওয়া যাবে যেখানে মহাসড়কের গাছ নির্বিচারে কাটা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে যে চিত্র পেয়েছি, তাতে বিকট শঙ্কা ছাড়া আর কিছু জাগে না। দেখা যাচ্ছে, ৬৪টি জেলার মধ্যে মাত্র ১২টি জেলার গাছ দৃশ্যত অক্ষত থেকেছে। বাকি ৫২টি জেলার মহাসড়কজুড়ে গড়ে ওঠা বনাঞ্চল কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খতিয়ে দেখলাম, রংপুর বিভাগের আটটি জেলাতেই_ পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় মহাসড়কের গাছ কাটা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের দশাও তথৈবচ। রাজশাহী, চাঁপাইনবানগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ_ প্রত্যেকটি জেলার গাছ অবরোধকারীদের কোপানলে পড়েছে। ঢাকা বিভাগের পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল। মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এবং ঢাকা সদরের সাভার, দোহার প্রভৃতি এলকায় কিছু গাছ কাটা হয়েছে। বিস্ময়করভাবে এই বিভাগের ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর জেলায় গাছ কাটা পড়েনি। অন্তত সংবাদপত্রে খবর হওয়ার মতো মাত্রায় পেঁৗছেনি। খুলনা বিভাগেই রয়েছে চলতি অবরোধে মানুষ ও বৃক্ষ হত্যায় কুখ্যাতি পাওয়া সাতক্ষীরা অঞ্চল। তবে এর বাইরে খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, নড়াইল, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরেও কম গাছ কাটা পড়েনি। সেদিক থেকে এই বিভাগের মাগুরা জেলার গাছগুলো সৌভাগ্যক্রমে নিরাপদে ছিল। সিলেট বিভাগেরও সব ক'টি জেলার_ সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ_ গাছপালা কুড়াল-করাতের জিঘাংসা দেখেছে। বরিশাল বিভাগে বরগুনা ছাড়া বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, ভোলা, পিরোজপুরের গাছগুলোতে কোপ পড়েছে। বরিশাল বিভাগে বিরোধীদলীয় জোটের কর্মসূচি অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু যতটুকু হয়েছে, তাতে গাছ যে ছাড় পায়নি তা স্পষ্ট। চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এমনকি বান্দরবানেও গাছ কেটে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। অক্ষত ছিল রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি। তিন পার্বত্য জেলার গাছ কাটা পরিসংখ্যান থেকে পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে কর্মরত গবেষকরা এই অনুসিদ্ধান্তেও আসতে পারেন যে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসতি পরিবেশ ও সবুজের জন্য সহায়ক। যে কারণে সমতল থেকে যাওয়া সেটেলারের সংখ্যা যেখানে বেশি সেই বান্দরবানে গাছ নিরাপদ থাকেনি।
এভাবে নির্বিচারে গাছ কেটে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের যে কিছু করতে পারেনি, তা খুব সম্ভবত ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু এর হোতারা দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার যে ক্ষতি করলেন, তা অপূরণীয়। দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের যখন বেশি করে গাছ লাগানোর কথা, তখন আমরা রাতারাতি শত শত গাছ কেটে ফেললাম! অনেকে আশা করতেন, পরিবর্তিত জলবায়ুর যুগে বনাঞ্চলের পরিমাণ দেখিয়ে 'কার্বন-ট্রেড' ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সুবিধা করতে পারবে। কিন্তু গাছই যদি না থাকে, তাহলে সেই আশায় গুড়ে বালি! গাছ কাটার অঘটনগুলোর পর অনেকে যথার্থই সামাজিক বনায়নের সঙ্গে যুক্ত দেশের হাজার হাজার দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু অবরোধের চিত্রগুলো দেখলে, সংবাদ পড়লে বোঝা যায় বিভিন্ন স্থানের করাতকল থেকেও গাছের গুঁড়ি ছিনিয়ে বা চুরি করে সড়কে ফেলা হয়েছে, আগুন লাগানো হয়েছে। আহা কতজনের পুঁজি এভাবে অবরোধের উন্মাদনায় ফৌত হয়ে গেছে! নির্মম পরিহাস হচ্ছে, হাজার হাজার গাছ কেটে শেষ রক্ষা তো হয়ইনি_ বিরোধীদলীয় জোটকে ভবিষ্যতে যদি আবার অবরোধে নামতে হয়, 'প্রয়োজনীয়' গাছও আর পাবে না!
নির্মমতা ও নির্বুদ্ধিতার খতিয়ান দেখতে দেখতে প্রশ্ন জেগেছিল_ আর কিছু না হোক, মানুষের শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনেও যে গাছ প্রয়োজন, করাতধারী মূর্খরা তা কি জানে? এরা কি জানে যে মানুষের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে গাছের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। আমরা যে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করি, তা গাছ শোষণ করে অক্সিজেন ছাড়ে_ প্রাথমিক পর্যায়ের এই তথ্যটুকু কি তাদের কাছে আছে? এরা কি জানে যে গাছে নয়, তারা আসলে নিজ নিজ শ্বাসনালিতে করাত চালাচ্ছে?
আচ্ছা, গাছের অনুভূতি আবিষ্কারকারী বিশ্ববরেণ্য বঙ্গসন্তান জগদীশচন্দ্র বসুর নামও কি এরা জানে? অবশ্য যারা সাধারণ নাগরিকের বিড়ম্বনা বিবেচনা না করে দিনের পর দিন ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে; যারা যাত্রীবাহী বাস, লেগুনা এমনকি অটোরিকশার নারী-শিশুর আর্তি উপেক্ষা করে পেট্রোল বোমা মারছে বা অগি্নসংযোগ করছে; তাদের কাছে গাছের প্রাণ-অনুভূতির মূল্য কী? যারা অন্ধ ও সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থে মত্ত, তাদের কাছে পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ, সবুজের প্রয়োজনীয়তার কথা আক্ষরিক অর্থেই অরণ্য রোদন ছাড়া কী? আমরা কেবল বলতে পারি_ এদের জ্ঞান দাও প্রভু, এদের ক্ষমা কর!
শেখ রোকন : গবেষক ও সাংবাদিক
skrokon@gmail.com

গাছ নয়, শ্বাসনালি কাটছে ওরা by শেখ রোকন

যে কারণেই হোক, রাজনৈতিকভাবে যে পক্ষেরই হোক; 'আশরাফুল মাখলুকাত' মানুষের জানমালেরই যখন তোয়াক্কা করা হচ্ছে না, তখন গাছ নিয়ে উদ্বেগ কতটা সঙ্গত_ অন্ধ বিভাজনের শিকার এই সমাজে এমন প্রশ্ন তোলার লোকের অভাব নেই, বলা বাহুল্য। পাল্টা প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক যে সংকট সৃস্টি হয়েছে গাছ বলি দিয়ে কি তার সুরাহা মিলেছে? মহাসড়কে মহাসড়কে নির্বিচারে গাছ কেটে যে 'অবরোধ' সৃষ্টি করতে চেয়েছিল একটি গোষ্ঠী, তাও কি টিকিয়ে রাখতে পেরেছে?
স্বীকার করতে হবে, ক্রমবর্ধমান হারে বিসবুজায়নের এই দেশে কেবল রাজনৈতিক জিঘাংসাবশত গাছ কাটা হলো, এমন নয়। আমরা বেদনার সঙ্গে দেখে এসেছি, গাছ কাটতে ছলের অভাব হয় না। রাস্তাঘাট সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে 'উন্নয়ন' কর্মকাণ্ড বা নগরের 'সৌন্দর্য' বর্ধন, শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ছলে করাত উঁচিয়ে প্রস্তুত থাকে কিছু লোক। ইটভাটার খোরাক জোগাতে কিংবা পাহাড় কাটতে গিয়েও নির্বিচারে বন ধ্বংস হচ্ছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলো তো রক্ষক ও ভক্ষকদের যোগসাজশে বাইরে থেকে নিবিড় বনানী দেখা গেলেও ভেতরে ফোকলা হয়ে গেছে। এর মধ্যে মহাসড়ক ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির গাছগুলোই তুলনামূলক অক্ষত ছিল। এর একটি কারণ হচ্ছে, এসব বৃক্ষের টিকে থাকার সঙ্গে বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রশ্নটি জড়িত। তারাই দিন-রাত পাহারা দিয়ে কুড়ালের কোপ থেকে মহাসড়কের গাছগুলো টিকিয়ে রেখেছিল। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যে আমলেই হোক, মহাসড়কের গাছের প্রতি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালীদের লোলুপ দৃষ্টির ছাপও বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। দেখা গেছে, রাতের আঁধারে, এমনকি দিনের আলোতেও ঝপাঝপ কোপ দিয়ে গাছ নিয়ে উধাও তারা। ছায়াঘন সড়ক হঠাৎই ন্যাড়া, মুখব্যাদান করে পড়ে থাকে কাটা গাছের গুঁড়ি। বন বিভাগ, সড়ক ও জনপথ কিংবা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলের ছোট ও মাঝারি কর্তাদের 'বিধিমতো ব্যবস্থা' নেওয়ার আশ্বাসই সার। না মেলে গাছের হদিস, না পায় কেউ শাস্তি। কিন্তু এবার বিরোধীদলীয় জোটের হরতাল, অবরোধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ডাকা হরতাল-ধর্মঘট 'সফল' করতে গিয়ে যেভাবে নির্বিচারে মহাসড়কের গাছ কাটা হয়েছে, তা অতীতে কখনও দেখা গেছে কি?

এ বিষয়ে সমকালের ১৫ ডিসেম্বরের সম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃতি_ "বিরোধীদলীয় জোটের গত কিছু দিনের 'কর্মসূচি' যেন হয়ে উঠেছে বৃক্ষ নিধনের মচ্ছব। দিনের আলোতে বা রাতের অন্ধকারে উন্মত্ত কিছু গোষ্ঠী বহু যত্নে লালিত চারা থেকে বৃক্ষ হয়ে ওঠা গাছগুলো কয়েক মিনিটেই কেটে রাস্তায় ফেলছে। আমরা দেখেছি, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো যখন রাজধানীতে তাদের জমায়েত করেছিল, তখন এখানকার সড়কদ্বীপের লাবণ্যময় গাছগুলোও তাদের কঠোর করাত থেকে রেহাই পায়নি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারসাজিতে মহাসড়কের বৃক্ষবন ফোকলা হওয়ার অঘটন এ দেশে বিরল নয়; কিন্তু এমন কদমছাঁট কে কবে দেখেছে! সরেজমিন না দেখেও আশঙ্কা করা কঠিন নয় যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলে সবুজ নদীর আকার ধারণ করা আমাদের মহাসড়কগুলো এখন ন্যাড়া হয়েছে। সড়কের পাশে সামাজিক বনায়ন করে বাংলাদেশ বিশ্বে যে নজির সৃষ্টি করতে পেরেছিল, তা এখন বোধহয় অতীত।"

ঠিক কত গাছ কাটা হয়েছে বিরোধীদলীয় জোটের দেশব্যাপী প্রায় টানা অবরোধ ও খুচরা হরতালের দিনগুলোতে? সড়কে-মহাসড়কে বন বিভাগ ছাড়াও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রকল্পের গাছ রয়েছে। বলা বাহুল্য, গাছ-ঘাতকরা এসব বিচার করেনি। সামনে যা পড়েছে উন্মত্তের মতো কেটেছে। বন বিভাগের একটি হিসাবে জানা যাচ্ছে কমবেশি ১৫ হাজার। আমার ধারণা, সংখ্যাটা আরও বেশি। কতটা ব্যাপক তা গুগলের ইঞ্জিনে গিয়ে 'মহাসড়ক+অবরোধ+গাছ' লিখে সার্চ দিলেই বোঝা যায়। দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর প্রভৃতি 'বৃক্ষ বধ্যভূমি' তো আছেই; অন্তত ৩২টি জেলার নাম পাওয়া যাবে যেখানে মহাসড়কের গাছ নির্বিচারে কাটা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে যে চিত্র পেয়েছি, তাতে বিকট শঙ্কা ছাড়া আর কিছু জাগে না। দেখা যাচ্ছে, ৬৪টি জেলার মধ্যে মাত্র ১২টি জেলার গাছ দৃশ্যত অক্ষত থেকেছে। বাকি ৫২টি জেলার মহাসড়কজুড়ে গড়ে ওঠা বনাঞ্চল কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খতিয়ে দেখলাম, রংপুর বিভাগের আটটি জেলাতেই_ পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় মহাসড়কের গাছ কাটা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের দশাও তথৈবচ। রাজশাহী, চাঁপাইনবানগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ_ প্রত্যেকটি জেলার গাছ অবরোধকারীদের কোপানলে পড়েছে। ঢাকা বিভাগের পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল। মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এবং ঢাকা সদরের সাভার, দোহার প্রভৃতি এলকায় কিছু গাছ কাটা হয়েছে। বিস্ময়করভাবে এই বিভাগের ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর জেলায় গাছ কাটা পড়েনি। অন্তত সংবাদপত্রে খবর হওয়ার মতো মাত্রায় পেঁৗছেনি। খুলনা বিভাগেই রয়েছে চলতি অবরোধে মানুষ ও বৃক্ষ হত্যায় কুখ্যাতি পাওয়া সাতক্ষীরা অঞ্চল। তবে এর বাইরে খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, নড়াইল, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরেও কম গাছ কাটা পড়েনি। সেদিক থেকে এই বিভাগের মাগুরা জেলার গাছগুলো সৌভাগ্যক্রমে নিরাপদে ছিল। সিলেট বিভাগেরও সব ক'টি জেলার_ সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ_ গাছপালা কুড়াল-করাতের জিঘাংসা দেখেছে। বরিশাল বিভাগে বরগুনা ছাড়া বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, ভোলা, পিরোজপুরের গাছগুলোতে কোপ পড়েছে। বরিশাল বিভাগে বিরোধীদলীয় জোটের কর্মসূচি অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু যতটুকু হয়েছে, তাতে গাছ যে ছাড় পায়নি তা স্পষ্ট। চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এমনকি বান্দরবানেও গাছ কেটে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। অক্ষত ছিল রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি। তিন পার্বত্য জেলার গাছ কাটা পরিসংখ্যান থেকে পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে কর্মরত গবেষকরা এই অনুসিদ্ধান্তেও আসতে পারেন যে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসতি পরিবেশ ও সবুজের জন্য সহায়ক। যে কারণে সমতল থেকে যাওয়া সেটেলারের সংখ্যা যেখানে বেশি সেই বান্দরবানে গাছ নিরাপদ থাকেনি।
এভাবে নির্বিচারে গাছ কেটে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের যে কিছু করতে পারেনি, তা খুব সম্ভবত ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু এর হোতারা দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার যে ক্ষতি করলেন, তা অপূরণীয়। দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের যখন বেশি করে গাছ লাগানোর কথা, তখন আমরা রাতারাতি শত শত গাছ কেটে ফেললাম! অনেকে আশা করতেন, পরিবর্তিত জলবায়ুর যুগে বনাঞ্চলের পরিমাণ দেখিয়ে 'কার্বন-ট্রেড' ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সুবিধা করতে পারবে। কিন্তু গাছই যদি না থাকে, তাহলে সেই আশায় গুড়ে বালি! গাছ কাটার অঘটনগুলোর পর অনেকে যথার্থই সামাজিক বনায়নের সঙ্গে যুক্ত দেশের হাজার হাজার দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু অবরোধের চিত্রগুলো দেখলে, সংবাদ পড়লে বোঝা যায় বিভিন্ন স্থানের করাতকল থেকেও গাছের গুঁড়ি ছিনিয়ে বা চুরি করে সড়কে ফেলা হয়েছে, আগুন লাগানো হয়েছে। আহা কতজনের পুঁজি এভাবে অবরোধের উন্মাদনায় ফৌত হয়ে গেছে! নির্মম পরিহাস হচ্ছে, হাজার হাজার গাছ কেটে শেষ রক্ষা তো হয়ইনি_ বিরোধীদলীয় জোটকে ভবিষ্যতে যদি আবার অবরোধে নামতে হয়, 'প্রয়োজনীয়' গাছও আর পাবে না!
নির্মমতা ও নির্বুদ্ধিতার খতিয়ান দেখতে দেখতে প্রশ্ন জেগেছিল_ আর কিছু না হোক, মানুষের শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনেও যে গাছ প্রয়োজন, করাতধারী মূর্খরা তা কি জানে? এরা কি জানে যে মানুষের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে গাছের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। আমরা যে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করি, তা গাছ শোষণ করে অক্সিজেন ছাড়ে_ প্রাথমিক পর্যায়ের এই তথ্যটুকু কি তাদের কাছে আছে? এরা কি জানে যে গাছে নয়, তারা আসলে নিজ নিজ শ্বাসনালিতে করাত চালাচ্ছে?
আচ্ছা, গাছের অনুভূতি আবিষ্কারকারী বিশ্ববরেণ্য বঙ্গসন্তান জগদীশচন্দ্র বসুর নামও কি এরা জানে? অবশ্য যারা সাধারণ নাগরিকের বিড়ম্বনা বিবেচনা না করে দিনের পর দিন ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে; যারা যাত্রীবাহী বাস, লেগুনা এমনকি অটোরিকশার নারী-শিশুর আর্তি উপেক্ষা করে পেট্রোল বোমা মারছে বা অগি্নসংযোগ করছে; তাদের কাছে গাছের প্রাণ-অনুভূতির মূল্য কী? যারা অন্ধ ও সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থে মত্ত, তাদের কাছে পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ, সবুজের প্রয়োজনীয়তার কথা আক্ষরিক অর্থেই অরণ্য রোদন ছাড়া কী? আমরা কেবল বলতে পারি_ এদের জ্ঞান দাও প্রভু, এদের ক্ষমা কর!
শেখ রোকন : গবেষক ও সাংবাদিক
skrokon@gmail.com

Saturday, June 8, 2013

প্রাকৃতিক সম্পদ-এই সমুদ্র লইয়া কী করিব! by শেখ রোকন

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বহুল উদ্ধৃত বাক্যটিকে_ এই জীবন লইয়া কী করিব_ ব্যক্তিগত জীবনের বদলে সামষ্টিক সমুদ্রের ক্ষেত্রেও অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। কেবল আজ (৮ জুন) বিশ্ব মহাসাগর দিবসকে সামনে রেখেই নয়; ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেও প্রশ্নটি উঠতে পারে।

প্রাকৃতিক সম্পদ-এই সমুদ্র লইয়া কী করিব! by শেখ রোকন

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বহুল উদ্ধৃত বাক্যটিকে_ এই জীবন লইয়া কী করিব_ ব্যক্তিগত জীবনের বদলে সামষ্টিক সমুদ্রের ক্ষেত্রেও অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। কেবল আজ (৮ জুন) বিশ্ব মহাসাগর দিবসকে সামনে রেখেই নয়; ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেও প্রশ্নটি উঠতে পারে।

Sunday, January 20, 2013

নদীকৃত্য দিবস : জাতীয় নদী চাই by শেখ রোকন

আলতাব হোসেন, একরামুল হক শামীম, জায়েদ ইবনে আবুল ফজল, ফারহাত জাহান, মাহফুজুর রহমান মানিক রমাপ্রসাদ বাবু, শেখ রোকন, সাঈদ জুবেরী ও সিরাজুল ইসলাম আবেদ

Monday, January 7, 2013

মোটরসাইকেলের প্রথম আরোহী by শেখ রোকন

 এই লেখায় ব্যবহৃত আলোকচিত্রটি বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র 'দ্য মোটরসাইকেল ডাইরিজ' থেকে নেওয়া। মোটরসাইকেল চালক রডরিগো ডি লা সারনা যার ভূমিকায় ওই ছবিতে অভিনয় করেছেন, সেই আলবার্তো গ্রানাদো মার্চের পঞ্চম দিন কিউবার হাভানায় বয়সোচিত মৃত্যুবরণ করেছেন। স্ত্রী ও তিন পুত্র-কন্যা ছাড়াও তিনি রেখে গেছে ৮৮ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন।

Tuesday, January 1, 2013

রুদ্রপুর কত দূর? by শেখ রোকন

 নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত প্রায় পৌনে শতক পুরনো ভ্রমণ ম্যাগাজিন 'ট্রাভেল+লেজার' মাঝে মধ্যেই কৌতূহলোদ্দীপক নানা বিষয়ে ফিচার করে থাকে। যেমন বিশ্বের রোমান্টিকতম ৫১ হোটেল নিয়ে তারা যে ফিচারটি এখন হোমপেজে শীর্ষ আইটেম হিসেবে প্রদর্শন করছে, তা অনেককেই নিঃসন্দেহে আকৃষ্ট করবে।

Friday, December 28, 2012

উপকূলীয় বাঁধ-গড়তে দুইদিন ভাঙতে একদিন? by শেখ রোকন

 শিরোনামটি 'প্রেমের মরা জলে ডোবে না' শীর্ষক জনপ্রিয় লোকগীতির অংশ। গীতিকার এমন প্রেম করতে নিষেধ করেছেন যা গড়তে দুইদিন লাগলেও ভাঙতে মাত্র একদিনই যথেষ্ট।

Thursday, December 27, 2012

হিতে বিপরীত by শেখ রোকন

নেহরু-গান্ধী পরিবারের পুত্রবধূ মানেকা গান্ধীর কংগ্রেসবিরোধী তৎপরতা কীভাবে বিভিন্ন সময়ে ভারতের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারটির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, তা প্রায় সর্বজনবিদিত।

Tuesday, December 25, 2012

শেষ পর্যন্ত সোমেশ্বরীই by শেখ রোকন

 'এর নাম সোমেশ্বরী হলো কেন?'_ প্রশ্নটির মধ্য দিয়ে দলবদ্ধ নীরবতা ভেঙেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জায়েদ ইবনে আবুল ফজল। পহেলা বৈশাখের জ্যোৎস্না রাতে দুর্গাপুরের সঙ্গে বিরিশিরির সংযোগ স্থাপনকারী সেতুর ওপর আমরা দাঁড়িয়ে।

Sunday, December 23, 2012

বড় পরিবর্তনের ছোট্ট সূচনা by শেখ রোকন

চন্দ্রপৃষ্ঠে প্রথম পদক্ষেপটিকে নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং ব্যাখ্যা করেছিলেন মানবতার জন্য জাতির বৃহৎ উল্লম্ফন হিসেবে_ ওয়ান স্মল স্টেপ ফর আ ম্যান, আ জায়ান্ট লিপ ফর ম্যানকাইন্ড। এরপর চার দশকের বেশি সময় কেটে গেলেও সৌরজগতের দ্বিতীয় গ্রহ বা উপগ্রহে মানুষের আর পা রাখার সুযোগ হয়নি।

Wednesday, December 19, 2012

কূটনীতি-বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক এবং তিন দুয়োরানী by শেখ রোকন

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদীতে উভয় দেশের সীমানা চিহ্নিতকরণ মার্কার বা পিলার স্থাপনে সম্পূরক চুক্তি (সাপ্লিমেন্ট এগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষরের প্রস্তাব গত ১০ ডিসেম্বরের বৈঠকে অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা (সমকাল, ১১ ডিসেম্বর ২০১২)।

Saturday, December 8, 2012

এসব খুঁটির জোর by শেখ রোকন

দুই পাড়ে সীমানা পিলার বসিয়ে নদী রক্ষার আয়োজন খানিকটা অভিনবই বটে; কিন্তু যথেষ্ট বিলম্ব করে গাজীপুর জেলা প্রশাসন যেভাবে পিলার বসাচ্ছে, তা আরও অভিনব। শুকনো মৌসুমে এসে প্রায় তলানি দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির রেখা আর যাই হোক নদীর 'সীমানা' যে হতে পারে না,

Thursday, December 6, 2012

ব-দ্বীপ বর্ম by শেখ রোকন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্থির সাগরের ছোবল থেকে উপকূলীয় শহর কীভাবে রক্ষা পেতে পারে_ প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে সুপারস্টর্ম স্যান্ডিতে নিউইয়র্ক লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ার পর। এ নিয়ে গত সপ্তাহের টাইম সাময়িকীতে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।

Thursday, November 29, 2012

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-ঘরের বাইরে যেতেই হবে by শেখ রোকন

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সর্বশেষ (১২ নভেম্বর ২০১২) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার বাংলা ভাবার্থ রবীন্দ্রনাথ থেকে ধার করা যায়। মিয়ানমার :স্টর্ম ক্লাউডস অন দ্য হোরাইজন_ 'কালি-মাখা মেঘে ওপারে অঁাঁধার'।

Sunday, November 18, 2012

দুর্যোগ-নাম না জানা এক ঝড়ের কবলে by শেখ রোকন

এটা ঠিক, প্রায় এক মাস আগে, গত ১০ অক্টোবর গভীর রাতে উপকূলীয় পাঁচ জেলা_ ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়টিরও নাম খুঁজে পায়নি সংবাদমাধ্যম; কিন্তু ক্ষুদ্র এই নিবন্ধের উপজীব্য অন্য এক ঝড়। নামহীন, নির্দিষ্ট গতিবেগহীন ও অভিমুখহীন এক ধূসর ঝড়।

Saturday, November 17, 2012

ডাক দেয় হিজল-করচ by শেখ রোকন

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায়_ সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া_ কমবেশি বত্রিশ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত হাওরাঞ্চলের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথাই মনে পড়ে।