Friday, July 11, 2025

ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের গাজা নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কে এই আলবানিজ

গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন দেওয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেসকা আলবানিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

এ নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে আলবানিজের যদি কোনো সম্পদ থেকে থাকে, তা জব্দ করা হবে। এ ছাড়া তাঁর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণও সীমিত হয়ে পড়বে।

গত বুধবার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই ইতালীয় আইনজীবী (আলবানিজ) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালাচ্ছেন।

ফ্রানচেসকা আলবানিজের জন্ম ইতালির আরিয়ানো ইরপিনো শহরে, ১৯৭৭ সালে। তিনি একজন মানবাধিকার আইনজীবী। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা দুই দশকের বেশি। তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক এবং লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (এসওএএস) থেকে মানবাধিকার আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

৪৮ বছর বয়সী এই আইনজীবী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটনের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ইন্টার‍ন্যাশনাল মাইগ্রেশনের অ্যাফিলিয়েট স্কলার হিসেবে কাজ করছেন।

আলবানিজ নিজস্ব নকশায় তৈরি একটি কোর্স বেথলেহেম, বিরজেইত ও সালেন্তোর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনাবাসিক অধ্যাপক হিসেবে পড়ান। তাঁর এ কোর্সের বিষয়বস্তু হলো‘ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির প্রতি মানবিক, আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া’।

আলবানিজ তাঁর কর্মজীবনে জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি পদে কাজ করেছেন। এর মধ্যে মরক্কোতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিতে দুই বছর ও জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ে মানবাধিকার কর্মকর্তা হিসেবে চার বছর কাজ করেছেন। এ ছাড়া জেরুজালেমে তিনি ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় (ইউএনআরডব্লিউএ) আইন কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন।

আলবানিজ ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের আইনি পরিস্থিতি নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন। তিনি ‘প্যালেস্টাইনিয়ান রিফিউজিস ইন ইন্টারন্যাশনাল ল’ (২০২০) ও ‘জে’অ্যাকিউজ’ (২০২৪) নামের দুটি বইয়ের সহলেখক।

জাতিসংঘের বাইরে তিনি থিঙ্কট্যাংক আরব রেনেসাঁস ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে গবেষণা ও আইনি সহায়তা দেন। তিনি গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অন দ্য কোয়েশ্চেন অব প্যালেস্টাইন’–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা।

২০২২ সালের মে মাস থেকে আলবানিজ অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি মতামত ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে কয়েকজন জোরালো দাবি জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

আলবানিজের প্রকাশিত প্রতিবেদনের মধ্যে আছে ফিলিস্তিনে আত্মনিয়ন্ত্রণ আইনের লঙ্ঘন; ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার ব্যাপক বঞ্চনা; ফিলিস্তিনি শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন ও ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত দুটি প্রতিবেদন।

গত বছরের মার্চে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে আলবানিজ বলেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে—এমন বিশ্বাস করার যৌক্তিক ভিত্তি আছে।

আলবানিজ সেখানে গণহত্যার প্রমাণ হিসেবে গণহারে হত্যা, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি, যেগুলো ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে—এসব বিষয় তুলে ধরেন।

‘গণহত্যার অর্থনীতি’ নিয়ে প্রতিবেদন

ফ্রানচেসকা আলবানিজের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনই যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন মার্কো রুবিও।

গত ৩০ জুন প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আলবানিজ ৬০টির বেশি কোম্পানির নাম প্রকাশ করেন। যার মধ্যে আছে মার্কিন টেক জায়ান্ট গুগল, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফট। আলবানিজ বলেন, এসব কোম্পানি ‘ইসরায়েলের দখলদার অর্থনীতিকে একধরনের গণহত্যার অর্থনীতিতে রূপান্তর’ করতে ভূমিকা রাখছে।

প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও জাতীয় বিচারব্যবস্থাকে এসব কোম্পানির নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার করার আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোকে তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দ করারও সুপারিশ করেন।

রুবিও অভিযোগ করেন, আলবানিজ প্রধান প্রধান মার্কিন সংস্থাসহ বিশ্বজুড়ে কোম্পানিগুলোকে ‘হুমকি দিয়ে চিঠি’ পাঠিয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে চরম ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছেন।

রুবিও বলেন, ‘আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ আমরা বরদাশত করব না।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আলবানিজ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ করেছেন। এ অভিযোগপত্র গত নভেম্বরে দাখিল করা হয়।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা ও আফগানিস্তানে মার্কিন অপরাধ তদন্তে যুক্ত থাকায় গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চারজন বিচারকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এ ছাড়া গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে একটি চিঠি পাঠিয়ে আলবানিজকে তাঁর পদ থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে।

রুবিও অভিযোগ করেন, আলবানিজ প্রকাশ্যে ইহুদিবিদ্বেষ, সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বকে ঘৃণা করেন। তবে আলবানিজ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

চলতি সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগেই নেওয়া হয়) তিনি গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ থেকে লাভবান হওয়ার জন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন।

আলবানিজ বলেন, ‘ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রতিরক্ষাশিল্পের সঙ্গে একটি অভিজাত জোট জড়িত, যারা এ গণহত্যা থেকে ধনী হচ্ছে। আজ... আমাদের কাছে একটি আইনি কাঠামো আছে, যা শতভাগ স্পষ্ট করে দেয়—দখলদারত্বের সঙ্গে যেকোনো সম্পৃক্ততা অবৈধ। কারণ, ইসরায়েল রাষ্ট্র বা তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। সেই বিচারপ্রক্রিয়া চলমান।’

 জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেসকা আলবানিজ। ১০ জুলাই
জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেসকা আলবানিজ। ১০ জুলাই। ছবি: এএফপি

‘আমরা গোটা বিশ্বের চোখের সামনে মরছি’

গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলে একটি ক্লিনিকের সামনে পুষ্টিসহায়ক সামগ্রী নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত মানুষদের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে কমপক্ষে ১৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮ শিশু ও ২ জন নারী। একটি হাসপাতাল সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

দেইর আল-বালাহর আল-আকসা মারটায়ারস হাসপাতালে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, মেঝেতে শিশু ও অন্য মানুষদের মরদেহ পড়ে আছে। চিকিৎসকেরা আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থা প্রজেক্ট হোপ এই ক্লিনিক চালায়। সংস্থাটি বলেছে, এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ‘হামাসের এক সন্ত্রাসী’কে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। হামলায় সাধারণ মানুষ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়ায় তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। যদিও এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আশাবাদ প্রকাশ করেছে।

প্রজেক্ট হোপ বলেছে, বৃহস্পতিবার সকালে দেইর আল-বালাহর আলতাইয়ারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে হামলা হয়। তখন অনেকে ক্লিনিক খোলার জন্য বাইরে জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তারা অপুষ্টি, সংক্রমণ, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং অন্যান্য সমস্যার চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন।

ইউসুফ আল-আইদি নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেন, ‘হঠাৎ  ড্রোনের শব্দ শুনতে পেলাম, তারপরই বিস্ফোরণ। পায়ের নিচে মাটি কেঁপে উঠল; আর চারপাশ একমুহূর্তেই রক্তে ভরে গেল। অনেক চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলার ঠিক পরপরই রাস্তার ওপর প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং ছোট ছোট শিশু পড়ে আছে। তাদের কেউ গুরুতর আহত, আবার কেউ একদম নড়াচড়া করছে না। ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেছে বিবিসি।

পাশের আল-আকসা হাসপাতালের মর্গে নিহত ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়।

এক নারী বিবিসিকে বলেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি মানাল এবং মানালের মেয়ে ফাতিমাও আছে। মানালের ছেলে এখন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
ইন্তেসার বলেন, ‘ঘটনার সময় মানাল শিশুদের জন্য পুষ্টিসামগ্রী নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল।’

আরেকজন নারী পাশ থেকে বলে ওঠেন, ‘তাদের কী অপরাধে হত্যা করা হলো?’

ইন্তেসার আরও বলেন, ‘আমরা গোটা বিশ্বের চোখের সামনে মরছি। সারা বিশ্ব গাজার ওপর নজর রাখছে। যাঁরা ইসরায়েলি সেনাদের হাতে মারা যাচ্ছেন না, তাঁরা সহায়তা নিতে গিয়ে মারা যাচ্ছেন।’

প্রজেক্ট হোপের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাবিহ টোরবে বলেন, তাঁদের পরিচালনাধীন ক্লিনিকগুলো গাজার শরণার্থীদের আশ্রয়ের জায়গা। সেখানে মানুষ তাঁদের ছোট ছোট সন্তানকে নিয়ে আসেন। নারীরা গর্ভাবস্থায় ও প্রসব–পরবর্তী যত্ন পায়। সেখানে অপুষ্টি ও অন্যান্য অসুস্থতার চিকিৎসা পাওয়া যায়।

রাবিহ টোরবে আরও বলেন, ‘তবুও আজ সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে ক্লিনিক খোলার জন্য অপেক্ষা করতে থাকা নিরীহ পরিবারগুলোর ওপর নির্দয় হামলা হয়েছে। আমরা এখন আর হতভম্ব আর হৃদয়বিদারক শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দে আমাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছি না।’

টোরবের মতে, এটা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও গাজায় কেউ বা কোনো জায়গা নিরাপদ নয়।

ইউনিসেফের প্রধান ক্যাথরিন রাসেল বলেন, ‘জীবন রক্ষাকারী সাহায্য পেতে চাওয়া পরিবারের ওপর এই হত্যাকাণ্ড একেবারেই অসহনীয়।’

- বিবিসি

দেইর আল-বালাহর আল-আকসা মারটায়ারস হাসপাতালে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা আহাজারি করছেন
দেইর আল-বালাহর আল-আকসা মারটায়ারস হাসপাতালে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা আহাজারি করছেন। ছবি: এএফপি

যুদ্ধবিরতির নামে ‘উচ্ছেদ’ কি গাজায় ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর নতুন কৌশল

মধ্যপ্রাচ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ হচ্ছে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করা—বলছে হোয়াইট হাউস। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চলতি সপ্তাহে যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানালেন, তখন দুই নেতাই একে অপরের প্রশংসা করেছেন।

এদিকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রেখেছে। উপত্যকাটিতে এ পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৫৭৫ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প যদি সত্যিই গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চান, তাঁকে ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তা কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান ফিনুকেন ট্রাম্পের বার্তাকে তাঁর পূর্বসুরি জো বাইডেনের দ্ব্যর্থপূর্ণ বার্তার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ফিনুকিন বলেন, দুজনই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিলেন; কিন্তু যুদ্ধ বন্ধে ইসরায়েলকে চাপ দিতে তাঁরা অনিচ্ছুক।

ফিনুকেন বলেন, ‘এ যেন বাইডেন প্রশাসনের পুরোনো দৃশ্যপটের পুনরাবৃত্তি। আপনি হোয়াইট হাউস থেকে একই ধরনের ঘোষণা শুনবেন; কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যপট বদলায় না। যুদ্ধবিরতিই যদি সত্যি হোয়াইট হাউসের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়, তবে তা কার্যকর করার জন্য তাদের যথেষ্ট চাপ প্রয়োগের ক্ষমতাও আছে।’

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয় এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিকভাবে তাদের পক্ষ নেয়।

যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে গাজায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছেন। এটা স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। তবে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘গাজায় কাজ এখনো শেষ হয়নি। হামাসকে নির্মূল করতেই হবে।’

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আইনজীবী ফিনুকেন নেতানিয়াহুর এ মন্তব্যকে ‘খুবই বাগাড়ম্বরপূর্ণ’ ও ‘অস্পষ্ট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ট্রাম্প চাইলে ইসরায়েলকে যুদ্ধ বন্ধ করতে চাপ দিতে পারেন। সামরিক সহায়তা স্থগিত করার হুমকিও ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে এবং প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনের জন্যও সহায়ক।

ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর একই সুর

নেতানিয়াহু গত সোমবার ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর ট্রাম্পের সঙ্গে একজোট হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য ‘বিজয় উদ্‌যাপন’ করেছেন।

শুরু থেকেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের অহমিকাকে তুষ্ট করার কৌশল নেন। ওই দিন রাতে হোয়াইট হাউসের নৈশভোজে বসে তিনি ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন বলে ঘোষণা করেন।

পরদিন মঙ্গলবার এ দুই নেতা আবারও সাক্ষাৎ করেন। সে সময় ট্রাম্প বলেন, তাঁদের আলোচনা গাজা ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে। এর এক দিন পর নেতানিয়াহু বলেন, তাঁরা গাজা নিয়ে পুরোপুরি ‘একমত’।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি সমঝোতা চান; তবে যেকোনো মূল্যে নয়। আমিও একটি সমঝোতা চাই; কিন্তু যেকোনো মূল্যে নয়। ইসরায়েলের নিরাপত্তা চাহিদা আছে এবং আমরা একসঙ্গে তা সমাধানের চেষ্টা করছি।’

মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফটের রিসার্চ ফেলো অ্যানেল শেলিন বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির পথে প্রধান বাধা প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েল। হামাস ইতিমধ্যে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির দাবি জানিয়েছে, যেটা ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে।’

অ্যানেল শেলিন বলেন, ‘ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির কথা বললেও এখনো পর্যন্ত আমরা দেখিনি যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তা কার্যকরের জন্য চাপ দিচ্ছেন।’

বরং ট্রাম্প প্রশাসন গর্ব করে বলছে, তারা ভারী বোমার চালান আবারও চালু করেছে। এটি বাইডেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিলেন।

গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতি

যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চললেও গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনকে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছে।

হাসপাতালগুলোর জ্বালানি ফুরিয়ে যাচ্ছে, প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, খাদ্যসংকট চরমে উঠেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বেসরকারি ত্রাণকেন্দ্রগুলোতে খাদ্য নিতে গিয়েও শত শত ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের গুলিতে নিহত হচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈদেশিক নীতি গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির (সিআইপি) সভাপতি ন্যান্সি ওকাইল বলেন, ট্রাম্প গাজা যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে; কারণ তিনি শান্তিরক্ষী হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি বাড়ানো ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেতে চান।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় ট্রাম্প ইরাক ও আফগান যুদ্ধের পর মার্কিনদের ক্লান্তির কথা বলে বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত তিনি ইউক্রেন ও গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ইসরায়েল–ইরান সংঘাতের তত্ত্বাবধান করেছিলেন; এমনকি এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এতে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ওকাইল বলেন, শুধু মৌখিকভাবে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে গাজায় নৃশংসতা বন্ধ করা যাবে না। তিনি বলেন, ‘যদি এর সঙ্গে পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, যেমন ইসরায়েলকে সাহায্য বা অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করা; তবে নেতানিয়াহুর শান্তি আলোচনায গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।’

নেতানিয়াহুর বাস্তুচ্যুতির কৌশল

৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি যদি কার্যকরও হয়, তবু অধিকারকর্মীরা উদ্বিগ্ন। কারণ, সে সময় হয়তো ইসরায়েল গাজাবাসীকে বিতাড়িত ও দখলদারত্ব আরও ব্যাপক করতে চাইবে।

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস বুধবার জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ১০ জন ইসরায়েলি বন্দীকে মুক্তি দিতে রাজি। তবে এখনো মূল অচলাবস্থা গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা নিয়ে।

ইসরায়েলের হারেৎস পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে যাওয়ার আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দক্ষিণ গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বন্দিশিবির তৈরির পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল ‘বহির্গমন পরিকল্পনা’ (ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন) কার্যকর করতে চায়।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এটি জাতিগত নির্মূলের শামিল ও মানবতাবিরোধী অপরাধ।

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার এ ধারণা নতুন নয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলের উগ্রপন্থী মন্ত্রীরা তা প্রকাশ্যে বলে আসছেন। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প গাজাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা’ (অবকাশকেন্দ্র বা সাগরসৈকতের শহর) বানানোর স্বপ্নের কথা বলার পর বিশ্বসম্প্রদায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে শুরু করে।

নেতানিয়াহু এবার সফরের সময়ও বলেছেন, ‘গাজার মানুষ চাইলে অন্য কোথাও চলে যেতে পারে।’

জবরদস্তিমূলক স্থানান্তর

যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এ সপ্তাহে গাজায় জাতিগত নির্মূলের পরিকল্পনার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানায়নি, তবে হোয়াইট হাউস থেকে বক্তব্য এসেছে—ফিলিস্তিনিদের আর গাজায় থাকার উপায় নেই।

ট্রাম্পের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ জায়গা এখন মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং প্রেসিডেন্টের হৃদয় অনেক বড়। তিনি চান, এটি একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চল হোক; যেখানে পরিবারগুলো উন্নতি করতে পারে।’

তবে অধিকারকর্মীরা জোর দিয়ে বলছেন, বোমাবর্ষণের মধ্যেও মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ না থাকা মানুষের থাকার কিংবা স্থান ত্যাগ করার ‘স্বাধীন’ পছন্দ থাকতে পারে না।

অ্যানেল শেলিন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আশঙ্কা, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু গাজায় জাতিগত নির্মূল ও সেখানকার বাসিন্দাদের অন্যত্র স্থানান্তর করার জন্য কাজ করছেন।’

শেলিন আরও বলেন, ‘অনেকেই ধারণা করেছিলেন, হয়তো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলকে সহায়তার বিনিময়ে গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্প চাপ প্রয়োগ (ইসরায়েলের ওপর) করবেন; কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তিনি যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে গাজাবাসীকে জোর করে বিতাড়িত করতে চাইছেন।’

ওকাইল বলেন, বোমাবর্ষণ ও অনাহারের হুমকিতে মানুষকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করার মানে তাঁদের বন্দুকের মুখে তাড়িয়ে দেওয়া। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির নামে যদি দখলদারি বাড়ানো ও জাতিগত নির্মূলই হয় তাদের উদ্দেশ্য, তবে তারা আদৌ কোনো যুদ্ধবিরতি চায় না; বরং সেটি ধ্বংস করতে চায়।’

ফিলিস্তিনি মা সামাহ আল-নুরি গতকাল বৃহস্পতিবার দেইর আল-বালাহর একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি হামলায় মেয়েকে হারিয়েছেন। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন তিনি
ফিলিস্তিনি মা সামাহ আল-নুরি গতকাল বৃহস্পতিবার দেইর আল-বালাহর একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি হামলায় মেয়েকে হারিয়েছেন। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন তিনি। ছবি: রয়টার্স
ফিলিস্তিনের গাজায় গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৮২ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার আলোচনা ও রাফায় ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর করার ইসরায়েল–মার্কিন পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনা চলার মধ্যে গতকাল ভোর থেকে এসব হামলা হয়। এদিকে এই ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ জন দেইর আল-বালাহ এলাকায় খাবার সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। এর মধ্যে ৯টি শিশু আর ৪ জন নারী। এ হামলায় আরও অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৯টিই শিশু। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সহায়তা নিতে আসা পরিবারগুলোর সদস্যদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা একেবারেই অমানবিক। ক্যাথরিন আরও বলেন, গাজায় এখন যা ঘটছে, সেটারই নির্মম বাস্তবতা হলো এই ঘটনা। মাসের পর মাস ধরে এখানে যথেষ্ট সাহায্য ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আর সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলো বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিতে মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ক্যাথরিনের মতে, ত্রাণসহায়তার ঘাটতি থাকার মানেই হলো শিশুরা অনাহারে ভুগছে। আর তাতে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে। পুরোদমে যদি সহায়তা ও সেবা নিশ্চিত না করা যায়, তবে অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। এ হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন পুরোপুরি মেনে চলতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ক্যাথরিন। এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসও। তারা বলেছে, এটি গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের ‘চলমান জাতিহত্যা অভিযানের অংশ’। এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, ‘ইসরায়েল এখন স্কুল, রাস্তা, আশ্রয়কেন্দ্র ও বেসামরিক এলাকায় নিরীহ মানুষের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব হামলা একেবারে পরিকল্পিতভাবে চালানো হচ্ছে; যা পুরোদমে জাতিগত নির্মূল অভিযানের শামিল। আর এ অপরাধ পুরো বিশ্বের চোখের সামনেই ঘটছে।’

ইন্দিরার ‘জরুরি অবস্থা’: ৫০ বছরে ভারত কী শিক্ষা পেল by শশী থারুর

১৯৭৫ সালের ২৫ জুন। ওই দিন ভারত এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হলো। সেদিন সকালবেলা রেডিও-টেলিভিশনে শোনা গেল এক শীতল ঘোষণা: ‘দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।’ এরপর ২১ মাস ধরে দেশটিতে মৌলিক অধিকার স্থগিত ছিল। তখন সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক ভিন্নমত নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল।

জরুরি অবস্থার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেন নিশ্বাস বন্ধ করে ছিল। মনে হচ্ছিল ভারতের সংবিধানের মূল প্রতিশ্রুতি—স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব—সবই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে গিয়েছিল। এরপর পঞ্চাশ বছর পার হয়েছে। এত বছর পরে এসেও সেই সময়টি ভারতবাসীর সামষ্টিক স্মৃতিতে ‘জরুরি অবস্থা’ নামে গেঁথে আছে।

জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় আমি ভারতে ছিলাম। অবশ্য ঘোষণার কিছুদিন পরেই আমি যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর করার জন্য চলে যাই এবং বাকিটা সময় দূর থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকি।

জরুরি অবস্থার শুরুর মুহূর্তেই আমার মনে গভীর এক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। ভারতের যে উন্মুক্ত ও প্রাণখোলা গণপরিসরে সব সময় প্রাণবন্ত বিতর্ক আর স্বাধীন মতপ্রকাশ চলে আসছিল, সেটি যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। চিরচেনা কোলাহলের বদলে নেমে এসেছিল একধরনের ভয়ের নীরবতা।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দাবি করেছিলেন, এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন; জরুরি অবস্থা ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও বাইরের হুমকি সামলানো যাবে না। তিনি বলেছিলেন, জরুরি অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিশৃঙ্খল অবস্থাকে শৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

জরুরি অবস্থার সময়ে বিচারব্যবস্থাও প্রবল চাপে নতি স্বীকার করেছিল। এমনকি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তখন হ্যাবিয়াস কর্পাস (যার মাধ্যমে একজন নাগরিক অন্যায়ভাবে আটক হলে আদালতে নিজের মুক্তির আবেদন করতে পারেন) এবং মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা বাতিলের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিয়েছিলেন।

সে সময় সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা—সবাইকে ধরে জেলে ভরে দেওয়া হয়। সংবিধানের এই ব্যাপক লঙ্ঘন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ ইতিহাস তৈরি করে। জেল হেফাজতে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা সে সময়ে ততটা প্রকাশ না পেলেও যাঁরা সরকারের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের জন্য এটি ছিল এক নির্মম বাস্তবতা।

আসলে ‘শৃঙ্খলা’ আর ‘শান্তি-শৃঙ্খলার’ কথা বলে যা প্রচার করা হয়েছিল, তা অনেক সময়ই ভয়ংকর নিষ্ঠুরতায় রূপ নিয়েছিল। এর সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ ছিল জোর করে পুরুষদের বন্ধ্যকরণ কর্মসূচি। ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর নেতৃত্বে ওই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। মূলত দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর ওই ‘অভিযান’ চালানো হয়। শুধু সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সে সময় মানুষকে ভয় দেখিয়ে বা জোর করে ভ্যাসেকটমি অপারেশন করা হতো।

অন্যদিকে শহরাঞ্চলেও ছিল দমন–পীড়ন। রাজধানী নয়াদিল্লির মতো জায়গায় নির্মমভাবে বস্তি উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ এক রাতেই গৃহহীন হয়ে পড়েছিল। এসব গরিব মানুষের কী হবে, কীভাবে তারা বাঁচবে—সেসব নিয়ে সরকার তখন একটুও চিন্তা করেনি।

এই ঘটনার ভয়াবহতাকে পরে অনেকেই ‘দুঃখজনক বাড়াবাড়ি’ বলে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ এও বলেন, জরুরি অবস্থার পরপরই সাময়িকভাবে একটা শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, যা নাকি গণতন্ত্রের গোলমালপূর্ণ রাজনীতির মধ্যে একধরনের বিরতি এনে দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই সহিংসতা ও দমন-পীড়ন এসেছিল এমন এক ব্যবস্থার হাত ধরে যেখানে ক্ষমতার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং সেই ক্ষমতা একসময় নিপীড়ক স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

জরুরি অবস্থার সময় যে শৃঙ্খলা এসেছে বলে বলা হয়েছিল, তার মূল্য ছিল অনেক বেশি। এর মধ্য দিয়ে ভারতের প্রজাতন্ত্রের আত্মাকেই হারাতে হয়েছিল।
বিরোধী মত দমন, সভা-সমাবেশের অধিকার কেড়ে নেওয়া, মতপ্রকাশ ও লেখার স্বাধীনতা বন্ধ করে দেওয়া এবং সংবিধানের নিয়মকানুনকে প্রকাশ্যেই অবজ্ঞা করার মতো কাজগুলো ভারতের রাজনীতিতে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল।

যদিও বিচারব্যবস্থা পরে গিয়ে নিজ অবস্থান ঠিক করে নেয়, তবে শুরুতে তারা যেভাবে ভয় পেয়ে নতি স্বীকার করেছিল, তা সহজে ভুলে যাওয়ার নয়। ওই সময়ের এই কথিত ‘বাড়াবাড়ি’ বা ‘অতিরঞ্জন’ অসংখ্য মানুষের জীবনে গভীর ও স্থায়ী ক্ষতি করে যায়। অনেক পরিবার তাদের আপনজন হারায়। অনেকে অন্যায্য কারাদণ্ড বা নির্যাতন ভোগ করে।

এই দুঃসহ অভিজ্ঞতা অনেক মানুষের মধ্যে একধরনের আস্থা ও বিশ্বাসহীনতার জন্ম দেয়। এর প্রকাশ আমরা দেখি ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে। তখন জরুরি অবস্থা শেষ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ভোট হয় এবং মানুষ বিপুলভাবে ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর কংগ্রেস পার্টিকে পরাজিত করে।

আজ জরুরি অবস্থা ঘোষণার ৫০ বছর পূর্তি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন শুধু ভারতে নয়, অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নীতিমালাকে ঘিরে গভীর বিভক্তি ও সংকট চলছে। তাই ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো ও নিজেদের ভেতরটা পর্যালোচনা করার জন্য এই বার্ষিকী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। জরুরি অবস্থা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল, এই ধরনের আদেশ জারিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে কতটা ভঙ্গুর হতে পারে।

একটি সরকার কত সহজেই নৈতিক দিশা হারাতে পারে এবং মানুষের কাছে তার দায়িত্ববোধ ভুলে যেতে পারে সেটি আমাদের এই ঘটনা আবার মনে করিয়ে দিয়েছে।
ওই জরুরি অবস্থা আমাদের দেখিয়েছিল, ব্যক্তির স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে ধীরে ধীরে ঘটানো হয়। তখনই আমরা সম্যকভাবে দেখেছিলাম, প্রথমে খুব সূক্ষ্মভাবে ‘জনস্বার্থ’ বা ‘উন্নয়ন’—ইত্যাদির নামে ছোট ছোট পরিসরে অধিকার খর্ব করা হয়। ‘পরিবার পরিকল্পনা’ আর ‘শহর উন্নয়ন’ এর মতো কথাগুলো একসময় জোরপূর্বক বন্ধ্যকরণ আর লোকদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ভয়ংকর কাজে কীভাবে ব্যবহৃত হয়, তা ওই ঘটনা আমাদের দেখিয়েছিল।

এই অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মতো অনেক শিক্ষাই আছে। এসব শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, তথ্যের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যখন গণমাধ্যমকে দমন করা হয়, তখন সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহি করানোর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়। তবে এটাও সত্য, অনেক সংবাদমাধ্যম যেভাবে ভয় বা চাপের মুখে মাথা নিচু করেছিল, তা কিছুতেই ক্ষমাযোগ্য নয়।

দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র টিকে থাকার জন্য একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা দরকার, যেটি নির্বাহী ক্ষমতার বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে। আদালতের আত্মসমর্পণ (যদি সেটি সাময়িকও হয়) এক ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

তৃতীয় যে শিক্ষাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে, তা হলো—যখন একজন শাসক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকে এবং নিজের সিদ্ধান্তকে সব সময় নির্ভুল মনে করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। জরুরি অবস্থার সময় সমস্ত ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল এবং যখনই কেউ সরকারের বিরোধিতা করেছে তখনই তার গায়ে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা এঁটে দেওয়া হয়েছে।

আজকের ভারত ১৯৭৫ সালের ভারত নয়। এখন দেশ অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। অনেক বেশি সমৃদ্ধ। অনেক দিক থেকে ভারত এখন অধিকতর শক্তিশালী গণতন্ত্র। তবু জরুরি অবস্থার শিক্ষা এখনো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ, ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করার প্রলোভন, সমালোচকদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা, কিংবা সংবিধানের নিয়মনীতি এড়িয়ে চলার প্রবণতা—এসব এখনো বিভিন্ন রূপে সামনে আসে।

অনেক সময় এসবের আড়ালে থাকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বা ‘স্থিতিশীলতা’র মতো আকর্ষণীয় ভাষা। এই দিক থেকে জরুরি অবস্থা আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা। সেটি হলো—গণতন্ত্রে বিশ্বাসীরা কখনোই উদাসীন থাকতে পারে না।

ভারতে হোক কিংবা বিশ্বের অন্য কোথাও; আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তাদের নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে হবে: আমরা কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধীরে ধীরে ক্ষয় বুঝতে পারছি? আমরা কি শক্তিশালী একনায়কতন্ত্রের আগমন ঠেকাতে পারব? আমরা সংবাদমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজকে রক্ষা করার জন্য যা করছি তা কি যথেষ্ট? এগুলো কি আমাদের স্বাধীনতার জন্য অপরিহার্য?

জরুরি অবস্থাকে শুধু ভারতের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে মনে রাখলেই হবে না। বরং তার শিক্ষা আমাদের ভেতরে ধারণ করতে হবে। এটা যেন সব সময় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র কোনো স্থায়ী বা নিশ্চিত কিছু নয়। এটি আমাদের কাছে এমন এক অমূল্য উত্তরাধিকার, যাকে ভালোবাসা দিয়ে লালন করতে হয় আর বিপদের সময় সাহস নিয়ে রক্ষা করতে হয়।

* শশী থারুর, জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব এবং ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বর্তমানে ভারতের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির একজন সদস্য
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

‘জরুরি অবস্থাকে শুধু ভারতের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে মনে রাখলেই হবে না। বরং তার শিক্ষা আমাদের ভেতরে ধারণ করতে হবে।’
‘জরুরি অবস্থাকে শুধু ভারতের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে মনে রাখলেই হবে না। বরং তার শিক্ষা আমাদের ভেতরে ধারণ করতে হবে।’ কোলাজ: প্রথম আলো

জুলাই হত্যাকাণ্ড এবং বিবিসির তথ্যচিত্র by মহিউদ্দিন আহমদ

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের মেয়ে। মুজিব দেশ শাসন করেছেন সাড়ে তিন বছর। এ দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পত্তন হয় তাঁর হাতে। তাঁর জনপ্রিয়তা যখন তলানিতে, তখন তিনি খুন হন মিলিটারির হাতে। হাসিনার হাতে দেশ ছিল সাড়ে ২০ বছর। অনেক বিষয়ে তিনি তাঁর বাবাকে অনুসরণ করেছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন। কর্তৃত্ববাদী শাসনকে তিনি চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। একসময় তাঁরও পতন হয়। তিনি প্রাণ নিয়ে পালান। সেই সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো খুন করে যান তাঁর বাবাকে। এটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।

হাসিনার অনুগতরা নানান ইহজাগতিক প্রাপ্তির জন্য তাঁকে রীতিমতো পূজা করতেন। কেউ তাঁকে দেশরত্ন, আবার কেউ তাঁকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলতেন; কেউ তাঁকে ভাষাকন্যা আবার কেউ তাঁকে মানবতার মা উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর আশ্রিত বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে স্বাধীনতার বয়ান নতুন করে লিখছিলেন। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে ছোট–বড় কয়েকটি রাজনৈতিক দল। হাসিনার লোকেরা তাদের অনেককে হেনস্তা করেছে, পিটিয়েছে, জেলে পুরেছে, গুম করেছে, মেরে ফেলেছে। হাসিনা জীবৎকালে প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না, কিংবা খালেদা জিয়া তাঁর জীবদ্দশায় মুক্ত জীবন যাপন করতে পারবেন, একসময় তা অবিশ্বাস্য মনে হতো। সেটাই ঘটে গেল চব্বিশের ৫ আগস্ট।

হাসিনার আমলে রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করলেও নানা কারণে তাতে জনসম্পৃক্তি ঘটেনি। আন্দোলনগুলো ছিল মূলত দলীয় কর্মীনির্ভর। আসলে মানুষ সনাতন ধারার রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়েছিল, বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে আমরা কয়েকটি আন্দোলন দেখলাম, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের একাত্ম হতে দেখা গেছে। এগুলো সরকার বদলের আন্দোলন ছিল না, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারেও হয়নি। যদিও সেগুলো অনেক রাজনৈতিক দলের সহানুভূতি ও সমর্থন পেয়েছিল এবং তাদের অনেক কর্মী সেসব আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা বলতে পারি। এই আন্দোলনে সাধারণ নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল। শেষের দিকে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয়েছিল সরকারি দলের গুন্ডারা। হেলমেটধারী এসব লোকের ছবি ও খবর দেখেছি সংবাদমাধ্যমে।

এবার কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গে আসা যাক। এটি হয়েছে তিন দফায়। প্রথম দুবার এটি সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে সাড়া জাগালেও বেশি দূর যেতে পারেনি। দুবারই হোঁচট খেয়েছে। ক্যাম্পাসে তাদের ওপর চড়াও হয়েছিল সরকারি ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েরা। আন্দোলন দমনে হাসিনার মডেলটা ছিল এ রকম: ছাত্ররা আন্দোলন করবে। সরকারি ছাত্রসংগঠনের লোকেরা তাদের ওপর হামলা করবে। পিটিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেবে। তাতেও কাজ না হলে টাকাপয়সা দিয়ে, গোয়েন্দা লাগিয়ে, পোষা সাংবাদিকের ভুয়া রিপোর্ট প্রচার করিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করবে। একসময় আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু তৃতীয় দফায় এসে কোটা আন্দোলনটি এভাবে দমানো যায়নি। বলা চলে, সরকারের অতিচালাকির কারণেই আন্দোলনের সূত্রপাত। দ্বিতীয় দফা কোটা আন্দোলনের পর সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে চাকরির ক্ষেত্রে সব ধরনের কোটা বন্ধ করে দিয়েছিল। যদিও আন্দোলনকারী ছাত্ররা সেটি চায়নি। তারা চেয়েছিল, কোটা সংস্কার করে একটা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে। হাসিনা একটা স্টান্টবাজি করে পুরো কোটাব্যবস্থাই তুলে দেন।

এখানে থামলেই ভালো হতো। কিন্তু হাসিনার মাথায় সব সময় দুষ্টবুদ্ধি কিলবিল করে। তিনি বিরোধীদের দৌড়ের ওপর রেখেছেন। যেখানে কোনো সমস্যা ছিল না, সেখানে একটা ইস্যু তৈরি করে বিরোধীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। মুখের ভাষা ছিল অসংযত, অমার্জিত, দুর্বিনীত। তাঁর লাগামহীন কথার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, এটা বোঝার মতো রুচি, শিক্ষা কিংবা আগ্রহ তাঁর ছিল না। ভয়ে তাঁকে কেউ পরামর্শ দিতে পারতেন না। বেছে বেছে মোসাহেবদের উপদেষ্টা বানাতেন তিনি। তারা ছিল হুকুমের চাকর।

কোটা পুনরুদ্ধারের জন্য আদালতে রিট হলো। এটা সেই পুরোনো কৌশল। হাসিনা নিজে না করে আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তাঁর নোংরা খেলাটা খেলতে চেয়েছেন। একই খেলা খেলে তিনি আদালত থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার–সম্পর্কিত সংবিধানের ধারাটি অবৈধ ঘোষণা করিয়ে নিজের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেছিলেন। তিনি জানতেন, এই ধারা বাতিল হলে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। বিচারালয়ে সেবাদাসের অভাব ছিল না। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। ছাত্রসমাজ আর চাকরিপ্রত্যাশীরা ফুঁসে উঠল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। এটি দমাতে আবারও সেই পুরোনো কৌশল। প্রথমে ভাড়াটে হেলমেট বাহিনী দিয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রদের পেটানো, ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেওয়া, রাস্তায় তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চলল। প্রথমবারের মতো দেখা গেল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা এমনকি স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত এই আন্দোলনে একাত্ম হয়ে গেল। আন্দোলন চলে এল ক্যাম্পাসের বাইরে। এবার মাঠে নামল পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি। হেলমেট বাহিনী আন্দোলনকারীদের পেটায়, আইন প্রয়োগকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হামলাকারীদের সুরক্ষা দেয়। তারপর তারাও যুদ্ধ ঘোষণা করে আন্দোলনকারীদের ওপর। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। জনসম্পৃক্তি বেড়ে যাওয়ার একপর্যায়ে এটি প্রচণ্ড গণবিদ্রোহে রূপ নেয়। হাসিনা সরকারের পতন হয়।

দেশ ও দলের প্রতি হাসিনার কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। দলের মধ্যেই তিনি তৈরি করেছিলেন আত্মীয় লীগ। তাঁর ভাবনা ছিল শুধু পরিবার ও ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতিগুষ্টি নিয়ে। তাদেরকে নিরাপদে সরিয়ে সবশেষে তিনি চম্পট দেন। এমন স্বার্থপর ও অমর্যাদাকর প্রস্থান এ দেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি।

আন্দোলন দমনে সরকারি দলের গুন্ডা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর নির্মমতার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। নানা রকম বিধিনিষেধের কারণে অনেক খবরই মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশ পেত না। নির্ভর করতে হতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর ওপর। হাসিনা সেখানেও থাবা বসান। টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে তিনি সারা দেশকে কয়েদখানা বানিয়ে ফেলেন।

কারফিউ দিয়েও রাস্তায় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার স্রোত আটকানো যায়নি। এটা ছিল আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র–জনতার ওপর রাষ্ট্রের ভয়াবহতম যুদ্ধ, যা আমাদেরকে একাত্তরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সম্প্রতি বিবিসি প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের যে ছবি তুলে ধরা হয়েছে, তাতে সরকারি বাহিনীগুলোর নৃশংসতার কিছুটা পরিচয় মেলে। ফাঁস হওয়া কলরেকর্ড থেকে জানা যায়, স্বয়ং হাসিনা আন্দোলন দমাতে পুলিশকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এটা অবশ্য জানাই ছিল, সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া আন্দোলনকারীদের ওপর এ ধরনের বর্বরোচিত হামলা হতে পারে না। হাসিনার ফাঁস হওয়া নির্দেশ তার একটি প্রামাণ্য দলিল হয়ে থাকবে।

ইতিমধ্যে দেশে ও বিদেশে ঘাপটি মেরে থাকা হাসিনার কিছু আত্মীয় ও পোষ্য বলতে শুরু করেছে, এআই দিয়ে এসব বানানো হয়েছে, বিবিসি তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সংস্থা, পুরো আন্দোলনটা ছিল আমেরিকার ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। তাঁর গুণধর পুত্র মায়ের কণ্ঠস্বর শনাক্ত করে বলেছেন, এটা নাকি ২০১৬ সালের ফোনকল। হাসিনার ক্রীতদাসেরা এটি প্রচার করে বেড়াচ্ছে। একটা কথা মনে পড়ে গেল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাতের ভোট নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। কোনো কোনো পোষ্য সাংবাদিক এমনও বলেছেন, এটা মিথ্যা প্রচারণা, আপনাদের কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে, কোনো ছবি বা ভিডিও ফুটেজ আছে ইত্যাদি। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন, রাতেই ভোট হয়েছিল।

বিবিসি যথেষ্ট পেশাদারত্ব নিয়ে তথ্যচিত্রটি বানিয়েছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ীতে ঘটে যাওয়া পুলিশি নৃশংসতার যে ছবি আমরা দেখলাম, তা শিউরে ওঠার মতো। অনুসন্ধান করে বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও অন্যান্য জায়গার ঘটনাগুলোও এভাবে তুলে আনা যায়। এ তো গেল শুধু ঢাকা শহরের কথা। দেশের অন্যান্য জায়গায় এমন হামলা হয়েছে অনেক। জাহাঙ্গীরনগর কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি দলের গুন্ডারা হামলা চালিয়ে নরক বানিয়ে ফেলেছিল। অনেকেই অনেক জায়গায় ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার ভিডিও করে রেখেছেন। সবার হাতে এখন মুঠোফোন। কোনো কিছুই দীর্ঘদিনের জন্য লুকিয়ে রাখা যাবে না।

* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

আন্দোলন দমনে দলীয় গুন্ডা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মমতা সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল
আন্দোলন দমনে দলীয় গুন্ডা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মমতা সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফাইল ছবি

‘এ যেন এক শূন্য মরুভূমি’ by নেত্তা আহিতুভ

ফরাসি ইতিহাসবিদ জ্যাঁ-পিয়ের ফেলিউ যখন গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করেন, তখন প্রথমেই তিনি বুঝতে পারেন, এই গাজা তিনি চেনেন না। আগের বহুবার ভ্রমণের পরিচিত ল্যান্ডমার্ক, রাস্তা, ভবন, শহর- সব কিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তিনি দিক হারিয়ে ফেলেন। তিনি লিখেছেন- ধ্বংসস্তূপের মধ্যদিয়ে কনভয় সামনে এগোয়। প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটি বিভীষিকার দৃশ্য। একটি গাছ পড়ে আছে, ডালপালা মুচড়ানো। একটি ধ্বংস হওয়া ঘর। দূরে একটি ভবন ভেঙে পড়েছে। গাড়ি যতটা সম্ভব চলাচল করে বিধ্বস্ত রাস্তাগুলোর উপর দিয়ে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি- যে গাজা আমি চিনতাম, সেটি আর নেই। এ যেন এক শূন্য মরুভূমি। অথচ হাজার বছরের ইতিহাসে গাজা ছিল একটি সবুজ অভয়ারণ্য।

জ্যাঁ-পিয়ের ফেলিউ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস নিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান গবেষক। বর্তমানে একমাত্র ইউরোপীয় একাডেমিক হিসেবে তিনি গাজার ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন। প্যারিস থেকে ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রতিযোগী থাকলে আমি খুশি হতাম। কিন্তু গাজার ইতিহাস লেখা কঠিন। কারণ কোনো আর্কাইভ নেই। একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাই আমার ফিরতে হয়েছে। দূর থেকে তথ্য জোগাড় করছিলাম। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসরাইলের অনুমোদন নিয়ে তিনি আম্মানে যান। তারপর কারেম শালোম সীমান্ত দিয়ে ফরাসি চিকিৎসকদের একটি দলের সঙ্গে গাজায় প্রবেশ করেন। সেখানে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা তাদের অভ্যর্থনা জানান। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কিছু ওষুধ ও সর্বোচ্চ ৩ কেজি খাবার সঙ্গে নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এক মাস তিনি সেখানে কাটান। তিনি লিখেছেন ‘আন হিস্তোরিয়েন আ গাজা’ (গাজার এক ইতিহাসবিদ)। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইংরেজিতে অনুবাদ প্রকাশ হয় বইটির। এই বইতে এবং তার সাক্ষাৎকারগুলোতে স্পষ্ট- তিনি একদিকে ভয়াবহতা তুলে ধরতে চান, আবার অন্যদিকে নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদের মতো পেশাগত সতর্কতা বজায় রাখতে চান। ফেলিউ বলেন, আমি ইউক্রেন, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক, সোমালিয়া- যুদ্ধবিধ্বস্ত অনেক দেশ দেখেছি। কিন্তু এমন কিছু কখনো দেখিনি। এখন বুঝি, কেন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে এখানে (গাজা) ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরাইল।

তিনি লিখেছেন- গাজায় একটানা গর্জনে মাথা ফাটার উপক্রম। ড্রোনের শব্দ এত তীব্র যে বাইরে সাধারণভাবে কথা বলা অসম্ভব। ড্রোন, ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান, ব্যক্তিগত অস্ত্র- সব কিছুর আওয়াজের পার্থক্য বুঝে উঠতে শেখেন তিনি। মৃত্যু এখানে কোনো নিয়ম মানে না। হঠাৎ যেকোনো সিদ্ধান্ত-কোথায় দাঁড়াবেন, কখন ঘুমাবেন- সেটিই ঠিক করে দেয় আপনি বেঁচে থাকবেন, না মারা যাবেন। কেউ মারা গেলে দাফনের সুযোগ নেই। কবর নেই। অনেকে মৃতদের নাম বাড়ির ধ্বংসাবশেষে লিখে রাখেন। শিশুর নামের পাশে ছোট্ট আঁকাবাঁকা চিহ্ন যুক্ত করেন।

তিনি আরও লিখেছেন, একসময় গাজার স্কুলশিশুদের ইউনিফর্ম ছিল, বই ছিল। এখন তারা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, খালি হাতে। ময়লা স্তূপে খুঁজে বেড়ায় কাগজ, পলিথিন, যা দিয়ে একটু আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতা পাবে। একটি শিশুকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, এত অল্প খাবার নিয়েও কেন তারা রাস্তায় থাকা ক্ষুধার্ত বিড়ালদের খাওয়াচ্ছে। উত্তরে শিশুটি বলে, আমরা জানি ক্ষুধা কেমন। তাই চাই না ওরাও সেই কষ্ট পাক।

গাজায় বর্তমানে মাত্র ৪ জন মনোরোগ চিকিৎসক আছেন। ইউনিসেফ জানায়, লাখ লাখ শিশু মানসিক ও সামাজিক সহায়তার জন্য হাহাকার করছে। গাজায় আগে যে আত্মীয়তা ও পারিবারিক বন্ধন ছিল, তাও এখন ক্ষুধার চাপে ভেঙে পড়েছে। ফেলিউ বলেন, প্রত্যেকে এখন শুধু নিজেদের ক্ষুধার্ত পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। গাজার এতিমদের ট্র?্যাজেডি সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। অনেক শিশু হাসপাতালে পড়ে থাকে। তাদের আত্মীয়-স্বজন নেই। কেউ তাদের দেখতেও আসে না। বহু জায়গায় তিনি দেখেন মেডিক্যাল ক্লাউনরা শিশুদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে চেষ্টা করছে, যা এই বিভীষিকার মধ্যে একটা আশার আলো।
তিনি আরও লিখেছেন, একজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি তার তাঁবুর সামনের ময়লা ফেলে জায়গা পরিষ্কার রাখছিলেন। একটি পরিবার বিধ্বস্ত একটি ভবনের ছাদে আশ্রয় নিয়েছে। কাপড় শুকাচ্ছে টিনের বারান্দায়। ছাউনি ছায়া ফেলেছে ধূসর ধ্বংসাবশেষে- সবুজ, নীল আর লাল রঙের। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৮০ শতাংশ বন্ধ। কেউ কেউ ব্যাংক অ্যাপ কিংবা নগদ অর্থে (ইসরাইলি শেকেল) লেনদেন করে।
ফেলিউ এক জায়গায় হিসাব দেন- প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩৩ হাজার মানুষ বাস করছেন সেখানে। দুই পাশে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার তাঁবু। কেউ কেউ সমুদ্রতীরে ঘর বানিয়ে নিয়েছে।
শীতের দিনে পানির অভাব ভয়ঙ্কর। প্রতিদিন মাথাপিছু ৯ লিটার পানি মেলে। এর এক-চতুর্থাংশও খাওয়ার উপযোগী না। আগে এই হার ছিল ৮০ লিটার। অসুস্থতা, ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, নারীদের জন্য ত্বক ও অন্ত্রের রোগ- সবকিছু যেন নিয়তি হয়ে গেছে। শৌচাগার বলতে বালিতে খুঁড়ে রাখা গর্ত, উপরে পর্দা হিসেবে একটি ছেঁড়া কাপড়। এটাই ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ‘ভান’।

শিশু শিলা মাত্র তিন সপ্তাহ বয়সে ঠাণ্ডায় মারা যায়। এক বৃদ্ধা বলেন- কখনো এত ঠাণ্ডা পাইনি। কখনো এত ক্ষুধার্ত হইনি। জ্যাঁ-পিয়ের ফেলিউ প্যারিসের ‘সায়েন্স প’-তে ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বহু বছর ধরে কলাম লেখেন ‘লা মান্ডে’তে। তিনি ‘গাজা: এ হিস্টরি’ এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনীসহ বহু গ্রন্থের লেখক। তার মতে, গাজা নিয়ে আজও একাডেমিক দৃষ্টিকোণে অন্ধত্ব বিরাজ করছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ইসরাইল গাজার সমাজকে জানে না। ড্রোন বা ট্যাঙ্ক থেকে দূরে বসে সমাজ বোঝা যায় না।
একসময় গাজায় বিরাট সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল- র‌্যাপ ব্যান্ড, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী সব ছিল। তারা হামাসের বিরোধিতায়ও সোচ্চার ছিল। কিন্তু এখন সব ধ্বংস। হামাসবিরোধী বিক্ষোভের সময় ইসরাইল বোমাবর্ষণ করছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো- ইসরাইল এখন ‘আবু শাবাব’ নামের অপরাধী গ্যাংকে সমর্থন দিচ্ছে। তারা ত্রাণবাহী ট্রাক লুট করে। ফেলিউ স্বচক্ষে দেখেছেন- রাত ২:৩০-এ এই গ্যাং ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সেখানে ১১ জন নিহত ও ৫০টি ট্রাক লুট হয়। এই গ্যাংদের সহায়তায় ‘ইসরাইল নিজেই হামাসকে শক্তিশালী করছে’। কারণ সাধারণ মানুষ লুণ্ঠনকারীদের ঘৃণা করে। আর যখন হামাস লুণ্ঠনকারীদের শাস্তি দেয়, তখন জনগণ সেটাকে সমর্থন করে। তিনি বলেন, এরা এমন অপরাধী যাদের পরিবারও তাদের ত্যাগ করেছে। এদের উপর নির্ভর করে গাজা নিয়ন্ত্রণ করা-নৈতিকতা বাদ দিন, কৌশলগতভাবেও ভয়ঙ্কর।

ফেলিউ বলেন, গাজা শুধু একটি অঞ্চল নয়, এটি ভবিষ্যতের পরীক্ষা কেন্দ্র। এখানে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, জেনেভা কনভেনশন- সবকিছু ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। এর প্রভাব সীমানার বাইরে ছড়িয়ে পড়বে। এটি গোটা বিশ্বের জন্য হুমকি। ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলাও সম্প্রতি বলেন- আজ গাজার শিশুরা মরছে। কাল আমাদের সন্তানদের পালা আসবে। জ্যাঁ-পিয়ের ফেলিউর মতে, গাজা এখন এক ‘হতাশার ভূগোল’। এমনকি নির্দেশ মেনে অন্যত্র চলে গেলেও সেখানে নিরাপত্তা নেই। তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন ওয়ালা ফ্রাঙ্গি ও আহমাদ সালামের মৃত্যুতে। এই দম্পতি গাজা শহর ছেড়ে নুসেইরাত ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। ২৫শে ডিসেম্বর তারা সেখানেই বোমায় নিহত হন। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তারা ৪৫,৩৩৯ ও ৪৫,৩৪০ নম্বর মৃত।

mzamin

রুশ ক্ষেপণাস্ত্রেই ধ্বংস এমএইচ ১৭ বিমান, মৃত্যু ২৯৮ জনের: ইউরোপের মানবাধিকার আদালতের চাঞ্চল্যকর রায়

নয় বছর আগে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলাতেই  ধ্বংস হয়ে যায় মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের এমএইচ ১৭ বিমানটি। যার জেরে মৃত্যু হয়েছিল ২৮৩ জন যাত্রী ও ১৫ জন বিমানকর্মীরা। এই চাঞ্চল্যকর রায় ঘোষণা করল ইউরোপের শীর্ষ মানবাধিকার আদালত। এক দশক ধরে ইউক্রেনে নৃশংসতার অভিযোগে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল কিয়েভ ও নেদারল্যান্ডস। সেই মামলাতেও পুতিনের প্রশাসনের বিরুদ্ধে গিয়েছে মানবাধিকার আদালতের রায়। ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ভেঙে পড়ে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ ১৭। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম থেকে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে যাচ্ছিল যাত্রীবাহী ওই বিমানটি। সেটি যখন পূর্ব ইউক্রেনের দোনবাস অঞ্চল অতিক্রম করছিল, তখনই একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বিমানটিতে। ওই সময় দোনবাস অঞ্চলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ধুন্ধুমার সংঘর্ষ চলছিল। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেই যে বিমানটি ধ্বংস হয়েছিল তা নিশ্চিত করেছে ইউরোপের সর্বোচ্চ মানবাধিকার আদালত। এর ফলেই মৃত্যু হয় ৮০টি শিশু-সহ ২৮৩ জন যাত্রী এবং ১৫ জন বিমানকর্মীর।

স্ট্রাসবার্গের একটি আদালতের কক্ষে রায় পড়ার সময়, আদালতের বিচারপতি মাতিয়াস গুয়োমার বলেছেন, ‘প্রমাণ থেকে বোঝা যায় ক্ষেপণাস্ত্রটি ইচ্ছাকৃতভাবে ফ্লাইট এমএইচ ১৭  লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল, সম্ভবত তারা ভেবেছিলো এটি একটি সামরিক বিমান ছিল। বিচারকদের সামনে প্রমাণিত হয়েছে যে  ফ্লাইট এমএইচ ১৭ ধ্বংসে রাশিয়ার জড়িত থাকার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করতে মস্কোর ব্যর্থতা মৃতদের আত্মীয় এবং বন্ধুদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।’ মে মাসে, জাতিসংঘের বিমান সংস্থাও এই বিপর্যয়ের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে অন্যান্য রায়
এর পাশাপাশি আদালত রাশিয়াকে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং ২০২২ সালের মস্কোর পূর্ণ-মাত্রায় আক্রমণের পরে ইউক্রেনীয় শিশুদের অপহরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে। আদালত জানিয়েছে, রাশিয়ান বাহিনী ইউক্রেনে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করেছে।  হামলা চালিয়ে  হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যা ও আহত করেছে, ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে।

আদালতের  আরও পর্যবেক্ষণ, এই  মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো কোনও সামরিক উদ্দেশ্যে নয়। ইউক্রেনের মনোবল ভাঙার কৌশলের অংশ হিসাবে যৌন সহিংসতাকে হাতিয়ার করেছে রাশিয়া। ৫০২-পৃষ্ঠার রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে রাশিয়া ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের চুক্তিও লঙ্ঘন করেছে।

আদালত সম্পর্কে
European Court of Human Rights বা ইউরোপের মানবাধিকার আদালত হলো ইউরোপের কাউন্সিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা এই মহাদেশের শীর্ষ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান। আদালতের গভর্নিং বডি সর্বাত্মক আক্রমণের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ২০২২ সালে মস্কোকে বহিষ্কার করেছিল। তা সত্ত্বেও  আদালত এখনও রাশিয়ার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করতে  পারে। আইনত, রাশিয়া এখনও কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য। আদালত পরবর্তী তারিখে আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়ে রায় দেবে, তবে রাশিয়ার বহিষ্কারের  ফলে ক্ষতিপূরণ সংগ্রহ করা যাবে এমন আশা কম ।
সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

হাসিনার বিচার শুরুর আদেশ: রাজসাক্ষী মামুন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দায় স্বীকার করে মামলায় ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেছেন। মামলার অপর দুই আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১। সেইসঙ্গে প্রসিকিউশনের প্রারম্ভিক বিবৃতির (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) ৩রা আগস্ট এবং মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর জন্য ৪ঠা আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১। মামলায় ৩ জন আসামির মধ্যে একমাত্র আবদুল্লাহ আল-মামুনই কারাগারে আটক আছেন, বাকি ২ জনকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার কার্যক্রম চলছে। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ৫টি অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন। ট্রাইব্যুনালে অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

সকালে আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানিতে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল-১। এ সময় আদালত জানতে চান, তার (চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন) বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের দায় তিনি স্বীকার করেন কি না। জবাবে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, তিনি দোষ স্বীকার করছেন। জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা-গণহত্যা সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সত্য। এ ঘটনায় আমি নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করছি। আমি রাজসাক্ষী হয়ে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন চলাকালীন যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার বিস্তারিত আদালতে তুলে ধরতে চাই। রহস্য উন্মোচনে আদালতকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে চাই। পরে ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন মঞ্জুর করেন। এ সময় মামুন যেহেতু দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন, সেজন্য নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে কারাগারে আলাদা সেলে রাখার আবেদন করেন তার আইনজীবী জায়েদ বিন আমজাদ। এ সময় প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয় যে, মামুনের নিরাপত্তার জন্য আলাদা সেলে রাখলে প্রসিকিউশনের কোনো আপত্তি নাই। ট্রাইব্যুনাল সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।

শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আবদুল্লাহ আল-মামুন আজ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। তাকে অভিযোগ পড়ে শোনানো হয়। ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, তাকে যে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সে ব্যাপারে তার বক্তব্য কী? তিনি তার দোষ স্বীকার করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, সেই অপরাধের সবকিছু তার জানার কথা। সব তথ্য উদ্‌ঘাটনের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালকে সহায়তার মাধ্যমে তিনি ‘অ্যাপ্রুভার’ হতে চেয়েছেন। সেই প্রার্থনা ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করেছেন।

তাজুল ইসলাম বলেন, সুতরাং চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন পরবর্তী সময়ে এই ট্রাইব্যুনালে সুবিধাজনক সময়ে তার বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনাসহ অপরাধ কাদের মাধ্যমে, কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, সেই তথ্য উদ্‌?ঘাটনে সাহায্য করবেন।

তিনি বলেন, যেহেতু মামলায় একজন আসামি উপস্থিত আছেন। বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন। তাদেরকে উপস্থিত হতে বিজ্ঞপ্তি দেয়াসহ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু তারা উপস্থিত না হওয়ায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বন্দিবিনিময় চুক্তির মাধ্যমে আসামিদের ফেরত আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তির অপর পক্ষ ভারত সরকার সাড়া না দেয়ায় আসামিদের ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।

শুনানি শেষে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠিত হয়েছে। কিন্তু বিচারপতিগণ এ কথাও বলেছেন আসামিদের ডিসচার্জের প্রেয়ারে আমি যেসব বক্তব্য তুলে ধরেছি, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যদি তার কোনো কিছু প্রাসঙ্গিক হয় তখন ট্রাইব্যুনাল তা বিবেচনায় আনবেন। মামলায় যুক্তিকর্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবো। এখানে কোনো আসামি দোষ স্বীকার করেছে বলে অন্য আসামিরাও দোষী সে কথা বলা যাবে না।

উল্লেখ্য, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বিসিএস ৮ম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি ১৯৬৪ সালের ১২ই জানুয়ারি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার শ্রীহাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকসহ (সম্মান) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৯৮৬ ব্যাচের (অষ্টম ব্যাচ) কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশের সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট (এএসপি) হিসেবে যোগ দেন।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আইজিপি’র দায়িত্ব নেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। চাকরির স্বাভাবিক মেয়াদ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১১ই জানুয়ারি তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। ২০২৩ সালের ১২ই জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১১ই জুলাই পর্যন্ত তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। পরে ২০২৪ সালে এক বছর মেয়াদে তাকে আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে তিনি আত্মগোপন করেন। পরে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের ৩রা সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন ডিএমপি’র গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ। জানানো হয়, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন সেনা হেফাজতে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় তিনি সেনা হেফাজতে থাকা অবস্থায় আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়।

কর্মজীবনে আবদুল্লাহ আল মামুন পুলিশ সদর দপ্তর, মেট্রোপলিটন পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর সার্কেল এএসপি, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ সার্কেল এএসপি, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ সার্কেল এএসপি, চাঁদপুরের অতিরিক্ত এসপি, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (ডিএমপি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের এএসপি, এডিসি (ডিএমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া নীলফামারী জেলার সুপারিনটেনডেন্ট পুলিশ (ডিপি), ডিএমপি’র ডেপুটি কমিশনার (ডিসি), এআইজি (এস্টাবলিশমেন্ট) এবং ঢাকা সদর দপ্তরের এআইজি (গোপনীয়) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি ও ডিআইজি হন।

৫টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ

গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে উস্কানিমূলক বক্তব্য: ২০২৪ সালের ১৪ই জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসাদুজ্জামান খান কামাল, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা ও সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে হামলা চালায়। এর মাধ্যমে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ করা হয়। এসব ঘটনায় আসামিদের প্ররোচনা, উস্কানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতা, অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শান্তি প্রদান না করা এবং ষড়যন্ত্র করার অপরাধ যা আসামিদের জ্ঞাতসারে ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ: শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আন্দোলনকারীদের দমনে হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এই নির্দেশ বাস্তবায়নে তাদের অধীনস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেন। এর মাধ্যমে আসামিরা অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ প্রদান, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে।

রংপুরে ছাত্র আবু সাঈদ হত্যা: ২০২৪ সালের ১৬ই জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ- এই হত্যাকাণ্ডে তাদের নির্দেশ, প্ররোচনা, উস্কানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্র, অন্যান্য অমানবিক আচরণের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন হয়েছে।

চানখাঁরপুলে ছাত্র হত্যা: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ছয়জন ছাত্র নিহত হন। এই ঘটনাতেও শেখ হাসিনাসহ ৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আশুলিয়ায় হত্যা ও লাশ পোড়ানো: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আশুলিয়ায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা; তাদের মধ্যে পাঁচজনের লাশ পুড়িয়ে দেয়া এবং একই সঙ্গে গুরুতর আহত একজনকে পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনায় তিন আসামি কর্তৃক হত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা, উস্কানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্র, অন্যান্য অমানবিক আচরণ করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসামিদের জ্ঞাতসারে এবং তাদের নির্দেশে এই অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রথম মামলাটি (মিস কেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। এছাড়াও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও ২টি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে একটি আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে গুম-খুনের ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। অপরটি রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলা। জাজ্বল্যমান এসব অপরাধের বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

mzamin