Showing posts with label রঞ্জন বসু. Show all posts
Showing posts with label রঞ্জন বসু. Show all posts

Tuesday, June 23, 2020

কাশ্মীরে যে বাঙালি নেতার ‘পিতৃঋণ’ শোধ করল বিজেপি by রঞ্জন বসু

বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যমা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়
তার নাম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পুরো বাহান্ন বছরও বাঁচেননি, কিন্তু স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়েকজন বাঙালি রাজনীতিবিদ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব রেখে যেতে পেরেছেন তিনি তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

তার আরও একটা পরিচয়, তিনি ছিলেন ‘জনসঙ্ঘে’র প্রতিষ্ঠাতা। এই জনসঙ্ঘই পরে ভারতের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নামে আত্মপ্রকাশ করেছে, যে দল আজ দেশের ক্ষমতায়। সেই হিসেবে বিজেপির শীর্ষ নেতারা সকলেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে তাদের দলের আদি জনক হিসেবে মানেন।

কাশ্মীরের ভারতভুক্তির পর থেকেই সংবিধানের ৩৭০ ধারার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। পার্লামেন্টে কাশ্মীরের এই বিশেষ অধিকারের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছেন, তারপর প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ফরমানকে অস্বীকার করে শ্রীনগর অভিমুখে যাত্রা করে কাশ্মীরে বন্দি থাকা অবস্থাতেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় প্রাণ দিয়েছেন।

গত ৫ আগস্ট সোমবার ভারতীয় পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ওই বিতর্কিত ধারা বিলোপ করার কথা ঘোষণার পর বিজেপি নেতাদের কথায় আর স্মৃতিচারণায় ঘুরে ফিরে আসছেন সেই শ্যামাপ্রসাদ।

রাজ্যসভায় বিজেপির এমপি ও সুপরিচিত বাঙালি চিন্তাবিদ স্বপন দাশগুপ্তর কথায়, ‘আজ বাঙালি হিসেবে আমাদের বড় গর্বের দিন। বিজেপির আদি প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রায় সাত দশক আগে যে ধারা বিলোপের দাবি জানিয়েছিলেন, তার দল সেই স্বপ্নকে অবশেষে সত্যি করল।’

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি আরও বলছিলেন, ‘বলা হয় পিতৃঋণ আর মাতৃঋণ না কি কখনও শোধ করা যায় না। হয়তো ঠিকই, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ যেখানেই থাকুন তিনিই যে আজ সবচেয়ে পরিতৃপ্ত হতেন তাতে কোনও সংশয় নেই।’

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদপ্রতিম উপাচার্য, শিক্ষাবিদ ও বিচারপতি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি নিজেও ব্যারিস্টার হয়েছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার সামলেছেন। অবিভক্ত বাংলায় এ কে ফজলুল হকের (শেরে বাংলা) মন্ত্রিসভায় তিনি অর্থমন্ত্রীও ছিলেন।

দেশভাগের পর জহরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি দেশের বাণিজ্য তথা শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।

কিন্তু পণ্ডিত নেহরুর সঙ্গে মতবিরোধের জেরেই পরে কেবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন শ্যামাপ্রসাদ। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের সহযোগিতা নিয়ে গঠন করেন জনসঙ্ঘ, তিনি ছিলেন সে দলের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি।

১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দক্ষিণ কলকাতা সংসদীয় আসন থেকে ভোটে জিতে সংসদে যান শ্যামাপ্রসাদ। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে সংসদেও তার বহু ভাষণ স্মরণীয় হয়ে আছে।

সে সময় বিখ্যাত হয়েছিল তার তোলা স্লোগান, ‘এক দেশ মে দো বিধান, দো প্রধান আর দো নিশান নেহি চলেঙ্গে।’

তখন কাশ্মীরের জন্য একটি ও বাকি দেশের জন্য আরেকটি - ভারতে এই দুটো সংবিধান চালু ছিল (‘দো বিধান’)।

কাশ্মীরে রাজ্য সরকারের প্রধানকেও বলা হত উজির-এ-আজম বা প্রধানমন্ত্রী ('দো প্রধান'), এবং ভারতের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি কাশ্মীরের ছিল নিজস্ব পতাকাও (‘দো নিশান’)।

এই দু’রকমের বিধান, প্রধান আর নিশান বাতিলের দাবি নিয়েই সরকারি নির্দেশ অগ্রাহ্য করে কাশ্মীরে পা রাখেন তিনি ১৯৫৩ সালের জুনে। কিন্তু শেখ আবদুল্লার সরকার তাকে বন্দি করার পর জেলে কম্বল পর্যন্ত দেয়নি বলে অভিযোগ, যার পরিণতিতে তিনি প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৩শে জুন রহস্যময় এক পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়।

বর্তমানে বিজেপির একটি গবেষণামূলক শাখা প্রতিষ্ঠান ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রিসার্চ ফাউন্ডেশন’।

ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও বিজেপির পলিসি রিসার্চ সেলের সদস্য অনির্বাণ গাঙ্গুলি বলছেন, ‘৩৭০ ধারার অবলুপ্তি না-হলে কাশ্মীর যে কিছুতেই বাকি ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হতে পারবে না, সেই বাস্তবতা দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন তিনি।’

‘শুধু তা-ই নয়, নিজের কথাকে কাজে করে দেখাতে তিনি নিজের জীবন পর্যন্ত বলিদান দিয়েছেন। কাশ্মীরে যে ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটা প্রমাণ করেছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মোৎসর্গ–আজ সেই বলিদান পরিপূর্ণতা পেল’, বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন তিনি।

বস্তুত, বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদের নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দল যে বহুদিন পর্যন্ত পায়ের তলায় তেমন একটা জমি খুঁজে পায়নি, এই তথ্যটা এই সেদিনও বিজেপি নেতৃত্বের প্রবল অস্বস্তির কারণ ছিল।

বিজেপির এক শীর্ষ নেতা ও কেবিনেট মন্ত্রীর কথায়, ‘আড়াই মাস আগে লোকসভা নির্বাচনের ফল বেরুনোর পর যখন দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আঠারোটি আসন পেয়েছে ও তৃণমূলের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, সে দিন থেকেই কিন্তু আমাদের সেই অস্বস্তি দূর হওয়া শুরু।’

‘আর এদিন ৩৭০ ধারা বিলোপ করার মধ্যে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদকে তার হাতে গড়া দল চূড়ান্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালো’, বলছিলেন বিজেপির ওই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

Wednesday, September 11, 2019

অগ্নিগর্ভ কাশ্মির নিয়ে মোদি সরকারের পরিকল্পনা আসলে কী? by রঞ্জন বসু

গত ১০ আগস্ট শনিবার, ভারতীয় সময় বেলা দুটো বেজে চার মিনিট। দিল্লিতে বিবিসি-র দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো চিফ নিকোলা করিম নিজের টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লিখলেন, ‘সরকার যদিও অস্বীকার করছে যে শ্রীনগরের সোউরা-তে বিক্ষোভের খবর সম্পূর্ণ বানোয়াট, সত্যিটা জানতে বিবিসির এই এক্সক্লুসিভ ভিডিওটা দেখুন। হাজার হাজার মানুষ সেখানে মিছিল করেছেন, পুলিশ সেখানে ফায়ারিং করেছে – বহু লোক আহত হয়েছেন।’
সংক্ষিপ্ত ওই ভিডিওতে সত্যিই বহু মানুষকে আজাদি বা স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছিল। এমন কী, কারও কারও হাতে ইংরেজিতে লেখা ব্যানারও ছিল ‘৩৭০ ধারার বিলোপ মানছি না, মানবো না। শব্দ শোনা যাচ্ছিল ফায়ারিংয়ের, পেছনে দেখা যাচ্ছিল ধোঁয়ার কুণ্ডলীও - সম্ভবত টিয়ার গ্যাস থেকে। এমন কী একটি সমাবেশ থেকে বক্তারা যখন আওয়াজ তুলছিলেন, ‘হাম ক্যায়া চাহতে হ্যায়?’ - হাজারো কণ্ঠে জবাব আসছিল ‘আজাদি, আজাদি।

বিকেল পাঁচটার দিকে নিকোলা করিম আরেকটি টুইটে বলেন, ‘এটুকু পরিষ্কার করতে চাই যে এই ভিডিওটা শুক্রবার শ্রীনগরের সোউরাতে জুমার নামাজের পর বিকেল সাড়ে তিনটার সময় তোলা। ভিডিও-র র’ ফুটেজও শিগগির প্রকাশ করা হবে।’

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভেতরই অস্বীকার করলো ভারত। জানালো,‘ এসব ফায়ারিং-টায়ারিং নাকি একদম বাজে কথা। জম্মু ও কাশ্মির সরকারের শীর্ষ আমলা ও পুলিশ প্রধান একযোগে বিবৃতি দিলেন, ‘বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবরে একেবারেই কান দেবেন না। জেনে রাখুন, গত ছয় দিনে পুলিশ কাশ্মিরে একটাও বুলেট চালায়নি।’

রবিবার সকালে দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেই বিবৃতি আবার রিটুইট করলেন। তিনি এর আগেই রয়টার্স ও বিবিসিকে একহাত নিয়েছেন, ‘দশ হাজার মানুষে’র কথিত বিক্ষোভের খবরকে ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করে। জানিয়েছেন, শ্রীনগর বা বারামুলায় ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ হলেও তার কোনওটিতেই ২০ জনের বেশি লোক ছিল না।

ইতোমধ্যে কাশ্মির পুলিশের আইজি স্বয়মপ্রকাশ পানি নিজে ভিডিও বার্তা রেকর্ড করে টুইটারে পোস্ট করলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে কাশ্মীর ভ্যালি কিন্তু শান্তিপূর্ণই আছে।’ সঙ্গে ছিল মিডিয়ার প্রতি তার প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি, ‘সংবাদমাধ্যমকে বলবো তারা যেন দায়িত্বশীল আচরণ করে!’

শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শ্রীনগরে ৩৭০ ধারা বিলোপের দাবিতে কাশ্মিরি নারীরাও পথে নেমেছেন। সে খবরও উড়িয়ে দিয়েছে সরকার।

বস্তুত গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় ভারত সরকার কাশ্মির প্রসঙ্গে বিবিসি, আল জাজিরা, নিউ ইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে যেভাবে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের সত্তর বছরের ইতিহাসে তা কখনও ঘটেনি বললেও বোধহয় ভুল হবে না।

আর এই দাবি আর পাল্টা দাবির বিস্তারিত বিবরণ এই জন্যই পেশ করলাম যে ভারতে পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা অনেকেই মনে করছেন কাশ্মির নিয়ে ভারত এবারে যে একটা ‘হেস্তনেস্ত করার লড়াইয়ে নেমেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর সঙ্গে এই মুখোমুখি সংঘাতেই তা স্পষ্ট। কাশ্মিরে এবারকার মর্যাদার যুদ্ধটা জেতার জন্য ভারতীয় গণতন্ত্র যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের ভাবমূর্তি বা ইমেজ নিয়েও ভাবিত নয় – সেই লক্ষণও এরই মধ্যে পরিষ্কার।  

সামরিক শক্তিতে বুলডোজ করা যাবে কাশ্মিরের ভাবাবেগ?

বিখ্যাত প্রতিরক্ষা সাময়িকী জেনস ডিফেন্স উইকলি-র নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাহুল বেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেখুন, অনেকেই হয়তো ভাবছেন ভারত সরকার কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার সিদ্ধান্ত একেবারে হঠাৎ করে নিয়েছে। কাউকে কোনও আভাস না-দিয়ে পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন ঠিকই, তবে আমি কিন্তু বলবো সরকার অনেক ভেবেচিন্তেই কাশ্মির নিয়ে এখানে একটা বিরাট ফাটকা খেলেছে।’

রাহুল বেদীর বক্তব্য, সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বা স্বীকৃতি রাতারাতি ছিনিয়ে নেওয়া হলে ওই প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা যে তাকে স্বাগত জানাতে রাস্তায় নেমে মিছিল করবেন না নরেন্দ্র মোদি সরকারেরও তা বিলক্ষণ জানা আছে।

কিন্তু সরকার এখন যেভাবেই হোক এই আত্মবিশ্বাসটা অর্জন করেছে লক্ষ লক্ষ ফৌজ ও আধাসেনা নামিয়ে কাশ্মীরের ভাবাবেগকে দমিয়ে রাখা সম্ভব। সেটা পুরো কাশ্মিরকে গ্যারিসন বানিয়ে করা হলেও ক্ষতি নেই।’

তিনি বলেন, ‘কাশ্মির যতই ক্ষুব্ধ হোক, তারা খুব বেশিদিন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে পারবে না বলেও মোদি সরকারের বিশ্বাস। যেমন ২০১৬তে বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর কাশ্মিরের স্বত:স্ফূর্ত প্রতিবাদও তিন চার মাসের বেশি টেকেনি।’

দিল্লিতে একাধিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলেও এই ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে প্রয়োজন হলে ভারত সরকার কাশ্মিরে আরও সেনা ‘মোবিলাইজ’ করতেও প্রস্তুত। তারা জানাচ্ছেন, সমগ্র ভারত-শাসিত কাশ্মিরে এখনই প্রায় সাত লাখ সেনা মোতায়েন আছে, আরও দুলক্ষ সৈন্য আনা নিয়ে আসা সম্ভব মাত্র কয়েক দিনের নোটিশেই।

কী ভূমিকা মোদির ‘জেমস বন্ড’অজিত ডোভালের?

মোদি সরকারের এই ‘কাশ্মির গেমপ্ল্যানে’ একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত ডোভাল – যাকে অনেকেই মোদির ‘জেমস বন্ড’ বলে ডাকেন।

ভারতের এই সাবেক গোয়েন্দা-প্রধান তার ডাকাবুকো স্বভাব ও দুঃসাহসী নানা সিদ্ধান্তের জন্য পরিচিত। ইসলামাবাদে একটা সময় তিনি টানা সাত বছর মুসলিম সেজে কীভাবে ভারতের হয়ে কাজ করেছেন, দিল্লিতে সে গল্পও মুখে মুখে ফেরে।

পাঁচ বছর আগে এনএসএ-র দায়িত্বে আসার পর থেকেই অজিত ডোভাল কিন্তু গোপনে কাশ্মির নিয়ে নানা তৎপরতা ও স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর একটি সূত্র জানাচ্ছে, ‘শুনলে অবাক হবেন গত কয়েক বছর ধরে দু-চারটে সপ্তাহ বাদ দিলে প্রতি শুক্র বা শনিবার অজিত ডোভাল কাশ্মির আসছেন। চলে যাচ্ছেন নানা সেনানিবাসে বা স্থানীয়দের মহল্লায়। কাশ্মিরে গিয়ে তিনি শুধু ফৌজের সঙ্গেই নয়, সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গেও মিশছেন ও কথাবার্তা বলছেন।’

গত সোমবার পার্লামেন্টে অমিত শাহ-র নাটকীয় ঘোষণার পর থেকেই কাশ্মির ভ্যালিতে ঘাঁটি গেড়ে পড়ে আছেন অজিত ডোভাল। বুধবার তাকে দেখা গেছে শোপিয়ানে সরকারি লঙ্গর থেকে বিরিয়ানি নিয়ে স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলে তাদের ভরসা দিয়েছেন, কাশ্মির পুলিশের মনোবল চাঙ্গা করতে ভাষণও দিয়েছেন।

এরপর শুক্রবার তিনি গিয়ে হাজির হন অনন্তনাগে। সেখানে রাস্তার ধারে ঈদের কোরবানির জন্য ভেড়া বিক্রি করছিলেন এক স্থানীয় ব্যাপারি, তার কাছে গিয়ে ভেড়ার দরদামও করেন অজিত ডোভাল। জানতে চান, দশ হাজার রুপির ওই ভেড়াতে কতটা মাংস মিলবে, ইত্যাদি। ব্যাপারি তাকে প্রথমে চিনতে পারেননি অবশ্য, তবে সংবাদ সংস্থার তোলা সেই দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের নানা টিভি চ্যানেলে।

লন্ডন-ভিত্তিক কাশ্মিরি অ্যাক্টিভিস্ট শামিমা শল এ কারণেই মনে করছেন, ‘কাশ্মিরে আমরা আজ যা ঘটতে দেখছি তা কিন্তু তথাকথিত ‘ডোভাল ডকট্রিনে’রই পরিণাম। কাশ্মিরকে জোর করে ভারতের অংশ বানানোর লক্ষ্য নিয়েই অজিত ডোভাল তৈরি করেছেন এই নীতিমালা বা স্ট্য্যাটেজি পেপার, ধাপে ধাপে এখন যার বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।’

কাশ্মিরের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ বা সেলফ-ডিটারমিনেশনের জোরালো সমর্থক শামিমা শল বাংলা ট্রিবিউনকে আরও বলছিলেন, ‘এই ডোভাল ডকট্রিনের অংশ হিসেবেই ভারতের নানা প্রান্ত থেকে হিন্দুদের কাশ্মিরে এনে জমি-বাড়ি দিয়ে বসত করানোর চেষ্টা হচ্ছে। তৈরি করা হচ্ছে শিল্প শ্রমিক বা রিটায়ার্ড সেনা সদস্যদের আলাদা কলোনি।’

‘৩৭০ ধারা বিলোপ করে কাশ্মিরের যে স্বতন্ত্র একটা মর্যাদা আছে, জাতিসংঘের চোখে বা আন্তর্জাতিকভাবে যে বিতর্কিত ভূখন্ড হিসেবে স্বীকৃতি আছে – এই ডকট্রিন সেটাই ধ্বংস করতে চাইছে।’

বাবরি মসজিদ ভাঙার সঙ্গে অদ্ভুত মিল?

কাশ্মির নিয়ে এই নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ভারতের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর কিন্তু তেমন শোনাই যাচ্ছে না বলা চলে। গত এক সপ্তাহ ধরে নরেন্দ্র মোদির স্পর্ধা ও সাহস, অমিত শাহ্-র আত্মবিশ্বাসের প্রশংসায় ভেসে যাচ্ছে ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া – ‘দুর্বিনীত’ কাশ্মিরকে অবশেষে একটা ‘সবক’ শেখানো গেল, এ কথা বলতেও দ্বিধা করছেন না অনেকেই।

এই যেখানে পাবলিক ডিসকোর্সের অবস্থা, সেখানে ৩৭০ ধারা বিলোপের বিরুদ্ধে বাকি ভারতে প্রতিবাদের মাত্রা যে স্তিমিত হবে তা বলাই বাহুল্য। দিল্লির জেএনইউ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা বামপন্থী দলগুলোর উদ্যোগে ইতস্তত বিক্ষোভ হলেও ভারতীয়দের সমবেত হর্ষোল্লোসে তা এর মধ্যেই চাপা পড়ে গেছে।

এই পটভূমিতেই বিষয়টি নিয়ে একটি ব্যতিক্রমী নিবন্ধ লিখেছেন ভারতের ঐতিহাসিক-দার্শনিক রামচন্দ্র গুহ, যিনি প্রথম দিন থেকে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। সামাজিক মাধ্যমে তীব্র বিদ্রুপের শিকার হয়েও রাম গুহ লিখতে দ্বিধা করেননি, ‘সাতাশ বছর আগে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার সঙ্গে ভয়ঙ্কর সাদৃশ্য আছে এই ঘটনার।’

তার যুক্তি, এই দুটো ঘটনার পক্ষেই সাফাই দেওয়া হয়েছে এর মাধ্যমে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ শোধরানো হয়েছে। দুটো ঘটনাই ঘটেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সঙ্ঘ পরিবার ও তার সমর্থকদের হাতে। সর্বোপরি, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক মূল্যবোধকে যারা সম্মান করেন ও মর্যাদা দেন – তাদের নীরবেই এই দুটো ঘটনাতে শোকের ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে।

ভারতের সুপরিচিত শিক্ষাবিদ ও ঐতিহাসিক তনিকা সরকারেরও বলতে দ্বিধা নেই, ‘বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্যে দিয়ে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে যদি ছিন্নভিন্ন করার চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে বলা যেতে পারে ৩৭০ ধারা বিলোপের মধ্যে দিয়ে তার কফিনেই শেষ পেরেকটা মারার চেষ্টা হল।’

ফলে সার্বিকভাবে বার্তাটা খুব পরিষ্কার, প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রির মাধ্যমে কাশ্মিরের বিশেষ ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া ভারত সরকারের নেওয়া আচমকা কোনও পদক্ষেপ নয় – এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের ভাবনাচিন্তা, স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল প্রণয়ন এবং একটি সুপরিকল্পিত লক্ষ্য বা ‘ডিজাইন’।

সেই লক্ষ্য সফল হলে ভারতের ইতিহাসে হয়তো স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেবেন নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদি, আর ব্যর্থ হলে কাশ্মির অবধারিতবাবে আরও রক্তাক্ত হতে থাকবে আগামী বহু বছর ধরে।

Wednesday, August 28, 2019

আইএস-এর নতুন ঘাঁটি হচ্ছে কাশ্মির? by রঞ্জন বসু

জঙ্গিবাদ বিষয়ক মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কমব্যাটিং টেররিজম সেন্টার’ (সিটিসি) ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তাদের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল, ইরানের খোরাসান প্রদেশে সক্রিয় আইএস-এর (ইসলামিক স্টেট) একটি শাখা আফগানিস্তানকে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। তবে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, ইসলামিক স্টেট অব খোরাসানের (আইএসকে) মনোযোগ এখন ভূস্বর্গখ্যাত ওই উপত্যকায় কেন্দ্রীভূত হতে পারে।
২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত কেবল আফগানিস্তানেই কম করে ২১১টি হামলা চালিয়েছে খোরাসানভিত্তিক ইসলামিক স্টেট জঙ্গিরা। সেসব হামলায় অন্তত ১৫১১ জন নিহত হয়েছেন। ওই একই সময়ে পাকিস্তানেও তারা অন্তত ৮৩টি হামলা চালায়, হত্যা করে ৭০৬ জনকে। গত বছরের জুলাইয়ে বালুচিস্তানের এক নির্বাচনি সভায় পাকিস্তানের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী হামলায় দেড়শ মানুষ প্রাণ হারান। ওই হামলারও দায় স্বীকার করা হয়েছিল একই জঙ্গি সংগঠনের পক্ষ থেকে।
ভারতের সাবেক শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ক্যাবিনেট সচিবালয়ের বিশেষ সচিব ভাপ্পালা বালাচন্দ্রন মনে করছেন, আইএসকে এখন কাশ্মিরকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। তিনি বলছেন, ‘কাশ্মির উপত্যকায় ভারতের সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের ফলে সেখানকার প্রধান জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো–যেমন লস্কর-ই-তৈবা, জৈশ-ই-মহম্মদ বা হিজবুল মুজাহিদিনের নেতৃত্ব প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলা চলে। কিন্তু অতীতেও আমরা বহুবার বিশ্বের বহু জায়গায় দেখেছি এ ধরনের ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা বেশি দিন থাকে না।’ তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতিতে যেটা হয় তা হলো, জঙ্গিরা একটা সংগঠন থেকে অন্য আর একটায় গিয়ে ভিড়ে, যেটাকে আমরা বলতে পারি এক রকমের ‘ল্যাটারাল মাইগ্রেশন’। ফলে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সংগঠনগুলো থেকে কাশ্মিরের জঙ্গিরা এখন আইএসকে বা আল কায়দায় গিয়ে ভিড়বে, তা মনে করার তাই যথেষ্ট কারণ আছে।’
‘মনে রাখতে হবে, ইরাক-সিরিয়াতেও ইসলামিক স্টেটের উত্থান হয়েছিল সেখানে আল কায়দা দুর্বল হওয়ার পরেই’, বলেন ভাপ্পালা বালাচন্দ্রন।
কাশ্মিরে বিভিন্ন বিক্ষোভের সময় গত দু-চার বছরেও একাধিকবার ইসলামিক স্টেটের পতাকা দেখা গেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বহুদিন আগে থেকেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের তালেবান থেকে ইসলামিক স্টেট অব খোরাসানে (আইএসকে) জঙ্গিদের ‘ল্যাটারাল মুভমেন্ট’ শুরু হয়ে গেছে। স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্টরা বলছেন, আইএসকে কাশ্মিরকে তাদের ‘ভিলায়াত’ (পরদেশ) বলে মনে করে ঠিকই, কিন্তু চলতি মাসে ভারত তাদের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করার পর থেকেই সেখানে যে অস্থিরতা চলছে তার সুযোগ নিতে আইএসকে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।
গার্ডিয়ান পত্রিকার চিত্রসাংবাদিক স্টেফানি গ্লিনস্কি গত ৮ আগস্ট তার এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, আফগান তালেবান যদি সত্যিই শেষ পর্যন্ত আমেরিকার সঙ্গে কোনও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে, তাহলে কম করে হলেও তাদের ১০ শতাংশ ক্যাডার আইএসকে-তে যোগদান করবে। ওই প্রতিবেদনে তিনি উদ্ধৃত করেছিলেন সাবেক আফগান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লে. জেনারেল আবদুল হাদি খালিদকে–যিনি এখন আফগান ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত। একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, খোরাসানে ইসলামিক স্টেটের এখন অন্তত চার থেকে ছয় হাজারের মতো সদস্য রয়েছে –যার এক-চতুর্থাংশই বিদেশি। ধারণা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিকট ভবিষ্যতেই বিপুলভাবে আইএসকে-এর শক্তি বৃদ্ধি করবে। তখন তারা অবধারিতভাবে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে।
এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সাময়িকীতে সম্প্রতি বলা হয়েছে, লাদাখের শিয়া-অধ্যুষিত ও স্পর্শকাতর কার্গিল এলাকায় ইরান সম্প্রতি এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেন তারা সৌদি মদতপুষ্ট ওয়াহাবি-সালাফি ভাবধারায় প্রভাবিত না হয়। ইসরায়েলের একটি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, সিরিয়ায় আসাদপন্থী জোটের হয়ে লড়াই করার জন্য ইরান নাকি কার্গিলের বেশ কিছু শিয়া যুবককে রিক্রুট করেছে। একাধিক মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এরইমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ইরাক বা সিরিয়া যেমন সৌদি বনাম ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, কাশ্মিরের পরিণতিও তেমন হতে পারে।

Saturday, August 10, 2019

‘চাইনিজ ডেট ট্র্যাপ’ -দক্ষিণ এশিয়ার জন্য চীনা ঋণের ‘নাগপাশ’ সত্যিই কি দুশ্চিন্তার? by রঞ্জন বসু

আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি চীন তাদের আর্থিক পরাক্রমকে কাজে লাগিয়ে বহু দেশকে ঋণের নাগপাশে বেঁধে ফেলছে, আমেরিকাসহ বহু পশ্চিমা অর্থনীতিই এই অভিযোগ করে আসছে বহু দিন ধরে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিভাষায় চীনের এই নীতিকে অভিহিত করা হচ্ছে ‘ডেট ট্র্যাপ ডিপ্লোমেসি’ (debt Trap Diplomacy) বলেও।
কিন্তু সমস্যা হলো, বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে চীনের এই ঋণের পরিমাণটা ঠিক কত, এই ঋণের শর্তগুলোই বা কী, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য বা পরিসংখ্যান পাবলিক ডোমেইনে কখনও তেমন একটা ছিল না। এ জাতীয় তথ্য প্রকাশ করার ব্যাপারে চীনের তেমন সুনাম নেই, ফলে এই কথিত ডেট ট্র্যাপের বহরটা ঠিক কত তাও অজানাই রয়ে গিয়েছিল।
শুধুমাত্র যখন ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে শ্রীলঙ্কার মতো দেশকে হামবানটোটা বন্দর চীনের হাতে তুলে দিতে হয়েছে, কিংবা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে মালয়েশিয়া বাতিল করে দিয়েছে চীনা রেল প্রকল্প, তখনই হইচই হয়েছে চীনের ঋণ নিয়ে। পরে আবার তা চীনের কুশলী কূটনীতিতে থিতিয়েও গেছে।    
কিন্তু সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীনের দেওয়া ঋণের সঠিক পরিমাণ কত, সেই তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে নানা বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে। কোথাও সে দেশের সরকার নিজেই তা কবুল করছে, কোথাও আবার অনুসন্ধানী গবেষণায় তা বেরিয়ে আসছে।
বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদনেও আমরা দেখিয়েছি, পাকিস্তান থেকে শুরু করে মালদ্বীপ, নেপাল ও বাংলাদেশ থেকে এমনকি ভারত পর্যন্ত কীভাবে চীনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে এবং কোন দেশ কীভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে।
পাকিস্তান
চীনের ‘অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড’ বলে পরিচিত পাকিস্তান গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে, শুধু চলতি আর্থিক বছরেই তারা চীনের কাছ থেকে ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছে। গত ১০ মাসে তাদের মোট বৈদেশিক ঋণের যা পরিমাণ, তার তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি এসেছে শুধু চীন থেকেই।
তবে পাকিস্তান এই তথ্য নিজে থেকে প্রকাশ করেনি, আইএমএফ  বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপেই তাদের এ কথা জানাতে হয়েছে। ইসলামাবাদের পত্রিকা দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানাচ্ছে, আইএমএফের ৬০০ কোটি ডলার বেল-আউট প্যাকেজ পাওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে দেওয়া প্রধান শর্তই ছিল চীনা ঋণের সব শর্ত ও পরিমাণ তাদের প্রকাশ করতে হবে।
এরপরই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের আর্থিক উপদেষ্টা ড. আবদুল হাফিজ শেখ এই তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন আরও  বলছে, পাকিস্তান তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চীনের দেওয়া আমানতকে সেখানে যোগ করে দেখিয়ে আসছিল। কিন্তু এই প্রথম সে দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক ঋণের পরিসংখ্যানে (ডেট স্ট্যাটিসটিকস) সেটা প্রতিফলিত হলো।
চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর নির্মাণে চীনের দেওয়া ঋণের বিরুদ্ধে পাকিস্তানে এর আগেও প্রতিবাদ হয়েছে, নতুন করে সেই ঋণের ব্যাপকতা সামনে আসার পর সে দেশে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মালদ্বীপ
ভারত মহাসাগরের এই ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ রাষ্ট্রেরও চীনের কাছে মোট ঋণের পরিমাণ ১৪০ কোটি ডলারের বেশি। মালদ্বীপের অর্থমন্ত্রী ইব্রাহিম আমিরকে উদ্ধৃত করে গত বছরের ডিসেম্বরে এ তথ্য জানিয়েছে নিক্কে এশিয়ান রিভিউ।
মাসপাঁচেক আগে টোকিও সফরে গিয়ে মালদ্বীপের নতুন অর্থমন্ত্রী আরও জানিয়েছিলেন, এরইমধ্যে তার দেশ প্রায় ৬৭ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে ফেলেছে। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই (মার্চ ২০১৯) বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে খরচের মাধ্যমে এর পরিমাণ ৮৫ কোটি ডলারে ঠেকবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
আরও একটা খুব দামি তথ্য প্রকাশ করেছিলেন তিনি, সেটা হলো চীনের দেওয়া ঋণে সুদের হার কত। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, সহজ শর্তে দেওয়া ঋণে চীনের সুদের হার হল ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ। তবে সভেরেন গ্যারান্টি স্কিমে দেওয়া ঋণগুলোতে সুদের হার ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত।
মালদ্বীপের আর্থিক উন্নয়ন মন্ত্রী ফায়াজ ইসমাইল নিক্কে এশিয়ান রিভিউয়ের কাছে বলেছিলেন, ‘সভেরেন গ্যারান্টির আওতায় নেওয়া ঋণে যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেগুলো আমাদের অর্থনীতিতে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলছে, সেটাই আমরা এখন খতিয়ে দেখছি।’
গত নভেম্বরে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সোলিহ’র নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রাক্কালে ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনে গবেষক রোনক দেশাই এমন কথাও লিখেছিলেন, ‘এই বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধের জন্য মালদ্বীপের ওপর বেইজিংয়ের চাপ এতটাই প্রবল হবে যে, নতুন প্রেসিডেন্ট চাইলেও ভারতের দিকে তেমন একটা ঝুঁকতে পারবেন না!’
শ্রীলঙ্কা
বৈদেশিক ঋণের পাহাড় কীভাবে একটা দ্রুত বিকাশশীল অর্থনীতির চাকাকে স্তব্ধ করে দিতে পারে, গত কয়েক বছর ধরে শ্রীলঙ্কাকে তার ক্ল্যাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা তাদের দক্ষিণ উপকূলের হামবানটোটা বন্দরকে ৯৯ বছরের লিজে চীনের কাছে হস্তান্তরে বাধ্য হওয়ার পর সেই ধারণাই আরও জোরালো হয়েছে।
সপ্তাহ দুয়েক আগে ‘দ্য ডিপ্লোমেট’ পত্রিকায় শ্রীলঙ্কান অর্থনীতিবিদ ও গবেষক উমেশ মোরামুদালি লিখেছেন, শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের চেহারা আসলে যা ভাবা হচ্ছে, তারচেয়েও অনেক বেশি সাংঘাতিক ও বিপর্যয়কর এবং সেটার জন্য চীনের ঋণ একা দায়ী নয়, বরং এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কার মোট বিদেশি ঋণের মাত্র ১০ শতাংশ চীনের কাছ থেকে এসেছে।
তিনি আরও জানাচ্ছেন, হামবানটোটা বন্দর নির্মাণের জন্য চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে শ্রীলঙ্কা যে ঋণ নিয়েছিল তার জন্য প্রতিবছর যে টাকা শোধ করতে হচ্ছে, সেটা শ্রীলঙ্কার মোট বার্ষিক ঋণ পরিশোধের ৫ শতাংশও নয়। অন্যভাবে বললে, হামবানটোটা আসলে হিমশৈলের চূড়ামাত্র।
বছর দুয়েক আগে বিবিসি’র এক প্রতিবেদনেও জানানো হয়েছিল, শ্রীলঙ্কা সরকারের মোট রাজস্বের ৯৫ শতাংশই খরচ হয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধে, যা থেকে আন্দাজ পাওয়া যায় ওই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের সংকট আসলে কত গভীরে।
প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের আমলেই শ্রীলঙ্কার চীন নির্ভরতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের ভেতর শ্রীলঙ্কার মোট বিদেশি ঋণের ৬০ শতাংশই এসেছে চীন থেকে, আজ  যার চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে দেশটিকে।
নেপাল 
নেপালে গত বছর কে পি শর্মা ওলি’র নেতৃত্বে যে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, চীনের প্রতি তাদের নরম মনোভাবের কথা সুবিদিত। পুরনো বন্ধু দিল্লির দিক থেকে বেশ কিছুটা সরে এসে কাঠমান্ডু যেভাবে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকেছে, তা ভারতকেও সম্প্রতি বেশ বিচলিত করেছে।
নেপাল ও চীনের প্রস্তাবিত যে যৌথ প্রকল্পটির দিকে এখন এই অঞ্চলের নজর কেন্দ্রীভূত, সেটি হলো—ট্রান্স হিমালয়ান রেলওয়ে। বেইজিং থেকে তিব্বতের লাসা (পরে শিতাসে) পর্যন্ত বিস্তৃত রেলপথকেই সম্প্রসারিত করে হিমালয়ের বুক চিরে কাঠমান্ডুতে এনে ফেলাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য। আর এর ভালোমন্দকে ঘিরে নেপালের ভেতরেও এখন বিতর্ক তুমুল। কেউ বলছেন এটা নেপালের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দেবে, কারও মতে এটা শ্বেতহস্তী হয়েই পড়ে থাকবে।
অস্ট্রেলিয়ার কারটিন ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত নেপালি অর্থনীতিবিদ জগন্নাথ অধিকারী তার এক সাম্প্রতিক নিবন্ধে (‘দ্য কনভারসেশন’) বলেছেন, চীনের ঋণ তারা আদৌ শোধ করতে পারবে কিনা, এই আশঙ্কার মধ্যেও অনেক ছোট দেশই প্রবল উৎসাহে চীনের বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে, নেপালও তাদের অন্যতম।
প্রধানমন্ত্রী ওলি গত বছরের জুনে বেইজিং সফরে গিয়ে চীনের সঙ্গে ২৪০ কোটি ডলার মূল্যের আর্থিক সমঝোতায় সইও করে এসেছেন, যার মধ্যে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র অনেক কিছুই আছে।
ট্রান্স হিমালয়ান রেলওয়ে (যা বেল্ট রোডেরই অংশ) বাস্তবায়নে চীন পুরো টাকাটা অনুদান হিসেবেই দিক, প্রধানমন্ত্রী ওলি এখন সেটাই চান। তবে চীন বলছে, তারা খুব সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারে, কিন্তু অনুদান নয়। এই জটটা খোলেনি বলেই এখনও ওই রেলপথ নির্মাণের কাজও থমকে আছে।
গবেষক জগন্নাথ অধিকারীর কথায়, ‘নেপালের পরিণতি যাতে শ্রীলঙ্কার মতো না হয়, সেজন্য খুব সাবধানে তাদের পা ফেলতে হবে। নেপালও চীনের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে কিনা, সেটা বোধহয় আমরা খুব শিগগিরই টের পাবো।’
বাংলাদেশ
গত ১১ মে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনেই প্রথম জানানো হয়েছিল, বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে চীনের কাছ থেকে এরমধ্যেই ৫৭০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এই ঋণের অর্থে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে পদ্মা ব্রিজ রেলওয়ে লিংক, দাসেরকান্দি স্যুয়ারেজ লাইন, কর্ণফুলীর নিচে টানেল, টেলিকম খাতের আধুনিকীকরণ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং ঝু দাবি করেছেন, বাংলাদেশ বা কোনও দেশকেই ঋণের ফাঁদে ফেলা তাদের লক্ষ্য নয়। ‘আমরা সবাইকে সহযোগিতারই চেষ্টা করছি, কাউকেই ডেট ট্র্যাপে ফেলতে চাইছি না’, বলেছেন তিনি।
এর আগে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন ২০১৬-এর অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, তখন দ্বিপাক্ষিক স্তরে প্রায় ২৬ কোটি ডলারের আর্থিক সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অনেক দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমেই তখন লেখা হয়েছিল, ‘ঢাকায় এসে কার্যত ব্ল্যাংক চেক লিখে দিয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট শি’।
তবে চীনের আর্থিক সহায়তা যে মোটেই অনুদান ছিল না, বরং তার বেশিরভাগটাই আসলে মোটামুটি সহজ শর্তে ঋণ, তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরাও এক্ষেত্রে ‘দেখেশুনে পদক্ষেপ নেওয়ার’ পক্ষেই মত দিয়েছেন।
ভারত
বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের সঙ্গে পাল্লা দিতে চায় যে ভারত, সেই দেশটিও কিন্তু চীনের স্পনসর্ড এশিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে।
চীনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত গৌতম বাম্বেওয়ালা গত জানুয়ারিতেই এআইআইবি’র প্রেসিডেন্ট জি লিকুনের সঙ্গে (যিনি আগে চীনের সহকারী অর্থমন্ত্রীও ছিলেন) দীর্ঘ বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পরই জানানো হয়, গত বছরই ভারত ওই ব্যাংক থেকে দেড়শ’ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে, আরও তিনশ’ কোটি ডলার পাইপলাইনে আছে।
ফলে এআইআইবি’র ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে ভারতই শীর্ষে। ভারতের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প রূপায়ণেই এই অর্থ খরচ হচ্ছে, চলতি মাসে মুম্বাইতে ওই ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনেও ভারতকে আর কী কী ঋণ দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
ভারত অবশ্য দাবি করে থাকে, যদিও এআইআইবি’র প্রধান স্পনসর হলো চীন, কিন্তু এটি কোনও চীনা ব্যাংক নয়। কাজেই এআইআইবি থেকে নেওয়া ঋণকেও ভারত ‘চাইনিজ ডেট’ বলতে রাজি নয়।
বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবেই বছর কয়েক আগে চীন এই এশিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল। এআইআইবি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ব্রিটিশ কেবিনেট মন্ত্রী ড্যানি অ্যালেক্সান্ডার বহুবার বলেছেন, ‘আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেন এটা কি একটা চীনা ব্যাংক? আমি তাদের সবসময় বলি এটা একটা বহুপাক্ষিক (মাল্টিলেটারাল) ব্যাংক, আর অন্তত ৮৪টি দেশ এর সদস্য।
কিন্তু চীন যেহেতু এই ব্যাংকের মূল প্রতিষ্ঠাতা ও অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত, তাই এআই আইবি থেকে নেওয়া ভারতের বিপুল ঋণকেও অনেক বিশেষজ্ঞই চীনের দেওয়া ঋণ হিসেবেই দেখে থাকেন।
উপসংহার
ওপরের তথ্য ও পরিসংখ্যান থেকে মোটামুটি পরিষ্কার, দক্ষিণ এশিয়ার ছোট-বড় প্রায় সব দেশেরই যথেষ্ট পরিমাণে চীনের ঋণ নেওয়া আছে। কারও পরিমাণ কিছুটা কম, কারও বেশি। সংকটের মাত্রাতেও ফারাক আছে।
দিল্লির থিংকট্যাংক রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজে অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে যুক্ত অর্থনীতিবিদ ড. প্রবীর দে বহুদিন ধরে চীনের দেওয়া বৈদেশিক ঋণ ও তার প্যাটার্ন নিয়ে গবেষণা করছেন।
ড. দে বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘এটা সবার জন্য ট্র্যাপ বা ফাঁদ হবে কিনা বলা মুশকিল। তবে বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, অনেক ছোট দেশই চীনের দেওয়া অর্থকে প্রথমে গ্র্যান্ট বা অনুদান হিসেবে ধরে নেয়। তারা মনে করে, চীন বিনা পয়সায় বেল্ট রোডের আওতায় তাদের দেশেও কিছু অবকাঠামো বানিয়ে দেবে।’
কিন্তু আসলে এখানে ‘ফ্রি লাঞ্চ’ বলে কিছু হয় না। চীনের ঋণে সুদের হার হয়তো ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের চেয়েও কিছুটা কম, কিন্তু একেবারে শূন্য তো নয়। কাজেই ছোট উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে অতি সতর্ক থাকতেই হবে, বিশেষ করে যেসব দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের সমস্যা আছে।
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলামও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘চীনের ঋণ যেন ওপেন টিকিট না হয়ে যায়, সেটা আমাদের দেখতে হবে। অর্থাৎ যেনতেন প্রকল্পে যেন ঋণ না নেওয়া হয়, সেটা নিশ্চিত করাটা জরুরি।’
কী শর্তে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সুদের হার কী এবং সেটা যেন খুব চড়া না হয়, সে বিষয়েও তিনি সাবধান থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গেই তিনি আরও বলেছেন, রফতানিমুখী খাতে সহায়তা দেবে যেসব প্রকল্প, সেখানে ঋণ নিলেই ভালো। কারণ, রফতানি থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রায় চীনের ঋণ পরিশোধও তুলনায় সহজ হবে।
ফলে একদিকে বিগ-টিকিট উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের হাতছানি, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো, এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বিধান করেই চীনা ঋণ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা।

Thursday, August 8, 2019

ঠিক কী কী বদলে যাচ্ছে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে by রঞ্জন বসু

ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ৫ আগস্ট সোমবার রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরিত এক বিবৃতির মাধ্যমে ভারতের জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যের বিশেষ স্বীকৃতি বা মর্যাদা বাতিল করার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা অতিক্রান্ত হয়েছে।
ভারতীয় সংবিধানের যে ৩৭০ ধারা কাশ্মিরকে এই বিশেষ স্বীকৃতি দিতো, তা অবলুপ্ত হওয়ার পর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সেখানে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে তা নিয়ে এখনও চলছে বিস্তর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধরে ধরে এই প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ভারত সরকারের ওই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য।
কাশ্মিরে গত কয়েকদিন ধরে চলছে অঘোষিত কারফিউ
কাশ্মিরে গত কয়েকদিন ধরে চলছে অঘোষিত কারফিউ
>>>প্রশাসনিক পরিবর্তন
জম্মু ও কাশ্মির এতদিন ছিল ভারতের এমন একটি অঙ্গরাজ্য, যার কার্যত নিজস্ব সংবিধান ছিল। প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও পররাষ্ট্র ছাড়া ওই রাজ্যের কোনও বিষয়ে ভারত সরকার নাক গলাতে পারতো না। পার্লামেন্ট কাশ্মির নিয়ে কোনও নীতি নিলেও সেটা ছাড়পত্র পেতে কাশ্মির বিধানসভা অনুমোদন দিলে, তবেই।
’৪৭-এ দেশভাগের পর যে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশনে’ সই করে কাশ্মিরের তদানীন্তন হিন্দু রাজা হরি সিং তার রাজ্যর ভারতভুক্তিতে সায় দিয়েছিলেন, তার অংশ হিসেবেই ভারত এই সব শর্তে রাজি হয়েছিল–আর কাশ্মিরের সেই বিশেষ রক্ষাকবচেরই নাম ছিল ৩৭০ ধারা।
এদিনের পর সেই ভারতীয় সংবিধানের সেই ধারাটাই ইতিহাসে পরিণত হলো।
৩৭০ ধারা রদ করার ফলে যা যা ঘটবে তা নিয়ে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার গ্রাফিক্স
৩৭০ ধারা রদ করার ফলে যা যা ঘটবে তা নিয়ে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার গ্রাফিক্স
সরকারের নতুন বিজ্ঞপ্তি অনুসারে জম্মু ও কাশ্মির এখন হবে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (ইউনিয়ন টেরিটরি), যেখানে কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে প্রশাসকের ভূমিকায় থাকবেন একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর।
অন্যদিকে, রাজ্যটি থেকে শিয়া মুসলিম ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত লাদাখ অঞ্চলকে আলাদা করে গড়া হবে আর একটি ইউনিয়ন টেরিটরি, সেখানে আবার কোনও বিধানসভাও থাকবে না।
ফলে জম্মু ও কাশ্মিরের অবস্থা হবে অনেকটা দিল্লির মতো (যেখানে আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল ক্ষমতায় আছেন), যেখানে রাজ্যের একটা নিজস্ব বিধানসভা থাকলেও সেটা আসলে থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণেই।
>>>ভারতীয়দের কাশ্মিরে জমি-বাড়ি কেনার ক্ষমতা
বিগত সাধারণ নির্বাচনে বিজেপির একটা পোস্টার ছিল ‘আপকা সাহি ভোট কাশ্মিরমে আপকো প্লট দিলা সাকতা হ্যায়’।
হিন্দি ভাষার ওই নির্বাচনি স্লোগানের অর্থটা হলো, আপনি যদি ঠিকমতো ভোট দিয়ে (বিজেপিকে) জেতান, তাহলে আপনার কাশ্মিরে জমি কেনার স্বপ্নও সফল হবে।
ভূস্বর্গ বলে পরিচিত কাশ্মিরে বাকি ভারতের অধিবাসীরা এতদিন জমি বা সম্পত্তি কিছুই কিনতে পারতেন না।
কাশ্মিরে সব ধরনের সরকারি চাকরি বা ট্রেড লাইসেন্সও বরাদ্দ ছিল শুধুমাত্র রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্যই। আর কাদের স্থায়ী বাসিন্দা বলা হবে, সেই কঠোর সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতাও ছিল রাজ্য বিধানসভার হাতেই।
আর কাশ্মিরিদের কপালে এই সব বিশেষ সুযোগ-সুবিধা জুটেছিল সেই ৩৭০ ধারার সুবাদেই।
সেই ধারা বিলুপ্ত হওয়ার পর এখন ভারতের অন্য অংশের নাগরিকরাও কাশ্মিরে গিয়ে জমি-বাড়ি কিনতে পারবেন। চাইলে টাটা বা বিড়লা শিল্পগোষ্ঠী জমি কিনে সেখানে কারখানাও গড়তে পারবে।
কাশ্মির পুলিশে বা রাজ্যের বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবেন বিহার, উত্তরপ্রদেশ বা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারাও। ফলে এক ধাক্কায় কাশ্মির নেমে আসবে দেশের বাদবাকি অংশের সঙ্গে এক কাতারে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুপরিচিত কাশ্মিরি অ্যাক্টিভিস্ট আবদুল মজিদ ত্রামবু
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুপরিচিত কাশ্মিরি অ্যাক্টিভিস্ট আবদুল মজিদ ত্রামবু
>>>কাশ্মির কি আর মুসলিম-প্রধান থাকবে না?
বিজেপির এদিনের সিদ্ধান্তকে অনেকেই কিন্তু দেখছেন ভারতের একমাত্র মুসলিম-গরিষ্ঠ রাজ্যটির ডেমোগ্রাফিক বা জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলানোর একটি চেষ্টা হিসেবে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুপরিচিত কাশ্মিরি অ্যাক্টিভিস্ট, ব্যারিস্টার আবদুল মজিদ ট্রাম্বো বাংলা ট্রিবিউনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে বলছিলেন, ‘বিজেপি আসলে চাইছে এখন দলে দলে হিন্দুদের কাশ্মির ভ্যালিতে ঢুকিয়ে মুসলিমদের সেখানে সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে।’
তিনি আরও জানাচ্ছেন, বিজেপি যখন থেকে আবার কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা তথা আর্টিকল ৩৫এ বিলোপ করার কথা বলতে শুরু করেছে তখন থেকেই তারা ঠিক এই আশঙ্কাটাই করে আসছেন।
‘অথচ কাশ্মির হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ডিসপিউটেড ল্যান্ড বা বিতর্কিত ভূখণ্ড। সেখানে আপনি এভাবে একতরফাভাবে বাইরে থেকে লোকজন ঢুকিয়ে ডেমোগ্রাফি পাল্টে দিতে পারেন না’, বলছিলেন ব্যারিস্টার ট্রাম্বো।
কাশ্মিরি অ্যাক্টিভিস্টরা অনেকেই আশঙ্কা করছেন, তাদের রাজ্যের বিশেষ রক্ষাকবচ চলে যাওয়ার পর এখন সুপরিকল্পিতভাবে বাকি ভারত থেকে অমুসলিমদের সেখানে সরিয়ে আনা হবে।
কাশ্মিরি হিন্দু পণ্ডিতদের যেমন আলাদা কলোনি গড়া হবে, তেমনি এক্স সার্ভিসমেন বা সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্যদের জন্যও জমির বিশেষ ব্যবস্থা হবে। কলকারখানার শ্রমিকদেরও নিয়ে আসা হবে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে।
এর মাধ্যমেই কাশ্মির ভ্যালির প্রায় সত্তর লাখ মুসলিমকে নিজভূমেই ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু করে ফেলাটাই বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি গেমপ্ল্যান বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
শেষ পর্যন্ত কাশ্মিরে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে, তা অনেকটাই এখনও অনুমানের বিষয়–কিন্তু ভারত-শাসিত এই ভূখণ্ডটির আগামী দিনগুলো যে গত সত্তর বছরের মতো একই খাতে বইবে না তা এখন পরিষ্কার।

Saturday, July 13, 2019

মোদির ‘সেকেন্ড টার্ম’ বাংলাদেশের জন্য কেমন? by রঞ্জন বসু

নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর জোটের নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয় তাকে। (সাম্প্রতিক ছবি)
ভারতে লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার ছবিটা স্পষ্ট হয়ে উঠতেই যে বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন বার্তা আসা শুরু হয়, তার একেবারে প্রথম দিকেই ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম।
বস্তুত, ঢাকার গণভবন থেকে দিল্লির সাত নম্বর জনকল্যাণ মার্গে যখন শেখ হাসিনার ফোনটা আসে, তখনও কিন্তু ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেউই মোদির সঙ্গে কথা বলে উঠতে পারেননি।
পরে এই বিষয়টির উল্লেখ করেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এটাই দেখিয়ে দেয় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটা কী অসাধারণ – আর দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কটাও কত মধুর।’
বস্তুত, মাসচারেক আগেই বাংলাদেশে নির্বাচনের পর প্রথম যে বিশ্বনেতা ৩১ জানুয়ারির সকালে শেখ হাসিনাকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তিনি নরেন্দ্র মোদি – আর প্রথম সুযোগেই শেখ হাসিনাও সেই সৌজন্যের প্রতিদান দিলেন।
কিন্তু, বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদির প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক হবে, সে বিষয়ে গত তিন-চারদিনে গণমাধ্যমে বেশ কিছু নিবন্ধ ও মতামত প্রকাশিত হয়েছে – বাংলাদেশের কোনও কোনও বিশ্লেষক এক্ষেত্রে কিছুটা সংশয়ও প্রকাশ করেছেন।
ভারত এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে, তা বোঝার জন্য বাংলা ট্রিবিউন দিল্লিতে কথা বলেছিল দু’জন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। তারা হলেন  সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মুচকুন্দ দুবে এবং দিল্লির নামি থিঙ্কট্যাঙ্ক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো ড. শ্রীরাধা দত্ত।
ভারতীয় কূটনীতিক মুচকুন্দ দুবে ও শ্রীরাধা দত্ত
ভারতীয় কূটনীতিক মুচকুন্দ দুবে ও শ্রীরাধা দত্ত
তাদের দুজনের মতামতের সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো।
সার্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব:
নরেন্দ্র মোদি  ও শেখ হাসিনার আমলেই যে ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ‘সর্বকালের সেরা পর্ব’ অতিক্রম করছে তা নিয়ে বেশ কিছুকাল ধরেই দুদেশের পর্যবেক্ষক ও ভাষ্যকাররা সবাই প্রায় একমত। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তারা দুজনেই আবার বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে নিজ নিজ দেশের ক্ষমতায় – দুজনেই দুজনকে খুব ভালভাবে চেনেন ও পছন্দ করেন - কাজেই সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় কোনও ছন্দপতন ঘটার কারণ নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক মুচকুন্দ দুবে
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক মুচকুন্দ দুবে
মুচকুন্দ দুবে: গত পাঁচ বছরে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কেমিস্ট্রিটা যেভাবে ‘আনফোল্ড’ করেছে সেটা সত্যিই অবাক করার মতো। আমরা বাস্তবের মাটিতেও তার প্রতিফলন দেখেছি। যে বাংলাদেশ একদিন তাদের ভূখণ্ডে ভারতীয় জঙ্গিদের অস্তিত্বই স্বীকার করতো না, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তাদের ধরে ধরে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। সহযোগিতার দিগন্ত নানা ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়েছে। আর ভারতীয় গণতন্ত্র এমন একটা ম্যাচিওরিটি গত সত্তর বছরে অর্জন করেছে, যেখানে সরকারের বদল হলেও দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটা ধারাবাহিকতা থাকে – দুম করে সব কিছু পাল্টে যায় না। আর এখানে তো মোদি আর হাসিনা দুজনেই আগামী পাঁচ বছরও ক্ষমতায় থাকছেন, কাজেই আমি অন্তত সম্পর্কের গ্রাফে ঊর্ধ্বগতিই দেখছি।
শ্রীরাধা দত্ত: এটা অস্বীকার করার উপায় নেই বিজেপি যখন পাঁচ বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিল, তখন বাংলাদেশে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল যে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী দাঁড়াবে। কিন্তু, যেভাবেই হোক নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনা দুজনেই সেই আশঙ্কাকে খুব তাড়াতাড়ি ভুল প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন–তারা দুজনেই যে একই ধরনের লেন্স দিয়ে দেখেন সেটাও শিগগির বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। মোদি ক্ষমতায় আসার মাত্র বছরখানেকের মধ্যে স্থল সীমান্ত চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এখন দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আট বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিগ ইনফ্রা (অবকাঠামো) প্রকল্পে ভারত শত শত কোটি টাকা লগ্নি করছে। শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার মতো ঘটনাও দুটো দেশকে নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে বলেই আমার বিশ্বাস।
বিজেপির হিন্দুত্ব এজেন্ডাও এনআরসি অভিযান:
সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনের প্রচারণায় বিজেপি হিন্দুত্ববাদী তাসকে ব্যবহার করেছে খোলাখুলিভাবে। আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) তৈরির মাধ্যমে লাখ লাখ বাঙালি মুসলিমের ভারতীয় নাগরিকত্ব যখন হুমকির মুখে, সেই একই ধরনের অভিযান পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্যে শুরু করা হবে বলে বিজেপি ঘোষণা করেছে। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ হুমকি দিয়েছেন, ‘অবৈধ বাংলাদেশিরা হলো উইপোকার মতো–তাদের খুঁজে খুঁজে বের করে দেশ থেকে তাড়ানো হবে। এখন বিজেপি আবার জিতে আসার পর এসবের কোনও প্রভাব কি বাংলাদেশে পড়বে না?’
মুচকুন্দ দুবে: বছর কয়েক আগে আমার ‘ইন্ডিয়া’স ফরেন পলিসি’ বইটাতেই আমি বলেছিলাম বিশেষত আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় একটা দেশের শান্তি ও সুস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করে প্রতিবেশী দেশের পরিস্থিতির ওপরেও। আজকের ভারতে যদি সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে, তাদের পিটিয়ে মারা হতে থাকে–তাহলে সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশেও কিন্তু সংখ্যালঘু হিন্দুরা ঝুঁকির মুখে পড়বেন, তাদের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই ভালো হোক, তার মানে এই নয় যে বাস্তবের মাটিতে সব সমস্যাও আপনা থেকে দূর হয়ে যাবে। অন্যভাবে বললে, এই অঞ্চলের সার্বিক সুস্থিতি চাইলে মোদিকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে।
গবেষক ড. শ্রীরাধা দত্ত
গবেষক ড. শ্রীরাধা দত্ত
শ্রীরাধা দত্ত: এই যে এনআরসি বা উইপোকা নিয়ে হুমকি, আমার মতে এগুলো বিজেপির ‘ইলেকটোরাল রেটোরিকস’ ছাড়া কিছুই নয়। মানে নেহাত ভোট জোগাড় করার জন্য বলা, তারপর তারা ঠিক ভুলে যাবে। ২০১৪-র ভোটের আগেও নরেন্দ্র মোদি আসামে দাঁড়িয়ে নিজে বলেছিলেন, প্রতিটা তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’কে লোটাকম্বল সমেত তিনি দেশে ফেরত পাঠাবেন। পরের পাঁচ বছরে কিন্তু আমরা দেখেছি মোদি সরকার প্রায় একজন ‘বাংলাদেশি’কেও ফেরত পাঠাতে পারেনি–‘পুশব্যাকে’র হার বিগত ইউপিএ আমলের চেয়েও অনেক কমে গেছে। অবৈধ অনুপ্রবেশের ইস্যুটাও বরাবর বিজেপি ঠিক ভোটের আগ দিয়ে তুলতে থাকে–তারপর আর তাদের মুখে শব্দটাই শোনা যায় না। এবারেও তার পুনরাবৃত্তি হলে আমি অন্তত অবাক হবো না।
তিস্তা চুক্তিতে কোনও ব্রেক-থ্রুর সম্ভাবনা?
গত প্রায় এক দশক ধরে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা হয়ে রয়েছে না-হওয়া তিস্তা চুক্তি। এতদিনে এই ধারণাও মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাইলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই চুক্তি সম্পাদনের পথে প্রধান বাধা। এবারের নির্বাচনে সেই পশ্চিমবঙ্গেই অপ্রত্যাশিত ভালো ফল করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে বিজেপি–কিন্তু সে রাজ্যের এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণ তিস্তার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে?
মুচকুন্দ দুবে: দেখুন, আগামী দিনে বিজেপি সারা দেশের মধ্যে যে রাজ্যটি দখল করার জন্য সবচেয়ে মরিয়া চেষ্টা চালাবে, সেটি অবধারিতভাবে পশ্চিমবঙ্গ। এই নির্বাচনের পরই তারা সেখানে ক্ষমতার গন্ধ পেতে শুরু করেছে, আর ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে তৃণমূলকে হঠাতে তারা প্রাণপণে ঝাঁপাবে তা বলাই বাহুল্য। আর যদি বিজেপি শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাতে আসতে চায়, তাহলে সে রাজ্যের ‘পপুলার সেন্টিমেন্ট’ যাচাই না-করে তারা তিস্তা নিয়ে এগোতে চাইবে বলে মনে হয় না। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গবাসী যদি বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার জল ভাগাভাগির বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সেই জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিজেপি তিস্তা চুক্তি সই করার জন্য তৎপরতা দেখাবে বলে তো আমার মনে হয় না। ফলে অন্তত পশ্চিমবঙ্গে ২০২১-র নির্বাচন পর্যন্ত তো আমি তিস্তা নিয়ে কোনও মুভমেন্ট দেখছি না–তারপর সেখানে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারলে হয়তো অন্য কথা।
শ্রীরাধা দত্ত: নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে আমি কিন্তু মনে করছি না তিস্তা চুক্তি অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথম দিকে থাকবে। বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ যেভাবে বদলাতে শুরু করেছে, তাতে মনে হয় বিজেপিও তিস্তা নিয়ে তাদের উৎসাহে আপাতত রাশ টানবে। পাশাপাশি আর একটা কথাও বলা দরকার, ভারতে এখন এই ধারণাটা ক্রমশ বদ্ধমূল হচ্ছে যে তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশ এতদিন একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করেছে–সে দেশে তিস্তার জলের গুরুত্ব যতটা, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব তিস্তাকে দেওয়া হয়েছে বলেই ভারতীয় কূটনীতিক ও নীতি-নির্ধারকরা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। ফলে তিস্তা চুক্তির চেয়েও রাঢ়বঙ্গসহ ভাটিতে তিস্তার অববাহিকায় জলের অভাবকে কীভাবে অ্যাড্রেস করা যায়, ফসলের প্যাটার্ন বদলে সেচের জল ছাড়াই কীভাবে চাষাবাদ করা যায় সেদিকে ফোকাসটা ঘোরানোর চেষ্টা চলছে। আমার মনে হয় তিস্তা নিয়ে ভারতে মোদির নতুন সরকারের দিক-নির্দেশও সে দিকেই থাকবে।

Thursday, June 6, 2019

অমিত শাহকে নিয়ে ঢাকার ‘অস্বস্তি’ কি দূর করতে পারবেন জয়শঙ্কর? by রঞ্জন বসু

অমিত অনিলচন্দ্র শাহ
দুজনেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রিয়পাত্র, আস্থাভাজন। একজন প্রায় তিন দশক ধরে রাজনৈতিক ডান হাত। অন্যজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা দশক পুরনো; কর্মজীবনে অনেক আমলাকে টপকে তাকে বসিয়েছিলেন শীর্ষপদে।
প্রথমজন অমিত অনিলচন্দ্র শাহ—ভারতের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি। দ্বিতীয়জন সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর—দুঁদে কূটনীতিবিদ ও বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ; এখন তার নতুন পরিচয় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভায় এই দুজনের যোগদানকে কীভাবে দেখছে বাংলাদেশ?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, অমিত শাহকে নিয়ে ঢাকার অস্বস্তিবোধের কিছু কারণ আছে বৈকি। অন্যদিকে জয়শঙ্করের ব্যাপারে খুশি হওয়াটা স্বাভাবিক বলেই ধরে নেওয়া চলে।
মোদির প্রথম মেয়াদে যে তিন বছর জয়শঙ্কর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন, প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে তার অবদান ছিল অসামান্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, প্রত্যেকের সঙ্গে তিনি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।
আর তিন বছরের মেয়াদে জয়শঙ্কর এতবার ঢাকা সফর করেছেন, তা রেকর্ড হয়ে আছে; ভারতের দ্বিতীয় কোনও পররাষ্ট্র সচিবের তা নেই। মোদির বিদেশনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ যে ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (সবার আগে প্রতিবেশী), তার মূল স্থপতিই ছিলেন জয়শঙ্কর। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশ ছিল সেই নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
ফলে অসুস্থতার কারণে ভারতের মন্ত্রিসভা থেকে সুষমা স্বরাজের বিদায়ের পর জয়শঙ্করকে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ায় বাংলাদেশের খুশি হওয়ারই কথা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার নিয়োগের পর গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের যে কথাবার্তা হয়েছে তাতেও সেই ইতিবাচক সুরই ঝরে পড়েছে। বিশ্লেষকরাও একই কথার প্রতিধ্বনি করছেন। কিন্তু ভারতের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে একই কথা বলা যাচ্ছে না।
এবার নির্বাচনি প্রচারণায় ভারতের যে রাজনীতিবিদ সবচেয়ে চড়া গলায় বাংলাদেশ প্রশ্নে আক্রমণ শানিয়েছেন, তিনি অমিত শাহ। বিভিন্ন জনসভায় তিনি হুমকি দিয়েছেন, ভারত থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করে দেশ থেকে তাড়ানো হবে। আর এখানে কোনও ‘ডিপ্লোম্যাটিক কারেক্টনেস’-এর ধারও ধারেননি তিনি। সোজাসুজি বলেছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলতে তিনি বাংলাদেশিদেরই বোঝাচ্ছেন।
ভারতে বসবাসকারী কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের তিনি কী চোখে দেখেন, সেটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে তার ‘উইপোকা’ (টারমাইটস) সম্বোধনে। বোঝাতে চেয়েছেন, ভারতের অর্থনীতিতে ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় ঘূণ ধরাচ্ছে এরা।
এতেই শেষ নয়, আসামের বিতর্কিত যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) জেরে রাজ্যের লাখ লাখ বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের আরও নানা রাজ্যে চালু হবে বলেও তিনি ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। এই ‘রাষ্ট্রহীন’দের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করাই বিজেপির ঘোষিত অবস্থান, এবং দলের সভাপতি এই হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন, ‘মিলিয়ে নেবেন, অমিত শাহ যা বলে তা-ই করে!’
এমন ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে থাকা এক জিনিস, আর যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, সেটা অন্য জিনিস। ফলে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কেমিস্ট্রি যতই ভালো হোক, এই নিয়োগে অন্তত বাংলাদেশের স্বস্তি পাওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের কোন রাজ্যে কীভাবে অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত করার কাজ শুরু হবে, কারা কীভাবে নাগরিকত্ব খোয়ানোর হুমকিতে পড়বেন— এসবই দেখাশুনা করবে অমিত শাহের মন্ত্রণালয়। তার দফতর থেকেই স্থির হবে, এ দেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা—যাদের ভারত নিরাপত্তার হুমকি বলে মনে করছে এবং শরণার্থী বলেও স্বীকার করছে না—তাদের তালিকাই বা কবে কীভাবে প্রস্তুত হবে।
শুধু তা-ই নয়, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীও (বিএসএফ) এখন থেকে কাজ করবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। অনেকেই ধারণা করছেন, বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ যে প্রাণঘাতী অস্ত্র (লিথাল ওয়েপন) ব্যবহার না-করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটাও এবার পর্যালোচনা করা হতে পারে।
সীমান্তে গরুপাচার ঠেকাতে বিএসএফ কড়া ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে রাজনাথ সিংয়ের আমলেই। তার উত্তরসূরি এক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান নেবেন মনে করারও যথেষ্ট কারণ আছে বলেই পর্যবেক্ষকরা বলছেন। তাদের আশঙ্কা, এর চেয়েও বড় কথা, ভারত যাদের অবৈধ বিদেশি বলে মনে করছে তাদের ‘পুশব্যাক’ বা বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা গত ৫ বছরে প্রায় শূন্যে ঠেকেছিল, অমিত শাহর আমলে সেই প্রবণতা আবার বাড়তে পারে।
এগুলোর কোনোটিই যে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এর কোনোটাকে কেন্দ্র করে দুদেশের সম্পর্কে কোনও উত্তেজনার আভাস দেখা দিলে তার নিরসনের ভার এসে পড়বে অবধারিতভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ওপর।
এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন যখন (২০০৯-২০১৫ সাল) নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন, ওই সময় ওয়াশিংটনে ভারতের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন এস জয়শঙ্কর। সেই সুবাদে তারা পরস্পরকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, এবং দুজনের কূটনৈতিক জীবনের ব্যক্তিগত পরিচয় এখন নিজ নিজ দেশের মন্ত্রী হিসেবেও কাজে দেবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস মোয়াজ্জেম আলীরও গুণমুগ্ধ জয়শঙ্কর। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দুজনের মধ্যে বহুবার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। মাস চারেক আগে ঢাকায় ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত রিভা গাঙ্গুলি দাসের সম্মানে হাইকমিশনার মোয়াজ্জেম আলী তার চাণক্যপুরীর বাসভবনে যে বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন, সেখানেও উপস্থিত ছিলেন সস্ত্রীক জয়শঙ্কর।
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইন্দ্রনাথ মুখার্জির কথায়, ‘অমিত শাহ একজন ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ, আর জয়শঙ্কর সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ ও স্ট্র্যাটেজিস্ট।’
তিনি বলেন, “দুজনের এই ব্যাকগ্রাউন্ড মাথায় রাখলে হয়তো আমরা ধরেই নিতে পারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও অমিত শাহ ‘বাংলাদেশ তাস’ কারণে-অকারণে খেলতে চাইবেন। আর দেশের বাইরে সেটার ড্যামেজ কন্ট্রোলের দায়িত্ব যথারীতি এসে পড়বে জয়শঙ্করের ওপর!”
অমিত অনিলচন্দ্র শাহ

Sunday, May 19, 2019

ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের ফয়সালা পশ্চিমবঙ্গে! by রঞ্জন বসু

ভারতে প্রায় দেড় মাসব্যাপী নির্বাচনি প্রক্রিয়া একেবারে শেষ ধাপে। এখন গোটা দেশের মনোযোগ পশ্চিমবঙ্গের ওপর। কারণ রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত চরমে পৌঁছেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মুখ্যমন্ত্রীর মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মধ্যে বাগযুদ্ধ চলছে। এছাড়া বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে তুলকালাম চলছে রাজ্যে। এজন্যই পশ্চিমবঙ্গ এখন ভারতীয় সব সংবাদ মাধ্যমের মনোযোগের শীর্ষে।
এখানেই শেষ নয়, বুধবার (১৫ মে) রাতে ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনি প্রচারের মেয়াদ একদিন কমিয়ে দেয়। এ পদক্ষেপ ছিল নজিরবিহীন। সেই সঙ্গেই ‘নির্বাচনি প্রক্রিয়াতে হস্তক্ষেপে’র অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এনে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব অত্রি ভট্টাচার্যকে। ভোটের সময় একটা রাজ্যের প্রশাসনের বিরুদ্ধে কমিশনের এত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা সত্যিই বিরল।
নির্বাচন কমিশনের এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেন,  ‘নির্বাচন কমিশনটা এখন বিজেপি আর আরএসএসের দালালে ভরে গেছে।’ বিজেপিও কম যায় না, দলীয় সভাপতি অমিত শাহ দিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কই, গোটা ভারতে আর কোনও রাজ্যে তো এ পরিমাণ সহিংসতা হচ্ছে না। কারণটা আপনারা মমতাকেই জিজ্ঞেস করে নিন।’
ভারতের জাতীয় নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ আচমকা বিজেপি ও তৃণমূলের সংঘাতের ‘ফ্ল্যাশ পয়েন্টে’ পরিণত হওয়া প্রসঙ্গে দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্যাণ গোস্বামী বলেন, ‘কারণ এবার ভারতে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সেই উত্তরটা সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ থেকেই আসবে। কথাটা একটু অদ্ভুত শোনাতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা সে কথাই বলছে। সেজন্যই পশ্চিমবঙ্গে এত রাজনৈতিক উত্তাপ।’
হিন্দি বলয়ের ক্ষতি পোষাতে বিজেপির ভরসা বাংলাই। বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হিন্দি ভাষাভাষী রাজ্যগুলোতে ২০১৪ সালের চমকপ্রদ ফলাফলের পুনরাবৃত্তি করা বস্তুত অসম্ভব। পাঁচ বছর আগে বিজেপি উত্তরপ্রদেশে ৮০-র মধ্যে ৭৩, রাজস্থানে ২৫, মধ্যপ্রদেশে ২৯ এর মধ্যে ২৭, ছত্তিশগড়ে ১১ এর মধ্যে ১০, হরিয়ানায় ১০টি এবং  দিল্লির সাতটি আসনই পেয়েছিল। যা বিজেপিকে একার শক্তিতেই লোকসভায় গরিষ্ঠতা পেতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এবার এই ফলাফল পুনরাবৃত্তির কোনও সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
প্রথম কারণ হলো, উত্তরপ্রদেশে এবার পুরনো শত্রুতা ভুলে হাত মিলিয়েছে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও মায়াবতীর নেতৃত্বাধীন বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি)। ফলে রাজ্যে বিজেপিবিরোধী ভোট ভাগ হওয়া অনেকটাই ঠেকানো যাবে। পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, উত্তরপ্রদেশে বিজেপি গতবারের তুলনায় কম করেও ৩০ আসন হারাবে। কারও কারও মতে, সংখ্যাটা আরও বেশি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
অন্য দিকে, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড় এই তিন রাজ্যেও মাত্র চার-পাঁচমাস হলো বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে সরকার গড়েছে কংগ্রেস। ফলে এই তিন রাজ্যেও বিরোধীদের মনোবল তুঙ্গে, বিজেপির আসন এখানেও কমবে বই বাড়বে না।
এই ক্ষতির হিসাবটা বিজেপিও করেছে, আর সেই হারানো আসনগুলো পুষিয়ে নেওয়ার জন্য তারা বহুদিন ধরেই ‘পাখির চোখ’ করেছে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতকে। এই অঞ্চলে ৯০টির মতো লোকসভা আসন আছে। বিজেপির নীতি-নির্ধারকরা বিশ্বাস করেন, এখানেই তাদের শক্তি বাড়ানোর সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এই রাজ্যগুলোর মধ্যে ভোট বাকি আছে শুধু পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি আসনেই। আর গত কয়েকদিন ধরে সেই পশ্চিমবঙ্গই তাই যাবতীয় রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রে।
গত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২আসনের মধ্যে মাত্র দু’টি পেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ নিয়ম করে রাজ্যের প্রতিটি জনসভায় বলে চলেছেন, তারা এবার রাজ্যে অন্তত ২৩টি আসনে জিতবেন। প্রধানমন্ত্রী মোদিও দু-একদিন বাদে বাদেই পশ্চিমবঙ্গে এসে জনসভা করে যাচ্ছেন। এবারে তিনি ১০ দিন পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন। আর ১৭টির মতো সমাবেশে ভাষণ দিয়েছেন। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলটি টাকাও খরচ করছে জলের মতো।
ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেরই বিশ্বাস, বিজেপি জোট এবার পার্লামেন্টে গরিষ্ঠতা পাবে কিনা বা তার কাছাকাছি পৌঁছতে পারবে কিনা, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে তাদের এই ‘মরিয়া ক্যাম্পেন’ কতটা সাফল্য পায় তার ওপর।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিকে ধ্যান-জ্ঞান ছিল রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বামফ্রন্টকে হঠানো। আট বছরেরও বেশি হলো সেই লক্ষ্য তিনি হাসিল করে ফেলেছেন। আর এখন যে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পর্বে তিনি যে প্রধানমন্ত্রী হতে চান সেকথাও একেবারেই গোপন নয়।
মমতার ঘনিষ্ঠরা  বলছেন, তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন ২০১৯ সালের নির্বাচন তার সামনে দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের চমৎকার সুযোগ এনে দিয়েছে। বিজেপি কোনোভোবেই একশো থেকে সোয়াশ’র গণ্ডি পেরোবে না। আর কংগ্রেসও একশোর নিচেই থাকবে। সেক্ষেত্রে নন-কংগ্রেস, নন-বিজেপি একটি তৃতীয় বা ফেডারেল ফ্রন্টের সরকার গড়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে পারে। যার প্রধান হিসেবে মমতা ব্যানার্জি আত্মপ্রকাশ করতেই পারেন।
কলকাতায় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অধ্যাপক শিবাজী বসুরায় বলেন, ‘গত নির্বাচনে তৃণমূল ৩৪টি আসনে জিতেছিল। এবার তাদের তার চেয়ে একটিও কম পেলে চলবে না। বরং নেত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে দেখতে চাইলে সংখ্যাটা বাড়িয়ে চল্লিশের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে।’
এ কারণেই মমতা রাজ্যের জনসভায় বারবার বলছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে আমাদের বিয়াল্লিশে বিয়াল্লিশটাই চাই।’
এরই মধ্যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কলকাতা অমিত শাহ’র রোড শো উত্তাল হয়ে উঠেছিল। বিজেপি সমর্থকরা সেখানে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়ার পর তৃণমূলের কর্মীরা বিজেপি সভাপতিকে ‘গো ব্যাক’ আর ‘মুর্দাবাদে’ বরণ করেছেন। সেই সংঘাতের জেরেই যেখানে ভাঙা হয়েছে বিদ্যাসাগরের মূর্তি। বিদ্যাসাগরের মূর্তি কে বা কারা ভেঙেছে কোনওটা থেকেই তা এখনও প্রমাণিত নয়। তৃণমূল ও বিজেপি অবশ্য পরস্পরকে দোষারোপ করেই চলেছে।
মমতা বলছেন, ‘হিন্দুধর্মের সংস্কারের প্রবর্তক বিদ্যাসাগরকে বিজেপি যে সইতে পারবে না সেটাই তো স্বাভাবিক।’
আর প্রধানমন্ত্রী মোদী মূর্তি ভাঙার জন্য তৃণমূলকে দায়ী করেছেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন,  ‘ক্ষমতায় এলে তারা আরও বড়, আরও দামী বিদ্যাসাগরের মূর্তি নির্মাণ করবেন।’
ভারতের কোনও জাতীয় নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ বা এই রাজ্যের ৪২টি আসনের এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কোনও দিনই ছিল না। কিন্তু ২০১৯ সালের নির্বাচন এই রাজ্যকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করতে শুরু করছেন হয়তো দেখা যাবে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রিত্বের ফয়সালা করে দেবে পশ্চিমবঙ্গই।