Showing posts with label কলকাতা. Show all posts
Showing posts with label কলকাতা. Show all posts

Wednesday, August 19, 2026

কলকাতায় হোটেলে আগুন : স্ত্রী, সন্তান, শ্বশুরসহ কুষ্টিয়ার সাংবাদিকের মৃত্যু

ভারতের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তাঁদের মধ্যে আছেন এক সাংবাদিক, তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুর।

মৃত দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। ওই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), ছেলে শর্ণশীষ দত্ত (৩) ও শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬০) মারা গেছেন। চিকিৎসার জন্য ১৫ দিন আগে তাঁরা ভারতের কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন। আজ বুধবার তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ৯ ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার ওই চারজন ছিলেন।

সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯) কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার দিলীপ দত্তের ছেলে। আজ সকালে দিলীপ দত্ত ছেলে, পুত্রবধূ ও তাঁদের সন্তানের মৃত্যুর খবর পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ছেলের (দেবাশীষ) লাশের ছবি দেখেছেন।

দিলীপ দত্ত আজ দুপুরে প্রথম আলোকে জানান, দেবাশীষের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে ফাহিমাকে (৮) রেখে ৩ আগস্ট তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ভারতে যান। দুই দিন পর তাঁর শ্বশুরও কলকাতায় যান। প্রথমে তাঁরা কলকাতায় দুই দিন ছিলেন। এরপর স্ত্রী ও ছেলের চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরুতে যান। গত সোমবার রাত এগারোটায় উড়োজাহাজে করে কলকাতায় আসেন তাঁরা। সেখানে হোটেলে উঠেছিলেন। আজ সকালে দিলীপ দত্ত জানতে পারেন যে অগ্নিকাণ্ডে তাঁরা সবাই মারা গেছেন।

দেবাশীষের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আজ সকাল থেকে তাঁর বাড়িতে বন্ধু, সাংবাদিক ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেন। ছেলেকে হারিয়ে মা স্বপ্না দত্ত পাগলপ্রায়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আমার দেবা (দেবাশীষ) একটু পরই বাড়িতে আসবে। এত দেরি করছে কেন? রাতে বলেছিল, ব্যাগ গোছাচ্ছে। সকালেই রওনা দেবে বাড়ির উদ্দেশে।’

কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছেলে শর্ণশীষ দত্ত। ভারতে গিয়ে ৪ আগস্ট ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করেন দেবাশীষ দত্ত
কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছেলে শর্ণশীষ দত্ত। ভারতে গিয়ে ৪ আগস্ট ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করেন দেবাশীষ দত্ত। ছবি : দেবাশীষ দত্তের ফেসবুক থেকে

Friday, August 14, 2026

কলকাতার বহু মসজিদে জুমার আজান শোনা যায়নি, আতঙ্কে মুসলিমরা

পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। একসময় কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে জুমার দিন মসজিদে জায়গা না হলে রাস্তায় নামাজ পড়তেন অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিন্তু বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এখন সরাসরি মসজিদ থেকে মাইক খুলে নেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও সামনে আসছে। এর জেরে শুক্রবার কলকাতা ও সংলগ্ন বহু মসজিদে জুমার আজান শোনা যায়নি। আজানের ধ্বনি না পৌঁছানোয় বহু মুসল্লি ঠিকমতো নামাজেও যোগ দিতে পারেননি। সব মিলিয়ে চারদিকে এক অজানা আতঙ্ক ও হতাশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

এদিন কলকাতার পার্ক সার্কাসের এক ইমামের কণ্ঠে এই করুণ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। চরম অসহায়তার সুরে তিনি বলেন, ‘মাইক কেড়ে নিয়ে আমাদের ওপর নানাভাবে জুলুম করা হচ্ছে। আমরা সব সহ্য করব, কারণ আমাদের আর কিছু করার নেই। শনিবার (১৫ আগস্ট) আমাদের স্বাধীনতা দিবস। আমি সবাইকে অনুরোধ করছি, সবাই নিজের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করুন। না হলে এই সরকার মুসলমানদের গায়ে খুব সহজেই দেশদ্রোহীর তকমা সেঁটে দেবে।’ তার এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, রাজ্যের মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে বর্তমানে কতটা ভীতির সঞ্চার হয়েছে।

এরইমধ্যে মসজিদের মাইক খুলে নেওয়ার এই বিতর্কিত বিষয়টি গড়িয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে এ-সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি হয়। আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের লিখিত নোটিশ ছাড়াই শুধু মৌখিক নির্দেশে পুলিশের সহায়তায় রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার মসজিদের মাইক খুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেঞ্চের পুরোনো রায়ের প্রসঙ্গ টেনে সব মসজিদে পুনরায় মাইক লাগানোর অনুমতির আবেদন জানান। পাশাপাশি, ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে কেন এমন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি জানান, শুধু হুগলির চাঁপদানি থেকেই অন্তত ১০০টি মসজিদের পক্ষ থেকে এমন আবেদন আসতে পারে।

অন্যদিকে, রাজ্যের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল (এএজি) আদালতে এই মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে মাইক খোলার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি এবং কোন পুলিশ কর্মকর্তা এমন নির্দেশ দিয়েছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা নাম মামলাকারী দিতে পারেননি। এ ছাড়া, ৪ হাজার মাইক খোলার অভিযোগ উঠলেও কোনো ইমাম নিজে থেকে এগিয়ে এসে মামলা করেননি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এএজি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী নির্দেশ না দিয়ে রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হোক।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জানতে চান, ঠিক কোন জেলার কোন কোন মসজিদ থেকে মাইক খোলা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য আদালতে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, আজান দেওয়ার ক্ষেত্রে মাইক ব্যবহারের শব্দবিধি মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। আগামী ১৮ আগস্ট মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। তার আগে রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান জানানোর নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।

এই তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের আবহে গত সপ্তাহে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, সরকার কোনো নতুন আইন আনছে না; বরং ২০২০ সালের হাইকোর্টের নির্দেশিকাই কার্যকর করছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ধর্মীয় স্থান বলতে মন্দির ও মসজিদ—উভয়ই বোঝায় এবং সেই অনুযায়ী ৪২০০টি মসজিদ ও ১০৯৬টি মন্দির থেকে মাইক খোলা হয়েছে।

কিন্তু সরকারের এই পরিসংখ্যানে বিন্দুমাত্র আশ্বস্ত হতে পারছেন না সংখ্যালঘু সমাজ। তারা জানান, এই পদক্ষেপ আসলে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ার একটি সুকৌশলী প্রয়াস মাত্র। সব মিলিয়ে এক দমবন্ধ করা ভয়ের আবহে শনিবার স্বাধীনতা দিবস পালন করতে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা।

কলকাতার বহু মসজিদে জুমার আজান শোনা যায়নি, আতঙ্কে মুসলিমরা

Monday, July 27, 2026

কলকাতায় ৬৫৩ বছরের পুরোনো মসজিদে পূজার আয়োজন

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মসজিদ ভাঙা কিংবা মসজিদের মধ্যে মন্দিরের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে প্রতিনিয়তই বিদ্বেষ বাড়ছে। দেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এই বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে। সম্প্রতি কলকাতার পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার পান্ডুয়া এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদকে ঘিরে হিন্দুত্ববাদীরা তাদের দাবিকে আরো তীব্র করেছে। তাদের দাবি আদিনা মসজিদ নাকি আদিনাথের প্রাচীন শিবমন্দির—আর এই দাবিকে কেন্দ্র করে মসজিদটির কাছাকাছি এলাকায় শিবপূজা ও রুদ্রাভিষেকের আয়োজন করা হয়েছে।

সোমবার প্রায় ৬৫৩ বছরের পুরোনো এই স্থাপনার ৫০ মিটারের মধ্যে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সেখানে আদিনাথের রুদ্রাভিষেকের (হিন্দু ধর্মে দেবাদিদেব মহাদেবের পবিত্র মন্ত্রপাঠ সহকারে জল ও পঞ্চামৃত দিয়ে শিবলিঙ্গ স্নান করানোর একটি বিশেষ পূজা) আয়োজন করা হয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিজেপির রাজারহাটের বিধায়ক তরুণজ্যোতি তেওয়ারি আদিনা মসজিদকে আদিনাথ মন্দির হিসেবে দাবি করলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সিকান্দর শাহ আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন। তবে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে স্থাপনাটির বিভিন্ন কারুকাজে শিবসহ হিন্দু দেবদেবীর নিদর্শন রয়েছে—এমন দাবি তুলে একাংশের মানুষ এটিকে প্রাচীন আদিনাথ শিবমন্দির বলে দাবি করে আসছেন।

এ নিয়ে বর্তমানে আদালতেও মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মসজিদের নিকটবর্তী এলাকায় শিবপূজার আয়োজনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ উপলক্ষে আশপাশের এলাকাও সাজসজ্জা করা হয়েছে।

আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা কাজল গোস্বামীর দাবি, স্থাপনাটির বিভিন্ন কারুকাজে আদিনাথ ও অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। তার ভাষ্য, এটি মূলত একটি প্রাচীন শিবমন্দির, যা পরবর্তীতে মসজিদে রূপান্তর করা হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও একই ধরনের দাবি করে বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় শিব ও দুর্গার মূর্তি উদ্ধার হয়েছে। তাই তারা স্থাপনাটিকে মন্দির হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।

আদিনাথ শিব মন্দির ও মেলা কমিটির পক্ষ থেকে কাজল গোস্বামী আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। আদালতের নির্দেশনা মেনে ভবিষ্যতে শিবলিঙ্গ নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে স্থাপনাটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই)-এর অধীনে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, স্তম্ভটিকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের একটি অন্যতম বিষয় হলো এর কিছু ব্যাসল্ট পাথরের দেয়াল ও দরজায় খোদাই করা হিন্দু চিত্রকলার উপস্থিতি।

স্থাপত্য ইতিহাসবিদরা সাধারণত এই খোদাইগুলোকে পূর্ববর্তী কাঠামোর উপকরণ পুনঃব্যবহারের ফল বলে মনে করেন—যা মধ্যযুগীয় নির্মাণে একটি সাধারণ রীতি ছিল—অন্যদিকে পণ্ডিতরা স্মৃতিস্তম্ভটিকে ইসলামি ও দেশীয় স্থাপত্য ঐতিহ্যের সংশ্লেষণ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

তবে, পুনঃব্যবহৃত উপকরণগুলোর সঠিক উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদ এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

নতুন করে আন্দোলন জোরদার হওয়ায় জেলা প্রশাসন স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।

যদিও হিন্দু সংগঠনটি জানিয়েছে যে এ বছরের আচার-অনুষ্ঠান নিকটবর্তী মন্দিরেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং স্মৃতিস্তম্ভটির ওপর ভবিষ্যতের যেকোনো দাবি শুধুমাত্র বিচারিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই উত্থাপন করা হবে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও শতবর্ষী আদিনা মসজিদকে প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, ধর্ম ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এক বিতর্কিত আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গ শাসন করছে, তাই এই বিবাদটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে পরস্পরবিরোধী বয়ান জনমতকে প্রভাবিত করে চলেছে।

ওই স্থানে প্রস্তাবিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মালদা জেলা পুলিশও একটি জনবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে জনগণকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই স্মৃতিস্তম্ভটি ১৯৫৮ সালের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও ধ্বংসাবশেষ আইনের অধীনে সুরক্ষিত। এতে সতর্ক করা হয়েছে যে, অনুমতিবিহীন ধর্মীয় কার্যকলাপ আয়োজন বা এই সুরক্ষিত কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনার চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতেরও পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে আদিনাথ শিবমন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে আদিনা মসজিদের ঐতিহাসিক পরিচয় ও মালিকানা নিয়ে বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।

কলকাতায় ৬৫৩ বছরের পুরোনো মসজিদে পূজার আয়োজন
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মালদা জেলার পান্ডুয়া এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত।

Thursday, June 11, 2026

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত ও আটককেন্দ্রে দুর্দশাগ্রস্ত কথিত ৪৭১ বাংলাদেশি

ভারতে এখন চরম বিপদের মুখে পড়েছেন কথিত বহু বাংলাদেশি নাগরিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের ধরে নিয়ে বিভিন্ন ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটককেন্দ্রে রাখছে। আবার কাউকে আটকে থাকতে হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী অঞ্চল, অর্থাৎ ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট সীমান্তবর্তী এলাকায় কথিত অনুপ্রবেশকারীদের ভিড় বাড়ছে। প্রশাসনিক কর্তারা জানিয়েছেন, বসিরহাটের বিথারী-হাকিমপুর পঞ্চায়েত এলাকার হাকিমপুর চেকপোস্টে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮২ জন কথিত বাংলাদেশি নাগরিক সে দেশে ঠেলে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। বাদুড়িয়া ও স্বরূপনগর এলাকার তিনটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ সব মিলিয়ে ৪৭১ জন কথিত বাংলাদেশি নাগরিককে আটকে রাখা হয়েছে।

আটক এই মানুষদের সিংহভাগই অত্যন্ত সাধারণ শ্রমজীবী শ্রেণির। ভারতের সংবাদমাধ্যমের দাবি, অভাবের তাড়নায় বা ভালো কাজের লোভে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নানা সীমান্ত এলাকা দিয়ে দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। অনুপ্রবেশের পর তাঁরা কেবল পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, কাজের খোঁজে ছড়িয়ে পড়েছিলেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও।

বর্তমানে বাদুড়িয়া ও স্বরূপনগরের ওই তিনটি আটককেন্দ্রে থাকা ৪৭১ জনের সঠিক নাম, পরিচয় ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার কাজ চলছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) আধিকারিকেরা আটক ব্যক্তিদের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) থেকে শুরু করে যাবতীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন।

বিএসএফ সূত্রকে উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ সঠিক ও নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে না।

পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়, আটককেন্দ্রের বন্দিদশা স্বস্তির না হলেও সেখানে থাকা শিশু, নারী ও পুরুষদের মানবিক দিকটি বিবেচনা করছে প্রশাসন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তাঁদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা, নিয়মিত খাওয়াদাওয়া ও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করা হচ্ছে, যাতে নিজ দেশে ফেরার আগে তাঁদের বড় ধরনের কোনো শারীরিক বা মানসিক অসুবিধা না হয়। পাশাপাশি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আটককেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্তরে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি সরকার দেশের সীমান্তগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাড়তি নজর দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কথিত অনুপ্রবেশ নিয়ে আরও বেশি শোরগোল শুরু করেছে এবং কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বলে অনেক মানুষকে ধরপাকড় করছে, যাঁদের বেশির ভাগই মুসলিম। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের ২ হাজার ২০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ দ্রুত শেষ করতে বিএসএফের হাতে জমি তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাজ্যের প্রশাসনিক বৈঠকেও কথিত অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নিজের কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের কথা বারবার বলছেন উগ্রপন্থী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর। ছবি: এএফপি

Sunday, March 22, 2026

কলকাতার মুসলিম এলাকায় জমজমাট ইফতারির বাজার by অমর সাহা

পবিত্র রমজান মাস চলছে। রোজা ঘিরে এখন কলকাতায় বিশেষ করে মুসলিম এলাকায় ইফতারির বাজার জমে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী নানা বাহারি খাবার আর ফলমূল থাকছে কলকাতার ইফতারির বাজারে।

কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বরাবরই ইফতারির বাজার জমজমাট থাকে। তবে দুই বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে ভিসা ইস্যু এক রকম বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় পর্যটক আসা একদম কমে গেছে। এতে কলকাতা ইফতারির বাজারে কিছুটা ভাটার টান চলছে।

অবশ্য কলকাতার মুসলিম এলাকার ব্যবসায়ীরা আশায় আছেন, এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পার্ক সার্কাস এলাকার ইফতারির দোকানদার আফতাব আহমেদ বলেছেন, এটা সাময়িক। বাংলাদেশি পর্যটকদের আসা শুরু হলে আবার ভিড় জমবে কলকাতার ইফতারির বাজারে।

এখন মেডিক্যাল ভিসায় আসা হাতেগোনা কিছু পর্যটকের দেখা মিলছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে নিউমার্কেটে এক বাংলাদেশি পর্যটক আশা প্রকাশ করে বলছিলেন, ভিসা সমস্যা অচিরেই কেটে যাবে। আবার চলবে দুই দেশের মধ্যে ট্রেন ও বাস পরিষেবা। ফিরে আসবে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সুদিন।

তবে কলকাতার বাংলাদেশি ক্রেতাদের পছন্দের জায়গা হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। প্রতিবছরই বহু বাংলাদেশি ঈদের কেনাকাটা করতে কলকাতায় আসেন। থাকেন কলকাতার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে। কলকাতার ইফতারির বাজার থেকে নানা ইফতারি কেনেন। অনেকে বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে ইফতার করেন। বাংলাদেশি পর্যটক না থাকায় ওইসব এলাকায় ইফতারির বাজারের জৌলুশ অনেকটা কমে গেছে।

কলকাতার নিউমার্কেট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, এসএন ব্যানার্জি রোড, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড, বড়বাজার—এসব এলাকায় পবিত্র রমজানে ইফতারির বাজার জমজমাট থাকে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। নিউমার্কেট, জাকারিয়া স্ট্রিটের নাখোদা মসজিদ–সংলগ্ন ইফতারির বাজার, ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদ–সংলগ্ন ইফতারির বাজার আর জাকারিয়া স্ট্রিট, পার্ক সার্কাসের ইফতারির বাজার বেশ জমজমাট। গ্রাহকেরা কিনে নিচ্ছেন হরেক রকম ইফতারি।

ইফতারির বাজারে ব্যবসায়ীরা ফলমূল থেকে মাংসের নানা পদ, পেঁয়াজু, জিলাপিসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের পসরা সাজিয়েছেন। এখানে মিলছে ইফতারির নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার। বাড়িতে রান্নার ঝামেলা না করে অনেকেই কিনে নিচ্ছেন বাজার থেকে ইফতারির নানা পদ।

সবকিছুর পরও বাংলাদেশি পর্যটকদের নিয়ে আফসোসটা রয়েই যাচ্ছে কলকাতার ব্যবসায়ীদের। ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদ–সংলগ্ন ইফতারির বাজারের ব্যবসায়ী মুক্তার খান বলছিলেন, ‘এখন বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। আমরা আশা করি, এই সরকারের আমলে ফের কলকাতার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসবে। ইফতারির বাজার জমজমাট হবে।’

নিউমার্কেটের ফুটপাতের ব্যবসায়ী আজাদ বলেছেন, ‘আমরা নতুন করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছি। মনে করছি, আবার জমজমাট হবে কলকাতার ঈদ ও ইফতারির বাজার।’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, জাকারিয়া স্ট্রিট
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, জাকারিয়া স্ট্রিট। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

Saturday, January 10, 2026

তৃণমূলের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আই–প্যাকে ইডির তল্লাশির প্রতিবাদে মমতার নেতৃত্বে কলকাতায় বিক্ষোভ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী পরামর্শক সংস্থা আই–প্যাকের কলকাতার কার্যালয় ও প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার প্রতীক জৈনর বাসভবনে তল্লাশি চালানোর প্রতিবাদে তৃণমূল সভানেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে আজ শুক্রবার কলকাতায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের চাঞ্চল্যকর কয়লা দুর্নীতি মামলাকে কেন্দ্র করে গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) প্রতীক জৈনর বাসা ও আই–প্যাকের কার্যালয়ে তল্লাশি চালায়।

ওই ঘটনার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল কলকাতার যাদবপুরের এইট–বি বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ কলকাতার হাজরা মোড়ে শেষ হয়। যাদবপুর এইট–বি বাসস্ট্যান্ড থেকে হাজরা মোড়ের দূরত্ব প্রায় সাত কিলোমিটার। এই প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

বেলা তিনটায় প্রতিবাদ মিছিল শুরুর আগে মমতা দাবি করেন, তল্লাশির নামে ইডি গতকাল আই–প্যাকের দপ্তর ও কর্ণধারের বাসভবন থেকে তৃণমূলের বহু নথি নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, ওই দুই দপ্তর থেকে চুরি হওয়া নথি যেন আদালত সংরক্ষণ করে রাখে।’ পরে প্রতিবাদ মিছিল শেষে হাজরা মোড়ে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় মমতা বলেন, ‘ইডি আমাদের আসন্ন বিধানসভার ভোট–সংক্রান্ত নথি চুরি করে নিয়ে গেছে।’

ইডি দাবি করেছে, তারা আই–প্যাক দপ্তরে গিয়ে কোনো নথি বা নথির কোনো কপি সংগ্রহ করতে পারেনি। তল্লাশির সময়ও কোনো নথি নিয়ে যায়নি; বরং তাদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী কার্যত ওই দুই দপ্তর থেকে মূল্যবান নথি নিয়ে গেছেন।

এসব ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতা হাইকোর্টে দুটি পৃথক মামলা করা হয়েছে। আজ মামলার শুনানির কথা ছিল। তবে শুনানির সময় উভয় পক্ষ আদালতের এজলাসে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ এই মামলার শুনানি ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছেন।

যদিও ইডি আজ কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে এক আবেদনে এই মামলার শুনানি আজই করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে তারা এই মামলা অবিলম্বে সিবিআই দিয়ে তদন্ত করার দাবিও তোলে। সেই আবেদনে প্রধান বিচারপতি সাড়া দেননি।

ইডির তল্লাশির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিবাদ মিছিলে নেতা–কর্মীদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ৯ জানুয়ারি, ২০২৬
ইডির তল্লাশির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিবাদ মিছিলে নেতা–কর্মীদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

Friday, January 9, 2026

জানুয়ারিতে কলকাতায় স্মরণকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা, দার্জিলিংয়ে ১.৩ ডিগ্রি

প্রকাশ ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ঃ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় আজ মঙ্গলবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে হয়েছে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জানুয়ারি মাসে এটিই কলকাতায় শীতের সর্বকালীন রেকর্ড বলে কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

কলকাতায় জানুয়ারি মাসে এমন শীত আগে কখনো পড়েনি। পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো স্থানে তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে।

আজ মঙ্গলবারও কলকাতাসহ শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় ঘন কুয়াশা ছিল। ছিল মেঘলা আকাশ। আরও ছিল উত্তুরে হাওয়া।

পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি জনপদ দার্জিলিংয়ের সর্বনিম্ন¤তাপমাত্রা গতকাল সোমবার ছিল ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর আজ এই রাজ্যের আট জেলায় শৈত্যপ্রবাহের আগাম সতর্কতা জারি করেছে। জেলাগুলো হলো দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ ও পশ্চিম বর্ধমান।

তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরবঙ্গে তুষারাপাতের আশঙ্কার কথা বলেছে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর। বলা হয়েছে মানেভঞ্জন, সান্দাকফু, ঘুমসহ পাহাড়ের উঁচু এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ চলবে। আর উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘনকুয়াশা থাকবে। মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা থাকবে; পাশাপাশি সাগরদ্বীপ, দীঘা, ডায়মন্ডহারবারসহ উপকূল এলাকায় কুয়াশার দাপট বাড়বে। আবহাওয়া দপ্তর আরও জানিয়েছে, ২১ দিন ধরে এই রাজ্যে স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে তাপমাত্রা।

এদিকে কলকাতাসহ এই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। যানবাহন কমেছে। ট্রেন চলাচলে কুয়াশা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তীব্র ঠান্ডাকে মাথায় নিয়ে চাকরিজীবীরা সকাল থেকে ছুটছেন কর্মস্থলে। তবে হাটবাজারে ক্রেতা কম। অনেক ব্যবসায়ী তীব্র শীতে দোকানপাট খোলেননি। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় কাঠ আর গাড়ির টায়ার পুড়িয়ে শীতকে সামাল দিচ্ছেন অনেকে। স্কুল–কলেজেও শীতের কারণে অনেকেই স্কুলমুখী হয়নি। বাস, ট্রেন, উড়োজাহাজসহ অন্যান্য যান চলাচলে এই প্রচণ্ড শীতের পাশাপাশি ঘন কুয়াশা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দিল্লির আবহাওয়া দপ্তরও সতর্কতা জারি করে বলেছে, দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড় ও রাজস্থানে শৈত্যপ্রবাহ বইবে। জারি করা হয়েছে সতর্কতা। বিহার, ঝাড়খন্ড, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখন্ডে তীব্র ঠান্ডার আভাস দেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি ওডিশা, দিল্লি ও মধ্যপ্রদেশে ঘনকুয়াশা থাকার আভাস দিয়েছে।

শীতে জড়সড় হয়ে একদল ব্যক্তি আগুনের তাপ নিচ্ছে। ৬ জানুয়ারি, কলকাতা
শীতে জড়সড় হয়ে একদল ব্যক্তি আগুনের তাপ নিচ্ছে। ৬ জানুয়ারি, কলকাতা ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

Wednesday, November 19, 2025

রায়ের দিন কলকাতায় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের মিটিং

টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টঃ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) রায় ঘোষণার প্রেক্ষিতে কলকাতার একটি স্থানে মিটিং করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। সেখান থেকে আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ‘আওয়ামী নেতাস ইন এক্সাইল প্লান স্টেয়ার ইন বাংলা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা লিখেছে ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া। তবে কলকাতার কোথায়, কোন ঠিকানায় ওই মিটিং হয়েছে তা জানায়নি পত্রিকাটি। সোমবার কেন্দ্রীয় কমিটির ওই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন দলটির এমন একজন সিনিয়র নেতা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় সম্পর্কে বলেছেন- ৫ই আগস্টের পর থেকে এটা নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে ক্ষমতাসীনরা উন্মুখ হয়ে আছেন। তাই এ সময়ে তারা বিচারবিভাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ওদিকে সোমবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আপডেট পাওয়ার জন্য খবরের চ্যানেল এবং নিউজ পোর্টালগুলোতে আঁঠার মতো লেগে ছিলেন। সন্ধ্যায় তিনি একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিকেল নাগাদ আদালতের রায় নিউজ চ্যানেল এবং অনলাইন নিউজ প্লাটফরমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া গণঅভ্যুত্থানকে নিয়ন্ত্রণে নিতে ঢাকায় শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে আদালত তাকে অভিযুক্ত করে। ওবায়দুল কাদের আদালতের রায়কে ‘একটি ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারের নামে প্রহসন’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি আদালতের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দাবি করেন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে মিথ্যা অভিযোগে এই মামলা করা হয়েছে। তিনি রায়কে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এতে আমরা বিস্মিত নই। সোমবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা এই বিচার ও রায়কে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে দেখেন বলে বলা হয় রিপোর্টে।

তাতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের কাছ থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন শেখ হাসিনা। এ জন্য তার বিরুদ্ধে এই প্রতিশোধ। কেন্দ্রীয় কমিটির ওই নেতা আরও বলেন, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে এবং তার পক্ষে আমরা যেসব আইনজীবীকে প্রস্তাব করেছিলাম তাদের কাউকে আদালতে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি না দেয়ার মাধ্যমে বিচার হয়েছে। তার আত্মরক্ষার অধিকার সমুন্নত রাখা হয়নি। এই নেতা আদালত গঠনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, শিগগিরই যমুনামুখী মার্চ করার জন্য আমরা আমাদের নেতার সঙ্গে আলোচনা করবো এবং তার অনুমতি চাইবো। দেশে গণতন্ত্র ফেরাতে এটা হবে অত্যন্ত কঠোর এক আন্দোলন।

জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া
ওদিকে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর (ওএইচসিএইচআর) সব পরিস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভে পরিণত হয়, যা জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী সহিংসভাবে দমন করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের পর দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। জাতিসংঘ-নেতৃত্বাধীন এক তদন্তে পাওয়া গেছে যে, গত বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে প্রায় ১৪০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক শিশু ছিল। বিচারের রায়কে ‘ভুক্তভোগীদের জন্য একটি মুহূর্ত’ আখ্যায়িত করে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ।

ওএইচসিএইচআর এ রায়কে ‘গত বছরের বিক্ষোভ দমনকালে সংঘটিত গুরুতর লঙ্ঘনের ভুক্তভোগীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে ওএইচসিএইচআর আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে বাংলাদেশি প্রশাসন ক্রমবর্ধমান সহিংস পদ্ধতিতে বিক্ষোভ দমনে পদ্ধতিগতভাবে চেষ্টা করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফোলকার তুর্ক বলেন, ‘আমরা যে সাক্ষ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, তা রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে গুরুতর রূপগুলোর মধ্যে পড়ে এবং যা আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।’

অ্যামনেস্টি যা বলেছে
ওদিকে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেছেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের সময় যেসব ভয়াবহ লঙ্ঘন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তাদের জন্য যারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী, তাদের অবশ্যই স্বাধীন ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু এই বিচার ও রায় কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়। ভুক্তভোগীদের প্রয়োজন ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা, অথচ মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি চূড়ান্ত নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অপমানজনক শাস্তি, এবং কোনো বিচার প্রক্রিয়ায় এর স্থান নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে ১৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন। বেঁচে থাকা ব্যাক্তি ও নিহতদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসম্পন্ন বিচার প্রক্রিয়া। কিন্তু এর পরিবর্তে এই বিচার হয়েছে এমন একটি আদালতে, যাকে দীর্ঘদিন ধরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্বাধীনতার অভাব ও অন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার জন্য সমালোচনা করে আসছে। তাছাড়া, অনুপস্থিতিতে এই নজিরবিহীন দ্রুত বিচার ও রায় এতো বড় ও জটিল মামলায় যথাযথ সুষ্ঠু বিচারের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। শেখ হাসিনাকে আদালতনিযুক্ত আইনজীবী দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করানো হলেও আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতির সময় ছিল স্পষ্টতই অপ্রতুল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমন অভিযোগ যে, পরস্পরবিরোধী প্রমাণ নিয়ে আসামীপক্ষকে জেরা করতে দেয়া হয়নি, যা বিচারকে আরও অনিয়মের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশে এমন একটি বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন যা একেবারে নিখুঁতভাবে ন্যায়সঙ্গত, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, পক্ষপাতহীন এবং কোনোভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীর জন্য মৃত্যুদণ্ড ব্যবহার করে না।’

টেলিগ্রাফের সম্পাদকীয়: নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে ঝুঁকি
ওদিকে এই বিচার নিয়ে ভারতের দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। এর শিরোনাম- ‘গ্রে জাস্টিস: এডিটরিয়াল অন বাংলাদেশ ট্রাইব্যুনালস ডেথ সেন্টেন্স এগেইনস্ট ফরমার পিএম শেখ হাসিনা’। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় দেশটির একসময়কার শাসনব্যবস্থার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার ধরন, পূর্বনির্ধারিত বলেই মনে হওয়া রায় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিক্রিয়া- এসবই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের ইতিমধ্যেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

শেখ হাসিনাকে গত বছর তার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত শত শত ছাত্র ও অন্যান্য বিরোধীদের হত্যার জন্য দায়ী করে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে বিচার করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতেই নির্বাসনে আছেন। শেখ হাসিনার কখনোই শক্তিশালী আইনি প্রতিনিধি দল ছিল না এবং ট্রাইব্যুনালের রায়ও ছিল প্রায় অনুমেয়। মামলার গুণগত প্রমাণ যা-ই হোক না কেন, গোটা বিচারপ্রক্রিয়াটি একটি পূর্বনির্ধারিত ফলাফলসহ প্রদর্শনীমূলক বিচারের মতো দেখিয়েছে। পাশাপাশি রায় ঘোষণার পর সরকারের প্রতিক্রিয়াও হতাশাজনক। দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যাশিতভাবেই ভারত থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। কিন্তু তারা অনুরোধের পাশাপাশি হুমকিও জুড়ে দিয়েছে: শেখ হাসিনাকে তৎক্ষণাৎ প্রত্যর্পণ না করলে ঢাকার পক্ষ থেকে তা ‘অবন্ধুসুলভ’ আচরণ হিসেবে দেখা হবে বলে সতর্ক করেছে।

ভারতের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারত বাংলাদেশের ‘মঙ্গলকামী’ এবং আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবুও ঢাকার কর্মকর্তারা নিশ্চয়ই জানেন- ভারত যদি সত্যিই শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়, তবে প্রকাশ্য বিবৃতি বা কঠোর ভাষার বদলে নীরব, আড়ালের কূটনীতি-ই তাদের সবচেয়ে কার্যকর সম্ভবত একমাত্র পথ। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কোনো একজন ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলা ভুল। ভারত ও বাংলাদেশকে অবশ্যই পরস্পরের সঙ্গে কাজ করার পথ খুঁজে বের করতে হবে- এমনকি শেখ হাসিনার বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও। তাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এই ভিন্নমতকে সামলে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর।

সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী যা বললেন
অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তাদের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় ছিল ‘মঞ্চায়িত নাটক’। একে তারা ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলে আখ্যায়িত করেছে। আওয়ামী লীগ নেতা মহিবুল হাসান চৌধুরী হলেন হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তার সরকারের সাবেক মন্ত্রী। তিনি এনডিটিভির কাছে অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত নেত্রীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়টি ‘আগেই লিখে রাখা ছিল’ এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগ দেয়া হয়নি।

তিনি আরও দাবি করেন, শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের প্রতি এখনো বাংলাদেশে জনসমর্থন রয়েছে। মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘এটা ছিল এক সাজানো নাটক। তারা জানে এই রায় বাস্তবায়নযোগ্য নয়। তাই কিছু একটা দেখানোর জন্যই এ রায় দেয়া হয়েছে। রায় আগে থেকেই লেখা ছিল। গত এক মাস আদালতের চেয়ারম্যানও উপস্থিত ছিলেন না।’

তিনি আদালতের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনালের আইন পরিবর্তনের কোনও বৈধ ক্ষমতা রাখে না। অথচ তারা এই আইন বদলে আমাদের সবাইকে এই ক্যাঙ্গারু কোর্টে বিচার করছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, হাসিনার বিচার চলাকালে সরকার কোনো মানদণ্ডের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। এমনকি তার পক্ষে আইনজীবী বেছে নেয়ার সুযোগও দেয়া হয়নি।

চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আমাদের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারিনি। আমাদের ‘ফেরারি’ ঘোষণা করা হয়েছিল। ঢাকার অনেক সিনিয়র আইনজীবী শেখ হাসিনার পক্ষে লড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের সবাইকে নিষেধ করা হয়। তাদের আদালত পর্যন্ত যেতে দেয়া হয়নি।’ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাবেক এই মন্ত্রী দাবি করেন তার দল ‘এখনো জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন করে আছে।’

 তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগ এটা দেখে আসছে। তখনও আমাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, আমরা ছাই থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। এবারও তাই করব।’ তিনি বলেন, ‘সরকার যদি সত্যিই জনসমর্থনে আত্মবিশ্বাসী হয়, তাহলে কেন তারা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করতে দিচ্ছে না?’

শশী থারুর বললেন ‘উদ্বেগজনক’

ওদিকে ভারতের সিনিয়র কংগ্রেস নেতা শশী থারুর সোমবার বলেন, বাংলাদেশের অপসারিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ঘটনা ‘খুবই উদ্বেগজনক’। গত বছর আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারত পালিয়ে যান। সোমবার বাংলাদেশে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে তার অনুপস্থিতিতে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। এনডিটিভি বলেছে, শশী ঠারুর এ নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে হোক বা বিদেশে, আমি ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডে বিশ্বাস করি না। তাই এই রায় আমাকে বিশেষভাবে হতাশ করেছে। কাউকে অনুপস্থিতিতে বিচার করা- যেখানে তিনি নিজেকে রক্ষা করার বা ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ পান না, তারপর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া...অন্য দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করা আমার জন্য সমুচিত নয়। কিন্তু এটুকু বলতে পারি- এটা কোনোভাবেই ইতিবাচক ঘটনা বলে মনে করি না। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

https://mzamin.com/uploads/news/main/190058_Hasinainner.jpg

Tuesday, October 28, 2025

তিন মাসে ২২৩ বার ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ ভারতে পাচার হওয়া বাংলাদেশি কিশোরীর by অমিতাভ ভট্টশালী

(এই প্রতিবেদনের কিছু বর্ণনা আপনার মানসিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে)

"কিশোরীটি যখন আমাকে বলছিল যে গত তিন মাসে ২২৩ জন পুরুষ তাকে ধর্ষণ করেছে, ওর চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম।"

কথাগুলো বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মহারাষ্ট্রের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'হারমোনি ফাউন্ডেশন'-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্রাহাম মাথাই।

তিনি জানান, বাংলাদেশের খুলনার বাসিন্দা ১২ বছর বয়সী ওই কিশোরীকে পাচার করে দেওয়া হয়েছিল ভারতে। পাচারকারীরা কিশোরী জানিয়েছে, তাকে জোর করে, অত্যাচার চালিয়ে যৌন সংসর্গ করতে বাধ্য করা হতো। গুজরাত ও মহারাষ্ট্রের মীরা-ভায়ান্দার এলাকায় তার ওপরে চলেছিল এই অমানুষিক অত্যাচার।

আরেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'এক্সোডাস রোড ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন' এবং পুলিশের মানবপাচার রোধ ইউনিট এক অভিযান চালিয়ে ২৩শে জুলাই ওই কিশোরীটিকে উদ্ধার করে মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার নাইগাঁও থেকে।

কৃত্রিমভাবে শারীরিক গঠন বৃদ্ধির জন্য ওই কিশোরীটিকে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল।

মীরা-ভায়ান্দার-ভাসাই-ভিরার পুলিশের কমিশনার নিকেত কৌশিক সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন যে, এখন পর্যন্ত নয়জনকে তারা গ্রেফতার করতে পেরেছে। এদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও দুইজন নারী বাংলাদেশের নাগরিক। পুরো পাচার চক্রটিকে ধরার চেষ্টা করছে পুলিশ।

গত সপ্তাহে তেলেঙ্গানার হায়দ্রাবাদ শহরে আরেক বাংলাদেশি কিশোরী স্থানীয় থানায় এসে সাহায্য চায়। ঢাকার বাসিন্দা ১৫ বছরের ওই কিশোরীকে তারই এক প্রতিবেশী ভারতে নিয়ে এসে দেহ ব্যবসায় নামিয়েছিল বলে অভিযোগ করে।

ওই কিশোরীর কাছ থেকে খবর পেয়ে হায়দ্রাবাদ পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে একটি আন্তর্জাতিক যৌন ব্যবসার চক্র খুঁজে পেয়েছে।

বাড়ি থেকে পালিয়ে পাচারকারীর খপ্পরে

মহারাষ্ট্রের পালঘর থেকে যে বাংলাদেশি কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়েছে, তার বাড়ি খুলনার আমিরপুরে। তার পরিবারের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করে উঠতে পারেনি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মকর্তারা।

'হারমোনি ফাউন্ডেশন'-এর সভাপতি আব্রাহাম মাথাই বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "ওই কিশোরীর সঙ্গে কথা বলে আমি জানতে পারি যে সে স্কুলের পরীক্ষায় একটি বিষয়ে ফেল করেছিল। বাড়িতে বাবা-মা বকবেন, সেই ভয়ে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।"

"এক পরিচিত নারী কিশোরীটিকে কাজের লোভ দেখিয়ে সীমান্ত পার করিয়ে কলকাতায় নিয়ে আসে। সেখানেই তার জাল ভারতীয় পরিচয়পত্র বানানো হয় এবং তারপরে বিমানে চাপিয়ে তাকে মুম্বাই নিয়ে আসা হয়।"

এক বাংলাদেশি কিশোরীকে পাচার করে আনা হয়েছে, এই খবর পেয়ে মীরা-ভায়ান্দার-ভাসাই-ভিরার পুলিশের মানব-পাচাররোধ ইউনিট যখন তল্লাশিতে যায়, তাদের সঙ্গেই ছিলেন 'এক্সোডাস রোড ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন'-এর শ্যাম কুম্বলে।

তিনি বলছিলেন, "মুম্বাই থেকে তাকে গুজরাতের নাদিয়াদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে এক ব্যক্তি ওই কিশোরীকে কৃত্রিমভাবে শারীরিক গঠন বৃদ্ধির ইনজেকশন দেয়, তাকে ধর্ষণ করে ভিডিও করে রাখা হয়। ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে যৌন সংসর্গ করতে বাধ্য করা হয়।"

"যে পাচারকারীরা ধরা পড়েছে, আর ওই কিশোরী – সবার সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি যে গত তিন মাসে ২২৩ জন পুরুষ তাকে ধর্ষণ করেছে। ওই কিশোরীটিকে গুজরাতের চারটি হোটেল এবং পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন খামারবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপরে তাকে মহারাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়," বলছিলেন মি. কুম্বলে।

উদ্ধার করার পরে ওই কিশোরী এখন একটি হোমে রয়েছে।

বাংলাদেশের কিশোরী সাহায্য চেয়ে হায়দ্রাবাদের থানায়

দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরের পুলিশ গত শুক্রবার একটি ঘটনার কথা জানিয়েছে, যেখানে ১৫ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি কিশোরী নিজেই সাহায্য চেয়ে থানায় এসে হাজির হয়েছিল।

সেদিন সকাল সোয়া আটটা নাগাদ বান্ডলাগুড়া থানায় হাজির হয় ওই কিশোরী। সে পুলিশকে জানায় যে তার বাড়ি ঢাকায় এবং তার এক প্রতিবেশী কলকাতায় বেড়াতে নিয়ে যাবে বলে তাকে পাচার করে দেয় এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে।

চন্দ্রায়নগুট্টার সহকারী পুলিশ কমিশনার এ সুধাকর সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে কলকাতায় বেড়াতে নিয়ে আসার নাম করে ওই কিশোরীকে হায়দ্রাবাদে নিয়ে এসে জোর করে যৌনকর্মে নামানো হয়।

তার দেওয়া তথ্যের ওপরে ভিত্তি করে বান্ডলাগুড়া ও মেহদিপটনমের দুটি পৃথক বাড়িতে তল্লাশি চালায় পুলিশ।

ওই চক্রের সদস্য দুই নারীকে গ্রেফতার করার সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিমবঙ্গের তিনজন নারীকেও উদ্ধার করা হয়, যাদের জোর করে যৌনকর্মে নামানো হয়েছিল।

এছাড়া একজন অটোরিকশা চালককেও গ্রেফতার করা হয়েছে, যে ওই বাংলাদেশি কিশোরী এবং অন্য নারীদের 'খদ্দের'দের কাছে নিয়ে যেত।

প্রতিটা 'খদ্দের'কে গ্রেফতারের দাবি

হারমোনি ফাউন্ডেশনের আব্রাহাম মাথাই বলছিলেন, "ওইটুকু বাচ্চা মেয়ে, ষষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। পরীক্ষায় ফেল করে বকা খাওয়ার ভয়ে সে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। অথচ তারই এক পরিচিত নারী এইভাবে তার কৈশোরটা ছিনিয়ে নিল!"

"আমি পুলিশের কাছে দাবি জানিয়েছি প্রতিটা পুরুষ খদ্দের, যাদের এই কিশোরীর কাছে পাঠিয়েছিল চক্রের মাথারা, সেই সব খদ্দেরকেও গ্রেফতার করতে হবে।"

"প্রতিটা খদ্দের যদি ধরা পড়ে কঠোর শাস্তি পায়, তবেই একটা কড়া বার্তা যাবে যে কিশোরীদের ধর্ষণ করলে কী শাস্তি পেতে হয়। তবে যদি কিছুটা রাশ টানা যায়," বলছিলেন আব্রাহাম মাথাই।

শ্যাম কুম্বলের কথায়, বাংলাদেশ থেকে বহু কিশোরী এবং নারীকে পাচার করে মহারাষ্ট্রে নিয়ে আসা হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে শুধু তার সংগঠনই ৫০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নারী ও কিশোরীকে উদ্ধার করেছে।

"শুধু আমাদের একটা সংগঠনই যদি মহারাষ্ট্রে এত জন পাচার হওয়া নারী ও কিশোরীকে উদ্ধার করে থাকতে পারি, তাহলে ভাবুন, অন্য অনেক সংস্থাও কাজ করে, তারাও উদ্ধার কাজ চালায়, সংখ্যাটা পুরো দেশে কত হতে পারে!"

"পুণের যৌনপল্লী বলে পরিচিত বুধওয়ারপেটে অন্তত হাজার দশেক বাঙালি নারী যৌনকর্মে জড়িত। এদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নারীরা যেমন আছেন, তেমনই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে আসা নারীরাও আছেন," বলছিলেন মি. কুম্বলে।

বাড়ি থেকে পালিয়ে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে খুলনার ১২ বছরের কিশোরী - প্রতীকী চিত্র
ছবির ক্যাপশান, বাড়ি থেকে পালিয়ে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে খুলনার ১২ বছরের কিশোরী - প্রতীকী চিত্র

Monday, August 25, 2025

'আমি ঢাকা থেকে এসেছি, আমাকে যদি সেখানে পাঠানো হয় আমার খুব একটা সমস্যা হবে না'

বাংলায় কথা বলা কি তার জন্য নিরাপদ? একটি আলোচনাসভায় মজার ছলেই একথা বলে ওঠেন নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন। আলোচনায় উপস্থিত শহরের তরুণ দর্শকদের মনে করিয়ে দেন তিনি মূলত ঢাকার বাসিন্দা। কলকাতায় সল্টলেকের অমর্ত্য সেন গবেষণা কেন্দ্রে যুব ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা বিষয়ক এক   আলোচনা সভায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমি ঢাকা থেকে এসেছি এবং আমাকে যদি সেখানে পাঠানো হয় তাহলে আমার খুব একটা সমস্যা হবে না।’

তিনি ভাষাগত কুসংস্কার থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করেন। সেন বলেন, ‘আমি সংবাদপত্রে পড়েছিলাম যে বাংলা বলার জন্য একজনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল। আমি চিন্তিত ছিলাম।’

অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকরা যখন বাংলা বলার জন্য লোকদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তখন সেন কটাক্ষ করে বলেন, ‘আমি কি বাংলায় উত্তর দেব?’

তিনি বলেন, ‘বাংলা সভ্যতার নানা গুন আছে যেগুলো আমাদের মর্যাদা দিতে হবে। যেখানে তার উল্টোটা ঘটবে সেখানে বড় ভাবে প্রতিবাদ করতে হবে।’

সেনের কথায়, ‘আমি বলছি না যে, ভারতে বাঙালি সভ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলা ভাষা একাদশ শতাব্দী থেকেই বিদ্যমান।’

বিহার এসআইআর
মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিষয়েও সতর্ক করে দেন অমর্ত্য সেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের অনেক মানুষের কাছে এমন কোনও নথি নেই যার সাহায্যে তারা ভোটার হওয়ার দাবি করতে পারে। যদি কিছু মানুষের উপকার করার অজুহাতে এমন একটি অনুশীলন বাস্তবায়িত হয় যা আরও অনেকের ক্ষতি করবে এবং মানুষকে বঞ্চিত করবে তাহলে এটি একটি বড় ভুল হবে।’

অর্থনীতিবিদের কথায়, ‘আমি বলছি না যে, পুরাতন তালিকায় কোনও ত্রুটি নেই- ত্রুটি অবশ্যই থাকবে। কিন্তু আমি মনে করি না যে কোনও অনুশীলনকে ন্যায্যতা দেয়ার কোনও কারণ আছে যদি এটি সংশোধন করার নামে আরো সাতটি ত্রুটি সংযুক্ত করে।’

নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে একই রকম Special Intensive Revision বা SIR প্রয়োগ করবে কিনা তা নিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে। ইতিমধ্যেই বিহারে বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জুন মাস থেকে এই ভোটার তালিকা সংশোধন চলছে। নথি-ভিত্তিক যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধী ইন্ডিয়া ব্লক সতর্ক করে দিয়েছে যে, এটি কাগজপত্রবিহীন প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

হিন্দু-মুসলিম ঐক্য
মুসলিম শাসকরা কেবল হিন্দুদের উপর অত্যাচার করতো এই আখ্যানকে প্রত্যাখ্যান করে সেন বন্ধুত্ব এবং সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে বলেন, মুসলিম শাসকদের অধীনেই রামায়ণ ও মহাভারত সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছিল।'

তিনি আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দারা শিকোহের উপনিষদের ফারসি অনুবাদের কথা উল্লেখ করেন এবং সিরাজ-উদ-দৌলাকে লেখা রবার্ট ক্লাইভের একটি চিঠির কথা উল্লেখ করেন। ওই চিঠিতে ক্লাইভ সিরাজের নয়জন বন্ধুর নাম উল্লেখ করেছিলেন তাদের মধ্যে সাতজন ছিলেন হিন্দু।

সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ

mzamin

Wednesday, August 20, 2025

কলকাতার নিউমার্কেট থেকে বলছি by পরিতোষ পাল

কলকাতার হগ মার্কেট। সবার কাছে পরিচিত নিউমার্কেট হিসেবে। গত সপ্তাহে এই নিউমার্কেটের আইকনিক ক্লক টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম চারদিকের পরিস্থিতি। গত বছরের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা এসেছে তা সর্বগ্রাসী হয়েছে। বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি মানুষে মানুষে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আর তাই এক সময় নিউমার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট-যেখানে বাংলাদেশি মানুষের ভিড়ে গমগম করতো তা এক রকম উধাও। এখানকার দোকান বা মলে, এমনকি রেস্টুরেন্টগুলো যেভাবে ভিড়ে ঠাসা থাকতো এখন তা চোখে পড়ে না।

সারাদিন নিউমার্কেট ও সংলগ্ন এলাকা ঘুরেও সেই পুরনো জমজমাট ভিড়ের ছবিটি পাইনি। আগে যেখানে প্রতি একশ’ জনের মধ্যে ৬০-৭০ জন বাংলাদেশির দেখা পাওয়া যেতো, এবার সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন বাংলাদেশির দেখা পেলাম। এরা কেউই পর্যটক নন। মেডিকেল ভিসায় চিকিৎসা করাতে এসেছেন। এরই ফাঁকে নিউমার্কেটে সামান্য কেনাকাটা করছেন। আগের মতো বিশাল বিশাল সুটকেস বা পেটি ভর্তি করার মতো কেউ বাজার করছেন না।

ঢাকার বাসিন্দা আসিফ হোসেনের সঙ্গে দেখা হতেই জানালেন, তিনি মায়ের ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য ভারতে এসেছেন। বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এই নিয়ে পরপর তিনবার এলাম। কিন্তু এবার দেখছি বাংলাদেশিদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। মেডিকেল ভিসার সংখ্যা বাড়ায় কলকাতায় বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়েছে।’

মারকুইস স্ট্রিটের এক নামকরা পরিবহন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথায় উঠে এসেছে নিউমার্কেট অঞ্চলের হতাশার ছবিটি। জানালেন, বাংলাদেশে পরিবর্তনের পর থেকে ভারত সরকার পর্যটক ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে যে হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রতিদিন কলকাতায় আসতেন তা এখন বন্ধ। আগে থেকে যারা মেডিকেল ভিসা নিয়ে রেখেছিলেন, তারাই শুধু আসছিলেন। মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রে ভারত সরকার নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার ফলে বাংলাদেশিদের আসা এক রকম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অতি সম্প্রতি মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রে উদার মনোভাব নেয়ায় আবার বাংলাদেশিদের কলকাতায় আসা বাড়ছে বলে তিনি জানান।

নিউমার্কেটের একটি শাড়ির দোকানের কর্মী শ্যামল দত্ত জানালেন, গত এক বছর ভীষণ খারাপ অবস্থায় কাটিয়েছি। আগে যেখানে বাংলাদেশি ক্রেতার সংখ্যা নিয়ে আমরা খুশি ছিলাম, সেখানে গত এক বছরে ৫০ জন বাংলাদেশি ক্রেতা পাইনি।
তিনি বলেন, ‘শুধু আমরাই নই, নিউমার্কেট সংলগ্ন সব ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টে কাটিয়েছেন। সবচেয়ে করুণ অবস্থা ফুটপাথের ব্যবসায়ীদের।’

নিউমার্কেটের উল্টোদিকের ফুটপাথে জাঙ্ক জুয়েলারির ব্যবসা করেন শেখ জামির। তিনি জানালেন, বাংলাদেশি ক্রেতাই ছিল আমাদের বড় ভরসা। কিন্তু গত এক বছরে তারা কেউ না আসায় বিক্রিবাট্টা ৭০ শতাংশ কমে গেছে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।’
নিউমার্কেট অঞ্চলের শ্রী লেদার্স, খাদিমের মতো জুতার বিপণিগুলোতে এখন স্থানীয় মানুষের ভিড় ছাড়া বাংলাদেশিদের ভিড় নেই। আগে দোকানের ভেতরে ভিড়ের জন্য প্রবেশ করা যেতো না। কিন্তু এখন একরকম ফাঁকা।
শ্রী লেদার্সের এক কর্মী জানান, বাংলাদেশিরা আমাদের এই অঞ্চলের দোকানগুলোর বড় ক্রেতা ছিলেন। কিন্তু গত এক বছরে তাদের অনুপস্থিতি আমাদেরও আর্থিক সংকটে ফেলেছে। এখন অবশ্য কিছু বাংলাদেশির দেখা পাওয়া যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের অভিমত, গত এক বছরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিউমার্কেট অঞ্চলের আর্থিক পরিস্থিতি। মূলত বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর ভিত্তি করে এই অঞ্চলের অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশি পর্যটকের অভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মুদ্রা বিনিময়ের কারবারিরা।
কস্তুরি, ধানসিঁড়ি, প্রিন্স-এর মতো রেস্টুরেন্টগুলোতে ঢুঁ দিয়ে দেখা গেল আগের মতো বসার জায়গার অভাব নেই। বাংলাদেশিদেরও দেখা নেই। কর্তৃপক্ষ জানালেন, বাংলাদেশিদের লক্ষ্য রেখেই আমরা আমাদের খাবারের পদ তৈরি করতাম। কিন্তু এখন  রান্নার পরিমাণ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছি। স্থানীয়দের ভরসায় চলছি।  

পরিবহন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এখন পেট্রাপোল থেকে প্রতিদিন কয়েকশ’ যাত্রী আসছেন। কলকাতা থেকেও অনেকে বাংলাদেশে যাচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা আবার বাড়ছে। আরএনটেগোর হাসপাতাল সূত্রে খবর, তাদের হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা কিছুদিন আগের থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। একই মত, টাটা ক্যান্সার, মেডিকা, পিয়ারলেসের মতো হাসপাতালগুলোর।
চিকিৎসা নিতে আসা শামিমা ও তার পরিবার জানালেন, শহর কলকাতা আগের মতোই নিরাপদ আছে। তবে বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যম এমন রটনা করছে, তাতে কিছুটা শঙ্কিত ছিলাম। কিন্তু এসে দেখতে পাচ্ছি সবকিছু আগের মতোই আছে।

তবে মেডিকেল ভিসায় যে পরিমাণে বাংলাদেশি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আসছেন, তার একটি বড় অংশ আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ বা উত্তর ভারতমুখী হচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশিরা আগের তুলনায় বেশি আসছেন ঠিকই, আর তাতে পরিবহন সংস্থা এবং কলকাতা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালগুলো নতুন করে লাভের মুখ দেখলেও সেভাবে খুশি নন নিউমার্কেট, সদর স্ট্রিট, মারকুইস স্ট্রিটের মানি এক্সচেঞ্জ, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট এবং ফুটপাথের ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিমত, যতদিন পর্যটক ভিসা স্বাভাবিক না হবে, ততদিন নিউমার্কেটও স্বাভাবিক হবে না।

mzamin

Monday, March 31, 2025

কলকাতার রেড রোডে ঈদের ঐতিহাসিক জামাত অনুষ্ঠিত

পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতজুড়েই আজ সোমবার উদ্‌যাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। প্রতিবছর প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে কলকাতার ধর্মতলার রেড রোডে। এবারও সেই রেড রোডে আয়োজন করা হয়েছে এই জামাতের। আজ বৃষ্টিহীন কলকাতায় আবহাওয়াও কিছুটা ঠান্ডা। এই পরিবেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা মনের আনন্দে ঈদের খুশিতে নামাজ আদায় করেছেন। নামাজ শেষে মুসল্লিরা শুভেচ্ছা বিনিময়, কোলাকুলি করেছেন যথারীতি একে অপরের সঙ্গে। সেই সঙ্গে দেশের উন্নয়ন ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আজ সকালে কলকাতার রেড রোডের ঈদের জামাতে উপস্থিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন মুসল্লিদের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরা।

মমতা তাঁর শুভেচ্ছা ভাষণে বলেন, ‘সকলে শান্তিতে থাকুন। ধর্মের নামে এখানে কাউকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে দেওয়া হবে না।’ তিনি বলেন, ‘সব ধর্ম রক্ষা করার জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘ধর্মের ব্যবসা করে এখানকার একটি রাজনৈতিক দল। প্ররোচনা দেয়। দাঙ্গার ওই সব প্ররোচনায় পা দেবেন না। আজ লাল-গেরুয়া এক হয়ে গেছে। আমরা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। কেউ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে চাইলে মনে করবেন এই দিদি আপনাদের পাশে আছেন।’

মমতা বলেন, ‘একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য মাঠে নেমেছে। ওরা আজ দাঙ্গার প্ররোচনা দিচ্ছে। অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে। কারও দাঙ্গার প্ররোচনায় পা দেবেন না। আমরা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি করি না।’

আজকের অনুষ্ঠানে আরও যোগ দেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

আজ রেড রোড ছাড়া কলকাতায় বেশ কয়েকটি বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে পার্ক সার্কাস ময়দান, টিপু সুলতান মসজিদ, মেটিয়াব্রুজ, খিদিরপুর, মল্লিক বাজার, রাজাবাজার, এন্টালি, বেলগাছিয়া, আনোয়ার শাহ রোডসহ শহরের বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহ ময়দানে।

প্রতিবছরের মতো এবারও কলকাতার প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে নগরীর ধর্মতলার রেড রোডে
প্রতিবছরের মতো এবারও কলকাতার প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে নগরীর ধর্মতলার রেড রোডে। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

কলকাতার রেড রোডের ঈদের জামাতের পর সেখানে উপস্থিত হয়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতার রেড রোডের ঈদের জামাতের পর সেখানে উপস্থিত হয়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

Friday, February 21, 2025

রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধের জেরেই সর্বস্বান্ত হয়ে মৃত্যুর পথে কলকাতার দে পরিবার? by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

কলকাতার ট্যাংরার শীল লেন। গত মঙ্গলবার সেখানেই দে বাড়ির গ্যারাজ থেকে বেরিয়ে আসে একটি গাড়ি। চালকের আসনে ছোটভাই প্রসূন। পাশে নাবালক ভাইপো। আর পিছনের সিটে বড়ভাই প্রণয় দে। বুধবার ভোরে দেখা যায় বাইপাসের রুবি মোড় ও কালীকাপুরের মাঝামাঝি মেট্রোর পিলারে সজোরে ধাক্কা মেরে পড়ে আছে গাড়িটা। বনেট বলে কিছু নেই। ফেটে গিয়েছে এয়ার ব্যাগ। তড়িঘড়ি তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হয় কাছের হাসপাতালে। তারপরই সাদা চোখে দেখা ‘দুর্ঘটনা’ এক ঝটকায় হদিশ দেয় তিনটি মর্মান্তিক রহস্যমৃত্যুর। পুলিশ ছোটে ট্যাংরায়। শীল লেনের চারতলা বাড়ি। দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা যায়, দোতলার তিনটি ঘরে পড়ে রয়েছে তিনটি দেহ। বড়বউ সুদেষ্ণা দে, ছোটবউ রোমি দে, আর তার মেয়ে প্রিয়ংবদা। তাহলে কি খুন করে নাবালককে নিয়ে দুই ভাই আত্মহত্যার চেষ্টায় বেরিয়ে পড়েছিলেন? কেনই বা এমন নৃশংস পথ বেছে নিলেন?  ইউক্রেন যুদ্ধ না গ্রোমোটিংয়ে বিপুল টাকা লগ্নি করার ফলেই ব্যবসায় মন্দা? ট্যাংরা-কাণ্ডের তদন্ত শুরু করে এখন  এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

পুলিশের কাছে খবর, প্রোমোটিংয়ে লগ্নি ছাড়াও রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে তাদের রপ্তানির ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়। পুলিশি তদন্তে আপাতত উঠে এসেছে, 'প্রোটেকটিভ লেদার গ্লাভস'-এর কারখানা ছিল ট্যাংরার দে পরিবারের। বাবার মৃত্যুর পর তার শুরু করা ব্যবসা বর্তমানে চালাতেন দুই ভাই। আর্থিকভাবে যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ ছিলেন তারা। পরিবার নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ থেকে শুরু করে, দেদার পার্টি, সবই হত। পুরনো ব্যবসার মাঝে আবার তাঁরা নাকি নতুন 'ভেঞ্চার'ও এনেছিলেন। তাতেও বিপুল টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন দুই ভাই। কিন্তু শেষমেশ ব্যবসায় বিরাট ক্ষতি হওয়ায় দেনা হয়ে গেছিল তাঁদের। এও জানা গেছে, রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের রফতানি ব্যবসায় মন্দা হতে শুরু করে। নতুন 'ভেঞ্চার'-এর জন্য বিনিয়োগ করতে যে টাকা খরচ হয়েছিল তা উশুল করতে পারছিলেন না তারা। ফলে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিতেন তারা। প্রতি মাসে অনেক টাকা শোধ দিতে হত। মূলত ২০২০ সালের পর থেকেই এই অবস্থা তৈরি হয়। ফলে বাজারে লক্ষ লক্ষ টাকা দেনা হয়ে যায় তাদের। পাওনাদারদের লাখ লাখ টাকার চেকও বাউন্স হচ্ছিল। তারপর থেকে বাড়িতে ভিড় বাড়তে শুরু করেছিল পাওনাদারদের। মনে করা হচ্ছে, আর্থিক অবস্থার জন্য মানসিক অবসাদ চলে গেছিল ট্যাংরার পরিবার। তাই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পুলিশের তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, বাড়িতে কোনও সুইসাইড নোট মেলেনি। এদিকে খুনের তত্ত্ব জোরাল হচ্ছে। কিন্তু কেন?
আসলে  ট্যাংরার বাড়ি থেকে যাদের মৃতদের উদ্ধার হয়েছে প্রত্যেকের হাতের শিরা কাটা। দুই নারীর গলায় ক্ষত রয়েছে, এদিকে নাবালিকার মুখে একাধিক ক্ষত চিহ্ন রয়েছে। যদি সে আত্মহত্যাই করে, তাহলে তার মুখে আঘাতের চিহ্ন কীভাবে এল, তা স্পষ্ট নয়। আপাতত ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য।

mzamin

Tuesday, February 18, 2025

‘একটা ধর্মকে বিক্রি করে খাচ্ছেন’, বিজেপিকে তোপ মমতার by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

বিধানসভায় জবাবি ভাষণে বিজেপিকে একহাত নিলেন পশ্চিমবঙ্গের  মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, বিজেপি বিধায়করা একটি ধর্মকে বিক্রি করে খাচ্ছেন। রাজ্যের শাসকদলকে তা করতে হয় না। তারা সব ধর্মকে নিয়ে চলতে পারে। শুভেন্দু অধিকারীসহ ৪ বিজেপি বিধায়ককে সাসপেন্ড করার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিধানসভার বারান্দার সিঁড়িতে ধরনায় বসেন শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির বিধায়করা। তখন বিধানসভার ভিতরে চাঁচাছোলা ভাষায় বিরোধী দলনেতাকে আক্রমণ শানান মমতা। বিধানসভায় জবাবি ভাষণে নাম না করে শুভেন্দুকে আক্রমণ করেন  মুখ্যমন্ত্রী । মমতা বলেন, আমি নাকি হিন্দু ধর্মকে তাছিল্য করে, মুসলিম ধর্মকে তোষণ  করি। যিনি হিন্দু ধর্মের কথা বলছেন তিনি জানেন  না আমি ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে। এই বয়সে এসে এই সব শুনতে হচ্ছে। আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে রাজনীতি করিনি। কোনও দিন জাত-ধর্ম নিয়ে কথা বলি না। ভোট এলেই বিবেকানন্দর বাড়ি যায় বিজেপি। বিবেকানন্দর বাড়ি ওরা দখল করে রেখেছে। আমরা ধর্ম বেচে খাই না।

স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে কাগজ ছুঁড়ে একমাসের জন্য বিধানসভা থেকে সাসপেন্ড হয়েছেন শুভেন্দুসহ ৪ বিজেপি বিধায়ক। এরপর রাজ্য সরকারের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ এবং সাসপেনশনের কারণ নিয়ে মিথ্যাচার করায় বিরোধী দলনেতার বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিসও দেওয়া হয়েছে।এর বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর জবাবি ভাষণ বয়কট করে বিজেপি। সিঁড়িতে ধরনা দেয় তারা। এনিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর তোপ, “ওঁরা আমাকে ফেস করতে পারে না। তাই আমি যখন বলতে আসি ওঁরা চলে যায়।” শুভেন্দু অভিযোগ করেছিলেন, রাজ্য সরকার আদপে মুসলিমের সরকার। হিন্দু ধর্মের হয়ে বলতে গিয়ে তাঁকে সাসপেন্ড হতে হয়েছে। বিরোধী দলনেতার অভিযোগ উড়িয়ে পালটা তোপ দাগেন মমতা। বলেন, 'বারবার আমায় অসম্মান করতে দেব না। লক্ষ্মণরেখা যদি ভাঙবার চেষ্টা করেন তাহলে জবাব দেওয়ার অধিকার আমার আছে।” বিরোধীদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা প্রশ্ন রাজ্যে হিন্দু ধর্মের জন্য কী কী করেছেন? “স্বামীজির বাড়ি দখল হয়ে যাচ্ছিল। নিবেদিতার বাড়ি দখল রুখেছি। এগুলো কোন ধর্মের? উত্তর আছে বন্ধুরা?' গঙ্গাসাগর মেলায় কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়েও সরব হন তিনি। মমতার চ্যালেঞ্জ, “আমায় মুসলিম লীগ বলছেন? আপনারা তো নির্বাচনের সময় সাহায্য নেন মুসলিম লীগের। সব সত্যি  ফাঁস করব?”

mzamin


Wednesday, February 5, 2025

কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’-এ ব্যবসায়ীদের হাহাকার, হোটেল-রেঁস্তোরা বন্ধ

মধ্য কলকাতার মারকুইজ স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, কিড স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড, নিউ মার্কেট ও আশেপাশের এক বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের পরিচিতি ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে। প্রায় সারা বছরেই বাংলাদেশিদের আনাগোনায় সরগরম থাকতো গোটা এলাকা। বাংলাদেশি খাবার থেকে শুরু করে নানা ধরনের ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশিদের জন্যই গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চলের হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলোতে এক সময় ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই অবস্থা ছিল। শীতকালে ও ঈদের সময় বাংলাদেশিদের ভিড়ে হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়তো। বিভিন্ন দোকান ও মলগুলোতে উপচে পড়তো ভিড়।

কোথায় সেই ভিড়? গোটা এলাকা থেকে বাংলাদেশিরা যেন উবে গিয়েছেন। চারিদিক এখন শুনশান। স্থানীয় মানুষ ও মেডিকেল ভিসায় আসা নামমাত্র কিছু বাংলাদেশির আনাগোনা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের ধাক্কায় কলকাতার মিনি বাংলাদেশে এখন শুধুই হাহাকার। চারিদিকে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে, বলছিলেন এক ব্যবসায়ী।

জুলাই থেকেই বাংলাদেশিদের আসা কমছিল। তবে গত ছয় মাসে তা কমতে কমতে এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, হোটেল মালিকরাসহ সব ব্যবসায়ীরাই মাছি তাড়াচ্ছেন। অনেক হোটেল বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বন্ধ হয়েছে অনেক রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সির অফিস ও মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রও।
বিশিষ্ট হোটেল ব্যবসায়ী ও মার্কুইজ স্ট্রিট-ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ওয়েলফেয়ার সোসাইটি'র সহ সম্পাদক মনতোষ সরকার এই প্রতিবেদককে জানান, এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সবই বাংলাদেশিদের উপর নির্ভর করে ব্যাপক আকার নিয়েছিল। গত ছয়-সাত মাসে বাংলাদেশিদের আসা কমতে কমতে প্রায় শূণ্যে নেমে আসায় এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা  সবাই অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত। হোটেলগুলোতে আবাসিক নেই বললেই চলে। বিশাল খরচের বোঝা সকলের কাঁধে। একই কথা জানান, সম্রাট হোটেলের ম্যানেজার প্রেম ঘোষ। তিনি বলেন, একসময় আমরা বাংলাদেশি আবাসিকদের জায়গা দিতে পারতাম না। এখন দু’চার জন ছাড়া কোনও আবাসিক নেই।

এক রেঁস্তোরার মালিক জানালেন, আর বলবেন না। রেস্তোরাঁ খুলে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে বাংলাদেশি পর্যটকদের বসার জায়গার জন্য অপেক্ষা করতে হতো এখন সেখানে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া কোনো কাজ নেই। তিনিই জানালেন, ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। ক্রেতার অভাবে অনেকে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। নিউমার্কেটের সামনে দেখা সিরাজগঞ্জের মহম্মদ সিরাজের সঙ্গে। পিতাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তিনি কথায় কথায় বলেন, চারিদিক এমন শুনশান চেহারা আগে কখনো দেখিনি। ফুটপাতের সস্তার খাবারের দোকানগুলোর সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। কাপড়ের দোকান, পোষাকের দোকানগুলোতে তেমন কোনও ক্রেতা নেই। তিনি জানান, যে হোটেলে তিনি রয়েছেন সেখানে বাংলাদেশি পর্যটক মাত্র দুই জন। তার কথায়, এমন দৃশ্য কোনোদিন দেখব বলে ভাবিনি।

নিউমার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলছিলেন, বাংলাদেশিদের উপরই আমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। ফলে তাদের অনুপস্থিতিতে সব কাপড়ের দোকানে কর্মী কমিয়ে দিতে হয়েছে। অনেক আর্থিক ঋণের বোঝা চেপে রয়েছে। কী হবে তা নিয়ে তিনি ও তার মতো সব ব্যবসায়ীরাই চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ঈদ আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি যা চলছে তাতে কোনও আশা দেখতে পাচ্ছি না। ফলে ঈদের জন্য আগে থেকে যে সব অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাস সেগুলো বাতিল করতে হচ্ছে।

পার্ক স্ট্রিটের বিলাসবহুল শাড়ি ও শেরওয়ানির দোকানগুলোরও এখন করুণ অবস্থা্। স্থানীয়রা ছাড়া আর কোনও পর্যটকের দেখা মিলছে না। বাংলাদেশিরাই ছিলেন এসব দোকানের বড় বড় ক্রেতা, জানান এক দোকানের কর্মচারী।

মিনি বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পরিবহন ব্যবসায়ী শ্যামলী যাত্রি পরিবহনের মালিক অবনী কুমার ঘোষ বলেন, এক কথায় ভয়াবহ।পরিস্থিতি যেভাবে চলছে তাতে খুব শিগগিরই কোনও আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। তিনি বলেন, সৌহার্দে্র বন্ধন হিসেবে দুই বাংলার মধ্যে যে যাতায়াতের সেতু বন্ধন গড়ে উঠেছিল তা এক প্রকার ভেঙে পড়েছে। দুই বাংলার মধ্যে যাতায়াতের জন্য অসংখ্য পরিবহনের বাস চলতো সেগুলো সবই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

তিনি জানান, এখন তাদের সৌহার্দ বাস প্রতিদিনের বদলে চলে সপ্তাহে একটি বা দুটি। সেগুলোতেও আট দশ জনের বেশি যাত্রী থাকে না। ফলে ঘোর সঙ্কটে রয়েছেন তিনিও। আর বাংলাদেশিদের উপর নির্ভর করে যে অসংখ্য পরিবহন সংস্থা গড়ে উঠেছিল সেগুলোর অনেকেই পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়েছে।
বণিকসভার এক কর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে পর্যটক আসা ভিসা ও অন্যান্য কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। হাসপাতালের ব্যবসা মার খাচ্ছে। নিউ মার্কেট থেকে ই এম বাইপাসে তৈরি বহু হোটেল বাংলাদেশি রোগী ও তাদের পরিবারের উপরে নির্ভরশীল। সেখানে কলকাতা ও রাজ্যের ছেলেমেয়েরা কাজ করেন। বাংলাদেশিরা না আসায়  হোটেলের ব্যবসাও মার খেয়েছে। ফলে অনেকেই রুটিরুজি হারিয়েছেন। বিভিন্ন দোকানের কর্মচারীদেরও ছাঁটাই করা হচ্ছে।

শুধু নিউমার্কেট অঞ্চল নয়, গড়িয়াহাট, হাতিবাগানের মতো এলাকাগুলোর ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশিদের উপর নির্ভর করতেন। তারা এখন হা হুতাশ করছেন। একই চিত্র বড় বাজারের বড় বড় শাড়ির আড়ৎগুলোতেও। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণ শাড়ি ও পোষাক কিনে বাংলাদেশে পাঠাতেন সে সব এখন এক প্রকার বন্ধ।

mzamin


বাংলাদেশি রোগী নেই: কলকাতার হাসপাতালে ত্রাহি অবস্থা

দক্ষিণ কলকাতার মুকুন্দপুরের আর এন টেগোর হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম গত বছরের এই সময়ের ছবিটি। চারদিকে শুধুই বাংলাদেশির ভিড়। হাসপাতালের বাইরের দোকানগুলোসহ গেস্ট হাউসগুলো থাকতো বাংলাদেশিতে ঠাসা। কিন্তু মঙ্গলবার হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে যে ছবিটি উঠে এসেছে তাতে চারদিক সুনশান। হাসপাতালের লবিও এখন গিজগিজ করছে না বাংলাদেশি রোগীদের ভিড়ে। মধ্য কলকাতা থেকে ই এম বাইপাসের ধারের হাসপাতালগুলোর সামনে এখন সেই রমরমা ভিড়ের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালের বেশির ভাগ নির্ভরশীল বাংলাদেশি রোগীদের উপর। ফলে বাংলাদেশি রোগীদের অনুপস্থিতিতে কলকাতার হাসপাতালগুলোর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সংগঠন এসোসিয়েশন অব হসপিটালস্‌ অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি রূপক বড়ুয়া জানান, কলকাতার হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশের রোগীদের থেকে মাসে প্রায় ২০-২৫ কোটি রুপির মতো আয় হতো। জুলাইয়ে যা ২০ শতাংশের মতো কমেছে। আগস্টের পর থেকে তা কমতে কমতে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল ও অশান্তির জেরে এবং ভারতীয় ভিসার নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা বাংলাদেশির সংখ্যা কমতে কমতে এখন প্রায় শূন্যে এসে দাঁড়িয়েছে। চূড়ান্ত গুরুতর ও আপৎকালীন অসুস্থতা ছাড়া মেডিকেল ভিসাও ভারত সরকার ইস্যু করছে না। ফলে আগস্টের পরবর্তী দু’-তিন মাস পুরনো মেডিকেল ভিসায় কিছু রোগী এলেও নতুন করে মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ির কারণে এখন তাও বন্ধ। অনেকে নিরাপত্তাজনিত কারণেও আসছেন না।

ভাষাগত সাযুজ্য, সুবিধাজনক থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা খরচের স্বল্পতার জন্য লাখ লাখ বাংলাদেশির স্বাভাবিক পছন্দ ছিল কলকাতা। হার্টের অসুখ থেকে শুরু করে নিউরোসার্জারি, ক্যান্সার, পেডিয়াট্রিক সার্জারি, ইউরোলজিক্যাল সমস্যা, অর্থোপেডিক রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি কিংবা বন্ধ্যত্ব, সবকিছুর চিকিৎসাতেই বাংলাদেশিরা ঢাকার চেয়ে কলকাতাকে ভরসা করতেন বেশি। ভারতে বিদেশ থেকে চিকিৎসা করাতে রোগীদের মধ্যে ৬৯ শতাংশই এসেছেন বাংলাদেশ থেকে। এর বেশির ভাগই বেছে নিয়েছিলেন কলকাতাকে।

কলকাতায় ১০-১২টি বেসরকারি হাসপাতালেই থাকতো বাংলাদেশি রোগীদের যাতায়াত। কলকাতায় মণিপাল গোষ্ঠীর অধীন চারটি হাসপাতালে গত সাত দিন ধরে বহির্বিভাগে নতুন বাংলাদেশি রোগী নেই বললেই চলে। সূত্রের খবর, আগে মাসে ২৩০০-২৪০০ রোগী বাংলাদেশ থেকে আসতেন। কিন্তু এখন বাংলাদেশের কোনো রোগী নেই ইনডোর বিভাগেও। কর্তৃপক্ষ মনে করেন, এই অবস্থা আরও কিছুদিন চলবে। বাংলাদেশের রোগীরা মূলত নগদে চিকিৎসার খরচ মেটাতেন। ফলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে হাসপাতালকে।

রুবি জেনারেলের সিজিএম-অপারেশনস শুভাশিস দত্ত বলেন, আগে পড়শি দেশ থেকে দিনে ৩০-৩৫ জন রোগী আসতেন। গত ১ তারিখ থেকে নতুন রোগী ভর্তিও হননি। তার কথায়, আর্থিক ক্ষতি তো হচ্ছেই। আর এন টেগোর হাসপাতাল সূত্রের খবর, বহির্বিভাগে দিনে ১৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি রোগী আসতেন। সেখানে শেষ কয়েকদিনে তা কমে শূন্যে দাঁড়িয়েছে।

বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়াও বাংলাদেশি রোগীর অভাবে কলকাতা ও শহরতলির ছোট-মাঝারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা খুবই সংকটজনক। এই সব হাসপাতাল ও নার্সিং হোমের ব্যবসার বড় অংশ আসতো বাংলাদেশের রোগীদের চিকিৎসা থেকে। ফলে নগদের অভাবে ভুগছে তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিউরোসার্জন জানান, বাংলাদেশের রোগীরা মূলত চিকিৎসা করান নগদে। তাদের সংখ্যা কমতে কমতে শূন্যে নেমে আসায় প্রভাব পড়েছে চিকিৎসকদের উপরেও। অস্ত্রোপচারও বন্ধ। এখন ভরসা ভারতের রোগীরা।

পিয়ারলেস হাসপাতালের সিইও সুদীপ্ত মিত্রের মতে, বাংলাদেশের যে রোগীরা চিকিৎসা করাবেন বলে স্থির করেছিলেন, তারা আসবেনই। ফলে এটা লাভ-ক্ষতির বিষয় নয়। এখন হয়তো রোগী পাচ্ছি না। আগামী দিনে তা পাবো।

কয়েকটি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তারা ইতিমধ্যেই চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করা বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ই-চিকিৎসা ব্যবস্থা দিচ্ছেন।অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ‘চিকিৎসা পর্যটকদের’ সংখ্যা কমায় কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। কারণ, কলকাতার বিভিন্ন বড় হাসপাতাল থেকে হোটেল, রেস্তরাঁ ব্যবসা চিকিৎসার কারণে আসা বাংলাদেশিদের উপরে নির্ভরশীল। দিল্লির আর্থিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশনস’র সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের চিকিৎসা পর্যটন শিল্পে সব থেকে বড় অংশীদার বাংলাদেশ। গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা গদিচ্যুত হওয়ার পরে ভারতের চিকিৎসা পর্যটন ক্ষেত্র ধাক্কা খেয়েছে। চিকিৎসা পর্যটক কমেছে। ফলে হাসপাতাল ও তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সব থেকে বেশি প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। কারণ, এই সব অঞ্চলেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা পর্যটক আসেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে দশটি দেশ থেকে সব থেকে বেশি মানুষ ভারতে চিকিৎসা করাতে আসেন, তার মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম। ২০২২ সালে যে ৪ লাখ ৭৪ হাজার বিদেশি ভারতে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন, তার ৬৮.৯ শতাংশ এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে। এর বাইরে বহু মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে সীমান্তবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা করিয়ে যান।

বাংলাদেশের উপর নির্ভরতা কমাতে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশনস বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। তাতে অন্যান্য দেশ থেকেও চিকিৎসা পর্যটন টানতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

mzamin

Tuesday, January 21, 2025

আরজিকর কাণ্ডে রায় দিতে গিয়ে বললেন বিচারক: 'দেখে মনে হয়নি বিরলতম ঘটনা, তাই ফাঁসি নয়' by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

আরজিকরে তরুণী চিকিৎসক ধর্ষণ-খুন মামলায় ১৬৪ দিনের মাথায় দোষী সঞ্জয় রায়ের  সাজা ঘোষণা করলেন শিয়ালদহ আদালতের বিচারক অনির্বাণ দাস। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৪ (ধর্ষণ), ৬৬ (ধর্ষণের জন্য মৃত্যু), ১০৩ (১) (খুন) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাকে। বিচারক জানিয়েছেন, আরজি করের ঘটনাকে ‘বিরল থেকে বিরলতম অপরাধ’ বলে মনে করছেন না। তাই আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে সঞ্জয়কে। জরিমানাও করা হয়েছে। সেইসঙ্গে নির্যাতিতা চিকিৎসকের পরিবারকে ১৭ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্য সরকারকে। সেই রায়ের বিরুদ্ধে সঞ্জয় এবং নির্যাতিতার পরিবারের সামনে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ আছে।  শিয়ালদহ আদালতের ২১০ নম্বর কোর্টরুম। কোর্টরুমে সঞ্জয়ের আইনজীবীরা দাবি করেন, এটা বিরলের মধ্যে বিরলতম ঘটনা নয়। মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে সওয়ালও করেন তারা। সঞ্জয় তখন নির্লিপ্ত ভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ফের দাবি করতে থাকল সে নির্দোষ। ফাঁসানো হয়েছে তাকে। বিচারক সঞ্জয়ের কাছে জানতে চান, 'আপনি আপনার কথা আগেও বলেছেন। যা হয়েছে, আপনার থেকে ভাল আর কেউ জানেন না। বাড়িতে কে আছেন আপনার?' উত্তরে সঞ্জয় বলে, 'মা'। বিচারক জানতে চান, 'বাড়ির লোকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে?' সঞ্জয় জানায়, সে ব্যারাকে থাকত। মায়ের- তার কোনও যোগাযোগই ছিল না। এরপরই বিচারক জানতে চান, 'আপনি যে নির্দোষ সেটা ছাড়া আর কিছু বলতে চান?' সঞ্জয় জানায়, 'যে কাজটা আমি করিনি তাতে দোষী বলা হচ্ছে। আরজি কর মামলার শুনানি শুরু হওয়ার পর একদিনও সঞ্জয়ের মা শুনানিতে যাননি। এই নিয়ে তার মন্তব্য, ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি মিথ্যে হত, তাহলে হয়তো তিনি যেতেন। কিন্তু দোষ প্রমাণ হয়েছে। তাই নির্যাতিতার বাবা-মার মতো তিনিও তার কঠোর শাস্তি চাইছেন। সঞ্জয়ের মায়ের কথায়, ‘নিহত চিকিৎসক আমার মেয়ের মতোই। তাই তার মায়ের যন্ত্রণা আমি অনুভব করতে পারি।’ গত বছরের ৯ আগস্ট, হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ, ধর্ষণ করে খুন করা হয় তাকে। তদন্তে নামে কলকাতা পুলিশ। ১০ আগস্ট এই ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়।

কলকাতায় চাঞ্চল্যকর নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাবাস

কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত সিভিক ভলান্টিয়ারকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাবাসের শাস্তি দিযেছেন শিয়ালদহ আদালতের অতিরিক্ত জেলা দায়রা বিচারক অনির্বাণ দাস। সোমবার বিচারক এই শাস্তির রায় ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে তিনি নির্যাতিতার পরিবারকে ১৭ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছেন। সাজা ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, এটি বিরলতম অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। এর আগে গত শনিবার বিচারক নারী চিকিৎসককে খুন ও ধর্ষণে যুক্ত থাকার অভিযোগে এককভাবে কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করেন। সেদিনই তিনি জানিয়েছিলেন, সোমবার শাস্তির রায় ঘোষণা করবেন।

গত বছরের ৯ আগস্ট কলকাতার আরজি কর হাসপাতালের চেস্ট মেডিসিন বিভাগের সেমিনার হল থেকে এক নারী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয়। তাকে ধর্ষণ এবং খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। গত ৪ নভেম্বর মামলায় চার্জ গঠনের পরে ১১ নভেম্বর থেকে দীর্ঘ শুনানি চলে। গত ১৮ জানুয়ারি ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৪ (ধর্ষণ), ৬৬ (ধর্ষণের পর মৃত্যু) এবং ১০৩ (১) (খুন) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে।

সোমবার রায় ঘোষণার আগে বিচারক অভিযুক্তের বক্তব্য শোনেন। আগের দিনের মতই অভিযুক্ত সঞ্জয় রায় দাবি করেন, তিনি নির্দোষ। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। তবে সিবিআইয়ের আইনজীবী অভিযুক্তের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানান। নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবীও অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সওয়াল করেন।

তবে বিচারকের শাস্তির রায়কে সকলে স্বাগত জানালেও নির্য়াতিতা নারী চিকিৎসকের পরিবারসহ নাগরিক সমাজের বৃহৎ অংশ মনে করেন, অভিযুক্তের একার পক্ষে এই নারকীয় কাজ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে আরও অনেকে যুক্ত। তাদের কন্যার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ন্যায় বিচার না পাওয়া পর্যন্ত নির্যাতিতার পিতা-মাতা লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন। তারা বলেন , আমরা ক্ষতিপূরণ চাই না। আমরা বিচার চাই। ইতিমধ্যেই তারা সুপ্রিম কোর্টেও আবেদন করেছেন। নির্যাতিতার পিতা জানান, তারা যে ৬৭টি প্রশ্ন তুলেছেন তার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তারা থামবেন না।

প্রথমে ঘটনার তদন্তে নেমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেপ্তার করেছিল কলকাতা পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে একাধিক ‘বায়োলজিক্যাল’ এবং ‘ডিজিটাল’ তথ্যপ্রমাণও সংগ্রহ করেছিল তারা। পরে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের ভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। সিবিআইও তদন্ত চালিয়ে আটক সিভিক ভলান্টিয়ারকেই ‘একমাত্র অভিযুক্ত’ হিসাবে বর্ণনা করে আদালতে চার্জশিট পেশ করে।

তার দু’মাস পর রায় ঘোষণা হলো। তবে ধর্ষণ-খুনের মামলায় তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলকেও গ্রেপ্তার করে সিবিআই। যদিও তাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ফলে ওই মামলায় সন্দীপ এবং অভিজিৎ দু’জনেই জামিন পেয়েছেন। এদের বিরুদ্ধে কবে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দেয়া হবে তা এখনও জানা যায়নি।

অভিযুক্তের শাস্তি প্রসঙ্গে আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকদের বক্তব্য,  জুনিয়র ডাক্তার থেকে সিনিয়র ডাক্তার ,সমাজের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সবাই বলেছি, একটা বৃহত্তর প্রমাণ লোপাটের ষড়যন্ত্র এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। বারে বারে তা প্রমাণিত হয়েছে। এখনও পর্যন্ত সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট সিবিআই জমা দিতে পারেনি। অনেক প্রশ্নচিহ্ন এখনও রয়ে গিয়েছে। যার উত্তর আমাদের কাছে অজানা।

আরজিকর কাণ্ডে অভিযুক্ত সঞ্জয়ের আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজায় অসন্তুষ্ট মমতা

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় সোমবার ২০ জানুয়ারি দোষী সঞ্জয় রায়ের আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে শিয়ালদহ কোর্ট। কিন্তু এই সাজাতে খুশি নন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।আরজি কর -কাণ্ডে প্রথম দিন থেকেই মুখ্যমন্ত্রী দোষীর ফাঁসির সাজা দাবি করেছিলেন। আজ আদালতের রায় ঘোষণার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ”ফাঁসি হলে মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।”সোমবার মালদায় তিনি বলেন, ‘আমাদের হাত থেকে ইচ্ছে করে কেসটা কেড়ে নিয়ে চলে গেল। আগেই বলেছিলাম না পারলে সিবিআইকে কেসটা দিন, আপত্তি নেই। আমরা চাই বিচার হোক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই নরপিশাচদের চরমতম শাস্তি চেয়েছিলাম।’ আরজি করের তদন্ত প্রথমে করছিল কলকাতা পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় সঞ্জয় রায়কে। তবে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে সেই তদন্তের ভার যায় সিবিআই-এর হাতে। তা নিয়ে আগেও আক্ষেপ শোনা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়। বলেছিলেন, “আমি মা-বাবাকে বলেছিলাম সময় দিন। তারপর না হলে সিবিআই দিতেন। কিন্তু তার আগেই সিবিআই-এর হাতে চলে গেল তদন্তভার।” এরপর সময় যত গড়িয়েছে, তদন্ত নিয়ে সিবিআই-কে আক্রমণ করতেও শোনা গিয়েছে মমতাকে। কখনও বলেছেন, কলকাতা পুলিশ যাকে গ্রেফতার করেছে তারপর সিবিআই কাউকে নতুন করে ধরতে পারেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংযোজন, ‘আপনারা দেখেছেন আমরা ৫৪ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফাঁসির অর্ডার করিয়ে দিয়েছি। এই কেসে আমাদের ফাঁসির দাবি সকলের ছিল। সেক্ষেত্রে বিচারের রায় নিয়ে কিছু বলব না। আমাদের হাতে কেস থাকলে অনেকদিন আগেই ফাঁসির অর্ডার করিয়ে দিতে পারতাম। প্রথম দিন থেকেই ফাঁসি চেয়েছি। 'সিবিআই তদন্তে গাফিলতি রয়েছে কি না, তা নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি মমতা।
mzamin

Tuesday, December 10, 2024

শিলংয়ে ধর্ষণে অভিযুক্ত সিলেট আওয়ামী লীগের ৬ নেতা, গ্রেপ্তার ৪

ভারতে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৬ নেতা। মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে একটি আবাসিক হোটেলে থাকাকালীন তারা ধর্ষনের ঘটনা ঘটিয়েছেন। পুলিশের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন ভুক্তভোগী। এরপর তারা কলকাতায় পালিয়ে এসে নিউটাইনের একটি ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন। সেখানেই অভিযুক্তদের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশ ও মেঘালয়ের শিলংয়ের পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে তাদের রোববার গ্রেপ্তার করে। অভিযুক্ত দুইজন পালিয়ে গিয়েছেন। ঘটনাস্থলে আটক এক ইউপি চেয়ারম্যানকে এজাহারে নাম না থাকায় ছেড়ে দেয়া হয় বলে জানা গেছে।

পুলিশ সুত্রে জানানো হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতারা সিলেট থেকে পালিয়ে শিলংয়ে অবস্থান করার সময় তাদের আবাসস্থলেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিলং থানায় ছয় জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। কলকাতায় আটককৃতরা হলেন, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের অপসারিত চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, সিলেট মহানগর যুবলীগের সভাপতি আলম খান মুক্তি, সিলেট মহানগর যুবলীগের সহ-সভাপতি রিপন ও যুবলীগের সদস্য জুয়েল। পলাতক ২ জন হলেন, সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আফসর আজিজ ও সাধারণ সম্পাদক দেবাংশু দাস মিটু।

রোববারই ধৃত চারজনকে  বারাসাতের স্পেশাল ক্রিমিনাল কোর্টে তোলার কথা থাকলেও বিচারক না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। এরপরে শিলং পুলিশ তাদের শিলং নিয়ে যায়। জানা গেছে, নিউটাউনে যেখান থেকে পুলিশ চার আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করে সেখানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী  উপস্থিত ছিলেন।

mzamin

Saturday, December 7, 2024

বাংলাদেশ-ভারত উত্তেজনায় আলোচনার আহ্বান মমতার, শান্তিরক্ষী মোতায়েনের বিষয়ে দিলেন ব্যাখ্যা

ভারত-বাংলাদেশের চলমান উত্তেজনা নিরসনে কার্যত আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ জন্য তিনি অস্থিরতা কাটিয়ে সুস্থির পরিস্থিতি প্রত্যাশা করেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে তার রাজ্যের। ফলে বাংলাদেশে অব্যাহত রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা থেকে শুধু তার রাজ্যই ঝুঁকিতে এমন নয়। নিউজ১৮ বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শুক্রবার মমতা বলেন- বাংলাদেশের আঁচ যদি কেউ এখানে (পশ্চিমবঙ্গ) এনে আগুন লাগায়, তাহলে বিহারও বাদ যাবে না। কারণ, আমরা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। আমাদের বর্ডার সবারই এক। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি যে উত্তেজনা চলছে তা নিয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন মমতা। এর আগে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তারও কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ নিয়ে তিনি নিজেদেরকে দৃশ্যত আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। খোলা রাখার আহ্বান জানান যোগাযোগের মাধ্যম।

সাক্ষাৎকারে মমতা বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সমস্যা নিজেরা-নিজেরা বসে দেখে নিন। এ জন্য আন্তর্জাতিকভাবে অনেক ফোরাম আছে। কিন্তু নেগোশিয়েশন বন্ধ করে দেয়া ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, দুই দেশ একে অপরের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয় অস্থিরতা কাটিয়ে একটা সুস্থির পরিস্থিতির মধ্যে আসুক। এটা আমার এক নম্বর পয়েন্ট।

দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো- (ভারতের) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পার্লামেন্ট অধিবেশনে স্টেটমেন্ট দিতে হবে। ব্যাখ্যা করতে হবে বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি। এটা করতে হবে আমাদের সকলের জানার জন্য। বাংলার জানার জন্য। আগে নিয়ম ছিল পার্লামেন্ট চলাকালে যদি কোথাও কোনো ঘটনা ঘটতো, এমনকি প্রধানমন্ত্রীরা বিদেশেও (যদি) যেতেন- তারা এসে পার্লামেন্টে একটা স্টেটমেন্ট দিতেন। (অথচ) এতদিন ধরে পার্লামেন্ট চলছে আমরা এটার ওপর কোনো স্টেটমেন্ট দিতে দেখলাম না। বিস্তারিত জানানো উচিত ছিল। তাহলে আমরা (বিষয়টি বিস্তারিত) জানতে পারতাম।

মমতা বলেন- তৃতীয়ত, আমি কেন শান্তিরক্ষীর কথা বলেছি। আমি বলেছি এই কারণে যে, যখনই কোনো দেশে কোনো অস্থিরতা হয় বা শান্তি বিঘ্নিত হয়, তখন জাতিসংঘের নিজস্ব একটা শান্তিরক্ষী বাহিনী থাকে, যে ফোর্সে থাকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোক। তাদের বলা হয় শান্তিরক্ষী বাহিনী। শ্রীলংকাতেও যখন গণ্ডগোল হয়েছিল, তখন শান্তিরক্ষী বাহিনী এসেছে। কাজেই ভারতের সঙ্গে একান্তই যদি (বাংলাদেশের) সম্পর্কের খুব অবনতি হয়ে থাকে, তাহলে ভারত সেক্ষেত্রে জাতিসংঘকে বলতে পারে যে- তোমাদের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাও। অন্তত মানুষ যাতে নিরাপত্তা পায়। সেটা দেখা উচিত। কারণ আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে যে- সব বাংলাদেশি ওপার বাংলার, তা নয়। একীভূত ভারতে ইন্ডিয়া একটাই ছিল। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত- একটাই ছিল। দেশভাগের পর বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হয়ে গেল। পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হয়ে গেল। ভারতবর্ষ আলাদা রাষ্ট্র হয়ে গেল। কিন্তু আপনারাতো জানেন, অনেক বাবা আছেন, তার বাড়ি ওখানে। আবার বিয়ে করেছেন এখানে। অনেক ছেলেরা আছে- ওখানে ছেলে থাকে, এখানে মেয়ে থাকে- তার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। এগুলো একটা বড় সমস্যা। খেলাধুলা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান থেকে শুরু করে সবকিছু। কিন্তু মনে রাখবেন, যেহেতু বাংলাদেশের ভাষাটা আর আমাদের ভাষাটা এক। সংস্কৃতি এক এবং ওখানে অনেক ব্যবসায়ী আছেন, যারা ব্যবসা করেন- এপার বাংলা থেকে ওপার বাংলা। আবার ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলা। অবশ্যই ভূরাজনৈতিক সীমারেখা আছে। কিন্তু আমাদের হৃদয়ের কোনো বাউন্ডারি নেই। আমাদের মনটা কিন্তু একেবারে খোলা এবং উন্মুক্ত। আমরা সবাই-সবাইকে খুব ভালোবাসি। কাজেই আমি চাই যে, আমাদের রাজনৈতিক মতামত যা-ই থাকুক না কেন রাজনৈতিক প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা- যার প্রতি যা-ই থাকুক না কেন, অন্তত বাংলাদেশও ভালো থাক। ভারতও ভালো থাক। আমাদের বর্ডার আছে নেপালের সঙ্গে। নেপালও ভালো থাক। নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এমনকি বাংলাদেশের পাশে আছে মিয়ানমার। বেঙ্গলটা হলো উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় গেটওয়ে এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে। বাংলা হচ্ছে বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়ির সীমান্ত।

প্রশ্নকর্তা জানতে চান- শ্রীলংকার সঙ্গে ভারতের মিত্রতা কমে গেছে, নেপাল হাত থেকে বেরিয়ে গেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার পড়শি, ভুটানও। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র নীতিতে কোনো সমস্যা দেখছেন কিনা? তার এ প্রশ্নের জবাবে মমতা বলেন, আমার মনে অনেক কথা থাকলেও এটা পাবলিকলি বলবো না। কারণ, আমার দেশ- আমারই দেশ।

mzamin

Sunday, November 24, 2024

কলকাতায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মন্দা, বইমেলা ও চলচ্চিত্র উৎসব থেকে বাদ by পরিতোষ পাল

ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত কলকাতায় বাংলাদেশের নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হয়ে এসেছে এতদিন। সেই কর্মকাণ্ড ঘিরে দুই বাংলা মিলনমঞ্চে পরিণত হতো। সাহিত্য, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের গুণীজনদের আনাগোনায় প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠতো সংস্কৃতির শহর কলকাতা। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলাতেও বাংলাদেশের সগৌরব উপস্থিতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে উৎসাহের জোয়ার দেখা যেতো। কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি  সুবিশাল প্যাভিলিয়ন থাকতো সকলের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী ও নাট্যকার অভিনেতা ব্রাত্য বসু গত বছর বইয়ের স্বর্গ কলেজ স্ট্রিটে আয়োজিত বাংলাদেশ বইমেলার উদ্বোধন মঞ্চে দাঁড়িয়ে গর্বের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, দুই বাংলাকে জুড়ে রেখেছে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি এবং অবশ্যই বই। যা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে রাখা যাবে না।

কিন্তু এ বছর একটা মন্দার ছবি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর একটা পরিবর্তন এসেছে ঠিকই। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও শীতলতা দেখা দিয়েছে। দূতাবাস ও উপদূতাবাসগুলোতেও একটা আপাত স্থবিরতা বিরাজ করছে। ফলে বাংলাদেশের তরফে সাংস্কৃতিক কোনো কর্মকাণ্ডের চঞ্চলতা এখন পর্যন্ত চোখে পড়ছে না। ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে যে ‘বাংলাদেশ বইমেলা’ ও ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবে'র আয়োজন করা হতো তার ইঙ্গিত কোনও সূত্র থেকেই মেলেনি। অবশ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে একটি সূত্রে দাবি করা হয়েছে। আর কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণও এক প্রকার অনিশ্চিত। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকেও বাদ রাখা হয়েছে বাংলাদেশকে।

ইতিমধ্যেই এই সব খবর মিডিয়ার কল্যাণে জানাজানি হওয়ার পর থেকে কলকাতার বাংলাদেশ অনুরাগীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সাহিত্যের এক নিবিষ্ট পাঠক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের স্নাতকোত্তর ছাত্র নীলাঞ্জন সেন তার হতাশার কথা কোনওরকম গোপন না রেখেই বলছিলেন, সাহিত্য -সংস্কৃতির অঙ্গনে রাজনীতির প্রবেশ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি প্রতিবছর বাংলাদেশের নতুন নতুন লেখকদের সাহিত্য পড়ার জন্য বইমেলায় বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকতেন জানিয়ে বলেন, আমার মতো বহু সাহিত্য অনুরাগীই এ বছর বঞ্চিত হতে চলেছেন। অবশ্য শেষ মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা আলাদা কথা।

কলকাতা বইমেলার বয়স ৪৮ বছর হলেও গত ২৮ বছর ধরে এই বইমেলায় বাংলাদেশ অন্যতম অতিথি দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়ে এসেছে। বাংলাদেশ থিম কান্ট্রি হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে একাধিকবার। বইমেলার ১২ দিনের মধ্যে একটি দিন পালন করা হতো বাংলাদেশ দিবস হিসেবে। সারাদিন ধরে মেলা প্রাঙ্গনে বাজতো বাংলাদেশের নানা সঙ্গীত। আর সেমিনার হতো বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা অভিমুখ নিয়ে।
সম্প্রতি কলকাতা বইমেলার আয়োজক সংস্থা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের তরফে বইমেলায় অংশগ্রহণের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স থেকে লাতিন আমেরিকার দেশের নাম থাকলেও নাম নেই প্রতিবেশী বাংলাদেশের।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণেই এই সিদ্ধান্ত। গিল্ডের সভাপতি ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় সব দায়ভার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের ডিরেক্টার আফসানা বেগম অবশ্য সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেছেন, কলকাতা বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ প্রবলভাবে আগ্রহী ছিল। আগ্রহী ছিলেন বাংলাদেশের প্রকাশকরাও। সরকারিভাবে কলকাতা বইমেলায় অংশগ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে তারা আয়োজক সংস্থার কাছে ই-মেইল এবং একাধিকবার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে কথা বললেও কোনও উত্তর পান নি। আর তাই হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

আগামী ২৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে কলকাতা বইমেলা। গত বছর এই বইমেলায় ২৬ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল। বই বিক্রি হয়েছিল ২০ কোটি রুপির বেশি। বইমেলার বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে প্রবশের জন্য বইপ্রেমীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতো হতো।  
তবে এবারের পরিস্থিতি নিয়ে  আয়োজক সংস্থা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সভাপতি ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতের ভিসা কার্যক্রম এক প্রকার বন্ধ থাকার কারণে গিল্ডের পক্ষে নিজের থেকে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের পরামর্শ চেয়েছি। সেইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছি।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে ভারত সরকারের নীরব থাকার নীতি নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও একই পথ নিয়েছে। আর তাই রাজ্য সরকার আয়োজিত আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশকে এ বছর বাদ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উৎসব কমিটির প্রধান চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ।

চলচ্চিত্র সংক্রান্ত কোনও আলোচনাতেও বাংলাদেশের কাউকে রাখা হয়নি বলে জানা গিয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই সহজ অজুহাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত, বাংলাদেশে পট পরিবর্তন ও ভারত বিরোধীতার দিকে লক্ষ্য রেখেই সম্ভবত ভারতের প্রশাসনিক মহল একরকম নীরব থাকার পথ নিয়েছে। ফলে ভারতের কোনও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে দূরে রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, কলকাতা বইমেলা বা চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের উপস্থিতি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের  হিন্দু মৌলবাদীরা ইতিমধ্যেই বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছেন। ইতিমধ্যেই তারা কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের অদূরে বিক্ষোভ করেছে। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন ও উপাসনালয় ভাঙার প্রতিবাদে দূতাবাসে স্মারকলিপিও দিয়েছে। তাই বইমেলা বা চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কোনওরকম বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ হলে নতুন করে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অবশ্য বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের মতে, কোনও আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ঘেরাটোপের মধ্যে রাখা ঠিক নয়। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য পবিত্র সরকার কলকাতা বইমেলা ও চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশকে যোগ দিতে না দেয়াকে অন্যায় সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন, বাংলাদেশে পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই।  কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এইভাবে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে বাধা তৈরির নীতি মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।

তবে সাফটা চুক্তি অনুযায়ী দুদেশের মধ্যে চলচ্চিত্র বিনিময় হতে চলেছে। ভারতের দুটি ছবি বহুরূপি ও পুষ্পা ২ বাংলাদেশে মুক্তি পাচ্ছে ডিসেম্বরেই। তেমনি ভারতে মুক্তি পেতে চলেছে বাংলাদেশের ছবি রায়হান রাফির দামাল। রহুরূপির পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই খবর জানিয়ে বলেছেন, প্রক্রিয়াকরণের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ। শুধু সরকারি স্তরে চূড়ান্ত অনুমতির অপেক্ষা। প্রশ্ন থেকেই যায়, অনুমতি আসবে তো?

mzamin