Sunday, October 18, 2026
ট্রাম্পের বিরতি, এশিয়ার স্বস্তি: বিশ্ব শক্তির নতুন সমীকরণ by সহিদুল আলম স্বপন
রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মস্কোকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার লক্ষ্যও স্পষ্ট ছিল। কিন্তু যখন সেই চাপের অভিঘাত গিয়ে পড়ে জ্বালানি বাজারে, সরবরাহ ব্যবস্থায় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর, তখন বাস্তবতা রাজনীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
সবচেয়ে বড় স্বস্তি পেয়েছে ভারত ও চীন। কারণ গত কয়েক বছরে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের প্রধান ক্রেতা হিসেবে এই দুই দেশ নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথে যেত, তাহলে শুধু নয়াদিল্লি বা বেইজিং নয়, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাই নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ত। এমনকি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পরও কেন পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে পুরোপুরি কোণঠাসা করতে পারল না? উত্তরটি সহজ। কারণ বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর একমুখী নয়। নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী শক্তিগুলোর বিকল্প বাজার রয়েছে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু দেশগুলোরও বিকল্প ক্রেতা রয়েছে। রাশিয়ার তেল ইউরোপে না গেলে এশিয়ায় যাচ্ছে, এশিয়া কিনলে বিশ্বের শিল্প উৎপাদন সচল থাকছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি আজ আর আগের মতো একপাক্ষিক ক্ষমতার প্রদর্শন নয়।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এশিয়া। একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো আটলান্টিকের দুই তীর থেকে। এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। বিশ্বের প্রবৃদ্ধির বড় অংশ আসছে এশিয়া থেকে, জ্বালানির বড় বাজার এশিয়ায়, উৎপাদনের বৃহত্তম কেন্দ্রও এশিয়া। ফলে ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস কিংবা মস্কোকে এখন এশিয়ার বাস্তবতা বিবেচনায় নিতেই হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় বার্তা লুকিয়ে আছে। আমাদের অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর। আমাদের শিল্প উৎপাদন আমদানি করা জ্বালানি, কাঁচামাল ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো ভুল হিসাব কিংবা বড় শক্তিগুলোর সংঘাতের মূল্য শেষ পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকেই বেশি দিতে হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে। আবার বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা দেখা দিলে আমাদের রপ্তানি খাতও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ কারণে বাংলাদেশের স্বার্থ কখনোই কোনো একক শক্তি বা ব্লকের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলার মধ্যে নেই। আমাদের স্বার্থ রয়েছে ভারসাম্যে। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। চীন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও অবকাঠামো অংশীদার। ভারত আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জ্বালানি এবং প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস। এই বাস্তবতায় কূটনৈতিক ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন।
আজকের বিশ্বে বন্ধুত্বের চেয়ে স্বার্থ বেশি স্থায়ী। আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন সত্য হলো, কোনো রাষ্ট্র স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়; স্থায়ী হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই পুরোনো সত্যকেই নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দিল। যে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে চাপে রাখতে কঠোর আইন পাস করেছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্রই পরে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে তার প্রয়োগ স্থগিত করেছে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আদর্শ নয়, স্বার্থ।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এখানে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আগামী দিনের বিশ্ব হবে আরও প্রতিযোগিতামূলক, আরও অনিশ্চিত এবং আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনীতি হতে হবে আরও পরিণত, অর্থনীতি হতে হবে আরও বৈচিত্র্যময় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা হতে হবে আরও শক্তিশালী। শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত আসলে একটি বড় সত্যকে সামনে এনেছে। বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে শক্তির লড়াই যতই তীব্র হোক, শেষ চালটি অনেক সময় দেয় অর্থনীতি। আর যে দেশ সেই বাস্তবতা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্ব ব্যবস্থায় তার অবস্থানই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। বাংলাদেশেরও এখন সেই বাস্তবতার ভাষা বুঝে এগিয়ে যাওয়ার সময়।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: shahidul.alam@bluewin.ch
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প |
সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় দ্বিগুণ হবে দাকোপের অর্থনীতি by সেখ ফরিদ আহমেদ
সমুদ্র উপকূলবর্তী এই অঞ্চলের প্রায় দেড় লাখ জনগোষ্ঠীর ৬৬ দশমিক ০৭ শতাংশই কৃষিনির্ভর। তবে সেখানে লবণাক্ততা, পানীয় জলের সংকট এবং অনিয়ন্ত্রিত জোয়ার-ভাটা এখনো অগ্রগতির পথে বড় বাধা। এসব চ্যালেঞ্জ উত্তরণে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টার পাশাপাশি কৌশলগত ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা দরকার।
দাকোপ উপজেলায় প্রায় ১৮ হাজার ৬৫৭ হেক্টর কৃষিজমিকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে পরিচালিত স্লুইসগেটগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এই গেটগুলোর নির্মাণ ও সংস্কারকাজ একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
দুর্ভাগ্যবশত, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে গেটগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে। প্রতিদিন দুইবার জোয়ার-ভাটার সময় লোনাপানির সঙ্গে আসা পলি অভ্যন্তরীণ শাখা নদী ও খাল-বিলগুলো ভরাট করছে, যা পানি ধারণের ক্ষমতা ও নিষ্কাশনব্যবস্থাকে স্থবির করে দিচ্ছে। এই প্রবণতা রোধে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৈজ্ঞানিক মডেল অনুসরণ করে একটি সুনির্দিষ্ট অপারেটিং–পদ্ধতি (এসওপি) প্রণয়ন করতে পারে।
বর্ষাকাল শেষে পানি মিষ্টি থাকা অবস্থায় স্লুইসগেটগুলো কঠোরভাবে বন্ধ রেখে একদিকে মিঠাপানি সংরক্ষণ, অন্যদিকে পলিবাহিত জোয়ারের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। গেট পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত পানি ব্যবহারকারী দলকে (ডব্লিউইউএ) প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সুযোগ দিয়ে তাদের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় উপকূলীয় কৃষকদের মধে৵ লবণসহিষ্ণু জাতের বীজ সরবরাহ ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতি প্রচলনের মাধ্যমে যে সহযোগিতা করছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। দাকোপে তরমুজসহ বিভিন্ন রবিশস্যের বিপুল উৎপাদন এখানকার অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
স্লূইসগেটের মাধ্যমে সেচের জল নিশ্চিত হলে প্রায় ১৮ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। এই সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফ–সিজন তরমুজ চাষের জন্য উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর মাচাপদ্ধতি এবং পরাগায়ন নিশ্চিতকরণের জন্য মৌমাছি পালনকে প্রণোদনা দিতে পারে। এর ফলে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে অন্তত ২৫ তেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
সমন্বিত বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন
এই কৌশলগত ও টেকসই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে অবকাঠামোগত মেরামত, খাল পুনঃখনন এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন। এই বিনিয়োগের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতিটি বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং) ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যা শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট নিরসনে একটি স্থায়ী সমাধান দেবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ হবে উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করা, যা কৃষি ও জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা দেবে। এই সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর বার্ষিক আয় দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাবে। যা কেবল দাকোপের অর্থনৈতিক চিত্রই নয়; বরং সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করলে দাকোপ অচিরেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক নতুন মডেল হিসেবে আবির্ভূত হবে।
* সেখ ফরিদ আহমেদ, যুগ্ম সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| উপকূলীয় উপজেলা দাকোপে পানি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। ফাইল ছবি : প্রথম আলো |
Saturday, October 17, 2026
গণহত্যার মুখে ভারতের মুসলমানরা by মেহেদী হাসান
যুক্তরাষ্ট্রের গঠন করা প্যানেলের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ১৩ এপ্রিল স্টিফেন জে. র্যাপের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণ। সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনের ভূমিকায় দ্য ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, ‘ভারতে মুসলিমবিরোধী সহিংসতা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। তবে ২০১৪ সাল থেকে, যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন থেকে ভারতের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর পরিকল্পিত ও ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করে হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রা ধারণ করেছে। মুসলিমরা মারধরসহ গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে। তাদের জীবনযাত্রা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও মুসলিমদের নিয়মিত অমানবিক নির্যাতনের পথে ঠেলে দিতে সহায়তা করছেন। তারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেন। মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, মুসলিমদের ওপর এই সহিংস, ব্যাপক এবং পরিকল্পিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় সমর্থনে পরিচালিত হচ্ছে।’
৭ মে ২০২৬ তারিখে ‘ইউএস কমিশন ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম হিয়ারিং অন রিলিজিয়াস ফ্রিডম কন্ডিশনস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই শুনানিতে স্টিফেন জে. র্যাপ প্যানেলের একজন সদস্য হিসেবে ভারত বিষয়ে তার লিখিত বক্তব্য জমা দেন।
স্টিফেন জে. র্যাপ তার প্রতিবেদনের শুরুতে লিখেছেন, ‘ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক অত্যাচারের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টান ও শিখরাও এর বাইরে নন।’
এরপর তিনি লিখেছেন, ‘ভারতে গত এক দশক ধরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অত্যাচার স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় বেসরকারি গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের যোগসাজশ রয়েছে। এর সবকিছুই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরাম অমানবিকীকরণ এবং উসকানির এক বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে ঘটছে।’
র্যাপ লিখেছেন, “আমরা যে তথ্য পর্যালোচনা করেছি, তা থেকে দেখা যায়, আসাম ও উত্তর প্রদেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষের দ্বারা সবচেয়ে গুরুতর নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতন। এই রাজ্যগুলোজুড়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অজুহাতে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তি হিসেবে নানা ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এই রাজ্যগুলো সংখ্যালঘুবিরোধী উসকানি ও সহিংসতারও কেন্দ্রস্থল। এখানে ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন হিন্দু জঙ্গি গোষ্ঠী ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), এর সহযোগী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল (হনুমানের সেনাবাহিনী) এবং বিভিন্ন ‘ভিজিল্যান্ট’ গ্যাং। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও এসব জঙ্গি দল মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। উভয় রাজ্যেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত ভিত্তি আমরা পেয়েছি। আমাদের ২০২২ সালের প্রতিবেদনের মতোই, এখানেও আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেয়েছি, বিশেষত এমন সব কর্মকাণ্ডের, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।”
আসামে সহিংসতার পাশাপাশি অন্তত ১৭ হাজার মুসলমানকে তাদের বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৪৫০ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তরের সমতুল্য হতে পারে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা একাধিক প্রকাশ্য বিবৃতিতে বাংলাভাষী মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা কার্যকরভাবে সহিংস সংঘাতকে উৎসাহিত করেছে। সাম্প্রতিক একটি বিশেষ উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। আসাম বিজেপির সরকারি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। এই ভিডিওতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সহিংসতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ‘পয়েন্ট ব্ল্যাংক শট’ শিরোনামের ভিডিওটিতে শর্মার রাইফেল তাক করার আসল ফুটেজ বলে মনে হওয়া একটি দৃশ্য দেখানো হয়, যেখানে স্প্লিট স্ক্রিনে বন্দুকের নিশানায় থাকা মুসলিম পুরুষদের দেখা যাচ্ছিল। পর্দাজুড়ে অসমিয়া ভাষায় ঘৃণাসূচক স্লোগান ভেসে উঠছিল, যার মধ্যে ছিল, ‘কোনো দয়া নেই’ এবং ‘বাংলাদেশিদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই’। এটি আমাকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মিডিয়া ট্রায়ালের অভিযুক্ত করার অভিজ্ঞতা এবং হুতুদের দশটি আদেশের কথা ভীষণভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বিশেষ করে, ‘তুতসিদের জন্য কোনো করুণা নেই’—এই আদেশটির কথা, যা আট লাখ তুতসি পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যার তিন বছর আগে কাঙ্গুরা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
স্টিফেন জে. র্যাপ আরো লিখেছেন, “আসাম ও উত্তর প্রদেশ উভয় রাজ্যেই পুলিশের দ্বারা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ‘এনকাউন্টার কিলিং’ ঘটেছে। এ ধরনের ‘এনকাউন্টার কিলিং’-এর শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যাই অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। এ জন্য কোনো জবাবদিহি নেই এবং প্রায়ই হত্যাকারীদের প্রশংসা করা হয় ও পদোন্নতিও দেওয়া হয়। আসামে শর্মার সরকারের প্রথম তিন বছরে এ ধরনের ঘটনায় ৮৩ জনকে হত্যা করা হয়েছিল এবং উত্তর প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের সরকারের প্রথম ৭ বছরে ২৬৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।”
উত্তর প্রদেশের পুলিশও ‘অপারেশন ল্যাংলা’ নামে পরিচিত একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এই কৌশলে কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীকে হত্যা না করে বরং পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ করে দেয়, যা ‘হাফ-এনকাউন্টার’ ঘটনা নামে পরিচিত। আমরা শুধু ২০২৪ সালেই এমন ৫৬ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান পেয়েছি।
স্টিফেন জে. র্যাপ তার প্রতিবেদনে আসামে পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার অধীনে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে গণহারে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা খুবই উদ্বেগের বিষয়।
র্যাপ উল্লেখ করেছেন, ‘আসাম ও উত্তর প্রদেশ শুধু দেশব্যাপী সেই প্রবণতারই প্রতীক, যা বিহার, হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং উত্তরাখণ্ডের মতো অন্যান্য বিজেপিশাসিত রাজ্যে সরকারি কার্যকলাপ, আইন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে সংঘবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের এ ধরনের ঘটনার জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
র্যাপ পরামর্শ দিয়ে লিখেছেন, “সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। ইতিহাস
আমাদের শেখায়, গণসহিংসতার দিকে যাত্রা যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় বিভিন্ন বয়ান থেকে এবং ধীরে ধীরে এই ধারণার স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে যে সহাবস্থান আর সম্ভব নয়। এর পরে আসে আইনি ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ, যা জনগোষ্ঠীকে শ্রেণিবদ্ধ করে, অধিকারের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে জনসংখ্যাগত বা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু পরবর্তী সময়েই এই প্রক্রিয়াগুলো জাতিগত নির্মূল এবং শেষ পর্যন্ত গণহত্যায় রূপ নেয়, যেমনটি আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়া ও মিয়ানমারে দেখেছি। এসব ঘটনাতেই অনেক ইঙ্গিত ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পরই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।
‘জেনোসাইড ওয়াচ’ তাদের ১০ ধাপের প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারতের আসাম রাজ্যের মুসলিমদের পরিস্থিতিকে ‘পর্যায় ৭ : প্রস্তুতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা আশঙ্কা করছে, এই অঞ্চলগুলোতে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু মুসলিমদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ের সমান্তরাল।”
সরাসরি আক্রমণ পর্যায়
ভারতে, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে, মুসলমানদের জন্য বর্তমানে দমবন্ধ করা পরিবেশ বিরাজ করছে। বছরের পর বছর ধরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, নিপীড়ন ও ঘৃণা প্রচারের পর বর্তমানে সরাসরি হামলা, হত্যা ও তাদের স্থাপনা ধ্বংসের পর্যায় শুরু হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত সেপ্টেম্বর মাসে বিহার রাজ্যের দরভাঙ্গা জেলার মেকনা গ্রামে হিন্দুদের জমির ওপর দিয়ে একজন মুসলমানের লাশ নিয়ে যেতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এতে ওই জমি অপবিত্র হবে এবং ভবিষ্যতে সেখানে আর কোনো দিন মন্দির নির্মাণ করা যাবে না।
সেপ্টেম্বরে কলকাতায় আরো দুটি ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, বিজেপি সরকার মুসলিমবিদ্বেষ ও বর্ণবাদকে কোন মাত্রায় নিয়ে যেতে চায়। সালাম দেওয়া ও ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার কারণে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, নারী আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানুকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের মুসলিম উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদী তরন্নুমকে ২৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে পদত্যাগে বাধ্য করেছে হিন্দুত্ববাদী ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ।
কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে মুসলিম কর্মকর্তাদের মেনে নিতে পারছে না বর্ণবাদী উগ্র হিন্দুরা। আদালতে বিচারকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুসলিম কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের অনেককে পদ ছাড়ার জন্য সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শিলিগুড়ির একটি আদালতে একজন মুসলিম বিচারকের সামনে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মুসলিমকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সেই নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে উগ্রবাদী হিন্দুরা। লোকসভায়ও অনেক উগ্রবাদী হিন্দু সাংসদ মুসলিম সাংসদদের উপস্থিতি সহজে মেনে নিতে পারছেন না।
গরু পালন, গরু পরিবহন ও গরু জবাইকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের পিটিয়ে এবং পুড়িয়ে মারার বর্বরতা এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ৩ অক্টোবর রাতে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির বাগডোগরার কাছে গরু পাচারের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দুই মুসলিম যুবককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করে বিজেপির উগ্র গো-রক্ষক বাহিনী। এর আগে জুলাই মাসে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে একজন, জুন মাসে মহারাষ্ট্রের নাসিক এলাকায় একজন, মে মাসে আসামের বালিকুং জেলার শানিতপুরে দুজন এবং জানুয়ারিতে ওড়িশার বালাসোর জেলায় একজন মুসলিমকে গরুসংক্রান্ত ঘটনায় পিটিয়ে হত্যা করে উগ্র হিন্দুরা।
২০২৩ সালে রাজস্থানের জুনাইদ ও নাসির নামের দুই মুসলিম যুবককে হরিয়ানায় গাড়ির ভেতরে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে গো-রক্ষা গোষ্ঠীর হিন্দুরা। গরুসংক্রান্ত ঘটনায় তাদের হত্যা করা হয়।
২০২২ সালে নাজির আহমদ নামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে গরু পরিবহনের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গত ১২ জুন মধ্যপ্রদেশের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান ১৪ জন হিন্দুত্ববাদী আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর জের ধরে রাষ্ট্রীয় বজরং দল ও গো-রক্ষা পরিষদ ওই মুসলিম নারী বিচারককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দিয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান থেকে মুসলিম নির্যাতনের বিষয়ে সম্প্রতি কিছু তথ্য সামনে এসেছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। দেশটির গণমাধ্যম এসব বিষয় সচেতনভাবে এড়িয়ে যায়।
মানবাধিকার সংস্থা ও মুসলিম সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ভারতে প্রায় ২ হাজার ১০০টিরও বেশি মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধারা বর্তমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে অবস্থিত প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক শাহি মসজিদের একটি বড় অংশ এবং এর মিনার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মসজিদ ও মাদরাসা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও বস্তুত দেশটি বিজেপির নেতৃত্বে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারতে উগ্র হিন্দুদের যেসব সংগঠন রয়েছে এবং তারা মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যেসব বর্বরতা চালাচ্ছে, তা যদি বাংলাদেশসহ কোনো মুসলিম দেশে ঘটত, তাহলে ভারত বিশ্বে সেই দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করত। চলমান মোদিবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ নেহা বোরা বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি, গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে একজন স্বৈরাচারী লুকিয়ে রয়েছেন।’
গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে মোদি একজন স্বৈরশাসক—এ কথা যেমন বিশ্ব জেনেছে, তেমনি বিশ্ব শিগগিরই জানতে পারবে, ক্ষমতাসীন বিজেপি আসলে হিন্দুদের একটি জঙ্গি ও ফ্যাসিবাদী দল, যাদের অধীনে মুসলমানরা বর্তমানে গণহত্যার পরিস্থিতির মুখোমুখি।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ

Monday, October 5, 2026
আপনাকে দেখেই কিন্তু শিখছে আপনার শিশু by সুমনা করিম
খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর হিসেবে শিক্ষার্থীরা আসবাব বা শিকারের যন্ত্রপাতি অথবা অন্য কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের কথা ভাবছিলেন।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের অবাক করে দিয়ে মিড জানান, সাংস্কৃতিক সভ্যতার প্রথম নিদর্শন আসলে সুস্থ হয়ে ওঠা একটি ঊরুর হাড়।
কোমর থেকে হাঁটু অবধি মানব শরীরের সবচেয়ে বড় হাড়টি একবার কোনো কারণে ভাঙলে প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ হতে কমপক্ষে ছয় সপ্তাহ লাগে।
প্রাচীন সমাজে একবার এই হাড় ভেঙে যাওয়ার মানে ছিল চলাচলের ক্ষমতা একেবারেই হারিয়ে ফেলা; আর শিকারি কোনো প্রাণীর শিকার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা।
নৃবিজ্ঞানী মিড শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘আজ থেকে প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে পাওয়া সুস্থ হয়ে ওঠা ঊরুর হাড়টি থেকে আমরা বুঝতে পারি, কেউ একজন এই অসুস্থ সঙ্গীকে বন্য প্রাণীর শিকার হওয়ার জন্য পেছনে ফেলে যায়নি। বরং তার সঙ্গে থেকে নিরাপত্তা দিয়েছে; তার জন্য আশ্রয়, খাবার ও পানির ব্যবস্থা করেছে এবং কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে তাকে সঙ্গে বহন করে নিয়ে গেছে।’
পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এই সম্পর্কই মানবজাতিকে প্রাচীন সমাজের বিপৎসংকুল পরিবেশে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। আর আধুনিক মানবসভ্যতা গড়ে ওঠার ভিত্তিই হচ্ছে মানবিক এই মূল্যবোধ।
পাশাপাশি এটাও স্বীকার করে নিতে হবে যে মানবিক মূল্যবোধের সবকিছুই মানবশিশু জন্ম থেকে নিয়ে আসে না। এর অনেক কিছুই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিখে নিতে হয়। আর শিশুর শিক্ষাগ্রহণ যেহেতু পরিবার থেকে শুরু হয়, তাই পরিবারই হচ্ছে শিশুর মূল্যবোধ তৈরির প্রথম জায়গা।
আমাদের শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। এ কারণে পরিবারের বড়রা যা বলেন, যা করেন, তা-ই দেখে দেখে সেই অনুযায়ী শেখে তারা। তাই পরিবারের সদস্যদের ইতিবাচক কোনো কথা, কাজ, আচরণ বা অভ্যাস শিশুদের মধ্যে মূল্যবোধ হিসেবে খুব ছোটবেলাতেই বিকশিত হতে পারে।
টিস্যু বা চিপসের প্যাকেট রাস্তায় না ফেলে জায়গামতো ফেলা, বড়দের সম্মান করা, ভালো কথা বা কাজকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করা অথবা কারও কাছ থেকে সহায়তা পেলে তাকে ধন্যবাদ জানানোর মতো ছোটখাটো কিন্তু সুদূরপ্রসারী বিষয় শৈশবে খুব সহজেই শিখিয়ে ফেলা যায়। আর ছোটবেলায় একবার অভ্যাস হয়ে গেলে বড় হওয়ার পরও এসব মূল্যবোধ তাদের মধ্যে বজায় থাকে।
শিশুদের মূল্যবোধের বিকাশে পরিবারের পরপরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শিক্ষক। তিনি একজন শিশুর ভাবনার জগৎকে আলোড়িত করতে পারেন, কোনো তথ্য মুখস্থ না করিয়ে নতুন নতুন বিষয় শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন, প্রতিদিন কীভাবে নতুন চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, তা শেখাতে পারেন।
শিক্ষকেরা একদিকে পাঠ্যক্রমের ভেতরে থাকা সাহিত্য, বিজ্ঞান বা ইতিহাসের মতো বিষয়গুলো আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। আবার অন্যদিকে খেলাধুলা, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি বা অভিনয়ের মতো পাঠ্যক্রমবহির্ভূত নানান কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জীবনমুখী মূল্যবোধ তৈরি করতে পারেন।
একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করতে হলে তার মধ্যে সব ধরনের মূল্যবোধ নিশ্চিত করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত ও শারীরিক মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, মানসিক ও আবেগীয় মূল্যবোধ এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ। একজন শিক্ষার্থী তার জীবনের কোনো না কোনো সময় এসব মূল্যবোধের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। একজন শিক্ষক শৈশবেই একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সহযোগিতা, একতাবোধ, উদারতা, মমত্ববোধ, নেতৃত্ব ও সহানুভূতির মতো ইতিবাচক গুণাবলির বিকাশ ঘটাতে পারেন।
শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও আবেগীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের বেশ কিছু স্কুলে ইতিমধ্যে এসইএল (সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং) চালু করা হয়েছে। এতে করে নিয়মিত ক্লাসের বাইরেও শিক্ষার্থীরা মানসিক ও নৈতিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করেই মানুষের সমাজ পরিচালিত হয়। আর আজকের শিশুই ভবিষ্যতে সমাজে নানাভাবে অবদান রাখবে। তাই শৈশবেই তাদের মধ্যে মূল্যবোধ বিকশিত করার সুযোগ তৈরি করা, সমাজের টিকে থাকা ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জরুরি।
* সুমনা করিম, ভাইস প্রিন্সিপাল, ডিপিএস (দিল্লি পাবলিক স্কুল) এসটিএস জুনিয়র স্কুল

Sunday, October 4, 2026
পেডোফাইলরা কি চারপাশে কিলবিল করছে by গওহার নঈম ওয়ারা
দেশ–বিদেশের অনেকে চমকে উঠেছেন ভিডিওটি দেখে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর জন্মদিনে কেক কাটা হয়েছে। সেই কেক শিক্ষার্থীর মুখে আগ্রহ নিয়ে লেপে দিচ্ছেন শিক্ষক।
শিক্ষক এখানে থেমে গেলে বিষয়টি ‘ফান’ হিসেবে গণ্য করে সেদিনের মতো ‘ফুলস্টপ’দেওয়া যেত; কিন্তু থলের মধ্যে বিড়াল থাকলে ‘ফুলস্টপ’ সহজ নয়।
এই শিক্ষকের অতি আগ্রহের বিড়াল টুপ করে থলে থেকে বেরিয়ে পড়ল তখন, যখন তিনি কিশোর ছাত্রটির কেক মাখনো গাল নিজের জিহ্বা দিয়ে পরিষ্কার করা শুরু করেন।
এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন শিশুটির মা জানান ওই শিক্ষক নাকি ছেলে শিক্ষার্থীদের জন্মদিনে এ রকম আচরণ করেন হামেশাই।
একজন অভিভাবক শিক্ষকটির এই অগ্রহণযোগ্য আচরণকে পেডোফাইল–সুলভ আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে পেডোফাইল কী? পেডোফাইল বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি প্রাক্–কৈশোর শিশুদের (সাধারণত ১৩ বছরের কম) প্রতি যৌন আকর্ষণ, তাড়না বা লালসা অনুভব করেন।
তবে এখানে যে এরা থেমে থাকবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এ রকম অগ্রহণযোগ্য যৌন আচরণ ১৩ –১৪ বছর পার হয়ে যাওয়া শিশু=কিশোরদের প্রতিও থাকতে পারে। যৌন অপরাধবিজ্ঞান সেই প্রবণতাকে ‘হেবেফিলিয়া’ বলে উল্লেখ করেছে।
হেবেফিলিয়া এমন একধরনের যৌন প্রবণতা, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্কের যৌন আকর্ষণ থাকে শুধু ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রতি। এটি পেডোফিলিয়া থেকে আলাদা; কারণ পেডোফিলিয়ায় আকর্ষণ থাকে কৈশোরে পৌঁছানোর আগের শিশুদের প্রতি, অর্থাৎ যারা এখনো বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছেনি। তা ছাড়া ‘ইফেবোফিলিয়া’ বলেও আরেকটি গ্রুপের কথা গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
পেডোফিলিয়া, হেবেফিলিয়া বা ইফেবোফিলিয়ার চুলচেরা বিশ্লেষণ এই লেখার মোক্ষ নয়।
তবে এটুকু বলা যায়, তাঁরা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি যৌন তাড়নায় তাড়িত থাকেন এবং সুযোগ পেলেই নানাভাবে সেটি মিটিয়ে নেন। গালে কেক লাগিয়ে সেটি জিহ্বা দিয়ে পরিষ্কার করা সেই যৌন তাড়নারই বহিঃপ্রকাশ।
মাত্র হাঁটতে শেখা ভাগনে-ভাগনি বা ভাতিজা-ভাতিজির পেছন থেকে প্যান্ট খুলে দিয়ে অথবা শিশুর নরম গাল বা শরীরে দাড়ি ঘষে পুরুষ আত্মীয় বা পরিচিতজনেরা যে আনন্দ পান, সেটিও মনের মধ্যে সুপ্ত বিকৃত যৌনাচারের প্রকাশ। সেটি নির্দোষ কোনো বিনোদন নয়।
উদ্বিগ্ন মায়ের পোস্টে অনেকেই আওয়াজ তুলেছেন ‘শিক্ষাঙ্গনে যৌন নিপীড়ন নির্মূল করুন।’
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বড়দের পেডোফিলিয়ার শিকার হলে শিশুর মন, শরীর, আচরণ, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক সবকিছুই গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পেডোফিলিয়ার শিকার হওয়া শিশু ভয়, উদ্বেগ ও দুঃস্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, অপরাধবোধ ও নিজেকে দোষী ভাবা, বিষণ্নতা ও পিটিএসডি বা আঘাত– পরবর্তী মানসিক আভিঘাতের ঝুঁকিতে পড়ে।
সময়মতো পরিবারের সহযোগিতা, চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং না পেলে শিশুকে এর ভার সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
পাঠকদের মনে থাকার কথা, বছর তিনেক আগে (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২) এক বয়স্ক মানুষের যৌন লালসার শিকার হয়ে সাত বছরের এক শিশু এতটাই বিপর্যস্ত হয়েছিল যে সে বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আত্মহত্যা করার চেষ্টার পরেই জানা যায় ঘটনাটা।
ওই ঘটনায় শিশুটি প্রথমে ভয়ে সংকুচিত হলেও সে ব্যথায় অতিষ্ঠ হয়ে পরের দিন সন্ধ্যায় ফুফুকে ঘটনাটি বলে, ‘দোকানদার আঙ্কেল জোর করে ব্যথা দিয়েছে।’ এটা কোনো অভিযোগ ছিল না। স্রেফ আস্থায় থাকা একজনকে শিশুটি জানাতে চেয়েছিল গা শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতার কথা। হয়তো তার কষ্টের কথা বলে সে হালকা হতে চেয়েছিল।
বড়রা জানেন না শিশুদের সঙ্গে এমন পরিস্থিতিতে কেমন ব্যবহার করতে হয়; এমন হলে শিশুকে তার শারীরিক আর মানসিক সুস্থতার জন্য কী পদক্ষেপ নিতে হয়।
শিশুকে দোষারোপ করে এবং জনে জনে বারবার একই প্রশ্ন করে বড়রা তাকে সেই গর্তে ফেলে দেন, যে গর্ত থেকে সে বেরিয়ে আসতে চায়।
যে ঘটনার পরিকল্পনা ফাঁদ পাতা ও বাস্তবায়ন—সবকিছুতে একজন বয়স্ক মানুষের হাত; তখন শিশুকে দোষারোপ করে তার মনের মধ্যে অপরাধবোধ চাগিয়ে তোলার কোনো যুক্তি নেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুটির ভোগান্তি বাড়ে।
ওই শিশুর ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছিল। বড়রা কেউ বিশ্বাস করেননি। উল্টো শিশুটিকেই তাঁরা বকাবকি করেন। নিরুপায় শিশু তাই বোধ হয় মৃত্যুকেই তার শেষ আশ্রয়ের জায়গা মনে করেছিল।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নির্যাতনের ঘটনা যদি ঘটে, তাহলে কখনো শিশুকে দায়ী করা যাবে না। তাকে মানসিকভাবে সমর্থন করতে হবে। তাঁর সামনে এ ঘটনা নিয়ে বারবার আলোচনা বা কান্নাকাটি করা যাবে না। এতে তার মানসিক সংকট চরমে পৌঁছে যায়।
এই সাত বছরের শিশুটির ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছিল। শেষমেশ সে ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভাগ্য ভালো, শিশুটি বেঁচে গিয়েছিল। পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল যৌন নির্যাতককে।
ছেলে শিশুরা যে সহজেই যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে, সেটি অনেকের ধারণাতেই নেই। এই সুযোগটাই নেয় ছদ্মবেশী যৌন নির্যাতক বা পেডোফাইলরা।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২১ সালে আইন সালিশ কেন্দ্রের এক হিসাবে দেখা যায়, সে বছর (২০২১ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত) মোট ৭৫ জন ছেলেশিশুকে ধর্ষণসহ যৌন হয়রানি করা হয়েছিল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করে, সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশি হবে। বছর পাঁচেক আগে একটি সংগঠনের সাতক্ষীরা আর ঢাকার ৯টি স্কুলে চালানো জরিপ থেকে দেখা যায়, প্রতি ১০ জনের একজন ছেলে যৌন নির্যাতন বা অশোভন আচরণের শিকার হয়।
এই জরিপে বিভিন্ন বয়সের ও ক্লাসের মোট ১ হাজার ২০০ ছাত্র অংশ নিয়েছিল। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রির সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে কমপক্ষে একজন যৌন হয়রানির শিকার। মেয়েশিশুদের মধ্যে এই হার প্রতি চারজনে একজন।
মেয়েশিশুরা যেমন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাছের লোকজন যেমন আত্মীয়, শিক্ষক, পারিবারিক বন্ধু, প্রতিবেশীর দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়; ছেলেদের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটে।
চট্টগ্রামে সেই শিশুর কথা আমরা পত্রিকায় জেনেছিলাম, যাকে ধর্ষণ করেছিল, সে শিশুটির নিকটাত্মীয়। পুলিশ ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠায়।
অনেকে মনে করেন, দরিদ্র পরিবারের ছেলেশিশুরা একটু বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অভিভাবকদের নজরদারির বাইরে থাকলেই শিশুরা যৌন নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সেখানে ধনী–গরিবের বিষয়টি গৌণ।
শিশু নির্যাতনবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে একজন ভারতীয় বক্তার জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় জানতে পারি, মা–বাবার অর্থের অভাব না থাকায় দেশের অত্যন্ত সম্মানিত ও কাঙ্ক্ষিত বোর্ডিং স্কুলে পড়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।
স্কুলের ছুটিতে বাড়ি এলে ব্যস্ত মা–বাবা অধিকাংশ সময় তাকে গৃহভৃত্যের কাছে রেখে বাইরে যেতেন। গৃহভৃত্য সেই সুযোগে নিয়মিত এই অবোধ কিশোরকে ধর্ষণ করেছেন।
বোর্ডিং স্কুল ছুটির সময় আর সব ছেলে যখন আনন্দে মেতে উঠত, কিশোরটি মনেপ্রাণে চাইত ছুটি যেন না হয়, তাকে যেন বাড়িতে যেতে না হয়।
শিশুর সম্ভাব্য যৌন নির্যাতন ও যৌন হেনস্তার ক্ষেত্রে একজন মা তাঁর মেয়ে সন্তানকে নিয়ে যত উদ্বিগ্ন–উৎকণ্ঠায় থাকেন, ছেলেকে নিয়ে ততটাই নিরুদ্বেগ নিশ্চিন্তে থাকেন। একজন মা জানান, ‘ছেলেকে নিয়ে আমার অন্য ভয়; তাকে কেউ তুলে নিয়ে যাবে না তো! তাকে কেউ ফুসলিয়ে নিয়ে বা জোর করে যৌন নির্যাতন করবে, এটা কখনো হয় নাকি? আমরা শুনি, মেয়েরাই কেবল এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়।’
শুধু মা–বাবা কেন, দেশের মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোও ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। উদ্বিগ্ন হলে প্রকাশিত ভিডিও নিয়ে তাঁরা কথা বলতেন অথবা নিরপেক্ষ ও পরিচ্ছন্ন তদন্তের ব্যবস্থার দাবি নিয়ে এগিয়ে আসতেন।
হতে পারে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামজাদা শিক্ষক বলেই সবাই চুপ আছেন। কেউ কেউ ফেসবুকে লিখেছেন এসব ‘এআই’–এর কীর্তি। সেটি হলেও তদন্তের কোনো বিকল্প নেই।
* গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক ও গবেষক। ই–মেইল: wahragawher@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| Galib Mujahid |
ভাইরাল ভিডিও: শিশু শোষণের নতুন মাধ্যম নিয়ে ভাবতে হবে by জাহিদ হোসাইন খান
অনেক অভিভাবক নিজেরা হয়তো ক্যামেরার সামনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, কিন্তু শিশুরা সহজেই ক্যামেরা ফ্রেন্ডলি হয় বলে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের সামনে আনেন। এই জনপ্রিয়তা কিংবা স্বীকৃতি অর্জনের বাসনা থেকেই অনেকেই না ভেবে শিশুদের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরেন।
এ অবস্থাকে প্যারেন্টাল নার্সিসিজম বলে চিহ্নিত করছেন অনেক মনোবিজ্ঞানী। এ ধরনের অভিভাবকেরা সন্তানের জীবনের একেকটি দিক ব্যবহার করছেন নিজের সামাজিক পরিচিতি গড়তে। এখানে সন্তান নয়, বরং সন্তানের জনপ্রিয়তাই হয়ে উঠছে অভিভাবকের আত্মতৃপ্তির উৎস। আবার অন্য যেসব শিশুর ভিডিও দেখেন অভিভাবকেরা, তাঁদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। আরেকজনের সন্তান তারকা, আমার সন্তান তারকা নয়, এমন ভাবনা মনে আসে অনেক মা-বাবার।
শিশুর ব্যক্তিগত মুহূর্ত যেমন ঘুমানোর সময়, কান্নার সময়, গোসলের মুহূর্ত—এসব অনেক সময়ই ভিডিও আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। এটি শিশুর গোপনীয়তা লঙ্ঘনের শামিল। শিশু বড় হয়ে যখন এসব ভিডিও দেখবে, তখন তার মধ্যে লজ্জা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি বা সামাজিক বঞ্চনার অনুভব তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব। শিশু আইন ২০১৩ এবং জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, কোনো শিশুর মানসম্মান, মর্যাদা বা গোপনীয়তা বিঘ্নিত হয়, এমন কিছু করা আইনসিদ্ধ নয়। বাংলাদেশে এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে নির্দিষ্ট আইন খুব শক্তিশালী নয়, কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা এ ধরনের কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, যদি এতে শিশু শোষণের উপাদান থাকে।
বাস্তবে দেখা যায়, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির এ বিষয়ে আইন প্রয়োগ তুলনামূলক দুর্বল। কোনো ভিডিওতে শিশুর প্রতি অবমাননাকর আচরণ বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ উপস্থাপন থাকলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলেও সাধারণ কনটেন্টের ক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। তাই এ ক্ষেত্রে সরকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিশুকেন্দ্রিক কনটেন্ট অনেক সময় ইউটিউব বা ফেসবুক থেকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শিশুদের কনটেন্ট অনেক বেশি দর্শকপ্রিয় হওয়ায় একশ্রেণির অভিভাবক এটিকে ‘বাণিজ্যিক পণ্য’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। অথচ এই আয়ের ভাগ শিশুর নামে রাখা হচ্ছে না, কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে না। শিশুশ্রমের একধরনের আধুনিক রূপ হয়ে উঠছে এই ডিজিটাল এক্সপ্লয়টেশন। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা কিংবা গ্রামেও শিশুদের ভিডিও দিয়ে আয় করাটা এখন অনেক পরিবারে আয় বা পেশার একটি অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই অর্থে শিশুর কোনো অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে এই জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশু-কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারে গাইডলাইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। ইউটিউব বা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত বয়সভিত্তিক কনটেন্টে নির্দিষ্ট ফিল্টার এবং মনিটরিং সিস্টেম চালু করা।
প্রেস কাউন্সিল, আইসিটি মন্ত্রণালয় ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিশনের সম্মিলিত উদ্যোগে শিশুর ডিজিটাল সুরক্ষা নিয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে। ডিজিটাল অভিভাবকতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এখনই গ্রহণ করা উচিত; নাহলে ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানদের হয়তো এর মূল্য দিতে হবে দীর্ঘ সময় ধরে।
● জাহিদ হোসাইন খান, গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচির সাবেক কর্মী
- zahid.pen@gmail.com

Saturday, September 26, 2026
রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই, কী ভবিষ্যৎ মমতার by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
চলতি বছরের ১৮ মার্চ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, মহারাষ্ট্রের এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়াসহ ৫৯ জন রাজ্যসভা সদস্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই আপ্তবাক্য মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই।’
তৃণমূল কংগ্রেসকে দুরমুশ করে এই বছরের মে মাসে যারা প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, সেই বিজেপির রাজ্য–নেতৃত্ব অবশ্য সদর্পে ঘোষণা করেছেন, মমতাকে তাঁরা শেষ করে ছাড়বেন। সেই লক্ষ্যে তাঁরা এগোচ্ছেনও। নিজ হাতে যে দল মমতা তৈরি করেছেন, জোড়া ফুল প্রতীককে পরিচিতি দিয়েছেন; সেই নাম ও নিশানা আপাতত হাতছাড়া। এখন তাঁর সর্বস্বান্ত হাল।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্তে মমতা ও তাঁর দলত্যাগী বিক্ষুব্ধ নেতারা কেউ আপাতত ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকের অধিকারী নন। আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যে যে দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হতে চলেছে, অধিকারী পরিবারের খাসতালুক নন্দীগ্রাম ও মুসলমান–অধ্যুষিত রেজিনগর; সেখানে কোনো পক্ষই ওই নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।
মমতা বনাম মমতাত্যাগী তৃণমূলিদের সম্ভাব্য নির্বাচনী টক্কর ঘিরে উত্তেজনার যে ফানুস উড়ছিল, গুরুমারা বিদ্যা প্রয়োগে তাতে সুচ ফুটিয়েছেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামে মমতার প্রার্থী বসে গেছেন। রেজিনগরের প্রার্থী টলমল করতে করতে টিকে আছেন ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রীয় চাপ সহ্য করতে না পেরে প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানকার মূল শক্তি আমজনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবির, যিনি এই আসন ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচন। ফলে ৭০ শতাংশ মুসলমান এলাকায় বিজেপি জেতে কি না, সেটাই আপাতত মূল আকর্ষণ।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের চোখে মমতা এখন ‘সর্বহারা’। কিছুকাল আগেও যিনি রাহুল গান্ধীকে বিরোধী জোটের নেতা মানতে চাননি, পদে পদে অসম্মান করেছেন, জোটের মধ্যে জোট তৈরি করে পরোক্ষভাবে বিজেপিকে সাহায্য করেছেন; নখদন্তহীন বৃদ্ধ সিংহের মতো সেই মমতা আজ কংগ্রেসের শরণাপন্ন! সর্বভারতীয় স্তরে তো বটেই, রাজ্য-রাজনীতিতেও তিনি বিজেপিবিরোধী শক্তিদের জোটবদ্ধ হওয়ার হাঁক দিচ্ছেন! মানভঞ্জনের চেষ্টা করছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। এই অবস্থান পাঁচ মাস আগে নিলে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এভাবে ছড়ি ঘোরাতে পারত না। এই দায় বাকি জীবন তাঁকেই বহন করতে হবে।
পরিসংখ্যান সব ক্ষেত্রে সত্য চিত্র হয়তো ফুটিয়ে তোলে না। কিন্তু তা উপেক্ষাও করা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় এক কোটি ভোটারের নাম কেটে তৈরি তালিকা, ২৭ লাখ ভোটারকে ট্রাইব্যুনালে ঠেলে ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সাড়ে ৭০০ সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাকে ক্ষমতাহীন করা, গোটা রাজ্যের ভার কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যুগলবন্দীও পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ৪১ শতাংশের নিচে নামাতে পারেনি! বেছে বেছে মুসলমানদের ভোট কাটার অভিযোগ আজ নির্বাচন কমিশনের গায়ে খামের ওপর ডাকটিকিটের মতো সেঁটে রয়েছে।
দেশের সাবেক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি ইসির এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘১০০ শতাংশ স্ক্যাম’ বা প্রতারণা বলে জাহির করেছেন। এত কিছু করেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট আদায় করতে পারেনি! পাটিগণিতের হিসাব দেখাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে বিজেপি মাত্র ৩২ লাখ ১১ হাজার ৪২৭ ভোট বেশি পেয়েছে! তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, সেটাও তারা করতে পেরেছে গণনার দিন প্রতিপক্ষ এজেন্টদের বের করে দিয়ে। নাহলে তাদের নাকি ঠাঁইনাড়া করা যেত না।
পরাজিতরা চিরকালই অজুহাত খোঁজে। মমতা ও তাঁর দলের নেতাদের এই অভিযোগও অজুহাত হিসেবে খারিজ করা যায়। কিন্তু পরিসংখ্যান? নির্বাচন কমিশনের হিসাব দেখাচ্ছে, বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছে ৪৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট। দুই বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে তারা পেয়েছিল ৩৯ শতাংশ। এর মানে, মমতা-বিদ্বেষ ও ইসির কল্যাণে তারা ৭ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে। তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৪১ দশমিক ১৬ শতাংশ, কংগ্রেস ২ দশমিক ৯৯, সিপিএম ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট। রাজ্যের এই তিন বিজেপিবিরোধী শক্তির অর্জন ৪৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর সঙ্গে এআইএসএফের ১ দশমিক ৫৪ এবং অন্য তিনটি বাম দলের প্রাপ্ত ভোট জুড়লে হিসাবটা ৫০ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়ায়।
মমতা আন্তরিক হলে এই ভোট ভাগাভাগি রুখতে পারতেন। বিজেপির উল্কা-উত্থান ঠেকাতে পারতেন। রাজনীতিতে কখন কুশলী হতে হয়, এক পা পিছিয়ে দুই পা এগোতে হয়, বিজেপিকে দেখে তা শিখতে পারতেন। সেই শিক্ষা তিনি নেননি। অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতা পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
অমোঘ প্রশ্ন, এখন তিনি কী করবেন। তিনি কি এভাবেই নিঃসীম নীলিমায় ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবেন? অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়বেন উত্তর প্রদেশের দলিত নেত্রী মায়াবতীর মতো? নাকি ছাইয়ের গাদা থেকে গাত্রোত্থান করবেন ইন্দিরা গান্ধীর মতো?
পুত্র সঞ্জয়ের কারণে বিড়ম্বিত ও নিন্দিত হয়েছিলেন ইন্দিরা, ভাতিজা অভিষেকের জন্য মমতা। দলের কান্ডারিরা ইন্দিরাকে কোণঠাসা করেছিলেন; মমতাকে ত্যাগ করেছেন তাঁরা, যাঁদের তিনি গড়েপিটে বড় করেছেন। এই মিলের পাশে অমিলও আছে। ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ (বোবা পুতুল) ইন্দিরা যখন কংগ্রেসি বাস্তুঘুঘুদের মোকাবিলা করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫০। সেটা ছিল তাঁর গড়ে ওঠার সময়। পাঁচ বছরের মধ্যেই একাত্তরে তিনি ‘এশিয়ার সূর্য’। মমতা নিঃশেষ হলেন তাঁর রাজনৈতিক গোধূলিবেলায়। ৭১ বছর বয়সে। ইন্দিরাকে গদিছাড়া করেছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, ৭৫ বছর বয়সে। মমতার মধ্যে এখনো কি তেমনই শক্তি অবশিষ্ট? নাকি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসই তাঁর বার্ধক্যের বারানসি, যেখানে জন্মে, যে আদর্শ ধারণ করে পৃথক পরিচিতি তিনি গড়ে তুলেছেন?
মমতা নিজেও সম্ভবত এই ধন্দের মীমাংসা করে উঠতে পারছেন না। হয়তো এখনো বিশ্বাস করেন, স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে ঠিক তীরে ফিরবেন। তাই এখনো পরাজয় মানেননি। অভিষেককেও আড়াল করে চলেছেন। তাঁকে নিয়ে কংগ্রেসেও রয়েছে বিস্তর দোলাচল।
প্রয়াত রাজীব ও তাঁর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী ছাড়া কংগ্রেসের আর কাউকে কখনো মমতা মন থেকে নেতা মানেননি। জোটসঙ্গী হিসেবে বিজেপি বা কংগ্রেস কাউকে কখনো স্বস্তি দেননি। জোটের মধ্যে জোট ও ঘোঁট করে নিজেকে জাহিরের চেষ্টা করেছেন। তাই বিশ্বস্ত হতে পারেননি।
কংগ্রেসে অনেকের ধারণা, মমতাকে দলে নেওয়ার অর্থ তাঁর যাবতীয় অপকর্মের ভাগীদার হওয়া। এর চেয়ে রাজ্যে প্রকৃত বিজেপিবিরোধী শক্তি হিসেবে মাথা তোলার চেষ্টা চালানো দরকার।
রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই ঠিকই, বিজেপিবিরোধী জোটের সঙ্গী হওয়া ছাড়া মমতার বিকল্পও কিন্তু সীমিত।
* সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত সমাবেশে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১ জুলাই ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গ। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি |
মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাণ্ডব: দখলবাজি ও ক্ষমতা দেখানোর এ কেমন নমুনা! by রাফসান গালিব
আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ধূলিসাৎ হওয়া ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালে মেকিয়াভেলির সেই আশঙ্কাই যেন চোখে ধরা পড়ে।
যে দেশে হামে প্রতিদিন একাধিক বাচ্চা মারা যাচ্ছে, এ বছর সাত মাসের হিসাবে ইতিমধ্যে সহস্রাধিক বাচ্চা মারাও গেছে, সেই দেশের খোদ রাজধানীতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ৫০ বছরের পুরোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে মূলত প্রসূতি নারী ও শিশুদের সেবা দেওয়া হয়, টিকা দেওয়া হয়, তা এক রাতে ভারী এক্সকাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো!
শুধু তাই নয় জীবনের সঞ্চার করা শিশুটিকা আর কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতিও লুট করে নিয়ে যাওয়া হলো। মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটলেও কয়েক শ মানুষের এ তাণ্ডব কোনোভাবেই নীরব কর্মকাণ্ড ছিল না। এলাকাবাসী জানলেও কোনো বাধা দেওয়ার বা প্রতিবাদ করার উপায় ছিল না।
মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্রটি কেবল একটি চার দেয়ালের পাকা ভবন ছিল না; এটি ছিল ১৯৭৪ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের হাজার হাজার নারী ও শিশুর আশার আশ্রয়স্থল।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের উদ্যোগে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যেটির সঙ্গে যুক্ত আছেন এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি নারী ও সমাজকর্মী তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ। জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিও এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এক সময়।
নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট প্রতিনিধি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, নামকরা চিকিৎসক ও সমাজসেবীদের স্মৃতি ও ঘাম জড়িয়ে ছিল এ প্রতিষ্ঠান, তা রাতারাতি পরিণত হলো পলেস্তারা, বাঁশ আর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক ধ্বংসস্তূপে।
আর এই ধ্বংসযজ্ঞের ঠিক পরের দিন সকালে কী দেখা গেল? খোলা আকাশে, ধুলোবালির মধ্যে, বাঁশের খুঁটিতে ত্রিপল টাঙিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিলে বসে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের হামের টিকা দিচ্ছেন। শিশুরা প্রচণ্ড গরমে ও অস্বস্তিতে ছটফট করে কাঁদছে। চরম এই অমানবিক দৃশ্য আমাদের কোনোভাবেই স্বস্তিতে থাকতে দেয় না।
বলতেই হচ্ছে যে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই চেনা, পুরোনো ও দুর্বৃত্তায়িত ক্ষমতাচর্চার বহিঃপ্রকাশ ঘটল। সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার পরিবর্তন হয় কিন্তু জবরদখল ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনৈতিক চরিত্র বিন্দুমাত্র বদলায় না। আরও হতাশার বিষয় যে, একটা রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থানের পরেও আমাদের এসব দেখতে হচ্ছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই ১০ কাঠা জমির ওপর নজর ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’ নামক এক ভুঁইফোড় সংগঠনের ব্যানারে সাবেক এক কাউন্সিলরের স্ত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) মদদে এই দখলদারির অভিযোগ উঠেছে।
এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের দায় এড়িয়ে যেমন মেকি বক্তব্য দিয়ে থাকেন, সেই নারী সংসদ সদস্যের মুখেও তা শোনা গেল, ‘আমি ভাঙচুরের কথা শুনেছি, তবে আমি জড়িত নই’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০০-২৫০ জন সশস্ত্র লোক রাতারাতি এসে এক্সকাভেটর বা বুলডোজার দিয়ে একটি বিশাল স্থাপনা ভেঙে ফেলবে, অথচ স্থানীয় রাজনৈতিক অভিভাবক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই জানবে না—এমন গল্প বিশ্বাস করার মতো অবোধ কি এ দেশের মানুষ? ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারী সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ ওঠেছে। মানুষ তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছে।
আরও বেশি অবাক হতে হয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খানের বক্তব্যে। তাঁর জানামতে, জায়গাটি কাঁচাবাজার ও সেমিপাকা ধরনের ছিল। সেখানে কোনো ভবন বা স্থাপনা ছিল না। তার মানে এখানে যে কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের স্থাপনা ছিল তা তিনি জানতেন না! নাকি জেনেও অস্বীকার করলেন?
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় হামলা চালিয়ে একটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র যখন এভাবে গুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় এবং হামলাকারীদের কেউ বাধা দিতে পারে না, পুলিশ অসহায় হয়ে থাকে, প্রশাসকও পরোক্ষভাবে এ নিয়ে সাফাই গায়—তখন এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ‘আইনের শাসন’ বা ‘জননিরাপত্তা’ শব্দগুলো এ ক্ষেত্রে স্রেফ অর্থহীন।
এই ঘটনার সবচেয়ে আতঙ্কজনক দিক হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা। কেন্দ্রটির কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, তাণ্ডব চলার সময়েই তাঁরা পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন। পুলিশ নাকি ঘটনাস্থলেও গিয়েছিল, অথচ চোখের সামনে এত বড় একটি হাসপাতাল স্থাপনা ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া তারা ঠেকাতে পারল না! ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর শাহ আলী থানার পুলিশ কর্মকর্তার মুখে সেই গতানুগতিক বক্তব্যই শোনা গেল, ‘মামলা হয়েছে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব’।
রাজধানীর বুকে থানার এক কিলোমিটারের মধ্যে, মাত্র ৫–১০ মিনিট দূরত্বে এত বড় একটি তাণ্ডব ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলল, আর পুলিশ তা ‘ঠেকানোর সাধ্য রাখল না’—এটি কি স্রেফ অক্ষমতা, নাকি অপরাধীদের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সম্মতি?
এ ঘটনা কেবল ১০ কাঠা জমি দখলের একটি সাধারণ অপরাধ নয়; এটি যেন একটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক অধপতনের বড় দৃষ্টান্ত। একটি চিকিৎসাকেন্দ্রকেও এভাবে সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক মব বা অরগানাইজড্ পলিটিক্যাল মবের শিকার হতে হবে, তা অভাবনীয়।
যে শিশুটি আজ রাস্তার ওপর ধুলোবালিতে বসে ত্রিপলের নিচে দাঁড়িয়ে টিকা নিচ্ছে, বড় হয়ে সে এই রাষ্ট্রকে কীভাবে মনে রাখবে? সে কি জানবে না যে, এই দেশে মানুষের জীবনের চেয়ে জমির দাম বেশি? এই দেশে আইনের চেয়ে রাজনৈতিক মাস্তানদের হাতুড়ি আর এক্সকাভেটর বা বুলডোজারের শক্তি বেশি?
আজ সরকার যদি এই দখলদারির বিচার করতে ব্যর্থ হয় তবে এ ধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতার জন্য যে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তখন নাগরিক হিসেবে আমরা কি কেবল নীরব দর্শক হয়ে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাব?
* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই-মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। মিরপুর, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: জাহিদুল করিম |
জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীদের জয়, কী তাদের এজেন্ডা by জন ক্যাম্পফনার
বিগত দশকজুড়ে দাপট দেখানো অন্যান্য জনতুষ্টিবাদী আন্দোলনের মতোই এএফডিও তাদের আসল রূপ লুকিয়ে রাখার কোনো চেষ্টা করেনি।
স্যাক্সনি-আনহাল্টে নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই এএফডি ২৫৮ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার প্রকাশ করে, যার মূল স্লোগান ছিল: ‘সবার আগে দেশ’। এই ইশতেহারে প্রাকৃতিক উপায়ে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিসহ বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে বিতাড়িত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বিশেষত যাদের দেখতে বা শুনতে ঠিক ‘জার্মানদের মতো’ মনে হয় না।
ইশতেহারটিতে স্কুলের ইতিহাস পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে ‘হিটলারের পাঠ কমিয়ে বিসমার্কের ইতিহাস বেশি পড়ানো হয়’। এর মূল উদ্দেশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর জার্মানির নাৎসিবাদ ও হলোকস্ট স্মরণের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তাকে ছোট করে সাম্রাজ্যবাদী অর্জন ও জাতীয় শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
এএফডির এই ইশতেহারে ‘স্বাভাবিক’ বা প্রথাগত বিষমকামী পরিবারকে সব ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এলজিবিটিকিউ পরিবারসহ তাদের চোখে ‘পথভ্রষ্ট’ গোষ্ঠীগুলোর আইনি স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
দলটি ইউক্রেনে জার্মানির সামরিক সহায়তার কঠোর বিরোধিতা করে এবং দাবি করে যে রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলেই কেবল জার্মানদের জন্য সস্তা জ্বালানি ও পণ্যের কম দাম নিশ্চিত করা সম্ভব।
উগ্র ডানপন্থী এই দলটির ইশতেহার পুরোটা পড়ার মতো। কোনো সন্দেহ নেই যে স্যাক্সনি-আনহাল্ট এবং পাশের একটি রাজ্যে এএফডির শাখাগুলোকে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা কেন ‘ডানপন্থী চরমপন্থী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে এটি স্বীকার করতেই হবে যে জার্মানির এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে এই চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিই বেশ প্রলুব্ধকর মনে হচ্ছে।
এএফডির প্রলোভনময় প্রতিশ্রুতি
বার্লিনের একের পর এক জোট সরকারের নীতি ছিল আমলাতান্ত্রিক ও ধীরগতির—যেখানে কঠিন বাস্তবতার মুখে অগ্রগতি হতো অত্যন্ত ধীরগতিতে, যদি আদৌ কোনো অগ্রগতি হতো। এর বিপরীতে এএফডির এই চোখধাঁধানো ও সরলীকৃত প্রতিশ্রুতিগুলো ভোটারদের সহজে আকৃষ্ট করছে।
বাজেটঘাটতি মেটাতে কাটছাঁট, চীনের তীব্র প্রতিযোগিতায় চাকরি হারানো, আর নতুন করে অস্ত্রসজ্জায় শতকোটি ইউরো খরচ করা দলগুলোকে কেন ভোট দেবে মানুষ— যখন তারা নিশ্চিন্তে অতীত জীবনের সেই নিরাপদ সময়েই ফিরে যেতে পারছে?
মূলধারার সব রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরই ভোটব্যাংকে থাবা বসিয়েছে এএফডি। এমনকি বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) প্রায় ৮২ হাজার ভোটারকে নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে তারা।
তবে ৬ সেপ্টেম্বরের স্যাক্সনি-আনহাল্ট নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল হলো এএফডি এমন সব মানুষকে ভোটের মাঠে ফিরিয়ে এনেছে, যারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এলাকার মোট ভোটারের প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগ—প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার নিষ্ক্রিয় মানুষকে তারা আবার ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
এরা মূলত সেই শ্রেণির মানুষ, যারা রাজনীতির ওপর থেকে আশা ছেড়ে দিয়ে এত দিন এক সমান্তরাল জগতে বাস করছিল। এই ভোটারদের অনেকেই জার্মানির নাৎসি অতীতকে ‘বড় করে দেখানো হয়েছে’ বলে মনে করে এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা টানতে নারাজ।
উপরন্তু, তারা মধ্যপন্থী রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের মূল্যবোধ ধ্বংস করার কাজে নিয়োজিত একটি ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য ব্যবস্থার অস্ত্র হিসেবে দেখে।
স্যাক্সনি-আনহাল্ট থেকে রিপোর্টিং করার সময় অতিমারির আগের একটি ছোট ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সাবেক কমিউনিস্টশাসিত পূর্ব জার্মানির প্রধান শহরগুলোর একটি লাইপজিগের রাস্তা দিয়ে আমি হাঁটছিলাম এক স্থানীয় পরিচিত সাহায্যকারীর সঙ্গে। স্মার্ট ও বুদ্ধিমতী সেই নারী অ্যাকটিভিস্ট একসময় গ্রিন পার্টির হয়ে কাজ করতেন।
আঞ্চলিক পাবলিক ব্রডকাস্টার ‘এমডিআর’-এর কার্যালয় অতিক্রম করার সময়, কোনো উসকানি ছাড়াই তিনি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন—‘মিথ্যাবাদী সংবাদমাধ্যম’ বা ‘ফেক নিউজ’। চমকে উঠে আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই চ্যানেলটি তাঁর এমন ক্ষোভের কারণ কী করল?
‘ওরা আমার মতো সাধারণ মানুষের কথা শোনে না,’ ব্যস, এটুকুই ছিল তাঁর উত্তর। যখনই তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের কথা বলতে বললাম, তিনি আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।
জার্মান রাজনীতিতে এখন যা ঘটছে তার কিছুটা কেবল এই দেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত—বিশেষ করে ১৯৯০ সালে দুই জার্মানির একত্রকরণের পর থেকে পূর্ব জার্মানির মানুষের মনে নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবার যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমে আছে, তা অনস্বীকার্য। তবে এর একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বাইরে ছড়িয়ে পড়া উগ্র ডানপন্থীদের সামগ্রিক উত্থান।
মাগার প্রতিধ্বনি
স্যাক্সনি-আনহাল্টে জয়ী এএফডি প্রার্থী ৩৫ বছর বয়সী উলরিখ সিগমুন্ড ছিলেন সুগন্ধি বিক্রির একজন সাবেক সেলসম্যান, যিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নিখুঁতভাবে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই তাঁর ‘আদর্শ’।
নীতি এবং যোগাযোগ কৌশল—উভয় ক্ষেত্রেই এএফডি হলো ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক মিত্র।
বিষয়টি ট্রাম্পের নজর এড়ায়নি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপজুড়ে ‘দেশপ্রেমিক’ আন্দোলনগুলোকে সমর্থন করার কথা বলা হয়েছিল, যাতে তাদের ভাষায় ‘সভ্যতার বিলুপ্তি’ রোধ করা যায়।
নির্বাচনের ফলাফল আসার পর নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি এএফডির নাম না নিলেও লেখেন, ‘ওয়াও, জার্মানির জনতুষ্টিবাদী দলটির জন্য খুব বড় ঘটনা।’ তিনি তাঁর পোস্টের শেষে যোগ করেন—মাগার আদলেই লেখেন এমজিজিএ!—যা ‘মেক জার্মানি গ্রেট এগেইন’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
উচ্চপর্যায়ে ট্রাম্পই এএফডির একমাত্র বন্ধু নন। ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি নিজেদের অনুরাগের কথা কখনোই গোপন করেনি দলটি। ইউক্রেনসহ অন্যান্য নানা ইস্যুতে তারা মূল রুশ প্রেসিডেন্টের সুরেই কথা বলে। ক্রেমলিনের শর্ত মেনেই অবিলম্বে ইউক্রেন যুদ্ধের ‘শান্তি’ আলোচনার দাবি জানায় তারা।
এই দলের বিশ্বাস, রাশিয়াকে পুনরায় ইউরোপের প্রাণকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনলে তাদের সামাজিক রক্ষণশীল এজেন্ডাকে ত্বরান্বিত করা যাবে, সস্তা তেল ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরবে।
তবে এই সবকিছুর পেছনে এখনো একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত জার্মান সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় পর্যায় সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
উদ্দেশ্য একটাই—ক্ষমতা যেন একক কোনো দলের হাতে পুঞ্জীভূত না হতে পারে। ৮৩ আসনের রাজ্য সংসদে সরকার গঠনে মাত্র ৩টি আসন দূরে থেকে এএফডির এভাবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি চলে আসাটাই এক অভাবনীয় ঘটনা।
এখন মোটরসাইকেল র্যালি আর বর্ণিল নির্বাচনী প্রচারণায় নজরকাড়া এএফডি নেতা সিগমুন্ডকে সরকার গঠনের কঠিন লড়াইয়ে নামতে হবে। এর জন্য তাঁকে হয় অন্য কোনো দলকে রাজি করাতে হবে, না হয় দু-একজন বিদ্রোহী আইন প্রণেতাকে নিজেদের দিকে টানতে হবে।
কিন্তু কোনোটিই সহজ হবে না; বিশেষ করে তথাকথিত ‘ফায়ারওয়াল’–এর কারণে। এটা মূলত মূলধারার দলগুলোর এএফডির সঙ্গে কাজ না করার এক যৌথ অঙ্গীকার। সেই দেয়াল হয়তো কিছুটা দুর্বল হয়ে আসছে, তবে এবারও হয়তো তা কোনোমতে টিকে যেতে পারে।
অক্টোবরের শুরুতে সংসদ অধিবেশন বসার আগে এই রাজনৈতিক দর–কষাকষি একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গড়াবে। সিগমুন্ড যদি মুখ্যমন্ত্রী হনও, তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে বিল পাস করানোর জন্য এএফডির মূলনীতিতে কোনো আপস তিনি করবেন না।
যুদ্ধ–উত্তর জার্মান রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি ছিল সমঝোতা ও ঐকমত্য—যা কয়েক দশক ধরে গুণ হিসেবে বিবেচিত হতো। অথচ আজকের অনেক ভোটার সেটিকেই দুর্বলতা হিসেবে দেখছে। আর সোশ্যাল মিডিয়া দেশ ও বিশ্বের সব জটিল সমস্যার তাৎক্ষণিক এবং ব্যথাহীন সমাধানের দাবিকে কেবল আরও উসকে দিচ্ছে।
বার্লিনের গোধূলিলগ্ন
৯ সেপ্টেম্বর বার্লিনে বার্ষিক বাজেট ভাষণ দেওয়ার সময় চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জকে অত্যন্ত বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। তাঁর নেতৃত্ব এখন গুরুতর সংকটের মুখে। পূর্বের আরেকটি রাজ্য মেকলেনবার্গ-ভোরপোমার্ন এবং রাজধানী বার্লিনে আসন্ন রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটস এক বড় ধরনের পরাজয়ের আশঙ্কা করছে।
এমনিতেই কিছুটা কড়া মেজাজের মানুষ মার্জ মাসের পর মাস ধরে জনমত জরিপে ইতিহাসের সর্বনিম্ন রেটিং নিয়ে চলছেন। জার্মান সংবাদমাধ্যমের এক বড় অংশ তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছে এবং তাঁর ব্যাকফায়ার করা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বড়াই করে বলেছিলেন এএফডির সমর্থন অর্ধেক কমিয়ে আনবেন, অথচ দেখলেন তা দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
মার্জ চ্যান্সেলর পদের জন্য বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তিনি তাঁর পূর্বসূরি অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে ম্যার্কেল দলকে অতিরিক্ত মধ্যপন্থার দিকে নিয়ে গেছেন, কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনে অতিরিক্ত অর্থ অপচয় করেছেন এবং অভিবাসীদের খুব বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে জার্মানদের সামনে খাঁটি রক্ষণশীলতার বিকল্প থাকা উচিত। সাধারণ মানুষ তাঁর সেই কথা শুনেছে ঠিকই, তবে তাঁর দেখানো পথে হাঁটেনি; হেঁটেছে আরও চরমপন্থার দিকে।
কেবল মার্জের দলই যে সংকটে আছে তা নয়। ক্ষমতাসীন জোটের জুনিয়র শরিক মধ্য-বামপন্থী সোস্যাল ডেমোক্র্যাটদের (এসপিডি) অবস্থাও করুণ, তাদের ভোটব্যাংক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
এসপিডির তৃণমূল কর্মীরা মনে করেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হলো বামপন্থীদের ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের নীতিতে ফিরে যাওয়া। অন্যদিকে সিডিইউ কর্মীরা চান সরকার যেন ব্যয় আরও কমায় এবং অভিবাসীদের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে।
অর্থাৎ একসঙ্গে সরকার পরিচালনা করতে হলেও দুটি দল প্রতিদিন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে টান দিচ্ছে।
মস্কো এবং ওয়াশিংটন—দুই পক্ষই যখন এএফডিকে উৎসাহ দিচ্ছে, তখন জার্মানির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে তার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে। মার্জ হয়তো তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তবে জার্মানির সামরিক অবস্থান পুনর্গঠনে তিনি যথেষ্ট সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন।
তবে এই নীতি ঝুঁকিমুক্ত নয়, যা স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনের পর চ্যান্সেলর নিজেও স্বীকার করেছেন। তিনি মেনে নিয়েছেন যে ওই রাজ্যের ৫৭.৭ শতাংশ ভোটার এমন দলগুলোকে সমর্থন করেছে ‘যারা ইউক্রেনের প্রতি জার্মানির নিরঙ্কুশ সমর্থনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’
তবুও তিনি যোগ করেছেন যে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে ‘এক মিলিমিটারও সরবেন না।’ সংসদে মার্জ এএফডিকে মস্কোর সঙ্গে ‘অদ্ভুত আঁতাত’ এবং ‘গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবজ্ঞা’ প্রদর্শনের জন্য অভিযুক্ত করেন।
মার্জ যখন নিজের বক্তব্য শোনাতে এবং আশাবাদী শোনাতে লড়াই করছিলেন, তখন এএফডির সহনেত্রী অ্যালিস ওয়াইডেল পুরো সংসদ মাতিয়ে রেখেছিলেন। জার্মান অর্থনীতির একমাত্র বর্ধনশীল খাত হিসেবে ‘সরকারি খাত এবং আশ্রয়শিল্পকে’ খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, তাঁর দল তাদের পথে দাঁড়ানো সবাইকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
এটি ছিল ক্ষোভের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। আর সামনের অন্ধকার দিন ও মাসগুলোতে এমন দৃশ্য যে আরও দেখতে হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
* জন ক্যাম্পফনার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। হোয়াই দ্য জার্মানস ডু ইট বেটার–এর লেখক।
- টাইম থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
![]() |
| বক্তব্য দিচ্ছেন এএফডির নেতা উলরিখ সিগমুন্ড। রয়টার্স |
‘প্যাক্স আমেরিকানা’র দিন শেষ, এরপর কী হবে? by পেদ্রো আব্রামোভাই ও জুলিয়া সাকর-টার্নি
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ৬০ দিনের আলোচনা শুরু করা এবং শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি; বরং লড়াই চলেছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের হামলা হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এতে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও হুমকির মুখে পড়েছে।
ইরানের ওপর হাজার হাজার বিমান হামলা চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি আবার খুলতে তেহরানকে বাধ্য করতে পারেনি। ইরান বলছে, চার দশকের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে তারা এই অবরোধ প্রত্যাহার করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র উল্টো আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ মাত্রার নিষেধাজ্ঞাকেও আরও বাড়ানো হচ্ছে। তবু ইরান আত্মসমর্পণের কাছাকাছি যায়নি। এতে নিজেদের সামরিক আগ্রাসনের পরিণতি সামলানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে।
পুরো অঞ্চলেই এখন শক্তিকে আর শক্তির প্রতীক বলে মনে হচ্ছে না; বরং তা অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠছে। গাজায় যুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের উপায় নয়; যুদ্ধই যেন সেখানে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল যে অতিরিক্ত ও ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করছে (লেখকদের ভাষায় যা ‘গাজা ডকট্রিন’), তার লক্ষ্য শুধু হামাস নয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবস্থাকেও আঘাত করা হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননেও একই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। সেখানে দুটি যুদ্ধবিরতি ও একটি শান্তিচুক্তি থাকা সত্ত্বেও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে লেবাননের সার্বভৌমত্ব কার্যত উপহাসে পরিণত হয়েছে।
অনেকে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘শক্তিই ন্যায়’—এই নগ্ন নীতি প্রাধান্য পেয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর অসাধারণ হস্তান্তর এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ভণ্ডামিপূর্ণ হলেও আগে যে আনুষ্ঠানিক সম্মান দেখাত, সেটিও এখন অনেকটাই পরিত্যাগ করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন ইরাকে হামলার আগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন সেখানে কোনো ধরনের পরামর্শ বা অনুমোদনের ভানও করছে না। ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া আন্তর্জাতিক পরামর্শের বিষয়টি যেন গুরুত্বই হারিয়েছে।
তবে এটি পুরোপুরি নতুন কোনো পরিবর্তন নয়; বরং আগের নীতিরই আরও চরম রূপ। ড্রোন হামলায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে গুয়ানতানামো বে-তে অনির্দিষ্টকাল আটক—এক প্রজন্ম ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই যুদ্ধপরবর্তী ‘নিয়মভিত্তিক’ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যেটি একসময় তারা প্রতিষ্ঠা করেছিল। শুধু নিয়মের সর্বজনীন প্রয়োগ সীমিত করা হয়নি; প্রয়োজন হলে নিয়মকে ব্যবহার না করার সুযোগও তৈরি করা হয়েছে। লেখকদের মতে, বিশ্বজুড়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ট্রাম্প নীতির পথ আগেই তৈরি হয়েছিল গাজায় গণহত্যার ঘটনায় আগের মার্কিন প্রশাসনের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে।
তবে প্রকাশ্য সামরিক শক্তিনির্ভর নীতির একটি পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সেটি ট্রাম্পের প্রত্যাশিত পরিবর্তন নয়। এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য শক্তিশালী করার বদলে তা দুর্বল করেছে। যুদ্ধ ও শান্তির সীমারেখা যখন এমন এক যুদ্ধবিরতিতে মিলিয়ে যায়, যেটি পুরোপুরি যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়, আর মাসের পর মাস বোমাবর্ষণের পরও যখন বিজয় আসে না, তখন সামরিক শক্তিকে আর শক্তি বলে মনে হয় না। মনে হয় অর্থহীন ধ্বংসযজ্ঞ।
চলমান যুদ্ধ কোনো কার্যকর বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করতে পারে না। কাঁচা শক্তি প্রয়োগ করলে প্রতিরোধ তৈরি হবেই। যুদ্ধাপরাধ আন্তর্জাতিক নিন্দা ডেকে আনবে। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে শর্তসাপেক্ষ করা গেলেও দীর্ঘদিন আধিপত্য ধরে রাখা যায় না। তাই এখন বড় প্রশ্ন হলো, এরপর কী?
সামরিক শক্তিনির্ভর নীতি গভীর অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। কিন্তু এর ব্যর্থতা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। এর ভিত্তি হতে পারে নতুন ধরনের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, যেখানে সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান থাকবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বজনীন অধিকার, পারস্পরিক সংযম এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে শক্তিশালী করবে। যৌথ সম্পদ, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মূল্যবোধের বিষয়ে সিদ্ধান্তও সম্মিলিতভাবে নেওয়া হবে। এমন ব্যবস্থা এখনো আকাঙ্ক্ষার বিষয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রতিটি দেশেরই এতে স্বার্থ রয়েছে।
এই নতুন ব্যবস্থায় জাতিসংঘ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে না। তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রস্তাব দিয়েছে। সেখানে ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করা হয়েছে, কিন্তু যে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তার সমালোচনা করা হয়নি। ফলে কূটনীতির পক্ষে নতুন রক্ষকদের প্রয়োজন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আর এর সম্ভাবনাও ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক এর একটি উদাহরণ। এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান ও কাতারের নেতৃত্বাধীন একটি জোট। এতে মিসর, সৌদি আরব ও তুরস্কও সহায়তা করেছে। এটি ২০১৫ সালের ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ নিয়ে আলোচনার চেয়ে বড় পরিবর্তন। ওই চুক্তিতে ইরানের সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্ত ছিল।
বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০১০ সালে ব্রাজিল ও তুরস্ক ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি বিনিময়ের একটি সমঝোতা করেছিল। পরে জেসিপিওএতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো দ্রুত সেই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে। তখন ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেলসো আমোরিম আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘প্রচলিত ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো তাদের বিশেষ মর্যাদা সহজে ভাগ করে নিতে চায় না।’
আরেকটি উদাহরণ হলো মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ কাঠামো। এর লক্ষ্য হলো অভিন্ন নীতির ভিত্তিতে আরও স্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা। এর মধ্যে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকারও রয়েছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং অন্য দেশগুলোর যোগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলার মধ্যে এই চুক্তির কার্যকারিতা এখন পরীক্ষা হচ্ছে। তবে বৃহত্তর প্রবণতাটি স্পষ্ট। আরও বহুত্ববাদী একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেখানে দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই বেশি করে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সেখানে কমছে।
হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মানদেব প্রণালিও এখন কার্যত বন্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির জবাবে যে অসম শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, তার ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমরা শুধু চরম সহিংসতাই দেখছি না, দেখছি চরম মাত্রার ক্ষমতার অপব্যবহারও।
তবে যে যুদ্ধ প্যাক্স আমেরিকানা তথা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে, সে যুদ্ধই আরও টেকসই একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার জন্য জায়গা তৈরি করতে পারে। এই নতুন ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে অধিকার, সংযম, মর্যাদা, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান।
* পেদ্রো আব্রামোভাই, ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনসের কর্মসূচিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জুলিয়া সাকর, একই প্রতিষ্ঠানের বিশেষ উপদেষ্টা।
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন একটি মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ড। সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি এবং লেখা রয়েছে—‘মহান বিজয়, হরমুজ প্রণালি’। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স |
Saturday, September 19, 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বর্তমান বাস্তবতা by মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি প্রধান সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসান ঘটিয়ে অস্ত্রধারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করে। চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি অথবা শক্তিশালী করা হয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন, কারণ এর মাধ্যমে সশস্ত্র সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও শান্তির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি। ভূমির মালিকানা, স্থানীয় পরিষদের ক্ষমতা ও নির্বাচন, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে। অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন গড়ে উঠেছে। জনসংহতি সমিতির ভাঙনের পাশাপাশি ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট—ইউপিডিএফ এবং এর বিভিন্ন অংশ নিজেদের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র কাঠামো তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানের কিছু এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টÑকেএনএফ এবং এর সশস্ত্র শাখার উত্থান নতুন নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ, অস্ত্র লুট ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় কেএনএফের কথিত সংশ্লিষ্টতা দেখিয়েছে যে সীমিত ভৌগোলিক এলাকায় সক্রিয় একটি সংগঠনও জাতীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
চাঁদাবাজি, অপহরণ, গোষ্ঠীগত হত্যাকাণ্ড এবং অবৈধ কর আদায়ের কারণে ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, ঠিকাদার ও সাধারণ গ্রামবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন সংগঠন বিশেষ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও তাদের সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সেই জনগোষ্ঠীর মানুষেরই স্বাধীন রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, জীবিকা ও নিরাপত্তাকে সংকুচিত করে। অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে মতামত দিতে বা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মিয়ানমারের সংঘাত এ পরিস্থিতিতে আরো বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেছে। রাখাইন ও চীন রাজ্যে যুদ্ধ, আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান শক্তি, জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং অবাধ অস্ত্রপ্রবাহ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তকে একটি অস্থিতিশীল রণসীমায় পরিণত করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্গম বনাঞ্চল, পাহাড়ি পথ এবং বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারে বিস্তৃত জাতিগত এবং পারিবারিক যোগাযোগকে কাজে লাগাতে পারে। মাদক—বিশেষ করে ইয়াবা ও মেথামফেটামিনÑছোট অস্ত্র, চোরাই পণ্য এবং মানব পাচারের পথগুলোও অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি স্থানীয় ঘটনা খুব দ্রুত আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা-সংকটে রূপ নিতে পারে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতাকে বিদেশি শক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহল কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকা, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য যোগাযোগ করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত। আন্তর্জাতিক অধিকার সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তঃসীমান্ত জাতিগত নেটওয়ার্ক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী—সব পক্ষেরই এ অঞ্চলের ঘটনাবলির প্রতি আগ্রহ থাকতে পারে। এর কিছু মানবিক সহায়তা বা মানবাধিকারের বৈধ উদ্বেগ থেকে পরিচালিত হতে পারে; আবার কিছু তৎপরতার উদ্দেশ্য হতে পারে স্থানীয় সংগঠনকে প্রভাবিত করা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে কাজে লাগানো অথবা ঢাকাকে কূটনৈতিক চাপে রাখা। তবে সরকারকে প্রমাণিত বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অনুমাননির্ভর অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। বিদেশি অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কিংবা নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ গোয়েন্দা তথ্য, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। পাহাড়ি জনগণের প্রতিটি দাবি বা অভিযোগকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করলে নাগরিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং প্রকৃত বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ আরো প্রসারিত হবে। আবার সব নিরাপত্তা-আশঙ্কাকে প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়াও বিপজ্জনক। প্রয়োজন পেশাদার প্রতিগোয়েন্দা তৎপরতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং স্বচ্ছ তদন্ত।
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ অমীমাংসিত থাকলেই বিদেশি পক্ষগুলো তা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়। ভূমিবিরোধ, দুর্নীতি, দুর্বল স্থানীয় শাসন, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং সংস্কৃতি অবজ্ঞার ধারণা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সদস্য সংগ্রহের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত না হলে সেসব ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বিদেশি প্রভাব মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু গোপনীয়তা বা শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা প্রত্যেক নাগরিককে সমানভাবে সুরক্ষা দেয়। সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন সড়ক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা আদায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখায়, তখন সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে আলোচনায় অংশ নিতে পারে না।
এ কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সীমান্ত নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, অস্ত্র ও মাদকের পথ বন্ধ এবং সশস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণ প্রতিরোধ করতে হবে। অভিযান হতে হবে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর, লক্ষ্যভিত্তিক ও আইনের সীমার মধ্যে। সামষ্টিক শাস্তি, নির্বিচার আটক কিংবা কোনো সম্প্রদায়কে হয়রানি করা অন্যায় এবং কৌশলগতভাবেও ক্ষতিকর। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের পাশাপাশি সেখানে নিয়োজিত সদস্যদের স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, মানবাধিকার ও সংঘাত-সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সরকারকে একটি স্থায়ী জাতীয় সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় পরিষদ এবং সব সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন। এই কাঠামো সশস্ত্র সংগঠন, সীমান্তপথ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অর্থায়ন, ভূমিবিরোধ এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা সম্পর্কে সমন্বিত মূল্যায়ন করবে। সীমান্ত নজরদারিতে আধুনিক প্রযুক্তি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও দ্রুত চলাচলের সক্ষমতা দরকার; তবে প্রযুক্তি কখনো মানব গোয়েন্দা তথ্য এবং জনগণের আস্থার বিকল্প হতে পারে না। শান্তিচুক্তির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে সরকারকে প্রকাশ করতে হবেÑকোনগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনগুলো অসম্পূর্ণ এবং কোনগুলোতে আইনগত ব্যাখ্যা বা সংশোধন প্রয়োজন। এরপর একটি সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন-রোডম্যাপ প্রণয়ন করা উচিত। গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকার ভিত্তিতে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। ভূমি কমিশনকে পর্যাপ্ত জনবল, অর্থ, কার্যকর বিধিমালা, আধুনিক জরিপ, ডিজিটাল রেকর্ড এবং ভুয়া দাবি প্রতিরোধের ক্ষমতা দিতে হবে। ভূমিবিরোধের সমাধান জাতিগত উত্তেজনা বা শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়; আইন, দলিল, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে।
সরকার, শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরকারী পক্ষ, চুক্তিবহির্ভূত রাজনৈতিক সংগঠন, নারী, যুবক, প্রথাগত নেতা, বাঙালি অধিবাসী এবং তুলনামূলক ছোট পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নতুন সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন। তবে সংলাপের অর্থ সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া নয়। যেসব সশস্ত্র সংগঠন সহিংসতা ত্যাগ, অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ এবং সংবিধান মেনে শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে অংশ নিতে রাজি হবে, তাদের জন্য যাচাইযোগ্য পুনর্বাসনের পথ রাখা যেতে পারে। যারা হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কিন্তু আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নয়নকে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু সড়ক ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করলেই শান্তি আসবে না, যদি স্থানীয়রা বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কায় থাকে কিংবা উন্নয়নের সুফল না পায়। বাংলা, ইংরেজি ও উপযুক্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা, দুর্গম এলাকায় আবাসিক বিদ্যালয়, বৃত্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, টেলিমেডিসিন, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় ও অপরিকল্পিত পর্যটন জীবিকা ধ্বংস এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার এবং মিয়ানমার সীমান্তের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি, যাতে কোনো সশস্ত্র সংগঠন প্রতিবেশী ভূখণ্ডকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। সহযোগিতার ক্ষেত্র হবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার এবং অপরাধীদের প্রত্যর্পণ। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের নীতিনির্ধারিত হবে ঢাকায় এবং ওই অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে।
সরকারকে দুটি বিপজ্জনক ধারণা পরিহার করতে হবে—একটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা; অন্যটি হলো, নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো প্রয়োজন নেই এবং শুধু ছাড় দিয়েই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। টেকসই শান্তির জন্য রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও ন্যায়বিচার—উভয়ই দরকার। বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে সীমান্ত ও ভূখণ্ড রক্ষা, সশস্ত্র গোষ্ঠী নিরস্ত্রীকরণ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিহত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ অভিযোগের সমাধান, সমান নাগরিক মর্যাদা, বাস্তবসম্মত অঙ্গীকার পূরণ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে কখনো আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বা সরকারের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। পাহাড়ের মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক; তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমৃদ্ধি দেশের সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে রাষ্ট্র সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে শক্তিশালী, আইন মানতে সংযত এবং মানুষের অভিযোগ সমাধানে আত্মবিশ্বাসীÑসেই রাষ্ট্রই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে শান্তি, যোগাযোগ ও সমৃদ্ধির সেতুতে রূপান্তর করতে পারবে।
hrmrokan@hotmail.com

ভারতে দারিদ্র্য ঢেকে রাখার পর্দা সংস্কৃতি by এলাহী নেওয়াজ খান
মূলত, ব্রিকস সম্মেলন কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নয়াদিল্লির প্রধান সড়কের পাশে বসন্তবিহার কুলি নামক বস্তিকে ঢেকে রাখতে এই পর্দা টানানো হয়। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনেও ওই বস্তি ঢাকতে একইভাবে পর্দা টানানো হয়েছিল। তবে এবারের ঘটনা ইতালির প্রখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফ্যালাসির সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের বর্ণনার কথাটি মনে করিয়ে দিয়েছে। সেটি ছিল ফ্যালাসির নেওয়া ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকার। সে সাক্ষাৎকারের ভূমিকা অংশে নয়াদিল্লির চরম দারিদ্র্য ও বস্তির এক মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল।
সেই ঘটনার ৫৫ বছর পর সেই দিল্লিতেই ২০২৬ সালে সেই দরিদ্রতার পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে আগের তুলনায় রাস্তায় সেই পবিত্র পশুর বিচরণ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ফ্যালাসি তার বর্ণনায় উল্লেখ করেছিলেন। এটি ছিল ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ওরিয়ানা ফ্যালাসির সেই সাক্ষাৎকারের ভূমিকা অংশের বর্ণনাটি ছিলÑযেমন একদিকে রয়েছে নয়াদিল্লির চওড়া রাস্তা, রাজকীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ সরকারি প্রাসাদ এবং লন, আর এর উল্টো পাড়ে নির্মম দারিদ্র্যের দৃশ্য।
ফ্যালাসির বর্ণনাটা ছিল এ রকম—‘ফুটপাতের ওপর জীর্ণ নোংরা কাপড়ের স্তূপের উপর এক বৃদ্ধ ভিখারি অঘোরে ঘুমাচ্ছিলেন, ঠিক তার পাশেই একটি গরু মলত্যাগ করছিল। যার ফলে সেই মল ছিটকে এসে ঘুমন্ত বৃদ্ধ লোকটির শরীর ও কাপড় নোংরা করে দিচ্ছিল।’
এই দৃশ্যটি দেখে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে তিনি মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলে উঠেছিলেন, ‘ভারতে সবকিছু বোধ হয় একটু বেশি ধীরগতিতে চলে।’ এই মন্তব্যটি ইন্দিরা গান্ধীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল। ফ্যালাসি লিখেছেন, ‘তার কথাটি শেষ হতে না হতেই ইন্দিরা গান্ধী লোহার মতো শক্ত পাঁচটি আঙুল দিয়ে তার হাত চেপে ধরেছিলেন এবং অত্যন্ত শীতল ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি তার বিখ্যাত অব দ্য রেকর্ড মন্তব্যটি করেছিলেন।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একদল বোকা দ্বারা পরিবেষ্টিত।’
সে যাই হোক, ওই পটভূমিতে বর্তমানে ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির স্বরূপটা আমাদের জানা দরকার। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ভারতে জীবনযাত্রার প্রকৃত মান বোঝার জন্য দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের একটি উচ্চতর দরিদ্রসীমা ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই উচ্চতার মানদণ্ড অনুযায়ী ভারতের প্রায় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষÑঅর্থাৎ ৩৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। অর্থাৎ মানুষ এখন না খেয়ে মারা যাচ্ছে না ঠিকই, তবে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মানসম্মত জীবনযাত্রার দিক থেকে বড় একটি অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এছাড়া ভারতের সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে এসে শহরে অভিবাসনের ফলে বস্তি অঞ্চলে দরিদ্রের একটি নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অন্যদিকে ভারতে অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অক্সফাম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের সিংহভাগ সম্পদ মাত্র ১ শতাংশ ধনকুবেরের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উত্তরণ ধীরগতির হয়ে পড়েছে।
এদিকে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপিএইচআই যৌথভাবে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, তা শুধু আয়ের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান—এই তিনটি বিষয়ের বারোটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এই আন্তর্জাতিক সূচক অনুযায়ী, ভারতে তীব্র দারিদ্র্য অনেক কমেছে বটে, তবে এখনো দেশটির হেডকাউন্ট রেশিও ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১৬ শতাংশের অধিক মানুষ এখনো প্রতিদিনের জীবনে পুষ্টি, মানসম্মত বাসস্থান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কিংবা শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারের কোনো না কোনোটি থেকে বঞ্চিত।
যদিও বাগাড়ম্বরপূর্ণ প্রচারণার কারণে ভারতের অর্থনীতির সত্যিকারের চেহারা জানা সম্ভব হয় না। তবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উপদেষ্টা জয়ন্ত ভান্ডারী বিভিন্ন সময়ে ভারতের দারিদ্র্য ও অর্থনীতি সম্পর্কে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা থেকে প্রকৃত সত্যটা পাওয়া যায়। তিনি ভারতকে মেরুদণ্ডহীন জেলিফিশের সঙ্গে তুলনা করে মতাদর্শহীন রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ভারতের দারিদ্র্য ও অর্থনীতি সম্পর্কে বিস্ফোরক সব মন্তব্য করেছেন।
ভান্ডারীর মতে, ভারত বিশ্বশক্তি হয়ে উঠছে—এই প্রচারণামূলক আখ্যানটি একটি মরীচিকা। মহাকাশ অভিযান, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন, ট্রিলিয়ন ডলারের মোট জিডিপির আড়ালে সাধারণ নাগরিকদের প্রকৃত অর্থনৈতিক দুর্দশাকে আড়াল করা হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন যে, মোট জনসংখ্যার অনুপাতে মাথাপিছু আয় অত্যন্ত কম। তার মতে, প্রকৃত অর্থে ভারত এখনো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ তীব্র অর্থনৈতিক অসমতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।
ভান্ডারী মনে করেন, ভারতের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার মূল কারণ শুধু ভুল নীতি নয়, বরং সাংস্কৃতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়। তিনি বলেন, ভারতে সর্বস্তরের শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সমাজে যুক্তি ও সৃজনশীলতার অভাব, লোকদেখানো জাতীয়তাবাদ ও অন্ধবিশ্বাস যোগ্যতার স্থান দখল করে নিয়েছে।
তিনি স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের পক্ষে পরবর্তী চীন হওয়া অসম্ভব। চীন যেভাবে তাদের শাসনতান্ত্রিক সক্ষমতা ও উৎপাদনযোগ্যতার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছে, সে ক্ষেত্রে ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং অদক্ষতার কারণে সেই স্তরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়।
জয়ন্ত ভান্ডারী আরো বলেছেন, ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণেই দেশের শিক্ষিত তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীরা সুযোগ পেলেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার মতে, দেশের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ না থাকায় এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

বিশ্ববাণিজ্যের দুটি দুঃস্বপ্ন: রুদ্ধ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবে by প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে নিয়ে জিবুতি ও ইয়েমেনকে যুক্ত করেছে। বাব আল-মান্দেব ফারসি শব্দ। এর অর্থ মৃত্যু দরজা। অতীতে নাবিকরা দিকনির্দেশনা ভুল করে এই পথে দিশাহারা হয়ে পড়তেন বলেই এমন নামকরণ করা হয়েছিল। ভৌগোলিকভাবে এটি সরু; কিন্তু বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব অসীম।
একটির অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে কাঁপিয়ে দেয়; অন্যটির সংকট জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু দুটিই যদি একই সময়ে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সংকট আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ববাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য, শিল্প, মূল্যস্ফীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবনে।
২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই আশঙ্কাকে আর শুধু কল্পনায় থাকতে দিচ্ছে না। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাবে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবাহিত হয়েছে, যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। একই সময়ে প্রতিদিন ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এ পথ দিয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের ২০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ হরমুজ কেবল একটি জলপথ এবং বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনি।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের প্রায় ৮৯ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল প্রধান ক্রেতা। তাই হরমুজের সংকটের প্রথম ধাক্কা পড়বে এশিয়ার শিল্পোন্নত অর্থনীতিতে; কিন্তু দ্বিতীয় ধাক্কা পড়বে পুরো বিশ্বে। কারণ তেলের বাজার বৈশ্বিক বাজার।
ইতোমধ্যেই এর নমুনা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ে না। বাড়ে ট্রাকের ভাড়া, জাহাজের ভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়, কারখানার উৎপাদন খরচ, কৃষির সেচ ও পরিবহন ব্যয়। অর্থাৎ তেলের দাম হলো অর্থনীতির এমন একটি সুইচ, যেটি চাপ দিলে একসঙ্গে বহু খাতের ব্যয় বেড়ে যায়।
অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব বিশ্ববাণিজ্যের আরেক দরজা স্বরূপ। হরমুজের সংকট মূলত জ্বালানি সরবরাহের সংকট। বাব আল-মান্দেবের সংকটের চরিত্র কিছুটা ভিন্ন। এটি বিশ্ববাণিজ্যের সময় ও দূরত্বের সংকট।
ইয়েমেন ও আফ্রিকার জিবুতি-ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর উত্তরে রয়েছে সুয়েজ খাল। ফলে এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়া জাহাজের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিদের তৎপরতায় বাব আল-মান্দেবও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনায় বড় বড় জাহাজ কোম্পানি আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ বেছে নিচ্ছে। সম্প্রতি ব্রেন্ট তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
দুটির সংকট একসঙ্গে হলে এখানেই শুরু হবে আসল দুঃস্বপ্ন। হরমুজ বন্ধ হলে উপসাগরীয় তেল ও এলএনজির প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে এশিয়া-ইউরোপের সমুদ্রপথে সুয়েজের কার্যকারিতা আরো কমে যাবে। অর্থাৎ একটি পথ বন্ধ করবে জ্বালানির সরবরাহ, আর অন্যটি বাড়াবে বাণিজ্যের দূরত্ব ও পরিবহন ব্যয়। একসঙ্গে ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি দুই দিক থেকে চাপে পড়বে। বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়।
বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব বোঝার জন্য সুয়েজ খালের কথা মনে রাখতে হবে। এশিয়া থেকে ইউরোপে জাহাজ যদি বাব আল-মান্দেব দিয়ে লোহিত সাগরে ঢুকতে না পারে, তাহলে সুয়েজ খাল ব্যবহার করেও লাভ নেই। তাকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরতে হবে।
এ কারণেই লোহিত সাগরের সংকট শুরু হওয়ার পর বড় বড় শিপিং কোম্পানি আফ্রিকা ঘুরে যেতে শুরু করেছিল। এখন যদি একই সময়ে হরমুজও অচল থাকে, তাহলে জ্বালানি পরিবহন ও কনটেইনার বাণিজ্য দুই ক্ষেত্রেই বিকল্প পথের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল পরিবহন ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন পর্যন্ত উঠেছিল বলে ইআইএর তথ্য দেখায়। একই সময়ে সুয়েজ খাল ও সুমেড (SUMED) পাইপলাইন দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবহনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, এই জলপথগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ সংকটের অভিঘাত আরো তীব্র হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটা নতুন বিপদের ঘণ্টা।
হরমুজে তেল ও এলএনজি সরবরাহ কমলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে। বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজের সংকটে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়বে। এই দুই ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি।
একজন বাংলাদেশি নাগরিক হরমুজ বা বাব আল-মান্দেবের মানচিত্র হয়তো কখনো দেখেননি। কিন্তু ওই দুই জলপথের সংকট তার বাজারের ব্যাগে, বাসের ভাড়ায় কিংবা বিদ্যুতের বিলে এসে পৌঁছাতে পারে।
কৃষির জন্য ডিজেল দরকার। সেচে বিদ্যুৎ দরকার। সার আমদানি করতে বৈদেশিক মুদ্রা দরকার। কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানি দরকার। বন্দরে পণ্য খালাস ও দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনে জ্বালানি দরকার।
আধুনিক বিশ্ববাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে ‘জাস্ট ইন টাইম’ মডেলের ওপর দাঁড়িয়েছে। কারখানায় কাঁচামাল বেশি দিন পড়ে থাকবে না; প্রয়োজন অনুযায়ী আসবে। কিন্তু সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা বাড়লে এই মডেল ভেঙে পড়ে। একটি কনটেইনার যদি নির্ধারিত সময়ের বদলে দুই-তিন সপ্তাহ দেরিতে আসে, তাহলে পুরো উৎপাদন পরিকল্পনা বদলে যেতে পারে।
এ কারণেই হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবকে আলাদা দুটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির দুটি স্পর্শকাতর স্নায়ু। আজ হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় তলানিতে এবং বাব আল-মান্দেবেও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি বন্ধ থাকাই যদি বিশ্ববাণিজ্যের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়, তাহলে দুটি একসঙ্গে বন্ধ হওয়া হবে সেই দুঃস্বপ্নের দ্বিতীয় অধ্যায়।
একটি জাহাজকে কয়েক হাজার অতিরিক্ত নটিক্যাল মাইল যেতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, জাহাজের সময় বাড়ে, ক্রু ও বীমা ব্যয় বাড়ে এবং একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনের জন্য বেশি খরচ হয়।
কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুধু জাহাজ ও বন্দরের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বীমা, ব্যাংকিং, ক্রেডিট, জ্বালানি, কনটেইনার, বন্দর, সরবরাহচুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন।
হরমুজ এবং বাব আল-মান্দেব, দুটি প্রণালি ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির শিরা-উপশিরায় তারা একই স্রোতের অংশ। একটি তেল ও গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে; অন্যটি এশিয়া-ইউরোপের বাণিজ্যপথকে সুয়েজের সঙ্গে যুক্ত করে। তাই একটির সংকট অন্যটির বিকল্প নয়; বরং দুটির সম্মিলিত সংকট বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহ, জ্বালানি ও পরিবহন—তিন স্তম্ভেই আঘাত করতে পারে।
সৌদি আরব কিছু তেল হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প রুটে পাঠাতে পারে। মিসরের সুমেড পাইপলাইনও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কিন্তু এগুলোর সক্ষমতা সীমিত এবং দীর্ঘ সমুদ্রপথের তুলনায় ব্যয় বেশি। EIA-ও উল্লেখ করেছে, বিকল্প রুটগুলো দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও সীমিত সক্ষমতার। অর্থাৎ সংকটের সময় বিশ্ব বুঝতে পারে দক্ষতার জন্য তৈরি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সবসময় স্থিতিস্থাপকতার জন্য তৈরি নয়। কারণ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব যদি একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়, তখন বিশ্ববাজারে শুধু জাহাজের পথ বন্ধ হবে না, একইসঙ্গে বিশ্বায়নের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসই সংকুচিত হয়ে আসবে।
* প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন
- fakrul@ru.ac.bd

অখণ্ড ভারত: এক অসম্ভব স্বপ্ন by শাহীদ কামরুল
‘অখণ্ড ভারত’ হয়তো একটি রাজনৈতিক কল্পনা, কোনো হারানো ভূগোলকে পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, কিংবা নির্বাচিত ইতিহাসের স্মৃতিকে বর্তমানের মানচিত্রে আবার এঁকে দেওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ইতিহাসের মাটিতে কল্পনার বীজ বপন করলেই তার ডালে ফুল ফোটে না। ইতিহাসের নিজস্ব ঋতু আছে, ভূগোলের নিজস্ব স্মৃতি আছে, আর মানুষের আত্মপরিচয়ের গভীরে এমন কিছু শিকড় প্রোথিত থাকে, যেগুলো কোনো সাম্রাজ্যিক মানচিত্রের রেখা দিয়ে উপড়ে ফেলা যায় না। মানচিত্রে একটি রেখা টেনে দেওয়া সহজ; কিন্তু একটি জাতির সার্বভৌম ইচ্ছার সীমারেখা আঁকা হয় রক্ত, অশ্রু, স্মৃতি, আত্মত্যাগ এবং সম্মতির কালিতে। কাগজের ওপর আঁকা সীমান্ত মুছে ফেলা যায় এক টানে; কিন্তু মানুষের চেতনায় খোদাই হয়ে থাকা স্বাধীনতার রেখা কোনো কলমে মুছে ফেলা যায় না।
যে রাষ্ট্র তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে বন্ধুত্বের পরিবর্তে ভীতি, সমতার পরিবর্তে আনুগত্য এবং সহযোগিতার পরিবর্তে নতজানুতা দাবি করে, সে অজান্তেই নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দেয়। বাইরে থেকে তার প্রাসাদ যতই উঁচু হোক, তার জানালায় যতই বিজয়ের পতাকা উড়ুক, ভেতরে যদি আস্থার বাতাস প্রবেশ না করে, তবে একদিন সেই প্রাসাদ নিজেরই প্রতিধ্বনির মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় কখনো কখনো পরাজয় নয়; বরং এমন এক নিঃসঙ্গতা, যেখানে চারপাশে সবাই উপস্থিত থেকেও কেউ আর হৃদয়ের দরজা খুলতে চায় না।
ভারতের সফট পাওয়ারের (Soft Power) শক্তি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। বলিউডের রঙিন পর্দা, ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভারতীয় প্রবাসীদের উপস্থিতি এবং ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের সক্রিয়তা ভারতকে বিশ্বপরিসরে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচিতি দিয়েছে। জওহরলাল নেহরুর জোটনিরপেক্ষতার নীতি, উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের প্রাথমিক কল্পনা বহু দশক ধরে ভারতের একটি আকর্ষণীয় মুখ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল। আমেরিকান রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোসেফ নাইয়ের চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রলোভনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে না; আকর্ষণ, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধও মানুষের মন জয় করার শক্তিশালী মাধ্যম।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে থাকে সূক্ষ্ম বিপদের রেখা। আকর্ষণ যখন প্রভাবের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, আর প্রভাব যখন নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়, তখন সংস্কৃতির যে সেতু একদিন দুই তীরকে কাছে এনেছিল, সেটিই ধীরে ধীরে আধিপত্যের সিঁড়িতে পরিণত হতে পারে। ফুল দিয়ে যদি পথ দেখানো হয়, তাকে সৌন্দর্য বলা যায়; কিন্তু সেই ফুলের আড়ালে যদি পথের দিক নির্ধারণের চেষ্টা থাকে, তখন সৌন্দর্য আর নিছক সৌন্দর্য থাকে না।
ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসির হেজিমনি (Hegemony) ধারণা এই জায়গাটিকে বুঝতে বিশেষভাবে সহায়ক। গ্রামসি দেখিয়েছিলেন, আধিপত্য সবসময় বন্দুকের নল দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। অনেক সময় তা মানুষের চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংবাদমাধ্যম এবং দৈনন্দিন বোধের মধ্যে এমনভাবে প্রবেশ করে যে মানুষ আধিপত্যকে আর আধিপত্য হিসেবে চিনতেই পারে না। শিকল তখন আর লোহার তৈরি থাকে না; শিকল হয়ে ওঠে ধারণা। কারাগারের দেয়াল তখন ইট-পাথরে নয়, মানুষের চিন্তার ভেতরে নির্মিত হয়।
একটি সমাজ যখন ভাবতে শুরু করে, ‘আমাদের নিরাপত্তার জন্য ওদের দরকার’, ‘আমাদের স্থিতিশীলতার জন্য ওদের অনুমোদন প্রয়োজন’, কিংবা ‘ওদের অসন্তুষ্ট করা বিপজ্জনক’, তখন আধিপত্য আর সীমান্তের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে না; সে মানুষের মনের ভেতরে ঘর বানিয়ে ফেলে। তখন শাসককে প্রতিটি দরজায় প্রহরী বসাতে হয় না, কারণ মানুষের ভয়ই প্রহরীর কাজ করতে শুরু করে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিজয় তাই শুধু ভূখণ্ড দখল নয়; বরং অন্যের কল্পনাশক্তির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারতীয় উপমহাদেশে শুধু সেনাবাহিনীর শক্তিতে শাসন করেনি। আইন, শিক্ষা, আমলাতন্ত্র, জনশুমারি, মানচিত্র, ইতিহাসচর্চা এবং জ্ঞান উৎপাদনের মধ্য দিয়েও তারা একটি ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলা নির্মাণ করেছিল। মানচিত্র তখন শুধু ভূখণ্ডের ছবি ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার একটি ভাষা। ইতিহাস তখন শুধু অতীতের বিবরণ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি উপায়।
বিখ্যাত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সাহিত্যতাত্ত্বিক অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ তার ওরিয়েন্টালিজম (Orientalism) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও ক্ষমতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। কে কাকে কীভাবে বর্ণনা করবে, কে সভ্য, কে পশ্চাৎপদ, কে নিরাপদ, কে বিপজ্জনক, কে মধ্যপন্থি এবং কে উগ্র, এই শব্দভান্ডারও ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হতে পারে। কোনো জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট নামে ডেকে দীর্ঘদিন ধরে তার পরিচয় ব্যাখ্যা করতে থাকলে একসময় সেই ব্যাখ্যাই যেন তার ওপর আরোপিত আয়নায় পরিণত হয়।
আসলে, ক্ষমতা শুধু আদেশ দেয় না; ক্ষমতা শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে, পরিচয়ের নাম দেয়, ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’-এর সীমা নির্ধারণ করে এবং কোন সত্য দৃশ্যমান হবে আর কোন সত্য অন্ধকারে ঢাকা থাকবে, তার কাঠামো নির্মাণ করে। ফলে কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়, কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কিংবা কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে যে ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, সেই ভাষাও ক্ষমতার একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের প্রশ্নটি তাই ভারতপ্রীতি বনাম ভারতবিদ্বেষের সরল দ্বন্দ্ব নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বাধীনতা (Sovereignty) । প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক একটি প্রয়োজনীয় বাস্তবতা, কিন্তু বন্ধুত্ব কখনো অভিভাবকত্বের সমার্থক হতে পারে না। বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মমর্যাদা এবং স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি (Strategic Autonomy) । ছোট ভূখণ্ড মানেই ছোট আত্মা নয়; সামরিক শক্তিতে দুর্বল হওয়া মানেই রাজনৈতিক ইচ্ছায় দুর্বল হওয়া নয়।
বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই নতজানু আনুগত্য কিংবা অন্ধ বৈরিতার কোনো একটি প্রান্ত বেছে নেওয়া নয়; প্রয়োজন বিচক্ষণ কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং সমমর্যাদার সম্পর্ক। বন্ধুত্ব থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, সীমান্ত সহযোগিতা থাকবে, নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকবে; কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি থাকবে ঢাকার হাতেই। প্রতিবেশীর সঙ্গে হাত মেলানো যায়, কিন্তু নিজের হাতের মুঠোয় থাকা কলমটি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।
তাছাড়া, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা (Sovereignty) শুধু পতাকা বা সীমান্তে নয়; তা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও মানুষের আত্মপরিচয়ে বাস করে। যে জাতি নিজের ইতিহাসকে অন্যের আয়নায় দেখতে অভ্যস্ত হয়, একসময় সেই আয়নাকেই নিজের মুখ বলে ভুল করতে পারে। তবে আত্মপরিচয় কোনো দুর্গ নয়; গভীর শিকড়ের বৃক্ষের মতোই সে বহির্বিশ্বের বাতাস গ্রহণ করতে পারে।
বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের কল্পিত সম্প্রদায় (Imagined Communities) ধারণা দেখায়, জাতি শুধু ভূখণ্ড নয়; অভিন্ন স্মৃতি ও কল্পনায় নির্মিত একটি কমিউনিটি (Community)। বাংলাদেশের পরিচয়ও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বৈচিত্র্য, নদী, সাহিত্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামের বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতায় গড়ে উঠেছে। তাই এই বহুত্বই তার শক্তি, কোনো দুর্বলতা নয়।
আদতে, ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণাটিকেও তাই ইতিহাসের আদালতে নতুন করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। উপমহাদেশের ইতিহাস একদিকে সাংস্কৃতিক সংযোগের, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিচ্ছেদেরও ইতিহাস। ভাষা, খাদ্য, সাহিত্য, ধর্ম, সংগীত এবং পারিবারিক স্মৃতির সীমান্ত আধুনিক রাষ্ট্রের সীমান্তের চেয়ে অনেক পুরোনো। কিন্তু সাংস্কৃতিক সংযুক্তি থেকে রাজনৈতিক পুনরেকত্রীকরণের দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্ম নেয় না। একই নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ একই জলের স্মৃতি বহন করতে পারে; একই ভাষার শব্দ উচ্চারণ করতে পারে; একই গানের সুরে আবেগ খুঁজে পেতে পারে। কিন্তু তাই বলে দুই তীরকে একটি ঘর বানানো বাধ্যতামূলক নয়। ইতিহাসের আত্মীয়তা আর রাষ্ট্রের একীভবন এক জিনিস নয়। সাংস্কৃতিক নৈকট্য সীমান্তকে নরম করতে পারে, কিন্তু সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অকার্যকর করে না। ইউরোপের ইতিহাসেও বহু জাতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধনে যুক্ত থেকেও পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে। তাই ভারতীয় সভ্যতার বিস্তৃত ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে সম্মান করা এবং একটি অখণ্ড রাজনৈতিক ভূখণ্ডের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা এক বিষয় নয়। অতীতের একটি অভিন্ন স্মৃতি ভবিষ্যতের একটি অভিন্ন রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক নকশা নয়।
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা হলো, কোনো সাম্রাজ্য তার মানচিত্রের আয়তন দিয়ে চিরস্থায়ী হয় না। তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রতিবেশীদের আস্থা, নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি এবং অন্যের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের ওপর। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ক্ষমতার বাস্তবতা বুঝেছিলেন; কিন্তু আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি আরো একটি শিক্ষা দিয়েছে : জবরদস্তি দিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু বৈধতা আদায় করা যায় না।
ভারত যদি সত্যিকারের আঞ্চলিক নেতৃত্ব চায়, তার পথ আধিপত্য নয়, আস্থা ও সমমর্যাদার অংশীদারত্ব। ভয় দিয়ে প্রতিবেশীকে নীরব করা যায়, হৃদয়ে জায়গা করা যায় না। বাংলাদেশের পথও তাই নতজানু আনুগত্য বা অন্ধ বৈরিতা নয়; জাতীয় স্বার্থ, সাংবিধানিকতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ভিত্তিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ। দিল্লি, ওয়াশিংটন, বেইজিং বা মস্কো নয়, বাংলাদেশের দিকনির্দেশ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশেই।
তাই ‘অখণ্ড ভারত’-এর রাজনৈতিক ফুল ফুটবে কি না, তার উত্তর কোনো স্লোগান, প্রচারণা কিংবা টেলিভিশন স্টুডিও দিতে পারবে না। উত্তর দেবে ইতিহাস, ভূগোল এবং জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা। ফুলের ছবি হাজারবার আঁকা যায়, তার নামে অসংখ্য কবিতা লেখা যায়, কাগজে তার জন্য নতুন মানচিত্রও তৈরি করা যায়; কিন্তু শিকড় যদি মাটির গভীরে না থাকে, তবে সেই ফুল কাগজের ফুল হয়েই থেকে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কোনো একক রাজধানীর স্বপ্নে নয়; বরং সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যে ভারত সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী, তাকে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ভয় পেতে হবে না। আর যে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে সার্বভৌম, তাকে নিজের সার্বভৌমত্ব প্রমাণ করার জন্য ভারতের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে হবে না।
আধিপত্যের বীজ বারবার বোনা যেতে পারে। নতুন নতুন বয়ান বাজারে আসতে পারে। ভূরাজনীতির মঞ্চ বারবার নতুন সাজে সজ্জিত হতে পারে। কিন্তু জনগণের ইতিহাসের মাটি যদি জেগে থাকে, তবে প্রতিটি সাম্রাজ্যিক কল্পনার সামনে এক অদৃশ্য প্রাচীর দাঁড়িয়ে থাকবে। সেই প্রাচীরের নাম সার্বভৌমত্ব; তার ভিত্তির নাম আত্মমর্যাদা; আর তার প্রাণ হলো জনগণের নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করার অধিকার।
তাই ‘অখণ্ড ভারত’ যদি রাজনৈতিক আধিপত্যের স্বপ্ন হয়, তবে তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো বাহ্যিক শক্তি নয়; প্রশ্নটি ইতিহাসের নিজস্ব বিধানের : জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো মানচিত্রই চিরস্থায়ী নয়। কারণ মানচিত্র কালি দিয়ে আঁকা যায়, সাম্রাজ্য শক্তি দিয়ে বিস্তৃত করা যায়, সীমান্ত ক্ষমতা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করা যায়; কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ আঁকা যায় শুধু তার নিজের ইচ্ছার ক্যানভাসে।
আর সেই ক্যানভাসে অন্যের রঙ যতই গাঢ় হোক, ইতিহাসের শেষ তুলির আঁচড়টি নিজের হাতেই রাখে একটি জাতি। সার্বভৌমত্বের রঙ তাই সহজে মুছে যায় না। যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ নিজে লিখতে শেখে, তার ভাগ্যের পৃষ্ঠা অন্য কেউ দীর্ঘদিনের জন্য নিজের নামে লিখে রাখতে পারে না।
* শাহীদ কামরুল, সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
- sahidkamrul25@gmail.com

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2398)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...



