Thursday, October 10, 2019

চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে ভারতে এলাহিকাণ্ড

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরকে কেন্দ্র করে এলাহিকাণ্ড ভারতে। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে নেয়া হয়েছে এক মহাপরিকল্পনা। শুক্রবার তিনি মামাল্লাপুরামে ভারত-চীন সামিটে যোগ দিতে আসছেন। তার আসার পথকে বর্ণাঢ্য করে তুলছে ভারত। ৪৩ জন স্পেশাল অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে এ জন্য। তার গাড়িবহর চলার রুটে ৩৪টি স্থানে আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। মোতায়েন করা হচ্ছে ১০ হাজার পুলিশ সদস্য। আর ব্যবহার করা হচ্ছে ৫০০ সিসিটিভি ক্যামেরা।
ফলে সব মিলে সৃষ্টি হয়েছে এক উৎসবের আমেজ। বঙ্গোপসাগর ও গ্রেট সল্ট লেকের মধ্যবর্তী একটুকরো ভূখন্ড হলো মামাল্লাপুরাম। এটি ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের দক্ষিণে। সেখানেই বসবেন দুই নেতা শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বহনকারী গাড়িবহর মামাল্লাপুরামের কাঠিপাড়া ফ্লাইওভার ও আইইটি মাদ্রাসের কাছের ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যাবে না। শহরের বিমানবন্দর থেকে জিএসটি রোড ধরে ডানদিকের লেনে যাবে ওই গাড়িবহর। বিভিন্ন বিভাগ থেকে রাজ্য সরকার আইএএসের ৯ জন কর্মকর্তা ও ৩৪ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে বাছাই করেছেন মোদি-শির মধ্যে সংযোগ ও সমন্বয়কারী কর্মকর্তা হিসেবে। এ বিষয়ে সোমবার এক নির্দেশনা জারি করেছেন রাজ্যের মুখ্য সচিব কে শানমুগাম। ওইসব কর্মকর্তা দুই নেতা ও দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি ঝামেলাহীন ও মসৃণ যোগাযোগ নিশ্চিত করবেন। এই নির্দেশে শি জিনপিংয়ের আসার পথে ৩৪টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হবে। এর শুরু হয়েছে চেন্নাই বিমানবন্দরের ৫ নম্বর গেট থেকে। শি জিনপিং ও অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো হবে হোটেল ট্রাইডেন্ট, সিএসআই ক্রাইস্ট চার্চ, আলানদুর, এমএসএমইর অফিস, আইটিসি গ্রান্ড চোলা, সহ বিভিন্ন স্থান।
শি জিনপিংয়ের মোটরযান বিমানবন্দর থেকে আইটিসি গ্রান্ড চোলা পর্যন্ত এবং হোটেল থেকে মামাল্লাপুরাম পর্যন্ত যাবে। এই পথে দাঁড়িয়ে তাদের প্রহরা দেবেন প্রায় ১০ হাজার পুলিশ সদস্য।  প্রায় ১০টি জেলা থেকে এসব পুলিশ সদস্যকে তলব করে নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে তারা নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। তারা এরই মধ্যে স্থাপন করেছেন ৫০০ সিসিটিভি ক্যামেরা। এমনি করে বহুস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে মামাল্লাপুরামে সম্মেলন স্থলের নিরাপত্তা দেখাশোনা করবে রাজ্য পুলিশ, রাজ্য পুলিশের স্পেশাল ব্যাটালিয়ন, চীনের নিরাপত্তা বিষয়ক ব্যক্তিরা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর স্পেশাল প্রটেকশন গ্রুপ।
এদিন পুলিশ ৫০০ সড়ক সিল বা বন্ধ করে দেবে। তারা উত্তর চেন্নাই ও মধ্য চেন্নাই থেকে প্রায় ২৫০০ টি ব্যারিকেড সংগ্রহ করেছে, যাতে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অতিথিরা যেসব হোটেলে থাকবেন তার নিরাপত্তা আগেই দেখা হয়েছে। আসা-যাওয়ার রুট, অনুষ্ঠানের আয়োজনের স্থান এরই মধ্যে যাচাই করেছেন চীনের নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তারা।

মেহবুবা মুফতির প্রশ্ন- কাশ্মীরে সেনা কেন?

পাকিস্তান থেকে কথিত অত্যাসন্ন হামলা মোকাবিলার জন্য কাশ্মীরে সেনা মোতায়েন করেনি বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার। তারা সেনা মোতায়েন করেছে কাশ্মীরের ভিন্নমতকে দমিয়ে রাখতে। এ অভিযোগ করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। অফিসিয়াল টুইটার একাউন্টে পোস্ট করা এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেছেন। মেহবুবা গৃহবন্দি হওয়ার পর ওই টুইট একাউন্টটির ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন তার মেয়ে ইলতিজা মুফতি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জি নিউজ।
প্রথম টুইটে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, সবকিছু যদি স্বাভাবিক থাকে তাহলে কাশ্মীরে কেন ৯ লাখ সেনা সদস্য তার ব্যাখ্যা কি? পাকিস্তান থেকে হামলা হবে এই কারণে তারা কাশ্মীরে নন। তারা শুধু কাশ্মীরে অবস্থান করছেন প্রতিবাদ বিক্ষোভকে থামাতে।
ভিন্নমত দমন করায় ব্যবহৃত হওয়ার পরিবর্তে সেনাবাহিনীর প্রথম দায়িত্ব হলো সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখা।
পরের এক টুইটে তিনি যোগ করেন, বিজেপি জওয়ান কার্ড ব্যবহার করছে ও তাদের ভোটাধিকার ছিনতাই করছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, কাশ্মীরিদের যদি কামানের তোপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে কাশ্মীরে অসন্তোষ দমাতে সেনারা দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হবেন। জওয়ান অথবা কাশ্মীেিদর প্রতি কোনো তোয়াক্কা করে না ক্ষমতাসীন দল।
মেহবুবা মুফতি হলেন কাশ্মীরের পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান। তিনি ভারতীয় সংবিধান থেকে অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করার বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে কথা বলে আসছেন। ওদিকে কাশ্মীরে আটক রাজনীতিবিদদেরকে আজ বৃহস্পতিবার থেকে মুক্তি দেয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

গ্রেটার সঙ্গে দেখা করতে চান কিম কারদাশিয়ান

আলোচিত সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থানবার্গের ভ’য়সী প্রশংসা করেছেন মার্কিন টেলিভিশন তারকা ও মডেল কিম কারদাশিয়ান। মঙ্গলবার তিনি গ্রেটাকে একজন সাহসী ও অসাধারণ তর”ণী হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিজেও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ৩৮ বছর বয়সী জনপ্রিয় ওই মডেল আরো বলেন, আমি গ্রেটার সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নিতে ইচ্ছুক। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এর আগে জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের পরিবেশ নিয়ে উদাসীনতার বির”দ্ধে কথা বলে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে গ্রেটা থানবার্গ। এ নিয়ে আরমেনিয়া সফরকালে রয়টার্সকে দেয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে কিম কারদাশিয়ান বলেন, গ্রেটা অসাধারণ একটি মেয়ে। আমাদের যেমন সাহসী ও সৎ মানুষ দরকার তেমনই একজন গ্রেটা। তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর সমস্যা।
আমি তাই গ্রেটার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই এবং তার ধারণা ও চিন্তাকে বিশ্বব্যাপী ছড়াতে সাহায্য করতে চাই।

বুয়েটে জুনিয়রদের ভয়ঙ্কর রাত by মরিয়ম চম্পা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দু’দিনের সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয় বৃহস্পতিবার থেকে। সারা সপ্তাহ ক্লাস শেষে বৃহস্পতি এবং শুক্রবার দু’দিন তাদের সাপ্তাহিক ছুটি। বুধবার সন্ধ্যা থেকে দু’দিনের জন্য ক্লাস-পরীক্ষার চাপ কমে যায়। কিন্তু এই বুধবার রাতই বিভিন্ন হলের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্ক হয়ে আসে। কারণ এই রাতেই হলের ছাত্রলীগ নেতা বা সিনিয়রদের কাছে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের নানা নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এ বিষয়ে শেরে বাংলা হলের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী বলেন, বুয়েটে মূলত সে সকল শিক্ষার্থীরাই চান্স পেয়ে থাকেন যাদের মাথা ঠান্ডা। কারণ মাথা গরম শিক্ষার্থী কখনোই ইঞ্জিনিয়ারিং এর মতো বিষয়ে পড়তে পারে না। আমাদের ক্লাসের পড়া থেকে শুরু করে জীবনের সব সিদ্ধান্তগুলোই ঠান্ডা মাথায় নিতে হয়।
সপ্তাহে ছুটির দুদিন শিক্ষার্থীদের কাছে অনেকটা ঈদের মতো। কারণ এই সময়টাতে আমরা নিজেদের মতো করে সময় কাটাই। আর সাপ্তাহিক ছুটি মানে আমরা বুধবার রাত থেকে হিসাব করি। কিন্তু এই রাতটিই আমাদের কাছে ভয়ের এবং আতঙ্কের। কারণ হলের সিনিয়র ভাইয়েরা বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা এই রাতটিকে তাদের টর্চার বা র‌্যাগিংয়ের উপযুক্ত রাত হিসেবে ব্যবহার করে। এই রাতে তারা মদসহ যাবতীয় নেশা করে এক্সট্রা পেনিক হিসেবে জুনিয়রদের পিটিয়ে বাড়তি আনন্দ পায়।

একই হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমি যখন প্রথম বর্ষে তখন আমার ভাগ্যে এই ভয়ংকর বুধবার রাতটি একবার এসেছিল। হলের প্রতিটি রুমে মূলত চারজন করে শিক্ষার্থী থাকে। আমাদের রুমে বাকী দুজন রুম মেটের মাথা ঠান্ডা থাকলেও আমার আর আমার পাশের বেডের রুম মেট উত্তপ্ত মেজাজের। কোনো অন্যায় দেখলে মুখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। আমরা নিজেদের মতো করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতাম। কিন্তু এটার জন্য যে বড় ভাইদের ভয়ংকর র‌্যাগিংয়ের শিকার হব সেটা বুঝতে পারিনি।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কোনো এক বুধবার রাতে আমি আর আমার রুমমেটের ডাক আসে। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাম্প দিয়ে আমাদের পিঠে আর নিতম্বে এলোমেলো ভাবে পিটানো শুরু করে। এরপর আমাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। আমাদের দোষ ছিল একটাই আমরা তখন সমসাময়িক রাজনৈতিক কোনো একটা বিষয় নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম।

তিতুমীর হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি এখনো রাতে ভালো ঘুমাতে পারিনা। প্রায় রাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। হলে আসার পর বড় ভাই এবং তাদের দলের নেতাদের সঙ্গে কেন রুমে গিয়ে দেখা করিনি। সালাম-আদাব দেইনি। অজান্তে কোনো এক বড় ভাইয়ের সামনে দিয়ে তার আগে হেঁটে গিয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার দোষ। হঠাৎ এক ছুটির দিন রাতে আমাকে ডাকা হয়। গণরুমে গিয়ে বড়ভাইদের সালাম দেয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি না করাতে মূলত আমাকে ডাকা হয়। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে বললো, রাখি সাওয়ান্তের মতো নেচে দেখা। আমি লজ্জায় কেঁদে ফেলি। এসময় হঠাৎ একজন এসে আমাকে পেছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। সেও জুনিয়র ছিল। উঠে দাঁড়ালাম। এরপরে কি হয়েছে মনে করতে চাই না।

সোহরাওয়াার্দী হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় জুনিয়রদের দিয়ে জুনিয়রদের পিটানো হয়। কারণ, হলে আসার পরেই যে সকল জুনিয়ররা রাজনীতিতে যোগ দেয় তারা প্রথম দিকে একটু ভীতু প্রকৃতির থাকে। ভয় ভাঙ্গানো, হাত পাকানো এবং সাহস বাড়াতে তাদের দিয়ে জুনিয়রদের পিটানো হয়। এসময় বড় ভাইরা পাশ থেকে বলেন, ভালো করে হাত পাকা। ভবিষ্যতে কাউকে মারতে যেন হাত বা বুক না কাপে। আমরা আছি। চালিয়ে যা। এভাবে জুনিয়রদের দিয়ে জুনিয়রদের পেটানো হয়।
ড. এম. এ. রশীদ হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসের হলগুলোতে জুনিয়রদের র‌্যাগিং-এর বিষয়টি খুবই কমন। আবাসিক হলে আছে অথচ ছোট বড় র‌্যাগিং এর শিকার হয় নি এমনটা নেই বললেই চলে। চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, বাজে গালি শোনা এগুলো নিত্য নৈমত্যিক। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে হলে ভিন্নমতাদর্শী বিকল্প কোনো ছাত্র সংগঠন নেই। ফলে একচোটিয়াভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন রাজত্ব করে যাচ্ছে। কাজেই হলে থেকে তাদের মতাদর্শের বাইরে গিয়ে কেউ কোনো কথা বলার দুঃসাহস দেখানো প্রায় অসম্ভব। যারা কোনো রকমের দলাদলি এড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করতে চায়, তারাই মূলত ছাত্রলীগ নেতাদের রোষানল এবং নির্যাতনের শিকার বেশি হন। কেউ নিয়মিত নামাজ-রোজা করলেই তাকে ‘শিবিরকর্মী’ ট্যাগ দেয়া হয়। সে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হলেও।

আহসান উল্লাহ হলের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, যখন প্রথম বর্ষে তখন বড় ভাইদের দ্বারা র‌্যাগিং এর শিকার হয়েছি। এখন সিনিয়র হয়েছি। কিন্তু কাউকে তো কখনো র‌্যাগিং করিনি। এটা সম্পূর্ণরূপে কুরুচিপূর্ণ একটি কাজ। এটা যারা করে তারা একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পাওয়ার জন্যই মূলত করে। বুয়েটে পড়ালেখার এতো চাপ থাকা সত্বেও তারা এসব করার সময় পায় কখন ভেবে পাই না।

আবরার হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা: পানিও দেয়নি খুনিরা, বলে ও নাটক করছে by পিয়াস সরকার

রাত আটটায় শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেয়া হয় আবরার ফাহাদকে। এরপর থেকে শুরু নির্যাতন। প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলে মানসিক নির্যাতন। পরে শুরু  হয় পেটানো। সেখানে থাকা ছাত্রলীগ নেতারা পেটানোর ফাঁকে ফাঁকে মদ পান করে। কয়েক ঘণ্টা পেটানোর পর রাত দুইটার দিকে আবরার নেতিয়ে পড়েন। কয়েক বার বমি করে। মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে।
তাকে টেনে হিচড়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেলে দেয়া হয় সিঁড়ির সামনে। মুমূর্ষু অবস্থায় খুনীদের উদ্দেশ্যে মৃদু কণ্ঠে কথা বলেন আবরার। বলেন, আমার অবস্থা খুবই খারাপ। মনে হচ্ছে আমি মরে যাচ্ছি। আমাকে মাফ করে দেন। আমাকে একটু পানি খেতে দেন। কিন্তু খুনীরা আবরারের অন্তিম এ আবদারটুকুও পূরণ করেনি। উল্টো তারা হাসাহাসি করে বলে, ও নাটক করছে। পরে তারা আবরারকে ফেলে টিভি রুমে খেলা দেখতে চলে যায়। সিঁড়ির সামনে ফেলে যাওয়ার পর বেশ কয়েকজন আবরারকে জীবিত অবস্থায় দেখেছেন। আরাফাত নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি খাবার নিতে নিচে নেমে দেখি আবরারের নিথর দেহ পড়ে আছে। শের-ই বাংলা হলেই থাকেন আরাফাত। তিনি বলেন, আমি বলি ভাই কি হইছে? আবরার বলে, ভাই বাঁচা বাঁচা।
আমি হাত-পা মালিশ করা শুরু করি। শরীর এতোটাই ফুলে ছিলো যে রগ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি চিল্লাইতাছি ভাই কেউ একটু ডাক্তাররে খবর দে। কেউ যে চোখের সামনে মরতে পারে কল্পনাই করি নাই। তিনি বলেন, যখন হাত মালিশ করতে ছিলাম তখন দেখি হাতের মধ্যে রক্তের ছোপ। পুরো বডি ঠান্ডা। মনে হচ্ছিল তোশকের মধ্যে একটা বরফের টুকরা পড়ে আছে। আবরারের তোশক ছিলো প্রস্রাবে ভেজা। তোশকে বমি। মুখে ফেনা। হাত পা মালিশ করার পরও কিছু না হওয়ায় বুক মালিশ শুরু করি। চাপ দেই কিছু হচ্ছে না। ভিতর থেকে হো হো একটা শব্দ আসে।
কাঁদতে কাঁদতে আরাফাত বলেন, মাপ করে দিস ভাই আবরার। আমি তোরে বাঁচাইতে পারি নাই। শেষ সময়ে আবরার বলেছিলো, আল্লাহ আমার সকল গুণা মাপ করে দিও। ঠিক মারা যাওয়ার আগ মুহুর্তে সে কালেমা পড়ে। মারা যাওয়ার আগে আবরার তার বন্ধুকে ফোন দিয়েছিলেন, এমনটাই টকশোতে বলেন ছাত্রলীগের এক নেতা। সেই কথার প্রেক্ষিতে ওই শিক্ষার্থী বলেন, যে মানুষটা এই রকম নির্মম অবস্থায় পড়ে আছে। যে কথা বলতে পারছিলো না ঠিক মতো সে কি করে ফোন করবে? আর আবরারের ফোনতো তারা আগেই নিয়ে গিয়েছিলো।
আন্দোলনরত আরেকজন বলেন, আবরার যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। তখন থানায় ফোন করে তারা। ও যদি মারা না যেত ওকে শিবির বলে চালিয়ে দেয়া হতো। আমরা জানতাম আমাদের বন্ধু, আমাদের ভাই শিবির করতো। কিন্তু মারা যাওয়ার কারণে পুলিশের হাতে শিবির বলে ধরিয়ে দিতে পারে নাই।
মহিউদ্দিনও থাকতেন সেই হলে। তিনি আড়াইটার দিকে পড়া শেষে খেতে বের হন। তখন তিনি দেখেন আবরার সিঁড়ির মেঝেতে কাতরাচ্ছে। তিনি বলেন, আমি আমার রুমমেটকে বলি ওর মনে হয় মৃগি হয়েছে ওকে হাসপাতালে নিতে হবে। বুয়েট ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক জিয়ন তখন বলে, ও নাটক করতেছে। ওকে ফেলে রাখ। তোরা যা। ওরে এখনো ২ ঘণ্টা পিটানো যাবে। আমি ৩দিন ঘুমাইতে পারিনি। আমারে মাপ করে দিস ভাই।
এই ২০১১ নম্বর রুমের টর্চারের কথা বলেন, আরেক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, গত ২ তারিখ আমাকে ও আমার রুমমেটকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো সেই রুমে। আমরা ৩০০৭ নম্বর রুমে থাকি। এর ২ দিন আগে স্যার যখন আসে তার আগে বলে তোরা স্যারকে কিছু বলিস না। তোদের আর ডাকা হবে না। ঘটনার দিন আমরা রুমে ছিলাম। আমার বন্ধু ডাকলেও দরজা খুলে দেয়নি। এইছিলো আমাদের অপরাধ। ১৭ ব্যাচের লীগের ভাইয়েরা আমাকে ও আমার বন্ধুকে নিয়ে যায়। সিয়ামকে যেভাবে মারা হয় আমি দেখে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি। সংজ্ঞা ফেরার পর তারা বলে, এই রুম থেকে জীবিত ফিরতে পারবি কীনা সেটা ভাব। তিনি আরো বলেন, আমি এই বুয়েটে অনেক স্বপ্ন নিয়ে পড়তে এসেছি। এখন আমার আর এই বুয়েটে পড়তে ইচ্ছা করে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানও সেই রাতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, প্রাধ্যক্ষ্য ও সহকারী প্রাধ্যক্ষ রোববার রাত ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে আমার বাসায় যান। খুব বিমর্ষ অবস্থায় বলেন, আমার হলে খুন হয়েছে। তাদের সঙ্গেই আমি হলে আসি। সিসিটিভি ফুটেজ সাদা পাঞ্জাবী পড়া ব্যাগ থাকা লোকটিকে দেখা গেছে, তিনি ছিলেন ডাক্তার। তিনি পরীক্ষা করে বলেন, সেতো অনেক আগেই মারা গেছে। এরপর সেখানে থাকা ছাত্রলীগের নেতারা চাপ দিতে থাকে লাশ নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু ডাক্তার বলেন, আমি লাশ নিয়ে যেতে পারবো না। এটা পুলিশ কেস। তখন তিনি বলেন, সেখানে থাকাদের আমি চিনিনা। শুধু রাসেলকে চিনি। এরপর আমি ভিসিকে ফোন দিয়ে ঘটনা বলি। ভিসি আমাকে বলেন, পুলিশকে ফোন দিতে। পুলিশ যা করবার করবে। চকবাজার থানায় ফোন দেবার পর পুলিশের সঙ্গে একজন ডাক্তার আসেন। তিনি সেখানেই সুরতহাল রিপোর্ট করেন।
এই শিক্ষক আরো বলেন, সুরতহালের সময় হল প্রাধ্যক্ষ, সহকারী প্রাধ্যক্ষ, ডাক্তার ও আমি ছিলাম। এরপর পুলিশ লাশ ঢামেক মর্গে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, পুলিশ হলে আগেও এসেছিলো এটা তিনি জানতেন না। পরে ভোর বেলা কিছু শির্ক্ষার্থীদের কাছে জানতে পারি হলে পুলিশ এসেছিলো শিবির ধরতে।

আবরারের খুনিদের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী: যত রকম উচ্চ শাস্তি আছে ওদের হবে

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকারীদের সব ধরনের শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কে ছাত্রলীগ বা কী জানি না, অপরাধী অপরাধীই। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, এ নৃসংসতা কেন? এই জঘন্য কাজ কেন? এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যতরকমের উচ্চ শাস্তি আছে সেটা দেয়া হবে। গতকাল বিকালে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এ সংবাদ সম্মেলন হলেও আবরার হত্যা এবং ক্যাসিনো ও দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা বাচ্চা ছেলে, ২১ বছর বয়স। তাকে হত্যা করা হলো। মারা হলো পিটিয়ে পিটিয়ে।
কী অমানবিক! পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দেখেছি। সব ইনজুরি ভেতরে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ যদি কোনও অপরাধ করে, সে কোন দল করে, কী করে, তা আমি দেখি না, অপরাধী অপরাধীই। বুয়েটে এই ঘটনা যখন ঘটে, সকালে শুনে আমি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম আলামত সংগ্রহ করতে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে। ছাত্ররা নামার আগেই আমরা তৎপরতা শুরু করি।

কে ছাত্রলীগ বা কী জানি না। অপরাধী অপরাধীই, অন্যায়কারীর বিচার হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন,আমি তো বলেছি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কোথায় কে ছিল সব কয়টাকে গ্রেপ্তার করতে। তবে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার পর সেটা আনতে দেবে না। আমার মনে প্রশ্ন দেখা দিলো, এটা কেন? হত্যাকারীদের কেউ কি এর মধ্যে আছে যে ফুটেজ প্রকাশিত হলে তাদের পরিচয় বের হয়ে যাবে কিনা। পরে তারা ফুটেজ নিয়ে আসলো এবং কর্তৃপক্ষকে একটা কপি দিয়ে আসলো। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আন্দোলন কীসের জন্য। বিচার তো হবেই। যে মা সন্তান হারিয়েছেন, যে বাবা সন্তান হারিয়েছেন তাদের যে কষ্টটা কী সেটা আমি বুঝি। একটা সাধারণ পরিবারের ছেলে, একটা ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। তাকে কেন হত্যা করা হলো। তিনি বলেন, ২০০১ সালে আমাদের নেতাকর্মীদের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মারা হতো এমনভাবে যাতে বাইরে থেকে বোঝা যেত না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কত হত্যা হয়েছে। ছাত্রদল বুয়েটে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে সনিকে হত্যা করেছে। ওই বুয়েটে আমাদের কত নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আমরা কারও কাছে বিচার পেয়েছি? ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমি চেষ্টা করেছি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনও ঘটনা যাতে না ঘটে। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী লিখিত বক্তব্যে তার দুই সফরের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম প্রধানমন্ত্রীর পাশে ছিলেন।

বুয়েট চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে: এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বুয়েট যদি মনে করে, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। এটা তাদের ব্যাপার। তবে ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি বন্ধের বিপক্ষে মত দেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, যেকোনও আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্ররাই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। তবে ছাত্ররাজনীতি পুরো নিষিদ্ধের কথা তো মিলিটারি ডিক্টেটরদের কথা। তারাই এসে এটা নিষিদ্ধ করে, সেটা নিষিদ্ধ করে। এসময় তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ছাত্রলীগ সবসময় একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র সংগঠন ছিল। তবে নীতি-আদর্শের প্রশ্নে মূল দল তো কিছু দিকনির্দেশনা দেবেই। জিয়াউর রহমান আসার পর নষ্ট রাজনীতি শুরু হয়েছে, যেটা শুরু করছিলেন আইয়ুব খান। ছাত্র সংগঠনগুলোকে মূল দলের অঙ্গসংগঠন করা হয়। শেখ হাসিনা বলেন, নেতৃত্ব উঠে এসেছে ছাত্র নেতৃত্ব থেকে। রাজনীতি শিক্ষার ব্যাপার, ট্রেনিংয়ের ব্যাপার। আমি নিজেই ছাত্ররাজনীতি করে এসেছি। দেশের ভালো-মন্দের চিন্তা তখন থেকেই আমার তৈরি হয়েছে। তবে একটা ঘটনার কারণে পুরো ছাত্ররাজনীতিকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এটা তো রাজনীতি নয়। আবরার হত্যাকাণ্ডে রাজনীতি কোথায়, এমন প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

বাংলাদেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে এটি হতে পারে না: আমদানি করা তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ভারতের ত্রিপুরায় রপ্তানির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে সেটি হতে পারে না। যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এলপিজি রপ্তানি করবে, প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝিরও কোনো অবকাশ নেই। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বিদেশ থেকে এলপিজি এনে প্রক্রিয়াজাত করে ভারতে রপ্তানি করব। এটা প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রকৃত মজুদ কত, তা না জেনে রপ্তানি করার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না বলেও তিনি আশ্বস্থ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলপিজি বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না, বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গ্যাস উত্তোলনের সময় বাই প্রডাক্ট হিসেবে এলপিজি পাওয়া যায়। ত্রিপুরায় যে গ্যাসটা দিচ্ছি তা আমদানি করা এলপিজি, বটল গ্যাস। অন্য পণ্য যেমন আমরা রপ্তানি করি, ঠিক তেমন। এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই। গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে আমাদের রপ্তানিখাতে আরেকটি মাত্রা যোগ হলো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এর বিরোধিতায় সোচ্চার, মানে বিএনপি, ২০০১ সালের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। আমেরিকা গ্যাস বিক্রির জন্য বলেছিল, আমি বলেছিলাম দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমরা তারপর বিক্রি করব। যে কারণে ২০০১ সালে আমরা ক্ষমতায় আসতে পারিনি। আর যারা গ্যাস বিক্রি করে দিচ্ছে বলছে, তারাই গ্যাস দেবে বলে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিমি কার্টারের বাসায় আমরা বসেছিলাম।
তাদের মাঝে চুক্তি হয়েছিল। বিল ক্লিনটন এসেছিলেন, তিনিও আমাকে গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমাকে আমেরিকায় দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেও আমি একই কথা বলেছিলাম। আমি তখন বলেছিলাম বিএনপি গ্যাস দিতে পারবে না। কারণ আমাদের অত গ্যাস ছিল না। তারা সার্ভে করার জন্য লোক পাঠাল। বলল, বাংলাদেশ গ্যাসে ভাসছে। যখন ভালো করে তাদের কাছে জানতে চাইলাম তখন তারা সঠিব জবাব দিতে পারেনি। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালের কথা যারা মনে রাখবেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা আমাদের একটা ঘাঁটি ছিল। সেখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করা হতো। তারা আমাদের দেশের মানুষদের ওই সময় আশ্রয় দিয়েছে খাবার দিয়েছে। ত্রিপুরা আমাদের শক্তি ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলপিজি গ্যাস আমাদের দেশে উৎপন্ন হয় না। আমরা আমদানি করছি। রান্নায় সিলিন্ডারে সরবরাহ করছি। আগে স্বল্প পরিমাণে আমাদের এলপিজি উৎপাদন হতো। আমদানিকৃত গ্যাস গ্রামে বিভিন্ন কোম্পানি সরবরাহ করছে। আগে ১০ কেজির সিলিন্ডার ১৬শ টাকা দাম পড়তো। বাজার উন্মুক্ত করে দেয়ায় এখন ৯শ টাকা। এখন অনুমোদিত ২৬টি কোম্পানি কাজ করছে।

চুক্তিটা হয়েছে খাবার পানির জন্য: ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যে চুক্তিটা হয়েছে সেটা তাদের খাবার পানির জন্য। তারা যখন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে, সেটার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ে। তাই নদী থেকে সামান্য পানি দিচ্ছি। কেউ যদি পানি পান করতে চায়, আর আমরা না দেই, সেটা কেমন দেখা যায়? প্রধানমন্ত্রী বলেন, বলেন তো ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল কোথায়? এটা খাগড়াছড়িতে। এটা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটা নদী। এর ৯৪ কিলোমিটার সীমান্তে, ৪০ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে। সীমান্তবর্তী নদীতে দুই দেশেরই অধিকার থাকে। যে চুক্তিটা হয়েছে, সেটা ত্রিপুরাবাসীর খাবার পানির জন্য। তারা যখন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে,সেটার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ে। তাই নদী থেকে সামান্য পানি দিচ্ছি। সব জায়গায় আমরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছি। যেটুকু পানি নিয়েছে, ততটুকু আমাদের অংশে পড়েছে বলেই চুক্তি করেছি। তাদেরকে দেয়া হচ্ছে মাত্র এক দশমিক ৮২ কিউসেক। অত্যন্ত নগন্য পানি দিচ্ছি। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমারসহ উজান থেকে আসা নদীগুলোর পানি বণ্টনের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেও উল্ল্যেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিএনপিসহ অন্যদের সমালোচনার বিষয়ে বলেন, বিএনপি নেতাদের কাছে আমার প্রশ্ন, জিয়াউর রহমান ও পরে খালেদা জিয়া যখন ভারতে যায় তারা কি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করতে পেরেছিল? তারা কী জবাব দিয়েছিল? আমরা ক্ষমতায় আসার পর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করার পর শুনতে হয়েছে ২৫ বছরের চুক্তি, দেশ বেচার চুক্তি। এবার হিসাব করে দেখেন কতটা গেছে আর কতটা পেয়েছি।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না: কোনো অপরাধ ঘটলে অপরাধীদের ধরতে প্রধানমন্ত্রীকেই কেন নির্দেশনা দিতে হয়? কিংবা ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে তাকে বহিষ্কার করতেও কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই নির্দেশ আসতে হয়? সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি সরকার প্রধান, দেশের কোথাও কিছু ঘটলে অবশ্যই তা দেখার দায়িত্ব আমার আছে। আমি তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। তিনি বলেন,আমি মনে করি এই রাষ্ট্র, এই দেশ আমার। এই দেশের মানুষ আমার মানুষ। তাদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তো আমারই। আমি যতক্ষণ পারি, সেই দায়িত্ব পালন করি। এটা নিয়ে এত প্রশ্ন কেন, সেটা আমার বোধগম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাথা থাকলে মাথা ব্যথা থাকবেই। আমি সরকার প্রধান। ফলে কোথায় কী ঘটছে, সেদিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা আমার কর্তব্য। আমাকে তো এটা কেউ চাপিয়ে দিচ্ছে না। আমি নিজের অনুভূতি থেকেই এটা করি। কখন কে কী বলবে, ওই চিন্তা কখনো করি না। দেশের জন্য ভাবি বলেই সব কাজ করি। তিনি বলেন, এর আগে একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে রাতে ব্যস্ত হতেন। এগুলো দেখে আপনাদের বদঅভ্যাস হয়ে গেছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ রাষ্ট্র চালানো দেখেছেন আপনারা, তাই অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। আমার এটাই মনে হচ্ছে। আমি সবদিকে নজর না রেখে যদি এখন বলতাম পানির কথা ভুলে গেছি, তাহলে নিশ্চয় খুশি হতেন।

ভাসানচরে ক্যাসিনোর জন্য জায়গা ঠিক করে দেয়া হবে:
ক্যাসিনো বা জুয়ার জন্য দেশের একটি জায়গা নির্ধারণ করে দেয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক্ষেত্রে তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য নির্ধারিত নোয়াখালীর ভাসান চরের এক পাশে একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়ার কথা বলেন। ক্যাসিনো ও জুয়ার জন্য তিনি নীতিমালা তৈরির কথাও এ সময় বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা ক্যাসিনো ও জুয়া খেলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে- তাদের কেউ কেউ হয়তো দেশ থেকে ভেগে গেছে। এখানে সেখানে খেলার জায়গা খোঁজাখুঁজি করছে। আমি বলেছি, একটা দ্বীপ মতো জায়গা খুঁজে বের করো, সে দ্বীপে আমরা সব ব্যবস্থা করে দেবো। দরকার হলে ভাসানচর, বিশাল দ্বীপ, এর একপাশে রোহিঙ্গা আরেক পাশে এই ক্যাসিনোর ব্যবস্থা করে দেবো। সবাই ওখানে চলে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবতার নিরীখে বলছি, অভ্যাস যদি বদঅভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, এই বদভ্যাস যাবে না, বার বার খোঁজাখুঁজি করতে হবে। তাই বার বার খোঁজাখুঁজি না করে একটা জায়গা ঠিক করে দেবো। ভাসানচর খুব বড় জায়গা। অসুবিধা নাই। ১০ লাখ লোকের বসতি দেয়া যাবে। তিনি বলেন, এখন যারা লুকায় চুরায় এটা সেটা করে, তারা সেখানে গিয়ে খেলতে পারবেন। কারা কারা করতে চায় নীতিমালা তৈরি করে লাইসেন্স নিতে হবে। ট্যাক্স দিতে হবে। তারপর সেখানে গিয়ে সবাই মিলে করেন আমাদের কোন সমস্যা নেই। সেই ব্যবস্থা করে দেবো। এতে আমরা ট্যাক্স পাবো তো টাকা পাবো। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যে সাংবাদিক সারির কয়েকজন হেসে উঠলে তিনি বলেন, আমি বাস্তবতাটাই বলছি। পরে প্রধানমন্ত্রী নিজেও হেসে ফেলেন।

ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে তথ্যমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেয়া হলো: সাংবাদিকদের জন্য সম্প্রতি সরকার ঘোষিত নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের ব্যাপারে সংবাদপত্র মালিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ওয়েজবোর্ডের ব্যাপারে আমাদের যে দায়িত্ব ছিল সেটা করেছি। এখন সংবাদপত্র মালিকরা না দিলে আমরা কী করব? এটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে মালিকদেরই দায়িত্ব পালন করতে হবে। এসময় প্রধানমন্ত্রী ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এখন এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আমি তাকেই দায়িত্ব দিলাম।

ন্যায়বিচার চান আবরারের পিতা: -গার্ডিয়ানের রিপোর্ট

কাম্প্যাসগুলোতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার অব্যাহত প্রতিবাদের মধ্যে বুয়েটের নিহত ছাত্র আবরার ফাহাদের পিতা তার সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করেছেন। সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার জন্য আবরার ফাহাদকে (২২) টার্গেট করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ফাহাদকে তার হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যার ন্যায়বিচার চান তার পিতা। বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা গার্ডিয়ানের অনলাইন সংস্করণ এ খবর দিয়ে বলছে,  ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা তার ওপর হামলা চালিয়েছে। এখন সন্তান হারিয়ে বুক চাপড়ে কাঁদছেন তার পিতা বরকত উল্লাহ। তিনি বলেছেন, আবরার পিএইচডি অর্জন করার আশা করেছিল। চেয়েছিল দেশের সেবা করতে।
তাকে হত্যার মতো এমন ঘটনা বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের জানা উচিত হলের ভিতরে কি ঘটছে। এমন কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রশাসন যদি এটা করতে পারে তাহলে হয়তো এ ধরনের হত্যা বন্ধ হবে।
গার্ডিয়ান আরো লিখেছে, ফাহাদের হত্যাকান্ড পুরো দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতা দমনে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। গার্ডিয়ান আরো লিখেছে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মতো এমন সংগঠনগুলোর নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো। এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের প্রহার এবং সমালোচনাকে স্তব্ধ করে দেয়ার অভিযোগ আছে। গত বছর স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অধিক নিরাপদ সড়কের দাবিতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছিলেন। তাদেরকে লাঠিসোটা দিয়ে পেটানো হয়েছে। চাপাতি দিয়ে তাদের ওপরা হামলা চালানো হয়েছে। এর জন্য আওয়ামী লীগ ও এর যুব সংগঠনকে দায়ী করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, কিন্তু যারা ওই সহিংসতা ঘটিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি কর্তৃপক্ষ। উল্টো তারা আটক করেছে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের।
গার্ডিয়ান আরো লিখেছে, আবরার ফাহাদ যে বুয়েটে পড়তেন সেখানকার প্রথম বর্ষের একজন ছাত্র বলেছেন, আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ বোধ করেন না। তার ভাষায়, আমরা কখনো মুক্তভাবে কথা বলতে পারি না। ফাহাদ ছিলেন বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে পড়ার সুযোগ পাওয়া খুব কঠিন। এখানে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকন্ট্রনিক নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন তিনি। ফাহাদের বন্ধুরা বলেছেন, সম্প্রতি নয়া দিল্লি সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এর সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন ফাহাদ। এ জন্য তার ওপর ওই নৃশংসতা হয়েছে। এসব চুক্তির মধ্যে রয়েছে পানিবন্টন ও ভারতের কাছে গ্যাস রপ্তানির মতো বিতর্কিত চুক্তি। গার্ডিয়ানের ভাষায়, অনেকেই যুক্তি দেখাচ্ছেন যে এ চুক্তি দেশের স্বার্থে নয়।
আবরার ফাহাদের লাশের ময়না তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী প্রহারের ফলে শরীরের অভ্যন্তরে মারাত্মক রক্তক্ষরণ থেকে নিহত হয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই প্রহারগুলো যেন এখন তার পিতামাতাকে দংশন করছে। পিতা বরকত উল্লাহ বলেন, ফাহাদ ছিল অত্যন্ত সাধারণ একটি ছেলে। তার ছিল শিশুসুলভ মানসিকতা। আমার ছেলে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চেয়েছিল। তার এই হত্যাকা-কে ভয়াবহ এক ক্রাইম হিসেবে আখ্যায়িত করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সাউথ এশিয়া। তারা অবিলম্বে এই হত্যার তদন্ত দাবি করেছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আবরার সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুকে শান্তিপূর্ণভাবে তার মুক্ত মত প্রকাশের অধিকার চর্চা করেছিলেন। ফাহাদের পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই হত্যার সঙ্গে জড়িত কমপক্ষে ১১ জন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার বুয়েটে কয়েক শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মৌন মিছিল করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্র বলেছেন, শিক্ষার্থীদের মানহানি করা ও প্রহারের ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু বুয়েটের নেতৃত্ব তা অবজ্ঞা করে যান। এই র‌্যাগিং সব সময়ই একটি বড় সমস্যা হয়ে আছে। আগের দিনের অনেক ঘটনা আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে নোটিশ করেছি। কিন্তু তারা কখনোই গুরুত্বর কোনো পদক্ষেপ নেয় নি। তাদের সেই গাফিলতির ফলই হলো আবরারের মৃত্যু। এসব ঘটনায় জড়িতরা কখনো ভাবেনি তাদেরকে করুণ পরিণতির মুখে পড়তে হবে। কোনো ঘটনাকে আলোর মুখ দেখানোর জন্য কাউকে হত্যা করা- এটা এক লজ্জা।

বিক্ষোভ, আল্টিমেটাম রাজনীতিকে শিক্ষক সমিতির ‘না’

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদে উত্তাল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়েছে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও। বিক্ষোভ প্রতিবাদ  কর্মসূচিতে দাবি উঠেছে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের। এমন দাবির মধ্যেই গতকাল বুয়েট শিক্ষক সমিতি শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। বুয়েটে ছাত্র এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনীতি বন্ধেও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন তারা। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে দেশসেরা এ বিদ্যাপীঠকে রাজনীতিমুক্ত করার। আগের দিন পেশ করা বুয়েট শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবি গতকাল ১০ দফায় ঠেকেছে। দিনভর বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি পালন করেন তারা।

দাবি পূরণে প্রশাসনকে সাত দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে মানববন্ধন ও মৌন মিছিল করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। এসময় তারাও পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। বুয়েট শিক্ষক সমিতি শিক্ষকদের সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়া ছাত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়েও শিগগিরই প্রশাসনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানানো হয়। এদিকে বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনও সাত দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। বুয়েটের সাবেক-বর্তমান ও শিক্ষক সমিতি ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করণের দাবি জানিয়েছেন। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের পদত্যাগও দাবি করা হয়। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে বিকালে নিজের ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন শের-ই বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল খান। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এসময় তারা আবরার হত্যার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে হত্যাকারী ছাত্রলীগ নেতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। মানববন্ধন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কালো পতাকা মিছিল নিয়ে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন।

পৃথকভাবে বিক্ষোভ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও ছাত্র ফেডারেশন।
আবরার হত্যার প্রতিবাদ ও হত্যাকারী ছাত্রলীগ নেতাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গতকাল তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকে দিনভর চলে এ বিক্ষোভ। এসময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রশাসনকে ১০ দফা দাবিতে সাত দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়। দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা একটি প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন। এসময় তারা পলাশী এবং চানখারপুল সংযোগ রাস্তা বন্ধ করে দেন। এ সময় তারা ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে, ‘শিক্ষা সন্ত্রাস একসঙ্গে চলে না’, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই খুনিদের ফাঁসি চাই’, ‘ভিসি তুমি নীরব কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘খুনিদের ঠিকানা এই ক্যাম্পাসে হবে না’, ‘সন্ত্রাসীদের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। আন্দোলনকারীরা এসময় তাদের সব দাবিগুলো না মানা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।

শিক্ষার্থীদের দশ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- খুনিদের শানাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত; খুনিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে আজীবন বহিষ্কার; আবরার হত্যা মামলার সব খরচ এবং ক্ষতিপূরণ বিশ্ববিদ্যালয়কে বহন করা; মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীন স্বল্পতম সময়ে নিস্পত্তি করা; অবিলম্বে চার্জশিটের কপিসহ অফিসিয়াল নোটিশ দেয়া; বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা; ঘটনার পর ভিসি কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি এবং ৩৮ ঘন্টা পর গিয়ে কোনো প্রশ্নের উত্তর না দেয়ায় বুধবার দুপুর ২টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে তার জবাব দেয়া; আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগ এর নামে এবং ভিন্নমত দমানোর নামে নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা; এ ধরণের ঘটনা প্রকাশে একটি কমন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা; নিরাপত্তার জন্য সব হলের উইংয়ের দুই পাশে সিসি ক্যামেরা বসানো এবং ১১ই অক্টোবরের মধ্যে শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করা। এদিকে, আন্দোলন চলাকালীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন বুয়েটের ডিরেক্টর অফ স্টুডেন্ট ওয়েলফারের পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) অধ্যাপক মিজানুর রহমান। এসময় শিক্ষার্থীরা কার নির্দেশে ক্যাম্পাসে পুলিশ আসলো এবং কার নির্দেশে গেলো এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, পলিটিক্যাল স্টুডেন্টদের ক্ষমতা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের কোনো কাজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজন হলে আমরা নম্বর সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকে জানাই। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আমাদের তেমন একটা সখ্যতা নাই যতটা পলিটিক্যাল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও ক্রমাগত চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন বুয়েট শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল খান। পৌনে তিনটার দিকে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি একে মাসুদ সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার সর্বসম্মতিক্রমে হলের ভিতরে বিভিন্ন ধরনের দোকান বন্ধ, বিভিন্ন টর্চার সেল বন্ধ, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ, সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের প্রভাব বন্ধ, বহিরাগত ছাত্রদের হলে প্রবেশ নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে। একইসঙ্গে আমরা আগে এগুলো যে নিষিদ্ধ করতে পারিনি সেই দায় নেন শিক্ষকরা।
শের-ই বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ: এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেছেন বুয়েটের শের-ই বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাফর ইকবাল খান। গতকাল দুপুরে তিনি বুয়েট ভিসি, রেজিস্ট্রার ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালক বরাবর নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে প্রভোস্ট পদত্যাগপত্র তিন জায়গায় জমা দিয়েছেন।

শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ, শিগগিরই ছাত্র রাজনীতির ব্যপারে সিদ্ধান্ত: বুয়েটে শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে শিক্ষক সমিতি। গতকাল ৩০০ শিক্ষকের উপস্থিতিতে বুয়েট শিক্ষক সমিতির এক সভা থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভা শেষে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ১০ দফা দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এরপর শিক্ষকরা আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন ও ক্যাম্পাসে মৌণ মিছিল করেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষক সমিতি ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেন। আর ছাত্র রাজনীতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনীতি শিগগিরই প্রশাসনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক একে এম মাসুদ এসব তথ্য জানান। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে তিনি বলেন, আবরারের পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এ হত্যার পেছনে কর্তৃপক্ষেরও দায় রয়েছে। এই দায় আমরাও শিকার করছি, আমরাও এর দায় নিচ্ছি। দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে শিক্ষক সমিতি বলছে, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হত্যাকারী ছাত্রদের আজীবন বহিষ্কার করতে হবে। আবাসিক হলগুলো থেকে বহিরাগতের সরাতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা। তিনি বলেন, আমরা বুয়েটে সকল প্রকার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জরুরি ভিত্তিতে র‌্যাগিং এবং নির্যাতনের শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ওয়েবসাইটে কম্পেইন করার ব্যবস্থা করেছি। তিনি আরও বলেন, ভিসি যদি নিজে থেকে পদত্যাগ না করেন তবে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।

ভিসির পদত্যাগ ও ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের: এদিকে দ্বিতীয় দিনের মতো আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছে বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল বুয়েটে এক প্রতিবাদ সমাবেশে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সাত দফা দাবি করে। যেখানে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি করা হয়। বুয়েট অ্যালামনাইয়ের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী এই সাত দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হত্যার সঙ্গে জড়িত সকলকে বিশেষ বিচার ট্রাাইব্যুনাল এর আওতায় এনে দ্রুততম সময়ে বিচার করা; জড়িত সকল ছাত্রকে অনতিবিলম্বে বুয়েট থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার; বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলসমূহের অঙ্গ সংগঠন ভিত্তিক ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা; বুয়েট প্রশাসনকে ঐতিহ্য পরিপন্থী যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাব মুক্ত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রম এর তদন্ত, বিচার ও শাস্তি প্রদান এর ক্ষেত্রে ভিসিসহ বুয়েট প্রশাসনের ধারাবাহিক অবহেলা ও ব্যর্থতা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মদদ জুগিয়েছে- তাই অবিলম্বে ভিসির অপসারণসহ প্রশাসনের আমূল পরিবর্তন করে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মান অতীতের মত সমুন্নত রাখতে সুযোগ্য, নির্ভীক ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের পদায়ন করা; র‌্যাগিং এবং অন্যান্য অজুহাতে ছাত্র-ছাত্রী নির্যাতন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ও ক্যাম্পাসে সকল ছাত্রের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং আবরার হত্যাসহ ইতিপূর্বে সাংঘটিত অন্যান্য ছাত্র নির্যাতনের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বিচার কার্য অবিলম্বে সম্পন্ন করে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

গণতদন্ত কমিশন গঠন করবে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা: বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে নির্যাতনের বিষয়ে গণতদন্ত কমিশন গঠন করে রিপোর্ট প্রকাশ করার ঘোষণা দিয়েছে নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে নিপীড়নবিরোধী অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশে একথা জানান অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের নির্যাতনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী আমাকে তদন্ত কমিটি গঠন করে নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরার কথা বলেছে। কিন্তু আমি ঘোষণা করতে চাই শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, পাশাপাশি এ কমিটিতে শিক্ষকরাও অংশ নেবেন। কমিটি নির্যাতনের চিত্র সারাদেশের মানুষের সামনে তুলে ধরবে। ঢাবি অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, আমরা সবাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গেস্টরুম-গণরুমের কথা জানি। বুয়েটে প্রায় প্রতিদিন রাতেই কাউকে না কাউকে টর্চার সেলে অত্যাচার করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অবস্থা। আমরা জানি, এই সমাবেশের পর গণরুম-গেস্টরুম বন্ধ হবে না। ঢাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টর বিন্দুমাত্র বিচলিত হবেন না। তারা সরকারের কথা অনুযায়ীই চলবেন। সমাবেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অংশ নেন।
ঢাবি সাদা দলের মৌন অবস্থান: এদিকে আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মৌন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামাতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এসময় সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আবরারের হত্যায় আজ আমরা স্তম্ভিত। জাতি স্তম্ভিত। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে পাঁচ ঘণ্টা পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য আমরা লজ্জিত। তিনি বলেন, আমাদের একটা ছেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আজকে সে তার জীবন দিতে হয়েছে। আমরা মনে করি এ জীবন হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য। সে শহীদের মর্যাদা পাবে। আমরা তার হত্যার বিচার দাবি জানাচ্ছি।

ঢাবি শিক্ষার্থীদের কালো পাতাকা মিছিল: আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে কালো পতাকা মিছিল করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে একটি কালো পতাকা মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়ে বুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানায়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, বর্তমানে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনই নয়, বরং দেশের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের দলকানা প্রশাসন দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। মানুষকে কোনো কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। যখনই ছাত্ররা টুকটাক কথা বলছে, তখনই এটা স্বৈরাচারদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষভাবে গড়ে তুলতে হবে। বুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা কোনোভাবেই আন্দোলন বন্ধ করবেন না। এ ধরনের আন্দোলনের ক্ষেত্রে অতীতে দেখা গেছে, প্রশাসন মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেয়। পরে আর কোনো ফলাফল পাওয়া যায় না। আপনারা ভয় পাবেন না। আমরা সবসময় আপনাদের সঙ্গে আছি।

আবরার হত্যার শাস্তি দাবি ছাত্রলীগের: আবরার হত্যার সঙ্গে জাড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘আবরার হত্যার দ্রুত বিচারের’ দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করে সংগঠনটি। এসময় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিজেদের নেয়া পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি। অন্যদিকে ঘটনাকে পুঁজি করে কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইলে তাদের মোকাবিলা করারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ঘটনার পরপরই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ১১ জনকে বহিষ্কার করি। দ্রুততম সময়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত এজাহারভুক্ত ১৯ জনের মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই। পলাতকদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতারের আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে এজাহারের বাইরে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসারও আহ্বান জানাই। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগ সব ধরনের সহযোগিতা করবে। জয় বলেন, সাংগঠনিকভাবে ছাত্রলীগ কখনোই কোনও প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় কিংবা উৎসাহ প্রদান করে না। সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে অতি উৎসাহী কোনও কর্মকাণ্ডকে ছাত্রলীগ অতীতের মতো ভবিষ্যতেও প্রশ্রয় দেবে না। সমপ্রতি আবরার হত্যাকাণ্ডের ছাত্রলীগের পদক্ষেপে আবারও তা প্রমাণ পেয়েছে। এসময় তিনি বলেন, আমরাও বুয়েটের শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একমত। অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। তবে বুয়েটের শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনাকে কেউ কেউ ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। যদি কেউ এ ঘটনাকে পুঁজি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায় তাহলে ছাত্র সমাজ তার মোকাবিলা করবে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, আমরা আবরার হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি করছি। আপনারা দেখেছেন, শুরু থেকেই আমরা অপরাধীদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছি। কারণ আমরা বলেছি কোনও অপরাধীর স্থান বাংলাদেশ ছাত্রলীগে হবে না। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ১১ জনকে স্থায়ী বহিষ্কার করেছি। আপনারা জানেন, কোনও ঘটনার জন্য এই প্রথম এতো দ্রুত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি এবং সাংগঠনিকভাব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আমরা লজ্জা প্রকাশ করছি।

ছাত্রদলের মৌন মিছিল: এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের ঘটনায় হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মুখে কালো কাপড় বেধে মৌন মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবন থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে অপরাজেয় বাংলায় সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। এসময় তারা ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের ত্রাসের রাজনীতি বন্ধের দাবি করে আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের জোর দাবি করে। এসময় উপস্থিত ছিলেন, ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার প্রমুখ।

প্রগতিশীলদের বিক্ষোভ: ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি করে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। বুধবার মধুর ক্যান্টিন থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে নেতৃত্ব দেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন প্রিন্স, ঢাবি শাখার সাধার সাধারণ সম্পাদক সুজন, ছাত্রমৈত্রীর ইকবাল কবীর প্রমূখ। এছাড়া বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনও ঢাবি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে।

জাতিসংঘে তহবিল সংকট, সীমিত হতে পারে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম

চরম তহবিল সংকটে জাতিসংঘ। পরিস্থিতি এ পর্যায়ে গেছে যে, সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, অর্থ সংকটের কারণে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের বরাদ্দ থেকে অন্য খাতে তাকে খরচ করতে হয়েছে। শেষ হয়ে আসছে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সেই রিজার্ভও। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মাস শেষের আগে অর্থ না পেলে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমও সীমিত করে দেয়া হতে পারে। এমনটা চলতে থাকলে নভেম্বরে বেতন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জাতিসংঘের তরফে বলা হয়েছে-  বিগত এক দশকের মধ্যে ‘সবচেয়ে বড় অর্থ সংকট’ এর সম্মুখীন সংস্থাটি। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, চলতি মাস শেষে আর কর্মসূচি পরিচালনার মতো আর্থিক সক্ষমতা নাও থাকতে পারে সংস্থাটির।

মঙ্গলবার সদস্য রাষ্ট্রদেশগুলোকে এমনটি জানিয়েছেন, মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। বাজেট নির্ধারণী ফিফথ কমিটির উদ্দেশে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য দেশ সংগঠনটির বার্ষিক বাজেট পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দেয়নি।
ফলে, একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে তাদের বাজেট তহবিল। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিকও পৃথক বিবৃতিতে জানান, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজেটের মাত্র ৭০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করেছে সদস্য দেশগুলো। গত বছর একই সময়ের মধ্যে পরিশোধিত হয়েছিল ৭৮ শতাংশ অর্থ। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৯ সালের বাজেট পূরণে অর্থ দিয়েছে ১২৯ দেশ। তবে সিরিয়াসহ আরো ৬৪টি দেশ এখনো অর্থ পরিশোধ করেনি। জরুরি ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধ করতে হবে তাদের। চলতি বছরের জন্য দেশগুলোর অপরিশোধিত অর্থের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার। ফিফথ কমিটির সামনে দেয়া বক্তব্যে জাতিসংঘ মহাসচিব আরও বলেন, সংকট মোকাবিলায় অবিশ্বাস্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

এর মধ্যে রয়েছে, খালি পদে নতুন লোক না নিয়োগ দেয়া, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ ছাড়া সব ধরণের ভ্রমণ সীমিত করে দেয়া, একাধিক বৈঠক বাতিল বা পিছিয়ে দেয়াও রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, জাতিসংঘের সার্বিক কর্মসূচিই আক্রান্ত হবে এই অর্থ সংকটে। অর্থ না পরিশোধ করা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পূর্ববর্তী বাজেটে নির্ধারিত ৩৮ কোটি ১০ লাখ অর্থ পরিশোধ করেনি দেশটি। আর চলতি বছরের বাজেটে এখনো ৬৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার অপরিশোধিত রেখেছে মার্কিন সরকার। যদিও সাধারণত বছরের শেষ প্রান্তিকেই অর্থ পরিশোধ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ পর্যন্ত বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের ১৪৬ জন শান্তিরক্ষী প্রাণ দিয়েছেন। আহত হয়েছেন ২২৭জন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস-এ প্রকাশিত মধ্য জুনের এক পরিসংখ্যান বলছে, ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৮১জন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী জাতিসংঘে কাজ করেছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৬ শ ১৬ জন নারী। প্রায় ৬ হাজার ৫’শ বাংলাদেশি বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে রয়েছেন, যারা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত।

আবরার হত্যায় শোকস্তব্ধ বাংলাদেশ: -বিবিসি’র রিপোর্ট

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে শোকস্তব্ধ বাংলাদেশ। এ ঘটনা বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহিংসতার সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলেছে। বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা ও নির্যাতন একটি সাধারণ বিষয়। এ জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ আছে। তাতে বলা হয়, তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালায়, চাঁদাবাজি করে। আবরার হত্যাকাণ্ডে তারা জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েকজন নেতাকর্মীকে। বুয়েটে নিষ্ঠুর ও নৃশংসভাবে হত্যা করা আবরার ও পরবর্তীতে সহপাঠী, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের ওপর রিপোর্ট করতে গিয়ে এ কথা বলেছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়েছে, আবরার হত্যাকাণ্ডের জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।
রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নির্যাতন নতুন কিছু নয়। হোস্টেলে থাকতে হলে নতুন শিক্ষার্থীদের প্রায়ই জোরপূর্বক মিটিং ও র‌্যালিতে যেতে বাধ্য করা হয়। ভিন্নমত পোষণ অথবা নেতাদের নির্দেশ অমান্যকারীদের প্রহার ও নানাভাবে হয়রানি করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ২০১৮ সালে যখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুলের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় আন্দোলন করছিল তখন তাদেরকে প্রহার করেছে হেলমেট পরা অজ্ঞাত হামলাকারীরা। এ জন্য দায়ী করা হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। একই বছর আন্দোলনরত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। হামলার শিকার একজনের ছবিতে তারা হাতুড়ি দিয়ে পিটাতে থাকে। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
বিবিসি আরো লিখেছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পেশীশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে ছাত্রদের। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো অফিসিয়ালভাবে ছাত্র সংগঠন রাখতে অনুমোদিত নয়, তবু তাদের উপস্থিতি অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। এ নিয়ে বিবিসি বাংলাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতা পর্যন্ত বলেছেন, এখন সময় এসে গেছে এই ধরনের রাজনীতিকে সমর্থন করা উচিত হবে কিনা তা বিবেচনা করা। যেসব পিতামাতা স্বপ্ন দেখছেন তাদের সন্তানরা একদিন বুয়েটে পড়বে শুধু তারাই নন, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই ওই একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।
বিবিসি আরো লিখেছে, সোমবার ঢাকা ও অন্যান্য শহরে রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা স্লোগান দিয়েছেন। সড়ক অবরোধ করেছেন। বুয়েটে আবরার হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে মঙ্গলবারও তারা বিক্ষোভ করেছেন। সাবেক শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষকদের অনেকে বুয়েট ক্যাম্পাসে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। বুয়েট টিচার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম মাসুদ বলেছেন, আবাসিক হলে একজন ছাত্র নির্যাতনে মারা যাবে- এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আবরার ফাহাদ হত্যা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
ওদিকে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে পুলিশের এক মুখপাত্র বলেছেন, আবরার ফাহাদের হল থেকে তদন্তকারীরা ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৫ জন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। মঙ্গলবার এই গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩। তারা সবাই বুয়েটের। আরো ৬ জন রয়েছে সন্দেহের তালিকায়। ঢাকা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, প্রহারে মৃত্যু হয়েছে আবরারের। স্থানীয় মিডিয়াগুলো ছাত্রলীগের সদস্যদের উদ্ধৃত করে বলছে, আবরার ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। ইসলামপন্থি ছাত্রশিবিরের সঙ্গে তার যোগসূত্র থাকার অভিযোগে প্রহার করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের করা একটি পানি চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে আবরার একটি পোস্ট দেয়ার পরে এ ঘটনা ঘটেছে। ওদিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এক বিবৃতিতে বলেছে, তদন্তের পরে তারা বুয়েট শাখা ছাত্রলীগ থেকে ১১ সদস্যকে বহিষ্কার করেছে।

শিক্ষা ও এ সময়ের শিক্ষকেরা by রফিকুজজামান রুমান

ছোটবেলা থেকেই আমাদেরকে শেখানো হয়েছে, ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড।’ তখন থেকেই মনে প্রশ্ন জেগেছিল, তাহলে জাতির প্রাণ কী? বড় হয়েছি। নিজেই জড়িয়ে পড়েছি শিক্ষার সঙ্গে। ‘মেরুদণ্ড’ যথেষ্ট শক্ত হয়েছে হয়তো। তবু জাতি হিসেবে আমরা পুরো তৈরি হলাম না। ‘প্রাণের’ খোঁজে কিংবা খুঁজে পাওয়া ‘প্রাণের’ চর্চার অভাবে কেটে গেল অনেক সময়। মুক্তি মিললো না। যে শিক্ষা হয়ে উঠতে পারতো সোনালি সূর্যের আভা, প্রাণের অভাবে তাতেই এখনো নিকষ অন্ধকার। যে শিক্ষক হয়ে উঠতে পারতেন অবিরাম আলোর মশাল, তিনিই এখন পথহারা বিভ্রান্ত রাজনীতির মুখপাত্র।


এমন এক প্রেক্ষাপটেই উদযাপিত হচ্ছে ২০১৯ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষক এমনিতেই এদেশে প্রচলিত আলোচনার অনুষঙ্গ হয়ে থাকে সারা বছর। দিবস এলে এই আলোচনায় হয়তো যুক্ত হয় কিছু বাড়তি মাত্রা। এই প্রবন্ধ সেরকমই একটি দিবসকেন্দ্রিক উৎপাদন!

যদি বলা হয়, বাংলাদেশের যা কিছু অর্জন, তার পেছনে নেপথ্যের কারিগর হয়ে আছেন কে? শিক্ষক। যদি বলা হয়, এই জাতিকে অন্ধকারে পথ দেখিয়েছেন কে? শিক্ষক। একটি পথহারা ছাত্রকে টেনে তুলে তার সুকুমার বৃত্তিকে জাগ্রত করে আলোর ঠিকানায় নিয়ে গিয়েছেন কে? শিক্ষক। জ্ঞান চর্চায়, সাধনায়, উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এদেশের শিক্ষকেরা। খেয়ে না খেয়ে, অর্থের অভাবকে চিরসঙ্গী করে, রোদ বৃষ্টিতে ভিজে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন একজন শিক্ষক। ‘তোমাকে দিয়েও সম্ভব;’ কিংবা ‘তোমাকে দিয়েই সম্ভব’- শিক্ষার্থীদের মননে এমন সম্ভাবনার বীজ বপন করেছেন এদেশের শিক্ষকসমাজ। সততার প্রশ্নে, নৈতিকতার প্রশ্নে কোনোদিন কারো কাছে মাথা নত করবে না- এই মন্ত্রণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়েছিলেন এদেশের শিক্ষকেরা।

এমন সোনালি অতীতের উত্তরাধিকারী হয়ে আমরা আজ দেখি ভিন্ন এক মেঘাচ্ছন্ন বর্তমান। সুশিক্ষা ঢাকা পড়েছে মেঘে, আদর্শ শিক্ষকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে দিনকে দিন, শিক্ষকের মর্যাদা নেই আর আগের মতো। শিক্ষকেরা আর খবরের কাগজে খবর হয়ে ওঠেন না কোনো উদ্ভাবনের জন্য; খবর হন রাজনৈতিক দাসত্বের অংশীজন হিসেবে। শিক্ষকেরা আর শিক্ষার্থীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন না, তুমি পারবে, তোমাকে দিয়ে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীরা পুরুষ শিক্ষকের কাছে ভরসার সেই জায়গাটি আর খুঁজে পায় না। বরং প্রায়ই শোনা যায়, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নির্যাতিত। আলোকিত মানুষ বানানোর ব্রত আজ আর নেই শিক্ষায় এবং শিক্ষা ব্যবস্থায়। বরং ‘চাকর’ বানানোর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে ক্যাম্পাসগুলো। নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা দখল করে নিয়েছে মুখস্তনির্ভর পরীক্ষামুখী পড়াশুনা। নৈতিক আদর্শিক মানুষ হওয়ার কথা ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে, সেখানেই আজ অনৈতিকতার জয়জয়কার। সর্বোচ্চ শিক্ষিত মানুষগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায় সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্তদের কালো তালিকায়।

শিক্ষা হলো এমন এক বোধের নাম, যা হৃদয়কে স্পর্শ করে। শিক্ষা হলো আলো। শিক্ষা হলো শিক্ষার্থীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অমিত সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন। শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে মানবিক বানাবে। নতুন করে ভাবতে শেখাবে। কোনো একটি বিষয়ের ‘ডেফিনিশন’ মুখস্ত করা শিক্ষা নয়; শিক্ষা হলো সেই ডেফিনিশনকে ভেঙ্গে চুরে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা। বৃত্তের বাইরে ভাবতে শেখানো। শিক্ষা হলো আরও শেখার অনুপ্রেরণা জোগানো। শিক্ষা হলো বিনয়। যে যত শিখবে, সে তত বিনয়ী হবে। শিক্ষা হলো সৌজন্যবোধ। শিক্ষা হলো নিজেকে ছাড়া কাউকে ছোট মনে না করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষা মানে হলো মানবিক রাষ্ট্র বানানোর শিক্ষা। পদার্থবিদ্যা শিক্ষা মানে মানুষের কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস বানানোর শিক্ষা। ইতিহাস শিক্ষা হলো ইতিহাসের নানা বিষয় থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে ঠিক রাখার শিক্ষা। সাংবাদিকতা শিক্ষা মানে সত্য তথ্য সরবরাহ করে শুদ্ধ সমাজ নির্মাণের শিক্ষা। ফার্মেসি শিক্ষা মানে খাঁটি ঔষধ উৎপাদন করে মানুষের স্বাস্থ্য সেবার কাজটিকে পবিত্র ইবাদত মনে করার শিক্ষা। প্রত্যেকটি শিক্ষা বিভাগেরই মৌলিক উদ্দেশ্য হবে মানবিক মানুষ বানানো। শিক্ষা আমাকে পেশাজীবি বানাবে। সবার আগে বানাবে মানুষ। যে শিক্ষায় মানুষ বানানোর রেসিপি থাকে না, সেটি শিক্ষা নয়।

শিক্ষকই সবচেয়ে বড় মডেল। একজন শিক্ষক আপাদমস্তক শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা তা শেখে না, যা শিক্ষক পড়ান। শিক্ষার্থীরা তা-ই শেখে, যা একজন শিক্ষক! তারা শিক্ষককেই পড়ে। একজন শিক্ষক হলেন একজন নির্মাতা। তিনি মানুষ ‘নির্মাণ’ করেন। মানুষ চাষ করেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বহু আগেই একথা বলে গেছেন, ‘শিক্ষকদের কাজ মানুষ চাষ করা।’ এ কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পেশা, সবচেয়ে মহান পেশা শিক্ষকতা। নবী রাসুলদেরও আল্লাহ শিক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছেন। শিক্ষক হলেন সংস্কারক। তিনি সমাজের যাবতীয় অনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। তিনি হয়ে উঠবেন সত্যের প্রতীক কিংবা তিনিই সত্য! জাগতিক কোনো মোহ, কোনো প্রলোভন তাকে বিচ্যুত করবে না। অর্থের পেছনে নিরন্তর ছুৃটে চলা শিক্ষকের কাজ নয়। প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতেই হবে। কিন্তু অর্থকেই জীবনের ‘অর্থ’ বানানো তার সাজে না। তিনি ছুটবেন জ্ঞানের পেছনে। স্বপ্ন দেখাবেন শিক্ষার্থীদের। তার মতো হতে চাইবে কিংবা তাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবে শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করবেন। একজন শিক্ষকের আর কোনো পরিচয় নেই। তিনি ক্লাসে শিক্ষক, পরিবারে শিক্ষক, সমাজে শিক্ষক। তিনি অপরাজেয় মূল্যবোধ ধারণকারী একজন মানুষ। ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে গেলেও’ তিনি একা দাঁড়িয়ে থাকবেন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। তিনি শিক্ষার্থীকে ভালোবাসবেন, শিক্ষার্থী তাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে।

শিক্ষা ও শিক্ষকতার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকার পরেও বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের নিবেদন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমান্বয়ে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। বিশ্বর‌্যাংকিং-এ এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। মৌলিক জ্ঞান উৎপাদনে আমাদের সাধনা নেই। এদেশে শুধু পরীক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে; শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। পরীক্ষামুখী বিদ্যাচর্চা জ্ঞানের গভীরতা অনুসন্ধানের প্রয়োজনকে উপেক্ষণীয় করে তুলছে। লক্ষ লক্ষ জিপিএ ৫ পাওয়াকেই ধরে নেয়া হয়েছে সফলতা। আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে: শিক্ষার গুণগত মানের অভাব, মুখস্তনির্ভর পড়াশুনা, আনন্দহীন পড়াশুনা, শিক্ষায় বাজেট কম, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সমস্যা, শিক্ষকদের রাজনৈতিক আনুগত্য, গবেষণার অভাব, কোচিং ও শিক্ষাবাণিজ্য এবং নৈতিকতার অভাব।

পরীক্ষায় পাশ করাকেই বানানো হয়েছে উদ্দিষ্ট, বেড়ে গেছে না-বুঝে মুখস্ত করার প্রবণতা। বিষয়ের গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছে না শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা পড়াশুনায় আনন্দ পাচ্ছে না। উপভোগ না করতে পারলে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। এক্ষেত্রে পাঠ্যবইগুলোও কম দায়ী নয়। বইগুলোকে আকর্ষণীয় করা যাচ্ছে না। অন্যান্য দেশের তুলনায় এদেশের শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ থাকে কম। তাছাড়া শিক্ষকদের আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধাও অপ্রতুল। বিশেষ করে মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হতে চায় না। এখানে পেশা হিসেবে শিক্ষকতা টিকে আছে। এটি অনেকেরই নেশা হয়ে ওঠেনি। ভেতর থেকে শিক্ষকতা বোধ তৈরি হওয়া, তার জন্য তাড়না বোধ করা- এসব না হলে দক্ষ শিক্ষক হয়ে ওঠা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে) যে প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়, তা প্রশ্নাতীত নয়। রাজনৈতিক বিবেচনা তো আছেই; তার উপরে শুধু রেজাল্ট দেখে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যৌক্তিক হতে পারে না। তার পড়ানোর সক্ষমতা, বিষয়ের গভীরে যাওয়ার সামর্থ, কথা বলার মুন্সিয়ানা- এসব পরখ না করে দশ মিনিটের একটি ভাইভায় একজনকে শিক্ষক বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়। শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্য পরীক্ষা, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে দলগত বিবেচনা, শিক্ষকদের মধ্যে ‘সাদা/নীলের’ বিভাজন আমাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। গবেষণাই জ্ঞান। একজন শিক্ষক স্বভাবতই একজন গবেষক। গবেষণায় আমাদের ঘাটতি পাহাড়সম। এই অভিযোগ অস্বীকার করা যাবে না যে, কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের চেয়ে কোচিং/প্রাইভেটে বেশি মনোযোগী। এতে শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণের বিষয়টি শিক্ষার্থীর কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্ভবত শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় সংকট নৈতিকতা চর্চার অভাব। একজন শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে অগ্রসর মানুষ। তিনি হবেন সবার আদর্শ। অথচ আমরা দেখি, এই শিক্ষকই নানারকম অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত। শিক্ষকের হাতে ছাত্রীর যৌন হয়রানির খবর এখন নিয়মিত। ‘পরিমল’ শুধু একজন নন। অতি সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও নিরাপদ নয়। আমরা দেখি, প্রশ্ন ফাঁসের মতো অতি অনৈতিক কাজে শিক্ষকরা জড়িয়ে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকা-ে বরাদ্দ অর্থ উপাচার্য ও ছাত্রদের মধ্যে ভাগভাটোয়ার খবরও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

এরকম আরও অনেক অপ্রত্যাশিত বিষয়ে আজকাল খবর হচ্ছেন আমাদের শিক্ষকরা। এই মুহূর্তে কমপক্ষে তিনটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যগণ খবরের শিরোনাম। এটি বলা বোধ হয় আর ভুল নয় যে, জ্ঞান চর্চার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন রাজনীতির চর্চা বেশি হচ্ছে। আর সি মজুমদাররা এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন না। স্যার এ এফ রহমান কিংবা অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরীরা থাকেন না ভিসি প্যানেলে। রাজনৈতিক ‘আনুগত্যে’ উত্তীর্ণ হওয়াই বড় যোগ্যতা।

এর মানে এই নয় যে, ভালো শিক্ষক এখন আর নেই। অবশ্যই আছেন। আমরা তো মনে করি, অধিকাংশ শিক্ষকই এখনো সঠিক পথে আছেন। যারা পথ হারিয়েছেন, তারা সংখ্যায় কম হলেও শিক্ষকতার পবিত্র পেশা তাতে কলুষিত হয়। শিক্ষকদের সমালোচনা করার সময় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর হওয়ার জন্য শিক্ষকদের যথাযথ সুযোগ ও সম্মান আমরা দিতে পেরেছি কিনা। শিক্ষকদের জীবনধারণ সহজ করবার এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করবার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেনি। তাই তো দু-একটি যৌক্তিক দাবি নিয়ে রাস্তায় নামলে পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হয় রাষ্ট্রের কারিগরদের। শিক্ষকদের উপর নিক্ষেপ করা হয় জলকামান। সারাটা জীবন শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করা শিক্ষক অবসরে গেলে খুব সহজেই পেনশনের টাকা উঠাতে পারেন না। দিনের পর দিন ধর্না দিতে হয় বিভিন্ন অফিসে।

এখনো এমন শিক্ষক আছেন, যিনি শিক্ষার্থীর হৃদয় ছুঁয়ে যান। এমন শিক্ষক এখনো আছেন, যিনি বই দিয়ে নয়; হৃদয় দিয়ে পড়ান। যিনি পড়েন, পড়ান এবং স্বপ্ন দেখান। এমন শিক্ষক নিশ্চয়ই আছেন, শিক্ষার্থীরা যার মতো হয়ে উঠতে চায়! মনের অজান্তে শিক্ষকই হয়ে ওঠেন তার রোল মডেল। শিক্ষার্থীর সাফল্যে শিক্ষক গর্বিত হন। এমন শিক্ষকই আমাদের দরকার, যিনি জ্ঞানচর্চায়, আত্মসম্মানবোধে, সততায়, নৈতিকতায় ছাপিয়ে যাবেন সবাইকে।

শুরুর সেই প্রশ্ন, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হলে জাতির প্রাণ কী? জাতির প্রাণ হলো এই মূল্যবোধ। নৈতিকতা। মূল্যবোধ ছাড়া, নৈতিকতার যথার্থ অনুশীলন ছাড়া একটি জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। শিক্ষক মূল্যবোধ বিনির্মাণের আদর্শ কারিগর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূল্যবোধ চর্চার অনন্য সুঁতিকাগার। একজন শিক্ষক এই নৈতিকতাবোধ নিজে ধারণ করবেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে সঞ্চারিত করবেন, রাষ্ট্র শিক্ষককে সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন করবে- তবেই শিক্ষা সত্যিকারের আলো হয়ে ফুটবে। দূর করবে যাবতীয় অন্ধকার। বলা হয়, To teach is to touch a life forever. আমাদের শিক্ষকেরা এমন শিক্ষকই হয়ে উঠুন, যাদের স্পর্শে একটি জীবন তার সমস্ত সম্ভাবনা নিয়ে জেগে ওঠে।  শিক্ষক দিবসে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

লেখকঃ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
rafique.ruman@gmail.com

ঢাকায় যৌতুকের কারণে বছরে হত্যা ২২ নারী by আসাদুজ্জামান

দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে মাথা ফাটিয়ে ফারজানা আক্তারকে তাঁর স্বামী হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর কাফরুলে ঘটা এ ঘটনায় ফারজানার পরিবার ফারজানার স্বামীসহ চারজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছে। আদালতের নথি বলছে, ব্যবসা করার জন্য ৩০ লাখ টাকা যৌতুক চেয়েছিলেন ফারজানার স্বামী। তা দিতে না পারায় ফারজানার এ পরিণতি।
ফারজানা হত্যার চার দিন আগে রাজধানীর হাজারীবাগে মুনা আক্তার নামের আরেক নারীকে যৌতুকের কারণে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ঢাকার আদালতের বিচারিক নিবন্ধন খাতার হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ বছরে ঢাকায় ৩৭৪ জন নারীকে যৌতুকের জন্য হত্যা করা হয়েছে। প্রতিবছর ঢাকায় যৌতুকের জন্য গড়ে ২২ নারীকে হত্যা করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর এলাকায় গত এক বছরে যৌতুকের জন্য ১৪ জন নারী হত্যার শিকার হন।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩–এর সরকারি কৌঁসুলি মাহমুদা আক্তার বললেন, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের অভিযোগে প্রায় প্রতিদিন তাঁর আদালতে মামলা হচ্ছে। থানায় করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনও আদালতে পাঠানো হচ্ছে। যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে হত্যার কয়েকটি মামলাও তাঁর আদালতে বিচারাধীন।
যৌতুকের জন্য হত্যা
ঢাকায় যৌতুকের কারণে হত্যার কয়েকটি ঘটনার অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ভুক্তভোগী নারীর স্বামী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা নানাভাবে নির্যাতন করে খুন করলেও খুনের ঘটনাকে আত্মহত্যা বা অসুস্থতা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়।
কাফরুলের ফারজানা হত্যার ঘটনাটি তেমনই। মামলার নথিতে দেখা যায়, ১০ বছর আগে ১৫ বছর বয়সী ফারজানা আক্তারের সঙ্গে কামরুল হাসান ভূঁইয়ার বিয়ে হয়। ব্যবসা করার জন্য যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকেন স্বামী।
মামলার বাদী ফারজানার মামা হাবিব উল্লাহ বললেন, ‘জমি বিক্রি করে দোকান করার জন্য টাকা দেওয়া হয়েছিল কামরুলকে। এরপর আরও চাইত। ঘটনার দিন দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে ফারজানার মাথা ফাটিয়ে হত্যা করা হয়। অথচ আমাদের ফোন করে বলা হয়, ফারজানা স্ট্রোক করে মারা গেছে।’
গত ২২ এপ্রিলে মুনা আক্তার হত্যায় আদালতকে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজারীবাগের পারভেজের সঙ্গে সাত-আট মাস আগে মুনার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে যৌতুকের চার লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য মুনাকে চাপ দিতেন স্বামী। ঘটনার দিন মুনাকে লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে প্রথমে জখম করা হয়। পরে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কল্যাণপুরে ফারজানা আক্তার নামের আরেক নারীর খুনের ঘটনায় আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এতে বলা হয়েছে, ফারজানাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পিবিআই এ ঘটনায় স্বামী শফিকুল ইসলামকে গত ১০ এপ্রিল ঢাকার আদালতে পাঠায়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, দুই লাখ টাকা যৌতুকের কারণে প্রায়ই ফারজানাকে নির্যাতন করতেন স্বামী।
চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত বছরের ১৫ জুন খিলগাঁওয়ে খুন হন নাসিমা। স্বামী অহিদুল ইসলাম যৌতুকের কারণে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেন বলে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে।
১৭ বছরে ঢাকায় ৩৭৪ জন নারীকে যৌতুকের জন্য হত্যা করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর এলাকায় গত এক বছরে ১৪ জন নারী হত্যার শিকার হন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার বললেন, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার নারীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসা নিতে আসা নারীদের মধ্যে দেখা যায়, যৌতুকের কারণে কারও গায়ে আগুন দেওয়া হয়েছে, কাউকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
সাজা মাত্র ৩ শতাংশ
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, ঢাকায় ২০১৬ সালে ২৭ জন, ২০১৫ সালে ২৫ জন, ২০১৪ সালে ২২ জন, ২০১৩ সালে ৩০ জন, ২০১২ সালে ২৫ জন, ২০১১ সালে ২৬ জন এবং ২০১০ সালে ১৫ জন নারীকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে যৌতুকের কারণে ঢাকায় যে হারে নারীরা হত্যার শিকার হচ্ছেন, সে অনুপাতে সাজার হার খুব কম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, ২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া যৌতুকের জন্য হত্যা মামলার মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক সরকারি কৌঁসুলি ফারুক আহম্মেদ বললেন, যৌতুকের কারণে হত্যার ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর জোর চেষ্টা থাকে আসামিপক্ষের।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বললেন, যৌতুকের মামলাগুলো ভালোভাবে তদন্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ট্রাইব্যুনালে দক্ষ সরকারি কৌঁসুলি দরকার। সালমা আলীর মতে, যৌতুক বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্রকে নির্যাতনের শিকার নারীর পাশে দাঁড়াতে হবে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিমানের চাকার খোলে লুকিয়ে বিদেশে যেতে চাইলে আপনার মৃত্যু নিশ্চিত - কিন্তু সবাই কি মারা যায়?

বিমানের চাকার খোপের মধ্যে লুকিয়ে ব্রিটেনে অভিবাসী হবার চেষ্টা করতে গিয়ে মারা যাওয়া কেনিয়ান যুবকের ঘটনাটি সারা দুনিয়ায় মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে।
এরকম মৃত্যু এই প্রথম নয়।
বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশেরও এক তরুণ চট্টগ্রাম থেকে ওড়া একটি বিমানের চাকার খোপে লুকিয়ে সৌদি আরব যাবার চেষ্টা করেছিল বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল। বিমানটি সৌদি আরব অবতরণ করার পর তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।
কিন্তু এভাবে যারা আরেক দেশে যেতে চায় তারা ঠিক কোথায় এবং কিভাবে লুকিয়ে থাকে? বিমানটি যখন আকাশে উড়ছে তখন সেখানকার পরিবেশ কেমন হয়?
আর, কেউ এরকম করলে তার মৃত্যু কি অনিবার্য? নাকি কেউ কেউ ভাগ্যক্রমে বেঁচেও যেতে পারে?
গত ৩০ জুন রোববার বিকেলে লন্ডনে অবতরণের আগে - নাইরোবি থেকে আসা কেনিয়ান এয়ারওয়েজের বিমানটির ল্যান্ডিং গিয়ারের ঢাকনা খোলার পর - লুকিয়ে থাকা লোকটির মৃতদেহ পড়ে যায় ক্ল্যাপহ্যাম এলাকার এক বাড়ির বাগানে।
বিস্ময়করভাবে, এত উঁচু থেকে পড়লেও তার মৃতদেহটি প্রায় অক্ষত ছিল। কিন্তু ভালো করে দেখার পর পরিষ্কার হয়: কেন তা ঘটেছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন: লোকটির দেহটা জমে গিয়ে একটা বরফের টুকরোর মত হয়ে গিয়েছিল।
ইউরোপে স্থলপথে বা সমুদ্র পার হয়ে অভিবাসী হবার চেষ্টা প্রতিনিয়তই ঘটছে, কিন্তু বিমানে লুকিয়ে ইউরোপে আসার চেষ্টা বেশ বিরল।
কেনিয়া এয়ারওয়েজের বিমানটি ফ্লাইট শুরু করেছিল নাইরোবি থেকে
এর কারণ অনুমান করা কষ্টসাধ্য নয়।
এভিয়েশন সাংবাদিক ডেভিড লিয়ারমন্ট বলছেন, কারণ উড়ন্ত বিমানের চাকার খোপের ভেতরে আপনার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

কেমন পরিবেশ হয় ল্যান্ডিং গিয়ারের ভেতরে?

মি. লিয়ারমন্ট বলছেন, "প্রথম চ্যালেঞ্জটা হলো, প্লেনটা আকাশে ওড়ার পর পরই যখন চাকাগুলো গুটিয়ে আবার খোপের ভেতরে ঢুকে যায় - সেই সময়টা। "
"এ সময় ওই ভাঁজ হতে থাকা চাকাগুলো আপনাকে পিষে মেরে ফেলতে পারে।"
দ্বিতীয় ঝুঁকি: গরম আবহাওয়ায় বিমানের ব্রেকগুলো অসম্ভব উত্তপ্ত হয়ে যায়, এবং এর কাছে থাকা অবস্থায় আপনি গরমে ভাজাভাজা হয়ে মারা যেতে পারেন।
তবে ধরে নেয়া গেল, আপনি ভাগ্যবান এবং এই প্রথম দুটো ঝুঁকি আপনি পার হয়ে এসেছেন।
কিন্তু বিমানটি যখন আকাশে উড়ছে, তখন আপনার সামনে আরো দুটো ভয়ংকর বিপদ উপস্থিত। একটি হলো ঠান্ডায় জমে যাওয়া। দ্বিতীয়টি হলো অক্সিজেনের তীব্র অভাব।
মনে রাখতে হবে বিমানের ভেতরে যেখানে যাত্রীরা বসেন - সেখানে বাতাসের চাপ, অক্সিজেনের পরিমাণ এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এত উচ্চতায়ও মানুষের বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশ কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয় ।
কিন্তু বিমানের চাকার খোপে তা করা হয় না।
দূরপাল্লার যাত্রায় বিমান ওড়ে অন্তত ৩৫,০০০ ফিট উচ্চতায়। সেখানে বিমানের বাইরের তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। সেটা হচ্ছে এ্যান্টার্কটিকায় শীতলতম অংশে বছরের গড় তাপমাত্রার সমান।
এই ঠান্ডায় সাধারণ কাপড়চোপড় পরে মানুষের পক্ষে বেশিক্ষণ বেঁচে থাকা কঠিন।
তা ছাড়া বিমান যখন মাটি থেকে প্রায় ৬-৭ মাইল ওপর দিয়ে উড়ছে - সেখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম এবং বাতাসের চাপও খুব কম।
বিমানের নিচের দিকে চাকার খোলের ভেতরে বিবিসির সাংবাদিক রব ওয়াকার
তাই সে অবস্থায় শ্বাস নেবার সময় মানুষের ফুসফুস ঠিকমত ফোলে না এবং যথেষ্ট পরিমাণ অক্সিজেন নিতে পারে না।
এটাও কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাবার মতোই এক পরিস্থিতি।
তাই বিমানের চাকার খোলে লুকিয়ে যারা বিদেশ যাবার চেষ্টা করেন তাদের বেশির ভাগই বিমান অবতরণের অনেক আগেই ঠান্ডায় এবং অক্সিজেনের অভাবে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন - অথবা মারা যান।

বিমান অবতরণের সময়ও বিপদ

বিমানটি যখন মাটিতে নামার জন্য এয়ারপোর্টের কাছাকাছি আসছে, তখন ল্যান্ডিং গিয়ারের খোপের ঢাকনাটি খুলে যায়।
সেসময় কেউ এর ভেতরে থাকলে তাকে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে খুবই সতর্ক থাকতে হবে, নিরাপদ জায়গায় স্থির থাকার জন্য তার গায়ে যথেষ্ট শক্তি থাকতে হবে।
মি. লিয়ারমাউন্ট বলছেন, লুকিয়ে থাকা লোকদের বেশিরভাগই এ সময়টায় বিমান থেকে পড়ে যান - কারণ তারা একটা বিপজ্জনক জায়গায় বসা, অথবা তারা ইতিমধ্যেই অজ্ঞান হয়ে গেছেন, বা মারা গেছেন।

সবাই কি মারা যায় ? নাকি কেউ কেউ বেঁচে থাকতে পারেন?

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ এ্যালেস্টেয়ার রোজেনশাইন বলছেন, "বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম, প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।"
মার্কিন ফেডারেল বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (এফএএ) ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত এধরণের ঘটনাগুলোর উপাত্ত পরীক্ষা করেছে।
বিমানের চাকার খোলে লুকিয়ে ভ্রমণের চেষ্টাকারীদের ইংরেজিতে বলা হয় 'স্টোএ্যাওয়ে'।
এফএএ বলছে, গত ৭২ বছরের সময়কালে ১১২টি ফ্লাইটে ১২৬টি স্টোএ্যাওয়ের ঘটনা ঘটেছে।
দূরপাল্লার বাণিজ্যিক ফ্লাইট সাধারণত ৩০ হাজার ফিটেরও বেশি উচ্চতায় ওড়ে
এই ১২৬ জনের মধ্যে ৯৮ জন বিমান অবতরণের আগেই মারা গেছেন, বেঁচে গেছেণ ২৮ জন - এবং বিমান অবতরণের পর তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
যারা নিহত হয়েছেন - তাদের অনেকে বিমান উড্ডয়ন বা অবতরণের সময় নিচে পড়ে গেছেন অথবা চাকার খোলের মধ্যেই মারা গেছেন।
এফএএ-র উপাত্ত অনুযায়ী ৪০টি দেশে এমন ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ঘটেছে কিউবা (৯টি) চীন (৭টি) ডমিনিকান রিপাবলিক (৮টি) দক্ষিণ আফ্রিকা (৬টি) এবং নাইজেরিয়া (৬টি)। কোন কোন ক্ষেত্রে বিমান যেখান থেকে উড়েছে সে তথ্য পাওয়া যায়নি।
আঞ্চলিকভাবে দেখতে গেলে - বিমানের নিচে লুকিয়ে বিদেশে যাবার চেষ্টা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে আফ্রিকায় (৩৪টি), ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে (১৯টি), এবং এশিয়ায় (১২টি)

বিমান থেকে পড়লো লাশ

লন্ডনের হিথরো বিমান বন্দরে অবতরণের পথে আকাশ থেকে লাশ পড়ার ঘটনা এর আগে বেশ অনেকবার ঘটেছে।
২০১৫ সালে পশ্চিম লন্ডনে একটি অফিস ভবনের ছাদে একজন লোকের মৃতদেহ পাওয়া যায়। পরে জানা যায়, জোহানেসবার্গ থেকে হিথরোগামী ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটি বিমান থেকে এই মৃতদেহটি পড়েছে।
তার একজন সঙ্গীকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তারা পড়েছিল ৪২৭ মিটার ওপর থেকে।
লন্ডনের ক্ল্যাপহ্যাম এলাকার এই বাড়ির বাগানে সবশেষ স্টোএ্যাওয়ের মৃতদেহটি পড়েছে
এর তিন বছর আগে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লন্ডনের রাস্তায় জোসে মারাদা নামে মোজাম্বিকের এক নাগরিকের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে জানা যায় এ্যাঙ্গোলা থেকে আসা একটি বিমান থেকে সে পড়ে গিয়েছিল।
ওই একই বছর কেপটাউন থেকে আসা একটি বিমান হিথরোয় অবতরণ করার পর তার নিচে মালপত্র রাখার কুঠরিতে একজন লোকের মৃতদেহ পাওয়া যায়।
চাকার খোলে লুকিয়ে বিমানযাত্রার পর কতজন বেঁচেছেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে এরকম ক্ষেত্রে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত, কিন্তু কিছু লোক সত্যি এর পরও বিস্ময়করভাবে বেঁচে গেছেন।
তবে এই দু:সাহসের মূল্য তাদের দিতে হয়েছে নানাভাবে।
বেঁচে-যাওয়াদের বেশির ভাগই হাত-পা হারিয়েছেন। কারণ চরম ঠান্ডায় তাদের হাত-পায়ে ফ্রস্টবাইট হয়ে গিয়েছিল অর্থাৎ মাংসপেশী সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
ফলে তাদের হাত বা পা কেটে বাদ দিতে হয়।
তবে হ্যাঁ, কম দূরত্বের ফ্লাইট যেখানে বিমান অপেক্ষাকৃত নিচু দিয়ে ওড়ে সেখানে স্টোএ্যাওয়ে-দের বেঁচে যাবার কিছুটা সম্ভাবনা থাকে - এটা বলা যায়।
বিমান থেকে পড়া লোকেরা বেশির ভাগই ছিল হিথরোগামী ফ্লাইটে
২০১০ সালে ভিয়েনা থেকে একটি প্রাইভেট বিমানের নিচের কুঠরিতে লুকিয়ে লন্ডনের হিথরোতে এসে নেমেছিলেন ২০ বছরের এক রোমানিয়ান তরুণ।
তা ছাড়া ২০১৫ সালে জোহানেসবার্গ থেকে আসা একটি বিমানে লুকিয়ে থাকার যে দুই যুবকের কথা আগে বলা হয়েছে - তার একজন মারা গেলেও অপরজন বেঁচে গেছেন।
এরকম ঘটনা আরো আছে।
কিউবা থেকে পালিয়ে ১৯৬৯ সালে মাদ্রিদে এসে নেমেছিলেন আরমান্দো সোকারাস রামিরেজ (২২)। তার ফ্রস্টবাইট হলেও শরীরের তেমন কোন ক্ষতি হয় নি।
১৯৯৬ সালে দিল্লি থেকে বিমানের খোলে লুকিয়ে লন্ডন আসতে চেয়েছিলেন - দুই ভাই বিজয় আর প্রদীপ সাইনি। হিথরোতে নামার পথে খোল থেকে নিচে পড়ে মারা যান বিজয়, কিন্তু প্রদীপ বেঁচে যান।
২০০০ সালে তাহিতি থেকে লসএঞ্জেলেসগামী বিমানে লুকিয়ে ৪,০০০ মাইল পথ পাড়ি দিযেও বেঁচে থাকেন ফিদেল মারুহি।
২০০২ সালে কিউবা থেকে কানাডার মন্ট্রিয়লগামী বিমানে চার ঘন্টার ফ্লাইটের শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলেন ভিক্টর আলভারেজ মোলিনা।
২০১৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে থেকে হাওয়াইয়ের মাওয়ি পর্যন্ত লুকিয়ে বিমানভ্রমণ করেন ইয়াহিয়া আবদি।

এভাবে বিদেশে যাবার ঝুঁকি কারা নেবেন?

বিমান থেকে মানুষের লাশ পড়ার শেষ ঘটনাটি ঘটেছে লন্ডনে ক্ল্যাপহ্যাম এলাকার এক বাড়ির বাগানে - যা হিথরোগামী বিমানের ওড়ার পথেই পড়ে।
সাংবাদিক লিয়ারমাউন্ট বলছিলেন, প্রতিটি বিমানেরই নিচের দিকটা ওড়ার আগে পরীক্ষা করা হয়।
এ কাজটা করে একজন স্থানীয় গ্রাউন্ড মেকানিক বা ক্রু এবং কখনো কখনো তারা দুজনে মিলেই এ পরিদর্শনের কাজটা করে। 
ফলে কেউ যদি বিমানের চাকা বা মালপত্রের কুঠরিতে ঢুকতে চায়, তা করা হয় একেবারে শেষ মুহুর্তে।
তাই যারা এ কাজটা করতে সক্ষম হয় - তারা প্রায়ই হয়ে থাকে অদক্ষ কোন বিমানবন্দর কর্মচারী, বা অন্য কোন কর্মীর পরিচিত জন - যাদের এই এলাকায় থাকার মতো নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্স আছে।
কিন্তু লিয়ারমাউন্ট মনে করেন - যারা এভাবে প্লেনে উঠতে চায় - তারা হয়তো জানে না যে এই চেষ্টাটা কত বিপজ্জনক।
এতে রয়েছে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি।
বেশির ভাগ লোকই বিমানের চাকার খোলে বা মালপত্রের কুঠরিতে লুকাতে চান

বাংলাদেশে বিনিয়োগ: চীন বনাম ভারত ৬০ কোটি বনাম সাড়ে ৬ কোটি

বাংলাদেশে বিনিয়োগে ভারতকে দ্রুত পেছনে ঠেলছে চীন। চলতি অর্থবছরের প্রথমভাগে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মেগা প্রকল্পগুলোতে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে প্রায় ৬শ’ মিলিয়ন ডলার (৬০ কোটি ডলার) গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে তার আগের স্ট্রেটেজিক উন্নয়ন অংশীদাররা চীনের কাছে পিছিয়ে পড়ছে। ভারত একই সময়ে বিনিয়োগ করেছে চীনা বিনিয়োগের মাত্র এক দশমাংশ- ৬৫ মিলিয়ন (সাড়ে ৬ কোটি) ডলার।
নিউ দিল্লি ও লন্ডনভিত্তিক ওয়েবসাইট দি থার্ড পোল ডট নেট-এ গত ১৩ই মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সমর্থন দেয়ার সময় থেকে বাংলা-ভারত একটি ঐতিহাসিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু সামপ্রতিক বছরগুলোতে ওই বন্ধন আলগা হতে শুরু করেছে। কারণ বাংলাদেশ ক্রমশ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
বৃটেনের উন্নয়ন সংস্থা ডিএফআইডি-র অর্থায়নে এবং চায়না ডায়লগের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত দি থার্ড পোল ডট নেট রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এবং এশিয়াজুড়ে চীনের দিগন্ত প্রসারিত করার আগ্রহের মধ্যে একটা মেলবন্ধন ঘটেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীন তাই এখন বদ্বীপীয় দেশটির প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এর ফলে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চীন থেকে সরাসির বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৫০৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা মোট বৈদেশিক পুঁজি প্রবাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বর্তমানে প্রায় ৪০০টি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসা করছে। এর মধ্যে প্রায় দু’শ’ বড় কোম্পানি এবং দু’শ’ ছোট ও মাঝারি কোম্পানি রয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভারতকে হতাশ করেছে। এর মধ্যে বড় ঘটনাটি ঘটে যখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ গত বছরে বেদনাদায়কভাবে ভারতকে পাশ কাটিয়ে শেনঝেনের একটি কনসোর্টিয়াম এবং সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে ২৫ ভাগ শেয়ার বিক্রি করে। ভারতের জাতীয় স্টক এক্সচেঞ্জ চীনা স্টক এক্সচেঞ্জের থেকে ৫৬ শতাংশ কমে বিড করেছিল।
ডার্টি পাওয়ার: ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীনের অধিকাংশ বিনিয়োগ, যার পরিমাণ ৪০৭ মিলিয়ন ডলার, সেটা বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিতে ঢুকেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১৩শ’ মেগাওয়াট চীনা তহবিলযুক্ত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যটি বিখ্যাত  হিলসা (বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত মাছ) অভয়ারণ্যের কাছে পটুয়াখালীতে (পায়রা) অবস্থিত। কক্সবাজারে ১৩০০ মেগাওয়াট কয়লা প্রকল্পের জন্য চীনের সঙ্গে সমপ্রতি আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বর্তমানের ২ ভাগ থেকে ৫০ ভাগের বেশিতে উন্নীত করার টার্গেট নিয়েছে। এর আওতায় ২৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন কয়লাচালিত প্রকল্প পাইপলাইনে রয়েছে।
চীনা ও অন্যান্য বিদেশি সমর্থিত কয়লাচালিত প্লান্ট জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। কারণ তারা ভয় করছেন যে, তাদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তারা তাদের জমি হারাবেন।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই প্রশ্ন করছেন, দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে বাংলাদেশ কেন কয়লার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কারণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো গুরুতর দূষণ সংকটের ভয়ে কয়লার মতো নোংরা জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সৌর, বায়ুু, এবং গ্রিড দক্ষতার জন্য মূল্য শিগগিরই কয়লার নিচে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
২৩টি দেশে কয়লা নির্ভর ১০২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে বর্তমান প্রকল্পগুলো রয়েছে, তার মধ্যে চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং কোম্পানিগুলি এক চতুর্থাংশ প্রকল্পে অর্থায়ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বা প্রস্তাব করেছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস (আইইইএফএ)-এর সামপ্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশই হলো সেই দেশ, যেখানে প্রায় ১৪ গিগাওয়াট শক্তি উৎপাদনে মোট ৭ বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যাই হোক, প্রস্তাবিত ওই প্রকল্পগুলো অধিকাংশই দীর্ঘ বিলম্বিত এবং এখনও প্রাক নির্মাণ অবস্থায় রয়েছে।
প্রধান অবকাঠামো: এটি শুধু শক্তি খাতে নয় যে, চীন একটি প্রধান খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে। চায়না ডেইলির মতে, চীন বাংলাদেশে ১০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে চীনের অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, অষ্টম চীন-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ সেতু এবং একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্র রয়েছে।
রিপোর্ট বলেছে, বাণিজ্যেও একই প্রবণতা লক্ষণীয়। ঢাকা চেম্বার অর কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ওসামা তাসির বলেন, চীন এখন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ সবজি, হিমায়িত এবং জীবন্ত মাছ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, টেক্সটাইল ফাইবার, কাগজের সুতা এবং বোনা কাপড়, পোশাক এবং পোশাক সামগ্রী রপ্তানি করছে।
২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২১ সালের মধ্যে তা ১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়?: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব ইনাম খান বলেন, চীন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও পরিকাঠামোতে চীনা বিনিয়োগের সুবিধাগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক ও যোগাযোগের প্রকল্পগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে, অবকাঠামোতে চীনা বিনিয়োগের সাফল্য মূলত প্রকল্পগুলোর আর্থিক কার্যকারিতা এবং রপ্তানি আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। পুঁজিবাজারে  এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এসইজেড) বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা আনতে সক্ষম হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ওয়াশিংটন ভিত্তিক উড্রো উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, যদিও বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী,  জিডিপি বৃদ্ধির হার এই বছর প্রায় ৮% হতে পারে, তবে দেশটি প্রচুর পরিমাণে ঋণগ্রস্ত হওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদি ঋণশোধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। 
‘আরেকটি সমস্যা হলো, চীনের বিনিয়োগের অনেক প্রকল্পই টেকসই বিষয়ে সামান্যই মন দেয়। বেইজিং যখন রিনিউঅ্যাবল এনার্জি সংক্রান্ত প্রকল্পে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়,  তখন তার বড় টিকিট বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হিসেবেই দেখা যায়। যেমন পাকিস্তানে তার একটি প্রধান কয়লা উৎপাদন প্রকল্প রয়েছে। অনুরূপভাবে, বেইজিংয়ের বেশিরভাগ অবকাঠামোগত বিনিয়োগ প্রকল্পে হেভি ডিউটি শিল্প নির্মাণ ও উৎপাদন জড়িত, যাতে প্রচুর পরিমাণে পানি খরচের দরকার পড়ে এবং এতে এমিশন-বেলচিং প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হয়।’ -মি. কুগেলম্যান বলেন।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য আরো জ্বালানি সরবরাহের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বিবেচনা করা হচ্ছে, [ঢাকা] প্রকল্পগুলি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেখানে পরিবেশগত উদ্বেগ উপেক্ষা করাকেই শ্রেয় মনে করা হচ্ছে।
বেল্ট এবং রোড নির্মাণ: ২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ঘোষণার পর থেকে নতুন বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
একুশ শতকের মেরিটাইম সিল্ক রোড এবং সিল্ক রোড অর্থনৈতিক বেল্ট-উভয়েরই বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বদ্বীপবেষ্টিত জাতি ভারত মহাসাগর ও ইউনানসহ চীনের ভূমিবেষ্টিত প্রদেশগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক ও স্থলপথে সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি।
এই সম্পর্কটি ২০১৬ সালের অক্টোবরে শি জিনপিংয়ের দুই দিনের ল্যান্ডমার্ক সফরকালে গতিশীলতা অর্জন করেছিল। যা চীন ও বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি ‘নতুন দিগন্ত’ হিসাবে শুরু হয়েছিল। ওই সফর ব্যাপকভাবে ‘ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফর’ হিসাবে লেবেলযুক্ত ছিল। এই সফরকালে উভয় দেশ ভূমি ও মেরিটাইম কানেকটিভিটি, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, পরিবহন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন সেক্টরে তাদের সহযোগিতা আরো বাড়াতে সম্মত হয়।
চায়না গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাকারের মতে, ওই সফর থেকে এ পর্যন্ত উভয় দেশ ৯ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি চুক্তি সই করেছে। এর আওতায় মোট বিনিয়োগ ২৬.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এর মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণে ৩.৩ বিলিয়ন  ডলারের চুক্তি গত বছর সম্পন্ন হয়েছিল। এটি উত্তর ও দক্ষিণ বাংলাদেশকে সড়ক ও রেলপথে সংযুক্ত করবে। দেশটিতে নির্মিত চ্যালেঞ্জিং প্রকৌশল প্রকল্পগুলির মধ্যে এটিই সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।
অন্য প্রধান প্রকল্পগুলোর মধ্যে ডিজিটাল কানেকটিভিটি উন্নত করতে ১ বিলিয়ন ডলার এবং পাওয়ার গ্রিড শক্তিশালী করতে ১.৩২ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অংশেও চীনা বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চায়না গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাকারের মতে, চীনা কোম্পানিগুলো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের বিভিন্ন সেক্টরে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চীন পাকিস্তানে ২.৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, শ্রীলংকায় ২.৫৫ বিলিয়ন ডলার, নেপালে ১.৩৪ বিলিয়ন ডলার, এবং মিয়ানমারে ২.১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

ইয়েমেন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের নেপথ্য কারণ: পর্ব-এক

আপনারা হয়তো এরই মধ্যে শুনেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে বিভিন্ন ঘাঁটিতে মোতায়েন তাদের সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার কিংবা সেনা সংখ্যা কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছে। ইয়েমেনের এ ঘোষণায় আন্তর্জাতিক সংবাদ ও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহারে আমিরাতের সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে চারটি কারণের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রথমত, আমিরাতের অভ্যন্তরীণ সংকট, দ্বিতীয়ত, ইয়েমেন বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, তৃতীয়ত যুদ্ধের ময়দানে প্রতিকুল পরিস্থিতি এবং চতুর্থ কারণ হচ্ছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতি।

সাতটি অঙ্গরাজ্য  নিয়ে  সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠিত। বিভিন্ন ইস্যুতে এই অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে যেমন মতবিরোধ রয়েছে তেমনি ইয়েমেন বিষয়েও তাদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য বিরাজ করছে। শারজা, দুবাই ও রাআস আল খেইমে অঙ্গরাজ্যগুলো প্রথম থেকেই ইয়েমেন যুদ্ধের বিরোধিতা করে এসেছে। তারা এখন ইয়েমেন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন যায়েদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের প্রধান কারণ হচ্ছে, ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের কারণে আর্থিক দিক দিয়ে তারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার কিংবা সেনা সংখ্যা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, ইয়েমেনবিরোধী সামরিক জোটের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ইয়েমেন যুদ্ধের ব্যাপারে রিয়াদের সঙ্গে আবু ধাবির তীব্র মতপার্থক্য। যুদ্ধ শুরুর পর সর্বশেষ গত দুই বছর ধরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ চলে আসছে। ইয়েমেনের পদত্যাগী সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদ বাহারের অপসারণকে কেন্দ্র করে মূলত এই বিরোধের সূচনা হয়। খালেদ বাহা সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের খুব ঘনিষ্ঠ ও কাছের মানুষ। কিন্তু সৌদি আরব ইয়েমেনের পদত্যাগী সরকারের প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদির ওপর প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে খালেদ বাহাকে অপসারণ করে এবং তার জায়গায় ইয়েমেনের পদত্যাগী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আহমাদ বিন দাগারকে নিয়োগ দেয়। এ থেকে বোঝা যায়, ইয়েমেন সরকারের গঠন কাঠামো ও দেশটিকে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য বিরাজ করছে।

২০১৭ সালের মে মাসে ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার মতবিরোধের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে ইয়েমেনের পদত্যাগী সরকারের প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদি ২০১৭ সালের মে মাসে এডেনের গভর্নর ইদ্রিস আয যাবিদি ও তার সহকারীকে অপসারণ করলে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। কারণ ওই অপসারণের ফলে ইদ্রিস আয যাবিদির সমর্থকরা বিক্ষোভ করে এবং তারা ইদ্রিস আয যাবিদির নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী পরিষদ গঠন করে যার নেতৃত্ব থাকবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাতে। আমিরাতের সমর্থকদের এ পদক্ষেপ ও ইয়েমেন থেকে আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের ফলে আমিরাত সমর্থক যাবিদির সমর্থকদের সঙ্গে সৌদি সমর্থক মানসুর হাদির মিলিশিয়া বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সংঘাত ও বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমিরাত সমর্থক দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী পরিষদের অনুগত বাহিনী মানসুর হাদির অনুগত সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী ও দখলদার হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ইয়েমেনবিরোধী সামরিক জোটে যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রধান ভূমিকা পালন করছে কিন্তু এ দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক মতবিরোধ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনে তৎপর 'ইখওয়ানি আল এসলাহ' দলকে পছন্দ না করলেও সৌদি আরব এ দলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং তাদেরকে ইয়েমেন সরকারের অংশীদার করতে চায়। এ অবস্থায় সৌদিপন্থী আল কায়দা  ও তালেবানের মতো অন্যান্য সব সালাফি গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দলগুলোর বিরোধীদের প্রতি সমর্থন দিচ্ছে আমিরাত।

ইরান ইস্যুতেও রিয়াদ ও আবু ধাবির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। আমিরাত বাহ্যিকভাবে ইরান বিরোধী অবস্থান নিলেও বাস্তবে তেহরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রয়েছে। কিন্তু ইরান-আমিরাতের এ সম্পর্ক সৌদি আরবের মোটেই পছন্দ নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও সৌদি আরব সেই সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক স্যামুয়েল রামানি এ ব্যাপারে বলেছেন, "আমিরাত ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে বলে মনে হলেও বাস্তবতা হচ্ছে স্বার্থগত বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে এমনকি তাদের মধ্যে আদর্শিক মিলও নেই। এ ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্য এলাকার ব্যবস্থাপনা  নিয়েও রিয়াদ ও আবু ধাবির মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ চলে আসছে। সৌদি আরব এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে থাকে এবং এ কারণে তারা ইরান ও ইরান সমর্থক গোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের জন্য হুমকি বলে মনে করে। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি  আরবের এ নীতির সঙ্গে একমত নয়।"

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে. কোনো কোনো সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্মানের সঙ্গে ইয়েমেনের চোরাবালি থেকে উদ্ধারের জন্য ইরানের কাছে সাহায্য চেয়েছে। লেবাননের দৈনিক আল আখবার এ ব্যাপারে লিখেছে, "ধারণা করা হচ্ছে ইয়েমেন যুদ্ধের আগুন আমিরাতের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ায় আবু ধাবি কর্তৃপক্ষ নীতি পাল্টিয়েছেন এবং এ থেকে উদ্ধারের জন্য তারা তেহরান ও মস্কোর শরণাপন্ন হয়েছে।"

এ ভাবে ইরান ও ইয়েমেন ইস্যুতে তীব্র বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আমিরাত। এ ছাড়া, আরব বিশ্বে সুন্নি মুসলমানদের নেতা বা অভিভাবক হওয়ার জন্য সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে বহুদিন ধরেই প্রতিযোগিতা চলে আসছে এবং এ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ এখন তুঙ্গে। সাংবাদিক ডেভিড হেরাতয বার্তা সংস্থা মিডিলইস্ট আই এ এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, "সুন্নি বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে আমিরাত ও সৌদি আরব।"

ইয়েমেন থেকে আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সুবিধা করতে পারছে না। এর কারণ হচ্ছে, ইয়েমেনের সরকারী ও আনসারুল্লাহ বাহিনী এখন পাল্টা আঘাত হানা শুরু করেছে। যুদ্ধের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে আনসারুল্লাহ নেতা আব্দুল মালেক আল হুথি বলেছেন, "পঞ্চম বছরের যুদ্ধ আমাদের জন্য বিজয় এনে দেবে।" তাই সংযুক্ত আরব আমিরাত বুঝতে পেরেছে ইয়েমেন যুদ্ধে তারা অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়েছে এবং নিশ্চিত পরাজয় বরণ করতে হবে। ইয়েমেনিরা যেভাবে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমান বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো শুরু করেছে তাতে আমিরাত আরো বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এসব কারণে আমিরাত শেষ পর্যন্ত ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।