Tuesday, July 14, 2020

নাকের পলিপ হলে যা করবেন

একুশে টেলিভিশন: আমাদের নাকে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। অনেক শুরুতে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নাকে কোনো সমস্যা দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ দিয়ে ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।
সাধারণত নাকের এক ধরনের বোটা থাকে। এটা দেখে অনেক নাকে পলিপ হয়েছে বলে ধারণা করে। তাদের এ ধারণা ভুল। পলিপ একটু নাকের গভীরে হয়ে থাকে। নাকের মধ্যে এক ধরনের মাংস পিণ্ডকে পলিপ বোঝানো হয়। এটি দুই ধরনের হতে পারে এবং দেখতে স্বচ্ছ।
নাকের এ রোগ ও তার চিকিৎসা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক কান গলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান তরফদার।
পলিপ কি?
ন্যাসাল পলিপ নাম দেখেই বোঝা যায় যে এটা নাকে হয়। পলিপ জিনিসটা আসলে একটা মাংসপিণ্ড। এটাকে মাংসপিণ্ড বলা হলেও আসলে এটা মাংসপিণ্ড নয়। ইংরেজিতে এটাকে বলা হয় ম্যাস। আসলে এটা নাকের ভেতরে হয় এবং দেখতে স্বচ্ছ, দেখতে অনেকটা সাদা রংয়ের আঙুরের থোকার মতো নাকের ভেতরে হয়ে থাকে। পলিপ দুই নাকেই হতে পারে।
সাধারণত পলিপ দুই ধরনের হয়ে থাকেঃ
১. ইথময়েডাল পলিপ, যা উভয় নাসারন্ধ্রেই হয়ে থাকে। এই ধরনের পলিপ শিশুদের কম হয়।
২. অ্যান্ট্রোকোয়োনাল পলিপ, এটি শিশুদের বেলায় বেশি দেখা দেয়। দুই ধরনের পলিপ হওয়ার পেছনের কারণও ভিন্ন।
পলিপ হাওয়া প্রধান কারণগুলো কি কি?
সাধারণত পলিপ এলার্জির কারণে হয়ে থাকেন। যাদের হাঁছি থাকে, সর্দি থাকে, তাদের মূলত পলিপ বেশি দেখা দেই। হাপানি, চোখ চুলকানো নাখ চুলকানোর কারণে পলিপ দেখা দিতে পারে কিন্তু মূল এলার্জির কারণে দেখা দেয়। এছাড়া বিভিন্ন ইনফেকশনের কারণে পলিপ হতে পারে।
অপারেশন ছাড়া পলিপ চিকিৎসা সম্ভব কি না?
অপারেশন ছাড়া অবশ্যই পলিপ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে আগে পলিপ কোন অবস্থায় আছে সেটা দেখতে হবে। ধুলা-বালি,গরম এবং এলার্জির কারণের পলিপ হতে পারে। সে জন্য আগে পলিপ হওয়ার কারণ নির্মাণ করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। চিকিৎসক যে খাবারগুলো খেতে নিষেধ করে সেগুলো খাওয়া যাবে না। নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করলে পলিপ ভাল হয়েই যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়দী পলিপ হলে শিশুদের স্বাস্থ্যর ঝুঁকি আছে কি না?
অবশ্যই, দীর্ঘমেয়াদী পলিপ হলে শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। এমন কি মৃত্যু পযর্ন্ত হতে পারে। বেশি আকার ধারণ করলে মেডিক্যাল চিকিৎসা সম্ভব নয়। তখন সেটাকে সার্জারি করতে হবে। মাঝে মাঝে নাত বন্ধ হয়ে যায়। রাতের বেলা দম বন্ধ হয়ে যায়। দিনের বেলায় বেশি ঘুমায়।দাঁতগুলো উচু হয়ে যায়। সারা সময় সর্দিভাব থাকে। নাকে কম শোনে। স্মৃতিশক্তি কমে যায়। পড়াশুনা মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়। দিনে দিনে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি এক সময় শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
কারো যদি পলিপ হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য কি করতে হবে?
পলিপ হয়ে থাকলে দেখতে হবে এটি প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে নাকি অনেক পরে মানে দেরি করে রোগী ডাক্তারের কাছে এসেছেন। প্রাথমিক অবস্থায় যদি খুব ছোট থাকে তাহলে আমরা অ্যান্টি অ্যালার্জিক ড্রাগ দেই এবং একই সাথে লোকাল অ্যাস্টেরয়েড স্প্রে হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকি। তাতে অনেকসময় দেখা যায় ওই পলিপ ছোট হয়ে মিশে যায়।
আবার কখনও কখনও পলিপ চিকিৎসার জন্য স্টেরয়েড ট্যাবলেট খাওয়ার জন্য দিয়ে থাকি। আর সেটা ব্যবহারেও অনেক সময় পলিপ ছোট হয়ে যায়। আর যদি খুব পলিপ বেশি বড় হয়ে গিয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে বড় তা নাক থেকে দূর হয় না। সে সব ক্ষেত্রে অপারেশন করে পলিপ সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলা সম্ভব। আর পলিপ অপারেশনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন রকমের পদ্ধতি আছে।
এ রোগ এড়াতে আপনার পরামর্শ কি?
মূলত পলিপ থেকে মুক্ত থাকতে হলে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। যেহেতু এটার কারণ অ্যালার্জি সেহেতু অ্যালার্জির সৃষ্টির।

ডেঙ্গুজ্বর: এডিস মশা সম্পর্কে যেসব তথ্য জেনে রাখা ভাল

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার পর ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণু বহনকারী এডিস মশা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে।
এডিস মশা খালি চোখে দেখে চেনা যায় কিনা, এটি কখন কামড়ায় অথবা এ মশা শরীরের বিশেষ কোনো জায়গায় কামড়ায় কিনা - বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এরকম প্রশ্ন তুলছেন।

এডিস মশা দেখতে কেমন হয়?

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু বিষয়ক কর্মসূচির ব্যবস্থাপক এম. এম. আখতারুজ্জামান জানান ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশা খালি চোখে দেখে সনাক্ত করা সম্ভব।
"এই জাতীয় মশার দেহে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে, যে কারণে এটিকে টাইগার মশা বলা হয়।"
এই জাতীয় মশা মাঝারি আকারের হয়ে থাকে এবং এর অ্যান্টেনা বা শুঙ্গটি কিছুটা লোমশ দেখতে হয়।
"এডিস মশার অ্যান্টেনায় অনেকটা দাড়ির মত থাকে। পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রী মশার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি লোমশ দেখতে হয়।"
দেহের ডোরাকাটা দাগ এবং অ্যান্টেনা দেখে এডিস মশা চেনা সম্ভব বলে জানান মি. আখতারুজ্জামান।

এডিস মশা কি শুধু সকালে কামড়ায়?

শুধুমাত্র দিনের আলো থাকাকালীন সময়েই এডিস মশা কামড়ায় বলে নিশ্চিত করেন ডা. আখতারুজ্জামান।
"সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এডিস মশা কামড়ায়। তবে কামড়ানোর হার সবচেয়ে বেশি থাকে সূর্যোদয়ের পর দুই-তিন ঘন্টা এবং সূর্যাস্তের আগের কয়েক ঘন্টা।"
রাতে এডিস মশা কামড়ায় না বলে নিশ্চিত করেন মি. আখতারুজ্জামান।

শুধু কি পায়েই কামড়ায় এডিস মশা?

এডিস মশা শুধু মানুষের পায়েই কামড়ায় - সম্প্রতি বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে এই বিষয়টি প্রচার করা হয়।
তবে ডা. আখতারুজ্জামান নিশ্চিত করেন এডিস মশা যে শুধু পায়ে কামড়ায়, এই দাবি ভিত্তিহীন।
"মশা সাধারণত মানুষের পায়েই কামড়ায়, কারণ সাধারণত শরীরে পা'ই অনাবৃত থাকে। তবে শুধু যে পায়েই মশা কামড়ায়, বিষয়টি এরকম নয়।"

এডিস মশা একবার কামড়ালেই কী ডেঙ্গু হয়?

এডিস মশা কামড়ালে যে মানুষের ডেঙ্গুজ্বর হবেই, বিষয়টি এমন নয় বলে জানান ডা. আখতারুজ্জামান।
পরিবেশে উপস্থিত ভাইরাস এডিস মশার মধ্যে সংক্রমিত হলে সেই মশার কামড়ে ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
"এডিস মশা ভাইরাস সংক্রমিত থাকা অবস্থায় মানুষকে কামড়ালে সুস্থ মানুষের ডেঙ্গু হতে পারে।"
ভাইরাসের কারণে হওয়া জ্বরে আক্রান্ত থাকা ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ালেও মশার মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার সুযোগ থাকে বলে জানান মি. আখতারুজ্জামান।
"এডিস মশার একটা বিষয় হলো, তারা সাধারণত একাধিক ব্যক্তিকে কামড়ায়। তাই ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির শরীর থেকে এডিস মশার মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার পর ঐ মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়।"
অন্যান্য মশার সাথে এডিস মশার বাহ্যিক গঠনে কিছু পার্থক্য রয়েছে

জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জন্য শোকগাঁথা by ডেরেক ব্রাউন

স্বৈরাচাররা যেমনটা হয়ে থাকেন, হোসেন মুহম্মদ এরশাদ ততটা নৃশংস ছিলেন না। তার শাসনামলে বাংলাদেশ ত্রাস, কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের জনপদ ছিল না। তবে দেশটা ছিল এমন যেখানে সর্বত্র যেন সন্দেহ ও নৈরাশ্যের ছাপ। দুর্নীতি পৌঁছে গিয়েছিল দেশের প্রতিটি কোণায়। ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামো আরও ন্যুজ্ব হয়ে গিয়েছিল।

এরশাদ মারা গেছেন ৮৯ বছর বয়সে। আশির দশকের পুরোটা ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশ শাসন করে গেছেন তিনি। নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার একমাত্র যোগ্যতা ছিল এই যে, তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। ওই সময় বাংলাদেশ শাসন করছিলেন আরেক সামরিক শাসক, ক্যারিশম্যাটিক জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর জিয়া ক্ষমতায় এসেছিলেন। ১৯৮১ সালে ঘাতকদের বুলেট বুকে নেয়ার সময় চলে এল জিয়ার। বিফল ওই অভ্যুত্থান করেছিলেন মধ্যম পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তারা, যাদের কয়েকজন অভ্যুত্থানের সময়ই মারা যান।

শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর যেমনটা হয়েছিল, জিয়ার মৃত্যুর পরও অন্তর্বর্তীকালীন জরুরী প্রশাসন দেশ শাসন করার চেষ্টা করছিল। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী জন্মের পর থেকে উত্থান-পতন ও সহিংসতা ছাড়া খুব কম কিছুই চাক্ষুষ করেছে বাংলাদেশ।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ ছিলেন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা। ওই সময় রাজনীতির প্রতি তেমন আগ্রহ তিনি দেখাননি। সাবেক বস জিয়ার মৃত্যুর পর ঝঞ্ঝাটময় সময়েও এরশাদ শক্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। তবে ১৯৮২ সালের শুরুর দিকে তিনি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটান। দেশে সেনা শাসন আরোপ করেন। নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ক্ষমতা দখল করার সময় দাবি করেছিলেন (কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশ্বাসও করেছিলেন) যে, তিনি সংবিধান রক্ষা করতে ও দেশকে গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করতেই সামনে এসেছেন।

এরশাদ পরবর্তীতে সেনাপ্রধান পদ ছাড়েন। সামরিক শাসনের অবসান ঘটান। তিনি সংসদ নির্বাচনও আয়োজন করেন। জাতীয় পার্টি (জেপি) নামে দল গঠন করে ওই নির্বাচনে লড়েন। বেসামরিক রাজনীতিতে তখন আধিপত্য ছিল (এখনও আছে) আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। যেই দুই দলের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন যথাক্রমে মুজিব ও জিয়া।

উপমহাদেশীয় রাজনীতির বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় দল দু’টির নেতৃত্বে আসেন মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনা ও জিয়ার বিধবা স্ত্রী খালেদা জিয়া। এই দুই নারী একে অপরকে দেখতে পারতেন না, কিন্তু তারা এরশাদকে আরও বেশি ঘৃণা করতেন। তারা এরশাদের অধীনে নির্বাচন বর্জন করেন।

১৯৮৮ সালের নির্বাচনে, জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনের ২৫১টিতে ‘জয়’ পায়। এর আংশিক কারণ হলো প্রধান দুই দলের বয়কট, আরেক কারণ ছিল স্থূল কারচুপি।

ওই সময় আমি ছিলাম ওই অঞ্চলে গার্ডিয়ানের প্রতিনিধি। তখন আমি জোচ্চুরির পর জোচ্চুরি প্রত্যক্ষ করেছি। ভোটাভুটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত দেখাতে শ্রমিকদের ভাড়া করা হয়েছিল। ওই দিনটি যেন মানুষের ঔদাসীন্য ও ক্ষোভের মিশেল ছিল। ঢাকার একটি ভোটকেন্দ্রে দুপুরের আগেই রিটার্নিং কর্মকর্তা ঘোষণা দিলেন, ১০০ শতাংশ ভোট হয়ে গেছে, আর ভোটগ্রহণ করা হবে না। তাকে এই প্রশ্ন করতে যাওয়াটা নিষ্ঠুর হয়ে যেত যে, তার সকল ব্যালট বক্স রাজপথে। ক্ষুদ্ধ লোকজন সেগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। ওই রাতেই কিছু জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও বিদেশী সংবাদদাতা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন, টার্নআউট কতো হতে পারে, তা নিয়ে। সর্বোচ্চ অনুমান ছিল, ২ শতাংশ।

এই প্রশ্নবিদ্ধ ম্যান্ডেট নিয়ে এরশাদ ক্ষমতায় ফিরলেন, দেশের আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনের কাজে। তার প্রিয় ছিল সিদ্ধান্ত কথিত উপজেলা পদ্ধতির মাধ্যমে তৃণমূলের কাছে ক্ষমতা দেয়া। এগুলো ছিল প্রত্যন্ত এলাকার প্রশাসনিক ইউনিট, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব অর্পিত ছিল এই প্রশাসনে। এতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত ছিল। উপজেলা নেটওয়ার্ক স্থাপিত হয় পূর্বের ৪৬০টি থানা বা পুলিশ স্টেশনের ভিত্তিতে। নিজেদের দুর্দশাগ্রস্থ জীবন নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে সামান্য হলেও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল ওই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব উপজেলায় আধিপত্য ছিল স্থানীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও সরকারী কর্মকর্তাদের।

এরশাদ বসবাস করতেন প্রকাণ্ড প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে। তার ছিল নিজস্ব গলফ কোর্স। সবসময় দুর্নীতি নির্মূল নিয়ে প্রগাঢ় ভাষায় কথা বলতেন। দারিদ্রপীড়িত মানুষের কষ্ট নিয়েও তিনি সত্যিকার অর্থে পীড়িত ছিলেন। ১৯৮৭ সালে আমি তার সঙ্গে একটি বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সফর করি। বহু গ্রামে যাই আমরা। প্রত্যেকটা গ্রামে প্রেসিডেন্ট বন্যার বিধ্বস্ততার শিকার এলাকায় যেতেন। তাকে মিনতির সুরে ছুঁতে যাওয়া নারীদের ভদ্রস্থভাবে এড়িয়ে যেতেন। তার পেছনে থাকতো একজন সহযোগী, যার হাতে ছিল নোটভর্তি ব্রিফকেস। এরশাদ নারীদের দিকে ইঙ্গিত দিতেন, আর তাদের হাতে টাকা বিলাতেন ওই সহযোগী।

সেখান থেকে বিরতি নিয়ে আমরা বগুড়া সামরিক ক্যান্টনমেন্টে অফিসার্স মেসে দারুণ কিন্তু একেবারেই বেমানান দুপুরের খাবার খেলাম। আমরা যখন খাচ্ছিলাম, এরশাদের চোখ অশ্রুসজল। তিনি বর্ণনা করছিলেন, যেই ক্ষুদা ও দারিদ্র্য আমরা গ্রামে গ্রামে চাক্ষুষ করলাম। তিনি বিদেশী ত্রাণ চাননি। সতর্কভাবে নিজের পর্যবেক্ষণের কথা বললেন, ‘মানুষ ভিক্ষুককে কিছু দিতে চায় না।’

সমালোচকরা বলেন, ১৯৮৮ সালে, সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে, এরশাদ সংবিধান সংশোধন করে ইসলামকে ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাষ্ট্রধর্ম বানালেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন। তখন সেটি ছিল বৃটিশ শাসিত ভারত। তার পিতার নাম মকবুল হোসেন, মায়ের নাম মাজিদা খাতুন। তার পরিবার বর্তমান বাংলাদেশে অভিবাসী হয়ে আসে ১৯৪৮ সালে। তখন এটি ছিল পাকিস্তানের অংশ।

এরশাদ রংপুরের কারমাইকেল কলেজে ও পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। ১৯৫০ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের কোয়েটায় কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের পর তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে পদায়ন পান। তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধে লড়ছিল, তখন তাকে অন্তরীন করা হয়। ১৯৭৩ সালে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘকালের শাসক ছিলেন এরশাদ। কিন্তু দেশের অবস্থা এত উত্তাল ছিল যে, তিনি আজীবন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র নজির গড়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হয়ে হরতাল ও রাজপথে আন্দোলন করে। সহিংসভাবে হরতাল প্রয়োগও করে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে, প্রেসিডেন্ট বুঝতে পারলেন তার সময় শেষ। তিনি পদত্যাগ করলেন। তার পরে যেই সরকারগুলো আসলো সেগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা।

১৯৯১ সালে এরশাদকে আটক করা হয়। দুর্নীতির অভিযোগে কারান্তরীণ করা হয়। কিন্তু ভেঙ্গে যাওয়ার পরিবর্তে জাতীয় পার্টি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে যায়। টানা দুই নির্বাচনে এরশাদ ৫টি আসন থেকে নির্বাচন করেন ও প্রত্যেকটি থেকে জয়লাভ করেন, অথচ তখন তিনি কারাগারে। কিন্তু তারপরও তার গৌরবময় দিনগুলো ততদিনে শেষ।

১৯৯৭ সালে তিনি জামিনে মুক্ত হন। এরপর ২০০০ সালে তাকে আবারও ৪ মাসের জন্য জেল দেয়া হয়। ওই সময় তিনি ৫ বছরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য হন। মৃত্যুর সময়, তার বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভ্যুত্থান সমর্থনের অভিযোগে মামলা চলছিল, যেই অভ্যুত্থানে তারই সহকর্মী মেজর জেনারেল আবুল মনজুর নিহত হন।

এরশাদ ১৯৫৬ সালে রওশন এরশাদকে বিয়ে করেন। তিনি ২০০০ সালে বিদিশা সিদ্দিকিকে বিয়ে করেন। ২০১৫ সালে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়। মৃত্যুর সময় ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে রেখে গেছেন তিনি।
  • *সৈনিক থেকে রাজনীতিবিদ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০, মৃত্যু ১৪ জুলাই ২০১৯।
  • *ড্রেক ব্রাউন ২০১১ সালে মারা গেছেন।
২০০০ সালে ঢাকার আদালত পাড়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, ছবি: পাভেল রহমান/এরশাদ
(সংকলিত)

এতো এতো পুরনো কাপড় কোথায় যায়?

লাস্ট আপডেট- ১২ জুলাই ২০১৭: আপনি কি কখনো ভেবেছেন আপনার ব্যবহার করে ফেলে দেয়া পুরনো কাপড় কোথায় যায়?
পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যবহার করা কাপড় অনেক সময় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা এবং দোকানে দেয়া হয়।
সেসব পুরনো কাপড় কখনো দরিদ্র মানুষদের মাঝে বিতরণ করা হয়। আবার কখনো সেসব কাপড় বিক্রি করে দাতব্য সংস্থাগুলো তহবিল জোগাড়ের চেষ্টা করে।
কিন্তু যেসব কাপড় কেউ পরতে চায় না কিংবা কিনতে চায় না , সেগুলো কোথায় যায়?
সেখান থেকে এসব কাপড় চলে যায় ভারতের উত্তরাঞ্চলের পানিপথ এলাকায়। এ জায়গাটি বিশ্বের পুরাতন ব্যবহার্য কাপড়ের ভাণ্ডার। এটিকে অনেকে পুরাতন কাপড়ের রাজধানী হিসেবেও বর্ণনা করেন।
প্রতিদিন ব্রিটেন এবং আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার-হাজার টন পুরনো কাপড় এখানে আসে।
শহরে বাইরে পুরাতন কাপড় বহনকারী শতশত ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি বন্দরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজে করে শতশত কন্টেইনারে করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পুরনো কাপড় আসে। সে বন্দর থেকে ট্রাকে করে কাপড়গুলো এ শহরে আসে।
পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশ পুরনো ব্যবহার্য কাপড় আমদানি করে ভারতে স্থান সে তালিকায় সবার উপরে। এখানে দুই ধরনের কাপড় আমদানি করা হয়।
এক ধরনের কাপড় আছে যেগুলো পুরনো হলেও ব্যবহার করা যায় এবং আরেক ধরণের কাপড় হচ্ছে ছেঁড়া , যেগুলো ব্যবহারের উপযোগী থাকে না।
পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে পুরনো কাপড় আসে ভারতে
ব্যবহার করার মতো কাপড় যারা আমদানি করে তাদের জন্য সরকারি লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। কারণ ভারতের স্থানীয় পোশাক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে চায় সরকার।
এসব পুরনো কাপড় যদি বাজারে বিক্রি হয় তাহলে ভারতের স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেজন্য এ কাপড়গুলো ভারতের বাজারে বিক্রি না করে পুনরায় বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
কিন্তু ভারতে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় পুরাতন ছেঁড়া কাপড়।
পুরাতন কাপড় পুনরায় প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে রপ্তানি করে এমন একটি কারখানা পরিদর্শন করে দেখা গেলো
সেখানে বিভিন্ন ধরনের জ্যাকেট, সোয়েটার, স্কার্ট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেসব কাপড় থেকে জিপার, বোতাম এবং লেবেল আলাদা করে একটি মেশিনে দেয়া হয়।
মেশিনে দেবার আগে কাপড়ের রং অনুযায়ী সেগুলোকে আলাদা করে স্তূপ করা হয়। মেশিনের মাধ্যমে কাপড় থেকে সুতা আলাদা করা হয়।
প্রতি তিন টন কাপড় থেকে প্রায় দেড় টন সুতা উৎপাদন হয়। তারপর সে সুতার মাধ্যমে কম্বল তৈরি করা হয়।
কারখানার মালিক জানালেন, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় দুর্যোগের সময় এসব কম্বল বিতরণ করা হয়।
এসব কারখানায় তৈরি বেশিরভাগ কম্বল আফ্রিকার দেশগুলোতে যায়। কিছু কমদামী কম্বল ভারতের বাজারেও বিক্রি হয়। কিন্তু সেটির পরিমাণ খুব বেশি নয়।
একসময় অনেক কম দামে বিদেশ থেকে পুরনো কাপড় আমদানি করা যেত। কিন্তু এখন সে খরচ বেড়ে গেছে।
কারণ ভারতে আসার পর সরকারী শুল্ক, উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় - এসব মিলিয়ে উৎপাদিত কম্বলের দাম বেড়ে যায়।
আফ্রিকার দেশগুলো খুব সস্তায় কম্বল কিনতে চায়। তাদের সে চাহিদা পূরণ করা এখন উৎপাদকদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
পুরনো কাপড় পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে কম্বল তৈরি করে এ কারখানাটি।

শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ কী?

বিশ্বজুড়ে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসী হামলা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। গত বছর নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ ও যুক্তরাষ্ট্রের এল পাসো হত্যাযজ্ঞ এর মধ্যে অন্যতম। হামলাকারীরা এ ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যা ‘প্রতিস্থাপিত’ হওয়া নিয়ে আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে থাকে। এছাড়া এ ধরণের পূর্ববর্তী হামলা থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথাও তারা স্বীকার করে। বিশেষ করে, নরওয়ের অসলো ও পার্শ্ববর্তী দ্বীপে ২০১১ সালে আন্দ্রে ব্রেইভিক যেভাবে ৭৭ জন মানুষকে হত্যা করেছে, তা এই শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীদের রীতিমতো অনুপ্রেরণা যোগায়! কিন্তু এই শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ বা হোয়াইট ন্যাশনালিজম কী? এই ধারণার উৎপত্তি হয়েছে কীভাবে? লন্ডনের দ্য ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন এই প্রশ্নদ্বয়েরই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

ম্যাগাজিনটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। কেননা, তবে মোটা দাগে বলা যায়, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা শ্বেতাঙ্গদের জন্য একটি জাত-রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। অনেক শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী অবশ্য খোলাখুলিভাবে বলেন না যে, তাদের শ্বেতাঙ্গ জাত অন্য জাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
পরোক্ষভাবে তারা বলেন, (শ্বেতাঙ্গদের মতো) অন্যান্য জাতেরও নিজস্ব রাষ্ট্র থাকা উচিত। এমন অল্প ক’জন ‘উদারমনা’ বাদে, বেশিরভাগ শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীকেই হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট বা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বলা যায়। যারা কিনা মনে করেন, জগতের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জাত হলো শ্বেতাঙ্গরা, অর্থাৎ বাকি সকলে তাদের চেয়ে নিকৃষ্টতর। এই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের দাবি বিভিন্ন রকমের। তাদের কেউ চান, কঠোরভাবে দেশে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করা হোক। আবার চরমপন্থীরা খোলাখুলিভাবেই অন্য জাতকে জাতিগতভাবে নির্মূল, এমনকি গণহত্যা সমর্থন করেন।

তাদের এমন বিদ্বেষের নেপথ্যে প্রায়ই থাকে শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা বা শ্বেতাঙ্গদের প্রতিস্থাপিত করার আশঙ্কা! শ্বেতাঙ্গ প্রতিস্থাপন বলতে বোঝানো হয় যে, ‘শ্বেতাঙ্গ জাতে’র মানুষদের মধ্যে নিম্ন জন্মহার, অন্য জাতের মানুষকে বিয়ে করা ও অ-শ্বেতাঙ্গ মানুষদের উচ্চ জন্মহারের কারণে শ্বেতাঙ্গদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।

আধুনিক শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ, যা এখন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে, তার উৎপত্তি হয় আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর। গৃহযুদ্ধ শেষে সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হয়। এরপর থেকেই সমাজে আমেরিকান শ্বেতাঙ্গরা (যারা মূলত পশ্চিম ইউরোপ থেকে যাওয়া আমেরিকান প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান) নিজেদের উঁচু অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কিত বোধ করে। এরপর থেকেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এই শ্বেতাঙ্গদের বিশেষ সুবিধা ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আইন প্রণয়ন করা হয়। এসব আইনের মধ্যে ছিল কুখ্যাত ‘জিম ক্রো’ আইন, যার মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গদের জন্য আলাদা আলাদা স্কুল, কলেজ ও প্রার্থনাস্থল সৃষ্টির বৈধতা দেওয়া হয়। অন্যরা আবার রীতিমতো আধাসামরিক বাহিনী গঠন করে সহিংসতা ও গণপিটুনিতে মত্ত হয়ে উঠে। পরবর্তীতে, অভিবাসনের হার বাড়লে, বিশেষ করে চীনা, আইরিশ ক্যাথলিক, দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউরোপিয়ান ও ইহুদীদের আগমনে এই শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে আরও ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এরপর নতুন নতুন অভিবাসন আইন প্রণীত হয়, যার উদ্দেশ্য হলো অভিবাসীর হার কমানো। ১৯১৬ সালে ম্যাডিসন গ্রান্ট প্রকাশ করেন ‘দ্য পাসিং অব দ্য গ্রেট রেইস’। এই বইয়ে শ্বেতাঙ্গ ভাবনা ও উৎকৃষ্টতর মানবসন্তান জন্মানোর বিদ্যা ইউজেনিকস নিয়ে আলোচনা করা হয়। এভাবেই জন্ম হয় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও ‘রেইস সুইসাইড’ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব তখন জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার পর্যন্ত পৌঁছায়, যিনি নিজে আবার জার্মানদের আর্য রক্তের অধিকারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতেন। বলা হয়, ওই বই পড়ে হিটলার নিজে গ্রান্টকে চিঠি লিখে জানান, ‘দ্য পাসিং অব দ্য গ্রেট রেইস’ বইটি তার কাছে বাইবেল সমতুল্য।
পরবর্তীতে হিটলারের নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর লড়াই এবং পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কারণে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ ব্যাপক নিন্দা কুড়ায়। কিন্তু বিংশ শতাব্দির শেষের দিকে এসে ফের প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতে শুরু করে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা। এই সময়ে এসে আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে তারা বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসবাদী সহিংস হামলা চালায়।

১৯৮৮ সালে ডেভিড লেইন একটি বই লিখেন, যার শিরোনাম ‘দ্য হোয়াইট জেনোসাইড ম্যানিফেস্টো’। এই বইয়ে গ্রান্টের ‘রেইস সুইসাইডে’র তত্ত্বকে নতুন নাম দেওয়া হয়। এই বইয়েই শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের মূল বক্তব্য নথিবদ্ধ করা হয়। এতে লেখা হয়, ‘আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের জনগণের অস্তিত্ব ও শ্বেতাঙ্গ শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।’ মূল ইংরেজি বাক্যটি ছিল ১৪টি শব্দের। শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের কাছে এই বাক্য এতটাই জনপ্রিয় হয়ে পড়ে যে, তারা একে ‘দ্য ফোর্টিন ওয়ার্ডস’ বলে সম্বোধন করে থাকে।

কিন্তু কেন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা নিজ জাতকে শ্রেষ্ঠ মনে করে? এক্ষেত্রে নানা ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। এদের অনেকে কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ে ভীষণ সন্দেহপ্রবণ। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিলিশিয়া গ্রুপ এ ধরণের ধারণা পোষণ করে। কেউ কেউ আবার গৃহযুদ্ধকালীন ইতিহাসের পরিবর্তিত সংস্করণে বিশ্বাস করে, যেখানে কিনা দাসপ্রথার পক্ষপাতী কনফেডারেসি সরকারকে মহান হিসেবে তুলে ধরা হয়। কোনো কোনো শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী আবার ইহুদী-বিদ্বেষী ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করে ও মনে করে, গোটা দুনিয়া ইহুদীদের নিয়ন্ত্রণে! এরা এমন তত্ত্বেও বিশ্বাস করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন উস্কে দেওয়ার জন্য দায়ী আন্তর্জাতিক ইহুদী অভিজাত চক্র।
১৯৭৮ সালে ‘দ্য টার্নার ডাইরিজ’ নামে একটি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ফ্যান্টাসি উপন্যাস রচনা করেন উইলিয়াম লুথার পিয়ের্স। এই উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে যায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গ জাতের রক্ষকদের নেতৃত্বে সশস্ত্র বিদ্রোহের একটি কল্পিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এই বইটি ‘দ্য হোয়াইট জেনোসাইড ম্যানিফেস্টো’ বইয়ের লেখক ডেভিড লেইনকে উজ্জীবিত করেছিল। এই বই দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছিল টিমোথি ম্যকভেহ নামে এক সাবেক সেনা সদস্য ও বন্দুক-অধিকারের পক্ষে সোচ্চার এক ব্যক্তিকেও, যিনি ১৯৯৫ সালে কুখ্যাত ওকলাহোমা সিটি বোমা হামলা চালান। ওই হামলায় ১৬৮ জন মানুষ নিহত হন।

ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদও বিবর্তিত হয়। ইন্টারনেটের অন্ধকার গলিতে বিস্তৃত হতে থাকে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ। এসব বিষয় নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। কিন্তু এমন অদ্ভুত সব আলোচনা এমন অস্পষ্টভাবে সেখানে আলোচনা হয় যে, বোঝা মুশকিল আদৌ সত্যি সত্যি নিজের মনোভাব প্রকাশ করছে কেউ, নাকি মশকরা করছে! এতে করে, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা কৌশলে নিজেদের মতবাদ অন্যত্র ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। অর্থাৎ, অনেকে স্রেফ মজা পেতে এসব ফোরামে গেলেও কথাগুলো ঠিকই ছড়িয়ে যাচ্ছে।

ওদিকে ইউরোপে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা কল্পিত ইসলামি আক্রমণ নিয়ে চিন্তিত। বিশেষ করে, নাইন ইলেভেন ও বৈশ্বিক জিহাদবাদের উত্থানের পর এই মনোভাব সেখানে বেড়েছে। ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ শীর্ষক বইয়ে রেনড ক্যামুস দাবি করেন, ফ্রান্সে প্রকৃত ফরাসিদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে এখন আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসীরা, যাদেরকে উৎসাহিত করেছে ‘প্রতিস্থাপনবাদী’ অভিজাতরা। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরাও ‘হানাদার জাতে’র তালিকায় মুসলমানদের অন্তর্ভূক্ত করেছে, তবে তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু লাতিনো, কৃষ্ণাঙ্গ ও ইহুদীরা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচকরা অভিযোগ করেন, তিনি নিজেই একজন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী। এ নিয়ে সরাসরি প্রমাণ নেই। তবে তার কিছু কিছু বাক্য শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শের সঙ্গে মিলে যায়। যেমন, ২০১৭ সালে তিনি ভার্জিনিয়ার শার্লোৎসভিলে ‘ইউনাইট দ্য রাইট’ নামে একটি সভায় অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে বলেন, ‘এই মানুষগুলো খুব নীরবে রবার্ট ই লি’র (কনফেডারেট সরকারের জেনারেল) ভাস্কর্র্য অপসারণের প্রতিবাদ করছিল।’ প্রকৃতপক্ষে, এই সভায় শামিল হওয়া লোকজন নিজেদেরকেই নব্য নাৎসি হিসেবে দাবি করে। তারা ‘জিউইশ উইল নট রিপ্লেস আস’ (ইহুদীরা আমাদের হটাতে পারবে না) সহ বিভিন্ন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী শ্লোগান দিচ্ছিল।

গত বছর এই দক্ষিণপন্থী চরমপন্থীরা আমেরিকায় যত মানুষকে হত্যা করেছে, তা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ (ওই বছরই অকলাহোমা সিটি বোমা হামলা হয়েছিল)। এই হত্যাকারীদের সিংহভাগই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের হুমকি পশ্চিমা দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ বেশ হালকাভাবেই নিয়েছে।

>>>(সূত্র দ্য ইকোনমিস্ট)