Thursday, December 19, 2013
ইসি এখন ‘বিবেকহীন অনুপ্রবেশকারী’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
সবার আগে বাংলাদেশপন্থী হোন
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
bagharu@gmail.com
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
তারানকোর সফর : অতঃপর? by বেগম জাহান আরা

তারানকো বেশ কয়েকবার বলেছেন, বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন চায় জাতিসংঘ। সেটা তো বাংলাদেশের মানুষও চায়। কিন্তু সব রাজনৈতিক দল কি তা চায়? যদি তাই হতো, তাহলে সমঝোতার পথ খুলে যেত। প্রধানমন্ত্রী নিজেই একবার বলেছেন, তিনি শান্তি চান, প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না। হয়তো এমন সদিচ্ছাই তার ছিল। কিন্তু পারিষদ, দল হয়তো তাকে সেটা করতে দিচ্ছে না। প্রায় একদলীয় নির্বাচনের ফল কী হবে, সেটা সবাই জেনেও ভুল পথে হাঁটছেন। এর আগেও এমন চেষ্টা হয়েছে। লাভবান হয়নি কেউ। টেকেওনি তেমন নির্বাচনের ফল। শুধু শুধু অপচয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা। অপচয় হয়েছে পর্যাপ্ত মানুষের শ্রম। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। আর শেষ ফল হিসেবে জেদ আর ক্ষমতার লোভের পরাজয় মানতেই হয়েছে। আরও একটা বিষয় ভাবতে হবে। যে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না বলেই ধরে নিচ্ছেন সচেতন ও যুক্তিবাদী মানুষ, সেই নির্বাচনে অর্থ অপচয়ের প্রয়োজনই বা কী? মনোনয়ন দিয়েই কাজ চলতে পারে। আপসে-আপ জয়ী হচ্ছে প্রার্থীরা- তাহলে একদলীয় নির্বাচন, থুক্কু, মনোনয়নে অসুবিধা কোথায়? বান্ধবী আবার বলল, একদলে সবাই কি একমতের অনুসারী? তাহলে একটা আসনের জন্য একাধিক আবেদনপত্র জমা পড়ে কেন?
বলা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন তো হতেই হবে। খাঁটি কথা। বাংলাদেশে বহু রাজনৈতিক দল আছে। প্রতিটা দলই নেতাসর্বস্ব। বেশ বোঝা যায়, দলের মধ্যে গণতন্ত্র নেই। মত প্রকাশসহ কোনো বিষয়ে স্রোতের উল্টোদিকে কেউ কথা বলতে চায় না। যারাই বলতে গেছে, তাদেরই দল ছাড়তে হয়েছে। এই তো পাঁচ বছর আগেও দলের নীতিতে সংস্কার আনতে চেয়ে বড় দুই দলই ভাঙা ভাঙা অবস্থায় পৌঁছেছিল। অনেক কষ্টে সামলে নিলেও ফাটল কিন্তু সারেনি। ঝরেও পড়েছে কিছু। তারা আবার নতুন দলও গড়েছে। এটাও একরকম গণতান্ত্রিক অধিকার তো বটেই। কিন্তু এতে কারও কি বড় কোনো লাভ হয়েছে? আমার মতে, দলকে শক্তিশালী এবং কার্যক্রমে ন্যায়পর করতে দলীয় ঐক্য দৃঢ় করার জন্য ব্যক্তিগত লাভ ও লোভের রাশ টেনে ধরতে হয়। সংযমী হতে হয় মতামত আদান-প্রদানে। এসব কথা রাজনীতির মানুষরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক ভালো জানেন। কিন্তু মানতে পারেন না। দল করতে গিয়ে দাস হওয়াও ঠিক নয়, আবার টেক্কা দেয়ার মনোভাবও ঠিক নয়।
কথাগুলো এজন্য বললাম, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যখন বাতিল করা হয়, তখন আজকের অবস্থাটা কল্পনা করতে হতো। এযাবৎ যা দেখেছি, দুটি বড় দলের সংস্কৃতি হল, নির্বাচনের ফল মানতে না চাওয়া। তাই বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদে বসেনই না। ফলে গৃহীত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবদানও রাখতে পারেন না। ফলে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পাস হয়ে যায় প্রায় নিরাপদে, আপসে কোনো বাধা না পেয়ে। এটাকেও কি গণতান্ত্রিক চর্চা বলা যায়? নির্বাচনে জিতে সংসদ বর্জন করাকেও গণতান্ত্রিক চর্চা বলা যায় না। আর সংসদ বর্জন করেও সংসদ সদস্য হিসেবে ষোলো আনা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করাকেও বলা যায় না গণতান্ত্রিক চর্চা। অথচ বড় দুটি দলই এমনটা করেছে। গণতন্ত্র চর্চা মানে শুধু নির্বাচন নয়। শুধু সাংবিধানিক বিধি-রীতি নয়। এ কথাগুলো টিভি টকশোতে বলছেন আলোকিত মানুষরা। সেই সুবাদেই বলছি কথাগুলো।
রাজনৈতিক সংকটে যখন দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বারবার, তখনই কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের ঘোষণা এল। লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে তরুণ প্রজš§ ছুটে গেল শাহবাগ চত্বরে। গণজাগরণের তীর্থস্থান। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়টা তো চত্বর প্রজন্মেরই বিজয়। সেই রায় যখন কার্যকর হবে, তখন তারা আবেগাক্রান্ত হবেই। ফেসবুকে অজস্র লেখালেখি। অজস্র ছবি শাহবাগ চত্বরের। আলোক ঝলমল জনজোয়ারের সেই ছবিটা দেখলাম আবার ‘পোস্টে’। একটু পরই যেন দপ করে নিভে গেল সব আলো। আঁধারে ঢেকে গেল বাতিঘর। মানুষগুলোর মনের বাতিঘরের কথা বলছি। ঝুলে থাকল মোল্লার ফাঁসির ক্রিয়াকর্ম। ফাঁসি দেয়ার আদেশ স্থগিত ঘোষণা করা হল। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনার নাভি পিল্লাই। এতেই কি গণেশ উল্টে গেল? পরে জানা গেল, আপিল বিভাগের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করবে না সরকার। তাহলে সন্ধ্যাবেলা স্টান্ট খবর ঘোষণা করার কী প্রয়োজন ছিল? রায় কার্যকরে ‘ওঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’র মতো তড়িঘড়ি করার কারণ নিয়ে মানুষজন তো ভাববেই। ওদিকে জেগে আছে শাহবাগ। আমরা জানি, রায় কার্যকর হবেই। দু’দিন আগে বা পরে। আমার বিচারে যুদ্ধাপরাধীরা যে অন্যায়, অমানবিক ও নৃশংস কর্মকাণ্ড করেছে অসহায় নিরীহ মানুষদের ওপরে, তার ক্ষমা হয় না। হাজার বছর পরও এই কুকীর্তির কথা মনে রাখবে বাংলার মানুষ। ঘৃণায় কুঞ্চিত করবে মুখ। অনেক আগেই এদের শাস্তি হওয়া উচিত ছিল।
কাদের মোল্লার ফাঁসি স্থগিত হওয়ার ঘটনায় আমিও স্থগিত করেছিলাম লেখা। আহা কি আনন্দ! এই কলম দিয়েই লেখতে পারছি যে, যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে, ১২-১২-২০১৩ তারিখ রাত ১০টা ১ মিনিটে। এ দেশের মাটিতে অন্তত একজন রাজাকার-ঘাতক-নির্যাতক এবং প্রমাণিত জঘন্য মানুষ শাস্তি পেল অবশেষে। হোক না তা স্বাধীনতার ৪২ বছর পর। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে স্বাধীনতা ও মানবতার বিপক্ষের একজন শত্র“ তো শেষ হল। শুরু হল পাপ স্খলন প্রক্রিয়া। টিভি সংবাদেই দেখলাম শাহবাগের বাতিঘর। শত-সহস্র তরুণ প্রজšে§র হাতে বিজয়ের আলো। মুখে সাফল্যের হাসি। কণ্ঠে উজ্জীবনী সোগান। মন ভরে যায় ওদের তারুণ্য দেখলে। মৃত্যু ভুলে যাই ওদের হাতের আলো দেখলে। জীবনকে আলোকিত করতে পারে ওরাই। কিন্তু আরও কথা আছে। ফিরে আসি বাস্তবতায়। নির্বাচনের বিষয়গুলো এখনও স্বচ্ছ হল না। কে কী বলল, কে কী বোঝাল, সেটা বড় কথা নয়। দেশের জন্য, ষোলো কোটি মানুষের জন্য যা কল্যাণকর, তাই করতে হবে নেতাদের। এমন প্রতিশ্র“তি দিয়েই তারা নির্বাচনে জিতে আসেন। আশা ভঙ্গ হলে জনগণ তো কথা বলবেই। অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবও ক’দিন আগে বলেছেন, বিরোধী দল নির্বাচনে না এলে লোকজন ভোট দিতে আসবে না। এই যদি বাস্তবতা হয়, তাহলে কোন ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে নির্বাচন?
এলাকার বাচ্চারা প্রতিবারই কিছু না কিছুর আয়োজনে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করে। এবার মনমরা সবাই। কারও কারও পরীক্ষা শেষ হয়নি। ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র দেখে যারা পরীক্ষা দিয়েছে, তারা ভয়ে ভয়ে আছে। না জানি আবার কবে পরীক্ষার ঘোষণা শোনা যায়। মায়েরা উৎকণ্ঠিত। পত্র-পত্রিকায় অটোপ্রমোশনের প্রস্তাবও দেখলাম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও কাহিল। শুক্রবার সারাদিন ক্লাস করে কোনোরকমে সিলেবাসের পড়া শেষ করছে। পরীক্ষা দিয়ে পাসও করবে। শিখবে কতটুকু?
বারবার আমরা প্রজন্মের কথা বলি। উঠতি প্রজন্মরা বেড়ে উঠছে প্রতিদিন। কী দেখছে তারা? কী শিখেছে তারা? ওদের সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি করতেই হবে রাজনৈতিক নেতাদের। কবিই শুধু বলেননি, ‘আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে’; আমাদের মনেও প্রজন্মের জন্য সেই প্রার্থনা নিরন্তর। নির্বাচন তো আমরা চাই-ই। সমঝোতা করে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন হোক, সেটাই চাই। আর সেটা বাস্তবায়নের সম্পূর্ণ দায় রাজনৈতিক নেতাদের। বিশেষ করে বড় দলের। কিন্তু সেই দলের নেতারা যদি আন্দোলন দমনে সমঝোতার বদলে গুলি করার কথা বলেন, তখন ভাষা হারিয়ে ফেলি। তবুও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মানবিক ও রাজনৈতিক সমাধান আশা করি। এই আশা নিয়েই অসহায় আমজনতা বেঁচে আছে। আর কি-ই বা করতে পারি আমরা?
বেগম জাহান আরা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, গবেষক
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
রাজনৈতিক সংকটে বিপন্ন কৃষি ও শিল্প খাত by ড. আর এম দেবনাথ

পত্রিকার রিপোর্টে দেখলাম, একদিনের হরতাল বা ব্লকেডে কমপক্ষে ৫ লাখ লিটার দুধ নষ্ট হয়। ‘মিল্ক ভিটা’ প্রতিদিন ২৫ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে। এ ব্যবসাটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবহনের অভাবে ‘মিল্ক ভিটা’ তার সংগ্রহের কাজ করতে পারছে না। দেশের তিনটি বড় শহরেই ৩০ হাজার দুধ বিক্রয় কেন্দ্র আছে। এগুলো বন্ধ। এতে প্রায় ১০ লাখ সমবায়ী কৃষক এরই মধ্যে ১৫০ কোটি টাকার লোকসান দিয়েছে। অবুঝ শিশুরা এমনিতেই দুধ খেতে পায় না। গত ১৫-২০ দিন ধরে শিশুরা দুধের মুখ আর দেখছেই না। এদিকে পোলট্রি শিল্পের অবস্থা কী? এ শিল্পটি প্রায় ‘খতম’। এতে ব্যাংকগুলোর প্রচুর ফিন্যান্স আছে। দুধের জন্য হয়তো এত নেই। মোরগ-মুরগি চাষে রত খামারের এক-তৃতীয়াংশই বন্ধ। এ পোলট্রি শিল্প তিন মাসে চার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে বলে খবর ছাপা হয়েছে। হাঁস-মুরগির চাহিদা নেই। ৩৫ টাকায় বাচ্চা উৎপাদন করে বিক্রি করতে হয় ১৫-২০ টাকায়। হরতাল-অবরোধের কারণে এক-তৃতীয়াংশ বাচ্চা বিক্রি হয়। পরিবহনের অসুবিধা, ক্রেতার অভাব। বাজারে ডিম নেই। ক্রেতাও নেই। আমাদের দরকার ছিল এখন মাছ-মাংস ও ডিম। চালের সমস্যা নেই। চালে আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। সমন্বিত জীবনের জন্য সমন্বিত-সুষম খাদ্যের জন্য দরকার মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ। এ পুরো খাতই এখন হরতাল-অবরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত বললে ভুল হবে। এ খাত যে মার খেয়েছে তার থেকে উঠে দাঁড়াতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এর বোঝা পড়বে ব্যাংকগুলোর ওপর। এ কথায় পড়ে আসছি।
এদিকে দেখা যাচ্ছে চা শিল্পের অবস্থা খুবই খারাপ। তারা এরই মধ্যে ১০০ কোটি টাকার লোকসান দিয়েছে। সব চা বাগানের পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা নেই। ফলে পাতা নষ্ট হচ্ছে। চট্টগ্রামের নিলাম হাউসে চা পাঠানো যাচ্ছে না। সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথ ঝুঁকিপূর্ণ। নষ্ট হচ্ছে চায়ের গুণগত মান। অনেক বাগানে স্টক পড়ে আছে অবিক্রীত অবস্থায়। কিছুদিন পর এসব চায়ের কোনো বিক্রয় মূল্য থাকবে না। দুধ, ডিম, হাঁস-মুরগি, চা এসবই কৃষি খাতের বিষয়। এসব খাত পুড়ছে, দগ্ধ হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে, ব্যবসায়িকভাবে। তবে কি মূল কৃষি খাতের কাজ চলছে ভালোভাবে? নিশ্চয় না। এখন আমনের মৌসুম। বোরোর আয়োজনের সময়। প্রচুর ফলন হয়েছে। কিন্তু ধান-চালের দাম নেই। সরকার কিনবে চাল। এটা কৃষকের নেই, আছে মিলারদের। অতএব কৃষকের মাথায় হাত। এ সময় যাও কিছুটা দাম পাওয়া যেত তাও সম্ভব হচ্ছে না, কারণ চাল উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যেতে পারছে না। ট্রাক নেই। ড্রাইভার, হেলপার, শ্রমিক বেকার। তাদের রোজগার নেই, কারণ মালিকের দৈনিক আয় বন্ধ। অতএব তারা উপোসে। মালিকরা ব্যাংকের ‘লোনের’ টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। দেখা যাচ্ছে এর বোঝা, মানে পরিবহন শিল্পের বোঝাও ব্যাংকের ওপর পড়ছে।
এটা ডিসেম্বর মাস। ব্যাংকের বছর শেষ এ মাসে। বহু ব্যাংকের মুনাফা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। অনেক ব্যাংকের শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ বাড়বে। এতে দেখা দেবে মূলধন ঘাটতি। এদিকে কৃষক তো ধান-চালের দাম পাচ্ছে না। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। তাকে বোরোর প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। তার টাকার দরকার। বাধ্য হয়ে ধান-চাল বিক্রি করছে জলের দামে। বোরো ফসল পড়েছে বিপদে। সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারছে না। কৃষি উপকরণ পরিবাহিত হচ্ছে না। বলাই বাহুল্য, এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে বোরো উৎপাদনে। মজা হচ্ছে, কৃষক যখন দাম পাচ্ছে না তখনও কিন্তু ভোক্তারা মূল্য দিচ্ছে বেশি। বাজারে চালের দাম চড়া। চাল ঢাকায় আসতে পারছে না। অবরোধ। শুক্রবার একটা স্বস্তির দিন। সেদিনও বাস-ট্রাক-প্রাইভেট গাড়ি, সিএনজি পোড়ানো হচ্ছে। দিনে-রাতে সব সময়। ঢাকায় কম তো মফস্বলে বেশি, মফস্বলে কম তো ঢাকায় বেশি। কোনো রেয়াত নেই। ফলে পুরো কৃষি খাত শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চলছে না ট্রাক-বাস, চলছে না নৌকা, চলছে না ট্রেন। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পণ্য আনা-নেয়া এক অসম্ভব ব্যাপার। এর কুফল পড়েছে খাদ্যমূল্যে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্য জিনিসের দাম বাড়লে মানুষ তা ভোগ না করে পুষিয়ে নিতে পারে। কিন্তু চাল, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ইত্যাদির দাম বাড়লে, সয়াবিনের দাম বাড়লে মানুষের কোনো বিকল্প থাকে না।
এখন শীতকাল। এ সময় মানুষ একটু স্বস্তিতে থাকে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, নতুন আলু, পটোল, টমেটো, গাজর, বেগুন, লেটুস পাতা, ডাঁটা, লাউশাক, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, মুলা ইত্যাদি প্রাণভরে খাওয়ার এখনই সময়। এ সময় একটু সস্তা থাকে এসবের দাম। অথচ বিধি বাম। আঠারো দলীয় জোটের অবরোধ-হরতাল এবং এর সংশ্লিষ্ট ভাংচুর, ধ্বংসযজ্ঞ আজ মানুষের স্বপ্নকে চুরমার করে দিচ্ছে। এখনই পুঁটি মাছের চচ্চড়ি, ভাজা খাওয়ার সময়। এখনই দেশী কই খাওয়ার সময়, বাচা মাছ খাওয়ার সময়। টেংরা মাছ খাওয়ার সময়। নদীর মাছ খাওয়ার সময়। নিষ্ঠুর বাংলাদেশী রাজনীতির কারণে এসব আজ দুঃস্বপ্ন। ঢাকার আশপাশ থেকে শাকসবজি আসছে না, মাছ আসছে না টানা হরতাল, টানা অবরোধের কারণে।
শনিবার ছুটির দিন। সেদিনও অবরোধ। রাতেও অবরোধ, দিনেও অবরোধ। নৌকাতেও অবরোধ, ট্রেনেও অবরোধ, রাস্তায়ও অবরোধ। নরসিংদীর শাকসবজিওয়ালারা অভিশাপ দিচ্ছেন দিন-রাত। কোনো ক্রেতা নেই। ঢাকা থেকে পাইকাররা যেতে পারছে না। যেসব কৃষক শস্য আগাম বিক্রি করে দিয়েছে- সেই ক্ষতি এখন পাইকারদের। আবার যারা আগাম বিক্রি করেনি- সেই ক্ষতি কৃষকের। পাইকাররা পুষিয়ে নেয়। ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু মাল ঢাকাস্থ করে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করে। ফলে তার লোকসান কিছুটা পোষায়। কিন্তু ক্ষুদ্র কৃষকের সেই সুযোগ নেই। তারা পোশাক শিল্পের মালিক নন যে ‘ধমক’ দিয়ে সরকারের কাছ থেকে সব সুযোগ আদায় করে নেবেন। তাদের মরণ মানে মরণই। বাঁচার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাদের কোনো বীমা সুযোগ নেই। তাদের অনেকের ব্যাংকঋণ আছে, কিন্তু খাতায় তাদের নাম থাকলেও ঋণের টাকা নিয়েছে টাউট-বাটপাররা, যারা দেশ ‘চালায়’, যারা ‘ঢাকার মালিকদের’ সঙ্গে ‘ভার্টিকালি’ সংযুক্ত।
দেখা যাচ্ছে মাসাধিককাল ধরে ঘটমান ধ্বংসযজ্ঞে বাংলাদেশের কৃষি এক গভীর জলে পড়েছে। নাক ভাসানো অবস্থা তার আর নেই। অথচ এই কৃষি আমাদের অনেকটা বাঁচিয়ে রেখেছে খাইয়ে। আবার তাদের ছেলেরাই বিদেশ থেকে রোজগার করে ডলার পাঠায়, যা পাচার করে ঢাকার অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা, ব্যবসায়ীরা, শিল্পপতিরা। বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কৃষি, বন, পশু সম্পদকে বাঁচিয়ে তোলা আগামী সরকারের পক্ষে কঠিন এক কাজ হবে। কৃষি থেকে বিচ্যুত লোকেরা শহরে এসে আশ্রয় নেয়, কাজ পায় আবাসন শিল্পে। লাখ লাখ শ্রমিক আবাসন শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। এ শিল্প বহুদিন ধরে মরণাপন্ন। ক্রেতা নেই। ‘কালো টাকার’ বাজার আবাসন শিল্প। সে টাকা বিনিয়োগের ব্যবস্থা সরকার করেছে গত বাজেটে। কিন্তু রাজস্ব বিভাগ এসব মানে না। তাদের প্রশ্ন করার অভ্যাস রয়েছে অপরিবর্তিত। ফলে ক্রেতা নেই। অবরোধ-হরতালের কারণে কাজ বন্ধ। সিমেন্ট, বালু, ইট, পাথর ও অন্যান্য মালামাল সাইটে নেয়ার কোনো কায়দা নেই। ট্রাক চলে না। চট্টগ্রাম থেকে পণ্য আসে না। ক্রেতা নেই, সরবরাহ নেই, ব্যাংকের কড়াকড়ি। এতে ধুঁকে ধুঁকে মরছে আবাসন শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কমপক্ষে আরও বিশটি শিল্প। সেগুলোরও একই অবস্থা। ‘ত্রাহি মধুসূদন’! এ শিল্পের কাছেও ব্যাংকের পাওনা হাজার হাজার কোটি টাকা। তারা আসছে সুদ মওকুফের জন্য, ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য, ‘ব্লকড অ্যাকাউন্ট’ করার জন্য যাতে সুদ আর ধার্য করা না হয়। তাদের সিমেন্ট আমদানির ‘পিএডি’কে করতে হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। তারা ‘এলটিআর’ ‘ওভারভিউ’ রাখছেনÑ টাকা শোধ করতে পারছেন না।
পোশাক শিল্প চরম সংকটে। এদের সমস্যা অনেক। ইদানীং ১২০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি পোশাক কারখানা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর মালিককে অতি সহজ শর্তে ৪০০ কোটি টাকার ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মালিকরা এখন অভিযোগ করছেন, ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করছেন। তারা চলে যাচ্ছেন অন্যত্র। ক্রেতারা শত হোক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে চান না। ঠিক যেন শ্রীলংকার অবস্থা! অনেকের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমাদের অঞ্চলে পোশাক শিল্পে শ্রীলংকা ছিল অগ্রণী। কিন্তু শ্রীলংকা আক্রান্ত হয় গৃহযুদ্ধে- সিংহলি বনাম তামিল। সিংহলিরা সংখ্যালঘু তামিল হিন্দু-মুসলমানকে কোনো অধিকার দেবে না। এ নিয়ে বিরোধ। গৃহযুদ্ধ চলেছে দীর্ঘদিন। শ্রীলংকা ভীষণভাবে মার খায় পোশাক শিল্পে। এখন তাদের নামও শুনি না। বলা বাহুল্য, সেই সুবিধা আমরাও পেয়েছি। আজ অনেকটা এমনই অবস্থা আমাদের। আর কিছুদিন এভাবে চললে বিদেশী ক্রেতারা বসে থাকবে না। তারা বিকল্প বাজার খুঁজবে। এটি হলে কার কী হবে জানি না, ৩০-৪০ লাখ নারী শ্রমিক বেকার হবে। বাড়বে সামাজিক অস্থিরতা। বহু ছোট ছোট শিল্প মারা যাবে। কারণ এ নারী শ্রমিকদের ওপর ভর করে অনেক চুড়ি, শাড়ি, লিপস্টিক, স্নো ইত্যাদির কারখানা দেশে গড়ে উঠেছে।
দেখা যাচ্ছে, একটা সমস্যা আরেকটা সমস্যায় আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। কৃষি মরছে, দুগ্ধশিল্প মরছে, হাঁস-মুরগি-ডিম শিল্প মরছে, চা শিল্প মরছে। আবাসন শেষ হচ্ছে, গার্মেন্ট শেষ হচ্ছে। তাহলে রইল কী? রইলাম ‘আমরা আর মামুরা’। তাই নয় কি?
ড. আরএম দেবনাথ : সাবেক প্রফেসর, বিআইবিএম
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বাংলাদেশ ইনকর্পোরেটেড by ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নকামী কল্যাণ অর্থনীতিতে সব পক্ষকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন এবং সব প্রয়াস-প্রচেষ্টায় সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক উদ্দেশ্য অর্জনের অভিপ্রায়ে অয়োময় প্রত্যয়দীপ্ত হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। একজন কর্মচারীর পারিতোষিক তার সম্পাদিত কাজের পরিমাণ বা পারদর্শিতা অনুযায়ী না হয়ে কিংবা কাজের সফলতা-ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব বিবেচনায় না এনে যদি দিতে হয় অর্থাৎ কাজ না করেও সে যদি বেতন পেতে পারে কিংবা তাকে বেতন দেয়া হয়, তাহলে দক্ষতা অর্জনের প্রত্যাশা আর দায়িত্ববোধের বিকাশ ভাবনা মাঠে মারা যাবে। এ ধরনের ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হতে থাকলে যে কোনো উৎপাদন ব্যবস্থা কিংবা উন্নয়ন প্রয়াস ভর্তুকির পরাশ্রয়ে যেতে বাধ্য। দারিদ্র্য প্রপীড়িত জনবহুল কোনো দেশে পাবলিক সেক্টর বেকার ও অকর্মণ্যদের জন্য যদি অভয়ারণ্য কিংবা কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিভূ হিসেবে কাজ করে, তাহলে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। যদি বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করা না যায় উপযুক্ত কর্মক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করে, তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বড় বিনিয়োগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
অনাবশ্যক ব্যয় পরিহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় সাধনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে পুঁজি-ভূমি-শ্রমের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে মুনাফা অর্জন কোম্পানি ব্যবস্থাপনার অভীষ্ট লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। জাপানে শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক কোম্পানিগত প্রাণ। সেখানে শ্রমিক যাতে তার সর্বাধিক মনোযোগ কোম্পানির জন্য দিতে পারে সে জন্য স্ত্রীকে দেয়া হয়েছে সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব বহনের ভার। কোম্পানির কাজে সার্বক্ষণিক মনোযোগ দেবে স্বামী। সংসার চালানোর বিষয় নিয়ে অফিস থেকে বাসায় ফোন যাবে না- বাসা থেকে কোন ফোন আসবে না কোম্পানিতে। জাপানে নারীদের চাকরি, ব্যবসা, প্রশাসন, রাজনীতিতে বড় একটা দেখা যায় না। তার কারণ সমাজ তাদের সংসার চালানোর দায়িত্ব দিয়ে পুরুষদের উৎপাদন কর্মে পূর্ণ মনোনিবেশে সহায়তা করার দায়িত্ব দিয়েছে। স্বামীর বেতনের টাকা মাস শেষে পারিবারিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যায়। স্ত্রী ওই হিসাব অপারেট করেন। সংসারের যাবতীয় খরচপাতি স্বামীর সম্মতিতে স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। স্বামী প্রতি সপ্তাহের শুরুর দিনে তার সাপ্তাহিক হাত খরচ বাবদ টাকা পেয়ে থাকেন। সেই টাকা দিয়ে পুরো সপ্তাহ তার চলতে হয়। সুতরাং স্বামীর পক্ষে অপব্যয় কিংবা বাড়তি খরচ করার কোনো সুযোগ সেখানে নেই। পারিবারিক সঞ্চয় এভাবে প্রথাগত ব্যবস্থাদির দ্বারা উৎসাহিত হচ্ছে। জাপানের নারীরা বাইরের কাজে তেমন অবদান রাখছেন না ঠিকই, কিন্তু গৃহে যে দায়িত্ব তারা পালন করেন, তার আর্থিক ও তাৎপর্য মূল্য অনেক বেশি।
জাপানে কলকারখানা কিংবা অফিস-আদালতে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন হয় না। অর্থবছর শুরুর পরপরই একটি নির্দিষ্ট দিনে শ্রমিক-মালিক পক্ষ একত্রে বসে বিগত বছরের আয়-ব্যয়ের স্থিতিপত্র সামনে নিয়ে খোলাখুলি আলোচনায় বসে স্থির করে আগামী বছরে বেতন বেশি হবে, না কম হবে। কোম্পানি টিকলে আমি টিকব- এই নীতিতে বিশ্বাসী সবাই যার যার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে থাকে। কোম্পানির প্রেসিডেন্ট, তার স্ত্রী কিংবা তার ছেলেকে কর্মকালীন আলাদা করে শনাক্ত করা যায় না। কোম্পানির প্রেসিডেন্ট, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে সবাই নিজেকে ওই কোম্পানির চাকুরে হিসেবে বিবেচনা করে। বছর শেষে কোম্পানির নিট লাভ-লোকসান যা হয়, তাই-ই তার প্রকৃত পাওনা। কোম্পানিতে বড় সাহেব, ছোট সাহেব বলে কোনো ভেদ-বিভেদ নেই। আছে কর্মক্ষমতা দক্ষতা আর দায়িত্ব অনুযায়ী শ্রেণীবিন্যাস। সেখানে একজন সাধারণ কর্মীরও অবদান রাখার সুযোগ আছে। কোম্পানির সার্বিক অগ্রগতির পেছনে পরামর্শ দেয়ার স্বীকৃতি আছে সবার। সনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ মরিতা সান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে প্রথমে তিনি পরিদর্শনে যান কারখানার টয়লেটগুলো। তিনি মনে করতেন টয়লেট ও অন্যান্য আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখার দায়িত্বে রয়েছে যেসব শ্রমিক, তাদেরও যথেষ্ট অবদান রাখার অবকাশ আছে উৎপাদনে। তিনি হিসাব করে দেখিয়েছেন, উৎপাদন শ্রমিকেরা অবসরে যখন টয়লেটে আসে, তখন তা যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পায়, তাহলে তাদের মন প্রসন্ন হয়। সিটে ফিরে গিয়ে তারা উৎপাদনে পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারে। এর ফলে উৎপাদনের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। এভাবে দিনে যদি ১০০০ টেলিভিশন উৎপাদিত হয় কোনো কারখানায়, মরিতা সানের মতে, তার মধ্যে ন্যূনতম ৪টি টেলিভিশন উৎপাদন বেশি হয় শ্রমিকের প্রসন্ন মন-মানসিকতার কারণে। তিনি সবাইকেই উৎপাদনের যোগ্য অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতেন। ফলে শ্রেণী ও পর্যায় ভেদে সবাই যার যার কাজ তা সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পাদন করে। হোন্ডা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা নিজেই হোন্ডা মোটরসাইকেলের ডিজাইন করতেন গভীর রাতে। গভীর মনোনিবেশ সহকারে তিনি যাতে এ কাজ করতে পারেন, সে জন্য তার স্ত্রীও তার সঙ্গে রাত জাগতেন। রাতে ফেরিওয়ালা মিষ্টি আলু বিক্রি করত সুন্দর সুরে গান করে। ফেরিওয়ালার গানের সুরে হোন্ডা সাহেবের মনোনিবেশে যাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তার স্ত্রী ফেরিওয়ালার পুরো আলু কিনে নিয়ে তাকে ঘরে ফিরে যেতে অনুরোধ করতেন। এ হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি বলে বলীয়ান জাপানে পথিকৃৎদের প্রতিষ্ঠার কাহিনী। টয়োটা পরিবারের উত্থান একজন ব্যক্তির অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। অনুসন্ধিৎসা ও গভীর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সামান্য অবস্থা থেকে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এক বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা। কোয়ালিটির প্রশ্নে কোনো আপস নেই- পরিবেশনে, মুন্সিয়ানায় ও আন্তরিকতায় কমতি নেই। ডিজাইন ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গভীর অভিনিবেশ সহকারে এমন সচেতন ও একাগ্রতার সমাহার ঘটানো হয়ে থাকে, যাতে উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে অপচয়-বাতিল-পরিত্যক্তের পরিমাণ কমে আসে।
জাপানে ইনকর্পোরেটেডের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে পুনর্গঠন প্রয়াসের সময় থেকে। জাপান ইনকর্পোরেটেডের নিয়ন্ত্রণে প্রধান তিনটি পক্ষ হল- রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা আর বেসরকারি শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত ব্যক্তিত্ব। সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রকৌশলী ফুকুদা যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন জাপানের বিশৃঙ্খল অর্থনীতিকে পথে আনার জন্য ‘অর্থনৈতিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। ওহিরা, যিনি এক সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তিনিও তার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন অর্থনীতিতে ভালো না করতে পারলে নিস্তার নেই। জাপানের আমলা শ্রেণীও সার্বিক জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে নিবেদিত চিত্ত। সেখানে বেসরকারি খাতের পোশক প্রতিষ্ঠানই হল গোটা সরকারি আমলা শ্রেণী। উন্নয়নশীল অনেক দেশে আমলারা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যার যার মন্ত্রণালয় বা বিভাগে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো অবস্থান নিয়ে থাকেন। রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা শুধু রাজস্ব বাড়াবার কথা ভেবে বসে থাকেন। বর্ধিত রাজস্ব আদায়ের নামে শিল্প বিকাশের পথ রুদ্ধ হচ্ছে কিনা কিংবা অন্য বিভাগের কর্মসূচি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কিনা এবং এর ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হচ্ছে কিনা, তা দেখার কথা যেন তাদের নয়। মনে রাখতে হবে, একটি ক্ষেত্রে আপাত কিছু ছাড় দেয়ায় অর্থনীতির অপর কার্যক্রম গতিশীলতা পেলে সার্বিকভাবে অর্থনীতিই লাভবান হবে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পর্যটন দফতর তাদের মোটেলের ভাড়ার হার সামান্য হ্রাস করলে অধিক পর্যটক আসতে আগ্রহী হতে পারে। তাতে পর্যটন মোটেলের আয় হয়তো একটু কম হবে, তবে বেশি পর্যটক এলে অন্যান্য দফতর ও ক্ষেত্রের আয় বাড়বে। কেননা ট্যুরিস্টরা শুধু মোটেলে ঘুমাতে আসেন না। সেখানকার কুটির শিল্পজাত পণ্যসহ আরও অনেক সামগ্রীর বিক্রি বাড়লে উৎপাদন সংশ্লিষ্ট সবার আয় বাড়বে। এটা হল সমন্বয়ের ব্যাপার। জাপানের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও সংগঠিত নিজেদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। সবাই এক সূত্রে কথা বলেন সরকারের সঙ্গে। সেখানে দলাদলি নেই। এক অ্যাসোসিয়েশন অন্য অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে শত্র“তা বা বৈরিতা পোষণ করে না। সেখানকার ফেয়ার ট্রেড কমিশন কারও প্রতি কটাক্ষ করে নয়, বরং নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণকেই তার ধর্ম মনে করে। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির জয়-জয়কার।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
সমঝোতার সূত্র সন্ধান by ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

এ নির্বাচন অনেকটা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনের মডেলের কাছাকাছি হলেও দু’য়ের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। ১৯৯৬-এর সেই নির্বাচন ছিল একটি পূর্বঘোষিত আনুষ্ঠানিকতার নির্বাচন। তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি নীতিগতভাবে বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয় এবং তদনুযায়ী সংবিধান সংশোধনে সম্মত হয়। কিন্তু বিরোধীদলীয় সদস্যদের গণপদত্যাগের কারণে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য তখন সংসদে ছিল না। এ অবস্থায় তিন মাসের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে আবার নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়ে তবেই ওই নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণা করা হয়। সে কারণে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে অংশ না নিলেও তা হতে দিয়েছে। এবারে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিরোধী দলের দাবি মেনে নেয়া বা কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না। ফলে দেশজুড়ে যে পরিস্থিতির সূচনা হয়েছে তাতে জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং জাতীয় অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত ৫ জানুয়ারি তারিখে বিরোধী দল ও জোট নির্বাচন হতে দেবে বলে মনে হয় না। সরকার জোর করে নির্বাচনের আয়োজন করতে গেলে সংকট আরও ভয়ংকর রূপ নেবে বলে সব মহলের আশংকা।
এ ক্ষেত্রে সরকারকেই অগ্রণী হয়ে সমঝোতার সূত্র সন্ধান করতে হবে।
লক্ষ্য করার বিষয়, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছিল আওয়ামী লীগের। জামায়াতে ইসলামী তখন ছিল আওয়ামী লীগের দোসর। আর বিএনপি সরকার সে দাবি মানতে নারাজ। রাজনীতির নির্মম পরিহাসে এবারে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। এবারে বিএনপির দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তা মানতে নারাজ। আর জামায়াতে ইসলামী এবারে বিএনপির দোসর।
২.
জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে তা কার্যকর করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে তা খুবই গুরুতর। আমাদের প্রচলিত আইনে এ ধরনের অপরাধে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ডই বিধেয়। তাতে বলার কিছু নেই। তবে এই বিচার নিয়ে সরকার দেশের ভেতরের চেয়েও বেশি বিপাকে পড়ছে বিদেশে। ভারত ছাড়া প্রায় সব দেশই এই বিচার ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছে।
আজকের পৃথিবীতে অধিকাংশ রাষ্ট্রেই মৃত্যুদণ্ড নেই। আমি নিজেও এর পক্ষে নই। বহুবার এ নিয়ে লিখেছি। আগামীতেও লিখব। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যদি কখনও কোনো ভূমিকা পালনের সুযোগ হয়, তাহলে আমাদের দণ্ডবিধি থেকে মৃত্যুদণ্ড তুলে দেয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালাব। এই ক্ষণস্থায়ী মানবজীবনে প্রাণের চেয়ে মূল্যবান আর কোনো বস্তু নেই। আমরা যা সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখি না, তা নষ্ট করার অধিকার আমাদের নেই। সেজন্যই কারও মৃত্যু নিয়ে উল্লাস করাটা সুরুচির পরিচায়ক মনে করি না। চরম শত্র“ও যদি মৃত্যুমুখে পতিত হয় তাতে উল্লসিত না হয়ে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়াই মুসলমানের জন্য বিধেয়। যার মোদ্দা অর্থ : ‘আমরা সবাই আল্লাহর জন্যই এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে’। আদালত যাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাওয়ার পর তার অপকর্মের দায় পরিশোধ হয়ে যায়। তাকে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ‘প্রাণ’ দিয়ে সেই দায় পরিশোধ করতে হয়েছে। অতএব দণ্ড ভোগের পর দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা বাঞ্ছনীয়। অন্যদিকে কারও মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আরও কিছু প্রাণ নিঃশেষ করার বর্বরতাও কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।
৩.
বিষয়টি অন্যদিক থেকেও দেখা প্রয়োজন। রাজনীতির মঞ্চে চিরসত্য বা অভ্রান্ত মতবাদ বলে কিছু নেই। সময়ের সঙ্গে মানব সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তনে এক সময়ের ‘সত্য’ অন্য সময়ে ‘অসত্যে’ পরিণত হতে পারে। এক সময় সবাই ‘জানত’ সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। সেই ‘সত্যে’র বিরোধিতা করে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরার তত্ত্ব প্রচার করতে গিয়ে কোপার্নিকাসকে রাজদণ্ডে প্রাণ দিতে হয়েছে। ধর্মের বিধিবিধান অমান্য করার কারণে যুগে যুগে কতজনকে প্রাণ দিতে হয়েছে; আবার অন্যযুগে ধর্মীয় মতবাদ প্রচার করার ‘অপরাধে’ অন্যত্র কতজনকে নিগৃহীত হতে হয়েছে। তাই কোনো রাজনৈতিক মতবাদ বা সিদ্ধান্তকে ‘চিরন্তন’ মনে করা যথার্থ নয়। আমাদের চোখের সামনে তার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর কথাই ধরা যাক। ব্রিটিশ আমলে এই দলটি মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার ঘোরতর বিরোধী ছিল। এ কারণে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগের সঙ্গে তার বৈরী সম্পর্ক এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, এই দলের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মওদুদীকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর অভিযোগে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ আমলে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন ‘জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ্’ ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মিত্র। এই দলটিও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিল। ১৯৪৬ সালে বাংলা ও আসামের বিভক্তির সময় সিলেট জেলা ছিল আসামের অংশ। মুসলমান অধ্যুষিত জেলা হিসেবে এই জেলা পাকিস্তানের ভাগে পড়ে। কিন্তু তার করিমগঞ্জ মহকুমায় গণভোট দেয়া হল। সেটি কার ভাগে পড়বে- পাকিস্তান, না ভারত- তা নির্ধারণ করার জন্য। ওই গণভোটের সময় ‘জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ্’-এর সর্বভারতীয় নেতারা সেখানে গিয়ে ভারতের পক্ষে দিবারাত্র প্রচারণা চালিয়েছিলেন। মূলত সে কারণেই শতকরা ৮০ ভাগ মুসলমান অধ্যুষিত এই জেলার গণভোটের রায় ভারতের পক্ষে গিয়েছিল, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক ছিল না। সিলেটের অন্যান্য এলাকাসহ করিমগঞ্জ যে কোনো বিচারে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের অংশে থাকাই যৌক্তিক ছিল।
অতএব দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের সেই দিনগুলোতে কট্টর ইসলামী দলগুলো, বিশেষ করে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ধর্মীয় নেতারা, মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রকল্পের সমর্থক ছিলেন না। তারা কার্যত কংগ্রেসের অখণ্ড ভারত প্রকল্পকেই সমর্থন দিয়েছেন। তাদের প্রতিপক্ষ ‘ইংরেজি শিক্ষিত ও মধ্যপন্থী’ মধ্যবিত্ত মুসলমানদের আন্দোলনেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়।
মুসলিম লীগের ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ কতটা যৌক্তিক ছিল, কিংবা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য কতটা কল্যাণকর হয়েছে, উপমহাদেশে বসবাসরত পৃথিবীর এক-পঞ্চমাংশ মানুষের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতির বিকাশে তার প্রভাব কতটা ইতিবাচক এবং কতটা নেতিবাচক হয়েছে, সে আলোচনায় আমরা এখানে যাব না। তবে আজ এতদিন পর হলেও বর্তমানের বাস্তবতায় কেউ নিশ্চয়ই প্রশ্ন তুলতে পারেন, উপমহাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর অধিকাংশকে দুই প্রান্তে দুটি ক্ষুদ্রতর ভূখণ্ডে বৃত্তবন্দি করে বৃহত্তর ভারতে প্রায় ২০ কোটি মুসলমানকে চতুর্বর্ণের পশ্চাতে ‘পঞ্চম বর্ণে’র অসহায় অবস্থানে ফেলে আসা দূরদর্শিতার কাজ হয়েছে কিনা।
লক্ষ্য করার বিষয়, ব্রিটিশ আমলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সেদিনের মুসলিম লীগের লড়াকু সৈনিক যারা ছিলেন- শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী ও তাদের সহযোগীরা- তারাই মাত্র এক দশক পরই সে রাষ্ট্রটি ভেঙে ফেলার আওয়াজ তুলেছেন। তার চেয়েও লক্ষণীয় ব্যাপার হল, এক্ষেত্রে পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য ইসলামী দল-উপদল চলে এসেছে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। এবারে তারা পাকিস্তান ‘রক্ষা’ করার জন্য জান কোরবান করে মাঠে নামলেন এবং লাখো মানুষের জান কবজ করার কাজে শরিক হতেও কুণ্ঠিত হলেন না। কাজেই, সময়ের ব্যবধানে রাজনীতিতে কার অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা কেবল সময়ই বলে দিতে পারে। ধরা যাক, আজকের বাংলাদেশ কোনো বহিঃশত্র“র দ্বারা আক্রান্ত হল। সেক্ষেত্রে বর্তমানের বাস্তবতায় কার কী অবস্থান হবে? সেক্ষেত্রে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদেরই কেউ কেউ যে ‘রাজাকারে’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন না, তা হলফ করে বলা যায় কি?
অন্যদিকে একাত্তরে যারা পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার বেদনায় মুহ্যমান হয়েছেন, তাদের মধ্যে দু’ধরনের মানুষ চিহ্নিত করা যায়। একাংশ স্পষ্টতই জেনে-বুঝেই পাক-বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছে। তারা রাজাকার, আল-বদর হয়ে পাক-বাহিনীকে পথ দেখিয়েছে। তাদের ধ্বংসযজ্ঞে শরিক হয়েছে অথবা নানা দুষ্কর্মে জোগান দিয়েছে। আরেকটি অংশ পাক-বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও অপকর্মে শরিক হয়নি, কিন্তু ব্রিটিশ আমলে বাংলার মুসলমানদের প্রতি উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার, ধনিক ও ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর চরম অবজ্ঞা ও অবমাননার স্মৃতি তখনও তারা বিস্মৃত হতে পারেননি। তাই চোখের সামনে ‘স্বপ্নের পাকিস্তান’ ভেঙে যেতে দেখে তারা হতাশ হয়েছেন, তীব্র বেদনাবোধ করেছেন।
এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর তফাৎ। প্রথমোক্ত শ্রেণীর অনেকে হয়তো এখনও তাদের একাত্তরের ভূমিকার জন্য অনুতপ্ত হতে চান না। কিন্তু দ্বিতীয় অংশে যারা সেদিন অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতার নিরিখে পাকিস্তান ভেঙে যেতে দেখে কষ্ট পেয়েছেন, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বাস্তবতা তারা মেনে নিয়েছেন। তারা এখন বাংলাদেশকে আঁকড়ে ধরেই তাদের ব্রিটিশ আমলের ‘বাঙাল’ জীবনের গ্লানিময় স্মৃতির পীড়ন থেকে রক্ষা পেতে চাইবেন, সেটাই স্বাভাবিক। অতএব আজকের দিনে বাংলাদেশের সীমান্ত বা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা সম্মুখ সারিতেই থাকবেন, তা অবধারিত। অর্থাৎ, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা যেমন আজকের প্রেক্ষাপটে রাজাকারের ভূমিকায় চলে যেতে পারে, তেমনি একাত্তরের পাকিস্তানপন্থীরাও অনেকে আজকের ভিন্ন প্রেক্ষাপটে মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় চলে আসতে পারেন। সেই দ্বান্দ্বিক বাস্তবতাকে সামনে রেখেই আমাদের জাতীয় ঐক্যের সর্বজনীন ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে। বিভাজন নয়, ঐক্যের সূত্র সন্ধান করাই হবে প্রকৃত দেশপ্রেমিকের কাজ। বাংলাদেশের জাতি গঠনের চলমান প্রক্রিয়ায় এ বিষয়টি অবশ্যই মনে রাখতে হবে।
৪.
আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী কিছু দল-উপদল জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সুবাদে তারা সেই কাজটি করতেও পারেন। জামায়াতে ইসলামীর কিছু কার্যকলাপ দৃষ্টে এ রকম দাবি ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু দল নিষিদ্ধ করলেই সে দলের চিন্তাভাবনার বিলুপ্তি ঘটে না। দু-চারজন ছাড়া সে দলের সমর্থকরা দেশ ছেড়ে যাবে না। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সে দলের কার্যক্রম কখনও থেমে থাকেনি। এখন দেশের অন্যতম নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল।
দল নিষিদ্ধ করা রাজনীতির ভিন্নমত মোকাবেলার কার্যকর পথ নয়। রাজনীতির ভিন্নমত মোকাবেলা করতে হবে রাজনীতি দিয়েই। অপরাজনীতির বিপরীতে নীতির রাজনীতি দিয়ে। নইলে হিতে-বিপরীত ঘটার আশংকাই বেশি। আফগানিস্তানে আল কায়েদা ও তালেবান নিষিদ্ধকরণ তার দৃষ্টান্ত। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে লাখো প্রাণের বিনিময়ে। রাজনৈতিক সামাজিক বিবাদ-বিসংবাদ কিংবা বিভ্রান্তি ১৬ কোটি মানুষের এই দেশকে সাময়িকভাবে মেঘাচ্ছন্ন করতে পারে, কিন্তু এই কষ্টার্জিত-রক্তার্জিত স্বাধীনতাকে কখনই ম্লান করতে পারবে না। সেই বিশ্বাস হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
গত সপ্তাহে এই কলামে এ নিয়ে নানা মত ও পথের উল্লেখ করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছিলাম। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে বর্তমান সরকারের অহেতুক অনড় অবস্থান পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। এখন এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারকেই আগ বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারকেই বিরোধী দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানের সূত্র বের করতে হবে এবং তদনুযায়ী সংকট নিরসনে অগ্রণী হতে হবে। এক্ষেত্রে সাংবিধানিক সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিবদমান পক্ষগুলোকে সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যের পথে নিয়ে আসতে হবে। সেজন্য সব পক্ষকেই কম-বেশি ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে সম্পন্ন হওয়ার সব সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। এজন্য সরকারের অযৌক্তিক অনমনীয়তাকেই আমরা বেশি দায়ী করব। এখন সংসদ ভেঙে দিয়ে তিন মাস সময় নেয়ার যে সুযোগের কথা সরকারের পক্ষ থেকে এতকাল বলা হয়েছে, সে সুযোগও আর আছে বলে মনে হয় না। এ কারণেই গত সপ্তাহে আমরা দশম সংসদের পাশাপাশি একাদশ সংসদের নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা বলেছিলাম। ইতিমধ্যে সরকারি দলের মুখপাত্ররাও সে রকম কথা বলছেন। কিন্তু বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া এ কথা বলা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।
সারা দেশে এখন যা ঘটছে, তা দৃষ্টে বর্তমান সরকারের উচিত হবে কালবিলম্ব না করে বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা সন্ধান করা এবং তদনুযায়ী সমঝোতায় উপনীত হয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি মডেলে ৫ জানুয়ারি ‘আনুষ্ঠানিকতার নির্বাচন’ সম্পন্ন করে তার অব্যবহিত পরে ‘একাদশ সংসদে’র নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া এবং সব দলের অংশগ্রহণে সেই নির্বাচনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া।
বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির ও যুদ্ধাপরাধবিরোধী জনমত চাঙ্গা করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এই পথে সংকটের একতরফা সমাধান প্রত্যাশা করা যৌক্তিক হবে না। দেশটা সবার। এ মুহূর্তে সরকারের পক্ষে যে জনমত, সরকারের বিপক্ষে তার চেয়ে মোটেই কম নয়। সেই বাস্তবতা অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কিছুটা সময় এখনও আছে।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1353)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ▼ 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
