Monday, February 24, 2014

উপজেলা নির্বাচন- প্রথম ধাপ: একটি সমীক্ষা by এম সাখাওয়াত হোসেন

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ৯৭টির মধ্যে ৯৬টির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনটি উপজেলায় বিএনপিসহ আওয়ামী লীগের তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিভিন্ন কারণে ভোট গ্রহণের দুই ঘণ্টার মধ্যে কারচুপির অজুহাতে নির্বাচন বর্জন করা এবং কয়েকটি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ ছাড়া প্রথম ধাপের নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে।
আলোচিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা তথ্য বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম ধাপের নির্বাচন ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় উপজেলা নির্বাচনে একই উপজেলার নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে কয়েকটি বিষয় ধর্তব্যের মধ্যে পড়বে। প্রথমত, নানা ধরনের প্রতিকূলতা এবং পরবর্তী সময়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপি এবং এর প্রধান সহযোগী দলের চমকপ্রদ উত্থান। দ্বিতীয়ত, মামলাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, নেতাদের ব্যাপক গ্রেপ্তার, যুদ্ধাপরাধের দায়ে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া এবং ব্যাপক নেতিবাচক প্রচার সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর আশ্চর্যজনক প্রাপ্তি। তৃতীয়ত, এযাবৎ বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টির তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম। চতুর্থত, মহাজোটের অন্যান্য শরিক দলে জামানত হারানোর মতো পরিস্থিতি এবং আশাতীত ভোটার সমাগম না হওয়া।

প্রথম ধাপের ভোট এবং ফলাফলের পর এসব বিষয়ে কিছু বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হলে ঘোষিত ৪৪৬টি উপজেলার ভোট গ্রহণের পর ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তথাপি প্রথম ধাপের নির্বাচনে যে গতিধারা দৃশ্যমান হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকাটাই স্বাভাবিক। অন্যথায় নতুনভাবে বিশ্লেষণ হবে ব্যতিক্রম গতিধারা নিয়ে।
বিএনপি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে তিন দশকের মধ্যে এমন সাংগঠনিক সংকটে পড়েনি। সাংগঠনিক সংকটই নয়, নেতাদের ব্যাপক ধরপাকড় ও মামলা ইত্যাদির কারণে কেন্দ্রে এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে। উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন এবং রয়েছেন। তদুপরি ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায়, সূত্রমতে, তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা রয়েছে বলে প্রচারিত। এমতাবস্থায় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ওই দলের উল্লেখযোগ্য হারে শীর্ষে এগিয়ে থাকার বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মূলে রয়েছে সরকারি দলের অব্যাহত জনসমর্থন হ্রাস। যদিও বিভিন্ন জরিপে এ ধরনের তথ্য ইতিপূর্বে প্রকাশিত হলেও ধারাবাহিকভাবে সরকারে অধিষ্ঠিত দল বা জোট এসব ফলাফল ধর্তব্যের মধ্য না নিয়ে একধরনের আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত ছিল। মূল কারণ খতিয়ে না দেখে তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান জনমনে আস্থা ফেরাতে পারেনি। সরকারি দল বা জোট দেয়াললিখন পড়লেও তা বিশ্বাস না করার প্রবণতায় রত ছিল।
বিএনপির এগিয়ে থাকার আরেকটি কারণ, সিংহভাগ সময় অনবরত সরকারি দল এবং দলের সমর্থকদের তৎকালীন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কারণে-অকারণে নানা ধরনের অপ্রিয় বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অনেক ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপনে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
প্রথম ধাপের নির্বাচনে ভোটের যে প্রতিফলন ঘটেছে, তার বেশির ভাগ সরকারি জোটের নেতিবাচক ভোটের সংখ্যাই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বাক্সে জমা পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ৫ জানুয়ারির ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া এবং পরে সামগ্রিক নির্বাচন চিত্র, যেখানে প্রায় সাত কোটি ভোটার ভোট দিতে পারেননি, তার মর্মব্যথা। এ বিষয়টি হালকাভাবে দেখার উপায় নেই। ভোটারদের মনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারার যে হতাশা ছিল, তাও প্রতীয়মান হয়েছে প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে। বিভিন্ন জরিপে তথ্য ছিল যে, এ দেশের সিংহভাগ ভোটার একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে ছিল।
প্রথম ধাপের নির্বাচনে চারটি দলের সমর্থকদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, যদিও উভয় দল ঘোষিত তথাকথিত কিছু কিছু বিদ্রোহী প্রার্থীরও উপস্থিতি ছিল। চারটি দলের মধ্যে জাতীয় পার্টি না থাকার মতো, সরকারের শরিক আর কোনো দলের অস্তিত্বই ছিল না। অথচ বেশ কিছু দলের মন্ত্রীরা রয়েছেন এবং ছিলেন অতীত ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায়। বড় দলের ছত্রচ্ছায়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এসব দল মোটেও বিকশিত হতে পারেনি। লক্ষণীয় যে, এসব দলের বিচরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহু দশকের। প্রাক্-নির্বাচনী জোটবদ্ধ হওয়া এবং নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণে এসব দল তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হতে পারেনি বলে বিশ্বাস। বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য এমতাবস্থা কোনোভাবেই সহায়ক নয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো নীতিগতভাবে নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ার কথা, তবে রাজনীতিবিবর্জিত নয়। হালে নির্বাচনগুলোকে অধিক রাজনৈতিকীকরণ করার ফলে দলের প্রত্যক্ষ মনোনয়ন প্রদান, মনোনয়নের বাইরের প্রার্থীদের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আখ্যায়িত করার কারণে এসব নির্বাচন কার্যত দলীয় রূপ ধারণ করেছে। বিগত কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে এ ধরনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব নির্বাচন উন্মুক্ত এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীকে ঘিরেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ভোটারদের ধর্তব্যের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীর পরিচয় এবং স্থানীয় চাওয়া-পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে থাকেন। উপজেলা নির্বাচনের এই পর্যায়ে এমনটি থাকেনি। ভবিষ্যতেও এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ধরনের অলিখিত ব্যবস্থার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নেতিবাচক দিকই প্রতীয়মান হয়েছে। উপরিউক্ত বাস্তবতার আঙ্গিকে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে দলের প্রভাবের কারণে একদিকে যেমন স্থানীয়ভাবে বহু জনপ্রিয় দলীয় ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্তরের পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ার কারণে প্রার্থী হতে পারেননি, তেমনি দলের নির্দেশনাও অনেকেই ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি। এ কারণেই স্থানীয় প্রভাবের চেয়ে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবে নির্বাচন আচ্ছন্ন ছিল। তদুপরি ছিল ক্ষমতাসীনদের স্থানীয় পর্যায়ের নিজস্ব বলয় তৈরি করার অতি উৎসাহ। এসব কারণে বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বাকি নির্বাচনগুলোতে হয়তো একই ধারা বজায় থাকবে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রথম ধাপের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও জামায়াতে ইসলামীর কল্পনাতীত সাফল্য। জামায়াত ১৩টি চেয়ারম্যান, ২৪টি পুরুষ এবং ১০টি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদে বিজয়ী হতে সক্ষম হয়েছে। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদগুলো যে শুধু জামায়াত প্রভাবিত অঞ্চলেই হয়েছে, তেমনটি নয়। এ সত্য ভাইস চেয়ারম্যান পদের বিশ্লেষণ করলেই দৃশ্যমান হবে। বিএনপি প্রভাবিত কয়েকটি উপজেলায় জামায়াতের প্রার্থী বিএনপির প্রার্থীদের পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন। প্রসঙ্গত, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে পাওয়া যায়, ২০০৯ সালে বর্তমানের প্রথম ধাপের নির্বাচনের উপজেলাগুলোতে জামায়াত মাত্র ছয়টিতে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছিল। এবার তার দ্বিগুণ স্থানে জয়ী হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ, জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো বিতর্ক ছিল না। ছিল না কোনো ধরনের সাধারণ অথবা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। অনেকে মনে করেন, জামায়াতের প্রার্থীরা গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ভোটারদের সহানুভূতিও পেয়েছেন। অবশ্যই ধর্মীয় অনুভূতিও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে বলে বিশ্বাস। যা হোক, জামায়াতের পুনরুজ্জীবিত হওয়ার বিষয়টি আরও গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তবে এ ধারা ভবিষ্যতে বজায় থাকে কি না, তা হবে লক্ষণীয় বিষয়।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বর্তমানে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। তৃতীয় বৃহৎ দল বলে পরিচিত পার্টিটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর্যায়ে। বিগত ২০০৯ সালের নির্বাচনেও এমনটি হয়নি। এই দলের ওপর অবশ্যই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের জের যে পড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে জাতীয় পার্টির দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অবস্থান পরিষ্কার নয়। সরকারেও যোগ দিয়েছে, আবার বিরোধী দল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রয়াস জনমনে আস্থার অভাব ঘটিয়েছে। তদুপরি জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। এরশাদ জাতীয় পার্টির মূল চালিকাশক্তি থেকে বিচ্যুৎ অবস্থায় রয়েছেন। অপরদিকে রওশন এরশাদের নেতৃত্ব নিয়ে পার্টির অভ্যন্তরে রয়েছে দ্ব্যর্থকতা। জাতীয় পার্টি থেকে বহুদিনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বর্ষীয়ান নেতা এবং জাতীয় পার্টির শাসনকালের প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর সদলবলে এরশাদকে পরিত্যাগ করায় জাতীয় পার্টির যে ক্ষতি হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাবও যোগ হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের সমর্থনে। সংক্ষেপে বলা যায় যে এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টির সমর্থন এবং জাতীয় পর্যায়ে পার্টির অবস্থান আগের অবস্থানে নেই। ভবিষ্যতে জাতীয় পার্টির অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়তে পারে।
যেমনটা আগেই বলেছি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নীতিগতভাবে নির্দলীয় হওয়ার কথা থাকলেও সে আবরণ আর থাকছে না। কারণ, সব দলের এই আবরণ অপসারণের কারণে। যেহেতু জাতীয় পর্যায়ে আমাদের দেশের রাজনীতি অতিরিক্ত মাত্রায় সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে, মূলত সে কারণে স্থানীয় নির্বাচনকে বিভিন্ন দল জাতীয় পর্যায়ে দলের অবস্থানের মাপকাঠি হিসেবে দেখার প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। এমতাবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ের নীতি এবং অবস্থানের প্রতিফলন ঘটছে। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সংগঠন। কোন্দল মাথাচাড়া দিচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে। স্থানীয় সমস্যাগুলো ধামাচাপা পড়ছে। এমতাবস্থায় দল এবং প্রার্থীর অবস্থান নিয়েও ভোটাদের বিভ্রান্তির মধ্য পড়তে হচ্ছে।
ধারণা করা হয়েছিল যে ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদে সিংহভাগ ভোটার ভোট প্রয়োগে বঞ্চিত হওয়ার কারণে ভোটের হার বেশি হবে, তেমনটি হয়নি। ইডব্লিউজি-১-এর মতে, মাত্র ৫৯ শতাংশ ভোট প্রদান করা হয়েছে, যা তৃতীয় উপজেলা নির্বাচন থেকেও অনেক কম। নিম্নগামী ভোটের হারের দুটি প্রধান কারণ হতে পারে; প্রথমত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জের এখনো কাটেনি, যার পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে বিরূপ ভাব বিদ্যমান ছিল। হয়তো ভবিষ্যতে এই হারের বৃদ্ধি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিগত সময়ে বিভিন্ন কারণে উপজেলা পরিষদ জনগণের কাছে তেমন আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেনি। অনুমেয় যে, এই দুই প্রধান কারণেই ভোটের হার আশাতীত হয়নি।
পরিশেষে উপরিউক্ত পর্যালোচনা আংশিক নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে হলেও ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ উপজেলা নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পরে আরও অর্থবহ হবে। অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনের। দৃশ্যপটের পরিবর্তন হতে পারে।


এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

উপজেলা নির্বাচন- প্রথম ধাপ: একটি সমীক্ষা by এম সাখাওয়াত হোসেন

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ৯৭টির মধ্যে ৯৬টির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনটি উপজেলায় বিএনপিসহ আওয়ামী লীগের তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিভিন্ন কারণে ভোট গ্রহণের দুই ঘণ্টার মধ্যে কারচুপির অজুহাতে নির্বাচন বর্জন করা এবং কয়েকটি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ ছাড়া প্রথম ধাপের নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে।

লাল গোলাপের দেশে by সোনিয়া ইসলাম

চারদিকে নিঝুম নিস্তব্ধতা। বসন্তের মিষ্টি রোদে ধানের সবুজ কচি শিষে আলোর ঝিকিমিকি। ধানখেতের আল ধরে হাঁটলাম দীর্ঘপথ। তারপর উঁচু রাস্তা। লাল মাটির মেঠোপথ। যেন হেঁটে চলেছি আবহমান গ্রামবাংলার ছবির ভেতর দিয়ে।
মেঠোপথ পেরোলেই গোলাপের দেশ। শুনতে বহুদূরের পথ মনে হলেও ওই গোলাপের দেশ কিন্তু রাজধানীর খুব কাছেই। বুকে লাল ফুলের বন্যা নিয়ে তুরাগ নদের কোলে এক সবুজ দ্বীপ যেন ঢাকার সাভারের বিরুলিয়া গ্রাম।

প্রিয়ার কাছে পৌঁছানোর তাড়া তো থাকেই। কিন্তু অনেক সময় পথও তো হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর! আর গোলাপ! সে তো ফুলের রানি। তাকে খুঁজে বের করা চাট্টিখানি কথা নয়। অনেকটা পথ হেঁটে হেঁটেও যখন তার হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন মনে হলো গোলাপদেবী বুঝি অভিমানই করেছেন। যাহোক, ১১টা নাগাদ প্রথম বাগান দেখেই মনটা আনন্দে ভরে গেল। সেই শুরু। তারপর শুধু গোলাপ আর গোলাপ। মাঠের পর মাঠের বদলে এ হলো গোলাপের বনের পর বন।

প্রথমে ভেবেছিলাম কেবল বিরুলিয়া গ্রামেই বুঝি গোলাপের চাষ হয়। কিন্তু শুধু বিরুলিয়া নয়, সারুলিয়া, ভাগ্নিবাড়ি, সাদুল্লাপুর, শ্যামপুরসহ আশপাশের সব গ্রামেই কমবেশি গোলাপের চাষ হয়। দুপুর হয়ে যাওয়ায় ফুটন্ত গোলাপ খুব একটা চোখে পড়েনি। বিকেল নাগাদ আধফোটা ফুলগুলো ফুটে যায়। তাই বিকেলেই ফুল তোলা হয়। গোছা গোছা করে বেঁধে প্রস্তুত করা হয় হাটে নিয়ে যাওয়ার।

গোলাপের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে তখন পড়ন্ত দুপুর। এমনিতেই গ্রামগুলো শান্ত। তার ওপর দুপুরের নিস্তব্ধতায় যেন নিঝুমপুরি। সুন্দর ছবির মতো গ্রামগুলোর সৌন্দর্য অপার্থিব মহিমা ছড়াচ্ছিল আদিগন্ত বিস্তৃত লাল গোলাপের সমাহারে। একে তো গ্রামের রূপ তার সঙ্গে গোলাপের মহিমা—সব মিলিয়ে বিরুলিয়া যেন রূপকথার দেশ।
নিঝুম শান্ত গ্রামগুলোর চারপাশে যতদূর চোখ যায় কেবল গোলাপের বন। ছবি: লেখক

পুরো মাঠে ফুটন্ত লাল গোলাপের চোখ ঝলসানো সৌন্দর্য দেখতে না পারার একটা কষ্ট মনে মনে অনুভব করলেও, যা দেখেছি তার সৌন্দর্যও অসাধারণ। নিঝুম শান্ত গ্রামের আনাচ-কানাচে গোলাপের বন। যতই সামনে এগোচ্ছিলাম মুগ্ধতা বেড়েই চলছিল। ঢাকা শহরের অদূরেই এমন সৌন্দর্যের উত্স দেখে বিস্ময় জাগে।

বিরুলিয়া পৌঁছানোর আরও সোজা পথ আছে। বাসে-রিকশায় চলে যাওয়া যাবে অনেক কাছাকাছিই। ঢাকা থেকে বাসে সাভার বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে মিনিবাসে বিরুলিয়া বাজার। এরপর আপনি চাইলে হেঁটে বা রিকশায়ও চলে যেতে পারেন গ্রামের ভেতরে। তবে, নির্জন সকাল বা দুপুরে রিকশা খুঁজে পাওয়া একটু কঠিন বৈকি। আর যেতে পারেন ঢাকার মিরপুর-১ থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে নদী পার হয়েও। বেড়িবাঁধে রিকশা বা বাস যাতেই থাকুন বলতে হবে বিরুলিয়া যাব। তাহলেই আপনাকে নামিয়ে দেওয়া হবে খেয়াঘাটে। নৌকায় মাত্র চার-পাঁচ মিনিটেই পার হয়ে যাবেন নদী। ওপারেই বিরুলিয়া গ্রাম।

সেখানকার শ্যামপুরে প্রতিদিনই বসে গোলাপের হাট। ফুলচাষিরা ফুল কেটে নিয়ে চলে আসেন এই হাটে। সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় ফুল ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য ব্যবসায়ী এসে ভিড় জমান এখানে। রাতে জমতে থাকে বেচাকেনা। ভোর থাকতে থাকতেই সেই ফুল পৌঁছে যাওয়া চাই রাজধানী ঢাকার শাহবাগে, পৌঁছে যাওয়া চাই এমন সব পাইকারি বিক্রির কেন্দ্রে। সেখান থেকে তা যাবে পাড়া-মহল্লার দোকানে দোকানে। তাই ফুলচাষিরা রাতেই করেন ফুলের বিকিকিনি।

গোলাপের চাহিদা থাকে সব সময়। তাই চাষিরাও সারা বছরই ব্যস্ত থাকেন। বিশেষ উত্সবের দিনগুলোতে চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণ। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে দামও। লম্বা ডাঁটা রেখে কেটে নেওয়া গোলাপের বড় একটা গোছায় থাকে প্রায় ৩০০ ফুল। এমন একটা গোলাপ গোছার পাইকারি দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে উত্সবের সময় তা বেড়ে চলে যায় হাজার টাকার কাছাকাছি।

গোলাপ চাষে লাভের পাশাপাশি খরচও কম নয়। বিরুলিয়ার গোলাপচাষি শাফিজ উদ্দিন জানান, প্রথমবার এক পাকি (৩০ শতাংশের মতো) জমিতে গোলাপ চাষ করতে খরচ হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। আর সারা বছর ধরে যত্নআত্তি তো আছেই। শীতে পোকা-মাকড়ের প্রকোপ কম থাকলেও গরমে খুব বেশি থাকে। তাই নিয়মিত ওষুধ দিতে হয় তখন।

ফেরার পথে গোলাপের পাশাপাশি চোখে পড়ল বেশ কিছু গ্লাডিওলাসের বাগান। লাল মেঠোপথের একদিকে লাল গোলাপ আর অন্যদিকে সাদা গ্লাডিওলাস। ছবির মতো দৃশ্য। যাঁরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভালোবাসেন, নগরের ব্যস্ততম জীবনযাপন থেকে একটু সময় বের করে ঘুরে আসতে পারেন লাল গোলাপের দেশ বিরুলিয়া ও এর আশপাশের গ্রামগুলোতে। অসাধারণ কিছু নির্মল ভালো লাগা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবেন।

ফেরার সময় যখন লাল গোলাপের দেশ পেছনে ফেলে ক্রমশ নাগরিক জীবনের কাছাকাছি আসছিলাম, কেবলই কবি গুরুর সেই লাইনগুলো মনে পড়ছিল— ‘বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।’

লাল গোলাপের দেশে by সোনিয়া ইসলাম

চারদিকে নিঝুম নিস্তব্ধতা। বসন্তের মিষ্টি রোদে ধানের সবুজ কচি শিষে আলোর ঝিকিমিকি। ধানখেতের আল ধরে হাঁটলাম দীর্ঘপথ। তারপর উঁচু রাস্তা। লাল মাটির মেঠোপথ। যেন হেঁটে চলেছি আবহমান গ্রামবাংলার ছবির ভেতর দিয়ে।

ফিল্মি কায়দায় ৩ জঙ্গি ছিনতাই by মতিউল আলম, খালিদ মাসুদ, ও সাইফুল ইসলাম সানি

ফিল্মি স্টাইলে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে সাজাপ্রাপ্ত ৩ জেএমবি সদস্যকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইয়ের সাত ঘণ্টার মাথায় টাঙ্গাইল থেকে জঙ্গি সদস্য রাকিবকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাকি দু’জনের খোঁজ মেলেনি।
এদিকে এ ঘটনার পর সীমান্ত ও দেশের সব কারাগারে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার কারণে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজ ও অন্যজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এদিকে রাতে গাজীপুর থেকে জঙ্গি ছিনতাইয়ে সহযোগিতার অভিযোগে আটক জাকারিয়ার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করেছে পুলিশ।

গতকাল সকাল সোয়া ১০টায় আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ময়মনসিংহের ত্রিশালে। ছিনতাইকৃত আসামিরা হলো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সালাউদ্দিন সালেহীন, রাকিব হাসান এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বোমা মিজান। ঘটনার সময় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলি ও বোমার আঘাতে আতিকুর রহমান (৩২) নামে পুলিশের এক কনস্টেবল নিহত ও দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। গুলিবিদ্ধ এসআই হাবিবুর রহমান (৫০) ও সোহেল রানাকে (৩০) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।  নিহত আতিকের বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পণ ঘাগড়া গ্রামে। এ ঘটনার পর পালানোর সময় টাঙ্গাইলের সখিপুর থেকে জাকারিয়া নামের এক জেএমবি’র সদস্যকে অস্ত্র ও ব্যবহৃত গাড়িসহ আটক করে পুলিশ। অপরদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত ৩ আসামিকে ছিনতাই করে নিয়ে যওয়ার ৭ ঘণ্টা পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাফেজ রাকিব হাসানকে টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার তক্তারচালা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় পলাতক আসামিদের ধরিয়ে দিতে পুলিশের পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। আসামিদের কাশিমপুর কারাগার থেকে ময়মনসিংহ কোর্টে নেয়া হচ্ছিল। আসামিদের মধ্যে সালাউদ্দিন সালেহীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৪০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। এর তিনটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সালাউদ্দিন সালেহীনের  বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায়। অপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাকিব হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৩০টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১টিতে মৃত্যুদণ্ড ও ১টিতে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়। তার বাড়ি জামালপুরে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি বোমা মিজানের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে। এর একটিতে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়। তার বাড়িও জামালপুরের মেলান্দহে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমীরাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহজাহান জানান, সকাল সোয়া দশটার দিকে আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে ত্রিশালের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। এ সময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় বিকট শব্দ শুনতে পাই। তখন তাকিয়ে দেখি একটি পুলিশের গাড়িকে সামনে ও পিছন দিয়ে ঘিরে ফেলেছে একটি সাদা ও একটি কালো মাইক্রোবাস। মাইক্রোবাস দু’টি থেকে ১০-১৫জন কালো মুখোশধারী লোক বোমা ফাটিয়ে ও পিস্তল দিয়ে গুলি করে। একপর্যায়ে ৩ আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আসামিদের নিয়ে গাড়ি দু’টি দ্রুত উত্তর দিক দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ তালুকদার জানান, কাশিমপুর কারাগার থেকে পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যান আসামি নিয়ে ময়মনসিংহ কোর্টে যাচ্ছিল। পথে ত্রিশাল উপজেলার সাইনবোর্ড এলাকায় মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার দিয়ে প্রিজন ভ্যানকে ব্যারিকেড দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ও বোমা হামলা চালিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ৩ আসামিকে ছিনতাই করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় তিন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থলে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে আতিক নামে এক পুলিশ কনস্টেবল মারা যায়। গুলিবিদ্ধ এসআই হাবিব ও সোহেল রানাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হতাহত পুলিশ সদস্যরা সবাই কাশিমপুর কারাগারের কনস্টেবল ও উপ-পরিদর্শক (এসআই)।  এদিকে ৩ পুলিশকে গুলি করে ৩ আসামি ছিনতাই হলেও অক্ষত রয়েছেন প্রিজনভ্যান চালক সবুজ মিয়া। সবুজ মিয়া জানান, আমার গাড়িটির সামনে একটি ট্রাক আটকে দেয়। ঠিক সে সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস সামনে এসে গুলি শুরু করলে আমি গাড়িতে নুয়ে যাই এবং তারা গুলি করে ও বোমা ফাটিয়ে আসামিদের নিয়ে যায়। চোখের পলকে তারা এ ঘটনা ঘটিয়ে চলে যায়। পুলিশের কোর্ট ইন্সপেক্টর শহীদ শুকরানা জানান, দণ্ডপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানায় ২০০৬ সালের ২৬শে মার্চ একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। এই মামলায় ময়মনসিংহ বিশেষ জজ আদালতে হাজিরা দিতে কাশিমপুর কারাগার থেকে ময়মনসিংহ কোর্টে নেয়া হচ্ছিল। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ ভ্যানের ভেতরে পড়ে আছে আহত পুলিশ সদস্যদের ভাঙা রাইফেল। ভ্যানের পিছনের সিঁড়িতে জমাট বাঁধা রক্ত। গাড়ির সামনের কাচে গুলির চিহ্ন।
যেভাবে ছিনতাই: ভ্যানচালক সবুজ জানান, সকালে কাশিমপুর কারাগার থেকে উল্লিখিত আসামিদের  নিয়ে সুবেদার হাবিবুর রহমান ও চালকসহ মোট ৪জন পুলিশ সদস্য ময়মনসিংহ আদালতের উদ্দেশ্যে প্রিজন ভ্যানে (নং-ঢাকা মেট্রো-উ-১১-১৬২৮) রওনা হন। পরে ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকায় পৌঁছালে সামনে ও  পিছন দিক থেকে ২টি মাইক্রোবাসে  করে ৭-৮ জন দুর্বৃত্ত এসে অতর্কিতে গুলি ও বোমা হামলা চালাতে থাকে। তারা প্রথমেই চালক ও তার পাশের সিটে বসা সুবেদারকে গুলি ও বোমা  নিক্ষেপ করে। এতে চালক লুটিয়ে সিটের পাশে পড়ে যান  এবং  সুবেদার গুরুতর আহত হন। একই সময় দুর্বৃত্তরা প্রিজন ভ্যানের পিছনের দরজার তালা ভেঙে গুলি ও বোমা হামলা চালায়। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তদের গুলি ও বোমার আঘাতে কনস্টেবল আতিকুল লুটিয়ে পড়েন। দুর্বৃত্তরা পুলিশের দু’টি রাইফেল ভেঙে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শী লেগুনা চালক তাইজুল ইসলাম জানান, গুলি ও  বোমার শব্দ শুনে বাড়ি থেকে বের হয়ে এক পুলিশ  সদস্যের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। ঘটনার পর পরই এলাকার বিপুল  সংখ্যক উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে জড়ো হন।  তাদের অনেকে বলেন, শব্দ শুনে তারা কিছু বোঝার আগেই খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে ডিআইজি নুরুজ্জামান, ময়মনসিংহের এসপি মঈনুল হক, ত্রিশাল থানার ওসি ফিরোজ তালুকদার সহ পুলিশ,  র‌্যাব,  ডিবি, সিআইডিসহ সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থলে  উপস্থিত হন।
যেভাবে গ্রেপ্তার রাকিব: পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেয়ার পর টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় গ্রেপ্তার হয়েছে জেমএমবির জঙ্গি রাকিব হাসান। দুপুর আড়াইটার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করে সখীপুর থানা পুলিশ। সখীপুরের তক্তারচালা গ্রাম থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পালিয়ে যাওয়ার সময়  গ্রেপ্তার করা হয়  তাকে। সদ্য শেভ করা মুখ ও হাতে-পায়ে ডাণ্ডাবেড়ির দাগ দেখে তাকে সন্দেহ করে পুলিশ। তক্তারচালা নামে ওই গ্রামটি সখীপুর ও মির্জাপুর থানার মাঝামাঝি জায়গায়। মির্জাপুর থানা পুলিশ জানায়, সকালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে জঙ্গি মামলার তিন আসামি ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই পুলিশ আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালায়। সখীপুর ও মির্জাপুরের মাঝামাঝি হওয়ায় তক্তারচালা গ্রামে পুলিশ চেকপোস্ট বসায়। ওই এলাকা দিয়ে যাওয়া সব গাড়িতে তল্লাশি চালাতে থাকে পুলিশ। বেলা ২টার দিকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে যাচ্ছিল রাকিব হাসান। তার সঙ্গে ছিল রাসেল নামে আরও এক যুবক। তল্লাশি চালানোর সময় এসআই শ্যামল দত্তের সন্দেহ হয় রাকিবকে দেখে। কারণ তার মুখ ছিল সদ্য শেভ করা। প্রিজনভ্যান থেকে পালানোর পরই দাড়ি কামিয়েছিল রাকিব। কিন্তু সময় কম থাকায় সম্ভবত দাড়ি কাটতে গিয়ে তার গাল কয়েক জায়গায় কেটে যায়। এ ছাড়া তার থুতনির নিচে অল্প কিছু দাড়ি ছিল। এই দাড়ি দেখে সন্দেহ হওয়ায় রাকিব হাসানকে আরও ভাল করে তল্লাশি করে পুলিশ। এ সময় রাকিব হাসানের হাতে ও পায়ে ডাণ্ডাবেড়ির দাগ দেখতে পান পুলিশ সদস্যরা। রাকিবের পায়ে নতুন স্যান্ডেলও ছিল। সেখান থেকে আটক করে সখীপুর থানায় নিয়ে যাওয়ার পরে রাকিব হাসান তার পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন। জানায়, তার নাম রাসেল। পুলিশকে সে বারবার বলতে থাকে সে রাকিব হাসান নয়। তবে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হয় সে-ই রাকিব। এর আগে জেএমবির তিন আসামি সালাউদ্দিন সালেহীন, বোমা মিজান ও রাকিব হাসানকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় সখীপুর প্রশিকা এলাকা থেকে তাদের সহযোগী জাকারিয়া (২৫)-কে গাড়িসহ আটক করে সখীপুর থানা পুলিশ। জাকারিয়া চাঁপাই নবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থানার জিনারপুর গ্রামের আজহারুল ইসলামের ছেলে।  প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল ১১টার দিকে কালো রঙের ভক্সি মাইক্রোবাসটি (ঢাকা মেট্রো-চ ১১-৬০৪৮) সাগরদীঘি-সখীপুর সড়কে ফিল্মি স্টাইলে ভাঙচুর করে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় সখীপুর থানার সামনে পৌঁছলে পুলিশ ও জনতা গাড়িটির গতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়। পরে পুলিশ ও জনতা গাড়িটির পিছু নেয়। অবস্থার বেগতিক দেখে ঢাকা-সখীপুর সড়কের প্রশিকা এলাকায় গাড়িটি রেখে আসামিরা পালিয়ে যায়। এ সময় স্থানীয় জনতা গাড়ির চালক জাকারিয়া (২৫)-কে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। পুলিশ এসময় গাড়ি থেকে দুই রাউন্ড গুলি, একটি পিস্তল, ৪টি মোবাইল ফোন সেট ও রড কাটারসহ বেশ কয়েকটি তাজা বোমা উদ্ধার করে।
দু’লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা
বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান ঘটনাস্থল ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকা পরিদর্শন করেন। পরে ডিআইজি হতাহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের জানান, আসামিদের গ্রেপ্তার করতে র‌্যাব-পুলিশসহ কয়েকটি টিম মাঠে তৎপর রয়েছে। ইতিমধ্যে এ ঘটনায় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুখকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেএমবির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে পাঠানো হয়েছে কিনা- এ বিষয়টি এবং গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলা পুলিশকে আগে থেকেই কেন অবহিত করা হয়নি- এ ব্যাপারটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি রয়েছে কিনা- এ বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ডিআইজি আরও জানান, নিহত পুলিশ সদস্যকে আইজিপির পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরও পাঁচ লাখ টাকা অনুদান দেয়া হবে। সে সঙ্গে পলাতক আসামিদের ধরিয়ে দিতে পুলিশের পক্ষ থেকে দু’লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
সারা দেশে সতর্কতা: ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ হত্যা করে তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় সারা দেশের কারাগারগুলোতে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহীর কেন্দ্রীয় কারাগারে দণ্ডপ্রাপ্ত শতাধিক জঙ্গি সদস্য থাকায় ওই কারাগারে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেন জানান, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে জেএমবির সাজাপ্রাপ্ত শতাধিক নেতাকর্মী রয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে  কারা অভ্যন্তরে ও আশপাশে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি সদস্যরা রয়েছে। ত্রিশালের এ ঘটনার পর বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। বিশেষ করে জঙ্গিদের সেলে অতিরিক্ত রক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে ৩ জেএমবি সদস্য ছিনতাইয়ের ঘটনায় গাজীপুরের জেলা পুলিশ রিজার্ভ ইন্সপেক্টর সাইদুল করিমকে ক্লোজ এবং সুবেদার আবদুুল কাদিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি: ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রকাশ্যে প্রিজন ভ্যানে গুলি চালিয়ে ও বোমা মেরে জেএমবির ৩ আসামি ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীকে প্রধান করে ৪ সদস্যের এ কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ঢাকা রেঞ্জর ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক, ডিআইজি (প্রিজন) টিপু সুলতান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে উপসচিব (জেল-১) সালমা বেগম। এদিকে ছিনিয়ে নেয়া জঙ্গিদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ প্রশাসন। ধরিয়ে দিতে পারলে মিলবে জনপ্রতি এক লাখ টাকা।
ছিনতাই হওয়া জঙ্গিরা যত মামলার আসামি
ইকবাল আহমদ সরকার, গাজীপুর থেকে জানান, ফিল্মি কায়দায় পুলিশ মেরে ছিনতাই করা জেএমবি’র তিন সদস্যের মধ্যে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে ছিলেন রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাসেল, কারাগারের পার্ট-১-এ সালাউদ্দিন ওরফে সালেহিন সজীব ওরফে তৌহিদ ও কারাগারের পার্ট-২-এ মিজান ওরফে বোমা মিজান ওরফে জাহিদুল হাসান সুমন। জেএমবি’র শূরা সদস্য সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন ওরফে তৌহিদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায়। তার পিতার নাম রফিকুল ইসলাম। তিনি ১৩টি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। এর মধ্যে ৩টিতে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তার। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে তার নামে থাকা ২৪টি মামলা। সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ওরফে তৌহিদকে ২০০৬ সালের ২৫শে এপ্রিল চট্টগ্রামের সিডিএ এলাকার একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেএমবি’র বোমা বিশেষজ্ঞ জাহিদ হোসেন সুমন ওরফে বোমা মিজান ৫টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত। এর মধ্যে ১টিতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। বর্তমানে তার ২১টি মামলা বিচারাধীন। তার বাড়ি জামালপুর সদরের শেখের ভিটা গ্রামে। বোমা মিজানকে ২০০৯ সালের মে মাসে রাজধানীর মিরপুর পীরেরবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেএমবি’র শূরা সদস্য হাফেজ রাকিব হাসান ওরফে মাহমুদ চারটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। এর মধ্যে ১টিতে মৃত্যুদণ্ড, ১টিতে ১৪ বছর ও ১টিতে ৭ বছর কারাদণ্ড হয়েছে। বর্তমানে তার নামে থাকা ২৯টি মামলা বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। রফিক হাসানের পিতার নাম আব্দুস সোবাহান। তার বাড়ি জামালপুর জেলার মেলান্দহ থানার বশিংবাড়ি গ্রামে। ২০০৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
বোমা মিজানের স্ত্রীরও ৩৭ বছর জেল
২০১২ সালের ৩রা জুন জেএমবির বোমা বিশেষজ্ঞ ও সুইসাইড স্কোয়াডের কমান্ডার জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান ও তার স্ত্রী হালিমা বেগমের ৩৭ বছর করে কারাদণ্ডের আদেশ দেয় আদালত। একটি অস্ত্র মামলায় ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আখতারুজ্জামান ওই দিন ১৯ (এ) ধারায় যাবজ্জীবন (৩০ বছর) ও ১৯ (এফ) ধারায় ৭ বছর কারাদণ্ডের  রায় ঘোষণা করেন। রায়ে অবৈধভাবে নিজেদের হেফাজতে অস্ত্র রাখার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় প্রত্যেকের যাবজ্জীবন এবং গুলি রাখার জন্য ৭ বছর করে কারদণ্ড দেয়া হয়।
এদিকে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ হত্যাচেষ্টা মামলায় আসামি ছিলেন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের  (জেএমবি) সদস্য রাকিব আল হাসান।

ফিল্মি কায়দায় ৩ জঙ্গি ছিনতাই by মতিউল আলম, খালিদ মাসুদ, ও সাইফুল ইসলাম সানি

ফিল্মি স্টাইলে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে সাজাপ্রাপ্ত ৩ জেএমবি সদস্যকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইয়ের সাত ঘণ্টার মাথায় টাঙ্গাইল থেকে জঙ্গি সদস্য রাকিবকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাকি দু’জনের খোঁজ মেলেনি।

চাচার পাঁ চালি- কৌশল by মাহবুব তালুকদার

চাচা বললেন, আমাদের জাতীয় সংসদ এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
কি সেই ইতিহাস? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

প্রথমত, এমন একটি সভ্য ভব্য বিনীত বিরোধী দল বিশ্বের আর কোন দেশের সংসদে পাওয়া যাবে না। এখানে বিরোধী দলের কাজ হলো সরকারের পক্ষে গুণকীর্তন করা। দ্বিতীয়ত, সরকার ইশারা দিলে সময়মতো কোনও কোনও বিষয়ে ‘না’ বলা। জাতীয় পার্টি এ দু’টি দায়িত্ব পালনে পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছে।
তবে যে এরশাদ সাহেব বলেছেন, সরকারে জাতীয় পার্টির কোন মন্ত্রী না থাকলেই ভাল হতো।
এ কথা তিনি কখনও সংসদে দাঁড়িয়ে বলবেন না। চাচা মৃদু হেসে বললেন,
মন্ত্রীরা এরশাদের মন্ত্রী নয়, রওশনের মন্ত্রী। এ জন্যই এরশাদের এত দুঃখ। তিনি এক রাশ দুঃখ নিয়ে কথাগুলো বলেছেন।
কিন্তু আপনি বিরোধী দলকে ‘সভ্য ভব্য বিনীত’ আখ্যা দিলেন কেন?
আসলে তারা জাতীয় সংসদে কখনও অনাকাঙিক্ষত পরিবেশ সৃষ্টি করবেন না। সৌজন্যে বিনয়ে ভদ্রতায় ও আনুগত্যে তারা সংসদে বিরোধী দলের এক নতুন ধারার উদাহরণ সৃষ্টি করবেন। এদের কাছ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংসদীয় রীতিনীতির অনেক কিছু শেখার আছে। চাচা জানালেন।
কি বলছেন আপনি?
ঠিকই বলছি। তুমি নিশ্চয়ই দেখেছো সমপ্রতি ভারতে সংসদ সদস্যরা হাতাহাতি, মারামারি, মরিচের গুঁড়ো প্রতিপক্ষের চোখে ছুড়ে দেয়া ইত্যাদি কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে। তুরস্কের সংসদেও হাতাহাতি হয়েছে। এরকম ঘটনা বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পার্লামেন্টেও ঘটেছে। আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশের বর্তমান সংসদে এমন কিছু ঘটবে না। বরং সরকারি দল বিরোধী দলকে যেভাবে উঠবস করতে বলবে, তারা সেভাবেই তা করবে। চাচা আরও বললেন, ‘বশংবদ’ বলে বাংলাভাষায় একটি শব্দ আছে। সংসদে বর্তমান বিরোধী দল সম্পর্কে সেটা খুব মানায়।
চাচা! কথাটা আপনি বিরোধী দলের সাংসদদের পক্ষে বললেন, না বিপক্ষে বললেন?
পক্ষেই বললাম। ‘বশংবদ’ হওয়া কি খারাপ? চরিত্রের মধ্যে বিনয়, আনুগত্য, ‘জ্বি হুজুর’ মার্কা স্বভাব, ইত্যাদি মহৎ গুণাবলী না থাকলে কখনও বশংবদ হওয়া যায় না। দল বেঁধে এমন বশংবদ হওয়ার নজির তুমি বিশ্বের আর কোন দেশের সংসদে পাবে না।
চাচার কথায় আমি মাঝে মধ্যেই বিভ্রান্তিতে পড়ি। তার অনেক কথার দ্বৈত অর্থ থাকে। অনেক সময় তিনি যা বলেন, কথাগুলো বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়, আবার অনেক সময় কারও বিরুদ্ধে কিছু বললে মনে হয়, তার প্রশংসা করছেন, যাকে ব্যাজস্তুতি বলা যায়। এটা চাচার এক ধরনের স্বভাব।
আমি প্রসঙ্গান্তরে যেতে চাইলাম। বললাম, চাচা, নির্বাচন সম্পর্কে কিছু বলুন।
কোন নির্বাচন? জাতীয়, নাকি উপজেলা?
জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়েছে। সে বিষয়ে আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি? উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। সে সম্পর্কে আপনার মতামত শুনতে চাই।
উপজেলা নির্বাচনে সরকার জিতেছে।
সরকার জিতেছে মানে? ৯৭টি উপজেলার মধ্যে ৫৫টি উপজেলায় বিএনপির জোট এবং ৩৪টি উপজেলায় আওয়ামী লীগের জোট জয়লাভ করেছে। আর আপনি বলছেন কিনা-
চাচা বাঁধা দিয়ে বললেন, আমি আওয়ামী লীগের কথা বলিনি। সরকারের কথা বলেছি। বিএনপি যে এবার উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলো, এটাই তো সরকারের জয়। এর অর্থ বিএনপির শত অপপ্রচার সত্ত্বেও বোঝা গেল, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে।
আমি জানালাম, উপজেলার প্রথম পর্বের নির্বাচন সম্পর্কে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ (মন্ত্রী নয়) বলেছেন, ‘গত সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল দেখলে বোঝা যায়, জনপ্রিয়তার একটা ধারাবাহিকতা আছে। গ্রামগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো তারা হোয়াইট ওয়াশ হননি’ (প্রথম আলো, ২১শে ফেব্রুয়ারি সংখ্যা)।
চাচা ব্যাজার মুখে বললেন, হোয়াইট ওয়াশ হবে কি করে?
কোন উপজেলায় নির্বাচনকালে যাতে সাদা রঙ না পাওয়া যায়, প্রশাসনকে গোপনে তেমন নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া, তোফায়েল সাহেব স্পষ্টতই বলেছেন, গ্রামেগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে।
কিন্তু গ্রামেগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীরও সমর্থন আছে। সেটাই তো এলার্মিং। তারা ১২টি উপজেলায় জয়ী হয়েছে।
চাচার মুখ কালো হলো। বললেন, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হলে এমন ঘটনা ঘটতো না। সন্ত্রাসী দল হিসেবে নিশ্চয়ই ওরা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ভোটারদের ভোট দিতে বাধ্য করেছে। এব্যাপারে ইলেকশন কমিশন কিছু করতে পারতো।
ইসি এতে কি করবে?
ইসি এদের মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারতো।
এটা কি কোন কথা হলো! ইসি কি কারণে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করবে? কোন ক্ষমতাবলে?
ইসি’র হাতে কি ক্ষমতা কম? ইসি যদি মনোনয়ন প্রত্যাহারকারীদের প্রার্থিতা বাতিল না করে জাতীয় নির্বাচনে জিতিয়ে আনতে পারে, তাহলে সামান্য উপজেলা নির্বাচনে কারও প্রার্থিতা বাতিল করার কোন কৌশল করতে পারতো না? ইসি না পারে কি?
চাচার কথায় ইসি’র করণীয় বিষয়ে আমি কোন কথা ভাবছি না। ভাবছি একটি সন্ত্রাসী দল হওয়ার পর হাজার হাজার নেতা-কর্মী জেনে যাওয়ার পর এবং বাকিরা পলাতক থাকার পরও জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা উপজেলা নির্বাচনে পার হলেন কিভাবে? যদি ওদের জনসমর্থন না থাকে, তাহলে ওদের ভোট দিলো কারা?
আমাকে চুপ থাকতে দেখে চাচা বললেন, কোন চিন্তা করো না। উপজেলা নির্বাচনের আগামী পর্বে জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
কি ব্যবস্থা হবে?
এই মুহূর্তে তা বিস্তারিত বলতে পারছি না। তবে আমরা জাতীয় নির্বাচনকে হ্যান্ডেল করতে সেভাবে ব্যবস্থা নিয়েছিলাম, উপজেলা নির্বাচনে তেমন সচেতন ছিলাম না। জামায়াতে ইসলামীর যারা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী অভিযোগ আছে কিনা দেখলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো।
চাচা, আরেকটা বিষয় ভাববার আছে।
কি সেটা?
উপজেলা নির্বাচনের এই পর্বে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি কিন্তু একটা আসনও পায়নি।
তবে যে শুনেছিলাম তারা একটা আসন পেয়েছে।
যে একটি আসন পেয়েছে তা নাকি জাতীয় পার্টির এক বিদ্রোহী প্রার্থীর।
এটা কিন্তু ঠিক হলো না। আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টি জাতীয় নির্বাচনের কলাকৌশলগুলো মোটেই কাজে লাগালো না। তখনকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপজেলা নির্বাচনে সরকারি দল ও বিরোধী দল কিছু আসন নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে পারতো। তবে এখনও কিছু আশার আলো আছে।
আপনি আশার আলো দেখছেন কিভাবে?
দেখছি এ জন্য যে উপজেলা নির্বাচন তো একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। অন্যান্য উপজেলাতে আগামী পর্বে নির্বাচন হবে। তখন যাতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মুখরক্ষা হয়, এমন ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
সেটা কিভাবে সম্ভব?
কিছু পছন্দের প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়ে আনা কি এমন কঠিন?
বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে সেটা হতে পারতো। আমি বললাম।
চাচা ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি খুবই খারাপ কাজ করেছে। এটাকে গর্হিত বলবো না জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলবো, বুঝতে পারছি না।
চাচা, আপনি এমন কথা বলছেন কেন?
বলছি কি সাধে! খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনে এলেন না। তার কথা হলো, নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না। এখন তো নির্দলীয় সরকার নেই। হাসিনার সরকার বহাল আছে। তাহলে খালেদা জিয়া কোন মুখে নির্বাচনে গেলেন? আসলে তার মুখের কথারই কোন ঠিক নেই।
বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে জিতেছে এবং জিতে যাচ্ছে বলেই কি আপনি গোস্‌সা করে এসব কথা বলছেন?
না, না। তা নয়। তবে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগের কোন বিকল্প নেই। আগামী ২০৪১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ যাতে ক্ষমতায় থাকে, যে কোন ভাবেই হোক, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
সেটা কি গায়ের জোরে করা হবে?
গায়ের জোর বলছো কেন? আসল কথা হলো কৌশল। সবাই জানে সরকারি দলের কৌশলের কাছে বিএনপি কেমন ধরাশায়ী হয়ে পড়ছে। একটু থেমে চাচা মৃদু হাস্যে নিচু গলায় বললেন, তবে গায়ের জোরও একটা কৌশল বলা যেতে পারে। দেখলে, তো, সরকার এবার গায়ের জোরেই কেমন টিকে গেল!

চাচার পাঁ চালি- কৌশল by মাহবুব তালুকদার

চাচা বললেন, আমাদের জাতীয় সংসদ এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
কি সেই ইতিহাস? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

সাদ্দাম নামের বিপদ

সাদ্দাম হোসেন
ইরাকের সাবেক নেতা সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর নামের সঙ্গে মিল রয়েছে যাঁদের, তাঁরা আজও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিপদের মুখে পড়ছেন। ইরাকে সাদ্দাম নামের ছড়াছড়ি দেখে বিদেশিদের কেউ কেউ চমকে ওঠেন। কারণ, সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে ২০০৬ সালে। তাঁর প্রায় ২৫ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। তাদের অধিকাংশই ছিল শিয়া সম্প্রদায়ের। এসব মৃত্যুর জন্য সাদ্দাম সরকারকেই দায়ী করা হয়। সাদ্দাম হোসেন উলাইবি (৩৫) একটি জেনারেটর চালান। বললেন, তাঁর দাদা ১৯৭৮ সালে সাদ্দাম নামটি রেখেছিলেন। বিশ্বব্যাপী পরিচিত সাদ্দাম তখনো প্রেসিডেন্ট হননি, তবে ধীরে ধীরে তাঁর উত্থান হচ্ছিল। বর্তমান সাদ্দামের কাছ থেকে সেই ছোটবেলা থেকেই সবার প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি, মূলত তাঁর নামের কারণেই। বিদ্যালয়ে বড় সাফল্য না পেলে তাঁকে শাস্তি দিতেন শিক্ষকেরা।
পরে তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। আশা ছিল, সেনা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অন্তত সদয় আচরণ পাওয়া যাবে। কিন্তু হলো বিপরীত। ২০০৩ সালে সাদ্দামকে উৎখাতের পর জেনারেটর চালক সাদ্দাম আশা করলেন, এবার অন্তত নামের বোঝা বহনের যন্ত্রণা থেকে তিনি রেহাই পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক জটিল। রাজনৈতিক দলগুলোর লোকজন তাঁর বাবাকে ডেকে ছেলের নাম পাল্টানোর পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তিনি শুনলেন না। রাস্তাঘাটে লোকজন এখনো অপমান করে সাদ্দামকে। তাঁর অনুরোধে কান দেন না সরকারি কর্মকর্তারা। সুন্নি সম্প্রদায়-অধ্যুষিত উত্তর ও পশ্চিম থেকে শুরু করে শিয়া-অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলেও সাদ্দামদের দেখা মেলে। নামের কারণে দুর্দশা তাঁদেরও কম নয়। রামাদি শহরে কর্মরত সাদ্দাম নামের এক সাংবাদিক বললেন, সন্তানের নামের কারণে তাঁর বাবাকে সরকারি চাকরি হারাতে হয়েছে। এ রকম গল্প আরও আছে। রাজধানী বাগদাদে কুর্দি-অধ্যুষিত এলাকায় একটি বিদ্যালয়ের ছাত্র সাদ্দামকে তার সহপাঠীরা বেজায় অপছন্দ করে। বিবিসি।

ইয়ানুকোভিচ অপসারিত

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইউনুকোভিচ বিদায় নিয়েছেন। তাঁর স্থলে আপাতত দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার ওলেকসান্দার তারচিনভ। গতকাল রোববার পার্লামেন্টে জরুরি অধিবেশনে তিনি আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে পার্লামেন্ট সদস্যদের (এমপি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত শনিবার প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে ভোট দেন পার্লামেন্ট সদস্যরা। একই সঙ্গে তাঁদের ভোটে মুক্তি পেয়েছেন কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেঙ্কো। গতকাল পার্লামেন্টের অধিবেশনে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ও স্পিকার বলেন, ‘নতুন সরকার গঠনই এখন প্রথম ও প্রধান কাজ।’ বিরোধী দলের নেতা ভিতালি ক্লিৎচকো গতকাল পার্লামেন্টে বলেন, সরকার গঠনের জন্য আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ২৫ মে তারিখ নির্ধারণ করা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইউক্রেনকে ইউরোপের আধুনিক একটি দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’ ইয়ানুকোভিচ পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তকে তাঁর বিরুদ্ধে ‘অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ইয়ানুকোভিচ বলেন, তিনি পদত্যাগ করেননি, দেশও ছাড়েননি। তাই তিনিই দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট। পার্লামেন্ট তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে ‘অবৈধ’ কাজ করেছে। তিনি একে তিরিশের দশকে নাৎসি বাহিনীর জার্মানির ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গেও তুলনা করেন।
গত শনিবার থেকে ইয়ানুকোভিচের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও বাসভবন গত শনিবার থেকে ফাঁকা। তবে সাক্ষাৎকার প্রচারকারী টেলিভিশন দাবি করেছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খারকিভ শহরে ইয়ানুকোভিচের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। ইয়ানুকোভিচের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত তাঁর দলের নেতা ওলেহ সারয়োভ বলেন, ‘আমাদের জীবিত ও বৈধ একজন প্রেসিডেন্ট আছেন। তবে এই মুহূর্তে তিনি কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত নই।’ ইয়ানুকোভিচ ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তকে ‘অবৈধ’ বললেও মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রস্তুত রয়েছে। ইউক্রেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তিমোশেঙ্কো শনিবার রাতে মুক্তি পেয়ে কিয়েভের ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেন। হুইলচেয়ারে বসেই সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তৃতা করেন তিনি। তিমোশেঙ্কো বিক্ষোভকারীদের ‘নায়ক’ বলে অভিহিত করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিমোশেঙ্কো বলেন, ‘আপনাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই স্কয়ার ছেড়ে যাবেন না...সেই অধিকার কারও নেই। ইয়ানুকোভিচের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমরা এই ক্যানসার অপসারণ করতে পেরেছি।’ ২০১১ সাল থেকে কারাভোগ করছিলেন তিমোশেঙ্কো। ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল তাঁর। তাঁর দলের অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়। গত বছরের নভেম্বরে শুরু হওয়া ইয়ানুকোভিচবিরোধী আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল ইনডিপেনডেন্স স্কয়ার। বিবিসি ও রয়টার্স।

‘সাউন্ড অব মিউজিক’ খ্যাত ট্রাপ পরিবারের শেষ সদস্যের মৃত্যু

অস্ট্রিয়ার আলোচিত সংগীত পরিবারের সর্বশেষ সদস্য মারিয়া ফ্রানজিসকা ফন ট্রাপ মারা গেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গিয়েছিল পরিবারটি। ট্রাপ পরিবারের কাহিনি নিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত হলিউড চলচ্চিত্র দ্য সাউন্ড অব মিউজিক। যা ব্যাপক সাড়া ফেলে। ফন ট্রাপের (৯৯) মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর সৎভাই জোহানেস ফন ট্রাপ। তিনি গত শনিবার সিএনএনকে জানান, ফন ট্রাপ গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য ভারমন্টে নিজ বাড়িতে মারা যান। ট্রাপ ফ্যামিলি সিঙ্গারস গ্রুপের আসল সদস্যদের একজন ছিলেন ফন ট্রাপ। ক্যাপ্টেন জর্জ ফন ট্রাপ ও তাঁর প্রথম স্ত্রী আগাথি হোয়াইটহেডের অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত সাত সন্তানের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন তিনি। ক্যাপ্টেনের দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়া কুটসচেরা ফন ট্রাপ তাঁদের পরিবার নিয়ে একটি বই লেখেন।
ওই বইয়ের ওপর ভিত্তি করে দুটি জার্মান চলচ্চিত্র, একটি ব্রডওয়ে প্রোডাকশন এবং আলোচিত হলিউড চলচ্চিত্র দ্য সাউন্ড অব মিউজিক নির্মিত হয়। ফন ট্রাপের পরিবার নাৎসিদের দখল করা অস্ট্রিয়া থেকে ১৯৩৮ সালে পালিয়ে যায়। পরের বছর তারা যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়। ১৯৪২ সালে পরিবারটি ভারমন্টে বসতি গড়ে। সেখানে তারা ট্রাপ ফ্যামিলি লজ নামে একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র খোলে। পরিবারটি ১৯৫৬ সালে সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রে কনসার্ট করে। ফন ট্রাপ চিরকুমারী ছিলেন। তিনি পাপুয়া, নিউ গায়নাতে ধর্ম প্রচারে কাজ করেন। আর তাঁর সৎভাই জোহানেস বর্তমানে ট্রাপ ফ্যামিলি লজের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। এএফপি।

নির্বাচন বর্জন বিএনপির রাজনৈতিক ভুল

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন
এবার উৎসবমুখর নির্বাচন
বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া উৎসবমুখর পরিবেশে ৯৭টি উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ের ভোট গ্রহণ হয়েছে। বিরোধী দলবিহীন ‘একতরফা’ সংসদ নির্বাচনের ৪৪ দিনের মাথায় অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে মানুষের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও বিএনপি ও জামায়াতসহ ১৯-দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এ বিষয়ে পাঠক দেবপ্রিয় দেব লিখেছেন: বিএনপি-জামায়াত নিশ্চয় উপলব্ধি করেছে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা ছিল বড় রাজনৈতিক ভুল ও আওয়ামী লীগের কাছে কৌশলগত পরাজয়। মো. তুহিন: বিএনপির এখন তো ছালা আছে, জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলে আম-ছালা দুটোই যেত। উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল দেখে তা-ই মনে হয়। শফিক: বিএনপির জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা ছিল বড় রাজনৈতিক ভুল। আব্দুল মজিদ কাজী: অনিয়মের অভিযোগ যাঁরা করেন, তাঁরাই তো মূলত অনিয়মকারী। নির্বাচন কমিশন কি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে অনিয়ম করেছে? আমাদের প্রার্থী বা তাঁর সমর্থকেরা যে যেখানে শক্তিশালী, সেখানেই তাঁরা অনিয়ম করেন, আবার এই প্রার্থীরাই অভিযোগ করেন। সবাই নিজেকে শুধরে নিলে দেশে যেমন শান্তি আসত, তেমনি অনিয়মের বালাই থাকত না। মনিরুজ্জামান: রুহুল কবির রিজভী কী বলেন তা শোনার অপেক্ষায়...। আবারও প্রমাণিত হলো একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। মো. শাহ আলম: এই উৎসবমুখর নির্বাচন এটাই প্রমাণ করে যে বাংলার জনগণ তাঁদের প্রতিনিধি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করতে চান।
রিজার্ভ ভেঙে ‘মুরগির খাবার’!
নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু হবে, সেটা সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী পরিষ্কার বললেন, নিজেদের সম্পদেই পদ্মা সেতু হবে এবং এ প্রকল্পে অর্থের জোগান দিতে কোনো সমস্যাই হবে না। এর সমালোচনা করে পাঠক শেখর রনি লিখেছেন: হ্যাঁ, রিজার্ভে যত সম্ভব হাত দেওয়া ঠিক হবে না, সেটা তো পরিষ্কার। কিন্তু লেখক, সমাধান কী? সমস্যার কথা লেখা সহজ, এমন তো না ধারদেনার চেষ্টা করা হয়নি। আবুলের ঘটনা তো জানা, কিন্তু এখন সমাধান কী? সেতু করতে হবে কিন্তু সে জন্য বিশাল সুদের বোঝা জনগণ বহন করবে কেন? মোহাম্মদ খান: কথার কচকচানি বেশি দরকার, না পদ্মা সেতু হওয়াটা বেশি দরকার? যারা বেশি বকবক করে, তারা কাজের কাজ কিছুই করতে পারে না। কথায় বলে শূন্য কলস বাজে বেশি। পদ্মা সেতু শুধু অর্থনৈতিক কারণেই দরকার নয়, নাক উঁচুদের দেখিয়ে দেওয়া দরকার বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। আর এসব বড় কাজ নিজেরাই করতে পারে। যত দিন যাবে, পদ্মা সেতু বানানোর খরচ ততই বাড়বে। আজকের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে রিজার্ভ এখন ১৯ বিলিয়ন ডলার পার হয়েছে। পদ্মা সেতু হোক যারা চায় না, তারাই বেশি কথার মারপ্যাঁচ করছে। গোলাম রব্বানি নয়ন: পদ্মা সেতু আমাদের অনেক দরকার। এই সেতুর জন্য যা যা করা দরকার তা-ই করতে হবে। মো. এস রহমান: ফান্ড যেখান থেকেই আসুক না কেন, আমরা চাই পদ্মা সেতু। এ সেতু জাতীয় উন্নয়ন ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে প্রভূত পরিবর্তন আনবে। আজ যে বাংলাদেশ, এর চেয়েও অনেক বেশি ওপরে থাকবে আমাদের দেশের অবস্থান। বিশ্ববিবেক মূল্যায়ন করছে যে, ১৯২১ সালে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ১৯৪১ সালে হয়ে যাবে উন্নত দেশের তালিকায়। যদি পদ্মা সেতু তৈরি করা যায়, তবে এ বিষয়ে কোনোই সন্দেহ থাকবে না।
রাজধানীর গণপরিবহন, রাজনীতিকেরাই নিয়ন্ত্রক
প্রভাবশালী মন্ত্রী, সাংসদসহ ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিকেরা রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে তুষার মণ্ডলের মন্তব্য: ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিকেরা রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছেন, এটা কি চাট্টিখানি কথা। কোনো একদিন শুনেছিলাম আমেরিকার কোনো এক প্রেসিডেন্ট নাকি জুতা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আর আমাদের দেশের রাজনীতিকেরা ড্রাইভারি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন, ভালো তো। নুরুর রহমান: প্রভাবশালী মন্ত্রী, সাংসদসহ ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিকেরা রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ অবস্থায় একে আর গণপরিবহন না বলে দলীয় পরিবহন বলাই সংগত নয় কী? খন্দকার দিদারুল ইসলাম: শেখ হাসিনা যতই পরিচ্ছন্ন সরকার করার চেষ্টা করুন না কেন, কিছু সাংসদকে বাদ দেওয়া ও তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে জনগণের সরকার কখনোই গঠন করতে পারবেন না। মো. লুৎফুল কবির: বাসের এ সংকটে সব বাসের সিটিং সার্ভিস বাতিল করা উচিত। এ ছাড়া সব বাসে টিকিট চালু করা উচিত।
‘বাংলাদেশ’ নামেরও বিরোধিতা করেছিল জামায়াত
জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে কেবল বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের বিরোধিতাই করেনি, ১৯৬৯ সালে বাঙালি রাজনীতিকেরা যখন ‘বাংলাদেশ’ নামকরণের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন, তখন জামায়াত এর বিরোধিতা করেছিল। বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে পাঠক এম এইচ রহমতুল্লাহ বাবু লিখেছেন: ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর মাজার প্রাঙ্গণে আয়োজিত সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, আজ থেকে আমাদের এই ভূখণ্ডের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। তখন থেকেই বাংলাদেশ নামটি জনপ্রিয় হয়ে যায়। এর আগে কখনো কখনো লোকেরা বলতেন, ইস্ট পাকিস্তান সেপারেট হয়ে যাবে, কিন্তু কখনোই কারও মুখে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি অন্তত আমি শুনিনি। অবশ্য ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি বাংলা ভাষার বইপত্রে কখনো কখনো লেখা হয়েছে। আসিফ শিকদার লিখেছেন: বাংলাদেশই বোধ হয় পৃথিবীর একমাত্র দেশ যে দেশে দেশদ্রোহী হয়েও বহাল তবিয়তে থাকা যায়। আকিব হোসেন: জামায়াত সব সময় বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাংলা—এই শব্দগুলোর শত্রু।
সুন্দরবন থেকে বঙ্গোপসাগর
অন্য বহু দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অনেকগুলো বিশেষ শক্তির দিক আছে। উর্বর তিন ফসলি জমি, ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ বিশাল পানিসম্পদ, নদী-নালা, খাল-বিল, ঘন জনবসতি—সবই আমাদের সম্পদ, যা অনেকের নেই। এর বাইরেও আছে সুন্দরবনের মতো অসংখ্য প্রাণের সমষ্টি এক মহাপ্রাণ। আমাদের আরও আছে বঙ্গোপসাগর। এ ব্যাপারে পাঠক আশরাফের মন্তব্য: দেশটা আমাদের, আমাদেরই দেখভাল করতে হবে। যেসব বুদ্ধিমান মানুষ অসুস্থ মন-মানসিকতা নিয়ে বলেন দেশ গোল্লায় গেছে, মানুষ বা তরুণদের দিয়ে কিছু হবে না, তাঁরা কখনোই কোনো তরুণকে ডেকে দেশপ্রেমের কথা বলেন না। সরাসরি না হলেও তাঁরা পরোক্ষভাবে দেশের উপকার করতে পারেন। কেন সুশীল সমাজ বা বুদ্ধিজীবীরা এক হয়ে দেশবিরোধী এসব চুক্তির বিরোধিতা করেন না? আন্না হাজারে, হুগো চাভেজ কেন আমরা দেখতে পাই না আমাদের সোনার বাংলায়? সবাই কি তাহলে নিজেদের দেশাত্মবোধ, বিবেক কোনো না কোনো দলের কাছে বেচে দিয়েছেন? এ দেশে কোনো সরকার যা পারে না, সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীরা তা পারেন। তাঁরা যুবসমাজের শুধু সমালোচনা না করে তাঁদের আলোর পথে ফিরিয়ে এনে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। তবেই দেশের সর্বময় উন্নতি সম্ভব এবং দেশ পৌঁছে যাবে উন্নতির চরম শিখরে। এ-জাতীয় লেখা নিয়মিত চাই। আব্দুল্লাহ আল মামুন: আমাদের দেশের সম্পদ আছে কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবহার নেই। সুমন: আসলে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সাধারণ জনগণকে একত্র হয়ে সরকারকে চাপ দিতে হবে।

প্রথম ধাপ: একটি সমীক্ষা

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ৯৭টির মধ্যে ৯৬টির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনটি উপজেলায় বিএনপিসহ আওয়ামী লীগের তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিভিন্ন কারণে ভোট গ্রহণের দুই ঘণ্টার মধ্যে কারচুপির অজুহাতে নির্বাচন বর্জন করা এবং কয়েকটি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ ছাড়া প্রথম ধাপের নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। আলোচিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা তথ্য বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম ধাপের নির্বাচন ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় উপজেলা নির্বাচনে একই উপজেলার নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে কয়েকটি বিষয় ধর্তব্যের মধ্যে পড়বে। প্রথমত, নানা ধরনের প্রতিকূলতা এবং পরবর্তী সময়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপি এবং এর প্রধান সহযোগী দলের চমকপ্রদ উত্থান। দ্বিতীয়ত, মামলাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, নেতাদের ব্যাপক গ্রেপ্তার, যুদ্ধাপরাধের দায়ে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া এবং ব্যাপক নেতিবাচক প্রচার সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর আশ্চর্যজনক প্রাপ্তি। তৃতীয়ত, এযাবৎ বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টির তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম। চতুর্থত, মহাজোটের অন্যান্য শরিক দলে জামানত হারানোর মতো পরিস্থিতি এবং আশাতীত ভোটার সমাগম না হওয়া।
প্রথম ধাপের ভোট এবং ফলাফলের পর এসব বিষয়ে কিছু বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হলে ঘোষিত ৪৪৬টি উপজেলার ভোট গ্রহণের পর ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তথাপি প্রথম ধাপের নির্বাচনে যে গতিধারা দৃশ্যমান হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকাটাই স্বাভাবিক। অন্যথায় নতুনভাবে বিশ্লেষণ হবে ব্যতিক্রম গতিধারা নিয়ে। বিএনপি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে তিন দশকের মধ্যে এমন সাংগঠনিক সংকটে পড়েনি। সাংগঠনিক সংকটই নয়, নেতাদের ব্যাপক ধরপাকড় ও মামলা ইত্যাদির কারণে কেন্দ্রে এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে। উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন এবং রয়েছেন। তদুপরি ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায়, সূত্রমতে, তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা রয়েছে বলে প্রচারিত। এমতাবস্থায় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ওই দলের উল্লেখযোগ্য হারে শীর্ষে এগিয়ে থাকার বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মূলে রয়েছে সরকারি দলের অব্যাহত জনসমর্থন হ্রাস। যদিও বিভিন্ন জরিপে এ ধরনের তথ্য ইতিপূর্বে প্রকাশিত হলেও ধারাবাহিকভাবে সরকারে অধিষ্ঠিত দল বা জোট এসব ফলাফল ধর্তব্যের মধ্য না নিয়ে একধরনের আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত ছিল। মূল কারণ খতিয়ে না দেখে তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান জনমনে আস্থা ফেরাতে পারেনি। সরকারি দল বা জোট দেয়াললিখন পড়লেও তা বিশ্বাস না করার প্রবণতায় রত ছিল।
বিএনপির এগিয়ে থাকার আরেকটি কারণ, সিংহভাগ সময় অনবরত সরকারি দল এবং দলের সমর্থকদের তৎকালীন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কারণে-অকারণে নানা ধরনের অপ্রিয় বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অনেক ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপনে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। প্রথম ধাপের নির্বাচনে ভোটের যে প্রতিফলন ঘটেছে, তার বেশির ভাগ সরকারি জোটের নেতিবাচক ভোটের সংখ্যাই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বাক্সে জমা পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ৫ জানুয়ারির ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া এবং পরে সামগ্রিক নির্বাচন চিত্র, যেখানে প্রায় সাত কোটি ভোটার ভোট দিতে পারেননি, তার মর্মব্যথা। এ বিষয়টি হালকাভাবে দেখার উপায় নেই। ভোটারদের মনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারার যে হতাশা ছিল, তাও প্রতীয়মান হয়েছে প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে। বিভিন্ন জরিপে তথ্য ছিল যে, এ দেশের সিংহভাগ ভোটার একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে ছিল। প্রথম ধাপের নির্বাচনে চারটি দলের সমর্থকদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, যদিও উভয় দল ঘোষিত তথাকথিত কিছু কিছু বিদ্রোহী প্রার্থীরও উপস্থিতি ছিল। চারটি দলের মধ্যে জাতীয় পার্টি না থাকার মতো, সরকারের শরিক আর কোনো দলের অস্তিত্বই ছিল না। অথচ বেশ কিছু দলের মন্ত্রীরা রয়েছেন এবং ছিলেন অতীত ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায়। বড় দলের ছত্রচ্ছায়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এসব দল মোটেও বিকশিত হতে পারেনি। লক্ষণীয় যে, এসব দলের বিচরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহু দশকের। প
রাক্-নির্বাচনী জোটবদ্ধ হওয়া এবং নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণে এসব দল তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হতে পারেনি বলে বিশ্বাস। বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য এমতাবস্থা কোনোভাবেই সহায়ক নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো নীতিগতভাবে নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ার কথা, তবে রাজনীতিবিবর্জিত নয়। হালে নির্বাচনগুলোকে অধিক রাজনৈতিকীকরণ করার ফলে দলের প্রত্যক্ষ মনোনয়ন প্রদান, মনোনয়নের বাইরের প্রার্থীদের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আখ্যায়িত করার কারণে এসব নির্বাচন কার্যত দলীয় রূপ ধারণ করেছে। বিগত কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে এ ধরনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব নির্বাচন উন্মুক্ত এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীকে ঘিরেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ভোটারদের ধর্তব্যের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীর পরিচয় এবং স্থানীয় চাওয়া-পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে থাকেন। উপজেলা নির্বাচনের এই পর্যায়ে এমনটি থাকেনি। ভবিষ্যতেও এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ধরনের অলিখিত ব্যবস্থার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নেতিবাচক দিকই প্রতীয়মান হয়েছে। উপরিউক্ত বাস্তবতার আঙ্গিকে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে দলের প্রভাবের কারণে একদিকে যেমন স্থানীয়ভাবে বহু জনপ্রিয় দলীয় ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্তরের পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ার কারণে প্রার্থী হতে পারেননি, তেমনি দলের নির্দেশনাও অনেকেই ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি। এ কারণেই স্থানীয় প্রভাবের চেয়ে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবে নির্বাচন আচ্ছন্ন ছিল। তদুপরি ছিল ক্ষমতাসীনদের স্থানীয় পর্যায়ের নিজস্ব বলয় তৈরি করার অতি উৎসাহ। এসব কারণে বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।
বাকি নির্বাচনগুলোতে হয়তো একই ধারা বজায় থাকবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রথম ধাপের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও জামায়াতে ইসলামীর কল্পনাতীত সাফল্য। জামায়াত ১৩টি চেয়ারম্যান, ২৪টি পুরুষ এবং ১০টি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদে বিজয়ী হতে সক্ষম হয়েছে। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদগুলো যে শুধু জামায়াত প্রভাবিত অঞ্চলেই হয়েছে, তেমনটি নয়। এ সত্য ভাইস চেয়ারম্যান পদের বিশ্লেষণ করলেই দৃশ্যমান হবে। বিএনপি প্রভাবিত কয়েকটি উপজেলায় জামায়াতের প্রার্থী বিএনপির প্রার্থীদের পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন। প্রসঙ্গত, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে পাওয়া যায়, ২০০৯ সালে বর্তমানের প্রথম ধাপের নির্বাচনের উপজেলাগুলোতে জামায়াত মাত্র ছয়টিতে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছিল। এবার তার দ্বিগুণ স্থানে জয়ী হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ, জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো বিতর্ক ছিল না। ছিল না কোনো ধরনের সাধারণ অথবা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। অনেকে মনে করেন, জামায়াতের প্রার্থীরা গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ভোটারদের সহানুভূতিও পেয়েছেন। অবশ্যই ধর্মীয় অনুভূতিও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে বলে বিশ্বাস। যা হোক, জামায়াতের পুনরুজ্জীবিত হওয়ার বিষয়টি আরও গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তবে এ ধারা ভবিষ্যতে বজায় থাকে কি না, তা হবে লক্ষণীয় বিষয়। এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বর্তমানে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি।
তৃতীয় বৃহৎ দল বলে পরিচিত পার্টিটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর্যায়ে। বিগত ২০০৯ সালের নির্বাচনেও এমনটি হয়নি। এই দলের ওপর অবশ্যই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের জের যে পড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে জাতীয় পার্টির দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অবস্থান পরিষ্কার নয়। সরকারেও যোগ দিয়েছে, আবার বিরোধী দল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রয়াস জনমনে আস্থার অভাব ঘটিয়েছে। তদুপরি জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। এরশাদ জাতীয় পার্টির মূল চালিকাশক্তি থেকে বিচ্যুৎ অবস্থায় রয়েছেন। অপরদিকে রওশন এরশাদের নেতৃত্ব নিয়ে পার্টির অভ্যন্তরে রয়েছে দ্ব্যর্থকতা। জাতীয় পার্টি থেকে বহুদিনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বর্ষীয়ান নেতা এবং জাতীয় পার্টির শাসনকালের প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর সদলবলে এরশাদকে পরিত্যাগ করায় জাতীয় পার্টির যে ক্ষতি হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাবও যোগ হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের সমর্থনে। সংক্ষেপে বলা যায় যে এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টির সমর্থন এবং জাতীয় পর্যায়ে পার্টির অবস্থান আগের অবস্থানে নেই। ভবিষ্যতে জাতীয় পার্টির অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়তে পারে। যেমনটা আগেই বলেছি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নীতিগতভাবে নির্দলীয় হওয়ার কথা থাকলেও সে আবরণ আর থাকছে না। কারণ, সব দলের এই আবরণ অপসারণের কারণে। যেহেতু জাতীয় পর্যায়ে আমাদের দেশের রাজনীতি অতিরিক্ত মাত্রায় সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে,
মূলত সে কারণে স্থানীয় নির্বাচনকে বিভিন্ন দল জাতীয় পর্যায়ে দলের অবস্থানের মাপকাঠি হিসেবে দেখার প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। এমতাবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ের নীতি এবং অবস্থানের প্রতিফলন ঘটছে। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সংগঠন। কোন্দল মাথাচাড়া দিচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে। স্থানীয় সমস্যাগুলো ধামাচাপা পড়ছে। এমতাবস্থায় দল এবং প্রার্থীর অবস্থান নিয়েও ভোটাদের বিভ্রান্তির মধ্য পড়তে হচ্ছে। ধারণা করা হয়েছিল যে ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদে সিংহভাগ ভোটার ভোট প্রয়োগে বঞ্চিত হওয়ার কারণে ভোটের হার বেশি হবে, তেমনটি হয়নি। ইডব্লিউজি-১-এর মতে, মাত্র ৫৯ শতাংশ ভোট প্রদান করা হয়েছে, যা তৃতীয় উপজেলা নির্বাচন থেকেও অনেক কম। নিম্নগামী ভোটের হারের দুটি প্রধান কারণ হতে পারে; প্রথমত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জের এখনো কাটেনি, যার পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে বিরূপ ভাব বিদ্যমান ছিল। হয়তো ভবিষ্যতে এই হারের বৃদ্ধি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিগত সময়ে বিভিন্ন কারণে উপজেলা পরিষদ জনগণের কাছে তেমন আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেনি। অনুমেয় যে, এই দুই প্রধান কারণেই ভোটের হার আশাতীত হয়নি। পরিশেষে উপরিউক্ত পর্যালোচনা আংশিক নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে হলেও ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ উপজেলা নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পরে আরও অর্থবহ হবে। অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনের। দৃশ্যপটের পরিবর্তন হতে পারে।



এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বিরোধীরা

সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে রাজধানী কিয়েভ ছেড়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ। শনিবার কিয়েভে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা সরে যাওয়ায় সেখানে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আন্দোলনকারীরা। রাজধানীর অন্যান্য স্থান থেকেও নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। জনগণের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে পুলিশ। ইয়ানুকোভিচের সহযোগীরা বলছেন, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী খার্কিভে গেছেন প্রেসিডেন্ট। শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। তাতে দেশটির রাশিয়াপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতা ছেড়ে আগাম নির্বাচন ও একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনে সম্মত হলেও রাজপথ ছাড়েনি আন্দোলনকারীরা।
চুক্তি অনুযায়ী ডিসেম্বরের শেষ দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হলেও ২৫ মে’র আগে নির্বাচন দাবি করছেন সরকারবিরোধীরা। গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে না গিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে বড় অংকের ঋণ নেন প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ। এরপর থেকে তার সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা গত দু’দিন ধরে ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। বৃহস্পতিবার রাজধানী কিয়েভের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত স্বাধীনতা চত্বরে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে পুলিশ, যাতে অনেক মানুষ হতাহত হন। মঙ্গলবার থেকে দেশটিতে বিক্ষোভ সহিংসতায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীসহ অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। হতাহতের এ ঘটনার পর শুক্রবার সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে ওই চুক্তি হয়। ইউক্রেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুক্তি পাচ্ছেন কারাগারে ৩০ মাস কাটানোর পর অবশেষে মুক্তি মিলছে ইউক্রেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেঙ্কোর। পার্লামেন্ট তিমোশেঙ্কো অপরাধী আইনের যে ধারায় অভিযুক্ত ছিলেন সেটিকে ভোটের মাধ্যমে সরিয়ে তাকে মুক্তি দেয়ার বন্দোবস্ত করেছে। বিভিন্ন দলের ৩১০ জন আইনপ্রণেতা এতে ভোট দেন। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। রাশিয়ার সঙ্গে একটি গ্যাস চুক্তির পর তার এই সাজা হয়।
প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ তার রাজনৈতিক বিরোধীদের সাজা প্রদানের জন্য নিন্দিত হয়েছেন। এদিকে, পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার ভোলোদামির রায়বাক। যদিও শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি তার পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও অনেকেই মনে করছেন বিষয়টি রাজনৈতিক। তার জায়গায় এসেছেন কারাবন্দি বিরোধীদলীয় নেতা ইউলিয়া তিমোশেঙ্কো। ইউক্রেনে ২৫ মে’র মধ্যে নির্বাচন দাবি : আগামী ২৫ মে’র মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন ইউক্রেনের বিরোধী নেতা ভিতালি ক্লিটসচো। তিনি শনিবার বলেছেন, প্রেসিডন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে ইউক্রেন পার্লামেন্টকে অবশ্যই খারিজ করতে হবে এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কোনোমতেই ২৫ মে অতিক্রম করা যাবে না। সরকারি স্থাপনা পুনর্দখলের হুমকি : ইউক্রেনের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করতে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও বিরোধী নেতারা যে চুক্তি করেছে তাতে সমর্থন জানায়নি বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ । তারা হুমকি দিয়ে বলেছে, কিয়েভে শনিবার সকালের মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ না করলে তারা সরকারি স্থাপনাগুলোও দখল করে নেবে। যদিও বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ চুক্তিটিতে সমর্থন জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক নেতারাও এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে জোর দিতে বলেছে।