Monday, October 6, 2014

গল্প- মিতাপু by আনিসুল হক

সত্য বটে আজ আর তাকে ভালোবাসি না, কিন্তু একসময় কী ভীষণ ভালোই না তাকে বেসেছিলুম... পাবলো নেরুদা।

মিতাপুকে দেখে আমি চমকে উঠলাম। সেই মিতাপু। এ কি সেই মিতাপু!
রাতের বেলা গেছি বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে। দিনের বেলা হরতাল। রাতের বেলা ‘ও’ লেভেলের পরীক্ষা হচ্ছে। আমার মেয়ে রিমঝিম পরীক্ষা দিচ্ছে। তাকে নিয়ে এই রাতের বেলা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আসতে হয়েছে। দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের গালিগালাজ করছি রাস্তায় দাঁড়িয়ে। রিমঝিমের ক্লাসমেটদের মা–বাবারাও আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে। এই দেশটার ভবিষ্যৎ যে রাজনীতিই নষ্ট করছে, সে বিষয়ে একমত পোষণ করছেন তাঁরাও।
এরই মধ্যে হঠাৎ দূরে একটা গাড়িতে...কালো গাড়ি, তার দরজা খোলা, রাস্তার লাইটপোস্টের আলো তার ওপরে পড়েছে...আমি দেখতে পাই মিতাপুর মুখ।
আমার সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়।
সেই মিতাপু। সেই টিকালো নাক, চশমা পরা দ্যুতিময় চোখ।...
মিতাপু কারমাইকেল কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে। আমি ফার্স্ট ইয়ারে। ইশা স্যারের কাছে যাই কেমিস্ট্রি পড়তে। স্যার দারুণ পড়ান। বলেন, কার্বনের চার হাত। হাউড্রোজেনের এক হাত। চার হাত দিয়ে একটা কার্বন চারটা হাইড্রোজেনকে ধরে।
স্যারের মাথায় টাক। শীতের রোদ জানালা দিয়ে তেরছা হয়ে তার টাকে পড়েছে। প্রতিফলিত হয়ে ছাদে পড়েছে সেই আলো। আমরা এ–ওর গায়ে চিমটি কেটে সেটা দেখাচ্ছি। একটা চড়ুই জানালার ওপারে জবাগাছে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে।
আমরা পাঁচ ফার্স্ট ইয়ার একসঙ্গে পড়ছি স্যারের কাছে। প্রাইভেট। এর পরের ব্যাচে সেকেন্ড ইয়ার। তিনটা ছেলে। দুটো মেয়ে। একজন মিতাপু। আরেকজন নার্গিস আপু।
মিতাপুর চোখে চশমা। নাকটা টিকালো। নাকে নাকফুল। মিতাপুর গায়ের রং কাঁঠালচাঁপা ফুলের মতো। মিতাপু আস্তে আস্তে হাঁটেন, এমনভাবে পা ফেলেন, মনে হয় তাঁর পা মাটিতে পড়ে না। তিনি রাজহাঁস। তিনি হাঁটছেন না, সাঁতার কাটছেন।
আমরা বেরিয়ে যাই। মিতাপুরা ঢোকেন। আমরা পড়ি, মিতাপুরা বারান্দায় অপেক্ষা করেন। আমি কেমিস্ট্রি বাদ দিয়ে মিতাপুর দুচোখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। আজ তিনি পরেছেন কালো সালোয়ার। তাঁর পায়ে দুই ফিতার কালো স্যান্ডেল। তাঁর ফরসা পা দুটোকে মনে হচ্ছে পারিজাত ফুল। আমি পারিজাত দেখিনি। শুনেছি, পারিজাত হলো স্বর্গের ফুল।
মিতাপুর পা দুটোই তো স্বর্গের ফুল।
আমার বয়স তখন ১৬+। তখনো আমি রবীন্দ্রসংগীত শোনার ও উপভোগ করার বয়সে পৌঁছুইনি। এখন রবীন্দ্রসংগীতের তুলনা আমি দিতে পারব। বলতে পারব, দুটো অতুল পদতল রাতুল শতদল জানি না কী লাগিয়া পরশে ধরাতল।
মাটির পৃথিবী মিতাপুর পা দুটোকে স্পর্শ করতে পারে না।
তাঁর স্যান্ডেল থেকে ঝরে পড়ে অপার্থিব জোছনা।
মিতাপুর প্রেমে আমি পড়ে গেলাম। পড়তাম না। কিন্তু এই ছিল বিধিলিপি। এই ছিল অদৃষ্টের নির্দেশ।
কারমাইকেল কলেজের ক্যাম্পাস ৯০০ বিঘা জমির ওপরে। তার একটা ডিপার্টমেন্ট মাঠের এক কোণে, তো আরেকটা ডিপার্টমেন্ট মাঠের আরেক কোণে। মাঠে চোরকাঁটা। আমরা কেমিস্ট্রি বিল্ডিংয়ে। এটা একটা পুরোনো ভবন। ওপরে টালির ছাদ। ক্লাসরুমটায় একটা গ্যালারি বানানো। পেছনের দিকে কাঠের পাটাতনে উঁচুতে বসানো চেয়ার। সামনের আসনগুলো অনেক নিচুতে।
সেই রসায়ন ভবনের বারান্দায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। কেমিস্ট্রির প্রাকটিক্যাল ক্লাস ছিল। আমি লবণ কিছুতেই শনাক্ত করতে পারছিলাম না। পাঁচটা বেজে গেল। সবাই চলে গেল। আমি আর স্যার শুধু ল্যাবরেটরিতে।
বেরোলাম। ততক্ষণে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে কলেজের মাঠ। ভেসে গেছে দিগন্তরেখা। আবছা হয়ে গেছে দূরের মিনারশোভিত প্রশাসনিক ভবন। মেয়েদের কমনরুম দেখাই যাচ্ছে না।
বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে দুটো ছাগল।
এরই মধ্যে কোত্থেকে এসেছেন মিতাপু। বললেন, শান্ত, কী মুশকিল হলো বলো তো। একটা রিকশা কী করে পাই।
আমার গলার স্বর কেঁপে উঠছে...আমি বলছি, মিতাপু, আমার কাছে ছাতা আছে। আপনি চলেন। আপনাকে মেয়েদের কমনরুম পর্যন্ত পৌঁছে দিই।
তিনি বললেন, খুব ভালো হয়। চলো।
আমরা একটা ছাতার নিচে। ধন্যবাদ মিস্টার কারমাইকেল, ধন্যবাদ রংপুরের সাবেক জমিদারগণ, বাবু গোপাল লাল রায় আর মহিমারঞ্জন রায়কে, আপনাদের দাক্ষিণ্যে এই কলেজের ভবনগুলো অনেক দূরে দূরে বানানো সম্ভবপর হয়েছে। মিতাপু আমার ছাতার নিচে। বৃষ্টির ছাট ছাতা ডিঙিয়ে এসে চোখেমুখে লাগছে। পা ভিজে যাচ্ছে। মিতাপু এক হাতে তাঁর পাজামা উঁচু করে ধরেছেন। আমি তাঁর পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে আছি। পানির স্রোতে পা ডুবছে-ভাসছে। তাঁর গায়ে বকুল ফুলের গন্ধ। আমি বুঁদ হয়ে যাচ্ছি। আমি ডুবে যাচ্ছি। এই পথ যেন শেষ না হয়। তিনি এক হাতে ছাতা ধরেছেন। আমার এক হাত ছাতার ডাঁটায়। বৃষ্টির পানিতে আমার নীরক্ত হাতে লাগে তাঁর স্পর্শ। আমার হাতে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়।
জোরে বাজ পড়ল। মিতাপু কেঁপে উঠলেন। তিনি আমার দিকে একটু ঝুঁকে এলেন। আমার গায়ের সঙ্গে তাঁর গা লাগল। আমার জন্ম ধন্য হয়ে গেল। আমার কিছু চাই না। আমি এখন কেঁদে ফেলব। আমি আর বাঁচব না।
আমার ঘুম বন্ধ হয়ে গেল। আমি ঘুমাতে পারি না। আমি সারা রাত জেগে থাকি। সারা সপ্তাহ জেগে থাকি। আমি সারা মাস জেগে থাকি। আমি সর্বত্র মিতাপুকে দেখি। আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই হেরি তাই সকলখানে। মধুমিতা হলে চলিতেছে...ইত্তেফাক–এ সিনেমার বিজ্ঞাপনে আমি মিতা শব্দের দিকে তাকিয়ে থাকি। মিতালি রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ডের সামনে গেলে আমার পা স্থির হয়ে যায়।
আমি কী করব। আমি কী করি? আমি গল্প লিখব। আমি একটা গল্প লিখেই ফেলি। গল্পের নামই দিই মিতা। গল্পের নায়কের নাম শফিকুল হাসান। আমার ভালো নাম। গল্পে মিতার সঙ্গে শফিকুল হাসানের বিয়ে হয়েছে। শফিকুল হাসান কেমিস্ট্রির শিক্ষক। তারা গ্রীষ্মের দুপুরে মাদুর বিছিয়ে ভাত খায়। বাইরে প্রান্তরে কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাস ওড়ে। কাঁঠালগাছের নিচে এঁচোড় ঝরে পড়ে। শফিকুল হাসান ঘামে। তার পিঠে ঘামাচি। মিতা তার পিঠে পাউডার ছিটিয়ে দেয়। তার ঘামাচি দুই বুড়ো আঙুলের নখে গলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারপর ক্যারম খেলে। তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে শফিকুল হাসান বিড়বিড় করে, আমি তোমাকে ভালোবাসি মিতা। আমি তোমাকে ভালোবাসি।
সেই গল্পটা প্রকাশ করার জন্য আমি একটা গল্পপত্র বের করি। বর্ণসজ্জা প্রিন্টিং প্রেসে সেটা কম্পোজ করা হয়। আরডিআরএস আর রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেডের বিজ্ঞাপনও জোগাড় করা যায়। পত্রিকার নাম ‘হৃদয়’। সেটা বেরিয়ে গেলে পুরো কলেজে হইচই শুরু হয়। ছাত্রসংসদের ভিপি আমাকে ডেকে পাঠান। বলেন, তোমাকে আর কোনো দিনও যেন এই কলেজে না দেখি। যদি দেখি, তোমাকে ওই কৃষ্ণচূড়াগাছটার নিচে পুঁতে ফেলব। তোমার রক্ত ওই গাছের কৃষ্ণচূড়াকে লাল করে তুলবে। ভিপি ভাইয়ার গায়ের রং কালো, তাঁর দাঁতের রং সাদা, তাঁর চোখের রং লাল। তাঁর পকেটের পিস্তলের নল ইস্পাতের, তাতে রোদ পড়ে ঝিকমিকিয়ে ওঠে। তাঁর টেবিলে পিতলের বুলেট। সেসব ঝনঝন করে বাজে।
তখন দেশে সামরিক শাসন। ভিপি সামরিক শাসকের দলে যোগ দিয়েছেন। তাঁর অগাধ ক্ষমতা। আব্বা কী করে যেন খবর পেয়ে যান। আমাকে নিয়ে সোজা চলে যান বগুড়ায়। আমি ফুপুর বাড়িতে লুকিয়ে থাকি।
ছয় মাসের মধ্যেই মিতাপু আইএসসি পরীক্ষা দিয়ে কলেজ ছাড়েন। তারপর তাঁর সার্কেল অফিসার বাবা বদলি হয়ে রংপুর ছেড়ে চলে গেলে মিতাপুর প্রসঙ্গ চাপা পড়ে যায়। আমি আবার রংপুর ফিরে আসি, আর যথারীতি ক্লাস করে পরের বছরের পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে থাকি।
কিন্তু গল্প আমাকে ছাড়ে না। আমি ঢাকা আসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রিতে ভর্তি হই। আজাদ স্যারের চ্যালা হই। ভালো ছাত্র হিসেবে গণ্য, আবার গল্পও লিখি। গল্প লেখার প্রয়োজনে নীলক্ষেতে গিয়ে একরাতে দেশি মদ, সন্দীপনের গল্প এবং সুবিমল মিশ্রর প্রতিষ্ঠানবিরোধী লিটল ম্যাগাজিন পান করে দেখি।
এখন একটা ওষুধ কোম্পানির এমডি আমি। আমার মেয়ে রিমঝিম ‘ও’ লেভেল দিচ্ছে। ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট কিনেছি। বেঙ্গলে গিয়ে অদিতির রবীন্দ্রসংগীত এবং কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পকর্ম উপভোগ করি। মাসে একবার রেডওয়াইন, বছরে একবার ব্যাংকক কি ইস্তাম্বুল। আমার স্ত্রী সুরাইয়া এনজিওতে কাজ করে, মানুষের জন্যই করে। তার কুঁচি করে পরা শাড়ির ফাঁকে ঈষৎ চর্বির আভাস। বিয়ের সময় সে শ্যামলা ছিল, বিশ বছরে সে ফরসাত্ব অর্জন করেছে।
আর আমি, তার মেয়ে রিমঝিমের কর্তব্যপরায়ণ পিতা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় রাত তিনটায় দাঁড়িয়ে আছি।
এবং ধন্দে পড়ে গেছি।
মিতাপু ওই সামনের কালো গাড়িতে। টয়োটা এলিয়েন।
আমার বুক কাঁপে। ৩০ বছর আগে যেভাবে কেঁপেছিল। আমার গলা শুকিয়ে আসে। ৩০ বছর আগে যেভাবে শুকাত।
আমি এগিয়ে যাই। চন্দ্রগ্রস্তের মতো। তখনই আমি আকাশে তাকিয়ে দেখি, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ, আধা খাওয়া তালপিঠার মতো আকাশের প্লেটে।
আমি বলি, মিতাপু, আপনি?
তিনি আধশোয়া ছিলেন। তাঁর কানে হেডফোন। আইপডে গান শুনছেন।
তিনি কানের যন্ত্র খুলে ফেলেন।
আমি বলি, মিতাপু...
তিনি বলেন, আপনি আম্মিকে খুঁজছেন? আম্মি আম্মি, কই যে যায়। তিনি হাতের মোবাইল তুলে নিয়ে ফোন করেন। দূরে আরেকটা জটলায় একটা মোবাইল ফোনের সেটে আলো জ্বলে উঠলে তিনি বলেন, ওই যে আম্মি...চলেন আমি নিয়ে যাচ্ছি...
আমি মিতাপুর কাছে যাই। মিতাপুর মেয়েই নিয়ে যায়। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় মিতাপুর মেয়ের মাকে দেখে, সত্যি কথা বলতে কি, আমার প্রত্যাশাভঙ্গ ঘটে। আমার কাছে মিতাপু আইএসসি সেকেন্ড ইয়ারে পড়া এক কিশোরী। কিন্তু এ তো একজন মধ্যবয়স্কা নারী। ভীষণ মোটা। আশাহীনভাবে বুড়িয়ে যাওয়া। আম্মি, এই আংকেল তোমাকে খুঁজছেন...
মিতাপু বলেন, আপনি? আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
আমি বলি, আমি ঠিক আপনার চেনার মতো কেউ না। কারমাইকেল কলেজে আপনার এক ক্লাস নিচে পড়তাম। আমার নাম শফিউল হাসান।
ও আচ্ছা। হ্যাঁ, আমরা এক বছর রংপুরে ছিলাম। ওখান থেকেই আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছিলাম। খুব ছোট বয়সের কথা তো। আমার কিছুই মনে নাই।
তিনি আবার জটলার একটা আলাপে ফিরে যান, ‘বোঝে না সে বোঝে না’র পাখি এটা কী করল, বলেন? আমাকে তেমন পাত্তাই দেন না।
আমিও পাত্তা দেব না।
যে মিতাপুকে আমি চিনতাম, এ তো তিনি নন।
আমার বুকের ওপর থেকে একটা ভারী পাথর ৩০ বছর পরে নেমে যায়।
ঘাম দিয়ে আমার জ্বর ছাড়ে।
আমিও হাঁটতে হাঁটতে আমার পরিচিত জটলায় ফিরে আসি।
আকাশে আধা খাওয়া তালপিঠা।
গাড়িতে গানের তালে পা দোলাচ্ছে একজোড়া পা।
আমি বিড়বিড় করে নেরুদা আবৃত্তি করি: সত্য বটে আজ আর তাকে ভালোবাসি না, কিন্তু একসময় কী ভীষণ ভালোই না তাকে বেসেছিলুম।
এই রাত তারকাখচিত, আর সে আমার পাশে নেই।
পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে, রিমঝিমকে ভিড়ের মধ্য থেকে নিয়ে আসতে হবে। আমি ভিড়ের দিকে পা বাড়াই। রিমঝিমের মা ফোন করে, এই রিমঝিমকে পেয়েছ, ওর পরীক্ষা কেমন হয়েছে...

‘গুগল সবচেয়ে নিরাপদ’ -এরিক স্মিথ

ওয়েব দুনিয়ায় গুগল সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা বলে দাবি করেছেন গুগলের চেয়ারম্যান এরিক স্মিথ। সম্প্রতি অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক অ্যাপলকে খোঁচা দিয়ে মন্তব্য করার পরিপ্রেক্ষিতে এ মন্তব্য করেন স্মিথ।

সিএনএকে এরিক স্মিথ জানিয়েছেন, ‘নিরাপত্তা ও এনক্রিপশনের ক্ষেত্রে আমরাই নেতৃত্ব দিয়ে আসছি। অ্যাপল কিংবা অন্যদের তুলনায় আমাদের সিস্টেম অনেক বেশি নিরাপদ ও এনক্রিপটেড। তারা আমাদের ধরার চেষ্টা করছে, যা ভালো একটি বিষয়।’
গত মাসে আইক্লাউড থেকে হলিউডের বিভিন্ন তারকার নগ্ন ছবি ফাঁস হওয়ার পর প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা অ্যাপলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই সময় অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক অ্যাপলের সিস্টেম হ্যাকের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘অ্যাপলের সিস্টেম যথেষ্ট নিরাপদ।’ তিনি আরও বলেন, ‘গুগলের মতো অনলাইন সার্ভিসগুলো বিনা মূল্যে সেবা দেয়, তাদের ক্ষেত্রে গ্রাহক নয় বরং ব্যবহারকারীরাই পণ্য। কিন্তু অ্যাপলের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর প্রাইভেসি বিষয়টি নিয়ে আমরা কোনো ছাড় দিতে রাজি নই।’
টিম কুকের সমালোচনার জবাবে কুম বলেন, ‘অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সরকার ও হ্যাকারদের গ্রাহকদের কাছ থেকে তথ্য সুরক্ষায় কঠোর প্রচেষ্টা চালায় গুগল। এ ছাড়াও ব্যবহারকারীদের কাছে তাদের সেটিংস পরিবর্তন করার, তথ্য কম-বেশি শেয়ার করার সুবিধাও দেওয়া রয়েছে।’
স্মিথ অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীকে খোঁচা দিয়ে বলেছেন, ‘গুগলের নীতিমালা সম্পর্কে কেউ হয়তো তাঁকে ঠিকমতো জানায়নি। এটা তাঁর জন্য দুর্ভাগ্যই বটে।’
সম্প্রতি গুগল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরবর্তী প্রজন্মের গুগল অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে ব্যবহারকারীর ডাটা এনক্রিপ্ট করার বিশেষ সুবিধা থাকবে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে ব্যক্তিগত তথ্যে নজরদারি করার বিষয়টি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
১৮ সেপ্টেম্বর গুগল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরবর্তী অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণে বাই ডিফল্ট ডাটা এনক্রিপ্ট হবে। এতে স্মার্টফোনে জমা রাখা তথ্যের নিরাপত্তার আরও একটি বাড়তি স্তর যোগ হবে।
গুগল কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে বেশ কয়েক বছর ধরেই ডাটা এনক্রিপশন সুবিধা দিয়ে আসছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুব কম ব্যবহারকারী ডাটা এনক্রিপশনের পদ্ধতি জানেন। এখন গুগল এমন একটি ফিচারের নকশা করছে, যাতে স্মার্টফোনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনক্রিপ্ট হয়ে যাবে। কেবল যার কাছে স্মার্টফোনের পাসওয়ার্ড থাকবে, সে–ই স্মার্টফোনে রাখা তথ্যে নজরদারি করতে পারবে।
সম্প্রতি আইফোন ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার জন্য অ্যাপলও স্বয়ংক্রিয় ডাটা এনক্রিপশন প্রযুক্তি চালু করেছে।
গুগল জানিয়েছে, স্বয়ংক্রিয় এনক্রিপশন প্রযুক্তি চালু করতে দীর্ঘসময় লেগেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার গোপন নজরদারির খবর ফাঁস হওয়ার পর থেকে মার্কিন প্রযুক্তি-প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক সুরক্ষায় নজরদারি ঠেকানোর যে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, গুগলের পদক্ষেপ তারই একটি অংশ।
এরিক স্মিথ দাবি করেন, বিভিন্ন সময় তথ্য হ্যাক হওয়ার ঘটনা ঘটলেও গুগলের সিস্টেমে এত বড় দুর্ঘটনা কখনও ঘটেনি।
অবশ্য, স্মিডের কথা শতভাগ ঠিক নয় বলেই প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন। গুগলের প্রাইভেসি দেওয়ার ক্ষেত্রে রেকর্ড ভালো নয়। ২০১২ সালে গুগল অ্যাকাউন্টে বিতর্কিত প্রাইভেসি নীতিমালা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে গুগল। অভিযোগ ওঠে, ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করে তা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রির পথ সুগম করেছে গুগল। এ ছাড়াও অতীতে প্রাইভেসি নিয়ে গুগলের জরিমানা দেওয়ার রেকর্ডও রয়েছে।
সম্প্রতি এরিক স্মিথ ও গুগলের সাবেক জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট জোনাথান রোজেনবার্গ মিলে ‘হাউ গুগলন ওয়ার্কস’ নামে একটি বই লিখেছেন।

বলিউডের আকাশে নিখোঁজ তারা

চাকচিক্যে ভরা বলিউডের মায়াবী জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু অনেক তারকাই যথেষ্ট চাহিদা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বলিউড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আড়ালে বসবাস করছেন। বলিউডের জগৎ ছেড়ে নিজস্ব জগতেই তাঁদের বিচরণ। বলিউডের এমন কয়েকজন নিখোঁজ তারকার কথা বলা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে।

মমতা কুলকার্নি
নব্বইয়ের দশকের সাড়া জাগানো বলিউডের অভিনেত্রী মমতা কুলকার্নি। খুবই অল্প বয়সে চলচ্চিত্রজগতে যাত্রা শুরু করেছিলেন মমতা। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া আশিক আওয়ারা ছবিতে সাইফ আলী খানের সঙ্গে অভিনয় করে ফিল্মফেয়ার লাক্স অ্যাওয়ার্ড অব দ্য ইয়ার পুরস্কার ঝুলিতে ভরেন মমতা। বলিউডে ১১ বছরের অভিনয়জীবনে তিনি বেশ কয়েকটি ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিয়েছেন। সালমান খান, আমির খান, শাহরুখ খানের মতো প্রভাবশালী অভিনেতাদের সঙ্গেও অভিনয় করেন তিনি। যথেষ্ট তারকাখ্যাতি থাকার পরও হঠাৎ করেই নিজেকে গুটিয়ে নেন মমতা। দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর গত বছরের মে মাসে খবরের শিরোনামে আসেন মমতা কুলকার্নি। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দুবাইতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মাদক ব্যবসায়ী ভিকি গোস্বামীকে মুক্ত করতে ২০১২ সালের নভেম্বরে তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন মমতা। বিপুল পরিমাণ মাদক পাচারের সময় দুবাইতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ভিকি। ১৯৯৭ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে। দুবাইতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে ২৫ বছর জেল খাটতে হয়। তবে ভালো আচরণসহ আরও কিছু শর্তপূরণ সাপেক্ষে নির্ধারিত সময়ের আগেই মুক্তি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে সেখানে। ২০১২ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলামি রীতি অনুযায়ী মমতাকে বিয়ে করেন ভিকি। এর পরপরই তিনি মুক্তি পান। তাঁকে মুক্তি দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ভিকি বদলে গেছেন এবং ভালো মানুষে রূপান্তরিত হয়েছেন।

এদিকে গত বছর মমতা জানান, দীর্ঘ এক যুগ ধরে ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তিনি। অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যান যোগিনী শিরোনামে আধ্যাত্মিক একটি বইও লিখেছেন ৪২ বছর বয়সী মমতা। তিনি বলেন, ‘গত ১২-১৩ বছর আমি কোথায় ছিলাম, কী করেছি, তা আমার পরিবারের সদস্যরাও জানতেন না। আধ্যাত্মিক জগতের নিয়ম পালন করতেই লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে হয়েছে আমাকে। আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের ফুরসতই মেলেনি। এমনকি আয়নায় নিজের মুখটিও দেখিনি। কেবল পার্থিব জগতে বিচরণের জন্যই নয়, ঈশ্বরের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার জন্যও কেউ কেউ জন্ম নেয়। আমি ভিকিকে ভালোবাসি। আমার প্রায়শ্চিত্ত শেষ হওয়ার পর ভিকি মুক্ত জীবন ফিরে পেয়েছে। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ ভিকির মতো মমতাও ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি স্বামীর সঙ্গে কেনিয়ার নাইরোবিতে বসবাস করছেন।
মন্দাকিনী
হালকা রঙের সুন্দর চোখের মায়াবিনী অভিনেত্রী মন্দাকিনী। ১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া রাম তেরি গঙ্গা মাইলি ছবিতে অভিনয় করে ব্যাপক হইচই ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। বলিউডের প্রথম সারির একাধিক অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন মন্দাকিনী। কিন্তু বলিউডে সফল ক্যারিয়ার গড়তে পারেননি তিনি। আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহীমের সঙ্গে তাঁর সখ্যকেই বলিউডে মন্দাকিনীর ক্যারিয়ারের ভরাডুবির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিমি কাতকার
আশির দশকের শেষ দিক থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরুর সময় পর্যন্ত পর্দা কাঁপিয়েছেন টারজান ছবির অভিনেত্রী কিমি কাতকার। বলিউডের বাঘা বাঘা অভিনেতার বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ‘বলিউড শাহেনশা’ অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন তিনি। আলোকচিত্রী ও বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা শান্তনু শোরেকে বিয়ের পর বলিউড ছেড়ে দেন কিমি কাতকার।
রাহুল রায়
আশিকি ছবির মাধ্যমে বলিউডে দারুণ অভিষেক হয়েছিল রাহুল রায়ের। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কোনো ছবি দিয়েই প্রথম ছবির সাফল্যকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি রাহুল। তারকাবহুল বলিউডের রাজ্যে নীরবে হারিয়ে গেছেন তিনি।
অনু আগারওয়াল
আশিকি ছবির ব্যাপক সাফল্যের রেশ ধরে রাতারাতি তারকা বনে যান অনু আগারওয়াল। প্রথম ছবির সাফল্যের পর আরও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করলেও ফ্লপ অভিনেত্রীর তালিকায় নাম লেখান তিনি। ১৯৯৯ সালে মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়লে তাঁকে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৯ দিন কোমায় থাকার পর সেরে উঠলেও তাঁর শরীরের অর্ধেক অংশ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়। তিনি বর্তমানে বিহারে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। বিহার স্কুল অব যোগায় যোগব্যায়াম চর্চা করেন অনু।
মীনাক্ষী শেষাদ্রী
মাত্র ১৭ বছর বয়সে মিস ইন্ডিয়া খেতাব জয় করেছিলেন মীনাক্ষী শেষাদ্রী। পরে বলিউডে নিরঙ্কুশ সাফল্য পান তিনি। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে শাহেনশা এবং জ্যাকি শ্রফের সঙ্গে হিরোর মতো ছবিতে দেখা গেছে মীনাক্ষীকে। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় মীনাক্ষী অভিনীত সর্বশেষ ছবি ঘাতক। এরপর বলিউডের আর কোনো ছবিতে দেখা যায়নি গুণী এ অভিনেত্রীকে।
ভাগ্যশ্রী
আশির দশকের সাড়া জাগানো ছবি ম্যায়নে পেয়ার কিয়ায় সালমান খানের বিপরীতে অভিনয়ের মাধ্যমে ভাগ্যশ্রীর সফল বলিউড অভিষেক হয়। কিন্তু পরবর্তী কয়েকটি ছবিতে তাঁর প্রতি ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হননি। তাঁর অভিনীত একের পর এক ছবি ফ্লপের খাতায় নাম লেখায়। আর এভাবেই বলিউড থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যান ভাগ্যশ্রী।
আয়শা জুলকা
জো জিতা ওহি সিকান্দার ছবিতে আমির খানের বিপরীতে অভিনয় করেছেন আয়শা জুলকা। আর খিলাড়ি ছবিতে অক্ষয় কুমারের নায়িকা ছিলেন তিনি। বলিউডে শক্ত একটি আসনই গেড়েছিলেন আয়শা। কিন্তু ধনাঢ্য আবাসন ব্যবসায়ী সমীর বাসিকে বিয়ের পর বলিউড ছেড়ে দেন জনপ্রিয় এ তারকা অভিনেত্রী।
সোনম
রাজীব রায় পরিচালিত ত্রিদেব ছবিতে অভিনয় করে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন সোনম। পরবর্তী সময়ে বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজীব রায়কে বিয়ে করেন সোনম। আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে চাঁদাবাজির হুমকি পাওয়ায় ভারত ছেড়ে চলে যান একসময়ের জনপ্রিয় এ তারকা অভিনেত্রী।
গ্রেসি সিং
‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ তারকা আমির খানের সঙ্গে লগন ছবিতে অভিনয় করে বিভিন্ন মহলের প্রশংসা কুড়ান গ্রেসি সিং। গঙ্গাজল ছবিতে অজয় দেবগন এবং মুন্নাভাই এমবিবিএস ছবিতে সঞ্জয় দত্তের মতো প্রভাবশালী অভিনেতার বিপরীতে অভিনয় করেন গ্রেসি। শুরুটা ভালো হলেও তাঁর অভিনীত একাধিক ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিতে না পারায় গ্রেসির জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে থাকে এবং হারিয়ে যান তিনি।

জেনে-শুনে বিষ করেছি পান by সালাহউদ্দিন লাভলু

বিনোদন শব্দটা অত্যন্ত মধুর। বিশেষ করে টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের দর্শকেরা বিনোদিত হতে চান। তবে সাম্প্রতিককালের ‘ঈদের নাটক এবং দর্শকদের বিনোদন’ এই সরল অঙ্কটায় কেন যেন ফলাফল শূন্য থেকে যাচ্ছে। মাসুম রেজার একটা লেখায় পড়েছিলাম, আগে ছিল ঈদের নাটক, এখন ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে নাটকের ঈদ। এই কথাটার সত্যতা ও যথার্থতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
শুনতে পেলাম গত ঈদে নাকি সব মিলিয়ে প্রায় তিন শ নাটক প্রচার হয়েছে। এই তিন শ নাটকের জন্য কমপক্ষে তিন শ নাট্যকার, তিন শ নির্মাতা এবং তিন শ পূরণ দশ সমান সমান তিন হাজার অভিনয়শিল্পী মজুত আছেন। ব্যাপারটা খুশিরই বটে। আমাদের কমবেশি ২৪টা চ্যানেল আছে। সে হিসাবে ২৪টা ঈদের নাটক হলে মহাভারতের কী এমন অশুদ্ধি ঘটে। একটির জায়গায় না হয় তিনটিই করলাম। তিন দিন ধরে ঈদের আনন্দ করেন। সরকারি ছুটি থাকে তিন দিন। তাতেও তো ৭২টি নাটকের বেশি প্রয়োজন পড়ে না। তা না করে এক দিনেই বাহাত্তরটি নাটক (!) প্রচারের চেষ্টা চলছে। বিনোদনের ছড়াছড়ি।
ইদানীং শুটিং স্পটে একটা শব্দ খুব শুনছি। প্যানা। প্রথমে এর অর্থ অনুধাবন করতে পারিনি, পরে একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম ইহা একটি মনুষ্য সৃষ্ট পেইন বা ডিস্টারব্যান্স। পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে প্যানা শব্দটির সময়োপযোগী কিছু নমুনা তুলে ধরছি:

প্যানা ১
ঈদ হবে ৬ অক্টোবর। জুলাই মাসেই সিদ্ধান্ত হয়ে আছে অমুক চ্যানেলে অমুক নাট্যকার লিখবেন এবং অমুক নির্মাতা নাটকটি নির্মাণ করবেন। দাবিটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রচার কর্তৃপক্ষের। এখন বোঝেন প্যানাটা। তিন মাস আগে থেকে জানার পরও নাট্যকার সাহেব ইলেভেন্থ আওয়ারেও নয় টুয়েলভথ আওয়ারে দেবেনপাণ্ডুলিপি। এবার পাণ্ডুলিপি নিয়ে নির্মাতা ছুটতে শুরু করলেন অভিনয়শিল্পীদের পেছনে।

প্যানা ২
আগেই উল্লেখ করেছি আমাদের মতো ছোট্ট একটা দেশে তিন হাজার অভিনয়শিল্পী মজুত আছেন। কিন্তু নাট্যকার সৃষ্ট চরিত্রের জন্য যে শিল্পীর প্রয়োজন তার সংখ্যা বাস্তবত একজন কি দুজন। যেহেতু সেই একজন বা দুজন শিল্পী তাঁদের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে দিন হাজিরায় সময় বিক্রি করে দিয়েছেন। শুরু হলো প্যানার ওপর প্যানা। প্রয়োজন তিন দিন, কিন্তু যেহেতু তিনি সময় বিক্রি করে দিয়েছেন, সেহেতু উনি মূল্যবান একটা দিন দিয়ে ধন্য করলেন। নির্মাতা হিসেবে আমি নিস্তার পেলাম কিন্তু...!

প্যানা ৩
শুটিংয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নির্মাতাকে যখন ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে ভাবার কথা, তখন কথিত অভিনয়শিল্পী সেটে এসে কী খাবেন না খাবেন তা নিয়ে তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। সবই হলো ঠিকঠাক, কিন্তু সকালের নাশতা ঢাকা পড়ে থাকে। কারণ সকাল নয়টার কল তিনি এলেন বেলা দুইটায়। গাড়ি থেকে নেমেই রাস্তার যানজট, দেশের যোগাযোগব্যবস্থার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন তাতে নির্মাতাসহ ইউনিটের সবাই চুপচাপ শ্রোতা বনে গেলেন।

প্যানা ৪
এখানে কিছু উপপ্যানা বর্ণিত হবে। উপপ্যানা ১: মোবাইল ফোনের যথেচ্ছ আগমন, নির্গমন এবং ছবি উত্তোলন। উপপ্যানা ২: ফেসবুকে চ্যাটিং, আপলোডিং, ডাউনলোডিং। উপপ্যানা ৩: প্রথম দৃশ্যটি কোনোমতে হলো কিন্তু দ্বিতীয় দৃশ্যটিতে দেখা গেল কথিত অভিনয়শিল্পী তাঁর প্রয়োজনীয় কস্টিউম আনেননি। কারণ তিনি পাণ্ডুলিপি পড়ার সময়ই নাকি পাননি। অথচ বিভিন্ন মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বলেন আমি বেছে বেছে নাটক করি! তো তুমি বাবা স্ক্রিপ্ট না পড়ে কীভাবে বেছে বেছে নাটক করো, আমি বুঝি না।

প্যানা ১০
মাঝের পাঁচটি প্যানা সুযোগ পেলে অন্য কোনো ঈদে বলব। প্যানা ১০-এরও কিছু উপপ্যানা আছে। উপপ্যানা ১: নাটকের প্রযোজক বাহাদুর তাঁর অর্থবল এবং জ্যাকজুক লাগিয়ে প্রচার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগাম ওয়ার্কঅর্ডার নিয়ে নেন। ওয়ার্কঅর্ডার অনুযায়ী উনি মালামাল সরবরাহের জন্য নির্মাতাদের মাঠে নামান। তিন দিনের মাথায় ওনার মাথায় বায়ু চড়ে যায় মালামাল ‘বুঝিয়া লইবার জন্যে’। নাটক ওনার কাছে কেবলই চল্লিশ মিনিটের একটা পণ্য। এ রকম গোটা দশেক পণ্য সাপ্লাই করতে পারলে ওনার সুখ হয়। ইদানীং শুনছি এর ভেতরে আরেক মহাঠিকাদারের আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের বলা হচ্ছে এজেন্সি। বিষয়টা আমি খুব বেশি পরিষ্কার না। উপপ্যানা ২: নাটকের শরীরে সবচেয়ে বড় অপারেশনটা চালানো হয় প্রচার কর্তৃপক্ষের টেবিলে। একটা নাটককে তাঁরা তিন চার পাঁচ যত খুশি, তত খণ্ডে খণ্ডিত করে বিজ্ঞাপন বিরতির ব্যবস্থা করেন। এর ভেতরে সংবাদ বাবাজিও দুবার প্রচারিত হন। একটা নাটকের প্রচার শেষ হতে প্রায় আড়াই ঘণ্টাও লেগে যায়। এই যদি হয় অবস্থা তবে সে নাটক দিয়ে বিনোদন জোগাব কার? উপপ্যানা ৩: দর্শক উপাস্য দর্শক নারায়ণ। আমাদের এত এত প্যানা সহ্য করে নির্মিত নাটক শেষমেশ আপনাদের সামনে আসে। কিন্তু আপনাদের অনেকেই তখন পাশের দেশের নাটকগুলোতে দিদিগণের কুটনামি আর কোন দিদি কোন দাদার ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেলেন বা কোন দাদা কোন বউদিকে সহ্য করতে পারছেন না বলে মদ্যপ হয়ে উঠছেন, এসব নিয়েই মেতে থাকেন।
ওপরের প্যানাতে বর্ণিত সব ক্ষেত্রেরই অন্য চিত্র আছে। নাট্যকারদের সময়মতো পাণ্ডুলিপি প্রেরণ, শিল্পীদের সময়মতো শুটিং স্পটে উপস্থিত হওয়া, চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করা, প্রযোজকদের শুধুই অর্থ লগ্নি নয় পাণ্ডুলিপি পড়া থেকে শুরু করে প্রযোজনার সকল স্তরেই নিজের অংশগ্রহণ রেখে সঠিক দায়িত্ব পালন করা, প্রচার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য বিরক্তহীনভাবে নাটক প্রচার করার প্রয়াস—এসবই মুদ্রার অন্য পিঠ। তা না হলে আমরা এখনো কাজ করছি কীভাবে?
এই লেখা পাঠান্তে অনেকেই মনে মনে বলছেন, প্যানা তো নির্মাতারাও কম দেন না লাভলু ভাই। এতই যদি প্যানা তবে নাটক বানানো ছেড়ে দিলেই পারেন। এর উত্তরে আমার তেমন কিছু বলার নেই, শুধু বলব আমি জেনে-শুনে বিষ করেছি পান, প্রাণেরও আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ।

সালাহউদ্দিন লাভলু: অভিনেতা, নাট্যনির্মাতা।

বিচারের বাণীকে কাঁদবার জায়গা অন্তত দিন by ফারুক ওয়াসিফ

বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে যে কাঁদবে, সে রকম একটা জায়গা দরকার ‘সংখ্যালঘুদের’। পূজা এলে প্রতিমা ভাঙা হবে, দেবী ভাসানোর আগেই আরেকবার ভাসবে চোখ। নির্বাচন এলে ঘর পুড়বে, দেশের ভেতরেই শরণার্থীর হা-হুতাশ শোনা যাবে। কিন্তু বিচার হবে না। তাহলেও যারা দরিদ্র, যাদের সংখ্যা কম, যাদের মনের মধ্যে অপমানের চিতা; তাদের তো কাঁদবার একটা জায়গা দিতে হবে। তবেই না ‘বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কেঁদে কেঁদে’ লাঘব হবে, সান্ত্বনা পাবে। বিচার না হলেও বিচারের অপেক্ষা থাকে, কিন্তু যদি ফরিয়াদ প্রকাশেরই সুযোগ না থাকে, তাহলে তো দমবন্ধ গুমটি ঘর হয়ে পড়বে পুরো সমাজ। বিচারহীনতার এই বিপর্যয়ে সংখ্যায় লঘু ও গুরুরা সবাই আজ এককাতারে।
অসাম্প্রদায়িকতা যদি থাকে, তা আছে জনসমাজে। কিন্তু রাজনীতির সিঁড়ি দিয়ে যত ওপরে যাই তত বিষ। ‘বত্রিশ জাতি ছাড়া দ্যাশ হয় না’ স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন উপদ্রুত হিন্দুসমাজের এক প্রতিবেশী মুসলমান কৃষক। আরেকজন গ্রামের মানুষ শুনিয়েছিলেন ‘হিন্দু ছাড়া কি দ্যাশ হয়?’ ঘরে দুর্গতদের ঠাঁই দিয়ে দরজায় বঁটি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক মুহুরির বউ। এই গল্প গত বছরের সাঁথিয়ার। রামুতে বুক পেতে হামলা ঠেকাতে গিয়ে আহত হন কয়েকজন মুসলমান যুবক। অভয়নগরে রাজনৈতিক দস্যুদের হামলার সময় পাশে এসে দাঁড়ান নদীর ওপারের এক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান। বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু-মুসলমান মিলে রাত জেগে গ্রাম পাহারার খবরও পাই। তাই বলা যাবে না, ১৫ ভাগ সংখ্যালঘুর অভিযোগের কাঠগড়ায় ৮৫ ভাগ মুসলমানই দাঁড়িয়ে। কোথাও বাঙালির নামে, কোথাও মুসলমানের নামে যে সন্ত্রাস, সেগুলো তাহলে কারা করে?
আমরা জানি না কারা করে! কারণ, আদালতে তা প্রমাণিত হয়নি। কেবল জানি, স্বাধীনতার পর থেকে হিন্দু-সম্পত্তি দখলের কৃতিত্বে বিএনপি-আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির আনুপাতিক ভাগ আছে। অর্থাৎ, যে যত বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল বা যতটা ছিল ক্ষমতার অংশীদার, ততটা লুণ্ঠিত সম্পদ এসব দলের নেতা-কর্মীর হাতে এসেছে। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত এটা রীতিমতো গবেষণা করে দেখিয়েছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার বিচার না হওয়ার খতিয়ান দেখিয়েছেন ব্র্যাকের গবেষক মোহাম্মদ রাফি। আর দৈনিক পত্রিকায় হররোজ জাতীয় আত্মজীবনীর যে খণ্ডচিত্র ছাপা হয়, তাতেও দেখা যায় হিন্দুদের মন্দির, ঘরবাড়ি, খেতখামার-পুকুরে মাঝেমধ্যেই পড়ে বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াতের সদস্যদের হাত। এ যদি সর্বদলীয় অবদান না হতো, তাহলে হয়তো বিচার হতো!
সাঁথিয়ার বাবলু সাহার বাড়িঘরে হামলা হয়েছিল গত বছর। তিনি এখন ভালো আছেন, মনের আনন্দে পূজাও করেছেন। রাতে পুলিশের বাঁশি শুনে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যান। কিন্তু গত বছরের হামলার মামলার কী হলো? বাবলু সাহা বলেন, পুলিশ তো ‘ধরতেছে আর জামিন দিচ্ছে। এক বছর তো হলো, মনে হয় না ২-৪-৫ বছরেও সুরাহা হবে!’ খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ওই ঘটনার মূল হোতা খোকন এখনো পলাতক। আর সে সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর সাঙাতেরাও পুলিশের খাতা থেকে খালাস। সেই ঘটনায় চারটি মামলা হয়, দুটির তদন্ত করছে সিআইডি। ৪৪ জন গ্রেপ্তার আছে বটে, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য করে নিরীহ লোকদের হয়রানির অভিযোগও আছে বটে, তবে আজ অবধি অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি। বাবলু সাহা তাই বিচারের আশা করেন না, কেবল নিরাপদে ভালো থাকতে চান।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের রাতে যশোরের অভয়নগরের মালোপাড়ায় নদীপথে তিন দিক থেকে আক্রমণ আসে। মেয়ে-শিশুরা নদীর ধারের ঝোপের আঁধারে লুকায়। ভাগ্যিস সে সময়েই উদ্ধারের তরি পাঠিয়েছিলেন প্রতিবেশী মুসলিম সমাজপতি। কিন্তু পুলিশ ছিল না, প্রশাসন ছিল না। ওই ঘটনায় ৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও দুই শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়। এজাহারভুক্ত আসামিদের আটজনকে আটকও করা হয়। কিন্তু এখন তারা সবাই জামিনে। জামায়াতের যে নেতা ও তাঁর পুত্রদের নাম এসেছিল, তিনি সপুত্র পলাতক। জামায়াত নেতা বদরুল ইসলাম ও আবদুল কাদেরের নাম এজাহারে ছিল না। কারণ, তাঁর ভাই হাবিবুর রহমান হবি আওয়ামী লীগের নেতা। পরে পত্রিকায় নামধাম প্রমাণসহ খবর হলে থানায় নাম ওঠে বটে, কিন্তু ওতটুকুই সার। ওদিকে হিন্দু প্রার্থীর কাছে মনোনয়নের দৌড়ে হেরে যাওয়া শেখ আবদুল ওহাব এখন ধোয়া তুলসীপাতা। ঘটনার কয়েক দিন আগে স্থানীয় সুন্দলী উচ্চবিদ্যালয়ে মালোপাড়ার ভোটারদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিলেও ২৩ জানুয়ারি অভয়নগরে অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর জনসভার মঞ্চে বসতে তাঁকে কেউ নিষেধ করেনি। এত সব দেখে মালোপাড়ার শেখর বর্মণ বলেন, ‘নেতারা কেউ আসেনি... আমরা আবার মার খাব।’ তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর গ্রামটায় বিদ্যুৎ গেছে, স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পও বসেছে। খেলার মাঠে মুসলিম ও হিন্দু ছেলেমেয়েদের আবার একসঙ্গে খেলতে দেখা যাচ্ছে। সমাজ নিজের মতো উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু বিচার না হলে আবার বিপদের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসে।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রামুতে। রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার মানুষ সেখানকার বৌদ্ধপল্লির বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালায়। টেকনাফ ও কক্সবাজারেও হামলা হয়। ওই ঘটনায় মামলা হয় ১৫ হাজার আসামির নামে। মোট ১৯টি মামলায় অভিযোগপত্রে নাম আসে ৯৪৮ জনের। এর মধ্যে ৭৮ জন জামিনে রয়েছেন এবং বাদবাকি সব পলাতক। এত আসামি, তবু মূল অভিযুক্তদের নাম নেই। স্থানীয় প্রেসক্লাবের সভাপতির উসকানি ও নেতৃত্বদানের আলামত থাকলেও পুলিশের চোখে তিনি নির্দোষ। কিন্তু এ ঘটনায় উচ্চ আদালতে যে রিট পিটিশন করা হয় সেখানে তিনিই ১ নম্বর আসামি। সেই রিট পিটিশন করেন রামুর সন্তান জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে যে আসামির নাম আছে, পুলিশের মামলায় তার নাম নাই কেন? বিচার তো একটাই হবে!’
তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়নি, অথচ তার বিভিন্ন ছেঁড়া পৃষ্ঠা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে দেখা গেছে। প্রতিবেদনটি এখন বিচার বিভাগের নিরাপত্তা হেফাজতে আছে। কিন্তু বিচার তো বন্ধ। দুই বছর ধরে রামুর মামলা আদালতের অপেক্ষমাণ তালিকায় ক্রমেই নিচে নামছে। যে আদালতে এর বিচার হওয়ার কথা সেই আদালতের কর্তৃত্বও কমেছে। দেখেশুনে মনে হয় সরকারের তদন্ত প্রতিবেদনের শেষের বাক্যটাই ভরসা। ওখানে অতীত ভুলে সামনে যাওয়ার সুপারিশের পর লেখা ছিল: বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। অর্থাৎ যাঁরা তদন্ত করছেন তাঁদেরই বিচারে ভরসা নেই। তাই তাঁরা আহত বৌদ্ধসমাজকে ভগবান বুদ্ধের শরণ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ভগবান বুদ্ধই যদি বিচার করবেন, তাহলে আর আইন-পুলিশ-প্রশাসন আছে কেন?
রামু-সাঁথিয়া-অভয়নগরের ঘটনায়, এ বছরের প্রতিমা ভাঙার উদাহরণের পর প্রশাসনের ওপর আস্থা নড়ে গেছে অনেকের। রামুতে মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যে সামাজিক ফাটল আরও বেড়েছে পুলিশের কারণে। পুলিশের গ্রেপ্তার-বাণিজ্যে যখন যাকে-তাকে হয়রান করা হচ্ছে, তখন নিরীহ মুসলমান মানুষটা অবিশ্বাস করছে প্রতিবেশী বৌদ্ধকে। বৌদ্ধসমাজের নেতাদের তখন বারবার বলতে হচ্ছে, এসব নাম আমরা দিইনি, আমরা তোমাদের দোষী বলিনি। চিহ্নিত আসামি ছাড় পেয়ে যায়, আর দুর্বল বা নিরীহ ব্যক্তিরা আটক হন। পুলিশ কি এতই বেকুব? জামায়াত নেতার জন্য তদবির করেন লীগ নেতা, প্রতিমা ভাঙতে গিয়ে ধরা পড়ে যুবলীগের নেতা। পুলিশ করে গ্রেপ্তার-বাণিজ্য, রাজনীতি হয় দুর্বৃত্তদের স্বপ্নপুরী। জামায়াত-বিএনপি-লীগের তিন ভাই মিলে অপকর্ম করে, আর দোষ হয় দেশের, সংখ্যাগুরুর।
বর্তমান আইনমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা দ্রুত বিচার আইনে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ওই আইনে বিচার বড়জোর কয়েক মাস লাগার কথা। কিন্তু বছর পেরিয়ে বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদবার জায়গাটাও হারায়। বড় আশ্চর্য এই দেশ! 

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।  
bagharu@gmail.com

তোতা পাখির শিক্ষা ও মান নির্ধারণী পরীক্ষা by ম তামিম

মান নির্ধারণী পরীক্ষার প্রথম প্রচলন হয় চীনে, যখন সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের কনফুশিয়াসের দর্শন ও কবিতার পারদর্শিতার পরিচয় দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে হতো। পশ্চিমা দেশগুলো মূলত সক্রেটিসের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন বিষয়ে রচনা লেখার মাধ্যমে সম্ভাব্য চাকরিজীবীদের মেধা যাচাই করত। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শিল্পবিপ্লবের সময় যখন ব্যাপক হারে চাকরি সৃষ্টি হয়, তখন একসঙ্গে অনেক ছাত্রের মেধা যাচাইয়ে মান নির্ধারণী পরীক্ষা নেওয়া  হয়। ১৯০৫ সালে ফ্রান্সের মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড বিনে আইকিউ পরীক্ষার ধারণা তৈরি করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের আগেই মাননির্ধারক পরীক্ষার (Standardized Test) মাধ্যমে সৈনিকদের মানসিকতা এবং সম্ভাব্য অফিসার পদপ্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়। ধীরে ধীরে এ ধরনের পরীক্ষার ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এখন বিশ্বের সব দেশে স্কুল-কলেজেও বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এই  মাননির্ধারক পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।

আমেরিকায় স্কুলপর্যায়ে কোনো জাতীয় মাননির্ধারক পরীক্ষা নেই। অষ্টম শ্রেণি শেষে জুনিয়র হাই এবং বারো শ্রেণির পরে হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েশন পরীক্ষা ও মান বিভিন্ন রাজ্যের শিক্ষা গাইডলাইনের ভিত্তিতে স্কুলভিত্তিকই হয়ে থাকে। যে কারণে ১৯২৬ সালে কলেজ বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রথম স্যাট বা স্ট্যান্ডারাইজড অ্যাপটিটিউট টেস্ট চালু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে স্যাট পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য মোটামুটি অপরিহার্য হয়ে যায়। এই পরীক্ষাটি মূলত ইংরেজি ভাষা ও অঙ্কের পারদর্শিতা যাচাই করে। ২০০৫ সালে এর সঙ্গে রচনা লেখা সংযুক্ত হয়েছে। এখন বিষয়ভিত্তিক স্যাট পরীক্ষাও হয় এবং অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই সেগুলো অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে গণ্য করে।
ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে প্রথম মাননির্ধারক পরীক্ষা দিতে হয়, যেখানে মূলত ভাষা, বিজ্ঞান ও অঙ্কের দক্ষতা যাচাই করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো একটি শিশুর শেখার ও তার বয়সে মূলত ভাষা ও অঙ্কের দক্ষতা অর্জনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা। একই সঙ্গে সারা দেশের বিভিন্ন স্কুলের কার্যক্রম তুলনা করা। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উন্নতি সাধন ও সাফল্যের চাবিকাঠি ভাগ করে নেওয়াই এর উদ্দেশ্য। এই পরীক্ষা ফলাফলের ভিত্তিতে ছাত্রের দুর্বলতা ও সাফল্য যাচাই করে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। তারপর ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত লেখাপড়া করাটা বাধ্যতামূলক। অনেকে যারা ট্রেড বা ভোকেশনাল লেখাপড়া করার সিদ্ধান্ত নেয়, তারা ও-লেভেল পরীক্ষা দিয়ে সেদিকে চলে যায় এবং মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহীরা এ-লেভেল পরীক্ষা দেয়। আমেরিকায় যেহেতু স্যাট–এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়, অনেকেই জুনিয়র হাই শেষ করে ট্রেডে চলে যায় আবার কেউ কেউ হাই স্কুল শেষ করে।

ছোট থেকে শিশুর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা একটি অত্যন্ত জটিল কাজ। শুধু একটি পরীক্ষার মাধ্যমে একটি শিশুর দক্ষতা/মেধা যাচাই করা তাদের প্রতি অবিচার। ইংল্যান্ডে অত্যন্ত দক্ষ শিক্ষক এবং স্কুলপদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও তাদের দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষাপদ্ধতির ব্যাপক সমালোচনা হয়। বলা হয়, একটি শিশুর মুক্তচিন্তা এবং বহুমুখী জ্ঞানার্জনের আনন্দকে গলা টিপে পরীক্ষার মাধ্যমে তোতা পাখি বানানো হচ্ছে। যার জন্য ২০১৬ থেকে এতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন পদ্ধতিতে সারা বছরের ক্লাসের মূল্যায়ন ও শ্রেণিশিক্ষকের পর্যবেক্ষণকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি, তারা আশির দশকের শুরু থেকেই প্রথম বর্ষের নতুন ছাত্রদের মধ্যে একটা ধীর পরিবর্তন লক্ষ করি তাদের পঠিত সিলেবাসের বাইরের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। ধীরে ধীরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পাসের হার ও নম্বরপ্রাপ্তি যত বৃদ্ধি পেতে থাকল, এই সমস্যাটি ততই প্রকট হয়ে দেখা দিল। পুরোনো প্রশ্নের ধারা, সম্পূর্ণ সিলেবাস বাদ দিয়ে খণ্ডিত অংশ পড়া, স্কুল, কলেজ ও কোচিং সেন্টারগুলোর চামচে তুলে নম্বরপ্রাপ্তির ফরমুলা গলাধঃকরণ আস্তে আস্তে একটি সম্পূর্ণ জাতির মুক্তচিন্তা এবং প্রতিটি ছাত্রের স্বকীয়তা প্রায় মৃতের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সিলেবাসে ছিল না অথবা ওই অংশ বাদ দিয়ে পড়েছি, এ রকম উত্তর অহরহই শুনতে হয়। বিজ্ঞান বা সাহিত্য, অবজেক্টিভ বা সাবজেক্টিভ বা এ দুইয়ের সংমিশ্রণ একটি ছাত্র যেদিকেই এগিয়ে যাক না কেন, তার বিশ্লেষণক্ষমতা থাকতে হবে। সিলেবাসে সীমাবদ্ধ নম্বরপ্রাপ্তির দক্ষতা দিয়ে সেটা অর্জন করা যায় না। পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থা, অদক্ষ অপ্রতুল শিক্ষক এবং কোচিংয়ের মাধ্যমে চরম বাণিজ্যিকীকরণ যে সত্যিকারের বিশ্লেষণধর্মী সুশিক্ষিত উচ্চমাধ্যমিক সমপর্যায়ের ছাত্র তৈরি করতে পারছিল না, তাতে সন্দেহ নেই। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সৃজনশীল পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছে। তবে এর সুফল এখন অবধি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এসে পৌঁছায়নি।
আগে প্রতিটি স্কুলের পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা হতো। স্কুলের নিজস্ব নিয়মে কিছু মেধাবী ছাত্রছাত্রী এতে অংশ নিতে পারত। মেধার স্বীকৃতি ছাড়া এই বৃত্তি আসলে খুব কার্যকরী কিছু ছিল না। কারণ, লেখাপড়া করার আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। হঠাৎ করেই সবাইকে এই বৃত্তি পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য পঞ্চম শ্রেণিতে পিএসসির প্রবর্তন করা হলো। মুহূর্তের মধ্যে আমাদের স্কুল শিক্ষার বাণিজ্যিক অংশের জন্য নতুন বাণিজ্যের অবারিত দ্বার উন্মোচন হলো। শুরু হয়ে গেল অভিভাবকদের জুজুর ভয়ের ইঁদুরের দৌড়। শিশুর গল্পের বই পড়া, ছবি আঁকা, খেলাধুলা, নাচ-গান, আনন্দ—সব বন্ধ হয়ে গেল। পিএসসির ফলাফল হয়ে উঠল সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি। সকাল থেকে স্কুল, বাড়ির কাজ, কোচিং, নোট বই, প্রশ্নপত্র জোগাড় ইত্যাদির মহা তোড়জোড়ে মারা গেল শিশুর জানার আনন্দ আর মুক্তচিন্তা বিকশিত হওয়ার সব পথ। শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে উঠল জিপিএ–৫ প্রাপ্তি। মান নির্ণয়ের পরীক্ষার দুটো মূল উদ্দেশ্যের একটি হলো স্কুলের ফলাফল যাচাই। জিপিএ–৫-এর বিজয় অঙ্গুলি দেখানোর দৌড়ে পিছিয়ে পড়া স্কুলগুলো নানা অনিয়মে জড়িয়ে যাচ্ছে। মূল সমস্যার সমাধানে না গিয়ে শতভাগ পাস এবং উচ্চ গ্রেডপ্রাপ্তিতে সরকারি পরিতৃপ্তি ও বাহবা এসব পিছিয়ে পড়া স্কুলগুলোকে তাদের কাঠামোগত এবং গুণগত মান উন্নয়নে সহায়তা করছে না।

পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জেনেছিলাম যে আমেরিকার শিক্ষাপদ্ধতির আদলে অষ্টম শ্রেণিতে জেএসসি প্রবর্তনের পরে পিএসসি ও এসএসসি  উঠিয়ে দেওয়া হবে। এখন দেখা যাচ্ছে যে মাত্র ১২ বছরের স্কুলে লেখাপড়ার সময়ে ছাত্রদের পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি—এই চারটি মান নির্ধারক পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। এসব পরীক্ষার উচ্চতর ফলাফলের আত্মতৃপ্তির বাইরে দুর্বল স্কুলগুলোর মান উন্নয়ন এবং ছাত্রদের মেধা ও মননের বিকাশ সাধনে এই ফলাফলগুলো কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার কোনো পরিষ্কার দিকনির্দেশনা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়। দুই বছর অন্তর জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে কী মান নির্ণয় করা হচ্ছে বা উদ্দেশ্য সাধন হচ্ছে, তাও বোধগম্য নয়। সত্যিকারের সৃজনশীল, অনুসন্ধানী ও অর্থবহ শিক্ষার চেয়ে যখন পরীক্ষার ফলাফল বড় হয়ে যায়, তখন প্রকৃত শিক্ষার মৃত্যু হতে বাধ্য। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এবং অপ্রয়োজনীয় (অতিরিক্ত) মান নির্ধারণী পরীক্ষা ছাত্রদের শেখানো বুলি আওড়ানো তোতা পাখিতে পরিণত করছে।
দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে নোট এবং শিক্ষক নির্ধারিত উত্তরের বাইরে কোনো কিছু শেখার বা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা হারাচ্ছে আমাদের ছাত্ররা। এর সরাসরি প্রতিফলন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায়। ইংরেজি দূরে থাকুক, বিশুদ্ধ বাংলায় ২০টি বাক্যে একটি অনির্ধারিত বিষয়ে লিখতে পারার মতো ছাত্র খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এর মানে কি জাতি মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে? মোটেও তা সঠিক নয়। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা নিয়ে বড় রকমের পদ্ধতিগত ভুল করছি। সেই ভুলগুলো খুব পরিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো শোধরানোর ব্যবস্থা না নিয়ে বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষিত ভর্তি পরীক্ষার কাঠামোকে দোষারোপ করা হচ্ছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সত্তা আছে এবং তাদের উচ্চমাধ্যমিকের মেধা ও দক্ষতার ব্যাপারে একটি প্রত্যাশাও আছে। সেই প্রত্যাশাকে নিচে না নামিয়ে কেন আমাদের ছেলেমেয়েরা সেটা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেই অনুসন্ধানটি এখন শুরু করা উচিত এবং তা শোধরানোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা না হলে আমরা তোতা পাখির জাতিতে পরিণত হব।

ম তামিম: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী।

তাহলে অ-খু​নিদের সঙ্গেই সংলাপ হোক! by সোহরাব হাসান

ঈদের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিদেশি কূটনীতিক, দলীয় নেতা-কর্মী ও সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। প্রতিবারই তাঁরা এ কাজটি করে থাকেন। দুই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসাদের মধ্যে বিদেশি কূটনীতিকরাই অভিন্ন অতিথি। আর সবাই ভিন্ন ভিন্ন ‘গ্রহের’ মানুষ।
এই শুভেচ্ছা বিনিময়ে কতটা শুভেচ্ছা আছে আর কতটা রাগ ও বিরাগের মিশেল আছে, তা বের করা কঠিন নয়।
বরাবরের মতো প্রধানমন্ত্রী দেশের সর্বত্র শান্তি ও সমৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছেন। মানুষের মুখে হাসি ও আনন্দ দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু ঈদের আগে বেতন না পাওয়া তোবা গার্মেন্টসের ১৬০০ শ্রমিকের মতো আরও অনেক শ্রমিকের মুখে যে হাসি ছিল না, সেটি তিনি শ্রম প্রতিমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারতেন।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পুলিশের কড়া পাহারায় রংপুরে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। কড়া পাহারায় তাঁর ঈদের নামাজ পড়ার কারণ রংপুরে জাতীয় পার্টির দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি, কাটাকাটি। এক গ্রুপ রওশনের সমর্থক, আরেক গ্রুপ এরশাদের। দেশের নিরুত্তাপ রাজনীতিতে কিছুটা হলেও এরশাদ দম্পতি উত্তাপ ছড়াচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দেশের মানুষ ঈদ করতে পারায় গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ঈদ ও হজ পালনকারীদের প্রতি মোবারকবাদ জানিয়েছেন। ঈদের আগে তিনি আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে যে কঠিন সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন, সে জন্য তাঁকে অনেকেই ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে তাঁর মন্ত্রিসভায় লতিফ সিদ্দিকীর মতো বেফাঁস মন্তব্য করা লোক দ্বিতীয়টি না থাকলেও জনগণের সম্পত্তিকে নিজের সম্পত্তি মনে করা মানুষ আরও আছেন। দেশবাসী আশা করে, তাঁদের ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রী কঠোর হবেন। এ ছাড়া ‘অকর্মক’ মন্ত্রীদের ব্যাপারেও তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, বেফাঁস মন্তব্য করে লতিফ সিদ্দিকী বেকায়দায় পড়েছেন। জনগণের প্রশ্ন, লতিফ সিদ্দিকী গত সাড়ে পাঁচ বছর মন্ত্রী পদে থেকে যে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপ করেছেন, তার বিচার হবে কি না? রোববারের প্রথম আলোতে ইফতেখার মাহমুদের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গাজীপুরের শালবন দখল করে তিনি নিজের নামে পাঠাগার তৈরি করছিলেন। মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর সেই পাঠাগারের মাটি ভরাটের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বস্ত্রকল সংস্থার কোটি কোটি টাকার সম্পদ তিনি শ্বশুরবাড়ির লোকদের বিনা মূল্যে দান করে দিয়েছেন। বাপের সম্পত্তি হলে যে কেউ দান করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি কীভাবে তিনি দান করলেন? এসব সম্পত্তি উদ্ধারের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো ক্ষমতাবান এ ধরনের কাজ করতে সাহস পাবেন না।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু র্যাব-পুলিশ এমনকি শিক্ষাব্যবস্থাও ধ্বংস করার অভিযোগ এনে বলেছেন, দেশের মানুষ ভালো নেই, স্বস্তিতে নেই। পথে পথে চাঁদাবাজির জন্য তিনি সরকারদলীয় লোকদের দায়ী করে বলেছেন, এই অবৈধ ও ভেজাল সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, দেশের কল্যাণ হবে না। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে বলেছেন, দেশের মানুষ এবারে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে ঈদ উদযাপন করছে। ‘গণতন্ত্রহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়?’
আজ মির্জা ফখরুলেরা সর্বত্র গণতন্ত্রহীনতা দেখছেন। হয়তো তাঁদের এই দেখার মধ্যে সত্যও আছে। কিন্তু বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন কি তারা গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পেরেছিল?
আমাদের রাজনীতিকেরা গণতন্ত্রকে বিচার করেন ক্ষমতায় থাকা না-থাকা নিয়ে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি সবখানে একদলীয় বাকশালের ভূত দেখতে পায়। আবার বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ চোখে বাইনোকুলার লাগিয়েও গণতন্ত্র খুঁজে পায় না।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন উভয়ের বক্তৃতায় সংলাপ ও আন্দোলনের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিএনপির সংলাপ প্রস্তাবের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যাঁরা আগে সংলাপের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন, তাঁরা আবার কীভাবে বলেন, সংলাপ হতেই হবে। এর মধ্যে তিনি অশান্তি ও ষড়যন্ত্রের ছায়া দেখেছেন।
অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেছেন, দিনক্ষণ দিয়ে আন্দোলন হয় না। সংলাপের জন্য অনন্তকাল তাঁরা অপেক্ষাও করবেন না। যখনই প্রয়োজন হবে, ডাক দেবেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কার সঙ্গে সংলাপ? খুনিদের সঙ্গে তো সংলাপ হতে পারে না। তিনি বিএনপি আমলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, সাংসদ-মন্ত্রী হত্যা এবং ২০১৩ সালে যারা বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মেরেছে, তাদের ইঙ্গিত করেছেন। যারা এসব দুষ্কর্ম করেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিচার চলছে। বিচার শেষ হলেই প্রমাণিত হবে কে অপরাধী, কে নিরপরাধ। তার পরও আমরা এদের সন্দেহভাজন হিসেবে ধরে নিতে পারি। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তদন্ত নেই, তাঁদের সঙ্গে সংলাপ করতে বাধা কোথায়?
গত ৫ জানুয়ারির আগে যদি প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে সংলাপে বসার প্রস্তাব দিতে পারেন, এখন বিএনপির সংলাপ প্রস্তাব নাকচ করার কী যুক্তি হতে পারে? একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী ভুল করলে কেবল তাঁকে বা তাঁর দলকে খেসারত দিতে হয়। কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রী ভুল করলে তার খেসারত দিতে হয় গোটা দেশকেই।
প্রধানমন্ত্রী খুনিদের সঙ্গে সংলাপ করতে চান না। তাহলে অ-খুনিদের সঙ্গেই সংলাপ হোক।

বিমান হামলা সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছে আইএস

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা অব্যাহত রাখলেও তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। কুর্দিদের একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, কুর্দি সীমান্তে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হামলা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে হামলা চললেও আইএস যোদ্ধারা নতুন নতুন এলাকা দখল করে যাচ্ছে।

অনেকেই বলছেন, আইএসকে থামাতে বিমান হামলাই যথেষ্ট নয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেনাবাহিনী নামানোর ধারণা বাতিল করে দিচ্ছেন। তিনি এখনো ব্যাপকভিত্তিক কোনো অভিযান চালাতে নারাজআইএস যোদ্ধারা এখন কোবানি দখল করার চেষ্টা করছে। এটা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তুরস্কও আক্রান্ত হতে পারে। এদিকে আইএসের অগ্রযাত্রার মুখে হাজার হাজার লোক তাদের বাড়িঘর থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।

ত্যাগের মহিমায় ঈদের আনন্দ

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসব আমেজের মধ্যদিয়ে আজ সোমবার সারা দেশে পশু কোরবানির মধ্যদিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে।

হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগ ও অনুপম আদর্শের প্রতীকী নিদর্শন হিসেবে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে থেকে কোরবানির এ প্রচলন শুরু। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। ওই অনন্য ঘটনার স্মরণেই এ কোরবানির প্রচলন।
মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় দ্বিতীয় বৃহত্তম এ উৎসব উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ধর্মীয় এ উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
পবিত্র এ দিনটিকে উৎসবের আমেজ দিতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়ক দ্বীপসমূহে জাতীয় ও ঈদ মোবারক খচিত পতাকা দিয়ে সুশোভিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সকল সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা ও ঈদ মোবারক খচিত পতাকা উত্তোলন এবং নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারী ভবনগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের সকল কারাগার, সরকারি হাসপাতাল, ভবঘুরে কল্যাণ কেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, শিশু সদন, ছোটমনি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র, সেফ হোমস, দুস্থ কল্যাণ কেন্দ্র এবং শিশু ও মাতৃসদনে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ পুত্রকে কোরবানি দেয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্ল¬াহপাকের নির্দেশে তিনি জীবদ্দশায় প্রতি বছরই পশু কোরবানির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার আনুগত্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদও (সা.) এ আদর্শ অনুসরণ ও বহাল রাখতে আদিষ্ট হন। তিনিও তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন এবং তাঁর উম্মতদের জন্য এ আদর্শ ও প্রথা অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
এ আদর্শ অনুসরণের জন্য গোটা মুসলিম জাহানের পাশাপাশি বাংলাদেশেও ঈদ উদযাপনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এ উপলক্ষে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে পশু কোরবানী দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিআরটিসি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি), বাংলাদেশ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য বেসরকারি সংস্থা বিপুলসংখ্যক যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এদিকে পবিত্র উৎসব উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও বিনোদনমূলক বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
যথাযোগ্য মর্যাদা ও আনন্দ উৎসবের মধ্যদিয়ে ঈদ উদ্যাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্থানীয় পর্যায়ে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো দেশব্যাপী ঈদ উদ্যাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
তাছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে সরকারি কর্মসূচির আলোকে ঈদুল আজহা উদ্যাপনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে কোরবানীর পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণের বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
রাজধানীতে সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় ঈদগাহে। এ ব্যাপারে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে আবহাওয়া প্রতিকুল থাকলে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে।

রেডমিটও আছে অনেক গুণ

রেড মিট বা লাল গোশতের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে শুনতে শুনতে, অনেকেরই মনে হতে পারে লাল গোশত তথা গরু-খাসির গোশতের বুঝি কোনো ভালো গুণই নেই। আসলে রেডমিট সম্পর্কে সর্তকবাণীর প্রায় পুরোটাই বয়স্কদের জন্য। যাদের বয়স ৩০-এর নিচে, রক্তে কোলেস্টেরল মাত্রা ঠিক আছে, মেদাধিক্য নেই, ওজনও স্বাভাবিক তাদের জন্য লাল গোশতের এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ঠিক হবে না।

রেড মিট বা লাল গোশত অনেকেই মজা করে খান; কিন্তু অবাক ব্যাপার হচ্ছে কেউ কেউ গরুর গোশতকে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন। এর কারণ হলো রেডমিটের পক্ষ ও বিপক্ষ দুই দলই চরম পক্ষপাতিত্বের বিবেচনায় রেডমিটকে বিচার করছেন। আসলে কৃশকায় গরুর গোশতকে স্বাস্থ্যকরই বলা চলে। কারণ তাতে কোলেস্টেরল থাকে কম। এ ধরনের গরুর সাধারণ গোশত দৈনিক ৫০-১০০ গ্রাম গ্রহণে খুব একটা অসুবিধা নেই। তবে কথা হচ্ছে, হৃদরোগ বা ক্যান্সার ঝুঁকি থাকলে রেড মিট এড়িয়ে চলা উচিত। আবার এ কথাও ধ্রুব সত্য, গরুর গোশত বা রেডমিট হচ্ছে প্রাণিজ প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, থায়ামিন, রিবোফ্ল্যাভিন, সেলেনিয়াম ও ভিটামিন বি১২-এর অন্যতম উৎস। এই গরুর গোশতই হতে পারে স্বাস্থ্যকর খাবার যদি গরুর গোশতের চর্বি বাদ দিয়ে ছোট ছোট টুকরো করে খাওয়া যায়। পাশাপাশি এই রেড মিটই আবার হৃদরোগ এবং কোনো কোনো ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়; কিন্তু কৃশকায় গরুর গোশত বা চর্বি বাদ দেয়া গরুর গোশতে এই সম্পৃক্ত চর্বি খুবই কম থাকার জন্য ঝুঁকিও কম। তবে রেডমিটের এসব ঝুঁকির পেছনে মূলত দায়ী গোশত প্রক্রিয়াজাতকরণ।

ঈদে ফয়’স লেক কমপ্লেক্সে নানা আয়োজন by নূরুল মোস্তফা কাজী

কোরবানির ঈদ ও দুর্গাপূজার ছুটিতে ভ্রমণপিপাসুদের আনন্দের সাথী হতে অন্য রকম সাজে সেজেছে চট্টগ্রামের আকর্ষণীয় বিনোদন কেন্দ্র ফয়’স লেক কমপ্লেক্স। ভ্রমণপিপাসু মানুষের অন্যতম পছন্দসই স্থান ফয়’স লেক কমপ্লেক্সে রয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট ও নয়নাভিরাম প্রকৃতির মেলবন্ধন। তাই অগণন দর্শক ভিড় করে ফয়’স লেক কমপ্লেক্সের এমিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ড ও সি ওয়ার্ল্ডে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদের দিন থেকে দর্শনার্থীদের জন্য নানা আয়োজনে খোলা থাকবে পুরো কমপ্লেক্স।

অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ড : ফয়’স লেকের অন্যতম আকর্ষণ অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ড। লেকের দুই পাশে পাহাড় আর সংরতি সবুজ বন যেখানে খেলা করে বুনো হরিণ আর খরগোশ। বিভিন্ন ধরনের বোটে চড়ে লেক ভ্রমণে উপভোগ করা যায় প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, যেখান থেকে দেখা যাবে নীল আকাশ আর ঘন সবুজের মেলা। প্রকৃতির সাথে আধুনিকতার সমন্বয়ে বিনোদনের সব উপকরণ বিদ্যমান এখানে। আনন্দ উল্লাসে রয়েছে সার্কাস সুইং, বাম্পার কার, ফ্যামিলি রোলার কোস্টার, ফেরিস হুইল ও পাইরেট শিপ। অ্যামিউজমেন্ট পার্কে রয়েছে অ্যাডভেঞ্চারল্যান্ড, ফোটিং ও লেকভিউ রেস্টুরেন্ট যেখানে পাওয়া যায় মজাদার সব খাবার। অ্যাডভেঞ্চারল্যান্ড রেস্টুরেন্টের ঠিক পাশেই দেখা মিলবে হরেক রকম মাছের খেলা। পাহাড়ের ঠিক ওপরেই আছে ফটো কর্নার যেখানে দেখা মিলবে নানা ভঙ্গিতে হরেক প্রাণীর ভাস্কর্য। লেকের গা ঘেঁষেই তৈরি করা হয়েছে সামুদ্রিক প্রাণীদের ভাস্কর্য নিয়ে অ্যাকুয়াটিক জোন।
সি ওয়ার্ল্ড  : ফয়’স লেকের বোট স্টেশন থেকে ইঞ্জিন বোটে ১০ মিনিটের পথ পেরোলেই দেখা মিলবে দেশের সর্ববৃহৎ ওয়াটার পার্ক সি ওর্য়াল্ড। ফয়’স লেকের এক প্রান্তে গড়ে তোলা হয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট কৃত্রিম সামুদ্রিক তরঙ্গের এ সি ওয়ার্ল্ড। সাথে রয়েছে রোমাঞ্চকর সব রাইড। এখানকার সবচেয়ে আর্কষণীয় রাইড ওয়েভ পুল। এটি মূলত একটি কৃত্রিম সমুদ্রসৈকত, সাগরের ঢেউয়ের মতো কৃত্রিম ঢেউ খেলা করে এখানে। আর টিউবে চড়ে ঢেউয়ের তালে ভেসে বেড়ানো যায় ইচ্ছামতো। ওয়েভ পুলের ঠিক পাশেই রয়েছে ড্যান্সিং জোন। কৃত্রিম বৃষ্টি, নানা রঙের আলো আর মনমাতানো মিউজিকের তালে তালে নেচে ওঠেন আগত দর্শনার্থীরা। চিলড্রেন পুলটি সাজানো শিশুদের উপযোগী অনেক রাইড নিয়ে, যা দিয়ে অনায়াসে উপভোগ করতে পারে তাদের জন্য গড়ে তোলা এ স্বপ্নরাজ্য। পরিবারের সবাইকে নিয়ে মজা করতে আছে ফ্যামিলি পুল। উঁচু জায়গা থেকে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পুলে ধপাস করে পড়ার মজা পাওয়া যাবে এখানকার স্লাইড ওয়ার্ল্ডে। এ ছাড়া মাল্টি স্লাইড, ডোম স্লাইড,পেজোনের মতো মজার সব রাইড।
ফয়’স লেক রিসোর্ট : প্রকৃতি ও মনুষ্যসৃষ্ট এ মনজুড়ানো বিনোদন কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে উপভোগ করতে চাইলেও সুযোগ রেখেছেন সংশ্লিষ্টরা। রয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ফয়’স লেক রিসোর্ট ও বাংলো। ওয়াটার পার্ক সিওর্য়াল্ড লাগোয়া রিসোর্টে রয়েছে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পাহাড় ও হ্রদমুখী ক যেখান থেকে উপভোগ করা যাবে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। নিরিবিলি পরিবেশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলো। এখানে থাকলে মনে হবে এ বুঝি কোনো এক দ্বীপ। বাংলোর ঝুলন্ত বারান্দা থেকে প্রকৃতিকে কাছে পাওয়া যায় সহজেই। রিসোর্ট ও বাংলোয় আগত পর্যটকদের খাবার-দাবারের রয়েছে মানসম্পন্ন রেস্টুরেন্ট যা রাতদিন খোলা থাকে।

মানুষের বানানো প্রাচীনতম ও দীর্ঘতম পানিপথ

চীনের ইতিহাসে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কমই আছে: মানুষের বানানো পৃথিবীর দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে প্রাচীনতম পানিপথ এটা, যা সুয়েজ খালের চেয়ে ৯ গুণ দীর্ঘ। এই খাল কাটা না হলে বেইজিং হয়তো কখনোই চীনের রাজধানী হয়ে উঠত না। আর এই খাল ছাড়া হয়তো চীন-ই চীন হয়ে উঠত না! এমন আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ‘বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল’ বা ‘বেইজিংয়ের বড় খাল’-কে এ বছরের জুন মাসে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে ইউনেসকো। সরেজমিন ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে এক ফটো ফিচারে এ সম্পর্কে জানিয়েছেন বিবিসির আমান্দা রুগেরি।

এ প্রজন্মের ‘বেইজিংগার’ বা বেইজিংয়ের বাসিন্দাদের মধ্যে অল্প কিছু লোক যদিও বা বড় খাল ঘুরে দেখে থাকেন, তাহলে তার চেয়ে আরও কম পর্যটকই তা দেখেছেন। অবশ্য এই বড় খাল দক্ষিণ চীনে তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। সেখানে প্রমোদতরি আর বার্জগুলো এখনো ২ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো এই নৌপথে চলাচল করে। কিন্তু অনেক বেইজিংগারই জানেন না যে, তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ৩৫ কিলোমিটার দূরে বেইজিংয়ের তোংঝু উপশহর থেকে শুরু হওয়া এই হাতে কাটা খাল ১ হাজার ৭৯৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পূর্ব-চীনের ঝেইজিয়াং প্রদেশের রাজধানী হাংঝোও পর্যন্ত বিস্তৃত।

বেইজিংয়ের এই বড় খাল কাটতে কাটতে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৮০০ বছর। যে লাখ লাখ শ্রমিক এই খাল কাটতে গিয়ে জীবনতিপাত করেছেন, দুনিয়ার আর কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভবত এত মানবসম্পদ কাজে লাগাতে হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৬ সালে এই খাল কাটার কাজ শুরু হয়। ৬০৫ সালের দিকে চীনের এক সাবেক রাজধানী লুয়োইয়াং থেকে কিংঝিয়াং পর্যন্ত এক হাজার কিলোমিটারের মতো খাল কাটা শেষ হয়েছিল। এর পাঁচ বছর পর ঝেনজিয়াং থেকে হাংঝোও পর্যন্ত আরও ৪০০ কিলোমিটার খাল কাটা শেষ হয়।

মানুষের বানানো এই দীর্ঘতম পানিপথে আরও জল গড়ানো বাকি ছিল তখনো। ৬১০ সালের দিকে এই খাল পৌঁছে যায় প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে। অন্ততপক্ষে ৩০ লাখ কৃষককে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল এখানে। ধারণা করা হয়ে থাকে, এই কৃষক-শ্রমিকদের অর্ধেকেরও বেশি কঠোর পরিশ্রম আর অনাহারে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু কুবলাই খান যখন ১২৭১ সালে কাইফেং বা লুয়োইয়াং থেকে রাজধানী স্থানান্তর করে বেইজিংয়ে নিয়ে আসেন, তখন আগের চেয়ে আরও বেশি কৃষক-শ্রমিককে জীবন উৎসর্গ করতে হয় এই খাল কাটার জন্য। এখনকার বেইজিং-হাংঝোও নৌপথের রূপ দিতে আরও ৪০০ কিলোমিটার খাল কাটতে হয়। সে সময় ১০ বছরে অন্তত ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন কুবলাই খানের নতুন রাজধানীকে আরও সরাসরি এই খালে যুক্ত করতে। ইউনেসকোর ভাষ্য অনুযায়ী, বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল ‘শিল্প বিপ্লবের আগে বাস্তবায়িত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এবং সুপরিসর পুর-কৌশল প্রকল্প’।

প্রাচীন চীন সাম্রাজ্যের জন্য নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই এত সাধনায় বাস্তবায়ন করা হয়েছিল এই খাল কাটা। নাগরিকদের খাদ্যনিরাপত্তা তার মধ্যে অন্যতম। ইয়াংসি অববাহিকা চীনের রুটির ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত হলেও খোদ ইয়াংসি নদীই পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত। কিন্তু শাসকেরা জানেন, ক্ষুধার্ত জনগণই বিদ্রোহ করে বসে আর না-খাওয়া সৈনিকেরা কোনো কাজে আসে না। ফলে এই খাল কাটার মধ্য দিয়ে চীনের শাসকেরা ইয়াংসি থেকে হলুদ নদী হোয়াংহো পর্যন্ত চাল বোঝাই নৌকা চলাচলের সুযোগ করে দিতে পেরেছিলেন। এই অববাহিকায় উৎপাদিত চালের মতোই উত্তর চীনে উৎপাদিত গমও এই নৌপথ দিয়েই দক্ষিণ চীনে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন তাঁরা। পাশাপাশি আরও কিছু ছোট ছোট খাল-নদীতে যুক্ত হয়ে এই নৌ-পথ রাজধানী বেইজিংকে ঘিরে চীনে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে।
যেকোনোও মহৎ সৃষ্টিই যেমন সৃজনের পথকে আরও প্রসারিত করে, ঠিক তেমনটাই ঘটেছে বেইজিং বড় খালের ক্ষেত্রে। ৫৮৭ সালেই সুই সাম্রাজ্যের শাসনামলে এই খালে দুনিয়ার প্রথম ‘লক গেট’ বানানো হয়েছিল। হোয়াংহো নদীর সঙ্গে এই খালের সংযোগ পথে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন গেট বসিয়েছিলেন প্রকৌশলী লিয়াং রুই। ৯৮৪ সালে আরেক প্রকৌশলী কিয়াও উইয়েও এই খালে প্রথম ‘পাউন্ড লক’ বানান। আধুনিক পানি-প্রযুক্তিতে অনেক খালেই আমরা এমন ধরনের ব্যবস্থা দেখি। এতে দুই পাশে ঘের দিয়ে একটা নিরাপদ পুকুরের মতো তৈরি করা হয় এবং পানির উচ্চতা কমে-বেড়ে স্থির না হওয়া পর্যন্ত নৌকাগুলো সেখানে অপেক্ষা করতে পারে। ১৯৭৩ সালে ইউরোপে প্রথমবারের মতো এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় নেদারল্যান্ডসের ভ্রিসভিকে।

১৯ শতকে চীনে রেলপথের প্রসারের পর থেকেই এই নৌপথের গুরুত্ব কমতে থাকে। গ্র্যান্ড ক্যানালের অনেক ছোট ছোট সংযোগ খালের সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে ১৯৫৮ সালে মূল খালে একটা বড় ধরনের সংস্কারকাজ করা হয়। সে সময় থেকেই দক্ষিণ চীনে গুরুত্বের সঙ্গে নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা। অতি সম্প্রতি বেইজিং নগর হয়তো নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করেছে ভুলে যাওয়া এই খালকে। ২০০৮ সালের অলিম্পিক গেমসের সময় এই খালের পাড় ধরে একটা অলিম্পিক পার্ক গড়ে তোলা হয়। গত বছর এই খালের পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘গ্র্যান্ড ক্যানাল ফরেস্ট পার্ক’। গাছ-গাছালি আর পাখ-পাখালিতে ভরা খাল পাড়ের এই উদ্যান এখন অনেক বেইজিংবাসীরই নজর কাড়ছে।


বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল কেবল মানুষের বানানো দীর্ঘতম ও প্রাচীনতম পানিপথ কিংবা এককালের সবচেয়ে বড় পুরকৌশল প্রকল্পই নয়, এটা আমাদের ধীরগতির পরিবেশবান্ধব উন্নয়নেরও একটা নমুনা। আজকের দিনে বেইজিংয়ের বুলেট ট্রেন, কিংবা আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা আর পশ্চিমা ধাঁচের উন্নয়নের জোয়ারের আগে সভ্যতার অগ্রযাত্রায় চীনের অনন্য পথচলার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে মানুষের বানানো এই খাল। এই নৌপথ যথাযথভাবে সংস্কার করে এখানকার প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে মানুষের বানানো এই খালও হয়তো আগামী দুনিয়ায় চীনের বিশাল প্রাচীরের মতোই চীনের গর্ব হয়ে থাকবে।

মানুষের বানানো প্রাচীনতম ও দীর্ঘতম পানিপথ

চীনের ইতিহাসে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কমই আছে: মানুষের বানানো পৃথিবীর দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে প্রাচীনতম পানিপথ এটা, যা সুয়েজ খালের চেয়ে ৯ গুণ দীর্ঘ। এই খাল কাটা না হলে বেইজিং হয়তো কখনোই চীনের রাজধানী হয়ে উঠত না। আর এই খাল ছাড়া হয়তো চীন-ই চীন হয়ে উঠত না! এমন আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ‘বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল’ বা ‘বেইজিংয়ের বড় খাল’-কে এ বছরের জুন মাসে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে ইউনেসকো। সরেজমিন ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে এক ফটো ফিচারে এ সম্পর্কে জানিয়েছেন বিবিসির আমান্দা রুগেরি।

এ প্রজন্মের ‘বেইজিংগার’ বা বেইজিংয়ের বাসিন্দাদের মধ্যে অল্প কিছু লোক যদিও বা বড় খাল ঘুরে দেখে থাকেন, তাহলে তার চেয়ে আরও কম পর্যটকই তা দেখেছেন। অবশ্য এই বড় খাল দক্ষিণ চীনে তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। সেখানে প্রমোদতরি আর বার্জগুলো এখনো ২ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো এই নৌপথে চলাচল করে। কিন্তু অনেক বেইজিংগারই জানেন না যে, তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ৩৫ কিলোমিটার দূরে বেইজিংয়ের তোংঝু উপশহর থেকে শুরু হওয়া এই হাতে কাটা খাল ১ হাজার ৭৯৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পূর্ব-চীনের ঝেইজিয়াং প্রদেশের রাজধানী হাংঝোও পর্যন্ত বিস্তৃত।

বেইজিংয়ের এই বড় খাল কাটতে কাটতে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৮০০ বছর। যে লাখ লাখ শ্রমিক এই খাল কাটতে গিয়ে জীবনতিপাত করেছেন, দুনিয়ার আর কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভবত এত মানবসম্পদ কাজে লাগাতে হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৬ সালে এই খাল কাটার কাজ শুরু হয়। ৬০৫ সালের দিকে চীনের এক সাবেক রাজধানী লুয়োইয়াং থেকে কিংঝিয়াং পর্যন্ত এক হাজার কিলোমিটারের মতো খাল কাটা শেষ হয়েছিল। এর পাঁচ বছর পর ঝেনজিয়াং থেকে হাংঝোও পর্যন্ত আরও ৪০০ কিলোমিটার খাল কাটা শেষ হয়।

মানুষের বানানো এই দীর্ঘতম পানিপথে আরও জল গড়ানো বাকি ছিল তখনো। ৬১০ সালের দিকে এই খাল পৌঁছে যায় প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে। অন্ততপক্ষে ৩০ লাখ কৃষককে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল এখানে। ধারণা করা হয়ে থাকে, এই কৃষক-শ্রমিকদের অর্ধেকেরও বেশি কঠোর পরিশ্রম আর অনাহারে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু কুবলাই খান যখন ১২৭১ সালে কাইফেং বা লুয়োইয়াং থেকে রাজধানী স্থানান্তর করে বেইজিংয়ে নিয়ে আসেন, তখন আগের চেয়ে আরও বেশি কৃষক-শ্রমিককে জীবন উৎসর্গ করতে হয় এই খাল কাটার জন্য। এখনকার বেইজিং-হাংঝোও নৌপথের রূপ দিতে আরও ৪০০ কিলোমিটার খাল কাটতে হয়। সে সময় ১০ বছরে অন্তত ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন কুবলাই খানের নতুন রাজধানীকে আরও সরাসরি এই খালে যুক্ত করতে। ইউনেসকোর ভাষ্য অনুযায়ী, বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল ‘শিল্প বিপ্লবের আগে বাস্তবায়িত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এবং সুপরিসর পুর-কৌশল প্রকল্প’।

প্রাচীন চীন সাম্রাজ্যের জন্য নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই এত সাধনায় বাস্তবায়ন করা হয়েছিল এই খাল কাটা। নাগরিকদের খাদ্যনিরাপত্তা তার মধ্যে অন্যতম। ইয়াংসি অববাহিকা চীনের রুটির ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত হলেও খোদ ইয়াংসি নদীই পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত। কিন্তু শাসকেরা জানেন, ক্ষুধার্ত জনগণই বিদ্রোহ করে বসে আর না-খাওয়া সৈনিকেরা কোনো কাজে আসে না। ফলে এই খাল কাটার মধ্য দিয়ে চীনের শাসকেরা ইয়াংসি থেকে হলুদ নদী হোয়াংহো পর্যন্ত চাল বোঝাই নৌকা চলাচলের সুযোগ করে দিতে পেরেছিলেন। এই অববাহিকায় উৎপাদিত চালের মতোই উত্তর চীনে উৎপাদিত গমও এই নৌপথ দিয়েই দক্ষিণ চীনে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন তাঁরা। পাশাপাশি আরও কিছু ছোট ছোট খাল-নদীতে যুক্ত হয়ে এই নৌ-পথ রাজধানী বেইজিংকে ঘিরে চীনে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে।
যেকোনোও মহৎ সৃষ্টিই যেমন সৃজনের পথকে আরও প্রসারিত করে, ঠিক তেমনটাই ঘটেছে বেইজিং বড় খালের ক্ষেত্রে। ৫৮৭ সালেই সুই সাম্রাজ্যের শাসনামলে এই খালে দুনিয়ার প্রথম ‘লক গেট’ বানানো হয়েছিল। হোয়াংহো নদীর সঙ্গে এই খালের সংযোগ পথে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন গেট বসিয়েছিলেন প্রকৌশলী লিয়াং রুই। ৯৮৪ সালে আরেক প্রকৌশলী কিয়াও উইয়েও এই খালে প্রথম ‘পাউন্ড লক’ বানান। আধুনিক পানি-প্রযুক্তিতে অনেক খালেই আমরা এমন ধরনের ব্যবস্থা দেখি। এতে দুই পাশে ঘের দিয়ে একটা নিরাপদ পুকুরের মতো তৈরি করা হয় এবং পানির উচ্চতা কমে-বেড়ে স্থির না হওয়া পর্যন্ত নৌকাগুলো সেখানে অপেক্ষা করতে পারে। ১৯৭৩ সালে ইউরোপে প্রথমবারের মতো এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় নেদারল্যান্ডসের ভ্রিসভিকে।

১৯ শতকে চীনে রেলপথের প্রসারের পর থেকেই এই নৌপথের গুরুত্ব কমতে থাকে। গ্র্যান্ড ক্যানালের অনেক ছোট ছোট সংযোগ খালের সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে ১৯৫৮ সালে মূল খালে একটা বড় ধরনের সংস্কারকাজ করা হয়। সে সময় থেকেই দক্ষিণ চীনে গুরুত্বের সঙ্গে নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা। অতি সম্প্রতি বেইজিং নগর হয়তো নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করেছে ভুলে যাওয়া এই খালকে। ২০০৮ সালের অলিম্পিক গেমসের সময় এই খালের পাড় ধরে একটা অলিম্পিক পার্ক গড়ে তোলা হয়। গত বছর এই খালের পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘গ্র্যান্ড ক্যানাল ফরেস্ট পার্ক’। গাছ-গাছালি আর পাখ-পাখালিতে ভরা খাল পাড়ের এই উদ্যান এখন অনেক বেইজিংবাসীরই নজর কাড়ছে।


বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল কেবল মানুষের বানানো দীর্ঘতম ও প্রাচীনতম পানিপথ কিংবা এককালের সবচেয়ে বড় পুরকৌশল প্রকল্পই নয়, এটা আমাদের ধীরগতির পরিবেশবান্ধব উন্নয়নেরও একটা নমুনা। আজকের দিনে বেইজিংয়ের বুলেট ট্রেন, কিংবা আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা আর পশ্চিমা ধাঁচের উন্নয়নের জোয়ারের আগে সভ্যতার অগ্রযাত্রায় চীনের অনন্য পথচলার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে মানুষের বানানো এই খাল। এই নৌপথ যথাযথভাবে সংস্কার করে এখানকার প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে মানুষের বানানো এই খালও হয়তো আগামী দুনিয়ায় চীনের বিশাল প্রাচীরের মতোই চীনের গর্ব হয়ে থাকবে।

সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের বৈষম্য পাহাড়সম by আমানুর রহমান

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ও ভাতার বৈষম্য পাহাড়সম। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক ৪৭০০ টাকা স্কেলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সাথে রয়েছে সরকারি বিধি অনুসারে নানা ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা। অপর দিকে বেসরকারি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সহকারী শিক্ষক বেতন পান মাত্র এক হাজার বা তার চেয়ে কিছু বেশি। হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষকের বেতন ৬৪০০ টাকা (সরকারি-বেসরকারি)। সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের এর সাথে যুক্ত হয় মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, ৪৫ শতাংশ চিকিৎসা ভাতা, দু’টি পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা। আর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামর্থ্য অনুযায়ী ভাতা দেয়া হয় বা হয় না। কোথাও কোথাও বেতন পাঁচ হাজার টাকাও দেয়া হয় না। অপর দিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা সরকারি হারে বেতন পেলেও বাড়ি ভাড়া পান ৫০০ টাকা আর চিকিৎসা ভাতা পান ৩০০ টাকা। কলেজ শিক্ষকেরা ১১ হাজার টাকা মূল বেতনের সাথে সরকারি বিধি অনুসারে ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা পান। বেসরকারি কলেজের শিক্ষকেরা তাও পান না।
উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চিত্রটি আরো করুণ। সারা দেশে ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যে সুযোগ-সুবিধা পান, তার বিপরীতে বেসরকারি বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনভাতা শুধু লজ্জাজনকই নয় অনেক ক্ষেত্রে অপমানজনকও বটে। হাতে গোনা কয়েকটি মানসম্পন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অনেক বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পেলেও বেশির ভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকেরা শিক্ষকদের বেতন ১০ হাজার টাকা দিতেও কুণ্ঠিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নবীন লেকচারার ১১ হাজার টাকা মূল বেতনের সাথে অন্যান্য ভাতাসহ প্রায় ২৩ হাজার টাকার মতো পেয়ে থাকেন।
এরূপ হাজারো বৈষম্য আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দেশের প্রায় ১২ লাখ শিক্ষক নানামুখী সঙ্কট নিয়ে সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এ বেতনভাতা বৈষম্য যুগের পর যুগ ধরে চলছে। মাঝে মধ্যেই কাসরুম ছেড়ে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকেরা। পুলিশের লাঠিপেটায় লাঞ্ছিত হচ্ছেন মানুষ গড়ার এ কারিগরেরা। এসব কারণে মেধাবীরা আর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
শিক্ষকদের এমন নানামুখী সমস্যার মধ্য দিয়ে আজ ৫ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
সারা বিশ্বের শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৯৪ সাল থেকে শিক্ষকসমাজ দিবসটি পালন করে আসছেন। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছেÑ ‘শিক্ষকদের জন্য বিনিয়োগ, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ’। ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো-আইএলও যৌথ কনভেনশন থেকে শিক্ষক সনদ প্রণয়ন করা হয়। পরে শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষক সংগঠনের অব্যাহত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন ইউনেস্কোর তৎকালীন মহাপরিচালক ফেডারিক মেয়র। সে থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক নেতারা বলছেন, মহান পেশা শিক্ষকতা এখন আকর্ষণহীন। বেতন বৈষম্যের কারণে মেধাবীরা এখন আর শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না। দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ছে। তাই শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। 
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আফ্রিকার দরিদ্র দেশেগুলোর চেয়েও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম বাংলাদেশে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় সার্কভুক্ত নেপাল, ভুটানে যেখানে শিক্ষা খাতে বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়, সেখানে বাংলাদেশে বরাদ্দ বাজেটের মাত্র ১১ শতাংশ। ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ (কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক বরাদ্দ মিলে) আরো বেশি। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে সচেষ্ট দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি হলো মালদ্বীপ। জাতীয় আয়ের ৭ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছে এ দেশটি।
ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক আবদুস সাত্তার বলেন, ১০ বছর ধরে তিনি শিক্ষকতা করছেন। তিনি জানান, ইবতেদায়ি শিক্ষকেরা মাসে এক হাজার টাকা ভাতা ও ২০০ টাকা মহার্ঘ্য ভাতা পান। এটি প্রতি মাসে দেয়া হয় না। তিন মাস পরপর দেয়া হয়। তিনি বলেন, একজন দিনমজুরও মাসে নয় থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন। তারা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার কারিগর (শিক্ষক) হয়েও তাদের বেতন মাত্র এক হাজার টাকা।
এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি ও প্রবীণ শিক্ষক প্রফেসর মাযহারুল হান্নান নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থাপনায় বৈষম্য ও শিক্ষা জাতীয়করণ না করা হলে শিক্ষার কাক্সিক্ষত মান অর্জন হবে না এটি সরকারের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত এনজিওগুলোর সংগঠন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকারীকরণ করা হলেও শিক্ষকদের বেতনভাতায় বৈষম্য আছে। বেসরকারি শিক্ষকদের চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৩০০ টাকা আর বাড়ি ভাড়া ৫০০ টাকা। এ ভাতা কোনোভাবেই যুক্তির মধ্যে পড়ে না। ৫০০ টাকায় বাড়ি ভাড়া যেমন অযৌক্তিক, কোচিং বাণিজ্য নিয়ে শিক্ষকদের দায়ী করাও তেমন অযৌক্তিক। তিনি বলেন, শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। এর প্রভাব শিক্ষা ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। উচ্চতর শিক্ষায় প্রবেশ পথে শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় পাসও করতে পারছে না। কারণ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ভিত্তিটাই নড়বড়ে। শিক্ষার বড় চালিকাশক্তি শিক্ষক এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক চাকরিতে প্রবেশকালে বেতন পান ২০ হাজার রুপি। তিনি বলেন, মাধ্যমিকপর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য হয়। সরকার বদলের সাথে সাথে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি সরকারের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাণিজ্য হচ্ছে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকেরাও জানেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভিকারুননিসা স্কুলের শিক্ষকের নৈতিকস্খলনের উদাহরণ দিয়ে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, অনৈতিকভাবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের কাছে নৈতিকতা আশা করা যায় না।  
এ দিবসের কর্মসূচি : সরকার সমর্থক শিক্ষক সংগঠন ও এনজিওগুলো শিক্ষক দিবস পালনের জন্য জাতীয় উদযাপন কমিটি করেছে। এর আহ্বায়ক হচ্ছেনÑ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও সমন্বয়ক হচ্ছেন প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ। তারা আগামী ২০ অক্টোবর এ দিবসের কর্মসূচি পালন করবে। ওই দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে র‌্যালি বের করা হবে এবং বিকেলে টিএসসি মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে শিক্ষামন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
শিক্ষক দিবস উপলক্ষে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের একক বৃহৎ শিক্ষক সংগঠন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট আগামী ১৩ অক্টোবর সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস কাবে আলোচনা ও সেমিনারের আয়োজন করেছে। এ প্রসঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষকদের জন্য বর্তমান সরকার উল্লেখযোগ্য ও ইতিবাচক কোনো পদক্ষেপ নেননি, বরং শিক্ষকেরা ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবির আন্দোলন করতে গেলে নানাভাবে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।

হার্ডলাইনে সরকার -আবারো শুরু হয়েছে ধরপাকড় by আবু সালেহ আকন

রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম নেই। মিছিল-সমাবেশ নেই। কিন্তু তাই বলে গ্রেফতার অভিযান থামছে না। প্রতিদিনই গ্রেফতার হচ্ছে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে। আবার কেউ কেউ গ্রেফতার হওয়ার পরে পুরনো মামলায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্রমেই হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার। ঈদের পর সরকারবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচি যাতে দানা বাঁধতে না পারে সেজন্যই এই গ্রেফতার অভিযান। একইসাথে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সহিংসতা নিয়ে দায়েরকৃত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ডিসিদের চিঠি দেয়া হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আন্দোলন যাতে চাঙ্গা না হতে পারে সেজন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকও রয়েছেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিবকে। আমেরিকা যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দরে গেলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এরপর তাকে শাহবাগ থানার একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হালিমকে সম্প্রতি খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
সম্প্রতি ঝিনাইদহে গ্রেফতার হন জামায়াতে ইসলামীর ৩৮ নেতাকর্মীসহ ৪০ জন। কুরআন ও হাদিসের তালিম নেয়ার সময় পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতারা। ওইদিন সিলেট ও সাতকানিয়া থেকে বিরোধী দলের আরো ১২ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। গত ১৮ ও ২১ সেপ্টেম্বর জামায়াতের হরতাল এবং ২২ সেপ্টেম্বরের ২০ দলীয় জোটের হরতালকে কেন্দ্র করে দুই শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে পুলিশি কাজে বাধা দান, পুলিশের ওপর হামলাসহ নানা অভিযোগে মামলা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুরনো মামলার সাথে নিত্যনতুন মামলা হচ্ছে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। প্রতিদিনই দু-চারটি মামলা হচ্ছে দেশের কোথাও না কোথাও। রাস্তায় নামলেই মামলা হচ্ছে। মিছিল, সমাবেশসহ যেকোনো কর্মসূচিকে ঘিরেই এই মামলাগুলো দায়ের হচ্ছে। বেশির ভাগ মামলায় বাদি হচ্ছে পুলিশ। নতুন করে গ্রেফতার ও মামলা প্রদানের সাথে সাথে চলছে পুরনো মামলার চার্জশিট প্রদান। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করে বিভিন্ন মামলায় চার্জশিট প্রদান করা হচ্ছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর সাবেক মেয়র বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বর্তমান মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলসহ ৮৯ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একটি মামলায় চার্জশিট প্রদান করা হয়। রাজশাহীতে বোমা মেরে পুলিশ কনস্টেবল সিদ্ধার্থ চন্দ্র সরকারকে হত্যার অভিযোগে দায়েরকৃত এই মামলায় চার্জশিট প্রদান করা হয়। রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওসি নুর হোসেন খন্দকার এই চার্জশিট দাখিল করেন।
এ দিকে, সহিংসতাকে ঘিরে যেসব মামলা হয়েছে বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেসব মামলা হয়েছে সেসব মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের ৪৪ জেলায় এরূপ মামলার সংখ্যা তিন হাজার ৭৮০টি। এর মধ্যে ইতোমধ্যেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে ৭২৯টি মামলার। এসব মামলায় এজাহার নামীয় আসামি রয়েছে তিন লাখ ৫৫ হাজার ৯০৮ জন। অজ্ঞাত আসামি রয়েছে দুই লাখ ৫১ হাজার ৮৬২ জন। সূত্র জানায়, এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হলে বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মী এই মামলায় আটকে যাবেন। এতে হয় তাদের পালিয়ে বাঁচতে হবে, না হয় গ্রেফতার হয়ে জেলে যেতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোরবানির ঈদের পরে আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে পারে বিরোধী জোট। এমন আশঙ্কাই করছে সরকার। আর সে কারণেই আগেভাগে শুরু হয়েছে ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান। একইসাথে পুরনো মামলাগুলোকেও চাঙ্গা করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, পুলিশি অভিযানও বাড়ছে আগের চেয়ে। গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। ঈদের পরপর এই অভিযানের আরো বিস্তৃতি ঘটবে বলে একাধিক সূত্র জানায়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়া দিগন্তকে বলেছেন, সরকার মনে করছে ঈদের পর আন্দোলন কর্মসূচি তীব্র হয়ে উঠবে। আর আন্দোলন যাতে চাঙ্গা হতে না পারে সেজন্যই নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যাপকহারে গ্রেফতার। একইসাথে পুরনো মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে সেসব মামলায় সাজা দিতে চাচ্ছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের।
এ দিকে, পুলিশের আইজিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে এই গ্রেফতার অভিযানের ব্যাপারে জানার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, পুলিশ প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

সময়মতো আন্দোলন -ঈদের শুভেচ্ছায় খালেদা জিয়া

সময়মতো সরকার বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিবেন বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, দিনক্ষণ দিয়ে আন্দোলন হয় না। তাই আর দিনক্ষণ দিয়ে নয়, এবার সময় মতোই আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে।  বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, দেশকে এবং নিজেকে বাঁচাতে হবে। এই অত্যাচারীদের থেকে দেশকে বাঁচানোই এখন কর্তব্য। সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে আমরা বিজয়ী হব। দেশের মানুষের বিজয় হবে। দেশে সুদিন আসবে। খালেদা বলেন, গুম-খুন থেকে মানুষ বাঁচতে চায়। র্যাব-পুলিশের অত্যাচার এখনো বন্ধ হয়নি। র্যাব-পুলিশ যদি টাকার বিনিময়ে খুন করে, আসামি ছেড়ে দেয় তাহলে দেশের কী হবে? মানুষ কোথায় যাবে।

আওয়ামী লীগের প্রতি ইঙ্গিত করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, দেশকে ধ্বংস করার জন্য কি এরা বসেছে? এদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে খালেদা বলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশেবাসীকে বাঁচাই। আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। এদের দিয়ে দেশ চলতে পারে না। চলবে না। এরা লুটেরা, খুনী, অত্যাচারী। এদের থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমানের ব্যাপারে তিনি বলেন, সে এখনো চলতে পারে না, অসুবিধা হয়। আমার সঙ্গে যারা (মক্কায়) গিয়েছিলেন তারাও দেখেছেন ওর অবস্থা কী? (তারেক) কবে আসবে বলা মুশকিল। চিকিৎসা শেষ না হলে আসতে পারবে না। চিকিৎসক ছাড়বে না। ওকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হচ্ছে।

মরণোত্তর দেহদান করলেন ভাষা মতিন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরণোত্তর দেহ দান করলেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। আজ রোববার বিষয়টি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সকদের লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তিনি বর্তমানে সেখানকার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিত্সাধীন রয়েছেন।

মরণোত্তর দেহদানে ভাষা মতিনের স্ত্রী গুলবদন নেসা মনিকা ও মেয়ে মালিহা শোভনের সম্মতি রয়েছে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রতনতনু ঘোষ।

ভাষা মতিনের ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘আমি আবদুল মতিন, পিতা-মৃত আবদুল জলিল, মাতা-মৃত আমেনা খাতুন স্বেচ্ছায় শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ অবস্থায় আমার মরণোত্তর দেহ বা লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের শিক্ষার্থীদের এনাটমি ফিজিওলজি ইত্যাদি শেখার কাজে লাগবে জেনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে দেহ সম্পূর্ণ এবং সন্ধানীকে চক্ষু দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে আমার স্ত্রী ও কন্যাদের সম্মতি রয়েছে। কাজেই মৃত্যুর পরে আমার মৃতদেহ কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অর্পণ করার জন্য আমার স্ত্রী ও কন্যাদের নির্দেশ দিচ্ছি।’

ঈদ আনন্দ নেই তাদের by আজহারুল হক

রাজধানী ঢাকার কাছের উপজেলা দোহার। আর্থসামাজিক অবস্থায় গোটা দোহারই বেশ উন্নত, এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু ভালোর মাঝেও যে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়, এটাও সত্যি। তেমনি দোহারের নয়াবাড়ী, মাহমুদপুর ও নারিশা ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের মাঝে ঈদের আনন্দ নেই। সম্প্রতি পদ্মার ভাঙনে বসতভিটে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে তারা। ঈদের আনন্দ তাদের স্পর্শ করছে না। অনেকেরই দিন কাটছে কান্না আর হাহাকারে।

সরেজমিন দেখা যায়, পদ্মাপারের কয়েক শ পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে নদীতে। তাদের কেউ রাস্তায়, আবার কেউ অন্যের জমি ভাড়ায়, কেউবা অস্থায়ীভাবে টিনের চালা তুলে বাস করছে। কাল সোমবারে ঈদ, কিন্তু তাদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি কিছুই নেই। চোখে মুখে শুধুই হতাশা।

গত বর্ষা মৌসুমে দোহারের নারিশা ইউনিয়নের রানীপুর, বেলতলা, মধুর চর ও পশ্চিম চর এলাকার প্রায় তিন হাজার পরিবার ভাঙনের কবলে পড়ে। এ ছাড়া মাহমুদপুর, বিলাশপুর ও নয়াবাড়ী ইউনিয়নের দুই হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। বাহ্রাঘাট, ধোয়াইর, নয়াডাঙ্গী, দেওয়ান গ্রাম, চর বিলাশপুর, কুলছুরি, রাধানগর গ্রামে বেশির ভাগ পরিবারই ছিল দিনমজুর। এদের অনেকেরই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা।

রানীপুর এলাকার সামসু মিয়া (৬০) বলেন, ‘বাবা, আমাগো আর ঈদ নাই। সব আনন্দো দুয়ে মুছে পদ্মায় নিয়ে গেছে। গায়ে খাইডা আর জানডা চলে না। কেউ আমাগো খবরও নিল না।’ পশ্চিম চরের রওশনারা বেগম বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদে বাচ্চাগো নিয়ে কত আনন্দ করতাম। নদীর বাঙ্গন সব মাটি করে দিছে। আল্লায় যুদি কোনো দিন বালোবাবে ঈদ করতে দেয় সেদিন করুম।’ সরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতাও পায়নি বলে জানান তিনি।

দোহারে পদ্মা রক্ষা বেড়িবাঁধের সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়ক রাজীব হোসেন বলেন, ওদের মাঝে কোনো ঈদ আনন্দ নেই। অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারের ত্রাণসহায়তা করা উচিত ছিল। তাদের অবস্থা খুবই খারাপ।

দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, সরকারি কোনো বরাদ্দ না থাকায় ঈদের আগে পদ্মার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে কোনো সহায়তা করা যায়নি। তবে সরকার শিগগির তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেবে।

ত্যাগ ও আনন্দে ঈদ উদযাপন

আজ ১০ জিলহজ, সোমবার পবিত্র ঈদুল আজহা। যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ত্যাগের মহিমায় উৎসবমুখর পরিবেশে সারা দেশে উদ্যাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আজ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সাতটায়। এরপর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে সকাল সাড়ে আটটায় ঈদের প্রধান জামাত শুরু হয়। এ ছাড়া সারা দেশের বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে দেশের মুসলিম সম্প্রদায় তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা উদযাপিত করছে। ঘরে ঘরে ত্যাগের আনন্দে মহিমান্বিত হচ্ছে মন।
প্রায় চার হাজার বছর আগে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগের মহিমার কথা স্মরণ করে মুসলিম সম্প্রদায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় পশু কোরবানি করে থাকেন। তবে ঈদের পর দুই দিন, অর্থাৎ ১১ ও ১২ জিলহজেও পশু কোরবানি করার ধর্মীয় বিধান রয়েছে।
আজ সকালে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ের জন্য মুসল্লিরা স্থানীয় ঈদগাহ বা মসজিদে সমবেত হন। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে নিজের পাপমোচন এবং পরিবার-পরিজন, দেশ ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া চেয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন।

নামাজ শেষে অনেকেই যান কবরস্থানে স্বজনের কবর জিয়ারত করতে। অশ্রুসিক্ত হয়ে চিরকালের জন্য চলে যাওয়া স্বজনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে করজোড়ে মোনাজাত করেন তাঁরা।
এরপর হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান আত্ম ত্যাগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের ভেতরের পশুত্বকে পরিহার ও আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় পশু কোরবানি করেন তাঁরা।
প্রতিবারের মতো এবারও দেশের বৃহত্তম ঈদের জামাত হয়েছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। রাজধানী ঢাকায় হাইকোর্ট-সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রী, সাংসদ, রাজনৈতিক নেতা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিকেরাসহ সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। জাতীয় ঈদগাহে নামাজ শেষে দেশের অব্যাহত শান্তি ও উন্নয়ন, জনগণের কল্যাণ এবং মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্য কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঈদের জামাত হয়।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে সারা দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কালেমা ও ঈদ মোবারকখচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
আজ দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, শিশুসদন, ছোটমণি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র ও সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে।
শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা নিয়ে ঈদুল ফিতরের দিন নির্ধারিত হয়। এ কারণে একেবারে রোজার শেষাবধি ঈদের দিনটি নিয়ে একরকমের অনিশ্চয়তা থাকে। তবে ঈদুল আজহা যেহেতু জিলহজ মাসের ১০ তারিখেই নির্ধারিত, তাই জিলহজের চাঁদ ওঠার পর হাতে বেশ খানিকটা সময় নিয়েই লোকে ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারেন।
ঈদুল আজহায় পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি কেনাকাটা গৌণ। এই ঈদের প্রস্ত্ততির মধ্যে প্রধান বিষয় হলো পশু ক্রয়। অবশ্য যাঁরা ঈদের উৎসবে রাজধানী ঢাকা বা অন্য কোনো শহরের কর্মস্থল থেকে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে ফেরেন, তাঁদের প্রস্ত্ততি শুরু হয় যানবাহনের টিকিট সংগ্রহ করা থেকে বাক্স-পেটরা গোছানো দিয়ে। এরপর যাত্রা।
শুক্রবার থেকেই ঢাকা থেকে ঘরে ফেরার পালা শুরু হয়েছে। শনি ও রোববার শহরের সড়কগুলো ছিল প্রায় ফাঁকা। তবে ভিড় ছিল পশুর হাট, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে। ঈদের যাত্রায় ভোগান্তি কম নয়। এবারও তার কোনো হেরফের হয়নি। প্রিয়জনের সান্নিধ্য লাভের আনন্দ, আপন ঠিকানায় ফেরার অনুভূতির তুলনায় যাত্রার দুর্ভোগ মেনে নিয়েই সপরিবারে গ্রামে গেছেন অনেক মানুষ।

নিজের নামেই ভোট চাইলেন মোদি

নরেন্দ্র মোদি
হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপিকে পার করার যাবতীয় দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১০ দিনে অন্তত ৩০টা জনসভা করবেন তিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই দুই রাজ্যে একার ক্ষমতায় বিজেপি সরকার গড়তে পারবে কি না, সেই সংশয় থেকেই যাচ্ছে। আর সে কারণেই লোকসভার ভোটের পর এই দুই রাজ্যের নির্বাচন ‘টিম-মোদিকে’ দাঁড় করিয়েছে কঠিন পরীক্ষার মুখে। গতকাল শনিবার থেকে শুরু হয় মোদির প্রচারপর্ব। প্রথমে হরিয়ানা, পরে মহারাষ্ট্র। দুই রাজ্যেই বিজেপি তার জোটসঙ্গীদের বিদায় দিয়েছে। হরিয়ানায় তিন বছর ধরে জোট ছিল হরিয়ানা জনহিত কংগ্রেসের সঙ্গে। আর মহারাষ্ট্রে শিবসেনার সঙ্গে জোট ছিল টানা ২৫ বছর। দুই রাজ্যে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজেপি এককভাবে সরকার গড়তে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন যত বড় হয়ে উঠছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে মোদি-নির্ভরতা। মোদিও তাই একেবারে সোজাসুজি নিজের নামে ভোট চাইতে দ্বিধা করছেন না। গতকাল হরিয়ানায় মোদি বলেছেন, এই রাজ্যে তিনি পড়াশোনা করেছেন। এই রাজ্যেই পেয়েছেন তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষা। তাঁকে ভোট দেওয়ার অর্থ সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। মোদি ভোটারদের উদ্দেশে সরাসরিই বলেন, কংগ্রেসের ‘অপশাসন’ থেকে রাজ্যকে মুক্ত করতে হলে বিজেপিকেই ভোট দিতে হবে। উন্নয়নের জন্য পরিবর্তন জরুরি। রাজ্যবাসী পরিবর্তন চাইলে তাঁকেই জেতাতে হবে। নিজের নামে এই যে সরাসরি ভোট-ভিক্ষা, এই দুই রাজ্যের ভোটে তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মোদির কাছে বিরাট ঝুঁকির ব্যাপার। ডান হাত অমিত শাহকে তিনিই দলের সভাপতি করেছেন। দীর্ঘদিনের দুই জোট সঙ্গীকে বিদায় দিয়ে একলা লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত এই জুটিরই সাহসী পদক্ষেপ। সেই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলে দলে অমিত শাহর একাধিপত্যের দিনও শেষ হয়ে যেতে পারে। এটা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ দুজনেই বিলক্ষণ বুঝেছেন। সেই কারণেই মহারাষ্ট্রে কুড়িটিরও বেশি এবং হরিয়ানায় অন্তত ১০টি জনসভার গুরুদায়িত্ব মোদি নিয়েছেন। সেই প্রচারে সবকিছুর ওপরে স্থান দেওয়া হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে। এটাও দলেরই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে গত চার মাসে দেশে ও বিদেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের উচ্চতাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলেছেন। বিদেশি নেতাদের সঙ্গে তাঁর সখ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর সাম্প্রতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় থেকে এ কথাও সমর্থকেরা বলতে শুরু করেছেন যে শিগগিরই মোদি হয়ে উঠবেন একজন আন্তর্জাতিক নায়ক।
মোদিও এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা তাঁকে তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে আলাদা করে দিচ্ছে। ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসের দিন তিনি সারা দেশের সব রাজ্যের পড়ুয়াদের সঙ্গে টেলিভিশন মারফত কথা বললেন। ২ অক্টোবর গান্ধীজির জন্মদিন পালন করলেন ‘স্বচ্ছতা আন্দোলনকে’ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনী প্রচার শুরুর ঠিক আগের দিন গত শুক্রবার ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ব্যবহার করলেন রেডিওকে। লক্ষ্য ছিল, নিজের স্বপ্ন ও বিশ্বাসকে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। ওই অনুষ্ঠানের নামও তাঁরই দেওয়া, ‘হৃদয়ের কথা’। রেডিও মারফত দেশবাসীকে বললেন মোদি, আমরা সব পারি। আমাদের বিশ্বজয়ের ক্ষমতা আছে। শুধু নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। মোদি স্বচ্ছতা আন্দোলনের কথা শোনালেন, সবচেয়ে কম খরচে মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠানোর কথা শোনালেন, জোর দিলেন খাদি বস্ত্র কেনার প্রয়োজনীয়তায়। মহাপুরুষদের গল্প শুনিয়ে বললেন, আমরা আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়েছি। আমাদের দোষ একটাই, নিজেদের শক্তি উপলব্ধি করতে না পারা। জনগণকে তিনি বললেন, একযোগে আমরা বহুদূর যেতে পারি। গঠনমূলক চিন্তা যাঁর মাথাতেই আসুক, দ্বিধামুক্ত হয়ে তা তাঁকে জানাতে তিনি অনুরোধ করেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে এসবই মোদিকে আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা করেছে। এই ভাবমূর্তিতে ভর দিয়েই মোদি হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রে বাকিদের মোকাবিলায় নেমেছেন। রাজ্যে বড় মাপের দলীয় নেতা না থাকায় এই দুই বিধানসভার ভোটও হয়ে উঠছে মোদি বনাম অন্যদের লড়াই।

অ্যালান হেনিংকেও গলা কেটে হত্যা করল আইএস

শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাহায্যকর্মী অ্যালান হেনিংকেও গলা কেটে হত্যা করল জঙ্গিসংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। গত শুক্রবার হেনিংয়ের শিরশ্ছেদের ভিডিওচিত্র প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। যুক্তরাজ্যকে আইএসবিরোধী সামরিক অভিযানে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে হেনিংকে নিয়ে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। শুক্রবারের ভিডিওচিত্রে মার্কিন সাহায্যকর্মী পিটার কাসিগেরও শিরশ্ছেদ করার হুমকি দিয়েছে আইএস। খবর এএফপি, রয়টার্স, বিবিসির। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গতকাল শনিবার বলেছেন, ‘আইএসের হাতে জিম্মি হওয়া নাগরিকদের উদ্ধারে এবং এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে পরাজিত করতে আমাদের আছে এমন সব সম্পদের ব্যবহার করব।’ অ্যালান হেনিংকে নিয়ে চারজন পশ্চিমা নাগরিকের শিরশ্ছেদ করল আইএস। এর মধ্যে দুজন মার্কিন ও দুজন ব্রিটিশ নাগরিক।
গত মাসে যুক্তরাজ্যের নাগরিক ডেভিড হেইন্সের শিরশ্ছেদ করে প্রকাশ করা ভিডিওচিত্রেই অ্যালান হেনিংকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল সংগঠনটি। ম্যানচেস্টারের ট্যাক্সিচালক দুই সন্তানের বাবা অ্যালান (৪৭) সাহায্যকর্মী হিসেবে গৃহযুদ্ধপীড়িত সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভিডিওটি তারা খতিয়ে দেখছে। উল্লেখ্য, এর আগে আইএসের প্রচার করা তিনটি শিরশ্ছেদের ভিডিওই সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। আগের শিরশ্ছেদের ভিডিওগুলোতে ঘাতককে ব্রিটিশ উচ্চারণে কথা বলতে শোনা গিয়েছিল। এটিতেও হত্যাকারীকে তেমন উচ্চারণে কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, মরুভূমির বালুতে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন অ্যালান। গায়ে কমলা রঙের কয়েদির মতো পোশাক। পাশেই ছুরি হাতে মুখোশধারী জঙ্গি। শিরশ্ছেদের আগে অ্যালানকে দৃশ্যত আইএসের লিখে দেওয়া কিছু বক্তব্য পড়তে হয়। এতে বলা হয়, ‘যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট আইএসের বিরুদ্ধে হামলার অনুমোদন দেওয়ায় দেশটির নাগরিক হিসেবে আমাকে সেই মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।’

কয়েক দশকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

দিলমা রুসেফ ও মারিনা সিলভা
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ রোববার। বিভিন্ন জরিপ বর্তমান প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের এগিয়ে থাকার কথা বললেও আভাস দিচ্ছে, কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এই নির্বাচনে। খবর এএফপি ও রয়টার্সের। ১২ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় রয়েছে দিলমা রুসেফের দল ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি)। এবার তাঁকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী মারিনা সিলভা। সাবেক পরিবেশমন্ত্রী সিলভা ব্রাজিলে ‘নতুন রাজনীতির’ প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হওয়ার চ্যালেঞ্জে নেমেছেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সহিংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ এক জরিপে দেখা যায়, ব্রাজিলের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট রুসেফ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সিলভার চেয়ে মাত্র তিন শতাংশ এগিয়ে আছেন। তবে কেউই প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন না বলে আভাস মিলেছে। সে ক্ষেত্রে ২৬ অক্টোবর দ্বিতীয় দফা ভোট হবে। মারিনা সিলভা গত শুক্রবার খুদে ব্লগ লেখার ওয়েবসাইট টুইটারে ভোটারদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘এখন এমন একজনকে ভোট দেওয়ার সময়, যিনি পিটির ১২ বছরের শাসনের অবসান ঘটাতে পারবেন।’ রুসেফের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগই মূলত তাঁকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তবে সরকারের সমাজকল্যাণমূলক কিছু নীতি সিলভার চেয়ে তাঁকে এগিয়ে রেখেছে।
অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট এবং ‘নতুন রাজনীতির’ স্লোগানই সিলভার সবচেয়ে বড় পুঁজি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রসপেক্টিভা কনসালটেন্সির বিশ্লেষক আন্দ্রে সিজার বলেন, কয়েক দশকের মধ্যে ব্রাজিলে এটাই সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে। সিলভা যে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়াইয়ে নেমেছেন, সেই দলের নেতা লুলা ডি সিলভার সরকারের পরিবেশমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী এদুয়ার্দো কাম্পোস সম্প্রতি বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ায় দল তাঁকে মনোনয়ন দেয়। রাবারবাগানে কাজ করা এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম মারিনা সিলভার। তাঁর পূর্বপুরুষেরা পর্তুগিজ ও আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনিই প্রথম লিখতে ও পড়তে শেখেন। পড়াশোনার পাশাপাশি গৃহপরিচারিকার কাজ পর্যন্ত করেছেন। দারিদ্র্যের বাধা ঠেলে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন সিলভা। তখন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
দিলমা রুসেফ (৬৬)
ওয়ার্কার্স পার্টি
অর্থনীতিবিদ, সাবেক গেরিলা
২০০৩-২০০৫ খনি ও জ্বালানি মন্ত্রী
২০০৫-২০১০ প্রেসিডেন্ট দপ্তরের মহাসচিব
২০১১ থেকে বর্তমান ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট
মারিনা সিলভা (৫৬)
সোশ্যালিস্ট পার্টি ইতিহাসে স্নাতক পরিবেশকর্মী
১৯৯১-১৯৯৪ প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য
১৯৯৫-২০০১ সিনেটর
২০০৩-২০০৮ পরিবেশন্ত্রী