Saturday, November 30, 2013

অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিন- রাজনীতির নামে নৃশংসতা

যাত্রীসমেত বাসে পেট্রলবোমা মেরে ১৯ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না, এটা কে না জানে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা যেন এ রকমই!
এ দেশের মানুষের জীবনযাপন আজ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে নৃশংস রাজনৈতিক কৌশলের হাতে। ১৮-দলীয় জোটের তিন দিনের অবরোধের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটির নিন্দা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
নিরীহ ১৯ জন মানুষ, যাঁদের দুজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি জানাই সান্ত্বনা ও সমবেদনা।
পেট্রলবোমার শিকার হওয়া বাসটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মডেল। সেটিতে বাসচালক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ—ছাত্র, ব্যাংকের কর্মকর্তা, পুলিশের কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁরা কাজ শেষে ঘরে ফিরছিলেন। কী অপরাধ ছিল তাঁদের? কেন এই নৃশংসতার শিকার তাঁদের হতে হলো?
এমন নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে সারা দেশের মানুষ। বিরোধী দলের তিন দিনের অবরোধে নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারালেন ২০ জন। এর আগে গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে তিন দিনের হরতালে এবং এর মাত্র পাঁচ দিনের
মাথায়, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে টানা চার দিনের হরতালেও প্রাণহানি ঘটেছে প্রায় ২০ জনের। এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে
এ পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তিন শ জন! এ কোন ধরনের রাজনীতি? কিসের জন্য এই রাজনীতি?

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে এসব প্রাণহানির দায় এড়াতে পারে না। কারণ, তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কথা বলে, কিন্তু শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে না। নাশকতার ঘটনাগুলোর দায় তারা বরং সরকার ও সরকারি দলের ওপর চাপিয়ে দিয়ে দায় সারতে চায়। কিন্তু এভাবে দায় সারা যায় না, যাবেও না। বাসে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারা তো গণহত্যার অপচেষ্টার শামিল! নিরীহ সিএনজিচালককে পুড়িয়ে মারা, কিংবা অফিসফেরত মানুষদের বোমা মেরে হত্যা করার মাধ্যমে সরকারকে দুর্বল করার ভাবনা তো সন্ত্রাসবাদীদের অশুভ ভাবনা!

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মানুষ হত্যার ঘটনাগুলো যেন আইনি প্রতিকারের ঊর্ধ্বে থেকে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ এসব অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে না, বরং তাদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু প্রতিটি সহিংস ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও যথাযথ বিচারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বিরোধী জোটের যেমন উচিত অবিলম্বে এসব নাশকতা বন্ধ করা, তেমনি সরকারের উচিত প্রতিটি ঘটনায় আইনের যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

পূর্ব এশিয়াতে মার্কিন আধিপত্যের প্রতি চীনা চ্যালেঞ্জ

এশিয়ার পূর্বাঞ্চলের আকাশে চীনের বিমান প্রতিরক্ষা অঞ্চল ঘোষণা নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। কয়েক দশক ধরে এ এলাকায় মার্কিন আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত।

চীনের নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বহু বছর ধরে জানিয়ে আসছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে তাঁরা অস্বস্তিতে ভোগেন। দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ দ্বীপ পারসেল ও স্কারবোরও এবং পূর্ব চীন সাগরের জাপানশাসিত দ্বীপগুলোতে চীনের নৌবাহিনীর শক্তিপ্রয়োগ তাই যুক্তরাষ্ট্রকে শঙ্কিত করে তুলছে।

এই সম্পর্কে রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শি ইয়নহংয়ের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, বাণিজ্য ও কূটনীতিক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কাছে চীনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের ‘কৌশলগত অবস্থানকে’ স্বীকার করতে হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তাঁর মিত্ররা কীভাবে চীনকে গ্রহণ করছে, সেটির ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের ভবিষ্যত্ চীনের উদয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে।

ওয়াশিংটন এ অবস্থায় গোপন কূটনীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। গত সপ্তাহের চীনের ঘোষণার পর দেশটির সবচেয়ে কাছের মার্কিন ভূখণ্ড গুয়াম থেকে দুটি বি-৫২ যুদ্ধবিমান আকস্মিকভাবে উড়িয়ে, চীনকে জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য এতে পুরো বিষয়টিতে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

কাউকে তোয়াক্কা না করে, নিজের ক্ষমতা দেখাতে বিমান প্রতিরক্ষা অঞ্চল ঘোষণা করে জাপানের সঙ্গে ছোটখাটো কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে চলমান কলহকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে চীন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামী সপ্তাহের চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর সফরের সময়ও এ উত্তেজনা জারি থাকবে।

বাংলাদেশি খাবার ও পোশাকের উৎসব by মাসুদুর রহমান

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে সম্প্রতি (২৭ অক্টোবর) প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় বাংলাদেশি খাবার ও পোশাক উৎসব। কাউয়ানডিলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এ উৎসব বেলা ১১টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবার ও পোশাকের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের পরিচিতি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করাই ছিল এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
উৎসবে ছিল নানা ধরনের ২২টি খাবার ও পোশাক স্টল। পাশাপাশি পরিবেশিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পীরা অনুষ্ঠানে নাচ-গান পরিবেশন করেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিথিরা নাচ দেখছেন 
টেস্ট দ্য ফ্লেবার অব বাংলাদেশ স্লোগানে এ উৎসব আয়োজন করে অবাক (অ্যাডিলেড-বাংলাদেশি কালচারাল ক্লাব)। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি কমিউনিটি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদেরই সামাজিক সংগঠন অবাক। স্থানীয় লোকজনের কাছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরতেই তারা এ উৎসবের আয়োজন করে।
এ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা, শিশু উন্নয়ন ও বহুসংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী জেনিফার র‌্যানকিন এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে গৃহায়ণ, নগর উন্নয়ন, যোগাযোগ, অবকাঠামো ও খনিজসম্পদমন্ত্রী টম কাউটসানতোনিস এমপি, হিন্ডমার্শের ফেডারেল সদস্য ম্যাট উইলিয়ামস এমপি, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার বহুসংস্কৃতি ও জাতিগতবিষয়ক কমিশনের (SAMEAC) সদস্য জোসেপ মাসিকা ওএম, পার্লামেন্টের স্পিকার মিখায়েল অ্যাটকিনসন এমপি এবং ওয়েস্ট টরেন্স শহরের মেয়র জন ট্রেইনার উপস্থিত ছিলেন।
অতিথিরা বাংলাদেশি খাবারের স্বাদ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। তাঁদের কেউ কেউ দলীয় সংগীতেও অংশ নেন। প্রধান অতিথি জেনিফার র‌্যানকিন এমপি বাংলাদেশি সালোয়ার-কামিজ এবং বিশেষ অতিথি স্পিকার মাইকেল অ্যাটকিনসন বাংলাদেশের পাঞ্জাবি পরেন। অতিথি সবাই মেহেদির রং লাগান।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিশুদের নৃত্য পরিবেশনা 
স্থানীয় ও অন্যান্য দেশের প্রায় দেড় হাজার দর্শক উৎসবে যোগ দেন।
 সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করছে কয়েকজন শিশু শিল্পী 
তাঁরা বাংলাদেশি খাবার খেয়ে এবং পোশাক কেনার সুযোগ পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে ছিল পিঠা, হালিম, ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, বিরিয়ানি, আমের লাচ্ছি, ফালুদা, বোরহানি, দইবড়া, জিলাপি, শিঙাড়া, সমুচা ইত্যাদি। পোশাক ও হস্তশিল্পের মধ্যে ছিল সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, শাড়ি, নকশিকাঁথা, শোপিস, গয়না ইত্যাদি।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রুদ্র শোভন ও বেদোয়ারা হক অমন গান এবং ইশতি, সৃষ্টি, লুবাবা, অরিত্রি প্রমুখ নাচ পরিবেশন করেন। তাঁদের পরিবেশনা শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়ায়। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত কয়েকজন বাংলাদেশি বলেন, অ্যাডিলেডে এই প্রথমবারের মতো তাঁরা এত সুন্দর অনুষ্ঠান দেখলেন। অংশগ্রহণকারী কেউ কেউ উৎসবকে অ্যাডিলেডে ছোট্ট এক বাংলাদেশ বলে অভিহিত করেন।
অবাক প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, পয়লা বৈশাখসহ বাংলাদেশের বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে।
মাসুদুর রহমান
অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া
 উত্সবের একাংশউত্সবে আগত কয়েকজন বাংলাদেশি
ওয়েস্ট টরেন্স শহরের মেয়র জন ট্রেইনার বাংলাদেশের হস্তসামগ্রী দেখছেন

বিএনপি ক্ষমতার জন্য উন্মাদ হয়ে গেছে: প্রধানমন্ত্রী

বিএনপি ক্ষমতার জন্য উন্মাদ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিএনপি মানুষ পুড়িয়ে মারছে। যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, তাঁদের কোনো মানবিকতা নেই।

আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা বাসের ভেতর আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করছে, যাত্রীসহ সিএনজি অটোরিকশায় আগুন দিয়ে মানুষ মারছে। এমনকি তারা হেফাজত ও জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে কোরআন শরিফও পুড়িয়েছে। যারা মানুষ পোড়ায়, কোরআনে আগুন দেয়, তারা ধর্মে কীভাবে বিশ্বাস করে?’
বিরোধীদলীয় নেতাকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, ‘কেন এভাবে পুড়িয়ে মানুষ মারবে? এতে তিনি কী পাচ্ছেন, কী লাভ হচ্ছে?’
শেখ হাসিনা বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা জনগণের অশান্তি চান। ‘“অশান্তি বেগমে”র আগুনে তো বাংলার জনগণ জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। দয়া করে আপনি (খালেদা জিয়া) মনের আগুন মনে রাখুন। ওই আগুনে বাস জ্বালিয়ে মানুষ পোড়াবেন না।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষকে আগুনে পোড়ানো বন্ধ করে রাস্তায় নামুন। দেখি কী আন্দোলন করতে পারেন। লোক ভাড়া করে, বোমা-ককটেল মেরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করবেন না। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের মারবেন না। যুব সমাজকে সন্ত্রাসী ট্রেনিং দেওয়া বন্ধ করুন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নিয়েই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে। চাইলে আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও দিতে রাজি আছি। দয়া করে মানুষ পুড়িয়ে মারবেন না। তাহলে মানুষ এর প্রতিশোধ নিবে। তখন যাবেন কোথায়? মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশের মানুষ কখন কী করে তার ঠিক নেই।’ তিনি বলেন, ‘তাদের যত ক্ষোভ সব সাধারণ মানুষের ওপর। গরিব কৃষকের কাছে শিক্ষা নিন কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়।’
প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি নিজে তাঁকে রেড ফোনে কল করেছি। আমি তাঁকে সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছি। আসলে উনি নির্বাচন চান না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটের অধিকারে বিশ্বাস করি, জনগণের গণতন্ত্রায়নে বিশ্বাস করি।’
বিরোধী দলের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতই চেষ্টা করুন না কেন, কেউ নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। যথাসময়ে নির্বাচন হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপির দুই গুণ, দুর্নীতি আর মানুষ খুন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক ব্যর্থ লোক আমাদের বুদ্ধি-পরামর্শ দেয়, আবার রাষ্ট্রপতির কাছেও যায়। আপনারা তাহলে কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকা অবস্থায়ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারলেন না। কেন তাঁরা ব্যর্থ হলেন? আপনাদের ব্যর্থতার কারণেই তো ১/১১ সরকার দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। এখন আমাদের ছবক দিতে আসেন।’

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর সভাপতিত্বে পুনর্মিলনী সভায় আরও বক্তব্য দেন ভূমিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার জীবনী নিয়ে লেখা ‘রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম’ শীর্ষক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য নাসির উদ্দিন ইউসুফ (চলচ্চিত্র), রফিকুল ইসলাম-মরণোত্তর (ভাষা), মুশফিকুর রহিম (খেলাধুলা), সিদ্দিকুর রহমান (খেলাধুলা), মোহাম্মদ এ আরাফাত (গণমাধ্যম) এবং ঝর্ণা বেগমকে (সাহসিকতা) বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।

পুলিশ জলদস্যুর মতো কার্যালয়ে প্রবেশ করেছে: বিএনপি

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেপ্তার ও কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনাকে ‘জঘন্যতম’ বলে বর্ণনা করেছে দলটি। বিএনপির ভাষায়, পুলিশ জলদস্যুদের মতো দলের কার্যালয়ে প্রবেশ করেছে।

দলের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র, যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদ আজ শনিবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে ওই ঘটনার নিন্দা জানান। সেই সঙ্গে দলের কার্যালয়ে পুলিশির অভিযানের একটি বর্ণনাও দেওয়া হয়।

অন্যান্য অবরোধের দিনের মতো সংবাদ সম্মেলন করে পরিস্থিতি তুলে ধরা না হলেও সন্ধ্যায় এই বিবৃতিতে অবরোধ পরিস্থিতি তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। দলের সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফের সই করা ওই বিবৃতিতে সালাহউদ্দিনকে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আজ সকালে সালাউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেও দুপুরের পর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও তাঁকে যেতে দেখা যায়নি। এর মধ্যে পুলিশ সালাউদ্দিনের গ্রামের বাড়িতে তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালায়।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অবৈধ সরকারের’ মন্ত্রীরা আলোচনার নামে ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে। আলোচনার আগে সব নেতা-কর্মীর মুক্তি দিয়ে, মামলা প্রত্যাহার করে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করার আহ্বান জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমরা কোনো গোপন সংগঠন করি না। তলে তলে নয়, আলোচনা যদি হয়, তা প্রকাশ্যে হতে হবে। অবশ্যই আলোচনার পূর্বে নির্দলীয় সরকারের দাবি নীতিগতভাবে মেনে নিতে হবে।’

 

বিএনপির বর্ণনায় পুলিশের অভিযান

বিবৃতিতে সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, ‘গত রাতে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাদাপোশাকধারী ডিবি পুলিশ ডাকাতি কায়দায় গভীর রাত্রে সাড়ে তিনটার দিকে কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় জলদস্যুদের ন্যায় কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা গ্রিল কেটে দরজা ভেঙে দুজন সাংবাদিককে এক কক্ষে বেঁধে ফেলে, তাদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয় এবং তাদের লাঞ্ছিত করে। তারা প্রথমে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং কক্ষের সব আসবাব তছনছ করে। এরপর তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং সব আসবাব তছনছ করে। সবশেষে তারা বিএনপির (দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত) যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের কক্ষে ঢুকে কম্পিউটার, টেলিফোন লাইন, টেলিভিশনসহ কক্ষের সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আসবাব ভেঙেচুরে তছনছ করে এবং ঘুমিয়ে থাকা রিজভী আহমেদকে তাঁর কক্ষের কাচের দরজা ভেঙে প্রবেশ করে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাঁর চোখ বেঁধে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে উঠিয়ে নিয়ে যায়।’

অবরোধের প্রথম দিনে আজ শনিবার সারা দেশে একজন নিহত, ২৬৮ জন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার এবং ৩৩৭ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।

বিবৃতিতে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণ-আন্দোলনে তীব্রতা দেখে সরকার অতিমাত্রায় ভীত হয়ে দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা, হত্যা-গ্রেপ্তারের চালিয়ে শেষ রক্ষা পেতে চায়।



বিএনপির বক্তব্য তুলে ধরার কেউ নেই!

দপ্তরের দায়িত্বে থাকা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেপ্তারের পর থেকে কার্যত দল ও জোটের বক্তব্য তুলে ধরার মতো কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।

হরতাল-অবরোধ চলাকালে প্রতিদিন বিকাল চারটায় রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দিনের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। কিন্তু আজ শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ৭২ ঘণ্টা অবরোধের প্রথম দিনে দল বা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো সংবাদ সম্মেলন হয়নি। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দায়িত্বশীল কোনো নেতাকেও দেখা যায়নি। দলের বেশির ভাগ শীর্ষ নেতাই আছেন আত্মগোপনে। তবে সন্ধ্যায় বিবৃতির মাধ্যমে দলের বক্তব্য গণমাধ্যমে তুলে ধরা হয়।

আজ ভোরে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বে থাকা রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেপ্তার করে। এরপর দলের আরেক যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদ দলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে কথা বলেন। কিন্তু দুপুরের পর তাঁকেও আর পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পুলিশ তাঁর খোঁজে তাঁর গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়ায় তল্লাশি চালিয়েছে। দলের মুখপাত্র ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আত্মগোপনে আছেন। তাঁর ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ফোন করে দলের স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ সদস্যের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

এর আগে গত ৮ নভেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিন সদস্যসহ পাঁচ নেতাকে গ্রেপ্তারের পরও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ নেতা আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। তবে সে সময় হরতালের চিত্র তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করে দলের বক্তব্য তুলে ধরতেন রিজভী। তাঁকে গ্রেপ্তার করার পর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আর কোনো নেতাকে যেতে দেখা যায়নি। সকাল থেকে কার্যালয়ে ছিলেন কর্মচারীরা। এর মধ্যে দুপুরে বিএনপিপন্থী পেশাজীবীদের একটি প্রতিনিধিদল বিএনপির কার্যালয় পরিদর্শন করে।

বিকেলে ঢাকা মহানগর বিএনপি এক ই-মেইল বার্তায় ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে অবরোধের সমর্থনে মিছিল এবং নেতা-কর্মীদের আটক করার খবর জানিয়েছে। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা ও সদস্যসচিব এম এ সালাম ওই বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের নির্যাতন ও নিপীড়নের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। তাঁরা নেতা-কর্মীদের মুক্তি দাবি করেন।

ঢাকায় ককটেল, চট্টগ্রামে গুলি, রাজশাহীতে ধানের ট্রাকে আগুন- ঝিনাইদহে সংঘর্ষে শিবির কর্মী নিহত

১৮ দলের ডাকা ৭২ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি শুরুর আগ মুহূর্তে আজ শনিবার ভোরে রাজধানীর দলীয় কার্যালয় থেকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে শিবিরের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ইসরাইল হোসেন (২৪) নামের ছাত্রশিবিরের একজন কর্মী নিহত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম নগরের এ কে খান রোড ও চাঁদগাঁও এলাকায় অবরোধ-সমর্থকদের সঙ্গে পৃথক সংঘর্ষে পুলিশের দুই সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া নগরের জিইসি মোড় থেকে ৪০০টি গুলিসহ দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। রাজশাহীতে ধান ও ওষুধবাহী পাঁচটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ নানা সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের পাঠানো খবর:
ঢাকা: গাবতলী বাস টার্মিনালের কাছে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে কে বা কারা দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় সকাল সাতটায় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ সেখান থেকে আবদুল হালিম ভূইয়া ও আনোয়ারুল কবির নামের দুজনকে আটক করে। সকাল নয়টার দিকে রাজধানীর গ্রিন রোডে অবরোধের সমর্থনে বের করা শিবিরের মিছিল থেকে সাত-আটটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। একই সময় রামপুরায় মিছিল করতে গিয়ে কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটান জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। দুপুর ১২টার দিকে সাভারের আমিনবাজার-সংলগ্ন সালেহপুর ব্রিজের কাছে অবরোধ-সমর্থকেরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিকেল চারটার দিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়।



চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরের একে খান ও চাঁদগাঁও এলাকায় অবরোধ-সমর্থকদের সঙ্গে পৃথক সংঘর্ষের ঘটনায় আনিসুর রহমান ও অঞ্জন নামে পুলিশের  দুই সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। অবরোধকারীদের ছোড়া গুলিতে তাঁরা গুলিবিদ্ধ হন বলে পুলিশের দাবি।



এদিকে পলিব্যাগে করে ৪০০টি গুলি নিয়ে যাওয়ার সময় টহল পুলিশ নগরের জিইসি মোড় থেকে আনোয়ার হোসেন ও আবুল হোসেন নামের দুজনকে আটক করে।



চট্টগ্রামের ইস্পাহানি এলাকায় রেললাইন অবরোধ করায় ঢাকা ও সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ আছে।



রাজশাহী: অবরোধ শুরুর আগেই নগরের দেওয়ানপাড়া এলাকায় ধানবোঝাই চারটি ট্রাক ও ওষুধবাহী একটি গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওষুধবাহী গাড়ির চালক আহত হয়েছেন।



ধানবাহী ট্রাকগুলোর চালকেরা চালক জানান, নওগাঁ থেকে ধানবোঝাই করে কুষ্টিয়ার পোড়াদহ যাচ্ছিলেন তাঁরা। চারটি ট্রাকে এক হাজার ২০ বস্তা ধান ছিল। প্রতিটি বস্তায় দুই মণ করে ধান ছিল।



চালকেরা জানান, রাত একটার দিকে দেওয়ানপাড়া এলাকায় রাস্তার ওপর কাঠের গুঁড়ি ফেলানো দেখে গাড়ি থামালে মাফলারে মুখ বাঁধা একদল মানুষ ইটপাটকেল ছোড়ে এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। একজন চালক প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফায়ার সার্ভিসের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে গিয়ে খবর দিলে তাঁরা গিয়ে আগুন নেভান বলে ওই স্টেশনের কর্মকর্তা এনায়েতুল হক জানান।



ঝিনাইদহ: কোটচাঁদপুর উপজেলায় শিবিরের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইসরাইল হোসেন (২৪) নামের একজন নিহত হন। উপজেলার হরিণদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইসরাইল শিবিরের কর্মী বলে জানিয়েছেন কোটচাঁদপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জাহিদ হোসেন।



ফেনী: দাগনভূঞায় গতকাল রাত সাড়ে তিনটার দিকে অবরোধ-সমর্থকেরা যাত্রীবাহী একটি বাস থামিয়ে প্রথমে লুটপাট চালায় এবং পরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় একটি পিকআপে অগ্নিসংযোগ এবং সাতটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।



নোয়াখালী: অবরোধকারীরা শহরের মাইজদী বাজার, শহীদ ভুলু স্টেডিয়াম, পৌর বাজার, রশিদ কলোনি, দত্তেরহাট ও সোনাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। পুলিশ গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ২০টি রাবারের গুলি ছোড়ে। সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হন। এ ছাড়া পুলিশ শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে আটজনকে আটক করে।



জেলার সোনাইমুড়ী এলাকায় নোয়াখালী-কুমিল্লা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করায় সংবাদপত্রের গাড়ি লক্ষ্মীপুর পৌঁছাতে পারেনি।

অবশেষে কহিলেন বিষাদে by শরীফুল ইসলাম খান

নির্বাচনকালীন সরকার থেকে বাদ পড়েছেন অনেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। এদের মধ্যে আলোচনায় এসেছেন যে কয়জন তাদের মধ্যে অন্যতম দীপু মনি, মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ওই তিনজনের বাদ পড়াটা যতটুকু না বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার চেয়ে বেশি জনমনে আলোচনায় এসেছে বাদ পড়ার পেছনের দিকগুলো। বেশ কয়েকটি পত্রিকা এর অনেক কারণও উল্লেখ করেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সেই মন্তব্যগুলোর মধ্যে এসেছে, এরা ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায় অনেক বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দেয়ায় দলের শীর্ষ নেতাদের বিরাগভাজন হয়েছেন এবং নির্বাচনকালীন সরকারের আয়তন ছোট রাখার কারণে এদের মন্ত্রিপরিষদের বাইরে রাখা হয়েছে। তাদেরসহ আরও অনেকের সম্পর্কে মিডিয়া এর আগেও সমালোচনার ঝড় তুলেছিল; কিন্তু সরকার সেদিকে খেয়াল দেয়নি বরং মনে মনে এগুলোকে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। মজার বিষয় হচ্ছে, এখন দলের সিনিয়র নেতারাই তাদের এসব কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন এবং তা প্রচার মাধ্যমেও জায়গা করে নিচ্ছে। এমনকি অনেক অপ্রকাশিত সত্যও থলে থেকে বের হয়ে আসছে। বিশেষ করে ড. ইউনূসের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর দায়ভারও এখন ব্যক্তির পারিবারিক সম্পর্কের জের বলে প্রচারিত হচ্ছে। অথচ ড. ইউনূসকে খাটো করে কথা বলতে এবং কলমে আগুন ঝরাতে যারা রীতিমতো যুদ্ধে নেমেছিলেন তাদের তালিকাও অনেক বড়। এমনকি অনেক শক্তিশালী পত্রিকাকেও সে সময় ‘দেখি না কী হয়’ ধরনের ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছুদিন নিশ্চুপ থাকতে হয়েছিল।
যাই হোক, অপরদিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সারা দেশ যখন উত্তাল, তখন ঢাকা শহরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অনেক নেতাকর্মী নীরব ভূমিকা পালন করছিলেন, এমনকি কেউ কেউ সরকারের সঙ্গে আপস করতে পারেন এমন সন্দেহের তালিকায়ও ছিলেন। বিশেষ করে গ্রেফতার এড়ানোর ভয়ে দলীয় কার্যালয়ে যখন প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে একমাত্র রিজভী সাহেব ছাড়া অন্য কাউকে দেখা যায়নি, তখন খোদ বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে বলেছিলেন- ‘সারা দেশ উত্তাল, ফুঁসে উঠছে সর্বস্তরের মানুষ, ঢাকায় এই নীরবতা কেন? যারা মন্ত্রী, এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন সেই নেতারা কোথায়? কী তাদের ভূমিকা? ভীতু আর মোনাফেকদের জায়গা বিএনপিতে নয়।’ (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৪ নভেম্বর, ২০১৩)
উপরোল্লিখিত বিষয়টুকু তুলে ধরে যেটি উত্থাপন করার ইচ্ছা তা হচ্ছে, এদেশের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি দলে বা বিরোধী দলে নিজের প্রতিপত্তি, ক্ষমতা ও রাজ-রাজা ভাবটুকু অর্জনের জন্যই অনেক সুধীজনের আগমন ঘটে। সত্যিকার অর্থে জনমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করার মতো মানসিকতাসম্পন্ন নেতা বা কর্মীর সংখ্যা অতি নগণ্য। ভয়-বিপদ উপেক্ষা করে দল, দেশ ও জনগণের পক্ষে সংগ্রাম করার ধারা বিলুপ্ত প্রায়। বরং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ছুতায় ও হাতছানিতে দলছুটের রাজনীতি কখনও কখনও গোল্লাছুট খেলার মতোই রূপ ধারণ করে। এছাড়া আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের কোনো পূর্ব গুণ তৈরির ম্যাকানিজম নেই। সুষ্ঠু রাজনীতি এবং দক্ষ নেতা তৈরি করার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও আমরা তৈরি করিনি। নেতাদের ভিশন কী হওয়া উচিত, কিভাবে স্ট্র্যাটেজি নিয়ে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে হয়, তাও জানা নেই বেশিরভাগ রাজনীতিকের। সুযোগ বুঝে ভোল পাল্টানো আর নিজের ক্ষমতা, বিত্ত, কিভাবে ফুলে ফেঁপে উঠতে পারে সেটাই মুখ্য এবং সেই কর্মকাণ্ডেই এরা জড়িয়ে থাকে। এ মুহূর্তে বিএনপির রাজনীতিতে নিজেদের চাহিদাকে জয়যুক্ত করার কী কৌশল হওয়া উচিত দলের অনেক নেতাকর্মীরই তা জানা নেই। সেই ফাঁকফোকর ভাঙিয়েই নিজেদের কৌশল প্রয়োগ করছে সরকারি দল। এদেশে যে রাজনীতিকরা ভালো কিছু দিতে পারেন, তারা তাঁবেদারি করা লোকদের ঠেলাঠেলিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ে থাকেন এবং পরম সত্য কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করতে ভয় পান, পাছে তাদের আদব-কায়দা সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে বা দলীয় প্রধানের চক্ষুশূল হন। স্তু‘তি গাওয়া লোকদের ভিড়ে অনেক সময় সরকারপ্রধান বা বিরোধীদলীয় প্রধান সঠিক নেতৃত্বের পথ থেকে বিচ্যুত হন। পরিচালিত হন ভুল পথে। অন্যদিকে স্তুতি গাওয়া লোকেরা নিজ স্বার্থে দলীয় প্রধানদের চোখে কালো রুমাল বেঁধে দেয়। কালো পট্টি চোখে বেঁধে হাঁটলে গর্তে পড়া ছাড়া অন্য উপায় থাকে না। তাদের গর্তে রেখে লুটপাট, ধ্বংস, সন্ত্রাস, জমি দখল, ভূমি দখল চলতে চলতে যখন প্রধানদের বোধোদয় ঘটে তখন অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। তাই চাটুকার, তাঁবেদার ও স্তুতি গাওয়া নিজ স্বার্থবাদী দলীয় কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখা, কর্মীদের কর্মপরিধি নিয়ন্ত্রণ করা দলীয় প্রধানদের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে নেয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ তাদের কার্যকলাপের কালিমা প্রধানদের গায়েও লেপ্টে যায়।
এ থেকে মুক্ত হওয়ার একটি বিশেষ দিক নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল ভেবে দেখতে পারে। এর একটি উদাহরণ এরই মধ্যে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশকে উপহারও দিয়েছিলেন। তা হচ্ছে তিনি গণভবনে নিজ দলের সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে একটি আনন্দ মেলার আয়োজন করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে নিজেও গানের তালে তালে গান গেয়েছিলেন। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মতো আজব একটি দেশের সরকারপ্রধানের মাথায় যে চাপ বয়ে বেড়াতে হয়, স্বল্প সময়ের জন্য হলেও তিনি তখন সে চাপমুক্ত ছিলেন। মুক্ত চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারে এমন কিছু গণজমায়েত বা মেলা যদি কোনো দল দেশের সার্বিক পরিস্থিতিবিষয়ক করতে পারেন এবং সেখানে স্যাম্পল টেস্টিংয়ের মতো দেশের সর্বস্তরের লোকজনকে জায়গা দিয়ে তাদের সত্য কথা বলার অধিকার দেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তাহলে দেশ কোথায় চলছে এবং দেশকে কী দিতে হবে তা অকপটে জেনে যাবেন। বর্তমানে কনসোলিডেশনের যে যুগ চলছে (সংবাদ মাধ্যমে লেখালেখিতে, টকশোতে আলাপচারিতায়, মিডিয়ায় অংশগ্রহণ, সুশীল সমাজ ইত্যাদি) তা থেকে এ মেলা বা জনজমায়েতকে আলাদা রাখতে হবে। সিন্ডিকেটেড বা কনসোলিডেটেড বিজ্ঞদের বাইরেও আমাদের সমাজ ও দেশে অনেক মেধার ছড়াছড়ি আছে, যারা দেশের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অনেক কিছুর সঠিক পথ বাতলে দিতে পারবে। আমরাই দেখেছি আমাদের দাদি-নানি যারা খুব একটা বাইরে বের হতে পারতেন না তারাও বলতেন, ‘এমন যুগ আসবে, নখের মধ্যে মানুষের ছবি দেখা যাবে।’ আজকের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তাদের ধারণাকে খুব একটা বেশি অবজ্ঞা করতে পারে কি?
অন্যদিকে জনমনের চাওয়া ও তা শোনা শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সাজিয়ে রাখলে হবে না। ‘বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার’ এ ধারায় অথবা গ্রামের সেই পরাভূত কুস্তিগিরের মতো পা উপরে রেখে বলা যাবে না, ‘আমি হেরে গেছি তাতে হয়েছে কী, আমার পা তো উপরে ছিল।’ জনগণের ইচ্ছায় দেশকে চালাতে হবে। জনগণের রায়ের কাছে পরাভূত হওয়া মেনে নেয়া শিখতে হবে। এ মুহূর্তে একটা জনমত যাচাই সব দলই করতে পারছেন খুব সহজেই, তা হচ্ছে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন খুব বেশি কাম্য জনসাধারণের কাছে। কিন্তু জনগণের আকাক্সক্ষা উপেক্ষা করে রাজনীতিকরা নিজ নিজ স্বার্থে নেমেছেন ধ্বংসের হোলি খেলায়। বিরোধী দল বা সরকারি দল কারও দায়ভার কোনো অংশেই কম নয় এতে।

রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো সুযোগ আছে কি? by বিভুরঞ্জন সরকার

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ ডিসেম্বর, ২০১৩। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করার সময় ৫ ও ৬ ডিসেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৩ ডিসেম্বর। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ আরও কিছু ছোট রাজনৈতিক দল এই তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে। বলা হচ্ছে, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে নির্বাচন ইস্যুতে কোনো সমঝোতা হওয়ার আগেই এই তফসিল ঘোষণা করায় দেশের রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়বে। বিএনপিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার পরিকল্পনা থেকেই এভাবে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা হলে নির্বাচনের তফসিল পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, সমঝোতা প্রতিষ্ঠার আদৌ কোনো সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে কি? বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য কিছু নেপথ্য উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো তথ্য কারও কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছে। অবশ্য এ আন্দোলনের কারণে সরকারের অবস্থান বা মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি, হবে এমন কোনো সম্ভাবনাও দেখা যায় না। অথচ বিরোধী দল বারবার বলে আসছে, আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর এখন অনেকেই আর মনে করছেন না বিএনপি দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে। তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ২৬ নভেম্বর থেকে সারা দেশে ৭১ ঘণ্টার রাজপথ, রেলপথ, নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি পালন করেছে। ব্যাপক সহিংসতা ও নাশকতার মধ্য দিয়ে এই অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। অবরোধের সময় কুমিল্লায় এক বিজিবি সদস্যসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ২০ জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে যেমন আওয়ামী লীগ সমর্থক আছেন, তেমনি বিএনপি-জামায়াত সমর্থকও আছেন, আছেন দল করেন না এমন সাধারণ মানুষও। অবরোধের সময় সারা দেশ ‘অচল’ করা সম্ভব না হলেও রেল যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত করতে বেশ কয়েকটি স্থানে রেললাইনে অগ্নিসংযোগ, ফিসপ্লেট খুলে ফেলার মতো নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। কয়েক জায়গায় রেলের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও আহত হয়েছেন অনেকেই। অবরোধের সময় সড়ক ও রেলপথে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ না করে যে রকম হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়েছেন তাতে যাত্রী ছাড়াও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের নিরাপদ চলাচলে এভাবে বিঘ্ন ঘটিয়ে বিরোধী দল যে আন্দোলন করছে, তার প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন আছে কি-না সেটা অবশ্য আন্দোলনকারীরা একেবারেই বিবেচনায় নিচ্ছেন না। বরং এটাই বলা হচ্ছে যে, বিরোধী দলের দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা বহাল থাকলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। এরই মধ্যে যে হরতাল-অবরোধ হয়েছে, তাতে যে পরিমাণ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, আরও ‘কঠোর’ কর্মসূচি দিলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে তা ভাবলে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। মানুষ এ ধরনের আন্দোলন চায় না। চাপিয়ে দেয়া আন্দোলনের মাধ্যমে বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করতে চায় সে প্রশ্ন দেখা দেয়াই স্বাভাবিক।
সন্ত্রাস-সহিংসতা চালিয়ে রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যতিব্যস্ত রাখা যায় কিন্তু পর্যুদস্ত কিংবা পরাজিত করা যায় না। তাই আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালিয়ে বিএনপি তাদের জনসমর্থন ধরে রাখতে পারবে বলে যদি মনে করে থাকে, তাহলে তাদের এই মনে করা খুব দ্রুতই ভুল বলে প্রমাণিত হতে পারে। নির্বাচনে অংশ নেয়াই বরং বিএনপির জন্য অধিক লাভজনক হতে পারে। বিএনপিকে বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চায় বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা যদি সত্যও হয়ে থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের এই পরিকল্পনা ব্যর্থ করার জন্য নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোনো বিকল্প আছে কি? বিএনপি এবং অন্যসব রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ পাবে না। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করলে সেই নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, এটা একেবারেই অনুমাননির্ভর কথা। নির্বাচনে সব দল অংশ নিলে যদি নির্বাচনের ফলাফল ছিনতাই করার অপচেষ্টা চালানো হয় তাহলে তখন দেশবাসীকে নিয়ে আন্দোলন করা যত সহজ হবে, এখন কিন্তু তত সহজ হচ্ছে না। এখন মানুষের সামনে কারচুপির প্রমাণ নেই। তাই বিরোধী দলের আন্দোলনে মানুষ সেভাবে সাড়া দিচ্ছে না। কিন্তু মানুষ যখন দেখবে তারা যে প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে সে প্রার্থীর বদলে অন্য প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হচ্ছে, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রতিবাদী হয়ে উঠবে। তখন সমগ্র পরিস্থিতিই যাবে বিরোধী দলের অনুকূলে।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে না বলে যে প্রচারণা চালানো হয় তার আরেকটি ত্র“টির দিক হল, সরকার নির্বাচন পরিচালনা করে না। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সে জন্যই একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার চেয়ে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারেই অধিক গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিরোধী দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যতটা সময় ও শক্তি ব্যয় করেছে, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে তার তিলাংশও করেনি। বিরোধী দলের আন্দোলন সাফল্যের মুখ দেখতে ব্যর্থ হওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে। প্রসঙ্গত এ প্রশ্নও অনেকের মনেই দেখা দিচ্ছে যে, দলীয় সমর্থকরা খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন’ নেত্রী বলে সম্বোধন করলেও তার নেতৃত্বে দেশে কোনো সফল গণআন্দোলনের নজির আছে কি? বিএনপি নেতারা নিজেরা যাই দাবি করুন না কেন, বাস্তব এটাই যে তারা কোনো সফল গণআন্দোলনের রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারেননি। এই বাস্তবতা মনে রেখে বিএনপি নেতৃত্ব যদি নির্বাচনের প্রশ্নে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সুফল ঘরে তোলার সুযোগ হয়তো তারা পেতেও পারেন। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে তাদের ‘মুখ’ থাকবে না বলে যদি মনে করা হয় তাহলে ভুল হবে। রাজনীতিতে পরিণতিটাই আসল কথা। নির্বাচন বর্জন করে যদি ক্ষতি বেশি হয়, আর অংশ নিয়ে যদি লাভ বেশি হয় তাহলে অংশ নেয়াটাই হবে বিচক্ষণতার পরিচায়ক। বিএনপি নেতৃত্বের কাছ থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশের মানুষ বিচক্ষণতাই প্রত্যাশা করে। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আওয়ামী লীগের গায়ে একটি ‘একতরফা’ নির্বাচনের কলংকচিহ্ন এঁটে দিয়ে বিএনপি যে লাভের আশা এখন করছে, নির্বাচনে যদি শেষ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং শতকরা ৫০-৫৫ ভাগ ভোটার ভোট দেন, তাহলে কিন্তু বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বড় লোকসান গুনতে হতে পারে।
দুই
২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন দেশে বিশিষ্ট ছয় নাগরিক। তারা হলেন- ড. কামাল হোসেন, ড. আকবর আলি খান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. বদিউল আলম মজুমদার, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এবং ড. শাহদীন মালিক। তারা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন, দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে দেশবাসী গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা দেশের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে (নির্দিষ্ট সময়ে কোনো কারণে নির্বাচন না হলেও যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে সে কথা কি তারা বলেছেন?)। উৎকণ্ঠিত ছয় বিশিষ্ট নাগরিককে রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালনে তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে থেকেই তিনি প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রপতির কাছে এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের একটি প্রতিনিধি দলও সাক্ষাৎ করে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে তার উদ্যোগ কামনা করেছিলেন। তখনও মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি জাতির অভিভাবক। তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকলেও সংকট সমাধানে তার একটি নৈতিক ক্ষমতা আছে বলে অনেকেই মনে করেন। সম্ভবত তার নৈতিক ক্ষমতার ওপর আস্থা রেখেই দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে ভূমিকা পালনে তার উদ্যোগ প্রত্যাশা করে তার কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়াও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ছুটে গেছেন। কিন্তু প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট এতই প্রবল যে রাষ্ট্রপতির কোনো উদ্যোগ বরফ গলানোর ক্ষেত্রে আদৌ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে মনে করতেও সংশয় জাগে। রাষ্ট্রপতি তার বিবেচনায় যেটা ভালো মনে করবেন, সেটা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কি মানবে? রাষ্ট্রপতি যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরামর্শ দেন, তাহলে বিএনপি কি নির্বাচনে অংশ নেবে? আবার বিরোধী দলের মুখ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রপতি যদি শেখ হাসিনাকে ‘সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের’ পরামর্শ দেন, সেটাও কি এখন আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দুই দল যখন সামান্য ছাড় দিতে আগ্রহী নয়, তখন রাষ্ট্রপতির কাছে ধরনা দিয়ে তাকে উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ জানালে সেটা তার জন্য স্বস্তিদায়ক হয় কি-না এটা সংশ্লিষ্ট সবারই বিবেচনায় রাখা দরকার। রাষ্ট্রপতির মর্যাদা যাতে দেশের মানুষের কাছে ক্ষুণ্ন না হয়, তার প্রতি সবার সম্মান যেন অব্যাহত থাকে সেটা নিশ্চিত করার স্বার্থেই তার কাছে এমন আবদার নিয়ে বারবার যাওয়া উচিত নয়, যে আবদার রক্ষা করার আইনি ক্ষমতা তার নেই। মানুষের মনে কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি হয় এমন কোনো কিছু করা থেকে বিরত থাকা বর্তমান সময়ে খুবই জরুরি।
জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণের একটি লাইন উদ্ধৃত করেই আজকের লেখাটি শেষ করছি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘দেশবাসীর শান্তির জন্য গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে আপনারা সমঝোতায় আসুন। দেশবাসীর কল্যাণের ওপর আর কিছুই প্রাধান্য পেতে পারে না।’
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক, কলাম লেখক

জলবায়ু সম্মেলন : প্রত্যাশা বনাম প্রাপ্তি by কামরুল ইসলাম চৌধুরী

প্রত্যাশার তুলনায় ওয়ারশ জলবায়ু সম্মেলনে প্রাপ্তি কম নয়। ওয়ারশ জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ুতাড়িত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চালু হল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু দূত টড স্টার্ন, যুক্তরাজ্যের জলবায়ু প্রতিনিধি বেন লিওন আর ফরাসি জলবায়ু প্রতিনিধি পল তাদের কথা রেখেছেন। স্বল্পোন্নত আর দ্বীপ রাষ্ট্রসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থে ছাড় দিয়েছেন। জলবায়ুবিষয়ক ১৯তম সম্মেলনের একেবারে শেষ মুহূর্তে ২৩ নভেম্বর অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি মোকাবেলায় একটি সমঝোতায় উপনীত হয়েছেন। সম্মেলনের শেষ ভাগে আলোচনায় টানা ৩০ ঘণ্টার অচলাবস্থার পর বিবদমান পক্ষগুলো একটি নয়া বিশ্ব জলবায়ু চুক্তির পথনির্দেশ অনুমোদন করে। এর আগে এই পথনির্দেশ প্রশ্নে সম্মেলন একদিন বেড়ে ২৩ নভেম্বর রাত পর্যন্ত গড়ায়। পথনকশার মূল বিষয়গুলো নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছতে এই বাড়তি সময়ে জোর চেষ্টা চালান মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা। ১৯৯৭ সালে প্রণীত কিয়োটো প্রটোকলের পর বহু কাক্সিক্ষত নতুন এই চুক্তি ২০১৫ সালে রাজধানী ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠেয় ২১তম সম্মেলনে সইয়ের কথা রয়েছে।
সম্মেলন যখন প্রায় ভেস্তে যাওয়ার মুহূর্তে, তখন সম্মেলনের সভাপতি পোল্যান্ডের পরিবেশমন্ত্রী মারসিন করোলেক সম্মেলনে যোগ দেয়া মন্ত্রী ও প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, ‘ওয়ারশে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি (খসড়া প্রণয়ন) গ্রহণ এবং চূড়ান্ত না করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্কভাবে বিবেচনার জন্য আমি আপনাদের অনুরোধ করছি।’ তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হবে না।
সভাপতির সেই আহ্বানের পর সম্মেলনে অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশসহ আমরা কিছু উন্নয়নশীল রাষ্ট্র অসন্তুষ্টির কথা তুলে ধরি। জলবায়ু সনদের মূল শব্দগুচ্ছ ‘আলটিমেট অবজেকটিভ’ থেকে আলটিমেট খসড়ায় বাদ দেয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করে বলি, ২১ বছর ধরে আমরা জাতিসংঘ জলবায়ু সনদ আলোচনায় হাজার হাজারবার এ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছি। তাপমাত্রা দুই থেকে দেড় ডিগ্রির নিচে নামিয়ে আনার জরুরি বার্তা বারবার দিয়েছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কিছু দায়ী দেশের কারণে আমাদের মতো হারিকেন, সিডর, আইলা, মহাসেন, টাইফুন হাইয়ান বিধ্বস্ত দেশগুলো বারবার মার খেয়েই যাবে।
বৈশ্বিক উষ্ণতার হার নিজ নিজ অবস্থান থেকে গড়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মূলত ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর এই লক্ষ্য পূরণে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় প্যারিস সম্মেলনে চুক্তি সইয়ের কথাও রয়েছে। এ চুক্তি সইয়ের পর ২০২০ সালের মধ্যে তা কার্যকরও হওয়ার কথা।
ধনী ও দরিদ্র দেশগুলো কী পরিমাণ কার্বন নির্গমন কমাবে এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তহবিল সরবরাহ প্রশ্নে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিনিধিরা শুরু থেকেই তর্কে জড়ান। ৭৭ জাতি-গোষ্ঠী ও চীনের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মাধ্যমে পরিবেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে, অতএব তাদেরই সবচেয়ে বেশি হারে কার্বন নির্গমন কমাতে হবে। অন্যদিকে পশ্চিমাদের যুক্তি, চীন ও ভারতের মতো দ্রুত উদীয়মান দেশগুলো পরিবেশের ক্ষতি করছে বেশি। অতএব কার্বন নির্গমন হ্রাসেও তাদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে। অন্যদিকে তহবিল সরবরাহের বিষয়টিও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। তবে ক্রান্তীয় বনাঞ্চল রক্ষা-সংক্রান্ত একটি নতুন আইনে সম্মত হয়েছে সব পক্ষই। পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে এই বনাঞ্চলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া গাছ পচে গেলে কিংবা কেটে ফেললেও পরিবেশে কার্বন নির্গমন হয়।
২০১৫ সালের সম্ভাব্য জলবায়ু চুক্তির কয়েকটি বিষয়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ঐকমত্য হয়েছে। ১১ নভেম্বর এ সম্মেলন শুরু হয়। এতে ১৯৪টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে ক্ষতিকর কার্বন নির্গমনের দায়ভার গ্রহণ নিয়ে ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে মতানৈক্যের কারণে কোনো চুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি জাতিসংঘের সমঝোতাকারীরা। ধনী ও দরিদ্র দেশগুলো কী পরিমাণ কার্বন নির্গমন কমাবে এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তহবিল সরবরাহের প্রশ্নে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ঠেকাতে ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক চুক্তির এখনই একটি পথনকশা চায় উন্নয়নশীল দেশগুলো। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) উন্নত বিশ্ব এবং দ্রুত উন্নয়নশীল বেশ কয়েকটি দেশের নানা বাধায় অগ্রগতি থমকে থাকে। দু’পক্ষের মধ্যে প্রায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো সমঝোতা না হওয়ায় ওয়ারশ জলবায়ু সম্মেলনেও দেখা দেয় অচলাবস্থা।
একই ইস্যুতে সম্মেলনের শুরুতেও দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধের কারণে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত এবারও অনিষ্পন্নই রয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়। গত জুনে দু’সপ্তাহ ধরে আলোচনা চালিয়েও তেমন আশার আলো দেখা দেয়নি। বরং বাস্তবায়ন আর বৈজ্ঞানিক ও কারিগরিক আলোচনা রাশিয়া, ইউক্রেন আর বেলারুশের পদ্ধতিগত আপত্তির কারণে থমকে যায়। সেই অচলাবস্থার রেশ কাটিয়ে ওয়ারশ সম্মেলনের শুরু থেকেই দিনরাত লাগাতার আলোচনা, দরকষাকষি চলে। অতীতে কখনও জলবায়ু সম্মেলনের প্রথম দিন থেকেই এমন টানা নেগোসিয়েশন চলেনি।
শিল্পোন্নত ধনী আর উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিদের তীব্র বাদানুবাদের পর মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা একমত হন, প্রত্যাশিত প্যারিস চুক্তির জন্য আগেভাগেই জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় একটি আইনগত বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন। এছাড়া ক্ষতিকর কার্বন গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে তারা একমত হন।

এটা কি সিইসির স্ববিরোধিতা নয়? by বদিউর রহমান

বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে আমি আজতক কিছুই লিখিনি বলা চলে। লিখবই বা কেন, কমিশন যে রাষ্ট্রপতির সার্চ কমিটির মাধ্যমে যোগ্যতর ব্যক্তিদের নিয়েই গঠিত, না কি? তারপরও বিভিন্ন জন, রাজনৈতিক দলের কথা না হয় বাদই দিলাম, এ কমিশনকে মাঝেমধ্যেই একহাত নিতে ছাড়েন না। বিরোধী দল বাজাদ তো রকিব কমিশনকে অথর্ব, মেরুদণ্ডহীন বলেই থাকে। কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছেন শোনার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে আনন্দিত যেমন হয়েছিলাম, তেমনি হতাশও হয়েছিলাম। আনন্দিত হয়েছিলাম এজন্য যে আমি তাকে যতটুকু জানি সে হিসেবে তিনি সৎ, বেশ লেখাপড়াও জানেন, ধীরস্থির, ছাত্রজীবনে তো মেধাবী ছিলেনই, কর্মজীবনেও পাকিস্তানি তিন অক্ষরী সাহেব ছিলেন। অফিসের কাজে তিনি মনোযোগী ছিলেন, দায়িত্ব পালনে খুবই সচেতন ছিলেন। সহকর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্কও ভালো ছিল, সর্বোপরি ঊর্ধ্বতনদের বেশ প্রিয় ছিলেন। সচিব হিসেবেও তিনি আহামরি কিছু না হলেও সুনামের সঙ্গেই চাকরি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু তার জাত-ভাইদের মতো ঠিকাদারি তথা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তিনিও পছন্দ করেছেন। সরকারের অনেক সচিবই অবসরের পর আবার কোনো-না-কোনো কাজে জড়িয়ে পড়েন; কেউ বলেন সময় কাটানোর জন্য, কেউ বা বলেন অর্থ উপার্জনের জন্য। তবে সচিব পদের পর তাদের পরবর্তী কর্মপদ সম্মানজনক বা মানানসই কিনা সেটা অনেকেই বাছবিচার করেন না। যারা এসব বাছবিচার করেন না তারা একদিকে কিন্তু ভালো, তারা সচিব পদটাকেও একটা চাকরি ভাবতেন, পরের চাকরিকে তা-ই ভাবেন। পাকিস্তানের এক প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা নাকি পরে হোটেলেও চাকরি করেছেন, আমাদের এক রাষ্ট্রপতিও নাকি পরে নিু কোনো পদের নির্বাচন করেছেন; অতএব কোনো সচিব যদি চাকরিরত অবস্থায়ই সচিব পদ থেকে ইকোনমিক মিনিস্টার পদে যান সাবেক (খাদ্য সচিব বরুনমিত্র), কোনো অবসরপ্রাপ্ত সচিব যদি পৃথিবী গোল বিবেচনায় আবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি হন (এজেডএম সামসুল আলম), কিংবা অন্য কোনো সচিব যদি কোনো হাউজিং কোম্পানির এমডি হন অথবা কোনো সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবও যদি কোনো এনজিওতে চাকরি করেন, তাহলে তাদের দোষ দেবেন কেন? চাকরি তো চাকরিই, টাকা পেলেই হল, একটা গাড়ি পেলেই হল, বেকার তো আর থাকলাম না, কী বলেন? কত ডজন ডজন সচিব রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, কার খোঁজ কে রাখে? সেদিক বিবেচনায় রকিব সাহেব সরকারি চাকরির পর শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সম্মানজনক কাজেই জড়িত ছিলেন মর্মে শুনেছি। আমার ভালো লেগেছে।
কিন্তু তার সিইসি নিয়োগে হতাশ হয়েছিলাম এজন্য যে, সিইসির মতো দায়িত্ব, অন্তত আমাদের দেশে, পালনের জন্য যে সাহস প্রয়োজন তা তার ছিল বলে আমরা মনে করিনি। শুধু জ্ঞানী আর ভদ্রলোক হলেই কিন্তু সব হয় না, পদ-বিশেষে কোনো কোনো পদে একটু কম জ্ঞানী হলেও সাহসী মানুষ বেশি উপযুক্ত বটে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালনে তৎপরতা, ঊর্ধ্বতনদের প্রিয় হওয়া চাকরির বেলায় খুব প্রযোজ্য হয়তো হতে পারে, নিজের ভবিষ্যৎ তরক্কির জন্যও হয়তো এটা সুবিবেচ্য হতে পারে, বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন পাওয়ার জন্য তো এটা নির্ঘাত ভালো গুণ। কিন্তু সাংবিধানিক বড় গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য এসব গুণের চেয়ে সাহসের, বরং সৎ সাহসের একটা শক্ত অবস্থান বড় বেশি প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন এবং একটা নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি সৃষ্টিতে বর্তমান কমিশন যে সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারেনি, তা আমাকে অকপটে স্বীকার করতেই হচ্ছে। কমিশনের বেশ কিছু কার্যকলাপ কমিশনকে বিতর্কিত করেছে, দুর্বল প্রমাণ করেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিশনকে বড় (বাধংরাব) মনে হয়েছে। রাজনৈতিক একটা নাজুক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে নেতিবাচক কিছু লিখে প্রতিষ্ঠানটিকে ছোট করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না বলেই আগে কয়েকবার লিখতে গিয়েও লিখিনি, যাতে নাচুনে বুড়ি আবার যেন ঢোলের বাড়ি না পায়। এমনিতেই সাবেক এক নির্বাচন কমিশনার প্রায়ই এবং সাবেক এক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ক্ষণে ক্ষণে যেভাবে এ কমিশনের কড়া সমালোচনা করেন, তাতেই বিএনপির পোয়া বারো, তার ওপর আবার আমরাও যদি কমিশনের ভুলভ্রান্তি এবং অদক্ষতা নিয়ে চিৎকার শুরু করি তাহলে অবস্থাটা কি ভালো ঠেকবে? তা-ই একবার প্রায় লিখতে গিয়ে কমিশনের এক কর্তাব্যক্তির সঙ্গে কিছু বিষয়ে শেয়ার করেও পরে থেমে যাই। উদ্দেশ্য, কমিশন নির্বাচনটা সুন্দরভাবে করে দিক। পাঁচ সিটির নির্বাচনে কমিশন শুনামও কুড়িয়েছে বটে।
বর্তমান কমিশনের পাঁচজনের মধ্যে সিইসিসহ তিনজনকে অন্তত আমি জানি, চিনি। তাদের কর্মদক্ষতা এবং সুনাম সম্বন্ধেও আমি অবগত। কিন্তু সার্বিকভাবে তাদের কর্মকাণ্ড কমিশনের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক তো হয়ইনি, বরং কমাতে সহায়ক হয়েছে বলা চলে। সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ সম্পর্কিত এক বৈঠকে সংশ্লিষ্ট আসনের একজন ভোটার হিসেবে আপত্তি নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় আমিও অংশগ্রহণ করেছিলাম এবং বক্তব্য রেখেছিলাম। কমিশনের প্রস্তাবিত সীমানা পুনঃনির্ধারণের কিছু বিষয় আমার কাছে কমিশনের নীতিমালার আলোকেই অপ্রয়োজনীয় এবং অনভিপ্রেত ঠেকেছে। পূর্বে সীমানা যদি প্রতিষ্ঠিত নীতিমালায় যথাযথ থেকে থাকে, তাহলে নতুন একটা কিছু করার অপ্রয়োজনীয়-পরিবর্তন ভালো ফল আনে না। শুনানির পর ফের পূর্বাবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে গেলেও কোনো কোনো পরিবর্তন অযৌক্তিক এবং মনগড়া ঠেকেছে। ঢাকা-১৪ আসনের সঙ্গে সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নকে যুক্ত করা নিয়ে যার পর নাই সমালোচনা হয়েছে। এমনও শোনা গেল যে, কোনো এক কমিশনারের ব্যক্তিগত ইচ্ছায় নাকি তা হয়েছে। বড়ই দুঃখজনক বটে। অথচ কাউন্দিয়া ইউনিয়ন এ আসনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কোনোই গ্রহণযোগ্য যুক্তি নেই, সীমানা নির্ধারণের বিবেচ্য অনুষঙ্গগুলোর আলোকেও কোনো ভিত্তি নেই। তখন আমার মনে হয়েছে, কমিশন গায়ে পড়ে ঝামেলা সৃষ্টি করছে। আবার কমিশনের এক ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পক্ষে (যদিও পরে সমালোচনার কারণে আর হয়নি) দেয়া উদ্ভট যুক্তি হাস্যকরই হয়েছিল যেন। সর্বশেষ এক আইনি সংশোধনেও কমিশনকে যেন নীরব ভূমিকায় থাকতে দেখা গেল। ফলে মনোনয়ন জমা দেয়ার একদিন আগে কোনো দলের সদস্য হয়েও সে দলের প্রার্থী হতে আর বাধা থাকল না। বড় চমৎকার না, সত্যি গণতন্ত্র বলে কথা যে!
আজ নির্বাচন কমিশন নিয়ে লিখতে গিয়ে আমাদের ছোট্ট বেলায় পাকিস্তান আমলের রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান নিয়ে করা এক মশকরার কথা মনে পড়ল। এক বাচ্চা নাকি কী জন্য রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন হরেক কৌশল করেও তাকে কথা বলাতে পারছে না। সবাই বড় দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল, না জানি বাচ্চাটার জবানই বন্ধ হয়ে গেছে। ডাক্তার ডাকা হয় আর কী! লোভ-লালসা, খেলনা-খাবার-কিছুতেই কোনো কাজ হচ্ছিল না। তখন এক মুরব্বি বললেন, তিনি বাচ্চাকে কথা বলাতে পারবেন। সবাই তো অবাক, বলে কী! হাতি-ঘোড়া গেল তল, গাধা বলে কত জল- অবস্থা যেন। তিনি বাচ্চার কানে কানে গিয়ে বললেন, রেডিও পাকিস্তানের কিছুক্ষণ পরের অনুষ্ঠানটা তোমার খুব ভালো লাগবে। একটা রেডিও আনা হয়েছে। অমনি বাচ্চা নাকি চিৎকার করে ‘না, না, আমি শুনব না’ বলে উঠল। হুবহু বলতে না পারলেও মশকরাটা এ রকমই- রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান বাচ্চাও নাকি অপছন্দ করত। এখন পাঠক জানতে চাইতে পারেন- সিইসির সঙ্গে এ মশকরা-গল্পের সম্পর্ক কোথায়। উত্তরে আমি বলব, আমি তো নির্বাচন কমিশন নিয়ে লিখতেই চাইছিলাম না, যত ভুলভ্রান্তি ও অপক্বতার পরিচয়ই কমিশন দিয়ে থাকুক না কেন। ‘সব ভালো যার শেষ ভালো’ নীতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর, সবার অংশগ্রহণে বিশ্বাসযোগ্য করে দিতে পারলেই হল। সে আশায় বুক বেঁধেই তো চুপ করে ছিলাম। তফসিল ঘোষণার আগের দিনও যখন সিইসি বললেন, তারাও সমঝোতার জন্য সময় দিতে আগ্রহী, তখন তো আমরা আশার আলোই দেখেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ এমন কী ঘটল যে, সিইসির ওই বক্তব্যের পর একদিনও না যেতে তার তফসিল ঘোষণা!
এই-ই যদি হবে, আগের দিন ভিন্ন কথা কেন তবে? অন্তত আরও দু-চারটা দিন অপেক্ষা করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় এ তফসিল ঘোষণা তার অবশ্য কর্তব্য বটে। কিন্তু তিনি নিজে যে-কথা বললেন তা কেন রাখলেন না? তিনি কি কোনো চাপে ছিলেন? থাকলেও তো তার নিজের কথা ঠিক রাখা তার আরও বড় কর্তব্য ছিল, না কি? আগে তিনি বা তার কমিশন যা-ই করেছেন, কমিশনের ভাবমূর্তি তুলনামূলকভাবে যত সমালোচনার মুখেই ফেলেছেন, সবই আমরা হজম করেছি বড় পাওনার আশায়। অবশ্যই এটা মানব যে, বিএনপি সমঝোতায় না এলে তিনি তফসিল সময়মতো ঘোষণা করতেই পারতেন। কিন্তু একটু সমঝোতার সুযোগ দেয়ার কথা বলে তা থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরে আসা তাকে, তার কমিশনকে বড় বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদি সমঝোতার চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেও তিনি বা কমিশন এটা করে থাকেন, যদি প্রয়োজনে তফসিল আবার পেছানোর ইচ্ছা নিয়েও এটা করে থাকেন, যদি সময়ের নিরাপদ অবস্থানে থাকার কৌশলেও এটা করা হয়ে থাকে, তবুও বলব ওয়াদা দিয়ে, সময় দেয়ার ইঙ্গিত প্রকাশ্য ঘোষণায় বলে এমন পশ্চাদপসারণ তার এবং কমিশনের সদিচ্ছাকে, ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, বিশ্বাসযোগ্যতাকে খাটো করেছে। এতে আমার হতাশার প্রমাণ মিলল বটে। এখন অন্তত আশা করি, তিনি বাকি কাজগুলো অবশ্যই বুঝে-শুনে ভালোভাবে করবেন, যাতে আর কোনো হতাশা আমাদের না হয়।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

তবু বিএনপি নির্বাচনে আসুক

বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ কয়েকজন। রাজনীতির
নামে এই সহিংসতা আর কত দিন?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাল্ফ ডরেনডর্ফ লিখেছেন, গণতন্ত্র হলো জনগণের কণ্ঠস্বর; যারা প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ গণতন্ত্র হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। আমাদের সংবিধানেও জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক বলে উল্লিখিত। ডরেনডর্ফ গণতন্ত্রের তিনটি পূর্বশর্তের কথা বলেছেন: এক. সহিংসতা ছাড়া সমাজে পরিবর্তন আনা, দুই. এটি হলো এমন এক ব্যবস্থা, যার দ্বারা ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায়, ক্ষমতাসীনেরা যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে, তাদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা এবং ক্ষমতা প্রয়োগে সব নাগরিকের ভূমিকা নিশ্চিত করা। ক্ষমতা প্রয়োগে সব নাগরিকের ভূমিকা নিশ্চিত করার উপায় হলো নির্বাচন। নির্বাচন মানে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও পরিচ্ছন্ন বাছাই প্রক্রিয়া। শাসনতান্ত্রিক গণতন্ত্রকে আমরা অনেক আগেই বিদায় দিয়েছি। এখন নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রকেও নির্বাসনে পাঠানোর আয়োজন চলছে। এ দায় কে নেবে—সরকার, বিরোধী দল, নাকি উভয়েই? গণতন্ত্রের লক্ষ্য যদি হয় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও সুস্থ কর্মসম্পর্ক, গণতন্ত্রের লক্ষ্য যদি হয় জাতীয় সংসদকে সচল ও সজীব রাখা, গণতন্ত্রের লক্ষ্য যদি হয় সব সন্দেহ ও অবিশ্বাস পেছনে ফেলে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা, গণতন্ত্রের লক্ষ্য যদি হয় রাষ্ট্রের মূল তিন স্তম্ভ নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভাকে পৃথক সত্তা স্বীকার করে নেওয়া এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া, তাহলে বলতে হবে, আমাদের দেশে সেই গণতন্ত্র কখনোই ছিল না, এখনো নেই, অদূর ভবিষ্যতে হবে কি না বলা কঠিন।
দুই গণতন্ত্রের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর। গত ৪২ বছরেও আমরা সেই ব্যবস্থা করতে পারিনি। প্রতিবারই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে একটি রক্তাক্ত অধ্যায় তথা প্রচুর প্রাণহানির মধ্য দিয়ে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এসব রক্তাক্ত অধ্যায় ও তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাঁরা ক্ষমতায় আসেন, তাঁরা অতীত থেকে শিক্ষা নেন না। বরং পরবর্তী রক্তাক্ত অধ্যায়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। অন্যদিকে বিরোধী দলও নির্বাচনের পরাজয় সহজে মেনে নিতে পারে না। মনে করে, তাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ও ২০০৮ সালে বিএনপি নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি লক্ষ করুন। আসলে নিজেকে ক্ষমতার বাইরে দেখতে না পারার মানসিকতাই আমাদের গণতন্ত্রের বড় দুর্বলতা। যাঁরা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারটিকে মনের মতো সাজিয়েছিলেন, আর যাঁরা আদালতের দোহাই দিয়ে বাতিল করেছেন, তাঁদের উভয়ের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। ক্ষমতার বাইরে থাকা যাবে না। বিএনপি সেই কূটকৌশলে জয়ী হতে পারেনি, তবে আওয়ামী লীগ পারবে কি? বর্তমানে দেশে নির্বাচন বা আন্দোলনের নামে যা চলছে, তা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনীতি নয়। ক্ষমতাসীন দল ও জোট বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে যেনতেন প্রকারে একটি নির্বাচন করে ফেলতে চায়। তাদের ভয়, বিরোধী দলের দাবি মানলে পরাজয় অনিবার্য। আর বিরোধী দল মনে করে, যেহেতু বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করে বিজয়ী হওয়া যাবে না, তাই সেই নির্বাচন ঠেকাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। এবং করছেও। তারা হরতাল-অবরোধ করে দেশ অচল করে দিতে চাইছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি থাকলে তাতে আপত্তির কিছু ছিল না।
কিন্তু হরতাল-অবরোধের নামে যখন আগুনে গাড়ি পুড়িয়ে, ভাঙচুর করে, রেলওয়ের ফিশপ্লেট খুলে এবং স্লিপার উপড়ে মানুষ হত্যা করা হয়, জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করা হয়, তখন আর সেটি রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকে না। হয়ে পড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আবার বিরোধী দলের কথিত নৈরাজ্য বন্ধে সরকার যে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, গয়রহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠাচ্ছে, রিমান্ডে নিচ্ছে, তা-ও গণতান্ত্রিক শাসনের পরিপন্থী। বিজয়ের জন্য শয়তানের সঙ্গে সখ্য করতেও এই দুই দলের বাধে না। সরকারি দলের সঙ্গে এরশাদের এবং বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের গাঁটছড়া বাঁধাই এর বড় প্রমাণ। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ বিচলিত ও বিপন্ন বোধ করছে। উদ্বিগ্ন বিশ্ব সম্প্রদায়ও। জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত হয়ে সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে আসছেন। ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী ব্যারোনেস সাইদা ওয়ারসি আসছেন ১২ ডিসেম্বর। তাঁরা আগেও এসেছিলেন। ৪ ডিসেম্বর আসছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং। তাঁদের সবার উদ্বেগ বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে। কিন্তু আমাদের নেতা-নেত্রীদের মধ্যে উদ্বেগের লেশমাত্র নেই। তাঁরা নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। সর্বনাশের গিরিখাতে দাঁড়িয়েও তাঁরা যুদ্ধের হুংকার ছুড়ছেন।
তিন পত্রিকান্তরের খবরে জানা যায়, বিএনপির পক্ষ থেকে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে আছে এক. শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না। তাঁর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার বা কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে, স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দিতে হবে। দুই. বর্তমান নির্বাচন কমিশন ভেঙে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন করতে হবে। তিন. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ জনপ্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। চার. বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নির্বিঘ্নে দেশে ফিরে আসতে দিতে হবে এবং নেতা-কর্মীদের মামলা প্রত্যাহারসহ মুক্তি দিতে হবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে বিএনপি এসব দাবির কথা বললেও তাদের মূল দাবি শেখ হাসিনার বদলে অন্য কাউকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান করা। সর্বশেষ তারা শেখ হাসিনাকেও নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মানতে রাজি আছেন, যদি তাঁর একক কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা খর্ব করা হয়। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন সে রকম ইঙ্গিতই দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে ছয় বিশিষ্ট নাগরিকও আপস রফা হিসেবেও একই কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলটির কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তারা বলছে, বিএনপি নীতিগতভাবে সংবিধানের আওতায় সমাধানের ব্যাপারে রাজি হলে অন্যান্য বিষয় আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা যাবে। বিরোধী দল বাইরে গরম দেখালেও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তারা মুখ রক্ষার জন্য একটা কিছু চাইছে। কিন্তু সরকারি দল মনে হচ্ছে, তাতেও রাজি নয়। বিরোধী দল নির্বাচনে না এলেই তারা বরং খুশি।
নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিযোগী সরকারি দল ও বিরোধী দল। আর রেফারির ভূমিকায় থাকে নির্বাচন কমিশন।এখন দুই প্রতিযোগীর একজন অনুপস্থিত থাকলে সেটি খেলা হবে না এবং রেফারিরও প্রয়োজন পড়বে না। নির্বাচন মানেই সবাইকে নিয়ে নির্বাচন। নির্বাচন মানেই বাছাইয়ের সমান সুযোগ। নির্বাচন মানেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। এখন সেই কাজটি করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরাও দাবি করে আসছেন, ক্ষমতাসীন দল ও জোট বিএনপিকে বাইরে রেখেই একতরফা নির্বাচন করার চক্রান্ত আঁটছে। তাহলে বিএনপির করণীয় কী? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। বিএনপি যে পদ্ধতিতে আন্দোলন করছে, তাতে জনসম্পৃক্ততাও বাড়বে না। মানুষ ভয়ে ঘরে বন্দী থাকছেন, বাস-গাড়ি রাস্তায় বের হচ্ছে না। আবার বিরোধী দলের আহ্বানে তাঁরা রাস্তায় নেমেও আসছেন না। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে মানুষের সব আগ্রহ-মনোযোগও নির্বাচনের দিকে যাবে। বাংলাদেশে যেমন নির্বাচন বর্জনের ইতিহাস আছে, তেমনি বড় দল ছাড়া নির্বাচন করার ইতিহাসও আছে। এক-এগারোর পট পরিবর্তন না এলে কি বিএনপি নিজে থেকে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করত? অবশ্যই নয়।
চার বিভিন্ন জরিপ বলছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা আছে। সে ক্ষেত্রে তারা কেন নির্বাচন বর্জন করবে? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়া সত্ত্বেও তারা পাঁচটি সিটি নির্বাচনে জিতেছে। জিতেছে চট্টগ্রামে, কুমিল্লায় ও হবিগঞ্জ উপনির্বাচনে। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে উপনির্বাচন বা স্থানীয় নির্বাচনের পার্থক্য আছে। কিন্তু তাই বলে এখন রাতকে দিন করা যাবে না। ভোটের বাক্স উল্টানোরও সুযোগ নেই। এখন গণমাধ্যম স্বাধীন। টিভি ক্যামেরা প্রতিটি কেন্দ্রে পাহারা দেবে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা থাকবেন। এত সব সত্ত্বেও যদি সত্যি সত্যি কোনো দল জনরায় উল্টে দিতে চায়, মানুষ তখন রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ করবে। তখন জনগণকে নিয়েই বিএনপি আন্দোলন করতে পারবে। অতএব শত শত প্রতিবন্ধকতা ও বৈরিতা সত্ত্বেও বিএনপির উচিত আগামী নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজের শক্তি পরীক্ষা করা। নির্বাচনী হাওয়া তার পক্ষেই আছে। বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রতিকূল পরিবেশেই বিরোধী দল বরাবর জয়ী হয়েছে। ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন করে যুক্তফ্রন্ট জিতেছে, ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
১৯৯১ সালেও বিএনপি অনেকটা প্রতিকূল পরিবেশে নির্বাচন করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল। তাই, বর্জনের ঝুঁকিপূর্ণ পথ ছেড়ে নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ না দিয়েও বিএনপি প্রতিবাদের অংশ হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামতে পারে। তবে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার অনুকূল পরিবেশ তৈরির কাজটি ইসিকে করতে হবে। তফসিল পুনর্নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বিরোধী দল প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করতে পারে। বিরোধী দলের আটক নেতা-কর্মীদের ছেড়ে দিতে হবে। মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। যথাসম্ভব প্রশাসনের একটি নিরপেক্ষ চেহারা দিতে হবে, যাতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা আশ্বস্ত হতে পারেন। জমি পুরোপুরি সমতল না হলেও অসমতলের মাত্রাটি কমবে। প্রায় প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে, কখনো বিরোধী দলের বোমার ঘায়ে, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে। এঁদের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ, রাজনীতি না-করা মানুষ। তবু তাঁরা সন্ত্রাসের শিকার। এই অবস্থা থেকে জাতি মুক্তি চায়। আর তার একমাত্র উপায় হলো সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন। সরকার চাইছে না বিএনপি নির্বাচনে আসুক। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হোক। তাদের এই না চাওয়ার মোক্ষম জবাব হতে পারে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপির নির্বাচনে যাওয়া। জয়ের যে সম্ভাবনা তাদের হাতছানি দিচ্ছে তা হেলায় হারানো ঠিক হবে না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

রফিকুল এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক রফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তাঁর সেই পরিচয় ছাপিয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণে। কানাডাপ্রবাসী দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের তিনি ছিলেন অন্যতম, যিনি ১৯৯৮ সালে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য জাতিসংঘসহ নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে লবিং করেছিলেন। এই মিশনে তাঁর অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন আবদুস সালাম। তাঁরা ছিলেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রচলনের উদ্যোগী। শুধু বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়েই তাঁদের সাফল্য সীমিত ছিল না। এটি করার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর অন্য নানা ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে এবং শ্রদ্ধা করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে এই ঘোষণায়। সেই দিক থেকে তাঁদের অবদান শুধু দেশের জন্য সীমিত নয়। দলের সংকীর্ণ পরিচয়ের বাইরে থেকে একটি বড় কাজ করার চিন্তা, উদ্যোগ এবং সেই কাজে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসের সহযোগিতা পাওয়া এক বিরল ঘটনা। দলের লোক না হলে বাংলাদেশে কোনো নির্দল লোকের অতি ছোট আইডিয়াও সরকারের আনুকূল্য লাভ করে না। তাঁদের এই উদ্যোগ ও সাফল্য বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, যাঁরা সংগ্রাম করেছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের পাশাপাশি এই দুজন বিশিষ্টজনের অবদানও স্মরণীয়। রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম মাতৃভাষা বাংলা ও মাতৃভূমির জন্য তাঁরা তাঁদের সাধ্য অনুযায়ী করেছেন। কিন্তু তার ফলোআপ হিসেবে আমরা কি আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি? আমাদের কোনো সরকার কি সেই দায়িত্ব পালন করেছে? আমরা হচ্ছি অনুষ্ঠানপ্রিয় জাতি, বক্তৃতাপ্রিয় জাতি। রফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে আমরা আনুষ্ঠানিকতা ও বক্তৃতা করার কোনো সুযোগ ছাড়িনি। তাঁদের জন্য বিষয়টার এখানেই হয়তো সমাপ্তি। কিন্তু কাজটা তো আরও অনেক বড় ছিল। ২০০০ সালে দৈনিক ভোরের কাগজ-এর শহীদ দিবস সংখ্যায় এই বিষয়ে সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনার একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এটা কারও নজরে এসেছিল কি না, জানি না। নজরে এলেও কিছু হতো কি না, আমার সন্দেহ। কারণ, বাংলাদেশে কী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, কে প্রস্তাব দিয়েছে। এটাই আমাদের দূষিত রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। সেদিন কী প্রস্তাব দিয়েছিলাম, একালের পাঠকের জন্য তার সারকথা আবার তুলে ধরছি। জাতিসংঘ প্রস্তাব পাস করেই তাদের দায়িত্ব পালন করেছে।
জাতিসংঘের এ রকম অসংখ্য ‘দিবস’ রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান দিবসের পেছনে না থাকলে তা জাতিসংঘের নথিতেই পড়ে থাকত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হবে ইউনেসকো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাস ইউনেসকোতে অব্যাহত লবিং করে এ ব্যাপারে ইউনেসকোকে সক্রিয় করতে হবে। ইউনেসকোর চিঠি ও অনুরোধে অন্যান্য দেশকেও সক্রিয় করা যায়। বাংলাদেশের দায়িত্ব হবে ইউনেসকোকে এই বিষয়ক লেখা, ছবি, ভিডিও ও পোস্টার ডিজাইন দিয়ে সহায়তা করা। ইউনেসকোর মাধ্যমে প্রত্যেক দেশের সরকারকে অনুরোধ করা যায়, তাদের দেশের স্কুল পাঠ্যবইতে বা সহ-পাঠ্যবইতে একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত রচনাকে স্থান দিতে। যে রচনায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কোথায় কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল, মাতৃভাষার গুরুত্ব কী, মাতৃভাষা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন কেন ইত্যাদি বক্তব্য থাকবে। যাতে পৃথিবীর নানা দেশের একজন স্কুলছাত্র জীবনের প্রারম্ভেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব অনুভব করতে পারে। আমরা অনেকেই আমেরিকাকে চেনার আগেই স্কুল পাঠ্যবই পড়ে ১ মে শিকাগো নগরের হে মার্কেটে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল তা জানতে পেরেছিলাম। এভাবে বাংলাদেশকে না চিনেও পৃথিবীর নানা দেশের স্কুলছাত্ররা স্কুলের পাঠ্যবই পড়ে ‘ঢাকা’ ও একুশে ফেব্রুয়ারিকে জানতে পারবে। ইউনেসকোকে দিয়ে চেষ্টা চালাতে হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
সার্ক দেশগুলোতে আমরা নিজেরা এই চেষ্টা চালাতে পারি। এটা নিছক বাংলাদেশের প্রস্তাব নয়। এটা জাতিসংঘ-স্বীকৃত একটি দিবস। কাজেই বাংলাদেশের পক্ষে লবিং করা অনেক সহজ হতো। সার্কের পর আশিয়ান দেশগুলোয় বাংলাদেশ চেষ্টা চালাতে পারত। কাজটা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ ও পোশাকশিল্প ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর কিছুই ইতিবাচকভাবে পরিচিত নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস একটি ইতিবাচক পরিচিতি হতে পারত। ক্ষুদ্রঋণ বা পোশাকশিল্প দুটোই প্রাইভেট সেক্টরের, এতে সরকারের ভূমিকা খুব সামান্য। এখন তৃতীয় যে ইস্যুটা আমরা পেয়েছি, তার প্রচারে সরকার একটা বড় প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে। এই অর্জনটাও পুরোপুরি সরকারের নয়। তবু সরকার এই অর্জনে ভাগ বসাতে পারে। কারণ, সরকার এই কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তবে সরকার প্রকৃত কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে যদি বিশ্বব্যাপী একুশে ফেব্রুয়ারিকে পরিচিত করতে পারে। শুধু বক্তৃতা দিয়ে বা ফিতা কেটে এটা সম্ভব হবে না। এর জন্য দরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা, দক্ষ লোকদের টিম, বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ, মনিটরিং ইত্যাদি। ২০১৪ সালে এই কাজ শুরু করলে ২৫ বছরের মধ্যে একটা দৃষ্টিগ্রাহ্য ফল পাওয়া যেতে পারে।
যদি সরকার এ ব্যাপারে কাজ করতে আগ্রহী হয়, তাহলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ জন্য একটা সেল তৈরি করতে হবে। যেটা তাদের সার্বক্ষণিক কাজ হবে। তার আগে দরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত। সরকার একটা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট করেছে। গত কয়েক বছরে তাদের অবদান কী, তা-ও দেশবাসীর অজানা। এই ইনস্টিটিউট গঠন করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই ইনস্টিটিউটের কাজ বাংলা একাডেমির একটি নতুন বিভাগও করতে পারত। মনে হয় সরকারের টাকার অভাব নেই। তা দেখে ভরসা হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সেল গঠন করা অসম্ভব কোনো কাজ হবে না। আমাদের প্রস্তাবটি সরকার ভেবে দেখতে পারে। এভাবেই আমরা মাতৃভাষা বাংলা, একুশের শহীদ ও প্রয়াত রফিকুল ইসলামের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা দেখাতে পারব। প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও তাঁর সহযাত্রী আবদুস সালাম তাঁদের কাজ করেছেন। আসুন, আমরা এবার আমাদের দায়িত্ব পালন করি। সম্প্রতি বাংলা একাডেমিতে ‘হে উৎসব’ নামে বিদেশি সাহিত্যের একটা আন্তর্জাতিক উৎসব হয়ে গেল। এর উদ্যোক্তা দ্য ডেইলি স্টার ও কয়েকটি সংস্থা। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ভাবমূর্তি বাড়ানোর জন্য এ ধরনের উৎসবের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষায় সৃজনশীল লেখার লেখকের সংখ্যা খুবই কম। আজ কম বলে ভবিষ্যতে কম থাকবে, এমন মনে করার কারণ নেই। হে উৎসব ও ইংরেজি দৈনিকের সাহিত্য পাতা ইংরেজি ভাষায় সৃজনশীল লেখকদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। এ রকম চর্চা চলতে থাকলে একদিন বাংলাদেশের লেখকদের ইংরেজি ভাষায় রচিত সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম বা বই এশিয়ায় ও অন্যান্য মহাদেশের পাঠকদের কাছে সমাদৃত হতে পারে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের মাতৃভাষার সৃজনশীল সাহিত্য বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু আমাদের মান অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে আমাদের পরিচিতি নেই বললেই চলে। এর প্রধান কারণ আমাদের উন্নত মানের সাহিত্য ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষায় তেমন অনূদিত হয়নি। এ ব্যাপারে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ নেই বললেই চলে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও এ নিয়ে কোনো সরকার কোনো পরিকল্পনাও গ্রহণ করেনি। আমাদের প্রস্তাব: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে সাহিত্য ও উচ্চতর পাঠ্যবইয়ের অনুবাদকর্মের জন্য ঢেলে সাজানো হোক। বাংলাদেশের নির্বাচিত সৃজনশীল সাহিত্য প্রতিবছর ইংরেজি, ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদের কর্মসূচি গ্রহণ করা হোক। অনূদিত বই বিদেশি প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে প্রকাশ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এভাবে কাজটা শুরু হোক। ক্রমে তা বড় একটি অনুবাদ প্রকল্পে পরিণত হতে পারে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

বাংলাদেশ কী পাবে?

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অতীতে বিভিন্ন সময়ে যথেষ্ট দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সম্মেলন ঘিরে আগ্রহ, উৎসাহ ও উত্তেজনা কোনোটিই কম ছিল না। সিয়াটল (১৯৯৯), দোহা (২০০১), কানকুন (২০০৩) বা হংকং (২০০৫) সম্মেলনের কথা স্মরণ করলেই তা বোঝা যায়। আর তাই আগামী ৩ থেকে ৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নবম সম্মেলন ঘিরে আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, বালি সম্মেলন কি তেমন উত্তেজনাকর হবে? বাংলাদেশই বা এই সম্মেলন থেকে কী পাবে? ডব্লিউটিওর নিয়ম অনুসারে দুই বছর পর পর সদস্যদেশগুলোর বাণিজ্যমন্ত্রীরা একটি সম্মেলনে মিলিত হয়ে থাকেন। এতে বিশ্ব বাণিজ্যের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। তবে ২০০১ সালে দোহা পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকে এই সম্মেলন নতুন মাত্রা পায়। যেমন, ২০০৫ সালের সম্মেলনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ এলডিসির জন্য বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। বালিতে এলডিসির প্রথম বিষয়টি হলো কোটামুক্ত ও শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা। ডব্লিউটিওর গোড়াপত্তন থেকেই এলডিসিগুলোর প্রধান দাবি হলো, এই বাজারসুবিধা যা থেকে বাংলাদেশও বড় আকারে উপকৃত হতে পারে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন উন্নত দেশ এলডিসিগুলোকে অবাধ বাজারসুবিধা দিয়েছে। যেমন, ২০০১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর ২০০২ সালে কানাডা। ডব্লিউটিওর হংকং সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল উন্নত দেশগুলো তাদের ট্যারিফ লাইনের অন্তত ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রে এলডিসিগুলোকে অবাধ বাজারসুবিধা দেবে।
বাস্তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদে সব উন্নত দেশই এলডিসিগুলোকে প্রায় পূর্ণ বাজারসুবিধা দিয়ে দিয়েছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে ২০০৫ সালের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যারা সামর্থ্যবান, তারাও যেন এই সুবিধা দেয়, সে সিদ্ধান্তও ছিল; যদিও অনেক দেশই তা সীমিত পরিসরে দিয়েছে। সম্প্রতি জেনেভায় এই বাজারসুবিধার বিষয়ে এলডিসিগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাওয়া আফ্রিকার কয়েকটি দেশ অভিযোগ করেছে, এশিয়ার এলডিসিগুলোকে যদি একই রকম বাজারসুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। যখন বলা হলো, পণ্য পার্থক্যের কারণে আমাদের (বাংলাদেশ) সঙ্গে আফ্রিকার দেশগুলোর তেমন কোনো প্রতিযোগিতা নেই, তখন পাল্টা যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে তাদের নতুন ও সম্ভাবনাময় পণ্য এই প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। তবে এই যুক্তি সঠিক নয়। বালি সম্মেলন থেকে আমরা সর্বোচ্চ এটুকুই আশা করতে পারি, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের দেওয়া বাজারসুবিধার পরিধি বাড়ানো এবং তা ডব্লিউটিওর তদারকির মধ্যে আনার বিষয়ে সমঝোতা। এটা অবশ্য প্রতিশ্রুতির অংশ হবে না। দ্বিতীয়ত, প্রথমবারের মতো আমরা বহুপক্ষীয় সম্মতির একটি উৎসবিধি (রুলস অব অরিজিন) পেতে পারি। এটা তিনটি পদ্ধতিতে হতে পারে: মূল্যানুপাতিক শতকরা হিসাব; এইচএস শ্রেণীকরণে পরিবর্তন; এবং সুনির্দিষ্ট উৎপাদন বা প্রক্রিয়া পরিচালন। স্বচ্ছতা ও দালিলিক প্রয়োজনীয়তার সংস্থানও থাকছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।
আমাদের রপ্তানিকারকদের এ বিষয়গুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। তৃতীয়ত, সেবা খাতে এলডিসিগুলোর সুবিধার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে হয়েছে। আগামী বছরের জুলাই মাসে সদস্যদেশগুলো একটি সম্মেলন করে জানান দেবে যে এলডিসিগুলোর জন্য কোন কোন খাত এবং কোন ধরনের সেবা সরবরাহে অগ্রাধিকার-সুবিধা দেওয়া হবে। বালিতে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হলে আমাদের জনশক্তি রপ্তানির জন্য সহায়ক হবে। বাজারসুবিধার বাইরে বাণিজ্য সহজীকরণও এলডিসিগুলোর জন্য বালি সম্মেলনে তাৎপর্যপূর্ণ হবে। গ্যাট চুক্তির তিনটি অনুচ্ছেদ পরিবর্তন এখনো সমঝোতার অপেক্ষায় রয়েছে। এগুলো হলো: পঞ্চম অনুচ্ছেদ—ট্রানজিটের স্বাধীনতা; সপ্তম অনুচ্ছেদ—আমদানি ও রপ্তানির মাশুল ও আনুষ্ঠানিকতা; এবং দশম অনুচ্ছেদ—বাণিজ্য প্রবিধানের প্রকাশনা ও প্রশাসন। সদস্যদেশগুলো একটা চুক্তি করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে এই তিনটি বিষয়ই একত্রে গাঁথা। আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে ট্রানজিটের স্বাধীনতার বিষয়টি। বিস্তারিত কার্যপদ্ধতি মোটামুটি সমঝোতা হয়ে গেছে। ট্রানজিট দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর এ বিষয়গুলো প্রভাব ফেলবে। আমাদের এ জন্য খুব সতর্ক থাকতে হবে। নতুন কাস্টমস-প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতাও তা প্রভাব ফেলবে।
যদিও এলডিসি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কিছুটা ছাড় আছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিন ধরনের সময়সীমা রাখা হয়েছে: তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন, নির্ধারিত বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন এবং উন্নত দেশগুলো থেকে কারিগরি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সহায়তা পাওয়া সাপেক্ষে বাস্তবায়ন। তবে এখন পর্যন্ত উন্নত দেশগুলো থেকে তাদের নিয়মিত সহায়তার বাইরে বাড়তি কোনো সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। আমাদের শুল্ক কর্তৃপক্ষের এই সমঝোতায় নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকা প্রয়োজন। বালি সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার কাজ চলছে। তিনটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে: বাণিজ্য সহজীকরণ, উন্নয়ন (এলডিসি ইস্যু) ও কৃষি। সদস্যরা একটা ভারসাম্যপূর্ণ সমঝোতার চেষ্টা করছে, যেন সবার স্বার্থ রক্ষিত হয়। তবে কৃষি খাতে বোঝাপড়া ছাড়া এ ধরনের কোনো সমঝোতা সফল হবে না। বাংলাদেশকে যেসব বিষয় প্রভাবিত করবে, সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। উৎসবিধি ও সেবা খাতে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন সেগুলো মসৃণভাবে বাস্তবায়ন হলেই হয়। বাণিজ্য সহজীকরণ, বিশেষত ট্রানজিটে আমাদের উদ্বেগ রয়ে গেছে। আর শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধার ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য কিছু পাচ্ছি না।
তৌফিক আলী: ডব্লিউটিওতে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের প্রধান নির্বাহী।

আইকন নই : সুচি

মিয়ানমারের বিরোধীদলীয় নেত্রী অংসান সুচি জানিয়েছেন, তিনি সেইন্ট বা পুণ্যাত্মা নন। এমনকি তিনি আইকনও নন। বৃহস্পতিবার সুচি জানান, তিনি এ ধরনের অভিধা পছন্দ করেন না। তিনি নিজেকে সব সময় একজন সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবেই দেখে আসছেন। সেলিব্রেটি অ্যাক্টিভিস্ট ও গণতন্ত্রের প্রবক্তা এই নেত্রী মিয়ানমার সামরিক শাসনামলে দীর্ঘদিন গৃহবন্দি ছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পর থেকে দেশে-বিদেশে ভক্ত-অনুরাগীদের হৃদয়ে স্থান পেয়ে এলেও নিজেকে তিনি একজন সাধারণ মানুষ মনে করেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় তার প্রথম সফরকালে সিডনিতে বলেন, ‘আমি সব সময়ই নিজেকে আইকন না, একজন রাজনীতিবিদই ভেবে এসেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সব সময়ই ‘আইকন’ শব্দটির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে এসেছি। এএফপি

Friday, November 29, 2013

‘ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়’ by সিরাজুর রহমান

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে যাত্রা ধরনের এক রকম নাটক গ্রিসে খুবই জনপ্রিয় হয়। এশিলাস, সোফোক্লিস আর ইরিপাইডিস নাট্যকারদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন।
এ নাটকগুলো সাধারণভাবেই গ্রিক ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত। নাটকগুলো উপকথা-ভিত্তিক হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। গ্রিক ট্র্যাজেডির একটা বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে ট্র্যাজেডিগুলো যে ঘটবে, আগে থাকতেই সে সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। কিন্তু ট্র্যাজেডিগুলো ঘটা প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা কেউ করেননি।

ঠিক যেন বর্তমান বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আজ সর্বনাশের গভীর খাদের একেবারে কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েছে বলা ভুল হবে। খাদে পড়ে যেতে শুরু করেছে। কিন্তু এ সর্বনাশ যারা ঠেকাতে পারতেন তারা পায়ের ওপর পা তুলে দিব্যি আয়েশে নিশ্চেষ্ট বসে আছেন। ইতিহাসে আছে, রোম যখন পুড়ছিল সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। আসলে তিনি ‘লুট’ (দোতারা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে এবং গান করে নিজের সঙ্গীত প্রতিভা জাহির করতে চেয়েছিলেন।
দেশের জনসমর্থন সরকারের পক্ষে নেই। দেশের এবং বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়ার জরিপ অনুযায়ী ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ বর্তমান সরকার এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করে না। তারা তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে না হলেও নিদেন একটা নির্দলীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন চায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গোঁ ধরে বসে আছেন। তার অধীনে এবং তার খেয়াল-খুশি অনুযায়ী তিনি নির্বাচন করবেনই করবেন, কেননা তা না হলে তিনি পাকাপোক্তভাবে গদি ও গণভবন দখল করে রাখতে পারবেন না। অন্যদিকে দেশ-বিদেশের সবাই এখন বুঝে গেছে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট কিছুতেই এই প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হতে দেবে না। তারা জানে এ ব্যাপারে দেশের মানুষ পুরোপুরি তাদের সঙ্গে আছে।
মার্কিন সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, চীন, এমনকি জাতিসংঘও বার বার বলেছে, নির্বাচন করার আগে সরকারের উচিত বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে সবার গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সামনা-সামনি তাদের ‘হ্যাঁ’ বলেছেন, কিন্তু পেছনে হাত দিয়ে দলের সমর্থকদের ইশারায় বলেছেন ‘না’। এবং বিদেশিরা সামনে থেকে সরে গেলেই তিনি বিরোধীদের টেনিস খেলার টেকনিকে ‘রং-ফুট’ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। বনানীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আদৌ কোনো বৈঠক হয়েছে কি না জানি না, কিন্তু স্পষ্টতসই সরকারি অনুপ্রেরণায় জোর প্রচারণা হয়েছে যে বৈঠক অবশ্যই হয়েছে এবং ‘মেঘের কোলে রোদ’ অবশ্যই হেসেছে। বাংলাদেশের শান্তিকামী মানুষ মনে মনে খুবই আশাবাদী হয়েছিল।
এদিকে শেখ হাসিনা তার মহাজোটের ভেতরেই ঘুঁটি চালাচালি করে নতুন কয়েকজন মন্ত্রী এবং ১১ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করে ঘোষণা দিলেন যে, তিনি একটা ‘সর্বদলীয়’ নির্বাচনী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। বাংলাদেশের সবচাইতে কম শিক্ষিত মানুষটিও আপনাকে বলে দেবেন, তার নিজের জোটের তিন দল থেকে কয়েকজনকে মন্ত্রী নিয়োগ করলে সেটাকে সর্বদলীয় বলা যায় না। খালেদা জিয়া তার ১৮ দলের জোটের প্রতিনিধিদের নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কাছে আপিল করতে গেলেন। তাদের দাবি ছিল নির্বাচনী পদ্ধতি সম্বন্ধে সংলাপ এবং সমঝোতা হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা বিলম্বিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট যেন ইলেকশন কমিশনকে নির্দেশ দেন। জনাব আবদুল হামিদ তাদের হতাশ করলেন, প্রমাণ করলেন যে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চাইতে তিনি আওয়ামী লীগ দলীয় প্রেসিডেন্ট হওয়াই বেশি পছন্দ করেন।

মারাত্মক নির্বাচনী তফসিল
ভেতরে ভেতরে তিনি শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেন এবং তার পরপরই সরকারের ক্রীড়নক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ গত সোমবার রাত সাড়ে সাতটায় বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে ভাষণ দিয়ে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেন। এরপর যা হয়েছে তা থেকে বিরোধী দল ও জোট সম্বন্ধে একটা সঠিক বর্ণনা পাওয়া যায়। সিইসির ভাষণের পরপরই জোট ও বিএনপির নেতা খালেদা জিয়া নেতাদের একটা বৈঠক ডাকেন। আরও পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের মারফত ঘোষণা দেন যে মঙ্গল ও বুধবার বিএনপি ও ১৮ দলের জোট দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি পালন করবে।
লক্ষণীয় যে, মাত্র দিনদুয়েক আগেও খালেদা জিয়া এবং অন্য নেতারা পরিষ্কার বলেছিলেন, সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলে তারা লাগাতার হরতাল এবং সড়ক, রেল ও নদী পরিবহন অবরোধ করবেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এবার আর ভুল করেনি। তারা নেতাদের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে তফসিল ঘোষণার পরপরই, অর্থাত্ সোমবার রাত আটটা থেকেই অবরোধসহ সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কর্মসূচি শুরু করে। এ সংক্রান্ত সর্বোচ্চ তিতন ব্যক্তি, অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও সিইসির অন্যায্য এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের প্রতিকারের দায়িত্ব বিরোধী দলের নেতাদের ওপর সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিয়ে নিজেদের হাতেই তুলে নিয়েছে জনতা। আমার মনে হয় এ ব্যাপারটি থেকে বিএনপির কোনো কোনো নেতা শিক্ষা নিতে পারলে উপকৃত হবেন। তাদের বুঝতে হবে, নেতা হতে হলে জনতার সামনে থাকতে হবে, পেছনে থেকে নেতা হওয়া যায় না।

যে শিক্ষা সরকারকে জরুরিভাবে নিতে হবে
বাংলাদেশের সর্বত্র হরতাল ও অবরোধ চলছে। দেশের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যানবাহন ভাংচুর এবং সম্পত্তি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং দলীয়কৃত পুলিশ ও র্যাব মানুষ খুন করছে, জখম করছে, রক্ত ঝরাচ্ছে। ভুয়া অভিযোগে পুলিশ যাকে পাচ্ছে তাকেই গ্রেফতার করছে।
সরকারকেও বড় একটা শিক্ষা নিতে হবে সোমবার রাতের ঘটনাগুলো থেকে। তারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেককে গ্রেফতার করে রেখেছে, গ্রেফতারের ভয়ে অন্যরা পলাতক আছে। সরকার ভেবেছিল বিএনপির নেতৃত্বকে দুর্বল করে ফেলা হলেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ভেস্তে যাবে। এখন তাদের বুঝে নেয়া উচিত যে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে, অন্তত নির্দলীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন সত্যিকারের একটা গণদাবি, শুধু খালেদা জিয়ারই নয়।
সরকারের গলাবাজ প্রচারবিদরা বিদেশিদের চোখে ধুলো দেয়ার কোনো চেষ্টারই ত্রুটি রাখবে না। কিন্তু সেটা অরণ্যে রোদনেরই শামিল হবে। বিদেশিদের চোখ হাসিনার গুপ্তচরদের চাইতেও বেশি তীক্ষষ্ট। মাত্র চার দিন আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট একটা সর্বসম্মত প্রস্তাবে সংলাপের ভিত্তিতে সবার গ্রহণযোগ্য একটা স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার দাবি জানিয়েছে। তার দু’দিন আগে (২০ নভেম্বর) মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র কমিটিও এক আলোচনা সভায় একই দাবি জানিয়েছে। এ কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান স্টিভ শ্যাভোট কিছুদিন আগেই স্বচক্ষে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখে গেছেন।
একই তারিখে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা এক সম্পাদকীয় প্রবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কটের জন্য শেখ হাসিনাকেই দায়ী করেছে। পত্রিকাটি ২০১১ সালে সংবিধান পরিবর্তন, মানবাধিকারের চূড়ান্ত অবমাননা, তথাকথিত আন্তর্জাতিক আদালতে রাজনৈতিক বিচার এবং বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য শেখ হাসিনার গদি-লিপ্সাকেই দায়ী করেছে। তাত্পর্যপূর্ণভাবে পত্রিকাটি বাংরাদেশের বিরুদ্ধে অবরোধের সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিয়েছে। তাত্পর্যপূর্ণভাবেই চীনও ‘স্বাধীন ও সমৃদ্ধ’ বাংলাদেশ দেখতে চায় বলে জানিয়েছে।

বাংলাদেশ কি উত্তর কোরিয়া হয়ে যাবে?
বিগত প্রায় পাঁচ বছরে সরকার বিদেশি দাতা ও বন্ধুদের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করেছে তাতে বাংলাদেশ বিশ্ব সমাজে উত্তর কোরিয়ার মতোই একঘরে ও অচ্ছুত হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। প্রথমেই বিচার-বহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকারের অবমাননার নিন্দায় বিশ্ব সমাজ সোচ্চার হয়েছে। শেখ হাসিনা তার স্বভাব-সুলভ গোঁয়ার্তুমি দিয়ে কারও পরামর্শই শোনেননি। ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবি জানিয়েছে ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তার এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে বিশ্ব সমাজ, বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসন ও নেতাদের তিনি রীতিমত অপমান করেছেন। পদ্মা সেতু দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারে বাধা দিয়ে ঋণদাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর ক্রোধের উদ্রেক করা হয়েছে। এখন আবার রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের জন্য সংলাপের ব্যাপারে তিনি ভারত ছাড়া গোটা বিশ্বের উপদেশ ও পরামর্শকে উপেক্ষা করে তাদের প্রতি অসৌজন্য দেখিয়েছেন।
বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। একমাত্র চীন ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গেই উত্তর কোরিয়ার সদ্ভাব কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। চীনও এখন উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে অস্বস্তি দেখাচ্ছে। বাংলাদেশেরও হয়েছে সেই দশা। ভারত ছাড়া আর কোনো দেশ ঢাকার সরকারের ওপর প্রীত নয়। বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিচার না হলে বিশ্বব্যাংক সেতুর অর্থায়ন করতে অস্বীকার করেছে। ক্রমে ক্রমে অন্যান্য দেশ থেকেও ঋণ সম্পূর্ণ থেমে না গেলেও কমে আসবে। সেই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও।
সরকারের ভ্রান্ত নীতি, বিশেষ করে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অবিমৃশ্যকারিতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। বিদেশি রেমিট্যান্স হু-হু করে পড়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে অস্বীকার করছে বাংলাদেশকে। এদিকে দেশের ভেতরের সম্পদও লুটপাট হয়ে মালয়েশিয়া, দুবাই এবং লন্ডনে সম্পত্তিতে লগ্নি হয়ে গেছে। বর্তমান দুর্বৃত্ত সরকারকে গদিচ্যুত করা না হলে দেশ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিন্তু তাতে শেখ হাসিনার কী এসে যায়? তিনি দেশটাকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা করেছেন বলেই মনে হয়।
সিরাজুর রহমান

নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলেও সেনা মোতায়েন হচ্ছে না by ফারুক হোসাইন

নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলেও সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে না। সেনাবাহিনী নামিয়ে আন্দোলন ঠেকিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টায় সিইসি সেনা মোতায়েন করতে চাচ্ছেন।
এনিয়ে ইসিতে দফায় দফায় মিটিং করা হয়। সরকারের ইংগিতে কমিশন এ ব্যাপারে একমত হয়। কিন্তু গতকাল স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবির মহাপরিচালক, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং অন্য বাহিনী ও বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সিইসি জানান, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে না। আপাতত নির্বাচনের মাঠে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার ও কোস্টগার্ড থাকবে। চলমান আন্দোলন ঠেকাতে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর ইসির আগ্রহের কঠোর সমালোচনা করেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের নামে ইসি দেশপ্রেমী সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি নামাতে চায়। সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ সম্প্রতি এক টেলিভিশন টকশোতে নির্বাচনের অনেক আগেই সেনা মোতায়েনে ইসির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, এতো আগে সেনাবাহিনী নামানো হলে তাদেরকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে। সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর সিইসির অতি আগ্রহে বিস্ময় প্রকাশ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজনের) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একতরফা নির্বাচনে সেনাবাহিনী জড়ালে জনগণ মনে করবে, তারা একটি পক্ষ নিয়েছে। আমরা আমাদের এই বাহিনীকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে চাই। একতরফা নির্বাচনে দীর্ঘমেয়াদে সেনা মোতায়েন হলে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের প্রশ্ন উঠবে। একতরফা একটি নির্বাচনে দীর্ঘমেয়াদে সেনা মোতায়েন করা হলে এটা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে কাক্সিক্ষত না-ও হতে পারে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন একদলীয় নির্বাচনের ফলে জনরোষ থেকে রক্ষা পেতে সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করে তাদের বিতর্কিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিরোধী দলের আন্দোলন কর্মসূচিতে সারাদেশ অচল ও স্থবির হয়ে পড়ায় পাতানো নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন কমিশন সদস্যরা। বিরোধী দলের আন্দোলন রোধে তাই আগেভাগেই সেনা মোতায়েনের কৌশল গ্রহণ করেছিলেন তারা। তবে কমিশন সদস্যরা সেনা মোতায়েনে আগ্রহ প্রকাশ করলেও মোতায়েন করা হচ্ছে না সেনাবাহিনী। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ইসির প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একতরফা নির্বাচনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে নামানোর চেষ্টা সফল হয়নি।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ কলকাতার ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান এখন নেই। এই মুহূর্তে এমন কোনো জেনারেল বা সেনা কর্মকর্তা নেই যার অভ্যুত্থানের খায়েশ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলার জনগণ মেনেও নেবে না। তিনি বলেন, আমাদের দেশের সুশীল সমাজের একটি অংশ ক্ষমতায় যেতে চায়, কেননা সেনা সমর্থনেই তাদের ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি হওয়া সম্ভব। আর এরাই সামরিক হস্তক্ষেপের কথা বলছে। কিন্তু একটি অভ্যুত্থান সফল করতে হলে ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার জন্য আগে শেখ হাসিনার নাগাল পেতে হবে। তিনি বলেন, যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন- গণভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন তারা সবাই শেখ হাসিনার অত্যন্ত বিশ্বস্ত। তারা কাউকে সুযোগ দেবে না। প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের মুখে হঠাৎ এধরনের বক্তব্য শুনে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন।
হঠাৎ করে সকলকে অবাক করে দিয়ে নির্বাচন কমিশন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশ জুড়ে চলছে আন্দোলন। বিরোধীদলের আন্দোলনে অচল হয়ে পড়েছে সারাদেশ। পাতানো নির্বাচন ঠেকাতে পথে নেমে এসেছে সারাদেশের মানুষ। তিন দিনের অবরোধে সারাদেশ থেকে ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কর্মসূচিতে পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় নিহত হয়েছে বিজিবি সদস্যসহ ১৮জন। সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জার্মানীসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র। আর তাই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই সহিংসতা ও অচলাবস্থায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে ইসি। সহিংসতা ঠেকাতে ও জনগণের আন্দোলন প্রতিহত করতেই আগেভাগে সেনা মোতায়েনের চেষ্টা করেন কমিশন সদস্যরা। দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী প্রথম বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দেশজুড়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। তার এই ঘোষণার পর থেকেই সেনা মোতায়েনের বিষয়টি ঘুরপাক খেতে থাকে। এ নিয়ে ইসির কয়েকটি সভায় আলোচনাও হয়। সাংবাদিকরাও বিষয়টি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের কাছে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে জানতে চান।
এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই গত সোমবার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৫ জানুয়ারি রোববার ভোট নেওয়া হবে। তফসিল ঘোষণার পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে টানা ৭১ ঘণ্টার রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। রাজধানীসহ সারাদেশেই রাজপথে নেমে আসে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। শুরু হয় হামলা, ভাঙচুর ও প্রতিরোধ। অবরোধে সহিংসতায় সারাদেশে নিহত হয়েছেন বিজিবি সদস্যসহ ১৮জন। বিরোধীদলের অবরোধ কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ও জান-মালের ব্যপক ক্ষতির কারণে বিপাকে পড়ে যায় ইসি। সহিংসতা এড়ানোর পন্থা খুঁজতে গত বুধবার অবরোধের দ্বিতীয় দিন তিন দফা বৈঠকে বসেন তারা। ইসি সূত্রে জানা যায়, ইসির এই বৈঠকগুলোয় প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা ছিলো আন্দোলন ঠেকাতে সেনা মোতায়েন করা। বুধবার বৈঠকে কমিশনের সদস্যদের সবাই সেনাবাহিনী নামানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। আর তাই ওই দিনই কমিশন সদস্যরা ঘোষণা করেন প্রয়োজনে আগেই সেনাবাহিনীকে নামানো হবে। কমিশনের এই ঘোষণার পর থেকেই তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও বুদ্ধিজীবীরা। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ এবং অন্যান্য কমিশনাররা ছাড়াও উপস্থিত আছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবির মহাপরিচালক সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপ্যাল স্টাফ অফিসার সহ সংশ্লিষ্টরা।
ইসির বৈঠক : জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে এক্ষুণি সিদ্ধান্ত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ইসির এক বৈঠকে গতকাল এই সিদ্ধান্ত হয়। কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রসচিব সি কিউ কে মোশতাক, পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার, র‌্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু বেলাল মো. শফিকুল হক এবং অন্য বাহিনী ও বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কবে থেকে সেনা মোতায়েন করা হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে সিইসি বলেন, সেনা মোতায়েনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠকে। সাধারণত মনোনয়ন প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আগামী ১৩ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। সে হিসেবে ১৩ ডিসেম্বরের আগে সেনাবাহিনী মোতায়েন হচ্ছে না। কাজী রকিব বলেন, আপাতত নির্বাচনের মাঠে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার ও কোস্টগার্ড থাকবে। তবে নির্বাচন যেহেতু এক দিনে হবে তাই নিয়মিত বাহিনীর পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তাই আগে যেমন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। একতরফা নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে নামানো হলে বাহিনীটি বিতর্কিত হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না, বিতর্কের কিছু নেই। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন যেমন চাইবে তারা সব সময় তেমন সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। সিইসি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার আশা এখনো ছাড়িনি। সমঝোতা হলে সব দলের অংশ গ্রহণের মধ্য নিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।

আরো বেগবান হয়ে রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ

থাইল্যান্ডে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে চাপের মুখে থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা গতকাল বৃহস্পতিবার থাই পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে জয়লাভ করেছেন।
বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব আনলেও ইংলাকের দল ফিউ থাই পার্টি সহজে ভোটে জয়লাভ করে। ইংলাক সরকার ২০১০ সালের সহিংসতার পর থাইল্যান্ডের বৃহত্তম সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছে। জাতিসংঘের প্রধান বান কি মুন দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। বান কি মুন দেশটির সব দলকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার এবং আইন ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর অনুরোধ জানান। রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি অনলাইন।

গত রোববার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা দেশটির বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কার্যালয় দখল করে প্রতিবাদ করে। তাদের দাবি, ইংলাক তার ভাই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার নির্দেশমতো দেশ পরিচালনা করছেন। ইংলাক সিনাওয়াত্রার সরকারের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলন আরো বেগবান হয়েছে। গত বুধবার রাজধানী ব্যাংককের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। হাজার হাজার সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারী ইতোমধ্যে ব্যাংককে মোট ১৪টি মন্ত্রণালয় এবং বেশ কয়েকটি সরকারি দফতর অবরোধ করেছে। গত বুধবার অন্তত ১৯টি প্রাদেশিক সরকারের কার্যালয়ের বাইরেও জড়ো হয় হাজারো বিক্ষোভকারী। তবে এখনো পর্যন্ত এই আন্দোলন অহিংস রয়েছে।
বতর্মান প্রধানমন্ত্রীর নির্বাসিত ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ২০০৮ সালে দুর্নীতির দায়ে কারাদ- দেন আদালত। তাকে দায়মুক্ত করতে পার্লামেন্টে একটি বিল পাসের চেষ্টা করেন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। এর প্রতিবাদে গত রোববার শুরু হয় বিক্ষোভ। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারি কার্যালয় অবরোধ করেছে বিক্ষোভকারীরা। পার্লামেন্ট ভবন অবরোধেরও পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকার হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে, আন্দোলনকারীদের পার্লামেন্ট ভবন অবরোধের সুযোগ দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর মহাসচিব সুরানন্দ ভেজ্জাজিভা বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের দমনে সেনা নামানোর পরিকল্পনা সরকারের নেই। শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিক্ষোভ চলছে। পুলিশই তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ করার অভিযোগে বিরোধী নেতা সুথেপ থাংসুবানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা সুথেপ ইংলাকের সরকারকে উৎখাত করতে ও সরকারি সব মন্ত্রণালয় দখল করে নেয়ার জন্য সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সরকারি কর্মকর্তাদের প্রয়োজনে কারফিউ জারি করার বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন। তবে তিনি তাদের সতর্ক করে এও বলেন, সবার উচিত আইন মেনে চলা ও জনতার আইন ব্যবহার না করা। ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে থাকসিন ক্ষমতাচ্যুত হন। তখন থেকে থাইল্যান্ডে বেশ কয়েকবার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। প্রথমে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে তা সহিংস রূপ ধারণ করে। ২০১০ সালের রক্তাক্ত বিক্ষোভের পর থেকে সবচেয়ে বড় ধরনের সংকট চলছে দেশটিতে।

অবরোধে লন্ডভন্ড ট্রেনের শিডিউল

তিন দিনের অবরোধে ল-ভ- হয়ে গেছে ট্রেনের সিডিউল। প্রতিটি ট্রেন চলছে দেরিতে। এর মধ্যে কোনটা ১৩/১৪ ঘন্টা দেরিতে গন্তব্যে এসে পৌঁছাচ্ছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহের রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে ৩৭ ঘন্টা পর। গতকালও ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নাটোর ও বগুড়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। অবরোধের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তির সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একই সাথে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন রেল কর্মী ও যাত্রীরা। আতঙ্কের মধ্যে কাটছে রেল কর্মীদের দিন। চলার পথে কখন কোথায় দুর্ঘটনা ঘটে সে আশংকায় তাদের পরিবার পরিজনদেরও ঘুম হারাম হয়ে গেছে। নাশকতারোধে রেল কর্তৃপক্ষ যে নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলছে তা মানতে নারাজ রেল কর্মীরা। তাদের মতে, পর্যাপ্ত ট্রালভ্যান না থাকায় সামান্যতম নিরাপত্তাও দিতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ। বিশেষ কিছু স্থানে পাইলট (জরুরী ইঞ্জিন) রাখা হলেও তা কার্যক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অবরোধের তৃতীয় দিনে নওগাঁর আত্রাইয়ের থাওয়াই পাড়া এলাকায় ও ২৪৮ নম্বর ব্রিজের কাছে বুধবার রাতে ৩২ ইঞ্চি রেলপাত কেটে ফেলায় হয়। এতে সৈয়দপুরের সঙ্গে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনার সঙ্গে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সকল প্রকার রেল যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয়  রেল প্রকৌশলী বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন জানান, অবরোধকারীরা রাতের অন্ধকারে নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার থাওয়াই পাড়া এলাকায় ৩২ ইঞ্চি রেলপাত কেটে ফেলে। রেলকর্মী মাহমুদু হাসান ভোর রাতে রেললাইন কাটা দেখতে পেয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে সংবাদ দেয়। খবর পেয়ে রেলকর্তৃপক্ষ সান্তাহার থেকে প্রয়োজনীয় লোকবল ও সরঞ্জামাদি নিয়ে গিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রেললাইনের কাটা অংশ মেরামত করে। এর ফলে রেল যোগাযোগ পুনরায় স্বাভাবিক হয়। এই রেললাইন কাটার ফলে সৈয়দপুরের সঙ্গে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনার রেল যোগাযোগ প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা বিছিন্ন ছিল। অন্যদিকে, কুমিল্লার অশোকতলা রেল ক্রসিংয়ের ২০০ গজ দক্ষিণে উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন ও দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। বুধবার দিবাগত রাত সোয়া একটায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর থেকে চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। কুমিল্লার স্টেশনমাস্টার সফিকুর রহমান জানান, ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুটি বগির কয়েকজন যাত্রী সামান্য আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া আটটার দিকে বিকল ইঞ্জিনটি উদ্ধার করে মেরামত করা হয়েছে। অপরদিকে, বগুড়ায় অবরোধকারীরা রেললাইন উপড়ে ফেলায় ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোররাতে বগুড়ার সাবগ্রামের ছাতিয়ান তলায় ৭২ ফুট রেলের লাইন উপড়ে ফেলেছে অবরোধকারীরা। এতে বগুড়ার সব রুটের রেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকটি স্টেশনে আটকা পড়েছে চারটি ট্রেন। এরফলে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার ট্রেনযাত্রী।  রেলওয়ে সূত্রে জানায়, ভার রাতে অবরোধকারীরা বগুড়ার সাবগ্রামের ছাতিয়ান তলায় ৭২ ফুট রেললাইন উপড়ে ফেলায় বগুড়ার সঙ্গে লালমনিরহাট ও সান্তাহারের ট্রেন চলালচ বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে লালমনিরহাট এক্সপ্রেস, করতোয়া এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস ও  কলেজ ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে।
গত তিন দিনে রেলপথ অবরোধের কারণে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে ট্রেনের সিডিউল। কমলাপুর স্টেশন সূত্র জানায়, গতকাল প্রতিটি ট্রেনই দেরিতে কমলাপুর স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা সুবর্ণ এক্সপ্রেস ৪ ঘন্টা, ওয়ান আপ মেইল ১৩ ঘন্টা, রংপুর এক্সপ্রেস ১১ ঘন্টা, একতা ৫ ঘন্টা দেরিতে কমলাপুর স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। একইভাবে পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলোও ৪ থেকে ১০ ঘন্টা দেরিতে চলাচল করছে। এতে করে ট্রেনের যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ট্রেন চালক (এলএম) জানান, তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিউটি করছেন। পরিবার পরিজনও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষ যেভাবে নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলছে বাস্তবে তার কিছুই হচ্ছে না। রেল পুলিশের কোন ট্রলিভ্যান না থাকায় সব ট্রেনই চলছে সীমাহীন ঝুঁকি নিয়ে। ট্রলি থাকলে ট্রেনের আগে তা চালিয়ে নিয়ে রেল লাইন ঠিক আছে কি না তা জানা যেতো বলে একজন চালক জানান। তার মতে, প্রতিটি ট্রেনের আগে একটা ট্রলি বা ছোট আকারের কোন যান রেলের উপর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে গেলে অন্তত দুর্ঘটনা থেকে রেহাই মিলতো। ওই চালক বলেন, রেল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বলতে আমাদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, “দেখে শুনে সতর্কতার সাথে যান”। আমরা যেভাবে চলি তাতে দেখে শুনে যাওয়ার কোন উপায় নেই। এমতাবস্থায় আমরাও নিরাপত্তাহীন, যাত্রীরাও বটে।