Friday, July 17, 2026

ইরানের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ায় ইসরায়েল-সম্পৃক্ত গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হন ভ্যান্স

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধ অবসানে সম্ভাব্য চুক্তির বিরুদ্ধে মার্কিন জনমত গড়ে তুলতে ইসরায়েল সরকারের কিছু সদস্য প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। গত বুধবার মার্কিন পডকাস্টার জো রোগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স এ কথা বলেছেন।

ওই সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের কড়া সমালোচনা করেন।

যুদ্ধ বন্ধে গত মাসে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘ইসরায়েল সরকারের কিছু সদস্য চান সামরিক অভিযান চলুক। তাই তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তির পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’

ভবিষ্যতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা ভ্যান্স এর আগেও ইসরায়েলের সমালোচনা করেছেন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জো রোগানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যে চুক্তির জন্য কাজ করছিলাম, সেটি ভেস্তে দিতে বিদেশি অর্থায়নে প্রচার চালানো হচ্ছে, যাতে জনমত চুক্তির বিরুদ্ধে যায়।’

টাইম সাময়িকীতে সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন ভ্যান্স। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ সম্পর্কে মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করতে ইসরায়েলের পক্ষে ডিজিটাল প্রচার চালানোর জন্য ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচার শিবিরের সাবেক এক ব্যবস্থাপককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

ভ্যান্স বলেন, আলোচনা ও চুক্তি ভন্ডুল করার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত গোপনে এবং বিপুল অর্থায়নে প্রচারণা চালানো হয়েছে।

ভ্যান্স মনে করেন, ইসরায়েলি সরকারের ভেতরে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করে অনির্দিষ্টকাল ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান।

ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক প্যাটি কালহেন বলেন, ভ্যান্স যে ইসরায়েল-সম্পৃক্ত প্রচারণার কথা বলেছেন, তার মূল লক্ষ্য সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) সমর্থকদের প্রভাবিত করা। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল-নীতি নিয়ে এই সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমেই মতভেদ বাড়ছে।

কালহেন মনে করেন, এ কারণেই ভ্যান্স জো রোগানের পডকাস্টে গিয়েছেন। জো রোগান যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় পডকাস্টারদের একজন। বিশেষ করে ‘মাগা’র সমর্থক তরুণদের মতামত গঠনে তাঁর বেশ প্রভাব রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়ায় ইসরায়েল-সম্পৃক্ত একটি গোষ্ঠী তাঁকেও ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছে।

ভ্যান্স বলেন, ‘দেশের জন্য প্রেসিডেন্ট যে আলোচনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন, আমি সেটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। আর সে কারণেই আমার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালানো হচ্ছে।’

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘মিত্র হোক বা প্রতিপক্ষ—সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ইসরায়েলও এমন চেষ্টা করে থাকে, এতে আমার আপত্তি নেই। তবে আমার উদ্বেগ তখনই, যখন এ ধরনের প্রভাব বিস্তারের প্রচারণা সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।’

ভ্যান্স গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির পক্ষেও কথা বলেছেন। যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে করা ওই চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলে ব্যাপক বিরোধিতা আছে।

তবে গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বেড়ে যাওয়ায় ওই শান্তি চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

ইসরায়েলের প্রভাব না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ ইরান যুদ্ধের সঙ্গে জড়াতো বলে তিনি মনে করেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তা–ই মনে করি।’

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের প্রভাবের বিষয়টি আলাদা। তবে প্রেসিডেন্ট দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এবং আমিও একমত, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরান-যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার বেশি প্রয়োজন

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ ক্রমবর্ধমান আক্রমণের এক চক্রে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় পক্ষই ঘোষণা করেছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো ও জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি আর কার্যকর নেই। যদিও উভয় পক্ষই আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে।

এদিকে এই আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান উভয় দেশকে হামলা বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, ‘স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নতির জন্য সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।’

প্রকাশ্য বিবৃতিতে উভয় দেশের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা সমঝোতায় আসতে কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার দাবি করেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে আছে ইরান; কিন্তু তেহরান যে চুক্তি মেনে চলবে, সে বিষয়ে তিনি আস্থা রাখেন না।

অন্যদিকে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ করছি। তাই আগের শান্তিচুক্তি মেনে চলার কোনো কারণ নেই।’

কিন্তু মাসব্যাপী এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য কি কোনো পক্ষেরই আছে?

ইরানের অবস্থা: দুর্বল অর্থনীতি ও ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক শক্তি

শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণেই নয় বরং দেশটির ওপর কয়েক দশক ধরে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণেও ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে। এখনো শক্তিশালী হলেও ইরানের সামরিক অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা

ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার শিকার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তেল রপ্তানিকে সংকুচিত করেছে, বৈশ্বিক অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করেছে এবং সম্পদ জব্দ হয়েছে। এর ফলে ইরানের মাথাপিছু জিডিপি ২০১২ সালের আট হাজার ডলার থেকে কমে ২০২৪ সালে পাঁচ হাজার ডলারে নেমে আসে। তেল রপ্তানি ২০১২ সালের দৈনিক ২২ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৫ সালে ১৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।

জুনে উভয় পক্ষ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করার সময়, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করে, ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। চুক্তির দিন ইরানের রিয়ালের মূল্য ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়। তবে, যুক্তরাষ্ট্র এই সপ্তাহে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা দেশটির দুর্বল অর্থনীতিতে একটি বড় আঘাত।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে আগ্রাসীভাবে পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখলেও, যুদ্ধের প্রথম পর্বে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সিএসআইএসের তথ্যমতে, ১ এপ্রিলের মধ্যে ইরান তার যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ৩০ শতাংশ এবং ড্রোন অস্ত্রের ৬০ শতাংশ শেষ করে ফেলেছে। বন্দর ও নৌযানসহ নৌ অবকাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতেও হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দিয়েছে।

আঞ্চলিক কূটনীতি


মার্চ ও এপ্রিলে ইরানের হামলার কারণে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক এমনিতেই টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। এখন পাল্টা হামলার কারণে তা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। ইরান ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছে যে তারা মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম পর্বের হামলায় সাধারণ মানুষও নিহত এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব ভূখণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং নিরাপত্তা তথ্য আদান-প্রদান করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংকট

ট্রাম্পের বড়াই সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে এবং তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার পর অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশ বেড়েছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হতো। ইরানের অবরোধের কারণে এই পথে তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার, পরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।

মধ্যবর্তী নির্বাচন

তেলের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে আমেরিকানদের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয় করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। এই সপ্তাহে প্রকাশিত ইউগভের জরিপ অনুযায়ী, ৫৭ শতাংশ মার্কিনি বিশ্বাস করেন, এটি একটি ভুল পদক্ষেপ ছিল।

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই যুদ্ধের প্রভাব রিপাবলিকান দলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তারা কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে আছে। কয়েকটি জরিপে ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাটরা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।

অস্ত্রের ঘাটতি

সিএসআইএসের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে। যদিও এখনো তা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল সাতটি যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই সেগুলোর মধ্যে অন্তত চারটির অর্ধেক মজুত শেষ হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্ত্রের মজুত আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। যদিও ট্রাম্প সম্প্রতি ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট ব্যবহার করে বেসরকারি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অস্ত্রের পেছনে শত শত কোটি ডলার ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ১৪ জন সেনাকে হারিয়েছে এবং ১৪ জুলাই পর্যন্ত আহত হয়েছেন ৪১৪ জন।

কোনো পক্ষ কি পিছু হটবে

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলম সালেহ আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক চাপ থাকলেও দেশটির নেতৃত্ব এই সংঘাতকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখে। তাই তারা সহজে নতি স্বীকার করবে না।

সালেহ বলেন, ইরানের অর্থনীতি অনেকটাই নিজস্ব উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। গত প্রায় ৪৭ বছর ধরে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও দেশটি টিকে থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ইরান নিজেকে দুর্বল হিসেবে পরিচিত করতে চায় না। তাই শুধু সামরিকভাবে কিছুটা দুর্বল পড়লেও তারা কোনো সমঝোতায় রাজি হবে না। অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইরান খুব দ্রুত আবার ড্রোন তৈরি শুরু করেছে। কোনো কোনো বিশ্লেষকের ধারণা, কয়েক মাসের মধ্যেই তারা আগের মতো ড্রোনের মজুত গড়ে তুলতে পারবে।

তার মতে, ‘কাজেই ইরান তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে কোনো চুক্তিতে রাজি হবে না। যতই অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ুক না কেন, ইরান কোনো আপোস করবে না। তাদের কাছে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।’

অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত নিয়ে যে উদ্বেগ আছে, তা ইরানের যুদ্ধের কারণে নয়; বরং ভবিষ্যতে চীনের মতো বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতকে ঘিরে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র খুব দ্রুত ব্যবহার হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে কোনো সামরিক সংঘাত হলে এসব অস্ত্রের প্রয়োজন হতে পারে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দুই পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল ও কঠিন।’

সালেহ বলেন, ‘চীন ও রাশিয়া দেখছে যে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও ইরানকে সহজে দমন করতে পারছে না। এতে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের মতো একটি মধ্যম শক্তিকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরান-যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার বেশি প্রয়োজন

হাতির জন্য কান্না by পল্লব মোহাইমেন

নিথর বঙ্গ বাহাদুর। ছবি: শফিকুল ইসলাম
ভারতের আসাম থেকে ভেসে আসা বন্য হাতিটির মৃত্যু সত্যিই কাঁদিয়েছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার মানুষকে।
‘হাতিটি যখন একেবারেই নিথর হয়ে গেল, তখন চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলাম।’ ১৮ আগস্ট ২০১৬ মুঠোফোনে যখন এ কথা বলছিলেন তখনো বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ ছিল সরিষাবাড়ীর দর্পণ থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আশরাফুল ইসলামের।

মো. মুকুল হোসেনের আবেগও থামে না। কামরাবাদ ইউনিয়নের সাবেক এই সদস্য বললেন, ‘মনে হলো আমার কোনো আত্মীয় মারা গেছে।’

ভারতের আসাম থেকে ভেসে আসা বন্য হাতিটির মৃত্যু সত্যিই কাঁদিয়েছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার মানুষকে। মুকুল ও আশরাফের কথা তো আলাদাই। ১১ আগস্ট প্রথম দফা যখন হাতিটিকে অজ্ঞান করা হয়, তখন সেটি কয়রা গ্রামের ডোবায় নেমে গিয়েছিল। প্রায় অচেতন হাতিটি তলিয়ে যাচ্ছিল। ভেটেনারি চিকিৎসক তপন কুমার দে হ্যান্ডমাইকে আহ্বান জানান এলাকার মানুষজনকে। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে যান মুকুল ও আশরাফুল।

সেদিনের কথা বলতে থাকেন মুকুল হোসেন, ‘হাতিটা যখন পড়ে গেল পানিতে, তখন প্রথমে নৌকা নিয়ে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। তারপর কলার ভেলা। কিন্তু কচুরিপানার কারণে কাছাকাছি যেতে পারি না। এরপর পানিতে নেমে পড়ি।’

প্রায় একই সময় পানিতে ঝাঁপ দেন আশরাফুল ইসলামও। ‘হাতিটি তখন অচেতন হলেও শুঁড় নাড়াতে পারছিল। একটা বাঁশের লাঠির (স্থানীয়ভাবে কোটা নামে পরিচিত) আগায় বড়শির মতো লোহা লাগিয়ে আমরা হাতির কান টানতে থাকি। শুঁড় যেহেতু নাড়াছিল, তাই ভয়ও করছিল। তারপরও আমি ডুব দিয়ে হাতির পায়ের নিচ দিয়ে দড়ি ঢুকিয়ে বুক আটকে ফেলি।’ দড়ি হাতির পিঠের ওপর দিয়ে বাইরে পাঠানো হলে শতাধিক মানুষ হাতিকে ডাঙায় তুলে দড়ি টানা শুরু করে। একপর্যায়ে হাতিটিকে ডাঙায় তোলা হয়। এরপর আমগাছের সঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা তখন হাতিটির নাম দেন ‘বঙ্গ বাহাদুর’।

পানিতে ডুব দিয়ে প্রায় অচেতন হাতিটির পায়ে রশি পরানোর কাজটা কিন্তু বেশ ঝুঁকিপূর্ণই ছিল। তারপরও কেন সেই ঝুঁকি নিলেন? আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘হাতিটির ওপর মায়া পড়ে গিয়েছিল। সরিষাবাড়ীতে ঢোকার পর থেকেই এই হাতির পেছনে রয়েছি। যখন দেখলাম হাতিটি তলিয়ে যাচ্ছে তখন আমি আর আমার মধ্যে ছিলাম না। আমি আর মুকুল মেম্বার সাঁতার দিলাম। ভয় ছিল শুঁড় দিয়ে যদি পানির নিচে জড়িয়ে ধরে! তারপরও আমাদের মনে হয়েছে যে করেই হোক হাতিটাকে বাঁচাতে হবে।’

শেষ পর্যন্ত অবশ্য মুকুল-আশরাফুলসহ শত শত গ্রামবাসী এবং বন বিভাগের উদ্ধারকর্মীরা মিলেও বাঁচাতে পারেনি বঙ্গ বাহাদুরকে। ১৬ আগস্ট ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে মারা যায় হাতিটি। প্রথম আলোর সরিষাবাড়ী প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম জানান, সেদিন সত্যিই শোকের গ্রামে পরিণত হয়েছিল কয়রা এলাকাটা। বরকত হাজী নামে এক ব্যক্তির জমিতে পড়েছিল, সেখানেই সমাহিত করা হয়েছে হাতিটিকে।

কিছুটা আক্ষেপের সুরে মুকুল হোসেন বললেন, ‘আমাদের কথা তো কেউ শোনে না। হাতির দুই পা একসঙ্গে চেপে বাঁধতে না করেছিলাম। আর ডিপ টিউবওয়েল থেকে পানি ছিটাতে চেয়েছিলাম হাতির ওপর।’ আশরাফুল বলেন, ‘বন বিভাগের কর্মকর্তাদের চেষ্টা ছিল, আন্তরিকতাও ছিল কিন্তু তাঁদের দক্ষতার অভাবটাই ছিল বেশি।’

২৮ জুন এই বুনো হাতিটি ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে ভেসে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। এরপর ২৭ জুলাই হাতিটি সরিষাবাড়ী উপজেলায় আসে। ৮ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় প্রতিনিধিদল ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা হাতিটিকে চেতনানাশক প্রয়োগ করে উদ্ধারের উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেন। ৯ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছিল উদ্ধার অভিযান। প্রায় ২০ দিন বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করায়, স্থানীয় মানুষদের মনে দাগ কেটেছিল বঙ্গ বাহাদুর। জীবন বাজি ধরে হাতি উদ্ধারেও নেমেছিলেন মুকুল-আশরাফুলের মতো মানুষেরা। আর তাই আজ হাতির জন্য কান্না এলাকাজুড়েই।
>>>২০ আগস্ট ২০১৬

৬৪ দিন সূর্য দেখবে না যুক্তরাষ্ট্রের যে শহর

২২ নভেম্বর ২০২৫ঃ যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহর একটানা কয়েক মাস অন্ধকারে ডুবে থাকবে। শহরটি হলো আলাস্কার উটকিয়াগভিক। এই শহরের বাসিন্দারা সূর্যকে বিদায় জানাচ্ছেন। কারণ, আগামী ৬৪ দিন তারা আর সূর্যালোক দেখতে পাবেন না। সেখানে শুরু হয়েছে বার্ষিক পোলার নাইট। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে আরও বলা হয়, পৃথিবীর অক্ষের ঢালু অবস্থানের কারণে ঘটে এই ঘটনা। ফলে উটকিয়াগভিক ২২ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সরাসরি সূর্যের আলো পাবে না। ফেয়ারব্যাঙ্কস থেকে প্রায় ৫০০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৪৪০০। চরম আবহাওয়ার সঙ্গে তারা বেশ পরিচিত। উটকিয়াগভিক শহরের পুরনো নাম ব্যারো।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্ব উত্তরে যেসব বসতি আছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম। এটি আলাস্কার নর্থ স্লোপ অঞ্চলে আর্কটিক মহাসাগরের কাছেই অবস্থিত। যদিও শহরটি দীর্ঘ অন্ধকার পার করবে, তবুও পুরোপুরি কালো অন্ধকার থাকবে না। বাসিন্দারা প্রতিদিন কিছু সময় সিভিল টুইলাইট দেখবেন। এটি ভোরের আগের মৃদু নীল আলো। সূর্যালোকের অনুপস্থিতির কারণে শহরের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাবে। কারণ দিনের তাপ আর পাওয়া যাবে না। পোলার নাইট আর্কটিক অঞ্চলের আবহাওয়া ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এটি পোলার ভর্টেক্স নামক ঠাণ্ডা বায়ুর ঘূর্ণাবর্ত গঠনে ভূমিকা রাখে। যা মাঝে মাঝে দক্ষিণ দিকে নেমে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে।

কঠোর আবহাওয়া সত্ত্বেও উটকিয়াগভিকের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। শহরের ওয়েবসাইট উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে, এখানে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পর্যন্ত রয়েছে। প্রতি বছর পৃথিবীর অক্ষ ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে থাকার কারণে সূর্য প্রায় দুই মাস দিগন্তের নিচে চলে যায়। ফলে উত্তর মেরুর কাছাকাছি এলাকাগুলো শীতকালীন সময় সূর্যালোক পায় না। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর তথ্যমতে, ২৩.৫ ডিগ্রির মধ্যে থাকা এলাকাগুলো পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যায়। ৭১.১৭ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত উটকিয়াগভিক পুরোপুরিই আর্কটিক বৃত্তের ভেতরে। ফলে এই চরম প্রাকৃতিক ঘটনা এখানে প্রতি বছরই ঘটে।

শহরের প্রায় ২৫ শতাংশ দিনে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির ওপরে ওঠে না এবং বরফ গলার মতো উষ্ণতা মাত্র ৩৭ শতাংশ সময় দেখা যায়। সেখানে শীতে টানা ৬০ দিনের বেশি অন্ধকার থাকে। গ্রীষ্মে প্রায় তিন মাস ধরে সূর্য অস্ত যায় না। শহরের মানুষ এই চরম আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। এমনকি এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বউত্তরের ফুটবল দলও রয়েছে- যারা ব্যারো হাই স্কুলে মৌসুমী খেলায় অংশ নেয়। উটকিয়াগভিক শহর পরবর্তী সূর্যোদয় দেখবে স্থানীয় সময় ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ দুপুর ১টা ২৩ মিনিটে, যা পোলার নাইটের সমাপ্তি ঘটাবে।

mzamin