Showing posts with label পিয়াস সরকার. Show all posts
Showing posts with label পিয়াস সরকার. Show all posts

Thursday, October 23, 2025

বিপ্লব আপস করেছে -ড. সলিমুল্লাহ খান by কাজল ঘোষ ও পিয়াস সরকার

জুলাই আন্দোলনের এক বছর। নতুন বাংলাদেশে ঘটনা প্রবাহের অন্ত নেই। অন্তহীন প্রবহমান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। প্রতিটি পদক্ষেপের হিসাব রাখছে বাংলাদেশ। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব কষছেন আন্দোলনে সম্পৃক্তরা। জুলাইয়ের অভূতপূর্ব পরিবর্তনে আমরা কি পেলাম বা কি পাইনি- এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই পট পরিবর্তনের সাক্ষী এবং যোদ্ধা অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান। তাত্ত্বিক, বিশ্লেষক, চিন্তক, অনলবর্ষী বক্তা ড. সলিমুল্লাহ খানের মুখোমুখি হয়েছিল ‘জনতার চোখ’। ফিরে দেখা রক্তাক্ত জুলাই নিয়ে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “পুরনো চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে ক্ষমতা। বড় আকারের মৌলিক পরিবর্তনের আশা করা যাবে না। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে বিপ্লব। ইতিহাসের বিচারে শেখ হাসিনার অপরাধের দায় আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটা কর্মীকে নিতে হবে।” সর্বোপরি তিনি বললেন, “বিপ্লব আপস করেছে। আওয়ামী লীগের নৈতিক পরাজয় হয়েছে, দৈহিক পরাজয় হয়নি।”

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খানের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, “সংস্কার প্রক্রিয়া অনেকটা ধীরগতিতে শুরু হয়েছে। সার্চ কমিটি গঠনটাকেই শুরু হওয়া বলছি না। আসল কাজের কাজ এক বছরে কিছুই হয়নি। বিপ্লবের পরের মুহূর্তে এক বছর অনেক সময়। এক বছর আগে ছাত্ররা অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। অনেকে বলেন, এটা কোটা আন্দোলন। এটা অনেকটা লক্ষণ দেখা, কারণ না দেখা। কোটা ছিল একটা লক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পার হয়ে যাবার পরেও যখন মুক্তিযোদ্ধা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের নাতি-পুতি বা আরও নিচের পুরুষের লোকজনদের কাজে লাগাতে চেয়েছিল হাসিনা সরকার।”

তিনি প্রশ্ন রাখেন, বৈষম্যের গোড়া কোথায়? ১৯৭২ সালে যে সংবিধান আমরা গ্রহণ করেছিলাম তাতেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের যে ঘোষণাপত্র ১০ই এপ্রিল দেয়া হয়েছিল, সেটাই প্রথম সরকারি ঘোষণাপত্র। এটাকে আমি প্রকৃত ঘোষণাপত্র বলতে চাই। জিয়াউর রহমানেরটাও নয়। শেখ মুজিবের নামে প্রচারিত মিথ্যা দলিলটাও নয়। জিয়াউর রহমান যেটা করেছেন সেটা হলো কনটিনজেন্সি (বিকল্প ব্যবস্থা) ম্যানেজমেন্ট। যুদ্ধের জন্য তো একটা ঘোষণা লাগে, জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালন করেছেন। ১০ই এপ্রিল প্রথম বলা হয়েছে, আমরা একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে যাচ্ছি। এর মূল ভিত্তি হবে তিনটি শব্দ- সাম্য মানে বৈষম্য থেকে মুক্তি, মানবিক মর্যাদা মানে পাকিস্তান আমলে যে মানবিক মর্যাদা বা সমতা অস্বীকার করা হয়েছিল সেটা ফিরিয়ে আনা এবং সামাজিক সুবিচার। আমার প্রশ্ন ১৯৭১ সালের ঘোষণাপত্র ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রিয়ম্বল (ভূমিকা) আকারে যোগ হলো না কেন? পরে পরিশিষ্ট আকারে দেয়া হলো। এখানেই তো বৈষম্যের গোড়া।

জুলাই সনদের বিষয়ে বলেন, জুলাই সনদ আমরা রক্ত দিয়ে লিখেছি। তার ভাষাটা অনুবাদ করার বিষয়। ঘটনাটাই আসল ঘোষণাপত্র- ‘আমরা শেখ হাসিনাকে বিদায় দিয়েছি, আমরা শহীদ হয়েছি।’ ৩৬ দিনে- জাতিসংঘের হিসাবে ১৪০০’র বেশি লোক নিহত, ২০ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। মানুষ ট্রমাটাইজড হয়েছে। এটাই ঘোষণাপত্র। এর আগে কতো লোক গুম-খুন হয়েছে। শেখ হাসিনা দেশটাকে আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা দুটো ঘোষণা দিয়েছি। ‘প্রথমত এদেশে একটা আইয়ামে জাহেলিয়াত কায়েম হয়েছিল, দ্বিতীয়ত আমরা তা মেনে নেইনি।’
সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বললে আমার ১৯৯০ সালের কথা মনে পড়ে। জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান সম্পন্ন হয়েছিল সেটার নাম লোকেই দিয়েছিল ‘নাগরিক অভ্যুত্থান।’ এবারেরটার নাম ‘গণ-অভ্যুত্থান’। নাগরিক অভ্যুত্থানের সময় কয়েকটা টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছিল। সে সময় অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রভৃতি মণীষী বস্তাপচা রিপোর্ট লিখেছিলেন। ওগুলোর খবর কি কেউ জানেন? এগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। এখনকার সংস্কার কমিশনের ত্রুটি হচ্ছে তারা ত্রুটি অনুসন্ধান করছেন না। হাসিনার আমলে তিনবার নির্বাচন হয়নি। সুুতরাং হাসিনা অবৈধভাবে ক্ষমতায় ছিলেন। এরকম সরকারকে হটাতে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। সেটাও আমাদের এখানে করা প্রায় নিষিদ্ধ। জনগণ গ্রহণ করবে না। বাকি পথ হচ্ছে গণ-অভ্যুত্থান। জনগণ তার সার্বভৌমত্ব নিজেই দাবি করে। সেটাই ঘটেছে। এটাই জুলাই সনদ।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, এর আগে ছিল গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি, গণঅধিকার পরিষদ ইত্যাদি। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হয়েছে। গতবছর জুলাই আন্দোলনের মাঝামাঝি সময়ে বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছিলেন, ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা এটাকে নৈতিক সমর্থন দিচ্ছি মাত্র। ছাত্রদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন সেটা ছাত্রদের ওপর আস্থার জন্য নয়। হাসিনার বিরুদ্ধে মানুষের যে ঘৃণা আর ক্ষোভ তার কারণেই মানুষ রাজপথে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বলছিল- হাসিনার বিরুদ্ধে একটা কলাগাছকে দাঁড় করালেও কলাগাছকেই ভোট দেবো। ছাত্ররাই ছিল প্রকৃতপক্ষে কলাগাছ। তাদের গুণ হচ্ছে সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা। সেটাও বেশি নয়। তারা শেষ কথাটা বলছে গত বছরের আগস্টের এক কি দুই তারিখে। কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৯ দফা দাবি। এরপর কমতে কমতে একদফা। হাসিনা বিদায় নেয়ার পর আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
তিনি বলেন, বর্তমানে ফিরে আসি। বর্তমান সরকার যে অব্যবস্থিত চিত্ত বা আনডিসাইটেড মাইন্ড তার প্রমাণ হচ্ছে ৮ই আগস্টকে তারা নতুন বাংলাদেশ দিবস ঘোষণা করেছিলেন। শ্রদ্ধা রেখে বলছি, এ থেকে বোঝা যায় রাজনীতি সম্পর্কে ড. ইউনূসের কোনো ধারণাই নেই। যদি থাকতো তিনি একথা বলতেন না। পরে বুঝতে পেরেছেন, ভাগ্য ভালো যে তাকে বোঝানোর মতো পাশে কিছু লোক আছে। শেখ মুজিবের পাশে সিপিবি ছিল। এখন ড. ইউনূসের পাশে কারা আছে জানি না। তিনি যদি এই সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন এটা আত্মঘাতী হতো। আসল ঘটনা ঘটেছে ৫ই আগস্ট। তিনি তার নিজের আরোহণ দিবসকে নতুন বাংলাদেশ দিবস বলে ঠিক করেন নাই। প্রত্যাহার করেছেন এটা বুদ্ধিমানের কাজ।

সংস্কার কমিশন প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান বলেন, এগুলোর তুলনা করা যায় টাস্কফোর্সের সঙ্গে। বাংলাদেশের অবনতির আরেকটা কারণ হলো- তারা বাংলা ভাষায় কিছু বলতে পারেন না। যত গর্জে তত বর্ষে না। কিন্তু যেটুকু বর্ষণ হয়েছিল সেটাও ছিল ভুল চিন্তা। প্রথমে শুরু হলো প্রধানমন্ত্রী পদ্ধতি নিয়ে। যেটাকে ক্যাবিনেট সিস্টেম বলে। বাহাত্তরে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্মে গেলেন, ’৭৫ সালে জিয়াউর রহমানও প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিতে থেকে গেলেন। সেই সুখকে কেউ উৎখাত করেননি। জেনারেল জিয়াউর রহমান, এরশাদ কেউ করেননি। সকলেই মনে করলেন প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্মই হচ্ছে আমাদের দেশে গণতন্ত্রহীনতার একমাত্র কারণ।

১৯৯০ সালের অভ্যুত্থানের ফলাফল হলো, চারটা জোট লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে আন্দোলন করলেন। এরপর বললেন, আমরা সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাবো। সেটার পরিণতি আরও খারাপ হলো। ’৯১ সালে নতুন যাত্রা শুরু হলো- নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। এটা যে একটা ভুয়া কথা তা হাসিনা প্রমাণ করেছেন। এখন নতুন আলোচনা চলছে আমরা কি প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে ফেরত যাবো? নাকি প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য করবো? এগুলো লক্ষণ দেখে বিচার করা, কারণে যেতে না পারা। দারিদ্র্য কীভাবে দূর করা যাবে, এটা নিয়ে অনেক কথা। কিন্তু দারিদ্র্য কি কারণে হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয় না। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ সরকার কেউই এ নিয়ে আলোচনায় রাজি নয়।


একটা গল্প রয়েছে- ঘরে সূঁচ হারিয়েছে সে তা রাস্তায় গিয়ে খুঁজছে। কারণ রাস্তায় আলো আছে। যেখানে সূঁচটা হারিয়েছে সেখানে সে খোঁজে না। তাদের দশাও তাই। সংসদে একটা উচ্চকক্ষ যোগ করতে হবে। এটাই কি প্রধান কারণ দেশের ক্ষতির? দেশে গণতন্ত্র না থাকার প্রধান কারণ কি জিজ্ঞাসা করতে তারা রাজি নন। নতুন ধনদৌলত সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিল্প গ্রুপগুলো কীভাবে এত ধন সঞ্চয় করলো? কীভাবে গড়ে উঠলো? এরা দেশের গণতন্ত্রকে কীভাবে প্রভাবিত করছে? কোন পার্টিকে চাঁদা দিচ্ছে? কোনো সংস্কার কমিশনে তার উল্লেখ নেই। উল্লেখ আছে, আমরা কি প্রধানমন্ত্রী শাসিত থাকবো, ৭০ ধারা থাকবে কি থাকবে না ইত্যাদি। এগুলোকে আমি খারাপ বলছি না। এগুলো সব অর্ধসত্য। তাদের বোধদয় হয়েছে সংসদে এককক্ষ থাকার কারণে বুঝি একনায়কতন্ত্রের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু এই এককক্ষেরই নির্বাচন হয়নি।

তিনি বলেন, পৃথিবীর অর্ধেক দেশ আছে যাদের সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট। যেসব দেশ ফেডারেল গোত্রের যেমন ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য তারা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। কোনো দেশ রাজাপ্রধান, কোনো দেশ প্রেসিডেন্ট প্রধান। লক্ষণটা কি? তারা বলছেন, এককক্ষ থাকার কারণে গণতন্ত্র ব্যাহত হচ্ছে। হতে পারে একদলীয় ব্যক্তি যখন সংসদের প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং পার্টি প্রধান হন তখন তা হতে পারে। এটা রোধ করার অনেক পথ আছে। দ্বিকক্ষের বিরোধী আমি নই। কিন্তু এটা আমাদের প্রধান সমস্যা না। প্রধান সমস্যা হচ্ছে- স্থানীয় শাসন বলতে কিছু নেই। যেমন ঢাকা একটা বড় শহর যার মেয়রকে বলা যেতে পারে মন্ত্রীর থেকেও শক্তিশালী। চট্টগ্রাম কি ছোট শহর? তাহলে তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদা কেন দেয়া হবে না। বলা হয় অমুক খারাপ লোক, সন্ত্রাসী। তাহলে আপনি খারাপ লোককে মেয়র নির্বাচিত করেছেন কেন? এটাকেই বলে স্বৈরাচার।

স্বৈরাচার নিয়ে একটা বিখ্যাত সংজ্ঞা আছে। ফ্যাসিবাদ সেটা নয় যে, সে কতো লোককে হত্যা করেছে। ফ্যাসিবাদ সে কোন পদ্ধতিতে হত্যা করেছে তার মাপে মাপতে হয়। বিনা বিচারে হত্যা, গুম, টর্চার করে হত্যা, ধরে নিয়ে ভারতের ওপারে পার করে দেয়া ইত্যাদি। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদ বলা জাস্টিফাইড কিনা? আমি বলবো শতভাগ জাস্টিফাইড। সামরিক শাসক আসলে সংবিধান বাতিল করে। শেখ হাসিনা করলো সংবিধানের ভেতর থেকে খেয়ে ঝাঁঝরা। একটা উদাহরণ দেই, সংবিধানে লেখা আছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু দেশের উচ্চতম আদালতে বাংলা চলে না। ডেইলি স্টার ইংরেজি মিডিয়াম পাস করা শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেয়। তারা চায় ইংরেজি মিডিয়ামে, বৃটিশ সিলেবাসে পড়ুক। এটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অনাস্থা জানানো। তারা তো এসএসসি, এইচএসসি পাস করাদের সংবর্ধনা দিচ্ছেন না। তারা এ লেবেল, ও লেবেলকে দিচ্ছেন।


অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, হাসিনার আমলে কীভাবে সংবিধানকে ফোকলা করে দেয়া হয়েছে এটা আমরা হাসিনার আমলেই বহুবার বলেছি। অনেকেই বলতেন, ধরে নিয়ে যাবে। ধরলে ধরবে, ধরা তো সম্মানের বিষয়। ফ্যাসিবাদের আরেকটা ধরন হচ্ছে ধরবে কিনা তার গ্যারান্টি নেই। হয়তো দেখা যাবে লাশ পড়ে আছে তুরাগের চরে। ফ্যাসিবাদ হচ্ছে, ভয়ে রাখা, ভয়ে থাকা। ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির জন্য আমরা কি করতে পারি? প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া মোটেও সমাধান নয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ্ধতির ভেতরে কি কি সমস্যা ছিল সেগুলো খুঁজে বের করা। অনেকেই আবার সমালোচনা করেন, ড. আলী রীয়াজ তো বিদেশ থেকে আসছেন। এসব কথা অন্যায্য। বলা উচিত ওনার যুক্তির ত্রুটিটা থাকলে কোথায় আছে? সবাইকে নিয়ে ঐকমত্য করার প্রশ্নটা কোথায়? বলা হচ্ছে কোনো ব্যক্তি একইসঙ্গে দলের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না? এগুলোকে আমি তুচ্ছ কথা মনে করি। কারণ, ছদ্মবেশেও শাসন করা যায়। যেমন ইয়াজউদ্দীন, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে প্রেসিডেন্ট করে দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ চালানো যায়।

পাকিস্তানে উপরের কক্ষ, নিচের কক্ষ আছে। কিন্তু সেখানেও নানান রকম পরিবর্তন হয়। আমেরিকার এক আমলা নাকি তারেক আলীকে বলেছিলেন, পারভেজ মোশাররফ আমাদের এখানে আসতেন, নানা বিষয়ে একমত হতেন, পাকিস্তানে গিয়ে ঠিক তার উল্টোটা করতেন। বলতেন, প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক কারণে পালন করতে পারছি না। আর আসিফ জারদারি বলার আগেই বাস্তবায়ন করতেন। ঐকমত্য কমিশন লক্ষণ নিয়ে টানাটানি করছে, আসল কারণ বের করতে পারছে না।

অবৈধ ক্ষমতার উৎসে হাত দিতে হবে। উৎসটা হচ্ছে, দেশের পুঁজির আদিম সঞ্চয়ন প্রক্রিয়াটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পুঁজি ধর্মঘট যখন চলে, তখন পুঁজি প্রত্যাহার করে বিনিয়োগ বন্ধ করে রাখে। এখন যেমন বিনিয়োগ কমে গেছে। বিদেশিরা আসছে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, অতিরিক্ত ভারতের উপর নির্ভরশীলতা, বিদেশি বাজারের উপরে নির্ভরশীলতা। যেভাবে আমরা অর্থনীতি গড়ে তুলেছি, যেটাকে নিওলিবারেলিজম বলে। মানে রপ্তানি করা আয়ের উপর ভিত্তি করেই মাত্র অন্যান্য জিনিস আমদানি করতে পারবেন। দেশীয় বাজার বলতে এদেশে শতকরা ৫০ ভাগও কিছু গড়ে ওঠেনি। এরকম দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে কোনো স্বকীয় রাজনৈতিক তত্ত্ব তৈরি করা যায় না।

তিনি বলেন, ছয়টা সংস্কার কমিশন অনেক কথা বলেছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন রিপোর্টের বিষয়ে বলেন, সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা আছে। কিন্তু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো কথা নেই। শুধু সরকার আর সংবাদপত্রের কো-রিলেশন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।  অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফলস্বরূপ। এই সরকার গণ-অভ্যুত্থানের পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই সরকারের অধিকাংশ লোকই গণ- অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এখানে আরও অনেক লোক আছে। তাদের নেয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞ আকারে। তারা যা করছেন তারা অক্ষমতার প্রকাশ। যারা সরকারে এসেছেন সবাই অভিজ্ঞ নন। সব দায়দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টাকে নিতে হবে। প্রথমদিকে, তিনি ক্ষমতা নেবেন কিনা তা নিয়েও চিন্তা করেছেন। এরপর শপথ নিয়ে নিজের বিরুদ্ধে রুজু মামলাগুলো প্রত্যাহার করেছেন। তার সব কাজকে আমি খারাপ বলবো না। তার ম্যান্ডেট গণ-অভ্যুত্থান। গণ-অভ্যুত্থানের যারা সাক্ষাৎ নেতা, যেমন নাহিদ ইসলাম- তারা ড. ইউনূসের কথা বলেছেন। অন্যরা মেনে নিয়েছেন। আমরা নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেয়েছি। এখন যেটা চলছে সেটা মবোক্রেসি। মব হচ্ছে কারণ জনগণ ঐক্যবদ্ধ নয়। এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে মারামারি করে। এখন আওয়ামী লীগ গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে।

বিভিন্ন দেশের মবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রুশবিপ্লবী লেনিনকে কিন্তু গুলি করেছিল মবেরই একজন লোক। এই মব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কারণ অব্যবস্থিত চিত্ততা বা আনডিসাইটেড মাইন্ডের জন্য। সব বিপ্লব তার প্রতিপক্ষ তৈরি করে। অবাক লাগে নবনীতা চৌধুরীর মতো সাংবাদিক কেন দেশ ছেড়ে পালালেন? তাদের বিদেশে পালিয়ে গিয়ে কেন প্রোপাগান্ডা করতে হচ্ছে? গণহারে মামলা হচ্ছে এই সরকারের ত্রুটি। এগুলো সরকার স্বীকারও করেছে। শেখ হাসিনা যেসব টেনডেন্সি দমন করেছিলেন সেগুলোর এখন বিস্ফোরণ হচ্ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই জঙ্গি বলা শুরু করেছিলেন। তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। কওমী জননী উপাধি নিয়েছিলেন তিনি। শেষ মুহূর্তে জামায়াত নিষিদ্ধ করেছিলেন। জামায়াতের বহু নেতাকে যুদ্ধাপরাধী হওয়ার কারণে শাস্তি দিয়েছেন। এসব কারণে একদম বন্ধ আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল। দেশে যেহেতু গণতন্ত্র ছিল না এজন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারগুলো যে নিরপেক্ষ তা তিনি প্রমাণ করতে পারেননি। বেশ কিছু স্ক্যান্ডাল তৈরি হয়েছিল, একজন বিচারপতিকে সরিয়েও দিতে হয়েছিল। বিপ্লবের ভ্যাকুয়ামটা হচ্ছে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের। কারণ তাদের দেশব্যাপী কোনো সংগঠনই ছিল না। যার কারণে সম্ভাবনা ছিল নৈরাজ্য তৈরি হওয়ার অথবা সামরিক শাসন জারি করার। সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত ছিল না। অন্তত তাদের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা ছিলেন। ডিজিএফআই কলঙ্কিত হয়েছিল গুম, খুন, আয়নাঘরের সঙ্গে জড়িত হয়ে। তাদের পায়ের তলায় মাটি ছিল না। জনরোষ সামরিক বাহিনীকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়- এটা তার প্রমাণ। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তারা কতোগুলো শক্তির উপর নির্ভর করেছে।

সংগঠিত শক্তি হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। বিএনপি বড় দল, কিন্তু জামায়াত অধিক সংগঠিত। এই কারণে নানারকমের মব তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি কিছু ইসলামিক শক্তি রয়েছে, তারা সক্রিয় হয়েছে। পিপল আর মব এক জিনিস নয়। পিপলের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে অনেক মব হয়েছে। এখন সুবিধাবাদী একটা গোষ্ঠী শাপলা বনাম শাহবাগ- এরকম কিছু কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করছে। আমার মনে হয়, এগুলো ধোপে টিকবে না। যেগুলোকে মব বলা হয়েছে। তাদের আমি বলবো বুদবুদ। তবে এগুলো লক্ষণ হিসেবে ভালো না। দেশে নানাধরনের যে শক্তি আছে তাদের মোকাবিলা করতে হবে রাজনৈতিক পদ্ধতিতে।


ছাত্র নেতাদের বিষয়ে বলেন, তাদের বয়স কম হতে পারে কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সাহসের প্রশংসা না করলে অন্যায় করা হবে। রাজনীতি হচ্ছে শেষ বিচারে ক্ষমতার জন্য লড়াই। আমি একদিন বলেছিলাম, উপদেষ্টা পরিষদে ছাত্রদের শতকরা ৫০টা আসন নেয়া উচিত। কিন্তু তাদের মাত্র দুটা বা তিনটা আসন দিয়েছে। পুরনো সরকারের যে প্রেসিডেন্ট তাকে রাখার যৌক্তিকতা কি? সংসদ বিলুপ্ত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেছেন। ওই সরকার বিলুপ্ত হয়েছে। সংসদ বিলুপ্ত হলে ওই সংসদের স্পিকার আর থাকে না। দেশ চলছে প্রেসিডেন্টের অর্ডিন্যান্সে অথচ সেই প্রেসিডেন্টেরই কোনো বৈধতা নেই। সুতরাং দেশ একটা নৈরাজ্যের মতো চলছে। আমরা ধারাবাহিকতায় চলছি। ১৯৯০ সালে বলতো, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় চলতে হবে। বর্তমান বিপ্লবের অসম্পূর্ণতাটা এখানেই। বিপ্লবটাকে আর বিপ্লব বলা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এটাকে আমি প্রতিবিপ্লব বলবো না। আমি বলবো, বিপ্লব আপস করেছে। দুই বা তিনজন ছাত্রকে স্থান দেয়া হয়েছিল সরকারে। তারা একজনও না থাকতেন; যেটাকে বলা হয় প্রেশার গ্রুপ সেটা হতেন তাহলেও তাদের সনদ বাস্তবায়িত হতো। বিপ্লব যে হয়নি তার প্রমাণ তথাকথিত জুলাই সনদ চূড়ান্ত হতে অনেক বেশি সময় লেগেছে।
একাত্তরে আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো প্রস্তুতি ছিল না স্বাধীনতার জন্য। ইন্দিরা গান্ধীর অনুমতি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হয়েছে। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ থেকে ১০ই এপ্রিল পর্যন্ত এত সময় লাগলো? এটাতেই প্রমাণ, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের জন্য দল হিসেবে প্রস্তুত ছিল না। ব্যক্তি হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ থাকতে পারেন। অনেকে বলবেন, তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কেন দেখা করলেন? দেখা করা ছাড়া উপায় কি? আওয়ামী লীগের সময় ছিল। ’২৪ বিপ্লবীদের সময় ছিল না। তাদের যখন ধরে নিয়ে যেয়ে পেটানো হলো: তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাদের রাজনৈতিক সংগঠন না থাকলেও গোটা দেশ তাদের নেতৃত্বের অপেক্ষায় ছিল। জিয়াউর রহমান যেভাবে ’৭১ সালে নেতা হয়েছেন শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে। তাজউদ্দীনও বলেছিলেন, জিয়াউর রহমানের বক্তব্য শুনে তিনি উজ্জীবিত হয়েছেন। যিনি পরবর্তীতে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন, যার অধীনে তিনি সেক্টর কমান্ডার হবেন তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ওই বিপ্লবের মুহূর্তে সেক্টর কমান্ডার নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখানেও তাই। এই বিপ্লবের প্রকৃত নেতা নাহিদ ইসলাম। ক্ষমতায় নাহিদ ইসলামের প্রধান উপদেষ্টা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা এই: তিনি ইউনূসকে ডেকেছেন। বলেছেন, আমি পারবো না। নাহিদের চেয়ে সামান্য বেশি বয়স ছিল ফিদেল ক্যাস্ট্রোর। ক্যাস্ট্রোর হাতে বন্দুকও ছিল। ফিদেল ক্যাস্ট্রো প্রথমে আরেকজনকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেছিলেন। এই আন্দোলনের কাঠামোগত দুর্বলতা হলো, জনগণ যাদের নেতা মেনে হাসিনাকে পরাজিত করেছে তারা নিজেরাই নেতৃত্ব নিতে সাহস করেননি। তারা আরেকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছেন। তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া আছে। এক বছর পর মনে হচ্ছে ক্ষমতা আবারো পুরনো নহরে, পুরনো চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে। বড় আকারে মৌলিক পরিবর্তন আশা করা যাবে না। আহা! যে অন্যায় হাসিনা করেছে এই অন্যায় ’৭১ সালে পাকিস্তান আর্মিরাও করেনি।


গত বছরের ৩১শে জুলাই ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বক্তব্যে আইয়ুব খানের উন্নয়ন দর্শন ও শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন আমি বর্ণনা করেছিলাম। কিন্তু আইয়ুব খান এত লোক খুন করেনি। শুধু ৩৬ দিনের কথা বলছি না, রাজত্বকালে যত খুন করেছে, যত জঙ্গি নাটক করেছে- তা আইয়ুব খানকে করতে হয়নি। শেখ হাসিনাসহ যারা হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তাদের বিচার না করলে বিপ্লব ব্যর্থ হবে। কিন্তু তাদের বিচার হলে বিপ্লব অর্ধেক সফল হবে। বাকিটা বাস্তবায়ন করার জন্য জনগণের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। মূল আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে- জনগণ তাদের অধিকার ফেরত চায়। যে সরকারই হোক সরকার তাদের অধিকার বদলাতে পারবে না। মাইনোরিটিদের অধিকার বদলাতে পারবে না। মেজোরিটির শাসনকে গণতন্ত্র বলা হয়। কিন্তু মেজোরিটির জোরে মাইনোরিটির অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। ভারতে এখন হিন্দুত্ববাদ চলছে। আমি মৌলভীদের সম্মানের সঙ্গে বলি আপনারা ভারতে যদি সেক্যুলারিজম চান তো বাংলাদেশে চান না কেন? বাংলাদেশে যেহেতু মুসলিম মাইনোরিটি না তাই সেক্যুলারিজম চান না। বাংলাদেশ উপমহাদেশে তখনই নেতৃত্ব দিতে পারবে যখন মাইনোরিটি, মেজোরিটি ভাগ থাকবে না। হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান বলে যাতে কাউকে নির্যাতন করা না হয়। এমনকি কাদিয়ানি বলেও যাতে নির্যাতন করা না হয়। আমাদের দরকার নাগরিক অধিকার।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, শেখ হাসিনার আরেকটা ফ্যাসিবাদী চরিত্রের নজির হচ্ছে রাষ্ট্রভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় উন্নীত না করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলা। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন হয়েছিল। শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করে বোঝানো হয়েছে এটা একটা বিশাল অর্জন। কোনো লেখককে যদি বলা হয়- মহিলা লেখক। তা ওই লেখকের ডিমোশন। এটাও একটা ফ্যাসিবাদের প্রকাশ।

গণতন্ত্র চাইলে সবাইকে ভোটাধিকার দিতে হবে। ভোটের দিন মারামারি না হয়, কেউ যাতে কারও ভোট কেড়ে নিতে না পারে। এককক্ষ হোক, দ্বিকক্ষ হোক সেটা বড় কথা নয়। প্রত্যেকটা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে হবে। আমার একটা প্রস্তাব আছে- পিআর নয় প্রয়োজন স্থানীয় প্রতিনিধি পদ্ধতি। বাংলাদেশের ৬৪ জেলা আছে। প্রত্যেক জেলা থেকে ২ জন করে সদস্য নেয়া হবে। ১২৮ জন সদস্য নিয়ে একটা জাতীয় পরিষদ হবে। ঢাকায় জনসংখ্যা বেশি, তার সংসদীয় আসন সংখ্যা যাই হোক উচ্চকক্ষে সদস্য দুইজন হবে। কুড়িগ্রাম থেকেও দুইজন হবে। তাহলে উন্নয়নের বৈষম্যে লাগাম টানা হবে। উচ্চকক্ষ যা  হবে সেটা হবে সরাসরি ভোটে। এখন এনজিওতন্ত্র বেশে দানা বাঁধছে মেরিটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করা নিয়ে। এটা সাংঘাতিক ফ্যাসিবাদে যাবার পথ। বিনাভোটে বা তথাকথিত পিআর পদ্ধতিতে ভোটে উচ্চকক্ষে নির্বাচনের চক্রান্তটা অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল, গণতন্ত্রহীন। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটা হতে হবে জেলা অনুসারে। প্রতি জেলা থেকে ২ এর জায়গায় ৩ হতে পারে। একসঙ্গে সকল কক্ষের নির্বাচন করা যাবে না। আলাদা আলাদা সময়ে নির্বাচন হতে হবে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য এটা ভালো পথ হতে পারে। উচ্চকক্ষের বিষয়টি এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রমোট করছে। এটা সুকৌশলে আলী রীয়াজের ঐকমত্য কমিশনও চালানোর চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, ভারত এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো প্রভেদ দেই। ওবায়দুল কাদের সেনাপ্রধানকে মীর জাফরের সঙ্গে তুলনা করে ফেলেছেন। আওয়ামী লীগের বড় পরাজয় হচ্ছে নৈতিক পরাজয়, হয়তো দৈহিক পরাজয় হয়নি। এসবি’র রিপোর্ট বলছে, দেশে একটা গৃহযুদ্ধ হতে যাচ্ছে। এসবি’র এক পরিচিত লোক আমাকে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার আমলেও আন্দোলন হতে যাচ্ছে বলে তিনি রিপোর্ট দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করেনি। আওয়ামী লীগ ভারতের পার্টি এবং সেটা বিজেপি-কংগ্রেস একসঙ্গেই প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপিও এক্সপোসড হয়েছে। বিএনপি যে একটা প্রো-ইন্ডিয়ান পার্টি সেটাও প্রমাণিত পেয়েছে। শুধু সালাহউদ্দিন নয়, পুরো বিএনপি চাইছে যাকে প্রয়োজন তাকে তোষণ করে ক্ষমতায় যাওয়া। আওয়ামী লীগ এখন রটাচ্ছে এই আন্দোলনটা আমেরিকা ঘটিয়েছে। যেটা ডাহা মিথ্যা কথা। প্রকৃতি শূন্যতা সহ্য করে না। বাংলাদেশে এখন নতুন আন্তর্জাতিক খেলা চলবে এর মধ্যে আমেরিকা আছে, চীন আছে, ভারত তো আছেই। রাশিয়া দূরে হলেও ইনভলব। আওয়ামী লীগের গায়ের কাপড় খুলে গেছে। দলটা পুরোপুরি ভারতনির্ভর। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। ’৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি পরিত্যাগ করেছিল তারা। আওয়ামী লীগকে প্রথম হত্যা করে কে? শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি এটার নাম বাকশাল দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা নামটা বদলাননি। কিন্তু চরিত্র একই ছিল।

ইতিহাসের বিচারে শেখ হাসিনার অপরাধের দায় আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটা কর্মীকে নিতে হবে। তাকে কেন্দ্র করে কীসব স্লোগান দেয়া হয়েছে! আওয়ামী লীগাররা হাততালি দিয়েছে। প্রত্যেককে ইতিহাসের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কথা বলছি না। অন্যদিকে বিএনপি ১৬ বছর আন্দোলন করেছে। অনেক নির্যাতন, অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কিন্তু তারা আখেরে ধরে রাখতে চাইছেন পুরনো সংবিধান। যেটাতে তাদের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী ও দলনেতা রাখতে চায়। যদিও সেটাতে তারা ছাড় দিচ্ছেন- পরে যে তারা সরে যাবেন না- এটার গ্যারান্টি কি?
তিনি বলেন, জুলাই সনদের মানে হচ্ছে ‘লেজিটেমেসি অব জুলাই রেভ্যুলুশন’। জুলাই সনদ না হলে এদের হাসিনা এসে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে। সুতরাং ইট শুড বি লিগ্যালাইজড। শুধু অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে নয়, সর্বদলীয়ভাবে হলে ভালো। এটা এরকম হবে যে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা ছিল জাতির পক্ষে কর্তব্য। যারা অংশ নিয়েছে তারা নায়ক। কিন্তু একদল এটা নিয়ে পড়ে আছে। ’২৪ কি দ্বিতীয় স্বাধীনতা? ’২৪ কি ’৭১ বিরোধী? হ্যাঁ, এখানে জামায়াতের একটা টেনডেন্সি আছে; ’৭১কে অস্বীকার করার। জামায়াতের বিচার হয়েছে কেন? তারা একটা সামরিক শক্তি গঠন করেছিলেন আল বদর নামে। নেজামে ইসলাম ও যারা এখন কওমীপন্থি হয়েছেন তারা গঠন করেছিলেন আল শামস। রাজাকার, আল বদর, আল শামস এই পার্টিগুলো যারা করেছেন তাদের বিচার হয়েছে। আমার মনে হয় জামায়াতের পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে ’৭১ বিষয়ে তারা এমবিগুয়াস। জামায়াতের একটা তরুণ সমাজ আছে। যারা মনে করে আমার বাংলাদেশ নামকরণের মধ্যেই একটা অনুশোচনা আছে। কিন্তু তারা কি কারণে ক্ষমা চেয়েছেন সেটা পরিষ্কার না। জামায়াতের ’৭১ বিষয়টি নিয়ে স্পষ্টকরণ করা উচিত। তাতে নতুন যাত্রা হতে পারে।

দক্ষিণপন্থা যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে মূলত মধ্যমপন্থার লোকেরা বেশি ছিল। তাতে বামেরও কিছু হিস্যা ছিল। বামেদের রাজনীতি হচ্ছে না। তারা হয় নিষ্ক্রিয় কিংবা শেখ হাসিনার সহযোগীতে পরিণত হয়েছিলেন। যেমন, সিপিবি, বাসদ। তাদের রাজনীতিতে আমরা হতাশ। বামের রাজনীতি বলতে গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্য এনারা মধ্য বামপন্থি। বিএনপিতে ডান-বাম দুটোই আছে। বিএনপিকে মধ্যপন্থি ধরতে পারেন। ডানে আছে জামায়াত। তাদেরও ডানে আছে ইসলামী ব্যানার বহনকারী দল। আগে তারা কথা বলতে পারেনি। তাদের শেখ হাসিনার আমলে দমন করা হয়েছে। যেহেতু তারা বিপ্লবে অংশ নিয়েছেন সরাসরি কিংবা পরোক্ষ সেহেতু তাদের কথা আপনাকে শুনতেই হবে। তাদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ করলে লাভ হবে পরাজিত ফ্যাসিস্টদের। বাংলাদেশকে একটা স্থিতিশীল করতে চাইলে আমরা গৃহযুদ্ধ চাই না। তবে আমরা ভারত বা পাকিস্তান কারও অধীনস্থতা মেনে নিতে প্রস্তুত নই। ভারতকে মনে রাখতে হবে তার পেছনে চীন লেগে আছে। বাংলাদেশের সঙ্গেও লড়াই করবে, চীনের সঙ্গেও লড়াই করবে এটা ভারতের জন্য সহজ নয়। ভারত যখন ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের পানি বন্ধ করেছে; ভেবেছে এটা তার অধিকার। আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হলেও ভারত পানি দেয়নি। কিন্তু চীন যখন বাঁধ দিয়েছে তখন মাথাব্যথা হয়েছে। এখন ভারত বাংলাদেশকে টানতে চাইছে। চীন বাঁধ দেয়াতে ভারত-বাংলাদেশ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা শক্তের ভক্ত নরমের যম।

তিনি বলেন, নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধিতা নতুন নয়। এটা পাকিস্তান আমলেও ছিল। যখন পরাধীন ছিলাম তখন পরাধীনতার বিরুদ্ধে আমরা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছি। পাকিস্তান আমলে ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের সময় কয়েকটা আইনগত কাঠামো গঠন করেছিলেন। ইয়াহিয়া খান একটা বিপ্লবই করেছিলেন। এক মাথা এক ভোট। চার মাসের মধ্যে সংবিধান রচনা করতে হবে। এমন কোনো আইন করা যাবে না কোরআন-সুন্নাহর বিরোধী হবে। পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র হবে। এগুলো শেখ মুজিব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ’৭০ নির্বাচনে এগুলোর কথা আর কেউ বলে না। মানে ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র করার পক্ষে তো তিনি ছিলেন না। তবু মেনেছিলেন কারণ না মানলে তো আর নির্বাচনে যেতে পারবে না। মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ ভাসানীপন্থিরা স্বাধীনতার স্লোগান দিলেও শেখ মুজিব দিতে পারেননি।  বাংলাদেশ বহু জাতির দেশ। আমরা বলছি সকল জাতির অধিকার রাখতে হবে। ঠিক তেমনি সকল ভাষার অধিকার রাখতে হবে। চাকমা, গারো, মারমা, সাঁওতাল সবার অধিকার-ভাষা রাখতে হবে। নারীরা কিন্তু সংখ্যাগুরুদের অংশ।

প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র আনতে চাইলে শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা চালু করতে হবে। সকল ধর্ম বাংলা ভাষায় শেখাতে হবে। কেন বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেন বা স্কুলগুলো ইংরেজি মাধ্যমে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অন্য বিষয়। বর্তমান সরকার শিক্ষা নিয়ে কোনো কমিশনই গঠন করলো না। ভবিষ্যতে হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশে কয়েকশ’ বিলিয়নিয়ার হয়েছে। দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে তারাই। তারা মিডিয়া, করপোরেট, আন্তর্জাতিক পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইংরেজি মাধ্যম চালু রাখা। শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ব্যয় করছে সরকার তা লজ্জাজনক। মাত্র ২ শতাংশ। এটা ১০ শতাংশে না গেলে ব্যাপক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে পারবে না। আমাদের দেশে ৩৫ রকমের প্রাথমিক শিক্ষা রয়েছে। যেকোনো রকমের প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করলেই সে নিজ উদ্যোগে বই পড়বে। সুশিক্ষিত ব্যক্তি মানেই স্বশিক্ষিত। স্কুলে কয়েকদিন থাকা মানে জেলখানায় থাকা তো। জেলখানায় থাকার একটা উপকারও আছে। জীবনে শৃঙ্খলা চলে আসে।

তিনি বলেন, সব থেকে বড় সংস্কার করা উচিত ছিল সবার জন্য বিনা পয়সায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সুযোগ করে দেয়া। এটা হবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। পরিচালনা হতে পারে বেসরকারি।  যারা অর্থের অভাবে পড়তে পারে না তাদের পরিপূর্ণ বৃত্তি দেয়া উচিত। দেশে ‘এ’, ‘ও’ লেবেল নিষিদ্ধ করা উচিত। ইংরেজি মিডিয়াম উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা উচিত। মাদ্রাসা ছাত্ররা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসায় হিন্দুরাও পড়তে পারে। ওখানে মাদ্রাসা হাইস্কুলের মতো। আরবি, ফারসি বিষয় আছে। পড়লে পড়বেন না পড়লে নেই। আমাদের দেশে ইংরেজি পড়ানো বাধ্যতামূলক। ২০০ নম্বরের ইংরেজি না পাস করে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করতে পারছে না। কিন্তু গণিত কেন ইংরেজিতে পড়াচ্ছেন? ইংরেজি মিডিয়ামে কেন ভারতের বই পড়াচ্ছেন? নারীদের অধিকার আসবে তখনই যখন গণতন্ত্রের বিজয় হবে। নারীদের নিয়ে যে আলোচনা এগুলো মূল সমস্যা, গণতন্ত্রের সমস্যা লুকানোর জন্য মুখরোচক আলোচনা। মেয়েদের ভাগ্য মেয়েদেরই নির্ধারণ করার অধিকার দিতে হবে।

শেষ কথায় এই চিন্তাবিদ বলেন, ইতিহাসে যত বিপ্লব দেখেছি কোনো বিপ্লব সম্পূর্ণ ব্যর্থ বা সম্পূর্ণ সফল হয়নি। বিভিন্ন বিপ্লবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমন কোনো পরিপক্ব ধনিক শ্রেণি তৈরি হয়নি যারা জনগণের উপর কর্তৃত্ব করতে পারেন নৈতিক অধিকারে। তারা এজন্য একটা পরিবারের উপর নির্ভর করেন। আমার বাবা দেশটা স্বাধীন করে দিয়েছে। তার মানে ক্ষমতায় এসেছেন বাবার অধিকারে, নিজের অধিকারে না। একইভাবে বিএনপিও তাই। এটাই বিপ্লবের ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের পোশাক

আমরা ’৭১-এ আংশিক সফল হয়েছি। একটা দেশ পেয়েছি, একটা পাসপোর্ট পেয়েছি। কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ছদ্মবেশী রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেছি। পরিবারতন্ত্র দক্ষিণ এশিয়ায় আছে। আমি বিপ্লব নিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখি না। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার যেন থাকে। ফ্যাসিবাদ যাতে না ফিরে আসে।

’৭২-এর সংবিধান পরিবর্তন করা ছাড়া কোনো পথ নেই। অবাক কাণ্ড। বর্তমান সরকার এই সংবিধান বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জুলাই বিপ্লব আংশিক সফল হয়েছে। কারণ আমরা ’৭২ এর সংবিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারছি। ’৭১-এর এপ্রিল সনদের আলোকে ’২৪-এর জুলাই সনদ বহাল হতে হবে। ইতিহাস এটাকে প্রগতি বলে। আমি অবশ্য প্রগতিতে বিশ্বাস করি না। আমি বলি, ইতিহাসে গতি আছে, প্রগতি নেই। আর বিপ্লব কখনো ব্যর্থ হয় না। অন্য বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে।

(জনতার চোখ থেকে ) সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজল ঘোষপিয়াস সরকার

Saturday, May 3, 2025

দুরবস্থায় ৬০০ বিজ্ঞানী by পিয়াস সরকার

ক’দিন ধরেই উত্তাল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপশক)। দু’মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারী-বিজ্ঞানীরা। ১১ দফা দাবিতে টানা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন তারা। প্রায় ৬০০ বিজ্ঞানী ও ২৫০০ কর্মকর্তার অভিযোগ তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে খুব বাজেভাবে। করতে দেয়া হচ্ছে না স্বাধীন বিজ্ঞান চর্চা। ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ মেলার পরও মিলছে না অনুমতি। সভা-সেমিনারগুলোতে যাচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আমলে নেয়া হচ্ছে না নিউক্লীয় তথ্যের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা। যে সফটওয়্যারে তাদের তথ্য দিতে বলা হচ্ছে তা ভারতীয় একটি সফটওয়্যার। নিয়ন্ত্রণ করা হয় চেন্নাই থেকে।

বাপশক-এর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিজ্ঞানীরা জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেতন-ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামের তালিকার পাশাপাশি প্রত্যেকের পরিবারের জীবন বৃত্তান্ত, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আয়-ব্যয়, আমদানি-রপ্তানি, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি সব কিছু এই সফটওয়্যারে দিতে হয়। এই সফটওয়্যারটি নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে ভারতের চেন্নাই থেকে। বিজ্ঞানীদের অভিযোগ, এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার রীতিনীতি মেনে পরমাণু প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিশেষায়িত গবেষণা ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করলে কোনো গোপনীয়তাই থাকবে না।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন চেয়ারম্যান ও ৪ জন সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ পদগুলো শূন্য। বর্তমানে চেয়ারম্যান ও মাত্র একজন সদস্য দায়িত্বে রয়েছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফ্যাসিস্ট সরকার বিতাড়িত হলেও এখনো মন্ত্রণালয় ফ্যাসিস্টের দোসরমুক্ত হয়নি। পূর্ণ স্কলারশিপ থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা/প্রশিক্ষণের জন্য গভর্নমেন্ট অর্ডার (জিও) প্রদান করা হচ্ছে না। অভিযোগ গত কয়েক মাসে মন্ত্রণালয়ের প্রায় ১২ জন কর্মকর্তা পরমাণু প্রযুক্তি বিষয়ক বৈদেশিক প্রশিক্ষণে মনোনয়ন নিয়েছেন। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র দেখছেন বিজ্ঞানীরা। তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত নিউক্লিয়ার সিকিউরিটির ওপর একটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং কোর্সে কোনো বিজ্ঞানীকে না পাঠিয়ে পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ের এডিশনাল সেক্রেটারি মো. মইনুল ইসলাম তিতাসকে। ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর নিউক্লিয়ার সিকিউরিটির ওপর ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত প্রোগ্রামে যান ডেপুটি সেক্রেটারি মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার, অস্ট্রিয়ায় ইনসাইডার থ্রেট ইউজিং দি শাপারস থ্রিডি মডেলের ওপর কর্মশালায় যান সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ফারজানা, সিডনিতে অনুষ্ঠিত সেইফ ট্রান্সপোর্ট অব রেডিওকেটিভ মেটেরিয়াল প্রোগ্রামে যান সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মো. সানোয়ার হোসেন।

ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তিনি ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েও যেতে পারেননি দেশের বাইরে। তিনি বলেন, ১৯৮৫ সালের নির্দিষ্ট একটা কমিশন আইন আছে। যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে কমিশন কীভাবে চলবে সব বলা আছে। এখানে উচ্চশিক্ষাকে ট্রেনিং হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটা ২০১০-এর আগে অনেক সহজ ছিল। আমি আমেরিকায় ফুল ব্রাইট ভিজিটিং স্কলার্স প্রোগ্রামে স্কলারশিপ পাই, যা সারা বিশ্বের মধ্যে সেরা। রূপপুরে যে বর্জ্যগুলো উৎপন্ন হবে বা আমাদের এখানেও কিছু মেডিকেল নিউক্লিয়ার বর্জ্য বের হয়, এটার ডিসপোজালের জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা প্রয়োজন। কমিশন থেকে খুবই উৎসাহ দেয়া হলো। দেশের একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে এই স্কলারশিপটা আমি পেয়েছিলাম। ২০২৪ সালের কথা, কমিশন থেকে মন্ত্রণালয়ে জিও’র জন্য চিঠি পাঠালো। আমার পাসপোর্টে জে ওয়ান ভিসা লেগে গেছে, আমি কোথায় থাকবো, কার আওতায় কাজ করবো সেটাও ঠিক করা হয়েছে। জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটিতে এই প্রোগ্রামটা ছিল। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ আমার জিও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) নামঞ্জুর করা হলো।

তিনি বলেন, আমি সচিবের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি বললেন সিদ্ধান্ত হয়েছে ওটা কিছু করা যাবে না। এরপর ফের পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করার পরও হলো না। জে ওয়ান ভিসা ছয় মাসের জন্য দেয়া হয়। আমাকে ছয় মাস পর অবশ্যই ফেরত আসতে হতো। সচিব বললেন, এত পড়াশুনা করে কী হবে? এই বিজ্ঞানী বলেন, দুইজন উপদেষ্টা ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন, দেখেন এটা প্রেস্টিজিয়াস একটা প্রোগ্রাম। দুই দেশের সম্পর্কেরও বিষয়। তাও জিও দেয়া হয় নাই। ফুল ব্রাইট স্কলারশিপে চান্স পেয়ে যাননি- এমন ইতিহাস বাংলাদেশে নাই। সরকারের এক টাকাও খরচ দিতে হতো না বরং রেমিট্যান্স নিয়ে আসতে পারতাম। আমি গত ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখ রিট করেছিলাম। হাইকোর্টের রায় আমার পক্ষে আসলো। একটা রুলিং দেয়া হলো, কেন জিও দেয়া হবে না এবং ৭ দিনের মধ্যে জিও দেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হলো। এরপর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। এটা চিফ জাস্টিজ পর্যন্ত গিয়েছিল। চিফ জাস্টিজ বলেন, রুলিংয়ের উপর হেয়ারিং করে রায় দেয়ার জন্য। এরপর আবারো আমি আপিল করতে পারতাম কিন্তু করি নাই। কারণ সময় শেষ। যখন হাইকোর্টে ডিরেকশন দেয়া হয় তখন হাইকোর্ট থেকে মন্ত্রণালয়ে ফোন করা হয়েছিল। তারা তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। এ বিষয়ে শোকজও করা হয়েছিল। সেটা আমার রায়েও লেখা আছে।

তিনি বলেন, আমরা কমিশনে আসি দেশকে সেবা দিতে। দেশি-বিদেশি একটা চক্র আছে যারা চায় না বাংলাদেশ বিজ্ঞানে এগিয়ে যাক। রূপপুরে আমাদেরকে কোনো কাজে লাগানো হয় নাই। রাশিয়ানদের, ভারতের কাজে লাগানো হচ্ছে। আমি নিউক্লিয়ার ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য সক্ষম। প্রয়োজনে তারা আমার মেধা যাচাই করুক। সেখানে যারা বাংলাদেশি কাজ করছে যারা তারা সব স্টাফ টাইপের লোক। মনে রাখতে হবে, রূপপুর কিন্তু চারটা পদ্মা সেতুর সমান টাকা। প্রশ্ন তো ওঠেই, রূপপুরে যে প্রকল্প করা হয়েছে এর থেকে ভারত-পাকিস্তান অর্ধেক টাকায় কীভাবে করলো?

ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ৫ই আগস্টের পর আমরা আশাবাদী ছিলাম পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে। কিন্তু উল্টো হয়েছে বরং সচিবালয়ের লোকদের মাধ্যমে জঘন্য আকার ধারণ করেছে। তারা চান আমরা যাতে ভারতের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকি। রূপপুর কিন্তু ১০০ বছরের প্রজেক্ট। এখানে নিজস্ব লোকবল না থাকলে, প্রযুক্তি না থাকলে অন্য স্থান থেকে নিয়ে আসতে হবে। ভারত এটাই চায়। রূপপুরে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমান মন্ত্রণালয় ত্রাণকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী ড. মো. সাইফুর রহমান বলেন, আমি ফুল ফান্ডেড জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব সায়েন্স (জেএসপিএস) ফেলোশিপ পাই। আমি বাংলাদেশে হাড় ও মাথার স্কাল (খুলি) নিয়ে কাজ করি। জাপানে আমার কাজ ছিল মানুষের দেহের একটা কোষ থেকে মাথার খুলির বিভিন্ন অংশ তৈরি করা। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে কিনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করবে। আমার প্রোগ্রাম ছিল ২ বছরের। এরমধ্যে মেডিসিনের যারা নোবেল লরিয়েট ছিলেন তাদের সঙ্গে বৈঠকও ছিল।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে জিও’র জন্য ’২৪ সালের অক্টোবরে আবেদন করি। এরপর ডিসেম্বরে আবেদন করলেও দেয়া হয়নি। পোস্ট ডক্টরেট শুধু ডিগ্রি নয়। মন্ত্রণালয়ের লোকজনভাবে এটা বেনজির টাইপ ডিগ্রি। এটা একটা প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীদের উন্নতি হয়। বিশ্বব্যাপী কাজকে দেখানো যায়। ২০২২/২৩ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথে বাচ্চাদের মাথার খুলি ডেভেলপের বিষয়ে একটা সুযোগ ছিল পোস্ট ডক্টরেট করার। তখনো আমাকে যেতে দেয় নাই। তখন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বলা হয়েছিল লাইফ ক্রাশ করে দেবে, গোয়েন্দাদের দিয়ে ফ্যামিলিকে তুলে নেবো ইত্যাদি। হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পাওয়ার পরও যেতে পারি নাই। তখন চেয়ারম্যান ছিলেন ড. অশোক কুমার পাল। তিনি বলেন, হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ে কী হবে?
এই বিজ্ঞানী বলেন, মন্ত্রণালয় বলে ডক্টরেট করেছেন নামের আগে ড. লেখার জন্য আমাদের অনুমতি নিতে হবে। এগুলো কিন্তু দেশের টাকার ফেলোশিপ না বা বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ না যে, দেশের টাকায় বিদেশে গিয়ে  মোজ মাস্তি করবো। বিগত সময়ে এক সচিব শুধু বলতেন, ব্লিডিং বানাও-যন্ত্রপাতি কেনো। মানে তার কথা শুধু রাজমিস্ত্রি হও। সব সময় বলছি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগাবো, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। কিন্তু কোনো অর্থ ব্যয় করা হয় নাই, কোনো লক্ষ্য নিয়ে কাজও করা হয় নাই। পলিসিও নাই। এদের লক্ষ্য ছিল যন্ত্রপাতি কেনো। এটা কীভাবে চালায় এটা শেখার জন্য বিদেশে গিয়ে ঘুরে আসো।

সাইফুর রহমান বলেন, জাপানের স্কলারশিপ যখন দিল না তখন আমি মন্ত্রণালয়ে একজন এডিশনাল সেক্রেটারির কাছে গেলাম। অনেক কথার পর তিনি বলেন, আমরা রাজা, আপনারা প্রজা এটা মেনে নেন। এটা মেনে নিলেই সমস্যা শেষ। ৫ই আগস্টের আগে তো এসোসিয়েশনের নির্বাচনও করতে দেয়া হয় নাই। বলে, তোমরা এসোসিয়েশন করলে পিটায়া পিঠের ছাল উঠায়া দেবো। যাই হোক, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আবেদন না করে দেয়া হলো। কমিশন চেয়ারম্যান স্যার আবেদন করতে বললেন। এরমধ্যেই জাপানের ভিসা পেলাম, যে বাসায় থাকবো সেটা ঠিক হলো, ল্যাবের ফান্ডও প্রস্তুত হয়ে গেলো। কিন্তু পুনর্বিবেচনাতেও না করে দেয়া হলো। জাপান অ্যাম্বাসি থেকে ফোন দেয়া হলো স্কলারশিপ নেবো কিনা? আমি বারবার সময় বাড়ালাম কিন্তু যেতে পারলাম না। হাইকোর্টে গেলাম গত মার্চে। রিট করলাম। হাইকোর্ট আদেশ দিলেন, সাতদিনের মধ্যে জিও দিতে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে আপিল করা হলো। এই প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার কথা ছিল নভেম্বরে। এখনো প্রফেসরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। আমার সুযোগ এখনো রয়েছে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বাপশক) কার্যালয় আগারগাঁওয়ে। প্রবেশ পথেই চোখে পড়ে একটি পোস্টার। যাতে লেখা- ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র সিনিয়র সচিব খুনি হাসিনার সুরক্ষা সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মোকাব্বির হোসেনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে অপসারণ চাই।’ এসব অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন বলেন, তথ্য পাচারের কোনো বিষয় না। তাদের মূল দাবি তারা আইবাসে যুক্ত হতে চান না। এটা সরকারের ইস্যু। অর্থ বিভাগ যখন দুই বছর ধরে সময় দিচ্ছে তারা অক্টোবরে না করেন। তারা সময় বাড়িয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দিলেন। আমরা দেখলাম ১৩ শতাংশের জন্য সমস্যা হবে। আমরা বললাম, এটা কেস টু কেস সমাধান করে দেবো কিন্তু তারা রাজি হলেন না। ওনাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আইবাসে বেতন না নেয়া। তাদের কিছু লোকবল নিয়োগ আছে তারা অনুমোদনবিহীন। আইবাসে ঢুকতে গেলে ওনারা আটকে যাবেন।

উচ্চশিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, ড. মুনিরুজ্জামান পোস্ট ডক্টরেট স্কলারশিপ পেয়েছেন। উচ্চশিক্ষা হচ্ছে পিএইচডি পর্যন্ত। এটা কোনো উচ্চশিক্ষা নয়, এটা চাকরি। এটা কোনো সেমিনার না ওয়ার্কশপও না। ফলে ওনারটা নামঞ্জুর করা হয়েছে। উনি আদালতে গিয়েছিলেন। মহামান্য আদালত ফুল বেঞ্চে এটা না করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ওনারা স্বায়ত্তশাসন চান। ২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী ওনারা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। স্বায়ত্তশাসন দেয়া আমাদের এখতিয়ার না।

রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের বিষয়ে বলেন, রাশিয়ান টেকনোলজি ও নির্দেশনায় প্রত্যেকটি কাজ হচ্ছে। কোথায় কোন লোক কী করবে, সব রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। মন্ত্রণালয়ের এখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। আমরা ১৯০০’র বেশি লোক নিয়োগ দিয়েছি। ওনাদের একদল ফেস বাই ফেস কাজ করেছে। এখানে গবেষণার কোনো সুযোগ নাই। পাওয়ার প্লান্টে যে নিয়োগ, সেটা গত সাত বছরে হয়েছে। ওনাদের দাবি বায়ারদের বাদ দিয়ে ওনারা বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি করবেন পিডিবি’র সঙ্গে। নিউক্লিয়ার পাওয়ারের আইন বলা হয়েছে, রূপপুরের প্রথম পিডি হবেন কোম্পানির এমডি। তাহলে পাওয়ার বিক্রির চুক্তি করবে কীভাবে? কোম্পানি আইনেই তো রেজিস্ট্রার্ড হয়েছে। কোম্পানি করাই হয়েছে ব্যবসার জন্য। সেই অনুযায়ী কোম্পানিকে বলা হয়েছে তোমরা পিডিবি’র সঙ্গে সেল পারসেস এগ্রিমেন্ট করো।

কমিশনের বিষয়ে বলেন, এখানে কমিশনের মেম্বার পদ খালি। তাদের মধ্যে কিছু জটিলতা ছিল। ওনারা গুছিয়ে দেয়ার পরই এসএসবি’তে পাঠাই। এটা তো এসএসবি’র এখতিয়ার, আমার না। আমরা ১৮২ জন নিয়োগ দেয়ার কথা বলেছি। ওনারা নিয়োগ করেন নাই। সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছেন। আমাদের ২২টি ইনমাস (ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস) পরে রয়েছে। এখানে যে জনবল সৃজন হয়েছে, একজন লোকও নিয়োগ দেন নাই। আমি বারবার চিঠি দিয়েছি, মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন, কোটি কোটি টাকার যন্ত্র পড়ে আছে। এটার কারণ হচ্ছে নিয়োগ যদি আগে হয়ে যায় ওনারা জুনিয়র হয়ে যাবেন।
অস্থায়ী পদ স্থায়ীকরণের বিষয়ে সিনিয়র সচিব বলেন, ওনাদের তো প্রস্তাব দিতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে মো. মোকাব্বির হোসেন বলেন, ওনারা তো রিসার্চ প্রজেক্ট নেন। উদাহরণ হিসেবে বলেন, চিটাগংয়ে ১ কোটি ২ লাখ টাকার ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করবেন। ওনারা ওয়ার্ক অর্ডার দেয়ার পর দুই কিস্তিতে কাজ হওয়ার প্রেক্ষিতে ৭৬ লাখ টাকা দেয়া হয়। ওনারা বলেন, এটা বাদ দিয়ে অন্য একটা করবো। অডিটে আসছে ওনারা একটা কাজও করেন নাই। যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে, এই টাকা দিয়ে ভিন্ন কাজের সুযোগ তো দিতে পারি না।

বিভিন্ন সেমিনারে মন্ত্রণালয়ের লোকজন যায়। এই বিষয়ে বলেন, আইইএফ (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ফোরাম) যে সেমিনার ডাকে কিছু সেমিনার হয় বিজ্ঞানীদের জন্য, কিছু ম্যানেজমেন্টের জন্য। তারা তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন- আইন, লেজিসলেটিভ ও পলিসি রিলেটেড। এটা বিজ্ঞানীদের ট্রেনিং না। আমরা আগে নিউক্লিয়ার ইউজার কান্ট্রি ছিলাম না। আমি আগস্টে যোগদানের পর ১৬৮টি জিও দেয়ার প্রস্তাব পেয়েছি। কিছু বাদে সব দিয়ে দিয়েছি। দাবির বিষয়ে বলেন, সরকারের সঙ্গে কথা বলবো আমরা এটা পুরোই ছেড়েই দিতে চাই। সরকার স্বায়ত্তশাসন দিতে চাইলে আমার কোনো সমস্যা নাই। তারা অনেক জ্ঞানী মানুষ, দেশের অগ্রগতির জন্য তাদের প্রয়োজন রয়েছে।

mzamin

Thursday, March 20, 2025

কী হচ্ছে ইউজিসিতে by পিয়াস সরকার

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) ভিন্ন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কয়েকটি কোরামে ভাগ হয়ে গেছেন। প্রতিনিয়ত আসছে মনোমালিন্যের বার্তা। অভিযোগ রয়েছে ইউজিসি’তে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলাম। তাকে অপসারণের দাবি জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতা। পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। আওয়ামী লীগের চিহ্নিত অনেকেই এখন নিজেদের বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্টতার ঘোষণা দিচ্ছেন। এরইমধ্যে সাংবাদিকদের ইউজিসিতে প্রবেশের কড়াকড়ি জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম ছিলেন আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী। শেখ হাসিনাকে নিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে লিখেছেন একাধিক প্রবন্ধ। গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে রাজাকার উল্লেখ করে দিয়েছিলেন স্ট্যাটাস। গণ-অভ্যুত্থানের আগে ইউজিসি’র এই কর্মকর্তা পরবর্তীতে হয়ে যান সচিব। এরপর থেকেই শুরু করেন আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার আন্দোলন হয়।
আওয়ামী সরকারের আমলে নিয়ম না মেনেই বাগিয়ে নিয়েছিলেন দুটি পদোন্নতি। জুলাই অভ্যুত্থানে তিনি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন- ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। বঙ্গবন্ধুর বাংলায় রাজাকারের ঠাঁই নাই।’ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পূর্বের সচিব ফেরদৌস জামানকে সরিয়ে দেয়া হয়। তখন নিজ চেয়ারে ছিলেন আওয়ামী লীগের নিয়োগকৃত প্রফেসর অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীররা। তারা সেই সময়ে তাদের আস্থাভাজন ফখরুলকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর এক মাস পর নিয়োগ পান ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ। কিন্তু আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাবঞ্চিত দলের সঙ্গে নিজেকেও বঞ্চিতদের কাতারে দাঁড় করান তিনি।

আওয়ামী লীগ আমলে বৈষম্যের শিকার এমন অভিযোগ তুলে বঞ্চিতদের পাশাপাশি পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন কিছু সুযোগ সন্ধানী কর্মকর্তা। দাবির প্রেক্ষিতে পদোন্নতি দেয়ার কারণে বঞ্চিত হয়েছেন অন্তত ৭০/৮০ জন। তাদের দাবি পদোন্নতিতে মানা হয়নি জ্যেষ্ঠতা বা চাকরির শর্ত। বঞ্চিতরা নতুন করে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এমন অভিযোগ তোলার পরও পড়েছেন রোষানলে। এমনকি কমিশনের সভার দিন বহিরাগতদের দিয়ে শোডাউনও করা হয়।

পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের আমলেও ছিলাম বঞ্চিত। এখনো বঞ্চিত হলাম। সচিব ফখরুল ইসলাম নিজ বলয়ের লোকদের নিয়ে এই পদোন্নতির জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। যাতে বলয় শক্ত হয়। তিনি বলেন, ফখরুল নিজেকে আওয়ামী লীগের সময়ে ঘোর আওয়ামী লীগের পরিচয় দিতেন। এখন তিনি ভোল পাল্টিয়ে হয়েছেন আওয়ামী বিরোধী।

তারা লিখিতভাবে গত ২৬শে জানুয়ারি আলাদা দুটি অভিযোগ করেছিলেন। প্রথম চিঠিতে স্বাক্ষর করেন ৩০ জন কর্মকর্তা।
ফখরুল ইসলাম ২০০৫ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে ইউজিসিতে যোগদান করেন। এরপর ২০১১ সাল হন উপ-সচিব। ২০১৪ সালে পদোন্নতি পেয়ে হন অতিরিক্ত পরিচালক। ২০১৮ সালে হন পরিচালক। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ১১ই আগস্ট হন সচিব। কমিশনে এক পদ থেকে অন্য পদে পদোন্নতির যোগ্য হতে কমপক্ষে আগের পদে চার বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। তবে অনেক কর্মকর্তাই সাত-আট বছর হওয়ার পরও পদোন্নতি পান না। কিন্তু ফখরুল ইসলামকে পূর্বের চেয়ারম্যান সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেন। তিনি চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পদোন্নতি পান। পদোন্নতির ক্ষেত্রে ইউজিসিতে যোগদান করার আগের চাকরির অভিজ্ঞতাও যোগ করা হয়েছে। কিন্তু কমিশনের বিধি অনুযায়ী, ইউজিসিতে যোগদানের আগের চাকরির অভিজ্ঞতার অর্ধেক শুধুমাত্র অবসরোত্তর সুবিধার ক্ষেত্রে যোগ হবে।

ফখরুল একাধিকবার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ও সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছেন। যা চাকরির জন্য বাধ্যতামূলক নয়। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি-জামায়াত ঘরনার অনেক কর্মকর্তাকেই তিনি কম গুরুত্বের বিভাগগুলোতে পদায়ন করছেন। তাকে অপসারণের দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার পক্ষে মাহমুদুল হাসান রানাসহ পাঁচ ব্যক্তি। গত ১১ই মার্চ প্রধান উপদেষ্টা বরাবর এ স্মারকলিপি দেয়া হয়।

তার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ এনে তার বাড়ির সামনে ব্যানারও টাঙানো হয়েছিল। যাতে বিভিন্ন অভিযোগ উল্লেখ করে লেখা হয়, ফ্যাসিস্ট ফখরুল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক। জানা যায়, তার নানান বিষয়ে অপকর্ম সামনে আসায় ইউজিসিতে সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকাড়ি জারি করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউজিসি’র এক কর্মকর্তা বলেন, কর্মকর্তাদের অনিয়ম, গণ-অভ্যুত্থানে কমিশনের কিছু কর্মকর্তার ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হন কমিশনের ঊর্ধ্বতনরা। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হওয়া এটি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, ইউজিসি’র প্রশাসনিক সভায় সাংবাদিকসহ সব ধরনের দর্শনার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রবেশের কড়াকড়িতে ক্ষোভ জানিয়েছেন বাংলাদেশ এডুকেশন রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ইরাব) সভাপতি ফারুক হোসাইন। তিনি বলেন, কমিশনের এ ধরনের চিন্তাভাবনা আমাদের অবাক করেছে। এটা দুঃসাহস। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারও ইউজিসিতে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেনি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, সাংবাদিক প্রবেশের কড়াকড়ির বিষয়টি সত্য হয়। এ ছাড়াও ইউজিসি’র চলমান পরিস্থিতির বিষয়ে খোঁজ রাখছেন ও ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে ইউজিসি সচিব ড. ফখরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিস্টের পতনের পর কমিশনে কর্মরত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট-বিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণের রোষানলে কমিশনের তৎকালীন সচিব ড. ফেরদৌস জামানকে সরিয়ে বৈষম্যবিরোধী ও ছাত্র-জনতার পক্ষে থাকা কমিশনের আপামর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবেদন এবং আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে (প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বাধীন কমিশন) প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীরসহ কমিশনে কর্মরত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র কমিশনে কর্মরত ফ্যাসিস্ট-বিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণের আবেদন ও তীব্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের সার্ভিস রুলস ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী আমাকে সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়।

ফুল দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিগত সময়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অংশগ্রহণ এবং ফুল দেয়া এটা তৎকালীন কমিশনের কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী দাপ্তরিক কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের অংশ ছিল।
পদোন্নতির বিষয়ে তিনি বলেন, অনিয়ম করে পদোন্নতির বিষয়টি সর্বৈব অসত্য ও বানোয়াট।

এ ছাড়াও তিনি তার ছেলে ও মেয়ের অভ্যুত্থানের সময়ের ছবি দেখিয়ে বলেন, আমার ছেলে-মেয়েও আন্দোলনের অংশীদার ছিল।
এদিকে, গতকাল সচিবের পদত্যাগ দাবিতে ইউজিসিতে আন্দোলন করেন ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তারা সচিবের পদত্যাগের দাবি জানান। দিনকে দিন ইউজিসিতে অসন্তোষ বাড়ছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে। গতকাল সংবাদ প্রকাশের জেরে মব সৃষ্টি করে সাংবাদিকের ওপর হামলাচেষ্টা করা হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাপ্যতার অতিরিক্ত অর্থ ঋণ দেয়ার সংবাদ প্রকাশের জেরে মব সৃষ্টি করা হয়। ইউজিসির প্রথম তলায় লিফটের সামনে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক এ ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নাম মো. শিহাব উদ্দিন। শিহাব দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস ডটকম নামক একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। অভিযুক্তরা হলেন- ইউজিসি চেয়ারম্যানের রুমে দায়িত্ব পালন করা সিনিয়র সহকারী সচিব মোহা. মামুনুর রশিদ খান ও পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের অফিস সহায়ক খোকন খান। এ ছাড়াও ঘটনার সময় ১০ থেকে ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের সঙ্গে ছিলেন বলেন জানান ভুক্তভোগী সাংবাদিক।

পরে ইউজিসি সচিব ফখরুল এবং জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক শামসুল আরেফিনের সহযোগিতায় আমাকে ইউজিসির গাড়িতে আগারগাঁওয়ের মেট্রো স্টেশনের নিচে নামিয়ে দেয়।

সিনিয়র সহকারী সচিব মোহা. মামুনুর রশিদ খান বলেন, আমি চেয়ারম্যান দপ্তরে কর্মরত আছি। এজন্য ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিককে চেয়ারম্যানের রুমে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। তবে তিনি হামলাচেষ্টায় জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, ইউজিসিতে সাংবাদিককে হেনস্তার যে ঘটনা ঘটেছে- সেটি অপ্রত্যাশিত। আমরা ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছি। ফুটেজ দেখে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

mzamin

Sunday, March 16, 2025

প্রতারণার নয়া ফাঁদ by শুভ্র দেব ও পিয়াস সরকার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ রাহি। থাকেন রাজশাহীতে। তার বাবা থাকেন কুড়িগ্রামে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্ত। হঠাৎ একটা ফোনকল আসে রাহির বাবার কাছে। রাহির বড় ভাই আহসান হাবিব রাভি বলেন, আব্বু চিৎকার করে উঠলো- তোমার কাছে মাদক মানে! আব্বুর কাছে গেলাম। আব্বু ফোনে কথা বলছে। ফোন লাউড স্পিকারে দিলাম। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হচ্ছে, রাহিকে ছাড়াতে হলে ২২ হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে এখনই। রাভি বলেন, আমি ফোনটা নিলাম। অপরপ্রান্তে পুলিশের গাড়ির সাইরেন, ওয়াকিটকির শব্দ আর ব্যস্ত পুলিশ স্টেশনের আবহ। রাহি কাঁদছে। একদম রাহির কণ্ঠ। মনে হলো- অনেক মার খেয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে- পুলিশ ধরেছে। মাদক পেয়েছে। আমাকে ছাড়াও। শব্দ শুনে মনে হলো, ফোনটা কেড়ে নিলো। এখন কয়েকজনের কথা শোনা যাচ্ছে। ওয়াকিটকির শব্দ আসছে। একজন বলছে, কোন ধারায় মামলা দেবো? আলোচনা চলছে। মাদকের কঠিন মামলা হবে। হঠাৎ একজন ফোনটা নিলেন। ভরাট গলা। বললো- আমি এসআই শফিক। ডিবি থেকে রাহিকে ধরেছি। ওর সঙ্গের দু’জনের শরীর থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। ওর কাছে পাওয়া যায়নি। মামলা হবে। রাহি হবে ৩ নম্বর আসামি। আমি বললাম, কোন থানায় আছে এখন? এবার ও পাশ থেকে সাড়া নেই। তারা আলোচনা করছেন। ৭২ ধারায় মামলা দেন। এসপি স্যারের রুমে যান। স্যারকে জানান। আবার ওয়াকিটকির শব্দ। খানিক বাদে আর একজন ফোন নিলেন। সে জানালো রাহি এখন রাজশাহী ডিবিতে আছে। মামলা হচ্ছে। কোর্টে তোলা হবে।

রাহির বড় ভাই বলেন, আমার গলা শুকিয়ে গেছে। ফোনটা কেটে গেল। আমরা নির্বাক। আব্বু চিন্তাগ্রস্ত। আমার স্ত্রী জানতে চাইলে বলি, রাহির কাছে মাদক পাওয়া যায়নি তবে ছাড়াতে হলে টাকা দিতে হবে। বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠাতে হবে। আমার স্ত্রী বলে, পুলিশকে চার্জ দিতে হবে মানে? চার্জ নাকি ঘুষ চায়। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা চেনা পরিচিতদের ফোন করা শুরু করি। এরপর কোনো উপায়ান্তর পাই না। আমার স্ত্রী বললো, রাহিকে ফোন দাও। আমি আর আব্বু বললাম, রাহির সঙ্গের দুজনেরই কথা হয়েছে এসআই এর ফোন থেকে। তবুও আরেকবার ফোন দিলাম। রাহির একটা নম্বর ব্যস্ত পাওয়া গেল। এবার আব্বুর ফোনে রাহির ফোন এসেছে। আমরা সবাই আরও তটস্ত হলাম। কিছু হলো নাকি। আব্বু কথা বলছে। বুঝলাম রাহি। নিরাপদেই আছে। আব্বুর বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি ফোন নিলাম। ও নিশ্চিত করলো ও রুমে আছে। ‘এসআই শফিকে’র নম্বরে ফোন দিলাম। নম্বর বন্ধ। আবার ফোন দিলাম। এসআই পরিচয় দেয়া শফিকের নম্বর বন্ধ। রাহির কাছে ফোন এসেছিল ০১৪০২৫০৩৪০৮ নম্বর থেকে।

একই রকম ঘটনা ঘটেছিল সুলতানা মাহির সঙ্গে। তিনি থাকেন রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায়। তারা দু’জনই চাকরিজীবী। ছুটির দিন শুক্রবার তার স্বামী সজীব বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারের জন্য ধানমণ্ডি যায়। মাহিও যায় ইফতারে ভার্সিটির এলামনাইদের একটি ফোরাম ইফতারে, লালমাটিয়ায়। একসঙ্গেই মোটারসাইকেলে আসে তারা। লালমাটিয়ায় মাহিকে নামিয়ে দিয়ে সজীব যায় ধানমণ্ডিতে। ইফতারের ঠিক আগ মূহূর্তে অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। মাহিকে বলা হয়, সজীব একটি বাচ্চাকে মোটরসাইকেল দিয়ে হিট করেছে। বাচ্চার অবস্থা অশঙ্কাজনক। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন বাঁচাতে চাইলে জরুরি ২০ হাজার টাকা পাঠালে ছেড়ে দেবে। এরপর সজীবের সঙ্গে কথা বলায় দেয়। সজীব জানায় বিকাশে যা আছে আপাতত দিয়ে দাও। আর টাকার ব্যবস্থা করো। ওয়াকিটকির একটি শব্দ ধীর থেকে প্রবল হলো। কেটো গেল ফোন। মাহি বলেন, আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কোনো কিছু না ভেবেই বিকাশে টাকা রিচার্জ করতে যাচ্ছিলাম। তখন বিষয়টি বুঝতে পেরে এক বন্ধু সজীবকে ফোন দিতে বলে। ইফতারের আগে ব্যস্ততার কারণে হয়তো ফোন ধরছিল না। আমি তার এক বন্ধুকে ফোন দেই জানতে পারি যা ফোনে বলা হয়েছিল সব ভুয়া। তিনি বলেন, আমার কাছে যা টাকা ছিল আমি সব দেবার জন্যই দোকানে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছে যে, বিশ্বাস করতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, সজীবের সঙ্গে প্রায় ৩০ সেকেন্ড কথা হলো আমার। তাকেও ০১৪০২৫০৩৪০৮ এই নম্বর থেকেই ফোন দেয়া হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এখন রোবোকল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ০১৮৯৮৯১৬২০৩ নম্বরসহ আরও কয়েকটি নম্বর থেকে কল দিয়ে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে কোনো কথাই বলা হচ্ছে না। যারা কল দিয়ে কথা বলেন না তারা চান যাকে কল দেয়া হয়েছে তিনি কথা বলেন। কথা বললেই সেটি রেকর্ড করে রাখবেন। পরে প্রযুক্তির কেরামতিতে কণ্ঠটি টোপ হিসেবে ব্যবহার করে তার পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করবেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া বিভিন্ন ধরনের পোস্ট থেকে জানা যায় অনেককেই ফোন দেয়া হয়েছে বিভিন্ন নম্বর থেকে। আবার কয়েকজনকে একই নম্বর থেকে ফোন দেয়া হয়েছে। একেক পরিবারের একেক ধরনের সমস্যার কথা বলা হয়। যারা এই কাজ করছেন তারা বিষয়টি এমনভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করেন বিশ্বাস না করার উপায় থাকে না। কাউকে বলা হয়েছে চাকরির কথা, রং নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স আপডেট, অগ্রীম ঈদের শুভেচ্ছ, বিপণিবিতানের অফার এসব উল্লেখযোগ্য।

সাইবার সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলছে, এটি প্রতারণার নতুন এক কৌশল। আগে বিভিন্ন মানুষকে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তার কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা হয়। প্রতারকরা ফোন দিয়ে অনেক সময় কথা বলে না। আবার অনেক সময় বিভিন্ন অজুহাতে কথা বলে। মূল উদ্দেশ্য হলো কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা। পরে সেই কণ্ঠ ব্যবহার করে তাদের পরিবারে ফোন দিয়ে বিভিন্ন বিপদে বা সমস্যায় পড়ার কথা বলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নিজের স্বজনের বিপদের কথা তার নিজের মুখে শুনে অনেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন। আবার অনেকেই টাকা পাঠানোর আগে একটু কৌশলী হয়ে সত্যতা জানতে পারেন। টাকা নেয়ার পর প্রতারকরা মোবাইল বন্ধ করে রাখে।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, মূলত এআই ব্যবহার করে এসব কাজ করছে কিছু চক্র। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ছড়িয়ে দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করে প্রতারণা করাই তাদের কাজ। এটি প্রতারকদের নতুন কৌশল। তবে যাদের কাছেই ফোন যাবে তারা সতর্ক থাকবে। যার কথা বলে ফোন দেয়া হবে তার নিজের নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু কোনো ভুক্তভোগী  থানায় মামলা বা জিডি করছেন না। যদি থানায় অভিযোগ আসে তবে আমরা অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। তবে আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করছি। মানুষকে সচেতন হতে হবে। না বুঝে কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। প্রয়োজনে অবশ্যই পুলিশের সাহায্য নিতে হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে। একেক সময় একেক ধরনের ফাঁদ পাতে তারা। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। মানুষকে সচেতনতার জন্য বলছি।

mzamin

Tuesday, February 18, 2025

শিক্ষার জঞ্জাল ঘোচাতেই নাভিশ্বাস by পিয়াস সরকার

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়মই নিয়ম হয়ে ওঠা শিক্ষা খাতের জঞ্জাল সারাতে এখন গলদঘর্ম অবস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা প্রশাসনের। একের পর এক দাবি নিয়ে শিক্ষা খাতের কর্মীদের আন্দোলন থামাতে ব্যতিব্যস্ত কর্মকর্তারা। যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেয়ার পর সামনে নতুন দাবি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরো খাত নিয়ে মহাপরিকল্পনা বা সংস্কার পরিকল্পনা নেয়া ছাড়া এই সমস্যা উতরানো যাবে না। শিক্ষা খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার প্রথম চিত্র দেখা গেছে সরকার পতনের পর প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক মব। দলীয় প্রশাসন ও দলীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ অনেকটা মবে পরিণত হয়েছিল। এই মব পরিস্থিতি এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে গড়ে উঠেছে অনিয়মের আখড়া। সনদ বিক্রি, যত্রতত্র প্রতিষ্ঠান করে বাণিজ্য করার সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। আর এই সিন্ডিকেটেই ধস নামে শিক্ষা ব্যবস্থায়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রধান চ্যালেঞ্জ সামনে আসে পাঠ্য বইয়ের সংস্কার। দ্রুত সময়ে এই সংস্কার এবং পরিবর্তন করতে গিয়ে নানা বিপত্তিতে পড়ে প্রশাসন। সংস্কার করতে গিয়ে বছরের প্রায় দুই মাস পার হলেও এখনো অনেক শিক্ষার্থী হাতে বই পায়নি।

এ ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি ও অন্যান্য পদে নিয়োগের বিষয়ও চ্যালেঞ্জ হয়ে আসে। সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই ভিসি ও অন্যান্য পদে আনতে হয়েছে পরিবর্তন। এসব পদে নিরপেক্ষ লোক খুঁজে পেতে নাভিশ্বাস অবস্থা তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুরোদমে আওয়ামী লীগের প্রশাসন তৈরি করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছুটা গতি আসা শুরু হলেও একের পর এক আন্দোলন সামনে আসছে। যা ছিল গত ছয় মাসের নিয়মিত চিত্র। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন দশম গ্রেড বাস্তবায়নের দাবিতে। তারা আন্দোলন করেছেন বেশ কয়েকদিন। সভা-সমাবেশ করার পাশাপাশি অবরোধ করেছিলেন সড়ক। কয়েক বছর ধরে এই আন্দোলন চললেও গুরুত্ব দেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের তৃতীয় ধাপের চাকরিপ্রত্যাশীরা এখনো রয়েছেন সড়কে। যদিও এই সংকট তৈরি হয়েছে গত ৬ই ফেব্রুয়ারি আদালতের রায়ে নিয়োগ বাতিলের প্রেক্ষিতে। এই নিয়োগপ্রত্যাশীরা কয়েকবার অবরুদ্ধ করেন শাহবাগ। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়।
স্বতন্ত্র এবতেদায়ী শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দাবি দীর্ঘদিনের। বেশ কয়েক বছর ধরেই তারা আন্দোলন করে আসছেন। সরকার কোণঠাসা করে রেখেছিল মাদ্রাসাগুলোকে। একাধিকবার করেছিলেন কর্মসূচি। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এসবে গুরুত্ব দেয়নি, করেনি সমাধান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই শিক্ষকরা ফের আসেন সড়কে। তাদের উঠিয়ে দিতে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এনিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের দাবি মেনে নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিদ্যালয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলিপ্রথা চালুর জন্য আন্দোলন করেছিলেন শিক্ষকরা। বছরের পর বছর ধরে চলা সেই আন্দোলনে শুধু আশ্বাসই দিয়ে গেছে তৎকালীন প্রশাসন। কিন্তু ইতিবাচক মনোভাব থাকায় এক মাসের মধ্যে এই বদলিপ্রথার প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত কয়েকদিন ধরে আন্দোলন করেছেন জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষকরা। তাদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শতভাগ উৎসব ভাতা, সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা প্রদানের আশ্বাস দেয়া হলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। একইসঙ্গে আজ ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়াও এই সময়ে আন্দোলন হয়েছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)’র ঝুলে থাকা বিসিএস’সহ অন্যান্য পরীক্ষা দ্রুত নেয়ার দাবিতে। এ ছাড়াও নন-ক্যাডার নিয়ে অসন্তোষও দূর করেনি আওয়ামী লীগ সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)’তেও হয়েছে নানান আন্দোলন। শীর্ষ পদে এসেছে পরিবর্তন। আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগীদের হটাতেও হয়েছে আন্দোলন। এ ছাড়াও বৃহদাকার ধারণ করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজ নিয়ে। অপরিকল্পিত, অপরিকপক্ব সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে অধিভুক্ত করা হয়েছিল সাত কলেজকে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল নিয়মিত ঘটনা। অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেন। ঘোষণা দেন এই ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজ নিয়ে হবে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরের প্রক্রিয়া ঠিককরণে প্রক্রিয়া নিয়েও মহাবিপাকে সরকার।

এসব নানান আন্দোলন নিয়ে ভয়েই আছেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সম্প্রতি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেন, ভয়ে থাকি কখন কোথায় কোন আন্দোলন শুরু হয়। আমরা এসেছি সংস্কারের জন্য। কিন্তু বিভিন্ন পক্ষের জমে থাকা ক্ষোভ, না পাওয়ার বিষয় নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। আমরা সংস্কার নিয়ে ভাবার সময়টাও পাচ্ছি না। তিনি যুক্ত করেন, শিক্ষায় এত বিস্তর দুর্নীতি হয়েছে যেসব বিষয়ে সমাধানে আসাও দুরূহ।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, বিগত সরকারের নৈরাজ্য ছিল তারই প্রভাব এটা। শিক্ষা খাতের কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছিল বিগত সরকার। যার কারণে বর্তমান সরকারকে চাপ দিয়ে দাবি আদায়ের একটা চেষ্টা চলছে। সরকারের বল প্রয়োগের যে অনীহা আছে সেটার কারণেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই অযৌক্তিক দাবিগুলোর বিষয়ে কঠোর হওয়া উচিত। আগস্টের পর এইচএসসিতে অটোপাসটা মানবিক কারণে মেনে নিলো তখন সবার কাছে বার্তা চলে গেল তাদের কাছে আন্দোলন করলে দাবি মানানো যায়। এখন উচিত স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসা।

mzamin
শাহবাগে নিয়োগপ্রত্যাশী প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের অবস্থান ছবি: জীবন আহমেদ

Sunday, February 9, 2025

মেধা পাচাররোধে ইউজিসি’র নতুন পরিকল্পনা by পিয়াস সরকার

দেশের বাইরে থাকা মেধাবী শিক্ষক-গবেষকদের ফেরাতে চায় সরকার। এই উদ্যোগের পাশাপাশি দেশে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এই পরিকল্পনার আওতায় শিক্ষার্থীরা দেশে থেকেই বিদেশি কারিকুলামে অধ্যয়নের সুযোগ পাবেন। চাকরির ক্ষেত্রে মিলবে অগ্রাধিকার। যার ফলে দেশেই থেকে যাবেন মেধাবীরা। এই প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণে এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন (টিএনই)। এই শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে একটি মডেল তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

টিএনই হচ্ছে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি রূপান্তরমূলক পদ্ধতি। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিদেশি কারিকুলামে দেশেই অধ্যয়ন করবেন। দেশের মেধা দেশেই থাকবে সেইসঙ্গে কাজে লাগবে উন্নত দেশের গুণগত মানের শিক্ষা। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষায় দেশের বাইরে যাওয়ার খরচ কমবে। বর্তমানে দেশে চলমান ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন (সিবিএইচই)’র মাধ্যমে দেশে-বিদেশে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার এবং ইন্সটিটিউটগুলোর সঙ্গে পার্টনারশিপে গিয়েছে। কিন্তু যথাযোগ্য সফলতা না আসায় টিএনই বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়ায় পরিকল্পনা চলছে।

টিএনই মূলত চারভাবে করা যেতে পারে বলে বলা হয়। প্রথমত, বিদেশের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দেশে নির্মাণ করা, বিদেশি ইন্সটিটিউশনের মাধ্যমে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা, দেশে থেকেই বিদেশের কোর্স নিয়ে পড়ানো হবে যা পরিচালিত হবে দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে, যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স ডেলিভারি এবং স্বীকৃতি প্রদান।
টিএনই বাস্তবায়ন হলে যেসব সুবিধা মিলবে। এরমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিলেবাস ও টিচিং মেথড। বিদেশে থাকার খরচ, যাতায়াত ও জীবনযাত্রার খরচ কমবে। ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিশেষায়িত খাত যেমন হসপিটালিটি এবং ফ্যাশন ডিজাইনের মতো বিষয়ে উচ্চমানের শিক্ষা মিলবে। দেশেই চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য লোক পাবে।
ইউজিসি প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষায় চাহিদা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় একটা ফারাক রয়েছে। ২০২২ সালের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে ৫৩টি পাবলিক ও ১০৮টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এরপরও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ভালো প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সরকার ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন (সিবিএইচই) পলিসি চালু করে ২০১৪ সালে। এই পলিসির মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশে ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে টিএনই পরিচালনা করছে কিন্তু তা দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থায়। উত্তীর্ণ হবার পরও বিপুল পরিমাণ শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে। এসব কারণে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থানে যেতে পারছে না। আবার বিপুল পরিমাণ উচ্চ শিক্ষিত দেশে থাকলেও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো দেশের বাইরে থেকে লোক আনছে। এসব কারণে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে ৫.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পায়। ২০১২ সালে দেশ থেকে ২১ হাজার ৯২৭ শিক্ষার্থী দেশের বাইরে যায়।

দেশে বর্তমানে দুটি টিএনই পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এগুলো হলো ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং দ্য এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর ওমেন। লোকাল সেন্টারগুলো এসিসিএ, সিআইএমএ এবং পিয়ারসন এডেক্সসেল পরিচালনা করছে। এই দূরবর্তী শিক্ষাকার্যক্রমগুলো মূলত ইউকে ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ইউকে, ইউএসএ, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় অধ্যয়ন করছে। বাংলাদেশে পড়তে আসছে নেপাল, মায়ানমার, ইন্ডিয়া এবং ভুটান থেকে। ২০১২ সালে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে পড়তে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১,৫৮৯ জন যা ২০২৩ সালে এসে দাঁড়ায় ২৬০০ জনে।
এসব বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলা হচ্ছে। টিএনই প্রোগ্রামের যে খরচ অনেক শিক্ষার্থীই বহন করতে সক্ষম হবেন না। টিএনই অগ্রগতি ধরে রাখার জন্য গুণমান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিএনই দক্ষ আন্তর্জাতিক মানের লোক প্রস্তুতে কাজ করে। এরমাধ্যমে বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি হয়। টিএনই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে সাউথ এশিয়ার মধ্যে একটি এডুকেশন হাব হিসেবে নাম কুঁড়াতে পারে।

কোভিড ১৯ পরবর্তী সময়ে বিদেশে শিক্ষার জন্য বাংলাদেশের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে ৫৩টি হলেও যথাযোগ্য শিক্ষাদানে ব্যহত হচ্ছে। একই সময়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে (১১০টি)। এরমধ্যে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য কোলাবরেশন, ডুয়েল ডিগ্রির ব্যবস্থা, ফ্রাঞ্জাইজড প্রোগ্রাম চালু করেছে। তবে টিএনই দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি খরচ বহন করতে হবে। টিএনই অনেক সময় তার মূল প্রতিষ্ঠানের মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না। টিএনই শিক্ষায় স্থানীয় সংস্কৃতি ধারণ করতে পারে না সেইসঙ্গে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের যোগসূত্র স্থাপনে ব্যর্থ হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০ শতাংশ জনসংখ্যার বয়স ৩০ এর নিচে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা উচ্চমানের শিক্ষার সুযোগ পাবে। চাকরির বাজারে এই শিক্ষার্থীরা ভালো সুযোগ পাবে, তারা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দেশে বসেই অর্জন করতে পারবে। টিএনই বাস্তবায়নে ভর্তি সংক্রান্ত সময়ে গ্যাপটা পূরণ করতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিক পরিমাণ বৃত্তি ও আঞ্চলিকতা বিবেচনায় শিক্ষাব্যয় কমাতে হবে।

টিএনই নিয়ে একটি পরিকল্পনা এনেছে ইউজিসি। এটি করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ, সহযোগিতায় ছিলেন ইউজিসি পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ভুঁইয়া। এটি প্রস্তুত করেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. সাব্বির হোসাইন। তারা সম্প্রতি এই মডেলটির উল্লেখ শ্রীলঙ্কায় হয়ে যাওয়া একটি শিক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে।  
এবিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে টিএনই গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। যার ফলে মেধাবীদের প্রাপ্ত শিক্ষা দেশের উন্নয়নে কাজে আসবে। তিনি আরও বলেন, এর নানান ধরণের চ্যালেঞ্জ আছে। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের উচ্চ শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। উপকৃত হবে দেশ।

mzamin

Saturday, January 18, 2025

যেভাবে মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করতো আওয়ামী লীগ সরকার by পিয়াস সরকার

দেশের মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখতে মরিয়া ছিল আওয়ামী লীগ সরকার।  মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে শেখ হাসিনা দাপট দেখিয়েছেন চতুর্দিক থেকে। আবার উল্টোদিকে মাদ্রাসা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের গাল-গপ্পো ঝেড়েছেন। প্রায়শই শিক্ষার্থীদের উগ্র সন্ত্রাসবাদীর ট্যাগ দিতেন। নিজ বলয়ে মাদ্রাসাগুলোকে রেখে বাগিয়ে নিয়েছিলেন ‘কওমি জননী’ খেতাব। নানামুখী উন্নয়নের কথা বললেও মূলত মাদ্রাসাগুলোকে রেখেছিলেন চাপের মুখে। শিক্ষার মানে উন্নয়ন না করলেও নজর ছিল স্থাপনা নির্মাণে। বেতনের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন করেও সুখবর পাননি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী শিক্ষকরা। মাদ্রাসাগুলোতে বন্ধ রাখা হয়েছিল জাতীয়করণ, এমপিওভুক্তি, মিড ডে মিল ও উপবৃত্তিও।

মাদ্রাসা শিক্ষার মানে গুরুত্ব না থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে ছিল সজাগ। শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবসহ করা হয়েছে নতুন নতুন ভবন নির্মাণ। প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা খরচ করে সারা দেশব্যাপী ১ হাজার ৮০০ মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ করা হয়। মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বসানো হয় নিজ বলয়ের লোকজন। সারা দেশে নির্মিত ৫৬৪টি মডেল মসজিদে লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও ছিল আওয়ামী মনা লোক। আওয়ামী লীগ সরকারের কথামতো চলায় পুরস্কারও পেয়েছেন অনেকেই। খবর চাউর হয়েছিল সরকারের সঙ্গে অলিখিত সমঝোতায় পৌঁছেছে হেফাজতে ইসলাম। অলিখিত ও অঘোষিত কিছু শর্তে একমত হয়েছে উভয়পক্ষ। এদিকে সমঝোতার অংশ হিসেবে হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী পরিচালিত হাটহাজারী মাদ্রাসা লিজ পাচ্ছে ৪০ কোটি টাকা মূল্যের তিন একর জমি। তবে বিশাল এই প্রাপ্তির বিনিময়ে হেফাজত নেতারা অঙ্গীকার করেছেন তারা আর বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করে কোনো আন্দোলন করবেন না। পাশাপাশি হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ব্যাপারে নমনীয় হবে সরকার। যদিও বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে হেফাজত। হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক বলেছিলেন, যে জমি পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে তা অনেক আগে থেকেই হাটহাজারী মাদ্রাসার দখলে আছে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতার কারণেই এই জমি মাদ্রাসা লিজ পাচ্ছে, তা সঠিক নয়।

করোনার পর মাদ্রাসা শিক্ষার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। সরকারের অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণ ও নেতিবাচক প্রভাবের পরও বেড়েছে মাদ্রাসা শিক্ষার হার। বিশেষ করে প্রাথমিক পরবর্তী শেষ কয়েক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। মার্চে প্রকাশিত বিবিএস’র তথ্য অনুযায়ী, ৩ বছরের ব্যবধানে ধর্মীয় শিক্ষার হার বেড়েছে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার প্রতি ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মানুষের আগ্রহ কমেছে। ৩ লাখ ৮ হাজার ৩২টি পরিবারের ওপরে সমীক্ষা চালিয়ে ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্‌?স-২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে সাধারণ শিক্ষার হার ছিল ৯৩ দশমিক ২৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯১ দশমিক ০২ শতাংশে। ২০২১ সালে ধর্মীয় শিক্ষার হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪ বছরে মাদ্রাসায় প্রাথমিক পরবর্তী শ্রেণিগুলোতে শিক্ষার্থী বেড়েছে আড়াই লাখেরও বেশি। তবে এই তথ্যে উঠে আসেনি আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর চিত্র। আবার চলতি বছর প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) করা ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৩’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪ বছরের ব্যবধানে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমেছে। তবে একই সময়ে কারিগরি, মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থী বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী ২৭ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি। এরমধ্যে ছাত্রী প্রায় ৫৪ শতাংশ।

দিনাজপুর সদরের প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন শ্যামল কান্তি সিংহ রায়। গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র প্রকল্পের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর শ্যামল বলেন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা অধিকাংশই কৃষি শ্রমিক। এখন শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে সেইসঙ্গে কাজ কমে আসছে। আবার কৃষিতে টেকনোলজি আসার কারণেও কাজের হারটা কমছে। শিক্ষার্থীরা এখন নতুন করে যুক্ত হচ্ছে অন্য পেশায়। আর যারা শিক্ষায় থাকছে তারা স্বল্প ব্যয়ের কারণে মাদ্রাসায় যাচ্ছে। আবার অনেক মাদ্রাসায় কোনো খরচ তো লাগছেই না। উল্টো পোশাক, পরিপাটি থাকার জায়গা মিলছে। নিয়মিত ভালো খাবারের নিশ্চয়তা পাচ্ছে।

কুড়িগ্রাম জেলায় নাগেশ্বরী উপজেলায় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেন আহসান হাবিব। তিনি বলেন, এমন শিক্ষার্থী আছে যাদের একটা খাতা কেনার মানে বিশাল ব্যাপার। একটা খাতার জন্য অভিভাবকদের কাছে আবদার করতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা প্রাথমিকের পরই মানে কর্মক্ষম হওয়ার পরই কাজে যোগ দেয়। কারণ দিনব্যাপী কাজ করলে তার সে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত পায়। তিনি বলেন, অনেক পরিবার আছে যাদের নিজের আয়ে সংসার চলে কিন্তু ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও খরচ করতে পারেন না। এসব শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় যাচ্ছে সেখানে তাদের কোনো খরচ করতে হচ্ছে না। বিশেষ করে খাবারের চিন্তা করতে হচ্ছে না।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, করোনাকালীন সময়ে আমরা দেখেছি প্রতিবেদনে ৪টি শঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়বে, বাল্যবিবাহ বাড়বে, শিশুশ্রম ও অপুষ্টি বাড়বে। এই ৪টি আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। মাদ্রাসাগুলো অধিকাংশই লিল্লাহ বোডিং। শিক্ষার্থীরা প্রায় বিনামূল্যে পড়তে পাচ্ছে। যার কারণে অভিভাবকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। আর বাবা-মায়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়িয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন। যেটা অধিকাংশই ঠিক না। বর্তমানে শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ খুবই কম। যেখানে পারিবারিক বিনিয়োগ ৭১ শতাংশ অভিভাবকদের বহন করতে হয়। এই কারণেই মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে। দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ও সিলেবাস প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) থেকে শেখ হাসিনার সহযোগীদের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।

গত ৩রা জানুয়ারি জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে ‘সচেতন কওমি ছাত্র সমাজ’র ব্যানারে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এ সময় বক্তারা বলেন, কওমি মাদ্রাসার ইতিহাস শাপলা চত্বরের রক্তাক্তের ইতিহাস। আমাদের ইতিহাস বায়তুল মোকাররমের এই উত্তর গেটে মোদির বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনীর হামলার ইতিহাস। তাই এই কওমি অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ও মাদ্রাসা শিক্ষার বোর্ড বেকাফকে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দোসরদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে।
তারা আরও বলেন, বেফাকে এখনো ৫ই আগস্ট পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দোসররা রয়ে গেছে। আমরা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বারবার আন্দোলন ও প্রতিবাদ জানিয়ে এলেও এখনো এই দোসরদের অপসারণ করা হয়নি। ফ্যাসিবাদের দোসর মৌলভি উবায়দুর রহমান খান নদভী ও আনাস মাদানীকে এখনো অপসারণ করা হয়নি। আমরা বেফাকের কাছে সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ দেয়ার পরও তাদের অপসারণ করা হচ্ছে না। দ্রুত সময়ে তাদের অপসারণ না করা হলে কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রথম কথা হলো একেবারে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে একটিও ইবতেদায়ী মাদ্রাসা সরকারি নয়। অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক স্তরকে বিগত সরকার অবহেলা করেছে।  এ ছাড়া কওমি এবং আলিয়া দ্বন্দ্ব তো আগে থেকেই ছিল সেটাকে আরও অনেক বেশি গভীর করেছে বিগত সরকার। তারা ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি নিয়েছে। তারা চেয়েছে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যাতে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কাছে আসতে না পারে তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠতে না পারে। কারণ এই ঐক্য হাসিনা সরকারের জন্য সমস্যা হতে পারতো। কওমি মাদ্রাসাগুলোকে নিষ্পেষণের মধ্যে রাখা হয়েছে তাদের দুনিয়াবী কাজ কর্মের জন্য অনুপযোগী করে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আর দীর্ঘকাল ধরে চলা জেনারেল শিক্ষিত এবং মাদ্রাসা শিক্ষিতদের মধ্যে একটা যে দ্বন্দ্ব সেটা তো ছিলই। অনেক সময় দেখা গেছে ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষকের জন্য কলেজগুলো আবেদন করেছে, কিন্তু সরকার অনুমোদন দিচ্ছে না। এটিকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে এবং এমনভাবে রাখা হয়েছে যাতে কোনো শিক্ষার্থী এটি পড়তে আগ্রহ প্রকাশ না করে।

এদিকে গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন করে মাদ্রাসার স্বীকৃতি দিতে কাজ করছে সরকার। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলোকে স্বীকৃতি দিতে কাজ করা হচ্ছে। গত ১৮, ২২শে ডিসেম্বর ও ৫ই জানুয়ারি যথাক্রমে ৯, ৫ ও ৮টি মাদ্রাসার তথ্য চেয়েছে ব্যানবেইস। পরিচালক (উপ-সচিব) মোহাম্মদ মশিউর রহমান স্বাক্ষরিত এসব চিঠিতে মাদ্রাসার কাছে তথ্য চাওয়া হয়। এ ছাড়াও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদো বেতন কাঠামোর আওতায় আনারও উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো এমপিওভুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইবতেদায়ি মাদ্রাসা নিয়ে দুটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাদ্রাসা জাতীয়করণ অন্তত প্রথম ধাপ হিসেবে এমপিওভুক্ত করা। ইতিমধ্যে আমার অফিসারকে এ নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছি। তারা এ নিয়ে কার্যক্রম শুরু করবেন। দ্বিতীয়ত, এসব মাদ্রাসায় বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের জন্য আলাদা প্রজেক্ট করার নির্দেশনা দিয়েছি, তারা একটি ডিপিপি তৈরির প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু করবেন। এ সময় তিনি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি চালুর উদ্যোগ ও মিড ডে মিল চালুর প্রজেক্ট নেয়া হচ্ছে বলে জানান।

mzamin

Friday, January 17, 2025

ইউল্যাবে কোণঠাসা জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শিক্ষার্থীরা by পিয়াস সরকার

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি অঙ্কনকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গ্রাফিতি অঙ্কনকে অন্যায় ঘোষণা দিয়ে শাস্তিস্বরূপ মুছে ফেলার নির্দেশনা দেয় কর্তৃপক্ষ। এরপরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন শিক্ষার্থীরা। ভাইস চ্যান্সেলরের পদত্যাগসহ ৫ দফা দাবি জানান তারা। বিষয়টি তদন্তে কাজ করছে একটি প্রতিনিধিদল। তবে শিক্ষার্থীরা উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী প্রশাসন জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ২৯শে ডিসেম্বর ইউল্যাব প্রশাসন দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ‘গ্রাফিতি অঙ্কন’কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। শাস্তিস্বরূপ শিক্ষার্থীদের ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাফিতিগুলো মুছে ফেলার আল্টিমেটাম দেয়া হয়। রেজিস্ট্রার কর্তৃক অনুমোদিত একটি নির্দেশনায় গ্রাফিতি আঁকার অভিযোগে দুই শিক্ষার্থীকে ‘প্রবেশন’-এ রাখা হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি- এই সিদ্ধান্ত জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে অসম্মান করে। ঐতিহাসিকভাবে গণ-অভ্যুত্থানের সময় গ্রাফিতি একটি শক্তিশালী প্রতিরোধের মাধ্যম ছিল, যা শহর জুড়ে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি ইমরান রহমান শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেয়া শাস্তি প্রত্যাহারের ঘোষণা ই-মেইলের মাধ্যমে দেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাতে কোনো ক্ষমা বা ভুল স্বীকারের তথ্য ছিল না। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের দাবি- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে অসম্মান এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হয়রানির দায় নিয়ে ভিসি’র পদত্যাগ; ফ্যাসিবাদের দোসর এবং দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ট্রাস্টি বোর্ড থেকে অপসারণ; ডিসিপ্লিনারি কমিটি ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের পদত্যাগ; কোড অফ কন্ডাক্টের যৌক্তিক সংস্কার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা-ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সকল কালো আইন বিলোপ করতে হবে।

শিক্ষার্থীরা ১লা জানুয়ারি বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে ভিসি’র পদত্যাগ অত্যাবশ্যক বলে দাবি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ফ্যাসিবাদ-সংশ্লিষ্ট এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যদের ট্রাস্টি বোর্ড থেকে অপসারণের কথা বলেন। এর আগের দিন ৩১শে ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক একটি যৌথ বিবৃতি দেন। তারা গ্রাফিতিকে মত প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ অনৈতিক এবং গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটের প্রতি অসম্মানজনক। তারা দাবি করেন, বিদ্যমান আচরণবিধি সংশোধন করে শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে।

২রা জানুয়ারি কোনো সদুত্তর না পাওয়ায় দুই শিক্ষার্থী অনশন শুরু করেন। এদিন মধ্যরাতে ইউল্যাবের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভিসি ও প্রো-ভিসি’র পদত্যাগের জন্য আল্টিমেটাম দিয়ে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করেন। তবে প্রশাসন আল্টিমেটামের সময়সীমা পার হওয়া সত্ত্বেও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ফলে দু’জন শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। রাতে অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদের মধ্যস্থতায় রেজিস্ট্রার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ভিসি তার দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন এবং প্রো-ভিসি শুধু কার্যনির্বাহী দায়িত্ব পালন করবেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব করবে না। আন্দোলনকারীরা আপত্তিকর গ্রাফিতি সরিয়ে দেবে এবং এজন্য দুঃখ প্রকাশ করবে। আন্দোলনকারীরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনবে।

কিন্তু বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভিসিকে তার দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার কথা থাকলেও, পরের দিন তিনি সকল শিক্ষার্থীকে একটি ই-মেইল পাঠান। ই-মেইলে তিনি আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির প্রয়াস চালান। তিনি আন্দোলনকারীদের প্রতি তিরস্কারমূলক মন্তব্য করে প্রতিবাদের পরিবর্তে প্রশাসনের প্রতি আনুগত্যের পরামর্শ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থীদের ছবি অ্যাপ করে লেখা হয়- উই স্ট্যান্ড উইথ ভিসি স্যার, সেভ ইউল্যাব, রেসপেক্ট টিচার্স ইত্যাদি স্লোগান।

বুধবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা প্রশাসন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এতে ছিলেন ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমাসহ আরও দু’জন। শিক্ষার্থীরা জানান, আমরা তদন্তকারী কমিটিকে তথ্য দিয়েছি, আমাদের দাবি জানিয়েছি। আন্দোলনের সম্মুখে থাকা এক শিক্ষার্থী বলেন, ২০১০ সালের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বলা হয়েছে, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা এমন কিছু করতে পারবেন না যাতে তা জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। তারা জাতীয় স্বার্থ ভঙ্গ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, গত বুধবার আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের মেইল করা হয়। সেই মেইলে আমরা নানাবিধ অন্যায়ের বিষয়টি তুলে ধরেছি। এই মেইলে দেখা যায়, ভিসি অধ্যাপক ইমরান রহমান সাম্প্রতিক আন্দোলনে যেসব শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন তাদের ইন্ট্রারগেশন সেলে পাঠান। এই সেলটাকে তারা আয়নাঘরের সঙ্গে তুলনা করেন। সেখানে মানসিক চাপ দেয়া, অশ্রাব্য কথা বলেন। ভিসি ভারতীয় একজন শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীকে নিয়োগ দেন। যিনি ৩০শে জুলাই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। যার কোনো পিএইচডি ডিগ্রিও ছিল না।  তারা বলেন, কয়েকজন শিক্ষক আছেন যাদের এখনো বেশ কিছু শিক্ষককে রানিং শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। কিন্তু আট বছরেও তারা কোনো ক্লাস নেননি। বিদেশি শিক্ষকদের শুধুমাত্র প্রোফাইল শো করা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান কাজী নাবিল আহমেদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও একাধিক সংসদীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি জেমকন গ্রুপের মালিক ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অপকর্মের অভিযোগ। সরকারি-বেসরকারি ভূমি দখল, মামলা দিয়ে স্থানীয়দের হয়রানি, মন্দির দখল, নদী দখল ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান কাজী আনিস আহমেদ জুলাই বিপ্লবে বিরোধী অবস্থান নেন। শেখ হাসিনাপন্থি প্রচারে মোটা অংকের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। নেত্র নিউজের সংবাদ অনুযায়ী, কাজী আনিস তার মালিকানার দুবাইভিত্তিক কোম্পানির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ডানপন্থি লবিং কোম্পানির সাহায্যে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা চালিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগও কোনো ধরনের অফিসিয়াল মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, এই মুহূর্তে এ বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। যেহেতু তদন্ত চলমান। তিনি তদন্ত প্রতিবেদন আসার পরই যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান।

Monday, November 18, 2024

দীপু মনির সুপারিশে মাউশিতে তিন হাজার পদায়ন by পিয়াস সরকার

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির ইশারায় নিয়োগ পান প্রায় তিন হাজার ১৮৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী। দীপু মনি সিন্ডিকেটের বলয়ে তারা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) চাকরি পান। এর জন্য উচ্চ মহলের সুপারিশসহ তাদের দিতে হয়েছে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা। নিয়োগের জন্য যাচ্ছেতাইভাবে পরীক্ষা নেয়া হয় তাদের জন্য। দীপু মনির আমলে চার হাজার ১০৯ জনকে নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এখনো চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন ৬১০ জন।

মাউশি’র এই নিয়োগ পুরোটা সামলেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনির ভাই ডা. জে আর ওয়াদুদ টিপু ও চাঁদপুর পুরান বাজার ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার। অভিযোগ রয়েছে এই চক্রটির খাতা কলমে বৈধতা দেয়ার কাজ করে গেছেন মাউশি’র কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক শাহেদুল খবির চৌধুরী, প্রশাসন শাখার উপ-পরিচালক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস। বর্তমানে এই দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা ২০২৩ সালে দু’দফায় (আগস্ট ও নভেম্বরে) যোগদান করেন।

মাউশি’র একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীপু মনি শিক্ষার দায়িত্ব হাতে পাবার পরই গড়ে তোলেন সিন্ডিকেট। মাউশিতে নিয়ে আসেন পছন্দের লোকদের। জনপ্রশাসন থেকে নিয়োগের ছাড়পত্র এনে তার আমলে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করেন। এই চক্র এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, কেউ প্রশ্ন করার সাহস পর্যন্ত ছিল না। পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই। পরীক্ষায় এমসিকিউ বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র অধীনে লিখিত পরীক্ষা নেয়ার দাবি তোলা হয়েছিল। কিন্তু তা আমলেই নেয়া হয়নি। এমনকি ভাইবার আগেই এসব প্রার্থীদের দেয়া হয়েছিল চাকরির নিশ্চয়তা।

সুপারিশের প্রেক্ষিতে চার হাজার ১০৯ জনকে নিয়োগ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় আটকে যায় ৬১০ জনের পদায়ন। তবে তাদের পদায়নের জন্য চলতি বছরের জুনে ফল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনের তোড়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। যার কারণে আটকে আছে তাদের নিয়োগ। নিয়ম অনুযায়ী দশম থেকে দ্বাদশ গ্রেড পর্যন্ত দ্বিতীয় শ্রেণির পদ, কিন্তু মাউশি’র নিয়োগবিধিতে এই পদগুলোকে তৃতীয় শ্রেণির দেখিয়ে শুধু এমসিকিউ পরীক্ষা নেয়া হয়। ২০২০ সালের অক্টোবরে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ২৮টি ক্যাটাগরির বিভিন্ন পদের মধ্যে প্রদর্শক পদে ৫১৪টি, গবেষণা সহকারী (কলেজ) পদে ২১টি, সহকারী গ্রন্থাগারিক কাম ক্যাটালগার পদে ৬৯টি এবং ল্যাবরেটরি সহকারী পদে ৬টি পদ উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এসব পদের বিপরীতে পরীক্ষা ২০২১ সালের আগস্ট ও অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয়। পরিদর্শক পদের ফল অনিবার্যকারণবশত স্থগিত করা হয়েছিল। সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় ২০২৪ সালের এপ্রিলে। এতে প্রায় আট হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। মে মাসে ভাইবা শেষে জুনে নির্বাচিতদের ফল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতির কারণে আটকে আছে এই ৬১০ জনের নিয়োগ। চাকরি পাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন কম্পিউটার অপারেটর ৯ জন, উচ্চমান সহকারী ৮৫ জন, ক্যাশিয়ার ১১৯ জন, স্টোরকিপার ৫০ জন, হিসাব সহকারী ১০৬ জন, অফিস সহকারী ৫১৩ জন, মেকানিক ৩৩ জন, গাড়িচালক ১১ জন, বুক সর্টার ৪৬ জন, অফিস সহায়ক ১৭০৪ জন, নিরাপত্তা প্রহরী ২৪৭ জন, মালী ৯৭ জন, পরিচ্ছন্নকর্মী ১৬৩ জন। অন্যদিকে তালিকায় নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন প্রদর্শক পদে পদার্থবিদ্যায় ১০৯ জন, রসায়নে ১২০ জন, জীববিজ্ঞানে ৩১ জন, প্রাণিবিদ্যায় ১০৯ জন, উদ্ভিদবিদ্যায় ৯৬ জন, ভূগোলে ১৩ জন, মৃত্তিকায় ৫ জন, গণিতে ২২ জন, গার্হস্থ্য বিজ্ঞানে ৮ জন, কৃষিতে একজন, গবেষণা সহকারী (কলেজ) ২১ জন, সহকারী গ্রন্থাগারিক ৬৯ জন এবং ল্যাবরেটরি সহকারী ৬ জন।

এই নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর এবিএম রেজাউল করীম বলেন, তালিকা ধরে নিয়োগের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময়ে দায়িত্বেও ছিলাম না। এটা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হলে সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।

mzamin

Monday, October 28, 2024

বিনামূল্যে পাঠ্য বই: ২৭০ কোটি টাকা লোপাট by পিয়াস সরকার

বিনামূল্যের পাঠ্য বই নিয়ে নানা অনিয়ম হয়েছে বিগত সরকারের সময়ে। বইয়ের মান, ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছাপার সঙ্গে লুটপাট হয়েছে সরকারি অর্থ। বিপুল অর্থ লুটপাট হলেও সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে দেয়া যায়নি বই। খোদ আওয়ামী লীগের শাসনামলের হওয়া অনুসন্ধানেই উঠে এসেছে ২৭০ কোটি টাকা লোপাটের তথ্য। এর বাইরেও ৯৪৫ কোটি টাকা বাজেটের বই থেকে প্রকাশনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও করেছে অর্থের নয়-ছয়। ২৭০ কোটি টাকার দুর্র্নীতির তথ্য মেলার পর নিশ্চুপ ছিল প্রশাসন। কারও শাস্তি হয়নি। জবাবদিহিতা করতে হয়নি কাউকে।

পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের দায়িত্বে থাকা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা যায়, পাঠ্য বই ছাপাতে মূলত পাঁচ খাতে দুর্নীতি করা হয়েছে। বইয়ের আকারে সুক্ষ্মভাবে ছোট করা হতো। যার কারণে সেখানে খরচ কমে আসতো। কাগজের উজ্জ্বলতার জন্য নির্দিষ্ট মান থেকে কমিয়ে আনা হতো। আর এই অপরাধকে একপ্রকার বৈধতা দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ডা. দীপু মনি। পূর্বের বছরের পাঠ্য বই নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের ছাপানো বইয়ের কাগজের মান খারাপ নয়, রং কিছুটা ভিন্ন হলেও তা নিউজপ্রিন্ট নয়। ছাপানো কাগজ অনেক বেশি সাদা হলে তা চোখের জন্য তত ভালো নয়। আমাদের দেশে সবাই মনে করে বইয়ের কাগজ যত বেশি সাদা হবে তত বেশি ভালো কিন্তু তা নয়। আমাদের বইয়ের কাগজের উজ্জ্বলতা কিছুটা কম হলেও তা নিউজপ্রিন্ট নয়।

২০২৩ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩৪ কোটি পাঠ্য বই ছাপানো হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৪৫ কোটি ৬৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৭৩ টাকা। এতে পাঠ্য বইয়ের প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠাসংখ্যার ক্ষেত্রেও করা হয় নয়ছয়। পাঠ্য বইয়ে প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠাসংখ্যা বেশি দেখিয়ে ছাপানো হয় এসব বই। আর বাঁধাইয়ের কাজেও নিম্নমানের সুতা ও আঠা ব্যবহারের অভিযোগও ছিল। একই মানের বই ছাপানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দরে। এনসিটিবি’র গুটিকয়েক কর্মকর্তা যাদের বইয়ের মান দেখভালের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তারাই কোটি কোটি টাকা লোপাট করেন।

২০২৩ সালের ছাপানো পাঠ্য বইয়ের কাজে অনিয়ম পেয়েছিল বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অধীন শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানায়, এসব অনিয়মের কারণে সরকারের প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা লোপাট হয়। আর এ ছাড়াও দেনদরবার, উপঢৌকন ও অযাচিত বিলের কারণে আরও ২৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অধিদপ্তর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে পত্র দেয়া হলেও যথাযোগ্য জবাব দেয়নি এনসিটিবি। পাঠ্য বই নিয়ে নানাবিধ সমালোচনা শুরু হলে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী গত মার্চে বলেছিলেন, কারও বিপক্ষে দুর্নীতির অভিযোগ মিললে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আদতে কোনো ব্যবস্থাই নেননি তিনি।

অডিট অধিদপ্তরের চিঠিতে বলা হয়েছিল, বই ছাপায় দরপত্রে অনিয়মের কারণে সরকারের ২৩৫ কোটি ৩০ লাখ ৫৭ হাজার ৭৮৫ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। চিঠিতে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং অর্থ আদায় করে এনসিটিবি’র তহবিলে জমা দেয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ না দেয়ায় অতিরিক্ত ৬ কোটি ৫৩ লাখ ৪১ হাজার ২৮৭ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এজন্য জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া বই ছাপানোর কাজে গঠিত বিভিন্ন কমিটিকে অতিরিক্ত হারে ৬৪ লাখ ৭২ হাজার ৩০ টাকার অতিরিক্ত সম্মানী দেয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্র উন্মুক্তকরণ কমিটিতে তিনজন, মূল্যায়ন কমিটিতে সাতজন সদস্য থাকবেন। এই অতিরিক্ত সম্মানীসহ ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রাপ্যতা না থাকলেও সম্মানী ও উদ্দীপনা ভাতা দেয়ায়, আয়কর না কাটায়, অতিরিক্ত হারে প্রশিক্ষণ-কর্মশালা ভাতা ও নির্দিষ্ট সীমার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ অগ্রিম দেয়ায় প্রায় ২৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

অধিদপ্তরের চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ৭ কোটি ৫৫ লাখ ৮ হাজার ১১২ টাকা অগ্রিম দেয়া হয়েছে। সার্ভিস চার্জ এবং প্রদত্ত সম্মানী থেকে আয়কর না কাটায় ৫ কোটি ৮৮ লাখ ১৩ হাজার ৬৭৬ টাকা এবং ভ্যাট আদায় না করায় ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬৩ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এসব অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে সুপারিশ করা হয়।

তথ্যমতে, সে বছর ২৮০টি লটে বই ছাপানো হয়। ৪৩ লটের বই ছাপানো হয় ২ টাকা ৬৮ টাকা করে। ২৩৭ লটের বই ছাপানো হয় ১ টাকা ৬৩ পয়সা দরে। একই মানের বই হওয়ার কথা থাকলেও ভিন্ন দামে বই ছাপানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছিল।

এনসিটিবি’র সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটিতে গত চার থেকে পাঁচ বছরে ব্যাপক পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে। আমাকেসহ কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছিল তাদের কথামতো না চলায়। এটার দুর্নীতি এতটাই স্ট্রং যে এটা ওপেন সিক্রেট ছিল। যার ভাগ সরাসরি যেত শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও পানি জাহাঙ্গীরের (শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী জাহাঙ্গীর আলম) কাছেও।

তিনি বলেন, এখন এসব দুর্নীতি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্ত হলে এসব দুর্নীতির বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে আসবে। প্রথম ২০১৭ সালের দেয়া বইয়ে নিম্নমানের কাজ শুরু হয়। এরপর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় পরবর্তী বছর থেকে দুর্নীতি বাড়তেই থাকে। এরপর এমনি অবস্থা হয় যে ২০২৩ সালের পাঠ্য বইয়ে তারা নিজেদের ছেলে-মেয়ে ও পরিচিতজনদের জন্য আলাদাভাবে বই ছাপিয়ে নিতেন। বই মনিটরিংয়ের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৭৫ লাখ টাকা করে সম্মানী দেয়া হয়। কিন্তু জানা মতে, তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৫ লাখ টাকা। টিএ-ডিএ আরও ২ লাখ টাকার মতো। কিন্তু এই টাকা তারা আত্মসাৎ করেছেন। এই পুরো কর্মযজ্ঞের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এনসিটি’র পূর্ববর্তী চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফরহাদুল ইসলাম।

এ বিষয়ে এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রিয়াজুল হাসান বলেন, বিগত দিনে নানাবিধ অনিয়মের বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরাও চাই এসব বিষয়ের তদন্ত হোক। উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি আর্থিক অনিয়ম বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রদান করে উপদেষ্টার দপ্তরে পৌঁছে দিতে।

mzamin

Saturday, October 19, 2024

জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার -সাক্ষাৎকারে এহছানুল হক মিলন by পিয়াস সরকার

সর্বাত্মক চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার ভালো করতে পারছে না। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ না করার কারণে তারা দিনে দিনে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ (ইআরআই) চেয়ারম্যান ড. আন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, অনেকেই বলছেন, বিএনপি’র লোকেরা চাঁদাবাজি করছে। বিএনপি  তো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বহিষ্কার করছে। বিএনপি যদি বহিষ্কার করতে পারে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার কেন সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না? তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সরকার কী কোনো সিন্ডিকেটের নির্দেশে নির্দেশিত?

এহছানুল হক মিলন মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি সকল বিপ্লবের সঙ্গে সহযোগিতা করা দল থেকে লোক নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করতো তাহলে খুব ভালো হতো। ১/১১ সরকার ব্যর্থ হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল তাদের এডভাইজারি কাউন্সিল ছিল পুরোপুরি নন-পলিটিক্যাল। লংটার্ম গভর্নমেন্ট যদি নন-পলিটিক্যাল হয় তাহলে ব্যর্থতা ছাড়া সফলতা আসা সম্ভব নয়। যে ভুলটা স্বাধীনতার পর পর করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ভেবেছিলেন, তার দল স্বাধীনতায় অবদান রেখেছে তার দলই ক্ষমতায় থাকবে। ১৯৭২ ও ২০০৭ সালে ব্যর্থ হয়েছি, এবার যদি ব্যর্থ হই তাহলে ভাগ্যবিধাতা আমাদের উপর ব্যাপক মনোক্ষুণ্ন্ন হবেন। তবে আমাদের আশার জায়গা হচ্ছে দায়িত্ব নিয়েছেন একজন একাডেমিশিয়ান, বিশ্ববরেণ্য নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, এত অল্প সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নির্ধারণ করা যাবে না। অন্তর্বর্তী সরকারে যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তারা যার যার সেক্টরে সফল। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এসেছেন ছাত্র-জনতার মতামতের ভিত্তিতে। কিন্তু অন্যরা ইউনূসের মতামতের ভিত্তিতে এসেছেন কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একজনকে পোস্টিং দেয়া হচ্ছে, এরপর সরিয়ে নেয়া হচ্ছে এসব একটা সমন্বয়হীনতার অভাব। যে যাকে চেনে, জানে, কাছের লোক তাকে টেনে নিয়ে আসছে। এখানে ব্যক্তিগত প্রভাব চলছে। যাচাই-বাছাইয়ের কোনো পদ্ধতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে, উপদেষ্টারা নিজেদের অতিরিক্ত উৎপাদনশীল মনে করায় কাজগুলোর গতি স্থবির হয়ে যাচ্ছে। ড. ইউনূসের নির্দেশনা আরও কঠিন হওয়া উচিত। এই সরকার যাদের নিয়োগ দিচ্ছেন তারা অনেকেই বিগত সরকারের ভিকটিম না। উপদেষ্টাদের অনেকেই বিগত সরকারের আমলে ভালোভাবেই ছিলেন। এজন্য তারা নিরুত্তাপভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এভাবে করলে হবে না। এটা বিল্পবী সরকার। তাদের বিল্পবী হয়ে র‌্যাপিড চেঞ্জ আনতে হবে।

তিনি বলেন, সংস্কার কমিটিগুলোকে সমস্যাগুলো জানতে হবে। এরপর দেখতে হবে সমাধান কোন পথে হবে। এরপর দেখতে হবে আইনত কী কী সমস্যা রয়েছে। সংস্কার করলেই হবে না সেগুলোর আইনগত কাঠামো তৈরি করতে হবে। নির্বাচন কমিশন সংস্কারের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। আমি মনে করি প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল একটি কমিটি গঠন করতে পারে। তারা সংস্কার প্রস্তাব জমা দিক। ৪৮টি দলের মধ্যে একটি দল পলায়নরত বাকি ৪৭টি দল তাদের সংস্কার প্রস্তাব দিক। এগুলো জনগণের মধ্যে ছেড়ে দেয়া উচিত। জনগণের মতামতও মিলবে তাতে। এরপর সংস্কার কমিটি এগুলো বিবেচনা করে সংস্কার প্রস্তাব করতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই ক্ষমতা দিতে হবে যাতে নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে যাতে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়। আপাত দৃষ্টিতে বর্তমান সরকার কোনো সুফল বয়ে আনতে পারছে না। তারা প্রতিনিয়ত পিছনের দিকে যাচ্ছে। প্রধান সমস্যা এখন দ্রব্যমূল্য। বাস ভাড়া এক টাকা কমে নাই। এখনতো প্রশ্ন আসতে পারে- কেন আমি আমার সন্তানকে হারালাম? কোথায় পরিবর্তন? এর কারণ অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত না। যেহেতু তারা জানে না কোথায় কোথায় দুর্নীতি। তাই এই সরকার বেশিদিন চালাতে পারবে না। তারা এখন আমলাদের উপর নির্ভরশীল। আমলারাতো আগের সরকারের সময় ছিল। কিন্তু শুধু রদবদল করা হয়েছে। আদালতে রাজনীতি বিহীন বিচারক নিতে পারতেন। এই সরকারতো বলে নাই রাজনৈতিক মদতপুষ্ট আইন সমিতি, ডাক্তারদের সংগঠন, শিক্ষকদের সংগঠন নিষিদ্ধ হবে। উভয় জায়গা রাজনীতিকরণ রয়েছে। আগে যে প্রক্রিয়া ছিল সেটাই রয়েছে। তাহলে পরিবর্তন আশা করা যায় না। যারা আসনে বসেছেন তারা শুধু নিরপেক্ষ থাকলেই তো হবে না। ২০ জন সদস্য দিয়ে ৪৪টি মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন। বিগত সরকার এক মন্ত্রণালয় একাধিক মন্ত্রীও দিয়েছিল। শুধু তাই নয় তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, জনসম্পৃক্ততা নেই।

সরকার নির্বাচনের সময় আইন করে মিথ্যা কথা বলতে বাধ্য করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০৮ সালের কথা বলি সরকার নিয়ম চাপিয়ে দিলো ২৫ লাখ টাকা দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। এই টাকা দিয়ে কখনই নির্বাচন করা সম্ভব নয়। নির্বাচনের সময় হলফনামা দিয়ে মিথ্যা বলতে হচ্ছে ২৫ লাখ টাকা খরচ করেছি। সংসদে যাওয়ার আগেই মিথ্যা কথা বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। উপদেষ্টারা কী কী কাজ করবেন সেই রোডম্যাপটাও দিচ্ছেন না। ২৩ জন জাজ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমি বলছি না খারাপ নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া কী ছিল সেটাতো বললেন না।
তিনি বলেন, জনগণের সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ড. ইউনূস। শুধু আমরা ব্যালটে সিল দেইনি। শিশু আর পাগল ছাড়া সকলই ড. ইউনূসকে ভোট দিয়েছেন। যারা নির্বাচনের জন্য ৩ মাস বা ৬ মাসের কথা বলছেন তাদের সঙ্গে আমি একমত নই। উনি ক্ষমতায় থাকার জন্য লোভ করবেন সেটা আমি বিশ্বাস করি না। ড. ইউনূস জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন। এখন তার জনপ্রিয়তা সমান্তরালে যাচ্ছে। যখন তার জনপ্রিয়তা নিচের দিকে নামতে থাকবে তার আগেই নির্বাচন দিয়ে সরে যাওয়া উচিত।
জামায়াতের বিষয়ে তিনি বলেন, জামায়ত একটি সুশৃঙ্খল দল। অতীতে তারা কেয়ারটেকারের জন্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলন করছিলেন। এরপর তারা অনেক ভুগেছে, আত্মাহুতিও হয়েছে। এখন তারা সাংগঠনিক কাজগুলো অত্যন্ত ভালোভাবেই করছে। কিন্তু অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে এলাকাভিত্তিক অনেক নিরপেক্ষ এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকদেরও দলে ভেরাচ্ছে। বিএনপি’র দলীয় কোন্দলের কারণেও জামায়াত এগিয়ে যাচ্ছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারেক রহমানের (বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) সঙ্গে আমার সম্প্রতি কথা হয়েছে। ম্যাডামের (সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া) স্বাস্থ্যগত বিষয়টি দেখতে হচ্ছে। তাকে লন্ডনে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। লন্ডনে নেয়ার পরপরই তারেক রহমানের দেশে আসার বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করবেন। এরমধ্যে আইনগত দিকগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবি তুলে তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস এমন লোক নিয়েছেন যে, তারা বলছেন- ‘আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা যাবে না।’ আমি তাদের প্রশ্ন করতে চাই- কী কী অন্যায় করলে একটা দলকে নিষিদ্ধ করা যায়? সেটা আগে বলুন। আর তার কোনটা আওয়ামী লীগ করে নাই তখন বোঝা যাবে। তারা পুলিশ লীগ বানিয়েছে, ডিজিএফআই’কে ব্যবহার করেছে, সেনাবাহিনীর অংশ বিশেষ, বিজিবিকে নষ্ট করেছে। তারা দলকে মাফিয়া গ্রুপ তৈরি করেছে। দলকে নিষিদ্ধ করা না হলে যত মামলা হয়েছে এগুলোতে তাদের নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে।

mzamin


Monday, October 14, 2024

শিক্ষা ঋণ বদলে দিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা by পিয়াস সরকার

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও কার্যকর করতে ‘শিক্ষা ঋণ’র ধারণা দিয়েছেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে গরিব-মেধাবী শিক্ষার্থীরা সমভাবে শিক্ষার পরিবেশ পাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গতিশীলতার সঙ্গে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে শিক্ষা জীবন শেষ করতে পারবেন। যা ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক উপকারী হবে। মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এহসানুল হক মিলন শিক্ষার বিষয়ে নানান কথা বলেন।

২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এহসানুল হক মিলন বলেন, বিনা পয়সায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়ছেন। তারা বিনামূল্যেই পড়ুক কিন্তু একটু টাকাটা ঘুরিয়ে দেয়া যায়। ধরেন একজন শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিবছর সরকার এক লাখ টাকা খরচ করছে। এই শিক্ষার্থীকে প্রথম বর্ষের পর সার্টিফিকেট দেয়া হলো- ‘তিনি ভালো করেছেন এবং গ্রেড পয়েন্ট এত’। এরপর সরকার ওই শিক্ষার্থীকে এক লাখ টাকা শিক্ষা ঋণ দেবে অর্থাৎ পরবর্তী বছরের জন্য এক লাখ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা হবে। এর সঙ্গে এর ৩০ শতাংশ শিক্ষার খরচ দেবে শিক্ষার্থীর হাতে। পাঁচ বছরে সরকার থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা পাবে ওই শিক্ষার্থী। গ্যারান্টার হবে শিক্ষক, চেয়ারম্যান। সার্টিফিকেটের জন্য শিক্ষার্থীকে প্রতিটি পরীক্ষায় পাস করতে হবে। সাড়ে ৬ লাখ টাকার মধ্যে শিক্ষার্থী দেড় লাখ টাকা হাতে পাবে। যার কারণে শিক্ষার্থীর কোনো চিন্তা থাকবে না। পড়ালেখার বাইরে টাকার সন্ধান করতে হবে না। তবে এটা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কার্যকর ‘বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদ’ খুবই জরুরি। যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। কিন্তু কেউ যদি পড়ালেখা না করে সরকারের তো কোনো সমস্যা নাই। চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট দেবে না। ওই শিক্ষার্থী তার বাবার টাকায় পড়ুক, ৫০ বছর থাকুক। ওই শিক্ষার্থী এই অর্থ ব্যয় করে নিজের জীবন প্রতিষ্ঠিত করবে। এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর ব্যাংক ম্যাসেজ দেবে- ‘পে ব্যাক ইউর লোন।’ এই লোন পরিশোধের জন্য কোনো চাপ বা শাস্তি দেয়া হবে না। ধরে নিলাম ওই শিক্ষার্থী সিনিয়র সচিব থেকে পদত্যাগ করছেন। এক কোটি টাকা পেনশন পাচ্ছেন। সেখান থেকে টাকাটা কেটে নেয়ার অনুমতি চাওয়া হবে। কারণ তার টাকা পরিশোধের যোগ্যতা আছে। এরপরও যদি না দিতে চান সেটাও সমস্যা নাই। সরকার জোর করবে না। ধরে নেই আরেক শিক্ষার্থী সিআইপি কার্ড চায়। ওখানে তথ্যে উল্লেখ থাকবে যে স্টুডেন্ট লোন পরিশোধ করেনি। আশা করি শিক্ষার্থীদের পিছনে ব্যয় করা ৫০ শতাংশ অর্থ ফেরত আসবে। বাকি টাকাটা পরিশোধ হলো না সমস্যা নাই। এখন তো বিনামূলেই পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি’র এই নেতা বলেন, শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছেন ‘বাই দ্য স্টুডেন্ট, ফর দ্য স্টুডেন্ট, ফর দ্য এডুকেশন’। এরপর আমরা অনেক ভাগ্যবান একজন কনক্রিট শিক্ষাবিদকে দেশের কর্ণধার হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন আন্দোলনরত নন-পলিটিক্যাল শিক্ষার্থীরা। আমাদের দেশের ছাত্র রাজনীতি হয় মূল দলের প্রতি বায়াস্‌ড হয়ে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বার্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নন-পলিটিক্যাল শিক্ষার্থীরা তীব্র আন্দোলন করলেন। রক্ত দিলেন।
শিক্ষার সংস্কারের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক এই শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষার সংস্কার কাজ এখনো শুরুই হয়নি। এরজন্য সময় দিতে হবে। শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো একজন গুণী মানুষ পেয়েছেন। কিন্তু শিক্ষা প্রশাসনে আগে যারা দায়িত্ব পালন করছিলেন তারা কিন্তু এখনো সেখানেই আছেন। যদিও কিছু লোককে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তারা স্যাডো মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখন যে সরকার রয়েছে তারা পলিটিক্যালি এত স্ট্রং নয়। কোর কমিটিতে যেমন এনসিটিবি’তে (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড) আওয়ামী লীগের লোকেরা রয়ে গেছেন। এনসিটিবি’র টেন্ডার হয় জুন-জুলাইয়ে। কিন্তু তারা দায়িত্বই নিয়েছেন আগস্টে। পরিমার্জনই এখনি হয়নি। এই কাজটা এত সহজ নয়। কারণ গত ১৫ বছরে তারা এতটা ধ্বংস করেছেন যে বলা যায় বইগুলোকে- ‘শরীফ থেকে শরীফা বানিয়ে ফেলেছে’। এই ধ্বংসাবশেষ থেকে বের হওয়া খুবই কঠিন। অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে- ‘পুরনো শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়া হবে’। এটার জন্য অবশ্যই সময়ের প্রয়োজন।

সমালোচনার জেরে পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন কমিটি বাতিলের বিষয়টি তিনি সমর্থন করেন না উল্লেখ করে বলেন, সমালোচনা তো হবেই। উনি দায়িত্ব দেয়ার পর সমালোচকরা যা বলছেন সেটার কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা এটা দেখতে হবে। ইসলাম ফোবিয়া নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে। বইগুলো তো ধর্ম ছিল না। তবে আমি বলতে চাই, ধর্মীয়-নৈতিকতার বিষয়টি থাকতে হবে। প্রত্যেকটি ধর্মের ভালো কথা, নৈতিকতা, আদর্শের কথা উল্লেখ থাকতে হবে।

১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সাবেক এই সংসদ সদস্য কারিগরি শিক্ষা সেক্টরের বিষয়ে বলেন, শিক্ষায় দেশে ৭১ শতাংশ ব্যয়ভার বহন করে পরিবার। বাকিটা সরকারসহ অন্যরা ব্যয় বহন করে। তবে কারিগরি শিক্ষা পুরোপুরি বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এটার খরচ সরকার দিচ্ছে। আর্থ সামাজিক উন্নয়নে এটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ২১টি মন্ত্রণালয় কারিগরি শিক্ষার উপর প্রজেক্ট করে। এই অর্থগুলো নষ্ট করছে। এই বিষয়গুলো একখানে এনে একটা কারিগরি শিক্ষা মন্ত্রণালয় করা যেতে পারে। অতিদরিদ্র পরিবারের মানুষগুলো মাদ্রাসায় যায়। কারণ সেখানে কোনো খরচ হচ্ছে না। সেজন্য এই সেক্টরের লোকজন মূলধারায় আসছে না। আমরা ক্ষমতায় আসার পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ করেছিলাম। এরপর বোর্ডগুলোকে এক্সটেন্ড করি। কিন্তু মাদ্রাসায় যারা আছেন তারা তো উচ্চ শিক্ষার মূল্যায়ন করার মতো না। এরপর ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় করে তাদের দায়িত্ব দিলাম। কিন্তু আমরা শিক্ষায় যেটুকু অগ্রগতি করেছিলাম বিগত সরকার শিক্ষার গাড়িকে পেছনের দিকে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ তারা পিছিয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম মাদ্রাসা শিক্ষায় কর্মমুখী করতে। আমরা কারিগরি মাদ্রাসার উদ্যোগ নেই। ইংরেজি মিডিয়ামে ইংরেজিতে গুরুত্ব দেয়া হয় তেমন মাদ্রাসায় আরবিকে প্রাধান্য দেয়া হবে। যাতে তারা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে সহজে কাজ করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের কাজের একটা বড় সুযোগ আছে কিন্তু যোগাযোগ দক্ষতাটা নেই।

এহসানুল হক মিলন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার এতটাই শিক্ষা নিয়ে কাজ করেছিল যে, তারা পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বোর্ড পরীক্ষা আনলো। তারা শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানালো। পৃথিবীতে এখন আর গিনিপিগ বানানোর প্রয়োজন নাই। এখন গ্লোবাল ভিলেজ সবই আমরা জানি। আমরা পঞ্চম জেনারেশন কম্পিউটার ব্যবহার করছি। আমরা এন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করছি। এডুকেশনেও আমাদের লেটেস্টটা ব্যবহার করতে হবে। বিশ্ব যেখানে এগিয়ে যাচ্ছে, পরীক্ষা কমিয়ে দিচ্ছে সেখানে আওয়ামী লীগ পঞ্চম, অষ্টম শ্রেণিতে পরীক্ষার আয়োজন করলো। এরপর তারা বললো, পরীক্ষার প্রয়োজন নাই, এরপর বললো, কোনো পরীক্ষাই নাই। মানে যখন যা মন চেয়েছে করেছে। আমেরিকায় আমি দেখেছিলাম সেখানে যে পেশাতেই যাই না কেন লাইসেন্স লাগবে। এজন্য আমি শিক্ষকদের লাইসেন্স দেয়ার জন্য এনটিআরসিএ (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) তৈরি করলাম। কেউ যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করতে চায় সেটাকে অনেক সময় করা যায় না, আবার প্রয়োজনও আছে। এজন্য শিক্ষার মান রক্ষায় শিক্ষকদের যোগ্যতা ধরে রাখার জন্যই তাদের লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা। এনটিআরসিএ’র ড্রাফট আমিই প্রথমে করেছিলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এটাকে দুর্নীতির রাজ্য বানালো। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হয় কসাই বা গ্রামের প্রতিপত্তিওয়ালা লোক। তিনি শিক্ষকদের উপর খবরদারি করেন। এরপর ক্রাইটেরিয়া ঠিক করা হলো এই যোগ্যতাগুলো থাকলে সভাপতি হতে পারবেন। এরপর আমরা বদলির ব্যবস্থাও করেছিলাম। কিন্তু পুরোপুরি বাস্তবায়নের কাজ করার সময় পাইনি। এরপর আওয়ামী লীগ এটাকে এমনভাবে রাজনৈতিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেললো যে কোনো উপকারই এখন মিলছে না।

পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)’র বিষয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে (২০০১ সালের আগে) বিসিএস ভাইভাতে ২০০ নম্বর ছিল। আমরা এটাতে কমিয়ে ১০০ নম্বর করেছি। অন্যান্য পরীক্ষাসহ বিশেষ করে বিসিএস পরীক্ষার ভাইভার নম্বর আরও কমানো যেতে পারে। ভাইভাতে স্বজনপ্রীতি করা সহজ। কারণ এটার নির্দিষ্ট কোনো কাঠামো নেই। কারচুপি করলে ধরাও খুব কঠিন। আবার এই ভাইভাতেও কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ করে নম্বর বণ্টন করা যেতে পারে। পিএসসি সদস্যদের খুঁজে বের করতে হবে যারা স্বজনপ্রীতিতে যুক্ত নন। ধরেন একজন শিক্ষক ৩০ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তাদের চরিত্র তো একদিনে ফুটে ওঠে না। চরিত্র বুঝে যোগ্য লোকদের নিয়োগ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, পিএসসি পরিচালনার জন্য সদস্যরা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বিশ্ববরেণ্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নিয়েছেন। বিশ্বের কোনো দেশের সরকার প্রধান হয়তো এত গ্রহণযোগ্য নন। আর উনি যদি একটা শিক্ষা কমিশন না করেন তাহলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে। এই সরকারের কাছে চাওয়া এমন একটা শিক্ষা কমিশন করতে হবে প্রয়োজনে সংবিধানের সঙ্গে সন্নিবেশিত করতে হবে যাতে পরবর্তী সরকার পাল্টাতে না পারে। সেখানে বেসিক কিছু ধারা থাকবে যেগুলো পরিবর্তন করা যাবে না। বিগত সরকার জাতির ভবিষ্যত নিয়ে খেলাধুলা করেছে। জাতির সঙ্গে এর থেকে বড় অন্যায় কোনো সরকার কোনোদিন করেনি।

mzamin