Thursday, November 7, 2024

ওয়াশিংটনের সমর্থনে আমরা বিপ্লব করিনি : মাহমুদুর রহমান

ওয়াশিংটনের সমর্থনে আমরা বিপ্লব করিনি বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবে বিদেশি কোনো সমর্থন ছিল না। কাজেই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প এলো, না কমলা হ্যারিস এলো তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।

বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে লেখক সাহাদত হোসেন খানের ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ছাত্র-জনতার শক্তিতে বিপ্লব করেছি আমরা। শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল জাতি গড়ে তোলার জন্য এই বিপ্লব হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন নির্বাচনে আমাদের কিছু যায় আসবে না।

সংহতি দিবস নিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বর আমরা জনতার বিপ্লব দেখেছি, যে অসাধারণ বিপ্লবের মাধ্যমে ভারতের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হয়েছিল। সেই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সব বাংলাদেশি প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, গত ১৬ বছর ধরে স্বাধীনতা হারিয়ে বাংলাদেশ আবার ভারতের অধীন হয়ে যায়। সেখান থেকে ছাত্র-জনতা আমাদের উদ্ধার করে, আমরা যেন তাদের অবদান না ভুলি। এই বিপ্লব সবাই চেয়েছে, কিন্তু তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছে। আপামর জনতা বিপ্লবের সঙ্গে ছিল।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠ’র সম্পাদক হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে প্রকাশনা উৎসবে আরও উপস্থিত ছিলেন- দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক আলমগীর মহীউদ্দীন, সাবেক সেনাপ্রধান (অব.) লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূরুদ্দিন খান প্রমুখ। 

প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত
প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত

লেবাননের বেকা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় নিহত ৪০

লেবাননের বেকা উপত্যকায় হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এতে উপত্যকার পূর্বাঞ্চলীয় শহর বালবেকের আশপাশে কমপক্ষে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যায় বৈরুতের দক্ষিণ দিকের এলাকাতেও হামলা চালায় ইসরাইল। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, ইরান সমর্থিত হিজবুল্লা যোদ্ধাগোষ্ঠী এবং ইসরাইল গত এক বছর যাবৎ সংঘর্ষ চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তেল আবিবের সঙ্গে সংঘর্ষে জাড়িয়েছে হিজবুল্লাহ। তবে এ বছরের সেপ্টেম্বরে লেবাননের অভ্যন্তরে হামলা জোরালো করেছে ইসরাইল। বিশেষ করে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ভারী বোমা হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে তেল আবিবের বাহিনী।

বুধবার হামলা চালিয়ে লেবাননের বালবেক এবং বেকা ভ্যালিতে ৪০ জন নিহতের পাশাপাশি আরও ৫৩ জনকে আহত করেছে ইসরাইলি বাহিনী। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবির পর এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি তারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের বালবেক এবং বেকা ভ্যালির দক্ষিণাঞ্চল খালি করার নির্দেশ দিয়ে সেখানে হামলা চালানো হয়েছে। ইসরাইল দুই ধাপে বোমা বর্ষণ করেছে। প্রথম ধাপে বুধবার রাতে এবং দ্বিতীয় ধাপে বৃহস্পতিবার ভোরে উল্লিখিত অঞ্চলে হামলা করেছে তারা।

লেবাননের আল জাদিদ টিভি জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী বৃহস্পতিবার সকালে কমপক্ষে চারটি বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ভয়াবহ ওই হামলার বিস্তারিত জানায়নি টিভি চ্যানেলটি।

হিজবুল্লাহর নয়া প্রধান নাইম কাসেম বুধবার বলেছেন, তিনি মনে করেন না যে- ইসরাইলের সঙ্গে তাদের এই বৈরিতা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা যাবে। তিনি মনে করেন ইসরাইল যদি হামলা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেয় তাহলে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান হতে পারে। নাইম কাসেম বলেন, ‘যখন শত্রু পক্ষ আগ্রাসন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেখানে আলোচনার পথ উন্মোচন হয়। আমরা বারবার এ বিষয়টি উল্লেখ করে আসছি।’

mzamin

তেলআবিবে ইসরায়েলি সেনাঘাঁটিতে ড্রোন হামলা

লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। এরই মধ্যে প্রথমবারের মতো তেল আবিবেরে দক্ষিণে একটি সামরিক ঘাঁটিতে একঝাঁক ড্রোন হামলা চালিয়েছে লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা হিজবুল্লাহ।

বৃহস্পতিবার (০৭ নভেম্বর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, যোদ্ধারা প্রথমবারের মতো তেল আবিবের দক্ষিণে বিলু ঘাঁটিতে একঝাঁত ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এ হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো তথ্য জানায়নি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

এর আগে, ইসরায়েলের বন্দর নগরী হাইফার কাছে নৌ ঘাঁটি এবং তেল আবিবের কাছে ইসরায়েলের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে আরেকটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে কয়েকটি হামলার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ।

ইসরায়েলের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার কারণে বিমানবন্দরের পরিষেবায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটেনি।

এদিকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। লেবাননের রাজধানীতে থাকা সাংবাদিকরা সেখানে বিকট হামলার শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। এরপর দক্ষিণ বৈরুতে দুটি বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। লেবাননের আল জাদেদ টেলিভিশন জানিয়েছে, রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত ৪টি হামলা হয়েছে।

বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে মধ্যপ্রাচ্য। গত এক বছরে বিশ্বে অনেক বিপদের মুহূর্ত এসেছে। তবে এবারেরটি সবচেয়ে ভয়াবহ। সম্প্রতি লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হয়েছেন। এরপর লেবাননে স্থল হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। অন্যদিকে ইরান প্রায় ২০০ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে ইসরায়েলে। তেহরানে পাল্টা হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে তেলআবিব।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো উত্তেজনা কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এর পক্ষ থেকে সব পক্ষকে ধৈর্য ধরতে বলা হয়েছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্য সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। গত এক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার কারণে মূলত এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যায় লেবাননের বৈরুতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ইসরায়েল বোমা হামলা চালায়। সেখানে ব্যাপক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। অনেক আবাসিক ভবন ধসে পড়ে। মাটিতে বড় গর্ত সৃষ্টি হয়। আকাশ ধুলাবালি ও ধোঁয়ায় ভরে ওঠে। পুরো লেবানন থেকে ওই দৃশ্য দেখা যায়। এ হামলা হয় মাটির নিচে থাকা হিজবুল্লাহর বাংকার লক্ষ্য করে। এ হামলায় নিহত হন হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ। ইসরায়েলের এক সপ্তাহ ধরে চালানো হামলায় ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর নাসরুল্লাহর মৃত্যুর খবর আসে।

তারও এক সপ্তাহ আগে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে লক্ষ্য করে পর পর অসংখ্য ওয়াকি-টকি এবং পেজার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে কমপক্ষে ৩২ জন নিহত এবং তিন হাজার জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল। 

ইসরায়েলি হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। পুরোনো ছবি
ইসরায়েলি হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। পুরোনো ছবি

জন্মসূত্রে আর নয় মার্কিন নাগরিকত্ব

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে ডনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তন হিসাবে বিবেচিত। ট্রাম্প ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, তবে তার বিজয় অভিবাসী দম্পতিদের উদ্বেগে ফেলেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় থাকা অভিবাসী ভারতীয়দের সন্তানরাও আগামী দিনে জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক হওয়ার সুযোগ পাবে না। অফিসিয়াল ট্রাম্প-ভ্যান্স প্রচারাভিযানের সাইটে পোস্ট করা পরিকল্পনাটির বাস্তবায়নের জন্য একদিনের মধ্যেই নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করবেন নতুন প্রেসিডেন্ট । শুধু অবৈধ অভিবাসীদের জন্যই এটি মাথাব্যথার কারণ নয় বরং খসড়া নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, “আমেরিকায় জন্মালেই কোনও শিশুকে আর নাগরিকত্ব দেয়া হবে না। সন্তানের পিতামাতার মধ্যে যেকোনও একজনকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে। অথবা থাকতে হবে গ্রিন কার্ড। তবেই তাদের সন্তানরা আগামী দিনে আমেরিকার নাগরিক হতে পারবে।'

ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নি রাজীব এস খান্না টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে বলেছেন -'এটি প্রায় নিশ্চিতভাবে মার্কিন সংবিধানের ১৪ তম সংশোধনীর লঙ্ঘন। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট রায় রয়েছে।' পদক্ষেপের বৈধতা সম্পর্কে  কথা বলতে গিয়ে অভিবাসন অ্যাটর্নি গ্রেগ সিসকিন্ড বলেছেন, ‘এটি অবশ্যই ১৪তম সংশোধনীর লঙ্ঘন। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনত দম্পতিদের সন্তানদের বাদ দিতে এতদূর যায় কিনা তা আমাদের দেখতে হবে।’

২০২২ সালের মার্কিন জনগণনা অনুযায়ী, আমেরিকায় ৪৮ লক্ষ ভারতীয় বসবাস করেন। তার মধ্যে ১৬ লক্ষই জন্মগ্রহণ করেছে মার্কিন মুলুকে। ট্রাম্পের নয়া নীতি অনুযায়ী, তারা কেউই মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়। কারণ তাদের পিতামাতা মার্কিন নাগরিক নন বা তাদের গ্রিন কার্ড নেই।  H-1B ভিসায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অনেকেই কয়েক দশক ধরে ব্যাকলগে আটকা পড়েছেন। কর্মসংস্থান-ভিত্তিক গ্রিন কার্ডের জন্য বার্ষিক লক্ষ্য ১৪০,০০০ সেট করা হয়েছে। অতিরিক্তভাবে কোনও দেশই কর্মসংস্থান বা পরিবার-ভিত্তিক বিভাগে মোট গ্রিন কার্ডের সাত শতাংশের বেশি পেতে পারে না।

এই নিষেধাজ্ঞা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কর্মসংস্থান ভিত্তিক বিভাগে ভারতীয় আবেদনকারীদের প্রভাবিত করতে পারে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া দ্বারা উদ্ধৃত ক্যাটো ইনস্টিটিউটের অভিবাসন অধ্যয়নের পরিচালক ডেভিড জে বিয়ারের একটি সমীক্ষা দেখায় যে, ভারত থেকে কর্মসংস্থান ভিত্তিক গ্রিন কার্ড ব্যাকলগ ২০২৩ সালের মার্চ মাসে এক মিলিয়ন অতিক্রম করেছে। যদি মৃত্যু এবং বার্ধক্যের মতো কারণগুলি বিবেচনা করা হয় (যা এই ব্যক্তিদের ব্যাকলগ পরিসংখ্যান থেকে বাদ দিতে পারে) গ্রিন কার্ডের জন্য কাউকে ৫৪ বছর থেকে ১৩৪ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এই বিভাগে অপেক্ষারত প্রায় ৪.১৪ লক্ষ ভারতীয় গ্রীন কার্ড পাওয়ার আগেই মারা যাবে এবং ভারতীয় পরিবারের এক লক্ষেরও বেশি শিশুর নির্দিষ্ট  বয়স অতিক্রম করে যাবে  (২১বছর বয়সে) এবং তাদের  ভিসা আর বৈধ থাকবে না। তারা  গ্রিন কার্ডের সারি থেকে বাদ পড়বে।

সূত্র : ইকোনমিক টাইমস

mzamin

১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের ব্যর্থ সিপাহী বিপ্লব এবং তারপর… by ওয়াসীম সোবহান চৌধুরী

১৯৭৫ এর ৭ই নভেম্বর উত্থান হয়েছিল জিয়াউর রহমানের। সেদিনের পর থেকে তিনি বনে গিয়েছিলেন সারা দেশের হর্তাকর্তা। কিন্তু দিনকাল খুব একটা নির্বিঘ্ন কাটেনি তার; প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে তাকে, মোকাবেলা করতে হয়েছে সামরিক বাহিনীর ভেতরে এবং বাইরে অসন্তোষ, মোকাবেলা করতে হয়েছে জাসদের আক্রোশ, মোকাবেলা করতে হয়েছে বেয়াড়া আমলাদের। ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার মানুষ, ট্রেনিং পেয়েছিলেন পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীতে, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ এ যুদ্ধ করেছেন সামনা সামনি, আবার পাকিস্তানের গোয়েন্দা দপ্তরেও বহু বছর কাজ করেছেন।
এসবের অভিজ্ঞতা দিয়ে বেশ সফল ভাবেই তিনি অসন্তোষ, আক্রোশ, বেয়াড়াপনা সামাল দিচ্ছিলেন। ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় তিনটি প্রধান পদ জিয়াউর রহমান নিজের করে নিয়েছিলেন – সেনাবাহিনী প্রধান, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (চীফ মার্শাল’ল অ্যাডমিনিস্ট্রাটর)। তিনিই সর্বেসর্বা। এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট হয়েই তার প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের হত্যাকারী অফিসারদের কাউকে কাউকে সেনাবাহিনীর চাকরীতে বহাল করা এবং কাউকে কাউকে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরী দেওয়া।
তাই  ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে যখন মিশরের গোয়েন্দা সংস্থা তাকে জানালো বিমানবাহিনীর এক অংশ বিদ্রোহ করবে, তখন তিনি বিমানবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন এবং তার বিশ্বস্ত বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক ইউনিটকে দিয়ে নিজের নিরাপত্তা বাড়িয়ে নিলেন। ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ড্যান্ট তখন তার একান্ত বিশ্বস্ত কর্নেল আমিনুল হক, নবম ডিভিশনের জিওসি আরেক বিশ্বস্ত মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী। জিয়াউর রহমান জানেন তার গায়ে টোকা দেবার জন্য এই দুইজনের লাশের উপর দিয়ে আসতে হবে।
কিন্তু বিমানবাহিনী প্রধানকে বিদ্রোহের আগাম সঙ্কেত জানানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না জিয়াউর রহমান। ফলে ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর রাতে আর্মি সিগন্যাল ব্যাটালিয়ানের সৈন্যরা যখন আব্দুল লতিফের নেতৃত্বে এবং বিমানসেনারা যখন সার্জেন্ট অফিসার আফসারের নেতৃত্বে জাসদ ও বামপন্থীদের প্ররোচনায় ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ শুরু করলো তখন জিয়াউর রহমান প্রস্তুত ও নিরাপদ থাকলেন কিন্তু বিমানবাহিনীর অফিসাররা বিপ্লবের বলি হলেন। বেশ কিছু অফিসার সেই রাতে তেজগাঁও বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারে ছিলেন, বিপ্লবের প্রথম থাবায় গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাশ মাসুদ ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার আহমেদকে বিপ্লবীরা গুলি করে হত্যা করে। সেখানে তখন কিছু জাপানী কূটনৈতিক ছিলেন, তারা বেঁচে যান।
তেজগাঁও বিমানবন্দরে অস্ত্র হাতে সৈনিকেরা
৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ড্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক ও নবম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী জিয়াউর রহমানের একান্ত কাছের লোক ছিলেন, কিন্তু এদের দুইজনের মধ্যে আবার সদ্ভাব ছিল না। বিপ্লব শুরু হলে জিয়াউর রহমান আমিনুল হককে দায়িত্ব দেন তার বাসার আশেপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে এবং মীর শওকতকে দায়িত্ব দেন যত দ্রুত সম্ভব বিপ্লব দমন করতে। মীর শওকত অতি দ্রুত শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত হেডকোয়ার্টারে চলে যান।
তেজগাঁও বিমানবন্দর ও বেইস তখন সম্পূর্ণ বিপ্লবীদের দখলে। তারা বিভিন্ন ঘর খুঁজে খুঁজে অফিসারদের ধরে আনছে।
মীর শওকত খবর পান বিপ্লবীদের একটি দল অনেক গুলো ট্রাকে করে ফার্মগেইটের দিকে গিয়েছে। তিনি লেঃ কর্নেল ইমতিয়াজকে নির্দেশ দেন বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট ও রোডব্লক বসানোর জন্য এবং রেডিও স্টেশনে স্পেশাল ব্যাটালিয়ান পাঠাতে ।
ভোর চারটার দিকে ফোন এলো মীর শওকতের অফিসে। অপরপ্রান্তে সেনাবাহিনী প্রধান কাম রাষ্ট্রপতি কাম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান। মীর শওকত সংক্ষেপে ‘স্যার’ বলে কাজ সারেন। জিয়াউর রহমান প্রশ্ন করেন – “Who is in control of the radio station, Mir?” মীর শওকত বলেন – “Of course it is in our control sir”. জিয়া বিমর্ষ হয়ে মীর শওকতকে  উপদেশ দেন – “Listen to the radio.”
মীর শওকত জিএসও-১ খায়রুল আনামকে নির্দেশ দেন রেডিও আনতে। আনাম রেডিও এনে ছাড়লে তারা শুনেন বিপ্লবীরা ভাষণ দিচ্ছে। মীর শওকত আকাশ থেকে পড়েন এবং বিব্রত হন। তিনি জিয়াউর রহমানকে প্রতিশ্রুতি দেন ১৫ মিনিটের মধ্যে তার নিজের লাশের বদলে হলেও রেডিও ষ্টেশন দখল হবে। তিনি লেঃ কর্নেল ইমতিয়াজকে বলেন ক্যাপ্টেন আবেদিনকে রেডিও ষ্টেশন পাঠাতে এবং যে কোন মুল্যে দখল নিতে। সাথে সাথে আদেশ দেন- “শুট টু কিল”।
হ্যাঙ্গারের সামনে বিমানবাহিনী কর্মকর্তাদের লাশ, পাশে অস্ত্রহাতে বিদ্রোহীরা।
ক্যাপ্টেন আবেদিনের মাত্র ১২ মিনিট লাগলো বিপ্লবীদের হটিয়ে দিতে; গুলি করে মারলেন কিছু, ধরলেন কিছু, বাকিরা পালিয়ে গেল। মীর শওকত জিয়াউর রহমানকে  ফোন করে জানালেন – “Radio station is in our control sir.”
এদিকে ভোরের আলো ফোটার কিছু পরে বিপ্লবীরা ছয়-সাত জন অফিসারদের ধরে আনে কন্ট্রোল টাওয়ারের উত্তরে অবস্থিত হ্যাঙ্গারের কাছে। এক লাইনে দাঁড়া করিয়ে তাদের ব্রাশফায়ার করে বিপ্লবীরা। লুটিয়ে পড়েন স্বাধীনতা পরবর্তী কালের সেরা পাইলটেরা। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর উড্ডয়ন ক্ষমতা নিমিষে অর্ধেকে নেমে আসে।
বিমানবাহিনী প্রধান এ জি মাহমুদও তখন তেজগাঁও বিমানবন্দরে। তিনি কর্পোরাল রুহুল আমিন ও কর্পোরাল আরজুর সহায়তায় একটা রুমের স্টিল আলমারির পেছনে লুকান। কিন্তু রক্ষা হয় না, বিপ্লবীরা রুমের দরজা ভেঙে ঢুকে স্টিল আলমারির পেছন থেকে বের করে আনে তাকে। নিয়ে যায় নীচে, উদ্দেশ্য পরিষ্কার।
কিন্তু ভাগ্য ভাল এ জি মাহমুদের। কর্পোরাল রুহুল আমিন বিপ্লবী নেতা ও দেশের তথাকথিত প্রেসিডেন্ট (রেডিও স্টেশনের ভাষণে এমনটাই দাবী করা হয়েছিল) সার্জেন্ট অফিসার আফসারকে মিনতি করেন এ জি মাহমুদকে বাঁচিয়ে রাখতে। আফসার শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেয় বিমানবাহিনী প্রধানকে গুলি না করার। সে নির্দেশ দেয় এ জি মাহমুদকে কন্ট্রোল টাওয়ারের দুতালার এক রুমে তালা বন্ধ করে রাখতে। তবে সেখান থেকে চলে যাবার আগে সার্জেন্ট অফিসার আফসার বলেছিল – “আপনিই হয়তো একদিন আমাকে হ্যাং করবেন”। তার ভবিষ্যৎবাণী ফলেছিল। ১৯৭৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ট্রাইবুনালের রায় বাস্তবায়িত হয়, সার্জেন্ট অফিসার আফসারকে কুমিল্লা কারাগারে ফাঁসি দেয়া হয়।
ভোরের আলো ফুটলে লেঃ কর্নেল ইমতিয়াজের অধীনস্থ স্পেশাল ব্যাটালিয়ানের এক প্ল্যাটুন সৈন্য গেল কন্ট্রোল টাওয়ারে আটকা পরা অফিসার ও জাপানী কুটনৈতিকদের বাঁচাতে আর অন্য এক দল গেল ক্যান্টনমেন্টের দিক দিয়ে রানওয়ে ও হাঙ্গারগুলোর দখল নিতে। নেতৃত্বে মেজর মুস্তফা, ক্যাপ্টেন সাদেক ও ক্যাপ্টেন হোসেন। বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত  এসব অফিসার ও সৈন্যদের কাছে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবস্থানরত ২০০ বিপ্লবী পাত্তা পেল না; বেশীর ভাগ গুলি খেয়ে মরলো। ধরা পরলো ৬০ জন। সাঙ্গ হলো দ্বিতীয় সিপাহী বিপ্লব, মুখ থুবড়ে পড়লো জাসদের শ্রেণীসংগ্রামের নামটা জপে আর সৈনিকদের তাঁতিয়ে ক্ষমতায় যাবার আর একটি প্রয়াস। কিন্তু এর মূল্য দিতে হয়েছিল কয়েক হাজার নির্দোষ বিমানসেনাকে। কারো কারো মৃত্যু হয়েছিল ফায়ারিং স্কোয়াডে, কারো কারো মৃত্যু হয়েছিল ফাঁসীর কাষ্ঠে আর বাকীদের পঁচতে হয়েছিল কারাগারের ভেতর।
নিহত বিদ্রোহীদের লাশ এভাবেই পড়ে ছিল বেশ অনেকটা সময়।
১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর বেতার ভাষণে জিয়াউর রহমান দাবী করেছিলেন, “আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি একজন সৈনিক। রাজনীতির সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই এবং আমাদের সরকার সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক।” ১৯৭৬ সালের মে মাসে  সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “আমি একজন শ্রমিক।” এই সৈনিক ও শ্রমিক ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের পর থেকে হয়ে উঠলেন সৈনিক ও শ্রমিক হত্যাকারক। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে সই দিতে লাগলেন বিমানসেনাদের ফাঁসির ও কারাবাসের। সাথে সাথে পুনর্বাসিত করতে লাগলেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ডালিম, ফারুক, রশিদদের। আর সাথে সাথে চললো রাজনৈতিক দল গড়ার প্রয়াস। এ কাজে সাথী তার মেজর জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু, কর্নেল অলি আহমেদ ও মেজর কামরুল ভুঁইয়া। সেনাবাহিনীর চার ডাকসাইটে ‘এলিট’ অফিসার ‘গণতান্ত্রিক’ একটি দল গড়তে ঘাম ঝরাতে লাগলেন। জাগদল হয়ে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট হয়ে যা শেষে বিএনপিতে এসে ঠেকলো।
২ অক্টোবরের বিপ্লবের সাথে জড়িতদের তো তেজগাঁও বিমানবন্দরেই গুলি করে মারা হয়েছিল, ধরা হয়েছিল সার্জেন্ট অফিসার আফসার সহ অন্যদের। কিন্তু সাথে সাথে আটক করা হলো কুর্মিটোলা বেইসে থাকা প্রায় সব বিমানসেনাদের।  কুর্মিটোলা বেইসের বিমানসেনাদের উপর জিয়াউর রহমানের রাগ ছিল আগে থেকে। ১৯৭৭ এর মে মাসের যে হ্যাঁ / না ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে কুর্মিটোলা বেইসের বেশিরভাগ মানুষ না ভোট দিয়েছিল এরকম একটা রিপোর্ট পৌঁছেছিল জিয়াউর রহমানের কাছে। তাই এবার সুযোগ পেয়ে তিনি হয়ে উঠেন প্রতিশোধ পরায়ণ। এক একটা ঘরে উলঙ্গ করে রাখা হলো ৫০-৬০ জনকে। চালনো হলো অত্যাচার। সামরিক ট্রাইবুনাল আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে রায় দিতে লাগলো। অক্টোবর ও নভেম্বরের প্রায় প্রতি রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ড্রেনগুলো রক্তে ভরপুর হতো কারন গলায় রশি বেধে ফেলে দেবার পর, প্রান যাবার আগেই কেটে ফেলা হতো হাত-পায়ের রগ। সুত্রাপুরের ওসি’র দায়িত্ব ছিল কাফনের ব্যবস্থা করা আর লালবাগের ওসি’র দায়িত্ব ছিল লাশ আজিমপুরের গোরস্থানে নাম ফলকহীন দাফন করা। প্রহসনের শেষ সীমা অতিক্রম করে মৃতব্যক্তিদের কারো কারো গ্রামের বাড়ীতে পাঠানো হতো চিঠি যেখানে বলা হতো অতিসত্বর চাকুরিতে যোগদান করার জন্য। এটা পাঠানো হতো যাতে পরিবারের মানুষ ধরে নেয় এরা পলাতক আছে।
অভ্যুত্থানের সমাপ্তি, সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিমানবন্দরে পড়ে থাকা লাশগুলো
যাদেরকে সেই সময় টর্চার করা হয়েছে তাদের চেহারা চেনা যেত না। কর্পোরাল আজম নামে একজন যে ইংলিশে অনার্স করছিল সেই সময়, মার্শাল ল কোর্টে ইংরেজিতে জবাব দেবার কারনে ট্রাইবুনালের অফিসার তাকে মেরে ফেলে রেখেছিল, তার শরীর পঁচে গিয়েছিল বিনা চিকিৎসায় এবং একসময় সে সেলের ভেতরেই মারা যায়। কর্পোরাল লতিফ নামের একজনকে উলঙ্গ করে লাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে এক সময় লাঠি তার পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, লতিফ মারা যায় তখনই।
টেনেহেঁচড়ে যখন বিমানসেনাদের ফাঁসীর কাষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হতো, তাদের কেউ কেউ চিৎকার করে বলতো, হে আল্লাহ্‌ যেই জালেম বিনা বিচারে আমাকে ফাঁসি দিচ্ছে, তুমি তার বিচার করো। এই ঘটনার সাড়ে তিন বছর পর একদল মুক্তিযোদ্ধা অফিসার চিটাগং সার্কিট হাউজে গিয়ে জিয়াউর রহমানের শরীরের উপরিভাগে বিশ-বাইশটি গুলি করে তার দেহ ভূপাতিত করে। তারও মুখমন্ডল চেনার উপায় থাকে না। এরপর  জিয়াউর রহমানের যাওয়া হয় দুটি কবরে- রাঙ্গুনিয়ায় একবার, ঢাকায় আরেকবার।
তথ্যসূত্রঃ
১। সশস্ত্র বাহিনীতে গণহত্যা, বাংলাদেশ (১৯৭৫-১৯৮১)।
আনোয়ার কবির।
২। রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি।
জায়েদুল আহসান।
৩। বিএনপি সময়-অসময়।
মহিউদ্দিন আহমদ।
৪। জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি।
মহিউদ্দিন আহমদ।

ভয় আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে খেলেছেন ট্রাম্প, তাতেই ধরাশায়ী কমলা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কমলা হ্যারিসকে হারিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনে জয়ী হতে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়েছেন। একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের মন জয় করেছেন। হোয়াইট হাউসে শক্তিশালী রাজনীতির ধারা ফেরানোর আশায় অনেকেই তাঁকে ভোট দিয়েছেন। পুনর্নির্বাচনে ২০২০ সালে হেরে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ১২০ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম সাবেক প্রেসিডেন্ট, যিনি আবার প্রেসিডেন্ট হয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত সময়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে কমলার বিপরীতে ট্রাম্পকেই  বেছে নিয়েছেন ভোটাররা। একজন প্রমাণিত অর্থনৈতিক চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তাঁকে গ্রহণ করেছেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের ৩৪টি অভিযোগ ভোটারদের মনে দাগ কাটতে পারেনি। এ ছাড়া ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর ক্যাপিটলে তাঁর সমর্থকদের হামলায় উসকানি কিংবা গোপন নথি নিজের কাছে রাখার যেসব অভিযোগ উঠেছিল, সেসব বিষয় ভোটারদের রুখতে পারেনি।

ট্রাম্পের এবারের নির্বাচনী প্রচারজুড়েও ছিল নাটকীয়তা। তাঁকে দুবার হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। সব বাধা দূর করে ৭৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসছেন তিনি।

নির্বাচনের দিন সকালে ফ্লোরিডার পাম বিচে সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকান জনগণ তাদের দেশের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করার দিন হিসাবে একে চিরকাল স্মরণ রাখবে।

সিনেটে দীর্ঘদিন সংখ্যালঘু হিসেবে থাকার পর এবার ওয়াশিংটনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই ফিরছেন তিনি। এতে মন্ত্রিসভায় বিশ্বস্ত লোকদের সহজেই বসাতে পারার সুযোগ হবে তাঁর। প্রতিনিধি পরিষদে এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি রিপাবলিকানরা। তবে সেখানেও নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গত জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে জো বাইডেন সরে দাঁড়ানোর পর থেকে ব্যাপক প্রচার করেন কমলা হ্যারিস। তিনি জিতলে মার্কিন নির্বাচনে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হতেন। তবে শেষ পর্যন্ত করোনা–পরবর্তী মূল্যস্ফীতি, ব্যাপক বাড়িভাড়া ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো থেকে উত্তরণ ঘটানোর জন্য নীতিনির্ধারণ কমলার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর নীতি পরিষ্কারভাবে সামনে আনতে পারেননি বলেও সমালোচনা রয়েছে।

ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে কড়া অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূলে ছিল মেক্সিকোর সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া এবং লাখো অবৈধ অভিবাসীকে তাড়ানোর মতো বিষয়। তিনি দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করতে আমদানি শুল্ক বাড়ানোর কথা বলেছেন। নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনগুলোতে তিনি ব্যাপক ব্যয়বহুল আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি ভ্রমণে কর বিলুপ্তি, অতিরিক্ত কাজের জন্য ভাতা বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর মতো কথা বলেছেন।

বাইডেন প্রশাসনের অজনপ্রিয়তা ও ব্যর্থতাগুলোর জন্য কমলাকে দায়ী করে নির্বাচনের শেষ দিকে ব্যাপক প্রচার করেছেন ট্রাম্প। তাঁর স্লোগান ছিল, ‘কমলা ভেঙেছেন ট্রাম্প ঠিক করবেন।’ এ ছাড়া বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, মানুষ পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে ছিল। ট্রাম্পের বার্তাগুলোতে তাই ক্ষমতায় থাকা কমলার জন্য কঠিন হয়ে গেছে।

এবারের নির্বাচনের শুরুটাই ছিল প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষের বিষয়টি। শুরুতে বাইডেন ও ট্রাম্পের মতো দুই বয়স্ক ব্যক্তির লড়াইকে গ্রহণ করেননি ভোটাররা। সংঘাত, বিভক্তি ও অর্থনৈতিক স্থানচ্যুতিতে বিরক্ত মার্কিন নাগরিকেরা নতুন করে শুরুর জন্য মুখিয়ে ছিলেন।

গত জুন মাসে বাইডেন ও ট্রাম্পের প্রথম বিতর্কের পর বাইডেন মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়ে সরে যেতে বাধ্য হন। এর দুই সপ্তাহ পরেই পেনসিলভানিয়ায় নির্বাচনে সমাবেশে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সেখানে রক্তাক্ত ট্রাম্প ‘ফাইট’, ‘ফাইট’ বলে যে দৃঢ়তা দেখান, সেসব ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আবার রিপাবলিকান দলের জাতীয় সম্মেলন হয়। তাতে ট্রাম্পকে নভেম্বরের নির্বাচনে স্পষ্ট জয়ী হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

বাইডেন সরে দাঁড়ানোর পর ডেমোক্র্যাটরা কিছুটা স্বস্তি ফিরে পায়। নতুন করে কমলা হ্যারিস সব শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়ে শুরু হয় কমলা-ট্রাম্পের নির্বাচনী লড়াই।

কমলা হ্যারিস ট্রাম্পের সাবেক প্রশাসনের অনেক রিপাবলিকান ব্যক্তির সমর্থন পেয়েছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে এসে কমলার প্রচারশিবির থেকে ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রচারশিবির থেকে যেসব বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে, সেগুলোতে সীমান্তে অভিবাসীদের আক্রমণ চলছে এমন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া হিস্পানিক অপরাধীদের ছবি, ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি সহিংসতা, মানুষের মধ্যে ভয় ও আস্থা নষ্ট করে এমন নানা ধরনের আবেদন সৃষ্টিকারী বিষয়বস্তু প্রচার করা হয়েছে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কমলাকে অলস, নির্বোধ, পাথরের মতো নিশ্চল বলে আক্রমণ শানানো হয়েছে।

ট্রাম্পের দেওয়া এসব আক্রমণাত্মক বক্তব্য মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। তিনি অপরাধ নির্মূলে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহারের মতো কথা বলেছেন। এ ছাড়া দেশের মধ্যে থাকা শত্রুদের নির্মূল করার হুমকিও দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে তিনি রিপাবলিকান সমালোচক লিজ চেনিকে আক্রমণ করেও বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্য তাঁর জন্য ভোটারবিমুখ পরিস্থিতি তৈরি করেনি। তাঁর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আবার ফিরবে বলে যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, মানুষ সেটাই গ্রহণ করেছে বেশি।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

ড. ইউনূসের অভিনন্দন

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ডনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার ট্রাম্পকে লেখা এক অভিনন্দন বার্তায় দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। চিঠিতে ড. ইউনূস বলেন, ২০২৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আপনি বিজয়ী হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আপনাকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাতে পেরে আমি আনন্দিত। আপনাকে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা মানে আপনার নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। আমি নিশ্চিত আপনার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সমৃদ্ধি লাভ করবে এবং বিশ্ব জুড়ে অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে। চিঠিতে প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অসংখ্য ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আমি আমাদের অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করতে এবং টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশায় রয়েছি।

চিঠিতে ড. ইউনূস লিখেন- আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সম্ভাবনাগুলো অফুরন্ত, আমাদের দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ অংশীদারিত্বের নতুন নতুন পথ খোঁজার লক্ষ্যে কাজ করে। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবার জন্য শান্তি, সমপ্রীতি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আপনার প্রচেষ্টার অংশীদার ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশের সরকার ও শান্তিকামী মানুষ। এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আমরা তাকে স্বাগত জানাই। ট্রাম্পের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উচ্চতায় যাবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ইউএস-এর ইতিমধ্যে ভালো সম্পর্ক আছে। আগস্ট বিপ্লবের পর সেটি ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। কারণ ইউএস চায় সারা বিশ্বের দেশগুলো যেন গণতন্ত্রের চর্চা করে।

ওরা দেখছে আগের ১৫ বছর যে স্বৈরশাসক ছিল সে জায়গায় বর্তমানে যে সরকারটা এসেছে তারা চাচ্ছে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ায়। সেদিক থেকে ইউএস আরও উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আশা করছি ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হবে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বন্ধুত্বও রয়েছে। আশা করছি, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা আরও গভীর হবে। এ সময় এক প্রশ্নের উত্তরে শফিকুল আলম বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্প এখন ইউএসের প্রেসিডেন্ট। আগে যখন তিনি মাইনরিটি ইস্যুতে পোস্ট করেছিলেন তখন তিনি ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির ক্যান্ডিডেট। আমরা মনে করি তখন তাকে মিস ইনফরম করা হয়েছে। এখন যেহেতু তিনি ইউএসের প্রেসিডেন্ট সেহেতু তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন আসলে তাকে যে ইনফরমেশনটা দেয়া হয়েছে সেটি ঠিক কিনা। তিনি বলেন, মাইনরিটি নিয়ে অসংখ্য মিস ইনফরমেশন ও ডিশ ইনফরমেশন রয়েছে। কিছুদিন আগেও নেত্র নিউজ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের দাবির তথ্য যাচাই করে দেখে সবগুলো ঘটনা মিথ্যা। আমরা আশা করবো যারা রিপোর্ট করবেন তারা যেন সত্য তুলে ধরেন। অসত্যকে না প্রচার করি। এ সময় প্রেস উপ-সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর ও আবুল কালাম আজাদ মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।

mzamin


১২০ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন ডনাল্ড ট্রাম্প: বাজিমাত

ভূমিধস জয় পেলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী তিনি নিজেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করলেন। তখনো ভোট গণনা চলছে। এমন সময় বিভিন্ন প্রক্ষেপণে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প জয়ের দ্বারপ্রান্তে। ফক্স নিউজ জানিয়ে দেয় তিনি ২৭৭ ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পেয়েছেন। তার আগেই ট্রাম্প তার নেতাকর্মীদের মাঝে উপস্থিত হয়ে নিজেকে ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ডেমোক্রেট কমালা হ্যারিস পরাজয় স্বীকার করেননি। এমনই এক প্রেক্ষাপটে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে ট্রাম্প এখন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত। পাশাপাশি কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে তার দল রিপাবলিকানরা। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে এর নিয়ন্ত্রণ ছিল ডেমোক্রেটদের হাতে। কমপক্ষে ১২০ বছরের  রেকর্ড ভাঙলেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড প্রথম মেয়াদের পর দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। এর চার বছর পর নির্বাচন করে ১৮৯২ সালে তিনি জয়ী হন। ফক্স নিউজের হিসাবে, সেই রেকর্ড ভেঙে ১২০ বছর পরে হোয়াইট হাউসের চাবি হাতে আসছে ট্রাম্পের। একই সঙ্গে তিনি ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার পর নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রের প্রায় পুরোটা লাল হয়ে গেছে। লাল হলো রিপাবলিকানদের রং। পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি রাজ্য নীল রং ধারণ করেছে। এ ছাড়া মধ্যবর্তী স্থানে তিনটি রাজ্য এই রং পেয়েছে। নীল রং হলো ডেমোক্রেটদের। এই জয়ের জন্য তিনি যেমন মার্কিনিদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন, তেমনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন আরব মার্কিনিদের। ধারণা করা হয়, গাজা যুদ্ধের কারণে ডেমোক্রেটদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন মুসলিমরা। তারা এবার ব্যাপকভাবে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। তবে এদিন তিনি বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করেননি। তার জয়ে রিপাবলিকান শিবিরে আনন্দের বন্যা। অন্যদিকে ডেমোক্রেট শিবিরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। ওদিকে রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে অভিনন্দন জানিয়েছে ট্রাম্পকে। জনমত জরিপ এবং বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস ধোপে টিকলো না। যেখানে নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বলাবলি হচ্ছিল নির্বাচন নিয়ে ‘ডেডলক’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। খুব সামান্য ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে। সেখানে মঙ্গলবার রাতে (বাংলাদেশ সময় দুপুর নাগাদ) খবর চলে আসে ট্রাম্প জয়ের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি যে ধারায় ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পাচ্ছিলেন তাতে তার ধারেকাছে দাঁড়াতেই পারছিলেন না ডেমোক্রেট প্রার্থী কমালা হ্যারিস। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্থানীয় সময় বুধবার দুপুর ১টার দিকে ট্রাম্প যখন ফ্লোরিডার পাম বিচে কনভেনশন সেন্টারে দলীয় সমর্থক, নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন, তখন কমালা হ্যারিসের ডেমোক্রেট শিবির নিস্তব্ধ। পূর্ব পরিকল্পিত ভাষণ বাতিল করেন কমালা। নির্ধারিত ২৭০ মাইলফলক স্পর্শ করে আরও দূরে এগিয়ে গেছেন ট্রাম্প। তিনি জিতেছেন ২৭৭টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট। তার কাছে কুপোকাত হয়েছেন ডেমোক্রেট কমালা হ্যারিস। তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ২২৬ ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটে।

এর মধ্যদিয়ে ট্রাম্প দুইবার দু’জন ডেমোক্রেট নারী প্রার্থীকে ধরাশায়ী করলেন। ২০১৬ সালে তার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয় ডেমোক্রেট নেতা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। আর এবার পরাজিত হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট, ডেমোক্রেট কমালা হ্যারিস। চার বছর পরে আবার ট্রাম্পের হাতে উঠতে যাচ্ছে হোয়াইট হাউসের চাবি। এরই মধ্যে তিনি ফ্লোরিডার পাম বিচে দলীয় নেতাকর্মীদের কনভেনশন হলে পৌঁছে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি মার্কিনিদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। নিজেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন। দলীয় সমর্থকদের ব্যাপক করতালির মধ্যদিয়ে তিনি মঞ্চে আরোহণ করেন। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প, রানিংমেট জেডি ভ্যান্স, মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প, ছেলে ব্যারন ট্রাম্প প্রমুখ। প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষতি হয়েছে তা সারিয়ে তুলতে। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি মেলানিয়া ট্রাম্পকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেন। এ সময়ই তিনি মেলানিয়াকে ফার্স্টলেডি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে ধন্যবাদ জানান। মেলানিয়া একটি বই লিখেছেন। সেটা দেশে অন্যতম বেস্টসেলার হয়েছে বলে তার প্রশংসা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সে একটি মহান কাজ করেছে। জনগণকে সহায়তা করার জন্য সে কঠোর কাজ করে। নিজের সন্তানদের ‘অ্যামেজিং চিলড্রেন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন ট্রাম্প।

তিনি এ সময় প্রতিশ্রুতি দেন সীমান্ত সমস্যা সমাধান করার। তিনি আরও বলেন, তিনি এবং তার দল আরও একবার ইতিহাস রচনা করেছেন। এ জয়কে তিনি ‘ম্যাগনিফিসেন্ট ভিক্টরি’ বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, এর মধ্যদিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সোনালী যুগের সূচনা হলো। তিনি বলেন, এই বিজয় মার্কিন জনগণের। ফলে আমরা আবার আমেরিকাকে গ্রেট করে গড়ে তুলতে পারবো। এ সময় সমর্থকদের স্লোগানে ফেটে পড়ছিল কনভেনশন সেন্টার। তার মাঝেই ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদেরকে অপ্রত্যাশিত ও শক্তিশালী ম্যান্ডেট দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় পাশে থাকার জন্য এক্সের মালিক ও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ককে তিনি রিপাবলিকান দলের ‘নতুন তারকা’ আখ্যায়িত করেন। ট্রাম্প বলেন, প্রচারণাকালে দু’বার হত্যাচেষ্টা থেকে তিনি রক্ষা পেয়েছেন। তিনি রক্ষা পেয়েছেন একটি কারণে। ট্রাম্প বলেন, হোয়াইট হাউসে তিনি প্রতিটি কাজে উৎসাহ ও লড়াই নিয়ে আসবেন। বলেন, প্রেসিডেন্ট হওয়া হলো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সরকার চালাবেন তার ঘোষণা- ‘প্রমিজেস মেইড, প্রমিজেস কেপ্ট’ নীতি অনুযায়ী।

ট্রাম্পকে বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন: রিপাবলিকান ডনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিধস জয়ে খুশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানাতে মোটেও কালক্ষেপণ করেন নি তিনি। ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে এক্সের এক পোস্টে মোদি লিখেছেন, ‘হে বন্ধু ডনাল্ড ট্রাম্প, আপনার ঐতিহাসিক জয়ের জন্য হৃদয় নিংড়ানো শুভেচ্ছা।’ এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার প্রত্যয় জানিয়ে মোদি বলেছেন, আপনার (ট্রাম্পের) আগের মেয়াদের সাফল্যের উপর ভিত্তি করে আমি ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বৈশ্বিক এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বকে পুনরায় আরও শক্তিশালী করার জন্য উন্মুখ। আসুন একসঙ্গে আমাদের জনগণের উন্নতির জন্য এবং বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধির জন্য কাজ করি।’ ওদিকে টাইমস অব ইসরাইলের এক খবরে বলা হয়, ট্রাম্পের জয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য ট্রাম্প এবং তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন নেতানিয়াহু এবং তার স্ত্রী সারা। ইংরেজিতে লেখা এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ইতিহাসে মহান হয়ে ফিরে আসার জন্য শুভেচ্ছা। নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘হোয়াইট হাউসে আপনার (ট্রাম্পের) ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন আমেরিকার জন্য একটি নতুন সূচনা; যার মাধ্যমে ইসরাইল ও আমেরিকার মধ্যে প্রতিশ্রুতিশীল ঐক্য বজায় থাকবে। এটি একটি বিশাল বিজয়!’ বিবৃতিতে স্বাক্ষরের উপরে নেতানিয়াহু লিখেন, ‘সত্যিকারের বন্ধুত্বের জন্য’। অভিনন্দন জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ।  বিশ্বের পরবর্তী নেতা হিসেবে ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। তিনিও ট্রাম্পের বিজয়কে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার প্রত্যয় জানিয়ে স্টারমার বলেছেন, ‘আমি সামনের বছরগুলোতে আপনার সঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ।’  ট্রাম্পকে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি থেকে শুরু করে সকল বিষয়ে আটলান্টিকের উভয় তীরে সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে।’ হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানও ট্রাম্পের বিজয়কে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তন বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে তার ভূমিধস জয়ের জন্য অভিনন্দন। বিশ্ববাসীর জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় বিজয় বলেও উল্লেখ করেছেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী। ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রিপাবলিকান নেতার বিজয়কে ‘আকর্ষণীয় বিজয়’ বলে উল্লেখ করেছেন জেলেনস্কি। এক্সের পোস্টে তিনি বলেছেন, কিয়েভের নেতারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তমূলক নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রের যুগের অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের জন্য শক্তিশালী সমর্থনের উপর নির্ভর করি। বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের শক্তির প্রশংসা করেছেন জেলেনস্কি। তিনি মনে করেন, এই নীতি এমন, যা ইউক্রেনে শুধু শান্তি আনতে পারে। মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পশ্চিমা ব্লকের চির শত্রু রাশিয়া। এক্সের এক পোস্টে ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা লিখেছেন, ‘যারা অন্যের প্রতি ঘৃণা নয়, দেশের প্রতি ভালোবাসায় বেঁচে থাকে তারাই জয়ী হয়।’ এর আগে এক্সে তিনি কমালা হ্যারিসের প্রচারাভিযানের একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। সেই ভিডিওতে হ্যারিস বলেছেন, ‘রাতের কান্না শেষেই ভোরে বিজয় আসে।’

এ ছাড়া রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী দমিত্রি মেদভেদেভ টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের একটি বড় গুণ আছে, যা আমাদের জন্য বেশ কার্যকর- তিনি একজন কোটিপতি ব্যবসায়ী, তিনি ‘মূর্খ মিত্রদের’ পেছনে অর্থ ব্যয় করাকে মারাত্মকভাবে অপছন্দ করেন। তিনি ট্রাম্পকে ইউক্রেনে সাহায্য থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। মেদভেদেভ বর্তমানে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের দায়িত্ব পালন করছেন। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট বলেছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্ব ‘আমাদের জোটকে শক্তিশালী রাখার জন্য আবারো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’  তিনি আরও বলেন, ‘আমি ন্যাটো জোটের শক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করতে ট্রাম্পের সঙ্গে আবারো কাজ করার জন্য উন্মুখ।’ ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আমি ডনাল্ড ট্রাম্পকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু বলে মন্তব্য করেন উরসুলা।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের জনগণের মাধ্যমে সত্যিকারের সম্পর্কে আবদ্ধ। সুতরাং আমরা শক্তিশালীভাবে একত্রে কাজ শুরু করতে প্রস্তুত।’ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি তার এক্স পোস্টে ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘ভালো করেছেন মিস্টার প্রেসিডেন্ট।’ ইতালি এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘ঘনিষ্ঠ জাতি’ হিসেবে উল্লেখ করে ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত বন্ধন রয়েছে, যা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করি আমি।’ তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ট্রাম্পকে একজন ‘বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক্সের পোস্টে ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়ে এরদোগান বলেছেন, ‘আমি আশা করি তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। যা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জোরালো ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন-ইসরাইল এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুুদ্ধের ইতি টানতে পারবো।’ ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে এবং দু’দেশের সম্পর্ক আরও জোরালো করতে সামনের দিনগুলোতে আমরা একসঙ্গে কাজ করবো।  দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইয়ল ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, আপনার শক্তিশালী নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়া-মার্কিন জোট আরও উজ্জ্বল হবে। আমরা আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে উন্মুখ। কমালা হ্যারিসকে পরাজিত করে হোয়াইট হাউসের টিকিট পাওয়ায় ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের কথা উল্লেখ করে ম্যাক্রন বলেন, আমরা চার বছর ধরে যেভাবে কাজ করেছিলাম, আবারো সেভাবে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। উভয়ের বিশ্বস্ততার প্রত্যয়ের কথা উল্লেখ করেন ফ্রান্সের  প্রেসিডেন্ট।

mzamin

ড. ইউনূসকে ইইউ দূত: বার্তা স্পষ্ট ইইউ আপনার সঙ্গে আছে

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি আবারো পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ২৭টি রাষ্ট্রের এ জোটের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতে বলেন, বার্তা খুব স্পষ্ট, ইইউ আপনার সঙ্গে আছে। এমনকি সরকারের চলমান সংস্কার কাজের জন্য তহবিলেরও কোনো অভাব হবে না। বুধবার দুপুরে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ’র রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার এবং সফররত এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক পাওলা পামপোলিনি। এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সম্ভাব্য সব উপায়ে সমর্থন করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। পাওলা পামপোলিনি প্রধান উপদেষ্টাকে বলেন, বার্তা খুব স্পষ্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আপনার সঙ্গে আছে। আমরা আপনার সংস্কারকে সমর্থন করতে চাই। তিনি জানান, সংস্কার কাজের জন্য তহবিলের কোনো অভাব হবে না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তাও দেয়া হবে। প্রধান উপদেষ্টা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আন্তরিকতার জন্য ধন্যবাদ জানান। গত সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ফাঁকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। সে সময় উরসুলা ভন ডার লিয়েন বাংলাদেশকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে প্রধান উপদেষ্টা জানান। পাম্পালোনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে অন্যান্য অনেক দেশকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে। আমরা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আপনার ভাষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এখন আমাদের এমন একজন আছে যার সঙ্গে বাংলাদেশে কাজ করা যেতে পারে। আপনার একা বোধ করার দরকার নেই। আমরা সত্যিই সমর্থন করতে আগ্রহী। ইইউ কর্মকর্তারা বাংলাদেশকে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান, যা আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বাণিজ্য বাড়াবে। রাষ্ট্রদূত মিলার প্রধান উপদেষ্টাকে বলেন, ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ব্যবসার সুযোগ খুঁজতে জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা করছেন। প্রধান উপদেষ্টা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের শ্রম অধিকার সংস্কারে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আশ্বস্ত করেন, যা আরও বিনিয়োগ আনার পথ প্রশস্ত করবে। বলেন, আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, আমরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখি... কোনো লুকোচুরি থাকবে না। আমরা এই গেমটি আর খেলতে চাই না। ইইউ কর্মকর্তারা বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য প্রফেসর ড. ইউনূসের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেন। পাম্পালোনি বলেন, এই প্রথমবারের মতো আমরা এমন কিছু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেখেছি যা আমরা সমর্থন করি। তাই, আমরা আপনার ওপর নির্ভর করছি। প্রধান উপদেষ্টা আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগ বাড়াতে নেপাল ও ভারতের সঙ্গে কাজ করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অনুরোধ করেন। তিনি জানান, নেপালের ব্যাপক জলবিদ্যুৎ রয়েছে, যা নষ্ট হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় নেপাল, বাংলাদেশ এবং ভারতসহ অন্যরাও এর থেকে উপকৃত হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বাংলাদেশের তরুণদের দিকে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান এবং দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল দলে বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের সামপ্রতিক অর্জন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তারা এসেছে এবং জয় করেছে, শুধু একবার নয়, দু’বার। এ সময় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে অনুপ্রাণিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি ইউরোপীয় ফুটবল দল পাঠানোর অনুরোধও করেন তিনি।
mzamin

অনিশ্চিত দেশের হয়ে খেলাও: ‘সাকিবের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ’ by ইশতিয়াক পারভেজ

ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। বিষয়টি দৈনিক মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা। এর আগে ২রা অক্টোবর সাকিব ও তার স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশিরের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছিল। পুঁজিবাজারে কারসাজি ও আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে এই ক্রিকেটার ও তার স্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় তথ্য তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। জানা গেছে এরপর তদন্ত শেষে সম্প্রতি সরকারের নির্দেশে তার সকল ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। এমনটা হওয়ার কারণে সাকিব আর বাংলাদেশের হয়ে আর খেলবেন না বলেই জানা গেছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, সাকিব আসন্ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ ছাড়াও চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলবেন না। এরই মধ্যে সাকিব  টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা করেছেন। যে কারণে তার শুধু ওয়ানডে ফরম্যাটে খেলার কথা। কিন্তু এখন জানা গেছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার কারণে তিনি অভিমানে খেলবেন না সেখানেও। যদিও এটি নিয়ে সাকিব প্রকাশ্যে কোনো কিছু জানাননি। তবে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এমনটাই দাবি করেছে। শুধু তাই নয়, এতদিন নিরাপত্তার কারণে তার দেশে ফেরা ছিল অনিশ্চিত এবার এই ঘটনায় ষ্পষ্ট হলো তার ফিরে আসার পথ প্রায় বন্ধই হয়ে গেলো। তিনি চট্টগ্রাম কিংসের হয়ে খেলতে পারবেন না বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগেও (বিপিএল)। খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার শঙ্কা, সাকিববিরোধীদের দ্বারা নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সবশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হওয়ার কারণে তার বাংলাদেশে ফেরাটাই হয়ে গেছে অনিশ্চিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘এটি নিশ্চিত যে সাকিব আল হাসানের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে।’ তবে সিদ্ধান্তটি কবে এসেছে তা তিনি জানাতে রাজি হননি।

সাকিব আল হাসান ছিলেন ছাত্র আন্দোলনের মুখে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সংসদ সদস্য। দলটির হয়ে তিনি ছিলেন রাজনীতিতে সক্রিয়। যখন ছাত্র আন্দোলনে নিহতের ঘটনা বাড়ছিল তখন তিনি ছিলেন দেশের বাইরে। এমনকি এই ঘটনাতে তিনি ছাত্রদের পক্ষে কোনো মন্তব্যও করেননি। উল্টো পরিবার নিয়ে আনন্দ ভ্রমণের ছবি পোস্ট করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।  তার আন্দোলন চলাকালে তার নীরবতাকে পতিত সরকারের
প্রতি তার সমর্থনই মনে করেছেন দেশের জনগন। ধারণা করা হচ্ছিল তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার পাঁচ আগষ্টের পরই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ক্রিকেটার সাকিবের প্রতি সম্মান দেখায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দেশের বাইরে থেকেই তাকে জাতীয় দলে খেলতে সুযোগ দেয়া হয়। তিনি পাকিস্তান ও ভারতে টেস্ট সিরিজ খেলেন দলের হয়ে। সবশেষ ভারতের কানপুরে তিনি ঘোষণা দেন টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে অবসরের। তবে নিজের ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট ম্যাচটি খেলতে চান ঢাকায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। শুরুতে তার দেশে আসার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত ছিল। তবে সিরিজের আগে ১৬ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে  দুবাই এসেও দেশের বিমান ধরতে পারেননি। তাকে সরকারের উপর মহল থেকে দেশে না ফিরতে নির্দেশ দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, তার দেশে আসা ঠেকাতে সাকিব বিরোধীরা মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সামনে শুরু করে সামাবেশ। অন্যদিকে ম্যাচের আগের দিন সাকিবের ভক্তরা অবস্থান নেয় স্টেডিয়ামের সামনে। এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে সংঘর্ষে মিরপুর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সাকিবভক্তদের ওপর কে বা কারা হামলাও চালায়। পরে পুলিশ ও সেনা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে  সিরিজে সাকিবকে দলে রাখেনি বিসিবি। বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ জানিয়েছিলেন এই সিরিজে না খেললেও তার খেলার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। তবে পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা।  বেশ কয়েকটি সূত্র থেকে জানা গেছে সাকিবকে জাতীয় দলে রাখা হলেই তাকে দেশে ফেরানোর জন্য তার ভক্তরা দাবি তুলবে। সেটি হলে ফের দেশে তৈরি হবে অশান্তি। শুধু তাই নয়, বিপিএলে তাকে খেলার সুযোগ করে দিলেও তার নিরপত্তা দেয়া হবে বিসিবি’র অন্যতম মাধা ব্যথার কারণ। তখন ৭ দলের দেশি বিদেশি ক্রিকেটারদের নিরাত্তার মাঝে একা সাকিবকে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টিও কঠিন হয়ে পড়বে। যে কারণে তার দেশে এসে কিংবা দেশের হয়ে খেলা হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। আর জানা গেছে ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়াতে এত সব জটিলতা নিয়ে তিনি নিজেও আর দেশে হয়ে খেলতে চান না! 

mzamin

৭ই নভেম্বর ঘটেছিল অভূতপূর্ব সিপাহী জনতার ঐক্য by শায়ের খান

৭ই নভেম্বরের সেই উত্তাল অনিশ্চিত দিনগুলোয় সাধারণ সিপাহী-জনতার কাছে বেস্ট চয়েস ছিল জিয়াউর রহমান। এর কারণ, জিয়া ছিলেন স্মার্ট, ক্যারিশম্যাটিক, সাহসী ও দেশপ্রেমিক। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ কালরাত্রির পর নেতাবিহীন  হতবিহ্বল জাতির সামনে দেবদূতের মতো উদয় হয়েছিলেন এই অখ্যাত ‘মেজর জিয়া’।

রেডিওর যন্ত্রপাতি টেনে দুর্গম কালুরঘাট থেকে তার স্বাধীনতার ঘোষণা আর কমান্ডিং গলায় ‘উই রিভোল্ট’ মুহূর্তে স্পার্ক করে মুক্তিকামী জনতাকে। মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা।  জিয়াউর রহমানই হচ্ছেন একমাত্র নেতা যিনি দুই দুইবার দেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র হওয়া থেকে বাঁচাতে লিড দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে ২৬শে মার্চ দেশে যখন কোনো উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন না, তখন সাড়ে সাত কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করে মুক্তিযুদ্ধে নামিয়ে দেন তিনি।

৭ই নভেম্বর এক ইতিহাসের নাম। এ জাতির জন্য শ্বাসরুদ্ধকর কয়েকটি রক্তস্নাত দিনের পরিসমাপ্তি। দিনটি  ছিল বাংলাদেশের সিপাহী-জনতার বিজয়ের দিন। ইন ফ্যাক্ট পুরো জাতির উদ্ধার পাওয়ার দিন। আর সময়টা ছিল ১৯৭৫ সাল।   
বাংলাদেশের জন্মের পরপরই দেশ ডুবে গিয়েছিল বেদনাদায়ক সব ড্রামাটিক ঘটনায়। অধিকার আর গণতন্ত্রের লড়াইয়ে লাখে লাখে জীবন দিয়ে এ জাতি এনেছিল বিজয়। কিন্তু অচিরেই দেখলো  মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিসর্জন, চুরি, লুটপাট, একদলীয় শাসন, গুম, খুন ও বিয়োগান্তক সব ঘটনা।  

বাংলাদেশের জন্য ১৯৭৫-এর ৭ই নভেম্বরের আগের ক’টা দিন ছিল অনিশ্চিত। ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত। সশস্ত্র ওয়েস্টার্ন মুভি’র মতো। মুভি’র কাহিনী নেয়া হয় জীবন থেকেই। আর এই ক’টা দিন মোটেই কোনো শ্বাসরুদ্ধকর বেদনাদায়ক মুভি’র চেয়ে কম ছিল না।    

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি অংশ সিটিং প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে (শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাদে) হত্যা করে অভ্যুত্থান ঘটায়। এর ফ্রন্টলাইনে ছিলেন তদানীন্তন মেজর ফারুক-মেজর রশিদ-মেজর ডালিম। তারা সফলও হন। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ, বীরউত্তম। অভ্যুত্থানকারীদের সমর্থনে আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশ্‌তাক আহমেদ নতুন প্রেসিডেন্ট হন। ২ জন ছাড়া আওয়ামী লীগের সব সংসদ সদস্য মোশ্‌তাকের নতুন সরকারে যোগ দেন। এরপর সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ পদত্যাগ করলে উপ-প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীরউত্তম নতুন সেনাপ্রধান হন।    

১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, বীরউত্তম ও কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে আবারো একটি ক্যু হয়। খালেদ মোশাররফের এই ক্যু ছিল  আওয়ামী লীগের পক্ষে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। তিনি নিজেকে মেজর জেনারেল পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান হন। মোশ্‌তাককে সরিয়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে প্রেসিডেন্ট করেন। আগের অভ্যুত্থানকারীরা  দেশত্যাগ করে থাইল্যান্ড উড়াল দেন। তারা দেশত্যাগের আগ মুহূর্তে কিছু সেনাসদস্য জেলখানায় আওয়ামী লীগের ৪ হাই প্রোফাইল নেতাকে হত্যা করে। আবারো টানটান উত্তেজনায় পড়ে দেশবাসী।

৩ দিন টানা উত্তেজনায় কেটে যায় জনতার দিনরাত্রি। ৭ই নভেম্বর ভোরে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহীরা জেনারেল খালেদ মোশাররফের বিপক্ষে ৩য় পাল্টা ক্যু করে। এই ক্যু’তে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের পর নিহত হন জেনারেল খালেদ মোশাররফ। সাধারণ জনগণ সিপাহীদের সঙ্গে রাস্তায়  নেমে আসে। সিপাহী ও জনতা তাদের প্রিয়নেতা বন্দি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে খুঁজে বের করে নিয়ে আসে। জিয়া আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন সিপাহী-জনতার সমর্থনে।  

এই শেষ অভ্যুত্থানটি মূলত জাসদ সমর্থিত কর্নেল (অব.) তাহের, বীরউত্তমের কৌশলগত নেতৃত্বে হয়েছিল। কর্নেল তাহের জেনারেল খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধাবস্থানে  ছিলেন। আর সাধারণ সিপাহী-জনতা ১৯৭১-এর স্বাধীনতার ঘোষক সেই ‘মেজর জিয়া’র বন্দিতে ক্ষোভে ফুঁসছিল। ফলে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে।  

আস্তে আস্তে সকল ঘাত-প্রতিঘাতের অবসান হতে থাকে। জেনারেল জিয়া সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে দেশকে স্থিতিশীল করতে সামরিক শাসন জারি করেন। সিটিং প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে করেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক।  
মোটা দাগে এটাই ৭ই নভেম্বরের সিপাহী- জনতার বিপ্লবের সাদামাটা স্কেচ। এই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ চরম বিশৃঙ্খল ও অনিশ্চিত এক দুঃখজনক অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছিল।

আজ ৪৯ বছর পর খুব সহজে এই স্কেচ আঁকা গেলেও সেই সময়ের পরিস্থিতিটা ছিল জাতির জন্য ভয়াবহ ও টানটান উত্তেজনায় ভরা। ছিল অনিশ্চিত ও রক্তস্নাত। মাত্র ৪ বছর আগে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন করা জনতার ভাগ্য দুলছিল পেন্ডুলামের মতো। একবার ডানে, একবার বাঁয়ে।  

ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বরকে যদি আমরা একেবারে নিরপেক্ষ ড্রোন শটে উপর থেকে দেখি, তবে কিছু ইন্টারেস্টিং বিষয় চোখে পড়বে। যেমন, এই শ্বাসরুদ্ধকর নাটকীয় ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিল ৪টি আলাদা আলাদা গ্রুপ। এক. শেখ পরিবার সদস্যদের হত্যা করে অভ্যুত্থান ঘটানো ফারুক-রশীদ-ডালিম গ্রুপ। এরা প্রত্যেকে ছিলেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। দুই. আওয়ামীপন্থি ২য় অভ্যুত্থানকারী খালেদ মোশাররফ গ্রুপ। জেনারেল মোশাররফ ছিলেন বীরউত্তম। তিন. খালেদ মোশাররফকে পরাভূত করা জাসদ সমর্থক ৩য় অভ্যুত্থানকারী কর্নেল তাহের গ্রুপ। কর্নেল তাহেরও ছিলেন বীরউত্তম। চার. বন্দি জেনারেল জিয়াউর রহমান, সাধারণ সিপাহী ও জনতার নিরপেক্ষ গ্রুপ। জেনারেল জিয়াউর রহমানও ছিলেন বীরউত্তম। অর্থাৎ বিবদমান ও নিরপেক্ষ  ৪টি গ্রুপই ছিল ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থাকা টগবগে মুক্তিযোদ্ধা।

৭ই নভেম্বরের সেই উত্তাল অনিশ্চিত দিনগুলোয় সাধারণ সিপাহী-জনতার কাছে বেস্ট চয়েস ছিল জিয়াউর রহমান। এর কারণ, জিয়া ছিলেন স্মার্ট, ক্যারিশম্যাটিক, সাহসী ও দেশপ্রেমিক। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ কালরাত্রির পর নেতাবিহীন  হতবিহ্বল জাতির সামনে দেবদূতের মতো উদয় হয়েছিলেন এই অখ্যাত ‘মেজর জিয়া’। রেডিওর যন্ত্রপাতি টেনে দুর্গম কালুরঘাট থেকে তার স্বাধীনতার ঘোষণা আর কমান্ডিং গলায় ‘উই রিভোল্ট’ মুহূর্তে স্পার্ক করে মুক্তিকামী জনতাকে। মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা।  জিয়াউর রহমানই হচ্ছেন একমাত্র নেতা যিনি দুই দুইবার দেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র হওয়া থেকে বাঁচাতে লিড দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে ২৬শে মার্চ দেশে যখন কোনো উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন না, তখন সাড়ে সাত কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করে মুক্তিযুদ্ধে নামিয়ে দেন তিনি। নিজেও নামেন। অকার্যকরের বদলে স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করেন দেশকে। আর দ্বিতীয়বার ১৯৭৫-এর ৭ই নভেম্বর। অকার্যকরের দিকে যাওয়া চরম বিশৃঙ্খল রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাহসের সঙ্গে কাঁধে নিয়ে তিনি জাতিকে ট্র্যাকে উঠান।   

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে-‘নেতা তৈরি করা যায় না, নেতা উদয় হয়।’ মেজর জিয়া উদয় হয়েছিলেন। আবার বলা হয়-  ‘প্রকৃত নেতা সে-ই, যাকে দেখামাত্র জনতা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।’ ১৯৭৫-এর ৭ই নভেম্বর জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে সিপাহী-জনতার উল্লাস ছিল ঐতিহাসিক। এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে শহীদ জিয়ার জানাজায় উপস্থিত মানুষের সংখ্যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড হয়ে আছে। জিয়া ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন সফল সমর ও রাষ্ট্রনায়ক।

তারুণ্যের সঙ্গে জিয়া’র এক অদ্ভুত কেমিস্ট্রি আছে। কাকতালীয়ভাবে বৈষম্যবিরোধী বিপ্লবী প্রজন্ম অন্য কারণে নিজেদের জেন-জি বললেও অনেকে মজা করে বলেছে- ওটা জেনারেল জিয়ার সংক্ষেপ। সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ খুব বুদ্ধিমান। প্রতিপক্ষরা যখন জেন-জি’কে ট্রল করে গে-ঞ্জি বলছে, তখন হাসনাত এক টকশো’তে সম্ভবত ট্রল এড়াতে জেন-জি’কে জেন-জেড বলে দিয়েছে। মজার বিষয়, জেড-এর মধ্যেও লুকিয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়ার ‘জেড ফোর্স’।  

এমন একজন বিস্তৃত ব্যক্তির নাম ৭ই নভেম্বরের সঙ্গে চলে আসবে- এটাই  স্বাভাবিক। ৭ই নভেম্বর শুধুই নির্দিষ্ট কোনো দলের দিবস না, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবস। দেশরক্ষায় সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিজয়ের এক মহান দিন।     

লেখক: নাট্যকার-ফিল্মমেকার  

‘ভাগ্যে ছিল বলেই এখানে সভাপতি হয়ে ফিরেছি’

চার বছর আগে সহ-সভাপতির নির্বাচনে ফেল করে বাফুফে ছেড়েছিলেন তাবিথ আউয়াল। সেই তাবিথ কাল বাফুফে ভবনে ফিরলেন সভাপতি হয়ে। প্রথমবারের মতো সভাপতি হিসেবে ভবনে এসে সাক্ষাৎ করেন বাফুফের সকল এক্সিকিউটিভের সঙ্গে। সাধারণ সম্পাদকের অনুপস্থিতিতে বাফুফের কর্মকর্তাদের নানা নির্দেশনা দেন তাবিথ। এরপর নারী ফুটবলারদের সঙ্গেও কথা বলেন বাফুফে বস। আগামী ৯ই নভেম্বর প্রথম সভায় বসবে বাফুফের নতুন কমিটি। ওই সভা শেষে চ্যাম্পিয়ন নারী দলের জন্য বড় ঘোষণা দিতে চান বাফুফের এই নতুন সভাপতি।  

গত ২৬শে অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় বাফুফের নির্বাচন। সেখানে ১২৩ ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হন তাবিথ আউয়াল। সভাপতি নির্বাচিত হয়েই এএফসি কংগ্রেসে যোগ দিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। সেখান থেকে থাইল্যান্ড হয়ে গত রোববার ঢাকায় ফেরেন তাবিথ। গতকাল নির্বাহী কমিটির প্রায় সকল সদস্যকে নিয়ে প্রথমবারের মতো বাফুফে ভবনে আসেন নয়া সভাপতি। প্রথমে সভা করেন বাফুফের বেতনভুক্ত সকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঙ্গে। তাবিথ এটাকে সৌজন্য সাক্ষাৎ বললেও, জানা গেছে পরিষ্কার মেজেজ ছিল তার এই সভাতে। সেখানে অতীত ভুলে সামনের দিকে কাজে মন দিতে বলেছেন নতুন সভাপতি। পাশাপাশি দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাফুফে বস। সভাপতি হয়ে বাফুফেতে ফেরা নিয়ে তাবিথ বলেন, ‘আসলে ভাগ্য বলতে পারেন। একদম চার বছর আগে নির্বাচনে হেরে যাই। সে ব্যাপারে অভিযোগ ছিল এবং আছে। সেটা আসলে মুখ্য বিষয় নয়। তবে সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে নিশ্চিত ফিরে আসবো। কিন্তু পরেরবার আমি সভাপতি হয়ে ফিরবো। এর দুটি কারণ ছিল; একটি ছিল, বাফুফে নির্বাচনে দুইবার সহসভাপতি হয়েছি। যদি জিততাম তিনবার হতো। অভিজ্ঞতা ছিল আমার যথেষ্ট। কিন্তু যেভাবে ভেবেছিলাম সেভাবে কাজ করতে পারিনি। তাই ভেবেছিলাম, পরেরবার সভাপতি হয়ে না এলে সেই কাজগুলো করতে পারবো না। শেষের দিকে এসে একরকম জেদ কাজ করেছে। বলতে পারেন সেটা থেকেই সভাপতি হিসেবে ফিরছি।’ নতুন দায়িত্বকে নতুন চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বাফুফের এই নয়া সভাপতি বলেন, ‘যারা আমাকে নির্বাচিত করেছেন, তারা তো আমার ওপর প্রত্যাশা রাখছেন। আমি যেন ফুটবলকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। এখন সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে আমাকে।  আমরা যেটা বললাম, অতীতে কী হয়েছে সেটা দেখছি না। সামনে কী করবো, সেসব নিয়ে ভাবছি। আমাদের মেয়েরা ও ছেলেরা যদি মাঠে ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারে, তাহলে এই সুনামের সঙ্গে ব্র্যান্ডিং এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু দুটোই বাড়বে।’ মেয়েদের পুরস্কার নিয়ে তাবিথ বলেন, ‘বাফুফের পক্ষ থেকে ৯ তারিখে একটা ঘোষণা আসবে। এছাড়া আমরা জানতে পেরেছি অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নারী দলকে সংবর্ধনা দিতে চায় এবং উপহার দিতে চায়। বাফুফের পক্ষ থেকে একটা ঘোষণা আসবে একটা আয়োজন করা হবে নির্বাহী কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে যাতে আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়টা নিশ্চিত করা যায়।’ বাফুফের এবারের কমিটির ১৪ সদস্যের মধ্যে সাত জনই নতুন মুখ। এছাড়া সহ-সভাপতি হিসেবে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে এসেছেন নাসের শাহরিয়ার জামান জাহেদী, ওয়াহিদ উদ্দিন চৌধুরী হ্যাপি, সাব্বির আহমেদ আরেফ ও ফাহাদ করিম চৌধুরী। আগের কমিটির সহ-সভাপতি ইমরুল হাসান হয়েছেন সিনিয়র সহ-সভাপতি। সবমিলিয়ে এবারের কমিটি কেমন হয়েছে জানতে চাইলে তাবিথ বলেন, ‘আমার সহযাত্রীদের ব্যাপারে এখনও আমার যোগ্যতা নেই ডেলিগেটের ভোটে যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তাদের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করার। বরং তাদেরকে প্রশ্ন করা উচিত, তারা আমাকে নিয়ে সন্তুষ্ট কী না, আমি নেতৃত্বের জন্য যোগ্য কী না। ওনাদের ডেলিগেটরা নির্বাচিত করে এনেছেন। এখন বাকী দিনগুলো মিলেমিশে আমাদের সবাইকে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে নিজেদের সামর্থ্যের পুরোটা দিয়ে।

mzamin

হিমালয় অববাহিকায় দুর্গম অঞ্চলজুড়ে নতুন গ্রাম গড়ে তুলছে চীন

হিমালয় অববাহিকায় নিজ সীমান্তের কাছে দুর্গম অঞ্চলজুড়ে নতুন গ্রাম গড়ে তুলছে চীন। কুয়াশায় ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়ের গায়ে দেখা গেছে তিব্বতী শৈলীর ধাচে নির্মিত ছোট ছোট ঘর। ভূমি থেকে পাইন বনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি গ্রামে ঢুকে গেছে একটি সড়ক। প্রতিটি ঘরের উপরে রয়েছে চীনের পতাকা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।

এতে বলা হয়, হিমালয় ঘেষা চীনের দুর্গম এলাকাগুলোতে এমন ঘরবাড়ি গড়ে উঠার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেখানের সড়কগুলোতে ঘর নির্মাণের সরঞ্জামাদি দেখা গেছে। এছাড়া ঘর বানানোর ভারী যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কাজও চলমান রয়েছে।
চীনের ভ্রমণপিয়াসু এক ভ্লগারের ভিডিওতে এসব চিত্র দেখা গেছে। ভিডিওতে তিনি বলেছেন, তারা সেখানে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছে। তাকে সড়কের পাশের চিত্র দেখানোর পাশাপাশি তার বর্ণনা দিতে দেখা যায়। তিনি বলেন, যেহেতু লোকজন এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, অর্থাৎ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে- এটা আমাদের দেশেরই অংশ।

গ্রামটির নাম দেমালং। ৭০টি পরিবারের বসবাসের মধ্য দিয়ে গত বছরের মার্চ মাসে এই গ্রামের গোড়াপত্তন হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সরকারি নোটিশে গ্রামটিকে চীন নিজের বলে দাবি করেছে। তবে এই অঞ্চলটি শুধু চীনের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীন সীমান্তজুড়ে যে বসতি স্থাপন করছে এটি তারই ধারাবাহিক একটি অংশ। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে ভুটানের সরকারী মানচিত্রে দেখানো সীমানার মধ্যেও এই অংশটি রয়েছে। দেশটিতে ১ মিলিয়নেরও কম সংখ্যক মানুষ বাস করে। সিএনএন-এর খবরে বলা হচ্ছে ভুটানের সম্মতি ছাড়াই এভাবে হিমালয় অববাহিকায় গ্রাম গড়ে তুলছে চীন।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পূর্ব হিমালয়ের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উপরে গ্রীষ্মকালীন চারণভূমির সন্ধানে এখানে জড়ো হয় পশুপালনকারী সম্প্রদায়গুলো। কিন্তু এখন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ফলে চীন সরকার ভুটানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসতি বাড়াচ্ছে। যার কিছু কিছু অঞ্চল ভুটানের মানচিত্রেও রয়েছে। উল্লেখ্য, কয়েক দশক ধরে অমীমাংসিত সীমান্ত নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে চীন ও ভুটান। সেই আলোচনার পটভূমিতে রয়েছে ভারত। দেশটি চীনের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ভুটানের কূটনৈতিক মিত্র। 

mzamin

ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বর আজ

ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বর আজ। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এদিনে আধিপত্যবাদী চক্রের সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে সিপাহী-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল। দিবসটি উপলক্ষে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দল কর্মসূচি পালন করবে। বিএনপি’র কর্মসূচির   অংশ হিসেবে আজ সকাল ১১টায় শেরেবাংলা নগরস্থ সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধিতে বিএনপি’র পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ করা হবে।

এ ছাড়া দিবসটি ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে শোভাযাত্রাসহ ১০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বাণীতে তারেক রহমান বলেন, ৭ই নভেম্বর জাতীয় জীবনের এক ঐতিহাসিক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে সিপাহী-জনতা রাজপথে নেমে এসেছিল জাতীয় স্বাধীনতা সুরক্ষা ও হারানো গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের অভূতপূর্ব অঙ্গীকার নিয়ে। তাই ৭ই নভেম্বরের ঐতিহাসিক বিপ্লব অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। স্বাধীনতাত্তোর রাষ্ট্রীয় অনাচার, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহল নিজ স্বার্থে জাতীয় স্বাধীনতাকে বিপন্ন ও সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে আধিপত্যবাদের থাবার মধ্যে দেশকে ঠেলে দেয়। শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্যই গণতন্ত্রবিনাশী কর্মকাণ্ড শুরু করে। সেজন্য মানুষের বাক-ব্যক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গলাটিপে হত্যার মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল গঠন করে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়। শুরু হয় নির্মম একদলীয় দুঃশাসন। দেশে নেমে আসে অশান্তি ও হতাশার কালো ছায়া। বাকশালী সরকার চরম অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী পন্থায় মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকারগুলোকে হরণ করে।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার মহিমান্বিত আত্মদানের মধ্যদিয়ে ফ্যাসিস্টরা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। মানুষের মধ্যে গণতন্ত্রের মুক্তির পথ প্রসারিত হয়েছে। এখন চূড়ান্ত গণতন্ত্রের চর্চার জন্য অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনসহ গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত মানুষের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের নতজানু নীতির কারণেই আমাদের আবহমানকালের কৃষ্টি, ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর  চলেছিল বাধাহীন আগ্রাসন। তাই আমি মনে করি ৭ই নভেম্বরের চেতনায় সকল জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্রের পথচলাকে অবারিত এবং  জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।

ওদিকে এক বিবৃতিতে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান দিবসটি পালনে দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও চক্রান্ত মোকাবিলায় এই দিনটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক।

mzamin


গুলিতে আলী হোসেনের মৃত্যু: দুই সন্তানকে নিয়ে অন্ধকার দেখছেন রত্না by ফাহিমা আক্তার সুমি

আলী হোসেন। জীবিকার জন্য কাজ করতেন একটি দোকানের কর্মচারী হিসেবে। ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। গুলিটি বুকের ডান পাশে বিদ্ধ হয়। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে মারা যান। সাত ভাইবোনের  মধ্যে আলী হোসেন ছিলেন সবার ছোট। তার ছোট দুই সন্তান রয়েছে। বাবা মো. ইদ্রিস মারা গেছেন বহুবছর আগে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে ভাড়া বাসায়। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন আলী। তার মৃত্যুতে সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না স্ত্রী রত্না বেগমের। আলীর মৃত্যুতে পুরো পরিবারটিতে নেমে এসেছে অন্ধকার।

আলী হোসেনের ভাই আলী আকবর মানবজমিনকে বলেন, ১৯শে জুলাই বিকালের দিকে নিউমার্কেট এলাকায় বিকাল পাঁচটার দিকে গুলিবিদ্ধ হয় আমার ভাই। সন্ধ্যায় আমরা খবর পেয়ে ঢাকা মেডিকেলে যাই। একটা গুলি আমার ভাইয়ের বুকের ডান পাশে লাগে। সেদিন নিউমার্কেট এলাকায় অনেক গোলাগুলি হয়। আমাদের ভাইবোনের মধ্যে আলী ছিল সবার ছোট। রাতুল (১৩) ও ফাহিম (৬) নামে তার দুই সন্তান রয়েছে। আমাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। বাবা অনেক আগে মারা যান। মায়ের বয়স হয়েছে, তার সব ছোট সন্তানকে হারিয়ে একদম ভেঙে পড়েছেন। আমরা সব ভাইবোন কামরাঙ্গীরচরে পাশাপাশি থাকি। ওর সন্তানরা বাবাকে হারিয়ে অসহায় জীবন-যাপন করছে। বড় ছেলেটি মাদ্রাসায় পড়তো ওর বাবা মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে নিয়ে এসেছি। সন্তানরা সব সময় বাবার কথা বলতে থাকে, বাবার জন্য কাঁদে।

তিনি বলেন, আমার ভাই দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। বাবা খুব অল্প বয়সে মারা যান তখন আলী হোসেন অনেক ছোট ছিল, কিছুই বুঝতো না। বাবা মারা যাওয়ার পরে আমিই ভাইটিকে মানুষ করি। আমাদের পারিবারিক অবস্থা এত ভালো ছিল না। বাবা একটি পাউডার কারখানায় কাজ করতেন। ভাই যেদিন মারা যায় সেদিন সকাল নয়টার সময় আমার সঙ্গে কথা হয়। সে তখন কাজে বের হয়। আমি ওকে বলি, ভাই যাই করো না কেন চারদিকের অবস্থা বেশি ভালো না সোজা দোকানে গিয়ে আবার সোজা বাসায় চলে এসো। আমিও মার্কেটে চাকরি করি। ও চলে আসার এক-দেড় ঘণ্টা পর আমিও মার্কেটে যাই আবার দোকান বন্ধ করে দুপুরের দিকে বাসায় চলে আসি। মার্কেটে থাকতে ঘটনার আগেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেট থেকে বের হতে চেয়েছিল। ওর সঙ্গে আরেকটি লোকও মারা যায় গুলিতে।

আলী আকবর বলেন, ভাই হারানোর যন্ত্রণা কাউকে বোঝানোর মতো না। আমাদের সবার ছোট হওয়ায় অনেক আদরের ছিল। ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে মানুষ হয়েছে সেজন্য ওর প্রতি অনেক মায়া আমার। আলী হোসেনের লাশ নিয়ে অনেক ঝামেলা ছিল। মৃত্যুর তিনদিন পর অনেক জায়গা দৌড়িয়ে, অনেক ভোগান্তি পেরিয়ে আমার ভাইয়ের লাশ বুঝে পাই। পরে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। অনেকে খোঁজ-খবর নিচ্ছে। আলীর মৃত্যুতে স্ত্রী-সন্তান একদম ভেঙে পড়েছে। এদিকে বয়স্ক মা সন্তানকে হারিয়ে তিনিও ভেঙে পড়েছেন। সেই তার পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল। তার সন্তানরা একেবারে ছোট। ছোটবেলা থেকে আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় পড়াশোনা করাতে পারিনি। তিনি বলেন, আমার ভাই দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। তাকে হারিয়ে স্ত্রী-সন্তানরা অসহায় হয়ে পড়েছে। সন্তানদের নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তা করতে থাকে। কীভাবে মানুষ করবে, কীভাবে গড়বে তাদের ভবিষ্যৎ। ওদের বাবা যে টাকা আয় করতো তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলতো। অল্প আয় থাকলেও সন্তানদের জন্য ছায়া ছিল। সব বাবা-মায়েরই তো চিন্তা থাকে সন্তানদের নিয়ে। এখন আলীর মৃত্যুতে হতাশ হয়ে পড়েছে তার স্ত্রী। সন্তানদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তা করছে।

mzamin

সিলেটে সন্ত্রাসী শুটার আনসার গ্রেপ্তার by ওয়েছ খছরু

সিলেটের মেজরটিলার ত্রাস ‘শুটার’ আনসার। তার ভয়ে তটস্থ থাকতো এলাকার মানুষ। সেই আনসার পলাতক হওয়ার তিন মাসের মাথায় র‌্যাব’র হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। এতে এলাকায় ফিরেছে স্বস্তি। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পূর্ব পর্যন্ত এলাকায় ভয়ঙ্কর ত্রাস ছিল আনসার। ৪ঠা আগস্ট সিলেটের রাজপথে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। এ সময় মাঠের দখল নিতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে গুলি ছুড়ে। ওইদিন সিলেটের রাজপথে একটি শর্টগান হাতে নিয়ে হাজির হয়েছিল শুটার আনসার। মাথায় হেলমেট পরে রাজপথে ছিল বেপরোয়া। অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলিবর্ষণের ঘটনার দিন রাজপথে সশস্ত্র অবস্থায় থাকা আনসারের ছবি পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। গণমাধ্যমেও আসে তার ছবি। পরবর্তীতে প্রশাসনের তদন্তে অস্ত্র সহ আনসারকে চিহ্নিত করা হয়। তবে; ৫ই আগস্টে সরকার পতনের দিন থেকে আনসার পলাতক ছিল।  মেজরটিলার বাসিন্দারা জানিয়েছেন; শেখ হাসিনার পতনের পর মেজরটিলা এলাকার ছাত্র-জনতা সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ দেখিয়েছে। ওইদিন তারা শুটার আনসারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আড্ডাস্থল ও বাড়িও ভাঙচুর করে। ওইদিনই ছাত্র-জনতার ক্ষোভ থেকে রক্ষা পেতে শুটার আনসার গা-ঢাকা দেয়। এরপর থেকে গত তিন মাস এলাকায় তার কোনো উপস্থিতি ছিল না। গতকাল দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনার ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী ‘শুটার’ আনসার ও তার সহযোগী নাঈমকে সিলেট জেলার ওসমানীনগর থানার বড় হাজিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাব’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে; শাহ্‌পরাণ থানার তালিকাভুক্ত আসামি আনসার ওসমানীনগর উপজেলার বড় হাজীপুর গ্রামের একটি বাড়িতে অবস্থান করছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে গতকাল দুপুরের পর র‌্যাব’র পক্ষ থেকে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে শুটার আনসার আহমদ ও তার বন্ধু আমিনুল ইসলাম নাঈমকে গ্রেপ্তার করে। আনসারের বাড়ি মেজরটিলার সৈয়দপুর এলাকায়। তার পিতার নাম উনাই মিয়া। আর নাঈম মেজরটিলার ইসলামপুর কলোনির আলমগীর হোসেনে ছেলে। আত্মগোপনে তারা ওসমানীনগরের ওই গ্রামে অবস্থান করছিল। র‌্যাব জানিয়েছে- শুটার আনসার এলাকার ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাদের থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।মেজরটিলা এলাকার স্থানীয়রা জানিয়েছেন- শুটার আনসার মেজরটিলা ও ইসলামপুরের স্থানীয় বাসিন্দা। এলাকায় সে অস্ত্রবাজ ও ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। তার নেতৃত্বে মেজরটিলা বাজারে একটি অপরাধী গ্রুপ রয়েছে। জমি দখল, দোকান দখল কিংবা আধিপত্য বিস্তারে তাদের ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা।  মেজরটিলা এলাকা শাসন করতেন সিলেট জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন। সরকারের শেষদিকে এসে জাহাঙ্গীরের কাছাকাছি ভিড়ে শুটার আনসার। মূলত শেল্টার নিতে সে দলবল নিয়ে জাহাঙ্গীরের বলয়ে ঢুকে। এর আগে এলাকায় জমি দখল নিয়ে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। এসব বিরোধকে কেন্দ্র করে সব সময় মহড়া-পাল্টা মহড়া চলে মেজরটিলার টেক্সটাইল মিল ও সৈয়দপুর এলাকায়।  মেজরটিলা পয়েন্টে তার মালিকানাধীন একটি রেস্টুরেন্ট ছিল। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন; শুটার আনসার রেস্টুরেন্টকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করতেন। এলাকায় ছিনতাই, মাদক সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে সে পরিচিত ছিল। কেউ ভূমি দখলে নিতে হলে তার গ্রুপকে ব্যবহার করতেন। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অপরাধীরা মেজরটিলা, ইসলামপুর, সৈয়দপুর, শ্যামলী, পল্লবী ও মোহাম্মদ এলাকায় মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল। একই সঙ্গে বাসা দখল করে অসামাজিক কাজেও নিয়ন্ত্রণ ছিল তার। তারা জানিয়েছেন; ভয়ঙ্কর অপরাধী হওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতেন না। যারাই প্রতিবাদ করেছেন- হামলার শিকার হয়েছেন। এলাকার লোকজন জানান- মেজরটিলার পাশেই হচ্ছে সিলেট এমসি ও সরকারি কলেজ। এর পাশে আলোচিত টিলাগড় পয়েন্ট। ফলে এ দু’টি কলেজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাতা এবং টিলাগড় দখলে রাখতে এর আগে নিজ দলের প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে লড়াইয়ে অস্ত্র নিয়ে বেপরোয়া ছিল শুটার আনসার। এমসি কলেজে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায়ও এসেছিল তার নাম। তখন রাজনৈতিক নেতাদের শেল্টার থাকায় তার বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যায়নি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ওই সময় শাহ্‌পরাণ থানা পুলিশের মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সখ্য ছিল। ফলে শুটার আনসার সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।
mzamin