Thursday, November 21, 2019

রুয়ান্ডা গণহত্যা: ১০০ দিনে ৮ লাখ মানুষ হত্যা

১৯৯৪ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ১০০ দিনের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছিল রুয়ান্ডার প্রায় আট লাখ নাগরিক। ২৫ বছর আগে শুরু গণহত্যার শিকার অধিকাংশই সংখ্যালঘু তুতসি সম্প্রদায়ের মানুষ ছিল। গণহত্যা পরিচালনাকারীরা ছিল হুতু সম্প্রদায়ের। যদিও রুয়ান্ডাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, কিন্তু তারপরও এত অল্প সময়ে বিশালসংখ্যক মানুষকে হত্যা করার কথা চিন্তা করাও ছিল কল্পনাতীত।
দীর্ঘদিন শাসনক্ষমতায় থাকা তুতসিরা হুতুদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও ছিল। দেশটির মানুষের মধ্যে ৮৫ শতাংশ হুতু।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ১৯৫৯ সালে তুতসি রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে হুতুরা। তখন হাজারো তুতসি প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে পালিয়ে যায়। ২০০৩ সাল পর্যন্ত চলা গণহত্যায় প্রায় ৫০ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রতিষ্ঠা হয়েছে ২০০২ সালে। এর অনেক আগে রুয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফলে, এ জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করতে পারবেন না এই আদালত। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ওই হত্যাযজ্ঞের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিচারের জন্য তানজানিয়ার আরশা শহরে একটি আদালত স্থাপন করেছে। এ আদালতের নাম ‘রুয়ান্ডার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’। দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল বিচারের পর গণহত্যার জন্য এখন পর্যন্ত ৯৩ জনের বিচার হয়েছে। এঁদের অনেকেই হুতু সরকারের আমলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। সবাই হুতু সম্প্রদায়ের।
সামাজিক আদালত গাসাসা
গণহত্যায় অভিযুক্ত লাখো মানুষের বিচার দ্রুত করার জন্য রুয়ান্ডা সামাজিক আদালত তৈরি করেছে। এর নাম গাসাসা। বিচার শুরু হওয়ার আগেই অন্তত ১০ হাজার অভিযুক্ত ব্যক্তি কারাগারে মারা গেছেন। ২০১২ সাল পর্যন্ত ১২ হাজার গাসাসা আদালত বসেছেন। প্রায় ১২ লাখ মামলার বিচার করার চেষ্টা করছেন গাসাসা। সাধারণত, বাজার বা কোনো গাছের নিচে এসব আদালত বসেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্য বের করা, বিচার এবং পুনর্মিলন ঘটানো। রুয়ান্ডার ভাষায় গাসাসার অর্থ হলো একত্রে বসা এবং আলোচনা করা।
২০১৭ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন পল কাগামি। ছোট্ট ও বিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন কাগামি। তাঁর নীতির কারণে দেশটির দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। তিনি রুয়ান্ডাকে একটি প্রযুক্তির কেন্দ্র বানানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও টুইটারে সক্রিয়। তাঁর অনুসারীও অনেক। তবে তাঁর সমালোচকেরা বলছেন, তিনি বিরোধিতা সহ্য করতে পারেন না। দেশে–বিদেশে তাঁর বেশ কয়েকজন বিরোধী অপ্রত্যাশিতভাবে মারা গেছেন।
এদিকে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে গণহত্যার স্মরণে ৮ এপ্রিল একটি সমাবেশ হবে। রুয়ান্ডা একসময় যাদের কলোনি ছিল, সেই বেলজিয়ামের প্রেসিডেন্ট চালর্স মাইকেল, রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট কাগামি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট উয়োরি মুসেভেনিসহ কয়েকটি আফ্রিকান দেশের সরকারপ্রধানেরা উপস্থিত থাকবেন।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
গণহত্যা কেন হয়েছিল, এর প্রধান কারণ জানতে হলে ফিরে যেতে হবে পেছনে। ১৯১৬ সালে বেলজিয়াম সেনাবাহিনী দখল করে নেয় পূর্ব আফ্রিকার ছোট সবুজঘেরা দেশটিকে। জাতিগতভাবে রুয়ান্ডাতে সংখ্যাগুরু হুতু এবং সংখ্যালঘু তুতসি দুই সম্প্রদায়ের লোক বাস করত। চালচলন ও আচার-আচরণের দিকে থেকে দুই সম্প্রদায়ের লোকই একই রকম ছিল। তারা একই ভাষায় কথা বলত, একই এলাকায় থাকত, কিন্তু দেখতেই কেবল কিছুটা ভিন্ন ছিল। তুতসিরা ছিল হুতুদের চেয়ে কিছুটা লম্বা এবং চিকন গড়নের। কথিত আছে, তুতসিদের আদি বাসস্থান ইথিওপিয়া। সেখান থেকে আদি পুরুষেরা রুয়ান্ডায় পাড়ি জমান। এই নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক আগে থেকেই দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল।
বেলজিয়াম ক্ষমতা দখলের পর রুয়ান্ডার নাগরিকদের সম্প্রদায়ের ওপর ভিত্তি করে দুই রকম পরিচয়পত্র দেওয়ার নিয়ম প্রচলন করে। এতে তুতসি ও হুতুদের মধ্যে ভেদাভেদ তৈরি হয়। যেখানে তাদের একমাত্র পরিচয় হওয়ার কথা ছিল রুয়ান্ডার নাগরিক, সেখানে তারা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে হুতু এবং তুতসি দুই গোত্রে বিভক্ত হয়ে গেল। বেলজিয়ানরা তুতসিদের বেশি প্রাধান্য দিত হুতুদের চেয়ে এবং বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন মনে করত। বেশি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তুতসিরাও বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছিল।
বৈষম্যের স্বীকার হুতু সম্প্রদায়ের মধ্যে ধীরে ধীরে ক্ষোভ জমতে থাকে। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫৯ সালে। সে বছর হুতু ও তুতসিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ হারায় প্রায় ২০ হাজার তুতসি। অনেকেই পালিয়ে পাশের দেশ বুরুন্ডি, তানজানিয়া ও উগান্ডায় যায়। ১৯৬২ সালে বেলজিয়ান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে নিজেদের স্বাধীনতা ফিরে পায় রুয়ান্ডা। স্বাধীনতা পাওয়ার পরপরই হুতুরা তাদের হারিয়ে ফেলা ক্ষমতা আবার ফিরে পায়।
১৯৭৩ সালে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে রুয়ান্ডার দায়িত্ব গ্রহণ করেন হুতু নেতা একনায়ক জুভেনাল হাবিয়ারিমানা। তাঁর শাসনামলে রুয়ান্ডার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ে। একই সময়ে পল কাগামির (বর্তমান রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট) নেতৃত্বে উগান্ডায় পালিয়ে যাওয়া তুতসিরা রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ) নামে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী দল গঠন করেন। প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তুতসিদের নিজে দেশে ফিরিয়ে আনাই এই ফ্রন্টের উদ্দেশ্য ছিল।
নির্বাসিত তুতসির একটি দল বিদ্রোহী বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনীর নাম রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ)। ওই বাহিনী ১৯৯০ সালে রুয়ান্ডায় অভিযান শুরু করে এবং ১৯৯৩ সালে শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলে।
১৯৯৪ সালের ৮ এপ্রিল রাতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানা এবং বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট সাইপ্রিয়েন নটারিয়ামনাকে—যাঁদের দুজনেই হুতু সম্প্রদায়ের—বহনকারী বিমান গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। ওই বিমানে থাকা সব যাত্রী নিহত হন।
এই ঘটনার জন্য আরপিএফকে দায়ী করে হুতু চরমপন্থীরা এবং গণহত্যার সুপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড শুরু করে। আরপিএফের দাবি, ওই বিমানকে গুলি করেছে হুতুরাই, যাতে তারা গণহত্যার একটি প্লট তৈরি করতে পারে। অতি সতর্কতার সঙ্গে বিরোধী পক্ষের সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকা হুতুদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তালিকা ধরে ধরে তাদের পরিবারের সদস্যসহ হত্যা করা হয়। ওই সময় প্রতিবেশীরা প্রতিবেশীদের হত্যা করে। এমনকি অনেক হুতু স্বামী তাদের তুতসি স্ত্রীদের হত্যা করেছে। এর কারণ হিসেবে হুতুরা দাবি করে, এ হত্যা না করলে তাদের (হুতু) হত্যা করা হতো।
সেই সময় প্রত্যেকের পরিচয়পত্রে গোত্রের নাম উল্লেখ থাকত। এ কারণে চরমপন্থীরা রোড ব্লক বসিয়ে পরিচয়পত্র যাচাই করত এবং তুতসিদের হত্যা করত। বেশির ভাগ সময় এসব হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে ধারালো ছুরি। হাজারো তুতসি নারীকে আটক করে যৌনদাসী করা হয়।
রুয়ান্ডার তখনকার সরকারি দল এমআরএনডির একটি যুব শাখা ছিল ইন্টেরা হামায়ি। এই যুব শাখার সদস্যরাই পরে চরমপন্থী মিলিশিয়ায় রূপ নেন। তাঁরাই বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছেন। স্থানীয় গ্রুপগুলোর হাতে অস্ত্র এবং হিটলিস্ট তুলে দেওয়া হয়, যারা ভালোভাবে জানত যে এসব মানুষকে কোথায় পাওয়া যাবে।
হুতু চরমপন্থীরা একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপন করেছিল, যার নাম ছিল আরটিএলএম। ওই বেতার কেন্দ্র এবং পত্রিকার মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হতো, লোকজনকে হত্যা করার জন্য বলা হতো। যে নামীদামি ব্যক্তিদের হত্যা করা হতো, তাঁদের নাম ওই রেডিওতে পড়ে শোনানো হতো। এই সময় ১০০ দিনের হত্যাযজ্ঞে আট লাখ তুতসি আর প্রগতিশীল হুতুকে হত্যা করা হয়।
রুয়ান্ডায় ২৫ বছর আগে শুরু গণহত্যার শিকার অধিকাংশ মানুষই ছিলেন সংখ্যালঘু তুতসি সম্প্রদায়ের। ছবি: বিবিসি

লিবিয়ার নতুন ‘গাদ্দাফি’ খলিফা হাফতার

তাকে বলা হয় দ্বিতীয় গাদ্দাফি। তিনি খলিফা হাফতার। পুরো নাম ফিল্ড মার্শাল খলিফা বেলকাসিম হাফতার। তাকে লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে বসিয়েছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে সেই খলিয়া হাফতার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকেই ক্ষমতাচ্যুত করার চক্রান্ত শুরু করেন। তাকে হত্যা মিশনে সমর্থন দিতে থাকেন। গাদ্দাফির খুব ঘনিষ্ঠ এমন একজন ব্যক্তি এখন লিবিয়ায় বহুল আলোচিত। তিনি প্রায় চার দশক ধরে লিবিয়ার রাজনীতিতে আলোচিত নাম।
এ সময়ে তার অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। তিনি সাহচর্য পেয়েছেন গাদ্দাফির মতো নেতার। আবার খলিফা হাফতারকে কখনো সরে যেতে হয়েছে দূরে। যুদ্ধবন্দি হিসেবে তাকে জেলে কাটাতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার আশীর্বাদ ছিল বা আছে তার ওপর। তাই তিনি আবার আলোচনায় ফিরেছেন। তার অধীনে থাকা বাহিনী এখন লিবিয়ার বড় বড় তেল টার্মিনালগুলো দখল করেছে। ফলে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর তবরুকের পার্লামেন্টের হাতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। এত আলোচিত ব্যক্তিকে তুলনা করা হয় লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সঙ্গে। তাকে বলা হচ্ছে লিবিয়ার সবচেয়ে বড় যুদ্ধবাজ নেতা।

লিবিয়ান-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক খলিফা হাফতার। জন্ম ১৯৪৩ সালের ৭ই নভেম্বর। তিনি লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) প্রধান। খলিফা হাফতারের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর এই অংশটি নয়টি মিউনিসিপাল কাউন্সিলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উৎখাত করেছে। এসব কাউন্সিল তারা নিয়ে এসেছে সামরিক শাসনের অধীনে। ২০১৯ সালের মে মাসে যখন লিবিয়ায় ‘সেকেন্ড লিবিয়ান সিভিল ওয়ার’ হয় তাতে যুক্ত তার বাহিনী। নির্বাচিত আইনি পরিষদ লিবিয়ান হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ-এর প্রতি অনুগত সেনাবাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ করা হয় তাকে ২০১৫ সালের মার্চে।

খলিফা হাফতারের জন্ম লিবিয়ার আজদাবিয়া এলাকায়। প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির অধীনে লিবিয়ার সেনাবাহিনীতে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৯ সালে যে সামরিক অভ্যুত্থানে গাদ্দাফি ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাতে অংশ নিয়েছিলেন খলিফা হাফতার। ১৯৭৩ সালে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে তিনি লিবিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। চাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তিনি ফাঁদে পা দিয়ে ধরা পড়েন এবং যুদ্ধবন্দি হন। এটা তখনকার প্রচণ্ড ক্ষমতাধর গাদ্দাফির কাছে ছিল মারাত্মক এক বিব্রতকর অবস্থা। গাদ্দাফি চাদ নিয়ে যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিলেন এতে তার সেই পরিকল্পনায় বড় আঘাত লাগে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক চুক্তির মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালে মুক্তি দেয়া হয় খলিফা হাফতারকে। এরপর তিনি প্রায় দু’দশক ভার্জিনিয়ার ল্যাংলিতে কাটান। এ সময়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকালীন তার অনুপস্থিতিতে ১৯৯৩ সালে জামাহিরিয়ায় অপরাধের দায়ে তাকে অভিযুক্ত করে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
২০১১ সালে লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে যে সেনাবাহিনী মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করে তাদের একটি সিনিয়র পদ দখল করেন খলিফা হাফতার। জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেস মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতা ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল ২০১৪ সালে। এ  সময় তাকে বানানো হয় লিবিয়ান আর্মির কমান্ডার। জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেস ও এর ইসলামপন্থি কট্টরবাদী মিত্রদের  বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন হাফতার।  জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে নতুন নির্বাচন অনুমোদন দিলেন তিনি। কিন্তু তারপর তা পরিণত হয় এক গৃহযুদ্ধে। ডারনা পুনর্দখলের সময় হাফতার ও তার অনুগতরা যেসব বন্দিকে হত্যা করেছেন তার জন্য খলিফা হাফতারের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনেন ডারনা সিটি কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট রামজি আল শায়েরি, আইনজীবী রায়ান গুডম্যান এবং অ্যালেক্স হুইটিং। ওদিকে খলিফা হাফতারকে বর্ণনা করা হতে থাকে ‘লিবিয়ার সবচেয়ে বড় যুদ্ধবাজ’ হিসেবে। তিনি লিবিয়া যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য প্রায় প্রতিটি অংশের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। অদ্বিতীয় সামরিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বলেও তার সুনাম আছে। তা ছাড়া তিনি লৌহমানবের মতো শাসন করেন বলেও সুখ্যাতি আছে তার।

খলিফা হাফতার আজদাবিয়াতে আল ফারজানি উপজাতি গোত্রে জন্মেছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি আজদাবিয়াতে আল হুদা স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণ করতে ছুটে যান ডারনাতে। সেখানে ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা করেন। এরপরেই ১৯৬৪ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর তিনি বেনগাজি মিলিটারি ইউনিভার্সিটি একাডেমিতে যোগ দেন। সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন ১৯৬৬ সালে। ১৯৭০ এর দশকে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। পররাষ্ট্র বিষয়ক কর্মকর্তাদের জন্য তিন বছরের একটি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এমভি ফ্রানজি মিলিটারি একাডেমি থেকে। অধিকতর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন তিনি মিশর থেকে।

গাদ্দাফি সরকারে হাফতারের দিনগুলো
১৯৬৯ সাল। তখন খলিফা হাফতার একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা। এ সময় লিবিয়ার রাজা ইদ্রিসকে ক্ষমতাচ্যুত করেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। তার এই অভ্যুত্থানে অংশ নেন হাফতার। এর অল্প পরেই হাফতার হয়ে ওঠেন গাদ্দাফির একজন শীর্ষ সামরিক অফিসার। ১৯৭৩ সালে ইসরাইলের সিনাই উপত্যাকা দখল নিয়ে মিশরের সঙ্গে যে যুদ্ধ হয় তাতে মিশরকে সমর্থনকারী লিবিয়ান বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন হাফতার। ফ্রি ইউনিয়নিস্ট অফিসারস-এর অন্য সদস্যদের মতো হাফতারও ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পরেই লিবিয়া শাসন করে রেভ্যুলুশনারি কমান্ড কাউন্সিল। এর সদস্য ছিলেন হাফতার। পরে তাকে বানানো হয় গাদ্দাফির সেনাপ্রধান। ১৯৮০র দশকে চাদ ও লিবিয়ার মধ্যে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধের লিবিয়ার সেনাদের কমান্ডার ছিলেন খলিফা হাফতার। কিন্তু ওই যুদ্ধে লিবিয়া পরাজিত হয়।

এরপর হাফতারের অধীনে থাকা সেনা সদস্যদেরকে লিবিয়া ফিরে যাওয়ার দাবি তুললেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। কিন্তু এর পরিবর্তে তাদেরকে জায়েরে উড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে হাফতারের অধীনে থাকা সেখানকার সেনাদের অর্ধেক লিবিয়া ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮৭ সালে হাফতার ও তার অফিসারদের একটি গ্রুপ যুক্ত হন ন্যাশনাল ফ্রন্ট ফর সালভেশন অব লিবিয়ার (এনএফএসএল) সাথে। এটি হলো যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বিরোধীদের একটি গ্রুপ। ১৯৮৮ সালের ২১ শে জুন তিনি এনএফএসএলের সামরিক শাখার ঘোষণা দিলেন। এর নাম দেয়া হলো লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। এর নেতৃত্বে রইলেন খলিফা হাফতার। যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জায়েরে আর অর্থনৈতিক সহায়তা আসার লক্ষণ দেখা গেল না তখন জায়ের থেকে বাকি সদস্যদেরকে কেনিয়া পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে তাদেরকে অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৯০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সমস্যা সমাধানে মাঠে নামে। তারা মধ্যস্থতা করে। যুক্তরাষ্ট্রের শরণার্থী বিষয়ক কর্মসূচির অধীনে হাফতার ও তার ৩০০ সেনা সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পথ করে দেয়া হয়।

এরপর আসে ১৯৯৬ সালের মার্চ। খলিফা হাফতারকে সেনা প্রধান বানিয়েছিলেন যে মুয়াম্মার গাদ্দাফি তার বিরুদ্ধে এক উত্তাল আন্দোলনে অংশ নেন হাফতার। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হন তিনি। হাফতার ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াতে। ২০০৭ সাল পর্যন্ত সেখানকার ফলস চার্চে বসবাস করতে থাকেন। এরপর চলে যান ভার্জিনিয়ার ভিয়েনাতে। সেখানে অবস্থান করে তিনি সিআইএ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে অব্যাহতভাবে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতে থাকেন। মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করার বেশ কিছু উদ্যোগে ছিল তার অব্যাহত সমর্থন।

২০১১ সালে লিবিয়ায় গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থান শুরু হয়। খালিফা হাফতার এসময় দেশে ফিরে আসেন। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহী বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক ছিলেন তিনি। তবে গাদ্দাফির পতনের পর ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাফতারের কথা আর তেমন শোনা যায়নি। ২০১৪ সালে হঠাৎ আবার খালিফা হাফতারকে দেখা গেল টেলিভিশনে। সেখানে তিনি তার ভাষায়, জাতিকে রক্ষার এক পরিকল্পনা হাজির করলেন এবং নির্বাচিত পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানালেন। তখনও পর্যন্ত জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেস (জিএনসি) নামে পরিচিত লিবিয়ার পার্লামেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। খালিফা হাফতার এমন এক সময় এই নাটকীয় ঘোষণা দেন, যখন কিনা লিবিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বেনগাজি এবং পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য শহর কার্যত আল কায়েদার সহযোগী একটি সংগঠন আনসার আল শরিয়া এবং অন্যান্য জঙ্গি ইসলামী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে। তারা লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল জুড়ে তখন সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের হত্যা করছে, বোমা হামলা চালাচ্ছে।
খলিফা হাফতার যে পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছিলেন, সেটি কাজে পরিণত করার মতো যথেষ্ট সমর্থন তার ছিল না। তিনি আসলে তখন লিবিয়ায় যে ব্যাপক জন-অসন্তোষ সেটিরই প্রতিধ্বনি করার চেষ্টা করছিলেন। বিশেষ করে বেনগাজিতে, যেখানে জেনারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ছিল। কারণ তারা জঙ্গি ইসলামী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছিল না।
খলিফা হাফতার নিজের এলাকায় জনপ্রিয় হলেও, লিবিয়ার অন্য অঞ্চলে তার তেমন সমর্থন ছিল না। বরং গাদ্দাফির সঙ্গে যে তার একসময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তিনি যে আসলে যুক্তরাষ্ট্রের লোক, সেটাই লোকে মনে রেখেছিল।
অন্যদিকে, ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোও খলিফা হাফতারকে পছন্দ করতো না। কারণ তিনি এদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

২০১৪ সালের মে মাসে খলিফা হাফতার বেনগাজি এবং লিবিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে ইসলামী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। তার এই অভিযানের নাম দেয়া হয় অপারেশন ডিগনিটি। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে লিবিয়ার নির্বাচিত পার্লামেন্ট হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ, যা কিনা জেনারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের জায়গা নিয়েছিল, তারা খ০িলফা হাফতারকে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অধিনায়ক নিযুক্ত করে। প্রায় এক বছর ধরে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে বেনগাজির ইসলামী জঙ্গিদের লড়াই চলে। শুরুতে লড়াইয়ে তারা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। তবে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা বেনগাজির বেশিরভাগ এলাকা থেকে জঙ্গিদের হটিয়ে দেয়। ২০১৬ সালের মে মাসে তারা আরও সাফল্য পায়। ইসলামী জঙ্গিদের তারা এবার শুধু বেনগাজির উপকন্ঠ নয়, ২৫০ কিলোমিটার পূর্বের ডারনা শহর পর্যন্ত হটিয়ে দেয়।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে অপারেশন সুইফট থান্ডার শুরু করে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। উদ্দেশ্য ছিল লিবিয়ার গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোর দখল নেয়া। তখন পর্যন্ত এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো 'পেট্রোলিয়াম ফ্যাসিলিটিজ গার্ড' নামের একটি বাহিনী। এই সশস্ত্র বাহিনী ছিল জাতিসংঘের সালিশে গঠিত 'গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড' বা জিএনএ'র অনুগত। লিবিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সব তেল টার্মিনাল এদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় হাফতারের নেতৃত্বে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি।
এর স্বীকৃতি হিসেবে খালিফা হাফতারকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল থেকে পদোন্নতি দিয়ে ফিল্ড মার্শাল করা হয়। তবে খালিফা হাফতার নাকি জিএনএ'র কাজ-কর্মে অখুশি ছিলেন। কারণ এই সরকার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দিয়েছিল ইব্রাহিম আল বারগাতি বলে এক অফিসারকে।

মিসরাতা ভিত্তিক যে মিলিশিয়া বাহিনী, তাদের ওপর খুব বেশি নির্ভর করতো জিএনএ। এই মিলিশিয়াদের সঙ্গে নাকি আবার ইসলামী জঙ্গিদের সম্পর্ক ছিল। এনিয়েও অখুশি ছিলেন খালিফা হাফতার।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে লিবিয়ায় একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের জন্য চুক্তি হয়। তাতে বলা হয়েছিল, হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ বা পার্লামেন্ট নতুন সরকার গঠিত হওয়ার এক মাসের মধ্যে এটিকে অনুমোদন দেবে। কিন্তু কয়েকবার চেষ্টা করেও কোরামের অভাবে এই পার্লামেন্টের কোন অধিবেশন শুরু করা যায়নি।
গণমাধ্যমের খবরে তখন এজন্যে দোষারোপ করা হচ্ছিল খালিফা হাফতারকে। তিনি নাকি তার অনুগত পার্লামেন্ট সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন পার্লামেন্টে না যেতে, যাতে করে নতুন মন্ত্রিসভা এই পার্লামেন্টের অনুমোদন না পায়।

খালিফা হাফতার অবশ্য বলছিলেন, তিনি পার্লামেন্টের যে কোন সিদ্ধান্ত মেনে চলবেন। কিন্তু নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে খালিফা হাফতার খুব খোলামেলাভাবে কখনো কিছু বলেননি। তবে ধারণা করা হয়, তিনি নতুন জাতীয় ঐক্যের সেনাবাহিনীতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখতে চান।

জনগণ কেন শাস্তি পাবে? by সাজেদুল হক ও মোহাম্মদ ওমর ফারুক

উনাদের ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। কখনও কখনও বলা হয়েছে, তারা সরকারের ভেতর আরেক সরকার। কথা হয়েছে অনেক। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সেই পুরনো ভূমিকাতেই আবার দেখা  যাচ্ছে তাদের। শাজাহান খান। সরকারি দলের নেতা। সাবেক মন্ত্রী।
পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ নেতা। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে গঠিত কমিটিরও প্রধান করা হয়েছিল তাকে। আরেকজন মশিউর রহমান রাঙ্গা। জাতীয় পার্টির মহাসচিব। বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ। কিন্তু তারও সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি পরিবহন মালিকদের সংগঠনের শীর্ষ নেতা।
সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলছে অনেকদিন হলো। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। নেয়া হয়েছে নানা উদ্যেগ। কিন্তু এসব উদ্যোগ কার্যকরে সবসময়ই বাধা এসেছে শ্রমিক-মালিকদের পক্ষ থেকে। আর এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন এই সংগঠন দুটির শীর্ষ নেতারা। বিশেষকরে শাজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা সবসময়ই ছিলেন আলোচনায়। গত বছর দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে স্কুল শিক্ষার্থীরা। সেসময় শাজাহান খানের একটি হাসিখুশি ছবি ভাইরাল হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যা শিক্ষার্থীদের আরও বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। আন্দোলনের মুখেই সড়ক আইনে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। নতুন আইন সবেমাত্র কার্যকর শুরু হয়েছে। এ আইনে শাস্তির মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ নিয়ে সুযোগ রয়েছে আলোচনার। চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে আদালতেও।
সরকার সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী নেতা হিসেবে শাজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গার সুযোগ রয়েছে সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনার। কিন্তু সে পথে তারা হাটেননি। নেয়া হয়েছে সে পুরনো কৌশলই। অঘোষিত ধর্মঘটে জিম্মি করা হয়েছে জনগণকে। নিজেরা গাড়ি পরিচালনা না করেই শ্রমিকরা ক্ষ্যান্ত হননি। যারা রাস্তায় নেমেছেন তাদের নাজেহাল করা হয়েছে। মারধর আর লাঞ্চনার শিকার হয়েছেন গাড়ি নিয়ে বের হওয়া চালকরা। এতো রীতিমতো নৈরাজ্য। আর এ নৈরাজ্যের পেছনে ইন্দনদাতা হিসেবে দুই শীর্ষ শ্রমিক ও মালিক নেতার দিকেই আঙ্গুল তুলছেন সবাই। শাজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা স্পষ্টতই ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিবিসি বাংলাকে তারা জানিয়েছেন, তাদের দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ধর্মঘট বা কর্মবিরতির কোন কর্মসূচি নেয়া হয়নি। কিন্তু তারা একইসঙ্গে এটাও জানিয়েছেন যে, শ্রমিকদের দাবিকে তারা সমর্থন করেন। সরকারের পক্ষ থেকে শুরুতে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জনগণকে দুর্ভোগে না ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আপনারা জনগণকে শাস্তি দেবেন না। শাস্তির ভয়ে জনগণকে শাস্তি দেবেন না। জনগণকে দুর্ভোগে ফেলবেন না প্লিজ।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবারই প্রথম নয়, প্রভাবশালী নেতাদের ইন্ধনে বারবার জনগণকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত তারা থেকে যাচ্ছেন আইনের উর্ধ্বে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণ আর কতবার এ ধরনের শাস্তি পাবেন?
এটাতো ধর্মঘট না: শাজাহান খান
ধর্মঘট তো ডাকে নাই। ধর্মঘট হচ্ছে নোটিশ দিয়ে, টাইম দিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়ে যেটা করে সেটাই হচ্ছে ধর্মঘট। আর এটা হচ্ছে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ সমাবেশ, বিক্ষিপ্তভাবে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছে। প্রচারের অভাব, অপপ্রচার প্রপাগান্ডাসহ এসমস্ত কারণেই এটা হয়েছে। মানবজমিনকে এসব কথা বলেন শাজাহান খান। ধর্মঘটে জনগণের ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ থেকে আমরা আরো বেশি ভোগান্তির শিকার। শাস্তি দিবে আমাদের লোকজনদের। তবে আমাদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সমর্থনও করিনি, বিরোধিতাও করিনি। সমর্থন জানাইনি এই জন্য, ফেডারেশনের মিটিং ছাড়া তো আমি সমর্থন করতে পারি না। আমরা ফেডারেশনের পক্ষ থেকে মিটিং করে তারপর জানাবো। তবে বিরোধিতা না করারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিছু ভুল ভ্রান্তি, ভুল ধারণাসহ আইনের কিছু অসঙ্গতি আছে এসব কারণে তাদের আমরা বিরোধিতাও করিনি।
তিনি পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন ,তাদের প্রচারণারওও কিছু ঘাটতি রয়েছে। তাদের লিফলেটগুলোতে দেখা যায়, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যত কঠিন সাজাগুলো আছে সেগুলো তারা উপস্থাপন করেছে। এই আইনে ভালো দিকও তো আছে। সেগুলো কিন্তু  কোনো জায়গায় বলা হয়নি। পথচারীদের নিয়ে আইনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে সেগুলোও কিন্তু বলা হয়নি। এটা শ্রমিকদের অস্তিত্বের প্রশ্ন, কোন আইনে তাদের যাবজ্জীবন হবে, কোন আইনে তাদের আরও বড় শাস্তি হবে সেটা নিয়ে তো তারা উদ্বিগ্ন হবেই। তাছাড়া এখনো শ্রমিকরা এসব বিষয় নিয়ে পরিষ্কার না। এ জন্যই তারা বিক্ষোভ করেছে। রাস্তায় তো তাদেরও চলতে হবে, এটা তাদের রুটিরুজির ব্যপার। আমাদের দুই দিন মিটিং হবে কাল (আজ) এবং পরশুদিন। মিটিংয়ে বসে তারপর সিদ্ধান্ত হবে এবং আমরা গণমাধ্যমে জানাবো। মিটিং চলাকালীন দুইদিন কি ধর্মঘট থাকবে এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন , বিষয়টি কালকে ( আজ) ঠিক হবে।
মানুষকে জিম্মি করে ধর্মঘট করবে এটা হতে পারে না: নাসিম
ওদিকে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দেশের মানুষেকে জিম্মি করে যারা পরিবহন ধর্মঘট করছে তাদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের জনগণকে যারা জিম্মি করছে, শক্ত হাতে তাদের মোকাবিলা করা হবে। ক্যাসিনোকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের যেমন কোনো ছাড় দেয়া হয়নি, তেমনি এদেরকেও ছাড় দেয়া হবে না। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। পরিবহন শ্রমিক নেতা ও মালিকদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এ সদস্য বলেন, কোনো ঘাতক চালক নিজের ইচ্ছেমতো কাউকে হত্যা করবে, এটা দেশের জনগণ মেনে নেবে না। তারা এখন সুযোগ বুঝে ধর্মঘট করছে। যারা দেশ ও দেশের মানুষকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে, তাদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সড়ক পরিবহন আইন হওয়ার আগে শ্রমিক ও মালিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য অনেক আলোচনা করা হয়েছে। এরপর এক বছর পর্যালোচনায় রেখে এই আইন পাস করা হয়েছে। এখন জনগণকে জিম্মি করে ধর্মঘট করবে,এটা হতে পারে না। সংগঠনের কার্যনির্বাহী সভাপতি ফালগুনী হামিদের সভাপতিত্বে তথ্যপ্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

একেই বলে গণতন্ত্র by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অনেকটা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে তবেই মনোনয়ন পেতে হয় দল থেকে। তাতে কুপোকাত হয়ে পড়েন অনেক বাঘা বাঘা নেতা। দলীয় এমন মনোনয়ন পাওয়াকে প্রাইমারি নির্বাচন বলা হয়। দৃশ্যত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মূল পর্বের লড়াইয়ের চেয়ে এই লড়াই কোনো অংশে কম নয়। ব্যাপারটা এমন নয় যে, আপনি একটি দলের শীর্ষ নেতা। আপনি বলেন আর নাই বা বলেন- আপনিই দলের প্রার্থী। ফলে দল থেকে আর কারো মাথা উঁচু করার সাধ্য নেই।
ব্যাস, আপনিই দলীয় প্রার্থী। কিসের আবার প্রাইমারি! যুক্তরাষ্ট্রে এমনটা নেই বলেই সম্ভবত তাদেরকে গণতান্ত্রিক বলা হয়। কারণ, গণতান্ত্রিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একটি দল থেকে একজন প্রার্থীকে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে তবেই মূল পর্বে আসতে হয়।
আগামী বছর সেখানে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কিন্তু প্রধান দুই দল রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট শিবিরে এর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বিগত নির্বাচনের অব্যবহিত পর থেকেই। বিশেষ করে অনাকাঙ্খিতভাবে ডেমোক্রেট দল থেকে শক্তিধর প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন হেরে যাওয়ার পর পরই আলোচনা চলতে থাকে কে হবেন পরবর্তী ডেমোক্রেট প্রার্থী। সম্ভাব্যরা তাদের টার্গেট ঠিক করে প্রস্তুতি নিতে থাকেন। প্রায় দু’বছর বাকি থাকতেই তারা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন। ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতার। ফলে এবার ডেমোক্রেট দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা অনেক বেশি। এরই মধ্যে তাদের প্রাথমিক পর্যায়ের বিতর্ক হয়ে গেছে অক্টোবরে। আজ বুধবার আবার আটলান্টায় তাদেরকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সেখানে মঞ্চে বিতর্ক করবেন তারা। স্থানীয় সময় রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ওই বিতর্ক সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে। এর সহ-আয়োজক এমএনএনবিসি এবং ওয়াশিংটন পোস্ট।
আজকের বিতর্কে অংশ নিচ্ছেন শক্তিধর প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ম্যাচাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন, ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, ইন্ডিয়ানার সাউথ বেন্ড, মেয়র পিটি বুটিগিত ও ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমলা হ্যারিস। তবে অক্টোবরের ডিবেট বা বিতর্কের চেয়ে এবার কিছুটা পরিবর্তন রয়েছে। গত মাসের বিতর্কে ছিলেন ১২ জন প্রার্থী। কিন্তু আজকের বিতর্কে থাকবেন শুধু ১০ জন। কারণ, নির্বাচনী লড়াই থেকে নিজেকে ১লা নভেম্বর প্রত্যাহার করে নিয়েছেন টেক্সাসের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য বেটো ও’রোর্কি। প্রথমবারের মতো নির্বাচনী বিতর্ক মিস করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহায়ন ও নগর উন্নয়ন বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী জুলিয়ান ক্যাস্ত্রো। আবার কিছু নতুন প্রার্থী এই নির্বাচনী দৌড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। তার মধ্যে আছেন ম্যাচাচুসেটসের গভর্নর ডেভাল প্যাট্রিক। তিনি মধ্য নভেম্বরের দিকে নির্বাচনী লড়াইয়ের ঘোষণা দেন। এছাড়া প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন নিউ ইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ।

আজ বুধবার (বাংলাদেশের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল) আটলান্টার টেলার পেরি স্টুডিওতে হবে বিতর্ক। এই চলচ্চিত্র প্রযোজনা বিষয়ক স্টুডিওটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাটা টেলার পেরি। সেখান থেকে বিতর্ক সরাসরি সম্প্রচার করবে এমএসএনবিসি। সরাসরি অনলাইনে দেখা যাবে এমএসএনবিসি ডট কম এবং ওয়াশিংটন পোস্ট ডট কম-এ। এ ছাড়া এই বিতর্ক দেখা যাবে এনবিসি নিউজে, ওয়াশিংটন পোস্টের ফোন অ্যাপে।

বিতর্কে অংশ নেয়া প্রার্থীদের সম্পর্কে এখানে সংক্ষেপে তথ্য তুলে ধরা হলো:
জো বাইডেন (৭৬): যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাস সৃষ্টিকারী সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন জো বাইডেন। তিনি ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেলাওয়ার রাজ্য থেকে নির্বাচিত ডেমোক্রেট দলীয় সিনেটর।
সিনেটর কোরি বুকার (৫০): কোরি বুকার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি থেকে নির্বাচিত সিনেটর। তিনি ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নিওয়ার্কের মেয়র ছিলেন। তারপর থেকে তিনি নিউ জার্সি থেকে প্রথম আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন সিনেটর।
পিটি বুটিগিগ (৩৭): ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেভি রিজার্ভের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন বুটিগিগ। ২০১২ সাল থেকে তিনি ইন্ডিয়ানার সাউথ বেন্ড থেকে নির্বাচিত মেয়র। তিনি সমকামী। যদি প্রাইমারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনোনয়ন পান তাহলে তিনিই হবেন বড় কোনো রাজনৈতিক দল থেকে প্রকাশ্যে আসা প্রথম সমকামী প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী।
তুলসি গাব্বাড় (৩৮): ২০১৩ সাল থেকে হাওয়াইয়ের সেকেন্ড ডিস্ট্রিক্ট থেকে প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। তিনি প্রথম আমেরিকান সামোয়া এবং কংগ্রেসে প্রথম হিন্দু সদস্য। ইরাক যুদ্ধের একজন যোদ্ধা তিনি।
কমলা হ্যারিস (৫৫): ক্যালিফোর্নিয়ার রাজনীতির মধ্য দিয়ে উত্থান ঘটে তার। তিনি ২০০৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সান ফ্রান্সিকোতে ডিস্ট্রিক্ট এটর্নি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনিই ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রথম নারী এটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর।
এমি ক্লুবুচার (৫৯): ২০০৬ সালে মিনেসোটা থেকে প্রথম নারী হিসেবে তিনি সিনেটর নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি মিনেসোটার সবচেয়ে জনবহুল এলাকা হেনেপিন কাউন্টিতে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কাউন্টি এটর্নি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বার্নি স্যান্ডার্স (৭৮): তিনি স্বঘোষিত ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট। ২০০৭ সাল থেকে তিনি ভারমন্টের সিনেটর। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি ভারমন্টের কংগ্রেশনাল প্রতিনিধি ছিলেন। ২০১৬ সালে ডেমোক্রেটিক দল থেকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন চান। কিন্তু প্রাইমারিতে তিনি হেরে যান হিলারি ক্লিনটনের কাছে।
টম স্টেয়ার (৬২): তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন নেক্সটজেন আমেরিকা অ্যান্ড নিডস টু ইমপিচ নামের রাজনৈতিক গ্রুপ। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রচারণায় ডিজিটাল মাধ্যম ও টেলিভিশনে নিজের লাখ লাখ ডলার খরচ করেছেন।
এলিজাবেথ ওয়ারেন (৭০): ২০১৩ সালে ম্যাচাচুসেটস থেকে প্রথম নারী সিনেটর নির্বাচিত হন তিনি। এর আগে তিনি আইন শাস্ত্র পড়াতেন। এর মধ্যে রয়েছে ঋণখেলাপির বিষয়।
অ্যানড্রু ইয়াং (৪৪): তিনি অটোমেশনের হুমকির বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ভেনচার ফর আমেরিকা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে সৃষ্টি করেছেন বহু কর্মসংস্থান।

আজকের বিতর্কে প্রার্থীরা দাঁড়াবেন বাম থেকে ডান দিকে। এই অর্ডারে সর্ববামে থাকবেন বুকার, গাব্বাড়, ক্লুবুচার, বুটিগিগ, ওয়ারেন, বাইডেন, স্যান্ডারস, হ্যারিস, ইয়াং এবং স্টেয়ার। তবে জরিফে সবচেয়ে বেশি সামনে এগিয়ে থাকা জো বাইডেন এবং এলিজাবেথ ওয়ারেন দাঁড়াবেন মাঝখানে।

কিউই ফলের বীজ থেকে চারা পাবেন যেভাবে

কিউই ফল আমাদের দেশে খুব বেশি পাওয়া যায় না। শহরের সুপার শপগুলোতে ইদানিং ফলটি দেখতে পাওয়া যায়। দেশের কিছু সৌখিন ফল চাষি তাদের বাগানে কিউই ফল চাষ করছেন। মূলত কিউই ফলের বীজ থেকেই চারা তৈরি করতে হয়। আজ জেনে নিন বীজ থেকে চারা পাওয়ার উপায় সম্পর্কে-
বৈশিষ্ট্য: চীন দেশের ফলটি দেখতে অনেকটা লেবুর মতো। সবুজ এ ফল সালাদসহ নানা সবজিতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এমনিতেও খাওয়া যায়। নিউজিল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া ও গ্রিসে ফলটি বেশ জনপ্রিয়। গাছ লাগানোর পরে ফল হতে সাধারণত ২-৩ বছর সময় লাগে। একবার ফলন শুরু হয়ে গেলে তেমন খরচ নেই।
বীজ থেকে চারা: প্রথমে পাকা ফলটি কেটে নিন। ফলের ভেতরে ছোট ছোট অসংখ্য বীজ রয়েছে। সেই বীজগুলো সংগ্রহ করে নিন। আঠালো আঁশের ভেতর থেকে বীজগুলো আলাদা করতে ছোট একটি বাটি নিন। বাটিতে এবার পানি ঢালুন। পানির মধ্যে বীজগুলো রাখুন। আঠালো আঁশ ছাড়িয়ে বীজ আলাদা করুন।
এরপর বাটির পানি ফেলে দিন। বীজ প্রক্রিয়ার জন্য এক টুকরো টিস্যু নিন। টিস্যুটি পানিতে ভিজিয়ে নিন। টিস্যুর ওপর বীজগুলো ঢালুন। ঢেলে বীজগুলো ছড়িয়ে নিন। বীজ ছড়ানোর পর টিস্যুটি মুড়িয়ে নিন। এরপর ছোট একটি পটে রেখে ঢেকে দিন। এভাবে ২-৩ সপ্তাহ রেখে দিন।
২-৩ সপ্তাহ পর পটটি খুললে টিস্যুর ভেতরে অঙ্কুর দেখতে পাবেন। অঙ্কুরগুলো বিভিন্ন টবে লাগিয়ে নেবেন। লাগানোর পর টবে পানি দিয়ে দেবেন। এভাবেই ধীরে ধীরে পেয়ে যাবেন কিউই ফলের চারা।

যৌনতা কমছে দেশে দেশে

যৌনতা প্রাকৃতিক কিছু নয়, বরং মনুষ্য ডিসকোর্সের (আলাপ-আলোচনা) উপজাত। এমন তত্ত্ব দিয়েছিলেন দার্শনিক মিশেল ফুকো। এক্ষেত্রে তার পর্যবেক্ষণ ছিল, মানুষ যৌনতা নিয়ে প্রচুর কথা বলে। নিজের চার খণ্ডের গ্রন্থ ‘দ্য হিস্টরি অব সেক্সুয়ালিটি’তে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা নিজেদের বুঝ দেই যে, যৌনতা নিয়ে আমাদের যত আলোচনা, তা কখনোই যথেষ্ট নয়। এটি সম্ভব যে, যৌনতা বিষয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর ও সবচেয়ে অধৈর্য সমাজ বোধ হয় আমাদেরই।’ মিশিগানের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যৌনতা ও ডেটিং নিয়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে, এই কলামিস্টের মনে হয়েছে যে, তিনি জানেন কেন যৌনতা নিয়ে আমাদের আলাপ শেষই হচ্ছে না। ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের লেক্সিংটন ব্লগের লেখক এভাবেই যৌনতা নিয়ে সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, মানুষের এমন ...আর খুব আচরণই অবশিষ্ট আছে যা ব্যাখ্যা করা এত কঠিন। আর এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তো নয়ই। নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্লগার লেক্সিংটনের সফরের একটি কারণ ছিল এই যে, জাপান ও কিছু ধনী দেশের মতো আমেরিকায়ও তরুণ-তরুণীরা আগের তুলনায় অনেক কম যৌনক্রিয়ায় মিলিত হচ্ছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি গবেষণাও প্রকাশিত হয়েছে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী আমেরিকানদের মধ্যে ১২ মাসে সেক্স করেন নি, এমন দাবি করা ব্যক্তিদের সংখ্যা এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর এমন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ শতাংশে। যৌনতা নিয়ে বহু সামাজিক বিধিনিষেধ পশ্চিমা সমাজে এই এক দশকে গত হয়েছে। তরুণ বয়সী আমেরিকানরা তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে ধর্মকর্ম করেন কম। যৌন অভিগামিতা প্রকাশে তারা পূর্বসূরিদের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করেন। এ ছাড়া স্মার্টফোনে বিনামূল্যে অবারিত পর্নো দেখার কারণে তাদের মধ্যে যৌনতা নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর প্রবণতাও বেশি। কিন্তু তারপরও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ার হার কমেছে! নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ‘ম্যারেজ ১০১’ কোর্সের পরিচালক ক্লিনিক্যাল মনোবিদ অ্যালেক্সান্দ্রা সলোমন অনেকটা বিস্ময়ের সুরে বলেন, ‘আপনার হাতের মুঠোয় এখন পর্নোর ভাণ্ডার।’ কিন্তু তার এই পর্যবেক্ষণ ক্লাসে খুব একটা মজার উদ্রেক করলো না। ফলে লেক্সিংটনের কাছে এই শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে সবচেয়ে বিস্ময়কর যা মনে হলো তা হলো, তারা যৌনতা নিয়ে অনেক বেশি স্পষ্টবাদী ও সংকোচহীন। নর্থওয়েস্টার্নের মতো একটি অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌনতা নিয়ে পড়াশুনা করেন তারা। এই শিক্ষার্থীদের পরিচয়ে অনেক বৈচিত্র্য আছে। কেউ সমকামী, কেউ বি-সমকামী। কেউ শ্বেতাঙ্গ, কেউ কৃষ্ণাঙ্গ। এদের প্রায় অর্ধেকই এসেছেন ধর্মপরায়ণ পরিবার থেকে। কিছু এসেছে অভিবাসী পরিবার থেকে। কিন্তু প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই যৌনতা বিষয়ে তাদের পছন্দ, অপছন্দ, উদ্বেগ নিয়ে কথা বলতে বেশ আগ্রহী মনে হয়েছে। পর্নোর ব্যবহার, শারীরিক লজ্জা এবং প্রকাশ্যে সৌন্দর্য্য চর্চা করার ক্ষেত্রে এই মিলেনিয়াল প্রজন্মের মধ্যে যে অবসেশন তৈরি হয়েছে, তার নেপথ্যে এই দুয়ের সম্পর্ক- এই সব নিয়ে তারা আলোচনা করেছে। এমন কি কিছু মাত্রায়, তারা যেন তাদের প্রজন্মেরই প্রতিনিধিত্ব করেছে। যৌনতা নিয়ে কুণ্ঠা যেন কোনো সমস্যাই নয়। তবে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যৌনতা নিয়ে আগ্রহ কমার সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত খুবই সরল। সেটা হলো, সিঙ্গেলদের চেয়ে বিবাহিতরাই বেশি যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হন। আর আমেরিকানরা বিয়ে করছে দেরি করে। এই হলো একটি ব্যাখ্যা। অর্থনৈতিক টানাপড়েন আরেকটি কারণ। এটি কিন্তু কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় যে, আমেরিকার যুবক-যুবতীদের মধ্যে যৌনতায় কম জড়ানোর প্রবণতা দেখা দিয়েছে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে। কিছুটা এই কারণেই অনেকে এখনো তাদের পিতামাতার সঙ্গে থাকেন। ক্যারিয়ার নিয়ে সম্ভাবনা কম থাকলে আত্মবিশ্বাসে যে ঘাটতি দেখা দেয়, যেমনটা অনেক জাপানির ক্ষেত্রে দুঃখজনকভাবে দেখা গেছে, সেটার কারণেও গণ যৌন-অনাগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। আমেরিকার অর্থনীতিতে সম্প্রতি জোয়ার এলেও, এখন তা অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে। এমন কি নর্থওয়েস্টার্নের শিক্ষার্থীদের মতো সফলদের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। এটি ভীষণ বিস্ময়কর যে, প্রচুর শিক্ষার্থী ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন যে, সেই সময়কার করুণ স্মৃতিই তাদেরকে নিজ ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দিতে প্ররোচিত করেছে। এজন্য প্রয়োজনে অনেকে রোমান্টিক সম্পর্ক একেবারে এড়িয়ে চলতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না। এক নারী সম্ভবত আবার এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন। খোঁচা দেয়ার সুরে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা এখন আর বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চাই না। তো আমরা করছি কী তাহলে?’ কিন্তু তারপরেও আমেরিকার যৌন অনাগ্রহের যে তীব্রতা, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কেন এই অনাগ্রহ পুরুষদের মধ্যে বেশি কাজ করে, তারও কোনো জবাব নেই। ২০০৮ সালের পর থেকে আজ অবধি, যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হচ্ছেন না, ৩০ বছরের কমবয়সী এমন পুরুষদের সংখ্যা প্রায় ৩ গুণ বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে এমন নারীদের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। এর নানা ধরনের কারণ অনেকে অনুমান করেছেন। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য থেকে কয়েকটি কারণের স্বপক্ষে যুক্তিও পাওয়া যায়। এদের অনেকেই মনে করেন, প্রযুক্তির ওপর অতি নির্ভরতার ফলে পুরুষদের সামাজিক দক্ষতা মিইয়ে গেছে। অতিরিক্ত পর্নো দেখার ফলে তারা বাস্তবতা থেকে পালানোর এক ধরনের পথও খুঁজে পেয়েছেন। তবে সবচেয়ে গ্রহণীয় উত্তর হতে পারে এই যে, তরুণরা ক্রমান্বয়ে ডেট করতে বেশি অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন। এর কারণ কী? প্রায়ই এ জন্য দায়ী করা হয় কলেজ প্রাঙ্গণের কথিত ‘হুক আপ সংস্কৃতি’কে। হুক আপ হলো, সম্পর্কের অঙ্গীকারে না জড়িয়েও কারও সঙ্গে শুধু যৌনতায় লিপ্ত হওয়া। কিন্তু নব্বইয়ের দশকেও আমেরিকায় সাধারণ সেক্স ও ডেটিং-এর অস্তিত্ব ছিল। এ ছাড়া সঙ্গী না বানিয়েই একে অপরের সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হচ্ছে এমন মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে বলাও সহজ। নর্থওয়েস্টার্নের শিক্ষার্থীদের অর্ধেকই বলেছে, তারা জীবনে এমনটা খুবই কম করেছে বা কখনই করেনি। তারা ডেট করার অনাগ্রহের পেছনে যেসব কারণ বলেছে তার মধ্যে একটা হলো, ডেট কীভাবে এগিয়ে যাবে তা নিয়ে পুরুষদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করা। অনেকের কাছেই পানশালায় কারও সঙ্গে আলাপ করার দৃশ্যকল্প ভয়ঙ্কর না হলেও, আপত্তিকর মনে হয়েছে। একজন পুরুষ শিক্ষার্থী বলেন, ‘কারও সঙ্গে কথা বলার উদ্দেশ্য যে যৌনতা-প্ররোচিত, সেই উদ্দেশ্য আবার প্রকাশ করা? এটা বেশ ভীতিজনক।’ সুতরাং, সমস্যাটা সম্ভবত হলো এই যে, সম্ভাব্য সঙ্গীর প্রত্যাশা ও চাহিদা নিয়ে ভীষণ এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ কাজ করে অনেকের মধ্যে। বিশেষ করে, কোনো সম্পর্কের ভিত্তি, সম্পর্কের অগ্রগতির প্রত্যেক ধাপে উভয় পক্ষের সম্মত হওয়ার ওপর শিক্ষার্থীরা অতিমাত্রায় যে গুরুত্ব আরোপ করেছে, সেখানেই হয়তো এই সমস্যার সূত্র লুকিয়ে আছে। এটিই হয়তো এই সমস্যার কারণ, আবার প্রতিফলক। ডেটিং অ্যাপস, যেগুলো প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই ব্যবহার করে, সেগুলো হয়তো এই সমস্যা কিছুটা উপশম করতে পারে। আবার এই অনাগ্রহের একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, নারীদের বর্ধিত ক্ষমতায়ন, যৌন রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন, মি-টু ধারার হয়রানি করার অভিযোগ ওঠার আশঙ্কা ইত্যাদি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগে দুর্বল এমন তরুণ আমেরিকানরা সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এক গোলমেলে খেলায় পড়েছে। ফলে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, তারা ভিডিও গেইম নিয়েই পড়ে আছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি এমন থাকবে না। অর্থনীতি এখন শক্তিশালী। পপুলার কালচারের গতিধারা পরিবর্তিত হবে। আর যখন আমেরিকান তরুণ-তরুণীরা সমতা-ভিত্তিক সম্পর্কে আরো অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, তখন তারা রোমান্সের অস্পষ্টতা ও ঝুঁকি নিয়ে আরো স্পষ্ট ধারণা পাবে। পরিস্থিতি আরো ভালো করার স্বার্থে, তারা হয়তো তাদের ফোনটা একটু নামিয়ে, অন্যের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, এমনকি একটু আধটু মজা করার চেষ্টা করেও দেখতে পারে। (ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন)

সুবর্ণবন্দরের খোঁজে by হাবীবুল্লাহ সিরাজী

পায়ে ধুলো লাগা বাঁচায় জুতো আর গায়ে ময়লা যাতে না লাগে তা রক্ষা করে পোশাক। কিন্তু বনের ময়লার জন্য তো কেউ এগিয়ে আসে না। এ ময়লা বনে যেমন পড়ে, তেমনি বনকেই মুছে ফেলতে হয়। যে পারে সে ময়লা সাফ করতে, সে-ই তো অরণ্য। তার জন্মই তো সার্থক অরণ্যজন্ম। পড়শি ফোড়ন কাটে, ধূলিসম পত্রালি নিচে পড়ে, ভিন্ন পাড়া গলা উঁচিয়ে কেচ্ছাকাহিনি ছড়ায়। হেলাফেলা গা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায়, কিন্তু পরদেশি যদি নাক-মাথা দোলায় তখন তো তা সামাল দেওয়ার জন্য নিজের মাথাকেও ওপরে তোলার প্রয়োজন পড়ে। এই মন ও মাথা নিয়ে, এই হৃদয় ও বুদ্ধি নিয়ে চলাচলের অংশে চাই জুতসই একটি মাধ্যম—বিস্তারমাধ্যম।
কথার পিঠে কথা তাই—মানুষের জন্য হৃদয়কে পঞ্চভূতে মিশিয়ে এবং মস্তিষ্ককে সৃষ্টিদর্শনে লগ্ন করে দাঁড়াতে হবে। মেরুদণ্ডী প্রাণীর সব গুণ ধারণপূর্বক জানান দিতে হবে বিশ্বকে—আমরা এসেছি। নিজের ভাষা বাংলাই এই আগমনের একমাত্র প্রতীক! তাই বাংলা নিয়েই আমরা দখল নিতে চাই সারা বিশ্বের। আমাদের কর্মী দল মজবুত, আমাদের মেধাবাহিনী অটুট এবং আমাদের মেধা-সমবায় অভিযানের জন্য প্রস্তুত।
এখন এই অভিযাত্রার স্থানচিত্র এবং বিজয়সীমা নির্ধারণের জন্য পরিকল্পনা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। পৃথিবীর মানচিত্রে বিজয়বিন্দু বসিয়ে এগোলে দরজার ওপাশেই তো আপনচিত্র। এরপর পশ্চিমের ডাক। স্থলপথে যেতে সময় লাগবে, জলপথ এখন প্রায় অচল, বাকি রইল উড়ালযাত্রা। নামা যাক ইউরোপে, আশপাশে অনেক ঝাল-ঝোলের গল্প। অনেক ছুরি-কাঁচির সঙ্গে পাঁচ-আঙুল পাল্লা দিচ্ছে দীর্ঘদিন। অতএব, অগ্রবর্তী বাহিনীর সমর্থনে বিজয় সম্ভব হতে দিন-ক্ষণ বেশি ব্যয় হবে না। এবার মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পতাকা পোঁতার পালা। ঢোল–শোহরত করে শুরুর সময় নির্ধারিত হলে মনে হয় না সমাগম হতে বেশি সময় লাগবে। ওখানে দাঁড়িয়েই স্থানীয় চিত্রটি নজর করার পাশাপাশি এশিয়ার পূর্বাঞ্চলটির কথা ভাবা যাবে।
আসুন লুই পা, আসুন আলাওল, আসুন মাইকেল, আসুন রবীন্দ্রনাথ, আসুন বঙ্গবন্ধু,—আসুন বৈশাখ, আসুন ডাল-ভাত—আসুন একুশে, আসুন মুক্তিযুদ্ধ—পায়ের ধুলো, গায়ের ময়লা ঝেড়ে হৃদয়ে হৃদয় রাখি। বিশ্বময় গড়ে তুলি বাংলা ভাষার অমিয় সংস্কৃতি।
---দুই.---
কখন যে কোন বিষয় মোচড় দেবে বোঝা দায়। ঘর থেকে বেরোনোর মুখেই বিপত্তি মাথা ধরে টান দিল। ঢাকা থেকে দোহা হয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস–যাত্রা। আমন্ত্রণটি কবিতা উৎসবের, আর যাত্রাপথের বিমান মাশুলও পরিশোধিত হয়েছে উৎসবকর্তাদের মাধ্যমে। তবে বিপত্তি কোথায়? বিপত্তি, যে মাধ্যমে মাশুল পরিশোধিত হয়েছে তার নিশ্চিতকরণ নিয়ে! বিমানবন্দরে নানা টানাপোড়েন উতরিয়ে বুঝিবা একটা ঝুঁকি ঝুলিয়ে রেখেই শুরু করা গেল যাত্রা।
এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহের আমেজটুকু রাত তিনটায় চোখমুখে ঝাপ্টা দিয়ে যায়। ছয় ঘণ্টার যাত্রা। দোহা এসে দুই ঘণ্টার বিরতির পর আবার শুরু হলো টানা ষোলো ঘণ্টার যাত্রা—লস অ্যাঞ্জেলেসের জন্য।
একসময় ভারি চকচকে অপরাহ্ণে ঢুকে গেলাম নগরীর অভ্যন্তরে। চারদিকে মাথা তোলা পাহাড়ের পেটের মধ্যে বসতি। ঘন সবুজের অপরূপ সমারোহে চিনিয়ে দিল বৈচিত্র্যের আন্তরিক মাত্রা। তাপমাত্রা সতেরো-আঠারোর বেশি নয়, মৃদু হাওয়ায় বসন্তের পুলক।
এখানে যাঁর প্রথম আহ্বান আমাকে মূকাভিনয় পর্বটি মনে করিয়ে দিল, তিনি তো একদিন বাংলাদেশেই ছিলেন। যশোরের ধুলো-জল ছেঁকে-ছেনে ঢাকা এসে ছড়িয়েছিলেন প্রতিভার দ্যুতি। অভিনয়ে পটু, তাও আবার বাক্‌বিহীন সবই তো ছিল তাঁর ঝুলিতে। তারপরও অন্য এক আকর্ষণ, ভিন্ন এক প্রণয় তাঁকে দেশ থেকে বৈদেশে নিয়ে এসেছে! তা-ও বুঝি তিন যুগ আগেকার অমোঘ আখ্যান। তিনি—কাজী মশহুরুল হুদা হাতে গহনা বাজিয়ে, আঙুলের অলংকার ঘুরিয়ে—আজ এই বেলা আমাকে ভাত ও সরপুঁটি মাছের ঝোলে নামিয়ে দিলেন। ‘স্বদেশ’-এর ভান্ডারে করলা ভাজি থেকে বেগুন-মানকচু, মুগডাল কিছুই বাদ নেই। লস অ্যাঞ্জেলেসের এই ‘লিটল বাংলাদেশ’ যেন বৈশাখের বৈভব নিয়ে এল, দিল বাংলার পূর্ণতা।
আমার আমিতে খুঁজি সুবর্ণবন্দর!
---তিন.---
‘হলিউড’ শব্দটির সঙ্গে ঝমঝম করে ওঠে পরিপার্শ্ব এবং দৃশ্যপটে আলোর ঝলকানি নেড়ে দেয় লৌকিক ও অলৌকিক চালচিত্র।
বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার অংশটুকু মিলিয়ে নেওয়ার অভিপ্রায়ে সকাল-দুপুর কাটল ‘গ্রিফিথ অবজারভেটরি টাওয়ার’ আর ‘বেভারলি হিলস’–এ। উপত্যকার শোভার সঙ্গে দর্শনার্থীর ঢল মিলেমিশে তৈরি করেছে বিচিত্র এক অবকাশ-প্রণালি। ছবি তোলা থেকে স্যুভেনির ক্রয়—এক পর্যায়ে ভেতর মহলে আপন অবস্থানটির জানান দিয়ে যায়।
‘উত্তর আমেরিকা কবিতা সম্মেলন ২০১৯’-এর আয়োজনকে সামনে রেখে নানা কর্মকাণ্ডের ফাঁকে সন্ধ্যায় ভয়েস অব আমেরিকার একটি সাক্ষাৎকার রেকর্ড করার ভেতর দিয়ে ফুরাল দিন। তবে এ কথাও ঠিক, দিনের সঙ্গে কে কবে পাল্লা দিতে পেরেছে? এই যে এখন সূর্যের উল্টো দিকে পৃথিবীর এ অঞ্চল তার হাসি-তামাশায় উনিশে এপ্রিল শেষ করল, তার ভঙ্গি কতটুকু পাবে গোলকের ওপারের মানুষ?
‘লাল একটি পিঁপড়েপৃথিবী
মিথ্যের মধ্যে পড়ে আছে!’
---চার.---
বেশ ঠান্ডা বাতাস, তাপমাত্রা পনেরো ছুঁই-ছুঁই। সকালে বেরোবার মুখে দূরের পামসারি ক্যামেরা টেনে নিল। যেন প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম উপকূলের পাকাপোক্ত একটি ব্যবস্থার মধ্যে একমাথা চুল নিয়ে তারা পাহারা দিচ্ছে জনবসতি। পথে পড়ল ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিও’। ভেতরে ঢোকার মুখেই ঝাপটা দেওয়া মিশ্র ঘ্রাণ ঠেলে দিল নানা বর্ণে, ভিন্ন ভিন্ন প্রাঙ্গণে। শিশু-তরুণ-বয়সী মিলে যে সাদা-কালোর তৈলচিত্র, তা যেন কেবল আনন্দের, তা যেন কেবল শনিবারের ছুটি-উপভোগের।
হু-হু করে বেলা নেমে যায়। সন্ধ্যায় কবিতার আয়োজন। প্রবাসে বাংলা কবিতার তল ঠাহর করা বড় কঠিন! অর্থ-বাণিজ্য-সচ্ছলতার এত দেমাগের মধ্যে লাজুক কবিতার ঠাঁই পাওয়া ভার। হ্যাঁ, এসব আয়োজনের শেষ দৃশ্যে সংগীত এবং নৈশভোজের পর্ব বড় মনোহর।
‘একটি দিনের জন্য রাত ফর্সা হলে
একটি রাতের লোভে লুট হয় জীবনের ছুটি’
---পাঁচ.---
ফুরিয়ে আসে সময়। বাঁধাধরা ভ্রমণের শেষ দিন চোখ জুড়িয়ে দেয় সাগরের প্রসন্নতা। বালু ও ফেনার কোলাহলে এক জলরেখা যেন ডাক দিয়ে বলে:
 ‘তুমি ইংরেজি লেখা নিয়ে
বাংলায় কি আমার সঙ্গে খেলবে’।
উত্তর আমেরিকা কবিতা সম্মেলনে কবিতাপাঠ। মঞ্চে বসে আছেন লেখকসহ অন্য অতিথিরা। ছবি: সংগৃহীত

পেটের চর্বি কমানোর ব্যায়াম by উম্মে শায়লা রুমকি

*প্রথমে ১ মিনিট জগিং।
*তারপর ৩০ সেকেন্ড দৌড়ানো।
*তারপর আবার ১ মিনিট জগিং।
*৩০ সেকেন্ড দৌড়ানো।
*এভাবে ৫ মিনিট।

পেটে চর্বি জমা বা ভুঁড়ি বাড়ার সমস্যা নিয়ে বিব্রত অনেকেই। শুধু তা-ই নয়, পেটে চর্বি জমা সরাসরি হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলন ক্যানসার ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত। শরীরের মধ্যভাগে চর্বি বেশি থাকলে বলা হয় ‘আপেল’ শেপের বডি, যা অতিরিক্ত বিএমআইয়ের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। পেটের চর্বি মূলত ভিসেরাল ফ্যাট। এ থেকে বিপাকক্রিয়ায় নানা জটিলতা ঘটে, রক্তনালিতে ও যকৃতে চর্বি জমে, ইনসুলিন রেসিসট্যান্স হয়।
কীভাবে বুঝবেন?
পাঁজরের খাঁচার নিচ থেকে হিপবোন বা কোমরের হাড় পর্যন্ত এলাকার ঠিক মধ্যভাগ একটি ফিতা দিয়ে মাপুন। ফিতাটা সোজা করে ধরে জোরে শ্বাস ছেড়ে দিয়ে মাপবেন। নারীদের ৮০ সেন্টিমিটার ও পুরুষদের ৮০ সেন্টিমিটারের ওপর মাপ হলে বুঝতে হবে আপনার পেটে মেদ আছে।
কী করবেন
পেটের চর্বি বা ভুঁড়ি কমানোর জন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি ব্যায়ামও দরকার। আসুন জেনে নিই কীভাবে এটা কমানো যায়।
মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার, উচ্চ শর্করাযুক্ত খাবার বাদ দিন, যেমন কোমল পানীয়, চিনিযুক্ত খাবার, কেক পেস্ট্রি, চকোলেট ইত্যাদি।
আমিষজাতীয় খাবার, আঁশযুক্ত খাবার বেশি করে খান। সবুজ শাকসবজি, তাজা ফলমূল খেতে হবে বেশি করে।
কায়িক পরিশ্রমের পরিমাণ বাড়ান। নিয়মিত হাঁটুন। এ ছাড়া পেটের চর্বি কমানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম করতে পারেন।
পেটের ব্যায়াম
ব্রিস্ক ওয়াকিং: প্রথমে ধীরে ধীরে এক মিনিট হাঁটুন, তারপর গতি বাড়িয়ে জোরে ৩০ সেকেন্ড হাঁটুন। আবার ধীরে এক মিনিট হাঁটুন, আবার জোরে ৩০ সেকেন্ড। এভাবে ৫ থেকে ১০ মিনিট।
জগিং: প্রথমে এক মিনিট জগিং, তারপর ৩০ সেকেন্ড দৌড়ানো, তারপর আবার এক মিনিট জগিং ও ৩০ সেকেন্ড দৌড়ানো। এভাবে ৫ মিনিট।
ক্রাঞ্চ: মাদুর বা ম্যাটে চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন। এবার হাঁটু ভাঁজ করে বুকের কাছে আনতে চেষ্টা করুন। একই সঙ্গে মাথার পেছনে হাত দিয়ে শরীরটাকে উঠিয়ে হাঁটুর কাছাকাছি নিয়ে যান। হাঁটু মাথা একসঙ্গে আনার সময় শ্বাস নেবেন, আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সময় শ্বাস ছেড়ে দেবেন। দিনে দুবেলা ১০ থেকে ২০ বার করুন।
৯০ ডিগ্রি পা: ম্যাটের ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন, হাতের তালু ম্যাটের ওপর থাকবে। এবার পা দুটো জোড়া করে নব্বই ডিগ্রি ওপরে উঠিয়ে দিন। ১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। পা সোজা রেখে হাঁটু ভাঁজ না করে নামিয়ে আনুন। ১০ থেকে ২০ বার করুন।
ফ্লাটার কিক: ম্যাটে চিত হয়ে শুয়ে হাত দুটো হিপের নিচে রাখুন। এবার মাথা, কাঁধ ও পা ম্যাট থেকে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে ওঠান। এই অবস্থায় দ্রুত পা দুটো ওঠানামা করুন। ৫ থেকে ১০ বার।
পেটের স্ট্রেচিং: চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন। দুই হাত সোজা করে মাথার পেছনে নিয়ে যান টানটান করে। একই সঙ্গে পায়ের পাতা টানটান করে মেঝে ছুঁতে চেষ্টা করুন। পেটের পেশিতে টান অনুভব করবেন এতে। এভাবে ৫ থেকে ১০ মিনিট থাকবেন। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে।
লেখক: উম্মে শায়লা রুমকি: ফিজিওথেরাপি পরামর্শক, পিটিআরসি

নিয়ন্ত্রণহীন এবং সর্বগ্রাসী: ডিজিটাল যুগের মোহ কেমন?

আমি জানি যে, কে আপনার নতুন সঙ্গী
গভীর আবেগ নাকি মোহ? যখন কেউ অনলাইনে থাকে তখন মানব আচরণের এই দুটি প্রকাশের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য আলাদা করাটা বেশ কঠিন হয়ে পরে।
কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন তো, আপনি কি কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার পুরনো সঙ্গীর খোঁজ করতে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন যে, তিন ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও আপনি তার নতুন সঙ্গীর সাথে তোলা বিভিন্ন ছবি তখনো দেখছেন?
পকেটে কম্পিউটার আর ২৪ ঘণ্টা ইনস্টাগ্রাম ও টুইটার ফিডে প্রবেশাধিকার হাতের নাগালে থাকলে এ ধরণের অযৌক্তিক কাজ করার অন্ধ তাড়না থেকে বের হওয়াটা বেশ কঠিনই বটে।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানী এবং বিবিসির উপস্থাপক অ্যালেকস ক্রতোস্কি বোঝার চেষ্টা করেছেন যে কিভাবে মোহগ্রস্ত আচরণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তিনি এমন কিছু মানুষের সাথে কথা বলেছেন যাদের অন্যের বিষয়ে জানতে চাওয়ার প্রবণতা অনিয়ন্ত্রিত, বাধাহীন এবং সর্বগ্রাসী হয়ে গেছে। সাথে এমন আচরণ থেকে বের হওয়ার উপায়ও বলেছেন তিনি।

বিপরীতমুখী ঈর্ষা

কিশোর বয়সে প্রেমে পড়েছিলেন জ্যাক স্টকিল।
কিন্তু শিগগিরই তিনি তার বান্ধবীর অতীত জীবন নিয়ে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। যদিও এরআগে আর কারো বিষয়ে এমনটা হয়নি তার।
তিনি কখনোই একজন ঈর্ষান্বিত ব্যক্তি ছিলেন না। কিংবা তার বান্ধবী তার তাকে ধোঁকা দিতে পারে এমন আশঙ্কাও ছিলো না তার। কিন্তু তার বান্ধবীর সাবেক এক সঙ্গীকে নিয়ে একটি মন্তব্য হঠাৎই তার মস্তিষ্কে একটি সুইচ খুলে দেয়।
"এই একটি জিনিসই আমার মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে এনে দেয়," জ্যাক বলেন।
"সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি তার অতীতের খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়েও খুব আগ্রহ বোধ করতাম। আমার সাথে দেখা হওয়ার আগে তার প্রেম জীবন কেমন ছিলো সেসব নিয়ে খুব আগ্রহী ছিলাম আমি।"
"আমি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টও দেখতাম," জ্যাক বলেন, "আমি ভাবতাম এই ব্যক্তিটি কেমন? কিংবা ওই ছবিতে কে? এবং এই কমেন্ট দিয়ে কি বোঝায়?"
জ্যাক তার সঙ্গীর অতীত নিয়ে তার কৌতুহলের এমন একটি চক্রে নিজেকে আবিষ্কার করলেন যা অগ্রাহ্য করা তার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব ছিলো না।
তিনি তার বিপরীতমুখী ঈর্ষাকে দমন করতে ক্রমাগতভাবে অনলাইনে উত্তর খুঁজতেন। কিন্তু এটি তার ওই ঈর্ষাকে দমন না করে বরং তা আরো বাড়িয়ে দিতো।

সাইবার নজরদারি বা সাইবার স্টকিং

সাইবার স্টকিং শব্দটি ২০১০ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে সংযুক্ত করা হয়।
এটি হচ্ছে স্টকিং বা কোন ব্যক্তির উপর অনাকাঙ্ক্ষিত নজরদারির ডিজিটাল রূপ। যা শুধু অনলাইন জগতেই ঘটে থাকে এবং এটি পুরোপুরি প্রযুক্তিগতভাবেই হয়।
স্টিনা স্যান্ডার্স একজন সাংবাদিক যিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সম্পর্কে লেখালেখি করেন।
ছয় বছর আগে যখন তার সঙ্গী তাকে কোন কারণ ছাড়াই ছেড়ে চলে যায়, তখন এর কারণ জানতে তিনি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো মোহগ্রস্থের মতো পর্যবেক্ষণ শুরু করেন।
"সে কেন আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলো এ নিয়ে কখনোই ভাবনা বন্ধ করতে পারতাম না আমি," স্টিনা বলেন, "আর এর জন্য অনলাইনে প্রকাশিত তার নতুন সঙ্গীর সাথে বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি দেখাই আমার একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায়। "
এটা একটা মোহ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর কয়েক বছর কেটে গেলেও এখনো সে তার ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং টুইটার পেজ দেখে।
"আমি প্রায়ই আমার সাবেক ছেলে বন্ধুর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখি এটা জানতে যে সে এখন কি করছে? এবং আমি এটাও দেখি যে নতুন করে কাদের সাথে ডেট করছে সে আর তার নতুন সঙ্গীর এমন কি আছে যা আমার নেই। "
এ ধরণের সাইবার স্টকিং ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।
ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোর ভেরোনিকা লুকাক্সের পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন সাবেক সঙ্গীর মধ্যে নয় জনই তাদের পুরনো সঙ্গীর ফেসবুক প্রোফাইল দেখে থাকে।

সাইবার স্টকিং বেশ সহজ কারণ এতে আপনার সামনে আসার ভয় থাকে না

কানাডার এই গবেষণাটি আরো প্রকাশ করে যে, ৭০ ভাগ মানুষ তাদের সাবেক সঙ্গীর প্রোফাইল তাদের মিউচুয়াল বন্ধুর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেখে। এমনকি তারা যদি বন্ধু নাও থাকে কিংবা ব্লক করে দেয়া হলেও সাবেক সঙ্গীর অ্যাকাউন্ট দেখার কোন না কোন উপায় খুঁজে বের করে তারা।
স্টিনা বলেন, তার সাবেক সঙ্গী ও তার নতুন সঙ্গীর উপর নজর রাখতে একটি ফেক প্রোফাইল তৈরি করেছেন তিনি। যাতে তারা কখনো টের না পায়।
ইউনিভার্সিটি অব বেডফোর্ডশায়ারের জাতীয় সাইবারস্টকিং গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক এবং মনোবিজ্ঞানী এমা শর্ট, বিশ্লেষণ করেছেন যে, কিভাবে অনলাইন স্পেস আমাদেরকে সবকিছুর সাথে জড়িত না হয়েও সবকিছু পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেয়।
তবে এমন সুযোগ আমাদের "সীমানা" সম্পর্কে সচেতন থাকার চেতনাকে দুর্বল করে দেয়।
মানুষের সম্পর্কে নজর রাখা আসলে খারাপ কিছু নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের নজর রাখতে এতো বেশি সুযোগ করে দেয়, যা করাটা উচিত নয় এবং যা অনেক সময় আমরা আসলে করতে চাইও না।
কোন ধরণের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এখন মোহগ্রস্ত আচরণ এমন ভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব যা ভিন্ন পরিবেশ আসলে মোহগ্রস্ত মনে হবে না।
আপনি চাইলে আপনার সাবেক সঙ্গীর প্রোফাইল দিনে একশবার দেখতে পারেন। সাথে আপনার দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও চালিয়ে যেতে পারবেন। বন্ধুদের সাথে দেখা করা, স্বাভাবিক আচরণ করা দেখলে মনে হবে যে আপনি আপনার খেয়াল রাখছেন...বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে না যে কোন সমস্যা আছে।
কিন্তু আপনি যদি আপনার সাবেক সঙ্গীর অফিসের বাইরে গিয়ে হাজির হন এবং জানালা দিয়ে দিনে আট ঘণ্টা তার দিকে তাকিয়ে থাকনে তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়।

আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ তথ্য রয়েছে আমাদের হাতে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অন্যের জীবনে আমাদের উঁকি মারার একটি জানালা খুলে দেয় এবং বিশাল তথ্য ভাণ্ডারে প্রবেশের সুযোগ করে দেয় যা আগে কখনো ছিলো না।
অনলাইনে আমরা যে তথ্য দেই- যখন কারো সাথে সিনেমা দেখতে গিয়ে চেক ইন দেই কিংবা কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানোর কথা জানাই তখন সেটা নতুন নতুন সূত্র ও সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করে।
বিপরীতমুখী ঈর্ষার সমস্যা রয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সঙ্গীর অতীত জীবন নিয়ে জানার আগ্রহ অনেক বেশি হয়ে দেখা দিতে পারে।
অতীতে, কারো সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানার তেমন কোন সুযোগ ছিলো না। কিন্তু এখন এটা বেশ সহজ।
কমেডিয়ান অ্যানড্রিয়া হাবার্ট বলেন, তার যখন ২০ বছর বয়স ছিলো, তখন তার সঙ্গী তাকে ছেড়ে যায়। তার সাথে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে দেয় সে। এমনকি এমন আচরণ শুরু করে যে, তার জীবনে তার অস্তিত্বই কখনো ছিলো না।
তিনি জানতেন যে, তার সঙ্গী অন্য কারো সাথে যুক্ত হয়েছেন এবং সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর নিয়মিত তাকে অনলাইনে স্টক করা শুরু করেন তিনি। আর এটি তিনি বার বারই করতে লাগলেন।
"যখন আপনাকে বাধা দেয়ার কেউ নেই, তখন আপনি অন্যের প্রোফাইলে দিনে ৬০-৭০ বার দেখবেন," অ্যানড্রিয়া বলেন।

"নিজের ক্ষতি করার অত্যন্ত সূক্ষ্ম মাধ্যম"

অনলাইনে কিছু দেখাকে আসলে নির্দিষ্টভাবে তেমন ক্ষতিকর মনে হয় না। কিন্তু "আসলে নিজের একটু একটু করে ক্ষতি করছেন আপনি। নিজের ক্ষতি করার অতি সূক্ষ্ম একটি মাধ্যম এটি।"
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার জনিত আচরণ যে তার ভোগান্তিকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলো তা তিনি বুঝতে পারতেন।
"আপনি যে দুঃখ অনুভব করছেন তা কমানোর জন্য স্থায়ী একটি সমাধান খুঁজবেন আপনি, কিন্তু আপনি যা খুঁজছেন তা কখনোই পাবেন না," তিনি বলেন।
মনোবিজ্ঞানী এমা শর্ট সহমত দেন যে, যারা সাইবারস্টকিং বা মোহগ্রস্ত অনলাইন আচরণ করেন তাদের স্বাস্থ্যের উপর এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
এসব আচরণ ভুক্তভোগীদের একই ধরণের আচরণ বার বার করার দিকে ঠেলে দেয় যা আসলে তাদের জন্য কোন ফল বয়ে আনে না।
"আপনি কোন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাবেন না। আর সামাজিক জীব হিসেবে সেখানে আমাদের থাকা উচিত নয়," এমা বলেন।
এছাড়াও, তিনি আরো বলেন, কোন কিছুর পেছনে এতো শ্রম আর শক্তি ব্যয় করার পরও আপনি কোন প্রতিদান না পেলে তা আপনার "আত্মসম্মানও বাড়াবে না।"

এ ধরণের সমস্যায় করনীয় কি?

সম্প্রতি গবেষণাগুলো থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে তা হলো, মানুষ যখন অনুভব করে যে তারা অনলাইনে অন্যের পেছনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে বা তারা যদি তাদের আচরণ নিয়ে দোষী অনুভব করে তাহলে সে বিষয়ে তাদের কথা বলা উচিত।
"বন্ধুদের সাথে কথা বলুন," এমা বলেন।
"যারা মনে করেন যে, তাদের জীবন এতোটাই প্রভাবিত হয়েছে যে তারা আটকে গেছেন বলে অনুভব করছেন তাদের জন্য পেশাদারদের সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।"
জ্যাক বলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পুরো সমস্যাটাই আসলে তার সৃষ্টি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শুধু এটাকে আরো বেশি খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে... "এটা থেকে বেরিয়ে আসার শুরুতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, শিগগিরই আমাকে এগুলো ছেড়ে দিতে হবে।"
অনলাইনে তিনি কম সময় ব্যয় করতে শুরু করলেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি যাতে তার সাবেক সঙ্গীর বিষয়ে আগ্রহী না হন তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা শুরু করেন।
"আপনাকে সেই লোভ সামলা বেশ কঠোর হতে হবে," তিনি বলেন, "কারণ ওই লোভ সহসাই আপনাকে ছেড়ে যাবে না।"
আর অ্যানড্রিয়া বলেন, তিনি জানতেন যে, সামনে এগিয়ে যেতে হলে ভিন্ন পথে এগুতে হবে তাকে। সম্পর্ক ভাঙার পর অনলাইনে সব ধরণের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ তিনি আবার মোহগ্রস্তদের মতো আচরণে অভ্যস্ত হতে চাননি।
তিনি বলেন, "সমস্যাটি বুঝতে পারাই ছিলো সবচেয়ে কঠিন।" তার পর থেকে আর কোন সাবেক সঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল দেখেন নি তিনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কে আপনাকে অনুসরণ করছে তা কি আপনি জানেন?

পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে ৬০০ প্রজাতির গাছ

বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার খবর নিয়মিতই আসছে। বিপন্ন প্রজাতির তালিকাটাও বেশ দীর্ঘ। বিশেষত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় সামনে আসার পর প্রজাতি বিলুপ্তির বিষয়টি সব সময়ই আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু ঠিক কত প্রজাতি এখন পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি তেমন। এক ধরনের ধারণার আশপাশেই মানুষকে কথা বলতে হয়েছে। এবার সে সুনির্দিষ্ট তথ্যই দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি পরিচালিত এক সমন্বিত গবেষণায় বলা হচ্ছে, গত আড়াই শ বছরের পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৬০০ প্রজাতির গাছ। এ সংখ্যা একই সময়ে বিলুপ্ত পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী ও সরীসৃপের মিলিত সংখ্যার দ্বিগুণ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাধারণ ধারণার চেয়ে ৫০০ গুণ দ্রুতগতিতে গাছ বিলুপ্তির ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বিষয়টি সেভাবে মনোযোগ পাচ্ছে না। একটি শতকে বিলুপ্ত হওয়া পশুপাখির সম্পর্কে হয়তো মানুষ মোটাদাগে একটি ধারণা রাখে। কিন্তু গাছের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে না। অনেকেই বলতে পারবে না, কোন গাছটি এখন আর দেখা যায় না।
জাতিসংঘ গত মাসে এ-সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়েছিল, বর্তমানে সব ধরনের প্রাণ মিলিয়ে বিশ্বের প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায় বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এ প্রতিবেদন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকদের বরাত দিয়ে বিবিসি বলছে, বৃক্ষ প্রজাতির এ বিলুপ্তির তথ্য ভবিষ্যৎ বিলুপ্তি ঠেকাতে বড় ধরনের সহযোগিতা করতে পারে। এ বিষয়ে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এলিস হামফ্রিস বলেন, ‘কোন কোন উদ্ভিদ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরির লক্ষ্যে এটিই প্রথম পরিচালিত কোনো গবেষণা। শুধু তা-ই নয়, এ গবেষণায় প্রজাতিগুলোকে নির্দিষ্ট করার পাশাপাশি বিলুপ্তির স্থান ও কতটা দ্রুত তারা বিলুপ্ত হয়েছে, তারও সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে।’
গবেষণার তথ্যমতে, এই বিলুপ্তির অধিকাংশই ঘটেছে দ্বীপাঞ্চল ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে। এ দুটি অঞ্চলই বড় বড় গাছের আবাস। বিশেষত কাঠ হয়, এমন গাছের সংখ্যা এসব অঞ্চলেই বেশি। আবার বৈচিত্র্যের দিক থেকেও এ দুই অঞ্চলই এগিয়ে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউ ও স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মিলে এ গবেষণা করেন। তাঁরা দেখেন, গত আড়াই শ বছরে পৃথিবী থেকে ৫৭১ প্রজাতির উদ্ভিদ হারিয়ে গেছে। একই সময়ে পশু, পাখি ও সরীসৃপ মিলে বিলুপ্ত প্রজাতির সংখ্যা ২১৭। এ-সম্পর্কিত গবেষণা নিবন্ধটি ‘নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, এই বিলুপ্তির পেছনে মানুষ অনেকাংশে দায়ী। প্রাকৃতিকভাবে প্রজাতি বিলুপ্তির গতি শুধু মানুষের উপস্থিতির কারণেই বেড়ে গেছে ৫০০ গুণ। উদাহরণ হিসেবে বলছেন, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলি থেকে চন্দনগাছ হারিয়ে গেছে শুধু প্রসাধনকাজে অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে। তাঁদের মতে, এমনকি বিলুপ্ত উদ্ভিদের যে সংখ্যা উঠে এসেছে, তাও বর্তমান বিলুপ্তির গতি বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, বর্তমানে মানুষের প্রকৃতি-ধ্বংসী কাজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়ে গেছে। তবে আশার কথাও আছে। এমন অনেক প্রজাতিরই সন্ধান পাওয়া গেছে, যা বিলুপ্ত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।
এমনিতে ৫৭১টি উদ্ভিদের বিলুপ্তি হওয়াটাকে একটি সংখ্যা মনে হতে পারে। কিন্তু আদতে এর সঙ্গে পুরো পৃথিবীর অন্য প্রাণগুলোও জড়িয়ে আছে বাস্তুসংস্থানের কারণেই। কারণ এখনো এই গাছই অক্সিজেন ও খাদ্যের জোগানদাতা। ফলে উদ্ভিদের বিলুপ্তি অন্য প্রাণীর বিলুপ্তি ত্বরান্বিত হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
গবেষণাটির সহগবেষক রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউ-এর ড. ইমিয়ার নিক লুগাধা বিবিসিকে বলেন, ‘উদ্ভিদের বিলুপ্তি সব প্রজাতির জন্য একটি বড় দুঃসংবাদ। কোটি কোটি প্রজাতি এই উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে মানুষও রয়েছে। তাই কোন অঞ্চল থেকে কোন প্রজাতি আমরা হারাচ্ছি, তা জানা থাকাটা জরুরি। বিশেষত বিপন্ন ও মহাবিপন্ন প্রজাতিগুলো রক্ষায় তাহলে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারব। এটি একই সঙ্গে এদের ওপর নির্ভরশীল অন্য প্রজাতিগুলোকেও বাঁচিয়ে দেবে।’
উদ্ভিদ প্রজাতির বিলুপ্তি ঠেকাতে বেশ কিছু প্রস্তাব রেখেছেন গবেষকেরা। এর মধ্যে রয়েছে, পৃথিবীর সব উদ্ভিদ প্রজাতির নিবন্ধন, উদ্ভিদের নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার, উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের সার্বিক সহযোগিতা এবং অবশ্যই স্থানীয় উদ্ভিদের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটানোর কাজটি করা।
গত আড়াই শ বছরে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে ৫৭১টি প্রজাতি। প্রতীকী ছবি: রয়টার্স

দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ঘাসের মাদুর by ড. রেঅপামুদ্রা মৈত্র বাজপাই

সম্প্রতি অবসরে যাওয়া প্রখ্যাত আমলা সিলেটি-বংশোদ্ভূত গুরুসাদে দত্ত বাংলার লোককলা ও শিল্প রক্ষায় ভূমিকা রাখার জন্য সুপরিচিত।
বাংলার হস্তশিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি লিখেছেন যে এই অঞ্চলের লোকজ শিল্প সাধারণ কৃষকদের আনাড়ি হাতের শিল্প নয়, বরং তা প্রতিটি ব্যক্তির সামাজিক মাত্রার মধ্যে তার শিক্ষা ও অবস্থানের মাত্রার বহিঃপ্রকাশ। আর কারিগর ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা ভিন্ন কেউ নন, বরং একই সাংস্কৃতিক ধারার অংশবিশেষ।
হস্তশিল্পের সাথে জড়িতরা কোনো ভৌগোলিক আয়তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের উপস্থিতি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আর এই শিল্প বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগসূত্র সৃষ্টি করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মও শিল্পীদের মধ্যে সংযোগ সাধনের কাজ করে। এ ধরনের একটি প্লাটফর্ম হলো ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ প্লাটফর্ম।

গত ৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু আইল্যান্ডে এর দ্বাদশ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইন্টারগভার্নমেন্টাল কমিটি অব ইউনেস্কো বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটিকে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ (আইসিএইচ) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। শিল্পপ্রেমীদের কাছে এটি একটি বিরাট মুহূর্ত।
শীতল পার্টির অন্তর্ভূক্তির ফলে তালিকায় বাংলাদেশের পণ্যসংখ্যা দাঁড়াল চারে। অন্যগুলো হলো পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা (২০১৬), জামদানি শাড়িতে ঐতিহ্যবাহী নক্সা (২০১৩) ও বাউল সঙ্গীত (২০০৮)।
শীতল পাটি বোনা হয় বেত-জাতীয় গাছের আঁশ থেকে। এই গাছটি মোস্তাক, পাটিপাতা, পাটিবেত ও পৈতারা। এই গাছটি সিলেট, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনি, চট্টগ্রামে জন্মায়।
শীতল পাটি সত্যিকার অর্থেই একটি বিরাট শিল্পকর্ম। এই কাজে নারীরা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই শিল্পের সাথে জড়িতরা তাদের অঞ্চলের নক্সা ও মটিফকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

আফগানিস্তান পরিচিত তার চমৎকার ছোট গালিচা ও কার্পেটের জন্য। বিশেষ করে দক্ষিণ আফগানিস্তানে উষ্ণ জলবায়ু এই শিল্পের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
পার্বত্যপূর্ণ ভুটানে বাঁশ হস্তশিল্পের জন্য প্রধান কাঁচামাল। মধ্য ও পশ্চিম ভুটানে জন্ম নেয়া ছোট বাঁশ ব্যবহৃত হয় ম্যাট, বেড়া বা ছাদ দেয়ার কাছে।
ভারতে শুকনা ঘাস, বেত ও বাঁশের মাদুর-বোনা বেশ জনপ্রিয়। মেঘালয়ে বাঁশের স্লিপিং ম্যাটের বেশ কদর রয়েছে। ত্রিপুরার চাটাই পর্যটকদের মধ্যেও চাহিদা রয়েছে।
শীতল পাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরাতেও পৌঁছে গেছে। কড়া/কড়াই নদীর তীরে জন্মানো ঘাস দিয়েও একই ধরনের পাটি বোনা হয় অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও কর্নাটকে। কেরালায় পাট দিয়ে বানানো কার্পেট বেশ জনপ্রিয়।
মালদ্বীপে একসময় থুনদুকুনা ম্যাট রাজকীয় উপহার হিসেবে পরিচিত ছিল। মালদ্বীপের সুলতানেরা ডাচ ও ব্রিটিশ গভর্নরদের এ ধরনের মূল্যবান উপহার দিতেন। নারীরাই এই ম্যাট তৈরির সাথে জড়িত ছিল। বর্তমানে দাধধু দ্বীপেই মূলত এসব ম্যাট তৈরি হয়। তবে যে নলখাগড়া দিয়ে এসব ম্যাট তৈরি হয় সেগুলো পাওয়া যায় ফিয়োরি দ্বীপে।

নেপালে খড় থেকে ম্যাট বানানো হয়। স্থানীয়রা একে বলে গুনদ্রি। একসময় নারীরাই জড়িত ছিল এই শিল্পে। এখন পুরুষেরাও হাত লাগিয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ধান কাটা হয় সেখানে। তারপর খড় সংগ্রহ করে মাঘ ও ফাগুন মাসে বোনা হয় এসব ম্যাট। তাদের কাজ দেখে মনে হয় খুব সহজ। কিন্তু করতে গেলে টের পাওয়া যায়, কত দক্ষতার প্রয়োজন এতে।
পাকিস্তানের নদীগুলোর ধারে এক ধরনের নরম ঘাস জন্মায়। এগুলো জায়নামাজ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। নারী-পুরুষ সবাই ঘাসের জায়নামাজ তৈরির সাথে জড়িত।
শ্রীলঙ্কায় নলখাগড়া থেকে তৈরি করা হয় জটিল ম্যাট। এসব ম্যাট মেঝ ঢাকতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। নানা ফুল-পাখির নক্সা আঁকা থাকে এসব ম্যাটে।