Tuesday, July 10, 2018

‘হাতুড়ির নিচে জীবন’ by গোলাম মোর্তোজা

কবি বা কবিতা নিয়ে কথা বলার সময় নয় এটা। আবার কবির কবিতাই তো সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ। এরশাদের সামরিক নিপীড়নের কালে কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন ‘হাতুড়ির নিচে জীবন’। মাত্র তিন শব্দের বাক্য দিয়ে কবি যা বুঝিয়েছেন, লক্ষ শব্দ লিখেও তা বোঝানো কঠিন। সবচেয়ে বড় কথা কবিতার প্রাসঙ্গিকতা। যখনই লেখা হোক, বহু বছর বা যুগ পরেও তা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বারবার।
চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গেও পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ‘হাতুড়ির নিচে জীবন’।
কোটা সংস্কার বিষয়ে বহুদিন ধরে কিছু তর্ক চলছে।
কিছু প্রশ্ন সামনে আনা হচ্ছে। আজকের লেখায় সেই সব সাধারণ কিছু প্রসঙ্গ- প্রশ্ন বিষয়ে দু’একটি কথা দিয়ে শুরু করি।
১. ‘কোটা বাতিল করা যাবে না। আমি কোটার পক্ষে। কোটা থাকতে হবে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্যে কোটা থাকতে হবে’- একথা বলে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমালোচনা করছেন কেউ কেউ।
প্রথমত, সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। কোটা সংস্কারের দাবিকে যৌক্তিক মনে করার অধিকার যেমন আছে, অযৌক্তিক মনে করারও অধিকার আছে।
দ্বিতীয়ত, কোটা থাকবে না, বাতিল করতে হবে- এ কথা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরতরা কখনো বলেননি। যৌক্তিক শতাংশে কোটা থাকার কথাই তারা সব সময় বলে এসেছেন। কোটা বাতিলের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী কোটা থাকার কথাও তিনি বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সংসদে এবং সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য যদি কার্যকর হয়, তবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা, নারী কোটা, জেলা কোটা থাকবে না।
সুতরাং যারা বলছেন ‘কোটা থাকতে হবে, বাতিল করা যাবে না’- তাদের দাবি করতে হবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আন্দোলনকারীদের অবস্থান আর আপনাদের অবস্থানে কোনো পার্থক্য নেই, নেই সমালোচনারও কিছু।
২. ‘ যারা আন্দোলন করছেন, তারাই শুধু মেধাবী? যারা কোটায় চাকরি পাচ্ছেন, তারা কি মেধাবী নয়? তারাও তো বিসিএসে প্রিলিমিনারি, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই চাকরি পাচ্ছেন। সুতরাং তারাও মেধাবী।’
প্রথমত, বিতর্কটা কে মেধাবী, কে মেধাবী নয়- তা নিয়ে নয়। যিনি কোটায় চাকরি পাচ্ছেন তিনি মেধাবী নন, সে কথাও কেউ বলছেন না। মেধার ভিত্তিতে চাকরি আর মেধাবী, এই দুটি বিষয় সচেতন বা অসচেতনভাবে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যারা উত্তীর্ণ হবেন, তাদের ভেতর থেকে মেধার ভিত্তিতে চাকরি নিশ্চিত করা হোক। একথা সত্যি যে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন সবাই (কোটা সুবিধা প্রাপ্তরাও)। পাশাপাশি আরও বড় সত্যি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একজন হয়তো ৩০০তম হয়ে চাকরি পাচ্ছেন না। আর কোটা প্রাপ্তজন হয়তো ৭০০তম হয়ে চাকরি পাচ্ছেন। শুধু বিসিএস পরীক্ষায় ৫৬ শতাংশ চাকরি হচ্ছে এই প্রক্রিয়ায়। এখানেই ‘মেধার ভিত্তিতে’ প্রসঙ্গ আসছে। কোটা প্রাপ্তজন মেধাবী নন, সেটা বলা হচ্ছে না। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ৩০০তম জন অবশ্যই ৭০০তম জনের তুলনায় মেধাবী এবং চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তারই অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। যেহেতু সেটা ঘটছে না, সেহেতু দাবি তোলা হয়েছে ৫৬ শতাংশ নয়, কোটা ১০ বা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক। এতে বৈষম্য কমে আসবে। আরও একটি তথ্য সবার জানা থাকা দরকার, ৫৬ শতাংশ কোটা শুধু বিসিএসের ক্ষেত্রে। অন্যান্য ক্ষেত্রে কোটা অনেক বেশি। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নন ক্যাডার চাকরিতে কোটা ৬১ শতাংশ। ৭০ শতাংশ কোটা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে। রেলওয়েতে কোটা ৮২ শতাংশ। ৯৬ শতাংশ কোটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে।
৩. ‘কোটা সংস্কারের দাবিতে যারা আন্দোলন করছেন তারা বিএনপি-জামায়াত। তারা সরকারবিরোধী। তারা শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায়।’- এই অভিযোগ ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ নেতা এবং মন্ত্রীদের।
প্রথমত, গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা গত তিন মাস অনুসন্ধান করে কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দের কারও বিএনপি বা জামায়াত সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি। সুতরাং আন্দোলনকারীরা সবাই বিএনপি বা জামায়াত এই বক্তব্যের কোনো ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, যে কোনো দাবি সরকারের কাছেই করতে হয়। সরকারের কাছে দাবি তোলা মানে সরকার বিরোধিতা নয়।
তৃতীয়ত, সরকারের বা সরকারের কাজের বিরোধিতা করার অধিকার দেশের সব নাগরিকের আছে। একইভাবে সমর্থন করার অধিকারও আছে। সরকারের কাজের বিরোধিতা করা মানে দেশের বিরোধিতা করা নয়, সরকার পতনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকাও নয়। সরকার আর দেশ বা রাষ্ট্র সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
চতুর্থত, অস্থিতিশীল যে পরিবেশ তৈরি করা হলো, তার দায় কার? কোটা সংস্কারের দাবি প্রধানমন্ত্রী মেনে নেওয়ার তিন মাস পরও প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। কবে হবে সে বিষয়েও কোনো ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেছেন, প্রজ্ঞাপন জারির কোনো অগ্রগতি নেই।
আন্দোলনকারীরা একটি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অবস্থান জানান দিতে চেয়েছিলেন। তারা রাস্তায় নেমে আসেননি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট ডাকেননি, গাড়ি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করেননি। মনে রাখা দরকার, গাড়ি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা ছাড়া অন্যগুলো করার অধিকার তাদের আছে। সংবাদ সম্মেলনকারীদের উপর আক্রমণ করার অধিকার ছাত্রলীগের নেই। যে অধিকার নেই, সেই অধিকার প্রয়োগ করে ছাত্রলীগ নুরুলদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে। এখানে ‘মারামারি’ হয়নি। শুধু ‘মারা’ হয়েছে। ছাত্রলীগ কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আহত করেছে। লোহার হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পায়ের হাড় ভেঙে দিয়েছে। ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন করেছে, শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে। একজন শিক্ষার্থী এখনও নিখোঁজ।
আন্দোলনকারীরা পরিস্থিতি ‘অস্থিতিশীল’ করেছে তার পক্ষে একটিও তথ্য বা প্রমাণ নেই। ছাত্রলীগ পিটিয়ে-নিপীড়ন করে পরিস্থিতি ‘অস্থিতিশীল’ করেছে, তার পক্ষে ভিডিও চিত্রসহ যাবতীয় প্রমাণ আছে।
প্রথমত, যে কোনো দাবি বা আন্দোলনের সঠিক প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা না করলে, বিরোধী দল সুযোগ নিতে চাইবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। এই সুযোগ নিতে চাওয়ার দায় আন্দোলনকারীদের নয়। এই দায় সরকারের। যদি বিরোধী দল কোনো সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, সেটা নিয়েছে সরকারের ভুল দমননীতির কারণে।
৪. শিক্ষার্থীদের জীবন চলে গেল হাতুড়ির নিচে, দেখার কেউ থাকল না। ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন লোহার হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে কোটা আন্দোলনের নেতা তরিকুলের জীবন বিপন্ন করে দিয়েছে। ভিডিও চিত্রে মামুনের দানবীয়তা ধারণ করা আছে, এক্সরে রিপোর্টে আছে তরিকুলের টুকরো হয়ে যাওয়া পায়ের ছবি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মেরুদণ্ড।
‘হাতুড়ির নিচে জীবন’র কিছু খণ্ড চিত্র-
ক. তরিকুলকে রাজশাহী সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা হয়নি। তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ করেছেন তরিকুলের ভাই-বোন- বন্ধুরা।
খ. নুরুলকে ঢাকা মেডিকেলের বারান্দায় ফেলে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা করা হয়নি। আনোয়ার খান মেডিকেলে আনা হয়েছে। পুলিশের ভয়ে মাঝরাতে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। নুরুল নিজেই গণমাধ্যমকে সেকথা বলেছেন।
গাজীপুরের কোনো একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। দরিদ্র বাবা জমি বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ছেলের চিকিৎসার জন্যে ঢাকায় এসেছেন।
গ. সবাই গাজীপুর থেকে চিকিৎসার জন্যে ঢাকায় আসেন। নুরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। কোনো অপরাধ ছাড়া তাকে পিটিয়ে আহত করেছে ছাত্রলীগ। তার চিকিৎসার দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা সরকার নিলো না। ঢাকা মেডিকেল বা বেসরকারি মেডিকেলে করতেও দিল না। তাকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে গাজীপুরে।
ঘ. ছাত্রীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে। শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের হুমকি দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ঙ. কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ফারুককে শহীদ মিনারে লাথি- ঘুষি- পিটিয়ে অজ্ঞান করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে গেছে ছাত্রলীগ। ভিডিও চিত্রে তা দেখা গেছে। একদিন পর জানা গেল ডিবি তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তুলে নিলো ছাত্রলীগ, পাওয়া গেল ডিবির কাছে!
চ. ‘আপনি কুলাঙ্গার ছেলের জন্ম দিয়েছেন। আপনার ছেলেকে গুম করে ফেলা হবে’- রাশেদের বাবাকে ফোন করে একথা বলেছেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেছেন রাশেদের বাবা। সোহাগ বলেছেন, রাশেদের বাবা অসত্য বলছেন।
জ. সাপ মারার মতো একজনকে দশ বারোজন মিলে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ক্ষত-বিক্ষত এবং লোহার হাতুড়ি দিয়ে রড সোজা করার মতো আঘাত করে পায়ের হাড়-কোমর ভেঙে দেওয়া নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বা প্রশাসন একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। সহস্রাধিক শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ১৪ জন তরিকুলদের নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছেন। ভিসি এই ১৪ জনকে বলেছেন ‘সরকারবিরোধী’। তিনি বলেছেন, সরকারি সুযোগ সুবিধা নিয়ে শিক্ষকরা সরকারের বিরোধিতা করছেন।
শিক্ষকরা যে মুক্তচিন্তা, মুক্ত কথা বলার অধিকার রাখেন, ৭৩’র অধ্যাদেশ তাদের সেই অধিকার দিয়েছে, ভিসি মহোদয় তা ভুলে গেছেন।
ঝ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নিপীড়ন বা ছাত্রলীগের হামলা বিষয়ে প্রথম তিন দিনে কিছু জানেনইনি। ভিসি বলেছেন, গ্রেপ্তার ছাত্রদের দায় বিশ্ববিদ্যালয় নেবে না। ‘শিক্ষক সমিতির কাজ শিক্ষকদের স্বার্থ দেখা’- বলেছেন শিক্ষক নেতা। বলেননি যে, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ দেখা বা তারা নিপীড়িত হলে তাদের দেখা শিক্ষকদের দায়িত্ব নয়। এমন বাক্য না বলেও তা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। দুই হাজারের অধিক শিক্ষকের মধ্যে নিপীড়নের প্রতিবাদ করছেন অল্প কয়েকজন শিক্ষক। উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের পক্ষে শিক্ষক- আইনজীবী- সমাজকর্মীরা প্রতিবাদ করছেন। পুলিশ তাদেরও অপমান- অসম্মান করছেন।
৫. বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে কর্মক্ষম মানুষের সাংখ্য প্রায় ১১ কোটি। এর মধ্যে কাজ নেই প্রায় সাড়ে ৪ কোটি কর্মক্ষম মানুষের। অর্থনীতির অবস্থা ভালো, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’-এই চিত্রের মাঝেও সাড়ে ৪ কোটি মানুষ বেকার।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, এই একটি পরিসংখ্যান তার প্রমাণ বহন করছে। যারা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করছেন, তারা এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীরই অংশ। আন্দোলনকারীদের উপর হামলা যারা করছে, তারাও এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অংশ। মূল সমস্যা কাজের নিশ্চয়তার অভাব। বিনিয়োগ বা কর্মক্ষেত্র বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ না দিয়ে, কোটা বৈষম্য দূর না করে, হাতুড়ি পেটা করে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দমন করা যাবে বলে মনে হয় না। আরও বড় হানাহানির আশঙ্কা তৈরির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সূত্রঃ ডেইলি স্টার

সু চি’র নির্দেশে রোহিঙ্গাদের জমিতে স্থাপিত বৌদ্ধগ্রাম উচ্ছেদ

জোরালো হওয়া আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাখাইনে স্থাপিত বৌদ্ধগ্রাম উচ্ছেদ করেছে মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এবং মিয়ানমারের শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পুড়িয়ে দেওয়া জমিতে ওই বৌদ্ধগ্রাম স্থাপিত হয়েছিল। একজন আইনপ্রণেতাকে উদ্ধৃত করে মিয়ানমারভিত্তিক ইরাবতি জানিয়েছে, জাতিসংঘের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চির নির্দেশনায় পুলিশ বৌদ্ধগ্রাম উচ্ছেদ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে মিয়ানমারের নিস্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থানের একদিনের মাথায় বৌদ্ধগ্রাম উচ্ছেদের খবর জানা গেল।
গত বছরের ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বলা হলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে এবং তাদের ফেরার সমস্ত পথ বন্ধ করতে আরসার হামলার আগে থেকেই পরিকল্পিত সেনা-অভিযান শুরু হয়েছিল। চলমান জাতিগত নিধনে হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিপুল পরিমাণ শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি করতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে রোহিঙ্গা সংকট পর্যবেক্ষণে ৭ দিনের বাংলাদেশ সফরের শেষদিনে রবিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি  বলেছেন, ‘যেহেতু এটি পরিষ্কার যে মিয়ানমার সরকার কার্যত কোনও অগ্রগতিই অর্জন করেনি অর্থাৎ, রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করার আইন, নীতি ও প্রথার বিলুপ্তিতে এবং দক্ষিণ রাখাইনকে নিরাপদ করে তুলতে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি, সেহেতু নিকট ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।’
জাতিসংঘ কমিশনের পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি প্রকাশের একদিনের মাথায় সোমবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় দক্ষিণাঞ্চলের মংডু শহরের কাছে রোহিঙ্গাদের পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামে স্থাপন করা বৌদ্ধ গ্রাম উচ্ছেদ করেছে পুলিশ। দেশটির সংসদের উচ্চ কক্ষের সদস্য উ কিয়াও কিয়াও জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশের প্রায় ১০টি গাড়ি থিন বাও গুই গ্রামে প্রবেশ করতে দেখা যায়। সেখানে রোহিঙ্গাদের জমিতে ৪৮টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সন্ধ্যার দিকে পুলিশ এসব ঘর ভেঙে ফেলা শুরু করে। ঘর ভেঙে দেওয়ার সেখানকার বাসিন্দাদের কেউ কেউ পাশের দিন ইন গ্রামে চলে যান। অন্য যান কিয়াউক পান দু গ্রামে। এই আইনপ্রণেতা আরও জানান, ওই বসতি স্থাপনের নেতৃত্বে থাকা তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার আগে স্থানীয় একটি আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ওই তিনজনের বিরুদ্ধে ‘জনগণের শান্তির প্রতি হুমকি’র অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
শুক্রবার জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানায় বলা হয়, তুন মিয়ান্ট নাইং ও তার স্ত্রী ওহমার কিয়াও এবং তার সহযোগী অং নাইংকে সোমবার সকাল ১০টার সময় আদালতে হাজির করতে হবে। তবে ওই নির্দেশনায় মামলার বাদী বা তাদের গ্রেফতারের কারণ সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। মংডুর কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তুন মিয়ান্ট নাইং মিয়ানমারে কট্টর বৌদ্ধদের সংগঠন প্যাট্রিয়োটিক অ্যাসোসিয়েশন অব মিয়ানমার বা মা বা থা’র সদস্য। সাবেক এই সেনা সদস্য গত বছর মংডুতে ভয়াবহ সহিংসতার সময় কট্টর বৌদ্ধদের সেখানে যেতে সহায়তা করতেন। উইন ইরাবতিকে টেলিফোনে জানান, গ্রেফতারি পরোয়ানায় আনা অভিযোগ বিতর্কিত বসতি স্থাপন সংক্রান্ত আর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ দায়ের করেছে।
তথাকথিত দাফতরিক গোপনীয়তা আইন ভঙ্গের ঘটনায় রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ওয়া লোনে ও কাউ সোয়ে উ’র গ্রেফতারের পর ইরাবতির প্রতিবেদক সরেজমিনে মংডু পরিদর্শন করেন।  সেখানে ইন দিন গ্রামে মিয়ানমার বাহিনীর হাতে ১০ রোহিঙ্গার গণহত্যার বিষয়ে রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের করা প্রতিবেদন সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছিল ইরাবতি। ইন দিন গ্রাম থেকে থিন বাও গুয়ে গ্রাম মাত্র ৫ মিনিটের দূরুত্বে অবস্থিত।  আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গত জুন মাসে তাদের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বহিস্কার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে অপব্যবহার করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলো মিয়ানমারের সেনা প্রধান জেনারেল মিন অং হালাইংয়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে।
২০১৭ সালের নভেম্বরে থিন বাও গুয়ে গ্রামে নতুন প্রায় ১০০ ঘর নির্মাণ করে বসতি স্থাপন করা হয়। আর গ্রামের প্রবেশমুখে একটি অস্থায়ী বৌদ্ধ মঠও স্থাপন করা হয়। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর পুড়িয়ে দেওয়া বাড়ি-ঘরের পাশে তারা এই নতুন বসতি স্থাপন করে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি'র মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল সেই 'আদর্শ বৌদ্ধগ্রাম' নির্মাণের কথা।  বলা হয়েছিল, বুলডোজারে রোহিঙ্গা স্মৃতি মুছে দিয়ে বিপুল সামরিকায়িত রাখাইনে এখন বৌদ্ধ মডেল গ্রাম নির্মাণ করা হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে, রাখাইন-বৌদ্ধদের অর্থায়ানে পরিচালিত সংস্থার মাধ্যমে রোহিঙ্গাশূন্য রাখাইন গড়ে তোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছিলো। সোমবারের প্রতিবেদনে ইরাবতি জানিয়েছে, সেখানে বৌদ্ধ ধর্মীয় পতাকা ও লাগানো বটগাছ প্রায় ৩০০ ফুট দূরের মহাসড়ক থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। তবে বসতি স্থাপনের কয়েক সপ্তাহ পরই তা সরিয়ে ইন দিন গ্রামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এরপর প্রায় ৫০টির মতো পরিবার সেখানে চলে যায়। এসব পরিবারের বেশিরভাগই রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে এসেছে।  সম্পতি এই নতুন বাসিন্দারা সাংবাদিকদের বলেছে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের এক সপ্তাহের মধ্যে ওই স্থান ত্যাগ করতে বলেছে। অন্যথায় তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিতর্কিত বৌদ্ধগ্রাম স্থাপনের বিষয়ে গত ৩ জুলাই আইনপ্রণেতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে এক পরামর্শমূলক সভা করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। উইন বলেন, ওই সভায় বসতির জায়গাগুলোকে ‘বাঙালি সম্প্রদায়ে’র বলে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে অভিহিত করে থাকে। তাদের দাবি, ব্রিটিশ শাসনামালে ওই এলাকায় কৃষি শ্রমিকের অভাব পূরণের জন্য বাংলাদেশ থেকে এসব মানুষকে নিয়ে আসা হয়েছিল। উইন আরও বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায়, নতুন বসতি সম্পর্কে সেস্ট কাউন্সিলর অং সান সু চি’র কাছে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘ। আর এ কারণে তিনি নিয়ম ভঙ্গের কারণে নতুন নির্মিত গ্রাম সরিয়ে নিতে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন’। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের কয়েকজন শীর্ষ সদস্যকে তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া সেখানে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে কর্তৃপক্ষে পক্ষ থেকে বসতি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ছাপানো নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে। তবে বসতি উচ্ছেদের ব্যাপারে জানার জন্য ইরাবতির পক্ষ থেকে সাধারণ প্রশাসন বিভাগের জেলা কর্মকর্তা উ ইয়ে হাতুতের সঙ্গে সোমবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পারা যায়নি।

ভিসি যখন গোয়েন্দা by সাজেদুল হক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র ভূমিতে এ এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন। আবিষ্কারক আর কেউ নন। স্বয়ং ভিসি প্রফেসর আখতারুজ্জামান। চাঞ্চল্য তৈরি করেছেন তিনি। তার আবিষ্কারে লা জবাব সবাই। মাসুদ রানা কোন ছার! যেন তিনিই সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা।
সময় কত কিছুই না বদলে দেয়। তাই বলে এতোটা। তিন মাস আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রফেসর আখতারুজ্জামান। বলেছিলেন, যৌক্তিক দাবির সঙ্গে ঢাবি প্রশাসন একমত। আর রোববার তিনি যে আবিষ্কারের কথা জানালেন, তা অবিশ্বাস্য। তবে অবিশ্বাস, বিস্ময় কাটিয়ে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো- ঢাবি ভিসি কাকে ডোবালেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস মোটাদাগে দু’ভাগে বিভক্ত। একটি জাতি-রাষ্ট্রের জন্মে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা দুনিয়ার আর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেই। যদিও সাম্প্রতিককালে শিক্ষা-গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছু হটা নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে রোববার নতুন এক তত্ত্ব দিয়ে অতীতের সব দুর্নামের রেকর্ড যেন অতিক্রম করে ফেললেন আখতারুজ্জামান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভয়ঙ্কর এক বদনাম ডেকে আনলেন তিনি। কোটা সংস্কারের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তালেবান, শাবাব, বোকো হারাম, লাদেন, মোল্লা ওমরের কার্যক্রমের মিল দেখতে পান তিনি। অকপটে সাংবাদিকদের আবার সে কথা বললেনও। এ নিয়ে চারদিকে ছি ছি! রব উঠলেও তার যেন কিছু যায়-আসে না।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কপালে এতো বড় কলঙ্ক তিলক আর কেউ আঁকতে পারেননি। নিজ প্রতিষ্ঠানকে ডোবানোর এ কৃতিত্ব তাকে দিতেই হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষকদের বিপুল দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। সমাজে, রাষ্ট্রে নারীর অগ্রগতির চিহ্ন হিসেবেই একে দেখতে পেয়েছেন তারা। অথচ এখানেও জঙ্গিবাদের ভূত দেখছেন আখতারুজ্জামান। গুলশান হামলার পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইস্যুটি নতুন করে বড় রকমের আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ সরকার বরাবরই এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির অনুসরণ করে আসছে। জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলোচনায় এলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কখনো এ তালিকায় আসেনি। সে তালিকায় নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত করতে কী আপ্রাণ চেষ্টাই না করছেন ঢাবি ভিসি।
প্রফেসর আখতারুজ্জামানের আলোচিত এ বক্তব্যের ঘণ্টা দুয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ ক্যাম্পাসে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করে। যেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানানো হয়। সমর্থন জানানো হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনে। সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনাকে লজ্জাজনক এবং দুঃখজনক হিসেবে অভিহিত করেন। এটাও বলেন যে, বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। আমাদের কপাল ভালো যে, ওই শিক্ষকদের এখনো পর্যন্ত জঙ্গি বলেননি আখতারুজ্জামান। হয়তো বলতেও পারেন।
প্রয়াত লেখক আহমদ ছফার বিখ্যাত উপন্যাস গাভী বিত্তান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, তার বাসার গাভীকে ঘিরে কীভাবে পরিচালিত হয় নষ্ট শিক্ষক রাজনীতি তার ছবি এঁকেছেন মহাত্মা ছফা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আখতারুজ্জামানের জঙ্গি তত্ত্ব প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সেই গাভীটি। অনেকেই বলছেন, আহমদ ছফা এখন বেঁচে থাকলে কী লিখতেন?
জঙ্গিবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ। আখতারুজ্জামানের বক্তব্যে বিস্মিত আলী রীয়াজ এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মীদের ‘জঙ্গি’ বলে বর্ণনার সময় তাদের তুলনা করেছেন তালেবান, আল শাবাব এবং বোকো হারামের সঙ্গে। তিনি বলেছেন যে, তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন না, কিন্তু তার একজন সহকর্মী তাকে এমন কোনো ভিডিও দেখিয়েছেন যা থেকে তার এই উপসংহার। আমি দীর্ঘদিন ধরে উগ্র সহিংসবাদ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিষয়ে পঠন-পাঠনের চেষ্টা করছি; বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে সামান্য গবেষণার অভিজ্ঞতাও আছে; সেই আগ্রহ থেকে এবং আমার গবেষণার প্রয়োজনেই আমি জানতে চাইছি- সেই ভিডিওটা কোথায়? তা ছাড়া উপাচার্য যেহেতু দেখেছেন সেহেতু এটা কোথাও আছে; সেটা দেখার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের নিশ্চয় আছে। যদি এটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চান সেইভাবে বিবেচনা করেই উপাচার্য মহোদয় বলুন কোথায় সেই ভিডিও?”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামও ভিসি আখতারুজ্জামানের যুক্তি মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলেছেন, ‘সমস্ত পৃথিবীতে তরুণরা যার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে সেটি হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সেটি জঙ্গিরা ব্যবহার করে আর এরা ব্যবহার করছে বলেই জঙ্গি হয়ে গেল এই যুক্তি আমি মেনে নিতে কোনো দিনই পারবো না। আমি এদের অনেককেই চিনি। এরা আমাদেরই সন্তান। তাদের প্রতি আমাদের বিশ্বাস থাকা উচিত, তাদেরকে আমাদের সম্মান করা উচিত।’
ইতিহাস নানা ধরনের শিক্ষক দেখেছে। কেউ নিজ ছাত্রদের রক্ষা করতে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছেন। আর কেউ ক্ষমতাসীনদের তোষামোদির রেকর্ড গড়েছেন। প্রফেসর আখতারুজ্জামানকে ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে সে বিচার ইতিহাসের।

লুকাকুর জীবনের অন্য গল্প: রুটি কেনার সামর্থ্য ছিল না আর আজ... by পিয়াস সরকার

রাশিয়া বিশ্বকাপে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন রেড ডেভিলরা। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই তারা জানান দিচ্ছেন আমরা এসেছি বিশ্বকাপ নিতেই। খেলেছেনও  তেমন। আর তাই তো বিশ্বকাপের শক্ত দাবিদার এখন বেলজিয়াম। অসাধারণ খেলে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছেন। অব্যাহত এ জয়যাত্রায় পানামা, তিউনিসিয়া, ইংল্যান্ড, জাপান এমনকি ব্রাজিলের মতো বড় দলকেও পেছনে ফেলেছেন তারা। বেলজিয়ামের এ জয়যাত্রার অন্যতম কারিগর রোমেলু লুকাকু। তিনি রয়েছেন গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে।
২৫ বছর বয়সী দীর্ঘদেহী লুকাকু আফ্রিকান বংশোদ্ভূত বেলজিয়াম নাগরিক। ২০১৭ সাল থেকে খেলছেন ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। এর আগে খেলেছেন এভারটন, চেলসির মতো স্বনামখ্যাত ক্লাবে। বেলজিয়ামের এই পোস্টার বয় বর্তমানে দর্শক জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কিন্তু এই লুকাকু তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে নির্মম বাস্তবতা। নাটকের থেকেও অধিক নাটকীয় জীবনের গল্প বলেছেন তিনি ‘দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’-এ। তার নিজ মুখে বলা জীবনের গল্পটা এরকম- তখন তার বয়স মাত্র ৬ বছর। মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতিতে লুকাকু স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরতেন। সামান্য রুটি এবং দুধ বরাদ্দ থাকতো তার জন্য। এর বাইরে অন্য কিছু চিন্তা পর্যন্ত করতেন না। একদিন তার মাকে দেখলেন দুধের সঙ্গে পানি মেশাচ্ছেন। তখন তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, তারা শুধু দরিদ্রই নয় তাদের পরিবার নিঃস্ব হওয়ার পথে। তবে তার মায়ের মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকতো। যেন সবকিছু স্বাভাবিক ভাবেই চলছে। মা এক সময় পাড়ার দোকান থেকে রুটি বাকিতে কেনা শুরু করলেন। দোকানদার হয়তো আমাকে এবং ছোট ভাইকে দেখেই ৩ দিন পরে টাকা দেয়ার শর্তে রাজি হয়ে যেতেন।
তার বাবা একজন পেশাদার ফুটবলার ছিলেন। তার ক্যারিয়ার ছিল শেষের পথে। ঠিক তেমনটাই ছিল অর্থের অবস্থাও। অর্থের অভাবে কেটে দেয়া হলো ক্যাবল কানেকশন। আর তখন থেকে ফুটবল খেলা দেখাটাও বন্ধ। শুধু তাই নয়, রাতে বাসায় ফিরে দেখতেন বিদ্যুৎ নাই। এভাবে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত অন্ধকারে থাকতে হতো লুকাকুদের। সব থেকে বেশি কষ্ট হতো গোসল করার সময়, কারণ গরম পানি থাকতো না। লুকাকু বলেন, আমাদের সংসারটাকে এত হতদরিদ্র অবস্থায় কখনোই দেখিনি। তখনই আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই যে, আমাকে কিছু করতে হবে।
ফুটবল খেলোয়াড়ের মানসিক শক্তি প্রবল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লুকাকু মনে করেন, তার থেকে প্রবল মানসিক শক্তি আর কোনো খেলোয়াড়ের হয়তো নেই। একদিন স্কুল থেকে এসে দেখেন তার মা কাঁদছেন। মাকে লুকাকু বলেছিলেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। অতি দ্রুতই আমি আন্দেরলেখট ক্লাবে খেলবো। কিন্তু পেশাদার ফুটবলার হওয়ার জন্য বয়স প্রয়োজন ১৬। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ৬। এই সময়টাতে আমি নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি। প্রতিটি ম্যাচ আমি ফাইনাল ম্যাচ হিসেবে নিতাম। পার্কের খেলা থেকে শুরু করে স্কুলের ম্যাচ সব আমার কাছে ফাইনাল ম্যাচ। আমি বলে কিক নিতাম শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে। কারণ আমি জানতাম এটা বাস্তব জীবনের খেলা, ভিডিও গেমস নয়।
১১ বছর বয়সে তখন তিনি খেলতেন লিয়ার্সা ইয়ুথ টিমে। তার শরীরের রং এবং দীর্ঘ দেহের কারণে বিপক্ষ দলের অভিভাবকরা লুকাকুকে মাঠে নামতে বাধা দিচ্ছিলেন। তারা প্রশ্ন করেন, বয়স কতো? কোথা থেকে এসেছি? পরিচয়পত্র কোথায়? এসব শুনে ভীষণ রাগ হতো তার। লুকাকু বলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি মানে। আমার জন্ম এন্টর্পে, আমি বেলজিয়ান।
অন্য খেলোয়াড়দের মতো আমার বাবা-মা আসতেন না। কারণ আমাদের নিজস্ব যানবাহন ছিল না। তাই আমি দূরে খেলা হলে একাই যেতাম। আমার পরিচয়পত্র দেখালে তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা শুরু করলো। তা দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হতো।
আমি সব সময়ই বেলজিয়ান ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হতে চেয়েছি। এটাই ছিল আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। খেলার সময় ভাবতাম সারা ঘরে ইঁদুর ছোটাছুটি করছে আর টেলিভিশনের অভাবে চ্যাম্পিয়নস লীগ দেখতে পারছি না। অনেক অভিভাবক আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। এসব কারণে আমি প্রচণ্ড রাগ নিয়ে মাঠে নামতাম।
নিজের জন্য এক জোড়া জুতা কেনার সামর্থ্য ছিল না লুকাকুর। বাবার জুতা পায়ে ১২ বছর বয়সে ৩৪ ম্যাচে করেছিলেন ৭৬ গোল। একদিন লুকাকুর নানা ফোন করলেন কঙ্গো থেকে। তিনি খেলাধুলার খোঁজখবর নিলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, প্রতীজ্ঞা কর তুমি আমার মেয়ের খেয়াল রাখবে। লুকাকু সেদিনই প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন তার মায়ের খেয়াল রাখার ব্যাপারে। তার পাঁচ দিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করেন লুকাকুর নানা।
লুকাকু তার মাকে বলেছিলেন, চিন্তা করো না, ১৬ বছর বয়সেই তোমার ছেলে লীগে খেলে দেখাবে। সত্যিই লুকাকু লীগে যোগ দেন ১৬ বছর ১১ দিন বয়সে। ২০০৯ সালের ২৪শে মে। প্লে অফের খেলা, খেলছে আন্দেরলেখট বনাম স্ট্যান্ডার্ড লীগ। অনূর্ধ্ব-১৯ টিম বেঞ্চে বসে খেলা দেখছেন আর ভাবছেন এখনো যদি দলভুক্ত না হই তবে লীগ খেলবো কবে? একদিন কোচের সঙ্গে বাজি ধরে বসলাম। আমাকে মাঠে নামান, বাজি ধরছি ডিসেম্বরের মধ্যেই ২৫ গোল করবো। প্রথমে হাসির ছলে উড়িয়ে দিলেও কোচের সঙ্গে লেগে থাকার কারণে রাজি হয়ে যান বাজিতে। কোচ বলেন, হেরে গেলে আবারো সাইট বেঞ্চে যেতে হবে। লুকাকু আবার পাল্টা বলে বসেন, বাজি জিতলে আমাদের আসা-যাওয়ার পরিবহন ব্যয় দিতে হবে এবং আমাদের প্রতিদিন প্যান কেক দিতে হবে। লুকাকু নভেম্বরেই দিলেন ২৫ গোল। আর ক্রিস্টমাসের আগেই তারা প্যান কেক খেতে লাগলেন। লুকাকু বলেন, এই ঘটনা থেকে একটাই শিক্ষা নেয়া যায় যে, ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে কখনোই কোনো বাজি নয়।
১৩ই মে নিজের জন্মদিনে আন্দেরলেখটের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন লুকাকু। খুশির সংবাদ নিয়ে বাসায় ফিরে ক্যাবল সংযোগ নেন। টেলিভিশনে বসে দেখছিলেন, সমান সমান পয়েন্ট নিয়ে আন্দেরলেখট এবং স্ট্যান্ডার্ড লীগ মুখোমুখি। শিরোপা নির্ধারণের জন্য দুই দলকেই দুইটি প্লে অফ ম্যাচ খেলতে হবে। প্রথম খেলার পর দ্বিতীয় খেলার আগের দিন রিজার্ভ বেঞ্চের কোচ লুকাকুকে ফোন দিলেন। তাৎক্ষণিক তাকে ব্যাগ গুছিয়ে ডাকলেন স্টেডিয়ামে এবং জানালেন সে আছে মূল একাদশে।
লুকাকু বলেন, আমি স্টেডিয়ামে পৌঁছে দৌড়ে গেলাম ড্রেসিং রুমে। বাচ্চা বলেই সম্বোধন করে আমাকে কিটম্যান বললেন, জার্সি নম্বর কতো চাও? আমি  বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বললাম ১০ নম্বর জার্সি চাই। কিটম্যান জানান, একাডেমির খেলোয়াড়দের ৩০ নম্বরের পর থেকে জার্সি পছন্দ করতে হয়। সেবার লুকাকু খেলেছিল ৩৬ নম্বর জার্সিতে।
ম্যাচের দিন খেলোয়াড়দের বাস স্টেডিয়ামে গিয়ে থামলো। সিনিয়রদের প্রত্যেকের পরনে ছিল স্যুট। শুধু গায়ে ছিল পাড়ার মাঠে খেলা ট্রাক স্যুট। ক্যামেরাগুলো যেন আমাকেই খুঁজে নিচ্ছিলো বারবার। আমি মুখ লুকাতে তখন ব্যস্ত। আমার ফোন বেজেই চলছে। পরিচিতজনরা আমাকে টিভিতে দেখে মাত্র ৩ মিনিটে প্রায় ২৫টি এসএমএস পাঠায়। লুকাকু শুধু তার এক বন্ধুকে রিপ্লে দেয়, আমি আসলে জানি না, কী ঘটতে চলেছে। আমি আজ খেলতেও পারি, নাও পারি। তুমি শুধু টিভিতে চোখ রাখো। খেলার ৬৩ মিনিটে লুকাকু পেলেন সেই স্বপ্নের মুহূর্ত। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামলেন ১৬ বছর ১১ দিন বয়সী লুকাকু। সে ম্যাচে হারলেও স্বর্গের সুখ অনুভব করেছিলেন লুকাকু। পরের বছরেই লুকাকু খেলেন ইউরোপা লীগে। লীগ শিরোপা ঘরে তুুলে তার দল। আবার ওই বছরেই নির্বাচিত হন সেরা খেলোয়াড়।
লুকাকুর সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চলছিল। পত্রিকাগুলোও তাকে নিয়ে প্রচার করা শুরু করলো। তবে সব ভালো হলেও জাতীয় দলে ততটা সুনাম ধরে খেলতে পারছিলেন না লুকাকু। ২০১০ সালে জাতীয় দলে নাম লেখান এই ক্ষুরধার স্ট্রাইকার। একদিন তিনি পত্রিকায় লক্ষ্য করেন লেখা, ‘রোমেলু লুকাকু, বেলজিয়ান স্ট্রাইকার’! কিন্তু এতদিন আমাকে লেখা হতো ‘রোমেলু লুকাকু, কঙ্গো বংশোদ্ভূত বেলজিয়ান স্ট্রাইকার’।
লুকাকুর ক্ষোভের জায়গা এই কঙ্গো বংশোদ্ভূত শব্দতে। তিনি বলেন, আমি এন্টর্প, লিজ আর ব্রাসেলসে বেড়ে উঠেছি। আন্দেরলেখটে খেলা ছিল স্বপ্ন। আমি ভিন্সেন্ট কোম্পানির মতো হতে চেয়েছি। আমার  প্রথম ভাষা ফ্রেঞ্চ, পরে ডাচ্‌ শিখেছি। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ বা লিঙ্গালা বলা হয়নি বললেই চলে। তারপরেও আমি কেন আফ্রিকান? আমি একজন  বেলজিয়ান। তিনি আরো বলেন, আমার দেশের কিছু মানুষ আমাকে সবসময় পরাজিত হিসেবে দেখতে চায়। আবার অনেকে আমাকে দেখে অকারণেই হাসে। সাইট বেঞ্চে বসে থাকতে দেখলেই সে হাসি যেন অন্য মাত্রা পায়। যখন চেলসিতে এবং ওয়েস্ট ব্রুমেও সহ্য করতে হয়েছে সেই হাসি।
ছেলেবেলায় আবার ফিরে যান লুকাকু। বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন দশ বছর চ্যাম্পিয়ন লীগ ফুটবল দেখতেই পারিনি। আমি স্কুলে যেয়ে সহপাঠীদের কাছে খেলার গল্প শুনতাম। মাঝে মাঝে সুযোগ হতো কম্পিউটার ল্যাবে গিয়ে হাইলাইটস দেখা। ২০০২ সালে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে বন্ধুর বাড়িতে গেলাম। সেবারই প্রথম রোনালদোকে দেখা। আমার মনে আছে সে বছর আমার জুতায় একটা বড় ছিদ্র ছিল। আর ঠিক ১২ বছর পর আমি ফুটবল বিশ্বকাপে খেলছি।
লুকাকু বলেন, ছোটবেলায় টিভিতে থিয়েরি অরিকে দেখতে পাইনি। তবে এখন প্রতিদিন তার সঙ্গে বসে গল্প করি। শিখি কীভাবে শূন্যে দৌড়াতে হয়। এর থেকে উপভোগ্য আর কী হতে পারে।
সাক্ষাৎকারের শেষে তার স্বর্গবাসী নানাকে স্মরণ করে লুকাকু বলেন, আমি তোমার কথা রেখেছি নানা। আমি তোমার মেয়েকে সুখে রেখেছি। আমাদের রুমে আর কোনো ইঁদুর নেই। আমরা এখন আর ফ্লোরে ঘুমাই না। এখন আর কেউ পরিচয়পত্র দেখতে চায় না। কারণ এখন আমাকে সবাই চেনে।

ডিসেম্বরে আসছে ই-পাসপোর্ট

আগামী ডিসেম্বরে দেশে ইলেক্ট্রনিক পাসপোর্ট (ই-পাসপোর্ট) চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে । ১৯শে জুলাই সকাল দশটায় জার্মানির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভ্যারিডোস জিএমবিএইচের সঙ্গে ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করবে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। চুক্তির সবকিছু ঠিক হওয়ায় পাসপোর্ট অধিদপ্তর আমন্ত্রণপত্র ছাপতে দিয়েছে। সূত্র মতে, ডিসেম্বর থেকেই ই-পাসপোর্ট ইস্যুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এ পাসপোর্টের মেয়াদ হবে ১০ বছর। শিগগিরই এই পাসপোর্টের ফি নির্ধারণ করা হবে। এর আগে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) গাইডলাইন অনুযায়ী বাংলাদেশ মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ও মেশিন রিডেবল ভিসা (এমআরভি) পদ্ধতি চালু করে। কিন্তু এমআরপি ব্যবস্থায় দশ আঙ্গুলের ছাপ ডাটাবেজে সংরক্ষণ না থাকায় একাধিক পাসপোর্ট করার প্রবণতা ধরা পড়ে। এর ফলে ই-পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে অনুভব করে সরকার।
এর প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২৪শে এপ্রিল পাসপোর্ট সেবা সপ্তাহ উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ই-পাসপোর্ট প্রবর্তনের নির্দেশ দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর জার্মানি সফরের সময় ২০১৭ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি সে দেশের প্রতিষ্ঠান ভ্যারিডোস জিএমবিএইচ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ই-পাসপোর্ট চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নাগরিকদের হাতে এই পাসপোর্ট তুলে দিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এক সপ্তাহ আগে একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়।
প্রকল্পটি এ বছরই বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ধরে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বশেষ উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন পাসপোর্ট ইস্যু, পাসপোর্টের নিরাপত্তা বৃদ্ধি, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে বাংলাদেশি নাগরিক ও আগত বিদেশি নাগরিকদের সুষ্ঠুভাবে গমনাগমন নিশ্চিত করতেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সরকার। এই পাসপোর্ট বাস্তবায়ন হলে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে ওই পাসপোর্টধারীর নম্বর অনুসন্ধানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সব তথ্য পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে বিদেশেও বাংলাদেশের ইমেজ বাড়বে।

বৃটিশ রাজনীতিতে ঝড়ের আশঙ্কা, ঝুঁকিতে প্রধানমন্ত্রী

ব্রেক্সিট নিয়ে আবার ঝড় উঠেছে বৃটিশ রাজনীতিতে। এবার প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ব্রেক্সিট বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া যে মন্ত্রী সেই ডেভিড ডেভিস।  নাটকীয়ভাবে তিনি পদত্যাগ করেছেন। এর ফলে ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ দলের মধ্যে ব্রেক্সিট ইস্যুতে যে চাপা বিদ্রোহ ছিল এতদিনে তা প্রকাশ্যে এলো। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ক্ষমতা হারাতে পারেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে আসা নিয়ে তেরেসা মে যে চুক্তি বা পরিকল্পনা নিচ্ছেন তা অনেকটাই নমনীয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে আরো কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করতে পারেন বলে আভাস দেয়া হচ্ছে।
এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন বৃটেনকে দাস রাষ্ট্রে পরিণত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। ব্রেক্সিট সম্পন্ন হলে বৃটেনের কি কি ক্ষতি হবে সেসব তুলে ধরেছেন তিনি। ব্রেক্সিট নিয় কয়েকদিন ধরেই বৃটিশ মন্ত্রীপরিষদে উত্তেজনা বিরাজ করছে। রিপোর্টে বলা হচ্ছে ব্রেক্সিট বিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী স্টিভ বেকার এবং সুয়েলা ব্রেভারম্যানও সরকার থেকে পদত্যাগ করতে পারেন।
গতকাল সোমবার হাউজ অব কমন্সে বৈঠক হওয়ার কথা। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে ব্যাকবেঞ্চারদের তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন তেরেসা মে। এটাকে তার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেরেসা মে বৃটেনকে ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সঠিক পথে নিয়ে যাচ্ছেন বলে যখন বলা হচ্ছে তখন ডেভিড ডেভিসের পদত্যাগ সেই সম্ভাব্যতার প্রতি কঠোর এক আঘাত হেনেছে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বলা হয়েছে, ডেভিড ডেভিস নিজে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনকে এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে ফেলে গেলেন। ডেভিড ডেভিস রোববার রাতে পদত্যাগ করেন। এ সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’কে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনকে বের করে আনার ক্ষেত্রে তিনি যেসব নীতি গ্রহণ করেছেন তা অত্যন্ত দুর্বল। সমঝোতা প্রক্রিয়ায় তা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এর দু’দিন আগে ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার জন্য মন্ত্রীপরিষদ তেরেসার পরিকল্পনায় সম্মতি দেয়। ফলে এখন বৃটেনের রাজনীতিতে ব্রেক্সিট নিয়ে এক ভয়াবহ কোন্দল সৃষ্টি হতে পারে। তাতে বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারেন তেরেসা মে।  হাউজ অব কমন্সে ঝড় উঠতে পারে। ডেভিড ডেভিস পদত্যাগ করার আগে তেরেসার সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি দেশকে বিক্রি করে দিতে পারেন না। ডেভিসের এমন বক্তব্য ও পদত্যাগকে রোববার রাতেই সমর্থন করেছেন কনজার্ভেটিভ পার্টির এমপি জ্যাকব রিস-মগ সহ আরো কয়েকজন এমপি। তবে নিজের দলকে এক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তেরেসা। ইউরোপপন্থিরা তার বিরুদ্ধে একটি কূটকৌশল আঁটছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রীকে অনাস্থা বিষয়ক চিঠি (নো কনফিডেন্স লেটারস) দিতে পারেন। যদি তাই হয় এবং এমন ৪৮টি আবেদন আসে তাহলে তেরেসার নেতৃত্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়বে। ওদিকে বিরোধী লেবার দলনেতা জেরেমি করবিন রোববার রাতে বলেছেন, ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার কোনো কর্তৃত্বই রাখেন নি তেরেসা এবং তিনি এক্ষেত্রে অপারগ। যদি তেরেসা মে পদত্যাগ করেন তাহলে একটি জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য লড়াই করবে লেবার। তার মধ্য দিয়ে তারা ব্রেক্সিট সমঝোতাকে সামনে এগিয়ে নিতে চায়। তিনি আরো বলেছেন, সরকারে ঝড় উঠেছে। এরপরও যদি প্রধানমন্ত্রী তার পদ ধরে রাখেন স্পষ্টত তা হবে তার নিজস্ব স্বার্থে। সেটা দেশের স্বার্থে নয়। উল্লেখ্য, ডেভিড ডেভিসকে ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় ব্রেক্সিট সম্পন্ন করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমঝোতা করার।

লন্ডন মিশন নিয়ে সরকারে অস্বস্তি, পরিবর্তন আসছে! by মিজানুর রহমান

লন্ডন মিশন নিয়ে চরম অস্বস্তিতে সরকার। এ নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সেখানে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বৃটেনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের চেয়ে নিজেদের মধ্যে ‘কূটচাল’ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। মিশনে বিএনপির হামলা ঠেকানোর ‘দায়-দায়িত্ব’ এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে বৃটিশ সরকারের সহযোগিতা আদায়ের প্রশ্নেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের ব্যাপক গাফলতির অভিযোগ আছে। নানা কাজে মিশনে যাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিকদের অবহেলা, হয়রানি ও ভোগান্তির অভিযোগও চরমে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওই মিশনে ব্যাপক রদবদল আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে- এবারের পরিবর্তনগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা ও মনিটরিংয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এটি করা হচ্ছে। গত ৭ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার রায়কে কেন্দ্র করে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে হামলা, ভাঙচুর ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি খুলে ভাঙচুরের ঘটনায় ডেপুটি হাই কমিশনার খন্দকার এম তালহাকে আগেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি মে মাসে ঢাকায় ফিরেছেন। বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। ওই ঘটনায় জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনকে প্রধান করে একটি  তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্যও নেয়া হয়েছে। তবে রিপোর্ট জমা পড়েছে কি-না তা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সূূত্র মতে, সেই ঘটনার পর থেকে মিশনে অনেক পদে পরিবর্তন এসেছে। অনেকে দেশে ফিরেছেন, অনেকে ফিরছেন। এবার ২০১১ সালে মিশনে নিয়োগ পাওয়া শিরীন আক্তারকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে ২০১৪ সালে নিয়োগ পাওয়া মনিরুল ইসলাম কবিরকেও। বিডিআর বিদ্রোহে শিরীন আক্তারের স্বামী নিহত হন। সেই বিবেচনায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে কর্মরত শিরিনকে মানবিক কারণে ওই পোস্টিং দেয়া হয়েছিল। শিরীন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেলেও তার দায়িত্বপালন বিষয়ে মিশনে তেমন বিতর্ক ছিল না। মনিরুল ইসলাম কবির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির আমলে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ছিলেন। লন্ডনে তার নিয়োগ নিয়ে শুরুতে বিতর্ক থাকলেও পরবর্তীতে তিনি এটি কাটিয়ে ওঠেন। যেকোনো মিশনে সাধারণত ৩ বছর থাকার অলিখিত নিয়ম থাকলেও কবির ও শিরীনের বেলায় এটি ব্যতিক্রম হয়েছে। মিশনে যাওয়ার পর দুই সন্তান রেখে কবিবের স্ত্রী (তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা) মারা যাওয়া এবং মানবিক কারণে শিরীনকে একটু বেশি সময় দেয়া হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গতকাল মানবজমিনকে বলেন- দীর্ঘ সময় মিশনে থাকা ওই দুই কর্মকর্তার সম্প্রতি ঢাকায় ফেরার আদেশ হয়েছে। তারা শিগগির ফিরছেন। উল্লেখ্য, লন্ডন মিশনে দীর্ঘ সময় প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্বপালনকারী নাদীম কাদিরের ফেরার পর থেকে ওই পদটি শূন্য। এটি পূরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এ পদে নিয়োগ পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। ওদিকে প্রত্যাহার হওয়া ডেপুটি চিফ অব মিশন খন্দকার এম তালহার শূন্য পদেও নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

এরা জঙ্গি মানবো কি করে

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করে দেয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির বক্তব্যে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বলে আন্দোলনকারীরা জঙ্গি এই যুক্তি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আকতারুজ্জামান রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের জঙ্গি গোষ্টীর সঙ্গে তুলনা করে বক্তব্য রাখেন।
এ বিষয়ে মানবজমিনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, আমার মনে হচ্ছে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল করা হচ্ছে। কারা করছে সেই বিষয়টা আমি এখনো পরিষ্কার জানি না। আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল সামান্য একটি কারণে।
যে কারণের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আবেগ জড়িত। সরকারি চাকরি আমাদের দেশে একটা সোনার হরিণ এবং উন্নত জীবনের একটা ছাড়পত্র। সেজন্য মানুষের একটা কামনা থাকে। আর যে শিক্ষা আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের দিচ্ছি তা দিয়ে তারা বাস্তব জগতের জন্য খুব বেশি তৈরি হতে পারে না। এ কারণে সরকারি চাকরিটা একটা ভরসা অনেক পরিবারের জন্য।
তিনি বলেন, সংস্কারের জন্য তারা আন্দোলনে নেমেছিল, বাতিলের জন্য নয়। যদি শুরুতেই দাবি মেনে নেয়া হতো, ১৫ বা ২০ শতাংশ যেটা রাখার রেখে বাকিটা বাদ দিয়ে দিলে কিন্তু আন্দোলনটাই আর থাকে না। এখন আন্দোলন যেহেতু হচ্ছে, সরকারের অনেকে মনে করছেন এটা সরকারবিরোধী। ছাত্রলীগ সেখানে হামলা করছে। প্রতিটি বিষয় আমাদের কাছে অনভিপ্রেত মনে হচ্ছে। এর কোনোই প্রয়োজন ছিল না। আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, শিক্ষার্থীদের কোনো জায়গা দেয়া হচ্ছে না। তাদের সামান্য একটা সংবাদ সম্মেলন যেভাবে পণ্ড করা হলো, এতে তারা দাঁড়াবার জায়গা পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, সমস্ত পৃথিবীতে তরুণরা যার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে সেটি হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সেটি জঙ্গিরাও ব্যবহার করছে, আর এটি এরা ব্যবহার করছে বলেই জঙ্গি হয়ে গেল এই যুক্তি আমি মেনে নিতে কোনোদিনই পারবো না। আমি এদের অনেককেই চিনি। এরা আমাদেরই সন্তান। তাদের প্রতি আমাদের বিশ্বাস থাকা উচিত, তাদেরকে আমাদের সম্মান করা উচিত। এদের কেউ বিভ্রান্ত হয়ে ‘আমি রাজাকার’ ট্যাগ লাগিয়ে ঘুরে অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ করেছে। কিন্তু সন্তানদের যদি আমরা না শিখাই, তাদের প্রতি যদি আমাদের বিশ্বাস ও সম্মান না থাকে তাহলে সেই সম্মান এবং বিশ্বাস তো তারা আমাদের দেবে না। এই যে বিভাজনের সৃষ্টি হবে এটি সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক।

‘বাড়াবাড়ি হলে, হয় মরবো নয় বাঁচবো’ -আরিফের হুঁশিয়ারি

‘আল্লাহর কসম করে বলছি- আর যদি বাড়াবাড়ি হয়, হয় মরবো না হয় বাঁচবো।’ গতকাল সিলেট বিএনপির মেয়রপ্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচন কমিশনে হাজির হয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামানকে এ কথা বলে সতর্ক করে দেন। ক্ষুব্ধ আরিফ গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ছুটে যান নির্বাচন কমিশনে। সেখানে তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে তার অভিযোগ তুলে ধরেন। অভিযোগের একপর্যায়ে আরিফ নির্বাচনী কর্মকর্তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এখানে পুলিশ অতি উৎসাহি করে, আর তাহলে নির্বাচন করবো কী করবো না- সেটা পরে সিলেটের মাটিতে ফয়সালা হয়ে যাবে। এই মাটি এমন এক মাটি, এই মাটিতে কোনো অন্যায়ের প্রশ্রয় নেই।’ তিনি নির্বাচনী কর্মকর্তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘এটা গাজীপুর না, এটা খুলনা না, এটা সিলেট। আমরার ৩৬০ জন আউলিয়া এ মাটির মাঝে শায়িত।
আল্লাহর কসম করে বলছি, আর যদি বাড়াবাড়ি হয়, হয় মরবো না হয় বাঁচবো।’ এ সময় তিনি বলেন, ‘সিলেটের পুলিশ সিলেট মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি সালেহ আহমদ খসরুর বাসায় অভিযান চালিয়েছে। রোববার রাতেও পুলিশের একটি দল ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতির বাসায় তল্লাশি চালিয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়ি-বাড়ি তল্লাশি শুরু করেছে। এটা হতে পারে না। এটা একচোখা নীতি। তিনি এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচনী কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেন। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালেও তার বাসার সামনে কুমার পাড়ায় নিজেদের প্রার্থী নিয়ে জামায়াতে ইসলামী লিফলেট বিতরণ করছে। এ সময় তাদের সঙ্গে অনেক মানুষ ছিল। পাশাপাশি শ্রমিকলীগ সিলেট নগরীর গুলশান সেন্টার ভাড়া করে সমাবেশ করেছে। নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।’
আরিফের সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ জানান উপস্থিত থাকা সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও কেন্দ্রীয় নেতা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক। নাসিম হোসাইনের বাসায় গিয়েও পুলিশ ঘুরে এসেছে বলে জানান। এদিকে, নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে এসে আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের কাছেও একই অভিযোগ করেন। আরিফ বলেন, ‘আমি কোনো প্রচারণায় নেই। নিজের বাসায় বসে যা পারছি করছি। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রচারণা শুরুর আগেই মিছিল, মিটিং ও গণসংযোগ করছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।’ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দায়ের করার পর সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছেও যান আরিফুল হক চৌধুরী। সেখানে গিয়েও তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি পুলিশ কমিশনারের কাছে দাবি জানান। এদিকে, গতকাল দুপুরে একটি ফ্লাইটে সিলেটে পৌঁছেন সিলেটের নির্বাচনের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি সিলেটে পৌঁছেই হোটেল রোজভিউতে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আর ওই বৈঠকের পরপরই নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে ছুটে যান আরিফুল হক চৌধুরী।

কিছু দুর্বৃত্তের কারণে চিকিৎসা পেশার সুনাম নষ্ট হচ্ছে - হাইকোর্ট

কতিপয় দুর্বৃত্তের কারণে চিকিৎসা পেশার সুনাম নষ্ট হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। আদালত আরো বলেছেন, নিজেদের ভুলকে যথাযথ করতে ধর্মঘট ডাকা অন্যায়। চুয়াডাঙ্গায় চক্ষু শিবিরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে চোখ হারানো ২০ জনকে ক্ষতিপূরণ দেয়া সংক্রান্ত রুলের শুনানিকালে গতকাল বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব মন্তব্য করেন।
চুয়াডাঙ্গায় একটি বেসরকারি কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় চোখ হারানো ২০ জনকে ক্ষতিপূরণ দিতে জারি করা রুলের জবাব না দেয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ও চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. মো. খাইরুল আলমকে তলব করে গত ৩রা জুলাই আদেশ দেন হাইকোর্ট। আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে গতকাল তারা সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির হন। তাদের উপস্থিতিতে শুনানিতে আদালত এসব মন্তব্য করেন। আদালতে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত, সঙ্গে ছিলেন শুভাষ চন্দ্র দাস।
অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম আমিনুল ইসলাম।
শুনানির শুরুতে আদালতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন রুলের বিষয়ে তাদের লিখিত জবাব দাখিলের জন্য সময়ের আবেদন করেন। এ সময় আদালত তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, লিখিত জবাব দাখিলের জন্য সময় পাবেন। যেহেতু দুইজন (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন) আছেন, তাই আপনাদের জবাব ব্যক্তিগত ভাবে শুনবো। এরপর আদালত চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, চক্ষু শিবির করার আগে আপনার অনুমতি নেয়া হয়েছিল কিনা? জবাবে তিনি জানান, অনুমতি নেয়া হয়নি। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বক্তব্য শুনতে চান আদালত। জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ দেখিয়ে আদালত বলেন, চট্টগ্রামে (চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকদের ধর্মঘট)  যা হয়েছে সেটি দু:খজনক। আজকের মামলার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত নয়। কিন্তু যেহেতু আপনি (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক) আছেন তাই বলছি, ‘মানুষ বিপদে পড়লে তিন পেশার লোকের কাছে যায়। তারা হচ্ছেন- ডাক্তার, পুলিশ, আইনজীবী। কিছু দুর্বৃত্তের কারণে তিনটি পেশার পেশাদারিত্ব যদি ধ্বংস হয়, তাহলে মানুষ বিপদে পড়বে।’ আদালত আরো বলেন, ‘মেয়েটাকে (চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশু রাইফার মৃত্যু) তো ফিরিয়ে আনা যাবে না। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। আমাদের (মানুষের) ভুল হবে বলে আমাদের একটা উচ্চ আদালত রয়েছে। ভুলটা অন্যায় নয়। কিন্তু ভুলটা জাস্টিফাই (যথাযথ) করার জন্য যদি হরতাল (ধর্মঘট) ডাকা হয়, তবে তা অন্যায়। এ সময় আদালত আরো বলেন, ‘কতিপয় দুর্বৃত্তের কর্মকাণ্ডের কারণে চিকিৎসা সেবার সুনাম নষ্ট হচ্ছে। দেশে অনেক স্বনামধন্য চিকিৎসক এবং ভালো মানের চিকিৎসা সেবার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কতিপয় ভুল চিকিৎসার ভয়ে রোগীরা পার্শ্ববর্তী দেশে চিকিৎসার জন্য চলে যাচ্ছে। এতে করে দেশীয় মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।’ আর এ ধরনের পরিস্থিতি কমিয়ে আনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকে নির্দেশ দেন আদালত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আদালতের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে একমত পোষণ করছি। এ বিষয়ে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। কিভাবে স্বাস্থ্য খাতকে রক্ষা করা যায় সে ব্যাপারে আমরা চেষ্টা করছি। শুনানি শেষে আদালত আগামী ১৬ই জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেন।
গত ২৯শে মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘চক্ষু শিবিরে গিয়ে চোখ হারালেন ২০ জন!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ওই প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত। গত ১লা এপ্রিল শুনানি নিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে চক্ষুশিবিরে চিকিৎসাপ্রাপ্ত চোখ হারানো ২০ জনের প্রত্যেককে এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রল জারি করেন হাইকোর্ট। আদেশের দুই সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন, ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টার কর্তৃপক্ষসহ ১০ জনকে রুলের জবাব দিতে বলা  হয়।

রিজভীর ওপর নিষেধাজ্ঞা

বিএনপির হাইকমান্ড নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর ওপর। যেকোনো বিষয়ে মন চাইলেই সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দিতে পারবেন না তিনি। এখন থেকে প্রয়োজনীয় ইস্যুতে বক্তব্য দেয়ার আগে অনুমতি নিতে হবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের। বিশেষ পরিস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন দলের মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটি। হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ীই নির্ধারণ হবে ইস্যু এবং বক্তব্যের ধরন। সোজা কথায় প্রতিটি প্রেস কনফারেন্সের আগে সবকিছু অবহিত করে হাইকমান্ডের অনুমতি নিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বহীন ইস্যুতে যখন তখন প্রেস কনফারেন্স ডেকে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দেয়ায় তার প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন দলটির সিনিয়র নেতারা। বিএনপির সিনিয়র নেতা ও জোটের বহু গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার যখন তখন প্রেস কনফারেন্স আয়োজনে। নেতাদের সে বিরক্তি-ক্ষোভে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে সমপ্রতি। দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে আলোচনা না করেই অদূরদর্শী ও আত্মঘাতী বক্তব্য দিয়েছেন স্পর্শকাতর কিছু বিষয়ে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নিয়ে তার সামপ্রতিক কতিপয় বক্তব্য নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে বিএনপি। তিনি যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তার সঙ্গে দলের অবস্থানের কোনো মিল তো নেই-ই, উল্টো সাংঘর্ষিক। যা রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত বিএনপিকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। ফেলে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলের সন্দেহের ঘূর্ণাবর্তে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে বিএনপির হাইকমান্ড অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে রুহুল কবির রিজভীর ওপর এ নিষেধাজ্ঞা দেয়। এছাড়া নির্দেশনা পেয়ে রোববার তিনি তার বক্তব্যের একটি সংশোধনীও দেন।  
এদিকে বিএনপিতে আবাসিক নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন রুহুল কবির রিজভী। বারবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে থাকার কারণে নেতাকর্মীদের কাছে তিনি এ পরিচিতি পান। ২০১২ সালের ৮ই ডিসেম্বর থেকে টানা ৫৭ দিন ও ২০১৩ সালের ৩০শে নভেম্বর থেকে মাসাধিককাল নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্বেচ্ছাবন্দি ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় দফায় স্বেচ্ছাবন্দি থাকাকালে ভোররাতে মই বেয়ে দোতলার বারান্দায় উঠে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সর্বশেষ নিম্নআদালত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর দিন ৮ই ফেব্রুয়ারি থেকেই দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছেন তিনি। সে সময় পুলিশের গ্রেপ্তার ও হয়রানির কারণে নয়াপল্টনে তার অবস্থানকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন নেতাকর্মীরা। আদালত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর তিনদিন পর ১১ই ফেব্রুয়ারি দলের নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান দুই মার্কিন কূটনীতিক। তারা কার্যালয়ে অবস্থানকারী রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে ২০ মিনিটের মতো আলাপ করেন। বিষয়টি মনোযোগ কেড়েছিল রাজনৈতিক মহলের। কিন্তু তারপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে চার মাস। দলের রাজপথ উত্তাপকারী কর্মসূচি নেই, কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তার-হয়রানিও কমে গেছে। তারপরও নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছাড়েননি তিনি। মাসের পর মাস তার এ স্বেচ্ছাবন্দিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক মহলসহ খোদ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই উঠেছে নানা প্রশ্ন। তার ঘনিষ্ঠদের দাবি, গ্রেপ্তার এড়িয়ে দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে নিজের মুক্ত জীবনকে  সেক্রিফাইস করে অবরুদ্ধ দিন কাটাচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী। কিন্তু নেতাকর্মীরা বলছেন, পুলিশ চাইলে রিজভীকে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করতে পারে। অতীতেও দুই দফা তাকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ফলে দৃশ্যমান যাই থাকুক, যত যুক্তিই দেয়া হোক, বাস্তবে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পোক্ত, প্রভাব খাটানো ও সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখতেই তার এ স্বেচ্ছাবন্দিত্ব বলে অনেকেই বলাবলি করছেন।
দৃশ্যত, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে রীতিমতো বাসাবাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন রুহুল কবির রিজভী। কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় ছোট্ট একটি কক্ষে অবস্থান করেন তিনি। সেখানেই খাওয়া-দাওয়া আর রাত কাটান। নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে দৃশ্যত তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল-বিকাল দুই দফা গণমাধ্যম ডেকে ব্রিফিং করেন। মাঝেমধ্যে ব্রিফিং ডাকেন রাত ৯টা-১০টায়। যেকোনো ইস্যুতে নিজের ইচ্ছায়, নিজের বক্তব্যই দলীয় অবস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। ব্রিফিংয়ের আগে দলের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত, মনোভাব জানার অপেক্ষা কিংবা মহাসচিবের সঙ্গে পরামর্শও করেন না। জাতীয় প্রেস ক্লাব, ডিআরইউ বা আশেপাশের এলাকায় বিএনপির সিনিয়র নেতাদের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম গুরুত্বহীন করে তুলেছেন তিনি। একই সময়ে ব্রিফিং ডেকে গণমাধ্যমকর্মীদের ডেকে নিয়েছেন নয়াপল্টনে। জোটের অনুষ্ঠানগুলোর দিন তাদের অনুরোধও রক্ষা করেন না রিজভী। যখন তখন ব্রিফিং ডেকে গণমাধ্যমকর্মীদের ফেলে দেন বিপাকে। কিন্তু তার ভাবখানা এমন যেন প্রতিদিন প্রেস ব্রিফিং করে বিএনপিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। দৃশ্যত দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মনে হলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে পেছনে। নির্দিষ্ট, নিয়মিত কিংবা দৃশ্যমান কোনো আয় নেই তার। অনেক সিনিয়র নেতাও টিভিতে নিজেকে দেখানোর আশায় রিজভীকে তোয়াজ করে চলেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে এসে রিজভীর পাশে বসেন। নিজেদের প্রোগ্রাম থেকে যেন গণমাধ্যমকর্মীদের জরুরি তলবের নামে ডেকে নেয়া না হয় সে জন্য রিজভীকে সমঝে চলেন। উল্লেখ্য, দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি গৃহীত ও দলীয় গঠনতন্ত্রে যুক্ত হয়। কাউন্সিলের পর দলের মহাসচিবসহ অনেকেই এক পদ রেখে অন্য পদ থেকে সরেও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েও দপ্তর সম্পাদক পদ ছাড়েননি রুহুল কবির রিজভী।

যুক্তরাজ্যের নতুন ভিসায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, গবেষকরাও সুযোগ পাবেন

যুক্তরাজ্যের চালু করা নতুন ভিসা ব্যবস্থায় বিজ্ঞানী আর গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এর আওতায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানী আর গবেষকরাও দেশটিতে আসার সুযোগ পাবেন। যুক্তরাজ্যের গবেষণা খাতের উন্নয়নে উৎসাহ দিতে নতুন এই ভিসা চালু করা হয়েছে। ৬ জুলাই থেকে নতুন ‘ইউকেআরআই সায়েন্স, রিচার্স অ্যান্ড অ্যাকাডেমিয়া’ প্রকল্পের আওতায় চালু হওয়া নতুন ভিসা বিদ্যমান টায়ার-৫ (সরকার অনুমোদিত অস্থায়ী কর্মী বিনিময়) ভিসার অন্তর্ভুক্ত হবে। এর আওতায় ইউরোপের বাইরের দেশগুলো থেকে গবেষক, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদরা দুই বছরের জন্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি পাবেন।
নতুন এই ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়ে এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের অভিবাসনমন্ত্রী ক্যারোলিন নোকস বলেছেন, গবেষণা আর উদ্ভাবনে অন্যতম বিশ্ব নেতৃত্ব যুক্তরাজ্য। ভিসা ব্যবস্থার এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক গবেষণা কাজ পরিচালনা এবং এতে যুক্তরাজ্যকে যুক্ত করাকে সহজ করবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন একটি অভিবাসন ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে করে আমরা আন্তর্জাতিক শীর্ষ প্রতিভাগুলো আকর্ষণ করে তাদের জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞতা থেকে যুক্তরাজ্যের লাভবান হওয়া নিশ্চিত করতে পারি।’
ক্যারোলিন নোকস বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজে তাদের অবদানকে আমি স্বীকৃতি দিতে চাই। আমি বিশ্বাস রাখি সারা বিশ্বের শীর্ষ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত থাকবে যুক্তরাজ্য।’
যুক্তরাজ্যের নতুন চালু করা এই ভিসা পরিচালনা করবে যুক্তরাজ্যের গবেষণা আর উদ্ভাবন দফতর (ইউকেআরআই)। এই দফতরের আওতায় দেশের সাতটি গবেষণা কাউন্সিল ছাড়াও ইনোভেট ইউকে এবং রিসার্চ ইংল্যান্ড রয়েছে।  ইউকেআরআই’র আওতায় থাকা ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতো ১২টি অনুমোদিত গবেষণা সংস্থা সরাসরি দক্ষ ব্যক্তিদের যুক্তরাজ্যে কাজের জন্য স্পন্সর করতে পারবে। এসব দক্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে বিশেষজ্ঞ ও টেকনিশিয়ানরাও থাকবেন। প্রকল্পটির তদারকি সংস্থা হিসেবে ইউকেআরআই স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারক করবে। এসব স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলোর টায়ার-৫ স্পন্সর লাইসেন্সও থাকতে হবে।
ইউকেআরআই’র প্রধান নির্বাহী প্রফেসর মার্ক ওয়ালপোর্ট বলেন, ‘গবেষণা ও উদ্ভাবন সহজাতভাবেই আন্তর্জাতিক। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি আমাদের মানতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিভাবান ব্যক্তিদের আদান-প্রদানের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা খুবই প্রয়োজনীয়। আর নতুন এই প্রকল্প আন্তর্জাতিক গবেষণা ও তাতে যুক্তরাজ্যের সংযুক্ত হওয়াকে আরও সহজ করবে।’
মূলত সরকার অনুমোদিত বিনিময় ভিসা টায়ার-৫ ব্যবহার করে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার বাইরে থেকে বিভিন্ন পেশাজীবীরা যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষণ আর কর্ম অভিজ্ঞতার জন্য আসতে পারেন। এর আওতায় যুক্তরাজ্যে আসা যেকোনও ব্যক্তি দুই বছর সেখানে থাকতে পারবেন।
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য, জ্বালানী ও শিল্প পরিসংখ্যান দফতর (বিইআইএস) ইউকেআরআই’র সঙ্গে নিয়মিত এই প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর মাধ্যমে টায়ার-৫ প্রকল্পের মানদণ্ড যে অনুসরণ করা হচ্ছে তা নিশ্চিত করবে।
যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, দেশকে বহুমাত্রিক, উন্মুক্ত ও বৈশ্বিক বাণিজ্য উপযোগী জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন প্রকল্পটি সাজানো হয়েছে। বিগত কয়েক মাসের মধ্যে নিজেদের ভিসা ব্যবস্থায় আরও কয়েকটি পরিবর্তন এনেছে যুক্তরাজ্য। এর মধ্যে রয়েছে, টায়ার-২ ভিসার নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে ডাক্তার ও নার্সদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশ থেকেও সেখানে ডাক্তার ও নার্সদের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় (এনএইচএস) কর্মী সংকট মেটাতে এই উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাজ্য।
টায়ার-১ (স্নাতক উদ্যোক্তা) ভিসার বদলে নতুন একটি স্টার্ট-আপ ভিসা চ্যানেল তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে নতুন ব্যবসা করতে চাওয়া ব্যক্তিদের আবেদনের ক্ষেত্র প্রশস্ত করা হয়েছে।