Wednesday, August 26, 2026
মুসলিম বিশ্বের এক প্রশ্নবিদ্ধ রাষ্ট্র আরব আমিরাত by মাহমুদুর রহমান
সেই সমস্যা কীভাবে সমাধান করেছিলাম, সেটা একেবারেই ব্যক্তিগত বিধায় সে প্রসঙ্গ আর বাড়াচ্ছি না। প্রিন্স মুবারক বাংলাদেশ সফরে এসে বেশ সন্তুষ্ট হয়েছিলেন, যার ফলে ওয়ারিদ টেলিকমের বাংলাদেশে আগমন ঘটেছিল। আমার সঙ্গে আলোচনায় টেলিকম ছাড়া অন্যান্য সম্ভাব্য লাভজনক সেক্টরেও মুবারক আল নাহিয়ানের ধাবি গ্রুপের বিনিয়োগের কথা থাকলেও ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে সেসব আর বাস্তবায়ন হয়নি। বরং পরবর্তীকালে ওয়ারিদ টেলিকম তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ভারতের এয়ারটেলের কাছে বিক্রি করে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। আমিও সরকারি দায়িত্ব ছেড়ে মিডিয়ায় প্রবেশ করলাম এবং সেই থেকে আমার বাঙালি মুসলমান আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আওয়ামী সুশীল ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে যথাসম্ভব লড়াই করাটাই বাকি জীবনের কর্তব্য ধরে নিয়েছি।
গত পঁচিশ বছরে মুসলিম বিশ্বে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মাত্রাটা কিছুটা বোঝানোর জন্য উপরের ঘটনা বর্ণনা করলাম। প্রসঙ্গক্রমে আমার আরো একটি পর্যবেক্ষণের কথা বলে রাখি। বিনিয়োগ বোর্ডে পাঁচ বছরের দায়িত্ব পালনকালে আমি তিনবার আরব আমিরাতে সরকারি সফরে গিয়েছিলাম। প্রথমবার আমার সঙ্গে একটি বিনিয়োগ প্রতিনিধি দল ছিল। দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম প্রিন্স মুবারক আল নাহিয়ানের বাংলাদেশ সফরের আগে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হতে। আর ২০০৬ সালের এপ্রিলে তৃতীয় ও শেষবার তারই আমন্ত্রণে নবনির্মিত আবুধাবি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার উদ্বোধনী একদিনের ক্রিকেট খেলা দেখতে।
আমিরাতের ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে তিনি সেই আয়োজনের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। আমার তিন সফরের অভিজ্ঞতায় একজন বাংলাদেশি এবং মুসলমান হিসেবে একটি বিষয় লক্ষ করে বেশ উদ্বিগ্ন বোধ করেছিলাম। আমার কাছে তখনই মনে হয়েছিল যে, আমিরাতের প্রধান দুই শহরের মধ্যে দুবাই ভারতীয়দের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এবং আবুধাবিতে পাকিস্তানের কিছুটা প্রভাব থাকলেও ভারতীয়করণ ক্রমেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ভারতের পাশাপাশি অন্তরালে যে ইসরাইল আমিরাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক হওয়ার পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, সেটা অবশ্য একেবারেই টের পাইনি। তবে ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে কথোপকথনে তাদের চিন্তাধারায় মুসলিম পরিচয়কে ছাপিয়ে পশ্চিমাদের প্রতি অন্ধ প্রীতি লক্ষ করেছিলাম। উম্মাহ নিয়ে আলোচনা উঠলে তাদের মধ্যে একধরনের দ্বিধাও যেন অনুভব করেছিলাম।
এবার বর্তমানে আসি। এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই যে, সারা বিশ্বে সবচেয়ে উগ্র মুসলমানবিদ্বেষী দুই দেশের নাম ইসরাইল ও ভারত। উভয় দেশে ইসলামোফোবিয়া রাজনৈতিক ময়দান ছাড়িয়ে জনগণের বৃহৎ অংশের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। কেউ যদি মনে করে থাকেন যে, নির্বাচনে হেরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে কট্টরপন্থি নেতানিয়াহু এবং নরেন্দ্র মোদি অপসারিত হলেই ইসরাইল ও ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর চলমান জুলুমের অবসান ঘটবে এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দেশ দুটির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরে আসবে, তাহলে তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আমি গণতন্ত্র প্রসঙ্গে বিভিন্ন লেখায় এবং বক্তব্যে একটি বিষয়ে সর্বদা জোর দিয়ে থাকি।
সেটা হলো, যেকোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে অবশ্যই সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চিন্তাচেতনার প্রতিফলন ঘটবে। অনেকেই হয়তো এই তর্ক তুলবেন যে, জনমতকে তো নেতাই প্রভাবিত করে থাকেন। আমি মনে করি এ কথাটি আংশিক সত্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতাকে নির্বাচনে জিততে হলে জনমত বুঝে চলতে হয়। সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় অভিমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো নেতার পক্ষে রাজনীতিতে সফল হওয়া কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। মানুষের মন অল্প সময়ে পরিবর্তিত হয় না। এই যে ভারতে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সব নির্বাচনের আগে মুসলমানদের ওপর নিগ্রহের মাত্রা বেড়ে যায়, এর পেছনে জনতুষ্টি এবং নির্বাচনি হিসাবনিকাশ কাজ করে। ইসরাইলে এই অক্টোবরে সংসদের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেখানে নেতানিয়াহুসহ সব সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর প্রচারের মূল বয়ান হলো, প্যালেস্টাইনের মুসলমান নারী, পুরুষ, শিশুকে কে কত সফল ও বর্বরভাবে নির্যাতন ও হত্যা করতে সক্ষম হবে। গণহত্যা চালিয়ে প্যালেস্টাইনকে নিশ্চিহ্ন করে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করতে যার পরিকল্পনা ইসরাইলি ভোটারদের কাছে সবচেয়ে কার্যকর মনে হবে, সেই আসন্ন নির্বাচনে জিতবে। সুতরাং, নেতানিয়াহু কিংবা মোদি অসুখ নয়, উপসর্গ মাত্র।
ভারত ও ইসরাইলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উন্মত্ত ধর্মান্ধতাই সেখানকার আসল রোগ। চরম বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এমন ভয়ংকর ইসলামবিদ্বেষী ভারত এবং ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতম মিত্র দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান কিন্তু ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় নয়। সেটা খোদ আরব ভূমিতেই। দেশটির নাম সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমি জেনেবুঝেই বলছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) প্রকৃতপক্ষে ইসরাইল ও ভারতের অধিক বিশ্বস্ত বন্ধু। গণতন্ত্রহীন ইউএই জনমতের তোয়াক্কা না করে যতটা অন্ধভাবে ভারত ও ইসরাইলের সব অন্যায় সমর্থন করতে পারবে, গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেটা সম্ভব নয়। গাজায় এই শতাব্দীর ভয়াবহতম গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে জায়নিস্ট ইসরাইলের প্রতি ‘ওয়াশিংটন এস্টাবলিশমেন্টের’ সমর্থন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে দেশটির তরুণ প্রজন্ম বর্ণবাদী জায়নিজমের বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছে। এমনকি ইসরাইলের কট্টর সমর্থক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পর্যন্ত এই পরিবর্তনকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। অথচ ইউএইতে ভিন্ন চিত্র।
ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের চলমান যুদ্ধে তেমন কোনো রাখঢাক না রেখেই আমিরাত ইসরাইলের পক্ষাবলম্বন করেছে। যুদ্ধের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ ইসরাইলের সামরিক কর্তারা আমিরাত সফর করে গেছেন। ইসরাইলি ‘আয়রন ডোম’ আমিরাতের আকাশ পাহারা দিচ্ছে। মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান আমিরাতের সব বিমান ঘাঁটি থেকে উড়ে গিয়ে ইরানের ওপর বোমা ফেলেছে, দেশটির সামরিক ঘাঁটি থেকে ইসরাইলি ও মার্কিন সৈন্যরা ইরান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ছে। বছরের শুরুতে ইরানের ওপর মার্কিন এবং ইসরাইলি অন্যায় আক্রমণ শুরু করতেও আরব আমিরাত ক্রমাগত উসকানি দিয়েছে। তারা মুসলিম রাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংসের জন্য ওয়াশিংটনে ওকালতি করেছে।
একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের আসালুয়ে পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ইসরাইল ও আমিরাত যৌথভাবে হামলা চালালে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরক্তি প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হঠকারী কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দেয়। হাজার বছরের শিয়া-সুন্নি বিভেদকে পুঁজি করে আরব দেশটির শাসক পরিবার মুসলিম উম্মাহ ধ্বংসের মরণ খেলায় মেতেছে। পাকিস্তান যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করায় চরম অসন্তুষ্ট হয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ দেশটিকে এক মাসের মধ্যে ফেরত দিতে বাধ্য করেছে তথাকথিত মুসলিম উম্মাহভুক্ত ইউএই সরকার। পাকিস্তান সৌদি আরবের কাছ থেকে ধার করে আমিরাতের সেই আকস্মিক দাবি মিটিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরেই এ-জাতীয় আত্মবিধ্বংসী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকলে বাইরে থেকে উম্মাহর আর কোনো শত্রুর প্রয়োজন দেখি না। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইসরাইল ইরানে আক্রমণ চালানোর মাত্র দুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তেল আবিব সফর করে ইসরাইলকে পিতৃভূমি এবং ভারতকে মাতৃভূমি ঘোষণা করে এসেছিলেন। ইসরাইল-ভারত-ইউএই ট্রয়কা সম্পর্কে মুসলিম বিশ্বের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা এখন আফ্রিকার দরিদ্র ও সংঘাতময় দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত আমাদের এখান থেকে জনশক্তি পাঠানো নিয়ে। বছরে গড়ে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স ইউএই থেকে বাংলাদেশ আয় করে যা মোট রেমিট্যান্সের ১০ শতাংশেরও কিছু বেশি। সে দেশে চাকরি এবং ব্যবসায় নিয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, যেটা বিদেশিদের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। দেশটিতে কর্মরত ভারতীয়দের সংখ্যা ৪০ লাখ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী পাকিস্তানিদের সংখ্যা ১৫ লাখ। আমার ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ইউএই সরকার পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশি কর্মীদের সে দেশ থেকে সরিয়ে ভারতীয়দের অধিক হারে নিয়োগ দেবে। সুতরাং জনশক্তি রপ্তানির জন্য আমাদের অন্য দেশের সন্ধান এখন থেকেই করা উচিত।
পাঠকদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জানেন না যে, কিছুদিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইউএই বাংলাদেশের পরিবর্তে ইসরাইলের মিত্র সাইপ্রাসের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ট্রয়কার অন্য সদস্য ভারত কেবল আমাদের বিপক্ষে ভোট দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, সাইপ্রাসকে জেতানোর জন্য সরাসরি প্রচারও চালিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনা এবং তার লুটেরা ও খুনি দোসররাও প্রধানত ভারত ও আমিরাতে আশ্রয় নিয়েছে। গণহত্যাকারী সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধকে আরব আমিরাত সরকার উপেক্ষা করেছে। আমার ধারণা, এ বিষয়ে ভারত এবং ইউএই যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে এই দুই দেশ সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান রেখে আজকের লেখা শেষ করছি।
![]() |
| মাহমুদুর রহমান |
Tuesday, August 25, 2026
যে ৩টি কৌশল ব্যর্থ হওয়ায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হার by ব্র্যাট ডেভরোক্স
ভবিষ্যতের সংঘাতগুলোর প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এগুলো হয়তো দরকারি শিক্ষা হতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে দেশের চরম ব্যর্থতার মূল কারণ এগুলো নয়। সংঘাতের অনেক আগেই যদি এই বিষয়গুলো সমাধান করা যেত, তাহলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য—অর্থাৎ শাসনব্যবস্থার পতন, ইরানের দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতা ধ্বংস করা বা পারমাণবিক অস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোর বিষয়ে তাদের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা—অর্জন করতে পারত কি না, তা বলা কঠিন।
অস্ত্রের মজুত বাড়ানো কিংবা তেলসংকটের প্রস্তুতি হয়তো দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণ অভিযান বা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির সুযোগ দিত। কিন্তু গত ছয় মাসে যা অর্জিত হয়নি, তা যে আরও সাত মাসের বোমাবর্ষণ বা অবরোধে অর্জিত হতো—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কৌশলগত ব্যর্থতার ফলে ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে আরও উন্মুক্ত সুযোগ পাওয়া, হরমুজ প্রণালিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখনো অত্যন্ত সক্ষম। এমনকি এই ভুলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধেও তারা এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা বিশ্বের অন্য কোনো সামরিক বাহিনীর নেই। তারা নিজস্ব উপকূল থেকে সাত হাজার মাইলের বেশি দূরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং ইরানের আকাশসীমার ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
এর ফলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটি অত্যন্ত একপেশে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যেখানে ইরানের পক্ষে মৃতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই হাজার ছাড়িয়ে গেছে (যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই)। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পরিকল্পনা ও সরবরাহের ব্যর্থতা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী দেখিয়েছে যে তারা এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তবে কোনো প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই সেই কৌশলগত অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ করতে পারে না, যা সামরিক বাহিনীর কাছে অসম্ভব কিছু দাবি করে বসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাহিনীর কাছে একটা নয়, তিন-তিনটি অসম্ভব কাজ চেয়েছেন এবং সেগুলো করতে ব্যর্থ হলে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
প্রথম অসম্ভব কাজ ছিল—কোনো ধরনের পদাতিক বা স্থল অভিযান ছাড়াই বোমাবর্ষণ করে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো। কেবল বিমানশক্তি দিয়ে কৌশলগত বিজয় অর্জনের স্বপ্ন স্বাধীন বিমানবাহিনীগুলো ১৯২১ সাল থেকেই দেখে আসছে, যখন ইতালীয় তাত্ত্বিক জিউলিও দুহেত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে কেবল বোমারু বিমান দিয়েই ভবিষ্যৎ যুদ্ধে জয় পাওয়া সম্ভব। তিনি ১৯২৮ সালে এমনকি এটাও দাবি করেছিলেন যে একটি মাঝারি আকারের দেশে মাত্র ৩০০ টন বোমা ফেললেই এক মাসের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।
কেবল আকাশপথেই যুদ্ধ জেতা যায়—এই তত্ত্ব আধুনিক শিল্পযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লন্ডনের ওপর জার্মানির ফেলা ৪০ হাজার টন বোমা কেবল ব্রিটিশদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার মানসিকতাকে আরও শক্ত করেছিল। জবাবে অক্ষশক্তির ওপর মিত্রবাহিনীর ফেলা ২৫ লাখ টন বোমা অ্যাডলফ হিটলারের রাজত্বকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তা কিন্তু তাদের পতন ঘটাতে পারেনি; বরং যুদ্ধের প্রতি সাধারণ জনগণের সমর্থনকে আরও চাঙা করেছিল।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা ৮০ লাখ টন বোমায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি; বরং তা সেখানে কমিউনিস্টদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়াতে সাহায্য করেছিল।
পারমাণবিক হামলা ছাড়া কেবল বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে কোনো শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা হয়তো অসম্ভব। এর কাছাকাছি যা গিয়েছিল, তা হলো স্লোবোদান মিলোসেভিচের অধীনে সার্বিয়ার ওপর ন্যাটোর বিমান হামলা। কিন্তু ১৯৯৯ সালের জুনেই সেখানে বোমাবর্ষণ বন্ধ হয়েছিল, আর মিলোসেভিচ সরকারের পতন ঘটেছিল ২০০০ সালের অক্টোবরে গণবিক্ষোভের মুখে।
কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানি সরকারের পতন ঘটানোর সম্ভাবনা ছিল শূন্যের কোঠায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে পরবর্তী অসম্ভব দাবি ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অকার্যকর করা—সেটিও কেবল আকাশপথ থেকে। কিন্তু সামান্য পদাতিক বাহিনী ব্যবহার করে মোবাইল লঞ্চার অকার্যকর করার এই চেষ্টাও অতীতে বারবার করা হয়েছে এবং প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও আমেরিকান ও ব্রিটিশ বিমানবাহিনী একটি বিস্তৃত বোমাবর্ষণ অভিযান চালিয়ে জার্মানির ভি-১ ও ভি-২ রকেটের উৎপাদন ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা উৎক্ষেপণ বন্ধ করতে পারেনি। এগুলো লুকিয়ে রাখা বা শক্ত আবরণে ঢেকে রাখা খুবই সহজ ছিল।
নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের বিকাশ এই হিসাবকে পাল্টে দিতে পারেনি। কারণ, এর বিপরীতে চলে এসেছে মোবাইল লঞ্চব্যবস্থা। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আকাশ থেকে ইরাকি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার ধ্বংস করার চেষ্টা একটিও নিশ্চিত ধ্বংসের প্রমাণ দিতে পারেনি।
একইভাবে ইসরায়েলও গাজা ও দক্ষিণ লেবানন থেকে হামাস ও হিজবুল্লাহর রকেট হামলা ঠেকাতে দুই দশক ধরে ব্যাপক বিমান অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু কেবল স্থল অভিযান চালিয়েই সেই রকেটগুলোকে নীরব করা সম্ভব হয়েছিল।
ইয়েমেন থেকে হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বন্ধ করতে একাধিক দেশের জোট চেষ্টা করেছে, অথচ এখনো সেই আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। সুতরাং নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কেবল আকাশ থেকে মোবাইল উৎক্ষেপণব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়, যা সহজে আড়াল থেকে নিক্ষেপ করে দ্রুত নতুন জায়গায় সরে যেতে পারে। শাসনব্যবস্থার পতনের মতোই, রকেট হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতেও স্থলবাহিনীর প্রয়োজন হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ ভরসা ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চালু রাখা, যাতে জিসিসিভুক্ত (গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলোর অবকাঠামো ইরান ধ্বংস করতে না পারে। কারণ, এই দেশগুলোর আতিথেয়তার ওপরই মার্কিন সামরিক অভিযান নির্ভর করছিল। আক্রমণ রোখার সস্তা উপায়ে বেশি বিনিয়োগ এবং স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করলে হয়তো মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি আক্রমণের বড় একটি অংশ প্রতিহত করতে পারত।
কিন্তু যেখানে ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সেগুলোকে ঠেকানোর ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি সস্তা এবং দ্রুতগতির, সেখানে ইরান শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে ভাসিয়ে দেবে—এটাই ছিল স্বাভাবিক। দুটি ব্যর্থতার পর তৃতীয় আরেকটি অসম্ভব কাজ মার্কিনদের রক্ষা করতে পারল না।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর যদি ড্রোন এবং রণতরি, মাইন অপসারণকারী জাহাজ ও সুরক্ষিত বিমানঘাঁটি–সম্পর্কিত কেনাকাটার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে চোখ খোলার প্রয়োজন থেকে থাকে, তবে সেই শিক্ষা তারা পেয়ে গেছে। কিন্তু এই যুদ্ধ পেন্টাগনের ভেতরে হারেনি; এটি হেরেছে হোয়াইট হাউসের অলিন্দে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে অসম্ভব কিছু দাবি করার ঝুঁকি যদি ট্রাম্পের মাথায় না ঢোকে, তবে তা মনে করিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব। অবশ্য ট্রাম্প কোনো অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বেছে নেননি; বরং পিট হেগসেথের মতো একজন অনুগত তোষামোদকারীকে বসিয়েছেন, যাঁর চরম অক্ষমতা তাঁকে কেবল আরও বেশি অনুগত করে তুলেছে।
হেগসেথ পেন্টাগনের শীর্ষ পদে থাকা এমন যেকোনো অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ছেঁটে ফেলার জন্য বহুদূর হেঁটেছেন, যিনি অন্য কোনো মতামত দিতে পারেন। মার্কিন অফিসার কোর কখনোই রাজনীতিবিদের কাছে অপ্রিয় খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজে খুব একটা পারদর্শী ছিল না, কিন্তু হেগসেথের এই কৌশলের কারণে প্রেসিডেন্টকে থামানোর মতো কেউ পেন্টাগনে অবশিষ্ট ছিল না।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন কাঠখড় পুড়িয়ে কোনোমতে সমস্যার সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করলেও হেগসেথের অন্ধ সমর্থনের মুখে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
এর সবই পূর্বানুমানযোগ্য ছিল এবং বস্তুত এর অনেকটাই আগেভাগে বলা হয়েছিল। ফলে ইরানে এই বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক দায় ট্রাম্প এবং তাঁর অপদার্থ উপদেষ্টাদের ওপর বর্তালেও, চূড়ান্ত দায় এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকে, যা কোনো রাজনীতিবিদ স্বীকার করবেন না—আর তা হলো দেশটির ভোটাররা।
ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ছিল মার্কিন সাধারণ ভোটারদের। একজন ব্যক্তি, যিনি স্পষ্টতই অক্ষম, যিনি অপ্রিয় বা ভিন্ন কোনো তথ্য গ্রহণে চরমভাবে অক্ষম এবং যিনি নিজেকে তোষামোদকারীদের দিয়ে ঘিরে রাখতে পছন্দ করেন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতা নির্বাচন করা আর কোনো রিয়্যালিটি শোর বিনোদনমূলক উপস্থাপক নির্বাচন করা যে এক কথা নয়, সেটাই এখন প্রমাণিত। পেন্টাগনের ভেতরে হয়তো ভুলগুলো নিয়ে প্রতিবেদন লেখা শুরু হয়ে গেছে।
কিন্তু তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে মার্কিন সম্পদের ক্ষয়—এই ব্যর্থতার কৌশলগত পরিণতিগুলো যখন আরও ঘনীভূত হতে থাকবে, তখন দেখার বিষয় একটাই: আমেরিকান ভোটাররা আদৌ বুঝতে পেরেছেন কি না যে ব্যালট বাক্সে করা ভুল পছন্দ থেকে কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কখনোই তাদের সুরক্ষা দিতে পারে না।
* ব্র্যাট ডেভরোক্স, একজন সামরিক ইতিহাসবিদ, রোমান অর্থনীতি ও সামরিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিসংবলিত একটি ব্যানার। তেহরান, ইরান। ২ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স |
আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম নেই!
ফলে আজকের আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইসরাইলের বিষয়ে নীরব থাকা। কারণ ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কোনো মুসলমান ভিন্নমত পোষণ করলেই তার ওপর নেমে আসে অপবাদ, সন্দেহ ও একঘরে করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি। আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে ইসলাম ও আরব বিদ্বেষের কারণে বৈষম্য এবং হয়রানির অভিযোগ সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক প্রচারণায় ইসলামবিরোধী বক্তব্য এবং ভুল তথ্যের প্রচারণার কারণে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিমরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরলোকগত রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী বারাক ওবামার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সে সময় তাকে তার এমন কিছু সমর্থককে সামলাতে হয়েছিল, যারা ছিল নির্লজ্জ বর্ণবাদী ও কট্টর ইসলামবিদ্বেষী। ম্যাককেইনের নিজের মধ্যেও গোঁড়ামি ছিল এবং তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল কট্টরপন্থি, যার জন্য তার কিছুটা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার ভোটারদের একাংশের চরম ও ভারসাম্যহীন আচরণ তাকে হতবাক করেছিল।
ম্যাককেইনের নির্বাচনি প্রচারণার এক সভায় শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক নারী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি ওবামাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি তার সম্পর্কে পড়েছি এবং তিনি আসলে... তিনি একজন আরব।’ কথাটি বলার সময় তার কণ্ঠস্বর ধরে আসে। একজন ‘আরব’ ব্যক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন এই চিন্তাই তাকে প্রায় কান্নার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। তখন ম্যাককেইন ওই নারীকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ম্যাডাম, ওবামা একজন ভালো পারিবারিক মানুষ ও আমেরিকার নাগরিক। রাষ্ট্রীয় মৌলিক কিছু বিষয়ে তার সঙ্গে আমার মতপার্থক্য রয়েছে এবং এই নির্বাচনি প্রচারণার মূল বিষয়বস্তু সেটাই।’
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি প্রচারণায় মূলত সেসব বিষয়ই প্রাধান্য পায়, যা নিয়ে সেই নারী ২০০৮ সালেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মিশিগানে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদকে আক্রমণ করার জন্য রিপাবলিকান সিনেটররা শুধু তার নামের ওপরই বেশি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘মিশিগানের সমাজতন্ত্রী অবশেষে নিজের পুরো নাম প্রকাশ করলেন। তার নাম আবদুল রহমান মোহাম্মদ আল-সায়েদ।’ যদি একজন ‘আরব’ ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়া উদ্বেগের বিষয় হয়, তবে একজন ‘মোহাম্মদ’-এর প্রেসিডেন্ট হওয়া নিশ্চয়ই আরো ভয়াবহ কিছু হবে উগ্রপন্থি আমেরিকানদের কাছে।
নির্বাচনি প্রচারণাসহ সর্বক্ষেত্রেই আল-সায়েদের ওপর বিরোধীদের আক্রমণ এতটাই তীব্র ছিল যে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও তাকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিতে দ্বিধা করেননি। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স গর্ব করে বলেছিলেন, তিনি তার সারা জীবন ‘সন্ত্রাসীদের শিকার’ করেই কাটিয়েছেন। একই মনোভাব নিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ন্যান্সি মেস আল-সায়েদ ও নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা কি আমেরিকায় সরকারি পদে ‘সন্ত্রাসীদের’ নির্বাচিত করা বন্ধ করতে পারি না?’ এরপর তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় সরকারি পদে আসীন প্রতিটি মুসলিমই হলো এক একটি ‘ট্রোজান হর্স’ (ছদ্মবেশী শত্রু) এবং তারা জাতীয় নিরাপত্তা ও আমাদের প্রজাতন্ত্র উভয়ের জন্যই হুমকি।’
আজকের দিনে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামকে তীব্রভাবে ঘৃণা না করলে কেউ আধুনিক ও প্রগতিশীল হতে পারে না। সিআইএর সাবেক পরিচালক মাইক পম্পেও এর মতো একজন ব্যক্তি যখন খুব অনায়াসেই আল-সায়েদকে ‘হামাস সমর্থক’ বলে অভিহিত করেন, তখন বোঝা যায় যে, মুসলিমবিদ্বেষের পরিধি অনেক বিস্তৃত। এই বিদ্বেষ থেকে বাঁচতে হলে আমেরিকান মুসলিমদের বেশ কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে একটি হলো ইসরাইলের প্রতি আনুগত্য, যে শর্তটি পূরণ করতে আল-সায়েদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেনসের কোনো বেগ পেতে হয়নি। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি স্বপ্নেও ইসরাইল নিয়ে ভাবেন। এর বিপরীতে, গাজায় ইসরাইলের গণহত্যার কঠোর সমালোচনা করে এসেছেন আল-সায়েদ। ফলে তিনি যে উগ্রপন্থি ও ইসরাইল সমর্থক আমেরিকানদের শত্রু হবেন তা বলাই বাহুল্য।
আমেরিকান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার সংজ্ঞা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে শুধু ‘চরমপন্থা’ থেকে নিজেকে দূরে রাখলেই চলে না, বরং ইসরাইলের বিরোধিতা করা থেকেও বিরত থাকতে হয়। আমেরিকায় ভালো মুসলমান হওয়ার জন্য ইসরাইলের প্রতি আনুগত্যের এই যোগসূত্রটি মোটেও গোপন বিষয় নয়। দেশটির কট্টর নব্য-রক্ষণশীল (নিও-কনজারভেটিভ) চিন্তাবিদ রবার্ট কাগান সম্প্রতি বিষয়টি স্বীকার করেছেন, ‘আমেরিকা সামগ্রিকভাবে ইসলামবিদ্বেষী, তাই অনেক আমেরিকানের কাছে ইসলামের যেকোনো শত্রুই আমাদের বন্ধু। আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ একটি বাস্তবতা এবং ইসরাইলকে ইসলামের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে দেখা হয়।’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যুক্তি শুধু মুসলিমদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসরাইলের সমালোচনা করলে একজন ইহুদিও ‘খারাপ ইহুদি’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন।
ইসরাইলের পক্ষে সোচ্চার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্যতম অ্যালান ডারশোভিটজ সম্প্রতি সেসব ‘বাজে ইহুদি’র সমালোচনা করেছেন যারা আল-সায়েদ ও মামদানির মতো প্রার্থীদের সমর্থন করার সাহস দেখান। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আসল সমস্যাটা হলো ইহুদিরাই’ এবং ‘তারা আসলে কী করছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই।’
ডারশোভিটজের মতে, ‘যেকোনো ইহুদি যদি মামদানিকে ভোট দেন তবে তিনি আসলে নিজেকেই ঘৃণা করেন।’ তার এই অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও। একজন অ-ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওইসব ‘বাজে ইহুদি’র চেয়ে নিজেকে ‘অনেক বেশি কার্যকর ইহুদি নেতা’ হিসেবে দাবি করেন।’
এই প্রবণতাটি শুধু আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেহালাবাদক মাইকেল বারেনবোইম তার পর্যবেক্ষণ বলেছেন, ‘জার্মানিতে যেসব ইহুদি জায়নবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন তাদের আর প্রকৃত ইহুদি হিসেবে গণ্য করা হয় না।’ অন্যদিকে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘জুইশ ক্রনিকল’ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘এড মিলিব্যান্ড আসলে কতটা ইহুদি?’
পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে এই বার্তাটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, একজন ‘ভালো মুসলিম’ বা ‘ভালো ইহুদি’ হওয়ার জন্য শুধু ইসরাইলের প্রতি অবিচল আনুগত্যই যথেষ্ট নয়, বরং যারা ইসরাইলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে সেসব মুসলিমের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করাও ইহুদিদের জন্য জরুরি। ফলে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বে ‘ভালো’ মুসলিম হওয়ার সংজ্ঞা হচ্ছে তাকে অবশ্যই ইসরাইলের বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
* ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Saturday, August 22, 2026
ইয়েমেন নিয়ে যেভাবে খেলছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল by শাদি ইব্রাহিম
বিষয়টি ১৯৯৯ সালে মার্কিন কৌশলবিদ এডওয়ার্ড লুটওয়াকের ‘গিভ ওয়ার আ চান্স’ শীর্ষক নিবন্ধে তোলা সেই তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা ২০১৩ সালে সিরিয়া সংকটের সময় প্রয়োগ করা হয়েছিল—সব যুদ্ধের সমাপ্তি মানেই শান্তি নয়, আবার সব বিজয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না।
কখনো কখনো কৌশলগত স্বার্থ লুকিয়ে থাকে কাউকে জিততে না দেওয়ার মধ্যে, যাতে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে এবং কেউ প্রতিপক্ষকে একেবারে চূর্ণ করতে না পারে। সিরিয়া প্রসঙ্গে লুটওয়াক যুক্তি দিয়েছিলেন, সরকারি বাহিনীর জয় মানে ইরানের শক্তিশালী হওয়া, আর তার পতন মানে ‘নিয়ন্ত্রণহীন জিহাদিদের’ উত্থান। মার্কিন ও ইসরায়েলি দৃষ্টিকোণ থেকে সে সময় তাই সংঘাতকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অচল অবস্থায় রাখাই ছিল সবচেয়ে অনুকূল পথ।
এক দশকের বেশি সময় পর ইয়েমেন যেন সেই তত্ত্বেরই এক বাস্তব মহড়া দিচ্ছে; যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয় না। ইয়েমেনের সংঘাত প্রথাগত যুদ্ধ হিসেবে থমকে গেলেও জমিনে এর মীমাংসা হয়নি।
২০১৫ সালের মার্চে হুতিরা সানা দখল করার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হস্তক্ষেপের মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বাসিত করা। কিন্তু এই যুদ্ধ ইয়েমেনকে না ফিরিয়ে নিতে পেরেছে আগের জায়গায়, না পৌঁছাতে পেরেছে কোনো চূড়ান্ত উপসংহারে।
হুতিরা কখনোই পুরো দেশ দখল করতে পারেনি, আবার জোট বাহিনীও তাদের সানা থেকে সরাতে পারেনি।
২০২২ সালের মধ্যে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনগুলো স্থবির হয়ে পড়ে এবং একটি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিমের বড় অংশ এখনো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এটি কিন্তু শান্তি নয়, এটি আসলে সংঘাতকে কেবল থামিয়ে রাখা।
শূন্যতা পূরণের সমীকরণ
হুতিদের পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের অর্থ হলো সৌদি আরবের এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্তে ইরানঘেঁষা এক সশস্ত্র শক্তির স্থায়ী অবস্থান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এর অর্থ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাব আল-মানদেবের ওপর চরম ঝুঁকি। তা ছাড়া হুতি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন হতে পারে অঞ্চলের মধ্যে ইরানের এক শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি।
অন্যদিকে হুতিদের একেবারে নির্মূল করাও বেশ কঠিন। তারা কেবল ইরানের প্রক্সি বা ছায়া শক্তি নয়। ইয়েমেনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও উপজাতীয় কাঠামোর সঙ্গে তারা গভীরভাবে যুক্ত।
আসল জটিল প্রশ্ন হলো, হুতিদের পতন হলে সেই রাজনৈতিক ও সামরিক শূন্যতা পূরণ করবে কে? ইয়েমেন কখনোই একক রাজনৈতিক সত্তা ছিল না। এখানে স্বীকৃত সরকার, নানা উপজাতীয় গোষ্ঠী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত–সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয়।
এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ২০২৫ সালের শেষের দিকে ও ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশ্য রূপ নেয়, যখন এডেন ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে প্রসারিত হতে যাওয়া দক্ষিণ অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের (এসটিসি) বিরুদ্ধে সৌদি আরব সামরিক পদক্ষেপ নেয় এবং এর পেছনে আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ জানায়। পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুড-ঘেঁষা ‘ইসলাহ’ পার্টিকে দমন করার বিষয়ে রিয়াদ ও আবুধাবির মূল্যায়নেও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
এখানে প্রতিটি পক্ষের হিসাব আলাদা। হুতি ও ইরান; ইয়েমেন সরকার, সৌদি আরব ও স্থানীয় জোট; আরব আমিরাত; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—এমনকি আল-কায়েদা, সবার কাছেই ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ ও বন্ধু-শত্রুর সংজ্ঞা ভিন্ন।
২০১৫ সাল থেকে মার্কিন নীতিতে যে দোলাচল দেখা গেছে, তা এই ফ্রেমওয়ার্ক দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। ওয়াশিংটন কখনো সৌদি আরবকে অস্ত্র দিয়েছে, আবার কখনো সমর্থন গুটিয়ে নিয়েছে; কখনো আবার ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলাতে চেয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের প্রতি রিয়াদের আস্থা নড়ে যায়, এমনকি তাদের গ্রিস থেকেও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ধার করতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি সৌদি বিজয় নিশ্চিত করার চেয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাকেই স্পষ্ট করে।
২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের ওপর হামলা জোরদার করে, আবার ওমানের মধ্যস্থতায় হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলে তারাও সেই আক্রমণ থামিয়ে দেয়। এখানে লক্ষ্য হুতি শাসন বা যুদ্ধের অবসান ঘটানো ছিল না; কেবল সংঘাতের একটি নির্দিষ্ট আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
নিয়ন্ত্রিত বিভাজন
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর গাজা যুদ্ধের জেরে হুতিদের সম্পৃক্ততা তাদের এক আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে। তারা পুরো ইয়েমেন না জিতলেও বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারছে; অন্যদিকে সরকার পুরোপুরি পরাজিত না হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ।
এই বৈপরীত্য ‘বিজয়’ শব্দটিকে প্রায় অর্থহীন করে তুলেছে। ফলে ওয়াশিংটন চায় না হুতিরা একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হোক, আবার তাদের প্রতিপক্ষদেরও অলআউট যুদ্ধে যেতে দিতে চায় না। এতে বহিরাগত শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের খরচ কমে যায়, যদিও ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব কেবল নামেই টিকে থাকে।
ওয়াশিংটন জেনেশুনে লুটওয়াকের তত্ত্ব প্রয়োগ করেছে কি না, তা বড় কথা নয়; তবে এই ফ্রেমওয়ার্ক সুদান, লিবিয়া, ইরাক ও লেবাননের ঘটনা বুঝতেও সাহায্য করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নীতি সংঘাত সমাধানের চেয়ে সমাজগুলোকে বিভক্ত ও দুর্বল করে রাখার কাজই বেশি করেছে।
হুতিদের পূর্ণ বিজয় যেমন রিয়াদ সীমান্ত বিপন্ন করবে, তেমনি তাদের পুরো পতন ঘটাতে প্রয়োজন এক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ। আবার দেশভাগ এক সংকট মেটাতে গিয়ে জন্ম দেবে নতুন সংঘাতের।
বর্তমান অচলাবস্থায় প্রতিটি পক্ষই কিছু না কিছু সুবিধা পাচ্ছে—হুতিদের হাতে সানা, সরকারের হাতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সৌদির জন্য হুতি রাষ্ট্রের প্রতিহত অবস্থা, আর ইরানের হাতে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রক কার্ড। তবে এই ভারসাম্য অত্যন্ত ভঙ্গুর।
আঞ্চলিক সমীকরণেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। নতুন উদীয়মান তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান অক্ষ এখনো কোনো যৌথ সামরিক জোট নয়; রিয়াদের হয়ে আঙ্কারা বা ইসলামাবাদ যুদ্ধে নামবে কি না, তা অনিশ্চিত।
মার্কিন নিরাপত্তার ওপর পুরো নির্ভর না করে কম খরচে অস্ত্র পাওয়া এবং ইসরায়েল ও ইরানকে ভারসাম্যে রাখার জন্যই সম্ভবত এই দেশগুলোর দিকে রিয়াদ ঝুঁকছে।
এর মানে কি উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন নিরাপত্তার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে?
অনেকাংশে তা–ই। তবে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনো অটুট। তাহলে কি এই অক্ষ মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে? একেবারেই নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্ভবত এটিই চায়, যাতে অন্য শক্তিগুলো অঞ্চলটির আঞ্চলিক সংঘাত ও ঝুঁকি সামলানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেয়।
এই জোট ইসরায়েলবিরোধী—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। এটি বরং ইয়েমেনের সেই ঝুলে থাকা যুদ্ধের যুক্তিকেই তুলে ধরে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ড্রাইভিং সিটে না বসে আড়ালে থেকেই যুদ্ধের সীমা ঠিক করে দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, আর অন্যরা বহন করে তার মাশুল।
* শাদি ইব্রাহিম, ইস্তাম্বুল সাবাহাত্তিন জাইম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষণা সহযোগী। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
| বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি বাড়ির সামনে বসে আছেন এক ব্যক্তি। সানা, ইয়েমেন। ৬ জুন, ২০১৮ ছবি: রয়টার্স। |
ট্রাম্পের প্রস্তাবে নেতানিয়াহুর ভেটো by সাঈদ আরিকাত
ট্রাম্প মনে করতেন আমেরিকার শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা অতিরিক্ত সতর্কতা দেখিয়েছেন। তার মতে, মিত্র, প্রতিপক্ষ এবং আমলারা ওয়াশিংটনকে উপেক্ষা করতে শিখে গেছে, কারণ ওয়াশিংটন ভুলে গেছে কীভাবে অন্যদের বাধ্য করতে হয়। এজন্য গাজা প্রস্তাবের মাধ্যমে এর বিপরীত চিত্রই তুলে ধরার কথা ছিল, যেখানে ট্রাম্প একটি রূপরেখা চাপিয়ে দেবেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তা মেনে নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সেই অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে দাবি করে আসছে।
কিন্তু তার সেই রূপরেখাকে নেতানিয়াহুর দ্রুত প্রত্যাখ্যান শুধু আলোচনার একটি কৌশল ছিল না, বরং এটি ছিল মূলত একটি আগাম ভেটো। এর লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পের উদ্যোগটি গতি পাওয়ার আগেই সেটিকে দুর্বল করা। এই বিরোধকে একজন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে সাধারণ মতপার্থক্য হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু তাতে বিষয়টির বৃহত্তর তাৎপর্য আড়ালে পড়ে যায়। হামাসকে ‘প্রকৃত অর্থে’ নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার করা যাবে না—নেতানিয়াহুর এই অনড় অবস্থান ট্রাম্পের প্রস্তাবের মূল ভিত্তিতেই আঘাত করেছে। একই সঙ্গে এটি এমন একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, যা ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে এড়িয়ে চলেছে। সেই প্রশ্নটি হচ্ছে—যখন কোনো পরাশক্তি তার মিত্রকে নিজস্ব কূটনীতির শর্তাবলি নির্ধারণের সুযোগ দেয়, তখন বাস্তবে কী ঘটে?
ট্রাম্পের ১৫ দফা রূপরেখা পারস্পরিক পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর আওতায় একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রক্রিয়া ও ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে শুরু করবে এবং নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলি বাহিনী গাজা থেকে পর্যায়ক্রমে সরে যাবে। কিন্তু নেতানিয়াহু ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কার্যত সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছেন। তার যুক্তি হলো, হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত ইসরাইল কোনো অর্থবহ সেনা প্রত্যাহার করতে পারে না। কিন্তু ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ বলতে কী বোঝায়, তা কে নির্ধারণ করবে এবং কে তা যাচাই করবে? আর তখন কী হবে যখন ইসরাইল দাবি করবে যে, হামাস কোথাও অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে অথবা নতুন কোনো হুমকি দেখা দিয়েছে?
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যদি ইসরাইল সরকারের হাতেই থাকে, তবে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি এমন এক মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা শুধু ইসরাইলই নির্ধারণ ও পরিবর্তন করবে। এটি ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী ভেটো বা বাধার সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক ও ফিলিস্তিনি অন্তর্বর্তী কাঠামোর কাছে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর অবস্থান অনুযায়ী ইসরাইল কখন তাদের সামরিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটাবে, সেটি তারাই ঠিক করবে। হামাসের হুমকি কখন দূর হয়েছে, তা যদি ইসরাইল একাই নির্ধারণ করে, তবে উত্তরণ প্রক্রিয়া কখন শুরু হবে, তাও দেশটিই ঠিক করবে। এর ফলে নিরস্ত্রীকরণের মোড়কে গাজায় ইসরাইলের নিরাপত্তা উপস্থিতি অনির্দিষ্টকাল বজায় থাকবে।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই মতপার্থক্য সংঘাতকে আরো তীব্র করবে। ট্রাম্প চান গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে। তিনি এমন একটি কূটনৈতিক সাফল্য চান, যা তার নিজের অর্জন হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং প্রমাণ করবে যে, প্রচলিত কূটনীতি যেখানে ব্যর্থ, সেখানে মার্কিন শক্তি সফল হয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার কাছে, ইসরাইলি বিজয়ের সংজ্ঞার সঙ্গে যুদ্ধ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এমন কোনো সমঝোতা—যার মাধ্যমে লড়াইও থামল, হামাসের হাতে কিছু সক্ষমতাও রয়ে গেল অথবা ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক পক্ষের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা হস্তান্তরিত হলো, সে রকম কিছু মানবে ইসরাইল। এটিকে নেতানিয়াহুর সরকারের উগ্রপন্থি মিত্ররা যুদ্ধের মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসা বা পরাজয় হিসেবে তুলে ধরবে।
ট্রাম্প সাফল্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন লেনদেন বা বিনিময়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আর নেতানিয়াহু তা দেখেন সর্বোচ্চ অর্জনের দৃষ্টিকোণ থেকে। তারা মিত্র হলেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এক নয়। ফলে এমন এক সংঘাতের সৃষ্টি হয়, যেখানে একদিকে আছেন এমন এক প্রেসিডেন্ট, যিনি সমাধান চাইছেন, অন্যদিকে এমন এক প্রধানমন্ত্রী যার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকে আছে সেই সমাধানটি ঠেকিয়ে রাখার ওপর। ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সংঘাত ঠিক এখানেই।
নেতানিয়াহু একটি বিষয় ভালোভাবেই বোঝেন, যা ইসরাইলের আগের সরকারগুলো প্রয়োগ করেছে। আর তা হলো ইসরাইল যদি অনড় অবস্থান নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া ‘রেড লাইন’ বা কঠোর সীমারেখা আলোচনা সাপেক্ষে নমনীয় হয়। তাদের এই কৌশলটি হলো—সময়ক্ষেপণ করা, আপত্তি জানানো, নিরাপত্তার দোহাই দেওয়া, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের পিছু হটার জন্য অপেক্ষা করা। এভাবেই তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে যুগ যুগ ধরে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে। কিন্তু তারপরও ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সব কথা বা শর্ত কখনোই মেনে চলেনি। ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে তা আবার প্রমাণ হলো। সবসময়ই দেখা গেছে, সংঘাতের রাজনৈতিক মূল্য যখন বেড়ে গেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইসরাইল সরকারের কাছে নতি স্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক মিত্রকে অর্থায়ন করে চলেছে যে নিয়মিতভাবে মার্কিন নীতি অগ্রাহ্য করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এজন্য ইসরাইলের ওপর অর্থবহ চাপ সৃষ্টির পরিবর্তে শুধু গোপনে অনুরোধ করে থাকে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিনের এই ধারা অব্যাহত থাকার ওপরই ভরসা করছেন।
ট্রাম্প এ ধরনের রাজনৈতিক স্থবিরতা ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি করতে হলে শুধু নেতানিয়াহুকেই নয়, বরং দেশটির সেই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে, যা ইসরাইল সরকারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করাকে কঠিন করে রেখেছে। কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখতে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা নেতানিয়াহুকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের ঘোষিত লক্ষ্য অমান্য করলে কোনো মাশুল গুনতে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষ্ক্রিয়তা ইসরাইলের অনমনীয় মনোভাব বজায় রাখাকে বরাবরই উৎসাহিত করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। ইসরাইল যদি তার গাজা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করা অব্যাহত রাখে, তবে তিনি বা তার প্রশাসন কী করবে? এর উত্তর পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে সামরিক সহায়তার সঙ্গে শর্ত জুড়ে দেওয়া, অস্ত্র সরবরাহ ধীর করা অথবা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া যে, ইসরাইলি নীতি যখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘোষিত লক্ষ্যকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে, তখন সহায়তা আর সহজে পাওয়া যাবে না।
রাজনৈতিক এই ঝুঁকি নেওয়ার সদিচ্ছা ছাড়া মার্কিন নেতৃত্বের বুলি শুধু লোকদেখানো নাটক ছাড়া আর কিছু নয়। ‘ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে’—এই বয়ান সামনে রেখে হামাসকে ধ্বংস করা ও গাজা উপত্যকা চিরদিন দখলে রাখার জন্য ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া লাইসেন্সই বরং বহাল থাকবে। ট্রাম্প যদি ইসরাইলের পক্ষের এই বয়ানে পরিবর্তন আনতে না পারেন, তবে তা এটাই প্রমাণ করবে, ইসরাইলি নেতারা বড় কোনো শাস্তির ভয় ছাড়াই মার্কিন কূটনীতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—তাদের ক্ষমতার অভাব নয়, বরং সেই ক্ষমতা প্রয়োগের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। ক্ষমতা প্রয়োগের সদিচ্ছা ছাড়া ক্ষমতা শুধুই লোকদেখানো অভিনয়। গাজার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সেই অভিনয় ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে।
* আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী
![]() |
| মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু |
Friday, August 21, 2026
স্বৈরাচারের পরিণতি বড়ই নির্মম by জালাল উদ্দিন ওমর
পৃথিবীতে আমরা সবাই ক্ষণিকের অতিথি। নির্দিষ্ট সময় পর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পৃথিবী ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যায়। অর্থ, বিত্ত, আভিজাত্য, ক্ষমতা এবং প্রভাব প্রতিপত্তি কোনোটাই মানুষের সঙ্গে যায় না। খালি হাতেই পৃথিবীতে মানুষের আগমন এবং খালি হাতেই বিদায়। একজন ভিখারি এবং প্রেসিডেন্টের বিদায় ও একই রকম। তবু কিছু মানুষ এই চিরন্তন সত্যকে ভুলে যায়। পৃথিবীতে প্রভাব-পতিপ্রত্তি এবং ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যায়। এরা সত্যকে হত্যা করে, আইনকে মানে না এবং অন্যের অধিকার হরণ করে। নিজের স্বার্থকে হাসিল করতে মানুষের ওপর জুলুম করে। তারা মনে করে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী এবং কখনো পতন হবে না। দম্ভ এবং অহংকারে মানুষকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, যা ইচ্ছা তাই করে এবং শক্তির জোরে মানুষকে দমিয়ে রাখে। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি যে নিজেকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে চায় না। অবশেষে একদিন ধ্বংসের সময় এসে যায় এবং ধ্বংস হয়ে যায়। সব হারানোর পর তিনি ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু তখন শোধরানোর সময় থাকে না। ধ্বংসই হয় তার জীবনের অনিবার্য পরিণতি, যা তাকে ভোগ করতেই হয়।
সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষের মধ্যে সত্য-মিথ্যা লড়াই বিদ্যমান। কিছু মানুষ ন্যায় ও সত্যকে বর্জন করে অন্যায় এবং মিথ্যার পথে চলে। কিছু মানুষ অন্যায় ও মিথ্যাকে বর্জন করে ন্যায় ও সত্যের পথে চলে। ন্যায় ও সত্যপন্থিদের সঙ্গে অন্যায় ও মিথ্যাপান্থিদের দ্বন্দ্ব সংঘাত চলে। অন্যায় ও মিথ্যার অনুসারীরা প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে সবসময় ন্যায় ও সত্যের অনুসারীদের ওপর জুলুম নির্যাতন চালায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ন্যায় ও সত্যপন্থিদের বিজয় হয় এবং অন্যায় ও মিথ্যার অনুসারীদের পরাজয় হয়। অন্যায়ও মিথ্যার অনুসারীদের জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়, অপমান এবং লাঞ্ছনা। ইতিহাসের এই নিয়ম বহতা নদীর মতোই বয়ে চলছে। ফেরাউন সবসময় হজরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদের ওপর, নমরুদ সবসময় হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার অনুসারীদের ওপর এবং আবু জেহেল ও আবু লাহাবরা সবসময় হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার অনুসারীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফেরাউন, নমরুদ, আবু জেহেল এবং আবু লাহাবদের করুণ পরিণতি হয়েছে। ইতিহাসে অভিশপ্ত এবং ঘৃণিত হয়েছে। যুগে যুগে সব স্বৈরাচারেরই করুণ পরিণতি এবং সবাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এরা মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান অর্জন করতে পারেনি বরং ঘৃণা এবং অসম্মানই অর্জন করেছে।
কিছু মানুষ সবসময় বিজয়ী হতে চায়। বিজয়ী হতে আইনলঙ্ঘন করে এবং সত্যকে হত্যা করে। কিন্তু সব বিজয় বিজয় নয় এবং সব পরাজয় পরাজয় নয়। কিছু বিজয় আসলে পরাজয় এবং কিছু পরাজয় আসলে বিজয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে চলে পরাজিত হলেও তা আসলে বিজয় এবং মিথ্যা ও অন্যায়ের পথে চলে বিজয়ী হলেও তা আসলে পরাজয়। কারবালায় ইয়াজিদ এবং পলাশীতে মীরজাফর বিজয়ী হলেও, তারা আসলে পরাজিতই হয়েছে। এজন্য বিশ্বজুড়ে ইয়াজিদ এবং মীরজাফর অতি ঘৃণিত এবং বাবা-মায়েরা সন্তানের নাম ইয়াজিদ এবং মীরজাফর রাখে না। কিন্তু ইমাম হোসেন (রা.) এবং সিরাজউদ্দৌলা সেদিন পরাজিত এবং মৃত্যুবরণ করলেও, দুজনেই বিশ্বজুড়ে অতি সম্মানিত । ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে সবারই শিক্ষা নিতে হবে।
প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা কথা আছে। মানুষের ওপর জুলুম, নির্যাতন, অবিচার এবং তাদের অধিকার হরণ করলে এর পরিণতি ভোগ করতেই হবে। যেভাবেই হোক জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এর প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে। মানুষের ওপর জুলুম নির্যাতন করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এটি পৃথিবীর অতীত ইতিহাসের প্রমাণিত সত্য এবং আগামী দিনের অনিবার্য বাস্তবতা। জুলুম এবং অবিচার শুধু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এবং সমাজের ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাই করে তা নয়। সবাই কিন্তু নিজ নিজ অবস্থানে ক্ষমতাবান। কারো ক্ষমতা ছোট এবং কারো ক্ষমতা বড়। সবাইকে নিজস্ব পরিমণ্ডলে অধীনস্থ মানুষগুলোর প্রতি সদয় আচরণ করতে হবে। জনগণের শাসক না হয়ে সেবক এবং জনগণকে শোষণ না করে সাহায্য করতে হবে। জনগণ না চাইলে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু ভোটাধিকার হরণ করে, বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে স্বৈরাচার হয়ে মানুষের অধিকার হরণ করা যাবে না। প্রত্যেকেই নিজ অবস্থান থেকে মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করলে বং কারো প্রতি জুলুম না করলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বÑসর্বত্রই শান্তি বিরাজ করবে। জালিম এবং স্বৈরাচার হয়ে মানুষের প্রতি অবিচার করলে পরিণতি নিশ্চিতভাবেই নির্মম ও করুণ হবে। এ দ্রুব সত্যটি সবারই বোঝা দরকার।
* লেখক : জালাল উদ্দিন ওমর, প্রকৌশলী, ইমেইল : omar_ctg123@yahoo.com
![]() |
| এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি। |
Thursday, August 20, 2026
মক্কা চুক্তি কেন ইসরায়েল-আমিরাত জোটকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে by ডেভিড হার্স্ট
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার জবাবে একটি মুসলিম জোট গড়ে তোলার ইচ্ছার কথা বেশ স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তবে আড়ালে থেকে চতুর চাল চেলেছেন সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক—ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। ইরান যুদ্ধের দুপক্ষই যাতে তাঁর পদক্ষেপে সমন্বয় বা সহমর্মিতা খুঁজে পায়, তিনি সেভাবেই এগোচ্ছিলেন।
গত মাসে ওয়াশিংটনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে বাদ সাধেন। তিনি পেছনের শর্ত হিসেবে সৌদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার তাগিদ দেন।
দক্ষিণ ইরাকে ইরান–সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স বা মিলিশিয়াগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় সৌদি ও মার্কিন যুদ্ধবিমান। এই মিলিশিয়াগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন ইরানের আইআরজিসির ‘উপদেষ্টারা’।
সৌদি গোয়েন্দারা খবর পেয়েছিল, মিলিশিয়াগুলো কুয়েতে সীমান্ত পার হয়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সময়ে ইয়েমেনের সানাতেও হামলা চালায় সৌদি যুদ্ধবিমান। কারণ, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল।
মৌলিক পরিবর্তন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ইরানবিরোধী হামলায় যারা যোগ দিয়েছিল, সেই জোটের কাছে মনে হচ্ছিল, সৌদির শাসক অবশেষে তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়া তাঁর ভাবনায় ছিল না।
এই পুরো অঞ্চলে এখন ঘটে চলেছে মৌলিক কিছু পরিবর্তন। ইরান, গাজা ও লেবাননে ইরানের সাম্প্রতিক তিন যুদ্ধ সৌদি মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
পশ্চিমে শিক্ষিত সৌদি বিশ্লেষকেরা দেখছেন, কীভাবে দুজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের গণহত্যাকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছেন। ফলে তাঁরা আর নিজেদের পশ্চিমা শিবিরের লোক ভাবতে পারছেন না। একই সঙ্গে তাঁরা দেখছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে নিজের বিমানঘাঁটিগুলোই রক্ষা করতে পারছে না। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তৈরি হয়েছে চরম অবজ্ঞা।
সৌদি শুরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ড. আহমেদ আলতুওয়াইজরি সেসব সৌদি বুদ্ধিজীবীর অন্যতম, যাঁদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। তিনি বললেন, ‘মক্কা চুক্তি এক চরম সংকটকালে আলোর মুখ দেখেছে। ট্রাম্পের ওপর থেকে সবাই আস্থা হারিয়েছে। এই চুক্তি শুধু এই তিন দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করবে। এটি পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরব ও মুসলিম বিশ্বের আরও দেশ এই চুক্তিতে যোগ দেবে।’
এ সংঘাতে ট্রাম্পের দুর্বলতা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। তিনি যুদ্ধে জিততে পারছেন না, আবার কোনো সমাধানও বের করতে পারছেন না। ইরানি মধ্যস্থতাকারীরা বিষয়টি ধরে ফেলেছেন। তাঁরা হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নিতে চান। কারণ, তাঁরা হিসাব করছেন, ট্রাম্প কংগ্রেসে তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। আর তাতে দুর্বল অবস্থায় তাঁকে আলোচনার টেবিলে আনা সহজ হবে।
এই নতুন চুক্তিতে প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্যেরই নিজস্ব সুবিধা রয়েছে।
ড. আলতুওয়াইজরির মতে, ‘এটি ভারতকে সামলাতে পাকিস্তানকে সাহায্য করবে। তুরস্কও মনে করত, তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সরাসরি হুমকির সামনে ন্যাটো যথেষ্ট নয়। প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছিল, ইরানের পর তুরস্কের পালা। আর সৌদি আরব কেবল তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তি দিয়েই সুবিধা পাবে না, তাদের গোয়েন্দা ও যুদ্ধকৌশলগত পরিকল্পনা থেকেও লাভবান হবে।’
আড়াল থেকে প্রকাশ্যে
ইসরায়েলি কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বলছিলেন, তাঁরা ‘সুন্নি’ মুসলিম জোটের বিরুদ্ধে একটি জোট তৈরি করতে চায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা ছিল এ পরিকল্পনার মূল কেন্দ্র। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আক্রমণ সেই জোটকে আড়াল থেকে সামনে নিয়ে আসে।
যেটা আগে গোপনে চলত, সেটা এখন একেবারে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজে) আব্রাহাম আকোর্ডে বেশ উৎসাহের সঙ্গেই সই করেছিলেন। যুদ্ধের আগুনে সেই চুক্তির পরীক্ষাও হয়ে গেছে।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে যখন আবুধাবি কোণঠাসা, তখন ইসরায়েল সেখানে তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং উচ্চ প্রযুক্তির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করে। একটি আরব দেশে সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে তাদের সবচেয়ে আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করাকে তখন নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হয়েছিল।
ইসরায়েলের স্বপ্ন ছিল, শত্রুদের একবার পিষে ফেলতে পারলে ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল জোট তৈরি হবে। আর ইসরায়েল বসবে তেল, গ্যাস, অর্থ ও প্রযুক্তির সেই সংযোগস্থলের কেন্দ্রে। এই অঞ্চলের সামরিক চাবিকাঠি থাকবে তেল আবিবের হাতে।
এ পরিকল্পনায় মিসর ও সিরিয়ার মতো প্রথাগত আরব শক্তির পতন ছিল নিশ্চিত। তারা হয় নিঃস্ব হয়ে দেউলিয়া হবে, না হয় ধর্মীয় ও জাতিগত উপদলে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। আহমদ আল-শারার সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের এখনো একই পরিকল্পনা।
আমিরাত ও ইসরায়েল—উভয়ের স্বার্থই ছিল অভিন্ন। তারা ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে চেয়েছিল। এমনকি সোমালিল্যান্ডের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে ব্যবহার করে সামরিক ঘাঁটির জাল বিছিয়ে নিজেদের জলপথের সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিল। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঠিক এ প্রকল্পেরই এক মারাত্মক প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোট
এর প্রথম প্রভাব পড়বে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার কৌশলগত বিরোধকে আরও গভীর ও তীব্র করার মাধ্যমে। গত ডিসেম্বরে ইয়েমেন থেকে আমিরাতিরা বহিষ্কৃত হওয়ার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল খালেক আবদুল্লাহ লিখেছিলেন, ‘ইয়েমেন নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য আছে। সংঘাতের কারণে তা এখন শীর্ষ পর্যায়ে। সহযোগীদের মধ্যে ঝামেলা হতেই পারে, কিন্তু তারা আবার এক হয়।’
কিন্তু জানুয়ারি আসতে না আসতেই আবদুল খালেক আবদুল্লাহর সুর বদলে গেল। তিনি লিখলেন, ‘সৌদি আরব আর আমিরাতের মধ্যকার দূরত্ব কেবল ইয়েমেন সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আরও গভীর।’ সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ তখন বলেছিলেন, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ‘সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর’।
এরপর আরব আমিরাত তাদের দেশে আল অ্যারাবিয়ার এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় এবং ওপেক ত্যাগ করে।
গত মাসে অবশ্য কিছুটা সম্পর্কের উন্নতি দেখা গিয়েছিল। সৌদি রাজকীয় উপদেষ্টা তুর্কি আল শেখ একটি ছবি শেয়ার করেন। সেখানে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এবং আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘সৌদি আরব ও আরব আমিরাত: দুই ভাইয়ের গল্প এবং এক গভীর অংশীদারত্ব’। কিন্তু এই ঐক্য বেশি দিন টিকল না।
মক্কা চুক্তি নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন আবদুল খালেক আবদুল্লাহ। তিনি প্রশ্ন তুললেন, ‘এটি যদি কোনো জোট না হয়, তবে এর নাম কী?’ এরপর তিনি বড় অক্ষরে ট্রাম্পের স্টাইলে লিখলেন, ‘উপসাগরীয় সহযোগিতা এখন ভালো অবস্থায় নেই। প্রধান দেশগুলো নিজ ঘরের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজছে। নতুন আঞ্চলিক অক্ষ আর সামরিক জোট তৈরির এই দৌড় জিসিসি-কে দুর্বল করে দিচ্ছে।’
জবাবে সৌদি প্রিন্স আবদুলরহমান বিন মুসাইদ লিখলেন, ‘সমস্যা কোথায়, জনাব? যেকোনো দেশের কি নিজের পছন্দমতো চুক্তি করার অধিকার নেই? এটি কি প্রতিটি দেশের সার্বভৌম বিষয় নয়? নাকি সৌদি আরবের বেলাতেই এই যুক্তি খাটবে না!’
সৌদির ড. আহমেদ আল-সানি পোস্ট করলেন, ‘পাঁচ বছর আগে কোনো আমিরাতি অ্যাকাউন্ট থেকে “সৌদির কৌশলগত গভীরতা” নিয়ে আক্রমণ করার কথা কল্পনাই করা যেত না। মক্কা চুক্তি তেতো সত্যটা সামনে এনে দিল: বিরোধ সেখানে, যেখানে রিয়াদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা কেবল অর্থায়নই করবে না, সিদ্ধান্তও তারাই নেবে।’
সৌদিরা এখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ইয়েমেন ও সুদানে তাঁদের জীবন কঠিন করে তুলবেন। আমিরাত ইচ্ছা করেই ইয়েমেন ও সুদানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। তারা মিসরকে সৌদির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে উসকানি দেবে।
পরিস্থিতি যদি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে রিয়াদ আবুধাবিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের পথও ভাবতে পারে। স্থানীয় দ্বন্দ্ব থামানোর এটিই হবে সহজতম উপায়।
সৌদিরা তাঁদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সে কারণেই তাঁরা মক্কা চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিলেন। গত সপ্তাহে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসর সফরকালে আশা প্রকাশ করেন, কায়রোও এই চুক্তিতে যোগ দেবে এবং চার দেশ মিলে কাজ করবে।
সুরক্ষা ও সমাধান
ওয়াশিংটনে এই দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোটকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে দুভাবে—একটি হলো গভীর কৌশলগত জোট, আর অন্যটি ক্ষিপ্র কিন্তু লেনদেনসর্বস্ব জোট।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডর সিঙ্গার বলেন, ‘প্রথম দর্শনে আমিরাত-ইসরায়েল জোট দুপক্ষকেই তাৎক্ষণিক সুবিধা দেয়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মক্কা চুক্তি আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে হয়তো ইসরায়েলের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে, কিন্তু সেই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো আঞ্চলিক বৈধতা তাদের নেই। তারপরও এ যুদ্ধগুলো তাদের সামরিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। নেতানিয়াহু আর ট্রাম্প পুরো উপসাগরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের উপক্রম।
গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে বড় ধরনের অবকাঠামো তৈরি করছে। কোনো ফ্রন্ট থেকেই পিছু হটার লক্ষণ নেই। হামাস আর হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করার সামরিক লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় ও ট্রাম্পের চাপ সামলাতে গিয়ে ইসরায়েল কেবল নিজের অবস্থান কাঁটাতারে ঘিরেই শক্ত করছে।
এমন পরিস্থিতিতে আরব বিশ্ব সুরক্ষার জন্য এবং সমাধানের জন্য মক্কা জোটের দিকেই তাকিয়ে থাকবে।
* ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
![]() |
| মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬। ছবি: এএফপি |
Wednesday, August 19, 2026
ইসরায়েলের হাজার দিনের যুদ্ধ ও হামাসের কৌশল by মালিহা লোধি
এই দীর্ঘ সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। তাঁদের মধ্যে ২১ হাজারের বেশি শিশু। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। পুরো গাজা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। শুধু সাধারণ মানুষই নন, লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন সাংবাদিকেরাও। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় প্রাণ গেছে দুই শতাধিক সাংবাদিকের। আন্তর্জাতিক মহলের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গাজার আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, এ পরিস্থিতি ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে।
মানবিক বিপর্যয় এখনো ভয়াবহ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা লঙ্ঘন করে চলছে হামলা। অথচ বিশ্বের দৃষ্টি অন্যত্র সরে গেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং তাদের সম্ভাব্য সমঝোতা। আঞ্চলিক শক্তিগুলোও গাজা প্রসঙ্গ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। ফলে গাজা কার্যত আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শান্তি পরিকল্পনাও তাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।
এ প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি বদলাতে চায় হামাস। আন্তর্জাতিক মহলের নজর ফেরাতে তারা নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত সপ্তাহে তারা ঘোষণা করেছে, গাজায় তাদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ক্ষমতা তারা একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে তুলে দেবে। প্রায় দুই দশক ধরে গাজায় কার্যত শাসনক্ষমতায় ছিল হামাস। এখন তারা সেই দায়িত্ব ছাড়তে চাইছে।
এই নতুন সংস্থার নাম ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা, সংক্ষেপে এনসিএজি। এটি মূলত ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞদের একটি অন্তর্বর্তী কমিটি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এটি গঠিত হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কমিটি গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেবে এবং বোর্ড অব পিস নামে একটি সংস্থার তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে ছিল ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা। প্রথম ধাপে ছিল ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটাই কার্যকর হয়নি।
এনসিএজিকে কোনো সম্পদ বা সহায়তা দেওয়া হয়নি। তারা এখনো কায়রোয় আটকে আছে। ইসরায়েল তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীও এখনো মোতায়েন হয়নি। বোর্ড অব পিস কার্যত নিষ্ক্রিয়। আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতায় তারা জড়িয়ে আছে। এমনকি তাদের জন্য গঠিত তহবিলেও কোনো অর্থ নেই।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন বোর্ড অব পিস ঘোষণা করে, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য রাষ্ট্রসংঘের সংস্থা ইউনরার গাজায় আর কোনো ভূমিকা থাকবে না। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এ সিদ্ধান্তকে শরণার্থী সমস্যাকে মুছে ফেলার চেষ্টা বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
এর পাশাপাশি দক্ষিণ গাজায় একটি ‘নিয়ন্ত্রিত মানবিক অঞ্চল’ তৈরির পরিকল্পনাও করছে বোর্ডটি। সেখানে যাচাই করা কিছু ফিলিস্তিনিকে রাখা হবে। এ পরিকল্পনাকে অনেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী বলে মনে করছেন। অনেকের মতে, এটি জোরপূর্বক জনসংখ্যা স্থানান্তরের শামিল।
হামাস বলেছে, তারা শাসনক্ষমতা ছাড়ছে, যাতে ইসরায়েল তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত হারায়। এ ঘোষণা দিয়ে তারা তাদের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। এর লক্ষ্য, ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করা এবং শান্তিপ্রক্রিয়াকে আবার সচল করা।
তবে ইসরায়েল এ ঘোষণাকে গুরুত্ব দেয়নি। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে ‘চালাকি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, নিরস্ত্রীকরণ এড়াতেই এ কৌশল নিয়েছে হামাস।
বোর্ড অব পিস জানিয়েছে, তারা কথার চেয়ে কাজকে গুরুত্ব দেবে। তাদের মতে, গাজায় সব অস্ত্র এনসিএজির নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। কিন্তু হামাস নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কিছু বলেনি। শুরু থেকেই তাদের অবস্থান পরিষ্কার—ইসরায়েল যদি গাজা থেকে পুরোপুরি সরে যায় এবং দখলদারি শেষ করে, তবেই তারা অস্ত্র ছাড়ার কথা ভাববে।
হামাস আরও বলছে, আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিনি প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। কারণ, কোনো কার্যকর প্রশাসন না থাকলে তারা অস্ত্র কার হাতে তুলে দেবে?
বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন গাজার ৭০ শতাংশ দখলে নিতে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, গাজার ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’গুলোয় অনির্দিষ্টকালের জন্য সেনা থাকবে। সেনা প্রত্যাহারের কোনো সময়সীমা নেই।
হামাসের পদক্ষেপ অনেকের কাছে প্রতীকী মনে হতে পারে। কিন্তু তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব। যদি ১৩ সদস্যের এই টেকনোক্র্যাট কমিটিকে (যার নেতৃত্বে রয়েছেন আলি শাথ) গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা প্রশাসনের দায়িত্ব নিতে পারবে। কিন্তু সে পথও আটকে রেখেছে ইসরায়েল।
কায়রোয় বিভিন্ন বৈঠক হয়েছে। সেখানে হামাস, অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী, বোর্ড অব পিসের প্রতিনিধিরা, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা অংশ নিয়েছেন। তবু অচলাবস্থা কাটেনি। শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে মতভেদ রয়ে গেছে।
এখন কী হবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। ট্রাম্প প্রশাসন গাজা পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে কতটা আগ্রহী, সেটাই মূল প্রশ্ন। আপাতত তাদের সমস্ত মনোযোগ ইরান সংকটের দিকে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানি তেল বিক্রির অনুমতিও বাতিল করেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ। তবে আলোচনার দরজা খোলা আছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। ট্রাম্পের অস্থিরতা, খামেনির অন্ত্যেষ্টির পর ইরানের কঠোর অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। ফলে গাজার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নজর ফেরার সম্ভাবনা কমছে।
আরেকটি প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে—ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কতটা চাপ প্রয়োগ করবে। এখন পর্যন্ত তারা কার্যত চোখ বন্ধ করে রয়েছে। গাজায় হামলা, ত্রাণে বাধা, নতুন এলাকা দখল—এসব নিয়ে ওয়াশিংটনের বক্তব্য নীরব।
বরং তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের দাবি। কিন্তু ইসরায়েলের দৈনন্দিন হামলা বা পশ্চিম তীরে কার্যত দখলদারি, অভিযান, বেদুইন ও পশুপালক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন—এসব বিষয়ে তারা কিছু বলছে না।
এর মধ্যে নেতানিয়াহু আসন্ন নির্বাচনের মুখে। তাঁর জনসমর্থন কমছে। ফলে শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে তিনি আরও অনিচ্ছুক হয়ে উঠেছেন।
সব মিলিয়ে গাজার শান্তি পরিকল্পনার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। আবারও ফিলিস্তিনিদের সামনে শান্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা পেয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস আর অন্তহীন যন্ত্রণা।
* মালিহা লোধি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাষ্ট্রসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত।
- ডন থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।
![]() |
| গাজাকে যেভাবে সাজানো বা পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কোলাজ: প্রথম আলো |
হামাস কি তাহলে শেষ হয়ে গেল? by তামির আজরামি
তবে এই বাস্তবতাগুলো থেকে যদি সরাসরি এই সিদ্ধান্তে আসা হয়—‘হামাসের ইতি ঘটেছে’, তা হবে বড় ভুল। একটি আংশিক সামরিক পরাজয় মানেই একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিলুপ্তি নয়। শাসনক্ষমতা কমে যাওয়া মানেই প্রভাব একদম মুছে যাওয়া নয়। আর জনগণের একটি অংশের সমর্থন হারানো মানেই হামাস ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মুছে গেছে তা বলা চলে না।
এ কারণেই ‘হামাসের সমাপ্তি ঘটেছে’—এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। বরং এটি বলা বেশি যথার্থ যে, হামাস এই যুদ্ধ থেকে একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে বের হয়েছে: সামরিকভাবে দুর্বল, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি ওজনদার; এখন শাসন করার ক্ষমতার চেয়ে টিকে থাকার সক্ষমতার ওপরই তারা বেশি নির্ভরশীল। তবুও, তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি বা তাদের বিকল্প অন্য কেউ তৈরি হয়নি। ফিলিস্তিনে এখনও এমন কোনো শক্তি উঠে আসেনি যা হামাসের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতে পারে।
মূল প্রশ্নটি এটা নয় যে: ৭ অক্টোবরের আগে হামাস যতটা শক্তিশালী ছিল, এখনো কি ততটাই আছে? এর উত্তর পরিষ্কার: না। আসল প্রশ্ন হলো: গাজার ভবিষ্যৎ কিংবা ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা কি হামাস হারিয়ে ফেলেছে? এখানে উত্তরটি একদম ভিন্ন। বন্দী বিনিময় প্রক্রিয়া, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি, গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কিংবা যুদ্ধের পর ‘পরবর্তী’ পরিকল্পনা—সবক্ষেত্রেই হামাস এখনও একটি বড় ফ্যাক্টর। এমনকি যারা হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়, তারাও তাদের ভূমিকা, অস্ত্র কিংবা প্রভাবকে ঘিরে আলোচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। এটিই প্রমাণ করে যে হামাসের অবসান ঘটেনি।
একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক ক্ষমতার পতন আর একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিলুপ্তির মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। হামাস হয়তো আগের মতো গাজা শাসন করতে পারবে না, কিন্তু সংঘাতের রাজনীতিতে তাদের কাছে এখনও বড় একটি শক্তি রয়ে গেছে: অন্য কাউকেও সহজে গাজা শাসন করতে না দেওয়ার ক্ষমতা।
রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখার জন্য সব সময় সরকারে থাকার প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো কোনো একটি পক্ষকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব বা অনেক কঠিন।
যারা হামাসের অবসান দেখছেন, তারা এই সত্যটি এড়িয়ে যাচ্ছেন যে খোদ ইসরায়েলও কিন্তু হামাস শেষ হয়ে গেছে—এমন আচরণ করছে না। হামাস সত্যিই শেষ হয়ে গেলে যুদ্ধ, অবরোধ, চাপ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার ইসরায়েলি অজুহাতও শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ইসরায়েল এখনও হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, তাদের ফিরে আসা ঠেকানো এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। এর মানে, মুখের কথা যাই হোক না কেন, ইসরায়েল মনে মনে ভালো করেই জানে যে হামাস এখনও এই সমীকরণের অংশ।
মূলত, ‘হামাস একটি বড় হুমকি’—ইসরায়েলের এই অবস্থানটি দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করে। এক. এটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং গাজার বড় অংশ দখল করে রাখার অজুহাত দেয়। দুই. এটি যুদ্ধের পরের বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে—যেমন: যুদ্ধের পর গাজা কে চালাবে? ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কী? স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো পথ তৈরি হবে, নাকি কেবল স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে? ‘হামাস আতঙ্ক’ বাঁচিয়ে রেখে তেল আবিব মূলত এই কঠিন প্রশ্নগুলো থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
গাজার ভেতরের পরিস্থিতি অবশ্যই জটিল। মানুষের চরম ক্ষোভ রয়েছে, অনেকেই এই বিপর্যয়ের জন্য হামাসকে আংশিক দায়ী ভাবছেন এবং যে কোনো স্লোগানের চেয়ে মানুষের কাছে এখন পানি, বিদ্যুৎ, খাবার, ওষুধ ও নিরাপত্তা পাওয়াটা বেশি জরুরি। তবে এই ক্ষোভের অর্থ এই নয় যে গাজাবাসী ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বা বিকল্প মেনে নিচ্ছে। এর মানে এই নয় যে তারা আত্মসমর্পণ করতে চায় বা ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীনতার অধিকার ছেড়ে দিয়েছে।
যুদ্ধ না চাওয়া কোনো গাজাবাসী রাতারাতি আত্মসমর্পণের সমর্থক হয়ে যান না। আবার হামাসের সমালোচনা করা মানেই কেউ ইসরায়েলের সমর্থক হয়ে গেছে—এমনটা ভাবাও ভুল। নিজের দেশের নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তের বিচার করা আর যে জাতীয় সংগ্রামের ভেতর থেকে সেই নেতৃত্বের জন্ম, সেটিকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেওয়া—এই দুটির মধ্যে স্পষ্ট তফাৎ রয়েছে।
হামাসের জনভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে—এমন দাবি করার ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গণহত্যার মতো যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া একটি সমাজ এত সহজে স্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারে না। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে, তাঁবুতে বসে মানুষ যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে তা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তাৎক্ষণিক ক্ষোভকে দশক ধরে টিকে থাকা একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ধরে নেওয়াটা তড়িঘড়ি বিশ্লেষণ হবে।
হামাস কেবল গাজার একটি সরকার নয়। এটি একটি সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিক নেটওয়ার্ক। এটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের এমন একটি অংশ, যা তাদের আগেও ছিল এবং পরেও থাকবে। তাই কেবল শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে এই আন্দোলন শেষ করা সম্ভব নয়। দখলদারির বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া সংগঠনগুলো তাদের নেতাদের মৃত্যু বা পরিকাঠামো ধ্বংসের কারণে একেবারে মরে যায় না। তারা আকারে ছোট হতে পারে, বদলাতে পারে, নতুন নামে ও নতুন কৌশলে আবার ফিরে আসতে পারে।
এখানেই আমাদের বুঝতে হবে আগের হামাস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হামাসের মধ্যে পার্থক্য কী। হয়তো গাজার শাসক হিসেবে হামাসের পুরোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। অবরুদ্ধ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ভূখণ্ডে একই সঙ্গে সরকার পরিচালনা ও প্রতিরোধ আন্দোলন চালানোর মোহ হয়তো ভেঙে গেছে। হয়তো সংগঠনটি এখন অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান কোনো রূপ গ্রহণে বাধ্য হবে। কিন্তু এটি হামাসের ধ্বংস নয়, বরং এটি হামাসের একটি নির্দিষ্ট সংস্করণের সমাপ্তি মাত্র।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সঙ্গে মূল পার্থক্যটা এখানেই। অনেকে হামাসের ওপর আসা আঘাতগুলোকে তাদের বিলুপ্তির প্রমাণ হিসেবে দেখেন; আমি সেগুলোকে দেখি নতুন এক যুগে প্রবেশের আলামত হিসেবে। অবসান মানে ইতিহাস থেকে মুছে যাওয়া, আর রূপান্তর মানে পরাজয় ও নতুন বাস্তবতার চাপে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে কারণগুলো হামাসের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলো কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। দখলদারি শেষ হয়নি, অবরোধ ওঠেনি, বসতি স্থাপন থামেনি, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তৈরি হয়নি, আর গাজাও কোনো মুক্ত বা নিরাপদ স্থান হয়ে ওঠেনি। যতক্ষণ এই কারণগুলো থাকবে, ততক্ষণ হামাস বা তার চেয়েও নতুন কোনো রূপ বা নতুন ধারার প্রতিরোধ জন্ম নেওয়ার মতো পরিবেশ থেকেই যাবে।
তাই ‘হামাসের কি অবসান ঘটেছে?’—প্রশ্নটি এভাবে করাটাই হয়তো ভুল। সঠিক প্রশ্নটি হওয়া উচিত: এই যুদ্ধের পর হামাস কী রূপ ধারণ করবে? তারা কি একটি শাসক দল হিসেবে থাকবে, নাকি শুধুই রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে? তারা কি তাদের সামরিক শাখা পুনর্গঠন করবে, নাকি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে কিছুটা পেছনে সরবে?
হামাসের অবসান ঘোষণা করা বস্তুনিরপেক্ষ বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বেশি। ইসরায়েল যখন বিজয়ের গল্প বলতে চায়, তখন বলে হামাস শেষ; আবার যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত দরকার হয়, তখন বলে হামাস এখনও বড় হুমকি। অন্যদিকে, হামাসবিরোধী অনেক গোষ্ঠীও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব থেকে এর অবসান দেখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা সকলের ইচ্ছার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।
হামাস শেষ হয়ে যায়নি, তবে তারা আর আগের মতো নেই। এটাই হয়তো সবার জন্য সবচেয়ে কঠিন সত্য—হামাসের নিজের জন্য, ইসরায়েলের জন্য, ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং এমন সবার জন্য যারা জটিল একটি সংকটের সহজ উত্তর খুঁজছেন।
একটি যুদ্ধে একটি দল হেরে যেতে পারে, তাদের মূল পরিকাঠামো ধ্বংস হতে পারে, তাদের সমর্থকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের উপস্থিতি বজায় থাকে এবং তাদের জন্ম দেওয়া মূল কারণগুলো বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত অবসান ঘোষণা করা সম্ভব নয়।
তাই আসল প্রশ্ন হামাস শেষ হয়েছে কি না তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো: এই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোন রূপের হামাস বের হয়ে আসবে?
* তামির আজরামি, বেলজিয়ামে বসবাসকারী লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।
![]() |
| হামাসের সশস্ত্র মহড়া। ফাইল ছবি: এএফপি |
Tuesday, August 18, 2026
ইরান ও ইউক্রেন যেভাবে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করছে by ওমর আশুর
সাম্প্রতিক সময়ের হামলা ও পাল্টা হামলা এই বাস্তবতা তৈরি করেনি, বরং এটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ওয়াশিংটন হয়তো এখন স্থলভাগে সেনা অভিযান, ইরানের বিদ্যুৎ-জ্বালানির মতো জরুরি অবকাঠামোতে হামলা, কিংবা ইসফাহান প্রদেশের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর গভীরে লুকিয়ে থাকা পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হেনে সংঘাত বাড়াতে পারে।
এসব পদক্ষেপে ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং যুদ্ধও ছড়াবে, সন্দেহ নেই। তবে এতে সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে রাখা ইরানের নৌ প্রতিরক্ষাব্যূহ ধসে পড়বে না, কিংবা প্রণালি হিসেবে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বও কমবে না।
গত মাসেই তেহরানে দেখা গেছে এই যুদ্ধের এক রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবন। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল শোক পালনের অনুষ্ঠান ছিল না; ভয়াবহ হামলা, শীর্ষ নেতৃত্ব হারানো আর বোমাবর্ষণের পর ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধারাবাহিকতা কতখানি বজায় রাখতে পেরেছে, এটি ছিল তারই এক শক্তি প্রদর্শন।
এই টিকে থাকার শক্তি কেবল সমুদ্র তৈরি করেনি, তবে সমুদ্র সেই শক্তিকে ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নিজের আকাশসীমা সুরক্ষিত না থাকা সত্ত্বেও ইরান পশ্চিমাদের ভারী আক্রমণ হজম করতে পেরেছে একটি বড় কারণে—সমুদ্রে তাদের একটি জবরদস্তিমূলক দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল। আকাশে চালানো প্রতিটি হামলার একটি বিশাল মূল্য দিতে হবে ওয়াশিংটন, উপসাগরীয় রাজধানী, বিমা কোম্পানি ও বিশ্ব জ্বালানির বাজারকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে বিষের পেয়ালায় চুমুক দিতে বাধ্য করতে পারেনি—যেমনটা একসময় রুহুল্লাহ খোমেনি করেছিলেন।
দেখা গেল, ট্রাম্প নিজেই নিজের তৈরি করা ফাঁদে পড়েছেন। ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা শতভাগ ধ্বংস করা হয়েছে’—নিজের এই অসত্য দাবির পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি পিছু হটেছেন। ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার যে মধ্যবর্তী চুক্তি হলো, তা কিন্তু ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি ছিল সমুদ্রের এক কঠিন বাস্তবতার কূটনৈতিক রূপান্তর।
একে হয়তো চিরাচরিত অর্থে কোনো ‘জয়’ বলা যাবে না। তবে এটি ছিল ওয়াশিংটনের যুদ্ধচেষ্টাকে কৌশলগতভাবে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর এক নিখুঁত উদাহরণ।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানশক্তি ইরানের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করতে পেরেছে, অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে, শীর্ষ সামরিক কর্তাদের হত্যা করেছে। কিন্তু সরকার পতন, ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা কিংবা পুরোপুরি সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো উদ্দেশ্যগুলো অর্জিত হয়নি।
ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘অরতেশ’-এর পদাতিক শক্তিতে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরান তাদের সামরিক কাঠামোর যে অংশকে সুরক্ষিত আকাশের ওপর নির্ভর না করে তৈরি করেছিল—অর্থাৎ তাদের উপকূলীয় নৌ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনব্যবস্থা—তা তার সামরিক কার্যকারিতা ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষমতা, দুটোই অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
ইতিহাসের শিক্ষা
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যে কতটা বিপজ্জনক, ইতিহাস তা বহুবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে হ্যানয়ে এক মার্কিন কর্নেল হ্যারি জি সামারস জুনিয়র তাঁর উত্তর ভিয়েতনামি প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন, ‘তোমরা কিন্তু আমাদের যুদ্ধের ময়দানে কখনোই হারাতে পারোনি।’
উত্তর ভিয়েতনামের কর্নেল টু এর উত্তর দিয়েছিলেন খুব সংক্ষেপে, ‘কথাটা সত্যি হতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিকতাহীন।’
২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের যেকোনো মূল্যায়নে কথোপকথনটি বড় এক শিক্ষা হয়ে ওঠার কথা। এ কথার পেছনের যুক্তি খুব সহজ, আকাশপথে আপনি কতটা একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাচ্ছেন, তা দিয়ে যুদ্ধ জয় নিশ্চিত হয় না, যদি না আপনি শত্রুর কৌশলগত অবস্থান ও তার মানসিক শক্তিতে ফাটল ধরাতে পারেন।
একই কথা সমুদ্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১৯৮০-এর দশকের ট্যাংকার যুদ্ধের কথা ধরা যাক। সাত বছরের রক্তক্ষয়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরান যখন এমনিতেই ক্লান্ত, ঠিক তখন আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একাধিক অভিযানের মাধ্যমে—আর্নেস্ট উইল, প্রাইম চ্যান্স, নিম্বল আর্চার এবং সর্বশেষ প্রেয়িং ম্যান্টিস।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে এক দিনের অভিযানে মার্কিন বাহিনী মূল ইরানি নৌসম্পদ ও তেল প্ল্যাটফর্মের কমান্ড পোস্টগুলো ধ্বংস করে এক বিরাট জয় পেয়েছিল। কিন্তু সেই জয় এসেছিল এক অভিজ্ঞতাশূন্য, ক্লান্ত ইরানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ এসকর্ট, মাইন অপসারণ ও আক্রমণের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল।
সেগুলো ছিল শাসনক্ষমতা বদলানোর মতো বড় উদ্দেশ্যের তুলনায় অনেকটাই সীমিত এবং এক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত মিশন।
কিন্তু আজকের পরিস্থিতি মার্কিন বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান তাদের নৌশক্তিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। একদিকে নিয়মিত নৌবাহিনী ‘নেদাজা’, যারা গভীর সমুদ্রে নিজেদের অবস্থান জাহির করতে চায়; অন্যদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘নেদসা’, যারা পারস্য উপসাগরকে এক কঠিন ও অনিশ্চিত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
নেদাজা মূলত একটি প্রথাগত ও মর্যাদার নৌবাহিনী। কিন্তু নেদসা হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা শত্রু প্রতিরোধ, হয়রানি, ধোঁয়াশা ও কৌশলগত কার্যকারিতার জন্য তৈরি।
প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ের মতো ভৌগোলিক অবস্থানও এক নিরপেক্ষ ব্যাপার। এটা বন্ধু বা শত্রু, যে কারোর কাজেই লাগতে পারে। কিন্তু কৌশল, কাজের পদ্ধতি, যুদ্ধ উপকরণের অভিযোজন এবং কমান্ড কালচার দিয়ে সেই ভূগোলকে কতটা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়। ইরান এ শিক্ষা আকাশের চেয়ে সমুদ্রেই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে।
এগুলো কোনো বিমানবাহী রণতরি নয়। এগুলো হলো সমুদ্রে বসানো একেকটি অদম্য দুর্গ এবং অনিশ্চয়তা তৈরির কারখানা।
সমুদ্রের দাবার চাল
ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে সমুদ্রের লড়াই স্থলযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া হাতছাড়া হওয়ার পর ইউক্রেন তাদের নৌসম্পদের বড় অংশ হারায়, আর ২০২২ সালের মধ্যে তাদের প্রথাগত কোনো নৌবাহিনীই অবশিষ্ট ছিল না।
তা সত্ত্বেও ইউক্রেন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল, বিশেষ অভিযান, ড্রোন বোট এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভর করে কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশকে রাশিয়ার জন্য এক নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত করে।
এর ফলাফল শুধু কৌশলগত নয়, ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউক্রেন রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের সেভাসতোপোল ঘাঁটি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এতে রাশিয়ার অবাধ নৌ চলাচল বন্ধ হয়েছে এবং ইউক্রেন ওদেসা বন্দর দিয়ে নিজেদের পণ্য রপ্তানি পথ আবার চালু করতে পেরেছে।
মূলত সাগরে সম্পূর্ণ আধিপত্য না থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন রাশিয়ার বড় বড় উদ্দেশ্য—যেমন ইউক্রেনকে অবরুদ্ধ করা, ওদেসায় চাপ সৃষ্টি করা এবং ক্রিমিয়াকে সুরক্ষিত রাখা—ব্যর্থ করে দিতে পেরেছে।
ইরানের উপসাগরীয় রণকৌশলও ঠিক আমেরিকার বিরুদ্ধে এই একই ব্যবস্থার এক রূপ। তেহরানের উদ্দেশ্য মার্কিন নৌবাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে হারানো নয়। তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিশাল শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে এসেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে হেরে যেতে পারে।
এ থেকে শিক্ষা স্পষ্ট, দুর্বল শক্তির জন্য সমুদ্রকে অবরুদ্ধ করা কেবল এক বিকল্প পথ নয়, এটিই এখন যুদ্ধ জয়ের বড় অস্ত্র। কৃষ্ণসাগরে এই কৌশল ব্যবহার করে ইউক্রেন যেমন এক পরাশক্তিকে রুখে দিয়েছে, ঠিক তেমনি উপসাগরে ইরানও কোনো বড় নৌযুদ্ধ না জিতেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
অবশ্য ইউক্রেন ও ইরানের ঘটনা হুবহু এক নয়। ইউক্রেন সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে এবং বাণিজ্যপথ সচল রাখতে এসব ব্যবহার করেছে। আর ইরান তা ব্যবহার করেছে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে—বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে, বিমা মাশুল বাড়াতে এবং ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিতে যে বিমান হামলার একটা বড় আর্থিক মূল্য সমুদ্রেই চোকাতে হবে।
ইরানের এই পথ কোনো প্রথাগত নৌসংগ্রাম নয়; এটি হলো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নৌ অবরোধের এক চতুর মিশ্রণ।
পরিস্থিতি তাই এক বড় বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ইরান হয়তো আকাশে অনেক লড়াইয়ে হেরেছে, কিন্তু সমুদ্রের কারণে তাদের কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্র আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখালেও সমুদ্রকে অপ্রাসঙ্গিক করতে পারেনি।
ইউক্রেন বিশ্বকে দেখিয়েছে, নৌবহর না নিয়েও একটি বিশাল নৌবাহিনীকে ঠেকিয়ে দেওয়া যায়। আর ইরান দেখিয়ে দিল, একটি বড় নৌযুদ্ধ না জিতেও কীভাবে এক পরাশক্তির মূল উদ্দেশ্যগুলোকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়া যায়।
* ড. ওমর আশুর, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
![]() |
| হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌযানের টহল। ফাইল ছবি: এএফপি |
ইরানি বিপ্লব এখন তৃতীয় অধ্যায়ে by সাইয়্যেদ মার্কোস তেনোরিও
প্রথম পর্যায়টি চিহ্নিত হয়েছিল ইসলামি বিপ্লব, ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং ‘ওয়ালিয়াত আল–ফাকিহ’; অর্থাৎ ইসলামি আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব বা শাসনব্যবস্থাভিত্তিক একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে। এই কাঠামোর মধ্যে একই সঙ্গে বিপ্লবকে সংরক্ষণ, দেশের ভূখণ্ড রক্ষা এবং বিপ্লবের নীতিগুলোকে এমন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা জরুরি ছিল, যা বিপুল বাহ্যিক চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম।
দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর এবং আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির উত্থানের মধ্য দিয়ে। এ সময় ইরান কেবল টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা একটি বিপ্লব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নিজেকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সুসংহত করেছে।
এই সময়েই গড়ে উঠতে শুরু করে পরবর্তীকালে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামো। এতে এমন বিভিন্ন আন্দোলন ও শক্তি যুক্ত ছিল, যেগুলোর জাতীয় ও মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য এবং ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরোধিতায় তাদের অবস্থান ছিল অভিন্ন।
তৃতীয় পর্যায়টি শুরু হচ্ছে এখন, আরও নাটকীয় পরিস্থিতিতে—যুদ্ধের মধ্যেই নেতা সাইয়্যেদ আলী খামেনির শাহাদাত এবং আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনির উত্থানের পর।
সাম্প্রতিক সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বে পরিবর্তনগুলো থেকে মনে হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর সংঘাত থেকে অর্জিত শিক্ষাগুলোকে ইরান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), বাসিজ গণসংগঠন এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নতুন নিয়োগ থেকে কমান্ড কাঠামোর অধিকতর কেন্দ্রীকরণ, গোয়েন্দা সক্ষমতা জোরদার, অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট প্রস্তুত করা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সংবেদনশীল বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে আইআরজিসির নৌবাহিনীতে অভিজ্ঞ কমান্ডারদের নিয়োগ অতিরিক্ত গুরুত্ব বহন করে এমন এক সময়ে, যখন হরমুজ প্রণালি আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন নেতৃত্বের গ্রহণ করা ভাষা ও অবস্থান। ইরানের প্রচলিত ‘কৌশলগত ধৈর্যের’ নীতি যেন এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিরোধক্ষমতার একটি মতবাদকে জায়গা করে দিচ্ছে, যার সঙ্গে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার কথাও স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে এই রূপান্তরের অর্থ এই নয় যে ইরান তার কৌশলের আঞ্চলিক মাত্রা পরিত্যাগ করে কেবল নিজস্ব সীমান্ত রক্ষাকেন্দ্রিক নীতির দিকে এগোচ্ছে। বরং এখানেই ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বজায় রয়েছে।
সম্প্রতি হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য এবং বহির্বিশ্ববিষয়ক রাজনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান বাসেম নাইম বলেছেন, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং গাজা, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের অবসানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই যে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, তা হামাস ‘গভীর আগ্রহের সঙ্গে’ গ্রহণ করেছে।
এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে যদি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ আঞ্চলিক কৌশলগত গভীরতা তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে, তাহলে তৃতীয় পর্যায়ে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আরও প্রত্যক্ষ সংঘাতের পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হবে বলেই মনে হচ্ছে।
এই কাঠামোর মধ্যে গাজা ইরানের পররাষ্ট্রনীতির কোনো প্রান্তিক ইস্যু নয়। ফিলিস্তিন এখনো সেই রাজনৈতিক ও প্রতীকী উপাদানগুলোর অন্যতম, যা এই আঞ্চলিক কাঠামোকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
অতএব, আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মধ্যে কেবল আপাতদৃষ্টিতে একটি বিরোধ রয়েছে। ইরানের কৌশলগত চিন্তায় অধিকতর সামরিক শক্তির উদ্দেশ্য হলো আগ্রাসনের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে প্রতিরোধক্ষমতাকে শক্তিশালী করা।
কূটনীতি এই কৌশল থেকে হারিয়ে যায়নি। কিন্তু দৃশ্যত এটিকে আর যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে না। অতএব, ইরান হয়তো কোনো ‘তৃতীয় প্রজাতন্ত্রে’ প্রবেশ করছে না; বরং এটি তার বিপ্লবের তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করছে—যার সূচনা হচ্ছে যুদ্ধ, প্রতিপক্ষদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাত এবং প্রতিরোধনীতির গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে।
সম্ভবত আগের কোনো পর্যায়ই এমন একটি কৌশলগত পরিবেশে শুরু হয়নি, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিরোধ, অভিযোজন এবং শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাকে এত স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। প্রতিপক্ষদের সর্বোচ্চ চাপের মধ্যেই ইরানি বিপ্লবের এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে—পশ্চাদপসরণের প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে টিকে থাকা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে।
* সাইয়্যেদ মার্কোস তেনোরিও, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিবিষয়ক একজন ইতিহাসবিদ, লেখক ও বিশ্লেষক। তিনি ব্রাজিল-ইরান ফ্রেন্ডশিপ ইনস্টিটিউটের সভাপতি।
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।
![]() |
| তেহরানের রাস্তায় একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ইরানি। ১১ মে, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স |
তালেবান পাঁচ বছরে যা অর্জন করেছে, যা করতে ব্যর্থ হয়েছে by ওবাইদুল্লাহ বাহির
২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সেনারা তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ছিল। সেই সময়ের বিশৃঙ্খলার মধ্যে বোমা হামলায় প্রায় ২০০ আফগান প্রাণ হারান।
আজকের কাবুল অনেকটাই ভিন্ন। বোমা হামলা ঠেকাতে শক্ত দেয়াল, নিরাপত্তাব্যবস্থা আর যান চলাচলে বাধা দেওয়া অস্ত্রধারী বহর এখন আগের মতো নেই। শহরটি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন ও শান্ত। স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে কাবুল। তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্তিতে তাই দেখা দরকার, তারা কী অর্জন করেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে।
তালেবানের প্রথম শাসনামলের বড় ব্যর্থতা ছিল পুরো আফগানিস্তান দখল করতে না পারা। যেসব প্রদেশ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেছিল, পরে সেগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তালেবানবিরোধী লড়াইয়ের ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
এবার তালেবান সেই ভুল করেনি। তারা পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং তুলনামূলক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারের শেষ বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রদেশের যে হুমকি ছিল, সেটিও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে।
এখন বড় কোনো বিদ্রোহী চ্যালেঞ্জ নেই। আফগানরা দেশের এমন অনেক এলাকায় যেতে পারছেন, যেখানে আগে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। দীর্ঘ সংঘাতের দেশে এটিকে তালেবানের বড় অর্জন হিসেবেই দেখতে হবে।
অর্থনীতির চিত্র অবশ্য জটিল। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগের দুই দশকে আফগান অর্থনীতি আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতাও অর্থনীতিকে দুর্বল করেছিল। ২০২১ সালে বিদেশি সহায়তা হঠাৎ কমে যাওয়ায় বড় ধাক্কা এলেও তালেবান অর্থনীতিকে সচল রাখতে পেরেছে। নিরাপত্তার উন্নতিতে ব্যবসা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বেড়েছে। দেশে ফেরা শরণার্থীরা পুঁজি এনেছেন এবং কেউ কেউ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। কর ও শুল্ক আদায় বেড়েছে। বিদেশে থাকা আফগানরা প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক ও বাণিজ্যও সহায়ক হয়েছে। তালেবান কোশ তেপা খাল, তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মতো বড় প্রকল্পে কাজ করছে। সড়ক ও অন্যান্য নির্মাণকাজও চলছে। এসব প্রকল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সৃষ্টি করেছে।
তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে অনীহা রয়ে গেছে। ফলে জবাবদিহি ও দুর্নীতির মতো কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলায় সরকার দুর্বল।
তালেবানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সামাজিক নীতিতে। গত পাঁচ বছরে একের পর এক আদেশে নারী ও মেয়েদের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের আধুনিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ। ফলে আফগানিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে চরম লিঙ্গবৈষম্যের উদাহরণগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এর অর্থনৈতিক মূল্যও বড়। নারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অথচ যে কাজগুলোতে নারীদের প্রয়োজন, সেই কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগই তাঁদের দেওয়া হচ্ছে না।
শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক ধরে রাখার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব নেই। বরং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে। ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ স্থান থাকলেও তা আধুনিক শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না।
এর সঙ্গে বেড়েছে নৈতিক পুলিশিং। নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। এতে শুধু মানুষের জীবনযাপন বদলাচ্ছে না, সরকার ও জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে দূরত্বও বাড়ছে।
তালেবান সরকারকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতেও ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে পাশে সরিয়ে দিয়েছেন। দোহা চুক্তিতে আলোচনাকারী ও স্বাক্ষরকারীদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ হারিয়েছেন। ফলে ক্ষমতা একজন নেতাকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এতে শাসনব্যবস্থা ধীর হয়েছে এবং অল্প কয়েকজনের দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাধান্য পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তালেবানের প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। প্রতিবেশী ও কিছু ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক থাকলেও আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো অধরা। নারীশিক্ষা ও অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ বহাল থাকলে এই বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে তালেবানের বিরুদ্ধে কার্যকর সামরিক হুমকি নেই। রাজনৈতিক বিরোধীরা বিভক্ত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও আবার সামরিকভাবে সরকার পরিবর্তনের আগ্রহ বা সামর্থ্য নেই। তাই তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকির চেয়ে ধীরে ধীরে জমতে থাকা জনঅসন্তোষই তালেবানের জন্য বড় বিপদ হতে পারে।
কোনো সরকার দীর্ঘদিন বিরোধিতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন সরকারের প্রতি এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যে তাকে দুর্বল করতে চাওয়া শক্তিগুলোর প্রতি আর উদ্বিগ্ন থাকে না, তখন সরকার ঝুঁকিতে পড়ে। সেই শক্তি বিদেশি রাষ্ট্রও হতে পারে, আবার দেশের ভেতরের বিদ্রোহী গোষ্ঠীও হতে পারে।
পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু তারা এখনো মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারেনি—তারা আসলে কী ধরনের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও জনবিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তালেবানের ভেতরে কেউ কেউ তা বুঝতেও পারছেন। কিন্তু তাঁরা কি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের পথ খুলবেন? কোনো না কোনো জায়গায় পরিবর্তন আসতেই হবে।
* ওবাইদুল্লাহ বাহির, আফগানিস্তানের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার বিষয়ের শিক্ষক
- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| এবার পুরো দেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তালেবান। ছবি: রয়টার্স |
Sunday, August 16, 2026
অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি by মিজানুর রহমান খান
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী অন্তত সাতটি তারবার্তা পাঠান মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ১৬ আগস্ট এ সম্পর্কে প্রাথমিক মন্তব্য শীর্ষক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৫ আগস্ট স্থানীয় সময় ভোর সোয়া পাঁচটায় অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল। ২৪ ঘণ্টা পরের ঘটনা এই আশাবাদ সৃষ্টি করেছে যে এ অভ্যুত্থানকে চ্যালেঞ্জ করা হবে না।’
ওই সময় ওয়াশিংটনেও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ঢাকার খবর জানতে উদ্গ্রীব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ১১-১২ ঘণ্টা পর তিনি তাঁর স্টাফ বৈঠকে উল্লেখ করেন, ‘আমি আইএনআর (ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ) থেকে এ বিষয়ে ভালো তথ্য পাই।’
এ সময় ব্যুরোর পরিচালক উইলিয়াম জি হিল্যান্ড বলেন, ‘আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলি, মুজিব তখনো মারা যাননি।’ সিআইএর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা হিল্যান্ড ৭৯ বছর বয়সে গত বছরের ২৫ মার্চ মারা যান। ‘তিনি ছিলেন এক ভালো বিশ্লেষক। আমাদের গ্রুপে তিনি ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তাঁর মৃত্যুর পর এ মন্তব্য করেন কিসিঞ্জার (ওয়াশিংটন পোস্ট, ২৮ মার্চ ২০০৮)। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ওয়াশিংটন সময় সকাল আটটার আগে মুজিবের মৃত্যুর বিষয়ে কিসিঞ্জার-হিল্যান্ড কথোপকথনের বিস্তারিত জানা যায়নি।
তবে ১৫ আগস্ট কিসিঞ্জার যখন তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে শুনলেন, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ছিল সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত, তাৎক্ষণিক বললেন, ‘তার মানে কী? মুজিবুর কি জীবিত, না মৃত?’ নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটন এ সময় বলেন, ‘মুজিবুর নিহত। তাঁর নিকটতম আত্মীয়স্বজন, যাঁদের অধিকাংশই পরিবারের সদস্য, তাঁরা বেঁচে নেই।’
এ-সংক্রান্ত দলিল থেকে জানা যাচ্ছে, হার্ভার্ড স্নাতকোত্তর ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আথারটন এবং ১৯৬৯ পর্যন্ত সিআইএতে থাকা হিল্যান্ড বাংলাদেশের এই অভ্যুত্থানের খুঁটিনাটি জানতেন। ১৯৬২-৬৫ সালে কলকাতায় কর্মরত আথারটন ২০০২ সালের ৩০ অক্টোবর মারা গেছেন।
১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি মিসরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ হিল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাতি কুড়ান। তিনি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন।
ওই দিন হিল্যান্ডের মুখে ‘মুজিব তখনো মারা যাননি’ শুনে কিসিঞ্জার পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘সত্যিই তাই? তারা তাহলে মুজিবকে কিছু সময় পরে হত্যা করেছিল?’ এর জবাব দেন নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন। তিনি বলেন, ‘আমরা যত দূর জানি—আমি বলতে পারি না যে আমরা বিস্তারিত সবকিছু জেনে গেছি। কিন্তু ইঙ্গিত ছিল তাঁকে হত্যা পরিকল্পনা বিষয়েই। এবং তারা তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে। ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে হত্যা করে।’
লক্ষণীয়, বোস্টারের পাঠানো তারবার্তাগুলোয় বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে যে তিনি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংবেদনশীল ও সতর্ক ছিলেন। তিনি ১৬ আগস্ট লিখেছেন, ‘জনসাধারণ যদিও মুজিবের পতনে আনন্দ প্রকাশ করেনি কিন্তু গ্রহণসূচক শান্ত অবস্থা বজায় রয়েছে এবং সম্ভবত তাতে স্বস্তির নিশ্বাসও রয়েছে।
শেখ মুজিব ও বাঙালিরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এর কারণ ছিল তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তাঁর ব্যর্থতা। এবং দৃশ্যত তাঁর ক্ষমতায় থাকাটা হয়ে পড়েছিল মূলত ব্যক্তিগত ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। অবশ্য এর সঙ্গে যুক্ত হয় “ডাইন্যাস্টিক রিজনস” অর্থাৎ রাজবংশীয় শাসকদের পরম্পরাসংক্রান্ত কারণ। বাঙালিদের কাছ থেকে মুজিবের বিচ্ছিন্নতা ক্রমশ বাড়ার বড় কারণ ছিল তিনি যথাযথ পরামর্শ গ্রহণ থেকে দূরে সরছিলেন। এমনকি মুজিবের মধ্যে স্বৈরশাসকের চিরায়ত বৈকল্য ফুটে উঠতে শুরু করেছিল।’
বোস্টারের কথায়, ‘জুনের গোড়া থেকে শেখ মুজিব ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর ভাগনে শেখ মনির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। এসবই অভ্যুত্থানকারীদের সন্দেহমুক্ত করে যে পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব করা আর সমীচীন হবে না। তবে অভ্যুত্থানের জন্য ভারতীয় স্বাধীনতা দিবস বেছে নেওয়ার বিষয়টি হয়তো শুধুই কাকতালীয়। এই কাকতালীয় বিষয়টি কিন্তু আমাদের বিবেচনায় লক্ষণীয়।’
বোস্টার এরপর লেখেন, ‘এটা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার সামান্যই উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পেরেছে। যদিও শেখ মুজিবের সঙ্গে যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁদের অনেকেই হত্যার শিকার কিংবা বাদ পড়েছেন। কিন্তু তারপরও বর্তমান সরকারে সেসব পরিচিত মুখই রয়ে গেছেন, যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্বল প্রশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। স্পষ্টতই মন্ত্রিসভায় এখন যাঁরা রয়ে গেছেন, তা থেকে মনে হয়, মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলবে। কিন্তু সেখানে বৃহত্তর মডারেশন থাকবে। ১৫ আগস্ট দেওয়া তাঁর প্রথম বেতার ভাষণে এই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করে।
শেখ মুজিবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের নিন্দা করলেও মোশতাক জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা অনেকটাই অব্যাহত থাকবে। ইতিমধ্যে কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে নতুন সরকার পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইবে।
মোশতাকের সঙ্গে ভারতের সদ্ভাব না থাকার বিষয়টি প্রকাশ্য বিষয় হলেও এটাও পরিষ্কার যে নতুন সরকার ভারতের মনে বাড়তি কোনো সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার দিকে যাবে না। মোশতাকের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে সেই ইঙ্গিত মেলে। পুরোনো মুখগুলো রেখে দেওয়ার পেছনে নতুন সরকার কার্যত ভারতের কাছে সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চায়।
মোশতাকের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্ব সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত মেলে। এভাবে সরকার সোভিয়েত প্রভাব কিছুটা স্তিমিত করতে চাইছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রভাব সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে বোস্টার লিখেছেন, ‘নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের নিজেদের সম্পর্ক মুজিব সরকারের চেয়ে “এমনকি আরও অন্তরঙ্গ ভিত্তি”র ওপর প্রতিষ্ঠা পাবে। নতুন রাষ্ট্রপতি অতীতে অত্যন্ত লক্ষণীয় ও প্রকাশ্যে “প্রো–আমেরিকান” দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
বড় কথা হচ্ছে, মুজিব সরকারের মধ্যে শেখ মনি ও সামাদের (আবদুস সামাদ আজাদ) মতো যাঁরা বামপন্থী ও আমেরিকাবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁরা আর নেই। আরও জোরালো সম্ভাবনা হচ্ছে, বাংলাদেশ আমাদের কাছে এখন বেশি পরিমাণে সাহায্য চাইতে পারে। ইতিপূর্বে মোশতাক আমাদের বলেছিলেন, শুধু আমেরিকাই আমাদের সত্যিকারের সাহায্য করতে পারে। সুতরাং আমাদের প্রতি নতুন সরকারের উচ্চাশার বাঁধ নিয়ন্ত্রণই হতে পারে বড় সমস্যা।’
মোশতাক সরকার এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইউজিন বোস্টার লক্ষণীয়ভাবে উল্লেখ করেন, ‘এটা আমরা বিচার করতে পারি না।’ তাঁর কথায়, ‘আমরা কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ করি যে প্রত্যেক সরকারি বিবৃতিতে ক্ষমতা গ্রহণের অনুকূলে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লিখিত হচ্ছে। আমাদের বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী বর্তমানে সামরিক আইন আদেশ এমএলও প্রস্তুত করছে এবং এ ক্ষেত্রে যদি পাকিস্তানি ধাঁচ অনুসরণ করা হয়, তবে তা-ই হবে দেশের আইনের ভিত্তি।
এর ফলে সামরিক ও বেসামরিক লোকের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াবে কি না, তা আমরা এখন বলতে পারি না। কিন্তু আমরা এটা ভাবতে পারি, মোশতাক বিবৃতিতে ইতিমধ্যে যা বলেছেন, তাতে গত জানুয়ারিতে মুজিব যা চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তার চেয়ে একটি নতুন ও অধিকতর উদার সংবিধান পাওয়া যাবে।’
বোস্টার এ পর্যায়ে আরও উল্লেখ করেন, ‘মুজিবকে উৎখাতে সামরিক বাহিনীর সাফল্যের প্রেক্ষাপটে আমাদের এই ধারণা জন্মেছে যে অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি। যাহোক, সামরিক বাহিনী—বিশেষ করে যেসব তরুণ কর্মকর্তা, যাঁরা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরাই শেখ মুজিবকে উৎখাত করেছেন এবং আমরা সন্দেহ করি এবং যেহেতু তাঁরা রক্তের স্বাদ পেয়েছেন, তখন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁরা কিছু ভূমিকা রাখতে চাইবেন।
অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে কোনো বাঙালি গাদ্দাফিকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। তার চেয়ে বরং এটা ভাবাই সংগত যে চাকরিমুখো মধ্যবিত্ত শ্রেণির পুরোনো সদস্য—যাঁরা শেখ মুজিব দ্বারা হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা হয়তো একটি অধিকতর উদারপন্থী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। পাকিস্তানি জমানায় পূর্ব বাংলায় যেমনটা দেখা গিয়েছিল, তার চেয়ে এটা হতে পারে ভিন্ন।’
বোস্টার লেখেন, ‘এখানে একটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা উচিত যে রক্তস্নাত হলেও শেখ মুজিবের উৎখাত যখন সফল হয়েছে, তখন আরও অনেক কিছুই করা বাকি রয়েছে। মোশতাকের ভাষণ প্রধানত সাধারণ বিবরণগত দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ এবং এতে আওয়ামী লীগের ইতিপূর্বেকার বাগাড়ম্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে কিন্তু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ এ পর্যন্ত যা নেওয়া হয়েছে, তা অল্পই।
দেশ পরিচালনায় সীমিত পদক্ষেপ দেখে আমরা বিস্মিত হইনি। তবে যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে নতুন সরকারের কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে আমরা খুবই অস্থিরতাপূর্ণ একটি ক্ষমতার লড়াই প্রত্যক্ষ করতে পারি। বাঙালির রাজনৈতিক মঞ্চে শেখ মুজিবের মতো আজ আর কোনো কমান্ডিং পারসোনালিটি বা আদেশদানকারী ব্যক্তিত্ব নেই, যা কিনা মুজিবকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রেখেছিল। বেসামরিক সরকারের পদস্খলন ঘটেছে। আমরা এখন সামরিক বাহিনীর দিকে তাকাতে পারি। জাতিকে বাঁচাতে সেটাই আবশ্যিক।’
* মিজানুর রহমান খান, প্রয়াত সাংবাদিক
![]() |
| ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...










